Showing posts with label স্পেন. Show all posts
Showing posts with label স্পেন. Show all posts

Wednesday, August 19, 2026

স্পেনের সেউতায় আটকা পড়েছেন ৮ হাজার অভিবাসী, আছে বাংলাদেশিও

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার অভিবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। ইরাকি বার্তাসংস্থা শাফাক নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

মরক্কো থেকে ব্যাপক অভিবাসন প্রবাহের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পরও তাদের আশ্রয় ও আইনি অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

সেউতা ও মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। মরক্কোর মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

২৯ ও ৩০ জুলাইয়ের ব্যাপক প্রবেশের সময় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ সাময়িকভাবে সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। পরে তাদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। স্পেন ও মরক্কোর তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রোববার ফ্রান্স২৪ জানিয়েছে, এখন যারা সেউতায় রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে ইরাকি, সিরীয়, ইয়েমেনি, ফিলিস্তিনি, মিসরীয়, আলজেরীয়, তিউনিসীয়, মরক্কান, সুদানি, নাইজেরীয়, সেনেগালিজ, বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন।

অনেক অভিবাসী সেউতার এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। খড়, কাপড় ও হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বানানো এসব আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন তারা।

খাবার ও পানির সংকটের পাশাপাশি মানবেতর পরিবেশে দিন কাটছে তাদের। কেউ সমুদ্রের পানিতে কাপড় ধুচ্ছেন, কেউ কার্ডবোর্ডের ওপর ঘুমাচ্ছেন।

আটকে পড়াদের একজন ইরাকের মসুলের তরুণ আবদুলরহমান। কয়েক বছর মরক্কোয় থাকার পর তিনি সেউতায় পৌঁছান। এখন তার আশা, স্পেনে নিজের অবস্থান বৈধ করে সুইডেনে যেতে পারবেন, যেখানে তার এক আত্মীয় থাকেন।

সিরিয়ার এক নাগরিক মোহাম্মদও সেউতায় আটকে আছেন। তিনি জানান, মরক্কো থেকে একটি সিরীয় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেন। পরে কয়েকজন সিরীয়কে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হলেও তিনি থেকে যান। তার সন্তান এখনো মরক্কোতে রয়েছে।

ইয়েমেনের আবদুলমাজিদ মূল প্রবেশের এক দিন আগে প্রায় আট কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান। এরপর থেকে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছেন তিনি। ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্পেন তার আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন তিনি।

মিসরীয় দুই অভিবাসী তারেক ও রমাদান জানান, তারা লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে সেউতায় পৌঁছেছেন। লিবিয়ায় যাত্রাপথে সহিংসতা ও গোলাগুলির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানান তারা।

সুদানের এক নাগরিক মুজাম্মিল জানান, ৩০ জুলাই সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর পর প্রথম তিন দিন তার কাছে খাবার ও পানি ছিল না। নাইজেরিয়ার কামারাও এখন ত্রাণ ও মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।

তবে আটকে থাকা সবার আইনি পরিণতি এক হবে না। স্পেন প্রত্যেকের আশ্রয়ের আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করবে।

দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেটির সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। তবে আবেদন করলেই আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

এদিকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর কারণে সেউতার আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা আশ্রয় ও অভ্যর্থনা ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। আশ্রয়ের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে পুলিশের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াতেও অনেকে সমস্যায় পড়ছেন।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ অভিবাসী চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এখনো ২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

রোববার সেউতায় শত শত অভিবাসী বিক্ষোভ করেছেন। তারা আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ এবং মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতায় আরও ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে স্পেন। এতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে বড় আকারের সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে মরক্কোও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।

সূত্র: শাফাক নিউজ

অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত
অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

Monday, August 3, 2026

সমুদ্রে ভেসে থেকে কীভাবে ৪০ ঘণ্টা বেঁচে ফিরলেন রাফি?

ভূমধ্যসাগরে একটি ভাসমান রিং আর ফ্লিপারের সাহায্যে টানা ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ভেসেছিলেন তিনি। মৃত্যুভয় তাকে গ্রাস করেছিল। কয়েকটি জাহাজ তার পাশ দিয়ে গেলেও কেউ তাকে উদ্ধার করেনি। ২৩ বছর বয়সী রাফি নাদি শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকলেন শুধুই আশা আর প্রার্থনার ওপর ভর করে। পাঁচ বছর আগে তিনি পরিবারকে সাহায্য করার জন্য মিশর ছাড়েন। এবার তিনি প্রাণপণে প্রার্থনা করেন যেন ইউরোপে পৌঁছাতে পারেন এবং জীবিত অবস্থায় আবারও মায়ের মুখ দেখতে পান। রাফি নাদি’র এই চিত্র তুলে ধরেছে লন্ডনের অনলাইন গার্ডিয়ান। এতে আরও বলা হয়, জুলাই মাসে তার উদ্ধার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। অতিরিক্ত রোদ আর লবণাক্ত পানিতে ঝলসে যাওয়া চামড়া, পানিশূন্যতা ও ভীষণ ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাকে দেখা যায় এক নৌকার ডেকে লুটিয়ে পড়তে।

স্পেনের বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে যাচ্ছিল একটি পরিবারের নৌকা। তারা তাকে দেখে প্রথমে তাকে টেনে তোলে। পরে স্পেনের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী জাহাজ এসে তাকে মালাগার বন্দরে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে পুলিশ ও রেডক্রসের কাছে হস্তান্তর করে। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দেয়, ইউরোপ সীমান্ত বন্ধ করতে থাকায় অভিবাসীরা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, শুধু গত বছরই কমপক্ষে ৫৭২ জন মানুষ উত্তর আফ্রিকা থেকে স্পেনে পৌঁছাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। রাফি নাদি জানান, ১৭ জুলাই ২০২৫ রাতে মরক্কোর ফনিদেক উপকূল থেকে তিনি ও তার ১৭ বছর বয়সী এক বন্ধু সমুদ্রপথে সেউতা পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। পরিকল্পনা ছিল ৫-৬ ঘণ্টায় সেউতায় পৌঁছে যাবেন। কিন্তু ভোরে সূর্য ওঠার পরও তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর আগে  রাফি নাদি চারবার সেউতার সীমান্ত প্রাচীর টপকাতে ব্যর্থ হন। তাই তারা বিকল্প পরিকল্পনা করেন- অল্প টাকায় ভাসমান রিং, ফ্লিপার আর ডাইভিং স্যুট কিনে নেন। দু’জনেই ভালো সাঁতার জানতেন। তাই পাচারকারীদের ৩-৪ হাজার ইউরো দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় এই পথই তাদের কাছে ভরসা মনে হয়।

রাত ১২টার দিকে সেনাদের চোখ এড়িয়ে তারা পানিতে নামে। বলেন, আমরা সাঁতার কাটলাম, কাটলাম আর কাটলাম। কিন্তু পূর্বাভাসে শান্ত সমুদ্রের কথা বলা হলেও সেদিন ঢেউ খুব উঁচু ছিল। সকালে টানা আট ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর ঢেউয়ের তোড়ে তার বন্ধুর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। রাফি নাদি বলেন, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। তখন চারপাশে শুধু পানি আর পানি। মৃত্যুভয়ে কাঁপছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো বোট আমাকে টেনে তুলবে। আমি আল্লাহকে ডাকছিলাম, যেন মায়ের কষ্ট না বাড়ে। অন্তত পাঁচটি জাহাজের কাছে সাহায্য চাইতে চেষ্টা করেন তিনি। বলেন, আমি হাত নেড়ে, চিৎকার করে বলেছি- ‘হেল্প, হেল্প’। একটি জাহাজ এতটাই কাছে এসেছিল যে লোকজন স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। জীবনের লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি শুধু ভেসে থাকার শক্তি জোগাড় করতে। দুই রাত আরও একটি দিন কেটে যাওয়ার পর দূরে একটি বোট দেখতে পান। তিনি মরিয়া হয়ে হাত নাড়তে থাকেন। অবশেষে নৌকার মানুষরা দূরবীন দিয়ে তাকে দেখে দড়ি ছুড়ে দেয়। রাফি আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, আমি দড়িটা আঁকড়ে ধরি। তারা আমাকে ওপরে তোলে, খাবার, পানি ও পোশাক দেয়।

উদ্ধার মুহূর্তটি ভিডিওতে ধরা পড়ে। স্পেনের বেনালমাদেনা উপকূল থেকে প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে, অর্থাৎ শুরুর স্থান থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে তাকে পাওয়া যায়। রাফি নাদি বলেন, যদি ওই বোট আমাকে না তুলত, আমি হয়তো আর বাঁচতে পারতাম না। আরও খুশির খবর পান পরে- তার বন্ধু মালাগার কাছাকাছি সমুদ্রতটে নিরাপদে উদ্ধার হয়েছে। রাফি বলেন, আমি তার কণ্ঠ শুনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি।
দুই সপ্তাহ রেডক্রস শিবিরে থাকার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কারণ স্পেন ও মিশরের মধ্যে ফেরত পাঠানোর কোনো চুক্তি নেই। আন্তর্জাতিক আইনে তিনি আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন, যদিও মিশরীয় নাগরিক হিসেবে তার সুযোগ খুবই কম। এখন তার চিন্তা নতুন জীবনের। বলেন, ভাবছিলাম স্পেনে এসে সাথে সাথেই কাজ শুরু করব। কিন্তু আসলে কাগজপত্র ছাড়া এখানে খুব কঠিন। কোনো কাজ পেলেই করতে চাই।
সমুদ্রে ভেসে থাকার সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এখনো তাকে তাড়া করে। বলেন, প্রতিবার ভিডিওটা দেখি, আমি বাঁচতে পেরেছি ভেবে আনন্দ পাই। কিন্তু আমি চাই না আর কেউ আমার মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাক।

mzamin

Sunday, August 2, 2026

অভিবাসীদের ঢল যেভাবে স্পেন-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও তিক্ত করল

আলজাজিরার বিশ্লেষণঃ উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউতায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসীর ঢলের পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে স্পেন সরকার। কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমান্ত অতিক্রম করা বেশির ভাগ মানুষই স্বেচ্ছায় আবার মরক্কো ফিরে গেছেন।

গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই অভূতপূর্ব ঢলে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে বা ছোট নৌকায় করে সিউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। অনেকে সীমান্ত ফটকে এত বেশি সংখ্যায় জড়ো হন যে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সামাল দিতে হিমশিম খায়। কেউ কেউ সীমান্তের বাঁধ ও কাঁটাতারের বেড়া টপকে ঢোকারও চেষ্টা করেন। এ সময় সিউতায় পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন একই সময়ে সিউতায় ঢোকার চেষ্টা করলেন, এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। ঘটনাটি যে নিছক কাকতালীয় নয়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে। তাহলে কি এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল? যদি হয়ে থাকে, তবে কারা এর পেছনে এবং উদ্দেশ্যই বা কী? এ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সিউতা কোথায়, কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সিউতা উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর, যার এক পাশে মরক্কো। মেলিলার সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকার মধ্যে থাকা মাত্র দুটি স্থলসীমান্তের একটি।

১৪১৫ সালে প্রথম পর্তুগালের দখলে যায় সিউতা। পরে ১৫৮০ সালে এটি স্পেনের অংশে পরিণত হয়। ১৬৪০ সালে পর্তুগাল স্বাধীন হলেও সিউতা স্পেনের অধীনেই থেকে যায়। আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পরও সিউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ দুটি ভূখণ্ড।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই এটি ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। শহরটি উঁচু সীমান্তবেষ্টনী, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্পেনের সিভিল গার্ড ও জাতীয় পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতির মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা হয়।

হঠাৎ অভিবাসীদের এত বড় ঢলের কারণ কী?

স্পেনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে স্পেনে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, আদালতের ওই রায়ের খবর এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর জানার কথা নয়।

উত্তর আফ্রিকায় অভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো এএফপিকে বলেন, সন্দেহ নেই, ৮ জুলাইয়ের রায়টি কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এত বড় মাত্রার মানুষের সমাবেশ ব্যাখ্যা করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিযোগ, মানব পাচারকারী চক্রগুলো আদালতের রায়কে অতিরঞ্জিত করে হাজার হাজার মানুষকে সিউতায় ঢোকার জন্য উৎসাহিত করেছে।

তবে আরেকটি আলোচিত ব্যাখ্যা হলো মরক্কো নিজেই হয়তো এই সীমান্ত ভাঙার ঘটনাকে নীরবে উৎসাহ দিয়েছে। মরক্কো কখনো সিউতা ও মেলিলার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেনি। তাদের দাবি, এগুলো মরক্কোর ভূখণ্ড এবং এখনো স্পেনের দখলে রয়েছে।

এ ছাড়া পশ্চিম সাহারা নিয়েও স্পেন ও মরক্কোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। ১৯৭৫ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা দখল করে নেয়। কিন্তু পলিসারিও ফ্রন্ট ওই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২১ সালের এপ্রিলে স্পেন মানবিক কারণে পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ব্রাহিম ঘালিকে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দেয়। এতে মরক্কো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। কারণ, ঘালিকে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা ও অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে।

এর জেরে মরক্কো মাদ্রিদ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ২০২১ সালের মে মাসে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। সে সময় প্রায় ১০ হাজার অভিবাসী সিউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল স্পেনের ওপর মরক্কোর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।

পরে ২০২২ সালে দুই দেশের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়। পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে প্রায় চার দশকের অবস্থান পরিবর্তন করে স্পেন মরক্কোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানায়। অনেকের ধারণা, সিউতা ও মেলিলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিকেই কূটনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল মরক্কো।

তবে সম্প্রতি সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনে পড়ে। কারণ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়া সফর করেন। আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে পলিসারিও ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং মরক্কোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

এ কারণে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, সিউতায় সাম্প্রতিক ঘটনাও হয়তো স্পেনকে নতুন করে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।

এর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কোথায়?

কিছু বিশ্লেষকের মতে, যদি মরক্কো সত্যিই এই পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকে, তাহলে তারা হয়তো একা নয়। কারণ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে এমন আরও কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

ইউরোপের মধ্যে পেদ্রো সানচেজকে সবচেয়ে প্রকাশ্য ফিলিস্তিনপন্থী নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একাধিকবার বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গণহত্যার শামিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়েও তিনি কড়া সমালোচনা করেছেন।

শুধু তাই নয়, স্পেনের যৌথভাবে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করারও অনুমতি দেননি তিনি।

অন্যদিকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে স্পেনের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছেন।

মরক্কো-ইসরায়েল সম্পর্ক

স্পেনের তুলনায় মরক্কোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি জাহাজ, যাতে ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র বহন করা হচ্ছিল, সেটিকে স্পেনের আলহেসিরাস বন্দরে ভিড়তে দেয়নি মাদ্রিদ। পরে জাহাজটি মরক্কোর বন্দরে যায়।

একই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রার পথে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ স্পেনে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে মরক্কোর তানজিয়ার বন্দরে জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহ করে।

ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিকই মনে করেন, স্পেন একদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে নিজেই আরব ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।

২০১৯ সালে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু সামাজিকমাধ্যমে সিউতা ও মেলিলার মানচিত্র প্রকাশ করে লিখেছিলেন, প্রিয় আরব ও মুসলিমরা, দখলকৃত আরব-ইসলামী ভূমি মুক্ত করতে চাইলে এখান থেকেই শুরু করুন।

চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক মিডল ইস্ট ফোরামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষক মাইকেল রুবিন লিখেছিলেন, মরক্কোর উচিত সীমান্তে বুলডোজার নিয়ে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সিউতা ও মেলিলা পুনর্দখলের উদ্যোগ নেওয়া।

এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মরক্কোর বিশ্লেষক আমিন আইয়ুবও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সম্পর্কে টানাপোড়েন মরক্কোর জন্য সিউতা ও মেলিলা প্রশ্নে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের মাধ্যমে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে রাবাতকে সমর্থন দিতে পারে।

শুক্রবার, যখন হাজার হাজার অভিবাসীর ঢলে সিউতা কার্যত অচল, তখন জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মন্তব্য করেন, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

তিনি লেখেন, স্পেন কখনো ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে না। অথচ এখন সিউতায় নিজেদের অভিবাসন নীতির কারণে তাদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে। অন্যদের শিক্ষা দেওয়ার আগে স্পেনের উচিত বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা করা তারা এখনো কেন আফ্রিকায় উপনিবেশ ধরে রেখেছে।

ড্যাননের এই মন্তব্যের জবাবে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বলেন, আচ্ছা, এখন অনেক কিছুই যেন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

তার এই মন্তব্যকে অনেকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি হয়তো মনে করছেন, সিউতার সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে ইসরায়েলেরও কোনো না কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।

মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি মনোভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

সম্প্রতি মরক্কো পশ্চিম সাহারার একটি ১ হাজার ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের নাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখার ঘোষণা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর একটি ছিল মরক্কো। ওই চুক্তির মাধ্যমে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।

এর বিনিময়ে পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে জাতিসংঘ এবং দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে অঞ্চলটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে রাবাত।

প্রমাণ নেই, তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে

সিউতায় অভিবাসীদের ঢল সংগঠিত করতে মরক্কো ইসরায়েলের হয়ে কাজ করেছে এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবে একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট সিউতার সাম্প্রতিক সংকট স্পেনের বামপন্থি প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং ইসরায়েলের ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের মধ্যকার আগেই তিক্ত হয়ে ওঠা সম্পর্ককে আরও শীতল করে তুলেছে।

সূত্র : আল জাজিরা 

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।। ছবি : সংগৃহীত
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।। ছবি : সংগৃহীত

Tuesday, July 21, 2026

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল by নজরুল ইসলাম

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন ১৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ তরুণ লামিনে ইয়ামাল অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো। এটি কেবল সান্ত্বনার কোলাকুলি ছিল না, বরং ছিল বিশ্বফুটবলের রাজদণ্ড এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের প্রতীক।

নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন ৩৯ বছর বয়সি মেসির নাম ধরে চিৎকার করছিলেন, তখন হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক তার শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। আর ঠিক সে মুহূর্তে বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী ইয়ামাল জড়িয়ে ধরলেন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের র‍্যাফেলের অংশ হিসেবে ২০ বছর বয়সি মেসির কোলে থাকা ছয় মাসের শিশু ইয়ামালের সেই ভাইরাল ছবিটির বৃত্ত যেন আজ সম্পূর্ণ হলো। সেই শিশুটিই আজ বিশ্বজয়ী পুরুষ।

দুবছর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের ইউরো জয়ের নায়ক ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে একপ্রকার ‘পূর্ণতা’ দিলেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে খেলতে আসা এই তরুণ মাত্র ১৯ বছর ছয়দিন বয়সে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপ ও ইউরো জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন।

ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালের উপস্থিতি ছিল স্পেনের নিখুঁত ও নান্দনিক কৌশলের মূল ভিত্তি। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। স্পেনের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও হারেননি ইয়ামাল। তাছাড়া বড় টুর্নামেন্টে মূল একাদশে থেকে টানা ১৩ ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়েছেন, যা ইউরোপীয় ফুটবলে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। পেলে (১৯৫৮), জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২) এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের (২০১৮) পর ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মূল একাদশে খেলে শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করলেন ইয়ামাল ও তার সতীর্থ পাউ কুবার্সি।

আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোসহ প্রতিপক্ষের চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ উড়িয়ে দিয়ে মাঠে শান্ত ছিলেন ইয়ামাল। তার এই পরিপক্বতা দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্টসের পণ্ডিত জো হার্ট বলেন, ‘লামিনে ইয়ামাল কেবল প্রতিক্রিয়াই দেখায়নি, সে বুক চিতিয়ে লড়েছে। পুরো দল তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শান্ত ছিল সে। ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েদিল।’

অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেনের নতুন এই সোনালি অধ্যায় লেখা হয়েছে। ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামালের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ও দারুণ ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরো পরিপক্ব হতে সাহায্য করবে। দলের জন্য ও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।’

রদ্রিগোর মতো অভিজ্ঞ অধিনায়কের ছায়ায় এবং নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভায় ভর করে ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বজয় করেছে। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণের সামনে যে আরো কত সাফল্য অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল
বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে লামিনে ইয়ামাল

Monday, July 20, 2026

স্পেনের জয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী মানুষকে আনন্দিত করেছে, বলল ইরান

বিশ্বকাপে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ে দেশটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইরান। সোমবার এক বিবৃতিতে তেহরান জানায়, স্পেনের এই জয় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্বাধীনতাকামী মানুষকে আনন্দিত করেছে।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর নিন্দা ও ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতের সমালোচনা করায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সমর্থন কুড়ায় স্পেন সরকার ও তাদের জাতীয় ফুটবল দল। কয়েক মাস ধরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ছিল দেশটি।

আরেক দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নীতিগুলোকে সমর্থন করেন। আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও সমর্থকও। রোববার নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খেলোয়াড়দের অবস্থান এবং ইরানের প্রতি স্পেনের সমর্থন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা সেই (স্পেন) বুদ্ধিমান ও সম্মানীয় জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’

বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, ‘এই জয় কেবল স্পেনের জনগণের হৃদয়কেই স্পর্শ করেনি, বরং বিশ্বের বহু স্বাধীন, সার্বভৌম ও ন্যায়বিচারকামী মানুষের হৃদয়কেও আনন্দিত করেছে।’

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও স্পেনকে সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আগ্রাসন, গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পেনের সার্বিক অবস্থান এবং তাদের জাতীয় ফুটবল দলের আচরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মূল্যবান ছিল।’

স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল
স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল। রয়টার্স

Tuesday, July 7, 2026

শত ফিলিস্তিনিকে নিজ দেশে নিলো স্পেন

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে গুরুতর অসুস্থ ও আহত ২০ ফিলিস্তিনি শিশুকে চিকিৎসার জন্য স্পেনে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদেরসহ মোট ১০০ ফিলিস্তিনি বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করছেন। এটি স্পেনের ষষ্ঠ মেডিকেল ইভাকুয়েশন কর্মসূচির অংশ।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে আসা এসব শিশু এখন স্পেনের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে। তিনি বলেন, তারা ভয় নিয়ে এসেছে, তবে তাদের সঙ্গে নতুন আশাও আছে।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, কোনো শিশুরই গাজার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হওয়া উচিত নয়। তিনি জানান, চিকিৎসা শেষে এসব শিশুর নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

গাজা যুদ্ধের শুরু থেকেই স্পেন ইসরায়েলের সমালোচনামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে, তেল আবিব থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে।

২০২৪ সালের মে মাসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে স্পেন ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কে আরও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। 

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

২০ শিশুসহ ১০০ ফিলিস্তিনিকে চিকিৎসার জন্য আশ্রয় দিল স্পেন

গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনের ২০ শিশুকে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চিকিৎসার জন্য আশ্রয় দিয়েছে স্পেন। দেশটির চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর কর্মসূচির আওতায় তাদের স্পেনে নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিভিন্ন স্প্যানিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে।

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, এসব শিশু নৃশংসতাকে পেছনে ফেলে আমাদের হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে এসেছে।

তিনি বলেন, তারা ভয় নিয়ে এসেছে, তবে সঙ্গে আশা নিয়েও এসেছে এবং তাদের আগমনকে জাতীয় গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, কোনো মানুষ, বিশেষ করে কোনো শিশুরই গাজায় চলমান বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত নয়।

তিনি জানান, বর্তমানে চিকিৎসার জন্য ২০ শিশুসহ মোট ১০০ জন ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দিয়েছে স্পেন। তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাকে তিনি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনিদের নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অধিকার রক্ষার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

মূলত গাজায় চলমান যুদ্ধের বিরোধিতার অংশ হিসেবেই স্পেনের এই উদ্যোগ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি স্থগিতের আহ্বান, তেল আবিব থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

২০২৪ সালের মে মাসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই মাদ্রিদ ও তেল আবিবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ আরও গভীর হয়।

সূত্র : মিডল ইস্ট মনিটর

ফিলিস্তিনি শিশু। ছবি : সংগৃহীত
ফিলিস্তিনি শিশু। ছবি : সংগৃহীত

Friday, July 25, 2025

আলহামরা: স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন by মো. রাশেদুল আলম

স্পেনের গ্রানাডা প্রভিন্সে মুসলিম সভ্যতার নিদর্শন ঐতিহাসিক আলহামরার আয়তন ৩৫ একর। বিশাল এই কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হয় ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ শতকে। আরবি শব্দ আল-কালাত-আল-হামরা থেকে আলহামরা নামটি এসেছে, যার অর্থ লাল দুর্গ।

ইতিহাস ও প্রাসঙ্গিক কথা—

গ্রানাডা শহর থেকে দূরে একটি মালভূমিতে নির্মিত আলহামরা তখন গ্রানাডার গভর্নর মুহাম্মেদ ইবনে আল আহমার, তিনিই আলহামরা নির্মাণের প্রদর্শক ও নাসরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। প্রধানত ১২৩৮ থেকে ১৩৫৮ সালের মধ্যে, ইবনে আল-আহমার ও তাঁর উত্তরসূরিদের শাসনামলে নির্মিত হয় আলহামরা। অভ্যন্তরের চমৎকার অলংকরণগুলো নির্মাণ করেন প্রথম ইউসুফ (মৃত্যু ১৩৫৪)। ১৪৯২ সালে মুরদের পরাজয়ের পর, অভ্যন্তরটির বেশির ভাগ অংশ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং মূল্যবান আসবাব ধ্বংস বা অপসারণ করা হয়। স্পেনের শাসক চার্লস পঞ্চম (১৫১৬-৫৬) একটি ইতালীয় প্রাসাদ নির্মাণের জন্য আলহামরার কিছু অংশ খুলে নিয়ে যান। ১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ১৮২১ সালের ভূমিকম্পে কমপ্লেক্সের আরও ক্ষতি সাধিত হয়।

আলহামরা বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আলয়ে অবস্থিত। যে মালভূমিতে এটি নির্মিত, সেটি গ্রানাডার মুরিশ মুসলিমদের পুরোনো শহর। মালভূমির গোড়ায় দারো নদী উত্তরে গভীর খাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রাসাদের বাইরের উদ্যানটি মুররা গোলাপ, কমলা ও চিরহরিৎ বৃক্ষ রোপণ করে সাজিয়েছিল। উদ্যানের নিচের প্রবেশদ্বার, বাংলায় বলা যায় ডালিমের গেট, ১৬ শতকে তৈরি বিশাল বিজয়ের খিলান। ১৫৫৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল, আলহামরার প্রধান প্রবেশদ্বার। আরও একটি বর্গাকার টাওয়ার ঘোড়ার নালের মতো খিলানপথ, যা মুররা বিচারের স্থান বা আদালত হিসেবে ব্যবহার করত।

অভ্যন্তরে সিংহাসন কক্ষ বা ‘হল অব দ্য অ্যাম্বাসেডরস’ আলহামরার বৃহত্তম কক্ষ। কক্ষটি ৩৭ ফুট এবং শীর্ষে একটি গম্বুজ, যার কেন্দ্র ৭৫ ফুট উচ্চ। বিশাল অভ্যর্থনাকক্ষ এবং সুলতানের সিংহাসনটি প্রবেশদ্বারের বিপরীতে স্থাপন করা হয়েছিল। গ্রানাডার শেষ সুলতান বোবদিল এই কক্ষে একটি ভোজসভায় আমন্ত্রিত অতিথিদের গণহারে হত্যা করেছিলেন। সিলিংটি নীল, বাদামি, লাল এবং সোনায় চমৎকারভাবে সজ্জিত। হলের মাঝখানে একটি ফোয়ারা এবং পুরো কক্ষটি উপদেশমূলক বাক্য ও কোরআনের সুরায় উৎকীর্ণ মুরিশ স্ট্যালাকটাইটের কাজের একটি অসামান্য উদাহরণ। এ ছাড়া আলহামরায় রয়েছে তিনটি প্যালেস, প্যালেস অব লায়ন্স, পোর্টাল প্যালেস ও কোমারেস প্যালেস। রয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা, হল অব দ্য কিংস, কোর্ট অব লং পন্ডস, কোর্ট অব মিরলেস ইত্যাদি।

স্পেনে মুসলিম সভ্যতা ও স্থাপনাগুলো দেখার ইচ্ছা ছিলো স্কুলজীবন থেকেই। বিশেষ করে আলহামরা। বছর কয়েক আগে মুসলিম সভ্যতায় উদ্ভাসিত ঐতিহাসিক টলেডো দেখে এসেছি। টলেডোকে বলা হয় ‘স্পেনের আত্মা’। পবিত্র জেরুজালেম নগরীর পরই টলেডোর স্থান, যেখানে খ্রিষ্টান, ইহুদি ও মুসলিম সম্প্রদায় পাশাপাশি বাস করে টলেডোকে ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে গেছেন। ভোর ছয়টায় স্টকহোম থেকে উড়াল দিয়ে আন্দালুসিয়ার প্রধানতম বিমানবন্দর মালাগায় এসে যখন নামলাম, তখন সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। সঙ্গে খুব একটা লাগেজ নেই, শুধু দুজনার দুটি ব্যাগ। দ্রুত ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেই আমাদের গাইডের সঙ্গে দেখা হলো। ৪০–৪২ বছর বয়েসের সুঠাম দেহি এক নারী আনিকা এলওইং। আনিকা জন্মগতভাবে সুইডিশ তবে ২৩ বছর ধরে স্পেনেই বসবাস, তাই সুইডিশ ও স্প্যানিশ—দুটি ভাষাতেই দক্ষ। স্পেনে ভাষাগত অসুবিধে ব্যাপক। স্প্যানিশরা স্প্যানিশ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় বলে না বোঝেও না, ইংরেজি তো নয়ই। স্কুল–কলেজে সরকারিভাবে স্প্যানিশ ভাষাটিই শিক্ষা দেওয়া হয়, ইংরেজি নয়। ইংরেজি শিখতে হলে প্রাইভেট ‍শিখতে হয় আর তা ব্যয়বহুল বলে স্প্যানিশরা এড়িয়ে গেছে। রাস্তাঘাটের দিকনির্দেশনাগুলোও স্প্যানিশ ভাষায়, বোঝার উপায় নেই তাই আনিকাই আমাদের ভরসা।

মালাগা থেকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা ট্যুরিস্ট বাস যাত্রার পর এলাম ঐতিহাসিক গ্রানাডায় আমাদের নির্ধারিত হোটেলে। ঝকঝক তকতকে বিশাল কামরা। উষ্ণ সাওয়ার নিতে নিতেই আলহামরা দেখার সময় হয়ে এল। দীর্ঘ প্লেন–যাত্রার জন্যই হোক বা অন্য উপসর্গ হোক ডান দিকের পায়ে পেইন অনুভব করছিলাম। হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। শুনেই আনিকা ছুটে এলেন। ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে গেলাম ফার্মাসিস্টের কাছে। আনিকা স্প্যানিশ ভাষায় সব বুঝিয়ে বলার পর ফার্মাসিস্ট একটি ইলাস্টিক ব্যান্ড ও মাসল রিল্যাক্সের ট্যাবলেট দিলেন। এখানেও ইংরেজি কোনো কাজে এল না, স্প্যানিশ ছাড়া। মাসল রিল্যাক্সের যে প্যাকেট পেলাম, সেখানে সবই স্প্যানিশে নির্দেশনা দেওয়া,কী বিপদ! হোটেলের কাছেই আলহামরা, ১০–১৫ মিনিটের হাঁটা রাস্তা। ঠিক হলো, সবাই আনিকার সঙ্গে পায়ে হেঁটে চলে যাবে আর আমি একা ট্যাক্সি নিয়ে যাব। ট্যাক্সি ভাড়া খুবই কম, মাত্র পাঁচ ইউরো, সুইডেনের কোথাও পাঁচ ইউরোতে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না।

নির্ধারিত সময়ে হোটেল থেকে ট্যাক্সি নিয়ে আলহামরায় চলে এলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার নির্ধারিত স্থানে নামিয়ে সামনে একটি পথ দেখিয়ে দিলেন। বাঁধানো চত্বরটি পেরিয়ে গাছের নিচে বেদির কাছে এসে দাঁড়ালাম। বিভিন্ন দেশের প্রচুর ট্যুরিস্ট আলহামরা দর্শনে এসেছেন। বেশ গরম তবে হাওয়া ঝিরঝিরে। ভিড়ের মধ্যে সবুজ মার্জিত পোশাকে এক স্প্যানিশ মেয়ে দাঁড়িয়ে। ভিড়ের মধ্যেও সতন্ত্র সে। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, সে ট্যুরিস্ট নয় বা কারও জন্য অপেক্ষা করছে না, মেয়েটি পেছনে ফিরতেই দেখা গেল পেছনে ইংরেজি অক্ষরের ‘আই’ সিম্বলটি, অর্থ্যাৎ ইনফরমেশন। গাছের নিচে বেদিতে বসে আনিকা ও অনান্যদের অপেক্ষা করছিলাম।

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে আলহামরার আর্কশনে আরেকজন এসেছিলেন তবে ট্যাক্সিতে নয়, খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে। সালটা ১৮২৯ এর বসন্ত। আমেরিকান লেখক ওয়াসিংটন আরভিং, স্পেনের মুসলিম অতীত ইতিহাসে আগ্রহ জাগাতে যাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মুরদের তৈরি সাজানো উদ্যান ডালিম গেটের ঠিক ভেতরে ‘টেলাস অব আলহামরা‘ লেখকের একটি মূর্তি রয়েছে। লেখক সেভিলা থেকে পাহাড়ি পথ পারি দিয়ে খচ্চরের পিঠে সওয়ার হয়ে গ্রানাডায় পৌঁছান। লেখক লিখেছেন সে সময়কার কথা, ‘স্পেনের বৃহত্তর অংশ কঠোর, বিষণ্ন। রুক্ষ পাহাড় ও দীর্ঘ বিস্তৃত সমভূমি, গাছপালাশূন্য এবং অবর্ণনীয়ভাবে নীরব ও একাকী। শকুন ও ঈগলকে পাহাড়ের চালে ঘুরে বেড়াতে ও সমভূমির ওপর উড়তে দেখা যায়, প্রকৃতি যেন আফ্রিকার বর্বর ও নির্জন চরিত্রের অংশীদার।

‘স্প্যানিশ খচ্চরচালকের কাছে গান ও ব্যালাডের এক অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে, যা দিয়ে তারা ভ্রমণের ক্লান্তিকে বিভ্রান্ত করে। খচ্চরচালকেরা উচ্চস্বরে এবং দীর্ঘ টান টান তালে গানগুলো উচ্চারণ করে আর খচ্চরের ওপর বসে অসীম গুরুত্বের সঙ্গে সময়কে তার গতিতে সুরের সঙ্গে ধরে রাখে। এই গানগুলো প্রায়ই মুরদের সম্পর্কে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রোমান্স অথবা কোনো সাধুর কিংবদন্তি অথবা কোনো প্রেমের কবিতা অথবা একজন সাহসী চোরাচালানকারী অথবা কঠোর ব্যান্ডোলেরো সম্পর্কে কিছু ব্যালাড। কারণ, চোরাচালানকারী ও ডাকাত স্পেনের সাধারণ মানুষের কাব্যিক নায়ক। প্রায়ই খচ্চরওয়ালাদের গান মুহূর্তের মধ্যে রচিত হয় এবং স্থানীয় দৃশ্য বা যাত্রার কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। গান গাওয়া ও ইম্প্রোভাইজ করার এই প্রতিভা স্পেনে প্রায়ই দেখা যায় এবং বলা হয় যে তারা মুরদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তারা যে অভদ্র এবং একাকী দৃশ্যগুলো চিত্রিত করে তার মধ্যে এই গানগুলো শোনার এক অদ্ভুত আনন্দের অনুভূতি আছে; যেমনটি হয় মাঝেমধ্যে খচ্চরের ঘণ্টার ঝনঝন শব্দও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। খচ্চরগুলো সারিবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে খাড়া খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসে।

প্রাচীন গ্রানাডা রাজ্য, যেখানে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম, স্পেনের সবচেয়ে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি। বিশাল সিয়েরা বা পাহাড়ের শৃঙ্খল, ঝোপঝাড় বা গাছবিহীন এবং বিভিন্ন মার্বেল এবং গ্রানাইট দিয়ে সজ্জিত, তাদের রোদে পোড়া চূড়াগুলোকে গভীর নীল আকাশের বিরুদ্ধে উঁচু করে তোলে; তবুও তাদের রুক্ষ বুকে সবুজ এবং উর্বর উপত্যকা, যেখানে মরুভূমি ও বাগান লড়াই করে ডুমুর, কমলা ও লেবু উৎপাদন করতে এবং গোলাপ ফুল ফোটাতে বাধ্য হয়।

এই পাহাড়ের জঙ্গলে পাহাড়ের মাঝখানে ঈগলের বাসার মতো নির্মিত প্রাচীর ঘেরা শহর ও গ্রাম, মুরিশ যুদ্ধক্ষেত্র অথবা উঁচু চূড়ায় স্থাপিত ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রহরী টাওয়ারের দৃশ্য, মনকে খ্রিষ্টীয় ও মুসলিম যুদ্ধের শৌর্যের দিনগুলোতে এবং গ্রানাডা বিজয়ের রোমান্টিক সংগ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই উঁচু সিয়েরা অতিক্রম করার সময় ভ্রমণকারীকে প্রায়ই নেমে যেতে হয় এবং তার খচ্চর বা ঘোড়াটিকে খাড়া খাড়া আরোহণ এবং অবতরণ বরাবর ওপরে ও নিচে নিয়ে যেতে হয়, যা সিঁড়ির ভাঙা ধাপের মতো। কখনো কখনো রাস্তাটি মাথা ঘোরানো খাড়া খাড়া, অন্ধকার ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নেমে যায়। কখনো কখনো পথটি জলের স্রোত দ্বারা পরিপূর্ণ, চোরাচালানকারীদের অস্পষ্ট পথের মধ্য দিয়ে সংগ্রাম করে; রাস্তার কোনো এক নির্জন অংশে পাথরের ঢিবির ওপর নির্মিত ডাকাতি ও খুনের স্মৃতিস্তম্ভ, অশুভ ক্রুশ ভ্রমণকারীকে সতর্ক করে যে সে ডাকাতদের আড্ডার মধ্যে আছে, সম্ভবত সেই মুহূর্তেই কোনো ব্যান্ডোলেরোর চোখের সামনে চলে আসবে। কখনো কখনো সরু উপত্যকা দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় সে একটি কর্কশ চিৎকারে চমকে ওঠে এবং তার ওপরে পাহাড়ের কোনো সবুজ ভাঁজে হিংস্র আন্দালুসীয় ষাঁড়ের একটি পাল দেখতে পায়। এই সবে আমি ভয়াবহতা অনুভব করেছি।

স্প্যানিশ ও ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি আরভিংয়ের আগ্রহ, অতীতের প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণের পাশাপাশি তিনি গ্রানাডা ভ্রমণে আসেন। তিনি বিশেষ করে আলহামরা এবং এর গল্প, কিংবদন্তি ও ইতিহাসের প্রতি আকৃষ্ট হন। গ্রানাডা ও আলহামরায় তাঁর সময়কাল তাঁর লেখায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, যার ফলে‘টেলস অব দ্য আলহামরার’ সৃষ্টি, যা প্রাসাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বর্ণনা, পৌরাণিক কাহিনি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে উদ্ভাসিত করে। 

১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়
১৮১২ সালে আলহামরার কয়েকটি টাওয়ার ফরাসি বাহিনী উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাকি ভবনগুলো অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ছবি: লেখকের পাঠানো

Tuesday, May 27, 2025

আগামী মাসে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে মাল্টা: ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান স্পেনের

আগামী মাসে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে মাল্টা। মাল্টার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট অ্যাবেলা রোববার এ ঘোষণা দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আনাদোলু। মাল্টা টুডে’কে উদ্ধৃত করে খবরে বলা হয়, একটি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকালে অ্যাবেলা স্থানীয় ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে গাজার মানবিক সংকট বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

প্রধানমন্ত্রী অ্যাবেলা বলেন, আমরা এই মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। এই ট্রাজেডি প্রতিদিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তিনি গাজায় চালানো ইসরাইলের নৃশংস বোমাবর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, এতে প্রায় ৫৪,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই নারী ও শিশু। অ্যাবেলা আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে ২০ জুনের এক সম্মেলনের পর।

মাল্টা এই ঘোষণার মাধ্যমে স্পেন, নরওয়ে এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোর কাতারে যোগ দিচ্ছে। এসব দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং গাজার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান স্পেনের

গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন থামাতে এবার আরও জোরালো পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিল স্পেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেছেন, এই যুদ্ধের আর কোনও যৌক্তিক লক্ষ্য নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ।

রোববার স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ২০টি ইউরোপীয় ও আরব দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নেয়। বৈঠকের মূল লক্ষ্য- এই যুদ্ধ থামানো এবং গাজায় বাধাহীন, নিরপেক্ষ ও ব্যাপকভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা। আলবারেস বলেন, ইসরাইল যেন নির্ধারণ না করতে পারে কে খাবে আর কে খাবে না। খাদ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার একটি মৌলিক মানবিক অধিকার।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা ইসরাইলের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতা চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন করবে। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আলবারেস বলেন, এখন সময় এসেছে সব ধরনের পদক্ষেপ নিষেধাজ্ঞাসহ বিবেচনায় আনার। যুদ্ধ থামাতে যা কিছু সম্ভব, তা করতে হবে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে ইউরোপ ও আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তুলতে চায় স্পেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সম্মেলন থেকে নিষেধাজ্ঞার বাস্তব পদক্ষেপ বা প্রস্তাবনা আসে, তবে সেটি হবে গাজা যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপগুলোর একটি।

mzamin

Saturday, December 7, 2024

স্পেনের সামান্য এক পদক্ষেপেই ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা সামরিক শক্তিধর দুই দেশকে একসঙ্গে চটিয়ে তুলেছে স্পেন। দেশটির সামান্য এক পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে পরম মিত্র ইসরায়েল। এ জন্য স্পেনকে হুমকিও দিয়েছে ওয়াশিংটন। মনে করা হচ্ছে, ওয়াশিংটনের পাল্টা পদক্ষেপে বিপদে পড়তে পারে স্পেন।

এক সময় মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ রচিত হয়েছে এই স্পেনেই। সেই স্পেন এবার ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে। গত মে মাসে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় দেশটি। তবে এবার এমন এক পদক্ষেপ নিয়েছে স্পেন, তাতে আর মাথা ঠান্ডা থাকেনি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কারোরই। বলা হচ্ছে, অস্ত্র নিয়ে ইসরায়েলগামী জাহাজকে নিজেদের বন্দরে ভিড়তেই দেয়নি স্পেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামুদ্রিক কমিশন বলছে, এ ধরনের তিনটি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার শিকার জাহাজগুলোর মধ্যে দুটি মার্কিন পতাকাবাহী ছিল। বৃহস্পতিবার ফেডারেল রেজিস্ট্রারে একটি নোটিশ বলা হয়, কমিশন উদ্বিগ্ন যে কিছু জাহাজে প্রবেশে বাধা দেওয়ার এই আপাত নীতি বৈদেশিক বাণিজ্যে শিপিংয়ের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করবে।

এখন অভিযোগ প্রমাণিত হলে শত শত কোটি টাকার জরিমানা হতে পারে স্পেনের। জেরুজালেম পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সমুদ্রযাত্রাপ্রতি সর্বোচ্চ ২৩ লাখ ডলার জরিমানা হতে পারে। এ ছাড়া স্পেনের জাহাজকেও মার্কিন বন্দরে প্রবেশে বাধা দেওয়া হতে পারে। ওই জাহাজগুলো স্পেনের বন্দরে ভিড়তে না দেওয়ার খবর গেল ১৯ নভেম্বর জানতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামুদ্রিক কমিশন।

একই মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানায়, ওই জাহাজে অস্ত্র থাকার কথা অস্বীকার করে শিপিং প্রতিষ্ঠান মায়েরস্ক। এর আগে গেল মে মাসে আরেকটি জাহাজ নিজেদের বন্দরে ভিড়তে দেয়নি স্পেন। এ নিয়ে স্পেনের কর্তৃপক্ষ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে গেল মে মাসে ডেনমার্কের পতাকাবাহী একটি জাহাজ নিজেদের বন্দরে ভিড়তে না দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে।

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী তখন জানিয়েছিলেন, ওই জাহাজ করেও ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো অস্ত্র যাওয়ার পেছনে আমরা আর কোনো ভূমিকা রাখতে চাই না। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি দরকার। এ কারণেই ইসরায়েলে অস্ত্র বহনকারী যে কোনও নৌযান, যেগুলো স্পেনের বন্দরে ভিড়তে চায়, সেগুলোকে প্রত্যাখ্যানের জন্য একটি নীতি চালু করা হবে।

মিশর ও তুরস্কের মতো মুসলিম দেশগুলো এখনও ইসরায়েলি জাহাজ বা ইসরায়েলগামী অন্য দেশের অস্ত্রবাহী জাহাজকে নিজ নিজ বন্দরে ভিড়তে দিচ্ছে। এ নিয়ে দেশগুলোর জনগণের মাঝে ক্ষোভ থাকলেও তা আমলে নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মুসলিম প্রধান দেশ না হয়েও স্পেনের এমন জোরালো পদক্ষেপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ছবি : সংগৃহীত
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ছবি : সংগৃহীত



Tuesday, October 15, 2024

‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ হলে যুদ্ধও বন্ধ হবে’

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ হলে যুদ্ধও বন্ধ হবে। সম্প্রতি ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে বক্তব্যকালে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

পেদ্রো সানচেজ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, যেমনটা স্পেন করেছে। এর কারণ খুবই সহজ এবং পরিষ্কার: অস্ত্র না থাকলে যুদ্ধও হবে না। একই কারণে, আমি বিশ্বাস করি ইউরোপীয় কমিশন, যা আমাদের আমাদের ইউরোপীয় দেশগুলোকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের অবিলম্বে সেই আনুষ্ঠানিক অনুরোধের জবাব দিতে হবে, যা স্পেন ও আয়ারল্যান্ড নয় মাস আগে দিয়েছিল। এবং যদি প্রমাণিত হয় যে ইসরায়েল মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, তাহলে ইউরোপের উচিত তেল আবিবের সাথে করা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করা।

তিনি আরও বলেন, একই কারণে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জাতিসংঘের সমর্থন আরও জোরদার করতে হবে। যেমনটি আপনারা জানেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী রোববার লেবাননে মোতায়েনকৃত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন, যা ইসরায়েল ও লেবাননের মতো বৈরি দুটি দেশের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্য কাজ করছে। স্পেন দেশ শুধু শান্তিরক্ষী মিশনে নেতৃত্বই দেয় না, যেখানে জেনারেল লাজারো নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বরং আমরা এই মিশনে ৬৫০ জন সৈন্যও পাঠিয়েছি। আমি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তারা অসাধারণ কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে। আমি এখান থেকেই বলতে চাই যে আমরা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর গতকালের বিবৃতির তীব্র নিন্দা জানাই।

লেবানন থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে পেদ্রো বলেন, লেবানন থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। আমাদের আন্তর্জাতিক আইনানুগতার প্রতি যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা রেজলিউশন ১৭০১ অনুযায়ী নির্ধারিত, আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে এখন যা ঘটছে তা দেখার পর। আমি আশা করি আমাদের আশপাশের অন্যান্য দেশগুলোও একই কাজ করবে। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জেগে ওঠার, দৃঢ়ভাবে কাজ করার। ইসরায়েলের জনগণের প্রতি আমাদের সহানুভূতি রয়েছে, তারা যা সহ্য করেছে, তা আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু একটি সরকার বা একজন প্রধানমন্ত্রী, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর, এই অঞ্চলে শক্তির মাধ্যমে একটি নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংস এবং বিশ্বের আরও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। সুতরাং, দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী এবং ন্যায্য শান্তি আসবে না। আমি নিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লক্ষ্য হল দুটি রাষ্ট্রের বিকল্প ও রাজনৈতিক সমাধানকে ধ্বংস করা।

ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পুতিনের যুদ্ধ ইউক্রেনে এখনও চলছে। যেমন আমি বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, এবং ইউরোপ তার জায়গা খুঁজছে। স্পষ্টতই বিশ্ব এখন এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে, আর গ্লোবাল সাউথ তাদের ন্যায্য অংশের দাবি করছে। এটিই সেই বহুমুখী বিশ্ব, যেখানে গণতন্ত্রের অবস্থান এখন মারাত্মকভাবে বিপন্ন। 

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ছবি : সংগৃহীত
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। ছবি : সংগৃহীত

Sunday, September 15, 2024

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান, স্পেনে বৈঠক

গাজা যুদ্ধের অবসান ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে স্পেনে একটি বৈঠক হয়েছে। ইউরোপীয় দুই দেশের পাশাপাশি কয়েকটি মুসলিম দেশের নেতারা শুক্রবার ওই বৈঠকে অংশ নেন। খবর এএফপির।

সম্প্রতি নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি স্পেনও ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের লক্ষ্যে এই বৈঠক আয়োজন করল দেশটি।

বৈঠকে নরওয়ে ও স্লোভেনিয়ার দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি অংশ নেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলও। মন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথে একটি আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরির চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।

মুসলিম দেশগুলোর প্রতিনিধির মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তাফা। পাশাপাশি অংশ নেন মিসর, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত আরব-ইসলামিক কনট্যাক্ট গ্রুপ ফর গাজার সদস্যরা। তবে ইসরায়েলের কোনো প্রতিনিধি ওই বৈঠকে ছিলেন না।

যুদ্ধের শুরু থেকেই গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। মূলত তার তৎপরতায় স্পেন গেল ২৮ মে আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। 

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে স্পেনে বৈঠক। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয়ে আলোচনা করতে স্পেনে বৈঠক। ছবি : সংগৃহীত

Sunday, September 8, 2024

অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সুসংবাদ দিল স্পেন

কাজের আওতায় অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সুসংবাদ দিয়েছে স্পেন। দেশটি এসব অভিবাসীদের নিয়মিত হওয়ার শর্তগুলো কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

শনিবার (০৭ সেপ্টেম্বর) অভিবাসনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশটির অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, ‘আররাইগো সোসিওলাবোরাল’ নামের নতুন রেসিডেন্স পারমিটের আওতায় তারা এ সুবিধা পাবেন।

স্পেনের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সরকার জানিয়েছে, অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য শিগগিরই নতুন একটি রেসিডেন্স পারমিট চালু করা হবে।

‘আররাইগো সোসিওলাবোরাল’ নামের নতুন এ রেসিডেন্স পারমিটের জন্য কতিপয় শর্ত পূরণ করতে হবে। এগুলো হলো :

১. আবেদনকারীকে অবশ্যই স্পেনের অনিয়মিত অভিবাসী হতে হবে। আগে কোনো ক্যাটাগরিতে নিয়মিত হলে তিনি এ সুবিধা পাবেন না। ২. আবেদনকারীকে দুই বছর ধরে স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দিতে হবে। স্পেন ত্যাগ বা ডিপোর্ট নোটিশ প্রাপ্তরা এ সুবিধা পাবেন না। ৩. আবেদনকারীকে একজন নিয়োগকর্তা বা একটি কোম্পানি স্বাক্ষরিত কাজের চুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। এতে তাকে স্পেনের ন্যূনতম কাঠামো অনুসারে বেতন পেতে হবে। এমনকি চুক্তির মেয়াদ তিন মাস হতে হবে।

৪. খণ্ডকালীন কাজ অথবা একাধিক নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট কাজের চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে। এসব চুক্তি মিলিয়ে সপ্তাহে কমপক্ষে ২০ কর্মঘণ্টার কাজ থাকতে হবে। আগের আইনে এটি ৩০ ঘণ্টা ছিল। নতুন আইনে ১০ ঘণ্টা কমানো হয়েছে।

৫. গত পাঁচ বছর স্পেন বা অন্য দেশে অবস্থান করলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা দিতে হবে। এক্ষেত্রে অপরাধে দণ্ডিত বা সাজাপ্রাপ্ত হলে তিনি অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

নতুন এ রেসিডেন্স পারমিট মূলত ২০২২ সালের আগস্ট মাস থেকে চলা কাঠামোর নতুন রূপ। ওই আইনে শ্রমিক সংকটে থাকা খাতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা এক বছর মেয়াদি রেসিডেন্স পারমিট পেতেন। তখন পর্যটন, পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে প্রশিক্ষণের শর্ত ছিল।

দেশটির ইন্টিগ্রেশন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের আইনানুসারে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত ২৩ হাজার ৯৭ জন অভিবাসী নিয়মিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৩৪৭ জন প্রশিক্ষণ শেষে কাজের চুক্তি পেয়েছিলেন। 

স্পেনের একটি স্থাপনার পাশে দেশটির পতাকা। ছবি : সংগৃহীত