Tuesday, June 19, 2018

বিশ্বকাপ ও সেক্স

বিশ্বকাপ ফুটবল আর সেক্স যেন একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে পড়েছে। ফুটবলের এই মহারণ শুরুর আগে থেকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য কোচ, ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তারা সাফ জানিয়ে দেন কোনো দেশের খেলোয়াড়রা তাদের স্ত্রী বা প্রেমিকার সঙ্গে বিশ্বকাপ চলাকালে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন কিনা। এতো গেল খেলোয়াড়দের কথা। তারা থাকেন একটি নীতিনির্ধারণী মহলের বেষ্টনিতে আবদ্ধ। কিন্তু যেসব ফুটবল ভক্ত বিশ্বকাপের আসরে জড়ো হন তাদের জন্য থাকে না কোনো বাধা, প্রতিবন্ধকতা। তারা চাইলেই নারীসঙ্গ ভোগ করতে পারেন। এ জন্য বিশ্বকাপের আসরকে কেন্দ্র করে দেহপসারিণীদের একটি রমরমা ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। অন্য দেশ থেকে দেহব্যবসায়ী নারী, যুবতী আগে থেকে হোটেল ভাড়া নিয়ে খদ্দেরের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে যে এর ব্যতিক্রম হয়েছে তা হলফ করে বলা যায় না। তবে বিদেশী পর্যটকদের সঙ্গে রাশিয়ার নারী বা যুবতীদের যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে কেন্দ্র করে এক তুলকালাম কান্ড ঘটে যাচ্ছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সেখানকার পার্লামেন্টের পরিবার, নারী ও শিশু বিষয়ক কমিটির চেয়ারওম্যান তামারা প্লেটনিওভা সতর্ক করে দেন নারীদের। বিদেশীদের সঙ্গে তাদের সেক্স নিষিদ্ধ করেন। তবে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন রাশিয়ান এমপি মিখাইল দেগতিয়ারিওভ। আবার তামারার নিষেধাজ্ঞাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। এমপি মিখাইল দেগতিয়ারিওভ তো প্রকাশ্যে রাশিয়ান নারীদের এক্ষেত্রে উৎসাহ দিয়েছেন। বলেছেন, ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে সেক্স করো। বিশ্বকাপে যৌন সম্পর্ক নিয়ে নতুন মাত্রা পাওয়ায় বিষয়টি লুফে নিয়েছে পশ্চিমা মিডিয়া। তাতে বলা হচ্ছে এমপি মিখাইল দেগতিয়ারিওভ রাশিয়ান নারীদের বলছেন, ফুটবল ভক্তদের বিছানায় টেনে নাও। তাদেরকে তিনি বলেছেন, সফররত ফুটবল ভক্তদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে রাশিয়ান মেয়েদের সন্তান নেয়া উচিত। এসব সন্তান যখন বড় হয়ে উঠবে তখন তারা নিজেদেরকে নিয়ে গর্ব করবে। তারা মনে করবে, তারা বিশ্বকাপ শিশু। এখন থেকে অনেক বছর পরে তারা স্মরণ করবে যে, তাদের পিতামাতা রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ চলাকালে প্রেমে পড়েছিলেন। সেই সম্পর্ক থেকেই তাদের জন্ম। নিজেদের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবকে ৫-০ গোলে হারায় রাশিয়া। তারপর যেন ফুটবল ও রাশিয়ায় যৌনতা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তামারা বা মিখাইল দেগতিয়ারিওভ পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিলেও প্রেসিডেন্ট পুতিন ছিলেন নীরব। কিন্তু তার মুখপাত্র দমিত্রি মেদভেদেভও এক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করেন এক্ষেত্রে রাশিয়ান যুবতীদেরকে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেদেরই নিতে দেয়া উচিত। যার অর্থ দাঁড়ায় কোনো যুবতী চাইলেই বিদেশী কোনো পর্যটকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়তে পারবেন।

ফেসবুকে প্রেম এবং বাংলাদেশী যুবতীর পরিণতি

ফেসবুকে তাদের পরিচয়। তারপর আস্তে আস্তে ভারতের কেরালায় বিলাসী জীবনযাপনকারী লিপিন পান্নাপ্পান (২৯) এর সঙ্গে প্রেম গড়ে ওঠে বাংলাদেশী এক যুবতীর। তিনি বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত পরিবারের সদস্য। দেশে বিবাহিত ছিলেন তিনি। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে তার। ততদিনে তিনি এক কন্যা সন্তানের মা হয়ে গেছেন। সেই যুবতীর সঙ্গে প্রেম করেন লিপিন। এক পর্যায়ে প্রেম থেকে বিয়ে হয় তাদের। লিপিনের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে তার ঘরে ওঠেন বাংলাদেশী ওই যুবতী। কিন্তু প্রায় দেড় বছরের মাথায় তাকে ও তার কন্যাকে ফেলে যায় লিপিন। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশী ওই যুবতী কেরালায় পুলিশের দ্বারস্থ হন। পুলিশ সময়ক্ষেপণ না করে লিপিনকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মুম্বই মিরর। এতে বলা হয়, কেরালার মাভেলিক্কারার বাসিন্দা লিপিন। দুই স্ত্রী ঘরে রেখে চলছিল তার বিলাসী জীবন। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রী থানায় অভিযোগ দেয়ার পর লিপিনের এখন ঠাঁই হয়েছে জেলখানা। ১৭ই জুন তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়েছে পুলিশ। ওইদিন তাকে গ্রেপ্তার করে এরনাকুলাম সেন্ট্রাল পুলিশ। ওই পুলিশ স্টেশনের সার্কেল ইন্সপেক্টর অনন্তলালের মতে, ২০১৪ সালে ফেসবুকে ওই বিদেশী নারীর সঙ্গে পরিচয় ও প্রেম হয় লিপিনের। লিপিনকে ওই নারী জানিয়ে দেন তিনি বিবাহিত। তা সত্ত্বেও তার প্রতি লিপিনের আগ্রহ বাড়তেই থাকে। অন্যদিকে থিরুভানান্তপুরামে অন্য এক যুবতীর প্রেমে পড়ে যায় লিপিন। এক পর্যায়ে তাকে বিয়ে করে। এই স্ত্রীকে নিয়ে লিপিন ঘর পাতে এরনাকুলামে। এর কিছুদিন পর তার ভারতীয় এই স্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে চাকরি পান। তিনি চলে যান সেখানে। বিদেশ থেকে স্ত্রী টাকা পাঠান আর লিপিন তা দিয়ে বিলাসী জীবন যাপন করতে থাকে। এই টাকা দিয়েই সে ২০১৭ সালে চলে আসে ঢাকা। এখানে এসে সে নতুন নাম ধারণ করে এবং বাংলাদেশী ওই যুবতীকে বিয়ে করে। নতুন স্ত্রীকে নিয়ে যায় এরনাকুলামে। সেখানে ইনফোপার্কের কাছে একটি ফ্লাটে তোলে তাকে । এরপর আরেকটি বাসায় চলে যান তারা। এভাবেই সময় এগুতে থাকে। এক পর্যায়ে লিপিনের ভারতীয় স্ত্রী ও এ নিয়ে মিথ্যা কথার বিষয়টি আবিস্কার করে ফেলেন বাংলাদেশী ওই যুবতী। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঘন ঘন ঝগড়া হতে থাকে। ততদিনে লিপিনের ভারতীয় স্ত্রী জেনে যান যে, তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। ফলে তিনি লিপিনের কাছে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। এ ঘটনার ফলে কন্যা সহ বাংলাদেশী স্ত্রীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যায় লিপিন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে গত রোববার লিপিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে।

জাতিসংঘ-মিয়ানমার সমঝোতা: চুক্তির অস্পষ্টতায় রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর ক্ষোভ, নাগরিকত্বের প্রশ্ন উপেক্ষার অভিযোগ

উখিয়ায় কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গারা
আসন্ন বর্ষার প্রস্তুতি হিসেবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করছে
প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমার সরকার ও জাতিসংঘের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি নিয়ে রোহিঙ্গাদের হতাশার কথা জানা গেছে আগেই। এবার ওই চুক্তির প্রক্রিয়া আর অস্পষ্টতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি রোহিঙ্গা সংগঠন। তাদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে যতোটুকু যা জানা গেছে, তাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নের কোনও মীমাংসা করা হয়নি। রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো অভিযোগ তুলেছে, মিয়ানমার সরকার ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করেনি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)’র সঙ্গে গত ৬ জুন সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে মিয়ানমার সরকার।
গত ৬ জুন (বুধবার) নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এই চুক্তিটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন মিয়ানমারে নিয়োজিত জাতিসংঘের আবাসিক এবং মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী নাট ওৎসবি। রবিবার (১০ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো ওই চুক্তি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
মিয়ানমার সরকার সমঝোতা চুক্তি সম্পন্নের পর দাবি করে, এর মধ্য দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। তবে মিয়ানমার সরকারের বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ করা হয়নি। তাদের ‘বাস্তুচ্যুত মানুষ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ১০ জুন রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, চুক্তিতে রোহিঙ্গা সংকটের ‘মূল কারণ’-এর কথা উল্লেখ করা হয়নি; বিশেষ করে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি সুরাহা করা হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যাবাসনের জন্য শরণার্থীদের ‘নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব ও অধিকারের’ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো নিশ্চিত হলেই তারা রাখাইন রাজ্যে বসবাস করতে পারবে। কক্সবাজারের কুতুপালং শিবিরে বসবাসরত এক রোহিঙ্গা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিয়ানমার ফ্রন্টিয়ারকে চুক্তি নিয়ে নিজের অবস্থান জানান। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পূর্ববর্তী উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘লোকজন (রোহিঙ্গা) চিন্তায় আছে, অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করেই যদি তারা ফিরে যায় তবে আগের মতো অবস্থা হবে।’
মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ও মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী নাট ওৎসবি ফ্রন্টিয়ারকে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে যথাযথ পরিবেশ গড়ে তোলার কাজে সহায়তার জন্য ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষর করেছে।’
সমঝোতা চুক্তি সংক্রান্ত  মিয়ানমার সরকারের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছিল, ২৫ বছর আগে ২ লাখ ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুতর প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘকে সহায়তা করেছিল মিয়ানমার।’ তবে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো মিয়ানমার ও জাতিসংঘের মধ্যে স্বাক্ষরিত পূর্ববর্তী প্রত্যাবাসন চুক্তিগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বলছে, সেই চুক্তিগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর পুনর্নির্মাণ করে দিতে এবং তাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীসহ ‘রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক ক্রীড়ানকদের’ প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। সেইসঙ্গে রোহিঙ্গা নিধনে দায়ীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কমিউনিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা না করেই, তাদের মতামত ছাড়াই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে। এমনকী ওই চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ও মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী নাট ওৎসবি জানান, চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। ফ্রন্টিয়ারকে তিনি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি হলো ইউএনএইচসিআর, ইউএনডিপি ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক রূপরেখা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইনি চুক্তি। সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু প্রকাশের ব্যাপারে তিন পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে তিন পক্ষেরই সম্মতি লাগবে। বাংলাদেশে থাকা শরণার্থী ও রাখাইনের সব সম্প্রদায়ের লোকজনসহ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ করার কথা রয়েছে জাতিসংঘের দুই সংস্থার ।’
জাপানি সংবাদমাধ্যম এনএইচকে-তে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচি’র বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচারের দুইদিন পরই বিবৃতিটি দেয় রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো। ওই সাক্ষাৎকারে সুচি বলেছিলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য আস্থা গড়ে তোলার দায়িত্বটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই দেশের উপরেই বর্তায়। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আস্থা স্থাপনের বিষয়টি কেবল মিয়ানমারের উপর বর্তায় না। আমি মনে করি, আস্থা স্থাপনের জন্য অন্য পক্ষকেও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।’
গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই  চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। এরমধ্যেই প্রত্যাবাসন প্রশ্নে জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এক প্রতিবেদনে জানায়, এতে নাগরিকত্বের প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়ায় বহু বছর ধরে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মিথ্যা আশ্বাস পেয়ে আসা রোহিঙ্গারা হতাশ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা তৈয়ব আলী নামে রোহিঙ্গা এপিকে সে সময় বলেন, প্রথমে রাখাইনে থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দিতে পারে ইয়াঙ্গুন সরকার। কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে তিনি বলেন, ‘যখন আমরা দেখে শুনে নিশ্চিত হবো যে তারা নাগরিক অধিকার উপভোগ করছে, তখন আমরা ফিরে যাবো।’
উল্লেখ্য, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র,কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ,কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।

মেক্সিকোর ভক্তদের উল্লাস কি আসলেই সেদেশে ভূমিকম্প তৈরি করেছিল?

মেক্সিকোর খেলোয়াড় হার্ভিং লোজানো যখন বিশ্বকাপে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে জার্মানির বিরুদ্ধে জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেন, ওই দলের সমর্থকরা তখন তাদের আনন্দ উল্লাস ধরে রাখতে পারেনি।
খেলার ৩৫ মিনিটের মাথায় বলটি যখন নেট স্পর্শ করে তখন ফুটবলপ্রেমীরা এমনভাবে লাফাতে শুরু করলো যে তাদের পদভারে কেঁপে উঠলো মেক্সিকোর মাটি। দেশটির কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে এও বলা হলো, সমর্থকদের লাফালাফিতে দেশটিতে মৃদু ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু আসলেই কি এরকম হতে পারে?
দেশটিতে ভূমিকম্প নিয়ে যে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা, মনিটর ও জরিপ পরিচালনা করে, সেই ইন্সটিটিউট অফ জিওলজিক্যাল এন্ড এটমোসফেরিক ইনভেস্টিগেশন বলছে, সেসময় আসলেই ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির এক টুইট বার্তায় এরকমটাই দাবী করা হয়েছে: "রাশিয়ায় ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির বিরুদ্ধে মেক্সিকোর গোল করার পর উল্লাসের কারণে মেক্সিকো সিটিতে কৃত্রিম ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে।"
নিচের ছবিতে ভূকম্পনের যে গ্রাফটি (সিসমোগ্রাম) তুলে ধরা হয়েছে তাতে লাল কালি দিয়ে ভূকম্পনের সময়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে সিসমোমিটারের কাছে স্থানীয়ভাবে কী ধরনের ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল।আসলেই কী ঘটেছিল?
ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলের বিরুদ্ধে গোল হওয়ার পর মেক্সিকোর সমর্থকরা যখন উল্লাস করতে শুরু করে তখন স্থানীয়ভাবে তাদের দুটো সিসমোমিটারে ভূকম্পনের মাত্রা ধরা পড়তে শুরু করে।
এই ইন্সটিটিউটের ব্লগে বলা হয়: "খেলার ৩৫ মিনিট সাত সেকেন্ডের সময় মেক্সিকো একটি গোল দিয়ে দেয়, তখন আমাদের মনিটিরং সিস্টেমে ভূকম্পনের একটি মাত্রা ধরা পড়ে। এই কম্পনের ত্বরণ ছিল ৩৭মি/এস২ যা মেক্সিকো সিটির ভেতরে কমপক্ষে দুটো সেন্সরে ধরা পড়ে। বড় ধরনের উল্লাসের কারণেই সম্ভবত এই কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে।"তবে ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে "এধরনের কম্পন খুব একটা বড় ঘটনা নয়।"
তারা বলছেন, সমবেত সমর্থকরা যেখানে উল্লাস করছিল তার খুব কাছে অবস্থিত অত্যন্ত স্পর্শকাতর এসব যন্ত্রে এই কম্পন ধরা পড়ে।
যেসব জায়গায় ফুটবল ভক্তরা জড়ো হয়েছিল তার একটি রাজধানী মেক্সিকো সিটির এঞ্জেল অফ ইন্ডিপেন্ডেস ভাস্কর্য চত্বর যার খুব কাছেই আছে একটি সিসমোমিটার। এই যন্ত্রটিতেই সেসময়কার ভূকম্পনের মাত্রা ফুটে ওঠে।
এটা কি ভূমিকম্প ছিল নাকি ছিল না?
ইন্সটিটিউট অফ জিওলজিক্যাল এন্ড এটমোসফেরিক ইনভেস্টিগেশনের ব্লগে এটা পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে এই কম্পন এতোটাই মৃদু যে তার সাধারণ লোকজনের পক্ষে অনুভব করা বা বুঝতে পারা সম্ভব নয়।
"এই ঘটনা কোন মাত্রা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেকারণে এটিকে ভূমিকম্প বলা যাবে না। যদি এটাকে ভূমিকম্প বলতে হয় তাহলে এর সাথে 'কৃত্রিম' শব্দটিও জুড়ে দিতে হবে। এটা যে ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক কারণে ঘটেনি সেটা পরিষ্কার করে দিতে হবে।"এরকম কি আগেও ঘটেছিল?
হ্যাঁ, হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে আমেরিকান এক ফুটবল টুর্নামেন্টের সময়। লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং অবার্নের ম্যাচের সময় লুইজিয়ানা যখন খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে গোল করে তখন টাইগার স্টেডিয়ামে এরকম ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগে স্থাপিত সিসমোমিটারে ধরা পড়েছিল এই ভূকম্পন। এরপর থেকে ওই ম্যাচটি পরিচিত হয়ে ওঠে "ভূমিকম্পের খেলা' হিসেবে।
অতি সম্প্রতি, ২০১৬ সালে নরিচের বিরুদ্ধে যখন লেস্টার সিটি শেষ মুহূর্তে গোল করে তখনও ইংল্যান্ডের মাটিতে এরকম কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল।
সূত্রঃ বিবিসি

হতাশার অন্ধকার রাজ্যে ফেভারিটরা

বিশ্বকাপের মঞ্চে ছোট দল-বড় দল বলে কিছু নেই- সতর্ক দক্ষ কোচেরা এমন বলে থাকেন সবসময়ই। আর মাঠের খেলায় বোদ্ধা বিশ্লেষকদের এমন ভাবনার ছাপ দেখা গেল এবারের বিশ্বকাপের শুরুতেই। রাশিয়া বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয়ের দেখা পায়নি ফেভারিটদের কেউই। শিরোপাধারী জার্মানি তো হার নিয়েই শুরু করেছে তাদের শিরোপা ধরে রাখার মিশন। আর ম্যাচ শেষে স্পেনের মিডফিল্ড তারকা ইসকো বলেন, জার্মানির হারই প্রমাণ করে বিশ্বকাপ কত কঠিন আসর। এবারের বিশ্বকাপের নিজেদের প্রথম ম্যাচে হোঁচট খেয়েছেন শিরোপাপ্রত্যাশী অপর দুই জায়ান্ট ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে আসা ‘পুঁচকে’ দেশ আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্র নিয়ে খেলা শেষ করে বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেন পাঁচবারের ব্যালন ডি অ’র জয়ী (বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার) লিওনেল মেসি। আইসল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে ৩ লাখ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যার দিকে সবচেয়ে ছোট দেশের রেকর্ডটা তাদেরই। ডি’ গ্রুপের অপর ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া। এফ’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলে হার দেখে শিরোপাধারী জার্মানি। ম্যাচের ৩৫তম মিনিটে জার্মানির জালে বল ঠেলেন মেক্সিকান উইঙ্গার হিরভিং লোজানো। পরে ৫৫ মিনিট সময় পেলেও সমতায় ফিরতে ব্যর্থ হয় কোচ জোয়াকিম লো’র শিষ্যরা। একই দিন ভক্তদের হতাশা ‘উপহার’ দেন নেইমার-মার্সেলোরাও। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এগিয়ে পরে ড্রতে সন্তুষ্ট থাকতে হয় রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। ম্যাচের ২০তম মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে বুলেট শটে গোল আদায় করেন ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফিলিপ্পে কুটিনহো। তবে আসরের হট ফেভারিট ব্রাজিলের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় পুরোটাই ছিল সুইসদের। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই কর্নার থেকে পাওয়া সুযোগে দারুণ হেডের গোলে সুইজারল্যান্ডকে সমতায় ফেরান স্টিভেন জুবার। এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ‘বড় ম্যাচে’ নাটকীয় ফুটবল উপভোগ করেন দর্শকরা। তবে ফেভারিট স্পেন ও সর্বশেষ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাজয়ী পর্তুগালের ওই লড়াইয়ে জয় দেখেনি কেউই। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি শেষ হয় ৩-৩ গোলের সমতায়। ওই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন পাঁচবারের ব্যাল ডি অ’র পুরস্কার জয়ী পর্তুগাল অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আর স্পেনের জার্সি গায়ে জোড়া গোল পান ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত স্টাইকার দিয়েগো কস্তা।
‘জার্মানির হারই প্রমাণ করে বিশ্বকাপ কত কঠিন’
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয় মেক্সিকো। আর ইসকো অ্যালারকন বলেন, বিশ্বকাপ যে কতটা কঠিন এ ম্যাচের ফল থেকেই বুঝা যায়। এ ম্যাচের পর দলের সবাইকে সতর্ক করেছেন তিনি। ইসকো বলেন, বিশ্বকাপ আসলেই কঠিন। জার্মানি ও মেক্সিকো ম্যাচের ফলই তা বলে দিচ্ছে। জার্মানি চ্যাম্পিয়ন দল। কিন্তু এক ম্যাচে যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। মেক্সিকো দুর্দান্ত খেলেছে। এ ম্যাচে জার্মানিকে সব দিক দিয়েই তারা প্রতিরোধ করেছে এবং ম্যাচ জিতে নিয়েছে। এটাই প্রমাণ করে বিশ্বকাপ কতটা কঠিন এবং আসরের প্রত্যেকটা দলই কঠিন প্রতিপক্ষ। নিজ দল স্পেন সম্পর্কে ইসকো বলেন, আমাদের দলের সবাই এখন উজ্জীবিত। প্রত্যেকটি ম্যাচের জন্য আমরা নিজেদের খুব ভালোভাবে প্রস্তুত করছি। বিশ্বকাপের দুইদিন আগে বরখাস্ত হয়েছেন স্পেন জাতীয় দলের কোচ হুলেন লোপেতেগি। তার অনুপস্থিতি দলে কোনো প্রভাব পড়ছে না বলে মনে করেন ইসকো। তিনি বলেন, এ বিষয়টাকে আমরা সামান্য এক ঘটনা হিসেবে মনে করছি। বিশ্বকাপে আমোদের স্বপ্ন অনেক বড়। এখানে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। আর সব বাধা উতরে আমাদের সেরাটা দিয়ে সাফল্য পেতে হবে। এটা বিশ্বকাপ, যা প্রত্যেক দিন আসে না এবং সবার খেলার সুযোগও হয় না। আমরা খুব ভালো করেই জানি বিশ্বকাপ সবার জন্য কঠিন এবং চ্যালেঞ্জের। এবারের আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের সঙ্গে ৩-৩ গোলে ড্র করে স্পেন। আগামীকাল নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা।

মৌলভীবাজারে ভয়াবহ বন্যা, নিহত ৭ by ইমাদ উদ দীন

আকস্মিক বন্যায় মৌলভীবাজারে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। হঠাৎ উজানের ঢল আর ভারি বর্ষণে তলিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। ১৩ই জুন সকাল থেকে  আকস্মিক বন্যায় জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর তীরবর্তী প্রায় ৪০টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার প্রায় চার শতাধিক গ্রামের ৪ লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। পানির তোড়ে বিভিন্ন এলাকার ৭ জন মানুষ ভেসে মারা গেছে। হঠাৎ নদীর বাঁধভাঙ্গা পানির তোড়ে মানুষের বসত ভিটার সঙ্গে আশ্রয় হারায় হাঁস, মুরগি, গরু, মহিষসহ গৃহপালিত পশুও। মানুষের সঙ্গে খাবার সংকটে ভুগছে গবাদি পশুগুলোও। ডুবে যায় প্রায় তিন শতাধিক পুকুর ও মৎস্য খামার। মনু নদীর বাঁধ ভেঙ্গে মৌলভীবাজার পৌর শহরের ৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়। এমন আকস্মিক বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েন শহরের বন্যাকবলিত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অফিস পাড়ার লোকজনসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। গেল তিন দিন থেকে জেলা ও উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। চলাচলের সড়কগুলোতে হাঁটু থেকে কোমর পানি থাকায় এই দুর্ভোগ। এবছরই নদী শাসনের বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কার কাজ হয়েছে। কিন্তু একাজ নিয়ে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষোভের অন্ত নেই। তাদের অভিযোগ যথাযথ  নিয়মে হয়নি একাজ। তাই ওই নতুন বাঁধ এলাকায়ই ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাছাড়া নদী খনন ও শুষ্ক মৌসুমে পরিকল্পিতভাবে সংস্কার কাজ না করাসহ  ওয়াপদা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির জন্য তাদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভোগ বলে মনে করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। বছরে বছরে ভেঙে যাওয়া নদীতীর রক্ষা বাঁধগুলোর সংস্কার করা কিংবা স্থায়ীভাবে বাঁধের কাজ না করায় তাদের এই চরম খেসারত। তবে স্থানীয় ওয়াপদা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা তাদের উপর আনীত এমন ঢালাও অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা বলছেন সাধ্যানুযায়ী দুর্ভোগ লাঘবে তারা যথেষ্ট আন্তরিক। এ বছর উজান থেকে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি আসায় তা উপচে পড়ে বাঁধ ভেঙেছে। গতকাল সরজমিনে কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়ন এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধ ভাঙায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম করিমপুর, বাদে করিমপুর, সোনান্দপুরসহ কয়েকটি গ্রামে গেলে দেখা মেলে মানুষের চরম দুর্ভোগের দৃশ্য। বাদে করিমপুর গ্রামের আবাস মিয়া (৫০), মায়া বেগম (৬৫), হারুন মিয়া (৪৮), মইডাইল গ্রামের রেহমান মিয়া (৪৫), হাসান মিয়া (৪৬)সহ অনেকেই জানান হঠাৎ করে বাঁধ ভেঙে বানের পানি প্রবেশ করে তাদের কৃষি ক্ষেত ও ঘরবাড়ি তলিয়ে দিয়েছে। তারা অভিযোগ করে বলেন, বাঁধ মেরামত বা সংস্কারের কোনো আন্তরিকতা নেই সংশ্লিষ্টদের। ক্ষতিগ্রস্থ ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের পাশেই নিজের বাড়ি ও সবজি ক্ষেত ডুবিয়ে যাওয়া দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওই এলাকার বাসিন্দা ইমান উল্লাহ (৭০) বলেন বছর বছর বাঁধ ভাঙায় আমরা চরম অসহায়। তিনি বলেন, আমার জীবদ্দশায় ১৫/২০ বার বাঁধ ভাঙলো কিন্তু তার কোন স্থায়ী সমাধান নেই। তার সঙ্গে ঐক্য হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী জানালেন এবছর কিছু অংশ নতুন বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু বাঁধের আশপাশ থেকে মাটি দেয়া হয়েছে বাঁধে। তা ছাড়া নির্মিত বাঁধটি যদি আরো উঁচু হতো তাহলে আজ আমাদের এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন ওরা বার বার বাঁধ দেয় আর বার বার ভাঙে তা হলে কি বাঁধ দেয়। মুন্সিবাজর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল মোত্তালিব বলেন আগে বিষয়টি আমরা তদারকি করতাম। এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়িত্ব পেয়েছে। মাত্র কয়েক হাজার টাকা খরচ করলে এই বিরাট ক্ষতি হতো না। আমার ইউনিয়নবাসী আর বন্যা দুর্গত হয়ে ত্রাণ নিতে চায় না স্থায়ী সমাধান চায়। তাদের মতো ক্ষোভের সঙ্গে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর, হাজিপুর, টিলাগাঁওসহ বেশ কয়েটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। শরীফপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান তোফাজ্জুল হোসেন চিনু, সদস্য  মো. মখদ্দিছ আলী, সঞ্জবপুরের আব্দুর রশিদসহ অনেকেই জানান অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে এবারকার ভয়াবহ বন্যা। তারা অভিযোগ করে বলেন নদী খনন, সময়মতো বেড়িবাঁধ মেরামত ও নির্মাণ না করায় এই আকস্মিক বন্যা। তারা বলেন ঈদের ৩-৪ দিন আগেই বন্যায় ঘরবাড়ির সঙ্গে মসজিদ, কবরস্থান ও ঈদগাহ মাঠ ডুবিয়ে দেয়। শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জুনাব আলী জানান আকস্মিক বন্যায় তার ইউনিয়নের সবক’টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। তিনি বন্যাদুর্গতদের জন্য সকলের সাহায্য সহযোগিতা চান। গেল কয়েক দিন থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল জেলার বন্যাকবলিতদের উদ্ধার, নদীর বাঁধ রক্ষায় মেরামত ও বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। এতে অনেকটাই আশ্বস্ত হয়েছেন দুর্ভোগগ্রস্ত মানুষ। জানা যায়, জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে ৭ জন মারা গেছেন। জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম  ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত জেলার ৪টি উপজেলার ২টি পৌরসভা ও ৩০টি ইউনিয়নের ৪০ হাজার পরিবারের ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪ জন মানুষ বন্যা আক্রান্ত হয়েছেন। দুর্গতদের জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯.৭ শ’ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নগদ ১০ লাখ টাকা বন্যাকবলিত এলাকায় বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও আরো ৫শ টন চাল ও নগদ টাকা ত্রাণ সহায়তার জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। খোলা হয়েছে ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্র। ৭৪টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এ ছাড়া যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করে তাদেরকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। জানা যায় ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের অন্তত  ৩০-৩৫টি স্থান ভাঙন ও এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন ভারতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর বাঁধ উপচে পানি এসে বাঁধ ভেঙেছে। নদীতে পানির গতি অত্যাধিক। তবে গতকাল সোমবার সকাল থেকে পানি কিছুটা স্থিতিশীল বা কোথাও কিছুটা কমতে শুরু করেছে। উজানের পানি কম আসলে বাঁধ ভাঙার ঝুঁকিও কমে যাবে।
রাজনগরের ৮৫টি গ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি
রাজনগর (মৌলভীবাজার), মৌলভীবাজারের রাজনগরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার উন্নতি হলেও সবখানেই রয়ে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন। ১৯৮৮ সালের পর এমন বন্যা কেউ দেখেনি বলেই মত বয়স্ক মানুষদের। ঈদের দুইদিন আগে (বুধবার) থেকে মনু নদীর পানি বাড়তে থাকলেও কোথাও বাঁধ ভাঙার ভয় ছিল না। আকস্মিক উজান থেকে নেমে আসা পানিতে মনুনদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের বেশ কয়েটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। এতে উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের ৪২টি গ্রাম ও মনসুরনগর ইউনিয়নের ৩৩টি গ্রাম পুরোপুরি এবং টেংরা ইউনিয়নের ১০টি গ্রামসহ ৮৫টি গ্রাম তলিয়ে যায়। এতে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে রাজনগরে ৫০ সদেস্যের সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার তৎপরতা চালায়। উদ্ধার তৎপরতা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ১৫টিরও বেশিও ফ্লাডসেন্টার খুলা হয়েছে। এদিকে রাজনগরে নগদ ২ লাখ বিশ হাজার টাকা ও ১৬৫ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মনসুরনগর ইউনিয়নে নগদ ৯০ হাজার টাকা ও ৭০ টন চাল এবং কামারচাক ইউনিয়নে নগদ ১ লাখ টাকা ও ৮৫ টন চাল ও টেংরা ইউনিয়নে ২০ হাজার টাকা ও ১০ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকালে মনসুরনগর ইউনিয়নের কদমহাটা এলাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বন্যাপরিস্থিতি পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি পর্যাপ্ত ত্রাণ ও নগদ টাকা দেয়া হয়েছে বলে বন্যাকবলিত মানুষদের আশ্বস্ত করেন।
এছাড়াও ঈদের দিন থেকে মৌলভীবাজারের সঙ্গে এই উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল সোমবার বিকালে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের সহায়তায় মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। ফলে হাল্কা যান চলাচল শুরু হয়েছে।
কদমহাটা, মালিকোনা, আশ্রাকাপনসহ বেশ কয়েকটি স্থানে মনু নদীর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শুক্রবার রাত থেকে কদমহাটা, শ্বাসমহল, প্রেমনগর আশ্রাকাপন, মহলাল, দক্ষিণ মহলাল, মালিকোনা, চাটুরা, বনমালী পঞ্চেশ্বর,  সরখরনগর, খাসপ্রেমনগর, বরকাপনসহ ওই ইউনিয়নের সবক’টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
কামারচাক ইউনিয়নে মশাজান, কামারচাক, ভোলানগর, দস্তিদারের চক, ইসলামপুর, জালালপুর, তেঘরি, করাইয়া, মৌলভীরচক, আদমপুর, মেলাগড়, শান্তকুল, পঞ্চানন্দপুর, একাসন্তোষ, হাটিকরাইয়া, তেঘরি, চাটিকোনাগাঁও, মুর্তিকোনাসহ ওই ইউনিয়নের পুরো ৪২টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
এদিকে ছোট ছোট ক্যানেলগুলো দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় রাজনগর সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ খারপাড়া এলাকার মুজিবনগর গুচ্চগ্রাম তলিয়ে গেছে।
কদমহাটা উচ্চ বিদ্যালয়, তারাপাশা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, পোর্টিয়াস মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, মহলাল উচ্চ বিদ্যালয়, কামারচাক বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রসহ ১৫টিরও বেশি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
ধান-চাল, গবাধিপশু নিয়ে মানুষ বেকায়দায় পড়েছেন। নিজেরা আশ্রয় পেলেও গবাধিপশুর থাকার জায়গার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। এছাড়া চুরি হওয়ার ভয়ে অনেকে গবাদিপশু রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন।
এদিকে এখন পর্যন্ত এ উপজেলায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জুন শনিবার টেংরা ইউনিয়নের সৈয়দনগর গ্রাম থেকে মৃত ইসমাইল উল্লার অসুস্থ স্ত্রী কর্পুল বিবিকে (৮০) স্পিড বোটে করে পানিবন্দি অবস্থা থেকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত ১৩ জুন বুধবার উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের হাটিকরাইয়া গ্রামের মো. মিছবা মিয়ার ছেলে ইমন মিয়া (১০) নিখোঁজ ছিল। পরদিন বৃহস্পতিবার ভাসমান অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায় একটি বাড়ির পাশে।
আশ্রাকাপন এলাকার কাপ্তান মিয়া (৬০) মৌলভীবাজার কুলাউড়া সড়কে ধান শুকাচ্ছিলেন। এ সময় তার ছবি তুলতে গেলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘৩০-৩২ মণ ধান ছিল। সব পানিতে ভিজে গেছে।’ এ সময় পাশ থেকে তার স্ত্রী বলেন, ‘এখন ছবি তুলিয়া কিতা অইতো। আমরা পানি আছলাম, কেই দেখাত আইলানা, এখন আইয়া কিতা খরতা’।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌসী আক্তার বলেন, পানি কমার কারণে মানুষজন বিভিন্ন ফ্লাড সেন্টার থেকে বাড়ি ফিরছে। আমরা যে ত্রাণ পেয়েছি তা সুষ্ঠুভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বণ্টনই এখন মূল কাজ। এজন্য আমার টেগ অফিসারদের বলে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে কানাডার অধিকাংশ নাগরিক

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজেদের দেশে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে কানাডার অধিকাংশ নাগরিক। এক জরিপে জনগণের ৬২ শতাংশই রোহিঙ্গাদের কানাডায় আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কানাডীয় টিভি চ্যানেল সিটিভির পক্ষ থেকে ওই জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ন্যানোস রিসার্চ'র তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হয়।  শনিবার (১৬ জুন) ওই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই  চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। এরমধ্যেই প্রত্যাবাসন প্রশ্নে জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের মধ্যেও একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানেও নাগরিকত্বের প্রশ্নটির সুরাহা না হওয়ায় চুক্তি নিয়ে হতাশ রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা প্রশ্নে শুরু থেকেই সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে কানাডা। মিয়ানমার ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নিয়োগকৃত বিশেষ দূত বব রে তার প্রতিবেদনে বলেছিলেন,রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে আগ্রহ দেখানোর পাশাপাশি তাদের জন্য মানবিক সহায়তা জোরদারে কানাডার ভূমিকা রাখা উচিত। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার প্রমাণ  সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় কানাডার সংশ্লিষ্টতার সুপারিশ করেন বব রে। সম্প্রতি কানাডার ত্রিশটি মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থার জোট কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বিশেষ দূত বব রে’র প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানায়। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কানাডায় অনুষ্ঠিত জি-সেভেন বৈঠকের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার জন্য গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, সিনেট, হাউজ অফ কমনস এবং কানাডীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া প্রশ্নে সম্প্রতি কানাডীয় টিভি চ্যানেল সিটিভির পক্ষ থেকে গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ন্যানোস রিসার্চ' একটি জরিপ পরিচালনা করে।  গত ৩০ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ১০০০ প্রাপ্তবয়স্ক কানাডীয়’র মধ্যে জরিপটি করা হয়। শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬২ শতাংশ মানুষ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে। এরমধ্যে ৩৭ শতাংশ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন জানিয়েছে, আর বাকি ২৫ শতাংশ ‘মৃদুভাবে সমর্থন’ জানিয়েছেন। এছাড়া ১৮ শতাংশ কানাডীয় সরাসরি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। আর ১৪ শতাংশ করেছেন ‘মৃদু বিরোধিতা’।

শিশুদের পার্ক ও মেলায় উপচেপড়া ভিড়

ঈদকে ঘিরে রাজধানীর বিনোদনকেন্দ্রগুলো এখন পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে! বিভিন্ন বয়সী মানুষ বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর এসব স্থান। শাহবাগের শিশু পার্ক ও শ্যামলীর শিশু মেলায় ভিড় লক্ষ করা গেছে বেশি। রবিবার (১৭ জুন) দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পার্কগুলোতে তিলধারণের জায়গা নেই। প্রতিটি রাইডের সামনে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষারত শিশুসহ তাদের পরিবার।
শাহবাগের শিশু পার্কের প্রবেশমুখে যেমন দীর্ঘ লাইন, তেমনই টিকিট কাউন্টারেও প্রচুর ভিড়। গরম আর রোদ উপেক্ষা করেই সেখানে আসছেন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। মিরপুর থেকে আসা হাবিবুল্লাহ খানের মন্তব্য, ‘ঢাকায় তো শিশুদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার জায়গার অভাব। তাই ছুটির দিনে বাচ্চাকে এখানে নিয়ে আসি বেড়াতে।’
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
মিরপুরের এই বাসিন্দা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুরা রাইড পছন্দ করে। তাদের জন্য এমন সুযোগ তো শহরে খুব কম জায়গায় আছে। খরচও কম। বাচ্চারা এখানে এসে মন ভরে খেলাধুলা করতে পারে। তাদের দেখে আমরাও শৈশবে ফিরে যাই।’
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজিম আহমেদ মনে করেন, ‘শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা করার সুযোগ থাকা উচিত। ঢাকায় খেলার মাঠের অনেক অভাব। তাই শিশু পার্ক ও শিশু মেলার মতো জায়গা আরও দরকার।’
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
এদিকে শিশু পার্কের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। ঈদ উপলক্ষে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই স্থান। প্রতি বছরের মতো এবারও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কমতি নেই সেখানে। এবার নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে ৪০টি সিসি ক্যামেরা। ফলে পুরো পার্ক সিসি ক্যামেরার আওতায় না এলেও বেশিরভাগ জায়গাই পর্যবেক্ষণ করা যায়।
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্র জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের কথা ভেবে শিশু পার্কের সব কর্মচারীর ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঈদের পর ছয়দিনই বিশেষ ব্যবস্থায় দর্শনার্থীদের জন্য চালু থাকবে এই পার্ক। এর প্রবেশ মূল্য ১৫ টাকা। রাইডগুলোর টিকিটের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে রাখা হচ্ছে। বিস্তারিত জানতে পার্কের দায়িত্বে থাকা ডিএসসিসি’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাকিরের হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
শিশু পার্কে শিশুরা (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)
অন্যদিকে শ্যামলীর শিশু মেলায়ও দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। শিশু-কিশোরদের পদচারণায় মুখর এখন শিশু মেলা। বিভিন্ন রাইডে চড়ার সুবাদে তাদের ঈদ আনন্দ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। শিশু মেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকছে মেলার ফটক। সাধারণত রাত ৯টায় বন্ধ হয়ে যায় এই স্থান।

ইয়েমেনবাসীর ঈদে দুর্ভিক্ষের ছাপ, দুষ্প্রাপ্য খাদ্যে সৌদি সেনাদের উদযাপন

চলমান আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে ইয়েমেনের বন্দর-নগরী হুদাইদা। পালিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার মতো অর্থ সংস্থানের সামর্থও নেই সেখানকার মানুষের। সেখানকার হতদরিদ্র মানুষের হাতে নেই খাবার কেনার প্রয়োজনীয় অর্থও। এমন মানবেতর পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের হুদাইদাতে উদযাপিত ঈদুল ফিতরের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেনট কথা বলেছে আহমেদ আব্দুল্লাহ নাসের নামের একজন সাধারণ বই বিক্রেতার সঙ্গে। তার সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে রচিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হুদাইদাতে  আতশবাজি পোড়ানো হয়নি এই ঈদে। এমনকী জ্বলেনি রাস্তার বাতিও। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জেনারেটরে তেল সরবরাহের সামর্থ নেই হুদাইদাবাসীর। ঈদে মিষ্টি ও উপহার বিনিময় করেছেন কেউ কেউ সাধ্য মতো। তবে স্থানীয়দের এমন শোচনীয় অবস্থার মধ্যে রেখেই ‘হুথি বিদ্রোহীদের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করতে যাওয়া’ সৌদি সেনারা ঈদ উদযাপন করেছে মাছ ও শিশা দিয়ে। যুদ্ধবিধস্ত ইয়েমেনে ওই দুটি খাদ্য সামগ্রী এখন দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য।
হুদাইদাতে থাকা বই বিক্রেতা আহমেদ আব্দুল্লাহ নাসের তার স্ত্রী ও সন্তানদের রাজধানী সানাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার ধারণা, সেখানে থাকলে তারা নিরপদ থাকবে। কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিতে তিনি নিঃসঙ্গ। ইন্ডিপেন্ডেন্টকে তিনি বলেছেন, ‘আমার ছেলের বয়স ৫ বছর। চলমান যুদ্ধকে বুঝে নেওয়ার মতো বোধ সে এরইমধ্যে অর্জন করেছে। সে আমার কাছে বিমান হামলা এবং ওই খারাপ লোকগুলোর বিষয়ে জানতে চায়। আমি তাকে বেশি কিছু বলি না। আমি চাই না, সে চিন্তিত হয়ে পড়ুক। আমি আশা করি আমার পাঠানো পোশাক ও মিষ্টি পেয়ে তারা আনন্দিত হয়েছে। এসবের জন্য অর্থ জমানো এখন আর সহজ নয়।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার পরিবারের ভাগ্য অন্যদের তুলনায় ভালো। হুদাইদার অনেক মানুষ এখন একবেলা খেয়ে থাকে। যুদ্ধের ভেতর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা অনেকেই করে,  কিন্তু সানাতে যাওয়ার জন্য যে তেল খরচ হবে আর যে পরিবহন ভাড়া লাগবে তা দেওয়ার সাধ্য তাদের নেই।’
গত কয়েকদিনে ইয়েমেনের আধাসামরিক বাহিনী এবং সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের যৌথ বাহিনী হুদাইদার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। তারা হুথি বিদ্রোহীদের হাত থেকে শহরটির পুনর্দখল নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। এখন পর্যন্ত শুধু সুইডেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব এনেছে। কিন্তু বরাবরের মতো কুয়েত সেটার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। ফলে বৃহস্পতিবারেও ইয়েমেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি নিরাপত্তা পরিষদ। অথচ ইয়েমেন সরকারের মুখপাত্র রাজেশ বাডি বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিলেন, ‘গোল্ডেন ভিক্টরি’ নামের অভিযানটি স্থগিত করা হয়েছে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  হুথিদের দখল থেকে ইয়েমেনকে উদ্ধার করতে যারা দেশটিকে সহায়তা করছে তারাও যে সবসময় ইয়েমেনর সঙ্গে একমত হয়েই সব করছে, তা নয়। হুদাইদার যুদ্ধকে এখন পর্যন্ত ইয়েমেনে চলা যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোকাবেলা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার ফলাফলের প্রভাব পড়বে পুরো দেশে।
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে সবার আগে ঝুঁকিতে পড়বে হুদাইদা বন্দর। অথচ ওই বন্দর দিয়েই ইয়েমেনের জন্য ৭০ শতাংশ ত্রাণ পাঠানো হয়। যুদ্ধে যদি ত্রাণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে ইতোমধ্যেই দুর্ভিক্ষের শিকার হুদাইদাবাসী পুরোপুরি অনাহারে থাকতে বাধ্য হবে। ত্রাণ বন্ধ হয়ে গেলে আরও  ২ কোটি ৮ লাখ মানুষের বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে যাবে। আহমেদের জন্য অনেক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হুদাইদা বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। বন্দর যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমদানি করা যে বই তিনি বিক্রি করেন তা ইয়েমেনে পৌঁছাবে না। আর পুরো শহর এডেনের মতোই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।

ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার মেলানিয়া ট্রাম্প

মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রত্যাশীদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। মেক্সিকোর অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিচালিত কঠোর অভিযানে বিপুল পরিমাণ পূর্ণ বয়স্ক নারী-পুরুষ আটক হওয়ায় ১৯৯৫ জন শিশু তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রবিবার (১৭ জুন) ফার্স্ট লেডির মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম মার্কিন সংবাদমাদ্যম সিএনএন-কে জানিয়েছেন, অভিবাসী শিশুদের তাদের মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করাকে ঘৃণার চোখে দেখছেন মেলানিয়া। বারাক ওবামার ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের অধীনে এ সংক্রান্ত আইন প্রণীত হলেও মেলানিয়া মনে করছেন, কখনও কখনও হৃদয় দিয়েও শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়। অভিবাসন নীতিতে সংস্কার আনতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
মেক্সিকো সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের রুখতে সম্প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ নিয়ে সমালোচনার জবাবে শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন, তিনি নতুন কোনও অভিবাসন নীতি গ্রহণ করেননি। বিগত ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের নেওয়া নীতি মেনেই মেক্সিকো সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি। অবশ্য অবৈধ অভিবাসীদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নকরণের ঘটনা পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনগুলোতেও দেখা গেছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সে সংখ্যাটা অনেক কম ছিল। অতীতে দেখা গেছে, যেসব লোক অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতো এবং অপরাধের কোনও রেকর্ড ছিল না তাদেরকে আইনের আওতায় অপরাধী সাব্যস্ত না করে শুধুই অস্থায়ীভাবে আটক করা হতো কিংবা বিতাড়িত করার সুপারিশ করা হতো। মা ও শিশুরা সাধারণত একসঙ্গেই থাকতো। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীর বিরুদ্ধে আইনগত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করার প্রথম ৬ সপ্তাহেই প্রায় ২ হাজার শিশু পরিবার-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অতীতে এমন নজির দেখা যায়নি।
মার্কিন স্বরাষ্ট্র দফতর-হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলরেছ,  ১৯ এপ্রিল থেকে ৩১ মে সময়ের মধ্যে আটক হওয়া ১৯৪০ পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে থাকা ১৯৯৫ জন শিশু পরিবার-বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এদের মধ্যে কার বয়স কতো, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা জানানো হয়নি। ওই শিশুরা হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিস বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় সরকারের ডিটেনশন ফ্যাসালিটিজ ও ফস্টার কেয়ারে রাখা হয়েছে তাদের। এভাবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার নীতির বিরোধিতা করেছেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। মেলানিয়ার মুখপাত্র সিএনএন-কে জানান, ‘পরিবারের কাছ থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করার দৃশ্যকে মেলানিয়া ঘৃণার চোখে দেখেন। তিনি আশা করেন, কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত অভিবাসন আইন সংস্কারের প্রশ্নে একমত হতে পারবে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প শিশুদের এই বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী করছেন ‘ডেমোক্র্যাটদের প্রণীত’ আইনকে। তবে অতীতের অভিবাসন নীতির সঙ্গে সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পার্থক্য টানতে গিয়ে সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন সে দেশের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের নেওয়া সিদ্ধান্তকে। ডিপার্টমেন্টের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স-এর গত মাসে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন, অপরাধী-নিরপরাধ নির্বিশেষে প্রথমবারের মতো কেউ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করলেও তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া হবে। শিশুদের যেহেতু অপরাধী বিবেচনা করার সুযোগ নাই, সে কারণে তারা পূর্ণ বয়স্ক অভিভাবকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
জেফ সেশন্স এ মাসে বাইবেলকে উদ্ধৃত করে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির পক্ষে যুক্তি হাজির করেন। বাইবেল থেকে সেইন্ট পলকে উদ্ধৃত করে সেশন্স বলেন,তিনি জনসাধারণকে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলতে বলেছিলেন,কেননা স্রষ্টা তার নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারকে দিয়েছেন। অভিবাসন প্রশ্নকে এরসঙ্গে যুক্ত করে তিনি বলেন,‘আমাদের নীতি সাময়িকভাবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে তবে এই সিদ্ধান্ত অপ্রয়োজনীয় ও অন্যায্য নয়’। তবে মেলানিয়ার অবস্থান ভিন্ন। তিনি মনে করেন যাবতীয় আইন অনুসরণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি দেশ হওয়া উচিত, যার শাসনকার্য পরিচালিত হবে হৃদয়গত বোধ দিয়ে। 
উল্লেখ্য, ফার্স্ট লেডি হিসেবে হোয়াইট হাউসে আসার পর থেকেই শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নটিকে মনযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছেন। সাইবার অপরাধ ও আফিমের মহামারী থেকে শিশুদের সুরক্ষাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা গেছে তাকে। গত মে মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে মেলানিয়া বলেন, ভবিষ্যতেও তিনি শিশুদের নিয়ে কাজ করবেন। শিশুদের নির্দিষ্ট একটি সমস্যার সমাধানে আটকে না থেকে শিশুদের সুরক্ষামূলক বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করার প্রত্যয় জানান তিনি।

‘রমজানের ঐ রোজার শেষে’ গান জনপ্রিয় কিভাবে হল?

'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ', গানটি বাংলাদেশে রীতিমতো যেন ঈদ উৎসবের জাতিয় সঙ্গীত অথবা ঈদের দিনের আবহ সঙ্গীত হয়ে উঠেছে।
সন্ধেয় ঈদের চাঁদ দেখা গেছে এমন ঘোষণার সাথে সাথেই পাড়ায় মহল্লায় প্রথমেই শোনা যায় হৈ হুল্লোড়।
আর তার পরপরই টেলিভিশন ও রেডিওতে বাজতে শুরু করে এই গানটি। অনেকের কাছেই এই গানটি না বাজলে ঠিক ঈদ বলে মনে হয়না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী বুশরা ফারিজমা হুসাইন বলছেন, "গানটি না শুনলে মনেই হয়না যে ঈদ শুরু হয়েছে"
ইশরাত জাহান বলছেন এই গান নিয়ে তার রয়েছে অনেক স্মৃতি। "কাজিনদের সাথে গানটি শুনতে শুনতে রীতিমতো নাচতাম আমরা"
কিন্তু কোথায় এই গানটির যাত্রা শুরু? আর কিভাবে তা বাংলাদেশে ঈদ আনন্দের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠলো?
বাংলাদেশের জাতিয় কবি কাজি নজরুল ইসলাম গানটি লিখেছিলেন ১৯৩১ সালে জনপ্রিয় শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমেদের অনুরোধে। সেই গল্পই করছিলেন তার ছেলে শিল্পী মুস্তাফা জামান আব্বাসি।
তিনি বলছেন, "আব্বা নজরুলকে বলতেন কাজিদা। তিনি একদিন বললেন কাজিদা এই যে পেয়ারু কাওয়াল ঈদের সময় কত সুন্দর গান রচনা করে আর এইচএমভি থেকে যখন গ্রামোফোন বের হয়, হাজার হাজার কপি মুসলমানরা কিনে নেয়। তুমি এরমক একটা গান লেখো না?"
আব্বাসউদ্দিন বয়সে একটু ছোট হলেও দু জনের সম্পর্ক বন্ধুর মতোই ছিল।
আব্বাসউদ্দিন আহমেদ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখে গেছেন সেই সময়কার রেকর্ড কোম্পানি এইএমভির কর্মকর্তা ভগবতী ব্যানার্জি তখন বলেছিলেন, মুস্তাফা জামান আব্বাসির ভাষায়, "তিনি বললেন আব্বাস সাহেব মুসলমানদের পয়সা নেই। তারা রেকর্ড কিনতেও পারবে না। পুঁজোর সময় গান বিক্রি হয়। ঈদের সময় কোন গান বিক্রি হবে না"
ছেলের ভাষায়, নাছোড়বান্দা আব্বাসউদ্দিন রাজি করিয়েছিলেন সেসময়কার এইচএমভি কোম্পানির ভগবতী ব্যানার্জিকে।
গানটি এর পর এক বসায় লেখা ও সুর করা। তিনি বলছিলেন, "নজরুল আব্বাকে বললো পান নিয়ে আসো আর চা। আব্বা অনেকগুলো পান নিয়ে এলো। আর বললো চা আসছে। নজরুল একটা কাগজ নিয়ে এই গানটি লিখলেন। তারপর বললেন সুরটা এখনই করি না পরে করবো? আব্বাসউদ্দিন বললেন, কাজিদা আপনার মনের যে অনুভূতিটা, যেটা গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন এখন না করলে সেই মজাটা হবে না। এই সেই ইতিহাস"
গানটি প্রথম গেয়েছেন আব্বাসউদ্দিন নিজেই। লেখার কদিন পরেই রেকর্ড করা হয়েছিলো।
কবি নজরুলকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলছেন, সেসময়কার বাঙালী মুসলিম সমাজ এই গানটি তখন লুফে নিয়েছিল।
তিনি বলছেন, "অন্য এলাকায় মুসলিমরা গান করলেও বাঙালী মুসলিমের কাছে সঙ্গীত ছিল অপাঙতেও। কিন্তু এই গানটিতে ধর্মীও ভাবধারা আর ঈদের যে খুশি সেটা খুব চমৎকারভাবে ধরা পরেছে"
সেই থেকে এই গানের শুধু উত্থানই হয়েছে। এমনকি অমুসলিম শিল্পী সতিনাথ মুখার্জি সহ আরো অনেকের কণ্ঠে শোনা গেছে গানটি।
আব্বাসউদ্দিনের ছেলে ও মেয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসি ও ফেরদৌসি রহমানও গানটি জনপ্রিয় করেছেন। কিন্তু গানটিকে ধীরে ধীরে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার।
ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই এই গানটি বাজানোর একটি রীতি প্রচলন করেছে সরকারি এই দুটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, বলছিলেন অধ্যাপক ইসলাম।
তবে মুস্তাফা জামান আব্বাসি বলছেন গানটি আসলে জনপ্রিয় করেছে বাংলার মুসলমান।
তিনি আরো বলছেন, "আব্বাস উদ্দিন মারা গেছেন ১৯৫৯ সালে। তার পরে এত বছর গানটি কারা গাইলো? আমরাইতো গাইলাম। আব্দুল আলিম, আব্দুল হালিম চৌধুরী, বেদার উদ্দিন আহমেদ, সোহরাব হোসেন, এদের নাম আমরা ভুলে যাবো কেন?"
আর অধ্যাপক ইসলাম বলছেন, এই গানটি দিয়েই বাংলায় মুসলিমদের মধ্যে সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার শুরু, শোনা ও চর্চার শুরু।
তিনি বলছেন, নজরুলই তার সূচনা করেছেন।
এরপর ইসলামের নানা দিক ও ঈদকে নিয়ে গান রচনার চেষ্টা আরো অনেকেই করেছেন কিন্তু তাতে এতটা সফল কেউই হননি, বলছিলেন অধ্যাপক ইসলাম।
সূত্রঃ বিবিসি