Sunday, August 2, 2015

দুই প্রজন্মের আওয়ামী লীগ by আবুল মোমেন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালে। মাত্র দুই বছর আগে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ সব স্তরের বাঙালি মুসলিমকে পরাধীনতা আর সামাজিক পশ্চাৎপদতার গ্লানি থেকে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর করেই ধর্মীয় জাতীয়তার রাজনীতিতে টেনে পাকিস্তান এনেছিল। তরুণ শেখ মুজিবও ছিলেন মুসলিম লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। কিন্তু বাস্তবে পাকিস্তান বাঙালির জন্য নতুন পরাধীনতা ও নতুনতর পশ্চাৎপদতা সৃষ্টি করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই উত্তর-পশ্চিমের দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণের জাতগুলো অপেক্ষাকৃত কৃশকায় শ্যামবর্ণের বাঙালিকে—কি মুসলমান, কি হিন্দু—হীন জাতি হিসেবে অবজ্ঞা করে এসেছে। তা ছাড়া উপমহাদেশে ইসলামের একাডেমিক চর্চা হয়েছে উর্দুতে এবং ব্রিটিশ শাসকেরা উত্তর-পূর্বের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলের শিক্ষার মাধ্যম করে দিয়েছিল উর্দু ভাষা। ফলে মুসলমানদের জন্য সৃষ্ট দেশের শ্রেয়তর নাগরিকের দাবিতে মুসলিম লীগের অবাঙালি প্রভাবাধীন নেতৃত্ব বাঙালি-অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গকে উপনিবেশের দৃষ্টিতেই দেখেছে। তাদের জন্য কাজটা সহজ হয়েছে বাঙালি অভিজাতদের হীনম্মন্যতা ও পরশ্রীকাতরতার কল্যাণে। হীনম্মন্য অভিজাত ব্যক্তিরা ক্ষমতাধরদের তোষামোদ ও চাটুকারিতায় ভোলাতে চেয়েছেন এবং আত্মসম্মানের বিনিময়ে নিজেদের জন্য ক্ষমতার কিছু প্রসাদ জুটিয়ে নিয়েছেন। আবার মজ্জাগত পরশ্রীকাতরতার কারণে তাঁরা পরস্পর কলহে লিপ্ত থেকেছেন, ফলে এই ক্ষয়িষ্ণু বাঙালি নেতারা কেন্দ্রে কখনো ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেননি।
আমরা জানি, ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলার নিম্নবর্গের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে, রাজা ও রাজন্যদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির দুই বছরের মাথায় গঠিত দল আওয়ামী লীগকে বলা যায় সর্বসাধারণের রাজনৈতিক মঞ্চ। মাওলানা ভাসানী এ দলের সভাপতি হিসেবে যথার্থই ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের ত্যাগী অভিজাত ব্যক্তিদের নিয়ে দল প্রায়ই সমস্যায় পড়েছে। দলে সাধারণদের মুখপাত্র ছিলেন তরুণ সংগঠক মুজিব। পাল যুগে কৈবর্ত বিদ্রোহে যেমন বিদ্রোহী জেলেদের নেতা ছিলেন দিব্যক, ব্রিটিশ যুগে বিদ্রোহী চাষিদের নেতা ছিলেন নূর আল দীন বা তিতুমীর, তেমনি এই সময়ে মুজিব যেন বাংলার বঞ্চিত-নিপীড়িত-সাধারণের নেতা হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করলেন। সাধারণের এই নেতা একপর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছেন দলের অভিজাত নেতাদের নিয়ে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেÿ ক্ষুব্ধ নেতা লিখেছেন, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন এক সাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ (পৃ.২৭৩)
২...
দুটি কারণে আওয়ামী লীগ এ দেশের উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে এই শ্রেণি পাকিস্তানের শাসকদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন প্রত্যাশা করছিল এবং সব শ্রেণির অন্তর্ভুক্তিমূলক বঞ্চনামুক্ত সমাজের স্বপ্ন তাদের অধিকাংশকে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত করেছিল। এই সচেতন দেশপ্রেমিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি জাতীয়তাবাদী জাগরণের জন্য উন্মুখ ছিল। তত দিনে পরিণত দূরদর্শী শেখ মুজিব এ দেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল প্রবক্তা এবং প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। জননায়ক শেখ মুজিবকে ঘিরে গণজোয়ার এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একসময় বামপন্থী দলগুলোর জন্য হয় তাঁর সহযাত্রী হওয়া, নয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় থাকল না।
সেদিনের পরিস্থিতিই গণতান্ত্রিক দলে ও গণতন্ত্রপ্রত্যাশী সমাজে একক নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারই অনুষঙ্গ হয়ে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। চুয়ান্নর নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে এখানে মুসলিম লীগের সংগঠন ভেঙে পড়েছিল, তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতার প্রসাদ দিয়ে টিকিয়ে রাখছিল মাত্র। ফলে বিরোধী দল হলেও তখন থেকেই আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের সবটা জুড়েই তৎপর ছিল। এটা রাষ্ট্রীয় না হলেও দলের সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। আর পূর্ববঙ্গে ষাটের দশকজুড়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংকুচিত ও সমাজের ক্ষমতা প্রসারিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ তখন থেকেই এ দেশের বড় দল, ক্ষমতাধর দল। দীর্ঘদিন এই অবস্থানে অভ্যস্ত দলের নেতা-কর্মীরা স্বভাবতই ক্ষমতাধরের মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছে। যার যার পরিসরে কর্তৃত্ব, মুরব্বিয়ানা এবং সেই সূত্রে নিজস্ব কায়েমি স্বার্থের ক্ষমতাবলয় তৈরির প্রবণতা দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। এ প্রবণতাকে ঠেকানোর অস্ত্র যে রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো, তাকে অকার্যকর করে রাখার বিষয়ে এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগসাজশ ঘটবেই। এর বিষময় ফল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর থেকেই ভোগ করছে। হয়তো এখন তা আরও বেড়ে গেছে। আমরা সরাসরি দলের বর্তমান নেতৃত্বকে উদ্দেশ করে হয়তো বলতে পারি, দেশকে এই অগণতান্ত্রিকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে।
৩...
গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের জন্য যারা প্রাণপাত করছি, তারা কেন এই ক্ষমতাধর দলের বিকল্পের—যদি শূন্যতা না–ও বলি—সংকট নিয়ে কথা বলছি না? ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি থেকে, অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে নতুন জাতির ভ্রূণ তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার কাঙ্ক্ষিত পরিণতি কি বিএনপি নিশ্চিত করতে পারে? বিএনপি আন্দোলনের প্রশ্নে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। কিন্তু কেবল যুদ্ধাপরাধ নয়, এ দল তো আদতে গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না, ধর্ম ও লিঙ্গসমতাও তো মানে না, যা গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত? সেই দলকে সঙ্গে রেখে কী করে বায়ান্ন থেকে একাত্তরের লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ হবে? যদি বিএনপির শক্তিশালী সক্রিয় সংগঠন থাকত, তাহলে জামায়াতকে ক্ষমতার অংশীদার করা নিয়ে ততটা আশঙ্কা থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিপুল সমর্থক আছে বিএনপির, আর সংগঠন রয়েছে জামায়াতের। ফলে ক্ষমতার ফায়দা তারাই অনেক বেশি উশুল করবে। আর আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে যেসব জঙ্গিগোষ্ঠী আজ মানবতাবিরোধী মারাত্মক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তার শাখা-প্রশাখা এই মুসলিমপ্রধান দেশেও তো ছড়াচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তারা প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হবে, কারণ জোটের অগ্রাধিকার পাবে আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার পাল্টা প্রতিশোধ।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত করতে আওয়ামী লীগের বিকল্প দল চাই। সেই দল আওয়ামী লীগের চেয়েও এগিয়ে রাজনীতি করতে পারে, যদি তারা একদিকে রাজনীতিতে সমাজের নিম্নবর্গের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্যদিকে ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়ার বিপর্যয়কে মাথায় রেখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তার আদর্শকে ধারণ করে। বলে রাখা দরকার, বিগত ৬৬ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে দলটি অত্যন্ত সজীব এবং বাস্তবতা অনুধাবনে দক্ষ, এমনকি প্রয়োজনে সৃজনশীল হতেও সক্ষম। এভাবে দলটি ষাটের দশকেই বামপন্থীদের প্রায় অকেজো করে ফেলেছিল, এখন ইসলামপন্থী রাজনীতির ঘরে হানা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর এই দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্যাদার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। আওয়ামী লীগ তার চেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক দলের জায়গা প্রায় পুরোপুরি দখল করে এখন তার চেয়ে পশ্চাৎপদ দলের জায়গায়ও দখল বাড়াচ্ছে। তা তাকে করতেই হচ্ছে, কারণ সেদিকে সমর্থক-ভোটারের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়। পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি আর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোরতার মাধ্যমে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও ধরে রেখেছে। এটাই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অকৃতকার্য হয়েও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নিশ্চিত থাকার কারণ।
ফল হলো এই, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্রয়ে-আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতা ভোগ করে যাওয়ার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। ফলে আপাতত পাল্টা প্রশ্ন হলো, একা হাসিনা কি দলে ভিড়ে থাকা উচ্চাভিলাষী, ভাগ্যান্বেষী তরুণ বা পাতিনেতাদের সামলাতে পারবেন? মনে হয় না এটা সম্ভব। এদের হাতে দিনে দিনে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং তাতে তিনি তো ভুগবেনই, ডুববে দেশ। এতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী ক্ষমতা, অধিকতর ক্ষমতার নিশ্ছিদ্র সুরক্ষায় বন্দী হয়ে যাবেন, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যদের স্বাধীনতাও হ্রাস পাবে, গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে। তা ছাড়া তলে তলে রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকবে।
তাহলে বাংলাদেশ কি আপাতত আওয়ামী লীগপন্থী ও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতিতে বিভক্ত হয়েই থাকবে? মনে হয় নাগরিক সমাজ এ ক্ষেত্রে কিছু করতে পারে। এক. আওয়ামী লীগের ওপর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও দল পরিচালনার প্রক্রিয়া প্রবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। দুই. রাজনীতিকে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্ত্র ও কালোটাকা থেকে মুক্ত রাখার জন্যও চাপ তৈরি করা যায়। তিন. ইসলামের মানবিক সহনশীল রূপটি তুলে ধরে মুসলিম সমাজেও যে বহুমতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যুগপৎ ইসলাম ও সুশাসন ভালোভাবেই বিকশিত হতে পারে, তার পক্ষে জনমত তৈরি করতে পারে। চার. পুরোনো সমাজব্যবস্থা ও ধ্যানধারণার অচলায়তন ভেঙে সমাজের নবায়ন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানবিক বিকাশমান সমাজ কায়েমে কাজ করতে পারে। ইতিহাসের আলোকে গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের ধারা এবং ধর্মান্ধ রক্ষণশীল সমাজের সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা করে দেখা উচিত।
কোনো সমাজ যথার্থভাবে গণতন্ত্রের উপযোগী হয়ে উঠলেই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। এমনকি সে কাজ শেখ হাসিনাও করতে পারেন, যদি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বেড়াজাল তিনি ভাঙতে চান।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

সীমান্ত নিরাপত্তায় ঝুঁকি মানব না

চীনা সীমান্তে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি সহ্য করবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাসহ বিতর্কিত জলসীমায় অন্য দেশের আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে সাবধান বাণী দিয়েছে তারা। শনিবার চীনের সেনাবাহিনী দিবস উপলক্ষে এমন ঘোষণা দেয় তারা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী চীনের। ১৯২৭ সালের ১ আগস্ট দেশটির পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সেনাবাহিনী দিবস উদযাপনে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমাসহ সীমান্ত লাগোয়া দেশগুলোকে হুশিয়ার করে দিয়েছে পিএলএ। গত কয়েক বছর ধরেই আধুনিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছে তারা। প্রতিরক্ষা খাতে খরচও বাড়ানো হয়েছে একইসঙ্গে তাদের সাফাই, কাউকে আতঙ্কিত করা তাদের লক্ষ্য নয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে মজবুত করতেই অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকীরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে বলে এর মধ্যেই সাফাই দিয়েছে চীনা প্রশাসন।
চীনের সেনাবাহিনীর মুখপত্র পিপলস লিবারেশন আর্মি ডেইলিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের আশপাশের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও যুদ্ধের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে গেছে।’ পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমা নিয়ে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত জলসীমা নিয়েও বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের রেষারেষি। প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তিক অংশের ৩৫ লাখ বর্গকিমি. এলাকাই দক্ষিণ চীন সাগর নামে পরিচিত। সিঙ্গাপুর থেকে মানাক্কা প্রণালী ঘুরে তাইওয়ান প্রণালী পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে এর বিস্তৃতি। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্র“নাই ও ফিলিপিন্স। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্যিক জাহাজ এ সাগরের ওপর দিয়ে চলাচল করে। চীন এ সাগরের মালিকানা দাবি করে ঐতিহাসিক রেকর্ডের শি ও হান রাজবংশের কর্তৃত্ব অনুযায়ী। ১৯৪৭ সালে নাইন ড্যাশ লাইন হয়ে চিয়াং কাই শেক যতদূর অগ্রসর হয়েছিলেন। চীনা প্রজাতান্ত্রিক আমলে বেইজং দক্ষিণ চীন সাগরের জরিপ পরিচালনা ও মানচিত্র ঠিক করে। তখন ২৯১ দ্বীপপুঞ্জ ও প্রবাল দ্বীপ নিজেদের দাবি করে নামকরণ করে। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ ও বিদ্যমান দ্বীপপুঞ্জে সামরিক বেসামরিক অবকাঠামো তৈরি কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে। প্রথম এ কাজ শুরু করেছে ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্স। বর্তমানে তারা যথাক্রমে ২১টি ও ৮টি দ্বীপে নিয়ন্ত্রণ রেখেছে। ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স ও তাইওয়ান প্রত্যেকেই তাদের কয়েকটি দ্বীপে সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। দ্বীপ নির্মাণের খেলায় চীন এসেছে অনেক পরে। কিন্তু গত ১৮ মাসে দেশটি একা যা করেছে, তা ইতিহাসে অন্যরা সবাই মিলেও করতে পারেনি।
একনজরে চীনা সেনাবাহিনী
পিপলস লিবারেশন আর্মি
মিলিটারি কমিশনের প্রধান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী
জেনারেল চাং ওয়ানকুয়ান
সেনাবাহিনী প্রধান
জেনারেল ফান ফেংঘুই
সক্রিয় সেনাসদস্য
২২ লাখ ৮৫ হাজার
রিজার্ভ সেনাসদস্য
৫ লাখ ১০ হাজার
প্রতিরক্ষা বাজেট
১৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার

জাপানকে শান্তিবাদ বজায় রাখতে হবে

৭০ বছর আগের কথা। সেদিন একান্তই ভাগ্য আর ভূগোলে নির্ধারিত হয়েছিল জাপানিদের জীবন অথবা মৃত্যু। দৈব সিদ্ধান্তেই সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন হিরোতামি ইয়ামাদা। তখন বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। আজ ৮৪-তে দাঁড়িয়েও স্পষ্ট দেখতে পান আণবিক বোমার সেই বীভৎসতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের পর মৃত্যুপুরী শহরের দৃশ্যটা কিছুতেই ভুলতে পারেন না তিনি। ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে বোমা বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আর নরকের তাপে মনে হয়েছিল আকাশ থেকে সূর্যটা নিচে পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই নিকষ অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিক। সেদিনের কথা স্মরণ করে ইয়ামাদা বলেন, ‘যখন আলো ফিরে এসেছিল, দেখলাম পুরো নাগাসাকি শহরটা বাষ্পীভূত ধোঁয়ায় পরিণত হয়েছে। আর তা মেঘের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আমি দেখলাম,
মানুষরা এমনভাবে দগ্ধ, চোখ মুখ বিস্ফোরিত ও ভস্মীভূত হয়ে আছে, দেখে বোঝার উপায় নেই, তারা জীবিত নাকি মৃত।’ বোমা নিক্ষেপের স্থান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একটি স্কুলে ছিলেন ইয়ামাদা। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যদের মোটামুটি অক্ষত দেখে স্বস্তি পেলাম। শুধু মনে হল একটু আগুনের আঁচ লেগেছে শরীরে। কিন্তু বছর ঘোরার আগেই তারা প্রায় সবাই মারা গেল।’ নাগাসাকি শান্তি মেমোরিয়াল পার্কে দাঁড়িয়ে ইয়ামাদা বলেন, ‘এসব মূর্তিকে আমি ঘৃণা করি। এগুলো দেখতে বেশ সুন্দর। কিন্তু বাস্তবতা ছিল খুবই কুৎসিত।’ যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে নাগাসাকিতে বেঁচে যাওয়া ইয়ামাদার মতো মানুষরা মনে করেন, যুদ্ধোত্তর সময়ে জাপানকে অবশ্যই শান্তিবাদী ডকট্রিন মেনে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের সাম্প্রতিক সামরিক ঘনিষ্ঠতাকে সমালোচনা করছেন তারা। জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সামরিক নীতির ওপর বিরক্ত তারা। নাগাসাকির মেয়র তোমিহিসা তাওয়ে বলেন, আমি মনে করি শিনজো আবেকে সতর্কতার সঙ্গে তার সমারিক নীতির প্রয়োজনীতা জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা দরকার।

২২শ বছর আগের বাল্মীকির সন্ধান

রামায়ণের পাঠকমাত্রই বাল্মীকির সঙ্গে পরিচয় আছে। ভারতবর্ষের আদি কবি। আসল নাম দস্যু রত্নাকর। রত্নাকরকে ‘রাম নাম’ জপতে বলেন নারদ মুনি। কিন্তু পাপে জর্জড়িত রত্নাকর জিহ্বা এতটাই আরষ্ট যে, তিনি রামের নাম উচ্চারণই করতে পারলেন না। নারদ তাকে সাধনা করতে বললেন। রত্নাকর ছয় হাজার বছর সাধনা করলেন। সাধনার এক পর্যায়ে তার সমস্ত শরীর উই পোকায় ভরে গেল। পুরো শরীর পরিণত হল উইয়ের ঢিবিতে। সেই থেকে তার নাম হল বাল্মীকি বা উইয়ের ঢিবি। সাধনা শেষে তিনি রামের জীবনী লেখা শুরু করেন; তাও আবার রামের জন্মের ৬০ বছর আগে। এবার সত্যিকারের এক ‘বাল্মীকি’ বা উইয়ের ঢিবির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
তাও আবার দুই হাজার দুইশ বছরের পুরনো। মধ্য আফ্রিকার প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর আপার কাতাঙ্গার লুবুম্বাশির বনাঞ্চলে পুরনো এ উইয়ের ঢিবির সন্ধান পান তারা। এটি এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরনো উই ঢিবির ফসিল। এর আগেও এমন একটি ফসিল পাওয়া গিয়েছিল। তবে সেটির বয়স ছিল সাড়ে সাতশ’ বছর। বেলজিয়ামের ঘেন্টা ইউনিভার্সিটির গবেষক হান্স আর্নেসের নেতৃত্বে লুবুম্বাশির ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ১০ মিটার উঁচু ও ১৫ মিটার চওড়া এ উইয়ের ঢিবির সন্ধান পান। রেডিওকার্বন পরীক্ষার মাধ্যমে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এটি প্রায় ২২শ’ বছর পুরনো। যে প্রক্রিয়ায় এ উই ঢিবি গড়ে উঠেছে, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কার্বন ১৪ ডেটিং। ঢিবি তৈরির ক্ষেত্রে মাটির মধ্যে থাকা কার্বন ১৪ আইসোটপ ব্যবহার করে উই পোকারা। বিবিসি, দ্য হিন্দু।

পড়ালেখায়ও কর দিতে হবে! by আলী ইমাম মজুমদার

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অর্থ আবশ্যক। এ অর্থের প্রধান উৎস জনগণের দেওয়া কর। সেই কর কোথা থেকে আসবে আর ব্যয় হবে কোথায়, তা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদকে দিয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, আয় হবে অধিকতর সক্ষমদের কাছ থেকে। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখা এবং এর কল্যাণধর্মী চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের চাহিদা অনুযায়ী হবে ব্যয়। সংবিধানের প্রস্তাবনায়ও ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য’ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বিবেচনা করা যায় যে শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রের সহায়তা থাকবে সর্বতোমুখী। এর জন্য ব্যয় করবে সামর্থ্য অনুসারে। অবশ্য গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যয়ভার আমাদের মতো দেশের সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এই ব্যয়ের অংশীদার হতে হবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকেও। তা–ই হয়ে চলছে দীর্ঘকাল যাবৎ। প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলেও এ ব্যবস্থাই আমাদের সমাজে ক্রমান্বয়ে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে অবদান রাখছে। এই ব্যয়কে একটি সামাজিক বিনিয়োগ বলেই বিবেচনা করা হয়। তাই এ খাতে করারোপ করে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের মূলনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, ৪ জুন ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আয়ের ওপর ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। পরে সাড়ে ৭ শতাংশ বহাল রাখা হয়। তাঁর মতে, শিক্ষাসহ অন্যান্য সামাজিক খাতে অধিকতর বিনিয়োগের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর সংগ্রহ করা যৌক্তিক। আলোচনা প্রাসঙ্গিক যে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর করারোপ করা হলেও তা আদায় করা হবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বের ধরনে বিভিন্ন দল থাকলেও মূলত কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই। সে কারণে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সংসদে কেউ সোচ্চার হননি। তবে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এর সমর্থক কারও মতে, সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন। তঁাদের আরেকটু বেশি ব্যয় করা অসংগত হবে না। তবে প্রায় বিনা মূল্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল কলেজের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আসন থাকলে এত অধিক টাকা ব্যয় করে খুব কমসংখ্যকই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পথে চলতেন। কেউবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেশন জট, মন্দ ছাত্র রাজনীতিসহ কোনো কোনো কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। তাঁদের সেই যাওয়াও যৌক্তিক। এর জন্য তাঁরা দিচ্ছেন চড়া মাশুল। আবার কর দেবেন কেন এবং কী যুক্তিতে?
যতটুকু জানা যায়, এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩টি, শিক্ষার্থী আছেন সাড়ে চার লাখ। তেমনি ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আছেন ২০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তো ছিল রাষ্ট্রের। তা করা হলো না। বরং উল্টো কর বসিয়ে আরও ব্যয়বহুল করে পথের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে উচ্চ–মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাশাপাশি নিম্ন–মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও প্রচুর ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। সরকারের কোনো ব্যয় ছাড়াই তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এতেও বাধা! এর নৈতিক দিকটি কোথায় তা বোঝা দুর্বোধ্য। পাশাপাশি এই স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রায় বিনা মূল্যে পড়ছেন। তা পড়ুক। সরকারের সামর্থ্য থাকলে সেখানে আরও ব্যয় করা উচিত। সে দাবিও সবাই করেন। তবে যাঁরা সেগুলোতে পড়তে পারেন না বা পড়েন না কোনো না কোনো কারণে, তাঁদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ কেন?
বলা হয়, বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিক হারে ছাত্র-বেতনসহ অন্যান্য ফি নিচ্ছে। অভিযোগ অনেকাংশে সত্য হতে পারে। আর তা ঠেকানোর জন্য তো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকার রয়েছে। তা না করে এ ধরনের করারোপ তো ছাত্রছাত্রীদের বোঝা আরও বাড়াল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুটি কয়েক উঁচু মানসম্পন্ন। তবে বেশির ভাগই নয়। আর সেসব প্রতিষ্ঠানে কিন্তু খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরাই। আর মানের এই দুর্বলতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো ভূমিকাই তো লক্ষণীয় হয় না। সেদিন শিক্ষাসচিব রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে মন্তব্য করলেন—একটি ভালো স্কুলের সুযোগ-সুবিধাও এগুলোতে নেই। তিনি সাহস করে সত্য কথা বলেছেন। তবে এদের পরিচালনার অনুমতি কারা দিল? আর সময়ান্তরে নবায়ন করছে কারা? নিজ ক্যাম্পাসে যাওয়ার একটি সময়সীমা একবার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কিছু হয়নি। কিছুই হয়নি, যারা আদেশকে মানল না তাদের। সময়ান্তরে পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর দায়িত্বও নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে। তাদের জনবল বা অন্য কোনো সক্ষমতার অভাব থাকলে তা দূর করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। জানা যায়, আরও শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন বিবেচনাধীন আছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে এতৎসংক্রান্ত দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়ের। নামকাওয়াস্তে রোগী নিয়ে একটি হাসপাতাল জরাজীর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি নিয়েই শুরু করছে চিকিৎসা শিক্ষার ন্যায় জটিল কাজ। অনুমোদন ও সময়ান্তরে নবায়নও হয়। ডিগ্রি নিয়ে বের হন শিক্ষার্থীরা। আর এ দোষ তো তাঁদের নয়। যাদের এ অব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের। সেই অক্ষমতার মাশুল দেবেন ছাত্রছাত্রীরা, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ঠিক তেমনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোও। এখানে ব্যয়ের অতিরিক্ত আয় উদ্যোক্তা, ট্রাস্টি বা বোর্ড সদস্যরা কেউ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন না। তা ব্যয় করতে হয় ভবন নির্মাণ, গবেষণাগার ও পাঠাগার সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের বর্ধিত বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া ইত্যাদি কাজে। কেউ তা না করে বাঁকা পথে নিতে চাইলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা হলে এমনটা হবে না। তবে প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি সরকারের সময়ে কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে তাদের সমর্থিত ব্যক্তিদেরই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর পরিচালনা পর্ষদের হয় কিছু চেহারা বদল। এমনকি বদলে যায় প্রতিষ্ঠানটির নাম। এই সুবিধার বিষয় মাথায় রেখে এমন নাম বদল বারবার হচ্ছে, এমনটাই দেখা যায়। তাদের কার্যক্রমের ওপর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর কর বসিয়ে কিছু টাকা আয় হলেও এগুলোর মানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই। এমনিতেই আমাদের দেশে শিক্ষায় বিনিয়োগ কম বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মধ্যেও যেটুকু বেসরকারি বিনিয়োগ আসছে, তার ওপর কর বসানোয় তা–ও নিরুৎসাহিত হবে।
কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ অযৌক্তিক। এটা সংবিধান প্রদত্ত আমাদের শিক্ষা লাভের অধিকারের পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও সরকার তা করে চলেছে। কিছুকাল আগে থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীরা সাড়ে ৭ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর দিয়ে যাচ্ছে সরকারকে। তবে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সাড়ে ৪ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব, প্রতিবাদের মুখে সরকার তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এ বছর বর্ধিত হারেই কর আরোগিত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশে প্রায় সব ক্ষেত্রেই করের ছড়াছড়ি। সেখানেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়ে গেছে করের আওতার বাইরে।
বরং তারা সেবামূলক সংস্থাগুলো থেকে কিছু ছাড় পায়। দিতে হয় না পৌর কর। এটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার যে সরকারের এসব শিক্ষার্থীর জন্য যে অর্থ ব্যয় করার কথা ছিল, তা করতে হচ্ছে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সেই দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে তো তাঁরা আশা করতেই পারেন সরকারি সহায়তা। করের বোঝা নয়। পড়ালেখা করতেও যদি কর দিতে হয়, তা সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক অঙ্গীকারের পরিপন্থীই হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

জেরুজালেমে সমকামী র‌্যালিতে হামলা

জেরুজালেমে সমকামীদের একটি বার্ষিক র‌্যালিতে এক ইসরাইলি কট্টরপন্থী ইহুদি হামলা চালিয়েছে। র‌্যালি চলাকালে একটি ছুরি নিয়ে আকস্মিক হামলা চালায় ওই ব্যক্তি। তার এলোপাতাড়ি ছুরির খোঁচায় আহত হয়েছেন ৬ জন। এদের দু’জনের অবস্থা গুরুতর। হামলার সময়ই ইয়েশাই শিলসেল নামের ওই ইহুদিকে গ্রেফতার করেছে সেখানকার পুলিশ। শুক্রবার এএফপি এক খবরে এ খবর প্রকাশ করেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, সমকামী সম্প্রদায়েরও ইসরাইলের সব নাগরিকের মতো শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকার রয়েছে। তার সরকার সেই অধিকার সর্বোতভাবে রক্ষায় সচেষ্ট হবে বলেও নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে,
হামলাকারী ব্যক্তির নাম ইয়েশাই শিলসেল। এর আগেও সে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। ২০০৫ সালে সমকামীদের একটি র‌্যালিতে হামলা চালিয়ে চারজনকে ছুরিকাহত করার অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করছিল সে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সে কারাগার থেকে ছাড়া পায় এবং আবারও একই ঘটনা ঘটাল। ছয়জনকে ছুরিকাহত করার পর ইয়েশাই শিলসেলকে ধরে ফেলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রায় ৫ হাজার মানুষ এ আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন। তারা একটি রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটি সুপার মার্কেট থেকে একজন সেই ভিড়ের মধ্যে খোলা ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজনকে ছুরিকাহত করে। ইসরাইলি চ্যানেল-২-তে মাই অ্যাভিয়র নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘আমরা মানুষের ভয়ার্ত চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। সবাই আড়াল খুঁজছিল আর রক্তাক্ত কয়েকজন রাস্তায় পড়েছিল।’ কয়েক বছর ধরে পালিত হওয়া এ আয়োজনে এটাই সবচেয়ে ভয়ানক আক্রমণ।

কাশ্মির সত্যিই ভূস্বর্গ, কিন্তু আড়ালে গহন অন্ধকার by জয়ন্ত ঘোষাল

অনেক দিন পর শ্রীনগর এলাম। ভূস্বর্গ কাশ্মির, পূর্বের ভেনিস এই শহরটিকে দেখে মন বিষণ্ণ হয়ে গেল। এক ভয়াবহ বন্যায় বিধ্বস্ত শ্রীনগর। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত বিশ বছরে এ হেন বর্ষণ কখনো হয়নি। ঝিলম নদীর জলস্রোত রুখতে এক পৃথক কৃত্রিম খাল তৈরি হয়েছিল জলনিকাশির জন্য। তা-ও ভেসে গিয়েছে কাশ্মির। কোনো কিছুই বিপর্যয়কে রুখতে পারেনি। প্রকৃতির ভয়াল তাণ্ডবে ভেদাভেদ নেই ধনী-দরিদ্রে। নিশ্চিহ্ন কত বাড়ি ও দোকান। ওমর আবদুল্লার বাড়ির মধ্যেও জল জমে ছিল সাত দিন। কিন্তু অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গরিব মানুষই। আর এ রকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে কাশ্মির রাজনীতিও এক বড় সঙ্কটের মুখোমুখি। মুফতি মুহম্মদ সৈয়দ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন সবে তিন মাস হলো। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারছেন বিজেপি-র মতো এক জাতীয় হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার ফল কী হতে পারে। এই জোটের ফলে রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়ছে বই কমছে না। কারণ, বিজেপি-কে অন্তর থেকে শ্রীনগরের মুসলমান সমাজ কিছুতেই কখনো গ্রহণ করতে পারে না। স্থানীয় নাগরিক সমাজ, মুসলিম বিদ্বজনেদের মনে হচ্ছে যে বিজেপি ‘হিন্দুস্থানি’ সরকার চালাচ্ছে। তারা এখানে সঙ্ঘ পরিবারের কৌশলে জম্মু ও কাশ্মিরের বিভাজন বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তার অভাববোধের এই বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বাড়ছে জঙ্গি কার্যকলাপ। বাড়ছে প্রবীণ গিলানির জনপ্রিয়তা। ফলে কাশ্মির সরকার এখন তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। অল্পবয়সী ছেলেরা আবার জঙ্গি সংগঠনে নাম লেখাচ্ছে। বিশেষত দক্ষিণ কাশ্মিরে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ দিকে দারিদ্র চরমে। বেকারি। অপুষ্টি। তবু উন্নয়ন এখনও কাশ্মিরের প্রধান আলোচ্যসূচি নয়। নরেন্দ্র মোদি যদি উন্নয়নের কথা বলেন তা হলেও কাশ্মিরি জনমানস মনে করে, হিন্দুস্থানি সরকার কাশ্মিরি আজাদির চেতনাকে ভোলানোর চেষ্টা করছে। কাশ্মির মানে আজও আমাদের কাছে পর্যটনের বিষয়। অমরনাথ যাত্রা সফল হলো না কি জঙ্গি নাশকতায় তা বন্ধ করতে হলো-এটাই যেন কাশ্মির সরকারের সাফল্যের একটি বড় পরীক্ষা। বাঙালি, গুজরাটি ও দক্ষিণি পর্যটকদের প্রিয় স্থান এই শ্রীনগর। শ্রীনগরে এসে পর্যটকেরা ডাল লেকে থাকেন। শিকারায় অনেকে রাত্রিবাস করেন। মুঘল বাগানে নানান রঙিন ফুলের বাহার দেখে মুগ্ধ হন। সেই মুগ্ধতাকে বিক্রি করে শ্রীনগরের কিছু যুবক, কিছু ব্যবসায়ী দৈনন্দিন অন্নচিন্তা সামাল দেন। কিন্তু বারবার এসেও কাশ্মিরের আর্থ-সামজিক ব্যবস্থা অতীতেও যা দেখেছি আজও তাতে বিপুল কোনো পরিবর্তন দেখছি না। সাংবাদিক হিসাবে তিন দশক আগে যখন এসেছিলাম তার সঙ্গে আজ ফারাক কোথায়! এর মধ্যে প্রায় পঁচিশ বার এসেছি এই প্রান্তে। চারার-এ-শরিফে যখন আগুন লাগে, হজরতবালে জঙ্গি প্রবেশ করে, বারবার ভোট হয়- যখনই এসেছি, কখনো ফারুক, কখনো মুফতি, কখনো গুলাম নবি। এখানেও রাজার পোশাক বদলায়, রাজতন্ত্র বদলায় না। ৩৭০-এর অধিকারে কোটি কোটি রুপি আসে। সে রুপি প্রত্যন্ত কাশ্মিরের গরিব মানুষ পর্যন্ত পৌঁছায় না। এবার এসেছিলাম সংবাদমাধ্যম সম্পর্কিত এক আলোচনায় যোগ দিতে। এক দিকে দিল্লি থেকে আসা নানা ধরনের সাংবাদিক। সেখানে সর্বভারতীয় বৈদ্যুতিন সাংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক যেমন আছেন, তেমনই আছেন দূরদর্শনের উপদেষ্টা। আবার আমার মতো বাংলা সংবাদপত্রে কর্মরত গদ্য-কর্মীও ছিল। অন্য দিকে নানা ধরনের কাশ্মিরি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। দু’দিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে এক সেতু রচনার চেষ্টা। কিন্তু দু’দিনে এটা বোঝা গেল যে কাশ্মিরি সংবাদমাধ্যম এক তীব্র বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার। কাশ্মিরি সাংবাদিকরা বার বার আমাদের সম্বোধন করছিলেন হিন্দুস্থানি মিডিয়া হিসাবে। আর ওরা হলেন কাশ্মিরি মিডিয়া। আমি বললাম, আমি তো জানতাম আপনারাও ভারতীয় সাংবাদমাধ্যম। আপনারা কি নিজেদের হিন্দুস্থানি বিরোধী মিডিয়া বলে মনে করেন? আমি তো বাঙালি। বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতা করি। কিন্তু আমি তো ভারতীয় সাংবাদিক। নিজেকে পশ্চিমবঙ্গীয় সাংবাদিক তো বলি না। কাশ্মিরি হয়েও ভারতীয় হতে না পারার মধ্যে কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে। কিন্তু সেই বিচ্ছিন্নতাবোধকে ৭০ বছর ধরে প্রশ্রয় দিয়ে কাশ্মিরের কোন উপকারটা হয়েছে! বিহারে গেলে রাস্তার যে অবস্থা দেখি এখানেও তো সেটাই দেখছি। দু’টোই তো ভারতের রাস্তা। বঞ্চনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তুললেও বলব, এই যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বাঙালিরও অনেক বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার কেরলের এক জন মালয়ালি, তামিলনাড়ুর এক তামিল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক মণিপুরিও। মানছি, কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রেক্ষাপট পৃথক। মানছি অতীতের পৃষ্ঠায় থাকা শেখ আবদুল্লাহ ও হরি সিংহ, মাউন্টব্যাটেন-গান্ধী, নেহরু-জিন্নার ভূমিকা নিয়ে আজও এ প্রান্তে বিতর্ক সজীব। স্থানীয় প্রকাশক ও বইয়ের দোকানে গেলে তা বোঝা যায়। এ ব্যাপারে নতুন নতুন বই প্রকশিত হয়েই চলেছে। বহু হরিয়ত নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত। তারাও ক্ষমতার রাজনীতিতে ব্যস্ত। কেউ স্থানীয় বাজারের ইজারা নিয়েছেন। কারও আমদানি-রফতানির ব্যবসা। কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাই তাদের রাজনীতির মূলধন। স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রকাশিত কার্টুন, এক রোবট কাশ্মিরের সাংবাদমাধ্যমের মঞ্চে সেমিনার করতে এসেছে। পিছন থেকে হাতে রিমোট নিয়ে দিল্লি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। দু’দিনের আলোচনা সভায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীরা ভারতীয় রাষ্ট্রের সমালোচনা করতে শুরু করেন। দু’দিন আলোচনা শুনতে শুনতে মনে হলো, আমিই কি তবে ভারতীয় রাষ্ট্র! ওনাদের বললাম, ভারতীয় সেনাবাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে আমরাও তার তীব্র সমালোচনা করি। আমরা ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমরা বেসরকারি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি। সংবাদমাধ্যমের যে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তা যেমন দিল্লিতে আছে তেমনই কাশ্মিরেও আছে। হাইপার জাতীয়তাবাদ যেন ভারতীয় চ্যানেল বা সংবাদমাধ্যমে কাঙ্খিত নয়, তেমনই কাশ্মিরি সংবাদমাধ্যমের বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বার অতিপ্রচারও ভাল নয়। মডারেট বা মাঝামাঝি পথে চলা মানুষেরা এ সমাজে ক্রমশ বেশি বেশি করে নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন। সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়িও ভালো নয়, আবার তা বলে জঙ্গি তৎপরতাও ভালো নয়। শ্রীনগর থেকে দিল্লি ফেরার পথে সহযাত্রী ছিলেন এক অবসরপ্রাপ্ত কাশ্মিরি বিচারক। এই প্রবীণ মানুষটিকে প্রশ্ন করেছিলাম, জঙ্গি তৎপরতা আবার বাড়ছে এ কথা সবার মুখে শুনে এলাম। জবাবে ওই প্রবীণ কাশ্মিরি বললেন, ও তো এখানে কখনো বাড়ে, আবার কখনো কমে। যখন কমে তখনও আসলে কমে না। আবার যখন বাড়ে তখনও এতটা বাড়ে না যে ওটা আর কমবে না। আসলে যে সরকারই আসুক তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ে। কারণ কাশ্মিরের মানুষের সমস্যার সমাধান হয় না। কাশ্মির সমস্যার নাম করে রাজনীতিকেরা দারিদ্র, বেকারির মতো ইস্যুকে ভুলিয়ে রাখেন। গৃহবন্দি গিলানি ভোট বয়কট করেন তাই জনপ্রিয়। কিন্তু তাকে যদি মুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয় তা হলে তিনিও অচিরেই জনপ্রিয়তা হারাবেন। এটাই দস্তুর। আপনাদের হিন্দুস্তানে মোদি থেকে মমতা, সকলকেই এই অসন্তোষের মোকাবিলা করতে হয়। এই অসন্তোষের জন্যই মনমোহন সিংহ থেকে পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম, সকলকেই ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে। তা হলে কাশ্মির কি যে তিমিরে সেই তিমিরেই থেকে যাবে? এ এক বিচিত্র ত্রিভুজ। ত্রিভুজের প্রথম বিন্দু দিল্লি-শ্রীনগর সম্পর্ক। দ্বিতীয় বিন্দু, জম্মু-কাশ্মির, অর্থাৎ হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আর তৃতীয় বিন্দু, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক। শুধু একটা প্রশ্নের সমাধান করতে গেলে অন্য বিন্দুগুলিতেও প্রত্তিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সহযাত্রী প্রবীণ বিচারকের সখেদ মন্তব্য, এখন তাই আমরা খবরের পিছনে দৌড়াই না। প্রতি দিন টিভি চ্যানেলের খবর আমাদের তাড়া করে ফেরে। আমরা খবর পড়ি। খবর শুনি। সব দেখি। সব বুঝি। কিন্তু কোনো উত্তর নেই কারও কাছে। দিল্লি বিমানবন্দরে নেমে কনভেয়ার বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে বলে এলাম, সমাধান আমরা না-ও দিতে পারি, কিন্তু আপনার হতাশার কথা, খেদের কথা আমার পাঠককে জানাতে পারি।
জয়ন্ত ঘোষাল: নয়া দিল্লি ব্যুরো চিফ, আনন্দবাজার পত্রিকা।

সামিউল হত্যা: কামরুলকে ফেরাতে জটিলতার শঙ্কা by রোজিনা ইসলাম

শেখ সামিউল আলম রাজন
সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলামকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলা হলেও সৌদি আরবের সঙ্গে বহিঃসমর্পণ চুক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে জটিলতা হতে পারে। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কামরুলকে ফিরিয়ে আনতে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই তাঁকে দেশে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, সৌদি আরবে আটক কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে সে দেশের সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ বহিঃসমর্পণ প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ওই প্রস্তাবের সঙ্গে মামলার এজাহারের অনুলিপি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের কপিসহ কোন আইনে কামরুলের বিচার করা হতে পারে, সে-সংক্রান্ত মোট ৩২ পৃষ্ঠার কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। দ্রুত বিচার আইনে সামিউল হত্যার বিচার করা হবে। প্রস্তাবটি সৌদি কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
১৩ বছর বয়সী সামিউলকে ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর সৌদি আরবপ্রবাসী কামরুল পালিয়ে সেখানে চলে যান। বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় জেদ্দায় তাঁকে আটক করে সৌদি পুলিশ। বর্তমানে তিনি সেখানকার কারাগারে আছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার সূত্র বলেছে, সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বহিঃসমর্পণ চুক্তি না থাকলেও কামরুলকে ফিরিয়ে আনতে সে দেশে পূর্ণাঙ্গ বহিঃসমর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। চুক্তি না থাকায় কামরুলকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ অনুরোধ জানাবে। অন্য কোনো আইনে তাঁকে ফেরত পাঠাতে পারে। সৌদি সরকার চাইলে কামরুলকে পুশব্যাকও করতে পারে অথবা তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পারে৷ তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে দুই দেশের সম্পর্ক ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর৷
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো কাগজপত্রে সিলেটের জালালাবাদ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলামের দায়ের করা এজাহারও পাঠানো হয়েছে। ওই এজাহারে সামিউলের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ৮ জুলাই ভোর ছয়টায় ভ্যানগাড়ি চুরি করার সময় ওই ওয়ার্কশপের নিরাপত্তা প্রহরী ময়না মিয়া আশপাশের ওয়ার্কশপের লোকজনকে নিয়ে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে (সামিউল) মারধর করে গুরুতর আহত করেন ও পরে ওই ব্যক্তি মারা যায়। তবে সামিউলের বাবা আজিজুর রহমান আলমের দায়ের করা এজাহারে ঘটনাটি স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে। তাই পুলিশের এজাহারটি পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কামরুলের বিষয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কামরুলের ভাই ও এই মামলার প্রধান আসামি মুহিত আলমসহ বেশ কয়েকজন আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। চুরির অভিযোগ তুলে সামিউলকে পেটানোর দৃশ্য ভিডিও করে তা নির্যাতনকারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ওই ভিডিওতে কামরুলকেও দেখা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকার অর্থ এই নয় যে এক দেশের আসামি অন্য দেশে ধরা পড়লে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠাতে হবে৷ এমন বাধ্যবাধকতা নেই৷ এই নোটিশের মাধ্যমে কোনো দেশের অপরাধীর ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ এবং তথ্য সংগ্রহ করা হয়৷
১৮ জুলাই সিলেটের সদর উপজেলার বাদেয়ালি গ্রামে সামিউলের বাড়িতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। ২০ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, অচিরেই কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। ২২ জুলাই সিলেটের বাদেয়ালি গ্রামে গিয়েও একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, সৌদি আরব থেকে কামরুলকে দেশে ফেরাতে তৎপরতা চলছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, সামিউল হত্যার বিচার দ্রুত বিচার আইনে করা হবে। কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুই দেশের আইনগত জটিলতা কাটিয়ে তাঁকে আনা হবে। তবে কখন আনা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। এই হত্যার ঘটনাটি সারা পৃথিবীকে নাড়া দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড, নৃশংস হত্যাকাণ্ড। দেশের আপামর জনসাধারণের মনে ঘটনাটি দাগ কেটেছে।
কামরুলের দেশ ছেড়ে পালানোর জন্য পুলিশের গাফিলতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আসামি কীভাবে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবু দেশহারা দুই পরিবার -ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর

কোচবিহারের বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোর ১৪ হাজারের বেশি বাসিন্দা যখন ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষা করছেন, সেখানকার আব্দুল হামিদ এবং তাঁর আত্মীয় সোবহান আলি শেখের দুই পরিবারের ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত। বাংলাদেশে তাঁরা ‘বিশ্বাসঘাতক’, আর ভারতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এই দুটি পরিবারকে নিয়ে গতকাল শনিবার ভারতের দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি প্রতিবেদন ছেপেছে।
দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহলবাসীদের নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া গতকাল শুরু হয়। ভারতীয় পত্রিকাটি জানায়, ৬২ বছর বয়সী হামিদ ও ৮২ বছর বয়সী সোবহান ১৯ বছর আগে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান। ‘বিএসএফের ১২ জওয়ানকে বাঁচাতে’ তাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। ঘটনাটির স্মৃতিচারণা করে হামিদ বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ১২ জওয়ান ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি) সেনারা ওই ১২ জনকে দেখে ফেলেন। তখন হামিদ ও তাঁর আত্মীয়রা ওই বিএসএফ সদস্যদের পথ দেখিয়ে ভারতে পৌঁছে দেন।
হামিদ বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী বিএসএফ সদস্যদের বাঁচানোর কারণে আমাদের “বিশ্বাসঘাতক” মনে করা হয়েছিল। এ কাজের “শাস্তি” হিসেবে দেশে ফিরে যাওয়ার আগেই সেউতি কুরশা এলাকায় ১৪২ নম্বর ছিটমহলে আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়। তারপর থেকে আমরা এখানকার শিবগঞ্জ ব্লকেই বাস করছি। এই জমির মালিক একজন হিন্দু এবং তিনি আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি যদি আগামীকাল আমাদের চলে যেতে বলেন, আমাদের কোথাও যাওয়ার নেই।’
হামিদ আরও বলেন, তিনি দুই ভাই, তিন বোন, মামা সোবহান আলি শেখ ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুটি পরিবার বড় হয়ে সদস্যসংখ্যা ৭৭ হয়েছে। তিনি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে লিখে জানিয়েছেন, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। শুধু প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, আর কিছু হয়নি। তাঁর সন্তানেরা বড় হয়ে বিয়ে করেছে। নাতি-নাতনির জন্ম হয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে তাঁদের কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি ছিটমহল বিনিময়ের সময় তাঁরা বাংলাদেশ বা ভারত—কোনো দেশের নাগরিক বলেই গণ্য হননি। স্থানীয় ছিটমহলবাসী সবাই ভারতীয় নাগরিকত্ব পাচ্ছে। তিনি মনে করেন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকেও ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত।
হামিদ দাবি করেন, তিনি যেহেতু বিএসএফ সদস্যদের বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন, ওই কাজের জন্যই তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত। ওই ঘটনার প্রমাণ হিসেবে তিনি স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সনদও দেখাতে পারেন। কোচবিহারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি উলগানাথন বলেন, হামিদের সমস্যাটির সমাধান কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই করতে পারে। সরকার স্পষ্ট বলে দিয়েছে যে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে যাদের নাম ওঠেনি, তারা কোনো সুবিধা পাবে না।

‘ঢাকায় বন্দি কি তালহা, অনুসন্ধানে এনআইএ’

‘ঢাকায় বন্দি কি তালহা, অনুসন্ধানে এনআইএ’- এই শিরোনামে ভারতের কলকাতার আনন্দবাজার আজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ধৃত জঙ্গিদের মধ্যে খাগড়াগড় কাণ্ডের এক চাঁই আছে কি না, সেই ব্যাপারে দিশা দেখাবে আর এক বন্দি! জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র অফিসারদের কারও কারও সন্দেহ, খাগড়াগড় কাণ্ডের অন্যতম মূল অভিযুক্ত তালহা শেখ এখন বাংলাদেশ পুলিশের হাতে বন্দি। ধৃত ব্যক্তিই তালহা কি না, সেই সম্পর্কে নিশ্চিত হতে গোয়েন্দারা খাগড়াগড় কাণ্ডের আর এক অভিযুক্ত ও ধৃত নুরুল হক ওরফে নইমকে ফের জেরা করতে পারেন। মুর্শিদাবাদের ডোমকলের বাসিন্দা নইমকে গত ১৮ জুন দুপুরে হাওড়া স্টেশনের কাছ থেকে গ্রেফতার করা হয়। এনআইএ-র বক্তব্য, জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এ নইম ছিল তালহা শেখের ঘনিষ্ঠ অনুগামী। ধৃত ব্যক্তি সত্যিই তালহা হলে, তার ছবি দেখে নইম তাকে শনাক্ত করতে ভুল করবে না বলে গোয়েন্দাদের দাবি।   ২৭ জুলাই, সোমবার রাতে ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর ৮ পাণ্ডাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে রয়েছে খোদ জেএমবি-র ভারপ্রাপ্ত আমির বা প্রধান— আবু তালহা মহম্মদ ফাহিম ওরফে পাখি। এনআইএ-র কর্তাদের একাংশের সন্দেহ, ওই পাখি আসলে খাগড়াগড় কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত তালহা শেখ। তবে এনআইএ-র এক শীর্ষকর্তা শুক্রবার বলেন, ‘‘এখনই নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাবে না। ধৃত পাখিই খাগড়াগড় কাণ্ডে অভিযুক্ত তালহা কি না, আমরা খোঁজ নিচ্ছি।’’ এনআইএ এই বছর মার্চ মাসে খাগড়াগড় কাণ্ডে চার্জশিট জমা দেয়। সেখানেই ফেরার অভিযুক্ত হিসেবে তালহার নাম ছিল। তালহার হদিস পেতে ১০ লক্ষ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছে এআইএ। তদন্তকারীরা গোড়া থেকেই তালহাকে বাংলাদেশি হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন। তালহা গত কয়েক বছর ধরে নদিয়ার দেবগ্রামের ডাঙাপাড়া ও বীরভূমের বোলপুরের শান্তিপল্লিতে ঘাঁটি গেড়ে জঙ্গি সংগঠনের কার্যকলাপ চালাচ্ছিল বলে এনআইএ জানতে পারে। গত ২ অক্টোবর খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের পর থেকে তালহা পলাতক। বাংলাদেশ পুলিশ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ধৃত আবু তালহা মহম্মদ ফাহিম ওরফে পাখির বাবা এখন জেলে এবং সে-ই জেএমবি-র আমির বা শীর্ষনেতা মৌলানা সইদুর রহমান। সাইদুর জেলে যাওয়ায় তার ছেলে পাখিকে আমিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এনআইএ-র বক্তব্য, পাখি আর তালহা শেখ এক ব্যক্তি হলে বুঝতে হবে জেএমবি-র একেবারে শীর্ষে থাকা নেতারা নিজেরাই পশ্চিমবঙ্গে এসে সংগঠনের জাল বিস্তার করছিল।

‘দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি’ লাঠিখেলায় আনন্দ আয়োজন by আনোয়ার হোসেন ও এ বি সফিউল আলম

৬০ বছরের বৃদ্ধ বাহেদ আলীর হাতে একটি বাঁশের লাঠি। লাঠিটি দিয়ে তিনি আঘাত করার চেষ্টা করছেন ৩৫ বছর বয়সী নুরুজ্জামানকে। নানা কসরতে সেই আঘাতের চেষ্টা হাতের লাঠি দিয়ে ঠেকিয়ে পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করেন নুরুজ্জামান। তা প্রতিহত করেন বাহেদ আলী।
বাহেদ আলী ও নুরুজ্জামান সম্পর্কে বাবা-ছেলে। তাঁদের এই ‘লড়াই’ পারিবারিক কোনো কলহ নয়। গ্রাম-বাংলার চিরায়ত উৎসব লাঠিখেলায় মেতেছিলেন তাঁরা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলে গিয়ে এই লাঠিখেলা দেখা গেল। স্থানীয় লোকজন বললেন, ৬৮ বছর পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার মুহূর্ত উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এই লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়।
বাবা-ছেলের লাঠিখেলা বেশ উপভোগ করেন বাঁশকাটা এলাকার কয়েকটি ছিটমহলের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষ। এঁদের মধ্যে ছিলেন বাহেদের স্ত্রী সুরাতন্নেছা, নুরুজ্জামানের স্ত্রী সামিনা খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও। তাঁরা হাততালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন দুজনকেই। দর্শকদের বেশির ভাগই ছিলেন নানা বয়সের নারী।
৪২ বছর বয়সী নুরনাহার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘কী কমো বাহে। দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি। এ জন্য আনন্দ-উল্লাস করছি বাহে।’
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রাক্কালে এমন নানা উৎসবের আয়োজন করেছেন বাঁশকাটার ছিটমহলের বাসিন্দারা। গতকাল রাত ১২টার সময় ৬৮টি মোমবাতি জ্বালিয়ে উৎসব করেন তাঁরা। ওই এলাকায় ২১টি ছিটমহল রয়েছে। এর মধ্যে ১১টিতে কোনো বাসিন্দা নেই। বাকি ১০টি ছিটমহলের বাসিন্দা ২ হাজার ৮২৪ জন। এর মধ্যে বসটারি গ্রামের ৯৭ জন ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অবশ্য তেমন কোনো উৎসব দেখা যায়নি।
ছিটমহল বিনিময় কমিটির নেতা ও বাঁশকাটার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, আজ শনিবার সকাল সাতটায় বাঁশকাটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। এ সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ ছিটমহলবাসীরা উপস্থিত থাকবেন।
ছিটমহলের নারীদের জন্য বিকেলে রয়েছে বালিশ খেলা। বিকেলে পুরুষেরা খেলবেন বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু।
ছিটমহলের বাসিন্দা ও পল্লিচিকিৎসক রেজাউল করিম বলেন, ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনে খেলাধুলা বা উৎসবের স্থান ছিল না। তাঁদের বিনোদন বলতে ছিল খেতে কাজ করা। এবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়াটা উদ্যাপনের জন্য সবাই নানা আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ছিটমহলের সব বাসিন্দার জন্য আজকের দিনটি ঈদের মতো।
ছিটমহলে মাঠ নেই। আনন্দ আয়োজনের এসব অনুষ্ঠান তাই গ্রামের বড় একটি বাড়ির উঠানেই সম্পন্ন হচ্ছে। বাড়ির বাসিন্দারাও সানন্দে এই আয়োজনে অংশ হতে পেরে গর্বিত বলে জানিয়েছেন।
লাঠিখেলা দেখতে আসা ছিটমহলের বাসিন্দা ৫০ বছরের রফিকুল ইসলামের চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছিল উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, ‘হামরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হমো বাহে। এই জন্যে আনন্দের শেষ নাই। বাংলার ঐতিহ্য খেলার মধ্য দিয়ে আরও একবার স্বাধীন হইনো।’
স্থানীয় লোকজন বললেন, লাঠিখেলায় দুজন খেলোয়াড় একসঙ্গে অংশ নেন। তাঁদের পালা শেষ হলে আসেন আরেক দল। এভাবে গতকাল বিকেল থেকে সাত-আটটি দল লাঠিখেলায় অংশ নেয়। এরা সবাই ছিটমহলের বাসিন্দা।

নির্বাচনের জন্য সু চির নিবন্ধন

নির্বাচনের জন্য নিবন্ধন করেছেন মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি। গত বুধবার কয়েক শ সমর্থক বেষ্টিত হয়ে আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে থানলিন শহরে গিয়ে তিনি নিবন্ধনের কাজ শেষ করেন। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে খাওমু থেকে নির্বাচন করবেন বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন সু চি। খবর এএফপির।
সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) থেকে প্রার্থী হিসেবে সু চিই প্রথম নিবন্ধন করেছেন। তবে নিবন্ধনের পর কাল সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি কোনো ভাষণ দেননি। এনএলডির মুখপাত্র নয়ন উইন এএফপিকে বলেন, নির্বাচন কর্মকর্তারা গ্রিন সিগন্যাল না দেওয়া পর্যন্ত প্রচারণা শুরু করা যাবে না।
সু চির এই নিবন্ধনে বিরোধী শিবিরকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ২০১০ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনে সামরিক জান্তা সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) জয়লাভ করে। সে সময়ে সু চি গৃহবন্দী থাকায় তাঁর দল নির্বাচন বর্জন করেছিল।
তবে ক্ষমতাসীন দল আসন্ন নির্বাচনে তাদের পরিণতি কী হতে পারে, তা এখনই মেনে নিয়েছে। ইউএসডিপির সাধারণ সম্পাদক মং মং থেইন বলেন, ‘২০১০ সালের নির্বাচনের মতো আমরা কোনো জয় আশা করছি না। এটি অসম্ভব।’
মিয়ানমারে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য আবেদনপত্র দাখিল করেছেন অং সান সু চি। গতকাল বুধবার বন্দর নগরী থানলিনের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে এনএলডির এই নেত্রী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। তিনি কাহমু আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ছবি: রয়টার্স

মেমনের ফাঁসির সাক্ষী রইলেন ‘মর্দানি’ মীরা

ফের একবার খবরের শিরোনামে এলেন বাস্তবের 'মর্দানি' মীরা বোরওয়ানকার। ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সময় মহারাষ্ট্রের যে পাঁচজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা জেলের অন্দরে ছিলেন, তাদের মধ্যে একজন তিনি। মহারাষ্ট্রের প্রথম মহিলা আইপিএস মীরা বর্তমানে এডিজিপি(অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ)। ''ইয়াকুবের ফাঁসি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, ''এটা একতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় , আমি এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।'' বাবা ওপি চাদা ছিলেন বিএসফ কর্মকর্তা। পাঞ্জাবেই তার স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে। পরে মহারাষ্ট্রে আসেন তিনি। তিনি বলেন, মারাঠি হিন্দি শিখতে তার বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল তার। অফিসার হিসেবে একের পর এক সাফল্য যুক্ত হয় তার নামের সঙ্গে। ১৯৯৪ তে জলগাঁওতে একটি মধুচক্র ফাঁস করে প্রথম খবরের শিরোনামে আসেন মীরা। এছাড়াও বহু বড় মাপের মাফিয়াদের ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। তার জীবন নিয়েই তৈরি হয়েছিল রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ছবি মর্দানি। কিভাবে একজন মহিলা তার ''মর্দানি' প্রকাশ করতে পারে তা নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে মীরা বলেন, 'প্রত্যেক মহিলার মধ্যেই মর্দানি লুকিয়ে থাকে। আমিও পাঞ্জাবের গ্রামে বড় হয়েছি। সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেছি। কোনোকিছুর সঙ্গে সমঝোতা না করলে আর প্রচুর পরিশ্রম করলেই প্রকাশ পাবে সেই 'মর্দানি'। শর্টকাট নিয়ে কেউ কখনও সফল হতে পারে না।'' – ওয়েবসাইট

পাঞ্জাব হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে -পার্লামেন্টে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে গত সোমবারের হামলায় অংশ নেওয়া তিন ব্যক্তি পাকিস্তান থেকেই এসেছিল। ভারতের পার্লামেন্টে গত বৃহস্পতিবার দেওয়া বক্তব্যে এ কথা বলেন রাজনাথ। এ হামলার ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। খবর এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে রাজনাথ বলেন, হামলাকারীদের কাছে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) যন্ত্র পাওয়া গেছে। জিপিএসে পাওয়া তথ্যে এটা পরিষ্কার যে তারা পাকিস্তান থেকে রাভি নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছেছিল।
হামলাকারীদের কাছে জিপিএস পাওয়ার দাবি করে ঘটনার পরের দিন ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বলেছিল, হামলার স্থান চিহ্নিত করার জন্য ওই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন বলা হয়, তিনটি জিপিএস সেটে পাওয়া তথ্য অনুসারে তিন সন্ত্রাসী ২১ জুলাই রাতে অথবা পরদিন ভোরে পাকিস্তানি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ঢুকেছিল। জিপিএসে পাওয়া তথ্যে এর বাহকদের ২১ জুলাই রাত ১০টা ৫১ মিনিটে পাকিস্তানের নারোট-জাইমাল সীমান্তে থাকার রেকর্ড আছে।
গুরুদাসপুর জেলার এসপি বলজিৎ সিংসহ চারজন পুলিশ সদস্য এবং চারজন সাধারণ পথচারী সোমবারের ওই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়। ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে এটি ছিল এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলা। এর ঘটনাস্থল গুরুদাসপুর পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে। সোমবার ভোর থেকে শুরু হয়ে হামলা চলে ১২ ঘণ্টা ধরে। সামরিক বাহিনীর পোশাক পরে আসা তিন হামলাকারীর হাতে চীনে তৈরি গ্রেনেড এবং একে-৪৭ ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনজন হামলাকারীর সবাই নিহত হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের আলোচিত শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আবার শুরুর সিদ্ধান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাজনাথের এ হুঁশিয়ারি এল। রাশিয়ায় একটি শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে গতকালই ভারতের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার জন্য আগামী আগস্ট মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিন-তারিখ ঠিক করার চেষ্টা করছে ভারত। আলোচনার জন্য পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ ভারত যাবেন।

‘আবারও ভুল করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে না’ -সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির অস্তিত্বই থাকবে না। আজ শনিবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি, সবাই সেই নির্বাচনে অংশ নেবে। নির্বাচন বর্জন করা ভালো রাজনীতি নয়। ভবিষ্যতেও যদি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে দলটির অস্তিত্ব থাকবে না।’
আশরাফ বলেন, ‘নির্বাচন বর্জনের রাজনীতি এখন আর কার্যকর নেই। ইয়াহিয়া, জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আপনি যদি জেনেও যান, আপনার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলেও আপনার নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন বর্জন করলে কোনো লাভ হবে না। আপনারা আসুন, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন। আমরা আশা করি, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।’
মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রশ্নে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো আলোচনাই আমাদের দলের মধ্যে হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও এই বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি। তবে, প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে। প্রধানমন্ত্রী যদি লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ করেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দিতে, তাহলে যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘সংবিধানে এই ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া আছে। উনি ইচ্ছা করলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতেও পারেন, নাও পারেন। উনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, যেকোনো সময় হবে। না হলে যথাসময়ে হবে।’
জাতীয় শোক দিবসে খালেদা জিয়াকে আবারও জন্মদিন পালন না করার আহ্বান জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট যদি সত্যিকারের জন্মদিন হয়ে থাকে তাহলেও ১৬ বা ১৭ আগস্ট যেন তিনি জন্মদিন পালন করেন। ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম শীতকালে। কিন্তু তিনি শীতকালে জন্মদিন পালন করেন না। তিনি দেশের জনগণের যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য শীতকালের পরিবর্তে জুলাই মাসে জন্মদিন পালন করেন।
এর আগে ভোর ছয়টার দিকে রাজধানী ঢাকা থেকে সৈয়দ আশরাফের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রওনা দেন। সেখানে দুপুর ১২টার দিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁরা। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বি এম মোজাম্মেল হক ও মেজবাহ উদ্দিন সিরাজসহ অনেকে। শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় বিভিন্ন জেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৪০ দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবেই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে আওয়ামী লীগ নেতারা শ্রদ্ধা জানাতে যান।

ডাকাতির নেপথ্যে ভাই

একমাত্র মেয়ের বিয়ের জন্য ৮৪ ভরি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার তৈরি করেছিলেন রাজধানীর মোহাম্মপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন ওরফে আক্তার কোম্পানি। বিয়ের খরচের জন্য ঘরে রেখেছিলেন ১৩ লাখ নগদ টাকা। সপ্তাহখানেক পরেই বিয়ের অনুষ্ঠান। তাই পুরো বাড়িতে আনন্দের আমেজ। কিন্তু সেই আনন্দে ভাটা পড়ে হঠাৎ। অনুষ্ঠানের সপ্তাহ খানেক আগে আক্তার কোম্পানির বাড়িতে হানা দেয় একদল ডাকাত। স্ত্রী সেলিনা আক্তার, মেয়ে লিমন আক্তার মীম আর ছেলে তানভীর হোসেনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হাত-পা-মুখ বেঁধে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা। গত বছরের নভেম্বরের ১১ তারিখ বিকালে দুর্ধর্ষ এই ডাকাতির ঘটনাটি ঘটে। প্রায় ৯ মাস পর এই ডাকাতির ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে নিজেরাও চমকে উঠেছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পুরো ডাকাতির এই ঘটনার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিল আক্তার কোম্পানির আপন ছোট ভাই নাজির আহমেদ ওরফে শামীম। শামীমের পরিকল্পনায় ডাকাতির পুরো ঘটনাটি বাস্তবায়ন করে আক্তার কোম্পানির বহু দিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার নূর মোহাম্মদ। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে গ্রেপ্তারের পর সব স্বীকার করেছে ছোট ভাই ও কেয়ারটেকার। জানিয়েছে ডাকাতির পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন ও বিপুল স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকার ভাগাভাগির কথাও। আর এসব শুনে রীতিমতো বিস্মিত ব্যবসায়ী আক্তার। প্রথম দিকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কথা বিশ্বাস করতে চাননি। পরে নিজের কানে ভাই ও কেয়ারটেকারের কাছে শুনে রীতিমতো ‘থ’ বনে গেছেন তারা। কারণ ডাকাতির ঘটনার পর প্রথমদিকে ছোট ভাই শামীম আর কেয়ারটেকার নূর মোহাম্মদই ডাকাতদের ধরার জন্য পুলিশের কাছে ছোটাছুটি করেছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনায় সেলিম, ফারুক, রিয়াজ নামে অপর ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের হেফাজত থেকে ডাকাতি করা নগদ ১ লাখ ৭ হাজার টাকা, একটি স্বর্ণের চেইন ও ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত দুটি চাপাতি ও একটি চাকু উদ্ধার করেছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, ক্লু লেস ডাকাতির ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে যে আপন ভাই জড়িত তা ঘূর্ণাক্ষরেও কেউ সন্দেহ করেনি। এখন ডাকাতির মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হলেন আক্তার কোম্পানি। তারা পাঁচ ভাই। নাজির হোসেন ওরফে শামীম হলো চতুর্থ। ব্যবসায়ী আক্তার কোম্পানির একমাত্র মেয়ের বিয়ের জন্য প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার তৈরি করেন। খরচের জন্য ঘরে রাখেন ১৩ লাখ টাকা। এই বিষয়টি পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাইয়েরা জানতো। ছোট ভাই শামীম এই টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করার জন্য পরিকল্পনা করে। বিষয়টি সে জানায় বাড়ির কেয়ারটেকার নূর মোহাম্মদকে। নূর মোহাম্মদ ডাকাতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়। এজন্য সে সেলিম, রিয়াজ, ফারুক ও সাহাবুদ্দিনকে ঠিক করে। সাহাবুদ্দিনও আক্তার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতো। পরিকল্পনা মতো ঘটনার দিন বাসার সামনে ভাই আক্তার কোম্পানিকে পাহাড়া দেয়ার দায়িত্ব নেয় ছোট ভাই শামীম। বাসার পাশেই আক্তার কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যালয়। ডাকাতির সময় আক্তার কোম্পানি যেন বাড়িতে প্রবেশ না করে এজন্য তাকে নানা অজুহাতে অফিসেই বসিয়ে রাখে সে। সাহাবুদ্দিনও অবস্থান করে তার সঙ্গে। আর নূর মোহাম্মদ বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। চতুর্থতলা আক্তার কোম্পানির ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিং বেল টিপে ডাকাতি করে সেলিম, রিয়াজ ও ফারুক। আক্তার কোম্পানির ছেলে তানভীর দরজা খুলে দিতেই তাকে প্রথমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা। পরে স্ত্রী সেলিনা ও মেয়ে মীমকেও জিম্মি করে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে। পরে আলমারি খুলে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। ঘটনার সময় আক্তার কোম্পানি তার কর্মচারী সাহাবুদ্দিনকে বাড়িতে পাঠায় কাজে। সাহাবুদ্দিন বিপদে পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে সাহাবুদ্দিনকেও বেঁধে রাখার পরিকল্পনা করা হয়। ডাকাতির ঘটনার পর আক্তার কোম্পানির পক্ষে শামীম, নূর মোহাম্মদ ও সাহাবুদ্দিন থানায় যায় মামলা করতে। কিন্তু সাহাবুদ্দিনের কথাবার্তায় সন্দেহ হলে থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে কোনও তথ্য আদায় করতে পারেনি বলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে স্থানান্তর করা হয়। তারা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেন, ডাকাতির ঘটনার কিছুদিন পরই চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছে বহুদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার নূর মোহাম্মদ। গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে সে ভারতে অবস্থান করছে। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় তার পরিবারের ও নির্দিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি জানতে পারে। একপর্যায়ে কৌশলে ডিবি পুলিশ ভারতে থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য করে নূর মোহাম্মদকে। পরে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে। জানিয়ে দেয়, ডাকাতির ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল আক্তার কোম্পানির ছোট ভাই শামীম। পরে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হলে সেও স্বীকার করে। বর্তমানে এই ডাকাত চক্রটিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। একই সঙ্গে ডাকাতি করা স্বর্ণালঙ্কারগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার যায়েদ শাহরিয়ার জানান, টাকা ও স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোন্দলের কারণে নূর মোহাম্মদ ইন্ডিয়া পালিয়ে যায়। শামীম নিজের ভাইয়ের বাসায় ডাকাতির কথা বলে ভাগ বেশি চায় আর নূর মোহাম্মদ সেটি মানতে চায়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ডাকাতির পর নগদ ১৩ লাখ টাকার মধ্যে শামীম ৪ লাখ, নূর মোহাম্মদ ৩ লাখ, সেলিম ২ লাখ, ফারুক ২ লাখ ও রিয়াজ ২ লাখ টাকা নেয়। আর স্বর্ণালঙ্কার ভাগ করা হয় ‘এক মুঠ’ মাপে। নূর মোহাম্মদের স্বর্ণালঙ্কারগুলো কোলকাতায় নিয়ে বিক্রি করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। অন্যরা ঢাকার যেসব দোকানে বিক্রি করেছে সেসব দোকানও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানান ডিবির এক কর্মকর্তা। ওইসব দোকানে অভিযান চালিয়ে ডাকাতি করা স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
আক্তার কোম্পানি ও তার অপর ভাইয়েরা জানিয়েছেন, শামীম এক সময় সৌদি আরবে ছিল। কয়েক বছর আগে সে দেশে ফিরে আসে। দেশে এসে সে মাদকাসক্ত ও খারাপ লোকজনের সঙ্গে মেশা শুরু করে। তার দুই স্ত্রী। কিন্তু তারপরও ভাই হয়ে ভাইয়ের এত বড় সর্বনাশ সে করবে, এটা কেউ কখনও কল্পনাও করতে পারেনি।

মংলা পৌরসভার সড়ক নির্মাণে ধীরগতি

বাগেরহাটের মংলা পৌরসভার সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ
নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। ফলে চলতি বর্ষায় শহরের অধিকাংশ
সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ছবি-প্রথম আলো
বাগেরহাটের মংলা পৌরসভার সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। এ কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে পৌরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
পৌরবাসী বলছেন, কাজের সময় তিন মাস বাড়ানো হলেও যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে এই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হবে না।
গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের শেখ আবদুল হাই সড়ক, শ্রমিক সংঘ সড়ক, হাজি বাহার উদ্দিন সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও সংলগ্ন ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে। ফুটপাতের নিচে নালা নির্মাণের জন্য সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করা হচ্ছে। ওই সব গর্তে বর্ষার পানি জমেছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী।
মংলা পৌর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, আট বছর মংলা পৌর এলাকার প্রধান সড়কগুলো সংস্কার না করায় সেগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে পৌর কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সালের মে মাসে দুটি গুচ্ছে ভাগ করে ৬ দশমিক ২৬ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার, ফুটপাত ও ৭ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার নালা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে ২৯ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪ মে এ দুটি গুচ্ছের কার্যাদেশ পায় খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। চলতি বছরের ২০ মের মধ্যে কাজ শেষ করার থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে পারেনি। পরে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পৌর কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ করার মেয়াদ চলতি বছরের ২০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ায়।
মংলা বাজারের ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন বলেন, কাদার মধ্যে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রিকশা, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন, এমনকি সাইকেল পর্যন্ত চলাতে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সড়কের গর্তে আটকে যাচ্ছে। শ্রমিক সংঘ সড়ক পুরোপুরি বন্ধ করে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে।
মংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শেখ নূর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে গতিতে ঠিকাদার কাজ চালাচ্ছেন, তাতে বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ হবে না।
এ বিষয়ে মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক সবুর মোল্লা বলেন, গত বছর বর্ষা মৌসুমে কার্যাদেশ পাওয়ার পর বৃষ্টির কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছিল। অবরোধের কারণে নির্মাণসামগ্রী আনতেও সমস্যা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি মৌসুমেও প্রচুর বৃষ্টিপাত কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারপরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মংলা বন্দর পৌরসভার মেয়র জুলফিকার আলী বলেন, বর্ধিত সময়ের মধ্যেই যাতে নির্মাণকাজ শেষ হয়, সে জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ তদারকি করছে। এর পরেও নির্মাণকাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘শহুরে বিশৃঙ্খলা’ ঢাকার ছবির প্রদর্শনী

গ্যালারি চিত্রকে ঢাকা নিয়ে আয়োজিত চিত্র প্রদর্শনী
দেখেন অতিথিরা l ছবি: প্রথম আলো
এক পাশে সারি সারি সুরম্য অট্টালিকা। মাঝের লেকের জলে ঝিলমিল করতে থাকা আলো নাগরিক আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে। লেকের অন্য পাড়ে ঘিঞ্জি বস্তিঘর। সেখানে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা মৃদু আলোয় যেন দৈন্যর ছাপ।
আলোকচিত্রটির নাম ‘দ্য কনট্রাস্ট’। অর্থ বৈপরীত্য। রাজধানীর গুলশান লেকের দুই পাড়ের ধনী-দরিদ্রের চিত্রকে একই ফ্রেমে বন্দী করেছেন আলোকচিত্রী। ঢাকা শহরের নিত্যদিনের জীবনযাত্রাকে আলোকচিত্রিক দৃষ্টিতে তুলে ধরা এমন আলোকচিত্র নিয়ে গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে প্রদর্শনী।
ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে ‘আরবান ক্যাওয়াস’ শীর্ষক প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে আলোকচিত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ফটোফি এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শেল্টেক্ (প্রা.) লিমিটেড। প্রদর্শনীতে ৩০ জন আলোকচিত্রীর ৬৫টি আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ৪ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত আটটা।
একটি আলোকচিত্রে ঢাকার রাস্তায় মাথার ওপরে ঝুলতে থাকা অবৈধ তারের জঞ্জালের মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়েছে নতুন দিনের সূর্য। কোনোটিতে উঠে এসেছে সদরঘাটের ঘিঞ্জি এলাকা আর নতুন ঢাকার সুউচ্চ দালানকোঠা।
মালিবাগের কোনো এক রাস্তার দেয়ালে লাগানো বাড়িভাড়া, রুমমেট আবশ্যক, টু-লেটের বিজ্ঞপ্তির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মধ্যবয়সী নারী। ঢাকার ভাড়াটেদের মাথা গোঁজার জায়গা খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামকে তুলে এনেছে আরেকটি আলোকচিত্র।
গতকাল প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নগরবিদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের শহরের বৈশিষ্ট্য বিশৃঙ্খল। ঢাকা একসময় ছিল মসজিদের শহর। এখন বস্তির শহর, রিকশার শহর। প্রদর্শনীর ছবিগুলো দেখলে বিভিন্ন রকম নাগরিক সংকট, সমস্যা বোঝা যায়।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শেল্টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক এম সেরাজ। উদ্বোধনের পরে আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ছিলেন আলোকচিত্রী আবীর আবদুল্লাহ।
ঢাকাকে নিয়ে এমন প্রদর্শনী আয়োজনের বিষয়ে ফটোফির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একসময় বাগান ও মসজিদের নগর বলে খ্যাত ঢাকা আজ মরতে বসেছে। দূষণ, দখল, মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এই শহরকে ইতিমধ্যে বসবাসের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মৃতপ্রায় ঢাকাকে আলোকচিত্রিক দৃষ্টিতে দেখার প্রয়াস এ প্রদর্শনী।
ট্রেনের ছাদে, দরজায় হাজারো মানুষের ভিড় বা সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চের ছাদে তিলধারণের ঠাঁই না থাকার আলোকচিত্র। শাঁকরাইতের দিনে পুরান ঢাকার আকাশে দলছুট হয়ে পড়া একলা ঘুড়ি। প্রদর্শনীর প্রতিটি আলোকচিত্রতেই নগরজীবনের ছাপ।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুন রহমান প্রদর্শনীতে এসেছিলেন বন্ধুদের নিয়ে। বললেন, ‘বাসের হাতল ধরে ঝুলতে থাকা ক্লান্ত বাসযাত্রীর ছবিতে যেন নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি।’

উদ্বোধনের পর থেকেই বিকল

বগুড়ার মহাস্থান এলাকায় সাইনবোর্ডসর্বস্ব ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র।
কারণ, যানবাহনের ওজন পরিমাপক যন্ত্রটি উদ্বোধনের
পর থেকে বিকল। গত বুধবার তোলা ছবি l প্রথম আলো
মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সাত মাসেও ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে স্থাপিত সড়ক বিভাগের ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রটি চালু হয়নি। ওজন পরিমাপক বৈদ্যুতিক যন্ত্র বিকল হওয়ায় এটি চালু করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বগুড়ার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন ঠেকাতে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সওজ। কেন্দ্রের অবকাঠামো ও কেন্দ্রসংলগ্ন সড়ক প্রশস্তকরণে সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আছালত জামান ২০১৪ সালের জুন মাসে অবকাঠামো বুঝিয়ে দেয়।
বগুড়া-সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, অবকাঠামো নির্মাণের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ওজন পরিমাপক যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। চীন থেকে আনা বৈদ্যুতিক যন্ত্রটি স্থাপনের পর ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকা থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, উদ্বোধনের পর ওজন কেন্দ্র পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় কেন্দ্রের ওজন পরিমাপক বৈদ্যুতিক যন্ত্র বিকল হয়। এরপর হরতাল-অবরোধ শুরু হলে বিকল যন্ত্র মেরামতের উদ্যোগ নিতে কিছুটা দেরি হয়। গত ৬ এপ্রিল মেরামতের জন্য যন্ত্রটি ঢাকায় সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়।
সড়ক বিভাগের কারিগরি শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাকির আহমেদ বলেন, বিকল যন্ত্রটি মেরামতের জন্য চীনে পাঠানো হয়েছে। কবে নাগাদ তা মেরামত হয়ে দেশে আসবে এবং যন্ত্রটির বাজারমূল্য কত তা কারিগরি শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন মৃধা বলতে পারবেন।
প্রকৌশলী স্বপন মৃধা বলেন, ‘বগুড়ার ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের যন্ত্রটি কোথায় কী অবস্থায় আছে সেটা আমি জানি। তবে গণমাধ্যমকে তা জানানো সম্ভব নয়। কারণ গণমাধ্যমে কোনো তথ্য দিতে গেলে সড়ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি লাগবে।’
বগুড়ার সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যন্ত্রটি বিকল থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রটি চালু করা যাচ্ছে না। এতে মহাসড়কে যানবাহন বেপরোয়াভাবে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন করছে। ফলে মহাসড়ক ও সেতুর স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া কেন্দ্রটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্যদের বেতন-ভাতা দিতে মাসে লক্ষাধিক টাকা গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বগুড়ার সহকারী পরিচালক ও জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, যানবাহনে অতিরিক্ত পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ঠেকাতে জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির পক্ষ থেকে মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পরও কেন তা চালু হচ্ছে না তা সড়ক নিরাপত্তা কমিটিকে কেউ জানায়নি।
জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন না করার জন্য প্রথম থেকেই বগুড়ার ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠন চাপ দিয়ে আসছিল। ওজন স্টেশন চালু হলে মালিক-শ্রমিকেরা পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গ অচল করার হুমকি দিয়েছিলেন। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের হুমকির কারণেই কার্যত সড়ক বিভাগ ওজন কেন্দ্রটি এখনো চালু করতে পারেনি।
বগুড়া আন্তজেলা ট্রাক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমরা ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রটি স্থাপনে বিরোধিতা করছি। কারণ হলো দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন রোধে এই নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন হলেও একে পুঁজি করে শ্রমিকদের কাছ থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের সঙ্গে বসে ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে তাতে আমাদের আপত্তি থাকবে না।’

জিহাদ হুসেইন ওবামার জন্ম পরিচয় রক্ষার লড়াই

বারাক ওবামার সঙ্গে জিহাদ হুসেইন ওবামার কোনো সম্পর্ক নেই। জিহাদ কোনো কেউ কেটা নয়, সে একটা পাঁচ বছরের ছোট ছেলে। শুক্রবার মাঝ রাত অবধি সে ছিল একটা বাংলাদেশী ছিটমহল মশালডাঙ্গার বাসিন্দা আর চব্বিশ ঘন্টাও হয় নি সে ভারতের নাগরিক হওয়ার অধিকার পেয়েছে। কিন্তু এই নাগরিকত্বের অধিকার আদায়ের লড়াইতে জিহাদের বাবা-মা-র একটা বড় অবদান রয়েছে।     মায়ের সঙ্গে জিহাদ হোসেন ওবামা ছিটমহলের বেশিরভাগ মানুষকেই যেখানে চিকিৎসা বা শিক্ষা পাওয়ার জন্য বাবা-মা-স্ত্রী বা স্বামীর নাম পাল্টে ফেলতে হতো এত বছর, সেখানে জিহাদ-ই প্রথম ছিটমহলের সন্তান, যে নিজের বাবা-মায়ের আসল পরিচয়েই জন্মিয়েছে ভারতের হাসপাতালে। তার এই নামকরণের পিছনে একটা কাহিনী আছে, লড়াইয়ের কাহিনী – ভারতের সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এক ছিটমহলবাসী দম্পতির অসম লড়াইয়ের ঘটনা। এই লড়াইটা শুরু হয়েছিল যখন জিহাদের মা আসমা বিবি-র প্রসব বেদনা উঠেছিল। আসমা বিবি আর তার স্বামী শাহজাহান শেখ চেয়েছিলেন তাদের সন্তান আসল বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়েই জন্মাক, কিন্তু বাধ সেধেছিল ভারতের দিনহাটা হাসপাতাল। তবে এক সময়ে ছিটমহলবাসীদের সম্মিলিত চাপের কাছে মাথা নোয়াতে হয় ওই হাসপাতালকে। নিজের নাম আর ছিটমহলের ঠিকানা দিয়েই আসমা ভর্তি হন আর জন্ম হয় জিহাদের। তবে শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে আর কোনো জিহাদকে জন্মের পর নকল বাবা-মায়ের পরিচয় দিয়ে আইনের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে না বা স্কুল কলেজ-হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয় গোপন করতে হবে না – তারা এখন সকলেই ভারতের নতুন নাগরিক – আর ছিটমহলের বাসিন্দা নয়।– বিবিসি

অনৈতিক ঘটনা ফাঁস করার হুমকি দেওয়ায় কিশোর খুন -তিন আসামির জবানবন্দি

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অনৈতিক কাজের কথা ফাঁস করার হুমকি দেওয়ায় আশিক দেওয়ান নামের এক কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনজন জড়িত ছিলেন। তাঁরা সবাই ওই কিশোরের সহকর্মী।
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হওয়া মামলার তিন আসামি গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন। নিহত আশিক (১৫) উপজেলার আজগানা বেলতৈল গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। গত ১৪ জুলাই পুলিশ উপজেলার চিতেশ্বরী কাঠবাগান থেকে আশিকের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তার বাবা ১৬ জুলাই মির্জাপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, আশিকদের বাড়িতে থেকে তাঁর চাচা ট্রাকচালক খাজা দেওয়ানের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার আবুডাঙ্গা গ্রামের মজিবর মোল্লার ছেলে সুজন (১৯)। কিছুদিন আগে সুজন তাঁর তিন সহযোগী মির্জাপুরের বেলতৈল গ্রামের শুকুর মিয়া (১৯), শরিফ সিকদার (১৯) ও সিরামিক এলাকার আলমগীর হোসেনকে (১৫) সঙ্গে নিয়ে চিতেশ্বরীর কাঠবাগানে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন। শুকুর মিয়া মুঠোফোনে ওই ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। ওই ভিডিও চিত্রটি দেখে ফেলে আশিক। এ ঘটনা সে তার চাচার কাছে প্রকাশ করবে বলে শুকুরকে হুমকি দেয়।
গত বুধবার ভোরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পুলিশ সুজনকে তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তিনি টাঙ্গাইলের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাঁর দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ শরিফ ও আলমগীরকে গত বুধবারই গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার তাঁরাও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
মির্জাপুরের বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন জানান, সুজন, শরীফ ও আলমগীর জবানবন্দিতে বলেন, চিতেশ্বরীর কাঠবাগানে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়। আশিক ওই ভিডিও চিত্র ফাঁস করার হুমকি দেওয়ায় ১৩ জুলাই সন্ধ্যার পর জরুরি কথা আছে বলে তাঁকে চিতেশ্বরী কাঠবাগান এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁরা হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে তাকে হত্যা করেন। হত্যার পর আশিকের লাশ জঙ্গলের পাশে একটি পুকুরে ফেলে তাঁরা চলে আসেন।
এসআই জাকির হোসেন আরও জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে গত বুধবার সুজনকে ও বৃহস্পতিবার অপর দুজনকে আদালতের মাধ্যমে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শুকুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ডের বীজ -মেনন

রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধানের মূলনীতিতে রেখে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মৌলবাদীদের কর্মকাণ্ড চালানোর বীজ রেখে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে এক আলোচনা সভায় মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে তাহের ও দেশপ্রেমিকদের হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নের উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়। জিয়ার নেতৃত্বেই পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানের মূলনীতি এবং সমাজতন্ত্রের বিকৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়। বাংলা ভাই, আবদুর রহমানের মতো জঙ্গিদের উত্থানও হয় জিয়ার আদর্শের খালেদা জিয়া সরকারের আমলে।
‘শহীদ কর্নেল তাহের দিবস’ উপলক্ষে ‘মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির ওপর আঘাত’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে কর্নেল তাহের সংসদ। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই কেন্দ্রীয় কারাগারে তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, জিয়া ঠান্ডা মাথায় কর্নেল তাহেরকে খুন করেছেন। সরকারি আদালত ও জনতার আদালত কর্নেল তাহেরকে দেশপ্রেমিক রায় দিয়েছে আর জিয়াকে রায় দিয়েছে ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে।
খালেদা জিয়াকে ‘আগুন সন্ত্রাসের জননী’ উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যতক্ষণ না এ দেশ থেকে আগুনের সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে পারব, ততক্ষণ দেশে শান্তি ফিরবে না। তাঁদের যদি আগুন সন্ত্রাসী হিসেবে আদালতে প্রমাণ করা যায়, তবে তাঁদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, শুধু ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুক্তবুদ্ধি ও গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। জনগণকে রাজপথে নামতে হবে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনোর সভাপতিত্বে সভায় সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর আহমেদ, আয়োজক সংগঠনের সহসভাপতি মুশতাক আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।

স্বামীদের ছেড়ে যাচ্ছেন দুই বোন দয়া ও ছবি by হারুন আল রশীদ ও শহীদুল ইসলাম

বাস্তবতা মাঝে মাঝে বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। যখন আসন্ন মুক্তির আনন্দে ভাসছে পঞ্চগড়ের কোটভাজনী ছিটমহলের বাসিন্দারা, তখন নাটকীয়তায় ভরা বাস্তবতা কাঁদাচ্ছে দুই বোন দয়া রানী ও ছবি রানীকে। দুজনই তাঁদের স্বামীদের বাংলাদেশে রেখে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার কোটভাজনী ছিটমহলের নতুন বাজারে যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা ভারতে যেতে আগ্রহীদের শুনানি গ্রহণ করছিলেন, তখনো দয়া ও ছবি ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। কর্তৃপক্ষকে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় গতকাল শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় পার হয়ে গেছে।
এর আগেই দুপুরে দয়া ও ছবির ভাই কমলেশ্বর কুমার প্রথম আলোকে জানান, তাঁর দুই বোন দয়া ও ছবি ভারতে চলে যাবেন। ছবির পাঁচ বছর বয়সী ছেলে দিগন্ত কুমার রায় ও দয়ার চার বছর বয়সী ছেলে বাঁধন চন্দ্র রায় তাঁদের সঙ্গে যাবে। দয়ার স্বামী হৃদয় কুমার রায় ও ছবির স্বামী ভূপেশ কুমার রায় বাংলাদেশে থেকে যাবেন। কমলেশ্বর আরও জানান, তাঁর বাবা-মা, চার ভাই ও তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরাও ভারতে চলে যাচ্ছেন।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, ছিটমহলে ২০১১ সালের জনগণনায় যাঁদের নাম ছিল কেবল তাঁরা ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। এ ছাড়া ২০১১ সালের পর তাঁদের পরিবারে জন্ম নেওয়া এবং বৈবাহিক সূত্রে পরিবারের সদস্য হওয়া ব্যক্তিরা ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। কিন্তু ২০১১ সালের জনগণনার তালিকায় দয়া ও ছবির নাম থাকলেও তাঁদের স্বামীদের নাম নেই।
হৃদয় ও ভূপেশ শুনানি গ্রহণকারী পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ গোলাম আজম ও কোচবিহারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৌমেন দত্তকে জানান, তাঁরা ঢাকায় কাজ করেন। যে কারণে ২০১১ সালের গণনার সময় তাঁরা উপস্থিত থাকতে পারেননি। দয়া ও ছবি বলেন, তাঁরা পারিবারিকভাবে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু স্বামীদের রেখে কীভাবে যাবেন?
তাঁদের প্রশ্নের জবাবে সৌমেন দত্ত বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে আপনাদের সমস্যার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। তা ছাড়া আপনারা চাইলে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
বৃহস্পতিবার বিকেলেও দয়া ও ছবি ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। তবে গতকাল দুই বোন প্রথম আলোকে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। দয়া বলেন, ‘না গিয়ে কোনো উপায় নেই। কারণ আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সবাই চলে যাচ্ছেন। আমরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ব।’
ছবি বলেন, ‘ভাইদের সঙ্গে আমরা ভারতে থাকব। সেখানে কোনো সমস্যা হবে না। ভারতে গিয়ে সরকারকে আমার স্বামীকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করব।’

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরকার পুষ্টি

রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পুষ্টিবিদেরা বলেছেন, ডায়াবেটিসের সঙ্গে পুষ্টির সম্পর্ক নিবিড়। খাদ্য বা পথ্যবিধি না মানলে ওষুধ সেবন করেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। এ জন্য মানুষের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
গতকাল শুক্রবার ধানমন্ডির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক নিউট্রিশন সোসাইটি (বিডিএনএস) এই সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন বিডিএনএসের সভাপতি আখতারুন্নাহার আলো।
‘সুস্থ জীবনের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার’ শীর্ষক মূল উপস্থাপনায় আখতারুন্নাহার বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য তিনটি ‘ডি’-এর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো হলো: ডায়েট (খাদ্য), ডিসিপ্লিন (নিয়মানুবর্তিতা) ও ড্রাগ (ওষুধ)। তিনি বলেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ যদি খাদ্য বা পথ্যবিধি না মানে, তাহলে ওষুধ বা ইনসুলিন নেওয়ার পরও তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও অধিভুক্ত সমিতিতে কর্মরত পুষ্টিবিদদের মোর্চা বিডিএনএস। গতকালের অনুষ্ঠানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পুষ্টিবিদেরা অংশ নেন।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সোসাইটির পরামর্শক ওয়াজেদুল ইসলাম খান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ইন্টারন্যাশনাল কালচার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য সুলতান মুহাম্মদ রাজ্জাক, গার্হস্থ্য অর্থনীতি মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ শাহীন আহমেদ।

পাঁচ বছরেও সড়কটি পাকা হয়নি, বিছানো হলো ইট

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় ছোনকা-বিনোদপুরহাট সড়কের ৭৫০ মিটার পাঁচ বছরেও পাকা হয়নি। গত জুন মাসে সেখানে ইট বিছানো (সলিং) হয়েছে।
স্থানীয় চুনিতাপাড়া গ্রামের পাঁচজন কৃষক অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকৌশলীর অবহেলায় সড়কটি পাঁচ বছরেও পাকা হয়নি। পাকার পরিবর্তে তাঁরা পেলেন ইট বিছানো সড়ক।
উপজেলা প্রকৌশলী ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ২০১০ সালের জুন মাসে পাকাকরণের জন্য নিযুক্ত ঠিকাদার সড়কের কাজ ফেলে চলে যান। এরপর তিনি ফিরে না আসায় পাকাকরণের কাজ শেষ হয়নি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কটি পাকাকরণের জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। যেটুকু ইট বিছানো হয়েছে, এতে মানুষজনের চলাচলে উপকার হবে।
উপজেলার সুঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ওই সড়কটুকু তাঁর ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। গত তিন বছরে কয়েকবার সড়কটি দ্রুত পাকা করার কথা উপজেলার সমন্বয় কমিটির সভায় তুলে ধরা হয়েছে। এতে কোনো উপকার হয়নি। কিন্তু পাশের ১০টি গ্রামের মানুষ বিনোদপুর ও ছোনকাহাটে কৃষিপণ্য কেনাবেচা করার জন্য এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে থাকে। সড়কটির জন্য গ্রামের লোকজনকে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, উপজেলার ছোনকা থেকে বিনোদপুরহাট পর্যন্ত সড়কটি সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। এই সড়কের চকসাদী চৌরাস্তা থেকে বিনোদপুরহাট পর্যন্ত ৭৫০ মিটার সড়ক খানাখন্দে ভরা থাকায় জনগণ চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছিল। ২০০৯-১০ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় ২৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে এই অংশটুকু উন্নয়ন ও পাকাকরণের কাজ শুরু হয়। বগুড়ার এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয় থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নওগাঁর মো. গোলাম কিবরিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায় এবং প্রায় ছয় লাখ টাকার উন্নয়নকাজ করে। এরপর আর কোনো কাজ হয়নি। তবে এ কাজের বিপরীতে ঠিকাদার কত টাকা উত্তোলন করেছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেননি উপজেলা প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল ইসলাম।
সর্বশেষ গত জুন মাসে সড়কের এই অংশের মধ্যে ‘চকসাদী চৌরাস্তা থেকে চকরাজীব আয়নাল মাস্টারের বাড়ির চৌরাস্তা পর্যন্ত’ প্রায় ৩৮০ মিটার ‘উপজেলা উন্নয়ন তহবিল ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি)’ আওতায় ইট বিছানো হয়েছে। এ জন্য ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এ কাজের ঠিকাদার ছিলেন বগুড়ার মালতিনগর এলাকার মেসার্স এস কে এস কনস্ট্রাকশন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম সরোয়ার জাহান বলেন, সড়কটির ইট বিছানো ওই অংশে বিগত বছরে পাকাকরণের জন্য ঠিকাদার নিযুক্ত করা হয়েছিল এ কথা উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়নি।
সড়কটির পাশের চুনিতাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আবদুল মজিদ বলেন, ‘২০১০ সালে রাস্তায় কাজ করার সময় উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকজন তাঁদের বলেছিল রাস্তাটা পাকা হবে। শুইনা গেরামের মানুষজন আনন্দে ছিলাম। পাঁচ বছরেও রাস্তাডা পাকা হয়নি। জুন মাসের মাঝামাঝিতে একদিন সকালে কয়েকজন লোক এসে রাস্তাডার ওপর বালি ফেলে ইট বিছায় যাচ্ছে।’ একই গ্রামের কৃষক ফজর আলী বলেন, এই সড়কটার ওপর দিয়ে আশপাশের ১০ গ্রামের কৃষকেরা খেতের ফসল হাটবাজারে নেন। পাঁচ বছর ধরে সড়কটি পাকা না করায় গ্রামের কৃষকের কষ্ট বেড়েছে। ভ্যানচালক নুরনবী ও আলী সড়কটি পাকা করার দাবি করেন।

বাংলাদেশ–ভারত ছিটমহল বিনিময়: শিকল ভাঙা উল্লাসে মুক্তির নিশ্বাস

প্রায় সাত দশক। যাঁদের বয়স ৬৮ বছরের বেশি, তাঁরা দু-দুবার দেশ স্বাধীন হতে দেখেছেন, কিন্তু কোনো নাগরিকত্বের পরিচয় পাননি। তারপর যাঁদের জন্ম, তাঁরাও বঞ্চিত ছিলেন ওই জাতীয় পরিচয় থেকে, মৌলিক সব নাগরিক অধিকার থেকে। জন্মনিবন্ধন থেকে মৃত্যুসনদ, স্কুলে ভর্তি থেকে চাকরিবাকরি, জমি কেনাবেচা থেকে বিয়ে-শাদি—সবকিছুতেই মিথ্যা আর ভুল ঠিকানা। এবার এ মিথ্যারই শিকল ভাঙলেন তাঁরা। আর শিকল ভাঙার উল্লাসে, মুক্তির নিশ্বাসে প্রথম সূর্যোদয়ও দেখলেন তাঁরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তির পর গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় হয়েছে দুই দেশের মধ্যে থাকা ১৬২টি ছিটমহল। সেই সঙ্গে মিথ্যা ছেড়ে সত্যের আলোয় পথ চলা শুরু করেছেন এখানকার বাসিন্দারাও। এখন মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নিতে পারছেন তাঁরা।
ভারতের ভেতর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ও বাংলাদেশের ভেতর ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বিনিময় হওয়ার ফলে বাংলাদেশের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আর ভারতের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাচ্ছেন ভারতের নাগরিকত্ব।
নতুন দেশ, নতুন পতাকা, নতুন জাতীয়তা, স্বাধীন পরিচয়—এ সবই এবার পাচ্ছেন দেশের মাটিতে পরগাছা হয়ে থাকা ছিটমহলবাসী। তাই তো এত সব পাওয়ার আনন্দে ঐতিহাসিক এ মাহেন্দ্রক্ষণকে তাঁরা বরণ করে নিলেন নেচে-গেয়ে, মিছিল-স্লোগানে মুখরিত করে। হাতে পতাকা, হৃদয়ে দেশপ্রেম ধারণ করে বিভিন্ন ছিটমহলে রাতভর এ মুক্তির উৎসবে মেতে ওঠেন তাঁরা। কেউ যত্নের সঙ্গে মাথায় বাঁধেন পতাকা।
রাত তখন ১২টা ১ মিনিট। লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামে কামারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে হাজারো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো ‘আর নয় ছিটবাসী, আমরা সবাই বাংলাদেশি।’ মোমবাতি জ্বালিয়ে মশাল হাতে মুক্তির আনন্দে তাঁরা l মঈনুল ইসলাম
আনন্দে উদ্বেলিত ছিটের মানুষেরা ওড়ান ফানুস, পোড়ান আতশবাজি। করেন ব্যান্ড পার্টির তালেতালে নাচ। হয় মশাল মিছিলও। উৎসবের এ জোয়ারে যোগ দেন ছেলে-বুড়ো, কিশোর-যুবা, তরুণ-তরুণীনির্বিশেষে সবাই।
রংবেরঙের কাগজ, রঙিন বাতিতে সাজানো হয়েছে ছিটমহলগুলোর বাসাবাড়ি, স্কুল, হাট-বাজার, মেলামাঠ। রাত ১২টায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার প্রতিটি ছিটমহলেই প্রজ্বালন করা হয় ৬৮টি মোমবাতি। ৬৮ বছরের বন্দিজীবন অবসানের প্রতীক ছিল এসব মোমবাতি। মুক্তির আনন্দের বহুল প্রত্যাশিত এ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে এর আগে চলে নানা উৎসব-আয়োজন। হয় হা-ডু-ডু, লাঠিখেলা। কোথাও বা নৌকাবাইচ।
ছিটমহলগুলোর বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় সুদৃশ্য তোরণ। করা হয় বর্ণিল আলোকসজ্জা। বসানো হয়েছে উৎসবমঞ্চ। আজ শনিবার সেখান থেকে বিজয় সমাবেশ শেষে শোভাযাত্রা হওয়ার কথা আছে। সারা দিন ছিটমহলগুলোর নাগরিক কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন খেলাধুলা, গান ও নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় হওয়ার পরপরই অনেক ছিটমহলে ওড়ানো হয়েছে জাতীয় পতাকা। গতকাল জুমার নামাজের পর ছিটমহলের মসজিদে মসজিদে দোয়া ও শোকরানা আদায় করেন মুসল্লিরা। আর সকাল থেকেই মন্দিরগুলোতে দল বেঁধে পূজা-অর্চনা করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
গত রাতে ছিটমহল বিনিময়ের পর এখানকার বাসিন্দারা নতুন করে জীবন উপভোগের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। দীর্ঘ প্রায় সাত দশক স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে গেলেও এখন সেটা বাস্তবে রূপ নেওয়ার হাতছানি দিচ্ছে তাঁদের। অন্য দেশের বেষ্টনীতে পরগাছা হয়ে আর থাকতে হবে না তাঁদের।
একই আলো-বাতাসে মানুষ হলেও ৬৮ বছর ছিটমহলবাসী পাননি স্বাধীনতার স্বাদ। খাঁচার পাখির বন্দিজীবনের মতোই এতটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এক ভয়ানক জীবনযাপন করেছেন।
নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এসব ছিটমহলের সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকায় এখানকার বাসিন্দাদের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না। ভিনদেশের সীমানায় হওয়ায় হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ বা বিচার-প্রশাসনও ছিল না। ফলে বাসিন্দাদের ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ ছিল সীমিত। অনেকেই বাংলাদেশি বা ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করলেও ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় চাকরির সুযোগ তাঁদের এত দিন হয়নি। তবে এবার সবই হবে বলে আশা তাঁদের।
এদিকে সুদীর্ঘ বঞ্চনা অবসানের আনন্দ ঘোরাফেরা করার মাঝেও ভারত, না বাংলাদেশ—ভিটেমাটি ছেড়ে ভূখণ্ড বেছে নেওয়ার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক খণ্ড খণ্ড কষ্ট-যন্ত্রণাও জমাট বেঁধেছে ছিটমহলগুলোতে। যাঁরা ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে চলছে অন্য রকম প্রস্তুতি।
জমিজমাসহ স্থাবর সম্পত্তি গতকাল পর্যন্ত বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। তবে অদরকারি আসবাব, গাছ ও গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন বাসিন্দারা। নতুন পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার যেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তেমনি জন্মভিটা ছেড়ে গিয়ে ঠিকমতো আবাস গড়ে তুলতে পারবেন কি না, সে শঙ্কাও দেখা গেছে অনেকের মধ্যে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে নানা বাস্তবতায়, আর্থিক অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কের টানাপোড়েনে।
{প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন: প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা}