Monday, June 1, 2015

মা বনাম জা by মাহবুব তালুকদার

আমাদের রাজনীতিবিদরা মাঝে মাঝে চমকপ্রদ বক্তব্য দিয়ে পত্রিকার পাতা আলোকিত করে থাকেন। বিগত ৯ই মে আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী তার নির্বাচনী এলাকার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘ক্ষমতা থাকলে তিনি জাফর ইকবালকে চাবুক দিয়ে পেটাতেন’। পত্রিকার এই ভাষ্য যদি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে মান্যবর সংসদ সদস্যের কথা আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন করে। প্রথমত, কি কারণে এবং কোন অপরাধে তিনি জাফর ইকবালকে চাবুক দিয়ে পেটাতে চান? দ্বিতীয়ত, জাফর ইকবাল কে, এত লোক থাকতে কেন তাকেই পেটাতে হবে? তৃতীয়ত, মাননীয় সংসদ সদস্যের ক্ষমতায় কি ঘাটতি আছে? ‘ক্ষমতা থাকলে’ কথাটি বললেন কেন? চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানুষ পেটানোর অধিকার আছে, কিন্তু একজন সংসদ সদস্যের এই সামান্য অধিকারটুকু নেই কেন? পঞ্চমত, প্রয়োজনে একজন আইনপ্রণেতা কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবেন না? এই পাঁচটি ছাড়া আরও অনেকগুলো সম্পূরক প্রশ্ন আছে। তবে আপাতত এই পাঁচটিই যথেষ্ট।
জাফর ইকবালকে মাননীয় সংসদ সদস্যের চাবুক দিয়ে পেটাতে চাওয়ার কারণ আপাতদৃষ্টিতে খুবই যৌক্তিক। পত্রিকায় লেখা হয়েছে- ‘জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে মাহমুদ-উস সামাদের অসন্তোষ তার ‘সিলেট বিদ্বেষী’ মনোভাবের কারণে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, জাফর ইকবালের কারণেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেটের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারে না। তাদের আটকাতে নানা আইনকানুন তৈরি করে নেন জাফর ইকবাল।’ এহেন অভিযোগ যে অত্যন্ত গুরুতর তাতে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল সিলেটের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে- এমন বিধিবিধান করে নিলে ল্যাঠা চুকে যায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে জাফর ইকবালের আইনকানুন তৈরির জারিজুরি বা তার কোনো অপকৌশল আর খাটবে না।
দ্বিতীয়ত, জাফর ইকবাল কে- এই প্রশ্নের জবাব দান খুবই সহজ। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং তার একটি ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং অর্ধশতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষকের ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। সে হিসেবে তিনি বিশেষ কেউ নন। অবশ্য তিনি একজন লেখক। লেখকদের পদাধিকার বলতে কিছু নেই। তারা কোনো প্রটোকলের মধ্যে পড়েন না। এমতাবস্থায় একজন প্রটোকলবিহীন শিক্ষককে সঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে অভিযুক্ত করা হয়নি। তিনি যদি তেমন কেউ হতেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হতো কি না জানি না।
জাফর ইকবাল আসলে একজন ছদ্ম-সিলেটপ্রেমী। ছদ্ম-সিলেটপ্রেমী ও সিলেট বিদ্বেষীর মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। ছদ্ম-সিলেটপ্রেমীরা সিলেটের প্রেমের ভান করেন কিন্তু সিলেটের স্বার্থ রক্ষায় তারা আগুয়ান হন না। জাফর ইকবাল সম্পর্কে পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ‘তার জন্ম এই সিলেটেই। এখানকার সিলেট নগরীর ব্যস্ততম এলাকা মিরাবাজারে তার শৈশব কেটেছে। বাল্যশিক্ষাও এখানে। তার স্ত্রী ড. ইয়াসমীন হকের রক্তেও রয়েছে সিলেটের উত্তরাধিকার। ইয়াসমীন হকের জন্ম সিলেটে না হলেও তার নানাবাড়ি এখানেই। সব মিলিয়ে জাফর ইকবালের ঘরজুড়ে সিলেটের মাটির ঘ্রাণ। আর তাই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিলাসী জীবনের মোহমায়া ছেড়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে ফিরে এসেছেন তার জন্মের শহর সিলেটেই।’ পত্রিকায় যাই লেখা হোক না কেন, জাফর ইকবাল যে সিলেটে জন্মেও সিলেট-বিদ্বেষী হয়েছেন, এটাই সত্য কথা। এক্ষেত্রে তার দুটো অপশন ছিল। এক. সিলেটে না জন্মানো। দুই. সিলেটে জন্মগ্রহণ যেহেতু তার ইচ্ছাধীন ছিল না সেহেতু তার উচিত ছিল সিলেটপ্রেমী হিসেবে ছদ্মবেশ ধারণ না করে সত্যিকার সিলেটপ্রেমিক হয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মাহমদু-উস সামাদের চিন্তা ও আদর্শের আদলে গড়ে তোলায় হাত সম্প্রসারিত করা।
উপরোক্ত ‘আদর্শ’ কথাটার উল্লেখ করে আমি আরেকটা বিপদ ডেকে আনলাম। ৯ই মে’র বক্তৃতায় মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন জাফর ইকবালের আদর্শও তার পছন্দ নয়। সেদিন জাফর ইকবাল প্রসঙ্গে বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘এই লেফটিস্টরা আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে।’ মাননীয় সংসদ সদস্যদের এই উক্তি প্রণিধানযোগ্য। আমরা লক্ষ্য করেছি, আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিবিদরা প্রায়ই এহেন আক্ষেপ করে থাকেন। এই আক্ষেপের সঙ্গত কারণও আছে। মধ্যপন্থি মূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের বাদ দিয়ে বাম ঘরানা থেকে আসা অনেককে মন্ত্রিত্ব দেয়া হচ্ছে, মূল্যায়ন করা হচ্ছে, এটা মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর। অন্যদিকে অনেকে বলে থাকেন, বর্তমান সরকার মার্কিনিদের পরিহার করে রাশিয়ার দিকে দিনে দিনে ঝুঁকে পড়ছে, এটাও তাদের দুঃখের কারণ। তাই লেফটিস্টদের সম্পর্কে এই আক্ষেপ চিরন্তন। জাফর ইকবালের সঙ্গে আমার পরিচয় থাকলে তাকে বলতাম, বামপথ পরিত্যাগ করে আপনি ডান দিকে মোচড় দিন। আখেরে যদি আপনি বেত্রাঘাত বা চাবুকের আঘাত এড়াতে চান।
মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীকে আমি সাধারণ একজন সংসদ সদস্য মনে করি না। তিনি আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দলের জনপ্রতিনিধি। জাতীয় সংসদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারবিল উত্থাপন করে তিনি দেশজুড়ে আলোচিত হন। অন্যদিকে জাফর ইকবালকে কোনক্রমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ব্যক্তি বলে আখ্যা প্রদান করা সম্ভব নয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস ‘আমার বন্ধু রাশেদ’-এর লেখক। বইটি দেশব্যাপী স্কুলগুলোতে পড়ানো হয়। এমতাবস্থায় মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীর সামনে দুটো অপশন আছে। এক. বেত্রাঘাতযোগ্য একজন লেখকের বই স্কুলে পড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বইটিকে বাতিল করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো। দুই. তিনি নিজেই ওই ধরনের একটি বই লিখে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
মাননীয় সংসদ সদস্যের আরেকটি বিষয় জানা আছে কি না জানি না। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাফর ইকবালের পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ পিরোজপুরের তৎকালীন এসডিপিও থাকাকালে শহীদ হন। পিতার মৃত্যুর পর এই পরিবারটিকে নানারূপ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। এ জন্য আমার মনে হয়, জাফর ইকবালকে বেত্রাঘাতের সিদ্ধান্ত প্রকাশের ক্ষেত্রে মাননীয় সংসদ সদস্যের আরও চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন ছিল।
এবার তৃতীয় বিষয় প্রসঙ্গে আসি। ক্ষমতা থাকলে তিনি জাফর ইকবালকে চাবুক দিয়ে পেটাতেন বলেছেন। ‘ক্ষমতা থাকলে’ কথাটার মধ্যে কিছুটা আক্ষেপ ও হতাশা পরিলক্ষিত হয়েছে। আমার মতে, মাননীয় সংসদ সদস্যগণের ক্ষমতা অবারিত হওয়া উচিত। তাদের ক্ষমতার যদি কিছু ঘাটতি থাকে, তাহলে অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংসদই সদস্যদের ক্ষমতা বর্ধিতকরণ সম্পর্কে ব্যবস্থা নিতে পারে। সংসদ সদস্যগণ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে আফসোস করবেন, এটা কারও কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। এক সময়ে শিক্ষকদের বেত দ্বারা ছাত্র পেটানোর অধিকার ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক আদেশবলে ওই অধিকার, এমনকি ছাত্রদের মারধর করার অধিকারও খর্ব করে। কিন্তু শিক্ষকদের পেটানোর ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো মানা নেই। তাছাড়া, চাবুক দিয়ে শিক্ষক পেটানোর ব্যাপারে কোনো নিষেধজ্ঞা তো নেইই। চাবুক জিনিসটা সাধারণত ফিল্মে দেখা যায়, জমিদার বা মালিকদের হাতে থাকে। আজকাল বাস্তবে চাবুক খুঁজে পাওয়া ভার।
চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, মানুষ পেটানোর অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হরহামেশাই নির্বিচারে জনগণের ওপর এই অধিকার প্রয়োগ করে থাকে। এটা হচ্ছে তাদের নিম্নতম অধিকার। আজকাল তারা পায়ে গুলি করা ও ক্রসফায়ার পর্যন্ত তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে নিয়েছে। বিস্ময়ের বিষয় এই, একজন সংসদ সদস্যের এই সামান্য অধিকারটুকু পর্যন্ত নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কাউকে পেটানোর জন্য ইউনিফরম পরতে হবে কেন? যদিও আজকাল অনেক জনপ্রতিনিধি জনগণকে কিংবা ব্যক্তি বিশেষকে মারধর করার অধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। সেটা হচ্ছে তাদের ইনফরমাল অ্যাকশন। এ কাজটির ফরমাল রূপদান করা এবং বিধিবদ্ধভাবে তা প্রয়োগ করার ব্যবস্থা থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ইউনিফরম না পরেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাদা পোশাকে কাউকে চাবুক দিয়ে পেটানোর অধিকার আইন দ্বারা সংরক্ষিত রাখা উচিত।
সর্বশেষ বিষয়টি হচ্ছে, একজন আইনপ্রণেতা কেন প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবেন না? যিনি আইন তৈরি করেন, কেন সেই আইন ক্ষেত্রবিশেষে নিজে প্রয়োগ করতে পারবেন না? এর মধ্যে এক ধরনের পরস্পর বিরোধিতা আছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়। আমি যে আইন বানাই, সেটা অন্যে ব্যবহার করতে পারবে, আমি পারবো না কেন? ময়রা মিষ্টি প্রস্তুত করে, কিন্তু সেই মিষ্টি সে নিজে সদ্ব্যবহার করলে অসুবিধা কোথায়? তাছাড়া ‘ডকট্রিন অব নেসিসিটি’ বলে একটা কথা আছে। সেই প্রয়োজন পরিপূণের জন্য একজন আইনপ্রণেতাকে নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার অধিকার দিতে হবে।
তবে মাহমুদ-উস সামাদর বক্তব্যের যে প্রতিবাদ হয়নি, এমন নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ তার জীবনের সর্বশেষ স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘মেধা-গুণ-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কোনো দিক দিয়ে যে অধ্যাপকের হাঁটুর কাছে বসার যোগ্যতা নেই তারাই আবার ওই অধ্যাপককে চাবুক মারার কথা বলে। কলিকালের শিক্ষা একেই বলে।’ নিহত ব্লগার অনন্ত কলিকালের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাখ্যা করার অবকাশ পাননি। তিনিও যে কলিকালের শিক্ষার যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। বেঁচে থাকলে এসব অর্বাচীনসুলভ স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য তার কি পরিণতি হতো কে জানে?
পরিশেষে জাফর ইকবালকে বলি, আপনি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেও মনেপ্রাণে সিলেটি হতে পারেননি। মনেপ্রাণে সিলেটি হতে না পারলে সিলেটি ছাত্র ভর্তিসহ অন্যান্য বিষয়ে সিলেটিদের স্বার্থে আঘাত করলে, আপনাকে বেত্রাঘাত বা চাবুক দ্বারা পেটানো থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী ‘ক্ষমতা থাকলে’ বিষয়টি অনুধাবন করে আপনাকে ছাড় দিয়েছেন। এটা তার মহানুভবতা। কিন্তু ভবিষ্যতে এমন কারও পাল্লায় পড়ে যাবেন, যিনি ক্ষমতা আছে কি নেই, সে বিষয়ে চিন্তা করবেন না। তাই বলি, আপনি সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন ডক্টর মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

বাজেট বাগাড়ম্বরের আড়ালে by আনু মুহাম্মদ

প্রতিবছরের মতো ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও বাজেটের আকার বাড়ছে। সে জন্য সর্বজনের প্রয়োজনীয় কোনো কোনো খাতে অনুপাতে না বাড়লেও অনেক খাতে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জিডিপি বাড়ছে, অর্থনীতির আকার বাড়ছে, সুতরাং বাজেট অঙ্কও বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। তাই আগের বছরের তুলনায় বড় বলে বাজেট যেমন বিরাট সাফল্যের স্মারক নয়, তেমনি তাকে অস্বাভাবিক বা উচ্চাভিলাষী বলার কিছু নেই। প্রশ্নটা বাজেটের আকার নিয়ে নয়, প্রশ্ন তার গতি-প্রকৃতি নিয়ে; শুধু বরাদ্দ নিয়ে নয়, প্রশ্ন তার গুণগত মান নিয়ে।
বাজেটের আয় তৈরি হয় জনগণের অর্থ দিয়ে। ঘাটতি তৈরি হলে সেটা মেটানো হয় দেশি-বিদেশি ঋণ দিয়ে, যা আবার জনগণকেই শোধ করতে হয়। জনগণের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় কর ও শুল্ক হিসেবে। বাজেটের প্রধান অংশ রাজস্ব আয় ও ব্যয়। সরকারের রাজস্ব আয় বলতে যা বোঝানো হয়, তাকে আমরা অন্যদিক থেকে বলতে পারি কর শুল্ক ও ফিসহ নানাভাবে সরকারকে দেওয়া জনগণের অর্থ। আর রাজস্ব ব্যয়? সেটি হলো সরকারি প্রশাসন-প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ। বাড়তি অর্থ খরচ হওয়ার কথা উন্নয়নের জন্য। ঘাটতি হলে নিতে হয় ঋণ।
বাংলাদেশের মানুষ সরকারকে যে কর–শুল্ক দেন, তা গত ছয় বছরে তিন গুণের বেশি বেড়েছে। তবে জনগণের ওপর বোঝা শুধু কর আর শুল্ক দিয়েই শেষ হয় না; বাড়তি কর–শুল্কের চেয়েও গত কয়েক বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে বাড়িয়েছে অনেক বেশি। শিল্প, কৃষিসহ সব উৎপাদনশীল খাতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের কাছ থেকে কর শুল্ক সারচার্জ বা বর্ধিত দাম আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা দেখা যায় না। সরকার জনগণের কাছ থেকে যা চেয়েছে, তা দিতে তারা কখনো আপত্তি করেনি। কিন্তু জনগণের পাওনা পরিশোধ করেনি কোনো সরকারই। ‘কর-জিডিপি’ অনুপাত নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা সব সময় কথা বলেন। কিন্তু কথা আরও জোরে বলা দরকার ‘কর-পরিষেবা (সার্ভিস)’ অনুপাত নিয়ে। জনগণ কর শুল্কসহ সরকারকে অর্থসম্পদ জোগান দেন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার জন্য, সুস্থ নিরাপদ জীবন ও জীবিকার জন্য, সর্বজনের সম্পদ রক্ষার জন্য, সর্বজনের শিক্ষা-চিকিৎসা সম্প্রসারণের জন্য। এসব ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা সীমাহীন; বরং উল্টো ভূমিকাই দেখা যায় বারবার।
তাহলে এই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়? সরকারি, আধা সরকারি প্রতিটি গাড়ি, প্রতিটি ভবন, এসি, সভা, চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া, বিলাস, অপচয়, জীবনযাপন, বিদেশ সফর, কেনাকাটা—সবকিছুই আসলে জনগণের দেওয়া অর্থেই পরিচালিত হয়। জনগণ হয়তো খেয়াল করেন না যে তাঁদের ঘরের ওপর বুলডোজার, তাঁদের মাথায় পুলিশ বা র্যাবের লাঠি-গুলি, তাঁদের সামনে মন্ত্রী-এমপি-আমলার চোটপাট কিংবা শানশওকত, নতুন নতুন ভবন, দামি গাড়ি, উৎসব-উল্লাস সবই তাঁদের অর্থ দিয়েই পরিচালিত হয়। সরকার প্রতিশ্রুতি আর বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে সবাইকে কৃতার্থ করে। অথচ ওই টাকা তো সরকারের কারও ব্যক্তিগত নয়, তা মানুষেরই।
যাদের হাতে দেশের আয় ও সম্পদের বৃত্তাংশ তারা প্রধানত করজালের বাইরে। সরকারের সমীক্ষা ও অর্থমন্ত্রীর ভাষ্যেই বলা হয়েছে বাংলাদেশের বিশাল অংশের অর্থ সরকারের হিসাবে নেই। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, টাকার অঙ্কে এটি ৪ লাখ থেকে ১০ লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অর্থশাস্ত্রে বা সাধারণ পরিচয়ে এর নাম ‘কালোটাকা’, নরম ভাষায় বলা হয় ‘অপ্রদর্শিত আয়’। এর মধ্যে একটি ক্ষুদ্র অংশ হতে পারে পরিশ্রমলব্ধ বৈধ আয়, বিভিন্ন কারণে কর না দেওয়ায় তা এখন ‘অপ্রদর্শিত’ তালিকাভুক্ত। তবে এটা নিশ্চিত বলা যায় যে এই টাকার বড় অংশের যথার্থ নাম হবে ‘চোরাই টাকা’, যা চুরি, ডাকাতি, লুণ্ঠন, ক্ষমতা প্রয়োগ, জালিয়াতি, দখল ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে অর্জিত। এগুলোর মধ্যে আছে ঘুষ, নিয়োগ-বাণিজ্য, কমিশন, রাষ্ট্রীয় বা সর্বজন সম্পদ আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, কাজ না করে উন্নয়ন প্রকল্প বরাদ্দ ভাগাভাগি, বাণিজ্যে ওভার-আন্ডার ইনভয়েসিং, মাদক-বাণিজ্য, শ্রমিক-নারী-শিশু পাচার ইত্যাদি। সবাই জানেন, এসব কাজ ক্ষমতাবানদের পক্ষেই করা সম্ভব, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এগুলো টিকতে পারে না। তাই সব সরকারের আমলেই ‘কালোটাকা’ সাদা করা নিয়ে ঢাকঢোল বাজে, কিন্তু এর উৎস বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের হিসাবে দেখা না গেলেও এই অর্থ যেভাবে উপার্জিত হয়, তাতে সন্ত্রাস, দখলদারত্ব আর সন্ত্রাসী বাহিনীর পুনরুৎপাদনই স্বাভাবিক। দেশে অপরাধ, সহিংসতা, যৌন–সন্ত্রাস ইত্যাদির বিস্তৃতি এমনি এমনি ঘটেনি। এই বিশাল সম্পদ ও অর্থ করদানের আওতার বাইরে এবং তা অব্যাহতভাবে ক্রমবর্ধমান। গত কয়েক দশকে যে উন্নয়ন গতিধারা সরকারনির্বিশেষে পুষ্ট হচ্ছে, এটা তারই ফল। অর্থমন্ত্রী গর্বের সঙ্গে যখন ‘এই উন্নয়ন গতিধারা অব্যাহত’ রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, তখন তাই আমরা আতঙ্কিত হই। বুঝি সামনের বছর বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে, প্রকল্প-অপ্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে দিয়ে চোরাই টাকার পরিমাণ আরও বাড়বে। রাজস্ব আয়ের এই সম্ভাব্য বিশাল উৎস শুধু যে সরকারি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে তা নয়, উল্টো এই অর্থ বিভিন্নভাবে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়। এভাবে দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৈরি করা বিদেশি মুদ্রার মজুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খোরাক হয় চোরাই টাকার মালিকদের।
প্রতিবছর বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, অনেক প্রকল্পের সমাবেশ। এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে এবারও প্রশ্ন উঠেছে। বাজেট বাস্তবায়ন বলতে যে আলোচনা করা হয়, তাতে বরাদ্দকৃত টাকা খরচই সাধারণত বোঝানো হয়। কিন্তু খরচ করা আর প্রকল্প সম্পন্ন হওয়া এক কথা নয়। প্রতিবছরেই জুন মাসের মধ্যে বরাদ্দ টাকার শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ খরচ হয়, যদিও এপ্রিল মাস নাগাদ খরচ হয় শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ। বহু বছরের বাজেটের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, খরচ পুরো হলেও খুব কম প্রকল্পই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়। এর ফলে পরবর্তী বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি পূর্ণ হয় পূর্ববতী বছরের অসমাপ্ত প্রকল্প দিয়ে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
অথচ প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থবরাদ্দ নিয়ে নানাবিধ নীতি, নিয়ম, প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। ‘নজরদারি’র নানা শাখা-প্রশাখা তৈরি হয়েছে, ‘ক্রয়-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ’ জারি হয়েছে, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে-বিদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’, ‘টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স’ নামে বিদেশি ঋণ অনুদান, সেমিনার-ওয়ার্কশপ, বিদেশি কনসালট্যান্ট আনা, গাড়ি কেনা, বিদেশ সফর—সবই হয়েছে। যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি-গোষ্ঠীর প্রাপ্তি মেটানো হয়, কিন্তু প্রকল্প অসমাপ্ত থাকে। সেতু অসমাপ্ত, রাস্তার খবর নেই, বাঁধ একটু হয়ে পড়ে আছে, ক্ষতিকর বাঁধে জলাবদ্ধতা স্থায়ী, হাসপাতালের ভবন একটু খাড়া কিন্তু যন্ত্রপাতি নেই, বিদ্যালয়ে কম্পিউটার আছে, শিক্ষক নেই, ঘর নেই, গ্যাসের লাইন শুরু, কিন্তু শেষ নেই, গবেষণার ভবন আছে, গবেষণার বরাদ্দ নেই ইত্যাদি।
কয়েক বছর ধরে সরকারের বিশাল অর্থের প্রকল্প নেওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকল্প শুরুর আগেই ব্যয় আরও বাড়তে থাকে। কেন বাড়ে তার পরিষ্কার চিত্রও পাওয়া যায় না। বড় বড় প্রকল্পের অর্থের বরাদ্দ বেশি, অস্বচ্ছতাও বেশি। আর লাভ-ক্ষতি হিসাবের চেয়ে বৃহৎ প্রকল্প নেওয়ার উৎসাহী লোকজনই এখন বেশি। জনগণের অর্থ খরচ করে উন্নয়নের নামে দেশ ও মানুষের দীর্ঘ মেয়াদে সর্বনাশ করার প্রকল্পও তাই নির্দ্বিধায় পাস করা হয়। সুন্দরবনধ্বংসী বিদ্যুৎ প্রকল্প তার একটি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে নানামুখী চিৎকার এবারও চলছে। কিন্তু এ চিৎকারে এই সত্য আড়াল হয় যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে সব সময় জনগণের জীবনের গুণগত মান পরিমাপ করা যায় না। প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয়, কী কাজ করে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি নষ্ট করে ইটখোলা বা চিংড়িঘের, জলাভূমি ভরাট করে বহুতল ভবন, নদী দখল করে বাণিজ্য, পাহাড় উজাড় করে ফার্নিচার, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে ক্রমান্বয়ে আরও বেশি বেশি বাণিজ্যিকীকরণ, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, সুন্দরবন ধ্বংসকারী বাণিজ্য—এর সবই জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো জনগণের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করে। এগুলো আবার চোরাই টাকার আয়তনও বাড়ায়। দখলদারি অর্থনীতি, আতঙ্কের সমাজ, আর সন্ত্রাসের রাজনীতি—সবই পুষ্ট হয় উন্নয়নের এই ধারায়।
বাংলাদেশের জিডিপি, টাকার অঙ্কে সরল হিসাবে, গত ৪৩ বছরে বেড়েছে ২০০ গুণেরও বেশি। এই জিডিপিতে বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠীর অবদান ও তার প্রাপ্তির তুলনামূলক চিত্র আমরা সরকারের দলিলপত্র থেকে পাই না। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে চিত্র ঠিকই ধরা যায়। দেশের কৃষি, শিল্প ও অশিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় হিসাব করে দেখা যায়, জিডিপিতে তাঁদের সম্মিলিত অংশীদারত্ব কমেছে। মানে তাঁদের শ্রমে দেশ চললেও তাঁদের আপেক্ষিক অবস্থান দুর্বলতর হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যাঁদের শ্রমে দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা হলেন প্রধানত কৃষক ও কৃষিশ্রমিক, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারখানা ও অশিল্পশ্রমিক এবং প্রায় লক্ষাধিক প্রবাসী শ্রমিক। লক্ষ করলে দেখা যাবে, যাঁদের অবদান অর্থনীতিতে বেশি, তাঁরাই রাষ্ট্রের অমনোযোগ ও বৈরিতার শিকার। কৃষকেরা বিশাল উৎপাদন করেও ভারত থেকে গুদাম খালি করা চালের মুখে দামপতনে বিপর্যস্ত। পোশাকশ্রমিকদের প্রায়ই দেখা যায় বকেয়া মজুরির জন্য রাস্তায় নামতে, রানা প্লাজা ধসের ২৫ মাস পরও নিহত-আহত শ্রমিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের নিষ্পত্তি হয়নি। আর প্রবাসী শ্রমিক? হিসাবে দেখা যায়, গত ১০ বছরে প্রায় ২০ হাজার লাশ এসেছে দেশে। আর এখন প্রবাসী শ্রমিক হওয়ার পথে গিয়ে সমুদ্রে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন অনেকে। দাসশ্রমের জাল কাজ করছে, জিডিপি বাড়ছে।
শত লুণ্ঠন, অনিয়ম, সম্পদ পাচার সত্ত্বেও যাঁদের জন্য অর্থনীতি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, যাঁদের মৃত-অর্ধমৃত শরীরের ওপর অর্থনীতির জৌলুশ, সেসব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি বা সংগঠনের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী কখনো প্রাক্-বাজেট সংলাপে বসেন না। কেন তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

স্থলভাগ বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করা যাবে না by বদরূল ইমাম

সম্প্রতি সরকার দেশের স্থলভাগে বিদেশি তেল কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নিয়োগ করার পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছে। এর আগে বেশ কয়েক বছর ধরে এ বিষয়ে হাইকোর্টেও নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে বিদেশি কোম্পানিকে কেবল সাগরবক্ষে নিয়োগের প্রক্রিয়া বলবৎ ছিল। বর্তমানে আইনি বাধা অপসারিত হলে স্থলভাগে অনুসন্ধান ব্লক বরাদ্দের জন্য বিডিং প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে নিয়োগ করা হলে আবিষ্কৃত গ্যাসের প্রায় অর্ধেকটাই বিদেশিদের ভাগে চলে যায়। তাই যেখানে দেশীয় তেল কোম্পানি গ্যাস অনুসন্ধান ও আবিষ্কার করতে সক্ষম, সেখানে বিদেশি তেল কোম্পানি নিয়োগ করা নেহাতই অযৌক্তিক। বিশেষ করে স্থলভাগে সম্ভাবনাময় এলাকা বাংলাদেশি জাতীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী সংস্থা বাপেক্সের অধীনে রেখে অনুসন্ধান করাই বাঞ্ছনীয়। ইতিমধ্যে বাপেক্স স্থলভাগে তেল-গ্যাস আবিষ্কারের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
বাপেক্স কর্তৃক আবিষ্কৃত ও পরিচালিত ফেঞ্চুগঞ্জ, শাহবাজপুর (ভোলা), শ্রীকাইল, মেঘনা, নরসিংদী, বেগমগঞ্জ প্রভৃতি গ্যাসক্ষেত্রে অদ্যাবধি গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এ কথাই প্রমাণ করে যে বাপেক্স এককভাবে মূল ভূখণ্ডে লাভজনকভাবে গ্যাস উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। কেবল তা-ই নয়, বাপেক্সের এই কার্যক্রম জাতির আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের সম্ভাবনাকে উজ্জীবিত করে। বাংলাদেশ যেখানে হয় কয়লাখনি পরিচালনা বা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা বা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কারিগরি কার্যক্রমে মূলত বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বাপেক্সের এই সার্থক কার্যক্রম ব্যতিক্রম বটে।
স্থলভাগের সেরা গ্যাস ব্লকগুলো বিদেশিদের হাতে: বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা সম্ভাবনাময় গ্যাস ব্লক সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলের ১২, ১৩, ১৪ ও ৯—সবগুলোই নব্বইয়ের দশকে বিদেশি কোম্পানির হাতে অনুসন্ধান চালানোর জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুতসমূহ বিদেশি কোম্পানির হাতে চলে যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরনসহ অন্য বিদেশি কোম্পানি সিলেট ও কুমিল্লা অঞ্চলে তাদের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করে, তা দেশের মোট দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ। দেশে গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সরবরাহের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানির হাতে থাকার নেতিবাচক দিক দুটি। প্রথমত, এতে দেশের গ্যাস–সম্পদের এক বড় অংশ (অন্তত ৫০ শতাংশ) বিদেশিদের ভাগে চলে যায় এবং দ্বিতীয়ত, তেল কোম্পানির সঙ্গে সরকারের কোনো অপ্রত্যাশিত বিবাদ দেশের গ্যাস সরবরাহকে নাজুক অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।
বাপেক্সের শক্তি ও দুর্বলতা
বাপেক্সের অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে গত বেশ কয়েক বছর সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে তিনটি আধুনিক খনন রিগ ক্রয় করে বাপেক্সের বহরে যোগ করার মাধ্যমে খননক্ষমতা যথেষ্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব রিগ ইতিমধ্যে খননকাজে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি রিগ (নাম বিজয়-১২) পাবনার মোবারকপুরে একটি অনুসন্ধানকূপ খনন প্রায় শেষ করেছে, যার ফলাফলে গ্যাস সন্ধানের প্রাথমিক আলামত লক্ষণীয় বলে জানা যায়। বাপেক্সের কর্মী বাহিনীতে দক্ষ কারিগরি কর্মী রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই দক্ষতায় খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির কর্মীদের সমতুল্য। এ কারণে বিদেশি তেল কোম্পানিগুলো কর্তৃক বাপেক্স থেকে ভূতত্ত্ববিদ, প্রকৌশলী বা অন্যান্য কারিগরি কর্মীকে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
বাপেক্সের দুর্বলতার মধ্যে একটি হলো তার কারিগরি কর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। উদাহরণস্বরূপ বাপেক্সের কর্মীদের ভাষ্যমতে, তিনটি নতুন রিগ একসঙ্গে চালাতে যে পরিমাণ কারিগরি কর্মী প্রয়োজন, তা তাদের নেই। তাই প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক কর্মী দলের ওপর কাজের বাড়তি চাপ থেকেই যায়। অথচ কেবল প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নিলেই দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে কর্মীসংখ্যার স্বল্পতাকে কাটিয়ে উঠতে পারে। বাপেক্সের প্রশাসনকে আরও গতিশীল করে উপরিউক্ত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কেবলই সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
অনেকে এ কথা বলে থাকেন যে বিদেশি কোম্পানি যে পরিমাণ গ্যাস আবিষ্কার করেছে, তার তুলনায় বাপেক্সের আবিষ্কার অনেক ছোট ও কম। অথচ তাঁরা এ কথা বলেন না যে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেশের যে শ্রেষ্ঠ ব্লকগুলো দেওয়া হয়েছে, তাতে বড় আকারের কাঠামো বিদ্যমান, আর বাপেক্সকে যে এলাকাটুকু দেওয়া হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে কম সম্ভাবনাপূর্ণ এবং সেখানে কেবলই ছোট আকারের কাঠামো বিদ্যমান।
সমালোচনার মুখে পেট্রোবাংলার গণসংযোগ
জাতীয় কোম্পানি হিসেবে পেট্রোবাংলা (ও বাপেক্স) জনগণের কাছে অধিক প্রত্যাশিত ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলেও এ প্রতিষ্ঠান দুটির সাম্প্রতিক কিছু গণসংযোগ কার্যক্রম বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়ে। সম্প্রতি সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত সুনেত্র ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে গ্যাস অনুসন্ধান চালানোর প্রক্রিয়ায় খননকাজ শুরুর আগেই বাপেক্সের পক্ষ থেকে সেখানে দুই থেকে তিন টিসিএফ গ্যাস থাকার ঘোষণা দেওয়া অপেশাদারত্বের সাক্ষ্য বহন করেছে। সুনেত্র ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে গ্যাস না থাকলে সেখানে গ্যাস আবিষ্কার না হতেই পারে। কারণ, সব ভূতাত্ত্বিক কাঠামো যে গ্যাসবাহী হবে, এহেন কোনো বৈজ্ঞানিক সূত্র নেই। সুতরাং সুনেত্রতে অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া পরিত্যক্ত হতে পারে, চলমান হতে পারে কিংবা পুনর্মূল্যায়িত হতে পারে, যার সব কটাই স্বাভাবিক। কেবল আবিষ্কারের আগে সংবাদমাধ্যমগুলোকে গ্যাসের বিরাট মজুতের হিসাব দেওয়াটা নেহাতই ভুল।
একইভাবে এর আগে পেট্রোবাংলা প্রশাসন কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্রে কূপ খনন না করেই তেলের নতুন মজুত আবিষ্কার এবং তার পরিমাণ ও আর্থিক মূল্য প্রচার করে অপেশাদারত্বের সাক্ষ্য প্রদান করে। বিশেষ করে ৩-ডি ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে তেলের মজুত আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা ছিল নেহাত অবৈজ্ঞানিক। পরবর্তী সময়ে কূপ খননের মাধ্যমে তেল মজুতের সাক্ষাৎ না পেলে সেটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রশাসনে পরিবর্তন আসে, প্রতিষ্ঠান থেকে যায়। আগেকার প্রশাসনের কোনো সমালোচিত কার্যক্রমের দায়ভার পরবর্তী প্রশাসন নেয় না, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি সুসংহত থাকে।
স্থলভাগের সম্ভাবনাময় ব্লকগুলো সবই বাপেক্সকে দেওয়া হোক
স্থলভাগে অনুসন্ধান ব্লক বরাদ্দের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করা উচিত। এর মূল সূত্র হওয়া উচিত সম্ভাবনাময় সব এলাকা বাপেক্সের জন্য সংরক্ষিত রাখা। সে অর্থে বাংলাদেশকে পূর্ব ও পশ্চিম (যমুনা নদী বরাবর উত্তর-দক্ষিণ লাইন ধরে) এই দুটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। ভূতাত্ত্বিকভাবে পূর্বাংশ তেল-গ্যাস সম্ভাবনায় অধিকতর উজ্জ্বল। কারণ এ অংশে তেল-গ্যাস ধারণক্ষম ভূতাত্ত্বিক কাঠামোগুলো স্পষ্টতর আকারে বিদ্যমান, যা অপেক্ষাকৃত সহজে শনাক্ত করা যায়। দেশের সব আবিষ্কৃত গ্যাস ও তেলক্ষেত্রগুলো এই পূর্বাংশেই অবস্থিত। পক্ষান্তরে পশ্চিমাংশে তেল-গ্যাস ধারণক্ষম ভূতাত্ত্বিক কাঠামোগুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট নয় এবং তা থেকে থাকলে অধিকতর সুপ্ত আকারে বিদ্যমান, যা কিনা শনাক্ত করা জটিল। সে হিসাবে পূর্বাংশে গ্যাস অনুসন্ধানে ঝুঁকি কম এবং পশ্চিমাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি। তাই পূর্বাংশ পুরোটাই বাপেক্সের আওতায় এনে অনুসন্ধানকাজ চালানো উচিত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের পূর্বাঞ্চলের অংশ হিসেবে ভূতাত্ত্বিকভাবে এক বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। এর অধিক পাহাড়ি অঞ্চলগুলো ভূতাত্ত্বিকভাবে অপেক্ষাকৃত জটিল এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি হওয়ার কারণে এখানে অনুসন্ধানকাজ চালানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন। সে কারণে বাপেক্স এককভাবে এ এলাকায় অনুসন্ধান না চালিয়ে বরং কোনো উপযুক্ত বিদেশি সরকারি অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠানের (যেমন রাশিয়ার গাজপ্রম কিংবা গণচীনের সিনোপেক কোম্পানি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে পারে। এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ কেবল উচ্চ পাহাড়ি জটিল এলাকার জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত; যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের সীতাপাহাড়, কাসালং, বরকল প্রভৃতি। চট্টগ্রামের নিম্ন পাহাড়ি অঞ্চল যেমন পটিয়া ও জলদিতে বাপেক্স এককভাবেই অনুসন্ধানকাজ চালাতে পারবে এবং এ ক্ষেত্রে বিদেশিদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন নেই।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের পূর্বাংশ পুরোটাই বাপেক্স কর্তৃক অনুসন্ধান করানোর নীতি অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। ঝুঁকিপূর্ণ পশ্চিমাঞ্চলে সীমিত আকারে (পশ্চিমবঙ্গ-সংলগ্ন) বিদেশি কোম্পানিকে দু-একটি ব্লক বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। বিদেশি কোম্পানি এ ঝুঁকি নিতে রাজি হলে বাংলাদেশ সে অনুসন্ধান ফলাফলকে কাজে লাগিয়ে ঝুঁকি হ্রাস সাপেক্ষে পশ্চিম অঞ্চলে অনুসন্ধানকাজ চালিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার এ মুহূর্তে বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে দেশের স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানকাজে নিয়োজিত করার যে পরিকল্পনা করছে, তাতে দেশীয় তেল কোম্পানি বাপেক্স তার সাম্প্রতিক বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত হবে। বাপেক্স ইতিমধ্যে সাতটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যায়। আশির দশকের দক্ষ বাপেক্স (পূর্বসূরি) নব্বইয়ের দশকে আমন্ত্রিত বিদেশি কোম্পানিগুলো কর্তৃক নিজ ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি অপসারিত হওয়ার পর তার কর্মদক্ষতা বহুলাংশে হারায়। গত কয়েক বছরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাপেক্স পুনরায় তার অবকাঠামো ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার প্রয়াস পায়। এ অবস্থায় বিদেশি কোম্পানিকে স্থলভাগে পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বাপেক্সের কর্মপরিধি খাটো করে দিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগি করা জাতীয় স্বার্থের অনুকূল পন্থা বলে বিবেচিত হবে না।
বদরূল ইমাম: ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সরকারি বেতন বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি? by ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রায় ১৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডে প্রায় দ্বিগুণ এবং অন্যান্য গ্রেডে বিভিন্ন অনুপাতে ৮৭ থেকে ১০১ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ-সংবলিত বেতন ও চাকরি কমিশনের রিপোর্ট গৃহীত হওয়ার পর আগামী অর্থবছরের (২০১৫–১৬) প্রথম দিন থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে পরিবর্তিত বেতনকাঠামো। উল্লেখ্য, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় বাড়বে ৬৪ শতাংশ। এই বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে এর ফলে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে কি না। কারণ, সরকার ঘোষিত এই নতুন বেতনকাঠামোর উল্লম্ফনের ফলে একদিকে যেমন সরকারের ব্যয় বেড়ে বাজারে সঞ্চারিত হবে নতুন অর্থ, তেমনি বেতন বৃদ্ধির খবরে বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে নানান মহলে শুরু হবে মূল্যবৃদ্ধির তোড়জোড়।
অতীতে বিভিন্ন বেতন কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই এ-জাতীয় প্রবণতা দেখা গেছে। হয়তো যদিও সেসব বাজার প্রতিক্রিয়া খুব ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী হয়নি। কিন্তু সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির মাধ্যমে চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কোনো অর্থনৈতিক বা মুদ্রানৈতিক ফলাফল নেই—সে কথাও খুব জোর দিয়ে বলা যায় না। কারণ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় হয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, আর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার পর এই ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা। কেবল সরকারি খাত থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা এক বছরে বাজারে যুক্ত হলে তার কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটবে না, সেটি আশা করা যায় না।
আমরা সবাই জানি, মুদ্রাস্ফীতির বহুবিধ কারণের পেছনে সরকারের খরচ বৃদ্ধি, নতুন টাকা ছাপানো—এসবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বর্ণমানের বিপরীতে টাকা ইস্যু করার প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার ফলে টাকা ছেপে সরকারের ব্যয় নির্বাহ করার সুযোগটা অবারিত হয়ে যায়। কারণ, স্বর্ণমান বজায় রেখে টাকা ছাপানোর পদ্ধতি চালু থাকা অবস্থায় সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সরবরাহ করার স্বাধীনতা থাকে না। সাধারণ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাই স্বর্ণমান মুদ্রা ব্যবস্থার অধীনে বাজারে চালু করা কাগজের মুদ্রার বিপরীতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত রাখার নিশ্চয়তা দিত। তখন বাজারে সঞ্চালিত মুদ্রার পরিমাণ নির্ভর করত দেশে বিদ্যমান স্বর্ণ এবং পরবর্তীকালে রৌপ্যের পরিমাণের ওপর। ফলে যথেষ্ট স্বর্ণ বা রৌপ্যের মজুত না থাকলে সরকারের পেÿক্ষ টাকা ছাপানো সম্ভব হতো না।
স্বর্ণমানের কথা উঠলই যখন, তার পেছনের কথাটাও পাঠকের জানা উচিত। প্রাচীনকালে মানুষ নিরাপত্তার জন্য তাদের স্বর্ণ এবং স্বর্ণমুদ্রা গচ্ছিত রাখত স্বর্ণকারদের কাছে। বিনিময়ে স্বর্ণকারেরা একটা নির্দিষ্ট হারে ফি আদায় করে জমাদানকারীকে একটা রসিদ দিত, যাতে জমাকারীরা প্রয়োজনমতো তাদের গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে নিতে পারে। এই রসিদের নির্ভরযোগ্যতার কারণে এটিকেই মানুষ টাকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় কাগজের মুদ্রার প্রচলন। কাগজের মুদ্রার ওপর ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে ৫০, ১০০, ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে’ লেখা অঙ্গীকারের প্রচলনও শুরু হয় এভাবে। অর্থাৎ এই রসিদটির বাহককে সমপরিমাণ স্বর্ণ দিতে বাধ্য থাকার অঙ্গীকার ছিল এটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনের ধাক্কায় এক দেশের মুদ্রাকে অন্য দেশের মুদ্রায় বিনিময় করার পদ্ধতি চালু হলে স্বর্ণমান সংরক্ষণ করার বিষয়টি আর মুখ্য থাকে না। ঠিক এ সময় মার্কিন ডলার বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে উঠে আসে। অবশেষে ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্বর্ণমান সংরক্ষণ করার বাধ্যবাধকতার বিষয়টির অবসান ঘটে। অনেক অর্থনীতিবিদ মুদ্রাস্ফীতির জন্য কাগজের মুদ্রা ছাপানোর অবিমৃশ্যকারিতাকে দায়ী করলেও বিপরীতভাবে অনেকেই অভিযোগ করেন যে ১৯২৯ সালের মহামন্দার জন্য মূলত দায়ী ছিল কঠোর স্বর্ণমান বজায় রাখার পদ্ধতি। কারণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার জন্য সামান্য মাত্রার মুদ্রা সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করা দোষের কিছু নয়। অথচ সেই মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিতে সরকারি ঘাটতিকে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যখন প্রাণের স্পন্দন আনার জন্য প্রয়োজন ছিল মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কঠোরভাবে স্বর্ণমান বজায় রাখছিল বলে অর্থনীতি মন্দা থেকে উঠে আসার জন্য সরকার কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে ১৯২০-এর দশকে অর্থনীতিবিদ কেইনস এই স্বর্ণমানের বিরোধিতা করলেও ব্রিটিশ সরকার তাঁর নীতি থেকে সরে আসেনি, ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্যোগ ও বেকারত্ব।
অতএব বোঝা যায়, কাগজের মুদ্রা ছাপানোর প্রবণতায় বাজারে অর্থ এবং ঋণের সরবরাহ বেড়ে গেলে তার বিপরীতে পণ্য ও সেবার সরবরাহ আনুপাতিক হারে না বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কুফল হচ্ছে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি। কারণ, বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে গেলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, ফলে যে পরিমাণ পণ্য আগে যত টাকা দিয়ে কেনা যেত, সেই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। সরকার যখন বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়, তখন ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে। ফলে বাজারে সরবরাহকৃত অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি টাকা দিয়ে আনুপাতিক হারে বাড়তি সেবা বা পণ্য কেনা সম্ভব হয় না, কারণ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ সেবা ও পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এই সেবা ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধিই বাজারে বাড়তি অর্থ সরবরাহের সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
সাধারণভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। কোনো পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের অসামঞ্জস্যতার কারণে সেটির মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে, তবে তা মুদ্রাস্ফীতি নয়। কোনো কারণে খাদ্যমূল্য কিংবা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বটে, যাকে মূল্যস্ফীতি বলা যেতে পারে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি নয়। শেষোক্তটি ঘটে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তার কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে।
বেতন ও চাকরি কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন হলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে কি না, এই বিতর্কে সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি ঘটতে পারে। সংবাদ সংস্থার খবরে জানা যায় তিনি পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পক্ষে, যাতে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিতে তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে না। তিনি বলেছেন, পাঁচ বছর পরপর সরকারি বেতন বৃদ্ধি করা হয়। এবারের বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিষয়ে যে গবেষণা করা হয়েছে, তার ফলাফল অতি নগণ্য। তিনি সরকারি কর্মচারীদের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং অতীত প্রবণতার দিকে নজর রাখতে বলেছেন। আমাদের অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যে, একসময় বাংলাদেশে অর্থ ও পরিকল্পনা নামের একটিই মন্ত্রণালয় ছিল, ফলে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক মন্ত্রীও ছিলেন একজনই। এখন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর বিপরীতমুখী ভাষ্য দেখে কৌতূহল জাগে এই দুটি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে থাকলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে মন্ত্রী কী বলতেন?
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও কার্যকর হতে যাচ্ছে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে। এ কারণে ভারতীয় অর্থনীতিবিদেরা আগাম পূর্বাভাস করছেন এক ধাপ মুদ্রাস্ফীতির।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বেতন বৃদ্ধির ফলে কোনো মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছে না। সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে (জানুয়ারি—জুন ২০১৫) আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোর কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে না। দেখানো হয়েছে অতীতের বিভিন্ন পে–স্কেল বাস্তবায়নের কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতি ঘটেনি, যদিও পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম পে–স্কেল বাস্তবায়নের পর মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল, কিন্তু তার কোনোটিই বাড়তি বেতনের জন্য নয়, বরং তা ঘটেছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি, ঋণ সম্প্রসারণ, সরকারের অত্যধিক ঋণ গ্রহণ এবং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে। অতএব অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এই আশাবাদ সফল হতে পারে যদি সরকার তার রাজস্ব আয় থেকে এই বাড়তি খরচের জোগান দিতে পারে। কিন্তু যদি নতুন মুদ্রা ছেপে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই খরচ মেটানো হয়, তাহলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে অবশ্যম্ভাবী মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে।
সরকার কেবল তার ১৩ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছে, কিন্তু নতুন সরকারি বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে আধা সরকারি, বেসরকারিসহ অন্য সব ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে, ফলে বাজারে সঞ্চারিত বাড়তি অর্থের সরবরাহ সরকারি পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যেতে পারে, এবং তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে কোনো গবেষণা বা হিসাব করা হয়েছে কি না, জানা যায় না। এমনকি বিভিন্ন সেক্টরে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দানা বাঁধতে পারে আন্দোলন, যার রাজনৈতিক তাৎপর্যও অস্বীকার করা যায় না।
তাই এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সর্বক্ষেত্রে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতির লাগাম হাতছাড়া হয়ে না যায়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, কেবল সরকারি কর্মচারীদের তুষ্টির চেয়ে বেশি প্রয়োজন বেতনবহির্ভূত জনগণের স্বস্তি, যা বিগত কয়েক বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

বেশ ফুরফুরে কাটল মোদির প্রথম বছর by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

মনে হচ্ছে এই সেদিন, অথচ দেখতে দেখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বছরটা কেটে গেল। আগে বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান ঘটা করে হতো। আজকাল উদ্যাপনের হরেক রকম হেতুর খোঁজ পাওয়া গেছে। প্রথম হইহল্লা প্রথম মাসপূর্তিতে, তারপর এক শ দিন অতিক্রান্ত হলে, এরপর ছয় মাস, তার পরে প্রথম বছর। এ সময় খুব ঘটা করে প্রচার চলে। সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে কাগজে-কাগজে পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। করদাতাদের টাকায় সে এক এলাহি ব্যাপার। এবার অবশ্য নরেন্দ্র মোদি ঘটা করে কিছু করতে চাইছেন না। তবে সরকারের এক বছরের ‘সাফল্য’ তুলে ধরতে তিনি মন্ত্রী ও সাংসদদের নির্দেশ দিয়েছেন। দলও তাঁর মতো করে সক্রিয়।
প্রথম বছরটা কেমন কাটল, কতটা সাফল্য কতটা ব্যর্থতা, সব মহলেই শুরু হয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি অবশ্য কটাক্ষ করে বলেছেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সরকারের মেজাজ ঠিক টি-টোয়েন্টির মতো। প্রকল্প ঘোষণাতেও পিছিয়ে নেই। ওয়ান ডে ক্রিকেটের ঢঙে একটার পর একটা প্রকল্প ঘোষণা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পগুলোর কার্যকর রূপায়ণের ক্ষেত্রে সরকার চলছে পরিত্যক্ত টেস্ট ম্যাচের মতো, ঢিমেতেতালায়। রাজনীতিকেরা তাঁদের মতোই সবকিছু রাজনীতির আলোয় দেখবেন। অতএব কংগ্রেসের বক্তব্য নিয়ে মন্তব্যের প্রয়োজন নেই। তবে জনতার মত যদি মাপকাঠি হয়, তাহলে সাম্প্রতিক এক জরিপের ফল অনুযায়ী দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ মনে করছেন নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রথম বছরটা বেশ ভালোই চালিয়েছে।
মোদির শপথ গ্রহণের দিন সার্ক সদস্যভুক্ত আট দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা উপস্থিত ছিলেন। মোদি তাঁদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণে আন্তরিকতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল একটা বার্তাও। তা হলো, প্রতিবেশীদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও ভালো করতে আগ্রহী। সেই আগ্রহ যে স্রেফ কথার কথা নয়, মোদি এই এক বছরে তার কিছুটা প্রমাণ রাখতে পেরেছেন। বিশেষ করে দলের বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে শেষ মুহূর্তে যেভাবে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিল সংসদের দুই কক্ষে সর্বসম্মতভাবে পাস করিয়েছেন, তা অভিনন্দনযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আজ উপদ্রবমুক্ত। এই প্রান্তের নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতকে আজ বহুদিন বিনিদ্র রজনী যাপন করতে হচ্ছে না। শেখ হাসিনার এই দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধাবনত মোদিও তাই সীমান্ত বিল বাস্তবায়নে বাড়তি রাস্তাটুকু হেঁটেছেন। মোদি ও হাসিনার মধ্যে অল্প দিনেই গড়ে উঠেছে সখ্য। রাজনীতির মতো কূটনীতিতেও ব্যক্তিগত রসায়ন অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে।
শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, এই এক বছরে মোদি এর প্রমাণ তাঁর বিদেশনীতির ছত্রে ছত্রে রেখেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াং, জাপানি প্রধানমন্ত্রী আবেসহ অধিকাংশ রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গেই তিনি ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে তুলেছেন। এই এক বছরে বিশ্ব নেতৃত্বের কাছে মোদির যে দুটি পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে, তার একটি হলো তিনি এক শক্তপোক্ত নেতা, অন্যটি হলো তাঁর স্থির লক্ষ্য। লক্ষ্য বা দৃষ্টিটা কী? ভারতকে তিনি অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী করে তুলতে চান। এ কারণে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র যে স্লোগান তিনি দিয়েছেন, পশ্চিমা শক্তি তা উপেক্ষা করতে পারছে না। মোদির জন্যই ভারত সম্পর্কে তাঁদের মূল্যায়ন নতুনভাবে করতে হচ্ছে।
আঞ্চলিক স্তরে বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও মোদি বড় পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। ভারতের বিশালত্ব এমনিতেই প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে সমীহ আদায়ে যথেষ্ট। কিন্তু অতীতে কখনো-সখনো কোনো কোনো ভারতীয় নীতি ছোট প্রতিবেশীদেরও ক্ষুব্ধ ও বিরূপ করেছে। নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওঠানামা তার প্রমাণ। ক্ষমতায় এসে ভারত সম্পর্কে সেই সন্দেহ ও সংশয়ের বেড়াটা মোদি ভাঙতে চেয়েছেন। নির্বাচনের পর শ্রীলঙ্কা-ভারত সম্পর্ক এখন অনেক সহজ, মালদ্বীপও এখন মোদিকে সেই দেশ সফরে আসতে অনুরোধ করছে। আর বাংলাদেশকে ভারত তো পরীক্ষিত সেরা মিত্র বলে মনে করছে। মোদি চাইছেন অর্থনৈতিক অগ্রগতির মধ্য দিয়ে সবাইকে নিয়ে এগোতে, যাতে উপমহাদেশে শান্তি থাকে এবং ভারতীয় প্রাধান্য সম্পর্কে কেউ সন্দিহান না হয়।
এই এক বছরে মোদি মোট ১৮টি দেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশ হতে চলেছে উনিশতম দেশ। তার পরপরই তিনি যাবেন রাশিয়ায়। তাঁর এই ‘পায়ের তলায় সর্ষে’ থাকা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও বেশ কথা চালাচালি হচ্ছে। রাহুল গান্ধী তো বলেই দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ঘুরেই চলেছেন, অথচ ঋণগ্রস্ত আত্মঘাতী কৃষকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সময় তাঁর নেই। মোদি এসব সমালোচনা কানে তুলছেন না। দেশনেতা থেকে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক নেতায় উত্তরণ ঘটাচ্ছেন।
মোদির পক্ষে স্বস্তির কথা, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন তাঁর নেই। কট্টর বিরোধীদের মন জেতা বা বশ করার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে এবং চমৎকারভাবে তিনি তা প্রয়োগও করছেন। উদাহরণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশনীতিতে এই এক বছরে মোদি যত নম্বর পাবেন, প্রায় তত নম্বরই তাঁর প্রাপ্য অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের আর্থিক বছরগুলোতে ভারতের অর্থনীতিতে সার্বিক যে হতাশা ছিল, এই এক বছরে তা কেটে গিয়ে নিঃসন্দেহে ফুরফুরে ভাব এসেছে। এতটাই যে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো ঘোষণা করেছে, ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার চীনকেও ছাপিয়ে যাবে। ফুরফুরে এই ভাবের পাশাপাশি মোদি আর একটা জিনিসও করেছেন। রাজনৈতিক, আমলাতন্ত্রসহ সরকারি স্তরে ঘুষের যে রমরমা ছিল, তা প্রায় শেষ করে দিয়েছেন। এই এক বছরে সরকারি স্তরে দুর্নীতির একটা অভিযোগও কেউ আনতে পারেনি। কয়লার ব্লক বণ্টন করা হয়েছে স্বচ্ছভাবে। সে জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের ওপর সাধারণের মধ্যে একটা আস্থার ভাব এসেছে। মোদি ক্ষমতায় আসার মাস দুয়েকের মধ্যেই দুর্নীতি-সংক্রান্ত একটা কাহিনি খুব চালু হয়েছিল। গল্পটা এ রকম, এক সিনিয়র মন্ত্রীর ছেলে নাকি ট্রান্সফার-পোস্টিংয়ে নাক গলিয়ে মোটা টাকা কামাচ্ছিলেন। মোদি সেই মন্ত্রীকে সপরিবারে একদিন দাওয়াত দেন। সেখানে বাবার সামনেই ছেলেকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এসব কথা শোনা যাচ্ছে। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, অভিযোগগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। অতএব, সাবধান হও! আর এক মন্ত্রী এক পাঁচতারা হোটেলে এক অতিপরিচিত শিল্পপতির সঙ্গে খেতে গিয়েছিলেন। মোদি তাঁকেও ডেকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
অর্থনীতি আর যাই হোক, পোলট্রির ব্রয়লার মুরগির মতো নয় যে ঠিক ৪৫ দিনের মাথায় ডিম দেওয়া শুরু করবে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান রঘুরাম রাজন সম্প্রতি নিউইয়র্কে বলেছেন, মোদি সরকারের ওপর মানুষের চাহিদা ‘বাস্তবোচিত নয়’। অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় দিতে হবে। সেই সময়ের আগেই হলো–না হচ্ছে–না বলে চিল-চিৎকার করা ঠিক নয়। মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, উৎপাদনশিল্প ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, কর্মসংস্থান ধীরে হলেও বাড়ছে, লগ্নিকারকেরা ভারতীয় বাজারের ওপর আস্থা রাখতে ভালোবাসছেন। এ সবই অর্থনীতির দিক থেকে সুলক্ষণ। প্রথম বছরে দুশ্চিন্তার একটা বড় ভার লাঘব করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম এবং রুপির শক্তিশালী হওয়া। এর ফলে কোষাগার ঘাটতি যেমন কমে গেছে, তেমনি কমেছে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতির সমস্যা। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে সমালোচনা শুনতে হচ্ছে, তার জন্য মোদি ও তাঁর দলই দায়ী। নির্বাচনের সময় যে স্লোগান তাঁদের কোল ভরিয়ে দিয়েছে, সেই ‘আচ্ছে দিন আনে বালা হ্যায়’, কিংবা বিদেশে পাচার করা কালোটাকা দেশে ফিরিয়ে প্রত্যেকের ব্যাংকে ১৫-১৬ লাখ করে ফেলার প্রতিশ্রুতি দেশের সাধারণ মানুষকে এমন একটা ধারণা দিয়েছিল, যেন মোদির হাতে এক জাদুদণ্ড রয়েছে, যার ছোঁয়ায় রাত পোহালেই সুদিন এসে দরজায় কড়া নাড়বে। ভারতের অর্থনীতি নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ এখনো নেই। তবে সবুর করতে হবে। সবুরেই মেওয়া ফলে।
ভর্তুকি সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেলে অপচয় বন্ধে মনমোহন সিং যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, মোদি সেটাকেই নতুন মোড়কে ছেড়েছেন। জনধন প্রকল্প ও সবার জন্য ব্যাংক খাতা সারা দেশে এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে। স্বচ্ছ ভারত অভিযান, গঙ্গা সংস্কারের মধ্য দিয়ে তিনি পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতাকে একটা আন্দোলনের রূপ দিতে চেয়েছেন। সফল হবেন কি না, সে জন্যও তাঁকে সময় দিতে হবে।
মোদিকে সমালোচনাবিদ্ধ হতে হচ্ছে সামাজিক ক্ষেত্রে। ‘ঘর ওয়াপসি’ অথবা সাম্প্রদায়িক অশান্তি বিষয়ে এই এক বছরে তিনি একবারের জন্যও মুখ খোলেননি। রাম জেঠমালানি, অরুণ শৌরির মতো দলীয় নেতারা সরাসরি তাঁর কাজের স্টাইল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নরেন্দ্র মোদি, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও দলীয় সভাপতি অমিত শাহ ছাড়া বাকি সবাই ‘অকিঞ্চিৎকর’, এই অভিযোগ মোদির দল ও সরকারের মন্ত্রীরাই তুলছেন। মোদির মত ছাড়া কোনো মন্ত্রীরই ক্ষমতা নেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভালোর কৃতিত্ব যেমন মোদির ঝুলিতে জমা হচ্ছে, খারাপের দায়িত্বও তেমনি তাঁরই। বিকেন্দ্রীকরণের যুগে ক্ষমতার এই বাড়াবাড়ি রকমের কেন্দ্রীকরণ মোদিকে শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড় করাবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। এখনো পর্যন্ত ৬৮ শতাংশ মানুষ তাঁর পক্ষে আছেন ঠিকই, কিন্তু এ বছর ভরা বর্ষা না হলে (যে আশঙ্কা এখনো ভালোমতোই রয়েছে) স্রেফ মূল্যবৃদ্ধি মোদিকে হিরো থেকে ভিলেন করে দিতে পারে।
মোদির পক্ষে স্বস্তির কথা, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অন্য কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন তাঁর নেই। কট্টর বিরোধীদের মন জেতা বা বশ করার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে এবং চমৎকারভাবে তিনি তা প্রয়োগও করছেন। উদাহরণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহির জন্যও তাঁর হাতে সময় রয়েছে আরও চারটি বছর। ভাগ্য এখনো তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছে। প্রথম বছরটা মোটের ওপর তাঁর ভালোই কাটল। কিন্তু একটা খরা অথবা বিহারে দলের ভরাডুবি ঘটলে অনেক দাঁত-নখ ঝপাঝপ বেরিয়ে পড়বে। ফুরফুরে ভাব কাটিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে তখন মোকাবিলা করতে হবে সংকটের।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

মাফিয়া পতনের সূচনা করলেন অদম্য বাবা by টিপু সুলতান

থাইল্যান্ডের জঙ্গলে আবিষ্কৃত প্রথম গণকবর। ডানে বড়
মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান আনোয়ার l ফাইল ছবি
ছেলের কবর আর ঘাতকের খোঁজে দিনের পর দিন থাই সমুদ্র উপকূলে কাটান কুইল্যা মিয়া। তাঁর টানা চার মাসের অদম্য চেষ্টায় ধরা পড়ল মানব পাচারকারী সবচেয়ে ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের প্রধান আনোয়ার। সন্ধান মিলল থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর। এরপর একে একে প্রকাশ পেল রোমহর্ষক সব ঘটনা।
এই অদম্য বাবাকে পাচারকারী চক্র খুন করতে পারে—এ আশঙ্কায় তাঁকে রাখা হয় থাইল্যান্ড পুলিশের একটি সেফ হোমে। রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ডের সহায়তায় কুইল্যা মিয়ার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয় ২১ মে।
মিয়ানমারের আরাকানে বাড়ি কুইল্যা মিয়ার। সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের মুখে অন্য আরও অনেক রোহিঙ্গার মতো তিনি দেশ ছাড়েন। সেটা প্রায় এক দশক আগে। তখন থেকে আছেন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশে। ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী-সন্তান থাকেন দেশে।
কুইল্যা মিয়া জানান, তাঁর দেশে রোহিঙ্গা যুবক ছেলেদের রাখাও বিপজ্জনক। তাই ছেলে মো. আবুল কাশেমকে (২৫) মালয়েশিয়া পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। আরাকানকেন্দ্রিক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দিতে থাইল্যান্ডের মুদ্রায় ৬০ হাজার বাথ (বাংলাদেশি দেড় লাখ টাকার সমান) চুক্তি করেন। আগাম টাকা পরিশোধের পর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সাগরপথে যাত্রা শুরু করেন কাশেম। দুই সপ্তাহ পর কুইল্যা মিয়ার কাছে ছেলের ফোন আসে থাইল্যান্ডের নম্বর থেকে। পাচারকারীরা আরও ৬০ হাজার বাথ দাবি করছে। না দিলে ছেলে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বন্দী থাকবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর আরও কয়েক দফা ফোন করে মুক্তিপণের জন্য তাগাদা দেয় পাচারকারীরা। নির্যাতন করে ছেলের কান্নাও শোনায়। থাইল্যান্ডে বসবাসকারী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন থেকে ধার করে একপর্যায়ে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করেন কুইল্যা মিয়া। কিন্তু তত দিনে খবর আসে, ছেলে আর জীবিত নেই।
এরপর থেকে ছেলের কবর ও ঘাতকের সন্ধানে বের হন কুইল্যা মিয়া। তাঁকে সহায়তায় এগিয়ে আসে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিন বসবাসরত রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত কিছু থাই নাগরিক এবং রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ড। তাঁরা একপর্যায়ে জানতে পারেন, মিয়ানমারকেন্দ্রিক মানব পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় চক্রের ক্যাম্পে মারা গেছেন কাশেম। এই চক্রের প্রধান মো. আনোয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রভাবশালী, থাকেন দক্ষিণ থাইল্যান্ডের হাতজ্জাই শহরে।
কুইল্যা মিয়া বলেন, আনোয়ারের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁরা যোগাযোগ করেন সেনাবাহিনীর ওই এলাকার উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রমাণ ছাড়া তিনি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবেন না।
প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টায় কুইল্যার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হন থাইল্যান্ডের পাটানি প্রদেশের নূর আহাম্মদ। তিনিও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ, দুই পুরুষ ধরে থাইল্যান্ডের বাসিন্দা।
নূর আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, একদিন তাঁরা খবর পান আনোয়ারের হাতজ্জাইয়ের বাড়িতে পাচারকারীদের বৈঠক হবে। জানালেন ওই সেনা কর্মকর্তাকে। ওই রাতেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু আগে থেকে টের পেয়ে আনোয়ার ও তাঁর সঙ্গীরা সটকে পড়েন। বাড়ি তল্লাশি করে টাকা লেনদেনের কিছু কাগজপত্র পাওয়া যায়।
ওই অভিযানের পর আনোয়ার মিয়ানমার পালিয়ে যান। নূর আহাম্মদ জানালেন, ২৫ দিন পর আনোয়ার থাইল্যান্ডে ফেরেন। তাঁরা খবর পান, আনোয়ার পাশের প্রদেশ নাখন সি থাম্মারাতের এক বাড়িতে অবস্থান করছেন। ফোনে খবর দেন ওই সেনা কর্মকর্তাকে। এরপর ২৮ এপ্রিল ভোরে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আনোয়ারকে আটক করা হয়।
নাখন সি থাম্মারাতে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আনোয়ার মানব পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং কুইল্যা মিয়ার ছেলের কবর কোথায় জানান। সে তথ্য অনুযায়ী, ১ মে মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের পাদাম বেসার জঙ্গলে প্রথম গণকবরের সন্ধান পায় থাই পুলিশ। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ২৭ জনের কঙ্কাল। এরপরই সারা দুনিয়া জানল গণকবরের খবর। পরদিন থেকে থাইল্যান্ডের সরকার শুরু করে মানব পাচারবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান।
রোহিঙ্গা সোসাইটি ইন থাইল্যান্ডের সদস্য ও ব্যাংককের ব্যবসায়ী মামুন রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, কুইল্যা মিয়া লেগে না থাকলে এ গণকবরের খবরও কেউ জানত না। এ কারবারও বন্ধ হতো না। লাশ হতো আরও অনেকের ছেলে। তিনি জানান, নিরাপত্তার কারণে কুইল্যা মিয়াকে কোথায় রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ, তিনি থাইল্যান্ডে এ-সংক্রান্ত মামলার প্রধান সাক্ষী। আর এসব মামলায় পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিসহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সন্দেহভাজন হিসেবে আছেন।
রুটি বিক্রেতা থেকে শতকোটি টাকার মালিক: থাইল্যান্ডের গণমাধ্যমের দাবি, মানব পাচারে জড়িয়ে আনোয়ার ওই দেশের মুদ্রায় অন্তত ৪০০ কোটি বাথের সম্পদের মালিক হয়েছেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনোয়ার এক দশক আগেও হাতজ্জাই শহরের রাস্তায় রুটি বেচতেন। তাঁর জন্মস্থান মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডুর নলবইন্যা গ্রামে। বাবার নাম ননু মিয়া।
২০ বছর আগে সাগরপথে ট্রলারযোগে থাইল্যান্ড আসেন আনোয়ার। আবাস গড়েন সংখলা প্রদেশের হাতজ্জাই শহরে। এ শহরের রাস্তায় রুটি বিক্রি করতেন। পরে থাইল্যান্ডের নাগরিকত্ব পান।
প্রায় একই সময়ে আরাকান থেকে এসে হাতজ্জাই আবাস গড়েছেন এবং আনোয়ারকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন, এমন একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা জানান, ২০০৮ সালে আনোয়ার রুটি বিক্রি ছেড়ে দেন। কাজ শুরু করেন মানুষ পাচারকারী চক্রের সঙ্গে। শুরুতে তিনি নৌকায় (ওদের ভাষায় জাহাজ) দোভাষীর কাজ করতেন। পথঘাট চেনার পর বছর দুয়েকের মাথায় আনোয়ার যোগ দেন হাফেজ আহাম্মদের সঙ্গে। মিয়ানমার থেকে মানব পাচারের সে সময়ের বড় হোতা হাফেজ মিয়ানমারের নাগরিক, থাকেন ইয়াঙ্গুনে।
দুই বছরের মধ্যে আনোয়ার ছাড়িয়ে যান ওস্তাদ হাফেজ আহাম্মদকেও। তিনি নিজেই গড়ে তোলেন আরও বড় পাচারকারী চক্র। অল্প দিনে হয়ে ওঠেন এ জগতের সবচেয়ে বড় মাফিয়া। এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল অনেকগুলো সূত্রই নিশ্চিত করেছে যে ২০১২ সাল থেকে আনোয়ারই পুরোনো মানব পাচার কারবারকে মুক্তিপণ বাণিজ্যে রূপান্তর করেন। জঙ্গলে ক্যাম্প বা নিজস্ব বন্দিশালা গড়ে তোলেন, যা পরে অন্যরা অনুসরণ করে।

‘মোদির সফরে তিস্তা চুক্তি হবে না’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হবে না। গতকাল এ বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের অধীনে ভারতীয় কূটনীতির এক বছর উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল এ খবর দিয়েছে ভারতের বার্তা সংস্থা ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া (ইউএনআই)। এই বার্তা সংস্থাটির রিপোর্টের গ্রাহক ১৪টি ভাষার সংবাদ মাধ্যম। এর মধ্যে রয়েছে অল ইন্ডিয়া রেডিও, দূরদর্শন, প্রধানমন্ত্রীর অফিস। এতে বলা হয়, সুষমা স্বরাজ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিস্তা যেহেতু শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গও জড়িত- তাই তিস্তা ইস্যুতে এখনও কোন ঐকমত্য হয় নি। এ চুক্তি করতে রাজ্য সরকারকে আস্থায় নিতে হবে। ৬ ও ৭ই জুন ঢাকা সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এ সফরসঙ্গী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হবেন কিনা তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক রকম ধূম্রজাল। তা কাটিয়ে মমতা সম্মতি দিয়েছেন। তিনি ৫ই জুন বাংলাদেশে আসছেন। পরদিন স্থল সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশে ফিরে যাবেন।
সীমান্ত চুক্তির অনুমোদন, মোদি সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য: এদিকে নয়াদিল্লির বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বর্তমান সরকারের সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম সাফল্য হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারতের উভয় সংসদে অনুমোদন। ৪১ বছর পর এ অনুমোদনের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের  ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। ভারতের বর্তমান সরকারের এক বছরের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড  নিয়ে আয়োজিত গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী বলেন, সফর, আলোচনা এবং কূটনৈতিক নীতি এক বছরে দারুণ সফল হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তিস্তাসহ ৫৪টি নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনার উপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের দাবিতে দু’দেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রথম দফা বৈঠক হয়েছে। এব্যাপারে আরও আলোচনা করা হবে। ২০১১ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সফরকালে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে চুক্তি করা সম্ভব হয়নি। তিস্তার পানি চুক্তি হবে কিনা জানতে চাইলে সুষমা স্বরাজ বলেন, তিস্তার পানি চুক্তি শুধুমাত্র ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের উপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ জড়িত। তাই মমতাকে নিয়েই চুক্তি করা হবে। মমতার ঢাকা সফরকে স্মরণ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি যে তিস্তা চুক্তির পক্ষে সেটা বাংলাদেশে গিয়ে মমতা নিজেই বলে এসেছেন। তবে মোদির আসন্ন সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে সুষমা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সমঝোতার জন্য আরও একটু আলোচনার প্রয়োজন।  প্রেস ব্রিফিংয়ের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, মোদির এ সফরে ফোকাস হচ্ছে ভারতের রাজ্য ও লোকসভায় স্থলসীমা চুক্তি অনুমোদন। বাংলাদেশে আটক উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আলোচনা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি ইতিবাচক জবাব দিয়ে বলেন, আমরা চাই তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হোক। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে সুষমা স্বরাজ বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যা কিছু হবে তাতে উত্তর-পূর্ব ভারত লাভবান হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের ফলে মাত্র এক বছরে ৩৯ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে।

২০ দলীয় জোটে টানাপড়েন by কাফি কামাল

টানাপড়েন চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিএনপিতে। খোদ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সামনেই সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় প্রশ্ন তুলেছেন দলটির এক সিনিয়র নেতা। গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে তারই প্রতিধ্বনি করেছেন দলের নীতিনির্ধারক ফোরামের এক সদস্যসহ বিএনপির কয়েক নেতা। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ শরিক দলের নেতাকর্মীরা। গত তিন দিনে তারা নিজেদের মধ্যে কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও করেছেন। এখন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মনোভাব ও বক্তব্যের অপেক্ষা করছেন তারা। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় জোটের কার্যকারিতা নিয়ে তাদের মধ্যেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এদিকে বিএনপি যখন আন্দোলন থেকে সরে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে তখন নিজেদের মতো করে দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াত। বিএনপি নেতারাও এখন দল গোছানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাইছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, জোটের প্রধান দল বিএনপির সঙ্গে পরিষ্কার দূরত্ব তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় প্রধান দল জামায়াতের। বর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষিতে বিএনপি একাংশ চাইছে, জোট ছেড়ে যাক জামায়াত। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের টানাপড়েন চলছে ২০ দলীয় জোটে। জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
এদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম জোটের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। তিনি পরিষ্কার বলেন, জোটের কোন কার্যকারিতা নেই, জোটের আর দরকার নেই। এ জোটের কারণে ৪০-৫০টি আসনে বিএনপির নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে না। কারণ অনেকেই মনে করে, সেসব আসনে জোটের শরিক দলের নেতারাই মনোনয়ন পাবেন। তাই কাজ করে লাভ কি। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানও নির্বাচনী জোট করেছিলেন পরে তিনি সেই জোট ভেঙে বিএনপিতে আসার আহ্বান জানান। সে সময় সমমনা বেশ কিছু দল বিএনপিতে যোগ দিয়েছিল। ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শরিক দলের নেতাকর্মীরা যদি জিয়ার আদর্শ পছন্দ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হন তাহলে তারা বিএনপিতেই যোগ দিতে পারেন। তাদের আওয়ামী লীগও নেবে না, অন্য কোথাও যাবার জায়গা নেই। তার এ বক্তব্যের পর শরিক দল কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক প্রতিবাদ করে বলেন, এসব আলোচনা নির্দিষ্ট ফোরামেই হওয়া উচিত, এমন প্রকাশ্যে নয়। তিনি ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে বলেন, এখানে অনেক ধরনের ফুল আছে। সবধরনের ফুল মিলে যেমন সুন্দর একটি তোড়া হয়েছে তেমন ২০টি দল নিয়ে একটি জোট। তোড়া থেকে একটি ফুল টেনে নিলেই এর সৌন্দর্য নষ্ট হবে। তিনি বলেন, গ্রামে অনেক গাছ থাকে, কিন্তু মানুষ বড় বটগাছের নিচেই আশ্রয় নেয়। বিএনপি হলো সেই বটগাছ।
এদিকে আলোচনা সভার পর বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এডভোকেট আহমেদ আজম খান জোটের কার্যকারিতা নিয়ে শাহজাহান ওমরের বক্তব্যের সমর্থন করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। এতে হঠাৎ করেই টানাপড়েনটি সামনে চলে আসে। বৃহস্পতিবার সে আলোচনা সভার পর থেকেই জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা নিজেদের মধ্যে একের পর এক বৈঠক করছেন। শরিক দলগুলোর একাধিক নেতা জানান, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শরিক দলগুলোর প্রতি সরকারের বিভিন্ন অফার ছিল। বিশেষ করে যেসব দলের নিবন্ধন আছে। তাদের রাজি করানোর জন্য আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা অনেক তৎপরতাও চালিয়েছেন। ওই সময় ৯ম সংসদের এমপি হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম ও বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রিত্ব, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মওলানা আবদুল লতিফ নেজামী ও বাংলাদেশ ন্যাপ সভাপতি জেবেল রহমান গানিকে উপদেষ্টা করাসহ নিবন্ধিত দলগুলোর বেশ কয়েকজনকে এমপি নির্বাচিত করার অফার দেয়া হয়। কয়েকজন নেতাকে বেশ চাপেও ফেলা হয়েছিল। কিন্তু তারা সরকারের সে অফার গ্রহণ করেননি। জোটের নেতারা জানান, জোটবদ্ধ আন্দোলন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, মওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, শফিউল আলম প্রধান, আহসান হাবিব লিংকন, সাঈদ আহমেদ, সাইফুদ্দিন মনি ও লুৎফর রহমান কারাভোগ করেছেন। মামলার আসামি হয়েছেন- জেবেল রহমান গানি, শাহাদাত হোসেন সেলিম, গোলাম মর্তুজা, গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়াসহ জামায়াত ও শরিকদলের অনেকেই। বরং বিএনপির যেসব নেতা জোটের সমালোচনা করছেন তাদের অনেকেই আন্দোলনের সময় সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেছেন। শরিক দলের নেতারা জানান, জোটের নেতৃত্বদানকারী দল বিএনপি ও দ্বিতীয় প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে একটি পরিস্কার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত বিভিন্ন ওয়ার্ডে তাদের প্রার্থী দিয়েছে। বিএনপি প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করলেও জামায়াত সেটা মানেনি। এর ফল হিসেবে জামায়াত ৫টি কাউন্সিলর পেয়েছে। উপজেলা নির্বাচনেও জামায়াত সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রার্থী দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের দায় ও অপপ্রচারের শিকার হয়েছে বিএনপি। নেতারা জানান, কেবল বিএনপি নয়- জোটের মধ্যে প্রগতিশীল মনোভাবের কয়েকটি দলের সঙ্গেও জামায়াতের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জোটের শরিক হিসেবে থাকলেও দল গোছাচ্ছে জামায়াত। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতাদের জোট প্রসঙ্গে প্রকাশ্য বক্তব্যে শরিকদলগুলোর জন্য অপমানজনক ও হতাশাব্যঞ্জক। শরিক দলের নেতারা এতে দারুণভাবে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা বলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে ছোট ছোট দলগুলোকে আগ্রহের সঙ্গে জোটভুক্ত করেছিল বিএনপি। আন্দোলনে বিএনপির ভুল বা ব্যর্থতার দায় নিয়েছে ছোট দলগুলো। কিন্তু বিএনপি নেতারা বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। নেতারা বলেন, জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে অনেক দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়ে ও মেনে নিয়ে নির্বাচনে প্রার্থিতা দেয়নি। সেখানে প্রার্থী হলে তারা নানাভাবে লাভবান এমনকি দলের পরিচিতি বাড়াতে পারতো। এখন বিএনপি নেতাদের কথায় পরিষ্কার যে, ভবিষ্যতে সুসময় এলে তারা ছোটদলগুলোকে ছুড়ে ফেলবে। আমরা এ বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মনোভাব ও ব্যাখ্যা জানার অপেক্ষায় আছি। এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, আমরা বিএনপির ভুল ও ব্যর্থতার দায়িত্ব নিয়েছি। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনসহ সরকারের নানা আহ্বানকে উপেক্ষা করেছি। কিন্তু বিএনপি নেতারা এখন আমাদের প্রকাশ্যে অপমান-অপদস্ত করছে। এতে আমরা হতাশ এবং স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ। সম্মান নষ্ট করে জোট করার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর একজন সিনিয়র রাজনীতিক। কিন্তু স্থান-কাল বিবেচনায় তিনি প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেননি। তিনি কিভাবে মনে করেন, অন্য দলগুলো বিএনপিতে যোগ দেবে। এটা তো বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে নীতি তার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে অপমানিত এবং ক্ষুব্ধ হলেও কিছু বিষয়ে তারা একমত। জোটের একাধিক শরিক দলের নেতারা জানান, ২০ দলের আন্দোলনের প্রধান ইস্যু ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে আন্দোলন এখন নেই। এমনকি মানবপাচার, ধর্ষণসহ বেশ কিছু ইস্যুতে আশ্চর্যরকম নীরব জোটের রাজনীতি। এখন জোটের তেমন কোন কার্যকারিতা নেই। কার্যকারিতার বিবেচনা করেই জোট গঠন করা উচিত ছিল। কিন্তু বিএনপি সংখ্যাতত্ত্বকে গুরুত্ব দিয়ে কিছু নাম ও ব্যক্তিসর্বস্ব দলকে জোটভুক্ত করেছে। এতে জোটের সিদ্ধান্তগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসুবিধার তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ২০দলীয় জোটের ৯টি শরিক দলেরই নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক নিবন্ধন নেই। দলগুলো হচ্ছে- জাতীয় পার্টি (জাফর), এনপিপি, এনডিপি, ইসলামিক পার্টি, পিপলস লীগ, লেবার পার্টি, সাম্যবাদী দল, ডেমক্রেটিক পার্টি ও ন্যাপ ভাসানী। শরিক দলের নেতারা জানান, জোটকে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর করতে বিএনপিকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য কয়েকটি উদ্যোগ নিতে হবে। সেগুলো হচ্ছে- জোটের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে একটি কোর কমিটি গঠন, জেলা পর্যায়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন, বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতাসহ জোটভুক্ত দলগুলোর মহাসচিবদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কর্মসূচি প্রণয়ন। শরিক দলের নেতারা মনে করেন, এখন যেহেতু আন্দোলনের ট্র্যাকে নেই তাই জোটভুক্ত দলগুলোর উচিত নিজেদের দল গোছানোর উদ্যোগ নেয়া। জোটের নেতারা জানান, বিএনপির একটি অংশ চাইছেন শরিক দল জামায়াত জোট ছেড়ে যাক। কারণ জামায়াতের কারণে বিএনপি যতটা লাভবান হয়েছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামায়াতের ঐতিহাসিক দায় বিএনপির কাঁধে চেপে বসেছে। আন্তর্জাতিকভাবেও বিএনপিকে কট্টর ইসলামপন্থি দল হিসেবে পরিচিত করানো হয়েছে জামায়াত ইস্যুতেই। আর ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতের সরে যাওয়ার ব্যাপারে কাজ করছেন অন্য শরিকদলের কিছু নেতাও।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাহজাহান ওমর বীরবিক্রম বলেন, আন্দোলন ইস্যুতে জোট গঠন হয়েছিল। এখন আন্দোলন নেই তাই জোটের প্রয়োজনও নেই। নাম ও প্যাড সর্বস্ব দল নিয়ে অনেকেই জোটের শরিক সেজে বসে আছেন। এতে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির মর্যাদাহানি হচ্ছে। বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা জোটের নামসর্বস্বদের জন্য মঞ্চে জায়গা পান না। এতে নেতাকর্মীরা অপমানিতবোধ করেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বিভিন্ন এলাকায় আমাদের সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আলোচনা সভায় যা বলেছি, বুঝে শুনেই বলেছি। চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা আহমেদ আজম খান বলেন, রাজনৈতিক দলের মতো জোট কোনদিন স্থায়ী হয় না। আর এটা কোন আদর্শিক জোটও নয়। আন্দোলনের জন্য জোট হয়েছিল এখন আন্দোলন নেই, নিকট ভবিষ্যতে নির্বাচনের লক্ষণ দেখছি না। তাই জোটের প্রয়োজনীয়তাও দেখি না। তিনি বলেন, শরিক দল বা কোন নেতার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে নয়, বাস্তবতা বিবেচনায় আমি এ কথা বলছি। এতে তারা মনোক্ষুন্ন হবেন কেন। এখন সময় এসেছে বিএনপি এবং শরিকদলগুলোরও নিজেদের দল গোছানোর। তারাও দল গোছানোর উদ্যোগ নিক। যখন আবার আন্দোলন শুরু হবে তখন দেখা যাবে জোটের প্রয়োজনীয়তা। আজম খান বলেন, আমার বক্তব্য হচ্ছে- দলের নীতিগত উপলব্ধি এবং প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরাও এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। তারা আলাপ-আলোচনায় তা বলছেন। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেবল বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার।

মাইরুনা রাগ করে তুরস্ক যায় by দীন ইসলাম

ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে তুরস্ক যায়নি ফারহিন মাইরুনা। একরোখা মেয়েটি পরিবারের সঙ্গে রাগ করেই তুরস্ক গেছে। এমনটাই দাবি করেন মাইরুনার বাবা প্রফেসর ডা. শামসুদ্দিন মোহাম্মদ ইসহাক। গত বৃহস্পতিবার দেশের নামী এক হসপিটালে বসে মানবজমিন-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন তিনি। তবে মেয়ের ইসলামপন্থি মনোভাবের চিত্র তার বাবার সঙ্গে আলাপে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে তুরস্কের আতাতুর্ক ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছে। মোবাইল, ল্যাপটপসহ সবকিছু সিজ করে নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মেয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও তল্লাশি চালানো হয়। এদিকে শুক্রবার রাতে ফারহিন মাইরুনের ফেসবুক পেইজে গিয়ে ইসলাম বিষয়ক নানা স্ট্যাটাস দেখা যায়। ৯ই ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছে মাইরুনা। এ ছাড়া ১৪ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালবাসা দিবস নিয়েও স্ট্যাটাস দিয়েছে সে। এ দিবসটি নিয়ে বলা হয়েছে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি পালন করা ইসলামে জেনা। এ রকম অনেক স্ট্যাটাস রয়েছে। গতকাল তার ফেসবুক পেইজ থেকে এসব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। আপনার মেয়ে মাইরুনা আইএসে যোগদানের জন্য তুরস্ক গিয়েছিল কি? সরকারি কাগজপত্রে তো তাই বলা হয়েছে- এমন প্রশ্নে থামিয়ে ডা. ইসহাক বলেন, পত্রিকায় আসার পর আমি বিষয়টি সম্পর্কে সরকারকে জানিয়েছি। আমার একটি ইজ্জত-সম্মান আছে। মেয়ের আইএসে যোগদান সম্পর্কে সরকারের কাছে কোন এভিডেন্স (প্রমাণ) থাকলে শো করার (দেখানো) জন্য অনুরোধ করেছি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের পর তারা আমাকে বলেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এটা করা হয়েছে। কিন্তু না জেনে একটি মেয়ে সম্পর্কে এটা করা কি তাদের ঠিক হয়েছে? তিনি বলেন, চরমপন্থি গ্রুপের সঙ্গে আমার মেয়ে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রশ্নই আসে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তদন্ত করে দেখুক। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তের পরই ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে আমার মেয়েকে ছাড়া হয়। আমি, আমার স্ত্রীসহ পরিবারের সবাইকে এয়ারপোর্টে ইন্টারোগেট (জিজ্ঞাসাবাদ) করা হয়। মেয়ের কাছে থাকা সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসেও তাকে ইন্টারগেট (জিজ্ঞাসাবাদ) করা হয়। ওর মোবাইল, ল্যাপটপ সবকিছু সিজ করে নিয়েছে। এ ছাড়া ওর ফেসবুক সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তারা আমাকে জানিয়েছে কিছু পাননি তারা। আইএসে যোগ দিতে না গেলে তুরস্কে আপনার মেয়ে যাওয়ার কারণ কি? কিছুক্ষণ চুপ থেকে ডা. ইসহাক বলেন, আমার সঙ্গে রাগারাগি করে তুরস্ক চলে যায় সে। আসলে আমার পরিবারের চারজন একসঙ্গে তুরস্ক যাওয়ার কথা ছিল। ওই দেশে একটি কনফারেন্সে যাওয়ার জন্য পরিবারের সবার ভিসা, টিকিট ও ডলার করেছিলাম। শাশুড়ির অসুস্থতায় সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মেয়ের অনেক দিনের ইচ্ছা তুরস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে। কিন্তু আমি তাকে টার্কিতে পড়াবো না। মাইরুনা তুরস্কে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে বলেছি ওকে মালয়েশিয়াতে ভর্তি করাবো। এরপর থেকে ও জেদ ধরেছিল ইস্তাম্বুলের টার্কি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করবে। এ লেভেলের ইসলামিক দুটি সাবজেক্টে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। এসব নানা কারণে তুরস্কে যায় সে। তিনি বলেন, আমার মেয়ে খুব একরোখা স্বভাবের। যা বলে তাই করে ছাড়ে। কিন্তু ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট। যে সাবজেক্টে পড়বে বলে সেই সাবজেক্টেই পড়বে। আমার বাসার কাছেই লেট হেড গ্রামার স্কুলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছে। বৃটিশ কাউন্সিল থেকে দুটি সাবজেক্টে এ লেভেল দিয়েছে। ওর বন্ধুদের থেকে এক বছর আগে পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছে। ও সবার থেকে এগিয়ে থাকতে চায়। ওর এমবিশন ভিন্ন। আমার মেয়ের টার্গেট তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিকাহ শাস্ত্রে পড়তে। আমার মেয়ে সব সময় বলে, বাংলাদেশে মেয়েদের নামাজ কালাম হয় না। ফিকাহ শাস্ত্রে পড়াশোনা করে এসে এ দেশে মেয়েদের নামাজ শেখাবে। আইএসের কর্মকাণ্ডকে আপনি বা আপনার পরিবার কি চোখে দেখেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ অর্গানাইজেশন আমি বা আমার মেয়েও পছন্দ করে না। তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামবিরোধী বলে আমরা মনে করি। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে এসব খোনাখুনি পারমিট করে না। তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের ধর্ম পালন করতে পারছি। তাই এখানে আইএস বা অন্য কিছুতে জড়ানোর সিচুয়েশন নেই। এ দেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। অন্য ধর্মের লোকদের প্রটেকশন ইসলামে সবচেয়ে বেশি। ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। ডা. ইসহাক বলেন, আমার বাসায় সিরাতের বইসহ অনেক ইসলামী বই রয়েছে। ছোটকাল থেকেই আমার মেয়েকে ওইভাবেই ট্রেইন-আপ করেছি। মেয়ে আমাকে বলেছে, আমাদের দেশের মানুষের রুকু-সিজদা হয় না। পরে বুখারি শরিফ পড়ে দেখেছি মেয়ের কথাই ঠিক। অনর্থক এত দিন এ বিষয়ে তাকে বকাবকি করেছি। মেয়ের থেকে আমি ৫০ বছর ভুল নামাজ পড়েছি। মেয়েই আমাকে শিখিয়েছে রুকু ও সিজদায় কতক্ষণ দাঁড়াতে হয়। কিভাবে রুকু-সিজদা করতে হয়। তুরস্ক এয়ারপোর্টে আপনার মেয়েকে কি কি জিজ্ঞেস করেছে- এমন প্রশ্নে বলেন, প্রথমেই বলেছে আব্বু-আম্মুকে না জানিয়ে তুমি কেন এসেছো? তখন সে বলেছে, আব্বু-আম্মু আমাকে খুব বকাবকি করেছে। আমাকে টার্কিতে পড়াশোনা করতে দেবে না। এ কারণে রাগ করে চলে এসেছি। ঢাকায় ফিরে আমাদের বলেছে, তোমাদের দেখাতে গিয়েছি তোমরা না পড়ালেও আমি যে যেতে পারি। আসলে ২০-২৫টি দেশে আমাদের সঙ্গে সে গিয়েছে। তাই একা যাওয়া কোন অস্বাভাবিক কিছু নয়। তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসের তরফ থেকে মাইরুনা সম্পর্কে আতাতুর্ক বিমানবন্দরকে চরমপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করে কেন জানানো হয়েছে- এমন প্রশ্নে ডা. ইসহাক বলেন, মাইরুনা তুরস্কে যাওয়ার সময় আমার বন্ধু মেজর জেনারেল আবদুস সালাম একই ফ্লাইটে ছিল। নিশ্চয়ই কোন ভাল কাজ করেছি। না হলে আমার বন্ধু একই ফ্লাইটে থাকবে কেন? তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসের আর্মি অ্যাটাচি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমার বন্ধু। তাই মেয়ের যাওয়ার পর সবার সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। সালাম ভাইয়ের ওয়াইফ (ভাবী) সবাইকে ফোন করে বলেছে ইসহাক ভাইয়ের মেয়ে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গেছে। এরপর এয়ারপোর্টে তাকে আটক করা হয়। আসলে আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। এ কারণে আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আছে। তারাই জানানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছে। তুরস্ক থেকে ফেরত আসার পর তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকালে আমার মেয়েকে দেখে মনে হয়েছে, ওর আত্মহত্যা করার জোগাড়। একটি ইয়াং মেয়ে যা না তা যদি দেখে সবাই তাকে তাই বানাচ্ছে তাহলে তো আত্মহত্যা করার জোগাড় হবেই। ওকে তো এখন পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে। ওর মন এখন ভেঙে গেছে। এখন কি নিয়ে ব্যস্ত আছে? মেয়ের বর্তমান কর্মকাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমার মেয়ের টার্গেট এ দেশের মেয়েদের হেদায়েত করবে। তার লক্ষ্য মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। তারপর যা করার করবে। এমনিতেও সে স্কুলে ফ্রি লেকচার দেয়। মানুষদের নামাজ কালাম শেখায়। ওকে কয়েকটি স্কুল থেকে লেকচার দেয়ার অফারও দেয়া হয়। কিন্তু সে আমাকে বলেছে আগে হেফজ করে নিই। প্রপার জিনিস শিখে সবকিছু ভাবনা-চিন্তা করা যাবে। মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ডা. ইসহাক বলেন, মক্কা ইউনিভার্সিটিতে মাহারামের জন্য দিতে পারি না। বাবা-মা বা স্বামী ছাড়া ওই ইউনিভার্সিটিতে অ্যালাউ করা হয় না। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমাদের থেকে পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়। মন ঠিক করে করবো। আমার বড় ভাইকে অ্যাকসেপ্ট করলে মক্কায় দেবো। অন্যথায় ভাল ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দেবো। বিয়ে দিয়ে জামাইকে মাহারাম বানিয়ে মক্কা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পাঠাবো। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার মানবজমিনে ফারহিন মাইরুনা আইএসে যোগদান করতে তুরস্কে যায় বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

সেতুর অভাবে বিচ্ছিন্ন দুই ইউনিয়নের মানুষ by আজাদ রহমান

শৈলকুপা উপজেলার আড়ুয়াকান্দি ঘাটে কুমার নদে  সেতু নেই।
তাই শিক্ষার্থীদের ​পানি পার হয়ে সাঁকোতে উঠতে হচ্ছে
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দক্ষিণে উমেদপুর আর উত্তরে মনোহরপুর ইউনিয়ন। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে কুমার নদ। এ নদে কোনো সেতু নেই। তাই পারাপারে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ। এলাকার অনেকে বলছেন, আড়ুয়াকান্দি ঘাটে একটি সেতু নির্মাণ এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শৈলকুপা উপজেলার আড়ুয়াকান্দি এলাকায় কুমার নদের ওপর রয়েছে একটি বাঁশের সাঁকো। এর কিছু অংশ ভেঙে পানির স্রোতে হারিয়ে গেছে। ভাঙা স্থানটি দিয়ে পানিতে ভিজে পার হচ্ছে পথচারীরা। উমেদপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বই-খাতা নিয়ে পানির মধ্যে নেমে গেছে। এভাবে পানিতে নেমে তাদের সব সময় যাতায়াত করতে হয়।
এলাকার অনেকে জানান, এই কুমার নদ তাঁদের এলাকার উমেদপুর আর মনোহরপুর ইউনিয়নকে আলাদা করে রেখেছে। উমেদপুর ইউনিয়নের রয়েড়া, তামিনগর, বাহির-রয়েড়া, আড়ুয়াকান্দি, গোয়ালবাড়িয়া, পার্বতীপুর, সষ্টিবর, কৃষ্ণপুর, বিষ্ণুপুর, লক্ষ্মণদিয়া, খড়িবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর এবং মনোহরপুর ইউনিয়নের দামুকদিয়া, বিষ্ণুপুর, মাধবপুর, মহিষাডাঙ্গা, মনোহরপুর, নাগিরহাট, দোয়া-নাগিরহাট, বিজুলিয়া, দলিলপুর গ্রামের মানুষ এই ঘাট দিয়ে পারাপার হয়। উমেদপুর ইউনিয়নে আড়ুয়াকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উমেদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উমেদপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, রয়েড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রয়েড়া দাখিল মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। নদের দুই পাশে রয়েছে রয়েড়া বাজার, কৃষ্ণপুর বাজার, খড়িবাড়িয়া বাজার, নাগিরহাট বাজার, শিতালী বাজার। উল্লেখিত ২০ গ্রাম ছাড়াও পাশের কিছু গ্রামের মানুষ বাজারগুলোতে প্রতিনিয়ত কেনাবেচা করে। তাদের পণ্য আনা-নেওয়া করতে হয় ১৫-১৬ কিলোমিটার দূরের ফাদিলপুর বাজার ঘুরে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মালামাল পার করে ডিঙ্গি নৌকায়। এভাবে কষ্ট করে বছরের পর বছর চলতে হয় হাজার হাজার মানুষকে।
আড়ুয়াকান্দি গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে তাঁরা বাঁশের সাঁকো তৈরি করে নেন। বছরের সব সময় এই নদে পানি থাকে, কিন্তু সাঁকো থাকে না। কারণ, তৈরির অল্প দিনেই ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁশের সাঁকো ভেঙে পড়ে যায়। সাধারণ মানুষকে নদের পানি ভেঙে চলাচল করতে হয়। আবার সাঁকো দিয়ে পার হতে গিয়ে অনেকে পানিতে পড়ে যায়। ফলে এলাকার মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। এ ছাড়া বর্ষাকালে পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে ডিঙ্গি নৌকা। তখন ভোগান্তি আরও চরমে ওঠে। এভাবে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কষ্ট করে চলাচল করছে মানুষ। তাই তারা আড়ুয়াকান্দি-বিষ্ণুদিয়া ঘাটে একটি সেতুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে। কিন্তু আজও প্রশাসন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
উমেদপুর গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম জানান, সেতু না থাকায় তাঁদের এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি। উমেদপুর বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী শিখা খাতুন জানায়, সেতু না থাকায় তাদের চলাচলে খুব কষ্ট হয়। মাঝেমধ্যে সাঁকো পার হওয়ার সময় পানিতে পড়ে বই-খাতা নষ্ট হয়।
জানতে চাইলে ঝিনাইদহ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব-উল-হাসান বলেন, ‘ওই জায়গায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, মানুষের দুর্ভোগ কমাতে আড়ুয়াকান্দি ঘাটে সেতু নির্মাণ হবে।’

চেয়ারে বসে নামাজ আদায় জায়েজ নয়: ইফার ফতোয়া

চেয়ারে বসে ফরজ, ওয়াজিব ও মুয়াক্কাদা নামাজ আদায়ের কোন বৈধতা নেই বলে ফতোয়া দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, যেখানে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য খোদ শরিয়াহ আইনে অনেকগুলো বিকল্প বলে দেয়া হয়েছে, সেখানে সেসব বাদ দিয়ে অন্য বিকল্প অর্থাৎ চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের বৈধতা দেয়ার অবকাশ থাকে না। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের এ ফতোয়ায় বলা হয়েছে, অসুস্থ বা ওজর অবস্থায় নামাজ আদায়ের শরিয়তসম্মত বিবরণ আকর গ্রন্থাদিতে পাওয়া যায়। তাতে তিনটি অবস্থানের কথা বলা হয়েছে- দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায়। গতকাল ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়। তবে দেশের আলেম সমাজ এ ফতোয়ার ব্যাপারে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তারা বলেন, কোরআন হাদিস না পড়ে না বুঝে এ ধরনের ফতোয়া দেয়া ঠিক না। ফাউন্ডেশনের ফতোয়ায় বলা হয়, নামাজের সব  ফরজ রোকনের মধ্যে সিজদা করা তথা মাটিতে নাক, কপাল-মাথা স্পর্শ করে সর্বোচ্চ বিনয় ও দীনতা-হীনতার স্বাক্ষর রাখা, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। যে কারণে, একজন অসুস্থ রোগী যিনি দাঁড়িয়ে হোক বা বসে হোক উভয় অবস্থায় ইশারা ব্যতীত নামাজ আদায়ে সক্ষম নন। তার বেলায় বলা হয়েছে, বসে নামাজ আদায়ই তার পক্ষে উত্তম। অথচ বসে আদায়ের ক্ষেত্রে ১৩টি ফরজের অন্যতম কিয়াম বা দাঁড়ানো ফরজটি বাদ পড়ে যাচ্ছে! তবুও সেটি উত্তম কেন? উত্তম হচ্ছে, যে-সিজদা মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে আদায় করতে হয়, বসা অবস্থায় সেই মাটির অধিক কাছাকাছি অবস্থান হয়ে থাকে, সেজন্য। চেয়ারে বসা অবস্থায় কি মাথা ঠেকিয়ে আদায় করতে হয়, বসা অবস্থায় সেই মাটির অধিক কাছাকাছি অবস্থান হয়ে থাকে, সেজন্য। চেয়ারে বসা অবস্থায় কি মাথা-কপাল মাটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে না?
চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ে এবাদতের প্রাণরূপ সর্বোচ্চ দীনতা-হীনতা প্রকাশের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয় না। তাই চেয়ারে বসে নামাজ আদায় সঠিক নয়। মসজিদে চেয়ার ঢুকিয়ে তাতে আসন গ্রহণ করা, রাজাধিরাজ, শাহানশাহ আহকামুল-হাকেমিন এর শাহী দরবারের আদব পরিপন্থি বিধায় তা বৈধ নয় এবং তাতে বসে নামাজ আদায়ও বৈধ নয়। চেয়ারদ্বারা মসজিদে জামাতের কাতারের বিঘ্ন ঘটে। তাই মসজিদে চেয়ার ঢুকানো ঠিক নয়। জামাত-কাতার ব্যতীতও তাতে মসজিদের স্বাভাবিক ও মৌলিক সৌন্দর্য, সকলের সমান বিনয়ী অবস্থানের বিঘ্ন ঘটে। তাই মসজিদে চেয়ার ঢুকানো ঠিক নয়।
একান্ত প্রয়োজন (সাময়িক বয়ান/আলোচনা, যখন বক্তা/আলোচক বৃদ্ধ-বয়স্ক হন) ব্যতীত মসজিদে চেয়ারের আসন পাতায় বিধর্মীদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে থাকে। অথচ ধর্মীয় বিষয়াদিতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সাদৃশ্যতা ইসলামী শরীয়তে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং মসজিদে চেয়ার ঢুকানো এবং চেয়ারে বসে নামাজ আদায় বৈধ নয়। নফল নামাজে ‘কিয়াম’ বা দাঁড়ানো ফরজ নয় বিধায় এবং সফর অবস্থায় বাহনে বসে বসে তা আদায়ের অনুমতির উপর ভিত্তি করে একজন রোগীর বেলায় তেমনিভাবে চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের বৈধতা বের করা যাবে না। তার কারণ ‘মাক্বীছ’ ও ‘মাক্বীছ আলাইহি’ এক বা সমান নয়। অর্থাৎ ফরজ/নফল/সফর অবস্থা ও বাসা বাড়িতে অবস্থানের অবস্থা ভিন্ন, তাই এসব ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা ও বিধান ভিন্ন ভিন্ন।
ফিকহ-ফাতাওয়ার আকর গ্রন্থাদিতে একজন রোগীর ক্ষেত্রে চেয়ারে বসে নামাজ পড়ার কোন প্রসঙ্গ নেই। তবে আধুনিক সময়ে তথা বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ছাপানো কোন কোন উর্দু/আরবি ফাতওয়া গ্রন্থে প্রসঙ্গটি স্থান পেলেও তাতে- প্রথমত, সমস্যারটির সমাধান সুস্পষ্টভাবে আসেনি। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্টরা সমস্যার গভীরে যাননি এবং ব্যতিক্রম হিসাবে বা বিশেষ বা কারও ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতা দানের সুযোগে, তার ভবিষ্যৎ মন্দ ফলাফল কি দাঁড়াবে (যা বর্তমানে মসজিদগুলোতে চেয়ারে সারি দেখে, বোঝা যাচ্ছে) তা তারা অনুমান করতে পারেননি।
সহীহ বুখারি ও সহীহগ মুসলিম এর বর্ণনা মতে প্রিয়নবী (সা.) ঘোড়া হতে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন এবং বসে বসে নামাজ পড়িয়েছেন। মসজিদে একটি চেয়ার থাকা সত্ত্বেও চেয়ারে বসে নামাজ পড়েননি।
একান্ত গবেষণা-বিতর্কের খাতিরে যদি কারও বেলায় এমনটি বলা হয় যে, তিনি দাঁড়িয়েও নামাজ পড়তে পারেন না এবং চেয়ার ব্যতীত যে কোন প্রক্রিয়ায় বসেও পারেন না। তেমন কারও জন্য বৈধতার অনুমতির কথা মেনে নিলেও তা প্রযোজ্য হতে পারে বাসা- বাড়ি, অফিস-আদালত তথা মসজিদের বাইরের ক্ষেত্রে, মসজিদে নয়। কারণ, তার প্রয়োজনে মসজিদের পরিবেশ ব্যাহত করা যাবে না এবং তিনি রোগী তার পক্ষে জামাতে অংশগ্রহণও জরুরি নয়।
ভিন্নমত আলেম ওলামাদের
চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঘোষিত ফতোয়া নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন আলেম ওলামারা। তারা বলেন, এ ধরনের ফতোয়া দেয়ার এখতিয়ার ফাউন্ডেশনের নেই। তা ছাড়া হঠাৎ এই ধরনের ফতোয়া জারির বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফী, এই প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ শিক্ষক হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ দেশের অনেক শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করেন। বাবু নগরীর খাদেম রাকিব আল হাসান গতকাল মানবজমিনকে এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, যারা বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন, অথবা কোমর বা পায়ে ব্যথার কারণে দাঁড়াতে পারেন না মসজিদের ফ্লোরে বসার মতো শক্তি যাদের নেই, তারাই চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করেন। সুতরাং কোরআন-হাদিস সম্পর্কে যাদের সীমিত জ্ঞান তারাই এ ধরেনর ফতোয়া দিতে পারেন। রাকিব হাসান বলেন, আমার দেখা এবং জানা মতে, দেশের অনেক বড় বড় মুফতিরা চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করেন। এটা নাজায়েজ হলে নিশ্চয় তারা সেটা করতেন না। ইসলামী ঐক্যজোটের চোরম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, এসব ফতোয়া দেয়ার এখতিয়ার মুফতিদের। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন হঠাৎ এই ফতোয়া নিয়ে আসলো কেন বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, আমার জানা মতে এই ফতোয়া সঠিক নয়। এটা নিয়ে সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি হবে। বিশৃঙ্খলাও দেখা দিতে পারে। আলেম সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে এ ধরনের ফতোয়া দেয়া ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক এ প্রসঙ্গে বলেন, অসুস্থতা থাকলে কেউ চেয়ারে বসে নামাজ আদায় করতে পারবেন। এতে বাধা নেই। বহুদেশে অসুস্থতার কারণে মুসলিমরা এভাবে নামাজ পড়েন। মুফতি মো. ওয়াক্কাস বলেন, ঢালাওভাবে এভাবে ফতোয়া দেয়া ঠিক নয়। যথাযথ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কেউ চেয়ারে বসে নামাজ পড়তে পারবেন।
ইফার ফতোয়ায় হতবাক প্রধানমন্ত্রী
আপডেট:  ২ জুন ২০১৫
‘চেয়ারে বসে নামাজ পড়া বৈধ নয়’- ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) জারি করা নতুন এ ফতোয়া শুনে হতবাক হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় ইফার ফতোয়া দেয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন প্রতিক্রিয়া জানান। কয়েক জন সিনিয়র মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নিয়মিত এজেন্ডা নিয়ে আলোচনার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জারি করা নতুন ফতোয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভার এক সিনিয়র মন্ত্রী কথা তোলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার আরও কয়েক সদস্য ওই আলোচনায় অংশ নেন। এক মন্ত্রী জানান, মন্ত্রিসভার অনির্ধারিত আলোচনার সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন ফতোয়ার বিষয়টি তোলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, চেয়ারে বসে নামাজ পড়া বৈধ না হলে অসুস্থ ব্যক্তিদের কি অবস্থা হবে? প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের বিষয়টি জানতে পেরে কয়েকজন মন্ত্রীও এ আলোচনায় অংশ নেন। মন্ত্রীরা তাদের আলোচনায় বলেন, দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামাদের মতামত না নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফতোয়া জারি করার কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হবে। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে ব্যাখ্যা দেয়া দরকার বলেও মত দেন কোন কোন মন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রীরা তাদের আলোচনায় চেয়ারে বসে নামাজ আদায়কারী মন্ত্রীদের ইঙ্গিত করে কথা বলেন। এর আগে গত রোববার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্যাডে ‘পীড়িত অবস্থা ও চেয়ারে বসে নামাজ আদায় প্রসঙ্গ’ সংক্রান্ত একটি ফতোয়া গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের মুফতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহর স্বাক্ষর রয়েছে। ১২টি পয়েন্টে মুফতি আবদুল্লাহ চেয়ারে বসে নামাজ পড়া কেন বৈধ নয় তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সহীহ বোখারী, সহীহ মুসলিম ও আবু দাউদসহ ১১টি সূত্র তিনি উল্লেখ করেছেন।

হার না–মানা মা ও ছেলে by সুজন ঘোষ

হাঁটতে পারে না ইমতিয়াজ। তাতে কী! মা ইয়াসমিন
নাহার ছেলেকে কোলে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেতেন।
চট্টগ্রামের কলেজিয়েট স্কুল থেকে এ বছর
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। গতকাল
স্কুল প্রাঙ্গণে মা-ছেলে l ছবি: জুয়েল শীল
ইয়াসমিন নাহারের মুঠোফোনে একটু পর পর রিং বাজছে। তিনিও একটার পর একটা ফোন ধরছেন। তাঁর চোখেমুখে আনন্দ, কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। গর্ব করে সাফল্যের খবর জানাচ্ছেন। ছেলে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলে এমন উচ্ছ্বাস তো সব মা-ই করেন!
ছেলেকে নিয়ে ইয়াসমিন নাহারের সংগ্রাম অন্য আট-দশজন মায়ের মতো নয়। জন্ম থেকেই হাঁটার সামর্থ্য ছিল না তাঁর ছেলের। কোনো দিন মা কোনো দিন বাবার কোলে চড়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে তাকে। সেই মো. ইমতিয়াজ কবির মা-বাবার পরিশ্রম আর কষ্ট বৃথা যেতে দেয়নি। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এ বছর এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
গতকাল শনিবার দুপুরে কলেজিয়েট স্কুলে গিয়ে কথা হয় অদম্য এই মা ও হার না-মানা তাঁর ছেলের সঙ্গে। ইয়াসমিন নাহার বলেন, ‘আজ কী আনন্দ হচ্ছে তা বোঝাতে পারব না। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সফল হয়েছে। এ জন্য ইমতিয়াজের শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা।’
চট্টগ্রামের কৃষ্ণকুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ইয়াসমিন নাহার। তিনি জানান, জন্মের পর থেকেই ইমতিয়াজের দুটি পা বাঁকা ছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও পা ভালো হয়নি। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নড়াইলের কালিয়া থানায়। ইয়াসমিন নাহারের স্বামী ইনামুল কবিরের চাকরির কারণে ২০০০ সালে তাঁরা চট্টগ্রামে আসেন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে ইমতিয়াজ বড়। বোন সাদিয়া কবির কেজির ছাত্রী। বাবা পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক।
ইমতিয়াজের সাফল্যের জন্য সহপাঠীদের ভূমিকাকেও বড় করে দেখেন তার মা। তিনি জানান, কোনো কোনো দিন ইমতিয়াজের বন্ধুরা তাকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যেত। পড়াশোনার ব্যাপারে তারা নিয়মিত সহযোগিতা করত। শিক্ষকেরাও তার প্রতি আন্তরিক ছিলেন। সবার সহযোগিতায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
ইয়াসমিন নাহার জানান, প্রথমে চট্টগ্রামের লালখান বাজারে তাঁদের বাসা ছিল। কিন্তু ছেলের আসা-যাওয়ায় সমস্যা হওয়ায় কলেজিয়েট স্কুলের পাশে মাদারবাড়ির এলাকায় বাসা নেওয়া হয়।
জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল ইমতিয়াজ। কম্পিউটার প্রকৌশলী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলে, ‘আমি এমন একটি পেশা বেছে নিতে চাই, যেখানে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।’
কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক খুরশীদ আলীয়া জানান, ইমতিয়াজের মনোবল শক্ত। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকত। পড়াশোনার জন্য তার মা-বাবা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এই পরিবারটির সাফল্য অন্যদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

পাখির নাম ষষ্ঠিনী by শরীফ খান

সেই ষষ্ঠিনী পাখিটি l ছবি: লেখক
৪০ বছর পরে দেখলাম এ রকম আশ্চর্য দৃশ্যটি—এক জোড়া পাতিশিয়াল অর্ধভুক্ত একটি মহিষের বাচ্চা প্রাণপণে টেনে নিয়ে তুলে ফেলতে চাইছে একটা ঝোপের ভেতরে। পাঁচটি শকুন গোগ্রাসে খেয়ে নিচ্ছে মাংস—দুই পক্ষের মধ্যে একটা টানাটানির প্রতিযোগিতাও চলছে, শিয়াল দুটি চাইছে মড়িটা ঝোপের ভেতরে নিয়ে আরামসে খাবে, শকুনরা তা নিতে দেবে না।
দৃশ্যটি দেখলাম এপ্রিলের (২০১৫) দ্বিতীয় সপ্তাহে। গ্রামে ছিলাম। কেউ একজন এসে খবর দিল—খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার একটা গ্রামে ছয়-সাতটি শকুন সে গাছে বসে থাকতে দেখেছে, সঙ্গে একটা মোরগশকুনও আছে। মাথায় আমার চক্কর। মরা পশর নদ থেকে কয়েক কিলোমিটার মাত্র এদিকে—ওই তল্লাটেই সর্বশেষ একটি মোরগশকুন দেখেছিলাম আমরা ১৯৭৮ সালের এক হেমন্ত সকালে। অতএব, মোটেও দেরি না করে দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে চারজন আমরা তখনই রওনা হলাম। নির্দিষ্ট গ্রাম পর্যন্ত মোটরসাইকেল গেল না। অতএব, হাঁটা। না, সে গাছে শকুন নেই। ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করে হতাশ হলাম। বেলা পড়ে আসছে। ফেরার পথেই দেখলাম ৪০ বছর আগে দেখা দৃশ্যের একটা খণ্ডাংশ। চোখ জুড়িয়ে গেল, মনপ্রাণ ভরে গেল একটা অনাবিল আনন্দে। হয়তোবা ওই শকুনগুলোই। কিন্তু মোরগশকুন বা রাজশকুন কই!
ফিরতি পথ ধরলাম। ছোট একটা বিল যখন পাশ কাটিয়ে আসছি আমরা, তখন একটা জায়গায় জনা কয়েক শিশু-কিশোরকে দেখলাম—যাদের হাতে পাখি। বাবুই-চড়ুই হবে ভেবেও এগোলাম আমরা। ওদের হাতে দুটো ষষ্ঠিনী পাখি, একটি বই পাখি ও একটি ভুতুমে চ্যাগা। ছোট জাল পেতে আটকিয়েছে ওরা। বাড়ি নিয়ে মাংস খাবে। আমরা ওদেরকে বার্ড ফ্লুর ভয় দিলাম। ওদের মতো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে (বাচ্চা) এই পাখিদের বাসায় আছে, মাকে না পেলে বাচ্চাদের কী হবে, ওদের যদি বাবা-মা না থাকে, তাহলে কেমন কষ্ট হবে—ইত্যাকার বোঝানোর পরে ওরা পাখিগুলো আমাদের হাতে দিয়েই দিল। বার্ড ফ্লুর ভয়ে একটি ছেলে তাড়াতাড়ি পাখি দিতে গিয়ে একটি ষষ্ঠিনীকে উড়িয়েই দিল।
ষষ্ঠিনী! এই নামটি আমি জীবনে প্রথম শুনলাম। ফকিরহাট-চিতলমারী-মোল্লাহাটের বেশ কজন বয়সী মানুষও আমাকে ষষ্ঠিনী নামটি বললেন। এক ব্রাহ্মণ তো ব্যাখ্যাই দিয়ে ফেললেন এক কাপ চায়ের বিনিময়ে, এই পাখিটির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুবই প্রবল-প্রখর। যেসব মা সন্তানের জন্য খুবই কষ্ট করেন, সন্তানদের দেখেশুনে রাখেন সতর্কভাবে—এরাই ষষ্ঠিনী। তা ছাড়া ‘সাষ্টাঙ্গ প্রণাম’ বলে যে কথাটি প্রচলিত আছে, এই পাখি নাকি তাই করে। অন্য কজন বললেন, শারদীয় দুর্গাপূজার শুরুতে দেবীকে ধরাধামে আগমনের আমন্ত্রণ জানিয়ে বেল বা অশ্বত্থতলায় যে ষষ্ঠীপূজার আয়োজন করা হয়, তখন এই পাখিকে দেখা যায়। এভাবেও হতে পারে নামটা, কিংবা জামাইষষ্ঠীর সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। সত্যি-মিথ্যা যা-ই হোক, বিষয়টি দারুণ উপভোগ্য হলো আমার কাছে।
ষষ্ঠিনীর কেতাবি নাম মাঠচড়াই। ইংরেজি নাম Tawny pipit। বৈজ্ঞানিক নাম Anthus campestris। মোট মাপ ১৬ সেন্টিমিটার। শুধু লেজটাই ৭ সেন্টিমিটার। ছোট পাখি। শুকনো মাঠে, নদীর ঘাটে, পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে দ্রুত বেগে হেঁটে হেঁটে খাবার খায়। মূল খাদ্য ছোট ছোট পোকা-পতঙ্গ-কীট ও নানান ধরনের বীজ। তাল-খেজুরের রস পান করে, সুযোগ পেলে বড় বড় ফুলের রেণু-মধুও খায়। কর্মচঞ্চল-চতুর-বুদ্ধিমান ও কুশলী পাখি। সমগোত্রীয় অন্য পাখিদের সঙ্গে দলেও চরে। কণ্ঠস্বর মিষ্টি-সুরেলা, মোলায়েম-ধাতব। রাতের আশ্রয় নেয় এরা শেওড়াগাছ-আখখেত, পানের বরজসহ অন্যান্য ঘন পাতাওয়ালা গাছে।
একনজরে বালু-মাটি আর বাদামি বড় ছোপওয়ালা পিঠ ও লেজের উপরিভাগটা, বুক-পেট মেটে-ধূসর-ফিকে। লেজের প্রান্তের পালক মেটে-সাদাটে। চোখের ওপর দিয়ে ঘাড়ের দিকে চওড়া সাদাটে একটা টান বয়ে গেছে। বুজানো অবস্থায় দুই ডানার প্রান্তদেশে ছয়টি কালো ঝুঁটি দেখা যায়। ঠোঁট হলুদাভ ধূসর। পা হলুদাভ। আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখি এরা। ওজন হবে ১৫-২০ গ্রাম। তবু চড়ে যায় রান্নার হাঁড়িতে! তাহলে বড়দের অবস্থাটা কী?