Wednesday, January 15, 2025

সংস্কার প্রতিবেদন থেকে হবে নতুন বাংলাদেশের চার্টার, তার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে নির্বাচন: ড. মুহাম্মদ ইউনূস

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা যেটা গঠন করতে চাচ্ছি, যার উদ্দেশ্য হলো এটা গণঅভ্যুত্থানের একটা চার্টার তৈরি। ওই যে নতুন বাংলাদেশের একটা চার্টার, সেরকম চার্টার মতৈক্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে। নির্বাচন হবে, সবকিছুই হবে; কিন্তু চার্টার থেকে যাবে। ভবিষ্যতে যে নির্বাচন হবে, এটাও হবে এই চার্টারের ভিত্তিতে। বুধবার সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এসব প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিশনের সদস্যরা। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুদার, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রীয়াজ প্রধান উপদেষ্টার হাতে প্রতিবেদন তুলে দেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট কমিশনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, এটা শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বহুধরনের কমিটি হয়, রিপোর্ট প্রকাশ হয়, আনুষ্ঠানিকতা হয়; কিন্তু আজকের আনুষ্ঠানিকতা সেগুলোর চাইতে বহু ঊর্ধ্বে। আজকের এই ঘটনা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কারণ ইতিহাসের প্রবাহ থেকেই এই কমিশনগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির হঠাৎ পুনরুত্থান হয়েছে, মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সেখান থেকেই ইতিহাসের সৃষ্টি, আজকের এই অনুষ্ঠান সেই ইতিহাসের অংশ। এটা বিচ্ছিন্ন কোনও প্রতিবেদন দেয়ার বিষয় নয়। আমরা সেই ইতিহাসকে ধারণ করতে পারছি কি না এবং সেটি সমানে নিয়ে যেতে পারছি কি না-সেই ইতিহাসের যে অঙ্গীকার ছিল সেটি আমরা পূরণ করতে পারছি কি না, সেটিই আজ আমাদের প্রশ্ন। আমাদের আত্ববিশ্বাসী হতে হবে যে আমরা পারব। আজ যে প্রতিবেদনগুলো আমরা হাতে নিলাম, অবশ্যই এটা আমাদের দেশের জন্য বড় একটি চর্চা। কেউ এটা অস্বীকার করবে না। কিন্তু আমরা মানুষের মনোভাবকে এর মধ্যে ধারণ করতে পেরেছি কি না-সেটি আমার প্রশ্ন।  

তিনি বলেন, আমরা একটা নতুন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে সেটার কাঠামো তৈরির কাজ আপনাদের হাতে দিয়েছিলাম, কমিশনের মাধ্যমে। স্বপ্ন আছে এখনও, সেই স্বপ্নের রূপরেখাগুলো তুলে ধরতে হবে। কাজেই এটা শেষ নয়, একটা অধ্যায়ের শুরু হলো। স্বপ্ন এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী তার যে যাত্রা, সেটা শুরু হলো। এর বড় একটি অংশ এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হবে যে, আমরা কী করতে চাইছি। এটার মাধ্যমে আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা শুরু করবো। সবার মন এতে সায় দিচ্ছে কিনা; অঙ্গীকারগুলো পূরণ হচ্ছে কিনা- এই আলোচনার রসদ আপনারা তৈরি করে দিয়েছেন।

ড. ইউনূস বলেন, এটা মতৈক্য প্রচেষ্টা, সবাই একমত হবেন। কিন্তু কিছু বিষয়ে একদমই একমত হবেন না। তা না হলে আমরা কী স্বপ্ন দেখলাম? আমরা নিজেরা স্বপ্ন দেখলাম, আর সেই স্বপ্নে মানুষের অংশ নেই, সেটাতো হতে পারে না। আমরা সেই স্বপ্নের কতটুকু এখানে নিয়ে এসেছি, সেটার জন্যেই এই আলোচনা। এটা বাইরে থেকের চাপানোর কোনও জিনিস নয়, ভেতর থেকে উদ্ভূত একটা জিনিস।

আগামীতে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে আলোচনা হবে, সেখানে কমিশনের সদস্যরাই নেতৃত্বে দেবেন বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যেহেতু আপনারাই তাদের পক্ষ থেকে স্বপ্ন দেখেছেন, কীভাবে তাদের স্বপ্ন আপনাদের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবে। তার মাধ্যমে আমরা যেটা গঠন করতে চাচ্ছি, যার উদ্দেশ্য হলো এটা গণঅভ্যুত্থানের একটা চার্টার তৈরি হবে। ওই যে নতুন বাংলাদেশের একটা চার্টার, সেরকম চার্টার মতৈক্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে। নির্বাচন হবে, সবকিছুই হবে; কিন্তু চার্টার থেকে যাবে। এই চার্টার থেকে যাবে, ইতিহাসের অংশ হিসেবে এটা আমাদের জাতীয় কমিটমেন্ট। এটা কোনও দলীয় কমিটমেন্ট না। আমরা আশা করছি, সব দল এই চার্টারে সাইনআপ করবে। এটা বাংলাদেশি, বাঙালি জাতির একটা সনদ, যে সনদ আমরা বুকে নিয়ে অগ্রসর হবো। যত দ্রুত পারি, যত বেশি পরিমাণে এটা বাস্তবায়ন করতে পারি করতে থাকবো। ভবিষ্যতে যে নির্বাচন হবে, এটাও হবে এই চার্টারের ভিত্তিতে। সেটাও যেন ঐকমত্যের সরকার হয়-যে চার্টারকে আমরা ধরে রেখেছি। যত কিছুই হোক, এটা যেন হাত থেকে ছেড়ে না দেই। তা না হলে এই স্বপ্নের যে কনটিনিউইটি সেটি থাকবে কী করে! আমরা সেই স্বপ্নের কনটিনিউইটি চাই, বাস্তবায়ন চাই।

তিনি বলেন, নির্বাচনও এই চার্টারের একটা অংশ হবে, ঐকমত্যের নির্বাচন হবে। তা নাহলে চার্টার হারিয়ে যাবে। কাজেই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

mzamin

গল্প- কুড়িয়ে পাওয়া নুড়ি by আহমেদ মুনির

‘তোমার কোথায় দেশ? কিবা পরমাত্মা-পরিচয়?

তুমি ছোট ঘরে বসে আজীবন পড়াশুনা করো

তোমার সামান্য আয়, তুমি স্ফীতোদর।’

(‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি অন্ধকারে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

বুকসেলফ …

একবার খুব টানাটানির মধ্যে পড়ে গেলাম। ২০০৯ সালের কথা। সুজলার বয়স তিন আর স্বননের সাত-আট মাস হবে। চট্টগ্রামের যে-দৈনিকটাতে কাজ করতাম সেখানে নিয়মিত বেতন হতো না। বকেয়া পড়ত প্রায়ই। তো সেরকম একটা রাতে পত্রিকার একটা বিজ্ঞাপন দেখিয়ে, দীপ্তির প্রশ্ন,

বই পাঠিয়েছ?

আমি বুঝতে পারিনি প্রথমে। তখন আমার প্রথম কবিতার বইখানা সদ্য প্রকাশিত হয়েছে। কোনো একটি পুরস্কারের জন্য বই পাঠাতে বলছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনে দেখা গেল বই পাঠানোর শেষ তারিখ ছিল সেদিনই।

যে-রুমটায় থাকতাম আমরা সেখানে মেঝেতে আমার বইগুলো একটা বিছানার চাদরের ওপর সত্মূপ করে রাখা। তখন কোনো বুকসেলফ ছিল না। বই পাঠানোর সময়সীমা পার হয়েছে শুনে দীপ্তির দীর্ঘ নিশ্বাস। ছড়ানো-ছিটানো বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, একটা বুকসেলফ তো কিনতে পারতে পুরস্কারের টাকাটা হাতে পেলে।

আশ্চর্য হলাম ওর কথা শুনে। প্রথমত আমি পুরস্কার পেতে পারি এই বিশ্বাস কি করে এলো ওর মধ্যে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চার দুধ কেনার টাকা থাকে না প্রায় সময়, এমন প্রয়োজনের বিষয় না ভেবে বুকসেলফের কথাই তার মাথায় এলো?

পরদিন এক বন্ধুর পরামর্শে যোগাযোগ করলাম পুরস্কারদাতা সংস্থার অফিসে। ওরা বলল, সময় পার হয়ে গেলেও ঈদের ছুটির কারণে অনেকের বই সময়মতো আসেনি। একদিনের মধ্যে পাঠাতে পারলে সেটা গ্রহণ করা হবে।

বই পাঠিয়ে বিষয়টা মাথা থেকে একরকম ফেলে দিয়েছি। অপেক্ষার প্রশ্নই আসে না। কারণ জানতাম, আমি কী লিখি। আর আমার সামনে কেউ বই হাতে নিলে কুঁকড়ে যেতাম সংকোচে। মনে হতো পোশাক পরিনি। ওই পাঠক নেড়েচেড়ে দেখছে আমাকে।

মাসচারেক পর হঠাৎ ফোনে জানানো হলো পুরস্কার পেয়েছি আমি। যার মূল্যমান এক লাখ টাকা।

আলমগীর মিস্ত্রি দেখতে ছোটখাটো হলেও বেশ চটপটে। সাত ফুট বাই আট ফুটের ভিনিয়ার বোর্ড কেটে বানানো বুকসেলফের নকশা দীপ্তি নিজে করেছিল। গত দশ বছরে সেলফটার নিচের অংশের গস্নাসডোরের একটাও অক্ষত নেই। দুবার বাড়ি বদলানোর ধাক্কায় কোথাও কোথাও ওপরের পস্নাস্টিক সরে গিয়ে কাঠের গুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছে। পেছনের পায়ার দিকে সামান্য পচনও ধরেছে। বছর কয়েক আগে এক লেখকবন্ধু অটবির শক্তপোক্ত একটা বুকসেলফ উপহার দিয়েছেন। সেটা আসার পর পুরনোটা বহাল হয়েছে বাড়ির নিভৃত কোণে, স্টাডি রুমে আর নতুনটা ড্রয়িংরুমে।

জীর্ণ বুকসেলফটা তবু অনেক আপন মনে হয়। তার কাছে গেলেই একটা অন্যরকম গন্ধ পাই আমি। এই গন্ধটা অনেকটা নতুন কচি বাঁশ, সুগন্ধি তেল আর ন্যাপথালিনের মিশেল বলে মনে হয়। নিউমার্কেটের মোড়ে শুকতারা নামে একটা বইয়ের দোকান ছিল। এখন নেই। সেখানে স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, শিশু, নবারুণ এসব ওলটাতাম। সেখানেই পেয়েছিলাম আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ। সেই বইয়ের ভেতরেও ছিল এমন অদ্ভুত ঘ্রাণ।

এজন্য বুকসেলফটাকে জীবন্ত মনে হয় আমার। জীবন্ত আর স্মৃতিভারাতুর। কত কাহিনি ওর পেটের ভেতর, শরীর জুড়ে। অথচ নতুন বুকসেলফটাকে মনে হয় নিশ্চল আর মৃত। কোনো গন্ধও নেই তার।

পাশে এসে বসো

চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ঘেরা একটা বাড়িতে থাকি তখন। বাড়িটাও গাছে ঘেরা একটা টিলার ওপরে। সেখানে আমার সকাল হতো বেলা দশটায়। তার আগে ঘুম ভাঙতো কদাচিৎ। লেখাপড়া, ক্লাস করার কোনো বালাই নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম মাঝে কালেভদ্রে। বন্ধু রোজাউল করিম সুমন নিয়মিতই আসত তখন। মাঝে মাঝে আমার ঘুম ভাঙার আগে। খবর পেয়ে এসে দেখতাম বারান্দায় বসে একমনে স্কেচ খাতা খুলে উবু হয়ে বসা কুকুরটার ছবি আঁকছে।

দুপুরের কিছু আগে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। গন্তব্য জলসা মার্কেটের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো, বিশেষত অমর বইঘর। সেখান থেকে কবি জ্যোতির্ময় নন্দীর রহমতগঞ্জের বাসায় কিংবা লালখান বাজারের বাগঘোনার আরেক বন্ধুর বাড়িতে। মাঝে মাঝে প্রয়াত লেখক অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের বাসায়ও যাওয়া হতো। জ্যোতিদার বাড়িতে আমরা অনাহূতই ছিলাম। খুব বিরক্ত হতেন। বলতেন, আপনাদের আর কোনো কাজ নাই? কবিতা একটা লিখেই শোনানোর জন্য এখানে ছুটে আসতে হবে? তবু আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। আসলে ভীষণ রকমের স্নেহই করতেন আমাদের। কয়েকদিন না গেলে জানতে চাইতেন কেন আসিনি।

নিপাট ভালোমানুষ বউদি আমাদের সাহিত্য আলোচনার কাছে ঘেঁষতেন না। চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে তাঁর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন আবার। একবার জ্যোতিদার বাসায় গিয়ে শুনলাম, তিনি নেই। বউদি বললেন, আপনাদের দাদা শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। আপনারাও তাড়াতাড়ি যান। নন্দনকাননের ফুলকিতে ওরা বসেছেন।

বুঝলাম সাহিত্যের আলোচনায় যোগ না দিলেও শঙ্খ ঘোষ যে আমাদের প্রিয় কবি এ-কথাটা বউদির কানে ঠিকই পৌঁছেছে। না হয় এমন উত্তেজিত হয়ে কেন খবরটা দেবেন তিনি।

তখনো জ্যোতিদা আর ওমর কায়সার ছাড়া চট্টগ্রামের কবিদের তেমন কারো সঙ্গে আলাপ-পরিচয় নেই। আবুল মোমেন, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শাহিদ আনোয়ার, শেলিনা শেলী এদের দূর থেকে চিনি। ততোদিনে তাঁদের অনেকের কবিতাই পড়া হয়েছে। একটা মুগ্ধতাও ছিল। তবে সাহস করে কথা বলা হয়নি। এদের আসরেই শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে চলছিল সাহিত্য-আড্ডা। সেখানে কোন পরিচয়ে হাজির হই? কেমন কুণ্ঠিত ছিলাম মনে মনে। সালটা ১৯৯৮ হবে। তারিখ মনে নেই। শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা ছোট অডিও রেকর্ডার জোগাড় করে নিয়েছিল সুমন। আসরের মাঝামাঝি তখন, সবাই গোল হয়ে বসেছেন। তাঁদের মাঝে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর মোজা পরা শঙ্খ ঘোষ। ভূত দেখার মতো সবার দৃষ্টি আমাদের দিকে নিবদ্ধ। এমনকি শঙ্খ ঘোষেরও। তবে সেখানে উপস্থিত জ্যোতিদা আর আসর পরিচালনা করছিলেন যিনি, কবি ওমর কায়সার তাঁদের দেখেই সাহস পেলাম। ভেতরে ঢুকে বসে পড়লাম এক কোণে। সস্নেহে কায়সারভাই বললেন, এখানে সবাই কবিতা পড়েছে। এরপর শঙ্খ ঘোষ পড়বেন। তোমরা কি কবিতা নিয়ে এসেছো? আমি দুপাশে মাথা নেড়ে জানালাম, না, পড়ব না। কিন্তু সুমন আসরের সবার সামনে জানিয়ে দিলো সদ্য লেখা একটা কবিতা পকেটে আছে আমার। আসলে সেটা পকেটে করে নিয়ে বের হয়েছিলাম জ্যোতিদাকে শোনানোর জন্য। ওমর কায়সার সে-কথা শুনে ঘোষণা দিলেন, এখন আহমেদ মুনির কবিতা পড়বে।

আমার সারাশরীর কাঁপছে ভয়ে, লজ্জায়। ভাঁজ করা কাগজটা বের করতে করতে বলেছিলাম, দুর্ভাগ্য যে, একটা কবিতা পকেটে ছিল। সেই কবিতাখানা তুলে দিলাম এখানে –

‘ধূসর সন্ধ্যায় বাইরে আসি

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

বাতাসে ফুলের গন্ধ;

আর কিসের হাহাকার।’

এই সমস্ত কিছুকেই আমি বলেছি ভাবালুতা

এবং অসময়ের বর্ষণও আমার আবেগকে

এখন আর জাগাতে পারছে না।

এখন আমি সকালকে বলছি সকাল

বিকেলকে বিকেল

আর সন্ধ্যাকে বলেছি কেবলমাত্র সন্ধ্যা।

বস্ত্তত এখন আমি এক প্রকার বর্ণান্ধ।

তবু এই বিকেলে আমাকে বেরোতে হলো

সমুদ্রের নোনা বাতাসের ঝাপটের মধ্যে,

জল আর জলের সবরকম তরলতার ভিতরে

ডুবে যেতে যেতে একটি উজ্জ্বল মাছ

কেবল প্রাণ পেল

অথবা বেরিয়ে এল কঠিন আড়াল থেকে;

তবু সেই বাড়িটার সামনে

আমার পদক্ষেপ কেমন টলোমলো হলো;

আর বাতাসে কিসের যেন হাহাকার

সবরকম ফুলের গন্ধকে ছাপিয়ে !

(‘ক্রমাগত ধূসর সন্ধ্যা’, আমি ও বাঘারু)

পাঠ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমার কাঁপুনি থামছিল না। হঠাৎ শুনতে পেলাম শঙ্খ ঘোষ বলছেন, আমারও দুর্ভাগ্য যে তোমার পকেটে একটা কবিতাই ছিল, আর শোনা হলো না। তুমি আমার পাশে এসে বসো।

নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। আসরভর্তি মানুষের চোখ আমার দিকে। চোখের পানি লুকাতে চেষ্টা করছি প্রাণপণ। কিন্তু সহজ করে দিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁর পাশে বসতেই বললেন, তুমি বাছাই করে দাও আমি পড়ি। আমি তাঁর বই থেকে এক-এক করে নিজের পছন্দের কবিতা উলটে সামনে এগিয়ে দিতে থাকলাম, আর তিনি পড়তে লাগলেন। পাশে এই সব যন্ত্রে ধারণ করছিল বন্ধু সুমন। বারোটি কবিতার সেই রেকর্ডটি পরে কবিকন্যা সেবমত্মী ঘোষ অর্থাৎ টিয়াদিকেও পাঠানো হয়েছিল। সেই আসরে উপস্থিত টিয়াদি পরে বলেছিলেন, তাঁকে তখন পিএইচ.ডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হচ্ছিল। প্রবাসে বাবার কণ্ঠ শুনবেন বলে কিছু কবিতা রেকর্ড করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ তাতে রাজি ছিলেন না। বলেছিলেন, যন্ত্রে স্বস্তি পান না তিনি (অবশ্য পরে সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাঁর ধারণ করা কবিতা খুঁজে পেয়েছি নানা জায়গায়)। অথচ এখানে কি অবলীলায় যন্ত্রে কবিতা ধারণের সম্মতি দিলেন!

আজ এতোকাল পর সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। অচেনা এক বালকের প্রায় না হয়ে ওঠা, কাঁচা কবিতার এমন প্রশংসা করা আর তাকে পাশে ডেকে নিয়ে বসানোর মধ্যে কেবল একটা প্রশ্রয়ই ছিল বলে মনে হয়। তরুণটি কবিতা লিখছে, আর সেই লেখার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, কুণ্ঠা আছে, এটা বুঝতে পেরেছিলেন হয়তো। আর সেটা দূর করতেই তাঁর এই প্রচেষ্টা? ভাবতে গেলে আজো শঙ্খ ঘোষের প্রতি ভালোবাসায় মন আচ্ছন্ন হয়ে আসে।

শব্দ করে হাসো, যত পারো আজ বাঁচো

শোকের আপেল থেকে মুক্ত হও নরম খোসার মতো

মমতা-মাখানো ধান রুয়েছি মাটিতে

যাও তার ঘ্রাণ নিয়ে এসো।

এই নাও শেষ মদ, শস্যের সোনালি স্বেদ

জীবনের সাদা ফেনা, আশা ও শান্তির গাঢ় জল

প্রশান্ত স্নেহের জলে ডুবে আছে কালো এই পাড়া

যদি দুঃখ পেয়ে থাকো অচেনা পথের বাঁকে

দ্যাখো ধুলোলীন ঘাস, সহজ করুণ আমাদের ঘর।

(‘চাকমা বুড়োটা যা বলেছিল’, আমি ও বাঘারু)

২০০১ সালের দিকে একটা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে বছরখানেক রাঙামাটিতে কেটেছিল। শহরের রাজবাড়ি এলাকার কে কে রায় রোডের একটা বাড়িতে আরো চার চাকমা তরুণের সঙ্গে আমার নতুন সংসার। সে-বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নন্দ চাকমার বাড়ি শুভলংয়ের কাছের একটা গ্রাম হাজাছড়ায়। নন্দর নিমন্ত্রণে একবার যাওয়া হয়েছিল ছবির মতো সুন্দর গ্রামটিতে।

শহরের রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে লঞ্চে শুভলং, সেখান থেকে ভাড়া নৌকায় হাজাছড়া। গ্রাম বলতে যে সহজ-সরল ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, হাজাছড়া সেরকম নয় মোটেও। কাপ্তাই হ্রদের মাঝে জলমগ্ন শান্ত এক গ্রাম। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি একেকটা টিলার ওপর। সেই টিলা আবার ডুবে আছে হ্রদের জলে। যেন অসংখ্য দ্বীপের একটা মালা। সেরকমই একটা টিলার সামনে এসে থামল আমাদের নৌকা। মূল বাড়ির আগে নৌকা ভেড়ার ঘাট, সেই ঘাট সংলগ্ন সেগুনবাগানের একটা অংশ হ্রদের জলে নিচু হয়ে মিশে গেছে। নৌকা থেকে নেমে, নন্দদা পথটা দেখিয়ে দিলেন,

সেগুনবাগানের ভেতর দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ, এই পথে সোজা গেলেই বাড়ি। আপনি দেখতে দেখতে আসেন, আমি বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে আসি।

টিলায় উঠতেই অপূর্ব দৃশ্য। সামনের নীল হ্রদের জলে ঝুঁকে পড়া সেগুনবাগানের টলটলে প্রতিবিম্ব। জলের ওপর ওঠা ঘূর্ণি বাতাস ক্ষণে ক্ষণে তাকে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। ঢেউ শান্ত হয়ে এলে সেটা আবার ভরে উঠছে আগের চেয়ে স্পষ্ট চেহারা নিয়ে। কোথাও কোনো গাছের ডাল থেকে ডেকে উঠছে একটা কোকিল। একবার ডাকতেই তার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যেতে সময় নিচ্ছে বেশ কয়েক মিনিট। বাতাসে ঘাস আর পাহাড়ি লতার অতিপরিচিত মিষ্টি ঘ্রাণ।

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল বাগানের প্রান্তে হ্রদের তীর ঘেঁষে একটা ছোট্ট মাচান ঘর। কাছে যেতেই দেখলাম, মাচানের দাওয়ায় দা-হাতে বাঁশের কঞ্চি কাটছে এক চাকমাবুড়ো। চোখাচোখি হতেই তিনি ইশারায় ডাকলেন। হাত ধরে মাচাঙে উঠে বসতে সাহায্য করলেন।

বুড়োর চোখে-মুখে হাসির ছটা। কথা বলে জানলাম, নন্দদার সেগুনবাগানের পাহারাদার তিনি। বাগানের পরিচর্যা করেন। জুমে আবাদ করে আর মাছ ধরে বেশ ভালোই কেটে যায় একার জীবন।

কথা বলতে বলতে ঘোলাটে এক গস্নাস পানীয় এগিয়ে দিলেন।

বললেন, ডাবের জল। বলেই আকর্ণবিসত্মৃত হাসি। তবে আমি যে বুঝতে পেরেছি এটা ডাবের জল নয়, তা বুঝতে দিইনি তাঁকে। বেশ ভালো এক চোয়ানি ছিল সেটা। একে তো নীরব, নিস্তব্ধ উদার
প্রকৃতি তার ওপর এমন উৎকৃষ্ট পানীয় – আমাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। চাকমা বুড়ো তখনো পর্যন্ত আমার নাম জানতে চায়নি। নন্দর সঙ্গে এসেছি এটুকু জেনেই আলাপ জমায়।

আমাদের কথোপকথন পুরোটা মনে নেই। তবে যা মনে আছে তুলে দিচ্ছি –

আপনার ডাবের পানি তো বেশ ভালো!

হা হা, হ্যাঁ নিজে বানাইসি। আমার শ্বশুর এসে বেশির ভাগ

খেয়ে ফেলসে।

বউ কই আপনার?

সে মারা গেসে দশ বছর।

তারপরও শ্বশুর আসে এখানে?

হা হা, আসে, ডাবের পানি খাইতে আসে।

আপনি চট্টগ্রাম গেছেন কখনো?

আমি রাঙ্গামাটিও যাই নাই কখনো।

বলেন কি কেন যান নাই?

হুই দূরে, কি কামে যাব? কোনো কাম নাই সেখানে।

আপনার একা থাকতে ভয় লাগে না?

ভয়? ভয় কেন লাগবে, কোনো ভয় লাগে না।

আপনার জীবনে কোনো সমস্যা নাই?

কি নাই?

সমস্যা, সমস্যা।

মাচানের ওপর দাবা (হুঁকো) টানতে টানতে কয়েকজন বাগানি আমাদের কথা শুনছিল। তাদেরই একজন সমস্যার অর্থটা বুড়োকে বুঝিয়ে বললো।

বুড়ো উত্তর দিলো,

আছে আছে, একটা অসুবিধা আসে। এখানে রাতের বেলা দেওতারা দিস্টাব (বিরক্ত) করে।

দেওতা মানে ভূত?

আমাদের মধ্যে যারা মারা যায় তারা আর কী, আশপাশেই থাকে। রাতের বেলায় মাছ ধরতে গেলে মশাল তেনে (টেনে) ধরে পানিতে দুবিয়ে (ডুবিয়ে) নিভিয়ে দেয়। ক্ষতি করে না। খেলে আর কি আমার সঙ্গে।

এটা ছাড়া অন্য কোনো অসুবিধা নাই জীবনে?

বুড়ো হাসে, হা হা হা। কেন থাকবে?

হাসি সংক্রামক। আমি আর মাচাঙে বসা পাঁচ-ছয়জন বাগানিও তাতে যোগ দিই। একজন লম্বা বাঁশের দাবা এগিয়ে দেয় টানার জন্য। তার আগে শিখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি কীভাবে টানতে হবে। আমি সেই মতো টানার চেষ্টা করি। প্রথম বারে ধোঁয়া বের হয় না। এবার ফুসফুসে দম নিয়ে আবার চেষ্টা। জোরে টান। ধোঁয়ায় মুখ ভরে যায়। কড়া তামাকে প্রচ- কাশির দমক ওঠে। আমি কাশতে থাকি আর দাওয়ায় বুড়ো আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে পড়ে। আমার কাশির দমক যত বাড়ে তাদের আছাড়ি-পিছাড়ি হাসিও তত বাঁধভাঙা হয়ে ওঠে।

গাজায় ‘জল্লাদের উল্লাস’ কি থামবে না by হাসান ইমাম

বিপদ এড়াতে উটপাখি নাকি বালুতে মুখ গুঁজে থাকে। সময়–অসময় বুঝে আমরা ঝুঁকে পড়ি মুঠোফোনের পর্দায়। তবে এমন না যে মুঠোফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে দেশ–বিদেশের বিপদ–আপদের খবর পাওয়া যায় না। যায়। অপতথ্যের ছড়াছড়ির মধ্যেও নিখাদ তথ্য পাওয়া যায় মেলা—মনে দাগ কাটার মতো, হৃদয়ে রক্ত ঝরানোর মতো, চোখ ঝাপসা করে তোলার মতো।

কিন্তু পাশের বাড়িতে লাগা আগুনের আঁচ নিজেদের আঙিনায় অনুভূত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের যেন হুঁশ হয় না। কেউ কেউ আবার সেই আগুনে ‘আলু পুড়িয়ে খাওয়ায়’ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ভূরাজনীতি, কূটনীতি, ‘অস্ত্রের অর্থনীতি’, পক্ষ–বিপক্ষের সিলসিলা, লাভ-ক্ষতির পাটিগণিত—এ রকম নানা হিসাব–নিকাশে প্রাণহানি তাই স্রেফ ‘পরিসংখ্যানে’ পরিণত হয়। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার নৃশংসতা, গাজাবাসীর অনিঃশেষ রক্তক্ষয় তার জাজ্বল্য উদাহরণ।

শুধু মালসামান, দরদালান বা রাস্তাঘাটের ধ্বংস নয়, আমজনতার বেঘোর মৃত্যু নয়, যুদ্ধে তো শেষতক পরাজিত হয় আসলে মানবতাই। মাথা হেঁট হয় সভ্যতার। ন্যায়ের পক্ষে, অন্যায্যের প্রতিবাদে কখনো কখনো যুদ্ধে নামা অনিবার্য হয়ে ওঠে বৈকি। কিন্তু যুদ্ধের মূল্য সব দেশ–কালেই পরিশোধ করতে হয় ‘রক্তে’। কার রক্তে? মূলত উলুখাগড়ার। মানে প্রজাসাধারণের, নিরীহ মানুষের। কিন্তু যে শিশুটি রাজা চেনে না, রাজ্যও বোঝে না, এমনকি মায়ের শরীরের ঘ্রাণও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি, তার কেন প্রাণ যাবে যুদ্ধে?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বাছবিচারহীন হামলার ১৫ মাসে গাজায় নিহত হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯২টি শিশু।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ হিসাব অনুযায়ী প্রতি ৩০ মিনিটে প্রাণ হারাচ্ছে একটি শিশু। এর বাইরে বিধ্বস্ত বাসাবাড়ি ও স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে কয়েক হাজার শিশু আটকা পড়ে মারা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা। নিহত শিশুদের মধ্যে ১ হাজার ৯১টির বয়স এক বছরের কম (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত)। তাদের মধ্যে ২৩৮ জনের জন্মই হয়েছিল যুদ্ধের সময়। অর্থাৎ গুলি–বোমার ভয়াবহতা, অসহায় মানুষের আর্তনাদ–আহাজারির মধ্যে পৃথিবীতে এসেছিল তারা, একইভাবে ‘জল্লাদের উল্লাসের’ মধ্যে তারা বিদায় নিয়েছে।

‘নবজাতকের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর’ কথা কবির মুখে উচ্চারিত হয়েছে বটে, কিন্তু এ অঙ্গীকার তো আসলে সভ্যতারই প্রথম সোপান। তাহলে ইসরায়েলের বিরামহীন হামলায় প্রতিদিন গড়ে শত ফিলিস্তিনির মৃত্যুর পরও কোথাও কোনো ‘কলরব’ নেই কেন!

কলরব দূরের কথা, নিদেনপক্ষে প্রতিকারের ন্যূনতম আন্তরিক প্রচেষ্টাও যে দৃশ্যমান নয়, বরং বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা যে স্পষ্ট, তা আরেক দফায় প্রমাণিত হলো ৩ জানুয়ারি, জাতিসংঘে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি প্রাণহানি ও বিপুল ধ্বংসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে বিজয়ী মিত্রশক্তি আগামী দিনগুলোতে যাতে যুদ্ধ-সংঘাত প্রতিরোধ করা যায়—সেই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ও পরে বিলুপ্ত লিগ অব নেশনসের স্থলাভিষিক্ত হয় বৈশ্বিক এই প্রতিষ্ঠান।

‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বাধেনি বটে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রাণ হারানো ‘উলুখাগড়া’র সংখ্যাও কিন্তু লাখ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাদের এক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ বলি অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ।

প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে স্বজনের শোক, সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে যাওয়ার বেদনা—যা তাঁদের আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়। আর যিনি চলে গেলেন, তাঁর শেষের কথা কতটা মর্মভেদী হতে পারে, গাজার চিকিৎসক মাহমুদ আবু নুজাইলা আমাদের তাই মনে করিয়ে দিলেন।

তিনি লিখেছিলেন, ‘যে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, গল্পটা সে-ই বলবেন। আমরা যতটুকু পেরেছি, করেছি। আমাদের কথা মনে রাখবেন।’

গাজার আল আওদা হাসপাতালের যে বোর্ডে তিনি কথাগুলো লিখেছিলেন, সেখানে সাধারণত রোগীর অস্ত্রোপচার কীভাবে করা হয়, তার বিবরণ থাকত। ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন আবু নুজাইলা।

তাঁর কথাকটি ৩ জানুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পড়ে শোনান জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি রিয়াদ মনসুর। তিনি অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি; কাঁদতে কাঁদতে গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) বন্ধে পদক্ষেপ নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর জবানিতে, ‘(গাজায়) এই নরকের অবসান ঘটানোর দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে আমাদের। যে জাতিগত নিধন চলছে, তা বন্ধ করার সম্মিলিত দায়িত্ব আমাদের।’

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিদের দখলদারত্বের সূচনার মাধ্যমে সাড়ে সাত দশক আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসে, তার শেষ কোথায়? ফি বছর কি শিশু-নারীসহ নিরপরাধ মানুষের বেঘোর মৃত্যুর খতিয়ান, বসতি ধ্বংসের বিবরণ, ভূমি হারানোর হিসাব লিখে যেতে হবে? স্পষ্ট দৃষ্টির কিছু তরুণ-যুবা, বিবেকি মানুষ বা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান তাদের জায়গা থেকে প্রতিবাদ-ধিক্কার জানাচ্ছে বটে।  

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান নৃশংসতার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। কিন্তু তাতে কী! মানুষের ‘বিবেকের আদালত’ জাগ্রত না হলে কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়?

* হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
- hello.hasanimam@gmail.com

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বাছবিচারহীন হামলার ১৫ মাসে গাজায় নিহত হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯২টি শিশু।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর বাছবিচারহীন হামলার ১৫ মাসে গাজায় নিহত হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯২ টি শিশু।

পুড়ে ছাই লস অ্যানজেলেস: ঘরবাড়ি বাঁচাতে ঘণ্টায় ২০০০ ডলার দিয়ে দমকল ভাড়া করছেন ধনকুবেররা

দাবদাহে পুড়ে ছাই লস অ্যানজেলেসের জনপদ। ধনী থেকে দরিদ্র। সবার বাড়িই ছাইভস্ম। এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি আগুন। উপরন্তু আবহাওয়া বিভাগ পূর্বাভাসে বলেছে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় শক্তিশালী বাতাস প্রবাহিত হবে। তার ফলে এই দাবদাহ থেকে সৃষ্ট আগুন বিধ্বংসী রূপ নিতে পারে। পুড়িয়ে দিতে পারে নতুন নতুন পার্ক ও জনপদ। ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে ইটন এবং পালিসাডেসে। আগুনে পুড়ে গেছে প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকা। এরই মধ্যে কোনো কোনো মহল লুটতরাজে মেতে উঠেছে। নতুন করে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার ফলে রেড ফ্ল্যাগ আবহাওয়া বিষয়ক সতর্কতা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৪টা থেকে সেখানে ঘণ্টায় ৭০ মাইল বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ জন্য লস অ্যানজেলেসের অধিবাসীদেরকে ঘরের বাইরে বের না হতে বলা হয়েছে। পরামর্শ দেয়া হয়েছে ময়লা ও ছাইভস্ম এড়িয়ে চলতে। এই সতর্কতা বুধবার ১২টা পর্যন্ত বহাল থাকবে। উল্লেখ্য, রেড ফ্ল্যাগ সতর্কতাকে চিহ্নিত করা হয় রেড বা লালের নিচের সতর্কতা হিসেবে। এর আওতায় আছে লস অ্যানজেলেস, ভেনচুরা কাউন্টি, আছে সান লুইস ওবিস্পো পাহাড়, সান্তা বারবারা কাউন্টি। চারদিকে এখন যে পরিস্থিতি তা নিয়ে বিবিসি নিউজের এমা পেঙ্গেলি বলেছেন, সত্যিকারভাবে মনে হচ্ছে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন নেটওয়ার্কের সাবেক প্রযোজক ডেভ ওয়াটারফল বলেছেন, তিনি আরেকটি বিপর্যয় দেখছেন। তার ভাষায়, আমি কখনো ভাবিনি এমন বিপর্যয়ের একটি সম্প্রদায়ে বসবাস করবো। গত সপ্তাহে সান্তা মোনিকা এলাকার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে। বর্তমানে সান্তা মোনিকায় নিজের মোটরসাইকেল দোকানের  ভেতর সবাইকে নিয়ে বসবাস করছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ওই অঞ্চলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণে হিমশিম খাচ্ছে লস অ্যানজেলেসভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো। কেউ কেউ অফিস সরিয়ে নিচ্ছেন। যেসব স্টাফ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন কেউ। ক্যাপিটল গ্রুপ, টিসিডব্লিউ গ্রুপ, ওকট্রি ক্যাপিটাল, অ্যারেস ম্যানেজমেন্টের মতো বিশাল সব শিল্প বিষয়ক কোম্পানির মালিক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাড়ি লস অ্যানজেলেসে। যুক্তরাষ্ট্রে বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মোট ১৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ আছে। তার মধ্যে কমপক্ষে ৪ ট্রিলিয়নের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবস্থান লস অ্যানজেলেসে। দাবানলের গ্রাসে তাদের আশপাশ সহ সবকিছুকে ধ্বংসস্তূপ করে দিয়ে গেছে। চারদিকে শুধু শূন্যতা। হাহাকার। পড়ে আছে শুধু ছাই আর ছাই। ধনীদের বসতি থেকে শুরু করে উপশহর। কিছুই অক্ষত নেই। টিসিডব্লিউ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট কেটি কোচ বলেন, আমাদের টিমের বিপুল পরিমাণ সদস্য বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন তাদের বাড়িঘর একেবারে হারিয়েছেন। আমার নিজের পরিবারেরও একই অবস্থা। উল্লেখ্য, টিসিডব্লিউ ২০,৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করে। কেটি কোচ লস অ্যানজেলেসে তার সহকর্মীদের কাছে এসব নিয়ে একটি চিঠি লিখেছেন। টিসিডব্লিউ বলেছে, লস অ্যানজেলেসে তাদের যেসব কর্মী ছিলেন তারা সবাই নিরাপদে আছেন। তাদের খোঁজ মিলেছে। আগুনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে প্যাসিফিক পালিসাডেসে ৬০.৫ মিলিয়ন ডলারের তহবিল নিয়ে বিশাল অফিস খুলেছিল আনাকাপা এডভাইজরস। তারা দেখেছে, চারপাশে সবকিছু আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানেরও সব কর্মী নিরাপদে আছেন। 

ঘরবাড়ি বাঁচাতে ঘণ্টায় ২০০০ ডলার দিয়ে দমকল ভাড়া করছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ধনকুবেররা

ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় লস অ্যাঞ্জেলেসের সবচেয়ে বিলাসবহুল এলাকাগুলো এখন হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতিতে ধনী বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপণ সেবাও নিচ্ছেন। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই সেবা নিতে প্রতি ঘণ্টায় খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ডলার। নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘরবাড়ি বাঁচাতে বেসরকারি দমকল ভাড়া করছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ধনকুবেররা। বেসরকারি এই দলগুলোতেও বিশেষজ্ঞ দমকলকর্মী, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং পানির ট্যাঙ্ক রয়েছে।

ঘরবাড়ি এবং সম্পত্তি আগুনের হাত থেকে বাঁচাতে অনেকেই এই বেসরকারি দমকলের সাহায্য নিয়ে থাকেন। ২০১৮ সালে কিম কার্দাশিয়ান এবং কেইন ওয়েস্টও সম্পত্তি বাঁচাতে এই বেসরকারি দমকলের সাহায্য নিয়েছিলেন।

একটি প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক ক্রিস ডান বলেছেন, সংকটময় পরিস্থিতিতে এ ধরনের সেবার চাহিদা বেড়েছে। সান ফ্রান্সিসকো ক্রনিকলের একজন সাংবাদিক সম্প্রতি একটি প্রাইভেট অগ্নিনির্বাপক দলকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা রাত ধরে একটি বাড়ির ছাদে পানি ঢালতে দেখেছেন। ওই সাংবাদিক এক্স মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপকেরা এই হলিউড হিলসের বাড়ি সুরক্ষিত রাখছেন। তারা দ্বিতীয় তলার কার্নিশ থেকে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করেছেন। তারা সারা রাত এখানে থাকবেন।’

এ নিয়ে সমালোচনাও কম হচ্ছে না। লস অ্যাঞ্জেলেসের বিধ্বংসী আগুনে যেখানে লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, সেখানে এই ধরনের পরিষেবা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে ধনী-গরিবের বৈষম্য ।

সম্প্রতি মিলিয়নিয়ার কিথ ওয়াসারম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রাইভেট অগ্নিনির্বাপক দল নিয়োগের চেষ্টা করায় তীব্র সমালোচনার শিকার হন। বিলিয়নিয়ার রিক কারুসোও একইভাবে সমালোচনার মুখে পড়েন, যখন জানা যায়, তিনি তার সম্পত্তি রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপক দল ভাড়া করেছিলেন।

এখনও পর্যন্ত দাবানলে ১২ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘর ছেড়ে অন্য কোনও আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিধ্বংসী আগুন প্রাণ কেড়েছে ২৪ জনের।

সূত্র : এনডিটিভি
mzamin

উপদেষ্টারা এখন কী করবেন?

হঠাৎ করেই আলোচনায় আসে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের বিষয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয় চাঞ্চল্য। ৩১শে ডিসেম্বর এই ঘোষণাপত্র প্রকাশের দিন ধার্য করে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তার ঠিক আগের দিন সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, সরকারই এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করবে। বলা হয় দুই সপ্তাহের মধ্যেই এটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হবে। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বছরের প্রথম মাসের দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনো এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেনি সরকার। এখন সরকারের তরফে বলা হচ্ছে এই ঘোষণাপত্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেই দেয়া হবে। সরকার শুধু ফ্যাসিলেট করবে। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া হবে, তাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এটি প্রকাশ করা হবে।  ঘোষণাপত্র প্রকাশের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের পক্ষ থেকে হতাশা প্রকাশ করা হচ্ছে। বক্তৃতা- বিবৃতির মাধ্যমে তারা সরকারকে সতর্ক করে বক্তব্যও দিচ্ছেন। সর্বশেষ গতকাল  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এক অনুষ্ঠানে সরকারের উদ্দেশ্যে কড়া বার্তা দিয়েছেন। ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া যারা উপদেষ্টা পরিষদে আছেন তাদের প্রয়োজনে পদ ছেড়ে জনগণের কাতারে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। 

নারায়ণগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ১৫ই জানুয়ারি জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্রের আল্টিমেটাম ছিল। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র দেবে বলে কথা দিলেও এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিনিধি হয়ে যাদের উপদেষ্টা করেছি, আপনারা যদি মনে করেন, কোনো কারণে ঘোষণা দিতে এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধা আছে, সেটি আপনারা জনসমক্ষে প্রকাশ করুন। যদি আপনারা সেটি করতে ব্যর্থ হন, তাহলে উপদেষ্টার কাতার থেকে জনগণের কাতারে নেমে আসুন। আমরা যেভাবে আগস্টে রাস্তায় নেমে হাসিনার পতন ঘটিয়েছি, ঠিক একইভাবে রাস্তায় নেমে দাবি আদায় করে নেবো। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক কাতারে নেতৃত্ব দেয়া সহকর্মী হাসনাত আব্দুল্লাহ’র এই আহ্বানের পর তরুণ উপদেষ্টারা এখন কী করবেন সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ঘোষণাপত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত ঐকমত্যের কোনো আভাস মিলছে না। কারণ দলগুলোর সঙ্গে এ পর্যন্ত সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।

সর্বশেষ গতকাল রাতে সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার এ নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে সরকার বসবে। এরপর জানা যাবে কবে এই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। ইতিমধ্যে বিএনপি, জামায়াতসহ দলগুলোর কাছে ছাত্রদের তৈরি করা ঘোষণাপত্রের খসড়া পাঠানো হয়েছে। এই খসড়ার উপর মতামত চাওয়া হয়েছে। গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পক্ষ থেকে এই খসড়া পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। তবে যেহেতু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এখানে সংবিধানের বিষয় আছে তাই দ্রুতই এ বিষয়ে বিএনপি মতামত দিতে পারবে না। বিএনপি’র সমমনা দলগুলোর পক্ষ থেকেও এমন ইঙ্গিতই মিলেছে। এমন অবস্থায় আগামীকালের বৈঠকে কোন কোন দল অংশ নেবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের বলেন, আমরা সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম সাহেবের কাছ থেকে একটা ঘোষণার খসড়াপত্র পেয়েছি। উনি আমাদেরকে অনুরোধ করেছেন যে, এবিষয়ে আমাদের মতামত জানাতে। এবিষয়টা এত বেশি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, এটা একদিনের নোটিশে করা সম্ভব না। আমরা এবিষয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আরও আলোচনা করছি। আমাদের অন্যান্য দলগুলো আছে, তাদের সঙ্গে এবিষয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে। শুধু তাই নয়, সংবিধান বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও আমাদের কথা বলতে হবে। এই ঘোষণাপত্রের মধ্যে সংবিধানের ব্যাপারেও হুবহু কথা আছে। যেটা আমাদেরকে দেখতে হবে।

ওদিকে ঘোষণাপত্রের খসড়া পায়নি গণতন্ত্র মঞ্চ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। বিষয়টি নিশ্চিত করে গতকাল রাতে গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবজমিনকে বলেন, আমরা এখনো ঘোষণাপত্রের খসড়া পাইনি। পাওয়ার পরে মঞ্চ এবং দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে, মতামত দেয়া হবে কি না।নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না খসড়া পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, মতামত দেয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জুলাই ঘোষণা নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকে বসছে সরকার: জুলাই ঘোষণা নিয়ে রাজনৈতিক দল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছে সরকার। আগামীকাল প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে এ বৈঠক অনুুষ্ঠিত হবে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, গত ১২ থেকে ১৫ দিন ছাত্রদের জুলাই ঘোষণাপত্রের অবলম্বনে আমরা একটা খসড়া প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি। সবার সঙ্গে আমাদের কথা বলা হয়ে ওঠেনি। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াত, নারী ও শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই একমত আছেন যে, ঘোষণাপত্রটি দিতে হবে। কিন্তু ঘোষণাপত্রটি কবে এবং ভেতরে কী কী কন্টেন্ট থাকবে সেই বিষয়ে আমরা এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারিনি।

মূলত আগামী বৃহস্পতিবার সর্বদলীয় একটি বৈঠক হবে। বৈঠকের স্থান এখনো নির্ধারণ হয়নি। আশা করছি বৈঠকের মধ্যদিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা দলিল প্রণিত হবে। সেদিনই সরকার কবে ঘোষণাপত্রটি জারি করবে সেটা স্পষ্ট হবে। আশা করি গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং প্রত্যাশা এতে প্রতিফলিত হবে। সকল রাজনৈতিক দল এবং পক্ষের মতামত নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্রটি ঘোষিত হবে। তিনি বলেন, ইনফরমালি আমরা অনেকগুলো দলের সঙ্গে কথা বলেছি। অধিকাংশ ক্লজেই উনারা একমত। পার্টির ইন্টারনাল ফোরামে এবং এক্সটার্নাল বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে তারা নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। তারা নিজেরাও কিছু প্রস্তাব দিতে চাচ্ছেন। আমাদের ধারণা, ছাত্রদের সম্মতিতে সর্বদলীয় একটা বৈঠক হলে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা যাবে এবং ঘোষণাপত্র ফলপ্রসূ হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত তিনটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। জাতীয় পার্টিকে আমরা কোনো বৈঠকে ডাকিনি। তাদের সঙ্গে এই বিষয়ে তাদের পরামর্শ আমরা যৌক্তিক মনে করছি না। বামপন্থি যেসব সংগঠন গণ-অভ্যুত্থানের সহযোগী ছিল উনাদের সঙ্গে অবশ্যই কথা হবে। তিনি আরও বলেন, ৫ই আগস্টের মতো মোমেন্টটা আমরা রিক্রিয়েট করতে চাচ্ছি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্যার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বশীল যারা আছেন বিশেষ করে এডভাইজাররা থাকবেন। এতে সব রাজনৈতিক দলের রিপ্রেজেন্টেশন থাকবে। আমরা মনে করি সম্ভব হবে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব আহমেদ ফয়েজ, সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি।

উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের চার মাস পর আন্দোলনকারীরা জুলাই বিপ্লবের ঘোষণার বিষয়টি সামনে আনেন। শুরুতে সরকার থেকে বলা হয়, এর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটিকে যেন একটি বেসরকারি উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরপর ৩০শে ডিসেম্বর সরকার জুলাই বিপ্লবের ঘোষণা প্রস্তুতের কথা জানায়। ছাত্ররা সরকারে আস্থা রেখে বিপ্লবের ঘোষণা থেকে সরে আসে। কিন্তু এর জন্য সরকারকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। 

mzamin

পদত্যাগ করলেন টিউলিপ সিদ্দিক

অবশেষে পদত্যাগ করেছেন বৃটেনের বহুল বিতর্কিত সিটি মিনিস্টার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বিরোধী দায়িত্বে থাকা টিউলিপ সিদ্দিক। তিনি বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি ও বোন শেখ রেহানার মেয়ে। শেখ হাসিনার পতনের পর টিউলিপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কেলেঙ্কারির খবর বোমার মতো ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একজন আওয়ামী লীগ নেতা ও ডেভেলপার আবদুল মোতালিফের কাছ থেকে উপহার হিসেবে বৃটেনের কিংস ক্রসে একটি ফ্ল্যাট নিয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তার বোন আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তির নামে আরও একটি ফ্ল্যাট উপহার দেন আইনজীবী মঈন গণি। প্রকারান্তরে সেই ফ্ল্যাটও টিউলিপকে উপহার দেয়া হয়েছে। কারণ, রূপন্তি ওই ফ্ল্যাট টিউলিপকে পরিবার সহ ব্যবহার করতে দিয়েছেন। এসব বিষয় গোপন করেছেন টিউলিপ। শুধু তা-ই নয়, তিনি শেখ হাসিনার ভাগ্নি হওয়ার পরও তার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আলোচনা কখনো করেননি বলে দাবি করেন। কিন্তু তার ব্লগ ফাঁস করে দিয়েছে মিডিয়া। তাতে দেখা যায়, তিনি শেখ হাসিনার জয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন। তার প্রচারণায় ছিলেন তিনি। এর বাইরে রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুক্তি করার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা, টিউলিপ, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় প্রমুখ ৫০০ কোটি ডলার মালয়েশিয়ার একটি ব্যাংকের মাধ্যমে আত্মস্মাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে বাংলাদেশে দুদক তদন্ত করছে। তদন্ত চলছে বৃটেনে। কিন্তু অভিযোগ উঠার পর দীর্ঘ সময় তা অস্বীকার করে মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকেন টিউলিপ। তার পদত্যাগ দাবি করেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা, বিরোধী কনজার্ভেটিভ দলের কিছু এমপি। কিন্তু টিউলিপ তার খালা শেখ হাসিনার মতো ক্ষমতা ধরে রাখেন। এ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার হলেন টিউলিপের ক্ষমতার খুঁটি।

টিউলিপ সিদ্দিক অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তকারী লরি ম্যাগনাসের কাছে এই আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। টিউলিপের বিরুদ্ধে যখন তীব্র চাপ, প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতিতে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ জোরালো হতে থাকে, বৃটেনের রাজনীতি উত্তাল হতে শুরু করে, তখন বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রী পিটার কিলি বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তকারী যদি দেখেন মন্ত্রিত্বের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন টিউলিপ, তাহলে তিনি সরকারি পদে থাকতে পারবেন না। কয়েকদিন ধরে এই বিতর্ক বৃটেনের প্রথম সারির সব মিডিয়ার প্রথম পৃষ্ঠায়। তারা গুরুত্ব দিয়ে টিউলিপের দুর্নীতি ও সে সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকে। কোনো কোনো মিডিয়া প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধান সংবাদ শিরোনাম করে। এসব রিপোর্টে টিউলিপের খালা, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার হিসেবে আখ্যায়িত করে। এমন বিতর্ক এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি যখন টিউলিপের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার পদত্যাগের খবর দেয় বিবিসি। ওদিকে বর্তমান পার্লামেন্টের পুরো মেয়াদে চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে প্রথমবার এমপিদের মুখোমুখি হতে হয়েছে চ্যান্সেলর র্যাাচেল রিভস।

mzamin

রিপোর্ট জমা আজ: সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের বিষয়টি সামনে এসেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস, আইনের শাসন না থাকা, বিচার বিভাগ দলীয়করণ, পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে দলীয় সংগঠনে পরিণত করা, লাগামহীন দুর্নীতি এবং সংবিধানকে নিজেদের মতো ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে টানা সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় দলটির বিরুদ্ধে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এ বিষয়ে বারবার কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা সরকার দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। এমতাবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করে। শুরুতে গঠিত হয় ৬টি কমিশন। সেগুলো হলো- নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন। এসব কমিশনের ৪টি আজ প্রধান উপদেষ্টার হাতে তাদের সংস্কার প্রস্তাব জমা দেবে। ইতিমধ্যে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাবের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছে। যে প্রস্তাবনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যক্তিরা। এমতাবস্থায় সরকারের কাছে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানের কিছু সংস্কার নিয়ে আপত্তি রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। এ ছাড়া জনপ্রশাসনে সংস্কারের প্রশাসন ক্যাডার ও অন্য ২৫টি ক্যাডারের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় নিয়ে বাহিনীটির অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে।

সেপ্টেম্বরে গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন ড. বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন সফর রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন ড. আলী রীয়াজ। এরমধ্যে বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনে ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় নিয়েছে। বাকি চারটি কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাব আজ প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তুলে দেবেন। এরপর সেগুলো নিয়ে সংস্কার কমিশনের সদস্য ও কয়েকজন উপদেষ্টাসহ প্রধান উপদেষ্টা আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে।
গত ৯ই জানুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সংস্কার অবশ্যই লাগবে। কিন্তু সেই সংস্কারটা হচ্ছে যে এর পেছনে যে শক্তিটা লাগবে সেটা হচ্ছে নির্বাচিত পার্লামেন্ট, নির্বাচিত সরকার। এটা ছাড়া সংস্কারকে কখনো লেজিটেমেসি দিতে পারবো না আমরা। এটা ফ্যাসিস্টরা পারবে। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বিভিন্ন প্রোগ্রামে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে আগে আওয়ামী লীগের বিচার ও সংস্কার কাজ শেষ করতে হবে। তারপর নির্বাচন। জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলও সংস্কার চায়। এমতাবস্থায় কতোটুকু সংস্কার অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এমতাবস্থায় সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তব্যে সংস্কার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। সরকারের শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, সংস্কার পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে আপনারা সবাই আমাদের পাশে থাকবেন। যথাসাধ্য চেষ্টা করে যে সংস্কারের পরিকল্পনা আছে, সেটুকু এগিয়ে নিয়ে আমরা বিদায় নেবো। ৪ঠা আগস্ট রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য রিজওয়ান খায়ের বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত ৫৩ বছরে অনেক কিছু ঘটেছে, কিন্তু সংস্কার সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবে। আমলাতন্ত্র তখনই সংস্কার হবে, যখন এটি ধাক্কা খাবে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ভারতে সংস্কার হয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। আমাদের সংস্কার প্রতিবেদনে যাই থাকুক, রাজনৈতিক ঐকমত্য না হলে প্রতিবেদনটি এক টুকরা কাগজ ব্যতীত আর কিছুই হবে না। এটাই বাস্তবতা। সংস্কার দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। আমাদের শুরু করতে হবে। পরবর্তী ধাপগুলো বর্তমান সরকার করবে না কি রাজনৈতিক সরকার করবে, সে ঐকমত্যটা গুরুত্বপূর্ণ। একই অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য খোন্দকার মোহাম্মদ আমিনুর রহমান বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কারে এর আগেও ১৭টি কমিশন হয়েছে, তাতে কোনো কাজ হয়নি। আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের কমিশনের পরিণতিও যেন একই রকম না হয়।

এদিকে সংস্কার কমিশনগুলো অনেকগুলো বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করতে যাচ্ছে। ন্যূনতম ভোটার উপস্থিতি ছাড়া নির্বাচন বাতিলসহ বেশকিছু সুপারিশ করছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। এই কমিশনের সদস্যরা জানান, নির্বাচন সংস্কার কমিশন ব্যালট পেপারে না ভোট বিকল্পের পুনঃপ্রবর্তন এবং নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের সুপারিশ করা হচ্ছে। সেইসঙ্গে নারীদের আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার পক্ষে সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন কমিশনার ও তাদের প্রধান নিয়োগের জন্য আইন সংশোধন, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করা, বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগের তিন ইসির বিচার করা, জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর অধীনে ইসির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইসিকে আরও জবাবদিহিমূলক করা। প্রার্থীদের তাদের হলফনামায় বিদেশে থাকা সম্পদ প্রকাশ করতে এবং হলফনামায় দেয়া তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার সুপারিশও করেছে সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া আগে স্থানীয় নির্বাচন করার বিষয়টিও সুপারিশে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কমিশনের এক সদস্য। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এই কমিশনের খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদের নিম্ন্নকক্ষে আসন থাকবে ৪০০টি। আর নির্বাচন হবে বর্তমান পদ্ধতিতে। এর মধ্যে ১০০ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তারা নির্বাচিত হবেন সরাসরি ভোটে। আর উচ্চকক্ষে আসন থাকবে ১০৫টি। সংসদের এই দুই কক্ষ মিলিয়ে মোট আসন হবে ৫০৫টি। এ ছাড়া সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র ঠেকাতে বা এক ব্যক্তির হাতে যাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে না যায়, সেজন্য ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে আরও কিছু সুপারিশ করবে এই কমিশন। এর বাইরে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সর্বনিম্ন বয়স ২৫ বছর থেকে কমিয়ে ২১ বছর করারও সুপারিশ করা হবে। এ ছাড়া দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, স্থানীয় সরকার কমিশন, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক সংস্থা করা, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার সুপারিশও করা হচ্ছে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সূত্র জানায়, তাদের সুপারিশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেসব সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেবে কমিশন। কমিশন ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারার অধীনে রিমান্ডে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করে একটি নির্দেশিকা তৈরির প্রস্তাব দেবে। এই নির্দেশিকায় থাকবে: সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে এবং অভিযানে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। গ্রেপ্তারের কারণ রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। গ্রেপ্তারের এক ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আত্মীয়দের জানাতে হবে। আটককৃতদের একজন আইনজীবী বা আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকতে হবে। রিমান্ডের সময় একটি স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালযুক্ত কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। একজন আইনজীবী বা আত্মীয় এই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। অন্যদিকে দুদকের সর্বোচ্চ পদ কমিশনের চেয়ারম্যান ও দু’জন কমিশনারের নিয়োগ নিয়ে সব সময় রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। দলীয় এবং দলীয় আনুগত্য থাকা ব্যক্তিদের ওই সব পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংস্কার কমিশন এমন সুপারিশ করবে, যাতে নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকে এবং সংকট সৃষ্টি না হয়। দুদক আইন অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন কমিশনার নিয়ে কমিশন। সুপারিশ করা হবে পাঁচ সদস্যের কমিশন করার জন্য। কমিশনের সার্বিক কার্যক্রম আমলাতন্ত্রের হাতে জিম্মি আছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হচ্ছে। 

mzamin

দেখা করতে গিয়ে বান্ধবীসহ দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এক যুবকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এক তরুণী ও তার বান্ধবী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় গত সোমবার মধ্যরাতে নাঙ্গলকোট থানায় মামলা করেছে ভুক্তভোগী তরুণীদের একজন। এতে ওই যুবকসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ৯ই জানুয়ারি দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত উপজেলার বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের সেবাখোলা বাজারে খোকন মিয়ার করাতকলের দোকানঘরের ভেতরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মামলার প্রধান আসামি শহীদুল ইসলাম উপজেলার নুরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ছাড়া করাতকলের মালিক খোকন মিয়াকে ২ নম্বর আসামি এবং মো. মহসিন নামের একজনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে। মহসিন বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের রঞ্জু মিয়ার ছেলে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে সে এলাকায় নেই। তার মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ রয়েছে।

এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী দুই তরুণী বান্ধবী। একজনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর, আরেকজনের বাড়ি চাঁদপুর। কুমিল্লা নগরের টমছম ব্রিজ এলাকার একটি মেসে তারা ভাড়া থাকে এবং গৃহকর্মীর কাজ করে। নাঙ্গলকোটের নুরপুর গ্রামের শহীদুল ইসলামের সঙ্গে একজনের মুঠোফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ৯ই জানুয়ারি তারা শহীদুলের সঙ্গে দেখা করতে যায়। সাতজনের একটি দল তাদেরকে তুলে নিয়ে সেবাখোলা বাজারে খোকন মিয়ার ‘স’ মিলে নিয়ে যায়। মহসিনের নেতৃত্বে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে তাদের ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করে রাখে। বিষয়টি কাউকে জানালে ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়।

মহসিনের বাবা রঞ্জু মিয়া বলেন, আমার ছেলে যুবদলের রাজনীতি করে। এজন্য একটি গ্রুপ আমার ছেলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর আগেও তার বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার করা হয়েছিল। এখন মেয়ে দিয়ে আমার ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। ওসি এ কে ফজলুল হক বলেন, আমাদের কাছে অপরাধীর পরিচয় অপরাধী। থানায় মামলা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আগেই জানাজানি হওয়ায় আসামিরা পলাতক রয়েছে। তাদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।