Sunday, December 6, 2009

প্রধান সন্দেহভাজনের বাড়িতে অভিযান -ফিলিপাইনে ৫৭ জনকে হত্যা

ফিলিপাইনে ২৩ নভেম্বরের গণহত্যার ঘটনায় জড়িত প্রধান সন্দেহভাজনের বাড়িতে গতকাল শুক্রবার অভিযান চালিয়েছে নিরাপত্তারক্ষীরা। সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে এ অভিযান চালায় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সামরিক মুখপাত্র জোনাথান পনস জানান, শতাধিক সেনাসদস্য ও পুলিশের একটি দল ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গতকাল মাগুইনদানাও প্রদেশের রাজধানী শরিফ আগুয়াতে অবস্থিত মেয়র আন্দাল আম্পাতুয়ান জুনিয়রের বাসভবনে অভিযান চালায়। তিনি বলেন, অস্ত্রের সন্ধানে এ অভিযান চালানো হয়েছে।

তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের সঙ্গে আলোচনা করতে চান কারজাই

তালেবানপ্রধান মোল্লা ওমরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চান আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন পেলে তিনি এ উদ্যোগ নেবেন। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিকভাবেই তালেবানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে চান কারজাই।
বুশ প্রশাসনের সময়ও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন কারজাই। কিন্তু তখন বুশ প্রশাসনের আপত্তির মুখে তিনি শেষমেশ আর এগোতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘তালেবান সদস্যরা যদি সহিংসতার পথ ছেড়ে দিতে চান, তাহলে তাঁদের জন্য আমাদের দরজা অবশ্যই খোলা থাকবে।’
আফগান প্রেসিডেন্ট কারজাই বলেন, ‘২০১১ সালে তাঁর দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর ব্যাপারে ওবামার সিদ্ধান্তে আমরা মোটেও হতাশ নই। কারণ ততদিনে আফগানিস্তান নিজেদের দায়ভার নিতে প্রস্তুত হবে।’ কারজাই বলেন, ‘শুধু লড়াই করে সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজনে তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। এ লক্ষ্যে আমি নিজে সরাসরি মোল্লা ওমরের সঙ্গে আলোচনা করব।’

তিন কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়েছে গোয়েন্দা দপ্তর -হোয়াইট হাউসে অনাহূত অতিথি

হোয়াইট হাউসে সম্প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দেওয়া নৈশভোজে অনাহূত অতিথিদের প্রবেশের ঘটনায় গোয়েন্দা দপ্তরের তিনজন কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানান মার্কিন গোয়েন্দা দপ্তরের পরিচালক মার্ক সুলিভান। একই দিন ওই ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেসের কঠোর জেরার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ওই ঘটনা প্রসঙ্গে ওবামা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা দপ্তরের ওপর তাঁর এখনো অবিচল আস্থা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির মুখোমুখি হয়ে ওই ঘটনার দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন মার্ক সুলিভান। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব বিবেচনা থেকেই আমরা স্বীকার করছি, একটি ভুল হয়েছে। যদিও এ ধরনের একটি ভুল করারও সুযোগ নেই আমাদের।’ অনাহূত অতিথি প্রবেশের ঘটনাকে দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে অভিহিত করে সুলিভান জানান, এ ঘটনায় গোয়েন্দা দপ্তরের তিনজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসে ওই নৈশভোজে অনাহূত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণকারী তারেক ও মিশেল সালাহি দম্পতি এবং হোয়াইট হাউসের সোশ্যাল সেক্রেটারি ডেসিরি রজার্স হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির মুখোমুখি হতে রাজি হননি। সুলিভানের পাশাপাশি ওই তিনজনকেও ডেকেছিল কমিটি। এ ব্যাপারে ক্ষোভ জানিয়ে কমিটির চেয়ারম্যান বেনি থম্পসন বলেছেন, সালাহি দম্পতিকে কমিটির সামনে হাজির হওয়ার জন্য তলবনামা জারি করা হবে। তিনি বলেন, দেশবাসী খুবই সৌভাগ্যবান যে, ওই রাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
এ ছাড়া রজার্সের অনুপস্থিতির জন্য হোয়াইট হাউসকে অভিযুক্ত করে কমিটির রিপাবলিকান দলীয় সদস্য পিটার কিং বলেন, ‘আমার মতে এটা ভুল, কমিটিকে অপমান করার জন্য এমনটি করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, হোয়াইট হাউস রজার্সকে রক্ষার চেষ্টা করছে। রজার্সের বিরুদ্ধেও তলবনামা জারি করার দাবি জানান তিনি। ওই নৈশভোজের আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহের জন্য সালাহিরা রজার্সকে ই-মেইল করেছিলেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ইউএসএ টুডে ও ডেট্রয়ট ফ্রি প্রেসকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ওবামা বলেছেন, ‘গোয়েন্দা দপ্তরের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা অসাধারণভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। আমি তাদের শতভাগ বিশ্বাস করি।’
গত ২৪ নভেম্বর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী পার হয়ে হোয়াইট হাউসের নৈশভোজে আমন্ত্রণপত্র ছাড়াই উপস্থিত হয়েছিলেন সালাহি দম্পতি। পরদিন ওই অনুষ্ঠানে তোলা ছবি সামাজিক নেটওয়ার্ক ওয়েবসাইট ফেসবুকে পোস্ট করেন তাঁরা। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোড়ন তৈরি হয় এবং প্রচণ্ড সমালোচনার মুখোমুখি হয় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা দপ্তর।

আফগানিস্তানে ন্যাটোর সহযোগিতা পেতে আশাবাদী হিলারি

আফগানিস্তানে তালেবান জঙ্গিবিরোধী লড়াইয়ে বাড়তি সেনা পাঠানোর ব্যাপারে ন্যাটো দেশগুলোর সহযোগিতা পেতে দারুণ আশাবাদী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে গতকাল শুক্রবার হিলারি তাঁর ওই আশাবাদের কথা বলেছেন। গতকালই হিলারি ব্রাসেলসে পৌঁছেছেন। খবর এএফপি ও বিবিসির।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে আরও ৩০ হাজার বিদেশি সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণার পরপরই এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় আফগানিস্তানসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশ। কাবুল দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন মার্কিন বাহিনীতে বাড়তি সেনা পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে।
ব্রাসেলসে বৈঠকের প্রাক্কালে হিলারি সাংবাদিকদের বলেন, এ পর্যন্ত যে সাড়া মিলেছে তা স

কার্বন নিঃসরণ ২০-২৫ শতাংশ কমাবে ভারত

২০২০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২০০৫ সালের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। গত বৃহস্পতিবার ভারতের পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। ভারতীয় লোকসভায় চার ঘণ্টার আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অধিবেশন শেষে জয়রাম রমেশ বলেন, ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে দেশগুলো যদি একটি সমন্বিত ও সমতাপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ভারত এ ব্যাপারে আরও বেশি উদ্যোগ নিতে আগ্রহী। তবে এসব উদ্যোগ অবশ্যই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হতে হবে।
ভারত কোনো ধরনের আইনি বাধ্যবাধকতার শর্তযুক্ত চুক্তিতে সম্মতি দেবে না উল্লেখ করে জয়রাম রমেশ বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে আলোচনার জন্য আমাদেরও কিছু প্রস্তাব থাকতে হবে। আমরা বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই, ভারত স্বেচ্ছায় ২০২০ সাল নাগাদ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমাতে রাজি।’ তিনি জানান, ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশটির কার্বন নিঃসরণের হার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
কোপেনহেগেন সম্মেলনে এ ব্যাপারে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো নিয়ে তেমন আশাবাদী নন উল্লেখ করে ভারতীয় পরিবেশমন্ত্রী আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা চীন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গেও বসতে চায় ভারত। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘জি-৭৭ জোটের সদস্য হওয়ার কারণে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে পারব না বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার মানে দেশকে বিক্রি করে দেওয়া—এমন ধারণা ঠিক নয়।’
ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কার্বন নিঃসরণ কমানো—এ কথা জানিয়ে রমেশ বলেন, ‘কোপেনহেগেনে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে তা বিবেচনায় না নিয়েই আমরা এ ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, এ ব্যাপারে নিজস্ব অর্থায়নে নেওয়া কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পর্যালোচনার জন্য দিতে প্রস্তুত নয় ভারত।

সিআইএকে পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বৃদ্ধির কর্তৃত্ব দিল যুক্তরাষ্ট্র

পাকিস্তানের আদিবাসী এলাকায় সন্দেহভাজন তালেবান ও আল-কায়েদা নেতাদের চিহ্নিত ও তাঁদের ওপর হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে পাইলটবিহীন বিমানের ব্যবহার বাড়ানোর কর্তৃত্ব দিয়েছে হোয়াইট হাউস। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার খবরে এ কথা বলা হয়।
অজ্ঞাতপরিচয় একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, চলতি সপ্তাহে সিআইএকে পাকিস্তানের আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকায় পাইলটবিহীন বিমানের ব্যবহার বাড়ানোর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস আরও জানায়, বেলুচিস্তান অঞ্চলেও পাইলটবিহীন বিমানের হামলার আওতা বাড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করছে ওয়াশিংটন। উপজাতি-অধ্যুষিত এলাকার বাইরে আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তবর্তী ওই অঞ্চলে আফগানিস্তানের তালেবান নেতারা লুকিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
বিশ্লেষক, গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তালেবান যোদ্ধারা বেলুচিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।
এদিকে আদিবাসী এলাকাগুলোর পাশাপাশি বেলুচিস্তানেও যুক্তরাষ্ট্রের পাইলটবিহীন বিমানের হামলার আওতা বাড়ানোর বিরোধিতা করেছে পাকিস্তান। গতকাল পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল বাসিত বলেছেন, পাইলটবিহীন বিমানের হামলার ব্যাপারে পাকিস্তান একটি পর্যায় পর্যন্ত সহযোগিতা করতে পারে, এর বেশি নয়।
বেলুচিস্তানে পাইলটবিহীন বিমানের হামলার আওতা বাড়ানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে আবদুল বাসিত বলেন, ‘এটা কখনোই আমাদের আলোচনার মধ্যে ছিল না।’

গিনির প্রেসিডেন্ট কামারা সহকারীর গুলিতে আহত

গিনির প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর প্রধান ক্যাপ্টেন মুসা দাদিস কামারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রেসিডেন্টেরই এক সাবেক সহকারী গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর ওপর ওই হামলা চালান বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রকৃত অবস্থা জানাতে পারেনি। ওই ঘটনার সময় প্রেসিডেন্ট কামারা রাজধানী কোনাক্রির কুন্দরা সেনাশিবিরে অবস্থান করছিলেন। ওই ঘটনার পরপরই রাজপথে সেনা মোতায়েন করা হয়। সব দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ঘটনার সময় কোনাক্রির ওই সেনাশিবির থেকে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। এর পরই রাজপথে সেনা মোতায়েন করা হয়।
প্রেসিডেন্ট কামারার মুখপাত্র যোগাযোগমন্ত্রী ইদরিস শরিফ সরকারি বেতারে দেওয়া এক ঘোষণায় বলেছেন, ওই ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ‘সামান্য আহত’ হয়েছেন। অপর এক ঘোষণায় বলা হয়, প্রেসিডেন্টের সাবেক সহকারী লে. কর্নেল আবুবকর সিদ্দিকী দিয়াকাইত ওরফে তুমবা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেন। তাঁর বর্তমান অবস্থান চিহ্নিত করা গেছে।
প্রতিবেশী দেশ সেনেগালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্টকে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে নিয়ে যেতে তারা একটি বিমান পাঠিয়েছে।
গত বছর রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কামারা ক্ষমতায় আসেন। কয়েক মাস ধরে ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার দেশটিতে বিরোধীদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই দমন-পীড়নের কারণে জান্তা সরকার কড়া সমালোচনার মুখে রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং পশ্চিম আফ্রিকার জোটভুক্ত দেশগুলো পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনির জান্তা সরকারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

এ বছরের শুরুতে লাদেনকে আফগানিস্তানে দেখা গেছে, দাবি তালেবান বন্দীর

আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে এ বছরের গোড়ার দিকে আফগানিস্তানে দেখা গেছে। তখন তিনি সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী এক তালেবান সদস্য তাঁর সহযোগীর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানান।
পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ ওই বন্দীর নাম প্রকাশ করেনি। লাদেনের সঙ্গে সাক্ষাত্কারী ওই তালেবানের নামও জানা যায়নি। তবে আটক বন্দী বলেছেন, তাঁর সহযোগী লাদেনকে কাছে থেকে দেখেছেন। তিনি পাকিস্তানের উপজাতি নেতা মেহসুদের সমর্থক। তাঁর দায়িত্ব ছিল বিদেশি আল-কায়েদা ও তালেবান সদস্যদের লাদেনের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। আটক করা ওই বন্দী আরও জানান, তাঁর সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার আগেও লাদেনের সঙ্গে বহুবার দেখা করেছিলেন।
বন্দী ওই তালেবান সদস্য জানান, এ বছরের গোড়ার দিকে তাঁর ওই সহযোগী আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় গজনি প্রদেশ থেকে ফিরে জানান, গজনির এক দুর্গম এলাকায় লাদেন তাঁর সমর্থকদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে লাদেনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। তিনি জানান, লাদেন এক জায়গায় বেশি দিন থাকেন না। আল-কায়েদা জঙ্গিরা পাকিস্তানে অবস্থান করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তার চেয়ে বরং আফগানিস্তানে থাকতেই পছন্দ করে। আল-কায়েদা মনে করে, এই মুহূর্তে পাকিস্তান তাদের জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান আক্রমণে দেশটির তালেবানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। আটক বন্দী আরও জানান, তাঁর ধারণা লাদেন এখনো গজনিতেই আছেন।
সিআইএয়ের একজন সাবেক কর্মকর্তা ব্রুশ রেইডেল বলেছেন, ওই বন্দীর বক্তব্য কতটা সত্য এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করা দরকার। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত সাত বছর ধরে লাদেনকে খুঁজছে। কিন্তু লাদেনকে কেউ দেখেছে এমন তথ্য এর আগে পাওয়া যায়নি। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে, তবে এ তথ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

লস্করকে সহযোগিতা দিচ্ছে আল-কায়েদা: গেটস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বলেছেন, পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবাকে সহযোগিতা দিচ্ছে আল-কায়েদা। ভারতে সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনার জন্য সংগঠনটিকে তথ্য সরবরাহ করাসহ নানা ধরনের সহায়তাও দেয় তারা। তিনি বলেন, পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা নস্যাত্ করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ বাধাতেই আল-কায়েদা এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আর্মস সার্ভিসেস কমিটিকে গেটস এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘আল-কায়েদা পাকিস্তানের তালেবান ও লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনকে নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের হাতে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। আইনপ্রণেতাদের এক প্রশ্নের জবাবে গেটস বলেন, পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে আল-কায়েদা খুবই তত্পর। এ কাজে তারা সে দেশের তালেবান ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘লস্কর-ই-তাইয়েবাকে বিভিন্ন হামলা পরিকল্পনায় ও সেগুলো বাস্তবায়নে আল-কায়েদা সহায়তা দেয়। আমরা জানতে পেরেছি, মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার সময়ও লস্করকে সহযোগিতা দিয়েছিল আল-কায়েদা।’
এর আগে সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিকে রবার্ট গেটস বলেন, আল-কায়েদা লস্কর-ই-তাইয়েবাকে ভারতে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে। হামলা পরিকল্পনা থেকে শুরু করে তা বাস্তবায়নেও সহায়তা দিচ্ছে। ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেপিয়ে, পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সংগঠনটি।
গেটসের বক্তব্য সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন বলেন, ‘আল-কায়েদার সঙ্গে লস্কর-ই-তাইয়েবার যে যোগসাজশ আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। গত দুই বছরে ব্যাপারটি আমার কাছেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেওয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণ মুম্বাই হামলা। আল-কায়েদার এ ধরনের তত্পরতা পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

ওয়ানডে সিরিজ জিতল ইংল্যান্ড

সিরিজের প্রথম ম্যাচের মতো শেষটিও ভেসে গেল বৃষ্টিতে। তাতে অবশ্য অখুশি হয়নি ইংল্যান্ড, মাঝের তিন ম্যাচের দুটি জিতে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জিতে নিয়েছে তারা। এত দিন অস্ট্রেলিয়া ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দ্বিপক্ষীয় ওয়ানডে সিরিজ জয়ের কৃতিত্ব ছিল না আর কোনো দলের। ১৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজ।

ব্রাভোকে ছাপিয়ে ‘রিভিউ’ বিতর্ক

‘এ অবস্থায় দুদলই দাঁড়িয়ে সমতায়’—দিনের খেলা শেষে বললেন ডগ বলিঞ্জার। একজন অস্ট্রেলিয়ানের মুখে এ কথা শুনে স্বস্তি পেতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। ব্রিসবেনে তিন দিনে হারের পর তাদের নিয়ে কত কথাই না বলা হয়েছে। অ্যাডিলেড টেস্টের গতিপথ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটা দিন কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশিই থেকেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ!
প্রথম দিন শেষে অনেকে হয়তো কিছুটা এগিয়ে রাখবেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। খেলা হয়েছে ৮৫ ওভার, ৬ উইকেট হারিয়ে ক্রিস গেইলের দল তুলেছে ৩৩৬। ওভারপ্রতি রান উঠেছে ৩.৯৫ করে। সেঞ্চুরি করেছেন ডোয়াইন ব্রাভো, তবে দিনভর তাঁর চেয়েও বেশি আলোচনায় ছিলেন ৬২ রান করা শিবনারায়ণ চন্দরপল। ‘রিভিউ’ পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কটা আরও একদফা উসকে দিয়েছে তাঁর আউট।
জবাব একটা দিয়েছেন বলিঞ্জারও। এই টেস্টে তাঁর খেলা নিশ্চিত হওয়ার পর গেইল বলেছিলেন ‘বলিঞ্জারটা আবার কে?’ কাল প্রথম ৫ ওভারেই দুই উইকেট নিয়েছেন এই বাঁহাতি, যার মধ্যে ছিল ক্যারিবিয়ান অধিনায়কের উইকেটটিও। বলিঞ্জারকে এখন আর না চিনে উপায় নেই গেইলের! অভিষেক টেস্টের ১১ মাস পর দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা বলিঞ্জারের জোড়া আঘাতের পর মিচেল জনসন সারওয়ানকেও ফিরিয়ে দিলে প্রথম সেশনটা হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ারই।
ব্রেন্ডন ন্যাশের সঙ্গে ৩৫ রানের জুটি গড়ে লাঞ্চে গিয়েছিলেন চন্দরপল। বিরতির পর ফিরলেন ব্রাভোকে নিয়ে। লাঞ্চের আগের ওভারেই সাবেক কুইন্সল্যান্ড সতীর্থ জনসনের বলে বাহুতে আঘাত পেয়েছিলেন ন্যাশ, লাঞ্চের পর তাই আর ব্যাটিংয়ে নামতে পারেননি। সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা সময়টা এসেছে তখনই। বরাবরের মতোই ধৈর্যের প্রতিমূর্তি ছিলেন চন্দরপল, আর ব্রাভো খেলেছেন নিজের সহজাত খেলা। ১১৬ রানের জুটিটার মৃত্যু হয়েছে একটি বিতর্কের জন্ম দিয়ে। চন্দরপলের ৩৮ রানের মাথায় কট বিহাইন্ডের দাবিতে রিভিউয়ের আবেদন করে অস্ট্রেলিয়া, পরিষ্কার বুঝতে না পারায় আউট দেননি টিভি আম্পায়ার আসাদ রউফ। যেটিতে আউট হয়েছেন, টিভি রিপ্লেতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না সেটিও। কিন্তু এবার আউট দিয়ে দেন রউফ।
চন্দরপল না পেলেও ব্রাভো পেয়েছেন ভাগ্য-সহায়তা। ৪৬ রানে দুবার এবং ৫৯ রানে আরও একবার ‘জীবন’ পেয়ে পূর্ণ করেছেন তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি। সর্বশেষ সেঞ্চুরিটি পেয়েছিলেন এই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই, ২০০৫ সালে হোবার্টে। ব্যাট হাতে বাংলাদেশ সিরিজের ফর্মটা এই সিরিজেও টেনে আনলেন স্যামি, আবার ব্যাটিংয়ে নামা ন্যাশকে নিয়ে সপ্তম উইকেটে গড়েছেন ৬৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।

বিশ্বকাপে বাড়ছে অর্থ পুরস্কার

গত বিশ্বকাপের মতো এবারও ৩২টি দলই খেলবে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের অনেক কিছুই জার্মানি ২০০৬ বিশ্বকাপের মতো থাকবে। আবার কিছু কিছু পরিবর্তনও আছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থ পুরস্কার। গত বিশ্বকাপের তুলনায় এবার প্রায় ৬১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে অর্থ পুরস্কারের পরিমাণ।
সব মিলে ৩২টি দলের জন্য অর্থ পুরস্কার আছে ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৩০ মিলিয়ন ডলার, রানার্সআপের জন্য থাকছে ২৪ মিলিয়ন ডলার।
সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দুই দল পাবে ২০ মিলিয়ন ডলার করে। আর কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা দলগুলোর প্রতিটি পাবে ১৮ মিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলোও কম পাবে না—প্রত্যেকে ৯ মিলিয়ন ডলার। খালি হাতে ফিরবে না অংশ নেওয়া কোনো দলই। অংশগ্রহণ ফি হিসেবে গ্রুপ পর্বে বাদ পড়া দলগুলো পাবে ৮ মিলিয়ন ডলার করে। ২০০৬ বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে পুরস্কার ২৬১.৪ মিলিয়ন ডলার।
কিছু অর্থ পাবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের ক্লাবগুলোও। একজন খেলোয়াড়ের জন্য প্রতিদিন ১৬০০ ডলার পাবে একেকটি ক্লাব।
পরিবর্তন আছে আরও একটি। এই প্রথম ২৫টি ম্যাচ বন্দী করা হবে ত্রিমাত্রিক ক্যামেরায়। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ধারণ করা এই ত্রিমাত্রিক ভিডিও পরে প্রদর্শন করা হবে বিশ্বের সাতটি শহরে। পরে এগুলো এক করে তৈরি করা হবে সিনেমা। আর এই ভিডিও এবং সিনেমা নির্মাণে ব্যবহার করা হবে সনি টেকনোলজি।

ভাগ্যের হাত ধরে শ্রীলঙ্কার জয়

ম্যাচ শেষে জর্জ কোটানকে দেখে যে কারও মায়া হতে পারত। তিনি বিষণ্ন, হতাশ। একটু বিরক্তও। অথচ এই কোটানই ছয় বছর আগে এই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে হেসেছিলেন বিজয়ীর হাসি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছিলেন প্রথম সাফ ফুটবলের শিরোপা। এবার পাকিস্তানের কোচ হয়ে সেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচেই পরাজয়ের স্বাদ পেতে হলো তাঁকে। বঙ্গবন্ধু সাফ ফুটবলের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কা কাল ১-০ গোলে হারাল পাকিস্তানকে। পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি করেছেন চাতুরা গুনারত্নে।
ম্যাচ শেষের তিন মিনিট আগে পেনাল্টি পায় পাকিস্তানও। কিন্তু গোল করতে পারেননি আদনান ফারুক।
২৪ মিনিটে বক্সের মধ্যে আগুয়ান শ্রীলঙ্কার খেলোয়াড় ইবি চান্নাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের গোলরক্ষক জাফর খান। পেনাল্টি পেয়ে যায় শ্রীলঙ্কা। আর তা থেকে গোল করতে ভুল করেননি চাতুরা।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে নিষ্প্রাণ ম্যাচটা হঠাত্ করেই প্রাণ পায়। ৮৫ মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন শ্রীলঙ্কার দুমিদু হিতারাচি। ১০ জনের দলে পরিণত শ্রীলঙ্কার জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে সঞ্জয় প্রদীপ কুমারার লাল কার্ড। ডি বক্সে হাত দিয়ে বল থামানোর চেষ্টা করে দ্বিতীয়বারের মতো হলুদ কার্ড দেখেন তিনিও। পেনাল্টি থেকে গোল শোধের সুযোগ আসে পাকিস্তানের। কিন্তু আদনান ফারুকের শট বারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায় বাইরে। ম্যাচ শেষে হতাশ কোচ কোটান ভাগ্যকেই দায়ী করলেন, ‘দুর্ভাগ্যই বলতে হবে আমাদের। সেই সঙ্গে হতাশও আমি। প্রথমার্ধে আমাদের ছেলেরা একটু নার্ভাস ছিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে বেশ ভালো খেলেছে। পেনাল্টি মিস করাটাই আমাকে বেশি হতাশ করেছে। বেশ কিছু সুযোগও হাতছাড়া হয়েছে আমাদের।’ শ্রীলঙ্কার ট্রেনার সুমিত ওয়ালপোলা ৩ পয়েন্ট পেয়েই খুশি, ‘আমরা নিজেদের ভাগ্যবানই বলব। এমন ম্যাচে পুরো পয়েন্ট পাওয়াটা আনন্দের।’

উপেক্ষিত ভাষাসৈনিক মঞ্জুর হোসেন -স্মরণ by এম আর মাহবুব

ভাষা আন্দোলনের অনেক ইতিহাসই চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেক ভাষাসৈনিকই থেকে যাচ্ছেন দৃষ্টির আড়ালে। এদিকে ফেব্রুয়ারি এলেই ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমে নতুন নতুন ভাষাসৈনিকদের দেখতে পাচ্ছি আমরা। এত দিন তাঁরা কোথায় ছিলেন, কীভাবেই বা তাঁরা ভাষাসৈনিক, প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া কঠিন। ঐতিহাসিকভাবে যাঁদের অবদান স্বীকৃত, কিন্তু এখন যাঁদের নিয়ে আলোচনা হয় না, তাঁদেরই একজন মঞ্জুর হোসেন। তাঁকে নিয়েই আজ কথা বলব।
মঞ্জুর হোসেনের জন্ম ১৯২৮ সালের ১৫ জুন, নওগাঁ জেলার সুলতানপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মোবারক আলী, মায়ের নাম নুরুন নাহার। তিনি ১৯৪৩ সালে নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৫ সালে কলকাতা থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। চিকিত্সাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করা সত্ত্বেও সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করে তিনি আজীবন সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। এমবিবিএস পাস করে জন্মভূমি নওগাঁয় এসে চিকিত্সক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের চিকিত্সাসেবা দিয়েছেন। গরিব রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিত্সা করতেন, এমনকি তাদের ওষুধ পর্যন্ত কিনে দিতেন। কথিত আছে, তিনি ঘোড়ার গাড়িতে গ্রামেগঞ্জে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে রোগীর সেবা করতেন। অনেক জটিল রোগীকে ঢাকা পাঠিয়ে তাদের চিকিত্সার সব ব্যবস্থা করে দিতেন ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে খ্যাত মঞ্জুর হোসেন। চিকিত্সার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। তাঁর বাবার উদ্যোগ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশ বাণীর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন ১৯৬০ সালে। পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে বিভিন্ন সময় কারাবরণসহ নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তিনি আবৃত্তি, সংগীতচর্চা ও লেখালেখি করতেন।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, ত্যাগী, সত্ ও আদর্শ মানুষ। সারা জীবন সংসার ও নিজের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেননি। নিজের শক্তি, শ্রম ও মেধা বিলিয়ে দিয়েছেন নওগাঁবাসী তথা দেশ ও জাতির জন্য। ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজশাহী জেলার সভাপতি পদে আসীন ছিলেন।
বায়ান্নর ভাষা আন্দালনে অত্যন্ত সাহসী ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেছিলেন মঞ্জুর হোসেন। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৃশেষ বর্ষের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনে সরকারবিরোধী বিপ্লবী নেতা হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে তিনি ‘বিপ্লব দা’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে সরকারি স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দিবসে মঞ্জুর হোসেন বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি হলে সেদিন সন্ধ্যায় তিনি সাহসী ও দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙবই ভাঙব।’ অন্যদিকে মেডিকেল ব্যারাকের এক স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে এর প্রতিবাদে বক্তব্য দেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে গোলাম মাওলার কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায়ও তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তা ছাড়া গভীর রাতে ফজলুল হক হলের পুকুরপাড়ে ১১ জন ছাত্রনেতার ১৪৪ ধারা ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের একমাত্র প্রতিনিধি মঞ্জুর হোসেন। তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলার সভায় ছাত্র জমায়েত ও সভা সফল করতে ঢাকা মেডিকেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। তিনি সভায় উপস্থিত থেকে ১৪৪ ধারা ভাঙার মিছিলেও অংশ নেন। একুশের আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি কারাভোগ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম কারিগর হলেন মঞ্জুর হোসেন। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও পরবর্তীকালে সংঘটিত এ দেশের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ছিলেন তিনি।
তত্কালীন সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাঁকে ১৭ বার গ্রেপ্তার করা হয়। এই মহান ত্যাগী ভাষাকর্মী ১৯৬৮ সালের ৪ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুদিবস।
মৃত্যুকালেও তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ভাষাসংগ্রামে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০০২ সালে ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি: দ্বন্দ্ব নিরসনের পথ কী -রাজনীতি by এম এম আকাশ

শিরোনামের প্রশ্নটির উত্তরদানের আগে আমাদের প্রথমে একটু আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। উন্নত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমানে একটি দ্বিদলীয় ব্যবস্থাই প্রধান ধরন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব রাষ্ট্রে প্রধান দুই দলই মৌলিক ধনতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারী হয়েও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে বিভক্ত অবস্থান গ্রহণ করে। ফলে একটি দল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা গ্রহণ করলে অন্য দলটি থাকে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায়। বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর জন্য এই ব্যবস্থাটি বেশ পছন্দনীয়। কারণ, এতে ক্ষমতার বা গদির পরিবর্তন হলেও ধনতান্ত্রিক নীতির পরিবর্তন হয় না। তবে এসব ক্ষেত্রে দুটি দলের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা নানা পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। নয়তো বুর্জোয়াদের দুটি দল তৈরি হলো কীভাবে? সচরাচর ‘ধনতন্ত্রের’ আদর্শের মধ্যেই দুটি প্রবণতার অস্তিত্ব সম্ভব—একটিকে বলা যেতে পারে ‘রক্ষণশীল’ প্রবণতা, অন্যটিকে তুলনামূলকভাবে ‘উদারনৈতিক’ প্রবণতা। আমেরিকায় যে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা, তার মূলে রয়েছে এই বিষয়টি। সে জন্যই সেখানে একদিকে তৈরি হয়েছে রক্ষণশীল ‘রিপাবলিকান’ দল, অন্যদিকে রয়েছে অপেক্ষাকৃত উদার ‘ডেমোক্রেটিক’ দল। তবে এই বিরোধ বিচারের সময় শাসকশ্রেণীর অন্যতম প্রতিনিধি ‘হেনরি ফোর্ড’-এর কথাটিও আমাদের মনে রাখা উচিত। আমেরিকান পুঁজিপতি হেনরি ফোর্ড বলেছিলেন, ‘আমি এই দুই ঘোড়ার ওপরই বাজি রাখি। সে জন্য যে-ই জিতুক, আমি কখনো হারি না।’ এ জন্যই উন্নত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সহজে কোনো তৃতীয় শক্তির আবির্ভাব হয় না।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে আমরা আজ আওয়ামী লীগ-বিএনপির যে দুর্বল বিস্তীর্ণ দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি ১৯৯০ সালের পর থেকে দেখে আসছি, সেটি কি অনুরূপ স্থীতিশীলতা অর্জনে সক্ষম হবে, নাকি বাংলাদেশের ইতিহাস একটু ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান? হলে সেই ভিন্ন সম্ভাবনার সম্ভাব্য চেহারাটা কী রকম হতে পারে?
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আমরা যে বিভেদ দেখছি, এটা এক দিনে তৈরি হয়নি। এই বিভেদ তৈরি হওয়ার পেছনে একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। এই ঐতিহাসিক পটভূমি না বুঝলে বিভেদটা বোঝা যাবে না এবং এই ঐতিহাসিক পটভূমি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম একটি ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে। এ সত্যটাকে আগে আমাদের প্রথম স্বীকার করে নিতে হবে। মুসলমানদের জন্য এক দেশ হবে আর হিন্দু হলে আরেক দেশ হবে—এই মত সঠিক হলে পাকিস্তান ভাঙার প্রয়োজন ছিল না। এই মত সঠিক নয় বলেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ হবে সব ধর্ম-মতনির্বিশেষে বাঙালি জাতির দেশ। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই এই জাতির সদস্য হবে।
কোনো দেশে স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা সংহত করার জন্য দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানরত পরাজিত শক্তির মোকাবিলা করতে হয়। এদের মধ্যে কেউ ছদ্মবেশে আবার কেউ মুখোশ পরা অবস্থায় থাকে। দুই ক্ষেত্রেই শত্রুকে দমনে বঙ্গবন্ধু ব্যর্থ হয়েছেন। ব্যর্থতার মূল কারণ, তিনি সবাইকে বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, সবাই পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি একটি উদার অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই উদার অবস্থান নেওয়ার কারণে শত্রুরা তাঁর আশপাশে থেকে গিয়েছিল। তারা পরিবর্তিত হয়নি। অথচ তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেননি। শত্রুরা তাদের নীতিকে বিসর্জন দেয়নি। এ জন্য তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ছিল, ছিল জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলো। অর্থাত্ পরাজিত শক্তি। মার্কিনপন্থীরা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে প্রথম থেকেই শত্রুর অবস্থানে ছিল। স্বাধীনতাসংগ্রামের সময়ও তিনি শত্রু ছিলেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কনফেডারেশন করার। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর প্রস্তাব ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান এটি জানতেন। জানতেন কারা তাঁর শত্রু। কিন্তু তিনি তাদের বিরুদ্ধে অনমনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এই শত্রুরা সময় ঠিক করল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশ দক্ষিণ পন্থার দিকে চলে গেল।
শুধু দেশ চলে গেল না, আওয়ামী লীগও নতুন দল হয়ে গেল। এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে আমলাতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল। এর ফলে আওয়ামী লীগের আর কোনো বামপন্থী টান থাকল না। আওয়ামী লীগ প্রথমে সমাজতন্ত্রের পক্ষে এসেছিল, সমাজতন্ত্রের সুবিধা বেশি হবে বলে। যখন অনুকূল হাওয়া তারা পেল না, তখন তারা মনে করল, সমাজতন্ত্রে থাকার আর কোনো কারণ নেই। এদিকে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর মৃত বঙ্গবন্ধুর শক্তি আরও বেড়ে গেল। দলের কিছু নেতা ভাবলেন, শেখ হাসিনাকে নিয়ে আসতে পারলে কাজ হবে। এভাবে আওয়ামী লীগ বিকশিত হতে থাকল।
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা বেশি লাভবান হয়েছে, তারা তৈরি করল নতুন বিএনপি। লাভবানদের লক্ষ্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন নীতিমালার বিরোধিতা। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এবং স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করলেন বিএনপি। কারণ, তাঁরা জানতেন, পরাজিত শক্তির সঙ্গে হাত না মেলালে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা যাবে না। আওয়ামী লীগের যাঁরা চাইলেন আগের নীতিতে থাকতে, তাঁরা একত্রে মিলে প্রথমে বাকশাল করলেন। আর বাকি যাঁরা বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পিছু হটে গিয়েছিলেন, তাঁরা সোভিয়েত ভাঙার পর নিশ্চিত হলেন যে, এখন ধনতন্ত্রই করতে হবে। এখন আমরা সেই পরিবর্তিত দক্ষিণপন্থী আওয়ামী লীগকে দেখতে পাচ্ছি। এই যে পরিবর্তন হলো, তা মূলত হলো নেতা পর্যায়ে। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের একেক নেতা একেকভাবে আছেন। সর্বশেষ যাঁরা আওয়ামী লীগে থাকলেন, তাঁদের পরে আর একটু অবনতি হলো। তাঁরা মনে করলেন, যে ভোটের রাজনীতি বর্তমানে চালু আছে, তাতে বিএনপির হাতে ৪০ ভাগ ভোট আর আওয়ামী লীগের হাতে ৪০ ভাগ ভোট। আর ২০ ভাগ ভোট বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এই ২০ ভাগের মধ্যে অবশ্য ১০ ভাগ রয়েছে মৌলবাদী ভোট। তাঁরা ভাবলেন, ১০ ভাগ ইসলামি ভোট আমাদের সঙ্গে রাখতে পারলে আমরা জিতব। এই ভোটের জন্য কখনো আমিনীর সঙ্গে আবার কখনো এরশাদের সঙ্গে তাঁদের যেতে হয়।
আর উল্টো দিকে বিএনপিরও একই অবস্থা। এই ভোটের জন্য তাদের কখনো জামায়াতের সঙ্গে আবার কখনো এরশাদের সঙ্গে যেতে হয়। এ জন্য এই দুই প্রধান বুর্জোয়া শক্তির মধ্যে ক্ষমতার প্রশ্ন ছাড়া মৌলিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দ্বন্দ্বটুকু আছে, তাও ধীরে ধীরে কমে যাবে। অর্থাত্ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে শেষাবধি উপরিকাঠামোর কিছু ইস্যু বাদ দিলে মৌলিক কোনো পার্থক্য থাকবে না। এর পরও অবশ্য ইতিহাসের এবং উত্তরাধিকারের পার্থক্য থাকবে। আর একটি পার্থক্য থাকবে তা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর পদ একটি, দুটি নয়। এ জন্য দুজনই প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।
বর্তমানে জিয়াউর রহমান ও বিএনপি ১৯৭৫-পরবর্তী দক্ষিণ পন্থার প্রতীক হিসেবে বিরাজমান। শেখ হাসিনা অবশ্য দক্ষিণ পন্থা ও অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের একটি মিশ্র প্রতীক হিসেবে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাদ দিয়ে দক্ষিণপন্থী একটি দল হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বন্দ্ব মেটানোর সম্ভাব্য রাস্তা দুটি। একটি হচ্ছে দেশের সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শক্তিগুলো থেকে মুক্ত হয়ে দেশে একটি ভদ্র দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। আর দ্বিতীয় রাস্তাটি হচ্ছে জামায়াত ও স্বৈরাচারের বিচ্ছিন্নতা এবং পরাজয়ের কারণে বিএনপির শক্তিহানি, ক্রমবিলুপ্তি ও খণ্ডায়ন। তখন দেশে একমাত্র দক্ষিণপন্থী দল হবে আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেরই কোনো না কোনো অপেক্ষাকৃত রেডিক্যাল একটি রাজনৈতিক দল।
আমার প্রস্তাবিত এই দুই সমাধানের যুক্তি-ভিত্তি আরেকটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে। আমাদের দেশে যে দুটি অপশক্তি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু, তারা হচ্ছে মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী এবং ‘সামরিক বাহিনীর মধ্যে উচ্চাভিলাষী জেনারেলরা’। বামপন্থীরা যে গণবিপ্লবের কথা বলে, তা বুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যেই তারা এযাবত্ পরিচালনা করছে বলে তাদের বর্তমানে শাসকশ্রেণীও ‘গণতন্ত্রের’ শত্রু হিসেবে মনে করছে না। কিন্তু অন্যদিকে মৌলবাদীরা এখনো জিহাদের মাধ্যমে ইসলামি শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এবং তাদের জঙ্গি-সম্পৃক্ততার অনেক প্রমাণও রয়েছে, যেহেতু তারা বর্তমানে গণতন্ত্রের ১ নম্বর বৈরী শক্তি। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিপদ হিসেবে নিকট অতীতে একাধিকবার আবির্ভূত হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে সামরিক বাহিনী ও ‘মৌলবাদের’ সঙ্গে আমাদের দেশে অপেক্ষাকৃত বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে রক্ষণশীল বিএনপি দলটির। তবে উদারনৈতিক আওয়ামী লীগও যে এই শত্রুদের সঙ্গে কখনো কখনো খেলেছে এবং কৌশলগত ঐক্যের মাধ্যমে বিএনপিকে ভোটযুদ্ধে পরাজিত করার প্রয়াস পেয়েছে, সেটিও আমাদের স্বীকার করতে হবে।
এই অবস্থায় এ দেশের বুর্জোয়া শাসকশ্রেণী যারা দুই দলেই আছে, তারা যদি একটি পরিষ্কার ভদ্র ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ চায়, তাহলে তাদের চিরতরে ‘মৌলবাদী-জঙ্গি’ শক্তির বিষদাঁত ভেঙে ফেলতে হবে এবং সামরিক বাহিনীকেও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির অনুগত বাহিনীতে পরিণত করার জন্য দৃঢ়ভাবে চেষ্টা করতে হবে।
ভালো খবর হচ্ছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বাংলাদেশে এই দুটি ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুকূল! ইউরোপ ও ভারতের অবস্থান এ প্রশ্নে কিছুটা ইতিবাচক এবং খোলামেলা বলেই মনে হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি এখনো অত পরিষ্কার নয়। জামায়াতে ইসলামীর মতো মৌলবাদী দলকে তারা এখনো পরিত্যাগ করেছে বলে মনে হয় না। আর চীনকে দমানোর কৌশল হিসেবে ভারত-বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির কৌশল যুক্তরাষ্ট্র ছাড়বে বলেও মনে হয় না। ফলে ‘সামরিক বাহিনী’ ও মৌলবাদকে এখনো নাকচ করে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। যা-ই হোক, সব মিলিয়ে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ যদি দেশীয় শাসকদের মূল কথা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মৌলবাদী শক্তি ও সামরিক ষড়যন্ত্রকারীদের অবশ্যই পরাজিত করতে হবে। সেটা করার পরিণতি আপাত বিচারে দুই রকম হতে পারে।
শাসকশ্রেণীর জন্য সবচেয়ে কাম্য হচ্ছে ‘মৌলবাদ’ ও ‘উচ্চাভিলাষী’ জেনারেলদের থেকে মুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই একটি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল দ্বিদলীয় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম দেবে এবং শাসকশ্রেণীর স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন থাকবে।
অথবা এই প্রক্রিয়ায় রক্ষণশীল বিএনপি নিজেকে পরিবর্তন করতে অক্ষম হবে বিধায় ক্রমবর্ধমান বিভক্তি ও খণ্ডীকরণের মাধ্যমে ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে। তখন সেই শূন্য জায়গায় প্রধান বিরোধী দল হিসেবে অপেক্ষাকৃত রেডিক্যাল বামপন্থীদের আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। অবশ্য এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি অনেকখানি নির্ভর করবে বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ ‘মৌলবাদ’ ও ‘জেনারেলদের’ বিরুদ্ধে কতখানি আপসহীন অদোদুল্যমান ভূমিকা গ্রহণ করে, তার ওপর।
তৃতীয় একটি সম্ভাবনার কথা না বললেই নয়। বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব (ক্যাওস থিওরি) অনুযায়ী বলা যায়, অসংখ্য পরস্পরবিরোধী শক্তির টালমাটাল ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মাধ্যমে আবার বিশৃঙ্খলাও ফিরে আসতে পারে।
[এই লেখার ওপর আপনার মতামত ও প্রতিক্রিয়া ছাপাতে আমরা আগ্রহী। বি. স ]
এম এম আকাশ : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
akash92@hotmail.com