Monday, January 5, 2026

গাজা দখলের ইসরায়েলি ‘হলুদ’ নকশা কি ঠেকাতে পারে ট্রাম্পের ২০ দফা by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা বন্ধ হওয়ায় বিদায়ী বছরটি ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বস্তির একমাত্র কারণ হয়ে থাকবে। তবে গাজা দখলে ইসরায়েলি নীলনকশা এবং পশ্চিম তীরে তাদের দখলদারির প্রসার আরও একটি কঠিন বছরের দুঃস্বপ্ন দেখাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০–দফা শান্তি প্রস্তাবের পথ ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় স্থায়ী শান্তি না ফিরলেও গত অক্টোবরে বন্ধ হয়েছে ইসরায়েলের চালানো দুই বছরের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। যদিও ‘একপক্ষীয়’ এই যুদ্ধবিরতিতে এখনো ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা। গাজাকে দুই ভাগ করে টানা ইসরায়েলের কথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা ‘হলুদ রেখা’ যে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ড দখলের নীলনকশা, তা দৃশ্যত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর প্রধান।

ইসরায়েলের নানা কূটকৌশল সত্ত্বেও নিজের ২০–দফা শান্তি প্রস্তাবের দ্বিতীয় ধাপ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। দ্বিতীয় ধাপের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় হলো—গাজা থেকে পুরোপুরি ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং সেখানে আন্তর্জাতিক একটি ‘অস্থায়ী’ বাহিনী মোতায়েন ও হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারে রাজি নয় ইসরায়েল আর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই কেবল অস্ত্র ছাড়তে সম্মত হামাস।

সবকিছু মিলিয়ে এখনো অনিশ্চিত গাজার ভবিষ্যৎ। ইসরায়েলের অব্যাহত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও গাজা দখলের পরিকল্পনার বিপরীতে হামাসের প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার—এ দুয়ের ফলে এ বছর বন্ধ হওয়া সংঘাত কত দিন টিকবে, নতুন বছরে তার ওপরই নজর থাকবে সবার।

‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’

গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। ওই দিন দক্ষিণ ইসরায়েলে ঢুকে নজিরবিহীন হামলা চালায় হামাসসহ গাজার স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলো। এ হামলাকে পুঁজি করে ওই দিনই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। বন্দিবিনিময়ের জন্য মাঝে কিছু দিনের বিরতি ছাড়া দুই বছর ধরে চলে এই হত্যাযজ্ঞ। ইসরায়েলি বাহিনীর ‘পোড়ামাটি নীতির’ ফলে বিরাণভূমিতে পরিণত হয় অবরুদ্ধ উপত্যকাটি। সর্বাত্মক অবরোধের কারণে গাজায় নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। দুধের অভাবে প্রাণ হারাতে থাকে শিশুরা।

ইসরায়েলের এই অমানবিক অবরোধ ভাঙতে সমুদ্রপথে গাজার উদ্দেশে রওনা হয় ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। এ ফ্লোটিলার প্রথম বহর ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়া ও ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে আরও নৌযান এ বহরে যুক্ত হয়। এ ছাড়া গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকে পরবর্তী সময়ে আরও কিছু নৌযান ত্রাণ নিয়ে বহরে যুক্ত হয়। নৌযানগুলোয় প্রতীকী হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানবিক কার্গোয় খাদ্য, চিকিৎসাসামগ্রী ও গাজার জনগণের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ছিল।

শুরুতে এই নৌবহরে ৫০টির বেশি জাহাজ ও অন্তত ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী শত শত আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক, কর্মী ও আইনপ্রণেতা ছিলেন। এই বহরে ছিলেন সুইডিশ জলবায়ু অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ ও বাংলাদেশি আলোকচিত্রী শহিদুল আলমও। ফ্লোটিলায় থাকা অধিকারকর্মীরা সমুদ্রে প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখোমুখি হন। এ ছাড়া মাল্টা ও ক্রিটের কাছে সন্দেহভাজন ড্রোন হামলার ঘটনাও ছিল। এতে কিছু নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। যখন ফ্লোটিলা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের কাছে পৌঁছায়, তখন বহরে ৪৪টি জাহাজ ছিল।

কিন্তু ফ্লোটিলার কোনো জাহাজকে শেষ পর্যন্ত গাজায় ভিড়তে দেয়নি ইসরায়েল। এই বহরের সব নৌযানের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। সেগুলোকে ইসরায়েলের সমুদ্রবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক করা হয় পাঁচ শতাধিক অধিকারকর্মীকে। অবশ্য পরে তাঁদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

‘অপারেশন গিডিয়নস চ্যারিয়ট’

চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন গিডিয়নস চ্যারিয়ট’ নামে গাজায় নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। মূলত গাজা নগরীকে লক্ষ্য করে এ হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এ অভিযান এড়াতে ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির বিনিময়ে দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় হামাস। ইসরায়েল সাড়া না দিলে যুদ্ধবিরতির এ প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়।

নতুন এই অভিযানের মাধ্যমে গাজা নগরীর অবশিষ্ট বাড়িঘর ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ অভিযান থেকে রেহাই পায়নি সেখানকার প্রায় অচল হাসপাতালগুলো এবং সেখানকার চিকিৎসক ও কর্মীরাও। এ ছাড়া বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিতে বিস্ফোরক ভর্তি চালকবিহীন সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় গাজায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি। গাজায় ইসরায়েলের চালানো হত্যাযজ্ঞকে জাতিসংঘ–সমর্থিত একটি কমিশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ট্রাম্পের ২০ দফা ও ‘একপক্ষীয়’ যুদ্ধবিরতি

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে এক পরিকল্পনা প্রকাশ করে হোয়াইট হাউস। তখন বলা হয়, উভয় পক্ষ পরিকল্পনার ২০–দফা প্রস্তাব মেনে নিলে যুদ্ধ মুহূর্তেই থেমে যাবে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গাজায় আটক সব জীবিত ও মৃত জিম্মিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে আর ইসরায়েলে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় গাজা শাসনের দায়িত্ব নেবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার। সেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি অস্ত্র ত্যাগ করবে। ইসরায়েলও গাজা দখল বা একে তার সঙ্গে যুক্ত করবে না। প্রস্তাবে গাজা উপত্যকার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স বা আইএসএফ) গঠনেরও কথা বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। চুক্তি অনুযায়ী জীবিত ও মৃত সব বন্দীকে হস্তান্তর করে হামাস।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলের হামলা থামেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রায় ৮০০ বার গাজায় হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৪১১ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর গাজা নগরীতে ইসরায়েলের হামলায় হামাসের সামরিক শাখা কাসাম ব্রিগেডের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার রায়েদ সাদ নিহত হন।

এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন গাজায় ৬০০ ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন বেসরকারি সরকারি সংস্থার মতে, বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ ট্রাক ত্রাণ নিয়ে প্রবেশ করতে পারছে। গাজায় প্রয়োজনীয় তাঁবু পর্যন্ত ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরায়েল।

এমনকি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে এখন পর্যন্ত মিসর সীমান্তবর্তী রাফাহ ক্রসিং খুলতে দেয়নি ইসরায়েল। এর ফলে গাজায় ত্রাণ প্রবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আর বছরের শেষ দিকে দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রবল বৃষ্টি আর কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া গাজার বাসিন্দাদের জীবন।

গাজা দখলের ‘হলুদ’ নকশা

যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপে উপত্যকাটিতে নির্দিষ্ট সীমারেখা বরাবর সেনা সদস্যের সরিয়ে নেয় ইসরায়েল। ওই সীমারেখাকে বলা হয় ‘ইয়েলো লাইন’ বা ‘হলুদ রেখা’। একটি খসড়া মানচিত্রে দেখা গেছে, হলুদ রেখা টেনে দেওয়ার মধ্য দিয়ে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

ওই হলুদ রেখার কাছে গেলেই ফিলিস্তিনিদের গুলি করে ও ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। ৬ ডিসেম্বর সাত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ বছর বয়সী এক নারী ও তাঁর ছেলেও ছিলেন।

গাজা নগরীতে তাঁদের দুজনকে একটি ইসরায়েলি ড্রোন তাড়া করে হামলা চালায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের পৃথক হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। ওই তিনজন ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করেছিলেন।

এই হলুদ রেখাই গাজা ও ইসরায়েলের ‘নতুন সীমান্ত’ হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াল জামির। সম্প্রতি গাজায় মোতায়েন করা ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি এ কথা বলেন।

হলুদ রেখা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের আর পিছিয়ে না নেওয়ার অর্থ হলো, গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইসরায়েলের। এর মধ্যে গাজার অনেক কৃষিজমি ও মিসরের সঙ্গে উপত্যকাটির রাফার সীমান্ত ক্রসিং রয়েছে।

ইয়াল জামির বলেন, ‘হলুদ রেখা হবে (ইসরায়েলের) নতুন সীমান্ত। এটি আমাদের সম্মুখ প্রতিরক্ষা রেখা হিসেবে কাজ করবে। এই রেখা বরাবর আমাদের অভিযান কার্যক্রম চলবে। গাজার বড় অংশে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা এই প্রতিরক্ষা রেখা থেকে সরব না।’

এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি সরকার গাজা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তারা বলেছে, ‘নতুন করে সন্ত্রাসের ঝুঁকি দেখা না দিলে’ তারা একটি বাফার জোন মেনে চলবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্তের এসব ফাঁকফোকর ইসরায়েলকে গাজায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করার সুযোগ দেবে।

আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের তোড়জোড়

চলমান যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী (আইএসএফ) মোতায়েন নিয়ে কাতারের রাজধানী দোহায় সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু হয়। এ আলোচনার নেতৃত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।

এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বাহিনীর নেতৃত্বের কাঠামোসহ অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নতুন বছরের প্রথম মাসেই বিভিন্ন দেশের সেনাদের গাজায় মোতায়েন করা হতে পারে।

এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গাজায় স্বাস্থ্য ও নির্মাণ-সংক্রান্ত কাজের জন্য সর্বোচ্চ ২০ হাজার সেনা পাঠাতে প্রস্তুত। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রিকো সিরাইত বলেন, ‘এটি এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে রয়েছে। যে বাহিনী মোতায়েন হবে, এখন তার গঠনপদ্ধতি প্রস্তুত করছি আমরা।’

তবে গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন এতটা সহজ হবে না। কারণ, এ বাহিনী কোথায় মোতায়েন করা হবে, সেটাই এখনো স্পষ্ট নয়। হামাস বলছে, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন হতে হবে সীমান্তে। অন্যদিকে, ইসরায়েল চায় গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হোক। আর ওই বাহিনীর হাতে অস্ত্র সমর্পণ করুক হামাস।

অবশ্য মার্কিন সূত্রগুলো বলছে, গাজায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ থাকা অংশে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।

পশ্চিম তীর গ্রাস করছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না দখলকৃত পশ্চিম তীরও। সেখানে নতুন করে আরও ১৯টি অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটি। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজেলাল স্মোতরিচ।

২১ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে স্মোতরিচ বলেন, নতুন বসতি স্থাপনের প্রস্তাব করেছিলেন তিনি নিজেই। সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের জুদেয়া ও সামারিয়া এলাকায় ১৯টি বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ নিয়ে বিগত তিন বছরে পশ্চিম তীরে ৬৯টি বসতি স্থাপনের অনুমতি দিল ইসরায়েল সরকার।

এমন সময় নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলো, যখন কয়েক দিন আগেই জাতিসংঘ থেকে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। পশ্চিম তীরে গড়ে তোলা ইহুদি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ উল্লেখ করে জাতিসংঘ তখন বলেছিল, কম করে হলেও ২০১৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনের এই ভূখণ্ডের অবৈধ বসতি স্থাপন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে জাতিসংঘ। সে সময় থেকে করা হিসাবের বরাতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘বিগত বছরগুলোয় অবৈধ বসতি স্থাপন দ্রুত বাড়তে দেখা গেছে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে অবৈধভাবে ১২ হাজার ৮১৫টি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।’

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে কম নৃশংসতা চালায়নি ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে অন্তত ১ হাজার ২৭ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। সেখানকার কয়েকটি শহরে সামরিক নিয়ন্ত্রণ পোক্ত করেছে ইসরায়েল।

শেষ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা বন্ধ হওয়ায় বিদায়ী বছরটি ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বস্তির একমাত্র কারণ হয়ে থাকবে। তবে গাজা দখলের ইসরায়েলি নীলনকশা এবং পশ্চিম তীরে তাদের দখলদারির প্রসার আরও একটি কঠিন বছরের দুঃস্বপ্ন দেখাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, এএফপি ও রয়টার্স

 গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান
গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলাকে নিশানা করলেন ট্রাম্প, এরপর কে by স্টিফেন ওয়ার্থাইম

গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন ট্রাম্প। এখন তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে উৎখাত করলেন। এরপর কোন দেশগুলো তাঁর নিশানা হতে যাচ্ছে?

‘একেবারে বুদ্ধিমানের কাজ’—ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে তখন ছিল উচ্ছ্বাস। সময়টা ছিল ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২। ভ্লাদিমির পুতিন কেবলই পূর্ব ইউক্রেনের কিছু অংশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং কথিত ‘শান্তিরক্ষী’ হিসেবে সেখানে রুশ সেনা পাঠিয়েছেন। পুতিনের পদক্ষেপে বেশ মুগ্ধ, এমনকি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সাবেক ও বর্তমান এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অবচেতন মনে ট্রাম্প তখন বলে ফেলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ সীমান্তেও আমরা এ কৌশল কাজে লাগাতে পারি।’

ট্রাম্প তখন জানতেন না যে তিনি একটি পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সূচনালগ্নে এ কথা বলছেন। যে আগ্রাসন প্রায় চার বছর ধরে চলছে এবং এখন পর্যন্ত ১৫ লাখের বেশি মানুষের হতাহতের কারণ হয়েছে এবং আরও হতাহত হচ্ছেন। একইভাবে ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন না যে ভেনেজুয়েলায় তিনি আসলে কী শুরু করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশ ইউক্রেন নয়, এমনকি এটি আফগানিস্তান, ইরাক বা লিবিয়ার মতোও নয়। কিন্তু নিকোলা মাদুরোকে ধরার জন্য সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি গত কয়েক দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা থেকে পাওয়া সবচেয়ে স্পষ্ট ও কষ্টার্জিত শিক্ষাটিকেও ছুড়ে ফেলেছেন; ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু জয়ী হওয়া কঠিন। আর একে প্রকৃত সাফল্যে রূপান্তর করা তো আরও দুরূহ।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্প কেবল প্রথম পদক্ষেপটি নিয়েছেন বলা যায়। তিনি ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থাকে এখনো পতনের দ্বারপ্রান্তে আনতে পারেননি; বরং কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে আসার মাধ্যমে এর মাথা ভেঙে দিয়েছেন মাত্র। যাহোক, যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া ভাষণে ট্রাম্পকে এক বিজয়ী বীরের ভূমিকায় দেখা গেছে। তিনি দীর্ঘক্ষণ তাঁর প্রদর্শিত ‘প্রচণ্ড সামরিক শক্তি’ নিয়ে বড়াই করেছেন, যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন কোনো ‘অপারেশনাল ট্রায়াম্ফ’ বা আভিযানিক সাফল্য নেই, যা পরবর্তী সময়ে কৌশলগত বিপর্যয়ের পথ তৈরি করেনি। এ ক্ষেত্রে বাগদাদে চালানো চোখধাঁধানো সামরিক অভিযানের কথা স্মরণ করা যায়।

ট্রাম্পের কথা শুনলে মনে হতে পারে, কঠিন অংশটুকু বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। এখন কেবল শান্তি, সমৃদ্ধি আর স্বাধীনতার শুরু। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা দেশটি চালাতে যাচ্ছি।’ আর তা করার জন্য ট্রাম্প দেশটিতে স্থলবাহিনী পাঠাতে আগ্রহী এবং দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনে উন্মুখ। মাদুরো-পরবর্তী শাসনের জন্য ট্রাম্পের ‘প্ল্যান এ’ ছিল মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মতো করে কাজ করতে সাহায্য করবেন। কিন্তু সেই ঘোষণার দুই ঘণ্টার মধ্যেই রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা। সেই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অবৈধ, সাম্রাজ্যবাদী দখলদার শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন, যারা দেশটি লুণ্ঠন করতে চাইছে।

‘প্ল্যান বি, অতঃপর’

ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী সময়ে যা-ই ঘটুক না কেন, এর পরিণতি কেবল দেশটিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই এ হামলার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য জাহির করতে চেয়েছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে আর কখনোই কোনো প্রশ্ন উঠবে না।’ গত মাসে প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’–এর একটি ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা অঞ্চল থেকে যেকোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব দূর করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো উপায় অবলম্বনের অধিকার দাবি করা হয়েছে। প্রশাসন তাদের এ বহুল প্রচারিত নীতিটি কেবল প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। ট্রাম্প নিজের দেশের কাছাকাছি থাকা পক্ষগুলোকে, যেমন অভিবাসী, গ্যাং এবং মাদক কার্টেল (মাদক কারবারি গোষ্ঠীগুলো)—যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিত্রিত করতে পছন্দ করেন; যারা বাইরে থেকে দেশটিতে অনুপ্রবেশ করছে এবং ভেতর থেকে একে ধ্বংস করছে।

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এ হামলা ক্যারিবীয় অঞ্চলে কয়েক মাস ধরে স্পিডবোটে চালিয়ে আসা তাঁর হামলার মাধ্যমে কী ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করেছে—যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের ক্লান্তিকর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধকে’ কথিত ‘নারকো-টেরর’ বা মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে রূপান্তর করছে। একসময় মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসীদের প্রতি যে শত্রুতা ছিল, তা এখন পশ্চিম গোলার্ধের আন্তসীমান্ত নানাবিধ হুমকির দিকে মোড় নিচ্ছে। এসব হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পের সংজ্ঞায় এতটাই ফাঁকফোকর রয়েছে যে এর আওতায় তিনি যাঁদের বারবার ‘ভেতরের শত্রু’ বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁরাও পড়েন। ভেনেজুয়েলা নিয়ে দেওয়া ভাষণের মাঝপথে ট্রাম্প হঠাৎ থেমে গিয়ে মার্কিন শহরগুলোতে টহল দেওয়ার জন্য পাঠানো সেনাদের সম্পর্কে যে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেছেন, তা মোটেও অকারণে ছিল না।

আজকের লক্ষ্য ছিল কারাকাস। আগামীকাল কী হবে? ট্রাম্প ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করে ফেলেছেন। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করা আর পানামা ক্যানেলে (পানামা খাল) মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন তিনি। এখন যেহেতু তিনি মাদুরোকে উৎখাত করেছেন, তাই একই যুক্তি ব্যবহার করে তিনি যেকোনো সংখ্যক দেশে হামলা চালাতে পারেন। গতকাল ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো’। এ একটি দাবিই মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালানোর জন্য ট্রাম্পের কাছে যথেষ্ট অজুহাত হতে পারে। এদিকে কিউবা সরকারের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত বলে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

যদি ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিও তৈরি হয়, অর্থাৎ যদি একটি স্থিতিশীল, তেলসমৃদ্ধ এবং মার্কিনপন্থী গণতন্ত্র হঠাৎ যাত্রা শুরু করে, তাহলে সেই সাফল্য এ প্রশাসনকে আরও উৎসাহী করে তুলতে পারে। এটি তারা নিজেদের পছন্দমতো এ অঞ্চলকে পুনর্গঠন করতে আর কত দূর যেতে পারে, সেটি খতিয়ে দেখতে উৎসাহী করতে পারে।

তবে সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি বাস্তবে খুব কমই ঘটে; বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঝটিকা সামরিক হামলার (হিট অ্যান্ড রান) ভাগ্য এবার ফুরিয়ে আসার সম্ভাবনাই বেশি। নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি বলেছিলেন, ‘শক্তিশালী দেশগুলো অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয় না।’ তাহলে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখন কোন ধরনের দেশ?

* স্টিফেন ওয়ার্থাইম, কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের আমেরিকান স্টেটক্রাফট প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো এবং ইয়েল ল স্কুলের একজন ভিজিটিং লেকচারার।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমাদের টেক্কা দিতে যেভাবে নিজস্ব ‘ম্যানহাটান প্রকল্প’ গড়ে তুলল চীন

উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত শেনঝেনের একটি পরীক্ষাগারে চীনের বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্রের প্রতিলিপি বা প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন, যা বানানো ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর চেষ্টা করে আসছে। এই যন্ত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টফোন এবং পশ্চিমা সামরিক আধিপত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনে সক্ষম।

চীনের বিজ্ঞানীরা ২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রোটোটাইপ যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। বর্তমানে পরীক্ষাধীন যন্ত্রটি প্রায় পুরো একটি কারখানার মেঝেজুড়ে বিস্তৃত। প্রকল্পটির সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তির মতে, নেদারল্যান্ডসের সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের সাবেক প্রকৌশলীদের একটি দল চীনের কোম্পানিটির এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি (ইইউভি) মেশিনটি রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়া (একটি যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ গঠন দেখে তা নতুন করে তৈরির প্রক্রিয়া) ব্যবহার করে তৈরি করেছে।

ইইউভি যন্ত্রগুলো প্রযুক্তিগত এক স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এগুলো এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট আলোর রশ্মি বা অতি বেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে সিলিকন ওয়েফারের ওপর মানুষের চুলের চেয়েও হাজার হাজার গুণ পাতলা সার্কিট খোদাই করে—যে সক্ষমতা বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। সার্কিট যত ছোট হয়, চিপ তত বেশি শক্তিশালী হয়।

চীনের তৈরি যন্ত্রটি কার্যকর অবস্থায় রয়েছে এবং সফলভাবে এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট আলো উৎপন্ন করতে পারছে। তবে এখনো কার্যকর চিপ তৈরি করতে পারেনি বলে প্রকল্প সম্পর্কে জানা দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন।

গত এপ্রিল মাসে এএসএমএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস্টোফ ফুকে বলেছিলেন, এমন প্রযুক্তি উন্নয়নে চীনের অনেক অনেক বছর লাগবে। কিন্তু রয়টার্স প্রথমবারের মতো যে প্রোটোটাইপের অস্তিত্বের কথা জানাচ্ছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্লেষকেরা যতটা ধারণা করেছিলেন, তার চেয়ে সেমিকন্ডাক্টর স্বনির্ভরতার অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছে চীন।

তবে চীন এখনো বড় ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, বিশেষ করে পশ্চিমা সরবরাহকারীরা যে উচ্চ নির্ভুলতার অপটিক্যাল সিস্টেম তৈরি করে, তা অনুকরণ করার ক্ষেত্রে।

ধারণার চেয়ে দ্রুত এগোচ্ছে চীন

দুটি সূত্রের মতে, মূল বাজারের বাইরের কোনো দ্বিতীয় উৎস থেকে এএসএমএলের পুরোনো যন্ত্রাংশ পেয়ে চীন একটি দেশীয় প্রোটোটাইপ তৈরি করতে পেরেছে। দেশটির সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—২০২৮ সালের মধ্যে ওই প্রোটোটাইপে কার্যকর চিপ উৎপাদন করার।

তবে প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ২০৩০ সালকে আরও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ধরা যায়। তবু এটি বিশ্লেষকদের ধারণা করা এক দশকের সময়সীমার তুলনায় কয়েক বছর আগেই তৈরি হয়ে যাবে। তাঁরা মনে করেছিলেন চীন পশ্চিমাদের সমকক্ষ হতে এত সময় লাগবে।এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে চীনা কর্তৃপক্ষ সাড়া দেয়নি।

এই সাফল্য সেমিকন্ডাক্টরে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে চীন সরকারের ছয় বছরব্যাপী উদ্যোগের সুফল। দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি এটি। যদিও চীনের সেমিকন্ডাক্টর লক্ষ্যগুলো প্রকাশ্য, তবে শেনঝেনের ইইউভি প্রকল্পটি গোপনে পরিচালিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

প্রকল্পটি চীনের সেমিকন্ডাক্টর কৌশলের আওতায় পড়ে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, সির ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিং শ্যুয়েশিয়াংয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে প্রকল্পটি। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমিশনের প্রধান।

চীনের ইলেকট্রনিকস খাতের বড় প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে সারা দেশে বিস্তৃত বহু কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যেখানে হাজার হাজার প্রকৌশলী যুক্ত আছেন—দুজন ব্যক্তি ও তৃতীয় একটি সূত্র এমনটাই জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন পারমাণবিক বোমা তৈরির উদ্যোগ ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’-এর চীনা সংস্করণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ‘লক্ষ্য হলো, চীন যেন শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে চীনে তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করেই উন্নত চিপ তৈরি করতে পারে। চীন চায় তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে শতভাগ বাদ দিতে।’

হুয়াওয়ে, চীনের রাষ্ট্রপরিষদ, ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস এবং চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়—কেউই এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

এখন পর্যন্ত কেবল একটি প্রতিষ্ঠানই ইইউভি প্রযুক্তি পুরোপুরি আয়ত্ত করেছে। সেটি হলো নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর ভেল্ডহোভেনে। প্রায় ২৫ কোটি ডলার দামের এসব যন্ত্র এনভিডিয়া ও এএমডির মতো প্রতিষ্ঠানের নকশা করা এবং টিএসএমসি, ইন্টেল ও স্যামসাংয়ের মতো চিপ নির্মাতাদের উৎপাদিত সবচেয়ে উন্নত চিপ তৈরিতে অপরিহার্য।

এএসএমএল ২০০১ সালে ইইউভি প্রযুক্তির প্রথম কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, ২০১৯ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চিপ উৎপাদন শুরু করে তারা। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছাতে তাদের প্রায় দুই দশক সময় এবং গবেষণা ও উন্নয়নে শত শত কোটি ইউরো ব্যয় করতে হয়েছে।

এএসএমএল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমাদের প্রযুক্তি অনুকরণ করতে চাওয়া কোম্পানিগুলোর বিষয়টি বোধগম্য। তবে এটি মোটেও সহজ কাজ নয়।’ এএসএমএলের ইইউভি সিস্টেমগুলো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে পাওয়া যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাধা

২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসের ওপর চাপ দিতে শুরু করে, যাতে এএসএমএল চীনের কাছে ইইউভি সিস্টেম বিক্রি না করে। ২০২২ সালে এই বিধিনিষেধ আরও বিস্তৃত হয়, যখন বাইডেন প্রশাসন উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে ব্যাপক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এএসএমএল রয়টার্সকে জানিয়েছে, চীনে কখনোই কোনো ইইউভি সিস্টেম বিক্রি করা হয়নি।

এই নিয়ন্ত্রণ শুধু ইইউভি সিস্টেম নয়, পুরোনো ডিপ আলট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেগুলো দিয়ে তুলনামূলক কম উন্নত চিপ যেমন হুয়াওয়ের চিপ তৈরি করা হয়। লক্ষ্য ছিল চিপ তৈরির সক্ষমতায় চীনকে অন্তত এক প্রজন্ম পিছিয়ে রাখা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জামের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা আরও জোরদার করেছে এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ‘ফাঁকফোকর’ বন্ধ করতে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।

ডাচ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংবেদনশীল প্রযুক্তিতে প্রবেশ ঠেকাতে নেদারল্যান্ডস এমন নীতি প্রণয়ন করছে, যার আওতায় জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের নিরাপত্তা যাচাই করতে হবে, যাতে খারাপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তি বা যাদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঝুঁকি রয়েছে, তারা এসব প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার না পায়।

রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কয়েক বছর ধরে চীনের সেমিকন্ডাক্টর আত্মনির্ভরতার অগ্রযাত্রা ধীর করে দিয়েছে এবং হুয়াওয়ের উন্নত চিপ উৎপাদন সীমিত করেছে—এমনটাই বলেছেন সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি ও তৃতীয় আরেকটি সূত্র।

প্রকল্পটির গোপনীয়তার কারণে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

চীনের ম্যানহাটান প্রকল্প

প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া এএসএমএলের এক অভিজ্ঞ চীনা প্রকৌশলী অবাক হয়ে যান যখন দেখেন, তাঁর মোটা অঙ্কের সাইনিং বোনাসের সঙ্গে একটি ভুয়া নামে ইস্যু করা পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি।

ভেতরে প্রবেশের পর ওই প্রকৌশলী বুঝতে পারেন, তাঁর আরও কয়েকজন সাবেক এএসএমএল সহকর্মীও ছদ্মনামে কাজ করছেন এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে কর্মস্থলে তাঁদের ভুয়া নাম ব্যবহার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরেক ব্যক্তি আলাদাভাবে নিশ্চিত করেছেন, নিরাপত্তা-ঘেরা ওই স্থাপনার ভেতরে অন্য কর্মীদের কাছ থেকে পরিচয় গোপন রাখতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভুয়া আইডি দেওয়া হয়েছিল।

দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট—জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় শ্রেণিভুক্ত এই প্রকল্পে তাঁরা কী বানাচ্ছেন, কিংবা তাঁরা সেখানে আছেন, এ তথ্য স্থাপনার বাইরে কেউ জানতে পারবে না।

সূত্রগুলো জানায়, দলে রয়েছেন সদ্য অবসর নেওয়া, চীনা বংশোদ্ভূত এএসএমএলের সাবেক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা। সংবেদনশীল কারিগরি জ্ঞান থাকার কারণে তাঁরা ছিলেন প্রধান নিয়োগের কেন্দ্রে, আর কোম্পানি ছাড়ার পর পেশাগত সীমাবদ্ধতাও তুলনামূলক কম ছিল।

নেদারল্যান্ডসে কর্মরত চীনা নাগরিকত্বধারী এএসএমএলের বর্তমান দুই কর্মী রয়টার্সকে জানান, ২০২০ সাল থেকে অন্তত হুয়াওয়ের নিয়োগকারীরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। মন্তব্যের অনুরোধে হুয়াওয়ে কোনো সাড়া দেয়নি।

ইউরোপের গোপনীয়তা আইন এএসএমএলের পক্ষে সাবেক কর্মীদের ওপর নজরদারি করার সক্ষমতা সীমিত করে। কর্মীরা নন-ডিসক্লোজার চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও সীমান্ত পেরিয়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

২০১৯ সালে বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির অভিযোগে এক সাবেক চীনা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এএসএমএল ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রায় পায়। তবে আদালতের নথি অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেউলিয়া ঘোষণা করে পরে বেইজিংয়ে চীনা সরকারের সহায়তায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

রয়টার্সকে এএসএমএল জানিয়েছে, তারা বাণিজ্যিক গোপনীয় তথ্য সতর্কতার সঙ্গে সুরক্ষা দেয়। কোম্পানিটি বলেছে, সাবেক কর্মীরা কোথায় কাজ করবেন, তা এএসএমএল নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করতে পারে না, তবে সব কর্মীই তাঁদের চুক্তির গোপনীয়তা সংক্রান্ত ধারার অধীনে আবদ্ধ।

তারা আরও জানায়, বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির ঘটনায় তারা সফলভাবে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি, চীনের লিথোগ্রাফি কর্মসূচিতে জড়িত সাবেক এএসএমএলের কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।

কোম্পানিটি জানায়, ইইউভি–সংক্রান্ত জ্ঞান সুরক্ষায় তারা এমন ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে কোম্পানির ভেতরেও কেবল নির্বাচিত কিছু কর্মীই ওই তথ্যের প্রবেশাধিকার পান।

ডাচ গোয়েন্দা সংস্থা এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে জানায়, চীন পশ্চিমা দেশগুলো থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও জ্ঞান অর্জনের চেষ্টায় ব্যাপক গুপ্তচরবৃত্তি কর্মসূচি ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমা বিজ্ঞানী ও উচ্চপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়োগ।

প্রকল্পের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত এএসএমএলের সাবেক কর্মীদের কারণেই শেনঝেনে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। তাদের প্রযুক্তির অন্তর্দৃষ্টি ছাড়া মেশিনগুলোকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার করা প্রায় অসম্ভব হতো।

চীনের সরকার ২০১৯ সালে বিদেশে থাকা সেমিকন্ডাক্টর বিশেষজ্ঞদের আকৃষ্ট করার জন্য একটি আগ্রাসী প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন ইউয়ান (৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৭ লাখ মার্কিন ডলার) সাইনিং বোনাস এবং বাড়ি ক্রয়ের সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন লিন নান, যিনি এএসএমএলের লাইট সোর্স টেকনোলজি সাবেক প্রধান ছিলেন। তাঁর দল চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের সাংহাই ইনস্টিটিউট অব অপটিক্সে ১৮ মাসে ইইউভি লাইট সোর্সে আটটি পেটেন্ট দাখিল করেছে।

কয়েকজন প্রযুক্তিবিদকে চীনা পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল এবং দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যদিও চীন আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিষিদ্ধ। চীনা কর্তৃপক্ষ মন্তব্যের জন্য সাড়া দেয়নি।

চীনের ইইউভি গবেষণাগারের অন্দরে

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের সবচেয়ে উন্নত ইইউভি (এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট) লিথোগ্রাফি যন্ত্রগুলো আকারে প্রায় একটি স্কুল বাসের সমান এবং এগুলোর ওজন ১৮০ টন।

সংশ্লিষ্ট দুই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শেনঝেনের গবেষণাগারে তৈরি করা চীনা প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক নমুনাটির আকার মূল যন্ত্রের মতো ছোট করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন গবেষকেরা। এরপর যন্ত্রটির সক্ষমতা বাড়াতে সেটির আকার কয়েক গুণ বড় করে তৈরি করা হয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এএসএমএলের যন্ত্রের তুলনায় চীনের এই প্রোটোটাইপটি যথেষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন নয়, তবে এটি পরীক্ষামূলক কাজের জন্য যথেষ্ট কার্যকর।

দুই সূত্রের দাবি, চীনের এই প্রযুক্তি এএসএমএলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হলো উন্নত অপটিক্যাল সিস্টেমের অভাব। এএসএমএলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী জার্মানির কার্ল জেইস এজির মতো উন্নত অপটিক্যাল সিস্টেম সংগ্রহ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে চীনা গবেষকদের। তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি জেইস।

এই যন্ত্রগুলোতে গলিত টিনের ওপর প্রতি সেকেন্ডে ৫০ হাজার বার লেজার নিক্ষেপ করা হয়, যা ২ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্লাজমা তৈরি করে।

জেইসের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এই আলোকরশ্মিকে নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফেলতে বিশেষ ধরনের আয়না ব্যবহার করা হয়, যা তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে। ওই দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, এসব প্রযুক্তির নিজস্ব বা দেশি বিকল্প তৈরিতে চীনের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের অধীন ‘চ্যাংচুন ইনস্টিটিউট অব অপটিকস, ফাইন মেকানিকস অ্যান্ড ফিজিকস’ (সিআইওএমপি) প্রোটোটাইপটির অপটিক্যাল সিস্টেমে অতি বেগুনি রশ্মি বা ইইউভি যুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই যন্ত্রটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা সম্ভব হতে পারে। তবে এর অপটিক্যাল ব্যবস্থায় এখনো অনেক পরিমার্জন ও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান ওই ব্যক্তি।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও সিআইওএমপি কোনো সাড়া দেয়নি।

গত মার্চ মাসে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক অনলাইন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, লিথোগ্রাফি নিয়ে কাজ করা পিএইচডিধারী গবেষকদের জন্য তারা ‘অবারিত’ বা সীমাহীন বেতনের প্রস্তাব দিচ্ছে।

এ ছাড়া গবেষকদের জন্য ৪০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার) পর্যন্ত গবেষণা অনুদান এবং অতিরিক্ত ১০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার) ব্যক্তিগত বিশেষ ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেমি অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক ও এএসএমএলের সাবেক প্রকৌশলী জেফ কোচ বলেন, যদি ‘আলোর উৎসে পর্যাপ্ত শক্তি থাকে, এটি নির্ভরযোগ্য হয় এবং খুব বেশি দূষণ তৈরি না করে,’ তবেই চীন এই খাতে ‘তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি’ অর্জন করতে পারবে।

জেফ কোচ আরও বলেন, প্রযুক্তিগতভাবে এটি যে সম্ভব, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশ্ন কেবল সময়ের। চীনের বড় সুবিধা হলো, বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ইইউভি প্রযুক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। ফলে তাদের একদম শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পেতে চীন এএসএমএলের পুরোনো যন্ত্র থেকে বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করছে। এ ছাড়া ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড’ বা ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের বাজার থেকেও এএসএমএলের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পার্টস সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ওই সূত্রগুলো আরও জানায়, প্রকৃত ক্রেতার পরিচয় গোপন রাখতে অনেক সময় মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ও আরেক ব্যক্তির বরাতে জানা গেছে, এই প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক সংস্করণ তৈরিতে জাপানের নিকন ও ক্যাননের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এমন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে নিকন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ক্যানন জানিয়েছে, এ ধরনের প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা কিছু জানে না। ওয়াশিংটনে অবস্থিত জাপান দূতাবাসও এ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।

সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো নিয়মিত পুরোনো সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সরঞ্জাম নিলামে তোলে। আলিবাবার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম ‘আলিবাবা অকশন’-এর নিলাম তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চীনে এএসএমএলের পুরোনো লিথোগ্রাফি মেশিন বিক্রি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রায় ১০০ জন সদ্য স্নাতক পাস করা প্রকৌশলীর একটি দল ইইউভি ও ডিইউভি লিথোগ্রাফি মেশিনের যন্ত্রাংশগুলোর ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে কাজ করছে। সেখানে প্রত্যেক কর্মীর ডেস্ক আলাদা ক্যামেরায় ভিডিও করা হয়। যন্ত্রাংশগুলো খোলা এবং আবার জোড়া দেওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিবদ্ধ করা হয়, যাকে চীনের লিথোগ্রাফি খাতের উন্নতির জন্য অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ওই ব্যক্তিরা আরও জানান, যেসব কর্মী সফলভাবে একটি যন্ত্রাংশ আবার জোড়া দিতে পারেন, তাঁদের বিশেষ বোনাস দেওয়া হয়।

কর্মস্থলেই রাত কাটছে হুয়াওয়ের বিজ্ঞানীদের

হুয়াওয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তি জানিয়েছেন, চীনের ইইউভি প্রকল্পটি সরকারিভাবে পরিচালিত হলেও এর সরবরাহ শৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) প্রতিটি ধাপে যুক্ত রয়েছে হুয়াওয়ে। চিপের নকশা তৈরি ও এর সরঞ্জাম উৎপাদন থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের মতো পণ্যে সেই চিপের চূড়ান্ত সংযোজন—সব পর্যায়েই প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, হুয়াওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেন জেংফেই এই প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে চীনের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত অবহিত করেন।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়েকে তাদের ‘এনটিটি লিস্ট’ বা কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে লাইসেন্স ছাড়া মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে হুয়াওয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অফিস, কারখানা ও গবেষণা কেন্দ্রে কর্মী মোতায়েন করেছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, সেমিকন্ডাক্টর টিমে কর্মরতদের প্রায়ই কর্মস্থলে রাত কাটাতে হয় এবং সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে তাদের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি নেই। এমনকি অত্যন্ত সংবেদনশীল কাজে যুক্ত দলগুলোর ফোন ব্যবহারের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

হুয়াওয়ের ভেতরেও খুব কমসংখ্যক কর্মী এই কাজের পরিধি সম্পর্কে জানেন। এক ব্যক্তি বলেন, ‘প্রকল্পের গোপনীয়তা বজায় রাখতে প্রতিটি দলকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হয়েছে। এক দল জানেই না অন্য দল আসলে কী কাজ করছে।’

সেমিকন্ডাক্টর চিপের একটি সার্কিট বোর্ডের ওপর চীনের পতাকা ও ‘মেড ইন চীন’ লেখাসংবলিত একটি ইলাস্ট্রেশন। চিপপ্রযুক্তিতে চীনের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টাকেই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে
সেমিকন্ডাক্টর চিপের একটি সার্কিট বোর্ডের ওপর চীনের পতাকা ও ‘মেড ইন চীন’ লেখাসংবলিত একটি ইলাস্ট্রেশন। চিপপ্রযুক্তিতে চীনের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টাকেই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবি : রয়টার্স

মাদুরোকে ২১০০ মাইল পাড়ি দিয়ে যেভাবে নেওয়া হলো নিউইয়র্কে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। গতকাল শনিবার ভোরে তুলে নেওয়ার পর তাঁকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে নিউইয়র্কে আনা হয়। মাদুরোর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও ছিলেন। তবে ফ্লোরেসের সর্বশেষ অবস্থান এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি।

কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় গতকাল ভোরে ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় এদিন ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য জানান।

ট্রাম্প লেখেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে এক ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জানানো হয়, সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ আবাসস্থল থেকে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনেন।

এর পর থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় ৭ ঘণ্টা পর ট্রাম্প নিজে ‘আটক’ মাদুরোর ছবি ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন। ছবিতে দেখা যায়, মাদুরোর চোখ বাঁধা ও হাতে হাতকড়া। পরনে ধূসর রঙের নরম কাপড়ের তৈরি ট্রাউজার–জ্যাকেট। বলা হয়, ছবিটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডব্লিউও জিমায় তোলা।

গতকাল ভোরেই কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টারে নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে উড়িয়ে নেওয়া হয়। গন্তব্য ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা। ক্যারিবীয় সাগরের কোনো এক অজানা জায়গায় যুদ্ধজাহাজটি অবস্থান করছিল।

এরপর যুদ্ধজাহাজটি মাদুরোকে কিউবার গুয়ান্তানামো বে মার্কিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে মাদুরোকে নেওয়া হয় নিউইয়র্কে।

স্থানীয় সময় গতকাল বিকেল ৫টার দিকে উড়োজাহাজটি নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অরেঞ্জ কাউন্টির স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে ওই উড়োজাহাজের দরজায় মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআইয়ের ইউনিফর্ম পরিহিত কর্মকর্তাদের দেখা যায়। এরপর উড়োজাহাজটি থেকে মাদুরো বেরিয়ে আসেন। কারাকাস থেকে তুলে নেওয়ার ১৫ ঘণ্টা পর তাঁকে নিউইয়র্কে দেখা যায়।

একটি অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভেনেজুয়েলার বন্দী নেতার পরনে একটি নীল জ্যাকেট, মুখ ঢাকা। মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁকে উড়োজাহাজের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনছেন। তাঁকে ঘিরে ছিলেন এফবিআই ও মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সদস্যরা। এ সময় তাঁর সঙ্গে স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে দেখা যায়নি।

এরপর মাদুরোর গন্তব্য ছিল নিউইয়র্ক শহর। উড়িয়ে নেওয়া হয় হেলিকপ্টারে। বিবিসির খবরে বলা হয়, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে একটি হেলিকপ্টারে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এ তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ হোয়াইট হাউসের সরকারি র‍্যাপিড রেসপন্স অ্যাকাউন্ট থেকে মাদুরোর একটি ছোট ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওতে মাদুরোকে ‘পার্প ওয়াক’ বা ‘অপরাধীকে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেওয়ার মতো’ করে হাঁটিয়ে নিতে দেখা গেছে।

সিএনএন বলছে, ভিডিওতে দেখা যায়, কালো হুডি পরা মাদুরো একটি করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সেখানকার নীল রঙের কার্পেটে ‘ডিইএ এনওয়াইডি’ (মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা-ডিইএ, নিউইয়র্ক বিভাগ) লেখা রয়েছে।

কারাকাস থেকে নিউইয়র্ক—বন্দী নিকোলা মাদুরো এ যাত্রায় পাড়ি দিয়েছেন ২ হাজার ১০০ মাইল বা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড–সংশ্লিষ্ট অভিযোগে মামলা করা হয়।

মাদুরোকে তুলে নেওয়া ‘ডেল্টা ফোর্স’ কী

সিএনএনের এক্সপ্লেইনারঃ নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নেওয়ার অভিযানে নিজেদের বিশেষায়িত বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অভিজাত বাহিনী। এ বাহিনী সম্পর্কে জানেন—এমন কয়েকটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। এসবের মধ্যে ডেল্টা ফোর্স অন্যতম। এ ইউনিট মূলত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, সরাসরি সামরিক হামলা ও বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি-সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রশিক্ষিত। চড়া মূল্যের লক্ষ্য পূরণে ডেল্টা ফোর্সকে ব্যবহার করা হয়।

ডেল্টা ফোর্স প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৭ সালে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের (জেএসওসি) সরাসরি অধীনে কাজ করে। নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগভিত্তিক ডেল্টা ফোর্সের মোট ৮টি অপারেশনাল ‘সেবরে স্কোয়াড্রন’ বা হামলা চালানোর উপযোগী স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট রয়েছে।

ডেল্টা ফোর্স–সম্পর্কিত প্রায় সব তথ্যই সর্বোচ্চ মাত্রায় গোপন রাখা হয়। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে এ ইউনিটকে সবচেয়ে জটিল, গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কুখ্যাত ‘এসইএএল টিম সিক্স’-এর মতো ডেল্টা ফোর্স সাম্প্রতিক ইতিহাসে বেশ কয়েকটি আলোচিত সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার উদ্ধার অভিযান অন্যতম।

ওই বছর সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। কয়েকজন মার্কিন সেনা আটকা পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানে ডেল্টা ফোর্স অংশ নিয়েছিল। এ অভিযান নিয়ে ২০০১ সালে ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ নামের একটি ছবি মুক্তি পায়।

লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ পরিচালনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতেও অংশ নিয়েছিল ডেল্টা ফোর্স। গত শনিবার শেষরাতে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তা অপারেশন জাস্ট কজের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-04%2Fn4ajlp1l%2FMaduro.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বন্দী অবস্থার এ ছবি ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইয়েমেনের ঘটনা দেখিয়ে দিল সৌদি আরব ও আমিরাত পরস্পরকে কতটা অবিশ্বাস করে

ইয়েমেনে সৌদি জোটের বিমান হামলার পর দেশটি থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পদক্ষেপটি সৌদি–আমিরাত উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশ দুটির মধ্যকার দীর্ঘদিনের মতবিরোধ ও বিশ্বাসের ঘাটতি থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট গত মঙ্গলবার ভোরে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুকাল্লা বন্দরে বিমান হামলা চালায়। এর পরপরই আরব আমিরাত তাদের সেনাদের ইয়েমেন ছাড়ার নির্দেশ দেয়।

আরব আমিরাত বলেছে, তারা এ বিমান হামলার ঘটনায় বিস্মিত। এর ঠিক পরেই তারা ঘোষণা দেয় যে সেনাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ইয়েমেন থেকে তাঁদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে।

সৌদি ও আমিরাতের মধ্যকার এ সংকটের সূত্রপাত ডিসেম্বরের শুরুর দিকে। ওই সময় দক্ষিণ ইয়েমেনে আমিরাত–সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হঠাৎ অগ্রসর হতে শুরু করলে উত্তেজনা তৈরি হয়। এর মধ্য দিয়ে তেল খাতে কোটাব্যবস্থা থেকে শুরু করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে দুই উপসাগরীয় দেশের মধ্যকার বিরোধের বিষয়টি সামনে চলে আসে।

সৌদি আরবের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি উপসাগরীয় সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, গত নভেম্বরে ওয়াশিংটনে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক নিয়ে ভুল–বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে এ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

সূত্রটি আরও বলেছে, ডিসেম্বর থেকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও ফোনালাপ হয়েছে। তবে তা এখনো বাস্তব কোনো ফল দেয়নি।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য অশান্তি তৈরি করবে। কারণ, এ অঞ্চলটি নিজেদেরকে অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল এলাকা হিসেবে দেখাতে চায়।

এ দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ থাকলে তেলের উৎপাদন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় উভয় দেশই আগামী রোববার অন্যান্য ওপেক প্লাস সদস্যদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যের ছিল না। তবে বর্তমান উত্তেজনা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র মনে হচ্ছে।’

এসটিসির অগ্রসর হওয়া

ডিসেম্বরের শুরুতে হঠাৎ অগ্রসর হতে শুরু করা আমিরাত–সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) ইতিমধ্যে ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাজরামাউত প্রদেশ।

অথচ একসময় এসটিসি সৌদি–সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে জোট বেঁধে ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও জনবহুল উত্তর–পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।

দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার মধ্য দিয়ে এসটিসি সৌদি আরব–সংলগ্ন ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এটি এমন একটি এলাকা, যেটিকে সৌদি নাগরিকদের অনেকে নিজেদের আদি নিবাস বলে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁদের কাছে ওই এলাকার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

একই সঙ্গে হামলার ঘটনা সৌদি আরব ও আমিরাতকে ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের বিপরীত পাশে দাঁড় করিয়েছে।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাত উভয়ই প্রকাশ্যে বলেছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলছে। তবে গত কয়েক দিনে ওই প্রদেশে দুবার বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

এসটিসিকে দখলকৃত এলাকা থেকে সরে যেতে বলেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে এসটিসি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, হাজরামাউত ও পূর্বের মাহরা প্রদেশে নিরাপত্তা বজায় রাখতে তারা অভিযান চালিয়ে যাবে।

মুকাল্লায় হামলার বিষয়ে এক বিবৃতিতে আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ বলেছে, এসটিসি অগ্রসর হতে শুরু করার পর থেকে তারা উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছে। তাদের দাবি, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আঘাত বা সীমান্ত লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

সুদানের বিষয়ে মতপার্থক্য

কুইলিয়াম বলেন, ‘দুই দেশই তাদের সম্পর্কের দ্বন্দ্ব কম করে দেখানোর চেষ্টা করে। তারা যুক্তি দেখায় যে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু গত বছর হঠাৎ প্রতিযোগিতা অনেক বেড়ে গেছে এবং একাধিক জায়গায় তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।’

ওই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও মতপার্থক্যের এমন একটি জায়গা হলো সুদান। দেশটিতে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে এবং দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মধ্যে আছে। সৌদি আরব, মিসর, যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাত মিলে গঠিত কোয়াড জোট কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলেও সুদানে সংঘাত বেড়েই চলেছে।

আরব আমিরাতের জন্য সুদান একটি স্পর্শকাতর বিষয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, আরব আমিরাত সুদানের আধা সামরিক বাহিনী আরএসএফকে সমর্থন দিচ্ছে। আরএসএফ সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে।

তবে আরব আমিরাত কোনো পক্ষকেই সমর্থন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নভেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ট্রাম্প ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সুদান প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। উপসাগরীয় একটি সূত্র বলেছে, ওই বৈঠককে কেন্দ্র করে আরব আমিরাতের নেতারা ক্ষুব্ধ ছিলেন। কারণ, তাঁরা বৈঠক নিয়ে একটি ভুল তথ্য পেয়েছিলেন। তাঁদের বলা হয়েছিল যে বৈঠকে সৌদি যুবরাজ শুধু আরএসএফের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞাই চাননি; বরং গোষ্ঠীটিকে সমর্থনের অভিযোগে আমিরাতের বিরুদ্ধেও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্রটির মতে, এ ভুল–বোঝাবুঝিই ইয়েমেনে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করেনি। তারা গত শুক্রবার দেওয়া একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে। সেখানে বলা হয়, ইয়েমেনে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সৌদি আরবের চেষ্টাকে স্বাগত জানায় আমিরাত। একই সঙ্গে আমিরাতও দেশটির স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

অতীতের অস্থিতিশীলতা

আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধান অপরিহার্য, যা বন্ধুত্ব ও জোটকে রক্ষা করে। তিনি সরাসরি ইয়েমেন বা সৌদি আরবের কথা উল্লেখ করেননি।

এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

উপসাগরীয় অঞ্চল অতীতেও অস্থিতিশীলতার সাক্ষী হয়েছিল। ২০১৭ সালে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান ও মিসর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছিল। তারা অভিযোগ করেছিল, দেশটি সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে কাতার সে অভিযোগ অস্বীকার করে।

এবারের উত্তেজনা কাতার সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে বলে মনে হচ্ছে না।

আমিরাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আবদুলখালেক আবদুল্লাহ বলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের শতভাগ মতভেদ আছে এবং বর্তমান উত্তেজনার সঙ্গে সঙ্গে সে মতভিন্নতা আরও বেড়েছে। মিত্রদেরও ঝগড়া হয়…কিন্তু তারা তাদের মতবিরোধ মেটায় এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিকগুলো শক্তিশালী করে।’

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট গত মঙ্গলবার ভোরে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুকাল্লা বন্দরে বিমান হামলা চালায়। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট গত মঙ্গলবার ভোরে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুকাল্লা বন্দরে বিমান হামলা চালায়। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

মাদুরোর উত্তরসূরি ভেনেজুয়েলার নেত্রী দেলসি কে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনি কি নমনীয় হবেন

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির কমান্ড বা শাসনভার এখন নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের হাতে।

ভেনেজুয়েলার সংবিধানে প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন যে পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট এখন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। সংবিধানের ২৩৩ ও ২৩৪ ধারা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি সাময়িক হোক বা পূর্ণাঙ্গ, ভাইস প্রেসিডেন্টই প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তা ছাড়া ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে তাঁকে দেশের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে বলেছেন।

গতকাল শনিবার বিকেলে দেলসি রদ্রিগেজ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একই সঙ্গে অর্থ ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস বন্দী হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের একটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অন্যান্য মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত সেই সভায় তিনি মাদুরো দম্পতির ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দাবি করেন। তিনি তাঁর দেশে মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, শেষ রাতের এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইন এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন এক হস্তক্ষেপ। তিনি আরও বলেন, এই পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাখ্যান করা উচিত এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকারের পক্ষ থেকে এর কঠোর নিন্দা জানানো উচিত।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘ভিটিভি’-তে সম্প্রচারিত ভাষণে দেলসি বলেন, ‘আমরা এই বিশাল মাতৃভূমির জনগণের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই। কারণ, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা অন্য যে কারও সঙ্গে করা হতে পারে। মানুষের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে শক্তির এই পাশবিক ব্যবহার যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে চালানো হতে পারে।’

মাদুরোর ‘আস্থভাজন’এক কর্মকর্তা

৫৬ বছর বয়সী দেলসি রদ্রিগেজ রাজধানী কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।
দেলসি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘চাভিজমো’-র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত এবং ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মাদুরোর নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।

দেলসির ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ (বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট) এবং তিনি নিজে চাভেজের আমল থেকেই ক্ষমতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী এবং পরবর্তী সময় ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেই সময় দেলসি প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে আসা আন্তর্জাতিক সমালোচনা, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের খারাপ পরিস্থিতির নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে দেলসি রদ্রিগেজ জাতিসংঘের মতো ফোরামগুলোয় ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সেখানে তিনি অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে তাঁর দেশের ক্ষতি করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনতেন।

২০১৭ সালে দেলসি রদ্রিগেজ ‘কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি’-এর প্রেসিডেন্ট হন। মূলত ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের জয়ের পর সরকারের ক্ষমতা আরও শক্তপোক্ত করতে কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে মাদুরো তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন।

২০২৪ সালের ২৮ জুলাইয়ের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি শুরু হওয়া মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদেও দেলসি এই পদে বহাল থাকেন। প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী তুলে নেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ভেনেজুয়েলার প্রধান অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর দাবি হলো ২০২৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে। মাদুরো বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন। বিরোধীরা মনে করেন, প্রকৃত বিজয়ী হলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এডমুন্ডো গঞ্জালেস উরুতিয়া। বিরোধীদের এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রসহ ওই অঞ্চলের বেশ কিছু সরকার সমর্থন করে থাকে।

সাংবিধানিক আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসে ম্যানুয়েল রোমানো সিএনএনকে বলেন, দেলসি রদ্রিগেজ এ পর্যন্ত যেসব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তাতে প্রমাণিত হয়, তিনি ভেনেজুয়েলা সরকারের অন্যতম ‘বিশিষ্ট’ একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি প্রেসিডেন্টের ‘পূর্ণ আস্থা’ উপভোগ করেন।

রোমানো আরও বলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দক্ষ একজন পরিচালক এবং দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর চমৎকার নেতৃত্ব গুণ রয়েছে। তিনি ফলাফলনির্ভর কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পুরো সরকারি ব্যবস্থার ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কি সমঝোতার পথ তৈরি হচ্ছে

মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এবং প্রতিরক্ষা কাউন্সিলে দেলসি রদ্রিগেজের ভাষণের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, দেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার একটি নতুন অধ্যায় শুরুর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক বলে মনে হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর (দেলসি) সঙ্গে মার্কোর কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “আপনারা যা চান, আমরা তাই করব”। আমি মনে করি, তিনি যথেষ্ট বিনয়ী ছিলেন। আমরা বিষয়টিকে সঠিকভাবে সামলাব।’

যা–ই হোক, ট্রাম্পের এই মন্তব্য অনেক বিশ্লেষককে অবাক করেছে। তাঁরা মনে করেন, দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ছাড় দেবেন, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

জ্যাক ডি. গর্ডন ইনস্টিটিউটের পলিসি অ্যানালিস্ট ও ভেনেজুয়েলায় নিয়োজিত তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক ইমদাত ওনার সিএনএনকে বলেন, ‘তিনি (দেলসি) মাদুরোর কোনো নমনীয় বা উদারপন্থী বিকল্প নন। তিনি এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কট্টরপন্থী ব্যক্তিদের একজন।’

এই বিশ্লেষক আরও যোগ করেন, ‘তাঁর (দেলসি) ক্ষমতায় আসাটা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু প্রধান পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতার ফল হতে পারে, যারা মাদুরো-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি মূলত একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করবেন, যতক্ষণ না গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন নেতা ক্ষমতা গ্রহণ করেন।’

মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর প্রথম দেওয়া বার্তাগুলোয় দেলসি রদ্রিগেজ পিছিয়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাননি। ট্রাম্পের বক্তব্যের কোনো উল্লেখ না করেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার যেকোনো সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

গতকাল শনিবার সকালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিটিভির সঙ্গে টেলিফোনে এক সাক্ষাৎকারে দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, মাদুরো ও ফ্লোরেস বর্তমানে কোথায় আছেন, তা অজানা। তাঁরা যে বেঁচে আছেন, তিনি সেটার প্রমাণ দাবি করেন। (অবশ্য মাদুরোকে ইতিমধ্যে নিউইয়র্কে নেওয়ার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে)।

বিকেলে প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের অধিবেশনে দেলসি তাঁর সুর আরও কঠোর করে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার দায়িত্বে আছেন।

ঘটনার পরিক্রমায় এখন ভেনেজুয়েলা সরকারের প্রধান মুখ হয়ে ওঠা দেলসি রদ্রিগেজ ঘোষণা করেছেন, ‘এ দেশে মাত্র একজনই প্রেসিডেন্ট আছেন, আর তাঁর নাম নিকোলা মাদুরো মোরোস।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-04%2Fthx60ydd%2FDelcy-acting-president.JPG?rect=1%2C0%2C6059%2C4039&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। ছবি: রয়টার্স

মাদুরোকে তুলে এনে যুক্তরাষ্ট্র কি ভেনেজুয়েলা ‘চালাতে’ পারে, আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে

নিউইয়র্ক টাইমসঃ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা শাসন—এই দুটি বিষয় আন্তর্জাতিক আইন ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে নজিরবিহীন কিছু আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিস্তারিতভাবে তাদের এই পদক্ষেপের আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে অতীতের কিছু অভিযান এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মন্তব্য থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

১৯৮৯ সালে বুশ প্রশাসন পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে সেখানে অভিযান চালিয়েছিল। তখন তারা এই অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামরিক সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। মাদুরোর মতো নরিয়েগার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল। পেন্টাগন একইভাবে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযানকে বিচার বিভাগের প্রতি ‘সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ভেনেজুয়েলায় অভিযান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিতভাবে নিচে আলোচনা করা হলো—

যুক্তরাষ্ট্রের কি ভেনেজুয়েলা ‘শাসন’ বৈধ

শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই দেশ ‘চালাবে’ বা যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ভেনেজুয়েলা চলবে। তখন তাঁর কথায় ইঙ্গিত ছিল, তিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে তাঁর কথা মানতে বাধ্য করবেন।

নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ট্যাবলয়েড দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ভেনেজুয়েলা চালাতে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরা যা চাই তা করেন, তবে আমাদের সেটা করতে হবে না।’

তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের এও বলেছেন, দেশের তেলের স্বার্থে সেখানে সরাসরি সৈন্য পাঠাতে হলে তিনি তাতে মোটেই ‘ভীত নন’।

এখন প্রশ্ন হলো, দেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ট্রাম্প এর কোনো আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি, যা আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।

‘কারডোজো স্কুল অব ল’–এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।

ইংবার আরও যোগ করেন, এটি করতে গেলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের কাছ থেকে তহবিলের প্রয়োজন হবে।

১৯৮৯ সালের পানামা অভিযান এখানে খুব একটা বড় উদাহরণ হতে পারে না। সে সময় নরিয়েগা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করলে বিরোধদলীয় প্রার্থী গুইলারমো এনদারাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। তখন এনদারাই পানামা চালিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নেননি।

মাদুরোকে তুলে আনা কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনা জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে, যে সনদ যুক্তরাষ্ট্রও স্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া, আত্মরক্ষা ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র যখন বিদেশের মাটিতে ড্রোন হামলা চালায়, তখন তারা দাবি করে, সেই দেশের সরকারের অনুমতি আছে অথবা এটি আত্মরক্ষার জন্য করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে বিচারের জন্য গ্রেপ্তার করা ‘আইন প্রয়োগকারী’ কাজ, এটি কোনো ‘আত্মরক্ষা’ নয়।

১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পানামায় অভিযানের নিন্দা জানানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭৫-২০ ভোটে এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।

মার্কিন আইনে জাতিসংঘের এই নিষেধাজ্ঞার কি কোনো গুরুত্ব আছে

এই জায়গাটি আরও বেশি জটিল। স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোকে দেশের ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবে গণ্য করে মার্কিন সংবিধান এবং প্রেসিডেন্টের ওপর দায়িত্ব দেয়, যেন ‘আইনগুলো সঠিকভাবে পালন করা হয়’।

কিন্তু সরকারি আইনজীবীরা এমন তত্ত্ব সামনে আনেন, সংবিধান কখনো কখনো প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে বিদেশে শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, পানামা অভিযানের সময় বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শক অফিস (ওএলসি) দাবি করেছিল, মার্কিন ফৌজদারি মামলার কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিদেশে এফবিআই পাঠানোর ‘সহজাত সাংবিধানিক ক্ষমতা’ বুশের আছে, এমনকি যদি সেই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকে তবুও।

এই মতবাদে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম পি বার। পরে প্রকাশ পাওয়া তাঁর এই যুক্তির বেশ সমালোচনা করেছিলেন আইনবিশেষজ্ঞরা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনজীবী ব্রায়ান ফিনুকেইন ২০২০ সালের একটি প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন, পি বারের মেমো দুটি বিষয়কে ভুলভাবে গুলিয়ে ফেলেছে। ফলে দুটি প্রশ্ন উঠছে।

একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কংগ্রেস যদি আলাদা কোনো আইন না করে, তবে মার্কিন আদালত কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তি কার্যকর করতে পারে কি না।

অন্য প্রশ্নটি হচ্ছে, আদালত কার্যকর করতে পারুক আর নাই পারুক—সব স্বাক্ষরিত চুক্তিই সেই ধরনের আইন কি না, যা প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিকভাবে মানতে বাধ্য।

ফিনুকেইন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের সনদ মানতে বাধ্য এবং এটি স্বাক্ষরের সময়ও তা–ই বোঝা গিয়েছিল। এমনকি কোনো আদালত যদি তাঁকে এটি মানতে বাধ্য করার নির্দেশ না–ও দেন, তবু তিনি মানতে বাধ্য। তবে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় দেননি।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমা হামলা আসলে কী

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মাদুরোকে তুলে আনার জন্য মার্কিন বাহিনীর দলকে বহনকারী হেলিকপ্টারগুলো যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কারাকাসে বড় বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান–দলীয় সিনেটর মাইক লি শনিবার সকালে এক পোস্টে বলেছিলেন, যুদ্ধের ঘোষণা বা সামরিক অভিযানের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবিধানিক ভিত্তিতে এই হামলা চালানো হয়েছে, তা জানার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

কয়েক ঘণ্টা পর লি জানান, মার্কো রুবিও তাঁকে ফোন করে বলেছেন, আজ রাতে যে হামলা দেখা গেছে, তা মূলত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে যাওয়া কর্মীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে।

লি বলেন, রুরিও তাঁকে আরও বলেছেন, এই পদক্ষেপ সম্ভবত সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীন প্রেসিডেন্টের ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতার’ আওতায় পড়ে, যা মার্কিন কর্মীদের আসন্ন হামলা থেকে রক্ষার অনুমতি দেয়।

এটি মূলত ‘সহজাত সুরক্ষা ক্ষমতা’র প্রয়োগ বলে মনে হচ্ছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ফেডারেল আইন কার্যকর করতে যাওয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট তাঁর সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে অভিবাসন কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে ফেডারেল সৈন্য মোতায়েনের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব ব্যবহার করেছে।

মার্কিন জেনারেল কেইন শনিবার বলেছেন, বেশ কয়েকবার মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো আক্রমণের মুখে পড়েছিল এবং তারা পাল্টা গুলি চালিয়েছিল। মূলত এই অভিযানে মোতায়েন করা ইউনিটের ‘আত্মরক্ষার সহজাত ক্ষমতা’র প্রয়োগ করা হয়েছে।

মাদুরোর স্ত্রীর বিষয়ে কী তথ্য আছে

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন না। কিন্তু তাঁকেও বন্দী করা হয়েছে। বিচারের জন্য তাঁকেও যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ঘোষণা করেছেন, তাঁকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

শনিবার আদালত একটি অতিরিক্ত অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে ফ্লোরেসকে আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। তারিখটি অস্পষ্ট করে রাখা হলেও এই অভিযোগপত্র পেশ করা মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল ক্লেটন গত বছর দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

মার্কিন আদালত কি গ্রেপ্তারের পদ্ধতি নিয়ে মাথা ঘামাবেন

সম্ভবত না। মাদুরো যদি এই যুক্তিও দেখান, জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী তাঁর গ্রেপ্তার অবৈধ ছিল, তবু মার্কিন আদালতগুলোর তাঁর বিচার করার ক্ষমতা থাকবে।

আসামিকে অবৈধভাবে আদালতে আনা হয়েছে—১৮৮৬, ১৯৫২ ও ১৯৯২ সালে বেশ কিছু মামলায় আদালত এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে নজির রয়েছে। মূলনীতি হলো আসামি কীভাবে সেখানে এসেছেন, তা বড় কথা নয়। আদালতে তাঁর উপস্থিতিই বিচারের জন্য যথেষ্ট।

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাদুরো কি ‘দায়মুক্তি’ পাবেন

আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানদের বিদেশি আদালতে ছাড় পাওয়ার একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতি রয়েছে। ১৮১২ সালের এক রায় থেকেই সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেন, ‘সার্বভৌম ব্যক্তি’ বিদেশি ভূখণ্ডে গ্রেপ্তার বা আটক থেকে মুক্ত থাকবেন।

মাদুরো কি তাহলে এই ছাড় পাওয়ার যোগ্য? তাঁর আইনজীবীরা অবশ্যই এই দাবি করবেন। তবে এটি নির্ভর করবে এই বিষয়ের ওপর—কাউকে কেবল একটি দেশের নেতা হিসেবে দেখা এবং তাঁকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নেওয়া—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? আর সেটি কে নির্ধারণ করবে?

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলেছেন, মাদুরো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট নন। বরং তিনি একটি মাদক পাচারকারী সংস্থার প্রধান, যিনি সরকারের ছদ্মবেশে আছেন।

পানামার তৎকালীন নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের পর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ছাড় দেওয়ার দাবি করেছিলেন তাঁর আইনজীবী। কিন্তু তৎকালীন বুশ প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল, তিনি এর যোগ্য নন। ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ও আপিল আদালত নরিয়েগার বিপক্ষে রায় দিয়েছিলেন।

জর্জ বুশের নাকচ করে দেওয়াই কেবল আদালতের রায়ের ভিত্তি ছিল না, বরং পানামার আইনও ওই রায়ে বিবেচ্য ছিল। সে দেশের আইন অনুযায়ী, দেশটির প্রেসিডেন্ট হবেন একজন নির্বাচিত ব্যক্তি। কিন্তু নরিয়েগা ছিলেন একজন সামরিক নেতা।

মাদুরোর অবস্থান আরও জটিল। তিনি ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি খুব সামান্য ব্যবধানে জয়ী হন। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ভেনেজুয়েলার জাতীয় নির্বাচনী কাউন্সিল ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নিকোলা মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেই ফলাফলে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ২০১৯ সাল থেকে এবং জো বাইডেনের মেয়াদে ২০২৪ সাল থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেয়নি।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ২০১৫ সালের একটি নজির টেনে অধ্যাপক ইংবারের অনুমান, ‘সুপ্রিম কোর্ট সম্ভবত এই রায়ই দেবেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি বাতিলের স্বার্থ মাদুরোকে স্বীকৃতি না দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের আছে। আর তাই মাদুরো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কোনো ছাড় পাবেন না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ অ্যাডমিনিস্টেশনের কার্যালয়ে নেওয়া হচ্ছে নিকোলা মাদুরোকে। ৩ জানুয়ারি ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ অ্যাডমিনিস্টেশনের কার্যালয়ে নেওয়া হচ্ছে নিকোলা মাদুরোকে। ৩ জানুয়ারি ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স

পঙ্খিরাজ, ভাষামানিকসহ ১০ জাতের ধান সংরক্ষণ করতে চান কৃষক সোহেল by আজাদ রহমান

দাদখানি, পঙ্খিরাজ, ভাষামানিক, দোলাভোগ, এলাইসহ অসংখ্য জাতের ধান এখন আর চোখে পড়ে না। কৃষকেরাও এসব জাতের ধানের নাম ভুলে যেতে বসেছেন। হারিয়ে যেতে বসা এমনই ১০টি জাতের ধান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ভাদড়া গ্রামের ‘আদান-প্রদান’ নামের এক কৃষি খামারে চাষ করেছেন মো. সোহেল রানা।

ওই কৃষি খামারে সোহেল রানা এবার দেড় শতাংশ করে প্লট বানিয়ে ১০টি প্লটে মোট ১৫ শতাংশ জমিতে ওই ১০টি জাতের ধানের চাষ করেছেন।

সোহেল রানার ভাষায়, হারিয়ে যেতে বসা ধানগুলো বাঁচিয়ে রাখতেই তাঁর এ উদ্যোগ। এ বছর ওই সামান্য জমিতে তিনি ধান চাষ করেছেন। এরপর পর্যাপ্ত বীজ তৈরি করে ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে ওই সব ধান চাষ করবেন। পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা আরও একাধিক জাতের ধানবীজ সংগ্রহ করে চাষ করার ইচ্ছা আছে তাঁর।

হরিণাকুণ্ডুর দুর্লভপুর গ্রামের মৃত গোলাম রব্বানীর ছেলে সোহেল রানা। তিনি গ্রামের স্কুল থেকে প্রাইমারি, মাধ্যমিক পড়ালেখা শেষ করে ঝিনাইদহ শহরের কেসি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন। পরে তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে চাকরি নেন। কর্মজীবনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশে ‘টেকসই পুষ্টির লক্ষ্যে বৈশ্বিক জোট প্রকল্পের কো-লিডার হিসেবে কর্মরত আছেন।

সোহেল রানা বলেন, ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্টের নানা প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন আমাদের মধ্য থেকে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ অনেক জাতের ধান হারিয়ে যাচ্ছে। যেগুলোর ওপর গবেষণা করলে ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। অথচ আমরা ভালো ফলনের কথা বলে নতুন নতুন জাতের ধান চাষ করে যাচ্ছি। জিংকসমৃদ্ধ ধান হারিয়ে ফেলতে বসেছি।’ এসব দেখে সিদ্ধান্ত নেন হারিয়ে যাওয়া ধান চাষের মাধ্যমে তিনি তা ফিরিয়ে আনবেন। সেই চিন্তা থেকেই স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির, স্থপতি সুহায়েলী পারভিন, শিক্ষক আলমগীর কবিরের সহায়তায় তিনি হারিয়ে যাওয়া ওই ১০টি জাতের ধান চাষের পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরু করেন খামার প্রতিষ্ঠা ও বীজ সংগ্রহ। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, দেশি বীজ সংরক্ষণ, কৃষি পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বনির্ভর আবাসন তৈরিতে স্থানীয় জ্ঞানের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা এই খামার গড়ে তোলেন।

মাসুদ রানা আরও জানান, প্রথমে ভাদড়া গ্রামের মাঠে ৫ বিঘা জমিতে খামার প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই খামারের নাম দেন ‘আদান–প্রদান’। এরপর শুরু হয় বীজ সংগ্রহ। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী এলাকা থেকে পঙ্খিরাজ, দাদখানি, বেগুনবিচি, ভাষামানিক, কলমকাটি, দোলাভোগ, এলাই, রানাশাইল, পরাঙ্গী, কৃষ্ণকলি নামের ১০টি জাতের বীজ সংগ্রহ করেন। বীজ পাওয়ার পর জমি তৈরি করে সেখানে চাষ শুরু করেন। চলতি আউশ মৌসুমে ১০টি প্লটে মোট ১৫ শতাংশ জমিতে ওই ১০টি জাতের ধানের চাষ করেন। বর্তমানে ধান পাকতে শুরু করেছে। অল্পদিনের মধ্যে এই ধান কেটে তাঁরা বীজ তৈরি করবেন। বর্তমানে কৃষকের খেতে যেসব জাতের ধান চাষ হচ্ছে একই নিয়মে তাঁরা ওই সব ধান চাষ করেছেন। অন্য জাতের ধান চাষের চেয়ে এই জাতগুলো চাষে খরচ কিছুটা কম হয়। ফলন বিঘায় ১৪ থেকে ১৫ মণ হয়ে থাকে। এই জাতের ধানগুলো পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে বিক্রির মূল্য বেশি পাওয়া যায়।

মাসুদ রানা আরও বলেন, ‘রানাশাইল ধান সম্পূর্ণ লাল চাল হয়। অনেক সময় চিকিৎসকেরা এই চাল খাওয়ার পরামর্শ দেন, অথচ আমরা এই ধান হারিয়ে ফেলছি।’ প্রথম বছর এই ধান চাষ করেছেন, আশা করছেন এই চাষ থেকে অধিক পরিমাণে বীজ তৈরি করে ভবিষ্যতে আরও বেশি বেশি ধান চাষ করবেন। মূলত ’৭০-এর দশক থেকে বোরো ধান চাষ শুরু হলে এসব জাত কমতে শুরু করে। কিন্তু ৭৫ থেকে ৮৫ দিন জীবনকালের এই ধানগুলো দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই বিধায় এগুলো চাষ করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তেমন প্রয়োজন পড়ে না। কবি যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর কাজের ছেলে কবিতায় দাদখানি চালের কথা উল্লেখ করেছেন। বেগুনবিচি সুগন্ধিযুক্ত ধান, দেখতে বেগুনের বিচির মতো গোল। কলমকাটি লম্বা সরু ধান, যা অতিথি আপ্যায়নের জন্য ব্যবহার হয়।

ভাদড়া গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আদান–প্রদান’ খামারে পুরোনো দিনের ধানের চাষ হচ্ছে জানতে পেরে তাঁরা মাঝেমধ্যেই দেখতে আসেন। খেতে ধানগাছও ভালো হয়েছে, এখন ফলন কেমন হবে, সেটা দেখার অপেক্ষায় আছেন। বাজারে বিক্রিমূল্য হিসাব করে এই ধান চাষে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে ভবিষ্যতে তাঁরাও চাষ করবেন বলে জানান। ইতিমধ্যে বীজ চেয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে  জানান, ‘এসব ধানের জাতের কৃষিক্ষেত্রে বেঁচে থাকা জরুরি। ধান গবেষণায় এগুলো কাজে লাগে। তবে এ ধানের ফলন কম হওয়ায় কৃষক চাষ করতে আগ্রহী হন না। এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা চিন্তা করে ধান গবেষণা বিভাগ অধিক ফলনশীল জাত আবিষ্কার করছে। তবে সোহেল রানার হারিয়ে যাওয়া ধানের চাষের উদ্যোগটা বেশ প্রশংসনীয়।’

‘আদান-প্রদান’ কৃষি খামারে ধানখেতে কৃষক সোহেল রানা
‘আদান-প্রদান’ কৃষি খামারে ধানখেতে কৃষক সোহেল রানা। ছবি : প্রথম আলো

বান্দরবানে চিত্র প্রদর্শনী: পাল্লায় উঠেছে প্রাণ-প্রকৃতি, শিল্পীর তুলিতে বিপন্ন পাহাড় by বুদ্ধজ্যোতি চাকমা

প্রকাশ ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ ঝিরি-ঝরনার পাথর ও জীবন্ত ব্যাঙ দাঁড়িপাল্লায় ঝুলছে। বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। প্রাণ-প্রকৃতি যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের নিসর্গ ও পাহাড়ি মানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আঁকা এই ছবির সামনে দর্শকেরা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ান। শিল্পী খিং সাই মং মারমার আঁকা ছবিটি যেন পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস।

বান্দরবান জেলা শহরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে (কেএসআই) খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীর শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৯ ডিসেম্বর। ‘রোয়া-দ্ব’ নামের এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর জলরং ও তেলরঙে আঁকা ২৭টি ছবি।

শিল্পী খিং সাই মং মারমা প্রতিটি ছবিতে বান্দরবানের প্রাকৃতিক ও জাতিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া যেমন রয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে হারানো সময়ের চালচিত্র। আদিবাসী ঐতিহ্যের শিকড়সন্ধানী শিল্পীর মনোভাবে পরিচয় মেলে প্রদর্শনীর নামকরণেও। ‘রোয়া-দ্ব’ নামে আয়োজিত এই প্রদর্শনী বান্দরবানের অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। মারমা ভাষায় ‘রোয়া-দ্ব’ বলতে বান্দরবানকে বোঝায়। আরও পরিষ্কার করে বললে, ‘রোয়া-দ্ব’ হলো বোমাং সার্কেলের কেন্দ্রীয় গ্রাম বা রাজধানী।

শিল্পীর বেশ কয়েকটি ছবির শিরোনাম ‘অস্তিত্ব’। এই সিরিজের একটি ছবিতে দেখা যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, কুকুরের পাশ ঘেঁষে বসে থাকা কয়েকটি পাহাড়ি শিশু শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উড়ন্ত পালকের দিকে। ছবিটি দর্শককে আচ্ছন্ন করে। আক্রান্ত করে। পাহাড়ের বাস্তবতা ও তার অনিশ্চয়তার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

‘পাথর’ শিরোনামে একটি ছবিতে দেখা যায়, ঝিরি-ঝরনার পাথর দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়েছে, তার নিচে একটি কাঁকড়া। কোটি বছর ধরে বালুকণা জমে সৃষ্ট পাথর বিক্রি হচ্ছে, অপর দিকে এই পাথর যার আবাস, সেই কাঁকড়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে।

শিল্পী খিং সাই মং মারমার ছবিতে হাইপাররিয়েলিজম অর্থাৎ অতিবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটেছে। ফটোগ্রাফির নিখুঁত ডিটেইল পাওয়া যায় তাঁর ছবিতে। একই সঙ্গে পরিপার্শ্বকে বদলে দেওয়া নতুন বাস্তবতাও আবিষ্কার করে দর্শক।

প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে খিং সাইয়ের ছবিতে। শিল্পী খিং সাই মং বলেন, তাঁর শৈল্পিক পথচলায় পাহাড়ের ভূমি, ভূমিপুত্র ও তাদের জীবনযাত্রা ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছে। ছবিগুলো সেই গভীর অনুভূতির প্রতিফলন। খিং সাইয়ের এটি প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেক এই ছাত্র এর আগে দলগতভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৫টি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন।

চিত্র প্রদর্শনীতে সহযোগিতা করেছেন সেনাবাহিনীর বান্দরবান ৬৯ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান। সমাপনী অনুষ্ঠানে এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান বলেন, শিল্পী খিং সাই মং মারমার এই প্রদর্শনী দেখে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন। তাঁর ছবি ভবিষ্যতে পাহাড়কে আলোকিত করবে।

শিল্পী খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীতে ছবি দেখছেন এক দর্শক। গত শুক্রবার বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে
শিল্পী খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীতে ছবি দেখছেন এক দর্শক। গত শুক্রবার বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে। ছবি- মং হাই সিং মারমা

বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট

কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার নাম বৈশ্বিক গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে প্রায় প্রতিদিন। ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল নৌ মহড়া, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি, নিকোলা মাদুরোর ‘যুদ্ধপ্রস্তুতি’—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, দেশটা যেন একটা ‘টাইমবোমা’র ওপর বসে আছে।

একজন বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন নিকোলা মাদুরো। কর্মজীবনের শুরুতে যখন বাসচালক ছিলেন, সে সময়ই শ্রমিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তিনি শ্রমিকদের নেতৃত্বে আসেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিক রাজনীতি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

নিকোলা মাদুরো শ্রমিক রাজনীতি থেকে ক্রমে জড়িয়ে পড়েন জাতীয় রাজনীতিতে। মাদুরো ২০১৩ সালের এপ্রিলে খুবই কম ভোটের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, পরে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ২০১৮ সালের ২০ মে সেই নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়। ক্ষমতা নেওয়ার পরই তাঁর বিরুদ্ধে গণতন্ত্র নস্যাৎ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আসে।

নিকোলা মাদুরো বিরোধী মত সহ্য করেন না এবং তাঁর কারণে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে মাদুরোর শাসনে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে চরম মন্দা দেখা দেয়। মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকট—সবকিছু মিলিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছে।

ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে দেশটির হাজার হাজার নাগরিক পাশের দেশগুলোয় গিয়ে আশ্রয় নেন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এত মানুষের নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। মাদুরো ২০১৭ সালের আগস্টে একটি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়।

মাদুরো একটা পর্যায়ে সবার ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেটা তাঁর শক্তি বাড়ানোর কৌশল ছিল বলে বিরোধীরা মনে করেন।

হুগো চাভেজের উত্তরসূরি হলেন যেভাবে

ভেনেজুয়েলায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা হুগো চাভেজের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন মাদুরো। চাভেজের সরকারে ঘটনা পরম্পরায় নিকোলা মাদুরো পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন ২০০৬ সালে। সেই থেকে তিনি হুগো চাভেজের মৃত্যুপর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন এবং অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৩ সালে নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

মাদুরো ১৯৯৮ সালে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হন। সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। হুগো চাভেজের বড় ধরনের প্রভাব ছিল তাঁর ওপর। মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও হুগো চাভেজের প্রতিরক্ষা দলের সঙ্গে ছিলেন। তবে মাদুরোর শাসনামলে তেলের দামে পতন, দুর্নীতি ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এর প্রভাব হিসেবে দেখা দেয় তীব্র মূল্যস্ফীতি। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা; বিতর্কিত নির্বাচন ও বিরোধী দমনের অভিযোগে মাদুরো সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞাও বাড়ে, যা চাভেজ–যুগের তুলনায় শাসনকালকে আরও সংকটপূর্ণ ও বিতর্কিত করে তোলে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও উদ্বাস্তু সংকট

ভেনেজুয়েলার অস্থিরতা ইতিমধ্যে কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও পেরুকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিরোধী দল মাদুরোকে বিশ্বাস করত না। আর মাদুরোও বিশ্বাস করতেন না যে ক্ষমতা ছাড়লে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা নিরাপদ থাকবেন। এদিকে চাপ জোরদার করতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। বারবার ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা হয়। হুমকি আসতে থাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকেও। মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। অবশেষে শনিবার মাদুরোকে তাঁর নিজ দেশের রাজধানী কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যায়।

নিকোলা মাদুরো
নিকোলা মাদুরো। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ব্রুকলিনের আটককেন্দ্রে রাখা হবে মাদুরোকে, অনেক কিউবান মারা গেছেন: ট্রাম্প

বিবিসি, আল–জাজিরাঃ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে কড়া নিরাপত্তায় ব্রুকলিনের আটককেন্দ্রে (মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে) নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখান থেকেই তাঁকে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, স্থানীয় সময় শনিবার বিকেলে নিউইয়র্কের বিমানঘাঁটিতে নামার পর মাদুরোকে উড়োজাহাজে করে ম্যানহাটানের ওয়েস্টসাইড হেলিপোর্টে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ডিইএ) সদর দপ্তরে নিয়ে প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। এরপরই তাঁর পরবর্তী গন্তব্য হতে যাচ্ছে ব্রুকলিনের বন্দিশিবির।

নিউইয়র্কের এই আটককেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দীদের রাখার জন্য পরিচিত। এর আগে পপ তারকা আর কেলি, যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল এবং সম্প্রতি র‍্যাপার শন ‘ডিডি’ কম্বসকে এখানেই রাখা হয়েছিল।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ৩ জানুয়ারি ভোরে এক অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন বাহিনী। আগামী সপ্তাহে ম্যানহাটানের আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে আনা মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগগুলোর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলে ফ্লোরিডার পাম বিচের মার–আ–লাগো বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের কাছে অনেক ‘জোরালো প্রমাণ’ রয়েছে। তিনি বলেন, এটি (মাদুরোর অপরাধ) একদিকে ভয়াবহ, অন্যদিকে হতবাক করে দেওয়ার মতো।

মাদুরোকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক কিউবান মারা গেছেন: ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটকের অভিযানে কিউবার অনেক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শনিবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন অভিযানের সময় কিউবানরা মাদুরোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, যা তাঁদের জন্য মোটেও ভালো সিদ্ধান্ত ছিল না।

দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কিউবা। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মাদুরো তাঁর নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের জন্য কিউবান দেহরক্ষী ও উপদেষ্টাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। মার্কিন বাহিনী যখন মাদুরোকে আটক করতে যায়, তখন সেখানে থাকা কিউবানরা বাধা দিলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে জানান ট্রাম্প।

এদিকে ভেনেজুয়েলায় এই অভিযানের পর কিউবা সরকারকেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, কিউবার কর্মকর্তাদের এখন ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত। তাহলে কিউবাতেও কি ভেনেজুয়েলার মতো সামরিক অভিযান চালাবে যুক্তরাষ্ট্র—নিউইয়র্ক পোস্টের এমন প্রশ্নে ট্রাম্প ‘না’ সূচক উত্তর দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেন, কিউবায় হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই। কিউবা নিজেই পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির অবস্থা বর্তমানে খুবই নাজুক।

অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল বারমুদেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে কড়া ভাষায় ভেনেজুয়েলায় হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘অপরাধমূলক হামলা’ চালানোর জন্য ওয়াশিংটনকে অভিযুক্ত করে জরুরি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-04%2Fag3xu1yf%2FHelicopte-Maduro.jpg?rect=0%2C0%2C3744%2C2496&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ম্যানহাটানের ওয়েস্টসাইড হেলিপোর্টে নামছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বহনকারী হেলিকপ্টার। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র; ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

নিকোলা মাদুরোপুত্র মাদুরো গুয়েরা সম্পর্কে যা জানা গেল

ইউএসএ টুডেঃ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাজধানী কারাকাস থেকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তাঁদের বিচার করার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ ঘটনার পর মাদুরো ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে অনেকের মধ্যে।

মাদুরোর বর্তমান স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তাঁকে বিয়ে করেন মাদুরো। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তাঁর এক ছেলে রয়েছে। তাঁর নাম নিকোলা মাদুরো (জুনিয়র) গুয়েরা (৩৫)।

নিকোলা মাদুরো (জুনিয়র) গুয়েরার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক চোরাচালানসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্ট সদস্য। তিনি ‘নিকোলাসিতো’ বা ‘রাজপুত্র’ নামেও পরিচিত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদুরো গুয়েরার জন্ম ১৯৯০ সালে। তাঁর মায়ের নাম আদ্রিয়ানা গুয়েরা আঙ্গুলো। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় মাদুরোর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়।

মাদুরো গুয়েরাই ভেনেজুয়েলায় ‘চাভিসমো’ আন্দোলনের ঝান্ডা বয়ে নেবেন বলে অনেকে মনে করেন। ভেনেজুয়েলার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ ছিলেন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত। এই মতবাদকে এগিয়ে নিতে তিনি ভেনেজুয়েলায় চাভিসমো আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন।

নিকোলা মাদুরো গুয়েরা কে

যুক্তরাষ্ট্রের মামলার নথি অনুযায়ী, নিকোলা মাদুরো ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর একমাত্র ছেলে নিকোলা মাদুরো গুয়েরাকে ‘প্রেসিডেন্সির স্পেশাল ইন্সপেক্টর কোরের’ প্রধান নিয়োগ করেন।

চার বছর পর মাদুরো গুয়েরা ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। এটি ছিল মূলত একটি নির্বাচিত অস্থায়ী সংসদ, যার দায়িত্ব ছিল সংবিধান পুনর্লিখন করা। এরপর ২০২১ সালে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির (পার্লামেন্ট) সদস্য নির্বাচিত হন মাদুরো গুয়েরা। তিনি এখনো এ পদে আছেন।

মাদুরো গুয়েরা ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্মড ফোর্সেসে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল সিস্টেম অব ইয়ুথ অ্যান্ড চিলড্রেনস অর্কেস্ট্রায় বাঁশি বাজানো শিখেছিলেন।

ব্যক্তিজীবনে মাদুরো গুয়েরা বিবাহিত। তাঁর স্ত্রীর নাম গ্রিসেল। এই দম্পতির দুটি কন্যাসন্তান আছে বলে ভেনেজুয়েলার সংবাদমাধ্যম এল এস্টিমুলোর জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

২০১৯ সালে মাদুরো গুয়েরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন। নিকোলা মাদুরোর ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এ পদক্ষেপ নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, মাদুরোর ছেলে প্রোপাগান্ডা ও সেন্সরশিপে জড়িত। তিনি ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে লাভ করেছেন। দেশটিতে মানবিক সহায়তা ঢুকতে না দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সহায়তা করারও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল, শক্ত হাতে অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভেনেজুয়েলার জনগণকে দমন করতে নিকোলা মাদুরো তাঁর ছেলেসহ অন্যান্য সহযোগীর ওপর নির্ভর করতেন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর একমাত্র ছেলে নিকোলা মাদুরো গুয়েরা
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর একমাত্র ছেলে নিকোলা মাদুরো গুয়েরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ধাপে ধাপে চাষ করেন জাহাঙ্গীর, ১৩ বিঘা জমিতে লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো by শফিকুল ইসলাম

চাকরির বেতনে সংসার চলত কোনোরকমে। ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার বেতনে প্রতিটি খরচ হিসাব করে করতে হতো। অনেক সময় ৫০ টাকা খরচ করতেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছে। সেই সময় পেছনে ফেলে চাকরি ছেড়ে কৃষি উদ্যোগে বদলে গেছে ৩৩ বছরের যুবক জাহাঙ্গীর হোসেনের জীবন।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। একসময় তিনি বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে চাকরি করতেন। রাজশাহী বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৯ বছর। ২০২১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নামেন কৃষিকাজে। শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০ কাঠা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ দিয়ে। পাঁচ বছরের মাথায় এখন তাঁর চাষ করা জমির পরিমাণ ১২ থেকে ১৩ বিঘা। এসব জমিতে চাষ করেছেন বিটরুট, পুদিনাপাতা, লেটুস, আইস লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম ও বালচিং অনিয়ন।

চেনা পথ ছেড়ে ভিন্ন কিছু

জাহাঙ্গীর চাকরি ছেড়ে প্রচলিত ফসল চাষের পথে হাঁটেননি। তিনি বেছে নিয়েছেন চায়নিজ বিভিন্ন সবজি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জমিতে আছে বিটরুট। তিনি ১০ বিঘায় চাষ করেছেন বিটরুট। জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ধান-গম কেজিতে দাম বাড়ে না, কিন্তু সবজিতে কেজিতেই দাম বাড়ে। এই চিন্তা থেকেই ভিন্নপথে হাঁটলাম।’ তিনি জানান, এই উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে ছিল পবা উপজেলা কৃষি অফিস। ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন দেওয়ান নিয়মিত মাঠে এসে পরামর্শ দিচ্ছেন। জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন দেওয়ান বলেন, জাহাঙ্গীর খুব বিচক্ষণ কৃষক। তিনি বাজার বুঝে চাষ করেন, নিজেই বাজারজাত করেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।

ধাপে ধাপে চাষ

সব ফসল একসঙ্গে চাষ না করে ধাপে ধাপে চাষ করে ফলন বাজারে আনেন জাহাঙ্গীর। আগাম চাষ করা কয়েক বিঘার বিটরুট ইতিমধ্যে তুলে বিক্রি করেছেন। মাঠে কোথাও বিটরুট তোলার শেষ পর্যায়, কোথাও গাছ বড় হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য বীজ বপন করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সব একসঙ্গে বাজারে আনলে দাম পাওয়া যায় না। তাই পর্যায়ক্রমে চাষ করি, যেন সব সময় কিছু না কিছু বাজারে থাকে। বর্তমানে বিটরুটের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা। ভালো বাজার পেলে এক বিঘা জমি থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব। এতে জমি ভাড়াসহ খরচ পড়ে ৭০-৭৫ হাজার টাকা।’

পুদিনাপাতায় আলাদা বাজার

তিন বিঘা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ করছেন জাহাঙ্গীর। বর্ষাকালে পুদিনাপাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বাসের মাধ্যমে পুদিনাপাতা পাঠান তিনি। জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, পুদিনাপাতা রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয়। রাজশাহী ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় পুদিনাপাতা পাঠান। এই পাতা চাষে খরচ কম, আয় বেশি।

বর্তমানে তাঁর খামারে প্রতিদিন পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। প্রয়োজনে আরও লোক নেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘একসময় আমি পরাধীন ছিলাম। অন্যের চাকরি করতাম। আজ আমার কাজ দিয়ে পাঁচটা পরিবার চলছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।’

সরেজমিনে মাঠে

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের সকালের রোদে থালতা গ্রামের মাঠজুড়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা। কয়েকজন শ্রমিক মাটির নিচ থেকে তুলে আনছেন লালচে বিটরুট। পাশে বস্তায় ভরে রাখা হচ্ছে সবজি। একটু দূরে কাঁচা সবুজের সারি পুদিনাপাতা। বাতাসে ভেসে আসছে তাজা সবজির গন্ধ। পাশাপাশি সারি সারি লেটুসপাতা নজর কাড়ছে। কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন মাঠে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছেন। কখনো বিটরুট তোলা দেখছেন, কখনো বস্তায় ভরছেন। আবার পুদিনাপাতার বস্তা ঠিকঠাক করছেন। স্থানীয় কৃষক তবুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ফসল আগে এলাকায় কেউ করতেন না। জাহাঙ্গীরই শুরু করেছেন। এখন তিনি একাই ১০ বিঘায় বিটরুট চাষ করছেন। এলাকায় এ উদাহরণ হয়ে গেছে।’

ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ ও কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন জাহাঙ্গীরের। তিনি বলেন, ‘কষ্টের কোনো বিকল্প নেই। মাটি ধরলে মাটি আপনাকে ফিরিয়ে দেবে—এই বিশ্বাসেই সামনে এগোচ্ছি। চাকরির অনিশ্চয়তার জীবন ছেড়ে মাটির ওপর ভরসা রেখেছি।’

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘জাহাঙ্গীর একজন শিক্ষিত উদ্যোক্তা। তিনি যে ফসলগুলো চাষ করছেন, সেগুলো লাভজনক ও ব্যতিক্রমী। আমরা নিয়মিত তাঁকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি। জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তা যদি আরও বাড়ে, তাহলে কৃষি আরও আধুনিক হবে।’

বিটরুট বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামে
বিটরুট বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

মাদুরো আটক: ভেনেজুয়েলা সরকারের একটি সূত্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল by গ্যারেথ ইভানস

যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরেরা মাসের পর মাস ধরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজর রেখেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, এ কাজে যুক্ত ছিল ছোট্ট একটা দল, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার সরকারে থাকা একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল, যাদের কাজ ছিল মাদুরো কোথায় ঘুমান, কী খান, কী পরেন, রোজ কী কী কাজ করেন—এসব কিছু নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা।

এরপর ডিসেম্বরের শুরুতে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’ নামে এক মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।

এটি ছিল বহু মাস ধরে করা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিকল্পনা আর অনুশীলনের (রিহার্সাল) ফল, যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট শাখা ডেলটা ফোর্সকে। অভিজাত এ বাহিনীর সদস্যরা মাদুরোর প্রাসাদের সমান আকারের একটি মডেল বানিয়ে অনুশীলন করেছেন।

এ পরিকল্পনা, যাকে বলা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান, তা ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়।

মার্কিন কংগ্রেসকে এ পরিকল্পনার বিন্দুবিসর্গ জানানো হয়নি, ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে কোনো আলোচনাও হয়নি।

পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিখুঁত পর্যালোচনার পর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছিল অভিযান শুরুর সর্বোত্তম পরিস্থিতির জন্য।

শনিবার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা আচমকা হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলাকে বিস্মিত করে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

চার দিন আগে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন, ভালো আবহাওয়া থাকবে, এমন সময়ে অভিযানের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বড়দিন এবং নতুন বছরের পুরো সপ্তাহজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত ছিলেন, ধৈর্য ধরেছেন সঠিক সময়ের জন্য এবং অভিযান শুরু করতে প্রেসিডেন্টের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেছেন।

অভিযান শুরুর নির্দেশ

শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অভিযান শুরুর নির্দেশ আসে।

‘আমরা এটা করতে যাচ্ছিলাম চার দিন আগে, তিন দিন আগে, দুই দিন আগে—তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু (পরিকল্পনার সঙ্গে) মিলে গেল এবং আমরা সঙ্গে সঙ্গে বললাম, শুরু’—ভেনেজুয়েলায় মধ্যরাতে অভিযান চালানোর পর শনিবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নিজেই এ কথা বলেন।

ট্রাম্পের নির্দেশ এসেছিল এমন সময়, যখন কারাকাসে মধ্যরাত শুরু হয়েছে। ফলে মার্কিন সেনাবাহিনী অভিযানের বড় অংশটি রাতের অন্ধকারেই চালাতে পেরেছে।
ভেনেজুয়েলার জল, স্থল আর আকাশসীমায় ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের সেই ক্ষিপ্র অভিযান ওয়াশিংটন ও বিশ্বের বহু মানুষকেই চমকে দিয়েছে।

অভিযানের মাত্রা এবং নির্ভুল নিশানা—এটি ছিল কার্যত নজিরবিহীন।
অভিযানের সময় ট্রাম্প ওয়াশিংটনের সিচুয়েশন রুম থেকে তা দেখেননি। বরং তিনি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে মার-এ-লাগো ক্লাবে বসে সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাডক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাশে বসিয়ে নিজের উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশনের লাইভ স্ট্রিম দেখেছেন।

শনিবার ট্রাম্প বলেন, ‘অভিযান দেখাটা ছিল এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আপনি যদি দেখেন, কী ঘটছে, মানে আমি দেখছিলাম যেন-বা এটা একটা টেলিভিশন শো। আপনি যদি এর গতি আর সহিংসতা দেখতেন...দারুণ একটা ব্যাপার, ওরা (সামরিক বাহিনী) একটা অসাধারণ কাজ করেছে।’

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওই অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, সঙ্গে একটি বিমানবাহী রণতরী এবং কয়েক ডজন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত করে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।

ট্রাম্প প্রশাসন বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে মাদক ও অপরাধ চক্রের সদস্য পাঠাচ্ছে।

গত কয়েক মাসের মধ্যে এ অঞ্চলে মাদক পরিবহনের অভিযোগে কয়েক ডজন ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু প্রাথমিকভাবে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’-এর পরিকল্পনা ছিল আকাশপথেই অভিযান চালানো। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা রাতে বোমারু বিমান, যুদ্ধবিমান, নজরদারি করার বিমানসহ দেড় শতাধিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছিল অভিযানে।

ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘এটা খুব জটিল, খুবই জটিল, পুরো কৌশল, ল্যান্ডিং, বিমানসংখ্যা—সবকিছু মিলে। প্রতিটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আমরা একটি করে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রেখেছিলাম।’

রাত দুইটার দিকে কারাকাসে বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল এবং দূর থেকে শহরের ওপরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যেতে থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে

সাংবাদিক আনা ভ্যানেসা হেরেরো বিবিসিকে বলেন, ‘আমি একটা বড় শব্দ শুনলাম, বিকট একটা আওয়াজ। বাড়ির সব কটা জানালা নাড়িয়ে দিয়েছিল। এরপরই দেখলাম, একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী জানালার সামনের পুরো অংশটা যেন ঢেকে দিল।
‘পুরো শহরে বিমান আর হেলিকপ্টার উড়ছিল তখন,’ বলেন তিনি।

এরপরই আকাশে অসংখ্য বিমান ওড়ার ছবি আর ভিডিও এবং বিস্ফোরণের পরের অবস্থাসংক্রান্ত ভিডিওতে ভরে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।

এ রকম একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে কারাকাসের আকাশের অনেক নিচু সীমা দিয়ে হেলিকপ্টারের বহর উড়ে যাচ্ছে।
কারাকাসের প্রত্যক্ষদর্শী দ্যানিয়েলা বিবিসিকে বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দে এবং বিমান চলার তুমুল যান্ত্রিক শব্দে রাত ১টা ৫৫ মিনিটে আমার ঘুম ভেঙে যায়। সবকিছু অন্ধকারের মধ্যে ঘটছিল, হঠাৎ ফ্লাশের মতো আলোর ঝলকানি উঠছিল, যখন কাছাকাছি কোথাও বিস্ফোরণ হচ্ছিল।

‘প্রতিবেশীরা সবাই বিল্ডিংয়ের গ্রুপ চ্যাটে একের পর এক মেসেজ করছিল, সবাই দ্বিধাগ্রস্ত, কেউ বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে! বিস্ফোরণের শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে’, বলেন তিনি।

ঠিক কোন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি চিহ্নিত করার জন্য বিবিসি ভেরিফাই কারাকাসের কাছাকাছি বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ার বেশ কিছু ভিডিও যাচাই করে দেখেছে।

এখন পর্যন্ত জেনেরালিসিমো ফ্রান্সিসকো ডে মিরান্ডা বিমানঘাঁটি, লা কারতোলা নামের একটি এয়ারফিল্ড এবং ক্যারিবীয় সাগরের সঙ্গে কারাকাসের প্রধান প্রণালি পোর্ট লা গুয়াইরাসহ মোট পাঁচটি জায়গার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পেরেছে বিবিসি।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা।

অভিযানের সময় কারাকাসের বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যদিও ঠিক কীভাবে, সেটি নির্দিষ্ট করেননি।

‘বিশেষ প্রক্রিয়ায় কারাকাসের বেশির ভাগ আলো নিভিয়ে রেখেছিলাম আমরা। ফলে অন্ধকার ছিল এবং এক প্রাণঘাতী রাত ছিল এটি’, বলেন ওই কর্মকর্তা।

‘তারা জানত, আমরা আসছি’

কারাকাসের চারপাশে হামলা শুরুর পর, মার্কিন বাহিনী শহরের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের পার্টনার সিবিএসকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ওই বাহিনীর সঙ্গে ছিল সামরিক বাহিনীর এলিট ফোর্স ‘ডেলটা ফোর্স’, এটি মূলত মার্কিন বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনার শীর্ষ বাহিনী।

তারা ছিল নানা রকম সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত—সঙ্গে ছিল ব্লোটর্চ নামের একধরনের আগুনবাহী সিলিন্ডার, যদি মাদুরোর প্রাসাদে কঠোর নিরাপত্তা ঘেরাটোপের মধ্যে কোনো ধাতব দেয়াল বা দরজা কেটে ফেলতে হয়, তার প্রস্তুতি হিসেবে ওই অস্ত্র নেওয়া হয়।

জেনারেল কেইন জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পরই মাদুরোর অবস্থানে পৌঁছে যায় মার্কিন বাহিনী।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোর সেফ হাউসকে কারাকাসের মাঝখানে এক ‘নিশ্ছিদ্র সামরিক দুর্গ’ বলে বর্ণনা করেন। ‘তারা যেন আমাদের জন্য তৈরি হয়েই ছিল। তারা জানত যে আমরা আসছি’, বলেন তিনি।

মার্কিন বাহিনী পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সেনাদের লড়াই হয় এবং একটি আমেরিকান হেলিকপ্টারেও হামলা চালানো হয়। যদিও তারপরও সেটি উড়তে পারছিল।

জেনারেল কেইন বলেন, মার্কিন বাহিনী এরপর মাদুরোর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে নেমে তীব্রগতিতে, যথাযথভাবে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে যায়।

এরপর তার প্রাসাদের ঢুকে পড়ে এবং এমন জায়গায় ঢুকে পড়ে, যা আসলে ভাঙা সম্ভব ছিল না। মানে সেখানে ছিল স্টিলের দরজা—যা কেবল এমন পরিস্থিতির জন্যই বসানো হয়েছিল, বলেন ট্রাম্প।

ওই অভিযানে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়েছে, সেটি শুরুর পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটির আইনপ্রণেতাদের এ পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাতে শুরু করেন এবং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতা চাক শুমার বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিকোলা মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী সময়ে কী হবে, তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া রীতিমতো বেপরোয়া পদক্ষেপ।’

ট্রাম্প বলেন, মাদুরোর বাড়ির প্রাঙ্গণে, অভিজাত ডেলটা ফোর্সের সেনারা যখন ঢুকছিলেন, তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট একটি নিরাপদ কক্ষে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তিনি একটি নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেটি নিরাপদ ছিল না। কারণ, ওই দরজা মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যে উড়িয়ে দেওয়া হতো, বলেন ট্রাম্প।

শনিবার স্থানীয় সময় ভোররাত ৪টা ২০ মিনিট নাগাদ মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে একটি হেলিকপ্টার ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ত্যাগ করে। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়ালার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

* গ্যারেথ ইভানস, ওয়াশিংটন

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ছবি নিজের ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ছবি নিজের ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলায় হামলার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন মামদানি

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহরান মামদানি। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তিনি বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকায় এ অভিযান নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের ওপর ‘সরাসরি প্রভাব ফেলবে’।

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মামদানি বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে ফোন করেছিলাম এবং এই কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমার আপত্তির কথা জানাতে তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছিলাম।’

মামদানি জানান, প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন যে তিনি সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইন লংঘনের বিরুদ্ধে।

গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ করা জোহরান মামদানি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে তাঁর সহযোগীরা জানিয়েছেন, মামদানি নিজেই ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন। অবশ্য তাঁদের মধ্যে বেশিক্ষণ কথা হয়নি।

স্থানীয় সময় শনিবার ভোররাতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।

এক সময় ট্রাম্পকে একজন ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যায়িত করা মামদানি শনিবার অনলাইনেও ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ব্রুকলিনের একটি আটককেন্দ্রে রাখার বিষয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তেও অসন্তোষ জানান তিনি।

মামদানি এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর আটক করা এবং তাঁদের নিউইয়র্ক শহরে ফেডারেল কাস্টডিতে বন্দী করে রাখার পরিকল্পনার বিষয়ে আজ সকালে (শনিবার) আমাকে জানানো হয়েছে।’ তিনি লিখেছেন, ‘একতরফাভাবে একটি সার্বভৌম দেশে হামলা চালানো যুদ্ধের শামিল এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন।’

মামদানি আরও লেখেন, ‘সরকার পরিবর্তনের এই নির্লজ্জ চেষ্টা শুধু বিদেশিদের ওপরই প্রভাব ফেলবে না, এটি সরাসরি নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। হাজার হাজার ভেনেজুয়েলান এই শহরকে নিজেদের শহর বলে থাকেন, তাঁদের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তাঁদের নিরাপত্তা ও নিউইয়র্কের প্রত্যেক বাসিন্দার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর আমরা গুরুত্ব দিই। আমার প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।’

ট্রাম্পকে মামদানির ফোনকলের বিষয়ে জানতে চেয়ে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল দ্য ইনডিপেনডেন্ট।

জোহরান মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার কথা–চালাচালি হয়েছে। তিনি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের সঙ্গে এই প্রথম তাঁর বিরোধ দেখা দিল। তবে এটাই শেষ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে মাদুরোকে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে (এমডিসি) আটক রাখা হয়েছে। ম্যানহাটনের আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের আনা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে তাঁর বিচার হতে পারে। সোমবার সকালের দিকে মাদুরোকে আদালতে হাজির করা হতে পারে।

মামদানি স্বীকার করেছেন যে মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যেসব ব্যবস্থা নেবে, সেগুলোয় তাঁর তেমন একটা প্রভাব রাখার সুযোগ থাকবে না। তিনি বলেছেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যেসব পদক্ষেপ নেয়, সেগুলোয় যেন নিউইয়র্কবাসীর দৈনন্দিন জীবনে তেমন প্রভাব না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-07%2F0p2s1vdu%2F2.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জোহরান মামদানি। ফাইল ছবি: এএফপি