Showing posts with label আবুল হাসনাত. Show all posts
Showing posts with label আবুল হাসনাত. Show all posts

Wednesday, June 24, 2026

সেন্ট মার্টিনে বেড়াতে গিয়ে যে ৫ অভিজ্ঞতা হলো by আবুল হাসনাত

কদিন আগে পরিবার নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেন্ট মার্টিনে। ভালো–মন্দ মিলিয়ে মিশ্র এক অভিজ্ঞতা। সেটাই শেয়ার করলাম আজ। যাঁরা যাওয়ার কথা ভাবছেন একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।

১. তবু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক

দ্বীপটায় মানুষ যায় ‘পঙ্গপালের’ মতো। ডিসেম্বর, জানুয়ারি—এবার এই দুই মাস ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে আমাদের কারও যেন হুঁশ নেই (আমি নিজেও বেহুঁশ হয়েছিলাম)। প্রতিদিন দুই হাজার মানুষ যাওয়ার কথা। সেখানে কমসে কম ৭–৮ হাজার মানুষ যাচ্ছে হররোজ। জাহাজে, জেটিঘাটে, সৈকতে, রিসোর্টে, খাবারের দোকানে সর্বত্র গাদাগাদি। তিলধারণের ঠাঁই নেই কোথাও।

এর থেকেও বিরক্তিকর দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজে ভ্রমণের ক্লান্তি। নতুন এই হুজ্জত এবারই শুরু হয়েছে। আগে টেকনাফ থেকে আড়াই–তিন ঘণ্টায় যাওয়া যেত। এখন কক্সবাজার থেকে জাহাজ ছাড়ে। পৌঁছাতে কম করে হলেও সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লেগে যায়। জাহাজে ওঠানামার কথা ভাবলেই তো গায়ে জ্বর আসে।

২. ছেড়া দ্বীপ

প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ছেড়া দ্বীপে যাওয়া নাকি নিষেধ। সকাল ৭টা থেকে কোস্টগার্ড দাঁড়িয়ে যায় সেন্ট মার্টিনের একেবারে দক্ষিণপ্রান্তে, যেখান থেকে টুকরা ছোট ছোট তিনটি দ্বীপে যাওয়ার সরু রাস্তাটার শুরু। ভাটার সময় রাস্তাটা জেগে উঠে, জোয়ারে তলায়। জোয়ারের সময় খুদে দ্বীপগুলোতে যাওয়া যায় না। সেই ভোরবিহানে অন্ধকার থাকতে লোকজন মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ছেড়া দ্বীপের উদ্দেশে রওনা দেয়। কারণ, বেলা হলেই আটকে দেবে কোস্টগার্ড। শত শত, হাজারে হাজার মানুষ, লাইন ধরে ছুটছে সবাই। নিঝুম দ্বীপ ডিঙিয়ে ছেড়া দ্বীপ, সবশেষে প্রবাল দ্বীপ। সেখানে পাথরের ওপর বসে–শুয়ে–দাঁড়িয়ে চলে সূর্যোদয় দেখার মচ্ছব। পথে যেতে যেতে চোখ আটকে পড়ে প্লাস্টিকের বোতলের স্তূপে। জোয়ারে এনে রেখে গেছে মানুষের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট।

একদল যা তা সাগরের পানিতে ছুঁড়ে ফেলছে। আরেকদল নিজের টাকায় দ্বীপটিতে গিয়ে সেসব কুড়িয়ে মূল ভূখণ্ড নিয়ে আসছে। এই হচ্ছে মানুষে মানুষে ফাঁরাক।

৩. সারমেয় বৃত্তান্ত

সেন্ট মার্টিনের যেখানেই যাবেন, চোখে পড়বে দলে দলে কুকুর। সংখ্যাটা চোখে পড়ার মতো। পর্যটকেরা অনেকে ভয় পান। খাবারের লোভে প্রায়ই পর্যটকদের ছেঁকে ধরে কুকুরগুলো। এদের অন্যত্র স্থানান্তরের কি কোনো উপায় নেই? এটা তো বাস্তুসংস্থানের জন্যও প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করবে। কোনো কিছুর সংখ্যাধিক্য মানেই অন্য অনেক কিছুর ওপর বাড়তি চাপ।

৪. বামুন নারকেল

একসময় সেন্ট মার্টিনকে মানুষ নারকেল জিঞ্জিরা নামে ডাকত। প্রমাণসাইজের ডাবও পাওয়া যেত দেশের সর্বদক্ষিণের এই দ্বীপটিতে। বছর দশেক আগে দ্বীপে বসে তেমনি একটি ডাব খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই আছে। কিন্তু এবার গিয়ে অবাক হলাম! ছোট ছোট ডাব ঝুলছে। একেকটার দাম হাঁকছে এক–দেড় শ টাকা।

—বিষয় কী ভাই? এট্টুকু ডাবের এত দাম কেন? জানতে চাইলাম।

—জবাবে দোকানি ছেলেটা বলল, দ্বীপে এখন ডাব হয় না।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম পাশে বসা বয়োবৃদ্ধ মানুষটির দিকে। বললেন, বছর তিনেক আগে একটা ঝড় হয়েছিল। তারপর থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ডাব আর তেমন হয় না। এখন টেকনাফ থেকে ডাব আনা হয়।

৫. অত্যাচার

একদল আছে সকাল নাই, বিকাল নাই সৈকতে মোটরবাইক চালাবে। রাতের আঁধার চিড়ে বিকট আওয়াজ তুলে ছুটে চলে মোটরবাইকগুলো। সৈকতের কাছে চেয়ারে এদের যন্ত্রণায় বসা দায়। এসব বাইকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মরে কাকড়াসহ নানা জলজ প্রাণীর ডিম, বাচ্চা। একই কথা সৈকতজুড়ে চালানো বাইসাইকেলের ক্ষেত্রেও খাটে। সাগরের পানিঘেঁষেই কেন সাইকেলগুলো চালাতে হবে?

সরকার খুলে দিয়েছে বলে আমরাও কী খুল্লামখোল্লা হয়ে নেমে পড়ব? নিজেদের এতটুকু বিচার–বিবেচনা নাই? আর সরকারই বা নজর দিচ্ছে না কেন!? এত হুজ্জত, এত দিকদারি জানলে পরিবার নিয়ে আমি কস্মিনকালেও যাওয়ার কথা ভাবতাম না। এর চেয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরে মাইলের পর মাইল ঘুরলে দিব্যি চারটা দিন কাটিয়ে দেওয়া যেত।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। ছবি: লেখক

Monday, November 2, 2015

বিজেএমসি থাকুক অর্থমন্ত্রী চান না! by আবুল হাসনাত

আবুল মাল আবদুল মুহিত
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর আগে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু করে সরকার ‘মারাত্মক ভুল’ করেছে। আর এবার লিখলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনই (বিজেএমসি) বিলুপ্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। এই বিজেএমসি সরকারি ২৬টি পাটকল পরিচালনার কাজটি করে থাকে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে আমি বিজেএমসির কোনো ভূমিকাই দেখতে পাই না। অথচ তারা সব মিল নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সময়মতো পাট খরিদ করতে দেয় না। এসব কার্যাবলিতে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করে এবং নানাভাবে মিলগুলোকে লাভজনক হতে দেয় না।’
অর্থমন্ত্রী এক চিঠিতে এমন সব মন্তব্য করে বিজেএমসিকে বিলুপ্ত করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। আর এই চিঠিটি গত ২৮ অক্টোবর পাঠানো হয়েছে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিককে। বিজেএমসি পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি সংস্থা।
বিজেএমসিকে বিলুপ্ত করা হলে পাটকলগুলো কীভাবে চলবে, তার পথও বাতলে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রতিটি পাটকল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। তখন এগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর এসব পাটকলের পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন এবং মূল্যায়ন করতে পাট মন্ত্রণালয়ে একটি ছোট সেল করা যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী শুধু চিঠিই লিখেননি, পাটমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নেন তার ফলাফল দেখার অপেক্ষায় আছেন। চিঠিতে তেমনটিই উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ূন খালেদ কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম প্রথম আলোকে বলেন, গত কেবিনেটে অর্থমন্ত্রী বিজেএমসি বিলুপ্ত করার বিষয়টি তুলেছিলেন। নানান যুক্তিও দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা খারিজ করে দেন। উল্টো তিনি বিজেএমসিকে আরও কার্যকর করা ও লোকসান কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পাটমন্ত্রীর কাছে অর্থমন্ত্রী চিঠিটি লিখেছেন আলীম জুট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জগলুল মাহমুদের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে। জগলুল মাহমুদ লিখেছেন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে তিনি এখন আলীম জুট মিলসের মালিক। রায় অনুযায়ী মিলটি হস্তান্তরের জন্য গত ১৯ ও ২৬ এপ্রিল তাদের সঙ্গে বিজেএমসির দুটি চুক্তি সই হয়। কিন্তু মিলটি এখনো তাদের সরেজমিন বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।
জগলুল মাহমুদের দাবি, বিজেএমসির কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা আলীম জুট মিলসের অর্থ আত্মসাৎ করে নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করছেন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসি ২০০৯ সালে একবার মিলটি হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত হয়। তখন মিলটির দায়দেনা ছিল ১৩২ কোটি টাকা। এখন এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৬ কোটি টাকায়। দিন দিন দেনা বাড়ছেই। তিনি এর ভাগীদার হতে চান না। তিনি মিলটি নিজের অর্থে চালু করতে চান।
অর্থমন্ত্রীও তাঁর চিঠিতে বলেছেন, বিজেএমসির কারণেই আলীম জুট মিলসের দায়দেনা ৫৪ কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
বিজেএমসির দুর্নীতির বিষয়ে পাট প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কোন করপোরেশনে দুর্নীতি নেই। বিজেএমসিতে দুর্নীতির মাত্রাটা একটু বেশি। দুর্নীতি আর লোকসান বিজেএমসিকে শেষ করে দিয়েছে। তবে বিজেএমসির কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয় সেগুলো আমরা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছি। সেভাবে ব্যবস্থাও নিচ্ছি। আশা করি পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে সংস্থাটি আর লোকসানে থাকবে না।’
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘুরেফিরে বারবারই এসেছে পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা। এ জন্য সরকার বিজেএমসিকে প্রচুর টাকাও দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিজেএমসিকে লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য ২০০৯ সালে পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসি একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিজেএমসির যাবতীয় দায়দেনা পরিশোধ করতে ৫ হাজার ২৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দেয়। গত অর্থবছরে আরও ২০০ কোটি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে সরকার গত অর্থবছর পর্যন্ত বিজেএমসিকে মোট ৫ হাজার ৪৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দেয়।
কিন্তু এত কিছুর পরও গত অর্থবছরে বিজেএমসির লোকসান ৪৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। আগের দুই বছর মিলিয়ে সংস্থাটির লোকসান হয় ৩২৬ কোটি টাকা।

Saturday, October 24, 2015

ডিজিটাল ক্যামেরা হারিয়ে যাচ্ছে? by আবুল হাসনাত

২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহকদের ছবি তোলার আগ্রহের ওপর একটি জরিপ চালায় ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফুজিফিল্ম। জরিপে উঠে আসে ফিল্ম দিয়ে ছবি তোলার যুগে গ্রাহকেরা যেখানে ১০ হাজার কোটি ছবি তুলেছেন, সেখানে ডিজিটাল ক্যামেরার যুগে ছবি তোলা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের ছবি তোলার প্রবণতা যে বেড়েছে, জরিপটি তারই প্রমাণ। তবে মজার ব্যাপার হলো, ডিজিটাল যুগের বেশির ভাগ ছবিই স্মার্টফোনে তোলা।
এবার আমেরিকার উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশটির বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইএ মার্কেট রিসার্চের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ সালে আমেরিকায় যত ছবি তোলা হয়, এর ৩৭ শতাংশই হয়েছে মোবাইলের ক্যামেরায়। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।
অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ায় ক্যানন, নাইকন, অলিম্পাস, সনি, ফুজিফিল্ম ও প্যানাসনিকের মতো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ক্যামেরার (বিশেষ করে কমপ্যাক্ট ক্যামেরা) দাম অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাতেও রক্ষা হচ্ছে না। স্মার্টফোনের বিল্ট-ইন ক্যামেরার কারণে আলাদা করে ক্যামেরা কিনতে এখন অনেকেই আগ্রহী নন। এখনকার স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটগুলোর ক্যামেরার মানও বেশ উন্নত। সে কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন ক্যামেরার বিক্রি কমছে। আর ছবি তোলার মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন।
যে স্মার্টফোন দিয়ে কথা বলা এবং গান শোনা যাচ্ছে, সেই একই মোবাইলে ভালো ছবিও তোলাও যাচ্ছে। কারও পকেটেই যখন ভালো মানের একটি ক্যামেরা থাকে, তিনি কি আর ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ করে আরেকটি ডিজিটাল ক্যামেরা কিনবেন?
প্রযুক্তি খাত নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) বলছে, ২০১৩ সালে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের রপ্তানি ১০০ কোটি ছাড়ায়। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৪৪ কোটিতে, যা আগের বছরের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। আর সংস্থাটির পূর্বাভাস হলো ২০১৯ সালে স্মার্টফোনের রপ্তানি হবে প্রায় ২০০ কোটি ছুঁই ছুঁই।
তবে ২০১৯ সাল নাগাদ ডিজিটাল ক্যামেরার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে পূর্বাভাস না করলেও চলবে। কারণ টোকিওভিত্তিক ক্যামেরা অ্যান্ড ইমেজিং প্রডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিআইপিএ) এরই মধ্যে পূর্বাভাস করেছে যে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হতে পারে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডিজিটাল ক্যামেরা। এটি আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। অথচ, ২০১২ সালেও সারা বিশ্বে ৯ কোটি ৮১ লাখ ডিজিটাল ক্যামেরা রপ্তানি হয়। অর্থাৎ দুই বছরেই রপ্তানি অর্ধেকে নেমেছে। কেন সাধারণ মানুষের হাত থেকে ডিজিটাল ক্যামেরা হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নিজের ছবি অন্যকে দেখানোর বড় দুটি মাধ্যম হলো ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম। ক্যামেরায় ছবি তুলবেন, সেই ছবি কম্পিউটারে নামাবেন, তারপর ফেসবুকে আপলোড করবেন, এত সময় কোথায়। এত ঝামেলায় না গিয়ে মানুষ এখন স্মার্টফোনে ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গেই তা আপলোড করছে।
আর স্মার্টফোনে তোলা ছবির মানও বেশ ভালো। এখন ১৩-১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। এমনকি ৪১ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার স্মার্টফোনও আছে নকিয়ার (নকিয়া লুমিয়া ১০২০)।
ডিজিটাল ক্যামেরার ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী যে ধাক্কা লেগেছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশেও কমেছে ক্যামেরার বিক্রি। তবে ডিএসএলআর ক্যামেরা ভালোই বিক্রি হচ্ছে।
স্যামসাং ইলেকট্রনিকস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং কমিউনিকেশন) মাশরুর হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্মার্টফোনের কারণে আমাদের ক্যামেরা বিক্রি অনেক কমে গিয়েছিল। সে কারণে ২০১৪ সালের প্রথমার্ধের পর থেকে বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের ক্যামেরা আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর আমাদের কোনো শোরুমেই ক্যামেরা বিক্রি হচ্ছে না।’
দেশে ক্যাননের ক্যামেরা বাজারজাত করে জেএএন এবং নাইকনের ক্যামেরা বাজারজাত করে ফ্লোরা লিমিটেড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের কমপ্যাক্ট ডিজিটাল ক্যামেরার বিক্রি ৮০ শতাংশ কমে গেছে। তবে ডিএসএলআর ক্যামেরা এখনো বিক্রি হয়।
বড় ক্যামেরা প্রস্তুতকারীদের কী হাল: বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল ক্যামেরা বিক্রি হয় ক্যাননের। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, এ বছর তাদের ডিজিটাল ক্যামেরার রপ্তানি কমবে আগের বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ। এবার প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ২৮ লাখ ক্যামেরা রপ্তানি করতে চায়। রপ্তানি কমে যাওয়ায় বছর শেষে পরিচালন (অপারেটিং) মুনাফা ৪ শতাংশের বেশি কমে যায় কি না, তা নিয়ে সন্দেহে আছে ক্যানন কর্তৃপক্ষ।
আরেক বড় ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকন। এই প্রতিষ্ঠানটিও এ বছর ১৭ শতাংশ রপ্তানি কমে যাবে বলে ধারণা করছে। তবে তাদের পরিচালন মুনাফা কমবে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
একসময়ের ক্যামেরার বাজারে সুপরিচিত নাম অলিম্পাস ২০১৪ সালে প্রায় ১৩৮ কোটি ইয়েন লোকসান গুনেছে। তবে এ বছর কোনো লোকসান হবে না বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ। কারণ তারা কয়েক ধরনের ক্যামেরার উৎপাদনই বন্ধ করে দিয়েছে। তেমনি বেছে বেছে কয়েকটি দেশে ক্যামেরা রপ্তানি করছে।
ফুজিফিল্ম কর্তৃপক্ষের ধারণা, এ বছর তাদের ক্যামেরা বিক্রি ৩৬ শতাংশ কমবে। তবুও প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে তাদের মুনাফা হবে। কারণ তারা এখন কম দামের ক্যামেরার চেয়ে বেশি দামের উচ্চমানসম্পন্ন ক্যামেরা প্রস্তুত ও বিপণনে মনোযোগী হয়েছে।
প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্টফোনের দাপটে টিকতে হলে এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি আনতেই হবে ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সেদিকটি মাথায় রেখে এরই মধ্যে ফুজিফিল্ম, অলিম্পাস ও প্যানাসনিকের মতো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে আয়নাবিহীন বিশেষ একধরনের ক্যামেরা বাজারে আনে। কিন্তু এতেও খুব একটা লাভ হয়নি। ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদনে অলিম্পাস জানায়, এই ক্যামেরা আনার পর প্রথম প্রান্তিকেই তাদের আয়নাবিহীন ছোট ক্যামেরার বিক্রি কমেছে ১২ শতাংশ।

Wednesday, October 21, 2015

আশা জাগাচ্ছে চুক্তিতে চাষ by আবুল হাসনাত

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার আনারস মোড় থেকে খানিকটা এগোলে ডানেই পড়বে সাথী সিনেমা হল রোড। এই রাস্তা ধরে যতই এগোবেন, দুই ধারে চোখে পড়বে সারি সারি কলা কিংবা আনারসের বাগান। দেখবেন ধান, লাউসহ নানা সবজির খেত।
এই রাস্তা ধরে চার কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই কুড়াগাছা গ্রাম। এই গ্রামেই রপ্তানিকারকদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে বেগুন। এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা রপ্তানির দ্বার খুলে দিয়েছে এই বেগুন। চুক্তিতে উৎপাদিত বেগুন এখন রপ্তানি হচ্ছে।
এটাই আশা জাগাচ্ছে দেশের সবজি রপ্তানিকারকদের। কারণ ইউরোপের বাজারে করলা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, পটোল, লালশাক, ডাঁটাশাক এবং লেবুর (জারা লেবু ছাড়া অন্যান্য লেবু) মতো সবজি-ফলের রপ্তানি সরকার নিজেই বন্ধ রেখেছে। তখন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, রপ্তানিকারকেরা যতক্ষণ চুক্তির ভিত্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষকদের মাধ্যমে উৎপাদিত সবজি না নেবে এবং যথাযথভাবে মোড়ক না করবে, তত দিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা চলবে। তবে এখন যেহেতু চুক্তিতে চাষের কারণে বন্ধ থাকা বেগুনের রপ্তানি শুরু হয়েছে, তাই এটিকেই এই ছয়টি সবজি রপ্তানির সুযোগ পাওয়ার চাবি হিসেবে বিবেচনা করছেন রপ্তানিকারকেরা।
সবজি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফভিএলপিইএ) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি জেলার ২০টি স্থানে এরই মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে নানা ধরনের সবজির চাষ শুরু করেছেন রপ্তানিকারকেরা।
সমিতির সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানসম্মত সবজি দিতে পারছিলাম না বলেই ডিএই কিছু পণ্য রপ্তানির অনুমতি দিচ্ছিল না। এখন কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে সেই সব সবজির চাষ শুরু হয়েছে। সেগুলো উঠলেই আবার এসব সবজির রপ্তানি চালু হবে, আমরা আশাবাদী।’
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপীই এখন চুক্তিভিত্তিক চাষকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়। আমদানিকারকেরাও সেটাই চান। সে কারণেই দেশে এই চাষ শুরু হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই চাষকে আরও সম্প্রসারণ করা হবে।’
১০ জেলায় হচ্ছে চুক্তিতে চাষ: রপ্তানিকারক সংগঠনটি বলছে, চুক্তিতে সবজি চাষ করার জন্য দেশের ১০টি জেলার ২০টি স্থান নির্বাচিত করা হয়েছে এবং কাজও শুরু হয়েছে।
নির্বাচিত স্থানের মধ্যে নরসিংদীর আটটি স্থান; নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও কুমিল্লার দুটি স্থান; টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বান্দরবান ও মুন্সিগঞ্জের একটি করে স্থান। এর বাইরে পাবনা কিংবা বগুড়ার একটি স্থানেও চুক্তির ভিত্তিতে চাষ হবে। কোন জেলায় হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর মধ্যে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জে বেগুন; নরসিংদীতে বেগুন, শিম, করলা, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া ও শসা; নারায়ণগঞ্জে লাউ, শিম ও শাক; মুন্সিগঞ্জে করলা ও শাক; গাজীপুরে বরবটি, কাঁকরোল ও শিম; কুমিল্লায় ফ্রেঞ্চ বিন; মানিকগঞ্জে কাঁচা মরিচ; পাবনা বা বগুড়ায় শিম, কাঁচা মরিচ ও পটোল এবং বান্দরবানে বরবটির চাষ হবে।
এখন পর্যন্ত চুক্তিতে চাষের সফলতা বলতে মধুপুরের কুড়াগাছার বেগুন। ১০ অক্টোবর শনিবার সেখান থেকে প্রথম বেগুন তোলা হয়। ওই দিনই ওই খেতের ৫০ কেজি বেগুন যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়। এর মধ্যে আর বেগুন তোলা হয়নি। আগামীকাল বুধবার এই খেত থেকে ৪০০-৫০০ কেজি বেগুন তোলা যাবে বলে আশা করছেন কৃষক ও রপ্তানিকারকেরা।
মধুপুরের কুড়াগাছায় সাত একর জমির ওপর বেগুনের চাষ শুরু হয় গত ১৪ আগস্ট। ১২ জন কৃষক তাঁদের জমি একত্র করে বেগুনের চাষ করেছেন। খেতে প্রায় পোকামুক্ত বেগুন উৎপাদিত হচ্ছে। চাষিদের কাছ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে এখানকার বেগুন কিনছেন রপ্তানিকারকেরা।
মধুপুরের বাইরে নরসিংদীর বেলাব, রায়পুরা ও শিবপুরে চুক্তিতে চাষ করা হচ্ছে শিম। সেখানকার শিম এরই মধ্যে মাচার ওপর উঠে গেছে। তবে অন্যান্য স্থানে এখনো সবজির চাষ শুরু হয়নি।
চুক্তিতে চাষ শুরু করার জন্য একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। ইউকেএইড, ডানিডা ও সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি) ও রপ্তানিকারক সমিতি এটি বাস্তবায়ন করছে। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ডিএই।
প্রকল্পের পরিচালক মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন শীতকালীন সবজির মৌসুম। সবগুলো স্থানেই সবজি চাষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টানা ও ভারী বর্ষণের কারণে সময়মতো বীজ বপন করা যায়নি। অক্টোবরের মধ্যেই বাকি জায়গাগুলোতে সবজির চাষ শুরু হয়ে যাবে।’
কৃষকেরাও বেশ আগ্রহী
বেগুনের খেত সরেজমিনে দেখতে গেলে কুড়াগাছায় চুক্তিতে চাষ শুরু করা কৃষকদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। আগে আনারস, কলা ও ধানের চাষ করেছেন। এখন চুক্তিতে বেগুনের চাষ হচ্ছে।
কেন হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষক চান মিয়া বলেন, ‘আনারস চাষে লাভ হইছিল। কিন্তু বারবার তো এক ফসল ফলানো যায় না। এরপর কলা লাগাইছিলাম। হেই বছর ঝড় হইছিল। নস (লোকসান) হইছে। এখন বেগুন করসি। আমাগোরে কইসে ৩৫ ট্যাকা কইরা কিনব।’
কুড়াগাছায় সাত একর জায়গার ওপর বেগুনের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে চান মিয়ার জমি চার কারা। এক কারা মানে সাড়ে ছয় শতাংশ।
কীভাবে চাষ শুরু হয়, সে সম্পর্কেও বলেন চান মিয়া। বলেন, ‘২৭ রোজার দিন প্রথম চারা নাগাইছি। বৃষ্টিতে ভাসি গেছে। কয়দিন পর আবার নাগাইছি। বৃষ্টিতে সেটাও নষ্ট হই গেছে। কয় দিন পর আবার নাগাইছি। সেটা টিকছে। হেই বেগুনটাই এখন উঠাইতাছি।’
কুড়াগাছার ১২ চুক্তিবদ্ধ চাষির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আলমগীর হোসেন। বলেন, ‘আগে কলার চাষ করতাম। নস হতো। পানামা রোগের কারণে এক হাজার গাছের মধ্যে ৩০০ গাছের কলাই নষ্ট হয়া যাইত। এরপর ধান নাগাইছি। পুঁজি উঠে না। তাই বাদ দিছি। কৃষি অফিসার কইল, সারা বছরই তোমরা ভালো দামে বেগুন বেচতে পারবা। হেই কারণে বেগুন চাষ শুরু করছি।’

Wednesday, September 30, 2015

দেশের ২৪ হিমাগার এখন বন্ধ, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় হিমাগার শিল্পে সংকট বৃদ্ধির আশঙ্কা by আবুল হাসনাত

দেশের ২৪টি হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) বন্ধ হয়ে গেছে। আলু, বীজ, সবজিসহ পচনশীল পণ্য সংরক্ষণে প্রতিষ্ঠিত এসব হিমাগার নিজেরাই এখন রুগ্ণ।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাওয়া, মালিকানাগত জটিলতা, ঋণখেলাপি হয়ে পড়া, চলতি মূলধনের অভাব ও সংরক্ষণ উপযোগী পর্যাপ্ত আলু না পাওয়ার কারণেই হিমাগারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
এ অবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি। সরকারের এ সিদ্ধান্তে দেশের হিমাগার শিল্প হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন হিমাগারের মালিকেরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানোর কারণে ও ব্যাংকঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় প্রতিটি হিমাগার ঋণের ভারে জর্জরিত ও রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হচ্ছে। ২৪টি কোল্ড স্টোরেজ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আরও কোল্ড স্টোরেজ বন্ধ হয়ে যাবে।
হিমাগার সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হিমাগার বন্ধ হয়েছে মুন্সিগঞ্জ জেলায়। এ জেলার পাঁচটি হিমাগার এখন বন্ধ। এগুলো হলো পিজেন্ট ট্রেডিং কোল্ড স্টোরেজ, চান কোল্ড স্টোরেজ, মৌসুমী কোল্ড স্টোরেজ, মীরকাদিম কোল্ড স্টোরেজ ও ময়নামতি আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ।
এরপরই বেশি হিমাগার বন্ধ হয়েছে রংপুরে, চারটি। এগুলো হলো ভরসা স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ, আরভি কোল্ড স্টোরেজ, আজি ভরসা কোল্ড স্টোরেজ ও মাওলানা বশির কোল্ড স্টোরেজ।
কুমিল্লায় বন্ধ হয়েছে তিনটি হিমাগার। এগুলো হলো মডার্ন কংশনগর কোল্ড স্টোরেজ, প্রিমিয়ার কোল্ড স্টোরেজ ও বন্দিশাহী কোল্ড স্টোরেজ।
এ ছাড়া ঢাকার মুন্না কোল্ড স্টোরেজ ও আরগোছী কনজার্ভস, গাজীপুরের ইরিনা অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ, টাঙ্গাইলের মালতি কোল্ড স্টোরেজ, লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মীপুর কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড আইস প্ল্যান্ট, হবিগঞ্জের পাইওনিয়ার কোল্ড স্টোরেজ অ্যান্ড আইস প্ল্যান্ট, সিলেটের সুরমা কোল্ড স্টোরেজ, খুলনার খুলনা আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ, কুষ্টিয়ার কুষ্টিয়া কোল্ড স্টোরেজ, বরগুনার মধুমতি কোল্ড স্টোরেজ, সিরাজগঞ্জের শাহ মুখদুমিয়া কোল্ড স্টোরেজ ও দিনাজপুরের উত্তরা হিমঘর বন্ধ হয়েছে।
এই বন্ধ ২৪টিসহ দেশে এখন হিমাগার আছে ৪০৪টি। এর মধ্যে ২২টি হিমাগার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি)। সেখানে শুধু বীজ সংরক্ষণ করা হয়। দেশের সব হিমাগারে বছরে ৫০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য সংরক্ষণ করার সক্ষমতা আছে।
হিমাগার সমিতি বলছে, দেশে উৎপাদিত আলুর প্রায় অর্ধেকই হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এ বছর হিমাগারে আলু এসেছে ৩৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৪৭ শতাংশ আলুই বাজারে সরবরাহ করা হয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ বিলে রেয়াত পায় না হিমাগার: হিমাগার শিল্প পুরোপুরিই কৃষিভিত্তিক শিল্প। তবে হিমাগার সমিতির অভিযোগ, জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখলেও এ খাত কৃষিভিত্তিক অন্যান্য খাতের মতো সুবিধা পাচ্ছে না।
হিমাগারের মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ছাড়া হিমাগারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। আলু থেকে প্রক্রিয়াজাত ও উৎপাদিত খাদ্য (যেমন ফ্লেক্স, চিপস, ফ্রেঞ্চফ্রাই ইত্যাদি) প্রস্তুতকারী শিল্পকে বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সংস্থা বিএডিসির আওতাভুক্ত ১৭টি হিমাগারও অনেক আগে থেকেই এ সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বেশি সংরক্ষণ করেও বেসরকারি হিমাগারগুলো তা পাচ্ছে না।
একজন হিমাগারের মালিক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘বীজের মোট চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ বিএডিসি সংরক্ষণ করে। কিন্তু সংস্থাটি বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রেয়াত পাচ্ছে। অথচ বেশির ভাগ বীজ আলু সংরক্ষণের পরও আমরা তা পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ রেয়াত দেওয়ার আইন থাকলেও হিমাগার শিল্পকে এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এটা না পেলে সবগুলো কোল্ড স্টোরেজই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
জসিম উদ্দিন আরও বলেন, এবারের বাজেটে হিমাগারের বিদ্যুৎ বিলের ওপর থেকে ৫ শতাংশ মূসক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করায় হিমাগারের মালিকেরা আশান্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন বিদ্যুতের দাম নতুন করে বাড়ানোয় তাঁরা হতাশ।

ঢাকায় কম দামেই চামড়া বিক্রি: ঠকেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী লাভবান ট্যানারি মালিক by আবুল হাসনাত

ঢাকার পোস্তা এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়ায়
লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজ করছেন শ্রমিকেরা
কোরবানির পশুর চামড়া এবার বিক্রি হয়েছে খুবই কম দামে। এতে ট্যানারি মালিকেরা লাভবান হলেও ঠকেছেন পাড়া-মহল্লার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে খুব বেশি দামে চামড়া কেনেননি আড়ত মালিক ও ট্যানারি মালিকেরা। সে কারণে বেশি দাম দিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন ঠিকই, কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন। অনেকেই কেনা দামের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করেছেন।
অন্যদিকে ভালো দাম পাওয়ার আশায় চামড়া নিয়ে এ জায়গায়, ও জায়গায় ঘোরাঘুরি করা এবং যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে ২০ শতাংশ চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার ঢাকায় কোরবানি হওয়া গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়া ৫০-৫৫ আর ঢাকার বাইরের গরুর চামড়া ৪০-৪৫, খাসির চামড়া ২০-২২ ও বকরির চামড়ার দাম ঠিক করা হয় ১৫-১৭ টাকা।
বিশ্ববাজারে প্রস্তুত চামড়ার দাম কমে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম দাম নির্ধারণ করে ট্যানারি মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ প্রস্তুত চামড়া, চামড়া পণ্য ও জুতা রপ্তানিকারক সমিতি (বিএফএলএলএফইএ) ও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।
হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবছরই কোরবানির সময় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ার বাজারটা অস্থির করে ফেলেন। তাঁরা মনে করেন যে দামেই কিনুক না কেন সেটা তো আমরা কিনবই। কিন্তু এবার আমরা নির্ধারিত দামের বাইরে খুব একটা যাইনি। তাই লাভের কথা ভেবে যাঁরা বেশি দামে চামড়া কিনেছেন, তাঁরা লোকসান দেবেন।’
দাম কম হওয়ায় খুশি ট্যানারি মালিকেরা। বিটিএর সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, এবার যে দামে চামড়ার বেচাকেনা হয়েছে তা ঠিকই আছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তো লোকসান দিচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না। কারণ তাঁরাও কম দামেই কেনেন।’
দাম নিয়ে পাল্টাপাল্টি: ঈদের দিন রাজধানীর গ্রিন রোডের ল্যাবএইড হাসপাতালের মোড়ে কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর চামড়ার দাম ২০০-৩০০ টাকা কম। ব্যবসায়ীরা তাঁদের কাছ থেকে চামড়াও কিনছেন কম।
রাজধানীর গ্রিন রোডের ইকরাম কবির প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘গত বছর একটু বড় গরুর চামড়া ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার তা ২০০০ টাকাও বলছেন না কেউ। চামড়া ব্যবসায়ীরা মনে হয় সিন্ডিকেট করছেন।’
তবে লালবাগের পোস্তার আড়ত মালিকেরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এবার চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেভাবেই চামড়া কিনতে বলা হয়েছে। বেশি দামে চামড়া কিনলে তাঁদের কাছ থেকে ট্যানারি মালিকেরা এই চামড়া কিনবেন না। তাই তাঁরা হিসাব করে চামড়া কিনছেন।
এতেই কপাল পুড়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। তাঁরা যে চামড়া ২০০০ টাকায় কিনেছেন বিকেল থেকে ঘুরে ঘুরে, শেষ পর্যন্ত রাতে ওই চামড়া ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাঁদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের দিন দুপুরের দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব ও জিগাতলায় কয়েকজন ব্যবসায়ী মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি দামেই চামড়া কেনেন। কিন্তু বিকেলে ওই একই ব্যবসায়ীর কাছে চামড়া নিয়ে গেলে তিনি আর আগের মতো বেশি দামে চামড়া কিনতে রাজি হননি।
রাজধানীর পোস্তায় গতকাল রোববার গরুর ছোট আকারের চামড়া ৫০০-৮০০, মাঝারি চামড়া ১২০০-১৫০০ ও বড় চামড়া ১৮০০-২২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বড় আকারের ভালো মানের কিছু চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৪০০-২৫০০ টাকায়। ঈদের পরদিন শনিবারও প্রায় একই দামে চামড়ার বেচাকেনা চলেছে।
এবার ৫০-৫৫ লাখ গরুর চামড়া এবং ৩০-৩৫ লাখ মহিষ-ছাগল-খাসির চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। ঢাকা থেকে আসবে ১০-১২ লাখ গরুর চামড়া।
তবে ঢাকা থেকে এবার গত বছরের চেয়ে ৫-৭ শতাংশ কম চামড়া সংগৃহীত হবে বলে ধারণা করছেন আড়তদারদের সংগঠনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। তাঁর মতে, ঢাকায় গরু কম কোরবানি হয়েছে। অবশ্য ঈদের দিন থেকে এ পর্যন্ত পোস্তায় তিন লাখের বেশি চামড়া এসে গেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চামড়ার চাহিদার ৪৮ শতাংশ সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে।

Wednesday, August 19, 2015

বন্ধ পাটকল চালু করা মারাত্মক ভুল! by আবুল হাসনাত

২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ পাট খাতকে লাভজনক করার অঙ্গীকার করেছিল। তারপর পাঁচটি বন্ধ পাটকল চালু করে সরকার। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজেই উদ্বোধন করেছিলেন খুলনায় খালিশপুর জুট মিলস। এরপর ২০১৪ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ জানায়, পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। আর এর দেড় বছরের মাথায় অর্থমন্ত্রী বললেন, বিলুপ্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালু করা ছিল সরকারের মারাত্মক ভুল।
সরকারের ভাষ্য, পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটলেও সরকারি পাটকল নিজের অর্থে চলতে পারছে না। পুনরুজ্জীবনের নামে সরকারি পাটকলে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া ৩৫ হাজার শ্রমিকের মধ্যে ২২ হাজারই প্রয়োজনের অতিরিক্ত। ফলে বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে পাট কেনা পর্যন্ত প্রায় সব কাজেই বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনকে (বিজেএমসি) হাত পাততে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এখন আর নতুন করে অর্থ দিতে রাজি নন।
বিজেএমসির পক্ষে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ঈদুল ফিতরের আগে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ এ বিষয়ে সারসংক্ষেপ তৈরি করে অর্থমন্ত্রীকে দেন। ওই সারসংক্ষেপে নিজের হাতে অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, ‘সরকার বিলুপ্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালু করে মারাত্মক ভুল করেছে বলে আমার মনে হয়। ব্যক্তিমালিকানা খাতে পাট পুনরুজ্জীবিত হয় এবং তারা বেশ ভালোই করছিল। সরকারি মিল চালু করার পর থেকেই পুরো পাট খাতের অবস্থা দিন দিন খারাপই হচ্ছে। সরকারি পরিচালনার দুর্বলতাই এর জন্য দায়ী। এই ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন না করে টাকা প্রদান শুধু লোকসানের বোঝা ভারী করবে। পাট মন্ত্রণালয়কে এভাবেই জানাতে হবে। প্রয়োজনে চিঠি আমিই লিখতে পারি।’
পাট খাতকে উজ্জীবিত করতে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিজেএমসিকে ৫ হাজার ৪৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দিয়েছে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পাট মন্ত্রণালয়/বিজেএমসির সই হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বিজেএমসির জন্য আর কোনো সরকারি অর্থ বরাদ্দ চাইতে পারবে না পাট মন্ত্রণালয়/বিজেএমসি।
পাট খাতের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে সরকার ২০১১ সালে বিজেএমসিকে প্রথম ১০৫ কোটি টাকা দিয়েছিল। এর পুরোটাই চলে যায় দুটি বন্ধ পাটকল চালু করতে। এগুলো হলো সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস (সাবেক কওমী জুট মিলস) ও খুলনার খালিশপুর জুট মিলস (সাবেক পিপলস জুট মিলস)। বিজেএমসি নিজস্ব অর্থায়নে ৭২ কোটি ৫০ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও তিনটি বন্ধ পাটকল চালু করে। এগুলো হলো চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী জুট মিলস ও ফোরাম-কর্ণফুলী কার্পেটস ফ্যাক্টরি এবং খুলনার দৌলতপুর জুট মিলস।
বিজেএমসি বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সময়ে সরকারি পাটকলে নতুন করে ৩৫ হাজার শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ২২ হাজারই প্রয়োজনের অতিরিক্ত। এই শ্রমিকদের জন্য বিজেএমসির বছরে খরচ হচ্ছে ২৫০ কোটি টাকা। আবার কাঁচা পাটের অভাবে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে। বছরের অধিকাংশ সময়ই মাত্র ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ তাঁত চালানো সম্ভব হয়েছে। কারণ, অর্থসংকটের কারণে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার ৩৩ শতাংশ পাট কিনতে পেরেছে সংস্থাটি।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে খানিকটা একমত ২০১০ সালে সরকারের গঠিত পাট কমিশনের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্ধ পাটকল পুনরায় চালু করা ভুল হয়েছে, তা আমি সরাসরি বলব না। কারণ, আমরা পাট কমিশনের প্রতিবেদন তৈরির সময় দেখেছিলাম, এর চাহিদা আছে। কিন্তু দক্ষ ব্যবস্থাপনা না থাকলে তো বাজার ধরা যাবে না। এসব পাটকল চালানোর জন্য দক্ষ লোক পাওয়া যায়নি। অন্য লোক দিয়ে চালাতে হয়েছে। সে কারণেই সমস্যা হয়েছে। তবে যেহেতু সরকার যেভাবে চেয়েছিল, সেভাবে পাটকলগুলো দাঁড়ায়নি; তাই এক অর্থে বলা যায়, ভুল ছিল।’
এসব বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ূন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী আমাদের পাটের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম ছিল পাটশিল্প পুনরুজ্জীবিত করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একের পর এক বন্ধ পাটকল চালু করেছেন। অন্যান্য বন্ধ কলকারখানা চালু করার বিষয়ে ওনার নির্দেশনাও আছে। এই অবস্থায় উনি (অর্থমন্ত্রী) কীভাবে বলেন যে বন্ধ পাটকল চালু করে ভুল হয়েছে।’
বিজেএমসি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়: ঈদের আগে পাট মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিজেএমসির জন্য ১ হাজার ২০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থ বিভাগ তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে চরম হতাশা ও উত্তেজনা চলছে। যেকোনো সময় পাটকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে পাট মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি ও উৎসব ভাতা দিতে ২০০ কোটি এবং পাট কিনতে ৫০০ কোটি মোট ৭০০ কোটি টাকা জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই সারসংক্ষেপটি তৈরি করেন অর্থসচিব। তাতে বলা হয়, ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিজেএমসিকে লাভজনকভাবে পরিচালনার জন্য পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসি একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিজেএমসির যাবতীয় দায়দেনা (বকেয়া মজুরি-বেতন-স্টোর বিল ও যাবতীয় ঋণ) পরিশোধ করতে ৫ হাজার ২৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা দেয়। এই আর্থিক সহায়তা দিলে ভবিষ্যতে বিজেএমসির জন্য আর কোনো সরকারি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হবে না এবং আরও কয়েকটি শর্তে পাট মন্ত্রণালয়/বিজেএমসি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়।
সারসংক্ষেপে আরও বলা হয়, এরপরও বিজেএমসিকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তিন দফায় ২০০ কোটি দেওয়া হয়। ফলে বিজেএমসিকে দেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
অর্থসচিবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বিজেএমসির কাঁচা পাট কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ ক্ষেত্রে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ‘অনুন্নয়ন খাতের নগদ ঋণ’ খাত থেকে পাট কেনার জন্য এ বছর ১০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তা নাকচ করে দেন। যদিও পরে ওই অর্থ দেওয়া হয়েছে। এরপরেও ৬ আগস্ট পাট কেনার জন্য ৪০০ কোটি টাকা চেয়ে আবারও চিঠি দিয়েছে বিজেএমসি।

Saturday, July 18, 2015

বড় হচ্ছে ঈদের অর্থনীতি, বেড়েছে কেনার সামর্থ্য by আবুল হাসনাত ও শুভংকর কর্মকার

কার্টুন: শিশির -প্রথম আলো
সময় অনেকটাই পাল্টে গেছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ সদ্যই নিম্নমধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মানুষের আয় আগের চেয়ে বেড়েছে। বেড়েছে কেনার সামর্থ্যও। আর এই কেনার সামর্থ্যকে পুঁজি করে বেড়ে গেছে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। বড় হচ্ছে ঈদের অর্থনীতিও। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ঈদকেন্দ্রিক এই অর্থনীতির আকার ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিস্তার এখন শাড়ি থেকে শুরু করে গাড়িতে গিয়েও ঠেকেছে। ঈদের এই অর্থনীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদায়ও বৈচিত্র্য এসেছে। ঈদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এত দিন পোশাক আর জুতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন মানুষ ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন কিনছে, তেমনি উপহার দিচ্ছে। আবার অনলাইনে ব্যবসা (ই-বিজনেস) বেড়েছে, এমনকি দেশে-বিদেশে ভ্রমণেও যাচ্ছে। সিপিডির এই গবেষক আরও বলেন, ঈদের অর্থনীতির আকার যা-ই হোক না কেন, দেশের ভেতরে এর মূল্য সংযোজন কতটুকু, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পণ্যই এ উপলক্ষে আমদানি হয়ে আসে। তবে ঈদকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটায় শহর ও গ্রামে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির বড় অংশজুড়েই পোশাকেরই রাজত্ব। ঈদ এবং পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করেই দেশে গড়ে উঠেছে ফ্যাশন হাউসকেন্দ্রিক বেশ বড় দেশীয় পোশাকশিল্প। দেশে সাড়ে চার হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস আছে। এর বেশির ভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ফ্যাশন হাউসগুলোতে বছরে আনুমানিক ছয় হাজার কোটি টাকার পোশাক বেচাকেনা হয়। সারা বছর তাঁদের যে ব্যবসা হয়, তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে।
এফইএবির পরিচালক (অর্থ) ও ফ্যাশন হাউস রঙ-এর অন্যতম কর্ণধার সৌমিক দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবছরই ফ্যাশন হাউসগুলোর বিক্রি বাড়ছে। এবারও বিক্রি হচ্ছে। তবে যতটা আশা করেছিলাম, ততটা হয়নি।’ এমন অনুকূল পরিবেশেও কেন বিক্রি ভালো হচ্ছে না—জানতে চাইলে সৌমিক দাসের জবাব, ফ্যাশন হাউসগুলো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। এর বাইরেও ঈদের পোশাকের একটা বিরাট বাজার আছে। সেটি আবার দখল করে আছে ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা নানা পোশাক। ওই বাজারটা কত বড়—এমন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, এটা তাঁদের বিক্রির অন্তত তিন গুণ হবে। সব মিলিয়ে এই পোশাকের বাজার ১৫ হাজার কোটি টাকার মতো বলেই মনে করছেন দেশীয় পোশাকের কয়েকটি বড় পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা। সালোয়ার-কামিজ, শার্ট-প্যান্ট, শাড়ি-লুঙ্গির কাপড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের থান ও গজ কাপড়ের সম্ভার ইসলামপুর এখন দেশের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নিবন্ধিত ছোট-বড় দোকানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। এর বাইরে আছে আরও দুই হাজার ছোট-মাঝারি দোকান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইসলামপুরে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ কোটি টাকার কাপড়ের ব্যবসা হয়। ঈদের আগে কখনো কখনো তা শতকোটি টাকায়ও গিয়ে ঠেকে। ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের অনুমান, এখানে বছরে ১৮-২০ হাজার কোটি টাকার পোশাকের বেচাকেনা হয়। এর ৩০-৪০ শতাংশ বিক্রি হয় রোজার মাসে।
জানতে চাইলে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার ঢালী প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার দোকানগুলোতে শবে বরাতের পর থেকে ১৫ রমজান পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকে। তবে এবার বিক্রি একটু কম। কারণ অনেক ব্যবসায়ীই এখন নরসিংদীর বাবুরহাট এবং রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া থেকে কাপড় কিনে নিয়ে আনেন। দেশে পাইকারি কাপড়ের আরেক বড় বাজার নরসিংদীর বাবুরহাটে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, শার্ট পিস, প্যান্ট পিস, থানকাপড়, পাঞ্জাবির কাপড়, গামছা, বিছানার চাদরসহ সব কাপড়ই পাওয়া যায়। এমনিতে এখানে প্রতি শুক্র, শনি ও রোববার হাট বসলেও ঈদের আগে হাট প্রতিদিনই জমজমাট। বাবুরহাট বণিক সমিতির সভাপতি জি এম তালেব হোসেন জানান, গত তিন ঈদে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেচাকেনা বেশি হয়নি। তবে এবারের বিক্রি ভালো। প্রতি হাটেই সাত-আট শ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হচ্ছে।
ঈদের বাহারি পাদুকা: পোশাকের পর ঈদে বেশি চাহিদা থাকে পাদুকার। পছন্দের স্যান্ডেল ও জুতা ছাড়া যেন ঈদই হয় না। এটি মাথায় রেখেই ঈদুল ফিতরের আগে এবার সারা দেশে অন্তত ২০টি শোরুম খুলেছে পাদুকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। জানা যায়, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২০ কোটি জোড়া পাদুকা বিক্রি হয়। পাদুকার স্থানীয় বাজার বছরে আনুমানিক চার হাজার কোটি টাকার। সারা বছর যত পাদুকা বিক্রি হয়, তার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরে। সে হিসাবে, আনুমানিক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার পাদুকা বিক্রি হয় ঈদে। এই হিসাব দিয়েছেন পাদুকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বে এম্পোরিয়ামের প্রধান নির্বাহী আবদুল কাদের। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাটার বিপণন ব্যবস্থাপক থাকাকালে দেশে পাদুকার বাজারের আকার নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি।
শতকোটি ছাড়ানো সেমাইয়ের বাজার: ঈদ আপ্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাই। লাচ্ছা সেমাই, বাংলা সেমাইসহ নানা ধরনের সেমাই ঈদের দিন পরিবেশিত হয়। সেমাই প্রস্তুতকারক বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরে দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ কেজি সেমাইয়ের চাহিদা থাকে। বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের ২০০ গ্রামের প্যাকেট ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সর্বনিম্ন দাম ধরলেও ঈদে সেমাই বেচাকেনা হয় আনুমানিক ১০৫ কোটি টাকার। পুরান ঢাকার কয়েকজন সেমাই ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীতে এখনো শতাধিক কারখানায় সেমাই তৈরি হয়। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বড় বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানও এখন সেমাই তৈরিতে এগিয়ে এসেছে।
কেনার তালিকায় অলংকার: ঈদের পরপরই বিয়েশাদির ধুম পড়ে। তাই অনেকে ঈদের আগেই বিয়ের গয়লা-অলংকার কেনেন। আর ঈদ উপলক্ষে গয়না উপহার দেওয়া তো আছেই। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) বলছে, সারা দেশে ১০ হাজার জুয়েলারির দোকান আছে। রমজান মাসে প্রতিটি দোকানে কমবেশি দুই ভরি করে বিক্রি হলেও ২০-২৫ হাজার ভরি স্বর্ণালংকার বেচাকেনা হয়েছে। টাকার অঙ্কে তা দাঁড়ায় ৯০ থেকে ১০০ কোটি। বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোজার ঈদের পর কোরবানির ঈদ পর্যন্ত অনেক বিয়েশাদির অনুষ্ঠান হয়। এর কার্যাদেশ রমজান মাসেই পান ব্যবসায়ীরা। তাই কম করে হলেও রমজান মাসে ২০-২৫ হাজার ভরি স্বর্ণালংকার বেচাবিক্রি হয়।’
ঈদে এখন নতুন গাড়ি: ঈদ সামনে রেখে লোকজন এখন গাড়িও কেনেন। এর সংখ্যাও কম নয়। এর প্রমাণ মেলে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের সংগঠন বারভিডার তথ্যে। সংগঠনটি বলছে, এই রমজানে সারা দেশে এ পর্যন্ত ৩৫০টি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বিক্রি এবং কার্যাদেশ পাওয়া গেছে। ঈদ পর্যন্ত তা ৪০০-তে গিয়ে ঠেকবে। বারভিডার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেক গাড়ি একেক দামের। তবে গড়ে ২০ লাখ টাকা ধরলে এই ঈদে প্রায় ৮০ কোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হয়েছে।’ তবে গত ঈদে গাড়ির ব্যবসা আরও ভালো ছিল বলে জানান বারভিডার সাধারণ সম্পাদক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত রোজায় ৫০০ থেকে ৫৫০টি গাড়ি বিক্রি হয়। প্রতিটি গাড়ির দাম গড়ে ১৮ লাখ টাকা ধরলে গত বছর অন্তত ৯০ কোটি টাকার গাড়ি বিক্রি হয়।
বেচাকেনা চলে ঈদমেলায়ও: একসময় শুধু পয়লা বৈশাখকে ঘিরে মৌসুমি মেলার আয়োজন করা হতো। এখন একই ধরনের মেলা বসে ঈদুল ফিতরের আগেও। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদের সপ্তাহ খানেক এমন মেলা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানে মেলা চলে রমজান মাসব্যাপী। এসব মেলায় শাড়ি, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজের পাশাপাশি পাদুকা, ব্যাগসহ অলংকারের বেচাকেনাও চলে। তবে মেলায় কী পরিমাণ পণ্য বেচাকেনা হয়, তার কোনো পরিসংখ্যান মেলেনি। বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুতকারকের ধারণা, সাত দিনের এসব মেলায় বেচাবিক্রিও কম হয় না।

Tuesday, March 3, 2015

নতুন বিপদে পাটকল- জুট ব্যাচিং তেলের দাম ৪২% বৃদ্ধি by আবুল হাসনাত

জুট ব্যাচিং তেলের (জেবিও) দাম ছিল প্রতি লিটার প্রায় ৬৮ টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এই তেলের দাম বাড়িয়ে করেছে ১১০ টাকা। দাম বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জেবিওর নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে।
এই জুট ব্যাচিং তেল শুধুই ব্যবহার করে দেশের পাটকলগুলো। পাটের আঁশ নরম করা এবং জট ছাড়ানোর কাজে এই তেল ব্যবহার হয়। ফলে দাম বাড়ানোর কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিপাকে পড়েছে ক্রমাগত রুগ্ণ হতে থাকা দেশের পাটকলগুলো।
বিপিসি বলছে, দাম কম হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সয়াবিন তেলের সঙ্গে জেবিও মিশিয়ে বাজারজাত করছিল। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটি বন্ধ করতেই জেবিওর দাম বাড়ানো হয়েছে।
তবে পাটকলমালিকেরা বলছেন, জেবিওতে কেরোসিনের গন্ধ থাকে। তাই ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা যদি সয়াবিন তেলের সঙ্গে এই তেল মিশিয়ে বিক্রিও করেন, তাহলেও মানুষ তা কিনবে না। আর নজরদারি না বাড়িয়ে জেবিওর দাম বাড়ানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
এ বিষয়ে সরকারি পাটকলগুলোর পরিচালনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান হুমায়ুন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই তেলের দাম বাড়ানোর ফলে আমাদের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। পাট খাতের ক্রেতারা পাঁচ সেন্টের জন্য অন্য কোম্পানির কাছে, এমনকি অন্য দেশেও চলে যায়। সেখানে এখন তো পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাবে। ফলে এই তেলের দাম বাড়ানো হলে আমাদের ক্রেতারা ভারতে চলে যাবে।’
পাট-সুতা রপ্তানিকারকদের সমিতি বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি মো. শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমনিতেই আমাদের শিল্প চলছে না। সিনথেটিকের কারণে আমরা বিশ্ববাজারে মার খাচ্ছি। রপ্তানি কমে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আমরা আশা করেছিলাম জুট ব্যাচিং তেলের দাম সরকার কমিয়ে দেবে। কিন্তু উল্টো এর দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো। সয়াবিন তেলের সঙ্গে জেবিও মেশানো হচ্ছে, এমন সন্দেহই যদি বিপিসি করে, তাহলে এই তেল যেন পাটকলের বাইরে না যায় সে বিষয়ে তারা নজরদারি বাড়াক।’
এই অবস্থায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় জেবিওর দামের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। এদিকে এই তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে আগামীকাল রোববার বিজেএসএর নেতাদের সঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যানের একটি বৈঠক হওয়ার কথাও রয়েছে।
জানতে চাইলে এ এম বদরুদ্দোজা প্রথম আলোকে বলেন, জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে জেবিওর দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম কম থাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সয়াবিন তেলের সঙ্গে জেবিও মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করত। এটা মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এ ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে বিপিসি নজরদারি বাড়াতে পারত—এমন মন্তব্য করলে তিনি বলেন, নানা পর্যায়ে জেবিও বাইরে চলে যেতে পারে। বিপিসি এত পর্যায়ে তদারকি কীভাবে করবে?
বাড়বে উৎপাদন ব্যয়: দেশে এখন ২৪৮টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে বিজেএমসির অধীনে ২৬টি, বেসরকারি খাতে ১২৫টি পাটকল এবং ৯৭টি পাট-সুতাকল আছে।
পাটকল সমিতিগুলোর সূত্র বলছে, দেশের পাটকলগুলোতে প্রতিবছর ১০ লাখ টনের বেশি পাটপণ্য উৎপাদিত হয়। এক টন পাটপণ্য উৎপাদন করতে অন্তত ৩ শতাংশ বা ৩০ কেজি জেবিওর প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন জেবিওর চাহিদা রয়েছে।
অন্যদিকে বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে জেবিও ১৯ হাজার ১৬৫ টন, ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় ২৬ হাজার টন এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিক্রি হয় ২৩ হাজার ৫৩৮ টন তেল।
তবে গত কয়েক বছরে দেশে নতুন বেশকিছু পাটকল স্থাপিত হয়েছে। তাতেও জেবিওর চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে।
এই জেবিও দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। আর জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মাধ্যমে এই জেবিও বিপণন করা হয়।
জেবিওর দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের পাটকল খাতে কেমন প্রভাব পড়বে তার একটি হিসাব করেছে বিজেএসএ। বিষয়টি উল্লেখ করে কয়েক দিন আগে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে চিঠিও দিয়েছে সংগঠনটি। এসব চিঠি থেকে জানা যায়, আগের দাম অনুযায়ী দেশের পাটকলগুলোতে প্রতিবছর জেবিও বাবদ ব্যয় হতো ২৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন দামে জেবিও কিনতে হলে পাটকলগুলোকে ব্যয় করতে হবে ৩৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়ায় পাটকলগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে ১৪৭ কোটি টাকা।
বিজেএমসিও ১৫ ফেব্রুয়ারি পাট মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। তাতে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, তাদের পাটকলগুলোতে প্রতি মাসে ১২ লাখ লিটার জেবিও লাগে। আগের দাম অনুযায়ী এর দাম পড়ে সাড়ে আট কোটি টাকা। আর বর্তমান দামে এই তেল কিনতে খরচ পড়বে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এখন বেশি ব্যয় হবে পাঁচ কোটি টাকা।
একটি হিসাব করেছে বেসরকারি পাটকলগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ পাটকল সমিতিও (বিজেএমএ)। সংগঠনটি বলছে, জেবিওর দাম বাড়ার কারণে তাদের আওতাধীন পাটকলগুলোতে বছরে এখন ২২ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে।
বিজেএমএর সচিব এ বারিক খান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের সমিতির ৪০ থেকে ৪৫টি পাটকল অত্যন্ত রুগ্ণ অবস্থায় আছে। এগুলো হয় বন্ধ, না হয় বন্ধ হওয়ার পথে। এ অবস্থায় জেবিওর দাম বাড়ানোর কারণে এসব পাটকল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
পাটকলমালিকদের সূত্র বলছে, বিজেএমসি, বিজেএসএ, বিজেএমএ এবং বিজেএর নেতারা ১৫ ফেব্রুয়ারি জেবিওর দাম নিয়ে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তাঁরা পৃথকভাবে জেবিও এবং জেবিওর সঙ্গে সয়াবিন তেল মিশিয়ে নিয়ে যান। তাঁরা ওই মেশানো তেলটা প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেন। তিনি ওই তেলের গন্ধ শুঁকে বলেন, ‘এই তেল খাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কেরোসিনের গন্ধের জন্য তো এই তেল খাওয়াই যাবে না।’ সে কারণে তিনিও সয়াবিন তেলের সঙ্গে জেবিও মিশিয়ে বিক্রি করার দাবি অযৌক্তিক বলে মত দেন। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন তিনি। খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী দাম কমানোর মৌখিক আশ্বাসও দিয়েছেন।
তবে বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত জেবিওর দাম পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা নেই। দাম বাড়ানোর ফলে পাটকলগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে জানালে বিপিসির চেয়ারম্যানও বলেন, ব্যয় তো কিছুটা বাড়বেই।
জেবিও ছাড়া পাট নরম করা যায় না। ফলে পাটকলগুলো এই তেল ছাড়া কোনো পাটপণ্যই উৎপাদন করতে পারে না
* দেশে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টন জুট ব্যাচিং তেলের চাহিদা রয়েছে।
* তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাটকলগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে ১৪৭ কোটি টাকা।
“সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত জেবিওর দাম পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা নেই।
এ এম বদরুদ্দোজা
চেয়ারম্যান, বিপিসি

“এই তেলের দাম বাড়ানোর ফলে পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। পাট খাতের ক্রেতারা ৫ সেন্টের জন্য অন্য কোম্পানি এমনকি অন্য দেশেও চলে যায়।
হুমায়ুন খালেদ
চেয়ারম্যান, বিজেএমসি

Monday, February 9, 2015

সংকটে দেশীয় সিরামিক শিল্প- হরতাল-অবরোধে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র by আবুল হাসনাত

চলমান টানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের সিরামিক খাতে প্রতিদিন ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সে হিসাবে গত ৩০ দিনে এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।
এ তথ্য বাংলাদেশ সিরামিক ওয়্যারস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের। সংগঠনটি বলছে, তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি এবং সারা দেশে সরবরাহ বেশ কমে গেছে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে তিন-চার গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। আবার বিক্রি না হওয়ায় কারখানায় পণ্য জমে গেছে। ফলে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিরামিক প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ক্ষতিটা হচ্ছে কয়েকভাবে। প্রথমত আমরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল কারখানায় আনতে পারছি না। আবার রপ্তানির জন্য সিরামিক পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে পারছি না। আবার উৎপাদিত পণ্য সারা দেশে পৌঁছাতে পারছি না। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সব ক্ষেত্রেই আমাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।’
কারখানায় পণ্যের প্রচুর মজুত জমেছে মন্তব্য করে ইরফান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কিন্তু চুল্লি বন্ধ রাখতে পারি না। গ্যাস কিন্তু ঠিকই পুড়ছে। ফলে আমাদের উৎপাদন চালিয়ে যেতেই হয়। আগে যেখানে ৭০ হাজার ইউনিট পণ্য উৎপাদন হতো, এখন হচ্ছে ৪০ হাজার ইউনিট।’
দেশে বর্তমানে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সিরামিক পণ্য প্রস্তুত করে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর সিরামিক পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। আর দেশে এই পণ্যের বাজার আনুমানিক আড়াই হাজার কোটি টাকার। সিরামিকশিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সিরামিক প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, হরতাল-অবরোধে বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ থাকে, খোলা থাকলেও ক্রেতা থাকে না। আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকভাবে পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সিরামিক পণ্যের বিক্রি ও সরবরাহ কমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এর আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। আবার আমদানি করা কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন-চার গুণ অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনে দৈনিক লোকসান হচ্ছে গড়ে ২০ লাখ টাকা। এসব কারণে উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে অনেক কারখানাই এখন কাঁচামালের সংকটে পড়েছে। একদিকে ট্রাকের সংকট, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় আমদানি করা কাঁচামাল বন্দর থেকে আনা যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানায় কাঁচামালের মজুত শেষ হয়ে গেছে। আবার সিরামিক পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে প্রস্তুত পণ্যের মজুত জমে গেছে। এসব পণ্য এখন রাখাও যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত পণ্যের মজুত জমে যাওয়ায় এবং কাঁচামালের ঘাটতির কারণে এরই মাধ্যে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় কারখানার পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংগঠনটি বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা দেশে আসছে না। সে কারণে রপ্তানির নতুন কাজও পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু রপ্তানির কাজ আছে, পরিবহন সমস্যার কারণে তা-ও সময়মতো রপ্তানি করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা এ দেশি পণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এসব কারণে কিছু কাজ এরই মধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। এতে সামনের দিনগুলোতে সিরামিক পণ্যের রপ্তানি দ্রুত কমে যাবে। সিরামিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের দিকে যাচ্ছে।
সমিতির নেতারা বলছেন, চলমান অস্থিরতায় পণ্য বিক্রি না হলেও কারখানার ব্যয় কমেনি। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে সুদসহ ব্যাংকঋণের কিস্তির টাকা। ফলে উৎপাদন চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন ঋণখেলাপি হওয়ার পথে।
সে কারণেই সংগঠনটির নেতারা এখন ব্যাংকঋণের বিপরীতে আগামী ছয় মাস পর্যন্ত সুদ মওকুফ এবং আগামী এক বছর পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ নবায়ন করার সুযোগ দেওয়ার জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশনা জারি করার দাবি করছেন।

Tuesday, December 23, 2014

সরকারি ২৬ পাটকল বন্ধ হওয়ার শঙ্কায় by আবুল হাসনাত

বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) টাকার অভাবে চলতি মৌসুমে ঠিকমতো পাট কিনতে পারেনি। এ কারণে আগামী দুই মাসের মধ্যে সরকারি ২৬টি পাটকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে খোদ রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি। দেশে এখন ২৬টি সরকারি পাটকল আছে। বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে এসব পাটকল পরিচালিত হয়। পাটকলগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে কাজ করেন ৮০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা। তাঁদের বেতন পরিশোধে প্রতি মাসে বিজেএমসির ব্যয় হয় ৬০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ূন খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় এবার আমরা খুবই কম পাট কিনতে পেরেছি। আমাদের পাটকলগুলোতে এখন গড়ে ২০-২৫ দিনের উৎপাদন চালানোর মতো পাট মজুত আছে। এরপর কী হবে আমি জানি না।’ তখন িক তাহলে পাটকল বন্ধ হয়ে যাবে? জানতে তাইলে তাঁর জবাব, ‘তা-ই তো হবে।’
জুলাই থেকে অক্টোবর হচ্ছে পাট কেনার মৌসুম। তবে পাটকলগুলো নভেম্বর পর্যন্ত পাট কিনে থাকে। এ সময়ের মধ্যেই মৌসুমে উৎপাদিত পাটের বড় একটি অংশ কেনা হয়ে যায়। নভেম্বরের পর খুবই সীমিত পরিসরে পাট কেনাবেচা হয়ে থাকে। বিজেএমসি সূত্র বলছে, চলতি ২০১৪-১৫ মৌসুমে ২৬ লাখ কুইন্টাল (১০০ কেজিতে এক কুইন্টাল) পাট কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বিজেএমসি। তবে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি পাট কিনতে পেরেছে প্রায় পাঁচ লাখ কুইন্টাল, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৮ শতাংশ। এখন সীমিত পরিসরে কিছু পাট কেনা হচ্ছে। তবে যেভাবে চলছে, তাতে সব মিলিয়ে কোনোভাবেই লক্ষ্য-মাত্রার ২৫ শতাংশের বেশি পাট কেনা সম্ভব হবে না।
গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিজেএমসি ২৪ লাখ ৩৯ হাজার কুইন্টাল পাট কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। শেষ পর্যন্ত কেনা হয় ১৬ লাখ কুইন্টাল পাট। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত পাঁচ লাখ কুইন্টাল পাট কিনতে পারলেও গত বছর এ সময়ে বিজেএমসি পাট কিনেছিল এর দ্বিগুণের বেশি, প্রায় ১২ লাখ কুইন্টাল। বিজেএমসি বলছে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবেই সংস্থাটি এবার চাহিদা অনুযায়ী পাট কিনতে পারেনি। এ কারণে এই মৌসুমের পাট যেন ঠিকমতো কেনা যায়, সে জন্য সংস্থাটি ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত জুনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় তিন দফায় বরাদ্দ দিয়েছে ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রোজার ঈদের আগে ১০০ কোটি এবং কোরবানির ঈদের আগে-পরে ৫০ কোটি করে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই অর্থের একটি বড় অংশই আবার শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধেই ব্যয় হয়ে গেছে।
বিজেএমসি বলছে, পাট ওঠার পর এর দাম কিছুটা কম ছিল। গত জুলাইতে সংস্থাটি প্রতি মণ পাট ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকায় কিনেছে। কিন্তু সে সময় টাকা না থাকায় বিজেএমসি যথেষ্ট পরিমাণে পাট কিনতে পারেনি। পরে পাটের দাম বেড়ে যায়। প্রতি মণ পাটের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়। ফলে বেশি দামে সংস্থাটিকে পাট কিনতে হয়েছে।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান হুমায়ূন খালেদ বলেন, ‘বেশি দামে পাট কিনতে হচ্ছে বলে আমরা বেশি পাট কিনতে পারিনি, আবার আমাদের বেশ লোকসানও হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে যদি চার মাস আগে আমরা টাকা পেতাম এবং আরেকটু বেশি পেতাম, তাহলে এত দিনে লক্ষ্যমাত্রার অন্তত ৫০-৬০ শতাংশ পাট কেনা হয়ে যেত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এই অর্থবছরের বাজেটে বিজেএমসির জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা ছিল, তা তাদের দেওয়া হয়েছে। এর বেশি অর্থ দেওয়া সম্ভব নয়।
এ বছর বিজেএমসি একদিকে যেমন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পাট কিনতে পারেনি, তেমনি এবার পাটকলগুলোতে উৎপাদনও শুরু হয়েছে আগের বছরের কম মজুত পাট নিয়ে। বিজেএমসি সূত্র বলছে, আগের বছরের তিন লাখ ৪১ হাজার কুইন্টাল মজুত পাট নিয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের উৎপাদন শুরু করেছিল বিজেএমসির আওতাধীন সরকারি পাটগুলো। কিন্তু এ বছর উৎপাদন শুরু হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার কুইন্টাল মজুত পাট নিয়ে। আর এ বছর পাট কিনতে না পারায় সরকারি পাটকলগুলোতে কত দিন উৎপাদন চলবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজেএমসি সূত্র বলছে, বড় পাটকলগুলোতে ১২ থেকে ১৮ দিনের উৎপাদন চালানোর মতো পাট মজুত আছে। অবশ্য এসব পাটকলের উৎপাদন ক্ষমতাও বেশি। তবে কম উৎপাদনক্ষম ছোট পাটকলগুলোতে মজুত পাট দিয়ে সর্বোচ্চ ৫০ দিন পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া যাবে। খুলনার খালিশপুরের ক্রিসেন্ট জুট মিলসে মজুত আছে মাত্র ১২ দিনের উৎপাদন চালানোর মতো পাট। চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলিতে বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরিতে (বিডিসিএফ) ৪৯ দিনের উৎপাদন চালানোর মতো পাট মজুত আছে। ক্রিসেন্ট জুট মিলসে হেসিয়ান, পাটের বস্তা, কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ (সিবিসি) মিলিয়ে প্রতি মাসে দুই হাজার ২২০ টন পণ্য উৎপাদিত হয়। বিডিসিএফে মাসে ১১০ টন পাটের সুতা উৎপাদিত হয়।
পাটের সুতা (জুট স্পিন) ছাড়া কাঁচা পাট ও অন্যান্য পাটজাত পণ্যের রপ্তানি দুই বছর ধরেই কমছে। আবার আইন করে সরকার পাটের বস্তা ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেও দেশে বস্তার ব্যবহার বাড়াতে পারেনি। রপ্তানি কমে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি না হওয়ার প্রভাবে বিজেএমসি আওতাধীন পাটকলগুলোতে পণ্যের স্তূপ জমে গেছে। এসব কারণে লোকসান গুনছে সংস্থাটি। আরও রয়েছে মিল পরিচালনায় অব্যস্থাপনা ও অদক্ষতা।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৪ অনুযায়ী, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিজেএমসি লোকসান দিয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। আর এর আগের বছর প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩৮৪ কোটি টাকা। আর এ লোকসান কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে গত অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটিকে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ৯৬ কোটি টাকা। আগের বছরের ভর্তুকি পরিমাণ ছিল ১৩৮ কোটি টাকা।

Monday, November 10, 2014

সৃষ্টিশীল শিল্পের উত্থান by মাসুম আলী ও আবুল হাসনাত

দেশে সৃজনশীল শিল্পের আকার ক্রমশ বড় হচ্ছে, পরিধিও বাড়ছে। এটি এখন আনুমানিক ১২ হাজার কোটি টাকার শিল্প। এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত তিন লাখ মানুষের।
রেডিও-টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও জনসংযোগ, ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থা, নানা ধরনের সফটওয়্যার তৈরি, মোবাইল অ্যাপস, অ্যানিমেশন, চলচ্চিত্র, নাটক, অনুষ্ঠান নির্মাণ তথা বিনোদনশিল্প—এসব নিয়েই সৃজনশীল শিল্প। দেশে এসব খাতকে আলাদা করে দেখা হলেও বিভিন্ন দেশে এদের একত্রে সৃজনশীল শিল্প বলা হয়। বহু দেশে এই সৃজনশীল অর্থনীতির পরিমাণ ব্যাপক।
সৃজনশীল অর্থনীতির দিক দিয়ে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। দেশটির ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) ২০১১ সালে করা এক গবেষণায় বলা হয়, ওই বছরে তাদের সৃজনশীল অর্থনীতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭৩ হাজার ৮০০ কোটি রুপিতে, যা আগের বছর ছিল ৬৫ হাজার ২০০ কোটি রুপি।
বিজ্ঞাপন নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান গ্রে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গাউসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখন একটা সৃজনশীল যুগে পৌঁছেছি। বুদ্ধি বিক্রি করে আমরা অনেকেই বেঁচে আছি। ১৫ বছর আগেও এটা চিন্তা করতে পারিনি। আমাদের সৃজনশীল শিল্পের আকার এখনো তত বড় না। তবে এটা ক্রমেই বড় হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন: কয়েক দশক ধরেই দেশে রেডিও-টেলিভিশনের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে বিলবোর্ড ও সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনও। ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে পাঁচ শতাধিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা রয়েছে। বিজ্ঞাপনের বাজারের অর্ধেকই বড় ১০-১৫টি প্রতিষ্ঠানের দখলে। এ খাতে সব মিলিয়ে আট-দশ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সংগঠন অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এএএবি) হিসাবে, সব মিলিয়ে দেশের বিজ্ঞাপনের বাজার আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইউনিট্রেন্ডের চেয়ারম্যান মুনীর আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর বিজ্ঞাপনের বাজার ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই বিজ্ঞাপন বানায়। আবার প্রোডাকশন হাউসকে দিয়েও বানিয়ে নেয়। বিজ্ঞাপননির্মাতা বড় প্রোডাবষন হাউস আছে ১৫টির মতো। ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০-৬০টি প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন বানায়। বছর দশেক আগেও বিজ্ঞাপনের প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ করা হতো ভারত থেকে। বর্তমানে বিজ্ঞাপনের প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজ দেশেই হয়।
বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর প্রায় সবারই মিডিয়া বায়িং হাউসও আছে। এই সংস্থাগুলো গণমাধ্যমের জায়গা কিংবা সময় কিনে নেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠান কিংবা নাটক প্রচারেও নিয়ে এসেছে নতুনত্ব।
ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও জনসংযোগ: বিজ্ঞাপন এখন আর রেডিও-টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাহকদের জন্য নানা ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন, কোনো একটি ব্র্যান্ডকে উৎসাহিত করা (ব্র্যান্ড অ্যাকটিভেশন), এমনকি জনসংযোগ কার্যক্রমও করে দেওয়া হচ্ছে।
দেশে অসংখ্য ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ৩০-৪০টি। এসব প্রতিষ্ঠান কনসার্ট আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম), ইনডোর ইভেন্ট, ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ অংশের উদ্বোধন কিংবা ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’র মতো অনুষ্ঠানও আয়োজন করে দিয়েছে বেসরকারি একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান।
এসব অনুষ্ঠানের কিছু অবশ্য জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানও আয়োজন করে থাকে। তারা মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাদের প্রচারণার দিকটি দেখে। দেশে বড় জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান আছে এখন পাঁচটি।
ডিজিটাল মিডিয়া: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিজিটাল মিডিয়ার সংস্থা এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। দেশে ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় যেতে হচ্ছে। অনলাইন গ্রাহকদের বেশির ভাগই যেহেতু তরুণ সেদিকে নজর দিতে হচ্ছে বেশি। তাই তো বড় একটি ডিজিটাল মিডিয়া সংস্থা নামই রেখেছে ‘বাঘের বাচ্চা ডিজিটাল’।
এশিয়াটিক মার্কেটিং কমিউনিকেশনসের নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌস হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এখন যারা ডিজিটাল ব্যবস্থায় না যাবে সে-ই পিছিয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞাপনের আয়ের ৫০ শতাংশই আসে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে। দেশে এ হার খুবই কম। তবে আগামী পাঁচ বছরে বিজ্ঞাপনের আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশই এখান থেকে আসবে।’
বিনোদনশিল্প: বাংলা চলচ্চিত্রে বর্তমানে পুরোপুরি ডিজিটালপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ছবি নির্মাণে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ছে। এ শিল্প সম্ভাবনাময়ও হয়ে উঠছে। প্রতিবছরই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে। এমনকি দেশীয় চলচ্চিত্র এসব উৎসবে পুরস্কৃতও হচ্ছে। ফ্রান্সের ‘গ্রাঁ প্রি’-তে পুরস্কার জিতেছে দেশীয় ছবি শুনতে কি পাও।
দেশীয় চলচ্চিত্র এখন রপ্তানিও হচ্ছে, সাড়াও মিলছে। সময়ের আলোচিত নায়ক ও প্রযোজক অনন্ত জলিল জানান, ইউরোপে মোস্ট ওয়েলকাম টু ছবিটি রপ্তানি করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন তিনি।
আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র মালয়েশিয়া, বাহরাইন, দুবাইতে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিয়া আলাউদ্দিন জানান, সারা দেশে ৩০০-এর বেশি প্রেক্ষাগৃহে নতুন ছবি মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়া ছবিতে বিনিয়োগের পরিমাণও বাড়ছে। এখন অনেক চলচ্চিত্র তিন কোটি টাকায় নির্মাণও হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও একটি ছবি নির্মাণে কোটি টাকা বিনিয়োগ ছিল রীতিমতো অস্বাভাবিক।
নাটক, টেলিফিল্ম, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, রিয়ালিটি শো, তথ্যচিত্রসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণে এখন মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বলছে, তাদের সদস্যসংখ্যা ১৭৫ ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরেও ৩৫০-৪০০টি অনুষ্ঠান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও নাট্যব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান প্রথম আলোকে জানান, প্রথম, দ্বিতীয় এবং অন্যান্য—এই তিন বিভাগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সপ্তাহে অন্তত তিনটি নাটক কিংবা তিন পর্বের নাটক প্রচারিত হয়। এর বাইরে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রতি ঈদে অন্তত ২০০টি নাটক জমা পড়ে, যা প্রতিটি সোয়া দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকায় বিনিময় হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ঈদের নাটকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকাও লগ্নি করা হয়। সে হিসাবে, টেলিভিশন নাটকে বছরে আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়। এ ছাড়া নানা ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণে বছরে আনুমানিক আরও ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়।
এ ছাড়া অডিওশিল্পে প্রতিবছর দেশে ১০০ কোটির বেশি অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে বলে জানা গেছে।
সফটওয়্যার ও অ্যানিমেশন: সৃজনশীলতার বড় ক্ষেত্র এখন সফটওয়্যার তৈরি। এ খাতে কাজ করা ৭৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বেসিসের সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠানে আছে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ কর্মী। সদস্যের বাইরে আছে আরও দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ব্যক্তি পর্যায়ে কাজ করছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার লোক।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) হিসাবে, রপ্তানি ও স্থানীয় বাজার মিলিয়ে দেশের সফটওয়্যার খাতের বাজার ১০০ কোটি ডলার বা সাত হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
বেসিসের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তসলীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে কয়টি খাতে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তার একটি সফটওয়্যার তৈরি। অ্যানিমেশন, মোবাইল অ্যাপস, গ্রাফিকসসহ সৃজনশীল খাতে কাজ করতে এখন লোকজন এগিয়ে আসছে।’
দেশের বহুল প্রচারিত মীনা কার্টুনটি ভারতের তৈরি। তখন অ্যানিমেশন তৈরির সক্ষমতা দেশে ছিল না। এখন দেশের ১৫-২০টি প্রতিষ্ঠান অ্যানিমেশন তৈরি করছে। আগে টুডি কার্টুন তৈরি হলেও এখন থ্রিডি কার্টুনও তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঠাকুরমার ঝুলি নামের একটি অ্যানিমেশন জনপ্রিয়তাও পেয়েছে।
বেসিসের তথ্য অনুযায়ী, ৪০-৫০টি প্রতিষ্ঠান এখন নানা ধরনের মোবাইল অ্যাপস তৈরি করছে। এই অ্যাপসের কারণেই এখন মুঠোফোনেই হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাসগুলো পড়া যাচ্ছে। সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের ওয়েবপেইজ তৈরি করে দিচ্ছে এবং গ্রাফিকস ডিজাইনও করে দিচ্ছে।

Thursday, October 9, 2014

কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে জটিলতার আশঙ্কা by আবুল হাসনাত

বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে বেশি দামে এবার কোরবানির পশুর চামড়া কিনেছেন মৌসুিম ব্যবসায়ীরা। আড়তদারদেরও সেই চামড়া চড়া দামেই কিনতে হয়েছে। তবে ট্যানারি মালিকেরা এ দামে তাঁদের কাছ থেকে চামড়া কিনবেন কি না, সেই শঙ্কায় আছেন তাঁরা।
অবশ্য বিশ্ববাজারে দরপতনের অজুহাত দেখিয়ে চামড়ার দর গত বছরের চেয়ে কম নির্ধারণ করে চামড়া-সংশ্লিষ্ট তিন ব্যবসায়ী সংগঠন। প্রতিবছরই বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে বেশি দামে খুচরা পর্যায়ে চামড়ার বেচাকেনা হয় বলে এবার ১৫ থেকে ২০ টাকা হাতে রেখেই দাম ঠিক করেন ব্যবসায়ীরা।
ফলে মাঠপর্যায় থেকে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ হওয়ায় ট্যানারি মালিকেরা লোকসানের যে আশঙ্কা করছেন, শেষ পর্যন্ত তা হবে না বলেই মন্তব্য আড়তদারদের। তবে ট্যানারি মালিকেরা বলছেন, এত দাম দিয়ে তাঁরা চামড়া কিনবেন না। দাম কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
বাংলাদেশ প্রস্তুত চামড়া, চামড়াপণ্য ও জুতা রপ্তানিকারক সমিতির (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৌসুমি ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। ট্যানারি মালিকেরা তো এত দাম দিতে পারবেন না। তাঁরা এখন লোকসান দেবেন।’
তবে চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘কিছু টাকা হাতে রেখেই এবার চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাই বেশি দামে চামড়ার বেচাকেনা হলেও লোকসানের আশঙ্কা নেই। তবে লাভ কম হবে।’
বাণিজ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ঈদের আগমুহূর্তে ট্যানারি মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ বিএফএলএলএফইএ ও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন চামড়ার দর নির্ধারণ করে। সে অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম ঢাকায় ৭০ থেকে ৭৫, ঢাকার বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। মহিষের চামড়া ৩৫ থেকে ৪০, খাসির চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ এবং বকরির চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

রাজধানীতে চামড়ার বড় আড়ত লালবাগের পোস্তায় ঈদের দিন বিকেল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে চামড়া আসতে থাকে। ওই দিন সেখানে চামড়া বিক্রি হয় প্রতি বর্গফুট ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। আড়তদারেরা বলছেন, ঈদের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত পোস্তায় সাড়ে তিন লাখ গরুর চামড়া এসেছে।
আড়তদারেরা জানান, কোরবানিতে সবচেয়ে ভালো গরুটা জবাই করা হয়। সে কারণে চামড়াটাও ভালো হয়। তাই বেশি দাম দিয়ে তা কিনলেও সমস্যা হয় না। চড়া দামে চামড়া কেনায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সমালোচনাও করেন তাঁরা।
তবে মৌসুমি ব্যবসায়ী আবদুস সোবহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা দামটা নির্ধারণ করে তারা তো আর মাঠে আসে না; এলে বুঝতে পারত কেন বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনতে হয়।’ ঈদের দিন তিনি বনশ্রী এলাকার চামড়া সংগ্রহ করেছেন।
পোস্তার একজন আড়তমালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্যানারি মালিকেরা তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় পর্যন্ত কিনেছেন। কিন্তু আমাদের বলেন, আপনারা বেশি দামে চামড়া কেনেন কেন? ওই চামড়া কিনব না। তাঁরা আমাদের জিম্মি করে নিজেদের মুনাফা বাড়াতে চান।’
এ বিষয়ে ট্যানারি মালিকদের বড় সংগঠন বিটিএর মহাসচিব মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘না পোষালে তো আমরা বেশি দামে চামড়া কিনব না। চামড়া যেহেতু কিনতেই হবে, তাই প্রয়োজনে আমরা অপেক্ষা করব। চামড়ার দামও একসময় কমে আসবে। তখন কিনব।’
কম দামে চামড়া কেনার পেছনে এর রপ্তানিমূল্য কমে যাওয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন ট্যানারি মালিকেরা। তবে আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইনডেক্স মুন্ডির ওয়েবসাইট বলছে, বিশ্ববাজারে গত জুলাইতে প্রতি পাউন্ড চামড়ার দাম যেখানে ছিল এক ডলার সাত সেন্ট, সেটা আগস্টে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক ডলার ১১ সেন্টে।
নষ্ট হওয়ার শঙ্কা: আড়তদার সমিতির মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, গ্রীষ্মকালে চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ না করলে তা নষ্ট হয়ে যায়। গত বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এবারও মোট চামড়ার ১০ শতাংশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
ট্যানারি মালিকদের হিসাবে, ঢাকায় এবার ১০ থেকে ১২ লাখ গরু কোরবানি হয়েছে। সারা দেশে গবাদিপশুর কোরবানির সংখ্যা ৮০ থেকে ৮৫ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

Saturday, October 4, 2014

চামড়া শিল্পনগরের কাজে অগ্রগতি by আবুল হাসনাত ও অরূপ রায়

ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্পনগরে স্থানান্তর হওয়ার এখনকার সময়সীমা ২০১৫ সালের জুনে। আর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী মার্চে। সে অনুযায়ী কাজও চলছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সিইটিপির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি ট্যানারি তাদের কারখানা ভবনের নির্মাণকাজও শুরু করেছে। কিন্তু যেভাবে কাজ চলছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, ঈদের পর পুরোদমে কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করবেন বলে ট্যানারি মালিকেরা জানিয়েছেন। কারণ, কোরবানি নিয়ে তাঁরা এখন কর্মব্যস্ত সময় পার করবেন। এটা শেষ হলেই কারখানা ভবন তৈরিতে পুরোপুরি মনোযোগী হবেন।
শিল্পনগর প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ মাস আগের সঙ্গে এখনকার শিল্পনগরের কোনো মিলই নেই। তখন শিল্পনগরটি ছিল বালুর চর। এখন সেখানে কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। সিইটিপির নির্মাণও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে। হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোও সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ প্রস্তুত চামড়া, চামড়াপণ্য ও জুতা রপ্তানিকারক সমিতির (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ট্যানারির মালিকেরা সাভারে যেতে আগ্রহী। কিন্তু সিইটিপি নির্মাণ না হওয়ার কারণে এত দিন হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া আটকে ছিল। তবে এখন এর কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে।
২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) চামড়া শিল্পনগর প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জায়গাজুড়ে নির্মাণাধীন এই শিল্পনগরের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১০ সাল পর্যন্ত। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। তাতেও কাজ শেষ হয়নি। ব্যয় না বাড়িয়ে আবারও ২০১২ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ শেষ হয়নি। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন হয় একনেকে। এ সময় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিসিক। শিল্পনগরে ২০৫টি প্লটে ১৫৫টি কারখানা স্থাপন করা হবে।
কারখানার নির্মাণকাজ চলছে: শিল্পনগর সূত্র বলছে, ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে ১৪৭টির লে-আউট পরিকল্পনা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টি ট্যানারি তাদের কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
অবশ্য গত বুধবার সরেজমিন সাভারের শিল্পনগর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো প্রকল্প এলাকায় কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। এমনকি নির্মাণ শুরু হয়নি কোনো ভবনেরও। অনেক প্লটের সামনে ট্যানারির সাইনবোর্ড ঝোলানো আছে। কোথাও নির্মাণশ্রমিকদের থাকার জন্য কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। শ্রমিকেরা পাইলিংয়ের কাজ করছেন। কোথাও ট্রাক থেকে ইট নামানো হচ্ছে। কোথাও বালু নামানো হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকায় নিয়োজিত সহকারী প্রকৌশলী মইন উদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ১২০টি কারখানা তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। কারখানা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে ২০টি ট্যানারির।
ট্যানারি মালিকেরাও বলছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের কারখানা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। ১৫-২০টি কারখানার পাইলিং শেষের দিকে।
বিএফএলএলএফইএর সভাপতি আবু তাহের বলেন, ‘আমার কারখানার (রুমা লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ) ২১৭ মিটার পাইলিংয়ের মধ্যে ১৭০ মিটারই শেষ হয়েছে। বলতে পারেন, মাটির নিচের কাজ শেষ।’
এগোচ্ছে সিইটিপির কাজও: প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সিইটিপির নির্মাণকাজ ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে।
সূত্র বলছে, সিইটিপির অংশ হিসেবে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য চারটি মডিউল তৈরি করার কথা। কয়েকটি চেম্বার নিয়ে একেকটি মডিউল। এসব চেম্বার তৈরির জন্য আরসিসি ঢালাইয়ের (রড দিয়ে কাঠামো বানিয়ে তাতে সিমেন্ট ও বালু দিয়ে ঢালাই) কাজ প্রায় শেষ। আর দুটি সিসি ঢালাইয়ের (রড ছাড়া অন্যান্য উপকরণ দিয়ে ঢালাই) কাজ অর্ধেক হয়েছে। ঈদের পর তা শেষ করা হবে। নতুন করে দুটি আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে।
এলাকায় গিয়ে দূর থেকে শ্রমিকদের সিইটিপি নির্মাণে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে সিইটিপি এলাকার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সিইটিপির নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তব্যরত চীনা প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রািজ হননি।
চীন-বাংলাদেশ যৌথ প্রতিষ্ঠান জেএলইপিসিএ-ডিসিএল জেভিকে ২০১২ সালের ১১ মার্চ চামড়া শিল্পনগরে সিইটিপি নির্মাণের কার্যাদেশ দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। শর্ত ছিল ১৮ মাসে কাজ শেষ করতে হবে। ওই মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়ায় এক বছরের বেশি সময় সিইটিপির নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। সে কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি। এরপর তাদের সময় দেওয়া হয় এ বছরের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়েও কাজ শেষ হয়নি। পরে আরেক দফায় তাদের সময় দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তোড়জোড়: গত ১০ সেপ্টেম্বর ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। বৈঠকে তিনি বলেন, শিল্পনগরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান ট্যানারি স্থানান্তরে ব্যর্থ হবে, তাদের প্লট বাতিল করে নতুন উদ্যোক্তাদের বরাদ্দ দেওয়া হবে।
এর পরই শিল্পনগর প্রকল্প কার্যালয় থেকে ৪৩টি ট্যানারি মালিককে তাঁদের প্লট কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ পাননি কেউ: শিল্প মন্ত্রণালয় ১০ সেপ্টেম্বর বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় যে যেসব ট্যানারির মালিক ইতিমধ্যে সাভার চামড়া শিল্পনগরে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পুরোদমে শুরু করেছেন, তাঁদের ওই মাসেই আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা হবে।
তবে ঈদের আগে কোনো ট্যানারি মালিকই ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না।
শিল্পনগর সূত্র বলছে, কারা ক্ষতিপূরণ পাবেন, কী পরিমাণ পাবেন, তা নির্ধারণ করার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে প্রকল্প কার্যালয়। সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওই কমিটি গঠিত হলে কমিটির সদস্যরা সরেজমিন কারখানা ভবনের নির্মাণকাজের অগ্রগতি দেখে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর পরই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আবু তাহের বলেন, ঈদের আগে প্রথম কিস্তিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না।
ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের এই প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৩ সালে। দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর কারণে বেড়েছে ব্যয়ও। ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে সব ট্যানারি স্থানান্তর করতে হবে
প্রকল্প কার্যালয়ের দাবি
১০৪টি কারখানার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আর কারখানা ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে ২০টি ট্যানারির
‘‘পাঁচ মাস আগে শিল্পনগরটি ছিল বালুর চর। এখন সেখানে কারখানা ভবন ও সিইটিপির নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে
সিরাজুল হায়দার
প্রকল্প পরিচালক, চামড়া শিল্পনগর, সাভার
প্লট বাতিলের শঙ্কা
কারখানা নির্মাণ শুরু না করায় প্রকল্প কার্যালয় থেকে ৪৩টি ট্যানারিকে তাদের প্লট কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে
ক্ষতিপূরণ হলো না
কারখানার নির্মাণকাজ শুরু করা ট্যানারি মালিকদের ঈদের আগেই ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তা পাননি

Tuesday, April 29, 2014

ওষুধশিল্প পার্ক আর কত দূর? by আবুল হাসনাত ও মো. মোমিনুর রহমান

বাংলাদেশও ওষুধশিল্পে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দুই দশক আগেও এ দেশ ছিল বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। ওষুধশিল্পের মতো সংবেদনশীল শিল্পে আমাদের দেশে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা বিস্ময়কর। বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে তা অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের ৮০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত ওষুধ আফ্রিকা, এশিয়ার বাজার ছাড়িয়ে এখন ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি হওয়ার পথে। ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওষুধের বাজার ধরতে পারলে ২০১৫ সালের মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বা ৩৫ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন ওষুধশিল্পের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস-এ গত ১৬ জানুয়ারি ‘উইন্ডো অন এ ডিফরেন্ট ঢাকা’ শিরোনামে বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়।

Tuesday, January 15, 2013

তদন্ত সাপেক্ষে মামলা করতে দুদককে চিঠি- মিল্ক ভিটার অবৈধ নিয়োগ বাতিল by আবুল হাসনাত

মিল্ক ভিটায় অবৈধভাবে ৭৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। নিয়োগ বাতিল করতে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধককে চিঠিও দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

Monday, December 31, 2012

জীবনযাত্রা ২০১২: খাদ্যবহির্ভূত ও খাদ্যপণ্য- চাল স্বস্তি দিয়েছে, তবু বাজারের কষ্ট কমেনি by আবুল হাসনাত

চালের দর স্থিতিশীল আছে, কিছুটা কমেছেও। কিন্তু তাতে স্বস্তি আসেনি সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের। বছরজুড়ে সবাই অস্বস্তিতে ছিলেন ডিম, ডাল, আলু আর পেঁয়াজের মতো প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য নিয়ে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে।

Friday, November 2, 2012

চারুশিল্প- সমুদ্র-শহরে আর্টক্যাম্প by আবুল হাসনাত

২৩ অক্টোবর মধ্যাহ্নে মিহিরলংকা এয়ারলাইনস কলম্বো বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শের কিছু আগেই জানালায় চোখ রেখে আমরা দেখলাম সবুজের বিপুল সমারোহ আর সমুদ্রের জলরাশি। বৃষ্টি পড়ছে। তবে একটানা নয়।

Thursday, September 6, 2012

উপজেলা-জেলার চেয়ে ঢাকায় ফরমালিনযুক্ত মাছ বেশিঃ বড় মাছে ফরমালিন বেশি by আবুল হাসনাত

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া মাছ পরীক্ষা করে তাতে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৭০ (পিপিএম) মাত্রার ফরমালিন পাওয়া গেছে। গ্রাম থেকে শহর পর্যায়ে ফরমালিনের ব্যবহার ও মাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর পরিচালিত পরীক্ষা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

Wednesday, August 29, 2012

ডেসটিনি কো-অপারেটিভের ১৫০০ কোটি টাকার অনিয়ম- রফিকুল আমীনসহ ১৪ কর্মকর্তা দায়ী by আবুল হাসনাত

ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির দেড় হাজার কোটি টাকার অনিয়মের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ১৪ জন কর্মকর্তাকে দায়ী করেছে সমবায় অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন একাই ১২৯ কোটি ৭৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।