Saturday, September 21, 2024

বিজয় ছিনিয়ে নিতে নানামুখি ষড়যন্ত্র চলছে: নজরুল ইসলাম খান

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিজয় ছিনিয়ে নিতে নানামুখি ষড়যন্ত্র চলছে। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে কেউ আইন হাতে তুলে নেবেন না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অর্জন কোনভাবে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।

শনিবার রাজধানীর গুলশানে বাড্ডা থানা বিএনপি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় ১৯টি পরিবার এবং আহতদের ৪০টি পরিবারের কাছে সহযোগিতার আর্থিক উপহার তুলে দেন নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম এ কাইয়ূম। এসময় নেতৃবৃন্দ আন্দোলনে আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন এবং ভবিষতেও আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, দেশ ও দেশের মানুষের জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সব সময় চিন্তা করেন। তার নির্দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত আহতদের জন্য ডাটাবেজ করা হয়েছে। সারাদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজে যুক্ত করা হচ্ছে। দলের পক্ষ থেকে নিহত, আহতদের পরিবারের কাছে যাওয়া হচ্ছে। তাদেরকে দলের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। প্রতিদিনই দলের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনে আহত ও নিহতদের জন্য সরকার কিছু আর্থিক অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও পরিবারদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অর্থের পরিমাণ দিয়ে তাদের ত্যাগের মুল্য দেয়া যাবে না। এই পরিরর্তিত দেশের জন্য তাদের মর্যাদা অতুলনীয়।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা তুলে ধরে নজরুল বলেন, সেদিন আমি কারাগারে। যখন খবর এলো স্বৈরাচারি খুনি শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন। তখন কারাগারে আনন্দের মিছিল শুরু হলো। কে কোন মামলার আসামি তার কোনো ঠিক নেই। সবার স্লোগানে-স্লোগানে প্রকম্পিত হলো কারাগার। সবার চোখে মুখে নতুন স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে। সেদিন যদি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান না হত তাহলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পেতেন না। আমিও কারাগার থেকে মুক্তি পেতাম না। এম এ কাইয়ুম ও নির্বাসিত জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে আজ আমাদের মাঝে ফিরে আসত না। তাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নিহত আহত পরিবারের প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ।
বাড্ডা থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এ জি এম শামসুল, সাবেক যুগ্ন আহ্বায়ক আতাউর রহমান, নগর নেতা তুহিরুল তুহিন, জাহাঙ্গীর মোল্লা, মাহফুজ চেয়ারম্যান, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হাজ্বী হারুন অর রশিদ প্রমুখ।

mzamin

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনা সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত: ফখরুল

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অস্থিরতার ঘটনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাকে আমি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করি না। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত আছে। একদিকে শূন্যতার সুযোগ নেয়া, অন্যদিকে জিও পলিটিক্সে যে পরিবর্তন ঘটছে মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে আশ-পাশের অঞ্চলে, ওইদিকে ভারতবর্ষের মনিপুরে যে বিদ্রোহ, এসবগুলোকে যদি আপনি আনেন, জিওপলিটিক্সের এই ঘটনাগুলো ভেরি সিগনিফিকেন্ট বলে আমি মনে করি। যেহেতু এখন কমেন্ট করাটা ঠিক হবে না।

 সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে, একটা বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়াকে শুরু করার চেষ্টা করা। অন্যদিকে শেখ হাসিনা পার্শ্ববর্তী দেশে থেকে যে সমস্ত কথা বলছেন, সেগুলো কতটুকু সত্য-মিথ্যা আমি জানি না। তবে সেই কথাগুলো এখানে বড় ইম্প্যাক্ট তৈরি করছে। বলা যায় যে, উদ্বিগ্ন হবার কারণ আছে। আর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর সচিবালয়ে আনসার বাহিনীর ঘেরাও, বিভিন্ন সংগঠনের নানা দাবি-দাওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মব লিঞ্চিং’, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার বিভিন্ন ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ উল্লেখ করে সরকারকে অস্থিতিশীল করতেই করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, যেমন শুক্রবার মেইন ঘটনাটা ঘটছে। আমাদের দলে যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীপেন দেওয়ান, উনি আগে এমপি প্রার্থী ছিলেন, তিনি আমাকে ফোন করে বললেন যে, স্যার ইমিডিয়েটলি কারফিউ দিতে বলেন, কারফিউ ছাড়া একে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তখন আমি জানার পরে যাদেরকে চিনি, তাদেরকে জানানোর পরে কারফিউ হয়নি, ১৪৪ ধারা দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। ঠিক এফেক্টিভ কন্ট্রোল তারা করতে পারেনি, এর মধ্যে এটা (ঘটনা) বিস্তারলাভ করেছে। এই যে দেরি হচ্ছে, এই দেরিটা কিন্তু ক্ষতির ব্যাপার হচ্ছে। এটাতে আমি তাদেরকে (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) দোষারোপ করছি না। যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে সঠিকভাবে পরামর্শ দেয়া, এটা করা উচিত। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এক্ষেত্রে অনেকটা গ্যাপ আছে। সমস্যাটা ওই জায়গায়।

তিনি বলেন, এই সরকার খুবই সিরিয়াস, তারা করতে চান, তারা সব কিছু করতে পারেন। আমার কথা হচ্ছে, আমরা সহযোগিতা করি। ইতিমধ্যে তারা অনেক বড় বড় কাজে হাত দিয়েছেন- সেগুলো আমরা দেখি। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে বিএনপির পরামর্শ কি জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, আমাদের পরামর্শ হচ্ছে,  মেইন পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর সঙ্গে কথা বলতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়ে হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে তো আমাদের চুক্তি আছে, এতো দিন কোনো সমস্যা হয়নি। এখানে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা তা নয়, সামাজিক সমস্যা আছে, এই সমস্যাগুলো দীর্ঘকাল ধরে, আমরা সমাধান করিনি। আওয়ামী লীগ সরকার এতো কথা বলেছে, চুক্তি করেছে কিন্তু সমস্যার সমাধান করেনি। এটা তো একদিনে হবে না, ওদের সঙ্গে বসতে হবে, কথা বলতে হবে, বিষয়গুলোকে আলাপ-আলোচনা করে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।

mzamin

নিউইয়র্কে দেখা হচ্ছে না ইউনূস-মোদির, তবে বাংলাদেশ-ভারত বৈঠক হবে :পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন

টাইমিংয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেখা হচ্ছে না। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের মধ্যকার বাংলাদেশ-ভারত বৈঠক হবে। এমনটাই জানিয়েছে সেগুনবাগিচা।

জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সূচি প্রায় চূড়ান্ত। শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা নিজেই এ তথ্য জানান।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিউ ইয়র্ক যাচ্ছেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দেখা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, উনাদের দুজনের নিউ ইয়র্কে উপস্থিতি এক সাথে হচ্ছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিউ ইয়র্ক থেকে আগে চলে আসছেন আর প্রধান উপদেষ্টা একটু পরে যাচ্ছেন। কাজেই তাদের সেখানে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জয়শঙ্করের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে এটা স্বীকার করতে হবে। সমস্যা সমাধান করতে হলে সমস্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করলে চলবে না। আমরা অবশ্যই টানাপোড়েন দূর করার চেষ্টা করবো এবং ওয়ার্কিং রিলেশন যেন হয়। তবে সম্পর্কটা হতে হবে মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে। এর ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং আমরা সেই চেষ্টাই করব।

এর আগে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা লিখিত বক্তৃতায় বলেন, ‘আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯-তম অধিবেশনের উচ্চ পর্যায়ের বিতর্ক পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে। এ অধিবেশনে যোগদানের জন্য প্রধান উপদেষ্টা আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে নিউইয়র্কে পৌঁছাবেন।’

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবার বাংলাদেশ থেকে শতাধিক সদস্যের প্রতিনিধিদল ভাড়া করা উড়োজাহাজে নিউ ইয়র্ক সফর করবেন না। বরং যার যেই সংশ্লিষ্টতা বা দায়িত্ব, সে অনুযায়ী যতটা সম্ভব সীমিত আকারে প্রতিনিধিদল গঠন করা হয়েছে। আমি আমার দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চ-পর্যায়ের সভাসমূহে অংশগ্রহণের জন্য ভিন্ন একটি ফ্লাইটে দুই দিন আগে নিউ ইয়র্কে যাবো। প্রধান উপদেষ্টা তিন দিন নিউ ইয়র্কে অবস্থান করে সফর শেষে ২৭ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এবছরের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এবছরই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে বাংলাদেশ একটি উচ্চ-পর্যায়ের সংবর্ধনার আয়োজন করছে। এতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানগণের পাশাপাশি জাতিসংঘের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, কিছু সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানবৃন্দ, বিভিন্ন সংস্থা প্রধানবৃন্দ অংশগ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করছি। এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, প্রধান উপদেষ্টার পরিচিতি এবং সুনাম বিশ্বব্যাপী। এ কারণে অনেকগুলো বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এছাড়া, বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সভায় অংশগ্রহণ করার জন্যও অনুরোধ এসেছে। যেহেতু তিনি মাত্র তিনদিন নিউ ইয়র্কে অবস্থান করবেন, সেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই স্বল্প সময়েরর মধ্যে সকলের অনুরোধ রক্ষা করা বেশ কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘২৭ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে বক্তব্য রাখবেন। তিনি তার বক্তব্যে বিগত দুই মাসে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানের বিবরণ ও আগামী দিনে জনভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও জনস্বার্থে নিবেদিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিকূলতা, উন্নয়নশীল দেশসমূহ হতে সম্পদ পাচার প্রতিরোধ, নিরাপদ অভিবাসন, অভিবাসীদের মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির টেকসই হস্তান্তর, এবং ফিলিস্তিন সম্পর্কিত বিষয়সমূহ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসতে পারে।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। তিনি নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, নেপালের প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘ মানবাধিকার সম্পর্কিত হাই কমিশনার, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, ইউএসএইডের প্রশাসক প্রভৃতির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। আসলে, এ সময়ে অনেক বৈঠকের সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তেও হয়ে যায়। সে বিবেচনায় নতুন বৈঠক তালিকায় যোগ হতে পারে; আবার সময়ের অভাবে কোনো বৈঠক বাদও যেতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ইতালির প্রেসিডেন্ট এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আয়োজনের আলোচনা চলমান রয়েছে। এছাড়াও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধান উপদেষ্টার সাথে দেখা করতে পারেন বলে আলোচনা চলছে।'

পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, ‘এবারের সাধারণ অধিবেশনের সাইড লাইনে আমিও বেশ কয়েকটি ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবো। এর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’। আগামী ২২-২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিতব্য ‘সামিট অব দ্য ফিউচার’-এ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ‘প্যাক্ট অব দ্য ফিউচার’ শীর্ষক একটি ভবিষ্যৎমুখী ঘোষণাপত্র অ্যাডাপ্ট করবেন। এই ‘প্যাক্ট অব দ্য ফিউচার’-এর সংযুক্তি হিসেবে ‘ডিক্লারেশন অন দ্য ফিউচার জেনারেশন’ এবং ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’ শীর্ষক আরও দু’টি ঘোষণাপত্র গৃহীত হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

উল্লেখ্য, এই তিনটি ডকুমেন্ট-এর চলমান নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা ও মত বিনিময়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কর্তৃক জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় ঢাকায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এছাড়া আমি আরও যে সকল সভায় অংশগ্রহণ করবো বলে আশা করছি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মন্ত্রীপর্যায়ের সভা, কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণের সভা, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সভা, স্বল্পোন্নত দেশসমূহের বার্ষিক মন্ত্রীপর্যায়ের সভা, এশিয়া সহযোগিতা সংলাপের মন্ত্রী পর্যায়ের সভা ইত্যাদি।'

পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, ‘এছাড়া আমরা রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে একটি উচ্চ-পর্যায়ের সাইড ইভেন্টও আয়োজন করছি। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কার কাজ শুরু করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এবারের অধিবেশন নতুন বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘে বা বিশ্ব সভায় নতুন পদচারণা। এবারের অধিবেশনে আমাদের কাছে একটি বিরাট সুযোগ বিশ্ব দরবারে এই বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশকে উপস্থাপনের জন্য।’

তিনি বলেন,  ‘জাতিসংঘের অগ্রাধিকার ইস্যুগুলোর প্রত্যেকটি বাংলাদেশের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ইস্যুগুলোর ওপর যেসব ইভেন্ট আছে, সেগুলোর সবকয়টিতেই বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসাবে মনে করে বাংলাদেশ। সার্বিক বিবেচনায় এবারের অধিবেশনে উপদেষ্টার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করবে আশা করা যাচ্ছে।’

mzamin

পার্বত্য চট্টগ্রামে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি -উপদেষ্টা নাহিদ

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার কোথাও সরকারিভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি জায়গায় সমস্যা হয়েছিল’। শনিবার সকালে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার আন্ধারমানিক এলাকায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করে তিনি এ কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারিভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করার বিষয়টি সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, এমন প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। একটি পক্ষ থেকে অতিরঞ্জিত করে বলা হচ্ছে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য জেলাগুলোতে বহুমুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে দেশের মানুষ সতর্ক ও রাষ্ট্র গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে।’

ফেনীতে বন্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারতের উজানের পানিতে ফেনীতে বন্যা হয়েছে। এখন কীভাবে ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারি, বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে করা যায় কিনা সেটিও ভাবতে হবে। বন্যা পরবর্তী এখন পুনর্বাসন কার্যক্রম কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে গৃহ নির্মাণের চাহিদা এবং শিক্ষা উপকরণের ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করে দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। আশা করছি সবাই ঘর পাবেন, কেউ গৃহহীন থাকবেন না।’

পরে উপদেষ্টা বন্যাকবলিত ফুলগাজী উপজেলার জগতপুর এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ফেনী জেলা প্রশাসক মুসাম্মৎ শাহীনা আক্তার, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান ও ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে তথ্য উপদেষ্টা ফুলগাজীর আনন্দপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ইস্তিয়াক আহমেদ শ্রাবনের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

জুতা থেকে ঘড়ি, তাহাদের বিলাসী জীবন

সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। ছিলেন হাসিনা সরকারের ভূমিমন্ত্রী। নীতিকথা বলতেন প্রায়ই। মাঝে মাঝে বিভ্রম হতো। বুঝি মসজিদের ইমাম। আল-জাজিরার ক্যামেরায় বন্দি তার হাসিটা দেখার মতো। গর্বভরে বলেছেন নিজের বিলাসী জীবনের কথা। কুমিরের চামড়া দিয়ে তৈরি জুতা পরেন তিনি। বিলাতে গেলে কেবল সুট কিনতে খরচ করেন কয়েক কোটি টাকা।

ওবায়দুল কাদের। সাবেক সেতুমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সেতুমন্ত্রী। ফেসবুকে একের পর এক সুটেড-বুটেড ছবি দিয়ে আলোচনায় থাকতেন। এ নিয়ে সমালোচনাও হতো অনেক। কিন্তু ওবায়দুল কাদের তা পাত্তা দিতেন না। ছবি শেয়ার করতেন আরও বেশি করে। তার ঘড়ি বিলাস নিয়ে নেত্র নিউজের একটি রিপোর্ট রীতিমতো তোলপাড় তৈরি করেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, একজন মন্ত্রী ঘড়ি কেনার জন্য লাখ লাখ টাকা পান কোথায়।

বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদও। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে এরইমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তার ঘড়ি বিলাস নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চর্চা হয়েছে অনেক।

আল জাজিরার কাছে জাভেদের স্বীকারোক্তি: আল জাজিরার অনুসন্ধানী রিপোর্টে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদকে তার বিলাসী জীবনের স্বীকৃতি দিতে দেখা যায়। তিনি একজনকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, তোমার জুতা আমার পছন্দ হয়েছে। ওই ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন, সত্যিই পছন্দ হয়েছে? সম্মতি জানিয়ে সাইফুজ্জামান জানতে চান জুতা কোন ব্র্যান্ডের? এটি টেইলর ব্র্যান্ডের। সাইফুজ্জামান বলেন, আমিও আমার জুতা হেরডস থেকে অর্ডার করেছি। এটি তৈরি হতে চার মাস সময় লাগে। প্রতিটি জুতার দাম ৩ হাজার পাউন্ড। এক্ষেত্রে এক জোড়া জুতার দাম ৬ হাজার পাউন্ড বা ৯ লাখ টাকা। এগুলো বাচ্চা কুমিরের পেটের চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। যদি পুরো জুতায় কুমিরের পেটের চামড়া ব্যবহার করা হয় তাহলে একটি জুতার দাম দাঁড়ায় ৬ হাজার পাউন্ড, এক্ষেত্রে এক জোড়া জুতার দাম ১২ হাজার পাউন্ড বা ১৮ লাখ টাকা। অর যদি জুতায় অর্ধেক কুমির এবং অর্ধেক গরুর বাছুরের চামড়া ব্যবহার করা হয় তাহলে একটি জুতার দাম পড়ে ৩ হাজার পাউন্ড। প্রতিবার লন্ডন গেলে সাইফুজ্জামান সুট কিনতে ২ থেকে ৩ লাখ পাউন্ড খরচ করেন। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ থেকে সাড়ে চার কোটি টাকা। সাইফুজ্জামান বলেন, আমি সুট ভালোবাসি। আমি সুপার ২০০, সুপার ১৮০ এর সুট ক্রয় করি। সুপার ২০০ এর দাম ৬ হাজার পাউন্ড বা ৯ লাখ টাকা।

ওবায়দুল কাদেরের ঘড়ি ও সেলফি: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ই আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ওবায়দুল কাদেরকে জনসম্মুখ দেখা যায়নি। ২০১৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বর তার ঘড়ি বিলাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে নেত্র নিউজ। ওই রিপোর্টে বলা হয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নির্বাচন কমিশনে কাদেরের নিজের দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ীই ২০০৮/২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি দুর্নীতির মামলা চলমান ছিল। এই মামলাগুলো হয়েছিল মূলত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতে মামলাগুলো বাতিল হয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে তৎকালীন এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আবারো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, আর এই অভিযোগে নতুনত্বও ছিল বটে।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নেত্র নিউজের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন একজন হুইসেলব্লোয়ার। তিনি দাবি করেছিলেন যে উৎকোচ হিসেবে বিশ্ব-বিখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামি হাতঘড়ি উপহার পেতে পছন্দ করেন কাদের। মোটা অঙ্কের একটি কন্ট্রাক্ট পাস করে দেয়ার বিনিময়ে মন্ত্রী কাদের বিলাসবহুল একটি ব্র্যান্ডের খুবই দামি একটি হাতঘড়ি উৎকোচ হিসেবে নিয়েছেন, এমন একটি লেনদেন খুবই কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এই অভিযোগকারী। অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে তিনি আমাদের ঘড়িটির বিশেষ সিরিয়াল নম্বরসহ ছবি ও এই ঘড়ির আসল উৎস সংক্রান্ত দলিলও দেখিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠকে ওবায়দুল কাদের ঘড়িটি পরে আছেন এমন ছবিও এই হুইসেলব্লোয়ার আমাদের দেখাতে সক্ষম হন। তিনি দাবি করেন যে ওবায়দুল কাদেরের ‘মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা’ লোকজনের কাছে, বিশেষ করে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারদের কাছে, মন্ত্রীর এই হাতঘড়ির লোভ একটি ‘ওপেন সিক্রেট’।

এই হুইসেলব্লোয়ারের সঙ্গে নেত্র নিউজের সমঝোতা অনুযায়ী এবং আমাদের এই সংবাদ সূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার্থে আমরা উল্লিখিত হাতঘড়িটির বা উক্ত লেনদেনের ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারছি না, কারণ তাহলে অভিযোগকারী ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে এবং তিনি বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন।

তবে এই হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়েই আমরা ওবায়দুল কাদেরের দামি হাতঘড়ির এক চমকপ্রদ সংগ্রহের সন্ধান পেয়েছি। এই ঘড়িগুলো, যার এক একটির মূল্য কয়েক লাখ টাকা, এতদিন আমাদের চোখের সামনেই ছিল। কেতাদুরস্ত পোশাক পরে ওবায়দুল কাদের যে তার ভেরিফায়েড ফেসবুকের প্রোফাইলে নিয়মিত ছবি পোস্ট করেন সেখান থেকেই তার হাতঘড়ি পরা কয়েকশ’ ছবি আমরা সংগ্রহ করি।

সংগৃহীত ছবিগুলো থেকে দামি ব্র্যান্ডের হাতঘড়িগুলো খুঁজে বের করতে আমরা সাহায্য নেই ঘড়ি বিশেষজ্ঞ, ঘড়ি সংগ্রাহক আর রেডিটে হাতঘড়ি সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যদের। দাশি অলঙ্কারের বাজার হিসেবে প্রসিদ্ধ লন্ডনের হ্যাটন গার্ডেনের হাতঘড়ির দোকানদারদের সঙ্গেও আমরা কথা বলি। এই বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আমরা ওবায়দুল কাদেরের কব্জিতে শোভা পাওয়া কয়েকটি ঘড়ি মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। রোলেক্স, উলিস নাদা আর লুই ভিতন ব্র্যান্ডের এই ঘড়িগুলোর সর্বমোট মূল্য কোটি টাকারও বেশি।

ওবায়দুল কাদের তার নিজের টাকা দিয়েই এই হাতঘড়িগুলো কিনেছেন এমনটি অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু তার আয়ের যে হিসাব আর সম্পদের যে বিবরণ আমরা সংগ্রহ করেছি তাতে হিসাব ঠিক মিলছে না।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে মন্ত্রী কাদের ২০১৮ সালে যে হলফনামা দাখিল করেছেন সেখানে তিনি তার আয়কর সনদও জুড়ে দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে তার মোট বাৎসরিক আয় ছিল ৩১,১৭,৬৫১ টাকা। তার মধ্যে ১২,৬০,০০০ টাকা তিনি মন্ত্রীর বেতন-ভাতা হিসেবে পেয়েছেন আর ৪,৮৯,৬৫১ টাকা পেয়েছেন বই লেখার রয়্যালিটি বাবদ। অন্যদিকে তার একটি রোলেক্স ডে ডেট ঘড়ির দামই ২৮,৮৬,০০০ টাকা। আবার তার দাখিল করা হলফনামা বা আয়কর সনদে এই দামি হাতঘড়িটির বা অন্য ঘড়িগুলোর কোনো উল্লেখই নেই, যা নির্বাচনী বিধিমালা আর আয়কর আইনের লঙ্ঘন বটে।

ওবায়দুল কাদেরের হাতঘড়িগুলো নকল বা রেপ্লিকা কিনা সেটাও আমরা যাচাই করার চেষ্টা করেছি। এই ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি নকল ঘড়ির বিষয়ে ওয়াকিবহাল এমন একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যার রেপ্লিকা ঘড়ির ব্যবসাও আছে। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, কাদেরের হাতঘড়িগুলোর মধ্যে কয়েকটি নকল বা রেপ্লিকা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে তার সবচেয়ে দামি হাতঘড়িগুলো নকল বা রেপ্লিকা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ এগুলো বেশ নতুন মডেলের যা এখনও রেপ্লিকা হয়নি। আবার তার কয়েকটি ঘড়ি এমন যে, সেগুলোর রেপ্লিকার দামও কয়েক হাজার মার্কিন ডলার।

বিশ্ব-বিখ্যাত ব্র্যান্ডের দামি এই হাতঘড়িগুলোর ব্যাপারে ওবায়দুল কাদেরের নিজের ব্যাখ্যা জানতে ও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে আমরা তার কাছে একটি প্রশ্নমালা পাঠাই তার জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে। কিন্তু এখনও আমরা তার কাছ থেকে কোনো জবাব পাইনি।

বেশ কিছুদিন ধরেই ওবায়দুল কাদের দুর্নীতির ব্যাপারে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সদ্যঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে।
অক্টোবর মাসের প্রথম দিকেই এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমাদের দলের ও সরকারের কোনো মন্ত্রী ও এমপি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের খোঁজ পেলে আপনারা তা লিখুন, তুলে ধরুন। আমাদের তথ্য দিন। আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’ সেই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী কাদেরের কব্জিতে ঠিক কোন ঘড়িটি শোভা পাচ্ছিলো সেটি আমরা এখনও চিহ্নিত করতে পারিনি।

সেলফির বাহার: টানা তৃতীয় বারের মতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা ওবায়দুল কাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সরব ছিলেন। ফেসবুকে তিনি নিয়মিত ছবি প্রকাশ করতেন। সেটা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে বেশ আলোচনা, সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিতো। তবে সরকার পতনের আগে সর্বশেষ গত ৫ই জুলাই তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৮টি ছবি পোস্ট করেন। কালো মুজিব কোট ও সাদা পাঞ্জাবি পরে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় এসব ছবি পোস্ট করেন। এরপর ফেসবুকে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি এই সাবেক মন্ত্রীকে।

প্রতিনিয়ত একই স্টাইলের ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিতেন সাবেক এই মন্ত্রী। কখনো ঘড়ি দেখা, কখনো টেলিফোনে কথা বলা, কখনো ম্যাগাজিন পড়া, কখনো ফুল বাগানে দাঁড়িয়ে ছবি- এই রকম নানা রকম ছবি তুলতেন তিনি। অনেক সময় একসঙ্গে একশ’টির বেশি ছবি পোস্ট দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন ওবায়দুল কাদের। নানা ক্যাপশান লেখা এসব ছবির নিচে অনেকের বিভিন্ন রকমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক মন্তব্য দেখা যেতো।

এ ছাড়াও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গে ছবি পোস্ট করতেন তিনি। মন্ত্রীর মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত পদে থেকে এমন ছবি বিলাস সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক সাড়ার থেকে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলতো বলে মনে করতেন অনেকে।

বেনজীর আহমেদের ঘড়ি বিলাস:
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে বেশ আলোচনায় ছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। গত ৩১শে মার্চ একটি গণমাধ্যমে ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অবৈধ টাকায় কেনা হয় বলে সেই প্রতিবেদনে উঠে আসে। তবে এটাই প্রথম নয়, এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ঘড়ি বিলাস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
২০২০ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে দায়িত্বে থাকা বেনজীর আহমেদের ঘড়ি বিলাস নিয়ে সমালোচনার জন্ম দেয়। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দামি রোলেক্স ঘড়ি ব্যবহার নিয়ে সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।

২০২১ সালের ২২শে ডিসেম্বর রোলেক্স ঘড়ি পরা বেনজীর আহমেদের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেন নেত্র নিউজ সম্পাদক তাসনীম খলিল। সেখানে তিনি ওই ঘড়ি মূল্য ৯ লাখ টাকা বলে দাবি করেন। এরপর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী এখন ৯ লাখ টাকার রোলেক্স ঘড়ি পরে। উনার কালেকশনে আর কী আছে দেখা দরকার।’

mzamin

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ধুম্রজাল

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।  তিনি যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্র‍য় নিয়েছিলেন, তার আওতায় নির্ধারিত মেয়াদ ৪৫ দিন শেষ হয়েছে। এখন তিনি ভারতে- কী অবস্থায়, কোন মর্যাদায় অবস্থান করছেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা। এরই মধ্যে ফিনান্সিয়াল টাইমস তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের স্বৈরাচারী নেত্রী শেখ হাসিনা গত মাসে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি ভারতে যাওয়ার পর থেকেই দিল্লির নৈশভোজগুলোতে আলোচনার বিষয় হচ্ছে হাসিনা এখন ঠিক কোথায়?


৫ই আগস্ট যখন বিক্ষোভকারীরা তার ঢাকার বাসভবনের দিকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যায় তখন হাসিনা পদত্যাগ করেন। পরে বাংলাদেশের একটি সামরিক হেলিকপ্টার যোগে ভারতের গাজিয়াবাদের কাছে একটি বিমান বাহিনীর ঘাঁটিতে অবতরণ করেন। তখন থেকেই শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এ বিষয়টি নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। এর চেয়ে বেশি কিছু জানায়নি ভারত। তবে বিষয়টি নিয়ে মানুষের আলোচনা চলছেই।

বিশ্বাসযোগ্যতায় গড়মিল আছে। কিন্তু ভারতের একটি শ্রেণির সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে দাবি করেছেন যে, ক্ষমতাচ্যুত শক্তিশালী নারী (হাসিনা) ভারতীয় সরকারের একটি নিরাপদ বাসভবনে রয়েছেন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দিল্লিভিত্তিক আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব নেয়া নিজ মেয়ের সাথে আছেন, এমনকি তাকে তার সঙ্গীদের সঙ্গে ভারতের রাজধানীর অন্যতম সেরা পার্ক লোধি গার্ডেনে ঘুরে বেড়াতেও দেখা গেছে।

মোদি সরকার, হাসিনার ঘনিষ্ঠ বিদেশি সমর্থক ছিল। যখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল তখন তাদের শাসনের বিষয়ে মোদি প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ। দিল্লির দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলো বেশিরভাগই এই ভান করা থেকে বিরত রয়েছে যে, তারা হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত-পরবর্তী প্রথম সাক্ষাৎকারটি পাবে।

এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। হসিনার পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জুলাই অভ্যুত্থানে শত শত হত্যার জন্য হাসিনাকে দায়ী করেছে ড. ইউনূসের সরকার। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৩ সালে চুক্তিটি করেছিল হাসিনার সরকার। তত্ত্বগতভাবে এই চুক্তিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি বাংলাদেশের নতুন সরকার তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ‘ভারতের সাথে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, আমরা তাকে (হাসিনাকে) বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণের দাবি জানাতে পারি। আপাতত, আমরা আশা করি ভারত তাকে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা ঘটাতে দেবে না, তিনি মিথ্যা ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

হাসিনাকে দায়ী করা বিতর্কিত মন্তব্য সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের পরে ড. ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, যতক্ষণ না বাংলাদেশ তাকে ফেরত চায় ভারত তাকে রাখতে পারবে, তবে শর্ত হবে তাকে সেখানে চুপ করে থাকতে। (এ কথায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছিলেন)

পালিয়ে আসা আঞ্চলিক নেতাদের আশ্রয় দেয়ার ইতিহাস রয়েছে ভারতের। ১৯৫৯ সালে চীনের অভিযানের মুখে তিব্বত থেকে পালিয়ে ভারতে বসতি আশ্রয় নেন আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। তিনি রাজনৈতিক বিষয়গুলি ভারতের বেসামরিক নির্বাসিত প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়েছেন। এই পদক্ষেপে চীন ক্ষুব্ধ হয়েছে। বেইজিং এবং এর বিশ্লেষকদের মতে মোদি সরকারের সম্মতি ছাড়া এমনটি ঘটেনি।

আফগান নেতা মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার ১৯৯২ সালে ভারতে পালিয়ে যায়। সেখানে তার স্ত্রী ফাতানা নাজিব এবং সন্তানরা এখনও তাদের বেশিরভাগ সময় কাটান বলে জানা গেছে। (তারা সাধারণ জনতার দৃষ্টি এড়িয়ে থাকছেন; নাজিবুল্লাহ নিজে পালানো থেকে বিরত ছিলেন এবং কয়েক বছর জাতিসংঘের একটি কম্পাউন্ডে আশ্রয় নেওয়ার পর, ১৯৯৬ সালে কাবুলে প্রবেশ করার সময় তালেবানরা তাকে হত্যা করে)। তার লাশ একটি ট্রাফকি লাইটের খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখে ।

১৯৭৫ সালে যখন শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যা করা হয় তখন শেখ হাসিনা নিজেও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন বেশ কয়েক বছর তারা ভারতে ছিলেন। ভারতের মনমোহন সিং সরকারের পররাষ্ট্রসচিব ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন শিবশঙ্কর মেনন। তিনি বলেছেন, প্রতিবেশী অঞ্চল থেকে ভারতে আসার অনেক নজির রয়েছে। আমরা সবসময় তাদের থাকার অনুমতি দিয়েছি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আমাদের ইচ্ছাকে সম্মান করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে দূরে থেকেছেন।

হাসিনা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে সমর্থিত। সেখানে তাকে ইসলামপন্থী চরমপন্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসাবে দেখা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার প্রয়াত পিতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ভারতে তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদশেকে সর্মথন দিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন ইন্দরিা গান্ধী সরকার। এ জন্য ভারতকে বেশ মূল্য দিতে হয়।

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এবং ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার তত্ত্বটি ছিল একটি ‘রঙিন বিপ্লব’ বা মার্কিন সমর্থিত একটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, যে দেশটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। ভারতে মোদিপন্থী লোকজনের বাইরেও এই ধারণার বিস্তৃতি রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে হাসিনার অবস্থানের যে সংবেদনশীলতা তার অর্থ হচ্ছে সতর্কতার আবরণ আপাতত তার অবস্থানকে ঘিরে রাখতে পারে – যে পরিকল্পনা নয়াদিল্লিরই করা।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মেনন বলেছেন, এগুলো ঘনিষ্ঠতার সমস্যা। আমাদের প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো সূক্ষ্ম হয়। আমরা বিশ্বের অন্য প্রান্তের দেশগুলির সাথে কাজ করছি, বিষয়টি এমন নয়।

mzamin

মোহাম্মদপুরে সাদেক খানই ছিলেন সব by সুদীপ অধিকারী

সাদেক খানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেন, আমাদের একটি গোয়েন্দা উইং রয়েছে। তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক আগে থেকেই তারা সাবেক এমপি সাদেক খানের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। তারা অনেক তথ্য-প্রমাণও পেয়েছেন। সেই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই সাদেক খানের বিরুদ্ধে আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, শিয়া মসজিদ, আদাবর, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, বুদ্ধিজীবী, জাফরাবাদ, পুলপাড়, গদিঘর, রায়েরবাজার নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪নং ওয়ার্ড পুরোটাই এই আসনের অন্তর্গত। রাজধানীর এই বিশাল এলাকার  বেশির ভাগেরই নিয়ন্ত্রণ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খানের হাতে। মোহাম্মদপুর, কাটাশুর, জাফরাবাদ, বুদ্ধিজীবী, রায়েরবাজার, গদিঘর, বসিলা, ঢাকা উদ্যান এলাকায় তিনিই সর্বেসর্বা। তার মতের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারোর-ই নেই। নিজেদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভয়ের রাজনীতি কায়েম করে এলাকাটিতে বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, ফিলিং স্টেশন, কাঁচামালের আড়তসহ নামে বেনামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। যার অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।

সাদেক খান ১৯৭৩ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্র লীগের সদস্য পদের মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত  অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ৪৭ নং ওয়ার্ড ও বর্তমান ৩৪ নং ওয়ার্ড থেকে পরপর চার বার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। দুইবার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সে সময় থেকেই নিজের দলের মধ্যেই একাধিক গ্রুপিং সৃষ্টি করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে রাতের ভোটে হন ঢাকা-১৩ আসনের এমপি। এরপর আর পেছনে তাকানো লাগেনি তার। নিজের সন্ত্রাসী বাহিনীর দাপটে সরকারি খালের জমি দখল, হিন্দু সম্পত্তি দখল করে গড়ে তুলেছেন সাদেক ফিলিং স্টেশন, সাদেক নগর মডেল টাউন, সাদেক খান কৃষি মার্কেট, সাদেক খান হাঁস-মুরগির মার্কেট, সাদেক খান শুঁটকি মার্কেট, সাদেক খান ইট মার্কেট, সাদেক খান বালি মার্কেট, সাদেক খান বস্তিসহ একাধিক সম্পত্তি। ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নিজ নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক রাস্তারও নামকরণ করেছেন তিনি। রায়ের বাজার গদিঘর এলাকার ৫৪ নম্বর বাড়িতে বাস করলেও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট রয়েছে তার। মোহাম্মদপুর বসিলা, ৪০ ফিট, ঢাকা উদ্যান এলাকায় সরকারি খাল ভরাট করে যেসব আবাসন গড়ে উঠেছে, অভিযোগ আছে এর নেপথ্যে কাজ করেছেন সাবেক এই সাংসদ। প্রতিটি আবাসন কোম্পানিকে প্রতি মাসেই মোটা অঙ্কের প্রোটেকশন মানি দিতে হতো তাকে।

সরজমিন দেখা গেছে, পশ্চিম ধানমণ্ডির রায়ের বাজার মসজিদের পেছন থেকে সোজা চলে গেছে হাশেম খান রোড। রোডটি গিয়ে গাবতলী-সদরঘাট রোডের যেই স্থানে মিলিত হয়েছে ঠিক তার ডান হাতেই ‘সাদেক ফিলিং স্টেশন’। যেটি পুরো পশ্চিম ধানমণ্ডির পানি নিষ্কাশনের পানি বের হওয়া খালের জায়গার ওপর। পুরো ফিলিং স্টেশনটিই পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালের জায়গা ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে।  আর এই ফিলিং স্টেশনের পেছনেই রয়েছে ‘সাদেক নগর মডেল টাউন’ নামে বিশাল আবাসন প্রকল্প। তেল পাম্পের পেছনে চারপাশে দেয়ালে ঘেরা এই মডেল টাউনে রয়েছে একাধিক বিশাল বহুতল ভবন। আর ভবনগুলোর যাতায়াতের রাস্তার পাশে এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। সাইনবোর্ডের পাশ দিয়েই চলে গেছে ভবনে ঢোকার প্রবেশ দ্বার। আর পাম্পের ভেতর দিয়ে ভবনগুলোতে যাওয়া-আসার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ রাস্তা। সাবেক এই সংসদ সদস্য প্রায়ই সেখানে সময় কাটাতেন। ফিলিং স্টেশনের সামনের গাবতলী-সদরঘাট রাস্তা ধরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দিকে এগুতেই হাতের বামে রাস্তার পাশের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘সাদেক খান শুটকি মাছের আড়ৎ’। ইটের অর্ধেক দেয়ালের ওপর স্টিলের পাত ও টিন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এই শুঁটকি মাছের আড়ত। এরপরই রয়েছে ‘সাদেক খান হাঁস-মুরগির আড়ত’। রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সঙ্গে লাগোয়া এই মার্কেটে প্রতিদিন রাতে-দিনে লাখ লাখ টাকার বেচা-কেনা চলে। এর থেকে কয়েক পা সামনে গেলেই মেইন রাস্তার দুইপাশ দিয়েই রয়েছে সাদেক খানের নামে বাজার। প্রথমে হাতের ডানে সাদেক পিয়াজ-রসুন-আদার পাইকারি মার্কেট। এরপর সাদেক খান কৃষি মার্কেট, সাদেক খান ফল মার্কেট, সাদেক খান আড়ত। সাদেক খান কৃষি মার্কেটের পাশেই রাস্তায় আলহাজ সাদেক খান মার্কেট। টিনের ছাউনি করা মার্কেটের নির্ধারিত জায়গা ছাড়াও রাস্তার উভয় পাশের ফাঁকা জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে বাজার। এভাবেই দিনের পর দিন বছরের পর বছর রাস্তা ও সরকারি জায়গা দখল করে মুনফা লুটছেন সাদেক খান গং। আর এসব বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য তার রয়েছে আলাদা আলাদা বাহিনী। যাদের মাধ্যমে এই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। শুধু বাজার, মার্কেট, ফিলিং স্টেশন,নামে বেনামে বাড়ি নয় সাবেক এই সাংসদের নামে বুড়িগঙ্গার খালের ওপর নিজ নামে ‘ঘাট’ও রয়েছে। সাদেক খান মুরগির আড়তের পাশ দিয়ে যাওয়া রাস্তার শেষে গিয়ে মিশেছে রায়ের বাজার সাদেক খান ঘাটে। এদিকে রায়ের বাজার মসজিদের পেছন থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটিকে নিজের নামে ‘সাদেক খান রোড’ নামকরণ করেছেন। আশপাশের রাস্তা, মার্কেটগুলোও ক্ষমতার দাপটে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণ করিয়ে নিয়েছেন। মিয়া চান খান সড়ক, আজিজ খান সড়ক, সাদেক খান সড়ক, মুকিম খান রোড, হাসেম খান রোডসহ রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী এলাকার প্রতিটি রাস্তাই ক্ষমতার জোরে সাদেক খান নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে করেছেন।

মো. আব্বাস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের এই ১৬ বছরে সাদেক খান নিজের নামে ও বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে রায়ের বাজার গদিঘর এলাকায় তার নিজ নামে একটি বাড়ি রয়েছে। সেখানে তিনি বসবাস করতেন। এ ছাড়াও রায়ের বাজার বৈশাখী মাঠের পাশে তার আরও একটি বাড়ি রয়েছে। সাদেক খান রোডেও তার বেশ কয়েকটি সুউচ্চ ভবন রয়েছে। যেগুলো অন্য মানুষের নামে থাকলেও মূল মালিক তিনিই। রায়ের বাজার সুলতানগঞ্জ লেনেও তার একটি বহুতল ভবন রয়েছে। আব্বাস বলেন, শুধু দেশে নয় ’১৯ সালে দেশের বাইরে মালয়েশিয়াতেও তিনি অনেক সম্পত্তি করেছেন। সেখানে বাড়ি-গাড়ি সব আছে তার। মো. জসিম নামে গদিঘর এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, রায়ের বাজার-বুদ্ধিজীবী এলাকায় সাদেক খানের যেমন সম্পত্তি রয়েছে তার থেকে আরও বেশি, সম্পত্তি করেছেন নদীর ওই পাড়ে (কেরানীগঞ্জ)। সেখানে ইট ভাটা, বালু মহল, বালুর ব্যবসা, আবাসন ব্যবসাসহ অনেক সম্পদ তার। আর মোহাম্মদপুর তিন রাস্তা থেকে আঁটি বাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই ধার দিয়ে যেসব আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে তার প্রতিটি থেকেই মাসোহারা পেতেন তিনি। আর এসব টিকিয়ে রাখতে নিজের দলের মধ্যেই কতো রক্ত ঝরিয়েছেন, কতো গ্রুপিং করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তিনি বলেন, গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের আগে মনোনয়ন পেতে ও নিজ দলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে একাধিক সংঘর্ষ বাধিয়েছেন সাদেক খান। আর তার এই বাহিনী দিয়েই রায়ের বাজার বস্তি, মার্কেট, আবাসন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। কোনো দিবস আসলে তার লাঠিয়াল বাহিনী এসব বস্তি প্রতি ১০/১৫টি গরু বরাদ্দ দেন তিনি। আর এই বস্তির লোক হাতে রেখে তাদের দিয়েই নিজের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এই এলাকার কাউন্সিলর হোক আর আওয়ামী লীগ নেতা সবই তার লোক। তার ইশারা ছাড়া কারও কিছু করার সাহস নেই। তিনি বলেন, এখন আওয়ামী লীগ নেই। এদিকে সাদেক খানের কথার বাইরে গেলেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে জানিয়েছেন রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী বস্তির বাসিন্দা নাসরিন। তিনি বলেন, এখানে সরকারের থেকে নতুন পাকাঘর করা হবে বলে আমাদের সকলের ঘর ভেঙে দেয়া হয়। অনেকে নিজের ঘর নিজেই ভেঙে নেই। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও এখনো পাকা ঘরের মুখ দেখিনি। এ বিষয়ে কারোর কথা বলারও সাহস নেই। কথা বললেই তাকে এলাকা ছাড়া করা হবে।

সাদেক খানের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন বলেন, আমাদের একটি গোয়েন্দা উইং রয়েছে। তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক আগে থেকেই তারা সাবেক এমপি সাদেক খানের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। তারা অনেক তথ্য প্রমাণও পেয়েছেন। সেই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই সাদেক খানের বিরুদ্ধে আমাদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

প্রসঙ্গত, সরকার পতনের পর গত ২৪শে আগস্ট রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়া এলাকা থেকে পুলিশের হাতে আটক হন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক এমপি সাদেক খান। পরে তাকে ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহত ট্রাকচালক মো. সুজন (২৪) হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

mzamin

উন্নত চিকিৎসার অভাবে পা হারাতে পারেন সাকিব

বিদেশে গিয়ে চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা এনে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবে এমনই স্বপ্ন ছিল সাকিব হাসানের। দিনকাল এভাবেই বেশ চলছিল। বাবা আব্দুল আজিজ স্থানীয় একটি ডাইং কারখানায় চাকরি করে তিল তিল করে সাকিবের বিদেশ যাওয়ার টাকা জমাতে থাকেন।

বাসার পাশে একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন সাকিব। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে গেল বছর মাদ্রাসায় আর পড়া হলো না। বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে তিনি স্থানীয় একটি টেইলারিং কারখানায় কাজও শিখেছেন।

জানা গেছে, ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অগ্নিঝরা স্লোগানে মুখরিত ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বরতম নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে ঘরে বসে থাকতে পারেনি সাকিব। গত ২১ জুলাই থেকে প্রায় প্রতিদিনই তিনি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থান করতেন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। প্রতিদিনই তার চোখের সামনেই হতাহতের বহু ঘটনা ঘটত। এসব দেখার পরও তিনি ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত আন্দোলনের সাক্ষী হতে ৫ জুলাই সকাল ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া এলাকায় অবস্থান নেন।

এ দিন দুপুর ১২টার দিকে যাত্রাবাড়ী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ছাত্র-জনতার মুখোমুখি অবস্থান নিলে উভয়ের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্র-জনতা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যেতে থাকে। এ সময়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। বিকেল ৩টার দিকে সাকিব গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে সহযোগীরা প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিলে ওখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর মুগদা হাসপাতালে নেওয়া হয় সাকিবকে। মুগদা হাসপাতালে সে ৫ দিন ভর্তি থাকার পর গত ১১ আগস্ট তিনি বাসায় ফেরেন। পরে আবার ঢাকার সায়েদাবাদে আল কারীম হাসপাতালে সপ্তাহখানেক ভর্তি থাকেন।

সাকিব আল হাসান (২১) শরীয়তপুরের সখিপুর থানার কিরণ নগর এলাকার আব্দুল আজিজের ছেলে। তিনি ঢাকার ডেমরায় বামৈল পশ্চিম পাড়ার জুলহাস মিয়ার টিনশেড বাড়িতে ভাড়া থাকেন।

এ বিষয়ে গুলিবিদ্ধ সাকিব কালবেলাকে বলেন, গত ৫ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করতে থাকে পুলিশ। এ সময় আমিসহ আরও ৪-৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখি আমার পায়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং প্রচণ্ড ব্যথায় আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। ওই সময় কয়েকজনের সহযোগিতায় মুগদা হাসপাতালে ভর্তি হই। এখানে ভুল চিকিৎসার কারণে পরে সায়েদাবাদের আল কারীম হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।

নিজের পায়ে গুলির বর্ণনা দিতে গিয়ে সাকিব কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক বলেছেন- গুলির আঘাতে আমার পায়ের গোড়ালি ভেঙে গেছে। পায়ে পচন ধরেছে। উন্নত চিকিৎসার করা না গেলে হয়তো পা কেটে ফেলা হতে পারে। বর্তমানে ১ দিন পর পর ড্রেসিং করানোর জন্য হাসপাতালে যেতে হয়। সব মিলিয়ে এখনো প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এ পর্যন্ত কেউ আমার খোঁজ নেয়নি। এ বিষয়ে কারও কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাকিব কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ বিষয়ে সাকিবের বাবা আব্দুল আজিজ কালবেলাকে বলেন, ঋণের টাকায় চলছে আমার সংসার। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ছেলেকে পড়াশোনা করাতে পারলাম না। স্থানীয় একটি ডাইং কারখানায় অল্প বেতনে চাকরি করে বাসা ভাড়া দিয়ে সংসারের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। এ জন্যই সাকিবের ইচ্ছে ছিল বিদেশে গিয়ে সংসারের হাল ধরবে কিন্তু সে ইচ্ছেও আর পূরণ হলো না। সে ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে পায়ের গোড়ালির হাড় ভেঙে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়নি। সে এখনও হাঁটতে পারছে না। এ ছাড়া তাকে বিদেশে পাঠানোর জন্য তিল তিল করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম, সে টাকাগুলোও তার চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়ে গেল। বর্তমানে ঋণ করে তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ৬৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী ইব্রাহিম খলিল কালবেলাকে বলেন, আমি যখন বিষয়টি জানতে পারি সঙ্গে সঙ্গেই তার খোঁজ-খবর নিয়েছি এবং মুগদা মেডিকেল থেকে আসার পরে চরমোনাই হুজুরের পরিচালনাধীন রাজধানীর সায়েদাবাদে আল কারিম হাসপাতালে ৪ দিন ফ্রি ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন সাকিব হাসান। ছবি : কালবেলা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন সাকিব হাসান। ছবি : কালবেলা



এই সরকারকে বিদ্যমান আইনে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই: ফরহাদ মজহার

ছাত্র-জনতার গণ–অভুত্থ্যানে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিদ্যমান আইনে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই পুরোনো সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ নগরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনের এক্সপেরিমেন্টাল হলে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন।

পাঠ-চিন্তার আয়োজনে আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন হাসান জাফরুল বিপুল। রাকিবুল রাকিবের সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য দেন সারোয়ার তুষার। আলোচনা শেষে প্রশ্ন–উত্তর পর্বের সঞ্চালনা করেন আফসার বিপুল।

উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক, পরিবেশবাদী সংগঠক ও কবি আরিফ বুলবুল, সংগঠক ও চিত্রনির্মাতা মো. রোমেল, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিবাদী শক্তি, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবারের ছাত্র-জনতার গণ–অভু্যত্থান হয়েছে। যারা পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চায়, তারা কিন্তু খুব ভালো সুযোগ নিয়ে নিয়েছে। তারা কী করল, পুরোনো ব্যবস্থার অধীনে এই যাঁদেরকে আমরা উপদেষ্টা বলছি। তাঁরা শপথ নিলেন পুরোনো ব্যবস্থার প্রেসিডেন্টের কাছে। তাঁরাা শপথ নিয়ে বললেন আমরা এই সংবিধান রক্ষা করব। আমরা কি এই সংবিধান রক্ষা করব। তাঁরা ফ্যাসিবাদ–ব্যবস্থা রক্ষা করবেন বলে শপথ নিয়েছেন। এখন তাঁদেরকে সরানো যাবে না। হয়তো এখানে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।’

বিদ্যমান আইনের মধ্যে এই সরকারকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার কীভাবে নিজেদের বৈধ প্রমাণ করবেন, আমি জানি না। তাঁরা যতটুকু করবেন, জোর করে করবেন, যতটুকু তাঁদের হাতে ক্ষমতা আছে, ততটুকু তাঁরা করবেন। কিন্তু লিগ্যালি ওইটা কখনো বৈধ হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের যে নতুন রাষ্ট্র গঠন করার আকাঙ্ক্ষা এই যে গণ–অভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে ঘটেছে, এটার ধারেকাছে আমরা যেতে পারিনি। গণ–অভুত্থ্যান হলে আপনি কেন গণ–আদেশে চলতে পারেন না প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাই পুরোনো সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।’

শেখ মুজিবকে হত্যার পরে ইনডেমনিটি আইন করা হলেও সেটি বাতিল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হলে এটা করা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, পুরোনো সংবিধান রেখে দেওয়া হলে আজকে থেকে ২০ বছর পরও যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তাহলে গণ–অভুত্থ্যানের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের সবার বিচার হবে।

শেখ হাসিনা চট করে ঢুকে পড়ার মুঠোফোন ফাঁস হওয়ার সারা দেশে মাজারে হামলা শুরু হয়ে গেছে উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার বলেন, মাজার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও পাহাড়িদের আমাদের রক্ষা করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে, আলোচনা করে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।’

সিগারেটের নিকোটিনের ক্ষতির চেয়ে গাঁজা খাওয়ায় ক্ষতি কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাজারে গাঁজা ও গানবাজনা বন্ধ করতে হলে, আগে বড় হোটেলগুলোতে মদ, বিয়ার খাওয়া ও গানবাজনা বন্ধ করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণ–অভুত্থ্যান আন্দোলন নস্যাৎ করতে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।  গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনে
‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

আন্দোলনে গুলিতে পা হারানো ইমরানের চিকিৎসা অর্থাভাবে বন্ধ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইমরান আলী। তিনি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের  সোহরাব আলীর ছেলে। ডান পা হারিয়ে নিজবাড়িতে অর্থাভাবে বন্ধ আছে তার চিকিৎসাসেবা। তিনি ঢাকায় ‘টপওয়ান’ নামে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন।

জানা যায়, গত ১৯শে জুলাই সন্ধ্যা ৭টার সময় ছাত্র জনতার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা মিরপুর-১১ থেকে গাড়ি না পেয়ে  হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে মিরপুর ১০ নম্বরে পুলিশের ছোড়া গুলি লাগে ইমরানের ডান পায়ে। এ সময় আন্দোলনকারীদের মধ্য  থেকে কয়েকজন তাকে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।  সেখানে এক মাসের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাসেবা নিয়েও বাঁচানো যায়নি ইমরানের পা। অবশেষে কেটে ফেলতে হয়েছে। এদিকে গত প্রায় ২০ দিন আগে ইমরানকে হাসপাতাল থেকে  ছেড়ে দেয়ায় চলে আসেন নিজ বাসায়। বাসায় গিয়ে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ইমরানের এমন পরিস্থিতিতে চলছে না সংসার। বন্ধ আছে তার চিকিৎসাসেবাও। এতদিন ধারদেনা করে চিকিৎসা চালালেও এক পা হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন ওই পরিবার।

ইমরানের বাবা সোহরাব আলী বলেন, আমার ছেলে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পা হারিয়েছে। আমার সংসার শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলের জীবন বাঁচাতে আপনারা সবাই সহায়তা করে চিকিৎসা নিতে সহায়তা করেন। ইমরান হোসেন বলেন, ১৯শে জুলাই বাইরে আন্দোলন চলছিল বিষয়টা আমি বুঝতে পারিনি। অফিস  শেষ করে সন্ধ্যা ৭টায় মিরপুর-১১ থেকে গাড়ি না  পেয়ে হেঁটে মিরপুর-১০ নম্বরে  পৌঁছাতেই দেখি ছাত্ররা আন্দোলন করছে। এ সময় হঠাৎ মনে হলো আমার পায়ে কেউ  যেন ইটের টুকরা দিয়ে আঘাত করলো। কিছুক্ষণ পর দেখি রক্তে ভিজে গেছে। পরে বুঝতে পারলাম পায়ে গুলি লেগেছে এবং আমার সামনেও আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তিনি বলেন, ঢাকায় চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন এখানে আমার সংসারও চলছে না আবার চিকিৎসাসেবাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এতদিন কাছে থাকা কিছু টাকা ও ধারদেনা করে চিকিৎসা চালিয়েছি এখন আর পারছি না। চিকিৎসা চালাতে পুঠিয়া ইউএনও স্যার বরাবর একটি সহায়তার জন্য আবেদনও দিয়েছি। আমি বাঁচতে চাই, আমাকে আপনারা বাঁচান।

ইমরান হোসেন বলেন, আমি ভাবতে পারি না যে আমার পা  নেই। মাঝে মধ্যে ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠে বসি। আমার হাত যখনই ডান পায়ের দিকে যায় তখন আমার কষ্টে বুকটা  ফেটে যায়। এখন পর্যন্ত কেউ আমাকে দেখতেও আসেনি।  কোনো চিকিৎসা সেবাও দেয়নি। আমি চাই আমাকে সরকার সহযোগিতা করুক। তা না হলে আমার ভবিষ্যৎ জীবনে স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং অসহায় বাবাকে নিয়ে দিন পার করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার একেএম নূর হোসেন নির্ঝর বলেন, একটি মানবিক সাহায্যের আবেদন পেয়েছি। সেটি জেলা প্রশাসক অফিসে পাঠিয়েছি। সরকার বর্তমানে শহীদদের তালিকা করছেন। পরবর্তীতে আহতদের তালিকা করার সময় বিষয়টি দেখা যাবে।

mzamin

ভারত কীভাবে একযোগে নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে?

একযোগে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের লক্ষ্যে আর এক ধাপ এগোল ভারত সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। 'এক দেশ এক ভোটের' সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে সুপারিশ জানানোর ভার ছিল এই কমিটির উপর। এই কমিটি যে সুপারিশ দিয়েছিল, বুধবার তাতে সিলমোহর দিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা। এ খবর দিয়েছে ডয়চে ভেলে। এতে বলা হয়, কোবিন্দের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম দফায় লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির নির্বাচন একসঙ্গে হবে। দ্বিতীয় দফায় ভোট গ্রহণ করা হবে পুরসভা ও পঞ্চায়েতে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার মধ্যে সর্বাধিক ব্যবধান হতে পারে ১০০ দিনের। সব নির্বাচনের জন্য একটি ভোটার তালিকা নির্ধারিত করার সুপারিশ মেনে নিয়েছে কেন্দ্র।

এই পদক্ষেপ অনুযায়ী ২০২৯ সালে যে লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা, তার সঙ্গে রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচন সেরে ফেলতে হবে। কিন্তু ২০২৯ সালে লোকসভার মেয়াদ শেষ হলেও সব রাজ্য বিধানসভার মেয়াদ ফুরোবে না। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট হবে ২০২৬ সালে। পাঁচ বছর পর ২০৩১ সালে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। অন্যান্য অনেক রাজ্যের ক্ষেত্রে একই সমস্যা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কীভাবে পাঁচ বছর পর একযোগে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন দেশজুড়ে সম্পন্ন হবে, তা স্পষ্ট করতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, ‘সরকার দেশ জুড়ে এ বিষয়ে মতৈক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ নেবে, সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর শুরু হবে সুপারিশ বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া। তার দায়িত্ব দেয়া হবে একটি বিশেষ কমিটিকে।’ তবে ২০২৯-এ সব রাজ্যের বিধানসভার মেয়াদ শেষ না হলে কী একত্রে ভোট হবে, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর বৈষ্ণবের কাছে মেলেনি।

মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পরপরই এক্স হ্যান্ডেলে নিজের মত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন, ‘দেশের গণতন্ত্রকে আরো মজবুত ও সকলের অংশগ্রহণের পক্ষে অনুকূল করে তোলার লক্ষ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’ সাবেক রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বাধীন কমিটি ৪৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছিল। এ নিয়ে আগেই আপত্তি জানিয়েছে ১৫টি দল। এর মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে বলেছেন, ‘সরকারের এই পদক্ষেপ সংবিধান, গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরোধী। দেশের জনতা একে সমর্থন করবে না। এর মাধ্যমে আসল সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।’ তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েনের বক্তব্য, ‘এটা গণতন্ত্র বিরোধী বিজেপির একটা চমক। এর আগে বিজেপি যেমন ভুয়ো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এটাও সেরকমই একটা উদ্যোগ।’ বিজেপি বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শরিকরাও কেন্দ্রের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব বলেন, ‘বিজেপি আগে তাদের নিজেদের সাংগঠনিক স্তরে সব নির্বাচন একসঙ্গে করুক। তারপর দেশের কথা ভাবা যাবে।’ বিরোধীদের প্রশ্ন, কেন্দ্র যেখানে একযোগে ভোট করানোর কথা বলছে, সেখানে হরিয়ানা ও জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে কেন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা আসনগুলির উপনির্বাচন করা হচ্ছে না?

প্রধানমন্ত্রী এই পদক্ষেপকে গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক বললেও বিরোধীরা এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের একাংশ এমনই মতামত দিচ্ছেন। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্ম (এডিআর)-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার সঞ্চালক উজ্জয়িনী হালিম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর এটা পরোক্ষ আঘাত। আঞ্চলিক দলগুলির জন্য খারাপ খবর। মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনের সময়, ভিন্ন ইস্যুতে ও ভিন্ন নিরিখে ভোট দেয়, এটা নানা গবেষণা থেকে প্রমাণিত। একসঙ্গে নির্বাচন হলে ভোটারদের একটা দলকে ভোট দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তাদের ভোটদান একপ্রকার প্রভাবিত হয়।’ সরকার মেয়াদ শেষের আগে পড়ে গেলে কী হবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বলেন, ‘সরকার সবসময় পাঁচ বছর থাকে না, মাঝপথে ভেঙে যায়। অনাস্থা এলে সরকারের পতন হতে পারে। নতুন নীতিতে মাঝেমধ্যে নির্বাচন হওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র নিরুৎসাহিত করছে। এটা গণতন্ত্রের পরিসরকে কমিয়ে আনতে পারে বলে বিরোধীরা মনে করছেন।’

শাসক-শিবিরের পক্ষ থেকে দুটি যুক্তি জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রথমত, সারা দেশে একযোগে নির্বাচন হলে খরচ অনেকটাই কমবে। আলাদা আলাদা নির্বাচন করার ব্যয় বেশি। উজ্জয়িনী হালিম বলেন, ‘বড় দলগুলি নির্বাচনে যে ভাবে সারা দেশে খরচ করতে পারবে, ছোট দল তাদের সামনে কোথায় দাঁড়াবে! নির্বাচনের খরচ কমানোর জন্য দরকার রাজনৈতিক দলগুলির উপর লাগাম টানা। খরচ কমানোর জন্য আরো অনেক পথ অবলম্বন করা যায়, এক দেশ এক নির্বাচনে তা হবে না। শাসক শিবিরের দ্বিতীয় জোরালো যুক্তি, একযোগে নির্বাচন উন্নয়নের কাজকে মসৃণ করবে। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন সময়ে ভোট হলে উন্নয়নের গতি থমকে যেতে পারে নির্বাচনী আচরণবিধির জন্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মইদুল ইসলাম ডিডাবলিউকে বলেন, ‘আলাদা ভোট হলে উন্নয়ন থমকে থাকবে না। ১৯৬৮-২০২৪ পর্যন্ত তো উন্নয়ন হয়েছে, যে সময়ে একসঙ্গে নির্বাচন হয়নি। নয়া নিয়মের ফলে জাতীয় দল বা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী এবং আঞ্চলিক দলগুলির তুলনায় বেশি সুবিধা পেতে পারে।’ হালিমের মতে, আচরণবিধির জন্য উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এই যুক্তি মানা যায় না। যে কোনো রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাস দেখুন, পাঁচ বছরে কতবার ভোট হয়েছে আর তার জন্য উন্নয়নের কাজ কতটা থেমেছে? অন্য সময় উন্নয়নের গতি কি খুব সাবলীল?

mzamin

মেহেদীর পরিবারে কান্না by ফাহিমা আক্তার সুমি

চৌদ্দ বছর বয়সী মেহেদী হাসান জুনায়েদ। স্বপ্ন দেখতেন একদিন বড় হবেন। পড়াশোনা শেষে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই পুলিশের বুলেট কেড়ে নেয় তার জীবন। দুই ভাইবোনের মধ্যে মেহেদী ছিলেন ছোট। রাজধানীর উইল পাওয়ার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন মেহেদী। ৫ই আগস্ট সোমবার ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে যোগ দিতে তার বন্ধুর সঙ্গে চাঁনখারপুলে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। তার মাথায় দুইটি গুলি লাগে। দুপুর দেড়টার দিকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সেদিন মেহেদীকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হয় তাদের নিজ বাড়িতে। মেহেদীর মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারটি। ঘর জুড়ে সন্তানের রেখে যাওয়া স্মৃতি আঁকড়ে কেঁদে যাচ্ছেন বাবা-মা।

মেহেদীর মা সোনীয়া জামান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের সন্তান ছিল আমাদের রত্ন। মেহেদী মেধাবী এবং সাহসী ছিল। ঘটনার দিন সকালে আমার সন্তানকে রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খাইয়ে দিয়েছিলাম। এ সময় মেহেদী বলেছিল এর আগে সে দু’বার আন্দোলনে গিয়েছিল এবং সেখানে খাবারও বিতরণ করেছিল। মেহেদীর মা বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা মেহেদীর এক বন্ধু জানায়- মেহেদী পুলিশের খুব কাছে গিয়ে ঢিল ছুড়ছিল। সে মেহেদীকে ফিরে আসতে বলেছিল, কিন্তু মেহেদী রাজি হয়নি। মেহেদীর কোনো দোষ ছিল না। আমি গর্বিত যে আমার ছেলে ন্যায়ের জন্য রাজপথে দাঁড়িয়েছিল। যারা নিহত হয়েছে আমি সবার বিচার চাই।  

পুরান ঢাকার ধুপখোলা পুকুরপাড়ে মেহেদীর নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার ব্যবহৃত সবকিছুই সাজানো-গোছানো, নেই শুধু মেহেদী। সে খেলাধুলা খুব পছন্দ করতো। পরিবারের সবার ছোট হওয়ায় তাকে সবাই ভালোবাসতো। একমাত্র বোন ছিল তার বন্ধু, সারাক্ষণ বোনের সঙ্গে কেটে যেতো গল্পে। মাতিয়ে রাখতো পুরো ঘরটি। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারটিতে এখানো থামেনি শোকের ছায়া। নীরব হয়ে রয়েছে বাড়িটি। কাঁদতে কাঁদতে সোনীয়া বলেন, ওর বাবা বাসা থেকে বের হয় না, একদম নীরব হয়ে গেছে। মেয়েটা ওর বন্ধুকে হারিয়েছে। মেহেদী বাসায় থাকলে সারাক্ষণ আম্মু আম্মু করতো। আমি খুব মিস করছি আমার সন্তানটিকে। মেহেদী ফাস্টফুড আইটেমগুলো খেতে খুব পছন্দ করতো। আমার সন্তান চলে যাওয়ার একমাস পার হয়ে গেছে কিন্তু আমার কাছে সবসময় মনে হয় ও ঘরেই আছে। আমি রাতে প্রায়ই ওকে স্বপ্ন দেখি। আমার সন্তানটির এই শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারবে না। দুইটা সন্তানকে কোনোদিন হাত-পা, শরীর কাটতে দেইনি এত যত্ন করে বড় করেছি। আমি যখন মেহেদীকে দেখি তখন ওর শরীর রক্তে ভেজা ও মাথায় ব্যান্ডেজ করা ছিল। শুধু আমার সন্তান মৃত্যুর জন্য না, একজন মা হিসেবে আমি মারা যাওয়া সব সন্তানের বিচার চাই। এরা তো খুব বেশি কিছু চাইছিল না, সামান্য একটা দাবির জন্য শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে হলো। এরা তো আমাদের রত্ন ছিল। আমরা মায়েরা গর্বিত যে এমন সন্তানদের জন্ম দিয়েছি।

তিনি বলেন, অন্যদিন ঘুম থেকে দেরি করে উঠলেও ওইদিন সকাল ৬টার সময় ঘুম থেকে উঠে যায় মেহেদী। এ সময় শুয়ে শুয়ে আন্দোলনের ভিডিওগুলো দেখে। সকাল ১০টার দিকে নাস্তা দিতে চাইলে বলে আম্মু রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খাবো। তখন আমি তাকে রসুন ভর্তা দিয়ে ভাত খাইয়ে দেই। মেহেদী বলে আমি এর আগে দুইদিন আন্দোলনে গিয়েছিলাম তুমি বকবে বলে বলিনি। আমার মেয়েটা বলে আম্মু আমি কলেজে যাবো সবাই আজ একসঙ্গে বের হবে কলেজ থেকে। তখন আমি মেয়েকে বলেছি তাহলে তোমার সঙ্গে আমিও যাবো। আর মেহেদী বলে ঠিক আছে আম্মু আমি তাহলে বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যাবো। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বের হয়ে যায় বুকের মানিকটি। আমিও ছেলে বের হওয়ার পাঁচ মিনিট পরে মেয়েকে নিয়ে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিকে যাই। তখন রাস্তায় অনেকবার পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। সোয়া দুইটার দিকে হঠাৎ আমার বড় ভাই কল দিয়ে বলে তুমি কই। এ সময় বলে মেহেদী কই? গুলির ঘটনাটি শুনতে পায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় মেহেদী। যারা হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং আশপাশে যারা ছিল তারাও বলেছে একই কথা। খবর শুনে আমি একটা রিকশা নিয়ে বাসার দিকে চলে আসি। বাসায় এসে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে আমার সন্তান আর নেই। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো আঘাত লেগেছে কিন্তু এসে দেখি আমার মেহেদীর রক্তাক্ত নিথর দেহ রেখে দিয়েছে বাড়ির সামনে। আমার একমাত্র ছেলে ছিল মেহেদী। কীভাবে আমার মনটাকে সান্ত্বনা দিয়ে রাখবো।

mzamin

সিকৃবিতে দুর্নীতি: অবৈধ নিয়োগে ১৪ বছর চাকরি করে অবসরে আনিছ

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়োগ-পদোন্নতি ঘিরে দলীয়করণ, অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যেন হাট বসেছিল সিলেট কৃষি  বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি)। শর্ত শিথিল, যোগ্যপ্রার্থীদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের উচ্চতর পদে নিয়োগের রীতিমতো মচ্ছব চালিয়েছিলেন ১৬ বছরের বিভিন্ন সময়ের সাবেক ভিসিরা।  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ সমর্থিত রফিক-আওলাদ প্যানেলে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী হলের ভিপি ছাত্রলীগ নেতা আনিছুর রহমান। পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সিকৃবি’র সাবেক দুর্নীতিবাজ দুই ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল আউয়ালের সময় ইউজিসি’র নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরে ডেপুটি ডিরেক্টর (এডহক) ভিত্তিতে নিয়োগ ও পরে ভিসি প্রফেসর ড. শহীদ উল্লাহ তালুকদারের সময়ে পরিচালক পদে স্থায়ী নিয়োগ লাভ করেন। শর্তানুসারে তার চাকরির পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। বয়সও ছিল বেশি। নিয়োগ বোর্ডে তিনি একাই ছিলেন প্রার্থী। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক এডহক ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ না করার জন্য (২৫.০৩.০৯ তারিখে) প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও সরকারি সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে ডেপুটি ডিরেক্টর পদে বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে একদিনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ডেপুটি ডিরেক্টর অস্থায়ী (এডহক) হিসেবে আনিছকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ পেতে কমপক্ষে ১০ বছর চাকরির অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে এ নিয়োগ দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা আনিছুর রহমান ২০১০ সালের মার্চ মাসে রেজিস্ট্রার পদে আবেদন করেন।

রেজিস্ট্রার পদের জন্য গঠিত বাছাই বোর্ড আনিছের যোগ্যতা না থাকায় অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে ২০১০ সালের ২২শে আগস্ট স্মারকে (রেজি.কার্যা/পরিষদ বিভাগ /১০/৯৭) জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর (এডহক) হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। অথচ এই পদে তিনি আবেদনই করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়- পতিত স্বৈরাচার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ডা. আওলাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ দাবিদার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আনিছুর রহমানকে ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিওতে চাকরিরত অবস্থায় ৪৭ বছর বয়সে অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আওয়ামী দলীয় বিবেচনায় অনিয়মের মাধ্যমে ২০১০ সালের ২৩শে আগস্ট জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক পদের বিপরীতে উপ-পরিচালক (এডহক)  হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ এ পদে নিয়োগ পেতে হলে যোগ্যতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক অথবা সমমানের পদে ৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসহ বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে একাধারে সর্বমোট ১০ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক হওয়ার পাশাপাশি বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হতে হবে। কোনো  নিয়োগ  বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই এডহক (অস্থায়ী)  ভিত্তিতে ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পর নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২০১০ সালের ২রা নভেম্বর অফিস আদেশে আনিছকে একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১২ই এপ্রিল এডহক (অস্থায়ী) হিসেবে ২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নিয়মিত করা হয়। এর ১ বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ২২শে আগস্ট স্মারকে (রেজি/সংস্থাপন-১/ব্যক্তি নথি (কর্মকর্তা-৭৪)/১০/১৫৪৪) জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয় আনিছকে। যে নিয়োগ বোর্ডে একমাত্র আনিছকেই ইন্টারভিউ কার্ড প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে এবং নিয়োগ বোর্ডে একজন মাত্র বহি: সদস্যের স্বাক্ষরে কোরাম না হওয়া সত্ত্বেও তার নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়।

আওয়ামী-বামপন্থি হিসেবে পরিচিত একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আনিছুর রহমানের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে তাকে ওই পদ পাইয়ে দিতে সবধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তৎকালীন দুর্নীতিবাজ ভিসি শহীদ উল্লাহ তালুকদার। রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়- ইউজিসির নির্দেশিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করতে হলে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার পাশাপাশি ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে একাধারে ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু সেটি পূর্ণ হওয়ার  কথা  উল্লেখ না করে বিজ্ঞপ্তিতে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের চাকরির অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হলেও জনসংযোগ দপ্তরে ডেপুটি ডিরেক্টর (এডহক) হিসেবে যোগদানের ৩ বছরের মাথায় আনিছকে দলীয় বিবেচনায় জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। দলীয় বিবেচনায় অবৈধভাবে নিয়োগ লাভের পর  দীর্ঘ ১৪ বছর আওয়ামী সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে চাকরি করা আনিছ ৩০শে আগস্ট পিআরএল ছুটি শেষ করেছেন বলে রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়। অবৈধ নিয়োগ লাভের পর ১৪ বছরে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা বেতন ভাতাদি উত্তোলনসহ ভবিষ্যৎ তহবিল খাতের প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন আনিছ। এখন অবসরের এককালীন কোটি টাকা পাওয়ার জন্য তদবির করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখার কর্মকর্তারা জানান- বিশ্ববিদ্যালয়ে পেনশনযোগ্য চাকরি গণনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরি বিবেচনাযোগ্য। সেটি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

mzamin

পলাতক খতিবের ফেরার চেষ্টায় বায়তুল মোকাররমে তুলকালাম

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পলাতক ছিলেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব রুহুল আমিন। গতকাল তার ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে মসজিদটিতে। দু’পক্ষের সংঘর্ষে মসজিদের ভেতরে রণক্ষেত্র তৈরি  হয়। এ সময় একে অপরের ওপর জুতা এবং জুতার বাক্স ছুড়ে মারেন তারা। করা হয় ভাঙচুর। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন মুসল্লি আহত হয়েছেন। তবে শেখ হাসিনা সরকার পতনের দেড় মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কেন নতুন খতিব নিয়োগ দেয়া হয়নি, এনিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল সকাল ১১টার দিকেই আনাগোনা বাড়তে থাকে মসজিদ প্রাঙ্গণে। প্রায় দুই শতাধিক ‘মাদ্রাসা শিক্ষার্থী’ মসজিদের দুই গেটে অবস্থান নেন। মসজিদের একাধিক মুসল্লি জানতে চাইলে তারা বলেন, গোপালগঞ্জ থেকে এসেছেন। মুসল্লিরা জানান, এ সময় ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে রুহুল আমিনকে মসজিদের উত্তর গেটে দেখা যায়। তিনি খতিবের পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। এরপর তাকে আর আর দেখা যায়নি। এরপর মসজিদের মেহরাবে বয়ান দিচ্ছিলেন নামাজের দায়িত্ব পাওয়া আবু ছালেহ পাটোয়ারী। বয়ান শুরু হওয়ার পর একদল অনুসারী নিয়ে প্রবেশ করেন খতিব রুহুল আমিন। বসেন সামনের কাতারে। কয়েক মিনিট বসার পর তার অনুসারী একজন বলেন, খতিব যখন এসেছেন তাহলে বয়ানের দায়িত্ব তাকেই দেয়া হোক। একই কথা বলেন আরও অনেকে। শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। পূর্বে থেকে অবস্থান নেয়া মুসল্লিরা তাতে না করেন। এরই একপর্যায়ে তিনি মাইক্রোফোন হাতে নেন। বয়ানরত আবু ছালেহ পাটোয়ারীকে মিম্বর থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে অপদস্ত করা হয়। পরে অন্য দল রুহুল আমিনের অনুসারীদের প্রতিরোধ করেন। তখন স্লোগান দেয়া শুরু হয় নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। একপর্যায়ে দু’ভাগ হয়ে হাতাহাতি শুরু হয়। জুতা ও জুতা রাখার ট্রে নিয়ে একে অপরের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকেন। প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রণক্ষেত্রে রূপ নেয়। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আশেপাশের এলাকা থেকে আসতে থাকেন নানা বয়সী মানুষ। লোকজন বৃদ্ধি পাওয়ায় কোণঠাসা হয়ে পড়েন রুহুল আমিনের অনুসারীরা। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মাঝে উত্তর গেট দিয়ে অনুসারীদের নিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। এ সময় তাদের উদ্দেশ্য করে আওয়ামীবিরোধী নানা স্লোগান দেয়া হয়। এরইমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। মুসল্লিরা বলেন, রুহুল আমিনের সঙ্গে আসা একদল যুবক শুধুমাত্র ভাঙচুরে লিপ্ত ছিলেন। তারা কাঁচ, আসবাবপত্র এগুলো ভাঙচুর করেন।

পরিস্থিতি শান্ত হলে অধিকাংশ মুসল্লি নামাজ না পরে বেরিয়ে অন্যান্য মসজিদে যান। আর সেখানে থাকা মুসল্লিরা নামাজের স্থানটি পরিষ্কার করেন। সুন্নত নামাজের জন্য স্বল্প সময় দিয়ে ১টা ১০ মিনিটের দিকে আজান দেন। জানা যায় এই আজান সাধারণ ১টা ২০ মিনিটের দিকে হয়ে থাকে। এরপর নামাজ আদায় হয় এবং খুব পরিপাটিভাবেই মোনাজাত আদায় করেন। আসরের নামাজের সময় সেখানে দেখা যায় পরিবেশ শান্ত। চারিদিকে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।

রুহুল আমিনকে ২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার খতিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। আসরের নামাজে আসা হেফাজতে ইসলামের কর্মী মো. আবু জাফর বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে এতটাই নিকৃষ্টভাবে পরিচালিত হয়েছে যে, খতিব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা লোককে দেয়া হয়েছে। আমাদের এই ১৫ বছরে অত্যাচার করা হয়েছে। এখনো আওয়ামী জাহিলিয়ার দোসররা ঘুরে বেরাচ্ছে ও চক্রান্ত করছে। জাতীয় মসজিদে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে তারা বিশ্বের কাছে নেগেটিভ মেসেজ দিতে চায়।

এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বলছে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব একটা সম্মানিত পদ। এই পদটাকে কেউ অসম্মানিত করতে চায়নি। এজন্য সবাই চাচ্ছিলেন যে, রুহুল আমিন নিজেই পদত্যাগ করুন। কিন্তু তিনি পদত্যাগ না করে শুক্রবার তার অনুসারীদের নিয়ে মসজিদে এসে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিলেন। সূত্রটি জানায়, দুই জুমার নামাজ অনুপস্থিত থাকায় রুহুল আমিনকে লিখিতভাবে শোকজ করা হয়েছিল। শোকজের জবাবও দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে রুহুল আমিন অসুস্থতার কারণ দেখিয়েছেন। আর খতিবের অনুপস্থিতিতে ইমাম এবং ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস পদে থাকা দু’জন কর্মকর্তাসহ মোট চারজনকে বাই রোটেশন জুমার নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল যিনি জুমা পড়িয়েছেন তিনি ফাউন্ডেশনের অন্যতম মুহাদ্দিস আবু ছালেহ পাটোয়ারী।

একজন মুসল্লি বলেন, সাবেক খতিব অন্যায়ভাবে শেখ হাসিনাকে সাপোর্ট করে এসেছিলেন। যখন হাসিনার পতন হয়, তখন তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ কোন সাহসে বা কী কারণে তিনি এখানে এসেছেন তা খতিয়ে দেখতে হবে। আমার ধারণা তিনি পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এখানে এসেছেন। এই সংঘর্ষে অনেক লোক আহত হয়েছেন। রক্তাক্ত হয়েছেন। পরে রুহুল আমিন আর নামাজ পড়াতে পারেননি। আর এখান থেকে যেহেতু রুহুল আমিন পালিয়ে গেছেন, তাহলে তিনি কেন এলেন? শেখ হাসিনার দোসররা সব সেক্টর থেকে পালিয়ে গেছে। কিন্তু তারা পাল্টা বিপ্লব করার চেষ্টা করছেন। এটাও তেমন। তারা এখানে আরেকটি বিপ্লব করার জন্য এসেছেন। তারা আগেভাগে একটা সেটআপ করে রেখেছেন, আজকে একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। আর সাধারণ মানুষ তাদের আবার বিতাড়িত করে দিয়েছেন।

এসব ঘটনার সময়কার কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে দেখা যায়, যখন মসজিদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তখন মাইকে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে বসতে বলা হয়। মসজিদের আদব রক্ষা করতে বলা হয়। কিন্তু উত্তেজিত মুসল্লিদের বসানো যাচ্ছিল না। মাইকে বলা হয়, সবাই বসুন। দরুদ শরীফ পড়ুন। আল্লাহর ঘর মসজিদ। আমরা সবাই শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে বসে যাই। মসজিদের সম্মান রক্ষা করি। মাইকে যখন এসব কথা বলা হচ্ছিল, তখন ভাঙচুরের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। এরপরও মাইকে সবাইকে অনবরত শান্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু কাউকে বসানো যাচ্ছিল না। পরে পরিবেশ কিছুটা ঠাণ্ডা হলে সাধারণ মুসল্লিরা মসজিদে প্রবেশ করেন। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ পড়ান আবু ছালেহ পাটোয়ারী। নামাজ শেষে সাধারণ মুসল্লিরা বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এর কিছু পরেই মসজিদ থেকে স্লোগান দিতে দিতে একদল মুসল্লি বের হন।

ওদিকে ঘটনার পর সেখানে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। খবর পেয়ে মসজিদে যান সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। এরপর পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়। তখন জুমার নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। নামাজের পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মুসল্লিদের দ্রুত মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মু. আ. হামিদ জমাদ্দার মানবজমিনকে বলেন, খতিব ছুটিতে ছিলেন। আজকের (শুক্রবার) ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিবো।

mzamin

নীরবতা ভাঙলেন উর্বশী

এক সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলের উইকেটরক্ষক ঋষভ পন্তের সঙ্গে বলিউড তারকা উর্বশী রাউতেলার প্রেমের গুঞ্জন ছিল। কিন্তু দু’জনের কেউই তা স্বীকার করেননি। এর মাঝেই ঋষভের পথ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় বছর শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। একটা সময় পন্ত এবং উর্বশী মাতেন বাকযুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করে একে অপরকে আক্রমণ করেন তারা। এবার নীরবতা ভাঙলেন উর্বশী। ঋষভের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে উর্বশী বলেন, আমাদের নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে তা শুধুই রটনা। যদিও আমি নিজের ব্যক্তিগত জীবন প্রকাশ্যে আনতে চাই না। এই মুহূর্তে আমার লক্ষ্য শুধুই কাজের দিকে। আসলে এটা খুব প্রয়োজনীয় যে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সত্যিটা প্রকাশ্যে আসুক, রটনা নয়। জানি না এই মিম পেজগুলো কেন এত উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, আমি যে সব মানুষের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তারাই আমাকে কঠিন সময়েও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করেন। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে পন্ত এবং উর্বশীকে প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যেত। সে সময় এক সাক্ষাৎকারে উর্বশী জানান, ‘আর’ আদ্যাক্ষরের এক ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য হোটেলের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি তার কথা ভুলে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে সেই ব্যক্তি মুম্বই গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। উর্বশী নাম না নিলেও সমাজমাধ্যমে ঋষভ পন্তকে সেই ব্যক্তি ভেবে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
mzamin

‘গণতন্ত্র এখনো বিপদমুক্ত নয়’

গণতন্ত্র এখনো কিন্তু বিপদমুক্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার দলের চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র উদ্যোগে ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠিত জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্মানে এক শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে’ তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিতাড়িত স্বৈরাচার গত ৫ই আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা এবং উদ্ভূত যে পরিস্থিতি, এগুলো পর্যালোচনা করলে কিন্তু নিঃসন্দেহে একটি কথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র এখনো কিন্তু বিপদমুক্ত নয়। এরকম একটা পরিস্থিতিতে কোনো কোনো অপশক্তি যাতে আবার গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত লক্ষ্যে এবং সাফল্যের ধারাকে ব্যর্থ করতে না পারেন, সেজন্য দল-মত-নির্বিশেষে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অগণতান্ত্রিক, অবৈধ গণতান্ত্রিক সরকার নিজেদের শাসন-শোষণ থেকে জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করতে বিভিন্ন সময় কিন্তু দেশে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরির কিন্তু অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো তারা এখনো চেষ্টা করছে। আপনারা যদি এই যে বিতাড়িত পলাতক স্বৈরাচারের দুঃশাসনের ১৫ বছর দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কিংবা ধর্মীয় স্থাপনার ওপর এই যে হামলাগুলো হয়েছে, এই ঘটনাগুলো হয়েছে-এগুলো যদি আমরা সকলে মিলে নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে যাই তাহলে কিন্তু আমরা দেখবো, একটা হামলার ঘটনাও কিন্তু সরাসরি ধর্মীয় কারণে সংঘটিত হয়নি; বরং পতিত এই যে রাজনৈতিক দলটা, এদের অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য প্রতিটি হামলার নেপথ্য কারণ।

তারেক রহমান বলেন, আমি এর আগে আমরা যে অনুষ্ঠানগুলো করেছি, সেখানে কিন্তু আপনাদের সঙ্গে আমি মতবিনিময়ের সভায় বলেছিলাম যে, দেশের সুশীল সমাজ, সর্বদলীয় এবং সর্বধর্মীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটা নাগরিক তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাসা-বাড়ি কিংবা ধর্মীয় উপাসনালয়ে যে সংঘটিত এই ঘটনা, প্রত্যেকটা হামলার নেপথ্যে ঘটনা উদ্ঘাটন করে সুষ্ঠু বিচার করা। এই দাবি আমি জানিয়েছিলাম। কিন্তু গত ১৫ বছরে একটা ঘটনারও কী বিচার হয়েছে? বিচার দূরে থাক। একটা ঘটনারও কী বিশ্বাসযোগ্য কোনো তদন্ত হয়েছে? ২০১২ সালে রামু বৌদ্ধ বিহারে হামলা, অথবা ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলাসহ দেশের কোনো একটা হামলারও কিন্তু বিচার হলো না। কেনো তদন্ত হলো না, কেনো?

সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে প্রত্যেকটি নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, নিজ নিজ অধিকার রক্ষায় প্রত্যেকটি নাগরিকের ভোটের অধিকার একটি কার্যকরী এবং শক্তিশালী অস্ত্র। যতদিন পর্যন্ত মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ব-খৃস্টান, অর্থাৎ দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি নাগরিক নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে নিজের ভোট দিয়ে, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে জনগণের কাছে একটি জবাবহিদিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠাতা করতে সক্ষম না হবে, ততদিন পর্যন্ত কোনো নাগরিকই নিরাপত্তা এবং অধিকার সুরক্ষিত নয়।  

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের জনগণের আবহমানকালে এই যে ধর্মীয় সামাজিক শিক্ষা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি-কখনোই কিন্তু অপর ধর্ম কিংবা বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণের  শিক্ষা দেয় না। এমনই কী বাংলাদেশে কখনো কোনোকালেই কিন্তু সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি ছিল না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে এটি করার কোনো কারণই আমি দেখি না। আমি মনে করি, কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, হাতেগোনা দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশে সংখ্যালুঘুকেন্দ্রিক অধিকাংশ হামলার ঘটনা কিন্তু ধর্মীয় কারণে হয়নি। অধিকাংশ হামলার ঘটনা অবৈধ লোভ- লাভের জন্য, দুর্বলের ওপর সবলের হামলা কিংবা এর নেপথ্যে রয়েছে অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করা। তাই ধর্মীয় সংখ্যালুঘু মানেই নিজেদের দুর্বল ভাবার কোনো কারণ নেই। আর এই স্বৈরাচারী দুর্বৃত্ত কিংবা ক্ষমতালোভীদের কাছে সংখ্যালুঘুসহ কেউ নিরাপদ নয়।
তারেক রহমান বলেন, গুম, খুন, অপহরণ কিংবা আয়নাঘরের ভীতিমুক্ত পরিবেশের অনেক বছর পর আতঙ্কমুক্ত এবং স্বাধীনভাবে আজকের এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরকম একটি স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশের জন্য দেশের সকল ধর্ম-বর্ণের গণতন্ত্রকামী মানুষ গত ১৫ বছর ধরে কিন্তু আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। আমাদের এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় লক্ষ কোটি জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে, হাজারো শহীদের বা অসংখ্য ভাইয়ের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন এবং স্বস্তির পরিবেশ আমরা অর্জন করতে পেয়েছি। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এই রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে যারা হতাহত হয়েছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- দেশের জনগণ তাদের এই আত্মত্যাগ ও অবদান সারাজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি’র রাজনীতি হচ্ছে সকলকে নিয়ে রাজনীতি করা। আমাদের যে একটা ভয়াবহ দানবকে একটা অবিশ্বাস্য বিপ্লবের মধ্যদিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর লড়াই করে বিজয় অর্জন করেছি, তারপরে এই বিপ্লব নস্যাৎ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছে, চক্রান্ত হয়েছে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই এবং দুঃখজনকভাবে আপনাদের এর ভেতরে ফেলে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। যেটা আমরা সবসময় আপত্তি জানিয়েছি। ইন্ডিয়ার জার্নালিস্ট এসেছিল দলে দলে, সবাইকে একটা কথা আমরা বলেছি যে, এই পরিবর্তনের ফলে যেটুকু ঘটেছে সেটা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক সেটা কোনো সাম্প্রদায়িক নয়। আজকে আবার একই চক্রান্ত শুরু হয়েছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে। দেখুন এগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেখবেন না। আজকে সেখানে একইভাবে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এটা কিন্তু আমাদের অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে। আসুন আমরা ভবিষ্যতে যেন একটি রেইনবো নেশন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই পথে আমরা এগিয়ে যাই।

বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহ-সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তপন দে’র যৌথ পরিচালনায় শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনে উপদেষ্টা অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী, হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান কল্যাণের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার, ফেনীর কামাক্ষা চন্দ, খাগড়াছড়ির অজয় সেনগুপ্ত, সাভারের উত্তম ঘোষ, খুলনার সুজনা জলি, বরিশালের সঞ্জয় গুপ্ত, অবসরপ্রাপ্ত টিভি প্রযোজক মনোজ সেন গুপ্ত, গৌড় সিনহা, ইসকানের চারু চন্দ্র্র দাস ব্রহ্মচারী, চট্টগ্রাম অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস গোস্বামী, মহানগর পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব, পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, গুলশান পূজা কমিটির জেএল ভৌমিক, পান্না লাল দত্ত, হিন্দু মহাজোটের সুশান্ত কুমার চক্রবর্তী, হিন্দু বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নির্মল রোজারিও প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, কেন্দ্রীয় নেতা জয়ন্তু কুমার কণ্ড, আবদুল বারী ড্যানি, অর্পনা রায়, রমেশ দত্ত, দেবাশীষ রায় মধু, সুশীল বড়ুয়া, জনগোমেজ, মিল্টন বৈদ্যসহ কেন্দ্রীয় এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

৩ ট্রিলিয়ন ডলার হালাল অর্থনীতির সুযোগ: মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক হালাল শোকেসে বাংলাদেশ by আরিফুল ইসলাম

আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের বৃহত্তম হালাল শোকেস হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক হালাল শোকেস এর ২০তম আসরে অংশগ্রহণ করেছে বাংলাদেশ।

কুয়ালালামপুরে অবস্থিত মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড এন্ড এক্সিবিশন সেন্টার (মিটেক) -এ ১৭-২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ চার দিনব্যাপী চলা এ আসরে খাদ্য ও পানীয়, মডেস্ট ফ্যাশন, ই-কর্মাস, ইসলামিক ফিন্যান্স ও ফিনটেকসহ মোট ১৫টি ক্লাস্টারে ১০০০ এর অধিক বুথের মাধ্যমে বিশ্বের ৪৫টি দেশ এই মেলায় অংশগ্রহণ করে।

এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের হাইকমিশনার জানান, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে হাইকমিশন বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণসহ অন্যান্য পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, হালাল পণ্যের বাণিজ্য একটি ক্রমবর্ধমান সেক্টর। সাম্প্রতিক সময়ে হালাল পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় হালাল বাণিজ্যের পরিমাণও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩য় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও হালাল পণ্য বাণিজ্যে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং  মালয়েশিয়া হালাল বাণিজ্যে বিগত ১০ বছর ধরে শীর্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের হালাল বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সাথে হাইকমিশন কাজ করছে। এছাড়াও বাংলাদেশে যৌথ প্রচেষ্টা/প্রকল্প গ্রহণপূর্বক হালাল করিডোর/হালাল হাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির সুযোগ গ্রহণের জন্য  মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেছেন, এই মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে হালাল সেক্টরের উন্নয়ন তথা মালয়েশিয়াসহ আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান যাতে এই ধরনের মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারে সে বিষয়ে হাইকমিশনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

মালয়েশিয়ার মিনিস্ট্রি অব ইনভেস্টমেন্ট, ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং মালয়েশিয়া এক্সটারনাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (মেট্রেড) এই মেলার আয়োজন করে। এই মেলায় মালয়েশিয়ার হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন বারাহাদ (এইচডিসি) জিইসি ডেভেলপমেন্ট অব ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট অফ মালয়েশিয়া (জেএকেআইএম) সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করছে।

এই মেলায় বাংলাদেশের ৫ টি শিল্প প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে । খাদ্য ও পানীয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ব্যবসায়িক চেম্বার এসব ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ থেকে নওরিস ফুডস লিমিটেড, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, প্রাণ ফুডস, কে.এম.আর ক্রাফ্ট (লেদার গুডস), এবং মালয়েশিয়া -বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এ মেলায় অংশগ্রহণ করে। মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে নেটওয়ার্কিং, বিজনেস ম্যাচমেকিংসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে।

শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪) মেলার সমাপনী দিনে মেলা ও বাংলাদেশি স্টল পরিদর্শন করেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শামীম আহসান। তিনি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে মালয়েশিয়ায় তাদের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বিভিন্ন পরামর্শ দেন এবং হাইকমিশনের পক্ষ হতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় মালয়েশিয়া এক্সটারনাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (মেট্রেড) এর চেয়ারম্যান দাতো সেরি রিজাল মেরিকান নেইনা মেরিকান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতুক মোহাম্মদ মুস্তফা আব্দুল আজিজ, ইভেন্ট প্রতিষ্ঠান কিউবি ইন্টিগ্রেটেড মালয়েশিয়া 'র পরিচালক (বিজনেস ইভেন্টস) ইউনিস লতিফ, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর (কনস্যুলার) জনাব মোঃ মোরশেদ আলম, প্রথম সচিব (প্রেস) সুফি আব্দুল্লাহিল মারুফ, প্রথম সচিব (বাণিজ্যিক) প্রণব কুমার ঘোষসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ২০তম মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক হালাল শোকেস এবং দ্য গ্লোবাল হালাল সামিট (জি এইচএ এস) ২০২৪ উদ্বোধন করেন। এ সময় উপ-প্রধানমন্ত্রী ড. আহমেদ জাহিদ হামিদি, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

যুক্তরাজ্যে শুরু হচ্ছে ই-ভিসা পদ্ধতি: বিড়ম্বনায় দুই লাখেরও বেশি অভিবাসী by আরিফ মাহফুজ

নন-বৃটিশ অভিবাসীদের জন্য ই-ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। লাখ লাখ ভিসাধারী এর আওতায় রয়েছেন। নানান ক্যাটাগরিতে ভিসা নিয়ে থাকা অভিবাসীদের তাদের অভিবাসন নথি আপগ্রেড করার জন্য তাগিদ দিচ্ছে হোম অফিস। সবাই যাতে অভিবাসন নথি আপগ্রেড করেন সেজন্য ভিসাধারীদের বার বার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।  নতুন ডিজিটাল ভিসা যুক্তরাজ্যের বর্ডার এবং মাইগ্রেশন সিস্টেমকে ডিজিটাল করতে সরকারের একটি পরিকল্পনার অংশ। অনেক ফিজিক্যাল মাইগ্রেশন নথি যেমন বায়োমেট্রিক  রেসিডেন্স পারমিট বা বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স কার্ড থাকা ব্যক্তিদের মাইগ্রেশন রাইটস প্রমাণ করে ই-ভিসায় রিপ্লেস করতে হবে।

বর্তমানে ভিসাধারীদের বহন করা সরকার ফিজিক্যাল বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স পারমিট (ইজচ) প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনার কথা বেশ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল এবং  ই-ভিসাতে কীভাবে আসতে হবে তারও ধারণা দেয়া হয়েছিল।
ভিসার ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল  ডকুমেন্টের পরিবর্তে ই-ভিসা পদ্ধতিতে  বৃটেনে বসবাস, কাজ করার এবং সুবিধা দাবি করার অধিকারের প্রমাণ করবে।  আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ফিজিক্যাল বায়োমেট্রিক  রেসিডেন্স পারমিট (ইজচ)’র ব্যবহার বলবৎ থাকবে ২০২৫ সাল থেকে আর ফিজিক্যাল বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স পারমিট থাকবে না। এক্ষেত্রে শুধুই ই-ভিসায় নাগরিকের সকল তথ্য বহন করবে যা সফটওয়্যারের মধ্যে সংরক্ষিত থাকবে।

হোম অফিস থেকে বলা হয়েছে বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স পারমিট থেকে ই-ভিসায় আসতে হলে একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল লিংক  দেয়া হবে। লিংক অনুযায়ীই-ভিসার  রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। ডিজিটাল লিংকের মাধ্যমে  ই-ভিসায় আসতে হলে ব্যক্তিকে অবশ্যই কম্পিউটার এক্সপার্ট বা ডিজিটাল এক্সপার্ট হতে হবে নতুবা কার্যটি সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

গবেষণায় দেখা  গেছে  দেশটিতে দুই লাখেরও ভিসাধারী নাগরিক আছেন যারা ডিজিটাল ব্যবহারের একেবারেই জিরো, তাহলে তারা কীভাবে ই-ভিসায় আসার কার্যটি সম্পাদন করবে?  এনিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া বিপাকে পড়ছেন এরকম নাগরিকরা। এ  ক্ষেত্রে শুধু  ফিজিক্যাল বায়োমেট্রিক  রেসিডেন্স পারমিট-ই নয় একই সঙ্গে ভাড়া, কাজ এবং  বেনিফিট প্রভৃতিকে ডিজিটালে  রিপ্লেস করা হবে।

তবে  এরকম  দুর্বল ব্যক্তিদের সাহায্য করতে হোম অফিস কয়েকটি সংস্থাকে  সহায়তা করার জন্য ৪ মিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করেছে যারা কারো সহায়তা ছাড়াই ই-ভিসাতে স্থানান্তর হতে পারবেন।
ওদিকে পদ্ধতিটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডিজিটাল অধিকার প্রচার সংস্থা-ওপেন রাইটস গ্রুপ নামের একটি সংগঠন। এ নিয়ে তারা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, ই-ভিসার ডিজাইন, রোলআউট এবং বাস্তবায়নের ক্রটির কারণে যুক্তরাজ্যে থাকার অধিকার থাকা মানুষেরা এটি প্রমাণ করতে পারবে না। ডেটা ত্রুটি, সিস্টেম ক্র্যাশ এবং ইন্টারনেট সংযোগের স্থিতিশীলতার জন্য এটি অনেক   সংবেদনশীল পদ্ধতি। ই-ভিসা স্কিমটি আরেকটি ব্যর্থ আইটি প্রকল্প যা যুক্তরাজ্যের হাজার হাজার মানুষের জীবন পরিবর্তনকারী হিসাবে পরিণতি হতে পারে।
অনেকেই বলছেন এরকম পরিবর্তন আরেকটি  “ডিজিটাল উইন্ডরাশ  কেলেঙ্কারি” সৃষ্টি করতে  পারে এবং সরকারকে ১ জানুয়ারি, ২০২৫ এ কার্যকর হওয়ার আগে এই প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছে। অনেক বিশেষজ্ঞরাও  কার্যকর হওয়ার আগে এই স্কিমটি বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ই-ভিসা প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছিল ইইউ  সেটেলমেন্ট স্কিমের সময়,  যেটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের জন্য যারা  ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছিল এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য করা হয়েছিল।

অশান্ত পাহাড়, নিহত ৪

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে। দীঘিনালার জেরে রাঙ্গামাটিতেও পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত ও  ৫৪ জন আহত হয়েছেন। এ নিয়ে খাগড়াছড়ির ৩ জন নিহতসহ দুই জেলায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ৬৫ জনের বেশি। গতকাল সকাল থেকে রাঙ্গামাটিতে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ, দোকানপাট ও বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর থেকে দুই জেলায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। দুই পক্ষের মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মাঠে পুলিশের পাশাপাশি কাজ করছে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, আনসার সদস্যরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। খাগড়াছড়ির সদর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন চন্দ্র রায় এক আদেশে দুপুর ২টা থেকে এবং রাঙ্গামাটির পৌর এলাকায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান পৃথক আরেক আদেশে দুপুর ১টা থেকে ১৪৪ ধারা জারি করেন। রাত ৯টা পর্যন্ত এটি বলবৎ থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বার্তায় দুই জেলার মানুষকে শান্ত থাকার পরামর্শ  দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ারও কথা বলা হয়েছে।

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানিয়েছেন- খাগড়াছড়ির পাহাড়ি-বাঙালির সংঘর্ষের রেশ রাঙ্গামাটি শহরেও ছড়িয়েছে। এর জেরে রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শহর জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গতকাল সকালে আগাম ঘোষণা ছাড়াই কয়েক হাজার পাহাড়ি যুবক বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে শহরের জিমনেসিয়াম হয়ে প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা বনরূপা বাজারে এসে মসজিদ, পেট্রোল পাম্পসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাতে থাকে। এতে শহর জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে ধাওয়া দিলে পাহাড়িরা পিছু হটে। রাস্তায় চলাচলকারী বাস, ট্রাক ও ট্যাক্সিতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। শহরের হ্যাপির মোড়কে কেন্দ্র করে এর দু’দিকে অবস্থান নেয় পাহাড়ি ও বাঙালিরা। পরে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষ শহরের বনরূপা, হ্যাপির মোড়, কালিন্দিপুর, রাজবাড়ী, স্টেডিয়াম এলাকা, কল্যাণপুর, ভেদভেদীসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে অন্তত ৩০টি যানবাহন ভাঙচুরের পাশাপাশি উভয়পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক লোকজন আহত হন। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করলেও তার নাম ও ঠিকানা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি। আহতদের মধ্যে বাঙ্গালিদের বেশ কয়েকজনের শরীরে গুলির আঘাত রয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়িরা মারধর ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের কারণে আহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে ১০-১২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক সাদিয়া আক্তার। পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. জামাল উদ্দিন জানান, সকালে পাহাড়িদের একটি মিছিল বনরূপায় এসে ফিরে যাওয়ার সময় বাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলাসহ বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুর করে। এরপরই বাঙালি ব্যবসায়ীরা সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের পাল্টা ধাওয়া দেয়।

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানিয়েছেন: খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উভয় পক্ষের ৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় দুর্বৃত্ত কর্র্তৃক অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উভয় পক্ষের প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। এ ঘটনায় পরস্পরবিরোধী অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার লারমা স্কয়ার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি’র সদস্যরা টহলে রয়েছে। বর্তমানে দীঘিনালায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।

সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে: বুধবার খাগড়াছড়িতে চোর সন্দেহে বাঙালি যুবক মোহাম্মদ মামুন (৩০) কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মামুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার বাসিন্দা। এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। পূর্বনির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করলে স্থানীয় পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে আসা সাধারণ বাঙালি শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া করে। এতে আন্দোলনকারী সাধারণ বাঙালি শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ ঘটনায় কয়েকজন বাঙালি শিক্ষার্থী আহত হয়। পরে বোয়ালখালী বাজার এলাকা ও আশপাশ এলাকা থেকে বাঙালি লোকজন জড়ো হয় বাসটার্মিনালের দক্ষিণ প্রান্তে। তখন বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ি লোকজনও জড়ো হতে থাকে লারমা স্কয়ারে। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তখন লারমা স্কয়ার থেকে বাঙালিদের দিকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। এতে মুহূর্তের মধ্যে এলাকায় চরম আতঙ্ক এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আর তা ছড়িয়ে পড়ে উপজেলা জুড়ে। কিছুক্ষণ পরেই দুর্বৃত্তরা লারমা স্কয়ারে সড়ক ও জনপদের জায়গায় গড়ে ওঠা অস্থায়ী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান দোকানপাটে আগুন দেয়। পরে পুলিশের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় যখন বেসামাল অবস্থা, তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামেন। ততক্ষণে মার্কেটের প্রায় সকল দোকানপাট পুড়ে যায়। মার্কেটটিতে পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষের দোকানপাট ছিল। তাদের মধ্যে সখ্যতাও ছিল বেশ।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালির সংঘর্ষের জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতভর জেলা সদরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে সদরসহ পুরো জেলায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাতের গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। নিহতরা হলেন জুনান চাকমা (২০), ধনঞ্জয় চাকমা (৫০) ও রুবেল চাকমা (৩০)। বৃহস্পতিবার রাতে জেলা শহরের নারানখখাইয়া, স্বনির্ভর এলাকায় ব্যাপক গুলির শব্দ শোনা যায়। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাত পর্যন্ত গুলির শব্দ পাওয়া যায়। এরমধ্যে ধনঞ্জয় চাকমা দীঘিনালায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সংঘর্ষে মারা যান। অপর ২ জনকে আহত অবস্থায় রাতে খাগড়াছড়ি সদর থেকে হাসপাতালে আনা হয়। খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রাতে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ১৬ জনকে আনা হয়। তারা বেশির ভাগই সদর উপজেলা থেকে এসেছেন। এরমধ্যে ৩ জন মারা যান। নিহত ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত শেষে বলা যাবে। বর্তমানে হাসপাতালে আরও ৯ জন চিকিৎসাধীন। রাতেই ৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে একজন বাঙালি রয়েছেন। আহত বাকি ৯ পাহাড়িকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

এদিকে আগুন লাগার ঘটনাস্থল লারমা স্কয়ার থেকে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দূরত্ব ছিল মাত্র ৫০০ মিটারের কাছাকাছি। খুব কাছে থেকেও ফায়ার সার্ভিস যথাসময়ে না পৌঁছায় আগুনে আরও কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, গত রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাঙালি ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বেশ কিছু ফেসবুক আইডি থেকে দীঘিনালায় সংঘাত ঘটানোর উগ্রতা ছড়ানো হয়েছে। অথচ এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এ ছাড়া যদি সমন্বিত কোনো সভা বা মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হতো তাহলে অবশ্যই এই সংঘাত ও ক্ষতি এড়ানো যেতো। এই ঘটনায় অনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এ ঘটনায় পরস্পর পরস্পরকে দুষছেন। দীঘিনালা থানার অফিসার্স ইনচার্জ মো. নুরুল হক বলেন, ‘দীঘিনালায় একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যা কখনো কাম্য নয়। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বিশেষ মতবিনিময় সভা: গতকাল বিকালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান এর সভাপতিত্বে এতে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এ সময় খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল, জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য্য, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার, মারমা প্রতিনিধি ম্রাসাথোয়াই মারমা, চাকমা প্রতিনিধি অনিমেষ চাকমা এবং ত্রিপুরা প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেন। মতবিনিময়ে বক্তারা ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হতাহতের ঘটনায় খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সবাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের উপর জোর দেন। সবাইকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানান।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, আপনারা কেউ আতঙ্কিত হবেন না, গুজবে কান দিবেন না। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে কাজ করছি। ইতিমধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শান্তি-সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে দীঘিনালায় আমরা উভয় পক্ষের ৪০ জন সদস্যকে নিয়ে একটি শান্তি কমিটি গঠন করেছি। আশা করি পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের আমরা সরকারি সহায়তার আওতায় আনবো।

রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান হাসান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, প্রশাসন যৌথবাহিনী কাজ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি আইনশৃঙ্খলা সভা করা হয়েছে। সকলে মিলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আমরা। সেনাবাহিনী সবসময় জনসাধারণের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন্ন রাখতে আমরা কাজ করছি। ফেসবুক গুজব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আপনারা গুজবে পা দেবেন না। গুজব থেকে দূরে থাকতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

মোহাম্মদপুর থানার লুট হওয়া ৭শ’ অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার ১১০

গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে হামলা চালানো হয় রাজধানীর বিভিন্ন থানায়। সে সময় নিজেদের জীবন বাঁচাতে অস্ত্র-পোশাক থানায় রেখেই আত্মগোপনে চলে যায় মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ সদস্যরা। সে সময় শত শত মানুষ থানায় ঢুকে সাত শতাধিক ছোট-বড় অস্ত্র, গোলাবারুদ, আসবাবপত্র, মোটরসাইকেলসহ থানায় রক্ষিত সবকিছু লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার দেড় মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ১১০টি আগ্নেয়াস্ত্র। অভিযোগ উঠেছে-জেনেভা ক্যাম্পের মাদক নিয়ে চলা দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের এসব আগ্নেয়াস্ত্র। এসব বন্দুকের গুলিতে এখন পর্যন্ত দুইজন নিহতসহ আহত হয়েছেন অর্ধশত মানুষ।

বাংলাদেশে ১১৫টি উর্দুভাষী ক্যাম্পের মধ্যে অন্যতম রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। তবে সরকার পতনের পর থেকে এই ক্যাম্পের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভূঁইয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম বাহিনী নামে দুটি পক্ষ। এই সোহেলের সঙ্গে আছে চিহ্নিত মাদক কারবারি রানা, কালীন জাম্বু, টুনটুন, কালু, আনোয়ার। আর চুয়া সেলিমের বাহিনীতে রয়েছে আকরাম, শাহ আলম, সোহেল, জানু, আরমানসহ বেশ ক’জন সক্রিয় সদস্য। এদের সঙ্গে মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এ সংঘর্ষে যোগ দিয়েছে জেনেভা ক্যাম্পের বিখ্যাত ‘বোবা বিরিয়ানি’ এর মালিকের ভাই কামরান এবং তার ছেলে ইরফান। এরা সকলেই জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই তাদের এই দ্বন্দ্ব। তবে এতদিনেরে দা-বঁটি ও লাঠিসোটা নিয়ে চলা সংঘর্ষে এবার যোগ হয়েছে শটগান, শুটারগান, পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় আগ্নেয়াস্ত্র। পান থেকে চুন খসলেই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ মিন্টু বলেন, সরকার পতনের পর থেকে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পে গোলাগুলির ঘটনা নিত্যদিনের হয়ে গেছে। আগে এসব সংঘর্ষে দা-ছুরি, বঁটি, লাঠিসোটা ব্যবহার হলেও আগস্টের পাঁচ তারিখের পর থেকে বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। মূলত থানা থেকে লুট করা হয় এসব অস্ত্র। আবার আন্দোলনের সময় স্থানীয় কাউন্সিলর সৈয়দ হাসানুর ইসলাম রাস্টন ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায়ীদের হাতেও কিছু অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। এখন নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে ক্যাম্পের বাসিন্দারা। তিনি বলেন, ৫ তারিখে হাসিনা চলে গেল। আর এর পরদিন ৬ই আগস্টে দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাসিন্দা শাহেন শাহ্‌। আর সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে মারা যান ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ সনু। প্রতিদিনই কেউ না কেউ গুলিতে আহত হচ্ছেন। আমি নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছি। তিনি বলেন, গত ২৯শে আগস্ট বাসা থেকে বের হয়ে দোকানে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ভূঁইয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দু’গ্রুপই গুলি ছোড়া শুরু করে। তাদের ছোড়া শটগানের ছররা গুলি আমার গায়ে এসে লাগে। সেদিন আমি মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে এসেছি।

নিহত সনুকে সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া তার প্রতিবেশী সাজিদ, শামীম ও সজীব আহমেদ বলেন, মাদক কারবারি হিসেবে বুনিয়া সোহেলকে জেনেভা ক্যাম্পের সবাই চিনে। সেদিন সকাল ৮টার দিকে সনু ভাই সোহেলকে বলেন, তুমি মাদক বিক্রি করছো, এতে এখানকার ছেলেরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। একপর্যায়ে সোহেলসহ কয়েকজন সনুর ওপর চড়াও হয়। সোহেল সনুর ওপর গুলি চালান। সেই গুলি সনুর বুকে এসে লাগে। শাওন নামে আরও একজনের গায়ে গুলি লাগে। তখন আমরা তাদেরকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে চিকিৎসক সনু ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা বলেন, ক্যাম্পে যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে এসবই থানা থেকে লুট করা অস্ত্র। গোলাগুলির সময় পুলিশের বিশেষ পোশাক পরা অবস্থায়ও অনেককে দেখা গেছে।

সরজমিন জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের বসবাস। এরা সকলেই অবাঙালি। তারা নিজেদের মধ্যে এক ভাষায় কথা বলেন। আর অন্যদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলেন। রাজধানীর সেলুনে চুল কাটাসহ নিম্নমানের কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করলেও অনেকেই আবার ক্যাম্পকে মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন। ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল এমন কিছু নেই সেখানে পাওয়া যায় না। রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টাই ক্যাম্পে চলে মাদকের জমজমাট বেচা-কেনা। আর এই মাদক বেচা-কেনা নিয়েই চলে নিত্যদিনের সংঘর্ষ। গত এক মাসে মাদক নিয়ে চলা এই গোলাগুলিতে দু’জন নিহতসহ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। শামীম হোসেন নামে ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, শুধু ক্যাম্প না, ক্যাম্পের আশপাশে যত ইয়াবা সিন্ডিকেট আছে সব ভূঁইয়া সোহেল ও চুয়া সেলিম বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। ওদের অনেক ক্ষমতা এরপর তাদের কাছে থানা ও সংসদ ভবন থেকে লুট করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভারী অস্ত্র রয়েছে। তারা নিরীহ লোকদের রাস্তা থেকে ধরে এনে নানাভাবে নির্যাতন করে টাকা আদায় করছে। এদের অত্যাচারে আশপাশের বাসিন্দারাও অতিষ্ঠ। মিরাজুল ইসলাম নামে মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের এক বাসিন্দা বলেন, এসব মাদক কারবারিদের অনেক ক্ষমতা। তাদের কাছে অস্ত্র আছে। তাই কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাই না। আমরা চাই সেনা অভিযানের মধ্যদিয়ে এখানকার মাদক কারবারিদের নির্মূল করা হোক। জেনেভা ক্যাম্পে একটা সেনা অভিযান খুবই প্রয়োজন। জুয়েল রানা নামে বাবর রোডের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের বাচ্চারা ছোট থেকেই এই ক্যাম্পের মাদক বেচা-কেনা দেখে বড় হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সকলে চিন্তিত। তাই এই জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি যৌথ অভিযান খুবই প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা এসআই সাদিক বলেন, গত ৫ই আগস্ট আমাদের থানায় হামলার সময় সরকারি-বেসরকারি মিলে ছোট বড় অন্তত সাত শতাধিক অস্ত্র লুট করা হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১০টির মতো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্রের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। একটি থানায় এত অস্ত্র কীভাবে এলো- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের মোহাম্মদপুর থানা অনেক বড় এলাকা জুড়ে। বিভিন্ন সময় অনেকে তাদের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র জমা দিয়েছেন। বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে আমরা অনেক অস্ত্র উদ্ধার করেছিলাম। আমাদের থানার পুলিশ সদস্যদের জন্যও প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র বরাদ্দ ছিল। সবমিলে প্রায় সাত শতাধিক অস্ত্র ছিল থানায়।

বিষয়টি নিয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, গত মাসখানেক ধরে চলা জেনেভা ক্যাম্পের গোলাগুলির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা অস্ত্রধারীদের তালিকা সংগ্রহের চেষ্টা করছি। কিছু নামও পেয়েছি।

ভোলাগঞ্জে পাথর লুটের মহোৎসব by ওয়েছ খছরু

ভোলাগঞ্জ কোয়ারিতে চলছে বালু ও পাথর লুটপাট। কোথাও কোথাও যন্ত্রদানব বোমা মেশিন ব্যবহার করে তোলা হচ্ছে বালু ও পাথর। এর বাইরে  রেলওয়ের সংরক্ষিত ব্যাংকার এলাকায় চলছে হরিলুট। স্থানীয়রা জানিয়েছেন; প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বালু ও পাথর লুটপাট করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৫ই আগস্টের পরবর্তী এক সপ্তাহ হরিলুট চলছে পর্যটন স্পট সাদা পাথরে। এ স্পটের অর্ধেক পাথরই লোপাট করা হয়েছে। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। দেশের বৃহত্তম পাথর কোয়ারি সিলেটের ভোলাগঞ্জ। পরিবেশ ধ্বংসের আশঙ্কায় প্রায় এক দশক ধরে এ কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। তবে থেমে ছিল না লুটপাট। স্থানীয়রা রাতের আঁধারে পাথর লুট করতো। গত ঈদ মৌসুমে একদফা হরিলুট হয়েছে সাদাপাথর। ওই সময় পাথরখেকোরা রাতের আঁধারে সাদাপাথর লুট করে। স্থানীয় ভোলাগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সময় পাথরখেকোরা নতুন করে সুযোগ নেয়। রাতের আঁধারে শত শত নৌকা দিয়ে সাদাপাথরের উপরে থাকা বড় বড় পাথর সরিয়ে নেয়। ছাতক নিয়ে আসা হয় ট্রলারও। এসব ট্রলারে করে পাথর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে অবশ্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের অনুরোধে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেনাসদস্যরা রাতের আঁধারে পাথর লুটের জন্য টহল জোরদার করে। একইসঙ্গে বিজিবিকে সক্রিয় রাখা হয়। সাদাপাথর এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন; সেনাসদস্যদের হস্তক্ষেপে সাদাপাথর এলাকায় পাথর লুট বন্ধ হলেও সংরক্ষিত এলাকা ব্যাংকারে চলেছে লুট। সর্বদলীয় পাথরখেকো চক্রের সদস্যরা ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় আঘাত হানে ব্যাংকারে। সেখানে থাকা রেলওয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের এক রুমে বন্দি রেখে প্রথমে লোহার যন্ত্রাংশ লুট করে। এক রাতেই কোটি টাকার যন্ত্রনাংশ লুট করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কালাইরাগ এলাকার বাসিন্দারা।  লোহার ওই যন্ত্রাংশ  নৌকা দিয়ে এনে গাড়ি করে সিলেটে বিক্রি করা হয়। একইভাবে ভোলাগঞ্জ পোর্ট এলাকায়ও নির্মাণাধীন ভবনের জন্য রাখা অন্তত ৫০ টন লোহার রড লুট করা হয়। এ পর্যন্ত অন্তত ৫ কোটি টাকার পাথর লুট করা হয়েছে বলে জানান তারা। সর্বশেষ বুধবার গভীর রাতে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ব্যানারে একদল যুবক কোয়ারি এলাকা থেকে উত্তোলিত বালু ও পাথরের গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করছিল তখন এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ৯ জনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা নিয়েছে। এ মামলার বাদী হয়েছে উপজেলার ছাত্র সমন্বয়ক দাবিদার নুর আহমদ। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, আটককৃতরা শ্রমিকদের দিয়ে সাদাপাথর ও নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর চুরি করে নিয়ে আসছিল। পরে এ বালু ও পাথরে চাঁদাবাজি করছিল। মামলার বাদী নুর আহমদ জানিয়েছেন, ভোলাগঞ্জ কোয়ারি ও সাদাপাথর এলাকা ওদের নির্দেশে বালু ও পাথর লুট করা হচ্ছিলো। বিষয়টি নিয়ে এলাকার শ্রমিক জনতা প্রতিবাদী হওয়ার পর বিষয়টি আলোচিত হয়। এ কারণে থানায় মামলা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে ভোলাগঞ্জ কোয়ারির তীরবর্তী দয়ারবাজার এলাকায় খেলার মাঠ ভরানোর কথা বলে কালিবাড়ি গ্রামের রজন মিয়ার নেতৃত্বে বোমা মেশিন লাগিয়ে পাথর ও বালু লুট করা হচ্ছে। তার সঙ্গে কোয়ারিতে পাথর লুটপাটে রয়েছে জামাল ও সাব্বির। তারা কোয়ারির তীরবর্তী খেলার মাঠে বালু ফেলে দেয়ার কথা বলে বোমা মেশিন দিয়ে কোয়ারি থেকে বালু ও সিঙ্গেল পাথর তুলছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তারা এ কাজ করলেও প্রশাসন নীরব রয়েছে। এ ছাড়া তাদের নেতৃত্বে প্রতিদিন কোয়ারি থেকে ২৫ থেকে ৩০ গাড়ি সিঙ্গেল পাথরও লুটপাট করা হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। তবে; বালু ও পাথর লুটের কথা অস্বীকার করেছে কালীবাড়ি গ্রামের রজন মিয়া। তিনি জানিয়েছেন; এলাকার মানুষের অনুরোধে তিনি  মেশিন দিয়ে বালু তুলে মাঠ ভরাট করছেন। আজ-কালের মধ্যে তাদের মাঠ ভরাটের কাজ শেষ হয়ে যাবে। পাথর লুটের ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এবারের পাথর লুটপাটের অভিযোগে বিদ্ধ হচ্ছে থানার ওসি মো. বদিউজ্জামানও। ২০১৮ সালে তিনি এ থানারই সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন। পাথর ও বালুখেকোদের সঙ্গে সখ্যতার কারণে ওই সময় তিনি বিতর্কিত হন। পরে অবশ্য তাকে থানা  থেকে বদলি করা হয়েছিল। এবার ওসি হয়ে তিনি কোম্পানীগঞ্জে এসে ফের বালু ও পাথর লুটপাটে তার সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করছেন। এলাকার লোকজন জানান, ওসির ঘনিষ্ঠজনেরাই এখন ফ্রন্টলাইনে থেকে চাঁদাবাজি করছে। বুধবার রাতে ৯ চাঁদাবাজ জনতার হাতে আটকের পর ওসি মামলা গ্রহণে নানা টালবাহানা করেন। তিনি ওদের ছেড়ে দিতে নানা নাটকতীয়তার আশ্রয় নেন। পরে অবশ্য মানুষের ক্ষোভের মুখে তিনি মামলা নিয়েছেন। তবে ওসি মো. বদিউজ্জামান জানিয়েছেন, যারা চুরি করে বালু ও পাথর লুট করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফ থেকে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানে যাদের ধরা হচ্ছে তাদের আসামি করা হচ্ছে।