Wednesday, November 24, 2021

বন্ধ হবে চুল পড়া, বাড়বে চুলের বৃদ্ধিও

ঝলমলে ও সুন্দর চুলের জন্য নিয়মিত চাই ঘরোয়া যত্ন। তেলের ৪ ধরনের মিশ্রণের সাহায্যে বন্ধ করতে পারেন চুল পড়া। পাশাপাশি চুলের দ্রুত বৃদ্ধিতেও কার্যকর এগুলো।
  • ১ টেবিল চামচ মেথি ও ১ টেবিল চামচ কালোজিরা আলাদা আলাদা করে গুঁড়া করে নিন। ১টি কাচের বোতলে ১০০ মিলি নারকেল তেল নিয়ে মেথি ও কালোজিরা গুঁড়া দিয়ে ঝাঁকিয়ে নিন। একটি বড় প্যানে পানি ফুটিয়ে নিন। ফুটে উঠলে নামিয়ে তেলের বোতল পানির মধ্যে বসিয়ে দিন ১৫ মিনিটের জন্য। কড়া রোদে আরও ৫দিন রেখে ব্যবহার করুন এই তেল।
  • ২ কাপ নারকেল তেল গরম করুন। গরম তেলে ১ মুঠো কারি পাতা ও ৫-৬টি পেঁয়াজ কুচি করে দিয়ে দিন। ফুটে উঠলে জ্বাল কমিয়ে রেখে দিন চুলায়। ৪০ মিনিট পর নামিয়ে পুরোপুরি ঠাণ্ডা করুন। রাতে ঘুমানোর আগে এই তেল ম্যাসাজ করুন চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত। পরদিন সকালে মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • সমপরিমাণ ক্যাস্টর অয়েল ও নারকেল তেল ভালো করে মিশিয়ে একটি কাচের বোতলে নিয়ে নিন। একটি বড় প্যানে পানি ফুটিয়ে নিন। ফুটন্ত পানি নামিয়ে তেলের বোতল রাখুন পানির মধ্যে। গরম হয়ে গেলে মিশ্রণটি চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগিয়ে শাওয়ার ক্যাপ পরে নিন। ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে ভেষজ শ্যাম্পুর সাহায্যে ধুয়ে ফেলুন।
  • সমপরিমাণ নারকেল তেল ও অলিভ অয়েল প্যানে গরম করে নিন। কুসুম গরম থাকা অবস্থায় চুলে ম্যাসাজ করুন। ৪০ মিনিট অপেক্ষা করে মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • ১ চা চামচ করে অ্যালোভেরা জেল, মধু ও ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি চুলে লাগিয়ে রাখুন। শুকিয়ে গেলে রেগুলার শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
>>>তথ্য: গ্লো পিঙ্ক 

Wednesday, November 17, 2021

ডাবের পানি ১১ রোগের ওষুধ

ডাবের পানি খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা । একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে শুধু গরমকাল নয়, সারা বছর যদি নিয়ম করে ডাবের পানি খাওয়া যায়, তাহলে একাধিক রোগ শরীরের ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না। শুধু তাই নয়, ডাবের পানি উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, মেঙ্গানিজ এবং জিঙ্ক নানাভাবে শরীরে গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব উপাদানই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন পরে।
১. ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে : ডাবের পানি হলো প্রকৃতিক টোনার, যা ত্বককে সংক্রমণ থেকে বাঁচানোর পাশাপাশি সার্বিকবাবে স্কিনের ঔজ্জ্বলতা বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে ব্রণর প্রকোপ কমাতেও এই প্রাকৃতিক উপাদানটি সাহায্য করে থাকে।
২. ওজন কমবে : ডাবের পানি উপস্থিত বেশ কিছু উপকারি এনজাইম হজম ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মেটাবলিজমের উন্নতিতেও সাহায্য করে থাকে। ফলে খাবার খাওয়া মাত্র তা এত ভালো ভাবে হজম হয়ে যায় যে শরীরের অন্দরে হজম না হওয়া খাবার মেদ হিসেবে জমার সুযোগই পায় না। ফলে ওজন কমতে শুরু করে। ডাবের পানি শরীরে লবনের মাত্রা ঠিক রাখে। ফলে ওয়াটার রিটেনশন বেড়ে গিয়ে ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কাও হ্রাস পায়।
৩. ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকবে : ডাবের পানি উপস্থিত ভিটামিন সি, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে থাকে। সম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান মেডিকেল জানার্লে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে পটাশিয়াম শরীরে লবনের ভারসাম্য ঠিক রাখার মধ্যে দিয়ে ব্লাড প্রেসারকে স্বাভাবিক রাখে। তাই যাদের পরিবারে এই মারণ রোগটির ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত ডাবের পানি খাওয়া উচিত। একই নিয়ম যদি রক্তচাপে ভোগা রোগীরাও মেনে চলেন, তাহলেও দারুণ উপকার মেলে।
৪. ব্লাড সুগারকে বেঁধে রাখবে : ২০১২ সালে হওয়া জার্নাল ফুড অ্যান্ড ফাংশন স্টাডিসে দেখা গিয়েছিল ডাবের পানিতে থাকা অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং ডায়াটারি ফাইবার ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হবে : রাইবোফ্লবিন, নিয়াসিন, থিয়ামিন এবং পাইরিডোক্সিনের মতো উপকারি উপদানে ভরপুর ডাবের পানি প্রতিদিন পান করলে শরীরের অন্দরের শক্তি এতটা বৃদ্ধি পায় যে জীবাণুরা কোনওভাবেই ক্ষতি করার সুযোগ পায় না। সেই সঙ্গে ডাবের পানিতে উপস্থিত অ্যান্টি-ভাইরাল এবং অ্যান্টি-ব্য়াকটেরিয়াল প্রপাটিজ নানাবিধ সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৬. শরীরে পানির ঘাটতি দূর হবে : ডাবের পানি শরীরের অন্দরে প্রবেশ করা মাত্র পানির ঘাটতি মিটতে শুরু করে। সেই সঙ্গে এতে উপস্থিত ইলেকট্রোলাইট কম্পোজিশান ডায়ারিয়া, বমি এবং অতিরিক্ত ঘামের পর শরীরে ভিতরে খনিজের ঘাটতি মেটাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই কারণেই তো গরমকালে ডাবকে রোজের সঙ্গী করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।
৭. হার্টের টনিক : শরীরে বাজে কোলেস্টেরল বা এল ডি এল-এর পরিমাণ কমিয়ে হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ডাবের পানির কোনো বিকল্প হয় না বললেই চলে। শুধু তাই নয়, দেহে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমাতেও ডাবের পানি বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে।
৮. মাথা যন্ত্রণা দূরে থাকবে : ডিহাইড্রেশনের কারণে মাথা যন্ত্রণা বা মাইগ্রেনর অ্যাটাক হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে দ্রুত এক গ্লাস ডাবের পানি খেয়ে নেবেন। এমনটা করলে দেখবেন নিমেষে কষ্ট কমে যাবে। আসলে এই প্রকৃতিক উপাদানটিতে উপস্থিত ম্যাগনেসিয়াম, এই ধরনের শারীরিক সমস্যার চিকিৎসায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৯.শরীরের বয়স কমবে : খাতায় কলমে বয়স বাড়লেও শরীরের বয়স কি ধরে রাখতে চান? তাহলে আজ থেকেই ডাবের পানি খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন উপকার পাবেন। আসলে ডাবের পানি রয়েছে সাইটোকিনিস নামে নামে একটি অ্যান্টি-এজিং উপাদান, যা শরীরের উপর বয়সের ছাপ পরতে দেয় না। সেই সঙ্গে ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।
১০. কিডনি ফাংশনের উন্নতি ঘটবে : প্রচুর মাত্রায় পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকার কারণে ডাবের পানি কিডনির কর্মক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে শরীরে উপস্থিত টক্সিন উপাদানদের ইউরিনের সঙ্গে বের করে দিয়ে নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমায়।
১১. স্ট্রেস কমবে : বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ডাবের পানি উপস্থিত ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম শরীরের অন্দের প্রবেশ করার পর একদিকে যেমন স্ট্রেস কমায়, তেমনি পেশীর সচলতা বৃদ্ধিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এখানেই শেষ নয়, ডাবের পানিতে থাকা ক্যালসিয়াম দাঁত এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

Tuesday, November 16, 2021

কাবুলের চোর এবং কারজাই পরিবার

গ্রন্থ পর্যালোচনাঃ জোনা ব্যাঙ্ক # অনুবাদ : হাসান শরীফ>
‘এটা একটা চোর-ছ্যাঁচড়দের সরকার। আর এর যে পালের গোদা, সে হলো একটা নির্লজ্জ ছিঁচকাদুনে।’ সোজা-সাপ্টাভাবে বলতে গেলে, প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই সরকার সম্পর্কে এমন ধারণাই ছিল আফগানিস্তানে অবস্থানকারী বিদেশি পর্যবেক্ষকদের। তাদের মতে, কারজাই এত গুরুভার নেয়ার মতো লোক ছিলেন না। বলা যেতে পারে, তিনি যুদ্ধবাজের ভূমিকা পালনকারী এক নন্দনতত্ত্ববিদ। তিনি যে কাজকর্ম করে যাচ্ছিলেন, সেটা যে তার পদের সাথে মানানসই ছিল না। কিন্তু সেটা জেনেও তিনি তা থেকে সরে দাঁড়াননি। তাদের মতে, তার ১৩ বছরের আমলে আফগানিস্তান যোগ্য নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে, দেশটি অস্থিতিশীলতা আর দারিদ্র্যের দিকে আরো প্রবল বেগে ধেয়ে গেছে। কারজাই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অব্যাহতি নেয়ার পাঁচ বছর আগে সেই ২০০৯ সালেই কাবুল আর ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কে মারাত্মক চির ধরে। কারজাইয়ের অদক্ষতার কারণেই মূলত এমনটা হয়।
পর্যবেক্ষকদের এই ছবিটা কতটুকু সত্য? যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান সম্পর্কের অবনতির জন্য কারজাই আসলেই কতটুকু দায়ী? বিষয়টা দুর্দান্তভাবে বিশ্লেষণ করেছেন যশুয়া পার্টলো। তার বই অ্যা কিংডম অব দেয়ার ওন : দি ফ্যামিলি কারজাই অ্যান্ড দি আফগান ডিস্যাস্টার -এর প্রধান বিষয় এটাই।
অবশ্য যেকোনো ধরনের বিরোধে দুই পক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায় দুই ধরনের কাহিনী।
আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কারজাই বীরোচিত ব্যক্তি হিসেবে শুরু করেছিলেন। শক্তপোক্ত ও সুদর্শন এই লোকটিকে পাশ্চাত্যের অনেকে তাকে তার জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যতিক্রমী লোক হিসেবে মনে করেছিল।
অবশ্য ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলা শুরু হওয়ার পর দেশটির শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়ার দাবিদারও ছিল খুব কম। তালেবানবিরোধী সবচেয়ে সক্ষম কমান্ডার আহমদ শাহ মাসুদ ১১ সেপ্টেম্বরের মাত্র দু’দিন আগে আল-কায়েদার হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন। সন্ত্রাসী হামলার ফলে আমেরিকা আক্রমণ শুরু করতে পারে, এমনটা বুঝতে পেরে ওয়াশিংটনের কাজে লাগার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ব্যক্তিটিকে চিরদিনের জন্য সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে তারা। তবে মাসুদ বেঁচে থাকলেও খুব সহজে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন না। জাতিগতভাবে তিনি ছিলেন তাজিক। আর আফগান রাজনীতিতে ১৮ শতক থেকে বিপুলভাবে পশতু প্রাধান্যপূর্ণ। ফলে কোনো তাজিকের পক্ষে সেখানে সরকার পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ। সবচেয়ে মুগ্ধতা সৃষ্টিকারী পশতু নেতা ছিলেন এক পায়ের আবদুল হক। লাইমলাইটে থাকতে ইচ্ছুক এই মুজাহিদ কমান্ডারকে আমেরিকান কর্মকর্তারা ডাকতেন ‘হলিউড হক’ বলে। কিন্তু মাসুদ মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনিও নিহত হন। এটাও ঘটে তালেবানের হাতে।
মাসুদ, হক এবং প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আফগানিস্তানের অন্য সম্ভাব্য নেতাদের চেয়ে কারজাই ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটি ২০ বছর ধরে যুদ্ধে বিধ্বস্ত হলেও কারজাই একবারের জন্য যুদ্ধ দেখেননি। যুদ্ধের সাথে তার পরিচিত ঘটে ২০০১ সালে, মার্কিন হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। ইউএস গ্রিন বেরেট সৈন্যরা তাকে চুপিসারে দক্ষিণ আফগানিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকাটা তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুকূলে ছিল না। তবে আফগান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যায়, তিনি ছিলেন ঠিক অবস্থানে। একদিকে তিনি পশতু, তালেবানবিরোধী দুররানি ধারার পোপালজাই গোত্রের। আমেরিকানদের দৃষ্টিতে, তাকে দেখতে-শুনতে নেতার মতোই লাগে।
কারজাইকে ১৯৯০-এর দশক থেকে চিনতেন, এমন অনেকে মাঝারি মানের এক নেতা থেকে রাতারাতি বিশ্বকে মোহিতকারী লোকে পরিণত হতে দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন। তখন বড়জোর তিনি ছিলেন এক ‘গোত্রীয় নেতা।’ তারপর হঠাৎ করে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীতে সম্মানিত হতে লাগলেন, এমনকি ২০০২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়ে গেলেন।
অবশ্য ২০০৯ সাল নাগাদ, কারজাই আর মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যকার মধুর সম্পর্কটা খুবই তেতো হয়ে যায়। ওয়াশিংটনের মতে, ‘কারজাই পরিচিত ছিলেন আপস করতে আগ্রহী আপসকামী হিসেবে।’ ওয়াশিংটন মনে করত, কারজাই তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি, চেষ্টাও করেননি। তার সরকার বিশেষ করে তার স্বজনরা যে ভয়াবহ মাত্রায় দুর্নীতি করেছে, তিনি সে দিকে চোখ পুরোপুরি বন্ধ করেছিলেন। আমেরিকানরা তাদের যুদ্ধের ব্যাপারে অনীহ যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে দেখেছে। তাদের কাছে তিনি স্বার্থান্বেষীদের কান পরামর্শে চলেন। এমনকি আমেরিকান সৈন্যদের অব্যাহতভাবে অপমান করা সত্ত্বেও এক ‘অকৃতজ্ঞকে’ ক্ষমতায় বহাল রেখেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কারজাই কোনো সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারেন না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার ব্যাপারে আগ্রহী নন। আবার তালেবানকে তার ‘ভাই’ হিসেবে অভিহিত করে ন্যাটো সৈন্যদের দখলদার হিসেবেও অভিহিত করেছেন। ২০১০ সালে কারজাই যখন তার পদ ছেড়ে নিজেই তালেবান বাহিনীতে যোগ দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, তখন অনেক আমেরিকানই দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল। অনেকে তো মনে করেছিল, তিনি সত্য কথা বলছেন।
অন্যদিকে কারজাইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাষ্ট্র হলো বন্ধুর মুখোশ পরে থাকা শত্রু। আফগানিস্তানে পরাশক্তিগুলোর এটা পুরনো ভূমিকা : ১৯ শতকে ব্রিটিশরা এই পথ দেখিয়েছিল, তারপর ১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন একই ভূমিকায় নেমেছিল। কারজাই এবং আরো অনেক আফগান বিশ্বাস করেন, আগের পরাশক্তিগুলো যেসব ভুল করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সেগুলোই অনেকাংশে পুনরাবৃত্তি করছে। মুক্ত করতে আসা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী শিগগিরই বিবেচিত হবে দখলদার বাহিনী।
পূর্বসূরি সোভিয়েতদের মতো নতুন দখলদাররাও স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি আঘাত হেনেছিল, তারা কী ক্ষতি করছে সেটা না জেনেই। সবচেয়ে ক্ষতিকর ছিল অজ্ঞতার বশে আফগানদের ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়গুলো পদদলিত করা : বিদেশি সৈন্যদের রাত্রিকালীন অভিযানের সময় কৃষকদের বাড়িতে কুকুর প্রবেশ করানো, অস্ত্রের সন্ধানে ধর্মীয় সীমা লঙ্ঘন করে নারীদের তল্লাসি, এমনকি কারাগারের কক্ষ পরিষ্কার করার সময় পবিত্র কোরআনের পাতা পুড়িয়ে ফেলা। এসব ব্যাপারে কারজাই যখন ক্ষোভ প্রকাশ করতেন, তখন তিনি সত্য সত্যই তার জনগণের পক্ষে কথা বলতেন।
অন্যদিকে আমেরিকানরা যখন দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির কথা বলত, কারজাইয়ের চোখে তখন পড়ত কেবল আফগান রাজনীতির শীতল বাস্তবতার দিকে, যেখানে পরিবারের আনুগত্যই সর্বোচ্চ বিষয়।
পার্টলোর বইতে কারজাইয়ের সৎভাই আহমদ ওয়ালি কারজাইকে পরিবারটির গডফাদার হিসেবে দেখানো হয়েছে। সাধারণভাবে তার পরিচিতি ছিল এডব্লিউকে। উদার, হিসাবি, ক্যারিশমেটিক এবং সেইসাথে কিংমেকার এই লোকটি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডে এক রেস্তোরাঁয় বেয়ারার কাজ করতেন। পরে কান্দাহার প্রদেশে তার উত্থান ঘটে। মার্কিন সরকারের বিভিন্ন স্তরে তিনি একইসাথে প্রিয়ভাজন ও ঘৃণিত ছিলেন। কাবুলে শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা যে ধরনের ভয়ঙ্কর যুদ্ধবাজদের উৎখাত করার চেষ্টা তারা করছেন, কারজাইকে তেমনই বিবেচনা করতেন। আবার কান্দাহারে, যেখানকার বেশিরভাগ বৈধ-অবৈধ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন এডব্লিউকে, গুপ্তচর ও সামরিক নেতারা তাকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভাবতেন। তাদের কাছে সরকারের অন্য সদস্যদের চেয়ে তার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।
কারজাই তার সৎভাইয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্য এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিদের ব্যক্তিগত মিলিশিয়া ছিল। তাদের সম্পদ ছিল যথেষ্ট, অন্যদের বশ করতে কিংবা কিনে নেয়ার সামর্থ্য ছিল তাদের।
কারজাইয়ের এসবের কিছুই ছিল না। কাগজে-কলমে তার ক্ষমতা ছিল বিপুল, কিন্তু বাস্তবে এগুলো ছিল মূল্যহীন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য আমেরিকান দেহরক্ষীদের ওপর ভরসা করার জন্য অনেকে তাকে ‘কাবুলের মেয়র’ বলে বিদ্রুপ করত। এমন প্রেক্ষাপটে এডব্লিউকেই তাকে খাতাপত্রে থাকা তার প্রজাদের ওপর তাদের ছড়ি ঘোরানোর কিছু শক্তির ব্যবস্থা করে দিতেন। আমেরিকানরা যখন কারজাইকে তার ভাইকে নির্বাসনে পাঠানোর জন্য চাপ দিত, তারা এই কাজটা অনেকবারই করেছে, তখন তার প্রত্যাখ্যান করাটা ছিল অতি স্বাভাবিক।
কারজাইয়ের ভাই মাহমুদ কারজাই আবার নিজের অপরাধ করতেন বেপরোয়াভাবে। অনেকে তাকে ‘আফগান ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবে অভিহিত করেন। ২০১০ সালে কাবুল ব্যাংকের পতনের সময় তার কাছে পাওনা ছিল ২২ মিলিয়ন ডলার। এখন পর্যন্ত এর এক-তৃতীয়াংশ অনাদায়ী রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কারজাইয়ের বক্তব্য একেবারে সরল : মাহমুদ কারজাই যদি অপরাধী হয়ে থাকে, তবে আফগান এলিটদের বেশিরভাগই তা-ই।
তাছাড়া কাবুল ব্যাংক পতনে কেবল আফগানদের ভূমিকাই ছিল, এমন নয়। ব্যাংকটির শীর্ষ পদে ছিলেন আমেরিকানরা। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন তারাই। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলোকে যারা দেউলিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তারাই এখানে কলকাঠি নেড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কি এসব অপরাধের জন্য কারো বিচার হয়েছে? প্রশ্নটা কিন্তু হামিদ কারজাই নানাভাবে করেছেন।
কারজাইয়ের সবচেয়ে বড় অপরাধ কোনটি? তিনি অযোগ্য, অস্থিরমতি, দুর্নীতিগ্রস্ত, তার পরিবার ও মিত্রদের পাশবিকতা ও অপশাসন? না, এগুলোর কোনোটিই নয়। এগুলোর সবই বৈধ অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্র আসলে এ ধরনের অপরাধ আমলে নেয় না। গুল আগা শিরাজি, আবদুর রাজ্জাক, ইসমাইল খান, আতা মোহাম্মদের মতো অসংখ্য মার্কিন মিত্র পাওয়া যাবে, তাদের এর চেয়েও ভয়াবহ অপরাধের বিচার তো দূরের কথা, অভিযোগ পর্যন্ত উত্থাপিত হতে দেয়া হয়নি।
হ্যাঁ, কারজাইয়ের একটা অপরাধ ছিল, যা ক্ষমার অযোগ্য। সেটা হলো তার অকৃতজ্ঞতা। আমেরিকান সৈন্যরা যখন তার জীবন রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন দিচ্ছিল, তখন তিনি তাদের গালি দিচ্ছিলেন, তাদের আত্মত্যাগকে তাচ্ছিল্য করছিলেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ইউএস স্পেশাল ফোর্স ‘নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি, উৎপাত, নির্যাতন এবং এমনকি খুনও করছে।’ ২০১২ সালে কোরআন পোড়ানোর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তিনি আমেরিকান সৈন্যদেরকে ‘শয়তান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তারা এমন ‘শয়তানি করছে, তা ক্ষমা চাইলেও মার্জনা হবে না।’
যেকোনো যুদ্ধই মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসে। আফগানিস্তানে মার্কিন হামলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সোভিয়েত, তালেবান এবং ১৯৯০-এর দশকে গৃহযুদ্ধের চেয়ে আমেরিকান হামলা বেশি ক্ষতিকর ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্ক করা কঠিন।
যশুয়া পার্টলো বইটির বড় অংশ জুড়ে আছে কারজাই পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব। বেশ মজাদার। এই অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিবারটির অনেক সদস্যই খুন হয়েছেন। এডব্লিউকে পর্যন্ত নিহত হন ২০১১ সালে পরিবারের অপর এক সদস্যের হাতে। পার্টলো বলেন, ‘কারজাইদের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে খারাপ কথা শুনেছি কারজাইদের কাছ থেকেই।’
আফগানিস্তানের চলতি পরিস্থিতি বোঝার জন্য বইটি বেশ ভালোই বলতে হবে। এটা পড়ার পর এমনকি অনেকে কারজাই পরিবার সম্পর্কে জানতে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠবে।

Sunday, November 14, 2021

চুল নিয়ে ভাবনা? অ্যালোভেরায় আছে সমাধান

ত্বক বা চুলের যেকোনো সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে অ্যালো ভেরার ম্যাজিকে। বিশেষ করে চুলকে সুন্দর করে তুলতে অনেক রূপবিশেষজ্ঞই এর শরণ নিয়ে থাকেন। অ্যালো ভেরার গুণাগুণ জানাতে গিয়ে শর্মিলা সিংহ ফ্লোরা জানান, ‘‘যে কোনও হেয়ার মাস্কে অ্যালো ভেরা যোগ করতে পারলে তা চুলকে আলাদা ঔজ্জ্বল্য এনে দেয়। শুধু তা-ই নয়, অ্যালো ভেরার রস ও শাঁস দুই-ই চুলের জন্য উপযুক্ত।’’
বাড়িতেই তৈরি করে নিতে পারেন এমন কিছু হেয়ার স্পা যার অন্যতম উপাদান অ্যালো ভেরা। কীভাবে বানাবেন পদ্ধতিটি জেনে নিন:
মধু, নারকেল তেল ও অ্যালো ভেরা: শুষ্ক চুলে আর্দ্রতা ফেরাতে ও চুলের ডিপ কন্ডিশনিং করতে এই প্যাকের জুড়ি নেই। এক চামচ মধু, দু’ চামচ নারকেল তেল ও দু’ চামচ অ্যালো ভেরা নিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। স্নানের আধ ঘণ্টা আগে এই মিশ্রণ চুলে লাগিয়ে রেখে একটা শাওয়ার ক্যাপে ঢেকে দিন মাথা। আধ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করে ধুয়ে নিন চুল।
দই ও অ্যালো ভেরা: চুলের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্যকে ধরে রাখতে দু’ চামচ টক দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দিন এক চামচ অ্যালো ভেরা।
এই মিশ্রণ প্রায় দশ মিনিট ধরে মাথার ত্বকে মাসাজ করে শ্যাম্পু করে ধুয়ে নিন চুল। কন্ডিশনার দিতে ভুলবেন না যেন!
লেবু ও অ্যালো ভেরা: লেবুর রস, অ্যালো ভেরা ও আমলার রস দিয়ে বানানো এই মিশ্রণ চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। চুলকে গোড়া তেকে মজবুত করতেও এটি অত্যন্ত কার্যকর।
অ্যালো ভেরা ও ডিম: একটি ডিমের কুসুম ও দু’চামচ অ্যালো ভেরা ও তার সঙ্গে এক চামচ অলিভ অয়েল। এই উপাদানগুলি দিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। শাওয়ার ক্যাপে ঢেকে রাখুন চুল। আধ ঘণ্টা পর চুল ভাল করে ধুয়ে শ্যাম্পু করে নিন। চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও চল পড়া আটকাতে এই প্যাক বিশেষ কার্যকর।
সূত্র: আনন্দবাজার

Thursday, November 11, 2021

দেশলাইয়ের দেশে সিনেমা

কেমন লাগত যদি দেশলাইয়ের কাঠি ধরাতে গিয়ে হঠাত্‌ই বাক্সে দেখতেন অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী, করিনা কপূর বা প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার ছবি!
কেমন লাগত যদি দেশলাইয়ের কাঠি ধরাতে গিয়ে হঠাত্‌ই বাক্সে দেখতেন অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী, করিনা কপূর বা প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার ছবি! চমকে উঠবেন না, এটি কল্পনা নয়, বরং বাস্তব সত্যি! জনপ্রিয় বহু সিনেমা তারকার ছবি দেওয়া অজস্র দেশলাই বাক্স এই কলকাতা থেকেই অনেক বছর ধরে সংগ্রহ করেছি আমি। খুব কম ক্ষেত্রেই বেঁচে থাকাকালীন বিখ্যাত মানুষদের ডাকটিকিট বেরিয়েছে, কিন্তু দেশলাই বাক্সে তার উলটোটাই ঘটে। বিজ্ঞাপন জগতের ক্ষেত্রে দেশলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কারণ কম খরচে বহুসংখ্যক মানুষের কাছে এর মাধ্যমে নানা বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। আবার দেশলাইয়ের বাক্সে আকর্ষণীয় বিষয় থাকলে সাধারণে আগ্রহী হয়ে তা কিনতে পারেন বলেও ধারণা।
৪২ বছর ধরে আমার সংগৃহীত কমবেশি ৩০,০০০ দেশলাই বাক্সের মধ্যে সবথেকে পুরনো যে সিনেমার মার্কা আছে তা হল জয়রাজ শাকিলা অভিনীত ‘হাতিম তাই’-য়ের (১৯৫৬ সাল)। নার্গিস অভিনীত ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ১৯৫৭-তে তুমুল জনপ্রিয় হয়। নার্গিসের সেই বিশেষ ভঙ্গিমার ছবি এই সেদিন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বাক্সে ছাপা হয়েছে। দিলীপকুমারের অসাধারণ অভিনয় সমৃদ্ধ ‘রাম অউর শ্যাম’ (১৯৬৭) নামাঙ্কিত দেশলাইয়ের বাক্সে তাঁর, ওয়াহিদা রহমান আর মুমতাজ়ের ছবি ছিল। হিন্দি সিনেমার প্রবাদপুরুষ রাজ কাপুর নির্মিত ‘মেরা নাম জোকার’ বক্স অফিস অতটা হিট না হলেও দেশলাইয়ে সুপারহিট হয় কারণ ওই সময় ওই নামে অনেক মার্কা বাজারে প্রচুর বিক্রি হয়।
এঁদের পরবর্তীযুগে ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্নার মতো সুপারস্টারদের নিয়ে কয়েকটি মার্কা বেরিয়েছে। হিন্দি সিনেমার প্রথম ব্লকব্লাস্টার ছবি বললেই ‘শোলে’র কথা মনে পড়বে (১৯৭৫)। শোলের বাসন্তীরূপী হেমামালিনী ও বীরুরূপী ধর্মেন্দ্রকে একাধিক মার্কায় একসঙ্গে দেখা গেছে। শোলের কিছু আগে ফিল্মি দুনিয়ার প্রথম মেগাস্টার অমিতাভ বচ্চনের জয়যাত্রার সূচনা হয়। তাঁর পরপর সুপারহিট সিনেমার প্রতিফলন দেশলাইয়ের দেশে পড়ে এবং এক নাগাড়ে বহু বছর ধরে তাঁর একার ছবি বা কখনও কখনও তাঁর নায়িকাদের সঙ্গে তাঁর ছবি (রেখা, হেমা মালিনী প্রমুখ) বেরতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঢেউ এখন স্তিমিত। পরে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয় হন ‘কৌন বনেগা করোড়পতি’ সঞ্চালনা করে। নতুন করে তাঁর ছবি দেশলাইয়ে বেরোতে থাকে। এ যাবত্‌ অমিতাভ বচ্চনের সবচেয়ে বেশি ৫০টি ছবি পেয়েছি। তাঁর অভিনীত বেশ কয়েকটি সিনেমা যেমন ‘কুলি’, ‘মর্দ’, ‘দোস্তানা’ ইত্যাদি বাক্সে দেখা যায়। নির্দ্বিধায় বলা যায় এখানেও জনপ্রিয়তম মেগাস্টার তিনিই।

বাঙালিদের পক্ষে বিশেষ গর্বের বিষয়, বলিউডে ‘মৃগয়া’ দিয়ে যাঁর যাত্রা শুরু সেই মিঠুন চক্রবর্তী আমার সংগ্রহ দ্বিতীয় স্থানে আছেন। তাঁর ছবি দেওয়া বাক্সের সংখ্যা ২৮। বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তমকুমারকে নিয়ে চারটি দেশলাই বাক্স পেয়েছি যেখানে তিনি নানা নামে ভূষিত হয়েছেন। শোনা গেলেও মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের উপর দেশলাই জোগাড় করতে পারিনি। কিন্তু তাঁর কন্যা মুনমুন সেন স্বনামে উপস্থিত আছেন।
সত্তরের দশকের ‘ড্রিম গার্ল’ হেমা মালিনীর উপরেও এক ডজন দেশলাই পেয়েছি। এরপর চলচ্চিত্র আকাশে শ্রীদেবী আর্বিভূত হন এবং ‘চাঁদনী’ সুপারহিট হওয়াতে ওই নাম-সহ বেশ কিছু বাক্সে তিনিও উপস্থিত। দক্ষিণ ভারতীয় আর এক জনপ্রিয় নায়িকা জয়া প্রদাকেও নিয়েও বেশ কিছু মার্কা আছে। ‘তেজ়াব’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ ইত্যাদি সুপারহিট ছবির নায়িকা মাধুরী দীক্ষিতও সসম্মানে উপস্থিত আছেন। এছাড়া রেখা, জ়িনত আমন, মীনাক্ষি শেষাদ্রি, পুনম ধীলোঁ প্রমুখ বহু নায়িকার ছবি পাওয়া গেছে। আবার ইদানিং কালের নায়িকাদের মধ্যে রবিনা ট্যান্ডন, মনীষা কৈরালা, ঐশ্বর্য রাই, রানি মুখোপাধ্যায়, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, করিনা কপূরদের ছবিও কিছুদিন আগেই বেরিয়েছে।
অন্যদিকে নায়কদের মধ্যে সুনীল দত্ত, জিতেন্দ্র, বিনোদ খান্না, কমল হাসান, অনিল কপূর, ঋষি কপূর, সঞ্জয় দত্ত, সানি দেওলরা বিভিন্ন সময়ে দেশলাইয়ের ছবিতে জায়গা পেয়েছেন। সুবিখ্যাত ভিলেন ‘প্রাণ’ ও শোলের ‘গব্বর সিং’ আমজাদ খানও আছেন। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা স্টার এম.জি. রামচন্দ্রন, শিবাজী গণেশন, প্রভুদেবা, নার্গাজুনও আছেন। বলা বাহুল্য যে অত্যন্ত জনপ্রিয় তারকা রজনীকান্ত বহু দেশলাইয়ে নানা ভঙ্গিতে উপস্থিত আছেন। ২০০০-এ ‘কহো না প্যার হ্যায়’ বক্স অফিসে হই হই ফেলে দেয় এবং স্টার হিসেবে হৃত্বিক রোশন দেশলাইয়ের ছবিতে বিশেষ স্থান পান। ‘গদর’ ছবির বিজ্ঞাপনি বাক্সে সানি দেওল ও অমিশা পটেলের ছবি একসঙ্গে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। অক্ষয় কুমারকে একইভাবে ‘খিলাড়ি’ ছবির বাক্সে দেখা গেছে (১৯৯২)। আমির খান ও মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত ‘দিল’ (১৯৯০) বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় বেশ কিছু বাক্সে এঁদের দু’জনের ছবি একসঙ্গে ছাপা হয়েছে। ‘সাজন’ (১৯৯১) সুপারহিট হওয়ায় সলমন খান ও মাধুরী দীক্ষিতের ছবি ছাপা হয়। শাহরুখ খান এসেছেন তাঁর অসামান্য অভিনয় সমৃদ্ধ ‘বাজ়িগর’ ছবির জন্য। মনে রাখা দরকার এই তালিকাগুলি আংশিক মাত্র।

গানবহুল বাংলা সিনেমা ‘অজস্র ধন্যবাদ’ ১৯৭৭-এ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। মনে পড়ে, ভারতী সিনেমা হলেও বাইরে থেকে ওই সিনেমা বিজ্ঞাপনের বাংলায় লেখা বাক্স কিনেছিলাম (যা এখন অত্যন্ত বিরল), যেটিতে শৈলেন্দ্র সিংহের ছবির পাশে অভিনেত্রী অপর্ণা সেন ও পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের নাম ছিল।
ভারতীয় সিনেমা জগত্‌কে যিনি বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেন সেই সুমহান পরিচালক সত্যজিত্‌ রায় তাঁর সারাজীবনের অবদানের জন্য অস্কার পেয়েছিলেন। একটি দেশলাই বাক্সে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে তাঁর ছবির পাশে অস্কার পুরস্কারের রেপ্লিকা রেখে। তেমনই আর এক বিশ্ববিশ্রুত পরিচালক-অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনকে ভারতীয় দেশলাই শিল্প সম্মান জানিয়েছে কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে যাতে তাঁর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত টুপি ও লাঠিরও ছবি আছে। ব্রুস লি জনপ্রিয়তার বিচারে বিশেষ স্থান পেয়েছেন।
এবার একটু বিদেশি দেশলাইয়ের খোঁজ নেওয়া যাক। বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো, গ্রেটা গার্বো প্রমুখ অভিনেত্রী বিদেশি দেশলাইয়ের বাক্সে উপস্থিত আছেন। টাইটানিক-খ্যাত লিওনার্দো দি ক্যাপ্রিও অতি সম্প্রতি শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অস্কার পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁকে নিয়ে একটি বিদেশি বাক্সও পেয়েছি।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশলাইয়ের দেশে সিনেমার অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক সবাই বিশেষ স্থান পেয়েছেন। তবে ছবি জোগাড় করার অসুবিধে হল যে ছোটবড় অজস্র কোম্পানির দেশলাই ভারতের নানা জায়গা বিশেষত দক্ষিণভারত থেকে বেরোচ্ছে আবার উঠেও যাচ্ছে। এর জন্য তাই চোখ খোলা রেখে খোঁজখবর নিতে হয়। হঠাত্‌ যদি এরকম আকর্ষণীয় ছবির দেশলাই বাক্স পাওয়া যায় তখন সংগ্রাহকের মন যে আনন্দে ভরে ওঠে তার তুলনা কোথায়?

Wednesday, November 10, 2021

চিনি মসজিদের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী by নাকিবুল আহসান নিশাদ

চিনি মসজিদ
চিনি মসজিদ। নাম শুনলেই মনে হতে পারে চীনাদের তৈরি করা মসজিদ কিংবা এর নির্মাণের পেছনে চীনাদের কোনও অবদান আছে! আদতে চিনির দানার মতো নিখুঁত কাজ করা বিখ্যাত এই স্থাপনার নাম ‘চিনি মসজিদ’। নীলফামারী জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে সৈয়দপুর শহরের পাশে এটি অবস্থিত। এর দৃষ্টিনন্দন নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ হওয়ার মতো।
১৮৮৩ সালে হাজী বাকের আলী ও হাজী মুকু নামে দুই ব্যক্তি সৈয়দপুরের ইসলামবাগ এলাকায় ছন ও বাঁশ দিয়ে প্রথম এই মসজিদ নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় এটি টিনে রূপান্তরিত হয়। এরপর তারা একটি তহবিল গঠন করেন।
জনশ্রুতি আছে, মসজিদের উন্নয়নের জন্য এলাকাবাসীরা স্বেচ্ছায় তাদের পুরো একমাসের উপার্জন দান করেছিলেন। ১৯২০ সালে হাজি হাফিজ আবদুল করিমের উদ্যোগে মসজিদটির প্রথম অংশ পাকা করা হয়। ১৯৬৫ সাল থেকে চলতে থাকে দক্ষিণ পাশের অংশের কাজ। ঐতিহাসিক এই মসজিদের নকশা করেন মো. মোখতুল ও নবী বক্স। কয়েকশ’ দক্ষ কারিগর ও শিল্পীর একনিষ্ঠ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে গড়ে ওঠে এটি।
চিনি মসজিদ নির্মাণে মোগল স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণে রয়েছে দুটি ফটক। কারুকার্যমণ্ডিত মূল ফটকে চোখে পড়বে ফারসি বা উর্দু ও বাংলায় লেখা ‘চিনি মসজিদ’। মসজিদের পুরো অংশ চীনামাটি দিয়ে তৈরি বলে এর নামকরণ হয় ‘চিনি মসজিদ’। এটি খ্যাতি পাওয়ার অন্যতম কারণ দেয়ালের আবরণ। পুরো দেয়ালজুড়ে ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপফুল, চাঁদ, তারাসহ অসংখ্য কারুকাজ।
মসজিদের গায়ে রয়েছে কলকাতা থেকে আনা ২৪৩টি শংকর মর্মর পাথর। পাথরের সঙ্গে মসজিদের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয় ২৫ টনের মতো চীনামাটির টুকরা। মসজিদের গোটা অবয়ব ঢেলে সাজানো হয় রঙিন চকচকে পাথরে। মসজিদের বারান্দা বাঁধানো হয় সাদা মোজাইকে। দেয়াল জুড়ে চীনামাটির পাথরে আঁকা হয় নানান সুদৃশ্য নকশা। এগুলো আকৃষ্ট করে শিল্পানুরাগীদের।
বগুড়ার একটি গ্লাস ফ্যাক্টরি মসজিদের পুরো অংশ সাজানোর জন্য ২৫ মেট্রিক টন চীনামাটির টুকরা দান করে। এগুলো দিয়ে মোড়ানো হয় মসজিদের ৩২টি মিনারসহ তিনটি বড় গম্বুজ। এর মূল অংশের বর্ণ অনেকটা লালচে হলেও একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, পরবর্তী সময়ে তৈরি করা অংশ অনেকটা সাদা বর্ণের।
চিনি মসজিদ নিছক উপাসনালয় নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এর নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত মসজিদটির দোতলায় পর্যটকদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থা আছে।
কীভাবে যাবেন
রেলের শহর সৈয়দপুর। তাই একটু আরামদায়ক ও ক্লান্তিহীন ভ্রমণ চাইলে ট্রেনই জুতসই। ঢাকা থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে সৈয়দপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায় নীলসাগর এক্সপ্রেস। এটি সৈয়দপুর পৌঁছায় বিকেল পৌনে ৫টায়। রেলস্টেশন থেকে চিনি মসজিদ মাত্র দুই কিলোমিটার পথ। প্রতিদিন রাত ১১টা ৩০ মিনিটে এই ট্রেন ফের ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়।
সড়কপথে ঢাকার গাবতলী, উত্তরা, কল্যাণপুর থেকে নিয়মিত বিরতিতে সৈয়দপুর যাওয়ার বাস রয়েছে। উড়ালপথেও সৈয়দপুর যাওয়া যাবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও বেসরকারি সংস্থা নভোএয়ার এই রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।
>>>ছবি: লেখক
চিনি মসজিদ