Sunday, August 2, 2009

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন কি জীবিত না মৃত?by প্যাট্রিক সিল

এ মাসেই শারম আল-শেখে অনুষ্ঠিত হয়েছে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) পঞ্চদশ শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক ঘোষণা করেছেন, আন্দোলন এখনো ‘জীবিত এবং ভালো আছে’। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সন্দেহ নেই, ১১৮টি দেশের সরকারপ্রধানেরা মিসরের লোহিত সাগর উপলক্ষে একটি স্বীকৃত ছুটি কাটিয়েছেন। কিন্তু এ থেকে সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ কোনো অর্জন আছে কি?
আমি ধরে নিলাম, কারও এতটা সমালোচক হওয়া উচিত নয়। শীর্ষ সম্মেলনের অর্জনগুলো হচ্ছে: ফিলিস্তিন ও ডমিনিকান রিপাবলিকের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, আলজেরিয়ার কাছে ইয়েমেনের পাওনা নয় কোটি ডলার ঋণ বাতিল হয়েছে এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য একটি ন্যাম ইনস্টিটিউট স্থাপনে মিসর রাজি হয়েছে। সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ, জাতিসংঘের সংস্কার, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার পুনর্গঠন, কিউবার ওপর থেকে আমেরিকার ৫০ বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ আহ্বান কতটুকু গুরুত্ব বহন করে?
ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন, যদি তাঁরা সত্যিকার অর্থেই তেমন কিছু চাইতেন, তাহলে সেটা তো মিসরে না এসেও করতে পারতেন? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে ভারতের প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে।
ফলে যে কেউ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে উন্নয়নশীল বিশ্ব এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। সেখানে যৌথ শক্তি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। মীমাংসায় অক্ষম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এটি এক ধরনের পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। সোমালিয়ার যুদ্ধের বিষবাষ্প আফ্রিকা ছাড়িয়ে আশপাশেও ছড়িয়ে পড়ছে, দারফুরে হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সুদান ও শাদের সম্পর্ক খুবই খারাপ, ফিলিস্তিনের বিবদমান উপদলগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকাঠামোর চমত্কার সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না, এমনি অনেক কিছু।
১৯৫৫ সালে বান্দুংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীনযুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ঠান্ডাযুদ্ধের আবহ থেকে নিজেদের রক্ষা করা। এই আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নেতাদের মধ্যে ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু (যিনি জোটনিরপেক্ষ নামটির প্রস্তাব করেছিলেন), মিসরের নাসের, যুগোস্লাভিয়ার টিটো, ঘানার নক্রুমা ও ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন।
আন্দোলনের লক্ষ্যসমূহ (১৯৭৯ সালের হাভানা ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত) ছিল: ‘সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের আগ্রাসন, বর্ণবাদ এবং সব ধরনের বিদেশি আগ্রাসন, দখলদারি, প্রভুত্ব, হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বড় শক্তি ও ব্লক রাজনীতির বিরুদ্ধে’ ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা। এসব মহান লক্ষ্যের খুব সামান্যই অর্জিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রতি আগের শীর্ষ সম্মেলনগুলোর মতোই শারম আল-শেখেও মৌখিক সমর্থন জানানো হয়েছে, কিন্তু ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্ণবাদী, নব্য উপনিবেশবাদী দখলদারির অবসান করতে পারে এমন একটি কথাও উচ্চারিত হয়নি।
আমার জানা মতে, ইরাক ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গ নিয়ে খুব সামান্যই আলোচনা হয়েছে, যদিও প্রথমোক্ত দেশটি একটি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে উঠে আসার চেষ্টা করছে। অপরদিকে আফগানিস্তানের তালেবানবিরোধী যুদ্ধ এখন পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ছে এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জনগণের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি বয়ে এনেছে।
যদিও অনেক আগেই ঠান্ডাযুদ্ধের অবসান হয়েছে, তবুও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের একটি শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে জাতিসংঘের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য এবং পৃথিবীর ৫৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এটি এখনো তাদের উদ্দেশ্য পুনরাবিষ্কার করতে পারে না। এটি এখন একটি কথার দোকান, বিশ্বমঞ্চে কোনো দক্ষ অভিনেতা নয়।
সত্যি কথা বলতে কি, যে দুটি পরাশক্তি একসময় বিশ্বকে শাসন করত, তারা এখন নিজেরাই গুরুতর সমস্যার মধ্যে রয়েছে। আমেরিকা ইরাকে এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, যাতে জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না। অথচ এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে এবং ব্যাংকিং-ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। বুশ-যুগের সেই ভয়াবহ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন রীতিমতো মল্লযুদ্ধ করতে হচ্ছে। যদিও সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য বারাক ওবামা চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তবু এখনো তিনি এমন কোনো ঘাত সৃষ্টি করতে পারেননি, যাতে আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য বা আদর্শিক কর্তৃত্ব ফিরে আসতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের ছায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। যদিও দেশটি ককেশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় আবার প্রভাব বিস্তার করতে খুবই আগ্রহী, তবু তা করতে পারার মতো কোনো যুক্তিসংগত হাতিয়ার তাঁর কাছে নেই। নির্ভরযোগ্য ফরাসি দৈনিক লে মদ-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার জনসংখ্যা ক্রমেই কমছে। ১৯৯৩ সালে এর লোকসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৮৯ লাখ, আজ তা ১৪ কোটি ১৯ লাখ। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে জনবসতি এত কম যে চীনের বহু মানুষ সেখানে এসে কৃষিকাজ শুরু করেছে।
অত্যধিক তামাক ও মদ্যপান এবং নিম্ন মানের খাদ্যের কারণে রাশিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। ২০০৭ সালে মহিলাপ্রতি সন্তানের সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৪টি। পুরুষের গড় আয়ু নেমে এসেছে ৬১ দশমিক ৪ বছরে, বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের চেয়েও কম। প্রতি তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন মারা যায় ২০ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যে।
পরাশক্তিগুলো যদি এমন অনর্থ কাজ করে, তাহলে ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কাছ থেকে ভালো কিছু করবে, এমন প্রত্যাশা করা যায় কি? সম্ভবত গোটা গ্রহেরই প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য কর্মকাণ্ডে ফিরে আসা।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
প্যাট্রিক সিল: মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ লেখক

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য সুন্দরবনের নিরাপত্তাহীনতা by পাভেল পার্থ

বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ জুড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন, শুলোবন হিসেবে পরিচিত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবনকে দেশের প্রথম রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
সম্প্রতি সুন্দরবন আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ২১ জুলাই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য তালিকায় শীর্ষ আটাশের ভেতর নির্বাচিত হয়েছে এই জোয়ার-ভাটার বনভূমি। নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন আয়োজিত প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের তালিকায় সুন্দরবনকে ‘অফিশিয়াল ফাইনালিস্ট ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’, ‘রামসার এলাকা’, ‘সংরক্ষিত বনভূমি’, ‘দুনিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য’ কি হালের ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য’ হিসেবে চিহ্নিত সুন্দরবন এক অদ্ভুত আশ্চর্য প্রশ্নহীন নিরাপত্তাহীনতার ভেতর কোনোরকমে টিকে আছে। সুন্দরবনের বাঘ, পশুপাখি, সুন্দরীগাছসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন উদ্ভিদ, সুন্দরবন-নির্ভর বনজীবী জনগণ কি বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়গুলো নানা নিরাপত্তাহীনতার ভেতরে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে দিন দিন জীবনযাপন ও প্রাণের বৈচিত্র্য ঝলসে যাচ্ছে, নিঃস্ব হয়ে পড়ছে প্রকৃতির জটিল সম্পর্ক।
সুন্দরীগাছের আধিক্যের জন্য অনেকেই বলে থাকে এই জোয়ার-ভাটার বনভূমির নাম সুন্দরবন। অথচ দিনে দিনে ‘উদ্ভিদ জাদুঘর’ কি হার্বেরিয়ামের প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে সুন্দরী? প্রতিবেশ-ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আর দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে মরতে বসা শুকনো নদী পেরিয়ে বাঘ চলে আসছে মানুষের গ্রামে। বাঘ হামলে পড়ছে মানুষের ওপর, মানুষও জীবন বাঁচাতে পিটিয়ে মারছে বাঘ। সুন্দরবন রক্ষার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত বন বিভাগের কাছেও বনের বাঘ বনে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো রসদ জোগায়নি রাষ্ট্র। সিডর কি আইলার মতো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপদকে অনেকাংশে রক্ষা করেছে এই সুন্দরবনই।
কেবল বাংলাদেশ নয়, দুনিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের রাষ্ট্র কোনো নিরাপত্তা গড়ে তোলেনি এখনো। অথচ এই অঞ্চলকে নানাজন নানা সময়ে কত কিসিমের ‘সম্মান’ কি ‘স্বীকৃতির’ বহর দিয়ে ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে। সুন্দরবনের দৈন্যদুর্দশার শরীরে কি এত বিশাল ওজনের ‘স্বীকৃতির’ ভার সইবে? বলেশ্বর, রায়মঙ্গল, চুনা, পশুরসহ প্রায় সাড়ে চার শ ছোট-বড় নদ-নদীর প্লাবনভূমিতে গড়ে ওঠা এই বনের ছয় হাজার ১৭ কিলোমিটার এলাকায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির ঝিনুকসহ অগণিত প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে স্থানীয় বাওয়ালি-মৌয়াল-মাঝি-জেলে-চুনরি-মুন্ডা-মাহাতো জনগণ গড়ে তুলেছে এক ঐতিহাসিক স্থায়িত্বশীল বাদাবন জীবন।
সুন্দরবনকে জীবনের সঙ্গে আগলে রাখতে এখনো বাঘসহ অন্য প্রাণীকূল, উদ্ভিদ, বননির্ভর জনগণ এবং বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়ের বনকর্মী এমনকি বনপ্রহরীরাই জীবন দিয়ে চলেছেন। সুন্দরবনকে বাঁচাতে বাঘ-কুমির-কামট-সিডর-আইলা-জোয়ার-ভাটা-জলোচ্ছ্বাস-ঝড়-ঝঞ্ঝা সামাল দিতে হয় এদেরই। পাশাপাশি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমলাদের চোখরাঙানি আর বেসামাল চাহিদার চাপে গাছ কেটে নৌকাবোঝাই করা এবং হরিণ শিকার করতে হয় এই নিরীহ বনপ্রহরীদেরই। তার বাদেও রেহাই নেই। সুন্দরবনজুড়ে আছে ‘বনডাকাত’ আর ‘চাঁদাবাজ’ ‘অপহরণকারীদের’ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আস্তানা। সব ধরনের দুর্যোগ, দুঃসহ অত্যাচার, পেশাগত নি র‌্যাতনের ভেতর বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়গুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজের জীবন ও পেশার কোনো নিরাপত্তা নেই তাকে দিয়ে কিসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় রাষ্ট্র? বাংলাদেশে সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্র এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবার জন্যই শতভাগ রেশন ও ঝুঁকিভাতা নিশ্চিত করেছে। বন বিভাগ, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। অথচ রাষ্ট্র বন বিভাগের নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য কোনো ধরনের রেশন ও ঝুঁকিভাতা দিতে পারেনি আজও। দুনিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং রাষ্ট্রের প্রাণসম্পদ বাঁচাতে গিয়ে যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীরা বাঘের হামলা কি ডাকাতের গুলি বা সিডরের ঝড়ে মারা যান কিংবা আহত হন তখন রাষ্ট্র তাঁর চিকিত্সাসেবা বা ক্ষতিপূরণ—কোনো কিছুই নিশ্চিত করে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাড়াই ঐতিহাসিকভাবে এক প্রথাগত সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে সুন্দরবনের মূল সংরক্ষক হচ্ছেন সুন্দরবন-নির্ভর পেশাগত বনজীবী জনগণ। বনজীবীরা নিজেদের জীবন-জীবিকা এবং বেঁচেবর্তে থাকার প্রশ্নেই সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখছে এখনো। রাষ্ট্র সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তো দূরের কথা বরং বনজীবীদের কাছ থেকে বারবার টেনেহিঁচড়ে নিয়েছে বনের ওপর বননির্ভর জনগণের প্রথাগত অধিকারকে। বন বিভাগ সুন্দরবনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ও বনজীবীদের সঙ্গে বনের সম্পর্ককে বিবেচনা না করে আজ এটা আহরণ বন্ধ, কাল ওটা কাটা নিষিদ্ধ করেছে। ১৯৮৯ সন থেকে বন বিভাগ পশুর ও গরান আহরণ নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে বলে গেওয়া কাঠ ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খুলনার দেশলাই কারখানাগুলোয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের পর গোল ও গরান আহরণ নিষিদ্ধ করেছিল বন বিভাগ। অথচ বন বিভাগ একটিবারও সরেজমিনে দেখতে চাইল না কাদের মাধ্যমে এবং কীভাবে এখনো টিকে আছে এই সুন্দরবন। বনজীবীরা ঋতুভিত্তিক মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ না করলে, গোলপাতার ঝাড় কেটে সাফ না করলে, গরানের ছিটা কেটে পরিষ্কার না রাখলে কোনোভাবেই যে সুন্দরবনের বিকাশ ও বিরাজমানতা টিকে থাকবে না, তা বন বিভাগ বুঝতে চায় না। ঠিক একইভাবে বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়ের বনপ্রহরীরা নিজেদের পরিবার-পরিজন দূরে ফেলে রেখে নিতান্তই হাতেগোনা কটি মাইনের আশায় নিজেদের জীবনবাজি রেখে সুন্দরবনকে রক্ষা না করলে এই বন এখনো টিকে থাকত না। অথচ আজ সবাই জানে, এই বনের করুণ পরিণতির জন্য কারা দায়ী? বন বিভাগের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, কি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রভাবশালী, দুর্বৃত্ত রাজনীতিক—এঁরাই তো দিনে দিনে গলাটিপে হত্যা করে চলেছে দুনিয়ার এক অনন্য বনভূমিকে। রাষ্ট্রের মাধ্যমেই এসব দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের অনেক কিছুই প্রমাণিত হলেও যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এখনো করা যায়নি।
সুন্দরবন এলাকায় বৃক্ষ-প্রাণী-পতঙ্গ-মানুষ কারও জীবন ও যাপনের কোনো নিরাপত্তা নেই। নেই বসতি ও বসবাসের নিশ্চয়তা, এক ফোঁটা পানি নেই জীবনধারণের, খাদ্য ও জ্বালানির আকাল চারদিকে। অথচ বারবার এই বনকে বানিয়ে তোলা হচ্ছে ‘ঐশ্বর্যময়’ ও ‘আশ্চর্যকর’!
আশির দশক থেকে খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমিগুলোকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাপ ও করপোরেট বাজার। সুন্দরবন অঞ্চলে ব্যাপক চিংড়িঘেরের বিস্তৃতি যেমন লবণাক্ততা বাড়িয়েছে আবার এই চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে দিনের পর দিন বাঁধের অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে সুন্দরবন এলাকার নদীপ্রণালী। এই পরিবর্তন সরাসরি আঘাত করছে সুন্দরবনের জটিল প্রতিবেশ-ব্যবস্থায়, বদলে যাচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্যের আচার ও আচরণ। পাশাপাশি বননির্ভর মানুষও উদ্বাস্তু ও অপরিণামদর্শী হতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ এবং প্রাণবৈচিত্র্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিক সম্পর্কের ভেতর দিয়েই ক্রমবিকাশের পরিবর্তনশীল চলমানতা বজায় থাকে। সুন্দরবন অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট জীবনের চলমানতাকে বিবেচনা করে সবার জীবন ও যাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ সুন্দরবন অঞ্চলে যদি এমন বেহাল আশ্চর্য নিরাপত্তা বহাল থাকে তবে কোনোভাবেই তা ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের’ কোনো কারণ হতে পারে না। ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য’ হিসেবেও সুন্দরবনকে দেখতে চাইলে রাষ্ট্রের কাজ হবে এই অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য ও এর সম্পর্কের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা।
পাভেল পার্থ: পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক।

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য সুন্দরবনের নিরাপত্তাহীনতা by পাভেল পার্থ

বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ শতাংশ জুড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন। স্থানীয়ভাবে বাদাবন, শুলোবন হিসেবে পরিচিত দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবনকে দেশের প্রথম রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। সম্প্রতি সুন্দরবন আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ২১ জুলাই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য তালিকায় শীর্ষ আটাশের ভেতর নির্বাচিত হয়েছে এই জোয়ার-ভাটার বনভূমি। নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন আয়োজিত প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের তালিকায় সুন্দরবনকে ‘অফিশিয়াল ফাইনালিস্ট ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’, ‘রামসার এলাকা’, ‘সংরক্ষিত বনভূমি’, ‘দুনিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য’ কি হালের ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য’ হিসেবে চিহ্নিত সুন্দরবন এক অদ্ভুত আশ্চর্য প্রশ্নহীন নিরাপত্তাহীনতার ভেতর কোনোরকমে টিকে আছে। সুন্দরবনের বাঘ, পশুপাখি, সুন্দরীগাছসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন উদ্ভিদ, সুন্দরবন-নির্ভর বনজীবী জনগণ কি বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়গুলো নানা নিরাপত্তাহীনতার ভেতরে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে দিন দিন জীবনযাপন ও প্রাণের বৈচিত্র্য ঝলসে যাচ্ছে, নিঃস্ব হয়ে পড়ছে প্রকৃতির জটিল সম্পর্ক। সুন্দরীগাছের আধিক্যের জন্য অনেকেই বলে থাকে এই জোয়ার-ভাটার বনভূমির নাম সুন্দরবন। অথচ দিনে দিনে ‘উদ্ভিদ জাদুঘর’ কি হার্বেরিয়ামের প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে সুন্দরী? প্রতিবেশ-ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আর দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে মরতে বসা শুকনো নদী পেরিয়ে বাঘ চলে আসছে মানুষের গ্রামে। বাঘ হামলে পড়ছে মানুষের ওপর, মানুষও জীবন বাঁচাতে পিটিয়ে মারছে বাঘ। সুন্দরবন রক্ষার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত বন বিভাগের কাছেও বনের বাঘ বনে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো রসদ জোগায়নি রাষ্ট্র। সিডর কি আইলার মতো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় জনপদকে অনেকাংশে রক্ষা করেছে এই সুন্দরবনই। কেবল বাংলাদেশ নয়, দুনিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের রাষ্ট্র কোনো নিরাপত্তা গড়ে তোলেনি এখনো। অথচ এই অঞ্চলকে নানাজন নানা সময়ে কত কিসিমের ‘সম্মান’ কি ‘স্বীকৃতির’ বহর দিয়ে ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে। সুন্দরবনের দৈন্যদুর্দশার শরীরে কি এত বিশাল ওজনের ‘স্বীকৃতির’ ভার সইবে? বলেশ্বর, রায়মঙ্গল, চুনা, পশুরসহ প্রায় সাড়ে চার শ ছোট-বড় নদ-নদীর প্লাবনভূমিতে গড়ে ওঠা এই বনের ছয় হাজার ১৭ কিলোমিটার এলাকায় ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২১০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির ঝিনুকসহ অগণিত প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে স্থানীয় বাওয়ালি-মৌয়াল-মাঝি-জেলে-চুনরি-মুন্ডা-মাহাতো জনগণ গড়ে তুলেছে এক ঐতিহাসিক স্থায়িত্বশীল বাদাবন জীবন। সুন্দরবনকে জীবনের সঙ্গে আগলে রাখতে এখনো বাঘসহ অন্য প্রাণীকূল, উদ্ভিদ, বননির্ভর জনগণ এবং বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়ের বনকর্মী এমনকি বনপ্রহরীরাই জীবন দিয়ে চলেছেন। সুন্দরবনকে বাঁচাতে বাঘ-কুমির-কামট-সিডর-আইলা-জোয়ার-ভাটা-জলোচ্ছ্বাস-ঝড়-ঝঞ্ঝা সামাল দিতে হয় এদেরই। পাশাপাশি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমলাদের চোখরাঙানি আর বেসামাল চাহিদার চাপে গাছ কেটে নৌকাবোঝাই করা এবং হরিণ শিকার করতে হয় এই নিরীহ বনপ্রহরীদেরই। তার বাদেও রেহাই নেই। সুন্দরবনজুড়ে আছে ‘বনডাকাত’ আর ‘চাঁদাবাজ’ ‘অপহরণকারীদের’ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আস্তানা। সব ধরনের দুর্যোগ, দুঃসহ অত্যাচার, পেশাগত নি র‌্যাতনের ভেতর বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়গুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিজের জীবন ও পেশার কোনো নিরাপত্তা নেই তাকে দিয়ে কিসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় রাষ্ট্র? বাংলাদেশে সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, কোস্টগার্ড নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্র এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবার জন্যই শতভাগ রেশন ও ঝুঁকিভাতা নিশ্চিত করেছে। বন বিভাগ, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। অথচ রাষ্ট্র বন বিভাগের নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য কোনো ধরনের রেশন ও ঝুঁকিভাতা দিতে পারেনি আজও। দুনিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং রাষ্ট্রের প্রাণসম্পদ বাঁচাতে গিয়ে যখন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীরা বাঘের হামলা কি ডাকাতের গুলি বা সিডরের ঝড়ে মারা যান কিংবা আহত হন তখন রাষ্ট্র তাঁর চিকিত্সাসেবা বা ক্ষতিপূরণ—কোনো কিছুই নিশ্চিত করে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছাড়াই ঐতিহাসিকভাবে এক প্রথাগত সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে সুন্দরবনের মূল সংরক্ষক হচ্ছেন সুন্দরবন-নির্ভর পেশাগত বনজীবী জনগণ। বনজীবীরা নিজেদের জীবন-জীবিকা এবং বেঁচেবর্তে থাকার প্রশ্নেই সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখছে এখনো। রাষ্ট্র সুন্দরবনের বনজীবীদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তো দূরের কথা বরং বনজীবীদের কাছ থেকে বারবার টেনেহিঁচড়ে নিয়েছে বনের ওপর বননির্ভর জনগণের প্রথাগত অধিকারকে। বন বিভাগ সুন্দরবনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ও বনজীবীদের সঙ্গে বনের সম্পর্ককে বিবেচনা না করে আজ এটা আহরণ বন্ধ, কাল ওটা কাটা নিষিদ্ধ করেছে। ১৯৮৯ সন থেকে বন বিভাগ পশুর ও গরান আহরণ নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে বলে গেওয়া কাঠ ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খুলনার দেশলাই কারখানাগুলোয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের পর গোল ও গরান আহরণ নিষিদ্ধ করেছিল বন বিভাগ। অথচ বন বিভাগ একটিবারও সরেজমিনে দেখতে চাইল না কাদের মাধ্যমে এবং কীভাবে এখনো টিকে আছে এই সুন্দরবন। বনজীবীরা ঋতুভিত্তিক মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ না করলে, গোলপাতার ঝাড় কেটে সাফ না করলে, গরানের ছিটা কেটে পরিষ্কার না রাখলে কোনোভাবেই যে সুন্দরবনের বিকাশ ও বিরাজমানতা টিকে থাকবে না, তা বন বিভাগ বুঝতে চায় না। ঠিক একইভাবে বন বিভাগের স্থানীয় কা র‌্যালয়ের বনপ্রহরীরা নিজেদের পরিবার-পরিজন দূরে ফেলে রেখে নিতান্তই হাতেগোনা কটি মাইনের আশায় নিজেদের জীবনবাজি রেখে সুন্দরবনকে রক্ষা না করলে এই বন এখনো টিকে থাকত না। অথচ আজ সবাই জানে, এই বনের করুণ পরিণতির জন্য কারা দায়ী? বন বিভাগের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, কি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রভাবশালী, দুর্বৃত্ত রাজনীতিক—এঁরাই তো দিনে দিনে গলাটিপে হত্যা করে চলেছে দুনিয়ার এক অনন্য বনভূমিকে। রাষ্ট্রের মাধ্যমেই এসব দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের অনেক কিছুই প্রমাণিত হলেও যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার এখনো করা যায়নি। সুন্দরবন এলাকায় বৃক্ষ-প্রাণী-পতঙ্গ-মানুষ কারও জীবন ও যাপনের কোনো নিরাপত্তা নেই। নেই বসতি ও বসবাসের নিশ্চয়তা, এক ফোঁটা পানি নেই জীবনধারণের, খাদ্য ও জ্বালানির আকাল চারদিকে। অথচ বারবার এই বনকে বানিয়ে তোলা হচ্ছে ‘ঐশ্বর্যময়’ ও ‘আশ্চর্যকর’! আশির দশক থেকে খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমিগুলোকে চিংড়িঘেরে রূপান্তরিত করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাপ ও করপোরেট বাজার। সুন্দরবন অঞ্চলে ব্যাপক চিংড়িঘেরের বিস্তৃতি যেমন লবণাক্ততা বাড়িয়েছে আবার এই চিংড়ি চাষ করতে গিয়ে দিনের পর দিন বাঁধের অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে সুন্দরবন এলাকার নদীপ্রণালী। এই পরিবর্তন সরাসরি আঘাত করছে সুন্দরবনের জটিল প্রতিবেশ-ব্যবস্থায়, বদলে যাচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্যের আচার ও আচরণ। পাশাপাশি বননির্ভর মানুষও উদ্বাস্তু ও অপরিণামদর্শী হতে বাধ্য হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ এবং প্রাণবৈচিত্র্যের ঐতিহাসিক ধারাবাহিক সম্পর্কের ভেতর দিয়েই ক্রমবিকাশের পরিবর্তনশীল চলমানতা বজায় থাকে। সুন্দরবন অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট জীবনের চলমানতাকে বিবেচনা করে সবার জীবন ও যাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ সুন্দরবন অঞ্চলে যদি এমন বেহাল আশ্চর্য নিরাপত্তা বহাল থাকে তবে কোনোভাবেই তা ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের’ কোনো কারণ হতে পারে না। ‘প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য’ হিসেবেও সুন্দরবনকে দেখতে চাইলে রাষ্ট্রের কাজ হবে এই অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য ও এর সম্পর্কের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা।
>>>পাভেল পার্থ: পরিবেশ ও প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ- সরল গরল by মিজানুর রহমান খান

আমরা বিস্মিত, আমরা স্তম্ভিত। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে বিপুলসংখ্যক বিচারকের অস্বাভাবিক উপস্থিতি ও আর্মড পুলিশ দিয়ে দেহ তল্লাশিসংক্রান্ত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত আমরা চেয়েছিলাম। কারণ, বিচারক বা যিনিই হোন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিচারকদের কাছে মানুষ সকল পরিস্থিতিতে সংযম ও পরিমিতিবোধ আশা করে। কিন্তু সুষ্ঠু তদন্ত ও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়াই জেলা জজ মো. অবদুল গফুর ও মো. শাহজাহানকে অস্বাভাবিক পন্থায় চরম শাস্তি দেওয়া হলো। এই আদেশ সংবিধান ও আইনের চোখে অবৈধ, এখতিয়ারবহির্ভূত ও বাতিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ হয় সংবিধানের বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, নাহয় তাঁর উদ্ধৃতি পত্রিকায় ঠিকভাবে ছাপা হয়নি। তবে আপাতত তাঁর অভিমত জেনে মনে হয়েছে, তিনি যেন চতুর্থ সংশোধনী বহাল থাকা বাকশাল মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, জেনারেল জিয়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতার একটু মুখরক্ষা করেছিলেন! আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ ব্যবস্থা নিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে সে ক্ষেত্রে অন্য আইন বা বিধিবিধানে যা কিছুই থাক না কেন, তা প্রযোজ্য হয় না। কারণ, সংবিধান সবকিছুর ওপরে।’ (প্রথম আলো, ৩১ জুলাই)। আইনমন্ত্রী যে ভুল মন্তব্য করেছেন, তা বোঝার জন্য আপনাকে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। ১১৬ অনুচ্ছেদের বিবর্তন লক্ষ করুন।
বাহাত্তরের মূল সংবিধানে লেখা ছিল: ‘বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি-মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যস্ত থাকিবে।’ চতুর্থ সংশোধনীতে এই বাক্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের’ স্থলে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দ বসানো হয়। লক্ষ্য ছিল, বিচারকদের ওপর নির্বাহী বিভাগের খবরদারি প্রতিষ্ঠা করা। জিয়া ও পরবর্তী শাসকগোষ্ঠী নানা কলাকৌশলে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহতভাবে বজায় রাখে।
কয়েক দিন ধরে ভাবছিলাম, জেনারেল জিয়ার সমালোচনা করে একটি কঠিন লেখা লিখব। এসব কথা বলতে গিয়ে নিজেকে কখনো সং মনে হয়। কারণ, সমালোচনা বাদ দিয়ে এখন তাঁরই প্রশস্তি গাইতে হচ্ছে। এখন দেখছি, এ সরকার তাঁকেও টেক্কা দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টকে আর লাগছেই না। মাসদার হোসেন মামলায় বিচারপতি মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘অধস্তন আদালত ব্যবস্থাপনায় একটি ডায়ারকি বা দ্বৈত শাসন চলছে। আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণভার হাইকোর্ট বিভাগের কাছে এবং সেখানে কর্মরত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত।’ বিদ্যমান এই যে জগাখিচুড়ি অবস্থা, এর জনক জেনারেল জিয়া। কারণ, তিনি ধূর্ততার সঙ্গে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের পদানত রেখে যান। ১৯৭৮ সালে এক সামরিক ফরমান দিয়ে ১১৬ অনুচ্ছেদে এক অদ্ভুত সংশোধনী এনে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের একটি সড়ক তৈরি করেন; যদিও এই পরামর্শ বা কনসালটেশন অর্থ এই নয় যে সরকার তা অবশ্যই মানতে বাধ্য থাকবে। এরপর মাসদার হোসেন মামলার রায় দিয়ে এটুকু উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা চলে যে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সুপ্রিম কোর্টের মতামতই প্রাধান্য পাবে।
আমরা আজ একি দেখলাম? সর্বজনীন প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল জাস্টিসেরও আজ বিসর্জন ঘটল। অন্তত পাঁচটি কারণে দুই জেলা জজকে অবসরদানের আদেশ প্রশ্নসাপেক্ষ, যা আদালতে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
প্রথমত, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিচারককে অপসারণ বা অবসর যাই দেওয়া হোক, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিতেই হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আওয়ামী লীগের বিগত আমলের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘সরকারের জন্য এই পরামর্শ গ্রহণ ম্যান্ডেটরি বা বাধ্যতামূলক। যদি সুপ্রিম কোর্টের পারামর্শ ছাড়া কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা ভয়েড বা বাতিল বলে গণ্য হবে।’ (কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, পৃ. ৬৬৮)। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ বনাম ইদ্রিসুর রহমান মামলায় আপিল বিভাগ ওই অভিমত দেন।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের বিষয়ে প্রথম আলোর ৩১ জুলাইয়ের প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ‘সংশ্লিষ্ট একজন বিশেষজ্ঞ’ অবলীলায় মনের মাধুরী মিশিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি শৃঙ্খলামূলক কোনো ব্যবস্থা নয়। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হলে যেকোনো গণকর্মচারীকে চাকরি থেকে জনস্বার্থে অবসর দিতে পারেন।’ অথচ ওই প্রতিবেদনেই সিসিটিভির সাহায্যে তথাকথিত বিক্ষোভকারীদের শনাক্তকরণের কথা আছে। বলা আছে, ‘জনপ্রশাসনে সদাচরণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে’ দুজন জেলা জজকে অবসর দেওয়া হয়েছে বলে সরকারি আদেশেই উল্লিখিত হয়েছে। এ ছাড়া ১১৬ অনুচ্ছেদের বরাতে তথাকথিত ওই বিশেষজ্ঞর দাবি অবান্তর।
দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পর সংবিধানের ১১৫ ও ১৩৩ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলাবিধান এবং চাকরির অন্য শর্তাবলি) বিধিমালা-২০০৭ প্রণয়ন করা হয়। এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে, জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ ব্যতীত শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে আলাদা বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সরকারের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য গভর্নমেন্টস সার্ভেন্টস (ডিসিপ্লিন অ্যান্ড আপিল) রুলস-১৯৮৫-এর বিধানাবলি প্রযোজনীয় অভিযোজনসহকারে সার্ভিসের সদস্যদের শৃঙ্খলা বিধান করবে। সুতরাং রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টকে না জানিয়ে দুজন বিচারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ১১৫ অনুচ্ছেদের আওতায় তাঁরই জারি করা বিধি লঙ্ঘন করেছেন। তাই আইনের চোখে রাষ্ট্রপতির ৩০ জুলাইয়ের আদেশ তাঁরই জারি করা বিধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়। ১৯৮৫ সালের বিধিতে শৃঙ্খলাজনিত কারণে কোনো দোষী ব্যক্তির শাস্তি কিন্তু বাধ্যতামূলক অবসর লেখা আছে। তাহলে সে নিয়ম মানতে বাধা ছিল কি?
তৃতীয়ত, জেলা জজদের নিছক সরকারি কর্মকর্তা ভাবা হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছে, তাঁরা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের আওতাভুক্ত। এ কারণেই তারা হয়তো সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেয়নি। ১৯৯৯ সালের আগে স্বতন্ত্র জুডিশিয়াল সার্ভিস স্বীকৃত ছিল না। তাদের বলা হতো বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডার। আপিল বিভাগ বলেন, বিচারকদের চাকরির শর্তাদি ও ম র‌্যাদা অবশ্যই হবে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। কোনো অবস্থায়ই অন্য কোনো ক্যাডারের সঙ্গে সমান্তরাল, একীভূত বা সমন্বিত করা যাবে না। বিচারপতি মোস্তাফা কামাল লিখেছেন, এই মনোভাব একটা সাংবিধানিক রূপকথা। এটা করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এটি একটি monumental constitutional blunder বা বিশাল সাংবিধানিক বিপর্যয়, যা দেশের স্বাধীনতার গোড়ার বছরগুলোতেই করা হয়েছে। সেই বিপর্যয়ের ভূত আমরা আজও তাড়াতে পারিনি। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতায় নির্বাহী বিভাগের নগ্ন হস্তক্ষেপ ফুটে উঠেছে।
চতুর্থত, আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৪ সালের যে আইনটি বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, সেটি একটি কালাকানুন। আকবর আলি খানের নেতৃত্বে গঠিত রেগুলেটরি কমিশন ওই আইনের ৯(২) ধারা সংশোধনীর সুপারিশ করেছে। এ আইনে বাধ্যতামূলক অবসর সম্পর্কে ‘অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ শীর্ষক একটি বিখ্যাত মামলা রয়েছে। ১৯৮০ সালের দিকে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। তিনি তা চ্যালেঞ্জ করেন। আপিল বিভাগ তাঁকে চাকরি ফিরিয়ে দেন। বিচারপতি রুহুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান একটি শাস্তি। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দিতে হবে। তাঁকে শুনতে হবে।’ এই রায় পরে আর উল্টে গেছে বলে জানা যায় না। মাহমুদুল ইসলাম লিখেছেন, এই উপমহাদেশের আদালতের মতের প্রাধান্য হলো নিছক বাধ্যতামূলক অবসর শাস্তি নয়। কিন্তু শাস্তি হিসেবে অবসর দেওয়া হলে, তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা হলে সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁকে নোটিশ দিতে হবে। (পৃ.৭১৪)
পঞ্চমত, ১৯৭৪ সালের সরকারি কর্মচারী (অবসর) আইন ১৭০১ সালের অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্টের পরিপন্থী। আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থা ইংলিশ কমন লর ওপর দাঁড়ানো। এ থেকে ছিটকে পড়লে কারও সাধ্য নেই নৈরাজ্য ঠেকায়। ১৭০১ সালের আইনেই প্রথম রাজা বা রানির সন্তুষ্টি পর্যন্ত মেয়াদে বিচারকের পদে বহাল থাকার দিনের অবসান ঘটে। এই ক্ষমতা দেওয়া হয় সংসদকে। কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৫ সালে ওয়াল্টার ভেলেন্তি বনাম হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন মামলায় বিচারকদের চাকরির মেয়াদের সুরক্ষাকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে লেখা হয়, এই অভিমত আমরা বাংলাদেশেও গ্রহণ করলাম। একটি লেখা মনে পড়ছে, অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট পাস হওয়ার কিছুদিন আগে রানি অ্যান সিংহাসনে বসেছিলেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি দুজন বিচারককে অপসারণ করেন।
পরিহাস হলো, বিচারকদের বিক্ষোভ নিয়ে খবরের কাগজে বড় করে শিরোনাম ছাপা হয়েছিল। মনে হয়েছিল, সচিবালয়ে সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এবারের এই সাংবিধানিকভাবে অসংগতিপূর্ণ পদক্ষেপের দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।

অবিলম্বে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করা উচিত- টেন্ডারবাজদের দৌরাত্ম্য

গত রোববার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজে দেশজুড়ে টেন্ডারবাজদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য নিয়ে আলোচনার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এখনই এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে; তা না হলে সরকারের বদনাম হবে।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করে কী সুফল ফলবে, বলা মুশকিল; কারণ সমস্যাটা যতটা না দরপত্র ব্যবস্থাপনার, তার চেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলার। ওই সভায়ই স্থায়ী কমিটির কোনো কোনো সদস্য বলেছেন, সরকারি দলের এক শ্রেণীর লোক ছাড়া কেউ দরপত্র জমা দেওয়া দূরে থাক, কিনতেও পারছে না। অনেক জায়গায় ঠিকাদারদের মারধর করে দরপত্র কেড়ে নেওয়ার খবর সংবাদপত্রে এসেছে।
স্থায়ী কমিটির সভার খবর যেদিন প্রথম আলোয় ছাপা হয়, সেদিনই প্রকাশিত আরেকটি খবর ছিল: ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের কাছ থেকে দরপত্র ছিনিয়ে নিয়েছে ছাত্রলীগ নামধারী একদল সন্ত্রাসী। তারা এটা করেছে পুলিশের সামনেই।
এ রকম ঘটনা সারা দেশেই ঘটছে। পুলিশের ভূমিকা নীরব দর্শকের, বা খুব জোর মধ্যস্থতাকারীর। বিভিন্ন স্থানে সওজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা টেন্ডারবাজদের দৌরাত্ম্যের কাছে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। এ অবস্থায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করলেই মন্ত্রণালয় সব টেন্ডারবাজি বন্ধ করে দিতে পারবে, তা আশা করা যায় না।
আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নামে দেশজুড়ে যারা টেন্ডারবাজি চালাচ্ছে, তাদের দমন করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়, যদি সরকার আন্তরিকভাবে তা করতে চায়। পুলিশ কেন টেন্ডারবাজদের সন্ত্রাস নীরব দর্শকের মতো চেয়ে চেয়ে দেখে, সেটা উদ্ঘাটন করা দরকার। টেন্ডারবাজ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সরকারি দলের কোনো সম্পর্ক না থাকলে কি পুলিশ এমন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করত?
শুধু টেন্ডারবাজি নয়, সরকারি দলের নামে এক শ্রেণীর লোক চাঁদাবাজিসহ আরও যেসব অন্যায়-অপরাধে লিপ্ত, তা বন্ধ করতে গ্রেপ্তার অভিযান শুরু করা উচিত। পুলিশকে দেওয়া নির্দেশ ঠিকমতো পালিত না হলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আলাপ-আলোচনা করে, বদনামের আশঙ্কা করে কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করে লাভ নেই। সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজসহ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সক্রিয় উদ্যোগই প্রধান করণীয়।

ব্যয় কমানো ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করায় মাইলফলক পদক্ষেপ- পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি ছিল এবং এ কারণে সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর বিবাদ-বিসংবাদের কার্যকারণ অনেকটা লোপ পায়। সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়, ধীরে ধীরে সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং পাহাড়িদের ভূমি সমস্যারও সুষ্ঠু সমাধান আসবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করায় এসবই ছিল শান্তিচুক্তির শর্ত। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। এর মাধ্যমে পাহাড়ি জনজীবন সমতলের জনজীবনের সঙ্গে এক তালে ও এক ছন্দে প্রবাহিত হবে বলে আশা করা যায়।
শান্তির পথে পার্বত্য শান্তিচুক্তি যেমন বিরাট মাইলফলক, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাড়তি সেনা প্রত্যাহার তেমনই এক মাইলফলক। চুক্তির পর পাহাড়ি রাজনীতির মূলধারা বিদ্রোহীপ্রবণতা থেকে সরে আসে। শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে এবং একসময়কার সশস্ত্র আন্দোলনকারী দল জনসংহতি সমিতি সাংবিধানিক রাজনীতিতে ফিরে আসে। সশস্ত্র হুমকি কার্যত লোপ পায়। শান্তিবাহিনী যেখানে নেই, সেখানে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অজস্র সেনাক্যাম্পেরও প্রয়োজন থাকার কথা নয়। সে অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পর সেখান থেকে ২০০টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়। সাম্প্রতিক এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহার এরই ধারাবাহিকতা মাত্র। বিভিন্ন প্রয়োজনে অতিরিক্ত সেনাক্যাম্প কিংবা সেনা উপস্থিতির ব্যয়ের দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। বিনা প্রয়োজনে এত বিপুল ব্যয় সুবিবেচনার পরিচায়ক নয়। বাড়তি সেনার উপস্থিতি সেখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
পার্বত্য অঞ্চলে এখন অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। অর্থনৈতিক কারবার আগের চেয়ে গতিশীল। বিনিয়োগও আশাপ্রদ। এসব পরিবর্তন পরিস্থিতির স্বাভাবিকতারই লক্ষণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও যেহেতু সমতলের পরিস্থিতির থেকে মৌলিকভাবে আলাদা নয়, সেহেতু ব্রিগেডের সংখ্যা কমানো যুক্তিসংগত। আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে পুলিশসহ সংস্লিষ্ট সংস্থাসমূহের তদারকি বাড়ালে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারবে। জোরদার হবে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার বোধ; পাশাপাশি সেখানে বসতি স্থাপনকারী সাধারণ মানুষের দেখভালের দায়িত্বও আঞ্চলিক প্রশাসন ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভিভাবকদের নিতে হবে। তাদের অধিকার রক্ষায় পার্বত্য শান্তিচুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও জরুরি। পাহাড়ি-বাঙালি ভূমি সমস্যার সমাধানে ভূমি কমিশন গঠন করার কাজও বাকি রয়েছে; পাশাপাশি সুশাসনের স্বার্থে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদসহ অন্য আঞ্চলিক সংস্থাগুলোও শক্তিশালী করা দরকার।
শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় প র‌্যায়ে। গত এক যুগের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, চুক্তির আগের চেয়ে পরের পরিস্থিতি অনেক শান্তিপূর্ণ। এর সুফল পাচ্ছে গোটা দেশ। আংশিক সেনা প্রত্যাহারকে তাই সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিকীকরণ অভ্যন্তরীণ দিক থেকে যেমন স্থিতিশীলতা আনবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তা সংঘাত নিরসনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।

ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের মেডেল অব ফ্রিডম পদকের জন্য মনোনীত

ড.ইউনূস
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পদকের জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসই প্রথম বাংলাদেশি—যিনি এ পদকের জন্য মনোনীত হলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৯ সালের এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত ১৬ জনের নাম গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন। আগামী ১২ আগস্ট হোয়াইট হাউসে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাঁদের পদক দেওয়া হবে।
মনোনীত অন্যরা হলেন—নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু, মার্কিন নাগরিক আন্দোলনের নেতা সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি সান্দ্রা ডে ওকনর, আয়ারল্যান্ডের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার মেরি রবিনসন, প্রয়াত মার্কিন কংগ্রেসম্যান জ্যাক ক্যাম্প, পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের সহযোদ্ধা ও ক্রিশ্চিয়ান লিডারশিপ কনফারেন্সের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা রেভারেন্ড জোসেফ লাউরি, স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে শীর্ষস্থানীয় সংগঠক ও রেইস ফর কিউরের প্রতিষ্ঠাতা ন্যান্সি গুডম্যান ব্রিংকার, যুক্তরাষ্ট্রে সমকামীদের অধিকার আন্দোলনের নেতা হারভে মিল্ক, গৃহহীনদের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের পেড্রো হোসে গ্রিয়ার জুনিয়র, যুক্তরাষ্ট্রের সমকামীদের অধিকার আন্দোলনের নেতা ও ক্রীড়াবিদ বিলি জিন কিং, আদিবাসী মার্কিন তরুণদের উত্সাহের প্রতীক ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক জোসেফ মেডিসিন ক্রো, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিখ্যাত ক্যান্সার গবেষক জেনেথ ডেভিসন রাউলি, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা সিডনি পয়েটার, হিসপানিক অভিনেত্রী, কণ্ঠ ও নৃত্যশিল্পী শিতা রিভেরা।
পরিবর্তনের কথা বলে ক্ষমতায় আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবারের মনোনয়নে পরিবর্তনের নায়কদেরই প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরস্কারের জন্য ১৬ জনের নাম ঘোষণা করে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, সম্মাননার জন্য মনোনীতরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রতিভূ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়েও তাঁরা এ বিশ্বকে শ্রেয়তর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁরা নতুন ধারণা, নতুন উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। ওবামা বলেন, ‘এসব ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে আমি নিজেকেই সম্মানিত মনে করছি।’
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের চেষ্টায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্ব বিশ্বপ র‌্যায়ের। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং অনগ্রসরদের জীবন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ কর্মসূচি সারা বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানবতার পক্ষে অবদান রাখা বেসামরিক ব্যক্তিদের সম্মান জানানোর জন্য এ পদক চালু হয়। তৎকালীনপ্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১৯৪৫ সালে এটি চালু করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিবছর এ পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করে থাকেন। প্রেসিডেন্টের একক বিবেচনাই এ মনোনয়ন প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

কথা রেখেছেন আট ‘অদম্য মেধাবী’

আট অদম্য মেধাবী
অঙ্গীকার পূরণ করে আবার চমক দেখিয়েছেন আট ‘অদম্য মেধাবী’। এইচএসসি পরীক্ষায়ও তাঁরা জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ২০০৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পান তাঁরা। তাঁদের দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার বাধা ডিঙিয়ে সাফল্য পাওয়ার কথা যখন প্রথম আলোয় ছাপা হয়, প্রত্যেকেই বলেছিলেন, আর্থিক সহায়তা পেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন। অঙ্গীকার করেছিলেন, এইচএসসিতেও তাঁরা ভালো ফল উপহার দেবেন। গত দুই বছর প্রথম আলোর সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে যান তাঁরা, পৌঁছে যান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। শোনা যাক তাঁদের শিক্ষক, অভিভাবক ও নিজ নিজ অনুভূতির কথা।
তানজিলা খাতুন: রাজশাহীর বাঘার সোদপুর গ্রামের দিনমজুর ওমর আলীর মেয়ে তানজিলা। এবার মোজাহার হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। কলেজের অধ্যক্ষ এনামুল হাসান বলেন, ‘মেয়েটি যে পরিবেশে পড়াশোনা করেছে, তা সত্যি অকল্পনীয়। কলেজের পক্ষ থেকে তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। পড়াশোনার সুযোগ পেলে মেয়েটির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’
তানজিলার কথা, প্রথম আলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত যে আর্থিক সহায়তা তিনি পেয়েছেন, তা দিয়ে বইপত্র কেনাসহ পড়াশোনার খরচ চালিয়েও পড়ার জন্য চেয়ার-টেবিল কিনেছেন। এখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে ইচ্ছুক। এ ব্যাপারে তাঁর আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। তাঁর ইচ্ছা আইন বিষয়ে পড়ে বিচারক হওয়া।
রাশেদুল ইসলাম: দুপচাঁচিয়ার তালোড়া লাফাপাড়া গ্রামের রিকশাচালক ইয়াকুব আলীর ছেলে রাশেদুল। তালোড়া সরকারি শাহ এয়তেবারিয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। অধ্যক্ষ দেবাশীষ রঞ্জন রায় বলেন, ‘পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য ছিল না তার পরিবারের। প্রথম আলোর সহায়তা তাকে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে উত্সাহিত করে। আমরাও তাকে সহযোগিতা করেছি।’
রাশেদুলের বাবা বলেন, “আপনাকেরে প্রথম আলো পেপার হামার ছলের লেকাপড়ার খরচ না দিলে কলেজে ছলের লেকাপড়া করান গেলোনানি। আপনাকেরে সাহায্য লিয়্যা হামার ছল আবার ‘এ’প্লাস পাচে। হামার যে কী ভালো লাগিচ্চে, সেডা কওয়ার মতো লয়।” উচ্চশিক্ষা নিয়ে রাশেদুল দেশের সেবা করতে ইচ্ছুক।
রেনু ফাতেমা: রংপুর সদর উপজেলার বাহারকাছনা গ্রামের দিনমজুর আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ে রেনু ফাতেমা। বেগম রোকেয়া সরকারি মহিলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে তিনিই একমাত্র এ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। অধ্যক্ষ রিজিয়া খাতুন বলেন, রেনু কলেজের মুখ উজ্জ্বল করেছে।
মোবাইল ফোনে প্রথম আলোকে নিজের কৃতিত্বের খবর জানাতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন রেনু। বলেন, প্রথম আলো সহায়তা না করলে হয়তো বা তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হতো না। ভবিষ্যতে শিক্ষক হয়ে গ্রামের হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে পাঠদানের ইচ্ছা আছে তাঁর। বাবা কুদ্দুস বলেন, ‘নিজে খাবার পাই না, ছাওয়াক ফির কেমন করি লেখাপড়া শিখাই। হামার ছাওয়াক তো প্রথম আলোই পড়াশোনা করাইল।’
দীপক কুমার: জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হারুঞ্জা গ্রামের দরিদ্র বাদাম বিক্রেতা সুশীল চন্দ্রের ছেলে দীপক কুমার। জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুল্লাহ মিঞা বলেন, দীপকের এ ফলাফলে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই গর্বিত ও আনন্দিত।
স্থানীয় হাটবাজারে বাদাম বিক্রি করে ওই টাকায় পড়াশোনা করে এসএসসিতে একই ফল অর্জন করেন দীপক। জানান, আর্থিক দৈন্যের কারণে তাঁর কলেজে ভর্তি হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সে সময় পাশে এসে দাঁড়ায় প্রথম আলো। পাশাপাশি যমুনা ব্যাংক এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কুতুব উদ্দিন আহম্মেদও তাঁকে সহায়তা দেন। দীপক ভবিষ্যতে চিকিৎসক হয়ে বিনামূল্যে গরিব-দুখীর সেবা করতে ইচ্ছুক।
সুভদ্রা রায়: রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর কালিবাড়ি গ্রামের দরিদ্র কৃষক হলধর রায়ের মেয়ে সুভদ্রা রায়। পার্বতীপুর ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সুভদ্রা বলেন, “পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা শুনে ওই দিন সকাল থেকেই কাঁদছিলাম। যদি ভালো ফল করতে না পারি, তাহলে প্রথম আলোসহ যাঁদের সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করলাম, তাঁরা কী মনে করবেন। কান্নাকাটি দেখে বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘মা রে, তুই কোনোটে আটকিবু না’।”
ওই দিন দুপুরে কলেজের প্রভাষক মানচিত্র কুমার পাল তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘এবার কলেজের মানবিক বিভাগে ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। আর সেই ভাগ্যবতী ছাত্রীটি তুমি।’ সুভদ্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে চান।
আনোয়ারুল কাদির: ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার গাবরবোয়ালি গ্রামের মৃত সেকান্দর আলীর ছেলে মো. আনোয়ার কাদির। ময়মনসিংহ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ইটের ভাটায় মজুরি খেটে আনোয়ার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। প্রভাষক মফিজুন নূর বলেন, সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে। আনোয়ারের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ওর ফলাফলে আমি খুব খুশি।’ আনোয়ারের কথা, এইচএসসিতে ভালো ফল করে প্রথম আলোকে দেওয়া কথা রেখেছেন তিনি। প্রথম আলো ছাড়াও এই ভালো ফল লাভের পেছনে তাঁকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুলতান স্যার ও মফিজুন নূর বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন। ভবিষ্যতে তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে চান।
মিনতি খাতুন: সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার নতুন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামের দরিদ্র কৃষক নূর মোহাম্মদ খানের মেয়ে মিনতি খাতুন। সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘সংসারে অনেক ছেলেমেয়ে। মিনতিকে তেমন জোগান দিতে পারিনি। ও নিজের চেষ্টাতেই এত দূর এগিয়েছে।’
মিনতির কথা, প্রথম আলোর পাশাপাশি শিক্ষকেরাও তাঁকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চান তিনি।
আমির হামজা: মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের রিকশাচালক শাহজালাল মিয়ার ছেলে আমির হামজা। ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, ছাত্র হিসেবে আমির হামজা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। তিনি ও তাঁর দুই সহকর্মী আমির হামজাকে বিনা টাকায় পড়িয়েছেন।
আমির জানান, এসএসসিতে ভালো ফল করার পর প্রথম আলো ও কিছু ব্যক্তির আর্থিক সহযোগিতায় ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে তিনি নতুন উদ্যমে পড়ালেখা শুরু করেন। শিক্ষকদের উত্সাহ, সহযোগিতা ও তাঁর নিজের কঠোর অনুশীলনে এই ফল অর্জিত হয়। ভবিষ্যতে তিনি প্রকৌশলী হতে ইচ্ছুক।
বাবা শাহজালাল ও মা রাবেয়া খাতুন বলেন, এত দিন আমির নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করলেও তাঁর ভবিষ্যৎ শিক্ষার ব্যাপারে তাঁরা কিছুটা চিন্তিত। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তাঁরা।
আরও যাঁরা সফল হলেন: এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া আরও ১৩ জন ‘অদম্য মেধাবী’ প্রথম আলোর সহায়তায় দুই বছর পড়াশোনা করে এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছেন। তবে তাঁরা জিপিএ-৫ পাননি। তাঁরা হলেন ঢাকার বদরুন্নেছা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে মাদারীপুরের শিবচরের মিরা রানী মালো, ঝিনাইদহ সরকারি কে সি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দেওয়া ঝিনাইদহ সদরের রিজভী আহম্মেদ, পাবনার বেড়া মনজুর কাদের মহিলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে বেড়ার খাদিজা খাতুন, পঞ্চগড়ের এম আর সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পঞ্চগড় সদরের আনিসুর রহমান, মুন্সিগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে টঙ্গিবাড়ির সজিব আহমেদ, যশোরের কেশবপুর কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কেশবপুরের মেহেদি হাসান, খুলনার বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে রূপসার পুতুল রানী ঘোষ, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ঠাকুরগাঁও সদরের আফসানা মল্লিক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সদর উপজেলার আনোয়ার হোসেন, ঢাকার বোরহানউদ্দিন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কুড়িগ্রামের উলিপুরের শাহজাহান আলী, নওগাঁ সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সদর উপজেলার শেহতাজ সাদমানী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কালাইয়ের নূপুর কুমার ও ঢাকার উদয়ন কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ঢাকার সোবহানবাগের সেঁজুতি সনিমা।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজশাহী, ঝিনাইদহ ও রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক; সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অফিস এবং নওগাঁ, দুপচাঁচিয়া (বগুড়া), কালাই (জয়পুরহাট), ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ), গজারিয়া (মুন্সিগঞ্জ), শিবচর (মাদারীপুর) ও বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি]

চট্টগ্রাম বন্দরে আবার আন্দোলন by মামুন আবদুল্লাহ

‘আমাদের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে আমরা ১৫ হাজার ডকশ্রমিককে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছি’
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা দুটিতে কমিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। বন্দরের ৩২টি শ্রমিক সংগঠনের বেশির ভাগই এখন সমবায় সমিতির নামে নতুন করে নিবন্ধন নিয়ে কথায় কথায় বন্দর বন্ধের তৎপরতা শুরু করেছে। এসব নতুন সংস্থা চট্টগ্রামের মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত মাসে তুচ্ছ ঘটনায় চট্টগ্রাম বন্দর অন্তত তিন দফা বন্ধ থাকে। এ ছাড়া শ্রমিক সংগঠনের সমাবেশ-মানববন্ধনের কারণে আরও তিন দিন বন্দরের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। আগামী মঙ্গলবার নতুন করে চার ঘণ্টার জন্য বন্দরের কাজ বন্ধ রেখে অবস্থান কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে সরকারি দল-সমর্থিত চট্টগ্রাম ডক-বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশন।
ফেডারেশনের আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে আমরা ১৫ হাজার ডকশ্রমিককে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। ডকশ্রমিকদের সাতটি সংগঠন নিয়ে আমরা ফেডারেশন গঠন করেছি। চার ঘণ্টার কর্মবিরতিতে কাজ না হলে ফেডারেশন আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।’ সরকারি দলের লোক হয়েও কেন আন্দোলন করছেন, জানতে চাইলে গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দাবি-দাওয়ার কথা বললেও কেউ তো ডাকছে না। ডেকে আলোচনা করার জন্য এ আন্দোলন।’
এই সংগঠনের মহাসচিবের দায়িত্বে আছেন বন্দরের সাবেক সিবিএ নেতা মাহফুজুর রহমান। তিনি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
যোগাযোগ করা হলে বন্দরের শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি মেয়র।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ রাতে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন মেয়র। প্রায় ১৭ মাস জেল খেটে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম তিনি প্রকাশ্যে শ্রমিক সমাবেশ করেন বন্দর এলাকার বিমান চত্বরে। এ সমাবেশে মেয়র পরবর্তী এক মাসের মধ্যে চাকরিচ্যুত ১৫ হাজার ডকশ্রমিককে চাকরি ফিরিয়ে দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সময় বেঁধে দেন। এর পর থেকেই বন্দর পরিস্থতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। পরে আরও কয়েকটি সমাবেশে তিনি ডকশ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে হুঁশিয়ার করে দেন।
অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান কমডোর আর ইউ আহমেদ মনে করেন, শ্রমিকেরা শেষ পর্যন্ত বন্দর বন্ধের কর্মসূচিতে যাবে না। শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে কীভাবে দূরে রাখা যায়, সেই চেষ্টা চলছে।
বন্দর কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পর বন্দরে সংস্কারকাজ শুরু হলে জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত শ্রমিক অসন্তোষজনিত কারণে এক মুহূর্তের জন্যও বন্দরের কাজ বন্ধ হয়নি। বরং ওই সময়ে বন্দরের সেবার মান আন্তর্জাতিক যেকোনো বন্দরের সমমানের প র‌্যায়ে চলে আসে। বন্দরের জাহাজ অবস্থানের গড় সময় (টার্ন রাউন্ড টাইম) ১৩-১৪ দিনের স্থলে দুই-আড়াই দিনে নেমে আসে। নতুন ব্যবস্থাপনায় বন্দর ব্যবহারকারীরা ২০০৭ সালের ১৬ মে কাজ শুরু করেন। সে সময় বন্দরের ৩২টি শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের কেউ গ্রেপ্তার ও কেউ আত্মগোপনে চলে গেলে সাধারণ শ্রমিকেরা ঠিকই কাজে যোগ দেন। ফলে বন্দরের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে শ্রমিক নিয়োগকারী সংস্থা বার্থ অপারেটরদের প্রতিনিধি ফজলে একরাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই বছরে বন্দর পরিচালনায় দেশে-বিদেশে যে সুনাম অর্জিত হয়, তা শ্রমিক আন্দোলনের নামে ধূলিসাতের চেষ্টা হচ্ছে। তিনি বলেন, যে শ্রমিকেরা তাঁদের সব ধরনের দেনা-পাওনা বুঝে নিয়ে স্বেচ্ছায় চলে গেছেন, তাঁদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি অবান্তর।
বন্দর ব্যবহারকারী, শ্রমিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যা ৩২টি থেকে কমিয়ে দুটিতে নামিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণে বন্দর পরিস্থিতি আবারও বেসামাল হয়ে পড়েছে। একটি সংগঠনের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা-সমঝোতা হলে অন্য একটি সংগঠন নতুন দাবি তুলে বন্দরকে জিম্মি করতে চায়।

বৃষ্টির কারণে টিপাইমুখে নামতে পারেনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল by ইফতেখার মাহমুদ

ভারতের মণিপুর রাজ্যের টিপাইমুখ এলাকায় মুষলধারে বৃষ্টি পড়ায় হেলিকপ্টার থেকেই টিপাইমুখ দেখে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে প্রতিনিধিদল টিপাইমুখে নামতে পারেনি। বৃষ্টি কমলে ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আজ ভোরে আবার টিপাইমুখের উদ্দেশে রওনা হবেন।
গতকাল শুক্রবার ভোরে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলটি হেলিকপ্টারে করে গুয়াহাটি থেকে টিপাইমুখের পথে রওনা হয়। সেখানকার স্থানীয় জনগণ ও প্রকল্প কর্মকর্তারা দলটিকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বেশ কিছুক্ষণ মণিপুরের আকাশে বিচরণ করে দুপুর নাগাদ হেলিকপ্টারটি গুয়াহাটিতে ফিরে আসে।
বাংলাদেশ দলের সভাপতি সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক আজ আবার টিপাইমুখের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তকে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প র‌্যালোচনা করা হবে। প র‌্যালোচনা শেষে এ প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক করা হবে।
সংসদীয় প্রতিনিধিদল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যানের (ফ্যাপ) আওতায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করা হলে কী ধরনের প্রভাব বাংলাদেশ পড়তে পারে, তা নিয়ে একটি গবেষণা হয়। গবেষণায় বলা হয়, বরাক নদের ওপর বন্যানিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ও বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং লাভ হবে। ব্যারাজ নির্মাণ করা হলে ক্ষতির আশঙ্কার কথা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল। মূলত এই গবেষণার আলোকেই ভারতের দেওয়া তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের সব প্রস্তুতি শেষ করে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শেষে তারা প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকল্পের ব্যাপারে কোনো আপত্তি থাকলে তা বিবেচনায় নেওয়ার জন্য ভারত সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যদি প্রকল্পটি থেকে উত্পাদিত বিদ্যুৎকিনতে চায় তা বিবেচনা করা হবে।
ভারত সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, বাংলাদেশ যদি প্রকল্পটি নির্মাণে সহযোগিতা করে ও আপত্তি না জানায়, তাহলে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎকেনার সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হবে।
বিএনপির সংশয়: সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিনের মতে, ভারত বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে যে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। ১৯৭৮ সালে তৎকালীনরাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ তথ্য-উপাত্ত ভারতের কাছ থেকে চেয়েছিলেন। তখন ভারত তা দেয়নি। এত বছর পর যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাও সংক্ষেপিত ও যথেষ্ট নয়।
ব্যারাজ নির্মাণ না করার আশ্বাসের ব্যাপারে বিএনপির এই নেতা গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৫ সালে যৌথ নদী কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও ভারতের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে ফুলেরতলে ব্যারাজ নির্মাণ না করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তার পরও নিপকোর (নর্থ ইস্ট পাওয়ার করপোরেশন) ওয়েবসাইটে প্রকল্পের যে পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে ফুলেরতলে ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ড্যাম নির্মাণের পর বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি বেশি পাবে বলে ভারতের পক্ষ থেকে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের লাভ হবে না বলে মনে করেন তিনি।
যৌথ ব্যবস্থাপনা চান আইনুন নিশাত: টিপাইমুখ প্রকল্প বিষয়ে ভারত সরকারের দেওয়া তথ্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে পানিবিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বাংলাদেশ সরকারকে আরও সাবধানে এগোনোর পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, বরাক নদ থেকে বাংলাদেশ কী পরিমাণ পানি পাবে, তা ভারতকে নির্ধারণ করতে দেওয়া ঠিক হবে না। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ বেশি না কম পানি পাবে, তা অভিন্ন সমীক্ষা না করে বোঝা যাবে না।
আইনুন নিশাত গতকাল প্রথম আলোকে আরও বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বরাক নদের ওপর যৌথ ব্যবস্থাপনায় বন্যানিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এখন ভারত বলছে, তারা ড্যাম নির্মাণের সব সমীক্ষা ও প্রস্তুতি শেষ করেছে। ভারতের অধিকার নেই ভাটির দিকে থাকার সুযোগ নিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করা।
বরাকসহ সব অভিন্ন নদীতে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে হলে প্রথমে যৌথ সমীক্ষা করতে হবে। এরপর আলোচনার মাধ্যমে যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন আইনুন নিশাত। তাঁর মতে, তা না হলে উজানের দেশ সব সময় পানি প্রত্যাহারের সুযোগ পাবে। অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব বাংলাদেশের দিক থেকে তোলার সুপারিশ করেন তিনি।
শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ বেশি পানি পাবে বলে ভারতের দিক থেকে যে কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আইনুন নিশাত বলেন, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে বেশি পানি দরকার নেই। কেননা এ সময় হাওরের প্রধান ফসল বোরোর চাষ হয়। এ মৌসুমে বাংলাদেশের কী পরিমাণ পানি প্রয়োজন, তা নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি। ফলে আগের চেয়ে বেশি পানি এলে দেশের বেশির ভাগ হাওরে জলাবদ্ধতা হবে। ধান চাষ করা যাবে না।
ভারতের বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ বি জি ভার্গিস টিপাইমুখ প্রকল্পসহ অভিন্ন নদীগুলোতে বাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, নদীর ওপর যেকোনো বড় অবকাঠামোই পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করবে। ফলে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হতে পারে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে। ভারতের হিসেবে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি বেশি পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে বাংলাদেশে কৃষির কিছুটা ক্ষতি হলেও পানি বেশি আসায় মাছের পরিমাণ বাড়বে।

হাজার শিকার হচ্ছে না মুরালির

সেই ভয়াল চাহনি; বর্শার মতো ছুড়ে দেওয়া একেকটি বল, ব্যাটসম্যানদের কাছে যা দুর্বোধ্য ব্যাকরণ; একেকটি উইকেটের জন্য কী সর্বগ্রাসী ক্ষুধা; প্রতিটি উইকেটপ্রাপ্তিই এখনো যার কাছে অভিষেক উইকেটপ্রাপ্তির আনন্দমাখা উদ্যাপন... ক্রিকেটের আরেক মহা তারকার টেস্ট অধ্যায় সমাপ্ত হতে চলেছে। আগামী বছর নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ দিয়েই অবসর নেবেন সর্বকালের সফল বোলারটি। পরশু অনানুষ্ঠানিকভাবেই টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের কথা জানিয়ে দিয়েছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন।
বয়স হয়ে গেছে ৩৭ বছর। ১৭ বছর ধরে প্রায় বিরামহীন খেলে চলেছেন। শরীর আর ধকল নিতে পারছে না আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচির। ইদানীং হাঁটুর চোটটা খুব ভোগাচ্ছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজে খেলা হয়নি। ওয়ানডেতে ফিরেছেন। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ক্যারিয়ারটা দীর্ঘায়িত করতেই টেস্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত, ‘আর বেশিদিন ক্রিকেটেই থাকছি না। আগামী বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই খেলব ক্যারিয়ারের শেষ দুটি টেস্ট। এটাই সঠিক সময়। ৩৮ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। ২০১১ বিশ্বকাপ আমার মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি আরও কয়েক বছর আমি টি-টোয়েন্টিতে খেলে যেতে চাই।’
কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটের ধকল আর নিতে পারছেন না বলেও জানিয়ে দিলেন, ‘ক্রিকেটের সবচেয়ে কঠিন খেলা হলো টেস্ট। এতে উইকেট নিতে ব্যাটসম্যানদের আউট করতে খুবই পরিশ্রম করতে হয়। কখনো কখনো তো টানা দু দিন ফিল্ডিংও করতে হয়। প্রতিটি ম্যাচের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখতে হয়। আর টি-টোয়েন্টিতে আপনার মূল কাজটাই হলো ব্যাটসম্যানকে বেঁধে রাখা, যাতে সে রান তোলার চেষ্টা করতে গিয়েই আউট হয়ে যায়। ৫০ ওভারের ক্রিকেটও একই রকম। কিন্তু টেস্টে আপনাকে ব্যাটসম্যানকে ভালোভাবে পড়তে হবে। সেভাবে ফিল্ডিং সাজাতে হবে। তবেই উইকেট পাবেন।’
চোট পুরোপুরি সারাতে অস্ত্রোপচার করাতে হবে। আর সেটা করতে হলে সাত-আট মাস এমনিতেই মাঠের বাইরে থাকতে হতো। সে ক্ষেত্রে সেটাই এক রকম অবসরের সমান হয়ে যেত। বিকল্প হিসেবে চোটটা নিয়েই খেলছেন। খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না বলেই জানালেন। কিন্তু এর মাশুল তাঁকে দিতে হতে পারে খেলা ছাড়ার পর।
টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ১৯৯২ সালে কলম্বোতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ওই টেস্টে ৫১ ওভার বল করে ১৪১ রানে ৩টি উইকেট নিয়েছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে, উদিত সূর্যটা দিনের পূর্বাভাস ঠিকমতো দিতে পারেননি। ক্রেইগ ম্যাকডারমটকে আউট করে যে শিকার শুরু হয়েছিল, গত ফেব্রুয়ারিতে করাচি টেস্টে সালমান বাটকে আউট করার মাধম্যে সেটার সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭০টি। শেন ওয়ার্নের ৭০৮ টেস্ট উইকেটের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন সেই ২০০৭ সালেই। মুরালির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কেবল মুরালিই।
নিজে একসময় বলেছিলেন, ১০০০ টেস্ট উইকেট পেলেই তবে অবসর নেবেন। সেটা খুবই সম্ভব ছিল তাঁর জন্য। কিন্তু সহস্র উইকেট তো হচ্ছে না, মুরালি ৮০০ উইকেটও পূর্ণ করতে পারবেন কি না সন্দেহ। কারণ আগামী বছর মে পর্যন্ত মাত্র দুটি টেস্ট খেলবে শ্রীলঙ্কা। এরপর নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও মাত্র দুটো টেস্ট।
‘১০০০ উইকেট পেতে হলে আমাকে নিয়মিত টেস্ট খেলতে হবে। কিন্তু এখন তো আমরা টেস্ট ম্যাচই খেলছি অনেক কম। আগামী বছরও খুব বেশি ম্যাচ নেই আমাদের’—বাস্তবতাটাই মেনে নিচ্ছেন মুরালি।
কিন্তু যেখানেই গিয়ে থামুন, মুত্তিয়া মুরালিধরনের কীর্তিকে আর কেউ ছাপিয়ে যেতে পারবে কি?

মরা ম্যাচ থেকে দর্শকও মুখ ফিরিয়ে

অনেক ক্রিকেট মাঠই কোনো রেকর্ড বা নির্দিষ্ট কোনো কীর্তির সমার্থক হয়ে যায়। লন্ডনের ওভাল মানেই যেমন লেন হাটনের ৩৬৪, অ্যান্টিগার রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ড মানেই ব্রায়ান লারার ৩৭৫ ও ৪০০, ওয়েলসের সোয়ানসি মানেই গ্যারি সোবার্সের ছয় বলে ছক্কা...
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাত্র তিন বছর বয়সী সেন্ট কিটসের ওয়ার্নার পার্কও তেমনি ‘গিবস পার্ক’! গত বিশ্বকাপে গিবস-সৃষ্ট ওয়ানডেতে ছয় বলে ছয় ছক্কার একমাত্র কীর্তিটি এ মাঠেই। ৩৪তম ওভারে মাহমুদউল্লাহর প্রথম দুই বলেই ছক্কা মেরে ড্যারেন স্যামি আরও বেশি করে মনে করিয়ে দিলেন সেটিকে।
মাহমুদউল্লাহরও তা মনে পড়ে গেল কি না কে জানে, পরের বলটা করলেন লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে। উইকেটকিপার ঠিকমতো ধরতে না পারায় ওই ওয়াইড থেকে বাড়তি আরেকটা রান হলো। ছয় বলে ছয় ছক্কা নিয়ে আলোচনারও ওখানেই সমাপ্তি।
তৃতীয় বলটা ওয়াইড বলে ওভারে ছয় ছক্কা তখনো সম্ভব ছিল। কিন্তু মারবেন কে—ফ্লয়েড রেইফার? তাহলেই হয়েছে! স্বপ্নেও যা ভাবেননি, হঠাৎকরেই সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়কত্ব পেয়ে গিয়ে রেইফার আনন্দ করবেন কি, বেচারার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা! এই ম্যাচের আগে দুই টেস্ট আর দুই ওয়ানডের ছয় ইনিংসে মোট রান ৫৮। প্রথম টেস্টের দুই ইনিংসে ২৫ ও ১৯ রান করার পর পরের চার ইনিংসে দুই অঙ্কও ছুঁতে পারেননি। সেই রেইফার কাল রান পেলেন। সেঞ্চুরিও নয়, হাফ সেঞ্চুরিও নয়, কিন্তু আগের ৬ ইনিংসে যার ৫৮ রান, তাঁর কাছে ৪০ রানই তো সেঞ্চুরির আনন্দ হয়ে আসে। বিশেষ করে কালও শুরুতে তাঁর ব্যাটিং দেখে এই গেলেন-এই গেলেন মনে হচ্ছিল!
শুরুতে আন্দ্রে ফ্লেচারের ঝোড়ো ব্যাটিং, রেইফারের রান পাওয়ার বাইরে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডের প্রথমার্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বলতে হবে তামিম ইকবালের নেওয়া দুর্দান্ত ক্যাচটাকে। ব্যাটসম্যানের নাম কেমার রোচ বলে উইকেটটা তেমন দামি নয়, তবে ক্যাচটার মহিমা তাতে একটুও কমে না। ডিপ মিড উইকেট থেকে অনেকটা দৌড়ে সামনে ডাইভ দিয়ে মাঠের ইঞ্চিখানেক ওপর থেকে তামিম হাতে জমিয়েছেন বল।
আগের ম্যাচে ২৭৪ তাড়া করে ফেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪৮ রান করে ফেলার পরও মাঠ ছাড়ার সময় পরিতৃপ্ত দেখাল বাংলাদেশকে। তা দেখানোর আরেকটা কারণ বোধ হয় ওয়ার্নার পার্কের উইকেট উইন্ডসর পার্কের উইকেটের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাটিং-বান্ধব, যাকে বলে ব্যাটিং-স্বর্গ। তাতেও অবশ্য বাংলাদেশের বোলারদের দায়ভার একটুও কমে না। ব্যাটিং-স্বর্গ হলে ব্যাটসম্যান মারবে ঠিক আছে, কিন্তু এত ওয়াইড হবে কেন? চার স্পিনার নিয়ে খেলেও ওয়াইড ১৬টি! স্পিনাররা যে ওয়াইড করায় পেসারদেরও ছাড়িয়ে গেলেন। ৫টি ওয়াইড করে রাজ্জাক মাহবুবুলের সঙ্গে যুগ্মভাবে প্রথম, ৪টি করে দ্বিতীয় নাঈম। বাংলাদেশের ছয় বোলারের মধ্যে একমাত্র সাকিবই মুক্ত এই দায় থেকে। উইকেট না পেলেও ৯.৪ ওভারে মাত্র ২৮ রান দিয়ে বাংলাদেশের সেরা বোলারও অধিনায়ক।
রাজ্জাকের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। প্রথম ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে ১০ ওভারে দিয়েছেন ৫৮ রান। কাল দিলেন ৬৩। ৮৪ ম্যাচের ক্যারিয়ারে এর চেয়ে বেশি রান দিয়েছেন মাত্র পাঁচবার—এই তথ্যটা তাঁর দুই উইকেট পাওয়ার আনন্দকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মরা ম্যাচ বলে বাইরে বসে থাকা দুই পেসার মাহবুবুল ও নাজমুল সুযোগ পেয়েছেন। কালকের ম্যাচে মাহবুবুলের শুরু আর কিয়েরেন পাওয়েলের শুরুতে মিল থাকল। পার্থক্য হলো, ব্যাটসম্যানের জন্য একটা ভুলই সব শেষ করে দিতে পারে বলে সেই ভুলের মূল্য দিতে হলো শুধু পাওয়েলকেই। মাহবুবুলের প্রথম বলটি ওয়াইড, কিন্তু বোলারের তো ফিরে আসার সুযোগ আছে। দ্বিতীয় বলেই পাওয়েলকে এলবিডব্লু করে মাহবুবুল ফিরেও এলেন। বেচারা পাওয়েল! মাত্র ১৯ বছর বয়স, সেন্ট কিটসের ভগ্নি-দ্বীপ নেভিসে বাড়ি বলে ওয়ানডে অভিষেকটা ছিল হোমগ্রাউন্ডে। এক বলেই সেটি পরিণত দুঃস্বপ্নে!
তবে সেটি দেখার জন্য মাঠে কতজন ছিলেন, তা হাতে গুনেই বলে দেওয়া যেত। পরে সংখ্যাটা একটু বাড়লেও ওভারে ছয় ছক্কার রেকর্ডের মাঠে আরেকটা রেকর্ডও বোধ হয় হয়ে গেল। ওয়ানডে ম্যাচে সবচেয়ে কম দর্শকের রেকর্ড!
আন্দ্রে ফ্লেচারের দুর্দান্ত ইনিংসটারও তাই খুব কমই প্রত্যক্ষদর্শী থাকল। ৪২ বলে ৫২ রানের ৫০-ই চার আর ছয় মেরে (৮টি চার ও ৩টি ছয়)। পঞ্চম ওভারে মাহবুবুলের তিন বলে মেরেছেন দুই ছয়, তাঁরই পরের ওভারে এক পায়ে পুলে পর পর দুই চার মেরে মনে করিয়ে দিয়েছেন গর্ডন গ্রিনিজকে।
এই দলের অন্য অনেকের মতো হঠাৎসুযোগ পাননি। মূল দলেও হয়তো থাকতেন ফ্লেচার, যাকে বলা যেতে পারে টি-টোয়েন্টির উত্পাদিত ব্যাটসম্যান। ২০০৬ সালে অ্যালান স্টানফোর্ডের টোয়েন্টি-টোয়েন্টিই গ্রেনেডার অখ্যাত এই ব্যাটসম্যানের মার মার-কাট কাট ব্যাটিং প্রথম সবার নজরে আনে। স্টানফোর্ডের ওই মিলিয়ন ডলারের ম্যাচেও খেলেছেন। এক মিলিয়ন ডলার জিতে স্টানফোর্ডের লোকজনের পরামর্শমতো তা বিনিয়োগ করে অনেক টাকাও খুইয়েছেন। স্টানফোর্ড জালিয়াত বলে প্রমাণিত হওয়ার পরও ফ্লেচার অবশ্য বিতর্কিত আমেরিকান সম্পর্কে একটাও বাজে কথা বলতে রাজি নন। বরং সব ঝামেলা-টামেলা মিটিয়ে স্টানফোর্ড কবে আবার তাঁর টুর্নামেন্টটা শুরু করবেন, এর অপেক্ষায় আছেন তিনি।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল একটাই প্রাপ্তি—টেস্ট সিরিজের পর ওয়ানডে সিরিজেও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইট ওয়াশ করা। বাংলাদেশের ইনিংসের দশম ওভারে এই লেখা শেষ করার সময় সেই সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলই লাগছিল।

বাউন্ডারি-খরা

নিজেদের শততম ওয়ানডেতে ভারতের বিপক্ষে ১৯টি চার ও ৪টি ছয় ছিল বাংলাদেশের ইনিংসে, ২০০তম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৫টি চার ও ২টি ছয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ১৯৮৬ সালে নিজেদের প্রথম ওয়ানডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো চার-ছয়ের মুখ দেখেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। ৯৪ রানে অলআউট হওয়া ইনিংসে ‘শূন্য’ করেছিলেন চারজন।

জাতীয় রাগবি

ডায়মন্ড মেলামাইন জাতীয় রাগবির ফাইনালে উঠেছে চট্টগ্রাম ও ফরিদপুর। কাল সেমিফাইনালে চট্টগ্রাম ১২-৫ পয়েন্টে ঢাকাকে এবং ফরিদপুর ১০-৮ পয়েন্টে মুন্সিগঞ্জ জেলাকে হারিয়েছে। পল্টন ময়দানে আজ ফাইনাল।

ওয়াডার নীতিমালায় সই করেননি ধোনিরা

রাফায়েল নাদালের সঙ্গে এক জায়গায় মহেন্দ্র সিং ধোনিরাও। আন্তর্জাতিক ডোপিং-বিরোধী সংস্থার (ওয়াডা) নতুন চালু করা ‘হয়্যারঅ্যাবাউট’ শর্ত অনুযায়ী, শীর্ষ খেলোয়াড়দের অনলাইনের এক ফরম পূরণ করে নির্দিষ্ট সময়ে আগেভাগেই জানিয়ে দিতে হবে, অমুক অমুক দিনে তারা কোথায় কোথায় থাকবে। এই নিয়মের বিরোধিতা করে টেনিস তারকা নাদাল বলেছিলেন, ‘আমি কোথায় কোথায় থাকি সেটা তো আমার চাচা কোচ টনি আর আমার মাও জানে না।’
ওয়াডার এই শর্তে আপত্তি ভারতের ক্রিকেটারদেরও। আর তাই গতকাল আইসিসির বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ডোপিং-বিরোধী নীতিমালায় সই করেননি কেউই। বাকি সব দেশ এরই মধ্যে স্বাক্ষর করলেও কেবল ভারতের ক্রিকেটাররা এখনো বাকি আছেন।
ভারতীয় ক্রিকেটারদের যুক্তি, এই নিয়ম তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের শামিল। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক ব্যস্ত ক্রিকেট-সূচির কারণে আগাম জানিয়ে দেওয়াও অসম্ভব কে কখন কোথায় থাকবেন।
এ বছর জানুয়ারি থেকে আইসিসিও ওয়াডার নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ওয়াডার বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হচ্ছে আজ। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নিশ্চিতভাবেই সেই ‘ডেডলাইনে’র মধ্যেই কাগজপত্র আইসিসির কাছে পাঠাতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে আজ বিসিসিআইর জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। আগামীকাল বিসিসিআইর সঙ্গে আইসিসির আইনজীবীও বৈঠক করবেন।
হয়তো ভারতের জন্য সময়সীমা বাড়ানো হবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ‘হয়্যারঅ্যাবাউটস’ নীতিমালা বদলানো হবে না বলেই জানিয়েছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত।

রেকর্ডের রেকর্ড গড়েছে রোম

সিজার সিয়েলো ফিলহো
সাঁতার শেষ হতেই সিয়েলো ফিলহোর দু চোখ বেয়ে গড়াল অশ্রু, রোমের সুইমিং পুলও যেন গর্বিত হলো এই আনন্দাশ্রুতে। এটা তাঁর প্রত্যাশা পূরণ ও ভারমুক্তির অশ্রুও। ৪৬.৯১ সেকেন্ডে ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল জিতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টাইমিং নিয়ে এসেছেন ৪৭ সেকেন্ডের নিচে। যাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন, ফ্রান্সের সেই অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন অ্যালাইন বার্নার্ড অবশ্য একবার ৪৬.৯৪ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর তখনকার সাঁতার পোশাক বৈধতা না পাওয়ায় রেকর্ডটাও গৃহীত হয়নি। বার্নার্ড এখানে রুপা জিতেছেন আর ৫০ মিটারের বিশ্ব রেকর্ডধারী ফ্রান্সের ফ্রেডেরিক বাকেট জিতেছেন বোঞ্জ।
ভেঙে গেছে মাইকেল ফেল্পেসর আরও একটি রেকর্ড। ২০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ১ মিনিট ৫৪.১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে রেকর্ড গড়েছেন ফেল্পেসর স্বদেশি রায়ান লোকটে। ২০০৩ সাল থেকে ৭ বার এই ইভেন্টের বিশ্ব রেকর্ড নতুন করে লেখানো ফেল্প্স অবশ্য হারেননি, বাটারফ্লাই ও ফ্রি-স্টাইলে বেশি মনোযোগ দিতেই এই ইভেন্টে আর লড়ছেন না এই মার্কিনি। মেয়েদের ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ের হিটে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারি ডিসেনজার গড়া রেকর্ড ফাইনালেই ভেঙে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার জেসিকা শিফার, সময় নিয়েছেন ২ মিনিট ০৪.২৮ সেকেন্ড। অলিম্পিক সোনাজয়ী লিউ জিগে হয়েছেন দ্বিতীয়। বেইজিং অলিম্পিকে হিটে বাদ পড়ার ব্যর্থতা ঘুচিয়ে ২৭.০৬ সেকেন্ডে ৫০ মিটার ব্যাকস্ট্রোক জিতে রেকর্ড গড়েছেন চীনের ঝাও জিং। ২০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকের সেমিফাইনালে রেকর্ড গড়ে ফাইনালে বিশ্ব ও অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন রেবেকা সনির সঙ্গে জমজমাট লড়াইয়ের আভাস দিয়েছেন কানাডার আন্নামে পিয়ার্স। মেয়েদের ৪–২০০ মিটার রিলেতে ৭ মিনিট ৪২.৫৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে রেকর্ড গড়ে সোনা জিতেছে চীন।
এদিকে রেকর্ড গড়ার দিক থেকেও নতুন রেকর্ড গড়েছে রোম। পাঁচ দিনে মোট রেকর্ড হয়েছে ২৯টি, আগের রেকর্ডটি ছিল বেইজিং অলিম্পিকের ২৫টি রেকর্ডের।

অস্ট্রেলিয়ার অ্যান্ডারসন-অনিয়নস শিক্ষা

উইকেটটি রিকি পন্টিংয়ের বলেই কি এমন উল্লাস গ্রাহাম অনিয়নসের
বাজিকরদের জন্য লাভের আশা জেগে উঠল দ্বিতীয় দিনেই। এই মাঠে সর্বশেষ ২০টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচের ১৬টি ড্র, এ বছর মাত্র একটি জয়—এই সব হিসাব-নিকাশ, সেই সঙ্গে বৃষ্টির উত্পাত মিলে এজবাস্টন টেস্টে ড্রয়ের ওপরই বাজিটা ধরা হয়েছে বেশি। কিন্তু প্রথম দিন ৬০ ওভার ভেসে গেলেও এই ম্যাচ ফল দেখবে বলেই মনে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে তোলা ২৬৩ রানের জবাবে আলোর স্বল্পতার জন্য ১৮ ওভার আগেই দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় ইংল্যান্ড করেছে ২ উইকেটে ১১৬ রান। ফর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ৬৪ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেছেন অধিনায়ক অ্যান্ডু্র স্ট্রাউস, সঙ্গে ছিলেন দলে ফিরে আসা ইয়ান বেল। ২৬ রানে অপরাজিত বেল সিরিজে ইংল্যান্ডের পক্ষে প্রথম ছক্কাটি হাঁকিয়েছেন কাল হরিজের বলে।
অথচ ভেজা আবহাওয়ার পরও টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া অস্ট্রেলিয়া দুর্দান্ত শুরু করেছিল। শেন ওয়াটসনকে ওপেনার হিসেবে খেলানোর ফাটকাটাও কাজে লেগেছিল। প্রথম দিন ৩০ ওভারে মাত্র সাইমন ক্যাটিচকে হারিয়ে ১২৬ রান তুলে বড় হুমকিই দিচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া।
কাল মেঘাচ্ছন্ন দিনে শুরুতেই ইংল্যান্ডের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু করেছেন গ্রাহাম অনিয়নস। দিনের প্রথম আর দ্বিতীয় বলেই তুলে নিয়েছেন দুটি উইকেট। ৬২ রানেই শেষ ওয়াটসন। রানের খাতা খোলাই হয়নি মাইক হাসির। কিন্তু হ্যাটট্রিক পাওয়া হয়নি অনিয়নসের।
পন্টিং ছিলেন অন্য প্রান্তে। অ্যালান বোর্ডারকে ছাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ আর শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারার পর তৃতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট রানের রেকর্ড গড়ার দিনটায় বড় কিছু করার আভাসও মিলছিল। কিন্তু বোর্ডারকে পেরিয়ে আর ১৩ রান যোগ করে ৩৮ রানেই অনিয়নসের তৃতীয় শিকার তিনি।
নিয়মিত উইকেট তুলে নেওয়ার আনন্দে এর পরের ৫টি উইকেটই অ্যান্ডারসনের। নিজের অষ্টম ওভারে মাইকেল ক্লার্ক আর ষোড়শ ওভারে ফেরান মার্কাস নর্থকে। ১৭তম ওভারের চতুর্থ আর পঞ্চম বলে মিচেল জনসন আর গ্রাহাম ম্যানুকে বধ করে তো হ্যাটট্রিকের সামনে গিয়েই দাঁড়িয়েছিলেন। সেটা না পেলেও পরের ওভারে পিটার সিডলকে আউট করে ক্যারিয়ারে সপ্তমবারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট তুলে নেন তিনি।
সিডলকে আউট করে নবম উইকেট জুটিতে ২৬ রানের প্রতিরোধও ভাঙেন এই ফাস্ট বোলার। আর অনিয়নস নিজের চতুর্থ উইকেট হিসেবে বেন হিলফেনহসকে তুলে নিয়ে ভাঙেন দশম উইকেটে তোলা ৩৪ রানের জুটি। মানে শেষ দুই উইকেটে ৬০ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া!

ম্যানইউকে হারিয়ে দিল বায়ার্ন

জার্মানির বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারী অডির ১০০ বছর পূর্তি হলো এবার। সেই উপলক্ষে জার্মানিতে দুই দিনের সংক্ষিপ্ত একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হলো। আর সেই টুর্নামেন্টের শিরোপাটি ঘরেই রেখে দিল বায়ার্ন মিউনিখ। পরশু অডি কাপের ফাইনালে টাইব্রেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৭-৬ ব্যবধানে হারিয়েছে তারা।
চারটি ক্লাব এই প্রাক-মৌসুম টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল। ২৯ জুলাই প্রথম সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ম্যানইউ। আর দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইতালির এসি মিলানকে ৪-১ গোলে হারায় বায়ার্ন।
পরশু তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটাও গড়িয়েছিল টাইব্রেকে। সেখানে মিলানকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়েছে হুয়ান রোমান রিকুয়েমের দল। ফাইনালটাও নির্ধারিত সময়ে কোনো ফল দিতে পারেনি। গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকের লটারি। আর উত্তেজনা ছড়িয়ে আটটি শটের টাইব্রেক দেখল মিউনিখের আলিয়াঞ্জ অ্যারেনা স্টেডিয়াম। ম্যানইউর প্যাট্রিস এভরা আর জনি ইভান্স গোল করতে ব্যর্থ হলে প্রথম অডি কাপের শিরোপা নিয়ে উল্লাসে মেতেছে গত বুন্দেসলিগায় মাত্র ২ পয়েন্ট পেছনে থেকে রানার্সআপ হওয়া বায়ার্ন। ওয়েবসাইট।

বাপুজির বাড়ি কিনে ভারতকে দেবেন এক ভক্ত

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের মহাত্মা গান্ধীর (বাপুজি) স্মৃতিবিজড়িত একটি বাড়ি এবার কিনে ভারত সরকারকে উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন এক গান্ধীভক্ত। ওই ভক্তের নাম প্রদীপ ভাবনানি। মুম্বাইয়ের একজন ব্যবসায়ী তিনি।
জোহানেসবার্গের ওই খড়ের ছাউনির বাড়িতে মহাত্মা গান্ধী ১৯০৮ থেকে তিন বছর অবস্থান করেছিলেন। ওই বাড়িটি বিক্রি করার জন্য বাড়ির বর্তমান মালিকেরা উদ্যোগ নিলেও তা কেনার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছিল না ওখানে। খবরটি জানতে পেরে মুম্বাইয়ের ওই ব্যবসায়ী বাড়িটি কিনে ভারত সরকারকে উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও জোহানেসবার্গ শহরজুড়ে মহাত্মা গান্ধীর নামে রাস্তাঘাট ও বহু স্মারক থাকলেও ওই বাড়িটি কেনার ব্যাপারে স্থানীয়দের কেউ উত্সাহ দেখাচ্ছিল না।

ইরানে বিরোধীদের শোকসভায় পুলিশের হামলা, সংঘর্ষ

ইরানের রাজধানী তেহরানে গত বৃহস্পতিবার বিরোধীদের একটি সমাবেশে হামলা চালিয়ে সেটি ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে দাঙ্গা পুলিশ। গত মাসে সে দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত স্মরণসভার প্রতি সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। এ ছাড়া একই দিন সন্ধ্যায় ওই নিহতদের কবরস্থানের পাশে আয়োজিত একটি স্মরণানুষ্ঠানেও পুলিশের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষ হয়।
গত ১২ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে পরাজিত প্রার্থী মির হোসেইন মৌসাভির সমর্থকেরা বিক্ষোভ করে। ওই বিক্ষোভে নেদা আঘা-সুলতানা নামের এক তরুণীসহ কমপক্ষে ১৭ জন নিহত হয়। ওই বিক্ষোভের তিন সপ্তাহ পর তেহরানে এটাই সবচেয়ে বড় সহিংসতার ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, মধ্য তেহরানে একটি ঈদগাহে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করে বিরোধীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা এ সময় রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েক শ বিক্ষোভকারী মোটরসাইকেলের হর্ন বাজিয়ে প্রতিবাদ জানায়।

ভারতের কর্ণাটকে খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে হত্যা

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকে গত বুধবার জেমস মুকালেল (৩৯) নামের এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে হত্যা করা হয়েছে। ভ্যাটিকানভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এশিয়ানিউজ গত বৃহস্পতিবার এ খবর জানায়। বৃহস্পতিবার সকালে গির্জা অভিমুখী রাস্তায় ওই ধর্মযাজকের বিবস্ত্র মরদেহ পাওয়া যায়।

থাকসিনের মুক্তি চেয়ে থাইল্যান্ডে ১০ হাজার মানুষের শোভাযাত্রা

থাকসিনকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার দাবিতে গতকাল
ব্যাঙ্ককের শোভাযাত্রায় মেয়েকে নিয়ে অংশ নেয় এই সমর্থক
থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার দাবি জানিয়ে গতকাল শুক্রবার প্রায় ১০ হাজার থাই নাগরিক ব্যাংককে শোভাযাত্রা বের করে। তারা এ সময় প্রায় ১০ লাখ লোকের স্বাক্ষর-সংবলিত ব্যানার প্রদর্শন করে। অংশগ্রহণকারীরা লাল শার্ট পরে অংশ নেয়।
থাইল্যান্ডের সরকার এর আগে বলেছিল সাধারণ ক্ষমার জন্য থাকসিনকে বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের আবেদন করতে হবে। কিন্তু এই আবেদন জানাচ্ছে তাঁর সমর্থকেরা। থাকসিন ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর বিদেশে পাড়ি জমান।
শোভাযাত্রার নেতৃত্বদানকারী জাতুপর্ন প্রোমপান জানান, আজ (গতকাল শুক্রবার) মধ্যরাতের আগে আরও অনেক লোক থাকসিনের মুক্তি চেয়ে ব্যানারে স্বাক্ষর করবে।

সফল অভিযান শেষে ফিরছে এনডেভর


আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) দীর্ঘ অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত খেয়াযান এনডেভরের নভোচারীরা। গতকাল শুক্রবারই তাঁদের পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি মহাকাশকেন্দ্রের কাছে বৃষ্টিপাত হওয়ার সামান্য আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টিপাত হলে নভোচারীদের অতিরিক্ত একটি দিন কক্ষপথে থাকতে হতে পারে।
এনডেভরের কমান্ডার মার্ক পোলানস্কি বলেন, প্রাথমিক লক্ষ্যগুলো তাঁরা সফলভাবে শেষ করেছেন। এখন সময় হয়েছে পৃথিবীতে ফেরার।
এনডেভরের নভোচারীরা তাঁদের মহাকাশ অভিযানে জাপানের কিবো সায়েন্স ল্যাবরেটরির চূড়ান্ত অংশ সংস্থাপন করেন।
এ ছাড়া আরও কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ স্থাপন করেন তাঁরা। স্টেশনের বিদ্যুৎসংরক্ষণ মডিউলে পুরোনো ছয়টি ব্যাটারি বদলে নতুন ব্যাটারি স্থাপন করেন নভোচারীরা।
এনডেভরের নভোচারীদের আইএসএসে অবস্থানের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন রেকর্ডসংখ্যক নভোচারী। ইউরোপ, জাপান, কানাডা, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এই অভিযানে রেকর্ড পাঁচবার মহাশূন্যে হেঁটেছেন নভোচারীরা। একজন নভোচারীর স্পেস স্যুটে সমস্যা দেখা দেওয়ায় মহাশূন্য পদচারণ একবার সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল।
১৫ জুলাই এনডেভর উেক্ষপণ করা হয়। এর আগে প্রতিকূল আবহাওয়া ও কারিগরি ত্রুটির কারণে পাঁচবার এনডেভরের উেক্ষপণ স্থগিত করা হয়।

হোয়াইট হাউসে ওবামার অন্য রকম ‘বিয়ার সন্ধ্যা’

ডান থেকে বারাক ওবামা,সার্জেন্ট
জেমস ক্রাউলি,অধ্যাপক হেনরি
লুইস গেটস ও জো বাইডেন
মুখ ফসকে ‘বর্ণবাদীসুলভ’ মন্তব্য করে যে উত্তেজনা তৈরি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, সেই ক্ষতে প্রলেপ দিলেন তিনি। উত্তেজনা প্রশমনের পদক্ষেপ হিসেবে সেই শ্বেতকায় পুলিশ কর্মকর্তা ও কৃষ্ণকায় শিক্ষকের সঙ্গে বিয়ার পান করলেন ওবামা। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে পুলিশ সার্জেন্ট জেমস ক্রাউলি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেনরি লুইস গেটসের সঙ্গে বসে ওবামা তাঁর মন্তব্য সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করেন। এ সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উপস্থিত ছিলেন। সংবাদমাধ্যমগুলো ওই ভোজ অনুষ্ঠানকে ‘বিয়ার সামিট’ বলে অভিহিত করেছে।
১৬ জুলাই ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিজ বাড়ির দরজার তালা খুলতে সমস্যায় পড়েন ওবামার বন্ধু অধ্যাপক হেনরি লুইস গেটস। ওই সময় স্থানীয় পুলিশকে কেউ ফোন করে জানায়, গেটসের বাড়িতে চোর ঢোকার চেষ্টা করছে। পুলিশ গিয়ে গেটসকে তালা খোলার চেষ্টারত অবস্থায় দেখে চোর হিসেবে সন্দেহ করে। এ নিয়ে ওই সময় সার্জেন্ট ক্রাউলি ও অধ্যাপক গেটসের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এবং পুলিশ গেটসকে গ্রেপ্তারও করে।
ওবামা ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে বর্ণবাদী ইঙ্গিত করে মন্তব্য করেন, তাঁর বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ‘বোকার মতো কাণ্ড’ করেছে। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ডানপন্থীরা ওবামার সমালোচনা করে বলেন, প্রেসিডেন্ট বর্ণবাদী মন্তব্য করেছেন। এদিকে পুলিশ সদস্যরাও ওবামার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হন।
উত্তেজনা কমাতে ক্রাউলিকে ফোন করে ওবামা তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্রাউলি ও গেটসকে হোয়াইট হাউসে বিয়ার পানের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বৃহস্পতিবার ওবামা বলেন, ‘আমি শুনেছি, কেউ কেউ এটাকে বিয়ার সামিট হিসেবে মন্তব্য করছেন। কিন্তু আসলে তা নয়। বরং আমরা তিনজন ব্যক্তিগত কিছু কথাবার্তা বলার মাধ্যমে বিষয়টি হালকা করার চেষ্টা করেছি।’ হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস ওই বৈঠককে ‘শিক্ষণীয় একটি মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ছয় জাতি সংলাপ শুরুর তাগিদ যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকা ছয় জাতি সংলাপ আবার শুরু করার তাগিদ দিয়েছে। একই সঙ্গে চাপ সৃষ্টি করতে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আরও অবরোধ আরোপের কথাও বলেছে। তবে জাতিসংঘের মহাসচিব উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে শুধু আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়া গত মে মাসে ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এতে কোরিয়া উপসাগর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। ছয় জাতি সংলাপে মূলত উত্তর কোরিয়ার পরমাণু বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়। এর সদস্যরা হলো চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া।
উত্তর কোরিয়া বলছে, এ আলোচনা শুধু তাদের পরমাণু প্রকল্পের ওপর হবে। তবে এ নিয়ে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে সেটা মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে দেশটি।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ইয়ান কেলি গত বৃহস্পতিবার জানান, ‘আমরা তাঁর আহ্বান পেয়েছি। তবে আমরা চাই দেশটির সঙ্গে বহুপক্ষীয় অর্থাৎ ছয় জাতি সংগঠনের মাধ্যমে আলোচনা করতে।’
উত্তর কোরিয়ার পরমাণু প্রকল্প এবং ওই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৭ সাল থেকে ছয় জাতি সংলাপ শুরু হয়।
ছয় জাতির অন্য সদস্যরা উত্তর কোরিয়ার পরমাণু প্রকল্প থেকে অস্ত্র তৈরি করছে অভিযোগ করলেও উত্তর কোরিয়া তা বারবার প্রত্যাখ্যান করে। দেশটি দাবি করছিল, তারা জ্বালানি তৈরি করতে পরমাণু প্রকল্প চালু করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সত্যি সত্যি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে।

অং সান সু চিকে আরও অপেক্ষায় রাখল মিয়ানমারের জান্তা

জাপানে বসবাসরত মিয়ানমারের নাগরিকেরা
টোকিওতে গতকাল গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং
সান সু চির মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করে।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা গতকাল শুক্রবার শেষ মুহূর্তে মুলতবি করা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বিচারকেরা মামলাটি পুনর্বিবেচনা করতে চান। তাই শেষ মুহূর্তে রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী ১১ আগস্ট রায় ঘোষণা করা হতে পারে। খবর এএফপি ও রয়টার্স অনলাইনের।
গৃহবন্দীর শর্ত ভাঙার খোঁড়া অভিযোগে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নেত্রী সু চির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত শুনানি গত সোমবার শেষ হয়। শুনানিতে সু চি এবং তাঁর দুই গৃহপরিচারিকা ও মার্কিন নাগরিক জন ইয়েত্তার আইনজীবীরা যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। গতকাল মামলার রায় ঘোষণার কথা ছিল। এ উপলক্ষে ইয়াঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেন কারাগারের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ওই কারাগারেই সু চিকে রাখা হয়েছে। সেখানেই বিশেষ আদালতে নেত্রীর বিচার চলছে।
গৃহবন্দী অবস্থায় সু চির বাড়িতে মার্কিন নাগরিক জন ইয়েত্তার অনুপ্রবেশকে গৃহবন্দীর শর্ত ভঙ্গ হিসেবে আদালতে উত্থাপন করা হয়। এটাকে দেশের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক তৎপরতা বলে জান্তার আইনজীবীরা উল্লেখ করেন। ওই নাশকতা থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনের ২২ ধারায় সু চির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
সু চির আইনজীবীরা মঙ্গলবার আদালতে বলেন, পরিস্থিতির ওপর সু চির হাত ছিল না। তা ছাড়া যে আইনের আওতায় সু চিকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সেটি ১৯৪৭ সালের সাংবিধানিক আইন। ২৫ বছর আগেই ওই আইনটির বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতারা দাবি করে আসছেন, খোঁড়া যুক্তিতে সু চির বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে। জান্তা সরকারের আসল মতলব দেশটিতে ২০১০ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখা।
সু চির বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের জান্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে রয়েছে। এ মামলার শুনানি চলাকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাঁর মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার তোপের মুখে রয়েছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের মুখপাত্র এবং পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্র গতকাল জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে জান্তা নিজের মুখ রক্ষার শেষ চেষ্টা করছে। যদিও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অনেক আগেই বিচারের রায় তৈরি করে রাখা হয়েছে। এ মামলায় দোষী সাব্যস্ত দেখিয়ে সু চিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
গত ২০ বছরের মধ্যে ১৪ বছরই মিয়ানমারের জান্তার হাতে বন্দী রয়েছেন সু চি। তাঁর আইনজীবী নিয়ান উইন গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, ‘সু চি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন। বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তির জন্যও তৈরি আছেন তিনি। এর প্রস্তুতি হিসেবে তিনি বেশকিছু বই ও ওষুধ সংগ্রহ করেছেন।’

ইরাকে ঝুলন্ত উদ্যানের ব্যাপক ক্ষতি করেছে মার্কিন বাহিনী

প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ইরাকের ব্যাবিলন শহরের বড় ধরনের ক্ষতি করেছে মার্কিন সেনারা। ওই শহরেই প্রাচীন যুগে বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম ঝুলন্ত উদ্যানটির অবস্থান। জাতিসংঘের নতুন একটি প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে। ইরাক আগ্রাসনের পর ওই ঝুলন্ত উদ্যানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল মার্কিন সেনারা।
২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনীর ইরাক অভিযানের কিছুদিন পরই ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানকে ঘাঁটিতে পরিণত করে মার্কিন বাহিনী। নাম দেওয়া হয় ‘ক্যাম্প আলফা’।
জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক চাহিদা মেটাতে উদ্যানটি পুনর্গঠনের কাজ করা হয়। পুনর্গঠনের কাজ করতে গিয়ে সেখানে ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ি, কাটাকাটি ও জায়গা সমান করে মার্কিন সেনা ও ঠিকাদারেরা। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হয় ঐতিহ্যবাহী উদ্যানটির।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইশতার গেট নামের উদ্যানটির মূল ফটক। এ ছাড়া উদ্যানের মূল অবকাঠামোগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইশতার ফটক প্রাচীন এই শহরের উত্তরাংশের প্রবেশপথ। নানা ধরনের প্রাণীর ভাস্কর্য দিয়ে ফটকটি সজ্জিত ছিল।
ইউনেসকোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ফটকের শোভাবৃদ্ধির জন্য ফটকে স্থাপিত নয়টি প্রাণীর ভাস্কর্যের ইট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্থাপন করা ঘাঁটিতে পরিখা খনন করে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। এতে উদ্যানের সমূহ ক্ষতি হয়েছে। কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করতে গিয়ে দেয়ালও ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শুধু মার্কিন সেনারাই নয়, চার হাজার বছরের পুরোনো ওই শহরটির ক্ষতি করেছে স্থানীয় অধিবাসীরাও। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঝুলন্ত উদ্যানটি দখল করে ছিল ক্যাম্প আলফা। এখন উদ্যানটির পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র আট লাখ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন ইরাকি কর্মকর্তা।
সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, তিনি জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি দেখেননি। নিরাপত্তার জন্যই উদ্যানের ভেতরে ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তলব করা হতে পারে ব্লেয়ারকে
ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক আমলা স্যার জন চিলকট বলেন, তদন্তের কাজে তিনি ইরাক যাবেন। ইরাকি কর্মকর্তা এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন। ইরাক সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলবেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ তদন্তটি কোনো আইনি আদালতের নয়। এখানে কারও বিচারও করা হচ্ছে না। তবে আমি কিছু জিনিস পুরোপুরি পরিষ্কার করতে চাই।’
তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হতে কেউ বাধ্য নন। তবে চিলকট বলেন, তিনি আশা করছেন কেউ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করবে না। ইতিমধ্যে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন টনি ব্লেয়ার।

রাখাইন তাঁতের ঠক ঠক by রহমান আরিফ

তাঁতে কাপড় বুনন রাখাইনদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হস্তচালিত তাঁতশিল্পকে পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরে বরগুনার রাখাইন সম্প্রদায় বেঁচে আছে। প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যরা তাঁতে কাপড় বুনে নিজস্ব পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকি কাপড় বাজারে বিক্রি করে উপার্জনের পথ ধরে রেখেছেন। রাখাইন তাঁতশিল্প লাভজনক পেশা হওয়া সত্ত্বেও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রতিনিয়ত এর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাঁতশিল্প রাখাইনদের ঐতিহ্যপূর্ণ জাতিগত পেশা। অনেক রাখাইন পরিবারে হস্তচালিত পুরোনো তাঁত রয়েছে। তাঁতে রাখাইন তরুণী ও নারীরা তাঁদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি অনুযায়ী নানা রঙের, নানা ধরনের কাপড় বুনে থাকেন। প্রথমত, তাঁরা নিজস্ব পরিবারের জন্য লুঙ্গি, চাদর, থামি, বিছানার চাদর প্রভৃতি তৈরি করে নিজেদের অভাব পূরণ করে থাকেন। আর বাইরে বিক্রি করার জন্য অবশিষ্ট সময় তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে কাপড় বোনার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তবে পুরুষেরা প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো বাজারজাত করে অর্থ উপার্জন করে থাকেন।
তাঁতশিল্প রাখাইনদের অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। অতীতে রাখাইনদের তৈরি রেশমি লুঙ্গি ছিল যথেষ্ট প্রশংসিত পণ্য। কিন্তু বর্তমানে সুতার অভাবে রেশমি লুঙ্গি বয়ন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
হস্তচালিত তাঁতশিল্পে উত্পাদিত লুঙ্গি, চাদর, ব্যাগ, রুমাল, উলের শার্ট পিস প্রভৃতির যথেষ্ট চাহিদা থাকলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে রাখাইনরা সফলতা অর্জন করতে পারছে না।
তালতলী রাখাইন অঞ্চলের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা মং তাহান বলেন, ‘কতগুলো সমস্যার সামাধান হলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধরে রাখতে পারব। এগুলো হচ্ছে, তালতলীতে রাখাইন তাঁতিদের জন্য একটি স্থায়ী সেমি-অটোমেটিক (এসএ) তাঁত বুনন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও উত্পাদন কেন্দ্র স্থাপন করা; রাখাইন তাঁতিদের জন্য এসএ তাঁত বুনন এবং রি-অ্যাকটিভ ও ভেজিটেবল রংকরণে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; এসএ তাঁত স্থাপন করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাঁতিদের তাঁত ও সুতা কেনার জন্য সহজ শর্তে প র‌্যাপ্ত পরিমাণ ঋণ প্রদান করা; রাখাইন তাঁতিদের জন্য সুতা ও রং ন্যায্যমূল্যে পাওয়ার ব্যবস্থা করা; রাখাইন তাঁতিদের তৈরি বস্ত্র যথাযথ বাজারমূল্যে বিক্রয়ের জন্য নিশ্চিয়তা প্রদান করা; বরিশাল টেক্সটাইল মিলস থেকে রাখাইন তাঁতিদের জন্য বরাদ্দ সুতার ব্যবস্থা করা; রাখাইনদের জন্য বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে একজন তাঁত প্রশিক্ষক সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োগ করা।
মেয়েদের তাঁতে কাপড় বোনাকে জাতিগত গুণ বলে গণ্য করা হয়। বিয়ের সময় এই গুণ অনেক কাজে দেয় বলে জানা যায়। যে মেয়েটি কাপড় বোনার কাজে যত বেশি দক্ষ ও পারদর্শী, বরপক্ষ তার সঙ্গে তাদের ছেলে বিয়ে দিতে ততই আগ্রহী। কেননা, সে পরিবারের ভরণপোষণের আর্থিক সমস্যা দূরীকরণে সাহায্য করতে পারবে।
রাখাইন পরিবারে তাঁতে কাপড় বুনতে জানে না এমন মেয়ে বিরল। মা বা পরিবারের বয়স্ক নারীরা পরিবারের কিশোরীকে সংসারের দেখাশেনার কাজের সঙ্গে সঙ্গে তাঁত বোনার কাজ শিক্ষা দিয়ে তাদের পারদর্শী করে তোলেন।
বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার তালতলী এলাকায় ৪৪টি পাড়া রয়েছে। এখানে এক হাজার ৩৮০টি পরিবার, বরগুনা সদর উপজেলার বড় বালিয়াতলী এলাকায় নয়টি পাড়ায় ৩৯০টি পরিবার বসবাস করছিল। বর্তমানে অভাব-অনটন ও নানা সামাজিক অসুবিধার কারণে রাখাইন পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে তালতলী এলাকায় ১৪টি পাড়ায় ২৬৪টি পরিবার ও বালিয়াতলী পাড়ায় একটিতে ২৬ পরিবার বসবাস করছে।
তালতলীর মুনখেপাড়ার মায়েমেন রাখাইন বলেন, ‘আমরা বেশি লেখাপড়া করতে পারি না বলে ভালো চাকরিও পাই না। এ জন্য তাঁতের কাপড় বুনে বাড়তি আয়ের দিকে মনোযোগী হই। এ শিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।’

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার: দুর্দশার গহ্বর -প্রবাসীশ্রমিক by সুমন রহমান, এ কে এম মোহসীন

সমপ্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে সে দেশের নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে (প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০০৯)। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের মানবেতর জীবন নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচারমাধ্যমে তোলপাড় হওয়ায় গত মার্চে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আমদানির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে করে প্রায় ৫৫ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি, যাঁরা মালয়েশিয়ায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য দুই বছর আগে টাকা-পয়সা দিয়ে বিমানে চড়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের ভাগ্যটি কার্যত আরও ঝুলে যায়। তখন থেকেই এসব শ্রমিকের নিয়োগ-এজেন্টদের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল, অচিরেই এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং তাঁরা মালয়েশিয়া যেতে পারবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি সেই আশার কফিনে আরেকটা পেরেক মারল। কে জানে এটাই শেষ পেরেক কি না!
২০০৬ সালে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে ৮৪ হাজার টাকা খরচ করে একজন বাংলাদেশি শ্রমিক চাকরি নিয়ে মালয়েশিয়া যেতে পারার কথা। যাঁরা গিয়েছেন তাঁরা কাগজ-কলমে ৮৪ হাজার টাকাই দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে দিয়েছেন দুই লাখ ২০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত টাকাটা ভাগজোক হয়ে গেছে কিছু বাংলাদেশি ফড়িয়া ও মালয়েশীয় এজেন্টদের মধ্যে। এই নির্বিচার লুটের বখরা দুই দেশেই অতি উচ্চপ র‌্যায় পর্যন্ত গেছে, এটাও অনেকের জানা। যা-ই হোক, কাগজ-কলমে যে ৮৪ হাজার টাকা, এর মধ্যে ওই শ্রমিকের এক বছরের লেভি (সরকারকে প্রদেয় কর) অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য দেশে যেখানে শ্রমিকের লেভি তাঁর নিয়োগদাতা কোম্পানি দিয়ে থাকে, মালয়েশিয়ায় সেটা অত্যন্ত অমানবিকভাবে শ্রমিকের বেতন থেকে কেটে নেওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে সেটা বছরে ৩০০ রিঙ্গিত থেকে এক হাজার ৮০০ রিঙ্গিত (বাংলাদেশি টাকায় ছয় হাজার টাকা থেকে ৩৬ হাজার টাকা) পর্যন্ত।
এখন ধরা যাক, একজন শ্রমিক আড়াই লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় এসে এমন একটা চাকরি পেয়েছেন, যেখানে নিয়মিত কাজ আছে এবং বেতন-ভাতা আছে। সে ক্ষেত্রে সার্ভিস সেক্টরে একজন শ্রমিকের আদর্শ বেতন মাসে ৬০০ রিঙ্গিত বা বাংলাদেশি টাকায় ১২ হাজার টাকার মতো। এই টাকা থেকে মাসে ১৫০ রিঙ্গিত লেভি, ১৫০ রিঙ্গিত খাওয়া খরচ, আরও ১০০ রিঙ্গিত অন্যান্য (ফোন, সিগারেটের খরচ ইত্যাদি)। বাকি থাকে ২০০ রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রা চার হাজার টাকার মতো। বছরে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এখন আড়াই লাখ টাকা দিয়ে তিন বছরের চুক্তিতে মালয়েশিয়ায় যাওয়া শ্রমিক তিন বছরে মোটের ওপর মাত্র দেড় লাখ টাকা বাড়ি পাঠাতে পারেন। ধরা যাক, তাঁর চুক্তি নবায়ন হলো আরও দুই বছর। মালয়েশিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি শ্রমিক সে দেশে পাঁচ বছরের বেশি কাজ করতে পারবেন না। তো, এই পাঁচ বছর নিয়মিত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার মাধ্যমে আমাদের শ্রমিকটি আসলে তাঁর ‘চালান’টিই ফেরত পাবেন মাত্র। আর এই ফেরত পাওয়া চালানকে রেমিট্যান্স ভেবে আমরা পরম আনন্দে বগল বাজাব!
এ তো গেল আদর্শ পরিস্থিতির কথা। মোটের ওপর ২০ শতাংশ শ্রমিকের এই ভাগ্য হয়েছে মালয়েশিয়ায়। বাদবাকি ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভয়াবহ। শুরু করি লেভি প্রসঙ্গ দিয়েই: সরকার নির্ধারিত ৮৪ হাজার টাকার মধ্যে ওই শ্রমিকের এক বছরের লেভি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও মালয়েশিয়ায় গিয়ে আবারও সেটা দিতে বাধ্য হন ওই ৮০ শতাংশ শ্রমিক। অর্থাৎ প্রথম বছর থেকেই কোম্পানি লেভি কর্তন করতে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা আরও ভয়াবহ: লেভি কর্তন করার পরও দ্বিতীয় বছরের শুরুতে কোম্পানি এবং এজেন্ট ওই শ্রমিকের চুক্তি নবায়নে থোক দুই থেকে আড়াই হাজার রিঙ্গিত দাবি করে। শ্রমিক যখন বলেন যে তিনি নিয়মিত লেভি দিয়েছেন, তখন তাঁকে বলা হয় ওটা লেভি নয়, ‘কমিশন’ ছিল! এখন টাকা দিতে না পারলে চুক্তি নবায়ন হবে না। আবার, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানি/ফ্যাক্টরিগুলো পুরো বছরের কাজ দিতে পারে না শ্রমিককে। গড়ে পাঁচ মাস থেকে নয় মাস কাজ থাকে তাঁর। বাকি সময় বসে বসে খেতে হয়। ফলে বছরে পাঁচ মাস থেকে নয় মাস কাজ করে যে টাকা তিনি উপার্জন করেন তা থেকে লেভি ও খাইখরচা বাদ দিলে যা থাকে তা দিয়ে আবার আগামী বছরের লেভি পরিশোধ করা তাঁর পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া, ক্রমাগত হাতবদলের চক্করে তাঁর ন্যায্য মজুরিও বুঝে পান না তিনি, চাইতে গেলে শারীরিক নিগ্রহ তো আছেই। তখন তাঁর সামনে তিনটা পথ খোলা থাকে: হয় দেশ থেকে টাকা এনে লেভি পরিশোধ করা, নয় দেশে চলে আসা (তাও যদি বিমানভাড়া থাকে), নয়তো ‘অবৈধ’ শ্রমিক হয়ে গিয়ে ফ্যাক্টরি বা এজেন্টের হাতে বন্দী হয়ে থাকা কিংবা পালিয়ে ফেরারি হয়ে যাওয়া।
বেশির ভাগ শ্রমিক তৃতীয় পন্থাটি বেছে নিতে বাধ্য হন। মালয়েশিয়ায় তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্টই ওয়ার্ক পারমিট। সেটা মালিকের জিম্মায় থাকে। মালিক বা এজেন্ট তখন এসব শ্রমিককে হয় তাঁদের ডর্মে বন্দী করে রাখে, নয়তো অন্য কোনো কোম্পানির কাছে বেচে দেয়। পাসপোর্টহীন এসব শ্রমিকের পক্ষে তখন সুদূর কুয়ালালামপুর পর্যন্ত গিয়ে হাইকমিশনে অভিযোগ করারও সাধ্য থাকে না। আর তাতে কোনো ফায়দাও নেই। ইতিমধ্যে জেনে গেছেন তাঁরা বাইরে বেরোলেই বিপদ। পুলিশের হাতে পড়লে শ্রীঘরে। পুলিশকে টাকা না দিলে নিশ্চিত কারাবাস। পাসপোর্ট যেহেতু মালিকের জিম্মায়, কাজেই রাস্তাঘাটে কোনো শ্রমিক ধরা পড়লে তাঁকে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে গিয়ে পুলিশ মোটা টাকা দাবি করে। শ্রমিক এত টাকা পাবেন কোথায়? এখন ধরা যাক তাঁর কোম্পানি, কোনো আত্মীয় বা নিয়োগকারী বাংলাদেশি এজেন্টের কাছ থেকে তিনি হয়তো পুলিশের ঘুষের টাকাটা ধার হিসেবে চাইবেন। সে ক্ষেত্রে ডিটেনশন সেন্টার থেকে ওই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বরে একটা মিসড কল দেওয়ার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়। ডিটেনশন সেন্টার থেকে প্রতিটি মিসড কলের চার্জ ১০ রিঙ্গিত!
এভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের যে অবস্থাটি মালয়েশিয়ায় দেখা যায়, তাকে ‘একবিংশ শতাব্দীর নব্য দাসপ্রথা’ বলে অভিহিত করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাংবাদিক এবং গবেষক। একটা দৃষ্টান্ত দিই: ২০০৮ সালে জোহর বাহরু এলাকায় এক ফ্যাক্টরির ৬০/৭০ জন শ্রমিকের লেভির টাকা ওই কোম্পানি সরকারকে পরিশোধ না করায় তাঁরা আইনত অবৈধ হয়ে যান। তখন এসব শ্রমিকের অন্য এজেন্টের কাছে বেচে দেওয়া হয়। লোকালয় থেকে বেশ দূরে এক পরিত্যক্ত দোকানঘরে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল তাঁদের। বাইরে যাওয়া বারণ ছিল, যেহেতু তাঁরা ‘অবৈধ’। ঘরে তালা লাগিয়ে রাখা হতো। কিছুদিন পরপর লরিতে করে তাঁদের কাজের জন্য এখানে-ওখানে নিয়ে যাওয়া হতো। দু-তিন দিন পরপর কিছু খাবার দেওয়া হতো। ৬০-৭০ জনের প্রাতঃকৃত্য সম্পাদনের জন্যও ছিল একটি বাথরুম, ওই খুপড়ি-লাগোয়া। এভাবে এই অসহনীয় দশায় তিন মাস কাটিয়ে গত মার্চ মাসে এই শ্রমিকেরা জানালা ভেঙে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে আমরা সেই ঘরটি দেখতে গিয়েছিলাম। ঘরের দেয়ালে বড় বড় করে বাংলায় লেখা ছিল—‘দোজখের আরেক নাম মালয়েশিয়া’!
এভাবে ফ্যাক্টরির ‘জেলখানা’ থেকে বের হয়ে ওই সব ভাগ্যবিড়ম্বিত শ্রমিক গোটা দেশটাকেই পায় জেলখানা হিসেবে। কয়েদির নিশ্চিত জীবনও তাঁর নয়। ফেরারি আসামির মতো পালিয়ে পালিয়ে কাজ করে চলেন তিনি। পদে পদে পুলিশ কিংবা তামিল গ্যাংস্টারদের নিগ্রহ তাঁকে তাড়া করে। কখনো এক শহরে কোনো ফ্যাক্টরি, কখনো অন্য শহরে কোনো দোকান, কখনো গ্রামে প্লানটেশন সেন্টারে, এভাবে দিনের পর দিন কাটে তাঁর। তিনি জানেন না তাঁর ভবিষ্যৎ কী, জানেন না দেশে ফিরতে পারবেন কি না। মালয়েশিয়ায় বৈধ শ্রমিকেরও কোনো ইনজুরি ইনস্যুরেন্স করা হয় না। অবৈধ হলে তো প্রশ্নই আসে না। ফলে কারও হাত-পা ভেঙে গেলে, আঙুল কেটে গেলে বা কেউ মারা গেলে এক পয়সাও ক্ষতিপূরণ নেই।
৫৫ হাজার শ্রমিকের মালয়েশিয়া-গমন যে কার্যত ঝুলে গেল তাতে আসলে ক্ষতি কতটুকু হলো? এসব শ্রমিকের অধিকাংশেরই নিয়োগদাতা কোনো না কোনো আউটসোর্সিং কোম্পানি, সরাসরি ফ্যাক্টরি নয়। তাদের হাতে যদি ১০০ শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার মতো চাকরি থাকে, তবে তারা এক হাজার বা পাঁচ হাজার শ্রমিক নিয়ে আসে। ভিসা ফির সঙ্গে পাওয়া অতিরিক্ত টাকাটার লোভে। চাকরিহীন অতিরিক্ত শ্রমিক তখন ওই আউটসোর্সিং কোম্পানির ডর্মে কার্যত বন্দী অবস্থায় থাকেন, এমনকি কখনো কখনো এয়ারপোর্ট থেকেও তাঁদের ছাড়িয়ে নেওয়া হয় না। তখন এয়ারপোর্টের ডিটেনশন সেন্টারে মাসের পর মাস কয়েদ করে রাখা হয় তাঁদের। আউটসোর্সিং কোম্পানি এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি অসাধু এজেন্টদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এই ৫৫ হাজার শ্রমিকের কতজনের যে সুনিশ্চিত চাকরি আছে সে বিষয়ে সবাই সন্দিহান। আমরা সরেজমিনে গিয়ে কথা বলেছি সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধি ও স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে। সবাই এই নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশ্বমন্দার এই সময়ে প্রায়-চাকরিহীন মালয়েশিয়ার বাজারে যেখানে অবস্থানরত পাঁচ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের একটা বড় অংশ অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে নতুন করে আরও ৫৫ হাজার শ্রমিককে ঠেলে দেওয়া যত না জনশক্তি রপ্তানি হবে, তার চেয়ে বেশি হবে মানব পাচার। কার স্বার্থে সেটা?
এ প্রশ্নকে সামনে রেখেই এগোতে হবে। সরকারকে জানতে হবে কোন ধরনের চুক্তির অধীনে এসব শ্রমিকের নিয়োগ হয়েছে? আদৌ এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না। বিদেশ গিয়ে কাজ করার আশায় এসব মানুষ আর কত দিন দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন? যদি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, তবে তাঁদের বিনিয়োগের টাকা ফেরত দেওয়া হবে কবে? বায়রার এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিদেশে শ্রমিক নিয়োগের প্রায় ৭০ শতাংশই সেসব দেশে অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি এজেন্টদের তৎপরতার মাধ্যমে হয়ে থাকে। এরা কারা? এদের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাবান লোকদের কী সম্পর্ক? জনশক্তি রপ্তানি জিনিসটাকে একটি অসাধু মাফিয়াচক্র দিন দিন মানব পাচার বা হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের সমার্থক বানিয়ে ফেলছে। এই দশা থেকে উদ্ধার পেতে হলে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে প্রবাসে শ্রমিক নিয়োগের প্রতিটি প র‌্যায়ে। মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করতে হবে এই প্রক্রিয়াকে, সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে একেবারেই যে জবাই করে ফেলছে অল্প কিছু লোভী মানুষ!
সুমন রহমান: সাহিত্যিক, গবেষক। এ কে এম মোহসীন: সাংবাদিক, সম্পাদক বাংলার কণ্ঠ।
sumanrahman@hotmail.com