Thursday, December 10, 2015

শরীর ও মন ফিট রাখতে যা করবেন

শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ একজন মানুষকেই ফিট বলা যায়৷ সেজন্য স্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়াম ও মনের খোরাকের দিকেই নজর দিতে হয়৷ নিজেকে ফিট রাখতে যা করবেন জেনে নিন৷
মস্তিষ্ক থেকেই শুরু
মানুষের মস্তিষ্কই যদি সুস্থ না থাকে, তাহলে আর সুস্থ থাকার মূল্য কোথায়? সেজন্য নিয়মিত আখরোট খান৷ এতে অনেক বেশি ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা মস্তিষ্ককে রোগ থেকে রক্ষা করে৷ আর টমেটো, গ্রিন টি-তে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কোষগুলোকে রক্ষা করে স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে৷ সামুদ্রিক মাছ আলঝেইমার রোগের হাত থেকে মস্তিষ্ককে দূরে রাখে৷
হৃৎপিণ্ড বা হার্ট
যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষেজ্ঞ ডা. বেথ অলিভার বলেন, ‘‘প্রতিদিন, প্রতিবেলায় বিভিন্ন রঙয়ের ফল ও সবজি এবং যথেষ্ট পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার, পানি, আপেল ও আখরোট, সূর্যমুখী ফুলের বিচি, ডাল এবং ডিমের হলুদ অংশ খান৷ এসবই হৃৎপিণ্ডের জন্য খুবই উপকারী৷’’
কিডনি ঠিক রাখতে
খেলাধুলা, হাঁটাচলা, ব্যায়াম উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে ডায়াবেটিস রোধ করে৷ কারণ ডায়াবেটিস থেকেই কিডনির নানা সমস্যা দেখা দেয়৷ ফলমূল, শাকসবজি, ফাইবার ইত্যাদি খেয়ে ওজন ঠিক রাখা প্রয়োজন৷ লবণ যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত, কারণ অতিরিক্ত লবণ কিডনির ক্ষতি করে৷ কিডনি পরিষ্কার রাখতে দিনে দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করা প্রয়োজন৷
হাড়ের যত্ন
হাড় শক্ত রাখতে নিয়মিত শরীর চর্চা বা বিশেষ ধরনের ব্যায়াম বড় ভূমিকা পালন করতে পারে৷ হাড় নরম বা ভেঙে যাওয়ার জন্য শুধু বয়স বাড়াই একমাত্র কারণ নয়৷ থাইরয়েড, পেটের ক্রনিক সমস্যা বা পাকস্থলির অসুখের কারণেও হাড় নরম বা ক্ষয় হতে পারে৷ আর পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার না খাওয়া ও অতিরিক্ত ধূমপান ও নানা ধরনের ওষুধপত্র সেবন হাড়কে নরম করতে পারে৷
পেট বা অন্ত্র ঠিক রাখুন
মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ অন্ত্র বা পেট যা লম্বায় প্রায় আট মিটার৷ শরীরের গ্রহণ করা খাবারগুলো সহজপাচ্য বস্তুতে পরিণত করে অন্ত্র৷ সেখানে সমস্যা দেখা দিলে সবই ওলট-পালট মনে হয়৷ সেকথা মনে হয় কমবেশি সবাই জানি৷ তাই শরীরকে ফিট রাখতে হলে অবশ্যই পেট ঠিক রাখতে হবে৷ তাই হাঁটাচলা, শষ্যদানা, বিচি, সাদা দই, শাকসবজি, ফলমূল ও সুষম খাবার গ্রহণ খুবই দরকার৷
অতিরিক্ত রোদ নয়!
তারুণ্য ধরে রাখতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের জুড়ি নেই৷ ফাস্ট ফুড, স্ট্রেস, অতিরিক্ত টেনশন, ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি ত্বক নষ্ট করে৷ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে৷ তাই রোদ থেকে দূরে থাকা উচিত৷ শরীর ও মন ভালো এবং ফিট রাখার জন্য শরীরের ভেতরের মতো শরীরের ত্বকের স্বাস্থ্যও ভালো থাকা প্রয়োজন৷ ল্যুবেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিকের ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. বিরগিট কালে বলেন এসব কথা৷
হেঁটে পায়ের যত্ন
আমাদের শরীরের সমস্ত ভার বহন করে আমাদের পা দুটো৷ তাই পায়ের স্বাস্থ্য খুব জরুরি৷ পায়ের মাংসপেশি শক্ত করতে ও ফিট থাকতে হাঁটাহাঁটির কোনো বিকল্প নেই৷ হাঁটা যেকোনো মানুষকে ফিট রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে৷
ব্যায়াম
শরীরচর্চা বা ব্যায়াম ছাড়া শারীরিকভাবে সুন্দর হওয়া সম্ভব নয়৷ তাছাড়াও শারীরিক এবং মানসিকভাবে ফিট থাকার জন্য বছরে অন্তত একবার ‘মেডিক্যাল চেকআপ’ করিয়ে নেয়াও অত্যন্ত দরকারি৷

২০৪৩ সালে ইউরোপ হবে ইসলামী খেলাফত

প্রায় এক দশক আগেই আইএসের উত্থান নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এক রহস্যময়ী অন্ধ মহিলা জ্যোতিষী। বাবা ভাঙ্গা নামের বুলগেরিয়ান জ্যোতিষী বলেছিলেন, মুসলিমরা একটি ‘বৃহত্তর মুসলিম যুদ্ধের’ মাধ্যমে ইউরোপ আক্রমণ করে পদানত করবে এবং ২০৪৩ সালের মধ্যেই ইসলামি খেলাফত গঠন করবে। এ খেলাফতের রাজধানী হবে ইতালির রোমে। ১৯৯৬ সালে বার্ধক্যজণিত কারণে মৃত্যু হওয়ার আগে এই রহস্যময়ী জ্যোতিষী আরও বলেছিলেন, পরমাণু যুদ্ধে ইউরোপ খ্রিস্টানশূন্য হয়ে যাবে এবং মুসলিমরা ইউরোপের দখল নেবে। বাবা ভাঙ্গা নামের এই মহিলা ১২ বছর বয়সে এক তীব্র ঝড়ের কবলে পড়ে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তারপর থেকেই তিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান বলে তার ভক্তরা জানিয়েছেন। তার ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতার কথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে বুলগেরিয়ার স্বৈরশাসক তৃতীয় বরিস তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং পরে বরিস তাকে নিজের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। যদিও বরিসের দুর্ভাগ্য ঠেকাতে পারেননি বাবা ভাঙ্গা, তবে এখনো তার অনেক ভক্ত রয়ে গেছে বুলগেরিয়ায়। টাইমস অব ইন্ডিয়া।
বুলগেরিয়ার অন্ধ জ্যোতিষীর আগাম কথা
২০১৬ : মুসলিমরা ইউরোপ আক্রমণ করবে
২০২৩ : পৃথিবীর কক্ষপথ পরিবর্তন হয়ে যাবে (এর অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি)
২০২৫ : ইউরোপের জনসংখ্যা প্রায় শূন্য হয়ে যাবে
২০২৮ : নতুন জ্বালানি উৎসের খোঁজে মানুষ শুক্র গ্রহে যাবে
২০৩৩ : সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যাবে (এটা এখন ঘটছে)
২০৪৩ : সমগ্র ইউরোপ ইসলামী খেলাফতের আওতায় আসবে। রোম হবে রাজধানী
২০৬৬ : আমেরিকা জলবায়ু অস্ত্র ব্যবহার করে রোম খ্রিস্টান দখলে আনার চেষ্টা করবে
২০৭৬ : ইউরোপসহ পৃথিবীতে আবার কমিউনিজম ফিরে আসবে
২০৮৪ : প্রকৃতির পুনর্জন্ম হবে (এর অর্থ কেউ বুঝতে পারেনি)
২১০০ : মানবসৃষ্ট সূর্য পৃথিবীর এক পাশকে অন্ধকারে ঢেকে দেবে (এটা ঘটছে। ২০০৮ সালে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তির সাহায্যে কৃত্রিম সূর্য বানানো প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে)
২১৩০ : এলিয়েনের সহায়তায় সভ্যতা পানির নিচে থাকবে
২১৭০ : পৃথিবীব্যাপী খরা হবে
২১৮৭ : বৃহৎ দুটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ করা সম্ভব হবে
২২০১ : সূর্যের পারমাণবিক বিক্রিয়ায় তাপমাত্রা কমে যাবে
২২৬২ : গ্রহগুলোর কক্ষপথ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। মঙ্গলগ্রহে ধূমকেতু আঘাত করবে
২৩৫৪ : কৃত্রিম সূর্যে দুর্ঘটনায় পৃথিবীতে খরা নামবে
২৪৮০ : দুটি কৃত্রিম সূর্যের সংঘর্ষে পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যাবে
৩০০৫ : মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথ পরিবর্তিত হবে
৩০১০ : একটি ধূমকেতু চন্দ্রে আঘাত করবে। পৃথিবীর চারদিকে পাথর ও ছাই থাকবে
৩৭৯৭ : পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। মানবসভ্যতা নতুন ব্যবস্থায় উত্থিত হবে

উস্কানি বক্তব্য ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশল

বিতর্ক, উত্তেজনা ও উস্কানিকে কৌশল হিসেবে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প। চরমপন্থা-সন্ত্রাসবাদের আমেরিকানদের ভীতি ও সিরীয় শরণার্থীদের ঘিরে অজানা আতংককে পুঁজি করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চান তিনি। বুধবার বার্তাসংস্থা এএফপির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এসব বিতর্কিত বক্তব্য পরিকল্পনামাফিক ও ইচ্ছাকৃত। মনোয়নপ্রাপ্তিতে নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপে তিনি এতে সফলতাও পেতে পারেন। গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিম দম্পতির বন্দুক হামলাকে সূত্র ধরে ট্রাম্প সোমবার সবচেয়ে চরমপন্থী বক্তব্য রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার দাবি করেছেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়া হামলার নিন্দায় পুরো দুনিয়ার মুসলিমরা সরব হলেও নির্বাচনী বিতর্ক সৃষ্টিতে এটাকেই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে নিলেন তিনি। দক্ষিণ ক্যারোলিনায় তার জনসভায় সমর্থকরা এতে খুশি হয়ে উল্লাসও প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ১ ফেব্র“য়ারি আইওয়াতে ও তার আট দিন পর হ্যাম্পশায়ারে মনোনয়ন ভোট রয়েছে। নির্বাচন পর্যন্ত যে কোনো মূল্যে আলোচনায় থাকতে চান ট্রাম্প।
এর আগে মেক্সিকো সীমান্তে বেড়া দিয়ে অভিবাসী ঠেকানোর প্রস্তাব দিয়ে অতি রক্ষণশীলদের কাছে টানতে চেয়েছিলেন। তাদের ভয় দেখিয়েছিলেন, আমেরিকার চাকরি-বাকরি ও সুবিধা বিদেশীরা দখল করছে। উপরন্তু ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থী নেয়ার প্রস্তাবে অনেক মার্কিনিই ভীত সন্ত্রস্ত। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেনিফার লনেস বলেন, শুধু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বলে কাজ না-ও হতে পারে। কিন্তু অভিবাসীদের যদি সন্ত্রাসবাদ, পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জুড়ে দেয়া যায় তবে সহজেই ভীত আমেরিকানদের পক্ষে টানা যাবে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড সিগেল বলেন, সন্ত্রাসী ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকানরা চিন্তিত। এমতাবস্থায় কেউ একজন সমাধানের পথ দেখালে (যদিও তা ভুল) সাময়িকভাবে হলেও অনেকে ভালো আইডিয়া হিসেবে গ্রহণ করবেন। আমেরিকানদের এই অজানা আতংককে কাজে লাগাতে চান ট্রাম্প। জরিপ বলছে, এতে রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন ক্রমশই বাড়ছে। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে কাউকে নিষিদ্ধ করতে যাওয়া আমেরিকান সংবিধানের পরিপন্থী। তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা গভীরভাবে না ভেবে এটাকে তার সন্ত্রাসবিরোধী নীতি হিসেবে দেখছে।

আইএস জঙ্গিদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে ইসরাইল

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আহত জঙ্গিদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে ইসরাইল। সিরিয়া সীমান্তবর্তী গোলান হাইটে ইসরাইল পরিচালিত হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত যোদ্ধাদের তুলে নিয়ে আসছে ইসরাইলি সৈন্যরা। সম্প্রতি এমন একটি ভিডিও ফুটেজ হস্তগত হয়েছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী দৈনিক ডেইলি মেইলের। তবে ইসরাইল দাবি করেছে, তারা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের এ সেবা দিচ্ছে। বুধবার ডেইলি মেইল জানায়, রাতের আঁধারে ইসরাইলি সেনারা নিয়মিত গোপন অভিযান চালায় সিরিয়ায়। সেখান থেকে আহত যোদ্ধাদের নিয়ে ফেরত আসে গোলান হাইটের হাসপাতালে। তবে এই যোদ্ধা ইসরাইলি সৈন্য নয়, এরা ইসলামী জঙ্গি। এ ব্যাপারে ইসরাইলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় ইরানের মিত্র সরকার বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সুন্নি বিদ্রোহীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে তারা। কিন্তু সমালোচকদের মতে, আইএস জঙ্গিদের সেবা দিচ্ছে ইসরাইল।
ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ আইএসকে সৃষ্টি করেছে বলে শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। মোসাদ আইএস জঙ্গিদের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে। ইসরাইলের বক্তব্য সত্য ধরে নিলেও বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হচ্ছে, সুন্নি বিদ্রোহীরা আসাদবিরোধী হলেও ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতি সরাসরি শত্রুতা পোষণ করে। ডেইলি মেইলকে এ কথা জানিয়েছে, খোদ ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তাহলে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইসরাইল সৈন্যরা কেন যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের উদ্ধারে গোপন অভিযান চালাবে? প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার ইসলামী যোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছে ইসরাইলি সৈন্যরা। এতে ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে ৫ কোটি শেকেল (১ কোটি ৪০ লাখ ডলার)। এছাড়া ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারিতে ওই হাসপাতাল সফর করে আÍঘাতী স্কোয়াডের এক জঙ্গি নেতার সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। এ নিয়ে ইসরাইলের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ দৃঢ় হয়।

আমরা কোথায় আছি? by সুলতানা কামাল

১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। জাতিসংঘ এবার বিশেষভাবে এ দিবসকে পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে, কারণ মানবাধিকারকে সংজ্ঞায়িত করা এবং তা বাস্তবায়নে জাতিসংঘের যে মানবাধিকার আন্দোলন, শিগগিরই তা ৫০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ এবারের মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে, ‘আমাদের স্বাধীনতা-আমাদের অধিকার, চিরন্তন’। এবারের মানবাধিকার দিবসকে ঘিরে বছরব্যাপী ব্যাপক প্রচারণাও হাতে নিয়েছে জাতিসংঘ। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক দলিলগুলো যেহেতু অধিকার চর্চার স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাই এ বছরের প্রতিপাদ্যে জাতিসংঘও অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে সর্বদা যেন আমাদের স্বাধীনতা অটুট থাকে, তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
কিন্তু ২০১৫ সালে বাংলাদেশে অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে ‘স্বাধীনতা’ বিষয়টি ছিল উপেক্ষিত। জীবনের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে জীবনধারণের স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত পোষণ করা থেকে শান্তিপূর্ণভাবে তা প্রকাশ করতে পারার স্বাধীনতা—সবকিছুই হয়েছে নিদারুণভাবে উপেক্ষিত।
২০১৪ সালের মতো ২০১৫ সালও শুরু হয় রাজনৈতিক সহিংসতা দিয়ে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সেই নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবিতে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি সমাবেশ অনুষ্ঠানের কর্মসূচি দেয় বিরোধী দলগুলো। সরকারের পক্ষ থেকে সেই কর্মসূচি পালনের অনুমতি না দিয়ে বিএনপির নেত্রীকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্ভাব্য নাশকতা এড়ানোর জন্যই সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং বিএনপির নেত্রীকে সমাবেশে যেতে দেওয়া হয়নি। এর পরদিন থেকেই সারা দেশে শুরু হয় বিরোধী দলের ডাকা লাগাতার অবরোধ এবং একই সঙ্গে নাশকতা। টানা ৬৬ দিন ধরে চলে এই অবরোধ। অবরোধ চলাকালীন পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ৭০ জন। এসব হামলা থেকে রক্ষা পাননি নারী-শিশু-বৃদ্ধ। হামলা হয়েছে স্কুলে, পাঠ্যপুস্তকবাহী গাড়িতে। হত ও আহত ব্যক্তিদের প্রায় প্রত্যেকে ছিলেন সাধারণ মানুষ, বেশির ভাগই দরিদ্র, বাস ও ট্রাকের চালক, সহকারী—রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সংস্রব ছিল না। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর বলপ্রয়োগের মাত্রাও এ সময় ভয়ংকরভাবে বেড়ে যায়। আমাদের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, বছরে অক্টোবর পর্যন্ত গুমের শিকার হয়েছেন ৪৭ জন। নভেম্বর পর্যন্ত কথিত ‘ক্রসফায়ার’ আর বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ১৫৩ জন। উল্লেখ্য, এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যাঁরা শিকার হয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদিও এসব হত্যাকাণ্ডের দায় অস্বীকার করেছে, কিন্তু অধিকাংশের স্বজনের অভিযোগ, তাঁদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়েই ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চলতি বছরের চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। একদিকে মুক্তমনা লেখক-প্রকাশকদের ওপর হামলা এবং তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা, অন্যদিকে আইনি, প্রশাসনিক ও বিচারিক পদ্ধতিতে ভিন্নমতকে রুদ্ধ করার চেষ্টা। সর্বোপরি ভিন্নমতের প্রতি যে ব্যাপক অসহিষ্ণুতা তৈরি হয়েছে, তাকে নিরুৎসাহিত না করে বরং প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচজন মুক্তমনা লেখক-প্রকাশক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, আহত হয়েছেন দুজন আর চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন অনেকে। এর মধ্যে নতুন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে ড. আনিসুজ্জামান ও হাসান আজিজুল হকের মতো প্রথিতযশা আরও অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবীকে।
এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কাউকে কাউকে আটক করা হয়েছে, কিন্তু তারাই যে প্রকৃত হত্যাকারী, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিচারকার্যও চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। উপরন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নানা সময়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যার মাধ্যমে অপরাধীদের উৎসাহ পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী বৈশিষ্ট্য, বিশেষত ৫৭ ধারা নিয়ে আমরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছি। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে এই আইনে আটক করা, রিমান্ডে নেওয়া। পরে চটজলদি জামিন মঞ্জুর করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে যে প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে এই আইনে আটক করা হয় ও রিমান্ডে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে তাঁর জামিনের ব্যবস্থা হয়। আইন ও আদালতকে মর্জিমাফিক চালানোর এ ধরনের আরেকটি ঘটনা—পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা অদম্য ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকদের আটক করা, রিমান্ডে নেওয়া এবং প্রায় দুই মাস পর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তাঁদের জামিন লাভ। উভয় ঘটনাতেই ভুক্তভোগীদের জামিন লাভ স্বস্তিকর বটে, কিন্তু এসব ঘটনায় যে প্রক্রিয়ায় আইন-আদালতসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তাঁদের ভূমিকা রেখেছেন, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এ লেখা যখন লিখছি তখন ফেসবুক, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধের প্রায় এক মাস হতে চলল।
এ বছর মানব পাচারের এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে। থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অসংখ্য গণকবরের সন্ধান লাভ, গভীর সমুদ্রে ভাসমান ক্ষুধার্ত রোগাক্রান্ত মৃতপ্রায় মানুষের ছবি-খবর, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলের কাছাকাছি দরিয়ায় খাবার নিয়ে ক্ষুধার্তদের মারামারিতে শতাধিক মানুষের প্রাণহানি—এসব খবর আমাদের সামনে এই বাস্তবতা হাজির করে যে বাংলাদেশের বেকার, ভাগ্যান্বেষী মানুষেরা দালালদের প্রলোভনে পড়ে, বৈধ ও সুগম পথে বিদেশে যাওয়ার উদ্যোগের স্থবিরতার কারণে এই ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ উপায়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। এই দালালদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা আমরা দেখি না।
চলতি বছর জাতিসংঘের শিশু অধিকার রক্ষা কমিটিতে বাংলাদেশের শিশু পরিস্থিতির মূল্যায়ন হয়েছে। এতে শিশুকল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ কিছু সাধুবাদ পেয়েছে। কিন্তু শিশু হত্যার ক্ষেত্রে বর্তমান বছর বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শুধু সংখ্যার দিকে থেকে নয়, যে ধরনের ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর পন্থায় শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, তা সমাজের বিশেষ বৈকল্যকে ইঙ্গিত করে। যে শিশুদের নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, তাদের অনেকেই শিশু শ্রমিক। ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে সাতটি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। বছর শেষে আমরা দ্রুততার সঙ্গে রাজন, রাকিব, সাঈদ হত্যার বিচার সম্পন্ন হতে দেখছি বটে, কিন্তু শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো শিশুদের প্রতি আমাদের আরও অধিক মনোযোগ ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সরকারদলীয় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বেপরোয়া আচরণ এবং তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা ছিল চলতি বছরের অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ, এ রকম সংঘর্ষ চলাকালে মায়ের পেটে শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়া, জনৈক সাংসদের গুলিতে শিশুর আহত হওয়া, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির অপ্রাপ্তবয়স্ক ভাতিজার বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে পথচারীকে আহত করা এবং পরবর্তী সময় পুলিশের তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা—ইত্যাদি ঘটনা এই দুঃখজনক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে যে—এ দেশে আইন সবার জন্য সমান নয়।
সভা-সমাবেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও এ চিত্র ছিল দুর্ভাগ্যজনক। বিরোধী দলগুলোকে কার্যত কোনো সভা-সমাবেশই করতে দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন অজুহাতে গ্রেপ্তার, জামিন না দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের মৌলিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। বর্ষবরণ উৎসবে নারীদের যৌন হয়রানির প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ, শিক্ষকদের দাবিদাওয়া প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন সমাবেশ—তা ভূমি রক্ষার আন্দোলনই হোক আর উৎসবের শোভাযাত্রাই হোক, অথবা সুন্দরবন রক্ষা অথবা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সভা-সভাবেশ—সবকিছুকেই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভন্ডুল করা হয়েছে, যা মেনে নেওয়া যায় না। সেপ্টেম্বরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ছেলের সামনে মাকে নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিবাদে পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন। এ ঘটনায় তিনজন নিহত হন এবং আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হন।
ধর্মীয় উগ্রপন্থার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার প্রবণতা চলতি বছরের আরেকটি উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর নামে দেশের ও বিদেশের মানুষকে হত্যা—হুমকি প্রদান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং এসব নিয়ে সরকারের অস্বীকারের অথবা বিরোধীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা আমাদের মনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ছিল বর্তমান বছরের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর মাধ্যমে ভিনদেশের জঠর থেকে মুক্ত হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল। প্রায় ৫৯ হাজার ছিটমহলবাসীর জন্য এটি ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সমতুল্য। কিন্তু ছিটের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি সমস্যাসহ তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি কতটা নজর দেওয়া হয়, তা দেখার বিষয়।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি যে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র নিপীড়নমূলক আচরণ করছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব চূড়ান্ত বিচারে জনগণের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে নয় বরং পূর্ণরূপে সম্পৃক্ত করেই কেবল রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর জনগণের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষা না করে তাদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব নয়।
সুলতানা কামাল: নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।

বাগাড়ম্বর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না by রবার্ট ফিস্ক

আইসেনহাওয়ার ১৯৫৬ সালে অ্যান্থনি ইডেনকে কিছু অভব্য পরামর্শ দিয়েছিলেন, যখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মিসরে ব্রিটেনের প্রতারণামূলক যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত। তিনি বলেছিলেন, ‘সেনারা, থামো এবার।’ এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বেশ বিখ্যাত। কথাটি এখন রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসবিদদের জন্য পুনরুচ্চারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সেই সব নির্বোধ ব্যক্তির উদ্দেশেও এটা পুনরুচ্চারণ করা জরুরি, যারা নিজেদের অনিঃশেষ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ-বক্তা হিসেবে মনে করে।
প্রতিটি সকালেই যেন আরেকটি হলিউডি নিষ্ঠুরতার গল্প শোনার জন্য আমার ঘুম ভাঙে, যার গল্পকার হচ্ছে আমাদের গোপন পুলিশ বা জনসংযোগ প্রভাবিত রাজনৈতিক নেতারা। জার্মানির শীর্ষ গোয়েন্দা আমাদের ‘সন্ত্রাসী বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে’ সতর্ক করে দেন, আমি তাঁর বিশেষজ্ঞ মতামত মেনে নিই, কারণ বিশ্বযুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে জার্মানির দক্ষতা প্রমাণিত। ওদিকে একজন মেধাবী ও সুস্থ মস্তিষ্কের ইতিহাসবিদ ইউরোপের দুর্দশাকে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনেকেই মনে করে, প্যারিস হত্যাকাণ্ড ‘প্যারিসকে চিরদিনের জন্য বদলে’ দিয়েছে বা ‘ফ্রান্সকেই চিরতরে বদলে’ দিয়েছে। কিন্তু প্যারিস হামলাকে ১৯৪০ সালের জার্মান দখলদারির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। একঘেয়ে প্রকৃতির ফরাসি দার্শনিক বার্নার্ড অঁরি-লেভি বলেই যাচ্ছেন, আইএস হচ্ছে ‘ফ্যাসিস্টইসলামিস্ট’।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৮২ সালে বৈরুতের সাবরা-শাতিলা শরণার্থীশিবিরে যে খ্রিষ্টান খুনিরা ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছিল, তখন কিন্তু অঁরি ইসরায়েলের এই লেবানিজ জঙ্গিগোষ্ঠীকে ‘ফ্যাসিস্টক্রিশ্চিয়ান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন বলে আমার মনে পড়ে না। সেটা এক সন্ত্রাসী হামলাই ছিল, যার সঙ্গে আমি পরিচিত। দুজন সহকর্মী সাংবাদিককে নিয়ে আমি সেই শরণার্থীশিবিরে গিয়েছিলাম, ধর্ষণের শিকার ও কচুকাটা হওয়া মানুষের সারি সারি লাশ পড়ে আছে। মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত ও সেখানকার টাকায় পরিচালিত ইসরায়েলি সেনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখলেও তারা কিছুই করেনি। কিন্তু তারপরও একজন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক বলেননি যে এ কারণে ‘মধ্যপ্রাচ্য চিরদিনের জন্য বদলে গেছে।’ বৈরুতে ১ হাজার ৭০০ বেসামরিক মানুষ মারা যাওয়ার পরও যদি ‘বিশ্বযুদ্ধ’ ঘোষিত না হয়, তাহলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ১৩০ জন নিরীহ মানুষ মারা যাওয়ার পর কীভাবে বলেন যে ফ্রান্স ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হয়েছে?
এত কিছু সত্ত্বেও আমার বন্ধু নিয়েল ফার্গুসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই গাদাগাদি করে থাকা গরিব মানুষ প্রাচীন রোমের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। ফার্গুসন স্বীকার করেন, তিনি পঞ্চম শতকের রোমান ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না, ফলে এই বিষয়ে তিনি রোমান ইতিহাস থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারবেন না। কিন্তু রোমানরা নতুন দেশ জয় করলে সেখানকার মানুষকে নাগরিকত্ব দিত, আর নিয়েল তৃতীয় শতকের ইতিহাস একটু পড়ে দেখবেন, যখন নতুন রোমান সম্রাট সিজার মার্কাস জুলিয়াস ফিলিপাস সিরিয়া থেকে এসেছিলেন। দামেস্ক থেকে ৩০ মাইল দূরে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তাঁকে ‘আরবের ফিলিপ’ বলা হতো। কিন্তু আসুন, আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আধুনিক ইতিহাসকে বাগড়া দিতে না দিই।
মালির ঘটনাটি লক্ষ করুন। সেখানকার ইসলামপন্থীরা দেশটির উত্তরাঞ্চল দখল করে রাজধানী বামাকোর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ফরাসি সেনাবাহিনী ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মালিতে অভিযান চালায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদকে সেখানকার গণমাধ্যমে ব্যঙ্গ করে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করা হয়। তিনি মালিতে ‘সন্ত্রাসীদের’ ধ্বংস করার জন্য তাঁর সেনাদের পাঠান, যে সন্ত্রাসীরা সেখানে বেসামরিক মানুষকে ‘ইসলামি’ কায়দায় শাস্তি দিচ্ছিল, যেখানে ইসলাম ছিল তাঁদের বিদ্রোহের তরিকা। কিন্তু ফ্রান্স একবারও বলল না যে এই সহিংসতা সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের যাযাবর গোষ্ঠী তুয়ারেগ ও মালি সরকারের মধ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের অংশ। জানুয়ারির শেষ নাগাদ খবর পাওয়া গেল, ফ্রান্সের সেনাবাহিনীর মালি-মিত্ররা সেখানে জাতিগত প্রতিশোধের ঢেউয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। তৎকালীন ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন, ‘শহরাঞ্চলের গেরিলা যুদ্ধ’ সামাল দেওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।
আবার দেখা গেল, মালির যেসব মানুষ ফরাসিদের সহায়তা করেছিল, ইসলামপন্থীরা তাদের মারা শুরু করেছে। ফ্রান্স যেহেতু ইতিমধ্যে বিজয় অর্জন করেছে বলে দাবি করছিল, ফলে সেই ইসলামপন্থীদের মুখপাত্রের কথা কেউ তেমন একটা খেয়াল করতে পারেনি: ‘ফ্রান্স আমাদের শত্রু, যারা মালি, নাইজার, সেনেগাল ও টোগোর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করছে...এই সব দেশই আমাদের শত্রু, আমরা তাদের শত্রুর মতোই গণ্য করব।’
যারা মনে করে, ইউরোপীয় সেনারা আফ্রিকার দেশে দেশে ঠুসঠাস গুলি ছুড়বে, আর কেউ তার প্রতিশোধ নিতে চেষ্টা করবে না, তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, গত জানুয়ারি মাসে প্যারিসে একজন নারী পুলিশ ও সুপার মার্কেটে চারজন ইহুদিকে যে এক আইএস যোদ্ধা হত্যা করল, তার জন্ম কিন্তু প্যারিসের এক মালি মুসলমান পরিবারে। তাঁর নাম আমেদি কুলিবালি।
এখন মালির ওপর ২০১৩ সালের শুরুর দিকের এই প্রতিবেদন পড়া যাক: ‘ফরাসি যুদ্ধবিমানগুলো উত্তর মালির সন্দেহভাজন বিদ্রোহী শিবির, কমান্ড পোস্ট, “সন্ত্রাসীদের যানবাহন” ও মালপত্রের ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা তিমবাকতু ও গাও অঞ্চলে নানা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে, এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ডজন খানেক হামলা চালিয়েছে তারা...।’ তিমবাকতু ও গাওয়ের জায়গায় রাকা ও ইদলিব বসান, আজ প্যারিস ও মস্কো আমাদের সেই একই খবর দিচ্ছে।
আর আমাদের প্রতিক্রিয়া কী? তার সবই অবশ্যই বাগাড়ম্বর, আমাদের অজ্ঞতা, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি কী অন্যায় করা হচ্ছে, সেটা বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের অনাগ্রহ এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্যযুক্ত দ্বন্দ্ব-বিবাদ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের আলস্য। আমরা যদি আজও ‘সেনারা, থামো এবার’ গোছের উপদেশ দিই, তাহলে একদম নতুন মনোভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এই অঞ্চলকে নিয়ে ১৯৪৫ সালের আদলে বিশ্ব সম্মেলন করা যেতে পারে, যখন বিশ্বনেতারা একত্রে বসে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল পৃথিবীতে আর যেন বিশ্বযুদ্ধ না লাগে, সেটা নিশ্চিত করা। আর শরণার্থীদের জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন নানসেন শরণার্থী পাসপোর্ট প্রণয়ন করা হয়েছিল, সে রকম কিছু একটা করা যেতে পারে, সেবার ৫০টি জাতি তা গ্রহণ করেছিল।
রবার্ট ফিস্ক
আমরা সে রকম কিছু না করে উদ্দেশ্যহীনভাবে কেয়ামত, সন্ত্রাসী বিশ্বযুদ্ধ ও প্রাচীন রোমের বিষয়ে কথা বলে যাচ্ছি। আমাদের জনসংযোগপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে আমি পুনরুচ্চারণ করব: ‘বাছা, এবার থামো।’
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের অধিকার চিরন্তন by রবার্ট ওয়াটকিন্স

রবার্ট ওয়াটকিন্স
মানবাধিকার উন্নয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্স
১৯৪৮ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। দিবসটি সব জাতির, সব মানুষের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ সাধারণ মানদণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ বছর আমরা মৌলিক স্বাধীনতা, যা মানবাধিকারকে তুলে ধরে এবং যা এখনো বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে প্রাসঙ্গিক, যেমন ভয় ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, বাক্স্বাধীনতা ও নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা—এ বিষয়গুলো স্মরণ করি। ২০১৫ সালের প্রতিপাদ্য ও স্লোগান হলো ‘আমাদের স্বাধীনতা—আমাদের অধিকার, চিরন্তন’।
বাংলাদেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আটটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং এর ফলে দেশটি কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই প্রত্যেক ব্যক্তির নাগরিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অথবা রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশ নারী ও কিশোরীদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং শিশু অধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো নিয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে সম্পৃক্ত ছিল এবং মানবাধিকার কাউন্সিলের ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের বাংলাদেশ সফরের আয়োজন করে। বাংলাদেশ বর্তমানে মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য এবং দেশটি একটি মানবাধিকার কমিশন গঠন করেছে, যার ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের দায়িত্ব অনেক বেড়েছে। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে মানবাধিকার এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের কাজ করার ইচ্ছার প্রকাশ ঘটে।
গত দশকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে জনগণের মানবাধিকারের সুফল ভোগের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। যদিও এই সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না এবং অনেকেই বেশ পিছিয়ে আছে, বিশেষ করে দেশে যাদের আইনি মর্যাদা নেই। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক ব্যবধান এবং নারীর প্রতি বৈষম্য এখনো বিদ্যমান রয়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক উন্নয়নের প্রক্রিয়া, যেমন সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), সবার উন্নয়ন নিশ্চিতের লক্ষ্যে অসমতার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আলোকপাত করেছে। ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ণয়ের জন্য এটি একটি পরিষ্কার দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এই অসমতা দূরীকরণের পথনির্দেশ এবং কাঠামো প্রদর্শন করে। এই পরিকল্পনা সম্প্রতি গৃহীত এসডিজির সঙ্গে সংযুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়াসহ তদারকি পদ্ধতির সঙ্গে একত্র, যা জাতির অগ্রগতির সময় কেউ যেন বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, অধিকারভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কিন্তু মানবাধিকার বলতে শুধু অর্থনৈতিক ও সামাজিক আচরণকেই বোঝায় না। যদি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার না থাকে, তাহলে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করা যায় না। ভয় থেকে মুক্তি ঠিক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি। বাংলাদেশ একটি নবীন রাষ্ট্র, যেটি এখনো তার অতীতের সঙ্গে সংগ্রাম করছে, যা দেশটির নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সামগ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলো ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা হেফাজত থেকে সুরক্ষা, বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, চলাফেরার স্বাধীনতা, একত্র হওয়া, দল গঠন ও ধর্ম পালন এবং বিবেক-বুদ্ধি ও বক্তব্য প্রদানের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ আছে। এ বিষয়গুলো যেমন সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, তেমনি আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ ও অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে এবং কিছু বিষয়, যেমন গ্রেপ্তার করার সময় অথবা আটকাবস্থায় মৃত্যু, তদন্তকালীন এবং আইনি প্রক্রিয়া চলার সময় হস্তক্ষেপ, গুম ও নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, সাংবাদিক, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সুশীল সমাজের মানুষের বিধিবহির্ভূত গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, উত্ত্যক্তকরণ ইত্যাদি এখনো রয়ে গেছে। স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্থার দ্বারা এই অভিযোগগুলোর তদন্ত হওয়া এবং দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তা পদ্ধতির অংশবিশেষ এবং উন্নয়নের প্রক্রিয়া চলমান রাখার জন্য অনস্বীকার্য।
আজকের দিনটি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে গৃহীত ১৬ দিনব্যাপী কার্যক্রমের শেষ দিবস। মানবাধিকার দিবসের সঙ্গে এই সংযুক্তি এটাই মনে করিয়ে দেয় যে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটায়, যা অবিচল অঙ্গীকার ও শক্তি দিয়ে বন্ধ করা প্রয়োজন। সহিংসতা নারী ও কিশোরীদের সমাজে অবদান রাখার সক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ বিষয়টি যখন উপেক্ষা করি, তখন আমরা সামাজিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিই।
মানবাধিকারের সুফল উপভোগ করা একটি প্রক্রিয়া, যা চলমান এবং যার শেষ নেই। আজকের এই দিনে অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পাদন এবং সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে প্রত্যেকের অংশগ্রহণ ও অবদানের গুরুত্বের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

এখনো বিভাজনের কাল চলছে by কুলদীপ নায়ার

ভারত সাম্প্রদায়িকতা তুলে ধরছে,
আজ একুশ শতকে, এ ভারত আমাদের অচেনা
ভারতের অন্যতম শীর্ষ অভিনেতা আমির খান যে অনুষ্ঠানে বললেন, তাঁর স্ত্রী বলেছেন, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করার জন্য তাঁদের অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিত কি না, সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। না, তাঁর কণ্ঠে তিক্ততা ছিল না, ছিল কিছুটা দুঃখবোধ। তারপরও আমিরের কথা আমাকে নাড়া দিয়েছে। সম্ভবত, পুরো জাতিকেই সেটা নাড়া দিয়েছে।
এর আগে আমি কখনোই মনে করিনি যে পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে গেছে যে আমির খানের মতো মানুষকে ভাবতে হয়, তাঁকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। তাহলে তো আমিরের সম্প্রদায়ের ক্ষমতাহীন মানুষেরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ভারতের ৫০০ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী আসলে কোন কারণে বিভিন্ন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা বোধগম্য। এটা আসলে তাঁদের মর্মবেদনা প্রকাশের তরিকা। আর যাঁরা সেই পর্যায়ে যাননি, তাঁরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
আমিরের মন্তব্যে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভাবা উচিত, সংখ্যালঘুদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল কেন? এমনকি তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও পরিশীলিত মানুষ আমির খানও মনে করেন, তিনি অনিরাপদ। এর পরিণামে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাঁর ওপর হামলে পড়েছে, আক্ষরিকভাবে তাঁকে হেনস্তা করেছে। বিজেপি বলেছে, ভারত যাঁকে আমির খান বানাল, সেই তিনিই কিনা এমন অকৃতজ্ঞের মতো কথা বললেন। তিনি আজ এ জায়গায় এসেছেন কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। ভারত অভিনয়ের জন্য তাঁকে মূল্যায়ন করেছে।
আমি মনে করি, এমন কিছু ঘটেনি যে আমির সম্পর্কে এমন কথা বলা যায়। তাঁর অনুভূতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আমাদের সবাইকে অন্তর্বীক্ষণ করতে হবে, আমির খানের মতো মানুষ যিনি দেশজুড়ে এত সমাদৃত ও প্রশংসিত, তাঁকে কেন এমন কথা বলতে হলো। এই কথা বলার পরিণাম কী হবে, সেটা নিশ্চয়ই তিনি ভেবে দেখেছেন। তিনি একজন সংবেদনশীল মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই মনে করেছেন, ভারতে যেভাবে অসহিষ্ণুতা শিকড় গেড়ে বসেছে, তাতে তাঁর মতো একজন মানুষও সেখানে অনাবশ্যক হয়ে পড়েছেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারও সন্দেহ নেই, আর তাঁর পুরো জীবনই তো একটা উন্মুক্ত খাতার মতো।
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে যে বিতর্ক হচ্ছে, সেটা তেমন স্বাস্থ্যকর নয়। তিনি এ কথা কেন বললেন, তার সম্ভাব্য কারণ খোঁজা উচিত। জাতিকে এই প্রশ্ন পূর্ণাঙ্গরূপে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের উচিত, নিজেদের নিরাপদ মনে করা। কারণ, তাঁরা যেটা বলেন, সমাজে তার প্রতিক্রিয়া হয়, সংখ্যাগুরুর কথার ক্ষেত্রে তা হয় না।
দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, বিভাজনই কিন্তু এখন পর্যন্ত মূল বিষয়। বিভাজন একটা বাস্তবতা। জওহরলাল নেহরু ও সরদার প্যাটেল এটা মেনে নিয়েছিলেন, যাঁরা তখন স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এটা সত্য যে তাঁরা দুজনেই দেশভাগ মেনে নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁরা মনে করলেন যে ব্রিটিশ শাসন অবসানের আর রাস্তা নেই, তখন তাঁরা ভারত ভাগ করতে রাজি হলেন।
গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন যখন দেশভাগের পালে হাওয়া দিলেন, তখন মহাত্মা গান্ধী তাঁর কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে তিনি কিছু করতে নারাজ ছিলেন। কিন্তু যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি বললেন, তাঁরা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মীমাংসা ছাড়াই দেশ ত্যাগ করবেন, তখন নেহরু ও প্যাটেল সত্যের মুখোমুখি হয়ে দেশভাগ মেনে নিলেন, যদিও অনেক দুঃখ ও বেদনা নিয়ে।
এটা সত্য যে ধর্মের ভিত্তিতে যে বিভাজন রেখা টানা হলো, তার ফলাফল বিপর্যয়কর। ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য মানুষকে এই মূল্য দিতে হয়েছে। দুঃখজনকভাবে বিব্রতকর সত্য হচ্ছে, দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের জাতশত্রুতে পরিণত হয়। এর জন্য দুই তরফের রাজনীতিকদেরই দায়ী করতে হবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের রাজনীতিকেরা এখনো বিভাজনের পথেই হাঁটছেন।
ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছিল, এটা শুধু কথার কথা। রাজনৈতিক নেতারা শান্তি ও বন্ধুত্বের অনেক আশ্বাস শোনালেও মানুষ এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গেছে, যেখানে তাদের সম্প্রদায়ের মানুষ থাকে। ইতিহাসে এর আগে এমন রক্তাগঙ্গা সৃষ্টি হয়নি, দুই সম্প্রদায়ের মোট প্রায় এক কোটি মানুষ মারা গেছে এবং তার কয়েক গুণ ঘরছাড়া হয়েছে।
এখনো সেই ক্ষত শুকায়নি। এর বিপরীতে ভারত-পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধ করেছে, আর দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাও নেই। ভারতের মুসলমানরা সংখ্যায় ১৫ কোটি হলেও তারা সেখানে গুরুত্ব হারিয়েছে আর পাকিস্তানের হিন্দুরা দেশটির জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান নিজেকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করল, তারা সেই ধারায় সংবিধানও প্রণয়ন করল। ওদিকে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলো। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দু হলেও হিন্দুরা এমন একটি সংবিধান অধিকতর শ্রেয় মনে করল, যার মুখবন্ধেই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা রয়েছে। সেখানে আইনের সামনে সবাই সমান আর ধর্মের কারণে কেউ নিকৃষ্ট নয়। যদিও এই রাষ্ট্রের পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা খুবই নগণ্য।
ভারতে এখন ভোটারদের মধ্যে বিভেদ নেই, স্বাধীনতার আগে যেটা ছিল। ফলে সংখ্যালঘুরা সেখানে অসহায় নয়। কিন্তু নির্বাচন হয়ে গেলে অন্য বিষয়গুলো সামনে চলে আসে, আর মুসলমানরা উপেক্ষিত হয়। নির্বাচনের আগে যেমন থাকে, নির্বাচনের পরও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার বিভেদই প্রধান হয়ে ওঠে। ভারত এখনো এই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

ইসলামভীতির ক্রসফায়ারে ইউরোপীয় মুসলিম by হোসাম শাকের

পশ্চিমের দেশগুলোর অনেকেই এখন সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য ইসলামকে দায়ী করে। প্রকারান্তরে এভাবেই দায়েশ বা ইসলামিক স্টেটকেই (আইএস) পুরস্কৃত করা হচ্ছে। সন্ত্রাসীদের দাবি, তারা ইসলামের কট্টর অনুসারী। আর ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, ইসলাম ধর্মের ‘মৌলিক সংস্কারের’ প্রয়োজন- দুই পক্ষের মাঝে পড়ে খাবি খাচ্ছে ইউরোপের মুসলমানরা। অসহনীয় একটা সময়ের মধ্যে যাচ্ছে তারা।
সন্ত্রাসীরা ইসলামকে বিকৃত করছে। আর এরই জেরে ইউরোপে মুসলিমবিদ্বেষী প্রচার চলছে। বৈষম্যের শিকার হচ্ছে মুসলমানরা। সমালোচকেরা দাবি তুলতে শুরু করেছেন, ধর্মে আমূল পরিবর্তন আনার। একই সাথে তাদের নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠ অবস্থান নিশ্চিত করারও চেষ্টা চলছে। এসব সমালোচক মুসলমানদের সাথে এমনভাবে কথা বলে যেন তারা প্রধান শিক্ষক। বিশৃঙ্খল শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করতে নেমেছে। তারা মুসলমানদের শুধু ‘বাড়ির কাজ’ দিয়েই থেমে নেই। চাপ দিয়ে ধর্মে ‘সংস্কার’ আনতেও তারা দৃঢ়প্রতীজ্ঞ।
ইউরোপের এসব সমালোচক কণ্ঠকে সাময়িকী আর পত্রিকার পাতায় কলামের পর কলাম জায়গা দেয়া হচ্ছে। টেলিভিশনে বিশেষভাবে সময় দেয়া হচ্ছে তাদের। সবাই মিলে মুসলমানদের হামলার কারণে তাদের কতটা বেদনা সৃষ্টি হয়েছে সেই বয়ানে ব্যস্ত। কেন এমন হচ্ছে সেই কারণ জানতে আগ্রহী নয় তারা। ইসলামের বাণী পড়ার আগ্রহও তাদের নেই; বরং মুসলমানদের বিশ্বাস নাকচ করে ধর্মকে বাতিল করে দিতেই তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রথাগতভাবে ‘সংস্কার’ বা ‘পুনর্বিবেচনা’ বলতে যা বোঝায়, এসব তা নয়। সমালোচকেরা প্রকৃতপক্ষে এখন ধর্মের নিন্দায় ব্যস্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে মুসলমানদের বলা হয়, ‘তোমার ধর্ম পুনর্বিবেচনা করো’ বা ‘তোমাদের ধর্মীয় নেতারা কী বলছেন বিশ্লেষণ করো, তাদের বিরোধিতা করতে পিছপা হয়ো না’- এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। সংখ্যাগুরুদের পক্ষ থেকে এ ধরনের দাবি উঠছে। তবে প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের ধর্ম বাদ দেয়া বা পরিবর্তন করলেই কি বিশ্বে চলমান সন্ত্রাস থেমে যাবে? বাকিরা কি এমনটাই আশা করছেন?
যেসব বিশেষজ্ঞ হামলাকারীদের ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন তারা জানিয়েছেন, এসব জঙ্গি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেননি। তাদের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা তেমন একটা নেই বললেই চলে। এরা ইউরোপের সরকারি স্কুলে লেখাপড়া করেছে, বেড়ে উঠেছে ক্রেতাবান্ধব সমাজে। সেখানেই মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা সঙ্কটের মুখে পড়ে তারা। তাদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কারণ সেখানেই প্রথিত।
অন্য দিকে মুসলিম বিশ্বে যে লড়াই এবং সঙ্কট চলছে তা-ও সন্ত্রাসী সহিংসতার নতুন নতুন সংস্করণ তৈরির অন্যতম কারণ। এসব সহিংসতার কালো মেঘই ইউরোপের দিকে উড়ছে।
ইউরোপে যে ব্যথা সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রসঙ্গে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। একগুঁয়ে কলাম লেখকেরা যেসব ভুল যুক্তি দেখিয়ে চলেছেন, সেগুলোর ছড়িয়ে পড়াও বন্ধ করার বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার পর ইসলাম ধর্মকে পুনর্বিবেচনা এবং সংস্কারের যে দাবি উঠছে, সেটাও ভুলে ভরা এবং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। বর্তমানে সন্ত্রাসী হামলার যে স্রোত বয়ে চলেছে তার প্রকৃত কারণ অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। হামলার জন্য সরাসরি ইসলামকে দায়ী করে এর পেছনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণগুলোকে চাপা দেয়া হচ্ছে। ফলে সঙ্কট সমাধানের জন্য যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।
গত শতাব্দীতে যখন বামপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নানা স্থানে হামলা চালিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন কি মার্কস ও এঙ্গেলসকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল? মিয়ানমারে যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন চলছে তার জন্য বুদ্ধকে দায়ী করা হয়েছে কখনো? লর্ড রেজিস্টেন্স আর্মি দাবি করেছে খ্রিষ্টান ঈশ্বরের আদেশে তারা উগান্ডায় তাণ্ডব চালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সে কারণে তো খ্রিষ্টান ধর্মে পরিবর্তন আনার দাবি কেউ করছে না।
যারা সন্ত্রাসী হামলার জন্য ইসলামকে দায়ী করছে, তারা প্রকারান্তরে আইএসকেই পুরস্কৃত করছে। তাদের স্লোগানটিও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। অর্থাৎ মূলধারার মুসলমানরা সন্ত্রাসকে যে ভাষাতেই নিন্দা জানান না কেন তা অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে।
সব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন। এটা আমাদের মানতে হবে। তবে কয়েকটি দেশ কি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনে সে সাহস দেখাতে পারবে? ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং তাদের নির্যাতনের নতুন ধারাকে সমর্থনকারী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলে তার ফলাফল কেমন দাঁড়াবে? অথবা গণতন্ত্রের ধার ধারে, এমন একনায়ক শাসকদের সাথে সম্পর্ক যদি পুনর্বিবেচনা করা হয়?
তবে যারা নীতিনির্ধারকদের বিরক্ত করতে চান না তারা ইতিহাস পুনর্বিবেচনা করে দেখতে পারেন। কারণ ইতিহাস থেকে আসা কম্পনই আমরা আজো অনুভব করে চলেছি। উদারহণ হিসেবে ঔপনিবেশিক আমলের কথা বলা যায়। তখন কয়েকটি দেশ যে তীব্র অনাচার-অত্যাচার চালিয়েছে আজ পর্যন্ত তার জন্য কারো বিচার হয়নি। কেউ ক্ষমা চায়নি।
ভিয়েনায় বসবাসকারী হোসাম শাকের গবেষক ও লেখক। ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ এবং সামাজিক ও গণমাধ্যমের নানা বিষয় বিশ্লেষণে তার আগ্রহ রয়েছে। লেখাটির অনুবাদ করেছেন। তানজিলা কাওকাব

সরকারদলীয়দের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য পায় না দুদক by মোর্শেদ নোমান

গত পাঁচ বছরে দুদকের কৌশলী পদক্ষেপে সরকারি দলের দুই শতাধিক রাজনীতিবিদ ও সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি দুর্নীতির মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা থেকে রেহাই পাননি।
ওই সময়ে আরও কয়েক হাজার প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদকে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়লেও অনুসন্ধান পর্যায়ে নথিভুক্ত (মামলার জন্য উপযুক্ত নয়) এবং মামলা করার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে অব্যাহতিপত্র দেওয়া হয়েছে। কমিশনের ভাষায় ‘অভিযোগের আমলযোগ্য তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কারণে’ তাঁরা অব্যাহতি পেয়েছেন।
তবে দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে দুদক কাউকেই ছাড় দেয় না। কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার করে না। অনুসন্ধানের সময় আদালতে উপস্থাপন করার মতো তথ্য না পেলে অভিযোগটি নথিভুক্ত করে কমিশন। আর তদন্তে কোনো অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
দুদক সূত্র জানায়, ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের জন্য ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার কয়েকবারে ৩৩৭ জনের তালিকা পাঠায় দুদকে। তাঁদের সবাই সরকারদলীয় নেতা কিংবা সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিন্তু দুদক আইনে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনা করে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ না থাকায় ভিন্ন কৌশলে তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। তদন্তে অভিযোগের ‘সত্যতা’ না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া, ‘মানবিক বিবেচনা’য় আপিল না করা এবং আপিলের পর উচ্চ আদালতে উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজের আবেদন করা—এ তিন পদ্ধতিতে মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা হয়।
কিন্তু গত ১২ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ হাজি সেলিমের দুর্নীতির মামলা শেষ মুহূর্তে না চালানোর জন্য দুদকের সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি ওই আদেশে বলেন, শুনানিকালে এভাবে খারিজের আবেদন করা বা মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে আদালত বিভ্রান্ত হন। হাজি সেলিমের এই মামলায় ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন। রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৩ বছরের দণ্ড বাতিল হয়।
দুদকের প্যানেল আইনজীবী খুরশিদ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, যে আইনি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা খুবই স্পষ্ট। তাই একই ধরনের কোনো মামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে আপিল বিভাগ নিরুৎসাহিত করেছেন।
সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এভাবে একের পর এক ছাড় পেয়ে গেলেও বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান বা তদন্তে খুবই কঠোর অবস্থানে দুদক। এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ’৯৬ সালের একটি নোটিশের ধারাবাহিকতায় সম্পদ বিবরণী দিতে হয়েছে দুদকে। গত বছর হিসাব বিবরণী দিতে দুদকে এসে অলি আহমদ সাংবাদিকদের কাছে বলেন, মন্ত্রিত্ব গ্রহণ না করার খেসারত হিসেবে তাঁকে দুদকে আসতে হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ ও তাঁর প্রবাসী ভাই মঞ্জুর আহমদ, বিএনপির নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার, এম মোরশেদ খান, আলী আসগার লবি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা, মোসাদ্দেক আলী ফালু, এহছানুল হক, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দুদকের মামলায় লড়ছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের একাধিক মামলা চলছে। তবে খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় দুদক। আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা পরিচালনার সময় সিঙ্গাপুর থেকে পাচার করা অর্থ ফেরত এনেছে দুদক।
দুদকে আসা অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন লাখের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ২২ হাজার অভিযোগের অনুসন্ধান হয়। বাকি অভিযোগগুলো দুদকের তফসিলভুক্ত না হওয়ায় অনুসন্ধানের জন্য বিবেচনা করা হয়নি। ২২ হাজার অভিযোগ অনুসন্ধানের পর প্রায় চার হাজার মামলা করা হয়। অভিযোগের ‘সত্যতা’ না পাওয়ায় নথিভুক্ত করা হয় প্রায় ১৮ হাজার অভিযোগ। এর মাধ্যমে ১৮ হাজার ৩৯ জন দুদকের অব্যাহতিপত্র পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও ব্যবসায়ী ৬৯৭ জন, বিভিন্নভাবে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি ১৫ হাজার ১১ জন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন অন্তত তিন হাজার।
অন্যদিকে এ সময়ে করা মামলাগুলোর মধ্যে ১ হাজার ১৩১টির অভিযোগপত্র দেওয়া হয় আদালতে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ২ হাজার ৮৬৭টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ৩ হাজার ২২ আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকারদলীয় নেতা-কর্মী ও ব্যবসায়ী রয়েছেন ৮৬১ জন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাপক হারে দায়মুক্তির কারণে এ প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক যে দুদক বাস্তবেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে কি না।
অভিযোগ থেকে দায়মুক্তির ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা গেছে, অনেক ঘটনায় দৃশ্যমান প্রমাণ থাকলেও দুদকের কর্মকর্তারা এর কোনো প্রমাণ পাননি। নির্বাচন কমিশনে নিজেদের দেওয়া হলফনামায় আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও ‘ভুল হয়েছে’ অজুহাত গ্রহণ করে অনেককে দায়মুক্তি দিয়েছে দুদক। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বেশ জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আলোচিত অনেক ব্যক্তিত্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তি পেয়েছেন বলে কথিত রয়েছে।
নবম জাতীয় সংসদের হলফনামা নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান শেষে হলফনামায় তথ্য দিতে ‘ভুল হয়েছে’ যুক্তি গ্রহণ করে আ ফ ম রুহুল হক ও আসলামুল হককে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় সংস্থাটি। সরকারদলীয় সাংসদ এনামুল হকের বিরুদ্ধে ২১৩ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে অনুসন্ধান কর্মকর্তা মামলার সুপারিশ করলেও তাঁকে অব্যাহতি দেয় কমিশন। তবে সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, সাংসদ আবদুর রহমান বদি, বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী ও সাতক্ষীরার সাবেক সাংসদ আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।
মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বন্ধুদের সম্মাননা দেওয়ার সময় ক্রেস্টের সোনা জালিয়াতির অনুসন্ধানের কাজ শুরু হলেও দীর্ঘদিনেও এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই।
রেলওয়ের দুর্নীতির কালো বিড়াল ধরার ঘোষণা দিলেও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার অভিযোগ ওঠে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে। কিন্তু ঘুষের তথ্য ফাঁসকারী ইউসুফ আলী মৃধার গাড়িচালক মো. আলী আযম প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে না আসায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর রেলওয়ের নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগে ১৩টি মামলা করে দুদক। ওই সব মামলার প্রধান আসামি ইউসুফ আলী মৃধাকে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে ছয়টি মামলার অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠলেও মামলায় তাঁকে আসামি করেনি দুদক। দায়মুক্তি দেয় অনুসন্ধান পর্যায়েই। সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও মামলায় আনা হয়নি। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু ও ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য থাকলেও দুদকের করা ৫৬টি মামলার একটিতেও আবদুল হাই বাচ্চু বা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি।
পেট্রোবাংলায় নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগে সংস্থার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুরের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে ৪০৩টি হজ এজেন্সিকে লাইসেন্স দেওয়ার ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান চালায়নি দুদক। অথচ প্রতিমন্ত্রীর এপিএস সৌমেন্দ্র লাল চন্দর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
এ ছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে দায়মুক্তি পেয়েছেন ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাসহ অনেকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাংসদ হাজি সেলিম, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান, আনন্দ শিপইয়ার্ডের মালিক আবদুল্লাহিল বারী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হুদা, ইউসিবিএলের এমডি মুহাম্মদ আলী, সোনালী ব্যাংকের সিবিএর সাধারণ সম্পাদক হাসান খসরু, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুছুর রহমান, পুলিশের ডিআইজি (এসবি) মো. রফিকুল ইসলাম, এসপি মিজানুর রহমান প্রমুখ।

প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ by মহিউদ্দিন অদুল

বর্ষার পানিতে ঢাকার আশপাশের বিলঝিলের জমির আইল বা সীমানা ডুবে গেলে সুবিধামতো জায়গায় বিশাল জমির মালিক বনে যান প্রতারক নিজাম মোল্লা। বর্ষা এলেই তার জমি বিক্রির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিভিন্নভাবে ভুলিয়ে কম মূল্যে অন্যের জমি বিক্রি করে দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জমির রেজিস্ট্রিও সম্পাদন করেন। তার এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকে। তিন বছর আগে একই কায়দায় নিজাম মোল্লা আশুলিয়ায় মহাসড়কের পাশে সাড়ে চার লাখ টাকায় ১৬ শতক জমি বিক্রি করেন শাহবাগ বটতলা ক্ষুদ্রফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদকে। সম্প্রতি ওই জমি অন্য একজনকে বিক্রির চেষ্টার খরব পেয়ে জমিতে ছুটে যান আবুল কালাম। গিয়ে তাতে বাধা দেন। পরে জানতে পারেন ওই জমি আরও তিনজনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। শেষে নিজাম মোল্লা ওই জমির মালিকই ছিলেন না জানতে পেরে হতবাক হয়ে যান তিনি। এরপর নিজাম মোল্লাকে এ প্রতারণায় হাতেনাতে ধরা হলে প্রতারণার কথা স্বীকার করে টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে আজ পর্যন্ত টাকা ফিরে পাননি তিনি। আবুল কালাম আজাদ মানবজমিনকে বলেন, নিজাম মোল্লা কয়েক বছর আগে আগ বাড়িয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় ও সুসম্পর্ক গড়েন। এরপর আন্তরিকতা ও উপকারের মানসিকতা দেখিয়ে কমমূল্যে জমি দেয়ার নাম করে বর্ষায় আশুলিয়ায় নিয়ে জমি দেখান। জানান, ডুবে থাকা জমিগুলো তার। এরপর আমাকে জমি বিক্রি করে রেজিস্ট্রিও করে দেন। পরে তার প্রতারণা ধরা পড়ার পর দেখি ভিন্ন লোকের ওই জমিটি একই কায়দায় আরও তিনজনকে বিক্রি করেছেন। পরে জানতে পারি একইভাবে তিনি অনেক লোককে একইভাবে প্রতারণা করে জমি বিক্রির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সব দলিলপত্র, টাকা গ্রহণের ছবিসহ সব প্রমাণ থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে এ প্রতারণার বিচারও চাইতে পারছি না। রাজধানীর চারদিকে ওত পেতে আছে এমনই নানা প্রতারণার ফাঁদ। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বিপণিবিতান, অফিস-আদালত, সচিবালয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায়। বাকি নেই বাস-ট্রেনও। সকাল-সন্ধ্যে যে কোনো সময় যে কেউ অচেনা-অর্ধচেনা লোকের মন ভোলানো নানা তৎপরতায় এমন বহু প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রতারণায় রাজধানীতে প্রতিদিনই একাধিক মানুষ হারাচ্ছেন টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি। শুধু তা-ই নয়। প্রতারণায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে প্রায় প্রতি মাসে। এতেই শেষ নয়। অনেকে চেনা বা অর্ধচেনা মানুষের কাছেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও নেই প্রতিকার। রাজধানীর সব থানায় প্রতারণার শত শত অভিযোগ গেলেও তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শিডিউলভুক্ত হওয়ায় থানা পুলিশ তদন্ত করতে পারছে না। আবার দুদকও লোকবল সংকটের অজুহাতে অভিযোগগুলো তদন্ত করছে না বললেই চলে। ফলে প্রতারণার প্রতিকার চাওয়ার রাস্তাও বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফল হিসেবে প্রতারণার ঘটনা বাড়লেও অভিযোগ ও মামলা করার প্রবণতা কমে গেছে। এ সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নানা প্রতারক চক্র।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মানবজমিনকে বলেন, প্রায় সময় বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করলে তথ্য-প্রমাণ নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই প্রতারণার অভিযোগের তদন্ত দ্রুত সারতে হয়। কিন্তু লোকবল সংকটের পাশাপাশি সক্ষমতা না থাকলেও দুদককে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে এখন প্রতারণার তদন্ত প্রায় হচ্ছেই না। এতে প্রতারণার শিকার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তারা ক্ষতির শিকার হলেও আইনি সুরক্ষা বা প্রতিকার পাচ্ছেন না, যা সুশাসন বাস্তবায়নে অন্তরায়।
বৃহস্পতিবার সকালে সরজমিনে দেখা তিন বেদেকন্যার আরেক প্রতারণা ছিল এমনই- ‘তোমার কপাল তো খুলে গেছে। এখন থেকে শুধুই উন্নতি হবে তোমার। তবে হাদিয়া ছাড়া তা জানানো যাবে না। অশুভ। ভাগ্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। ২০ টাকা দাও।’ হঠাৎ এই বলে কাকরাইল মোড়ে ওই তিন মহিলা পথ আগলে দাঁড়ায় মধ্য বয়সী সুনিল চন্দ্র সাধুর। টাকা বের করতেই পুরনো টাকা না নিয়ে নতুন ১০০ টাকার একটি নোট পছন্দ করে বসে তারা। ৮০ টাকা ফেরত দেয়ার নাম করে তা হাতিয়ে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে একজনের হাতে থাকা কৌটায় ঢুকিয়ে নেয়। বলে ‘পুরো টাকাই নিলাম। তোমার অনেক মঙ্গল হবে।’ একাধিকবার অনুরোধেও ওই টাকা ফিরে পায়নি সুনিল। এর কারণ জানতে চাইলে ওই তিন বেদেকন্যা জানায়, এমনি চাইলে তো কেউ টাকা দেয় না। তারা আরও জানায়, এভাবে প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ জন মানুষের কাছ থেকে প্রতিজন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে। প্রতিদিন ৫০০-এর মতো মহিলা সাভার থেকে ঢাকা শহরে এসে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এ প্রতারণার কাজ করে বলে জানায় তারা। তবে তারা নিজেদের নাম ও দলনেত্রীর নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।
এর আগে গত ২৪শে নভেম্বর সকালে মিরপুরে ছদ্মবেশী ডাববিক্রেতা হাজি মহসিন (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে ভুলিয়ে ডাব খাওয়ায়। এরপর মেরুল বাড্ডার বাসায় যাওয়ার জন্য বাসে উঠে বসতেই তিনি অজ্ঞান। এরপর হাতিয়ে দেয়া হয় তাকে। ওই দিন অচেতন মহসিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর শেষরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
গত এপ্রিলে কলাবাগান থানায় কর্মরত উপপরিদর্শক এস এম ফারুক আলমের (বর্তমানে বাড্ডা থানায় কর্মরত) মোবাইলে ফোন আসে। বিকাশের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় ‘এজেন্ট কমিশন বা চার্জ ছাড়া বিকাশে টাকা লেনদেনের সিস্টেম আছে। সে সুযোগ নিন। এজন্য নতুন বিকাশ আইডি খুলতে হবে। আমি যেভাবে বলি সেভাবে আপনি নতুন আইডি খোলতে থাকুন।’ এই বলে সে আমাকে দিয়ে নতুন আইডি খুলিয়ে নিচ্ছিল। তাতে আমার বিকাশে থাকা ৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এমন সময় সঙ্গে থাকা অন্য একজনের পরামর্শে শেষ কাজটুকু বাকি রেখে বলি ‘একটু অপেক্ষা করুন। বিষয়টি কাছে থাকা এক এজেন্টের কাছ থেকে জেনে নিই। এর পরই তিনি এজেন্টের কাছে না যেতে অনুনয়-বিনয় করতে শুরু করে। তা না শুনলে একপর্যায়ে গালাগাল শুরু করে। পরে নিজেই প্রতারণার কথা স্বীকার করে মোবাইলের সংযোগ কেটে দেয়।’ তবে বিকাশ নম্বরে ভিন্ন এক প্রতারণায় ৬ হাজার টাকা খুইয়েছে দক্ষিণ বাড্ডা বাজার এলাকার স্বয়ং বিকাশ এজেন্ট ফারুক হোসেন। সম্প্রতি তার বিকাশ নম্বরে বিকাশ কার্যালয় থেকে পাঠানোর আদলে ৮ হাজার টাকার একটি ভুয়া খুদে বার্তা আসে। এরপর সন্ধ্যার ব্যস্ততম সময়ে বারবার ফোন আসে আর বলতে থাকে ‘একজন লোকের জন্য ২ হাজার টাকা পাঠাতে গিয়ে ভুলে ৮ হাজার টাকা চলে গেছে। ৬ হাজার টাকা আমার নম্বরে ফেরত পাঠান।’ খুদে বার্তা দেখে তিনি ৬ হাজার টাকা বিকাশে ফেরত পাঠান। পরে ব্যালেন্স দেখে বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে ওপারের মোবাইল নম্বর।
এদিকে গত ২৭শে নভেম্বর সকালে রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর সড়ক থেকে মো. শহিদুল ইসলাম নামের এক প্রতারককে বিভিন্নজনের ২৭টি পাসপোর্ট ও প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়া সাড়ে তিন লাখ টাকাসহ আটক করে র‌্যাব-১। জিজ্ঞাসাবাদে শহিদ বিদেশে পাঠানোর নামে বিভিন্নজনের পাসপোর্ট নিয়ে প্রতরণা ও জিম্মি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা ও সক্ষমতার অভাবে এসব নানা প্রতারণার প্রতিকারই চাইতে পারছেন না ভোক্তভোগীরা। প্রতারণায় সর্বস্ব হারালেও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সুযোগই যেন নেই।
জানা যায়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ব্যস্ততম এলাকা, অফিস-আদালত, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় রয়েছে প্রতারক ও সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। নানা কায়দায় তারা প্রতারণার ফাঁদ পাতে। সাধারণ সহজ-সরল মানুষই তাদের লক্ষ্য। সুযোগ বুঝেই নানা ছল-চাতুরী ও মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে। এসব প্রতারণার মধ্যে রয়েছে কম দামে জমি বিক্রি, চাকরি প্রদান, কম খরচে বিদেশ প্রেরণ, বিকাশ বা মুঠোফোনে বড় পুরস্কার জেতা, উন্নত ওষুধ বিক্রি, কম দামে বিদেশি ভালো জিনিস বিক্রি, ভাগ্য পরিবর্তন ইত্যাদি। এসব প্রতারণার কৌশলগুলো বিচিত্র ও অভিনব। প্রথমে পরিচয়, তার নানা কায়দায় বিশ্বাস জমানো, প্রয়োজনে আগে বিনিয়োগ, এরপর সুযোগ বুঝে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি নানা পর্যায় ও স্তরে চলে প্রতারণায় কার্যসিদ্ধি। রাজধানী ঢাকায় কয়েক সহস্রাধিক লোক ও প্রতারক চক্র শতাধিক রকমের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ ঘটনাচক্রে ধরপাকড় হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার প্রতারণায় জড়াচ্ছে। তবে চার বছর ধরে প্রতারণার অভিযোগ তদন্তের অভাবে মামলা করা প্রায়ই হচ্ছে না। এতে পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতারক চক্র।
দুদক ও আদালত সূত্র জানায়, গত ২০১৩ সালের ২০শে নভেম্বর প্রতারণার মামলাগুলো আইন করে দুদক শিডিউলভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে আদালত, থানা পুলিশ বা দুদকের কাছে প্রতারণার অভিযোগ গেলে সব অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা (আদালত ও পুলিশের পরিবর্তে) দুদকের ওপর ন্যস্ত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৮ হাজারের বেশি প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও তদন্ত হচ্ছে মাত্র হাতেগুনা কয়েকটির। লোকবল সংকটের কথা বলে দুদক প্রতারণার মামলা তদন্ত করছে না। এ সুযোগে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য ও আইনজীবী। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও কমেছে অভিযোগ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, প্রতারণাকে আমরা দুই ভাগে দেখে থাকি। কিছু হচ্ছে সরকারি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কিত। আর কিছু হচ্ছে এর বাইরের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার প্রতারণা। এর আগে সব প্রতারণার মামলাই দুদকের তফসিলভুক্ত করা হয়েছিল। লোকবল সংকটসহ বিরাজমান সীমাবদ্ধতায় দুদকের পক্ষে এত মামলা তদন্তের চাপ নেয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে সারা দেশে পুলিশের নেটওয়ার্ক রয়েছে। আমরা সরকার সংশ্লিষ্ট মামলা ছাড়া বাকিগুলো তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেয়ার জন্য সরকারকে জানিয়েছি। অচিরেই সংসদে বিল আকারে পাস হতে পারে। তা হলেই পুলিশ তা তদন্ত করবে।
এজন্যই বর্তমানে ব্যক্তি খাতের প্রতারণার অভিযোগগুলো তদন্ত ছাড়াই ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, একেবারে বন্ধ নেই। তবে এখন ওই অভিযোগ বা মামলাগুলোর তদন্ত ধীরগতিতে চলছে।

কুনিও হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড়

কুনিও হোশি,সিজার তাবেলা
রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার নয় সপ্তাহ পর মামলার তদন্ত নতুন মোড় নিয়েছে। শুরুতে এ ঘটনায় কুনিও হোশির এক ব্যবসায়িক সহযোগীসহ বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এখন পুলিশ বলছে, এ হত্যায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি জড়িত।
মাসুদ রানা (৪০) নামে জেএমবির একজন ‘কমান্ডার’ গত সোমবার রংপুরের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে কুনিও হত্যাসহ রংপুরের সাম্প্রতিক তিনটি হামলার কথা স্বীকার করেছেন। স্বীকারোক্তির বিষয়টি গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন রংপুরের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুল মালেক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
রংপুরে গত ৩ অক্টোবর জাপানি নাগরিক ও ঢাকায় ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির নাগরিক হত্যায় বিএনপি-জামায়াত জড়িত থাকতে পারে বলে এর আগে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছিল। উভয় ঘটনায় ঢাকায় বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তারও করে। এর মধ্যে ঢাকায় ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যার পরিকল্পনায় ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আবদুল কাইয়ুম জড়িত বলে পুলিশ দাবি করে। কাইয়ুমের ভাইকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
গতকাল পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হুমায়ুন কবীর সাংবাদিকদের বলেন, জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যায় জড়িত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আঞ্চলিক কমান্ডার মাসুদ রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাসুদই কুনিওকে গুলি করেছেন। তিনি বলেন, এই মাসুদ গত ১০ নভেম্বর কাউনিয়ায় মাজারের খাদেম রহমত আলীকে হত্যা এবং ৮ নভেম্বর বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা রুহুল আমিনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টায় জড়িত ছিলেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, ‘জাপানি নাগরিক হত্যা ঘটনার আলামত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পেয়েছি। আশা করি খুব শিগগির প্রকৃত ঘটনা আপনাদের জানাতে পারব।’
মাসুদ রানাকে কবে, কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে ডিআইজি কিছু বলেননি। পুলিশসহ স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মাসুদ রানার বাড়ি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া গ্রামে। তাঁকে গত বৃহস্পতিবার বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে।
এই দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে দায় স্বীকার করে। সাইট নামে একটি মার্কিন নজরদারি সংস্থার বরাতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এ খবর বের হলে বাংলাদেশ সরকার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
কুনিও হত্যা মামলায় এর আগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ ও র্যা ব। তাঁরা হলেন কুনিওর ব্যবসায়িক সহযোগী হুমায়ুন কবির (হীরা), রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য রাশেদ-উন-নবী খান ওরফে বিপ্লব, মহানগর যুবদলের সদস্য রাজীব হাসান ওরফে মেরিল সুমন, শহরের জুম্মাপাড়ার নওশাদ হোসেন ওরফে ব্ল্যাক রুবেল ও শালবন মিস্ত্রিপাড়ার কাজল চন্দ্র বর্মণ ওরফে ভরসা কাজল। তাঁদের মধ্যে রাশেদ-উন-নবী হলেন বিএনপির ঢাকা মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিব-উন-নবী খানের (সোহেল) ভাই। এ ঘটনায় তখন হাবিব-উন-নবী খানকে খুঁজেছিল পুলিশ। তিনি আত্মগোপনে আছেন।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় মাজারের খাদেম হত্যা ও রংপুরে বাহাই সম্প্রদায়ের এক নেতাকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এর আগে ছয় ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। খাদেম হত্যায় গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি হলেন কাউনিয়ার মধুপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সদস্য মোর্শেদ আলী, শহিদুল ইসলাম ও আবু রায়হান ওরফে রঞ্জু। বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী রুহুল আমিন হত্যাচেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান ওরফে নয়ন, শহরের ধাপ এলাকার আবু রায়হান ও সজলকে।
এখন তিনটি ঘটনাতেই জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন জেএমবির ‘আঞ্চলিক কমান্ডার’। এ অবস্থায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশ কী করবে? জানতে চাইলে গতকাল রংপুরের ডিআইজি সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তিনি কেবল বলেন, ‘এসব ঘটনার সঙ্গে একটি বিরাট সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। সবকিছুই বেরিয়ে আসবে।’
কুনিও হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, পীরগাছা উপজেলার আরও দুজন জেএমবির জঙ্গি গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। তাঁদের শিগগির গ্রেপ্তার করা হবে।
কুনিও হত্যা মামলায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে যাঁরা কারাগারের বাইরে আছেন, তাঁরা আত্মগোপনে, মুঠোফোনও বন্ধ।
কুনিও হোশির হত্যায় জেএমবি জড়িত থাকার খবর প্রকাশের পর ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যার তদন্তও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আইএসের নিজস্ব সাময়িকী দাবিক-এর সর্বশেষ সংস্করণে (১৮ নভেম্বর অনলাইনে প্রকাশিত) দুই বিদেশি হত্যাসহ চারটি ঘটনায় আইএসের দায় স্বীকার করা হয়। একই সঙ্গে জেএমবির প্রশংসা ও এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানকে ‘শহীদ মুজাহিদ’ আখ্যা দেওয়া হয়। অপর দুটি হলো ঢাকায় হোসেনি দালানে ও আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যার ঘটনা।
দাবিক-এর এ দাবিও বরাবরের মতোই সরকার ও পুলিশ প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছিলেন, বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব বা সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। তাবেলা হত্যায় বিএনপি নেতা কাইয়ুম জড়িত। তাঁর ভাইকে দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
এ অবস্থায় ঢাকায় সিজার তাবেলা হত্যা মামলার তদন্ত আবার নতুন মোড় নেওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না—জানতে চাইলে মামলার তদন্ত-তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মাহফুজুল ইসলাম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে সিজার তাবেলা হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। রংপুরের প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত তাবেলার মামলার তদন্তে অন্য কিছু তাঁরা ভাবছেন না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, সিজার তাবেলা হত্যায় বিএনপি নেতা কাইয়ুমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র তৈরি হচ্ছে। বাকি ছয়জন হচ্ছেন কাইয়ুমের ছোট ভাই এম এ মতিন, তামজিদ আহম্মেদ ওরফে রুবেল, রাসেল চৌধুরী ওরফে চাক্কি রাসেল, মিনহাজুল আরেফিন ওরফে ভাগনে রাসেল, শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফ ও ভাঙারি সোহেল। তাঁরা সবাই বাড্ডা এলাকার বিএনপির কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তাঁদের মধ্যে এম এ কাইয়ুম ও ভাঙারি সোহেল ছাড়া সবাই গ্রেপ্তার আছেন। আর তামজিদ, রাসেল চৌধুরী, মিনহাজুল আরেফিন ও শাখাওয়াত হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
যদিও মতিন, তামজিদ, রাসেল চৌধুরী, মিনহাজুল ও শাখাওয়াতের স্বজনেরা দাবি করে আসছেন, ওই পাঁচজন তাবেলা হত্যায় জড়িত নন। ডিবি ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছে।

পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু: তথ্য দিচ্ছে না রেলওয়ে, থমকে আছে তদন্ত! by কাজী আনিছ ও আসাদুজ্জামান

জিহাদ
রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ের পানির পাম্পের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনার পুনঃতদন্ত কার্যত থমকে গেছে। হাইকোর্টের দেওয়া পুনঃতদন্তের নির্দেশের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ।
তদন্ত থমকে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন খোদ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, ওই নলকূপ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ কারণে তদন্ত আর এগোচ্ছে না।
২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনি এলাকায় গভীর পাইপে পড়ে যায় শিশু জিহাদ। পরদিন দুপুরে কয়েকজন সাধারণ যুবক চেষ্টা চালিয়ে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করে। গণমাধ্যমের কল্যাণে এ ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়।
শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ এনে বাবা নাসির উদ্দিন বাদী হয়ে ওই পানির পাম্প বসানোর প্রকল্প পরিচালক রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসআর-এর মালিক প্রকৌশলী আবদুস সালামের বিরুদ্ধে শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। গত ৭ এপ্রিল এ দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। কিন্তু আরও কয়েকজন আসামির নাম বাদ পড়ায় জিহাদের বাবা নাসির অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেন। নারাজিতে আবু জাফর, সাইফুল ইসলাম, দীপক বাবু ও নাসির উদ্দিন নামের রেলওয়ের চার কর্মকর্তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়ার আবেদন করা হয়। শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনাস্থল ওই পানির পাম্প স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে এ চারজনেরও অবহেলা ছিল বলে নারাজিতে বলা হয়।
নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ জুন আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) নির্দেশ দেন। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।
জিহাদের বাবা নাসির বলেন, ‘আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আমি ছিলাম শোকাহত। থানা-পুলিশ একটা অভিযোগ লিখেছিল। সেখানে আমি শুধু সই করি। আর ওই অভিযোগটাই মামলা হয়। মামলায় দুজনের নাম ছিল। কিন্তু পরে আমি জানতে পারি, আমার ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় আরও কয়েকজনের অবহেলা আছে। তাদের অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত না করায় আমি নারাজি দিয়েছি।’ নাসির বলেন, তিনি নারাজি আবেদনে নতুন চারজনের নাম দিয়েছেন। তাঁরা ওই পানির পাম্প স্থাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অথচ তারপরও কোনো তদন্ত হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জিহাদের  বাবা নাসির বলেন, মামলার তদন্ত এভাবে দীর্ঘায়িত হওয়ায় সুযোগ পেয়ে বসছে জড়িতরা। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে। বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে ক্ষতি আছে বলেও হুমকি দিচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে আমি রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি দিয়েছি। ওই নলকূপ স্থাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কারা, তাঁদের নাম-ঠিকানা, তাঁদের পদবিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে এ চিঠি দিয়েছি। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো উত্তর পাইনি।’ তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দিচ্ছে না বলেই মামলা নিয়ে এগোতে পারছেন না তিনি। তবে তিনি এবার নিজেই রেলওয়ে কার্যালয়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টা করব।’
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাত্র এক মাস হলো আমি এ পদে যোগ দিয়েছি। এ বিষয়টি আমি জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। আর তথ্য চাইলে অবশ্যই তথ্য দেব।’

সাজা কমলো শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের

একটি হত্যা মামলায় নব্বই দশকের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই মামলায় যাবজ্জীবন প্রাপ্ত আরেক আসামি কাবিল সরকারকে খালাস দেয়া হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেন।
আসামিপক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান, মাহবুব আলী, এএম আমিন উদ্দিন, খুরশীদ আলম খান। আদেশের পর খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, কাবিল সরকারকে আদালত খালাস দিয়েছেন। তাই তার কারামুক্তিতে বাধা নেই। জোসেফের সাজা কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে তার কত বছর সাজা ভোগ করা হয়েছে এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, যাবজ্জীবনের রায় হওয়ায় এই মুহূর্তে জোসেফ মুক্তি পাচ্ছে না। আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, জোসেফ এখনই মুক্তি পাচ্ছে না। তার আরও সাজা ভোগ করা বাকি রয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৭ই মে ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী রাশিদা পারভীন পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। এ মামলায় বিচারিক আদালত ২০০৪ সালের ২৫শে এপ্রিল আসামি জোসেফ ও মাসুদ মজুমদারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কাবিল সরকার, হারিস আহমেদ ও আনিস আহমেদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। হারিস ও আনিস পলাতক থাকায় তারা হাইকোর্টে আবেদন করেনি। তবে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে  হাইকোর্টে আবেদন করে জোসেফ, কাবিল ও মাসুদ। হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর মাসুদকে খালাস দিয়ে জোসেফের মৃত্যুদণ্ড এবং কাবিলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখেন। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জোসেফ ও কাবিল। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ গতকাল রায় ঘোষণা করলো।
কে এই জোসেফ?
এক সময়ের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী। প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে কারাবন্দি। বড় ভাইয়ের হাত ধরেই অন্ধকার জগতে পদার্পণ হয়েছিল তার। কারাগারে থেকেও নিয়ন্ত্রণ করেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা। নাম তার তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। জোসেফ নামেই পরিচিত সর্বমহলে। বড় ভাই হারিস আহমেদও পলাতক দীর্ঘদিন ধরে। হারিসের নামে ইন্টারপোলে রেড ওয়ারেন্ট জারি রয়েছে। পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর একজন তিনি। আরেক ভাই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। সাঈদ আহমেদ টিপু নামে এক ভাই মারা যায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে। গতকাল নতুন করে আলোচনায় আসলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার সাজা কমিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অন্য প্রায় ডজনখানেক মামলার কোনোটি থেকে জামিন আর কোনোটি থেকে রেহাই মিলেছে তার। গ্রেপ্তারের দিন থেকে দিন গণনা শুরু হলে শিগগিরই কারামুক্ত হয়ে যাবেন তিনিও।
জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জোসেফের বাবার নাম ওয়াদুদ আহমেদ। বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট জোসেফ। সবার বড় ভাইয়ের নাম আনিস আহমেদ। স্বৈরাচার এরশাদের আমলে জাতীয় পার্টির নেতা ছিলেন জোসেফের বড় ভাই হারিস আহমেদ। ৯০’র দশকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে মোহাম্মদপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতার হাত ধরে যোগ দেন যুবলীগে। ওই সময় তৎকালীন ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে জয়লাভও করেন। বড় ভাইয়ের হাত ধরে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় জোসেফের। পদে না থেকেও নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা পরিচয় দিতেন তিনি। বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। সেই থেকে অন্ধকার জগতে পদার্পণ হয় তার। সে সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দুটি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতো। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের। জোসেফের নামে প্রতিমাসেই মোহাম্মদপুর এলাকার বাস-ট্রাক-টেম্পোস্ট্যান্ড, ফুটপাথ, বাজার, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হতো। কারাবন্দি হওয়ার পরও তার অনুসারীরা তার নামে চাঁদা তুলতো। সূত্র জানায়, দীর্ঘ ১৮ বছর কারাবন্দি থাকলেও বিলাসী জীবন কাটিয়েছেন কারাগারেই। কারা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে কারাগারের ভেতরেই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাগিয়েছেন। কারণে-অকারণে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে কাটিয়েছেন বহু সময়। হাসপাতালে বসেই অনুসারীদের সঙ্গে মিটিং করাসহ নানা দিকনির্দেশনা দিতেন তিনি। তার নামে তোলা চাঁদার টাকাতেই কারাগারে বসে বিলাসী জীবনের ব্যয় নির্বাহ করেন তিনি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের ৭ই মে লালমাটিয়া এলাকায় মোস্তফা নামে ফ্রিডম পার্টির এক নেতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে জোসেফের বিরুদ্ধে। তৎকালীন সরকার শীর্ষ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে ধরতে পুরস্কার ঘোষণা করে। ওই তালিকায় ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল সন্ত্রাসী জোসেফের বিরুদ্ধে। এক বছর পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে জোসেফকে গ্রেপ্তার করে। সেই থেকে দীর্ঘ ১৮ বছর কারাবন্দি হয়ে রয়েছেন তিনি। মোস্তফা মার্ডার ছাড়াও আরও অন্তত ডজনখানেক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সবগুলোই খুন, ছিনতাই-চাঁদাবাজি আর অস্ত্র মামলা। সব মামলা থেকেই জামিন বা রেহাই মিলেছিল তার। কিন্তু মোস্তফা খুনের মামলায় ২০০৪ সালের ২৫শে এপ্রিল ঢাকার জজ আদালত তাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন তিনি। ২০০৮ সালে হাই কোর্টও সেই রায় বহাল রাখে। এরপর তার আইনজীবীরা লিভ টু আপিল চাইলে সুপ্রিম কোর্ট তা মঞ্জুর করে। গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার সাজা কমিয়ে দেয়।

সিলেট ছাত্রলীগে অস্থিরতা

কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সিলেটে মারমুখী হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। একপক্ষ কমিটি বাতিলের দাবিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ডেকেছে। আর নতুন কমিটির নেতারা সিলেট নগরীতে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। এতে নগরে আতঙ্কও বিরাজ করছে। আর এ নিয়ে বিব্রত সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতারা। এদিকে, গতকাল পদবঞ্চিত অংশের ছাত্রলীগ নেতারা সিলেটের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের পাশাপাশি শোডাউন করেছেন। ১০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণার প্রায় ১৫ মাস পর শুক্রবার দিবাগত রাতে জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। কমিটি অনুমোদনের জন্য জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায় অবস্থান করেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী, প্রকৃত ছাত্র এবং বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের হাতে নির্যাতিতদের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু শনিবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর জেলা ছাত্রলীগের একপক্ষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। রোববার জেলা ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ ৫২ নেতা এবং তাদের অনুসারীরা ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগের জন্য নগরীর আম্বরখানাস্থ হোটেল পলাশে জড়ো হন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন খান, ছাত্রলীগ নেতা সঞ্জয় চৌধুরী, জেলা ছাত্রলীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মওদুদ আহমদ আকাশ, গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক কনকপাল অরূপ, পাঠাগার সম্পাদক মেহেদী হাসান উজ্জল প্রমুখ। হোটেল পলাশে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা পদত্যাগ করতে উদ্যত হলে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু তাদের নিবৃত করেন। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন তিনি। এদিকে জেলা ছাত্রলীগের সদ্য পূর্ণাঙ্গ হওয়া কমিটি প্রত্যাখ্যান করে এবং কমিটি বাতিলের দাবিতে সোমবার বিকালে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। মিছিল পরবর্তী সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ছাত্রশিবির, ছিনতাইকারী, ছাত্রদল, অছাত্র, বিবাহিতদের স্থান দেয়া হয়েছে।’ তারা কমিটি বাতিলের দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে মঙ্গলবার সিলেট জেলা সকল বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজেছাত্র ধর্মঘট, বুধবার সকল উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল। একই সঙ্গে সমাবেশ থেকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরীকে সিলেটে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার বিকালে আবার নগরীতে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে মাজার জিয়ারতের পর সশস্ত্র মহড়া করতে দেখাযায়। এখানেও নবগঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটির পদধারী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে জেলা ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের এই কমিটি প্রত্যাখ্যানকে গুরুত্ব দিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের মন্তব্য হচ্ছে, ‘তারা পদত্যাগ করতে চাইলে করতে পারে। ঢাকায় এসে পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা গ্রহণ করা হবে।’ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের নবগঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র ধর্মঘট পালন করছে সংগঠনের একাংশের নেতারা। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় সিলেটের বিভিন্ন কলেজে অবস্থান নিয়ে তারা এ ধর্মঘট পালন করছে বলে জানিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিপ্লব কান্তি দাস। বিকাল ৪ টা পর্যন্ত এ ধর্মঘট পালন করছেন। বিপ্লব কান্তি দাস জানান, সিলেট জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনতিবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়ে ঘোষিত ২ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়েছে। এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ, মদন মোহন কলেজ ও দক্ষিণ সুরমা কলেজসহ সিলেট জেলার সকল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এ ছাত্র ধর্মঘট পালনের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছে।

যৌনপল্লী থেকে মিতা, পিয়ালীদের তুলে এনে আলো দেখাচ্ছে এসআরবি

গান গাইতে খুব ভালবাসত সে। কিন্তু গান গাইলেই যে বাবা বড্ড মারে। তাই একদিন রাগ করে ক্যানিংয়ের বাড়ি থেকে পালিয়েছিল ১৪ বছরের মিতা। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে পথ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছিল সোনাগাছিতে। এক যৌনকর্মীর ঘরে আশ্রয় পাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিল, এখান থেকে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। কিন্তু মিতার আশঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে তাকে উদ্ধার করেছিল ‘এসআরবি’ (সেল্ফ রেগুলেটরি বোর্ড)। সেই ঘটনার দশ বছর পর মিতা এখন এক জন পেশাদার গায়িকা।
শহরে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে বসিরহাটের পিয়ালীকে সোনাগাছিতে নিয়ে চলে এসেছিল পরিচিত এক যুবক। তারপর সোনাগাছির এক দালালের কাছে পিয়ালীকে বিক্রি করে চম্পট দিয়েছিল সে। কিন্তু ইচ্ছের বিরুদ্ধে দেহব্যবসায় নামতে হয়নি পিয়ালীকে। দালালদের খপ্পর থেকে তাকেও উদ্ধার করেছিল এসআরবি। পিয়ালী এখন বারুইপুরের একটি হোমে যৌনকর্মীদের সন্তানদের পড়ায়।
মিতা বা পিয়ালী কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বহুদিন ধরেই যৌনপল্লীতে চলে আসা কোনও অনিচ্ছুক মেয়ে বা নাবালিকাদের উদ্ধার করে আসছে এসআরবি। তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছে অথবা ব্যবস্থা করছে পুর্নবাসনের।
কী এই এসআরবি বা সেল্ফ রেগুলেটরি বোর্ড?
এটি পুলিশের কোনও বিশেষ বাহিনী নয়। নেহাৎই যৌনকর্মীদের তৈরি করা একটি স্বনিয়ন্ত্রিত বোর্ড। এসআরবির এক সদস্যা কবিতা রায় জানান, আনুষ্ঠানিক ভাবে ২০০০ সালে সূচনা হলেও এ রকম কিছু করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেক দিন আগেই।
কিন্তু খোদ যৌনকর্মীরাই কেন উদ্যোগী হলেন?
কবিতাদেবী জানাচ্ছেন, মেয়ে বিক্রির একটি বড় চক্র সব সময়ই সক্রিয় ছিল সোনাগাছি এবং কলকাতার অন্য যৌনপল্লীগুলিতে। গ্রাম গঞ্জ থেকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দেখিয়ে বা ভুলিয়ে-ভালিয়ে মেয়েদের এখানে নিয়ে আসা হত। তার পর তাদের বাধ্য করা হত যৌন পেশায় নামতে। প্রায়ই ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ত নাবালিকারা। অনিচ্ছুক কেউ কেউ পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যেত দালালদের হাতে। কপালে জুটত অকথ্য অত্যাচার। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই অবাধে চলত এই জুলুম। বাধা দিতে গেলে উড়ে আসত প্রাণনাশের হুমকি। কবিতাদেবী বলেন, ‘‘চোখের সামনে ছোট ছোট মেয়েগুলোকে দেখে খুব কষ্ট হত। আমরা বুঝেছিলাম, পুলিশ দিয়ে আটকানো যাবে না। তাই আমরাই যৌনকর্মীদের  তৈরির কথা ভাবি।’’
কেমন ছিল শুরুর দিনগুলো?
এসআরবি-র অন্য এক সদস্যা কল্পনাদেবী জানান, যৌনকর্মীদের সংগঠনের কথা শুনেই আপত্তি এসেছিল নানা মহল থেকে। সেই সময় পাশে এসে দাঁড়ায় দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি। তাদেরই হস্তক্ষেপে ২০০০ সালে পাঁচ জন যৌনকর্মী নিয়ে তৈরি হয় সেল্ফ রেগুলেটরি বোর্ড। সেই বোর্ডে চিকিৎসক, শিক্ষক, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়া বিভিন্ন পেশার আরও পাঁচ জন মানুষকেও রাখা হয়।
কী ভাবে কাজ করে এসআরবি?
কল্পনাদেবী জানাচ্ছেন, এসআরবির পক্ষ থেকে প্রতি দিন সোনাগাছির প্রত্যেকটি বাড়ি ঘুরে দেখা হয় নতুন কোনও মেয়ে এসেছে কি না? নতুন কেউ এলেই তাকে সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডের সামনে হাজির করানো হয়। দিন কয়েকের জন্য রাখা হয় নিজস্ব হোমে। সেখান থেকেই যারা অনিচ্ছুক, তাদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। আর ইচ্ছুক হলেও যারা নাবালিকা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে কাউন্সেলিং করা হয়। তারপর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় অন্য কোনও কাজের।
দুর্বারের মুখ্য উপদেষ্টা স্মরজিৎ জানা জানান, প্রতি বছর সাড়ে ছ’শো থেকে সাতশো নতুন মেয়ে সোনাগাছিতে আসে। তাদের মধ্যে অনেকেই অনিচ্ছুক এবং নাবালিকা। ২০০১ থেকে শুরু করে ২০১৪ পর্যন্ত এসআরবি ৭৮৪ জন নাবালিকা এবং ২০৯ জন অনিচ্ছুক মহিলাকে উদ্ধার করেছে বলে জানান তিনি।
কিন্তু শুরুর দিনগুলোয় এই উদ্ধার কাজ সহজ ছিল না বলেই জানাচ্ছেন এসআরবির সদস্যরা। তাঁরা বলছেন, প্রথম প্রথম তাঁদের কেউ ঘরে ঢুকতে দিত না। মেয়েরা ভাবত তাদের বোধহয় ক্ষতি হবে। বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লেগেছে অনেকটাই। সাধারণ যৌনকর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে অনেক সচেতন হয়েছেন। এখন কোনও বাড়িতে নতুন মেয়ে এলে বাড়ির অন্য মেয়েরাই এসআরবিকে খবর দেয়।
কিন্তু এখনও সব সমস্যার সমাধান হয়নি বলেই জানাচ্ছেন কবিতাদেবী। তিনি বলেন, ‘‘মেয়েদের বাড়ি পাঠানোই মুশকিল হয়ে যায়। বাড়ির লোকে ফেরৎ নিতে চায় না। অনেক নাবালিকাও যৌন পেশা ছেড়ে অন্য কোনও কাজও করতে চায় না। বরং তাদের পেশা থেকে সরিয়ে আনলে তারা আমাদের গালাগালি করে। অভিশাপ দেয়।’’কাজ করে যাচ্ছেন কবিতাদেবী, কল্পনাদেবী, শেফালীদেবীরা। হোমে বসে নাবালিকাদের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝানোর সময় তাঁদের যে মনে পড়ে যায় অনেক দিন আগেকার কথা। যখন অভাবের তাড়নায় চলে আসতে হয়েছিল সোনাগাছি, যখন খুব সংসার করতে ইচ্ছে করত আর যখন কোনও এসআরবি ছিল না!
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

আপিলে সাজা কমলো ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জোসেফের

নব্বইয়ের দশকের আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তোফায়েল আহমেদ জোসেফের মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফ্রিডম পার্টির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান হত্যা মামলার আপিলে আজ বুধবার এই রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
এর আগে এই মামলায় নিম্ন আদালতে ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলো জোসেফকে। মামলার আরেক আসামি কাবিল সরকারকে খালাস দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
১৯৯৬ সালের ৭ মে মোহাম্মদপুরে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মোস্তাফিজুর রহমান পিস্তলের গুলিতে নিহত হন। পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী রাশিদা পারভীন।
এজাহারে তিনি লিখেন, তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও তার কয়েকজন সঙ্গী চাঁদা না পেয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে থাকা লাইসেন্স করা পিস্তল কেড়ে নিয়ে তাকে এলোপাতারি গুলি করে হত্যা করেন।
১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর এই মামলায় চার্জশিট দেয় পুলিশ। ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এর রায় হয়। রায়ে তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও মাসুদ জামাদারকে মৃত্যুদণ্ড এবং কাবিল সরকার, আনিস আহমেদ ও হারিস আহমেদকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন জোসেফ, মাসুদ ও কাবিল। বাকি দুজন পলাতক থাকায় তারা কোনো আপিল করেননি।
২০০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এই মামলায় হাইকোর্টের রায় প্রকাশিত হয়। এতে মাসুদ জামাদারকে খালাস দেন হাইকোর্ট। এছাড়া জোসেফ ও কাবিলের দণ্ড বহাল রাখা হয়। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন হাইকোর্টে দণ্ড বহাল থাকা দুজন। তাদের আপিলের রায় দেয়া হয় বুধবার। আদালতে তাদের মধ্যে জোসেফের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং কাবিলকে বেকসুর খালাস দেন।
আদালতে জোসেফ ও কাবিলের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান। তাদের সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট এম মাসুদ রানা ও অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলী।
রায় শেষে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা জোসেফের জন্য বেকসুর খালাস চেয়েছিলাম। আদালত তার সাজা কমিয়ে দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, এই একটি মামলা ছাড়া বাকি সব মামলাতেই তিনি খালাস পেয়েছেন।