Thursday, November 19, 2009

মুদ্রার মান বাড়ানোর চাপে চীন সাড়া দিতে চায় না

চীনের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্যমান বাড়ানোর জন্য চীনের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে আমেরিকা। তবে চীন এতে তেমন একটা সাড়া দিচ্ছে না। বরং কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওকে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের মূল্যমান বাড়ানোর কথা বলেছেন। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য-বিরোধ নিষ্পত্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে তাঁরা যে আলোচনা করেন, তাতে ওবামা মুদ্রামানের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বৈঠক বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে গিয়ে ওবামা ছোট করে মুদ্রামানের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তবে হু জিনতাও এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।
ওবামা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘অতীতে চীন একাধিক বিবৃতিতে মুদ্রা বিনিময় হার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকতর বাজারমুখী করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। আর আমাদের বৈঠকে এটা উল্লেখ করে বলেছি এই পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় বিশেষ সহায়ক হবে।’
এর আগে গত রোববার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক দমিনিক স্ট্রাউস-কাহন চীনের মুদ্রা ইউয়ানের মান শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে চীনের ওপর ইউয়ানের বিনিময় হার শক্তিশালী করার আরেক দফা চাপ তৈরি হলো।
তবে আইএমএফের এ আহ্বানের পর চীন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই আহ্বানকে ‘ন্যায়সংগত নয়’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ডলার দুর্বল হয়ে পড়ায় ইউয়ানকে শক্তিশালী করা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য খুব লাভজনক হবে—চীন এমনটা মনে করা না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়াও জিয়ান বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন। তাঁর এ বক্তব্যের পর বিশ্লেষকেরা বলছেন যে চীন সহসা ইউয়ানের মূল্যমান বাড়াবে না।
গত বছর জুলাই থেকে চীন সরকার প্রতি মার্কিন ডলারের দর ৬ দশমিক ৮৩ ইউয়ানে ধরে রেখেছে। এর আগের তিন বছর চীনা মুদ্রার মূল্যমান ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আমেরিকা ও ইউরোপ অভিযোগ করে আসছে যে চীন তার মুদ্রামান কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রেখে তার রপ্তানিকারকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে আসছে।

দূরশিক্ষণ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সমপ্রতি মন্ত্রিপরিষদ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধনী খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। এ আইন সংসদে পাস হলে যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন সাপেক্ষে আউটার ক্যাম্পাস স্থাপন এবং দূরশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করতে পারবে। অচিরেই খসড়াটি সংসদে উত্থাপিত হবে।
একজন শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে খবরটি আমার কাছে সুখবর বলে মনে হয়নি। ১৯৯২ সালে যখন সর্বপ্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হওয়ার পর দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন শুরু হয়, তখন থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছি। কাজের সুবাদে এবং ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করেছি, পর্যালোচনা করেছি এবং বিষয়গুলো অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। সব বিষয়ের মধ্যে দূরশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আউটার ক্যাম্পাস বিষয় দুটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় বলে মনে হয়েছে।
১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দূরশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমান সরকার দূরশিক্ষণ ও আউটার ক্যাম্পাস স্থাপনের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করায় অনেকেই দূরশিক্ষণ কার্যক্রম প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এ রকম পরিস্থিতিতে হঠাত্ করে মন্ত্রিপরিষদ সম্প্রতি কেন দূরশিক্ষণ কর্মসূচি ‘শর্তসাপেক্ষে’ অনুমোদনের সুযোগ রেখে আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে তা বোধগম্য নয়।
দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে লেখাপড়া করানোর ব্যাপারে নীতিগতভাবে তাদের কোনো আপত্তি থাকা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। বহু উন্নত ও অনুন্নত দেশে এ পদ্ধতি চালু আছে এবং শিক্ষার উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। উদাহরণস্বরূপ ভারতের জওহরলাল নেহরু উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যায়। আমাদের দেশে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বহু বছর ধরে বেশ সাফল্যের সঙ্গে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থেকে শিক্ষার মান অটুট রেখে, আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগ করে এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের শিক্ষার মান নিয়ে কেউ বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠাচ্ছে না।
কিন্তু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দূরশিক্ষণ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে লেজে-গোবরে অবস্থা সৃষ্টি করে ফেলেছে। এর মূল কারণ, সরকারি তদারকির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মান নিয়ন্ত্রণে চরম গাফিলতি, অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে দূরশিক্ষণের কারিকুলাম প্রণয়ন, অভিজ্ঞতাহীন কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রোগ্রাম পরিচালনা, ইলেকট্রনিক পদ্ধতির ব্যবহার না করা, নিম্নমানের কোর্স ম্যাটারিয়াল এবং সর্বোপরি, অনভিজ্ঞ শিক্ষক ও দুর্বল পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন দূরশিক্ষণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে কিছু ভয়ংকর তথ্য পেয়েছি। প্রায় সবাই এক সুরে বলেছেন যে শিক্ষার্থীরা মূলত একটি সার্টিফিকেট চান, লেখাপড়া যা-ই হোক না কেন। কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক দূরশিক্ষণের অন্তঃসারশূন্যতা এবং কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কথা অকপটে জানিয়েছেন। শিক্ষকেরা বলছেন, ছাত্রছাত্রীরা চায় নম্বর (পরীক্ষার খাতায় যা-ই থাকুক না কেন); আর কর্তৃপক্ষ চায় ‘ব্যবসা’।
শিক্ষার সঠিক বিকাশের স্বার্থেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে দূরশিক্ষণ কোনোভাবেই ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আশা করি, শিক্ষাবিষয়ক সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে দৃষ্টি দেবেন।
এম এ মাননান, অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
drmannan@yahoo.com

গরুর ট্রাকে চাঁদাবাজি -এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার

ঈদুল আজহা কাছাকাছি চলে আসায় বিদেশ থেকে গবাদিপশু আমদানি এখন চলছে বেশ জোরেশোরে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে প্রধান শহরগুলোতে আসতে শুরু করেছে কোরবানির পশু। কিন্তু অন্যান্যবারের মতো এবারও গবাদিপশু পরিবহনে ব্যবসায়ীদের নানা জায়গায় অবৈধ চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে, এমন অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়টির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, চাঁদাবাজির অভিযোগগুলো উঠছে হাইওয়ে পুলিশ, থানা পুলিশ, কাস্টমস পরিদর্শক ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
গত মঙ্গলবারের প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা গবাদিপশু চট্টগ্রাম পর্যন্ত পরিবহনে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের অন্তত ২০টি জায়গায় অবৈধ চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদার পরিমাণ প্রতি ট্রাকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। চাঁদা না দিলে হয়রানির মুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এসব পশু পাঠানোর সময় যে এ ধরনের চাঁদাবাজি ঘটবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার নজির আমরা বিভিন্ন সময় ঘটতে দেখেছি। কোরবানির পশুর বাজারে নিঃসন্দেহে পরিবহনে এমন চাঁদাবাজির প্রভাব পড়বে। ভোক্তাদের অনেক বেশি অর্থ দিয়ে কিনতে হবে কোরবানির পশু। তাই এ বিষয়ে সরকারের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
গত বছরগুলোতে কোরবানির পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধে এবং পশুর চামড়া বিদেশে চোরাচালানের মাধ্যমে পাচার হওয়া রোধে সরকার বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। গবাদিপশুর হাটে, মহাসড়ক ও নৌপথে পশু পরিবহন নির্ঝঞ্ঝাট করার উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এ ধরনের উদ্যোগে বেশ সফলতাও পাওয়া গিয়েছিল। এবার পুলিশের বিরুদ্ধে অবৈধ চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক। তাই ব্যবসায়ীদের উত্থাপিত চাঁদাবাজির অভিযোগ আমলে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। চাঁদাবাজি রোধে পাহারা জোরদার করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দলের চেয়ে কোন্দলই বড় হলো

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন চট্টগ্রামে। এ কথা পাঠকের জানা আছে। তবে অনেকেই বিস্মৃত হতে পারেন, সেবার তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন স্থানীয় বিএনপির কোন্দল মেটাতে। মৃত্যুর আগের দিন বিবদমান দুটি গ্রুপের নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন ও সলিম উল্লাহর সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন তিনি। জিয়াউর রহমান আজ নেই, কিন্তু নানা দল ও আদর্শ থেকে বিএনপিতে এসে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাঁর পূরণ হয়নি কোনো দিনই। এর মধ্যে তিন-তিনবার (’৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারিসহ) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেছে দলটি, কিন্তু বিভেদ ও অনৈক্যের যে সুরটি ছিল শুরু থেকেই, তা থেকে আর কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি বিএনপি।
এবার ১৬ নভেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কাউন্সিলে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়, তাতে আরও একবার প্রমাণিত হলো দলের ঐক্য ও পুনর্গঠন নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যত কথাই বলুক, দলে প্রাধান্য বিস্তারে সচেষ্ট নেতা-কর্মীদের মনে তার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। কেন্দ্রীয় নেতা আ স ম হান্নান শাহ, বরকতউল্লা বুলু, মো. শাহজাহান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের উপস্থিতিতেই পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন দলের বিবদমান গ্রুপের কর্মীরা। অসহায় নেতাদের চোখের সামনে তাঁদের সমর্থকেরা যেভাবে মাইক ভেঙে, চেয়ার ছুড়ে কাউন্সিল পণ্ড করে দিয়েছেন, তাতে ঐক্যের ‘ললিত বাণী’কে ‘ব্যর্থ পরিহাস’ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।
আসলে এ কাউন্সিলের অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব-মতানৈক্য চলে আসছিল। নগরের কোতোয়ালি ওয়ার্ডের সম্মেলন নিয়ে পরস্পরবিরোধী সভা-সমাবেশ হয়েছে। বোয়ালখালী, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানেই সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেই হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
পাল্টাপাল্টি বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। এত কিছুর পরও বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কাউন্সিল আহ্বান করা হয়েছিল। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে কমিটি গঠন নিয়ে আবদুল্লাহ আল নোমান, মোরশেদ খান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বা সাকা চৌধুরীর বিরোধের কথাটি মাথায় রেখে ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠক করেছেন তাঁদের সঙ্গে। আপাতত সংঘর্ষ এড়াতে কাউন্সিলে কমিটি ঘোষণার পরিবর্তে কেন্দ্র থেকে কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয় বিবদমান গ্রুপগুলোর নেতাদের। সাময়িক সমঝোতার ভিত্তিতে কাউন্সিল করার ব্যাপারে সম্মতি দেন নেতারা। কিন্তু অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার বোধ থেকে আগুন জ্বলছিল কর্মী-সমর্থকদের মনে, তাকে ছাইচাপা দিয়ে রাখা যায়নি কাউন্সিলের দিন। এতে ইন্ধন জুুগিয়েছেন খোদ নেতারাই।
অবাক করার ব্যাপার হলো, নোমান, মীর নাছির, মোরশেদ খান বা সাকা চৌধুরীদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে হলেও এ কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে তাঁরা প্রায় সবাই এককাট্টা হয়েছে আমীর খসরুর বিরুদ্ধে। আমীর খসরুও আহ্বায়ক হিসেবে নিজের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি। তাই মীর নাছির বা সাকা চৌধুরীর সমর্থকেরা যখন নোমানের পক্ষে স্লোগান দিয়ে মঞ্চ দখল করতে এগিয়ে যান, তখন মনে হয় রাজনীতিতে তো বটেই, উপদলীয় কোন্দলেও স্থায়ী শত্রুমিত্র বলে কিছু নেই।
চট্টগ্রামের বিএনপিতে একসময় অলি-নোমানের দ্বন্দ্বের কথা ছিল বহুল আলোচিত, পরে নোমান-সাকা, নোমান-মীর নাছির বা সাকা-মোরশেদ খান দ্বন্দ্বের বিষয়গুলোও উঠে আসে প্রকাশ্যেই। এসব দ্বন্দ্ব খুন-জখম পর্যন্ত গড়িয়েছে। এবার কমিটি গঠন ও দলে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধিকে সামনে রেখে এই নেতারা যেভাবে অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে এককাতারে এলেন, তাতে মনে হয় নিজেদের স্বার্থের চেয়ে বড় কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নন তাঁরা। শুধু স্বার্থচিন্তাই। এক ঘাটে পানি খাওয়াতে নিয়ে এল বাঘ ও গরুকে।
সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবার এবং জাতীয় স্বার্থে নানা ইস্যুতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য এ সময়টিতে বিএনপির উচিত সাংগঠনিক ভিত্তি দৃঢ় করা। অথচ প্রধান বিরোধী দল তার সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।
সম্মেলন ও কাউন্সিল পণ্ড হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতারা সাংবাদিকদের যথারীতি বলেছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো বড় দলে এ রকম কিছু গোলযোগ থাকতেই পারে, তবে এটা দলের বৃহত্তর ঐক্যের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছে গোলযোগের সংবাদ।
কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো বড় দলগুলোই তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যায় জনসমর্থন নিয়ে, যাঁরা কমিটি গঠনের মতো ছোটখাটো বিষয়ে নিজেদের এভাবে বিভক্ত করতে পারেন, তাঁরা দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করবেন কীভাবে?
মাহবুবুল করিম, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।

বিএনপির চট্টগ্রাম সম্মেলন -এ ধরনের বিশৃঙ্খলা কাম্য ছিল না


বিএনপির চট্টগ্রাম শাখার সম্মেলন যেভাবে পণ্ড হলো, তাতে দলটির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে দুর্বলতার দিকটিই স্পষ্ট হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে এ ধরনের মারামারি ও গোলযোগ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। সম্মেলনে উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চেষ্টা সত্ত্বেও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারা আর কিছু নয়, দলের চেয়ে উপদলীয় প্রবণতারই জয়।
সাধারণ নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের জীবনীশক্তি, আর দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন তথা সম্মেলন হলো রাজনৈতিক দলের নবায়িত হওয়ার সুযোগ। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা বরং পুরোনো ধারার দলাদলি প্রবণতারই প্রকাশ ঘটাল। একটি গণতান্ত্রিক দলে ভিন্নমত ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। দুঃখজনকভাবে চট্টগ্রামে বিএনপির সম্মেলনে সে ধরনের কিছু দেখা গেল না। যা দেখা গেল তা শক্তির প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের কিছু ঘটতে পারে তা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আগেই অনুমান করা উচিত ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া বা এ ধরনের কোনো ঘটনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া যেত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে কঠোর সংকেত গেলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা এড়ানো যেত।
বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল দলগুলোর নিজস্ব বিষয় হলেও তা জাতীয় রাজনীতির মধ্যে অভিঘাত ফেলে। গণতন্ত্র যে কারণে রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে বিকশিত হয়, সে কারণেই সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ও দলীয় শৃঙ্খলা গণতন্ত্রের বিকাশেরই শর্ত। তাই বড় দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা করা না-করার বিষয়টি কেবল দলের নিজস্ব বিষয় নয়। দলের মধ্যে ব্যক্তির প্রাধান্য এবং সিদ্ধান্ত প্রণয়নে সর্বস্তরের কর্মীদের অংশগ্রহণের অভাব যে আখেরে দলের অভ্যন্তরীণ সংহতিরই ক্ষতি করে, বিএনপির চট্টগ্রাম সম্মেলন পণ্ডের ঘটনা তারই ইঙ্গিত হয়ে রইল।
১৬ বছর পর বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে তৃণমূল পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করতে হবে। চলমান এ ধরনের কাউন্সিল শেষে কেন্দ্রীয় সম্মেলন হওয়ার কথা আগামী ৮ ডিসেম্বর। সম্মেলন করে গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সময়সীমা মেনেই সম্মেলনের এই তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুসরণে তা যাতে যথাযথভাবে যথাসময়েই সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আরও সজাগ থাকবেন, এটাই প্রত্যাশিত। আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী এই অধ্যাদেশ মেনে দল পরিচালনার নীতিকে যুগোপযোগী ও স্বচ্ছ করা হবে এবং এ ধরনের বিশৃঙ্খল কার্যকলাপের পুনরাবৃত্তি আর দেখতে হবে না।

রোনালদোকে খেলার অনুমতি

রোনালদো যদি চান, তাহলে আগামী শনিবারই মাঠে ফিরতে পারেন। পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের তাতে কোনো আপত্তি নেই।
শনিবার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে স্প্যানিশ লিগের ম্যাচ রিয়াল মাদ্রিদের। কাল রিয়ালের অনুশীলনে ফিরেছেন রোনালদো। সম্ভবত শনিবারের আগে ম্যাচে খেলার মতো অবস্থায়ও ফিরবেন। তবে ওই ম্যাচে মাঠে নামার জন্য পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের অনুমতি প্রয়োজন ছিল তাঁর। ফিফা আইন অনুযায়ী কোনো খেলোয়াড় যদি ইনজুরির কারণে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে না পারেন, তাহলে জাতীয় দলের নির্দিষ্ট ওই ম্যাচটির পাঁচ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের অনুমতি ছাড়া ক্লাবের হয়েও খেলতে পারবেন না।
আগামীকাল পর্তুগালের প্লে-অফ ম্যাচে রোনালদো নেই। এর তিন দিন পরই রেসিং-রিয়াল ম্যাচ। রোনালদো তাতে খেলতে চাইলে খেলতেই পারেন।

এবার সত্যিই হাসলেন স্মিথ

দুটো টি-টোয়েন্টি ম্যাচ শেষেই গ্রায়েম স্মিথের মুখে হাসি। জোহানেসবার্গে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আরও একবার বৃষ্টির নির্মম রসিকতার শিকার হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। পুরো ডাগআউটে যখন বিষাদের ছায়া, অধিনায়কের মুখে তখনো হাসি। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল বেদনা, নিজেদের অদৃষ্টের কথা ভেবেই বেরিয়ে এসেছিল তা। পরশু সেঞ্চুরিয়নে মন খুলেই হাসলেন প্রোটিয়া অধিনায়ক। একসঙ্গে যে বেশ কিছু কাজ সেরে ফেলেছে তাঁর দল। পিছিয়ে থেকে সিরিজ ড্র করেছে, সেটাও আবার ইংল্যান্ডকে রীতিমতো গুঁড়িয়ে দিয়ে, মাটিচাপা দিয়েছে আগের দিনের হতাশা আর আক্ষেপকেও।
ম্যাচ শেষে প্রতিক্রিয়াতেও থাকল আগের ম্যাচের রেশ, ‘শুক্রবার রাতে বৃষ্টি আসার পর আমি সত্যিই হতাশ হয়েছিলাম। কারণ ম্যাচটি জেতার ভালো সম্ভাবনাই ছিল আমাদের। আজ (রোববার) ব্যাট হাতে আমরা দারুণ করেছি, তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে বোলারদের পারফরম্যান্স।’ আগের ম্যাচের হতাশাকে মুছে ফেলতে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন স্মিথ। লুটস বসম্যানের সঙ্গে তাঁর ৮১ বলে ১৭০ রানের বিস্ফোরক উদ্বোধনী জুটিটিই ইংল্যান্ডকে ছিটকে দিয়েছে ম্যাচ থেকে।
৬ রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি, তবে এই ৯৪ রান আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংস। ৩২ বছর বয়সী এই ডানহাতির ৯টি ছক্কা টি-টোয়েন্টিতে ব্যক্তিগত এক ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। টি-টোয়েন্টির একমাত্র সেঞ্চুরটি করার পথে সর্বোচ্চ ১০টি ছক্কা মেরেছিলেন ক্রিস গেইল। আর ২টি রান পেলেই স্মিথ পেরিয়ে যেতেন তাঁর সর্বোচ্চ ৮৮ রানের ব্যক্তিগত ইনিংসকে। নিজের প্রথম ৫টি টি-টোয়েন্টিতে তিনটি ফিফটি করা স্মিথ চতুর্থ ফিফটিটি পেলেন ১৪ ম্যাচ পর। মোট ১৭টি ছক্কা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে, যেটিও নতুন এক রেকর্ড। আগের সর্বোচ্চ ১৪টি ছক্কার রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার।
টি-টোয়েন্টির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৪১ রান করার পর ইংল্যান্ডের লড়াইটা ছিল মূলত ব্যবধান কমানোর। সেই কাজটাও তারা খুব ভালোভাবে পারেনি। ২০ ওভারে ১৫৭ রান করে হেরেছে ৮৪ রানে। পল কলিংউডের পিঠের ইনজুরিতে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করা অ্যালিস্টার কুক স্বীকার করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী জুটির কাছে হেরে গেছে তারা, ‘স্মিথ ও বসম্যানই ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছে আমাদের। ওরা যেভাবে খেলেছে তাতে বিন্দুমাত্র ভুল করার সুযোগ ছিল না।’ এই ম্যাচ থেকে ইংল্যান্ডের একটা বড় প্রাপ্তি ছিল দীর্ঘ ইনজুরি থেকে কেভিন পিটারসেনের ফেরা। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯ বলে ২৯ রান করেছেন কেপি।
আজ পচেফস্ট্রুমে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ওয়ানডে ম্যাচ খেলবে ইংল্যান্ড। ২০ নভেম্বর থেকে জোহানেসবার্গে শুরু হচ্ছে ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ।

শিল্প সীমানা মানে না -চারদিক by জাহিদ মুস্তাফা

যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে পৌঁছালাম, তখন সূর্য ম্রিয়মাণ। শীত-বিকেলের শরম যেন তার চোখে-মুখে। দিনটি ছিল ১১ নভেম্বর ২০০৯। নবীন প্রাণের মেলা যেন বসেছে দেড় যুগ আগে ছেড়ে আসা আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে। মৃিশল্প বিভাগের শ্রেণীকক্ষে প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী গোল হয়ে ঘিরে দেখছে মার্কিন এক মৃিশল্পীর কাজ। হুইল ঘুরিয়ে মাটি দিয়ে তিনি তৈরি করছেন সরু থেকে গোল পেট হয়ে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে মাথার ওপর ঢাকনার চেয়েও ক্ষুদ্রকায় এক বর্তুল আকৃতিসংবলিত এক পটারি। এটিই ঐতিহ্যবাহী রাকু পটারি নামে খ্যাত। নবীন মৃিশল্পীদের এটির নির্মাণকৌশল শেখাচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই থেকে আসা বিশিষ্ট রাকু পটারিশিল্পী রেমন কামারিল্লো।
৮ থেকে ১১ নভেম্বর ২০০৯ অবধি চার দিনের এক রাকু পটারি কর্মশালা পরিচালনা করলেন তিনি ওই মৃিশল্প বিভাগে ঢাকার আমেরিকান সেন্টারের সহায়তায়। মাত্র ১০ দিনের সফরে সস্ত্রীক ঢাকায় উড়ে এসেছিলেন রেমন। সঙ্গে এনেছেন একগাদা মাটির রাকু পটারি, সহজ বহনযোগ্য একটি চুল্লি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান। তাঁর আসার উপলক্ষই মূলত কর্মশালা।
গত এপ্রিল থেকে রেমন যোগাযোগ রাখছিলেন মৃিশল্প বিভাগের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলামের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহ ছিল কর্মশালাটি আরও একটু দীর্ঘ করার—অন্তত দুই সপ্তাহব্যাপী। কিন্তু রেমনের ব্যস্ততা ঢাকার আমেরিকান সেন্টারের কর্মব্যস্ত শিডিউল, নিরাপত্তা—এসব মিলিয়ে চার দিনের বেশি সময় চালানো গেল না। মাত্র চার দিন, তাও আবার বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা—চার ঘণ্টা করে সাকল্যে ১৬ ঘণ্টার সহাবস্থান। এই অল্প সময়েই কাজ আর বন্ধুতার সমন্বয়ে অদ্ভুত এক ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল সুদূর হাওয়াইয়ের রেমন কামারিল্লোর সঙ্গে বাংলাদেশের নবীন মৃিশল্প শিক্ষার্থী প্রকাশ, অনন্যা, আকতারদের সঙ্গে।
এ সময়ে রেমন শিখিয়েছেন—ওরা শিখেছে রাকু পটারি করার মৃেকৗশল এবং পিট ফায়ারিং পদ্ধতি। মানব সভ্যতার অগ্রগতির গোড়ার দিকে পটারির জন্ম। মানুষ যখন আগুনের ব্যবহার শিখে বন্যতার বাকল থেকে নিজেদের মুক্ত করার প্রয়াস পাচ্ছে, তখন সেই কৃষিকর্মে প্রথম নিবেদনকালে ফসল-বীজ সংরক্ষণের প্রয়োজনে, রান্নাবান্নার শুরুতে ক্রমান্বয়ে পটারি সৃজন শুরু করেছিল প্রাচীন মানুষ। আমাদের বাংলার মৃিশল্পের বয়সই তো আড়াই হাজার বছর পুরোনো!
রাকু পটারির জন্ম জাপানে প্রাচীন জেন চা-উত্সব থেকে। ষোড়শ শতকে জাপানের নেতৃস্থানীয় যোদ্ধা নৃপতি সোগান টয়োটমি হিদেয়োসিদি—চজিরো নামের একজন মৃিশল্পীকে নিযুক্ত করেন চা-উত্সবের জন্য বিশেষ ধরনের পাত্র তৈরি করতে। চজিরো তাঁর পরিবারের নাম থেকেই বিশেষ এই মৃত্ পাত্রের নাম রাখেন রাকু। সেই শুরু। তারপর ১৬ প্রজন্ম ধরে বংশপরম্পরায় জাপানি রাকুশিল্পীরা নিয়োজিত আছেন চা-উত্সব সফল করতে। জাপানিদের কাছে রাকুর গুরুত্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই। পশ্চিমে রাকুর প্রচলন কেবল এর কম উষ্ণতায় পোড়ানো, টেক্সচার সৃষ্টি—এসব কলাকৌশলের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে রাকু পটারি এসেছে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। রেমন কামারিল্লো এই মাধ্যমে কাজ করছেন আশির দশক থেকে। এ ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ৩২ বছর।
রেমন ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল অবধি মৃিশল্পশিক্ষা নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের লিওয়ার্ড কমিউনিটি কলেজ থেকে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন বাজার ব্যবস্থাপনায় হাওয়াই প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাক্রমে ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে। কিন্তু রেমন নিজেকে সুপরিচিত করেছেন তাঁর দেশে একজন রাকুশিল্পী হিসেবে। দুটি একক পটারি প্রদর্শনী করেছেন ওয়াশিংটন ডিসি ও ইংল্যান্ডের ওয়েলসে। মৃিশল্পী হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বাইরেও। মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত টর্পেডো ফ্যাক্টরিতে তিনি জুরি সদস্য, দলস চার্চের লি আর্ট সেন্টারে তিনি আবাসিক শিল্পী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ভিয়েনায় কেটেছে এক দশকের বেশি সময়। মৃিশল্পে রেমনের স্বকীয়তা ও দক্ষতার এক অতুলনীয় উদাহরণ হচ্ছে, একক হুইলে ২৫ পাউন্ড মাটি দিয়ে পটারি তৈরি করা। তাঁর কাজের আরেক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, থিকনেস কম রেখে তিনি অনেক বড় পটারি বানাতে পারেন।
চারুকলার মৃিশল্প বিভাগে রেমন কামারিল্লোর সঙ্গে পরিচয়। অবয়বে মঙ্গোলীয় বৈশিষ্ট্য। শরীর খর্বকায়, রং ফর্সা। নীল রঙের অ্যাপ্রোন পরে হুইলে কাজ করছিলেন আর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর কাজের কলাকৌশল নিয়ে কথা বলছিলেন। পাশেই আরেকটি হুইলে কাজ করছিলেন চারুকলার শিক্ষক মৃিশল্পী স্বপন কুমার সিকদার। দেখে মনে হলো, এই হুইলে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন হাওয়াইয়ের রেমন। অথচ মাত্র চার দিন ধরে তিনি এখানে এসেছেন। একজন শিল্পী বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। শিল্পের যে কোনো সীমানা নেই।
রেমন স্ত্রী ডরিনসহ ঢাকায় এসেছিলেন ৪ নভেম্বর। গিয়েছিলেন সাভার ও ধামরাইয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প ও কাঁসা-পিতলশিল্পের জায়গায়। বাংলাদেশের মৃিশল্পের ঐতিহ্য আড়াই হাজার বছর আগের—এ তথ্যে দারুণ অবাক হয়েছেন রেমন। বললেন, আমার বন্ধুরা এ সত্য বিশ্বাসই করবে না। বাংলাদেশের মানুষকে তাঁর অসম্ভব ভালো লেগেছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী মৃিশল্প ও কাঁসা-পিতলশিল্প তাঁকে অভিভূত করেছে। আর আধুনিক মৃিশল্পচর্চার ধরনেরও গুণগান করলেন এই বলে—ইউরোপের মৃিশল্পের চেয়ে তোমাদের কাজ আরও ভালো। আর মাত্র ১০ দিন থাকার পর তাঁর এ দেশকে মনে হয়েছে নিজেরই আরেকটা দেশ, আরেকটা আত্মীয়।
চারুকলা অনুষদের লেকচার থিয়েটারে রাকু পটারি কর্মশালার সমাপনীতে অংশগ্রহণকারীদের সনদ দেওয়া হলো আমেরিকান কালচার সেন্টার থেকে। সনদ বিতরণ করলেন শিল্পী রেমন কামারিল্লো, আমেরিকান সেন্টারের সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ক্যাথরিন হ্যালো ও মৃিশল্প বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক মো. রবিউল ইসলাম। এরপর ছিল ছোট্ট মনোজ্ঞ এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমেই হাওয়াইন গিটার বাজিয়ে চমত্কার এক স্বদেশি ঐতিহ্যের গান গাইলেন রেমন। তাঁর গানের তালে তালে নাচলেন স্ত্রী ডরিন। অদ্ভুত সুন্দর সে নাচ, আমাদের ঐতিহ্যবাহী নাচের সঙ্গে তার দারুণ মিল।
রেমন চলে গেছেন ১৪ নভেম্বর। মাত্র ১০ দিনে দারুণ মিশে গিয়েছিলেন এ দেশের শিল্প আর শিল্পীদের সঙ্গে। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বললেন, ‘আমি এখানে আবারও আসব, বন্ধুরা। তোমরাও এসো আমাদের দেশে। শিল্প সীমানা মানে না।’

ডিজিটাল বাংলাদেশ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ -তথ্যপ্রযুক্তি by মশিউল আলম

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন ২০০৯ অনুযায়ী ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়, কিন্তু বাস্তবে এখনো অনুসারী ছাত্রসংগঠন। খবর বেরিয়েছে, ছাত্রলীগ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এর সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটার-প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে, ছাত্রলীগের এ সিদ্ধান্ত সেটাকে মহিমান্বিত করার প্রয়াস বলে ধারণা করা যায়। সম্ভবত আওয়ামী লীগ নিজে ও তার সব অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনও ছাত্রলীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের উদেযাগ নেবে।
কথা হলো, ডিজিটাল বাংলাদেশ মানে কী। আওয়ামী লীগ সরকার ‘রূপকল্প ২০২১: ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে ‘জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতিমালা ২০০৯’ গ্রহণ ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৯’ (সংশোধিত) পাস করেছে, তার লক্ষ্য কী? নীতিমালায় উদ্দেশ্যের তালিকায় লেখা হয়েছে: উত্পাদনশীলতা বাড়ানো, জনসেবা প্রদানে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা ও অধিকতর দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বাড়ানো, সব নাগরিকের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এসবের মধ্য দিয়ে আমরা যে বড় লক্ষ্যে পৌঁছাব, সেটা হলো ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা। আরও দূরপ্রসারী লক্ষ্য: ৩০ বছরের মধ্যে এই দেশকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সারিতে নিয়ে যাওয়া। সামাজিক সাম্য বা সোশ্যাল ইকুইটির কথাও বলা হয়েছে: সবাইকে নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা, সাম্য, লিঙ্গসমতা, সমসুযোগ ও সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
নীতিমালার আওতায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সব মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য মোট ৩০৬টি করণীয় বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে স্বল্প (১৮ মাস বা তার কম), মধ্য (পাঁচ বছর বা তার কম) ও দীর্ঘ (১০ বছর বা তার কম) মেয়াদে। এসবের মধ্যে স্বল্প মেয়াদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় বিষয়গুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন—কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-সিটিজেন সেবাগুলোতে প্রবেশাধিকারের বন্দোবস্ত করতে বেসরকারি উদ্যোগে ই-সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনার ব্যবস্থা করা, স্বল্পোন্নত এলাকা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ব্যান্ডউইডথের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি, মূল্যবিষয়ক তথ্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা করা। দেশের যেকোনো স্থান থেকে জীবিকা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবাগুলো অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থা করা। যথাযথ ইলেকট্রনিক-মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারি পর্যায়ের যাবতীয় তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। জনগণের মতামত গ্রহণের উদ্দেশ্যে সব নতুন প্রণীতব্য নীতিমালা সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা। সব উন্মুক্ত দরপত্র অনলাইনে প্রকাশের ব্যবস্থা করা। সরকারি ক্রয় ও নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি সংশ্লিষ্ট ওয়েব পোর্টালে প্রকাশের জন্য একটি আইন প্রণয়ন; দরপত্র ও চাকরির দরখাস্ত অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত ও আন্তর্জতাকিভাবে গ্রহণযোগ্য মানের বিদ্যুত্-সাশ্রয়ী আইসিটি যন্ত্রপাতি ক্রয় বাধ্যতামূলক করা। সব সরকারি দপ্তরে দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথি প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য আদান-প্রদান ও সংরক্ষণে ইলেকট্রনিক-পদ্ধতির ব্যবহার বাড়িয়ে কাগজের ব্যবহার কমানো। কৃষক ও কৃষিপণ্যের ব্যবসার জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবস্থা করা। উচ্চগতির ডেটা সংযোগ ও অটোমেশনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ, ইত্যাদি।
ভাবনা, উদ্দেশ্য, কৌশলগত বিষয় ও সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার সমন্বয়ে ২১৪ পৃষ্ঠার নীতিমালাটি বিপুল কর্মজজ্ঞের এক বিরাট প্রতিশ্রুতি। এর অগ্রাধিকারগুলোর ১০ শতাংশও যদি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তাহলে দারিদ্র্যক্লিষ্ট, পশ্চাত্পদ, বিষম বাংলাদেশের সামগ্রিক চেহারা বদলে যেতে পারে। একটি ভালো নীতিমালা তৈরি করা হয়তো খুব কঠিন নয়; কিন্তু সে নীতিমালার বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ কাজ। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশে প্রথম একটি জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতিমালা বা আইসিটি পলিসি প্রণয়ন করেছিল। ২০০৬ সালের মধ্যে একটি ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছিল সে নীতিমালায়। তারা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ২০০৬ প্রণয়ন ও জারি করেছিল। কিন্তু সেই নীতিমালা বা আইনের বাস্তবায়ন ঘটেনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্যপ্রযুক্তির দিকে বেশি মনোযোগের প্রকাশ ঘটেছে আগেই। ১৯৯৬—২০০১ মেয়াদে তারা এ ক্ষেত্রে কতকগুলো ভালো কাজ করেছিল: কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সাবমেরিন কেবেলর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তথ্য-মহাসড়কে বাংলাদেশকে যুক্ত করা, ডিজিটাল টেলিফোন চালু করা, মোবাইল ফোন ব্যবসায় একটি কোম্পানির মনোপলির অবসান ঘটিয়ে আরও তিনটি কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া তাদের সেই আমলেই ঘটেছে। ১৯৯৯ সালে তারা জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করেছিল।
সেই ধারাবাহিকতায় এবারের আওয়ামী লীগ সরকারের নয়-দশ মাসে সরকারি সূত্রে কিছু অগ্রগতির খবর ও পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে: সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ইন্টারনেট সংযোগসহ ল্যাপটপ কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের মূল্য ৩৩ শতাংশ কমানো হয়েছে। অপটিক ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য সরকার একটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়েছে। দেশে বর্তমানে ৫০ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ঢাকা, সিলেট, পাবনা ও রাজশাহীতে মানুষ মোবাইল ফোন বা অপারেটর কোম্পানির মাধ্যমে বিদ্যুত্, গ্যাস ও টেলিফোন বিল পরিশোধ করতে পারছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি স্কুল-কলেজে ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া শুরু হয়েছে। মোবাইল ফোনে ভর্তি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন শুরু করেছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বাবিদ্যালয়। সেখানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সীমিত পরিসরে ওয়াইম্যাক্স জোন স্থাপন করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রথমবারের মতো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী বছরের জুন থেকে সরকারি ক্রয়, নির্মাণ ইত্যাদি খাতে দরপত্র ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটার-প্রযুক্তির ব্যবহার চালু করা হবে, এমন একটি সিদ্ধান্ত সরকার ঘোষণা করেছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার একটা পদ্ধতিমাত্র। উত্তম, যুগোপযোগী পদ্ধতি সন্দেহ নেই। কিন্তু পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে কী লক্ষ্য অজর্ন করতে চাই, সেই পথে কী কী প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে তা ভেবে দেখা, উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ক্ষমতাসীনের ক্ষমতার ব্যবহার, তাদের নিজেদের মানসিক গড়ন, জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের দিকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতার কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে, সেসব বলতে সরকার বা ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা আসলে কী বোঝেন। ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ যে মূল সমস্যাগুলোর একটি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটিয়ে ‘সরকারি কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ’ যে মানসিকতার কারণেই সহজ নয়, তা উপলব্ধি করা খুব প্রয়োজন। এ দেশে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র একটা শক্ত পিরামিড, যার শীর্ষবিন্দুতে বস্তুত সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এখানে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র অনুঘটকের কাজ করে না, করে উল্টোটা। মুহাম্মদ ইউনূস একবার স্লোগান তুলেছিলেন: পথের বাধা সরিয়ে নিন, মানুষকে এগিয়ে যেতে দিন। কিন্তু জনগণের পথের বাধা সরকারি প্রশাসনযন্ত্র সহজে সরিয়ে নিতে চায় না।
ডিজিটাল বাংলাদেশ যদি একটা ন্যায়ভিত্তিক, উন্নত, সুখী, শান্তিময় বাংলাদেশের রূপকল্প হয়, তাহলে সেই বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রথমেই হাত দিতে হবে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রে। সরকারি কর্মসম্পাদনে বা জনপ্রশাসনে যে প্রাচীন ঢিমেতেতালা ভাব কাজ করে, যে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছতা, কায়েমি গোপনীয়তা প্রশাসনযন্ত্র বা আমলাতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে জনসেবামুখী হতে বাধাগ্রস্ত করে, হয়রানির কারণ হয়, সেসব কাটিয়ে উঠে সত্যিকারের জনমুখীনতা ও গতিশীলতা অর্জন করার লক্ষ্যেই প্রথমত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য: স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারের শাখা অফিসের মতো করে রাখলে ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কী কী করা দরকার, নীতিমালায় লেখা আছে। তার বাইরেও অভিজ্ঞ, সমঝদার মানুষ আছেন। রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের সুপারিশগুলো অবহেলা করায় সরকারের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেনি।
কখনো কখনো কোনো কোনো শব্দ তার প্রাথমিক বা মূল অর্থ হারিয়ে ফেলে, কখনো বা নেতিবাচক, ব্যঙ্গাত্মক অর্থ পেয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের শুরুর দিকে ‘সংস্কার’ ছিল উত্সাহব্যঞ্জক শব্দ। মাঝামাঝি সময়ে সে উত্সাহে ভাটা দেখা দেয়, শেষের দিকে কেউ কেউ সংস্কার ব্যবহার করতেন ব্যঙ্গাত্মক অর্থে। রাজনীতির অঙ্গনে ‘সংস্কারপন্থী’ মানে দাঁড়িয়েছিল ‘বিশ্বাসঘাতক’।
বর্তমান সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদে ‘ডিজিটাল’ শব্দটির পরিণতি কী হয়, তা দেখার বিষয়। ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়ার পর নতুন সময়ের নাম হয়েছে ‘ডিজিটাল টাইম’। সরকার কিন্তু বলেনি, এই সময় ডিজিটাল টাইম নামে পরিচিত হবে। এই সরকার যদি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ঘোষণা না করত, তাহলে হয়তো নতুন সময়ের নাম হতো ‘আওয়ামী টাইম’।
শুধু ঘড়ির কাঁটার কারণে নয়, সরকারের সামগ্রিক পারফরম্যান্স বা কর্মসম্পাদনের পরিণতিতে যদি ‘ডিজিটাল’ শব্দটি ‘আওয়ামী’র সমার্থক হয়ে ওঠে এবং তা ঘটে নেতিবাচক অর্থে, তবে তা হবে দুঃখের বিষয়। এশিয়া ফাউন্ডেশনের জরিপ বলছে, ১০ মাসে সরকারের জনপ্রিয়তা কমে গেছে ২৩ শতাংশ। দ্রব্যমূল্য বেড়ে চলেছে; মানুষের আয় বাড়ছে না। প্রচুরসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নেই; প্রতিদিন বাড়ছে বেকার তরুণ-যুবকের সংখ্যা। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ বাড়ছে। মানুষ যেটুকু শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তা চায়, তা পাচ্ছে না। অর্থনীতির পূর্বাভাস ভালো নয়, কিন্তু সরকার সেটা মানতে নারাজ। অনিময়, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি কী মাত্রায় হচ্ছে, ক্ষমতার অপব্যহার করে কে কতটা নিজের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাচ্ছেন, তা জানার জন্য হয়তো এর পরের অন্য একটা সরকার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুদক বরাবরের মতো অতীতে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির অভিযোগগুলোর বাছাই করা অংশ নিয়ে ব্যস্ত। বর্তমান নিয়ে তাদের মাথাব্যথা কখনো ছিল না, এখনো নেই।
সবকিছু মিলিয়ে যদি জনগণের জীবনযাত্রায় একটুখানি উন্নতি না ঘটে, আর যদি ক্ষমতাসীনেরা সদলবলে ধনে-প্রতিপত্তিতে আরও ফুলেফেঁপে ওঠেন, তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্থ একদম বাঁকা হয়ে যাবে। ডিজিটাল দুর্নীতিবাজ, ডিজিটাল টেন্ডারবাজ ইত্যাদি কথা ছড়িয়ে পড়বে। বলা হবে, সরকার ডিজিটালি ফেইল করেছে। এই বিবেচনায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে যে উত্সাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে শুরু হয়েছে, তা সুসমন্বিতভাবে সামনের বছরগুলোতে অব্যাহত থাকলে অনেক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহ ও তত্পরতায় মনে হয়, ‘ডিজিটাল’ আন্দোলনের যে একটা অভিঘাত সৃষ্টি হবে, তার ফলে বাংলাদেশ অবশ্যই কিছুটা এগিয়ে যাবে।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

মানসম্মত শিক্ষার দিকনির্দেশনা চাই -শিক্ষা by মধুমিতা চক্রবর্তী

শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ ছিল। সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতায় গৃহীত সিদ্ধান্ত নিরঙ্কুশ হয়, নির্ভরযোগ্য হয়। সব দায়দায়িত্ব একা সরকার কিংবা সরকার মনোনীত বিশেষজ্ঞদের বহন করতে হয় না। এভাবে সর্বজনস্বীকৃত একটা নীতিমালা প্রণীত হলে পরবর্তী সময় সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে নীতিমালা বদলে যাওয়ার আশঙ্কাটাও থাকে না।
কিন্তু এত বিস্তৃত একটা বিষয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করতে যাওয়াটাও খুব কঠিন কাজ। দেশপ্রেমিক, নিঃস্বার্থ, বিদগ্ধ ব্যক্তিরা মিলে প্রচণ্ড খাটাখাটুনি করে যেটা দাঁড় করিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে তার এক বা একাধিক অংশের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করা যতটা সহজ, নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা ততটা সহজ বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে এই একটাই সম্ভবত ক্ষেত্র, যাকে ঘিরে প্রতিটি সরকারের আমলেই এবং প্রায় প্রতিনিয়তই একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরিবর্ধন-পরিমার্জন, পরিবর্তনের অন্তহীন প্রচেষ্টা চলতে থাকে। এত দিনে তবু একটা কিছু স্থায়ী সুরাহা হতে যাচ্ছে—এ রকম একটা আশাবাদ নিয়ে তাই শুধু প্রতীক্ষায় রয়েছি।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, প্রকৃতিপ্রেমী, পরম শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন শর্মার ‘আমলাতান্ত্রিক গাঁট’ শিরোনামের লেখাটি পড়ে নীতিমালাবহির্ভূত অথচ শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বিষয়টির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের পাশাপাশি নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা গেল না।
প্রশ্ন নীতি বা পরিকল্পনা নিয়ে নয়, প্রশ্ন থেকে যায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে। খোলনলচে সুদ্ধ বদলানো না গেলে সে ক্ষেত্রে ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়। দ্বিজেন শর্মার বর্ণনায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথার্থ চিত্রই ফুটে উঠেছে। সরকারি চাকরিতে বদলির বিধান অতি সাধারণ একটি ঘটনা। যিনি শিরীষ গাছগুলো লাগিয়েছেন, গাছ পাহারা দিয়ে বসে থাকার উপায় তাঁর নেই। কিন্তু তাই বলে সৃজনশীল বা উন্নয়নমূলক কাজের ধারাবাহিকতা থাকবে না? তাহলে প্রতিবারই তো সেই শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। আবার বদলির বিধান সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য না হওয়ায় একই প্রতিষ্ঠানে প্রচুর শিকড় ছড়িয়ে কেউ কেউ বিশাল মহীরুহ হয়ে ওঠেন, প্রতিষ্ঠানকে তখন তাঁরা পৈতৃক সম্পত্তির মতো ভাবেন। বর্ধন-সংরক্ষণ দূরে থাক, গাছের একটি পাতাও তাঁদের ইশারা ছাড়া নড়তে পারে না। তাই মূলোত্পাটন কিংবা মূলতন্ত্রের অবাধ বিস্তার কোনোটাই কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। মূলোত্পাটন ভালো কাজের গতিরোধ করে আর মূলের অবাধ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অবৈধ ক্ষমতায়নেরও বিস্তার ঘটে। শিক্ষা কার্যক্রমে সরাসরি এই বিষয়গুলোর প্রভাব রয়েছে। অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানে দক্ষ একজন শিক্ষককে হঠাত্ করে কোনো এক অচেনা ছোট্ট কলেজে বদলি করা হলে সেই শিক্ষকের ‘উল্টোরথ’ তখন হতাশার গহ্বরে মুখ থুবড়ে পড়ে। তেমনি একই কলেজে বছরের পর বছর যিনি একই ভঙ্গিতে চর্বিত-চর্বণে অভ্যস্ত, তাঁর চিন্তায়-চেতনায় খোলা হাওয়ার ঝাপটা লাগে না। এভাবে গোটা পদ্ধতির মধ্যেই এক ধরনের স্থবিরতা এসে যায়। এ রকম অবস্থায় ‘সকল কুঞ্জ-কানন ঘুরে’ যত মহার্ঘ্য উপাদানই জড়ো করা হোক না কেন, সুফল প্রাপ্তির ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।
দুঃশাসন, দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পলায়ন, পশ্চাত্গমন—যত ধরনের ত্রুটি আছে, গোটা ব্যবস্থার মধ্যে সবকিছু একেবারে জেঁকে বসেছে। অনেকটা ‘বায়োলজিক্যাল সিস্টেম’-এর অনুকরণে তারই প্রতিলিপিকরণ ঘটতে থাকে। তাই অতীতেও দেখা গেছে, বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া বিভিন্ন গঠনমূলক পদক্ষেপ মাঝপথে থমকে গেছে অথবা ‘কাজীর গরু’র মতো চালু থেকেছে। এ ক্ষেত্রে তাই বাস্তবায়ন-উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থাকে নীতিমালার অংশ করে নেওয়া উচিত।
দ্বিজেন শর্মার একটি হতাশাব্যঞ্জক মতের ক্ষেত্রে আমি অবশ্য দ্বিমত পোষণ করি। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন-কাঠামো নির্ধারণের মাধ্যমে তাঁদের আর্থিক দৈন্য নিরসনের উদ্যোগ নিলে প্রাইভেট কোচিংয়ের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য অনেকখানি কমবে বলে আমার বিশ্বাস, প্রাচুর্যের অসম প্রতিযোগিতার এই বাজারে শিক্ষকেরা তো আর ‘লাউটা, কুমড়োটা’র সওদাগরি দিয়ে দিন কাটাতে পারেন না! কারও ব্যক্তিগত অসততা, অসাধুতা, লোভ, দুর্নীতিপরায়ণতা চিহ্নিত করার ব্যবস্থাগুলোও অবশ্য পদ্ধতিগত হওয়া চাই। নইলে দু-একটি পচা আমের জন্য ঝুড়িশুদ্ধ আম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চরিত্র গঠনের জন্য একসময় ধর্মকে শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছিল। এখন এর সঙ্গে আরও কিছু সংযোজনের সময় এসেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মর্যাদাবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, সমাজসচেতনতা, দেশপ্রেম জাগ্রত করার উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। পরিবারের ছোট-বড় সবার সঙ্গে, প্রতিবেশীর সঙ্গে, পরিবেশ-পারিপার্শ্বের সঙ্গে নিজেকে সাবলীলভাবে সম্পৃক্ত রাখার শিক্ষা নিয়ে যেন বেড়ে উঠতে পারে আমাদের শিশুরা, তারও পদ্ধতিগত ব্যবস্থা রাখা উচিত। শিক্ষার্থীদের মনোবিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধানেরও পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা উচিত।
কিছুদিন আগে, শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত অতি বড় একটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে তখন আগুন জ্বলছে। পত্রিকার প্রতিবেদনে নাশকতামূলক কার্যের আভাস পাওয়া গিয়েছে। ক্রন্দনরত এক প্রেস মালিকের জবানিতে ‘সরকারের একটা শুভ উদ্যোগ, আমাদের এত পরিশ্রম। বিনামূল্যে বই পাওয়ার জন্য লক্ষ-কোটি শিক্ষার্থী অভিভাবকের প্রতীক্ষা সব ধূলিসাত্ হয়ে যাচ্ছে।’ শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যা যে কতটা ভয়াবহ, সর্বব্যাপী তারই এক নিকৃষ্ট উদাহরণ এই ঘটনাটি। বিন্দুমাত্র দেশপ্রেম থাকলে ব্যক্তিগোষ্ঠী কিংবা রাজনৈতিক কোনো স্বার্থেই এমন ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটাতে পারে না কেউ। এ রকম ভয়ঙ্কর কালো থাবা যা একাত্তরে দেখেছি, আজকের দিনেও তা-ই আমাদের তাড়া করে ফিরছে! ভয় নেই, আমাদের আছে অপ্রতিরোধ্য বিজয়ের উত্তরাধিকার। একাত্তরের মতোই সব অশুভ শক্তির কালো থাবা গুঁড়িয়ে দেবে আমাদের নতুন প্রজন্ম। নিজের বিবেকের কাছে সেই অঙ্গীকারে আবদ্ধ থাকতে হবে দেশপ্রেমিক প্রত্যেক নাগরিককে। শুভ-সুন্দরের প্রত্যাশায় সবার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে বজ্র-কঠিন ঐক্য। শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তেমনই একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠার প্রত্যাশা রাখি।
মধুমিতা চক্রবর্তী: সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ।

সংশোধনী
গত সোমবার ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ শীর্ষক সম্পাদকীয়র পঞ্চম প্যারায় ভুলক্রমে ‘তিস্তামুখ’ ছাপা হয়েছে, আসলে হবে ‘টিপাইমুখ’ এবং আনিসুল হকের ‘অরণ্যে রোদন’ কলামের দ্বিতীয় প্যারায় ছাপা হয়েছে ‘১৯৭১’, পড়তে হবে ‘১৯৫১’। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত। —বি. স.

পাকিস্তান সিরিজে খেলছেন ভেট্টোরি

পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির খেলা নিয়ে ইনজুরিজনিত যে অনিশ্চয়তা ছিল, সেটা কেটে গেছে। ২৪ নভেম্বর ডানেডিন টেস্ট দিয়ে শুরু হতে যাওয়া সিরিজের জন্য নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট ফিট ঘোষণা করেছে অধিনায়ককে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচে আমিরের বাউন্সারে চোট পেয়েছিলেন ভেট্টোরি। বল সরাসরি আঘাত করেছিল তাঁর হেলমেটে। পরে ভেট্টোরি বমি করায় তাঁকে নিয়ে ভালোই দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের কোনোটিতেই খেলেননি, অনিশ্চয়তা ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে খেলা নিয়েও। কিন্তু স্ক্যান রিপোর্ট দেখার পর কাল নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের এক বিবৃতি উড়িয়ে দিল সেই আশঙ্কা, ‘সে এখন অনেক ভালো বোধ করছে এবং ২৪ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্ট থেকেই পাওয়া যাবে তাঁকে।’
এটা নিউজিল্যান্ডের জন্য যতটাই সুসংবাদ, ঠিক ততটাই দুঃসংবাদ কাল নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রাখা পাকিস্তানের জন্য। কারণ আসন্ন সিরিজে নিজেদের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য পাকিস্তান বড় হুমকি হিসেবে দেখছে ভেট্টোরিকেই। নিউজিল্যান্ড রওনা হওয়ার আগে পাকিস্তান কোচ ইন্তিখাব আলম জানিয়েও দিয়েছেন, ‘ভেট্টোরিকে ভালো খেলতে হবে আমাদের। তাঁকে বেশি উইকেট দেওয়া চলবে না।’
ভেট্টোরি ছাড়াও পাকিস্তানের আরও এক দুশ্চিন্তার নাম নিউজিল্যান্ডের উইকেট। নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মের মাত্র শুরু, অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ তাই চিন্তিত, ‘ঘটনা হলো, মৌসুম শুরু হতে না হতেই নিউজিল্যান্ডে যাচ্ছি আমরা। আবহাওয়া তাই ঠান্ডা থাকবে। উইকেটও থাকবে সিমিং। অমন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং করাটা হবে আমাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ।’

অর্ধেক ভ্রমণ, অর্ধেক প্রতিযোগিতা

গত ১০ নভেম্বর চীনের গুয়াংজুতে এশিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই অ্যাথলেট সুমিতা রানী দাস ও সজীব হোসেন। তাঁদের কাছে শেষ পর্যন্ত এটি অর্ধেক চীন ভ্রমণ, আর অর্ধেক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ! ১৪ নভেম্বর প্রতিযোগিতা শেষে গত পরশু গভীর রাতে দেশে ফিরে এসেছেন তাঁরা। তাঁরা এটি না জানালে জানার অন্য কোনো উপায় ছিল না। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম নিজেই জানতেন না তাঁদের খবরাখবর।
শাহ আলমকে কাল টেলিফোন করতেই জানালেন, ‘ওরা তো আজ (কাল) এসেছে। আমিও টেলিফোনে জেনেছি খবরটা। ভালো রেজাল্ট হলে তো আগেই জানতেন। তবে আমি শুনেছি, সজীব নাকি ২.০৫ মিটার উচ্চতায় লাফিয়েছে। দেশে করা জাতীয় রেকর্ডের চেয়ে ভালো করেছে ও।’ তাদের ইভেন্ট কবে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেটাও ঠিকমতো বলতে পারলেন না তিনি, ‘ওদের ইভেন্ট কবে হয়েছে সেটা আমি বলতে পারছি না। দলের সঙ্গে ম্যানেজার হিসেবে গিয়েছিলেন ট্রেজারার মিজানুর। উনি চীনে গিয়েই আমাদের জানিয়েছিলেন ঠিকমতো পৌঁছেছি। এর পর আর যোগাযোগ হয়নি। কাল দেশে ফেরার পর কথা হয়েছে।’
মেয়েদের হার্ডলসে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও সুমিতা রানীর দুর্ভাগ্য, সেখানে খেলতে পারেননি তিনি, ‘আমি কীভাবে অংশ নেব বলেন? আমরা চীনে পৌঁছলামই তো ১১ তারিখ ভোর ৫টায়। সেখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও আমাদের কেউ রিসিভ করতে আসেনি। পরে মিজান ভাই (ম্যানেজার) আমাদের একটি ক্যাবে করে ভুল করে অন্য জায়গায় নিয়ে যান। আর ততক্ষণে আমার ইভেন্ট শেষ!’ দেশের বাইরে এর আগে ১০-১২ বার খেলতে গেলেও এমন বিব্রতকর অভিজ্ঞতায় আগে কখনো পড়েননি বলে জানান সুমিতা, ‘কী বলব? আমার খুব কষ্ট হয়েছে। এত জার্নি করে সেখানে গেলাম কিন্তু যে লক্ষ্য নিয়ে গেলাম সেটাই পূরণ হলো না।’ মিজানুর রহমান জানালেন, ‘ভিসা-জটিলতার কারণেই এমনটি হয়েছে। আমরা ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম ৫ নভেম্বর। অনেক দেনদরবারের পর ভিসা পাই ১০ নভেম্বর রাতে। এর পর চীনে গিয়েও বেকায়দায় পড়ি। সেখানে কাউকে চিনি না। কেউ আমাদের রিসিভ করতেও আসেনি। ভুল করে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিলাম।’ তবে ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ঠিকমতো করতে পারেননি বলে দুঃখ প্রকাশই করলেন তিনি, ‘স্যরি, ভাই। আমার ভুল হয়ে গেছে। আসলে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডের জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে করতে সময়ই পাইনি দেশে ফলাফল জানাতে।’
সুমিতা হার্ডলসে অংশ না নিলেও ছেলেদের লং জাম্পে অংশ নেন সজীব হোসেন। সজীব ২.০৫ মিটার উচ্চতায় লাফিয়ে ১৭ জনের মধ্যে হয়েছেন ১৪তম। তাঁর পেছনে ছিল বাহরাইন, তাইপে ও উজবেকিস্তানের খেলোয়াড়। আসন্ন এসএ গেমসের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চীনে গিয়ে বেশ মজার অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরলেন দুই অ্যাথলেট।

৫৫ অক্ষরের নাম

অনেক দিন থেকেই তাঁকে মনে করা হচ্ছে চামিন্ডা ভাসের উত্তরসূরি। কাল মোতেরায় ১২ বলের মধ্যে গম্ভীর, শেবাগ ও টেন্ডুলকারের উইকেট তুলে নিয়ে ইঙ্গিত দিলেন ‘আসছেন তিনি’। ‘ভাস’ হতে এখনো অনেক দেরি, তবে একটা জায়গায় ভাসকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন চানাকা ভেলেগেদারা। পুরো নাম উদা ওয়ালাউই মাহিম বান্দারালাগে চানাকা আসাঙ্গা ভেলেগেদারা। ইংরেজিতে লিখতে মোট অক্ষর লাগে ৫৫টি! ভাসের পুরো নামে অক্ষর ছিল ৫২টি।

অনেক শর্তেই আপত্তি নির্বাচকদের

তিনি একই সঙ্গে দুটি কমিটির প্রধান। বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনস এবং নির্বাচকদের নির্বাচক কমিটি। জাতীয় দল নির্বাচকদের চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণ এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার ব্যাখ্যা দেওয়ার তিনিই উপযুক্ত লোক। কিন্তু এনায়েত হোসেন সিরাজের কথা শুনে মনে হতে বাধ্য, এসব কোনো সমস্যাই নয়!
‘আমাদের দেওয়া চুক্তির নতুন শর্তাবলি সম্পর্কে তিন নির্বাচক তাঁদের মতামত দিয়েছেন। কোনো কোনো ব্যাপারে তাঁদের দ্বিমত আছে। সেসব নিয়েই আমরা সভায় বসব। কোনো কিছুই এখনো চূড়ান্ত নয়। আলোচনার ভিত্তিতে এসবের সমাধান হতে পারে’—কাল বলেছেন এনায়েত হোসেন। কিন্তু সমাধানটা কী? নির্বাচকেরা না মানলে আলোচিত শর্তগুলো কি উঠে যাবে নতুন চুক্তিপত্র থেকে! ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির প্রধান অপেক্ষায় রাখলেন এই জায়গায়, ‘আগে আমরা বসি। কমিটিতে তো আরও অনেক সদস্য আছে। তাঁরাও মতামত দেবেন...।’ নতুন শর্তের ব্যাপারে নির্বাচকদের জানানো মতামত নিয়ে আজই সভায় বসার কথা নির্বাচকদের নির্বাচক কমিটির।
রফিকুল আলম, আকরাম খান ও নাঈমুর রহমানের নির্বাচক কমিটির মেয়াদ শেষ হয় গত আগস্ট মাসে। এর পর সাময়িকভাবে দুই মাসের জন্য চুক্তি বাড়িয়ে পরে সেটা আগামী জুন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা হলেও এখনো চুক্তিতে সই করেন নি তিন নির্বাচক। নতুন চুক্তির জন্য দেওয়া হয় চাকরির নতুন শর্ত এবং এই শর্তের অনেকগুলোই নির্বাচকদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। সূত্র জানায়, নতুন শর্ত অনুযায়ী খেলা বা অনুশীলন না থাকলে নির্বাচকদের বোর্ডের অন্য স্টাফদের মতোই নিয়মিত অফিস করতে হবে। কিন্তু নির্বাচক কমিটি মনে করে তাদের কাজটা সব সময়ই স্বাধীন এবং অফিসের চার দেয়ালের চেয়ে মাঠেই তা বেশি। বর্তমান নির্বাচকেরা তো বটেই, সাবেক নির্বাচক আতহার আলী খানও এমন শর্তকে যৌক্তিক মনে করেন না, ‘নির্বাচকেরা পে-রোলে কাজ করেন না, তাঁদের কাজ চুক্তিভিত্তিক। সময়ের ফ্রেমে তাঁদের কাজকে বাঁধা যাবে না। প্রয়োজন হলে নির্বাচকেরা দিনে ১৮ ঘণ্টাও কাজ করতে পারেন। কিন্তু কাজ না থাকলে তাঁদের ৯টা-৫টা অফিস কেন করতে হবে?’
চুক্তিতে অদ্ভুত এই শর্ত আরোপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এনায়েত হোসেন বলেছেন, ‘অনেক সময় আমরাও জানতে পারি না নির্বাচকেরা কে কোথায় আছেন। আমরা তাঁদের কাজটাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চাই।’ বলা হচ্ছে, নতুন চুক্তিতে নির্বাচক কমিটির জবাবদিহিতা থাকবে বিশেষ কমিটির কাছে, এমনকি ছুটি-ছাটাও অনুমোদন করবে এই বিশেষ কমিটি। নির্বাচকদের প্রশ্ন, নির্বাচকদের নির্বাচক কমিটির কাজ তো নির্বাচক নির্বাচন করা পর্যন্তই। তাহলে বিশেষ কমিটি কোনটা? কারা সেই কমিটির সদস্য? নির্বাচকদের মতে, কোনো বিশেষ কমিটি নয়, সরাসরি ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির অধীনেই থাকা উচিত তাঁদের কর্মকাণ্ড। ‘বিশেষ কমিটি মানে তো আমাদের মতোই আরেকটা কমিটি। আমরা কেন আমাদের সমকক্ষ কোনো কমিটির কাছে জবাবদিহি করব? নির্বাচক কমিটির জবাবদিহি হবে বোর্ডের কোনো স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে’—বলেছেন এক নির্বাচক। এসব নিয়ে আপত্তি তোলার পাশাপাশি চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩০ জুনের পরিবর্তে ২০১১ বিশ্বকাপ পর্যন্ত করারও দাবি জানানো হয়েছে নির্বাচক কমিটির পক্ষ থেকে।
চুক্তির শর্তে ‘বেতনের’ কথা উল্লেখ থাকলেও নির্বাচকেরা মনে করেন, যেহেতু তাঁদের কাজটা চুক্তিভিত্তিক, কথাটা ‘বেতন’ না হয়ে হওয়া উচিত ‘সম্মানী’। নির্বাচকদের দেওয়া চিঠিতে এই সম্মানী এবং কাজের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলমের বেতন মাসিক ৮০ হাজার টাকা এবং অন্য দুই নির্বাচক আকরাম ও নাঈমুরের বেতন ৭০ হাজার টাকা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নির্বাচক বলেছেন, ‘শুরুতে আমাদের জানানো হয়েছিল যে পরে টাকার অঙ্কটা বাড়ানো হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেটা হয়নি।’
নির্বাচকদের নতুন চুক্তি নিয়ে এই জলঘোলা মূলত প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা এবং পেশাদার বোর্ডের অপেশাদারি চালচলনের কারণেই। তবে এনায়েত হোসেনের কথা সত্যি হলে দেরিতে হলেও একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে এ সমস্যার। ‘আমরা এই নির্বাচক কমিটির কাজে সন্তুষ্ট। তাঁরা খুব ভালো কাজ করেছেন। আমরা তাঁদের রাখতেই চাই। শুধু কিছু বিষয় আলোচনা করে ঠিক করে নিতে হবে’—বলেছেন ক্রিকেট অপারেশনস ও নির্বাচকদের নির্বাচক কমিটির প্রধান।

আহমেদাবাদ টেস্টে ভারতের প্রথম ইনিংস শেষ ৪২৬ রানে

আহমেদাবাদ টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভারতের প্রথম ইনিংস থেমে গেছে ৪২৬ রানে। মাত্র ৩২ রানে ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর ‘মি. ওয়াল’ রাহুল দ্রাবিড়ের অনবদ্য ১৭৭ রানের কল্যাণে ভারত ৪২৬ করতে পেরেছে। আজ দিনের শুরুতেই রাহুল দ্রাবিড়ের ১৭৭ রানের সঙ্গে আর কোনো রান যোগ করতে না পারা, দর্শকদের কিছুটা হতাশ করেছে বৈকি।
গতকাল টেস্টের প্রথম দিনই ৪ উইকেট হারিয়ে প্রাথমিক বিপর্যয়ের পর আহমেদাবাদ দেখল রাহুল দ্রাবিড়ের ১৭৭ রান, অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির ১১০ আর যুবরাজ সিংয়ের ৬৮ রানের ইনিংস।
গতকালকের ৩৮৫ রানের সঙ্গে ভারত আজ সকালে যোগ করতে পেরেছে আর মাত্র ৪২ রান। এর মধ্যে হরভজন সিংয়ের অবদান ২২ রান, জহির খানের ১২। শেষ পর্যন্ত অমিত মিশ্র অপরাজিত ছিলেন ৭ রানে। শ্রীলঙ্কার পক্ষে চানাকা ভেলেগেদারা ২২ ওভার বল করে ৮৭ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। তাঁর শিকারে পরিণত হন গৌতম গম্ভীর, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড় এবং বীরেন্দর শেহওয়াগের মতো ‘হেভিওয়েট’ ব্যাটসম্যানরা। মুরালিধরনের সংগ্রহ যথারীতি ৩ উইকেট। কিন্তু তাঁর খরচ ৯৭ রান। এছাড়া প্রসাদ ২টি, রঙ্গনা হেরাথ পান ১টি উইকেট।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ ৮ ওভারে ৩৮। ব্যাট করছেন তিলকরত্নে দিলশান ও পারানাভিতানা।

জাপানের প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী ধারায়

জাপানের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে জাপানের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২০ শতাংশ।
এই নিয়ে টানা দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকল। আর বার্ষিক ভিত্তিতে তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য ধারণা করেছিলেন, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে জাপানের প্রবৃদ্ধির হার আরও কম হবে।
এদিকে গতকাল সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের প্রায় ৩০ মিনিট আগে বাণিজ্যমন্ত্রী মাসেউকি নাওশিমা এক বৈঠকে এ তথ্য প্রকাশ করে বিপাকে পড়েছেন। তিনি অবশ্য এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন।
বলা হচ্ছে, এই প্রান্তিকে জাপানের প্রবৃদ্ধি ২০০৭ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়কালের পর সর্বোচ্চ।
রপ্তানি আয়ে গতিময়তা ফিরে আসাই প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকার কারণ। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জাপানের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে। এই সময়কালে ভোগব্যয় বেড়েছে দশমিক ৭০ শতাংশ হারে।
জাপান সরকারের উদ্দীপনামূলক পদক্ষেপের কারণে দেশটিতে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধনী ব্যয়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব শুরু হওয়ার পর ২০০৮ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে জাপানের জিডিপির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হতে শুরু করে। এই প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার আগের প্রান্তিকের তুলনায় দশমিক ৭০ শতাংশ হারে হ্রাস পায়।
এর পরের প্রান্তিকে অর্থাত্ ২০০৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৭০ শতাংশ হারে এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়কালে ৩ শতাংশ হারে কমে যায়। এ বছরের শুরুর প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২০ শতাংশ হারে কমে যায়।
এভাবে টানা চার প্রান্তিক নেতিবাচক থাকার পর এ বছরের এপ্রিল-জুন সময়কালে দশমিক ৭০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি দেখা দেয়।

সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা নিম্নমুখী

চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। তবে ওই হার সাড়ে চার শতাংশের ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচকের পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগস্ট মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
আর বার্ষিক গড় হিসাবে সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার হয়েছে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। আগস্ট মাসে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
অবশ্য গত অর্থবছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাসওয়ারি ও বার্ষিক উভয় ধরনের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ শতাংশের ওপরে।
অবশ্য গত বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের হার অনেক বেশি ছিল, যার প্রতিফলন দেখা দিয়েছিল মূল্যস্ফীতির ওপর।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে অবশ্য আগামী দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার বিষয়ে কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মূল্য পরিস্থিতি এই আভাসই দেয় যে আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভোক্তা মূল্যসূচক নিম্নমুখী না হয়ে বরং ঊর্ধ্বমুখী হবে।’
এতে অবশ্য এও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির বার্ষিক গড় হার সামনের দিনগুলোয় কমে আসবে এবং অর্থবছর শেষে সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যেই সীমিত থাকতে পারে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আগের যে মাসগুলোয় উচ্চহারে মূল্যস্ফীতি ছিল, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এক বছর সময়ের মধ্যে সেই মাসগুলো আর থাকবে না।
বিষয়টা এ রকম যে বর্তমানে সেপ্টেম্বরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর—এই ১২ মাসের মাসওয়ারি মূল্যস্ফীতির হার ধরে হিসাব করা হয়েছে। আর আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির বার্ষিক গড় হিসাব করা হয়েছিল ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১২ মাসের হিসাব নিয়ে।
এভাবে একটি মাস অতিক্রম হলে আগের একটি মাস বার্ষিক গড় হিসাব থেকে বাদ পড়ে যায়।

টিফা আগে জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি ব্যবসায়ীদের -আমেরিকায় বাজারসুবিধা পেতে টিফা প্রয়োজন: মরিয়ার্টি

দেশের ব্যবসায়ী নেতারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রূপরেখা চুক্তির (টিফা) বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ব্যবসায়ীরা টিফা চুক্তি স্বাক্ষরের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু আগে নিশ্চিত হতে হবে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় যেসব সুবিধা পেয়ে আসছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এর প্রত্যুত্তরে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেছেন, টিফা স্বাক্ষর করা ছাড়া বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ পাবে না। তবে মেধাস্বত্বসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রাপ্ত সুবিধাগুলো টিফার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, আর টিফা কোনো অবশ্যপালনীয় চুক্তি নয়।
গতকাল সোমবার দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে (এমসিসিআই) এক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, টিফা সই করার আগেই ব্যবসা, বাজারসুবিধা ও শ্রম বিষয়ে বড় ধরনের আলোচনা করা যেতে পারে।
জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেন, চলমান দোহা আলোচনার আলোকে যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে বাজারসুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কাজ করছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় বাংলাদেশ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্র সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি চুক্তি করতে আগ্রহী।
জিএসপি-সুবিধা সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস এ কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। চলতি সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বৈঠকে তা আলোচনা হতে পারে বলে তিনি জানান।
রাজধানীর মতিঝিলে চেম্বার ভবনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল হাফিজ চৌধুরী। তিনি বলেন, টিফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ চুক্তির আওতায় উভয় দেশ থেকে প্রতিনিধি নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পরিষদ গঠন করতে হবে। এ ফোরামে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক বিষয়গুলো আলোচনা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো সরকারই টিফার বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না। এ কারণে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কিছুই জানতে পারছে না।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি বলেন, টিফার বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে জানতে পারবে। এ ছাড়া টিফা চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করতে পারবে কি না, তা পরিষ্কার হবে। এর কোনো ধারায় কোনো অসংগতি থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
আবদুল হাফিজ চৌধুরী বলেন, আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে ডব্লিউটিও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্ব আইনে ছাড় দিয়েছে, টিফা তা ক্ষুণ্ন করবে না।
আবদুল হাফিজ আরও বলেন, জিএসপি-সুবিধা চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রধান ৩০টি রপ্তানিপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি এসব পণ্য জিএসপি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই প্রস্তাবিত টিফা সবার সামনে প্রকাশ করা উচিত। এতে আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের কোনো ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করা সম্ভব হবে।
মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন অ্যামচেমের সভাপতি আফতাব-উল ইসলাম, প্রাণ গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরী, সিটিব্যাংক এনএ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন রশীদ প্রমুখ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি লতিফুর রহমান, লায়লা রহমান কবীর, স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী, এমসিসিআইয়ের উপদেষ্টা সি কে হায়দার, মহাসচিব ফারুক আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শিশুনিগ্রহের ঘটনায় অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী রাডের দুঃখ প্রকাশ

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শিশুপরিচর্যা কেন্দ্র ও অনাথ আশ্রমে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড। ব্রিটেন থেকে এসব শিশুকে অভিবাসনে বাধ্য করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাডের ভাষণ শোনার জন্য গতকাল সোমবার পার্লামেন্ট হাউসে জড়ো হয়েছিল নিগ্রহের শিকার এক হাজার মানুষ। প্রধানমন্ত্রী রাড যখন ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এতিমখানা ও ইনস্টিটিউটে সংঘটিত কয়েকটি হূদয়বিদারক নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেভিন রাড বলেন, ‘জাতির পক্ষে দুঃখ প্রকাশ করার জন্য আজ আমরা একত্র হয়েছি। যেসব শিশুকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের উপকূলে পাঠানো হয়েছিল, তাদের বলছি যে আমরা দুঃখিত।’
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দুঃখিত যে আপনাদের শিশু অবস্থায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে এখানে আনা হয়েছিল। যেখানে আপনারা প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব শারীরিক দুঃখ-কষ্টের জন্য আমরা দুঃখিত।’
রাড বলেন, অতীতের বিভিন্ন ঘটনায় অভিবাসী শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, সে জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। সেই নিগ্রহের জন্য এখন দুঃখ প্রকাশ অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
ব্রিটেন গত শতাব্দীতে কয়েক হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে সুন্দর ভবিষ্যতের কথা বলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ সাবেক উপনিবেশগুলোতে পাঠায়। শিশু-অভিবাসন কর্মসূচির অধীনে ৪০ বছর আগে ব্রিটিশ সরকার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনে বাধ্য করা এসব শিশুকে রাষ্ট্র ও গির্জানিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়। সেখানে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং শ্রমে বাধ্য করা হয়।

বাবা আমাকে লস্করের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন -জিজ্ঞাসাবাদে কাসাব

গত বছরের নভেম্বর মাসে মুম্বাই হামলায় অংশগ্রহণকারী লস্কর-ই-তাইয়েবার একমাত্র বেঁচে থাকা সদস্য আজমল আমির কাসাব বলেছেন, অর্থের লোভে তাঁকে ওই জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তদন্তকারীদের এ কথা বলেন তিনি।
মুম্বাই হামলা নিয়ে এইচবিও চ্যানেলে প্রচারিতব্য ‘টেরর ইন মুম্বাই’ নামের একটি তথ্যচিত্রে ওই জিজ্ঞাসাবাদের অংশবিশেষ প্রচার করা হবে। গত রোববার সিএনএনে তথ্যচিত্রটির অংশবিশেষ প্রচার করা হয়। কাসাব বর্তমানে ভারতের কারাগারে বন্দী।
জিজ্ঞাসাবাদে কাসাব বলেন, ‘বাবা আমাকে বলেছিলেন, এ মানুষগুলো (লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্যরা) অনেক টাকাপয়সা কামিয়েছে। ওদের সঙ্গে থাকলে তুমিও বড়লোক হয়ে উঠবে। আমরা আর গরিব থাকব না। তোমার ভাইবোনদের বিয়ে হবে। এদের দেখো, তারা একটি ভালো জীবন কাটাচ্ছে।’
কাসাব জানান, তাঁর বাবা রাস্তার পাশে ঘোল ও আলুর তৈরি খাবার বিক্রি করতেন। তাঁকে বিক্রি করে সম্ভবত কয়েক শ ডলার পেয়েছিলেন তিনি। কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে না, বরং হাতে হাতে ওই লেনদেন হয়েছিল।
এসব হামলা চালানোর জন্য কত দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে কাসাব জানান, তাঁকে প্রায় তিন মাস প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এ জন্য ২৪-২৫টি ক্লাস করতে হয়েছে। তবে যাঁরা প্রশিক্ষণ দিতে এসেছিলেন, তাঁদের পরিচয় জানেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি। কাসাব আরও জানান, প্রশিক্ষণ ক্লাসের সময় প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক কথাবার্তা বলা নিষিদ্ধ ছিল। তিনি শুধু লাহোর থেকে আসা একজনের সঙ্গে আলাপ করতে পেরেছিলেন।
নিরীহ মানুষদের হত্যা করা প্রসঙ্গে কাসাব বলেন, তাঁকে বলা হয়েছিল, বড় মানুষ হতে গেলে এটা করতে হবে। আর এ জন্য বেহেশতে তাঁর জন্য পুরস্কার রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে জিহাদের প্রসঙ্গ তোলা হলে কাসাব জবাব দেন, ‘বিষয়টি আপনারা বুঝবেন না।’
গত নভেম্বরে মুম্বাইয়ে জঙ্গিদের হামলায় ১৭০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। এ ছাড়া হামলাকারী ১০ জন জঙ্গি সদস্যের মধ্যে নয়জনের মৃত্যু হয়।

অ্যান্টার্কটিকা থেকে উদ্ধার করা হবে শত বছরের পুরোনো হুইস্কি

অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে ১০০ বছর চাপা পড়ে থাকা দুই ঝুড়ি স্কচ হুইস্কি উদ্ধার করা হবে। গতকাল সোমবার নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তারা এ কথা জানান। মেরু অভিযাত্রী আর্নেস্ট শ্যাকলটন সেখানে ওই হুইস্কি নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯০৭-০৯ সালের দিকে দক্ষিণ মেরুবিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য ওই অভিযান চালান শ্যাকলটন। ২০০৬ সালে ওই হুইস্কির সন্ধান পাওয়া যায়।
নিউজিল্যান্ড অ্যান্টার্টিক হেরিটেজ ট্রাস্ট নামের একটি সংরক্ষণবাদী সংগঠনের কর্মীরা ওই হুইস্কি উদ্ধার করার পরিকল্পনা করছেন। দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকালের দিকে এ ব্যাপারে অভিযান চালাবেন তাঁরা। রেডিও নিউজিল্যান্ডকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ট্রাস্টের কর্মী আল ফাস্টিয়ের জানান, ওই অভিযাত্রীটি সম্ভবত ভুল করে ওই হুইস্কি ফেলে গিয়েছিলেন। এই সংগঠনটি অ্যান্টার্কটিকায় তিন অভিযাত্রীর কুটির সংরক্ষণ করছে। ওই হুইস্কি উদ্ধার করার পর শ্যাকলটনের কুটিরে তা সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হবে।
তবে ওই হুইস্কির প্রস্তুতকারক স্কটল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানি হোয়াইট অ্যান্ড ম্যাককেইয়ের কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা হুইস্কির একটি বোতল না হলেও কমপক্ষে সামান্য পরিমাণ হুইস্কি পেতে অধীর অপেক্ষায় আছেন। রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় লক্ষ্যস্থলের ১৬০ কিলোমিটার দূর থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন শ্যাকলটন। পরে ১৯১১ সালে প্রথম দক্ষিণ মেরুবিন্দুতে প্রথমে পৌঁছানোর কৃতিত্ব অর্জন করেন নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল্ড অ্যামুন্ডসেন।

আল-কায়েদা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি: বারাক ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, আল-কায়েদা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এশিয়া সফররত ওবামা গতকাল সোমবার চীনের সাংহাইতে একটি ছাত্র জমায়েতে এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রশাসন আল-কায়েদাবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন কর্মকৌশলকে সহায়তা করতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আফগানিস্তানে আরও ৪০ হাজার সেনা পাঠানো হবে কি না—এশিয়া সফর শেষে প্রেসিডেন্ট ওবামা সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁর প্রশাসন এই সেনাসংখ্যা বাড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক চাপে আছেন। ওবামার বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে ‘সিদ্ধান্তহীনতা’র অভিযোগ তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আল-কায়েদা দমনে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ওবামাবলেন, ‘আল-কায়েদা আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে সংগঠিত হচ্ছে। এই সংগঠনটি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সেখানে একযোগ কাজ করছে।’
এদিকে গত সোমবার নিউইয়র্ক টাইমসের এক খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে প্রেসিডেন্ট জারদারিকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন কর্মকৌশলের সঙ্গে সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।