Friday, June 14, 2019

১০ বছর বয়সে বিক্ষোভ, এখন তার মৃত্যুদণ্ড চায় সৌদি

মুর্তাজা কুরেইরিস (গ্রেপ্তারের আগে তোলা ছবি)
সৌদি আরবের ইস্টার্ন প্রদেশে ১০ বছর বয়সে সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়ায় মুর্তাজা কুরেইরিস নামেরে এক কিশোরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আয়োজন চলছে। ২০১১ সালে ইসলামি গণজাগরণের উত্তাল সময়ে সৌদি রাজতন্ত্রের নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র দাবিতে সেসময় দেশজুড়ে যে গণবিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তার অংশ হিসেবেই মুর্তাজা কুরেইরিস তার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে সাইকেল রাইডে নেমেছিল।
এই অল্পবয়সী বালকদের জড়ো হওয়ার বিষয়টি সেসময় ‘পর্যবেক্ষণ’ করে সৌদি সরকার। ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে তিন বছর পর মুর্তাজাকে ১৩ বছর বয়সে গ্রেফতার করে রাজতন্ত্রের বাহিনী। পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ বাহরাইনে চলে যাওয়ার সময় সীমান্তে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী ‘রাজনৈতিক বন্দী’ হিসেবে মুর্তাজাকে নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে।
প্রায় চার বছর ‘বিচার-পূর্ব কারাভোগ’ করানোর পর এখন মুর্তাজাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে চায় সৌদি আরব সরকার। মুর্তাজাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। মুর্তাজার বিরুদ্ধে যে অভিযোগপত্র দায়ের করা হয়েছে, সে অনুসারে ‘অপরাধ সংঘঠিত করার সময়’ তার বয়স ছিল ১০ বছর।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মুর্তাজার ভাই আলী কুরেইরিস মোটরসাইকেলেযোগে পূর্বাঞ্চলীয় শহর আওয়ামিয়াতে গিয়ে থানায় পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেন, সেসময় তার সঙ্গে ছিল মুর্তাজাও। মুর্তাজার ভাইকে পরে নির্মমভাবে হত্যা করে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী।
মুর্তাজার এখন সন্ত্রাস আদালতে বিচার চলছে। মৃত্যুদণ্ড চেয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে মুর্তাজার ১৮ বছর বয়সে পদার্পণের কয়েক মাস আগে। তার বিরুদ্ধে ‘উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এমনকি বিক্ষোভের সময় সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পেট্রোল বোমা হামলায় সহযোগিতা, ভাইয়ের জানাজার সময় পদযাত্রা বের করার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রপক্ষ এসব অভিযোগের ব্যাপারে মুর্তাজার কথিত ‘স্বীকারোক্তি’ হাজির করলেও অধিকারকর্মী ও স্বজনরা বলছেন, হুমকি-ধামকি দিয়ে, নির্যাতন করেই এ জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
গত এপ্রিলে সৌদি আরব প্রায় ৩৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মৃত্যুদণ্ড যাদের কার্যকর হয়েছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিয়া সম্প্রদায়ের। সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে শিয়া মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ট্রাম্পকে বার্তা দেবো না, তিনি বার্তা পাওয়ার যোগ্য নন: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, আমি ব্যক্তি ট্রাম্পকে কোনো বার্তা পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করি না। তার জন্য আমার পক্ষ থেকে কোনো বার্তা নেই। তাকে আমি কোনো বার্তা দেবো না। বৃহস্পতিবার তেহরানে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে বৈঠক করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে বৈঠকের সময় জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বলেন, আমি আপনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছি।
এর জবাবে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, "আপনার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যা তুলে ধরেছেন সে বিষয়ে বলব আমি ব্যক্তি ট্রাম্পকে বার্তা বিনিময়ের যোগ্য বলে মনে করি না। তার জন্য আমার পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। আমি তাকে কোনো উত্তর দেবো না।"
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেন, আমেরিকার প্রতি ইসলামি ইরানের কোনো ধরণের আস্থা নেই। পরমাণু সমঝোতা ইস্যুতে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি আর আমরা করব না। কারণ কোনো স্বাধীনচেতা ও বিজ্ঞ জাতিই চাপের মুখে আলোচনাকে মেনে নিতে পারে না।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, ট্রাম্প ইরানে সরকার পরিবর্তন করতে চান না বলে যে দাবি করেছেন তা সত্য নয়। তবে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সমস্যা সরকার পরিবর্তন নয়। কারণ তাদের এ ধরণের ইচ্ছা থাকলেও তারা তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা রাখে না। যেমনিভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টরা গত ৪০ বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংসের চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হতে পারে নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত রাখতে চান বলে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার প্রতি ইঙ্গিত করে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, "আমরা পরমাণু অস্ত্রের বিরোধী। পরমাণু অস্ত্র হারাম ঘোষণা করে আমার ফতোয়া রয়েছে। কিন্তু এটা জেনে রাখুন আমরা যদি পরমাণু অস্ত্র বানাতে চাইতাম তাহলে আমেরিকা কিছুই করতে পারতো না। আমেরিকার বিরোধিতা আমাদের জন্য কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারতো না।"
তিনি বলেন, তারা যে পরমাণু অস্ত্রের কথা বলছে তাদের গুদামেই কয়েক হাজার পরমাণু বোমা রয়েছে। তাদের এ কথা বলার অধিকার নেই যে, কোন দেশের পরমাণু অস্ত্র থাকবে আর কোন দেশের থাকবে না। আমরা বলতে পারি কারণ আমরা পরমাণু অস্ত্রের বিরোধী।
সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ট্রাম্প বলছেন ইরানের সঙ্গে আন্তরিক আলোচনা চান। আমরা এ কথা কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না। ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির পক্ষ থেকে আন্তরিক আলোচনা সম্ভব নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে আন্তরিকতা খুবই কম। আমরা বিশ্বাস করি আমেরিকার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। আমেরিকা আমাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ শত্রুতা করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে।
পরমাণু সমঝোতার ভিত্তিতে মার্কিনীদের সঙ্গে ইরানের অতীতের আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "পরমাণু সমঝোতার পর প্রথম যে ব্যক্তি তা লঙ্ঘন করেছিলেন তিনি হলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আবেদন জানিয়েছিলেন এবং এ লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীও পাঠিয়েছিলেন।"
আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসলে ইরানের উন্নতি হবে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন তার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, " আল্লাহর রহমতে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় না বসেই তাদের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকার পরও ইরান উন্নতি করবে।"
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, "জাপান এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আগ্রহ থাকলে জাপানকে দৃঢ় ইচ্ছা ও মনোবলের পরিচয় দিতে হবে যেমনিভাবে কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ দেশ এ ধরণের মনোবল প্রদর্শন করেছে।"
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে বৈঠকে জাপানি প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, তেহরানে যেসব বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে তা সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্র তৈরি করবে।

মাইকে ডাকাত ঘোষণা দিয়ে সিলেটের দুদুকে ‘গণপিটুনিতে’ হত্যা by ওয়েছ খছরু

সিলেটের বনকলাপাড়ার দুদু খান নিজেও ছিল চিহ্নিত অপরাধী। পহেলা বৈশাখের পরদিন রাতে সিলেটের আলোচিত গ্যাং রেপের ঘটনা ঘটিয়েছিল সে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর কারাবরণ করে বেরিয়ে আসার পর এলাকার আরেক প্রভাবশালী মহল গণপিটুনির নাটক সাজিয়ে সেই দুদু খানকে বেধড়ক পিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে। আর হত্যার পর তার হাতে রামদা দিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখে। গত বুধবার মধ্যরাতে সিলেট নগরীর বনকলাপাড়ার ইসলামাবাদ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর উত্তেজনা বিরাজ করছে এলাকায়। দুদু খানকে স্বেচ্ছাসেবকলীগ কর্মী দাবি করেছে তার পরিবার।
ঘটনার সম্পর্কে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততাকে দায়ী করেছে পরিবারের সদস্যরা। তবে গণপিটুনিতে হত্যা করা দুদু খানের মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্য দেখা দিয়েছে এলাকায়। গত পহেলা বৈশাখের পরের দিন সিলেট নগরীর বনকলাপাড়ার ইসলামাবাদ এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল জকিগঞ্জের আরেক বোন। রাতে দুদু খানের নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক মিলে ওই মহিলাকে বাড়ির বাইরের নির্জন স্থানে এনে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় ওইদিনই পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুদুসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ ঘটনায় প্রায় দেড় মাস কারাবরণের পর সপ্তাহখানেক আগে জামিনে বেরিয়ে আসে দুদু খান। এসে সে নিজ এলাকাতেই ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, দুদুর বিরুদ্ধে আরো দুটি চাঁদাবাজি মামলা ছিল। কারান্তরীণ হওয়ার পর সে ওই দুই মামলায় জামিন পেয়ে যায়। তবে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীর তালিকায় তার নাম ছিল। নানা অপরাধে জড়িত ছিল সে। দুদু খান আগে সিলেটের ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগের জুনিয়র কর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা করতো। তবে সে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কোনো কমিটিরই পদপদবিতে ছিল না। কেউ কেউ দুদু খানকে স্থানীয় ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আপ্তাব আলী খানের অনুসারী বলে দাবি করেন। তবে স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে তাকে অনুসারী হিসেবে অস্বীকার করা হয়েছে। দুদু খান বনকলাপাড়ার ইসলামাবাদ এলাকার ১১২নং বাসার বাসিন্দা। তার মূল বাড়ি হচ্ছে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলশোকা গ্রামে। তার পিতা মৃত তমিল খান।
দীর্ঘদিন তারা বনকলাপাড়া এলাকায় বসবাস করছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দুদু খান গত বুধবার রাত ১১টার দিকে তার ভাই হাসেম খানের দোকানে বসা ছিল। এ সময় স্থানীয় রিপন, শাহ আলম, কালা জামাল, বেলাল আহমদ ও মনু মিয়াসহ ১০-১২ জন লোক সাদিয়া টেলিকমে যায়। ওই দোকানে বসা দুদু মিয়ার সঙ্গে তাদের কথাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ওই যুবকরা দোকানে হামলা চালায়। তারা দোকান ভাঙচুর করে। এ সময় দোকানে দুদু খানের সঙ্গে তার ভাই জুয়েলও ছিল। হামলার ঘটনার সময় জুয়েল দৌড়ে পালিয়ে যায়। দুদু খান তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ওই যুবকরা দুদু খানকে দোকান থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখে। ওই সময় তারা দুদু খানকে নিয়ে একটি বাড়িতে ঢোকেন। সেখানেও তারা দুদু খানকে এলোপাতাড়ি কোপায় এবং মারধর করে। এদিকে, মধ্যরাতের দিকে বনকলাপাড়া ইসলামাবাদ জামে মসজিদের মাইকে এলাকায় ডাকাত পড়েছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণার পর ওই যুবকরা মৃতপ্রায় দুদু খানকে টেনেহিঁচড়ে রাস্তায় নিয়ে আসে।
এবং ডাকাত ডাকাত বলে তারা দুদু খানকে মারতে থাকে। এ সময় মাইকিং শুনে এগিয়ে আসা জনতাও দুদু খানকে কিল ঘুষি এবং লাথি মারে। এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান স্থানীয় কাউন্সিলর আপ্তাব আলী খান। তিনি পুলিশে খবর দিলে দুদু খানকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। এ সময় হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে কর্তব্যরত ডাক্তার দুদু মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, দুদু খানকে ঘটনাস্থলেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আর মারা যাওয়ার পর তার হাতে একটি রামদা রাখা হয়। পুলিশ লাশ উদ্ধারের সময় দুদু খানের হাতে রামদা পেয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলর আপ্তাব আলী খান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি এলাকায় যাই। সেখানে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে থামাই। এ সময় পুলিশ এসে দুদুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। তিনি বলেন, দুদু অপরাধী ছিল।
কিন্তু তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা কারো কাম্য নয়। বিচার হাতে তুলে নেয়া উচিত নয়। এ ঘটনা পুলিশ তদন্ত করছে। দুদুর ভাই কলাপাড়া পয়েন্টে নিউ সাদিয়া টেলিকমের মালিক হাসেম খান বলেন, ??‘পরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জামায়াত কর্মী রিপন, ছাত্রদল ক্যাডার ও একাধিক মামলার আসামি শাহ আলম, কালা জামাল, বেলাল আহমদ ও আওয়ামী লীগ কর্মী মনু। তিনি বলেন, দুদুকে হত্যার আগে আমরা চার ভাইয়ের ও আমার এক খালার পীরমহল্লার বাসায় ও আমার নিউ সাদিয়া টেলিকম নামের দোকানে হামলা করে ভাঙচুর করে। পরে দুদু খানকে রাস্তায় পেয়ে পিটিয়ে হত্যা করার পর মাইকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ডাকাত পড়েছে বলে জনতাকে জড়ো করে। এদিকে, সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে দুদুর লাশ পরিবারের কাছে দেয়া হয়েছে। লাশ কবর দিয়ে আসার পর তারা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, দুদুর সঙ্গে এলাকার বিরোধ পুরনো। পূর্বের ঘটনায় এলাকার কয়েকজন তাকে পিটিয়ে খুন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মামলা দিলে তদন্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

হরমুজ প্রণালীতে আরো দু’টি তেলবাহী জাহাজে টর্পেডো হামলা: ইরান ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ইস্যুতে উত্তেজনায় যুক্ত হলো নতুন মাত্রা। বৃহসপতিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলবাহী দুটি ট্যাংকারে বড় ধরনের টর্পেডো হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি ট্যাংকার পুরোপুরি ডুবে গেছে এবং অন্যটিও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন এ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর আগে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত হামলার জন্যও ইরানকে দায়ী করা হয়েছিল। তখন মক্কায় জরুরি সম্মেলন ডেকে ইরান সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে জড়িত দাবি করে দেশটিকে প্রতিহত করার আহ্বান জানান সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। বৃহসপতিবারের ওই হামলাও ইরানের ভূখণ্ড থেকে কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। সৌদি সংবাদমাধ্যম আল হাদাথ সর্ব প্রথম হামলার ছবি প্রকাশ করে।
এর আগে উপসাগরীয় অঞ্চলের ঠিক এই স্থানেই ইরানের বিরুদ্ধে মাইন ব্যবহারের অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির দাবি ইরান আরো ৪টি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে গত মাসে। তবে এবারের হামলা চালানো জাহাজ দুটোতে জাপানি কার্গো পরিবহন করা হচ্ছিল। এ হামলা ঠিক তখনই ঘটলো যখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ইরানের রাজধানী তেহরানে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে বৈঠক করছেন।
হামলার শিকার একটি জাহাজ সৌদি আরব থেকে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। অপর আরেকটি জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের জাহাজে টর্পেডো হামলা হয়েছে। এই হামলার পরপরই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে শতকরা ৪ শতাংশ। এখন ব্যারেল প্রতি তেল ৬২ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এটি আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে অবস্থানরত সবাইকে উদ্ধার করেছে। জাহাজ কোমপানি জানিয়েছে, তাদের সকল ক্রু নিরাপদ রয়েছেন। তবে ইরান জানিয়েছে, তাদের উদ্ধারকারী জাহাজ গিয়েই ক্রুদের উদ্ধার করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী শুধু তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করেছে।
বৃহসপতিবারের টর্পেডো হামলাটি হয়েছে বহুল আলোচিত হরমুজ প্রণালীতে। দীর্ঘ সময় ধরেই ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। এ অঞ্চল দিয়েই পৃথিবীর ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়ে থাকে। ইরান এ হামলাকে ষড়যন্ত্রমূলক হামলা হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কোনো একটি দেশ এ হামলা চালিয়ে ইরানের ওপর দায় চাপাতে চাচ্ছে যাতে করে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সফর ভণ্ডুল হয়ে যায়।
এদিকে, হামলার দিন সকালেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। এ সময় জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেন, আমি আপনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছি। জবাবে খামেনি বলেন, আপনার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যা তুলে ধরেছেন সে বিষয়ে বলবো আমি ব্যক্তি ট্রাম্পকে বার্তা বিনিময়ের যোগ্য বলে মনে করি না। তার জন্য আমার পক্ষ থেকে কোনো জবাব নেই। আমি তাকে কোনো উত্তর দেবো না।

আইওএম-এর উপ-মহাপরিচালক পদে নির্বাচন সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ by মিজানুর রহমান

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর উপ-মহাপরিচালক পদের নির্বাচনে প্রার্থী বিবেচনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। নীতি নির্ধারকরা বলছেন, সরকার এমন একজনকে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছে, যিনি অভিবাসন অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত মুখ, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। মিস্টার হক সচিব হওয়ার আগে টানা এক যুগের বেশি সময় আইওএমে ছিলেন। দুনিয়ার দেশে দেশে তিনি অভিবাসন নিয়ে কাজ করেছেন। অভিবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সুযোগ- সুবিধা নিশ্চিতে দরকষাকষির পাশাপাশি বাঙ্গালি কূটনীতিক হিসাবে বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদশকেও তুলে ধরেছেন। আইওএম থেকে ফেরার পরপরই শহীদুল হককে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেয় সরকার। তিনি আজ অবধি সরকার প্রধানের সেই আস্থা ধরে রাখতে পেরেছেন। পেশাদার ওই কূটনীতিক সচিবের দায়িত্ব পালনের অতিরিক্ত হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিবাসন বিষয়ক বিশেষ দূত হিসাবেও কাজ করছেন।
ঢাকা মনে করে, আইওএম এর উপ-মহাপরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হলে বৈশ্বিক অভিবাসনের উন্নত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ওই সংস্থাকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জনাব হক তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন। প্রার্থী হিসাবে মিস্টার হকও তা-ই বলছেন। সম্প্রতি বিশ্ব রাজনীতি তথা কূটনৈতিক দুনিয়ার হেড কোয়ার্টার নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি তার আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
দুনিয়ার ঝানু কূটনীতিকদের সামনে তিনি বৈশ্বিক অভিবাসনের সামপ্রতিক চালচিত্র তুলে ধরে নিরাপদ, নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়মিত অভিবাসন প্রতিষ্ঠায় একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তার বক্তৃতায় অভিবাসনের বিভিন্ন সমস্যা যেমন ওঠে আসে, ঠিক তেমনি এর সমাধান যে আছে সেটিও ফুটে ওঠে। তিনি একটি বারের জন্য আইওএম ও অভিবাসন নিয়ে তার বিদায়ী দিনের অভিজ্ঞতা বড় পরিসরে তথা বিশ্বের কল্যাণে ব্যবহার করার সূযোগ চান। নির্বাচনে তিনি সবার সমর্থন, ভোট এবং সহায়তা কামনা করেন। বাংলাদেশের ওই প্রার্থীর পক্ষে সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি ক্যাম্পেইন করছেন। গত সপ্তাহে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশন আয়োজিত একটি কূটনৈতিক পার্টিতে ভোট প্রার্থনা করেছেন। আগামী সপ্তাহে জেনেভায় সর্বশেষ ভোট ক্যাম্পেইনে সরকারের ওই প্রতিনিধি যাচ্ছেন। সেখানেও তিনি শহীদুল হক তথা বাংলাদেশের প্রার্থীকে বিজয়ী করার অনুরোধ রাখবেন। আইওএম-এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওই পদে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাড়া সুদান, ফিলিপাইন, আফগানিস্তান ও জর্ডান প্রতিদ্বন্ধিতায় রয়েছে। আগামী ২১ শে জুন জেনেভাস্থ আইওএম হেডকোয়ার্টারে সংস্থাটির ১৭৩ দেশ সদস্য রাষ্ট্র গোপন ব্যালটে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে উপ-মহাপরিচালক নির্বাচিত করবে।
ঢাকা মনে করে, বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় সচিবের দায়িত্ব পালনকারী ওই ব্যক্তিত্ব অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশ্ব নেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে সফল হবেন। যেমনটা তিনি বাংলাদেশের জন্য করতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্র সচিব হিসাবে শহীদুল হক যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে গোটা পশ্চিমা দুনিয়া, এশিয়া থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূর প্রাচ্য এবং কাছের ও দূরের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোতে বহুবার গেছেন। ওই সময়ে দেশগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা যেমন বাংলাদেশ সফর করেছেন তেমনি বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও দেশগুলো সফর করেছেন। সচিব হিসাবে শহীদুল শুধু সমন্বয়ের কাজটি করেছেন। অবশ্য তার পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। টানা ৬ বছরের বেশি সময় পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বে থাকা জনাব হককে এরইমধ্যে সরকার সিনিয়র সেক্রেটারি হিসাবে পদোন্নতি দিয়েছে। গেল বছরের ডিসেম্বরে তার অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার কথা থাকলেও সরকার পররাষ্ট্র সচিব হিসাবেই তার চাকরির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়েছে। অভিবাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক নবম বৈশ্বিক ফোরামের সভাপতি হিসাবে ঢাকায় জিএফএমডির সফল আয়োজক বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ২০১৪ সাল থেকে অভিবাসী পরিবারের সদস্যদের অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটির (সিএমডব্লিউ) স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি ওই পদে সর্বোচ্চ ভোটে ফের নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
হাই প্রোফাইল ওই ডিপ্লোমেট ২০০১-’১২ অবধি (লিয়েনে) আইওএম-এ থাকা অবস্থায় ফিল্ড অফিস থেকে শুরু করে জেনেভাস্থ প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ আইওএমের পরিচালক হিসেবে তিনি সংস্থার বৈদেশিক সম্পর্ক, দাতাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসননীতির বাস্তবায়নের কাজটি বিতর্কমুক্ত থেকে সামলেছেন। এর স্বীকৃতি হিসাবে ২০০৫ সালে আইওএম মহাপরিচালক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। লিয়েনে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের তরুণ কূটনীতিক হিসাবে তিনি লন্ডন, ব্যাংকক ও জেনেভায় কাজ করেছেন। হেড কোয়ার্টারেও পরিচালকের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন (ওয়াইপো), আইএলও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জনকারী শহীদুল হক ছাত্রজীবনেও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ‘অনারেবল মেন্টর ফর রবার্ট বি স্টিওয়ার্ড’ পুরস্কার পেয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া মিস্টার হক জীবনে কখনও সেকেন্ড হননি। অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জনকারী ওই কৃতিমুখ চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড, গ্র্যান্ট কমিশন অ্যাওয়ার্ড এবং চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল পেয়েছেন। অভিবাসন ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, বাণিজ্য ও মানবাধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে নিবন্ধ লিখছেন তিনি। বৈশ্বিক অভিবাসন প্রতিবেদনের সম্পাদনা পর্ষদেও কাজ করেছেন। আইওএমের তিনটি প্রশিক্ষণ গাইড এবং শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ‘আইওএম-ওএসসিই ট্রেইনারস ম্যানুয়েল’ প্রণয়নেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

চ্যালেঞ্জিং: রাজহাঁসটি যেন ব্যথা না পায়

আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য অনেকটা ভারসাম্যের এক বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অনুদান ছাড়া বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বিশাল এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংক বর্হিভুত খাত থেকে আরও ৩০ হাজার কোটি টাকা সংস্থানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। পুরো বাজেটেই ভারস্যাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যক্তি পর্যায়ে করসীমা আগেরটাই বহাল রাখা হয়েছে। তবে করদাতার সংখ্যা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। নতুন বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ ভাগ এবং মূল্যস্ফিতি ৫.৫ এ ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় ঘাটতির মেগা এই বাজেটকে অর্থনীতিবিদরা গতানুগতিক বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তারা বলছেন, অনেকটা পুরনো ধাচের এই বাজেটে ব্যক্তি খাতের প্রসারে কোন সুখবর নেই।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় প্রস্তাবিত বাজেটকে অনেকটা চ্যালেঞ্জের বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থনীতিবিদরাও এই বাজেট বাস্তবায়নে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখছেন। অর্থমন্ত্রী কর আহরণ প্রক্রিয়ায় অনেকটা সহনশীল অবস্থান প্রকাশ করে ব্যক্তি পর্যায়ের কর সীমা বহাল এবং নতুন কর আহরণে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছেন। তিনি তার বক্তৃতায় ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর অর্থমন্ত্রীর একটি উক্তি উদ্বৃত করে করনীতির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। রাজা লুই এর অর্থমন্ত্রীর উক্তিটি ছিল এরকম ‘ রাজহাঁস থেকে পালক উঠাও যতোটা সম্ভব ততোটা, তবে সাবধান রাজহাঁসটি যেন কোনভাবেই ব্যাথা না পায়’। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ কৌশলে রাজস্ব আহরণ কতোটা সহজ হবে তা সময়ই বলে দেবে।
নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৮ শতাংশ বেশি। বৃহস্পতিবার বিকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে সই করেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। যদিও অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে তার বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংসদীয় ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা। এবার সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার দুই লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা। এবার পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ১৬ শতাংশের বেশি।
এর মধ্যে ৬০ হাজার ১০৯ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই যাবে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের ১৯ শতাংশের বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৯ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১৬.২৮ শতাংশ। গতবারের মত এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, এক লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭.২১ শতাংশের মত। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯১২ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৬ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৪৮ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৫৪ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে প্রায় এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশের সমান। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে অর্থ সংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানোর আশা করা হচ্ছে।
নতুন বাজেটে ভ্যাটের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্য ব্যবহার্য কিছু পণ্যের ভ্যাট হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম বাড়ানো হচ্ছে। শুল্ক বাড়ানোর কারণে বাড়তে পারে মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ। একই সঙ্গে স্মার্ট ফোনের শুল্ক বাড়ানোর কারণে এটির দামও বাড়বে। রড উৎপাদন ও বিপণনে ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব করায় বাড়ি করার খরচ বাড়তে পারে। উৎপাদন পর্যায়ে ট্যারিফ মূল্যের পরিবর্তে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করায় এলপি গ্যাস, আমদানি করা গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, টমেটো কেচাপ, চাটনি, ফলের জুস, টয়লেট টিস্যু, টিউবলাইট, চশমার ফ্রেমের দাম বাড়তে পারে। একই কারণে দাম বাড়তে পারে প্লাস্টিকের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী, সিআর কয়েল, জিআই ওয়্যার, তারকাঁটা, স্ক্রু, অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসনসহ গৃহস্থালি সামগ্রী, ব্লেড, ট্টান্সফরমার, সানগ্লাস, রিডিং গ্লাসের। আইসক্রিমের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
তাই আইসক্রিমের দামও বাড়তে পারে। এ বাজেটে সয়াবিন, পাম অয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেলের উপর স্থানীয় ও আমদানি পর্যায়ের ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন, পাম অয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেল শুল্ক অব্যাহতি পেয়ে আসছিল। সয়াবিন, পামঅয়েল, সূর্যমুখী ও সরিষার তেলের উপর স্থানীয় ও আমদানি শুল্ক আরোপ করা করায় এসব পণ্যের দাম বাড়বে। টিভি ও অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সরবরাহকারী, স্থানীয় পর্যায়ে জ্যোতিষী ও ঘটকালিতে মূসক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পুঁজি বাজারের বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বাজেটে জ্যোতিষি ও বিয়ের ঘটকদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কর সুবিধা দিতে বার্ষিক ৫০ লাখ টাকার বেশি টার্নওভার হয় এমন ব্যবসায়ীদের ওপরই কেবল মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে দাম কমতে পারে এমন পন্যের মধ্যে আছে ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল। এসব কাঁচামালের কর অব্যাহতি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত উপকরণের শুল্ক কমানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এছাড়া পাউরুটি, বনরুটি, হাতে তৈরি কেক প্রতি কেজি ১৫০ টাকা পর্যন্ত মূসক অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।এছাড়া দাম কমতে পারে দেশে উৎপাদন হয় এমন মোটরবাইকের। কৃষি যন্ত্রপাতি পাওয়ার রিপার, পাওয়ার টিলার অপারেটেড সিডার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, লোরোটারী টিলার, লিস্ট পাম্পের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতে এসবের দাম কমতে পারে। এছাড়া পাদুকা সামগ্রির দামও কমতে পারে। বিদেশ থেকে আমদানি করা স্বর্ণের দাম কমতে পারে।
এদিকে আজ বিকালে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় বিকা তিনটায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন হবে বলে তার প্রেস উইং সূত্র জানিয়েছে।

এ যেন আয়নাবাজি

কুড়িগ্রামে মাত্র দুই’শ টাকার জন্য আদালতে আরেকজনের হয়ে হাজিরা দিতে গিয়ে ধরা পড়েছেন এক নারী। এ যেন আরেক আয়নাবাজি। একটি মামলায় আরেক নারী আসামির হয়ে হাজিরা দিতে যান ওই নারী। আদালতের কাঠগড়ায় ছিলেন ঠিকঠাকভাবেই। কিন্তু দুই পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক আসামির জামিন নামঞ্জুর করলে দেখা দেয় বিপত্তি। কাঠগড়াতে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। কুড়িগ্রাম সদর আমলীয় আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পবন চন্দ্র বর্মণ ওই নারীর কাছে কান্নার কারণ জানতে চান।
তখন নিজ মুখেই প্রক্সি হাজিরা দিতে আসার কথা স্বীকার করেন ফেলানী বেগম নামে ওই নারী।
জানান, ২০০ টাকার জন্য হাজিরা দিতে এসেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, জামিন পেয়ে যাবেন। শুধু কাঠগড়ায় দিয়ে হাজিরা দিতে হবে। তবে, বিচারক আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন ফেলানী বেগম। বিচারক পবন চন্দ্র বর্মণ পরে পেনাল কোডের ৪১৭ ধারায় ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে প্রক্সি হাজিরা দিতে আসা নারীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কুড়িগ্রাম জেলা ও দায়রা আদালত সূত্রে জানা গেছে এমন চাঞ্চল্যকর খবর। সূত্র জানায়, নুরজাহান বেগম নামে এক নারী গত ৯ জুন কুড়িগ্রামের রৌমারী থানায় একটি চুরির মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং ৮।
ওই মামলায় মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা হলেন- আবু সাইদ, মুরাদ হোসেন, মামুন, মনির, মুন্না ও নুরিনা বেগম। আসামিরা বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আত্মসমপর্ণ করে জামিন আবেদন করেন। তবে ছয় নম্বর আসামি নুরিনা বেগমের বদলে আদালতে হাজির হন ফেলানী বেগম। আদালত আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষে চারজনের জামিন মঞ্জুর করলেও ৫ এবং ৬ নম্বর আসামি মুন্না ও নুরিনা বেগমের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। জামিন নামঞ্জুরের বিষয়টি টের পেয়েই আাদালতের কাঠগড়ায় হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন নুরানী বেগমের হয়ে প্রক্সি দিতে আসা ফেলানী বেগম। পরে বিচারক তার কাছে কান্নার কারণ জানতে চান। এ সময় ফেলানী বেগম জানান, তিনি আসলে নুরানী বেগম নন, তার হয়ে হাজিরা দিতে এসেছেন। আসল নাম ফেলানী বেগম। তিনি বজলুর রহমান নামে একজন আইনজীবির সহকারীর পরামর্শে দুই শ’ টাকার জন্য প্রক্সি হাজিরা দিতে এসেছিলেন।
আদালত সূত্র আরো জানায়, প্রক্সির বিষয়টি ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে আমলে নিয়ে বিচারক ফেলানী বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ফেলানী বেগম জানান, তার স্বামীর নাম মৃত মালেক। তার বাড়ি সদর থানাধীন ভোগডাঙ্গা মাদুপাড়ায়। ফেলানী বেগমকে দুই শ’ টাকার বিনিময়ে প্রক্সি দিতে নিয়ে আসা আইনজীবির সহকারী বজলুর রহমানের পিতার নাম আবু জাফর আলী ও মায়ের নাম জহুরা বেগম। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী থানার জিগ্নিকান্দিতে তার গ্রামের বাড়ি। আদালত দুজনের বিরুদ্ধে একটি মিসকেস দায়ের করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ফেলানী বেগমকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এছাড়া আইনজীবির সহকারী বজলুরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
আদালত ও আইনজীবি সূত্র জানায়, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই মাঝে মধ্যেই অথের বিনিময়ে একজনের হয়ে অন্য জন আদালতে হাজিরা দেয়ার ঘটনা ঘটছে। হাজিরা দিতে এসে ধরাও পড়ছেন অনেকে। এক শ্রেণির অসাধু আইনজীবিরাও এমন জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলেও আদালত সূত্রে জানা গেছে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার একটি আদালতে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার বদলে প্রক্সি দিতে আদালতে গিয়ে ধরা পড়েন রিফাত শেখ নামে এক যুবক। পরে আদালত মূল আসামি মশিউর রহমানসহ দু’জনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অর্থনীতিবিদদের চোখে বাজেট

নতুন অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট গতানুগতিক, আগেরবারের ধারাবাহিকতা ও রিপিট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের কথা- বাজেটে কংক্রিট কিছু নাই। প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের বিরাট অংক। কিন্তু আয় ও লক্ষ্য অর্জনের কোনো দিক-নির্দেশেনা নেই। জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধবমুখীও নয়। সার্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার কার্যকর পদক্ষেপগুলো দেখা যায়নি বলে তারা মনে করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে অসম্পূর্ণ বাজেট হয়েছে। সুষ্ঠু তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না হলে প্রতিবছরের মত এবারের বাজেটও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলে অভিমত তাদের।
অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এসব মন্তব্য করেন তারা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটটা সার্বিকভাবে গতবারের বাজেটই এবার রিপিট হয়েছে। আগেরকার বাজেটের মতোই গতানুগতিক ও ধারাবাহিকতা। স্বদিচ্ছার প্রকাশ হয়েছে অনেক কিছু করার। কিন্তু লক্ষ্যগুলো কিভাবে অর্জন করবেন সে ব্যাপারে কোনো দিক-নির্দেশেনা দেখা যায়নি বাজেটে। তিনি বলেন, এটা অর্থমন্ত্রীর দোষের ব্যাপার না। কারণ নির্বাচনের পর মাঝামাঝি সময়ে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে সময় কম পেয়েছেন তিনি।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দ্বিতীয় দিক হলো- প্রস্তাবিত বাজেটের আয়ের বিরাট অংক। সেটা অর্জন করা, রাজস্ব আদায় করা, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা ও ভ্যাট আদায়ের আধুনিকায়নের কোনো ব্যবস্থায় নেই এনবিআরের। তাই এই আয় অর্জন করা কঠিন হবে। অন্যদিকে ভ্যাটের উপর আমরা নির্ভরশীল। একটা পণ্যের ওপর ভ্যাট বসলে অন্য সব কিছুর দাম বাড়ে। কারণ একটা পণ্যের দাম আরেকটার ওপর নির্ভরশীল। তাই এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধবমুখী খুব বেশি হয়েছে বলে মনে করেন না এই অর্থনীতিবিদ। পাশাপাশি বাজেটে খুব কংক্রিট কিছু নাই। বাজেটে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে। এতে করে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহ কমবে। ফলে এই খাত কঠিন চাপে পড়বে বলে মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। সার্বিকভাবে বাজেটের লক্ষ্যগুলো অর্জন করার কংক্রিট অ্যাকশনগুলো দেখা যায়নি। বাজেট গণমানুষের হতে পারেনি। এ কারণে আমাদের মতো দেশে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বাজেট প্রণয়ন করা দরকার বলে জানান সাবেক এই গভর্নর।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেট পরবর্তী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, অর্থমন্ত্রী নিঃসন্দেহে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবতার নিরিখে করার চেষ্টা করছেন। তবে এতে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা উচ্চাকাঙ্‌ক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণের জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে, তা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে কতকগুলো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। আমাদের ধারণা ছিল সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে উল্লেখ করে, সেগুলোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া হলো, সেরকম একটা ব্যবস্থা আমরা দেখবো। দুঃখজনকভাবে আমরা এই মুহূর্তে তা পেলাম না। যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যেমন তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা কোন খাতে, কীভাবে সৃষ্টি হবে এবং এটা ব্যক্তি খাতে হবে, না সরকারি খাতে হবে, এটা কি গ্রামে হবে, নাকি শহরে হবে, এ ধরনের কোনও মূল্যায়নভিত্তিক বা কোনও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাভিত্তিক কৌশলপত্র আমরা সেভাবে লক্ষ্য করিনি। তিনি বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি আছে, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে কোন সময়ের ভেতরে বাস্তবায়ন হবে, তা বলা নেই। যেমন ব্যাংক খাতে কমিশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আলাপ-আলোচনা করে করা হবে’। আমার কাছে এক কথায় মন্ত্রী নিঃসন্দেহে বাস্তবতার নিরিখে বাজেট করার চেষ্টা করেছেন, তবে সামগ্রিকভাবে বাস্তবতা তাতে প্রতিফলিত হয়নি। উনি প্রত্যাশা ও উচ্চাকাঙ্‌ক্ষার কথা বলেছেন, সেটা পরিপূরণ করার জন্য যে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প-প্রস্তাবনা থাকে, বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে, সেটা কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর আবু আহমেদ বলেন, বাজেটে পুঁজিবাজারে প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে কর দাতাদের হাতে পাবলিকলি ট্রেডের কোম্পানি হতে আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ হাজার টাকা করা হলেও বিষয়টি থেকে অনেকে সুযোগ নিতে পারবে না। স্টক ডিভিডেন্ডের উপর ১৫ শতাংশ কর প্রদানের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে বিষয়টি ইতিবাচক।

ঋণনির্ভর বাজেট -আমীর খসরু

অনির্বাচিত সরকারের বাজেট দেয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাবের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বনানীর নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন তিনি। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র অনির্বাচিত সংসদ বহাল রয়েছে বাংলাদেশে। অনির্বাচিত সরকার এই বাজেটটা দিয়েছে। এই অনির্বাচিত সরকারের বাজেট দেয়ার নৈতিক অধিকার নেই। কারণ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধও নয়। যখন কোনো সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয় না তখন জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতাও থাকে না।
সুতরাং তাদের কাছে সুশাসন প্রত্যাশা করাও কঠিন। কারণ জবাবদিহিতা না থাকলে, জনগণের আস্থা না থাকলে, সুশাসন থাকে না। আর সুশাসন না থাকলে কোনো অর্থনীতিই সঠিক পথে চলতে পারেনা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আজকে তাই। কারণ বাংলাদেশে সুশাসন অনুপস্থিত, গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তিনি বলেন, যেহেতু একটি অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা নেই।
তাদের কর্মকাণ্ডে কেউ প্রশ্ন করতে পারছেনা। সেহেতু তারা কি বাজেট দিল না দিল সেটাতে কিছু যায় আসে না। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গত ২০ বছরে সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এখানে এসেছে, এই সামষ্টিক অর্থনীতির মূল বিষয় আজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুশাসনের অভাবে আমাদের অর্থনীতি যেখানে ছিল সেখান থেকে সরে যাচ্ছে। সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, একদিকে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে অন্যদিকে সরকার এই ব্যাংকগুলো থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিচ্ছে; বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে। বাংলাদেশে অর্থনীতি মূলত ঋণনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে। এটা ভয়ঙ্কর। সবচেয়ে বিপদ হবে যখন এই ঋণগুলো আমাদের পরিশোধ করতে হবে। এখন সরকার যে ঋণনির্ভর বাজেট দিচ্ছে এটা কোনো না কোনো মাধ্যমে আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে। এই টাকা আমার-আপনার পকেট থেকেই নেয়া হবে। করের মাধ্যমে, ভ্যাটের মাধ্যমে বা অন্যান্য মাধ্যমে এই টাকা সরকার মানুষের পকেট কেটে নেবে। বিএনপির অর্থনীতিবিষয়ক কোর কমিটির অন্যতম সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজেটের টাকাটা আসবে কোথা থেকে? ঋণনির্ভর বাজেটের টাকা কে দেবে? জনগণকেই দিতে হবে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে দিতে হবে, তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে দিতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষকে এই টাকাটা দিতে হবে। বিএনপির অন্যতম এই নীতিনির্ধারক বলেন, ব্যাংকের টাকা যে লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে এটা বাজেট থেকে কমে যাচ্ছে। শেয়ার বাজার লুটপাটের টাকাও বাজেট থেকে কমে যাচ্ছে। বাজেট হল জনগণের। তারা যে ঋণ নিচ্ছে এটা তাদেরই পরিশোধ করতে হবে। কোনো না কোনো মাধ্যমে জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে। আর কোনো পথ নেই এই ঘাটতি পূরণ করার। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে লোকজন ব্যাংকে টাকা রাখতে চাইছে না। তিনি বলেন, ঋণনির্ভর অর্থনীতি হওয়ার কারণে বাজেটের একটা বিশাল অংক সুদ আকারে পরিশোধ করতে হবে। যে টাকাটা স্বাস্থ্যখাত থেকে নেয়া হবে। শিক্ষাখাত থেকে নেয়া হবে। মানব সম্পদ উন্নয়ন ও বেকারত্ব নিরসনখাত থেকেই এসব টাকা নেয়া হবে। বাজেটে যতো ঋণনির্ভরতা বাড়বে ততোই নাগরিক সুযোগ সুবিধার উপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। তারা বাজেট প্রণয়ন করছে। তারা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার তারাই সরকার পরিচালনা করছে। নীতিমালা প্রণয়ন করছে। তাদের স্বার্থেই মূলত আজকের এই বাজেট। আজকে সামষ্টিক অর্থনীতি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন যে বাজেট এক মিলিয়নের মধ্যে দেয়া সম্ভব সেটা তিন মিলিয়ন দেয়া হচ্ছে। ফলে যেসব সূচকের কথা বলা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের সূচক ও সার্ভের কোন মিল নেই। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ৫-৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেটা অটো পাইলট। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্প স্থাপন করে গেছেন, বিদেশে শ্রমিক রপ্তানি ও কৃষকের উন্নয়নে যে উদ্যোগগুলো নিয়ে গেছেন তাতে অটো পাইলটে চলে। আর প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি আমরা তো রেখে এসেছি ১২ বছর আগে। তিনি বলেন, দেশের সম্পদ এক শতাংশ-দেড় শতাংশ লোকের কাছে ক্রমান্বয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে। বাকি যে লোকজন তাদের রিয়েল আয় কমে যাচ্ছে। বেকারত্ব বেড়ে যাচ্ছে। যুব সমাজের একটি বিশাল শিক্ষিত একটি অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতে যখন বিনিয়োগ হবে না তখন তো বেকারত্ব বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে।

লিবিয়ায় এনামুলের টর্চার সেল: ‘টাকা দিলেই মেলে মুক্তি’

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার টুকদিরাই গ্রামের বাসিন্দা আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী এনামুলের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে ভূমধ্যসাগরে ডুবে প্রাণ গেল মাহবুবের। নিঃস্ব হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছে অনেক পরিবার। লিবিয়ায় রয়েছে এনামুলের টর্চারসেল। পাচারকারীদের সেখানে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। দেশে পরিবারের লোকজনকে বলা হয় তাদের সন্তান মাফিয়ার কবলে পড়েছে। এনামুলকে টাকা দিলেই মাফিয়ার কবল থেকে মেলে মুক্তি। এভাবেই ধাপে ধাপে টাকা দিতে হয় তাকে। নৌকা চালক থেকে আঙুল ফুলে কোটিপতি হওয়া এনামুলের ক্ষমতার কাছে ভুক্তভোগীরা অসহায়। তার বিরুদ্ধে থানা পুলিশে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না। তিউনিশিয়ায় সাগরে মাহবুব নিখোঁজের পর থেকে গা-ঢাকা দিয়েছে এনামুল। স্থানীয়রা জানান, উপজেলার টুক দিরাই গ্রামের হাজী আবদুল ওয়াহেদ মিয়ার পুত্র এনামুল হক ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। হঠাৎ করে ঢাকা, সিলেট আসা যাওয়া করে এলাকার যুবসমাজকে ইউরোপ পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে মানব পাচার শুরু করে। স্বপ্নের ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে লাখ লাখ টাকা নিয়ে এনামুলে শরণাপন্ন হয়েছেন এলাকার অনেকেই। দীর্ঘদিন অবৈধভাবে মানাব পাচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এনামুল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ পাড়ি দিলেও অনেকের সলিল সমাধি হয়েছে সাগরেই। কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরছেন কেউবা জেল খেটেছে। গত ৯ই মে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী নৌকাডুবিতে সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর সদরের চণ্ডিপুর গ্রামের মাহবুবুল করিম কনু (২৫) মিয়া নিখোঁজের পর দালাল এনামুল হককে নিয়ে এলাকায় আলোচনার ঝড় ওঠে। এরপর থেকে এনামুলকে এলাকায় আসতেও দেখছেন না কেউ। তবে এনামুল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলছেন, এসব কাজে তিনি এখন নেই, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই, মামলা হয়েছিল, তাও শেষ করা হয়েছে, ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার্তে এখন কিছুদিন ধরে সিলেট থাকছেন। জানা গেছে, গত রমজান মাসে দালাল এনামুলের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাড়ি ত্যাগ করে নিখোঁজ হওয়া মাহবুবুল করিমসহ কয়েকজন। এর মধ্যে লুৎফুর রহমান নামের একজন ৮ মাস শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করে লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলির আশরাফুল আলমের মাধ্যমে দেশে ফিরেন। এরপর গত ১৬ই জানুয়ারি সুনামগঞ্জ মানব পাচার প্রতিরোধ দমন ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সদস্য এনামুলসহ ৩ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আনোয়ারপুর গ্রামের হাজী আবদুল মালেকের ছেলে ভুক্তভোগী লুৎফুর রহমান। স্থানীয়রা জানান, আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সদস্য টুক দিরাই গ্রামের জনৈক এনামুল হকের মাধ্যমে উপজেলার অনেকেই স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি দিতে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। তাদের অভিভাবকরা অনেকেই চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। ভুক্তভোগী লুৎফুর রহমানের স্ত্রী দিলারা বেগম জানান, গত ৬ই রমজান আমার স্বামী লুৎফুর রহমান ও নিখোঁজ ছবুর মিয়ার ছেলে মাহবুবুলসহ ওরা ৫ জন এনামুলের মাধ্যমে টাকা-পয়সা দিয়ে ইউরোপের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন, কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সব কিছু পাল্টে যায়, নির্যাতনের শিকার হয়ে টাকা-পয়সা শেষ করে বাড়িতে আসেন আমার স্বামী এবং চলতি বছরের ১৬ই জানুয়ারি সুনামগঞ্জে মানব পাচার প্রতিরোধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় দিরাইয়ের এনামুলসহ হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের কালিয়া ভাঙ্গা গ্রামের মৃত দরছ মিয়ার পুত্র তৈমুর রহমান ও মামুনুর রশিদকে। চণ্ডিপুর গ্রামের মশাহিদ মিয়া জানান, এনামুল বহু মানুষকে ইউরোপের কথা বলে বিদেশ পাচার করেছে, আমার ভাতিজাকে ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে পাসপোর্ট ও এক লাখ টাকা নেয় সে, পাসপোর্ট ফেরত দিলেও টাকা ফেরত দেয়নি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ডের সাধারণ সম্পাদক রাহাত মিয়া জানান, এনামুল হককে ৪ লাখ টাকা দিয়ে আমার ভাতিজা জুয়েল লিবিয়া যায়, এরপর ইউরোপ পাঠানোর কথা বলে এবং মাফিয়ার কথা বলে মোট ১১ লাখ টাকা এনামুলের মাধ্যমে দেয়া হয়, সে এখন লিবিয়া আছে।
এ ছাড়াও পৌর সদরের মাদানী মহল্লার কাউছার, শাখাওয়াত, উপজেলা রোডের খসরুল হকসহ অনেক ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন বলেন, এনামুলের সঙ্গে ইতালি যাওয়ার জন্য ৮ লাখ টাকায় কণ্টাক্ট হয়। লিবিয়ায় পৌঁছার পরই আমাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়। বলা হয় বাড়িতে ফোন করে বল টাকা দেয়ার জন্য। এভাবে ১৬ লাখ টাকা দেয়ার পরও আমরা ইতালি পৌঁছতে পারিনি। পরে এনামুলের সিন্ডিকেট থেকে পালিয়ে অন্য মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা ইতালি পৌঁছেছি। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দিরাই সার্কেল বেলায়েত হোসেন শিকদার জানান, এনামুল একজন দালাল চক্রের সদস্য, তার বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে অভিযোগ হয়েছিল, আমি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছি, এরপর শুনেছি মানব পাচার প্রতিরোধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে, এরপর নাকি আদালতে মামলা আপস করা হয়েছে।

বিশ্বকাপ ঘিরে রমরমা জুয়া: কোটি কোটি টাকা যাচ্ছে বিদেশে by রুদ্র মিজান

এ এক অন্য রকম নেশা। ক্রিকেট খেলার মাঠে না গিয়েই ব্যাট করা যায়। এর মাধ্যমে যেমন আয় হয় তেমনি সর্বস্ব হারাতেও হয়। এই ভয়ঙ্কর খেলার নাম অনলাইন জুয়া। এ জুয়া  এখন দেশে রমরমা। অবশ্য তা প্রতিরোধ করতে তৎপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তবু থামছে না কিছুতেই। বরং দিনদিন বাড়ছে।
জুয়াড়িদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অসংখ্য ওয়েবসাইট গড়ে উঠেছে জুয়া ভিত্তিক। যে কোনো খেলা নিয়েই জুয়া হচ্ছে এসব সাইটে। সম্প্রতি তিন জুয়ারিকে গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত কয়েক মাসে অনলাইনে দেশে অন্তত শত কোটি টাকার জুয়া হয়েছে। চলতি মাসে এই সংখ্যা আরও বিপুল হবে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। বর্তমানে ক্রিকেট বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে বিপুল টাকার জুয়া খেলা হচ্ছে অনলাইনে। জুয়া হচ্ছে বলে-বলে, চার, ছক্কাসহ রান নিয়ে। কোন খেলোয়াড় কত রান করবেন, কত উইকেট নিবেন এসবের উপরও। অনলাইনের এই জুয়া খেলায় জড়াচ্ছেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, চিকিৎসক, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরা। খুব অল্প টাকায় জুয়া খেলার সুযোগ থাকলেও সাধারণত প্রতি জনে জুয়া হচ্ছে হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ লাখ টাকার।
কোনো কোনো আর্ন্তজাতিক সাইটের এজেন্ট রয়েছে ঢাকায়। জুয়া খেলায় টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা নিজেরা সহযোগিতা করে। এক্ষেত্রে বিকাশে টাকা লেনদেন করা হয়। এরকম দুটি সাইট থেকে গত তিন মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। সম্প্রতি অনলাইন বেটিং সাইট লিংক ব্যবহার করা অনলাইন জুয়াড়ি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিটিটিসির সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম বিভাগ।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে উত্তর ধানমন্ডির নাজিদ রাব্বান জানান, দীর্ঘদিন থেকেই অনলাইনে জুয়া খেলায় অর্থ লেনদেনে তারা জড়িত। জুয়া খেলার একটি বিদেশী সাইটের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তারা। অন্যের নামে নিবন্ধনকৃত বিকাশের এজেন্ট সিম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়াড়িদের টাকা লেনদেন করে তারা। খেলা চলাকালে বাংলাদেশে অবস্থানরত জুয়াড়িরা প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে নিজেদের নামে ডিপোজিট করে। ডিপোজিটকৃত অর্থ দিয়ে জুয়াড়িরা জুয়া ধরে। আর্ন্তজাতিক ক্ষেত্রে টাকাগুলো ডলারে রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে অনলাইনে দেশীয় বিভিন্ন ক্লাব রয়েছে। যেমন ঢাকা ক্লাব, সুইট অক্টাগন, স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড, বল বিডিসহ বিভিন্ন নামে জুয়াড়িদের ক্লাব রয়েছে অনলাইনে। এছাড়াও সেখানে যারা খেলেন তাদের অনেকেই ক্লাবের বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে খেলায় অংশ নেন। বিকাশে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে মূলত ম্যাচ নিয়ে জুয়া হয়। বিকাশে লেনদেনের মাধ্যমে জুয়া খেলার ক্ষেত্রে কোনো সাইটে মধ্যস্বত্ত্বভোগী থাকেন। তাকে বলা হয় পেটিসখোর। পেটিসখোরের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বাজি নেয়া। দুই বা তার অধিক পক্ষের বা গ্রুপের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জয়ী ব্যক্তিকে তা বুঝিয়ে দেন পেটিসখোর। এক্ষেত্রে পেটিসখোর পান ৫ থেকে ১০ শতাংশ টাকা।
অনলাইনে ক্রিকেট ছাড়াও বেটিং সাইট লিংক ব্যবহার করে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ফুটবল টুর্নামেন্টসহ বিশ্বের জনপ্রিয় যে কোন খেলাধুলা নিয়ে জুয়া হচ্ছে। পরিচিত একটি সাইটের জুয়াখেলা সম্পর্কে জুয়াড়িরা জানান, এতে নাম, ঠিকানা, বয়স ইত্যাদির সঠিক তথ্য দিয়েই অ্যাকাউন্ট করতে হয়। এমনকি অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করার জন্য পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা ড্রাইভিং লাইন্সেস এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের ছবি তুলে সাবমিট করতে হয়। ২০ টাকা ডিপোজিট করেই এতে বেট করা যায়। অ্যাকাউন্ট খুলতে প্রয়োজন হয় ৫শ’ টাকা। সাধারণত জুয়ার টাকা পেমেন্ট করা হয় নিটেলার ও স্ক্রল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। এছাড়াও ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন অনেকে। টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নিটেলার ও স্ক্রল অ্যাকাউন্টের ব্যবহারই বেশি বলে জানান জুয়াড়িরা। অ্যাকাউন্ট লগইন করে পছন্দ মত খেলা?টি বেছে নেন। তারপর কোন দলের পক্ষে, কিসের উপর বেট করবেন তা সিলেক্ট করতে হয়। সেইসঙ্গে ডলার বা সেন্টের পরিমাণও সিলেক্ট করে ক্লিক করতে হয়।
অতঃপর হারলে টাকা কেটে নেবে আর জিতলে অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হবে। শখে এবং পরিশ্রম ছাড়া বসে বসে অর্থ আয় করতে গিয়ে এতে নেশাগ্রস্ত হচ্ছেন তরুণরা। লাভ হলে বাজি ধরা ডলারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আর লস হলে যা ধরলেন তা। এই লোভে এই খেলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকে। জুয়া খেলায় সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। তাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, ক্ষুদে ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে একজন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্ট (ইউল্যাব)’র আইন বিভাগের ছাত্র। হাজার-হাজার টাকা জুয়া খেলে বেশ ভালোই আয় করছিলেন তিনি। এতেই অনলাইন জুয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। বেশ কিছুদিন আগে নিজের কাছে থাকা প্রায় ৪৫ হাজার টাকা নিয়ে জুয়া খেলে আয় করেন দেড় লক্ষাধিক টাকা। ওই টাকা দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পার্টি ও প্রিয় জিনিসপত্র  কিনেছেন। কিন্তু জুয়ার নেশা এখানেই শেষ না।
নিজের কাছে থাকা টাকা ও বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে দুই লাখ টাকা নিয়ে জুয়ায় নামেন তিনি। তারপরই ধাক্কা খান। সর্বস্ব হারান। ঋণ শোধ করতে পারেন না। এ নিয়ে মারধরের শিকার হন এই শিক্ষার্থী। একপর্যায়ে নিজের ফোন, ল্যাপটপ বিক্রি করে ও বাবার কাছ থেকে টাকা এনে সেই ঋণ শোধ করেন তিনি। একইভাবে রংপুরের বদরগঞ্জে জুয়া খেলে নিজেকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত নিয়ে গেছেন এক যুবক। প্রথমে টাকা আয় করেছেন ভালোই। এতে বেশি টাকা আয়ের জন্য স্ত্রীকে চাপ দেন। যৌতুক চান। গবাদি পশু বিক্রি করে টাকা দেন শ্বশুর। সেই টাকা দিয়ে জুয়া খেলেন। একপর্যায়ে সর্বস্ব চলে যায়। আবার স্ত্রীকে টাকার জন্য চাপ দেন। মারধর করেন। এ নিয়ে বদরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ গণমান্যদের নিয়ে সালিস বৈঠক হয়। সর্বশেষ স্ত্রীর দায়েরকৃত নির্যাতনের মামলায় জেল খাটতে হয় এই জুয়াড়িকে। এভাবেই অনলাইন জুয়ায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকেই। অনলাইনে জুয়া খেলার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে।
এসব বিষয়ে সিটিটিসি’র সাইবার সিকিউরিটি এন্ড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, আমাদের পরামর্শে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (বিটিআরসি) অনেকগুলো সাইট বন্ধ করেছে। তারপরও জুয়াড়িরার নতুন নতুন বিভিন্ন সাইট ও প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে জুয়া খেলছে। বিষয়টি আমরা নজরদারি করছি। এতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় অবনতি বাংলাদেশের

পৃথিবীর কম শান্তিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ এবং ক্রমশই এ অবস্থার অবনতি হচ্ছে। এমনটাই জানাচ্ছে সমপ্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই)। এতে বিশ্বে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় ১৬৩ দেশের মধ্যে ১০১তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ বছর বাংলাদেশের স্কোর ২.১২৮ যা গত  বছর ছিল ২.০৮৪। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এ তালিকায় ৯৩তম অবস্থানে থাকলেও এ বছরের তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। জিপিআই রিপোর্টে বলা হয়েছে, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ তালিকার নিচের অর্ধেকে রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশ তিনটির প্রায় ৪০ কোটি মানুষ চরম ভাবাপন্ন পরিবেশে বাস করে। জিপিআই    জানিয়েছে, গত বছর বাংলাদেশে শুধু সহিংসতার কারণেই ২২ হাজার ২৯৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে।
এটি ছিল মোট জিডিপির ৩ শতাংশ।
বরাবরের মতো এবারও বিশ্বের সব থেকে শান্তিপূর্ণ দেশ নির্বাচিত হয়েছে আইসল্যান্ড। ২০০৮ সাল থেকে এই অবস্থান ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। তালিকায় এর পরই আছে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও ডেনমার্ক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তালিকায় ভারত ১৪১তম, পাকিস্তান ১৫৩তম ও তালিকার সবার নিচে ১৬৩তম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান।
সামপ্রতিক এই রিপোর্টে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় পৃথিবীতে সামান্য হলেও শান্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের ৮৬টি রাষ্ট্রের এ তালিকায় উন্নতি হয়েছে ও ৭৬ রাষ্ট্রের অবনতি হয়েছে। এই তালিকার শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে ভূটানের। গত ১২ বছরে এই তালিকায় ৪৩ ধাপ উপরে ওঠে এসেছে দেশটি।
এদিকে, পুরো বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান। পূর্বে এ স্থানে ছিল সিরিয়া। এ বছর দেশটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এছাড়া সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ পাঁচ দেশের মধ্যে আরো রয়েছে দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন ও ইরাক। 
জিপিআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে শান্তি কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে। কারণ সমপদ, জীবিকা, নিরাপত্তা ও অভিবাসনের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে বাড়ছে সহিংস সংঘাতের পরিমাণ। জিপিআই বলেছে, ঢাকার বস্তিগুলো থেকে সরে যাচ্ছেন অনেকে। এরকম মানুষদের ৮২ শতাংশ তাদের অভিবাসনের কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছে। ব্যবহারযোগ্য সমপদ উচ্চহারে হ্রাস পাওয়ায় তা নিয়ে বেড়েছে সহিংসতা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সামুদ্রিক পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে তাতে আক্রান্ত হবে বাংলাদেশের অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। পানির নিচে তলিয়ে যাবে ১৬ শতাংশ ভূখণ্ড। ঘরহারা হবেন বহু উপকূলীয় জনগণ। এতে দেশের ভেতর অভিবাসনের হার আরো বাড়বে।

অভিনব চুরির পর এটিএম বুথে কড়া সতর্কতা by শুভ্র দেব

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাক করে বিদেশি নাগরিকের টাকা তোলার পর সতর্ক হয়েছে দেশের ৫১টি এটিএম কার্ড সেবাদানকারী ব্যাংক। এমন ঘটনা এড়াতে সারা দেশে ১০ হাজার ৫৩৬ টি এটিএম বুথে কড়া সতর্কতা নেয়া হয়েছে। বিশেষ কৌশলে পুরো এটিএম বুথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টাকা উত্তোলনের ঘটনা এর আগে দেশে কখনও হয়নি। তবে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি ইস্টার্ন, সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে তথ্য চুরি করে বিদেশিরা। ওই সময় ক্লোন করা ৪০ টি কার্ড দিয়ে ২০ লাখ টাকা তুলে নেয় তারা। এবারের ঘটনা একেবারেই ভিন্ন। কারণ, ওই দিন হ্যাকাররা যে পদ্ধতিতে টাকা তুলেছে এমন ঘটনা দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। বুথ থেকে টাকা তোলা হলেও তার কোন রেকর্ড ব্যাংকের সার্ভারে নেই।
এসব কারণে প্রতিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখন এটিএম বুথের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। ব্যাংকসূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মীদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এসব নির্দেশনার মধ্য রয়েছে নিরাপত্তাকর্মীরা একই সঙ্গে যেন একাধিক ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে না দেন এবং লেনদেনের সময় বুথের দরজার স্বচ্ছ অংশ দিয়ে গ্রাহকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হেলমেট, টুপি, মাস্ক, সানগ্লাস, হিজাব, রেইনকোট ও হাতমোজা পরিধান করা কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। এছাড়া ব্যাগ, ল্যাপটপ বা অন্য কোন মালামাল নিয়ে বুথে প্রবেশে বাধা দিতে হবে। বিদেশি কোন ব্যক্তি বুথে আসলে তাকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।  বুথের ভেতরে তার কার্যকলাপ নিজ চোখে দেখতে হবে। সন্দেহজনক মনে হলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। গ্রাহক এটিএম বুথে বেশি সময় অবস্থান করলে তাকে বিনয়ের সঙ্গে বেশি সময় নেয়ার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে হবে। দায়িত্বপালনকালে নিরাপত্তাকর্মী কোনভাবেই এটিএম বুথের আশেপাশের লোকদের সঙ্গে আড্ডায় জড়িত হতে পারবে না। দায়িত্বপালন করার সময় কর্মস্থল ত্যাগ করা যাবে না।
কেউ যদি বুথে প্রবেশ করে এটিএম কার্ড ছাড়া অন্য কোন ডিভাইস ব্যবহার করে তবে কর্র্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এছাড়া প্রতিটা বুথের অচল সিসি ক্যামেরা সচল রাখতে হবে। বেইলি রোডে ডাচ বাংলা ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী আমির হোসেন বলেন, হ্যাকিং করে টাকা তোলার পর আমাদেরকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদি কেউ এটিএম বুথে ঢুকে অস্বাভাবিক কিছু করে আর সেটা যদি আমাদের চোখে ধরা পড়ে তবে আমাদের অফিস ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হবে। এছাড়া কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে থানায় জানাতে হবে। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের বেইলি রোডের  নিরাপত্তাকর্মী মো. মিজানুর রহমান বলেন, তিন মিনিটের বেশি কেউ এটিএম বুথে অবস্থান করলে তাকে বের করে দিতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক হলে থানায় জানাতে হবে। নিজেকে সেইভ রাখতে হবে। ঢাকা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, আমরা ল্যাপটপ, ব্যাগ, হেলমেট, হাত মোজা, মার্কস ও কালো চশমা পরিহিত কাউকে এটিএম বুথে ঢুকতে দেই না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার পর থেকে আমাদেরকে আলাদাভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আগে আমরা বুথের বাইরে গল্প করতে পারতাম। চা খাওয়ার জন্য একটু দুরে যেতে পারতাম কিন্তু এখন আর সেটা হয় না। ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী সাদির মিয়া বলেন, আগের চেয়ে আমাদেরকে এখন অনেক সতর্ক থাকতে হয়। গ্রাহক সেজে কেউ ভেতরে ঢুকে বেশি সময় নেয় কিনা বা এটিএম কার্ড ছাড়া অন্য কোন ডিভাইস ব্যবহার করছে কিনা সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। বুথের স্বচ্ছ কাচ দিয়ে ভেতরে কি হচ্ছে খেয়াল রাখতে হয়।
মগবাজারের স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী মো. জনি বলেন, দায়িত্বপালনের সময় আমাদেরকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তিন থেকে চার মিনিটের বেশি কেউ ভেতরে অবস্থান করলে তাকে ফলো করতে হবে। কোন কারণে সন্দেহ হলে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। সিটি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী রাকিবুল ইসলাম বলেন, মাস্ক, হেলমেট, ব্যাগ ও ক্যাপ নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেই না। কোন সমস্যা হলে মোবাইল নম্বর দেয়া আছে ওই নম্বরে জানিয়ে দেই। ইস্কাটনে ইউসিবি ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী মো. বখতিয়ার বিশ্বাস বলেন, বিদেশি কেউ ঢুকলে বেশি নজরদারি করি। এছাড়া কোন গ্রাহক যদি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় নেন তবে তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা।
গত ৩১শে মে রাজধানীর বাড্ডা এলাকার ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতিতে দুইজন বিদেশি নাগরিক কার্ড ব্যবহার করে একাধিকবার টাকা উত্তোলন করেন। এসময় তাদের মুখে মাস্ক, চোখে সানগ্লাস ও মাথায় টুপি পরা ছিল। পরেরদিন শনিবার ওই এটিএম বুথের টাকার হিসাব মেলানোর সময় তিন লাখ টাকা কম হয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দুইজন বিদেশি কর্তৃক টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের সকল এটিএম বুথে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। ওই দিন রাতেই খিলগাঁও তালতলা এলাকার একটি বুথে দুই বিদেশি নাগরিক টাকা তুলতে যান। তখন তাদের মুখে মাস্ক ও মাথায় টুপি পরা ছিল। বুথে ঢুকেও তারা অস্বাভাবিক সময় নিচ্ছিলেন। নিরাপত্তাকর্মী বিষয়টি টের পেয়ে আশেপাশের লোকজন জড়ো করেন। তাদের সহযোগিতায় একজন বিদেশিকে আটক করা হয়।
পরে তার দেয়া তথ্যমতে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম ইন্টারন্যাশনাল থেকে আরও পাঁচ বিদেশিকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা হলেন, দেনিস ভিতোমস্কি (২০), নাজারি ভজনোক (১৯), ভালেনতিন সোকোলোভস্কি (৩৭), সের্গেই উইক্রাইনেৎস (৩৩), শেভচুক আলেগ (৪৬) ও ভালোদিমির ত্রিশেনস্কি (৩৭)। তারা ছয়জনই ইউক্রেনের নাগরিক। গতমাসে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে তারা বাংলাদেশে আসে। এর আগে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একইভাবে টাকা চুরি করে বাংলাদেশে এসেছে। ডাচ বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক ওই ছয় বিদেশিকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করে। আদালত তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু ভাষাগত সমস্যা থাকার কারনে ডিবি তাদের এখন জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (পূর্ব) উপ-কমিশনার খন্দকার নূরনবী বলেন, আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু এখনও তাদেরকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।

অসুস্থ অর্থমন্ত্রী: অসমাপ্ত বাজেট উপস্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বরাবরের মতো অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতা সংসদে উপস্থাপন শুরু করেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি বক্তৃতা চালিয়ে যেতে পারছিলেন না । এক পর্যায়ে স্পিকর ড. শিরিন শারমীন চৌধুরীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বসে বসেই কিছু সময় বাজেট বক্তৃতা চালিয়ে যান। এ পর্যায়ে বক্তৃতা চালিয়ে যেতে না পারায় নজিরবিহীনভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নিজে বাজেট বক্তৃতা পড়া শুরু করেন। সংসদ নেতা পরে পুরো বাজেট বক্তৃতাই পড়ে শোনান। সংসদীয় ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রীর বাজেট উপস্থাপনায় অংশ গ্রহণের ঘটনা এই প্রথম। বিকাল ৪ টা ১০ থেকে ৪টা ৪০ পর্যন্ত ৩০ মিনিটব্যাপী অবশিষ্ট বাজেট বক্তব্য শেষ করলে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘক্ষণ টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।
তবে হাসপাতাল থেকে সরাসরি সংসদে এসে প্রচন্ড অসুস্থ অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রথম কিছু সময় নিজেই বাজেট উপস্থাপন করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কালো সুটকেস হাতে বেলা পৌনে ৩টায় বাজেট অধিবেশনে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী। প্রচণ্ড অসুস্থতার মধ্যেও অর্থমন্ত্রী হাসপাতাল থেকে সরাসরি সংসদ ভবনে আসেন। তারপরও তার মুখে ছিল উচ্ছ্বাস। কিন্তু শারিরীক অসুস্থতার কারণে দলের সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতারা তাকে সহযোগিতা করতে দেখা যায়।
বাজেট পেশ উপলক্ষে অধিবেশন কক্ষ ছিলো কানায় কানায় পূর্ণ। সংসদ গ্যালারি থেকে ভিআইপি লাউঞ্জ সর্বত্রই ছিল উপচে পড়া ভীড়। বেলা ৩ টা ২৫ মিনিটে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিজের জীবনের প্রথম বাজেট প্রস্তাবনা পড়া শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এসময় বিরোধী দল বিএনপির সংসদ সদস্যরাও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট উপস্থাপনের জন্য ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থমন্ত্রী খুবই অসুস্থ। তার চোখে অপারেশন হয়েছে, ১৫ মিনিট পর পর তার চোখে ড্রপ দিতে হয়। আমারও চোখে অপারেশন হয়েছে, ঠান্ডা লেগে কথা বলতে গেলে কাশি আসে। এটাই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। তারপরও আপনি (স্পীকার) অনুমতি দিলে বাজেটের বাকিটা আমি উপস্থাপন করবো। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শুরু করলে টেবিল চাপড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান এমপিরা। তবে বাজেট বক্তৃতার বইয়ের অনেকাংশেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে কিছু বক্তব্যে ছিল। সেটি পাঠ করার সময় প্রধানমন্ত্রী হেসে স্পিকারকে উদ্দেশ্যে করে বলেন,’মাননীয় স্পিকার, এটি আমার বক্তব্যে নয়, এটি হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর। বাজেট বক্তৃতায় যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে সেটি আমি পড়বো কি না? জবাবে স্পিকার বাজেট বক্তৃতায় যেভাবে রয়েছে সেভাবেই উপস্থাপনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শেষ করলে স্পিকার বলেন, বাজেটের অপঠিত অংশগুলো পঠিত বলে গণ্য করা হলো। বাজেট বক্তব্যে শেষে প্রধানমন্ত্রী ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে নিজের চোখে নিজেই ড্রপ দেন।
অর্থ বিল উত্থাপন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাজেট বক্তৃতা শেষ হলে অর্থ মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিজেই দাঁড়িয়ে অর্থ বিল- ২০১৯ সংসদে উত্থাপন করেন। সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলী কার্যকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়। সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিলটি আগামী ৩০ জুন পাস হবে। এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্য ৪৫ ঘণ্টা আলোচনা করবেন।
উৎসবমুখর পরিবেশ: উৎসবমুখর পরিবেশ। অতীতের মতো কোন রাজনৈতিক দলের বর্জন নয়, বরং নিকট ইতিহাসে সরকার ও বিরোধী দলের সবচেয়ে বেশী জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ও দেশের ৪৮তম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শুধু অধিবেশনই নয়, দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করতে ভিভিআইপি, ভিআইপি, দর্শক গ্যালারী সবকিছু ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ। দেশের ৪৮তম বাজেট পেশ উপলক্ষে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সরব উপস্থিতি ছিলো সংসদ অধিবেশনে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়। বাজেট উপস্থাপনের আগে অর্থমন্ত্রী তার হঠাৎ শারিরীক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে কখনো নিজ আসনে বসে এবং দাঁড়িয়ে বাজেট উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি চান। স্পিকার তাকে অনুমতি দিলে শুরুতেই অর্থমন্ত্রীর অনুরোধে বাংলাদেশ শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রমাণ্যচিত্র তুলে ধরা হয়। প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তান আমলে বাঙালী জাতির ওপর বৈষম্য, শোষণ-বঞ্চণা, এর বিরদ্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জন, পরবর্তী স্বৈরশাসকদের দুঃশাসন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তিন মেয়াদে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সোপানে অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরা হয়। এদিকে বাজেট বক্তৃতার আগেই সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়। প্রতি বছর বাজেট উত্থাপনের আগে রেওয়াজ অনুযায়ি এই বৈঠকটি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়।
মন্ত্রীপরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর বাজেট বিলে স্বাক্ষর করেন প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ। উৎসবমুখর সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুনতে আসেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। সংসদে নিজ কক্ষে বসে বাজেট উপস্থাপন প্রত্যক্ষ করেন তিনি। এর আগে প্রেসিডেন্টকে সংসদ ভবনে স্বাগত জানান সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাড়াও প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, বিদ্যুত জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাজেট বক্তৃতা প্রত্যক্ষ করেন।
কঠোর নিরাপত্তা: বাজেট পেশ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় নেয়া হয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা। বৈধ পাশ ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি সংসদ ভবন এলাকায়। এমনকি দর্শক গ্যালারীতে পাস ইস্যুতেও ছিল কড়াকড়ি। র‌্যাব-পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য পুরো ভবনে নিরাপত্তা ঘেরাটোপ গড়ে তোলেন। বাজেট বক্তৃতার পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা যাতে নির্বিঘ্নে বের হতে পারেন সেজন্য সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার পিজিয়ন হলের গেটটিও খোলা রাখা হয়েছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল আলাদাভাবে।

শেখ হাসিনার নতুন বই ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ প্রকাশিত

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন বই ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ প্রকাশিত হয়েছে। শেখ রাসেলের জন্মগ্রহণ থেকে শুরু করে তার জীবনকাহিনী এবং ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ঘটনাপ্রবাহ বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। ছোটদের উপযোগী বইটি শেখ হাসিনা লিখেছেন গল্পবলার ঢংয়ে। খবর বাসস’র।
বইটিতে শেখ হাসিনা শেখ রাসেলের ছোটবেলা থেকে শুরু করে পুরো জীবনের অনেক ঘটনা, জীবন-যাপন, মা-বাবা, ভাই-বোনের সঙ্গে তার সময় কাটানো, পড়ালেখা, স্বজনদের সঙ্গে বন্দি জীবন, ঘাতকের হাতে নিহত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইতো না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা যে কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।’
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে বইটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কনিষ্ঠভ্রাতা শেখ রাসেল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্যান্য সসদ্যদের সঙ্গে ঘাতকের হাতে নিহত হন। বইটি বিশ্বের সব শিশুদের উৎসর্গ করে গ্রন্থকার শেখ হাসিনা লিখেছেন ‘বিশ্বের সব শিশুদের প্রতি ভালোবাসা।’
বইটির প্রকাশক শিশু একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন। শোভন প্রচ্ছদটি এঁকেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। ৫৬ পৃষ্ঠার বইটি অফসেট কাগজে ছাপা হয়েছে। প্রথম পাতায় জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাসেলের একটি ছবি দিয়ে বইয়ের শুরুটা হয়েছে। পুরো বইতে মা, বাবা, বোন ও ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২৪টি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। বইটির মূল্য ধরা হয়েছে- ১৫০ টাকা। ঢাকায় শিশু একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্রে বইটি পাওয়া যাবে।

তিউনিশিয়া উপকূলে ভাসছে ৬৪ বাংলাদেশি

তিউনিশিয়া উপকূলে অভিবাসী বোঝাই নৌকাডুবিতে ভয়াবহ প্রাণহানির মাত্র কয়েক দিন পার হয়েছে। এরই মধ্যে আবারো ওই এলাকায় ৬৪ বাংলাদেশি সহ ৭৫ অভিবাসী উপকূল এলাকায় সাগরে ভাসছেন। একটি উদ্ধারকারী জাহাজ তাদেরকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু তাদেরকে কেউ গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছে না। ফলে ১২ দিন ধরে তারা ওই উপকূল থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সাগরে ভাসছেন। তাদের অবস্থা শোচনীয়। তাদেরকে খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব সুবিধা গ্রহণ করতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
তাদের একটিই দাবি, ইউরোপ যেতে দিতে হবে। তিউনেশিয়া রেড ক্রিসেন্টকে উদ্ধৃত করে মঙ্গলবার এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। 
এদিকে, লিবিয়াস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ সিকান্দার আলী মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ওই বাংলাদেশিদের সর্বশেষ অবস্থা জানতে তিনি তিউনেশিয়াস্থ রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ নিয়ে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা পেতে তিনি একটি রিপোর্টও পাঠিয়েছেন। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার অণুবিভাগের মহাপরিচালক চিরঞ্জীব সরকার রিপোর্ট পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, দূতাবাসের একজন কর্মকর্তাকে নিয়ে রাষ্ট্রদূত সরজমিনে পরিস্থিতি দেখতে তিউনেশিয়ার ওই উপকূলীয় শহরে যাচ্ছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তারা সেখানে পৌঁছাচ্ছেন। রাষ্ট্রদূত তিউনেশিয়া কর্তৃপক্ষকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে, ওই অভিবাস প্রত্যার্শীদের তারা যেন স্থল সীমানায় আসার সুযোগ দেয়। এতে তারা অন্তত প্রাণে বাঁচবে।
রেড ক্রিসেন্ট বলছে, লিবিয়া থেকে একটি গ্রুপে এসব মানুষ ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন সমুদ্রপথে। এর মধ্যে ৬৪ জন বাংলাদেশি। বাকিরা মরক্কো, সুদান ও মিশরের নাগরিক। তাদেরকে বহনকারী বোট ডুবে গিয়েছিল কিনা, এসব বিষয় তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কারভাবে জানা যায় নি। তবে এটুকু জানা গেছে যে, তিউনিশিয়ার জলসীমায় এসব অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে মিশরের একটি বোট। কিন্তু স্থানীয় মেডিনিন শহর কর্তৃপক্ষ এসব অভিবাসীকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ, শরণার্থী রাখার জন্য তাদের যেসব সেন্টার রয়েছে তাতে অত্যাধিক মানুষে ঠাসা। স্থান সংকুলান হবে না সেখানে। ফলে তারা ওইসব অভিবাসীকে তীরে ভিড়তে দিচ্ছে না। এ জন্য জারজিস উপকূল থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে আটকা পড়ে আছেন ওই অভিবাসীরা।
সরকারি একটি সূত্র বলেছে, অভিবাসীদেরকে খাবার ও চিকিৎসা সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারা এর কোনোটিই নিতে রাজি নয়। তাদের একটাই দাবি, ইউরোপ যেতে দিতে হবে। এটাই তাদের টার্গেট। উন্নত জীবনের আশা নিয়ে তারা সমুদ্রপথে তাই যাত্রা শুরু করেছে।
রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা মঙ্গি স্লিম বলেছেন, উদ্ধারকারী বোটে আটকে পড়া অভিবাসীদের চিকিৎসা দিতে কিছু ডাক্তার পৌঁছেছেন সেখানে। অল্প কিছু অভিবাসী চিকিৎসা নিয়েছেন। বাকিরা যেকোনো রকম সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ১২ দিন সমুদ্রে আটকা থাকার পর এসব অভিবাসীর অবস্থা খুব শোচনীয় হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, লিবিয়ার পশ্চিম উপকূল ইউরোপের উদ্দেশ্যে আফ্রিকান অভিবাসীদের পাচারের প্রধান ট্রানজিট হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে ইতালির নেতৃত্বে পাচারবিরোধী প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এতে সহায়তা করছে লিবিয়ার কোস্টগার্ড। তা সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না। এই তো গত মাসে কমপক্ষে ৬৫ জন অভিবাসী নিয়ে তিউনিশিয়া উপকূলে ভূমধ্যসাগরে একটি বোট ডুবে যায়। তাতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অভিবাসী ডুবে মারা গেছেন। এ বছরের প্রথম চার মাসে এই রুটে কমপক্ষে ১৬৪ জন মানুষ ডুবে মারা গেছেন।

কাশ্মিরে চালানো বর্বরতা ভারতের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক : অমর্ত্য সেন

কাশ্মির ইস্যুতে ভারত সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। তিনি বলেছেন, কাশ্মিরে ভারত যে নৃশংসতা ও বর্বরতা চালাচ্ছে, তা ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে থাকবে। নিঃসন্দেহে এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ-ই নেই।
তিনি আরো বলেন, ভারতের এই কলঙ্কের জন্য দায়ী বেশ কিছু লোক। তাছাড়া কাশ্মিরে চালানো বর্বরতা নিয়ে কেবল ভারতে নয়, বিদেশেও অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ অবস্থা যে একটি কলঙ্ক তার অনেক প্রমাণ আছে। বিদেশের আলোচনাগুলোতেও কাশ্মীর গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়। ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেন, আমরা কাশ্মির এবং কাশ্মিরের মানুষের সাথে সঠিক আচরণ করিনি। এখনো পর্যন্ত আমরা কাশ্মিরের অপব্যবহার করছি। এটা আইন ও শৃঙ্খলার সমস্যা নয়।
তিনি আরো বলেন, কাশ্মিরের মানুষের সাথে আমরা ভয়াবহ ও সহিংস বর্বর আচরণ করছি। কাশ্মিরকে বিচ্ছিন্ন করতে আমরা ইন্টারনেট ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দিচ্ছি। আর এসব করে আমরা এমন ভাবে কাশ্মিরের মানুষদের শাস্তি দিচ্ছি যে তারা কখনোই ভারতকে আপন ভাবতে পারবে না।
তিনি বলেন,‘কাশ্মীরের জনগণ তাকিয়ে আছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ। বিক্ষোভ দমন করতে ভয়ংকর ও সহিংস ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। এতে কাশ্মীরিরা আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।’
ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের সাবেক শিক্ষক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনীর নৃশংসতা ও বর্বরতার ওপর সিএনএনের দীর্ঘ এক প্রতিবেদন আমি দেখেছি। ভারতের বাকি অংশের মানুষের সাথে কাশ্মিরের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। আসল কথা হল- বহু দশক ধরে আমরা একে মিসহ্যান্ডেল (কাশ্মিরে ভুল নীতি পরিচালনা) করেছি। এখন আরো খারাপ উপায়ে কাশ্মিরের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছি।

অভিনব কায়দায় চলন্ত ট্রেন থেকে মোবাইল ছিনতাই

সিলেট থেকে ছেড়ে চট্টগ্রামগামী আন্ত:নগর পাহাড়িকা ট্রেনের জানালার পাশে বসা এক যাত্রী মোবাইলে কথা বলছিলেন। শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের পুর্ববিরাইমপুর আউট স্যিগনাল ব্রীজের কাছে আসা মাত্র ওৎ পেতে থাকা তিন কিশোর অভিনবপন্থায় বাঁশ দিয়ে হাতে আঘাত করে তার মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে। এসময় এলাকাবাসীর সহায়তায় তাদের আটক করা হয়েছে।
এরা হলো- শ্রীমঙ্গল শহরতলীর পুর্ববিরাইমপুর এলাকার এরশাদ মিয়ার ছেলে কালন মিয়া(১৮),মাতু বাগালের ছেলে কামাল(১৯) ও একই এলাকার ইছাক মিয়া(১৬)।
স্থানীয় বাসিন্দা উপজেলা যুবলীগ নেতা সাদিকুল ইসলাম বলেন, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টারদিকে পুর্ববিরাইমপুর আউট স্যিগনাল ব্রীজের কাছে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা ট্রেনের জানলার পাশে বসা এক যাত্রী মোবাইলে কথা বলছিলেন। ওই সময় ওৎ পেতে থাকা তিন ছিনতাইকারী বাঁশ দিয়ে তার হাতে আঘাত করে চলন্ত ট্রেন থেকে মোবাইল মাটিতে ফেলে দেয়। এসময় পাহাড়িকা ট্রেনটির ধীরগতি হলে ওই যাত্রী ট্রেন থেকে দ্রুত নেমে গিয়ে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে ওই তিন ছিনতাইকারীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
সাদিকুল বলেন, ‘এরা বহুদিন যাবৎ চলন্ত ট্রেনের যাত্রীদের একই কায়দায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে মোবাইল ফোন মাটিতে ফেলে ছিনতাইয়ের ঘটনা করে আসছে।
কয় দিন আগেও কালন নামে একটি ছেলে চলন্ত ট্রেন থেকে এক যাত্রীকে মোবাইলফোনসহ টেনে নামিয়ে মাটিতে ফেলে আহত করে। পরে এলাকাবাসী তাকে ধরে থানা পুলিশে সোপর্দ করলে পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
কিন্তু এর কয়দিন পর সে কোর্ট থেকে জামিনে এসে আবার সেই একই কায়দায় আন্তঃনগর ট্রেনে ছিনতাই শুরু করেছে।
শ্রীমঙ্গল থানার পুলিশ পরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, ‘এরা তিনজনই পেশাদার কিশোর অপরাধী। চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের আঘাত করে মোবাইল ছিনতাই করে। এদের বিরুদ্ধে ওই যাত্রী বাদী হয়ে ফৌজধারী আইনে থানায় মামলা হয়েছে। বৃহস্পবিার সকালে তাদের আদালতের মাধ্যমে মৌলভীবাজারের কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

হংকং উত্তাল কেন?

প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে হংকং। অনানুষ্ঠানিক হিসেবে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে। এই আইনে বলা হচ্ছে, প্রত্যাবর্তন চুক্তি না থাকলেও কোনো আসামীকে চীন সহ যেকোনো দেশে পাঠানেভ যাবে। অব্যাহত প্রতিবাদে হংকং-এর সরকার এই আইন পার্লামেন্টে উত্থাপনের তারিখ পিছিয়ে দিয়েছে। তবে একেবারেই বাতিল করে নি। সরকার বলছে, হংকং যেন অপরাধীদের অভয়রাণ্যে পরিণত না হয়, সেজন্যই এই আইন প্রয়োজন। প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম আরও বলেছেন, বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনে বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক মামলা এই আইনের আওতাভুক্ত হবে না।
তিনি আরও যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডের সঙ্গে এই প্রস্তাবিত আইন সঙ্গতিপূর্ণ। শুধু গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবিশেষকেই এই আইন প্রয়োগ করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বিবেচনা করা হবে।
তবে হংকং-এর বৃহত্তর সামাজিক অংশটিই এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। আইনজীবী, প্রভাবশালী আইনি সংস্থা, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব, চেম্বার অব কমার্স, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা এই আইনের বিরোধিতা করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, এই আইনের কারণে স্বায়ত্বশাসিত এই শহরের ৭৩ লাখ বাসিন্দা, এমনকি এই শহরের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী ব্যক্তিবিশেষ চীনের সরকার-প্রভাবিত আদালতের নির্দেশের আওতাভুক্ত হয়ে যেতে পারেন।
বুধবার এই আইন উত্থাপনের কথা থাকলেও আইন পরিষদ তা পিছিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ হাজির হয়ে আইন পরিষদের ভবন বন্ধ করে দিয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র স্থবির করে রেখেছেন প্রতিবাদকারীরা। আশেপাশের সড়কজুড়ে প্রতিবাদকারীদের ব্যাপক ভিড়। এদের মধ্যে তরুণদের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের আশপাশে পুলিশের সঙ্গে লড়াইও করেছেন তারা। প্রতিবাদকারীদের থামাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুঁড়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে প্রচুর বিক্ষোভ সত্ত্বেও খুব একটা পিছু হটতে রাজি নয় সরকার। এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইন পরিষদের সভা পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হবে। পরিষদ সদস্যদের তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
প্রতিবাদের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন প্রধান সচিব ম্যাথিও চিউং। তিনি প্রতিবাদকারীদের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্মুক্ত করে দেওয়া, বিক্ষোভ প্রত্যাহার করার আহবান জানিয়েছেন। আইন অমান্য না করতে বলেছেন। তবে এই আইন নিয়ে আইনসভায় অনুষ্ঠেয় বিতর্কের সময় পেছানোর পরও আন্দোলনকারীরা পিছু হটতে রাজি হননি।
শিক্ষার্থী চার্লস লি বলেন, ‘সভা পেছানোই যথেষ্ট নয়। আমরা চাই এই প্রস্তাবিত আইন বাতিলের জন্য বিবেচনা করা হোক। যদি নাগরিকদের প্রতি তাদের আচরণ এই হয়, তাহলে সংঘাত অনিবার্য।’
প্রসঙ্গত, চীনের অংশ হলেও মূলভূমির চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ও স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে হংকং। হংকং-এ রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আছে, যেটা চীনে সহ্যই করা হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক প্রতিবাদকারীই নিজের নাম প্রকাশ করতে চান নি। অনেকে এসেছেন মুখোশ পরে। এর একটি কারণ হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার বড় ধরণের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ হয়েছে হংকং-এ। এরপর থেকে এ ধরণের বিক্ষোভের ব্যাপারে ক্রমশই কড়া অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এবারের বিক্ষোভে পুলিশ জলকামান ও পেপার ¯েপ্র ব্যবহার করেছে। এছাড়া পুলিশ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বলেছে, তারা বল প্রয়োগে প্রস্তুত। রোববার অনানুষ্ঠানিক হিসাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছে। ১৯৯৭ সালে সাবেক এই বৃটিশ কলোনি চীনের কাছে হস্তান্তরের পর থেকে এটি ছিল এই শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের একটি।
এর সঙ্গে মিল আছে ২০১৪ সালের গণতন্ত্রপন্থী আমব্রেলা আন্দোলনের। ওই আন্দোলনকারীরাও হংকং-এর প্রধান প্রধান সড়ক দখলে নিয়ে যায়। তাদের দাবি ছিল, হংকং-এর নির্বাচনে আগেই প্রার্থী বাছাই করে ফেলার যে পরিকল্পনা বেইজিং নিয়েছিল, তা বাতিল করতে হবে। সেবারের মতো এবারও হংকং রীতিমতো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যামের প্রশাসনের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তার চীনা সরকারি সমর্থকরাও হয়তো কিছুটা বিপাকে।
হংকং-এর চাইনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক উইলি লাম বলেন, ২০১৪ সালে তরুণরা বেশি জড়িত ছিল এই আন্দোলনে। কিন্তু এবারের প্রত্যাবর্তন আইনের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আছে। ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও পেশাজীবীরা সহ এনজিও কর্মী ও শিক্ষার্থীরা এতে সমর্থন দিচ্ছেন। এ কারণেই এই আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন এই আইন নিয়ে জনসমর্থন সৃষ্টিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই আইনের পক্ষে বেইজিং-এর কড়া সমর্থন থাকায় জনসাধারণের মধ্যে এর বিরোধিতা আরও বেড়েছে। হংকং-এর বেশিরভাগ মানুষ চীন সরকারের খবরদারির বিরুদ্ধে। কয়েক বছর ধরে হংকং-এ ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি হয়েছে চীন সরকারের।
রোববারের বিক্ষোভকে দেখা হচ্ছে চীন সরকারের প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই অধিকতর স্বায়ত্বশাসন চান। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে সরাসরি বলেছেন, এই দাবি তিনি সহ্য করবেন না।
২০১৭ সালে বর্তমান প্রধান নির্বাহী ক্যারি ল্যাম নির্বাচিত হন। তবে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়। তাকে বেছে নেয় বেইজিং-পন্থি অভিজাতদের আধিপত্য আছে এমন একটি কমিটি। তার প্রতি চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির সমর্থন আছে এমনটা ভাবা হয়। আইন পরিষদেও রয়েছে প্রচুর বেইজিংপন্থি আইনপ্রণেতা। স্থানীয় যারাই চীনের সমালোচনা করেছেন তারা শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে আরও চাপে পড়েছেন। ২০১৫ সালে একজন সুইডিশ সহ হংকং-এর কয়েকজন বইবিক্রেতা আটক হন চীনে। এরপর থেকে আর খোঁজ পাওয়া যায় নি তাদের। এপ্রিলে, ২০১৪ সালের আমব্রেলা আন্দোলনের ৯ শীর্ষ স্থানীয় নেতাকে বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মে মাসে ওই আন্দোলনের দুই কর্মীকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় জার্মানি। সাম্প্রতিক বছরে তারাই ছিলেন হংকং থেকে পশ্চিমা কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হওয়া প্রথম দুই ব্যক্তি।

বিআরটিসি সার্ভিসের বাসে বাঁশের বেড়া!

বরগুনা টু খুলনা রুটে বিআরটিসি সার্ভিসের একটি বাসের সামনের অংশে কাচের পরিবর্তে বাঁশের বেড়া দিয়ে সড়কে চলাচল করছে। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সোমবার খুলনা থেকে বিআরটিসি সার্ভিসের একটি বাস বরগুনায় আসার পথে সামনের গ্লাসটি ভেঙ্গে পড়ে। এ অবস্থায় বাসটি ঝুঁকি নিয়ে বরগুনায় চলে আসে। যাওয়ার পথে বাসের সামনের গ্লাসের জায়গায় বাঁশের ফালিতে পলিথিন দিয়ে বেড়ার মতো করে বরগুনা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এ সময় যাত্রীদের অনেকে আপত্তি করলেও কর্তৃপক্ষ অগ্রাহ্য করে ওই অবস্থায় খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
এ বিষয়ে ওই বাসের যাত্রী সাগর কর্মকার বলেন, এদের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। ঈদের মৌসুমে এমন একটি লক্কড়-ঝক্কড় বাস কীভাবে সড়কে চলাচল করতে পারে।
বরগুনা বিআরটিসি ডিপোর পরিচালক মো. নয়ন হোসেন বলেন, বাসটি সামনের গ্লাস ছাড়াই বরগুনা আসে। বরগুনায় গ্লাস লাগানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সে কারণে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এভাবে করেছি।
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ খুলনা অঞ্চলের কারিগরি ব্যবস্থাপক ওমর ফারুক মেহেদী বলেন, ফিটনেস পরীক্ষা করেই সড়কে চলাচলের জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু হঠাৎ সামনের গ্লাসটি ভেঙ্গে যাওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাসটিতে নতুন গ্লাস লাগানো হয়েছে।

কবুতর চুরির অভিযোগে...

ঝালকাঠির নলছিটিতে কবুতর চুরির অভিযোগে দুই স্কুলছাত্র নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রফিকুল ইসলাম। তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নির্যাতনের শিকার সজিব হোসেন খান বাকেরগঞ্জের তবিরকাঠি গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে এবং রিফাত হোসেন জয় একই গ্রামের আবদুল ক্দ্দুুস হাওলাদারের ছেলে। তাঁরা দুজনেই স্থানীয় জেড এ ভূট্টো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।
এ ঘটনায় জয়ের বাবা বাদী হয়ে গত সোমবার রাতে নলছিটি থানায় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম ও পুলিশ কনস্টেবল শাহ আলমসহ ৮ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।
নির্যাতনের শিকার দুই ছাত্রের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি ইউনিয়নের চৌদ্দবুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল অভিযোগ কেন্দ্র কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. শাহ আলমের বাড়িতে শনিবার রাতে কবুতর চুরি হয়। রবিবার সকালে পার্শ্ববর্তী বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার তবিরকাঠি গ্রামের মো. সজিব হোসেন খান (১৪) ও রিফাত হোসেন জয় (১৪) নামে দুই শিশুকে আটক করে শাহ আলম। পরে সিদ্ধকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের নয় নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও রফিকুল ইসলাম বিচার বসিয়ে নির্যাতনের নির্দেশ দেন।
কনস্টেবল শাহ আলম ব্লেড দিয়ে জয় নামে এক স্কুলছাত্রের মাথার মাঝখান থেকে চুল কেটে দেয়। এসময় তাদের ২০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। পুরো ঘটনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেন স্থানীয় লোকজন। চুল কাটা ও গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের চিত্র ভিডিও করে এবং ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দেয়া হয়।
নির্যাতনের শিকার স্কুলছাত্র জয় জানায়, গত রবিবার রাত থেকে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের আটকে রেখে দফায় দফায় নির্যাতন করা হয়েছে।  পরে পুলিশ সদস্য শাহআলম ব্লেড দিয়ে তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেয়।
জয়ের বাবা আবদুল কুদ্দুস জানান, আমার ছেলের নামে কবুতর চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মারধর করে চুল কেটে দিয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই। আমি জরিমানার টাকা দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে এনেছি।
সিদ্ধাকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ছেলে দুটি আমাদের গ্রামে এসে কবুতর চুরি করেছে। এর আগেও তারা কয়েকজনের বাসা থেকে কবুতর নিয়ে গেছে। আমি তাদের আটক করিনি কিংবা মারধরও করিনি। আমি ঘটনাটি শুনেছি মাত্র। এলাকার প্রতিপক্ষরা আমাকে ফাঁসানোর জন্য এ অপপ্রচার চালাচ্ছে।
নলছিটি থানার ওসি মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, নির্যাতনকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। নির্যাতনের শিকার জয়ের বাবা মামলা দায়ের করলে ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।

‘আসামে বিদেশি তৈরির কারখানা খোলা হয়েছে’

প্রথম আলো, ০৯ জুন ২০১৯: আসামে বিদেশি তৈরির কারখানা খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সারা আসাম সংখ্যালঘু ছাত্র সংস্থা (আমসু)।
আমসুর সভাপতি রেজাউল করিম সরকারের অভিযোগ, আসামে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ও বর্ডার পুলিশ এখন বেআইনি বিদেশি বানানোর কারখানা হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সংখ্যালঘুদের বেছে বেছে বিদেশি বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে।
রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈয়ের অভিযোগ, আসামের এনআরসি প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষ হারাতে চলেছেন তাঁদের বৈধ নাগরিকত্ব। এনআরসির রাজ্য সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ বলেও দাবি করেন তিনি।
৩১ জুলাই প্রকাশিত হবে আসামের এনআরসির পূর্ণাঙ্গ তালিকা। রাজ্যের ৩ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৪ জন নাগরিকের মধ্যে ৪০ লাখ ৭ হাজার ৭০৭ জনের নাম খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছে।
বাদ পড়া লোকজনের মধ্যে সংযোজনের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ৩১ লাখ। তাই ৯ লাখ নাগরিকের নাম বাদ পড়বে, তা অবধারিত। তা ছাড়া খসড়া তালিকায় নাম থাকলেও পরবর্তী সময় অনেকের নামে আপত্তি জানিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। ভুয়া আপত্তির হাত থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক মন্ত্রী বা বর্তমান সাংসদেরাও বাদ যাচ্ছেন না।
দেশ ছাড়ার আতঙ্ক গ্রাস করেছে সংখ্যালঘুদের মনে। বিদেশি বাছতে রাজ্য সরকার ১ হাজার ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠন করছে। গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন বন্দিশালাও। তাই বংশপরম্পরায় আসামে বসবাসকারী বাঙালিরা পড়েছেন গভীর সমস্যায়।
নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পেরে বর্ডার পুলিশের চাকরি খুইয়ে সম্প্রতি কারাগারে যেতে হয় সাবেক সেনা মহম্মদ সানাউল্লাহকে। পরে গুয়াহাটি হাইকোর্টের রায়ে জামিনে মুক্তি পান তিনি। সানাউল্লাহ ৩০ বছর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে দক্ষতার সঙ্গে চাকরি করে পান রাষ্ট্রপতি পদক। অবসরের পরে যোগ দিয়েছিলেন আসামের বর্ডার পুলিশে।
সানাউল্লাহ ছাড়া পেলেও আসামের ৬টি বিদেশি বন্দিশালায় ৯৮৬ জন ‘বিদেশি’ এখনো জেল খাটছেন। তাঁদের বেশির ভাগই ভাষিক (বাঙালি) ও ধর্মীয় (মুসলিম) সংখ্যালঘু। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে সাজা পেয়েছেন তাঁরা।
সানাউল্লাহ ছাড়া পেলেও আসামের ৬টি বিদেশি বন্দিশালায় ৯৮৬ জন ‘বিদেশি’ এখনো জেল খাটছেন। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে লিচু খাওয়ার পর ৫৩ শিশুর মৃত্যু

লিচুতে বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি পাওয়ার পর ভারতের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, এ ধরনের লিচু খাওয়ার পর প্রাণঘাতী মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশটিতে অন্তত ৫৩ শিশু নিহত হয়েছে। গত দশ দিনে ভারতের উত্তরাঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে।
দেশটির বিহার প্রদেশের মুজাফফরপুর জেলার দুটি হাসপাতালে ওই ৫৩ শিশুর প্রাণহানি ঘটে। রাজ্যের কর্মকর্তারা বলেছেন, লিচু উৎপাদনের জন্য দেশটির এ রাজ্য বিখ্যাত।
বিহারের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অশোক কুমার সিং বলেন, নিহত প্রত্যেক শিশুর মস্তিষ্কে অ্যাকিউট এনসেফালিটিস সিনড্রোমের (এইএস) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে নিহত শিশুদের অধিকাংশের রক্তে হঠাৎ করেই গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায়।
তিনি বলেন, দিনের মধ্যে তাপমাত্রা অধিকাংশ সময় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর থাকায় শিশুদের বাড়তি যত্ন নেয়ার জন্য জনগণকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। একই ধরনের অসুস্থতা নিয়ে আরো ৪০ শিশুকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
বিহারের শ্রীকৃষ্ণ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা এস পি সিং বলেন, আমরা এই শিশুদের বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
১৯৯৫ সালের পর থেকেই বিহার মুজাফফরপুর এবং পার্শ্ববর্তী কিছু জেলায় লিচু মৌসুমের সময় এ ধরনের প্রাণঘাতী রোগের বিস্তার ঘটে। স্থানীয়রা এই রোগকে 'চামকি বুখার' বলে দাবি করেন। ২০১৪ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিহারে অন্তত ১৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে।
২০১৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক বলে, লিচুতে বিষাক্ত একটি পদার্থের সঙ্গে মস্তিষ্কের রোগের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। গত বছর লিচু খাওয়ার পর ভারতে কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়। বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের লিচু উৎপাদনশীল কিছু অঞ্চলেও একই ধরনের প্রাণহানির খবর অতীতে পাওয়া গেছে।