Thursday, December 20, 2018

তেরেসা মে' কে 'স্টুপিড মহিলা' বলেছেন জেরেমি করবিন?

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে'র প্রশ্নোত্তর পর্ব চলার সময় লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন তাকে 'স্টুপিড মহিলা' বলেছেন দাবি করে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন কনজারভেটিভ এমপিরা।
তবে মি. করবিন বলছেন, তিনি এরকম কোন শব্দ বলেননি। বরং তিনি বলেছেন, ''স্টুপিড পিপল।''
যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা নারীদের প্রতি বিদ্রূপমূলক ভাষা ব্যবহারের তিনি সবসময়েই বিরোধী বলে জানাছেন মি: করবিন।
এই অভিযোগ ওঠার পর হাউজ অফ কমন্সের স্পিকার জন বারকো বলছেন, ঘটনাটি তিনি দেখতে পাননি এবং সব এমপিকে বক্তব্যের ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত।
তবে কনজারভেটিভ এমপিরা বলছেন, তারা মি. করবিনের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন এবং তার ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন।
কমন্সে দেয়া বক্তব্যে মি. করবিন বলেছেন, ''আজ প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব চলার সময় আমি তাদের কথাই বলছিলাম, যারা দেশের এই সংকট নিয়ে চলা একটি বিতর্ককে কৌতুকে পরিণত করতে চাইছে, তাদেরকেই আমি 'স্টুপিড পিপল' বলেছি।''
''মি. স্পিকার, আমি প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করে 'স্টুপিড উইমেনের' মতো শব্দ ব্যবহার করিনি'' বলছেন মি: করবিন।
তবে তার এই বক্তব্যের জবাবে কনজারভেটিভ এমপি র‍্যাচেল ম্যাকলিন বলছেন, ''ঠোঁটের ভাষা পড়ে দেখুন, আমি তাকে (মি:করবিনকে) বিশ্বাস করি না।''অভিযোগটি ওঠার পর হাউজ অব কমন্সের স্পিকার জন বারকো বলেছেন, মি: করবিনের বিরুদ্ধে যে আচরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে, তিনি সেই ভিডিও পরীক্ষা করে দেখেছেন, যেখানে মাইক্রোফোনে কোনো শব্দ আসেনি এবং সেটা দেখে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, কেন বিরোধী নেতার শব্দকে 'স্টুপিড ওম্যান' হিসাবেও বর্ণনা করা যায়।''
আদালতে যারা ঠোঁটের ভাষা অনুবাদের কাজ করেন, এমন একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন স্পিকার। তাকে ওই ভিডিওটি দেখানো হয়েছে, তবে এখনো কোন উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
''কারো পক্ষেই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না, এমনকি পেশাদার ঠোঁটের ভাষা বিশেষজ্ঞদের পক্ষেও নয়। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আমি একজন সম্মানিত সদস্যের বক্তব্যকেই গ্রহণ করবো, যা আসলে করা উচিত।''
''এটাই হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ যদিও হাউজও এমনটা করে'' বলছেন মি: বারকো।
তিনি বলেছেন, মি: করবিন পুরো সময়ে বসেই ছিলেন এবং হাউজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি, তাই তার বক্তব্য 'অন রেকর্ড' হিসাবে গ্রহণীয় হবে না।
এর আগের একটি ঘটনায় স্পিকার জন বারকোর বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছিল যে, তিনি টোরি এমপি ভিকি ফোর্ডকে 'স্টুপিড ওম্যান' বলেছেন। ফলে সংসদ সদস্যরা স্পিকারের নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
মি: বারকোকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে কমন্স এমপি অ্যান্ড্রিয়া লেডসোম বলেছেন যে, এ বছরের শুরুর দিকের ওই ঘটনার জন্য তিনি এখনো ক্ষমা চাননি। জবাবে স্পিকার বলেছেন, এর মধ্যেই ওই ঘটনা নিয়ে তিনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
মিজ লেডসোম বলছেন, মি: করবিনের বিবৃতির পর দর্শক এবং এমপিদের পক্ষে তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হবে। কিভাবে এই ঘটনার শুরু হয়েছিল?
তেরেসা মের বেক্সিট চুক্তি নিয়ে জেরেমি করবিনের সঙ্গে প্রথম সংঘাত শুরু হয় গত সপ্তাহ থেকে, যখন ভোটাভুটি পিছিয়ে দেয়াকে স্বার্থপর কৌশল বলে মন্তব্য করে মিসেস মে'কে 'ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী' বলে অভিহিত করেছিলেন জেরেমি করবিন।
এর পাল্টা আঘাত করতে গিয়ে মিসেস মে বলেন, তিনি (জেরেমি করবিন) তার প্রতিশ্রুত অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেননি এবং এরপরে যা করেছেন তাও অকার্যকর।
''আজি জানি এটা হচ্ছে কৌতুক-নাট্যের সময়....''এমপিদের তিনি বলেন, ''তিনি কি অনাস্থা ভোট আনবেন? ওহ, তিনি আনবেন'' আবার পেছনের টোরি এমপিদের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ''ওহ না, তিনি আনবেন না।''
তখন তিনি লেবার নেতার দিকে তাকিয়ে বলেন, ''আপনার পেছনে তাকিয়ে দেখুন, তারা আপনার কাজে মুগ্ধ নন এবং দেশের লোকজনও নয়। ''
এ সময় জেরেমি করবিনকে নিশ্বাস ফেলার সঙ্গে কিছু একটা বলতে দেখা যায়।
এই অভিযোগের বিষয়ে টোরি এমপি পল স্কুলি মিসেস মের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ''আমি মনে করি, হাউজের প্রত্যেক সদস্যের, বিশেষ করে যখন নারীদের ভোটাধিকারের শতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে, তখন সবার নারীদের রাজনীতিতে আসাকে উৎসাহিত করা উচিত এবং যথাযথ ভাষা ব্যবহার করা উচিত।''
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বের পরেও এই বিতণ্ডা চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকজন নারী কনজারভেটিভ এমপি তার ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাতে থাকেন।
সাবেক মন্ত্রী অ্যানা সুবরি স্পিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ তুলে বলেন, যদি লেবার পার্টির কোন নারী এমপির বিরুদ্ধে কনজারভেটিভ পার্টির কোনো এমপি এরকম মন্তব্য করতেন, তাহলে মি: বারকো আরো দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন।
প্রবীণ লেবার এমপি মার্গারেট বেকেট বলছেন, এই অভিযোগটি হচ্ছে দলীয় রাজনীতি।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক এমপি ভিরা হবহাউজ বলছেন, ''দেশের সব জায়গা থেকেই আজকের এই ঘটনাটি তরুণী মেয়েরা দেখেছে এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, যদি এরপরে তাদের অনেকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। এই অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে জেরেমি করবিনের অবশ্যই ক্ষমা চাওয়া উচিত।''
সূত্রঃ বিবিসি

কূটনীতিকদের যা বললেন ড. কামাল হোসেন

এই নির্বাচনে আমরা পুলিশি সন্ত্রাসের শিকার। আমি জীবনে কোনদিন এমন অবস্থা দেখিনি। পুলিশ কোন কারণ ছাড়াই মানুষকে ধরছে। এটা এক জায়গায় না। এই অবস্থা সারা বাংলাদেশে। এটা কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের কোন একটা কৌশলের অংশ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি আওয়ামী লীগের লোক ছিলাম। ১৪ দলে ছিলাম।
কিন্তু আজকে আমরা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি না, এদেশের নাগরিক হিসেবে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। আজ দুপুরে গুলশানে কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন এসব কথা বলেন। তিনি নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
দেশের মানুষ খুব আকাঙ্খার সঙ্গে নির্বাচন চাচ্ছিল। কারণ তারা পরিবর্তন চায়। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, গত দুই সপ্তাহ ধরে পুলিশ অসাধারণভাবে তৎপর সব জায়গায়। এর আগে আমি কখনো এতো পুলিশ রাস্তায় টহল দিতে দেখিনি। কাউকে দেখলে তারা ধরে বসে। এই নির্বাচনে আমরা পুলিশি সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছি। কেউ গেলেই তাকে ধরে ফেলে। কেন ধরছে সেটার কিছু বলে না। থানায় নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। পুলিশের কেউ কেউ বলেছেন এদের দুই তারিখের পর ছাড়া হবে। এটা থেকে আর বোঝার কিছু বাকি থাকেনা। তার মানে ৩০ তারিখ নির্বাচন। এর দুইদিন পরে ছাড়া হবে। যেন তারা কেউ নির্বাচনে কোন ধরণের ভূমিকা রাখতে না পারে। তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের এভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি জীবনে কোনদিন এমন অবস্থা দেখিনি। পুলিশ কোন কারণ ছাড়া মানুষকে ধরছে। এটা এক জায়গায় না। এই অবস্থা সারা বাংলাদেশে। এটা কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের কোন একটা কৌশলের অংশ। তারা বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরার জন্য সারাদেশে পুলিশকে নামিয়ে দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাত করে বলেছি আপনি আইজিকে এ বিষয়টি জানান। তিনি পরদিনই আইজিকে চিঠি দিয়েছেন। আমি এজন্য সিইসিকে ধন্যবাদ দিচ্ছি কারণ তিনি আমার কথা অন্তত শুনেছেন।
কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, আমরা যে বিষয়গুলো বলব সেগুলো উনারাও অবজার্ভ করছেন। যে কারণে আমাদের তেমন কিছু বলতে হয়নি। আমরা যে রিপোর্ট তৈরি করেছি তারাও তাদের অ্যাম্বাসিতে সিমিলার রিপোর্ট নিজেরা সংগ্রহ করেছেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা তো দেশের মানুষ। আমাদের সবারই এই বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। কারণ এই নির্বাচনে আমরা বাঙালি হিসেবে সবাই আস্থা রেখেছি। জনগণকে একটি সুযোগ দেয়া হোক। আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের পরিবর্তন করি।
আমরা ২০০১ সালে পরিবর্তন করেছি। এরপর ২০০৮ সালে করেছি। তখন আমি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলাম। ভোটার লিস্ট থেকে ১ কোটির বেশি ভূয়া ভোটার বাদ দিয়েছিলাম। পরে নির্বাচন কমিশনকে পুনঃর্গঠন করা হয়েছিল। এরপরই তো ২০০৮ সালে আমরা অসাধারণ একটা বিজয় অর্জন করেছিলাম। আমি তখন আওয়ামী লীগের লোক ছিলাম। ১৪ দলে ছিলাম। কিন্তু আজকে আমরা আওয়ামী লীগ বিএনপি না, এদেশের নাগরিক হিসেবে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।
এসময় তিনি বলেন, এখানে কি কেউ আছেন যিনি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিপক্ষে? শতভাগ আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে। আমি একথাই বলেছি কূটনীতিকদের। তিনি বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখবেন, ৭০ এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে আমাদের জন্ম। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনে এজেন্ট ছিলাম। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এসে বলল তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে এসেছে। আমি বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে বললাম কোটি কোটি টাকা তো দিতে পারবেন না। আমার দুই এক লাখ টাকা বাজেট আছে। আমার সঙ্গে প্রায় ২০০ ছেলে-মেয়ে ছিল। আমরা ঘরে ঘরে গিয়েছি। পায়ে হেঁটে গিয়েছি। বুঝিয়েছি আমাদের দাবি বৈষম্য নিরসন। কৃষক উৎপাদন করে, রপ্তানি করে বৈদেশিক মূদ্রা আয় করে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা সেগুলো নিয়ে গিয়ে সেখানে সবকিছু গড়ে তুলছে। সেখানে ৫ টা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আমাদের এখানে কয়টা। আয় করছি আমরা। আর উন্নয়ন হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। এই জিনিসগুলো জনগণকে বুঝিয়ে বলার কারণে ৭০ এর নির্বাচনে আমাদের জয় হয়েছে।
ড. কামাল বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা টাকা ঢেলেছে। কিন্তু ভোট পায়নি। আমি বিশ্বাস করি জনগণকে যদি সুযোগ দেয়া হয় তাহলে আজও আগের মতোই করবে। তারা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ পেলে পরিবর্তন করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এই সিইসির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা করে আসছি অনেক আগে থেকেই। তার সঙ্গে সাক্ষাতে আমরা বলেছি, আপনার নিষ্ক্রিয়তা আমাদের খুব উদ্বিগ্ন করছে। আপনি বলছেন সব ঠিক, সব ঠিক। কিন্তু কিছুই ঠিক না। আপনি একটু বেরিয়ে দেখেন। আর এটা আপনার গুরুদায়িত্ব।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার মানে হল জনগণ ক্ষমতার মালিক। জনগণ যদি সেই মালিকানা হারায়, তাহলে তো স্বাধীনতাই থাকেনা। সিইসিকে বলে এসেছি, এই স্বাধীনতা নির্ভর করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আপনার উপর। আপনার উপর বড় একটা দায়িত্ব। এটাকে আপনি হালকাভাবে দেখবেন না। পরদিন তিনি আইজিকে একটি চিঠি দিলেন।
তিনি বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আমাদের উপর হামলা হয়েছে। আ স ম আবদুর রবের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ওনার চালক আক্রান্ত হয়েছে। তিনি নিজে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। দেশের জন্য যারা যুদ্ধ করেছে তাদের উপরে আক্রমণ হয়েছে। এই পরিহাসগুলো আমাদের মনে রাখতে হয়। ড. কামাল বলেন, সরকার বলে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হয় তাহলে কাদের উপর হামলা করছে।

সবার সমান অংশগ্রহণ না হলে নির্বাচন পদ্ধতি কার্যকর হবে না -বিএনপির সঙ্গে বৈঠক শেষে মিলার

নির্বাচনের মাঠে সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সকলকে তা পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট আর্ল মিলার। গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমরা (যুক্তরাষ্ট্র)  চাই বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়ে যেসব রিপোর্ট  দেখছি তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান হলো সকলের এটা নিশ্চিত করা দরকার যে, সহিংসতাকে পরিহার করা এবং একে নিন্দা জানানো।
মিলার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে নির্বাচনের পদ্ধতি কার্যকর হবে না যদি না সবাই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারে। আমি সকলকে উদ্বুদ্ধ করবো গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার জন্য।  বৈঠকে অংশ নেয়া নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কারাবন্দি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা ও নির্বাচনে অংশ নেয়া ধানের শীষের প্রার্থীসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের  গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নতুন এসেছেন, সৌজন্য সাক্ষাতে এসেছিলেন।
বর্তমান নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আপনারা নিজেরা শুনেছেন তারা এখানে ভয়ভীতি ও ত্রাসমুক্ত নির্বাচন দেখতে চান, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সকলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটা সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চান।
এটাই হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা। তারা মনে করে যে, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে  দেয়া উচিত। কোনো প্রার্থীর ওপর যাতে কোনো আক্রমণ না হয়, ভায়োলেন্স যেন না হয়-একথায় শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া  উচিত। বিরোধী দল যারা আছেন তাদের প্রচারণাও যাতে নিরাপদে করতে পারে তা নিশ্চিত করা উচিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর বিএনপি মহাসচিব রাষ্ট্রদূতকে বিদায় জানান।
গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত। তাকে কার্যালয়ে অভ্যর্থনা জানান দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল।  বেলা ২টায় বৈঠক শেষে রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বৈঠকে মহাসচিব ছাড়া ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য সাবিহ উদ্দিন আহমেদ ও নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল।

নির্বাচনের সুবাতাস বইছে: সিইসি

সমগ্র দেশে নির্বাচনের একটি সুবাতাস বইছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। বলেন, আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে- সমগ্র দেশে নির্বাচনের একটি অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে স্বত:স্ফূর্ত নির্বাচনমুখী আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রার্থীদের মধ্যে উৎসাহ  দেখা যাচ্ছে এবং তাদের কর্মকান্ডের মধ্যে তা প্রতিফলিত হচ্ছে। তারা অনবরত সভা-মিছিল করে যাচ্ছেন এবং প্রার্থীরা তাদের ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
আজ সকালে আগারগাঁওস্থ  ইটিআই ভবনে নির্বাচনের দিন সফটয়্যার সংক্রান্ত ইলেকশান ম্যানেজমেন্ট সিসটেম (ইএমএস), ক্যানডিডেট ইনফরমেশান ম্যানেজমেন্ট সিসটেম (সিআইএমএস) এবং রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিসটেম (আরএমএস) প্রশিক্ষণে এসব কথা বলেন সিইসি।
মাঠ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে কেএম নরুল হুদা বলেন, আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, একটি সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেটার নিয়ামক হিসেবে আপনারা যে যার অবস্থান থেকে সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করবেন। সিইসি বলেন, যেসকল কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, তারা সক্ষমতার সঙ্গে, স্বার্থকতার সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।  আমরা প্রশিক্ষণের এমন  কোনো স্তর বাদ রাখিনি যে কারণে  মাঠপর্যায়ে গিয়ে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের  কোনো ঘাটতি থাকে।
তিনি বলেন, নতুন কতগুলো দিক নিয়ে এ বছর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ইভিএমের কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য সব সব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আরেকটি নতুন  যোগ হয়েছে সেটি হলো প্রার্থীদের যে এজেন্ট কেন্দ্রে থাকবেন সেই পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেয়া।  আমরা তাদের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেবো। তারা তাদের এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দেবে। এটার উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে নির্বাচন কার্যক্রমের যে নীতি, আচরণবিধি, নির্বাচন পরিচালনা বিধি, পোলিং বুথের ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক অবস্থা এসবগুলো ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পোলিং এজেন্টদের ধারণা দেয়া। যাতে পোলিং এজেন্ট বুঝতে পারে তার দায়িত্ব কি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, প্রায় একবছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে ধীরে ধীরে আমরা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাই। ৩০ তারিখে সেটার শেষ দিন। সেদিন প্রার্থী, সমর্থক এবং ভোটাররা ভোট দেবেন। ভোট নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি আমানত। সেই আমানত, সেই ভোটের ফলাফলগুলো বিশ্লেষণ এবং বিতরণ করার জন্য আপনাদের হাতে চলে যাবে।  সুতরাং এই বছরব্যাপী পরিশ্রম এবং বছরব্যাপী প্রস্তুতির ফসল আপনাদের হাতে চলে যাবে। এই ফসল যাতে কোনো রকমের ভুলত্রুটির মাধ্যমে প্রার্থীদের অবস্থান নির্ধারণে ব্যাঘাত না ঘটে, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আপনাদের একটু ভুলের কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সঠিকভাবে ফলাফল বিতরণ ও বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন। অত্যন্ত সতর্কার সাথে সঠিকভাবে আপনাদেরকে এই দায়িত্বপালন করতে হবে।
সিইসি বলেন, প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনের মৌলিক ও বেশির ভাগ দায়-দায়িত্ব পরিচলনার  ক্ষেত্রে অলরেডি ডেলিগেট করে দিয়েছি। এটা বিন্যাস্ত আছে রিটার্নিং, সহকারি রিটার্নিং অফিসার এবং তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রিজাইডিং ও সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার,  পোলিং অফিসাদের ওপরে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি কেন্দ্রভিত্তিক বিবেচনা করি, তাহলে কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্বটা চলে যাচ্ছে কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে। কারণ কেন্দ্র থেকে আমরা নির্বাচনের ফলাফল পাবো। সুতরাং কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের কাছ থেকে আপনারা ফলাফল নেবেন।
সিইসি আরো বলেন, যেহেতু নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বিকেন্দ্রী হয়ে রিটার্নিং, সহকারি রিটার্নং, প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছে চলে গেছে এবং সেগুলো দেখভাল করার জন্য কতগুলো কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি হলো,   ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি। সারাদেশে ১২২টি ইনকোয়ারি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সারাদেশে নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হলে, আচরণবিধি ভঙ্গ হলে অথবা নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো আইন বিচ্যুতি কর্মকান্ড ঘটলে সেগুলো সংশোধন করবেন। তারা অনুসন্ধান করবেন এবং ব্যবস্থা নেবেন।  জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন চার দিন। তারা মূলত প্রার্থী এবং সমর্থকদের সাহায্যই করবেন যে, কোনটা আচরণবিধি ভঙ্গের কারণ, তারা সেগুলো শুধরে দেবেন। যদি সেগুলো না শুনেন তাহলে বিচার করার তাদের সুযোগ থাকবে।  অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা আছে তাদের হাতে।  এরপর আছে এক্সিকিউটিভও ম্যাজিস্ট্রেট থাকবে।
মাঠপর্যায়ে অভিযোগ জমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সিইসি বলেন, আমাদের যেটা অসুবিধা হয়, সেটি হলো অভিযোগগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে কেন্দ্র থেকে চলে আসে। এই অভিযোগগুলো আমাদের কাছে না এসে, যদি তাৎক্ষণিকভাবে রিটার্নিং অফিসার এবং ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান পাবেন। আমাদের কাছে পাঠালে তাদের জন্য একটা বাড়তি অসুবিধা হয়।  সেখানে এসব পাঠানো জন্য অনুরোধ থাকবে সবার কাছে।

ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী আর নেই

গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী সাদুল্যাপুর) আসনের ৬ বারের এমপি একাদশ জাতীয় সংসদের ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী ও জাতীয় পার্টি (জাফর) এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী ড. টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরী ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ ভোরে মারা গেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহির রাজিউন) ফুসফুসে সংক্রমণসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। আজকে থেকেই নির্বাচনী এলাকায় প্রচার প্রচারণায় নামা কথা ছিলো।
ড. টিআইএম রাব্বী চৌধুরী ১৯৩৪ সালে ১লা অক্টোবর গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার তালুকজামিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৬ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবা মরহুম আহসান উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি ৩ ছেলে ও ২ কন্যা সন্তানের জনক। মৃত্যকালে তিনি স্ত্রী,  ৩ ছেলে ও ২ মেয়েসহ অসংখ্য গুণাগ্রাহী রেখেগেছেন।
ড. রাব্বী ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যানিম্যাল হ্যাজব্যনট্রিতে ২য় স্থান অধিকার করে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রী লাভ করেন ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরকারি চাকুরি যোগদান করেন।
১৯৬০ সালে আমেরিকা সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৬৩ সালে টেকসাস এন্ড এস হতে এমএসসি এবং ১৯৬৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহে এ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে এবং ১৯৬৯ সালে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এছাড়াও ডীন, ছাত্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি উলফসন কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন।
জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে পর্যায়ক্রমে ৬ (ছয়) বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র সাংসদ যিনি কেবলমাত্র বিরতিহীনভাবে গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ি) আসন হতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এই আসন থেকে ১৯৮৩, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ড. রাব্বী একজন সদালাপী ও স্বাধীনচেতা মানুষ। ১৯৮৪ সালে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপাতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। পরবর্তী সময় তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রী, ত্রাণ ও পূনর্বাসন মন্ত্রী ও সংস্থাপন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. ফজলে রাব্বী ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ এর দায়িত্ব পালন করেন।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকাকালীন তিনি হাঁস-মুরগীর সংক্রামক মরণব্যাধি ‘রাণীক্ষেত’ রোগ  নিরসনে নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে রাণীক্ষেত রোগের প্রকোপ কমে গেছে। তিনি পীরগঞ্জ উপজেলায় তার পিতার নামে আহসান উদ্দিন চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গাইবান্ধা আদর্শ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। হরিণাথপুরে ড. ফজলে রাব্বি দাখিলী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাসহ তিনি সাদুল্লাহপুর ও পলাশবাড়ি উপজেলায় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ করার চেষ্টা করছেন। জনসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘জাতীয় ব্যক্তিত্ব স্মৃতি পরিষদ’ কর্তৃক ২০০৫ সালে সাবেক মূখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার স্মৃতিপদক লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, জর্ডান, মিশর, ওমান, সৌদি আরাবিয়া, জার্মানি, অস্ট্রোলিয়া, কানাডা, আলজেরিয়া এবং আমেরিকাতে পার্লামেন্টে ডেলিগেট হিসেবে গমন করেন।
পরবর্তীতে তিনি এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি ছেড়ে কাজী জাফরের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কাজী জাফর মারা যাওয়ার পর থেকে ড. টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরী দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

কঙ্গোতে গোষ্ঠী সংঘর্ষে নিহত ১২০

কঙ্গোতে গত এক সপ্তাহে কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে ১২০ জনেরও অধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বুধবার এ খবর জানিয়েছে স্থানীয় অধিকারকর্মীরা। চলমান এ সংঘর্ষ সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির মাই দোম্বে প্রদেশে সংঘটিত হওয়া সবথেকে ভয়াবহ সংঘর্ষ। স্থিতিশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও গত এক সপ্তাহ ধরে প্রদেশটিতে সহিংসতা বেড়েই চলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে কঙ্গোতে আগামী রোববার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।  এ জন্য দেশের প্রত্যেক প্রদেশেই ভোটের আয়োজন করা হবে। বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনের পূর্বে গোষ্ঠিগত শত্র“তা নিয়ে চলমান সহিংসতাকে শান্তিপূর্ন ভোটের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করছেন। গত রোববার বাতেন্দে ও বানুনু গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এ সহিংসতার শুরু হয়। অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে কমপক্ষে ১২০ জন নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। হাসপাতালে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন আরো ৭১ জন। অনেকেই নদী পেড়িয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে পালিয়ে গেছে। এ বিষয়ে মাই দোম্বে প্রদেশের গভর্নরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।

সিইসির বক্তব্যের কড়া জবাব মাহবুব তালুকদারের

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার বিরুদ্ধে একজন নির্বাচন কমিশনারের অস্তিত্বে আঘাত করার অভিযোগ এনেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। নিজের বিরুদ্ধে সিইসির করা মন্তব্যের কড়া জবাবও দিয়েছেন তিনি। গতকাল সাংবাদিকদের নিজ কক্ষে ডেকে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি তার বক্তব্যে অটল থাকার কথা জানান। গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি মনে করি না নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।
ওই দিন ইসিতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মাহবুব তালুকদার এসব কথা বলেন। সিইসি কে এম নূরুল হুদা মঙ্গলবার রাঙ্গামাটিতে এক অনুষ্ঠানে মাহবুব তালুকদারের এ অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। সিইসি বলেন, মাহবুব তালুকদার সত্য বলেননি।
নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। রাঙ্গামাটিতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিন পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি এ কথা বলেন।
তিনি এও বলেন, সবাই নিজেদের মতো প্রচারণা চালাচ্ছেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে অসুবিধা কোথায়? বুধবার মাহবুব তালুকদার তার বিবৃতিতে বলেন, মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা রাঙ্গামাটিতে বলেছেন, ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে আমি মিথ্যা কথা বলেছি। আমি তার এই বক্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
কারণ, এ কথা বলে তিনি একজন নির্বাচন কমিশনারের অস্তিত্বে আঘাত করেছেন। মাহবুব তালুকদার বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে যে সিইসিসহ সব নির্বাচন কমিশনার সমান। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ইতিপূর্বে সিইসি মহোদয় আমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নানারূপ বিরূপ উক্তি করেছেন। আমি কখনো তার কথার প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ বলে আমি মিথ্যা বলেছি, এ কথার প্রতিবাদ না করে পারলাম না।
মাহবুব তালুকদার বলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আমি বলেছিলাম, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কি নেই, তা সাংবাদিকরা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর পেয়ে যাবেন। কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, এখনো সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলছি, আপনারা নিজেরা বিচার-বিবেচনা করে দেখুন, নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞাসা করুন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কি নেই? প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ইসি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে আনঅফিসিয়াল নোট দিয়ে আসেন মাহবুব তালুকদার।
এর পরে বিভিন্ন সময় কমিশনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। গত আগস্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামত উপেক্ষা করে ইভিএম প্রকল্প পাসের বিরোধিতা করে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার। পরবর্তীতে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ৫ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করতে না দেয়ায় কমিশনের বিরুদ্ধে নিজের বাকস্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ আনেন তিনি। ওই সময় আরপিও সংশোধন নিয়ে আয়োজিত সভাও বর্জন করেন তিনি। এছাড়া সিটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় ছিলেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।

ভয়ঙ্কর সুন্দর by ইশরাক পারভীন খুশি

প্রথম বৃষ্টি দেখে কি অনুভূতি হয়েছিল আমার মনে নেই। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজবার আনন্দ ও বৃষ্টি নিয়ে প্রতিটি বাঙালীর যে আবেগ তার সবই আমার হৃদয়ে আচ্ছাদিত। বৃষ্টির রিমঝিম বা টাপুরটুপুর শব্দ মনকে কেমন যেন আবেশে ভরিয়ে তোলে। ঠান্ডা শীতল অনুভূতি হালকা উষ্ণতা খুঁজে ফিরে পাতলা নরম নকশি কাঁথায়, মায়ের হাতের গরম খিচুড়ি- ডিম ভাজাতে অথবা ঝাল মুড়ির ঝালে। জানালার গ্রিলে অথবা কাঁচের শার্সিতে ঘামের মত বিন্দু বিন্দু জল গড়িয়ে পড়ে যে রেখা টানে তা সব বাঙালীর মনেই আঁচর কাটতে বাধ্য। কিন্তু যে গরম দেশের মানুষ, যে কোনদিনও তুষারপাত দেখেনি তার কাছে তুষারকন্যার সৌন্দর্য কি হতে পারে তা ভাবুন তো? গ্রীষ্মকালে লন্ডনে সন্ধ্যার সূর্য যেমন ডুবতে ডুবতে রাত নয়টা বাজিয়ে দেয় তেমনি শীতে সন্ধ্যা ঝুপ করে দুপুর সাড়ে তিনটায় নেমে পড়ে।
এরকমই একদিন হোয়াইট চ্যপেলের ৭৯ ওলেরির একরুমের বাসায় হু হু ঠান্ডায় কাজ থেকে ফিরে গরম ঝরণার জলে গা ভিজিয়ে ঘরে এসে দেখি প্রাণ ভোমরও কাজ থেকে চলে এসেছে। এসে জানাল জানালার পরদা তুলে বাইরে দেখো কি হচ্ছে ? আমি চোখ বড় বড় করে বাইরে তাকিয়ে দেখি ওমা একি! তুষারকন্যার পদার্পন হয়েছে। কত মাত্রার ঠান্ডা পড়লে জল জমে তুষার হয়? সে মাত্রার ঠান্ডাও কি তুষারপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করা রোধ করতে পারে? আমি খেয়াল করে দেখেছি সব সৌন্দর্যের মধ্যেই ভয়ংকর কিছু ঘাপটি মেরে বসে থাকে।
সাগরের ডেউ, পাহাড়ের উচ্চতা, জলপ্রপাতের তুমুল খরস্রোতা, সবুজ ঘন অরণ্যের নিস্তরঙ্গতা, তুষারের জমাট ঠান্ডা সবই ভয়ংকর সুন্দর । এ সৌন্দর্য একটা সীমা পর্যন্ত সুন্দর থাকে, আর সীমালঙ্ঘন হয়ে গেলে সুন্দর ভয়ংকরী হয়ে উঠে।
যাহোক তুষারের কথা বলি। তুষারপাত দেখে যত মোটা আর যত রকম গরম কাপড়চোপড় ছিল সব পড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম তুষারের প্রথম সৌন্দর্য গায়ে মাখতে। ঝিরঝির নিঃশব্দ হালকা সাদা বিন্দু গায়ে মাখতে থাকলাম সেই সন্ধ্যায়। উচ্ছাসে যেন ভেসে যাচ্ছিলাম হাওয়ায়। পাগলের মত ছুটোছুটি করে তুষার স্নান করলাম জীবনে প্রথম বারের মত। একরাশ ভাল লাগা নিয়ে ঘরে ফিরলাম প্রাণ ভোমরের তাড়ায়। একদিকে ঘরে হিটিং চলছে অন্য দিকে গরম কম্বলের নীচে ঢুকে ঘুমতে গেলাম সকাল দেখবো এ প্রত্যাশায়। বৃষ্টির মত কোন টাপুরটুপুর শব্দ নেই। পৃথিবীতে যেন কোথাও কিছু ঘটছেনা, নিশব্দে যেন কি ষড়যন্ত্র চলছে চারপাশে তার কোন খবর নেই কারো। উষ্ণ নরম আরামে তলিয়ে গেলাম ঘুমের দেশে অচিরেই। সকাল হতেই জানালার পরদা সরাতেই এক অভাবনীয় দৃশ্য আমার জানালার চোখ জুড়ে। সাদা সাদা মেঘ নেমে এসেছে মাটির পৃথিবীতে, হিমশীতল সাদা না শুভ্র চাদর কে যেন বিছিয়ে দিয়েছে সারা লন্ডনে। পাতাবিহীন কঙ্কাল সার গাছগুলো একরাশ পাকা সাদা চুল নিয়ে বুড়ি গাছে পরিণত হয়েছে, ঘরের চাল, পার্কিং লটে গাড়ির বহর, রাস্তা ঘাট, কোথাও একবিন্দু ফাঁকা নেই যেখানে সাদাপরি তার ডানা মেলে রাখেনি। অদ্ভুত ভয়ঙ্কর সুন্দর।
তাড়াতাড়ি গরম কাপড়টা পড়ে আবার বের হলাম তুষারে সাঁতার কাটবো বলে। এত নরম এত কোমল এত শুভ্র! ছুটোছুটি মাখামাখি গড়াগড়ি কোনটাই বাদ গেলোনা। প্রকৃতির নতুন একটা রুপকে দেখে আমি যে শুধু দিশেহারা তা নয়। আমরা যেমন বৃষ্টি নিয়ে মাতামাতি করি তেমনি তুষার নিয়ে এরাও মাতামাতি করে। ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে ছোট বাচ্চারা তুষারের বল বানিয়ে খেলা করে, বড়রাও বাদ যায় না বাচ্চা দের মজা দিতে, স্নো ম্যান বানায় যার নাকটা গাজড়, হাতগুলো শুকনো ডাল, গলায় মাফলার আর চোখ জোড়া বোতামের। এমনকি চিৎ হয়ে শুয়ে হাত পা তুষারের মধ্য ঘসে নড়াছাড়া করতে থাকলে অ্যাঞ্জেলের যে প্রতিকৃতি তৈরি হয় তাও আশ্চর্য সুন্দর। প্রতিটি তুষার কণার যে নিজস্ব একটা আকৃতি আছে এটা দশ বছর পর চোখে পড়েছে । ক্রিসমাসের সময় এরা যখন চারদিকে সাজসজ্জা করে তখন আল্পনার মত কি যেন একটা স্নোর প্রতীক হিসেবে ঝুলিয়ে রাখে। আমি এটাকে ভাবতাম কাল্পনিক একটা রুপ। কিন্তু এই কিছুদিন আগে খুব হালকা তুষার আমার জানালার কাঁচ ঘেষাঁ গাছের পাতার ওপর পড়ছিল, তখনই লক্ষ করলাম প্রতিটি তুষারের নিজস্ব ছাঁচ আছে। তখনই বুঝলাম এরা ঐ বিন্দু তুষারকেই সাজিয়ে রাখে। ক্রিসমাসের সাথে তুষারের একটা সম্পর্ক আছে বলে এরা বিশ্বাস করে। চব্বিশে ডিসেম্বর ক্রিসমাস ইভ যেদিন তুষারপাত মানে আশীর্বাদ। হট চকলেটের মগটা হাতে নিয়ে ফায়ার প্লেসের সামনে পরিবারের সবাই বসে হলিডে পালন করে। আর ভাবে রাত তিন প্রহরে সান্তা ক্লজ স্লেজ গাড়ি নিয়ে আসবে থলে ভর্তি উপহার নিয়ে।

তুষারপাতের সৌন্দর্য প্রথম দিনই ভাল তারপর তুষার জমাট বেঁধে বরফে রুপান্তর হলে তা বেজায় বিপদজ্জনক চলাফেরা করতে। পিচ্ছিল বরফের ওপর একবার পা পিছলিয়ে পড়লে আর রক্ষা নেই কোমড়ের হাড় আর আস্ত থাকবেনা। তবে কি, যে দেশের যে আচার তা না ঘটলে সেটার একটা বিরুপ প্রভাব প্রকৃতির ওপর পড়ে। আর তাই ঐরকম তুষার পাতে অনেক অনেক অনাকাঙ্খিত রোগ বালায় পোকামাকর বিনাশ হয়ে মানুষের উপকারই করে।
শীত শুরুর আগে গাছের পাতা হলুদ লাল নানা বর্ণের বর্ণিল হয়ে প্রকৃতি এখানে অপরুপ সুন্দর হয়ে ওঠে। এই সিজনটাকে এখানে ফল বলে। ঝরে পড়বার আগে গাছের পাতাগুলো যেন ঝলসে উঠে। তারপর একটা দুটো করে সব পাতা ঝরে হয়ে যায় কঙ্কাল সার। কেমন এক ভৌতিক রুপ নিয়ে গাছগুলো দীর্ঘ ঘুমে হারিয়ে যায়। এরকম এক সময়েই গিয়েছিলাম রিজেন্ট পার্কে। অবশ্য লন্ডনের প্রতিটি এলাকাতেই আছে ছোটখাট পার্ক। যেখানে বাচ্চারা খেলবে, মানুষ হাঁটবে নয়তো শুধুমাত্র বসে মিস্টি হাওয়ায় উপভোগ করবে প্রকৃতি। এই ফাঁকে বলে রাখি লন্ডন শহরে অসংখ্য কবুতর আর হাঁস দেখতে পাওয়া যায় সব সময়। এরা রানীর সম্পত্তি , এদের খাবার আসে রানীর তরফ থেকে। এদের ধরা মারা তো যাবেইনা উপরোন্ত উলটা-পালটা খাবারও দেয়া যাবেনা পাছে ওরা রোগাক্রান্ত হয়।
রিজেন্ট পার্ক খুব সুন্দর, বিশেষত ফল সিজনে দেখবার মত জায়গা। এটি লন্ডনের আটটি রয়াল পার্কের মধ্যে অন্যতম একটি রয়াল পার্ক যা ১৯৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত আর যাকে বলা হয় জুয়েল অফ দি ক্রাউন। আমি আর আমার সজ্ঞী আমরা ছবি তুলে মেমোরি কার্ড ভরে ফেললাম অথচ তারপরও মনে হল সৌন্দর্য কিছুই ক্যমেরা বন্দি করা গেলোনা। শুধু রিজেন্ট পার্ক নয় হাইড পার্কও রয়াল পার্ক। ৩৫০ একর জায়গা নিয়ে এটা তৈরি, এখানে স্পিকার কর্ণার নামে একটা জায়গা আছে যেখানে সর্ববৃহত মার্চ ও প্রোটেস্ট হয়ে থাকে। রিজেন্ট পার্ক যেমন ফুলের গাছে ঝরণা আর প্লে ডাউন্ড, লেক ইত্যাদি দিয়ে সাজানো গোছানো, অন্যদিকে হাইড পার্ক বড় বড় গাছের সমারোহে ভরা, বড় লেক, খেলবার জায়গা তো আছেই সেই সাথে এখানে নানা কনসার্টও অনুষ্ঠিত হয়।
শীতের শুরুতে যেমন পাতা ঝরার আগে প্রকৃতি অপরুপ ধারণ করে তেমন শীত শেষ হতে না হতেই গাছগুলো ঘুম থেকে জেগে উঠবার জন্য তরিঘরি শুরু করে দেয়। কেন বলছি এ কথা? কারণ শীত একটু কমতে না কমতেই ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া গাছেদের গায়ে লাগতেই গাছগুলো কুড়ি মেলে দেয়, পাতা আসার আগেই গাছগুলো সাদা গোলাপি নানা ফুলে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলে। আসলে গাছ নয় বৃক্ষ বললে বুঝতে সুবিধা হয়। বৃক্ষগুলি ফুলে ফুলে এত মেতে উঠে যা দেখবার মত দৃশ্য । এরকমই একদিন স্প্রিং-এর শুরুতে বাসা থেকে কাজে যাবার জন্য বের হয়েছি। বাসা থেকে ওভার গ্রাউন্ড স্যাডওয়েল ডিএলআর ইস্টিশনে যেতে বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। হাঁটার এ পথ জুড়ে গোলাপি সাদা ফুলের পাপঁড়ি বিছিয়ে থাকে। রাস্তার দুধারে ফুলে ঢাকা বৃক্ষরাজি আর রাস্তার কিনার ফুলের পাপড়িতে বিছানো কার্পেটের মত পথ ধরে হাঁটতে মন্দ লাগেনা। শুধু বাতাসে মিশে থাকা ফুলের রেণু নাকের ভেতর সুঁড়সুড়ি আর চোখের কোণে কড়কড়ে অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। একদিন সেই পথে এক হোমলেস বৃদ্ধ দেখি রাস্তা পার হতে গিয়ে পথের মাঝে এক অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমিও রাস্তা পার হতে গিয়ে দেখি ওর কেডসের ফিতা খুলে পায়ে বেঁধে হাঁটতে অসুবিধা তৈরি করছে। একটু অসহায় ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকাতেই বুঝলাম ওর সাহায্য দরকার। লাল টুকটুকে মুখ, মুখ ভর্তি সাদা দাঁড়ি, ছলছলে চোখ কিছুটা দিকভ্রান্ত। বললাম রাস্তাটা পার হই চল তারপর আমি ফিতাটা লাগিয়ে দেব। রাস্তা পার হয়ে ওর জুতার ফিতেটা ঠিক করে বেঁধে দিতেই খুব খুশি হয়ে গেল বৃদ্ধ, বলে উঠল গড ব্লেস ইউ। মনটা কিছুটা ভাল আর কিছুটা খারাপ লাগা নিয়ে নিজের পথে পা বাড়ালাম। এরকম কত হোমলেস মানুষও এখানে আছে কেউ ভাগ্যের দোষে কেউ ইচ্ছাকৃত। ভাল লাগল এজন্য যে সামান্য জুতোর ফিতে লাগিয়ে দিয়েও মনে হল কারো জন্য কিছু একটা করা হল।
লেখক: টেক্সাস (যুক্তরাষ্ট্র) প্রবাসী

হিরো আলম পর্যন্ত হাইকোর্ট দেখায়, বুঝেন অবস্থা: ইসি সচিব

আদালতের নির্দেশে নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন প্রার্থী যুক্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের এক সপ্তাহ আগে আসনগুলোতে ব্যালটপেপার পৌঁছানোর পরিকল্পনা ইসি’র। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রার্থিতার বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়ায় বিপাকে পড়েছে কমিশন। গতকাল এক অনুষ্ঠানে এ জটিলতার কথা জানান ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলাফল পাঠানোর বিষয়ে ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইএমএস), ক্যান্ডিডেট ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিআইএমএস) ও রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরএমএস) সফটওয়্যার নিয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ অনু্‌ষ্ঠানের আয়োজন করে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট। অনুষ্ঠানে সচিব বলেন, কমিশন এর মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। যেসব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে সেসব আসনের ব্যালট ছাপানোর কাজ চলছে।
আর যেসব আসনে এখনো বাকি আছে, ব্যালট পেপার একটু পরে ছাপবো। আমরা এক সপ্তাহ আগেই ব্যালট পেপার এলাকায় পৌঁছাতে চাই।
এখনো উচ্চ আদালত থেকে কিছু কিছু আসনের নির্দেশনা আসায় বিষয়টিতে নির্বাচন কমিশন উদ্বিগ্ন। আদালত থেকে নির্দেশনা আসার কারণে নির্বাচন কমিশনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয় করতে হচ্ছে। ৫০টির মতো আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিষয়টি সমন্বয় করতে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, উচ্চ আদালত বলছে, একজনকে দিলে আরেকজনকে দেবেন না কেন? আপনারা দেখেছেন হিরো আলম পর্যন্ত হাইকোর্ট দেখায়। হিরো আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনকে আমরা হাইকোর্ট দেখাইয়া ছাড়ছি।
বুঝেন অবস্থা! ইসি সচিব বলেন, ও (হিরো আলম) তো স্বতন্ত্র প্রার্থী। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যখন গেল তার নমিনেশন বাতিল হলো। আপিল করলে সেখানেও কমিশন বাতিল করেছে। পরে হাইকোর্টে তার প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০শে ডিসেম্বর ভোটের দিন ইন্টারনেটের গতি কমানোর পরিকল্পনা করছে বলে জানান ইসি সচিব। তবে, ভোটগ্রহণ শেষে গণনার সময়ে ফলাফল পাঠানো ও ব্যবস্থাপনার সুবিধায় বিকালের পর থেকে ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিক রাখতে চায় কমিশন।
অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশে ইসি সচিব বলেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানরা ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে আনতে আমাদের অনুরোধ জানিয়েছেন। ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে আনলে ভোটের ফল পাঠাতে খুব অসুবিধা হবে কি না এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। এ সময় প্রশিক্ষণার্থীরা জানান, ইন্টারনেটের গতি সীমিত থাকলে ফলাফল পাঠাতে সমস্যা হবে। পরে নির্বাচন কমিশন সচিব প্রশিক্ষণার্থীদের আবার প্রশ্ন করেন, ভোট গণনার আগে বিকাল ৫টার আগ পর্যন্ত যদি গতি কম থাকে? এমন প্রশ্নে প্রশিক্ষণার্থীরা জানান, এতে সমস্যা হবে না। পরে সচিব বলেন, আচ্ছা আমরা বিষয়টি দেখবো।
তাহলে ৩০শে ডিসেম্বর বিকাল ৪টার পরে যদি ফুল স্পিডে ইন্টারনেটের লাইন থাকে, তবে কোনো সমস্যা হবে না। সচিব বলেন, ৩০০ আসনে নির্বাচন করা একটা বিশাল ব্যাপার। দেশে যদি রাজনৈতিক সুপরিবেশ থাকে তাহলে কমিশনের কাজ করতে সুবিধা হয়। আর যদি সুপরিবেশ না থাকে সব সময় কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয়। হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনাররা মাঠে যাচ্ছেন, সভা করছেন, কথা বলছেন।
এসবের উদ্দেশ্য নির্বাচন যাতে সুশৃঙ্খল হয়, সুন্দর, সুষ্ঠু হয়, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের এতো ব্যাপক কর্মযজ্ঞ কিন্তু আর কখনো গ্রহণ করা হয়নি। আমি ৩১ বছর ধরে মাঠে আছি। আমি নিজে রিটার্নিং, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ছিলাম, ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতো বিশাল কর্মযজ্ঞ এর আগে কখনো দেখিনি। আবার নতুন যোগ হয়েছে ইভিএম। ইভিএম নিয়েও আমরা নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দফায় দফায় প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্য করে সচিব বলেন, ফলাফল গণনায় খুব সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে। একটা সংখ্যার এদিক-সেদিক হলে কিন্তু ওই এলাকায় মারামারি শুরু হয়ে যাবে। এগুলো আপনারা সাবধানে করবেন।
টেলিভিশনের একটি বিজ্ঞাপনের উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশন সচিব বলেন, যুদ্ধের সময় সেনাপ্রধান বললো- সবাই জাগো। কিন্তু সবাই শুনলো ভাগো। ভাগো শুনে সবাই ভেগে গেছেন। কথার শব্দের হের ফেরে যেমন একটা টোটাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়, ঠিক তেমনি আমাদের একটা সংখ্যার কারণেও কিন্তু একটা এলাকায় অশান্তির সৃষ্টি হতে পারে। আপনারা খুব সতর্কতার সঙ্গে, সুন্দরভাবে, ঠাণ্ডামাথায় এ কাজটা করবেন।

হুমকি বাড়ায় আত্মগোপনে যাচ্ছে বিরোধীরা -এএফপি’র রিপোর্ট

বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলীয় প্রার্থী এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এতটাই ভীতসঙ্কিত যে, নিজের অফিস ছাড়তে ভয় পাচ্ছেন তিনি। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণায় হত্যা ও হুমকি চরম আকার ধারণ করেছে। ঢাকার এই আইনজীবীর এখন ভোটারদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত করে প্রচারণায় রাজপথে থাকা উচিত ছিল হাতে লিফলেট নিয়ে। কিন্তু তার জন্য এ কাজ ভীষণ বিপদজনক। তার দল বলছে, প্রার্থীদের সুরক্ষা দিতে কর্তৃপক্ষ কিছুই করছে না।
বিষাদগ্রস্ত তার প্রধান কার্যালয়। সেখানে অব্যবহৃত প্রচারপত্র ও ব্যানার। সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমরা যখনই এসব পোস্টার টানাতে যাই তখনই আমাদের ওপর হামলা চালায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।
তখন পুলিশ থাকে নীরব দর্শক অথবা তারা ওইসব নেতাকর্মীর সক্রিয় সমর্থকে পরিণত হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সংঘর্ষে কমপক্ষে ৬ জন নিহত হয়েছেন। ৩০ শে ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে দেশজুড়ে ২০ হাজারের বেশি আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যকে মোতায়েন করেছে নির্বাচন কমিশন। তাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার কথা সেনাবাহিনীর। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারছে না বিএনপি।
তারা বলছে, গত এক সপ্তাহে তাদের দলের কমপক্ষে ৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গত সপ্তাহে পুলিশের ধাওয়ায় ঢাকায় একটি বাসার ছাদ থেকে পড়ে একজনের মৃত্যু। এ ছাড়া আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। বিএনপি দাবি করছে যে, নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে বিরোধী দলের ৩০০ আসনের প্রার্থীর মধ্যে ১৫২ জনের ওপর হামলা হয়েছে। ১৪ জন প্রার্থীসহ কমপক্ষে ৮৭০০ নেতাকর্মীকে গত মাসে আটক করা হয়েছে। বিরোধীরা আরো বলছে, তাদের র‌্যালির ওপর রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে র‌্যালি ভেঙে দিয়েছে পুলিশ। ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে ভোটারদের মাঝে যাতে তারা ক্ষমতাসীনদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে।
সুব্রত চৌধুরীর মতো প্রার্থীরা দৃশ্যমান হওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু লৌহদন্ড হাতে র‌্যালিতে হামলা চালানোর হুমকি দিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনুসারীরা। বিরোধীদের সঙ্গে সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের দু’জন অনুসারী নিহত হয়েছেন। বিরোধীদের র‌্যালিতে হস্তক্ষেপ বা প্রচারণায় হয়রান করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পুলিশ। ওদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, সম্প্রতি যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বিরোধী দল বলছে, আটক করা হয়েছে কয়েক হাজার সদস্যকে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তার দল নেতাকর্মীদেরকে বিরোধী দলের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেয় নি। তিনি বলেন, আমি বলবো না যে, অভিযোগের সবটাই মিথ্যা। কিন্তু আমরা কোন নির্দেশ দিই নি।
বিরোধী দলীয় বেশ কিছু সংখ্যক প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছে।
কিন্তু নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ বাড়ছে।
মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ও সরকারের সমালোচকরা সতর্কতা দিয়েছেন। বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে নির্বাচন অবাধ অথবা সুষ্ঠু হওয়ার মতো অবস্থা নেই।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেন, প্রধান বিরোধী দলগুলোর সদস্য ও সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, এমন কি গুম করা হয়েছে। এতে আতঙ্ক ও নিপীড়নের একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো আবারো একটি একপেশে নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০১৪ সালে বিএনপি ভোট বর্জন করেছিল এবং তাতে শেখ হাসিনা কোনো চ্যালেঞ্জ ছাড়াই সরকার গঠন করেন। তারপর থেকে হাসিনা ও তার দল ক্রমশ কর্তৃত্ববাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন,  দুর্বোধ্য একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে ভিন্ন মতাবলম্বী ও মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করছেন।
সমালোচক, বিশেষত পুরস্কার বিজয়ী ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমকে উস্কানিমুলক বিবৃতি দেয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
বিরোধী দলের অশীতিপর নেতা খালেদা জিয়াকে নভেম্বরে আরেকদফা জেল বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা নিশ্চিত হয়েছে।
আতঙ্কের ফলে ভোটারদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয়েছে যে, শাসক দলের কোনো বিকল্প আছে কিনা। রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার একজন ভোটার রেজাউর রহমান। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এটা হলো একপেশে নির্বাচন। বিরোধীরা প্রচারণা চালানোর ক্ষেত্রে ভীষণ ভীতির মধ্যে রয়েছে।
তার প্রতিদ্বন্দ্বি, বিরোধী দলীয় প্রার্থী অদৃশ্য। প্রতিশোধ নেয়া হতে পারে এই ভয়ে নাম প্রকাশ না করে একজন দোকানি বললেন, বিরোধীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে কিনা তা নিয়েই তো আমার সন্দেহ হয়। এখনও আমি তার কোনো পোস্টার বা লিফলেট দেখি নি। তার জন্য ভোট চাইতে কেউ আমার কাছে আসে নি।
জবাবে বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে অনেক প্রতিবন্ধকতা।
গত সপ্তাহে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা আব্বাসের গাড়িবহরে হামলা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, তারা (সরকার) দাবি করে জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। তাহলে কেন সবাই অবাধে প্রচারণা চালাতে পারছেন না?

আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যা আছে

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক ইশতেহারে ২১ দফা অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন তথা গ্রামে আধুনিক সুবিধার উপস্থিতি, শিল্প উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সুরক্ষা, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে আগামী ৫ বছরের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে ইশতেহারে। মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির সামনে দলের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেন। ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো।
গণতন্ত্র, নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ: ইশতেহারে এর ১০টি সাফল্য ও অর্জনের কথা তুলে ধরে লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হবে এবং সংবিধান হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা: প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও সাহায্য-সহায়তা লাভের সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনও প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হবে। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন: একটি আধুনিক, প্রযুক্তি নির্ভর, দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক গণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত থাকবে। নিশ্চিত করা হবে প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায়পরায়ণতা এবং সেবাপরায়ণতা।
প্রশাসনের দায়িত্ব হবে নির্ধারিত নীতিমালা ও নির্বাহী নির্দেশাবলি বাস্তবায়ন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সর্বপ্রকার হয়রানির অবসান ঘটানোর কাজ অব্যাহত থাকবে। বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নানা স্তর কঠোরভাবে সংকুচিত করা হবে। নিয়মানুবর্তী এবং জনগণের সেবক হিসেবে প্রশাসনকে গড়ে তোলার কাজ অগ্রসর করে নেয়া হবে।
জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা: আগামী পাঁচ বছরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ করা হবে। সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কারের কাজ আগামীতে অব্যাহত থাকবে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কাজ চলমান থাকবে।
সেবা প্রদানের জন্য দ্রুত সাড়াদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যানবাহন-সরঞ্জামাদি সরবরাহ, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, প্রয়োজনীয় ভূমি ও অবকাঠামোর সংস্থান, প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সদস্যদের কল্যাণমূলক কার্যের পরিধি বিস্তারে কৌশলগত পরিকল্পনার আলোকে বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ: দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং প্রায়োগিক ব্যবহারে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ভবিষ্যতে আরো জোরদার করা হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সামপ্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল: ইশতেহারে লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- আগামীতে জঙ্গিবাদ, সামপ্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতি সরকারের দৃঢ় অবস্থান থাকবে। সন্ত্রাসী-গডফাদারদের এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার এবং বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখল, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বন্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সরকার, জনগণের ক্ষমতায়ন: সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থানকে বিবেচনায় নিয়ে জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করা হবে। বিভিন্ন স্তরে স্থানীয় সরকারের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা হবে। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায়িত্ব বিভাজন সুনির্দিষ্ট করা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের উপযোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। নগর ও শহরে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনগণের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
সামষ্টিক অর্থনীতি : উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ থেকে স্বাধীনতার ৭০ বছর ২০৪১। বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনামলে উন্নয়নের সূচকগুলোর বিস্ময়কর অগ্রগতি এবং আপামর মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নতি গণমনে আত্মবিশ্বাস ও সাহস এমন পর্যায়ে উন্নীত করেছে যে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশে রূপান্তর সম্ভব। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর লক্ষ্য অর্জন করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে স্বাধীনতার ৭০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা, সুদূরপ্রসারী কৌশল ও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। এই পরিকল্পনায় অঙ্গীকার অনুয়ায়ী ২০১৯-২৩ সময়কালের লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রাকে এমনভাবে সমন্বয় করা হবে, যাতে দেশ ধারাবাহিকভাবে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অভিমুখে অগ্রসর হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ পালনকালে হবে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে ৫ হাজার ৪৭৯ ডলারেরও বেশি। এই পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট): অবকাঠামো রূপান্তরের লক্ষ্যে বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখা হবে। পদ্মা রেলসেতু সংযোগ এবং কক্সবাজার-দোহাজারী-রামু-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। মাতারবাড়ী কয়লা বন্দর, ভোলা গ্যাস পাইপলাইন ও উপকূলীয় অঞ্চলে একটি পেট্রোকেমিক্যালস কারখানা স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
‘আমার গ্রাম, আমার শহর’: উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কম্পিউটার ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা,  বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সমপ্রসারণের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সকল সুবিধাদি দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে। গ্রামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আরো বাড়ানো ও নির্ভরযোগ্য করার লক্ষ্যে গ্রুপভিত্তিতে বায়োগ্যাস প্লান্ট ও সৌরশক্তি প্যানেল বসানোর উৎসাহ ও সহায়তা দেয়া হবে।
গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সমপ্রসারণ করা হবে এবং এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করা হবে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্কা যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করতে বেসরকারি খাতের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।
প্রশাসন, নীতি ও বাজেট প্রণয়ন: একটি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় যুবনীতি পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। তরুণদের কল্যাণ ও উন্নয়ন কাজে প্রশাসনিক গতি আনতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতায় গঠন করা হবে পৃথক যুব বিভাগ। জাতীয় বাজেটে বাড়ানো হবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বরাদ্দ। জেন্ডার বাজেটের আলোকে প্রণয়ন করা হবে বার্ষিক যুব বাজেট। তরুণদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য গঠন করা হবে যুব মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘যুব গবেষণা কেন্দ্র’।
শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগ করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রাধিকার পাবে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রসারিত করা হবে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিটি উপজেলায় ‘যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি এই কেন্দ্রগুলোকে পর্যায়ক্রমে ‘তরুণ কর্মসংস্থান কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দুটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হবে। ‘কর্মঠ প্রকল্প’র অধীনে ‘স্বল্প শিক্ষিত/স্বল্প দক্ষ/অদক্ষ’ শ্রেণির তরুণদের শ্রমঘন, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উপযোগী জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ‘সুদক্ষ প্রকল্প’র অধীনে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, তা দূর করতে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের তথ্য সংবলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন ও তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির জন্য আবেদন করার আহ্বান জানাতে পারবে। কর্মসংস্থানে কৃষি, শিল্প ও সেবার অংশ যথাক্রমে ৩০, ২৫ ও ৪৫ শতাংশে পরিবর্তন করা হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া উক্ত সময়ে নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন: ২০২০ সাল নাগাদ উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষায় নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীর অনুপাত বর্তমানের ৭০ থেকে ১০০ শতাংশে বৃদ্ধি করা হবে। প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে নারীর অধিক সংখ্যায় নিয়োগের নীতি আরো বৃদ্ধি করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে তাদের জন্য আলাদা ব্যাংকিং সুবিধা, ঋণ সুবিধা, কারিগরি সুবিধা ও সুপারিশসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ‘জয়িতা’ ফাউন্ডেশন সম্প্রসারণের মাধ্যমে নারীদের সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ সম্প্রসারণ করা হবে। নারীদের পুরুষের সমান মজুরির নিশ্চয়তা দেয়া এবং গ্রামীণ নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সকল ক্ষেত্রে নারীদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস: বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ৪ কোটি ৯২ লাখ লোক বিভিন্ন প্রকার আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছে; আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হবে। দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি ও ভবঘুরেপনা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হবে। দারিদ্র্যসীমা ও চরম দারিদ্র্যের হার যথক্রমে ১২.৩ ও ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে দরিদ্র জনসংখ্যা ২.২ কোটির নিচে নামানো হবে। প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজনের নিয়মিত রোজগার নিশ্চিত করে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য হাসিল করা হবে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের মাধ্যমে পল্লি জনপদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হবে। পিকেএসএফ-এর ৮ মিলিয়ন ঋণ গ্রহীতার মধ্যে ৯১ শতাংশ নারী। সকল ক্ষুদ্র ঋণে নারীদের অগ্রাধিকার প্রদান অব্যাহত রাখা হবে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিধি আরো বৃদ্ধি করে সবার জন্য বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
বৈষম্য হ্রাস: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- বৈষম্য দূরীকরণে গৃহীত পরিকল্পনা ও কর্মসূচির পরিধি অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে জোরদার করা হবে।
কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি : খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে নিশ্চয়তা: সবার জন্য পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের জোগান দেয়ার লক্ষ্যে দ্রুত কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সফল ধারা অব্যাহত রাখা হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হবে। কৃষিতে শ্রমিক সংকট লাঘবের জন্য সহজে ব্যবহার্য ও টেকসই কৃষি যন্ত্রপাতি সুলভে সহজপ্রাপ্য করা হবে। সহজ শর্তে সময়মতো কৃষি ঋণ, বিশেষ করে বর্গাচাষিদের জন্য জামানতবিহীন কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। মহিলা কৃষকদের জন্য গৃহাঙ্গন ও মাঠে ফসল চাষের জন্য কৃষি ঋণ আরো সহজপ্রাপ্য করা হবে। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি আলু, শাক-সবজি, তৈলবীজ, মসলা, নানা জাতীয় ফলমূল, ফুল, লতাপাতা-গুল্ম, ঔষধি ও ফসল উৎপাদনে বর্তমানে প্রদত্ত সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করা হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষি পণ্যের দক্ষ সাপ্লাই চেন/ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা হবে। সে-সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। কৃষি গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ ইতিমধ্যে বাড়ানো হয়েছে এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা হবে। বিশেষ করে জীবপ্রযুক্তি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ন্যানো প্রযুক্তি, সংরক্ষণশীল ও সুনির্দিষ্ট কৃষি, হাইব্রিডাইজেশন, জিএম ফুড ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ইতিমধ্যে পাট ও ইলিশ মাছের জেনম আবিষ্কারের ফলাফলকে অধিকতর উৎপাদনশীল ও লাভজনক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে উৎসাহ ও সহযোগিতা দেয়া হবে। উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় অবকাঠামো, কৃষক সংগঠন (এফএফএস), বিপণন সংগঠন, সমবায় সমিতি ও কৃষি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ: ২০২৩-এর মধ্যে হাঁস-মুরগির সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রাণী খাদ্য, গবাদিপশুর ঔষধপত্র ও চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস ও সহজপ্রাপ্য করার ওপর জোর দেয়া হবে। সে-সঙ্গে এগুলোর জন্য যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়, তার জন্য বাজার-ব্যবস্থা ও বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার আরো উন্নয়ন করা হবে।
ছোট ও মাঝারি আকারের দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামার প্রতিষ্ঠা এবং মৎস্য চাষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনমতো ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নীতি-সহায়তা বৃদ্ধি করে তা অব্যাহত রাখা হবে। পুকুরে মাছ চাষ ও যেখানে সম্ভব ধানক্ষেতে মাছ চাষের আরো প্রসারের জন্য উন্নত জাতের পোনা, খাবার, রোগব্যাধির চিকিৎসা, পুঁজিসংস্থান ও সুলভে বিদ্যুৎ সংযোগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান অব্যাহত রাখা হবে। মৎস্য খাতের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গবেষণার ব্যাপক মানোন্নয়ন, কৃষকদের সম্পৃক্ত করে মাছ চাষের ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি সাধন ও ধৃত মাছের অপচয় ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। সার্বিক কৃষি খাতে প্রাণিসম্পদ উপখাতের অবদান ১৪.৩১ শতাংশ। এটাকে আরো বৃদ্ধি করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ২৩,০০০ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে সকলের জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চলে একটি এবং পায়রাতে একটি করে ‘এনার্জি হাব’ গড়ে তোলা হবে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতাসম্পন্ন আরো একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ শেষ হবে।  ২০২৩ সালের মধ্যে মোট ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকতর কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।  জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে ভারতের শিলিগুড়ি টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ৩০৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, গভীর সমুদ্র থেকে চট্টগ্রামে তেল আনার লক্ষ্যে পাইপ লাইনসহ ইতিপূর্বে গৃহীত অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি করে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে রিফাইনারি প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। দেশের কয়লা সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
শিল্প উন্নয়ন: রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে আর্থিক প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে। শিল্পায়নের প্রবৃদ্ধি অর্জনে সম্পদ ও উপাদান হিসেবে প্রযুক্তির উদ্ভাবনে দেশীয় গবেষণাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি করা হবে। শিল্প স্থাপনের বাধা বিশেষত, ভূমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা দূর করা হবে। দেশে যেসব পণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে সেসব ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত প্রতিরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়া হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে বিশেষ গুরুত্বসহকারে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে। পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের মানোন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, চামড়া, খেলনা, জুয়েলারি, আসবাবপত্র, পর্যটন- এসব খাত এই কর্মসূচির সুবিধা পাবে। ঔষধ শিল্প ও ঔষধের কাঁচামাল প্রস্তুতকারী অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট শিল্পকে উৎসাহ দেয়া হবে। ডব্লিউটিও অনুন্নত দেশের জন্য এপিআই শিল্পকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত বিবিধ রেয়াত দিয়েছে, যার সুফল গ্রহণের জন্য গৃহীত নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। পিপিপি আইন ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো সংস্কার করা হবে। বিডা (বিআইডিএ)-কে অধিকতর কার্যক্ষম করা হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আনুমানিক অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করবে এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করবে।
পদ্মা সেতুর দুই পাড়ে সিঙ্গাপুরের আদলে শিল্পনগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। জেলা শহর ও মফস্বল শহরে স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুচ্ছ শিল্পাঞ্চল (ক্লাস্টার ইন্ডাস্ট্রি) গড়ে তোলা হবে। সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পকে গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি গুচ্ছশিল্প কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে বগি ও কোচ উৎপাদন করার উদ্যোগ নেয়া হবে। বিভাগীয় শহরে আইটি শিল্প পার্ক স্থাপন এবং এসব শিল্প পার্কে আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শিল্পের ভিত্তি মজবুত এবং আধুনিকায়নে ভারী ও মৌলিক শিল্প স্থাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যাকে কেন্দ্র করে শিল্পনগরী গড়ে উঠবে। জ্ঞানসমৃদ্ধ সমাজে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহিত করা হবে।
শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য চার মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। গার্মেন্ট শ্রমিকসহ সকল শ্রমিক, হতদরিদ্র এবং গ্রামীণ ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় নানা পদক্ষেপের সঙ্গে রেশনিংসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রবাসী কল্যাণ: বিভিন্ন দেশে আরো বেশিসংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী প্রেরণের এবং তাদের শ্রমলব্ধ অর্থের আয়বর্ধক এবং লাভজনক বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত নীতি-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা হবে। বিদেশে যাওয়ার সময় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক হতে নমনীয় শর্তে ও সুদে এবং দেশে ফেরার পর স্থায়ী কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান সুনিশ্চিত করা হবে।
শিক্ষা: শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষা পাঠক্রমের লক্ষ্য হচ্ছে- শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞান আহরণ এবং দেশ ও জাতির অবিকৃত সত্য ইতিহাস জানার অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করা। শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে। ভাষা জ্ঞান ও গণিত জ্ঞানের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের ভাষা ও গণিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষরতার অভিশাপমুক্ত করা হবে। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। গত এক দশকে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ঝরে পড়ার হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। স্কুল ফিডিং সকল গ্রামে, আধা মফস্বল শহরে এবং শহরের নিম্নবিত্তের স্কুলসমূহে পর্যায়ক্রমে সার্বজনীন করা হবে।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে। শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগের একমাত্র মানদণ্ড হবে মেধা, যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকল সর্বতোভাবে বন্ধ করার জন্য গৃহীত ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত ও সহায়তা প্রদান করা হবে। এজন্য বাজেট বৃদ্ধি করা হবে। সকল জেলায় অন্তত একটি প্রাইভেট বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
মাদরাসা শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদানের জন্য কারিকুলাম যুগোপযোগী করা হবে। নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে প্রয়োজনীয় সকল বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থায়ও তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হবে। সকল দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের বই ছাপানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রতিবন্ধীদেরও মানবসম্পদে পরিণত করা হবে।
শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধিসহ সরকারের নানা কল্যাণমুখী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের বেতন গ্রেডসহ শিক্ষাখাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে, আগামী মেয়াদে তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ: দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা প্রাপ্তি উন্নত করা হবে। এক বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের ওপরে সবাইকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। সকল বিভাগীয় শহরে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হার্ট, ক্যানসার ও কিডনি চিকিৎসা-ব্যবস্থা চালু করা হবে।
প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত ১০০ শয্যার স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যানসার ও কিডনি চিকিৎসা-ব্যবস্থা চালু করা হবে। সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং হাসপাতালগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি প্রচলন করে স্বাস্থ্যসেবা-ব্যবস্থাকে আরো নির্ভুল ও জনবান্ধব করা হবে। অনলাইনে দেশ-বিদেশ থেকে বিশেষায়িত চিকিৎসকের সেবা পাওয়া যাবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ভবনসহ সব সুবিধা পর্যায়ক্রমে আধুনিকীকরণ করা হবে। আয়ুর্বেদী, ইউনানী, দেশজ ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও শিক্ষা-ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখা হবে। গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি, সেবার মান বৃদ্ধি এবং উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।
যোগাযোগ: মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ১৬,৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯.২৪ কিলোমিটার বিস্তৃত ঢাকা পূর্ব-পশ্চিম এলিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণ করা হবে। ঢাকাকে ঘিরে একটি এলিভেটেড রিংরোড এবং ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণেরও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং এক্সপ্রেস রেলওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে যাতে চট্টগ্রামে পৌঁছানো যায় সেজন্য বুলেট ট্রেন (দ্রুতগামী ট্রেন) চালু করা হবে। ক্রমে বুলেট ট্রেন সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা এবং কলকাতা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকে উন্নত করা হবে। ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করা হবে সুপিরিয়র বিমান অবতরণে সক্ষম দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর। বাগেরহাটে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সম্পাদন করা হবে। ইতিমধ্যে ‘নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আগামীতে সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন ধারা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে এটাকে আরো যুগোপযোগী ও কার্যকর করা হবে। নিরাপদ সড়কের জন্য লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা, ফিটনেসবিহীন গাড়িকে পারমিট না দেয়া, চালকদের লাইসেন্স প্রদানে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা, সড়ক ও মহাসড়কগুলোকে ক্রমে সিসিটিভি-র আওতায় আনা এবং জনসাধারণকে সচেতন করা প্রভৃতি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হবে। বেসরকারি বিমান পরিবহনকে আরো উৎসাহিত করা হবে। স্বল্প খরচে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজধানী ঢাকার জনপরিবহন সমস্যার সমাধান ও যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে পাতাল রেল, মেট্রোরেল অথবা সার্কুলার রেলপথ এবং রাজধানীতে নাব্য ও প্রশস্ত নৌপথ নির্মাণ করা হবে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে উন্নত করে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে আমাদের সীমান্তবর্তী ভারতের ৭টি প্রদেশ এবং নেপাল ও ভুটান এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। ট্রান্স এশিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক জোটের যোগাযোগ-ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।
নৌপথ ও বন্দর: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে-ব্যাপক খননের পরিকল্পনা হিসেবে আগামী মেয়াদে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর সংযোগ স্থাপন করার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি সুগম করা হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাণিজ্যকে সহজতর করার লক্ষ্যে ভারতের সঙ্গে নৌপথ বাণিজ্য আরো বাড়িয়ে একে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা ৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ঢাকার চারপাশের ৪টি নদী এবং খালগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত করে খননের মাধ্যমে নাব্য ফিরিয়ে এনে নদীতীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি: ২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি চালু করা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, ব্লক চেইন, আইওটি-সহ ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো হবে। ই-পাসপোর্ট এবং ই-ভিসা চালু করা হবে। শিক্ষাকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আর্থিক খাতের লেনদেনকে ডিজিটাল করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তির সফটওয়্যার, সেবা ও ডিজিটাল যন্ত্রের রপ্তানি ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এবং সাবমেরিন ক্যাবল-৩ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে। সামরিক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানো হবে। ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহারের মূল্য যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে।
সমুদ্র বিজয়: ব্লু-ইকোনমি-উন্নয়নের দিগন্ত উন্মোচন: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- আওয়ামী লীগ সরকার ইতিমধ্যে ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী মেয়াদে এই পরিকল্পনা অন্যতম অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- বিশ্ব উষ্ণায়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা থেকে মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেই প্রেক্ষিতে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড’-এ বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে। উৎপাদনশীল বনের আয়তন ২০১৫ সালের ১৩.১৪ হতে ২০ শতাংশে উন্নীতকরণ, ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে বায়ুর মান উন্নয়ন এবং বিশুদ্ধ বায়ু আইন প্রণয়ন করা; শিল্প বর্জ্যের শূন্য নির্গমন/নিক্ষেপণ প্রবর্ধন করা; জলাভূমি সংরক্ষণ আইন মেনে বিভিন্ন নগরের জলাভূমি পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা করা; উপকূল রেখাব্যাপী ৫০০ মিটার চওড়া স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে। সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও লবণাক্ততা রোধ ও সুন্দরবনসহ অববাহিকা অঞ্চলের মিঠা পানি প্রাপ্তির লক্ষ্যে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে। দেশের বিস্তীর্ণ হাওর ও ভাটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। উন্নয়ন কার্যক্রমের সকল ক্ষেত্রে সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণ করা হবে।
শিশু কল্যাণ: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা সুদৃঢ় সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বৃত্তি ও নানাবিধ কর্মকাণ্ড উন্নত ও প্রসারিত করা হবে। শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার, প্রলোভন বা জোর করে জড়িত করা হবে না। শিশু নির্যাতন বিশেষ করে কন্যাশিশুদের প্রতি বৈষম্য, নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পথশিশুদের পুনর্বাসন ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য শিশুসদন প্রতিষ্ঠা এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা উন্নত ও প্রসারিত করা হবে।
প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ কল্যাণ: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- প্রতিবন্ধী (অটিস্টিক) শিশুদের সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ, চিকিৎসা সহজ করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রবীণ কল্যাণ: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- সামাজিক ‘নিরাপত্তা-বেষ্টনী কার্যক্রম-এ প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তির বর্তমান সংখ্যা ও সহায়তার পরিমাণ সম্প্রসারণে বাস্তবতার আলোকে পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রবীণদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আয় সৃষ্টিকারী কার্যক্রম গ্রহণ, প্রবীণদের বিষয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে পাঠ্যবই-এ আলাদা অধ্যায় সংযোজন, যানবাহন এবং আবাসিক স্থাপনাগুলোতে প্রবীণদের জন্য আসন/পরিসর নির্ধারণ, তৃণমূল পর্যায়ে প্রবীণদের জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং হাসপাতাল, বিমানবন্দর, বিভিন্ন স্থাপনা ও যানবাহনে ওঠা-নামার ব্যবস্থা প্রবীণবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে।
মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- স্বাধীনতার স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাদের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বিশেষত দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, বার্ধক্যকালীন ভরণ-পোষণ ও বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ গৃহীত অন্যান্য ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। দেশের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা, ইতিহাস বিকৃতি রোধ এবং প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিতকরণ, শহিদদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।
সংস্কৃতি: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা অব্যাহত থাকবে। বাংলা ভাষা সাহিত্য, চারু ও কারুকলা, সংগীত, যাত্রা, নাটক, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল প্রকাশনাসহ শিল্পের সব শাখার ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধন ও চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো হবে।
ক্রীড়া: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- বিশ্ব ক্রিকেটে বর্তমানে বাংলাদেশের গৌরব জাগানো অবস্থান আরো সুদৃঢ় করার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল হকিসহ অন্যান্য খেলা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে। ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ সুবিধার
সম্প্রসারণে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে খেলাধুলা ও শরীর চর্চাকে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা হবে। সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য অন্যায় ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- সাংবাদিকদের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রস্তাবিত ২১তলা ভবন নির্মাণে সহায়তা প্রদান করা হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিকাশের ফলে এর অপব্যবহার করে গুজব ছড়িয়ে এক শ্রেণির মানুষ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। গুজব শনাক্ত ও সত্য তথ্য প্রচারের মধ্যদিয়ে গুজব নিরসনে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা হবে। জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠন করে সকল গণমাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকতা রোধ ও জনগণের সত্য তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতায় সমৃদ্ধ সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করা হবে। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে অধিকতর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চর্চায় সাংবাদিকদের উৎসাহিত করা এবং এ-বিষয়ে প্রয়োজনীয় ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বিতরণে বৈষম্যমূলক নীতি, দলীয়করণ বন্ধ এবং সংবাদপত্রকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে তার বিকাশে সহায়তা প্রদান করা হবে। গণমাধ্যমবান্ধব আইন করা হবে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কোনো আইনের অপপ্রয়োগ হবে না। পেশাদার সাংবাদিকদের কল্যাণের জন্য প্রচলিত উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ নেয়া হবে।
প্রতিরক্ষা: নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সুরক্ষা: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের চলমান প্রক্রিয়া যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বতোভাবে অব্যাহত থাকবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্বশাসন, শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা সমুন্নত রাখা হবে। জ্যেষ্ঠতা, মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধাসহ গৃহীত বহুমুখী কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ সমুন্নত রাখা ও বৃদ্ধি করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণের জন্য চলমান কাজ চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে।
পররাষ্ট্র: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- আন্তর্জাতিক যে কোনো বিরোধ শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ সকল ক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ভারত-ভুটান-নেপালের সঙ্গে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও অভিন্ন নদীর অববাহিকাভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।  বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো শক্তিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা হবে। রাশিয়া, চীন এবং আশিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক আরো জোরদার করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও কানাডাসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক আরো জোরদার ও ব্যাপক বিস্তৃত করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ বিশ্বের মুসলিম দেশসমূহের সঙ্গে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন ও সহযোগিতা আরো জোরদার করা হবে।
এদেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন প্রভৃতি বিষয়ে বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা থাকবে। মুসলিম উম্মাহর সংহতি এবং ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) কাঠামোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সহযোগিতা আরো জোরদার করা হবে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করা হবে। অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর এলাকার সঙ্গে অধিকতর যোগাযোগ ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
রোহিঙ্গা সংকট: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমে নিরাপদ সম্মানজনক ও স্থায়ীভাবে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে সফলভাবে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহকে এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করেছে।
এনজিও: ইশতেহারে এর লক্ষ্য পরিকল্পনা তুলে ধরে বলা হয়েছে- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ স্বশাসিতভাবে তাদের নিজস্ব বিধিমোতাবেক পরিচালিত হবে। দারিদ্র্য বিমোচন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান বিষয়ে নিজস্ব বিধি ও রীতি অনুযায়ী কাজ করার অধিকার অব্যাহত রাখা হবে। সরকার বিধিবদ্ধ এনজিও প্রতিষ্ঠানের অর্জন বা ব্যর্থতা মূল্যায়ন করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান/বিভাগ স্থানীয় সরকারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছামূলক সমন্বয় জোরদার করা হবে। অর্থায়নকারী অন্যান্য এনজিও-র সকল কার্যক্রম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ এবং স্থানীয় জনগণ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এনজিও সংস্থা সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করলে অথবা শিল্প ও বাণিজ্যে ভূমিকা রাখতে গেলে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় পড়বে এবং এনজিও হিসেবে কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাবে না। তাদের লভ্যাংশের যে অংশ জনসেবায় ব্যয় হবে সেক্ষেত্রে কর রেয়াতির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পাচার হওয়া নারী নিজেই যেভাবে হয়ে গেলেন পাচারকারী

"আমি কান্নায় ফেটে পড়লাম। এটা ছিল খুবই অন্যায্য। পুরুষদের কাছে আমাকে 'তুলে' দেয়া হতো যেখানে উত্তর কোরিয়াতে আমার স্বামী এবং সন্তান আছে। আমার মনে হতো ভুল দেশে জন্ম হওয়ার কারণে আমাকে এই নোংরা জগতে আসতে হয়েছে।"
কথাগুলো বলছিলেন 'মিসেস বি'।
২০০৩ সালে তাকে যখন চীনের কিছু লোকের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয় তখন তার বয়স ছিল ৩৬ বছর।
উত্তর কোরিয়া থেকে পলায়ন
ওই নারী উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত পার হয়ে চীনে পৌঁছান। ভেবেছিলেন কোনও বাড়িতে বয়স্কদের দেখাশোনার লোক হিসেবে কাজ জুটবে তার।
তাকে একজন দালাল অন্তত তেমনটাই বলেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল ডাহা মিথ্যা কথা।
মিসেস বি'র পরিকল্পনা ছিল তিনি এক বছর সেখানে কাজ করে টাকা জমাবেন এবং তারপর উত্তর কোরিয়াতে ফিরে যাবেন।
সেই টাকা-পয়সা দিয়ে দেশে থাকা তার স্বামী এবং দুই সন্তানের খাওয়া-পড়া চলে যাবে।
নতুন করে বিয়ে বা স্বামী পাওয়ার কোন ধরনের চিন্তাই ছিলনা তার মাথায়।
চীনাদের কাছে বিক্রি
চীনের জিলিন প্রদেশের চাংচুনে তাকে এবং উত্তর কোরিয়ান আরেকজন পাঁচজন নারীকে এক চীনা পুরুষের কাছে "তুলে দেয়া" হয়।
দালালটি তাকে তখন বলে "একজন চীনা লোকের সাথে কেবল এক বছর থাকো তারপর পালিয়ে যেও।"
মিসেস বি'র জীবনের নানান কাহিনীকে উপজীব্য করে পরিচালক জিরো ইউন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
নাম 'মিসেস বি, এ নর্থ কোরিয়ান উম্যান' অর্থাৎ 'মিসেস বি, একজন উত্তর কোরীয় নারী' ।
সিনেমাটিতে তার জীবনের বিপরীত অনেক বিষয় উঠে এসেছে।
সিনেমাতে যেমন দেখানো হয়েছে- ওই নারীকে যার কাছে তাকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল কিভাবে সেই চীনা লোকের প্রতি তার ভেতরে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
দশবছর ধরে ওই লোকটির সাথে একসাথে থাকেন এই নারী।
কীভাবে হয়ে উঠলেন একজন মানব পাচারকারী
যদিও এই‌ নারী নিজেই পাচারের শিকার হওয়া একজন ভুক্তভোগী, তবু একটা সময় তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন মানব পাচারকারী এবং উত্তর কোরিয়ার মেয়েদের তিনি চীনা পুরুষদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করেন।
বিবিসি কোরিয়ান সার্ভিসকে দেয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, তিনি অর্ধশত নারীকে বিক্রি করেছেন।
চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্ত পেরিয়ে গিয়ে পরে চীন-লাওস সীমান্ত পেরিয়ে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াতে পৌঁছাতেন।
এই নারী জানান এসব তিনি করেন তার উত্তর কোরিয়ান পরিবারকে একত্রিত রাখার জন্য।
কিন্তু তার স্বামীর সাথে তার সম্পর্কের ফাটল ধরতে থাকে।
মুক্ত অবাধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া তাকে সুখী করার চেয়েও বেশি 'বিতৃষ্ণা' দিয়েছে।
বাস্তব জীবন থেকে সিনেমা
দুর্ভাগ্যবশত তার জীবনের ঘটনা খুব বিচিত্র কিছু নয়।
কমিউনিস্ট দেশ উত্তর কোরিয়া ছেড়ে পালাতে গেলে দেশটির অনেক নারীকেই পাচারের অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়।
অনেক নারী চীনা লোকদের কাছে বিক্রি হওয়ার পর তাদের দ্বারা গর্ভবতী হয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে শেষপর্যন্ত সেখানেই স্থায়ী হয়ে যায়।
অনেক উত্তর কোরীয় পরে দক্ষিণ কোরিয়াতে পালিয়ে এলেও পরে এই দক্ষিণ কোরিয়াতে আসার জন্য তারা আক্ষেপ প্রকাশ করে এবং তাদের মধ্যে আবার কেউ কেউ অন্য কোন দেশে পাড়ি জমায়।
অপ্রত্যাশিত রোমান্স
তাকে যার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল সেই চীনা লোকটির সাথে তার সম্পর্কের ধরণ কি ছিল? সেটি কি "ভালবাসা"?
এমন প্রশ্ন করা হলে 'মিসেস বি' বলেন, "আমি মনে করি এটা মায়া, দুজন মানুষের একে অপরের প্রতি মায়া।
আমার কখনোই মনে হয়নি এটা 'ভালবাসা' ছিল।"
তিনি জানান তাকে কিনে নেয়া লোকটি ছিলেন অত্যন্ত সমঝদার এবং চমৎকার মানুষ।
তিনি লোকটির সাথে চীনের প্রত্যন্ত যে এলাকায় বাস করতেন সেখানে খুব অল্প মানুষই ভালোবাসা নিয়ে কথাবার্তা বলতেন।
ভালোবাসা বিষয়ক আলোচনা উত্তর কোরিয়াতেও সমানভাবে অনুপস্থিত ছিল।
যে সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছে সেখানে মূলত চীনা লোকটির সাথে এই নারীটির সম্পর্ককে ফোকাস করা হয়েছে।
তার কাছে বিক্রিত হলেও তকে একজন প্রেমময় স্বামী বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
সিনেমায় দেখা যায় নারীটি যখন রেগে যায় তখন তাকে হাসানোর জন্য লোকটি নানারকম চেষ্টা চালাতো।
মিসেস বি, চীন-লাওস সীমান্ত পেরুনোর প্রচেষ্টা শুরু করলে ওই ব্যক্তিও তাকে সাহায্য করেন এবং বিশ্বাস করেন যে দক্ষিণ কোরিয়ায় মিসেস বি একটু সেটেল হলে তাকেও সেখানে নেয়ার ব্যবস্থা করবেন তিনি।
মানব পাচারের ঘটনার দ্বারা অপ্রত্যাশিত রোমান্সের ঘটনা দেখে দর্শকরাও বিরক্তি প্রকাশ করেছে।
মিসেস বি বলেন,"আমি তাকে বলেছিলাম যে আমি সন্তান ধারণে সক্ষম কিন্তু যেহেতু আমার সন্তানদের কাছে উত্তর কোরিয়াতে আমার ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাই আমি আবার বাচ্চা নিতে চাইলাম না। এটা শুনে সে(চীনা নাগরিক) বলেছিল 'ঠিক আছে'। এজন্য তার প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করছিলাম।"
যেহেতু আমার জন্য সে সন্তানের মুখ দেখতে পেলো না, তাই দায়িত্ববোধ থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে তার মৃত্যু পর্যন্ত তার পাশে থাকবো আমি।"
চলচ্চিত্রে যা উঠে আসেনি
মিসেস বি প্রকৃতপক্ষে তার সন্তানদের এবং উত্তর কোরীয় স্বামীকে চীনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যদিও সিনেমা থেকে সেইসব অংশ বাদ দেয়া হয়েছে।
মিসেস বি তার বড় ছেলেকে ২০০৯ সালে চীনে আনার পর সে মা ও সৎ বাবার সাথে তিন বছর কাটানোর পর খাপ খাওয়াতে পারছিলনা।
তখন তার মা তাকে দক্ষিণ কোরিয়াতে চলে যেতে সহায়তা করেন।
২০১৩ সালে মিসেস বি তার ছোট ছেলে এবং উত্তর কোরীয় স্বামীকে দক্ষিণ কোরিয়াতে চলে যেতে সাহায্য করেন, তবে তারা সেখানে যাওয়ার আগে চীনে আসেন এবং তাদের সাথে এক মাসের বেশি থাকেন।
"আমরা সবাই একই কক্ষের ভেতর ঘুমাতাম, আমি, আমার চীনা স্বামী, আমার উত্তর কোরিয়ান স্বামী এবং আমার ছোট ছেলেটি" -বলেন মিসেস বি।
"আরও অনেকের মধ্যে একজন"
মিসেস বি বলেন, উত্তর কোরিয়া থেকৈ পালানোর সময় ৮০% নারী পাচারের অভিজ্ঞতার স্বীকার হয় এবং তিনি কেবল সেইসব নারীদের মধ্যে একজন"।
যদিও এ বিষয়ে কোন অফিশিয়াল পরিসংখ্যান দুই কোরিয়া কিংবা চীনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
মিসেস বি রাতারাতি একজন পাচারকারী হয়ে উঠেছিলেন-বিষয়টি তেমন নয়।
প্রাথমিকভাবে একটি গরুর খামারে চাকরি করতেন তিনি। মাসে নয় মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ রোজগার করতেন।
তিনি ওই ফার্মে কাজ করার সময় একজন দালালের সহায়তায় নিজের সন্তান আর উত্তর কোরিয়ান স্বামীকে একবার দেখার সুযোগ পান চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্তে।
সেখানে স্বামীকে অসহায় ও দরিদ্র অবস্থায় দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি। এরপরই অর্থের জন্য তিনি অবতীর্ণ হন পাচারকারীর ভূমিকায়।
"পরিবারের জন্য কিছু একটা করতে হবে -এটাই তখন আমার মাথার ভেতর ছিল। আমাকে প্রচুর টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে। কিন্তু আমার কোন জাতীয়তা ছিলনা, পরিচয় ছিল না সেসময় , এবং ভালো কিছু রোজগারের মত অনেক কাজই আমি কখনো করতে পারতাম না।"
এরপর ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন উত্তর কোরীয় নারীকে চীনা পুরুষদের কাছে বিক্রি করেছেন তিনি।
তিনি স্বীকার করেন এটা মানব-পাচার ছিল কিন্তু জোর দিয়ে বলেন তিনি তাদের সাথে প্রতারণা করেননি যেটা তার সাথে করা হয়েছিল।
কিন্তু এইসব মহিলাদের চুক্তি করেই আনা হতো" জানান মিসেস বি।
এক অর্থে এইসব নারীদের নিজেদের পথ খুঁজে নিতে তিনি সাহায্য করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, একজন নারীকে বিক্রি করে যে টাকা পেতেনে সেটা ওই বিক্রিত নারীর সাথে ভাগাভাগি করে নিতেন তিনি।
কিন্তু তার ভেতর কি অপরাধ-বোধ কাজ করে?
আমার কাছে মনে হতো মানব-পাচারের বিষয়টি এমন কিছু যার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ার নারীদের যাওয়া দরকার।
আমি প্রতারিত হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু এইসব মহিলারা জানতো তারা কি চাইছে। তাই তাদের হয়তো মনে যন্ত্রণা থাকলেও সেটি আমার মতো ছিল না ।"
উত্তর কোরিয়ার নারীদের চীনা নাগরিকদের কাছে বিক্রি ছাড়াও মিসেস বি দালাল হিসেবে উত্তর কোরীয়দের দক্ষিণ কোরিয়াতে পাঠানোর কাজও করতো।
এমন প্রায় ৫০ জনকে তিনি পাঠিয়েছেন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা জেরো ইয়ুন বলেন, এই সিনেমাটি নির্মাণের যে যাত্রা, তা ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। এটা তাকে সারাজীবনের জন্য বিশাল অভিজ্ঞতা দিয়েছে।
শেষটা সবসময়ই মধুর নয়
মিসেস বি তার চীনা স্বামীকে কথা দিয়েছিলেন যে একবার দক্ষিণ কোরিয়াতে জায়গা করে নিতে পারলেই তার কাছে আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু সেটা আর ঘটেনি।
২০১৪ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়া পৌঁছান এবং সেদেশের গোয়েন্দাদের দ্বারা জেরার মুখে পড়েন। তাকে সন্দেহ করা হয় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে।
এই সন্দেহের কারণ তিনি একটা সময় চীনে আইস নামে একটি মাদক বিক্রি করতেন।
দক্ষিণ কোরীয় গোয়েন্দাদের ভাষ্য ছিল যেহেতু সেই অর্থ উত্তর কোরিয়াতে গিয়েছে সেহেতু তার স্পাই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেন মিসেস বি।
তবে তাকে এবং তার স্বামীকে 'নন-প্রটেক্টেড' স্ট্যাটাস দেয়া হয় যার মানে তারা নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাবেন না।
মানে হল যাদের অতীতের অপরাধের রেকর্ড আছে, যারা অন্তত ১০ বছর চীনে বসবাস করেছে এমন ব্যক্তিদের এই স্ট্যাটাস দেয়া হয়।
দক্ষিণ কোরীয় সরকারের বিরুদ্ধে মামলাও করেন তিনি। আর এতকিছু যখন ঘটছে তার মধ্যে মিসেস বি'র চীনা স্বামী আরেকজন নারীকে বিয়ে করে ফেলেছেন।
যদিও এরপরও দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল, যাকে তারা বলেন "কেবলই বন্ধুত্ব"। এখনো মেসেজ আদান-প্রদান হয় তাদের মধ্যে।
তবে চীনা সেই লোকটি তার সঙ্গে প্রতারণার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন বলে জানান মিসেস বি।
সিউলে এখন তার সময় কাটে কফি বিক্রি করে।
"একটা সময় টাকা-পয়সাই ছিল আমার জন্য সবকিছু। কিন্তু এখন আর তেমন মনে হয়না। আমার বাচ্চাদের জন্য আমি সব ত্যাগ করেছি। এখন আমার ৫০ বছর বয়স। এবার আমি নিজের জন্য বাঁচতে চাই। নিজের খুশির জন্য।"
এখন পাচার কিংবা চোরাচালান কোনটির সাথেই আর আমার কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানান মিসেস বি।
সুত্রঃবিবিসি