Sunday, June 8, 2025
লাল মাংস কি সত্যিই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় by এ কে এম হুমায়ুন কবির
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালির রান্নায় বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে এসব লাল মাংস। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে লাল মাংস তো খেতেই হবে। সারা বছরের তুলনায় এ সময় বরং লাল মাংস খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।
পশু কোরবানির কারণে প্রায় প্রতিটি ঘরে মাংস রান্না হয় এবং অনেকেই একসঙ্গে অনেক পরিমাণে লাল মাংস গ্রহণ করে থাকেন।
অনেকে আবার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে লাল মাংস খেতে ভয় পান বা বেশি খাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে থাকেন।
প্রশ্ন হলো লাল মাংস কি আসলেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়? নাকি এটি কেবল অপব্যবহার ও অতিরিক্ত গ্রহণের ফল? আসুন, বিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
লাল মাংস প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস। এতে রয়েছে আয়রন (বিশেষ করে হিম আয়রন), জিংক, ভিটামিন বি-১২ ও অন্যান্য বি-ভিটামিন।
হিম আয়রন শরীরে সহজে শোষিত হয় এবং রক্তাল্পতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া প্রোটিন আমাদের পেশি গঠনে সহায়তা করে এবং শরীরের বিভিন্ন কার্যাবলি সুষ্ঠু রাখতে অপরিহার্য।
তবে সমস্যা কোথায়? বিপত্তি শুরু হয় অতিরিক্ত বা নিয়মিত ভাজাভুজি, বারবিকিউ অথবা প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস খাওয়া থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস, যেমন সসেজ, সালামি, হটডগ ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া কোলন ক্যানসার, হৃদ্রোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষ করে যখন মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করা হয় (যেমন: গ্রিল, বারবিকিউ বা তেলে ভাজা), তখন এতে হেটারোসাইক্লিক অ্যামাইন এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন নামে দুটি ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়। এই যৌগগুলো দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত।
লাল মাংসে সাধারণত উচ্চমাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি থাকে। এটি শরীরে এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’-এর মাত্রা বাড়ায়, যা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যাঁরা নিয়মিতভাবে লাল মাংস খান, তাঁদের মধ্যে হৃদ্রোগের আশঙ্কা প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বেশি।
সব লাল মাংস কিন্তু সমান নয়। প্রক্রিয়াজাত মাংসে যেমন সসেজ, বেকন, হটডগ ইত্যাদিতে প্রিজারভেটিভ, অতিরিক্ত লবণ ও রাসায়নিক উপাদান যোগ করা হয়, যা ক্যানসার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে তাজা ও স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না করা মাংস তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে কি লাল মাংস একেবারে বাদ? না, একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু পরিমিত এবং সঠিকভাবে গ্রহণ করাই শ্রেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, সপ্তাহে ৩-৪ বার ৭০-১০০ গ্রাম লাল মাংস খাওয়া নিরাপদ। তা–ও হতে হবে কম চর্বিযুক্ত ও স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না করা।
বাংলাদেশে মাংস খাওয়ার প্রবণতা ঈদ কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে অনেকটাই বেড়ে যায়। কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনতে হবে। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার, পরিমিত চর্বি ও লবণ কমানো খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে পারে।
লাল মাংস আমাদের শরীরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস—যেখানে রয়েছে প্রোটিন, আয়রনসহ অনেক উপকারী উপাদান।
তবে এই উপকারী খাবারটি যদি অতিরিক্ত বা ভুল উপায়ে খাওয়া হয়, তাহলে তা পরিণত হতে পারে এক নীরব ঘাতকে—বাড়িয়ে দিতে পারে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ক্যানসারের ঝুঁকি। তাই আতঙ্ক নয়, চাই সচেতনতা।
কোরবানির সময় লাল মাংস পুরোপুরি বাদ না দিয়ে; বরং পরিমিত পরিমাণে এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করে খাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
কোমল, রসালো, চর্বিহীন ও নিরাপদভাবে প্রস্তুত মাংস শরীরের পুষ্টিচাহিদা পূরণে যেমন সহায়ক, তেমনি সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবনের পথেও এগিয়ে রাখে। তাই এবারের কোরবানিতে হোক অঙ্গীকার—পরিমিতি, সচেতনতা আর পুষ্টির মধ্য দিয়ে গড়ে তুলি স্বাস্থ্যকর জীবন।
* ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (ডেইরি অ্যান্ড পোলট্রি সায়েন্স) এবং পরিচালক, পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। akmhumayun@cvasu.ac.bd
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
![]() |
| লাল মাংস আমাদের শরীরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস—যেখানে রয়েছে প্রোটিন, আয়রনসহ অনেক উপকারী উপাদান। ফাইল ছবি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বিশ্ব যখন চুপ, গাজার ঈদ তখন আর্তনাদে ভরা
গাজার অলিগলিতে এখন রক্তের স্রোত, কান্নার প্রতিধ্বনি, ধ্বংসস্তূপ আর ব্যথার চিৎকার। যেসব শিশুরা নতুন জামা পরে ঈদগাহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তারা আজ কেউ হাসপাতালের বারান্দায়, কেউবা ধ্বংসস্তূপের নিচে নিথর দেহ। ঈদের নামাজ পড়ার মতো জায়গাও নেই অনেক এলাকায়, কারণ ঈদগাহগুলোই আর অস্তিত্বে নেই- সেগুলো আজ কেবল ধূলোমলিন স্মৃতি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বজুড়ে, এই হত্যাযজ্ঞের দায় কার? শুধু কি দখলদার বাহিনীর? নাকি সেই সব ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর, যারা মানবাধিকারের বুলি কপচায়, কিন্তু বাস্তবে নিরবতা পালন করে? যারা অস্ত্র বিক্রি করে আগুন জ্বালায়, পরে শান্তির অভিনয় করে? কিংবা সেইসব মুসলিম রাষ্ট্রনেতাদের, যারা গাজায় হত্যাযজ্ঞের সময় নীরব থাকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য?
গাজার ঈদের বাস্তবতা দেখে চোখ ভিজে যায় বিবেকবানদের। ড. হানান আশরাওয়ি বলেন, ‘প্রতি ঈদেই গাজা কাঁদে, আর বিশ্ব থাকে নীরব। এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় সহিংসতা।’
আর্চবিশপ দেশমন্ড টুটু ফাউন্ডেশন বলেছে, ‘একটি ধর্মীয় উৎসবে যখন শিশুর কান্না, ধ্বংসস্তূপে প্রার্থনা আর পবিত্র দিনে বোমা পড়ে- তা শুধু অন্যায় নয়, বরং ঈশ্বরকেও অশ্রদ্ধা।
মার্কিন অধিকারকর্মী কোরনেল ওয়েস্টের মতে, ‘এই রক্তভেজা ঈদ আমাদের সকলের বিবেকের পরীক্ষা। কেউ কোরবানি দেয় আত্মশুদ্ধির জন্য, আর কেউ মানুষ হত্যা করে দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য।’
এই পরিস্থিতিতে এক শিশু যখন জিজ্ঞেস করে- ‘আমার বাবা-মায়ের রক্তের দায় কে নেবে?’-তখন কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বিশ্ব ব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়।
আমরা যারা প্রতিদিন গাজাবাসীর রক্তমাখা ছবি দেখে চোখ ফিরিয়ে নিই, ভাবি ‘আমার তো কিছু করার নেই’ -আমরাও কি দায়মুক্ত?
এই দায় কারও একার নয়- এই দায় ছড়িয়ে আছে প্রতিটি শক্তিধর রাষ্ট্রের নিরবতায়, প্রতিটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বে এবং প্রতিটি নিঃশব্দ মুসলিম নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তায়।
ঈদের দিনে এমন এক প্রশ্ন জেগে ওঠে, যা তাকবিরের আওয়াজকেও ছাপিয়ে যায় : ‘আর কত ঈদ আসবে যেখানে কেউ বুক চাপা কান্না লুকাবে, আর কেউ কবরস্থানে প্রিয়জন খুঁজবে?’
এই দায়ের হিসাব একদিন ইতিহাসই করবে- আর সেই দিন নীরবতার মুখোশ পরা সবাইকে জবাব দিতে হবে।
![]() |
আপনজনের কবরের পাশে নিঃশব্দে বসে গাজার এক ফিলিস্তিনি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ঈদেও গাজায় থেমে নেই ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো চাঁদ দেখা সাপেক্ষে শুক্রবার কোরবানির ঈদ উদ্যাপিত হয় অবরুদ্ধ গাজায়। এ নিয়ে টানা চতুর্থ ঈদ ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে কাটিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা।
হাসপাতাল সূত্রগুলো জানায়, ঈদের দিন ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজায় ৪২ জন নিহত হন। এর মধ্যে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় এক হামলায় নিহত হয়েছেন ১১ জন। এ ছাড়া গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে সাত ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
ঈদের পরদিন শনিবার সকাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আরও ৬৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজা নগরীর সাবরা এলাকায় এক হামলার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ জন। গাজার জরুরি পরিষেবা বিভাগ ‘সিভিল ডিফেন্স’ এ তথ্য দিয়েছে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় সাড়ে ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
জরুরি পরিষেবা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, সাবরা এলাকায় এক হামলায় নিহত ১৬ জনের মধ্যে ছয় শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় ৫০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ৮৫ জন বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ওই ভবনে আঘাত হানলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানান জরুরি পরিষেবা বিভাগের মুখপাত্র। এ ঘটনাকে ‘পুরোপুরি হত্যাযজ্ঞ’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একেবারে সীমিত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে জরুরি পরিষেবা বিভাগ।
ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’
এদিকে শনিবার সকালে ত্রাণের জন্য জড়ো হওয়া ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর আবারও গুলি চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। রাফাহ এলাকার একটি ত্রাণকেন্দ্রের কাছে সংঘটিত এ ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। নাসের হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। আগের দিনও ওই এলাকায় ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে সাত ফিলিস্তিনি নিহত হন।
অবশ্য জরুরি পরিষেবা বিভাগের বরাত দিয়ে গতকাল সকালে ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ছয়জন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি পরিচালিত ‘গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ)’ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে আল-আলম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মে মাসের শেষ দিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে তিনটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করে বিতর্কিত জিএইচএফ। এর পর থেকে ত্রাণকেন্দ্রের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আল-আলম এলাকায় ত্রাণের আশায় নিয়মিত জড়ো হন ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিরা।
সকালে ঘটনাস্থলে থাকা সামির আবু হাদিদ এএফপিকে বলেন, কয়েক হাজার মানুষ সেখানকার একটি মোড়ে জড়ো হন। যখনই তাঁরা ত্রাণকেন্দ্রের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন, তখন সাঁজোয়া যান থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে ইসরায়েলি সেনারা।
আল-আলম ত্রাণকেন্দ্রের কাছে গুলির বিষয়ে জানতে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে এএফপি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত ২৭ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত ফাউন্ডেশনটির ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে গুলিতে এ নিয়ে ১১৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রাণহানির কারণে কয়েক দফা ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাবা আল-জাজিরাকে বলেন, সম্প্রতি গঠিত জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলো এক ধরনের ‘ফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।
আমজাদ শাবা বলেন, উত্তর গাজার বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত করে দক্ষিণে নিয়ে আসার ইসরায়েলি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে এ বিতর্কিত ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ জন্য উত্তর গাজায় কোনো ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়নি, যাতে সেখানকার বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটে ত্রাণের জন্য দক্ষিণে আসেন।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাগুলোর পরিবর্তে জিএইচএফের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এদিকে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গাজার শতভাগ মানুষ মারাত্মক পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে রয়েছেন। চরম অপুষ্টির কারণে ৭০ হাজার শিশুর জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসার প্রয়োজন।
এদিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস এলাকা থেকে একজন থাই জিম্মির মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তাঁকে গাজায় ধরে নিয়ে যায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা।
![]() |
| ঈদের দিন স্বজনের কবর জিয়ারতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এক ফিলিস্তিনি নারী। শুক্রবার মধ্য গাজার নুসেইরাত এলাকায়। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সেকালের ‘বকরি ঈদ’: সমাজ, সাহিত্য ও সাময়িকীতে প্রতিধ্বনি by হোসাইন মোহাম্মদ জাকি
কবিতার পঙ্ক্তিতে (এম. করিম–এর ‘কার ঈদ’) এমনিভাবে প্রকাশ পেয়েছে বকরি ঈদের জন্য বাঙালি মুসলমানের উন্মুখ প্রতীক্ষা। ‘ঈদুজ্জোহা’, ‘ঈদ-উল-বকর’ বা ‘ঈদ-উল-আযহা’ তথা কোরবানির ঈদ সামাজিক ইতিহাসের পরতে পরতে ‘বকরি ঈদ’ নামে অভিহিত। ‘বকরিদ’ বা ‘বকর ঈদ’ নামেও পরিচিত এই ঈদ। পত্রিকা, সাময়িকী ও সরকারি নথিপত্রে ‘ঈদ-উল-আদহা’ নামেও আখ্যায়িত হয়েছে কোরবানির ঈদ। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আরব বণিকেরা যখন এ দেশে আসতে শুরু করলেন তখন ঈদুল আজহার সময় তাঁরা বকরি (ছাগল) কোরবানি দিতেন বলে ‘ঈদুল আজহা’, ‘বকরি ঈদ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত পায়।
জেমস টেলরের বিবরণ অনুযায়ী, ১৮৩৮ সালে ঢাকা শহরের বণিকদের মধ্যে হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন; মুসলমান ও খ্রিষ্টান ছিলেন মাত্র চার-পাঁচজন করে। সে সময় আজকের মতো প্রতিটি ঘরে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য মুসলমান সমাজে ছিল না। অধ্যাপক আবদুল গফুর তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘আমার কালের কথা’য় লিখেছেন, ‘কোরবানির ঈদ বা অন্য কোন বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া সাধারণত গরু বা বকরি জবাই করা হতো না। হাট–বাজারে গরু বা ছাগলের মাংসও এভাবে বিক্রি হতো না তখন। বাড়িতে মেহমান এলে সাধারণত মুরগী জবাই করেই তাদের আপ্যায়ন করা হতো।’
হিন্দু জমিদারপ্রধান এই অঞ্চলে গরু কোরবানি নিয়ে একটি বৈরী মনোভাব বিদ্যমান ছিল। ফলে মুসলমানদের প্রায়ই ছাগল (বকরি) কোরবানির দিকেই ঝুঁকতে হতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব তখন ততটা গুরুত্ব পেত না। তার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ১৮৯০ সালের ঢাকা প্রকাশ-এ ছাপা সরকারি ছুটির তালিকায়—যেখানে হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিষ্টান—এই তিন সম্প্রদায়ের জন্য ঘোষিত মোট ১৮ দিনের ছুটির মধ্যে মুসলমানদের ভাগে এসেছিল মাত্র ৩ দিন: মহররম উপলক্ষে দুই দিন এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে এক দিন।
উনিশ শতকের সাহিত্য ও সংবাদপত্র থেকেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মুসলমানদের গরু কোরবানি করতে কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো। সুফিয়া আহমেদের ‘বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়’ (১৮৮৪–১৯১২) গ্রন্থ থেকে জানা যায়, প্রায় প্রতিবছরই ঈদুল আজহার সময় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লেগে যেত, যার ফলে উভয় সম্প্রদায়েরই প্রাণহানি ঘটত। ১৮৮২ সালে দয়ানন্দ সরস্বতী গো-রক্ষা আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে হিন্দু জনগণকে আহ্বান জানানো হয়, যেন তাঁরা হাটবাজারে মুসলমান কসাইদের কাছে গরু বিক্রি না করেন। পাশাপাশি হিন্দু জমিদারদের অনুরোধ করা হয় যাতে তাঁরা নিজেদের জমিদারিতে গরু জবাই বন্ধ করেন। এই আন্দোলনে হিন্দু সমাজের উচ্চবর্গের একটি অংশের সক্রিয় সমর্থন ছিল।
এমনকি ১৮৮৭ সালে রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার রাজা শশী শেখরেশ্বর রায় কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে গো-হত্যা নিষিদ্ধের প্রস্তাব আনতে চেয়েছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত তা গৃহীত হয়নি। The Moslem Chronicle পত্রিকায় ১৬ মে, ১৮৯৬-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গো-রক্ষা আন্দোলনের একদিকে ছিল হিন্দুধর্মীয় পুনর্জাগরণের প্রবণতা, অন্যদিকে ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য—মুসলমানদের কংগ্রেসের অধীনে আনার কৌশল। পত্রিকাটি আরও অভিযোগ তোলে যে গরু কোরবানিকে কেন্দ্র করে অনেক হিন্দু জমিদার মুসলমান কৃষকদের ওপর অত্যাচার চালাতেন। তাদের ভাষায়:
‘Day after day, cruelties and oppressions are perpetrated on the helpless Mussalman cultivators by Hindu Zamindars in connection with the killing of cows, which would fill the darkest chapters in the most sensational novels.’
এই গো-রক্ষা আন্দোলন সাহিত্যে নতুন মাত্রা নেয়। গো-হত্যার বিপক্ষে মত প্রকাশ করে মীর মশাররফ হোসেন রচনা করেন ‘গো-জীবন’ গ্রন্থ। মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’-এর (১৮৮৯) প্রতিবাদে মৌলভী নইমুদ্দীন রচনা করেন ‘গো-কান্ড’ (১৮৮৯)। বাদ-প্রতিবাদ শেষে তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মীর মশাররফ হোসেনের ‘গো-জীবন’ গ্রন্থের প্রতিবাদে সে সময় বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়। তন্মধ্যে অন্যতম একটি রচনা হলো রেয়াজুদ্দীন মাশহাদীর ‘অগ্নিকুক্কুট’ (১৮৯০)।
‘অগ্নিকুক্কুট’–এর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে ১২৯৬ সালের ৩ ফাল্গুন সুধাকর পত্রিকায় লেখা হয়—‘গরু কোরবানি ও গো-মাংস ভক্ষণ মোসলমানের সামাজিক কার্য, উহা লইয়া হিন্দুগণ মোসলমানদের প্রতি অত্যাচার করেন, তাহার কারণ কি এবং সেই অত্যাচার নিবারণের উপায় কি, তৎ সমুদয় এই পুস্তকে দেখান হইয়াছে। ইহার প্রথম অংশে যুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ, দ্বিতীয় অংশে শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ ও তৃতীয় ভাগে হিন্দুদিগের বেদ-সংহিতার ভূরি ভূরি প্রমাণে পরিপূর্ণ।’ যাহোক, মশাররফ-নইমুদ্দীনের মামলার নিষ্পত্তি হলেও গো-হত্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে বিশ শতকের পুরো প্রথমার্ধ।
অমিতাভ চক্রবর্তীর লেখা ‘সাম্প্রদায়িকতা: উৎস ও প্রসার’ গ্রন্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে আজমগড়ে ‘বকর ঈদ’ উপলক্ষে ব্যাপক দাঙ্গা হয়। দাঙ্গা পূর্ব-উত্তর প্রদেশ, বিহার, বোম্বাই (মুম্বাই), জুনাগড় হয়ে রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে কোরবানিকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটত, তা প্রতিরোধ এবং মুসলমানদের নির্বিঘ্নে কোরবানি দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে আহসান মঞ্জিলের নওয়াবরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত ঢাকা প্রকাশ পত্রিকার তথ্যমতে, ৩০ ডিসেম্বর ১৮৭৯ থেকে ১ জানুয়ারি ১৮৮০ পর্যন্ত ঢাকায় সাধারণ জনগণের জন্য একটি গো ও মেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
সেই প্রদর্শনীতে নবাব সাহেবের জমিদারির একটি উৎকৃষ্ট জাতের ষাঁড়ের মূল্য ছিল ২৫ টাকা। ঈদুল আজহার তারিখ নির্ধারণে দিল্লি থেকে বার্তা আসত, যা ঢোল পিটিয়ে শহরে প্রচার করা হতো। তবে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে মতবিরোধও ছিল, যার উল্লেখ পাওয়া যায় গবেষক অনুপম হায়াত সম্পাদিত ‘নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে। তিনি ১৯২২ সালের ৩ আগস্টের একটি দিনলিপি উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে দেখা যায়, সে বছর ঢাকায় দুই দিন—শুক্র ও শনিবার—ঈদ উদ্যাপিত হয়েছিল। ওই গ্রন্থেই ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালের ঈদুল আজহার দিনলিপিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৯২৩ সালের ২৫ জুলাইয়ের দিনলিপিতে লেখা রয়েছে—‘খাজা মওদুদ আজ হোসেনী দালান এলাকার গরুর হাটে যান। সেখান থেকে ২৫ টাকা দামে একটি গরু কিনেন কোরবানীর জন্য।’ ১৯২৪ সালের ১৪ জুলাইয়ের দিনলিপিতে উল্লেখ—‘আজ ঈদুল আজহা। খাজা মওদুদ লালবাগ মসজিদে নামাজ পড়েন।’ ঈদের জামাত বিষয়ে ষাটের দশকের তথ্য পাওয়া যায় ১৯৬৭ সালের ২০ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। তাতে পুরান ঢাকার ঈদ জামাতের বর্ণনা রয়েছে, বিশেষ করে লালবাগ শাহি মসজিদ, বকশীবাজার, গেণ্ডারিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জামাতগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়।
যদিও কয়েক শতাব্দী ধরে বাঙালি মুসলমানরা ঈদ উদ্যাপন করে আসছে, তবু ঈদকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত ঘটে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে। ঈদকে কেন্দ্র করে সাহিত্য প্রকাশের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে গড়ে ওঠে ‘ঈদসংখ্যা’। ঈদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং সময়ের ভাবনার ছাপ মেলে এসব বিশেষ সংখ্যায়। ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পল্লী বান্ধব প্রকাশ করে একটি কোরবানি সংখ্যা, যা ছিল ঈদুল আজহাকে ঘিরে প্রথমদিককার সাহিত্যিক প্রয়াসগুলোর অন্যতম। সংখ্যাটির শিরোনাম ছিল—‘ধ্বনি ওঠে রণি দূর বাণীর—/ আজিকে গরু-ভেড়া কোরবানীর/ হত্যা যে নয় সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন!/ দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামাখা ক্ষুব্ধ মন!!’ পরবর্তী সময়ে ঈদসংখ্যা হয়ে ওঠে সাহিত্যিক সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৮৪ সালের সেপ্টেম্বরে সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রকাশ করে ‘ঈদ-উল আজহা’ সংখ্যা, যেখানে ঈদকে কেন্দ্র করে সামাজিক বাস্তবতা ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্র উঠে আসে জনপ্রিয় চরিত্র ‘টোকাই’-এর মাধ্যমে। শিল্পী রফিকুননবী (রনবী) নির্মিত এই মুখপাত্র টোকাই ঈদের সময় গরু কেনাবেচা এবং এর সামাজিক প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সবচেয়ে বেশি দামে কেনা গরুর মালিককে ঘিরে টোকাইয়ের বিদ্রূপে ঈদের বাজারব্যবস্থা ও ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির এক তীক্ষ্ণ সমালোচনা মেলে।
বিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা সাহিত্য ও আত্মজীবনীমূলক রচনায় কোরবানির ঈদ ঘিরে স্মৃতিচারণার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী (১৮৬৩–১৯২৯) রচিত ‘ঈদুল আজহা’ গ্রন্থে রয়েছে তাঁর ইমামতিতে ধনবাড়ীর ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায়ের একটি বিশদ বিবরণ। আধ্যাত্মিক সাধক খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ্ তাঁর ‘ভক্তের পত্র’ গ্রন্থের ৬৬ নম্বর চিঠিতে (আগস্ট ১৯২১) ঈদের দিনকার অনুভূতি বর্ণনা করেছেন গভীর আবেগে—‘আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। সকলেই মহোৎসবে উৎফুল্ল। আমি কেবল মজরেম হইয়া স্বীয় অন্ধকারে আচ্ছন্ন...’ এই আত্মমগ্ন ভাবনাগুলো ঈদের বহুমাত্রিক মানবিক অভিঘাতকে স্পষ্ট করে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’তে ১৯৪০-এর দশকের কোরবানি ঈদের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, ‘বকরিদে আমরা প্রতিবছর কোরবানি দিতাম না—মাঝে মাঝে তা বাদ পড়তো—ভক্তির অভাবে অতোটা নয়, যতোটা সামর্থ্যের অভাবে।’ এই বিবৃতি ঈদের সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য করে তোলে।
চল্লিশের দশকের সমাজব্যবস্থায় কোরবানি ঈদের যে সামাজিক ও ধর্মীয় স্বরূপ ছিল, তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আহাম্মদ ফজলুর রহমান রচিত ১৯৪৯ সালের গল্প ‘এক টুকরা জমি’তে। গ্রন্থটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘গ্রামের কোনো বাড়িতে বিয়ের বিষয়ে গ্রামের পক্ষ থেকে কথা বলার দায়িত্ব থাকত মুন্সি বংশের প্রধান ব্যক্তির উপর। তাঁর অনুমোদন ছাড়া কোনো বিবাহ সম্পন্ন হতো না—তিনি অস্বীকৃতি জানালে সেই সম্পর্ক ভেঙে যেত। ঈদ-উল-আজহার দিন, অর্থাৎ বকরির ঈদে, পুরো গ্রামের কোরবানির গরু ও খাসিগুলি গ্রামের উত্তরে মুন্সি সাহেবদের বাড়ির কিছুটা দূরের একটি খোলা জায়গায় জবেহ করা হতো। মুন্সি সাহেব নিজে একটি চৌকি নিয়ে সেখানে বসতেন। গ্রামের কে কে কোরবানি দিচ্ছেন না—সে খবর তিনি আগেই জেনে রাখতেন। প্রতিটি পশু জবাইয়ের পর সেখান থেকে খানিকটা মাংস মুন্সি সাহেবের সামনে হাজির করা হতো। বাকি মাংস তিনি নিজেই শরিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার দায়িত্ব নিতেন।’ এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে কোরবানি শুধু ধর্মীয় নয়, সমাজকাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত ছিল। মুসলমান সমাজে কোরবানির এই সামাজিক মাহাত্ম্য ও সম্মিলনী চরিত্র আজও অনেকাংশে অটুট রয়েছে।
তখনকার সময়ে আজকের মতো ঘরে ঘরে রেডিও ছিল না। শুধু অভিজাত পরিবার কিংবা বিখ্যাত কিছু দোকানে রেডিও দেখা যেত। তখন ভারতবর্ষের সব রেডিও স্টেশনের পাক্ষিক অনুষ্ঠানসূচি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হতো The Indian Listener নামের একটি ম্যাগাজিনে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটি কেন্দ্র ছিল ঢাকায়, যার অবস্থান ছিল নাজিমুদ্দিন রোডে—বর্তমানে যেখানে বোরহানউদ্দিন কলেজ অবস্থিত। সর্বভারতীয় এই রেডিও নেটওয়ার্কের পাক্ষিক অনুষ্ঠানসূচিতে ঢাকা ছাড়াও কলকাতা ও বোম্বে কেন্দ্রের ঈদুল আজহার অনুষ্ঠান স্থান পেয়েছে। ১৯৩৮ সালের The Indian Listener-এর ২২ জানুয়ারি সংখ্যায় দেখা যায়, আসন্ন ঈদুল আজহা (১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮) উপলক্ষে বিশেষ রেডিও অনুষ্ঠানের আয়োজন রাখা হয়েছিল, যেখানে কাসিদার পরিবেশনা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। সে সময়কার সংগীতজগতে রাজত্ব ছিল আব্বাসউদ্দীন, কমলাবালা, রাধারানী, হরিমতী, ইন্দুবালা ও আঙ্গুরবালাদের মতো খ্যাতনামা শিল্পীদের। নজরুলের গজল গাইতেন রাধারানী ও হরিমতী আর কমলাবালার ভজন গান ছিল শ্রোতাদের পরম প্রিয়। ঈদ উপলক্ষে আয়োজিত কাসিদার আসর মাতানোর দায়িত্ব ছিল এই তিনজন—রাধারানী, হরিমতী ও কমলাবালার ওপর।
ভাষাসংগ্রামী মাহবুব উল আলম চৌধুরী ‘স্মৃতির সন্ধানে’ গ্রন্থে ঈদের স্মৃতিচারণা করেছেন মানবিক মমত্ববোধ দিয়ে—‘প্রতি বছর যখন আমাদের বাড়িতে কোরবানির জন্য গরু কেনা হয়, তখন খুব যত্ন করে তাকে খাওয়ানো হয়। নানি বলতেন, গরু নাকি আগের দিন স্বপ্ন দেখে যে পরের দিন তাকে কোরবানি দেওয়া হবে। আমি গরুর পাশে গিয়ে তার চোখের জল মুছে দিতাম।’ এ যেন এক শিশুমন থেকে উৎসারিত গভীর ভালোবাসা। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ‘অন্য জীবন’-এ কোরবানির সময়কার রুটির বর্ণনা দিয়েছেন এক প্রাঞ্জল গৃহস্থালি চিত্রে—ধবধবে পাতলা, রসুনের খোসার মতো সাদা রুটি, হালুয়া-সেমাই-ফিরনির সুবাসে ভরপুর ঈদের সকাল।
১৯৬১ সালে শিলচরের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে ঈদুল আজহার সব আমোদ-প্রমোদ বর্জনের যে নজির পাওয়া যায়, তা ঈদের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটি উন্মোচন করে। ধর্মীয় আচার ও জাতীয় শোক একাকার হয়ে উঠেছিল তখনকার ঈদে। সমাজ ও সাহিত্যের পাশাপাশি কোরবানির চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে সমকালীন কবিতায়ও। নজরুল ইসলামের ঈদবিষয়ক কবিতা, গান ও গজলে ঈদের আত্মত্যাগ ও সাম্যের বাণী বারবার ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর কাব্যিক আহ্বান—
‘ঈদজ্জোহার চাঁদ হাসে ঐ এলো আবার দুস্রা ঈদ।
কোরবানী দে কোরবানী দে শোন্ খোদার ফরমান্ তাকীদ্।’
—ঈদকে কেবল ধর্মীয় নয়, সমাজ সংস্কার ও আত্মোৎসর্গের আহ্বানে পরিণত করে।
ঈদুল আজহা উদ্যাপনে পুরান ঢাকার মানুষের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির এক গৌরবময় ধারা। ঢাকার একজন প্রথিতযশা শিল্পপতি ও আদি বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার সাত দশকে’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন সেই সময়ের ঈদ উদ্যাপনের চিত্র। তিনি লিখেছেন, ‘ঈদের তিন-চার দিন আগে থেকে দাবড়ে বেড়াতাম পুরো মহল্লায়, কে কত বড় আর কত সুন্দর গরু কিনল দেখার জন্য। ঈদের নামাজের পরই ছোটাছুটি শুরু হয়ে যেত আমাদের—কোন গরুকে কিভাবে ফেলা হলো, কোন গরুকে ফেলতে কত কষ্ট হলো, কোন গরুকে তিন-চারবার ফেলার পরও উঠে দাঁড়িয়ে গেল—এসব দেখার জন্য। বাবা যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন দুটি করে বড় গরু কোরবানি হতো আমাদের বাড়িতে প্রতিবছর। ঈদে আমরা কখনো খাসি বা বকরি কোরবানি করতাম না, ষাঁড় কোরবানি করতাম। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথমবার কোরবানি দিই ১৯৫৩-৫৪ সালে, ১৫-১৬ বছর বয়সে। ভাড়া করা গাড়িতে গিয়েছিলাম ফতুল্লার হাটে। যতটুকু মনে পড়ে, ৬০-৬৫ টাকা দিয়ে একটি ষাঁড় কিনেছিলাম। চারজন লোক ভাড়া করেছিলাম। ওরা ফতুল্লা থেকে ষাঁড়টা নিয়ে আসে আমলীগোলায়। মাংস হয়েছিল সাত থেকে আট মণ। কোরবানি দিতাম সাধারণত ঈদের পরদিন।’
ঈদের আনন্দময় স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোরবানির চামড়া সংগ্রহের এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও। ১৯৬৫ সালের ১২ এপ্রিল দৈনিক আজাদ পত্রিকায় লালবাগ শাহি মসজিদের পক্ষে চামড়া সংগ্রহের একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়—যা তখনকার সমাজে এই অনুশীলনের শিকড়গাঁথা প্রমাণ করে। কোরবানির সময় চামড়া দান ছিল শুধু ধর্মীয় কর্তব্য নয়; বরং তা সামাজিক সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করার একটি সম্মিলিত প্রয়াস হয়ে উঠত। একসময় এটি ছিল এক গভীর সামাজিক আবেগ ও সম্প্রীতির বহিঃপ্রকাশ। আজ হয়তো সেই দৃশ্য অতীতের মতো বর্ণিল ও জোরালো নয়, তবু কোরবানির চামড়া সংগ্রহ এখনো আমাদের সামাজিক পরিসরে এক চলমান ঐতিহ্য হিসেবে টিকে রয়েছে।
একালে ঈদকে ঘিরে শহরের রাস্তাঘাটে, খোলা মাঠে গরুর হাট বসে ব্যাপক আয়োজন নিয়ে—কিন্তু সেকালের ঢাকা ছিল অনেক শান্ত, সুশৃঙ্খল ও সীমিত পরিসরে ঘেরা। জনসংখ্যা যেমন কম ছিল, তেমনি কোরবানির পশুর সংখ্যাও ছিল সীমিত। নির্দিষ্ট কিছু জায়গায়—যেমন রহমতগঞ্জ, গাবতলী, সোয়ারীঘাট, জিঞ্জিরা ও বাবুপুরা (নীলক্ষেত) ময়দানে গরুর হাট বসত। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ঢাকার নবাব আবদুল গণির নামে খ্যাত রহমতগঞ্জের হাট, যা লোকমুখে পরিচিত ছিল ‘গণি মিয়ার হাট’ নামে। এই হাটের প্রচারে ছিল এক আলাদা আকর্ষণ। ঢুলিয়ারা শহরজুড়ে ঢোল পিটিয়ে ডাক দিত—‘ধার করো, কর্জ করো, গণি মিয়ার হাট করো’। একধরনের উৎসবমুখর ছন্দেই জমে উঠত হাট। এই হাটে মুন্সীগঞ্জ জেলার বিখ্যাত মীরকাদিম বাজার থেকে আসত মোটাতাজা, সাদা ও স্বাস্থ্যবান গাই গরু—যার কদর ছিল সেই সময়ের ঢাকাবাসীর কাছে অপরিসীম। এখনো এসব গরুর প্রতি আগ্রহ একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। বিত্তবান ও ব্যবসায়ীরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসতেন এই উৎকৃষ্ট মানের গরু কিনতে। গরুগুলো পালন হতো বিশেষ যত্নে—নিয়মিত খাওয়ানো হতো উন্নত খাদ্য যেমন খৈল, ভুসি, খুদ আর কুঁড়া। এই সুনিবিড় পরিচর্যার ফলেই মীরকাদিমের গরুর মাংস হয়ে উঠত অতুলনীয়ভাবে সুস্বাদু ও কোমল।
ঈদের স্মৃতিচারণায় এক গভীর মানবিকতা ও পারিবারিক উষ্ণতা ফুটে ওঠে বিশিষ্ট নাট্যকার সাঈদ আহমদের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘জীবনের সাতরং’-এ। তিনি লিখেছেন—
‘কোরবানির পশু জবাই করার সময় আমরা সবাই গোল হয়ে হুজুর কর্তৃক জবাই করার দৃশ্য দেখতাম। এরপর কসাইয়ের দল ব্যস্ত হয়ে পড়তো কোরবানির পশু-চামড়া ছাড়াতে এবং মাংস কাটতে। আমরা এসব দৃশ্য খুবই উপভোগ করতাম। অতঃপর জবাইকৃত গরু-খাসির মাংসের কিছু অংশ আত্মীয় এবং গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। আমাদের মধ্যে ঈদে বড়দের সালাম করার ধুম পড়ে যেত। এর বড় আকর্ষণ ছিল ঈদী পাওয়া। চার আনা, আট আনা আর এক টাকা হলে তো কথাই নেই! ...ঈদের দিন পাড়া-প্রতিবেশী বিশেষ করে পাড়ার নিম্নবিত্ত মানুষদের বাবা সসম্মানে বাড়ি ডেকে নিয়ে আসতেন। এই খাওয়ার পর্ব চলত রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অনেকে আসত কোরবানির গরুর মাংস নিয়ে। আমরাও যেতাম আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় কোরবানির মাংস নিয়ে।’
এই পারিবারিক আন্তরিকতা ও প্রতিবেশীসুলভ সম্প্রীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ধর্মীয় আচরণেরও এক সূক্ষ্ম পরম্পরা। বংশাল এলাকার বাসিন্দা হাসমত আরা বেগম স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন—
‘মুসলিম গার্লস স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে আমি ম্যাট্রিক পাস করি। আমাদের পরিবারে কোরবানির ঈদের অনুষঙ্গ হিসেবে জিলহজ মাসের দুটি নফল রোজা রাখা এবং নিয়ম মেনে “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ” দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে। ঈদের খাবার আয়োজনে থাকে কাবাব, কোপ্তা, সুরুয়াসহ আরো বিবিধ।’
এসব স্মৃতিচারণায় ধরা পড়ে একসময়কার ঢাকার কোরবানি ঈদের অনাড়ম্বর অথচ গভীর আন্তরিকতায় ভরা রূপ। গরু কেনা, তাকে যত্নে রাখা, নামাজ শেষে আত্মত্যাগের স্মারক সেই পবিত্র জবাই আর এরপর আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের সঙ্গে মাংস ভাগ করে নেওয়ার যে উষ্ণতা—সব মিলিয়ে ঈদ ছিল এক আবেগঘন সামাজিক সম্প্রীতির উৎসব। এই স্মৃতিগুলো শুধুই অতীত নয়, বরং তা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরিত হওয়া ধর্মীয় অনুভূতি, পারিবারিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। এই ঐতিহাসিক স্মরণ যেন কেবল স্মৃতিমেদুরতায় আবদ্ধ না থাকে, বরং আজকের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্যেও সেই আন্তরিকতা, সাম্যবোধ ও আত্মত্যাগের মূল শিক্ষা জাগ্রত রাখার প্রেরণা হয়ে ওঠে।
সাহিত্য ও স্মৃতিচারণা থেকে এবার চলি কবিতার ছন্দে, যেখানে কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং হয়ে উঠেছে আত্মত্যাগ, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতীক। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় ঈদের এই ভাবনা যেমন এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল, তেমনি তাঁর সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুপ্রাণিত করেছিল বহু কবি-সাহিত্যিককে। ১৯৬৭ সালে কবি মোহাম্মদ আয়ূব খান তাঁর ‘খঞ্জর’ কাব্যে লিখেছিলেন—
‘খুসীতে জগত ভরিয়ে গিয়েছে
এসেছে বকর ঈদ্,
খঞ্জর হাতে দাঁড়িয়েছে খোদা
কোর্ব্বান দিতে হৃদ।’
এই পঙ্ক্তিতে ঈদুল আজহার গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য যেমন ধরা পড়ে, তেমনি প্রকাশ পায় আত্মত্যাগের এক প্রতীকী রূপ। মূলত ১৯৪৭-এর পর, পাকিস্তান পর্বে ঈদুল আজহা এই অঞ্চলে ধীরে ধীরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপিত হতে থাকে। তবে তখনো সাধারণ মানুষের সামর্থ্য সীমিত ছিল; কোরবানি ছিল অধিকাংশের নাগালের বাইরে। ঈদের মাংস মানেই ছিল বিতরণের মাধ্যমে পাওয়া এক টুকরা গো-মাংসের স্বাদ—সেই স্বাদ ছিল সাম্য ও সহানুভূতির। সময়ের স্রোতে পরিস্থিতি বদলেছে। আজ কোরবানি শুধু উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চমধ্যবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারেও পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ঈদের অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও আত্মিক তাৎপর্য কি আমরা ধরে রাখতে পেরেছি?
ঈদুল আজহা মানেই আজ আনন্দ, উৎসব, ত্যাগ ও ভাগাভাগির মেলবন্ধন। কিন্তু উনিশ শতকের বাস্তবতায় এই ঈদ ছিল অনেক বেশি প্রতিকূলতার ভেতরে বেড়ে ওঠা এক প্রার্থনা—সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অবরোধ ও জমিদারি শোষণের মাঝে দাঁড়িয়ে এক আত্মিক জাগরণ। সাহিত্য, সংবাদপত্র, রাজনীতি এমনকি জমিদারি–কাঠামোর ভেতরেও ঈদুল আজহার অভিঘাত ছিল স্পষ্ট ও গাঢ়। ‘বকরি ঈদ’ কেবল একটি ধর্মীয় দিন নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক চেতনার ধারক, সামাজিক অধিকারবোধের রূপকার এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের স্মারক। ঈদুল আজহার চিরন্তন শিক্ষা—আত্মত্যাগ, সহানুভূতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন—আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক, যতটা ছিল শতাব্দী আগে। আজকের রঙিন ও আয়োজনময় ঈদের ভেতরেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এই উৎসব যেন কেবল ভোগে সীমাবদ্ধ না থাকে। ত্যাগের যে মহান আদর্শ, তা যেন না হারিয়ে যায় বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে। নজরুলের বিপ্লবী সুরে সুর মিলিয়ে আমাদের প্রত্যাশা—শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, ন্যায়ের ভিত্তিতে গঠিত একটি মানবিক সমাজব্যবস্থা। কোরবানির ঈদ হোক সেই সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা, হোক হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক জীবন্ত আহ্বান।
* হোসাইন মোহাম্মদ জাকি: লেখক ও গবেষক
![]() |
| পবিত্র ঈদুল আজহা বা ‘বকরি ঈদ’–এর সেকালের কথা পাওয়া যায় সমাজ, সাহিত্য ও সাময়িকীতে। কোলাজ: প্রথম আলো |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গাজাবাসীর ঈদ: ‘কোরবানি দেওয়ার মতো কিছু নেই শুধু নিজেদের ছাড়া’ by জাভেদ হুসেন
লাখো মুসলমান যখন ঈদুল আজহার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন ফিলিস্তিনের গাজা এক মরুভূমির নিস্তব্ধতা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে ঈদ নেই। আছে কেবল খালিপেটে দীর্ঘশ্বাস, ধ্বংসস্তূপে শিশুদের কান্না আর আশাহীন এক অপেক্ষা। একটু যদি কেউ রাজি হন নিজের আনন্দের মধে৵ ভাবতে, তাহলে মনে আসবেই—এই ঈদের উৎসব কি কেবল তাঁদের জন্য, যাঁদের ঘরবাড়ি আছে, রান্নাঘরে খাবার আছে; আর আছে নতুন জামার আনন্দে হাসতে জানা শিশু?
রাফা, খান ইউনিস ও গাজার শহর—সবখানেই মসজিদ ধ্বংস হয়ে গেছে। ঈদের নামাজ পড়া হয় খোলা মাঠে, কখনো কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের পাশে। বহু জায়গায় কোনো জামাতই হয় না। কারণ, নেই নিরাপদ জায়গা, নেই ইমাম, নেই মাইক্রোফোন।
নামাজের পরপরই কেউ কেউ কবর জিয়ারত করেন। কেউ আবার চোখের জলে হারানো স্বজনকে স্মরণ করেন। ২০২৪ সালের ঈদের দিনেও থামেনি বোমা হামলা। গাজার আল-মাঘাজি ক্যাম্পে চালানো হয় বিমান হামলা। এতে অন্তত ১১ জন নিহত হন, যাঁদের মধ্যে সাতজনই শিশু। ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন যাঁরা, তাঁরা নতুন করে কবর খোঁড়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
‘কোরবানি দেওয়ার মতো আর কিছু নেই শুধু নিজেদের ছাড়া।’ কথাটি বলছিলেন নুহা আল নাজ্জার, গাজার এক মা। তাঁর পরিবারের ঈদ মানে প্রতিদিনের ক্ষুধা, বোমাবর্ষণের আওয়াজ আর শিশুদের কান্না। দুই বছরের আলমা দিনভর কাঁদছে শুধু এক বোতল দুধের জন্য। মাসের পর মাস একফোঁটা দুধ মেলেনি। একসময়ের ঈদ এখানে ছিল কাবাব, কিশোর-কিশোরীদের হাসি আর আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। এখন সেখানে কেবল ধ্বংসস্তূপ, ক্ষুধার্ত শরীর আর আতঙ্কে ভয়ে কাঁপতে থাকা মুখ।
রাফা সীমান্ত দিয়ে কিছু সাহায্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করছিল গত ঈদের সময়। খাবারের জন্য হাহাকার এত তীব্র ছিল যে মানুষ একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে উঠে পড়ে খাদ্যের গাড়িতে। চ্যানেল ফোর নিউজ জানায়, গমবাহী একটি ট্রাকে ধাক্কাধাক্কির ফলে ১২ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে তিনজন ছিল শিশু।
নুহা বলেন, ‘আমি এক দিনে একটি শসা আর দুটি টমেটো কিনে তা ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করি। সেটিই আমাদের দিনের একমাত্র খাবার।’ তাঁর এ কথায় কেউ ঈদের কোনো আমেজ পাবেন? না, এখানে আছে শুধু টিকে থাকার যুদ্ধ। ‘আমার একমাত্র ছোট ছেলেকে মিসরে পাঠানো হয়েছে চিকিৎসার জন্য। সে আমাকে ফোনে বলে, ‘মা, আমি সেই পুরোনো ঈদগুলোকে ফিরিয়ে আনতে চাই।’ আমি ওর কথা শুনে কাঁদি না। নিজের মুখ চাপা দিয়ে রাখি। যাতে ও না বুঝতে পারে আমি কতটা ভেঙে পড়েছি।’
নুহার ছোট মেয়ে মায়ার বয়স ১২। একসময় ঈদে তার আনন্দ দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। এখন সে চুপচাপ থাকে। ‘আমি জিজ্ঞাসা করি—কী রে, খিদে পেয়েছে? ও বলে, না। কিন্তু আমি জানি, ওর পেট খালি। ও জানে, ঘরে কিছু নেই। তাই অভিযোগ করে না।’
ঈদ মানেই শুধু এই দোয়া—আজ যেন কেউ ইসরায়েলিদের গুলি বা বোমায় মারা না যায়। ঘরবাড়ি নেই, বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই। ঈদের নতুন জামার তো প্রশ্নই ওঠে না। শুধু আছে এক বেলা কোনোভাবে বাঁচার খাবার খুঁজে পাওয়া; আর পরের বোমা কখন কোথায় পড়বে, সেই অপেক্ষা।
গাজার বাইরে থাকা মানুষেরাও সুখে নেই। নুহার বোন সামার এলউফ। ওরা এখন দোহায় আশ্রয়ে আছেন। তিনি একজন খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক। একসময় গাজার ঈদ উদ্যাপনের ছবি তুলতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ওর ডাক পড়ত। আজ তাঁর ক্যামেরা কেবল শিশুদের মৃতদেহের ছবি তুলে রাখে। ‘প্রতিটা ছবি যেন আমার বুকে ছুরি চালায়’ বলেন সামার।
সামার বলেন, ‘আমি কিছুই করতে পারি না। কেবল চোখের পানি ফেলি আর বারবার খোঁজ নিই—আমার বোন, ওর সন্তানেরা এখনো বেঁচে আছে তো?’
তার পরও এই পরিবারের সদস্যরা ভালোবাসা আর স্মৃতিতে টিকে আছেন। ‘ঈদ এখন আমাদের হৃদয়ে একটি ক্ষত। সুখের স্মৃতি দুঃখের চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। তবু আমরা বিশ্বাস হারাই না। কারণ, ঘরে ফেরার স্বপ্ন আমরা এখনো দেখি’ বলেন নুহা।
অন্যদিকে পরিবার ছাড়া তৃতীয় ঈদ কাটাচ্ছেন লেখক শাদি সালেম। তিনি লিখেছেন, ‘গাজার ঈদ এখন আর উৎসব নয়, এটি প্রতিরোধের প্রতীক। ঈদ মানে শুধু একাকিত্ব নয়, এটি স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকার আর্তি।’
শাদি সালেমের মা ফোনে বলেন, ‘আমরা যতটা পারি, ততটাই করি। আমি আজ যাব আমার ভাইদের শহীদ পরিবারের কাছে, ঈদের শুভেচ্ছা দিতে।’ এই একটি বাক্য যেন গাজার হাজারো মায়ের মনের দৃঢ়তার কথা বলে।
‘আমরা চাই না কেউ আমাদের মতো কষ্টে থাকুক। সবাই যেন সুখে থাকে, শান্তিতে থাকে। শুধু দোয়া করি, সারা পৃথিবীর আর কেউ যেন এই বেদনার ভাগীদার না হয়।’ শেষে এই কথাটা বলছিলেন নুহা। কথাটায় কি অভিমান মিশে ছিল?
গাজার ঈদ আর আমাদের ঈদ এক নয়। আমাদের জন্য এই পার্থক্য শুধু আবেগের প্রশ্ন নয়, নৈতিকতারও। আমাদের ঈদের আনন্দের সামনে গাজার শিশুদের ক্ষুধার্ত মুখগুলো যেন অদৃশ্য আয়না হয়ে ওঠে। যারা বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে, তাদের গল্পে ঈদ মানে এক নামহীন প্রার্থনা। এই প্রার্থনা শুধু গাজার নয়, আমাদের সবার হোক।
* জাভেদ হুসেন প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
(আলজাজিরা, আরব নিউজ, ডন, হিন্দুস্তান টাইমসের বিভিন্ন লেখা অবলম্বনে)
![]() |
| এক সময় এমন ঈদ পালন করত গাজার শিশুরা। ইসরায়েলের হামলার কারণে এখন তাদের ঈদগুলোও হারিয়ে গেছে। ২০২২ সালে তোলা ছবি। ছবি সংগ্রহ: দ্য প্যালেস্টাইন ক্রোনিকল |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
হামাস নিয়ে ভাবার সময় এসেছে by হাসান ফেরদৌস
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তার একটি ছবি মিলেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পাঠানো এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। তাতে ইসলাম আবু তাইয়েমা নামের একজন মা ও তাঁর ৯ বছরের মেয়ের কথা বলা হয়েছে। আবু তাইয়েমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতেন। এখন চাকরি নেই, মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে দানাপানি নেই। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তাই তিনি গাজার রাস্তায় রাস্তায় ডাস্টবিন থেকে খাদ্য সংগ্রহ করছেন। সারা দিন ঘুরে হয়তো আধখাওয়া রুটি জুটল। ‘আজকের জন্য এটাই আমাদের আহার,’ আবু তাইয়েমা এপিকে বলেছেন। ‘কেউ বুঝতেও পারবে না কী দুর্যোগের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি।’
গাজা অভিযানের শুরুতে এক ইসরায়েলি মন্ত্রী হাতের তিন আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি পথ খোলা। পালানো, গুলি খেয়ে মরা অথবা সাগরে ডুবে মরা। তাঁদের পরিকল্পনামাফিক ইসরায়েল তার সে কাজ গুছিয়ে এনেছে। কাজটা যে এত সহজ হবে দেশটির সরকার তা হয়তো ভাবেনি। তাদের ভয় ছিল, হামাস মরণপণ লড়াই করে তাদের মস্ত ক্ষতি করবে। আরব দেশগুলোও ক্রোধে জ্বলে উঠবে, বিশ্বসভায় আপ্তবাক্য শোনানো ছাড়াও তাকে থামানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছুই হয়নি, ফলে চালাও গুলি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত পৌনে দুই বছরে প্রায় ৫৪ হাজার ৬৭৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩০ জন। ইসরায়েল বলেছে, হামাসের শেষ সেনা শেষ না করা পর্যন্ত তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ইসরায়েলের হিসাবমতে, গত দেড় বছরে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন ১৭ হাজার হামাস সেনা। হামাস নতুন যোদ্ধা সংগ্রহ করেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা কেউ প্রশিক্ষিত নন। তাদের ট্যাংক বা ভারী কোনো সাঁজোয়া বহর নেই। সামরিক বিমানের তো প্রশ্নই উঠছে না।
ইসরায়েল হামাসকে ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হিসেবে, পূর্ণ সেনাবাহিনী হিসেবে আমাদের কাছে পরিচয় করিয়েছে। আমরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা ভেবে প্রশংসা করেছি। এমন কথাও বলেছি, হামাসের ভয়ে ইসরায়েল কাঁপছে।
এই দুই বাহিনীর তুলনা একদমই অবাস্তব। ইসরায়েলের রয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ নিয়মিত সৈন্য। আছে আরও সাড়ে চার লাখ রিজার্ভ। প্রযুক্তিগতভাবে তারা বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর সামরিক বাহিনী। বছরে সেনা খাতে দেশটির ব্যয় বরাদ্দ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া মাথার ওপর ছাতা হয়ে ‘আঙ্কল স্যাম’তো রয়েছেনই।
মাথা মোটা এমন কারও পক্ষেও বোঝা সম্ভব যে ইসরায়েলকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা একা হামাসের পক্ষে সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো এককাট্টা হয়ে সে চেষ্টা করলে একটা মরণকামড় দেওয়া হয়তো সম্ভব, যেমন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন আরব দেশগুলো ব্যস্ত ইসরায়েলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে। আর এই কাজে দূতিয়ালির দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এসব জানা সত্ত্বেও হামাসের যোদ্ধারা মরণপণ লড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মরছেন, সঙ্গে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ গাজাবাসী, সংখ্যায় যাঁদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যায় বেশি। যেহেতু হামাস যোদ্ধা ও সাধারণ গাজাবাসীর মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই—এই শহরে সবাই যোদ্ধা—সে কারণে ইসরায়েল একজন হামাস যোদ্ধাকে টার্গেট করে দুই ডজন মানুষ মারছে।
স্পষ্টতই লড়াই করে ইসরায়েলকে হারাব, হামাসের এই রণকৌশল কাজে দিচ্ছে না। তাদের ভিন্ন রণকৌশলের কথা ভাবতে হবে। যেমন ইয়াসির আরাফাত ভেবেছিলেন। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে দেখা যাক।
১৯৮২ সালে, বৈরুতে অব্যাহত ইসরায়েলি আক্রমণ এড়াতে ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামের নেতা আরাফাত তাঁর সঙ্গী ১৪ হাজার ফিলিস্তিনি যোদ্ধাসহ লেবানন ছেড়ে তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে সরে আসেন। আত্মসমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারতেন, কিন্তু নতুন যুদ্ধের কৌশল নির্মাণ করতেই তিনি পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন। এর ১০ বছর পর ১৯৯৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় অসলো চুক্তি, যার ভিত্তিতে সীমিত আকারে হলেও পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিন প্রশাসন গঠিত হয়। এ কথা ঠিক, সে চুক্তির ২০ বছর পরেও ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেনি; বরং প্রতিদিন ইসরায়েলি আগ্রাসন ও অধিগ্রহণে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিমাণ ক্রমেই কমে এসেছে। এ জন্য অবশ্যই পূর্ণ স্বাধীনতা প্রশ্নে ইসরায়েলের অনীহা প্রধান কারণ, তবে ২০০৬ সালের পর গাজার নিয়ন্ত্রণ হামাসের হাতে চলে আসাও একটা কারণ। সে বছর পশ্চিম তীর ও গাজায় যে নির্বাচন হয়, তাতে হামাস বিপুল সংখ্যাধিক্য ভোটে জয় লাভ করে। এ নিয়ে বিবাদ বাধলে গাজার নিয়ন্ত্রণভার একরকম জোর করেই গ্রহণ করে হামাস। তখন থেকেই পশ্চিম তীর ও গাজায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক আন্দোলন—ফাতাহ ও হামাস, তাদের অভিন্ন শত্রু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দুই হাত এক করে লড়াইয়ের বদলে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। ইসরায়েল তাতে ইন্ধন জোগানোয় এ বিভক্তি আরও বেড়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে স্পষ্ট, লড়াই করে তাঁকে পরাস্ত করা হামাসের পক্ষে সম্ভব নয়। শেষ হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করার কথা বলে ইসরায়েল শুধু যে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তা–ই নয়, গাজাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এক সপ্তাহ আগেও ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলছেন, গাজার শেষ বাসিন্দাটি সরে না যাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। পাশাপাশি গাজার ২২ লাখ মানুষকে মিসর, জর্ডান ও আফ্রিকার একাধিক দেশে স্থানান্তরের জোর চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টার পেছনে চলতি মার্কিন প্রশাসনেরও সমর্থন রয়েছে।
গাজা থেকে যদি হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সদলবল মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোথায় সরে যেতে সম্মত হয়, অনুমান করি, গাজার চূড়ান্ত ধ্বংস হয়তো ঠেকানো সম্ভব। হামাস ইসরায়েলের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ এই যুক্তি দেখিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যদি হামাসই না থাকে, তাহলে অব্যাহত বোমাবাজির পক্ষে যুক্তি দেখাবেন কী করে?
এ কথা ঠিক, ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে গাজায় গণহত্যার তীব্র নিন্দা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরেই কেউ কেউ বলেছেন, হামাস নয়, এই আগ্রাসনের কারণে বিশ্বজুড়ে যে নিন্দা রব উঠেছে, সেটাই ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য আসল সংকট। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট হারেৎজ পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছেন, ‘গাজায় ইসরায়েল যা করছে, তা যুদ্ধাপরাধ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।’ পরে সিএনএনকে তিনি বলেছেন, ‘হামাস এখন আর আমাদের জন্য হুমকি নয়। এখন যা করা হচ্ছে, তা নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড।’ তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, ‘আগ্রাসন অব্যাহত রেখে ইসরায়েলের কোনো সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না, বরং রাজনৈতিকভাবে আমরা বিশ্বব্যাপী ধিক্কারের মুখোমুখি হচ্ছি।’
নেতানিয়াহু সে কথা মানতে রাজি নন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে এই যুদ্ধ তাঁর প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধের পরদিনই তাঁর অতি দক্ষিণপন্থী কোয়ালিশন ভেঙে পড়বে, সে কথা তিনি জানেন। ফলে হামাসের দিকে আঙুল তুলে তিনি নিজেকে নৈতিকভাবে অধিক বলবান বলে প্রমাণ করতে চান। সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে। সে কথার জবাবে নেতানিয়াহু বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার কথা বলে এই তিন দেশ সন্ত্রাসীদের পক্ষে কাজ করছে, মানবতার পক্ষে নয়।
হামাস যদি আর কোনো ‘ফ্যাক্টর’ না হয়, এই দলের যোদ্ধাদের হত্যার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে নেতানিয়াহুর পক্ষে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের খোঁড়া যুক্তি দেখানো সহজ হবে না। হামাসের প্রস্থানের অন্য আরেক সম্ভাব্য ফল হবে, পশ্চিম তীর ও গাজা এই দুই ভূখণ্ডকে আবার মিলিত করা। রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নে এত দিন যে কোনো অগ্রগতি হয়নি, তার অন্যতম কারণই হলো গাজাকে ঘিরে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বে বিভক্তি।
দেশের বাইরে বসে হামাসের সাহসিকতার যত প্রশংসাই আমরা করি না, গাজায় এ মুহূর্তে তার পক্ষে জনসমর্থন ১০ শতাংশেরও কম। ইসরায়েলে হামলার পর নেওয়া জনমত জরিপ অনুসারে, গাজার মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ হামাসকে এই এলাকার শাসনভার তুলে দিতে সম্মত। এই জনমত সত্যি হলে হামাসের হাতে গাজার নিরপরাধ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে, এ কথা বলা একদম অযৌক্তিক হবে না।
হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব গাজা থেকে সরিয়ে নিতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে। এত দিন তারাই অর্থ দিয়ে তাকে জিইয়ে রেখেছে। বস্তুত, হামাসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রায় সবাই এখন কাতার অথবা উপসাগরের কোনো না কোনো দেশে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রস্থানের সময় হামাসকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে সম্মত হয়, তাহলে ব্যাপারটা ত্বরান্বিত হবে তাতে সন্দেহ নেই। ১৯৮২ সালে আরাফাতকে যুক্তরাষ্ট্র সে নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
| ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতাল—গাজার সব জায়গায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল। গাজা থেকে হামাসকে উৎখাতের পর এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কাকে দেওয়া হবে, এখন বিশ্ব মোড়লেরা ব্যস্ত সেই চিন্তায়। রাফাহ এলাকায়। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1422)
- ▼ 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




