Saturday, September 12, 2026

ইরান-সমর্থিত হুথিরা এগোচ্ছে ‘বিদ্যুৎ গতিতে’, বিস্মিত বিশ্লেষকরা

বিবিসি বাংলাঃ ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাংশজুড়ে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা অধিকাংশ বিশ্লেষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স নামে পরিচিত হুথিবিরোধী জোট ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে উল্লেখযোগ্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত।

কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় অংশ হুথিদের দখলে চলে গেছে।

কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) দখল করেছে। এটি কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য। ১২ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং মার্কিন, ইসরাইলি ও ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ সত্ত্বেও হুথিরা যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, সেটিই এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিপক্ষ যখন হতভম্ব ও মনোবলহীন, তখন অদূর ভবিষ্যতে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এখন তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে, ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন। আর তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে খরচও অনেক বেশি হবে।

অবশ্য হুথিরা একা নয়।

ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে এবং তথাকথিত অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর অন্য অংশগুলো, অর্থাৎ লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের অভিজ্ঞ বিপর্যয় ও পরাজয়ের পর তেহরানের জন্য এই সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই তারা হুথিদের জন্য তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে, আল-ওমেইসি বলেন।

এবং অবশ্যই তাদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।

বেশিরভাগ বিশ্লেষকই একমত যে হুথিদেরকে কেবল ইরানের পুতুল হিসেবে বর্ণনা করা ভুল হবে। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর সাত মাস পর, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করছে। একটি হলো পারস্য উপসাগরের মুখে হরমুজ প্রণালি, অন্যটি হলো লোহিত সাগর (এবং সুয়েজ খাল)-এর প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ করছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও বেশি এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এটি একটি পারমাণবিক বোমার বিপর্যয়ের সমপর্যায়ের প্রভাব হতে পারে।

যদি হুথিরা লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে পেরিম, যা বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝখানে অবস্থিত, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপ করার তাদের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরাইলকে ঘিরে হুথিদের কর্মকাণ্ডই দেখিয়েছে যে, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট আক্রমণকারী নৌযানের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এই ভৌগোলিক অগ্রগতি ছাড়াই তারা বাব আল-মান্দাব হয়ে সুয়েজের দিকে যাওয়া ও আসা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল, ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ শুক্রবার বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন।

কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর সরাসরি নজরদারির সুযোগ থাকা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাদের আরও বেশি প্রভাব দিচ্ছে। শুক্রবার বিকেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী বলেছে, যেসব কোম্পানির জাহাজ সৌদি নয়, তাদের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি জাহাজগুলো আগে থেকেই অবরোধের আওতায় রয়েছে। এই বক্তব্যের আন্তরিকতা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক।

তাদের আগের হামলাগুলোতে হুথিরা বলেছিল তারা শুধু ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন জাহাজেও হামলা চালায় যার সঙ্গে ইসরাইলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, যার মধ্যে একটি নরওয়েজীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে ক্রেগ বলেন, হুথিরা হয়তো নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহব্যাপী বড় মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা, 'অপারেশন রাফ রাইডার'-এর পুনরাবৃত্তি চাইবে না।

তিনি বলেন, তারা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও জড়াতে চাইবে?

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন একটি সংঘাতমুখী পরিস্থিতি তার জনসমর্থন বা নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে খুব একটা শক্তিশালী করবে বলে মনে হয় না।

অ্যাক্সিওস ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়ে করা আবেদনগুলো এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি।

অ্যাক্সিওস লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একদিকে সৌদি আরবকে সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।

তবে সৌদি আরবে উদ্বেগের কারণ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নয়।

সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্যাটেলাইট চিত্র ইঙ্গিত করে যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান সরাসরি হামলার নির্দেশ না দিয়ে থাকলেও, এর সুফল যে তারা পাবে তা স্পষ্ট।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাত বৃদ্ধির সূত্রপাত জুলাই মাসে। তখন হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসে।

তিনি বলেন, এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এবং খুব স্পষ্টভাবেই মনে হয়েছে যে [ইরান] এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইয়েমেন যখন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরে তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষায় উদ্বিগ্ন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দৃশ্যত এই সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী, তখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে।

আর ইয়েমেনের জনগণের জন্য, যারা ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, বিপর্যস্ত, ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।

ছবি: সংগৃহীত।
ছবি: সংগৃহীত।

৯/১১ হামলা: নিউইয়র্কের মূল অনুষ্ঠানে না গিয়ে ট্রাম্প গেলেন পেন্টাগনে

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ হামলার ২৫তম বার্ষিকী পালন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে এক আবেগঘন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি স্মরণ করা হলেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এ অনুপস্থিতির পাশাপাশি অনুষ্ঠানে মার্কিন নীতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা।

প্রথা ভেঙে নিউইয়র্কের ওই অনুষ্ঠানে না গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ট্রাম্প। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ছিনতাই করা উড়োজাহাজ দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। ওই ঘটনায় নিহত ২ হাজার ৯৭৭ জনের বেশির ভাগই সেখানে মারা যান। এ হামলা পুরো বিশ্বের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে একেবারে বদলে দিয়েছিল।

নাইন-ইলেভেনের পর তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই কারণেই বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যের নানা যুদ্ধে জড়িয়ে থাকতে হয়েছে দেশটিকে। রিপাবলিকান দলের এই বিলিয়নিয়ার নেতা (ট্রাম্প) এখন ইরানের সঙ্গে তাঁর বর্তমান সংঘাতকে সেই পুরোনো যুদ্ধের সঙ্গেই মেলানোর চেষ্টা করেছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আজ আমরা সেই পবিত্র শপথ আবার নতুন করে গ্রহণ করছি, যা ২৫ বছর আগে তাঁদের স্মরণে নিয়েছিলাম। আমরা কোনো দিনই তা ভুলব না। আর এ জন্যই আজ আমরা লড়ছি।’

‘আমাদের আর কোনো উপায় নেই। এখানে শুধু জয়ই হতে পারে। আমরা শক্ত লড়াই করছি। আমরা জয়ের জন্যই লড়ছি।

নিউইয়র্কের লোয়ার ম্যানহাটানের ‘গ্রাউন্ড জিরো’র অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সেখানে ট্রাম্পের আগের চার জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্টও এসেছিলেন। তাঁদের একজন হলেন রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ, যিনি হামলার সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অন্য তিনজন হলেন ডেমোক্র্যাট দলের জো বাইডেন, বারাক ওবামা ও বিল ক্লিনটন।

শোকাবহ এ বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের (গ্রিনিচ মান সময় ১২টা ৪০ মিনিট) ঠিক পরপরই অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এতে নাইন-ইলেভেনের সেই দিনের প্রতিটি ঘটনা মিনিট ধরে স্মরণ করা হয়।

প্রতিবারের মতো এবারও নিহত ব্যক্তিদের নাম পড়ে শোনানো হয়। আর সেদিনের হামলার বড় বড় মুহূর্ত স্মরণ করে বাজানো হয় ঘণ্টা।

সাধারণত অনুষ্ঠানটি রাজনীতিমুক্ত থাকে এবং এখানে কোনো ভাষণ দেওয়া হয় না। তবে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে যাঁরা নাম পড়ে শুনিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই সৌদি আরবের সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরও কড়া সমালোচনা করেছেন।

নিউইয়র্কের ‘ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল’-এ নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫তম বার্ষিকীর স্মরণানুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিউইয়র্কের ‘ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল’-এ নাইন-ইলেভেন হামলার ২৫তম বার্ষিকীর স্মরণানুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: এএফপি

লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার: ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধের ঘোষণা সৌদি আরবের

রয়টার্সঃ লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। হামলার শিকার হওয়ার পর তারা তেল রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ এ পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই এ হামলা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। ইরাকে তৎপর থাকা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলা চালিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাগদাদ ও রিয়াদ। হামলার পর আজ শনিবার ইরাকের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

আরব উপদ্বীপজুড়ে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জট এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে।

হামলাটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান

ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন বাব আল–মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ও ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণার ফলে আরব উপদ্বীপের দুপাশেই জ্বালানি সরবরাহে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

ইয়েমেনের চারটি সরকারি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, গতকাল শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে।

সৌদি আরবের পাইপলাইন ও পেরিম দ্বীপে হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে গেছে।

কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সৌদি আরব হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এমন সময়ে এ অনুরোধ জানানো হলো, যখন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল চাপে রয়েছে।

এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর নিজ দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। ট্রাম্প ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি এরই মধ্যে রাজনৈতিকভাবে ইরান যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে।

ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে কারা হামলা চালিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। স্যাটেলাইটের ছবিতে পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন ও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেল রপ্তানিতে এর কী প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এদিকে ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আজ শনিবার দেওয়া এক বিবৃতি অনুযায়ী, বরখাস্ত হওয়া ইরাকি সামরিক কমান্ডার মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকে ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ও প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইরাক সরকার সৌদি আরবে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের কাছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধও করেছেন। তবে এখনই এ অনুরোধে সাড়া দিচ্ছে না সৌদি আরব।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরাকের অনুরোধের পরও সৌদি আরব এখন পর্যন্ত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্তে অটল আছে। তবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার’ অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গতকাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী।

এদিকে ইরাক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সীমান্তের শালামচেহ সীমান্তপথ বন্ধ করে দিয়েছে। দুটি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছে। ইরান থেকে ইরাকে সবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য আমদানির অন্যতম প্রধান পথ এ শালামচেহ সীমান্তপথ।

ওই দুই সূত্র বলেছে, পাইপলাইনে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে বড় পরিসরে অভিযান চলছে।

পাল্টা হামলার প্রস্তুতি

জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন হুতি যোদ্ধারা।

ইয়েমেনের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, গতকাল লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক মাঝে অবস্থিত একটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয় হুতিরা। এর মাধ্যমে পুরো প্রণালিতেই তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সরকারি কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, ময়উন নামের দ্বীপ (পেরিম নামেও পরিচিত) থেকে গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌযান ওই দ্বীপে পৌঁছায়।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী এএফপিকে বলেছেন, সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাব আল-মানদেব উপকূলজুড়ে মোতায়েন রয়েছেন ও সামরিক যানবাহনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ইরান-সমর্থিত হুতিরা গত সপ্তাহে বাব আল-মানদেব এলাকায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরুর পর কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনী বলেছে, তারা হুতিদের দখলে নেওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।

রয়টার্স বৃহস্পতিবার বলেছিল, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের নাটকীয় অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছিল। এ কাজে সহায়তার জন্য আরও অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল তেহরান।

ইরান হুতিদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। তবে প্রকাশ্যে তাদের সামরিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা অস্বীকার করে। ইরানের ভাষ্য, হুতিরা তাদের ‘প্রক্সি বাহিনী নয়’।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, আগে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া বাকি সব জাহাজের জন্য সমুদ্রপথে চলাচল নিরাপদই রয়েছে।

সৌদি আরব সহায়তা চেয়েছে

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র গতকাল রয়টার্সকে বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করেন।

এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

সূত্র দুটি জানায়, ওয়াশিংটন রিয়াদকে বলেছে, আপাতত তারা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করবে।

দুই নেতার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে কি না—রয়টার্সের এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।

পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইটে এ দৃশ্য ধরা পড়েছে। হিজাজ অঞ্চল, সৌদি আরব। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

সৌদি জাহাজের জন্য লোহিত সাগরকে ‘নো-গো জোন’ বানাল হুতিরা

সৌদি আরবকে সরাসরি হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি যোদ্ধাগোষ্ঠী। তাদের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, সৌদি জাহাজ ছাড়া লোহিত সাগরে অন্য সব জাহাজের চলাচল নিরাপদ। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ওপর সৌদি অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

ইয়াহিয়া সারি বলেন, সৌদি জাহাজের ওপর হুতিদের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। তবে অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগরে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ইয়াহিয়া সারি আরও বলেন, ইয়েমেনের ওপর যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে বলে হুতিরা দাবি করছে, তা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সৌদি বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানো হবে। হুতিদের এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশে তারা সামরিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা বাব আল-মান্দাবের কাছে বেশ কয়েকটি কৌশলগত অবস্থান দখল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পেরিম দ্বীপ এবং উপকূলীয় শহর ধুবাব। এর ফলে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।

সৌদি জাহাজের জন্য লোহিত সাগরকে ‘নো-গো জোন’ বানাল হুতিরা

হুতিদের ঝড়ো গতির অগ্রযাত্রা

বিবিসির বিশ্লেষণঃ ইয়েমেনের শুষ্ক উপকূলীয় সমভূমি তিহামাহর দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হুতিদের ঝড়ের গতির অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ইরানবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় একটি অংশ হুতিদের দখলে চলে গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এলাকা দখল করেছে।

গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি হুতিদের সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, ১২ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ভয়াবহ বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও বৃটেনের হামলার পরও হুতিরা এখনও বড় ধরনের শক্তি হিসেবে টিকে আছে। প্রতিপক্ষরা হতবিহ্বল ও মনোবল হারিয়ে ফেলায় অদূর ভবিষ্যতে হুতিদের এই অবস্থান থেকে সরানো কঠিন হতে পারে। ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, এখন তারা সেখানে পৌঁছে গেছে। তারা সেখানে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলবে। আর তাদের সেখান থেকে সরানো অনেক বেশি ব্যয়বহুল হবে।

অবশ্য হুতিরা একা নয়। তারা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে। ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অন্য অংশগুলো যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনব্যবস্থা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ধাক্কা ও পরাজয়ের মুখে পড়ায় হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল-ওমেইসি বলেন, তাই তারা তাদের সমর্থন হুতিদের দিকে সরিয়ে দিয়েছে। আর অবশ্যই হুতিদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।

অধিকাংশ বিশ্লেষকই হুতিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে বর্ণনা করাকে ভুল মনে করেন। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা শুরুর সাত মাস পর এখন তেহরানের কর্তৃত্ব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। তা হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের থিঙ্কট্যাংক চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং প্রক্সিদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটপথ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার মতে, এটি পারমাণবিক বোমার মতোই শক্তিশালী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার। হুতিরা যদি লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে থাকে, যার মধ্যে বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সরু অংশের মাঝখানে অবস্থিত পেরিম দ্বীপও রয়েছে, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা তাদের অনেক বেড়ে যাবে।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের পর হুতিদের কর্মকাণ্ড এরই মধ্যে দেখিয়েছে, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুতি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট আকারের হামলাকারী নৌযানের কাছে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেইগ শুক্রবার বিবিসির এক রেডিও অনুষ্ঠানে বলেন, ভূখণ্ড দখল না করেও তারা বাব আল-মান্দাব দিয়ে এবং সুয়েজের দিকে কী ঢুকছে ও বের হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ঠিক পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তাদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে।

শুক্রবার বিকেলে হুতিদের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সমুদ্রপথে চলাচল সব কোম্পানির জন্য ‘নিরাপদ’। তবে সৌদি জাহাজ এর বাইরে থাকবে। কারণ এসব জাহাজের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। তবে জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো হুতিদের এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান থাকতে পারে। অতীতে হুতিরা দাবি করেছিল, তারা শুধু ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। বাস্তবে এমন কয়েকটি জাহাজও হামলার শিকার হয়েছে, যেগুলোর ইসরাইলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে নরওয়ের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে আইওনা ক্রেইগের মতে, হুতিরা নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি চায় না। ওই অভিযানে ছয় সপ্তাহ ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা চালানো হয়েছিল। ক্রেইগ বলেন, তারা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির স্বাদ পেয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ নতুন করে এই সংঘাতে জড়াতে চাইবে কি না। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এমনিতেই জনপ্রিয় নয়। এর মধ্যে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে ইয়েমেনে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিংবা নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনা বাড়াবে এমনটা মনে করার কারণ কম। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানালেও এ পর্যন্ত তার প্রতি সাড়া মেলেনি। অ্যাক্সিওস বলছে, ইয়েমেনে সংঘাত আরও বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন, তবে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলতে চাইছে।

তবে সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে নয়। উপগ্রহচিত্রে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হুতি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চলতি বছরের শুরুতে তেল রপ্তানির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে এই পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ থেকে তৈরি অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইরান সরাসরি এই হামলার নির্দেশ না দিলেও এর সুফল তেহরান পাবে এমনটাই স্পষ্ট। লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারায়া শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াইয়ের সূত্রপাত জুলাইয়ে। ওই সময় হুতিদের একটি প্রতিনিধি দল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে দেশে ফিরে আসে। তিনি বলেন, এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। দেখে স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, (ইরান) এখন লোহিত সাগরে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। সৌদি আরব লোহিত সাগরের দিকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পথটি নিরাপদ রাখতে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। ফলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে ইয়েমেনের এই পরিস্থিতি নতুন এবং সম্ভাব্যভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি মাত্রা যোগ করেছে। আর ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্য সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হুতিদের ঝড়ো গতির অগ্রযাত্রা
হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে একটি সাঁজোয়া যানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সদস্যরা। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রয়টার্স

যুদ্ধ-শুল্ক-ডলার নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত : সর্বসম্মতিক্রমে ব্রিকসে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’

যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ ও একতরফা শুল্ক ব্যবস্থার নিন্দা জানিয়ে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করেছে ব্রিকস। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে জোটটি।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সদস্যদেশগুলোর ঐকমত্যে ঘোষণাটি গৃহীত হওয়ার কথা জানান।

নয়াদিল্লি ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস।

নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে ব্রাজিল ও ভারতের আরও বড় ভূমিকার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। নিরাপত্তা পরিষদেও দেশ দুটির আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে তারা।

ঘোষণায় ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া এটি ‘একতরফা যুদ্ধ কর্মকাণ্ডের’ নিন্দা জানিয়েছে এবং এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নাবিকদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌচলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

মোদি বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার জরুরি। প্রতিনিধিত্ব, কার্যকরভাবে সাড়া দেয়ার সক্ষমতা এবং নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে।

ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিকাশ এবং এসব প্রযুক্তি পরিচালনার নিয়ম তৈরিতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।

মোদি বলেন, নয়াদিল্লি ঘোষণা ব্রিকসের সম্মিলিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এখন এসব সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দেয়ার দায়িত্ব সদস্য দেশগুলোর।

শনিবারের সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ ব্রিকসের বিভিন্ন সদস্য দেশের নেতারা অংশ নেন। ব্রিকস প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্তির সময় এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের গণ্ডি পেরিয়ে জোটটি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

একতরফা শুল্কের বিরোধিতা

বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ব্রিকস। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সংস্কারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জোটটি।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বাণিজ্য-সীমাবদ্ধতামূলক পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে এতে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
নির্বিচারে শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা বাড়ানো এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের অজুহাতে সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণের বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ব্রিকস।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা বাণিজ্যকে বিকৃত করে এবং ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এসব বাণিজ্যবাধা মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।
উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর (ইএমডিই) প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের প্রতি আরও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে ডব্লিউটিওকে সক্ষম করে তোলার ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।

পাহেলগাম হামলার নিন্দা

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলারও কঠোর নিন্দা জানিয়েছে ব্রিকস। ঘোষণায় বলা হয়েছে, হামলার উদ্দেশ্য, স্থান, সময় কিংবা হামলাকারী যে-ই হোক না কেন, সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অপরাধমূলক ও অগ্রহণযোগ্য।
পাহেলগাম হামলায় ২৬ জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হন উল্লেখ করে এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো।

সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নিজেদের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে জোটটি। এর মধ্যে সীমান্তপাড়ের সন্ত্রাসীদের চলাচল, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের বিষয়গুলো রয়েছে।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদকে কোনো ধর্ম, জাতীয়তা, সভ্যতা বা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের জবাবদিহির আওতায় এনে সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। 

সর্বসম্মতিক্রমে ব্রিকসে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’

ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে, দাবি ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে। জ্বালানি তেলের দামও শিগগিরই কমবে।

আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ দাবি করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার মনে হয় এটি (ইরান যুদ্ধ) খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে। সম্ভবত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরপরই এর সমাপ্তি ঘটবে। নির্বাচনকে জটিল করে তুলতেই তারা (ইরান) যতটা সম্ভব সময় ক্ষেপণ করার চেষ্টা করছে। তবে আমার মনে হয় জনগণ বিষয়টি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে।’

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির। দাম বাড়ছে দিন দিন। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘যখন যুদ্ধটা শেষ হয়ে যাবে, তখন তেলের দামও দ্রুত নেমে আসবে।’

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মত, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে এর ফল ভুগবে।

গাজা ইস্যু নিয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় শান্তি ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ও পদক্ষেপকে ‘চমৎকার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।

ইসরায়েলের ‘গণহত্যামূলক যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন। তখন নিজের প্রশাসনের ভূমিকার পক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘গাজার কথা যখন বলছেন—আমরা তো সেখানকার আগুন নিভিয়ে দিয়েছি এবং সব জিম্মিকে ফিরিয়ে এনেছি। এই মুহূর্তে গাজায় পরিস্থিতি অনেক শান্ত, তেমন কিছুই ঘটছে না।’

গাজায় মার্কিন তৎপরতার আত্মতুষ্টি প্রকাশ করে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘গাজার দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, সেখানে এখন অনেক ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ চমৎকার ছিল। আমার মনে হয়, আমরা সত্যিই দারুণ কাজ করেছি।

 মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডাবলিনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। আয়ারল্যান্ড, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডাবলিনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। আয়ারল্যান্ড, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: এএফপি

হুতিদের হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি এখন কী করতে পারে by খালেদ এম বাতারফি

ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এখন আর স্রেফ সে দেশের মধ্যকার কোনো যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। রিয়াদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এখন সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক উত্তাপকে নিজের সীমানার বাইরে আটকে রাখার সক্ষমতার ওপর এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো সেই বার্তাই দিচ্ছে। আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানের বেসামরিক এলাকা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এতে বহু বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জ্বালানি কেন্দ্রে সাময়িক অগ্নিকাণ্ড ও কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।

একদিকে ইয়েমেনের ভেতরে এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলে যখন সংঘাত তীব্র রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হুমকি বজায় রেখেছে হুতিরা।

সৌদি আরব তাই এখন দুটি পরস্পর সংযুক্ত সংকটে মুখোমুখি: প্রথমত, নিজস্ব ভূখণ্ডে সরাসরি আক্রমণ; দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ করার প্রচেষ্টা।

পরিস্থিতি রিয়াদের সামনে এক জটিল কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে এনে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি, উত্তেজনা প্রশমন এবং রাজনৈতিক সমাধানের দিকে জোর দিচ্ছিল।

কিন্তু একটি নতুন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া মানে সেই কৌশল থেকে বিচ্যুত হওয়া, যা অনাবশ্যক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে।

তবে সংযম দেখানোর অর্থ এই নয় যে নিজস্ব ভূখণ্ডে একের পর এক হামলা চুপচাপ সহ্য করে নেওয়া হবে।

বদলে যাওয়া নিরাপত্তা বাস্তবতা

ইয়েমেন যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোর তুলনায় আজকের নিরাপত্তাসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের ধরন অনেকটাই আলাদা।

সৌদি আরব তাদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বহুলাংশে আধুনিক করেছে। সেই সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে এক দশক আগের তুলনায় রিয়াদ এখন নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।

তবে হুতিদের শক্তির জায়গাতেও বিবর্তন ঘটেছে।

তাদের হাতে এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোনের এক শক্তিশালী ভান্ডার রয়েছে। অধিকাংশ হামলা আকাশেই ব্যর্থ করে দেওয়া হলেও, তুলনামূলক সস্তা এই ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে সৌদিকে গুনতে হচ্ছে চড়া প্রতিরক্ষামূলক খরচ।

উপরন্তু বিমানবন্দর, শিল্পাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে একটি স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এর অর্থ হলো, সৌদি আরব শুধু এই প্রতিরক্ষা বা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। পৃথিবীর কোনো বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে না।
তাই সৌদি আরবের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘প্রতিরোধমূলক বার্তা’ (ডিটারেন্স) দেওয়া। হুতিদের এটা স্পষ্ট করে বোঝানো প্রয়োজন যে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে তারা রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে যতটা সুবিধা পাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি চড়া মূল্য তাদের দিতে হবে।

এর জন্য পূর্বের মতো বড় আকারের সামরিক অভিযানে নামার কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ, রিয়াদের সামনে এখন একাধিক বিকল্প খোলা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে শক্তিশালী করা, সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পথ রুদ্ধ করা এবং প্রয়োজনে যেসব পয়েন্ট থেকে হামলা চালানো হচ্ছে, সেখানে সুনির্দিষ্ট ও আনুপাতিক পাল্টা হামলা চালানোর পথ খোলাই আছে।

এখানে পার্থক্যটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ: নীরব দর্শক হয়ে থাকা আর পুরোমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মাঝখানেও সৌদি আরবের হাতে অনেকগুলো কার্যকর পথ রয়েছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও কৌশলগত সুবিধা

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারেও, তা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যতই কম হোক না কেন। সাম্প্রতিক এসব হামলায় বেশ কিছু জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

এখানে একটি আপাত বৈপরীত্য বা প্যারাডক্স কাজ করে: আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণে তেলের দাম সাময়িকভাবে বাড়লে সৌদি আরবের রাজস্ব বৃদ্ধি পায় ঠিকই, তবে যুদ্ধের কারণে তেলের চড়া দামকে কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্য বলা চলে না।

সীমান্তজুড়ে চলতে থাকা এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের চোখ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে, যা পরিবহন ও বিমা খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আরও বড় কৌশলগত দুশ্চিন্তার জায়গা হলো সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা।

বিশ্বের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান-পূর্বে হরমুজ প্রণালি আর পশ্চিমে বাব আল-মানদেব। এই দুটি পথের যেকোনো একটিতে বিঘ্ন ঘটা পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই বড় হুমকি।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন সংঘাতের লোহিত সাগর অংশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

বাব আল-মানদেব প্রণালি ভারত মহাসাগরকে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানে বাণিজ্য জাহাজে হুতিদের ধারাবাহিক হুমকি পণ্য পরিবহন ও বিমা খরচ বাড়াবে, যার ফলে বাধ্য হয়ে অনেক জাহাজকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে রিয়াদের একটি বড় কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। তাদের পুরো জ্বালানি খাত কেবল পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটি তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের টার্মিনালগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে পারে। এটি হরমুজ প্রণালির চমৎকার একটি বিকল্প এবং রিয়াদকে কৌশলগত সুবিধা দেয়।

তবে এই সুবিধা সত্ত্বেও লোহিত সাগর বা বাব আল-মানদেবের অস্থিতিশীলতা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি থেকে সৌদি আরব পুরোপুরি মুক্ত নয়।

কাজেই বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে শুধু সৌদি বা ইয়েমেনের নিজস্ব স্বার্থ হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং এটিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

হুতিদের ফাঁদ এড়িয়ে চলা

রিয়াদের জন্য আসল বিপদ সামরিক শক্তির চেয়ে রাজনৈতিক ফাঁদে।

হুতিরা চাইছে সৌদি আরবকে আবার সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে টেনে আনতে। এতে করে তারা ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আবার ‘বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে ইয়েমেনের লড়াই’ হিসেবে প্রচার করার সুযোগ পাবে।

সৌদি আরবকে অবশ্যই এই রাজনৈতিক কৌশল এড়িয়ে চলতে হবে।

হুতি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার মূল দায়িত্বটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনীকেই ভূমিতে হুতিদের প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব নিতে হবে; আর সৌদি আরব পেছন থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিয়ে যাবে।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের উপকূলীয় সামরিক অবস্থানগুলোতে হুতিদের শিকড় যেন শক্ত না হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

তাই লক্ষ্য আবার সানা দখলের জন্য কোনো সর্বাত্মক বিমান হামলা চালানো বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া হওয়া উচিত নয়। বরং আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত—হুতিরা যেন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে না পারে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক নৌপথকে জিম্মি করতে না পারে।

কূটনীতি এবং সামরিক ভারসাম্য

সৌদি নীতিকে এখন একই সঙ্গে কয়েকটি ট্র্যাকে চালাতে হবে।

প্রথমত, নিজেদের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা। দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষ যুদ্ধে না জড়িয়ে ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া। তৃতীয়ত, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটের সহযোগিতা জোরদার করা।

একই সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রাখতে হবে।

সৌদি আরব বারবার ইয়েমেনে আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পক্ষেই মত দিয়েছে। তবে আলোচনা তখনই সফল হয়, যখন প্রতিপক্ষ বুঝতে পারে যে সংঘাত বাড়ালে তাদেরই বেশি ক্ষতি হবে।
সহজ কথায়, কার্যকর কূটনীতির পেছনে শক্তিশালী সামরিক শক্তির বার্তাও থাকতে হয়।

সৌদি আরব অবশ্যই চাইবে না ইয়েমেন আঞ্চলিক সংঘাতের একটি স্থায়ী ফ্রন্টে পরিণত হোক। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য স্থিতিশীলতা জরুরি, আর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন নিরাপদ সীমান্ত, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি রপ্তানি ও নিরাপদ নৌপথ।

তবে যে যুক্তি সৌদিকে সংযমী হতে বলছে, সেই একই যুক্তি তাদের ধৈর্যের সীমানাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

যদি সৌদি শহর, বেসামরিক নাগরিক ও তেল স্থাপনায় হামলা চলতে থাকে, তবে রিয়াদ এটিকে আর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ হিসেবে দেখবে না—বরং একে তারা দেখবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষার লড়াই হিসেবে।

সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ঠিক করে দেবে আগামী দিনের পদক্ষেপ।

* খালেদ এম বাতারফি, সৌদিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক।
- আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

সৌদি সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে হুতিদের হামলার দৃশ্য
সৌদি সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে হুতিদের হামলার দৃশ্য। এএফপি

শাকিব খানের সঙ্গে কাজের সুযোগটা হারাতে চাইনি...

প্রকাশ ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ঢালিউড মেগাস্টার শাকিব খানের সাথে বিগ বাজেটের সিনেমা ‘তাণ্ডব’–এ অভিনয় করে রীতিমতো লাইমলাইটে আসেন নাটকের মেয়ে সাবিলা নূর। বিশেষ করে ‘লিচুর বাগানে’ গানে নাচের দক্ষতা আর সিনেমায় স্বল্প উপস্থিতি সত্ত্বেও দর্শকমনে দাগ কেটেছেন সাবিলা।

তাঁর অভিনয় সবাই দেখলেও এই সিনেমার মধ্যে সাবিলার যে নাচেরও দক্ষতা আছে, সেটিও আন্দাজ করতে পেরেছেন দর্শক-ভক্তরা। সম্প্রতি মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে ‘তাণ্ডব’ সিনেমা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সাবিলা নূর। অভিনেত্রী বলেছেন, পরিচালক রায়হান রাফী যখন তাঁকে ‘তাণ্ডব’–এর গল্পটা শুনিয়েছিলেন, তখন সিনেমার ব্যাপারে খুবই স্বচ্ছ ছিলেন।

ছবিতে সাবিলার স্বল্প উপস্থিতির কথা আগে থেকেই তাঁকে জানিয়ে রেখেছেন পরিচালক। এই সিনেমাতে সাবিলা নূর আর শাকিব খানের দুটো গান আছে। তা সত্ত্বেও রাফি চেয়েছেন সাবিলা যেন এই সিনেমায় অভিনয় করেন। পরিচালকের এই সততাই ভালো লেগেছিল সাবিলা নূরের কাছে।

সাবিলা নূর বলেন, ‘পরিচালকের স্বচ্ছতা, সততার পাশাপাশি মেগাস্টার শাকিব খানের সাথে কাজ করার এই সুযোগটা হারাতে চাইনি। দুটো গান ছিল। এর মধ্যে একটা পুরোদস্তুর নাচের ওপর ভিত্তি করে বানানো। অনেকেই হয়তো জানেন না আমি একজন নাচের শিল্পী। আমি চেয়েছি এটার মাধ্যমে যদি আমি শুরু করি তাহলে পুরো একটি প্যাকেজ হবে। কারণ, এই ছবিতে শাকিব খান আছেন, রাফীর সিনেমা, সেই সাথে এত বড় বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আছেন, বড় প্রতিষ্ঠান, ঈদে মুক্তি পাচ্ছে—সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে প্যাকেজটা একেবারে ঠিকঠাক প্রথম বাণিজ্যিক সিনেমার জন্য।’

সত্যিই এই সিনেমা মুক্তির পর তুমুল আলোচিত হয়েছিলেন নাটকের অভিনেত্রী সাবিলা নূর। শাকিব খানের সাথে তাঁর সাবলীল অভিনয় আর প্রথম সিনেমা হিসেবে এমন একটি ছবি এক অন্য ধাঁচের আলোচনায় নিয়ে এসেছে সাবিলা নূরকে।

‘তাণ্ডব’ সিনেমা মুক্তির কয়েক মাস পার হতেই ভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন, কবে বড় পর্দায় দেখা মিলবে সাবিলা নূরের। 

‘লিচুর বাগানে’ গানের দৃশ্য
‘লিচুর বাগানে’ গানের দৃশ্য শাকিব খানের সঙ্গে সাবিলা নূর। ছবি : প্রযোজনা সংস্থার ফেসবুক

ইরাক থেকে আসা ড্রোনের হামলায় সৌদির তেল পাইপলাইন বন্ধ

ইরাক থেকে ছোড়া একাধিক ড্রোন হামলার পর ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। বৃহস্পতিবার রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ওই হামলায় কয়েকজন আহত এবং পাইপলাইনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক থেকে আসা কয়েকটি ড্রোন পাইপলাইনটিতে হামলা চালায়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হামলায় আহত কয়েকজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে কতজন আহত হয়েছেন বা তাদের শারীরিক অবস্থা কেমন, তা জানানো হয়নি।

হামলার পর জরুরি ও বিশেষায়িত কারিগরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পাইপলাইনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনায় কাজ শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রিয়াদ বলেছে, ইরাক থেকে আসা একাধিক ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

তবে আপাতত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা ঠেকাতে বাগদাদকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে।

রিয়াদ জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে ইরাকি সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন করছে। তবে একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, স্থাপনা, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।

হামলার ঘটনায় ইরাকও নিন্দা জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এমন যেকোনো হামলা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলি আল-জায়েদি হামলার পরিস্থিতি এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। জড়িতদের শনাক্ত করা গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বাগদাদ।

ইরাকি সরকার বলেছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর ঘাঁটি হিসেবে ইরাকের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আঞ্চলিক সংঘাতের ময়দানে ইরাককে পরিণত না করার নীতিতেই তারা অটল থাকবে। ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবে ড্রোন হামলার অভিযোগ নিয়ে জুলাইয়ের শেষ দিক থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

সৌদি আরব এর আগে জানিয়েছিল, ইরাক থেকে ছোড়া কয়েকটি ড্রোন দেশটির পূর্বাঞ্চল ও রিয়াদের তেল স্থাপনায় হামলার চেষ্টা করেছিল। এসব হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে রিয়াদ এবং ইরাকের ভূখণ্ডকে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার ঠেকাতে বাগদাদের প্রতি আহ্বান জানায়।

এরপর ইরাকি কর্তৃপক্ষ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অননুমোদিত হামলা ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে একটি যৌথ নিরাপত্তা কমিটি গঠন করে।

তবে ২৯ জুলাই পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরানপন্থি পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) কয়েকটি অবস্থানে হামলা চালায়। পিএমএফের দাবি, এতে তাদের ২০ সদস্য নিহত ও ৩২ জন আহত হন।

সৌদি আরব জানিয়েছিল, নিজেদের তেল স্থাপনায় ইরাক থেকে হামলার পর আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে ওই অভিযান চালানো হয়েছে।

সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি

ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি পাম্প স্টেশনের স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি : এএফপি
ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি পাম্প স্টেশনের স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি : এএফপি

সৌদি সমর্থিত শত শত যোদ্ধাকে হত্যা ও আটকের দাবি হুতিদের

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের দাবি করেছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। তাদের দাবি, হুদায়দাহ ও তাইজ প্রদেশে কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে তারা।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি বলেন, হুদায়দাহ ও তাইজের ছয়টি জেলা থেকে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।

সারি জানান, বড় আকারের এই সামরিক অভিযানে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সাতটি ডিভিশন পরাজিত হয়েছে। এসব ডিভিশনের অধীনে ছিল ৩৮টি ব্রিগেড। অভিযানে শত শত যোদ্ধা নিহত ও আহত এবং আরও অনেকে আটক হয়েছে।

ইয়েমেনি বাহিনী সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন বন্দিশিবির থেকে বেশ কয়েকজন বন্দিকেও মুক্ত করেছে বলে জানান সারি। তার দাবি, এসব বন্দিকে অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়েছিল।

এছাড়া ইয়েমেনের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট ৩২টি অভিযান চালিয়ে সৌদি আরবের নয়টি বিমান প্রতিহত ও ভূপাতিত করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ইয়েমেনি বাহিনীর মুখপাত্র আরও বলেন, লোহিত সাগর দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যবাহী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।

সারি বলেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক চাপ ও অবরোধ অব্যাহত রাখলে ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি বজায় রাখা হবে। সৌদি সামরিক স্থাপনা ও সমাবেশকে লক্ষ্য করে হামলা আরও বাড়ানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এর আগে ২০ জুলাই সানাভিত্তিক ইয়েমেনি সরকার সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছিল। ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের অবরোধের জবাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছিল তারা।

সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে দ্রুত অগ্রগতির দাবি করে আসছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। এর মধ্যে কৌশলগত বন্দরনগরী মোকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবিও রয়েছে।

২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ইয়েমেনের ওপর অবরোধ আরোপের পাশাপাশি সামরিক অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ এই সংঘাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয় এবং দেশটিতে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হয়।

রাজধানী সানা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর টেলিভিশনে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিচ্ছেন ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি।
রাজধানী সানা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর টেলিভিশনে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিচ্ছেন ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি।

২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে করতালি! ভেনিসে রেকর্ড গড়ল গাজায় ইসরায়েলের অভিযান নিয়ে তথ্যচিত্র

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার পেছনের সামরিক ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করেছে ইসরায়েলি তথ্যচিত্র ‘নাজা’। গতকাল ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রিমিয়ারের পর ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছেন দর্শকেরা। এটি উৎসবের অন্যতম দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশন হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।

৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল সোর। দুজনই ২০২৫ সালে অস্কারে সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কার পাওয়া ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর পরিচালক। সেই ছবিতে ফিলিস্তিনি সহপরিচালক বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লালের সঙ্গে তাঁরা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেছিলেন।

‘নাজা’ নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় নিয়েছেন আব্রাহাম ও সোর। তথ্যচিত্রটির জন্য তাঁরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষাৎকারদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তাঁদের মুখ ও কণ্ঠ ডিজিটালি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তেল আবিবের ছাদে রাতের আঁধারে ধারণ করা হয়েছে এসব সাক্ষাৎকার।

ছবিটির নাম ‘নাজা’ও তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি শব্দ, যা কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। ছবিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া সামরিক কর্মকর্তারা গাজায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের পদ্ধতি এবং এআইনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়ে কথা বলেছেন।

তথ্যচিত্রে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের একটি এআইসহায়ক ব্যবস্থা। নির্মাতাদের দাবি অনুযায়ী, গাজায় নজরদারি করা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক থেকে ফোনকল, মানুষের চলাচল ও পারস্পরিক যোগাযোগের মতো তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য হত্যার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়েছে।

এক সাক্ষাৎকারদাতা ছবিতে বলেন, এই প্রক্রিয়া ছিল ‘কারখানার মতো’, অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের একটি পদ্ধতিগত ব্যবস্থা। আরেকজন বলেন, দূর থেকে সবকিছু পরিচালিত হওয়ায় বিষয়টি অনেকটা ভিডিও গেমের মতো মনে হতো।
ছবিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া কয়েকজন ইসরায়েলি সামরিক সদস্য বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস, মানবিক আইন উপেক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সামরিক বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া ঘৃণার পরিবেশের কথাও বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতেন, যেসব বাড়িকে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই পরিবার বসবাস করত।

নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম জানিয়েছেন, পশ্চিমা দেশগুলো যেন ইসরায়েলকে দেওয়া সমর্থন পুনর্বিবেচনা করে এবং নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। তাঁর মতে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

আব্রাহাম ও সোর ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’-এ যৌথভাবে লিখেছেন, তাঁদের অনুসন্ধানে এমন একটি চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে গাজায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের হত্যাকে শুধু যুদ্ধের ‘দুঃখজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি ছিল পরিকল্পিত ও হিসাব করে করা কর্মকাণ্ড, এমনটাই তাঁদের তথ্যচিত্রের উপসংহার।

ছবিটি ভেনিসের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে শেষ মুহূর্তে যুক্ত করা হয়। জুলাইয়ে উৎসবের প্রাথমিক তালিকা ঘোষণার প্রায় এক মাস পর ‘নাজা’কে প্রতিযোগিতায় নেওয়া হয়। নির্মাতারা জানিয়েছেন, তিন বছর ধরে ছবিটির কাজ চলার কারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা এটি সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করছিলেন।

ভেনিসে প্রদর্শনীর পর নির্মাতাদের আবেগপ্রবণ দেখা যায়। দর্শকদের মধ্যেও ছিল প্রবল আবেগ। কেউ কেউ ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে ধরেন। ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক ও অস্কারজয়ী নির্মাতা জোনাথন গ্লেজারও তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে করতালিতে অংশ নেন। ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর প্রযোজক জেমস উইলসনের সঙ্গে গ্লেজারই এই ছবির প্রযোজনায় যুক্ত।

ভেনিসে এর আগের দীর্ঘতম স্ট্যান্ডিং ওভেশনের রেকর্ড ছিল ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’-এর দখলে। ২০২৫ সালে গাজাভিত্তিক সেই ছবির প্রদর্শনী শেষে প্রায় ২২-২৩ মিনিট করতালি পেয়েছিলেন নির্মাতা কাউথের বেন হানিয়া। ছবিটি পরে উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কারও জিতেছিল। এবারের ভেনিস প্রতিযোগিতায় বেন হানিয়া বিচারকমণ্ডলীর সদস্য।

এবারের উৎসবে ‘নাজা’ একমাত্র তথ্যচিত্র, যা মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পেয়েছে। আগামীকাল শনিবার উৎসবের পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কথা। এর আগে দর্শকদের প্রায় ২৫ মিনিটের এই অভ্যর্থনা ছবিটিকে উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।

গাজা যুদ্ধ নিয়ে তৈরি এই তথ্যচিত্র শুধু চলচ্চিত্র হিসেবে নয়, যুদ্ধের প্রযুক্তি, এআইয়ের ব্যবহার এবং বেসামরিক মানুষের জীবন নিয়ে একটি তীব্র রাজনৈতিক দলিল হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। ভেনিসে দীর্ঘ করতালি সেই আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

ভ্যারাইটি ও আল–জাজিরা অবলম্বনে

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার পেছনের সামরিক ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করেছে ইসরায়েলি তথ্যচিত্র ‘নাজা’। তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন র‍্যাচেল সোর ও ইউভাল আব্রাহাম। কোলাজ
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার পেছনের সামরিক ব্যবস্থাকে অনুসন্ধান করেছে ইসরায়েলি তথ্যচিত্র ‘নাজা’। তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন র‍্যাচেল সোর ও ইউভাল আব্রাহাম। কোলাজ

ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করেছে ইসরায়েল :-প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এল সেই বয়ান

দ্য গার্ডিয়ানঃ গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন ধরনের গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বেরিয়ে এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্দরের ২৪ জন সদস্যের জবানবন্দিতে। নতুন একটি প্রামাণ্যচিত্রে তাঁদের এসব চাঞ্চল্যকর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।

অস্কারজয়ী ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র‍্যাচেল জোরের নতুন ছবি ‘নাজা’ (এনএজেডএ) গতকাল বৃহস্পতিবার ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। উৎসবটির মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের লড়াইয়ে থাকা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র এটি।

ছবিটির নামকরণ করা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষেপিত শব্দ থেকে। কোনো সামরিক হামলায় সম্ভাব্য নিহত সাধারণ নাগরিকদের বোঝাতে কৌশলে এ পরিভাষা ব্যবহার করে থাকে তারা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রযোজিত এ প্রামাণ্যচিত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিস্তারিত জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো ও দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

ইসরায়েলের যুদ্ধসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি এড়াতে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছিল। রাজধানী তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পরিচয় লুকিয়ে রাখতে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রামাণ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারীদের চেহারা ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।

গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন গোপন কৌশলের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তিও, যার মাধ্যমে হামাসের তুলনামূলক নিচু স্তরের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য সদস্যকে চিহ্নিত করা হতো। এরপর পরিবারের সদস্যরাও নিহত হবেন জেনেও রাতের বেলা তাঁদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হতো।

নিশানা করা সম্ভাব্য হামাস যোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের ফোন হ্যাক করত। এরপর সপরিবার হত্যা করার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন গোপনে শুনত তারা।

প্রামাণ্যচিত্রটিতে কিছু প্রত্যক্ষ বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হিসাবেই প্রায় ২৫ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের ঘরে আছেন জেনেও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনা।

সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এমন এক গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করতেন, যা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরে বার্তা পাঠাত। এ ইউনিটের একজন বলেন, তাঁদের মূল মিশনই ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’।

পরিচালকদের এক যৌথ বিবৃতিতে আব্রাহাম ও জোর বলেন, ‘আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার জন্য দায়ী, তার নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার একটি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ছবিটি তৈরি করেছি। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।’

পরিচালকেরা জোর দিয়ে বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটির মূল লক্ষ্য ‘বিপথগামী সেনাদের দিয়ে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের’ ওপর ছিল না; লক্ষ্য ছিল সামরিক নির্দেশ, গৃহীত নীতি, এসব কার্যকর করার পেছনের যুক্তি এবং এ কাঠামোর ভেতরে থাকা মানুষগুলো উন্মোচন করা। অন্য কথায়, পুরো অবিচারমূলক ব্যবস্থা এবং সে ব্যবস্থার চালিকা শক্তি বা যন্ত্রের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগুলো তুলে ধরা, কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করা নয়।

প্রামাণ্যচিত্রটির সহপ্রযোজক ছিলেন জেমস উইলসন ও নির্বাহী প্রযোজক জোনাথন গ্লেজার। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর নেপথ্যেও ছিলেন তাঁরা।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রথম প্রকাশিত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘নাজা’। সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ঝুঁকির কারণে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এটির চিত্রগ্রহণ ও প্রযোজনার কাজ করা হয়েছে। আর বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগপর্যন্ত এটির বিষয়বস্তু রাখা হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে।

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান ও ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক পল লুইস ‘নাজা’কে বর্ণনা করেছেন গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোর উন্মোচন ও যাচাইয়ে বছরের পর বছর ধরে করা শ্রমসাধ্য এক কাজের চূড়ান্ত রূপ’ হিসেবে।

প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগে সাংবাদিকদের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা বলেন, ‘নাজা’ হবে ‘সত্যিই যুগান্তকারী’। তিনি একে ‘রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও সিনেমার দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন।

বারবেরার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ইতালির চিনেচিত্তা নিউজ লিখেছে, ‘এটি শুধু সাক্ষাৎকারের কোনো সাধারণ সংগ্রহ নয়; গাজায় অভিযান শুরুর সময় তাঁরা কী কাজ করেছিলেন, তা প্রকাশ করতে এ ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের রাজি করাতে তিন বছর লেগেছে। আর আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, তাঁদের জবানবন্দি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।’

২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। আর আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। এ দুই মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।

খাদ্যের চালানে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ গত গ্রীষ্মে গাজায় এক মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল। পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তিন-চতুর্থাংশের বেশি বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ায় বা ক্ষতিগ্রস্ত করায় বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিরা এখন তাঁবুর শিবিরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন; যেখানে বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের সুবিধা নেই বললেই চলে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় বর্বরতা শুরু করেছে দেশটি।

২০২৫ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবির চার সহপরিচালকের দুজন ছিলেন আব্রাহাম ও জোর।

দুই ছবির মধ্যে যোগসূত্র টেনে পরিচালকেরা বলেন, ‘নো আদার ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা (ফিলিস্তিনি সহপরিচালক) বাসেল আদরা ও হামদান বালালকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ বছর কাটিয়েছেন। মূলত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা দখলদারত্ব ও জাতিগত আধিপত্যের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো তাঁরা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত (ক্যামেরাবন্দী) করেছেন।

একইভাবে ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা একটি ব্যবস্থার নানা সূত্র মিলিয়ে দেখেছেন। এতে দুই ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনার সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার চিত্র, যা এমন এক অপরাধ ঘটাতে ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে জাতিসংঘের একটি কমিশন ও বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে।
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে
গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি ভবন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হুতিদের অগ্রগতিতে সংকট বাড়বে সৌদির

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে হুতিদের দ্রুত অগ্রগতি অনেককেই অবাক করেছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বৃহস্পতিবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বন্দর নগরী মোখা দখল করে নেয়। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

বিবিসির জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা নাওয়াল আল-মাগাফি বলেন, মোখা ও এর আশপাশের অঞ্চলের যাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তাঁরা জানিয়েছেন, হুতিরা ঢোকার পরপরই সরকারি বাহিনী দ্রুত সরে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হুতিদের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিবারগুলো শহর ছেড়ে যেতে শুরু করে। হুতিরা কত দূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে চায়, তা নিয়ে সেখানকার বাসিন্দারা অনিশ্চিত ছিলেন।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ইয়েমেনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ের কারণে এ পর্যন্ত ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ভিটেমাটিছাড়া হয়েছেন। কিন্তু হুতিরা মোখাতেই থামেনি।

ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা শুক্রবার মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন, হুতি বাহিনী পেরিম দখল করেছে। মাইয়ুন নামে পরিচিত এই ছোট দ্বীপটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ঠিক ভেতরে অবস্থিত। এর জবাবে সৌদি আরব মোখা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।

পেরিম দ্বীপ দখলের মধ্য দিয়ে কৌশলগত পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে।
বাব আল-মানদেব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার সরু প্রবেশপথ। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এরই মধ্যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরব ক্রমশ লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

হুতিরা জোর দিয়ে বলছে, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রয়েছে এবং তাদের অবরোধ নির্দিষ্টভাবে সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে কার্যকর হচ্ছে।

কিন্তু ওই অঞ্চলে হুতিদের অগ্রগতি গোষ্ঠীটিকে এমন এক শক্ত অবস্থান এনে দিয়েছে, যেখান থেকে তারা চাইলে ওই নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য আরও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।

আর ঠিক এই বিষয়টিই রিয়াদের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, ২০২২ সাল থেকে যে সংঘাতটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে ছিল, তা হঠাৎ করে বিশ্বের কৌশলগতভাবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ছড়িয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি কর্তৃপক্ষের অনুগত যোদ্ধাদের কুচকাওয়াজ। নতুন করে আরও যোদ্ধা নিয়োগের লক্ষ্যে এক সমাবেশে এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। গত বৃহস্পতিবার সানায়। সম্প্রতি হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত বেড়েছে
ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি কর্তৃপক্ষের অনুগত যোদ্ধাদের কুচকাওয়াজ। নতুন করে আরও যোদ্ধা নিয়োগের লক্ষ্যে এক সমাবেশে এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। গত বৃহস্পতিবার সানায়। সম্প্রতি হুতিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত বেড়েছে। ছবি: এএফপি

শক্তি, হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে কলা খাওয়ার সঠিক সময়

কলা পুষ্টিতে ভরপুর ও সহজলভ্য। তবে শুধু খাওয়াই নয়, সঠিক সময়ে খেলে কলা থেকে পাওয়া যাবে আরও বেশি উপকার। এতে আছে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ, যা শক্তি জোগায়, হজম ভালো রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

কখন খেলে বেশি শক্তি পাওয়া যায়

ব্যায়ামের আগে

ব্যায়াম করার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে একটি কলা খেলে শরীরে দ্রুত শক্তি আসে, পেশি কাজ করার জন্য প্রস্তুত হয়।

নাশতার সঙ্গে

দই, ওটস বা পাউরুটির সঙ্গে কলা খেলে দিনের শুরুটা হয় চাঙা, ক্লান্তি আসতে দেরি হয়।

দুপুর বা বিকেলে

দুপুরের খাবারের পর বা বিকেলের ক্ষুধায় একটি কলা খেলে শক্তি ফিরে পাওয়া যায়, মনও ভালো থাকে।

হজমশক্তি ভালো রাখার উপায়

খাবারের সঙ্গে

নাশতা বা দুপুরের খাবারের সঙ্গে কলা খেলে ফাইবার হজমপ্রক্রিয়া সহজ করে তোলে।

অপক্ব কলা

আধাপাকা বা কাঁচা কলায় থাকে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ, যা পেটে ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায় ও হজমে সাহায্য করে।

রাতে খাওয়া নিয়ে দ্বিধা

অনেকে মনে করেন রাতে কলা খেলে হজম ধীর হয়। তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তেমন নেই। যাঁদের সমস্যা হয়, তাঁরা রাত এড়িয়ে চলতে পারেন।

ওজন নিয়ন্ত্রণে কলার ভূমিকা

খাবারের আগে

ভাত বা রুটি খাওয়ার আধঘণ্টা আগে একটি কলা খেলে দ্রুত পেট ভরে যায়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।

স্ন্যাকস হিসেবে

দুপুর ও রাতের খাবারের মাঝের সময়ে একটি কলা ক্ষুধা মেটায়, ক্যালরিও বাড়ায় না বেশি।

ব্যায়ামের আগে

ব্যায়ামের আগে কলা খেলে তাৎক্ষণিক শক্তি মেলে, যা পরে ক্যালরি পোড়াতে কাজে দেয়।

অপক্ব কলা

এতে ফাইবার বেশি, চিনি কম। তাই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ওজন কমাতে উপকারী।

পুষ্টিগুণ

একটি মাঝারি আকারের কলায় থাকে প্রায় ১০৫ ক্যালরি, পাশাপাশি পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন সি ও বি৬। পাকা কলায় চিনি কিছুটা বেশি হলেও অপক্ব কলায় ফাইবার ও স্টার্চ বেশি থাকে। নাশতার সঙ্গে, স্মুদিতে কিংবা ওটমিলের সঙ্গে খেলে কলার পুষ্টিগুণ আরও ভালোভাবে কাজে লাগে।

সতর্কতা

ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে নিয়মিত কলা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ছাড়া সীমিত পরিমাণে ও সঠিক সময়ে খেলে কলা উপকার দেবে বেশি।

দিনে একটি কলাই যথেষ্ট। নিজের শরীর ও হজমের ধরন অনুযায়ী সময় বেছে নিলে এই সহজ-সরল ফল হয়ে উঠবে আপনার শক্তি, হজম আর ওজন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গী।

সূত্র: ওয়েব এমডি

সঠিক সময়ে খেলে কলা থেকে পাওয়া যাবে আরও বেশি উপকার
সঠিক সময়ে খেলে কলা থেকে পাওয়া যাবে আরও বেশি উপকার। ছবি: পেক্সেলস