Monday, February 10, 2020

আল মাহমুদের কবিতা : সত্তার ভারমুক্ততার ভাষ্য by মহীবুল আজিজ

সিক্স মেমোজ ফর দ্য নেঙট মিলেনিয়াম-সিরিজের বক্তৃতায় ইতালো ক্যালভিনো লিখেছিলেন, চার দশককালের লেখালেখির প্রেক্ষাপটে একটা কাজই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে – সত্তার ভারমুক্তি। মানবসত্তার আয়তন প্রভূত ভারে আক্রান্ত। তার সেই ভারাক্রান্ত অবস্থান থেকে, তার সামগ্রিক পরিপার্শ্ব থেকে, এমনকি হয়তো তাকে নিয়ে গড়া সাহিত্যের কাঠামো এবং ভাষা থেকেও ভার সরিয়ে নেওয়ার কাজটাই তিনি করতে চেয়েছেন। ক্যালভিনোর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, হয়তো মানবের সত্তায় প্রলিপ্ত থাকা উদ্বেগ, আশংকা, স্বপ্নহীনতা কিংবা দুঃস্বপ্নের চাপ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা লেখক তাঁর চরিত্র ভাব দর্শন এসবের মধ্যে প্রকাশ করেন। ‘লিখেছিলেন’ কথাটা বলতে হয় এজন্যে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চার্লস এলিয়ট নর্টন পোয়েট্রি লেকচার্সে’র জন্যে ছয়টি বক্তৃতা রচনা সমাপ্ত করে, প্রদানের আগেই ক্যালভিনো মৃত্যুবরণ করেছিলেন। পরে, সেই বক্তৃতামালা তাঁর স্ত্রী এস্থার ক্যালভিনোর সৌজন্যে প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে। কথাশিল্পী ক্যালভিনোর উপর্যুক্ত বক্তব্য বৃহত্তর দৃষ্টিতে সৃজনশীল সাহিত্যক্ষেত্রে নিবেদিত যে-কোনো সাহিত্য-রচনার অভিমুখ হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। এমনকি হতে পারে দুর্বোধ্য-দূরান্বয়ী রূপক-প্রতীকে মোড়ানো কাব্যভুবনের ক্ষেত্রেও। চকিতে আমাদের মনে পড়ে যায় পুশকিন, লেরমেন্তভ, আখমাতোভা, ইয়েভতুশেংকু, পোপা, হোলুব, মিয়োজ, ওসিপ মানডেলস্টাম, জর্জ ফালুদি, গিন্সবার্গ, হিনি এরকম সব বোধ্য-দুর্বোধ্য কাব্যরচয়িতাদের নাম। সেদিক থেকে আল মাহমুদের কবিতা অনেক বেশি স্পষ্ট এবং লক্ষ্যসচেতন।

দ্রম্নতধাবমান তরঙ্গ হয়ে ছুটতে থাকে কবিতা, অজস্র কবিতা – আল মাহমুদকে তাঁর প্রয়াণের পরে মনে করতেই কতকাল আগেকার সেসব কবিতা ভিড় করে। কবিতারা জ্বলে আর নেভে কিন্তু একেবারে নির্বাপিত হয় না। বরং কবিতাগুলো উপলক্ষের অপেক্ষাতেই থেকে যায় ফের জেগে ওঠার জন্য। দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’, জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’, অমিয় চক্রবর্তীর ‘চিরদিন’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘যযাতি’, বুদ্ধদেব বসুর ‘ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ’, বিষ্ণু দে-র ‘ঘোড়সওয়ার’, দিনেশ দাশের ‘কাস্তে’, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’, ফররুখ আহমদের ‘ডাহুক’, আহসান হাবীবের ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’, আবদুল গনি হাজারীর ‘কতিপয় আমলার স্ত্রী’, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে-দিনের কবিতা’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভালোবাসা ছাড়া’, শহীদ কাদরীর ‘উত্তরাধিকার’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখে নি’, রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, মোহাম্মদ রফিকের ‘সারা বিষ্ণুপুর জুড়ে’, মহাদেব সাহার ‘চিঠি দিও’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি’, হুমায়ুন আজাদের ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’, আবুল হাসানের ‘উদিত দুঃখের দেশ’, হুমায়ুন কবিরের ‘এ কেমন শহর’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদমত্মীর কথা বলছি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘নৈশভোজে রক্তপাত’ এসব কবিতার সঙ্গে একজোটে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি করছে আল মাহমুদের ‘কালের কলস’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘ভারতবর্ষ’। হ্যাঁ, ক্যালভিনো যেমনটি বলেছিলেন, কবি আল মাহমুদ সত্তাকে ভারমুক্ত করার প্রচেষ্টায় আকুল –

লোকালয় থেকে দূরে, ধোঁয়া অগ্নি মশলার গন্ধ থেকে দূরে

এই দলকলসের ঝোপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল

কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস আর বৃষের বিবাদ।

(‘কালের কলস’, কালের কলস)

একদিক থেকে বিবেচনা করলে কবিতা এক বিশেষ ধরনের ভাষিকতা, যেখানে বিন্যাস আর সজ্জার সীমানায় স্বয়ং কবি অধীশ্বরের মতো বিরাজমান। একমাত্র কবিতাতেই ঘটতে পারে রচয়িতা ‘আমি’র আত্মম্ভর প্রক্ষেপ। কিন্তু কবিতা কেবল ভাষা নয়, নয় কেবল আঙ্গিকও। কবিতা সংস্কৃতিও বটে। কবিতা সেই সংস্কৃতি যেটির অভ্যন্তরে বয়ে চলে এক জীবনপ্রবাহ। সেখানে থাকে মানুষ, প্রকৃতি, সময়, সমকাল, ইতিহাস এবং এসবের অতিরেক বহু কিছু। কবির সুচয়নে সেই জীবনের প্রবাহ স্ফূর্ততা পায়। কবিতা-অভ্যন্তরীণ এসব উপাদানের মধ্যে কোন কোন উপাদান কবির সংবেদনা ও মনোযোগের কেন্দ্র সেটা অনুভব করা যায় কবিকে পাঠ করলে। এসব উপাদানকে অবলম্বন করে কবি হয়ে ওঠেন এক জীবন-প্রতিনিধি এবং তাঁর শব্দজগৎও তখন সংযোগ রক্ষাকারী সেতু হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি সেই জগতের কবি যদি হন তথাকথিত সভ্যতার মানদ–র অক্ষরজ্ঞানবিহীন কোনো বেদুইন তবু তাঁর উচ্চারণ অর্থপূর্ণ। লেখা নয়, শুধু শব্দের উচ্চারণই তাঁর পৃথিবীকে করে তোলে প্রতিনিধিত্বপূর্ণ। লায়লা আবু-লুঘোড তাঁর বেদুইন সমাজবিষয়ক গ্রন্থে তাই জানান, বেদুইনদের কবিতা গোত্রসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক, দূরত্ব, ঐতিহ্য, বর্তমান সবকিছুকে প্রকাশ করে। অথচ, বেদুইনদের সেসব কবিতা লিখিত হয়নি, হয়েছে গীত। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে রচিত কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে থাকে চিন্তা, পরিকল্পনা এবং দর্শনের সুস্পষ্ট স্বাক্ষর। আর সেই কবিতা যদি হয় আল মাহমুদের ক্ষীণকায় একটি নমুনা তবু তার মুকুরে ঘটে নির্বিশেষের প্রতিফলন – ‘ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/ দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা/ তুলবো কেন খিল?/ আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ ফিরবে সে মিছিল।/ ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ ট্রাকের মুখে আগুন দিতে/ মতিয়ুরকে ডাক।/ কোথায় পাবো মতিয়ুরকে/ ঘুমিয়ে আছে সে!/ তোরাই তবে সোনামাণিক/ আগুন জ্বেলে দে।’ (‘উনসত্তরের ছড়া-১’, পাখির কাছে ফুলের কাছে)। কবি আল মাহমুদ এখানে একই সঙ্গে সমকাল, ইতিহাস, দেশ ও জাতির প্রতিনিধি। কিংবা আরো স্পষ্টভাবে বললে এক ঐতিহাসিক জীবনপ্রবাহের প্রতিনিধি। দীর্ঘকালীন কাব্যিক পর্যটনের পটভূমিতে আল মাহমুদের কবিতা জাগিয়ে তোলে নানামাত্রিক বিচিত্রতা ও দ্বান্দ্বিকতার আভাস।

বাংলাদেশের সাহিত্যে পূর্ববঙ্গ-সচেতনতার দুই সার্থক রূপকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং আল মাহমুদ। একজন কথাসাহিত্যে এবং অন্যজন কবিতায় প্রয়োগ ঘটান সেই সচেতনতার। মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণের সূত্রে বাংলা কথাসাহিত্য জনজীবনের গভীর প্রদেশসঞ্চারী হলেও বাংলাদেশের এই পূর্ব প্রান্তিকতায় যেখানে জাতিত্ব প্রতিষ্ঠার মতো বিশাল সংগ্রামে মানুষ একদিন জোটবদ্ধ হবে, সেই জনপদের স্পন্দন থেকে যায় অশ্রম্নত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র উপন্যাসে উঠে এলো পূর্ব প্রামেত্মর সমষ্টিবদ্ধ মানুষের কাহিনি, যে-মানুষেরা একেবারে মৃত্তিকাসংলগ্ন এবং যাদের দিনানুদিনের বাস্তবতার প্রতি নজর ছিল না কারো। ওয়ালীউল্লাহ্ তাদের রোজকার জীবনের কাহিনিই শুধু উপস্থাপন করলেন না, অনুসন্ধান করলেন তাদের বর্তমানতার নেপথ্যে থাকা সুদীর্ঘ পরম্পরার ঐতিহাসিক বাস্তবতা। পরবর্তীকালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র অনুসন্ধান সমষ্টি থেকে ক্রমে ব্যক্তিসত্তার সামাজিক চৈতন্যের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। সেটা করতে গিয়ে তিনি অস্তিত্ববাদ এবং চৈতন্যপ্রবাহরীতির আশ্রয় নেন। তবে সমষ্টিবদ্ধ জীবনের আয়তনটিকে তিনি কখনো ছেড়ে যান না। বাংলা কাব্যভুবন তিরিশের পাঁচ কবির পদচারণায় জাগিয়েছিল এক নতুন মুখরতা। তাঁদের কাব্যচেতনা পরিস্নাত হয়েছিল ইউরোপীয় নান্দনিকতার প্রেক্ষণাভিজ্ঞতায়। যদিও জীবনানন্দ দাশ (এবং খানিকটা বিষ্ণু দে) তাঁদের কাব্যে পূর্ব প্রান্তিকতায় থাকা মানুষদের সমষ্টিবদ্ধ জীবনকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। জীবনানন্দ দাশকে বাদ দিলে বাংলা কাব্যে নিম্নবঙ্গের দৈশিক চেতনার উপস্থিতি খুব ঝাপসা আর অস্পষ্ট। সেই ঝাপসা আর অস্পষ্ট আভাস উজ্জ্বলতা পেতে শুরু করল যখন একে-একে প্রকাশিত হতে লাগল লোক লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালি কাবিন। অবশ্য আল মাহমুদই আবার তাঁর উপর্যুক্ত ত্রয়ী-কাব্যের সামষ্টিকতার চেতনা ছেড়ে কালক্রমে যাত্রা করবেন এক ব্যক্তিক-দার্শনিক অনুসন্ধানের দিকে। এমনকি তাঁর কাব্যচেতনা যে তাঁরই সচেতন কবিতাকর্মের পরিণতিতে ক্ষেত্রবিশেষে প্রসারণের পরিবর্তে গ্রহণ করবে সংকোচনকে, সেই দর্পিত স্বাক্ষরও তিনি রেখে যান তাঁর পাঠকদের জন্য।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ যেমন তাঁর সৃষ্ট মহববতনগর গ্রামের অবলম্বনে মৃত্তিকাসংলগ্ন মানবম-লীর জীবনকে ধারণ করেন, তেমনি কবি আল মাহমুদ সেই জীবনকে ধারণ করেন তাঁর তিতাস-বিধৌত পরিক্রমায়। মহববতনগর একমাত্র ওয়ালীউল্লাহ্রই এবং তিতাস আল মাহমুদের। (অদ্বৈতর তিতাসকে আমরা ভুলি না – সেই তিতাস কাব্যের নয়, কথাসাহিত্যের।) বাংলাদেশের মানুষ, প্রকৃতি এবং ঘটনাপুঞ্জ আল মাহমুদের কাব্যবিশ্বের মৌল উপাদান। অন্তত তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থের। প্রকৃতি তাঁর কাব্যে আরো পূর্ববঙ্গময় হয়ে উঠেছে নদীর মুহুর্মুহু আবির্ভাবে। এবং প্রথম থেকেই

প্রকৃতি-আঁকিয়ে কবি শক্তিমান এবং অতুলনীয়। তাঁর তিতাসের সক্রিয়তা তাঁর কবিতাকে করে সজীব, নবপলিময় ও গতিগৌরবী। তাঁর ‘তিতাস’ (লোক লোকান্তর) শিরোনামের কবিতা থেকে কবির অসাধারণ সেই জীবনোপলব্ধির দেখা মেলে – ‘এ আমার শৈশবের নদী এই জলের প্রহার/ সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায় ঘোলা  স্রোত টানে/ যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে/ গতির প্রবাহ টানে। মাটির কলসে জল ভরে/ ঘরে ফিরে সলিমের বউ তার ভিজে দুটি পায়।/ অদূরের বিল থেকে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বক/ পাখায় জলের ফোঁটা ফেলে দিয়ে উড়ে যায় দূরে;/ জনপদে কি অধীর কোলাহল মায়াবী এ নদী/ এনেছে স্রোতের মতো, আমি তার খুঁজিনি কিছুই।’ অনন্তর এই তিতাস নামে-বেনামে বয়েই যেতে থাকে তাঁর কবিতার জনপদ ধরে। আল মাহমুদের এই নদীই স্বতন্ত্র এক চরিত্র হয়ে ওঠে এবং তা ‘বাংলাদেশের কবিতা’চিহ্নিত মানচিত্রে। দিনেশ দাশের কাস্তে যেমন তেভাগার স্থানিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে সর্বজনীনতায় উত্তীর্ণ হয়, তেমনি আল মাহমুদের তিতাস বাংলা কাব্যের নদীমাতৃকতায় এর স্থানীয়তাকে সংযুক্ত করে চিরন্তনতার স্রোতে। এমনকি আল মাহমুদের নদী-প্রকৃতিকে ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের নদীর কাব্যিক সন্দর্শনের চাইতেও অনেক বেশি বাঙ্ময় মনে হয়। এলিয়টের যেমন টেমস আল মাহমুদের তেমনই তিতাস। এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ড কাব্যে ঘুরেফিরে আসে টেমস নদী। মধুর সুরের রিফ্রেনে (‘মধুর টেমস, ধীরে বয়ে যায়, যতক্ষণ আমি গেয়ে যাই গান’) টেমস দেখা দেয়। দেখাই দেয় কেবল এবং কবিও অবলোকন করতে থাকেন সেই নদীকে; কিন্তু তা আল মাহমুদের তিতাসবহতার মতো স্পন্দিত হয় না। তিতাস বয়ে চলে যেন কবির সত্তার মধ্য দিয়ে, সুদূর অতীত থেকে বর্তমান হয়ে হয়তো অনাগত কালের দিকে। আর সেই বহমানতায় একা কবি নন, স্পৃষ্ট হতে থাকে এক বিপুল জীবনজঙ্গমতা।

আল মাহমুদের কবিতার এই জীবনজঙ্গমতার অঙ্গীকার সময়ের খাতে বিবর্তিত হতে থাকে। জনজীবনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ কবির আত্মতায় ছাপ পড়ে সময়ের ও সমকালের। সেই ছাপ রূপান্তরিত হয় তাঁর কাব্যাভিজ্ঞতায়। লোকজীবনের বার্তাবাহক কবি তাঁর সময়, সমকাল এবং পরিপার্শ্বকে পর্যবেক্ষণ করেন এক দর্শনোত্তীর্ণ অবস্থান থেকে। প্রথমদিককার কাব্যালোকনে যা ছিল দর্শন বা দেখা, বিশেষ করে সমষ্টির জীবনকে দেখা, পরের দিককার কাব্যালোকনে তা হয়ে উঠল জীবনদর্শন বা তাঁর নিজের জীবনের অবস্থান থেকে দেখা। এখানে প্রসঙ্গত তাঁরই এক কাব্য-সহযাত্রী শামসুর রাহমানের সঙ্গে তুলনা করলে দেখব, রাহমান তাঁর প্রথমদিককার আধেয়বদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেতে থাকেন ক্রমপ্রসারণের মাধ্যমে। সেই প্রসারণে আল মাহমুদের বিপরীত ধরনে শামসুর রাহমান তাঁর নগরাবদ্ধ জীবনচেতনা থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন বৃহত্তর জনচেতনা, হয়তোবা জাতিগত চেতনার দিকে। তাঁর সেই কাব্যপরিক্রমায় বিশেষ ভূমিকা রাখে তাঁর কাব্যে সমকালীন জীবনোদ্যাপন। সমকালীন জীবনপ্রবাহের বিচিত্র সব ঘটনা কাব্যিক উপাদানে পরিণত হয়ে শামসুর রাহমানের কবিতাবিশ্বকে দেয় আশ্চর্য এক সম্প্রসারণ। সেখানে থাকে মানুষের সংগ্রাম, লড়াই, প্রতিরোধ যার একটি বিশাল চিত্রণ ঘটে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাধারার মধ্য দিয়ে। ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে অনন্তর বাঙালির স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, গণতন্ত্রের লড়াই এসব বিষয়ের কাব্যিক নির্মাণ শামসুর রাহমানের কবিতাভুবনকে বাঙালির ইতিহাসের সমান্তরাল সৃজনকল্পে পৌঁছে দেয়। শুধু শব্দের মাধ্যমে একজন কবির পক্ষেও যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হয়ে লড়াই করা সম্ভব শামসুর রাহমানের অসংখ্য কবিতা তার প্রমাণ। সমকালীন ঘটনার প্রতিক্রিয়াজাত কাব্যনির্মাণের দিক থেকে শামসুর রাহমান কেবল আল মাহমুদ নন, ছাড়িয়ে যান তাঁর সমকালীন অন্য অনেক কবিকেও।

সমকালীন ঘটনার প্রতিফলনজাত কাব্যনির্মাণই কাব্যবিচারে উৎকৃষ্টতার মাপকাঠি নয়। একই সমকালীন দুজন কবির পারস্পরিক অবস্থানের বাস্তবতা বোঝানোর জন্যেই সে-প্রসঙ্গের অবতারণা। কবিতা নিশ্চয়ই এক নিতান্ত ব্যক্তিগত কর্মকা- কিন্তু কবি কখনোই এমন কোনো অমত্মঃপুরবাসী নন যেটি সমস্ত রকম সামাজিকতার স্পর্শশূন্য। বরং কবিদের ‘মানব জাতির আইনসংগত প্রতিনিধি’ বলে অভিহিত করেন কবি মিলটন। যে-ব্যক্তি একটি জাতিত্বের প্রতিনিধি হয়ে তাঁর কর্মতৎপরতা চালাবেন তা যতই নিভৃতচারী হোক না কেন তার থাকে বৃহত্তর চেতনামুখী আত্মপ্রকাশ। এটি হয়তো শেষ পর্যন্ত তর্ক-প্রতর্কেরও বিষয়। মার্কিন লেখক টনি মরিসন বলেছেন, কল্পনার ব্যক্তিগত অনুশীলন বলে কিছু নেই, লেখা ব্যাপারটাই হলো রাজনৈতিক। মরিসন দেখান যে, আত্মজৈবনিক রচনার রীতিও প্রবলভাবে সামাজিক চেতনার পরিবাহী হতে পারে। মরিসনের দৃষ্টিতে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখকদের অনেক রচনাই আত্মজৈবনিক ধরনের; কিন্তু আত্মজৈবনিক সেসব রচনাই হয়ে উঠেছে বহুস্বর-‘প্রতিনিধিত্বপূর্ণ’। এসব রচনায় প্রতিফলিত ব্যক্তির জীবন একই সঙ্গে নিজস্ব নির্জনতা এবং পরস্ব প্রতিবেশিতায় খচিত। বলা যায় মার্কিন কবি অ্যালেন্স গিন্সবার্গের কথা, যাঁর কাব্যের শিরোনামই (হাউল) তাঁর ধরন বলে দেয়। প্যারিস রিভিউকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্রিটিশ কবিদের কাব্যভঙ্গিকে ‘কাপুরুষোচিত ভঙ্গি’ বলে অভিহিত করেন। বস্ত্তত ব্রিটিশ কবিদের ‘আপারটোন’ ‘হাই ক্লাস’ ধরনের স্বর তাঁর অপছন্দ ছিল। বৈরী প্রতিপক্ষতাকে একমাত্র উচ্চকণ্ঠ ভঙ্গিতেই প্রকাশ করা যায় – গিন্সবার্গ তাঁর কাব্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে আক্রমণ করবার জন্যে প্রচুর খিস্তিখেউড়-শব্দ ব্যবহার করেন যেগুলোকে ‘গালাগাল’ আখ্যা দেওয়া যায়। শামসুর রাহমানের অনেক কবিতা আছে যেগুলোর বিষয়বস্ত্ত আন্দোলন-সংগ্রাম এবং যেগুলো স্বভাবত উচ্চকণ্ঠ বা ঘোষণাধর্মী। আবার, আল মাহমুদের তেমন কবিতা প্রায় দুর্লভ, যদিও তিনি ‘শুয়োরমুখো’র মতো খিস্তি-শব্দের দারুণ ব্যবহৃতি দেখিয়েছেন।

তবে ঘোষণাধর্মী কবিতা আল মাহমুদও লিখেছেন এবং সেই কবিতার সূত্র ধরে প্রথমে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে তারপর আবার সামনের দিকে আসা যেতে পারে। এক অর্থে গোটা বিশ্বই কবির বিষয়। কবি তাঁর স্থানগত সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে যান তাঁর অভিজ্ঞতার আয়তন দিয়ে। ফলে, প্যালেস্টাইনে, আফ্রিকায়, মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কিংবা বিশ্বের যেখানেই মানুষের বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তা-ই অনুপ্রেরণা জোগায় কবিকে। অচেনা, একেবারে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার বিষয়বস্ত্তও হতে পারে কবির উপজীব্যতার লক্ষ্য। সুইডেনের কবি টমাস ট্রান্সটোমার যখন ইজমির, সাংহাই কিংবা আফ্রিকা নিয়ে কবিতা লেখেন অথবা হাঙ্গেরীয় কবি জর্জ ফালুদি লেখেন তাঞ্জিয়ের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাজাত তাঁর ‘কসবাহ্’ নামক কবিতা, তখন কবির বিষয়বস্ত্তর অসীমতাই প্রমাণিত হয়। এমনকি অদেখা উপাদানও অভিজ্ঞতার বিষয়ে পরিণত হতে পারে। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার জেলেদের বলতেন, মাছেদের সম্পর্কে কোনো বিশেষ আকর্ষণীয় বা বিবেচনাযোগ্য কিছু লক্ষ করলে তারা যেন তা অ্যারিস্টটলকে জানায়। শামসুর রাহমান যখন আগামেমনন বা ইলেক্ট্রার প্রতীকে কাব্য রচনা করেন তখন তাঁর সেই গ্রিসমুখিতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। কেননা, কবিরা এক সম্প্রসারিত বিশ্বের নাগরিক। বেঞ্জামিন মলয়ঁসের ফাঁসি হলে কি কেন্ সারউইয়ার মৃত্যুদ- হলে বাঙালি কবির কাব্যিক সাড়া প্রাসঙ্গিকতা পায়। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ককে বাংলা কবিতায় অমর করে রাখেন কাজী নজরুল ইসলাম। বিষয় ছাড়াও বলা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কাব্যাঙ্গিক বা কাব্যভাবনাও হতে পারে কবির সৃজনশীলতার অনুপ্রেরণা। ইংরেজ কবি টিএস এলিয়ট বলেছিলেন, এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ডের রুবাইয়াৎ পাঠই ছিল তাঁর চার পঙ্ক্তির ‘কোয়ার্টেট’ (‘ফোর কোয়ার্টেট’) কবিতা রচনার অনুপ্রেরণা। কবি এজরা পাউন্ড জানান, চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াসের

চিন্তা-দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তিনি তাঁর ক্যান্টোজ-কবিতাবলি রচনা করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের পরে কবি ফররুখ আহমদ এবং সৈয়দ আলী আহসানের কথা বলা যায়, যাঁদের কবিতায় আরবি-ফারসি বিষয় ও আঙ্গিকের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর নানান দেশের বিষয়বস্ত্ত আল মাহমুদের কবিতাতেও উপজীব্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সক্রেটিস, গোর্কি, হজরত মুহাম্মদ, বখতিয়ার, বেঞ্জামিন মোলয়েসি, ঈশপ, ইকবাল, বেদুইন, লায়লা – এইসব বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন তিনি। অর্থাৎ বিশ্বদৃষ্টির আয়ত অন্বেষণে ব্যাপৃত থেকে আল মাহমুদ তাঁর কাব্য-উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তা সত্ত্বেও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাব্যপাঠের অভিজ্ঞতা ঘটাতে পারে ভিন্ন আলোকসম্পাত।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না। এ-গ্রন্থের একটি কবিতা ‘ইহুদিরা’। পঁচিশ পঙ্ক্তির কবিতাটির দশটি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতি অনুসরণ করি –

অনিষ্টকর অন্ধকারে যখন পৃথিবী

আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারদিকে ডাইনীদের

ফুৎকারের মতো হাওয়ার ফিসফাস,

আর পাখিরা গুপ্ত সাপের আতঙ্কে

আশ্রয় ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়

ঠিক তখুনি, ইহুদিরা হেসে ওঠে। …

ইহুদিরা হাসুক,

তবু সম্পদের সুষম বণ্টন অনিবার্য।

ইহুদিরা নাচুক, তবু

ধনতন্ত্রের পতন আসন্ন।

কবিতার সর্বশেষ পঙ্ক্তি ‘মানুষ মানুষের ভাই’ হলেও কবি আল মাহমুদের উপর্যুক্ত কাব্যিক স্বীকারোক্তি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে তিনি সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধি নন। কেননা, কবিতাটিতে মূল প্রতিপক্ষ ‘ইহুদিরা’ আর ধনতন্ত্র এবং ‘ইহুদিরা’ হয়ে পড়ে সমার্থক। এমনও মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, বিশ্বে সম্পদের সুষম বণ্টন হওয়ার পথে বাধা ইহুদিরাই। এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন নয়। গবেষক অ্যান্থনি জুলিয়াস তাঁর কবি টিএস এলিয়ট বিষয়ক গবেষণাকর্মে (১৯৯৫ সালে প্রকাশিত) দেখান, এলিয়টের কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে স্পষ্ট জাতিবিদ্বেষ। তাঁর অনেক কবিতায় এলিয়ট প্রত্যক্ষভাবে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা-অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। ‘বারব্যাংক উইথ আ ব্যাডেকার : বস্ন্যাইস্টাইন উইথ আ সিগার’, ‘সুইনি অ্যামাং দ্য নাইটিংগেইলস্’ কিংবা ‘আ কুকিং এগ’ প্রভৃতি কবিতার বিশেস্নষণে এলিয়টের জাতিবিদ্বেষ ধরা পড়ে। কবির ধর্মাশ্রয় বা ধর্মাশ্রিত ভাবধারানির্ভর কবিতারচনা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। স্বয়ং এলিয়টই বলেছেন (প্যারিস রিভিউ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে), বাইবেলের কাব্যিকতা ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সমান্তরালে আসাটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে, এলিয়টের মতে, বাইবেলের ‘সাম’ কিংবা ‘ইসাইয়াহ্’ অংশ তেমন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এলিয়ট অবশ্য এমনও বলেন যে, বাইবেলকে সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা না করে বরং সেটিকে শব্দের অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু বাইবেলের অভিজ্ঞতাকে জাতিবিদ্বেষের লক্ষ্যে পরিচালনা করাটা সৃজনশীল কবিস্বভাবের জন্যে বেমানান। গবেষক অ্যান্থনি জুলিয়াসের গবেষণাকর্ম সেরকম ধারণাই দেয় আমাদের। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বখতিয়ারের ঘোড়া। গ্রন্থের একটি কবিতায় (‘হত্যাকারীদের মানচিত্র’) কবি জানান, ‘আফগানিস্তান আমার দেশ আমার/ ভালোবাসা …/ আফগানিস্তান আজ কার দেশ নয়? আফগানিস্তান/ সব স্বাধীন মানুষের অপহৃত মাতৃভূমি।’ কবিতাটিতে তখনকার আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপস্থিতি ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত এবং তখন এমন কবিতা বাংলা ভাষা ছাড়াও বিশ্বের বহু ভাষার কবিরা রচনা করেছিলেন। আবার ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত আল মাহমুদের একাদশ কাব্যগ্রন্থের ‘রাফাতের লাশের ওপর জুঁইফুল’ কবিতাটি পাঠ করলে দেখব কবি ভাবছেন ‘ইসলামকে কবর দিতে’ হত্যা করা হয়েছে ‘রাফাত মাহমুদ ও তার উনত্রিশ সহযাত্রী’কে। এই কবিতাটাই এক সরব ঘোষণা হয়ে দাঁড়ায় অন্তিমে যখন কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে –

খুঁড়ে ফ্যালো গোটা আফ্রিকা কালো মহাদেশ। কায়রোর

কবরখানায় পবিত্র কোরআনকে পুঁতে ফেলে

যারা হোটেলগুলোতে মদের গস্নাস হাতে উদর নৃত্যে মশগুল

এখন পশ্চিম আফ্রিকা তাদের বিভীষিকা দেখাচ্ছে।

মহাদেশের মাটি চৌচির করে আলজেরিয়ায় বেরিয়ে এসেছে

আল্লার এই অদ্ভুত কিতাব।

আপন বিশ্বাসে স্থির আল মাহমুদকে আমরা সবশেষে এমন নির্দ্বান্দ্বিকভাবে পাই।

আল মাহমুদের কবিতা পাঠ করি। একদা ১৯৬৩ সালে তিনি প্রত্ন-মহেঞ্জোদারোর মৃৎপাত্রে গাঁথা অক্ষরের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। যদিও ‘মানুষের শিল্প’কে তাঁর কাছে ‘নির্বোধের নিত্য কারিগরি’ মনে হয়েছে, তবু শব্দশিল্পের গায়ে তিনি তাঁর স্বাক্ষর রেখে যান। তিতাস নদী বেয়ে চলে তাঁর ‘সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও’। কিন্তু আসে দুর্দিন আর খরাগ্রস্ততা, তাই তাঁর ‘সমস্ত গন্তব্যে একটি একটি তালা’ ঝোলে। কবির অন্তরের সর্বত্র বাসা বাঁধে প্রবল অবিশ্বাস। সেটা ছিল প্রত্যাশিতই। পাকিস্তানি সামরিক শাসনামলের বন্ধ্যত্বকে তিনি বিদ্ধ করেছিলেন দারুণ করণ-কুশলতায় – ‘শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা/ আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি/ নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না/ আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর!’ আবার, দেশ মুক্ত-স্বাধীন হলেও কবি আল মাহমুদ দেখতে পান ‘বন্দুকের নল’ তাঁর ‘মাথার দিকেই তাক করা’। এবং ১৯৮৫ সালে বাঙালি কবি আল মাহমুদের সোৎসাহী কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নতুন এক প্রণোদনা এবং কবিকে তখন সেই উৎসাহ প্রকাশ করার জন্য আশ্রয় নিতে হয় বাংলার পরিবর্তে বিদেশি ভাষার –

আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা

মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।

বারুদই বিচারক। আর

স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।

(‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, বখতিয়ারের ঘোড়া)

উপর্যুক্ত উচ্চারণে আমরা সংশয়ে পড়ি – এ-কবির বিশ্বাস নাকি অবিশ্বাসের প্রকাশ!

রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা ও ভাবনার নির্মিতি by লিটন মহন্ত

রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনাই তাকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করে; তার জীবন দর্শন, মূল্যবোধ ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আর কোনো বাঙালির জীবনে ঘটবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ কথা সহজেই স্বীকার করা যায় যে রবীন্দ্রনাথ তুলনারোহিত এবং বাঙালি কে মননশীলও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করতে তাঁর বিকল্প নেই; তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য।

আজো রবীন্দ্রনাথ আমাদোর জীবনে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক; এই কথা সহজেই অনুমেয় এবং বিবেচ্য কারণ তাঁকে বাদ নিয়ে কেউ সম্পূর্ণ রূপে বাঙালি হয়ে উঠতে পারে না। আমাদের প্রকৃত বাঙালি হয়ে উঠতে গেলে ক্রমশ রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করতে হবে; কোথায় নেই তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের জাদুকরি হাতের স্পর্শ পড়েনি শুধুমাত্র মহাকাব্য ছাড়া। হয়তো অনেকে আমার সঙ্গে একমত পোষণ করবেন না কিন্তু সত্য হলো এটাই বাঙালি হয়ে বাঙালিত্ব গ্রহণ করতে হলে রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় গ্রহণ করতেই হবে। জন্ম থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে জন্ম, বিরহ থেকে আনন্দ, বিষাদ থেকে আত্মপ্রকাশ সব কিছুর ভেতরেই আমাদের শ্রেষ্ঠতম আশ্রয় হলেন তিনি; এমনকি বাঙালির আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভাবনা এবং এই উপমহাদেশে প্রথম সমবায় তথা কৃষি ব্যাংকের ভাবনা এবং ক্ষুদ্র ঋণের কথা তিনিই প্রথম ভেবেছেন। তিনি জমিদারি থেকে দূরে গিয়ে দরিদ্র কৃষকের দ্বারে পদচারণা করেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভাবনা এবং তাদের মুক্তির কথা; কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া শুধু শিল্প আর সাহিত্য দিয়ে কখন মানবজাতির মঙ্গল সম্ভব নয়; আর এখানেই তিনি অনন্য এক মহীরুহে পরিণত হন। তিনি জীবনব্যাপী সাধনার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের যে নতুন মাত্রা দান করেছেন, তা তুলনাহীন। তাকে ঘিরেই বাংলা সাহিত্যে, শিল্প ও সংস্কৃতির ভুবনে আধুনিকতার সূচনা হয়েছে। পরবর্তী কালে এই ধারার ধারাবাহিকতায় বাংলা সাহিত্য বিষয় বৈচিত্র্যে, জীবন জিজ্ঞাসায় ও মানবিকতায় বিশ্বস্ত হয়ে উঠে। তার কাছে আমাদের অনেক ঋণ। তাঁর একক প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্যের সকল শাখা আজ সমৃদ্ধ। শুধু সাহিত্যে নয় সংগীতে এবং পরিণত বয়সে চিত্রকলায় বঙ্গীয় চিত্রধারার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তিনি যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আমাদের দেশে রবীন্দ্র চর্চার ইতিহাস আজকের মতো এত সহজ ও সুন্দর ছিল না; তিনি ছিলেন দেশ কাল জাতি বর্ণ নির্বিশেষে এক মহাবৃক্ষের মতো আশ্রয়দাতা; আর তাই ষাটের দশকে যখন তাঁর চর্চার প্রয়াস পূর্ণতা লাভ করছিল ঠিক তখনই নেমে আসে তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরোধিতা কিন্তু তা সত্ত্বেও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি এক নতুন অভিযাত্রার সন্ধান পায় এবং রবীন্দ্রিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সৃজন করেন বাঙালির জীবনে এক নতুন অধ্যায়। পরবর্তীতে রবীন্দ্র সংস্কৃতির চেতনায় সমৃদ্ধ হয়েই এই অঞ্চলের বাঙালি সব আনন্দ বেদনায়, সংকটে ও স্বপ্নে তাঁকে অবলম্বন করেছে, এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর গান সৃষ্টি করেছিল এক মহান উৎস, যা প্রেরণাসঞ্চারী হয়ে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। সেই জন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের মননে ও জীবনে নিত্যস্মরণীয় ও প্রাসঙ্গিক। তিনি যে বহুমাত্রিক জ্যেতির্ময় ছিলেন সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না এবং তা আত্মস্থ হয়েছে বাঙালির এক হৃদয়ে থেকে অন্য হৃদয়ে, এই আনন্দের ফল্গুধারা হাজার বছর ধরে বহমান হবে এবং প্রাণ পাবে। এই সে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ, তিনি তাঁর সকল কীর্তি, সকল গৌরব নিয়ে বহু উচ্চের, বহু দূরের একজন হয়ে যাননি, তিনি ইচ্ছা করলে হতে পারবেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও আশ্চর্যজনকভাবে সমগ্র জাতির হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন নিজের চির আসন। তাঁকে যেমন আমরা আপন জন ভাবি, তিনিও ঠিক তেমনিভাবে আমাদের আপন ভেবেছেন, এই আত্নীয় বোধটা ছিল পারস্পরিক এবং জন্ম জন্মান্তরের। রবীন্দ্রনাথ জীবনে বহুবার বৃহৎ বিশ্বের পথে পা বাড়িয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি লাভ করেছেন বাংলার মাটিতে পা রেখে, তাই তো বলেছিলেন
মোর নাম- এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়/ এই হোক শেষ পরিচয়!
বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ দূরে গেলেও হৃদয়ে সব সময় ধারণ করেছেন দেশের ছবি, দেশ মাতৃকার ছবি। তাইতো ভারতের রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রয়াসে তার সমর্থন ছিল নিঃশর্ত। এমনকি দাসত্বের গ্লানি তাঁর চিন্তা বা অনুভূতিকে কখন সংকীর্ণ করেনি তিনি প্রাচ্য সভ্যতার, তথা ভারতীয় সভ্যতার শক্তিকে চিত্তে ধারণ করে তারপর দৃষ্টি দিয়েছেন প্রতীচ্যের শক্তি ও সামর্থ্যরে দিকে এ এক অনন্য সমন্বয় সাধন হয়েছে তাঁর জীবনে। সমাজের এমন কোনো উল্লেখযোগ্য দিক ছিল না, যা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ভাবেননি। বিশেষ করে শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চার ব্যাপারে তার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল, এ বিষয়গুলো অল্প বয়স থেকেই তাঁর ভাবনায় ও চিন্তায় দৃশ্যমান হয়। তিনি শিক্ষাবিজ্ঞানী ছিলেন না কিন্তু শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা তাঁর বেড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিস্তৃত। অতি শৈশব থেকেই তিনি এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বিষহ পরিণতি অনুভব করেছেন এবং ব্যক্তিজীবনে সেই পরিণাম কখনই বিস্মৃত হতে পারেননি। ফলে সমাজ-সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আজীবন ভাবনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষা। তাঁর সেই ভাবনা শুধু গ্রন্থাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অধিকন্তু শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তাঁর স্বপ্নকে ফলপ্রসূ করে তুলতে চেয়েছেন। পৃথিবীর কোনো কবি, শিল্পী তাঁর কাব্য ও শিল্পচর্চাও পাশাপাশি শিক্ষা নিয়ে এমনতর বিপুল ভাবনা ও কর্মযজ্ঞের স্বাক্ষর রাখেননি। উপমহাদেশীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ই শুধু নয়, তাবৎ পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর শিক্ষা-দর্শনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিচিত্র রীতিতে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনে অনুসরণ করা হলেও এই দুর্ভাগা দেশে তার কোনো মর্যাদা আজো হয়নি। অধিকন্তু যে দুর্বিষহ ব্যবস্থার ভিতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যর্থ শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছেন সেই ব্যবস্থা কৌশল পরিবর্তন করে শোচনীয় অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ফলে এ যাবৎকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা-ভাবনা নিয়ে সুপ্রচুর আলোচনা-পর্যালোচনা ও লেখালেখি হলেও তাঁর আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বরং যতই দিন যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শন ততই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিক্ষাবিজ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞানের প্রতি-ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বপরিচয়’ বইটি পাঠ করলে তা সহজে অনুমেয়। তিনি বইটি উৎকর্ষ করেছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই আধুনিক বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবনসমূহ সেকালের সাধারণ মানুষের চিন্তার জগৎককেও অভাবিতপূর্ব বিস্ময়ে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল। পাশ্চাত্যের শিক্ষাজগতে ও চিন্তাজগতে সে আলোড়নের ছায়াপাত ঘটেছিল অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই, ইউরোপে একাধিকবার ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ তা অনুভব করেছিলেন গভীরভাবে। অন্যদিকে ইংরেজের উপনিবেশ ভারতবর্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে নিবিড় ও ব্যাপক সংযোগ একেবারেই সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ঔপনিবেশিক শিক্ষা-কাঠামোর মধ্যে তা হবার কথাও নয়। এই অনুভবকেই রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন বিশ্বপরিচয়ের সেই ভূমিকাস্বরূপ নিবেদনে :
“বড় অরণ্যে গাছতলায় শুকনো পাতা আপনি খসে পড়ে, তাতেই মাটিকে করে উর্বরা। বিজ্ঞান চর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলো কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতকার্য করে রাখছে। উপায়ে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে লেখা রচনাদি পড়া। এ জন্য চাই মনের স্বাভাবিক কৌতূহল এবং বিভিন্ন বিষয় জানার ইচ্ছে। ক্লাসের পড়া হিসেবে যা পড়তে হয় তার প্রতি আকর্ষণের শক্তিটা প্রায়শ কম থাকে- এ কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কৌতূহল নিবৃত্তির আনন্দ হিসেবে যখন তার আবির্ভাব ঘটে, তখন আনন্দটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।” রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের জীবনে বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথাটিও বর্ণনা করেছেন বিশ্বপরিচয়ের বিভিন্ন লেখায়। অতএব রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় ও ভাবনায় বিষয় বৈচিত্র্যেও ব্যাপকতা সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করার কোনো কারণ নেই। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি প্রথম ১৯১৩ সালে নোবেল প্রাইজ পান তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থের জন্য। সুতরাং তাঁর মতো এত আধুনিক মনস্ক একজন মানুষ; যিনি আজ থেকে শত বছর আগেই সমান দাবি নিয়ে সব বাঙালির মনের কথা একাই বিশেষ করে তাঁর গান ও কবিতায় উল্লেখ করেছেন। আমরা যখনই মানসিক দ্বন্দ্বে ও টানাপড়েনে সম্মুখিত হই এখনই তাঁর পাঠ আবশ্যকতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনাই তাকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করে; তার জীবন দর্শন, মূল্যবোধ ও মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আর কোনো বাঙালির জীবনে ঘটবে বলে মনে হয় না। সুতরাং এ কথা সহজেই স্বীকার করা যায় যে রবীন্দ্রনাথ তুলনারোহিত এবং বাঙালি কে মননশীলও সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ করতে তাঁর বিকল্প নেই; তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। তিনি তার সৃষ্টিশীল সাহিত্যের সব শাখার মধ্য দিয়ে যুগযুগ ধরে বাঙালিকে আলোর দীপশিখা দান করে যাবেন এটাই কাম্য।

প্রেমে-অপ্রেমে ইসমত-মান্টো by মহুয়া ভট্টাচার্য

ইসমত একদিন মান্টোকে বলছেন-‘ও মান্টো সাহেব! একটা বেশ গরমাগরম প্রেমের গল্প শোনান না! যা আপনার জীবনে ঘটেছিলো।’ মান্টো বলতে লাগলেন- ‘পূর্ব পুরুষের দেশ কাশ্মীর গেলাম টিবি রোগ সারানোর জন্য হাওয়া বদল করতে। কাশ্মীর উপত্যাকায় রোজ কম্বল গায়ে রোদ্দুরে গিয়ে বসে থাকতাম, জ্বর আসতো বলে। একটা বাচ্চা মেয়ে অদূরে ভেড়া চড়াতো। আমি খালি তার কাফতানের ফাঁকে কনুইয়ের অংশ দেখতে পেতাম। আমার সঙ্গে চোখে চোখ পড়লে হেসে পালিয়ে যেতো। একদিন সাহস করে কাছে এলো। হাতটা পেছনে মুঠো করে রাখা। আমি জোর করে হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দেখি একটা মিছরির ডেলা-আমার জন্য এনেছে।’
গল্প শেষ। মান্টো চুপ।
ইসমত বললেন- ‘আরে মেয়েটার কি হলো ?’
মান্টো বললেন, ‘ও, আমিতো শরীর সেরে যাওয়ায় চলে এলাম। আর মিছরির ডেলা? ও ড্রয়ারে রাখা ছিলো। একদিন দেখি পিঁপড়ে খেয়ে নিয়েছে।’
ইসমত বললেন- ‘ধ্যাত্তেরি! এই আপনার গরমাগরম প্রেম!? এমন ভিজে ন্যাতা ন্যাতা প্রেম জীবনে শুনিনি। বড় বাহাদূর! প্রেম করতে গিয়ে কনুই দেখে ফিরে এলো! হাতে মিছরির ডেলা! ছোঃ!’
মান্টো রেগে কাঁই! বললেন- ‘কীরকম হলে খুশি হতেন? এই বাচ্চা মেয়েটিকে অবৈধ সন্তানের মা বানিয়ে এলে?’
এই হলেন মান্টো! যিনি এক নির্জন পাহাড়ি উপত্যকায় একটি মেয়ের কনুইটুকু দেখার জন্য সারাজীবন অপেক্ষারত থাকতে পারতেন। তার বিরুদ্ধে সেই চল্লিশের দশকে অশ্লীল লেখার দায়ে মামলা হয়েছিল। অথচ মান্টো ছিলেন বাস্তবতার কাছে দায়বদ্ধ এক লেখক, অশ্লীলতা ছিল কেবল তার শব্দের গাঁথুনিতে, তিনি ছিলেন সমাজের অসঙ্গতি প্রকাশে বদ্ধপরিকর এক অসাধারণ লেখক। তিনি তাঁর যুগের চাইতে এগিয়ে ছিলেন বহুগুণ।
আর ইসমত? সিভিল সার্ভেন্ট পিতা, প্রতিষ্ঠিত লেখক মির্জা আজিম বেগ চুঘতাই এর বোন আর চলচ্চিত্র পরিচালক স্বামী শহীদ লতিফের স্ত্রী ইসমত। একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পারিবারিক বলয়ে জীবন যাপন করেও নিজের লেখায় তুলে এনেছিলেন সমকামীতা, যৌনতা। এতে তাঁকেও পোহাতে হয় মামলা। হতে হয়েছে বিতর্কিত। আর নিবিড় প্রেমে জড়িয়েছিলেন আরেক বিতর্কিত, চাল-চুলোহীন, সুরায় আসক্ত?, ব্রীজপ্রেমী মান্টোর সাথে।
উর্দূ সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক জুটি ইসমত চুঘতাই এবং সাদাত হাসান মান্টো। আজকাল আধুনিক সাহিত্য জগতে লেখক-লেখিকাদের যেমন একটি ভক্তকুল, ফ্যানক্লাব গড়ে ওঠে, ইসমত-মান্টোরও তেমনি একটি বিস্তৃত পরিসরের ভক্তকুল ছিলো। তাদের ভক্তরা তাদের লেখা, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চর্চা করত। তাঁরা দুজনেই দীর্ঘদিনের বিবাহিত জীবনে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের প্রেম ছিলো প্রকাশ্য। ভক্তকুল আশা করতেন ইসমত- মান্টোর প্রেমের পরিণতির। উর্দু সাহিত্যের কালজয়ী এই দুজন সাহিত্যিকের সৃষ্টি সম্পর্কে জানা নেই এমন পাঠক কমই আছে। তবে তাদের মধ্যে পারস্পারিক মতানৈক্য, দ্বন্দ্ব সংকুল ঈর্ষা কাতরতা- সবকিছুর সাথেই সমান্তরালভাবে চলত প্রেম। এ এক রহস্যময় সম্পর্কের গাঁথুনি। দুজনের মতাদর্শের, যাপিত জীবনের হাজারও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের দুজনের অখন্ড মিল ছিলো উচ্চকন্ঠে প্রতিবাদ, আবেগহীন বাস্তবতার চিত্র পট অঙ্কন আর নান্দনিক দৃষ্টিতে যৌনতার উপস্থাপনে। দেশ বিভাগের সময়টাতে এ-বিষয় নিয়ে লেখা, কোন লেখকের পক্ষে তো বিপদজনক ছিলোই- একজন নারী লেখকের জন্য তো আরো বেশি বৈপ্লবিক।
তাঁরা দুজনই লেখার সময় নারী না পুরুষ, কোন পরিবারে জন্ম এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তাঁরা দায়বদ্ধ ছিলেন বাস্তবতা ও শিল্পের প্রতি। তেমনি পরস্পরের প্রেমের সম্পর্কেও তাঁরা ছিলেন উদার। মামলার শুনানির জন্য লাহোর গিয়ে দুজনে ঘুরে বেড়িয়েছেন অবাধ। নিজেদের প্রেমকে তাদের নানা সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন অকপট।

ইসমত চুঘতাইকে বলা হত উর্দু সাহিত্যের ‘চেঙ্গিস খান’। লেখক হিসেবে তিনি সমসাময়িক নারী লেখক তো বটেই, পুরুষ লেখকদেরও টেক্কা দিতে সক্ষম হন। তিনি ছিলেন সেই সময়কার উর্দু সাহিত্যের কিংবদন্তি মান্টোর প্রায় সমপর্যায়ের। ফলে অহর্নিশ প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুমুল ঝড় উঠতো দুজনের মধ্যে। ‘লিহাফ’ বা ‘লেপ’ ইসমতের বহুল আলোচিত সমালোচিত গল্প। এই গল্পের জন্য তাকে আদালত অব্দি যেতে হয়েছে। তৎকালীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের নারীর জন্য এযে কতখানি বিপদসঙ্কুল, দুর্গম পথ ছিল তা বলাবাহুল্য। এমনকি এ সময়টাতে তিনি তাঁর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত চলচ্চিত্র পরিচালক স্বামী শহীদ লতিফের নির্ভরতাও পাননি। তিনি তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও বলেছেন, সে সময় তাঁর স্বামী আদালতের বিষয়টি আপোষে নিষ্পত্তির প্ররোচনা দিতেন। পরবর্তী সময়ে এই ‘লিহাফ’ গল্পেকে কেন্দ্র করে বিতর্কের কারণে তাঁর বিবাহিত জীবনেও তালাকের সংশয় দেখা দিয়েছিল। ইসমত তখন দুই কন্যা সন্তানের জননী এবং সর্বদা কুন্ঠিত থাকতেন লতিফের তালাক প্রদানের আশংকায়। মান্টো ইসমতের সকল নারীসুলভ ভীরুতা নিয়ে চরম ভর্ৎসনা করলেও তিনিই ছিলেন মূলত ইসমতের যোগ্য সহচর। মান্টো পারিবারিক মজলিসে, বন্ধু বান্ধবের সামনে ইসমতকে জেদী, একরোখা আখ্যায়িত করে ইসমতের সামনেই তার চরিত্রের নেতিবাচক দিক নিয়ে পরস্পর প্রচন্ড বাত-বিতন্ডায় লিপ্ত হতেন। এমনও হত তাঁদের ভক্তকুল ভাবত এরপর থেকে হয়তো দুজনকে আর ইহজনমে একসাথে দেখা যাবে না। কিন্তু পরদিন অথবা হপ্তাখানেক পর হয়তো মাঝরাতে ইসমত আইসক্রিম কামড়ে-কামড়ে তুফান বেগে লিখে চলেছেন। সেই সময়ই শব্দ আর ইসমতের মধ্যকার শেলক ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে সুরার বোতল হাতে মান্টো উপস্থিত হয়ে যেতেন সস্ত্রীক। তারপর কোনকিছু ধার না ধরে ইসমতের রান্নাঘরে মান্টো তাঁর স্ত্রী আরো কয়েকজন সঙ্গী সাথী জুটিয়ে নিজেরা রুটি গোশত বানিয়ে উদরপূর্তি করে নিতেন! শেষে সুরার বেতলের শেষ ফোঁটাটুকুও গলায় ঢেলে ফের ইসমতের লেখার খাতার দিকে তাকিয়ে তার আঁকাবাঁকা লেখার জন্য যারপরনাই হেনস্তা করে সে রাতের মতো ক্ষান্ত হতেন।

আবার এই মান্টোই ছিলেন ইসমতের লেখার প্রবল অনুরাগী। ইসমতের বিরুদ্ধে মামলা রজু হওয়ার প্রথম থেকে শেষদিন অব্দি তিনি ছিলেন ইসমতের পাশে।
অশ্লীলতার দায়ে দায়ের করা মামলার শুনানিতে উপস্থিত হতে ইসমত চুঘতাই এবং সাদাত মান্টো দুজনেই লাহোর গিয়েছিলেন। সেসময় তাদের জুটি এত জনপ্রিয় ছিল যে, লাহোর আদালতে দলবেঁধে ছাত্র-ছাত্রীরা আসতো তাদের দেখতে। ইসমত ও মান্টোর বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ক উদার পাঠকের মনে এক ভিন্নতর চিন্তার স্ফুরণ ঘটায়। ইসমতের ‘লিহাফ’ গল্পটি অভিযুক্ত হয় অশ্লীলতার দায়ে, ঠিক ঐ সময়েই মান্টোও অভিযুক্ত হন একই অভিযোগে। যদিও মান্টো পরপর ছয়বার আদালতে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তাঁর লেখার জন্য। ইসমতের কোলে তখন তার শিশুকন্যা। এই অবস্থাতেই তাকে মামলা লড়ে যেতে হয়। পরিবার এবং রাষ্ট্রপক্ষও ইসমতকে চাপ দিচ্ছিল মামলাটি আপোষে নিষ্পত্তির কিন্তু তিনি তা করেননি।আর মান্টো? তিনি তাঁর খামখেয়ালি জীবন, অপরিমিত মদ্যপান এবং ফলশ্রুতিতে নিদারুণ দারিদ্র বয়ে চলা জীবনে মামলার খরচ যোগানোর মতো অর্থ যোগাড় করতে পারেননি, পারেননি কোন চৌকস উকিল ধরতে। কিন্তু মৃত্যুর আগ অব্ধি কলম থামেনি তাঁর। এই সময় ইসমত চুঘতাই নিজের মামলা চলাকালে আদালতেও মান্টোকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘সমাজে বাজে জিনিসের অস্তিত্ব আছে বলেই মান্টো তা লিখছেন।’ সাদাত ইসমতের এই ক্ষুরধার, আপোষহীন চরিত্রকে ভালোবাসতেন। তিনি ইসমতকে দেখতে চাইতেন, ‘যে নারী পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধের মাঠে লড়ে, পাহাড় কাটে আর গল্প লিখতে লিখতে ইসমত চুঘতাই হয়। সেই নারী আবার হাতে মেহেন্দিও পড়ে।’ মান্টো ইসমতকে ভালোবাসতেন। মান্টো লিখেছেন- ‘ইসমতের ক্রোধ শিশুসুলভ। তবে তার কলম এবং মুখ দুটোই ধারালো’ (গাঞ্জে ফরিস্তে)। ইসমতের তীক্ষ্ম নজরে রান্নাঘরের খবরদারি থেকে শুরু করে, স্থির, অবিচল অধ্যাবসায়ে বাচ্চার ফ্রক সেলাই-কোনটাই মান্টোর চোখ এড়াতো না। একি কেবল গল্পের খোঁজে! না! আসলে মান্টোর চোখই ইসমতে মুগ্ধ ছিল। দর্জি হিসেবেও ইসমতের দক্ষতা পাঠককের সামনে মান্টোই এনেছিলেন। নিজের বাচ্চাদের ফ্রক তিনি নিজেই সেলাই করতেন। মান্টো বলতেন, ইসমতের পাতার পর পাতা আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় দুএকটা বা তারও বেশি ভুল বানান থাকতেই পারে, কিন্তু বাচ্চার ফ্রক সেলাইয়ে ফোঁড়ের এদিক-ওদিক হয়না কখনো! কোথাও এক ইঞ্চি ঝুল মাপে কমবেশি হচ্ছে না। চারপেয়েতে কনুইয়ে ভর দিয়ে কাত হয়ে বালিশের ওপর কাগজ নিয়ে ইসমত লিখতেন। একহাতে ফাউন্টেনপেন অন্যহাতে আইসক্রিমের ডাঁটি।
ইসমত বরফ খুব পছন্দ করতেন। আইসক্রিম খেতে খেতে তিনি তাঁর বহু গল্প লিখেছেন। শিশুদের মতো চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি আইসক্রিম খেতেন। এই সমস্ত বিবরনই মান্টো তাঁর ‘গাঞ্জে ফরিস্তে’ বইটিতে লিখে গিয়েছেন। মান্টো অনেক লিখেছেন ইসমতকে নিয়ে, সে তুলানায় ইসমতের লেখায় ‘মান্টো ভাই’ কিংবা ‘মান্টো সাহাব’ কেই বেশি পাওয়া গেছে। ব্যক্তি মান্টো-যাঁকে ঘিরে ইসমতের প্রেম ও নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল অথবা ইসমত যে মান্টোর সৃষ্টির প্রেরণা ছিলেন, তাঁকে নিয়ে ইসমত খুব কমই লিখেছেন। অথচ নিজে কিন্তু লেখার সময় পেয়েছিলেন মান্টোর চেয়ে বেশি! ইসমতকে জানতে জানতে পাঠক মান্টোকেই ভালোবেসে ফেলবে অবশ্যম্ভাবী। কারণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে মান্টো ছিলেন অবিচল। নিজেকে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন অকপট। মান্টো অন্য কারো চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হতে ঘেন্না করে। তার ধারণা যারা তাকে শিক্ষা দিতে যায়, তারা ইডিয়ট ছাড়া আর কিছু নয়। ‘আমি তোমাদের খুব জোর গলায় বলতে পারি যে মান্টো, যার বিরুদ্ধে এত অশ্লীলতার অভিযোগ রয়েছে, আদতে সে আগামাথা ভদ্রলোক। কিন্ত এ-কথাও বলে রাখি এর সঙ্গে যে, সে আসলে নিরন্তর ঝাড়পোছ করে চলেছে নিজেকে।’ এই হল মান্টোর নিজের সম্পর্কে নিজের ব্যাখ্যা! যে মানুষ নিজকে এতটা ভালো চেনে তারপক্ষেই তো সম্ভব অন্যের মন বোঝা। হাতের কাছে পেয়েওছিলেন ইসমতের মত একজনকে। মান্টোতো লিখেইছেন- ইসমতের মধ্যে নারীসত্তা ও পুরুষ প্রকৃতির মধ্যে আজব ধরণের জেদ ও অসম্মতি বিদ্যমান। হয়তো প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে কিন্তু প্রকাশ্যে অনীহা প্রকাশ করে যাচ্ছে। চুমো খাবার জন্য হয়তো প্রাণ তার মাথা কুটে মরছে, কিন্তু চুমোর বদলে সে গালে সুঁচ চালিয়ে দিয়ে তামাশা দেখবে। তার প্রেম খেলাচ্ছলে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে তা ফল্গুধারা হয়ে পরিণতি প্রাপ্ত হয়। ুপ্রথমদিন দেখা সেই ববছাঁট, চিকনপাড়ের শাড়ি আর আঁটসাট ব্লাউজ পরনের নারীটি, যার নাকি অল্প হাসিতেই গালে টোল পড়ত- মান্টো আজীবন সেই নারীর লাবণ্যময়তাকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন। আর ইসমতের কথা তেমন জানিনা, কারণ মান্টো নিজেই তো বলেছেন, ইসমত চুমু খাওয়ার সময়ও গালে সুঁচ ফুটিয়ে মজা দেখার মত গভীরেই লুকিয়ে রাখতেন সমস্ত মনোবাসনা!
ইসমত মান্টোর বিয়ের বিষয়টি ছিল বহুল আলোচিত। ভক্তদের কৌতূহল ছিল মান্টো ইসমতকে বিয়ে করছেন না কেন! আশ্চর্যজনকভাবে এই বিষয়ে দুজনেই ছিলেন উদাসীন। ইসমতকে বিয়ে করা না করা নিয়ে মান্টো একটি সুন্দর উপমা দিয়েছিলেন- ‘ক্লিওপেট্রার নাক যদি এক ইঞ্চির আঠারো ভাগের একভাগ বড় হত, তাহলে তার প্রভাবে নীলনদের ইতিহাসের কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত।’ সংবেদনশীল পাঠক ভক্ত এই কথার অন্তর্নিহিত রস গ্রহণ করতে পারলেও বহু আলোচক সমালোচকের চক্ষুশূল ছিল তাদের এই উদাসীনতা। এক হায়দ্রাবাদী বন্ধুর চিঠির জবাবে মান্টো তাকে একটি উত্তর পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ইসমতকে নিকাহ করা না করা নিয়ে লিখেছিলেন, “Had we thought of getting married, than instead of drowing others in wonder and agitation we ourselves would have been drowned in it. And when we would have come to our sense after the initial shock, than our wonderments and agitation would have changed not in to joy but sorrow. Ismat and Manto nikha and marriage -what a ludicrous idea!” মান্টোকে জানতে জানতে মনে হতেই পারে মান্টো শুধুই সুরাসক্ত, ব্রীজপ্রেমী আর ইসমতের একনিষ্ঠ প্রেমে মজে থাকা এক পুরুষ। আসলে কিন্তু তা নয়! মান্টো ছিলেন উদার স্বামী, প্রেমময় পিতা। তিনি তাঁর স্ত্রীর কাপড় ইস্তিরি করে দিতেন। সে যুগে যখন পুরুষ জল গড়িয়ে খেতে সম্মানহানি ভাবতো মান্টো তখন রান্না করতেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিতে ও যাপিত জীবনে আধুনিক ছিলেন। তেমনি ইসমতের সাথেও মান্টোর স্ত্রী সাফিয়ার গভীর সখ্যতা ছিল। সাফিয়া প্রায় ইসমতকে বলতেন, সা’সাহাব (সাদাত সাহেব) এর কথা তিনি বলতে পারবেন না, তবে নিজে ইসমতের প্রেমে মুগ্ধ। আর ইসমত তার স্বভাবজাত ক্ষুরধার জবাবে বলতেন, ‘তোমার বয়েসী মেয়ের বাপেরা অব্দি আমার প্রেমে পড়ে! ’ বম্বে টকিজ-এ ইসমত মান্টো একসাথে বহু কাজ করেছেন। বলা যায় সেই সময়টা তাদের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। ইসমতের প্রতি মান্টোর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল সবার চেয়ে বেশি। ইসমতের বড়ভাই মির্জা আজিম বেগ চুঘতাইকে নিয়ে ইসমত একটি গল্প লিখেছিলেন, নাম ‘দোজখী’। কিছু অকাট সত্যকথনের জন্য গল্পটি নিন্দিতও হয়েছিল তখনকার সময়ে। মান্টোর বোন-ইকবাল বলেছিলেন, ‘হতচ্ছাড়ি নিজের মৃত বড়ভাইকেও রেহাই দিলনা।’ মান্টো তখন বলেন,চইকবাল, আমার মৃত্যুর পর এমন একটি গল্প যদি তুমি লিখবে বলে কথা দাও, আমি আজ, এক্ষনি মরতে প্রস্তুত।’
মান্টো ইসমতের প্রথম যে গল্পটি পড়েন, সেটি হল ‘লিহাফ’। যেহেতু তাদের দুজনারই লেখার বিষয় মূলত সমাজের রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অসংগতি, মান্টোর নজর কাড়ে গল্পটি। মান্টো চাইলেন এই গল্পের লেখকের সাথে আলাপ করতে। দেখা হতেই মান্টো ইসমতকে বললেন, ‘আপনার লেহাপ গল্পটি পড়েছি। গল্পের বর্ণনায় আপনার সংযম অতুলনীয়। কিন্তু আমি ভেবে পাইনা আপনি গল্পের শেষে এই কথাটা কেন লিখলেন যে-“এক ইঞ্চি উপরের দিকে উঠানে লেপের ফাঁকে দিয়ে আমি কি দেখেছি, লক্ষ টাকা দিলেও আমি কাউকে তা বলব না।” ইসমত তখন বললেন,‘কেন এ লাইনটায় অসংগতি কোথায় ?’ মান্টো ফের কিছু বলতে যাবার আগেই ইসমত মান্টোর কথার মর্মার্থ বুঝে ফেলেন, আর লজ্জিত হন। আসলে ইসমত সেই সময়কার সমাজের দৃষ্টিতে অনৈতিক অথচ নিত্য ঘটে যাওয়া সত্যের বিবরণ তার লেখনীতে প্রকাশ করতেন নানা উপমায়। যৌনতা, সমকামিতা, নারীর প্রতি পুরুষের বৈষম্যমূলক আচরণ সবই তুলে ধরেছেন তার গল্পে একটি সংযত ভাষাশৈলীর আড়ালে। কিন্তু মান্টোর লেখার ধাঁচ ছিল তাঁর মুখের মতই আড়হীন। তাঁর কলম ছিল উলঙ্গ। হিন্দুস্থানে নানা চরাই-উৎরাই পেড়িয়ে ইসমত শক্তপোক্ত স্থান দখল করে নিলেন বটে, মান্টোর তা হলো না। দেশবিভাগের পর ইসমত হিন্দুস্থানে রয়ে গেলেন, মান্টো তার বন্ধুদের আপত্তি সত্ত্বে চলে যান লাহোর। তিনি কেন যে এতটা বেতাব ছিলেন লাহোর যাবার জন্য তা রহস্যময়। অথচ তখন বম্বে ফিল্ম ইন্ড্রাস্টিতে মান্টোর ক্যারিয়ার তুঙ্গে। তখন খুব কম শিল্পী, সাহিত্যিকই হিন্দুস্থান ছেড়ে ছিলেন। দেশবিভাগের সাথে সাথেই মান্টো লাহোর চলে আসেন। আর লাহোরে কাটানো জীবনের বাকি সময়টুকুই ছিল তাঁর জীবনের অগ্নিপরীক্ষা। ইংরেজ সরকার কর্তৃক দায়ের করা অশ্লীলতার অভিযোগে নবগঠিত পাকিস্তান সরকারও তুলে নিলেন না। ফলত লাহোর গিয়েও মান্টের রাষ্ট্র ও ধর্মব্যবসায়ী চক্রের ক্ষোভের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি। মান্টোর সত্য প্রকাশের দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে প্রগতিশীল লেখক সংঘেরও বিরুদ্ধ করে তুলেছিল। সে সময় কোন সংবাদপত্রই মান্টোর লেখা প্রকাশ করতে আগ্রহী হত না, মামলার ভয়ে। অথচ তখন এটাই ছিল মান্টোর উপার্জনের একমাত্র রাস্তা। নিম্নমানের সুরাপান, দারিদ্র্য, একের পর এক মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা মান্টোর জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। দেশবিভাগের রক্তাক্ত দলিল বসে গেল দুটি দেশের মানুষের অন্তরে। প্রেম, সমপ্রতি, ভ্রাতৃত্বের মাঝখানের কাঁটাতারের বেড়া দুর্বল তো হলোই না , পরতে-পরতে বেড়েই গেল। বাড়লো ধর্মের নামে হানাহানি। মান্টোর কলম সেখানেও থামেনি। লাহোর গিয়ে শুরু হয় মান্টোর নতুন জীবন, নতুন সংগ্রাম। একদিকে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, অন্যদিকে সংসারের নিদারুণ দারিদ্র্যের কষাঘাত। মান্টো এতটাই বেপর্দাভাবে সমাজের কুলীন সমাজের নোংরা কাহিনী ও দেশবিভাগের পরবর্তী সহিংসতা তুলে আনছিলেন যে, তিনি সকলের চক্ষুশূল হয়ে গেলেন। তাঁর নতুন প্রকাশিত কোন গল্পের কাহিনী পত্রিকায় এলেই সুশীল সমাজ ভয়ে তটস্থ হত- না জানি এবার কার ভান্ড উজাড় হল এই ভেবে!
লাহোরে এসে মান্টোর জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ, সীমাহীন অর্থকষ্ট। একসময় মান্টো মানসিক ভারসাম্য হারান। তাঁকে মেন্টাল এস্যাইলামে রেখেও সুস্থ করার চেষ্টা চালান স্ত্রী সাফিয়া। দেশ বিভাগের বিয়োগান্তক স্মৃতি, চারপাশের নির্বান্ধব পরিবেশ, পদে পদে চতুর সম্রাজ্যবাদী মুদ্রাওয়ালাদের কাছে হেরে যাওয়া মান্টোর কাছে বিষবত মনে হচ্ছিলো। মান্টোর লেখার ভক্ত ছিল, মান্টোর বইয়ের কাটতি ছিলো কিন্তু রাষ্ট্র ও ধর্মব্যবসায়ী সুবিধাবাদী চক্রকে টেক্কা দিয়ে মান্টোর লেখা ছাপানোর মতো সাহসী প্রকাশক, সম্পাদক ছিল না। আবার অনেকে মান্টোর বিষয়বুদ্ধিহীনতার সুযোগ নিয়ে তাকে না জানিয়েই তার বইয়ের সংস্করণ বের করে অর্থ লুটে নেয়। মান্টো এসব কিছুই বুঝতেন না। কাগজ, কলম আর সুরা ছাড়া মান্টোর কোনো আসক্তি ছিলোনা। ফিল্মের নামী হিরোইন থেকে শুরু করে মজলিসের নৃত্য শিল্পী অব্দি মান্টোর গল্পের প্রেমে মুগ্ধ ছিলো। পতিতার শয়নকক্ষ থেকে পর্দার আড়ালে অন্তরীণ গৃহবধূর অলস দুপুরেও মান্টোর বই রাজত্ব করত। মান্টো এসব নারীর কথাই তার লেখনীতে তুলে আনতে পেরেছিলেন, যা একজন পুরুষ লেখকের জন্য বিস্ময়। তিনি নারীর শরীর, নারীর প্রতি মোহকে ছাপিয়ে নারীর চোখের জল দেখেছিলেন। এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও মান্টোর দারিদ্র্য তাকে রেহাই দেয়নি। জীবনের শেষদিকে তিনি লিভারসিরোসিসে আক্রান্ত হন। মান্টোর লাহোরে আসার পরের যে নিদারুণ দুর্ভোগ এতে আর ইসমতকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি সশরীরে। চিঠিপত্রের আদান প্রদানের একপর্যায়ে হতোদম্য মান্টো বারবার ইসমতকে লিখেছেন-‘আমাকে যে করেই হোক এখান থেকে নিয়ে যাও, এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।’ অথচ ইসমতের তেমন কোন ভূমিকা আর দেখা যায়নি। মান্টো ঠকতে ঠকতে বুঝে গিয়েছিলেন বিষয়বুদ্ধি তার এ জীবনে হবে না। তাই তার সমস্ত বইয়ের স্বত্বাধিকারী করে যান তার স্ত্রী সাফিয়াকে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে লিভারসিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন মান্টো। জীবিতকালে নিজের সৃষ্টির কোনো মূল্যায়ন দেখে যেতে পারেননি। ইসমত পেয়েছেন দীর্ঘজীবন। তাকে নিয়ে বায়োপিক, সচিত্র প্রতিবেদন কম হয়নি। এত যুগ পেরিয়েও পাঠকের মনে ইসমত-মান্টোর গ্রহণযোগ্যতা কমেনি এতটুকু। সবকিছু ছাপিয়ে মান্টো এখনও হৃদয়রাজা!