Wednesday, August 6, 2025

রেডক্রসের হুঁশিয়ারি: গাজায় জীবন রক্ষার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে

mzamin
গাজায় জীবন রক্ষার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ সতর্কতা দিয়েছে রেড ক্রস কমিটি। তারা এক বিবৃতিতে ইসরাইল ও হামাসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। এর ফলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং গাজায় আটক বন্দিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। রেড ক্রসের বিবৃতিতে বলা হয়, তারা ওষুধ, খাদ্য এবং পরিবারগুলোর খবর বন্দিদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত। তবে এ কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পূর্বসম্মতি আবশ্যক। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শুধু একটি স্থায়ী চুক্তিই গাজায় আটক বন্দি ও তাদের পরিবারের দুঃখ-কষ্ট এবং গাজায় বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারে। খাদ্য সংকট প্রতিদিন আরও তীব্র হচ্ছে। গাজায় বেসামরিক মানুষের অবিলম্বে ও ধারাবাহিকভাবে খাদ্য, নিরাপদ পানি, ওষুধ, স্বাস্থ্যবিধি ও মানবিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রেড ক্রস আরও সতর্ক করে বলেছে, গাজায় জীবন বাঁচানোর জানালা দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখনই পদক্ষেপ নেয়ার সময়।

মুসলিম পুলিশ কর্মকর্তার জানাজায় হেডস্কার্ফ পরায় আমেরিকায় রাজনৈতিক বিতর্ক

নিউ ইয়র্ক সিটির নিহত পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের জানাজায় হেডস্কার্ফ পরায় নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুলকে প্রকাশ্যে সমালোচনা ও কটাক্ষ করেছেন টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ। অফিসার দিদারুল ছিলেন মুসলিম এবং তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রঙ্কসের একটি মসজিদে। ইসলামী রীতি অনুযায়ী, সেখানে নারী অতিথিরা হেডস্কার্ফ পরে অংশগ্রহণ করেন।

গভর্নর হোকুলও সেই প্রথা মেনে মাথায় কালো ওড়না পরেন। একজন বেনামী ব্যবহারকারী সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে অশালীন ভাষায় প্রশ্ন তোলে, কেন হোকুল ‘হিজাব’ পরেছেন। পরে সেই পোস্ট শেয়ার করে সিনেটর টেড ক্রুজ বিদ্রূপ করে লেখেন, ‘কি হচ্ছে এসব?’

হোকুলের জবাব ছিল স্পষ্ট, ‘‘একজন শহীদ মুসলিম কর্মকর্তার ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান জানানোই হল ‘একজন নেতা ও ন্যূনতম মানবিকতা সম্পন্ন মানুষের কাজ।”

ছবিতে দেখা যায়, গভর্নর হোকুল ও মেয়র এরিক অ্যাডামস মসজিদের ভেতরে জানাজায় অংশ নিচ্ছেন। পাশে বসা পুরুষরা কেউ ইউনিফর্মে, কেউবা ধর্মীয় পাশাকে। গভর্নর হোকুলের মাথায় ছিল কালো ওড়না, মুখে গম্ভীরতা।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক সিটির মিডমানহাটানে গণগুলিতে নিহত ৫ জনের অন্যতম দিদারুল ইসলাম, ৩৬ বছর বয়সী এনওয়াইপিডি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। হামলার সময় তিনি অতিরিক্ত শিফটে ছিলেন এবং নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে বড় পুলিশ বাহিনীর বাংলাদেশি সদস্যদের একজন ছিলেন তিনি। নিউ ইয়র্ক সিটি এবং এনওয়াইপিডি তার জানাজা অভূতপূর্বভাবে আয়োজন করে যা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলে এবং সেখানে নারীদের ও পুরুষদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ ছিল। অনেক নারী ও পুরুষ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মাথা ঢেকে অংশগ্রহণ করেন।

পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশও হেডস্কার্ফ পরে বক্তব্য রাখেন। মসজিদের বাইরে শতাধিক নারী পুলিশ কর্মকর্তারা মাথা ঢেকে জানাজায় অংশ নিতে অপেক্ষা করছিলেন।

এ বিষয়ে শনিবার, আমেরিকায় মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন কাউন্সিল অব ইসলামিক রিলেশন্স (সিএআইআর) এক বিবৃতিতে সিনেটর ক্রুজের মন্তব্যকে ‘ঘৃণ্য ও অসম্মানজনক’ বলে নিন্দা জানায় এবং গভর্নর হোকুল ও অফিসার ইসলামের পরিবারের কাছে তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। সংস্থাটি আরও জানায়, অতীতে টেড ক্রুজ নিজেও একটি ইহুদি অনুষ্ঠানে টুপি পরে অংশ নিয়েছিলেন, তাই হোকুলের প্রতি তার সমালোচনাকে তারা ‘দ্বিচারিতা ও বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে মনে করে।

তবে রোববার সিনেটর ক্রুজ আরও এক ধাপ এগিয়ে গভর্নর হোকূলকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘আপনার তো প্রতিদিন হিজাব পরা উচিত, কারণ আপনি এতটাই ‘ভদ্র’।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গভর্নর হোকুল নারীদের অধিকার রক্ষায় উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছেন। গভর্নর হোকুল টেড ক্রুজের মন্তব্যের জবাবে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘তার কাছে মাথা ঢেকে জানাজায় অংশ নেওয়া ছিল শহীদ পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক কাজ।’

উল্লেখ্য, শহীদ ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলামের জানাজায় নিউ ইয়র্ক ইসলামিক কালচারাল সেন্টারের ইমাম ড. জাকির আহমেদ বলেছিলেন, ‘এই শহর, এই জাতির প্রতি আমাদের বার্তা হলো—আপনারা আমাদের সেবা নিতে এবং একই সঙ্গে আমাদের কণ্ঠ রোধ করতে পারেন না। আপনারা আমাদের আত্মত্যাগ গ্রহণ করতে এবং একইসঙ্গে আমাদের কষ্টকে  উপেক্ষাও করতে পারেন না।’ তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম এমন এক সময়ে জীবন কাটিয়েছেন, যখন তার মতো মানুষদের অপমানিত করা হয়েছে এবং “বহিরাগত হিসেবে অনুভব করতে বাধ্য করা হয়েছে।’’

ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলামের জানাজার সপ্তাহ না যেতেই তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাজনীতির বিষয়ে পরিণত করা এবং তার ধর্মীয় রীতিকে নিয়ে রাজনৈতিক কটাক্ষ করার মাধ্যমে মূলত তার আমেরিকান পরিচিতিকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে প্রমাণ করারই একটি ঘৃণ্য চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করেন নিউইয়র্কের সাধারণ মুসলিমরা।

mzamin

ইরানের ভুলে আজারবাইজান যেভাবে ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ল

ইরানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি তাঁর স্মৃতিকথায় ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে প্রথম নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় আজারবাইজানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেইদার আলিয়েভের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেছেন। রাফসানজানির মতে, আর্মেনিয়ার সঙ্গে সংঘাতে ইরানের সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন আলিয়েভ।

রাফসানজানি লিখেছেন, ‘বারবার করে বলা তাঁর (আলিয়েভ) একটি মন্তব্য ছিল যে আর্মেনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ইরানের উচিত আজারবাইজানে তার উপস্থিতি বাড়ানো। মাঝেমধ্যে তিনি এ–ও বলতেন, আজারবাইজান একসময় ইরানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের (ইরান) সেখানে এসে এটিকে (আজারবাইজান) রক্ষা করতে ও নিয়ন্ত্রণ নিতে অনুরোধ করতেন।’ তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইরান যদি আজারবাইজানকে তার প্রভাববলয়ে নিয়ে আসে, তবে তা পুরো ককেশাসে রাশিয়ার আধিপত্যকে নাড়িয়ে দেবে।

৩২ বছর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আজারবাইজানের কর্মকর্তারা এখন আর বাকুর বিষয়ে তেহরানের সম্পৃক্ততা চান না।

এখন ইরানের রাজনৈতিক নেতারাও এই ছোট প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেবে তা নিয়ে অনিশ্চিত। আজারবাইজান ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, কিন্তু গোলস্তান (১৮১৩) এবং তুর্কমেনচায় (১৮২৮) চুক্তির মাধ্যমে রুশ সাম্রাজ্যের কাছে হস্তান্তরের আগে এটি একসময় ইরানের অংশ ছিল।

গত দশকে দুটি দেশের (ইরান ও আজারবাইজান) মধ্যে ক্ষমতার গতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আজারবাইজানের অনেকে ও দেশটির গণমাধ্যম এখন ইরানেরই কিছু অংশকে আজারবাইজানের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবি তুলছে।

এদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধ তেহরান ও বাকুর রাজনৈতিক বিভেদকে আরও গভীরতার দিকে নিয়ে গেছে। তেহরানে আজারবাইজানের ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইসরায়েলি ড্রোন কোথা থেকে এল?

ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই ইরানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কাছে বসবাসকারীরা আজারবাইজানের দিক থেকে ইসরায়েলি ড্রোন প্রবেশের খবর দেন। পরবর্তী সময়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও এই খবর নিশ্চিত করে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে যে তেহরান, তাবরিজ, উরমিয়াসহ বিভিন্ন শহরে ইসরায়েলের হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো আজারবাইজান থেকে ইরানে প্রবেশ করেছিল।

বিষয়টি তখন এতটাই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে তারা বিষয়টি দেখছে। তবে কয়েক দিন পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন যে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে ইসরায়েল আজারবাইজানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা চালায়নি।

যদিও এটি ইরানের অনেককে আশ্বস্ত করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউই আজারবাইজানের এ বক্তব্যকে গ্রহণ করেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন অধ্যাপক বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্ট উভয়ই এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন তার মানে ইরান এটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

ওই বিশেষজ্ঞের মতে, ইরান যদি আজারবাইজান সীমান্ত থেকে ইসরায়েলের যুক্ত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত না হতো, বিষয়টি এতটা উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বসহকারে নেওয়া হতো না।

তিনি আরও যুক্তি দেন যে আলিয়েভের আশ্বাস সম্পর্কে পেজেশকিয়ানের মন্তব্য ককেশাস অঞ্চলে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা তুলে ধরে। অধ্যাপক বলেন, ‘পেজেশকিয়ান যা বলেছেন, তা কেবল কূটনৈতিক ভাষা। বাস্তবে শেষ কারাবাখ যুদ্ধের পর থেকে ইরান আজারবাইজানের সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা জানে না। এর পর থেকে আজারবাইজান একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা অন্তত নিরপেক্ষ দেশ থেকে বরং একটি শান্ত কিন্তু গুরুতর হুমকির দেশে পরিণত হয়েছে।’

তিনি বাকু ও তেল আবিবের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আরও প্রমাণ হিসেবে আজারবাইজানীয় ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন।

ইরানের দোরগোড়ায় ইসরায়েল

সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আজারবাইজান প্রথমে ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্কের কাছাকাছি আসে। পরবর্তী সময়ে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গেও তার সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আজারবাইজান ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে এবং দেশটি উন্নত মানের ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম আমদানি করছে। কিছু প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইসরায়েল আজারবাইজানের সামরিক অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করেছে।

এখন আজারবাইজান নতুন সিরীয় সরকারের সঙ্গেও কাজ করছে। বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সিরীয় সরকার ইরান থেকে সরে এসেছে।

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ককেশাস অঞ্চলে কোনো স্পষ্ট কৌশল না থাকায় ইরান এখন দেখছে যে তেল আবিব তার সীমান্তের দিকে আরও কাছাকাছি আসছে।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ইসরায়েল, সিরিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক জোট দ্রুতই তুরস্কের মাধ্যমে ইসরায়েলকে ইরানের দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে পারে। একমাত্র বাধা হলো আর্মেনিয়া ও ইরানের মধ্যকার ৪৩ কিলোমিটার স্থলপথ, যার মাধ্যমে আজারবাইজান তার ছিটমহল এলাকা নাখচিভানের সঙ্গে যুক্ত।

২০২০ সালের ৪৪ দিনের কারাবাখ যুদ্ধ থেকে আজারবাইজান ও তুরস্ক উভয়েরই প্রধান দাবি হলো মেগরি বা জাঙ্গেজুর করিডর নামে গিরিপথটা নিয়ন্ত্রণ করা। যদি আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে ইরান আশঙ্কা করছে যে এই করিডরটি আজারবাইজানের হাতে চলে যেতে পারে। এ করিডরটি নাখচিভানকে আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ওই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে আজারবাইজান শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হচ্ছে না, বরং এটি ইসরায়েলের সামরিক কৌশলগুলোও অনুকরণ করছে। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আজারবাইজান সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র যুদ্ধকে বেছে নিচ্ছে। এটি তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে সহায়তা করছে। তাই আর্মেনিয়ার সঙ্গে আজারবাইজানের আরেকটি যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ইরানের উচিত তার উত্তর-পশ্চিম থেকে সম্ভাব্য সামরিক চাপের জন্য প্রস্তুত থাকা। এমনকি এখনো আমরা আজারবাইজান থেকে ইরানের ভূখণ্ডের কিছু অংশের দাবি নিয়ে জোরালো আওয়াজ শুনছি।’

ইরানের অঞ্চলগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার দাবি

ইরানের তুর্কিভাষী অঞ্চলগুলোকে আজারবাইজানিরা নিজেদের দাবি করার বিষয়টি ইরানি অধ্যাপক উল্লেখ করছিলেন। প্যান-তুর্কিরা এ অঞ্চলগুলোকে ‘দক্ষিণ আজারবাইজান’ হিসেবে উল্লেখ করে। এর মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিম আজারবাইজান, আরদাবিল, জাঞ্জান প্রদেশ এবং এমনকি ইরানের কুর্দি অঞ্চলের কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত। বৃহত্তর কুর্দিস্তান ও বৃহত্তর আর্মেনিয়ার সমর্থকেরাও এই একই এলাকার কিছু অংশের দাবি করে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর আজারবাইজানের সংবাদমাধ্যম আরাজনিউজ এক্সে (টুইটার) এ বিচ্ছিন্নতাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি প্রচারণা চালায়। ফারসি ও তুর্কি ভাষায় এই প্রচারণায় ইরানের তাবরিজ, আজারবাইজানের বাকু ও তুরস্কের আঙ্কারার তুর্কিদের মধ্যে ঐক্যের আহ্বান জানানো হয়েছিল।

আজারবাইজানের আরেকটি সংবাদমাধ্যম একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘আজেরিদের প্রধান শত্রু’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

আজারবাইজানের স্বাধীনতার পরের বছরগুলোতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করা একজন অবসরপ্রাপ্ত ইরানি কূটনীতিক বলেছেন, প্রথম কারাবাখ যুদ্ধের (১৯৮৮-৯৪) পরপরই এই কৌশলগুলো নেওয়া শুরু করেছিল আজারবাইজান।

সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘একবার বাকু যখন বুঝতে পারল যে তারা ইরানকে আর্মেনিয়ার সঙ্গে সামরিক সংঘাতে টানতে পারবে না, তখন তারা দ্রুত ইরানের শত্রু ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকে পড়ল। এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল কিন্তু আজারবাইজানকে সামরিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে কোনো বড় খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হয়নি, তাই ইরান তখন আজারবাইজানের প্রতি কোনো স্পষ্ট নীতি গ্রহণ করেনি।’

‘সক্রিয় নিরপেক্ষতা’ নীতি

আজারবাইজান ইসরায়েলের সঙ্গে শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং তেল ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে তার অর্থনীতিকে চাঙা করেছে। তবে সাবেক ওই ইরানি কূটনীতিকের মতে, আজারবাইজানের প্রতি ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়নি।

আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যকার সংঘাতে ইরান ‘সক্রিয় নিরপেক্ষতা’ নীতি গ্রহণ করেছিল, যা এখন বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করছেন ওই কূটনীতিক। [সক্রিয় নিরপেক্ষতা হচ্ছে কোনো সংঘাত বা বিরোধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেই এক পক্ষকে সমর্থন প্রদানের নীতি]

তাঁর মতে, এই তথাকথিত নিরপেক্ষতার মূল্য দিচ্ছে ইরান। এটি হয়তো প্রথমে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছিল, কিন্তু আজারবাইজান ইসরায়েলের কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে এটি ইরানের ক্ষতি করেছে। বাস্তবে এটি নিরপেক্ষতা ছিল না, এটি ছিল নিষ্ক্রিয়তা।’

ইরান সরকারের দাবি, জাঙ্গেজুর করিডরের বিরোধিতা ছিল আর্মেনিয়ার মাধ্যমে ইউরোপে বাণিজ্যের পথ বজায় রাখার জন্য। এ বিষয়টিকেও ওই কূটনীতিক নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ, ২০২৩ সালের বাণিজ্যবিষয়ক তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ইরান আর্মেনিয়ায় মাত্র ৪১২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং মাত্র ৪৫ মিলিয়ন ডলার আমদানি করেছে।

ইরানের এই কৌশলগত অবস্থান গ্রহণের জন্য দুটি গভীর কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি—প্রথমত, এ অঞ্চলে রাশিয়ার স্বার্থের সঙ্গে অটল থাকার তার দীর্ঘদিনের নীতি; দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের তার সীমান্তের খুব কাছাকাছি আসার ভয়।

ওই কূটনীতিক বলেন, ‘ইরানের নেতারা আজারবাইজান থেকে কোনো নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করার আশা করেননি। তাঁরা আরব দেশগুলোতে তাঁদের প্রভাব বিস্তারে মনোযোগ দিয়েছিলেন।’

যদিও তিনি সাম্প্রতিক হামলায় ইসরায়েল আজারবাইজানের আকাশসীমা ব্যবহার করেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অস্বীকার করেছেন, তবে ওই কূটনীতিক বলেছেন যে আজারবাইজানের ইসরায়েল-নির্মিত ড্রোন, নজরদারি প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রভাব এখন কত দূর ছড়িয়েছে তা এখন স্পষ্ট।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে ইরানের আজারবাইজানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে এবং তেহরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির জন্য ইসরায়েলের জন্য আরেকটি সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।

সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘ইসরায়েল আজারবাইজানের ভূখণ্ড থেকে হামলা চালিয়েছিল কি না তা বড় কথা নয়, আসল সমস্যা হলো ইরান জানে যে তার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এখন দুর্বল। এখন প্রশ্ন হলো, ইরানের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকেরা নতুন করে ভাববেন নাকি ‘সক্রিয় নিরপেক্ষতার’ ব্যর্থ নীতির পথেই হাঁটবেন।’

*মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে আজারবাইজানীয় সেনাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। ২০২৩ সালের নভেম্বরে
নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে আজারবাইজানীয় সেনাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। ২০২৩ সালের নভেম্বরে। ছবি: এএফপি

একদিনে গাজায় নিহত ৫২, এক হাজার বিজ্ঞানীর চিঠি

শুধু মঙ্গলবার গাজায় কমপক্ষে ৫২ জন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। এসব মানুষ খাদ্য সহায়তা নিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কারণে আরও ৮ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন।

ওদিকে কমপক্ষে এক হাজার বিজ্ঞানী ইউরোপের পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্নের (সিইআরএন) কাছে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন। এতে গাজায় ইসরাইলকে যুদ্ধ বন্ধ করতে তাদেরকে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে মূলনীতি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পিটিশনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানী হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞানের বিনিময় এবং মতের স্বাধীন চলাচল মানব অগ্রগতি ও শান্তির চালক। মধ্যপ্রাচ্যের বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর এই আদর্শ ধরে রেখেছেন। তারা আরও লিখেছেন, আমরা মেনে নিতে পারি না  ইসরাইলি সরকারের আরোপিত এই যুদ্ধ কেবল প্রাণহানি ও মানব মর্যাদার অবমাননাই ঘটাচ্ছে না, বরং ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানীদের পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহযোগিতাকেও বিপন্ন করছে। উল্লেখ্য, সার্নেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টিকেল অ্যাক্সেলারেটর লার্জ হেড্রন কলাইডার।

ওদিকে সোমবার ইসরাইল মোট ৯৫টি ত্রাণবাহী ট্রাককে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। যা দৈনিক ন্যূনতম ৬০০ ট্রাকের প্রয়োজনের মাত্র ১৫ শতাংশ বলে জানিয়েছে গাজার গভর্নমেন্ট মিডিয়া অফিস। ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬১,০২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১,৫০,৬৭১ জন।

mzamin

জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে কক্সবাজারে সারজিস, হাসনাতসহ এনসিপির পাঁচ নেতা, নানা গুঞ্জন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির বিশেষ দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতা হঠাৎ কক্সবাজারে এসেছেন।

কক্সবাজার বিমানবন্দর সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে এই পাঁচ নেতা কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

তাঁরা হলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। সঙ্গে তাসনিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহও রয়েছেন। তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক।

এনসিপির পাঁচ নেতার হঠাৎ কক্সবাজার আগমন রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি করেছে।

বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমান থেকে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে নেমে এনসিপির পাঁচ নেতা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানী সৈকতের পাঁচ তারকা হোটেল সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা-তে (আগের নাম রয়েল টিউলিপ) যান। হোটেলের মাইক্রোবাসে তাঁদের বিমানবন্দর থেকে নেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এনসিপির পাঁচ নেতার হঠাৎ কক্সবাজার আগমনের বিষয়টি প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করা হয়নি।

রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাংলাদেশস্থ রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করতে কক্সবাজারে গিয়েছেন এই পাঁচ নেতা।

কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বর্ষপূর্তির বিশেষ দিনে হঠাৎ করে এনসিপির শীর্ষ পাঁচ নেতার কক্সবাজার আগমন এবং শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থানের ঘটনা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। মানুষের মধ্যে নানা কৌতূহলের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে তাঁদের সঙ্গে পিটার হাসের বৈঠকের কথা শুনে লোকজনের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়ছে। তবে পিটার হাসের উপস্থিতির বিষয় নিয়ে তিনি সন্দিহান। এ বিষয়ে তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন।

পিটার হাস বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতে যুক্ত মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির কৌশলগত  উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন।

বেলা সোয়া তিনটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়, সি পার্লের বাইরে গণমাধ্যমকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। বিএনপির কিছু কর্মী-সমর্থককেও সেখানে দেখা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ফোন করা হলে তিনি হাসনাত আবদুল্লাহকে কথা বলতে দেন। হাসনাত ফোনটি দেন সি পার্লের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কামরুজ্জামানকে।

কামরুজ্জামান পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, পিটার হাস বা এ রকম কেউ তাঁদের হোটেলে আসেননি।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভিকে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, তাঁরা ঘুরতে কক্সবাজার গিয়েছেন। পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি গুজব ও অপপ্রচার।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনে ঢাকায় নানা অনুষ্ঠান হচ্ছে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ‘৩৬ জুলাই উদ্‌যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে সকালে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিকেল পাঁচটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন।

এমন দিনে এনসিপির পাঁচ নেতার কক্সবাজারে যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ফেসবুকে জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন ব্যক্তি লিখেছেন, আজ এত বড় দিনে তাঁরা কক্সবাজার কেন?

(বাঁ থেকে) এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এবং তাসনিম জারার স্বামী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ
(বাঁ থেকে) এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এবং তাসনিম জারার স্বামী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। ফাইল ছবি

আল জাজিরার প্রতিবেদন: ‘তারা অভ্যুত্থান বিক্রি করছে’

ঠিক এক বছর আগের ১৫ জুলাইয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার কথা এখনও ভুলতে পারেননি সিনথিয়া মেহরিন সকাল। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য ঢাকার রাজপথে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনিও সেসময় আন্দোলনে নেমেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল  আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের এক কর্মীর হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শেষ বর্ষের এই শিক্ষার্থীর মাথায় পড়েছিল ১০টি সেলাই। কিছু সময়ের জন্য স্মৃতিশক্তিও হারিয়ে ফেলেন তিনি।

এর এক দিন পর, রংপুরে শহীদ হন ২৩ বছর বয়সী আবু সাইদ। এক ভিডিওতে দেখা যায়, দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশ তার বুকে গুলি করে এবং তিনি লুটিয়ে পড়ে যান। এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। যা হাসিনার বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন গণআন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে ওঠে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দমন-পীড়নের মুখে নেমে আসে রাস্তায়।  পরে এদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ। বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলো আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে বিরল ঐক্যের সৃষ্টি করে। সিনথিয়া  বলেন, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমেছিল। মনে হচ্ছিল সত্যিকারের পরিবর্তন আসছে। এসব খবর দিয়ে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে- ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, ঢাকায় হাসিনার বাসভবন ও অফিসে যখন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ঢুকে পড়েন, তখন ৭৭ বছর বয়সী এই নেত্রী একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান। এখনো তিনি দিল্লিতেই অবস্থান করছেন।

হাসিনার পতনের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট আন্দোলনকারীরা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। চলতি বছরের মে মাসে এই সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

হাসিনা সরকারের পতনের এক বছর পূর্ণ হলেও আন্দোলনের সেই ঐক্য ও আকাঙ্ক্ষা এখন হতাশা ও বিভ্রান্তিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন সিনথিয়া । তিনি বলেন, তারা বিপ্লব বিক্রি করে দিচ্ছে। বর্তমানে ক্ষমতার দখল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতার দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলেন তিনি।

দেশের নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করলেও, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক চাপে পড়েছে। একসময় যারা হাসিনার বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল, তারা এখন ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। আজ (মঙ্গলবার) ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ প্রকাশ করবেন প্রফেসর ইউনূস। এতে তিনি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রোডম্যাপ উপস্থাপন করবেন।

তবে অনেকেই আশাবাদী নন। আমাদের সন্তানরা ন্যায্য, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নে রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু আমরা সেটা পাচ্ছি না বলে অভিযোগ করে ৩৬ বছর বয়সী সানজিদা খান দীপ্তি। এই নারীর ১৭ বছর বয়সী ছেলে আনাস ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সংস্কার ও বিচার যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ এই নারীর। তার প্রশ্ন, তাহলে আমার ছেলের আত্মত্যাগের মানে কী?

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিতে মুখমণ্ডলের বেশিরভাগ অংশ হারালেও, খোকন চন্দ্র বর্মণের আক্ষেপ নেই। তিনি বলেন, আমার আত্মত্যাগ একটি বৈষম্যকারী সরকারকে উৎখাত করতে সহায়তা করেছে বলে আমি গর্বিত।

ঢাকার উত্তরা এলাকার ২১ বছর বয়সী টিকটকার আতিকুল গাজী যিনি পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে বাঁ হাত হারান, তিনিও আশাবাদী। তার একটি হাস্যোজ্জ্বল সেলফি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি বলেন, একটা হাত নেই তো কী হয়েছে, জীবন আবার উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত।

তবে অনেকেই নিরাশ হচ্ছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী বলেন, এটি ছিল নজিরবিহীন ঐক্যের মুহূর্ত। সেই ঐক্য ধরে রাখা উচিত ছিল সরকারের প্রধান কাজ। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো এখন ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে। বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে ছাত্রনেতাদের  নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি এবং জামায়াতের মতো দলগুলো নির্বাচনের আগে কাঠামোগত সংস্কার চায়।

এই বিভাজন দূর করতে ইউনূস সরকার ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। এর উদ্দেশ্য হলো নানা পক্ষের সংস্কার প্রস্তাব একত্রিত করে একটি রাজনৈতিক খসড়া তৈরি করা, যা পরবর্তী সরকার বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করবে। তবে এখনো কমিশনের বৈঠকগুলোতে দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর মতো বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনির মতে, রাজনৈতিক শক্তিগুলো একমত হতে না পারলে অস্থিরতা বাড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক মোবাস্বার হাসান মনে করেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা সম্ভবত হবে না। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কিছু অগ্রগতি হবে ঠিকই, কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন হবে না। একইসঙ্গে, কোটি মানুষের সমর্থন পাওয়া আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ, যা নির্বাচনী গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করতে পারে।

আইন লঙ্ঘন করলেই গ্রেপ্তার, আটক ও প্রয়োজনে গুলি করার ক্ষমতা নিয়ে সড়কে টহল দিচ্ছে সামরিক বাহিনী। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার জানিয়েছে, এ বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ৭২ জন নিহত এবং ১,৬৭৭ জন আহত হয়েছে। পুলিশ ও র‍্যাবের বিরুদ্ধে আটটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও উঠেছে।

সহিংসতা, অপহরণ, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ বেড়েছে। পুলিশের মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত খুনের ঘটনা ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৫৮৭টি।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক মো. ইজাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে এমন অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ নিরুৎসাহিত, ফলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের বহু সদস্য বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মিলেই অনেক কিছু চলতো। সেই কাঠামো ভেঙে গেছে। এখন সবাই ক্ষমতা দখলে লিপ্ত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, প্রতিদিন আমাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিছিল-সমাবেশ সামলানো। ঢাকা যেন এখন ‘আন্দোলনের শহর’ হয়ে গেছে। তবুও তিনি মনে করেন, এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো।

বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় এর অবস্থান দ্বিতীয়। প্রধানত গার্মেন্টস ও কৃষিতে ভর করে এই অবস্থানে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের মে-তে ২৪ বিলিয়ন ডলার থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। প্রবাসী আয়, আইএমএফ-এর সহায়তা এবং অবৈধ অর্থপাচারের বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে এই সাফল্য এসেছে।

মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ থাকলেও, এ বছরের জুনে তা এ বছর দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে।

mzamin