Sunday, August 11, 2024

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে ‘অত্যাচার’ যেসব ভুয়া পোস্ট বিবিসি খুঁজে পেয়েছে

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে যে সহিংসতা চলেছিল সেদেশে, তার মধ্যেই এমন বহু ভুয়া পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয় যে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে ব্যাপক অত্যাচার শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং সেদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কমিটি গড়েছে ভারত সরকার। আবার বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় রবিবার থেকে হটলাইন চালু করতে চাইছে সেদেশের সরকার।

তবে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে ‘ব্যাপক অত্যাচার’ হচ্ছে বলে যেসব ভুয়া পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার বেশিরভাগই ভারতীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল বলে ফ্যাক্ট-চেকাররা নিশ্চিত করেছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকেও এধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে, এমনটাও ফ্যাক্ট-চেকাররা বলছেন।

তারা এটাও বলছেন যে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে কিছু আক্রমণ হয়েছে, বাড়িঘর জ্বালানো হয়েছে। কিন্তু তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা গেছে মুসলমানদের বাড়িঘরও ভাঙচুর করা হয়েছে, জ্বালানো হয়েছে।

এক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর, সম্পত্তি। ধর্মীয় পরিচয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গৌণ ছিল, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্যই তারা আক্রান্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের যেসব স্থানীয় নেতা-কর্মী পালিয়ে ভারতে চলে এসেছেন অথবা আসার চেষ্টা করছেন, তারাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে হিন্দু আর মুসলমান – উভয় সম্প্রদায়ের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িতেই হামলা হয়েছে।

কিন্তু ভারত থেকে সামাজিক মাধ্যমের পো বিষয়টিকে রাজনৈতিক না রেখে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন একাধিক ফ্যাক্ট চেকার।

বিবিসির তথ্য যাচাইয়ের বিভাগ, ‘বিবিসি ভেরিফাই’-ও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
 
মন্দির পাহারায় মইনুল

হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ হয়েছে বলে যে ধরণের পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, তার কয়েকটি চোখে পড়েছিল চট্টগ্রামের এক বিক্ষোভকারী মি. মইনুলের।

বিবিসির তথ্য যাচাই বিভাগ ‘বিবিসি ভেরিফাই’ যখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে, তিনি সেসময়ে চট্টগ্রাম লাগোয়া ‘শ্রী শ্রী সীতা কালী মাতা মন্দির’ পাহারা দিচ্ছিলেন।

তার বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা।

মি. মইনুল বলছিলেন, “তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব তো আমাদের। আমরা সব সরকারি স্থাপনা, মন্দির, গির্জা – সব কিছুই রক্ষা করব।“

তার কথায়, যেসব পোস্ট ছড়াচ্ছে, সেগুলো কিন্তু “আমাদের চোখে দেখা বাস্তব ছবির সঙ্গে মিলছে না। ওই সব পোস্ট বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ সম্বন্ধে একটা ভুল ছবি তুলে ধরছে।“

বিক্ষোভকারীদের ওপরে ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যার শেষে যখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালালেন, বিক্ষোভকারী ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা খুব আশ্চর্যের কিছু ছিল না।

অন্যদিকে, থানাগুলিতে আক্রমণ হওয়ার ফলে পুলিশ ছিল না পুরো বাংলাদেশেই। এই সময়েই সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়ি-ঘরে লুঠ চলে, সহিংসতা শুরু হয়।

তবে বাস্তবে দেখা গেছে, যে সাধারণ নাগরিকদের বাড়িতেও লুঠ চলেছে, তাদেরও কেউ কেউ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ‘বিবিসি ভেরিফাই’ মনে করছে ব্যাপক সহিংসতার ফলেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

ভারত থেকে ছড়ানো হয় ভুয়া খবর

চারদিকে যখন একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছিল, সেই সময়ে ভারতের অতি-দক্ষিণ-পন্থী ‘ইনফ্লুয়েন্সর’রা সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিকর ভিডিও শেয়ার করতে থাকেন, যাতে মনে হয় যে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার হচ্ছে।

এ ছাড়া এরকম গুজবও ছড়ানো হয় যে ছাত্র-বিক্ষোভকারীরা ‘ইসলামি কট্টরপন্থী’।

সামাজিক মাধ্যমের ওপরে নজর রাখে ‘ব্র্যান্ডওয়াচ’ অ্যাপ। তারা খুঁজে পেয়েছে যে চৌঠা অগাস্টের পর থেকে ভুয়া কাহিনীগুলি ছড়ানো হয়েছে এমন একটি হ্যাশট্যাগ দিয়ে, যেটি সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) সাত লক্ষ বার মেনশন হয়েছে।

যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে ট্রেন্ডিং পোস্টগুলি করা হয়েছিল, তার প্রায় সবই ভারতে অবস্থান করছে, এমনটাও জানা গেছে ‘ব্র্যাণ্ডওয়াচ’ থেকে।

বাংলাদেশ ভিত্তিক ফ্যাক্ট-চেকাররাও গত কদিনের সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণ করে অনেকটা একইরকম তথ্য পেয়েছেন যে মূলত ভারতের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকেই হিন্দুদের ওপরে আক্রমণের ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ বা ইউল্যাবের অনুমোদনপ্রাপ্ত স্বাধীন তথ্য যাচাই করার উদ্যোগ ‘ফ্যাক্ট ওয়াচ’এর প্রধান, অধ্যাপক সুমন রহমান বলছিলেন, “কিছু ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, যেখানে হিন্দুদের বাড়ি আক্রমণ করা হয়েছে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ওই ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি।"

"কিন্তু এমন একটা আখ্যান তৈরি করা হয়েছে, যাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে।  এটা একেবারেই ভুল আখ্যান ছড়ানো হয়েছে। যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে এই ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, সেগুলির বেশিরভাগই ভারতের," বলেন তিনি।

আবার ঢাকার ‘দৈনিক আজকের পত্রিকার’ ফ্যাক্ট চেকার রিদওয়ানুল ইসলাম বলছিলেন ভারতীয় অ্যাকাউন্টগুলি থেকেই বেশিরভাগ ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

"তবে বাংলাদেশের ভেতর থেকেও হিন্দুদের ওপরে আক্রমণের ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে বলে আমাদের অনুসন্ধানে জানতে পারছি।"

হিন্দুদের বাড়ি, মন্দির ‘জ্বালানো’র ভুয়া খবর

সামাজিক মাধ্যমে একটা পোস্ট ভাইরাল হয়েছিল, যাতে দাবি করা হয়েছিল যে ‘হিন্দু ক্রিকেটার’ লিটন দাসের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্য অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে সেই পোস্ট শেয়ার করে লেখা হয় যে কট্টর ইসলামপন্থীরা তার বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু যে বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছিল, সেটা যে আসলে বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তার্জার, তা এখন সবার জানা।

আরেকটি ভাইরাল হওয়া পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে ‘বাংলাদেশের ইসলামি জনতা’ একটা মন্দিরে আক্রমণ করেছে।

চট্টগ্রামের ‘নবগ্রহ মন্দির’এর কাছে আগুন লাগানোর ভিডিও ছড়ানো হয়েছিল। তবে দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে মন্দিরে আগুন লাগে নি।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের কাছে ছবি এসেছে যে, ওই মন্দিরের কোনও ক্ষতি হয় নি। তবে ওই মন্দিরের পিছনে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ই আসল লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয়েছে।

মন্দিরের কর্মকর্তা স্বপন দাস বিবিসিকে জানিয়েছেন, ওই দলীয় কার্যালয় থেকে চেয়ার-টেবিল বার করে আগুন লাগানো হয়েছিল মন্দিরটির পিছন দিকে। এই ঘটনা পাঁচই অগাস্ট দুপুরের।

অগ্নিকাণ্ডের পরের কয়েকটি ছবিতে দেখা গেছে যে আওয়ামী লীগ নেতাদের ছবি সহ বেশ কিছু পোস্টারও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মি. দাস আরও জানিয়েছেন যে ২৪ ঘণ্টাই মন্দিরে পাহারা দিচ্ছেন মানুষ।

লক্ষ্য আওয়ামী লীগ, হিন্দুরা নয়

আরও দুটি ভাইরাল হওয়া পোস্টে দেখা গেছে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে হিন্দুদের ওপরে আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে যাদের ওপরে আক্রমণ করা হয়েছিল, তারা আসলে আওয়ামী লীগের নেতা এবং তারা মুসলমান।

এইসব পোস্টই ভারতীয় দক্ষিণ-পন্থী অ্যাকাউন্টগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ‘সেভবাংলাদেশীহিন্দু’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে সেসব শেয়ার করা হয় হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভেরিফায়েড’ অ্যাকাউন্ট থেকে।

সম্প্রতি আরও একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ‘ইসলামি জনতা’ হিন্দুদের গ্রাম আক্রমণ করেছে এবং একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুকুরে সাঁতার কেটে পালানোর চেষ্টা করছে। ভারতীয় ফ্যাক্ট-চেকাররাই খুঁজে বার করেছেন যে ওই ব্যক্তি মুসলমান।

ইউল্যাবের ‘ফ্যাক্ট-ওয়াচ’এর প্রধান, অধ্যাপক সুমন রহমান বলছিলেন, “সম্প্রতি দুই নারীকে কিডন্যাপের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। এর মধ্যে একটি ঘটনা ঢাকার, অন্যটি নোয়াখালির। ঢাকার ঘটনাটি হল একটি ছাত্রী রাস্তায় ট্র্যাফিক ডিউটি করছিল দীর্ঘক্ষণ। তার বাবা মা-ই জোরপূর্বক তাকে বাড়ি নিয়ে যান।"

অধ্যাপক রহমান বলেন, “সেই ভিডিওকে বলা হল যে ওই ছাত্রীকে নাকি কিডন্যাপ করা হয়েছে। আর নোয়াখালির ঘটনায় যে নারীকে কয়েকজন ‘গণধর্ষণ’-এর জন্য কিডন্যাপ করা হয়েছে বলা হচ্ছে,আসল ঘটনা হল ওই হিন্দু নারী প্রাক্তন স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে নিজের বাবা-মায়ের কাছে থাকছিলেন।

কিন্তু তার স্বামী কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ওই নারীকে উঠিয়ে নিয়ে যান। এটাকে ‘হিন্দু নারীকে গণধর্ষণের জন্য কিডন্যাপ’ বলে চালানো হয়েছে,” বলছিলেন মি. রহমান।

দৈনিক আজকের পত্রিকার ফ্যাক্ট-চেকার রিদওয়ানুল ইসলামের কথায়, “শুধু যে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা নয়। কয়েকটি টিভি চ্যানেল এবং পোর্টালও সামাজিক মাধ্যমের ওই সব গুজবের ওপরে ভিত্তি করে সংবাদ প্রতিবেদন পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে।“

যে কয়েকটি টিভি চ্যানেল এবং পোর্টালর নাম তিনি নিলেন, সেগুলো সবই পরিচিত হিন্দুত্ববাদী সংবাদ মাধ্যম।

বিবিসি এটাও জানতে পেরেছে যে শুধু ভারত বা বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাজ্যের এক পরিচিত অতি-দক্ষিণপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারও এধরণের গুজব ছড়িয়েছেন।

টমি রবিনসন নামের ওই ইনফ্লুয়েন্সার যাচাই না করা নানা ভিডিও ছড়িয়ে লিখেছেন যে বাংলাদেশে ‘হিন্দুদের গণহত্যা চলছে’।

দুই সরকার যা ব্যবস্থা নিচ্ছে

বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে ব্যাপক আক্রমণ হচ্ছে, এই তথ্যের প্রেক্ষিতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ একটি কমিটি গড়ে দিয়েছেন, যারা বাংলাদেশে ভারতীয় নাগরিক, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করবেন।

ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিএসএফের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান, অতিরিক্ত মহা পরিচালক রভি গান্ধীকে। অন্য সদস্যরা হলেন বিএসএফের দক্ষিণ বঙ্গ এবং ত্রিপুরা সীমান্ত অঞ্চলের দুই আইজি এবং ল্যান্ড পোর্ট অথরিটির দুই প্রতিনিধি।

অমিত শাহ এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু এবং সেদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বিশেষ কমিটি গড়ল ভারত সরকার।

"এই কমিটি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে যাতে সেখানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে। বিএসএফের পূর্ব কমান্ডের এডিজি এই কমিটির প্রধান হবেন," লিখেছেন অমিত শাহ।

ওই কমিটির একজন সদস্য বিবিসিকে জানিয়েছেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যেরকম টুইটে লিখেছেন, বাংলাদেশে কেউ সমস্যায় আছেন, এরকম খবর পেলে আমরা সেদেশে আমাদের কাউন্টারপার্ট, অর্থাৎ বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা মেটানোর কাজ করব।

যেরকম শুক্রবার একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল কোচবিহারের শিতলখুচিতে। বাংলাদেশের দিকে বহু মানুষ ভারতে প্রবেশ করতে চেয়ে সীমান্তের অপর পাড়ে জড়ো হয়েছিলেন। আমরা বিজিবির সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। শনিবার কিন্তু এভাবে কেউ জড়ো হয় নি।"

আবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারও হিন্দুদের সহায়তার জন্য রবিবার থেকে একটা হটলাইন চালু করছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে শনিবার এ কথা জানান অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।

তিনি বলেন, কোথাও যদি সংখ্যালঘুদের ওপর কোনও হামলা বা সহিংসতার ঘটনা ঘটে হটলাইনে জানালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবেন তারা।

"ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর, উপাসনালয়ে হামলার খবর আসছে" মন্তব্য করে মি. হোসেন বলেন, "সরকারকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা চলছে"।

"এর সাথে গুজবও যুক্ত হয়েছে," যোগ করেন তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, যে কোনও মূল্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে চায় সরকার।

‘আমরা ফাঁদে পা দেব না’


চট্টগ্রামের ‘শ্রী শ্রী সীতা কালী মাতা মন্দির’-এর বাইরে মুসলমান আর হিন্দু ছাত্ররা কথা বলছিলেন সম্প্রীতি নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে।

“এই সব গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্য হল একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করা,” বলছিলেন মি. মইনুল।

“তবে আমরা ফাঁদে পা দেব না,” জানালেন তিনি।

এলাকার আরেক বাসিন্দা ছোটন নিয়মিত ওই মন্দিরটিতে যান। তিনি তার মুসলমান পড়শিদের ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন।

“তাদের ধন্যবাদ। যতক্ষণ না এই কঠিন সময়টা আমরা পার করতে পারছি, ততক্ষণ যেন তারা এভাবেই পাশে থাকেন।

“স্বাধীন বাংলাদেশে ভবিষ্যতেও যেন আমরা এভাবেই একসঙ্গে কাটাতে পারি,” বললেন ছোটন।

সূত্র- বিবিসি বাংলা

দ্য ইকোনমিস্টের নিবন্ধ: প্রত্যাশা কি বাংলাদেশে ঘৃণাকে দমাতে পারবে?

৫ই আগস্ট ঢাকার আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল শান্তিতে বাংলাদেশের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তার বিরুদ্ধে তথাকথিত একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। এমনকি এসব মামলায় তার যাবজ্জীবন জেলও হতে পারতো। ঠিক এর দুই দিন পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তা ড. ইউনূসকে বাংলাদেশের সেনা-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নিযুক্ত করা হয়। কয়েক সপ্তাহের ছাত্র বিক্ষোভের পর প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। কারণ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়ন এই ছাত্র বিক্ষোভকে দমাতে পারেনি। ঢাকার রাস্তায় আন্দোলনে সশস্ত্র সৈন্য এবং পুলিশ টহল দিয়েছে। এখন ছাত্ররা রাস্তার ট্রাফিক সামলাচ্ছে।  লুটেরাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোকে পরিষ্কার করছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশের সংসদ ভবনও। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায় বহু বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনকে রাতারাতি প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। সেটা কি পূরণ করা যাবে?

সাংবিধানিক শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা আংশিকভাবে কঠিন হবে। কারণ  শেখ হাসিনার আকস্মিক পদত্যাগে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কে পূরণ করবে তা স্পষ্ট নয়। তার আওয়ামী লীগ দল এমনিতেই দেশে সমালোচিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সাথে পালাক্রমে আধিপত্য বিস্তার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নেত্রী খালেদা জিয়া এখন জেল থেকে মুক্ত। কিন্তু তার বয়স এখন ৭৮। তিনি নিজেও অসুস্থ। শেখ হাসিনার ক্রমাগত দমনপীড়নে বিএনপি কার্যত বিপর্যস্ত। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ববাদী শাসন নতুন অধিক উদারপন্থি দলের উত্থানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামপন্থী দলগুলো যারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো শক্তিশালী হয়েছে, তারা শূন্যস্থান পূরণ করতে চাইতে পারে। চ্যালেঞ্জটা বেশ কঠিন। কারণ বাংলাদেশ এখন চীন, ভারত এবং পশ্চিমের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র।

প্রাথমিক কিছু লক্ষণ বেশ আশাব্যঞ্জক। শেখ হাসিনা ভারতে গা ঢাকা দেবার পর সেনাবাহিনী সংযম দেখিয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একই দিনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে আনার জন্য ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ করেন। ড. ইউনূসের প্রথম কাজই হলো দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসুরিদের জন্য শতকরা ৩০ ভাগ আসন সংরক্ষণের বিরুদ্ধে এই কোটা আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের যুক্তি ছিল যে এই সিস্টেম প্রধানত আওয়ামী লীগের সদস্যদের উপকৃত করেছে । সরকার বিক্ষোভকারীদের দমনের চেষ্টা করেছে। শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আদালত যখন শেষ পর্যন্ত কোটা বাতিল করে, তার আগে থেকেই  বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। শেখ হাসিনার স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে বছরের পর বছর মানুষের মনে জমে থাকা হতাশা ক্ষোভে পরিণত হয়। প্রতিবাদকারীদের ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বাসভবন, থানা ও বাসায় হামলা করে। ড. ইউনূস চলমান  অস্থিরতার ঝুঁকি স্পষ্টভাবে স্বীকার করে জনগণকে বলেন, শান্ত থাকুন এবং আপনার চারপাশের লোকদের শান্ত থাকতে সাহায্য করুন'।

ড. ইউনূসের পরবর্তী অগ্রাধিকার হবে বাংলাদেশের রাজনীতির পুনর্গঠন। দ্রুত নতুন নির্বাচন সংঘটিত করার চেয়েও এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ । দেশের আদালত এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মেরামত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অশান্তির উৎস— সেই প্রভাব কমাতে হবে। রাজনীতিতে আসা তরুণ শক্তিকে নিজেদের সংগঠিত করার জন্য সময় ও সুযোগ  দিতে হবে। এই পদক্ষেপগুলি ছাড়া, একটি নতুন নির্বাচন সহজেই ইসলামপন্থী দল বা পুনর্গঠিত বিএনপির হাতে  চলে যেতে পারে। ড. ইউনূসের জন্য তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হল একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ নেভিগেট করা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের দিক থেকে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের  ঘনিষ্ঠ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, তারা আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে দেখে এসেছে। গত দশকে দক্ষিণ এশিয়ায়  চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক ভারত শেখ হাসিনার সঙ্গে  বাণিজ্য, জ্বালানি ও সামরিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত করেছে। এখন ভারত,  আয়রন লেডিকে ( শেখ হাসিনা ) আতিথেয়তা  প্রদান করে প্রতিকূলতার মুখোমুখি  বাংলাদেশি জনসাধারণের অনেকেই ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের ওপর  ১০,০০০ ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য চাপ যেমন রয়েছে তেমনি বাংলাদেশে  ১৪ মিলিয়ন  হিন্দুর বসবাস।  

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং যে কোনো উত্তরসূরি  আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তার জন্য শেখ হাসিনার চেয়েও  চীনের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। হাসিনার  শাসনামলে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, এর দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদেশী বিনিয়োগকারী, তৃতীয় বৃহত্তম ঋণদাতা এবং সামরিক প্রযুক্তির প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। তবুও চীনের উপর খুব বেশি নির্ভরশীল হওয়া এড়াতে হাসিনা  ভারত এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সতর্ক ছিলেন ।

আত্মতৃপ্তি সবথেকে বড় দুশ্চিন্তার কারণ
বাংলাদেশের সংকট আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা সরকারের কাছেও উদ্বেগজনক। তারা দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা ও ইসলামিকরণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ প্রত্যক্ষ করে এসেছে। ২০০৮ সালের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর বাংলাদেশে একটি আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধি বিরাজমান ছিল। পশ্চিমা সরকারগুলি এটিকে কিছু সময়ের জন্য একটি আঞ্চলিক সাফল্যের গল্প হিসাবে দেখেছিল, দেশের  প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ এবং সমৃদ্ধ পোশাক শিল্পের প্রশংসা করেছিল। ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যার হার হ্রাস পেয়েছে, ২০২০ সাল নাগাদ জনপ্রতি জিডিপি (বাজার মূল্যে) এবং শ্রম খাতে নারীর অংশগ্রহণ সহ বাংলাদেশ বেশ কিছু সূচকে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত এক দশকে সেই আশা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার অঙ্গুলি হেলনে একের পর এক নির্বাচনে কারচুপি চলতে থাকে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া (যিনি দুইবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন)সহ শত শত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তিনি কারাগারে পাঠান।

বিশেষ করে আমেরিকা, শেখ হাসিনার আচরণের স্পষ্ট সমালোচক হয়ে ওঠে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিজাত বাংলাদেশি র‌্যাবের  উপর ২০২১ সালে তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৪ সালে প্রাক্তন সেনাপ্রধানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তা সত্ত্বেও, পশ্চিমা সরকারগুলি শেখ হাসিনার সরকারের  উপর কোনো ভারী জরিমানা আরোপ করা এড়িয়ে যায় । এটি আংশিকভাবে চীন সম্পর্কে তাদের উদ্বেগের কারণে ছিল, কারণ উন্নয়নশীল বিশ্বে চীন তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। তাই গণতান্ত্রিক রেকর্ড নিয়ে সমালোচনা থাকলেও পশ্চিমা হস্তক্ষেপ সম্পর্কে স্পর্শকাতর ভারতের সাথে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হবার এটাও একটি কারণ।

পশ্চিমা কর্মকর্তারা এখনও বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ৪.৭ বিলিয়ন বেল-আউটের মাঝামাঝি স্তরে রয়েছে বাংলাদেশ। (যেখানে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি ভোট দেওয়ার ক্ষমতা আছে)। বাংলাদেশের  সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যা তার রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্তু মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অনুপস্থিতির কারণে ২০২৯ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ধাক্কা খেতে পারে। জাপানেরও প্রভাব আছে বাংলাদেশের ওপর, কারণ তারাও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাহায্য দাতা। চীন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সাথে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে, ইতিমধ্যেই বিএনপি এবং বাংলাদেশের  বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে ভারতের প্রতি বিদ্বেষ রয়েছে। বিদেশী মুদ্রার মজুত বাড়াতে  চীন স্বল্পমেয়াদী আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দিতে পারে (জুলাইয়ে চীন সফরে গিয়ে ২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছেন শেখ হাসিনা ) পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করতে পারে চীন।  
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।  যা ২০০৯ সালে ৩.৬ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। (বেশিরভাগই চীনা রপ্তানির জন্য)।

তবুও, চীনের  নিজস্ব অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যার জেরে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সাথে যুক্ত ঋণের পরিমাণ কমানো হয়েছে। পাকিস্তানের প্রকল্পগুলিতে চীনা শ্রমিকদের উপর ধারাবাহিক হামলার পর, চীনা কর্তৃপক্ষও বাংলাদেশের সরকার গঠন নিয়ে  আগ্রহ হারাতে পারে, বিশেষ করে যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইসলামপন্থী সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পরিশেষে বলতে হয়,  বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িত সব দেশের অগ্রাধিকার হচ্ছে স্থিতিশীলতা। আশার কথা হলো, সামনের দিকে তাকিয়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা সহাবস্থানে থাকার একটি উপায় খুঁজে বের করতে পারে। যেমনটা শ্রীলংকা সরকারের পতনের পর দেখা গেছে। কিন্তু মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হয়, ততই ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আবার পুনর্গঠন করার  জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচেষ্টাকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।  এমনকি এটি শেখ হাসিনার সরকারকে  উৎখাত করার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

দিল্লির ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি -দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নাটকীয়তায় অনেকেই হতবাক হলেও নেপালিদের কাছে ওই গল্পটা খুব পরিচিত। সাবেক রাজাসহ নেপালি রাজনৈতিক নেতারা পদচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে আলাদা কেউ নন। এরা সকলেই গণতন্ত্র ও স্বৈরাচার এবং সুশাসন ও দুঃশাসনের মধ্যকার রেখাকে হালকা করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা এবং তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে তা আরও বেশি মনযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে।

নেপালের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যে পররাষ্ট্রনীতির উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দিল্লি এ যাবৎকাল তাদের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিল তা হাসিনার স্বৈরাচারী প্রবণতাকে উস্কে দিয়েছে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের যে গণতান্ত্রিক দাবি ছিল এবং তারা যে আকাক্সক্ষার প্রতি প্রবল ইচ্ছা পোষণ করছিল তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি।
বাংলাদেশের অবস্থান এবং কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভারতের একাধিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতা ছিল। যার সুযোগে হাসিনা হয়ে ওঠেন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দিল্লির সঙ্গে তার ঐতিহাসিক এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দেশটির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থনের কারণ হচ্ছে দিল্লির কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হওয়া হাসিনার সরকার।

এ বছর জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা এবং তার দলের প্রতি ভারতের প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ধরা পড়ে। ভারতের আধিপত্যের বিরোধী দলগুলোকে নানাভাবে বুঝিয়েও আওয়ামী সরকার তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশের বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্বাচন বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে ভারত।

যার ফল খুব একটা ভালো হয়নি। নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিলনা বললেই চলে। এছাড়া নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম এবং কারচুপির খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারত ওই নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা দিয়ে হাসিনার পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এভাবে হাসিনার অন্যায় এবং জোরপূর্বক ক্ষমতায় পিষ্ঠ হওয়াকে সমর্থন করার কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধীতা প্রবল আকার ধারণ করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র নীতি গত এক দশক ধরে বাস্তববাদ এবং নমনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে এক্ষেত্রে তারা ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার বই, দ্য ইন্ডিয়া ওয়ে-তে ‘কৃষ্ণের পছন্দ’ ধারণাটিকে সমান্তরাল বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এর অর্থ হল সামষ্টিক ধার্মিকতার পরিবর্তে  ধর্মকে স্বার্থসিদ্ধ হিসেবে ব্যবহার করা। এই ধরণের পররাষ্ট্রনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বিরোধীতাকে ক্রমান্বয়ে উস্কে দিচ্ছে। জয়শঙ্করের দর্শন অনুসারে ভারতের জনপ্রিয় হওয়ার প্রয়োজন নেই, তারা কেবল তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত করেত চায়। তবে এসব চিন্তাধারার বিপক্ষে দক্ষিণ এশিয়াতে ভারত বিরোধীতা প্রকট হচ্ছে।
এক্ষেত্রে যদি ভারত দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নেতৃত্বের দাবি করতে চায়। বৈশ্বিকভাবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায় বা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায় তাহলে দিল্লিকে অবশ্যই তাদের পররাষ্ট্রনীতির স্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্রকে গ্রহণ করতে হবে। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবেশী দেশগুলোর বৃহত্তর স্বার্থ বিশেষ করে গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

হাসিনার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান যেসব কারণে : বিবিসির প্রতিবেদন

এ বছরের ৫ জুন যখন হাইকোর্টের একক বিচারপতির একটি বেঞ্চ কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল সেটিকে খারিজ করে দেয়, তখন কারো ধারণাই ছিল না যে- পরের দুই মাসের মধ্যে সেটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটবে। শেষ পর্যন্ত এটি শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের টানা শাসন অবসানের দিকে নিয়ে গেছে।

সেদিন হাইকোর্টের সেই আদেশটি অনেক পত্রিকায় তেমন গুরুত্বও পায়নি। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহের মাথায় সেই বিক্ষোভের জেরে এক সময় ১৬ বছর ধরে কঠোরভাবে বিরোধী দলকে দমন করে একটানা ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে গোপনে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয়।

আন্দোলনটি শুরুতে ছাত্রদের কোটা সংস্কার কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এর সাথে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার, নানা বয়সের লাখো মানুষ অংশ নিতে শুরু করে।

লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ যাকে ‘গণবিদ্রোহ’ বলে বর্ণনা করছেন।

তিনি বলছেন, ‘শেষ পর্যন্ত এটা শুধু কোটা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। একপর্যায়ে দেশের সব স্তরের মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, বা সমর্থন দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মধ্যে নানা কারণে ক্ষোভ জমছিল। সেই ক্ষোভ বেরিয়ে আসার জন্য মানুষ একটা সুযোগ খুঁজছিল।

‘কোটা সংস্কার আন্দোলনটা তাদের একটা সুযোগ এনে দিয়েছিল। তারা সেই আন্দোলনকে ঘিরে নিজেদের ক্ষোভ, এতদিনের চাপা বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছে,’ বলছিলেন চৌধুরী।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ যে বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েছিল, প্রায় ৫০ বছরের মাথায় দলটি আবার সেই একই অবস্থায় পড়েছে।

কিন্তু পুরো পরিস্থিতি কিভাবে এবং কেন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছালো, যাতে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটির বিরুদ্ধে এভাবে রাজপথে নেমে এলো?

কেন ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকা শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হলো?

দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর থেকে আর দলটি ক্ষমতা থেকে বের হতে চায়নি।

একতরফা বা জালিয়াতির নির্বাচন, বিরোধীদের ও বিরুদ্ধমত দমন, অনিয়ম আর দুর্নীতি, আমলা আর প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে দলটির টিকে থাকা এই পতনের পেছনে মূল কয়েকটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘এই ১৫ বছরে বেশিরভাগ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দিয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তারা নিজেরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের যে ক্ষমতার ভিত্তি, তার কোনোটাই টেকসই ছিল না। কারণ তারা জনগণ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।’

‘ফলে মানুষের একটা ক্যাটালিস্ট বা স্ফুলিংগের দরকার ছিল। সেটাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়েছে’, তিনি বলছেন।

ফলে সরকার বিরোধী একটা আন্দোলন যখন জোরালো হয়ে ওঠে, সেই আন্দোলন ঘিরেও মানুষের ক্ষোভের জন্ম হয়, তখন সেনাবাহিনী, কারফিউ বা পুলিশের পরোয়ানা না করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার হাজার হাজার মানুষ গণভবনের উদ্দেশে পথে নেমে এসেছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘১৫ বছরের একটা পুঞ্জিভুত ক্ষোভ, জিনিসপত্রের দাম, গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা, লুটপাট, ব্যাংকিংয়ের অনিয়ম সব কিছু নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষ কোটা আন্দোলনের একটা উপলক্ষ্য করে একটা পরিবর্তনের আশায় নেমে এসেছে।’

সেই আন্দোলনে অংশ নেয়া তাহমিনা আক্তার বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার সরকারি চাকরির দরকার নেই, চাকরির আবেদন করার মতো বয়সও নেই। কিন্তু আমাদের সাথে যে মিথ্যাচার করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, আমাদের যে ভয়ভীতির মধ্যে রাখা হচ্ছে, সেটার অবসান চাই। সেটার জন্যই আজ আমি পথে নেমে এসেছি।’

গণঅভুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতের পেছনে আরো কিছু কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ভোটের আর মতপ্রকাশের অধিকার
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বাস্তবে কার্যত একটি 'একনায়কতান্ত্রিক' সরকারে পরিণত হয়েছিল।

২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে বাস্তবিক অর্থে আর কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। এই সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনের দু’টি হয়েছে অনেকটা একতরফা নির্বাচন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিলেও সেখানে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল, যে নির্বাচনকে ‘রাতের নির্বাচন’ বলেও অনেকে বর্ণনা করেন।

এমনকি স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ প্রভাব বিস্তার করেছে। সেসব নির্বাচনও বেশিরভাগ সময় একতরফা হয়েছে। যেখানে বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে, সেখানেই অনিয়ম বা কারচুপির অভিযোগ উঠেছে।

ফলে গত ১৫ বছরে মানুষ আসলে ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি বেছে নেয়ার বা মতামত জানানোর কোন অধিকার পায়নি।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেটা করেছে, জোরজবরদস্তি করে একটা কতৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করলো। জনগণের কোনো রায় তারা নেয়নি। ফলে জনগণের সমর্থনও ছিল না তাদের পেছনে। প্রশাসনকে ব্যবহার করে জবরদস্তি করে ভুয়া নির্বাচন করে তারা ক্ষমতায় ছিল।’

আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিরোধী দলকে শক্ত হাতে দমন করার অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

এসব দলের কেন্দ্রীয় নেতাসহ শত শত নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে, মামলা বা সাজা দিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। অনেক নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘যে দেশটা স্বাধীন হয়েছে মানুষের ভোটের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে, সেই দেশে দীর্ঘ ১৫ বছরে মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ। ’তাকে জিইয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আইন, নজরদারি করার মাধ্যমে।’

বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পুলিশের অনুমতি ছাড়া বিরোধী দল বিএনপিকে সভা সমাবেশও করতে দেয়া হয়নি।

মানবাধিকার হরণ ও ভয়ের সংষ্কৃতি
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

এ বছরের শুরুতেই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক অভিযোগ করেছিলেন যে- মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বিরোধী গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিরুদ্ধ মত দমন করা হয়েছে কঠোর হাতে। বিরোধী গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, দখল নেয়া হয়েছে অথবা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়েছে।

বাংলাদেশে গত বহু বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমেও শেখ হাসিনা বা শেখ মুজিব বিরোধী বক্তব্য পোস্ট করার জের ধরে মামলা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে। এই দমনের জন্য ডিজিটাল সিকিউরিট অ্যাক্ট, সাইবার সিকিউরিট অ্যাক্টের মতো আইন করা হয়েছে।

সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ার জের ধরে মাসের পর মাস ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বলছিলেন, ’তারা একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছি। সাইবার সিকিউরিটির ভয় দেখানো, মিথ্যা মামলা দেয়া- মানুষজন একটা ভয়ের মধ্যে ছিল।’

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনার সরকার ও পুলিশ বাহিনী মিলে পুরো দেশকে একটা 'মাফিয়া স্টেট' তৈরি করেছিল।

আর এসবের জন্য সবসময়েই সরকারি প্রশাসন যন্ত্র, পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনী এমনকি বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হয়েছে।

যেসব মামলায় গত ১৬ বছরে জামিন হয়নি, সরকার পরিবর্তনের পর এক রাতের মধ্যে সেসব মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এসব রাজনৈতিক দলের শত শত কর্মী। জামিন দেয়ার সময় বিচারক মন্তব্য করেছেন, 'অনেক কথা আছে যা আমরা বলতে পারি না।'

বছরের পর বছর বিরোধীদের ধরে নিয়ে হয় গুম করে দেয়া হয়েছে না হলে আটকে রাখা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর এরকম কয়েকজন ব্যক্তি মুক্তিও পেয়েছেন, যাদের আট বছরের বেশি সময় ধরে কোন অভিযোগ ছাড়াই গোপনে আটকে রাখা হয়েছিল।

ফলে মানুষ যে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি, ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে, তা থেকে মুক্তি পেতেই গণআন্দোলনে সবাই নেমে এসেছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

‘মানুষের মধ্যে দিনে দিনে সরকারের প্রতি বা আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষোভ দানা বেধেছে। ফলে তাদের একটা উপলক্ষ্য দরকার ছিল রুখে দাড়ানোর,’ বলছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

পুলিশ ও প্রশাসন নির্ভর একটি দল
বিভিন্ন দেশের ইতিহাসেও দেখা গেছে, জোর করে ক্ষমতায় থাকা দল বা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এক সময় আমলা, প্রশাসন বা পুলিশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

তাদের মতে, টানা বহুদিন ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে এক সময়ের মাঠের রাজনৈতিক দল হলেও দলটির নেতা-কর্মীরা জনগণের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল দলটি। বিশেষ করে দলটি পুরোপুরি প্রশাসন ও আমলানির্ভর হয়ে উঠেছিল।

দলের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব নেতাদের পদ দেয়া হতো, অভিযোগ রয়েছে যোগ্যতার বদলে বরং স্বজনপ্রীতি বা অর্থের বিনিময়ে এসব পদ দেয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পদ বা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমন অনেক ব্যক্তিকে সুযোগ দেয়া হয়েছে যাদের অতীতে রাজনীতির সাথে কোন সংস্রব ছিল না। তাদের অনেকেই এসব পদকে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছে।

সাংবাদিকসহ পেশাজীবী বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে এমনভাবে দলীয় বিস্তার ঘটানো হয়েছে যাতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আসল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছে। ।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র শক্তি ব্যবহার করতে করতে তাদের দলটাকে দুর্বল করে ফেলেছিলেন। অযোগ্য, অদক্ষ ব্যক্তিদের দলের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে। ফলে তাদের সব কিছু ছিল, কিন্তু দলটাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না।’

‘প্রতিটি গ্রামেগঞ্জে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নামে, আওয়ামী লীগের নামে তাদের নেতাকর্মীরা যা করেছে, তাতে মানুষের ক্ষোভ জমতে জমতে এমন একটা অবস্থায় গেছে, এবার শুধু সেটার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। গুলিতে যখন অনেক মানুষ মারা গেছে, তখন তাদের গুলিতে মৃত্যুর ভয়ও চলে গেছে,’ তিনি বলছেন।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, যেসব বাহিনীর ওপর নির্ভর করে সরকার ক্ষমতায় টিকে ছিল, সেইসব বাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তাদের শীর্ষ পদগুলো থাকা ব্যক্তিরা যেমন এসব ব্যবহার করে ইচ্ছেমতো বাহিনী পরিচালনা করেছেন, আইন বা নিয়মের ধার ধারেননি। তেমনি দুর্নীতির করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, ‘তাদের একটা ক্ষমতার দম্ভ তৈরি হয়েছিল। তারা মনে করেছিল, ১৫ বছর চলে গেছে। আরো ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে। জবাবদিহিতার কোন দায় তাদের তৈরি হয়নি। তারা মনে করেছে, যা করেছে, সব ঠিক করেছে।’

পরিবারে আওয়ামী লীগের পূর্ব ইতিহাস আছে অথবা সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের শীর্ষ বা গুরুত্বপদে বসানো হয়েছে।

রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় থানার ওসি থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যন্ত নিয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দলীয় সম্পৃক্ততার অভাবে অনেক কর্মকর্তা অবহেলিত থেকেছেন।

এসব কারণে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর অনেকের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিরোধী একটি মনোভাব তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তাদের একটি বিজ্ঞপ্তিতে যেমন দাবি করা হয়েছে, 'রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কাজে ব্যবহার করেছেন। বাধ্য হয়ে তাদের সেসব নির্দেশ মানতে হয়েছে।'

লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ যেমন বলছেন, ‘রাষ্ট্র আর দল একাকার হয়ে গিয়েছিল। দেশে এক ব্যক্তির শাসন, এক পরিবারের শাসন ছিল। সেটা পুরো রাষ্ট্রশক্তিকে ব্যবহার করে। সেখানে ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র, পুলিশ , মিলিটারি সব মিলিয়ে ছিল। সেখানে চিড় ধরায় তার ক্ষমতা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছে।’

‘দুর্নীতি আর বেগমপাড়া’
আওয়ামী লীগের সরকার তাদের ইশতেহারে ও নেতাদের বক্তব্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা ঘোষণা করে এলেও গত তিন মেয়াদে এই দলের ছোট থেকে কেন্দ্রের বেশিরভাগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে।

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগরিটি (জিএফআই) হিসাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। সেই হিসাবে ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ থেকে পাচার করা অর্থে কানাডায় বেগমপাড়া তৈরি হওয়ার মতো খবর এসেছে। অনেক নেতা-মন্ত্রী-এমপি, সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী দেশ থেকে অর্থ পাচার করে বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম তৈরি করেছেন, বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের মতো অনেক সরকারি সাবেক কর্মকর্তার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ তৈরির খবর প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। সরকারি অফিসে ঘুষ দেয়া যেন একটা স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-মন্ত্রীর বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ, বিনিয়োগ স্কিমে অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এতো দুর্নীতি হয়েছে, যা আগে কখনো মানুষ দেখেনি। দুর্নীতি নিয়ে মানুষের ভয়, চক্ষুলজ্জাও উঠে গিয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়ে তারা যে বিত্ত অর্জন করেছে, তা পাচার করে দিয়েছে। যেখানে মানুষ কষ্টে জীবনযাপন করছে, সেখানে নেতা-মন্ত্রীদের বিদেশে অঢেল সম্পদের তথ্য মানুষকে বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ করেছে।’

বেতনের তুলনায় দুর্নীতির সুযোগ থাকার জন্য সরকারি চাকরি এত লোভনীয় হয়ে উঠেছে যে- চতুর্থ শ্রেণির চাকরির পেছনেও লাখ লাখ টাকা ঘুষ দেয়া-নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘মানুষ ভালো চাকরি পেতে চেয়েছে, যাতে তারা অর্থনীতিকভাবে যাতে নিরাপদ থাকতে পারে। আগে প্রাইভেট সেক্টরে অনেক ভোলো চাকরি ছিল, সেই সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে তারা সবাই সরকারি চাকরি পেতে চাইছিল।’

কিন্তু সেই চাকরির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও তারা নানা অনিয়মের মুখোমুখি হয়েছে।

‘অর্থনীতির দৈন্যদশা’র চাপ
বাংলাদেশের গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ছুঁয়েছে। রাতারাতি ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে সব কিছুর ওপরে। মানুষের সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম রাতারাতি বেড়ে গেছে।

সেই সাথে র্রিজার্ভের ঘাটতি, দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ পাচার, ব্যাংকিংখাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের একের পর এক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে দেশের গণমাধ্যমে।

অথচ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দিনে দিনে কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে তাদের মধ্যে দিনে দিনে সরকার বিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে।

আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদের সময় পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, টানেল, পায়রা বন্দর, পায়রা সেতু, রেল সংযোগের মতো বহু ব্যয়বহুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে। তাতে দক্ষিণবঙ্গের মতো অনেক স্থানে অর্থনৈতিক পরিবর্তনও এনেছে। কিন্তু সেই সাথে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে।

শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রীরা বারবার এসব উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে গেলেও তার খুব বেশি প্রতিফলন নিজেদের সাংসারিক বা ব্যক্তি জীবনে তেমন একটা দেখছিলেন না সাধারণ মানুষ। ফলে তারাও একটি পরিবর্তন চাইছিলেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, ‘অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তারা দেখিয়েছিল উন্নয়ন। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই উন্নয়ন ছিল ফাঁপা উন্নয়ন। কারণ তাতে কর্মসংস্থান হয়নি। উন্নয়নের ফল বিতরণও ঠিক মতো হয়নি। অল্পকিছূ মানুষ এর ফল ভোগ করেছে।’

সেই সাথে নেতাদের, সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া, দুর্নীতি-ঘুষ, ছোটখাটো ব্যবসায়ী-হকার থেকে শুরু করে সেবা নিতে যাওয়া প্রতিটি মানুষের ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে।

ব্যাঙ্কিংখাতে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে সর্বশ্রান্ত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। সেসবের জন্যও অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু এগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি, কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। এগুলোর সব কিছুতে মানুষের ক্ষোভ জমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘এসবের বোঝা পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপরে, যাদের দ্রব্যমূলের ব্যয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেসব দূর করতে সরকারের কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছিল না।'

'মানুষ তাতেও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। তারা এসব কিছুর জন্য দায়ী করেছেন সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে।’

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, এসবের বাইরে ভারতের প্রতি সরকারের অতি নির্ভরতাও অনেকে পছন্দ করেনি বলে তিনি বলছেন।

কারণ গত কয়েক বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যেসব চুক্তি হয়েছে, বাংলাদেশের তুলনায় সেগুলো ভারতের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে সমালোচনা রয়েছে।

‘ভারতের ওপর তাদের নির্ভরতা, যেসব চুক্তি করেছে, দেখা গেছে সেসব ভারতের পক্ষে যাচ্ছে। ঋণ বাড়ছে। নানা কারণে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছি,’ বলছেন চৌধুরী।

বাস্তবতা বুঝতে পারেননি হাসিনা
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন কেন সরকার গুলি-গ্রেফতারের মতো বলপ্রয়োগের পথে গেল, তা অনেককে অবাক করেছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে?’ মন্তব্যের জবাবে মধ্যরাতে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে, আমি কে- রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়ে যখন পথে নেমে আসে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, তাদের স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগ দেবে।

এটা পরিষ্কার ছিলো যে- প্রথম থেকেই এই আন্দোলন নিয়ে কোনো আলোচনার আগ্রহ বা নমনীয়তা দেখায়নি আওয়ামী লীগ। বরং আগের সব আন্দোলনের মতো শক্ত হাতে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রথমে নিজেদের ছাত্র বাহিনীকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, সেখানে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি সদস্যদের দিয়ে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বেপরোয়াভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন, গুলি চালানোয় পাঁচ সপ্তাহে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। পরিস্থিতি সামলাতে ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি, সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে।

তারপরে যখন পরিস্থিতি খানিকটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হয়েছে, তখন শত শত মামলা করে রাতের বেলা ব্লকরেইড দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে ধরে এনে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এমনকি রংপুরের আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনার পুলিশের গুলি করার ভিডিও থাকার পরেও পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়েছে, নিরীহ এক শিক্ষার্থীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে।

ছয়জন সমন্বয়ককে হাসপাতাল ও বাড়ি থেকে ধরে এনে কোনো কারণ না দেখিয়েই দিনের পর দিন গোয়েন্দা কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিবৃতি আদায় করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে সেজন্য জবাবদিহিও করতে হয়নি।

পুলিশ, বিজিবি ও দলীয় বন্দুকধারীদের গুলি করার ছবি ভিডিও থাকার পরেও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতারা ক্রমাগত অসত্য বক্তব্য দিয়ে গেছেন, বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন, আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়েছেন।

এমনকি ‘পুলিশের পোশাক পরে সন্ত্রাসীরা গুলি চালিয়েছে’ এমন কথাও বলা হয়েছে সরকারি মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে। ইন্টারনেট বন্ধ করা নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হয়েছে।

এসব কিছুই মানুষের ভেতর ক্ষোভ তৈরি করেছে,তাদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘উচ্চপর্যায় থেকে নেতারা যে ধরনের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তার মধ্যেও ছিল অন্ধ বিশ্বাস। ফলে তারা আন্দোলনকে গুরুত্ব দেননি। তারা ইতিহাস থেকেও কোন শিক্ষা নেননি।’

‘আগের সব আন্দোলন যেমন তারা দমন করে এসেছে, এবারো সেটাই চেষ্টা করেছে। কিন্তু ছাত্ররা আন্দোলনা অব্যাহত রাখায় জনগণের সমর্থন চলে এসেছে। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, বলপ্রয়োগের ফলে জনগণের মধ্যে রোষানল তৈরি হয়েছে। ফলে তারা এর বিরুদ্ধে স্বতস্ফুর্তভাবে অংশ নিয়েছে,’ তিনি বলেন।

আন্দোলনের নেপথ্যে ‘জামায়াত-শিবির রয়েছে’ দাবি করে বরাবরই আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা বাস্তবতা অস্বীকার করে গেছেন। এমনকি এর জের ধরে তারা তড়িঘড়ি করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধও ঘোষণা করে। এর বাইরে দেশী-বিদেশী মহলের ইন্ধন রয়েছে বলেও নানাসময় অভিযোগ তোলা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, একদিকে যেমন সরকার এর মধ্যে প্রতিপক্ষের ইন্ধন খুঁজেছে, তেমনি আন্দোলনেও তাদের প্রতিপক্ষরাও নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছে, অংশ নিয়েছে। ফলে আন্দোলন ব্যাপকতা পেয়েছে, সংঘর্ষ-সহিংসতা সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে।

পরবর্তীতে সরকার আলোচনার কথা বললেও ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ততদিনে এটা কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছাড়িয়ে জনমানুষের ক্ষোভের একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

শেখ হাসিনার ছেলে ও তার সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও বিবিসিকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কোটা আন্দোলন যে সরকার উৎখাতের দিকে গড়াবে, সেটি তারা কেউ ধারণা করতে পারেননি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথমদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের দাবিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আমলে নেয়নি, তেমনি পরের দিকে এসব দাবির সাথে সাথে সাধারণ মানুষের দাবি মিশে গেছে, তারাও এর অংশ হয়ে উঠেছে, সেই বাস্তবতাও তারা বুঝতে পারেনি।

পুরো পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের অবিবেচনা, ভুল সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

আওয়ামী লীগ ঘরানার বিভিন্ন সংগঠন, গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের সেসব অযৌক্তিক ও অবিবেচক সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকরা অভিযোগ করছেন।

‘আওয়ামী ঘরানার লোকজন ও বিভিন্ন সংগঠন মিলে দিনের পর দিন সরকারকে নানা অযৌক্তিক অন্যায় কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে যে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করেছে, সেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইন পরে সবার জন্য ধ্বংসের কারণ হয়েছে,’ বলছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
সূত্র : বিবিসি

স্বৈরাচারের পতন ও নবযুগের সূচনা by ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

গভীর আনন্দের কথা যে, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমি মনে করি বিপ্লব বিজয়ী ছাত্র-জনতার এ নির্বাচন যথাযথ এবং ন্যায়সঙ্গত। ড. মোহাম্মদ ইউনুস আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। দেশ ও জাতির এই মহাক্রান্তিলগ্নে তিনি জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন যথাযোগ্য ভূমিকায়, বর্তমান সংকট উত্তরণে তার সুচিন্তিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ জাতিকে এক নতুন অভিজ্ঞতায় অভিষিক্ত করবে- এ বিষয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। দারিদ্র্য দূরীকরণের মধ্যদিয়ে মানবতার সার্বিক মুক্তির যে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিগত সামষ্টিক আন্দোলনের তিনি সূচনা করেছেন- তা কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অবিচল মহীরুহের ন্যায় ড. ইউনূস তার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন। জাতির এই ক্রান্তিকালে তিনি একই অবস্থান বজায় রেখে জাতিকে সঠিক পথে নেতৃত্ব দেবেন বলে আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সংশপ্তকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।

বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া বহু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, পরিণতি ও অর্জনের ঘটনাসমূহ বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, যেকোনো ন্যায়ভিত্তিক যৌক্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন সাফল্য অর্জন করেছে, কখনো ব্যর্থ হয়নি। এসব আন্দোলন- সংগ্রামের প্রকৃতি ও আদর্শগত অবস্থানের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও অবৈধ দখলদারী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এগুলো সর্বদাই বিজয় লাভ করেছে। বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাসেও স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহ সফল হয়েছে, কোথাও আবার ব্যর্থ হয়েছে। সাফল্য ও ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি আধুনিককালে কোনো স্বৈরশাসকই গণঅভ্যুথানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তার মসনদ রক্ষা করতে পারেনি।

সাম্প্রতিককালের প্রসঙ্গ বাদ দিলেও গত একশত বৎসরে আমরা অতিশয় কদর্যভাবে বিদায় নিতে দেখেছি বেশকয়েকজন মহাপরাক্রমশালী স্বৈরশাসকের। এইসব বহু নিন্দিত স্বৈরাচার আত্মমহিমায় এতই মগ্ন ছিলেন যে, কখন তারা জনতার রুদ্ররোষে উপলখণ্ডের মতো ভেসে গেছেন- তারা নিজেরাও বুঝতে পারেননি। হিটলার শেষ মুহূর্তে ভেবেছিলেন জার্মান আর্য জাতির নীলরক্ত কখনো পরাভূত হবে না। কুখ্যাত এই ফুয়েরারকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল। তারই এক সহোদরসম স্বৈরমিত্র মুসোলিনীর পরিণতি আমরা সবাই জানি। মার্কোজ পলায়ন করেন তার ‘প্রিয় দেশবাসীর’ হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। রক্ষা পাননি ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কো।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অনুকম্পা পেলেও স্বৈরতন্ত্রের অনিবার্য পরিণতি ডেকে এনেছে হত্যার মহামিছিল, দুর্ভিক্ষ এবং বিচ্ছিন্নতার মতো বিপর্যয়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকেরা অখণ্ড রাখতে ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে, খণ্ডিত হয়েছে সুদান, বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি আমাদের প্রতিবেশী বার্মা। এ রকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
তবে ইতিহাসের সেই বহু কথিত, বহু চর্চিত আপ্তবাক্য: ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। ইতিহাসের শিক্ষা কেন ক্ষমতার কষ্টকল্পিত প্রাসাদের  ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না- সে এক আশ্চর্য রহস্যময় জিজ্ঞাসা; যার উত্তর কোনোদিন কোনোকালেই কোনো স্বৈরাচার দিতে পারেননি। তবে নিষ্ঠুরভাবে ভোগ করেছেন ইতিহাসের অমোঘ পরিণতি।

স্বৈরাচার শেখ হাসিনাও তার ব্যতিক্রম নন। তার অলিন্দ উপচে পড়েছিল স্বৈরাচারের সর্বপ্রকার উপাদানে- কী অর্থনীতি, কী রাজনীতি, কী সমাজ, সংস্কৃতি- সর্বত্র হাসিনার আগ্রাসী স্বৈরতন্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুধার্ত হায়েনার মতো। বিশ্বের বহু স্বৈরাচারীর অসংখ্য ‘কীর্তি’ বিবর্ণ হয়ে গেছে হাসিনার ‘মহাকীর্তির’ কাছে। আলাদীনের দৈত্য ফ্যাসিবাদের সবগুলো চেরাগ ধরিয়ে দেয় হাসিনার হাতে এবং ইতিহাস আতঙ্কে হেসে উঠেছে তার অবধারিত বিনাশের গতিপথের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।

আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি আপনারা সকলেই গত পনেরো বছরে হাসিনা সরকারের ‘অবদান’ সম্পর্কে জানেন। ‘জানেন’- এই শব্দটি ব্যবহার করার চেয়ে আমার মনে হয় ‘মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন’ বলা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ন্যূনতম অস্তিত্বের বিনাশ সাধন করেছেন, অবারিত লুণ্ঠনের মধ্যদিয়ে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছেন, ঋণভারে বিধ্বস্ত করেছেন সমগ্র জাতিকে (বৈদেশিক ঋণ উনিশ লাখ কোটি টাকা), নিষ্ঠুর পৈশাচিকতায় নির্মম হাতে গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করেছেন, অগণিত গণতন্ত্রকার্মী মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করেই তিনি তৃপ্ত হননি- স্বৈরাচারের নির্বিঘ্ন রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলার কুবাসনায় হাজার হাজার দেশপ্রেমিককে কারাগারে নিক্ষেপ করেছেন, জীবনযাপনের ন্যূনতম চালিকা চাহিদাগুলো দুর্লভ করে ১৮ কোটি মানুষের জীবনকে করে তুলেছেন অবর্ণনীয় কষ্টের কারাগার। আমি আমার বিভিন্ন প্রবন্ধ- নিবন্ধে এবং সভা-সমিতিতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। পাশাপাশি গভীরভাবে এই আশাবাদও ব্যক্ত করেছি যে, স্বৈরতন্ত্রের পতাকাবাহী হাসিনা তন্ত্রের পতন অনিবার্য। কেননা, ইতিহাসের অপ্রতিরোধ্য সত্য এবং সেই সত্যের পথে ইতিহাসের অভিযাত্রা কেউ রুখতে পারে না।

২০২৪ সালের জুলাই মাস এবং আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ও অভূতশ্রুত গণআন্দোলন আমার পূর্ব ঘোষিত প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপদান করেছে। গণআন্দোলনেই যে হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের ঐতিহাসিক পতন হবে এ বিষয়ে আমি পূর্বেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করি। একইসঙ্গে আমি একথাও গভীরভাবে বিশ্বাস করেছিলাম যে, উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিকশিত নবজাগরণের বা রেনেসাঁর উন্মেষ থেকেই নবপর্যায়ের একটি গণআন্দোলনের সূচনা হবে।
স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-জনতার এই ঐতিহাসিক বিজয়লগ্নে দাঁড়িয়ে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি যে, এবারের গণআন্দোলন বৈশিষ্ট্যগত ও গুণগতভাবে ছিল বহুলাংশে ভিন্নতর মৌলিকতার দিক থেকে এবং এর প্রকৃতির দিক থেকে। আমি বালক বয়সেই ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি এ আন্দোলনের তাৎপর্য বুঝতে না পারলেও। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আমি কেবল একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারীই ছিলাম না, একজন সংগঠকের ভূমিকাও পালন করি।
১৯৭১ সালে আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। আমার জীবনে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির সকল আন্দোলনে আমি সক্রিয় থেকেছি।

একটি অনুশীলনশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা থাকলে রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল স্তরে নেমে আসে কালাপাহাড়ের অত্যাচার। এ ধরনের অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয় অর্থনীতি। হাসিনার অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের হাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। তার অনিবার্য ফলভোগ করতে হয়েছে সমগ্র দেশবাসীর। বিভিন্ন তথ্যে আপনারা লীগ দস্যুদের মহাডাকাতির বিস্তারিত বিবরণ জানেন, আমি সেগুলো পুনরায় উল্লেখ করতে চাই না।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সকল দিগন্তে এক নতুন সূর্য উঠেছে, এসেছে এক আশ্চর্য নতুন প্রভাত উদ্ভাসিত এ সূর্যের প্রতিটি আলোকবিন্দুতে আমি দেখতে পাচ্ছি রেনেসাঁর দ্যুতি।

কেননা, একমাত্র রেনেসাঁ মুক্তির পথ দেখাতে পারে। সব কালে, সব দেশে রেনেসাঁর মতো উন্মেষ নাও ঘটতে পারে। নিজের দেশের বাস্তবতায় সে দেশের জনগণ মুক্তির পথ খুঁজে নিবে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিন্যাস ও পটভূমির আলোকেই আজ এক নতুন রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে। আমার বহু প্রত্যাশিত এ রেনেসাঁ ইউরোপের মতো নয়; চরিত্রগতভাবে এ রেনেসাঁ শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার ক্ষুরধার দিয়ে ইহলৌকিকতার জয়গান নয়- এ রেনেসাঁ জাতীয় মুক্তির চেতনায় আলোকিত একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রেনেসাঁ। এ নব উন্মেষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের এক সম্মিলিত অঙ্গীকার। এ নবজাগরণ একটি জাতিকে নব উদ্বোধনের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমার বহুলালিত এ রেনেসাঁ বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় চেতনা, আবেগ ও প্রত্যাশার এক উজ্জ্বল অগ্রদূত।

এ দেশের ছাত্রসমাজ এ রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে। তারা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছেন রেনেসাঁর চিরাচরিত ধারণা। তারা ভাবমানসের অতীন্দ্রিয় কুহক থেকে রেনেসাঁকে সরিয়ে এনেছেন স্বৈরতন্ত্রের পতনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের মুক্তি। তারা মহামতি কাল মার্কসের সেই অমর বাক্যের মূর্তরূপ দিয়েছেন বাংলাদেশে। Philosophers have hitherto interpreted  history, now the task is to change it. বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ মার্কসের গভীর প্রত্যাশাকে আজ পূর্ণ করেছে। তারা আবদ্ধ কক্ষের গ্রন্থঠাসা আলো-আঁধারিতে বসে বাংলাদেশকে তথ্য ও তত্ত্বের সারণী ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মস্তিষ্ক উত্তপ্ত করেননি; তারা গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে সেনানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। মার্কস ‘পরিবর্তনের’ যে আশার কথা শুনতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ সমগ্র দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সেই আশা পূর্ণ করেছেন। ছাত্র-জনতা পরিণত হয়েছে সংগ্রামরত গণদার্শনিকে।

ছাত্র-জনতার এ আন্দোলনে অসংখ্য সম্ভাবনাময় নবীন প্রাণ ঝরে গেছে হাসিনা স্বৈরাচারের নির্বিচার সশস্ত্র আক্রমণে। নিহত হয়েছে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ। দুগ্ধপোষ্য শিশুও রেহাই পায়নি ফ্যাসিবাদের হত্যা উৎসব থেকে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। আজও বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুর দুঃসহ প্রহর কাটাচ্ছেন অনেক মানুষ। চিরতরে পঙ্গুত্বের শঙ্কায় শত শত আহত মানুষ। নিহত ও আহতদের প্রতি রইলো আমার গভীর সমবেদনা।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পৃথিবীর কোনো বিপ্লবই রক্তপাতহীন নয়; কোনো বিপ্লবই পুষ্পসজ্জিত সড়কপথের আনন্দদায়ক শোভাযাত্রা নয়। বিপ্লব মানেই আত্মত্যাগ, বিপ্লবের অপর নাম আত্ম উৎসর্গ। আমাদের ছাত্র-জনতা বিপ্লবের ধ্রুপদী পথই অনুসরণ করেছেন। তাদের প্রতি রইলো আমার আন্তরিক অভিনন্দন। বিশেষ করে স্বৈরতন্ত্রের সকল প্রকার ভয়ভীতি, রক্ত চক্ষু, রক্ত পিপাসা ও গুলিকে উপেক্ষা করে, আত্মবলিদানে উদ্বুদ্ধ ছাত্রনেতৃবৃন্দকে আমি কুর্নিশ করি। তাদের বিজয় আজ জাতির অমর বিজয়কাব্য।
ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে এবং সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গভীর আনন্দের কথা যে, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমি মনে করি বিপ্লব বিজয়ী ছাত্র-জনতার এ নির্বাচন যথাযথ এবং ন্যায়সঙ্গত। ড. মোহাম্মদ ইউনুস আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। দেশ ও জাতির এই মহাক্রান্তিলগ্নে তিনি জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন যথাযোগ্য ভূমিকায়, বর্তমান সংকট উত্তরণে তার সুচিন্তিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ জাতিকে এক নতুন অভিজ্ঞতায় অভিষিক্ত করবে- এ বিষয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। দারিদ্র্য দূরীকরণের মধ্যদিয়ে মানবতার সার্বিক মুক্তির যে সুশৃঙ্খল পদ্ধতিগত সামষ্টিক আন্দোলনের তিনি সূচনা করেছেন- তা কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। অবিচল মহীরুহের ন্যায় ড. ইউনূস তার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন। জাতির এই ক্রান্তিকালে তিনি একই অবস্থান বজায় রেখে জাতিকে সঠিক পথে নেতৃত্ব দেবেন বলে আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সংশপ্তকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।

সন্দেহাতীতভাবে তিনি অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পরাজিত স্বৈরাচারের চর-অনুচরেরা দেশের ভেতরে ও বাইরে চুপ করে বসে নেই। তারা আবার সিংহাসনে বসার স্বপ্নে বিভোর হবে, এটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েও ফ্যাসিবাদের দোসরদের অভাব নেই। সুতরাং, সরকারকে অতি সতর্কতার সঙ্গে সকল বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবেগের আকস্মিকতা এবং বিজয়ের বিহ্বলতায় কোনো ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। পরাজিত শক্তিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আমি গভীরভাবে আস্থাশীল যে, ড. ইউনূস বর্ণিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন রয়েছেন। একটি স্থিতিশীল শৃঙ্খলাপূর্ণ সরকার ব্যবস্থা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিলুপ্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হলেও অভ্যন্তরীণ
শান্তি-শৃঙ্খলাকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। স্বৈরাচার পতনের অব্যবহিত পরই এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা দেখেছি যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি এত বড় একটি ঐতিহাসিক অর্জনের গুরুত্বকে ম্লান করে দিতে পারে। সরকারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে- এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার তেমন প্রয়োজন নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কয়েকটি আশু দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর পারিবারের সদস্য হওয়ায় চাপে যুক্তরাজ্যের এমপি টিউলিপ

যুক্তরাজ্যের নগরমন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিক বেশ চাপে পড়েছেন। এই লেবার এমপি ইতিমধ্যেই  লন্ডনে একটি সম্পত্তি থেকে  আয় সংক্রান্ত তথ্য  নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তদন্তের অধীনে রয়েছেন।  বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তার পারিবারিক সংযোগ টিউলিপকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী  শাসনের পর সোমবার ভারতে পালিয়ে আসা হাসিনা হলেন টিউলিপের  খালা। বাংলাদেশে সপ্তাহব্যাপী ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দমাতে সরকারি দমন পীড়নে  ৪০০ জনেরও বেশি লোক মারা যায় । ৭৬ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ নেত্রী বাধ্য হন দেশ ছাড়তে। এই জল্পনা শুরু হয়  তিনি হয়তো  যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চাইতে পারেন। বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা ও গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ২০১৫ সাল থেকে হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেটের এমপি সিদ্দিকের বাংলাদেশ সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু যুক্তরাজ্যের  গুরুত্বপূর্ণ শহর  লন্ডনের মন্ত্রী হিসেবে নতুন লেবার সরকারে তার ভূমিকা তদন্তের আওতায় এসেছে। যদিও সিদ্দিক বাংলাদেশের পরিস্থিতি বা তার খালার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।

প্রশ্ন উঠছে

এনমেটেনা অ্যাডভাইজারি-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের  একজন ফেলো ম্যাক্স হেস বলেছেন, ‘টিউলিপ বেশ কিছুদিন ধরেই যুক্তরাজ্যের  এমপি। এখন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাছে আশ্রয় নিলে বিষয়টি খুব খারাপ দিকে মোড় নেবে। এটি লেবারকে  ভবিষ্যতে  সমস্যায় ফেলতে পারে। '২০১৯ সালে,   চ্যানেল ৪ - এর একটি তদন্তে  প্রমাণ মিলেছে  যে আওয়ামী লীগের ইউকে শাখা সিদ্দিকের পুনঃনির্বাচনকে সমর্থন করার জন্য একটি প্রচারণা চালাচ্ছিল।  দুইবার যুক্তরাজ্যের এমপি নির্বাচিত করতে সাহায্য করার জন্য  আওয়ামী লীগকে সিদ্দিকের  ধন্যবাদ দেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করেছে  চ্যানেল ৪।  ২০১৩ সালে ক্রেমলিনে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তার খালা  হাসিনার ছবিতে টিউলিপকেও  দেখা গেছে। পলিটিকো লেবারের  সদর দফতরকে প্রাক্তন বাংলাদেশি সরকার এবং এর সাথে সিদ্দিকের  সম্পর্ক  প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিন্তু  কোনও প্রতিক্রিয়া পায়নি। বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের  সাথে তার যোগসূত্র সহকর্মী লেবার এমপিদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করতে  পারে। বাংলাদেশি যোগসূত্র রয়েছে এমন আরেক  এমপি রূপা হক সোমবার সোশ্যাল মিডিয়ায় হাসিনার  শাসনকে ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। বৃটেনের পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে জাতিসংঘের তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

গত ৫ জুলাই লেবার যুক্তরাজ্যের সরকারে আসার পর সিদ্দিক এই প্রথম নয় যে  চাপের মুখে পড়েছেন। তিনি লন্ডনের একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা প্রমাণ  করতে ব্যর্থ হওয়ার পর  সংসদের তদন্তকারী দলের  মুখোমুখি হন।  এমপিদের জন্য প্রয়োজনীয় ২৮ দিনের মধ্যে একটি থিয়েটার শোতে কেন তাকে চারটি টিকিট উপহার দেওয়া হয়েছিল তাও জানাতে তিনি ব্যর্থ হন । বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি রায়ে সংসদীয় কমিশনার ঘটনাগুলিকে 'সম্ভাব্য  নিয়ম লঙ্ঘন' বলে উল্লেখ করেও  সিদ্দিকের যুক্তি মেনে নিয়েছেন যে  এগুলো  ‘প্রশাসনিক ত্রুটি’ ছিল। সিদ্দিক  ‘অজান্তে নিয়ম লঙ্ঘনের’ জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন  এবং কমিশনারকে আশ্বস্ত করেছেন যে  এরকম ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে না।

তবে শহরের তিনজন ব্যক্তিত্ব যারা লেবার  উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীদের সাথে নিয়মিত দেখা করেন তারা দেয়ালের লিখনে বিশ্বাস করেন।  নির্বাচনের পরের দিনগুলোতে সিদ্দিককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের  সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা কম এবং বিরোধীদের অভিযোগ  তিনি সংস্থাগুলোর সাথে দেখা করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। একটি বিনিয়োগ সংস্থার একজন প্রভাবশালী লবিস্ট যিনি লেবার কর্মকর্তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন । নাম প্রকাশ না করার শর্তে  তিনি বলেছেন,  'সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকারকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। কারণ অনেকেই চায়নি টিউলিপ অর্থ মন্ত্রণালয়ের  সচিব পদে আসুক। এর  পিছনে কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। 'একজন পাবলিক অ্যাফেয়ার্স এক্সিকিউটিভ যিনি নিয়মিত ট্রেজারি আধিকারিকদের সাথে দেখা করেন, তাকে একজন  লেবার  উপদেষ্টা নাকি বলেছিলেন - তার খালাকে  বাংলাদেশে  ক্ষমতাচ্যুত করার আগে সিদ্দিক নাকি 'কিছু করার জন্য' ছয় মাস সময়  পেয়েছিলেন।

যখন এই দাবিটি  ট্রেজারির কাছে রাখা হয়েছিল তখন একজন মুখপাত্র বলেছিলেন: "আমরা অনুমানের ওপর কোনো  মন্তব্য করতে চাই না ।"

সূত্র :  পলিটিকো

বাংলাদেশের সংকটের ব্যাখ্যা কী by দেব মুখার্জি

৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতের উদ্দেশে তাঁর যাত্রার আগে ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানা না-ও যেতে পারে। তবে দৃশ্যত, এ ঘটনার আগে সেনাবাহিনী গণভবন অভিমুখে আসতে থাকা জনতাকে বাধা প্রদান বা জোরপূর্বক থামানোর চেষ্টা করেনি; যদিও প্রধানমন্ত্রী হয়তো সেটিই (সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ) চেয়েছিলেন। এ কারণে ও পরিবারের সদস্যদের চাপে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তাঁর জন্য দেশের বাইরে নিরাপদ স্থান খোঁজা ছাড়া আর বিকল্প পথ ছিল না। ২০০৬ সালের এপ্রিলে নেপালেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। তখন সাধারণ জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল দেশটির রাজকীয় সেনাবাহিনী। ফলস্বরূপ, রাজনৈতিকভাবে রাজাকে পরাজয়বরণ করতে ও চূড়ান্ত পর্যায়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।

৫ আগস্টের পরিণতির পেছনে রয়েছে আরও কিছু কারণ। কার্যত কোনো বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও ছিল। এতে তিন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া বিজয়ী হয়। যদিও শেখ হাসিনা সরকার যৌক্তিকভাবেই এ দাবি করতে পারে যে চলতি বছরের নির্বাচন হয়েছে প্রচলিত আইন মেনে। কিন্তু বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের কারণে অনেকে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছিল প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশেও পরিণত হতে চলেছে। দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ইতিমধ্যে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।

কিন্তু সরকারকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে দেখা গেছে এবং বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ছিল উল্লেখ করার মতো। এ ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ। কয়েক দিন ধরে হলেও পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, সরকার জনগণের সঙ্গে নিজের দূরত্ব সৃষ্টি করেছে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা তাঁর পূর্বসূরি বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হন। পূর্ববর্তী জোট সরকারে জামায়াত ছিল অংশীদার। ‘ইসলামি মৌলবাদের’ প্রতিও তৎকালীন সরকার নমনীয় ছিল। শেখ হাসিনার কৃতিত্ব তিনি ‘কট্টর ইসলামপন্থীদের’ তৎপরতা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি উদারপন্থী ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে বিরোধ এড়িয়ে চলছিলেন। এটি সম্ভবত খুব সতর্কতার সঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছিল না; যা মানবাধিকার লঙ্ঘনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।

পরিহাসের বিষয়, ২০১৮ সালে সরকারের বাতিল করা কোটাপদ্ধতি হাইকোর্ট পুনর্বহাল করার পর গত জুন মাসে বর্তমান আন্দোলনটি শুরু হয়। বিষয়টি ছিল আদালতের বিচারাধীন। আন্দোলনের প্রাথমিক বিষয়টি ছিল, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের ৩০ শতাংশ কোটা। পরে সুপ্রিম কোর্ট রায়ে এটি কমিয়ে ৫ শতাংশে আনেন।

জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে আদালত এ রায় দেন। কিন্তু অস্বস্তিকর পরিবেশের কারণে আন্দোলনের মূল বিষয় নিয়ে ক্ষোভের প্রশমন বা সমস্যার সমাধান হয়নি। সরকারের কিছু দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্যে তৈরি হওয়া এ পরিবেশে হারিয়ে যায় মূল বিষয়টি। শেখ হাসিনা বিক্ষোভকারীদের ‘রাজাকারের বংশোধরের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে বক্তব্য দেন। রাজাকার শব্দ মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের সহায়তা করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যে খেপে যান বিক্ষোভকারীরা। অথচ বিক্ষোভকারীরা মনে করেন, একটি ন্যায়সংগত কারণে আন্দোলন করছেন তাঁরা। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একজন মন্ত্রীর আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের লেলিয়ে দেওয়ার হুমকিও হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। দেশে সহিংসতায় এ পর্যন্ত চার শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; যাঁদের বেশির ভাগই তরুণ।

দ্য ঢাকা ট্রিবিউন ঘটনার এ পর্বকে এভাবে তুলে ধরেছে, ‘এটি ছিল একটি ধীরগতির ট্র্যাজেডি (মর্মান্তিক ঘটনা)। এমন অনেক বিষয় ছিল, যা দিয়ে এ সংকট প্রশমিত বা সমাধান করা যেত। দুঃখজনকভাবে সেটি হয়নি; বরং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরও খারাপ হতে থাকে। নিহতের সংখ্যা বেড়ে যায়, বৃদ্ধি পায় অস্থিরতাও। সঙ্গে যুক্ত হয় জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ। যেখান থেকে ফেরার আর পথ ছিল না।’
হাসিনা বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে দেশের বড় অংশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। এর প্রাথমিক নিশানা আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ছাত্রনেতারা এমনকি, জামায়াতে ইসলামীর আমিরও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতেরাও হামলার ঘটনায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। শিক্ষার্থীরা ঢাকার মন্দিরগুলো পাহারা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু অপরাধী কারা, তা স্পষ্ট নয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ‘বিএনপি ও জামায়াতের সশস্ত্র নেতা–কর্মীদের’ নেতৃত্বে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হয়েছিল।

আমরা এমন একটি দৃশ্যকল্পের মুখোমুখি হচ্ছি বলে মনে হচ্ছে, যার মাত্রা এখনো অস্পষ্ট। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সমন্বয়কদের বিভিন্ন বক্তব্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা শাসনব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন চান; যেখানে ‘সত্যিকারের’ গণতন্ত্র থাকবে, মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে এবং স্বৈরতন্ত্র আবার মাথাচাড়া দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটা দেখার বিষয়। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটি তাঁদের মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণেরা রক্তের অনেক মূল্য দিয়েছেন; যা সম্মান করতে হবে।

এটা স্বাভাবিক, আমরা বাংলাদেশের ঘটনাবলির ওপর নজর রাখি; যা ভারতকে প্রভাবিত বা উদ্বিগ্ন করে। কিন্তু এসব ঘটনায় প্রায়োগিক প্রমাণ ছাড়াই ভারতকেন্দ্রিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এটা এ কারণে যে উদাহরণ হিসেবে যেসব দেশ আমাদের বিষয়ে বৈরী মনোভাবাপন্ন, তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের পেছনে এমন শক্তির হাত রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে আসাটা অবিবেচনাপ্রসূত হতে পারে। এর পেছনে সত্যি কারা রয়েছে, তা বোঝা দরকার; যাতে আগামী ঘটনাপ্রবাহের জন্য আমরা আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারি।

গত এক দশককে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি এখন আরও জোরালো করা প্রয়োজন। লন্ডনে নির্বাসিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি কী ভাবছেন বা তাঁর দল ক্ষমতায় এলে কোন পথ অনুসরণ করবে, সেসব বিষয়ে ধারণা পাওয়ার মতো কিছু বলেননি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের পথপ্রদর্শক নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগকে স্বাগত জানাই। এখন ভারতকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

    দেব মুখার্জি, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

    ইংরেজি থেকে অনূদিত, হিন্দুস্তান টাইমস থেকে নেওয়া

শান্ত হয়ে আসছে দেশ, গুজব স্থবিরতার নেপথ্যে কারা?

রক্তাক্ত একটি অধ্যায় পেরিয়ে ক্রমশ শান্ত হয়ে আসছে বাংলাদেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজ শুরু করেছে। উপদেষ্টারা অফিস করছেন। সশস্ত্র বাহিনী জনগণের  নিরাপত্তায় কাজ করছে। থানা সক্রিয় হচ্ছে। পুলিশের অনেকে কাজে ফিরেছেন।

তবে দেশে স্থবিরতা কাটেনি। গুজব মেশিন সক্রিয়। মিনিটে মিনিটে নানা গুজব ছড়াচ্ছেন তারা। বিশেষত সোশ্যাল মিডিয়ায়। সূত্রগুলো বলছে, একধরনের অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবেই এটা করা হচ্ছে।

প্রশাসন এখনো পুরোমাত্রায় কাজে ফেরেনি। সেখানেও একধরনের শৈথিল্য বহাল রাখার চেষ্টা চলছে। পুলিশ বাহিনীকে নিয়েও নানা ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যেন তারা পুরোপুরি সক্রিয় না হয়। এর বাইরে ‘সংখ্যালঘু’ ইস্যুটি সামনে আনার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এ লক্ষ্যে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। ঢাকায় তাদের বড় জমায়েতের চেষ্টা চালাচ্ছে একটি মহল। এ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে সুনির্দিষ্টভাবে দুই জন ব্যক্তির নাম শোনা যাচ্ছে। গত সোমবার শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও। তাদের বসত বাড়িতেও হামলা হয়েছে। যেসব আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় হামলা হয়েছে তাদের কেউ কেউ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ঢাকার একজন বিশ্লেষক বলেন, দৃশ্যত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে কারও বাড়িতে হামলা হয়েছে- এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। মূলত আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার কারণেই তাদের বাড়িতে হামলা হয়েছে। তবে এসব হামলার বিরুদ্ধে এরইমধ্যে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা মন্দির পাহারা দিচ্ছেন। ভারতের কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নজরেও বিষয়টি পড়েছে। তিনি যেটা বলেছেন, ভারতীয় মিডিয়ার হামলার খবর আসছে। কিন্তু জনগণের যে তৎপরতা সে খবর আসছে না।

গত ১৪ই জুলাই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পরদিন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট। হঠাৎই বদলে গেছে বাংলাদেশের দৃশ্যপট। প্রাণ দিতে হয়েছে বহু মানুষকে। কতো মানুষ এ ক’দিনে নিহত হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। কয়েকশ’ মানুষ নিহত হয়েছে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কব্জায় নেয় জনতা। লুটপাট চলে সেখানে। এ ছাড়া, ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। হামলা হয় থানায় থানায়। সব পুলিশ সদস্য তাদের কর্মস্থল থেকে সরে পড়েন। আধুনিক পৃথিবীতে কোথাও এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি বলে জানিয়েছেন এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা। মূলত এই অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। তবে সেনাবাহিনী তৎপর হয়। বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী-জনতাও সক্রিয় হয়। নিরাপত্তা এবং সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। রাজনৈতিক দলগুলোও সক্রিয় হয়েছে। বিএনপি’র সহযোগী সংগঠনগুলো হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠায় বেশ কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মন্দির পরিদর্শনে গেছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। এই অবস্থায় পরিস্থিতি বেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত সরকার সমর্থিত ব্যক্তিরা বিভিন্নস্থানে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে। প্রশাসন ও পুলিশ যেন পুরোদমে সক্রিয় হতে না পারে সে চেষ্টা তারা করছেন। এমনকি মেট্রোরেলেও অচলাবস্থা বহাল রাখার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া, নানা গুজব ছড়িয়েও তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন। শুক্রবার দিনভর গুজব ছিল একজন ইসলামী বক্তা নিখোঁজ। কিন্তু গতকাল তিনি লাইভে এসে জানান তিনি ঠিক আছেন। চট্টগ্রামেও একটি কিডন্যাপের ভুল খবর ছড়ানো হয়েছে। এক ধরনের ডাকাতির আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিগত শাসনের সুবিধাভোগী অনেকে এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়ে গেছেন। তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।

শেখ হাসিনা হিন্দুদের ওপর চেপে সংকট উত্তরণের চেষ্টা করছে -হিন্দু মহাজোটের সভাপতি

বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘুদের উপরে আওয়ামী লীগ নেতারা হামলা চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি এডভোকেট গোবিন্দ প্রামাণিক। গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রেরিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি এসব তথ্য দেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যখনই কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়েন ওই মুহূর্তে হিন্দুদের ঘাড়ের ওপরে চেপে সংকট থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করে। বর্তমান সময়ে এখন দেখতে পাচ্ছি- ভারতের কিছু নেতাদের আশ্বাসে উত্তরবঙ্গের বেশকিছু হিন্দু সীমান্তে গিয়ে জমা হয়েছে। তারা সেখান থেকে ভিডিও করে ছবি তুলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। এই ২ থেকে ৩দিন তারা সীমান্তে অবস্থান করেছে, তাদেরকে একটু জলও দেয়া হয়নি। অথচ ভারতের এক নেতা বলছে- ভারতে ১ কোটি লোকের আমরা শরণার্থী হিসেবে নেবো। এভাবে উস্কানি দিয়ে এই কাজগুলো করছে।

গোবিন্দ প্রামাণিক বলেন, বর্তমানে আবার কিছু নিরীহ হিন্দুদের ওপরে হামলা হচ্ছে। যাদের টাকা-পয়সা আছে, বাসার আশপাশে কিছু জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে তাদের ওপরে কিছু দুষ্কৃতকারী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজি ও ছিনতাই করছে। এর মধ্যে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের একটা বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে।

সেখানে একজন বিএনপি নেতার কথা বলে ডাকাতি করেছে। এরপর তাদের আটক করার পরে দেখা গেল আওয়ামী লীগের কর্মী। আরেকটি জায়গায় একজন প্রতিমা ভাঙতে গেছে, তাকে হাতে-নাতে ধরার পরে দেখা যায় তার গায়ে বিএনপি’র একটি জার্সি। পরে ভিডিও ফুটেজে তার বক্তব্যে দেখা যায়, তাকে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা টাকা দিয়ে বিএনপি সাজিয়ে পাঠিয়েছে। একটা গ্রামের বেশকিছু জায়গায় হামলা হয়েছে, তারা নিজেরাই (ভিকটিম) বর্ণনা করেছে অমুক মেম্বার ও তার লোকজন এসে আমাদের বাড়িতে হামলা করছে। তারা আওয়ামী লীগের লোক। তিনি বলেন, আজকেই শুধু এমন ঘটনা ঘটেছে তা নয়। আপনারা যদি দেখেন, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরের প্রায় সবগুলো মন্দির ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে। সেই ঘটনার বর্ণনা করেছে শেখ হাসিনার তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী মতিউর রহমান রেন্টু। তার ডায়েরি পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ পায়। সেখান থেকে জানা যায়। ‘আমার ফাঁসি চাই’- নামক সেই বইয়ের মধ্যে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সার্ক সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশে আসবে। সেই সময়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা রেন্টুকে বলেছেন- ‘তুমি সারা দেশে হিন্দু-মুসলিমের বিরোধ লাগিয়ে দাও। সার্ক সম্মেলন পণ্ড করতে হবে।’ উনি এটা নিয়ে বাদানুবাদ হওয়ার পরেও রেন্টুকে ৫ লাখ টাকা দেয়া হয়। এরপর ঢাকার প্রতিটি এলাকার মাস্তান, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারীদের টাকা দিয়ে মন্দিরগুলো পুড়িয়েছে। বইয়ে রেন্টু নিজে বলেছেন- ‘এর পরিকল্পনা ও নির্দেশদাতা হচ্ছেন শেখ হাসিনা’।  হিন্দু মহাজোটের এই নেতা বলেন, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অনেক জেলায় কুমিল্লা থেকে আরম্ভ করে শতশত মন্দির পুড়েছে। এর নির্দেশদাতাও শেখ হাসিনার আস্থাভাজন এমপি বাহার। সেই সময়ে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ হিন্দু নিহত হয়েছে। শতশত মন্দির গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শাল্লার ঘটনায় সেখানকার উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের নেতা গ্রাম ধরে জ¦ালিয়ে দিয়েছে। নাসিরনগর, কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধমন্দির  পোড়ানোর ঘটনা আওয়ামী লীগ নেতাদের উদ্যোগে সংঘটিত হয়। এছাড়া যশোরের অভয়নগর সহ রংপুরের পীরগঞ্জে একটা গ্রাম ধরে জ¦ালিয়ে দেয়া হয়, সেখানে হাতেনাতে যুবলীগের নেতা ধরা পড়ে।

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ -আদিলুর রহমান খান

শিল্প মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।

গতকাল শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জাকিয়া সুলতানাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা শোনা যায়, কাজ না করে বিল নিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে। এর জবাবে আদিলুর রহমান খান বলেন, দুর্নীতির বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি, এসব অবশ্যই আমলে নেয়া হবে। তিনি বলেন, রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সুতরাং দুর্নীতিকে মেনে নেয়ার কোনো উপায় নেই। দুর্নীতিকে মেনে দেশ চালানোর প্রশ্নই আসে না।
সাভার চামড়া শিল্পসহ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য দুর্নীতির যে অভিযোগ আছে, তা সমাধানের জন্য আমরা এসেছি। এ ছাড়া জাহাজ ভাঙা শিল্পে গুরুত্ব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কাজকর্ম হিসেবে শিল্প উৎপাদনে গ্যাস সংকট সমাধানকে মন্ত্রণালয়ে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানান। কারণ, অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি সচল রাখতে শিল্পখাতে গ্যাসের সংকট নিরসন সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমাতে কাজ করা হবে। সেসব প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নিরূপণ করে এসব প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সার উৎপাদনে যে সমস্যা রয়েছে তা দূর করার মাধ্যমে আমদানি-নির্ভরতা কমানো হবে। এতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ কমবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় ও এর সংস্থাগুলোর প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে শিল্প উপদেষ্টা বলেন, প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কিছু কাজ আছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে করা হবে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করতে কাজ করা হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে লোকসান কমে আসবে বলে আশা করছি। পোশাক কারখানাগুলোও একই সমস্যার কারণে যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি করতে পারছে না; এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানে কাজ করা হবে।
শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতে আমাদের যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, সমস্যা আছে; সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করবো। এ বিষয়ে উপদেষ্টা নির্দেশনা দিয়েছেন। আপনারা জানেন, গ্যাসের প্রাপ্যতা না থাকায় ছয় মাস ধরে আমাদের সার কারখানাগুলো বন্ধ। শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া প্রকল্প এখন উৎপাদনে আছে। এ ছাড়া চামড়া শিল্পনগরীর বিষয়গুলো আছে; এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ঠিক করে এখন থেকেই পুরোদমে কাজ শুরুর জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন উপদেষ্টা।

‘অর্থনীতিকে দ্রুত গতিশীল করাই প্রধান লক্ষ্য’ -ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিভিন্ন কারণেই দেশের অর্থনীতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। আমাদের লক্ষ্য হবে অর্থনীতিকে যত দ্রুত সম্ভব গতিশীল করা। কারণ অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে গেলে সেটা চালু হওয়া বেশ কঠিন। আমরা অর্থনীতিকে স্তব্ধ হতে দিতে চাই না। উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার পর শনিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে সচিবালয়ে প্রথম অফিস করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। নিজ দপ্তরে ঢোকার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে নানান ধরনের সমস্যা রয়েছে। ব্যাংকের সমস্যা রয়েছে, মূল্যস্ফীতি সমস্যা রয়েছে। আরও অনেক অনেক ধরনের জটিলতা আছে। সবক্ষেত্রেই কাজ করতে হবে।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশের ক্রান্তিকালে আমাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ সময় শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়- ব্যাংক খোলা, বন্দর চালু করাসহ অন্য সবকিছুই সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের করতে হবে।
লাইনচ্যুত অর্থনীতিকে লাইনে আনতে কতো সময় লাগবে, এমন প্রশ্নের জবাবে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার মনে হয় না মৌলিক কাজগুলো করতে বেশি সময় লাগবে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছিল, একেবারে লাইনচ্যুত হয়ে যায়নি; বরং গতি হারিয়ে ফেলেছিল। আমরা গতি বৃদ্ধি করবো।

মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি ছাড়াও উন্নয়ন কৌশলে ভুল ছিল। মানুষ সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের সুফল পায়নি। প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তার ফল কে পেয়েছে, কাদের কাছে টাকা গেছে, সেটাই মূল বিষয়। সরকার চায়, সমতাভিত্তিক ও ন্যায্য প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সব মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হবে।

আমার দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনীতি যদি থমকে যায়, মন্থর হতে পারে। থমকে গেলে কিন্তু অনেক সময় লাগে (একটা গাড়ির মতো)। তাদের ব্যাংকের ওপর চাপ পড়ে। তাই চাচ্ছি গতিটা যেন সচল করতে পারি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অফুরন্ত কর্মসংস্থান আছে। সুতরাং আমার মনে হয় নেতৃত্ব আর ব্যবস্থাপনা থাকলে সমস্যা হবে না। দ্রুত সবকিছু সমাধান করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা একটা মসৃণ পথ করে যাবো, খুব বেশিদিন তো আমাদের থাকার ইচ্ছা নেই, সেক্ষেত্রে পরে বাংলাদেশ যেন এগিয়ে যেতে পারে। সেজন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা দরকার। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভুলত্রুটি হলে সমালোচনা করবেন, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা না করার আহ্বান জানান তিনি।

গভর্নরের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি সেনসেটিভ। তিনি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন, এটি ঠিক। আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ বিষয়ে আগামীকালের (আজ) বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন বা দেশের যেকোনো আইন যথেষ্ট আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু তা মানা হয় না। যাদের মানানোর কথা তারা সেটা করেননি। যাদের মানার কথা, তারাও মানেননি।
ব্যাংকিং কমিশন হবে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হোক, এরপর সংস্কারের প্রসঙ্গ আসবে। এখনই সংস্কার শুরু হলে মূল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থপাচার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক এই গভর্নর বলেন, তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পদত্যাগের হিড়িক

একের পর এক পদত্যাগ করছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা (ভিসি)। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরই বদলে যেতে থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র। দলীয় মনোভাবাপন্ন ভিসিদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে অথবা নিজে থেকেই পদত্যাগ করছেন তারা। সবশেষ পদত্যাগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল। ভিসি ছাড়াও একে একে পদত্যাগ করতে শুরু করেছেন প্রক্টরিয়াল বডি থেকে শুরু করে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরাও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল গতকাল পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়াও সাতটি হলের প্রভোস্ট পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। শনিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। গত বছরের ৪ঠা নভেম্বর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের স্থানে ২৯তম ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। ভিসির পরপরই সাতটি হলের প্রভোস্ট পদত্যাগ করেছেন।

সেগুলো হলো- মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিজয় একাত্তর হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, রোকেয়া হল এবং শামসুন নাহার হল। এর আগে গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামালসহ প্রো-ভিসি (প্রশাসন ও শিক্ষা), প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, কোষাধ্যক্ষ, সব প্রভোস্টসহ সব সিনেট এবং সিন্ডিকেট সদস্যদের পদত্যাগসহ দুই দফা দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।

শাবি প্রতিনিধি জানান, অবশেষে পদত্যাগ করেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। শনিবার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে ভিসি ফরিদের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারসহ অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পদত্যাগের দাবি ওঠে। এর আগে ২০২২ সালেও ভিসি ফরিদের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল। তখন ক্যাম্পাসে পুলিশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। কিন্তু তখন তিনি আর পদত্যাগ করেননি। তৎকালীন সরকারও নেয়নি কোনো ব্যবস্থা।

চবি প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভিসি উপাচার্য, প্রো-ভিসি, প্রক্টর ও হল প্রভোস্টদের পদত্যাগের দাবিতে গত দুই দিন থেকে আন্দোলন করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। চলমান আন্দোলনের মুখে এবার পদত্যাগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সব সদস্যসহ তিনটি আবাসিক হলের হল প্রভোস্ট।

শনিবার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চবি’র রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কে এম নুর আহমদ। পদত্যাগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার বলেন, আমি শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. অহিদুল আলমের নেতৃত্বে ১০ জন সহকারী প্রক্টর পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া তিনটি আবাসিক হল আলাওল হলের প্রভোস্ট সৃজিত কুমার দত্ত, এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট আলী আরশাদ চৌধুরী এবং সোহরাওয়ার্দী হলের প্রভোস্ট শেখ সাদি পদত্যাগ করেছেন। তবে অফিস বন্ধ থাকায় আমি কারও পদত্যাগপত্র হাতে পাইনি।

নোবিপ্রবিতে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ, প্রক্টরসহ ৯ জনের পদত্যাগ, ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা: নোয়াখালী থেকে স্টাফ রিপোর্টার ও নোবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আল্টিমেটামের নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন সিন্ধান্ত গ্রহণ করে। পদত্যাগ করা কর্মকর্তারা হলেন- প্রক্টর অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক বিপ্লব মল্লিক, ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হলের প্রভোস্ট কাউসার হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক উকিল হলের প্রভোস্ট রুহুল আমিন, হযরত বিবি খাদিজা হলের প্রভোস্ট মো. রফিকুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট অবন্তী বড়ুয়া, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্ট মুহাম্মদ মহিনুজ্জামান, আইকিউএসি’র পরিচালক অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ ও অতিরিক্ত পরিচালক মোহাইমেনুল ইসলাম। শুক্রবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় রিজেন্ট বোর্ডের একটি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জানা যায়, শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী পদত্যাগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, পাঁচটি আবাসিক হলের প্রভোস্টসহ নয়জন। গতকাল তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি  ও রেজিস্ট্রার বরাবর তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলে দেয়া, সোমবার থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু এবং ২৫শে আগস্ট থেকে সশরীরে ক্লাস শুরু হবে। রেজিস্ট্রার মো. জসীম উদ্দিন পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে মানবজমিনকে জানান, পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে বিষয়টি ভিসিকে জানানো হয়েছে।  

গত বুধবার ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তা এবং প্রভোস্টদের নোবিপ্রবি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ দাবি করে বিবৃতি দেন। অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের এক জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করায় নোবিপ্রবি ভিসিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি এবং রেজিস্ট্রারকেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন,  নোবিপ্রবি’র সমন্বয়কবৃন্দ।

এর আগেও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ পদত্যাগ করেন। গত বুধবার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভিসি অধ্যাপক মো. নূরুল আলম। তিনি প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলর মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ই-মেইলে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

একই দিন পদত্যাগ করেছেন জাবি’র রেজিস্ট্রার (চুক্তিভিত্তিক) আবু হাসান। এ ছাড়া, জাবিতে একাধারে পদত্যাগ করেছেন প্রক্টর ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আলমগীর কবির এবং ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ছায়েদুল ইসলাম। তাদের পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রক্টর হিসেবে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রুবেল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ হলের প্রভোস্ট হিসেবে সহযোগী অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার ও ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রভোস্ট হিসেবে অধ্যাপক আফসানা হককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ভিসি অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুর রশীদ পদত্যাগ করে প্রেসিডেন্টের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। গত শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। এদিন সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের জন্য ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ভিসি অধ্যাপক ড. শেখ আব্দুস সালাম, প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া পদত্যাগ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তারা ই-মেইলের মাধ্যমে শিক্ষা সচিব বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। পদত্যাগপত্রে তারা ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া, প্রোভিসি অধ্যাপক ড. অলক কুমার পাল ও প্রক্টর অধ্যাপক ড. হারুন-উর রশীদ। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কগণ কর্তৃক  তাদের পদত্যাগের জন্য তিন ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ভিসি অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, প্রক্টর আসাবুল হক, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদসহ প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। গত বৃহস্পতিবার তারা পদত্যাগ করেন। শিক্ষার্থী ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত সকল কর্মকর্তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। এরপর এদিন রাতে পদত্যাগ করেন প্রো-ভিসি অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম (প্রশাসন) ও অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর (শিক্ষা) পদত্যাগ করেন।
প্রক্টর, দুই অনুষদের ডিন এবং বঙ্গবন্ধু হলের প্রভোস্টকে অব্যাহতি প্রদান এবং পদগুলোতে নতুনভাবে পদায়ন করেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মো. হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়।

এদিকে প্রশাসনিকভাবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০তম সিন্ডিকেট সভা শেষে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি জানান প্রোভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। তবে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কার্যবিধি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জন্ম রাস্তায়, বিক্রির পর নিরুদ্দেশ শিশুরা by মিফতাহুল জান্নাত

নাম লিমা। পেশায় যৌনকর্মী। তিন বছর আগে বিয়ে হয় এক অটোচালকের সঙ্গে। থাকতেন ঢাকার একটি কেন্দ্রীয় এলাকায়। সেখানেই পরিচয় হয় শারমিন নামের এক মহিলার সঙ্গে। তিনিই প্রস্তাব দেন সন্তান কেনার জন্য। এর পরেই রাস্তায় সদ্য জন্ম নেয়া ৭ দিনের ছেলে সন্তানকে বিক্রি করে দেন লিমা। স্বামীর সঙ্গে থাকলেও সন্তান পালনের সামর্থ্য নেই বলে দাবি তাদের। এর আগেও দুটি সন্তান বিক্রি করেছেন লিমা। বলেছেন, আগের স্বামীর চিকিৎসার খরচের জন্য বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

যাদের কাছে বিক্রি করেছেন তাদের ফোন নাম্বার ছাড়া আর কোনো তথ্য নেই। শুনেছেন বিদেশে নিয়ে গেছে বাচ্চাগুলোকে। সেখানেই বড় হচ্ছে। তাদের দেয়া ফোন নাম্বারে কল দিলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
১৫ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তার। থাকেন একই এলাকায়। সেখানেই এক কম বয়সী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলে দাবি কিশোরীর।

ফাতেমা এখন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য যে টাকা প্রয়োজন সেই সামর্থ্য নেই তার। সে কারণেই সন্তান বিক্রির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেকের সঙ্গেই ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দর কষাকষিও করেছেন।
৪০ বছর বয়সী শাহিনুর। পেশায় যৌনকর্মী। ৭ বছর বয়সে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয়া হয় তাকে। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে ঢাকায় আসেন। মাথাগোঁজার ঠাঁই মেলে রাজধানীর ফুটপাথেই। পেশা হিসেবে বেছে নেন যৌনকর্মীর। এ অবস্থায় পরপর তিনটি সন্তান বিক্রি করেছেন শাহিনুর। বলেছেন, সন্তানের পিতৃপরিচয় দিতে পারবেন না, মানুষ করতে পারবেন না। তাই নিজের নাড়িছেঁড়া ধনকে ভালো পরিবার দেয়ার আশায় বিক্রি করেছেন। কাদের কাছে বাচ্চা বিক্রি করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, কিছু লোক আছে যারা নিজেরাই এসে জিজ্ঞেস করেন বাচ্চা বিক্রি করবে কিনা? তাদের কাছেই ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। তবে নিঃসন্তান পরিবারের কাছেই সন্তানগুলো পৌঁছেছে বলে দাবি শাহিনুরের।
এর পেছনে কোনো চক্র আছে কিনা জানতে চাওয়া হয় পথবাসী নারীদের অধিকার ও আশ্রয় নিয়ে কাজ করা কল্যাণময়ী নারী সংগঠনের প্রেসিডেন্ট রিনা আক্তারের কাছে। তার নিজের জীবনও কঠিন সংগ্রামের। বলেছেন, সদরঘাট, গুলিস্তান, মুগদা, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী এলাকাগুলোতে কিছু দালাল চক্র আছে যারা কমবয়সী পথবাসী নারীগুলোকে ভালোবাসা দিয়ে কাছে রাখে। রাখার পরে তাদের দেখাশোনা, খাওয়া-দাওয়া দেয়। পরে বাচ্চা হওয়ার পরে বাচ্চা নিয়ে চলে যায়। এরপরে তারা জানানও না যে, বাচ্চাগুলো কোথায় দিয়েছে।
পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা হাজেরা বেগম। নিজেও ঢাকার রাজপথেই বড় হয়েছেন। বর্তমানে ‘শিশুদের জন্য আমরা’ নামে একটি আশ্রয়কেন্দ্র চালাচ্ছেন। সেখানে এককালীন ৪০ জনের বেশি শিশু বড় হচ্ছে। যারা সকলেই পথবাসী নারীর সন্তান। এসব বাচ্চার বিক্রি নিয়ে হাজেরা বলেছেন,  অনেক যৌনকর্মী রাস্তায় বাচ্চা পালতে পারে না, অনেক সময় চুরি হয়ে যায়। যেসব চক্র চুরি করে তারা পাচার করে দেয় নয়তো বিভিন্ন জায়গায় দিয়ে দেয়। যার খোঁজ মায়েদের জানা নেই। তিনি আরও বলেন, আবার অনেকেই বাচ্চাদের নিজের কাছে রেখে ভিক্ষাবৃত্তিও করাচ্ছেন।
এভাবে সন্তান বিক্রি অপরাধ হলেও এক শ্রেণির মানুষের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক। এ নিয়ে এক পথবাসী নারী বলেন, বাচ্চা বিক্রি করা একটা পেশা, টাকা পাওয়া যায়। শুধু আমি না অনেকেই করে।
সাকির ইব্রাহীম মাটি। গুলিস্তান এলাকায় ‘পথের স্কুল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালায়। যেখানে পথবাসী নারীদের সন্তানদেরকে প্রতিদিন বিকালে পড়াশোনা করান। ৯ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান চালান মাটি। তিনি জানান, এই নয় বছরের অভিজ্ঞতায় যা দেখেছি এসব নারীরা বাচ্চা বিক্রি পেশা হিসেবে নিয়েছে। তারা ভাবে যত বেশি সন্তান জন্ম, তত বেশি টাকা।
এসব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অনেক পথবাসী মা আছেন যারা সন্তানদের লালনপালন করতে না পারায় সন্তান বিক্রির যে চক্র তাদের খুঁজে বের করে নিজেরাই বিক্রি করে দেন।  একটি ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে যখন ভাসমান নারীদের গর্ভে কোনো সন্তান থাকে। এই প্রতারক চক্র তাদেরকে খুঁজে বের করে সে নারীদের খাবার, বস্ত্র  ও চিকিৎসা প্রদান করে। খরচ বহন করেন যাতে সন্তানটি সুস্থ থাকে। সন্তান জন্ম দেয়ার পর আর খোঁজ থাকে না। সন্তান নিয়ে চক্রটি চলে যায়। সময় এসেছে এই অপরাধগুলোর সঙ্গে যে চক্র জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার।

রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের সম্পূরক by আবদুল আউয়াল মিন্টু

অর্থনীতি ও বাস্তব পৃথিবীর মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে সবসময়ই রাজনীতি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেকোনো সমাজেরই একটা অর্থনৈতিক ও একটা রাজনৈতিক কাঠামো থাকে। এই কাঠামো একই সঙ্গে সে সমাজের বাজার ব্যবস্থা ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তাই সমাজ, ধনী হোক আর গরিব হোক, অপরিহার্য এই অঙ্গ দু’টি হচ্ছে- অর্থনীতি ও রাজনীতি। অর্থনীতির মাধ্যমে রাজনীতি বিকশিত হয়। তবে রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই কোনো বাজার আদর্শই রাজনীতিকে বাদ দিয়ে বিকশিত হতে পারে না। এ দুটি অঙ্গ একে অপরের সমপূরক।

আগের শতকের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা ব্যবসা, বাণিজ্য, বাজার পরিচালনা ইত্যাদি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণমূলক লেখায় সে সময়ের সরকার-রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উহার গঠনকে গুরুত্বের সঙ্গে হিসেবে এনেছেন। বিশ শতকের অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুমপিটার প্রথম এ বিষয়ে ব্যাপক ভাবে পর্যালোচনা করেন। আজকাল অর্থনীতিবিদরা যেকোনো দেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক মডেল বা নীতি তৈরি করার সময়ে সে দেশের রাজনীতি, ব্যবসা, শ্রমিকের বিশেষত্ব ও সে সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতি-বাণিজ্য ইত্যাদিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে হিসাবে আনছেন।

এমনকি অতীতে শ্রমিক বিভাজন ও বিশেষায়নের সঙ্গে গণতন্ত্র, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের কুকর্ম এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলোর কারণে অতিরিক্ত লেনদেনের খরচকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে মনে করা হচ্ছে। কেননা, এই লেনদেনের ব্যয় সে দেশের সমাজকে ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই নিহিত থাকে। একটা দৃঢ় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেবল তখনই কোনো দেশে গড়ে উঠতে পারে যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা যথাযথ সংমিশ্রণ ও সন্নিবেশন থাকে।  

কিন্তু রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা যদি গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে বা বিশেষ বিশেষ মহলের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যায়, তাহলে এই বিশেষ ব্যক্তিরা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দেশের যাবতীয় সমপদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এটাই রাজনৈতিক ও অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রকৃতি ও চরিত্র।
অর্থনীতির ইতিহাস থেকে দেখা যায়, আয় ও সমপদের সমবণ্টন না হলেও ক্ষমতার ভারসাম্যের বিধান সমাজকে সুষম বণ্টন ব্যবস্থার কাছাকাছি এগিয়ে নিয়ে যায়। আধুনিক পরিমাপমূলক সমীক্ষা ও জরিপের কল্যাণে আমরা সুনিশ্চিত জানি, অধিকতর উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনুন্নত ও অগণতান্ত্রিক সমাজে সম্পদ ও আয়ের বিলি-বণ্টনে বৈষম্য অনেক বেশি।  গণতান্ত্রিক সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে আয়ের বিলি-বণ্টনের সমতা আসে। এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার হোক বা মধ্যযুগের ইউরোপের মতো আগেকার দিনের কোনো কম উন্নত দেশ হোক- এই সব দেশের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য অভিন্ন বলে লক্ষ্য করা যায়।

অনুন্নয়ন ও দারিদ্র্যের প্রধান কারণ হলো শাসক ও শাসক দলের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন। অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারীরা রাজনৈতিক ক্ষমতা করায়ত্ত করার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত সম্পদও তাদের হাতে কুক্ষিগত করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সমাজে সমপদ সৃষ্টি ও আয়ের সুষম বিলি-বণ্টনের পথে পর্বতসমান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাতে যা হবার তা-ই হয়। পণ্য ও সেবা পণ্যের সর্বোত্তম উৎপাদন হতে পারে না। বাজার শক্তিগুলো তার আপন নিয়মে চলার জন্য যে সব বিধিবিধান দরকার সেগুলো গড়ে ওঠে না বা অতিরিক্ত বিধিবিধানের জটাজুটে আটকে পড়ে বাজার তৎপরতার গতিরোধ ঘটে। সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার বিলি-বণ্টন হয় না। সেই  সুযোগে  অপ্রতিহত  গতিতে  সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। ক্ষমতা এক হাতে বা মুষ্টিমেয় গুটিকয়েকের হাতে পুঞ্জীভূত হলে দুর্নীতি দিন দিন বিরতিহীন ও সীমাহীন ভাবে বাড়তে থাকে। স্বাভাবিক নিয়মেই সীমাহীন দুর্নীতি ক্ষমতাবানদেরকেই লাভবান করে। কেননা, তাদের অবস্থান সুবিধাভোগীর অবস্থান।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন বা বিলি-বণ্টনের প্রক্রিয়ায় যখন প্রতিযোগী শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে তখন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী- উভয় পক্ষই একে অন্যের দুর্নীতি কমানোর প্রয়াসে পরসপরকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে ক্ষমতা যদি মুষ্টিমেয় কিছু লোকের কব্জায় চলে যায় তাহলে দুর্নীতি দমন করার পরিবর্তে নিজ দলের সমর্থকদের নব উদ্যমে দুর্নীতি করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমনের আইন ও পন্থাগুলো ক্ষমতাসীনরা বেছে বেছে শুধুমাত্র তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে। আইনের অসম প্রয়োগ কেবল বিরোধীদের কণ্ঠরোধ ও দমন করে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে রাজনৈতিক অপরাধীদের চক্র, অত্যধিক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আর এ অপরাধ চক্রের বিস্তৃতি তৃণমূল পর্যায় অবধি বিস্তৃত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা ও অভিযান তাই প্রহসন বৈ কিছু নয়। গত ১৫ বছরের কাল পরিক্রমায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, দুর্নীতি উৎপাটনের সত্যিকারের কোনো অভিপ্রায় বা সামর্থ্য, কোনোটাই ক্ষমতাসীন সরকারের ছিল না।

পরিতাপের বিষয় হলেও ঐতিহাসিক সত্যি হলো; ‘কোনো অবৈধ সরকার বা অপশক্তিকে আরেকটি শক্তি না থামিয়ে দেয়া পর্যন্ত অবৈধ শক্তি বা ক্ষমতার সমপ্রসারণ ও অপব্যবহার চলতেই থাকে।’ সামন্ত প্রভু, অপরাধী, গডফাদার, একনায়ক, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার বা স্থানীয় সরকার যে বা যারা ক্ষমতাধারী, তা নির্বিশেষেই এ নিয়ম প্রযোজ্য। তাই সমাজের পরিপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য এবং ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমাতে হলে, সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে ভাগাভাগি করে দিতে হবে। তাতে সামাজিক উত্তেজনা প্রশমিত হবে এবং দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে বাধা-বিপত্তি অপসারিত হবে।
আগামী দশকের পরিক্রমায় বিশ্বের যেকোনো দেশের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ওপর। আর সেজন্য আমাদের জনসমাজে একটা সুগভীর পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যকীয়। যে সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনলে আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, এরকম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো:-

* সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে ভারসাম্য ও প্রতিবিধায়ক ব্যবস্থা জোরদার করে অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রায়নকে বিকেন্দ্রায়িত করতে হবে। যাতে করে অল্প কিছু অভিজাত শ্রেণির লোকের হাতে নাগরিক জীবনের সকল দিক নির্দেশনার ক্ষমতা না থাকে;
* ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ভাগ করে দিতে হবে;
* রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে;
* রাজনীতিক, পুলিশ ও অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অপরাধীদের মধ্যকার অংশীদারিত্ব সমপর্কের দুষ্টচক্র ভাঙতে হবে;
* বর্তমানে দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত করে জনগণের কল্যাণে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে তাদেরকে জনগণের নিকট দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে;
* রাজনীতি থেকে মাস্তান-চাঁদাবাজি সংস্কৃতিকে বিদায় করতে হবে;
* নীতি পর্যায়ে সর্বাঙ্গীণ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা ও তার পালন আবশ্যকীয় করতে হবে।
* অনতিবিলম্বে নির্বাচন প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির আমূল সংস্কার করে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সত্যিকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাচকমণ্ডলীর কাছে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে;
* সরকারি পদের অপব্যবহার বা সরকারি পদে থেকে রাজনীতি করা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ  শিক্ষক, প্র্রকৌশলী ও চিকিৎসকরা সরকারের বেতনভুক্ত হলে তাদের কনসাল্ট্যান্সি, প্রাইভেট টিউটেরিয়াল কিংবা বেসরকারি প্র্যাকটিসে নিয়োজিত অথবা রাজনীতিতে জড়িত হওয়া যাবে না। কারণ তারা নিজ কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে জনসাধারণ পেশাদারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়;
* বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও অর্থায়নকারীদেরকে অবশ্যই তাদের পণ্য ও সেবার যথা পরিমাণ, মান ও মূল্য, মূল্য পরিশোধ ও অঙ্গীকার রক্ষার পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা পালনে আরও বেশি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীল হতে আইনের সমপ্রয়োগ করতে হবে;
* সরকারি বনাম বেসরকারি, সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের এধরনের ধারণা বদলাতে হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মূল্যায়নে বা জনগণের কল্যাণে সেবা বা দেশের জন্য সম্পদ সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি বলতে কিছু নেই;
* রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অবশ্যই একে অন্যের পরিপূরক হতে হবে। বর্তমানে বাস্তবায়িত সংকুচিত রাজস্বনীতি অথচ সম্প্রসারিত মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের জন্য সংকুচিত, কিন্তু সরকারের জন্য সম্প্রসারিত নীতি অর্থনীতির দুরবস্থাকে আরও ঘনীভূত করবে;
* স্বতন্ত ও স্বাধীনভাবে দরকষাকষির মাধ্যমে সমপাদিত চুক্তিগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক পরিপূর্ণভাবে ও ত্বরিত গতিতে বলবৎ করতে হবে;
* আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে;
* হিসাব সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মান প্রবর্তন করতে হবে। অতএব এক্ষেত্রে অবশ্যই বিধি-বিধান কড়াকড়ি হতে হবে ও তা রাষ্ট্রকে পরিপূর্ণভাবে বলবৎ করতে হবে;
* রাজনৈতিক সংঘাত-মোকাবিলা ও সহিংসতা বন্ধে সংঘাত নিষপত্তি ব্যবস্থা বা আপোষরফার মাধ্যমে অবশ্যই কমাতে হবে;
* অসপষ্ট, সেকেলে ও বিতর্কিত আইন রহিতকরণ করতে হবে। বহু আইনই সপষ্ট নয়, খুব পুরনোও বটে। এসব আইন আকস্মিকভাবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এবং তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতিসাধনের জন্য বলবৎ করা হয়;
* মেধা শর্তের কঠোর পরিপালন করতে হবে। মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ রাজনৈতিক আনুকূল্যের ভিত্তিতে নয়, অবশ্যই জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে।
* বিচার বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্তরা অবশ্যই দলীয় প্রভাব মুক্ত থাকতে হবে। শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের পরিবর্তে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে শপথবদ্ধ ন্যায় বিচারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী বিচারবিভাগ স্বাধীন। অতএব বিচার করা যদি নিজেদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারেন তাহলে তারা দেশের আপাময় স্বাধীনতা ও অধিকারগুলোকে কীভাবে নিশ্চিত করবেন;
* দুর্নীতি এখন সমাজের তৃণমূল পর্যায় অবধি বিস্তৃত হয়েছে। এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ করতে হবে;
সমাজে জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটা আমূল পরিবর্তন এনে অনেক অনুমানমূলক ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার প্রয়োজন আবশ্যক।

লেখক: সাবেক সভাপতি এফবিসিসিআই

বাংলাদেশে কি ‘অন্ধকার যুগের’ অবসান ঘটবে : বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ

প্রথম আলো: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর এখন সেই সরকারের করণীয় এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, চলছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ।

‘ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার কি অন্ধকার যুগ থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে পারবে?’ শিরোনামে গতকাল শনিবার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আল–জাজিরা। তাতে বলা হয়, একমাত্র নোবেলজয়ী বাংলাদেশি ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এখন অনেকের ভাবনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্ধকার যুগ থেকে এই সরকার কীভাবে দেশকে বের করে আনবে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গতকাল প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগ নিয়েও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।

এএফপির গতকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। আরেকটি গুরুদায়িত্ব হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সংস্কার এনে সরকারে জন–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। তিনি ও তাঁর সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা সফল হন, তা–ই এখন দেখার বিষয়।

নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসকে বেছে নেওয়া কেন বাংলাদেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে দ্য ওয়্যার। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, নতুন সরকারপ্রধানের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হলেও ইউনূসের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। তিনি এমন সময়ে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিলেন, যখন দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নেই।

গতকাল দ্য ডন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব এখন একটি নতুন বাংলাদেশ গড়া।’

আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিসহ দেশটির বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধানদের পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে বলে গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস। তাতে আরও বলা হয়, ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো ভারতেই আছেন। তিনি ভারতেই থাকবেন নাকি অন্য কোথাও যাবেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছুই জানা যাচ্ছে না।

গতকাল বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ফিরে রাজনীতির হাল ধরার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। বাংলাদেশে নির্বাচনের ঘোষণা এলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার যে দাবি গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা জানিয়েছেন, তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের জন্য তাঁর বিচার দাবি করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশে এলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

‘বুলেটের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো সেই “শহিদ” আবু সাঈদের বাড়িতে ইউনূস’ শিরোনামে গতকাল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আনন্দবাজার পত্রিকা। সংবাদপত্রটির আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’’, তাই হাসিনাকে থাকতে হচ্ছে ভারতে! তবে মুজিবকন্যাকে “আশ্রয়” দিচ্ছেন না মোদি’।

এদিকে দ্য গার্ডিয়ান গতকালের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, নতুন সরকারের অধীন বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপ ও কড়াকড়ি আরোপ ছিল। তবে নতুন সরকার আসায় এই কড়াকড়ি আর না থাকার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠছেন দেশটির সাংবাদিকেরা।

আবু সাঈদের বাড়িতে আপ্লুত প্রধান উপদেষ্টা by জাভেদ ইকবাল

আবু সাঈদ। পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে শহীদ হওয়া এই তরুণের সাহস আর প্রতিবাদী ক্ষোভ ধারণ করে বিজয় এসেছে ছাত্র-জনতার। সাঈদের পর আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন আরও কয়েকশ’ ছাত্র-জনতা।  তাদের আত্মত্যাগের পথ ধরে গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব নেয়ার পর আনুষ্ঠানিক অফিস শুরুর আগেই গতকাল প্রথম রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সাঈদের বাবা-মা’সহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সাঈদের কবর জিয়ারত ও মোনাজাতের পর সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ড. ইউনূস। যে পতাকা হাতে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন সেই পতাকা তুলে দেন আবু সাঈদের বাবার হাতে।

প্রায় আধাঘণ্টা আলাপচারিতায় আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী, আবু হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা ৮ দফা দাবি সংবলিত একটি আবেদন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেন। এতে আবু সাঈদসহ ছাত্র-জনতার হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা, আবু সাঈদের স্মরণে ১৬ই জুলাইকে শহীদ আবু সাঈদ দিবস ঘোষণা করা, আবু সাঈদের স্মরণে পীরগঞ্জে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, একটি পাবলিক গ্রন্থাগার, স্মৃতি সংরক্ষণাগার, একটি মসজিদ ও এতিমখানা নির্মাণ, আবু সাঈদের নামে তার নিজস্ব এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শহীদি মর্যাদায় ভূষিত করা এবং অষ্টম বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা করা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, তরুণদের জন্য একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ, জাফরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আবু সাঈদের সমাধিস্থল সংলগ্ন রাস্তাটি জাফরপাড়া মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রশস্তকরণের দাবি জানানো হয়।

এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সকলকে ঐক্যবদ্ধ করাই বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নতুন স্বাধীনতা দিতে আবু সাঈদ যে স্বপ্নের জন্য বুক পেতে দিয়েছিল, আমাদের কাজ হলো- সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।

এটা গোটা জাতির কর্তব্য। আমি শুধু এখানে এসে কবর জিয়ারত করলাম, চলে গেলাম তা- না। এটা সারা জাতিকে বলতে চাই। যে লক্ষ্য নিয়ে বুক পেতে দিয়েছিল, যার কারণে কোটি কোটি ছেলে-মেয়ে বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ভয় পায় নাই। আবু সাঈদের জন্য আমরা যে নতুন বাংলাদেশ পেলাম, সেটি গড়ার দায়িত্ব আমাদের। তার কথা স্মরণ হবে- এই কাজ করার মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে অতি দ্রুতই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, একটি মুক্তির জন্য আবু সাঈদ বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছবি দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একটা মানুষ বন্দুকের সামনে হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে- মারেন। গুলি করেছে, একটু হেলে উঠে আবার  দাঁড়িয়েছে। পরে আবার একটা গুলি করেছে। আবু সাঈদ এখন পীরগঞ্জের না, তিনি এখন সারা বিশ্বের। আবু সাঈদ যে কাজ করেছে এটি নিয়ে যুগ-যুগান্তর কবিতা হবে, উপন্যাস হবে, নাটক হবে। মানুষ তাকে সারা জীবন স্মরণ করবে। এই সেই লোক এখানে শুয়ে আছে। তিনি বলেন, যারা ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে বড় হবে, স্কুলে আবু সাঈদের কথা পড়বে। নিজে নিজে প্রস্তুত হবে। আমিও ন্যায়ের জন্য লড়বো, আমিও বুক পেতে দিবো। আবু সাঈদ এখন ঘরে ঘরে। প্রত্যেক ঘরে আবু সাঈদ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা এ মাটির সন্তান। এটা আবু সাঈদের বাংলাদেশ। এটা এক বাংলাদেশ, দুই  বাংলাদেশ না। দেশ নিয়ে পার্থক্যকারীদের বিরুদ্ধে আমরা আবু সাঈদের মতো রুখে দাঁড়াবো। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তার মর্মস্পর্শী বক্তব্যের সময়ে সকলের চোখে অশ্রু চলে আসে। এ সময় আবেগতাড়িত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আন্দোলন সমন্বয়কারী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদসহ অন্যরা। এরপর তিনি আবু সাঈদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও রংপুরের সমন্বয়কারীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটা আন্দোলনে আহতদের দেখতে যান।
বিকালে রংপুর সার্কিট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে ক্রয়ক্ষমতার আওতায় আনাই লক্ষ্য উল্লেখ করে সকলের সহযোগিতা চান।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নিরাপরাধীদের কোনো হয়রানি নয়। তাদেরকে ফুলের টোকাও দেয়া হবে না। আমরা অপরাধীদের বিচার করবো। দেশে সহিংসতা বন্ধ হলে ১৭ কোটি মানুষকে আরও বহু উপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, দেখা যাবে কতোদিনে ভালো হয়। এখন আপনারাই বিচার করেন কতোদিন হলে ভালো হবে। এটা তো কেউ এখনো বলে নাই।  

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই একটি পরিবার, সবাইকে উপরে উঠানোর চেষ্টা করবো। এখানে কেউ আমাদের বিদেশি আক্রমণকারী নেই, আমরা-আমরাই। একটি পরিবারে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হতে পারে, তাই বলে সম্পর্ক নষ্ট হয় না। আমরা একটি পরিবার হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চাই।

এর আগে বেলা আড়াইটায় রংপুর সার্কিট হাউজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।   
দুপুর পৌনে ২টায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্ববিদ্যায়ের প্রশাসনিক ভবন মিলনায়তনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নানা দাবিসহ আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তাদের প্রত্যাশার কথা শোনেন। এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নতুন বাংলাদেশ তরুণদের বাংলাদেশ। তরুণদের এখন কেউ টেনে রাখতে পারবে না। পথ পরিষ্কার করতে হবে। বেগম রোকেয়া নারীদের মুক্ত করেছেন। এখন রংপুর পুরো বাংলাদেশকে মুক্ত করবে।

এর আগে সকাল ১১টায় তিনি হেলিকপ্টারে করে রংপুর পীরগঞ্জের মেরিন একাডেমিতে আসেন। এরপর সড়ক পথে উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপুর বাবনপাড়া গ্রামে কোটা আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে তার কবর জিয়ারতসহ পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন, ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।