Wednesday, March 18, 2015

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান খালেদার -মাহবুব-খোকনের সাক্ষাৎ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি এড. খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন। গত রাত ৮টা ১০ মিনিটে ফুলের তোড়া নিয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তারা। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সুপ্রিম কোর্ট বারের নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তারা কার্যালয় থেকে বের হন। এসময় খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের পরও সারা দেশে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ৮০-৯০ ভাগ পদে আমরা বিজয়ী হয়েছি। এতে প্রমাণিত হয়, এই সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন নেই। জনগণ তাদের চায় না। সারা দেশে বিরোধী জোটের  নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের নির্যাতনের নিন্দা জানান তিনি। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন বলে জানান সুপ্রিম কোর্ট বারের নবনির্বাচিত এই সভাপতি। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ডিসিসি ও সিসিসি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে নীতি-নির্ধারকরা দলীয় ফোরামে  আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত হলে তা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নেবে বিএনপি। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট আইন সমিতির নির্বাচনে ১৪টি পদের মধ্যে ৯টি পদেই বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয় লাভ করেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার প্রতি সংহতি জানাতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন সুমন নামের এক পঙ্গু যুবক। দুপুর দেড়টায় বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের সামনে থেকে তাকে আটক করে গুলশান থানা পুলিশ। রাত আটটার দিকে গুলশান থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা বলেন, তিনি এখনো থানায় আছেন। গতকাল দুপুরে ক্র্যাচে ভর দিয়ে পঙ্গু সুমন কার্যালয়ে সামনে যান। তখন তার হাতে ছিল হরতাল-অবরোধ, সালাহউদ্দিনের নিখোঁজ এবং খালেদা জিয়ার অবরুদ্ধতার খবর সংবলিত কয়েকটি পত্রিকা। এসময় সুমন জানায়, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নন। দেশের একজন নেত্রী আড়াই মাস ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো একজন নেতা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তার প্রতিবাদ এবং খালেদা জিয়ার প্রতি সংহতি জানাতে তিনি গুলশান কার্যালয়ের সামনে এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী- খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ

নিখোঁজ স্বামীকে ফেরত চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদনের জন্য একটি মর্মস্পর্শী চিঠি তিনি ও তার সন্তানরা লিখছেন। আজ এটি লেখা শেষ হলে কাল প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। হাসিনা আহমেদ ও তার সন্তানরা যাবেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আবেদন তারা নিজ হাতেই দিতে চান বলে যুগান্তরকে জানান হাসিনা আহমেদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার কষ্ট বুঝবেন। স্বজন হারানোর কষ্ট কী তা তিনি জানেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আশা নিয়ে যাব, তিনি আমার ও আমার সন্তানদের কথা ভেবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এদিকে সালাহ উদ্দিন আহমেদ আগেও আত্মগোপনে ছিলেন, এখনও আত্মগোপনেই রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
১০ মার্চ রাতে উত্তরার একটি বাসা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদ। ৮ দিন হয়ে গেলেও এখনও তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। হাসিনা আহমেদের দাবি, ওই রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩-বি রোডের ৪৯/বি নম্বর বাসা থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তার স্বামীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর থেকে স্বামীর খোঁজ নেই। এদিকে আইনশৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সালাহ উদ্দিন আহমেদের খোঁজ-অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান যুগান্তরকে বলেন, নিখোঁজ সালাহ উদ্দিনের সন্ধানে আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।
এদিকে স্বজনকে এতদিনেও ফেরত না পেয়ে সালাহ উদ্দিনের পরিবার উৎকণ্ঠায় রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সালাহ উদ্দিন আহমেদের গুলশান-২ নম্বরের ৭২ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) একটি প্রতিনিধি দল যায়। তাদেরও হাসিনা আহমেদ বলেন, আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে তার কিছুই জানি না। স্বামীকে আমি ফেরত চাই। আমার বাচ্চারা তার বাবাকে ফেরত চায়। আর কত দিন তিনি ফিরবেন না- জানতে চেয়ে হাসিনা আহমেদ বলেন, উনি যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, তাহলে জনসম্মুখে বা আদালতে হাজির করা হোক। উনাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা আমি বুঝতে পারছি না। হাসিনা আহমেদ বলেন, স্বামীকে ফেরত চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করব। তার হস্তক্ষেপ কামনা করব।
বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ বলেন, আমরা অস্বস্তিকর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। স্বামীর খোঁজে আইনশৃংখলা বাহিনীর সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলেও তিনি অভিযোগ করেন। বলেন, আমার ঘরে কোনো রান্না-বান্না হয় না। পাশের বাসার ভাবীরা রান্না করে খাবার পাঠান। বাচ্চারা কীভাবে আছে, কী খায় কিছুই বলতে পারি না।
সালাহ উদ্দিনকে ফেরত দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমার স্বামী যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে আদালতে হাজির করে তার বিচার করুন। তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীকে ফিরে পেতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সর্বাত্মক সহযোগিতা পাচ্ছি না। এই আট দিনের মধ্যে গত সোমবার সিটি এসবির একজন সাব ইন্সপেক্টর আমার সঙ্গে দেখা করেছেন মাত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক প্রো-ভিসি আ ফ ম ইউসূফ হায়দারের নেতৃত্বে ইউট্যাবের ওই প্রতিনিধি দল সালাহ উদ্দিন আহমেদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানায়।
অধ্যাপক ইউসূফ হায়দার বলেন, সালাহ উদ্দিন আহমেদ সফল ব্যক্তি ছিলেন। তার রাজনৈতিক সফলতা অনেক। সমাজ থেকে এভাবে একজন মানুষকে উঠিয়ে নেয়া হবে এটা আমাদের কাম্য নয়। এ ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত।
একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের ঘটনা মেনে নেয়ার মতো নয়। তিনিও সরকারের কাছে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে দিতে আহ্বান জানান। প্রতিনিধি দলটির সদস্য হিসেবে ছিলেন, ইউট্যাব প্রেসিডেন্ট ড. সুকমল বড়ুয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপদ ড. মোরশেদ হাসান খান ও ইশরাফিল রতন।
এদিকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের জন্য শুক্রবার দেশের মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে দোয়া করার জন্য ২০ দলীয় জোট অনুরোধ জানিয়েছে।
বাবাকে অক্ষত অবস্থায় ফেরতের আকুতি জানায় সালাহ উদ্দিন আহমেদের ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইদা। স্কলাস্টিকার দশম শ্রেণীর ছাত্রী রাইদার আবেদন, আব্বুকে সুস্থ অবস্থায় যেন ফেরত দেয়া হয়। এটাই আমার চাওয়া।
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন সালাহ উদ্দিন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে কক্সবাজারের সংসদ সদস্য হন এবং প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তার স্ত্রী হাসিনাও সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের দুই ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ কানাডায় ও বড় মেয়ে পারমিজ আহমেদ ইকরা মালয়েশিয়াতে লেখাপড়া করেন। ছোট ছেলে সৈয়দ ইউসুফ আহমেদ ও ছোট মেয়ে ফারিবা আহমেদ রাইদা দেশেই থাকেন। স্বামীর সন্ধানে সুশীল সমাজসহ দেশবাসীকে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান হাসিনা।
এর আগে ২০১২ সালে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তার হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। কিন্তু ইলিয়াস রহস্যের কূল-কিনারা হয়নি তিন বছরেও।
স্বামীর খোঁজ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদনও করেন হাসিনা আহমেদ। তবে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আদালতকে বলা হয়েছে, পুলিশ সালাহ উদ্দিনকে গ্রেফতার করেনি। তার কোনো খোঁজও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আগামী ৮ এপ্রিল হাইকোর্টে আবার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট আহূত অবরোধ ও হরতালকালীন রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে সালাহ উদ্দিনের নামেই গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে হরতালের বার্তা দেয়া হচ্ছিল।
সালাহ উদ্দিন এখনও আত্মগোপনে -স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : সালাহ উদ্দিন আহমেদ আগেও আত্মগোপনে ছিলেন, এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও জানান, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের আসামি নূর হোসেনসহ যেসব চিহ্নিত সন্ত্রাসী ভারতে অবস্থান করছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন নিখোঁজ সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও সন্তানরা। মঙ্গলবার রাতে তার গুলশান কার্যালয়ে দেখা করেন তারা। এ সময় সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ, ছোট ছেলে ইউসুফ আহমেদ, মেয়ে ফারিবা আহমেদ ও ভাবী শামীম আরা ছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। খালেদা জিয়া তাদেরকে সান্ত্বনা দেন।

নিরাপরাধ ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজাতেই অস্ত্র উদ্ধার নাটক : শিবির

চট্টগ্রাম নগরের সরকারি কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের ছাত্রাবাসে
পুলিশি অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় আটক কয়েকজনকে
নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবিটি আজ সকাল আটটার দিকে হাজী মুহাম্মদ মহসিন
কলেজ থেকে তোলা। ছবি: সৌরভ দাশ, প্রথম আলো, চট্টগ্রাম
অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি নিউজ, বাংলানিউজ ও কিছু ইলেট্রনিক্স মিডিয়ায় “চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ৭২ শিবির কর্মী আটক, বিপুল অস্ত্র উদ্ধার” উল্লেখ করে ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রকাশের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
এক যৌথ প্রতিবাদ বার্তায় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার ও সেক্রেটারী জেনারেল মো. আতিকুর রহমান বলেন, গণধিকৃত সরকার দেশ ধংসের পর এখন অস্ত্র উদ্ধার নাটক সাজিয়ে মেধাবী ছাত্রদের ভবিষ্যত ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আর দুঃখজনক ভাবে এই নিকৃষ্ট নাটকে মূল ভূমিকা পালন করছে পুলিশ ও দলকানা কিছু গণমাধ্যম। প্রতিবেদনগুলোতে সেবাদাস পুলিশের মিথ্যা বক্তব্যকে পুঁজি করে বলা হয়েছে, তথাকথিত অস্ত্র উদ্ধারের সাথে ছাত্রশিবিরের সম্পর্ক আছে। যা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও সাজানো। এসব অস্ত্রের সাথে ছাত্রশিবিরের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া অস্ত্রগুলো ছাত্রশিবিরের কোন নেতাকর্মীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়নি। এমনকি ছাত্রবাস থেকেও নয়। বরং এগুলো উদ্ধার করা হয়েছে গভীর রাতে পার্শবর্তি আবাসিক এলাকার একটি তিনতলা বাড়ীর পেছনে গর্ত থেকে। অন্যদিকে মাটির গর্তের ভিতর থেকে একটি ব্যানারে মোড়ানো অস্ত্রের বস্তা পাওয়ার কথা বলা হলেও, ছবিতে দেখা যাচ্ছে ব্যানারটিতে সামান্য মাটিও লেগে নেই বরং তা ঝকঝকে পরিস্কার। এতে প্রমাণ হয় বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যানারটি বাইরে থেকে এনে বস্তার সাথে মোড়ানো হয়েছে। অথচ কলেজের বাইরে গভীর রাতে এ অস্ত্র কারা রাখল, কি উদ্দেশ্যে রাখলো তার কোন যাচাই বাছাই না করেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা ৭২জন মেধাবী কলেজ ছাত্রকে। আর এসব গণমাধ্যমও বিবেকের দরজায় তালা মেরে অন্ধভাবে এখানে ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে অপপ্রচার করছে। সুতরাং এ নাটক সাজানো হয়েছে পরিকল্পিত ভাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
নেতৃবন্দ বলেন, একই রাতে চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের দু গ্রুপের মধ্যে প্রকাশ্য গুলাগুলিতে বেশ কয়েকজন মারাতœক আহত হলেও সেখানে পুলিশ কোন অভিযান পরিচালনা দূরে থাক একজনকে গ্রেপ্তারও করেনি। অথচ সুক্ষè ভাবে চট্টগ্রাম কলেজে নাটক পরিচালনা করেছে। দেশবাসী দেখে এসেছে চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের উৎপাত না থাকায় সেখানে সব সময়ই শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ বিরাজ করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি ছাত্রলীগ অবৈধভাবে সেখানে অবস্থানের চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু সাধারাণ ছাত্ররা প্রত্যাখান করায় তারা ব্যর্থ হয়েছে। এখন এটা পরিস্কার যে, ছাত্রলীগকে অবৈধ অবস্থান করে দিয়ে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল ও শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতেই এই নাটক সাজানো হয়েছে। আর এই অমানবিক নাটকের শিকার হয়েছে ৭২জন ছাত্র যাদের বেশির ভাগই পরীক্ষার্থী। জাতির জন্য লজ্জার বিষয় হলো মেধাবী ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী এই নাটকে সরাসরি মূল ভূমিকা পালন করছে পুলিশ ও কিছু গণমাধ্যম। এসব নিরাপরাধ মেধাবী ছাত্রদের সামান্যতম ক্ষতি হলে সরকার ও পুলিশের মত এসব দায়িত্ব বিসর্জনকারী গণমাধ্যমও সমান ভাবে দায়ী থাকবে।
নেতৃবৃন্দ কারো অপপ্রচারের হাতিয়ার না হয়ে সত্য প্রকাশের স্বার্থে এ ধরণের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকবৃন্দ ও গণমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানান এবং নিরপরাধ ছাত্রদের মুক্তি দিয়ে তাদের পড়াশুনা অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

আমরা সৃষ্টি করছি আর খালেদা জিয়া ধ্বংস করছেন -প্রধানমন্ত্রী

একদিকে আমরা সৃষ্টি করছি, অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন ঘরে বসে ধ্বংসের হুকুম দিচ্ছেন। ধ্বংসের দিকে তার দৃষ্টি। মানুষকে পোড়ানো, মানুষ হত্যাই যেন ওনার কাজ। বুধবার বিকেলে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একথা বলেন।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাকার বিআইসিসি মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। বিএনপির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে দল মানুষ পুড়িয়ে মারে, সে দলকে মানুষ কিভাবে ভোট দেবে? রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য থাকবে দেশের উন্নয়ন। কিন্তু বিএনপির লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে ধ্বংস করা। তারা এ দেশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করেনি।
শেখ হাসিনা এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের নৈরাজ্য, আগুন ও পেট্রোলবোমা হামলাকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, স্বাধীন দেশে নিরীহ ও খেটে খাওয়া মানুষের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদেরও রেহাই দেয়া হচ্ছে না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে সমন জারি করা হয়েছে। তিনি যদি আইন মানতেন তাহলে আদালতে যেতেন। সে মামলা মোকাবেলা করার সাহস নেই। তিনি বলেন, জ্বালাও পোড়াও করে দেশকে ধ্বংস করতে চায়। ছেলের মৃত্যুও তাকে হরতাল থেকে টলায় না। ছেলের জন্য তার দয়ামায়া নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেত্রীর অন্তরে পেয়ারে পাকিস্তান। বাংলাদেশের উন্নয়ন হোক এটা তিনি চান না। তাই জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমরা স্কুলে বই ফ্রি দিচ্ছি, আর খালেদা জিয়ার হরতালের জন্য ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। দেশ যখন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তখনই আমাদের পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যে সংববিধান আমাদের দিয়েছিলেন, আমরা সেটা বহাল রেখেছি। শুধু এর চারটি নীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি সংবিধানে নিষিদ্ধ ছিল। সেই যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বানানো হয়েছিল তাদের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী, যারা দেশের মানুষকে হত্যা করেছিল, ধর্ষণ করেছিল, তাদের বিচার হচ্ছে। সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের সঙ্গে নিয়ে একটি দল, যে দল ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা এখন অযৌক্তিক আন্দোলন করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা জাতির পিতার জন্মদিন পালন করছি। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার হত্যার পর খুনীদের বিচার হয়নি। তাদের সে সময় বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

সবাই আপনার শত্রু এই বোধ নিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না : কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, রাষ্ট্র চালাতে গেলে অন্যের কথা শুনবেন না তা হতে পারে না। অন্যের সাথে আলোচনা করবেন না, সবাই আপনার শত্রু- এই বোধ নিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায় না।
অবস্থান কর্মসূচির ৫০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আজ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক আলোচনা সভায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী একথা বলেন ।
দেশের বর্তমান সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আলোচনায় বসতে এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম গত ২৮ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখ থেকে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নিরবিচ্ছিন্ন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, সরকার রাষ্ট্রের সেবক। তিনি জানান এই অবৈধ মালিকদের বোঝাতেই এতদিন ধরে রাস্তা আছেন তিনি। কারণ এরা জানে না যে তারা জনগণের সেবক। জনগণ এই মালিকানা তাদের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। এখন জনগণকেই এই মালিকানা উদ্ধারে কাজ কতে হবে।

‘চলমান আন্দোলন আরও বেগবান করুন’ -বরকতউল্লাহ বুলু

সরকারের নির্যাতনের কালো হাত গুটাতে চলমান আন্দোলনকে আরও বেগবান করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ২০ দলের মুখপাত্র বরকতউল্লাহ বুলু।  বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। আজ তারা সেই কবরের ওপর দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং বিরোধী দল-মতের জনগণকে কবরে পাঠাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং মানুষ হত্যাকারী এই সরকারকে এখনই তার কালো হাত গুটাতে বাধ্য করতে আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্য ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মী এবং দেশের সকল গণতন্ত্রকামী ব্যক্তি, সংগঠন ও দলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে বরকতউল্লাহ বুলু বলেন, বিরোধী দল ও মতের নেতাকর্মীদের খুন, গুম এবং মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানি করে সরকার চলমান আন্দোলনকে স্তব্ধ করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে- তা সফল হবে না। নির্মম নিপীড়ন আন্দোলনকে সাময়িকভাবে স্থিমিত করতে পারলেও প্রকৃত পক্ষে তা বৃহত্তর আন্দোলনকে অনিবার্য করে থাকে। এটাই ইতিহাস-এটাই বাস্তবতা।  তিনি বলেন, সাবেক এমপি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও সাইফুল ইসলাম হিরু, ঢাকার নির্বাচিত কাউন্সিলর চৌধুরী আলম ও লাকসামের বিএনপি নেতা পারভেজের মতো শত শত বিরোধী নেতা-কর্মীকে গুম করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এবার সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে সরকারি বাহিনী বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করছে। ইলিয়াস আলী পালিয়ে গেছে কিংবা সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজেই আত্মগোপন করেছেন- এমন কাল্পনিক গল্প বলার পাশাপাশি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে এসব ঘটনা নিয়ে কা-জ্ঞানহীন নিষ্ঠুর রসিকতা করা হচ্ছে। এতে দায়িত্ব পালনে সরকারের অমার্জনীয় ব্যর্থতার পাশাপাশি বিকৃত মানসিকতার প্রমাণ পেয়ে দেশবাসী ক্ষুব্ধ ও ত্রুুদ্ধ হয়ে উঠছে।  তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে দেয়া জনগণের রায় অগ্রাহ্য করার জন্য সরকার গাজীপুর, সিলেট ও রাজশাহীসহ অসংখ্য সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করে কিংবা গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য করে তাদের স্থলে দলীয় লোকদের বসানো শুরু করেছে। এমন অপকৌশলের মাধ্যমে জনগণের সিদ্ধান্ত পাল্টে দেয়ার ফলে আজ সারা দেশের মানুষের কাছে এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে যে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার গণতন্ত্র মানে না, গণরায়ের পরোয়া করে না।

গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গিপনার উত্থান -ড. নাসিম আখতার হুসাইন

দু  পক্ষই একটা অনড় অবস্থান নিয়ে আছে সেটা আমরা দেখতে পারছি। এই অনড় অবস্থা থেকে সরে আসতে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার যদি বসতে নাও চায়, সংলাপের কথা যদি ভাবতে নাও পারে কিন্তু তারা তো জানে নির্বাচন কেন্দ্রিকই সব ঘটনাগুলো ঘটছে, সহিংসতা হচ্ছে এবং তারা এটাও জানে কেন নির্বাচনটা সেই অর্থে যথার্থ হয়নি। তাহলে নির্বাচন নিয়ে, নির্বাচনের ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং সংস্কারের উদ্যোগ কেন সরকার গ্রহণ করছে না? এটা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নাসিম আখতার হুসাইন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার রোকনুজ্জামান পিয়াস
অধ্যাপক ড. নাসিম আখতার হুসাইন বলেন, দেশটা কেবল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের নয়। দেশটা সবার। দেশের আরও অনেক পক্ষ রয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। আমি মনে করি সরকারের এখনই এ উদ্যোগ নেয়া উচিত। যেভাবে মানুষকে ধরপাকড় করছে, গুম করছে এবং একটি দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মতো অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে তাতে গণতন্ত্র টিকবে না। কিংবা এটাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে চালিয়ে দেয়ারও কোন কারণ দেখি না। এটা অগণতান্ত্রিক এবং অমুক্তিযোদ্ধাসুলভ আচরণ। সুতরাং এখান থেকে সরকার পক্ষকে সরে আসতে হবে। আর বিরোধীপক্ষ হিসেবে বিএনপি যা করছে- হয়তো তারা বলছে আমাদের আর উপায় নেই, এছাড়া আমরা আর কি করবো। কিন্তু সেটাও তো কোন কথা নয়। তাদের উচিত ছিল ছোট ছোট কর্মসূচি দেয়া। বিশাল কর্মসূচি, বিশাল সমাবেশ বা সরকার ফেলে দেবো এমন কোন আন্দোলনই কি একমাত্র কৌশল? ছোট ছোট কর্মসূচি দিয়ে তারা তাদের বক্তব্যগুলো নিয়ে জনগণকে সঙ্গে রাখতে পারতো। এখন কি হচ্ছে? জনগণ কিন্তু বিএনপি’র সঙ্গেও নেই, সরকারের সঙ্গেও নেই। তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেকে আছেন যারা মনে করেন দেশে একটা সিভিল ওয়ার হয়ে যেতে পারে। আমি তাদের মতো মনে করি না, কারণ জনগণ কিন্তু তাদের বাঁচার রাস্তা বের করেছে। হরতাল অবরোধের মধ্যে জীবিকার প্রয়োজনে তারা রাস্তায় বের হয়েছে আরেকটা হচ্ছে দেশটাকে দুইভাগ করার যে প্রচারণা চালিয়েছিল দু’টি দল তারা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণ একরকমের বোঝাপড়ার মধ্যে এসেছে যে- আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র কারণে নিজেরা নিজেরা মারামারি করে আমরা মারা যাবো না। কারণ তাদের মধ্যে এক রকমের আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে। আমাদের সমাজ এক্ষেত্রে এতটাই মজবুত যে সিভিল ওয়ার হওয়ার মতো কোন অবস্থায় তারা নিয়ে যেতে পারবে না। এটা জনগণের ক্রেডিট, সমাজের ক্রেডিট। ঐতিহাসিকভাবে তারা যে সমাজবদ্ধভাবে বাস করতে অভ্যস্ত তার কারণে তাদের উপলব্ধি হয়েছে- আওয়ামী লীগ করুক, বিএনপি করুক তাদের তো মারামারি করে কোন লাভ নেই। এখানে শ্রেণী একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একটা শ্রেণী তারা অর্থনৈতিকভাবে খুব লাভবান হয়, তাই তারা ক্ষমতায় যেতে চায়, ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, সহিংসতা করতে চায়। সাধারণ মানুষ হয়তো বা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ট্রেন্ড তৈরি করেছে তবে তারা নিজেরা মারামারি করবে বলে মনে করি না। তাহলে বিএনপি কিসের আশায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মসূচি ডেকে বসে আছে? আরেকটা যেটা বলা হচ্ছিল আমেরিকাসহ বাইরের কোন শক্তি তাদের সঙ্গে আছে, এখন তো সেটাও নেই কারণ অভিজিৎ হত্যার পর দেশের যে সহিংসতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, জঙ্গিপনা এগুলোও বিদেশী শক্তি বিবেচনায় নিয়েছে। কাজেই এ বিতর্ক যেখানে জারি আছে সেখানে বিদেশীদের সমর্থনের যে জায়গাটা সেটাও সরকারের পকেট হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমার ধারণা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার জন্য, দেশেকে মুক্ত করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং শুরু করতে হবে নির্বাচন কমিশনের সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সংস্কার এবং একটা গ্রহণযোগ্য অবস্থায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলা। বিএনপিকে এতে যোগ দেয়া উচিত। ডাকলেই যেতে হবে। না যাবো না- এ রকম নাটক বা থিয়েটারের পলিটিকস বাংলাদেশের মানুষ আর চায় না। কাজেই সরকার উদ্যোগ নিয়ে শুরু করলে আমার ধারণা এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হবে। আর বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করে প্রকারান্তরে নিঃশেষ করার যে পন্থা দেখতে পাচ্ছি তা বন্ধ করতেই হবে। কারণ বিরোধী দল ছাড়া শুধু একটি দলের রাজত্ব কায়েম হবে এজন্য তো মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হয়নি। সরকারকে মনে রাখতে হবে কোন দলকে এভাবে নিঃশেষ করা যায় না। আপাত স্থবিরতা দেখা যেতে পারে। কিন্তু এতে করে গণতন্ত্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর এখান থেকে ফিরে আসা খুব কঠিন। কারণ গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গিপনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবেই। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা ব্যালান্স অব পাওয়ারেও যেতে হবে। বর্তমান দেশ একটা ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে। সে অর্থে এখন গণতন্ত্র নেই। এখান থেকে সরকারকে উদ্যোগ নিয়েই বের হতে হবে। আর এর প্রধান পন্থা নির্বাচনের সংস্কার করা।

যেভাবে তুলে নেয়া হয় সালাহউদ্দিনকে -স্বাধীন তদন্ত দাবি এইচআরডব্লিউ’র

বিএনপি’র মুখপাত্র ও যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদকে বলপূর্বক গুমের ঘটনায় অবিলম্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে অতীতের বলপূর্বক গুমের সব ঘটনায় তদন্তের তাগিদ দিয়ে সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, প্রধান বিরোধী দলের  সদস্যদের জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্তে ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। সালাহউদ্দিন আহমেদের জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। জরুরি ভিত্তিতে সেটা করতে হবে। কারণ, ৮ই এপ্রিল পর্যন্ত তা অনেক দেরি হয়ে যাবে।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, ২০১৫ সালের ১০ই মার্চ শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল সালাহউদ্দিনকে। নিজেদের ডিটেক্টিভ ব্র্যাঞ্চের (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে কয়েক ব্যক্তি তাকে ধরে নিয়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়ার ঘটনার বিবরণও দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, যে বাড়ি থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নেয়া হয়, ওই বাড়ির কেয়ারটেকারের বক্তব্যমতে ১০ই মার্চ রাত ১০টার দিকে সাদা পোশাকের একাধিক সদস্য ওই বাড়ির সামনে আসেন। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং তাদের ব্যাজ দেখান। তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশের আধ ঘন্টা পর নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে হাতকড়া পরা অবস্থায় সালাহউদ্দিন আহমেদও ছিল। তারা তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে, এলিট ফোর্স র‌্যাবের একটি গাড়িও সেখানে ছিল। এরপর থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ রয়েছেন।  
সালাহউদ্দিন আহমেদ নিখোঁজের ঘটনায় সরকার তাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে বা এ মুহূর্তে সালাহউদ্দিন কোথায় অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারেও কোন তথ্য নেই বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের কাছে সালাহউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ জানান। সালাহউদ্দিন আহমেদকে আদালতে হাজির করার দাবি জানিয়ে তার স্ত্রী এ ব্যাপারে একটি মামলাও করেন। তা সত্ত্বেও, তাকে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ঢাকায় হাইকোর্টের নির্দেশের প্রেক্ষিতে গত ১৬ই মার্চ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) জানান, তার আওতাধীন নিরাপত্তা বাহিনীসমূহ সালাহউদ্দিনকে আটক করেনি। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত পরিচালনা করার পক্ষে আদালতে তেমন কোন তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আদালতের শুনানি আগামী ৮ই এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়।
২০১৪ সালের জানুয়ারির ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরাধী দলের মধ্যে যে সহিংসতার সূত্রপাত হয়, চলমান সহিংসতা সেটারই ধারাবাহিকতা। নির্বাচনের আগে ও পরে বেশ কয়েক শ’ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ সাল থেকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য সংগঠনগুলো বাংলাদেশে বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেছে। অধিকাংশ গুমের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হন। তার ভাগ্যে কি ঘটেছে, তা নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে ৭ জনকে অপহরণ ও সুস্পষ্টভাবে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকা-ের ঘটনায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সন্দেহভাজন সদস্যদের ভূমিকা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। তবে সেটাও গণমাধ্যমের পুক্সক্ষানুপুক্সক্ষ বিশ্লেষণের কারণে।
অ্যাডামস তার বিবৃতিতে বলেন, কর্তৃপক্ষ বলপূর্বক গুমের বহু ঘটনা গুরুত্ব সহকারে নথিভুক্ত করেছে। তা সত্ত্বেও, এ ঘটনাগুলো সরকার তদন্ত করেছে, সে ব্যাপারে যৎসামান্য ও এমনকি বহু ক্ষেত্রে কোন তথ্য-প্রমাণও নেই। তিনি বলেন, জনগণের কাছে সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, নিরাপত্তা বাহিনীর কোন সদস্যকে তাদের ভূমিকার জন্য জবাবদিহি করতে হয়নি। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু, বাংলাদেশে দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি তার শাসনামলের আগে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল, তিনি ক্ষমতায় আসার পরও তাতে কোন পরিবর্তন আসেনি। অ্যাডামস বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের ঘটনা বড় একটি রীতির একটি অংশ। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অস্বীকৃতি এবং তদন্তের জন্য অর্থবহ কোন ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করা একই ধরনের আচরণের অংশ।

রাজনীতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্পর্ক নিয়ে বোঝাবুঝি by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

গত বুধবার ১১ মার্চ ২০১৫ তারিখে এই নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বোঝাবুঝির অভাব’ শিরোনামে প্রকাশিত কলামের ধারাবাহিকতাতেই আজকের এই কলাম। তবে আজকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখার আগে অল্প পরিসরে কিছু ভিন্ন কথা উপস্থাপন করছি। অতঃপর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আলোচনা। গত সপ্তাহের কলামটি পড়ে প্রচুর লোক ইন্টারনেটে, ফেসবুকে এবং এসএমএস-এর মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বহু লোক ফোন করেছেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে বিশেষ ধন্যবাদ কারণ আজ প্রায় দেড় মাসের বেশি সময় তিনি মতিঝিলের রাজপথে, গণমানুষের মহব্বতে এবং তাদের স্বার্থে অবস্থান করছেন। ওই ভৌগোলিক অবস্থান থেকেই তিনি কলাম পড়ে ফোন করে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ১২ মার্চ ২০১৫ তারিখে। তার ওখানে (মতিঝিলের ফুটপাথ) রাজনৈতিক অতিথি হওয়ার জন্য দাওয়াতও দিয়েছেন। নয়া দিগন্ত পত্রিকার অফিস থেকেও বঙ্গবীরসহ আরো বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির অভিনন্দনের কথা আমাকে জানানো হয়েছে। বিনয়ের সাথে অভিনন্দন গ্রহণ করছি। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা এবং সংগঠক কাদের সিদ্দিকীকে আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন, তার সাহসী কষ্টসহিষ্ণু অবস্থানের জন্য। তিনি সর্বদাই মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণের পক্ষে নয়া দিগন্ত, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও অন্যান্য পত্রিকায় তার লেখা কলামগুলো বস্তুনিষ্ঠ ও পাঠকপ্রিয়।
প্রসঙ্গ সাংবাদিক মুন্নি সাহা
মাসাধিক কাল আগে ১৩ ফেব্র“য়ারি ২০১৫ তারিখে বিখ্যাত টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজে রাত সাড়ে ৯টায় একটি টকশোতে উপস্থিত ছিলাম। উপস্থাপক ছিলেন সম্মানিত এবং সুপরিচিত সাংবাদিক মুন্নি সাহা। আলোচনার শেষ চতুর্থাংশে হঠাৎ করে নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিকভাবে তিনি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ওয়ান ম্যান ওয়ান পার্টি। তিনি আমাকে ও আমাদের পার্টিকে অযাচিতভাবে অপ্রাসঙ্গিকভাবে অপমান করেছিলেন। আমি প্রতিবাদ করেছি সাথে সাথে, একপর্যায়ে দাবি করেছি তিনি যেন ক্ষমা চান। সম্মানিত সাংবাদিক মুন্নি সাহা তার ভুলের জন্য জাতির সামনে তাৎক্ষণিক ক্ষমা চান। অনেক অনলাইন পত্রিকা এবং অনেক ব্যক্তি, এটিএন নিউজের ওই লাইভ টকশো থেকে ওইটুকু দৃশ্য (৫১ সেকেন্ড) উদ্ধৃত করে ফেসবুকে শেয়ার করেন। ওই ৫১ সেকেন্ডের ভিডিওটি আমার টাইমলাইনে আমিও শেয়ার করেছি এবং আরো অগণিত ব্যক্তি ও অনলাইন পত্রিকা নিজেরাই শেয়ার করেছে। শুধু আমার ফেসবুক পোস্ট থেকেই প্রায় দুই লাখ বার ভিউ করা হয়েছে, মানে মানুষ দেখেছেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও তার লেখা কলামে প্রতিবাদ জানিয়েছেন আলোচ্য ঘটনার।
ছোট রাজনৈতিক দল এবং মিডিয়া
ওপরের অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য। এই কথাটা বললাম এ জন্য যে, আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা, আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আমাদের রাজনীতি ও মিডিয়ার মধ্যে সম্পর্ক এমন যে, ুদ্র রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড, পরিচিতি ইত্যাদি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা খুব মুশকিল। কল্যাণ পার্টি একটি নিবন্ধিত দল; নিবন্ধনের সব শর্ত মেনেই চলছে। ঢাকা মহানগরের নয়াপল্টন এলাকায় মসজিদ গলিতে একটি দালানের ষষ্ঠ তলায় চারশত বর্গফুটের অফিস আছে কল্যাণ পার্টির; একই ফোরে বাংলাদেশ ন্যাপেরও অফিস আছে। ঢাকা মহানগরের মহাখালী এলাকায় কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যানের আলাদা কার্যালয় আছে এক হাজার ৫০০ বর্গফুটের। কল্যাণ পার্টিতে যুব সংগঠন আছে, ছাত্র সংগঠন আছে, মহিলা সংগঠন আছে। নিয়মিত মিটিং ও কাউন্সিল হয়। কল্যাণ পার্টিতে জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক কর্মীর সমাহার কম নয়। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, আলেম-ওলামা, ইঞ্জিনিয়ার তথা পেশাজীবীরা বিভিন্ন নিয়মে সম্পৃক্ত আছেন। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য মেকানিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ার অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুশতাক হোসেন ১৩ মার্চ ২০১৫ দিনের শেষে রাত্রি ১১:৪০ মিনিটে ইন্তেকাল করলেন ৬৮ বছর বয়সে। আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি। সাড়ে ছয় বছর আগে আমাদের বয়স যখন মাত্র বারো মাস তখন ডিসেম্বর ২০০৮-এর নির্বাচনে আমাদের ৩৬ জন প্রার্থী ছিল। সাহসের সাথে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি এবং বিনয়ের সাথে পরাজয় স্বীকার করেছি। মরহুম কর্নেল মুশতাক লাকসাম থেকে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু ওইসব প্রার্থী বা অন্যান্য নেতাকর্মী বা জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা, দেশবাসীর সামনে পরিচিত হবেন কোন নিয়মে? তাদের নিজ নিজ এলাকার মানুষ চেনে, কিন্তু তারা জাতীয় ভিত্তিতে পরিচিত নন। তারা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে যায়, শান্তিপূর্ণ মিছিলে যায়, গঠনমূলক আলোচনা সভায় যায়, নিজ নিজ এলাকায় সময় দেয়। কিন্তু দেশবাসীর কাছে কথাগুলো বা ঘটনাগুলো উপস্থাপন করার সুযোগ ও মাধ্যম স্বাভাবিকভাবেই দু®প্রাপ্য ও খুবই কঠিন। কিছু দিন আগে সরকারের অনুমতি নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সভা করেছিল। আজ থেকে কয়েক দিন আগে টেলিভিশনের টকশোতে ওই পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে কথা প্রসঙ্গে বলতে শুনলাম, ‘সোহরাওয়ার্দীতে আমরা যতবড় মিটিং করেছি, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ করলে টিভিগুলো কম্পিটিশন দিয়ে দেখাত; অথচ আমরা ছোট বলে কেউ পাঁচ সেকেন্ড দেখাল, কেউ দেখালই না, কোনো টিভি বলল আবার কোনো টিভি বললও না।’ প্রায় চার মাস আগে, ৪ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে কল্যাণ পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল। প্রেস ক্লাবের বড় হলে ৬০০ থেকে ৭০০ লোকের মিটিং ছিল। স্টেজ ভরা বিভিন্ন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ছিলেন বিএনপি মহাসচিবসহ। ২০টা টিভি সংবাদে দেখিয়েছে। মুন্নি সাহার টিভিও দেখিয়েছে। কিন্তু শুধু এক দিন বা পাঁচ-সাত দিন দেখলেই, জাতির সামনে সব নেতাকর্মীর পরিচিত হওয়া বা রিকগনিশন পাওয়া মুশকিল, এটাও সত্য। আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই। আমাদের যত সদস্য, ততধিক শুভাকাঙ্ক্ষী আছে। আমাদের বড় কষ্ট আর্থিক কষ্ট। মেধার অভাব বা পরিশ্রমের অভাব আমাদের কষ্ট নয়। আমরা সবার সহযোগিতা চাই।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ও জনসংখ্যা
ওপরের অনুচ্ছেদের আলোচনার ধারাবাহিকতায় বলতে চাই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টিও বাংলাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অতি সচেতন এবং সোচ্চার। সর্বস্তরের বিশেষত জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদেরা এই সমস্যা অনুধাবন করলে ভালো। এই প্রসঙ্গে অল্পকিছু লিখব আজকের কলামে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১০০ ভাগের ১ ভাগের অর্ধেকের কিছু বেশি তথা শূন্য দশমিক পাঁচ পাঁচ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক আয়তন বাংলাদেশের আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও বিরাজমান সমস্যাটি আমাদের দেশের অন্য দশটি সমস্যার মতো নয়; অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আয়তন দেখলে হবে না, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব ভূমি চাষের যোগ্য নয় বা আবাসযোগ্য নয়, এটাও মনে রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা এক শতাংশের কম হলেও, তাদের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেন এই আলোচনাটাই অতি সংপ্তিভাবে গত কলামে এবং এই কলামে করছি। সম্ভবত আরো দুই-একটি কলাম লিখতে হবে।
সাংবাদিক ম. হামিদ এবং আগুন
আমরা আজ থেকে ২৬ বছর ১১ মাস পেছনে ফিরে যাই। রমজান মাস চলছিল। তারিখটি হলো ২৪ এপ্রিল ১৯৮৮; সময় হলো তারাবিহর নামাজের পর রাত ৯টা। তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের সুপরিচিত সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ আমার অফিসে বসা ছিলেন। আমি খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার। তিনি গিয়েছিলেন, ক্ষুদ্র একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বা প্রামাণ্য চিত্র বানাতে। ম. হামিদ গল্পচ্ছলে যা বলেছিলেন সেটা হুবহু উদ্ধৃত করতে পারছি না, কিন্তু অনেকটা এ রকম ছিল : ‘আপনারা আর্মির লোক সব দিকে ভয়ের কথা ছড়াইতে থাকেন। কয়েক দিন ধরে পড়ে আছি, আপনাদের সাথেই তো চলাফেরা করছি, কই কোনো মারধর, গোলাগুলি বা আগুন তো নেই।’ আমার উত্তর : ‘হামিদ ভাই, এইরূপ প্রার্থনা করবেন না, আল্লাহ যেন আপনার এ রকম কোনো প্রার্থনা কবুল না করেন। গোলাগুলি ও আগুন দেখার শখ ভালো না।’ সম্মানিত পাঠক, বিশ্বাস করতেও পারেন, না-ও করতে পারেন। বাংলা ভাষার দুইটি শব্দ যথা : কাকতালীয় বা ঘটনাক্রমের সাথে আপনারা পরিচিত। এ রকমই কাকতালীয় ঘটনা। আমার কথা শেষ হওয়ার দুই-চার মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড গোলাগুলির আওয়াজ কানে এসে গেল। জনাব ম. হামিদকে বললাম, আপনি জিতে গেছেন, আপনার প্রার্থনা কবুল হয়েছে, এখন আপনাকে নিয়ে গোলাগুলি এবং আগুনের স্থলে যাবো। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সঙ্গী-সাথী নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলাম। আমার অফিস থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে কুমিল্লা টিলা নামক বাঙালি গ্রামে আক্রমণ এবং আগুন দিয়েছে শান্তিবাহিনী। গ্রাম পুড়ে গেল, এক ডজন মানুষ আগুনে এবং গুলিতে মরে গেল, অনেক ডজন জখম হলো। পরের দিন এবং তার পরের দিন এবং অব্যাহতভাবে আমাদের চেষ্টা ছিল, যেন অন্যত্র বাঙালিরা পাহাড়িদের গ্রামে প্রতিশোধমূলকভাবে কোনো আক্রমণ না করে। ২৪ এপ্রিলের ঘটনার পর থেকে পরবর্তী ১০-১২ দিন, প্রায় প্রতিদিন শান্তিবাহিনী খাগড়াছড়ি জেলার কোনো-না-কোনো বাঙালি গ্রামে আক্রমণ করছিল এবং আগুন দিচ্ছিল। সাংবাদিক ম. হামিদ ভাইয়ের ক্যামেরার দ্বারা দারুণ উপকার পাওয়া গেল। তিনি অনেক সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করতে পারলেন এসব সহিংসতা প্রসঙ্গে। ২৫ এপ্রিল তারিখে তিনি ছবি এবং কিছু বক্তব্য খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম থেকে আকাশ পথে ঢাকা পাঠালেন। বাংলাদেশের মানুষ ২৫ তারিখ দিনের শেষে রাতের সংবাদে এই নৃশংসতা দেখল। পরবর্তী তিন চার দিন সন্ধ্যাতেই, এইরূপভাবে খাগড়াছড়ি থেকে সচিত্র সংবাদ, বিটিভিতে দেখানো হয়েছে। বাঙালি এবং উপজাতি অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মৌখিক সাক্ষাৎকারসহ সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করতে পারল যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক একটা জায়গা আছে এবং সেখানে একটা সমস্যা আছে। এই সুবিধাটা পাওয়া গিয়েছে, ঘটনাক্রমে খাগড়াছড়িতে টেলিভিশন ক্যামেরা থাকায়, যখন লোমহর্ষক ঘটনাগুলো ঘটছিল। সে জন্য বলতে বাধ্য যে, উপলব্ধি হয়েছে ভালো কিন্তু বড় মূল্য দিয়ে উপলব্ধি অর্জন করতে হয়েছে।
সমস্যার ব্যাপ্তি অনুধাবন
তখনকার আমলে কেউ বলতেন, এটা মিলিটারি প্রবলেম বা আর্মির সমস্যা। কেউ বলতেন, এটা ভারত সৃষ্টি করেছে। কেউ বলতেন, রাজনীতিবিদেরা এটাতে কোনোমতেই জড়িত না। সেই ২৪ এপ্রিল বা তৎপরবর্তী ঘটনাগুলো মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্ঘাত নিরসনের প্রক্রিয়ার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, ইতিবাচকভাবে। বাংলাদেশের জনমানুষের মানসপটে শান্তিবাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দাঁড়ায়। বাংলাদেশ সরকার সংলাপের মাধ্যমে বিরাজমান পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান চায়, অপরপে শান্তিবাহিনী আক্রমণের মাধ্যমে সমাধান চায়- এরূপ ধারণা মানুষ মিডিয়া থেকে পায়। ৫ মে ১৯৮৮ তারিখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ খাগড়াছড়ি জেলায় ও জেলা সদরে গিয়েছিলেন। হেলিকপ্টার থেকে এবং মাটিতে সব দেখে ও শুনে আমাদের ওপর অনেক বিরক্ত ছিলেন। অনেক বকাঝকা করলেন। বললেন, এত মানুষ কেন মরছে আমাকে বুঝাও। বোঝার জন্য তিনি ২০ মিনিট সময় দিয়েছিলেন। আমি বিনয়ের সাথে বলেছিলাম, ২০ মিনিটে বলা যাবে না! আমি দুই ঘণ্টা সময় চেয়েছিলাম, আমার আবেগঘন আবেদনে রাজি হয়ে তিনি এবং অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দুই ঘণ্টা ধরে আমার কথা শুনেছিলেন। শুনে তিনি বলেছিলেন, আমি এর অর্ধেক কথাও জানতাম না। না জানার কারণ, প্রেসিডেন্টের কাছে এত কথা কে বলবে? অথবা এত কথা শোনার সময় প্রেসিডেন্টের কি আছে? শুনলেন তো এমনভাবেই শুনলেন যে, প্রেসিডেন্ট আমাদের আদেশ দিলেন বঙ্গভবনে এসে এই কথাগুলো শুনাতে। ৮ মে ১৯৮৮ বিকেলে ইফতারের আগে দুই-তিন ঘণ্টা সময়। দুই মিনিট বললেন প্রেসিডেন্ট; পাঁচ মিনিট বললেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আতিক; পাঁচ মিনিট বললেন তৎকালীন চট্টগ্রামের জিওসি জেনারেল সালাম। এক ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট বললাম আমি কর্নেল ইবরাহিম বীর প্রতীক। আধা ঘণ্টার মতো সময় প্রশ্ন এবং উত্তরের জন্য নির্ধারিত ছিল। কাদের সামনে বললাম? সরকারের ক্যাবিনেটে যতজন মন্ত্রী ছিলেন তারা, যতজন সচিব ছিলেন তারা, ঢাকায় যতজন জেনারেল ছিলেন তারা, ঢাকায় জ্যেষ্ঠ ব্রিগেডিয়ার, পুলিশের আইজি এবং আরো চার-পাঁচজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ অফিসার প্রমুখ। প্রেসিডেন্ট এবং সেনাপ্রধান অভয় দিয়েছিলেন যে, তুমি স্পষ্টভাবে সব কথা বলবে, ভয় পাবে না। কারণ আমরা চাই সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সমস্যাটি সম্পর্কে অবহিত হোক।
সমস্যার দায়িত্ব হস্তান্তর
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম ছোটকালে ক্যাডেট কলেজে পড়ার আমল থেকেই উপস্থিত বক্তৃতা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। আশির দশকের মাঝখানে তিন বছর বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর মেধাবী মাঝারি চাকরিপর্যায়ের অফিসারদের অপরিহার্য প্রশিণ প্রতিষ্ঠান স্টাফ কলেজের প্রশিক ছিল। অর্থাৎ ইবরাহিমের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এরূপভাবে কথা গুছিয়ে উপস্থাপনের উদাহরণ যথেষ্ট ছিল। ওই ৮ মে ১৯৮৮ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটিকে মিলিটারিদের প্লেট (বাসন বা থালা) থেকে বেসামরিকদের প্লেটে হস্তান্তর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদপে ছিল। এটা যে শুধু বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সমস্যা নয়, এটা যে বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় সমস্যা (তথা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, নৃতাত্ত্বিক, জাতিগঠন, অর্থনৈতিক ইত্যাদি) এই কথাটা উপস্থাপন এবং এই কথাটার গ্রহণযোগ্যতা শক্তভাবে শুরু হয় ৮ মে ১৯৮৮ তারিখ থেকে। ৮ মে ১৯৮৮ তারিখের পরবর্তী এক মাসের মধ্যে, সরকারের পাঁচটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাঁচজন সচিব খাগড়াছড়ি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন এবং একটি করে রাত কাটিয়েছিলেন। ইংরেজিতে কথা আছে- সিইং ইজ বিলিভিং অর্থাৎ দেখলেই বিশ্বাস হয়। খাগড়াছড়িতে সফর করে, ছোট বড় মানুষের সাথে কথা বলে, সচিব মহোদয়রা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজেদের ধারণা পোক্ত করতে পেরেছিলেন।
নতুন অভিজ্ঞতা
আমি ওপরের দুই-তিনটি অনুচ্ছেদে বোঝাতে চেয়েছি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যাটির স্বরূপ নির্ধারণের প্রক্রিয়ার শুরু কী প্রকারে হয়েছিল। তাহলে পাঠকদের মধ্যে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো-না-কোনো প্রকারে কোনো-না-কোনো সময়ে চাকরি করেছেন, তাদের মনে প্রশ্ন থাকবে, এত দিন এটা কী প্রকারের সমস্যা ছিল। বস্তুত ১৯৭৫-এর ডিসেম্বরে শান্তিবাহিনী কর্তৃক আক্রমণের মাধ্যমে যেই বিদ্রোহ বা যুদ্ধের সূচনা করা হয়েছিল তার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছিল বা তার প্রকৃতি উন্মোচিত হতে দু’চার বছর লেগে গিয়েছিল। পাঠক অনুগ্রহপূর্বক ১৯৭৬-৭৭-৭৮-এর বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীগুলোর আকার-আকৃতি ও সাংগঠনিক অবস্থানের কথা খেয়াল করুন। নতুন দেশ নতুন বাহিনী। তার মধ্যে ১৯৭৫-এর ঘটনাবলি। ওই আমলের সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ে এইরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এইরূপ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। অর্থাৎ এক দিকে শান্তিবাহিনী তাদের বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড বা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, অপর দিকে বাংলাদেশ সরকার সেটা মোকাবেলা করার কলাকৌশল বা প্রক্রিয়ামাত্র রপ্ত করা শুরু করেছে। ঘটনাক্রমে ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালে যিনি বাংলাদেশ সরকারের কর্ণধার ছিলেন, সেনাবাহিনীরও কর্ণধার ছিলেন তিনি। অতএব তিনি তার কনিষ্ঠ সহকর্মীদের মূল দায়িত্বটি দিয়েছিলেন কলাকৌশল ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করার। মেহেরবানি করে খেয়াল করুন যে, ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ থেকে মাত্র একটি রাজনৈতিক দল ছিল দেশে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ অন্য সব রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করা হয়েছিল। একমাত্র দলটির নাম ছিল বাকশাল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, ওই দিনের রাজনৈতিক সামরিক বিদ্রোহের নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ দেশব্যাপী সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। আড়াই মাস পর ৩ নভেম্বরের সামরিক বিদ্রোহের মাধ্যমে সংবিধান স্থগিত করে দেয়া হয়েছিল। অতঃপর দেশে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, ক্রমান্বয়ে যখন রাজনীতির অঙ্গনে জড়িয়ে পড়ছিলেন তখন তিনি নতুন রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেন। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন রাজনীতিবিহীন একটি দেশ চলতে পারে না। তাই জিয়াউর রহমান যখন সংবিধান পুনরায় চালু করেন, তখন তিনি নতুন করে অথবা পুনরায় ১৯৭৫-এর জানুয়ারির আগের মতো বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। জিয়াউর রহমানের হাতেই আওয়ামী লীগও নতুন করে নিজেদের হারানো জীবন ফিরে পায়। আমি ১৯৭৮ সালের কথা বলছি। ওই আমলের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নাজুক অবস্থাতেই এত বেশি কাহিল ছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা চিন্তা করার অবকাশ ছিল না। এখন ২০১৫ সালে আরাম-আয়েশে বসে ৩৫ বছর আগের কর্তাব্যক্তিদের দোষ দেয়া সহজ।
জেনারেল জিয়া ও জেনারেল মঞ্জুর
জিয়াউর রহমান দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরেই ১৯৭৮ সালের একসময়, তার দৃষ্টিতে দ সেনা অফিসার ওই আমলের মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তমকে চট্টগ্রামের জিওসি নিযুক্ত করেছিলেন। মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম অত্যন্ত মেধাবী অফিসার ছিলেন, যথাসময়ে স্টাফ কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। ১৯৭০-৭১-এ তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নামী-দামি বা অভিজাত প্যারাসুট ব্রিগেডের (সংক্ষেপে প্যারা ব্রিগেড) ব্রিগেড মেজর বা বিএম ছিলেন। ১৯৭১-এর মাঝামাঝিতে তিনি সপরিবার পাকিস্তান থেকে পলায়ন করে, আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তিনি একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের জিওসি ছিলেন প্রায় তিন বছর এবং সেই সময় অনেক কৌশলগত (বা স্ট্র্যাটেজিক) সিদ্ধান্ত তিনি পেয়েছেন, বা নিজে নিয়েছেন এবং সবই বাস্তবায়ন করেছেন। অন্ততপে সামরিক বাহিনীর কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি রেওয়াজ বা ধারা তিনি গড়ে তোলেন। আমি ১৯৭৮ সালের প্রথমার্ধে যখন সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে, তখনকার আমলের ফারুয়া ও রাজস্থলী থানার ভৌগোলিক এলাকায় দায়িত্ব পালনরত ছিলাম। তখন একদিন রাজস্থলী বাজার ক্যাম্পে, জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর এসেছিলেন। আধাঘণ্টা সময় অবস্থান করেছিলেন। ৮-৯ বছর চাকরির ইবরাহিম, জেনারেল মঞ্জুরের জ্ঞানগর্ভ ধারণাগত আলোচনা এবং দিকনির্দেশনাগুলো আংশিকভাবে বুঝেছিলাম মাত্র। সেই সময় শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহমূলক যুদ্ধ তুমুলভাবে চলছে। শান্তিবাহিনীর প্রাধান্য বিস্তার করা এলাকা ছিল দণি ও মধ্যম পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ বর্তমান আমলের বান্দরবান জেলা এবং রাঙ্গামাটি জেলার দক্ষিণাংশ। সামরিক বাহিনীর সামরিক কর্মকাণ্ড এই এলাকাগুলোতেই জোরদার করা হচ্ছিল। শান্তিবাহিনী সর্বপ্রকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করেই যাচ্ছিল। চাঁদাবাজি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। গুম, অপহরণ ও হত্যা প্রায়ই হতো। শ্রমিকদের মেরে ফেলা হতো। পাহাড়িরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে অভ্যস্ত ছিলেন না, অভ্যাস করতে দেয়াও হচ্ছিল না। এইরূপ পরিস্থিতিতে কী নিয়মে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালু করা ও অব্যাহত রাখা যায় এবং সাথে সাথে সামরিক অপারেশনও পরিচালনা করা যায়, এটা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্ন ছিল। আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
লেখক: মেজর জেনারেল (অব:) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকেই ইঙ্গিত

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদ গতকাল মঙ্গলবারও সাংবাদিকদের বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই তাঁকে নিয়ে গেছে। এদিকে যে বাসা থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই এলাকার নিরাপত্তাকর্মী এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও একই রকম মন্তব্য করেছেন।
হাসিনা আহমদ গতকাল বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরই দায়িত্ব তাঁকে আদালতের সম্মুখে, আমাদের সবার সম্মুখে হাজির করা। আমরা এক অজানা আশঙ্কায় আছি যে ওনার কোনো ক্ষতি না হয়ে যায়!’
সালাহ উদ্দিন আহমদকে খুঁজতে পুলিশের তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। র্যাবের আইন ও জনসংযোগ শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সালাহ উদ্দিনকে খুঁজে বের করতে সব ব্যাটালিয়নকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবাই তাঁকে খুঁজছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান গতকাল বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা খুবই উদ্বিগ্ন যে সালাহ উদ্দিনের জীবনে কী ঘটেছে। উনি সত্যি বেঁচে আছেন কি না।’
তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিবিসিকে বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমদ আগেও লুকিয়েই ছিলেন। তিনি আমাদের কাছে নেই, আমরা চেষ্টা করছি আসলে কী ঘটেছে তা জানার। আমরা প্রথম থেকেই তাঁকে খুঁজছি।’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা ডিবির (উত্তর) উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম, উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইকবাল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত সোমবার রাতে ওই বাসায় (যে বাসা থেকে নিখোঁজ হন) গিয়েছিলেন। তাঁরা শুধু ঘটনাস্থলটি দেখেই চলে আসেন।
সোমবার রাতে ডিবির কর্মকর্তারা ওই স্থান থেকে চলে আসার পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ওই বাড়ির আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলা হয়। একাধিক ব্যক্তি প্রথম আলোকে জানান, সালাহ উদ্দিনকে অপহরণের রাত অর্থাৎ ১০ মার্চ রাতে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৩ বি নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে তাঁকে ধরে নেওয়ার আগে একটি বাহিনীর পিকআপ সেখানে গিয়েছিল। ওই ভ্যানে আসা ব্যক্তিরা ১৩বি নম্বর সড়কটির অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন সেখানে কর্তব্যরত ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির নিয়োগ করা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে।
কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মীদের একজন সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, আনুমানিক রাত নয়টার দিকে তিনি উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির কার্যালয়ের কাছেই কর্তব্য পালন করছিলেন। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি পিকআপ ভ্যান এসে সেখানে থামে। তিনি বলেন, ‘বাহিনীর গাড়ি দেখে আমি আগায়া যাই। স্যারেরা আমাকবলল, ১৩বি নম্বর রোড কোন দিকে। আমি সালাম দিলাম। দেখায়া দিয়া বললাম, স্যার মাঠের পাশ দিয়া যাইতে হবে। এরপর ওরা চলে গেল।’
সালাহ উদ্দিন আহমদের নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে হইচই শুরু হওয়ার পর সেখানে কর্তব্যরত অন্য নিরাপত্তা সদস্যরাও ওই সদস্যের কাছ থেকে এই গল্প শুনেছেন। তাঁদের একজন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি আসে ১৩বি নম্বর রোডের লোকেশন জানতে চায়। নিরাপত্তাকর্মী সেটা দেখায় দিছে।’
নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, রাত নয়টার পরেই ১৩বি নম্বর সড়কের আশপাশের কয়েকটি ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরাও নিজ নিজ এলাকায় সাইকেল, বাঁশি আর টর্চলাইট নিয়ে নেমে পড়েন।
সোমবার রাতে ১৩বি নম্বর সড়কে ঢোকার মুখেই স্থানীয় কিছু তরুণ-তরুণীকে ব্যাডমিন্টন খেলতে দেখা যায়। আনসার সদস্যরা জানান, সেদিনও (১০ মার্চ) এই তরুণ-তরুণীরা ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন। তাঁদের একজন বলেন, নয়টার দিকে ১৩বি রোডের মাথায় একটা কালো পিকআপ এসে থামল। এরপর আরও মাইক্রোবাস ওই সড়কে ঢোকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পিকআপ ভ্যান-মাইক্রোবাস দেখে ছেলেরা ঘটনা কী জানার জন্য গলির মুখে উৎসুক হয়ে জড়ো হন। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, ‘ভাইয়া আপনারা বাসায় যান। ঝামেলা হতে পারে।’ এরপর খেলা ভেঙে যায়। ছেলেমেয়েরা যে যার মতো বাসায় চলে যান। এর মধ্যে একজন নিজের বাসার দোতলার বারান্দা থেকে ৪৯/এ নম্বর বাসার সামনে একটি মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। কিছুক্ষণ পরে গাড়িগুলো চলে যায়। তবে বিশেষ কোনো হইচই এর শব্দ ছিল না। পরের দিনও পিকআপ ভ্যানটি ওই এলাকায় টহল দিয়েছে এবং ১৩বি নম্বর সড়কের মাথায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও ছিল।
গোয়েন্দা পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা জানায়, এ রকম কোনো তথ্য তারা জানে না।
সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীর অভিযোগ, ১০ মার্চ রাত নয়টা থেকে ১০টার মধ্যে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সালাহ উদ্দিনকে ধরে নিয়ে যান। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। ১১ মার্চ রাতে তিনি এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় অভিযোগ করেন। তবে আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ দাবি করেছে, ওই বাড়িতে যে সালাহ উদ্দিন ছিলেন, সেটাই নিশ্চিত নয়।
এদিকে নিখোঁজ সালাহ উদ্দিন আহমদের খোঁজ চেয়ে হাইকোর্টে করা আবেদনের বিষয়ে শুনানি আগামী ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি হয়েছে।
বিএনপিপন্থী শিক্ষকনেতা অধ্যাপক আ ফ ম ইউসুফ হায়দারের নেতৃত্বে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) একটি প্রতিনিধিদল গতকাল সালাহ উদ্দিনের গুলশানের বাসায় গিয়ে হাসিনা আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

নহরকে নিয়ে মনীষার ইচ্ছা by সিরাজুস সালেকিন

রাজনীতি করা খারাপ নয়। যারা রাজনীতি করে তারা দেশের জন্য কাজ করে। তাই ছোট্ট শিশু নহরের মায়ের ইচ্ছে ছেলে বড় হয়ে রাজনীতি করবে। দেশের মঙ্গলে কাজ করবে। চার দিন বয়সের শিশু নাদিফুজ্জামান নহর। যার বাবা নুরুজ্জামান জনি দুই মাস আগে পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘ক্রসফায়ারে’ গেছেন। ছাত্রদলের খিলগাঁও থানার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। গত ১৩ই মার্চ রাত দেড়টায় পুত্র সন্তান প্রসব করেন জনির স্ত্রী মুনিয়া পারভীন মণীষা। সবুজবাগের হেলথ এইড ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তার শিশুর জন্ম। গত সোমবার সন্তান নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। মৃত্যুর আগেই জনি জানতে পেরেছিলেন যে তার পুত্র সন্তান হবে। নাদিফুজ্জামান নহর নামটা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসও তাকে দেখতে হাসাপাতালে গিয়েছিলেন। মণীষা বর্তমানে খিলগাঁওয়ের শান্তিপুরে তার বাবার বাসায় অবস্থান করছেন। ২০১২ সালের ২৩শে নভেম্বর জনির সঙ্গে বিয়ে হয় মণীষার। পড়াশোনা করেছেন ডিগ্রি পর্যন্ত। তার ছোট ভাই এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আর ছোট বোনের বয়স তিন বছর। বাবা মঈদুল হক পেশায় ব্যবসায়ী। জনিও রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিয়ের পর জনির পরিবারের সঙ্গে থাকতেন মণীষা। তার মৃত্যুর পর বাবার বাসায় চলে আসেন। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নহর হবে ‘সেকেন্ড জনি’। সে বাবার মতই রাজনীতি করবে। রাজনীতি করা কোন খারাপ কাজ না। তাই যদি হতো তাহলে আওয়ামী লীগ যারা করে তারা সবাই খারাপ কাজে জড়িত। জনি দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। নহর বড় হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। স্বামীর মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে মণীষা বলেন, আমার সন্তান যখন বড় হয়ে জিজ্ঞেস করবে তার বাবাকে কারা খুন করেছে সে প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দেব জানি না। সরকার ক্রসফায়ারের কথা বলছে। কিন্তু সেটা তো কেউ বিশ্বাস করবে না। ঘটনার সময় যদি জনির হাত থেকে পিস্তল উদ্ধার হয়ে থাকে তবে পুলিশের গায়ে কেন কোন গুলি লাগলো না? কেন জনির গায়ে ১৬টি বুলেট বিদ্ধ হলো? আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছি। তিনি যদি বিচার না করেন তবে আল্লাহ যেন দোষীদের বিচার করেন। আমার সন্তান যেন বড় হয়ে জানতে পারে তার বাবা নির্দোষ ছিল। মণীষা বলেন, সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে দেশে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে। দেরিতে হলেও জনি হত্যার বিচার তিনি পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত মণীষা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, যখন নহর স্কুলে যাবে তখন বাবার গল্প কাউকে বলতে পারবে না। ভাবতেই কান্না চলে আসছে। প্যারেন্টস ডে’তে বাবাকে সে পাবে না। তার বেড়ে উঠাটা হবে অনেক কষ্টের। নহর গর্ভে থাকা অবস্থায় গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দেখা করতে গিয়েছিলেন মণীষা। কিন্তু সেখান থেকে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ এক ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দিলেও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেলিনা সুলতানা নিশিতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়েছিলেন বলে জানান মণীষা।
গত ১৯শে জানুয়ারি সোমবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছোট ভাইকে দেখতে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন জনি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৬টি রাজনৈতিক মামলা ছিল। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত তিনটার দিকে জনিকে নিয়ে জোড়পুকুর বালুর মাঠে নাশকতাকারীদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ পাল্টা গুলি করলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে জনি আহত হয়। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি জনিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। তার গায়ে ১৬টি গুলির চিহ্ন ছিল।

নির্বাচনই শান্তির নতুন বাতাবরণ by সৈয়দ আবদাল আহমদ

বাংলাদেশে এ মুহূর্তে একটি নির্বাচনই বসন্ত এনে দিতে পারে। বন্ধ করতে পারে অবরোধ-হরতাল, পেট্রলবোমা, গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সব বিভীষিকা। একটি নির্বাচনই সঙ্কট সুরাহা করে বইয়ে দিতে পারে শান্তির নতুন বাতাবরণ।
এমন একটি নির্বাচন কতদূর? না, এমন নির্বাচনের গন্তব্য সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তেও এক চিলতে আলো দেখা যাচ্ছে না। তবে এক নিমিষে আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন রাজনীতির দুই নেত্রী। শুধু প্রয়োজন দু’জনের আন্তরিকতা। এই একটি বিষয়ে প্রয়োজন দু’জনের এককণ্ঠ, ঐকমত্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি বলতে পারেনÑ আসুন নির্বাচন হবে, সংলাপে বসি। আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যদি বলতে পারেনÑ ঠিক আছে, অবরোধ হরতাল আর হবে না। তাহলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না।
শেখ হাসিনা তার অবস্থানে এখনো অনড়। তিনি কিছুতেই সংলাপ চান না। খালেদা জিয়া অবশ্য তার অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। সঙ্কটের গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান হোক, তা তিনি চাচ্ছেন। ১৩ মার্চ গুলশান কার্যালয়ে তিনি যে সংবাদ সম্মেলন করেন তাতে সে ইঙ্গিত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন তার সংবাদ সম্মেলনে নতুন কিছু নেই। সেটা ঠিক নয়। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কঠোর অবস্থান কিছুটা হলেও পরিবর্তন করেছেন। ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের’ অধীনে নির্বাচনে তার আপত্তি নেই। তেমনি বর্তমান দশম সংসদকে তথাকথিত বললেও সেই সংসদে একতরফা পঞ্চদশ সংশোধনী সরকার বাতিলও করে দিতে পারে এবং ১৯৯৬ সালের মতো নতুন সংবিধান সংশোধন বিলও আনতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন। চলমান অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহারের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু না বললেও ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস ঐক্যবদ্ধভাবে উদযাপনের আশাও তিনি করেছেন।
খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে বলেছেন, আজকের সঙ্কট সমাধানের চাবিকাঠি ক্ষমতাসীনদের হাতে। সঙ্কট নিরসনের মাধ্যমে তারা সেই কাক্সিত জাতীয় ঐক্যের পথ খুলে দিতে পারে। উপায় হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি পথ দেখিয়েছেন। বলেছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে দ্রুত একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই সঙ্কটের সুরাহা হবে। এ নিয়ে ক্ষমতাসীনেরা যদি কোনো আলোচনা করতে না চায়, তাহলে তারা এককভাবেও সমস্যা সমাধান করে ফেলতে পারে। আর তা হচ্ছে তথাকথিত হলেও একটি সংসদের অধিবেশন এখন চলছে। একতরফাভাবে যে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী তারা পাস করেছে তা একতরফাভাবে ওই সংসদে বাতিলও করে দিতে পারে। তাতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ খুলবে। এই সংশোধনীর পর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে আর সঙ্কট থাকবে না। শেখ হাসিনা সরকারের জন্য উদার হওয়ার অনেকটা সুযোগ এসেছে। সরকার জেদ পরিহার করে উদারতা দেখাতে পারলে সত্যিই বিপদ কেটে যায়।
বিষয়টি এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আলোচনা কি আকাশে হবে? খুনির সাথে কোনো আলোচনা হতে পারে না। একই দিন দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, শান্তির পরিবেশ এলে আলোচনা হলেও হতে পারে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মনে করেন সঙ্কট আর থাকা উচিত নয়, তাহলে সহজেই বিষয়টির সুরাহা হবে। কারণ শুধু খালেদা জিয়াই নন, গোটা জাতিই মনে করে সঙ্কট সমাধানের চাবিকাঠি শেখ হাসিনার হাতে। তার ইচ্ছার ওপরই সমাধান নির্ভর করছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিষয়টা সমাধান করলেই হয়।
শেখ হাসিনা তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করেছেন। তার বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। ইচ্ছা করলেই তিনি সঙ্কটের সমাধানে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন। এমন একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করতে পারেন, যাতে দেশে আর কখনো রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি না হয়। এমন একটি জাতীয় সনদ তিনি তৈরির উদ্যোগ নিতে পারেন, যার মধ্যে সব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করবে। পাঁচ বছর পর পর ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’Ñ সেøাগানের সত্যিকার প্রতিফলন ঘটবে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা এগিয়ে যাবে।
বর্তমান সঙ্কট যে কারণে
দেশের বর্তমান সঙ্কটের মূলে রয়েছে গত বছরের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন। জনগণের ভোটের অধিকারকে এ নির্বাচনে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। নির্লজ্জ প্রহসনের অংশ হিসেবে এ নির্বাচনে ভোট ছাড়াই সংসদের ১৫৩টি অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে। বাকি ১৪৭টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। সেদিন নির্বাচন কেন্দ্রগুলোয় কুকুর-বিড়াল ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্য দৈনিক পত্রিকায় প্রধান ছবি হিসেবে ছাপা হয়েছে। প্রচণ্ড সহিংসতাপূর্ণ এ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটগ্রহণের আগের দিন পর্যন্ত ৪১ দিনে নিহত হয়েছেন ১২৩ জন। আর ভোটের দিন সংহিসতায় মারা গেছেন ১৯ জন। ভোটের দিন এতসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এর আগে দেখা যায়নি। ৫৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। দেশের জনগণ কোনোভাবেই সেই ভোটহীন, ভোটারহীন ও প্রার্থীহীন নির্বাচন মেনে নেয়নি। নির্বাচনে শাসক দলের আজ্ঞাবহ কয়েকটি দল ছাড়া দেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে এবং অর্ধেকের বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা দিয়ে এক বিচিত্র সংসদ গঠিত হয়। এ সংসদের বিরোধী দলের সদস্যরা একসাথে বিরোধী দলেও আছে, আবার সরকারের মন্ত্রিসভায়ও আছে।
বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, ‘সংবিধানের বাধ্যবাধতার কারণে এটা একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সবার সাথে আলোচনা করে আবার পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন করা হবে।’ অর্থাৎ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রধানমন্ত্রীর মতেই ছিল অপূর্ণাঙ্গ, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান ‘ফলাফল শূন্য খেলায় নেমেছেন রাজনীতিকরা’ শীর্ষক তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। সেই রাজনৈতিক সমস্যার উৎস থেকে শাসকগোষ্ঠী দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে বলেই মনে হয়। এক বছর ধরে শাসকেরা নির্বাচনের আগে ভোটারদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখেছে। ওই নির্বাচনের আগে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, জানুয়ারির ওই নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য তারা গ্রহণযোগ্যমূলক মধ্যবর্তী একটি নির্বাচন দেবে। ওই নির্বাচনটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ, এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সবাই পূর্ণাঙ্গভাবে ওয়াকিবহাল। ... ... আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে নেতৃত্বদানকারী একটি দল। তাদের ঐতিহাসিক রীতির সাথে এ ঘটনা মিলানো যায় না। পরিষ্কার নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার যে প্রবণতা তা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেই। আওয়ামী লীগ যদি তার নিজেকে পিছলে পড়ে যেতে পারে এমন একটি পাহাড়ের ঢালে নিয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র নিজে বিপন্ন হবে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে তাই সুষ্ঠুভাবে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অর্জনের মাধ্যমে সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান করতে এগিয়ে যেতে হবে।’
সঙ্কটে বিপর্যস্ত দেশ
ভুয়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সঙ্কট বর্তমানে দেশকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশ এক প্রকার অচল হয়ে আছে। এক দিকে চলছে প্রতিরোধ আন্দোলন, অবরোধ-হরতাল, অন্য দিকে সরকারি বাহিনীর বন্দুকের গুলিতে সহিংসতায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত আর দগ্ধ মানুষের সারি, সরকারি সব বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা প্রয়োগ। চলমান আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাদের দমনের নামে সরকারি বাহিনী সরাসরি বুকে গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। হত্যার পর সেই পুরনো পন্থায় বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহতের হয়েছে বলে মিথ্যা কল্পকাহিনীর প্রচার করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা চলছে বেপরোয়াভাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবেই রাজনৈতিক কর্মীদের গাড়ির নিচে চাপা দিয়ে কিংবা সারা শরীরে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ মৃত ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে মৃত বলে দেখানো হচ্ছে। ১৪ মার্চ অবরোধের ৬৮তম দিনে সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে ১২১ জন। এর মধ্যে ক্রসফায়ার ‘গণপিটুনি’ তথা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ৩৭ জন (প্রথম আলো)। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া হিসাবেই চলমান সঙ্কটে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এই ভয়াবহ সঙ্কট সমাধানের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
সংলাপ কেন প্রয়োজন
সরকার সমস্যার মূলে না গিয়ে বলপ্রয়োগ করে সমাধান চাচ্ছে। কিন্তু বলপ্রয়োগ কখনই সমস্যার সমাধান নয়। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব এবং দেশের সর্বমহল থেকে তাই সঙ্কট সমাধানে দুই রাজনৈতিক পক্ষকে দ্রুত সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো কর্ণপাতই করা হচ্ছে না। সরকার একটি ন্যায্য রাজনৈতিক আন্দোলনকে ধ্বংসাত্মক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যর্থ প্রয়াসই চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অস্ত্রের ভাষা যে রাজনীতির ভাষা হতে পারে না, সে কথা কিছুতেই তারা বুঝতে চাচ্ছে না। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গোটা জাতি তাই চিন্তিত। মানুষের মুক্তি মিলছে না আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে। চার দিকের দমবন্ধ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চায় মানুষ।
বাংলাদেশের মানুষের এই শঙ্কা ও দমবন্ধ অবস্থা এবং বিরাজমান ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থা। তারা চরম বৈরী অবস্থান থেকে সরে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে উভয়পক্ষকে সঙ্কট নিরসনে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘে বড় বড় বিশ্ব সমস্যার সাথে প্রথম যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে প্রথমে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশন উদ্বেগ জানায়। এরপর জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন বিবৃতির মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়ে দুই পক্ষকে সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে সংলাপে বসার আহ্বান জানান। উদ্বিগ্ন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব সরকারের সাথে সমন্বয়ের জন্য সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পেয়েই তারানকো দক্ষিণ ও মধ্যএশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাই বিসওয়ালের সাথে বৈঠক করেন। একই সাথে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব দুই নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সঙ্কট সমাধানে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেন। সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী সম্প্রতি ওয়াশিংটনে গেলে তার সাথেও বৈঠক করে আবারো সংলাপের আহ্বান জানান জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিকের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ পরিস্থিতি প্রায় প্রতিদিনই উঠছে।
ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ব্রিফিংয়েও উঠে আসছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশের ঘটনায় উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সাথে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও বৈঠক করেন। তিনি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সহযোগিতারও প্রস্তাব করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্ট বাংলাদেশের অচলাবস্থায় উদ্বেগ জানিয়ে শুধু বিবৃতিই দেয়নি, ইইউর মানবাধিকারবিষয়ক একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেও গেছে। ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেডার নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই প্রতিনিধিদল বিএনপি, আওয়ামী লীগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস, মানবাধিকার কমিশন, আইনমন্ত্রী, স্পিকারসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে ২৬টি বৈঠকে মিলিত হয়। সফর শেষে এক বিবৃতির মাধ্যমে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানায় ইইউ। বিবৃতিতে তারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইইউ রাজনৈতিক সঙ্কটের সুরাহা ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অবসানের আহ্বান জানিয়েছে। সুস্পষ্টভাবে বলেছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক অধিকারের বিনিময়ে হতে পারে না। বিবৃতিতে বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণগ্রেফতার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের তাগিদ
আওয়ামী লীগ বলয়ের বাইরের সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে নাগরিক সমাজের উদ্যোগটি সবার দৃষ্টি কেড়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শিরোনামে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটশনে একটি গোলটেবিল হয়। এই গোলটেবিলে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা অংশ নেন। দেশের অবস্থা বর্ণনা করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ সৃষ্টি হয়েছে। একপক্ষ আরেক পক্ষকে শেষ করে দিতে চাইছে। এ গোলটেবিল সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনকে সংলাপের শুভ উদ্যোগ নিতে আকুতি জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া হয়। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির জন্য তাদের কাছে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়। তারা সংলাপের আহ্বানের পাশাপাশি একটি জাতীয় সনদ তৈরির জন্য ১২ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেন। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আরেকটি গোলটেবিল আলোচনা থেকে পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের জন্য ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠায় সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বরাবরে চিঠি পাঠিয়েও বাংলাদেশের সঙ্কট নিরসনে সহযোগিতা কামনা করেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা: এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী চলমান সঙ্কট নিরসনে দুই নেত্রী এবং দুই পক্ষকে সংলাপে বসাতে প্রতীকী গণ-অনশন করেন দলের কার্যালয়ে। তিনি বলেন, সঙ্কট নিরসনে সংলাপ করতেই হবে। দেশে আজ যা কিছু হচ্ছে তার জন্য দায়ী ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য একটি নিয়মরক্ষার নির্বাচন করতে হবে। সে কথা তিনি ভুলে গেছেন। ফলে যে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, সংলাপ ছাড়া উত্তরণের উপায় নেই।
গণফোরাম সভাপতি ডক্টর কামাল হোসেন একাধিকবার বলেছেন, সঙ্ঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে প্রয়োজন জাতীয় সংলাপ। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ২৮ জানুয়ারি থেকে মতিঝিলে দলের অফিসের সামনে ফুটপাথে রাত দিন অবস্থান করছেন দুই নেত্রীর সংলাপের দাবিতে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গ্রেফতার হওয়ার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থান করে বলেছেন, সঙ্কট উত্তরণের জন্যই সংলাপ। সংলাপের প্রস্তাবে সাড়া না দিলে প্রধানমন্ত্রী এক সময় কথা বলারও সুযোগ পাবেন না। টেলিভিশনের টকশোগুলোতেও বিশিষ্টজনেরা প্রতিদিনই সংলাপের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের একটি বক্তব্য এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সংলাপ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যদি ৭ মার্চের পরও পাকিস্তানিদের সাথে সংলাপে বসতে পারেন, তাহলে আপনি কেন পারবেন না।’
তোপের মুখে সংলাপ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের নেতারা এখন পর্যন্ত সংলাপের ব্যাপারে বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখিয়ে আসছেন। যারাই সংলাপের আহ্বান বা পরামর্শ দিচ্ছেন, তারা তোপের মুখে পড়ছেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস-এর সাথে তুলনা করে তাদের সাথে কোনো সংলাপ বা আলোচনা না করার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। অবরোধের ৩১ দিন পর অনুষ্ঠিত সরকারি দলের ওই বৈঠক শেষে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ সিদ্ধান্ত জানান। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আইএস ও খালেদা জিয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তিনি ‘খুনি’ ও ‘দানব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, সংলাপের প্রস্তাব অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি এম ইমাম বলেন, নাগরিক সমাজের একমাত্র শামসুল হুদা ছাড়া অন্য সবার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। তাদের নিশ্চয়ই এজেন্ডা আছে। আততায়ীর সাথে কিসের সংলাপ? ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম বলেন, যারা আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারে তাদের সাথে সংলাপ হতে পারে না।
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে হাত মেলান
একগুঁয়েমি দেখালে চলবে না। দেশের কথা ভাবতে হবে। মানুষের কথা ভাবতে হবে। জনগণকে আস্থায় নিতে হবে। জনগণের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি। জনগণকে পাশ কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলবাজ কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করে হয়তো সাময়িক ক্ষমতায় থাকা যাবে। কিন্তু এক সময় তা বুমেরাং হতে বাধ্য। আওয়ামী লীগ ৬৫ বছরের একটি পুরনো রাজনৈতিক দল। রাজনীতিতে বিএনপিরও হয়েছে ৩৭ বছর। রাজনীতির মাঠে একে অপরকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করা উচিত। শত্রুতার বশবর্তী হয়ে নয়। একে অপরকে নির্মূল করে দেয়ার বর্তমান মানসিকতা এখনই পরিহার করতে হবে। উভয়েরই উচিত জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনে কাজ করা। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আর বিরোধ না বাড়িয়ে একে অপরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিন।
লেখক : জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক

‘রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করব’ -মাশরাফি বিন মুর্তজা by উৎপল শুভ্র

দুদিন পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে টস করতে নামবেন। সেই রোমাঞ্চ ছাপিয়ে কাল সারা দিন মাশরাফি বিন মুর্তজার মনে বেদনার ছায়া। অকালপ্রয়াত প্রিয় বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানার মৃত্যুবার্ষিকীতে ব্যথাতুর মাশরাফির সঙ্গে কথা শুরু হলো এ দিয়েই-
আজ যে একটা বিশেষ দিন, এটা কি আপনার মনে আছে?
মাশরাফি: মনে থাকবে না মানে, সকালে উঠেই মনে হয়েছে এই দিনে রানা চলে গিয়েছিল। আমার সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল ও। টুরে একসঙ্গে ঘুমাতাম। ও আলো থাকলে ঘুমাতে পারত না। দরজার নিচে যে একটু ফাঁক থাকে, ওখান দিয়ে আলো আসত বলে টাওয়েল গুঁজে দিত। আমি আবার অন্ধকারে ঘুমাতে পারি না। ওকে তাই মারতাম। ও-ই তাই স্যাক্রিফাইস করত। বলত, তুই আগে ঘুমা, আমি পরে ঘুমাব, আমি অন্ধকার ছাড়া ঘুমাতে পারি না।
২০০৭ বিশ্বকাপে রানা মারা যাওয়ার পরদিনই ভারতের সঙ্গে ম্যাচ ছিল। এবার আরেকটি বিশ্বকাপে দুই দিন পর সেই ভারতের সঙ্গেই খেলা। অদ্ভুত না?
মাশরাফি: হ্যাঁ। কিছুটা তো অদ্ভুতই। একটু আগে এটাই ভাবছিলাম, আবার সেই ম্যাচ। আসলে এই দুনিয়াতে কাকতালীয়ভাবে অনেক কিছুই মিলে যায়। আমরা নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জিতলে তো দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খেলতে হতো। আমরা এখন ভারতের সঙ্গে খেলছি।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগে আপনি বলেছিলেন, এই মেলবোর্ন আপনার অনেক কিছু নিয়ে নিয়েছে... রক্ত, মাংস...এবার যেন কিছু ফিরিয়ে দেয়। এই কোয়ার্টার ফাইনাল আপনাকে আবার সেই মেলবোর্নেই নিয়ে এল! এবার কি মেলবোর্নের কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার পালা?
মাশরাফি: আসলে সব কথা বলে ফেলা ভালো না। মনেরটা মনেই থাক। পারলে তখন বলব। তবে এটা সত্যি যে, এই মেলবোর্নে আমি অনেক কষ্ট করেছি। অপারেশনের পর অপারেশন। অপারেশন তো অজ্ঞান করে করেছে। বুঝিনি। কিন্তু এরপর যে কষ্ট...হাঁটতে পারি না, সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করা...
মেলবোর্নে আপনি কবে প্রথম এসেছিলেন? ২০০৩ সালে?
মাশরাফি: হ্যাঁ। ২০০৩-এ প্রথম আসি মেলবোর্নে।
এরপর তো আরও অনেকবার। তবে এবারই প্রথম মেলবোর্নে খেললেন, তাই না?
মাশরাফি: হ্যাঁ, তবে এর আগে বসে বসে প্র্যাকটিস দেখেছি এমসিজিতে। অপারেশনের কিছুদিন পর ডাক্তার বলতেন, এবার তুমি একটু হাঁটতে পারো। সারা দিন বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগত না। বাবু ভাই (অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইকরাম) অফিসে যাওয়ার পথে আমাকে এমসিজিতে নামিয়ে দিতেন।
কোন টিমের প্র্যাকটিস দেখেছেন?
মাশরাফি: ভারতের প্র্যাকটিস দেখেছি। অস্ট্রেলিয়ার প্র্যাকটিস দেখেছি।
এই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত তো আপনার কাছে মেলবোর্ন মানেই ডেভিড ইয়াং, অপারেশন...মেলবোর্ন মানেই যন্ত্রণা...
মাশরাফি: মেলবোর্নে এই প্রথম আমি হাঁটছি। খেলছি (হাসি)। এর আগে যতবার এসেছি, তিন-চার দিন হাঁটার পরই বিছানা (হাসি)। আসলে এই প্রথম মেলবোর্ন ঘুরে দেখতে পারলাম। বাবু ভাই যদিও তখনো ঘুরে দেখিয়েছেন। এখানে বাবু ভাই-মতিন ভাইদের মতো মানুষ না পেলে আমার আর ক্রিকেট খেলা হতো না।
২০০৭ বিশ্বকাপে মন্টিগো বেতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন ‘ধরে দিবানি’ কথাটা আমাকেই বোধ হয় আপনি প্রথম বলেছিলেন। বলেছিলেন, যদি উইকেট একটু ভেজা থাকে আর আমরা বোলিং করি, ভারতকে ‘ধরে দিবানি’। ওটা দিয়েই হেডিং করেছিলাম। এখন তো ‘ধরে দিবানি’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হয়ে গেছে।
মাশরাফি: ওই সময় তো অত কিছু বুঝতাম না। মনে হয়েছিল, বলে ফেলেছি (হাসি)। তবে এখানে যে উইকেট দেখছি, তাতে এটা ভেজা থাকার কোনো চান্স নেই। এখানে মনে হয়, ৩০০ রানের উইকেটই থাকবে। তবে ওই বার আমি ভালো বোলিং করলেও আমরা সবাই মিলে ভালো খেলেছিলাম বলেই জিততে পেরেছিলাম। পুরো টিম পারফরম্যান্স ছিল। এখানেও আমাদের টিম একসঙ্গে ভালো খেললে সুযোগ থাকবে। ওদের যে দল, তাতে আমরা এক-দুজন ভালো খেললে পারব না।
বাংলাদেশের প্রায় সব বড় জয়েই আপনার ওপেনিং স্পেলের একটা বড় ভূমিকা ছিল। সবাই তাই আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা কি চাপ না প্রেরণা?
মাশরাফি: মানুষ আমার কাছ থেকে আশা করে, এটাকে আমি সব সময় প্রেরণাই মনে করি। আর এখন এসে চাপটাপ নিয়ে একদমই ভাবি না। আমার জীবনে যা গেছে, তাতে এটা আর এমন কী চাপ! আমি যে এখনো ক্রিকেট খেলছি, সেটাই তো খেলার কথা না। এ জন্যই সব সময় ভাবি, আরও বেশি কিছু দিতে পারি কি না।
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে কোন জিনিসটা নির্ধারক হবে বলে আপনার ধারণা?
মাশরাফি: আমাদের বোলিং।
তার মানে ব্যাটিংয়ের ওপর পুরো আস্থা আছে আপনার?
মাশরাফি: হ্যাঁ, কারণ ব্যাটসম্যানরা সবাই ফর্মে আছে। এই ম্যাচে কী হবে, সেটি পরের কথা। তবে এই বিশ্বকাপে যদি দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকান বোলাররাও সংগ্রাম করছে, ভারতীয় বোলাররা এখনো সত্যিকার চ্যালেঞ্জে পড়েনি। অস্ট্রেলিয়ারও মিচেল স্টার্ক ছাড়া আর কেউ এমন বিরাট কিছু করেনি। বিশ্বের সেরা বোলিং অ্যাটাক বললে আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কথা বলবেন। নিউজিল্যান্ড নিজেদের মাঠে খেলেছে বলে ভালো করেছে, তার পরও আমাদের কাছেই ওদের বোলাররা মার খেয়েছে। এখানে ইউএই পর্যন্ত ২৫০ রান করে ফেলছে। এর কারণ হচ্ছে, এখানে ট্রু উইকেট, বল উঁচু-নিচু হয় না। ব্যাটসম্যানদের বিশ্বাস থাকে যে, বল ব্যাটেই লাগবে। এখানে তাই বোলিংটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ এত ভালো বলে এই ম্যাচে তো সেটি আরও বেশি, তাই না?
মাশরাফি: বাংলাদেশে অনেকে মনে করছে ভারতের বিপক্ষে পড়েছি বলে আমরা লাকি। আবার আনলাকিও মনে করছে অনেকে। আমি বলব, সমান সমান। এই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার পরই ভারত সবচেয়ে ভালো খেলছে। ভারতের এই ব্যাটিংয়ের বিপক্ষে বোলিং করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জটা নিয়ে যদি আমরা জিততে পারি, ম্যাচটা খুব এক্সাইটিং হবে।
আপনি বলেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে পছন্দের প্রতিপক্ষ বলে কিছু নেই। তার পরও যদি সুযোগ থাকত, তাহলে কোন দলকে বেছে নিতেন?
মাশরাফি: সত্যি বলছি, কোনো পছন্দই নেই। আমি খুব করে চেয়েছিলাম যেন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে জিতি। জিতলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে পেতাম। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই ভাবত আমরা অনেক বড় টিম। নকআউট ম্যাচে চাপ আছেই। সব দলই চিন্তা করবে, হেরে গেলেই বিদায়। আমরা যদি নিজেদের আট নম্বর দল ধরি, একমাত্র আমাদেরই এ নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। কারণ, আমাদের হারানোর কিছুই নেই। বাংলাদেশের মানুষ তো আশা করেছেই, কিন্তু এই বিশ্বকাপ নিয়ে এত যে কথা শুনেছেন, কাউকে কি বলতে শুনেছেন বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারবে? কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাওয়ার পর বলা হচ্ছে, ওরা কি এই চাপ নিতে পারবে? আমাদের ওপর কিসের চাপ, চাপ তো থাকবে অন্য দলের ওপর।
আপনার কি কখনো মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ বাস্তবতাটা না বুঝে একটু বেশি আশা করে ফেলে?
মাশরাফি: এমন মনে হতে পারে। তবে এতে আমাদের পারফর্ম করতে সুবিধা হয়। আমরা তো বাংলাদেশের মানুষকে তেমন কিছুই দিতে পারিনি। যদি চিন্তা করে দেখেন, আমরা গত ১৫ বছর একঘেয়ে ক্রিকেট খেলে গেছি। কখনো হয়তো জিতেছি। আমি সব সময়ই বলি, বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিটি জয়ই খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই আমরা খুব বাজে খেলে হেরেছি। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দিনের পর দিন সমর্থন করে গেছে। খারাপ খেললে গালি দেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের পর দিন আমাদের যেভাবে সমর্থন দিয়েছে, এটা অসাধারণ। না হলে এই খেলাটায় যে এত মধু আছে, এত আনন্দ আছে, এর কিছুই আমরা পেতাম না।
ভারতীয় দলে তো অনেক তারকা। তার পরও যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে একজনের কথা বলতে বলি...
মাশরাফি: বিরাট কোহলি।
কেন?
মাশরাফি: একটু আগে আপনিই বলছিলেন না, ভারতের যে-ই দাঁড়িয়ে যাবে, সে-ই ম্যাচ বের করে নিয়ে যেতে পারবে। ধাওয়ান আছে, রোহিত শর্মা ওয়ানডেতে ২৫০-এর বেশি রান করেছে। রায়না গত ম্যাচে এক শ মারল। ধোনি তো অহরহ করে আসছে। এমনকি রাহানেও দুর্দান্ত ক্রিকেটার। তার পরও কোহলির কথা আলাদা করে বলব, কারণ ও এমন একজন ব্যাটসম্যান, যে ম্যাচ শেষ করে দিয়ে বেরোবে। ধোনিও তা করে, তবে ও যেখানে খেলে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু কোহলি তিন-চারে নেমেও শেষ পর্যন্ত খেলে আসে। এটাও একটা-দুইটা বা পাঁচটা-ছয়টা ম্যাচ না, অসংখ্য ম্যাচে এমন করেছে। ওর উইকেটটা তাই তাড়াতাড়ি নিতে হবে।
শেষ প্রশ্ন, ‘ধরে দিবানি’ ঘোষণা দেবেন এবার?
মাশরাফি: না, ‘ধরে দিবানি’ বলব না। তবে একটা প্রমিজ করতে পারি, আমরা আমাদের রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করব। এত দূর যখন এসেছি, সহজে ছাড়ব না। তবে হ্যাঁ, খেলায় কিছু বলা যায় না। আমরা খুব বাজেভাবেও হারতে পারি। আবার খুব ভালোভাবে জিততেও পারি। তবে একটা নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমরা সবাই নিজেদের উজাড় করে দেব।

নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া বন্দরের কাছে রণগোপালদী নদীতীরের
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান গতকাল শুরু হয়। দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া বন্দরের কাছে রণগোপালদী নদীর তীরের জমি অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা ১১০টি স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ গতকাল মঙ্গলবার শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন এই উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে।
সকাল থেকে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুব আলম, পটুয়াখালীর নির্বাহী হাকিম মঈন উদ্দিন খন্দকার ও গোকুল চন্দ্র কবিরাজের নেতৃত্বে উচ্ছেদ শুরু হয়। এ সময় গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিশির কুমার পাল উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনির অনুসারীরা ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে উলানিয়া বন্দরের পূর্ব পাশে রণগোপালদী নদীর পশ্চিম তীরের সাড়ে চার একরের বেশি জমি দখল করে বালু ভরাট করেন। পরে ভরাট জমিতে আধা শতাংশ করে প্লট বানিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছে বিক্রি করা হয়। উলানিয়া বন্দরের ব্যবসায়ী মো. মজিবুর রহমান বলেন, ওই সময় প্রতিটি আধা শতাংশের প্লট দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এভাবে ১২৩টি প্লট বিক্রি করা হয়।
উলানিয়া বন্দরের মন্টু সাহা বলেন, তিনি ওই সময় রনির অনুসারীদের কাছ থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকায় আধা শতাংশের একটি প্লট কিনে সেখানে ঘর তুলে ধান-চালের ব্যবসা করছেন। যাঁরা প্লট বিক্রি করেছেন, তাঁরা তাঁকে ওই জমির একসনা বন্দোবস্ত (ডিসিআর) পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা করা হয়নি। চলতি উচ্ছেদ-প্রক্রিয়ায় তাঁর ঘরটি ভেঙে দেওয়া হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
ইউএনও মাহবুব আলম প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক মাস ধরে রণগোপালদী নদীর তীরের এই জমিসহ উলানিয়া বন্দরের বিভিন্ন দাগের সরকারি খাসজমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছিল।
প্রথম পর্যায়ে ১০৯টি উচ্ছেদ মামলা করা হয়। স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার আগে মাইকিং করে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। দখলকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বেশ কিছু আপত্তি ছিল, সেগুলোর শুনানি নিয়ে তা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এরপর এক মাস আগে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ করা হয়েছে। ১০৯টি উচ্ছেদ মামলার বিপরীতে ১১০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ গতকাল শুরু হয়েছে।

২৩ বছর পর ছেলেকে ফিরে পেলেন মা

২৩ বছর পর হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ফিরে পেলেন এক মা। ফিরে পাওয়া ওই ছেলের নাম গোলাম হোসেন (৪৬)। গোলাম হোসেন বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের কলিগ্রামের মৃত ফকির মণ্ডলের ছেলে। গত শনিবার মায়ের কাছে ফিরে আসেন গোলাম হোসেন।
জন্মের পর থেকে সুস্থ স্বাভাবিকই ছিলেন। বাবা ফকির মণ্ডল জীবিত থাকা অবস্থায় খেজুরের রস জ্বাল দেয়ার জন্য সকালে মাঠে পাঠিয়েছিলেন খড়ি (লাকড়ি) সংগ্রহের জন্য। মাঠে গিয়ে ভয় পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন গোলাম। ১৬ বছর বয়সে এ ঘটনা ঘটার পর এভাবেই বাড়িতে কেটেছে সাত বছর। ডাক্তার, কবিরাজকে দেখিয়েও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এরপর ২৩ বছর বয়সে একদিন হঠাৎ করেই হারিয়ে যান তিনি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত শনিবার মায়ের কোলে ফিরে আসেন সেই গোলাম হোসেন। এত বছর পরে ফিরে পাওয়ার আনন্দে ছেলেকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রাজিয়াসহ ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়রা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে গোলাম সবার বড়।
এ ব্যাপারে সাতীরা জেলার কালিগঞ্জ থানার তারালি ইউনিয়নের তেথুলি পূর্বপাড়া গ্রামের আব্দুল বারি গাজি জানান, ২৩ বছর আগে সাতীরা চিংড়িঘের এলাকায় ঘোরাফেরা করাকালে পাগল বলে এলাকার কিছু যুবক গোলামকে মারধর করছিল। তখন এ বিষয়টি নজরে আসে বারি গাজির। রাস্তা থেকে ছেলেটিকে তুলে নিয়ে যান তার নিজ বাড়িতে। নিজের নাম ও গ্রামের নাম চারঘাটের পাইকড়ি ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেনি কুড়িয়ে পাওয়া মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটি। তার সন্ধানের জন্য এসব ঠিকানায় চিঠি দিয়েও ফেরত গেছে অনেক। এর পর থেকে সন্তানের মতো তাকে লালন-পালন করতে থাকেন আব্দুল বারি গাজির পরিবার।
মা রাজিয়া জানান, বিভিন্ন স্থানে তার খোঁজ না পেয়ে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই বাঘা ও চারঘাটের স্থানীয় দু’জন সাংবাদিক তার বাড়িতে এসে ছেলে হারানোর বিষয়ে জানতে চান। পরে তাদের মাধ্যমে খবর পেয়ে আব্দুল বারি গাজির বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন ছেলেকে।

বৃটেনে শীর্ষ দশ অপরাধীর তালিকায় বাংলাদেশী জাহাঙ্গীর

বৃটেনের মোস্ট ওয়ান্টেড ১০ অপরাধীর বা শীর্ষ দাগি অপরাধীর অন্যতম বাংলাদেশের মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (৩২)। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ধর্ষণের অভিযোগ। এ তালিকায় যারা রয়েছে তার মধ্যে আছে খুনি থেকে ধর্ষক। তবে এসব অপরাধী এখন পলাতক রয়েছে। ধারণা করা হয় তারা স্পেনে লুকিয়ে আছে। তাদেরকে ধরার জন্য তৎপর রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। গতকাল এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে অন্য যেসব অপরাধীর নাম রয়েছে তারা হলো- সাবেক সেনা সদস্য শেন ওয়ালফোর্ড, কার্লো ডসন, পল বুচানন, অ্যান্থনি মাইকেল ডেনিস, স্কট হিউজ, ডেভিড ম্যাকডারমট, জেসন ম্যাকডোনাল্ড, পল মঙ্ক ও মাইকেল জেমস রোডেন। অপরাধীদের ধরতে স্পেনজুড়ে চলছে অভিযান। এ অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে অপারেশন ক্যাপচুরা। গতকাল প্রকাশিত ওই তালিকায় বাংলাদেশের পলাতক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (৩২) সম্পর্কে বলা হয়েছে- ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১০ সালের মার্চে তার অনুপস্থিতিতে এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১৪ বছরের জেল দেয়া হয়। ২০০৭ সালের অক্টোবরে অস্থায়ী ভিসায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে যায় জাহাঙ্গীর। এর পরের বছর সে চলে যায় চেলটেনহ্যাম। ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি বলেছে, সেখানে সে একজনকে ধর্ষণ করে। শারীরিক নির্যাতন করে। এ ছাড়া পলাতক ওই তালিকায় শেন ওয়ালফোর্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে, সে সেনাবাহিনী থেকে ছুটি নেয়ার পর ২০১০ সালে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। এ অভিযোগে তাকে জেল দেয়া হয়েছে। শেন ওয়ালফোর্ড সাবেক একজন বক্সারও। কভেনট্রি এলাকায় একটি বার-এর বাইরে সে এক কোপে হত্যা করেছে দু’সন্তানের পিতা পল গিবনসকে। এ অভিযোগে ২০১৩ সালের আগস্টে তাকে সাড়ে চার বছরের জেল দেয়া হয়। কার্লো ডসন হলো দক্ষিণ লন্ডনের ক্রয়ডনের বাসিন্দা। একটি ১২ বছরের মেয়ের সঙ্গে অশোভন আচরণ করা ও তার আপত্তিকর ছবি তোলার অভিযোগ  রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাদক পাচারকারী ও পলাকত জেসন ম্যাগডোনাল্ড। ধারণা করা হচ্ছে, সে পালিয়ে আছে স্পেনে। তাকে ধরতে গত সপ্তাহে অভিযান শুরু হয়েছে। মালাগার কাছে কয়েন ভিলায় বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ ও অন্য কর্মকর্তারা তার সন্ধানে ঘেরাও দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া যায় নি। আরেক অপরাধী হলো মারসিসাইডের মাদক সম্রাট স্টিফেন ব্লুুন্ডেল (৩৬)।

আন্দোলনে বিএনপিকে বিরতি টানতেই হবে by এ কে এম জাকারিয়া

‘এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির বা কোনো দলের বিরুদ্ধে দলের নয়। এই আন্দোলন আদর্শিক ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।’ টানা অবরোধের দুই মাসেরও বেশি সময় পর গত শুক্রবার এক ‘সংবাদ সম্মেলনে’ বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ‘আদর্শিক’ বা ‘মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার’ আন্দোলন—যা-ই হোক না কেন, সব আন্দোলনেরই একটি কৌশল থাকে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘নির্বাচনের’ এক বছরের মাথায় বিএনপি যে আন্দোলন শুরু করেছে, তাতে দলটি যে শুরু থেকেই সন্ত্রাস ও নাশকতার কৌশল নিয়েছিল, তা আগে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম (রাজনৈতিক সহিংসতা নাকি সন্ত্রাস, প্রথম আলো, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৫)। এই কৌশলে আদৌ সাফল্য মিলবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছিলাম।
এখন দেখা যাচ্ছে, নাশকতার এই কৌশলে দলটির পেট্রলবোমার ব্যবহার বা মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো বর্বরতা আন্দোলনে সাফল্যের কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। এখন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘যৌক্তিক পরিণতি’ না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দীর্ঘ সময় ধরে টানা অবরোধ ও হরতালের কর্মসূচির পর কোনো প্রাপ্তি বা ‘পরিণতি’ ছাড়া কর্মসূচি প্রত্যাহার করা এখন দলটির জন্য কঠিনও বটে! কিন্তু এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনে সেই পুরোনো সন্ত্রাস ও নাশকতার কৌশলই চলবে, নাকি ভিন্ন কোনো পথ?
গত শুক্রবার খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো হলো, তাতে মনে হলো, বিএনপিকে তারা যেন পেয়ে বসেছে। দীর্ঘ এই আন্দোলনের নিষ্ফল দশায় সরকারি দল যেন আরও চাঙা ও আক্রমণাত্মক হয়েই কথাবার্তা বলছে। এরই মধ্যে বিরোধী দলের বড় নেতাদের প্রায় সবাইকে জেলে পুরা সারা হয়েছে। খালেদা জিয়ার ওপরও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে। বাকিরা পালিয়ে আছেন। গোপন স্থান থেকে ৭২ ঘণ্টা করে সপ্তাহে দুবার হরতাল ডাকার কাজ করে যাচ্ছিলেন যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনিও এখন নিখোঁজ। বিএনপির যে দু-একজন নেতা এখনো কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে এটা এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হবে।
নাশকতা বা পেট্রলবোমা বিএনপির কাজ নয় বলে দলটি এবং এর চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দাবি করে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এসব খুব কাজে দিচ্ছে বলে মনে হয় না। দলটির ভাবমূর্তির যা ক্ষতি হওয়ার এরই মধ্যে হয়ে গেছে। গত ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ, সপ্তাহে পাঁচ দিন হরতাল কর্মসূচি যখন আন্দোলনে কোনো সুফল দিতে পারল না, তখন খালেদা জিয়া কোন ভরসায় বা কিসের আশায় জাতির ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ আন্দোলন অব্যাহত রাখা ও ‘সাময়িক কষ্ট’ স্বীকার করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানালেন, তা সত্যিই এক বড় প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের জবাব বা ব্যাখ্যা দেওয়ার কেউ বিএনপিতে নেই। খালেদা জিয়া ‘সংবাদ সম্মেলন’ ডাকেন, কিন্তু সেখানে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না।
টানা অবরোধ ও সপ্তাহে পাঁচ দিন হরতালের কর্মসূচি যে কোনো বাস্তবসম্মত নয়, এবং জনগণের পক্ষে যে সেটা মানা সম্ভব নয়, তা আরও আগেই বিএনপির বোঝা উচিত ছিল। বিএনপির সমর্থক বা দলটির প্রতি সহানুভূতি আছে, এমন কারও পক্ষেও তো এই কর্মসূচি মেনে চলা সম্ভব নয়। হরতাল-অবরোধ এসব কারণে অনেকটাই অকার্যকর আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্তমান স্টাইলে এই আন্দোলন অব্যাহত রেখে বিএনপি যে আদৌ কোনো ফল পাবে না, তা পরিষ্কার। সরকার বা সরকারি দল সম্ভবত এখন একসময় নিস্তেজ হয়ে এই আন্দোলনের মৃত্যু ঘটার অপেক্ষা করছে।
আগেই বলেছি, এবারের আন্দোলনের শুরু থেকেই কৌশল হিসেবে সন্ত্রাস ও নাশকতার পথ ধরেছে বিএনপি। ফলে খুব স্বাভাবিক কারণেই এই আন্দোলন গণ-আন্দোলনের দিকে যায়নি। বিএনপি সম্ভবত সে চেষ্টা বা পথও ধরেনি। নাশকতা বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশ অচল ও বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে এনে তাদের মধ্যস্থতায় কিছু করার পথই মনে হয় তাদের বিবেচনায় ছিল। এখন খালেদা জিয়া যতই জনগণকে এই আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান, সন্ত্রাস ও নাশকতা দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন অব্যাহত রেখে তাঁকে আর কখনো গণ-আন্দোলনে রূপ দেওয়া যাবে বলে মনে হয় না। একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে যদি দলটি গণ-আন্দোলন করতে চায়, তবে নতুন করেই শুরু করতে হবে। বর্তমান আন্দোলনে বিএনপিকে বিরতি টানতেই হবে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরেই একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করছে বলে মনে হয় না। আর এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে সরকারের দমন-নিপীড়নের কারণে চাইলেও দলটির পক্ষে রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করা সম্ভব নয়। এই যে খালেদা জিয়া ‘অবরোধ চলবে’ বলে গত ৫ জানুয়ারি ঘোষণা দিয়ে বসলেন, সেটা তিনি কি আদৌ দলের কারও সঙ্গে পরামর্শ করে দিয়েছেন? বা এখন যে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা বলছেন, সেটাই বা তিনি কার পরামর্শে করছেন? আন্দোলনের ভুল ও সর্বনাশা কৌশল সরকারের বিএনপি নির্মূলের লক্ষ্য পূরণকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। নতুন করে আন্দোলন শুরুর আগে তাই বিএনপিকে এখন রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করার কঠোর সংগ্রামও করতে হবে।
সব বিবেচনাতেই আওয়ামী লীগ বা সরকার এখন সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু আপতভাবে নিষ্ফল বাংলাদেশের ইতিহাসের নজিরবিহীন এই আন্দোলনের কর্মসূচি, আন্দোলনের কৌশল হিসেবে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ মারার মতো বর্বরতার পথ ধরা ও এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দমন-নিপীড়ন চালিয়ে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দৃশ্যত নির্মূল করার কৌশল—এসব বাংলাদেশকে কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে?
বিএনপির আন্দোলন দৃশ্যত ব্যর্থ হওয়া, দলটির বর্তমান ছিন্নভিন্ন দশা বা দলটিকে কোণঠাসা করতে পারাকে হয়তো আওয়ামী লীগ বিজয় হিসেবে দেখছে। কিন্তু এটা সম্ভবত বিবেচনায় নিচ্ছে না যে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের অসংগঠিত অবস্থা ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা সবাই তাঁদের দল ও রাজনীতিকে ত্যাগ করেছেন—এমনটি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগ মনে করে না। সংগঠিত একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর চেয়ে একটি অসংগঠিত দলের ক্ষুব্ধ নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে কোনো জবাবদিহি বা দায়দায়িত্ব কাজ করে না। ফলে বিএনপি অবরোধ-হরতালের মতো কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিলেও যে নাশকতা বা সহিংসতা ঘটবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
সরকার শুরু থেকেই কঠোর হাতে এসব সংঘাত ও সহিংসতা দমনের কথা বলে আসছে। এখনো তা-ই বলে যাচ্ছে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় নানা সংস্থাকে যথেচ্ছা ও রাজনৈতিকভাবেই ব্যবহার করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন বাহিনী তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছে। নাশকতা দমন করতে গিয়ে আইনের অপপ্রয়োগ এবার যে মাত্রায় ঘটানো হলো ও যে দৃষ্টান্ত তৈরি হলো, সেখান থেকে ফিরে আসা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো যদি তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারায়, তবে ভবিষ্যতে যে বা যারাই ক্ষমতায় আসুক, তারাও যে সেই একই পথ ধরবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অবরোধের ৭০ দিন গেছে গতকাল সোমবার। এ পর্যন্ত সহিংসতায় মারা গেছে ১২১ জন। অধিকাংশই মারা গেছে পেট্রলবোমা, ককটেল, অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতার ঘটনায়। অনেকে এখনো কাতরাচ্ছেন হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিটে। এসব বর্বরতার জবাবে ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেছে ৩১ জন। এগুলো সবই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। সংঘাতের রাজনীতি একটা চক্রের মতো। কোনো দেশে দীর্ঘ সময় ধরে তা চললে সে অবস্থা থেকে ফেরা কঠিন। এই পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে ওঠে যখন আন্তর্জাতিক নানা শক্তি তাদের নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থে সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংঘাতের ক্ষেত্রটি তখন আর দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর হারা-জেতার মধ্যে আটকে থাকে না।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো সে জায়গায় যায়নি। কিন্তু বিএনপির দৃশ্যত ব্যর্থ আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের আপাতবিজয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

যে প্রশ্নের উত্তর সহজ নয় by সলিল ত্রিপাঠি

চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি আমি লাহোরে ছিলাম। চিত্তাকর্ষক আল হামরা আর্ট সেন্টারে ঢুকে দেখি, মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকেরা গত নভেম্বরে প্রকাশিত আমার বই দ্য কর্নেল হু উড নট রিপেন্ট: দ্য বাংলাদেশ ওয়ার অ্যান্ড ইটস আনকোয়ায়েট লিগেসির ব্যাপারে কৌতূহলী। প্রগতিশীল গোষ্ঠী লাল-এর প্রাগ্রসর সংগীতজ্ঞ তৈমুর রহমান লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান। সেদিনের আলোচনা সঞ্চালনার ভার পড়েছিল তাঁর ওপর। কাজটা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। আমার বই ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে, যে যুদ্ধে পাকিস্তান ভেঙেছে। এই আলোচনায় সেই ক্ষত হয়তো আবার দগদগে হয়ে উঠবে।
আমার সঙ্গে ছিলেন ঢাকার কবি সাদাফ সাজ সিদ্দিকী, তিনি বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যে বাংলাদেশি নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েও বেঁচে আছেন, তাঁদের সেখানে বীরাঙ্গনা বলা হয়। আমার সঙ্গে হিনা জিলানি নামের লাহোরের এক সাহসী মানবাধিকারকর্মী ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। সে সময় লাহোরের মল রোডে তিনি পাকিস্তানিদের এই যুদ্ধের বিরোধিতার জন্য বিবৃতিতে সই করানোর চেষ্টা করেন। সেটা করতে গিয়ে তিনি অবমাননার শিকার হন। তিনি অন্য কয়েকজনের কথা বলেন, যাদের গায়ে থুতু দেওয়া হয়েছিল।
আমার বইয়ের প্রশংসায় তৈমুর যারপরনাই উদার ছিলেন। তিনি এটাকে আখ্যা দেন ‘পাঠযোগ্য অপাঠ্যবই’ হিসেবে। তিনি বলেন, পাঠযোগ্যতার বিচারে বইটি উত্তম। কিন্তু পাকিস্তানি হিসেবে এর গল্পে তিনি অস্বস্তিবোধ করেন। আমাদের প্রাথমিক আলোচনা ছিল টানটান উত্তেজনার টেস্ট ম্যাচের মতো, সোজা বল সোজা ব্যাটে খেলার মতো।
এরপর তৈমুরকে কঠিন প্রশ্নে আসতেই হয়: আমি পাকিস্তানিদের জানালাম, তারা অতীতে কী করেছে। আমার এখন কেমন লাগছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা খুব সহজ ছিল না। উপস্থিত দর্শকদের অন্তত অর্ধেকেরই ১৯৭১ সালে জন্ম হয়নি। তাঁরা সাহিত্য ও মননশীল চর্চায় আগ্রহী, তাঁরা লাহোরের সেই সব উদার মানুষ, যাঁরা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে চান। লাহোরের বোমা বিস্ফোরণের দিন কয়েক পরেই অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে হাজির হওয়ার সাহস তাঁরা দেখিয়েছেন। কেন্দ্রের বাইরে সশস্ত্র রক্ষীদের টহল, ছাদের ওপর স্নাইপারদের পাহারা। কেন্দ্রের ভেতরেও উর্দি পরিহিত সশস্ত্র রক্ষীদের পাহারা ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিষয়ে জিলানির দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তারা জানত, তারা সেটার প্রশংসাও করত। কিন্তু যে সত্য আমি লিখেছি, তাতে তাদের মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা করেছে, তার জন্য দর্শকেরা দায়ী নয়। ইয়াহিয়া খান নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। সব পাকিস্তানি নাগরিক এ সরকার অনুমোদন করেনি। তাই আমি কয়েকজন সাহসী ও ইতিবাচক মানুষের উদাহরণ দিয়েছি। বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা বিবেকের তাড়নায় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা করতে অস্বীকার করেন। একজন কর্নেল চাকরি ছেড়ে দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করেন। এমনকি দুই জাতিকে (ভারত ও পাকিস্তান) এক করারও কথা বলেন।
আরেকজন কর্মকর্তার কথা আমি লিখেছি, যিনি তাঁর জানা ধর্ষণের ঘটনার কথা লিখেছেন। আর আরেকজন নিদারুণ যন্ত্রণাক্লিষ্ট কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কথা আমি লিখেছি, যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে যিনি হৃদয়ে দোলা দেওয়া গজল লিখেছেন। কাশ্মীরি-মার্কিন কবি আগা শহীদ আলীর ইংরেজি তর্জমার বাংলা অনুবাদে গজলটির দুটি লাইন এ রকম:
বহুবার মোলাকাত ও সহজিয়া ঘনিষ্ঠতার পর আমরা এখন আগন্তুক—
আরও কতবার দেখা হলে আমরা আবার পরিচিত হব?
দর্শকদের উদ্দেশে আমি বললাম, আপনাদের নামে ভয়ানক অপরাধ করা হয়েছে, যার কোনো জবাবদিহিও নেই।
হিনা জিলানি তাঁর স্বদেশবাসীকে সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তিনি আমার ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, খুব কম পাকিস্তানিই এ নিয়ে কথা বলেছে। তিনি তাঁর বাবার কথা স্মরণ করেন। তাঁর বাবা সামরিক আক্রমণের বিরোধিতা করে জেনারেল ইয়াহিয়াকে চিঠি লেখায় তাঁকে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত অন্তরীণ করে রাখা হয়। শান্তিকামীদের উদ্দেশে মল সড়কে যে অবমাননাকর কটূক্তি করা হয়েছে, সে কথাও তিনি স্মরণ করেন। তিনি বলেন, আমরা নীরব ছিলাম। হিনা দর্শকদের অভিবাদনে সিক্ত হলেন।
সে সময় বাংলাদেশে স্থাপিত পাকিস্তানি সেনাদের ডজন ডজন শিবিরে নারীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। তাদের অনেককে প্রায় প্রতি রাতেই ধর্ষণ করা হতো, মাসের পর মাস ধরে এটা হয়েছে। সেই অঙ্কটা কষলে ফলাফল নেহাত কম হয় না। সংখ্যাটা কি আড়াই লাখ? পাঁচ লাখ? আমরা কীভাবে তা গণনা করব? যতটুকু নথিপত্র ছিল, তা-ও তো ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক শিশুকেই দত্তক দেওয়া হয়েছে। অনেক ভ্রূণ হত্যা করা হয়েছে।
সে সময় দর্শকসারিতে একজন উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এগুলো বাজে কথা।’ হল থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে তিনি বলেন, ‘এটা ভারতীয় প্রচারণা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী জিন্দাবাদ।’ আমি তাঁকে বললাম, সাদাফকে শেষ করতে দিন। কিন্তু তিনি আমার কথায় কান দিলেন না। আবার অনেক পাকিস্তানি ওই শ্রোতাকে দুয়োধ্বনি দিয়ে বললেন, তাঁর লজ্জিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
হলের পরিবেশ বদলে গেল। একজন উঠে দাঁড়িয়ে আবেগকম্পিত কণ্ঠে সাদাফ ও তাঁর বাঙালি বোনদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। আরও অনেকে দাঁড়ালেন। তাঁরা বললেন, ১৯৭১ সালে আসলে কী ঘটেছে, সেটা তাঁদের জানানো হয়নি কেন। পাকিস্তানে যে আলোচনা করা দুরূহ ব্যাপার ছিল, তা শেষমেশ গত ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু হলো।
গোলযোগ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিটিকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু তার হস্তক্ষেপের কারণে অন্যরাও আমাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ব্রিটিশ বাংলাদেশি কবি আহসান আকবর আমাকে বলেন, ‘আমরা প্রায়ই রোমান্টিক কল্পনায় আপ্লুত হই, আজকের পাকিস্তানি তরুণেরা সঠিক চিন্তা করে। তারা ১৯৭১ সালের নৃশংসতার দায় স্বীকার করতে ও ক্ষমা চাইতে চায়। এটা রোমান্টিক, কারণ আমি সেখান ছিলাম, আর দর্শকেরা ছিল উত্তেজিত। আমি অনেক তরুণকে দেখেছি, যারা আপনার ও সাদাফের কথাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়। শুধু বয়োজ্যেষ্ঠরাই একটি ক্ষেত্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে চান না। ক্ষতিটা অনেক গভীর, আর আমরা প্রায়ই আশাবাদী হতে চাই: “অন্তত পরের প্রজন্ম তা স্বীকার করছে”। যদিও আমিই প্রথম বলছি যে এটা তাদের দোষ নয়, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক সে রকম নয়। পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমার এ রকমটা মনে হয়েছে।’
একজন বললেন, ‘আপনি সেটা বলছেন না, আপনার কথা নিরপেক্ষ নয়।’
ধর্ষণের কথা বলার সময় মানুষ নিরপেক্ষ থাকে কী করে? কিন্তু সেটা বলার আগে আমি বারবার অতীত রোমন্থন ও অপর পক্ষকে দোষারোপের সংস্কৃতির দুরবস্থা নিয়ে কথা বলেছি: দুটি ভুল কোনো কিছুকে সঠিক বানায় না। হিনা জিলানি এর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি ব্যাখ্যা করেছেন: অরাষ্ট্রীয় সংস্থার চেয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থার দায়িত্ব অনেক বেশি। মুক্তিবাহিনী তেমন একটি অরাষ্ট্রীয় বাহিনী ছিল, তারা ছিল এক বিদ্রোহী বাহিনী। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের কাজে জবাবদিহি করতে বাধ্য, তারা গেরিলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ইচ্ছামাফিক প্রতিশোধ নিতে পারে না। জেনেভা কনভেনশন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মারফত সেনাবাহিনীর ওপর যে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে, আমি তা উল্লেখ করেছি।
সন্দেহবাদীদের বললাম, বইটা পড়ে দেখুন। ‘আপনারা যদি আমাকে বিশ্বাস না করেন বা বইটি কিনতে না-ও চান, পাঠাগার থেকে ধার করে বইটি পড়ুন। কিন্তু আগে বইটি অন্তত পড়ুন,’ আমি বললাম।
সামনে এগানো কি সম্ভব? এর কি সমাপ্তি আছে? তৈমুর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ ও গবেষক মেঘনা গুহঠাকুরতা আমাকে যা বলেছিলেন, তা স্মরণ করলাম। সেই গল্পটি আমার বইয়েও আছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের প্রথম প্রহরে যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়, তাঁদের মধ্যে তাঁর বাবা অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা অন্যতম। মেঘনা বলেন, ভুক্তভোগীদের এ কথা বলা সহজ যে তারা ক্ষমা করতে চায় কি না। কিন্তু সেই ক্ষমা করার আগে অপরাধীকে অনুশোচনা করতে হবে। কিন্তু কোথায় সেই অনুশোচনা? সেটার ধরনটাই বা কেমন? বার্লিনে হলোকাস্ট জাদুঘর আছে। ইসলামাবাদে সে রকম কিছু আছে কি?
এরপর করতালি ও হর্ষধ্বনি হলো। আমার বক্তব্যের পর এত উচ্চ স্বরের করতালি আমি শুনিনি। দীর্ঘ সেই হর্ষধ্বনি ছিল বজ্রতুল্য। আমার কানে এখনো সেটা বাজছে। এই হৃদয়ানুভূতি ছিল বেশ শক্তিশালী। অনেক মানুষই এতে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। আমি ছিলাম নিতান্ত একজন বার্তাবাহক, ধ্বনি এসেছে ১৯৭১-এর যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ থকে।
সেদিন অনেকেই বইটি কিনে আমার অটোগ্রাফ নিয়েছেন। অনেকে এসে আমার সঙ্গে ছবি তুলেছেন। অনেকেই আমার সঙ্গে ই-মেইল ঠিকানা বিনিময় করেছেন, অনেকে পরবর্তীকালে আমাকে চিঠিপত্র লিখেছেন, আমিও তাঁদের লিখেছি। তাঁদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। তাঁরা ক্ষমতাকাঠামোর নির্মিত ইতিহাস পড়ে বেড়ে উঠেছেন। যে অতীত তাঁদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তার অংশবিশেষ তাঁরা আবিষ্কার করেছেন। সে গল্প তাঁদের কাছে অস্বস্তিকর, বোধগম্যভাবেই।
ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক এক পাকিস্তানি তরুণীর কথা আমাকে বলেছিলেন। সে মেয়েটি জাদুঘর পরিদর্শন করে একটি ভিডিও বানিয়েছিল, তাতে সে তার মা-বাবার প্রজন্মকে উদ্দেশ করে বলেছিল: তোমরা এটা লুকিয়ে রেখেছিলে/ আমার সমাজও তা-ই করেছে/ আমিও তা লুকিয়ে রেখেছিলাম।
ক্যামিলা শামসির ২০০২ সালের উপন্যাস কারটোগ্রাফি-তে মাহিন রাহিনকে বলে, ‘যে সত্য আমরা লুকিয়ে রেখেছি, তা হারিয়ে যায়নি। রাহিন, সেই সত্য নানা রূপে ধরা দিচ্ছে।’
পাকিস্তানে এমন কথাবার্তা প্রয়োজন।
www.livemint.com থেকে নেওয়া (সংক্ষেপিত)
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
সলিল ত্রিপাঠি: ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক।