Showing posts with label ভোলা. Show all posts
Showing posts with label ভোলা. Show all posts

Thursday, May 21, 2026

’৭০–এর সাইক্লোনের ভয়াবহতা কেন আমরা ভুলে গেলাম by এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী

‘মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই; জল থই থই তীরে কিছু নেই নেই; ভাঙনের যে নেই পারাপার; তুমি আমি সব একাকার; মেঘ থম থম করে কেউ নেই নেই।’

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সীমানা পেরিয়ে’ নামক বাংলাদেশি একটি চলচ্চিত্রে গাওয়া ভূপেন হাজারিকার গানের অংশবিশেষ। চলচ্চিত্রটি একই বছরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ মোট চারটি বিভাগে এবং দুটি বিভাগে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছিল। এ ছাড়া ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থানও লাভ করেছিল ছবিটি।

১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পর একজোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল; তৎকালীন ঢাকার সংবাদপত্রে এমন খবর প্রকাশিত হয়।

চরে একজোড়া নারী-পুরুষের বেঁচে থাকা ও বসবাসের বিষয়টি পরিচালক আলমগীর কবিরের দৃষ্টিতে সবার থেকে আলাদা মনে হয়। সেই থেকে তিনি এ ঘটনাটি নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করার কথা ভাবেন এবং ১৯৭৫ সালে তিনি এটির নির্মাণকাজ শুরু করেন।

আজ চলচ্চিত্রটি একটি ইতিহাস। এই ইতিহাসের পেছনে রয়েছে নির্মম আরেক ইতিহাস। সেটি ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর, শুক্রবার। উপকূলের জীবন ইতিহাসের এক ভয়াবহ কালরাত। এদিন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ আর এক কোটি মৃত গবাদিপশু। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়বিধ্বস্ত মনপুরা ঘুরে ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে ২৮ ফুট লম্বা ‘মনপুরা ৭০’ নামে একটি শিল্পকর্ম চিত্রিত করেন। জয়নুল আবেদিন বলেন, ‘মনপুরায় আমরা যখন থার্ড ডেতে নামলাম, সি-প্লেনে আমি আর আমার বন্ধু একা ঘুরতাছি সারা দিন। কয়টা লোক বাঁইচা আছে দেখলাম। দৌড়ায় আসল। দেখলাম জখমওয়ালা। তারা কানতে আরম্ভ করল। আমরাও কানতে আরম্ভ করলাম। আপনারা বিশ্বাস করেন, আমার পেছনে...সমুদ্র...ঠিক সমুদ্র না সমুদ্রের খাঁড়ি, যেখানে যান, খালি গরু-মানুষ শুইয়া রইছে।’

সাগর-নদী-খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য মৃতদেহ। এসব মৃতদেহের সৎকার করাও সম্ভব হয়নি। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখো মানুষ। এই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা শুনলে আজও অনেকে শিউরে ওঠেন। প্রবীণেরা বর্ণনা দিতে গিয়ে জয়নুল আবেদিনের মতো হু হু করে কেঁদে ওঠেন। এ রকম হাজারো মর্মস্পর্শী ইতিহাস রয়েছে উপকূলের এ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ঘিরে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

উপকূলে যে ভয়াবহতা হয়েছে, তা এই প্রজন্মের মানুষ জানে না। এই দিন দিবস হিসেবে পালন করলে হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ মনে রাখত। প্রাথমিকভাবে উপকূল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’-এর দাবি ওঠে। আমরা চাই একটি দিবস, যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’। বাংলাদেশে ‘উপকূল দিবস’ শুরু হলে বিশ্বে প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি দিবস পালন করা হবে। বর্তমান সময়; আগামী দিনের ইতিহাস। আর বিশেষ কোনো ‘দিবস’ মানেই যার মাধ্যমে প্রতিবছর আগের ইতিহাসকে স্মরণ করা। তেমনি একটি দিবস হোক ‘উপকূল দিবস’।

উপকূল দিবসের প্রাসঙ্গিকতাই–বা কেন? দেশের ৭১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঝড়ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই ‘উপকূল’। উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বৈরী প্রতিকূলতা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে ফেরে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। তাদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। বন্যা, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। খাদ্যচাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে দেশে; যার সিংহভাগই উপকূলে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূল জিডিপির কমবেশি প্রায় ২৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর পুরোপুরি উপকূলকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের কলকারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টর এবং উপকূলের জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।

গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের ভূমিকাও কম নয়। আর এসব খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা, এনজিও, গণমাধ্যমসহ সবাই উপকূলের জন্য একটি দিবস প্রত্যাশা করবেন নিশ্চয়ই। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা ও জলবায়ুর ঝুঁকিতে থাকা উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য। ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ ও ‘বিশ্ব উপকূল দিবস’ দাবি প্রতিষ্ঠিত হলে আরও একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হব আমরা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ’৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

ভূপেন হাজারিকার ‘দূরের আর্তনাদের নদীর, ক্রন্দন কোনো ঘাটের, ভ্রুক্ষেপ নেই, পেয়েছি আমি, আলিঙ্গনের সাগর। সেই সাগরের স্রোতেই আছে, নিশ্বাসেরই ছোঁয়া, আছে ভালোবাসা, আদর।’ উপকূলের অবস্থা ঠিক তা–ই। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। ’৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় স্রোতের নিশ্বাসের ছোঁয়া, ভালোবাসা ও আদর যুগ যুগ ধরে অবহেলিত। গত ২০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই প্রভাব মোকাবিলা না করা হলে, জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে। ৫৬ বছর পর এই দিনটিকেই ‘উপকূল দিবস’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন সূচনা হোক।

* এম আমিরুল হক পারভেজ চৌধুরী, উপকূল গবেষক এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন। ই-মেইল: ahcparvezdu@gmail.com

ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০
ভোলা সাইক্লোন, ১৯৭০ ফাইল ছবি

Sunday, April 5, 2026

চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফলের চাষ, এখন হোসেনের বাগানে কাজ করেন ৫ জন by নেয়ামতউল্যাহ

একসময় ধান ছাড়া কিছুই চাষ হতো না। অথচ সেই ধানি জমিতেই ফলছে মিষ্টি কুল, আম ও কমলা। ভোলার লালমোহন উপজেলার এক কৃষকের সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে এলাকার কৃষিচিত্র। করোনাকালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে মো. হোসেন বিশ্বাস (৪৫) প্রমাণ করেছেন—সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে ধানি জমিতেও ফলানো যায় স্বাবলম্বিতার গল্প।

ভোলার লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ গ্রামের হোসেন বিশ্বাস ১৮০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি মিশ্র ফলের বাগান। এখানে ফল কিনতে এখন আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।

মো. হোসেন বিশ্বাসের বাবা জালাল আহমেদ বিশ্বাস (৭১) বলেন, করোনার লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে বেকার হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। ফল চাষের জন্য জমি চাইলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৮০ শতাংশ জমিতে যেখানে ৬০–৭০ মণ ধান হয়, সেখানে ফল চাষ করে লাভ কী। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘ফল তো পাখি ছাড়া কেউ খায় না।’ কিন্তু ছেলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এখন বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বিমুখ করে না, প্রথম বছরেই লাভ হলো। এখন তো আর কথা নেই।’

সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ডাওরী–বাহাদুর চৌমহনী–রায়চাঁদ বাজার সড়কের পূর্ব পাশে ধানি জমিতে মাটি ফেলে কাঁটা মান্দারের ডাল পুঁতে সুপারির চারা লাগানো হয়েছে। মান্দার পাতা পচে সারে পরিণত হয়—এটি ভোলার শত বছরের পুরোনো চাষপদ্ধতি। এই সুপারিবাগানের পাশেই নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে মো. হোসেনের মিশ্র ফলের বাগান।

যাঁরা একসময় হোসেন বিশ্বাসকে ‘পাগল’ বলতেন, তাঁরাই এখন ফলের বাগান করার কথা ভাবছেন। লালমোহন ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের বাগান থেকে বরই কিনতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, সুপারিবাগানের তুলনায় অন্যান্য ফলের বাগানে আয় অনেক বেশি।

হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেল, ভারত সুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুলের চাষ করেছেন। এসব চারা তিনি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর এক বন্ধুর খামার থেকে। এ ছাড়া বাগানে আছে ১৩০টি হলুদ মাল্টা, ৬০টি দার্জিলিং কমলা ও ১৪০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ।

ভোলায় আগে থেকেই বাউকুল, নারকেলি কুল, টক বোল, মিষ্টি বোল ও খুদে আপেল কুলের চাষ হলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বলসুন্দরী, চায়না টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের আবাদ শুরু হয়। এসব জাতের ফলন ও দাম দুটিই ভালো। মো. হোসেন এ বছর বাড়ি থেকেই কুল বিক্রি শুরু করেছেন ২০০ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে বলসুন্দরী বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি।

মো. হোসেন বিশ্বাস বলেন, তিনি দীর্ঘদিন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদরুল আমিনের অধীনে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ফল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে মেট্রোরেলে চাকরি করলেও করোনায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,‘আল্লাহ প্রথম বছরেই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। গত বছর ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ বছর শুধু কুল থেকেই ১৮ লাখ টাকার বিক্রি আশা করছি।’

হোসেনের বাগানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি ও চারবার নাশতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে বাগান করতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ফলের আবাদ হয়। এর মধ্যে নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল ও তরমুজের আবাদ প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে সারা বছর বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়।

লালমোহন উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেলে দোআঁশ মাটি ও আবহাওয়া বলসুন্দরী, টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের জন্য খুবই উপযোগী। এমনকি লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও কুল ভালো হয়। তাই বেকার যুবকেরা সহজেই এই চাষে স্বাবলম্বী হতে পারেন। মো. হোসেনের বাগান দেখে ইতিমধ্যে ওই গ্রামের বেকার যুবকেরা প্রায় ১২ একর জমিতে ফলের আবাদ শুরু করেছেন।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুল উচ্চফলনশীল। ভোলার উর্বর জমিতে এসব জাতের ফলন আরও বেশি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ভোলায় ফল চাষের সম্ভাবনা ও চাহিদা—দুটিই আছে। কৃষি বিভাগ ফলের আবাদ বাড়াতে নানা প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের পাশে আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Ffg8hqd0j%2FBhola-1.jpg?rect=480%2C0%2C3204%2C2136&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেলের চাষ করেছেন। ছবি: প্রথম আলো

Monday, January 6, 2025

কেন তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? by হাসান পিন্টু

১৮ বছরের কিশোর মো. আরিফ। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র ছেলে। বাবা পেশায় দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়েই বহু স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। আরিফ ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর এলাকার সেকান্তর মুন্সি বাড়ির মো. ইউসুফের ছেলে। একই ইউনিয়নের লর্ডহার্ডিঞ্জ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম ২য় বর্ষে পড়ালেখা করতো আরিফ। তবে পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে সে আর বেশি পড়তে পারেনি। কিশোর বয়সেই পাড়ি দেয় ঢাকায়। গত বছরের জুলাই মাসে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে খাবার হোটেলে কাজ শুরু করে।

জুলাই মাসের ১৯ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আরিফের ডান চোখের সামনে দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যায় মাথার পেছন দিয়ে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আরিফকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতাল নেয়া এবং তার লাশ বাড়িতে পাঠানো পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন তার মামাতো ভাই মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি জানান, ১৯শে জুলাই হোটেলের জন্য বাজার করতে গিয়ে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে আরিফ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। একটি গুলি তার চোখের সামনে দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেখানে থাকা লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এরপর দ্রুত সেখানে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা আরিফকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আরিফকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন রাত ৯টার দিকে আরিফের মরদেহ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলায় নেয়া হয়।
আরিফের মা ফরিদা বেগম বলেন, মারা যাওয়ার আগের রাতেও তার সঙ্গে কথা বলেছি। ওই রাতে আমার ছেলে আরিফ ফোন দিয়ে আমি এবং তার বাবাসহ পরিবারের অন্যদের খোঁজ নিয়েছে। পরদিন খবর আসে আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। সন্তান হারানোর ৫ মাস পেরিয়েছে। আজও তার কথা মনে করে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদছি। আমার ছেলের দোষটা কী ছিল? কেন তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? যাদের নির্দেশে এবং যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
বাবা মো. ইউসুফ বলেন, আমার ৬ সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে ছিল আরিফ। তার চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েছি। ওর মা সারাক্ষণ কাঁদতে থাকে। অভাবের সংসারে পরিবারের হাল ধরতে সে ঢাকায় গিয়েছিল। সেখানে যাওয়ার ১৭-১৮ দিনের মাথায় পুলিশের গুলিতে মারা যায়। আমি কখনো ভাবিনি আমার ছেলেটা এত নির্মমভাবে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এমনটা জানলে তাকে ঢাকায় যেতে দিতাম না। তিনি বলেন, আরিফের মাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছি না। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সে। ভবিষ্যতে সংসারের উপার্জন করার মতো ছেলেই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আজিজ বলেন, এই উপজেলায় আন্দোলনে যারা নিহত এবং আহত হয়েছেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করে এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারিভাবে নিহত পরিবারকে ৫ লাখ টাকা এবং আহতদের ১ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হবে।

mzamin

Sunday, October 6, 2024

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যেতে তোড়জোড় মুজিব-সুমনের

মো. মুজিব এবং সুমন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানুষজনকে মামলা, হামলা, চাঁদাবাজি এবং ব্ল্যাকমেইলিংসহ নানাভাবে হয়রানি করার। তারা ভোলার লালমোহন উপজেলার কালমা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরছকিনা এলাকার বাসিন্দা। এরমধ্যে সুমন জড়িত ছিলেন লালমোহন পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে আর মুজিব জড়িত ছিলেন পৌর যুব লীগের রাজনীতির সঙ্গে। আওয়ামী লীগের সময় প্রভাব বিস্তার করা এই দুই নেতা এখন বিএনপিতে ভেড়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে। সুমন এবং মুজিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিজের ক্ষোভের কথা জানান কালমা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান রতন। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে ভোলায় বিএনপি’র একটি প্রোগ্রামে যাওয়ার দায়ে তারা আমার সঙ্গে থাকা জসিম নামে এক বিএনপি নেতাকে বেধড়ক মারধর করেন। এ ছাড়া সুমন এবং মুজিব আমার থেকে চাঁদা নেন। এমনকি আমার ছেলের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন। এর কিছুদিন পর আবার পৌরসভার গুদিরপুল এলাকায় মুজিব ও সুমনের নেতৃত্বে আমাকে ব্যাপক মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়। তখন আমি লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে চিকিৎসা নিই। আমার অপরাধ ছিল কেন আমি বিএনপি করি।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া আমার ওয়ার্ডের বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক কাশেম মিয়াকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগে মামলা দিয়ে হয়রানি এবং মারধর করেছেন মুজিব এবং সুমন। তাদের অত্যাচারে তখন এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হন তিনি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে তারা এমন অনেকের সঙ্গেই হামলা, মামলা এবং চাঁদাবাজি করে বেড়াতেন। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই মুজিব আর সুমন এখন বিএনপি সাজার তোড়জোড় চালাচ্ছেন। আমি একজন বিএনপিকর্মী হিসেবে দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে অনুরোধ করবো- এই মুজিব এবং সুমনকে যেন কোনোভাবেই বিএনপিতে স্থান না দেয়া হয়। এই মুজিব এবং সুমনের বিরুদ্ধে অত্যাচারের বেশ কিছু অভিযোগ পান কালমা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. ফারুক মাল। ওইসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাইলে ফারুক মালকেও নানাভাবে হয়রানি করেন মুজিব এবং সুমন। ফারুক মাল জানান, মানুষের কাছে চাঁদাবাজি, সুদের কারবার ও ব্লাকমেইলিং ছিল তাদের পেশা। এসবের টাকায় মুজিব এবং সুমন এলাকায় লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে সুরম্য বাড়ি করেছেন। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর বিচার করার দাবি জানাচ্ছি। অভিযোগের ব্যাপারে মো. সুমন বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে আমার ওপর অনেক হামলা এবং অত্যাচার চালানো হয়েছে। যার জন্য একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছি। তবে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে সবগুলোই ভিত্তিহীন। অন্যদিকে মুজিবের বিরুদ্ধে হামলা, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, আমি কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতি করিনি। তবে আমার চলাফেরা ছিল সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে। কারণ তিনি আমাকে ভাই ডেকেছেন। তবে যেই রতন অভিযোগ করেছেন, তিনি এবং তার ছেলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন।

mzamin

Friday, September 27, 2024

লাশ লঞ্চের ছাদ থেকে ফেলে দেয় প্রেমিক: ধর্ষণের পর জোসনাকে হত্যা

ভোলার চরফ্যাশনের মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া তরুণীর মরদেহের পরিচয় মিলেছে। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের পরিবার লাশটি গতকাল সকালে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেছেন। তবে ওই তরুণীর পরিবার দাবি করেছে ধর্ষণের পর জোসনাকে হত্যা করে তার লাশ লঞ্চের ছাদ থেকে ফেলে  দেয়া হয়।

এর আগে বুধবার দুপুরের দিকে চরফ্যাশনের মেঘনা নদীর প্রশান্তি পার্ক সংলগ্ন এলাকা থেকে জোছনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে মরদেহটির পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া গেলেও বিকালের দিকে পরিবার মরদেহটি শনাক্ত করে। জোছনার বাড়ি চরফ্যাশনের এওয়াজপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। সে ওই ওয়ার্ডের দিনমজুর জাহাঙ্গীর ও কুলসুম বেগমের মেয়ে। তার স্বামীর নাম মো. রাকিবুল ইসলাম। জোছনার মা কুলসুম বেগম জানান, গেল ৬ মাস আগে একই উপজেলার হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রিকশাচালক রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে জোছনার বিয়ে হয়। বিয়ের ২ মাস পর শশুরবাড়ির লোকজন তাকে ঢাকার গাবতলীতে নিয়ে যায়। তবে রাকিবের সংসারে খুব অভাব ছিল। দিন এনে দিন খেতে তার সংসারে কষ্ট হতো। প্রায়ই জোছনা তার মাকে ফোন করে বলতো, রাকিবের সংসারে সে খুব অভাবে আছে, কষ্টে আছে।

গাবতলীতে যাওয়ার ১ মাস পর মানিক নামের এক রাজমিস্ত্রির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে জোছনার। এরপর একাধিকবার গাবতলী থেকে মানিকের সঙ্গে সে পালিয়ে যায়। এসব ঘটনার কারণে জোছনাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় শশুরবাড়ির লোকজন। দেড়মাস আগে ঢাকা থেকে সে গ্রামের বাড়িতে আসে।
এখানে এসেও পরকীয়া প্রেমিক মানিকের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সবশেষ চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মানিক ঢাকা থেকে জোছনার গ্রামের বাড়ি চরফ্যাশনে আসে। এরপর সেখান থেকে জোছনাকে নিয়ে মানিক পালিয়ে যেতে চাইলে স্থানীয়রা তাকে গণধোলাই দিয়ে ঢাকায় চলে যেতে বলেন। কিন্তু, মানিক ঢাকা না গিয়ে একরাত চরফ্যাশনের একটি হোটেলে থাকে। পরদিন পুনরায় জোছনার সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাকে নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে যায়।

ঢাকায় গিয়ে মানিক জোছনার মাকে ফোন করে জানায়, তারা দু’জন সেখানে বিয়ে করেছেন। এরপর জোছনার মা মানিকের কাছে অনুনয়-বিনয় করলে ১৪ই সেপ্টেম্বর বিকালে মানিক জোছনার মাকে ফোন করে জানায়, সদরঘাট থেকে জোছনা হারিয়ে গেছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
জোছনাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, আমার মনে হচ্ছে আমার মেয়েকে মানিক বিয়ে না করেই লঞ্চে ধর্ষণ করে ছাদ থেকে নদীতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেছে। আমি আমার মেয়ে জোছনার হত্যাকারীর বিচার চাই। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি আরও বলেন, মেয়েটি আমার খুব আদরের। দুই ভাইয়ের মধ্যে জোছনা বড়। আমার পরিবারটি দরিদ্র হওয়ার কারণে ১৬ বছর বয়সে মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেই।
নিহত জোছনার স্বামী রাকিবুল ইসলাম জানান, খুব অল্প বয়সেই তিনি জোছনাকে বিয়ে করেছেন। কিন্তু, অভাবের সংসারে তিনি তাকে সুখে শান্তিতে রাখতে পারেননি। পরকীয়া প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গিয়ে সে আজ খুন হয়েছে। জোছনার পরকীয়া প্রেমিক মানিকের ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। জোছনার শাশুড়ি জানিয়েছেন, মানিকের বাড়িও ভোলায়। তবে ভোলার কোন জায়গায়, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। এ ছাড়াও জোছনা এবং রাকিবের পরিবার মানিককে ভালোভাবে চেনে-জানে না।
এদিকে বুধবার দুপুরের দিকে জোছনার লাশ উদ্ধার হওয়ার পর পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার কারণে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে তার লাশের ছবি পোস্ট করেন।

আল-আমীন ফরাজি নামের এক ব্যক্তি জোছনার লাশের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, গতকালকে (মঙ্গলবার) ঢাকা থেকে চরফ্যাশন এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময় এই মেয়েটাকে আমরা কর্ণফুলী-১২ লঞ্চে দেখেছি, হাউমাউ করতেছে। তখনো লঞ্চ সদরঘাটে। মেয়েটির সুন্দর চেহারা অথচ মানসিক সমস্যায় ভুগছে। রাতে তাকে ৩ তলার সামনে নিয়ে গেছে একটি লোক। আজ দুপুরে ফেসবুকে দেখি অনেকেই পোস্ট করছে বেতুয়া এলাকায় একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। যখন এই ছবিটা দেখলাম। তখনই আমার মনে হলো এই মেয়েটাকে তো গতকাল রাতে কর্ণফুলী ১২ লঞ্চে দেখেছিলাম। আসলে কেমনে কী হয়েছে আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন।
ভোলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শরিফুল হক বলেন, ‘জোছনার মৃত্যুর বিষয়ে প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। যখন অপমৃত্যু মামলা হয়েছে, তখনো তার পরিচয় মেলেনি। বিকালের দিকে জোছনার পরিবার চরফ্যাশন থানায় গিয়ে পরিচয় শনাক্ত করেছে। জোছনার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তার বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানতে পেরেছে।

ঘটনাটি মর্মান্তিক উল্লেখ করে শরিফুল হক বলেন, এটি যদি হত্যা হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই হত্যা মামলা হবে। পুলিশ ঘটনাটির বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

Thursday, September 19, 2024

ছোট্ট জিহাদের জীবিকার সংগ্রাম

মো. জিহাদ। বয়স ১২ কিংবা ১৩। বয়সের হিসেবে সে এখনো শিশু। তার বয়সের অন্য শিশুরা রোজ বই-খাতা নিয়ে যায় স্কুল-মাদ্রাসায়। থাকে বাবা-মায়ের পরম যত্নে। তবে ছোট্ট জিহাদ এই বয়সেই ভীষণ দায়িত্বশীল। বয়সের হিসেবে এই বয়সে তারও থাকার কথা ছিল স্কুল বা মাদ্রাসায়। জিহাদও মাদ্রাসায় গিয়েছিল হাফেজি পড়তে তবে তা আর দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবার অসুস্থতার কারণে তাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে পড়ালেখা। বাবার অসুস্থতার কারণে এখন ছোট্ট জিহাদের কাঁধে পুরো পরিবারের দায়িত্ব। পরিবারে রয়েছে-অসুস্থ বাবা, মা এবং ছোট এক ভাই। ভোলার লালমোহন পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মধুছন্দা সিনেমা হল সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসায় গত দেড় বছরের মতো সময় ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকে জিহাদ। তবে তার আসল ঠিকানা উপজেলার কালমা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাজার এলাকার ধনগাজী সরদার বাড়ি। সে ওই বাড়ির মোহাম্মদ আলীর ছেলে।

জিহাদ জানায়, গত ৩ বছরেরও অধিক সময় ধরে আমার বাবা অসুস্থ। তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। তাই মা মানুষের বাসায় কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন। আমিও পড়ালেখা করতাম। তবে সংসারে অভাবের কারণে আর পড়তে পারিনি। যার জন্য গত এক বছর আগ থেকে শুরু করি ভাঙারি মালামাল সংগ্রহ ও কেনার কাজ। প্রতিদিন সকালে একটি ভ্যানগাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষের কাছ থেকে পুরনো ভাঙারি মালামাল কিনি, একইসঙ্গে নিজেই আবার মানুষের ফেলে দেয়া অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করি। এরপর ওইসব মালামাল বিকালে আড়তে নিয়ে বিক্রি করি। এতে করে দৈনিক এক হাজার থেকে বারো শত টাকার ভাঙারি মালামাল বিক্রি করতে পারি। সেখান থেকে লাভ হিসেবে থাকে তিনশত থেকে সাড়ে তিনশত টাকার মতো। লাভের এই টাকা থেকে নিজের জন্য কিছু রেখে বাকি টাকা বাবাকে দিই। ওই টাকা দিয়ে তিনিই সংসার চালান। এ কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়। তবুও নিরুপায় হয়ে এ কাজ করছি।
জিহাদের ছোট আমার আরেক ছেলে রয়েছে। সন্তানদের মধ্যে সবার বড় ছিল মেয়ে। তাকে ধারদেনা করে বিয়ে দিয়েছি। তবে এখন যে দুই ছেলে রয়েছে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? তাই ভাবতে পারছি না। আমার নিজস্ব তেমন কোনো সম্পদও নেই। গরিবদের জন্য তো সরকারি অনেক সাহায্য-সহযোগিতা রয়েছে। আমার অবস্থা বিবেচনা করে সেখান থেকে কোনো একটি সহযোগিতা দিলে আমার জন্য খুবই ভালো হতো।
এ বিষয়ে উপজেলা ইউএনও মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করবো।

mzamin

Sunday, September 15, 2024

বঙ্গোপসাগরে ভোলার পাঁচ ট্রলারডুবি, ৪৯ জেলে উদ্ধার

সাগরে নিম্নচাপ ও দু’দিন ধরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে ভোলার মনপুরা ও চরফ্যাশন উপজেলার পাঁচটি ট্রলার বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেছে। এ ঘটনায় ৫টি ট্রলারের ৪৯ জন মাঝিমাল্লা জীবিত উদ্ধার হয়েছে। তবে স্বজনরা জানিয়েছেন এখন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া অনেকে ফেরত আসেনি। জেলা শহরসহ সাত উপজেলায় গত দু’দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন দ্বীপের মানুষ। ১৩ই সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এই ৫টি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার।

পাঁচটি ট্রলারের মধ্যে ৪টি ট্রলার ডুবেছে নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন খরচির চর এলাকার বঙ্গোপসাগর মোহনায়। অপরটি ডুবছে ঢালচর এলাকার বঙ্গোপসাগর মোহনায়। পাঁচটি ট্রলারে মোট ৪৯ জন মাঝিমাল্লা ছিল। তাদের সবাই জীবিত উদ্ধার হয়েছে। পাঁচটি ট্রলারের মধ্যে ৪টি ট্রলার মনপুরা উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের উৎপল মাঝি, স্বপন মাঝি, বাকের মাঝি ও আব্দুল হান্নান দপ্তরির। অপরটি ঢালচর ইউনিয়নের মো. আকতার মাঝির। ডুবে যাওয়া ট্রলারের মধ্যে উৎপল মাঝির ট্রলারে ছিলেন ৭ জন মাঝিমাল্লা, স্বপন মাঝির ট্রলারে ছিলেন ৮ জন, বাকের মাঝির ট্রলারে ছিলেন ১০ জন, আব্দুল হান্নান মাঝির ট্রলারে ছিলেন ১৪ জন ও আকতার মাঝির ট্রলারে ছিলেন ১০ জন মাঝিমাল্লা। খরচির চর এলাকায় ডুবে যাওয়া ৪টি ট্রলারের মাঝিমাল্লারা মনপুরার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। অন্যদিকে ঢালচর এলাকায় ডুবে যাওয়া আকতার মাঝির ট্রলারের সকল জেলের বাড়ি ঢালচর ও চর মানিকা এলাকায়। ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝি আকতার, উৎপল, বাকের ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার মানবজমিনকে জানান, গত শুক্রবার দুপুর থেকে হঠাৎ করে বঙ্গোপসাগর মোহনায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করে। এ সময় ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝিরা সাগর থেকে নিরাপদ জায়গায় আসতে শুরু করেন। বিকাল ৪টার দিকে প্রবল ঢেউয়ের চাপে আকতার মাঝির ট্রলারটি ১০ জন মাঝিমাল্লা নিয়ে ডুবে যায়। সঙ্গে সঙ্গে অপর একটি ট্রলার ৩ জেলেকে উদ্ধার করে। ঘটনার ৩ ঘণ্টা পর অন্য দু’টি ট্রলার নিখোঁজ ৭ জেলেকে উদ্ধার করে ঢালচর এলাকায় নিয়ে যায়। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নোয়াখালীর নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন খরচির চর এলাকার একই জায়গায় উৎপল মাঝি, স্বপন মাঝি, বাকের মাঝি ও আব্দুল হান্নান মাঝির ট্রলারসহ ৪টি ট্রলার ডুবে যায়। এ সময় ডুবে যাওয়া ট্রলারের মাঝিমাল্লারা সাগরে থাকা বয়া ধরে ভেসে থাকে। ঘণ্টাখানেক পর অপর দু’টি ট্রলার তাদের উদ্ধার করে।
ভোলার মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরার ৫টি জেলে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় নিখোঁজ কেউ নেই। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের তালিকা তৈরি করে তাদের সরকারি সহায়তা দেয়া হবে।

তবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত পুরো ভোলা জেলা জুড়ে চরম বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করায় অনেক জেলের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি। মৎস্য বিভাগ বলছে সকল জেল গতকাল লঘু চাপ চলাকালীন সময়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু জেলেদের স্বজনরা বলছেন এখনো সাগরে অনেকগুলো মাছ ধরা ট্রলার রয়েছে, যারা এখনো ফিরে আসেননি। অপরদিকে গত দু’দিন ধরে প্রবল বর্ষণ এবং বাতাসে ভোলার জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ সবজি সরবরাহ কম থাকায় দাম অনেকাংশে বেড়ে গেছে। ২ দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকাই বিপাকে পড়েছেন পুরো জেলার মানুষ। সাগর এবং মেঘনা মোহনা চরম উত্তাল থাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে ভোলার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ লঞ্চ যোগাযোগ।
mzamin

Friday, August 2, 2024

গুলিতে প্রাণ গেল হাবিবের সন্তানদের নিয়ে দিশাহারা স্ত্রী by হাসান পিন্টু

ভোলার লালমোহন উপজেলার ৪০ বছর বয়সী মো. হাবিব। ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজী এলাকার কাদের মৌলভী বাড়ির মৃত শফিউল্যাহর ৫ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। খুব ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান। এরপর তার মা সন্তানদের নিয়ে জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকায়। সেখানে তিনি একটি কারখানায় কাজ করে বড় করে তোলেন হাবিবসহ অন্যান্য সন্তানদের। কিছুটা বড় হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় হাবিবের জীবন সংগ্রাম। বেছে নেন ড্রাইভিং পেশা। কখনো সিএনজি আবার কখনো প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে চালাতেন। ২৪ বছর আগে বিয়ে করেন হাবিব। তার ৩ কন্যা সন্তান এবং এক পুত্র সন্তান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকতেন ঢাকার শনির আখড়ার ধনিয়া পাটেরবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাসায়। সুন্দরভাবেই চলছিল হাবিবের সংসার।

গত ২০শে জুলাই তার পরিবারের সদস্যদের সব আনন্দ রূপ নেয় বিষাদে। ওইদিন ঢাকায় চলছিল আন্দোলনকারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ। তবুও জীবিকার তাগিদে বের হন গ্যারেজে রাখা সিএনজি বের করতে। গ্যারেজে যাওয়ার আগেই হঠাৎ করে গুলিবিদ্ধ হন হাবিব। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তাকে দুই পথচারী নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। খবর পেয়ে হাবিবের নিথর দেহ দেখতে ছুটে যান ছেলে-মেয়ে এবং ছোট ভাইসহ স্বজনরা। তাদের সেখানে পৌঁছানোর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় লাশ শনাক্ত করতে। এরপর তারা খোঁজা শুরু করেন লাশ। একপর্যায়ে খোঁজ মেলে হাবিবের প্রাণহীন দেহের। ময়নাতদন্ত শেষে ওই লাশ স্বজনদের বুঝিয়ে দেয়া হয় ২১শে জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে। এরইমধ্যে নরম হয়ে যায় হাবিবের মরদেহ। যার জন্য আর হাবিবের মরদেহ গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজীতে নেয়া সম্ভব হয়নি। স্বজনরা বাধ্য হয়ে জুরাইন কবরস্থানে হাবিবের লাশ দাফন করেন।

বর্তমানে চরম বিপাকে তার স্ত্রী-সন্তানরা। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন হাবিব। তার অনুপস্থিতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাবিবের স্ত্রী মোসা. আয়েশা বেগম। সন্তানদের মধ্যে সবার বড় মেয়ে। সে ইন্টারমেডিয়েটে পড়ালেখা করে। এরপরই ছেলে মো. রিয়াদ। তার বয়স ১৫ বা ১৬। সংসার চালাতে বাবাকে সাহায্য করতে স্থানীয় একটি সুইস কারখানায় চাকরি নেন রিয়াদ। এ ছাড়া তিন বছর ও এক বছর বয়সী আরও দুই মেয়ে বাসায় মায়ের সঙ্গেই থাকে। এদের ভবিষ্যতের চিন্তায় দিশাহারা হাবিবের স্ত্রী আয়েশা বেগম। মুঠোফোনে হাবিবের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামীর তো কোনো দোষ ছিল না, তাহলে কেন আমার নিরীহ স্বামীকে মারা হলো? স্বামী তো এখন আর দুনিয়াতে নেই। দাবি করেও আর স্বামীকে ফিরে পাবো না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যদি আমার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে কোনো সহযোগিতা করা হয় তাহলে খুবই উপকার হবে।

মুঠোফোনে প্রতিবেদককে নিহত হাবিবের ছোটভাই মো. নূরউদ্দিন জানান, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে যাই। ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ গ্রহণ করি। আমার ভাই হাবিবের হৃদপিণ্ড ও কোমরে দুইটি গুলি লেগেছে। লাশ গ্রহণের পর থেকে দাফন পর্যন্ত আমি উপস্থিত ছিলাম। ভাইকে দাফন করে রেখে এসেছি। তবে তার স্ত্রী-সন্তানদের এখন কী হবে? আমার ভাইয়ের বিবাহ উপযুক্ত একজন মেয়ে আছে। এ ছাড়া ছোট আরও দুই মেয়েসহ একজন ছেলেও আছে। আমার ভাই-ই ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। এখন তিনি নেই। তার পরিবারের সদস্যদের কী হবে? ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তার স্ত্রী-সন্তানদের আমার সাধ্যের মধ্যে সহযোগিতা করছি। এভাবে আর কতোদিন সহযোগিতা করতে পারবো। আমি নিজেও তেমন সচ্ছল না। তাই সরকারের কাছে আমার অনুরোধ; আমার মৃত ভাইয়ের সন্তানদের কথা মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে যেন আর্থিকভাবে তাদের সহযোগিতা করা হয়।

তিনি আরও জানান, ছোট বেলায় আমরা মায়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসার পর তেমন আর এলাকায় যাওয়া হয়নি। এই সুযোগে গ্রামে থাকা চাচারা আমাদের জমি তাদের নামে করিয়ে নিয়েছেন। যার জন্য গ্রামে আর আমাদের নিজস্ব কোনো জমি বা সম্পত্তি কিছুই নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমরা ঢাকায় ভাড়া বাসায়ই থাকছি। আমার মৃত ভাই হাবিবের স্ত্রী-সন্তানদেরও এখন বাধ্য হয়ে ঢাকাতেই থাকতে হবে।
এ ব্যাপারে লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাহবুব উল আলম বলেন, ঢাকার আন্দোলনে লালমোহন উপজেলার মোট ৭ জন নিহত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা তাদের তথ্য সংগ্রহ করেছি।

আমার নাতিপুতি ক্যামনে চইলবো কে খাওন খোরাক দিবো by শাহাবুদ্দিন সিকদার

রাজধানী ঢাকায় কোটা আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন হোসেন (২৫)। নিহত হোসেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানাধীন নীলকমল ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড চর নুরুল আমিন গ্রামের মৃত: জাফরের ছেলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতেন মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে। তিনি মালবাহী ট্রাক চালাতেন। গত ১৯শে জুলাই  বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৩০ মিনিটে হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার লাশ উদ্ধার করে ২০শে জুলাই শুক্রবার  গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। নিহত হোসেনের মৃত্যুতে এলাকায় এখন শোকের মাতম।

নিহত হোসেনের মা রিনা বেগম মোবাইলে জানায়, প্রায় ১০ বছর আগে ৩ ছেলে ১ মেয়েকে রেখে আমার স্বামী মো. জাফর মৃত্যুবরণ করেন। বড় ছেলে হাসান (২৭) একজন অটো রিকশাচালক। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার ভিন্ন। দ্বিতীয় ছেলে নিহত হোসেন (২৫)।

সে ছিল ট্রাক ড্রাইভার। দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ভিন্ন সংসার চালাতো। তৃতীয় ছেলে রাকিব (২০)। সে হলো প্রতিবন্ধী। চতুর্থ হলো সাথী বেগম (১২)। বাবার মৃত্যুর পর এদেরকে নিয়ে আমি অনেক কষ্টে ইট ভাঙার কাজ করে সংসার চালাতাম। ছেলেগুলো বড় হলো। হাসান এবং হোসেনকে বিয়ে করালাম। তাদের সংসার হয়েছে। তারা আলাদা সংসার চালায়। প্রতিবন্ধী রাকিব ও ছোট মেয়েটা নিয়া আমি ভিন্ন বাসায় থাকি। আমি বর্তমানে পুরাতন বিল্ডিং ভাঙার কাজ করি। দৈনিক ২/৩শ’ টাকা করে পাই। এ নিয়ে কোনোরকমে সংসার চলছে। আমার ছেলে নিহত হোসেন ট্রাক চালাতো। ঘটনার রাত ১৯শে জুলাই বৃহস্পতিবার ট্রাকটি গাবতলী রেখে রাত ২টা ৩০ মিনিটে মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে পৌঁছলে কোথা থেকে যেন গুলিতে নিহত হয় ছেলে মো. হোসেন। সংবাদ পেয়ে রাত ৩টায় গিয়ে দেখি আমার ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে। স্থানীয়রা জানায়, আরও ১ জনের লাশও এখানে পড়েছিল। সেটি কারা যেন নিয়ে গেছে। আহত হয়েছে অন্য একজন ছেলে। সেটি নেয়া হয়েছে কোনো এক হাসপাতালে। তাদের পরিচয় আমি জানি না। আমার ছেলের লাশ উদ্ধার করে ২০শে জুলাই শুক্রবার বেলা ১১টায় ঘটনাস্থল মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান জামে মসজিদ সংলগ্ন জানাজা শেষে এম্বুলেন্সযোগে ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসি। ঐদিন রাত এশার নামাজের পর দ্বিতীয়বার জানাজার শেষে তার নানাবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।  মা রিনা বেগম আরও জানান, ছোটবেলায় তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। অনেক কষ্টে ছেলে- মেয়েদেরকে বড় করেছি। এখন হোসেনও মারা গেছে। নিহত হোসেনের দুই মেয়ে লিমা (৫) ও সীমা (২ বছর ৬ মাস)। আছে স্ত্রী হাসনুর (২১)। হোসেনের মৃত্যুর পর বর্তমানে আমরা ঢাকায় আছি। মা রিনা বেগম বিলাপ দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমগো জাগা-জমি বইলতে কিছু নাই। আমার নাতিপুতি ক্যামনে চইলবো। কে খাওন খোরাক দিব। হে আল্লাহ্‌ তোমার কাছে বিচার। প্রধানমন্ত্রী যেন আমাগরে একটু সহযোগিতা করে। এটাই আমার দাবি।’