Tuesday, May 18, 2010

জননীর কাছে by মাহফুজ রহমান

হাজার হাজার সালাম নিও/ জাহানারা ইমাম,/ বাঙ্গালির মনে অমর হোক তোমার ওই নাম।/ তুমি মোদের সবারই মা/ তুমি মোদের আশা,/ দেশের জন্য করেছ উজাড়/ সকল ভালবাসা।/ জানি তুমি যাচ্ছো লড়ে/ করতে দেশের ভালো,/ রাজাকারকে হটিয়ে দিয়ে/ আনতে দেশে আলো।/ তোমার রুমী হারিয়ে গেছে/ দুঃখ কি মা তাতে?/ আমরা তোমার সন্তান সব/ থাকবো তোমার সাথে।

‘মাকে’ শিরোনামের এ ছড়াটির লেখক ১২ বছরের মারজানা সাবিহা শুচি। ছড়াটির এক জায়গায় লেখা—‘জানি তুমি যাচ্ছো লড়ে’, মানে ছড়াটি লেখার সময় ছোট্ট শুচির ‘মা’ লড়াই করছিলেন। কার বিরুদ্ধে, কেন সেই লড়াই? আর কোন সে ‘মা’, যাঁকে লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল? অতীত বলে, শুচির ‘মা’ তিনিই, যিনি রাজপথে নেমেছিলেন সাধারণ দেশপ্রেমিকদের নিয়ে। লড়াই করেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী সব অপশক্তির বিরুদ্ধে। হ্যাঁ, তিনি শহীদজননী জাহানারা ইমাম।
আমাদের অনেকেরই শহীদজননীকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে এক অর্থে তাঁকে আমরা দেখেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথে সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া জাহানারা ইমামকে আমরা দেখেছি বইয়ের পাতায়, পত্রপত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনের ছোট্ট ক্যানভাসে। একসময় মনে প্রশ্ন জাগে, কতটুকু দেখেছি তাঁকে, কতটুকু বুঝেছি তাঁর কথা? বই, পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশনের ছেঁড়া ছেঁড়া এবং ছোট ক্যানভাসের এই দর্শন কি তাঁকে চেনার জন্য যথেষ্ট? উত্তরটা অবশ্যই ‘না’। তাই আরও কাছ থেকে দেখতে চাই তাঁকে, আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে চাই তাঁর আন্দোলনমুখর জীবনটাকে। এ সময় হাতে একটা চিরকুট আসে, তাতে একটা ঠিকানা—শহীদজননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর, কণিকা, ৩৫৫ শহীদজননী জাহানারা ইমাম সরণি, পুরাতন এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, ঢাকা-১২০৫।
ভরদুপুর। তেতে আছে রাস্তাঘাট। ভাগ্যিস ঠিকানাটা খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। সপ্তাহে শুধু শনিবারই খোলা থাকে এই ‘কণিকা’। সিঁড়ি ভেঙে কণিকার দোতলার ঘরটাতে ঢুকতেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস। ঘরে ঢোকার ঠিক ডানে কাঁচা হাতে লেখা কয়েকটা পঙিক্ত বাঁধাই করে রাখা। সে কটা পঙিক্ত মারজানা সাবিহা শুচির, যে ছড়াটা দিয়ে এই লেখার শুরু। শুচির ছড়ার পাশে একটা লাঠি। জাদুঘরে কর্মরত একজন বললেন, ‘আম্মা (জাহানারা ইমাম) যখন অসুস্থ, তখন এই লাঠিতে ভর করে চলাফেরা করতেন। রাজপথে বেরোতে হলেও লাঠিটি তাঁর হাতে থাকত।’ লাঠিটার অগ্রভাগে কালসিটে দাগ। কল্পনায় ঘাতক-দালালদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো দেখতে পাই। জাহানারা ইমাম এগিয়ে চলছেন, হাতে এই লাঠি! মিছিলের পুরোভাগে থাকা জননীর আলোকচিত্র। কোনো কোনো আলোকচিত্রে তর্জনী উঁচিয়ে বক্তৃতা করছেন তিনি। কোনোটাতে হয়তো সাধারণ জনগণের কথা শুনছেন, কোনোটায় আলোচনা করছেন আন্দোলনের সহযাত্রীদের সঙ্গে। মাথার ওপরে গনগনে সূর্য, শারীরিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অবিচল শহীদজননী।
ঘরের একপাশে বই ও আলোকচিত্রের অ্যালবামের সংগ্রহ। জাহানারা ইমাম ও সংগ্রামমুখর জীবনের কথা জানতে চাইলে যে কেউ এখানে আসতে পারেন, দেখতে পারেন ছবি। তার পাশে সোফাসেট। এক কোণে ‘ঘাতক-দালালের বিচার চাই’ লেখা অনেক পোস্টার। ঘাতক গোলাম আযমের নাগরিকত্ববিষয়ক মামলার প্রমাণপত্র। একাত্তরে রাজাকারদের কুকীর্তির ফিরিস্তি। একপাশে শহীদজননীর ব্যবহূত চেয়ার, ড্রেসিং টেবিল, চিরনিটাও আছে সেখানে। আছে পুরোনো একটা গ্রামোফোন, ‘আম্মার অসুস্থাবস্থার সঙ্গী ছিল এই যন্ত্র। গান শুনতে বড় পছন্দ করতেন তিনি।’ ঘুরে দেখাতে দেখাতে বলছিলেন জাদুঘরের একজন তত্ত্বাবধায়ক।
খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা একটা খাট। পাশে লেখা—এ খাটেই ঘুমাতেন শহীদজননী জাহানারা ইমাম। খাটের তাকে রাখা আছে ফুলদানি, ছোট ছোট পুতুল, বেটোভেন, ফিরোজা বেগমের নজরুলগীতিসহ আরও কিছু ক্যাসেট। পাশেই ন্যাশনাল ব্র্যান্ডের লালরঙা একটা পুরোনো ক্যাসেটপ্লেয়ার। শহীদজননী যখন ক্যানসারের সঙ্গে বসবাস করছেন, তখন এ ক্যাসেটপ্লেয়ারটি ছিল তাঁর একান্ত সঙ্গী। কাহলিল জিবরানের দ্য প্রোফেট, দিনলিপি ১৪১৪; ড. বদিউজ্জামানের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনামুখ এমন কয়েকটি বইও সাজিয়ে রাখা আছে খাটের তাকে। খাটের পাশেই একটা ময়না পাখি বসে আছে। দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, কাছে গেলে বোঝা যায়—প্রাণ নেই পাখিটির দেহে। ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলনের সময় শহীদজননীকে চট্টগ্রামের কেউ একজন এই পাখিটি উপহার দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, একটু পরপর ‘জয় বাংলা’ বলে ডাকাডাকি করত ময়নাটা! জননীর প্রিয় পাখিটি মারা গেছে তাঁর মৃত্যুর কিছুকাল পরে। ‘তাই প্রিয় পাখিটিকে বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা রাখা হয়েছে এখনো। জাদুঘরের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। ওয়েবসাইট খোলারও পরিকল্পনা আছে। জাদুঘরে এখন নতুন প্রজন্মের অনেকেই আসে। আমরা চাই স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা নিয়মিত আসুক এখানে।’ নিজেদের পরিকল্পনার কথা বলছিলেন জাদুঘরের একজন তত্ত্বাবধায়ক।
ঘরের পুবে একটা বারান্দা। বারান্দাজুড়ে ফুলের গাছ আর ছবি। রাজপথের ছবির পাশাপাশি পারিবারিক অনেক ছবিও আছে সেখানে। বারান্দা থেকে ফের ঘরে। ঘরের দেয়ালে এক জায়গায় একটা চিঠি বাঁধাই করে রাখা। তাতে লেখা—‘...বজ্রের মতো হও, দীপ্ত শক্তিতে জেগে ওঠো, দেশের অপমান দূর করো। দেশবাসীকে তার যোগ্য সম্মানের আসনে বসার দুরূহ ব্রতে জীবন উৎসর্গ করো। ইতি—তোমার আব্বু আম্মু।’ ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চে শহীদ রুমীর উদ্দেশে চিঠিটি লিখেছিলেন শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমাম। রুমী কথা রেখেছিলেন, এবার কি আমাদের পালা নয়?

রোগ সারাতে রোগের পেছনের কারণও জানতে হবে by বদিউল আলম মজুমদার

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব ধরনের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। আরও নির্দেশ দিয়েছেন উত্ত্যক্ত করাসহ নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দমন করার জন্য। এতে ব্যর্থ হলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও তিনি ঘোষণা দেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০ এপ্রিল, ২০১০)।
স্বরাষ্ট্র সচিবকে লেখা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের একটি চিঠিতে স্বীকার করা হয় যে সাম্প্র্রতিক সময়ে সারা দেশে টেন্ডারবাজি, টেন্ডার ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গণমাধ্যমসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষই এসব অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতা ও বেআইনি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এসব কর্মকাণ্ডে অনেক রাজনৈতিক দল ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও জড়িত। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির কারণে সরকার বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন হচ্ছে। কিন্তু অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইন প্রয়োগের হেরফের গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এমন কঠোর ভাষায় না হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতীতেও নিজ দল এবং দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এ ধরনের গর্হিত কর্মের বিরুদ্ধে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো কঠোর পদক্ষেপের কথা ক্রমাগতভাবে বলেই যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি, এগুলো বন্ধ হয়নি। বরং এগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্যায় সুযোগ-সুবিধার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, এমনকি খুনাখুনি। দুর্ভাগ্যবশত এবারও যেন এসব অপকর্মের হোতারা প্রধানমন্ত্রীর সাবধান বাণীর প্রতি কর্ণপাত করছে না। যার প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতা গত কয়েক দিন থেকে ছাত্রলীগ নেতাদের বর্জন করছেন বলে শোনা যায়। তবে অতীতের পদক্ষেপের মতো এসব কৌশলও কাজ করবে কি না তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। দুর্বৃত্তদের জেল-হাজতে পাঠালে কিংবা ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দিলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটলেও তা সাময়িক হবে বলেই অনেকের আশঙ্কা।
জ্বর হলে প্যারাসিটামল খাওয়ার পরও তা না সারলে, জ্বরের পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে হয়। তেমনিভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অতীতের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও কেন তা কাজ করেনি, বিষয়টি নিয়ে আজ গভীর ও নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। রোগের কারণ অনুসন্ধান করে চিকিৎসা করতে না পারলে রোগ হয়তো আরও প্রকট ও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যা আমাদের চরম সংকটের দিকে নিয়ে যাবে।
আমাদের ধারণা, যেসব অপকর্মের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হচ্ছে সেগুলো মূল রোগের উপসর্গমাত্র। মূল রোগ হলো দলবাজি ও ফায়দাবাজি, যা গত কয়েক দশকে আমাদের সমাজে ক্রমবর্ধমান হারে বিস্তৃতি লাভ করেছে। বস্তুত দলবাজি ও ফায়দাবাজি, যা পরস্পরের সহোদরসমতূল্য, মনে হয় যেন আমাদের একের পর এক সরকারের ক্ষমতায় যাওয়ার মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বলা বাহুল্য, ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতাসীনদের অনেকেই নিজেরা বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুযোগ নেন এবং দলের নেতা-কর্মীদের অবৈধ সুবিধা প্রদান করেন। বস্তুত নীতি-আদর্শের পরিবর্তে এমন হালুয়া-রুটির আকর্ষণই আজ যেন বড় রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের ফায়দা সাধারণত দুভাবে দেওয়া হয়। ফায়দা প্রদানের প্রথম পদ্ধতি হলো কতগুলো অন্যায় সুযোগ প্রদান। ঠিকাদারি, টেন্ডার, লাইসেন্সসহ দলীয় ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ প্রদান; চাকরি, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন, আবাসিক এলাকায় প্লট বরাদ্দ; এমনকি অতি দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বরাদ্দ করা সামগ্রীর ভাগ প্রদান ইত্যাদি যার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত তদবিরের মাধ্যমেই এগুলো কার্যকর করা হয়। উল্লেখ্য, এগুলোও দুর্নীতি, কারণ ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও প্রদান করার নামই দুর্নীতি।
ফায়দা প্রদানের দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় অপরাধী কর্মকাণ্ডে লিপ্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। বহুদিন থেকেই দলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দল ও দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে। বস্তুত, তাদের যেন সাত খুন মাফ! কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচিত প্রতিনিধি ও দলের নেতা-নেত্রীদের হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অপারগ—প্রকাশ্য ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ তাদের ‘খুঁজে পায় না’। আর কেউ সাহস করে ব্যবস্থা নিলে নিজেরাই অনেক ক্ষেত্রে ‘ভিকটিম’-এ পরিণত হন। হয় তাঁরা নিজেরা বদলি হন, না হয় সরকারের প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকের সিল তাঁদের ওপর এঁটে দেওয়া হয়, যার মাশুল তাঁদের পুরো কর্মজীবন ধরে দিতে হয়। এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও দলীয় বিবেচনায় অনেক সময় মামলা প্রত্যাহার করা অথবা মামলা দুর্বল করে দেওয়া হয়। অনেক সময় বিচারকের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপও সৃষ্টি করা হয়। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতাকেও ফায়দা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব অন্যায় সুবিধার জন্য অনেক সময় নিজেদের মধ্যে লেনদেনও হয়।
মধু ছিটালে যেমন পিঁপড়া আসে, তেমনিভাবে ফায়দার লোভে ক্ষমতাসীন দলে এবং দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনগুলোতে সুযোগ-সন্ধানীদের ও অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের ভিড় জমে ওঠে। এর ফলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি ইত্যাদির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এবারও তাই ঘটছে। অতীতের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জড়িত সুবিধাবাদীদের অনেকেই ক্ষমতাসীন দলে এবং দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনে যোগ দিয়েছে। মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঠিকই বলেছেন, অন্য দলের সন্ত্রাসীরাও এখন ছাত্রলীগে। আর তা ঘটেছে ফায়দার লোভে এবং তদবিরের জোরে আইনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারার আকর্ষণে।
উল্লেখ্য, এ ধরনের ফায়দাবাজিই দলবাজির উৎস। ফায়দার কারণেই আমাদের সমাজে আজ ডাক্তার, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সবাই বিভক্ত। এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও নগ্ন দলবাজিতে লিপ্ত। আর দলবাজ পেশাজীবী ও কর্মকর্তারাই ফায়দা বিতরণের মাধ্যমে সমাজের সকল ক্ষেত্র তথা জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে। বলা বাহুল্য, বিভক্ত জাতি নিজেরাই নিজেদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে এবং তারা সামনের দিকে বেশি দূর এগোতে পারে না।
দল এবং দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান মারামারির কারণও ফায়দাবজি। জাতীয় সম্পদ সীমিত, তাই ফায়দা হিসেবে বিতরণ করার মতো সম্পদও সীমিত। আর এ সীমিত ফায়দা নিয়েই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার ফলেই মারামারি। দলের নেতৃত্বে কোন্দলও বহুলাংশে এ হালুয়া-রুটির ভাগ নিয়েই। আর নেতৃত্বের কোন্দল প্রতিপক্ষকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে মারামারি, হানাহানি জিইয়ে রাখে।
ফায়দাবাজির বিস্তারের কারণে শুধু প্রতিবাদী ব্যক্তি ও সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাই নয়, সাধারণ নাগরিকেরাও তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। কারণ, এ ব্যবস্থায় সকল সরকারি সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা থাকে বিজয়ীদের করায়ত্ত। আর এগুলো বিতরণ করা হয় মূলত দল ও দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের স্বার্থে। ফলে ক্ষুণ্ন্ন হয় নাগরিকের সমতা ও সমসুযোগের মতো মৌলিক অধিকার, যা গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত। বলা বাহুল্য, ফায়দাতন্ত্র সামন্তবাদী পেট্রন-ক্লায়েন্ট প্রথারই উত্তরাধিকার, যা গণতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে ক্ষমতাসীন দল ও দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সৃষ্ট বর্তমান অরাজক পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্র। তাই একমাত্র কিছু দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই এ সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। বরং এর মাধ্যমে রোগের উপসর্গই চিকিৎসা করা হবে বলে অনেকের ধারণা, যদিও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অতি জরুরি। রোগের পরিপূর্ণ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিলুপ্তি, যা বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধিত) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী দলগুলো করতে বাধ্য। কারণ, এ আইনের ৯০বি(১)(খ)(iii) ধারার বিধান মতে নিবন্ধিত দলের কোনো অঙ্গ/সহযোগী সংগঠন থাকতে পারে না। আর এসব সংগঠন বিলুপ্ত করলে তাদের নেতা-কর্মীরা দলকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে পারবেন না। উল্লেখ্য, দলতন্ত্র বা ফায়দাতন্ত্রের মাধ্যমে সম্পদের অপচয় ও যথার্থ ব্যবহার বিঘ্নিত হয় এবং সাধারণত অযোগ্য ও অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন, যার মাশুল জাতিকে গুনতে হয়।
তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অঙ্গ/সহযোগী সংগঠন বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে দলবাজি ও ফায়দাবাজির অবসান ঘটাতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে যোগ্যতা-অযোগ্যতার তোয়াক্কা না করে এবং ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে দলের কর্মী-সমর্থকদের কাজ ও অবৈধ সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা। করতে হবে তদবিরের এবং দলীয় বিবেচনায় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার সংস্কৃতির অবসান। দল ও স্বজনপ্রীতির এ সংস্কৃতির পরিবর্তন না ঘটলে বিলুপ্ত অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা মূল দলে যোগ দিয়ে একই কাণ্ড ঘটাবেন। কারণ দলের প্রটেকশনে যতদিন স্বার্থ সিদ্ধির সুযোগ থাকবে, ততদিন তাদেরকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে না। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘ডিও লেটার’ দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি করার অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাও খর্ব করতে হবে। অন্যথায় নিজেরা ভিকটিম হওয়ার ভয়ে কোনো কর্মকর্তা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উৎসাহী হবেন না। এর জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে মাননীয় সাংসদদের স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বিযুক্ত করে সংসদীয় দায়িত্বে নিবিষ্ট রাখা।
আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এককালের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ আমরা অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু সংসদে পাস করা আইন বাস্তবায়ন করা তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ ছাড়া বর্তমানের তথাকথিত ছাত্র নেতা-নেত্রীদের দ্বারা রাজনৈতিক দল ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার করার এবং লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে অতীতের নির্বাচিত সংসদকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির কোনো মিল নেই। আর লেজুড় সংগঠন বিলুপ্ত হলেই সুস্থ ক্যাম্পাস-রাজনীতির বিকাশ ঘটবে, যা ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে কাজ করবে। তাই আমরা আশা করি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগস্ত হবেন না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার, সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

চলচ্চিত্রের দুর্দশার জন্য আসলে দায় কাদের by কাজী হায়াত

‘ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির নিষেধাজ্ঞা’ শিরোনামে ৬ মে প্রথম আলোয় মশিউল আলমের একটি লেখা ছাপা হয়েছে। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য ওই লেখার বিরুদ্ধাচরণ করা নয়। ওই লেখাটিতে কিছু ভুল তথ্য আছে আর লেখক দুর্দশাগ্রস্ত চলচ্চিত্রের জন্য যাদের দায়ী করেছেন, তারা আসলে কতটুকু দায়ী সে প্রসঙ্গে কিছু বলতেই এই লেখা।
প্রথমেই যে তথ্যটি সম্পর্কে আমি বলতে চাই তা হলো, তিনি বলেছেন, ২০০০ সালে বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬০০। ২০১০ সালে ওই সংখ্যা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০তে। এই তথ্যটি একেবারেই সঠিক নয়। বাংলাদেশে কখনোই এক হাজার ২০০-এর বেশি সিনেমা হল ছিল না এবং বর্তমানে সিনেমা হলের সংখ্যা ৭২০। তবে আশির দশকের শুরুতে যখন বাংলাদেশে প্রথম ভিসিআর আসে, তখন ঢাকার বেগম বাজারে তৈরি হয়েছিল কিছু মিনি সিনেমা প্রদর্শনকেন্দ্র; যেখানে অবৈধভাবে প্রদর্শিত হতো বোম্বাই সিনেমা এবং পশ্চিমা পর্নো ছবি। তারই ধারাবাহিকতায় এখন বাংলাদেশে গ্রামগঞ্জে, হাটবাজারে গড়ে উঠেছে অনেক মিনি সিনেমা প্রদর্শনকেন্দ্র। সেখানেও বাংলা, হিন্দি সিনেমা ছাড়া গরম গরম মিউজিক ভিডিও এবং পশ্চিমা ও দেশীয় পর্নো ছবি দর্শনীর বিনিময়ে অবাধে প্রদর্শিত হয়। সেগুলোকে সিনেমা হল বিবেচনা করার কোনো কারণ নেই। সারা দেশে এসব প্রদর্শনকেন্দ্রই হবে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ হাজার।
সিনেমা হল বাঁচাতে মশিউল আলম ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, কিন্তু আমার ধারণা, সিনেমা হলের মালিকদের অনেক দৌরাত্ম্যের কথাই তাঁর অজানা। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে আশির দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ দেশের সিনেমা চালাতে পরিবেশককে হল-মালিকদের হাউস প্রটেকশন দিতে হতো। সেই দিনগুলো ছিল এ দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের একটি কালো অধ্যায়। সেই সময়ের ৩০-৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সিনেমা মুক্তি দিয়ে অনেক সময় হল থেকে একটি টাকাও শেয়ার মানি পাওয়া যেত না; যার ফলে এ দেশের নির্মাতারা তখন শিল্পমানসম্পন্ন সিনেমা নির্মাণের কথা ভাবতেই পারতেন না। যদি কখনো কারও মনের তাগিদে অথবা সরকারি অনুদানে দু-একটি সিনেমা তৈরি হতো, সেসব সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে নির্মাতাগোষ্ঠীকে অনেক নাকানি-চুবানি খেতে হতো। যদি কখনো হল-মালিকেরা দয়া করে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার জন্য অনুমতি দিতেন, এরপর হলে দর্শকদের উপস্থিতি যদি একটু কম হতো, মাত্র দু-এক দিন চালিয়েই হল-মালিক কাউকে কিছু না বলে ওই সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ করে দিতেন এবং প্রটেকশন অর্থাৎ হল চালানোর খরচ বাবদ টাকা দাবি করতেন। সেই টাকা দিতে না পারলে চলচ্চিত্রের প্রিন্টটি আটকে রাখতেন সিনেমা হলের স্টোরে। এমনিভাবে আটকে থাকত অনেক ভালো চলচ্চিত্রের প্রিন্ট, যা আর কখনোই কোথাও প্রদর্শিত হতো না।
জনাব মশিউল আলমের ধারণা, চলচ্চিত্রশিল্পের নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলী ও অর্থলগ্নিকারীরা যদি এমন চলচ্চিত্র তৈরি অব্যাহত রাখেন (এখন যা হচ্ছে), তাহলে সিনেমা হলগুলো অলাভজনক, এমনকি লোকসানি প্রতিষ্ঠান হয়ে পড়বে। হলের মালিকেরা উপায়ান্তর না দেখে হলগুলো ভেঙে ফেলে অন্য কিছু করবেন। একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে আমাদের এই চলচ্চিত্রশিল্প। এ তথ্য এবং ধারণাটিও সত্য নয়। দেশে এখনো অনেক নতুন সিনেমা হল তৈরি হচ্ছে, তবে তার অধিকাংশই জেলা শহরগুলোতে নয়। জেলা শহরের মালিকেরা সিনেমা হল ভেঙে মার্কেট অথবা ফ্ল্যাটবাড়ি করছেন—কথাটি সত্য, কিন্তু সিনেমা চালিয়ে তাঁদের লোকসান হচ্ছে সে কারণে এমনটি হচ্ছে তা নয়। কারণটি হলো, জায়গাটি শহরের মধ্যস্থলে হওয়ার কারণে সেখানে মার্কেট অথবা ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করে এককালীন তাঁরা অনেক টাকা পেয়ে যাচ্ছেন। একটি তথ্য জানাই, আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগে সাভারে মাত্র দুটি সিনেমা হল ছিল আর সেই সাভার এবং তার আশপাশের এলাকায় এখন ১০টিরও বেশি সিনেমা হল হয়েছে। এটা ভালো ব্যবসার কারণেই হয়েছে।
বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার সিনেমাকে অনেক উন্নত করেছে। চলচ্চিত্রের শব্দ ডলবি ডিজিটাল হয়েছে। সিনেমাস্কোপ হয়ে চলচ্চিত্রের পর্দাটি অনেক বড় হয়েছে। সেই আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প একেবারেই বঞ্চিত। এর জন্য কোনোভাবেই আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নিকারী, শিল্পী ও কলাকুশলীরা দায়ী নন। সিনেমাস্কোপ বা ডিজিটাল শব্দ—এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সিনেমা তৈরি করার মতো অর্থ ও মেধার কোনো কমতি নেই। দেশে এ ধরনের সুযোগ না থাকায় আমাদের অনেক নির্মাতা বিদেশে গিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রযুক্তিগতভাবে এসব উন্নতমানের সিনেমা প্রদর্শনের জন্য ঢাকায় মাত্র তিনটি সিনেমা হল আছে। এ ছাড়া সারা দেশে আর কোনো সিনেমা হল নেই। আপনার কাছে প্রশ্ন, তাহলে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প আধুনিক ও উন্নতমানের না হওয়ার জন্য দায়ী কারা? নির্মাতারা, না সিনেমা হলের মালিকেরা?
সিনেমা হলে একটি গল্পের চিত্রায়ণ দেখাই এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের সংস্কৃতি ছিল না। পরিবার-পরিজন নিয়ে রিকশা অথবা গাড়িতে করে যাওয়ার আগে সাজগোজ করে প্রস্তুতি, এরপর সিনেমা হলের লবিতে বসে আড্ডা, বাদাম, চিপস, চকলেট অথবা এক কাপ গরম কফি কিংবা চা খাওয়ার মধ্যেও আনন্দ ছিল, বিনোদন ছিল, তা কি আজ আছে? এর জন্য দায়ী কারা? শিল্পী ও কলাকুশলী, নাকি হল-মালিকেরা? এ দেশের অধিকাংশ সিনেমা হলের মালিকেরা তাঁদের টিকিট এখন আর কাউন্টারে বিক্রি করেন না। কমিশনের ভিত্তিতে শো শুরুর অনেক আগেই সব টিকিট দিয়ে দেন একশ্রেণীর কালোবাজারির হাতে। মশিউল আলমের কাছে আমরা প্রশ্ন, সিনেমা হলগুলোর বাথরুম এবং দর্শকদের জন্য বসার আসনসহ কয়টি সিনেমা হলের পরিবেশ আপনি দেখেছেন? এর জন্য দায়ী কারা—চলচ্চিত্রের নির্মাতারা, না হল কর্তৃপক্ষ?
পরিশেষে বলতে চাই, এক দশক ধরে এ দেশে অশ্লীল চলচ্চিত্রের যে জোয়ার শুরু হয়েছিল, যার ফলে সিনেমা হল থেকে বিতাড়িত হয়েছিল মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও নারীসমাজ, তার জন্য মূলত কারা দায়ী তা অনুধাবন করতে হবে। বুঝতে হবে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কারা এসব অপকর্ম করত? কারা বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যে ইংরেজি পর্নো চলচ্চিত্রের রিল চালাত? চলচ্চিত্রের শিল্পী-কলাকুশলীরা, না হল-মালিকেরা?
চলচ্চিত্রের শিল্পী ও কলাকুশলীদের আন্দোলনের পর যখন চলচ্চিত্র থেকে অশ্লীলতা চলে গেছে, বছরে ১০ থেকে ১৫টি শিল্পমানসম্পন্ন সিনেমা তৈরি হচ্ছে, যখন প্রতিবছর আমাদের সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পুরস্কার নিয়ে আসছে, যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত দর্শক আবার সিনেমা হলে ফিরে এসেছে; তখন মশিউল আলমের মতো সমাজসচেতন ব্যক্তিদের বলিউডের সিনেমা আমাদানির পক্ষে অবস্থান নিতে দেখে আমরা এ দেশের সিনেমাওয়ালারা সত্যিই অবাক হই।
কাজী হায়াত: চলচ্চিত্র পরিচালক।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে মহাসংকট -মন্দা by সুজিত চৌধুরী

বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের ঘন কুয়াশা কেটে গেছে; চটজলদি এই সিদ্ধান্তে যাঁরা পৌঁছেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় মুদ্রাব্যবস্থার বর্তমান মহাসংকট তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। গ্রিসের অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ ‘ইউরো’ মুদ্রাব্যবস্থার ওপর বিরাট আঘাত। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনে গ্রিসের অবস্থান মাত্র তিন শতাংশ। ইউরোপের এই ঐতিহ্যবাহী দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া। গ্রিস সরকার কর বাড়াচ্ছে, পেনশন কমিয়ে দিচ্ছে, পেনশনে যাওয়ার বয়সসীমা বাড়িয়ে দিচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে ১৩ এবং ১৪ মাসের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এফআইএমএফ ঋণ সাহায্য দিতে গিয়ে এই শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে বিশ্বের আর্থিক বাজারে যে মহাসংকট ২০০৭ থেকে পৃথিবীব্যাপী পণ্য আদান-প্রদানে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কিছু দেশের উৎপাদনব্যবস্থার ওপর এত বড় আঘাত হানতে পারে, আগে কেউ এভাবে ভাবেনি। গ্রিসে উৎপাদিত পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমন মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। গ্রিসের এই মহাদুর্যোগ অপ্রত্যাশিতভাবে এসেছে বলা যাবে না।
সংকট গ্রিসে রাজনৈতিক চেহারাও নিয়েছে। ব্যাপক জনবিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘাত ও ধর্মঘট-অবরোধে বেশ কয়েকজন নিহতও হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দায়-দায়িত্ব নিয়েও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নব্য সদস্য দেশগুলোয় সংকট বরাবর ছিল। মাত্র কিছুদিন আগে হাঙ্গেরি সরকার বাজেট কাটছাঁট করেছে। হাঙ্গেরিতেও সংকটের মূল বোঝা টানতে হয়েছে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে। জার্মানি ৪৮০ বিলিয়ন ‘ইউরো’র গ্যারান্টি দিয়ে তাদের ধসে পড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুসংগঠিত করতে পেরেছে। জার্মানিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। জোট শরিক নয়া উদারবাদীদের দল চেষ্টা করেছে জার্মান সরকারের ঋণের বোঝা শ্রমজীবী এবং নিম্নবিত্তের ঘাড়ে চাপাতে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, নিম্নতম মজুরির সীমারেখা কমানো যাবে না। কর্মজীবীদের কর্মসংস্থানের আইনগত গ্যারান্টিও তুলে নেওয়া যাচ্ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে জার্মানি সংকট মোকাবিলায় অবশ্যই সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। জার্মানি মূলত রপ্তানিমুখী অর্থনীতি। ‘ইউরো’ মুদ্রাব্যবস্থার কারণে জার্মানরাই সবচেয়ে লাভবান। জার্মানির রপ্তানির দুই-তৃতীয়াংশ যায় ইউরোজোনের দেশগুলোতে। মুদ্রা অবমূল্যায়নের সুযোগ না থাকাতে জার্মান পণ্য ইউরো বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে যাচ্ছে।
পুঁজিবাদী মুক্তবাজারে সংকট আসে চক্রাকারে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সংকট ব্যতিক্রমধর্মী। ইউরোপীয় মুদ্রাব্যবস্থা ইউরো নিয়ে বিচলিত হওয়ার কারণ রয়েছে। স্পেন ও পর্তুগালের অবস্থাও নড়বড়ে। স্পেনে বেকারের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। জার্মানির মতো সংঘবদ্ধ সামাজিক গ্যারান্টি অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে নেই। কর্মজীবীদের পরিবারগুলো দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। স্পেনে বসবাসকারী অনেক প্রবাসী এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউরো মুদ্রাব্যবস্থা সুশৃঙ্খল রাখার দিকে সব সময় সতর্ক নজর রেখেছে। কিন্তু মুদ্রাব্যবস্থা তো আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রতিবিম্ব। উৎপাদিত পণ্য এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিবর্তন করার যোগ্যতা না থাকলে শিল্পোন্নত দেশেও সংকট উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করে আর জমানো টাকার প্রতি হাত দেয় না। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কমতে থাকে। গ্রিস, স্পেন ও পর্তুগালের মূল সমস্যা এখানেই। বিশ্ব অর্থবাজারের গভীর সংকট কাটিয়ে উঠতেই এই অর্থনীতিগুলো হিমশিম খেয়েছে। বিশ্ববাজারে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় পণ্যসম্ভারে পরিবর্তনের যে দ্রুতগতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তাদের হার মানতে হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুর্বল সংকেত শুধু মুদ্রনীতি দিয়ে সংশোধন করা যায় না। ইউরো মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে এখন অনেকে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছে। গ্রিস, পর্তুগাল ও স্পেনের মতো দুর্বল উৎপাদনকাঠামোর অর্থনীতিগুলোকে ইউরো-এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব এসে পড়েছে। তাতে করে তারা নিজস্ব মুদ্রা অবমূল্যায়ন করে পণ্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ করে নিতে পারত। এ রকম ধারণা এখন আর অজনপ্রিয় নয়। একটি শক্তিশালী মুদ্রাব্যবস্থা সরাসরি একটি গতিশীল উৎপাদনব্যবস্থার গ্যারান্টি নয়। শক্তিশালী ‘ইউরো’ও দুর্বল অর্থনীতি সবল করতে ব্যর্থ।
জার্মানি ও ফ্রান্স ইউরো মুদ্রাব্যবস্থার এই দুই বৃহৎ অর্থনীতি নিজস্ব স্বার্থে চাইবে না মুদ্রাব্যবস্থায় ফাটল লাগুক। গ্রিসকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল থেকে ৭৫০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। গ্রিসের অর্থনীতি চাঙা করার বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রিস সরকার কি গজিয়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে? কর্মজীবীরাই বা কেন বারবার সরকার ও শিল্পপতিদের তৈরি করা সংকটের বোঝা বহন করতে থাকবে। সংকটের বোঝা ভাগাভাগি করে নেওয়ার আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। এখানে জার্মানির অর্থনীতিবিদদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বিতর্ক উল্লেখযোগ্য। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কর্মজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া চাহিদা বাড়বে না, মানুষ কেনাকাটা করবে না। গ্রিসে মজুরি কমানোর প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। সংকট গভীর হলে তর্কবিতর্কের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। আরেক দল অর্থনীতিবিদ বলছেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের পারস্পরিক সহযোগিতা আর আগের মতো শক্তিশালী নয়, যে যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। তাই সামগ্রিক সমস্যায় ওদের দায়বদ্ধতাও কম নয়।
জার্মানি ও ফ্রান্সের কয়েকটি বড় ব্যাংক গ্রিসকে সাত বিলিয়ন ইউরো সাহায্য দিতে প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছে। একদল অর্থ-সাংবাদিক খুঁজে বের করেছে এখানে সুনির্দিষ্ট স্বার্থ জড়িত। গ্রিস সরকারের জার্মান ব্যাংকগুলোতে ২৭ বিলিয়ন ইউরো এবং ফ্রান্সের ব্যাংকগুলোতে ৩০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণপত্র রয়েছে। এই ব্যাংকগুলো নিজের স্বার্থেই এসব ঘোষণা দিচ্ছে। গ্রিসের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে ওরা ওদের অর্থ আর পাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ‘ইউরো’র স্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অতীব প্রয়োজন। তবে স্বার্থদ্বন্দ্বে যদি সব প্রতিষ্ঠান সাহায্যের নামে আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এসে যেতে পারে এবং এসেছে। ইউরোপে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের কিছু জরুরি প্রশ্নও রয়েছে। কেন এখন হঠাৎ রেটিং এজেন্সিগুলোকে স্পেন এবং পর্তুগাল নিয়ে এত সতর্কবাণী করতে হচ্ছে। ইউরোপের বড় বড় অর্থনীতি আগে কি এই অশনিসংকেত শুনতে পায়নি? এটাও তো একধরনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শুধু অর্থনীতিবাদী ক্লাব হলেই চলবে না। ইউনিয়ন সৃষ্টির শুরুতে যেমন রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আসল ব্যাপার ছিল, এখনো শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করা উচিত। নাহলে গ্রিসের অর্থনৈতিক সংকট যেভাবে রাজনৈতিক সংকটে গড়িয়েছে, যেভাবে জনবিক্ষোভ ও সংঘাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, সেই একই পরিণতি থেকে ইউরোপের অন্য দেশগুলো কতটা মুক্ত থাকবে তা বলা যায় না।
এবং এটাও ভাবা দরকার যে, চক্রাকারে আবর্তিত অর্থনৈতিক সংকটের ঢেউ বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের গায়ে লাগতে কতটা দেরি। বিশ্বায়িত পৃথিবীতে সংকটে কারো কারো সুবিধা, কিন্তু সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যখন সংকটে পড়ে তখন দুর্বলদের খেসারত দিতে হয় সবচেয়ে বেশি।
সুজিত চৌধুরী: জার্মান প্রবাসী অর্থনীতিবিদ, বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক।

এসএসসি পরীক্ষার ফল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গত কয়েক দিনে দেশের শিক্ষাচিত্রে যোগ হয়েছে বড় দুটি ঘটনা। এর একটি হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, অন্যটি বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি এবং সে-সম্পর্কিত বিতর্ক। দুটি ঘটনারই ভালোমন্দ আছে, তবে মন্দের অনুপাতে ভালোর পরিমাণটা বেশি এবং তা নিয়ে আমরা আশান্বিত হতে পারি। একই সঙ্গে মন্দ দিকগুলোর দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে, যাতে এগুলোর পুনরাবৃত্তি যতটা সম্ভব কমানো যায় এবং একসময় পুনরাবৃত্তির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা যায়। আমরা সবাই বিশ্বাস করি, শিক্ষা হচ্ছে সেই শক্তি, যা জাতি হিসেবে এই শতাব্দীর পথ ধরে উন্নত দেশগুলোর মিছিলে আমাদের শামিল হতে সাহায্য করবে। শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা আত্মঘাতী প্রমাণিত হবে। আমাদের মধ্যে এ রকম আত্মঘাতী প্রবণতা আবার মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই প্রবণতাকেও রুখতে হবে।
প্রথমেই ভালোর কথাগুলো বলি। এসএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী সাফল্য পেয়েছে, জিপিএ প্লাস প্রাপ্তির সংখ্যা বেড়েছে। সবগুলো বোর্ডেরই তারকাচিহ্নিত স্কুলগুলোর বাইরেও নতুন তারকা-স্কুলের জন্ম হচ্ছে। দুই হাজার ৯২৭টি স্কুলের সবাই পাস করেছে। টেলিভিশনের সংবাদে দেখলাম, স্কুলে স্কুলে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা আনন্দ উল্লাস করছে। ঢাকার মগবাজারের এক মিষ্টির দোকানমালিক জানালেন, ফল প্রকাশের দিন বিকেলের মধ্যে তাঁর দোকানের সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি ভালো যে আরেকটি সংবাদ তা হচ্ছে, এবারের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ভালো হয়েছে, নকলের ঘটনা কমেছে—অন্তত নকলের অভিযোগে শিক্ষার্থী এবং নকল সরবরাহ বা নকলে সহযোগিতা করার অপরাধে শিক্ষক বহিষ্কারের সংখ্যা এর প্রমাণ দেয়। এমপিওভুক্তির বিষয়টি অবশ্য আরেকটু জটিল, যেহেতু প্রতিযোগিতা অনুযায়ী অর্জনের অনুপাত এ ক্ষেত্রে অনেক কম। প্রায় সাত হাজার আবেদনপত্রের বিপরীতে এমপিওভুক্ত হয়েছে এক হাজার ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারপরও, ২০০৪ সালের পর দীর্ঘ বিরতিতে এমপিওভুক্তির এই ঘটনা ঘটল এবং এই প্রথম একটি নীতিমালার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তি হলো। এই নীতিমালার চারটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো হলো: প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণের হার। শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, নীতিমালা শতভাগ মেনেই এসব প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি হয়েছে। সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় স্থান পাওয়া এবং বাদ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রচণ্ড বিতর্ক হয়েছে। সংবাদপত্রগুলো লিখেছে, শিক্ষামন্ত্রী সহকর্মীদের ‘তোপের মুখে’ পড়েছেন এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীর ওপর নাখোশ হয়েছেন। শেষমেশ তালিকাটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য শিক্ষা উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহকর্মীদের উত্তেজনা প্রশমিত করেছেন। না, এ বিষয়টি মোটেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির ভালো দিকের অংশ নয়। এর উল্লেখ এ কারণে করেছি যে, এই বিবাদ-বিতর্ক বাদ দিলেও প্রক্রিয়াটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন রয়েছে। তা হলো, একটি সুষ্ঠু নীতিমালার ভিত্তিতে সরকারের কর্মকাণ্ডকে যে নিয়ে আসা যায় এবং ঘুষ লেনদেন ছাড়াও ঐতিহ্যগতভাবে ঘুষবান্ধব সরকারি কোনো প্রক্রিয়াকে যে নিষ্পন্ন করা যায়—এমপিওভুক্তির সাম্প্রতিক ওই ঘটনা তা প্রমাণ করেছে। তালিকাটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি টিকবে না, নীতিমালা জলে ফেলে মন্ত্রী-সাংসদদের দাবিমতো অন্যান্য স্কুলকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি হবে না, অথবা গায়ে বিএনপির গন্ধ লেগে থাকা স্কুল-কলেজগুলো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাদ দেওয়া হবে কি হবে না—সেসব প্রশ্নে না গিয়েও বলা যায়, নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্তির উদ্যোগটি ছিল ভালো এবং অন্যত্র অনুকরণযোগ্য। সরকারের একটি ভালো কাজে সরকারের কিছু মন্ত্রী এবং সরকারি দলের সাংসদেরা যদি বাগড়া দেন, তা নিশ্চয়ই শেষ বিচারে আত্মঘাতী প্রমাণিত হবে, কিন্তু কাজটিকে, আরও নির্দিষ্টভাবে কাজের পেছনের নীতি-চিন্তাটিকে আমরা বাহবা দিই। কাগজে দেখেছি, ভুলত্রুটি ছিল তালিকায়, কোনো এলাকায় বেশি, কোনো এলাকায় কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তালিকায় স্থান পেয়েছে। তা হতেই পারে এবং এসব ত্রুটি সংশোধনের নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাবান অভিভাবকহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্নতির একটা সুযোগ এ রকম ভালো উদ্যোগ যে এনে দেবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

২.
এসএসসি পরীক্ষার মন্দ দিকগুলোর উল্লেখ করতে আমার ইচ্ছে হয় না। কেননা, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক আশাভঙ্গের কাহিনি। যারা ভালো করে, ফল বেরোনোর দিন তারা উল্লাস করে—কিন্তু যারা উত্তীর্ণ হতে পারে না, তারা কী করে? তারা সারা দিন বিমর্ষ থাকে, কাঁদে, গালমন্দ খায়, শূন্য চোখে পৃথিবীটাকে দেখে। নিজেদের অসামর্থ্য, দারিদ্র অথবা অমনোযোগকে দায়ী করে। কেউ কেউ অনেক বড় শাস্তি দেয় নিজেদের। সেসবের না হয় উল্লেখ না-ই করলাম। এই অকৃতকার্যদের জন্য আমার মনটা খুব খারাপ থাকে। এদের কথাও কেউ বলে না। অথবা অনেক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে যারা টেনেটুনে পাস করে, তাদের জন্যও কেউ কোনো সংবর্ধনার আয়োজন করে না। আজকাল শিক্ষার্থীদের ভেতর প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়েছে। সচ্ছল পিতা-মাতারা চার থেকে ছয়জন শিক্ষক রেখে সন্তানদের পড়ান। সন্তানেরা গোল্ডেন জিপিএ না পেলে তাঁদের মুখে হাসি আসে না। আমার মনে হয়, আমরা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন থেকেও গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকে অনেক বেশি মূল্য দিচ্ছি। যারা অকৃতকার্য, তাদের বর্জ্য হিসেবে বিবেচনা করছি। আমরা ‘এসএসসি পরীক্ষার্থী’দের বোধ-অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখছি না; তাদের আশা-নিরাশা, ভয়-পেরেশানি, কষ্ট-লজ্জা—এসব কিছুকেই বিবেচনায় না এনে শুধু তাদের ফল নিয়ে ভাবছি, তাদের সাফল্য-উদ্দিষ্ট যন্ত্র হিসেবে দেখছি। এটি সংগত কি না, আমাদের একটু ভাবতে হবে।
আমাদের উচিত হবে গ্রামের দিকে, সুবিধাবঞ্চিত স্কুলগুলোর দিকে তাকানো; আমাদের উচিত হবে দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা যাতে নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তভাবে ভালো ফল নিয়ে এসএসসি পাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করা এবং অকৃতকার্যদের সাফল্যের পথে নিয়ে আসার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের যথাযথ বাজেট থাকতে হবে। প্রয়োজনে অনুৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ কমিয়ে স্কুলগুলোর জন্য অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। একবার কাগজে দেখেছিলাম, একটি গলফ কোর্সের পেছনে যত পয়সা খরচ হয় প্রতিবছর, তা দিয়ে পাঁচটি স্কুলকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যায়। গলফ কোর্সের জন্য যদি বরাদ্দ পাওয়া কঠিন না হয়, ওই পাঁচটি স্কুলের জন্য কেন হবে? অগ্রাধিকারের তালিকায় কোনটি ওপরে? দুস্থ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত সব শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তি, বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ এবং টিফিনের ব্যবস্থা করতে হবে, একই সঙ্গে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করে ভালো শিক্ষকেরা যাতে গ্রামের স্কুলে পড়াতে যেতে উৎসাহী হন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়া, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি স্কুলে তিন মাসের বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া যায়, যেখানে নিবিড় পঠনের মধ্য দিয়ে তারা তাদের ঘাটতিগুলো পুষিয়ে নিতে পারবে। আমি বিশ্বাস করি, কোনো শিক্ষার্থীই মৌলিকভাবে অক্ষম নয়। ক্ষমতা সবারই থাকে, শুধু তাকে জাগাতে হয়। এই জাগানোর কাজটা যাতে স্কুলগুলো প্রতি শ্রেণীতেই নিবিড়ভাবে করে, সে জন্য তাদের সহায়তা তহবিল এবং অন্যান্য সম্পদ দিতে হবে। সংবিধান সরকারকে এ রকম নির্দেশনাই দিচ্ছে। এটি অমান্য করা সরকারের উচিত হবে না।
এসএসএসসি পরীক্ষার ফল যেদিন বেরোয়, আমাকে কোনো না কোনো কাগজের রিপোর্টার দুটি প্রশ্ন করেন: ইংরেজির ফল খারাপ কেন হলো, এবার যদিও ইংরেজিতে সবাই ভালো করেছে এবং গ্রামের স্কুলের ফল খারাপ কেন? দুটি প্রশ্নের উত্তর আছে ওই এক জায়গায়, আমাদের মনোযোগের অভাব। ইংরেজি বিদেশি ভাষা, এটি রপ্ত করার জন্য যেসব পদ্ধতি-চর্চা-উপকরণ প্রয়োজন, আমাদের তার প্রায় কিছুই নেই। ইংরেজি শিক্ষা চলে মুখস্থ পদ্ধতিতে। ফলে প্রশ্ন যদি একটু এদিক-সেদিক হয়, তাহলে আর উপায় থাকে না। আমরা যদি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকি যে, ইংরেজি শিখতে হবে, তাহলে ভালো করে শেখার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না করে একই প্রশ্ন করে আমি যদি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ আর ধাদ্ধারা গোবিন্দপুর স্কুলের দুর্বল শিক্ষার্থী থেকে একই রকম ফল আশা করি, তা হবে একটা প্রহসন। অথচ ধাদ্ধারার শিক্ষার্থীর সেই অধিকার আছে ইংরেজির (বা যেকোনো বিষয়ে) ওই জ্ঞান লাভ করার, যা মির্জাপুরের শিক্ষার্থীটি পাচ্ছে। এর ব্যত্যয় সংবিধান স্বীকৃত অধিকার লঙ্ঘনেরই শামিল।

৩.
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার (অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতনের সরকারি অংশ) ভুক্তি নিয়ে যে বিতর্কের উল্লেখ আগে করেছি, সে প্রসঙ্গে ফিরে যাই। নিঃসন্দেহে একটি নীতিমালার ভিত্তিতে করা তালিকাটি বাদ দিয়ে নতুন তালিকা করাটা একটি বাজে উদাহরণ হয়ে থাকবে। যদি একটি নীতিমালা করাই হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সম্মান জানানো হলো না কেন? যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় তালিকা করতে হয়, তাহলে নীতিমালার কী দরকার ছিল? কাগজে পড়লাম, বিএনপি আমলে তৈরি স্কুল এমপিওভুক্ত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন এক মন্ত্রী। ওই মন্ত্রীর এলাকায় নিশ্চয় বিএনপির আমলে তৈরি একটি বা দুটি পুল আছে। তাহলে তো মন্ত্রীর এসব পুল ব্যবহার করা উচিত নয়। ঢাকার অনেক কাগজে দেখলাম শিক্ষামন্ত্রীকে ‘তোপের মুখে’ ফেলে তালিকা পুনর্বিবেচনার সমালোচনা হয়েছে। সংবাদ লিখেছে, ‘এমপি-মন্ত্রীদের অযৌক্তিক অভিযোগ-আবদারের কারণেই তালিকা পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়’। ডেইলি স্টার লিখেছে তালিকাটি পর্যালোচনার নির্দেশ ছিল ‘তড়িঘড়ি করে দেওয়া’ এবং তা ‘দেশের শিক্ষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খারাপ কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ সমকাল বলছে, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিনামূল্যে ২০ কোটি বই প্রকাশ ও বিতরণে, একটি শিক্ষানীতির চূড়ান্তকরণে এবং ভালো ব্যবস্থাপনায় পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর ‘দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন।’ আমারও বিশ্বাস, এমপিওভুক্তির কাজটি নুরুল ইসলাম নাহিদ সততার সঙ্গে এবং একটি নীতির আলোকে করেছিলেন। এর গঠনমূলক সংশোধনের পরিবর্তে এর প্রতি অনাস্থা দেখানোটা মন্ত্রী-সাংসদদের উচিত হয়নি।
তবে আমি আনন্দিত হব, যেদিন এমপিওভুক্তির জন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আবেদন করতে হবে না, যেহেতু দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের প্রয়োজনমতো আর্থিক সহায়তা পাবে সরকার থেকে এবং সব শিক্ষক-সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে দিনাদিপাত করতে পারবেন এবং উন্নত শিক্ষা দিতে পারবেন। তখন এসএসসির ফল প্রকাশের দিনগুলোও আর এত ব্যাপক গ্রাম-শহর, সচ্ছল-দরিদ্র বিভাজন নিয়ে আমাদের সামনে এসে হাজির হবে না।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাসপাতালে গোলযোগ -সব পক্ষকে সংযত থাকতে হবে

শনিবার এক অপ্রীতিকর ঘটনায় ঢাকার বারডেম হাসপাতালের কর্মচারীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংঘর্ষের ঘটনাটি সত্যিই মর্মপীড়াদায়ক। রোগীরা হাসপাতালে যায় রোগ-শোকের হাত থেকে বাঁচার জন্য। সেখানে যদি মারধর, সংঘর্ষ ও সহিংসতায় আতঙ্কিত হয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়তে হয় তাহলে রোগীরা যাবে কোথায়? বারডেম হাসপাতালের যে সুনাম তাতে ওই হাসপাতালের কর্মচারীদের কাছে অনেক বেশি সহনশীল আচরণ মানুষের কাম্য। অথচ সেদিন কথাকাটাকাটির জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীকে লিফটম্যান চড় মেরে বসলেন কীভাবে? কথার পিঠে কথা চলে, হাত ওঠানো তো গুরুতর অপরাধ। সেই ছাত্রের কথায় যদি কোনো আপত্তিকর কিছু থেকে থাকে তার প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক শান্তিপূর্ণ উপায়গুলোর আশ্রয় না নিয়ে কেন লিফটম্যান শক্তি প্রদর্শন করতে গেলেন?
ঘটনা সেখানেই থেমে থাকেনি। পরে বারডেমের পরিচালকের সঙ্গে আলোচনায় আশ্বস্ত হয়ে বের হওয়ার পথে বারডেমের নিরাপত্তারক্ষীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর হামলা চালান ও দুজনকে আটকে রাখেন। এভাবে সংঘর্ষ ছড়ায়। পাঁচজন ছাত্র আহত হন। শাহবাগ এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনায় একজন নিরাপত্তারক্ষীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হোক।
এ ঘটনায় বারডেমের কর্মচারী ও নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর সব দোষ একতরফাভাবে চাপানো যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে যতটা নমনীয় মনোভাব মানুষ আশা করে, অনেক সময় সে রকম পাওয়া যায় না। ছোটখাটো ঘটনায়ও দেখা যায় শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে গিয়ে হাজির হন। দলবদ্ধতার যে মনোভাব কাজ করে তা গ্রহণযোগ্য নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বেশি সংযত আচরণ কাম্য।
হাসপাতালকে সব সময় সব ধরনের গোলযোগ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। সেখানে মরণাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা হয়। যেখানে হাসপাতালের কাছে এমনকি গাড়ির হর্ন বাজানোও নিষেধ, সেখানে সংঘর্ষ কেন হবে? কয়েক দিন আগেও বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে এক তুচ্ছ ঘটনায় একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী মারা গেলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে রোগীর স্বজনেরা চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীদের ওপর হামলা চালান। গত শুক্রবার এ ধরনের এক ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড ভাঙচুর করা হলে রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
হাসপাতালে কোনোভাবেই শান্তিভঙ্গ হতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সব মহলকে সংযত থাকতে হবে।

এসএসসি পরীক্ষার ফল -এখন প্রয়োজন গুণগত মানের উন্নতি

পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, পাসের হার ও সর্বোত্তম ফল অর্জনকারীর সংখ্যা—সব মিলিয়েই এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এটা জাতির জন্য বড় আনন্দের সংবাদ। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী, তাদের শিক্ষকমণ্ডলী ও অভিভাবকদের আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন!
দেশের আটটি বোর্ড মিলিয়ে এবার মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল নয় লাখ ১২ হাজার ৫৭৭, যা আগের বছরের চেয়ে এক লাখ ১৪ হাজার ৬৮৬ জন বেশি। এবার গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। এবং এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬২ হাজার ১৩৪, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬ হাজার ২০০ বেশি। একজন পরীক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হয়নি এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা এবার কমেছে, ৭২ থেকে নেমে এসেছে ৪৯-এ। আর সব পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ২০১টি। এসএসসির সমমানের পরীক্ষা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিলের পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এগুলো ধারাবাহিক উন্নতির সূচক। নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা অনুষ্ঠান, দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ, ফল প্রকাশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার—এই চর্চাগুলো আগের তুলনায় আরও কার্যকর হয়েছে। এ বছরই প্রথমবারের মতো বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু হওয়ায় অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের আশঙ্কা ছিল যে, এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে পরীক্ষার ফলাফলে। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। আর পাসের হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পাসের হার বৃদ্ধি। এটি একটি উৎসাহব্যঞ্জক প্রবণতা। কারণ, বহু বছর ধরে দেখা গেছে, এই দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণেই গড় পাসের হার কম হয়। এবার এটা অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা গেছে, বিশেষত গণিতে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে এসেছে। এই ধারা যাতে অব্যাহত থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থী— সবার।
পরীক্ষায় পাসের হার ও ভালো ফলের হার বেড়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক ও উৎসাহব্যঞ্জক। এসএসসি পর্যায়ের পরীক্ষায় কেন গড় পাসের হার ৭৮ শতাংশ হবে, কেন ৯৮ শতাংশ হবে না—এমন প্রশ্ন আমরা তুলতে পারি। এবং সেই লক্ষ্যে উদ্যোগও নিতে পারি, যাতে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষার এই ধাপটি অতিক্রম করতে পারে। সবার জন্য শিক্ষা—এই লক্ষ্যে এগিয়ে আমরা যেন কয়েক বছরের মধ্যে এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারি, যখন একজন মানুষও থাকবে না যে এসএসসি পাস করেনি; বিশেষত যাদের জন্ম ২০০০ সালের পর। তবে শুধু পাসের হার বৃদ্ধি নয়, জাতি গঠনের জন্য শিক্ষার গুণগত মানও বাড়াতে হবে। ভালো ফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে শিক্ষার গুণমানও নিশ্চিত করার নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে।

লিভারপুলের কোচ ম্যারাডোনা

শিরোনাম দেখে চমকে উঠতে পারেন, চোখ কপালে উঠতে পারে কিন্তু খবর যা শোনা যাচ্ছে তাতে বিশ্বকাপের পর নিজের ভবিষ্যৎটা ঠিক করে ফেলেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। লিভারপুলের কোচ হচ্ছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি! এখনো চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি, তবে ঘটনা যা ঘটেছে তাতে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ম্যারাডোনার এ মৌসুমে বিবর্ণ ইংলিশ ক্লাবটির কোচ হওয়ার খবর রটেছে চীনের ফুটবল ধনকুবের ঝু জুনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর। বুয়েনস এইরেসে গত বৃহস্পতিবার জুনের প্রতিনিধির সঙ্গে ম্যারাডোনার চুক্তি হওয়ার খবর গত পরশু নিশ্চিত করেছে সিনা ডট কম। এই চুক্তির সঙ্গে লিভারপুলের কোচ হওয়ার সম্পর্কটা বুঝতে পারছেন না তো? সাংহাইয়ের কোটিপতি ব্যবসায়ী জুন লিভারপুল ক্লাব কেনার চেষ্টা করছেন। জুনের ১১৮ কোটি মার্কিন ডলারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাও চলছে। শেষ পর্যন্ত অল রেডদের মালিকানা তাঁর পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এদিকে লিভারপুলের বর্তমান কোচ রাফায়েল বেনিতেজের জুভেন্টাসে চলে যাওয়ার কথা জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নিন, খবরটাকে এবার খুব একটা অবিশ্বাস্য মনে হবে না।
এই খবরের পালে জোর হাওয়া দিয়েছে আরেকটি খবর। চীনের সুপার লিগের দল সাংহাই সিনহুয়া ফুটবল ক্লাবের উচ্চপদস্থ একটি প্রতিনিধিদল নাকি আর্জেন্টিনা যাবে ম্যারাডোনার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে। এই সিনহুয়া ক্লাবেরই মালিক আবার জুন। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে জুন লিভারপুল কিনতে পারেন কি না, তার ওপর। মালিকানা পেলে জুন ম্যারাডোনাকে কোচ বানিয়েই ছাড়বেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমনটা জানিয়েছেন জুনের অনলাইন গেমিং ফার্ম ‘দ্য নাইন লিমিটেড’-এর এক কর্মকর্তা। তবে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে অবিশ্বাস আছে চীনেই। গত বছর চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন গেম ‘ওয়ার অব ওয়ারক্রাফট’-এর ডিলারশিপ হারানোর পর থেকেই অব্যাহত ক্ষতির মুখে রয়েছে জুনের ‘দ্য নাইন লিমিটেড।’ এ অবস্থায় জুন ক্লাব কিনতে পারবেন কি না, অনেকের সন্দেহ তাই নিয়েই। অনেকের ধারণা, স্রেফ প্রচারণা পাওয়ার জন্যই এসব করছেন জুন।

কোচের দায়িত্ব ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই: ক্যাপেলো

ফ্যাবিও ক্যাপেলো ইংল্যান্ড ফুটবল দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন, ইংলিশ মিডিয়ার এই সংবাদকে গুজব হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন ইংলিশ কোচ স্বয়ং। ক্যাপেলো জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেও ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব পালন করতে চান তিনি।
আর মাত্র কয়দিন পরেই দক্ষিণ আফ্রিকাতে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের আসর। এরই মধ্যে ইংলিশ মিডিয়াতে খবর বেরিয়েছে, ক্যাপেলো নাকি ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন। ইংল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি ছিন্ন করতে নাকি তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সেরে ফেলেছেন। তবে এ খবর অস্বীকার করে রয়টার্সকে ক্যাপেলো বলেছেন, ‘অনেক সংবাদপত্রেই খবর বেরিয়েছে, আমি নাকি ইংল্যান্ডের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছি। তবে আসল কথা হলো, আমি দায়িত্বটি দারুণ উপভোগ করছি। এ দেশকেও আমি খুবই পছন্দ করি। ইংল্যান্ড আমাকে তাড়িয়ে দিলেই কেবল আমি অন্য কোথাও যাব।’
২০০৮ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ইংল্যান্ড কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হলে স্টিভ ম্যাকক্লারেনের বদলে দায়িত্ব নেন ৬৩ বছর বয়সী ক্যাপেলো। তাঁর কোচিংয়ে এ পর্যন্ত ২২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়ে ১৬টিতে জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড।
বিশ্বকাপেই নিজের আসল চ্যালেঞ্জটা দেখতে পাচ্ছেন ক্যাপেলো। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সামনে এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দলের আত্মবিশ্বাস, প্রত্যাশার চাপ সবই অনুভব করছি আমি। বিশ্বকাপে আমরা নিজেদের উজাড় করে দিতে চাই।’