Showing posts with label খাগড়াছড়ি. Show all posts
Showing posts with label খাগড়াছড়ি. Show all posts

Friday, April 25, 2025

মুক্তি পেলেন খাগড়াছড়িতে অপহৃত চবি’র ৫ শিক্ষার্থী

খাগড়াছড়িতে অপহরণের ৭ দিন পর মুক্তি পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী। গতকাল বুধবার মুক্তি পেলেও আজ  বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) বিষয়টি জানাজানি হয়। দুপুরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রিবেক চাকমা। শিক্ষার্থীরা হলেন- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য রিশান চাকমা, চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী মৈত্রীময় চাকমা, নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী দিব্যি চাকমা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের লংঙি ম্রো এবং চারুকলা বিভাগের অলড্রিন ত্রিপুরা। তারা প্রত্যেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অপহরণের প্রথম দিনই অটোরিকশা চালককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে অপহৃত শিক্ষার্থীরা বিঝু উপলক্ষ্যে বন্ধুদের সাথে খাগড়াছড়ি বেড়াতে আসলে বুধবার (১৬ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৬টায় জেলা সদরের গিরিফুল নামক এলাকা থেকে তাদেরকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়।

শিক্ষার্থীদের অপহরণের পর থেকে তাদের উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযানে নামে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী। এ অভিযানের মধ্যেই গত সোমবার জেলা সদরের ভাইবোনছড়া এলাকায় ইউপিডিএফের গোপন আস্তানার সন্ধান পায় যৌথবাহিনী। এসময় তল্লাশি চালিয়ে আস্তানা থেকে চাঁদা আদায়ের রশিদ, সামরিক ইউনিফর্ম, ল্যাপটপ, মোবাইলসহ বিপুল প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
অপহৃত শিক্ষার্থীরা মুক্ত হওয়ায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সদস্যরা।

শিক্ষার্থীদের এ অপহরণের জন্য ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপকে দায়ী করেছে সন্তু লারমার জেএসএস সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, ৫ শিক্ষার্থী অপহৃত হওয়ার পর তাদের উদ্ধারে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। সাঁড়াশি অভিযানে তাদের গোপন আস্তানা থেকে নানান প্রশিক্ষণ সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত অভিযানের চাপে পরে সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সব সময় আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

mzamin

Tuesday, November 5, 2024

প্রাণিসম্পদের প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্প by মো. আল-আমিন

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করেছে সংস্থাটি। তবে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কীভাবে পূরণ হবে সেই তথ্য নেই সমীক্ষা প্রতিবেদনে। এ ছাড়া চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্প শেষে পঞ্চম বছর থেকে আরও বরাদ্দ বিনিয়োগ করা হবে, যার মাধ্যমে প্রায় দ্বিগুণ আয়ের কথা প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কোন খাত থেকে কী পরিমাণ আয় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। অন্যদিকে দেশে মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেশি হয় বলে সমীক্ষায় জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের আওতায় প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া ও কবুতর বিতরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

সূত্র জানায়, দেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রস্তাবটি নিয়ে সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূত্র বলছে, প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি করেছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্টাডিটির আয় ও ব্যয় বিশ্লেষণ অধ্যায়ের টেবিলে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে সেটি পূর্ণাঙ্গ নয়। এতে দেখা যায়, প্রকল্প শেষে অর্থাৎ ৪ বছর পর পঞ্চম বছর আরও অতিরিক্ত ৩৭৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হলে প্রকল্প থেকে আয় হবে ৬৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। একইভাবে পরবর্তী বছরগুলোতে অতিরিক্ত ৩২৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হলে প্রতি বছর ৬৭৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু এই আয় প্রকল্পের কোন কোন খাত থেকে কীভাবে হবে তার কোনো হিসাব প্রতিবেদনে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া এই আয়ের জন্য প্রতি বছর অতিরিক্ত যে ৩২৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে তার সংস্থান কীভাবে হবে তারও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সমীক্ষা প্রতিবেদনে নেই।
কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১১৬ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর তথ্যে থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরেও ঘাটতি থাকবে ৬২৬ কোটি ২১ লাখ টাকা। এমন প্রেক্ষাপটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাজেট সিলিংয়ের মধ্যে থেকে এই প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টে কিছু উল্লেখ নেই।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পের ৩টি কম্পোনেন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম কম্পোনেন্টটি হলো- পার্বত্য এলাকার জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ৭২ হাজার ২৭টি পরিবারকে অনুদান হিসাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী (গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ভেড়া ইত্যাদি) বিতরণ করা হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা দারিদ্র্যবিমোচনের মূল ম্যান্ডেট হলো পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ মডেলের আওতায় এই ধরনের কাজ করে থাকে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনুদান হিসেবে উপকরণ সহায়তা দিয়ে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কতোখানি ফলপ্রসূ তার জন্য ক্ষুদ্রঋণ মডেলের সঙ্গে কোনো তুলনামূলক বিশ্লেষণ সমীক্ষায় উল্লেখ নেই।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, পার্বত্য জেলার প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কিন্তু সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে পার্বত্য জেলাগুলোর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা বা ঘাটতি এবং সরবরাহের তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্টাডি রিপোর্টে সারা দেশের দুধ, মাংস এবং ডিমের চাহিদা, উৎপাদন ও প্রাপ্যতার একটি তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেশি রয়েছে এবং দুধের উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি আছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য এলাকার প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, কবুতর ইত্যাদি বিতরণের যৌক্তিকতা প্রতীয়মান হয় না বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের দ্বিতীয় কম্পোনেন্টটি হলো রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্ম আধুনিকীকরণ। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্মটি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন প্রতিষ্ঠান এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা। তাই রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্মটি উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে করতে হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের তৃতীয় কম্পোনেন্টটি হলো বান্দরবান জেলায় একটি ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলএসটি) স্থাপন করা। এই আইএলএসটি স্থাপনের বিষয়ে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে প্রস্তাব করা হলেও ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টের ডিমান্ড অ্যানালাইসিস অংশে বাংলাদেশ লাইভ স্টক ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটদের কোন কোন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ রয়েছে সেটি নেই। এসব ক্ষেত্রে কি পরিমাণ ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটের চাহিদা রয়েছে, বর্তমানে প্রতি বছর কি পরিমাণ ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য উল্লেখ নেই। ফলে অসম্পূর্ণ ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডিপিপিতে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কমিশন থেকে বেশ কিছু সুপারিশ দেয়া হয়েছে। ডিপিপি সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হবে।

Monday, September 23, 2024

ধর্মঘটে অচল রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি

পার্বত্য দুই জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে নতুন করে সংঘাতের খবর পাওয়া না গেলেও কাটেনি আতঙ্ক। ১৪৪ ধারা তুলে নেয়া হলেও স্বাভাবিক হয়নি দুই জেলার জনজীবন। ৭২ ঘণ্টার অবরোধের দ্বিতীয় দিন গতকালও দুই জেলায় বন্ধ ছিল দূরপাল্লার যানবাহন। তিন উপদেষ্টার পরিদর্শনের পরও খোলেনি অধিকাংশ দোকানপাট। পরিবহন ধর্মঘট ও অবরোধের কারণে রাঙ্গামাটিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে রাঙ্গামাটি শহরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তেমন মানুষ বের হননি। যাদের জরুরি প্রয়োজন তারা হেঁটে কাজ সেরে বাড়িতে ফিরছেন। সকাল থেকে শহরে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। রাঙ্গামাটি শহরে একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম অটোরিকশাও চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই-বান্দরবান রুটেও কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এদিকে রোববার বেলা ১১টার দিকে রাঙ্গামাটি জেলার ১৪৪ ধারা তুলে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিদর্শন করা হচ্ছে। এ সময় রাঙ্গামাটির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শওকত ওসমান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন ও কোতোয়ালি থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আলী উপস্থিত ছিলেন।

রাঙ্গামাটিতে সংঘর্ষে মামলা: তদন্তে কোর কমিটি
রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে হতাহত, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কোর কমিটির মাধ্যমে তদন্ত চালানো হবে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোশারফ হোসেন খান। এই কোর কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এবং প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। অপরদিকে রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির নবাগত পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন। এই দুইটি মামলার আলোকেই রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, যারাই আইন হাতে তুলে নিয়েছে তাদেরকে কোনো ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সকলকেই ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

এদিকে খাগড়াছড়ি শহরের বেশকিছু স্থানে অটোরিকশা চলাচল করলেও রাঙ্গামাটি শহরের অভ্যন্তরেও কোনো যানবাহন চলছে না। এতে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লা ও আঞ্চলিক সড়কের যান চলাচল। খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন প্রান্তে আটকে আছে কাঁচামাল বহনকারী গাড়ি। আসতে পারছে না ফুয়েল চালিত গাড়িও। খাগড়াছড়ি বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতাশূন্য দিন কাটছে অনেকের।

খাগড়াছড়ি বাজারে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে সবজি, মাছসহ বিভিন্ন দোকানপাট খালি পড়ে আছে। অবরোধে গাড়ি চলছে না তাই তারা কোনো মালামাল আনতে পারছেন না। খাগড়াছড়ির মাছ ব্যবসায়ী রিয়াদ বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খাগড়াছড়িতে মাছ আনা হতো। অবরোধে কোনো গাড়ি চলছে না বিধায় কোনো মাছ আনা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ী ভোক্তাসহ সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’ সবজি বিক্রেতা বাবুল বলেন, খাগড়াছড়িতে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি ভরে সবজি আনা হতো। এখন সবজি আনা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনেক কাঁচামাল পচে যাচ্ছে।

মামুন হত্যার ঘটনায় মামলা
এদিকে খাগড়াছড়িতে আলোচিত মামুন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ১৯শে সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিহতের স্ত্রী মুক্তা আক্তার বাদী হয়ে মামলাটি করেন। আসামি হলো- গাড়িচালক মো. শাকিল (২৭), মো. রফিকুল আলম (৫৬) ও মো. দিদারুল আলম (৪৮)।  খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন মৃধা মামলা হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ১৯শে সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিহতের স্ত্রী মুক্তা আক্তার মামলাটি করেছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, বর্তমানে খাগড়াছড়ি অনেক শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালি মিলে শান্তি কমিটি করে সম্প্রীতি বজায় রাখতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি পাহাড়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে আমরা আর সেটার পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা সবাই মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রেখে চলতে চাই। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

পাহাড়ের ঘটনার প্রতিবাদে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের চেরাগী পাহাড় মোড় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে ৭২ ঘণ্টার এ অবরোধের ডাক দেয়া হয়। কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন নামের সংগঠন। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টও (ইউপিডিএফ) অবরোধে সমর্থন দেয়। শনিবার সকাল ৬টা থেকে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য মো. আবদুল মোমিন বলেন, পরিবহন শ্রমিক, সাধারণ যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি নির্নিমেষ দেওয়ান বলেন, তাদের কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। এতে গাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত অনেক কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, অবরোধের কারণে জেলায় কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটেনি। শহরে দোকানপাট এবং গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহলে রয়েছে।

mzamin

Saturday, September 21, 2024

অশান্ত পাহাড়, নিহত ৪

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে। দীঘিনালার জেরে রাঙ্গামাটিতেও পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত ও  ৫৪ জন আহত হয়েছেন। এ নিয়ে খাগড়াছড়ির ৩ জন নিহতসহ দুই জেলায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ৬৫ জনের বেশি। গতকাল সকাল থেকে রাঙ্গামাটিতে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ, দোকানপাট ও বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর থেকে দুই জেলায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। দুই পক্ষের মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মাঠে পুলিশের পাশাপাশি কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, আনসার সদস্যরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। খাগড়াছড়ির সদর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র রায় এক আদেশে দুপুর ২টা থেকে এবং রাঙ্গামাটির পৌর এলাকায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান পৃথক আরেক আদেশে দুপুর ১টা থেকে ১৪৪ ধারা জারি করেন। রাত ৯টা পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বার্তায় দুই জেলার মানুষকে শান্ত থাকার পরামর্শ  দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ারও কথা বলা হয়েছে।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানিয়েছেন- খাগড়াছড়ির পাহাড়ি-বাঙালির সংঘর্ষের রেশ রাঙ্গামাটি শহরেও ছড়িয়েছে। এর জেরে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শহর জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল সকালে আগাম ঘোষণা ছাড়াই কয়েক হাজার পাহাড়ি যুবক বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে শহরের জিমনেসিয়াম হয়ে প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা বনরূপা বাজারে এসে মসজিদ, পেট্রোল পাম্পসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে থাকে। এতে শহর জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে ধাওয়া দিলে পাহাড়িরা পিছু হটে। রাস্তায় চলাচলকারী বাস, ট্রাক ও ট্যাক্সিতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহরের হ্যাপির মোড়কে কেন্দ্র করে এর দু’দিকে অবস্থান নেয় পাহাড়ি ও বাঙালিরা। পরে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষ শহরের বনরূপা, হ্যাপির মোড়, কালিন্দিপুর, রাজবাড়ী, স্টেডিয়াম এলাকা, কল্যাণপুর, ভেদভেদীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে অন্তত ৩০টি যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি উভয়পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হন। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করলেও তার নাম ও ঠিকানা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি। আহতদের মধ্যে বাঙ্গালিদের বেশ কয়েকজনের শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়িরা মারধর ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কারণে আহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে ১০-১২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক সাদিয়া আক্তার। পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জামাল উদ্দিন জানান, সকালে পাহাড়িদের একটি মিছিল বনরূপায় এসে ফিরে যাওয়ার সময় বাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলাসহ বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর করে। এরপরই বাঙালি ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের পাল্টা ধাওয়া দেয়।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানিয়েছেন: খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উভয় পক্ষের ৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় দুর্বৃত্ত কর্র্তৃক অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উভয় পক্ষের প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। এ ঘটনায় পরস্পরবিরোধী অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার লারমা স্কয়ার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি’র সদস্যরা টহলে রয়েছে। বর্তমানে দীঘিনালায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।

সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে: বুধবার খাগড়াছড়িতে চোর সন্দেহে বাঙালি যুবক মোহাম্মদ মামুন (৩০) কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মামুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার বাসিন্দা। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। পূর্বনির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করলে স্থানীয় পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে আসা সাধারণ বাঙালি শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া করে। এতে আন্দোলনকারী সাধারণ বাঙালি শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ ঘটনায় কয়েকজন বাঙালি শিক্ষার্থী আহত হয়। পরে বোয়ালখালী বাজার এলাকা ও আশপাশ এলাকা থেকে বাঙালি লোকজন জড়ো হয় বাসটার্মিনালের দক্ষিণ প্রান্তে। তখন বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ি লোকজনও জড়ো হতে থাকে লারমা স্কয়ারে। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তখন লারমা স্কয়ার থেকে বাঙালিদের দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। এতে মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় চরম আতঙ্ক এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আর তা ছড়িয়ে পড়ে উপজেলা জুড়ে। কিছুক্ষণ পরেই দুর্বৃত্তরা লারমা স্কয়ারে সড়ক ও জনপদের জায়গায় গড়ে ওঠা অস্থায়ী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দোকানপাটে আগুন দেয়। পরে পুলিশের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় যখন বেসামাল অবস্থা, তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামেন। ততক্ষণে মার্কেটের প্রায় সকল দোকানপাট পুড়ে যায়। মার্কেটটিতে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষের দোকানপাট ছিল। তাদের মধ্যে সখ্যতাও ছিল বেশ।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালির সংঘর্ষের জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতভর জেলা সদরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সদরসহ পুরো জেলায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাতের গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। নিহতরা হলেন জুনান চাকমা (২০), ধনঞ্জয় চাকমা (৫০) ও রুবেল চাকমা (৩০)। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা শহরের নারানখখাইয়া, স্বনির্ভর এলাকায় ব্যাপক গুলির শব্দ শোনা যায়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাত পর্যন্ত গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এরমধ্যে ধনঞ্জয় চাকমা দীঘিনালায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংঘর্ষে মারা যান। অপর ২ জনকে আহত অবস্থায় রাতে খাগড়াছড়ি সদর থেকে হাসপাতালে আনা হয়। খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রাতে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ১৬ জনকে আনা হয়। তারা বেশির ভাগই সদর উপজেলা থেকে এসেছেন। এরমধ্যে ৩ জন মারা যান। নিহত ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত শেষে বলা যাবে। বর্তমানে হাসপাতালে আরও ৯ জন চিকিৎসাধীন। রাতেই ৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে একজন বাঙালি রয়েছেন। আহত বাকি ৯ পাহাড়িকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

এদিকে আগুন লাগার ঘটনাস্থল লারমা স্কয়ার থেকে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দূরত্ব ছিল মাত্র ৫০০ মিটারের কাছাকাছি। খুব কাছে থেকেও ফায়ার সার্ভিস যথাসময়ে না পৌঁছায় আগুনে আরও কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, গত রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাঙালি ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বেশ কিছু ফেসবুক আইডি থেকে দীঘিনালায় সংঘাত ঘটানোর উগ্রতা ছড়ানো হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এ ছাড়া যদি সমন্বিত কোনো সভা বা মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হতো তাহলে অবশ্যই এই সংঘাত ও ক্ষতি এড়ানো যেতো। এই ঘটনায় অনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনায় পরস্পর পরস্পরকে দুষছেন। দীঘিনালা থানার অফিসার্স ইনচার্জ মো. নুরুল হক বলেন, ‘দীঘিনালায় একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যা কখনো কাম্য নয়। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিশেষ মতবিনিময় সভা: গতকাল বিকালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান এর সভাপতিত্বে এতে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এ সময় খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল, জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য্য, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার, মারমা প্রতিনিধি ম্রাসাথোয়াই মারমা, চাকমা প্রতিনিধি অনিমেষ চাকমা এবং ত্রিপুরা প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেন। মতবিনিময়ে বক্তারা ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হতাহতের ঘটনায় খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সবাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের উপর জোর দেন। সবাইকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, আপনারা কেউ আতঙ্কিত হবেন না, গুজবে কান দিবেন না। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে কাজ করছি। ইতিমধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শান্তি-সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে দীঘিনালায় আমরা উভয় পক্ষের ৪০ জন সদস্যকে নিয়ে একটি শান্তি কমিটি গঠন করেছি। আশা করি পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের আমরা সরকারি সহায়তার আওতায় আনবো।

রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান হাসান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, প্রশাসন যৌথবাহিনী কাজ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি আইনশৃঙ্খলা সভা করা হয়েছে। সকলে মিলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আমরা। সেনাবাহিনী সবসময় জনসাধারণের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে আমরা কাজ করছি। ফেসবুক গুজব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আপনারা গুজবে পা দেবেন না। গুজব থেকে দূরে থাকতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

Tuesday, October 15, 2019

অপরূপা খাগড়াছড়িতে হাজারো পর্যটক by জসিম মজুমদার

রিছাং ঝরনা
চারদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড় এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে সব সময় আকর্ষণীয় খাগড়াছড়ি জেলা। এবার ঈদের ছুটির অবকাশে হাজারো পর্যটক এখন খাগড়াছড়িতে। পর্যটদের পদভারে মুখরিত এখানকার পর্যটন মোটেল, বিভিন্ন বেসরকারি হোটেল, গেস্ট হাউজ ও পর্যটন স্পটগুলো। তাদের ভ্রমণের আনন্দ নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চেঙ্গী, মাইনী আর ফেনী নদী এই জেলাকে অপরূপ করে তুলেছে। জেলায় সদর উপজেলার হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা, হেরিটেজ পার্ক, মাটিরাঙার শতবর্ষী বটগাছ, রিছাং ঝরনা, মহালছড়ির মনারটেক লেক, দেবতার পুকুর, মানিকছড়ির বনলতা অ্যাগ্রো প্রাইভেট, পুরাতন রাজবাড়ি, পানছড়ির অরণ্য কুঠির, রামগড়ের কৃত্রিম লেক, চা বাগান, দিঘীনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনাসহ রয়েছে শতাধিক মনোরম পর্যটন স্পট। ঈদ উপলক্ষে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নতুন সাজে সাজানো হয়েছিল পর্যটন স্পটগুলোকে। 
টিলার ওপর থেকে খাগড়াছড়ি শহর
টিলার ওপর থেকে খাগড়াছড়ি শহর
খাগড়াছড়ির বেসরকারি হোটেল গাইরিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা জানান, এই ঈদে অনেক পর্যটক এসেছেন। তার হোটেলে সপ্তাহখানেকের জন্য বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য হোটেলে স্থানীয় বিভিন্ন সু-স্বাদু খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া কোনও পর্যটক চাইলে তার হোটেলে নির্ধারিত ফি দিয়ে স্থানীয় শিল্পীদের নাচ-গান উপভোগ করতে পারবেন।
স্থানীয় হোটেল অরণ্য বিলাসের মালিক বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে চলমান ঈদে হাজার হাজার পর্যটক এসেছেন। আমার হোটেলে ১০০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও চলমান ঈদে গড়ে ১২০-১৪০ জন পর্যটক থাকছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কয়েক দিনের জন্য খাগড়াছড়ি এসেছেন। কারও কারও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি রাঙামাটির সাজেকে গিয়েও রাতযাপন করার কথা রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, থাকা ও খাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা অভিমুখী পর্যটকরা
আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা অভিমুখী পর্যটকরা
ভাড়ায় চলা প্রাইভেট কারচালক রাপ্রু মারমা জানান, সপ্তাহ খানেকের জন্য সব গাড়িই রিজার্ভ হয়ে আছে।  তবে এখানে কিছু টুরিস্ট কার আছে। পর্যটকেরা যখন চাইবেন, তখনই ভাড়া নিতে পারবেন। অনেক পর্যটক আসায় তারা খুশি। ভালো ব্যবসা হবে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য খাগড়াছড়ি চমৎকার জায়গা। পুরো এক সপ্তাহের মতো ছুটি পাওয়ায় অনেকই এবার খাগড়াছড়ির নয়নাভিরাম সবুজাভ পাহাড়ের দৃশ্য, চপলা ঝরনা, সর্পিল নদী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি উপভোগ করতে এসেছেন।’ তিনি আগত সব পর্যটককে স্বাগত জানিয়ে নিশ্চিন্তে এবং নির্ভয়ে এখানকার পর্যটন স্থানগুলো ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আহমার উজ্জামান জানান, খাগড়াছড়িতে বর্তমানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যটন পুলিশসহ গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সাদা পোশাকের পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। কোনও পর্যটক পুলিশ চাইলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
----------খাগড়াছড়ির উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটগুলো---------
আলুটিলা পর্যটন
খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশপথেই খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বড় পর্যটন স্পট আলুটিলা।  প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে দৃষ্টিনন্দন এই আলুটিলার শীর্ষে দাঁড়ালে শহর, চেঙ্গী নদীর সর্পিল গতিপ্রবাহ ও বিস্তৃত আকাশের মেঘমালা সবার মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। এখানে রয়েছে একটি রহস্যময় প্রাকৃতিক গুহা। পাহাড়ি পথ বেয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত যেতে দর্শনার্থীদের একসময় কষ্ট হলেও এখন জেলা পরিষদের অর্থায়নে পাকা সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে ২৬৬টি সিঁড়ি পেরোলেই গুহামুখ। গুহাটির ভেতরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ ফুট। অন্ধকার গুহার ভেতরে মশাল নিয়ে ঢুকতে হয়। গুহাটির ভেতরে শত শত বাদুড়ের ওড়াউড়ির দৃশ্য চোখে পড়ে।
হর্টিকালচার পার্কের ফটক
হর্টিকালচার পার্কের ফটক
হর্টিকালচার পার্ক
খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের এক কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে হর্টিকালচার পার্ক। শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদন ব্যবস্থার পাশাপাশি এখানে রয়েছে– ঝুলন্ত ব্রিজ, কৃত্রিম লেক, পর্যটন ট্রেনের ব্যবস্থা,  সু-সজ্জিত ফুল ও ফলদ বাগান। ছায়া-সুনিবিড় এই পার্কে ও লেকে সব সময় দেখা যায় শত শত পাখির। রয়েছে খাবারের ব্যবস্থাও।
হেরিটেজ পার্ক
খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের সামনে, চেঙ্গী নদীর অববাহিকায় জেলা আনসার ২০০৭ সালে গড়ে তোলে হেরিটেজ পার্ক। এই পার্কে গ্রামীণ অবয়বে রয়েছে ছোট-ছোট কুঠির। এসব কুঠিরে বসে চেঙ্গী নদীর প্রবাহ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। উপভোগ করা যায় নানা মৌসুমি ফলের জুস।
রিছাং ঝরনা
আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরেই রিছাং ঝরনা। ‘রিছাং’ মারমা শব্দ। ‘রি’ অর্থ পানি আর ‘ছাং’ অর্থ ধারা। ছন্দে-ছন্দে প্রবাহমান হিমশীতল ঝরনার স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই কাছে টানবে। এর জন্য অবশ্য মূল সড়ক থেকে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। রিছাং ঝরনায় যেতে ইতোমধ্যেই মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবেশমুখে একটি গেটসহ পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ ক’টি গোলাকৃতি ঘর। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে পুলিশি চৌকি।
চেঙ্গী নদী
চেঙ্গী নদী
দেবতা পুকুর
মহালছড়ি উপজেলার দুর্গম নুনছড়ি মৌজায় অবস্থিত ‘দেবতার পুকুর’। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১শ’ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ একর জায়গায় অবস্থিত এই পুকুরটি। পুকুরটির স্থির স্বচ্ছ জলরাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এর চারদিকে রয়েছে ঘন সবুজ বনরাজি। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, তাদের পানির চাহিদা পূরণের জন্য জলদেবতা পুকুরটি তাদের উপহার দেন। প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে হাজারো নারী-পুরুষ পুণ্য লাভের আশায় দেবতা পুকুর পরিদর্শনে আসেন।
ভগবান টিলা
মাটিরাঙ্গা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ‘ভগবান টিলা’। জেলা সদর থেকে উত্তর পশ্চিমে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কিলোমিটার। সবুজের বুকচিরে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এর ওপরে ওঠা যায়।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা। স্থানীয়দের ধারণা, এ টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা শুনতে পান। আর এ কারণেই এ টিলার নামকরণ ভগবান টিলা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি আউট পোস্ট রয়েছে এখানে।
রামগড় চা বাগান
রামগড় সীমান্ত ঘেঁষে জেলায় প্রবশের সম্মুখভাগে খাগড়াছড়ি-ফেনী আঞ্চলিক সড়ক-মহাসড়কের দুইধারে, ফেনীর নদীর অববাহিকায় রয়েছে চোখ জুড়ানো চা বাগান। যা খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পকে করেছে আরও উন্নত। ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানাতে সদা প্রস্তুত সবুজ গালিচাবিছানো এ চা বাগান।
রামগড় লেক
জেলা সদর থেকে ৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে রামগড় উপজেলা। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ২০০১ সালে  রামগড় উপজেলা পরিষদের সামনে তৈরি করা হয় লেকটি। হ্রদটি প্রায় ২৫০ মিটার লম্বা। এতে রয়েছে ছোট-বড় বেশ কটি নৌযান। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন, লেকটির চারপাশ রেলিং বাঁধানো আর ফুল বাগানে সজ্জিত। মাঝখানে রয়েছে সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু। রয়েছে সুন্দর সুন্দর বাগান, সবুজ ঘাস, আধুনিক লাইটিং, লেকে নামার জন্য শান বাঁধানো সিঁড়ি। দুই তীরের উদ্যানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে ১২টি শেড।
টটট
হেরিটেজ পার্ক
মানিকছড়ি রাজবাড়ী  
চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে খাগড়াছড়ি আসার প্রবেশমুখেই মানিকছড়ি উপজেলা। উপজেলা সদরে রয়েছে– ঐতিহ্যবাহী মানিকছড়ি রাজবাড়ী। রাজবাড়ীতে রয়েছে মংসার্কেল চিফের (মংরাজা) রাজত্বের সময়ের বিভিন্ন স্থাপনা। রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্র-শস্ত্রসহ প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক নিদর্শন রয়েছে এ রাজবাড়ীতে।
মানিকছড়ি বনলতা অ্যাগ্রো লি.
মানিকছড়ি উপজেলার হাতিমুড়া এলাকায় অবস্থিত এই বাগানটি। প্রায় ৫০০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই বাগানে রয়েছে পাঁচটি লেক। বাগানটিতে ফুল ও বনজ-ফলদসহ বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার গাছ রয়েছে। রয়েছে পাখ-পাখালির কলতান।
মাটিরাঙ্গা শতাবর্ষী বটগাছ
মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদরের খুব কাছাকাছি আলুটিলা-বটতলী এলাকায় এ শতবর্ষী বটবৃক্ষটি ইতিহাসের সাক্ষী। পাঁচ একরের বেশি ভূমির ওপরে এ গাছটি হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করেছে। মূল বটগাছটি থেকে নেমে আসা ডালপালা ও ঝুরি মাটিতে মিশে এক-একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বটগাছটিকে ঘিরে আছে নানা কাহিনী। যেমন– এটি রোগমুক্তির প্রতীক। মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে প্রায়  সাত কিমি উত্তরে অবস্থিত এ বটবৃক্ষের নামানুসারেই গড়ে উঠেছে বটতলী বাজার। গাছটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্কুল, মাদ্রাসা ও বাজার।
মহালছড়ির মনারটেক
জেলার মহালছড়ি উপজেলায় মনারটেককে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলেছে মহালছড়ি উপজেলা প্রশাসন। বিশাল লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখার পাশাপাশি অল্প খরচে নৌ-ভ্রমণের সুযোগ নিতে পারেন পর্যটকরা।
যেভাবে আসবেন 
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ৩১৬ কিমি ও চট্টগ্রাম থেকে ১০৯ কিমি। ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে সরাসরি বাস রয়েছে খাগড়াছড়িতে। সেন্টমার্টিনের এসি বাস, এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি পরিবহন ও শ্যামলী পরিবহনের যেকোনও একটি বেছে নিতে পারেন। নন-এসির ভাড়া ৫২০ টাকা। আর এসিতে গুনতে হবে এক হাজার টাকা। চট্টগ্রাম থেকে আসতে হলে অক্সিজেন অথবা কদমতলী বিআরটিসি বাস টার্মিনালে যেতে হবে। অক্সিজেন থেকে রয়েছে শান্তি পরিবহন ও লোকাল বাস এবং কদমতলী থেকে বিআরটিসি। চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া ১৮০-২২০ টাকা।
পর্যটন স্পটগুলোতে কীভাবে যাবেন
খাগড়াছড়ি শহর থেকে এসব পর্যটন স্পটে যেতে কমপক্ষে ১০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। খাগড়াছড়ি থেকে আলুটিলা এবং রিছাং ঝরনায় আসা-যাওয়ায় মাথাপিছু খরচ হবে ১০০ টাকা, মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটগাছ দেখতে গেলে মাথাপিছু ২০০ টাকা, মহালছড়ির দেবতা পুকুর দেখতে গেলে মাথা পিছু ৩০০ টাকা, মানিকছড়ির রাজবাড়ি অথবা বনলতা অ্যাগ্রো লিমিটেডে যেতে মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, দিঘীনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনায় অথবা রামগড়ে আসা-যাওয়ায় খরচ মাথাপিছু খরচ হবে ৪০০ টাকার মতো। এছাড়া রাঙামাটির সাজেকসহ অন্যান্য মনোরম পর্যটন স্পটগুলোতে আসা-যাওয়ায় প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
কোথায় থাকবেন  
শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত পর্যটন মোটেলের ডবল রুম নন-এসি এক হাজার ৫০ টাকা, ডবল এসি রুম এক হাজার ৫০০ টাকা, ভিআইপি স্যুইট ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়াও রয়েছে জেলা সদরের মিলনপুরে হোটেল গাইরিং, নারিকেল বাগান এলাকায় হোটেল অরণ্য বিলাস, মাউন্ট ইন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হোটেল ইকোছড়ি ইন। সেখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। খাগড়াছড়ি বাজার এলাকার হোটেল আল-মাসুদ, হোটেল লবিয়ত, হোটেল ফোর স্টারসহ খাগড়াছড়ি ও সাজেকের প্রায় দুই শতাধিক  হোটেলে থাকতে পারবেন সুলভে।

Sunday, August 18, 2019

অপরূপা খাগড়াছড়িতে হাজারো পর্যটক by জসিম মজুমদার

রিছাং ঝরনা
চারদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ পাহাড় এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন ও সংস্কৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে সব সময় আকর্ষণীয় খাগড়াছড়ি জেলা। এবার ঈদের ছুটির অবকাশে হাজারো পর্যটক এখন খাগড়াছড়িতে। পর্যটদের পদভারে মুখরিত এখানকার পর্যটন মোটেল, বিভিন্ন বেসরকারি হোটেল, গেস্ট হাউজ ও পর্যটন স্পটগুলো। তাদের ভ্রমণের আনন্দ নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া চেঙ্গী, মাইনী আর ফেনী নদী এই জেলাকে অপরূপ করে তুলেছে। জেলায় সদর উপজেলার হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা, হেরিটেজ পার্ক, মাটিরাঙার শতবর্ষী বটগাছ, রিছাং ঝরনা, মহালছড়ির মনারটেক লেক, দেবতার পুকুর, মানিকছড়ির বনলতা অ্যাগ্রো প্রাইভেট, পুরাতন রাজবাড়ি, পানছড়ির অরণ্য কুঠির, রামগড়ের কৃত্রিম লেক, চা বাগান, দিঘীনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনাসহ রয়েছে শতাধিক মনোরম পর্যটন স্পট। ঈদ উপলক্ষে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নতুন সাজে সাজানো হয়েছিল পর্যটন স্পটগুলোকে। 
টিলার ওপর থেকে খাগড়াছড়ি শহর
টিলার ওপর থেকে খাগড়াছড়ি শহর
খাগড়াছড়ির বেসরকারি হোটেল গাইরিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরা জানান, এই ঈদে অনেক পর্যটক এসেছেন। তার হোটেলে সপ্তাহখানেকের জন্য বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের জন্য হোটেলে স্থানীয় বিভিন্ন সু-স্বাদু খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া কোনও পর্যটক চাইলে তার হোটেলে নির্ধারিত ফি দিয়ে স্থানীয় শিল্পীদের নাচ-গান উপভোগ করতে পারবেন।
স্থানীয় হোটেল অরণ্য বিলাসের মালিক বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে চলমান ঈদে হাজার হাজার পর্যটক এসেছেন। আমার হোটেলে ১০০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও চলমান ঈদে গড়ে ১২০-১৪০ জন পর্যটক থাকছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কয়েক দিনের জন্য খাগড়াছড়ি এসেছেন। কারও কারও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি রাঙামাটির সাজেকে গিয়েও রাতযাপন করার কথা রয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, থাকা ও খাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা অভিমুখী পর্যটকরা
আলুটিলার প্রাকৃতিক গুহা অভিমুখী পর্যটকরা
ভাড়ায় চলা প্রাইভেট কারচালক রাপ্রু মারমা জানান, সপ্তাহ খানেকের জন্য সব গাড়িই রিজার্ভ হয়ে আছে।  তবে এখানে কিছু টুরিস্ট কার আছে। পর্যটকেরা যখন চাইবেন, তখনই ভাড়া নিতে পারবেন। অনেক পর্যটক আসায় তারা খুশি। ভালো ব্যবসা হবে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য খাগড়াছড়ি চমৎকার জায়গা। পুরো এক সপ্তাহের মতো ছুটি পাওয়ায় অনেকই এবার খাগড়াছড়ির নয়নাভিরাম সবুজাভ পাহাড়ের দৃশ্য, চপলা ঝরনা, সর্পিল নদী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি উপভোগ করতে এসেছেন।’ তিনি আগত সব পর্যটককে স্বাগত জানিয়ে নিশ্চিন্তে এবং নির্ভয়ে এখানকার পর্যটন স্থানগুলো ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আহমার উজ্জামান জানান, খাগড়াছড়িতে বর্তমানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যটন পুলিশসহ গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সাদা পোশাকের পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। কোনও পর্যটক পুলিশ চাইলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
খাগড়াছড়ির উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটগুলো
আলুটিলা পর্যটন
খাগড়াছড়ি শহরের প্রবেশপথেই খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বড় পর্যটন স্পট আলুটিলা।  প্রায় হাজার ফুট উঁচুতে দৃষ্টিনন্দন এই আলুটিলার শীর্ষে দাঁড়ালে শহর, চেঙ্গী নদীর সর্পিল গতিপ্রবাহ ও বিস্তৃত আকাশের মেঘমালা সবার মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। এখানে রয়েছে একটি রহস্যময় প্রাকৃতিক গুহা। পাহাড়ি পথ বেয়ে গুহার মুখ পর্যন্ত যেতে দর্শনার্থীদের একসময় কষ্ট হলেও এখন জেলা পরিষদের অর্থায়নে পাকা সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া বেয়ে ২৬৬টি সিঁড়ি পেরোলেই গুহামুখ। গুহাটির ভেতরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮২ ফুট। অন্ধকার গুহার ভেতরে মশাল নিয়ে ঢুকতে হয়। গুহাটির ভেতরে শত শত বাদুড়ের ওড়াউড়ির দৃশ্য চোখে পড়ে।
হর্টিকালচার পার্কের ফটক
হর্টিকালচার পার্কের ফটক
হর্টিকালচার পার্ক
খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের এক কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে হর্টিকালচার পার্ক। শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদন ব্যবস্থার পাশাপাশি এখানে রয়েছে– ঝুলন্ত ব্রিজ, কৃত্রিম লেক, পর্যটন ট্রেনের ব্যবস্থা,  সু-সজ্জিত ফুল ও ফলদ বাগান। ছায়া-সুনিবিড় এই পার্কে ও লেকে সব সময় দেখা যায় শত শত পাখির। রয়েছে খাবারের ব্যবস্থাও।
হেরিটেজ পার্ক
খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের সামনে, চেঙ্গী নদীর অববাহিকায় জেলা আনসার ২০০৭ সালে গড়ে তোলে হেরিটেজ পার্ক। এই পার্কে গ্রামীণ অবয়বে রয়েছে ছোট-ছোট কুঠির। এসব কুঠিরে বসে চেঙ্গী নদীর প্রবাহ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। উপভোগ করা যায় নানা মৌসুমি ফলের জুস।
রিছাং ঝরনা
আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরেই রিছাং ঝরনা। ‘রিছাং’ মারমা শব্দ। ‘রি’ অর্থ পানি আর ‘ছাং’ অর্থ ধারা। ছন্দে-ছন্দে প্রবাহমান হিমশীতল ঝরনার স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই কাছে টানবে। এর জন্য অবশ্য মূল সড়ক থেকে কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। রিছাং ঝরনায় যেতে ইতোমধ্যেই মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবেশমুখে একটি গেটসহ পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ ক’টি গোলাকৃতি ঘর। নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে পুলিশি চৌকি।
চেঙ্গী নদী
চেঙ্গী নদী
দেবতা পুকুর
মহালছড়ি উপজেলার দুর্গম নুনছড়ি মৌজায় অবস্থিত ‘দেবতার পুকুর’। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১শ’ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় পাঁচ একর জায়গায় অবস্থিত এই পুকুরটি। পুকুরটির স্থির স্বচ্ছ জলরাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এর চারদিকে রয়েছে ঘন সবুজ বনরাজি। স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, তাদের পানির চাহিদা পূরণের জন্য জলদেবতা পুকুরটি তাদের উপহার দেন। প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে হাজারো নারী-পুরুষ পুণ্য লাভের আশায় দেবতা পুকুর পরিদর্শনে আসেন।
ভগবান টিলা
মাটিরাঙ্গা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ‘ভগবান টিলা’। জেলা সদর থেকে উত্তর পশ্চিমে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কিলোমিটার। সবুজের বুকচিরে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এর ওপরে ওঠা যায়।  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা। স্থানীয়দের ধারণা, এ টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা শুনতে পান। আর এ কারণেই এ টিলার নামকরণ ভগবান টিলা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি আউট পোস্ট রয়েছে এখানে।
রামগড় চা বাগান
রামগড় সীমান্ত ঘেঁষে জেলায় প্রবশের সম্মুখভাগে খাগড়াছড়ি-ফেনী আঞ্চলিক সড়ক-মহাসড়কের দুইধারে, ফেনীর নদীর অববাহিকায় রয়েছে চোখ জুড়ানো চা বাগান। যা খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পকে করেছে আরও উন্নত। ভ্রমণপিপাসুদের স্বাগত জানাতে সদা প্রস্তুত সবুজ গালিচাবিছানো এ চা বাগান।
রামগড় লেক
জেলা সদর থেকে ৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে রামগড় উপজেলা। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে ২০০১ সালে  রামগড় উপজেলা পরিষদের সামনে তৈরি করা হয় লেকটি। হ্রদটি প্রায় ২৫০ মিটার লম্বা। এতে রয়েছে ছোট-বড় বেশ কটি নৌযান। এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন, লেকটির চারপাশ রেলিং বাঁধানো আর ফুল বাগানে সজ্জিত। মাঝখানে রয়েছে সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু। রয়েছে সুন্দর সুন্দর বাগান, সবুজ ঘাস, আধুনিক লাইটিং, লেকে নামার জন্য শান বাঁধানো সিঁড়ি। দুই তীরের উদ্যানে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য রয়েছে ১২টি শেড।
টটট
হেরিটেজ পার্ক
মানিকছড়ি রাজবাড়ী  
চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে খাগড়াছড়ি আসার প্রবেশমুখেই মানিকছড়ি উপজেলা। উপজেলা সদরে রয়েছে– ঐতিহ্যবাহী মানিকছড়ি রাজবাড়ী। রাজবাড়ীতে রয়েছে মংসার্কেল চিফের (মংরাজা) রাজত্বের সময়ের বিভিন্ন স্থাপনা। রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্র-শস্ত্রসহ প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক নিদর্শন রয়েছে এ রাজবাড়ীতে।
মানিকছড়ি বনলতা অ্যাগ্রো লি.
মানিকছড়ি উপজেলার হাতিমুড়া এলাকায় অবস্থিত এই বাগানটি। প্রায় ৫০০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই বাগানে রয়েছে পাঁচটি লেক। বাগানটিতে ফুল ও বনজ-ফলদসহ বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার গাছ রয়েছে। রয়েছে পাখ-পাখালির কলতান।
মাটিরাঙ্গা শতাবর্ষী বটগাছ
মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদরের খুব কাছাকাছি আলুটিলা-বটতলী এলাকায় এ শতবর্ষী বটবৃক্ষটি ইতিহাসের সাক্ষী। পাঁচ একরের বেশি ভূমির ওপরে এ গাছটি হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করেছে। মূল বটগাছটি থেকে নেমে আসা ডালপালা ও ঝুরি মাটিতে মিশে এক-একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বটগাছটিকে ঘিরে আছে নানা কাহিনী। যেমন– এটি রোগমুক্তির প্রতীক। মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে প্রায়  সাত কিমি উত্তরে অবস্থিত এ বটবৃক্ষের নামানুসারেই গড়ে উঠেছে বটতলী বাজার। গাছটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্কুল, মাদ্রাসা ও বাজার।
মহালছড়ির মনারটেক
জেলার মহালছড়ি উপজেলায় মনারটেককে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলেছে মহালছড়ি উপজেলা প্রশাসন। বিশাল লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখার পাশাপাশি অল্প খরচে নৌ-ভ্রমণের সুযোগ নিতে পারেন পর্যটকরা।
যেভাবে আসবেন 
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ৩১৬ কিমি ও চট্টগ্রাম থেকে ১০৯ কিমি। ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান থেকে সরাসরি বাস রয়েছে খাগড়াছড়িতে। সেন্টমার্টিনের এসি বাস, এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি পরিবহন ও শ্যামলী পরিবহনের যেকোনও একটি বেছে নিতে পারেন। নন-এসির ভাড়া ৫২০ টাকা। আর এসিতে গুনতে হবে এক হাজার টাকা। চট্টগ্রাম থেকে আসতে হলে অক্সিজেন অথবা কদমতলী বিআরটিসি বাস টার্মিনালে যেতে হবে। অক্সিজেন থেকে রয়েছে শান্তি পরিবহন ও লোকাল বাস এবং কদমতলী থেকে বিআরটিসি। চট্টগ্রাম থেকে ভাড়া ১৮০-২২০ টাকা।
পর্যটন স্পটগুলোতে কীভাবে যাবেন
খাগড়াছড়ি শহর থেকে এসব পর্যটন স্পটে যেতে কমপক্ষে ১০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। খাগড়াছড়ি থেকে আলুটিলা এবং রিছাং ঝরনায় আসা-যাওয়ায় মাথাপিছু খরচ হবে ১০০ টাকা, মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটগাছ দেখতে গেলে মাথাপিছু ২০০ টাকা, মহালছড়ির দেবতা পুকুর দেখতে গেলে মাথা পিছু ৩০০ টাকা, মানিকছড়ির রাজবাড়ি অথবা বনলতা অ্যাগ্রো লিমিটেডে যেতে মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, দিঘীনালার হাজাছড়া-তৈদুছড়া ঝরনায় অথবা রামগড়ে আসা-যাওয়ায় খরচ মাথাপিছু খরচ হবে ৪০০ টাকার মতো। এছাড়া রাঙামাটির সাজেকসহ অন্যান্য মনোরম পর্যটন স্পটগুলোতে আসা-যাওয়ায় প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
কোথায় থাকবেন  
শহরের প্রবেশমুখে চেঙ্গী নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত পর্যটন মোটেলের ডবল রুম নন-এসি এক হাজার ৫০ টাকা, ডবল এসি রুম এক হাজার ৫০০ টাকা, ভিআইপি স্যুইট ২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়াও রয়েছে জেলা সদরের মিলনপুরে হোটেল গাইরিং, নারিকেল বাগান এলাকায় হোটেল অরণ্য বিলাস, মাউন্ট ইন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হোটেল ইকোছড়ি ইন। সেখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। খাগড়াছড়ি বাজার এলাকার হোটেল আল-মাসুদ, হোটেল লবিয়ত, হোটেল ফোর স্টারসহ খাগড়াছড়ি ও সাজেকের প্রায় দুই শতাধিক  হোটেলে থাকতে পারবেন সুলভে।

Sunday, April 14, 2019

গড়াইয়া নাচে বাহারি বৈসুর by জয়ন্তী দেওয়ান

ফাইখালে, ফাইখালে, গড়াইয়া ফাইখালে...(এসেছে এসেছে গড়াইয়া নাচের দল)। পাহাড়ের ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় এখন এই শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব শব্দ লাগছে পাহাড়ের গায়ে। তাতে দোল খাচ্ছে শেষ বসন্তে ফোটা বাহারী ফুল, গাছপালা। পাহাড় মেতেছে উৎসবে। চাকমাদের বিজু, মারামাদের সাংগ্রাই আর ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবে।
বৈসুর অপরিহার্য অনুষঙ্গ গড়াইয়া নাচের দুটি দলের দেখা মিলল খাগড়াছড়ি শহরের ভাইবোনছড়া ও খাগড়াপুর এলাকায়।
যে গৃহস্থের বাড়ির উঠান বড় অথবা যেখানে লোকসমাগম বেশি, সেখানে থামছিল তারা। সুসজ্জিত এই দল গোল হয়ে কিছুক্ষণ নাচ পরিবেশন করে আবার ঢোল আর বাঁশি বাজাতে বাজাতে পাহাড়ি পথ ধরে নাচের ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে কোনো গৃহস্থের উঠানে। দলের সদস্যদের পরনে সাদা ধুতি এবং একই রঙের জামা। কোমর, মাথা ও হাতে রিসা নামে একটি লম্বা ঝুলের কাপড়।
নববর্ষ অর্থাৎ ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু উৎসবের সপ্তাহখানেক আগে থেকে পুরোনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় শুরু হয় গড়াইয়া নাচ। ত্রিপুরাদের বিশ্বাস, নাচের মধ্য দিয়ে তুষ্ট হন গড়াইয়া দেব। এতে পরিবার, এলাকাবাসীর ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি অটুট থাকে।
গড়াইয়া নাচে অংশগ্রহণকারীদের ‘খেয়েবাই’ বলা হয়ে থাকে। একজন আচাই বা ওঝা ও একজন দেওয়াই (দলনেতা) এই নাচ পরিচালনা করেন। গড়াইয়া নাচে রয়েছে ২২টি তাল ও মুদ্রা। এই ২২টি মুদ্রায় মানবজীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্রিয়াকলাপ প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এই নাচে কেউ একবার অংশ নিলে তাকে পরপর তিনবার অংশ নিতে হয়। কেউ যদি কোনো কারণে অংশ নিতে না পারে, তবে ক্ষমা চাইতে হয় গড়াইয়া দেবের কাছ থেকে।
ভাইবোনছড়া এলাকার গড়াইয়া নাচের দলের আচাই রবিধন ত্রিপুরা (৬৯)। তিনি বললেন, গড়াইয়ার দলের সদস্যরা গৃহস্থের উঠানে ২২টি মুদ্রা প্রদর্শন শেষে শুরু হয় বাড়ির কর্তা ও নারীদের নানা বায়না। নাচের মুদ্রায় কেউ দেখতে চান যুবক-যুবতীর প্রেম-বিরহ, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া।
রবিধন ত্রিপুরাদের দলটি নাচ শেষে পানীয়, টাকা, চালসহ নানা ফলমূল পেল গৃহস্থের কাছে থেকে। তারপর এ দল চলল আরেক বাড়িতে।
যেকোনো মাঙ্গলিক উৎসবেই গড়াইয়া নাচের প্রচলন আছে ত্রিপুরা সমাজে। একসময় যুদ্ধযাত্রার আগেও এ নাচ হতো।
ঠিক বর্ষবিদায় ও বরণের এই সময়ে গড়াইয়া নাচের উদ্দেশ্য ওই মঙ্গল কামনা—এমনটাই মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির গবেষক অরুনেন্দু ত্রিপুরা। তাঁর মতে, পাহাড়ে এই সময় গড়াইয়া নাচের মধ্যে একটি আর্থসামাজিক তাৎপর্য আছে। জুমনির্ভর গ্রামীণ পাহাড়ি সমাজের সঙ্গে আছে সাযুজ্য। চৈত্র শেষের এই সময়ে জুমের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেছে। বর্ষার জল পাওয়া মাত্রই জুমে বীজ বপন হবে। গড়াইয়ায় গৃহস্থের মঙ্গল কামনা করা হয়। তাঁর ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়। ফসল ভালো না হলে গৃহস্থের মঙ্গল হবে কীভাবে। তাই তো ইষ্ট দেবতার কাছে প্রার্থনা হয় নাচের মাধ্যমে।
সমাজের সহজাত পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। পাহাড়ের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক নানা দিকের নানা পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। গ্রামনির্ভর পুরো বাংলাদেশে নগরায়ণ হচ্ছে দ্রুত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি গ্রামীণ সমাজেও এসেছে পরিবর্তন।
স্থানীয় উন্নয়কর্মী মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা মনে করেন, এসব পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাত পড়ছে পাহাড়ের সংস্কৃতিতে। মথুরা ত্রিপুরা বলছিলেন, ‘আগে সাত দিন সাত রাত গড়াইয়া নাচ নাচা হতো। এখন শুধু নিয়ম পালনের জন্যই এর চর্চা। সেই জমজমাট পরিবেশটা এখন নেই।’

Tuesday, March 5, 2019

হুমকির মুখে খাগড়াছড়ির মহামুনি বিহার

খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে শতবর্ষী বিশ্বশান্তি রাজ মহামুনি বৌদ্ধ চৈত্য মন্দির ধ্বংসের পথে। সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই মন্দিরটি কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। একই সঙ্গে মং সার্কেলের রাজপরিবারের স্মৃতি হিসেবে গড়ে তোলা মিনারগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। কালের সাক্ষী এই বিহার ও মিনারের রক্ষার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় লোকজন ও মং রাজপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৮৮৩ সালে তৎকালীন মংরাজা নিপ্রু সাইন বাহাদুর (পঞ্চম) বিশ্বশান্তি রাজ মহামুনি বৌদ্ধ চৈত্য নামে রাজবাড়ির অদূরে মানিকছড়ি ছড়ার পাড়ে এই বিহারটি নির্মাণ করেন। বিহারের নাম অনুসারে ওই এলাকাটির নাম হয় মহামুনি। বিহারটি নির্মাণের পর থেকে প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে বিহারে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বৌদ্ধমেলা বসে। সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় হাজার প্রদীপ। মেলায় জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সমাগম হয়। তা ছাড়া এই বিহারের চারপাশে রয়েছে মংরাজা নিপ্রু সাইন বাহাদুর, রানি নিহার দেবীসহ রাজপরিবারের মৃতদের উদ্দেশে তৈরি মিনার।
সম্প্রতি মানিকছড়ি উপজেলা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের পাশে মহামুনি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শত বছর বয়সের বট, পাকুড়গাছ, কাঠগোলাপ, বাঁশঝাড়সহ বিভিন্ন গাছ-গাছালির ঘেরা শতবর্ষী এই বিহার। বিহারের চারপাশে বাগানের ভেতরেই রয়েছে রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের তৈরি মিনার। মিনারগুলোর বেশির ভাগেই দেখা দিয়েছে ভাঙন। কয়েকটি ভাঙা মিনারে মাঝে বটের চারাও গজিয়েছে। দেয়ালঘেরা একতলা তিন কক্ষবিশিষ্ট বিহারের প্রবেশদ্বারে রয়েছে দুটি সিংহের মূর্তি। বিহারের ভেতরে প্রথম কক্ষে রয়েছে শত বছরের ছোট–বড় বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তি। আর বাকি দুটি কক্ষে বসবাস করেন কয়েকজন শ্রমণ।
বসবাসরত শ্রমণেরা বলেন, সংস্কার না করায় বৃষ্টি হলে বিহারে দেয়াল বেয়ে পানি পড়ে। দেয়ালে ফাটলও দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর পর হয়তো দেয়াল ধসে পড়বে।
মনিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান ম্রাগ্য মারমা বলেন, কালের সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী এই বিহারটি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে কোনো ঐক্য না থাকায় এটি রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় সাংবাদিক মিন্টু মারমা বলেন, পুরাকীর্তি ও স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিহার ও মিনার রক্ষা জরুরি। রাজপরিবারের মিনারগুলো আজ ধ্বংসের পথে। এটি মংরাজার ইতিহাস বহন করেছে।
মংরাজা নিপ্রু সাইন বাহাদুরের বংশধর পার্সিয়েল সাইন বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী বিহারটি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। জেলা পরিষদ কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড যদি এগিয়ে আসে তাহলে বিহারটি রক্ষা পাবে।’
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, কেউ যদি এই ব্যাপারে জেলা পরিষদে আবেদন করে তাহলে জেলা পরিষদ থেকে বিহার ও মিনারগুলো রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Tuesday, July 31, 2018

সড়ক যখন মৃত্যুকূপ by জসিম মজুমদার

এ বছর দফায় দফায় প্রবল বৃষ্টিপাতে খাগড়াছড়ি জেলায় ৩টি মহাসড়ক এবং ৪২টি আন্তঃউপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও ধস দেখা দিয়েছে। এতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন এলাকাবাসী ও পর্যটকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে হারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, এই অবস্থা চলতে থাকলে সড়কগুলোতে সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তবে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সড়কগুলোতে সংস্কার কাজ চলছে।
বৃষ্টিতে ভেঙে লেকের মধ্যে বিলিন হয়ে গেছে রাস্তা
বৃষ্টিতে ভেঙে লেকের মধ্যে বিলিন হয়ে গেছে রাস্তা
খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর মধ্যে ৩টি মহাসড়কের মধ্যে খাগড়াছড়ি হতে রাঙামাটি পর্যন্ত মহাসড়কের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার, খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়কের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার এবং খাগড়াছড়ি থেকে ফেনী মহাসড়কের দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। এই তিনটি মহাসড়কের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪২টি আন্তঃউপজেলা সড়ক ও ইউনিয়ন সড়ক। খাগড়াছড়ি জেলা থেকে বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নে যাওয়ার সড়কগুলোর মধ্যে মহালছড়ি উপজেলায় রয়েছে ৪টি, মাটিরাঙা উপজেলায় ৬টি, গুইমারা উপজেলায় ৫টি, মানিকছড়ি উপজেলায় ৭টি, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় ৫টি, রামগড় উপজেলায় ৭টি, পানছড়ি উপজেলায় ৪টি এবং দীঘিনালা উপজেলায় ৪টি আন্তঃউপজেলা সড়ক রয়েছে, যা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার।
বৃষ্টিতে রাস্তার পিচ উঠে গেছে
বৃষ্টিতে রাস্তার পিচ উঠে গেছে
মহাসড়কগুলোর ৩৩০ কিলোমিটার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। আর ৭০ কিলোমিটার রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ করছে সেনাবাহিনীর ইসিবি। এছাড়া অন্যান্য সংস্থা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার আয়তনের ৬৬টি সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করছে। এরমধ্যে ৪২টি রাস্তার অনেক স্থানে প্রবল বর্ষণের কারণে ভেঙে যাওয়ায় বা ধসে যাওয়ায় রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তাগুলো ভাঙার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীসাধারণ, পর্যটক ও পরিবহন মালিকেরা।
মাটিরাঙা উপজেলার ট্রাকচালক মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘খাগড়াছড়ি থেকে আসা-যাওয়ার প্রত্যেকটি রাস্তার অবস্থাই খারাপ হওয়ায় আমরা ক্ষতির মুখে পড়ছি। বিভিন্ন সময় গাড়ি নষ্ট হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে।’
বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে গেছে
বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙে গেছে
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার মাইক্রোচালক মো. বাদশা মিয়া বলেন, ‘রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তা মেরামত না করাই বর্ষা মৌসুমে গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’
ঢাকার পল্লবী থেকে সাজেকগামী পর্যটক সামছুল আরেফিন বলেন, ‘অনেক রাস্তারই বেহাল অবস্থা। অনেক জায়গায় পর্যটকবাহী গাড়ি আটকে যায়। অনেক স্থানে পাহাড় ধসে গেছে। বৃষ্টির কারণে রাস্তাগুলোর প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। যাতায়াতে আগের তুলনায় সময় বেশি লাগছে। এ বছর বর্ষায় রাস্তাগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হবে বলে মনে হচ্ছে। ’
পাহাড় ধসে রাস্তার ওপর পড়েছে, রাস্তা পরিষ্কারে কাজ করছেন কয়েকজন
পাহাড় ধসে রাস্তার ওপর পড়েছে, রাস্তা পরিষ্কারে কাজ করছেন কয়েকজন
খাগড়াছড়ি এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী তৃপ্তি শংকর চাকমা বলেন, ‘এলজিইডির তত্ত্বাবধানে থাকা সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেগুলো সংস্কারে বিগত ২৭ জুন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। চিঠিতে আমরা ৩ কোটি ৩ লাখ টাকা চেয়েছি। টাকা বরাদ্দ পেলে রাস্তাগুলোর সংস্কার কাজ শুরু করবো।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রবল বর্ষণে মহাসড়কগুলোর অনেক জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার কাজ চলছে। এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আশা করি আগামী দুই মাসের মধ্যে রাস্তাগুলোর সংস্কার কাজ শেষ হবে।’

Saturday, June 16, 2018

খাগড়াছড়িতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে আম্রপালি by জসিম মজুমদার

খাগড়াছড়িতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে আম্রপালি
আর কয়েকদিন পরেই বাজারে আসবে পাহাড়ের সুস্বাদু আম আম্রপালি। গত বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে আম্রপালি ফলন বিপর্যয় হয়েছিল। এবছর আবহাওয়া অনকূলে থাকায় খাগড়াছড়িতে আম্রপালি চাষে বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে বেশিরভাগ কৃষকের আম্রপালি আম গুটিতেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ২ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে আম চাষ করে কৃষকেরা মাত্র ১৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন আম পায়। যেখানে ২০১৬ সালে ২ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে আমের ফলন ছিল ২৭ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৬০৯ হেক্টর জমিতে আমের ফলন ছিল ২০ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন।
চলতি বছর আমের ফলন আরও বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, চলতি বছর আবাদি জমির পরিমাণ ৩০০০ হেক্টর। তারা আশা করছে এই পরিমাণ জমিতে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন আম্রপালি উৎপাদন হবে শুধু খাগড়াছড়ি জেলাতে। কেজি প্রতি গড়ে ১০০ টাকা করে ধরলেও যার আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি টাকা হবে।
জেলা শহরের তেতুলতলা এলাকার আম্রপালি চাষি অনিমেষ চাকমা রিংকু জানান, তিনি প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে আম্রপালি চাষ করেছেন। এবছর আবহাওয়া ভাল থাকায় ও রোগ-বালাইয়ের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শে তারা সব সময় নির্দেশনা মেনে কাজ করায় আমের বাম্পার ফলন হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সব মিলিয়ে ৭০ থেকে ৮০ মেট্রিক টন আম পাবেন তিনি। যা গত বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি। তিনি আগামী ১০ জুন থেকে আম্রপালি বিক্রি শুরু করবেন বলে জানান।
গুইমারা উপজেলার জালিয়াপাড়া এলাকার কৃষক মো. শাহাজ উদ্দিন জানান, সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হেক্টরের আম্রপালি বাগান আছে তার। তিনি চলতি বছর ৭ থেকে ১০ মেট্রিক টন আম পাবার আশা করছেন, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
তিনি আরও জানান, আম্রপালি আম সুস্বাদু হওয়ায় ঢাকাসহ সারাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু খাগড়াছড়ি থেকে আম জেলার বাইরে যেতে তাদেরকে বিভিন্ন গ্রুপকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
দিঘীনালা উপজেলার মধ্য আশ্রম এলাকার কৃষক তুষার বসু জানান, তার ১০-১২ হেক্টর জমিতে বাগান আছে। এখানে বিভিন্ন ফলদ গাছের পাশাপাশি আম্রপালিও আছে। আম্রপালি এবার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। তার বাগানের আম্রপালি কিনতে ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন পার্টি এসেছে।
পুরো বাগানের আম ঠিক কত টাকায় বিক্রি করতে পারবেন জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, আম সাধারণত তিন ক্যাটাগরিতে বিক্রি হয়। ভালো মানের আমগুলো কেজি প্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়, এর থেকে একটু নিম্নমানের আম ৭০ থেকে ৮০ টাকায় এবং তৃতীয় ধাপের আমগুলো ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করা যায়। সারা বছরের খরচ বাদ দিলে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা থাকবে।
খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. সফর উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহ থেকে আম্রপালি বিক্রি শুরু হবে। এবার প্রথম থেকেই ধারণা ছিল ফলন ভালো হবে। পাহাড়ের মাটি এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করেই এই প্রজাতির আম প্রচলন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। চলতি বছর আগাম বৃষ্টি পাওয়ায় ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে কৃষকদের।

Monday, June 4, 2018

'কীভাবে আছি কেউ খবরও রাখে নাই' by জিয়াউল হক

২০১৭ সালের ১ জুন লংগদুর স্থানীয় যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে লংগদু উপজেলায় পাহাড়িদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুই শতাধিক বাড়িঘর ও দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়ি বানানোর বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। কিন্তু যার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এত কিছু ঘটে গেছে, সেই নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন দুই শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। স্বামীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গত বছরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সরকার তো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বাড়ি দিচ্ছে। আমার জন্য তো কিছুই করলো না। আমার ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কীভাবে আছি কেউ কোনোদিন খবরও রাখে নাই।’
স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সেদিন (গত বছর ১ জুন) সকালে অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার স্বামী নয়ন তখন বাসায়, মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। বাচ্চাদের সঙ্গে দুষ্টুমি করছিল সে। তখন বাইরে থেকে কে যেন ডাক দেয়- ও নয়ন দা, নয়ন দা, হুদু তুই? (নয়ন ভাই, কোথায় তুমি?)। তখন তিনি (নয়ন) বাসা থেকে একটা শার্ট ও জিন্স পরে বের হয়ে যান।’ এরপর সেদিন বিকালেই খাগড়াছড়ির চারমাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
জানা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও সদর যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন গত ১ জুন লংগদু সদর থেকে মোটরসাইকেল ভাড়ায় খাগড়াছড়ি যান। দুর্বৃত্তের হাতে তিনি প্রাণ হারান বলে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
নুরুল ইসলাম নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘চার বছরের ছোট মেয়েটা প্রায়ই বলে- মা, বাবা কেন আসে না। বাবা কই? বাবাকে কল দাও। তখন কোনও জবাব দিতে পারি না ওরে। ছেলেটার পড়ালেখা করানো এখন কঠিন হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড় মেয়ের বিয়ে হওয়ার কারণে সে এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকে। স্বামী ছাড়া আমার আর আয় করার মতো লোক নাই। একবেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। দলীয়ভাবে যা কিছু পেয়েছি তা দিয়ে বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ছিল, বাজারের দোকানেও টাকা বাকি ছিল, সেগুলো দিয়ে এখন একেবারে হাত খালি। সরকার যদি আমার কোনও সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমিসহ আমার বাচ্চা দুইটার জীবনটা বেঁচে যেত। না হলে এই ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে কয়েকদিন পর না খেয়ে মরে যেতে হবে।’
পাহাড়িদের সঙ্গে তার স্বামী নয়নের সুসম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে এই এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি অনেক দিন রাতে বাড়ি ফিরতেন না। তখন ফোন দিলে বলতো অমুক পাহাড়ি বন্ধুর বাসায় থাকবে। আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম। কিন্তু তাকে কেন মারলো এখনও জানি না। আমার স্বামীর কোনও শত্রু ছিল কিনা আমার জানা নাই। ওনার সঙ্গে সবার ভালো সম্পর্ক ছিল জানতাম।’
স্বামীর মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যতটুকু জানতাম, জেএসএস-এর কালেক্টরের সঙ্গে তার একটু কথাকাটাকাটি হয়েছিল। সেটাও ওনার মৃত্যুর কয়েক মাস আগে। কারণ, তিনি লাইনের প্রধান ছিলেন। কী কারণে তাদের সঙ্গে ঝামেলা হয় তা এখনও জানি না।’
নয়নের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এভাবে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কীভাবে দেখেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম নয়নের স্ত্রী জাহেরা খাতুন বলেন, ‘এটা কেন হলো, কীভাবে হলো, আমি কিছুই জানি না। হতে পারে অনেকে তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে নাই।’ পাহাড়িদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে জাহেরা খাতুন জানান, ‘২ জুন সকালে আমার স্বামীর মরদেহের গোসল দিয়ে বিদায় দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শুনি ‘আগুন, আগুন’। আমরা তখনও বাসায় ছিলাম। কী করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ১ জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন ভাড়া নিয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকালে সেখানকার চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। ২ জুন নয়নের লাশ নিয়ে জানাজার জন্য বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে রওনা দিলে তিনটিলা পাড়ায় মিছিল আসার পর মিছিল থেকে হঠাৎ করে পাহাড়িদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ৩টি গ্রামের ২১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সরকার মোট ১৭৬টি বসতঘর নির্মাণ করার জন্য মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এসব বসতঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৩০ মে।

Thursday, May 17, 2018

ছদ্মবেশে ১৮ বছর

কখনো সাধুবাবা, কখনো দরবেশ ছদ্মবেশে থাকতেন রফিকুল ইসলাম। ছদ্মবেশের আড়ালে তিনি একজন অস্ত্রমামলার ওয়ারেন্টভূক্ত আসামি। দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি এ ভাবে নিজেকে আড়ালে রাখলেও বুধবার রাতে তিনি ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। তার পুরো নাম রফিকুল ইসলাম (৪০)। পানছড়ি থানা পুলিশ বুধবার রাত ১০টার দিকে দক্ষিণ উল্টাছড়ির গায়েবি মাজার থেকে আটক করে। সে স্থানীয় মুসলিমনগর গ্রামের মো: মনির হোসেনের ছেলে।
পানছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মো: মিজানুর রহমান জানান, রফিকুল ১৯৯৭ সালে খাগড়াছড়ি সদর থানার অস্ত্র আইনের ১৯ (চ) ধারার মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামী। দীর্ঘ ১৮ বছর রফিকুল ইসলাম আইন শৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছদ্মবেশে দরবেশ, সাধুবাবা সেজে দেশের বিভিন্ন মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়াত। কিছুদিন ধরে সে উল্টাছড়ি গায়েবি মাজারে আশ্রয় নেয়।

Wednesday, April 19, 2017

ভাংচুর ও পুলিশের লাঠিচার্জে চলছে খাগড়াছড়িতে হরতাল

ট্রাক ভাংচুর, পুলিশের ধাওয়া ও লাঠিচার্জের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে বাঙালি ছাত্র পরিষদের ডাকে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলছে।  বুধবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের উন্নয়ন বোর্ড সড়কের সামনে পিকেটাররা একটি ট্রাক ভাংচুর করলে পুলিশ পিকেটারদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় তিন পিকেটারকে আটক করলেও পরে তাদের ছিনিয়ে নেয়া হয়। এদিকে হরতালের কারণে জেলার দোকানপাট ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকায় সতর্ক অবস্থায় পুলিশ রয়েছে। ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে হত্যা ও পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অব্যাহত চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সংগঠনটি এ হরতালের ডাক দেয়।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান ,শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালিত হচ্ছে। হরতালে কারণে এখনো পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা নাইট কোর্সগুলো পুলিশি পাহাড়ায় শহরে প্রবেশ করেছে। এছাড়া সব ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শহরে ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ছাদিকুল ইসলামের (২৩) মোটরসাইকেলে ভাড়ায় ওঠেন দুই পাহাড়ি। তারা মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর চালক ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।