Friday, October 11, 2013

জনগণের মূল্যায়ন- জনমত জরিপ থেকে প্রত্যাশা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বছর খানেক আগে একবার ভীষণ গুমোটে জীবন অতিষ্ঠ। বাতাসের লেশমাত্র নেই। গাছের পাতাটি নড়ে না। আবহাওয়া দপ্তর থেকে বলা হলো, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রেমের গল্প-দরজার বাইরে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

দরজায় কড়া নাড়ার পর কিছুটা সময় যায়, ঘড়ির কাঁটায় হয়তো এক-দুই মিনিট, কিন্তু রাশেদের কাছে একটা গোটা প্রহর। মিথিলা দরজা খোলে, মিষ্টি করে হাসে, একটু সরে দাঁড়ায়।

খোলা চোখে- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিদিগিরি’ by হাসান ফেরদৌস

ইন্দর কুমার গুজরাল একসময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। সেই সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ‘দাদাগিরি’র বদলে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তৈরি পোশাকশিল্প- ‘দুর্ঘটনায় কেন শুধু শ্রমিকই পোড়ে?’ by কাবেরী গায়েন

আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কথা হলো এডিনবরার নেপিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর প্রফেসর রবার্ট ম্যাকক্লাউড রেসাইডের সঙ্গে।

গল্প- আমার একটা পোষা দৈত্য আছে by আনিসুল হক

দুপুরবেলা তপু একাই থাকে বাসায়। স্কুল ছুটির পর স্কুল থেকে সে আসে রিকশাভ্যানে। একটা রিকশাভ্যানে আসে তারা আটজন। ভ্যানচালকের নাম হবিবর, তারা ডাকে হবিবর মামা বলে।

দৈহিক by শেখ আবদুল হাকিম

লাঞ্চের পর কর্মচারীদের নিয়ে মিটিং করছেন সামসুল হক। এইমাত্র তিনি জানালেন, তাঁদের ইনডেন্টিং ব্যবসা গত বছরের মতো ভালো না হলেও, প্রতিবারের মতো এবারও কোরবানির ঈদে এক জোড়া করে গরু-খাসি জবাই করা হবে, তাতে করে পিয়ন থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সবাই কমবেশি ১০ কেজি করে মাংস আশা করতে পারেন।

চারুশিল্প- অদেখা জীবনের গল্প by মোবাশ্বির আলম মজুমদার

গতি কি মানুষের জীবন পাল্টে দেয়? অনেকেই বলবেন, অবশ্যই। শিল্পী তৌফিকুর রহমান এবার গতির সহযাত্রী হয়েছেন প্রাণীকুলের শরীরের গতির আবহ দেখে—

নয়া মস্কো by জাহীদ রেজা নূর

ইমিগ্রেশন পেরিয়েই কে আমাকে নিতে এসেছে, খুঁজতে লাগলাম। বুকে ‘রুদেএন’ লাগানো এক দশাসই প্রবীণকে দেখে রুশে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার জন্য এসেছেন?’

হজের চমকপ্রদ নিদর্শন

হজ যুগে যুগে ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু কাবা শরিফের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করেছে। হজ ও কাবা শরিফকে ঘিরে উদ্দীপিত হয়েছে মানুষের সৃজনশীল কল্পনা।

জনমত জরিপ থেকে প্রত্যাশা

বছর খানেক আগে একবার ভীষণ গুমোটে জীবন অতিষ্ঠ। বাতাসের লেশমাত্র নেই। গাছের পাতাটি নড়ে না। আবহাওয়া দপ্তর থেকে বলা হলো, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে। তা থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানতে পারে। সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ও নৌযানগুলোকে ৪ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। পরদিন বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। সঙ্গে মাঝারি ঝোড়ো হাওয়া। কিন্তু ওই দিনই রাতের খবরে জানা গেল, আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্কসংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। নিম্নচাপ সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি ওডিশার উপকূল দিয়ে চলে গেছে। বাংলাদেশের উপকূলের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ঘূর্ণিঝড়টি যদি অন্যদিকে ধাবিত না হয়ে সত্যি সত্যি আমাদের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানত, তাহলে কী হতো?
মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকা কিছু ডুবত। বাড়িঘর লন্ডভন্ড হতো। কমবেশি কিছু প্রাণহানি ঘটত। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কতা না থাকলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটত বেশি। ঘূর্ণিঝড়টি যে শেষ পর্যন্ত আঘাত হানেনি, তাতে আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কসংকেতের গুরুত্ব কমে না। যেসব দেশে বহুদিন থেকে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত এবং গণমাধ্যম স্বাধীন ও প্রাণবন্ত, সেখানে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনমত জরিপের রেওয়াজ শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে। জনমত জরিপ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি উপাদান। গণতন্ত্রচর্চারই অংশ। জনমত জরিপ সংশ্লিষ্ট পক্ষকে তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণে খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যদি জরিপের ফলাফলকে তারা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। আর যদি অবহেলা বা অগ্রাহ্য করে, তাহলে অন্য কথা। তবে নীরবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণ সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা কারও তোয়াক্কা করে না। জনসমর্থন জিনিসটি নিক্তি বা বাটখারা দিয়ে পরিমাপের ব্যাপার নয়। স্কেল দিয়েও তা মাপা যায় না। আধুনিক জনমত জরিপে সংখ্যা ও পরিসংখ্যার কাজই বেশি। অমুক বিষয়ে অত পারসেন্ট অমুকের বেড়েছে, অমুকের কমেছে।
এতসংখ্যক মানুষ এটা পছন্দ করে, অতসংখ্যক ওটা পছন্দ করে। কোনো প্রশ্নের ফলাফল কোনো পক্ষের অনুকূলে না এলেই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ হওয়ার কিছু নেই। জনমত পক্ষে এলেই বগল বাজানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আগের বছরগুলোর মতো এবারও প্রথম আলো পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেশের পরিস্থিতির ওপর জরিপ করিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবারের সংখ্যায় মতামত জরিপের ফলাফলের ওপর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন বেরিয়েছে। প্রতিবেদন পাঠ করে আমার মনে হয়েছে তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও কোনো পক্ষের কাছে এবং তাদের অবিচল সমর্থকদের কাছে মনে হতে পারে বিরক্তিকর ও হতাশাজনক। কোনো পক্ষের কাছে মনে হবে সুখকর ও আশাব্যঞ্জক। আসলে হতাশ ও আশাবাদী হওয়ার চেয়ে দরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবা। আমি যদি বড় দলগুলোর নীতিনির্ধারক ও সাংগঠনিক পর্যায়ের কেউ হতাম, তাহলে ফলাফল বিশ্লেষণ করে করণীয় ঠিক করতাম। অনুকূলে থাকলেও করতাম, প্রতিকূলে থাকলেও করতাম।
বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও সামাজিক অবস্থান থেকে পাঁচ হাজার মানুষ কোনো রকম প্রভাবিত না হয়ে যে মতামত দিয়েছেন, তাকে উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সবচেয়ে সুবিবেচনার কাজ হয়, যেসব প্রশ্নে মানুষ নেতিবাচক জবাব দিয়েছেন, সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা। যেমন, ২০০৯ সালে ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। পৌনে পাঁচ বছর পরে এখন ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, দেশ ভুল পথে চলছে। কোনো কারণ ছাড়াই কি মানুষের মনের এই পরিবর্তন ঘটেছে? দেশের কোনো হাত-পা নেই। যদি উপমা দিয়ে বলি তাহলে বলা যায়, সে একটি যান, সে নিজে চলতে পারে না, কেউ যেভাবে চালাবে সে সেভাবেই চলবে। দেশ চালায় সরকার। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা নন, শিল্পী-সাহিত্যিকেরা নন, কলাম লেখকেরা নন, কাঁচাবাজারের দোকানদারেরা নন—জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার দেশ চালায়। কেন ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করছেন দেশ ঠিকভাবে চলছে না—এ প্রশ্নের জবাব কেউ বিরোধী দলের কাছে চাইবে না, সরকারি দলকেই দিতে হবে। কী কী কারণে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা বাড়ে এবং কমে, তা দলের নেতাদের চেয়ে আর কারও ভালো জানার কথা নয়। জরিপে দেখা যায়, ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবেন। বিএনপিকে ভোট দিতে ইচ্ছুক ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ। প্রায় সাত বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে মানুষকে কিছুই না দিয়ে বিএনপির ভোট বাড়ল। অন্যদিকে বহু মানুষকে তাঁদের ভাষায় এত কিছু দেওয়ার পরও পৌনে পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের ভোট কেন কমে—এ প্রশ্নের জবাব যদি দলের নেতারা না খোঁজেন, তাহলে তাঁদের দলীয় অবস্থানের উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে না। বিএনপির ভোট বেড়েছে। তাদের জন্য এটা খুবই খুশির কথা।
গত পৌনে পাঁচ বছরে প্রায় সবগুলো নির্বাচনে তারা ভালো করেছে। সবশেষে পাঁচ সিটির মেয়র নির্বাচনে তাদের প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পরাজিত করেছেন। এর অর্থ কি এই যে বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে অতি ভালো দল। তাদের প্রার্থীরা যোগ্যতর। তাদের সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দুর্নীতির ধারেকাছে তারা নেই। চাপাতি, রামদা ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি অস্ত্র পরিচালনায় তারা আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডারদের চেয়ে কম দক্ষ। পদ্মা সেতু বানানোর দায়িত্ব তাদের সময় হলে এক পয়সাও এধার-ওধার হতো না। দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির নামগন্ধ তাদের মধ্যে নেই। জরিপে বেশি ভোটারের সমর্থনের কথায় যদি বিএনপির নেতারা মনে করেন তাঁদের অতীত ফুলের মতো পবিত্র, দক্ষতায় তাঁরা মাহাথির মোহাম্মদ, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। তাঁদের চেয়েও বেশি ভুল করবেন ভোটাররা তাঁদের ভোট দিয়ে। আত্মসংশোধন না করে তাঁরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেও দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষার অংশভাগও পূরণ করতে পারবেন না। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি অসাম্প্রদায়িক, উদার, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়, কিন্তু তার পরিমাণ হবে কম। আইনের শাসন—যার অকল্পনীয় অভাব বাংলাদেশকে আজ এক বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে গেছে—তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চায় মানুষ। দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে, সেগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। এই কাজগুলো এখন একক কোনো দলের পক্ষে সম্ভব নয়।
সব দলের যোগ্যতর ব্যক্তিদের সমন্বিত চেষ্টায়ই সম্ভব। সুতরাং কোনো দলের জনসমর্থন বাড়া-কমায় জনগণের কিছুই আসে-যায় না—যদি না ভবিষ্যতের কোনো সরকার অতীতের নষ্ট প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে, জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে, আদর্শ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চার সূচনাটা না করে। বিএনপি নেতৃত্ব নিজেদের ভুলগুলোকে পর্যালোচনা করে, আত্মশুদ্ধির জন্য যে সাতটি বছর সময় পেয়েছে তার কিছুমাত্র সদ্ব্যবহার তাঁরা করেছেন—এমন প্রমাণ আমি অন্তত পাইনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী মিলে অনেকগুলো দল ও সংগঠন সক্রিয়। কিন্তু ক্ষমতার বা ভোটের রাজনীতিতে চারটি দলই গুরুত্বপূর্ণ। চারটির মধ্যে দুটি প্রধান: আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুটিই মধ্যপন্থী, আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার দিকে ঝোঁক, বিএনপির প্রবণতা ডানপন্থী মুসলিম জাতীয়তার। মাঝারি দুটি দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির নীতি-আদর্শ বিএনপির মতোই এবং জামায়াতে ইসলামী কট্টর ইসলামি মৌলবাদী। নির্বাচনী রাজনীতিতে দুই প্রধান দলের প্রতিটির সঙ্গে খুবই সক্রিয় রয়েছে বহু সহায়ক শক্তি। তাদের নিজেদের কোনো মূল্য নেই, কিন্তু দুই দলের কোনো না কোনোটির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে শক্তিশালী।
যেমন—ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ প্রভৃতি। এদের ভোটব্যাংকগুলো বড় দুই দলের কোনো একটির পক্ষে যায়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আওয়ামী লীগ তার ভোটব্যাংক মনে করে। যদিও এলাকাবিশেষে সংখ্যালঘুদের অনেকেই আওয়ামী লীগের বাইরের অন্য দলের যেমন—বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রার্থীদেরও সমর্থন দেন। বামপন্থী সংগঠনগুলোর অধিকাংশই আওয়ামী লীগের পোঁ ধরতে গিয়ে নিজেদের কপাল খেয়েছে। সারা বছর সমালোচনা করলেও নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকে। তাদের যুক্তি, আওয়ামী লীগকে তারা অসাম্প্রদায়িক দল বলে সমর্থন দেয়—প্রগতিশীল দল বলে নয়। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা বামদের মূল্যায়ন তো করেই না; বরং কলসির কানার আঘাত দিলেও তাই বলে বামরা প্রেম দেবেন না, তা নয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের ভোট শুধু তাদের দলের ভোট নয়, আরও অনেকের ভোট। মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামী ঐক্যজোট তো আছেই, তার বাইরে আরও যেসব ইসলামপন্থী সংগঠন রয়েছে, তাদের মধ্যে নবজাগ্রত হেফাজতের নেতারা নিজেদের নির্দলীয় বলে দাবি করলেও তাঁরা খুবই দলীয় ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। জাতীয় পার্টি তাঁদের কাছে টানতে চাইলেও তাঁরা প্রথমে জামায়াত ও তারপর বিএনপির মধ্যেই ঘনিষ্ঠ। হেফাজতের নেতাদের বাড়িতে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-সাংসদদের যাতায়াত হলেও তাঁদের ঝোঁক জামায়াত-বিএনপির দিকেই থাকবে। এবং যেখানে জামায়াত আছে,
সেখানে বিএনপিকেও তাঁরা সমর্থন দেবেন—সে ভরসা নেই। বর্তমান জরিপের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এমনও হতে পারে, তাদের দলীয় সমর্থকেরা দলের অবস্থা অনিশ্চিত বা শোচনীয় দেখে বিএনপিকে সমর্থন দিচ্ছেন। জাতীয় পার্টির সর্বাধিনায়ক প্রতিদিন বলছেন, দুই বড় দল থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে; কিন্তু জনমত জরিপ বলছে বিপরীত কথা। তিনি বুঝতে পারছেন না, যে মহাজোটের তিনি শরিক, সেই সরকারের প্রধান দলের জনপ্রিয়তা কমলে তাঁর দলের জনপ্রিয়তাও আনুপাতিক হারে কমবে, সেটাই স্বাভাবিক। ধারণা করা যায়, জাতীয় পার্টির বহু সমর্থকও বিএনপির দিকে চলে গেছেন। জরিপে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্দলীয় সরকারের পক্ষে ৮২ শতাংশ মানুষ। বিএনপি-সমর্থকদের শতভাগ এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের অর্ধেক নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। তাঁদের এই চাওয়া গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের অঙ্গীকারের প্রকাশ।
নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা হবে না বলে মনে করেন ৫৪ শতাংশ এবং সমঝোতা হবে বলে আশাবাদী ৪৫ শতাংশ। এ প্রশ্নে আমার ব্যক্তিগত ধারণা—বিধাতার পক্ষেও এই দুই দলের সমঝোতা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন হলে—৯৩ শতাংশ মানুষ বলেন তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন বলে ৮৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন। সেনাবাহিনীর প্রতি এই আস্থার কারণ, মানুষ সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে চান। জনমত জরিপের ফলাফল কোনো অমোঘ ব্যাপার নয়। পরিস্থিতির একটা মোটের ওপর চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু তা অনড় ও নির্ভুল বলে কেউ দাবি করে না। নির্মোহভাবে দেখলে এই মতামত জরিপ থেকে দুই প্রধান দলই লাভবান হতে পারে, তাদের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্তের ওপরই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বিধাতা তাদের সেই সুযোগ ও ক্ষমতা দিয়েছেন। আমরা আশা করি, তারা তার সদ্ব্যবহার করবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

‘দুর্ঘটনায় কেন শুধু শ্রমিকই পোড়ে?’

আগুনে পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু যেন গা-সওয়া ব্যাপার
আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস লিমিটেডে অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কথা হলো এডিনবরার নেপিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর প্রফেসর রবার্ট ম্যাকক্লাউড রেসাইডের সঙ্গে। তিনি ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যখন ফোনে ধরতে পারলেন আমাকে, তখন, প্রথমে উত্তেজিত অথচ শেষে বিষণ্ন গলায় জানতে চাইলেন তাজরীন আর রানা প্লাজার এমন সব দুর্ঘটনার পরেও কীভাবে আসওয়াদের এই ‘হত্যাকাণ্ড’ সম্ভব হলো? তিনি আক্ষরিক অর্থেই ‘কিলিং’ শব্দটি ব্যবহার করলেন। বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে গবেষণা করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই স্কটিস প্রফেসরের সঙ্গে আমার বহুবার বাংলাদেশের নানা প্রসঙ্গে আলাপ হয়েছে। তিনি সব সময়ই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্রমবর্ধমান সূচকটির ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত। বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়ে তিনি বরাবরই আশাবাদী। তাঁর মতে, ৫০-৬০ বছর আগেও স্কটল্যান্ডের অবস্থা বাংলাদেশের মতোই ছিল। ঊর্ধ্বমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে যখন অবিচলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, মানবিক-নৈতিক-রাজনৈতিক সব ব্যাপারেই এই দেশে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে তিনি নিঃসন্দেহ। বিশেষ করে, তাঁর আস্থা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ওপর। এমন মহৎ ইতিহাসের ওপর দাঁড়ানো জাতি উন্নতি না করে পারে না—এমনই অভিমত তাঁর। কিন্তু তাজরীনের পরে রানা প্লাজা এবং মঙ্গলবারের দুর্ঘটনায় প্রফেসর রেসাইড বুঝি বা হতবিহ্বল হয়েছেন।
আমার সঙ্গে কথা বলার আগেই তিনি ডেইলি স্টার আর অন্যান্য দেশি-বিদেশি ইংরেজি সংবাদসূত্রের বরাতে জেনে গেছেন যে ইতিমধ্যে ঘটনাটিকে কেবল যে ‘দুর্ঘটনা’ নামের লেবেলই দেওয়া হয়েছে এমন নয়, ‘নাশকতা’, ‘ষড়যন্ত্র’—এসবও খুঁজে বেড়ানো হচ্ছে। তিনি এত দ্রুত এত সব তথ্য জেনেছেন সম্ভবত এ কারণেও যে ব্রিটিশ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন (আইটিভি) জানিয়েছে, আগুন লাগা ওই কারখানায় ছয়টি ব্রিটিশ ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরির কাজ চলছিল। কোম্পানিগুলো হলো নেক্সট, প্রাইমার্ক, জর্জ, গ্যাপ, এইচ অ্যান্ড এম এবং মরিসন্স। এ ছাড়া রানা প্লাজায় সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কারখানার পরিবেশ এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তুমুল আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার বিষয়। ফোনে কথোপকথন শেষ হওয়ার আগে প্রফেসর রেসাইড আচমকা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, যদি এসব কেবল দুর্ঘটনাই হবে, কেন শুধু শ্রমিকেরাই পুড়ে মরে? দুর্ঘটনা হলে তো কোনো না কোনো সময় মালিকপক্ষেরও দু-চারজনের এমন পুড়ে যাওয়ার কথা কোনো না কোনো কারখানায়। তাই তো, নিখাদ দুর্ঘটনার কি কোনো শ্রেণী পক্ষপাত থাকে?
দুই. প্রথম আলোর অনলাইন আপডেটে দেখতে পাচ্ছি, ইতিমধ্যে বিজিএমইএর সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলাম দাবি করেছেন যে কারখানাটিতে দুই বছর আগে থেকেই অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র ছিল। আসওয়াদ কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিস শিকদারের মতে, ‘অগ্নিনির্বাপণের সব ধরনের সরঞ্জাম থাকার পরও এক লাখ ১৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের তিনটি ইউনিটে আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটা আমাদের জন্য একটি নতুন বার্তা।’ বটে! বার্তাটি আমাদের জন্যও নতুন বৈকি! প্রশ্ন হচ্ছে, অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র ব্যবহারের শিক্ষা কি দেওয়া হয়েছিল? ট্রেনিং কি দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে শ্রমিকদের যেকোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁরা কীভাবে বের হয়ে আসবেন ভবন থেকে? তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে ‘প্রকৃত কারণ’ খুঁজে বের করার জন্য। তদন্ত কমিটি কোন প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করবে? সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে এই সংবাদ সম্মেলনেই। তারা খুঁজে বের করবে কোনো নাশকতামূলক ‘ষড়যন্ত্র’ এই দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী কি না। তদন্ত কমিটি কি দেখবে অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র ব্যবহারের মহড়া, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে শ্রমিকেরা কীভাবে বের হবেন, সে বিষয়ে নিয়মিত মহড়া দেওয়া হয় কি না? যদি না দেওয়া হয়, তবে এই সাত শ্রমিকের মৃত্যু হত্যাকাণ্ড, বড়জোর শুনতে ভালো শব্দে বলা যায় ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।
তিন. প্রথম আলোরই (১০ অক্টোবর, ২০১৩) আরেকটি প্রতিবেদন থেকে দেখতে পাচ্ছি যে গত বছর তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগে শতাধিক শ্রমিক পুড়ে মারা যাওয়ার পরে পোশাক কারখানার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল, সেখানে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল বিজিএমইএ। এই টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের তিনজন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাঁচজন এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ে একজন সদস্যের সমন্বয়ে। শুরুতে উৎসাহ দিলেও পরে রীতিমতো অসহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে বিজিএমইএর বিরুদ্ধে। টাস্কফোর্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজিএমইএ ‘কমপ্লায়েন্ট’ ঘোষণা দিয়েছে, এমন ৩৪টি কারখানার অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব ‘কমপ্লায়েন্ট’ খেতাবধারী কারখানাগুলোই অগ্নিনির্বাপণের শর্ত মানছে না। অন্য কারখানাগুলোর অবস্থা অনুমান করাই যায়। এরপর যখন আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকেরা, তখন কেন এসব হত্যাকাণ্ডকে দুর্ঘটনা বলে পার পেয়ে যাবে বিজিএমইএ, সংশ্লিষ্ট কারখানার মালিকেরা?
চার. ২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো কারখানার ‘কমপ্লায়েন্স’ নির্ধারণের জন্য অন্যতম চারটি বিষয় হলো, কারখানার প্রতি তলায় কতজন শ্রমিক কাজ করছেন, শ্রমিকদের সম্মিলিত ওজন ও শ্রমিকের কাজের জায়গা থেকে বের হওয়ার দরজার দূরত্ব, দরজার প্রস্থ যা আগুন লাগলে শ্রমিকের বের হওয়ার জন্য যথেষ্ট কি না এবং দরজার ধরন। এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে টাস্কফোর্স দেখেছে, অধিকাংশ কারখানাই ত্রুটিপূর্ণ। এমনকি কোনো কারখানার একটি তলা হয়তো ‘কমপ্লায়েন্ট’, অন্যগুলো নয় অথচ তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব কারখানায় আগুন লেগে যখন শনাক্ত-অযোগ্য অবয়বে ছাই হয়ে যাচ্ছেন আমাদের শ্রমিকেরা, সেই সব হত্যাকাণ্ডকে দুর্ঘটনা বলে আর কত দিন চালানো হবে?
পাঁচ. বড় দুর্ভাগা আমরা। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন করেছে, তাদের বিচার ও সাজা প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। যে শ্রমিকের শ্রমে-ঘামে-জীবনের দামে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পোশাকশিল্প, তাঁদের পুড়িয়ে মারার, ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করে মেরে ফেলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দুর্ঘটনা’। নামকরণের রাজনীতিতে অনেক কিছুই আসে-যায়। এই উদ্দেশ্যমূলক নামকরণই অতঃপর সাধারণ হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমেও দেখি ‘দুর্ঘটনা’ আখ্যাই দেওয়া হয়ে থাকে। মতনির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল এবং দেশের মানুষ আমরা এসব ‘দুর্ঘটনা’ আখ্যা দেওয়া হত্যাকাণ্ড রোধের ব্যাপারে কিছুতেই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছি না, প্রতিরোধ করা তো দূরে থাক। অথচ মানুষের সংঘবদ্ধ মানবিক শক্তি রুখে দাঁড়ালে এসব কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা যায় না, এমন পরাভবে আমার আস্থা কম। জাতিগতভাবে, ক্ষেত্রবিশেষে, উপেক্ষা করার, উদাসীন থাকার যে অসীম ক্ষমতা আমাদের, তারই ফাঁক গলে স্পেকট্রাম, তাজরীন, রানা, আসওয়াদের হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটতে থাকে। শনাক্ত-অযোগ্য লাশগুলো শনাক্ত করার জন্য তাই প্রয়োজন হয় ডিএনএ পরীক্ষার,
যাঁরা পোশাকের গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ফুটিয়ে তুলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পরিচিতি দেন। আর বলিহারি দারিদ্র্য আমাদের, এসব হত্যাকাণ্ডকে ৪০ হাজার, ৫০ হাজার, বড়জোর এক লাখ, দুই লাখ টাকা দিয়ে কিনে ফেলে রীতিমতো পুণ্যলাভের তৃপ্তি ভোগ করা যায়। জানি যে প্রফেসর রেসাইডের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন ‘এসব যদি নেহাত দুর্ঘটনা, কেন শুধু শ্রমিকেরাই পুড়ে যায়?’ কয়েক দিন বাজতে থাকবে কানে, অস্বস্তি তৈরি হবে, ভুলে যাব সব ফের বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত। এসব মৃত্যু আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। আমরা পোশাক কারখানার শ্রমিক নই, আর যা-ই হোক, আমরা তো আর পুড়ে মরছি না! পুড়বে তো শুধু শ্রমিকেরাই। চিন্তা কি, যত দিন শ্রমিকের মজুরি সর্বনিম্ন রাখা যাবে, তত দিন বিদেশি ক্রেতার অভাব হবে না, যত দিন হা-ঘরে দারিদ্র্য থাকবে, তত দিন কারখানার আগুনে পুড়ে মরার জন্য শ্রমিক নামের লাকড়ির জোগান ফুরাবে না।
‘পৃথিবীর সবই ঠিক আছে, আর ঈশ্বরও রয়েছেন স্বর্গে’।
কাবেরী গায়েন: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ডেটলাইন ২৫শে অক্টোবর: সর্বনাশের সঙ্কেত? by মাহফুজ পারভেজ

একটি দৈনিকে আলী রীয়াজ [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং বর্তমানে পাবলিক পলিসি স্কলার, উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র] লিখেছেন:

চোরের দশ দিন, সাধুর একদিন by শামীমুল হক

গ্রামের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে এক লোক মানুষের হাত দেখেন। এই বাড়ি ওই বাড়ি গিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বউ-ঝিদের কাবু করার চেষ্টা করেন। কারও হাত দেখে বলেন, ইস মাগো তোমার কপালটাই খারাপ।

কাবাঘর জিয়ারত ও হজ

মুসলমানদের কিবলা কাবাঘর আল্লাহ তাআলার এক অপূর্ব সৃষ্টি। হজের মৌসুমে প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান কাবাঘর তাওয়াফ করতে মক্কায় গমন করেন। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে মক্কা নগরের অবস্থান হওয়ায় আল্লাহ তাআলা ‘বাইতুল্লাহ’ বা ‘কাবাঘর’ মক্কাতেই স্থাপন করেন। আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা প্রথম দুনিয়ায় কাবাগৃহ নির্মাণ করে এখানে ইবাদত করেন। কাবাঘরটি আল্লাহর আরশে মুয়াল্লার ছায়াতলে সোজাসুজি সপ্তম আসমানে অবস্থিত সম্মানিত মসজিদে বাইতুল মামুরের আকৃতি অনুসারে ভিত্তিস্থাপন করা হয়। আল্লাহ তাআলা কাবাগৃহকে মানবজাতির ইবাদতের কেন্দ্রস্থলরূপে নির্দিষ্ট করেন।
বেহেশত থেকে দুনিয়ায় পাঠানোর পর আদি মানব-মানবী হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.)-এর মক্কায় মিলন হলে তাঁরা উভয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ইবাদতের জন্য একটি মসজিদ প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তাঁদের দোয়া কবুল করেন এবং বাইতুল মামুরের আকৃতিতে স্থাপিত কাবাগৃহকে ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। মক্কার আবাদকারী মানুষ ও নবী হজরত আদম (আ.) সন্তুষ্টচিত্তে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতে থাকেন। কাবাঘরকে লক্ষ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ (কাবাঘর) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা মক্কায় অবস্থিত, এটা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারি। এতে রয়েছে মাকামে ইবরাহিমের প্রকৃষ্ট নিদর্শন। যে এর ভেতরে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ। মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরে হজ করা তার অবশ্যকর্তব্য।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬-৯৭) ইসলামের পূর্ব থেকেই কাবাঘর জিয়ারত ও হজ আদায়ের প্রচলন ছিল। হজরত আদম (আ.) প্রথম বায়তুল্লাহ শরিফের হজ আদায় করেন এবং আল্লাহর আদেশে কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ করেন। এরপর বহুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন নবীদের ওপর ওহি নাজিলের মাধ্যমে কাবাগৃহের নির্দিষ্ট অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী কাবাঘরের নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজ চলেছে।
এভাবে শত শত বছর অতিবাহিত হলেও আল্লাহর বান্দারা কাবাঘর জিয়ারত করত, তথায় সমবেত হয়ে আল্লাহর পবিত্রতা ও অংশীদারহীনতা ঘোষণা করত। এরপর হজরত শিস (আ.) কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ করলেন। অতঃপর হজরত নূহ (আ.)-এর যুগের মহাপ্লাবনে কাবা শরিফ ধসে যায়। আল্লাহর হুকুমে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে কাবাগৃহের পুনর্নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে সৃষ্টিকর্তার দরবারে আকুল প্রার্থনা করেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাদের উভয়কে আজ্ঞাবহ কর, আমাদের বংশ থেকে একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর, আমাদের হজের রীতিনীতি বলে দাও এবং আমাদের ক্ষমা কর। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের এ কাজটি কবুল কর।’ আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া কবুল করে নির্দেশ দিলেন, ‘হে ইবরাহিম! তুমি মানুষকে হজের জন্য আহ্বান কর। হজরত ইবরাহিম (আ.) বললেন, ‘হে আল্লাহ! সারা বিশ্বের মানুষ কি আমার ঘোষণা শুনবে?’ আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে ইবরাহিম! তুমি ঘোষণা কর আর তা মানুষের কানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’ আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম (আ.) কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ সমাপ্ত করে দুনিয়াবাসীর উদ্দেশে হজের আহ্বান করেছিলেন; স্বয়ং আল্লাহই তাঁকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘(হে ইবরাহিম!) মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দিয়ে দাও।মানুষ তোমার কাছে (আমার এ ঘরের সন্নিকটে) হজের জন্য দলে দলে চলে আসবে উটে আরোহণ করে, যা দূরদূরান্তের রাস্তা অতিক্রম করে আসায় দুর্বল হয়ে উঠতে থাকবে। ফলে আগমনকারীরা তাদের কল্যাণসমূহ হাসিল করতে পারবে।’
(সূরা আল-হজ, আয়াত: ২৬-২৭) তখন আল্লাহর আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) একটি উঁচু স্থানে আরোহণ করলেন এবং ডানে-বাঁয়ে, পূর্ব-পশ্চিমে ফিরে কাবাঘরের হজ (জিয়ারত) করার উদ্দেশ্যে দূরদূরান্ত থেকে আসার জন্য লোকদের প্রতি আহ্বান করে হজের ঘোষণা করেন, ‘ওহে লোকেরা! বায়তুল্লাহ শরিফের হজ তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে।’ হজের মৌসুম এলে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আল্লাহর মেহমানরা কাবাগৃহের পানে ছুটে আসেন। পরনে দুই খণ্ড ইহরামের সাদা কাপড়, মুখে তালবিয়ার মুহুর্মুহু ধ্বনি, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ানিন’মাতা লাকা ওয়াল্মুল্ক্, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক’। ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি তুলে কাবাগৃহের চারপাশে প্রদক্ষিণ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়ায় সাঈ বা ছোটাছুটি, মিনায় গিয়ে শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা—এসবই হজের কার্যক্রম। ইসলামের ইতিহাসে ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে নবম হিজরিতে হজের বিধান ফরজ হয়। পরের বছরে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.) হজ আদায় করেন। তিনি যেখানে, যে সময়ে, যে তারিখে, যে নিয়মে যেসব আহকাম-আরকান পালন করেন, প্রতিবছর ৮ থেকে ১৩ জিলহজ মক্কা মোকাররমা এবং এর ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নির্দিষ্ট নিয়মে সেভাবেই পবিত্র হজ পালিত হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হাজার হাজার বছর ধরে তাওহিদের ঘোষণাকারী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের উচ্চারণ, নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রকাশ ও আত্মত্যাগের মহান দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হচ্ছে। উম্মতে মুহাম্মদীর কণ্ঠে ১৪০০ বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে কাবাগৃহের চারপাশে সুমধুর ধ্বনি ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ উচ্চারিত হয়ে আসছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com

নিজ চোখে দেখে আসুন by মু আ কুদ্দুস

খবরের কাগজ ছিঁড়ে ফেললেন। এরপর লাফ দিয়ে উঠলেন। উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, এটা কি দেশ! এখানে একজনও সত্য কথা বলেন না!

সাদাসিধে কথা- বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.- কয়েক বছর আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে একটা ছেলে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছিল। আমি এ ঘটনার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না।

মাহফুজ আনামের তৃতীয় মত, হাসিনার পরিকল্পনা

একজন নাগরিক, করদাতা এবং সাংবাদিক হিসেবে আমরা এটা বিশ্বাস করতে পারি না যে, আসন্ন রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে রাজনীতিবিদরা উদাসীন থাকতে পারেন।

সমকামিতার অধিকার আদায়ে জাতিসংঘ চাপ দেয় কেন? by জিনিয়া জাহিদ

গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পাঁচ দিন ব্যাপী এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনসংখ্যা বিষয়ক ষষ্ঠ সম্মেলনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ থেকে সমকামী অধিকার নিশ্চিত করার জন্য চাপ দেয়া হয়।

আর কতকাল রক্ষক হবে ভক্ষক! by জিনিয়া জাহিদ

ঘটনা ১- ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট। ইয়াসমিন নামের ১৪ বছরের এক কিশোরী ধানমন্ডির একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। বাড়ি দিনাজপুর।

কী নৃশংস!!

রাজধানীর নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফাত নামে এক ছাত্রকে অপহরণের পর হত্যা করে পরে মুক্তিপণের ৫০লাখ টাকা নিতে এসে আটক হয়েছেন তারই বন্ধু মাসুদ রানা সুমন (২৫)ও লিংকন সরকার (২৩) নামে দুইজন।

দৈহিক by শেখ আবদুল হাকিম

লাঞ্চের পর কর্মচারীদের নিয়ে মিটিং করছেন সামসুল হক। এইমাত্র তিনি জানালেন, তাঁদের ইনডেন্টিং ব্যবসা গত বছরের মতো ভালো না হলেও, প্রতিবারের মতো এবারও কোরবানির ঈদে এক জোড়া করে গরু-খাসি জবাই করা হবে, তাতে করে পিয়ন থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সবাই কমবেশি ১০ কেজি করে মাংস আশা করতে পারেন। এই সময় পিয়নের গাফিলতিতে মূল অফিস কামরার ভেতর ঢুকে পড়ল এক তরুণ। তার হাবভাব রীতিমতো রহস্যময়, সামসুল হকের সামনে থেমে ফিসফিস করল, যদিও তার ফ্যাঁসফেঁসে গলা কারও আর শুনতে বাকি থাকল না, ‘আপনার সেই মেয়েটি কোথায় থাকে আমরা জেনেছি, স্যার।’ প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও, দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলেন সামসুল হক। ‘আজকের মতো মিটিং এখানেই শেষ,’ বলে সবার দিকে পেছন ফিরলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ভদ্রলোক, চলে গেলেন খোলা জানালার সামনে। ২০ তলা থেকে নিচের রাস্তায় লেগে থাকা যানজট দেখছেন। প্রায় নিঃশব্দে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তাঁর সব কর্মচারী। ‘এই নিন ঠিকানা।’ বলল তরুণ বেসরকারি গোয়েন্দা। নতুন, তাই এখনো ঠিক পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি, কৌতূহলী শ্রোতা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় হতাশ। ঘুরে দাঁড়িয়ে তরুণের বাড়ানো হাত থেকে কাগজটা নিলেন সামসুল হক। তাতে লেখা: মোনা বিস্তার, ২৭/৩, ওল্ড মডেল টাউন, ছয়তলা, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ, প্রযত্নে মিসেস সুশীলা বানু। ‘মাত্র এক সপ্তা হলো ওখানে উঠেছেন,’ বলল তরুণ। ‘স্যার, আপনি যদি চান এই মেয়েকে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে, আমাদের চেয়ে ভালো সার্ভিস আর কেউ...’ ‘না, লাগবে না। আমার শুধু ঠিকানাটা দরকার ছিল। কত দিতে হবে?’ 
মাত্র এক দিনের কাজ, আড়াই হাজার দিলেই হবে।’সেদিন বিকেলেই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে গেলেন সামসুল হক। গাড়ি নিয়ে নিচে অপেক্ষা করছে ড্রাইভার, নোংরা সিঁড়ি ভেঙে একা ছয়তলায় উঠলেন তিনি। দরজায় নেমপ্লেট আছে, দেখা গেল, সুশীলা বানু খুব নামকরা একটা হোটেলের সাবেক শেফ। আঙুলের গিঁট দিয়ে টোকা মারতে হলো দরজায়। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল, সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মোনা বিস্তার। বোঝা গেল শব্দটা শোনার অপেক্ষায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল সে। সামসুল হককে দেখে ওর চোখে আলো জ্বলল, মুখে হাসি খেলল, মায়া জাগানো ঘাড় দুলিয়ে ভেতরে ডাকল তাঁকে। একটা চেয়ার টেনে এনে ঘরের মাঝখানে বসতে দিল। নিজে বসল জানালার পাশে ফেলা অপর চেয়ারে, ধরনটা আয়েশি হলেও ভঙ্গিটা অমার্জিত নয়, তবে সামান্য আড়ষ্ট দেখাচ্ছে ওকে। পাঁচ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা মোনা বিস্তারের বয়স ২১। থোকা থোকা কোঁকড়া চুল হাঁটার সময় মাথাজুড়ে নাচানাচি করে। একহারা, কিন্তু শক্তিশালী কাঠামো, মুখের তাজা ভাবটা ওর অমূল্য সম্পদ। সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পরে আছে; কামিজটা খাটো, সালোয়ারটা আঁটো—সামসুল হকের সামনে একটু লজ্জাই পাচ্ছে, আড়ষ্ট দেখানোর সেটাই কারণ। ‘মোনা,’ সামসুল হক বললেন, সুর মোলায়েম, ‘তুমি আমার ফোন ধরছ না। অনেক চেষ্টা করার পর আজই জানতে পেরেছি, এখানে উঠে এসেছ। তোমার জন্য কেমন অস্থিরতায় ভুগি, সেটা তুমি ভালোই বোঝো, তারপরও কেন এই আচরণ করছ, আমাকে বলবে?’ চোখে মোহ জাগানো স্বপ্ন, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল মোনা। ‘আপনাকে যে কী উত্তর দেব সত্যি আমি জানি না। এটুকু বুঝি যে আপনার প্রস্তাব সত্যি খুব ভালো। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আপনার সঙ্গে থাকতে পারলে সব দিক থেকে আমি সুখী হব। আবার সন্দেহও যায় না।
আমি শহরে বড় হয়েছি, বুঝতে শিখেছি ভালোভাবে বেঁচে থাকা কাকে বলে...’ ‘বোকা মেয়ে,’ ব্যাকুল একটা ভাব ফুটল সামসুল হকের চেহারায়, ‘তোমাকে আমি বলিনি, আমার সাধ্যের মধ্যে কুলালে তোমার সব চাহিদা পূরণ হবে? তুমি প্রতি সপ্তায় নাটক-সিনেমা দেখতে যাবে, যতবার ইচ্ছা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করতে পারবে, মাসে এক-আধবার শপিং করলেও আমি কিছু মনে করব না। তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো, নাকি?’ পুরো বিশ্বাস করি,’ বলল মোনা, মুখে আন্তরিক হাসি। ‘আমি জানি আপনার মতো দয়ালু মানুষ হয় না। এও বুঝি, যে মেয়েকে আপনি পাবেন সে অতি ভাগ্যবতী। আপনার সম্পর্কে যা কিছু জানার সব আমি চৌধুরীদের ওখানে থাকার সময় জেনেছি।’ ‘ও, হ্যাঁ!’ উচ্ছ্বসিত হলেন সামসুল হক, মনে পড়ে যাওয়ায় কোমল আলো জ্বলল চোখে। ‘আমার মনে আছে, ওদের বাড়িতে তোমাকে প্রথম যেদিন দেখলাম। শুধু তোমার প্রশংসা করেই পুরোটা সন্ধে পার করে দিলেন মিসেস চৌধুরী। তারপরও বলব, তোমার প্রতি সুবিচার করা হয়নি। সেই রাতের ডিনার জীবনে কখনো ভুলব না। এসো, মোনা, তুমি আমাকে কথা দাও। আমি তোমাকে চাই। আমার সঙ্গে এলে তোমাকে কখনো পস্তাতে হবে না। এত ভালো একটা বাড়ি আর কেউ তোমাকে দিতে পারবে না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মোনা, চোখ নামিয়ে নিজের ভাঁজ করা হাতের দিকে তাকাল। হঠাৎ ঈর্ষা আর সন্দেহে প্রায় কাবু হয়ে পড়লেন সামসুল হক। তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি, জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে সত্যি কথা বলবে, মোনা! তুমি কি...আর কেউ আছে নাকি?’ ধীরে ধীরে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল মোনার ফরসা মুখ আর ঘাড়ে, কেউ যেন দুধে আলতা ঢেলে দিয়েছে। ‘এ রকম একটা কথা আমাকে আপনার জিজ্ঞেস করা উচিত নয়,’ বলে জানালা দিয়ে আবার বাইরে তাকাল, খানিকটা দিশাহারা দেখাচ্ছে ওকে। ‘তবু আপনাকে বলছি। আরেকজন আছে—কিন্তু তার কোনো অধিকার নেই—আমি তাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।’ ‘কে সে? নাম কী তার?’ খেপে উঠছেন সামসুল হক, চোখে জেদ।
‘সাদেক।’ ‘সাদেক খান!’ বিস্মিত হলেন সামসুল হক, রাগে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ‘ওই দুই নম্বর লোক তোমাকে চিনল কীভাবে? তুমি জানো আমার তিন নম্বর ম্যানেজার ছিল সে, চুরি করার অপরাধে চাকরি গেছে?’ ‘চুরির সেই টাকা দিয়ে গাড়িও কিনেছে,’ বলল মোনা, জানালা দিয়ে ঝুঁকে নিচের রাস্তা দেখছে, ‘আর সেই গাড়ি খানিক আগে নিচে এসে দাঁড়িয়েছে, আপনারটার পাশে। আমার উত্তর শোনার জন্য ওপরে আসছে সে। হে মাবুদ, কী করতে হবে আমাকে বলে দাও!’ দরজায় টোকা পড়ল। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াচ্ছে মোনা, কিন্তু তার আগে সামসুল হক দাঁড়ালেন। ‘তুমি বসো,’ বললেন তিনি। ‘ওর সঙ্গে ল্যান্ডিংয়ে কথা বলছি আমি।’ সাদেক খানের বয়স ২৯। সুঠাম স্বাস্থ্য, সুদর্শন, সুবেশ। ‘ফিরে যাও,’ দরজা খুলে তাকে বললেন সামসুল হক, হাত দিয়ে সিঁড়ির নিচটা দেখালেন। ‘স্যার, আপনি!’ অবাক হওয়ার ভান করল সাদেক খান। ‘বুড়ো মানুষ, আপনি এখানে কী করছেন, স্যার?’ ‘ফিরে যাও,’ কথাটা পুনরাবৃত্তি করলেন সামসুল হক, একবিন্দু মচকাতে রাজি নন। ‘কিছু যদি মনে না করো, এখানে জঙ্গলের আইন খাটবে। চাও, হিংস্র একটা পুরো দল এসে তোমাকে ছিঁড়ে ফেলুক? দ্য কিল ইজ মাইন, মাই ডিয়ার বয়!’ ‘আমি এখানে এসেছিলাম বানু আন্টিকে একটা চাকরির খবর দিতে,’ সাহস সঞ্চয় করে বলল সাদেক খান। ‘ঠিক আছে, খবরটা পরে দিয়ো। কিন্তু এখন তুমি যাও।’ সাদেক খান লেজ তুলে পালাল। দরজা বন্ধ করে সামসুল হক তাঁর প্রেমের কাছে ফিরলেন। ‘মোনা, তোমাকে আমার পেতে হবে,’ কর্তৃত্বের সুরে বললেন তিনি। ‘আমি আর কোনো রকম ধানাইপানাই শুনতে রাজি নই।’ ‘আপনি আমাকে কখন চাইছেন?’
‘এখনই। তোমার তৈরি হতে যতক্ষণ লাগে।’ চোখে চোখ রেখে শান্ত হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে মোনা। ‘আপনি কি ভেবেছেন তাসলিমা ওখানে থাকতে আমি আপনার বাড়িতে পা রাখব?’ যেন অপ্রত্যাশিত একটা ঘুষি ঝাঁকিয়ে দিল সামসুল হককে। তাঁর ভ্রুতে ঘাম ফুটছে। ‘আমার সুখী হওয়ার পথে ওই মেয়েমানুষ যদি বাধা হয়, সেটা আমি সহ্য করব কেন! যেদিন থেকে ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, একটা দিনের জন্য সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে পারিনি। তুমি ঠিকই বলেছ, মোনা। তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে তাসলিমাকে অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে। যাবে সে, যাবে, কেননা এটা আমার সিদ্ধান্ত। আমি তাকে দরজা থেকে বিদায় করে দেব।’ ‘কখন? আমি জানতে চাই, সেটা কখন?’ ‘আজ রাতে,’ বললেন সামসুল হক। ‘আজ রাতেই আমি তাকে বিদায় করে দেব।’ ‘তা যদি পারেন, তাহলে আমার উত্তর হবে—হ্যাঁ,’ বলল মোনা। ‘গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন, পৌঁছে যাব আমি।’ বারিধারা প্রকল্পে লনসহ আধুনিক দোতলা বাড়ি। গাড়িটা আসতে দেখে উর্দিপরা দারোয়ান গেট খুলে দিল। ভেতরে ঢুকে লনের পাশ ঘেঁষে সোজা এগোলেন সামসুল হক। বারান্দার সামনে পৌঁছে গাড়ি থামিয়ে নিচে নামলেন। বারান্দার ধাপ বেয়ে হেলেদুলে নেমে এলেন তাঁর স্ত্রী, শরীরের চারদিক থেকে উপচে পড়ছে থলথলে চর্বি। গতি সামলাতে কষ্ট, আর একটু হলে হুমড়ি খেয়ে স্বামীর গায়ে পড়তে যাচ্ছিলেন।
সামসুল হক এক পা পিছিয়ে বিপদ এড়ালেন। ‘এই শুনছ!’ চাপা স্বরে বললেন মহিলা, অস্থির আর উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তাঁকে। ‘আম্মি এসেছেন! কিন্তু ডিনারের কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।’ ‘তোমাকে আমার একটা কথা বলার আছে,’ বারান্দা থেকে বসার ঘরে ঢোকার সময় বললেন সামসুল হক। ‘ভেবেছিলাম পরে একসময় ধীরেসুস্থে বলব, কিন্তু যেহেতু তোমার আম্মি এখানে আছেন, ব্যাপারটা এখনই মিটিয়ে ফেললে ভালো হয়।’ ঝুঁকলেন তিনি, স্ত্রীর কানে নিচুস্বরে কিছু বললেন। তাঁর স্ত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন। মেয়ের চিৎকার শুনে কৌতূহল নিয়ে ছুটে এলেন বৃদ্ধ মা। চিৎকারটা যেন আদর ও ভালোবাসা পেয়ে ধন্য কোনো নারীর গলা থেকে বেরিয়েছে। ‘ও আম্মি!’ উল্লাসে ফেটে পড়লেন মহিলা। ‘তুমি কল্পনা করতে পারো? মোনা আমাদের বাড়িতে রাঁধতে আসছে। এই মেয়ের কথাই তো তোমাকে বলেছিলাম, চৌধুরীদের বাড়িতে পুরো এক বছর ছিল। তুমি এবার, সামসু, সোজা কিচেনে চলে যাও, এই মুহূর্তে নট করে দাও তাসলিমার চাকরি! আজও সে সিগারেট না কি যেন ছাই খেয়ে সেই সন্ধে থেকে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।’ বিদেশি গল্প অবলম্বনে

হাঙ্গেরির লোকালয়ে ভবঘুরে নিষিদ্ধ

নতুন আইনে রাস্তায় যাদের বাস, হাঙ্গেরিতে এমন মানুষদের প্রকাশ্য স্থানে অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বানের সরকার নিরাশ্রয় মানুষদের ‘স্কেপগোট’ হিসেবে ব্যবহার করছেন, বলছে সুশীল সমাজ। নিরাশ্রয়-ভবঘুরেদের প্রকাশ্য স্থানে ‘বাস করা’ অর্থাৎ লোকালয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রথমে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়া খাবার-দাবারের খোঁজ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তারপর বিশেষ বিশেষ প্রকাশ্য স্থানে নিরাশ্রয়-ভবঘুরেদের থাকাটা নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ‘বাল্কি ওয়েস্ট’ অর্থাৎ ফেলে দেয়া আসবাবপত্র ইত্যাদি কুড়িয়ে নেয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
ভিক্টর অর্বানের জাতীয়তাবাদী-রক্ষণশীল সরকার বিগত কয়েক বছর ধরেই নিরাশ্রয়-ভবঘুরেদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন। প্রথম দিকে সাংবিধানিক আদালত একাধিকবার তাকে নিরস্ত করেছিল। কিন্তু অর্বানের দল গত মার্চে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সাংবিধানিক আদালতকে নিরস্ত করার পর এবার আরেকটি প্রচেষ্টা নিচ্ছে অর্বান সরকার। গত সপ্তাহে বুদাপেস্ট সংসদ সেই পুরনো আইনের একটি নতুন সংস্করণ পাস করেছে : এবার নিরাশ্রয়-ভবঘুরেদের প্রকাশ্য স্থানে ‘বাস করা’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইন ভঙ্গ করলে নিরাশ্রয়দের ফাইন থেকে শুরু করে সমাজকল্যাণমূলক সেবার দণ্ড হতে পারে। হাফিংটন পোস্ট।