Friday, June 25, 2021

যৌবনকাল আল্লাহর মহানিয়ামত by অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন

যেকোনো মানুষের জীবনেই আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত রাজির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যৌবনকাল তথা যৌবনের শক্তিমত্তা। রাসূলে কারিম সা: যৌবনের এ সময়টিকে নিয়ামত এবং সেই সাথে গণিমত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার সঠিক ব্যবহারের জন্য তাকিদ দিয়েছেন। রাসূল সা: একজন সাহাবিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন- পাঁচটি বস্তুর পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে গণিমত মনে করো

১. তোমার বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে ২. অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে ৩.অভাব আসার পূর্বে সচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে যৌবনকে।

একটি জনপদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসমষ্টি হচ্ছে যুব সমাজ। সে জনপদের যুবকরাই জরাগ্রস্ত পৃথিবীর বুকে নব-জীবনের কুসুম ফুটিয়ে থাকে। একটি রুগ্ণ, ক্লান্ত, জীর্ণ, আশাহত ও বিপন্ন মানবতার মুক্তির জন্য দুর্বার, ক্লান্তিহীন, উদ্যম, অসীম সাহস, অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য ও অটল সাধনার প্রতীক হয়ে এগিয়ে আসতে হয় যুব সমাজকে। অন্যথায় মুক্তি অসম্ভব।

কিন্তু যুব সমাজ নিজেই যদি হয় রুগ্ণ, ক্লান্ত, জীর্ণ, তথা আশাহত তাহলে মুক্তিপাগল জনগোষ্ঠীর মুক্তির আর কোনো উপায়ই অবশিষ্ট থাকে না।

আমরা নিশ্চয়ই ঐশীর নামটি ভুলে যাইনি। ঐশী আমাদের বিপন্ন/রুগ্ণ তরুণ সমাজের একটি প্রতীক। যে কিনা অঢেল সম্পদের মধ্য বিলাসী জীবনযাপন করেও সামান্য চাওয়াকে পূরণ না করায় বন্ধুদের সাথে নিয়ে নিজের বাবা ও মাকে অবলীলায় খুন করল। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া এ তরুণী ছিল ইয়াবা আসক্ত। যার বাবা ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার।

তরুণদের এ ধরনের নৈতিক অবক্ষয় আমাদের জন্য অশনি সঙ্কেত। এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

অবক্ষয় শব্দের ইংরেজি আভিধানিক প্রকাশ Decadence বা Depreciation শব্দে। বাংলায় যাকে বলে ক্ষয়প্রাপ্তি বা ক্ষতি। জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণের পথে সাজাতে মানবজীবনে যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন, যা তখন লোপ পায় বা নষ্ট হয়ে যায় তখনই জীবনের অবক্ষয় নেমে আসে। Youth and Development গ্রন্থে বলা হয়েছে অর্থাৎ যুব সমাজের অবক্ষয় এর মূল কারণ হলো পরিবেশগত প্রতিফলন, প্রযুক্তির কুপ্রভাব, রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য এবং সর্বোপরি পারিবারিক অযতœ বা অবহেলা।

নিম্নে যুব সমাজের অবক্ষয় এর কিছু প্রধান কারণ ও প্রতিকার বিষয়ে আলোকপাত করা হলো-
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন : মানুষের ভেতরকার অনুশীলিত কৃষ্টির বাহ্যিক পরিশীলিত রূপকে সংস্কৃতি বলা হয়। তাওহিদ, রেসালত ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসের আলোকে শার’ঈ নির্দেশনায় গড়ে উঠলে সেটাই প্রকৃত অর্থে সংস্কৃতি। এর বাহিরে যা কিছু আছে সবই নষ্ট ও অপসংস্কৃতি। বর্তমানে যুব সমাজের মধ্যে নষ্ট সংস্কৃতির প্রভাব সুস্পষ্ট। যা তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট, ফেসবুক প্রভৃতি প্রচারমাধ্যমের দ্বারা যুব সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পশ্চিমা জগৎ মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার মানসে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অশ্লিলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। যার দ্বারা যৌন সুড়সুড়ি বর্ধক অশ্লীল দৃশ্য, নগ্ন-অর্ধনগ্ন নারীর বাহারি ছবি যুবক-যুবতীদের মধ্যে ভয়াবহ যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। এজন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ জাতিসঙ্ঘের ভাষণ প্রদানকালে বলেছিলেন, ‘পশ্চিমা জগৎ ইন্টারনেটের মাধ্যমে অশ্লীল ও মারদাঙ্গা ছবি গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এটি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এবং মাদক চোরাচালানের চেয়ে কম বিপজ্জনক নয়।

মাদকাসক্তি : ইংরেজিতে বলা হয়, Alcohol is the most important cause of broken bones and of broken homes.  অর্থাৎ মাদক এমন এক বস্তু যা হাড় ভাঙে এবং ঘরও ভাঙে।

বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে মাদক দ্রব্য। যা প্রতিনিয়ত ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ-তরুণীদের জীবন। ধসিয়ে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল। সেই সাথে মাদক ব্যবসা বর্তমান বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হওয়ায় চোরাকারবারিরা এ ব্যবসায় বেশি ঝুঁকে পড়েছে। তাছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে আমাদের এ দেশটি হয়ে উঠছে মাদক পাচারের আন্তর্জাতিক রুট। অধিকন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্র সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ দেশের উঠতি বয়সের তরুণদের ধ্বংস করার নিমিত্তে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে অনেক হেরোইন ও ফেনসিডিল কারখানা স্থাপন করেছে এবং সেখানকার উৎপাদিত সব মাদকদ্রব্য এ দেশে পাচার করেছে উভয় দেশের চোরাকারবারিদের মাধ্যমে। এ সব নেশাকর দ্রব্য প্রতিনিয়ত এ দেশের যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক : নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতির কারণে এবং দুনিয়াবি চাকচিক্যতার মোহে প্রতিযোগিতার কারণে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ মানুষের মধ্যে বেড়েই চলেছে। স্বার্থপরতা এবং সার্থান্বেষিতার মধ্যে মানুষ হাবুডুবু খাচ্ছে। একাই পাইব, একাই খাইব মনমানসিকতা দিন দিন চাঙ্গা হচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনৈতিক এহেন সব বিপর্যয়ের কারণে যুব সমাজ নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে অবক্ষয়ের দিকে দ্রুত ধাবমান হচ্ছে।

বেকারত্ব : এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ বেকার। যার প্রায় শতভাগই যুবক। যাদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ এর ভেতরে। কর্মসংস্থানের অভাবে দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর জন্য তারা অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। ফলে তাদের মধ্যে তৈরি হয় বেকারত্বের ক্ষোভ। যা এক সময় খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি ইত্যাদি নানাবিধ জঘন্য কাজের দিকে ধাবিত করছে।

ইসলাম জীবন সংশ্লিষ্ট স্বভাবজাত ধর্ম। মানুষের প্রতিটি প্রয়োজন অত্যন্ত সরল ও সাবলীল করে সমাধান দিয়েছে। সেজন্য ইসলাম বেকারত্বকে অভিশাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কারণ বেকারত্ব দারিদ্র্য ডেকে আনে আর দারিদ্র্য মানুষকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়। ফলে ব্যক্তি বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সমাজে ছড়িয়ে পড়ে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদকাসক্তি। এ ব্যাপারে ইসলামের সমাধান হলো- ‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো।’ আয়াতে ফজল (অনুগ্রহ) শব্দটি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা মূলত বুঝাতে চাচ্ছেন যে, কর্মক্ষেত্র তৈরি করার জন্য যতগুলো উপকরণ প্রয়োজন তার সবই তিনি আগে থেকেই তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। মানুষের দায়িত্ব হলো সেগুলোকে গুছিয়ে কাজে লাগানো।

রাজনৈতিক : রাজনৈতিক নেতাদের অনৈতিক ও নিচু মন-মানসিকতার কারণে তারা তাদের প্রভাব বৃদ্ধি ও ক্ষমতার মেয়াদ দীর্ঘ করার স্বার্থে বেকার যুব সমাজকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। খুন-হত্যা, দখলবাজিসহ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো ঘৃণ্য সব কাজে। এহেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের প্রয়োজনে গাড়ি-বাড়ি, অর্থ-বিত্ত, আশ্রয়-প্রশ্রয় সবই দেয়া হচ্ছে। আর এসব উপাদান যুব সমাজকে ক্রমেই অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি : আজকের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য প্রধানত দায়ী নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনজনিত মূল্যবোধের অভাব। ধর্মীয় অনুশাসনই মানুষকে চরিত্রবান করে তোলে। মানুষের মধ্যে বিবেক সৃষ্টি করে। তার মধ্যে খারাপ পথে যাওয়া ও চলার ব্যাপারে ভয়-ভীতির সৃষ্টি করে। ধর্মীয় অনুশাসন ছাড়া যুব সমাজের অবক্ষয় রোধ সম্ভব নয়।

--->------>---প্রতিকারসমূহ
তাকওয়া : মানুষ সৃষ্টিগতভাবে সবচেয়ে বেশি দুর্বল তার নফস বা প্রবৃত্তির কাছে। সাধারণত অন্যসব শত্রুর মোকাবেলা করতে গিয়ে সে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে, যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে, কিন্তু নফস এমন এক শত্রু যার বিরুদ্ধে সে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে তার চাহিদার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এবং তার চাহিদাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে। সে মনে করে নফসের চাহিদা তার নিজের কল্যাণেই। তাই এ চাহিদা পূরণে আত্মনিয়োগ করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং তাড়না থেকে বাঁচার জন্য তাকওয়া ব্যতীত অন্য কোনো হাতিয়ার কার্যকর নয়। হজরত ইউসুফ আ:-এর স্বীকৃতির কুরআনি বর্ণনাÑ আমি নিজেকে পবিত্র রাখতে পারি না। কারণ নফস মন্দের প্রতি বেশি বেশি নির্দেশ দিয়ে থাকে। তবে আমার রব যাকে অনুগ্রহ করেন সে ব্যতীত, নিশ্চয়ই আমার রব ক্ষমাকারী অনুগ্রহশীল। (সূরা : ইউছুফ, আয়াত-৫৩)

সূরা নাজিয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং নিজেকে নফসের খেয়াল খুশি থেকে বিরত রেখেছে তার ঠিকানা হবে জান্নাত। (সূরা : আন নাজিয়াত, আয়াত-৪০)

ইলমে ওহির বিস্তার : তাকওয়া বা আল্লাহভীতি বিষয়টি নির্ভর করে আল্লাহ তায়ালাকে চেনা বা জানার ওপর। আল্লাহকে যে যতটুকু জানবে সে ততটুকু ভয় করবে। তিনি বলেছেন- জেনে নাও যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই এবং তারপর তোমার গোনাহের জন্য ক্ষমা চাও। (সূরা: মুহাম্মদ, আয়াত-১৯)

এখানে ক্ষমা চাওয়ার আগে রব সম্পর্কে জানতে বলা হয়েছে। আর আল্লাহ তায়ালাকে জানা ইলমে ওহির মাধ্যমেই সম্ভব। তাই আল্লাহকে চেনা বা জানার জন্য ইলমে ওহির প্রসার ঘটাতে হবে। ইলমে ওহি ব্যতীত আল্লাহকে চেনা বা জানা সম্ভব নয়।
আল্লাহ তায়ালা প্রথম ওহিতে রাসূলে কারীম সা:-কে তাঁর রবকে চেনার জন্য আদেশ করেছিলেন, বলেছিলেন- পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সূরা : আলাক, আয়াত-১)

এ প্রসঙ্গে- Stenly Hall বলেছেন- ‘যদি আপনি আপনার সন্তানকে তিনটি R (পড়া, লেখা, অঙ্ক) শিক্ষা দেন এবং চতুর্থ R টি (ধর্ম) যদি বাদ দেন তাহলে আপনি পাবেন ৫ম R (বদমাশ)।

পারিবারিক যত্ন : একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। যে বিদ্যালয়ে সে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাধিক সময় অতিবাহিত করে থাকে। আর সব সন্তানের জন্যই প্রথম শিক্ষক হলো তার মা এবং বাবা। একজন সন্তানের বেড়ে ওঠা নির্ভর করে তার পারিবারিক যতেœর উপরে। চিন্তা-চেতনা মন ও মননের বুনিয়াদ নির্মিত হয় মূলত পরিবার নামক এই প্রতিষ্ঠান থেকেই। তাই খুব সতর্কতার সাথে পরিবারকেই যতœশীল হতে হয় সন্তানকে সু-সন্তান বা অলাদুন সলেই হিসেবে গড়ে তুলতে। কারণ সভ্যতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা-স্নেহ, পরোপকার, উদার মন-মানসিকতা- এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খুব বেশি অর্জন করা যায় না। একাডেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হওয়া যায়, মেধাবী হলে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন দেশেও নাম কুড়ানো যায়; কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা না থাকলে নৈতিকতার অভাবে একসময় সব শিক্ষাই ম্লান হয়ে যায়।

উপসংহার : আজকের সম্ভাবনাময় এসব তরুণ বিপথগামী হওয়ার মাধ্যমে সমাজকে কলুষিত করে ফেলছে এবং সমাজকে অবক্ষয়ের অতল গহিনে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের যুব সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। যুব সমাজের এই অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সামাজিক শাসনের পুনঃ প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি।

তাই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মাদকাসক্তির বিষাক্ত ছোবল, অর্থনৈতিক দুর্দশা, রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা আর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের যে গহিনে যাত্রা শুরু করছে সেখান থেকে ফেরানোর উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। এ তরুণ সমাজকে তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত করার পাশাপাশি সঠিক শিক্ষা প্রদান ও পারিবারিক যথার্থ যতœ নেয়ার মাধ্যমে পরিশীলিত, শিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী যুব সমাজ গড়তে পারলেই একটি কল্যাণময় সমাজ ও ভবিষ্যৎ গঠন করা সম্ভব হবে।

>>>লেখক : সেক্রেটারি, তা’মীরুল মিল্লাত ট্রাস্ট

Sunday, June 20, 2021

উইঘুর নির্যাতনে মুসলিম উম্মাহ কেন নিশ্চুপ? by রাশেদুল আলম

০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ প্রথম আলো'য় প্রকাশিতঃ একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আপনার বাড়িতে ঢুকে প্রিয়জনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। সন্তানদের ধরে নিয়ে রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। এ অবস্থা চীনের উইঘুর সম্প্রদায়ের।
রুকিয়ে তুরদুশ একজন উইঘুর কর্মী। উইঘুর কানাডা সোসাইটির সাবেক সভাপতি তুরদুশ গয়নার ব্যবসা করেন। চার বছর ধরে তিনি নিয়মিত তুরস্ক ও চীনে যাতায়াত করেন। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রেপ্তার হন। চীনে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। তুরদুশের হারানোর কিছুই নেই। কারণ, তাঁর স্ত্রীকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করেছে চীনের সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। তুরদুশ জানেনও না তাঁর দুই সন্তান কোথায়?
রুকিয়ে তুরদুশের এ গল্প শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো উইঘুরের প্রায় সবার জীবনের গল্পটাই এক সুতায় গাঁথা। গল্পের উপাদান, স্থান, কাল, পাত্র হয়তো আলাদা, কিন্তু পরিণতি সবার একই। অথচ পুরো বিশ্বের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা যেন নেই, যেমন আছে সাংবাদিক জামাল খাসোগি ও সিরিয়ার হামলা নিয়ে।
রুকিয়ে তুরদুশরা শান্তি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা চান। তুরদুশের মতো যাঁরা চীনের বাইরে থাকেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তাঁরা চীনে শান্তির জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করছেন।
এ বছরের আগস্টে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। চীন সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কমিটির প্রতিবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবাদও জানায় সি চিন পিংয়ের দেশ।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ
ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীন সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরও বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ।
চরমপন্থী মতাদর্শের শিক্ষা চালু
জিনজিয়াংয়ে স্থানীয় আইন পরিবর্তন করে শিক্ষা শিবিরের ‘চরমপন্থী মতাদর্শিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে চীন। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব শিবিরে বন্দীদের মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।
মেকিং ফ্যামিলি
২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে। চীন রাষ্ট্রীয়ভাবে উইঘুরদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে।
চীন সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনের জন্য তিনটি অভিযোগ ব্যবহার করেছে—চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। প্রথম অভিযোগ, যেকেউ গৌরব প্রকাশ করে তাদের উইঘুর পরিচয় প্রকাশ করে। আবার শিক্ষাশিবিরে পাঠানো লাখো বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এঁদের মধ্য আছেন ইসলামি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, পপশিল্পী আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম প্রমুখ।
উইঘুর কারা
উইঘুর জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর আগের। মূলত, এরা স্বাধীন পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী। পূর্ব তুর্কিস্তান প্রাচীন সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার একটি দেশ, যার চতুর্পাশ্বে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই উইঘুর সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে।
সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্ট বুক অনুযায়ী চীনের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ২ শতাংশ মুসলিম। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুসলিমরা চীনা জনসংখ্যার ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, এসব দেশের মধ্যে চীনের জিনজিয়াংয়ে ১ কোটি ২০ হাজারের মতো উইঘুর লোক বসবাস করে। কাজাখস্তানে ২ লাখ ২৩ হাজার, উজবেকিস্তানে ৫৫ হাজার, কিরগিজস্তানে ৪৯ হাজার, তুরস্কে ১৯ হাজার, রাশিয়ায় ৪ হাজার, ইউক্রেনে ১ হাজারের মতো উইঘুর লোক বাস করে।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেও প্রাচীন এ সম্প্রদায়ের লোকদের উইঘুর না বলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো। মূলত, ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানে এক সম্মেলনের পর উইঘুররা তাদের পুরোনো পরিচয় ফিরে পায়। ভাষাবিদ ও ইতিহাসবেত্তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন যে ‘উইঘুর’ শব্দটি ‘উয়্যুঘুর’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ সংঘবদ্ধ।
১৯১১ সালে মাঙ্কু সাম্রাজ্য উৎখাতের মাধ্যমে পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনচেতা বীর উইঘুররা এই বৈদেশিক শাসনের সামনে মাথা নোয়ায়নি। এ কারণে ১৯৩৩ ও ১৯৪৪ সালে তারা দুবার চীনাদের সঙ্গে সাহসিকতার চরম রূপ দেখিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ভাগ্য তাদের অনুকূলে ছিল না। এ কারণে ১৯৪৯ সালে আবারও তারা চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয় আর জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গড়ে ওঠে। তখন সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির গভর্নর ছিলেন সাইফুদ্দিন আজিজি।
জিনজিয়াং চীনের অন্যতম সর্ববৃহৎ একটি অঞ্চল। এর আয়তন ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের ১২ গুণ)। দেশটির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ এলাকা আয়তনে চীনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। এর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম দেশ তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তান; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে আফগানিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীর। জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের মতো। এর মধ্যে মুসলমান প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ। প্রায় ৫৮ শতাংশ মুসলিম।
মধ্যযুগে তাং সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকেই সেখানে ইসলাম ও আরবের প্রভাব বাড়তে থাকে। স্থানীয় উইঘুর জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। উইঘুর বললেই আজকে মুসলিম জনগোষ্ঠী বোঝানো হয়। অন্যদিকে, চীনা মুসলমানদের হুই বলা হয়। উইঘুরের বর্ণমালাও আরবি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এরা তুর্কি ও আরবি প্রভাবিত। উরুমকি বর্তমান জিনজিয়াংয়ের রাজধানী। কাশগড় অন্যতম বৃহৎ শহর। জিনজিয়াং একটি প্রধান ফসল উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে বিপুল পরিমাণ খনিজ ও তেলসম্পদ মজুত রয়েছে।
১৮৮৪ সালে কিং রাজত্বের সময় জিনজিয়াং চীনের একটি প্রদেশ হয়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর চীনা কমিউনিস্ট সেনারা জিনজিয়াংয়ে অভিযান চালায়। এর সূত্র ধরে চীনের হান সামরিক গোষ্ঠী জিনজিয়াংয়ে অভিবাসী হয়েছে। ১৯৫৫ সালে জিনজিয়াং চীনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। হান সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের বিরুদ্ধে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে বহু মানুষ নির্যাতিত হয়। বিপুল সংখ্যায় কাজাখ জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী কাজাখস্তানে পালিয়ে যান। এরপর থেকে উইঘুর মুসলমানদের সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একসময় তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত শতাব্দীর শেষে উইঘুর মুসলমানরা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে।
ফ্রিডম ওয়াচের মতে, চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়নের গোঙানির শব্দ বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। কালেভদ্রে কিছু জানা যায়।
উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নীতির ব্যাপারে চীন বলে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মোকাবিলা করার জন্যই তারা নানান পলিসি নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দাড়ি রাখা, রমজান মাসে রোজা রাখা কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা, তা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে পারে না। আসলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান তাদের মতে চরমপন্থা। আর এই চরমপন্থা দমনের নামে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা চলছে।
চীনের অর্থনীতির রমরমা অবস্থা এবং তাদের কাছ থেকে নানান সুবিধা পেয়ে অধিকাংশ মুসলিম দেশ এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। আসল কথাটি হলো বলতে চায় না। বুদ্ধিজীবীরাও কথা বলেন না। কারণ, এঁদের অনেকেই মার্ক্সীয় তত্ত্ব, মাও তত্ত্ব ভর করে আছেন। আর মুসলিমদের ব্যাপারে বরাবরই মুসলিম সুশীল সমাজ বা আমরা একরকম অন্ধ। এসব মানুষের কান্না তাদের কানে যায় না। উইঘুর মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা (সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী) কথা বলতে পারে না, কারণ তারা ‘বোবা’।

Friday, June 18, 2021

শওকত আলী : পথিকৃৎ লেখকের প্রতিকৃতি by জাকির তালুকদার

নিজের সাহিত্যিক লক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্যুত হননি শওকত আলী। প্রগতিশীল সাহিত্য ও সমাজচিমত্মা তাঁর ভেতরে প্রজ্বালিত রেখেছে পথচলার আলোকশিখা। তাই কখনো পথভ্রষ্ট হননি তিনি। বিভিন্ন সময় কলাকৈবল্যবাদ আক্রমণ শানিয়েছে বাংলাদেশের সাহিত্য-অঙ্গনে। সেই কুহকে বেপথু হয়েছেন অনেকে; কিন্তু নিজের জায়গা থেকে নড়েননি শওকত আলী। নিজের সাহিত্যদর্শনকে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। পর্যালোচনা এবং নির্মম আত্মসমালোচনায় কখনো পরাঙ্মুখ হননি তিনি। শেষ পর্যমত্ম স্থিত থেকেছেন সাহিত্য এবং সমাজ প্রগতির আন্দোলনে। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসগুলোর একটি বড় অংশই লিখিত হয়েছে তাঁর হাতে। অনেক সময়ই আলোচনার পাদপ্রদীপ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের কর্তৃত্ব বেশিরভাগ সময় থাকে প্রতিক্রিয়াশীল একটি দুষ্টচক্রের হাতে; কিন্তু তারা পরাজিত করতে পারেনি শওকত আলীকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের গত ৭০ বছরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, শওকত আলীর মতো লেখকরাই শেষ পর্যমত্ম দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন মাথা উঁচু করে। উপন্যাস-সাহিত্যে মনোযোগ বেশি নিবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশের গল্পের আলোচনাও শওকত আলীকে বাদ দিয়ে কিছুতেই পূর্ণাঙ্গতা পেতে পারে না।

শওকত আলীর লেখালেখির শুরু গত শতকের পাঁচের দশকে। নিজেকে আলাদা করে এবং উজ্জ্বলভাবে চিনিয়েছেন ষাটের দশকে। তারপর নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে গেছেন নতুন নতুন লেখার মাধ্যমে আমৃত্যু।

কেমন পরিবেশে লিখতে শুরু করেছিলেন শওকত আলী?

আর কেন এবং কীভাবে এই ভূখণ্ডেরগল্প শওকত আলীদের হাত ধরে অন্য এক রূপ লাভ করল কলকাতাকেন্দ্রিক কথাসাহিত্যকে পাশ কাটিয়ে? তিরিশ, চলিস্নশ এবং পঞ্চাশের দশকে এ-ভূখণ্ডেরআর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিলে বোঝা যাবে শওকত আলীদের লড়াই ছিল কত ধরনের ফ্রন্টে।

আজকের বাংলাদেশ, তখনকার পূর্ববঙ্গ, মূলত ছিল কৃষক-অধ্যুষিত অঞ্চল। সকল জমিদারি এবং বড় জোতের মালিক ছিলেন ব্রিটিশ-সখ্যসূত্রে উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দু এবং অবাঙালি আশরাফ গোত্রের মুসলমানরা। তারা বাস করতেন কলকাতায় বা দিলিস্নতে। বাঙালি জাতির হয়ে সব ভাবনাচিমত্মা এবং সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরচিরস্থায়ী বন্দোবসত্ম নিয়েছিলেন কলকাতার বাবু এবং সাহেবশ্রেণি। তারা যে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, তার সঙ্গে পূর্ববঙ্গীয় কৃষকসমাজের কোনো মিল ছিল না, থাকার কথাও নয়। ফলে আধুনিক সাহিত্যের অনুপ্রবেশ এ-অঞ্চলে ঘটেছিল খুবই ছোট একটি শহুরে অংশের মধ্যে। ভারত-বিভক্তির পরে যদিও বাঙালি-আত্মাকে বিভক্ত করা যায়নি, তারপরও সমাজ এবং রাজনৈতিক বাসত্মবতা দুই দেশের বাঙালির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে চিমত্মাকর্ম এবং সৃজনের ভিন্নতা এনে দিয়েছে। ভারতীয় বাঙালিরা সেদেশে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিয়ে একটি নিরুপদ্রব জীবনকে গ্রহণ করেছেন। তারা মনোযোগ দিয়েছেন ভারতীয় জাতীয় পুঁজি বিকাশের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে একটি বড়সড় মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দিতে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে না নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে অচিমত্মনীয় ভাষা-আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন। পাকিসত্মান এবং বাংলাদেশ আমলেও সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও সেই শাসনকে বারবার বিদূরিত করে গণতন্ত্রের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে। বস্ত্তত ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে সবসময় রক্ষা করতে না পারলেও সামরিক স্বৈরাচারকে বারবার গণতান্ত্রিক সংগ্রামে পরাজিত করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মানুষের সমান আর  কারো নেই পৃথিবীতে। তারপর রয়েছে একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ। বাষট্টির শিক্ষা-আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, টর্নেডো-ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের অর্জন ও উত্তরাধিকার পুরোপুরি বাংলাদেশের বাঙালির। এসব অভিজ্ঞতা থেকে ভারতীয় বাঙালি বঞ্চিত। ফলে তাদের রচিত ছোটগল্পে জীবন যেভাবে ধরা পড়বে, বাংলাদেশের গল্পে জীবনের জঙ্গমতা তার চেয়ে ভিন্ন হবেই।

এছাড়া রয়েছে পার্থক্যের অন্য একটি সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক মাত্রাও। এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পরেও, মাত্র এক দশক আগে পর্যমত্ম, বাংলাসাহিত্যের মূলধারা বলতে বিনা প্রশ্নে বোঝানো হতো ভারতের বাংলাভাষী অধ্যুষিত প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাকেন্দ্রিক  সাহিত্যকেই। আমাদের এই বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডেরমানুষ হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হলেও বাংলা-সম্পর্কিত ‘সবকিছু’র দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে তৈরি হতে সময় নেওয়া হয়েছে প্রচুর। একই কথা প্রযোজ্য এদেশের লেখকদের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ নামক বাঙালির একমাত্র স্বাধীন ভূমির অধিবাসী হিসেবে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের ধারণ-বাহন-রক্ষণ-সৃজনের প্রধান দায়ভার যে আমাদেরই – এই সত্য বুঝে উঠতে এবং সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্য হয়ে উঠতে বেদনাদায়কভাবে বেশি সময় নিয়েছেন এদেশের কবি-সাহিত্যিকরা। তাই কিছুদিন আগে পর্যমত্মও বাংলাসাহিত্যের প্রধান স্রোতধারা বলতে কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যকেই বোঝানো হতো। বর্তমানেও এ-মনোভঙ্গি পুরোপুরি অপসৃত হয়েছে, এমনটি নিঃসংশয়ে বলা যায় না।

পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য যে এতদিন ধরে মূল স্রোতধারা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে, অথবা সত্যি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতাই যে ছিল বাংলাসাহিত্যের প্রধান কেন্দ্র, তার পেছনে ঐতিহাসিক, প্রযুক্তিগত, সাংস্কৃতিক এবং লগ্নিবিষয়ক নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যের আধুনিক ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে-ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন কেবলমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্যিকবৃন্দ। পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি সে-ধারার রচনাকুশলতা অর্জনও সম্ভব হয়েছিল তাদের পক্ষেই। অবিভক্ত ভারত এবং অবিভক্ত বাংলার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় কলকাতাতেই প্রধানত বিকশিত হয়েছিল সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র এবং প্রকাশনা শিল্প। পত্রপত্রিকা তো বটেই, পুসত্মক প্রকাশনা ও বিপণনের মূল বা একমাত্র কেন্দ্র হওয়ায় সারাদেশের লেখক-শিল্পীরা কলকাতাকেই বেছে নিতেন নিজেদের অবস্থান এবং কর্মক্ষেত্র হিসেবে। দেশের অন্যত্র, বিশেষ করে ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী ও নদীয়া অঞ্চল থেকে কিছু সাময়িকপত্র ও গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও তা কখনো কলকাতার সমতুল্য গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। বাংলার বাইরে, বিশেষ করে ত্রিপুরা, আসাম, বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চলে বাংলাসাহিত্যের চর্চা হলেও সেগুলিকে প্রবাসী সাহিত্যের তকমা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারতভাগ এবং বাংলাভাগের পরেও অক্ষুণ্ণ থেকেছে কলকাতার একক প্রাধান্য। প্রকাশনা, ছাপা,  বাঁধাই এবং বিপণনের প্রায় সব কাঠামোই পড়েছিল কলকাতার ভাগে। ঢাকাকে শুরু করতে হয়েছিল শূন্য হাতে। তৃতীয়ত, ঢাকা তথা বাংলাদেশ ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্ত হলেও স্বাধীনতা অর্জনের পরিবর্তে পরিণত হয়েছিল পশ্চিম পাকিসত্মানের উপনিবেশে। পাকিসত্মানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাচর্চাকে সুনজরে দেখেনি, বরং তাকে দমাতে চেষ্টা করেছে সর্বাত্মকভাবে। চতুর্থত, ব্রাহ্মণ্যবাদী লেখকদের দ্বারা এত বছর সাংস্কৃতিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় অবহেলিত বাঙালি মুসলমান লেখকদের একটি বড় অংশ পাকিসত্মানি জোশে আত্মহারা হয়ে বাংলাসাহিত্যের উত্তরাধিকারকেই অস্বীকার করে মুসলমানি পাকিসত্মানি বাংলাসাহিত্য সৃষ্টির অলীক চেষ্টায় মেতে উঠে এই ভূখ– সাহিত্যের প্রকৃত বিকাশকে কঠিনতর করে তুলেছিলেন। পঞ্চমত, বাঙালি মুসলমান তথা বাংলাদেশে বসবাসরত লেখকদের সামগ্রিকভাবে সাহিত্যপ্রতিভায় উনতা ছিল লক্ষণীয়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে, বিশেষ করে বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের পরে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় তা ছিল বেদনাদায়কভাবে কম। আর ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহ্র মতো ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়েও নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সমালোচনা সাহিত্য তখন গড়েই ওঠেনি আদৌ। ফলে প্রতিভাবান লেখকবৃন্দ না পারতেন স্বদেশে চিহ্নিত হতে, না পারতেন প্রচারের আলোয় আলোকিত হতে। তদুপরি কোনো বহুল প্রচারিত এবং মানসম্মত নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকার অনুপস্থিতির কারণে, এবং একই সঙ্গে প্রকাশনা ও বিপণনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে তারা নিজ দেশের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সচেতন পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছতেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন প্রতিনিয়ত। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে (১৯৫৭ সালে) সমকাল প্রকাশিত হলেও তা যথেষ্টর বিবেচনায় ছিল নেহায়েতই অপ্রতুল। তাই ঢাকার কবি-গল্পকারদের তখনো নিজেদের লেখা ছাপার জন্য প্রধানত নির্ভর করতে হতো কলকাতার স্বনামধন্য পত্রিকাগুলির ওপরেই। তারা সামত্মবনাসূচক কিছু লেখা ছাপাতেন বটে, তবে তা কেবল নিজেদের লেখকদের লেখা ছাপার পরে ফাঁকা জায়গা থাকলে।

এতসব প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের নিজস্ব ধারা সৃষ্টি করতে হয়েছে শওকত আলীদের।

পঞ্চাশের দশকে এই দেশে সংঘটিত হয়েছে ভাষা-আন্দোলনের মতো যুগামত্মকারী ঘটনা। পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশ নামের এই ভূখ– ভাষা-আন্দোলনের পরে কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকেনি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিসত্মান নামক রাষ্ট্রটির প্রতি বাঙালির মোহ ফিকে হতে শুরু করেছিল সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই। সেই মোহ থেকে বাংলাদেশের মানুষ পুরোপুরি মুক্তিলাভ করে ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীবাসীকে এই সংকেত পাঠায় যে, বাঙালি নিজস্ব একটি রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেই রাষ্ট্রগঠনে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ থাকবে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকায়। বাংলাদেশের গল্পকাররা ভাষা-আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিলেন আমত্মরিকভাবে। এমনকি লেখকদের অনেকেই ছিলেন এই আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক এবং কর্মী। ভাষা-আন্দোলনের সব সাহিত্যিক দলিলকে ধারণ করতে হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন প্রগতিশীল লেখক ও কবিরা। বাহান্নর শহীদদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই একুশের প্রথম সংকলন প্রকাশিত হলো হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায়। সেই সংকলন আজো পৃথিবীতে মুক্তিকামী মানুষের অন্যতম প্রধান সৃজনশীল দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে এদেশের কবি-সাহিত্যিকরা এই উপলব্ধিতেও পৌঁছালেন যে, বাংলা সাহিত্যের চর্চা কেবলমাত্র আর সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন বাঙালি জাতিসত্তা রক্ষার এক মহান বিপস্নবী দায়িত্বেও পরিণত হয়েছে। এই দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখালে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না। ফলে লেখকরা সর্বাত্মকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাহিত্যকর্মে। ফল্গুধারা পরিণত হলো মুক্তধারায়। অসংখ্য সৃষ্টি ও ফসলে ভরে উঠল বাংলার সাহিত্যজমিন। গল্প-লেখকদের তো পিছিয়ে থাকার প্রশ্নই আসে না। কারণ, তাঁরা ততদিনে বুঝে গেছেন যে, বাংলার মানুষ একটি সম্মানজনক ও গণতান্ত্রিক জীবনের জন্য আবহমান কাল ধরে যে-লড়াই চালিয়ে আসছে, সে-লড়াইকে জীবমত্ম ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর সাহিত্যমাধ্যম হচ্ছে ছোটগল্প। পঞ্চাশের দশকের সব গল্পকারই আমৃত্যু সৃষ্টিমুখর। অনেকে পরবর্তী সময়ে গল্প লেখা থেকে সরে অন্য রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। কিন্তু সৃষ্টিশীলতার অঙ্গীকার থেকে পিছু হটেননি কেউ-ই। এই দশকে আবির্ভূত উজ্জ্বল গল্পকার শওকত আলী।

ষাটের দশকে হঠাৎ করেই যেন গল্প এবং গল্পকারের ব্যাপ্তি প্রসারিত হয় অনেকগুণ। কি সংখ্যায় কি বৈচিত্র্যে কি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় – সবক্ষেত্রেই ছোটগল্প যেন আমূল পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক-সামাজিক টালমাটাল ঢেউয়ের মধ্যে যেমন এই দশকেই বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে, বিকৃত পথে হলেও, একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সব শর্ত পূরণ হয়, তেমনি ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে সূচনা হয় একটি ভিন্ন ভূগোল এবং ভিন্ন কণ্ঠের। এই প্রথম লেখকদের কেউ কেউ উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে, তাঁদের বাংলাদেশের মানুষের গল্প লিখতে হবে, যে-গল্পগুলো ইউরোপীয় নয়, পশ্চিমবঙ্গীয় নয়। ষাটের দশকের গল্পগুলোর মধ্যে অনেকগুলো প্রবণতা ছিল, যা এই দশকের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবণতাসমূহের সমানুপাতী।

প্রথমত, ষাটের দশকের উজ্জ্বল ছোটগল্পগুলো প্রধানত প্রকাশিত হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনে। ফলে এক ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিকতার পরিচয় এই গল্পগুলির অবয়বে খুঁজে পাওয়া যায়। যেহেতু লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত, তাই কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ছিল। সবসময়ই সেগুলো শিল্পোত্তীর্ণ এমনটি বলা যাবে না। তবে এই অর্থে একে ইতিবাচক বলতেই হবে যে, একটি নিরীক্ষা-পরবর্তী সময়ে আরো নিরীক্ষার দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। দ্বিতীয়ত, ষাটের দশক প্রধানত কেটেছে আইয়ুবী স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। সে-সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল নিষিদ্ধ। তাই ষাটের লেখকদের কথনরীতিতে আনতে হয় পরিবর্তন। অপ্রত্যক্ষ কথনের মাধ্যমে গল্প-নির্মাণ। এর ফলে আবার জীবনবিমুখ শিল্প-সর্বস্বতার একটি প্রবণতাও দানা বেঁধেছিল এ-দশকে। তৃতীয়ত, ষাটের লেখকদের একটি বড় সাফল্য হচ্ছে, গল্পের ভাষাকে উপযুক্তরূপে গড়ে তুলতে পারা। ষাটের প্রধান গল্পকাররা শব্দের শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই তাঁরা প্রত্যেকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাষাশিল্পীও বটে। এই দশকে শওকত আলী একের পর এক সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে চেনাচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে।

-------দুই------

এতসব সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মনসত্মাত্ত্বিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শওকত আলী এবং তাঁর সঙ্গীরা বাংলাদেশের সাহিত্যকে নিয়ে এসেছেন আধুনিক প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষতার ধারায়। এবং অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ-ধারাটিই আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির মূলধারা হিসেবে প্রবহমান। পশ্চাৎপদ সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনায় নিলে এ এক মহাবিপস্নবই বটে। এটি কীভাবে সম্ভব হলো?

সম্ভব হয়েছে শওকত আলী এবং তাঁর সঙ্গীদের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং স্বচ্ছ দৃষ্টি আয়ত্ত করার মধ্য দিয়ে। তাঁরা ইংরেজি সাহিত্যের আধুনিকতা ও মানবিক ধারাটির সঙ্গে সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন বাঙালির চিরায়ত আখ্যানসমূহের।

হাজার বছর বয়সী একটি জাতির আখ্যান আসলে সেই জাতির সত্যিকারের প্রাণস্পন্দন। সেই প্রাণস্পন্দন কোনোদিনই লুপ্ত হয়নি বাঙালির। সমাজের ওপরতলার মানুষকে আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক মনে হলেও জাতিকে ধারণ করে রাখে অমত্ম্যবাসী কর্মীসমাজ। ইউরোপীয় শিক্ষা তথা সাহিত্য-সংস্কৃতির আগ্রাসন সেই তলা পর্যমত্ম পৌঁছতে পারেনি। আবার তারও আগে তুর্কি আগ্রাসনও এই পর্যমত্ম শেকড় বিছাতে পারেনি। ব্রিটিশ যুগে শরীয়তপন্থীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আমাদের অনেক ঋণ। কিন্তু এই শরিয়া-আন্দোলনও পরাজিত হয়েছে প্রকৃতিনিষ্ঠ বাঙালির আখ্যানকাব্যের শরীরে ফাটল ধরাতে। শেষ পর্যমত্ম বাঙালির আখ্যান তাই ধর্মনিরপেক্ষই থেকে গেছে, এবং গড়ে দিয়েছে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত। ধর্মনিরপেক্ষতার চেয়েও শক্তিশালী একটি ধারা রয়েছে বাঙালির আখ্যানের। সেটি হচ্ছে সর্বধর্মের সমন্বয়বাদী আখ্যান। পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো তুলনা পাওয়া যাবে না। বাঙালি তার মাটিতে আশ্রয় দিয়েছে আর্যদের, শক-হূন-মোগলদের, পাঠানদের, বৌদ্ধ-জৈনদের, তুর্কি-ইরানি-আরবীয়দের। তাদের দিয়েছে নিজের থালার অন্ন-ব্যঞ্জনের ভাগ, নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে তাদের, নিজের ধর্মপরায়ণতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে দেয়নি অতিথিদের ধর্মবিশ্বাসকে। তাই সকল ধর্মবিশ্বাসের বাইরের আবরণটিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খুঁজে নিতে হয়েছে ভেতরের অমত্মর্নিহিত আদর্শটিকে। সেখান থেকে যেসব অভিন্ন উপাদান সংগৃহীত হয়েছে – যেমন সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, অন্যের ধর্মাচরণে বাধা না দেওয়া, নির্বাণ বা প্রশামিত্মর জন্য ধর্ম-অবলম্বন – এসবকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে অভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কথকতা-কাব্য-পাঁচালি-পুঁথি। বিভেদের বিভ্রামিত্ম এসেছে কখনো কখনো, কিন্তু সমন্বয়ের সাফল্যই শেষকথা। আর আছে ভালোবাসা। ব্যক্তির জন্য ভালোবাসা, কৌমের জন্য ভালোবাসা, যে কাছে আসছে তার জন্যই ভালোবাসা, বৃক্ষের জন্য, বৃষ্টির জন্য, পিঁপড়ের জন্য, পাখির জন্য, মাছের জন্য, গায়ে পরশ বুলিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরঝিরে বাতাসের জন্য, প্রাণদায়ী বৃষ্টির জন্য, বিপাকে পড়া শত্রম্নর জন্যও, সর্বোপরি গর্ভধারিণী এবং হৃদয়ধারিণী মায়েদের জন্য। লিখিত হয়নি এসব আখ্যান। রচিত হয়েছে কৌমের কোনো প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ বা তরুণের মুখে, সঞ্চিত এবং পরিশীলিত হয়েছে বুকের মধ্যে, তারপর সঞ্চারিত হয়েছে মুখের বয়ান হিসেবে আরেকজনের কাছে, পরবর্তী জন ধারণ করেছে সে-আখ্যানকে, পুষে রেখেছে বুকের মধ্যে, তারপর ছড়িয়ে দিয়েছে পর্যটনে গিয়ে, পশুশিকারে গিয়ে, মৎস্যশিকারে গিয়ে, কৃষিক্ষেত্রে গিয়ে, ‘জলকে চল’তে গিয়ে, নাইয়রে গিয়ে। মুখে মুখে সৃষ্টি, বুকে বুকে সঞ্চয়ন, বুকে বুকে বহন, মুখে মুখে সঞ্চালন – এ-প্রক্রিয়ায় হাজার বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে এবং বাহিত হয়ে এসেছে বাঙালির আখ্যান। বিদেশি আগ্রাসন পারেনি এসব আখ্যান বন্ধ করতে, ঔপনিবেশিকতা পারেনি এসবের প্রবাহ রুদ্ধ করতে। মধ্যবিত্ত এবং ওপরতলার বাঙালির একটা অংশ শাসকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইংরেজ হতে চেয়েছে, পাঞ্জাবি হতে চেয়েছে, তুর্কি হতে চেয়েছে, পারসি হতে চেয়েছে, আরবীয় হতে চেয়েছে। কিন্তু আবহমান বাঙালিত্ব রয়ে গেছে সেই আগের জায়গাতেই অনড়, অপাপবিদ্ধ। বাঙালির সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে এই আগ্রাসী এবং ভিখারি-মানসিকতার বাইরে বসেই। সেই সংস্কৃতি শেষ পর্যমত্ম পুষ্টি জুগিয়েছে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে। চিরায়ত আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঙালির মুক্তির আখ্যান। এটাই বাঙালির প্রাণশক্তির সত্যিকারের উৎস।

শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজনই কেবল নয়, সকল গল্প-উপন্যাসই বাঙালির চিরায়ত আখ্যান ও জীবনের সম্প্রসারণ। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সাহিত্যের আধুনিক-প্রগতিশীল-ধর্মনিরপেক্ষ ধারাটির অন্যতম পথিকৃৎ।

Tuesday, June 15, 2021

গল্প- ফণির পরে by আনিসুল হক

ক্যা   বারে কুটি যাচ্ছু! রমেন মাস্টার বলে জয়নালকে। রমেন মাস্টারের বগলে ছাতা, তার হাঁটার গতি দ্রুত। তার মাথায় টাক, টাকের ওপরে নীল আকাশের নীল, গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘ প্রতিফলিত হচ্ছে। জয়নাল গেরস্তি কাম করে, খেতি কাম করে; মানে সে একজন কৃষক; তার পরনে চেককাটা তমন্দ, গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি, তার চোখেমুখে রাজ্যের মেঘের ছায়া! অন্ধকার।

রমেন মাস্টার আবারো বলে, ক্যা বারে জয়নাল, কুটি যাচ্ছু!

ভেঁওত যাই বারে, কাইল সানঝের বেল বাতাস হলো না! তারপর তো বৃষ্টি।

মোর ভেঁও তো দেখা হলো না, কালকা আইতের বেলা মুই আর ঘুমাবার পারোম না। খালি ভাপর লাগে। ধানের ভেঁওটার না জানি কী অবস্থা!

রমেন মাস্টার তার পাশে দাঁড়ায়, গ্রামের কাঁচা রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজে কাদাময়  হয়ে গেছে, হাঁটাও মুশকিল; বাটার খুব ভালো জুতা কাদায় গেঁথে যাচ্ছে। চারটা হাঁস রাস্তা দিয়ে প্যাঁক প্যাঁক করে হেঁটে যায়। বৃষ্টি হওয়ায় হাঁসগুলোর মনে বোধহয় বেশ ফুর্তি। একটা ছাগল গা ঝাড়ে। গা থেকে পানির ছিটা পিচকারির মতো ফুলঝুড়ি ঝরায়।

রমেন মাস্টার কাদায় ডেবে যাওয়া তার ডান পায়ের জুতাটা উদ্ধারের জন্য কসরত করতে করতে বলে, বাহে, ফণি হলো না? ওই যে ঘূর্ণিঝড়। ভগবানের আশীর্বাদে ফণি বাংলাদেশের ওপর দিয়া বয়া যায় নাই; কিন্তু বৃষ্টি তো হামার এলাকাতেও হলো। কী করব্যা! ওপরওয়ালাক তবু থ্যাংক ইউ বলা লাগে, ক্ষতি তো আরো বেশ হবার পাইরত! কী কও?

হ বারে। ওকনাই সান্তববনা। ক্ষতি তো আরো বেশিও হবার পারত।

বৃষ্টি ঝরল। ধরো যা গরম পড়ছিল, গরম তো কমল।

জয়নাল বলে, তা কমল। মাস্টর, তুমি কুটি যাচ্ছু?

মাস্টারের আর কাম কী! ছাত্র পড়াবার যাই বারে।

যাও। পড়াও। তোমার ছাত্র হামার ব্যাটার ফল বারাবি নাকি  বেষদবার, কথা কি ঠিক?

হ বারে। তাই তো শুনবার পাচ্ছি।

মাস্টর, হামার ব্যাটার জন্য আশীর্বাদ করো।

তাক ফির কওয়া লাগবি? আশীর্বাদই তো করিচ্ছি। সারাক্ষণ আশীর্বাদই করিচ্ছি।

জয়নালের বড় ব্যাটা জাহাঙ্গীর আলম। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল।  রেজাল্ট হবে বৃহস্পতিবার। জয়নালের দুই ছেলে। জাহাঙ্গীর, আলমগীর। আলমগীর ক্লাস সিক্সে উঠেছে। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। বড়টার মাথা আরো ভালো। ক্লাস এইটের পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল। জাহাঙ্গীর ম্যাট্রিকে যে কেমন করে, আল্ল­vহ জানে। ছেলেটার ব্রেন ভালো। মাস্টারেরা বলে। জয়নাল বাপ হয়ে ছেলের পড়াশোনার খবর নিতে পারে না। নিজে তো লেখাপড়া  বেশিদূর করতে পারে নাই। হাইস্কুলে গিয়েছিল কিছুদিন। শেষ তো করেনি। বাপ ডেকে ডেকে হালে লাগিয়ে দিত। জয়নালেরও হাল বাইতে ভালো লাগত। নিজেকে মরদ মরদ লাগত।

রমেন মাস্টার চলে যায় তার জুতায় আর কাদায় মচমচ শব্দ তুলে। খালি পায়ে জয়নাল হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তার মনটা কেমন কেমন  যেন করছে। বাজে-পোড়া পাকুড়গাছের ভিটায় তার দেড় বিঘা জমিতে  সে বোরো ধান লাগিয়েছে। চৈত্র মাসের শেষেই ধানে শীষ এসেছে, এখন ধান পুষ্টু। চার-পাঁচ দিন সময় দিলেই ধান পেকে সোনালি হয়ে যাবে। খুব ভালো ফলন হবে এবার। জয়নাল মনে মনে ভেবেছিল। কৃষিকাজে লাভ নাই। ফসল ভালো ফললে, ফলন ভালো হলে বাজার পড়ে যায়। আর বাজার ভালো থাকলে ফলন ভালো থাকে না। এখন তো কিষানের মজুরি বেশি। তাও কিষান পাওয়া যায় না। কাটামারির সময় কিষানদের পোয়াবারো। জামাই-আদর করা লাগে কিষানদের। গ্রামে  কেউ থাকতে চায় না। সব গাজীপুর নরসিংদী চলে যায় গার্মেন্টসের কাজে। চট্টগ্রাম না কি কোথায় যায় জাহাজভাঙার কাজে। ঢাকা সিলেট চলে যায় রাজমিস্ত্রির কাজে। গ্রামেগঞ্জে পড়ে থেকে কৃষিকাজ করবে  কে? এদিকে পানির পাম্পে তেল লাগে। সেচের জন্য খরচ লাগে। সার আছে, কীটনাশক আছে। খরচের খাতের কি শুমার আছে বারে!

জয়নাল ভিটার দিকে হাঁটে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে এই সকালে। কাল সারাটা দিন ছিল খোসা ছাড়া লিচুর মতো মেঘে মেঘে ছাওয়া। রেডিও-টেলিভিশনে বারবার করে বলছিল, ঘূর্ণিঝড় ফণি আসছে। এটা নাকি ভয়ংকরতম ঘূর্ণিঝড়। বাজারে বিকালবেলা আলুপুরি খেতে খেতে জয়নালও শুনছিল অন্যদের মতামত : এই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে উড়িষ্যায়। বাংলাদেশে আসতে আসতে দুর্বল হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশেও ঢুকবে খুলনা সাতক্ষীরা দিয়ে। চলে যাবে ফরিদপুর ঢাকা হয়ে মেঘালয় আসাম। তাদের এলাকায় ক্ষতি হবে না।

তা কাল রাতে যখন একটু বাতাস হলো, বৃষ্টি শুরু হলো, জয়নাল, তার দুই ছেলে জাহাঙ্গীর আর আলমগীর আর ছেলেদের মা মিলে তখন তারা টেলিভিশন দেখছিল। ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে তখন একটা সিরিয়াল হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চলে গেল, ঘর হয়ে গেল অন্ধকার, টেলিভিশন  ঘোলা! বাইরে হঠাৎ জোরে বাজ পড়ল, আলমগীর ভয়ে জড়িয়ে ধরল তার মাকে! জাহাঙ্গীর বলল, আলোর গতি শব্দের চায়া বেশি। এ আলমগীর, তুই বাজের আওয়াজকে ভয় পাচ্ছু কিসক, বিজলির আলোক ভয় পা।

তখনি তাদের টিনের চালে বৃষ্টি শুরু হলো।

জাহাঙ্গীর বলল, বাজান, ফণি আস্যা পড়ল।

জয়নাল বলল, হামাঘেরে এলাকাত নাকি আসপি না!

জাহাঙ্গীর বলল, আসপি না মানে ঝড়তুফান হবি না। কিন্তু বৃষ্টি  তো শুরু হয়াই গেল।

জাহাঙ্গীরের মা বলল, হারিকেনটা জ্বলাই। ম্যাচ কুটি থুছি চুলার পাড়তই তো থাকে।

জয়নাল বলল, পাকঘরত যায়া আমি আনা দিচ্ছি, তুমি যায়ো না।  তোমার শরীলডা তো জ্বরজ্বর।

জাহাঙ্গীর বলল, হামি যাচ্ছি। তোমরা নক করা বস্যা থাকো।

১৬‌ বছরের ছেলেটা চট করে ছাতাটা নিয়ে দরজার বাইরে গিয়ে ছাতাটা মেলে দৌড় ধরল রান্নাঘরের দিকে। দিয়াশলাইয়ের বাক্স আনতে। ওদের মা হারিকেন জ্বালাবেন। কারেন্ট তো আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকে। হারিকেন তাই লাগেই। কেরোসিনের খরচও লাগে।

জয়নাল সকাল সকাল বেরিয়েছে ক্ষেত দেখতে। ফণি চলে গেছে। সকালের আকাশ পরিষ্কার। নীল আকাশে সাদার ছিট, আকাশটাকে সুন্দর দেখাচ্ছে, মেঘগুলোকে মনে হচ্ছে একঝাঁক হাঁস, আকাশের নীলে সাঁতার কাটছে।

দুই পাশে ক্ষেতের দিকে তাকায় সে। ক্ষেত তো সব ঠিকই আছে। এই পাশে ধান, পাট, যারা যা করেছে, বৃষ্টির পানিতে ভেজা; কিন্তু ধানগাছগুলো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। তার নিজের ক্ষেত এখন ঠিক থাকলে হয়।

শিমুলগাছের মোড়টা পার হলো সে। সাইকেল মেকানিক শিবুর দোকান। তিনটা রিকশাভ্যান সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের এই কাঁচা রাস্তার মোড় পর্যন্ত এখনো ব্যাটারির টমটম আসে নাই। রিকশাভ্যানগুলো এইখান থেকে যাত্রা শুরু করে পাকা রাস্তায় যায়। আরো দূরে যাওয়া তখন তাদের পক্ষে সহজ হয়। এখন এই কাদা রাস্তাটুকু পার হতে রিকশাভ্যানগুলোর কষ্টই হবে।

পাকুড়গাছটা বাজে পুড়ল। তার ডালপালা শুকিয়ে গেল। তবু গাছটায় কেউ হাত দেয়নি। এই গাছে তেনারা থাকতেন বলে গ্রামে প্রচলিত আছে। বাজ মানে আগুন। তেনারাও তো আগুনের তৈয়ারি।  তেনারা তো আর গাছ ছেড়ে চলে যাননি। কেউ যদি পাকুড়গাছের ডালে হাত দেয় খড়ি করবে বলে, তাহলে তার হাত তো পুড়ে যাবেই, বংশ নির্বংশ হতে পারে।

পাকুড়গাছের তলাটা পার হওয়ার সময় কলেমা পড়ে নিল জয়নাল।

তারপর উঁচু জমিটা পেরিয়ে নিচে তার ধানক্ষেতের দিকে চোখ পড়ল জয়নালের।

সে স্থির হয়ে গেল। ওই পাশে তিনশো-চারশো হাত চওড়া একটা জায়গা জুড়ে যত ক্ষেত আছে, সব শুয়ে পড়েছে। বাতাসের একটা ঝাপ্টা এই জায়গা দিয়ে বয়ে চলে গেছে সম্ভবত। তার নিজের ধানক্ষেতের সব ধান নুয়ে আছে। আশেপাশে সামনে আরো আরো  ক্ষেতের একই অবস্থা। পুবের দিকের জমিতে খয়বার চাচা করলা করেছিলেন, জাংলা ছেড়ে মাটিতে পড়ে আছে সব করলার ডালপালা, ওইদিকে হামেদ মিয়ার কলাক্ষেতেও দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষয়ক্ষতি।

আহা রে, আর পাঁচটা দিন সময় পেলেই ধান পেকে যেত। কাটামারির ফুর্তি লাগত। মামুর কিষান নিয়োগ দিত জয়নাল। ভাই ভাসেত্ম ভাগ্নে যতজন কামলা কিষান আছে, সবাইকে সে আলু লাউ গরুর মাংসের ঘণ্ট দিয়ে দুপুরে ভাত খাওয়াত। সবাই মিলে লেগে পড়ত ধান কাটতে। কিন্তু পাঁচটা দিন সময় দিলো না ফণি। বাতাসটা কিনা তার ক্ষেতের ওপর দিয়েই বয়ে গেল।

এই ধান করার জন্য সে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে দশ হাজার টাকা  লোন নিয়েছে। ধানকাটা সেরে ধানের দাম কিছুটা উঠলে সে বিক্রি করে দিত ধান। ঋণ শোধ করত। ছেলে তার কলেজে যাবে। মোকামতলা কলেজে। তার জন্য একটা সাইকেল লাগবে। সাইকেলের টাকাও  সে জোগাড় করে ফেলতে পারবে। কলা করেছে কালীতলার ভিটায়।  রোজার মাসে কলার চাহিদা বাড়বে …

জয়নালের চোখের কোণে পানি জমে, আকাশ পরিষ্কার, নীল আরো নীল হয়ে উঠছে। আলোয় আলোয় ভরে উঠছে পুরা পাথার। শুধু তার  চোখের কোণে পানি জমছে। সে কি কাঁদবে। এই সকালবেলা নিজের  ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো দেড় বিঘার জমির শীষে ভরা ধানের জমিকে মাটিতে শুয়ে পড়তে নুয়ে পড়তে দেখে সে যদি কাঁদে, লোকে কি কিছু মনে করবে? কে দেখবে? দেখলেই বা কী!। মনে করলেই বা কী! জয়নালের নিজ হাতে চাষ করা জমিতে, নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করা ধান নুয়ে পড়েছে, হেলে পড়েছে, মাটির সঙ্গে মিশে আছে, তার অবশ্যই কাঁদা উচিত।

জয়নাল এগিয়ে যায়। মাটিতে বসে। ধানের একটা গোছা হাতে তুলে নেয়। ভেজা ধানের গা থেকে পানি ঝরে। তার হাত ভিজে যায়। মাটিতে পানি জমে আছে। একটা ঢোঁড়া সাপ হলুদ লেজ নাড়তে নাড়তে চলে যায় দূরে, তাকে দেখে, সসম্ভ্রমে। তিনটা চড়ুইপাখি ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে ঝগড়া করতে করতে পাক খেয়ে ওড়ে।

জয়নাল উবু হয়ে তার ক্ষেতের ধানে হাত বুলায়। ধানের ছড়াগুলোকে হাতে তোলে। ধানগাছগুলোকে সান্তবনা দেয়। বলে, এই  তোরা কি খুব ব্যথা পেয়েছিস?

কী করবে এখন জয়নাল?

জয়নাল দাঁড়ায়। তার পায়ের নিচে পানি। গোড়ালি ডুবে গেছে পানিতে। লুঙ্গিটা তুলে সে হাঁটুর ওপরে ভাঁজ করে বাঁধে। ঘাড়ের গামছা  সে কোমরে বাঁধে। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তার পুরা ক্ষেতের দিকে। পুরাটা ক্ষেতে সবুজ ধান কালো ধান আধাপাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে শুয়ে আছে।

হঠাৎ সে দেখতে পায়, কতগুলো পিঁপড়া তার ডান পা বেয়ে ওপরে উঠছে। একটা ধানগাছে বাসা বানিয়েছিল পিঁপড়াগুলো। তাকে পেয়ে তারা তার পা বেয়ে উঠছে। ছোট ছোট লাল পিঁপড়া। এখন সে কী করবে? এই পিঁপড়া তাকে কামড়াতে আরম্ভ করলে যন্ত্রণার আর অবধি রইবে না। আর যদি সে পা সরিয়ে নেয় পিঁপড়াগুলান বাঁচবে না তো।

এই মুহূর্তে তার কী করা উচিত। পিঁপড়াগুলানকে তার পা বেয়ে উঠতে দেওয়া উচিত। নাকি ঝেড়ে ফেলে দেওয়া উচিত?

সামনে কর্তব্য আছে। আজকালের মধ্যেই ধান কেটে ফেলতে হবে। যে-অবস্থায় আছে সে-অবস্থাতেই। ভালো চাল হবে না। কিন্তু হবে। ভালো দাম পাওয়া যাবে না। কিন্তু পুরাটা তো আর লোকসান হবে না। এখনই ব্যবস্থা করতে হবে। কিষান ডাকতে হবে।

জয়নাল পিঁপড়ার কথা ভুলে যায়।

তারপর সে কর্তব্যের টানে ঘরের দিকে ফিরতে থাকে। কোমরে বাঁধা কাপড়ের ফিতায় তার মোবাইল ফোনের থলে থেকে সে ফোনটা  বের করে। ফোনের নম্বর চেক করে সে ফোন দেয় জামালকে। ক্যা বারে জামাল, ক্যাংকা আছু। হ্যালো, শোনেক, হামার ধানের ভেঁও তো মাটির সাথে মিশা গেছে। ধান পাকতে আরো চার-পাঁচ দিন টাইম দেওয়া লাগত; কিন্তু উপায় তো নাই। কাটাই লাগবি। তুমি পাঁচটা কিষান আন্যা দেও বারে।

বলতে বলতেই পাকুড়তলা পেরিয়ে সামাদের দোকানের পাশে টিউবওয়েলের পাশে এসে সে দাঁড়ায়।

ব্যাগের মধ্যে মোবাইল ফোনটা ভরে সে চাপকলের হাতলে চাপ  দেয়। গলগল করে পানি বেরোতে থাকলে সে তার পা এগিয়ে দেয়।

পায়ে অনেক পিঁপড়া। টিউবওয়েলের পানির স্রোতধারায় পিঁপড়াগুলো ভেসে যেতে থাকে। পিঁপড়াগুলোকে বাঁচানোর কথা জয়নাল ভুলেই গিয়েছিল। খালি যে আকাশের দেওয়া খামখেয়ালি করে, কাউকে বাঁচায়, কাউকে মারে তা নয়, দেখা গেল, জয়নাল নিজেও খামখেয়ালি করে। একটু আগে তার মনে হয়েছিল সে পিঁপড়াগুলোকে বাঁচতে সাহায্য করবে; কিন্তু নিজের ক্ষেতের ধান কাটার ব্যবস্থা করতে গিয়ে সে তার গায়ে আশ্রয় নেওয়া পিঁপড়াগুলোর কথা বেমালুম ভুলে  গেছে।

এখন পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ার আগে তিন-চারটা পিঁপড়া তাকে কামড় বসিয়ে দেয়। তখন তার হুঁশ হয় যে পিঁপড়াগুলোকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

কিন্তু এর মধ্যে সে পিঁপড়াগুলোকে টিউবওয়েলের পানির ধারায় ভাসিয়ে দিয়েছে।

দুই দিন পরে ধান কেটে কিষানেরা তার উঠানে পালা করে। কাঁচা ধানের ভেজা গন্ধে উঠান ম-ম করে। ধান মাড়াই করতে হবে।

জাহাঙ্গীরের মা গরুর চাড়িতে মাড় দিতে দিতে ধানের পালাটাকে  দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জয়নাল পরের দিন দুই কিষানকে কামলা খাটানোর জন্য বলবে বলে মোবাইল ফোনে তাদের নাম সার্চ দেয়।

আঙিনায় মুরগি চরছে। একটা নেড়ি কুত্তা শুয়ে আছে আমগাছের ছায়ায়। দূরে একটা গরুর পিঠে দুইটা পাখি পোকা খাচ্ছে। গরুটা আরামে গলা বাড়িয়ে শরীর এলিয়ে দেয়।

হিন্দি গানের সুরে জয়নালের মোবাইল ফোনের রিংগার বাজে।  ফোন করেছে জাহাঙ্গীর। তার ছেলে।

হ্যালো, বাপ, কও বারে।

বাপজান, হামি জিপিএ ফাইভ পাছি।

জাহাঙ্গীর লাফিয়ে ওঠে, ও জাহাঙ্গীরের মাও, শুনছ বারে, তোমার ব্যাটা তো জিপিএ ফাইভ পাছে।

জাহাঙ্গীরের মায়ের হাতে তখন একটা আরএফএলের লাল বালতি। সে সেটা নামিয়ে রেখে ছুটে আসে, কেটা ফোন করিছে?

জাহাঙ্গীর। লাও। কথা কও …

হ্যালো, জাহাঙ্গীর …

মাও। হামি জিপিএ ফাইভ পাছি মাও। আমি আসিচ্ছি, বাপজানক কও, হামাক কিন্তু সাইকেল কিন্যা দেওয়াই লাগপে …

দিবে তো। তোর বাপ টাকা জোগাড় করিচ্ছে বাপ। আয় … বাড়িত আয় …

জয়নাল ধানের পালাটার দিকে তাকায়। আর পাঁচটা দিন পরে যদি ফণিটা আঘাত হানত, তাহলে কয়েক হাজার টাকা বেশি পাওয়া  যেত এই ধান থেকে। আল্ল­vহর মনে যে কী আছে। ফণি আঘাত হানল খুলনা, সাতক্ষীরায়, আর ধানক্ষেত শুয়ে পড়ল তার। কতদূরে থাকে তারা সমুদ্র থেকে।

জাহাঙ্গীরের বাপ, তুমি চিন্তা করিচ্ছ কী? সাইকেলের ট্যাকা হামি  তোমাক দেমো। হামার সমিতিত হামার টাকা জমা থাকিচ্ছে তো। ওঠো। ব্যাটার ফল ভালো হছে, হাসো তো।

চামেলি বলে। জয়নালের বউ। জাহাঙ্গীর আলমগীরের মা।

আলমগীর কোত্থেকে আসে। নীল শার্ট পরা, হাফপ্যান্ট। বলে, মা, হামি পড়বার বসিচ্ছি। ভাইজান ফল ভালো করিছে, হামাকো তো করা লাগবি, না?

চামেলি হাসে। ক্যা বারে আলমগীর, এক বেলা পড়লি ফল ভালো হবি?

আলমগীর বলে, ইস, হামার ফল কী খারাপ? হামিও তো জিপিএ ফাইভ পাছি। পিএসসিত। পাই নাই? কও।

একটা মোরগ অসময়ে ডেকে ওঠে, ক কক কক। কুক কুরু কু।

চামেলি দুধ জ্বাল দেয়। জাহাঙ্গীর এলে দুই ভাইকে একসঙ্গে দুধভাত খেতে দেবে সে।

তার ছেলেরা দুধভাতে বড় হচ্ছে, এটা ভাবতেই তার চোখে পানি চলে আসে।

গ্রামীণ ব্যাংকের লোক তখনই এসে তাদের উঠানে দাঁড়ায়, চামেলি  বেগম আছেন নাকি! এই সপ্তার কিস্তিটা …

Thursday, June 10, 2021

ট্রামের শহর কলকাতা; আছে দুই চাকার রিক্সাও by মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

একুশে টেলিভিশন: ট্রাম। দেখতে নাকি ট্রেনের মত তবে আকারে ছোট। সেই কৈশোর থেকে অনেক জল্পনা-কল্পনা, ট্রাম দেখতে কেমন? প্রযুক্তির কল্যাণে একটু-আধটু দেখতে পেয়েছি। সেই একটু-আধটু দেখার পর একবার সুযোগ হয়েছিল চোখ মেলে দেখবার। বছর দু’য়েক আগে আন্তর্জাতিক একটা সম্মেলনে গবেষনা পত্র উপস্থাপনের জন্য বাংলার প্রথম রাজধানী কলকাতায় তিন বন্ধুর যাওয়ার সুযোগ মিলল। গবেষকের ভাব ভঙ্গি নিয়ে গবেষণা কর্ম উপস্থাপনের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছি, মনের ভিতর সুপ্ত ইচ্ছেগুলো অনায়াসেই প্রকাশ পেতে থাকল।
সম্মেলন শেষে এবার কলকাতা ঘুরে দেখবার পালা। বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিস্তারের কারণে মনেই হয় না যে, বিদেশে এসেছি। তারপরও বিদেশ বলে কথা। এ ভাবনা নিয়ে দেখলাম বহু কিছু, ঘুরলাম বহু জায়গায়। তবে সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে ট্রামের ঠং ঠং শব্দে রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আর দুই চাকার টানা রিক্সা তো কলকাতার বৈশিষ্ট্যকে স্বাতন্ত্র রুপ দান করছে।
ট্রামের শহর কলকাতা, ট্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ইতিহাস। আছে রোমান্টিকতা, বিপ্লব, ঐতিহ্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অন্যান্য মাত্রার স্বাতন্ত্রতা। টালীগঞ্জ, ধর্মতলা, ডালহৌসী, শিয়ালদাহ, নিউমার্কেট, চিতপুর, চৌরঙ্গি, খিদিরপুর, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন রুটে চলে বৈদ্যুতিক ট্রাম।
খুব আটঁসাট সময়, এর মাঝে যেতে হবে অনেক জায়গায়। সময় মেলে তো ট্রামের রুট মেলা ভার। শেষে কি ট্রামে না চড়েই কলকাতা ত্যাগ করব। বন্ধুরা মার্কেটে ব্যস্ত সময় পার করছে, আমি তাই সময় পেয়েই চড়ে বসলাম ট্রামে। ধর্মতলা থেকে ট্রামে উঠলাম ঠিকই কিন্তু যাব কোথায়? রুট বা কোন জায়গার নামই তো জানি না। শেষে চুপচাপ বসে রইলাম। যেখানেই হোক যাব, অজানা রুটেই। টুন টুন শব্দে ঘণ্টি বাজিয়ে ট্রাম থামছে আবার চলছে, ইঞ্জিন ও লৌহ চাকার মাদকতার সুর মনের মাঝে বিরহের ঘণ্টা বাজায়। মন্থর গতিতে চলছে ট্রাম। একই রাস্তায় চলছে নানা যানবাহন। কোন যানজট ছাড়াই কেমন করে চলছে এ সরলরেখার ট্রাম। সামনে কোন অনাকাঙ্খিত যানবাহনের উপস্থিতে থামছে লোহা ও ইস্টিলের এ বৈদ্যুতিক বাহনটি।

দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, কানপুর, নাসিক থেকে অনেক আগেই উঠেছে ট্রাম। তবে এখন ভারতে ট্রামের একমাত্র ঠিকানা হয়ে আছে কলকাতা শহর। আর্থিকভাবে লাভজনক না হলেও কেন্দ্রীয় সরকার ট্রামকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে। ভারতে বিভিন্ন শহরে এখন এর বিস্তারে কাজ করছে সরকার। কলকাতায় ট্রামকে সম্পূর্ণরুপে ‘কলকাতার অতি নিজস্ব ঐতিহ্য’ রূপে আখ্যায়িত করা হয়।
কলকাতার মত ব্যস্ত শহরে ট্রাম তার চরিত্রগত স্বস্থির গতির মাধ্যমে দূষণমুক্ত একটি যান্ত্রিক বাহন ও সস্তা সেবা প্রদান করছে। কলকাতা ভারতের একমাত্র শহর এবং বিশ্বেরও সেই কয়েকটি শহরের মধ্যে একটি যেখানে এখনও ট্রামের প্রচলন রয়েছে। ১৮৭৩ সাল থেকে কলকাতায় ট্রাম চলে আসছে। ট্রাম থেকে কলকাতা শহরের আবেগের সান্নিধ্য দেখা যায়। ট্রাম কলকাতার বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে চলাচল করে প্রায় পুরো কলকাতাকে জড়িয়ে ধরেছে।

ট্রামের ঠং ঠং আওয়াজ কবির কাব্যিকতা প্রকাশ করে। কলকাতা ট্রামওয়ে গণপরিবহণ ব্যবস্থায় প্রথম সংগঠিত প্রতিষ্ঠান। ১৮৮২ এবং ১৮৮৪ সালের মধ্যে খুব অল্পসময়ের জন্য খিদিরপুর এবং চৌরঙ্গী এলাকায় বাষ্পচালিত ট্রাম চলে। লাইনগুলিতে অবশ্য ঘোড়া চালিত ট্রামই চলত।
১৯০২ সালে কলকাতা ট্রামওয়েতে বিদ্যুতায়ন সম্পূর্ণ হয়। একই বছরে খিদিরপুর এলাকায় প্রথমবারের মতো বিদুৎচালিত ট্রাম চলে। বিদ্যুৎ সংযোজন সম্পূর্ণ হলে কলকাতার ট্রামওয়েতে এক অস্বাভাবিক উন্নতি ঘটে। ভারতের স্বাধীনতার পর কোম্পানি এবং পশ্চিম বাংলা সরকারের মধ্যে ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। ১৯৬৭ সালের অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে সরকার কলকাতা ট্রামওয়ে কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে।

আর একটি দ্বি চক্র যান কলকাতার ঐতিহ্যকে বিস্তৃত করছে। দুই চাকার টানা রিক্সা। ঘোড়ার গাড়ির দুই চাকা নিয়ে এ দ্বি চক্র যানটিকে সামনে থেকে এক জন টেনে নিয়ে যায় যাত্রীর গন্তব্যে। দেখলে মনে হয় যাত্রি বুঝি উল্টে যাবেন, কিন্তু এ রকম ঘটেই না। সামনের রিক্সাওয়ালা হেঁটে হেঁটে এটিকে খুব সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে টেনে নিয়ে যান। কলকাতার একবালপুর লেনে এ রিক্সায় চড়ে এর উচ্চতার জন্য বেশ আরামই বোধ করলাম।
পরিবহনের এ মাধ্যমটি ‘রিক্সা’, যা পশ্চিমবঙ্গে সচরাচর সব সময় মানুষের অবলম্বন হিসাবে কাজ করছে। পায়ে হেঁটে টেনে নিয়ে যাওয়া এটি দাসত্বের প্রতিক রুপে প্রকাশ পায় বলে অনেকেই মনে করেন।
জাপানীদের কাছে রিক্সা হলো ‘জিঁরিকিশা’ যার আক্ষরিক অর্থ হল মানব-চালিত যানবাহন। ১৯০০ সালে চীনা অভিবাসীদের দ্বারা কলকাতায় এটির প্রবর্তন হয়েছিল এবং তখন থেকেই এটি পরিবহনের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে এখানে রয়ে গেছে। রাস্তায় ভারি পরিবহনের একমাত্র বিকল্প হল এই রিকশা। এগুলি স্বল্প দূরত্বে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত এবং যখন কেউ তার গন্তব্যের খুবই কাছে পৌঁছতে চায় তখন অনেকেই এটিকে পছন্দ করেন।
রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস কলকাতা শহরের রাস্তায় রাস্তায় রাতভর হাঁটতেন। "পথহাঁটা" কবিতায় সে উচ্চরণ করেছেন- ‘কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে/ অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে;/ তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে:’।
কলকাতার রাস্তায় দিনে-রাতে, বিভিন্ন অলিতে গলিতে কখনও মন্থর কখনও বা দ্রুত পা ফেলেছি। মনে হয়েছে দেশ থেকে বিদেশের মাটিতে আমাদের পিছু পিছু আত্রলিতা এসেছে এই কলকাতায়। ঐতিহ্যের এই শহরের অলিতে গলিতে উঁকি ঝুঁকি মারছে বিশ্বমাধূরী প্রিয়তমা।

Wednesday, June 9, 2021

ঐতিহাসিক অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার কিছু নজির

স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ আর ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিসের কাছে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট চিঠি লিখেছেন এমন আহবান জানিয়ে যে তারা যেন আমেরিকার দুই মহাদেশ দখল করার সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চান। অনেক অনেক বছর আগে ঘটা কোন ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে এই প্রথম অবশ্য কোন দেশ কিংবা কোন জনগোষ্ঠীকে আহবান জানানো হয়নি।
দৃষ্টি ফেরানো যাক কোন দেশ কখন এবং কেন এমনভাবে ক্ষমা চেয়েছিল।
দাসপ্রথা এবং জাতিগত পৃথকীকরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমা প্রার্থনা
দাসপ্রথার বিষয়ে দুটো সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশ করেছিল - ২০০৮ সালে প্রতিনিধি পরিষদে একবার এবং ২০০৯ সালে সিনেটে আরেকবার।
কংগ্রেসের এই দুটো কক্ষই মার্কিন জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আফ্রিকান আমেরিকানদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে তাদের এবং তাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে দাসপ্রথা ও এর পরবর্তীতে দশকের পর দশক ধরে চলা পৃথকীকরণ নীতির আওতায় যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, তার জন্য।
এই ক্ষমা প্রার্থণার ঘটনায় খুব সামান্যই বিরোধীতা হয়েছে। তবে কংগ্রেসের দুটো কক্ষ কেবল একটি মাত্র সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে একমত হতে পারেনি - অর্থাৎ ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কিছু দ্বিমতকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সিনেটের প্রস্তাবে এমন একটি ধারা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে দাসপ্রথা এবং জাতিগত পৃথকীকরণের কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাইতে ব্যবহার করা যাবে না।
তবে এটির বিরোধীতা করেছেন প্রতিনিধি পরিষদের কংগ্রেসনাল ব্ল্যাক ককাসের কিছু সদস্য, যারা ক্রীতদাসদের উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ওই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা। তিনি কংগ্রেসের ক্ষমা প্রার্থণাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কখনোই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আহবান জানাননি।
ওবামার পরিবারের সঙ্গে দাসপ্রথার ইতিহাসের সংযোগ রয়েছে। তার শ্বেতাঙ্গ মায়ের পরিবারের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে তাদের দাসের মালিকানা ও দাস - এই দুইয়ের সঙ্গেই সংশ্লিষ্টতা ছিলো। অন্যদিকে তার কৃষ্ণাঙ্গ পিতা দাসপ্রথা শেষ হওয়ার অনেক পরে আমেরিকায় আসেন। ফলে এটি প্রমাণ করে যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বেশ জটিল একটি ব্যাপার।
সুতরাং ক্ষতিপূরণ যদি দেওয়া হয়, তাহলে কে তা দেবে আর কেই-বা পাবে?
ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টির সাথে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আসা উচিত - এই ধারণার কারণে অনেক নেতাই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
আয়ারল্যান্ডের দুর্ভিক্ষে ব্রিটেনের ভূমিকা
আইরিশ দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল ১৮৪৫ সালে। এর ১৫০ বছর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন: ‘সে সময় যারা লন্ডন থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করছিলেন, তারা আসলে সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।’
ওই দুর্ভিক্ষে ১০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিলো, আর দেশত্যাগ করেছিলো ২০ লক্ষ আইরিশ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, দেশটিতে তখন আলু উৎপাদনে ধস নামলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট খাদ্য আমদানীতে চালু থাকা বিধিনিষেধ তুলে নিতে দেরি করে।
টনি ব্লেয়ারের ১৯৯৭ সালে দেওয়া বক্তব্য এমন একটি সময় আসে যখন ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছিল। ১৯২২ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ ছিলো, তবে উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে সম্পর্ক পরে চরম তিক্ততায় গড়ায়।
সমস্যা সমাধানে দেশ দুটো এরপর 'গুড ফ্রাইডে চুক্তি' করে। সমালোচকরা অবশ্য বলছেন যে ব্লেয়ারের কথাগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা হিসেবে নেয়া যায় না।
যদিও দুর্ভিক্ষের কারণে আয়ারল্যান্ডকে কখনোই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়নি, তবে ব্রিটেন সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশদের দ্বারা শাসিত কিছু মানুষকে অর্থ দিয়েছে।
এদিকে, ১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ার মওমও বিদ্রোহের সময় যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, ব্রিটিশ সরকার ২০১৩ সালে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তাদের জন্য আড়াই কোটি মার্কিন ডলারের একটি ক্ষতিপূরণ প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়।
হলোকাস্টের জন্য পশ্চিম জার্মানির ক্ষতিপূরণ
অন্যদের তুলনায় এক্ষেত্রে পশ্চিম জার্মানি বেশ দ্রুতই পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নাৎসী জার্মানির কৃতকর্মের জন্য পশ্চিম জার্মানি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজী হয়। ১৯৫১ সালে চ্যান্সেলর কনরাড অ্যাডিনয়ের বলেন: ‘জার্মান জনগণের নামে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন অপরাধ ঘটনো হয়েছে, যা নৈতিক ও বস্তুগত খেসারত দেয়ার দাবী রাখে।’
ইসরায়েল রাষ্ট্র ও হলোকস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের অর্থ দেওয়া শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। সব মিলিয়ে দেয়া হয়েছে ৭,০০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশী। তবে হলোকস্টের শিকার অনেকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিতে আপত্তি জানিয়েছেন।
বিরোধীরা বিশ্বাস করেন, পশ্চিম জার্মানীর কাছ থেকে ইসরায়েলের অর্থ নেয়ার বিষয়টি অপরাধের জন্য নাৎসীদের ক্ষমা করে দেওয়ার সামিল।
ইহুদি শরণার্থীদের ইউরোপ থেকে ইসরায়েলে পুনর্বাসিত করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেশটিকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। ওই অর্থের একটি অংশ প্রথম দিকে ইসরায়েলকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিলো।
দুঃখিত বলার সংগ্রাম
অন্য অনেক দেশ অবশ্য এতোটা দৃঢ়সংকল্প হতে পারেনি। জাপান যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিভিন্ন আর্থিক প্যাকেজ সম্বলিত চুক্তি সই করেছে, তারপরও নিকট প্রতিবেশী এই দুটো দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রায়ই অবনতি ঘটে।
জাপান যুদ্ধের সময় ‘আগ্রাসী’ ছিলো কি-না, সেই ব্যাপারটিতে স্পষ্ট কোন বক্তব্য না দেয়ার কারণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শিনজো আবে এমন একটি মন্দির পরিদর্শন করেছেন এবং সেখানে অর্ঘ্য পাঠিয়েছেন, যেটি আরও কিছু বিষয়ের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদেরও সম্মানিত করে।
তবে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ওইসব নারীদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে রাজী হয়েছেন, যাদেরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানী সেনারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছে।
আরও অনেক রাজনীতিবিদদের মতো আবে পরস্পরবিরোধী দাবীর মধ্যে সমতা আনতে বেগ পাচ্ছেন, যেখানে দেশের মধ্যে জাতীয়তাবাদী অনুভূতির বিষয়টির দিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে আবার ভালো সম্পর্ক রাখতে হচ্ছে বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও।

Thursday, June 3, 2021

লন্ডন ব্রিজ হামলা: গাজা খাওয়া, যৌন সম্পর্ক করা থেকে যেভাবে ইসলামপন্থী জঙ্গি হয়ে উঠলো খুরাম বাট

খুরাম বাট।
যুক্তরাজ্যে লন্ডন ব্রিজের উপর পথচারীদের উপর লরি উঠিয়ে দিয়েছিল যে তিনজন তরুণ এবং তার পর কাছেরই একটি বাজারে গিয়ে লোকজনকে ছুরি মেরেছিল তাদের নেতা ছিল খুরাম বাট।
দু'বছর আগে, ২০১৭ সালের ৩রা জুন চালানো ওই হামলায় মোট আটজন নিহত এবং আরো ৫০ জনের মতো আহত হয়।
পরে পুলিশের গুলিতে ওই তিন তরুণও প্রাণ হারায় এবং দেখা যায় তারা ভুয়া বিস্ফোরক ভেস্ট পরিহিত ছিল।
রিংলিডার খুরাম বাট তার কিশোর বয়সেও ছোটখাটো নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। তার মধ্যে ছিল গাজা খাওয়াও।
বড় হওয়ার পরেও তার চরিত্রের এসব কিছুই অটুট ছিল বলে নিহতদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের তদন্তে দেখা গেছে।

পাকিস্তান থেকে ব্রিটেনে

খুরাম বাটের জন্ম পাকিস্তানের ঝেলুমে, ১৯৯০ সালে। তার আরো একটি বড় ভাই (সাদ) ও বোন (হালিমা) আছে। তার পিতা আসবাবপত্রের ব্যবসা চালাতেন।
বাটের বয়স যখন মাত্র আট তখন তারা পর্যটক ভিসা নিয়ে ১৯৯৮ সালে ব্রিটেন এসেছিলেন।
এই পরিবারটি বসবাস করতো পূর্ব লন্ডনের ফরেস্ট গেট এলাকায়। তিনটি সন্তানই সেখানকার স্কুলে লেখাপড়া করেছে। এবং তারা সবাই পড়ালেখায় মোটামুটি ভাল ছিল।
পরিবারটি প্রথমে ব্রিটেনে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিল যা প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু পরে ২০০৮ সালে হার্ট অ্যাটাকে পিতার মৃত্যুর পর খুরাম বাটকে ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
স্কুলের পরে সে একটি পিৎজার দোকানে ক্যাশিয়ারের কাজ করতো। পরে সে লন্ডনের ব্যস্ততম শপিং এলাকা অক্সফোর্ড স্ট্রিটে টপশপ নামের একটি দোকানে চাকরি পায়।
তার বয়স যখন ১৮ তখন বন্ধুর পেমেন্ট কার্ড ব্যবহার করে যানবাহনে চড়ার কারণে পুলিশ তাকে প্রথমবারের মতো সতর্ক করে দিয়েছিল।
খুরাম বাটের ফ্ল্যাট।

মাদক ও যৌনতা

কিশোর বয়সে বাট বিভিন্ন ক্লাবে যাওয়া আসা করতো, মাদক গ্রহণ করতো, যৌন কাজেও লিপ্ত ছিল। তখন থেকেই মনে করা হতো সে যেন একজন 'গ্যাংস্টার হয়ে উঠছে।'
আরো পরে, ২০০৯ সালে, সে একটি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। পূর্ণকালীন চাকরি করার সময়েও সে বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো অপরাধমূলক তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে।
২০১০ সালে, তার বয়স যখন ২০, তখন একটি শপিং সেন্টারে দেহরক্ষীর উপর হামলা করার কারণে পুলিশ তাকে দ্বিতীয়বারের মতো সতর্ক করে দেয়।
এর দুবছর পর তার বোন হালিমার বিয়ে হয়ে যায়। ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে তার সাথে হাশিম রহমান নামের এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়। হাশিমের চাচা বাটের পিতার সাথে কাজ করতেন।
এর পর থেকে খুরাম বাট তার সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করে। সেসময় সে ইসলামি বই পড়তে শুরু করে। তখন সে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো।
সেসময় খুরাম বাটের একজন বান্ধবী ছিল। কিন্তু সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় বাট ওই সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়।
হাশিম রহমান পুলিশকে জানিয়েছেন যে ইসলামি বইপত্র পড়ার পর খুরাম বাট অনেক বদলে যায়। শুরুর দিকে সে খুব নরম মনের মানুষ ও বিনয়ী ব্যক্তিতে পরিণত হয়।

বাটের বিয়ে

খুরাম বাট পরে হাশিম রহমানের বোন জারাহকে বিয়ে করে।
ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তার আগ্রহের শুরুর দিকে সে নিয়মিত মসজিদে যেত এবং সেখানে অবস্থান করতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা চরমপন্থি চিন্তাভাবনার দিকে মোড় নিতে শুরু করে।
জারাহর সাথে বিয়ের দিন খুরাম বাট বলেছিল যে তাকে বোরকা পরতে হবে এবং তাকে এমনভাবে থাকতে হবে যাতে একমাত্র সে-ই তাকে দেখতে পারে।
বিয়ের পর খুরাম বাট স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে পাকিস্তান বেড়াতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে আসার পর সে তার স্ত্রীকে নিয়ে একটি বাড়িতে ওঠে যেখানে তার মা এবং ভাই ও ভাই-এর স্ত্রী বসবাস করতো।
খুরাম বাটের ভাই সাদ বলেছেন, তার ভাই নববিবাহিত স্ত্রীকে বাড়িতেও পুরো মুখ ঢেকে রাখার নিকাব এবং হাতে গ্লাভস পরতে বলতো।
খুরাম বাট যখন লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করতো।
"এ থেকেই সব বোঝা যায়। সে সবকিছুই ১০০% করতো। আগে সে যার তার সাথে যৌন সম্পর্ক করতো, অনেক বান্ধবী ছিল, মাদক গ্রহণ করতো। পরে যখন সে ধর্মের দিকে চলে গেল তখনও সেটাও সে ১০০% করতে চাইতো," তদন্তকারীদের কাছে একথা বলেন খুরাম বাটের ভাই।
সাদ বলেন, তার ভাই-এর এই চরমপন্থি মনোভাব তার ভাল লাগতো না। তিনি জানান, সে তার বোনের সাথেও রাগারাগি করতো। সে যখন হিজাব না পরে বাড়িতে আসতো তখনও সে রাগ দেখাতো।
তিনি জানিয়েছেন, বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানের যে ভিডিওতে খুরাম বাটকে নাচতে দেখা যায় সেটা সে তার বোনকে ডিলিট করে দিতে বলেছিল।
পরে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খুরাম বাট তার স্ত্রীকে নিয়ে পূর্ব লন্ডনের বার্কিং এলাকায় এক বেডরুমের ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে চলে যায়।
খুরাম বাট ওই ফ্ল্যাটের হলওয়েতে একটি পর্দা ঝুলিয়ে দেয় যাতে অন্যেরা তার স্ত্রীকে দেখতে না পারেন। "বন্ধুদের সাথেও সে ১০০% কড়া আচরণ করতো। তারা আমাকে দেখুক এটা সে চাইতো না," বলেন খুরাম বাটের স্ত্রী।
তার বাড়িতে প্রায়শই বন্ধুদের আড্ডা বসতো। খুরাম বাটের স্ত্রী তাদের জন্যে রান্না করতেন। পরে স্বামীর বন্ধুরা কখনো কখনো সারা রাত থেকে যেত এবং তিনি শোওয়ার ঘরে ল্যাপটপে টেলিভিশন দেখতে দেখতে বাকি রাত কাটিয়ে দিতেন।

সিরিয়ার যুদ্ধ

তিনি জানান যে ২০১৪ সালে তাদের একটি বাচ্চা হয়। তখন কিছুটা সময় খুরাম বাট বাচ্চাকে নিয়ে থাকতো। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তার সব মনোযোগ চলে যায় সিরিয়ার যুদ্ধের দিকে।
খুরাম বাট যে কেএফসিতে কাজ করতো তার ম্যানেজার জানিয়েছেন যে তারাও তার আচরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। তখন বাট তার মাথা ন্যাড়া করে ফেলে। দাড়ি রাখতে শুরু করে।
বাটের এক সহকর্মী জানান, তার সাথে একবার ব্রিটিশ সৈন্য লী রিগবিকে হত্যার ঘটনা নিয়ে কথা হয়েছিল। সেসময় বাট বলেছিল এটা হচ্ছে "চোখের বদলে চোখ নেওয়ার" মতো প্রতিশোধমূলক ঘটনা।

'খাঁচার বাইরে সিংহের মতো'

খুরাম বাটের স্ত্রী জানান, ২০১৪ সালের শেষের দিকে তার স্বামী অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর কারণে অত্যন্ত পরিচিত আঞ্জেম চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করে।
সেসময় তিনি তার স্বামীকে এধরনের লোকজন থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি জানান যে খুরাম বাট এসব কথা কানেই নিতো না। লোকজনের কথাকে সে পাত্তা দিতো না। সে যা ভালো মনে করতো সেটাই সে করতো।
তিনি আরো জানান যে তার স্বামী পরে মি. চৌধুরীর সাথে দেখা করেন। এর পর থেকে সে ইউ টিউবে মি. চৌধুরীর বক্তৃতা শুনতো এবং একবার সে তাকে বাড়িতেও দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছিল।
ফিটনেস সেন্টারের বাইরে খুরাম বাট। সিসিটিভি ক্যামেরায় তোলা
খুরাম বাটের একজন বন্ধু জানিয়েছেন, আঞ্জেম চৌধুরীর সংস্পর্শে সে খুব 'চাঙ্গা' হয়ে ওঠে। এই বন্ধুটি তাকে "খাঁচার বাইরে থাকা সিংহের" সাথে তুলনা করেন।
ইসলামের প্রতি গভীর আগ্রহের পরেও সে মাদক গ্রহণ ও অন্যান্য ছোটখাটো অপরাধমূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া অব্যাহত রাখে।

'জিহাদি নেক্সট ডোর'

তার আরেক আত্মীয় ওসমান দার ২০১৫ সালে এন্টি-টেররিস্ট হট-লাইনে ফোন করে খুরাম বাটের ব্যাপারে রিপোর্ট করেছিলেন। কারণ ইসলামিক স্টেটের জিহাদিরা যখন জর্ডানের একজন পাইলটকে খাঁচার ভেতরে আটকে তাকে আগুন দিয়ে হত্যা করেছিল তখন খুরাম বাট এই হত্যাকে সমর্থন করেছিল।
বাটের সাথে তার স্ত্রীর বড় রকমের ঝগড়া হয় ২০১৫ সালের শেষের দিকে যখন সে আরো একটি বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেসময় রাগ করে তার স্ত্রী এক মাসের জন্য বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল।
সেসময় চ্যানেল ফোর টেলিভিশনে 'জিহাদি নেক্সট ডোর' নামে একটি তথ্যচিত্র প্রচারিত হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ চরমপন্থির কথা তুলে ধরা হয়। তাতে খুরাম বাটকে দেখা যায় লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক পুলিশের সাথে তর্ক করতে।
বাটের স্ত্রী জানান, তার বাবা মায়ের বাড়িতে অবস্থানের সময় তিনি এই তথ্যচিত্রটি দেখেছিলেন। তার স্বামী তাকে এবিষয়ে কিছু বলেনি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে খুরাম বাটের মধ্যে পশ্চিমা-বিরোধী কড়া মনোভাব গড়ে ওঠে। হোয়াটস্যঅ্যাপে সে শিরশ্ছেদের ভিডিও শেয়ার করতো। এবং মসজিদ থেকেও তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

গোপনে পরিকল্পনা

তার বড় ভাই সাদ বলেন, "পররাষ্ট্র নীতি, যুদ্ধ, বিদেশিদের প্রতি অবিচার এসব বিষয় নিয়ে খুরাম বাট ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল।"
তিনি জানান, এসব নিয়ে তাদের মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝগড়াও হয়েছিল। এবং এরপর থেকে বাট তাদের সাথে সিরিয়া বিষয়ে কথাবার্তা বন্ধ করে দেয়।
সেসময় পরিবারের সদস্যরা মনে করেছিল যে হয়তো বাটের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সে তখন আসলে গোপনে গোপনে সন্ত্রাসী হামলারই পরিকল্পনা করছিল।
এর কয়েক মাস পরেই খুরাম বাট তুরস্কে যাওয়ার টিকেট কাটলে তার স্ত্রীর পরিবার তাদের পাসপোর্ট সরিয়ে নেয়।
বাটের স্ত্রী তার পিতামাতাকে জানান যে তার স্বামী ইসলামিক স্টেটে যোগ দেওয়ার জন্যে তাকে ও তার সন্তানকে সিরিয়াতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে তিনি সন্দেহ করছেন। পরে তার পিতা তাদের ডকুমেন্ট ধ্বংস করে ফেলেন।
হামলায় এই আটজন নিহত হয়।
খুরাম বাট ২০১৬ সালে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে কাস্টমার সার্ভিস সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
তার স্ত্রী ও পরিবার এতে খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই সে অসুস্থতার কথা বলে অর্থ দাবি করতে থাকে।
তার স্ত্রী বলেন, "তার কোন অসুস্থতা ছিল না। আসলে সে কোন কাজ করতে চাইতো না।"
কিন্তু খুরাম বাট তার এক আত্মীয়ের সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সময় তাকে বলেছিল সে এই কাজ করতে চায় না কারণ গ্রীষ্মকালে চারপাশে অনেক নগ্ন নারী চলাফেরা করে।"
পরে তাকে ওই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সেসময় যখন সে বাড়িতে ফিরতো তখন তার গা থেকে গাজার গন্ধ পাওয়া যেত।

কোরান শিক্ষক

খুরাম বাটের স্ত্রী জানান, তার স্বামী যখন অসুস্থতার কথা বলে ছুটিতে ছিল তখন সে একটি ফিটনেস সেন্টারে যেত।
ওই সেন্টারটি যারা চালাতো তাদের একজন পূর্ব লন্ডনের ইলফোর্ড এলাকায় আদ-দ্বীন প্রাইমারি স্কুলের হেডটিচার হিসেবে কাজ করতেন।
খুরাম বাটকে তারা অনুরোধ করেছিল ওই স্কুলে বাচ্চাদের কোরান পড়াতে। সে তখন ছয় থেকে সাতজন বাচ্চাকে পড়াতে শুরু করে। প্রত্যেকদিন দুপুরে সে দু'ঘণ্টা করে পড়াতো। পরে স্কুলটি ২০১৭ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
লন্ডন ব্রিজে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহ আগে খুরাম বাট আরো এক সন্তানের পিতা হন। কিন্তু তার স্ত্রী জানান এসময় স্ত্রী কিম্বা পরিবারের ব্যাপারে বাটের কোন আগ্রহ ছিল না।
তিনি জানান, তার দ্বিতীয় সন্তানের যখন জন্ম হলো তার কয়েক মিনিট পরেই বাট জিমে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছিল।
কিন্তু পরে জানা যায়, হামলায় আরো যারা অংশ নিয়েছিল সেদিন সে তাদের সাথে মিটিং করতে গিয়েছিল।
তার স্ত্রী তাকে বাড়িতে সময় দিতে বারবার অনুরোধ করেছিল কিন্তু খুরাম বাট তাতে কোন কান দেয়নি এবং ২০১৭ সালের ৩রা জুন, শনিবার সে বাড়ি থেকে শেষবারের মতো বের হয়ে গিয়েছিল।
পরিবারের কাউকে বিদায় না জানিয়ে, বাচ্চাদের চুমু না খেয়ে, সেদিন সে বের হয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে।
পরে তার নেতৃত্বে চালানো সেদিনের ওই হামলায় আটজন নিহত হয়।
খুরাম বাট।