Saturday, December 30, 2017

যেভাবে সৌদি আরবে নাজেহাল হয়েছিলেন সাদ হারিরি (পর্ব-২)

সৌদি আরবের সঙ্গে সাদ হারিরির সম্পর্ক বেশ কয়েক বছর ধরে অস্বস্তিকর ছিল। তবে পিতা রফিক হারিরির মতো সাদ হারিরিও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও পারিবারিক বিত্তের অনেকটাই পেয়েছেন সৌদি আরবের কৃপায়। কিন্তু ইরানপন্থী হিজবুল্লাহকে অনেক ছাড় দিচ্ছে হারিরি সরকার। এ নিয়ে সৌদি আরব অনেকদিন ধরেই বিরক্ত। হিজবুল্লাহ লেবাননে এতটাই শক্তিধর যে সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় সরকারের পক্ষে।
এ বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে একবার রিয়াদ গিয়েছিলেন হারিরি। ফিরে এসে তিনি অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলেন। তার ধারণা ছিল যে, সৌদি বাদশাহকে তিনি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এড়াতে হলে হিজবুল্লাহকে আপাতত ছাড় দেওয়া বৈ উপায় নেই। বৈরুতে ফিরে তিনি হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহকে বাহক মারফত বার্তা পাঠান যে, সৌদি আরবকে আপাতত শান্ত রাখতে তিনি যেন ইয়েমেন যুদ্ধ ও প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করেন।
কিন্তু হারিরি বেশিদিন স্বস্তিতে থাকতে পারেন নি। ওই সপ্তাহেই সৌদি আরবের কট্টর ইরান-বিরোধী মন্ত্রী থামের আল-সাবান লেবাননকে ‘অবিশ্বাস্য’ পরিস্থিতি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করে দেন। পাশাপাশি, তিনি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধানোর অভিযোগ আনেন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে।
৩রা নভেম্বর হারিরি ইরানের সফররত কর্মকর্তা আলি আকবর বেলায়েতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেলায়েতি ওই সফরে লেবানন ও ইরানের পারস্পরিক সহযোগীতার প্রশংসা করেন। এতেই সম্ভবত সৌদি আরব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।
ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরই সৌদি বাদশাহর কাছ থেকে বার্তা পান হারিরি: এখনই আসুন।
তার সৌদি সফর হওয়ার কথা ছিল আরও কয়েকদিন পর। কিন্তু এই আদেশ পেয়ে তখনই সৌদি আরবে রওনা দেন হারিরি। লেবাননের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনি মুনায়ের বলেন, প্রধানমন্ত্রী হারিরিকে ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে মরুভূমিতে ক্যাম্পিং করার আমন্ত্রণ জানানো হয়।
কিন্তু রিয়াদে বিমান অবতরণের পরই সৌদি কর্মকর্তারা হারিরিকে তার বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর তাকে বলা হয় অপেক্ষা করতে। বাদশাহর জন্য নয়, ক্রাউন প্রিন্সের জন্য। হারিরি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করতে কেউই আসেনি।
পরেরদিন সকালে তাকে বলা হয় ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে দেখা করতে। রীতি মোতাবেক রাজকীয় গাড়িবহর পাঠানো হয়নি তাকে নিতে। অগত্যা, নিজের গাড়ি ব্যবহার করেই রাজ দপ্তরের দিকে রওনা দেন তিনি। কিন্তু ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে সাক্ষাতের বদলে, সৌদি কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার জোটে তার কপালে।
রাজ কার্যালয়ে পৌঁছার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর সৌদি টেলিভিশনে নিজের পদত্যাগ ঘোষণা করেন হারিরি। কিন্তু মাঝের এই কয়েক ঘণ্টা কী হয়েছিল তা সম্পর্কে কেউই পুরোপুরি অবগত নন। লেবানিজ কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় হারিরিকে এ নিয়ে বলতে তারা চাপ দিতে চাননি। তবে এক কর্মকর্তা বলেছেন, হারিরিকে এই কয়েক ঘণ্টার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি মাথা নিচু করে বলেন, আপনারা যা জানেন, এটি ছিল তার চেয়েও খারাপ।
হারিরির বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মতো অস্ত্রের অভাব নেই সৌদি আরবের। যেমন, সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় আড়াই লাখ লেবানিজ শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া যেতে পারে। কেননা, এতে লেবাননের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ পড়বে। হারিরি নিজে লেবানন ও সৌদি আরবের দ্বৈত নাগরিক। সৌদি আরবে তার পারিবারিক ব্যবসা আছে বিপুল। দেশটিতে রাজপরিবার চাইলে নিমিষেই তার সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। ফলে হারিরিকে ব্যক্তিগতভাবেও কাবু করার শক্তি রাখে সৌদি আরব। এক আরব কূটনীতিক এ-ও বলেন যে, হারিরির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ গঠনেরও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
বেলা আড়াইটায় যে কক্ষ থেকে হারিরি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন, তা ছিল প্রিন্স মোহাম্মদের দপ্তরের ঠিক নিচে। হারিরির পদত্যাগপত্রে লেখা ছিল, তার পদত্যাগের জন্য হিজবুল্লাহ দায়ী। তার জীবনের ওপরও শঙ্কা আছে। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগীরা বলেন, ওই পদত্যাগপত্রে এমন সব শব্দ আছে যা তার সঙ্গে বেমানান।
হারিরির পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পরই দুর্নীতির অভিযোগে বহু সৌদি প্রিন্স ও ব্যবসায়ীকে আটক করা শুরু হয়। আটককৃতদের মধ্যে হারিরির সাবেক দুই ব্যবসায়িক আংশীদারও ছিলেন। এভাবে যেন হারিরিকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো, তাকে আটক করাও অসম্ভব কিছু নয়।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও লেবানিজ কর্মকর্তারা বলেন, সৌদিরা ভেবেছিল হারিরি যা বলবে, মানুষ তা-ই বিশ্বাস করবে। আর তাতে গণআন্দোলন শুরু হবে, যার ফলে হিজবুল্লাহর প্রতিপক্ষরা শক্তিশালী হবে। কিন্তু ঘটলো পুরো উল্টোটা। হারিরির পদত্যাগকে সন্দেহের চোখে দেখলো জনগণ। কেউই রাস্তায় নামেনি। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন লেবাননের প্রেসিডেন্ট ও হিজবুল্লাহর মিত্র মিশেল আয়োন ওই পদত্যাগপত্র গ্রহণে অসম্মতি জানান। তিনি বলেন, হারিরি নিজে এসে পদত্যাগপত্র না দিলে, তার পদত্যাগ গৃহীত হবে না।
ওদিকে কয়েক ঘণ্টা ধরে হারিরির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। প্রেসিডেন্ট মিশেল আয়োন তার পদত্যাগ গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশের পর হারিরি তাকে ফোন দেন। এটিই ছিল অজ্ঞাতবাসে থাকা অবস্থায় তার প্রথম ফোন কল। কিন্তু ফোনকলে হারিরির কথা শুনেই প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারেন, তার প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন না। আর তারপর আর কারোই কিছু বুঝতে বাকি রইলো না।
লেবানিজ কর্মকর্তারা দ্রুতই পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে শুরু করেন। পশ্চিমা কূটনীতিকরাও তখন এক হতবুদ্ধিকর পরিস্থিতিতে। তাদের কাছে লেবানিজ কর্মকর্তারা এক অস্বাভাবিক বার্তা নিয়ে আসেন, যার সারমর্ম হলো, আমাদের কাছে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আটক করে রাখা হয়েছে।
তখন হারিরিকে সৌদি আরবে তারই বাড়ির এক অতিথিশালায় রাখা হয়েছে। বাইরে শুধু সৌদি রক্ষী। নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গেও তার দেখা করা নিষেধ। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকজন পশ্চিমা রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন। অবশ্য, তিনি কতটা মুক্ত, সেই ব্যাপারে তারা পরস্পরবিরোধী বার্তা নিয়ে ফিরে আসেন। এক কক্ষে দুইজন সৌদি রক্ষী অবস্থান করছিলেন। পশ্চিমা কূটনীতিকরা তার সঙ্গে কথা বলার সময় ওই রক্ষীদের চলে যেতে বলেন। কিন্তু হারিরি বলেন, না, তারা থাকুক।
লেবানিজ কর্মকর্তারা পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতদের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে গেলে, তারা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, একজন বিদেশি নেতাকে আরেকটি দেশ কীভাবে পদত্যাগে বাধ্য করতে পারে! তখন লেবাননের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান জেনারেল আব্বাস ইবরাহিম একে ব্যাখ্যা দেন এভাবে: ‘এটি খুব সহজ। আমি দু’জন সৈন্য এনে আপনাকে বলবো টিভিতে বলুন আপনি আপনার দেশকে ঘৃণা করেন।’
এদিকে, আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যেও ভাবলেশহীন ছিলেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স। তিনি এবার আরেক আরব নেতাকে সৌদি আরবে আমন্ত্রণ জানান। তিনি হলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আব্বাসকে সৌদি প্রিন্স ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দেন। রিয়াদে আব্বাসকে কী বলা হয়েছিল, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিবরণ এসেছে। কিন্তু লেবানন এ নিয়ে আরও উদ্বিগ্ন হয়। কারণ তারা ইসরাইলের সীমান্তবর্তী। দেশটির সঙ্গে তাদের দুইটি যুদ্ধের ক্ষত এখনও লেবানিজদের মনে দগদগে। লেবানন দূত হিসেবে জেনারেল ইবরাহিম ও আম্মানে কর্মরত একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে পাঠায় মাহমুদ আব্বাসের কাছ থেকে তার ও সৌদি প্রিন্সের সাক্ষাৎ সম্পর্কে সবিস্তারে জানতে। বেশ অনেক কারণেই এত উদ্বেগ।
প্রথমত, সৌদি আরব আব্বাসকে যেই নির্দেশনা দিয়েছিল, সেই হিসাবে লেবাননে অবস্থিত ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি, লেবাননে সৌদি আরবের এক প্রভাবশালী মিত্র ফিলিস্তিনি ওই শিবিরে থাকা একটি জিহাদি গোষ্ঠিকে ‘সুন্নি বাহিনী’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। কিন্তু এই আহ্বান এতটা বিপজ্জনক ছিল যে, ওই জিহাদিরা নিজেরাই তা প্রত্যাখ্যান করে। এই বিবরণ নিশ্চিত করেন লেবানিজ, ফিলিস্তিনি ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা।
হারিরির পদত্যাগের কিছুকাল পরেই ওয়াশিংটন সফর করেন সেই সৌদি মন্ত্রী সাবান। কিন্তু ওয়াশিংটনে তিনি বেশ শীতল অভ্যর্থনা পান। মার্কিন ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড এম. স্যাটারফিল্ড তার কাছে জানতে চান, কেন লেবাননকে অস্থিতিশীল করে তুলছে সৌদি আরব। এরপর ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও অন্যান্য দেশ ব্যপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। তারই ফলস্বরূপ এক সমঝোতায় আসে সব পক্ষ, আর হারিরি সৌদি ত্যাগ করেন।
সমঝোতায় জড়িত ছিলেন এমন পশ্চিমা, লেবানিজ ও আরব কূটনীতিকরা বলেন, হারিরিকে দেশে ফেরত যাওয়ার আগে শর্ত বেঁধে দেন প্রিন্স মোহাম্মদ। সেটি হলো, ইয়েমেন থেকে যোদ্ধা সরাতে হিজবুল্লাহকে রাজি করাতে হবে তাকে। অনেক কর্মকর্তা বলেন, এ থেকে প্রমাণ মিলে যে, প্রিন্স মোহাম্মদ আসলে ইয়েমেন সম্পর্কে অত জানেনও না। এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ইয়েমেনে হিজবুল্লাহর মাত্র ৫০ জন যোদ্ধা আছে। সেখানে হুতি বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সহযোগীতায় বড় ভূমিকা পালন করছে বরং ইরান। তাই ইয়েমেনের যুদ্ধ থামাতে বৈরুতকে নাড়া দেওয়াকে অনেকটা ভুল ‘পোস্ট অফিসে চিঠি পাঠানো’র মতো বলে বর্ণনা করেছেন এক লেবানিজ কর্মকর্তা।
তবে এই উত্তাল পরিস্থিতি থেকে রিয়াদের কিছুটা অর্জনও আছে। লেবানিজ কর্মকর্তারা এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে আলোচনা করছেন একটি সমঝোতায় উপনীত হতে, যাতে করে হিজবুল্লাহ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বাগাড়ম্বর কম করে। পাশাপাশি, বৈরুতে হুতি বিদ্রোহী-পন্থী একটি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে সংগঠনটি।
রিয়াদকে শান্ত করতে যথেষ্ট কিছু হারিরি করতে পারবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহর সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রিন্স মোহাম্মদের সমালোচনা অনুপস্থিত। গত বুধবার তিনি ইয়েমেনে শান্তি আলোচনার ডাক দিয়েছেন, যা সংঘাত নিরসনের পথে বড় ধাপ। কিন্তু মঙ্গলবার ফের হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদে মিশাইল নিক্ষেপ করেছে।
(নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘হোয়াই সাদ হারিরি হ্যাড দ্যাট স্ট্রেঞ্জ সোজুর্ন ইন সৌদি অ্যারাবিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বের অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন মাহমুদ ফেরদৌস।)

এক মুসলিম ‘সান্তা ক্লস’, ফটোগ্রাফারের চোখে অশ্রু by মাহমুদ ফেরদৌস

সান্তা ক্লস কি আসল না নকল? প্রতি বছর বড়দিনের সময় শিশুদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন লম্বা দাঁড়ির আর লাল পোশাক পরা সান্তা ক্লস। বড়দিনের সময় পশ্চিমের প্রত্যেক শিশু ভাবতে চায় সান্তা ক্লস আসল কেউ হলে কতই না ভালো হতো! প্রতি বছর বড়দিনে মজার সব উপহার নিয়ে আসতো। কিন্তু আফসোস! সান্তা ক্লস বা ফাদার ক্রিসমাস স্রেফ উপকথার চরিত্র! বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। কিন্তু দক্ষিণ লন্ডনের ছোট্ট এক শিশুর বিশ্বাস, সান্তা ক্লসের অস্তিত্ব আলবৎ আছে! বিশ্বাস থাকবেই বা না কেন? নিজের চোখে যে সান্তা ক্লসকে দেখেছে সে!
এই ‘সান্তা’র আসল নাম হলো হোসেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। এমনই সময় তাকে দেখতে পায় আলফি।
তার বয়স তখন ছিল মাত্র ৩ বছর। হোসেনকে দেখেই ছোট্ট আলফি বলে উঠে ‘সান্তা’! কথাটি শুনে পেছন ফেরেন শ্মশ্রুম-িত হোসেন। খুশি হয়ে তাকে কিছু টাকা দেন। আর তাতেই আলফির বিশ্বাস জন্মে এই হোসেনই বুঝি আসল সান্তা!
ধর্মে হোসেন একজন মুসলিম। একটু দূরেই অবস্থিত একটি হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ধর্মপ্রাণ হোসেনের আছে সান্তা ক্লসের মতোই শুভ্র লম্বা দাঁড়ি। ওই দিনের পর তিনি প্রতি বছর বড়দিনের সময় আলফির বাড়িতে গিয়ে হাজির হন! সান্তা সেজে তাকে ও তার বড় বোন হ্যালের জন্য অনেক উপহার দিয়ে আসেন। আলফির পরিবারের সঙ্গেও এখন খাতির আছে হোসেনের। তাই দু’জনের জন্মদিনের সময়ও তাদের সঙ্গে দেখা করে আসেন তিনি। আর সঙ্গে থাকে উপহার!
আলফির মা ট্রেসি অ্যাশফোর্ড রোজ বলেন, ‘সান্তা’ না এলে তার দুই ছেলেমেয়ের বড়দিন এত মজার হতো না। তার আজও মনে পড়ে ৪ বছর আগের দিনটির কথা যখন আলফি প্রথম হোসেনকে দেখতে পায়। তিনি বলেন, হোসেনকে দেখেই আলফি আমাকে চিৎকার দিয়ে বলে, ওই দেখো ফাদার ক্রিসমাস যাচ্ছে!
আলফিদের বাসার তিন বাড়ি পরই হোসেন থাকেন। তিনি ফিরে এসে আলফির মাকে বলেন, আলফি তাকে ফাদার ক্রিসমাস ভাবার পর তিনি তাকে উপহার না দিয়ে থাকতে পারছেন না। ট্রেসি অ্যাশফোর্ড আরও বলেন, এটি ছিল ৪ বছর আগের ঘটনা। আর এখনও হোসেন প্রতি বছর আলফি ও হ্যালের জন্মদিনে আসে। তাদেরকে উপহার দিয়ে যায়। সে কখনই তারিখ ভোলে না। তিনি আরও বলেন, আমরা এখন তাকে দাদু ক্রিসমাস বলে ডাকি। সে এসে আলফির সঙ্গে করমর্দন করে যায়, তার গাল টিপে দেয়। তাকে ছাড়া আমাদের বড়দিন এমন মজার হতো না।
এই রোববারের বড়দিনে হোসেন যখন আলফির জন্য উপহার নিয়ে আসেন, তখন পাশেই ছিলেন আমান্ডা টেইলর। তিনি একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার ও আলফিদের সাবেক প্রতিবেশী। তিনিই ফেসবুকে এই মিষ্টি গল্পটি শেয়ার করেন। এ খবর দিয়েছে বাজফিড নিউজ।
আমান্ডা টেইলর বলেন, ফটো তোলার সময় আমার চোখ দিয়ে পানি কখনও আসেনি। কিন্তু হোসেন আর আলফির ছবি তোলার সময় আমার চোখে আনন্দাশ্রু টের পেয়েছি। আমার তখনই মনে হয়েছে, এই সুন্দর গল্পটি সবাইকে বলা উচিত।
টেইলর বলেন, আলফি যখন খুব ছোট ছিল, তখন থেকেই তাকে চিনি। যেদিন সে ‘ফাদার ক্রিসমাস’ অর্থাৎ হোসেনকে দেখলো, সে দৌড়ে আমার কাছে চলে এল। এরপর বললো, আসো দেখো যাও! আসল সান্তা ক্লস আমাদের বাড়িতে এসেছে! কিন্তু আমি যখন বাইরে তাকালাম দেখার জন্য, আমি কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম। কারণ, হোসেনকে ঠিক ফাদার ক্রিসমাসের মতো লাগেনি আমার কাছে।
আমান্ডা টেইলর বলেন, হোসেনের লম্বা সাদা দাঁড়ি দেখেই আলফি তাকে সান্তা ক্লস ভেবে নিয়েছে। কিন্তু তার গায়ের রং আমাদের দেখা সান্তার মতো নয়। তাছাড়া সে অফিসের পোশাক পরে ছিল। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি ঘটনা। কারণ, ছোট্ট আলফি গায়ের রং দেখেনি। পোশাকের রং দেখেনি। সে একজন মানুষের হৃদয়ের রংটা দেখতে পেয়েছিল। হোসেন স¤পর্কে তিনি বলেন, তিনি খুবই বন্ধুসুলভ ও উদারমনা একজন মানুষ। আলফি তার সাদা দাঁড়ির ভেতর সত্যিকারের সান্তা ক্লসকে খুঁজে পেয়েছে।
টেইলর আরও জানান, এক বছর পর আলফিদের বাড়ির বাইরে অনেকগুলো বেলুন দেখা গেল! তখন আলফি বুঝতে পারলো আজ তার জন্মদিন! আর বোঝা গেল, শুধু বড়দিনই নয়। আলফির জন্মদিনেও হোসেন এসে তাকে উপহার দিয়ে যান। এটি যেন এখন রোজকার নিয়ম।
আলফির জন্য বিষয়টি খুবই উচ্ছ্বাসের আর আনন্দের। প্রতি বছর একজন মানুষ তার জন্মদিন ভোলে না, বড়দিন ভোলে না। বরং এসে দরজায় কড়া নেড়ে তার জন্য উপহার নিয়ে আসে। এর চেয়ে মিষ্টি কিই বা হতে পারে? আলফির বড় বোন হ্যালে আবার বড় হয়ে গেছে। সান্তা ক্লসে বিশ্বাস নেই তার। কিন্তু সেও বেশ আনন্দিত। কারণ, উপহার যে সে-ও পায়।
টেইলর পুরো গল্পটি একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দিয়েছেন। আর মানুষের মন এতটাই ছুঁয়ে গেছে যে তারাই ‘সান্তা ক্লস’কে উপহার দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আর আলফি সহ সবাই মিলে শুক্রবার গেছেন হোসেনের বাড়িতে গিয়ে তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। টেইলর বলেন, ‘আমি এই কথা টানতে চাই না, কিন্তু তিনি খ্রিস্টানও নন। এটি তার ধর্মবিশ্বাসও নয়। তিনি এই সবকিছু করছেন শুধু এক ছোট বাচ্চার খুশির জন্য। তিনি আসলে অনেক উঁচু মনের মানুষ।’

আপন বলতে তাদের কেউ নেই

তিন মাস আগের কথা। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের দুই ভাই শামসুল ও জাফরের ছিল একটি হাসিখুশি পরিবার। নদীর কাছেই ছিল তাদের ছোট্ট বাড়ি। সেখানেই তারা খড়কুটোয় তৈরি একটি বল নিয়ে খেলা করতো। তাদের ছিল ১৫টি গরু। তার বেশির ভাগই দিত দুধ।
কিন্তু তার সবই চলে গেছে। কিছু নেই এখন আর। পরিবারে সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের বাড়ি। গরুগুলো চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। এই ভয়াবহতার মুখে কোনোমতে নিজেদের জীবন রক্ষা করে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে পালিয়ে এসেছে শামসুল (৮) ও জাফর (১১)। ২৫ শে আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতা শুরু হয়। এর পাঁচদিন পরের ঘটনা। সেনাবাহিনী শামসুল ও জাফরদের গ্রাম ঘিরে ফেলে। তারা অকাতরে নারীদের ধর্ষণ করে। হত্যা করে গ্রামবাসীকে। জ্বালিয়ে দেয় বাড়িঘর। তারপর বুকে পাথর বেঁধে তারা বাংলাদেশমুখী জনতার ঢলের সঙ্গে শরীক হয়। ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এমন প্রায় ১৮০০ শিশু রয়েছে। তাদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। অর্থাৎ তারা নিঃসঙ্গ। তাদেরই দু’জন শামসুল ও জাফর। তাদের অনেককে দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা ঠাঁই দিয়েছেন না হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে বসবাস করছে তারা। এসব শিশুই পাচার, নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার না হয় পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তাদের দুঃখ দুর্দশার শেষ নেই। তাই শামসুলের বুকফাটা আর্তনাদ- সবারই তো পিতামাতা আছেন। আমাদের তো কিছুই নেই।
আগস্টের এক সকালবেলা। সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলে গ্রাম। তাদের হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য রকেট লঞ্চার। তারা বাতাসে কিছু একটা স্প্রে করে ছড়িয়ে দিলো। গ্রামবাসী বিশৃংখল হয়ে ছড়িয়ে পড়লেন। অনেকে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিলেন জঙ্গলে। এমন অবস্থায় বাড়ির কাছে একটি ছোট্ট পাহাড়ে আশ্রয় নিলো জাফর। সেখান থেকে তার বাড়ি দেখা যায়। সে সেখান থেকে দেখতে পেল সেনারা তার মা মনিরা, তিন ভাইবোন সোমুদা (১৫), খুরশিদ (৭) ও শালিদা (৩ মাস) কে প্রহার করছে। তারা জোর করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করছে। বাড়ির দরজায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করেছে। তারপর সেই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সেই আগুনেই জীবন্ত পুড়ে মরেছে তারা। ঘটনাটি তুলাতলি গ্রামের। সেখান থেকে তাদের পিতাও পালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তাকে নদীর পাড়ে হত্যা করা হয়েছে। অক্টোবরে এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তাতে বলা হয়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল তুলাতলির অবস্থা। এ অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্টেট কাউন্সেল অং সান সুচি।
তুলাতলি থেকে শামসুল ও জাফরের পালিয়ে আসার পথে ছিল খর¯্রােতা একট নদী। সেনাবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে সেখানে আলাদা হয়ে যায় জাফর। শামসুল তখন একটি নৌকায় পাড়ি দিচ্ছে। সে দেখতে পায় তার ভাই জাফর সাঁতরাচ্ছে ওই খরস্রোতা নদী। সঙ্গে সঙ্গে শামসুল তার ভাইকে রক্ষা করতে নেমে পড়ে। ভাইকে কাছে পেতে জাফরও তার সর্বশক্তি দিয়ে নদী সাঁতরাতে থাকে। এরপর তারা কোনোমতে পাড়ি ধরতে পেরেছে। তারা ঠাঁই খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু নিঃসঙ্গ। তাদের আপন বলতে কেউ নেই।

প্রস্তুত ডিজেরা by রুদ্র মিজান

থার্টি ফার্স্ট নাইট। বরাবরের মতো এবারো এই রাতকে ঘিরে রয়েছে বর্ণিল আয়োজন। রাতব্যাপী চলবে নাচ, গান ও ফ্যাশন শো। সেই সঙ্গে রয়েছে নানা চমক। তারকা হোটেলগুলোর বাইরেও হচ্ছে পার্টি। বাসা-বাড়ি, বিভিন্ন ক্লাব ছাড়াও পার্টি হবে লঞ্চে।
এসব পার্টির প্রচারণা চলছে মূলত পরিচিতদের মধ্যে। নিজেদের ফেসবুক পেজেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ইংরেজি নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতির শেষ নেই ডিজে, মডেল ও শিল্পীদের মধ্যে। পার্টিকে আকর্ষণীয় করতে সুন্দরী পার্টি গার্লদের বুকিং করা হয়েছে ইতিমধ্যে। এমনকি চলচ্চিত্রের আইটেম গানের মেয়েরাও বিটের তালে নেচে-গেয়ে মাতাবেন পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের।
৩১শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে একটি লঞ্চ যাত্রা করবে চাঁদপুরের দিকে। উদ্দেশ্য শুধুই আনন্দ-বিনোদন উপভোগ। সারা রাত লঞ্চে নাচে-গানে মাতিয়ে রাখা হবে। সেইসঙ্গে থাকবে ডিজেরা। পপ ও হিন্দি গানের বিটে কেঁপে উঠবে রাতের আকাশ। লঞ্চে থাকবে খাবার ও পানীয়। এখানেই শেষ না। লঞ্চে একান্তে সময় কাটাতে রয়েছে কেবিনের ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে বুকিং প্রায় শেষ হয়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাপলদের কেবিনসহ সাত হাজার টাকা দিতে হবে। সারা রাত নদীতে ভাসবে লঞ্চ। সকালে আবার ফিরবে সদরঘাটে। এভাবেই নদীর বুকে উপভোগ করা হবে থার্টি ফার্স্ট নাইট।
এবার রেডিসন ব্লু হোটেলের ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের বল রুমে থাকবে ‘নিউ ইয়ার কাউন্টডাউন’ পার্টি। দেশের প্রথম সারির ডিজেদের অন্যতম মারিয়া থাকবেন পার্টিতে। থাকবেন হালের জনপ্রিয় ডিজে পরী। এ ছাড়াও থাকবেন ডিজে যুবায়ের, শাম, লিটন, রাজন ও তুর্য। সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই পার্টিতে থাকবে লাতিন ড্যান্স, ফ্যাশন শো। এই পার্টির টিকিট বিক্রি হচ্ছে চার হাজার টাকায়। কাপলের ক্ষেত্রে ছয় হাজার টাকা। পার্টি চলবে ভোর পর্যন্ত। ডিজে মারিয়া জানান, থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে আয়োজিত ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের ৩১ নাইট, রেডিসন ব্লু হোটেলের ‘নিউ ইয়ার কাউন্টডাউন’ পার্টিসহ কয়েক পার্টিতে অংশগ্রহণ করবেন তিনি। মারিয়া বলেন, থার্টি ফার্স্ট নাইট এনজয় করতে সবাই যেভাবে প্রস্তুত ঠিক তেমনি ডিজে হিসেবে আমিও প্রস্তুত তাদের আনন্দের বন্যায় ভাসাতে। দর্শকদের মুগ্ধ করতে প্রস্তুতির কমতি নেই সুদর্শনা মারিয়ার। রাজনৈতিক অস্থিরতা মুক্ত থাকার কারণে এবার পার্টিতে অংশগ্রহণকারী বেশি হবে বলেই ধারণা এই ডিজের।
একইভাবে লা মেরিডিয়ানের স্কাই বলরুমে অনুষ্ঠিত হবে ‘গ্রান্ড নিউ ইয়ার পার্টি’। ডিজে, ড্যান্স ও গানের পাশপাশি এতে থাকবে র‌্যাম্প মডেলিং। ডিজে পরী, ফারজানা, মেরাজ, প্রিন্স ও তন্ময় অংশ নেবেন এই পার্টিতে। ঢাকা রিজেন্সি মাতাবেন ডিজে সনিকা, সামান্তা, ডন, ইয়ামিন, রাজি ও রেইন। বিগেস্ট নিউ ইয়ার নামের এই পার্টি আয়োজন করেছে ঢাকা রিজেন্সি কর্তৃপক্ষ। পার্টিতে থাকবে ননস্টপ মিউজিক, ডিজে ও ফায়ার ড্যান্স ইত্যাদি। এই পার্টির টিকিটির মূল্য তিন হাজার টাকা। কাপল পাঁচ হাজার টাকা।
কমার্শিয়াল পার্টির বাইরে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানের। বেশ কয়েকটি তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে গানের অনুষ্ঠান। মূলত হোটেলের গেস্টদের জন্য থাকবে এই আয়োজন।
ঢাকার অভিজাত এলাকার বিভিন্ন বাসা বাড়িতেও আয়োজন করা হয়েছে বর্ণিল পার্টির। এসব পার্টিতে থাকবেন নানা পর্যায়ের তারকা ব্যক্তিরা। ডিজে পরী জানান, সারা বছর জুড়েই দেশে-বিদেশে নানা পার্টিতে ডিজে হিসেবে বাজাই। কিন্তু থার্টি ফার্স্ট নাইটে দর্শকদের প্রত্যাশা থাকে বেশি। আমরা চেষ্টা করি ওই রাতে সবটুকু উজার করে দিতে। বাজাতে বাজাতে সমবেতদের আনন্দ দিতে অনেক সময় আমরা নিজেরাও ড্যান্স করি। এসবই হচ্ছে আনন্দ দেয়ার জন্য। ডিজে পার্টিতে কাউকে বিমর্ষ হতে দেন না পরী। এবারো থার্টি ফাস্ট নাইটে সবাইকে আনন্দ দিতে প্রস্তুত এই ডিজে।

গর্ভপাতের মহামারি by হাফিজ মোহাম্মদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী তিনি। ভালোবাসেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রকে। তাদের দুইজনের বাড়িই রংপুরে। একই কলেজে পড়ার সুবাধে তাদের মধ্যে গড়ে উঠে প্রেমের সম্পর্ক। সময় পেলেই একে অন্যের কাছে ছুটে যেতেন। এভাবেই তাদের এ ভালোবাসা গড়ায় শারীরিক সম্পর্কে।
এ বছরের শুরুতে তাদের সামনে নেমে আসে কালো ছায়া। প্রেমিকা বুঝতে পারেন গর্ভধারণ করেছেন। তার বয়ফ্রেন্ডকে জানালে তিনিও চিন্তিত হয়ে পড়েন। এমন ঘটনা জানাজানি হলে সমাজে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। এ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেন গর্ভপাত ঘটানোর। দুজনই চলে আসেন ঢাকায়। স্বামী-স্ত্রী পরিচেয়ে ভর্তি করা হয় রাজধানীর স্বনামধন্য একটি হাসপাতালে। কিন্তু তাতে বাদ সাধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা কোনো  ধরনের গর্ভপাত করান না। চোখে-মুখে অন্ধকার যেন ভর করছে তাদের ওপরে। কূলকিনারা না পেয়ে হাসপাতালেরই আয়া মাহফুজা খানমের দেয়া ঠিকানা মতে কল্যাণপুরের এক ক্লিনিকে যান। এ মাহফুজাই দালালের ভূমিকা পালন করেন ওই ক্লিনিকের। কল্যাণপুরে এ ক্লিনিকে ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে নাদিয়ার গর্ভপাত করানো হয়। গর্ভপাতের পর ওই প্রেমিকা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে তিনদিনে ১০ ব্যাগ রক্ত দিতে হয় তাকে। শুধু এই প্রেমিক জুটিই নন। এরকম হাজারো জুটি অনিরাপদভাবে গর্ভপাত ঘটান দেশে। শুধু অবৈধ গর্ভপাত নয়, স্বামী এবং স্ত্রীর ভুলে গর্ভধারণ করা দম্পতিও গর্ভপাত ঘটাচ্ছে অহরহ। এভাবে গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে কেউ কেউ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতাও রয়েছে কারো। অনেকে আবার পরবর্তীতে আজীবনের জন্য মাতৃত্বের স্বাদ হারান। রাজধানীসহ দেশের আনাচে-কানাচে এমন অসংখ্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। যেখানে গর্ভপাত ঘটানো হচ্ছে। বেআইনি এ কাজ করেন হাতুড়ে ডাক্তার, নার্স এমনকি ক্লিনিকের আয়া। বৈধতা না থাকায় গর্ভপাত করাতে তাদের গুনতে হয় বড় অঙ্কের টাকা। অথচ দেশের আইনে গর্ভপাত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে বছরে কত সংখ্যক গর্ভপাত হয় তার একটি জরিপ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশে তাদের সঙ্গে গবেষণার কাজটি করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অব সেপটিক অ্যাবরশন বাংলাদেশ (বাপসা)। তারা মাঠপর্যায়ে গর্ভপাতের ওপর একটি জরিপ চালায়। গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট চলতি বছরের মার্চে তা প্রকাশ করে। এ জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ১১ লাখ ৯৪ হাজার অনিরাপদ গর্ভপাত হয়েছে। এ হিসাবে গড়ে দিনে ৩ হাজার ২৭১টি গর্ভপাত করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৪ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে বছরে হাজারে ২৯ জন গর্ভপাত করান। গর্ভপাতের হার খুলনা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বনিম্ন।
মার্তৃস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মায়েরা প্রজনন স্বাস্থ্য, জন্মধারণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং মাসিকের সঠিক সময় সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন। এ কারণেই অনেকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করেন। যদি তারা এসব সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখতেন তাহলে এমন গর্ভপাত করাতে হত না। তারা আরো বলেছে, বর্তমানে বৈবাহিক সম্পর্কের বাহিরে একাধিক জুটি পরিবারের অজান্তেই গর্ভপাত করাচ্ছেন। সংখ্যানুপাত হারে দিনদিন তা বেড়েই চলছে। অন্যদিকে একাধিক সংগঠন বলেছে, যৌন সম্পর্কের ফলে বেশির ভাগই গর্ভ ধারণ করেন। ফলাফল হিসেবে পরিবারের ভয়ে পরে গর্ভপাত ঘটান।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা বলেন, গর্ভপাতের হার কমিয়ে আনতে হলে এমআর সম্পর্কে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে মা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সব বিভাগের প্রচার-প্রচারণা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। গর্ভপাতে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়ে যায় বিষয়টি বুঝাতে হবে। আবার বেশির ভাগ মহিলাই গর্ভপাতের পরে রক্তক্ষরণের ফলে মারা যান। জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রতি লক্ষ্য রাখলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পথে থেকে সহজেই বেঁচে থাকতে পারবেন।
পরিবার ও পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যবস্থাপক ফাহমিদা সুলতানা বলেন, প্রথমত তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ, এমআর পদ্ধতি সম্পর্র্কে জানেন না। যারা জানেন তারা লোকলজ্জার ভয়ে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে যান না। ফলে গর্ভপাত করিয়ে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের অসহযোগিতার কারণে এমআর করতে আসা ব্যক্তিকে ফিরে যেতে হয়। গর্ভের ভ্রূণ বড় হওয়ায় এমআর করা যাবে না বলে তাদের ফিরিয়ে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা অদক্ষ ও হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন। ফাহমিদা সুলতানা আরো বলেন, যাদের এমআরের সময় অতিক্রম হয়ে যায় তাদের জন্য ট্যাবলেটের মাধ্যমে গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করার পদ্ধতি চালু হয়েছে। এটার সময় এমআর থেকে একটু বেশি। কিন্তু এ পদ্ধতিতে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিভাবে গর্ভপাত কমিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়।
বাপসার ট্রেনিং ও গবেষণা শাখার উপপরিচালক মো. হেদায়েত উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, আমাদের দেশে গর্ভপাতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো আমাদের মায়েরা সঠিক তথ্য জানেন না। কখনো কখনো পার্টনারে পক্ষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভ নষ্ট করার জন্য চাপ দেয়া হয়। এ কারণে গর্ভপাতের মতো কঠিন পথ বেছে নিতে হয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে গর্ভপাতের হার অনুপাতে বেশি। তারা যেমন জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অবগত কম থাকেন তেমনি গর্ভ সম্পর্কেও। যেসব প্রতিষ্ঠান গর্ভপাত করান তারা কেউই নিবন্ধনকৃত নয়। তিনি বলেন, আমরা মাঠপর্যায় এবং গর্ভপাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের উপর জরিপ পরিচালনা করেই এমন তথ্য পেয়েছি। সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে গর্ভপাতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নানা জটিলতা সম্পর্কে আরো ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালালে মানুষ সতর্কতা অবলম্বন করবে।