Monday, August 29, 2016

৪১ বছর পর তাঁরা জানলেন

লিওন সোয়ানসন ,ডেভিড টেইট জুনিয়র
দুজন একে অপরকে চিনতেন দীর্ঘদিন থেকে। বসবাসও একই শহরে। কিন্তু ঘুণাক্ষরে টের পাননি তাঁরা একে অপরের পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। ৪১ বছর আগে জন্মের পর হাসপাতাল থেকে অদলবদল হয়ে ভুল পরিবারে চলে যান লিওন সোয়ানসন ও ডেভিড টেইট জুনিয়র। ঘটনাক্রমে জানতে পারেন, তাঁরা দুজন একে অপরের বাবা-মায়ের কাছে লালিতপালিত হয়েছেন। ডিএনএ পরীক্ষাতেও তা প্রমাণিত হয়। ঘটনাটি ঘটেছে কানাডার মানিটোবা প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেখানে আদিবাসী ক্রি জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৭৫ সালে সরকারি নরওয়ে হাউস হাসপাতালে ডেভিড ও লিওনের জন্ম।
বয়সে একে অন্যের চেয়ে তিন দিনের ছোট-বড়। তাঁরা যে ছোট শহরে বেড়ে উঠেছেন, সেখানকার অধিবাসী মাত্র পাঁচ হাজার। ফলে তাঁরা একে অপরকে চিনতেন এবং এক সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। সম্প্রতি ডেভিড ও লিওন জানতে পারেন এক নির্মম সত্য। হাসপাতালের ভুলে তাঁদের বাবা-মা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ ডেভিড টেইট যে পরিবারে মানুষ হয়েছেন, সেটি আসলে বন্ধু সোয়ানসনের পরিবার। আর সোয়ানসন যে পরিবারে মানুষ হয়েছেন, সেটি ডেভিডের পরিবার। এক সংবাদ সম্মেলনে ডেভিড টেইট বলেন, এ ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট জবাব চাই। তবে যারা আমাকে লালন-পালন করেছেন তাঁরা বরাবরই আমার বাবা-মা থাকবেন।

অবৈধদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া ঘোষণা

ডোনাল্ড ট্রাম্প
অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিগবাজি খেয়েই যাচ্ছেন। আজ এক কথা বলছেন তো কাল আরেক কথা। তিনি প্রচারণার প্রথম থেকেই বলে আসছিলেন যে প্রেসিডেন্ট হলে সব অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে। গত সপ্তাহে তিনি ফক্স নিউজের উদ্যোগে এক টাউন হল মিটিংয়ে সুর নরম করে বললেন, সবাইকে নয়, অবৈধদের মধ্যে যাঁরা কোনো না কোনো অপরাধ করেছেন, শুধু তাঁদেরই বের করে দেওয়া হবে। কিন্তু এই বক্তব্য দেওয়ার পর এক সপ্তাহ না যেতেই আবার আগের কড়া অবস্থানে চলে এসেছেন তিনি। আইওয়ায় শনিবার এক প্রচার সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করার জন্য তিনি অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার একটি পদ্ধতি চালু করবেন। তাঁর ভাষায় ‘এক্সিট-এন্ট্রি ট্র্যাকিং সিস্টেম’ নামের এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া অভিবাসীদের সহজেই চিহ্নিত করে বের করে দেওয়া যাবে। ওই বক্তৃতায় ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে প্রতিবেশী মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তোলার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি অবৈধ অভিবাসীদের কল্যাণভাতা দেওয়া বন্ধ করবেন বলেও ঘোষণা দেন।
নির্বাচনের আর মাত্র ৭১ দিন বাকি। কিন্তু এখনো অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ট্রাম্প যেভাবে ডিগবাজি খাচ্ছেন, তা দেখে রিপাবলিকান পার্টি ও তাঁর সমর্থকদের শিরঃপীড়া শুরু হয়েছে। বাছাইপর্বে ট্রাম্প বাঘা বাঘা ১৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বীকে ডিঙিয়ে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর মনোনয়ন নিশ্চিত করেছিলেন মূলত অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কারণে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন, মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলবেন এবং ১ কোটি ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে দেশছাড়া করবেন—এই ছিল তাঁর প্রতিশ্রুতি। এ পরিকল্পনা অবাস্তব ও বর্ণবাদী—নিজ দলের নেতাদের কাছ থেকেই ট্রাম্পকে এমন সমালোচনা শুনতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর প্রাথমিক সাফল্যের কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতকায়রা তাদের আধিপত্য হারাচ্ছে এবং আগামী ২০-২৫ বছরের মধ্যে এটি একটি অ-শ্বেতকায়প্রধান দেশে পরিণত হবে—এই উদ্বেগকে তিনি সফলভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হন। কিন্তু বাছাইপর্ব আর সাধারণ নির্বাচন এক কথা নয়। কয়েক দিন আগে দেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্যে সবাই মনে করেছিল, কিঞ্চিৎ বিলম্বে হলেও এ কথাটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু শনিবার আবার ডিগবাজি খাওয়ায় অনেকেই অভিবাসন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এই প্রশ্নে তাঁর আসল অবস্থান কোনটি, তা ঠাহর করা সহজ হচ্ছে না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ফক্স নিউজের সঙ্গে এক টাউন হল মিটিংয়ে বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কারের ব্যাপারে তিনি ‘কিছুটা নরম’ হতে প্রস্তুত। অনেকেই তাঁকে বলেছে, এ দেশে ১০-১৫ বছর ধরে আছে এমন মানুষদের বের করে দেওয়াটা বড় অমানবিক হবে। তার চেয়ে বরং এরা যদি বকেয়া আয়কর মিটিয়ে দেয়, তাহলে বৈধভাবে থাকতে দেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে ঢালাও কোনো ‘অ্যামনেস্টি’ দেওয়া হবে না। ট্রাম্পের এই নতুন অবস্থানের কথা প্রকাশ হতে না হতেই চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়। অভিবাসন প্রশ্নে ঠিক এ রকম একটি প্রস্তাব রাখা ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশ টিপ্পনী কেটে বলেছেন, ‘কী! বলেছিলাম না, এই লোক মত বদলাবে!’ টেড ক্রুজ, ট্রাম্পের আরেক পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী, তিনিও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। আলাস্কার সাবেক গভর্নর সারাহ পেলিন তখন বলেন, ট্রাম্প তাঁর এত দিনের অভিবাসননীতি থেকে সরে গেলে তাঁকে ‘গভীর অনুশোচনার’ মুখোমুখি হতে হবে। এসব সমালোচনার পরই নতুন ডিগবাজি খেলেন ট্রাম্প। অধিকাংশ পর্যবেক্ষক একমত, আসলে ট্রাম্প অভিবাসন প্রশ্নটি তেমন ভালোভাবে জানেনই না, জানার চেষ্টাও করেননি। এখন চাপের মুখে পড়ে একবার এ কথা বলছেন, আরেকবার অন্য কথা। পরামর্শদাতাদের চাপে অথবা নতুন ভোটের সন্ধানে, যে কারণেই অবস্থান বদল করুন না কেন, এতে তাঁর কট্টর সমর্থকদেরও অনেকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা আছে।

কাশ্মীরের তরুণদের ‘উসকানিদাতাদের’ মোদির হুঁশিয়ারি

নরেন্দ্র মোদি
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যারা তরুণদের ‘সহিংসতায় উসকে দিচ্ছে’, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বেতারে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মাসের অনুষ্ঠান মন কি বাত-এ গতকাল রোববার ওই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। মোদি বলেন, এসব উসকানিদাতাকে তরুণদের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে। মন কি বাত-এ নরেন্দ্র মোদি বলেন, কাশ্মীরের সব রাজনৈতিক দল এখন ঐক্যবদ্ধ। তারা বিশ্ব ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই এক হওয়ার বার্তা দিয়েছে। তারা কাশ্মীরের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের চলতি দফা সহিংস বিক্ষোভের জন্য ভারতীয় নেতারা ইতিমধ্যে পাকিস্তানের ‘প্ররোচনাকে’ দায়ী করেছেন। গত ৮ জুলাই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে তরুণ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর থেকে সেখানে উত্তপ্ত পরিস্থিতি চলছে। রাজ্যটিজুড়ে সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭০ জন নিহত ও ৫ হাজার আহত হয়েছেন। বেতারে মোদি আরও বলেন, ‘একতা ও ভালোবাসা—এই দুই মন্ত্রই হবে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের পথ। কাশ্মীরের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলে আমি এ কথাই বুঝেছি।
..কাশ্মীরে একটি প্রাণহানি হলেও তা আমাদেরই ক্ষতি।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গত শনিবার কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ‘বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য’ ২২ জন আইনপ্রণেতাকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন। এই নিয়োগের এক দিন পরেই এল মোদির হুঁশিয়ারি। শনিবার ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর বলেন, কাশ্মীর দ্বিপক্ষীয় সমস্যা। একে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত করতে পারবে না কখনোই। শনিবার প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও কাশ্মীরের সহিংসতায় পাকিস্তানের ইন্ধনের অভিযোগ করেন। তবে বরাবরের মতো এবারও পাকিস্তান কাশ্মীরে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গতকাল বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মেহবুবা মুফতি কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের জন্য কার্যকর সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যে-ই সন্ত্রাস ছেড়ে শান্তির পথে আসবে, সরকারের উচিত তার সঙ্গে সংলাপ করা। অন্য পক্ষের সঙ্গে সংলাপে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান মেহবুবা।

জেলা পরিষদ নিয়ে কিছু সুপারিশ

স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করা যায় ২০১৬ সালের মধ্যে দেশের সমতলভূমির ৬১টি জেলা পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিতে পারবেন। সরকার নির্বাচিত জেলা পরিষদ পুনর্গঠন করলে দেশের স্থানীয় সরকারের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে। জেলা পরিষদ উপমহাদেশের স্থানীয় শাসন ও উন্নয়নের ইতিহাসে ১৩০ বছরের উত্তরাধিকার বহন করে। জেলা প্রশাসন সৃষ্টির (১৭৭২) ১১০ বছর পর ১৮৮২ সালে লর্ড রিপনের ঐতিহাসিক রেজল্যুশনের মাধ্যমে তিন স্তরের গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয়। তাতে স্থানীয় ‘জেলা বোর্ড’ অত্যন্ত শক্তিশালী প্রশাসনিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের প্রথম দশক পর্যন্ত ওই পদ্ধতি বজায় ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেলা পরিষদের সুরম্য ভবন, জনবল, প্রচুর নিজস্ব সম্পদ ও জাতীয় বাজেটের নিয়মিত বরাদ্দ সত্ত্বেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি রহস্যজনক কারণে আড়ালে পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে জেলায় ‘গভর্নর’ নিয়োগ করে জেলা প্রশাসকসহ জেলার সামগ্রিক প্রশাসনকে তার অধীন করে একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা হয়। পরে বিএনপির শাসনামলে ‘জেলা উন্নয়ন সমন্বয়ক’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে প্রতিটি জেলায় রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরশাদ আমলে পদটি বাতিল হয়; ১৯৮৮ সালের একটি নতুন আইনবলে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।
১৯৯০-এর পরে তা বাতিল হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সরকার গঠিত হওয়ার পর ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইন পাস করা হয়। কিন্তু পাস হওয়ার ১১ বছর পরও ওই আইন কার্যকর করা হয়নি। পরে ২০১১ সাল আইনের ৮২(১) ধারার অধীনে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে ওই আইন কার্যকর হয়। কথা ছিল প্রশাসক নিয়োগের ছয় মাসের মধ্যেই আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে, তা হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে ধারণা, সরকার ২০১৬ সালের মধ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচন দিতে যাচ্ছে এবং স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠিত হতে যাচ্ছে। এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও তার ফলাফল কীরূপ হবে সে সম্পর্কে কোনো আগাম মন্তব্য না করেও বলতে চাই, জেলা পরিষদ নানা অনিশ্চয়তার স্তর পার হয়ে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পেতে যাচ্ছে এ নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই ব্যবস্থাটি আরও টেকসই ও গণতান্ত্রিক হোক, এ লক্ষ্যে ওই আইনের কিছু সংশোধনী সুপারিশ করা সংগত মনে করি। ইতিপূর্বে এ বিষয়ে প্রথম আলোয় (২৮-১১-২০১১ এবং ৪-০১-২০১২) আমার দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এই লেখায় নতুন কিছু সুপারিশ যুক্ত করা হলো। প্রথমত, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনসহ অন্য সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আইন ও বিধিসমূহের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু আছে কি না, তা পর্যালোচনা করা দরকার এবং যে পটভূমিতে ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইন তৈরি হয় তার প্রেক্ষাপট অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং বিশেষত, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের কর্মধারার আলোকে জেলা পরিষদেও অনুরূপ বিষয়ের সংযোজন প্রয়োজন। পরিকল্পনা, বাজেট এবং উন্নয়ন সমন্বয়ের বিধানসমূহের আরও স্পষ্টকরণ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জেলা পর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসন, রেগুলেটরি ও উন্নয়ন বিভাগসমূহের সঙ্গে পরিষদের সম্পর্কের বিষয়ে আইনে বিস্তারিত কিছু দেখা যায় না। সংবিধান অনুযায়ী উন্নয়ন ও সেবার ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের দায়িত্ব ও ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।
তৃতীয়ত, জেলা পরিষদ আইন, ২০০০-এর ধারা ৩০ বলে জেলার সব জাতীয় সংসদ সদস্যগণ ‘জেলা পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং তাঁহারা পরিষদকে উহার কার্যাবলি সম্পাদনে পরামর্শ প্রদান করিবেন’ মর্মে যে ধারাটি আছে, তা উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের অভিজ্ঞতার আলোকে পুনরায় বিচার-বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। চতুর্থত, জেলা পরিষদ আইনের ১৪ থেকে ১৮—এ পাঁচটি ধারা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নাগরিকেরা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে থাকেন। কিন্তু জেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় বিশেষ ‘নির্বাচকমণ্ডলীর’ পরিবর্তে জেলার জনসংখ্যা, আকার ও ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে জেলায় জেলায় জেলা পরিষদের নির্বাচনী ওয়ার্ড সৃষ্টি করে জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা পরিষদের সদস্যগণ নির্বাচিত হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। নির্বাচিত সদস্য/সদস্যাদের মধ্য থেকে পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বা একটি ‘নির্বাহী কাউন্সিল’ গঠিত হতে পারে। বাকি সদস্যরা নির্বাহী দায়িত্বের বাইরে বিধানিক সদস্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। ভারতে অন্তত এভাবে জেলা পরিষদসমূহ পরিচালিত হয়। বিরাজিত আইন (জেলা পরিষদ আইন, ২০০০) সংবিধান ও দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তা ছাড়া, জেলা পরিষদকে ঘিরে জনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরিভাবে এ আইনে প্রতিফলিত হয়নি। তাই জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে এ আইনের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশের অতীতের জেলা পরিষদের কর্মকাণ্ড, বর্তমান জেলার প্রশাসন ও উন্নয়নের সমস্যাসমূহের সবিস্তারে আলোচনা-পর্যালোচনা প্রয়োজন। তা ছাড়া, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্যের জেলা পরিষদসমূহ কীভাবে কাজ করছে, তাও সঙ্গে সঙ্গে পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। এ সবকিছু বিবেচনা করে আইনের যথাযথ সংশোধনের পর নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই সংগত। আশা করব, সরকার আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতা-নেত্রী, অন্যান্য দল এবং নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণ করে জেলা পরিষদ আইন, ২০০০-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।
tofail101@gmail.com

নেপথ্যের শক্তিকে শনাক্ত করা দরকার

২৫ জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরের তাজ মঞ্জিল নামের এক বাড়িতে পুলিশি অভিযান চালিয়ে নয় সন্দেহভাজন জঙ্গিকে হত্যা করার পর ২৭ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার একটি বাড়িতে একই রকমের অভিযানে আরও তিন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে হত্যার ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে, জঙ্গি দমনে সরকার জোরালোভাবে তৎপর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের তৎপরতা ফলপ্রসূ হচ্ছে। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার পর জনমনে যে ভীতি-আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল, একের পর এক পুলিশি অভিযানে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের মারা পড়ার ফলে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই কাটতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জে নিহত তিনজনের মধ্যে আছেন তামিম চৌধুরী, যাঁকে হলি আর্টিজান হত্যাযজ্ঞের মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে বর্ণনা করে আসছিল পুলিশ। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লাখ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। এখন যখন তাঁর নিহত হওয়ার খবর পুলিশ জানাল,
তখন এটা জঙ্গিবিরোধী তৎপরতার একটা বড় সাফল্য বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, জঙ্গি হামলায় সশরীরে অংশগ্রহণকারী মাঠপর্যায়ের জঙ্গিদের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের নেপথ্যের নেতারা, যাঁরা কিশোর-তরুণদের কচি মনকে বিভ্রান্ত করে এই ভয়ংকর বিভীষিকার পথে নিয়ে যান, হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা করেন এবং তা বাস্তবায়ন করতে তাদেরকেই পাঠান। যে প্রক্রিয়ায় জঙ্গিবিরোধী তৎপরতা চলছে, তা অনেক ক্ষেত্রে জনমনে স্বস্তি দিলেও যে প্রশ্নটি উঠছে তা হচ্ছে, সন্দেহভাজন জঙ্গিদের কেন জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না? এর সঙ্গে বিচার ও আইনের শাসনের সম্পর্ক রয়েছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে পুলিশ ও র্যা বের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্দেহভাজন অপরাধীদের নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। জঙ্গিবিরোধী অভিযানগুলোর ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ ও বক্তব্য যেন একই রকমের সংশয়-সন্দেহ না জাগায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
জঙ্গিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকুক, জঙ্গিদের হাতে আর একটি প্রাণও ঝরবে না—এটা নিশ্চিত করা হোক।