Monday, September 21, 2026

হামলার প্রস্তুতি নিয়েও কেন সরে এলেন ট্রাম্প?

ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও অনুমোদিত হয়েছিল এবং যুদ্ধবিমানে বোমা তোলা হচ্ছিল। তবে হামলা শুরুর ঠিক আগে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত বদলে অভিযান থেকে সরে আসেন বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের জানানো হয়েছে।

এদিকে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ও সৌদি আরবের ওপর হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের চাপ বাড়ছে। রয়টার্সও জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ ট্রাম্পের কাছে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় রাজি না হয়ে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের অনুরোধ নিয়ে ট্রাম্প বেশ কিছুদিন ধরেই দ্বিধায় ছিলেন। সৌদি আরবের ওপর হুতিদের চাপ বাড়ার মধ্যে গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ আবারও ট্রাম্পকে ফোন করে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন।

এর মাত্র এক দিন আগে ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছিলেন, হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যকার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো উচিত নয়। কিন্তু সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনালাপের পর তিনি অবস্থান বদলে পেন্টাগনকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিতে বলেন।

তবে আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, অন্তত আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন বিমান হামলা চালানো হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে। ততক্ষণে কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনুমোদন করেছিলেন, নির্ধারিত যুদ্ধবিমানগুলোতে বোমা তোলা হচ্ছিল এবং হামলার প্রথম ধাপ শুরু হওয়ার অপেক্ষা চলছিল।

হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং ওয়াশিংটন তার মিত্রদের রক্ষা করবে।

আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বেশির ভাগ সদস্যই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে সৌদির হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর বিষয়ে গভীরভাবে সন্দিহান অথবা সরাসরি বিরোধী।

এদিকে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট জানান, ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন হুতিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না।

এর আগেও একই ধরনের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। ১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ড সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রকে ফোন করে জানিয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না।

তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সময় সৌদি আরব হুতিদের হামলার মুখে ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে সৌদি রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে হুতিরা। রয়টার্স জানিয়েছে, এ হামলার পর রিয়াদে রাতভর নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়।

ইয়েমেনের ভেতরেও হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রিত বড় অংশের ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। তাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তার ওপরও নতুন চাপ তৈরি করেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চাইলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এদিকে ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরান ইস্যুতেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে রয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে ট্রাম্প বলেছেন, খুব বেশি দূরে নয়, শিগগিরই বড় কিছু ঘটতে পারে।

ইরানকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছেন, দেশটির নেতৃত্বকে সতর্ক হতে হবে এবং তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

সৌদি যুবরাজ সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: গেটি ইমেজস
সৌদি যুবরাজ সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: গেটি ইমেজস

সৌদি আরবের এমন অবস্থারই অপেক্ষায় ছিল ইসরায়েল

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য পেতে রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে এ যোগাযোগ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আরটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের যোগাযোগ সত্যিই হয়ে থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এতদিন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় ছিল।

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নৌপথের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এতে সৌদি আরবের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি দেশটিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও লজিস্টিকসের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েল কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে হুথি ও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। স্যাটেলাইট নজরদারি, সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা ও অস্ত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য এসব তথ্য হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর বিনিময়ে রিয়াদকে রাজনৈতিকভাবে কতটা মূল্য দিতে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের ওপর হামলার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়িয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও ইয়েমেনে নতুন করে সরাসরি যুদ্ধের মূল দায়িত্ব নিতে এখনই প্রস্তুত নয়।

ইরানকে ঘিরে বদলে যেতে পারে সৌদি অবস্থান

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে রিয়াদ।

এ নীতির ফলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে। এমনকি বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরও রিয়াদ নিজেকে সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে দেখাতে চায়নি এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু হলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরান সৌদি আরবের কাছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য হস্তান্তরকে শুধু হুতিদের বিরুদ্ধে কারিগরি সহযোগিতা হিসেবে না দেখে তেহরানবিরোধী আঞ্চলিক জোটে রিয়াদের যোগদানের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কারণ ইরানের দৃষ্টিতে হুতিরা বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়, তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ।

ফিলিস্তিন ইস্যুও বড় বাধা

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতা শুধু ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে না। আরব বিশ্বে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক শর্তের কথা বলে আসছে। ফলে রাজনৈতিক সমাধানের আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা কেন প্রয়োজন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে রিয়াদকে।

এখানেই সেন্টকমের মধ্যস্থতার গুরুত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড দুই দেশের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে সৌদি আরব সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা না দিয়েও ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারে। একইভাবে ইসরায়েলও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত সুযোগ

ইসরায়েলের জন্য এমন সহযোগিতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগেই সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে ইসরায়েল দেখাতে পারবে, ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলায় দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরব দেশগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয়।

ফলে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ শুধু রাজনৈতিক প্রকল্প না থেকে বাস্তব নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

গত কয়েক বছর ধরে উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে ইসরায়েল। কয়েক বছর আগেও এমন সহযোগিতা প্রায় অকল্পনীয় মনে হলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সৌদির সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

হুতিদের হামলা, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের ঝুঁকি এবং সৌদি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা রিয়াদকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

সৌদি আরবকে হয় ইয়েমেনে আবারও জটিল ও অনিশ্চিত সামরিক অভিযানে একা যেতে হবে, নয়তো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এমন দেশগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক। যুক্তরাজ্য মূলত পরামর্শক পাঠানোর মধ্যেই সীমিত রয়েছে। আবার সৌদি আরবের আঞ্চলিক অংশীদাররাও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।

আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও এখন পর্যন্ত রিয়াদের তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজন মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলই হয়তো হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য দিতে সক্ষম হতে পারে।

যদি ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য সৌদি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে প্রথম কার্যকর সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। শুরুতে এটিকে জরুরি পরিস্থিতির সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হলেও তা কার্যকর প্রমাণিত হলে পরে ভেঙে ফেলা কঠিন হতে পারে।

ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান সম্ভবত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানের সঙ্গে ইসরায়েলের বৃহত্তর ইরানবিরোধী কৌশলের বিষয়টি আলাদা করে দেখবে না।

ইরান যদি মনে করে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতায় যাচ্ছে, তাহলে সৌদি সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি তেল স্থাপনা, বন্দর, ট্যাংকার চলাচলের পথ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব অবকাঠামো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জোটের পথে কতটা এগিয়েছে রিয়াদ?

তবে এখনই বলা কঠিন যে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং রিয়াদ আপাতত একটি নির্দিষ্ট সামরিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা খুঁজছে; এমনটাই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সৌদি নেতৃত্ব ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য, মার্কিন সহায়তা এবং ব্রিটিশ পরামর্শ নিতে আগ্রহী হলেও অন্য কোনো পক্ষের যুদ্ধে নিজেদের সরাসরি সম্মুখসারিতে দেখতে চাইবে না।

তবে হুতিদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা যদি ধীরে ধীরে ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তখন বিষয়টি শুধু ইয়েমেন, লেবানন বা লোহিত সাগরের পৃথক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ইসরায়েল, সৌদি আরব ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের একদিকে এবং ইরান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোকে অন্যদিকে রেখে দুটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বর্তমান যোগাযোগকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের আরেকটি ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটি ভবিষ্যতে পুরো আঞ্চলিক সংঘাতের কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে।

তবে এখনো রিয়াদ চূড়ান্ত কোনো সীমা অতিক্রম করেছে; এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। বরং বর্তমান যোগাযোগকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র : আরটি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

অমুসলিমদের ভয় কাটাতে ব্রিটেনে শতাধিক মসজিদ উন্মুক্ত

দ্য গার্ডিয়ানঃ ব্রিটেনে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ও মসজিদে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকায় মানুষকে ইসলাম ও ব্রিটিশ মুসলিমদের সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ দিতে একশর বেশি মসজিদ সাধারণ মানুষের জন্য তাদের দরজা খুলে দিয়েছে। ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচির আওতায় লন্ডন, বার্মিংহাম, শেফিল্ড, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, সাউথেন্ড ও কার্ডিফসহ বিভিন্ন শহরের মসজিদে এই আয়োজন করা হয়।

মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন আয়োজিত ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচিটি এবার ১১ বছরে পড়েছে। মসজিদগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য চা, বিভিন্ন সংস্কৃতির খাবার, আলোচনা, আন্তধর্মীয় কার্যক্রম, শিল্প প্রদর্শনী এবং মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের মতে, মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এবার এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

উত্তর লন্ডনের লন্ডন ইসলামিক কালচারাল সোসাইটিও এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়। গত তিন বছরে মসজিদটি একাধিক হামলা ও হয়রানির মুখে পড়েছে। এক ঘটনায় এক নারী মুসল্লিদের উদ্দেশে তাদের সন্তানদের হত্যার কথা বলেন। অন্য একটি ঘটনায় ভবনের গ্যাসের পাইপ খুলে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে গ্যাস জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব ঘটনার পরও মসজিদটি নিজেদের আরো বেশি মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের মহাসচিব ড. ওয়াজিদ আখতার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ মুসলিম ও তাদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কে অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তথ্য পাচ্ছেন। এতে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের মরিয়ম সেন্টারের প্রধান সুফিয়া আলম বলেন, বন্ধুত্ব ও সংহতি যে ঘৃণার চেয়ে শক্তিশালী—এটি দেখাতেই তাদের মসজিদ এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। তার মতে, মানুষ যখন মসজিদে এসে মুসলিম পরিবার, স্বেচ্ছাসেবী ও মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান, তখন অনেক প্রচলিত ধারণা ও ভয় দূর হতে শুরু করে।

মসজিদের নিরাপত্তা নিয়েও মুসলিমদের উদ্বেগ বাড়ছে। ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের হিসাবে, যুক্তরাজ্যে প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদ হামলার শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে ভয় দেখানো, সহিংসতা, সম্পত্তির ক্ষতি, হয়রানি, মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য, অনলাইনে নির্যাতন ও ভাঙচুর রয়েছে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের চেডল মসজিদের ফারুক রফিক ‘ভিজিট মাই মসজিদ’ কর্মসূচিকে এমন একটি জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে মানুষ ভুল বোঝাবুঝির শিকার একটি ধর্ম ও তার অনুসারীদের সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পান। ফিন্সবারি পার্ক মসজিদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কোজবারও মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় উন্মুক্ততা, সংলাপ ও সংহতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

লন্ডন ইসলামিক কালচারাল সোসাইটির মসজিদটি পরিচালনা করেন বিবি খান। তিনি যুক্তরাজ্যের কোনো মসজিদের সভাপতি হওয়া প্রথম নারী। তার মতে, গণমাধ্যমে অনেক সময় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস্তব চিত্র উঠে আসে না। তাই নিজেদের বিশ্বাস, কাজ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পর্কে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

ওই মসজিদের আয়োজনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নেন। সেখানে প্রায় দুই ডজন মানুষ গোলটেবিল আলোচনায় বসেন। যারা ইসলাম পালন করেন না, তাদের কেউ কেউ মসজিদ ও ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ থেকে সেখানে উপস্থিত হন। আয়োজনের সময় মসজিদে পুলিশের উপস্থিতিও ছিল।

অনুষ্ঠানে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। হ্যারিঙ্গে মুসলিম ও ইহুদি—দুই সম্প্রদায়ের বড় উপস্থিতি রয়েছে। বিবি খান বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও একসঙ্গে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ইহুদি প্রতিনিধি জুডিথ প্রিন্সলিও তার উপাসনালয়ের কাছে ইহুদিবিদ্বেষী গ্রাফিতি এবং উপাসকদের ভয় পাওয়ার কথা জানান।

বিবি খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, এ ধরনের গুজব ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মানুষের মধ্যে আরো ভয় ও সন্দেহ তৈরি করতে পারে। এ কারণে মুসলিম ও অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

অমুসলিমদের ভয় কাটাতে ব্রিটেনে শতাধিক মসজিদ উন্মুক্ত

যক্ষ্মা হতে পারে শরীরের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে, চিকিৎসা কী by ডা. আয়শা আক্তার

যক্ষ্মা বা টিবি বলতে আমরা বুঝি কাশি আর ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া। কিন্তু যক্ষ্মার জীবাণু শুধু ফুসফুসকে আক্রান্ত করে তা নয়, এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে লিভার, কিডনি, ত্বক বা শরীরের চামড়া-হাড়সহ দেহের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

তবে ফুসফুসে যক্ষ্মা সংক্রমণের হার ৮৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় সেটাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফুসফুসের বাইরে বাকি ১৫ শতাংশ যক্ষ্মা শরীরের অন্য যেকোনো জায়গায় হতে পারে। বলা যায়, হাত–পায়ের নখ ও মাথার চুল ছাড়া শরীরের যেকোনো জায়গায় যক্ষ্মা হতে পারে।

ফুসফুসের বাইরে যক্ষ্মা

ফুসফুসের বাইরে লসিকাগ্রন্থি বা লিম্ফ নোডের যক্ষ্মা সবচেয়ে বেশি হতে দেখা যায়। সম্প্রতি সার্জিক্যাল অপারেশনের পর সেই ক্ষতস্থানে যক্ষ্মা জীবাণু সংক্রমণের হার বাড়ছে। এ ছাড়া হাড়, মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কে যক্ষ্মার সংক্রমণও কম নয়।

সুপ্ত যক্ষ্মার জীবাণু শরীরে অনেক বছর বেঁচে থাকতে পারে। একে লেটেন্ট টিবি বলে। সক্রিয় বা অ্যাকটিভ না হলে এটি অসুস্থতা সৃষ্টি করে না। এটিকে সুপ্ত যক্ষ্মা বলা হয়। যখন কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, তখনই এটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

চিকিৎসা কী

সঠিক ও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে যক্ষ্মা সম্পূর্ণ ভালো করা সম্ভব। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুরো কোর্স সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। এটা ব্যক্তিভেদে ৬ মাস, ৮ মাস বা ১২ মাস, এমনকি ১৮ মাস লাগতে পারে। কারণ, কেউ যদি সম্পূর্ণ কোর্স, যাঁর জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তা শেষ না করেন, তাহলে ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন আর সাধারণ ওষুধে যক্ষ্মা সারে না।

বিশেষ অঙ্গের যক্ষ্মায় এর বাইরে আরও কিছু চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, যেমন স্টেরয়েড, অস্ত্রোপচার ইত্যাদি। ফুসফুসের যক্ষ্মায় কাশি বা কাশির সঙ্গে রক্তপাত থাকে। অন্য যক্ষ্মায় এমনটা না-ও হতে পারে।

এর উপসর্গ নির্ভর করে কোথায় যক্ষ্মা হয়েছে, তার ওপর। যেমন কোমর বা মেরুদণ্ডে ব্যথা ও ফ্র্যাকচার, গলা ও অন্যান্য স্থানের লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, পেটে পানি আসা, চেতনা লোপ পাওয়া ইত্যাদি।

যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী জ্বরে যক্ষ্মার কথা মনে রাখতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

* ডা. আয়শা আক্তার, উপপরিচালক, ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল, আগারগাঁও, ঢাকা

যক্ষ্মার জীবাণু শুধু ফুসফুসকে আক্রান্ত করে তা নয়, এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে লিভার, কিডনি, ত্বক বা শরীরের চামড়া-হাড়সহ দেহের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ ঘটাতে পারে
যক্ষ্মার জীবাণু শুধু ফুসফুসকে আক্রান্ত করে তা নয়, এটি মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে লিভার, কিডনি, ত্বক বা শরীরের চামড়া-হাড়সহ দেহের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ছবি: স্কুল অব পাবলিক হেলথ, বোস্টন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

দুঃস্বপ্নের শৈশব থেকে আপত্তিকর প্রস্তাব, পর্দার আড়ালে জয়ার কঠিন জীবন

প্রকাশ ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ টেলিভিশনের পর্দায় তিনি ছিলেন ব্যাপক আলোচিত, কিন্তু বাস্তব জীবনের গল্প আরও কঠিন। ‘কিউঁকি সাস ভি কভি বহু থি’ সিরিয়ালে ‘পায়েল’ চরিত্রে অভিনয় করে ঘরে ঘরে পরিচিতি পেলেও জয়া ভট্টাচার্যের নিজের জীবনে ছিল যন্ত্রণার দীর্ঘ ছায়া—নির্যাতন, অবহেলা আর অবিরাম সংগ্রাম।

শুরুর গল্প
১৯৭৮ সালে লক্ষ্ণৌয়ের এক বাঙালি পরিবারে জন্ম জয়ার। ছোটবেলায় পাড়ার লোকজন তাঁকে আদর করে ডাকত ‘বুলবুল’। কিন্তু সেই ডাকে উষ্ণতার চেয়ে বেদনাই বেশি ছিল। নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন—মা-বাবার অমিল, অপূর্ণতা, ক্রোধের আগুন সবই এসে পড়েছিল তাঁর ওপর। চপেটাঘাত, জুতো—কী দিয়ে যে মার খেয়েছেন, তার হিসাব নেই। এই নির্যাতন তাঁকে জেদি করেছে, আবার ভেতরটা ক্ষতবিক্ষতও করেছে।

জয়ার কথায়, মা তাঁর প্রতি কখনো আস্থাশীল ছিলেন না। অন্যের কথা সহজেই বিশ্বাস করতেন, এমনকি নিজের মেয়েকেও অপমান করতেন সামনাসামনি। তৃতীয় শ্রেণি থেকে কলেজপড়ুয়া হওয়া পর্যন্ত তাঁদের পরিবার একটি ছোট ঘরে কোনোরকমে টিকে ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন আত্মসম্মানী, সৎ মানুষ; কিন্তু তিনিও নানা অপমানে আঘাত পেয়েছেন পুরো জীবনটা।

শৈশব-কৈশোরে বন্ধুবান্ধব প্রায় ছিলই না; কারণ, মা জয়াকে কারও বাড়িতে যেতে দিতেন না। এদিকে নৃত্য ও সংগীতে ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও তাঁকে জোর করে অভিনয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। একটি টেলিফিল্মে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ আসতেই বাবা তাঁকে ভোরবেলা টেনে তুলে শুটিং স্পটে নিয়ে গিয়েছিলেন—যদিও তিনি সে কাজ করতে চাননি।

আপত্তিকর প্রস্তাব
এই পথে চলতে গিয়েই জয়া অভিজ্ঞতা পান শোবিজের অন্ধকার দিকের—অশোভন প্রস্তাব, কাস্টিং কাউচ, হুমকি, ভীতি। ১৭-১৮ বছর বয়সে এক পরিচালক ও তাঁর বন্ধুর সঙ্গে যুক্ত একটি ভয়ংকর ঘটনার কথাও বলেন তিনি; এমনকি একসময় তাঁকে মুম্বাই নিয়ে যেতে চেয়েছিল এক মাফিয়া-সম্পৃক্ত ব্যক্তি।

মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক এমন জায়গায় গিয়েছিল যে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়, মেয়ের বিয়ের জন্য ‘পণের টাকা কোথায় পাবে’—এই তুচ্ছ অপমান থেকে বাঁচতে তিনি ঘর ছাড়েন। সহপাঠীকে নিয়ে পালিয়ে যান হরিদ্বার; সপ্তাহভর আশ্রমে লুকিয়ে থাকেন ভয়ে। পরে মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক আর কখনো স্বাভাবিক হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও মা তাঁকে দোষারোপই করেছেন—‘তুই আমাকে হাসপাতালে ঢুকিয়ে আমার শরীর খারাপ করে দিয়েছিস।’ অথচ জয়া সব সঞ্চয় খরচ করেছিলেন মায়ের চিকিৎসায়।

জীবনের বাঁকবদল
জয়ার জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০০ সালে, যখন তাঁকে ‘কিউঁকি সাস ভি কভি বহু থি’-তে পায়েলের চরিত্রে নেওয়া হয়। এক মাসের জন্য আসা চরিত্রটি চলতে থাকে প্রায় সাড়ে সাত বছর, তা–ও কোনো চুক্তি ছাড়াই! ছিলেন সবচেয়ে কম বেতনের অভিনেত্রীদের একজন। সম্মান পাননি, স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের ‘ঘৃণা’ পেয়েছেন প্রচুর, যা তাঁর সাফল্যেরই প্রমাণ।
একবার স্মৃতি ইরানির সঙ্গে রাস্তার ধারের দোকানে খাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা নারী জয়াকে ধাক্কা দিয়ে বলেন—‘আপনার থেকে দূরে থাকতে হবে। না হলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হবে!’ এতটাই প্রভাব ছিল তাঁর অনস্ক্রিন চরিত্রের।
‘কিউঁকি’র পর জয়া ‘বানু মোঁ তেরি দুলহন’, ‘কসম সে’, ‘করম আপনা আপনা’-সহ বহু জনপ্রিয় সিরিয়ালে কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে ‘দিল্লি ক্রাইম সিজন ৩’-এ তাঁর অভিনয়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-29%2F9csfjqh1%2Fjayabhattacharyaf-1718618594.jpg?rect=0%2C0%2C1013%2C675&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জয়া ভট্টাচার্য। ইনস্টাগ্রাম থেকে