Thursday, September 20, 2018

উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনের এত নিপীড়ন কেন? by রবার্ট ডি. কাপলান

পশ্চিম চীনে তুর্কি উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন হলো দেশটির নয়া সাম্রাজ্যবাদী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গোপন বন্দিশালায় ১০ লাখ মানুষকে বন্দী করে রাখার বিষয়টিও এর অন্তর্ভূক্ত। চীনা সাম্রাজ্যের গতিবিধি বুঝতে পারলেই এই নির্মমতার হেতু উপলব্ধি করা সম্ভব।
শিনজিয়াং, চীনের যে প্রদেশে লাখ লাখ উইঘুরের বসবাস, সেটি অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘নয়া রাজত্ব’। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চল পূর্ব তুর্কিস্তান নামে পরিচিত। যদিও চীনা রাষ্ট্র টিকে আছে সাড়ে ৩ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু শিনজিয়াং প্রথম চীনের কিং রাজবংশের অন্তর্ভূক্ত হয় ১৮ শতাব্দীর মাঝামাঝি। তখন থেকেই এই অঞ্চলের পরিস্থিতি ছিল, বৃটিশ পরিব্রাজক ফিটজরয় ম্যাকলিনের ভাষায়, ‘স্থায়ীভাবে বিরোধপূর্ণ।’
আমি যখন ১৯৯৪ সালে প্রথম শিনজিয়াং সফর করি ও স্থানীয় উইঘুরদের সাক্ষাৎকার নিই, তাদের চোখে জাতিগত হান চীনা দখলদারদের (তাদের ভাষায়) প্রতি বিদ্বেষ ছিল স্পষ্ট। এক উইঘুর তরুণ আমাকে বলেন, ‘এটি তুর্কিস্তান, চীন নয়। চীনারা আমাদের ভাষা শেখে না। আমাদের অনেকেও তাদের ভাষা শেখে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে পর্যন্ত দু’ পক্ষের সম্পর্ক ভালো নয়।’
এরপর থেকে এই সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। চীন কেন রাষ্ট্র হিসেবে আরও উদার হয়নি এর একটি গভীর কিন্তু না-বলা কারণ হলো চীনের কর্তৃপরায়ণ নেতৃত্বের মধ্যে জাতিগত বিদ্রোহের আশঙ্কা কাজ করে। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন একটু উদার হলো তখনই এ ধরণের বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। তাই চীন নিজের রাজনৈতিক কাঠামো বদ্ধ রেখে, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার গভীরে প্রবেশ করেছে। এই অঞ্চলের অনেক দেশ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত ছিল। এখানকার বাসিন্দারাও মূলত উইঘুরদের মতো তুর্কি মুসলিম। তাদেরকে মিত্র বানাতে চীন বর্তমানে এই অঞ্চলে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ করছে। অথচ, দেশটি নিজের মুসলিম সম্প্রদায়কে অনুকূল পরিবেশ দিতে রাজি নয় পাছে ভবিষ্যতে কোনো বিদ্রোহ ঘটে যায়! কিন্তু চীন যে নিজের সীমান্ত ছাড়িয়ে এভাবে গভীরে প্রবেশ করতে চাইছে এর সঙ্গে নিজের ভেতরকার দানবটির এক ধরণের সংযোগ আছে, থাকতেই হবে।
ঐতিহাসিকভাবেই চীন কখনই স্থলভূমিতে সুরক্ষিত ছিল না। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে। ফলে সমুদ্রপথে আগানোর বিলাসিতা করার সুযোগ দেশটির ছিল না। মিং রাজবংশের প্রথম দিকে অ্যাডমিরাল ঝেং হি ভারত মহাসাগরের কিছু এলাকা দখল করেন। সেগুলো ছাড়া নৌ পথে চীনের দুর্বলতা লক্ষণীয়। এখন স্থলভূমিতে চীন বেশ সুরক্ষিত। তাই বর্তমানে দেশটি চায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ নৌ বাহিনীর অধিকারী হতে। এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হলো উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতন বৃদ্ধি করা। ইউরেশিয়া অঞ্চলজুড়ে ভূমি ও সাগরপথে পরিবহন করিডোর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চীন যেই বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সেটি বাস্তবায়নে উইঘুর জনসংখ্যার পূর্ণ অধীনতা আদায় করা প্রয়োজন।
একুশ শতাব্দীর এই সিল্ক রুটের কেন্দ্রবিন্দু হলো মধ্য এশিয়া। সাবেক সোভিয়েতভুক্ত তুর্কি দেশগুলোতে সড়ক, রেলপথ ও জ্বালানি পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে চীন সংযুক্ত হবে ইরানের সঙ্গে। রাশিয়াকে হটিয়ে ইউরেশিয়ায় আধিপত্য স্থাপনের যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে চীন-ইরান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো মৈত্রীর। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন উইঘুর সম্প্রদায়ের বশ্যতা। কারণ উপকূলীয় চীন ও মধ্যপ্রাচ্যকে সংযোগকারী এই সকল সড়ক ও জ্বালানি পথকে অবশ্যই শিনজিয়াং-এর মধ্য দিয়েই যেতে হবে।
ঐতিহ্যবাহী উইঘুর সংস্কৃতিকে লঘু করে তুলতে চীনের পরিকল্পনা হলো তাদেরকে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী গৃহের বদলে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে বাধ্য করা। তাদের লোকজ বাজারকে আধুনিক করা। ২০১৫ সালে আমার পরবর্তী শিনজিয়াং সফরে আমি যেমনটা দেখেছি, চীন চায় শহরগুলোকে নতুন মহাসড়ক ও উচ্চগতির রেলপথের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে। চিরাচরিত ‘গাজর-ও-লাঠি’ (পুরস্কৃত করা ও সাজা দেওয়া) নীতির মাধ্যমে চীন হাজার হাজার অবাধ্য উইঘুরকে যেমন বন্দিশালায় রাখছে, তেমনি বাধ্য উইঘুরদের জীবনমানে উন্নতি ঘটাচ্ছে। এই সব কিছুর উদ্দেশ্য হলো উইঘুর মুসলিম সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় হান চীনা আধিপত্যের ষোলকলা পূরণ করা।
পশ্চিমা গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের চীনা ঋণের জালে জর্জরিত হওয়া এবং এর মাধ্যমে দেশগুলোর বন্দর ও মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার বিষয়টি। কিন্তু যে বিষয়টি অগোচরে রয়ে গেছে তা হলো ইউরেশিয়াজুড়ে চীনের মহাপরিকল্পনার জাতিগত অধ্যায়টি। এ নিয়ে আরও মনোযোগ আসা দরকার। চীনের সিল্ক রুট পরিকল্পনায় উইঘুরদের মরু ঘর দেশটির সম্ভাব্য দুর্বলতা।
এই প্রক্রিয়ায় যে জাতীয় গৌরব ও জনক্ষোভের বিষয় জড়িত তাকে খাটো করে দেখবেন না। ইউরোপের উপনিবেশবাদীদের কাছ থেকে হং কং ও ম্যাকাও চীন ফেরত নিয়েছে। যার মাধ্যমে চীনের মজ্জায় বিদেশী অনুপ্রবেশের লজ্জাজনক যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান হয়। ওদিকে মঙ্গোলিয়ার স্বার্বভৌমত্ব চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বারা অনেকখানি ক্ষুণœ হয়েছে। তিব্বতকে পুরোদমে অধীনস্থ করে রাখা হয়েছে। শিনজিয়াং হলো ‘বৃহত্তর চীন’ প্রকৃত অর্থে রূপায়নের ক্ষেত্রে শেষ অজেয় স্থান, যেটিও ক্রমেই পড়তির দিকে। এরপরই চীন পুরোদমে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিতে পারবে। ফলশ্রুতিতে উন্মুক্ত হয়ে পড়বে ভারত মহাসাগর, যেখানে মিয়ানমার ও জিবুতির মাঝামাঝি নতুন নতুন বন্দর নির্মাণ বা নির্মাণে সহায়তা করছে চীন। কে বলে যে সাম্রাজ্যবাদের যুগ শেষ হয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রায় অর্ধ-পৃথিবী দূরত্বে। ফলে এই নয়া সাম্রাজ্যবাদী উত্থান ঠেকাতে এই দূরত্ব দেশটির জন্য অসুবিধার কারণ। পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে একসময় প্রভাব বিস্তার করতো যুক্তরাষ্ট্র। এখন পূর্ব গোলার্ধের ওপর কোনো একক রাষ্ট্র যাতে প্রভাব বলয় তৈরি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার মধ্যে ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু ইরানের মধ্য দিয়ে যাওয়া চীনা সিল্ক রুট, পাশাপাশি ইউরেশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় নাব্য অঞ্চলে দেশটির নৌ উপস্থিতি থাকলে, পূর্ব গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তার করবে চীন।
আমেরিকার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি, তথা লাভক্ষতির অঙ্কে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সম্পর্ক নির্ণয় করার যে নীতি, তা এই লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রই স্বেচ্ছায় ত্যাগ করার শামিল। এই অস্ত্র হলো মুক্ত বাজার অর্থনীতি, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকারের মতো আমেরিকান আদর্শে আবদ্ধ মৈত্রী। উইঘুরদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে চীনকে দায়বদ্ধ করাটা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়ার বাস্তববাদী প্রচেষ্টার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। উইঘুর নিপীড়ন যেমন চীনের মহাপরিকল্পনার অংশ, তেমনি চীনে মানবাধিকারের স্বপক্ষে আমেরিকার অঙ্গিকারও হওয়া উচিৎ আমেরিকার নিজস্ব প্রচেষ্টার অংশ।
(রবার্ট ডি. কাপলান হলেন ‘দ্য রিটার্ন অব মার্কো পোলো’জ ওয়ার্ল্ড: ওয়্যার, স্ট্রেটজি অ্যান্ড আমেরিকান ইন্টারেস্টস ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ বইয়ের লেখক। তিনি সেন্টার ফর অ্যা নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো। পাশাপাশি, ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। তার এই নিবন্ধ মার্কিন শীর্ষ পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।)

নকল থিসিসেই বিশ্ববিদ্যালয় পার! by রশিদ আল রুহানী

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে হলে শিক্ষার্থীদের সাধারণ কোর্সের পাশাপাশি বিভিন্ন বর্ষে টার্ম পেপার, থিসিস-মনোগ্রাফ, মাঠকর্ম জমা দিতে হয়। এ জন্য নির্দিষ্ট নম্বরও বরাদ্দ থাকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই গবেষণা প্রবন্ধগুলো নীলক্ষেত থেকে সস্তায় কিনে তার ওপরে কেবল নিজের নামটি বসিয়েই জমা দেন শিক্ষার্থীরা। এসব গবেষণাপত্র মৌলিক কিনা তা যাচাই না করেই শিক্ষকরাও সেগুলোতে নম্বর দেন। আর এভাবেই নকল থিসিসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে যান শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকরা নিজেরাই রেডিমেড থিসিস জমা দিতে শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করেন। এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, ‘এমন কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সৃষ্টিশীলতাকে নিরুৎসাহিত করছে।’
এ মাসের শুরুর দিকে নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটে সরেজমিন দেখা গেছে, ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকানগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ের গবেষণাপত্র সংগ্রহে রাখা আছে। কোনও কোনও দোকানের সামনে লেখাও রয়েছে, ‘এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস, মনোগ্রাফ, মাঠকর্ম তৈরি ও প্রিন্ট করা হয়’। এসব গবেষণাপত্র মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রবন্ধ জমা দেওয়ার সময় এলে নীলক্ষেতের অলিগলিতে রীতিমতো ভিড় লেগে যায়। আর এই সুযোগে মোটা অংকের ব্যবসা করেন নীলক্ষেতের দোকানিরা।
বাকুশাহ মার্কেটের একটি দোকানের সামনে টার্ম পেপার, থিসিস, মাঠকর্ম বিক্রির বিজ্ঞাপন
বাকুশাহ মার্কেটের একটি দোকানের সামনে টার্ম পেপার, থিসিস, মাঠকর্ম বিক্রির বিজ্ঞাপন
কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব টার্ম পেপার, থিসিস ও মনোগ্রাফ নীলক্ষেত থেকে নিয়ে যান। প্রসঙ্গত, উল্লিখিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদ, আইন অনুষদ, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদের বেশিরভাগ বিভাগের শিক্ষার্থীকে টার্ম পেপার, থিসিস, মনোগ্রাফ ও মাঠকর্ম কাজ করতে হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, নীলক্ষেতের বাকুশাহ মার্কেটের এ ব্লকের এক নম্বর গলির ৭/১ নম্বর ‘মা কম্পিউটার’ নামে দোকানের কর্মীকে দুই শিক্ষার্থী বুঝিয়ে দিচ্ছেন টার্ম পেপারের নামের স্থানে কী নাম বসবে। দোকানদার তাদের নাম বসিয়ে হুবহু দুটি টার্ম পেপার প্রিন্ট করলেন। প্রিন্টের পরে সেটা যাবে বাঁধাইয়ে। তার আগে পরিচয় গোপন রেখে ওই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টার্ম পেপারের কয়েকটি পৃষ্ঠার ছবি তোলেন বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদক।
এই নকল টার্ম পেপার থেকেই নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা দুজন ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। একই টপিক ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ’ শীর্ষক টার্ম পেপার জমা দেবেন তারা। তাদের সুপারভাইজার ঢাকা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দিললুর রহমান। এই দুই শিক্ষার্থীর টার্ম পেপার জমা দেওয়ার তারিখ ছিল গত ৩ সেপ্টেম্বর।
এ ধরনের নকল থিসিস জমা দিলে নম্বর পাওয়া যাবে? জানতে চাওয়া হলে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এর আগেও তো আমরা এভাবেই জমা দিয়েছি। কোনও সমস্যা নেই।’ মুখে ভেংচি দিয়ে একজন বলেন, ‘স্যারেরা ওসব দেখেন না। খালি প্রথম পৃষ্ঠায় তার (স্যারের) নিজের নাম আছে কিনা, সেটা দেখেই নম্বর বসিয়ে ছেড়ে দেন। আমাদের বড় ভাইয়েরাও একইভাবে পাস করে গেছে।’
নীলক্ষেতের দোকানে থিসিস-টার্ম পেপারের লিস্ট ও বাঁধাই করা স্যাম্পল
নীলক্ষেতের দোকানে থিসিস-টার্ম পেপারের লিস্ট ও বাঁধাই করা স্যাম্পল
এই শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধায়ক সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দিললুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনিও বিষয়টি স্বীকার করেন। ড. দিললুর বলেন, ‘আসলে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ক্লাস করে না, বহুদিন পর এসে শুধু পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষার আগে ৫০ মার্কের টার্ম পেপার জমা দেয়। আমরা তো তাদের ফেল করিয়ে দিতে পারি না। তবে শুধু ভাইভায় শিক্ষার্থীর কাছে টার্ম পেপারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়—সে যে বিষয়ে কাজ করেছে, সেটা সে বোঝে কিনা। যদি দেখা যায় সে উত্তর দিতে পারছে, তখন ধরে নেওয়া হয় সে বোঝে। আমরা এটুকুই সর্বোচ্চ দেখি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া নীলক্ষেত থেকে না কোথা থেকে কপি করে আনলো, সেগুলো তো আমরা চেক করতে পারি না। শুধু দেখা হয়  বিষয়বস্তু ঠিক আছে কিনা। আর সে ওই বিষয়ে জানে কিনা।’
শিক্ষার্থীদের জমা দেওয়া নকল টার্ম পেপারেই দিব্যি নম্বর দিচ্ছেন শিক্ষকরা, এটা কী করে সম্ভব? এ প্রশ্নে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন মোল্লাহ  বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ’অন্য কোথাও এমনটা হয় কিনা জানি না, কিন্তু অন্তত ঢাকা কলেজে এমনটা হওয়ার কথা না। কারণ, আমাদের শিক্ষকরা এগুলো খুব ভালো করে চেক করেন। তারপরও কেউ যদি এমনটা করে থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘মা কম্পিউটার’-এর এক কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমার কাছে প্রায় চার হাজার থিসিসের কপি আছে।’ থিসিসের শিরোনামের লিস্টসহ বাঁধাই করা একটি মোটা বই ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে শিরোনামের থিসিসটি আপনার দরকার, শুধু সেটা দেখিয়ে দেবেন। আপনার নাম বসিয়ে প্রিন্ট করে দেবো।’
সাইনবোর্ড সম্বলিত বাকুশাহ মার্কেটের বি ব্লকের ২ নম্বর গলির ৯৭ নম্বর দোকানটির নাম ‘মুন ফটোকপি’। এখানেও তৈরি হয় থিসিস ও টার্ম পেপার। নিজের নাম গোপন রেখে দোকানের এক কর্মচারী বলেন, ‘এখানে শুধু আমাদের দোকানেই নয়, আরও অনেক দোকানে থিসিস-মনোগ্রাফ ও টার্ম পেপার পাওয়া যায়। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই বেশি আসে।’ এগুলো দিয়ে তাদের কাজ হয় কিনা, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কাজ না হলে কি তারা  নেয়?’ এত থিসিস কীভাবে সংগ্রহ করেন, জানতে চাইলে তিনি তা জানাতে অস্বীকার করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন নীলক্ষেতের কম্পিউটারের দোকানগুলোতে টাইপ ও বাঁধাইয়ের কাজ করাতে আসেন, তখন দোকানদাররা সেগুলোর কপি তাদের কম্পিউটারে রেখে দেন। এগুলোই পরে চাহিদা অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন তারা।
থিসিস ও টার্ম পেপারের জন্য নীলক্ষেতের একটি দোকানে ইডেন কলেজের কয়েক ছাত্রী
থিসিস ও টার্ম পেপারের জন্য নীলক্ষেতের একটি দোকানে ইডেন কলেজের কয়েক ছাত্রী
ইডেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীকেও দেখা গেল কয়েকটি ফটোকপির দোকানে ভিড় করেছেন। তাদের অনেকের হাতে রয়েছে হুবহু একই রকমের থিসিস পেপার। এই শিক্ষার্থীরা জানান, তারা সবাই প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। থিসিস হুবহু কপি করলেও কোনও সমস্যা হয় না বলে দাবি করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন কলেজের মার্কেটিং বিভাগের মাস্টার্সের এক পরীক্ষার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে অভিযোগ করে বলেন, ‘শিক্ষকরা মাথা খাটানোর ভয়ে নীলক্ষেত থেকে থিসিসের কপি সংগ্রহ করতে আকার-ইঙ্গিতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন। সেক্ষেত্রে আমাদের কী করার আছে? অথচ তারা চাইলেই আমাদের একটু গবেষণা শেখাতে পারেন। শিক্ষকরা একটু দায়িত্বশীল হলেই আমরা গবেষণা শিখতে পারতাম। মৌলিক গবেষণা আমাদের ভবিষ্যতের জন্যেও কাজে লাগতো। কিন্তু এটা হয় না।’ বিভাগের কোন কোন শিক্ষক এ কাজে জড়িত, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি ইডেন কলেজের এই শিক্ষার্থী। তবে তিনি বলেন, ‘বিভাগের দুই-একজন বাদে বাকি সবাই একই কাজ করেন। এছাড়া, এদের কেউ কেউ চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।’
ইডেন কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে বিভাগে শিক্ষকের সংখ্যা ও জনবল খুবই কম। এত বেশি শিক্ষার্থীর থিসিস, টার্ম পেপার খুব বেশি যাচাই-বাছাই করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া, এক- একজন শিক্ষকের সঙ্গে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর একটি করে গ্রুপ তৈরি করে দেওয়া হয়। ফলে অনেক সময় নকল থিসিস জমা দিয়ে এই সুযোগটি কোনও কোনও শিক্ষার্থী নিতেও পারে। তবে আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করি যাতে নকল থিসিস জমা দিয়ে কেউ পার না পায়।’ নীলক্ষেত থেকে থিসিস সংগ্রহে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করেন শিক্ষকরাই, এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন অধ্যাপক আব্দুল কাদের।
বাজারে থিসিস বেচাকেনা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষা বর্তমানে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, সার্টিফিকেট, টার্ম পেপার, মাঠকর্ম, থিসিস-মনোগ্রাফও কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।’ এ ধরনের রেডিমেড থিসিস-মনোগ্রাফ শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক সৃষ্টিশীলতাকে নিরুৎসাহিত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘নকল থিসিস জমা দিয়ে কেউ যেন নম্বর নিয়ে যেতে না পারে, সেটা একমাত্র প্রতিরোধ করতে পারেন শিক্ষকরাই। ফলে শিক্ষকদের ইন্ধন ছাড়া কোনও শিক্ষার্থী এভাবে পার পেয়ে যেতে পারে না। ফলে এর পেছনে শিক্ষকরাই বেশি দায়ী।’

মেজর মান্নান স্বাধীনতাবিরোধী - মহিউদ্দিন আহমদ

বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নানের এই দেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। যমুনা টেলিভিশনের টকশো ২৪ঘণ্টা’র আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, কথাবার্তায় আমরা কিছু ভিন্নতা দেখছি। বলা হলো যে, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ। কে বললো এটা? মাহী বি. চৌধুরী। তাকে নিয়েও এখন আলাপ করতে হচ্ছে, কিছুই করার নেই।
এ সময় সাপ্লিমেন্টারি দিয়ে সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, উনি যে প্রস্তাবনাটি উত্থাপন করলেন- মাহী বি. চৌধুরীর। মাহী বি. চৌধুরী কিন্তু ইনডাইরেক্টলি বলেছেন, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী এবং তিনি তার বাবাকে বলেছেন- আমার বাবাও ভুল করেছেন।
টকশো’র সঞ্চালক বলেন, এটা কিন্তু ড. কামাল হোসেন এবং বি. চৌধুরী ঘোষণা দিচ্ছিলেন তখন সেখানেও এই বিষয়টি ছিল। পরে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।
এ পর্যায়ে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, আমি একটা এক্সাম্পল দিই। মাহী বি. চৌধুরীদের পার্টি যেটা, এ পার্টির সেক্রেটারি কে?
টকশো’র অন্য আলোচক ও গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী উত্তর দিয়ে বলেন, মান্নান। আলোচক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, মান্নান সাহেব। 
মহিউদ্দিন আহমেদ ফের প্রশ্ন করেন, মান্নান কে?
মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, আবদুল মান্নান। বিএনপির লোক।
এবার মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, না- বিএনপির লোক তো হয়েছে বিএনপি হওয়ার পরে। ১৯৭১ সালে সে কে ছিল। মেজর মান্নান পাকিস্তানি আর্মির কমান্ডো অফিসার ছিল। তাদের গুলিতেই শমসের মবিন চৌধুরী আহত হয়েছে। আমি তাকে ইন্টারভিউ করেছি, সে বলেছে- তার নেতৃত্বে আনোয়ারায় একটি কমান্ডো বাহিনী নেমেছে, নেমেই এলোপাতাড়ি গুলি কইরা মানুষজন মারছে। পরে সে চলে যায় পাকিস্তানে, রিপ্যাট্রিয়ট হয়ে ফিরে এসেছে। বঙ্গবন্ধু তারে আর চাকরিতে পুনর্বাসন করে নাই। এই হলো মেজর মান্নান। যুদ্ধাপরাধী। যুদ্ধাপরাধী বলবো না, স্বাধীনতাবিরোধী। সেই হচ্ছে দলের সেক্রেটারি। তো এখন বাবা ভুল করছে, বাবা বলুক না- আমি ভুল করছি।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, চাচাও তো তাহলে ভুল করেছে।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, পুরোটাই তো তাই। কোলের মধ্যে একজন সেক্রেটারি বানালেন, একটা লোককে- যে হইলো একদম মানে দেশবিরোধী। আপনি বলতেছেন, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ইয়ে...। তাহলে তো বাবার পক্ষ ত্যাগ করা উচিত তার। মাহী তখন ছোট ছিল বা জন্ম হয়নি- তাই সে হয়তো বলতে পারে আমার দায় নাই। কিন্তু মান্নান সাহেবের ব্যাপারটা তো সবাই জানে। এটা তো নতুন কিছু না। যে কারণে জামায়াতের রাজনীতি করা বা ইসলাম পছন্দ পার্টিগুলো ১৯৭১ সালে, পরবর্তীতে সংবিধানে যাদের রাজনীতির অধিকার ছিল না। একই অর্থে আমি তো মনে করি, মান্নান সাহেবদেরও রাজনীতি করার কোনো রাইট নাই এই দেশে। যতদিন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা আছেন।
উল্লেখ্য, বিকল্প ধারার সভাপতি প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র স্বাধীনতা বিরোধীদের ব্যাপারে ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ’ দুটি শব্দ যুক্ত করা হয়। জাতীয় ঐক্যের ঘোষণার দিন বি. চৌধুরী বা তার দলের শীর্ষ কোনো নেতা উপস্থিত না থাকা ও পরে এক অনুষ্ঠানে বিকল্প ধারার অন্যতম শীর্ষ নেতা মাহী বি. চৌধুরী শব্দ দুইটির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা রাজনৈতিক মহলে জন্ম দিয়েছে নানামুখী আলোচনা ও গুঞ্জন।

চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের অস্ত্রের মহড়া

ছাত্রলীগের ঘোষিত কমিটি নিয়ে ফের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ। দ্বিতীয় দিনের মতো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সড়ক অবরোধ. গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বহিরাগতদের উপস্থিতিও দেখা গেছে। বুধবার সকাল থেকে কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের উত্তেজনার পর দুপুর ১টার দিকে কলেজের সামনের সড়কে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করেনি। বরং এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম বলেন, সংঘাতের সময় পুলিশ কোনো অস্ত্র দেখেনি। কোনো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেনি। তাই পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
অথচ মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (চকবাজার জোন) নোবেল চাকমা বলেন, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের গণি বেকারির সামনে ছাত্রলীগের দু’পক্ষ মুখোমুখি হয়। তখন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এমনকি মুখ বাঁধা বেশ কয়েকজনের হাতে-কোমরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রও ছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তিনি জানান, কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ সদস্যের ঘোষিত কমিটি নিয়ে ছাত্রলীগের তিন পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরমধ্যে দু’পক্ষ এক হয়ে অপর পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে এ নিয়ে একটি পক্ষ প্রথম কলেজের সামনের সড়কে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে। আরেকটি পক্ষ কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে বিক্ষোভ করে। যাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে।
এরপর সড়কে গাড়ি ভাঙচুর শুরু হয়। ঘটানো হয় ককটেল বিস্ফোরণ, যা নিয়ে দিনভর উত্তপ্ত ছিল চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসসহ আশপাশের দুটি কলেজ ও তিনটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা। সড়ক অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়ে নগরীর মানুষ। একই ঘটনার জের ধরে গতকাল সকাল থেকেও উত্তেজনা বিরাজ করছিল কলেজ ক্যাম্পাসে। কিন্তু দুপুর ১টা থেকে আবারও দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় সংঘাত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১টার দিকে কলেজ ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে গণি বেকারি থেকে চকবাজার পর্যন্ত সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করতে দেখা যায়। একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। দুই গ্রুপকে ধাওয়া দিয়ে লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করলেও অস্ত্রধারী কাউকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেনি পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে ছাত্রলীগ কর্মীরা গণি বেকারি থেকে কাজেম আলী স্কুলের আশেপাশে থাকা দোকানপাট ও খাবার হোটেলগুলোতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর করেছে। এ সময় ভোজন নামে একটি হোটেলে ব্যাপক ভাঙচুর করে তারা।
গণি বেকারির কর্মচারী নাজিম উদ্দিন বলেন, একদিকে ককটেল বিস্ফোরণ হচ্ছিল অন্যদিকে গাড়ি ভাঙচুর করছিলেন একদল যুবক। দোকানের সামনে দরজার কাচও ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পথচারি, স্কুলের শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার রাতে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ। এতে মাহমুদুল করিমকে সভাপতি ও সুভাষ মল্লিক সবুজকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি অনুমোদন দেয় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান হাসান ইমু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সমপাদক দস্তগীর চৌধুরী।
মাহমুদুল করিম প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী এবং সবুজ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী। আর এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যামপাসে বিক্ষোভ শুরু করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া মেয়রের ছয়জন অনুসারী কমিটি থেকে পদত্যাগও করেন। 
বিক্ষুব্ধ নেতাদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে কমিটিতে ছাত্রদল ও শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের পদ দেয়া হয়েছে। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে রাতের আঁধারে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। যা কোনভাবেই মেনে নেবেন না তারা। ঘোষিত নতুন কমিটি যতদিন বাতিল না হবে ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবেন পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীরা।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানান, ১৯৮৪ সালে সর্বশেষ চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি হয়েছিল। ছাত্রশিবিরের সহিংস কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যামপাস ছাড়তে বাধ্য হওয়া ছাত্রলীগের প্রায় তিন দশক ধরে ওই কলেজে কোনো কর্মকাণ্ডই ছিল না। ২০১৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজ ক্যামপাস দখলে নেয়। এরপর থেকে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলে আসছে।

‘ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্য যদি হাজার বার নিহত হতাম!’

আজ মহান তাসুয়া বা আশুরার পূর্ব দিন। ১৩৭৯ বছর আগে এই দিনে অর্থাৎ ৬১ হিজরির নয়ই মহররম কুফায় ইয়াজিদের নিযুক্ত কুখ্যাত গভর্নর ইবনে জিয়াদ  ইমাম হুসাইন (আ.)’র ছোট্ট শিবিরের ওপর অবরোধ জোরদারের ও হামলার নির্দেশ দেয়।
এর আগেই আরোপ করা হয়েছিল অমানবিক পানি-অবরোধ। পশু-পাখী ও অন্য সবার জন্য ফোরাতের পানি ব্যবহার বৈধ হলেও এ অবরোধের কারণে কেবল নবী-পরিবারের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় এই নদীর পানি।ইয়াজিদ বাহিনীর সেনা সংখ্যাও ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং দশই মহররমের দিনে তা প্রায় বিশ বা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়।
একই দিনে অর্থাৎ নয়ই মহররম কুফায় ইয়াজিদের নিযুক্ত কুখ্যাত গভর্নর ইবনে জিয়াদের নির্দেশে শিমার কারবালায় আসে। শিমার জিয়াদের একটি চিঠি হস্তান্তর করে তাদের সেনাপতি ওমর ইবনে সাদের কাছে। ওই চিঠিতে ইমাম হুসাইন (আ.)’র ছোট্ট শিবিরের ওপর অবরোধ জোরদারের ও হামলার নির্দেশ দেয়া হয়। ইয়াজিদপন্থী সেনা সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে কারবালায়।
ফলে ইমামের শিবির ঘেরাও করে ফেলে ইয়াজিদ সেনারা। ইবনে জিয়াদ ও ওমর ইবনে সাদ তাদের সেনা সংখ্যার আধিক্য দেখে নিশ্চিত হয় যে সম্ভাব্য যুদ্ধে ইমাম হুসাইন (আ.)ই পরাজিত হবেন এবং নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ইরাকিরা বা অন্য কেউই ইমামকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না। ( কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে দূরবর্তী কোনো কোনো অঞ্চল থেকে ইমাম ও আহলে বাইতের  উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বা কয়েক শত সমর্থক যখন অবরূদ্ধ ইমাম আ. এবং তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদেরকে সাহায্যের জন্য কারবালার কাছাকাছি পৌঁছেন ততক্ষণে ঘটে যায় আশুরার  মহাট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক ঘটনা।)
শিমার সৌন্দর্যের জন্য বনু হাশিমের চাঁদ নামে খ্যাত আবুল ফজল আব্বাস ও তাঁর ভাইদেরকে ইয়াজিদ সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টিসূচক একটি কার্ড দিতে চেয়েছিল এই শর্তে যে তাঁরা ইমামের (আ.) পক্ষ ত্যাগ করবেন। কিন্তু বীরত্ব ও ইমামের প্রতি আনুগত্যের জন্য খ্যাত হযরত আব্বাস (আ.) তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন: তোমার ওপর ও তোমার আমিরের ওপর এবং নিরাপত্তা কার্ডের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তুমি আমাদেরকে নিরাপত্তা দিতে চাইছ অথচ আল্লাহর রাসূল (সা.)’র পুত্রকে নিরাপত্তা দিচ্ছ না।
ইমাম হুসাইন (আ.) নয়ই মহররমের বিকালের দিকে এক দিনের জন্য যুদ্ধ পিছিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন যাতে দশই মহররমের রাতটি শেষবারের মত ইবাদত বন্দেগিতে কাটানো যায়। ইয়াজিদ বাহিনীর প্রধান প্রথমে রাজি না হলেও পরে এ প্রস্তাবে রাজি হয়। বিকালেই হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) নিজ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। সঙ্গীরা আবারও তাঁর প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন।
নয়ই মহররম কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি অর্জনের সর্বশেষ দিন। এই পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন  ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর প্রায় ১০০ জন সহযোগী। আর এ জন্যই তাঁরা  ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন।
আশুরার রাত
ইমাম হুসাইন (আঃ)’র জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল শাহাদত। কারণ, রাসুলে খোদা স্বয়ং বলেছেন, শাহাদাত হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুণ্য। মনে পড়ে গেল তাঁর মহান পিতার শাহাদতের সময়কার কথাটি, সেটি হলো, কাবার প্রভুর কসম আমি সফল হয়েছি। তিনি বলেছিলেন খোদার কসম , অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুই ঘটেনি। মনে পড়ে গেল  নানাজী রাসূল (সা.)’র কথা। তিনি আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর উচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ তাঁকে দিয়েছিলেন।
এসব ভাবতে ভাবতে তাঁর ক্লান্ত অবসন্ন চোখে তন্দ্রা চলে এলো। স্বপ্নে দেখলেন নানাজান রাসুলে খোদাকে, পিতা হযরত আলীকে, স্নেহময়ী মা ফাতিমাকে, আর ভাই ইমাম হাসানকে (তাদের সবার ওপর মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও দরুদ বর্ষিত হোক)। তাঁরা বললেন, হে হুসাইন! তুমি আগামীকালই আমাদের সাথে মিলিত হবে। এর পরপরই তার তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। ইমাম  (আঃ) তাঁর বোন বিবি  জাইনাবকে স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। ভাইয়ের নিশ্চিত শাহাদাতের কথা শুনে বোনের মন কি আর মানে ? বোন চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। ইমাম তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন।
ইমাম  (আঃ) পরদিনের মহাকুরবানির জন্য প্রস্তুত হলেন। এই কুরবানি হবে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এতে তিল পরিমাণ খাঁদ থাকতে পারবে না। কারণ, আগামীকাল যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হবেন তাঁদের প্রতিটি রক্ত বিন্দু শত সহস্র রক্ত বিন্দুতে নয় বরং লক্ষ-কোটি রক্ত বিন্দুতে পরিণত হয়ে সমাজ-দেহে সঞ্চালিত হবে। শহীদের খুন রক্তশূণ্যতায় আক্রান্ত সমাজ-দেহে নতুন রক্ত প্রবাহ দান করে। তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও স্মৃতি যুগযুগ ধরে মানুষকে মুক্তির প্রেরণা যোগায়। তাদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস ও চেতনা দান করে। শহীদরা কিয়ামত পর্যন্ত অমর থাকবেন এবং শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাঁদেরকে এমন জৌলুসসহ হাজির করবেন যে স্বর্গীয় বাহনে উপবিষ্ট নবী-রাসূলরাও তাঁদেরকে সম্মান দেখানোর জন্য নীচে অবতরণ করবেন।
তাই ইমাম তাঁর কাফেলার মধ্যে যাদের নিয়্যতে বিন্দু পরিমাণ গোলমাল আছে তাদের কাছ থেকে মুক্ত হতে চাইলেন। তিনি সবাইকে একস্থানে সমবেত করলেন এবং শাহাদাতের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ভাষণ দিলেন। তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, "আমি আমার সঙ্গী সাথীদের চেয়ে কোন সাথীকে বেশি নেককার এবং আমার আহলে বাইতের চেয়ে কোন পরিবারকে বেশি উত্তম মনে করি না। মহান আল্লাহ তোমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।"
ভয়াবহ আশুরার পূর্বাভাস নিয়ে ঘনিয়ে এলো অন্ধকার। ধৈর্য্যের মূর্ত প্রতীক ইমাম হুসাইন (আঃ) সকলকে কাছে ডাকলেন। বললেন, ভায়েরা আমার! জেনে রাখো আজকের এই রাত হবে তোমাদের শেষ রাত। আমার সাথে থাকলে তোমরা কেউ রেহাই পাবে না। আগামীকালই আমাকে ও আমার পরিবার পরিজনকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হবে। এমনকি আমার দুধের বাচ্চাকেও এরা রেহাই দেবে না। ভাইসব, "তোমরা ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারো। আমার হাতে তোমরা যে বায়াত করেছো, তা আমি ফিরিয়ে নিলাম। তোমরা এখন মুক্ত। আমার জন্যে শুধু শুধু তোমরা কেন প্রাণ দেবে ? শত্রুরা শুধু আমাকে চায়, তোমাদেরকে নয়। এখন অন্ধকার রাত। যার ইচ্ছা চলে যাও, কেউ দেখতে পাবে না।" ইমাম ভাষণ শেষ করে তাঁর ভাই আব্বাসকে প্রদীপ নিভিয়ে দিতে বললেন।
কিন্তু আশুরার রাতে কেউই ইমামকে ত্যাগ করেননি বলে বেশিরভাগ ঐতিহাসিকরাই উল্লেখ করেছেন।  অবশ্য বলা হয় ইমামের সঙ্গীদের সংখ্যা  ছিল একশো জনেরও কম।
আত্মত্যাগের আদর্শে বলীয়ান বিশুদ্ধ অন্তরের এই মর্দে মুমিনদের দিকে তাকিয়ে ইমামের প্রশান্ত মুখটা উজ্জ্বল দীপ্তিমান হয়ে উঠল। মহাকালের মহাত্যাগের জন্যে এরকম বিশুদ্ধ হৃদয়গুলোই তাঁর প্রয়োজন ছিল। তবুও তিনি তাঁর সাথীদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেন গেলে না? এ প্রশ্ন শুনে আহলে বাইতের সদস্যরা বলে উঠলেন, একি বলছেন হযরত! আমরা আপনাকে একা ফেলে কিভাবে চলে যাবো? লোকের কাছে গিয়ে কীভাবে মুখ দেখাবো? আমরা কি বলব মহানবী (সঃ) এর সন্তানকে আমরা একা ফেলে চলে এসেছি। তা কখনো হবে না। নিজের জীবন দিয়ে দেব তবুও আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনার সাথে থেকে শহীদ হব।
মুসলিম বিন আউসাজা দাঁড়িয়ে বললেন, প্রিয় ইমাম একি বলছেন আপনি! আপনাকে দুশমনদের হাতে ফেলে রেখে পালিয়ে যাবো? খোদা আপনার পরে যেন আমাদের জীবিত না রাখেন। আমরা যুদ্ধ করবো । গায়ে শক্তি থাকা পর্যন্ত দুশমনের গায়ে তলোয়ার চালাবো, বর্শা চালবো। ওগুলো ভেঙ্গে গেলে পাথর মেরে মেরে যুদ্ধ করবো।
সাঈদ বিন আবদুল্লাহ হানাফী বললেন, প্রিয় ইমাম ! খোদার কসম আপনাকে রেখে আমরা কোথাও যাবো না। আপনার জন্যে যদি নিহত হই ও জীবন্ত দগ্ধ হই এবং তা যদি ৭০ বারও হয় তবুও আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনি মরে যাবেন আর আমরা বেঁচে থাকব এ কি করে হয় ! যুহাইর ইবনে কাইন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মহানবীর প্রিয় সন্তান, আপনি ও আপনার পরিবারকে রক্ষার জন্যে আমাকে যদি হাজার বারও মেরে ফেলা হয় তাহলেও আমি আপনাকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করব। অর্থাৎ আপনার জন্য আমার এ নগণ্য জীবনকে মাত্র একবার কুরবান করা খুবই তুচ্ছে!  এভাবে ইমামের বিভিন্ন সঙ্গী সাথী ইমামকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, নিজেদের আন্তরিকতা প্রকাশ করতে লাগলেন।
সঙ্গী-সাথীদের এরকম দৃঢ়তা দেখে ইমামের চেহারা মুবারক এক অভূতপূর্ব প্রফুল্লতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন। ইমাম হুসাইন (আঃ)’র ভাষণের পর সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে মশগুল হলেন ইবাদতে। কেউ সিজদায়, কেউ নামাজে, কেউ মুনাজাতে। কারবালার প্রান্তর সিক্ত হয়ে উঠল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহীদদের অশ্রুতে। দুনিয়ার সব ফেরেশতা যোগ দিলেন তাঁদের এই প্রার্থনায়।

কেউ বলতে পারবে না কারো গলা টিপে ধরেছি, বাধা দিয়েছি -প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকতা পেশাকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কখনো বালকসুলভভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি বলেন, আমরা সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু এটাকে বালখিল্যভাবে ব্যবহার করা উচিত নয় এবং সবারই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। মিডিয়া আমার বিরুদ্ধে কি লিখলো আর না লিখলো তা  আমি চিন্তা করি না।
এটা কেউ বলতে পারবে না যে, কারো গলা টিপে ধরেছি, কারো মুখ টিপে ধরেছি অথবা কাউকে বাধা দিয়েছি- দেইনি, দেই না। বরং সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার আমরা করেছি। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে তার কার্যালয়ে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অসুস্থ, অসচ্ছল ও দুর্ঘটনাজনিত আহত ও নিহত সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের অনুকূলে আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
জাতির পিতা সাংবাদিকদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি স্বাধীনতা ভালো। তবে, এখানে একটা কথা আছে- স্বাধীনতা ভালো- তবে তা বালকের জন্য নয়। কাজেই এ ধরনের বালখিল্য ব্যবহার যেন  কেউ না করে সেদিকেও দৃষ্টি দেয়া উচিত। তিনি বলেন, অন্তত গঠনমূলক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা যেটা দেশের কল্যাণের কাজে লাগবে। এটা হচ্ছে বাস্তবতা, আমি আশা করি নিশ্চয়ই সেটা আপনারা অনুভব করবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৮-এর নির্বাচনে দিন বদলের  যে অঙ্গীকার করেছিলাম, আমি মনে করি নিশ্চয়ই আপনারা এটা স্বীকার করবেন আজকে মানুষের দিন বদল হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে দেখার, জানার জন্য জীবনে যত রকম ঝুঁকি নেয়ার নিয়েছি এবং সুযোগ পেলে কীভাবে করবো  সেই পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছি বলেই আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আজকে আমরা মহাকাশও জয় করেছি, সমুদ্র সীমানা ঠিক করেছি আবার স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন করেছি। যাই করেছি তার শুরুটা করে দিয়ে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এই সময়ে জাতির পিতার সাড়ে ৩ বছরের শাসনে একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত প্রদেশকে একটি  দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি এত পরিমাণ কাজ তিনি সম্পাদন করেছেন যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিডিয়ার মাধ্যমে সাংবাদিকরা এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুস্থ জনগণের কথা, বিপন্ন জনমানুষের কথা তুলে আনেন- ফলে সরকারের তাদের পাশে দাঁড়াতে সুবিধা হয়। সকলের কথা বলার এবং মতপ্রকাশের অধিকার থাকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কথা বলার স্বাধীনতা এটা সকলেরই আছে। সংবাদপত্র, সাংবাদিকদের স্বাধীনতার কথায় আমরা সব সময় বিশ্বাস করি।
অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো সাংবাদিক কল্যাণকে  সরকার অগ্রাধিকার দেয় উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, সাংবাদিক কল্যাণে তার সরকার ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ স্থাপন করে এর আওতায় অসুস্থ, অসচ্ছল, আহত এবং নিহত সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অনুদান দিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে আরো ২০ কোটি টাকা অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি একেএম রহমতউল্লাহ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
তথ্য সচিব মো. আব্দুল মালেক অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মহাপরিচালক শাহ আলমগীরও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। এ ছাড়া, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মোল্লা জালাল, মহাসচিব শাবান মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি (ডিইউজে) আবু জাফর সূর্য এবং সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরীও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে একটি  টেলিভিশন এবং একটি রেডিও পেয়েছি। এরপর আমরা বেসরকারি খাতে  টেলিভিশন উন্মুক্ত করে দেই।
সংবাদপত্র এবং রেডিও যে যেভাবে চেয়েছে আমরা অনুমোদন দিয়েছি। এর উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা। আমি খুব কাছ থেকে  দেখেছি সাংবাদিকদের জীবন কেমন? তাদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই।  বেতনেরও নিশ্চয়তা কম। এ কারণে, আমি নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করি। সংবাদপত্র-টেলিভিশনে কখনো ভালো প্রচার পাননি উল্লেখ করে  শেখ হাসিনা বলেন, হতে পারে সেখানে যারা মালিক হয়তো তাদের কারণে। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক সব সময় রয়েছে। সংবাদপত্রের সঙ্গে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন যে, ছাত্র জীবন থেকে জাতির পিতার সংবাদপত্রের সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল।
প্রথমে ইত্তেহাদ নামে একটা পত্রিকা, তার আগে ছিল মিল্লাত নামে একটা পত্রিকা। এরপর ইত্তেফাক বের হলো। তিনি কিন্তু সবসময় এসব পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। নিজের হাতে ইত্তেফাক বিক্রি করার কাজও করেছেন এবং পূর্ববঙ্গের পক্ষ থেকে তিনি এসব পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করতেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা তার পিতার সম্পর্কে বলেন, তিনি যে সংবাদপত্রের লোক ছিলেন সেটা কিন্তু তার আত্মজীবনীতে স্পষ্ট লেখা আছে।
সেদিক  থেকে আপনারা আমাকে যদি আপনাদের পরিবারের একজন মনে করেন আমি খুশি হবো।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘সকালে এক কাপ চা ও একটি পত্রিকা যে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। টেলিভিশন বন্ধ  রেখে সকালে পত্রিকা নিয়ে বসি। সব পত্রিকা যে পক্ষে লেখে, তা নয়। প্রয়োজনীয় সংবাদগুলো মার্ক করি। সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বলি। সংবাদপত্র  থেকে অনেক তথ্য পাই। দুর্গম জায়গার অনেক তথ্যও সংবাদপত্রে আসে। তাতে আমরা সহযোগিতা পাই। এ জন্য সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতাকে ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার পর এদেশের মানুষের কথা বলার অধিকারটুকু পর্যন্ত হরণ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সব সামরিক শাসকেরই এই চরিত্রটা থাকে, তারা ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতিবিদদের গালি দেন এবং এরপর তারাই উর্দি খুলে রাজনীতিবিদ সেজে যান। যার কুফল ভোগ করেন দেশের আপামর জনসাধারণ। আর সুফল ভোগ করে তাদের সঙ্গে যারা যোগ দিতে পারে সেই মুষ্টিমেয় একটা এলিট শ্রেণি। সেটাই ছিল বাংলাদেশের ভাগ্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল কিন্তু তখনও মানুষের দ্বারে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, তখনকার ক্ষমতাসীনরা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল, স্বাধীনতার বিরোধিতা করাই ছিল তাদের কাজ। যার ফলে বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড  যেগুলো দেশ স্বাধীনের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে জাতির পিতা শুরু করেছিলেন  সেসব বন্ধ হয়ে যায়।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের প্রতি জাতির পিতার আন্তরিকতার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আপনারা জানেন, স্বাধীনতার সময় পাকিস্তানিরা পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর সমস্ত সাংবাদিককে সরকারি চাকরির মর্যাদা দিয়ে ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন জাতির জনক। তাদের অনেককে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। এই সুযোগ দেয়ার জন্য একটি কমিটিও করা হয়েছিল। যদিও সেই কমিটির সদস্যরা পঁচাত্তরের পর সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়েছিল।’
আবাসন সমস্যা নিয়ে সাংবাদিক নেতাদের সহযোগিতা চাওয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আবাসনের সমস্যার কথা উঠেছে। বিষয়টি আমি জানি। আমি যখন ন্যাম ফ্ল্যাট করেছি তখন বলেছিলাম কিছু ফ্ল্যাট থাকবে যেটা হায়ার পারচেজে সাংবাদিক, শিল্পী-সাহিত্যিক তারা নিতে পারবেন। যেকোনো কারণেই সেটা আর হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন কিছু ফ্ল্যাট করছি যেটা সামান্য টাকা দিয়ে, যেটা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করে এই ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবেন। যারা চান তারা হতে পারবেন। ভাড়া থেকেই মূল্যটা পরিষদ হবে। প্রতি মাসে ভাড়া হিসেবে  যেটা হবে সেটা মূল্য হিসেবে ধরা হবে।  সেভাবে আমরা ফ্ল্যাট দিতে পারবো।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্লট দেয়া হয়েছে, তখন সাংবাদিকদের অনেকে পেয়েছেন। এখন মনে হচ্ছে ওভাবে প্লট না দিয়ে আমরা যদি ক্লাস্টার করে দিয়ে দিতাম। অনেকে মিলে হয়তো বাড়ি করতে পারতো।’ অনুষ্ঠানে  মোট ১১৩ জনের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
মান-অভিমানের কিছু নেই: প্রধানমন্ত্রী
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক মান-অভিমান’ ভাঙ্গাতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখানে মান-অভিমানের কিছু নেই, এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইনের প্রশ্ন। দেশের মানুষকে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে পেরেছি সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এখানে কে মান-অভিমান করলো, কার মান ভাঙ্গাতে যাব- সেটা আমি জানি না।
তবে সহানুভূতি দেখাতে যেয়ে যদি অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়, সেখানে আর যাবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিমূলক বা উস্কানিমূলক পোস্ট, ভিডিও প্রচারকারীকে শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনী কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল যাতে গুজব বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে না পারে সে বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ত্রিশ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরনের পৃথক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। প্রশ্ন করতে গিয়ে জাপার সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, একটা পিছিয়ে পড়া জাতিকে উন্নয়নে ভাসিয়ে দেয়ার নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের এত উন্নয়ন হয়েছে, যার রূপকার অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটা নিয়ে কারোর মনে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে দেশে যে রাজনৈতিক মান-অভিমান চলছে, বাড়তে থাকা দূরত্বে ক্ষোভের পাহাড় জমছে।
রাজনৈতিক এই সমস্যা রোহিঙ্গা ইস্যুর চেয়ে কম গুরুত্ব নয়। এটা ভাঙ্গাতে প্রধানমন্ত্রী কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে মান-অভিমানের বিষয়টি কোথায় থেকে এলো জানি না। এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। আইনের প্রশ্ন। কেউ যদি দুর্নীতি করে, এতিমের টাকা চুরি করে, মানুষ খুন করে, খুন করার চেষ্টা চালায়, গ্রেনেড মারে, বোমা মারে তার বিচার হবে- এটাইতো স্বাভাবিক। রাজনীতি সবাই করে যার যার আদর্শ নিয়ে। আর আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি বলেই দেশটাকে উন্নত করতে পেরেছি।
দেশের মানুষকে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে পেরেছি সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। এখানে কে মান-অভিমান করলো, কার মান ভাঙ্গাতে যাব- সেটা আমি জানি না। এ প্রসঙ্গে সংসদ নেতা আরো বলেন, দেশটা আমাদের কারো  একার নয়। দেশটা আমাদের সকলের। আর দেশ ও জনগণের কল্যাণ করাই একজন রাজনীতিবিদের প্রধান দায়িত্ব। আমরা রাজনীতি করি নিজেদের স্বার্থে নয়, নিজেদের লাভ-লোকসানের জন্য নয়। আমরা দেখি জনগণের কল্যাণ, জনগণের স্বার্থ। নিঃস্বার্থভাবে ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে কাজ করতে পেরেছি বলেই এত অল্প সময়ে দেশের এত  উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছি।
সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল হবে: সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কীরনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিমূলক বা উস্কানিমূলক পোস্ট, ভিডিও প্রচারকারীকে শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনী কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্বে যে সুনাম অর্জন করেছে তা ধরে রাখতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর। কোনো গোষ্ঠী বা দল যাতে দেশে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল যাতে গুজব বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে চলছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি মুক্ত করার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

'ভিন্ন জাতের কারনে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়'

২৪ বছর বয়সী প্রণয় পেরুমল্লাকে কয়েক দিন আগে ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের মিরিয়ালগুড়া শহরে মেরে ফেলা হয়।
স্কুল থেকেই যাঁর সঙ্গে প্রেম, সেই অমৃতা বর্ষিণীকেই বিয়ে করেছিলেন প্রণয়।
গর্ভবতী স্ত্রীকে হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে আসার সময়েই তাঁকে ঘাড়ে কোপ মারা হয়।
পুলিশ বলছে, প্রণয়কে হত্যা করার জন্য পেশাদার খুনী নিয়োগ করেছিল তাঁর স্ত্রী অমৃতার পরিবারই।
এর জন্য এক কোটি ভারতীয় টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। একমাসের বেশী সময় ধরে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
নলগোন্ডা জেলার পুলিশ সুপার এ বি রঙ্গনাথ জানিয়েছেন, অমৃতার বাবা, চাচা, তাদের ড্রাইভার আর বাবার পরিচিত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেরায় অমৃতার বাবা জানিয়েছেন, প্রণয় নীচু জাতির ছেলে ছিল, পড়াশোনাও ভাল মতো করে নি আর মধ্যবিত্ত লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত।
স্কুলে প্রথম দেখা থেকে শুরু করে চোখের সামনে স্বামীর হত্যা - সব কিছুই অকপটে বিবিসি তেলুগুর সংবাদদাতা দীপ্তি বাথিনীকে অকপটে জানিয়েছেন ২১ বছর বয়সী অমৃতা বর্ষিণী। ৫ মাসের গর্ভবতী অমৃতার সঙ্গে বিবিসি কথা বলেছে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বসে।
প্রণয় একেবারে নিজের মায়ের মতো আমার খেয়াল রাখত। আমাকে স্নান করিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে খাইয়ে দেওয়া, রান্না করা - সব কিছুই করত ও। আমার রোজকার জীবনের একটা অংশই ছিল প্রণয়।
স্কুলে আমার থেকে একবছরের উঁচু ক্লাসে পড়ত ও। ছোটথেকেই দুজন দুজনকে পছন্দ করতাম। আমি যখন ক্লাস নাইনে, আর ও টেনে, তখনই প্রেম করতে শুরু করি। বেশী কথাবার্তা হত ফোনেই।
দেখবেন, ফেসবুকে একটা ছবি পোস্ট করেছিলাম - আমাদের দুজনের ছোটবেলার ছবি। লিখেছিলাম, 'ছোটবেলার প্রেম যার সঙ্গে, তাকেই বিয়ে করতে পারার থেকে ভাল কিছু হয় না। আমরা সবসময়ে একসঙ্গে থাকার জন্যই যেন জন্মেছি।'
এই যে কমাস পরে যে জন্মাবে, এই পেটে যাকে ধরেছি, এ তো আমাদের দুজনের প্রেমেরই চিহ্ন। প্রণয়কে চিরকাল আমার কাছে এ-ই রেখে দেবে।
প্রথম থেকেই কখনও প্রণয়ের জাতি বা আর্থিক অবস্থার কথা ভাবি নি আমি। আমার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আমি ওকে ভালবাসি আর একে অপরকে ভাল বুঝতে পারি।
এটা একটা খুব ছোট শহর তো। সব খবর খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারটাও জেনে গিয়েছিল বাড়িতে। ধমক-ধামক, ভয় দেখানো তো চলতই, গায়ে হাতও পড়েছে আমার বাড়িতে। তখনই আমরা ঠিক করি যে বিয়ে করব।
আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, সেকেন্ড ইয়ারে, তখনই, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে আমরা বিয়ে করি। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করাই নি তখন আমরা। আমার বাড়ির লোকজন ব্যাপারটা জানতে পেরে ঘরে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল আমাকে।
আমার কাকা প্রণয়কে ভয় দেখিয়েছিল, আমাকে ডাম্বেল দিয়ে মেরেছিল। সবকিছুই হয়েছিল কিন্তু আমার মায়ের সামনে। আরও প্রায় জনা কুড়ি আত্মীয়স্বজনও সেখানে ছিল। কেউ আমার পাশে দাঁড়ায় নি।
তারপরেই ঘরে আটকিয়ে রাখা হয়। রোজ কিছুটা ভাত আর আচার দেওয়া হত আমাকে খাবার জন্য। সবাই চাইছিল আমি প্রণয়কে যাতে ভুলে যাই। একটাই আপত্তি সবার - প্রণয় তপশীলি জাতির ছেলে।
ছোট থেকেই আমার মা অন্য জাতের বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করত। কিন্তু সেটা যে এই পর্যায়ে চলে যাবে, ভাবি নি কখনও।
অনেকদিন ঘরে আটকিয়ে রাখার পরে এবছরের ২০ জানুয়ারী আর্য সমাজ মন্দিরে যখন আমরা আবার বিয়ে করতে গেলাম, তখনই প্রণয়কে অতদিন পরে দেখলাম। মাঝের সময়টায় শুধু ফোনে মাঝে মাঝে কথা বলতাম আমরা।
নিজের ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হত না বাড়ি থেকে। তাই শরীর খারাপ হলে ডাক্তার দেখাতে যেতাম হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার বা হাসপাতালের কারও ফোন থেকে খুব কম সময়ের জন্য প্রণয়ের সঙ্গে কথা হত।
কী যে ভাল লাগত ওইটুকু সময়ের জন্য কথা বলতে পেরে! ওই সময়েই আমরা ঠিক করি যে আর্য সমাজে গিয়ে আবার বিয়ে করব, কারণ আগেরবারের বিয়েটার কোনও রেজিস্ট্রেশন করাই নি। কোনও কাগজপত্র কিছুই ছিল না আমাদের।
প্রণয়ের বাড়িতেও অবশ্য কেউ আমাদের বিয়ের ব্যাপারে জানত না। বিয়ের পরেই আমরা চলে গিয়েছিলাম হায়দরাবাদে। দুজনেরই ভয় ছিল যে বাড়ি থেকে চাপ আসবে।
প্রায় মাস দেড়েক হায়দরাবাদে ছিলাম আমরা। ওদিকে আমার বাবা খোঁজ নেওয়ার জন্য কয়েকটা গুণ্ডা ভাড়া করেছিল। তাই আবার আমরা মিরিয়ালগুড়ায় প্রণয়ের বাড়িতে থাকার জন্য ফিরে আসি। ভেবেছিলাম পরিবার পরিজনের মধ্যে থাকলে ভয়ের কিছু থাকবে না।
প্ল্যান করছিলাম যে দুজনেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ চলে যাব। কিন্তু এর মধ্যেই আমি গর্ভবতী হয়ে পড়লাম। তাই যতক্ষণ না সন্তানের জন্ম দিচ্ছি, ততদিন এখানেই থেকে যাব, এটাই ঠিক করেছিলাম আমরা। আর তারপরে পড়াশোনার জন্য কানাডা চলে যাওয়ার সব ব্যবস্থাও করা হয়ে গিয়েছিল।
মা হওয়ার জন্য বোধহয় আমার বয়সটা একটু কম। কিন্তু প্রণয় ওর আত্মীয়স্বজনকে বোঝাতে পেরেছিল যে সন্তানের জন্ম দিতে পারলে আমি নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে আরও শক্ত হয়ে লড়তে পারব।
আমার বাড়ির লোকদেরও জানিয়েছিলাম যে মা হতে চলেছি। প্রথম থেকেই ওরা বলছিল গর্ভপাত করিয়ে নেওয়ার জন্য। কদিন আগে গণেশ চতুর্থীর আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য বাড়িতে ফোন করেছিলাম। তখন আবারও বলেছিল অ্যাবরশন করানো কথা।
ভয় একটা সবসময়েই ছিল যে আমার বাবা আর তার ভাড়া করা গুণ্ডারা ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা যে এরকম ভয়ানক হবে, দু:স্বপ্নেও ভাবি নি। সেদিন একটু দেরী করে উঠেছিলাম ঘুম থেকে। এগারোটা নাগাদ। পিঠে একটা ব্যথা হচ্ছিল। আমি প্রণয়কে ডেকেছিলাম। এখনও কানে বাজছে ওর উত্তরটা, 'কন্না, আসছি'।
ও আদর করে আমাকে কন্না বলে ডাকত। আমি জলখাবার খেয়ে নিয়েছিলাম। প্রণয় খায় নি। ও আমাকে আগে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে দুজনে কথা বলছিলাম যে পিঠের ব্যথাটা কী করে সারানো যায়।
এরপরে যখন ডাক্তার ভেতরে ডাকলেন, তখনই আমার বাবা ওই ডাক্তারকে ফোন করেন। গর্ভপাত করানোর ব্যাপারে কথা হয় দুজনের। 'আমি হাসপাতালে নেই' বলে ডাক্তার বাবার ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন। তারপরেই বাবার একটা মিসড কল এসেছিল আমার ফোনে।
ডাক্তারকে দেখিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়েছিলাম আমরা। আমি প্রণয়কে কী যেন একটা জিজ্ঞাসা করছিলাম। জবাব না পেয়ে ওর দিকে তাকাতে গিয়ে দেখি ও মাটিতে পড়ে আছে আর একটা লোক ওর ঘাড়ে কোপ মারছে।
সঙ্গে আমার শাশুড়িও ছিলেন। তিনি ওই লোকটাকে ধাক্কা মারা চেষ্টা করেন। হাসপাতালের ভেতরে দৌড়ে যাই আমি লোকদের সাহায্য চাইতে।
কিছুক্ষণ পরে বাবাকে ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন, 'আমি কী করতে পারি! হাসপাতালে নিয়ে যাও!' কদিন আগের কয়েকটা ঘটনা এখন মনে পড়ছে একে একে।
কিছুদিন আগে বাবার একটা ছোট অপারেশন হয়েছিল। মা বলেছিল আমি যেন বাবাকে একবার দেখতে যাই। আমি মাকে মিথ্যা বলেছিলাম যে আমরা বেঙ্গালুরু যাচ্ছি। পরের দিন একজন লোক এসেছিল আমার শ্বশুরবাড়িতে। বাইরে একটা গাড়ি দাঁড় করানো ছিল, সেটার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিল। অদ্ভুত উচ্চারণ ছিল লোকটার। আমার শ্বশুর তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে হাসপাতালে যে প্রণয়ের ঘাড়ে কোপ মারছিল, ওই গাড়ির খোঁজ করতে আসা লোকটা সে-ই।
বাবা কিছুদিন আগে থেকেই বোধহয় প্ল্যান করছিল আমাদের বড়সড় ক্ষতি করার। এখনও পর্যন্ত আমার বাড়ির কেউ আমার সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলে নি।
মা আগে নিয়মিত ফোন করত। আমার শরীর স্বাস্থ্য কেমন আছে জানতে চাইত। জেনে বুঝেই হোক বা অজান্তে হয়তো সেইসব কথা বাবাকে জানিয়ে দিত মা।
ওরা সকলেই দোষী এই ঘটনার জন্য। ওদের বাড়িতে আর কখনও ফিরব না আমি। প্রণয়ের পরিবারই এখন আমার পরিবার।
আমার শ্বশুর-মশাই মি. বালাস্বামী, প্রণয়ের মা হেমলতা আর ওর ছোটভাই অজয় আমাকে সবসময়ে আগলিয়ে রাখছেন। কখনও একা ছাড়েন না আমাকে।
প্রণয় খুন হয়ে যাওয়ার পরে মাঝে মাঝেই নারী সংগঠন বা দলিত সংগঠনগুলো বাড়িতে আসছে। 'জয় ভীম' বা 'প্রণয় অমর রহে'র মতো স্লোগান দিচ্ছেন ওরা।
ওই স্লোগান শুনেই আমার শাশুড়ির চোখে জল এসে যায়। আমি ওঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে অজয়ই তো এখন আমার ভাই। আর এই ঘরেই আমার সন্তান জন্ম নেবে।
একটা ফেসবুক পেজ বানিয়েছি আমি 'জাস্টিস ফর প্রণয়' নামে। সমাজ থেকে জাতপাতের ব্যাপারটাই যাতে উঠে যায়, সেই কাজের জন্য ওই পেজটা এখন ব্যবহার করতে চাই আমি।
প্রণয় সবসময়ে বলত প্রেমিক-প্রেমিকার জাত নিয়ে কোনও সমস্যা তৈরী হওয়া উচিত না। জাতপাতের জন্য আমার এত ভুগলাম, এত কষ্ট সহ্য করলাম। কিন্তু সে-ই চলে গেল।
আমার ইচ্ছা আছে ওর একটা মূর্তি শহরের ঠিক মাঝখানে বসাবো। যেখান থেকে যা অনুমতি লাগে যোগাড় করব। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজনরা ভয় পাচ্ছেন যে আমার বাবা আমার অনাগত সন্তান বা শ্বশুরবাড়ির কারও ক্ষতি না করে দেয়।
একই সঙ্গে আমার আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও ওরা ভাবছেন। নিজের মেয়ের মতোই দেখেন ওরা আমাকে। আবার এটাও তাঁদের মাথায় ঘুরছে যে আমাকে আর্থিকভাবে স্বাধীন হতে হবে। কিন্তু সেখানে একটাই সমস্যা।
প্রেম-বিয়ে এসব নিয়ে পরিবারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আমি তো পড়াশোনাটা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
তবে আমি চাই, আমার আর প্রণয়ের সন্তান বেড়ে উঠবে একটা সাম্যের পৃথিবীতে।
সুত্রঃবিবিসি

সিরিয়ায় রুশ বিমান ধ্বংসের জের: ইসরাইলকে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি

সিরিয়ার আকাশে রাশিয়ার একটি আইএল-২০ গোয়েন্দা বিমান ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ার পর মস্কো ও তেল আবিবের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে।
সোমবার রাতে সিরিয়ার আকাশে রুশ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ১৫ সেনা নিহত হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় ইসরাইলকে দায়ী করেছে। রাশিয়ার এই বিমানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইসরাইলের কয়েকটি এফ-১৬ বিমান সিরিয়ার ওপর হামলা চালানোর সময় সিরিয় ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলি বিমানের ওপর আঘাত হানলে রুশ ওই বিমানটি ধ্বংস হয়।
সিরিয়ায় রাশিয়ার ব্যাপক সেনা উপস্থিতি রয়েছে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। দামেস্কের পুরনো মিত্র মস্কো আসাদ সরকারের অনুরোধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দমনের জন্য দেশটিকে ব্যাপক সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। রুশ সামরিক বিমানগুলো লাতাকিয়া প্রদেশে সিরিয়ার একটি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করছে।
ইসরাইল-বিরোধী আসাদ সরকারে অনুরোধে ইরানও সিরিয়ায় সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে। একইভাবে সন্ত্রাস দমনে সিরিয়ার আসাদ সরকারকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে লেবাননের হিজবুল্লাহও।
কিন্তু সিরিয়ায় ইরানি ও হিজবুল্লাহর উপস্থিতির বিরুদ্ধে বিষোদগার করে আসছে ইসরাইল। রাশিয়া যাতে সিরিয়ায় ইরান ও হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেয় সেজন্য নানা ধরনের প্রচারণা ও কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে এসেছে তেল-আবিব। কিন্তু মস্কোকে রাজি করাতে পারেনি তেল-আবিব।
এ অবস্থায় সিরিয়ায় ইরান ও হিজবুল্লাহর সামরিক উপস্থিতি মোকাবেলার অজুহাত দেখিয়ে প্রায়ই দেশটিতে হামলা চালাচ্ছে দখলদার ইসরাইল। সম্প্রতি এ ধরনের হামলা জোরদার করে দখলদার ইসরাইল। আর এরই প্রেক্ষাপটে রুশ গোয়েন্দা বিমান ধ্বংসের এই ঘটনা ঘটল।
রাশিয়া এ ঘটনায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইসরাইলের এফ-সিক্সটিন জঙ্গি বিমানগুলো সিরিয়ার লাতাকিয়ায় অভিযান চালানোর মাত্র এক মিনিট আগে রাশিয়াকে এ বিষয়ে অবহিত করে। ইসরাইলি জঙ্গি বিমানগুলো এমন সময় ওই রুশ বিমানটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল যখন বিমানটি লাতাকিয়ার বিমান ঘাঁটিতে ফিরে আসছিল। ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন ফ্রান্সের একটি যুদ্ধ-জাহাজ ইসরাইলের এই অভিযানে সহায়তা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সিরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কে বিরোধ ঘটানোর জন্যও ইসরাইল এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শুয়িগু ইসরাইলের এ তৎপরতাকে রুশ-ইসরাইলি  সহযোগিতার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, মস্কো বিদ্বেষমূলক এই ঘটনার জবাব দেয়ার অধিকার রাখে।
সিরিয়ায় ইরান ও ইসরাইলের দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ ভূমিকা রেখে আসছে রাশিয়া। রুশদের ধারণা এ নিরপেক্ষতার কারণে ইসরাইল কখনও সিরিয়ায় রুশ সামরিক টার্গেট বা উপস্থিতির কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতি পদদলনে অভ্যস্ত ইসরাইল যে তার স্বার্থে যে কোনো নিরপেক্ষ শক্তির ওপরও সহজেই আঘাত হানতে পারে তা সোমবারের ঘটনায় আবারও প্রমাণ হল।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, মস্কো সিরিয়ায় তার সেনাদের রক্ষার জন্য দরকারি যে কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইসরাইলি আচরণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, সিরিয়ার রুশ সেনাদের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। রাশিয়া হয়ত এখন থেকে এটা উপলব্ধি করছে যে সিরিয়ায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিষয়ে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো দরকার। এ ব্যাপারে রাশিয়ার এতদিনকার নমনীয় নীতি ইসরাইলের ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা দিনকে দিন বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যিক যুদ্ধে জিতবে কে!

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ। হ্যাঁ, যুদ্ধই তবে রণাঙ্গনের যুদ্ধ নয়। যুদ্ধটা হলো কৌশলগত ও বাণিজ্যিক। দুই দেশের মধ্যেই প্রকাশ্যে শুরু হয়ে গেছে এই যুদ্ধ। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। এই যুদ্ধে জিতবে কেÑ যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন? এমন প্রশ্নকে সামনে রেখে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। নতুন করে দুই দেশই পাল্টাপাল্টি বহুকোটি পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা মধ্যবিত্ত বা নি¤œ মধ্যবিত্ত তাদের ওপর এর প্রভাবটা পড়বে বেশি।
বিশ্বের দুই সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। দুই দেশ মিলে ৩৬০০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হচ্ছে তা আরো খারাপের দিকে ধাবিত হবে শিগগিরই। প্রথমে সর্বশেষ নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন। তারপরই চীন পাল্টা ঘোষণা দেয়। এ বিষয়ে অক্সফোর্ড ইকোনমিকের এশিয়া ইকোনমিকস বিভাগের প্রধান লুইস কুইজ বলেন, এ ঘোষণার ফলে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। এক যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখা দেবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে আঘাত লাগবে।  প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে ঘোষণা আসে যে, তারা চীন থেকে আমদানি করা ২০০০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করবে। এ ঘোষণার পর মঙ্গলবার চীনা প্রেসিডেন্ট পাল্টা ঘোষণা দেয়। তারা জানায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬০০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করবে। যুক্তরাষ্ট্রে এই শুল্ক শতকরা ১০ ভাগ থেকে শুরু হবে। বছর শেষ হওয়ার আগেই তা শতকরা ২৫ ভাগে উন্নীত হওয়ার কথা। এই ঘোষণা আগামী ২৪ শে সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এ শুল্ক আরোপ করা হবে মৌসুমি খাদ্য, বেসবল গ্লোভস থেকে শুরু করে নেটওয়ার্ক রুট, শিল্পে ব্যবহৃত মেশিনারিজের যন্ত্রাংশের ওপর। এর আওতায় আসবে চীনা হাজার হাজার পণ্য। পাল্টা চীন শতকরা ৫ ভাগ থেকে ১০ ভাগ শুল্ক আরোপ করবে। তবে তা নির্ভর করবে পণ্যের ওপর। একই দিনে এ শুল্ক প্রয়োগ হবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ৫০০০ পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে মাংস, বাদাম, এলকোহল জাতীয় পানীয়, রাসায়নিক পণ্য, কাপড়, মেশিনারিজ, আসবাবপত্র, অটো পার্টস।
বিশ্বের এই শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশের মধ্যে এই বাণিজ্যযুদ্ধে এরই মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের দুই পাড়ে অবস্থিত এই দুটি দেশের অনেক কোম্পানিতে আঘাত লাগা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যবস্থা নিচ্ছে তাতে প্রতি বছর তারা চীন থেকে যে পরিমাণ পণ্য কেনে তার মোটামুটি অর্ধেকটার ওপর এর প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ফলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে সর্বশেষ বাণিজ্যিক যুদ্ধের পক্ষেই মঙ্গলবার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ওভাল অফিস থেকে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে আমরা ভাল কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুবিধা নিচ্ছে তারা। তা আর হতে যাচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসন আসলে চেষ্টা করছে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তার আচরণ পরিবর্তন করছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিষয়ক সম্পত্তি চুরি তদারকি করছে চীন। এ ছাড়া আগ্রাসী শিল্প নীতির মাধ্যমে ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে চীনের কোম্পানিগুলো।  এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে চীনা সরকার। যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝেই করে থাকে।
এ বছর ৫০০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একে অন্যকে পাল্টাপাল্টি আঘাত করে যাচ্ছে। এ দুটি দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে ৫০০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এখন নতুন করে আরো শুল্ক আরোপের ফলে তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক যুদ্ধ আরো জটিল থেকে জটিল হয়েছে। সোমবার হোয়াইট হাউজ একটি সতর্কতা দেয়। তাতে বলা হয়, বেইজিংয়ের যেকোন প্রতিশোধের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ২৬৭০০ কোটি ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করবে। এর অর্থ হলো চীন থেকে প্রায় সব পণ্যের ওপর কার্যত যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করার কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীন ২০১৭ সালে বিক্রি করেছে ৫০৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। জবাবে চীন তাদের টার্গেট ছোট করে আনে। তারা গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনে ১৩০০০ কোটি ডলারের পণ্য।

কেন আমাকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে না?

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তার চিকিৎসা দরকার। তিনি শারীরিকভাবে খুব অসুস্থ। চলাফেরা করতে পারছেন না। আদালতে আসার ইচ্ছা থাকলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তা পারছেন না। তিনি জানতে চেয়েছেন, এখনো কেন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে না। শারীরিক সুস্থতার জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন তিনি। গতকাল বিকালে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো করাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এসব কথা বলেন তার দুই আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার ও সানাউল্লাহ মিয়া।
সাক্ষাৎ শেষে বিকাল পৌনে ৫ টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। এ সময় সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বেগম খালোদ জিয়া গত ৫ই সেপ্টেম্বররে জেলখানার ভেতরের স্থাপন করা আদালতে এসেছিলেন। সেদিনও তিনি অসুস্থ ছিলেন। সেদিন তিনি বলেছেন শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। তার একটা পা প্যারালাইজড হওয়ার মতো। হাতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাতের আঙ্গুল বাঁকা হয়ে গেছে। তিনি হাত নাড়াতে পারেন না। পায়ে ব্যথা। পা উঠাতে পারেন না। কিছুক্ষণ বসে থাকলে পায়ে ব্যথা হয়। আবার শুয়ে থাকলেও পায়ে ব্যথা হয়। এভাবেই তার জীবন চলছে।
দ্রুত খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবি জানিয়ে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বহুদিন ধরে খালেদা জিয়া চিকিৎসা চাইছেন। ডাক্তারও এসেছেন। ডাক্তার দেখেছেন। মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া জানালেন, এখনও কেন তাকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে না।
মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, আদালতে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেছেন আদালতে উপস্থিত থেকে বিচারকার্য শ্রবণ করা, পর্যবেক্ষণ করার মতো যে পরিমাণ শারীরিক সুস্থতা দরকার তা আমার নেই। তার সত্ত্বেও কারা কর্তৃপক্ষ তাকে আদালতে যেতে বলেছেন। জবাবে তিনি বলেছেন, আমিতো আদালতে বরাবরই গিয়েছি। আদালতের প্রতি আমিতো কোনো অশ্রদ্ধা দেখাইনি। আমার ছেলে ও মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর দিনেও আদালতে গিয়েছি। আমি এখনও আদালতে যাব। এই বিচার মোকাবিলা করবো। কিন্তু আমার শরীর আমাকে অনুমতি দিচ্ছে না।
আমার হেল্‌থ আমাকে পারমিট করছে না। আমি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কখনও বলিনি আমি আদালতে যেতে অনিচ্ছুক। কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে ভুল ব্যাখ্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেন আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার। তিনি বলেন, এজন্য আদালত আমাদের তার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন। খালেদা জিয়া বলেছেন আমার জন্য খুব জরুরি হচ্ছে চিকিৎসা।
আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, জেনে আশ্চর্য হবেন, আবারও দুইদিন আগে বেগম খালেদা জিয়া বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। এই হচ্ছে তার শারীরিক অবস্থা। একজন মানুষ যখন বলেন, আমার হাত দিয়ে খেতে পারি না। আমার পা চলে না। এই যদি বিষয় হয় তিনি কী করে আদালতে আসবেন। খালেদা জিয়া আদালতে আসতে পারেন না কারণ তার শরীর পারমিট করে না। অথচ সরকার পক্ষ ভুল  মেসেজ দেয়ার চেষ্টা করে যে, খালেদা জিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে আসেন না, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।  তিনি সুস্থ না হয়ে কীভাবে আদালতে যাবেন?
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ প্রসঙ্গে আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। প্রতিবেদনে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবী সানাউল্লাহ্‌ মিয়া বলেন, তিনি কোথায় চিকিৎসা নিবেন সেটা বড় কথা না। তিনি বলেছেন, তার চিকিৎসা দরকার। কারা কর্তৃপক্ষ বা সরকার নির্ধারণ করবেন তাকে বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে ভর্তি করা হবে। ভর্তির ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সে ব্যবস্থায় খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিবেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ এখনও তাকে কিছু জানায়নি। কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বলে জানান সানাউল্লাহ মিয়া।
আইনজীবীরা জানান, খালেদা জিয়া অসুস্থ, এ অবস্থায় তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচবছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। ওইদিন থেকেই নাজিমউদ্দিন রোডের এই পুরনো কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া।
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কারাফটকে তার তিনজন আইনজীবী গেলেও তারা সাক্ষাতের অনুমতি পাননি।