Wednesday, July 31, 2024

মুখে লাল কাপড় বেঁধে জাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিছিল: হত্যাকাণ্ডকে ‘জুলাই ম্যাসাকার’ ঘোষণা

কোটা আন্দোলন ঘিরে দেশব্যাপী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে গুম, খুন, নির্যাতন ও আটকের প্রতিবাদে মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেছেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চোখে-মুখে লাল কাপড় বেঁধে শিক্ষকদের সঙ্গে সংহতি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষকদের পক্ষ থেকে চলমান হত্যাকাণ্ডকে ‘জুলাই ম্যাসাকার’ ঘোষণা করেন দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদা আকন্দ।

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে একটি মৌন মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে পুরাতন ফজিলাতুন্নেসা হল সংলগ্ন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নিহতদের স্মরণে নবনির্মিত ছাত্র-জনতা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে যায়। পরে সেখানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে সেখান থেকে পুনরায় মিছিল নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একই পথে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে সমাবেশ করেন তারা। সমাবেশে দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষদের হত্যা, তাদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও আটকের ঘটনার প্রতিবাদ জানান শিক্ষকরা। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে ‘মিথ্যা মামলায়’ রিমান্ড মঞ্জুর করার ঘটনার নিন্দা জানান।

কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিনে হওয়া হত্যাকে ‘জুলাই গণহত্যা’ নামে অভিহিত করেন দর্শন বিভাগের মাহমুদা আকন্দ। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্র আজও স্বীকার করেনি। অন্যদিকে তারা ব্যস্ত কীভাবে এর সবকিছু ধামাচাপা দেয়া যায়। রাষ্ট্র আজ মেকি কান্না কাঁদছে। রাষ্ট্র শোক ঘোষণা করেছে অথচ এখনো শহীদের প্রকৃত সংখ্যা মানতে তাদের কষ্ট। প্রকৃত শহীদদের শনাক্ত করতে রাষ্ট্রের এখনো টনক নড়েনি। এখনো তার টনক নড়ছে না, এখনো রাষ্ট্রের মনে কোনো মায়া হচ্ছে না। আমি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে চাই, যারা এই আন্দোলনকে উন্নয়নের জন্য সহিংস বলছে, তারা আসলে এই উন্নয়ন কাদের জন্য করছে? যাদের জন্য উন্নয়ন   করছেন, তারাই রাস্তায় গুলি খেয়ে মরছে অথচ আপনারা নমনীয় হচ্ছেন না।

সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, দুঃশাসন ও স্বৈরাচারী মন-মানসিকতার দুঃশাসক যখন রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় থাকে, তার পরিপূর্ণ নকশা ও বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা যখন তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে, তখন তাদের প্রতিরোধ করতে রাষ্ট্রের বাহিনী, নানান যন্ত্র ও তাদের মদদপুষ্ট সংগঠনগুলো হামলা করেছে। এখন আবার সরকার শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে আটক করছে, জেলে নিয়ে নির্যাতন করছে। ৭১’র কালো রাতের যে ভয়াবহ অবস্থা ছিল, তা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।

ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার বলেন, আন্দোলকারী শিক্ষার্থীদের বেশকিছু স্লোগানে আমার দুঃখ হচ্ছিল কারণ কিছু স্লোগানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারছিলাম না। মেনে নিতে পাছিলাম না ‘শেখ হাসিনা স্বৈরাচার’, ‘শেখ হাসিনা বাংলা ছাড়’ এই স্লোগান। আজ বলতেই হচ্ছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন দেখিনি, ’৬৯ এর আন্দোলন দেখার মতো অবস্থা ছিল না। ৭১’র সামান্য বুঝেছি। আজকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় স্লোগান দেখে প্রশ্ন জেগেছে তাহলে কি ৯০’র গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে গেছে। দুঃখের সঙ্গে সেই দায় নিয়েই বলতে হচ্ছে সকল রাজনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে একটি বার্তা বুঝে নিন সংখ্যা কোনো বিষয় নয়। যখন একটি শিশুর লাশ পড়ে যায় তখন সকল সচেতন মানুষ একত্রিত হয়ে যায়। আজকে যে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে, ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছেন এগুলোর সমাধান করে নিজেদের দায় স্বীকার করে শিক্ষার্থীর দাবি মেনে নিয়ে নিজেরাও বাঁচুন আমাদেরকেও বাঁচান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার সমন্বয়ক তৌহিদ সিয়াম বলেন, গত দু’দিন আগে ৬ জন সমন্বয়কারীকে ধরে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে জোরপূর্বক জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বক্তব্য আদায় করা হয়। এর প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে সেই বক্তব্য প্রত্যাখ্যাত হতে দেখেছি। এ আন্দোলনটি ছাত্রসমাজের আন্দোলন। সমন্বয়কারীরা ছাত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং তাদের কোনো কথা থাকলে ছাত্রদের কাছে এসে বলতে হবে। ডিবি কার্যালয়ে থেকে কোনো কথা বললে সেটি ছাত্রসমাজ গ্রহণ করবে না। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই, যে রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত আন্দোলন চলাকালে শহীদদের তথা যাদের জন্য শোক ঘোষণা করেছে তাদের সংখ্যা স্পষ্ট করে বলতে পারছে না এবং যে হত্যায় রাষ্ট্র সরাসরি জড়িত সেই রাষ্ট্রের শোক ছাত্রসমাজ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। শহীদ ভাইদের হত্যার বিচার ও ৯ দফা দাবিতে মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছি। দৃড়ভাবে বলতে চাই, আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। একইসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলেনের জাবি শাখার সমন্বয়ক আরিফ সোহেলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।

আমার কলিজার টুকরাকে কে গুলি মারলো? by হাছান গাজী

আমার কলিজার টুকরা ছেলেটা কই, আমার নিমাই চানরে কে গুলি করে মারলো! আমার বুকটা খালি করলো কারা? তাদের কি একটুও বুক কাঁপলো না! আমার ছেলেরে কেউ আইন্না দাও, আমি জড়াই ধরি। না জানি আমার সোনার চানের কতো কষ্টে দম গেছে, আহারে কোন পাষণ্ড আমার নিরীহ ছেলেরে গুলি করলো, আমার চিকিৎসার খরচ আর কে দিবে। আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে এভাবেই হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন ঢাকায় গুলিতে নিহত কাদির হোসেন সোহাগের মা নাছিমা বেগম। গত ২০শে জুলাই শনিবার রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির সময় রাত ৮টার দিকে গুলিবিদ্ধ হয় সোহাগ (২৪)।  কয়েকজন তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত ৩টার পর তার মৃত্যু হয়। নিহত সোহাগ দেবিদ্বার উপজেলার ভানী  ইউনিয়নের সূর্যপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে। সে ঢাকার গোপীবাগ এলাকায় একটি মেসে থাকতো। পরদিন রোববার সকাল ১১টার দিকে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি সূর্যপুরে নিয়ে আসে। পরে দুপুরে জানাজা শেষে তাকে বাড়ির পাশে একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়।   

মা নাছিমা বেগম ছেলে সোহাগের ছবি দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ২২ বছর ধরে স্বামী নেই, সোহাগের যখন তিন বছর তখন আমার স্বামী ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়, আর ফিরে আসেনি। সে এখনও বেঁচে আছে না মরে গেছে আমরা কেউ জানি না। তবুও আমরা ধরে নিছি তিনি আর বেঁচে নেই। স্বামী নিখোঁজের পর সংসারের হাল ধরতে সোহাগ ও দেড় বছরের সহিদুল ইসলামকে নিয়ে ঢাকায় মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করেছি। পাঁচ বছর আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে আমি গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। সোহাগ লেখাপড়া বন্ধ করে সংসারের হাল ধরে। ছোট ছেলে সহিদুল মাদ্রাসায় ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। অভাব অনটনে তার লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায়,  সে এখন এক বই বাঁধাই কোম্পানিতে কাজ করে।  আমার চিকিৎসা ও সংসারের হাল ধরতে সোহাগ একটি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতো। গত ১০/১২ দিন আগে তার চাকরিটা চলে যায়। পরে নতুন আরেকটি কোম্পানিতে চাকরির কথা হয়। ১৫ই জুলাই বাড়িতে এসে কাগজপত্র নিয়ে নতুন কোম্পানিতে জমা দেয়। এরপর ৪/৫দিনের মধ্যে নতুন চাকরিতে যোগ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু রোববার আমার ছেলের বুকে গুলি লাগে।  আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো? আমার ছেলে শেষবার আমাকে ফোন করে  বলেছিল, ‘মা ঢাকায় অনেক গোলাগুলি হচ্ছে, অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে’ এ কথা শুনে আমার বুক কেঁপে ওঠে, আমি বলি বাবারে তুই রুম থেকে বের হইস না, না মা আমরা সব রুমমেট এক সাথে আছি বের হইনি। তবে মা মেসে কোনো খাবার নেই, আমার কাছেও কোনো টাকা নেই, তুমি যদি পারো আমার বিকাশে ৫০০ টাকা দিও। আর তুমি ঠিকমতো ওষুধগুলো খাইও। পরে আমি আমার ছেলের নম্বরে ৫০০ টাকা পাঠাই। ওই টাকা  নিয়ে সন্ধ্যায় নাস্তা আনতে বের হয়। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার কার কাছে চাইবো। কেউ কি আমার ছেলেকে ফিরায়ে দিতে পারবে বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন মা নাছিমা বেগম।    

সোহাগের ছোট ভাই সহিদুল ইসলাম বলেন, ভাই গুলি খাওয়ার পর তার বন্ধুরা আমাকে ফোনে জানায়। আমি রাত ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে  পৌঁছাই, গিয়ে দেখি ভাইয়ের বুকে ব্যান্ডেজ করা। আমাকে দেখে ভাই বলে, তুই এত রাতে এখানে কেন আসছিস। তুই মা’কে দেখে রাখিস। এই কথা বলে রাত ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে ভাই মারা যায়। ভাই একমাত্র আমাদের সংসার চালাতো। বাবা ও ভাই হারিয়ে আমরা আজ নিঃস্ব হয়ে গেলাম।  

নিহত সোহাগের চাচা এখলাছুর রহমান শানিক বলেন, ২২ বছর আগে সোহগের বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর তার মা বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন। তার মা অসুস্থ হয়ে গেলে তার চিকিৎসার খরচ ও সংসারের হাল ধরে সোহাগ। নতুন একটি কোম্পানিতে চাকরির কথা চলছিল তার। দুই একদিনের মধ্যে সেখানে যোগ দেয়ার কথা ছিল। সেটা আর হলো না। ছোটবেলা থেকে বাবার আদর পায়নি ছেলেটা, অভাব-অনটনে বড় হইছে। ধরতে গেলে ওরা এতিম ছিল। একটা গুলি এই পরিবারটাকে একেবারে পথে বসিয়ে দিলো।  

ভানী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ছেলেটা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। সংসারটা সেই চালাত। ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সে মারা যায়।  এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমি পরিষদ থেকে তার মা’কে বিধবা ভাতার কার্ড করে দেবো।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নিগার সুলতানা বলেন, এটি একটি মর্মান্তিক মৃত্যু। তার পুরো পরিবার সম্পর্কে আমি খোঁজ-খবর রাখছি। সরকারিভাবে সোহাগের মা’কে সাহায্য- সহযোগিতা করা হবে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিবিড় নজর রাখছে জাতিসংঘ। মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতিতে  প্রয়োজন হলে জাতিসংঘ মহাসচিব তার ম্যান্ডেট অনুসারে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। সোমবার মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেছেন। প্রথমে তিনি বাংলাদেশ ইস্যুতে একটি বিবৃতি পাঠ করেন। এরপর প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করেন। শুরুতেই বিবৃতিতে তিনি সব রকম সহিংসতার দ্রুত, স্বচ্ছ এবং পক্ষপাতিত্বহীন তদন্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এর জন্য যারা দায়ী তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। ডুজাররিক বলেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে আমার কাছে আপডেট আছে। আমি আপনাদের বলতে পারি যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি নতুন করে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার বিষয়ে অবহিত এবং তিনি শান্ত ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজারো তরুণ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের গণগ্রেপ্তারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। এ সময় ডুজাররিক বলেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। এ বিষয়ে রাজধানী ঢাকায় এবং নিউ ইয়র্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জাতিসংঘের উদ্বেগের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে সেনা পাঠানো শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি আমরা মানবাধিকারের প্রতি সম্মান ও সমুন্নত রাখার আহ্বান জানাই। বাংলাদেশের  ভেতরে জাতিসংঘের চিহ্ন সংবলিত কোনো যানবাহন আর ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি আমরা পেয়েছি। আমরা এটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এবং আবারো বলতে চাই যে, জাতিসংঘে সেনা ও পুলিশ দিয়ে অবদান রাখা দেশগুলো শুধু তখনই জাতিসংঘ চিহ্নিত এবং জাতিসংঘের চিহ্ন সংবলিত সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে, যখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের অধীনে তাদেরকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে কোনো ম্যান্ডেটেড কাজ দেয়া হয়।

ডুজাররিকের বিবৃতির পর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর। এ সময় একজন সাংবাদিক তাকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিতে থাকেন। তাতে বিরক্তি প্রকাশ করেন স্টিফেন ডুজাররিক। এর আগের দিন এক ব্রিফিংয়েও ওই সাংবাদিককে ডুজাররিক তার প্রশ্নের মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিলেন। ডুজাররিক তাকে বলেছিলেন, আমি বক্তব্য শুনতে চাই না। আপনার প্রশ্ন করুন। সোমবারও একই রকম অবস্থার অবতারণা হয়। ওই সাংবাদিককে থামিয়ে দেন তিনি। বলেন, আমি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানি। আমি আপনাকে ১০ সেকেন্ডও বক্তব্য দেয়ার জন্য দেবো না। আমি প্রশ্ন শুনতে চাই। ওই সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল- বাংলাদেশ সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, সব হত্যাকাণ্ড এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ন্যায়বিচার করা হবে পক্ষপাতিত্বহীন এবং বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করে।  বাংলাদেশ আহ্বান…

ওই সাংবাদিকের প্রশ্ন শেষ না হতেই তাকে থামিয়ে দেন ডুজাররিক। তিনি বলেন, নো, স্যার। আমি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানি। আমি আপনাকে বক্তব্য দেয়ার জন্য ১০ সেকেন্ডও সময় দেবো না। প্রশ্ন চাই। এ সময় ওই সাংবাদিক বলেন, এসব পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
জবাবে স্টিফেন ডুজাররিক বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো ঠিক দুই মিনিট আগে যেটা বলেছি সেটা। তাতে সব রকম সহিংস ঘটনার যথাযথ তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং পক্ষপাতিত্বহীনভাবে। এসব সহিংসতায় জড়িতদের সবাইকে জবাবদিহিতায় আনতে হবে। এ পর্যায়ে ওই সাংবাদিক আবার জানতে চান- আমার আরও জানার আছে। সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সম্পদের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার বিষয় প্রকাশিত হয়েছে। এ রকম একটি ভয়াবহ ক্ষতির বিষয়ে বাংলাদেশকে কী কোনো সহায়তা দেবে জাতিসংঘ? জবাবে ডুজাররিক বলেন, সংকটের সময় যেকোনো দেশকে আমরা সবসময় সংলাপে সহায়তা করতে প্রস্তুত। বিশ্বের কোথাও প্রতিবাদ বিক্ষোভের সময় যেসব মানুষ দুঃখজনকভাবে তাদের সম্পদ হারান অথবা পরিবারের সদস্যদের হারান- তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোনো স্কিমের সঙ্গে জাতিসংঘ জড়িত নয়। আপনাকে ধন্যবাদ।

এ পর্যায়ে অন্য এক সাংবাদিক জানতে চান- আপনি একটু আগে যে বিবৃতি দিয়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ। বাংলাদেশ ইস্যুতে আমার তিনটি প্রশ্ন আছে। তা খুব দ্রুত হবে। বাংলাদেশে তরুণ নিরপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে গুলি করে এবং তাদেরকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জোরপূর্বক বিবৃতি দেয়ানোর কূটকৌশল (উইচ হান্ট) চালাচ্ছে আইনপ্রয়োগকারী এজেন্সি। এতে তাদের ভূমিকার বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের পর্যবেক্ষণ কী? জবাবে স্টিফেন ডুজাররিক বলেন- মুশফিক (মুশফিকুল ফজল আনসারী) আমি পুনরাবৃত্তি করছি। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন- বাংলাদেশে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট আছে। এসব রিপোর্টে উদ্বেগ জানিয়েছেন মহাসচিব। এসব নিয়ম লঙ্ঘনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন কী? মুশফিক বলেন- এই একই বাহিনী অন্য দেশগুলোতে থাকা জাতিসংঘের পতাকাতলে এসব লোকদের নিয়ে তিনি (জাতিসংঘ মহাসচিব) স্বস্তি প্রকাশ করেন? এ প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন ডুজাররিক বলেন, এটা পরিষ্কার যে, আমরা বাংলাদেশের ওপর এবং বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ওপর নির্ভর করি। তারা মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে এবং এর সম্মানার্থে শান্তিরক্ষী মিশনগুলোতে কাজ করে চলেছেন। আপনার শেষ প্রশ্ন কী?

মুশফিক বলেন- জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান বলেছেন, তার অফিস তাদের (বাংলাদেশের) তদন্তে সহায়তা করতে প্রস্তুত। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞজন এবং নোবেল বিজয়ীরা পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়ে আসছেন। এর প্রেক্ষিতে মহাসচিবকে ব্যবস্থা নিতে কতোটা তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন হবে? এ প্রশ্নের জবাবে ডুজাররিক বলেন, ম্যান্ডেন্টের অধীনে সবসময় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত জাতিসংঘ মহাসচিব।

‘রক্ত লাল’ প্রতিবাদ দেশ জুড়ে

‘রক্ত লাল’ প্রতিবাদে গতকাল সরব হয়েছিল পুরো দেশ। এই প্রতিবাদ চলেছে অনলাইন ও অফলাইনে। লালে লাল হয়ে উঠেছিল অনেকের ফেসবুক প্রোফাইল। মুখে মাথায় লাল কাপড় বেঁধে মিছিল-র‌্যালি হয়েছে স্থানে স্থানে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যুক্ত হয়েছিলেন এসব কর্মসূচিতে। শিল্পী-সংস্কৃতিসেবীরাও যোগ দেন এতে। মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা। যে আহ্বানে সাড়া দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ প্রত্যক্ষ ও  পরোক্ষভাবে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হন বহু মানুষ। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও লাল রঙের এ প্রতিবাদে যুক্ত হন। মূলত আন্দোলন ঘিরে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচারে গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে লাল রঙ বেছে নিয়েছে আন্দোলনকারীরা। সরকার যখন হতাহতের ঘটনায় দেশব্যাপী শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ঠিক তখন লাল রঙে প্রতিবাদে শামিল হতে ভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক। লাল রঙের কাপড়ে মুখ ও চোখ বেঁধে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক প্রোফাইলে দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। শিক্ষার্থীদের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডিপি চেঞ্জ করা ছাড়াও   অনেকে রাস্তায় নেমেও লাল কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ করেছেন।

ওদিকে আজ সারাদেশের আদালত প্রাঙ্গণে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীরা। গতকাল সকাল থেকেই ফেসবুকে লাল রঙের ডিপিতে সয়লাব হয়ে পড়ে। অনেকে নিজেদের প্রোফাইল লাল রঙের ছবিতে পরিবর্তন করেছেন। একইসঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন নানা মতও। লাল কাপড়ে মুখ বেঁধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। গানের মিছিল বের করেছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। অভিভাবকরাও নেমেছেন লাল প্ল্যাকার্ড হাতে।

প্রোফাইল পিক পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী লিখেছেন, এত মানুষের মৃত্যুর পরও কেন মানুষ কালোকে বেছে না নিয়ে লালকে বেছে নিলো? আপনাদের ধ্বংসযজ্ঞ, ষড়যন্ত্র, তৃতীয় শক্তি, পানি ছিটানো, গুজব রোধ, নিরাপত্তা হেফাজত এসব তত্ত্ব আর ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে এটা যে কতো বড় শক্ত প্রতিবাদ, সেটা আপনাদের মতো বড় বড় ন্যারেটিভের জন্মদাতা ও প্রচারকের বোঝার ক্ষমতা নেই। কালো যেখানে শোকের প্রতীক, লাল সেখানে বিপ্লব আর ভালোবাসার রং। লাল শৌর্যবীর্য আর সাহসিকতার প্রতীক। শিক্ষার্থীদের এ ক্যাম্পেইনে সমর্থন দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ফেসবুক প্রোফাইলে লাল ফ্রেম জুড়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নরওয়ের অসলো ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষক মুবাশ্বার হাসান নিজের প্রোফাইল পিকচার লাল রঙে পরিবর্তন করেছেন যার মধ্যে একটি প্রতীকী ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্র লেখা আকৃতির একটি মানবদেহকে হামলা করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী টিপুর লাল প্রোফাইল পিকচারে লেখা, আহারে মৃত্যু!! হায়রে স্বাধীনতা!! বিবিসি’র সাংবাদিক আকবর হোসেন লাল রঙে রাঙিয়ে লিখেছেন, পাঁচ বছর পর কাভার ফটো পরিবর্তন করলাম। লাকী ইসলাম লিখেছেন, তোমাদের শোক আর অভিনয় দুটোই ভাগাড়ে মিলাক। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজও তার প্রোফাইল পিকচার লাল রঙে পরিবর্তন করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানও তার কাভার ফটো লাল রঙে  রাঙিয়েছেন। হ্যাশট্যাগ দিয়েছেন, রেড জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কামরুল হাসান মামুন লেখেছেন, ফুলগুলো সব লাল হলো ক্যান? লাল রঙের প্রোফাইল পরিবর্তনের এ স্রোতে যুক্ত হয়েছেন আইমান সাদিক, মুনজেরিন শহীদের মতো সোশ্যাল ইনফুলেয়েন্সাররাও। এদিকে শিক্ষার্থীদের সমর্থন দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজপথে নেমেছেন। এ সময় তারা লাল রঙের কাপড়ে চোখ ও মুখ বেঁধে দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক সমাজ’-এর ব্যানারে কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে প্রায় ২০০ শিক্ষক অংশ নেন। সমাবেশে শিক্ষকদের মধ্যে বক্তব্য দেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব, অধ্যাপক রায়হানা শামস ইসলাম, প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ফারুকী, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ইসমত আরা, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান, আরবি বিভাগের অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও লাল কাপড়ে মুখ বেঁধে মৌন মিছিল করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে একটি মৌন মিছিল বের করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হল সংলগ্ন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নিহতদের স্মরণে নবনির্মিত ছাত্র-জনতা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে যায়। পরে সেখানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সেখান থেকে পুনরায় মিছিল নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একই পথে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এসে শেষে হয়। সমাবেশে শিক্ষকরা দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষদের হত্যা, তাদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও আটকের ঘটনার প্রতিবাদ জানান। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার অন্যতম সমন্বয়ক আরিফ সোহেলকে ‘মিথ্যা মামলায়’ রিমান্ড মঞ্জুর করার ঘটনার নিন্দা জানান। দর্শন বিভাগের প্রফেসর আনোয়ারুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, দুঃশাসন ও স্বৈরাচারী মন-মানসিকতার দুঃশাসক যখন রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় থাকে, তার পরিপূর্ণ নকশা ও বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষার্থীরা যখন তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে রাস্তায় নামে, তখন তাদের প্রতিরোধ করতে রাষ্ট্রের বাহিনী, নানান যন্ত্র ও তাদের মদতপুষ্ট সংগঠনগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহত করেছে। এখন আবার সরকার শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে আটক করছে, জেলে নিয়ে নির্যাতন করছে। ৭১’র কাল রাতের যে ভয়াবহ অবস্থা ছিল, তা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন। শিক্ষার্থীদের হত্যার বিচার এবং শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার-হয়রানি বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক এতে অংশ নেন। সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে মানববন্ধন করেন তারা। সেখানে অনেকের হাতে লাল প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজ উদ্যোগে চলমান আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এই কর্মসূচি আয়োজন করেছেন। কর্মসূচিতে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদের সব বিভাগের প্রায় ৫০ জন শিক্ষক অংশ নেন। তাদের হাতে ‘নিরস্ত্র ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘দমন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা’, ‘নিরস্ত্র ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে’, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে’ ও ‘শিক্ষার্থীদের পাশে শিক্ষক’ লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল।

প্রতিবাদী গানে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ-মিছিলে পুলিশের বাধা: এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ছাত্র-জনতা হত্যা, নির্যাতন, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলার প্রতিবাদে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিবাদী গানের মিছিলে বাধা দিয়েছে পুলিশ। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বিকাল ৩টার দিকে গুলিস্তানের জিপিও মোড়ে অবস্থান নেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা অনেকে লাল কাপড়ে মুখ বেঁধে নেন। এ ছাড়াও লাল প্ল্যাকার্ড গ্রহণ করেন। পরে বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বাহাদুর শাহ পার্কের দিকে গানের মিছিল নিতে চাইলে জিপিও মোড়েই বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে সংগঠনের নেতাকর্মীদের। তারা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে দুয়োধ্বনি দিতে থাকেন। পুলিশি বাধায় বাহাদুর শাহ পার্ক অভিমুখে যেতে না পারলেও জিপিও মোড়ের খদ্দর বাজার শপিং কমপ্লেক্সের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদী গান করেন শিল্পীরা। এতে জিপিও থেকে গোলাপশাহ মাজার অভিমুখী সড়কটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিপরীত সড়ক দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। প্রতিবাদী এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্লোগান, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা। এসব প্ল্যাকার্ডে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের ছবিসহ স্মরণ করা হয়। এ সময় তাদের সরকারবিরোধী এবং কোটা আন্দোলনের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। প্রতিবাদী গান ও স্লোগানের ফাঁকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন উদীচীর সহ-সভাপতি জামশেদ আহমেদ তপন। আগামী শুক্রবার বিকাল ৩টায় প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনার অভিমুখে শোক মিছিল করার ঘোষণা দেন তিনি। জামশেদ আহমেদ তপন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে বাহাদুর শাহ পার্কের দিকে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশের বাধার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সেজন্য আমরা সড়কেই অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছি। আমরা থেমে থাকবো না। যেখানেই বাধা আসবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচার সরকার এতগুলো প্রাণ কেড়ে নিলো, এই সরকারকে আমরা পতন ঘটাবোই। আমাদের লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাসের মধ্যদিয়ে দমানো যাবে না। আমরা বাংলাদেশের শিল্পী সমাজ চেতনার তাগিদে, প্রাণের তাগিদে আজ এখানে কাঁদতে এসেছি। আমাদের কি কান্না করারও সুযোগ নাই? হাহাকার করার সুযোগ নেই? আজকে ঘরে ঘরে কান্না হচ্ছে। ঘরে ঘরে মানুষ ট্রমাক্রান্ত। ঘুমাতে পারছে না। সেই মানুষকে আমরা সাহস দিতে চাই। তোমাদের সন্তানরা গেছে। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি। আমাদের সবার সম্মিলিত আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই স্বৈরতন্ত্রকে আমরা উৎখাত করবো।

গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, এই হত্যাকাণ্ড গণহত্যার শামিল। এরপরে শেখ হাসিনার আর ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। তার পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত, ক্ষমতা থেকে অপসারণ হওয়া না পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন থামবে না। এদিন বিকাল ৫টা ২০ পর্যন্ত ২ ঘণ্টা জিপিও মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবাদী, দেশত্মবোধক, বিদ্রোহী গান ও বিভিন্ন স্লোগান দেন শিল্পীরা। পরে একটি র‌্যালি করে পুরানা পল্টন মোড়  দিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন। প্রতিবাদ সমাবেশে কণ্ঠশিল্পী ও মানবাধিকার কর্মী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান, কবি, লেখক ও গবেষক হাসান ফখরি, সাংস্কৃতিক কর্মী কাকলি পারভীনসহ বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন।

নাগরিক সমাজের হুঁশিয়ারি

আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কসহ ডিবিতে আটক অন্যদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। মঙ্গলবার দুপুরে ডিআরইউ সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘হত্যা, অবৈধ আটক ও নির্যাতনের বিচার চাই’- শীর্ষক এক আলোচনায় এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, এ দেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ঘটনায় আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। আমি নিজে বিব্রতবোধ করছি। স্বাধীনতার পর ৭১’র মতো সহিংসতা আর অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হতে হবে- এটা ভাবনায় ছিল না। যেটা এখন হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। অথচ স্বাধীনতার চেতনাই হচ্ছে- বৈষম্যহীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এটা করতে না পারার দায় আমাদের নিতে হবে।

আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশ-এর (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মির্জা তাসলিমা সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, ইতিহাসের ১৯৫২, ১৯৬৯, ৭১ ও স্বাধীনতা পরবর্তীতে তরুণ প্রজন্মরাই এগিয়েছিল। আজকে কোটা বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে। ইতিহাসই বলে দেয়, তরুণ-শিক্ষার্থীরা হচ্ছে- অজেয় শক্তি। আমরা আশা করেছিলাম সেটি সরকার বিবেচনায় নেবে। কিন্তু তরুণদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। আন্দোলন ঘিরে সবকিছুর দায় সরকারকে নিতে হবে।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমরা ডিবি কর্তৃপক্ষকে ২৪ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাদের আটক করে আনা হয়েছে, ধরে নেয়া হয়েছে, সেটা বন্ধ করা ও তাদের যদি নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া না হয়, তাহলে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষ থেকে আরও কঠোর আন্দোলনে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো।  তিনি বলেন, আজই ডিবি কার্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেই কর্মসূচি স্থগিত করে সভা থেকে এই আল্টিমেটাম দেয়া হলো। অনুষ্ঠানে ডিবি প্রতিনিধি উপস্থিত থাকতে পারেন, এমন ধারণা থেকে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ডিবি প্রতিনিধি যারা আছেন, আপনারা আপনাদের অফিসকে আমাদের এই বক্তব্য জানাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমি ঘুমাতে পারি না। কালকে ফোন এসেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে গেছে ভাটারা থানা পুলিশ। অত্যাচার করা হয়েছে। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা জায়গায় ব্লক রেইড করা হয়েছে। কারফিউ দিয়ে হেলিকপ্টারের আলো ফেলে চারদিকে ঘিরে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, তরুণ-কিশোরদের গণগ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে গায়ে আঘাতের চিহ্ন আছে কি না। তিনি বলেন, আমি ঘুমাতে পারি না, কারণ যখন আমি শহীদ মুগ্ধের গল্প পড়ি। যে ছেলেটি আন্দোলনে গিয়েছিল বিস্কুট আর পানি দেয়ার জন্য। সবাইকে বলছিল কারও পানি লাগবে কি না। এ রকম একটা ছেলেকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমি ঘুমাতে পারি না, যখন দেখি টিয়ারগ্যাস বাসায় ঢুকছে সেটি বন্ধ করতে গিয়ে তখন ১১ বছরের ছেলেটিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ছয় বছরের শিশু মারা গেছে। চার বছরের শিশু বারান্দায় মারা গেছে। শিশু-কিশোরদের হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একটা বর্ণনাও বাড়িয়ে বলছি না, ২৬৭ জন মারা গেছে। কালকে একটা দোকানে জিনিস কিনতে গিয়ে শুনছিলাম, স্যার হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে, আমরা বিশ্বাস করি, কিন্তু আমরা এই সরকারকে বিশ্বাস করতে পারছি না।

ঢাবি’র এই অধ্যাপক বলেন, আজকে যখন এইরকম হত্যাকাণ্ডের ক্ষত আমাদের বুকে, তখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে গণগ্রেপ্তার করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন উঠছে, এই সরকার কি তরুণ-ছাত্র-যুবকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? এটা কি কোনো অধিকৃত ভূমি, এটা কি গাজা স্ট্রিট? এটা কি কাশ্মীর? এই দেশে যাদের গায়ে পুলিশের পোশাক দেখছি, তারা কি ভিন্ন দেশি বাহিনী? এরা কি আমাদের ট্যাক্সের বিনিময়ে চলে না? এরা কি আমাদের অর্থে লালিত না, এই অস্ত্র কি আমাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা না?

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনি বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা নাকি আপনি বোঝেন! দুঃখিত, আমার কাছে মনে হয় স্বজন হারানোর বেদনা আপনি বোঝেন, তবে সেটি নিজেরটা। নইলে এই শত শত মানুষকে যারা হত্যা করেছে, ৭০/৮০ জন শিশু-কিশোর-ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে তাদের বিচার করা হয়নি, ধরেননি।

আসিফ নজরুল বলেন, আজকে ছয়টা শিশুর ছবি যখন বের হয়, ফেসবুকে দেয়া হয়, বর্তমান সরকারে যারা আছেন, তাদের কারও নাম নিচ্ছি না। আপনাদের বুকে তো কোনো ক্রন্দন দেখি না, কষ্ট দেখি না। সারাক্ষণ স্থাপনা স্থাপনা স্থাপনা কষ্ট। এই সব স্থাপনা তো আমাদের টাকায় করা। আমরা কষ্ট পাবো, যন্ত্রণায় ভুগবো। আপনারা তো মেট্রোরেলে চড়েন না। আপনারা তো রাস্তায় যাবার সময় মানুষকে বেআইনিভাবে আটকে রাখেন। আজকে এই ছয়টা ফুল যে ঝরে গেছে, ১৯ অপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ মারা গেছে, বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। একটা মাকে দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় আছড়ে পড়ছে, আমার ছেলেটা তো কোনো আন্দোলনে ছিল না। কিন্তু বাজার করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। এই সরকার কি সমস্ত তরুণকে গ্রেপ্তার করবে?

আসিফ নজরুল বলেন, আজকে ৭০-৮০ বছরের মন্ত্রীরা, ছাত্রদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। আমাদের তরুণ সমাজের একটা অংশকে ক্রীতদাস, আরেকটা অংশকে খুনি বানানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াতে যারা সরাসরি জড়িত শিক্ষার্থীরা তাদের বিচার চেয়েছে। শিক্ষার্থীরা তো সরকার পতনের ডাক দেয়নি, চায়নি নতুন নির্বাচন। তাহলে মানছেন না কেন? নিজে যদি খুনি না হন তাহলে খুনিদের বিচার কেন করছেন না? সমস্যা কি? তিনি বলেন, আজকে আবু সাঈদের বুকে গুলি করে হত্যা করার পর এজহারে লেখা হয়েছে আন্দোলনকারীদের ইটপাটকেলে মারা গেছে। ফাজলামি করেন আপনারা? আমাদের কিশোর ছাত্ররা এখন সাহসের নাম। আমরাও আর অত্যাচারীর অত্যাচারকে ভয় পাই না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে। কোনো ছাড় নাই। তিনি আরও বলেন, আজকে শোক দিবস পালন করেন। জাতির সঙ্গে রসিকতা করেন? নাশকতার নামে ১০ হাজার গ্রেপ্তার করেছেন। আড়াই লাখ আসামি। হত্যা মামলায় কতোজনকে গ্রেপ্তার করেছেন? আজকে পত্রিকার ফুটেজে দেখেছি, ছাত্রলীগ, যুবলীগের হাতে অস্ত্র। ইউনিফর্ম পরা পুলিশ। সবাই চিহ্নিত। জ্বলন্ত প্রমাণ এরপরেও তো কাউকে দেখিনি গ্রেপ্তার করতে? নাশকতা কারা করেছে আমরা তো এখনো প্রমাণ পাইনি। অথচ হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার করে ফেলেছেন। যেটার প্রমাণ রয়েছে, সেটির জন্য কাউকে ধরেননি।

নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও মানবাধিকারকর্মী শিরিন হক বলেন, আন্দোলনে আহত সমন্বয়করা হাসপাতালে ভর্তি ছিল তাদের তুলে আনা হয়েছে। তারা কি হাসপাতালে নিরাপদ ছিল না?  আপনারা কিসের নিরাপত্তা দিচ্ছেন? এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, গত ১৬ই জুলাই থেকে যে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে ১০০ বছরের ইতিহাসে এই উপমহাদেশে এমন নজির নাই। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বলছি, হানাদার বাহিনী যেভাবে নির্মম এবং নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে, আমরা কয়েকদিন তেমন নির্যাতন দেখেছি। এমন বাংলাদেশ দেখার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছর ধরে অনেক অন্যায়-অনাচার মুখ বুঝে সহ্য করেছি। এনাফ ইজ এনাফ। এই কথা বলার সময়ও অনেক আগে পার হয়ে গিয়েছে। এখন আমরা একটা ভিন্ন সময়ে চলে এসেছি। যখন দেখছি আমাদের সন্তানদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, আমাদেরই ট্যাক্সের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়ে। আমাদের নীরবতার সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে। আমি অভিভাবকদের হয়ে এটুকুই বলবো। সারা বাংলাদেশে দল-মতের যত অভিভাবক আছেন, আজকে তাদের রুখে দাঁড়ানোর দিন। শুধু এই কথাটি বলার জন্য যে, এভাবে আমাদের সন্তানদের হত্যা, গ্রেপ্তার এবং নির্যাতন করা সহ্য করবো না। ওরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আমরা যা পারিনি, তা ওরা করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়াল আছে। সহজে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু গেট খুলে বহিরাগতদের এনে আক্রমণ করেছে একদল। শিক্ষকরা আক্রান্ত হয়েছেন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছে। শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ না করার জন্য অনুরোধ করেছেন। সিন্ডিকেট তা শোনেনি। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রশাসন ছিল না।  তিনি বলেন, সাবেক ছাত্ররা হল দখল করে থাকে। ফলে ছয়জন থাকতে পারে এমন রুমে থাকছে নিয়মিত ২০ জন ছাত্র। অনেক বছর ধরে স্বৈরাচারী আচরণ হয়েছে। আমরা ২০১৫ সাল থেকে বলে আসছি। প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ফলে আজকের আন্দোলন শুধু কোটা বিরোধী আন্দোলন বলছে না ছাত্ররা, ছাত্ররা বলছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈষম্য দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন রাতে তুলে নেয়া হচ্ছে। যখন গুলি হয়েছে তখন কিছু করতে পারেনি। এখন তুলে নেয়া হচ্ছে, আমরা কিছু করতে পারছি না। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। হাসপাতালে গোয়েন্দারা খবর নিচ্ছে। আহতরা চিকিৎসা না নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আবু সাঈদের মামলা থেকে বোঝা যায় কতোটা মিথ্যাচার করা হচ্ছে। এই আন্দোলনকে ক্রিমিনাল অ্যাসপেক্ট থেকে বের করতে ছাত্র, শিক্ষক, নাগরিকদের পাশে থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষার্থীদের জায়গা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজিবি, র‌্যাব ইত্যাদি চলে আসলো। আর শিক্ষার্থীদেরকে ৬টার মধ্যে হল ছাড়তে বলা হলো। তার আগে হঠাৎ করেই ৩টার দিকে টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হলো। তিনি বলেন, আবু সাঈদ যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, আমার মনে হয় সে কখনো ভাবতেই পারেনি আমার দেশের পুলিশ গুলি করবে। এরপর ছবি ও ভিডিও থাকার পরও এফআইআরে যা লেখা হলো তা আপনাদের সবারই জানা।

১১ দফা দাবি:
কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলি চালানো কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করে অপরাধীকে খুঁজে বেড়ানো এবং ধরিয়ে দেয়ার আহ্বানকে উপহাস হিসেবে দেখছেন বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। তারা ১১ দফা দাবি জানিয়ে বলেছেন, প্রতিটি হতাহতের ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার ও বলপ্রয়োগের ঘটনা জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হতে হবে। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

১১ দফা দাবির মধ্যে আছে- কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ, র?্যাব, আনসার, বিজিবি, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকারি মদতপুষ্ট অস্ত্রধারীদের গুলি এবং নির্মম আঘাতে নিহত সকল মৃত্যুর সঠিক, স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে এবং প্রকৃত দোষীর, তা সে যতই উচ্চ পদাধিকারী বা কোনো দলমতের হোক, সর্বোচ্চ আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাধীন, গ্রহণযোগ্য এবং বস্তুনিষ্ঠতার স্বার্থে প্রতিটি হতাহতের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রের ব্যবহার ও বল প্রয়োগের বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হতে হবে। এই প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুরু করতে হবে। ইতিমধ্যে সংগৃহীত ছবি, ভিডিও ফুটেজ এর মাধ্যমে চিহ্নিত সকল হন্তারক ও আক্রমণকারীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

জাতির ইতিহাসে সংঘটিত এমন নজিরবিহীন হতাহতের শিকার সকল নিহত, আহত নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সরকারকে অবিলম্বে প্রকাশ করতে হবে।
১৪৭ জন নয়, সকল নিহত ও আহত নাগরিকের সম্মানে জাতির সহানুভূতি, সম্মান আর শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় শোক ঘোষণা করতে হবে। এই শোক প্রকাশকে আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তারের দৃশ্যমান প্রক্রিয়া শুরু করে আন্তরিক ও অর্থবহ করতে হবে।

দায় মেনে নিয়ে প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। অঙ্গ হারানো সকল নাগরিকের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, ক্ষতিপূরণ আর পুনর্বাসনের পুরো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চিত্র জাতির সামনে অনতিবিলম্বে তুলে ধরতে হবে।

অবিলম্বে আটককৃত সকল শিক্ষার্থীর মুক্তি দিতে হবে এবং শিক্ষার্থী গ্রেপ্তারের চলমান প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে এবং সেখানে অস্ত্রধারী ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। তথাকথিত ডিবি হেফাজত থেকে সকল সমন্বয়কারীকে মুক্তি দিতে হবে। এমন জোরপূর্বক উঠিয়ে নেয়া আর বেআইনি হেফাজতের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত সকলকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে হবে।

সরকারকে ভয় দেখানোর সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে। গুলি করে আন্দোলন দমানোর অসুস্থ মানসিকতার অবসান এখনি করতে হবে। স্বাভাবিক ও স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারফিউ ও সেনা প্রত্যাহার করতে হবে, সাঁজোয়া যান সরিয়ে নিতে হবে, হেলিকপ্টারের পাহারা থামাতে হবে, ব্লকরেইড, গণগ্রেপ্তার, ছাত্র-অভিভাবক হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

অবাধ তথ্যপ্রবাহে আরোপিত সকল বাধা দূর করতে হবে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পূর্ণ মাত্রায় খুলে দিতে হবে। সহিংসতা দমনের নামে বিরোধী মত দমন করা যাবে না। স্পষ্ট প্রমাণের মাধ্যমে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।