Saturday, June 19, 2010

সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মায়ের ভূমিকা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামের দৃষ্টিতে পারিবারিক জীবনে সন্তান লালন-পালনে বাবা-মায়ের দায়িত্ব অপরিসীম। মাতা-পিতার কারণেই শিশু ইহজগতের মুখ দেখতে পেরেছে। সন্তান জন্মের পরই মা সর্বপ্রথম তাঁর প্রাণপ্রিয় শিশুটিকে মাতৃদুগ্ধপানে আগলে রাখেন। মমতাময়ী মায়ের কারণেই সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য হয় ও তাঁর উষ্ণক্রোড়ে থেকে বাল্য অবস্থায় অসহায় শিশুটি নিরাপদে বেড়ে ওঠে। সন্তান গর্ভধারণ, প্রসব বেদনার কষ্ট এবং দুধপান করানো প্রভৃতি মা একাই বহন করে থাকেন। অতঃপর বাবা লালন-পালনের বেলায় মায়ের সঙ্গে অংশীদার হয়ে থাকেন। এর বাহ্যিক বিনিময়স্বরূপ আল্লাহ তাআলা সন্তানের প্রতি তার মাতা-পিতার সঙ্গে সদয় ও সদ্ব্যবহারকে ফরজে আইন করে ঘোষণা দিয়েছেন। মায়ের সন্তান গর্ভধারণ, প্রসব ও বুকের দুধদানের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে পবিত্র কোরআনে সন্তানকে পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য আদেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমি মানুষকে পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সঙ্গে এবং প্রসব করে কষ্টের সঙ্গে। তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার দুধ ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস।’ (সূরা আল-আহকাফ, আয়াত-১৫)
ছেলেমেয়েরা মানুষ হওয়াই বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিদান। তাই পিতা-মাতার দায়িত্ব হচ্ছে তাদের লালন-পালন করা, তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি অবশ্যই ধর্মীয় শিক্ষাদান ও ইসলামের আলোকে নৈতিক চরিত্র গঠন অপরিহার্য। পারিবারিক পরিবেশে শিশুরা বড় হতে থাকবে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধও তাদের হূদয়ে জাগ্রত হবে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হয় তখন তাদের নামাজের প্রশিক্ষণ দাও।’ হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘সুন্দর নৈতিক চরিত্র ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার চেয়ে উত্তম কিছুই পিতা-মাতা সন্তানদের দান করতে পারে না।’ (তিরমিজি)
মুসলিম সমাজে পরিবার এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পরিকল্পিত পদ্ধতিতে সন্তান জন্মদান ও প্রতিপালন করে এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার হলো একটি শিশুর জীবন গড়ার প্রাথমিক পাঠশালা ও প্রধান পাঠাগার। এ পাঠশালার ওপর শিশুর জীবনের ভিত রচিত হয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাসের মধ্য দিয়েই শিশুরা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার গুণাগুণের পরিচয় লাভ করতে শুরু করে। এ জন্য পরিবারের প্রধান দুজন সদস্য বাবা-মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। সন্তান পিতা-মাতার অতিশয় প্রিয়জন। তারা বাবা-মায়ের প্রতি অনুগত ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শিশুরা খুবই অনুকরণপ্রিয়; তারা যা শোনে, যা দেখে, তা-ই বলে ও করে। তাদের সামনে অশোভনীয় কিছু বলা বা করা মোটেই সমীচীন নয়। তাদের স্নেহ, আদর ও সুন্দর আচরণ শেখানো জরুরি। এতে তারা আদব-কায়দা ও ভালো কথা বলতে শিখবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘যে ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
(বুখারি, তিরমিজি)
বাবা-মা শিশুকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্ব্বীকার করে জীবন সংগ্রাম-যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েও বড় করেন, মানুষ করে গড়ে তোলেন, কিন্তু তাঁরা সন্তানের কাছ থেকে কোনো রকম প্রতিদান আশা করেন না। তবে সন্তানকে আদর্শবান করার জন্য একজন বাবা হিসেবে যে যেই ধর্মে বিশ্বাস করেন, সেই ধর্মীয় বিধান ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের সুশিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের স্নেহ করবে এবং তাদের শিষ্টাচার শিক্ষাদান করবে। সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেওয়া দান-খয়রাতের চেয়েও উত্তম।’ শিশুদের উত্তম ও উপযোগী শিক্ষাদানের জন্য নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞানদান কর। কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’ (মুসলিম)
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানব সন্তানকে সুস্থ, সবল ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা সব বাবা-মায়ের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অকালে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে শিশুদের সঠিক যত্ন, পরিচর্যা ও সুচিকিৎসা করা দরকার। মায়ের গর্ভ থেকে জন্মের পর প্রথম পাঁচ বছর বয়স শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়টিতে শিশুরা নানা রকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। অপুষ্টিজনিত কারণে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। শিশুরা যেসব রোগে আক্রান্ত হয়, সেগুলো প্রতিরোধ করতে হলে টিকা দানের কোনো বিকল্প নেই। একটু সচেতন হয়ে সময়মতো টিকা দিয়ে কোমলমতি শিশুদের জীবনকে বেশ কয়েকটি প্রাণসংহারী সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করা যায়। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে বাবা-মা ও সব অভিভাবকের উচিত, তাঁদের শিশুদের জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব টিকা দিয়ে নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা।
সন্তান প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তেমনি সন্তানের কাছে তার পিতা-মাতা আশীর্বাদস্বরূপ। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সন্তান যতই বয়োবৃদ্ধ হোক না কেন বাবা-মায়ের কাছে তারা সর্বদা শিশুর মতো। আজন্ম সন্তান পিতা-মাতার কাছে স্নেহ, আদর আর দয়া-মায়াতেই লালিত-পালিত হয়। পিতা-মাতা কখনো সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন না, বরং শত দুঃখ-কষ্ট পেলেও সন্তানের জন্য শুভকামনা করেন এবং দোয়া করে থাকেন। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা যতই আত্মিক হোক না কেন, জনক-জননী হিসেবে সন্তানের অধিকার ও তাদের প্রতি মাতা-পিতার কর্তব্য পালনে যথেষ্ট দায়দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাবা-মা ও অভিভাবকেরা আন্তরিক ভালোবাসা ও স্নেহের পরশে সন্তানদের সুন্দর জীবন গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তান লালন-পালনে বাবা-মায়ের অধিকার সচেতন এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যথাযথ সচেষ্ট হওয়ার তাওফিক দিন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)। dr.munimkhan@yahoo.com

কী করে পারলাম শিশুদের শৈশব কেড়ে নিতে by মেহতাব খানম

আমার তখন পাঁচ কি ছয় বছর বয়স। রেডিওতে ‘মায়া বন বিহারিণী হরিণী’ এই গানটি কয়েকবার শোনার পর প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়ায় আমি একদিন বেশ উঁচু স্বরে গাইছিলাম—‘দূর হতে আমি তারে সাধিব, গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব’। গানের কথার অর্থ আমার কাছে মোটেও পরিষ্কার ছিল না বলে এর কোনো আবেদনও অনুভব করছিলাম না, হয়তো বা গানের সুরটিতে ভালো লাগা ছিল। এ সময় হঠাৎ আমার মায়ের তীক্ষ চিৎকার শুনতে পেলাম। তিনি বেশ রাগ করে আমাকে বললেন, এই গানটি আমার কচিমুখে একটুও মানাচ্ছে না। আমি যেন এরপর থেকে ছোটদের গানগুলো গাই। সেদিন অবশ্য আমার অপরাধটা ভালো করে বুঝতে পারিনি। খুব অভিমান হয়েছিল গানটি এভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে। অপমান বোধও হয়েছিল বাড়ির অন্যদের সামনে বকুনি খেয়ে। তবে আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় দেখে মা আমাকে কাছে ডেকে আদর করে বুঝিয়ে বলেছিলেন—সব বয়সের মানুষের জন্য সব গান নয়। পরে আরও ভালোভাবে বুঝেছিলাম, আমার মা আমার মধ্যে শৈশবের স্বভাবসুলভ আচরণই দেখতে চেয়েছিলেন।
প্রতিটি মানুষের আচরণে তার চিন্তাধারা এবং আবেগের প্রতিফলন ঘটে এবং সেটি যখন তার বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তখন তার একটি স্বাভাবিক সৌন্দর্য এবং পবিত্রতা থাকে, যা অন্যদের কাছেও উপভোগ্য হয়। কিন্তু ইদানীং খুদে ছেলেমেয়েদের দিয়ে যেসব গান গাইয়ে টেলিভিশনে যে প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান দেখানো হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে না এই শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক প্রেমিক-প্রেমিকার মতো রোমান্টিক ভাবভঙ্গি নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছেন।
কিছুদিন আগে একটি কিশোর উপন্যাস পড়ছিলাম। সেখানে কৈশোরে থাকা ছেলেটি তার বাবার পরকীয়া প্রেমের ঘটনা নিয়ে মায়ের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করছে। বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ, এই কিশোরের কষ্টের সঙ্গে আমার কাছে সাহায্য নিতে আসা কিছু পরিবারের অসহায় মুখগুলো একাকার হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য সমাজে সাধারণত যা ঘটে তারই প্রতিচ্ছবি সাহিত্য, নাটক, সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু আমি তো আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ছোট্ট আর কচি মনগুলো কতটা বিপর্যস্ত হয় যখন তারা তাদের মা-বাবাকে অন্য কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে দেখে। তারা তখন হঠাৎ করে শৈশবের স্বাভাবিক উচ্ছলতা হারিয়ে বড়দের মতো আচরণ করতে থাকে। বাবার এ ধরনের আচরণের জন্য মা যখন বিমর্ষ থাকেন তখন শিশুটি মায়ের একজন অভিভাবক বনে গিয়ে মাকে নানাভাবে খুশি করার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা চালাতে থাকে। সে যদি মায়ের কোনো মন্তব্য থেকে বুঝতে পারে যে বাবা বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন, তাহলে মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারে এবং নিজেদের জীবনে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে খুব বেশি হোঁচট খায়। উপন্যাসটি পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল সেখানে এ বিষয়টির উপস্থাপন না হলেই ভালো হতো। তার চেয়ে বরং শিশু-কিশোরদের নির্মল আনন্দের খোরাক হয় এমন বিষয় থাকলে এই যান্ত্রিক যুগেও ওদের মনটা সুখানুভূতিতে ভরে যেত। সুন্দর একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার সময়টিতে তাদের সামনে ভালো দৃষ্টান্তগুলো তুলে ধরা উচিত বলেই আমার ধারণা।
এ দেশের অগণিত শিশুদের পড়ালেখা শিখে মানুষ হওয়ার পেছনের কাহিনির সঙ্গে শৈশব হারানোর বেদনা কি আমরা অনুভব করতে পারি? একটি কলেজপড়ুয়া ছেলে আমাকে বলেছিল, তার জীবনের সবচেয়ে দুর্বিষহ আর অন্ধকার সময় ছিল ছয় থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত। সেই সময়ে একটি তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যে কঠোর পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় ওকে। ওই দুটো বছর সে কোনো খেলাধুলা করেনি, প্রকৃতি দেখেনি, ভালো করে এক দিনও ঘুমায়নি পর্যন্ত। জানালায় দাঁড়িয়ে অন্যদের যখন বাইরে খেলতে দেখেছে, তখন ওর মনে হতো ওর চেয়ে বড় দুঃখী পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ছেলেটির অভিযোগ ছিল, বাবা-মা ওর জীবন থেকে শৈশবের দুটো বছর কেড়ে নিয়েছেন। এ দেশের হতভাগ্য শিশুদের চাওয়া-পাওয়াগুলোর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জনকে সাধারণত জুড়ে দেওয়া হয়। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বাবা-মায়েরা সন্তানদের বলেন, তোমরা পরীক্ষায় ভালো করতে পারলে সবকিছু পাবে। অনেক সময়ই আমাদের সন্তানরা অভিভাবকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে এবং হীনম্মন্যতার শিকার হচ্ছে। এতে করে আত্মমর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে আর যত নামজাদা বিদ্যালয়েই সে পড়ুক না কেন, জীবনে সুন্দরভাবে চলার সক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে।
এ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে শিক্ষকেরা পড়াচ্ছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা শিশু বিকাশের ওপর প্রশিক্ষণ নেন না। তাঁরা অনেকেই নিজেদের মন ও শরীরের প্রতি যথেষ্ট যত্নবান বলে মনে হয় না। প্রাক-বিদ্যালয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যে শিক্ষকদের অনেক বেশি শিশু মনোবিজ্ঞানের চর্চা প্রয়োজন, সে কথাটি আমরা বিবেচনায় রেখেছি বলে মনে হয় না। ফলে শিশুরা শিক্ষাজীবনের শুরুতেই লেখাপড়াকে বোঝা হিসেবে দেখে বলে একটি নিরানন্দ শৈশবের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে খুব তাড়াতাড়ি প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলে। এ দেশের শহরবাসী শিশুরা আর রূপকথার স্বপ্নীল রাজ্যে বিচরণ করে না। তারা যন্ত্রের সামনে বসে নিরন্তর কম্পিউটার গেম খেলছে। ইন্টারনেটে ঢুকে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও টেলিভিশনে শিশুদের জন্য অনুপযোগী এমন অনেক কিছু দেখছে। দেশের বাংলা প্রাইভেট চ্যানেলগুলোতেও শুধু ছোট শিশুদের কথা ভেবে তৈরি করা শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক কোনো অনুষ্ঠান হয় না। সত্যি কথা বলতে কি টেলিভিশনে শুধু বড়দের মনোরঞ্জনের জন্য প্রোগ্রাম তৈরি করা হচ্ছে। নাটকগুলোর বিষয়বস্তু এবং ভাষা কোনোটিই শিশু-উপযোগী নয় অথচ শিশুরা আর কিছু না পেয়ে সেগুলোই দেখছে বড়দের সঙ্গে বসে। আর শিশুসুলভ সরল মনটা হারিয়ে ফেলছে।
মনে হচ্ছে গোটা সমাজটাই এখন শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা ভাবছে। এ সমাজের বাসিন্দা হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়েছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি শহর এলাকার ভূমিদস্যুরা শিশুদের জন্য উন্মুক্ত জায়গার প্রয়োজনীয়তার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার ওপর ইট বসিয়ে দিচ্ছেন। এ দেশের সরকার এবং জনতাও নীরবে দৃশ্যগুলো প্রত্যক্ষণ করছে। কক্সবাজার এবং কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতও ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। আমরা কেউ প্রতিবাদ করছি না যখন টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে একটি ছোট শিশু কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘কক্সবাজারে কি আমাদের একটি ফ্ল্যাট হবে না?’ কোন ধরনের উদাহরণ আমরা তুলে ধরছি শিশুদের সামনে? এ ধরনের বিজ্ঞাপনের যে ক্ষতিকর প্রভাব শিশুদের মনে পড়তে পারে তা নিয়ে কি কেউ ভাবছি? একটি ছোট্ট শিশু বড়দের মতো ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখে, তা-ও আবার সমুদ্রসৈকতে। শিশুদের কি আমরা কিছু বড় মানুষদের মতো লোভী আর স্বার্থপর করে তুলতে চাইছি? বাংলাদেশে যেটুকু উন্মুক্ত জায়গা ছিল, সেটিও আর আগামী প্রজন্মের জন্য থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। কিছুদিন পরে যদি দেখি সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ ও অন্য প্রাণীদের মেরে সেখানেও ব্যবসার উদ্দেশ্যে ইটের ইমারত তৈরি হচ্ছে, তাহলে বোধহয় অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সুলেখক ও কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান গত ২৩ এপ্রিল প্রথম আলোয় লিখেছেন, মানুষের সারা জীবনকে যদি এক পাল্লায় এবং শৈশবকে আরেক পাল্লায় রাখা হয়, তাহলে শৈশবের পাল্লাই ভারী হয় এবং একটি মিষ্টি স্বপ্নের মতো শৈশব চলে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের শিশুদের মনে কি ভবিষ্যতে সে রকম কোনো মিষ্টি স্বপ্ন থাকবে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তাদের বারবার সেখানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে? মনে তো হয় না।
মেহতাব খানম: অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মিয়ানমারে ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬। এদিকে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে আকস্মিক ঝড় ও প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। দেশ দুটির সরকারি গণমাধ্যমে গতকাল বৃহস্পতিবার এসব তথ্য জানানো হয়।
নিউ লাইট অব মিয়ানমার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বুধবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যায় ওই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে বহু ঘরবাড়ি ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিমধ্যে ৪৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছে আরও অনেক মানুষ। সে দেশের রাখাইন রাজ্যের কোনো কোনো অংশ দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
এদিকে ফ্রান্সের গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দেশটির ড্রাগুইনান অঞ্চলে প্রবল বর্ষণের কারণে নদীর পানি বেড়ে বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যায় ইতিমধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। তাদের উদ্ধারের তৎপরতা চলছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে

দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্রের

দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে তিরস্কার করার ব্যাপারে সিউলের প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে পিয়ংইয়ং সামরিক অভিযানের হুমকি দেওয়ার কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ট ক্যাম্পবেল গতকাল বৃহস্পতিবার এই সমর্থনের কথা জানান।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ মিউং হ্যানের সঙ্গে গতকাল আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন ক্যাম্পবেল। এর আগে সাংবাদিকদের তিনি জানান, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি এখানে ছুটে এসেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি দৃঢ় সংহতি প্রকাশের জন্য। ক্যাম্পবেল বলেন, ‘এই জটিল সময়ে আমরা আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে আছি, এটা বোঝানো আমার এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।

কাঙ্ক্ষিত সাফল্যঅর্জিত হয়নি

পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী প্রভাবিত তিনটি জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুরা ও পশ্চিম মেদিনীপুরে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৮ জুন রাজ্যের পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর যৌথ নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল অপারেশন গ্রিনহান্ট। আজ শুক্রবার অপারেশন গ্রিনহান্টের বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। তবে এক বছর ধরে অভিযান চালিয়েও এই তিন জেলাকে মাওবাদী-মুক্ত করা যায়নি।
এদিকে এই অপারেশন গ্রিনহান্টের বর্ষপূর্তির দিন আজ তিন জেলায় পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটি পালন করছে কালো দিবস হিসেবে। তারা এই তিন জেলায় ২৪ ঘণ্টার বন্ধ্ও ডেকেছে। এ ছাড়া পুরুলিয়ার আদিবাসী-মূলবাসী জনগণের কমিটি এবং ঝাড়গ্রামের পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনগণের কমিটিও পৃথকভাবে আজকে বনেধর পাশাপাশি কালো দিবস পালনের ডাক দিয়েছে।
এদিকে আদিবাসী-মূলবাসী জনগণের কমিটির নেতা বিপ্লব ও পুলিশি সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটির নেতা মনোজ মাহাত এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এই অপারেশন গ্রিনহান্টে অন্তত ১০০ জন সাধারণ গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে সহস্রাধিক নির্দোষ মানুষ। গ্রামছাড়া হয়েছে লক্ষাধিক গরিব আদিবাসী। তাই তারা এই দিনকে কালো দিবস হিসেবে পালন করবে। দাবি তুলবে অপারেশন গ্রিনহান্ট বন্ধের। একই সঙ্গে তারা তিন দিন ধরে অপারেশন গ্রিনহান্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অপারেশন গ্রিনহান্টের বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে এক ঘোষণায় জানিয়েছে, মাওবাদীরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রত্যেককে এককালীন দেড় লাখ রুপি করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, তাদের স্বাবলম্বী করার জন্য তিন বছরের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ সময় তাদের মাসিক দুই হাজার রুপি করে ভাতা দেওয়া হবে। এ ছাড়া তাদের দুই রুপি কেজি দরে চাল এবং ব্যাংক ঋণ দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হবে। তাদের পুনর্বাসনের সার্বিক দায়িত্বও নেবে রাজ্য সরকার।

কিরগিজস্তানের পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ সংকটজনক’ বলছে রেডক্রস

কিরগিজস্তানে জাতিগত সহিংসতার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ সংকটজনক’ বলে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা রেডক্রস। ১০ জুন থেকে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১৯১ জন নিহত হয়েছে। অন্তত চার লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উজবেকিস্তান সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তা হিসেবে কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তানে প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এ দিকে কিরগিজস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী আজিমবেক বেকনাজারোভ গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, সহিংসতা কমে আসছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের জালালাবাদ ও ওশ শহরে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার উজবেক ঘরবাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান সীমান্তে আশ্রয় নেয়। উজবেকিস্তান সরকারের তথ্য মতে, ৭৫ হাজারের বেশি শরণার্থী দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এই সংখ্যা ৭৫ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে। সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হয়েছে চার লাখ মানুষ।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ত্রাণ নিয়ে বুধবার একটি বিমান উজবেকিস্তানের আন্দিজান সীমান্তে পৌঁছে। গতকাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ত্রাণ ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে শুরু করেছে। ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) উজবেকিস্তানে শরণার্থীদের জন্য সাদা ও সবুজ রঙের তাঁবু স্থাপন করেছে। শরণার্থীদের একটি শিবিরে এক হাজারের কম শরণার্থীর মধ্যে কাপড়-চোপড় ও কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ইউএনএইচসিআরের উদ্যোগে শত শত তাঁবু নিয়ে দুটি বিমান ইতিমধ্যে উজবেকিস্তানে পৌঁছে গেছে। চলতি সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগেই আরও চারটি বিমান ত্রাণসামগ্রী নিয়ে আসবে।
রেডক্রসের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি বিমান কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে এবং আরেকটি বিমান উজবেকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে পৌঁছেছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে কম্বল, রান্নার সরঞ্জাম, সাবান ও তাঁবু টানানোর মতো মোটা কাপড় রয়েছে।
শরণার্থীরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় তাঁরা তেমন কোনো সহায়তাই পাচ্ছেন না। খানাদাবাদ শহরের একটি স্টেডিয়ামে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী হালিমা ওতাজোনোভা। তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমাদের কাপড়চোপড় ও ওষুধ দরকার। আমরা জীবন নিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছি। কোনো কিছুই সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি।’
কিরগিজস্তানে রেডক্রসের উপপ্রধান সেভেরাইন চাপপাজ বর্তমান পরিস্থিতিকে ভয়াবহ সংকট বলে অভিহিত করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তানে বাস্তুচ্যুত এবং শরণার্থীদের খাদ্য, পানীয় ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বুধবার কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তানে তিন কোটি ২০ লাখ ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এতে বলা হয়, কিরগিজস্তানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলে সেখানে ওষুধসহ অন্যান্য ত্রাণসহায়তা পাঠানো হবে।

কার্বন কমালেও জলবায়ু স্বাভাবিক হতে কয়েক দশক লাগবে

ব্রিটেনের একদল পরিবেশবিজ্ঞানী বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা কমিয়ে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার পরও বন্যা, অনাবৃষ্টিসহ বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে রাতারাতি মুক্তি পাওয়া যাবে না। পরবর্তী কয়েক দশক এ উষ্ণতার রেশ থাকবে। এরই ধারাবাহিকতায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অনাবৃষ্টিসহ প্রাকৃতি দুর্যোগ অব্যাহত থাকবে। এক্সেটার শহরে অবস্থিত মেট অফিস হ্যাডলি সেন্টারের বিজ্ঞানীরা এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলেছেন। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটারস-এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে মানুষ যদি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তাহলেও পৃথিবীতে পানিচক্রের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে কয়েক দশক লাগবে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের আধিক্যের কারণে যে পরিমাণ ক্ষতির মাত্রা ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সেই ক্ষতির পরিমাণ হবে আরও অনেক বেশি।
হ্যাডলি সেন্টারের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা ভিকি পোপ বলেছেন, ‘আমরা এ কথা বলতে পারি না যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ মাত্রা কমিয়ে আনলেই আর চিন্তার কিছু থাকবে না। নিঃসরণ পরিমিত মাত্রায় নামিয়ে আনার পরও প্রকৃতির পরিবর্তনশীল প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।’
বিজ্ঞানী পিলি উর নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পৃথিবীর পানিচক্রে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে, তা কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। ওই মডেলে তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, নিঃসরণের মাত্রা দ্রুত নামিয়ে আনলেও পানিচক্রের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে কয়েক দশক লাগবে

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের ঝুঁকিতে ফেলেছে: বাশার

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বলেছেন, ইসরায়েলের বর্তমান সরকার একটি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী সরকার। গাজায় ত্রাণবাহী জাহাজে ইসরায়েলি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
বিবিসিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ৩১ মার্চের ওই হামলায় নয়জন তুর্কি নিহত হন। এতে করে অদূর ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে।
বাশার বলেন, ওই ঘটনা প্রমাণ করে ইসরায়েলের বর্তমান সরকার একটি বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সরকার। এ ধরনের সরকারের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ওই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই।’

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অবরোধ আরোপের এক সপ্তাহের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র গত বুধবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটন বলেছে, যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তা করছে, তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) ইরানের পরিবহন, ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইইউর এক সম্মেলনে এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের যেসব প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, তেল উৎপাদনকারী ও জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তির ওপরও অবরোধ আরোপ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরানের এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি জব্দ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী টিমোথি গেইথনার বলেছেন, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য অনেক কাজ করতে হয়েছে। ইরানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গেইথনার বলেন, মানববিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরানের মালিকানাধীন পোস্ট ব্যাংক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য ২০০৭ সালে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল সে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সেপাহ। পোস্ট ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ এই সেপাহ ব্যাংকের হয়ে কাজ করে আসছিল। এ নিয়ে ইরানের সর্বমোট ১৬টি ব্যাংক কালো তালিকাভুক্ত করা হলো।
ইরানের আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের বিমানবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া রেভল্যুশনারি গার্ডের বিমানবাহিনীর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তি, গণবিধ্বংসী কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুটি প্রতিষ্ঠান ও আরও দুই ব্যক্তিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কালায়া ইলেকট্রনিক কোম্পানির কর্মকর্তা জাভেদান মেহের তুসও রয়েছেন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আওতায় ইরানের শিপিং লাইনের (আইআরআইএসএল) পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে। আইআরআইএসএলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই পাঁচটি কোম্পানি নাম পরিবর্তন করে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রেখেছিল। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ২৭টি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইরানের আরও যেসব ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তাঁরা হলেন জাভেদ করিমি সাবেত ও মোহাম্মদ আলি জাফরি। ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে সাবেতের এবং জাফরি হলেন রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান কমান্ডার।
গেইথনার বলেন, ওবামা প্রশাসন ইরানের অভ্যন্তরে ও বাইরে অবস্থিত ২২টি তেল, জ্বালানি ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানি শনাক্ত করেছে। এগুলো কোনো না কোনোভাবে ইরান সরকারের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন।
মার্কিন কংগ্রেসের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হাওয়ার্ড বেরম্যান ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ওবামা প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা রবার্ট এইনহর্ন বলেছেন, এ নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের এই বোধোদয় হবে যে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা ছাড়া তাঁদের আর কোনো পথ খোলা নেই।

পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন রোববার

আগামী রোববার পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ব্রনিস্ল কমোরোস্কি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জারোস্ল কাচজিনস্কি। রাশিয়ায় ১০ এপ্রিল বিমান দুর্ঘটনায় পোলিশ প্রেসিডেন্ট লেস কাচজিনস্কি মারা যাওয়ার পর এ পদে শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
ক্ষমতাসীন দল সিভিক প্লাটফর্ম পার্টির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্কের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ব্রনিস্ল কমোরোস্কি। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট লেক কাচজিনস্কির দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়েও তিনি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। এ বছরের শরতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিমান দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট নিহত হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দায়িত্ব নেন।
১৯৮১ সালে পোল্যান্ডে কমিউনিস্টবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন ব্রনিস্ল কমোরোস্কি। এই অপরাধে তাঁকে কারাভোগও করতে হয়। ১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে তিনটি সরকারে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে স্পিকার নির্বাচিত হন কমোরোস্কি।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট লেস কাচজিনস্কির যমজ ভাই হলেন জারোস্ল কাচজিনস্কি। বিরোধী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির নেতা তিনি। ২০০৬ সালের জুলাইয়ে ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির নেতৃত্বে সংস্কারের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু একই বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আবার হেরে যান

প্রপৌত্রীর শেষকৃত্যে ম্যান্ডেলা

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার প্রপৌত্রীর শেষকৃত্যানুষ্ঠান গতকাল বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হয়েছে। এতে স্ত্রী গ্রাসার সঙ্গে ম্যান্ডেলা যোগ দেন। কিংবদন্তি এই নেতার সাবেক স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
নেলসন ম্যান্ডেলার মেয়ে জিন্দজি ম্যান্ডেলার নাতনি জেনানি ম্যান্ডেলা গত ১০ জুন জোহানেসবার্গে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হয়। বিশ্বকাপ কনসার্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় তার গাড়ি। জেনানির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর। সে উত্তর জোহানেসবার্গের বেসরকারি এসটি স্টিথিয়ানস কলেজে ষষ্ঠ গ্রেডে পড়াশোনা করত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির গির্জায় জেনানির সহপাঠী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে গতকালের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে কয়েক শ শোকার্ত মানুষ যোগ দেয়।
যদিও ৯১ বছর বয়সী নেলসন ম্যান্ডেলা আজকাল জনসমাবেশ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু নিজ দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
জেনানির মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত ম্যান্ডেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। জেনানির শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে সামনের সারিতে দেখা যায় ম্যান্ডেলাকে।
প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশ ধারণা করছে, বিশ্বকাপ কনসার্ট শেষে বাড়ি ফেরার পথে জেনানির গাড়ির চালক সিজউই ম্যানকাজানা মদপানের কারণে মাতাল ছিলেন। এতে গাড়িটি ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়।

কানাডায় মহাত্মা গান্ধীর ভাস্কর্য উন্মোচিত

কানাডার উইনিপেগ শহরে কানাডিয়ান মিউজিয়াম অব হিউম্যান রাইটসে (সিএমএইচআর) ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে। গত বুধবার কানাডায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার শশীশেখর জাভাই আনুষ্ঠানিকভাবে এ ভাস্কর্য উন্মোচন করেন।
ভারত সরকার ২০০৪ সালে বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ৫০০ কেজি ওজনের এ ভাস্কর্যটি কানাডাকে উপহার দেয়। উন্মোচন অনুষ্ঠানে হাই কমিশনার বলেন, ‘মহাত্মা গান্ধীর শান্তি ও ন্যায়বিচারের বার্তা সারা বিশ্বের মানুষের জন্য। সেখানে আমরা কোথায় অবস্থান করছি, সেটা বিবেচ্য নয়। আমি মনে করি, সিএমএইচআরের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন ব্যক্তির ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘মহাত্মা গান্ধী বিশ্বাস করতেন, মানবাধিকার অবিচ্ছেদ্য, শর্তহীন ও আপসহীন।’
ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ইনডিয়ান চ্যাপ্টার অব উইনিপেগ চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান হেমন্ত শাহ। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের জন্য গর্বের দিন। সব ভারতীয় বিশেষত গুজরাটের জনগণের জন্য খুশির দিন।’
বিশিষ্ট ভাস্কর রাম ভানজি সুতর মহাত্মা গান্ধীর এই ভাস্কর্য তৈরি করেন। গত ছয় বছর এটি উইনিপেগের বিশাল বিপণিকেন্দ্র ফোর্ক মার্কেট বিল্ডিংয়ে ছিল। এখন ভাস্কর্যটি স্থায়ীভাবে সিএমএইচআরে স্থাপন করা হলো।

‘ঈশ্বরের নির্দেশে লাদেনকে হত্যা করতে এসেছি’

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজতে এসে পাকিস্তানে আটক মার্কিন নাগরিক গ্যারি ব্রুকস ফকনার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার প্রতিশোধ নিতে তিনি ঈশ্বরের নির্দেশে লাদেনকে হত্যা করতে পাকিস্তানে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরে নির্দেশে আমি লাদেনকে হত্যা করতে এসেছি।’ ঈশ্বর তাঁকে স্বপ্নে লাদেনকে হত্যা করার এ নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, গ্যারি গত বুধবার জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, স্বপ্নে পাওয়া ঈশ্বরের নির্দেশে তিনি ওসামা বিন লাদেনের সন্ধানে পাকিস্তানে এসেছেন। গ্যারি সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এসব নিরাপত্তা কর্মকর্তার মধ্যে একজন তদন্ত কর্মকর্তাও রয়েছেন।
গ্যারির ভাই স্কট ফকনার বলেন, তাঁর ভাই উন্মাদ নন। তিনি একজন দেশপ্রেমিক ও ঈশ্বরে বিশ্বাসী। পুরস্কার পাওয়ার লোভে তিনি লাদেনকে ধরতে বের হননি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তিনি ওসামার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন।

যুক্তরাষ্ট্রকে দুই হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেবে বিপি

মেক্সিকো উপসাগরে তেলক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনায় ওই তেলক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুই হাজার কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছে। গত বুধবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে বিপির চেয়ারম্যান কার্ল হেনরিক স্তানভানবার্গের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা বিপির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়কে প্রেসিডেন্ট ওবামার বড় ধরনের সাফল্য বলে মনে করছেন। বিরোধী রিপাবলিকানরা বিষয়টিকে সাফল্য হিসেবে দেখলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওবামার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এদিকে বিপির প্রধান নির্বাহী টনি হাওয়ার্ডকে মার্কিন কংগ্রেস কমিটির গতকাল বৃহস্পতিবার জেরা করার কথা।
হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, তেলক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণে বিপি দুই হাজার কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছে। আগামী চার বছরে চারটি কিস্তিতে বিপি ওই অর্থ দেবে। প্রতি কিস্তির পরিমাণ হবে পাঁচ হাজার কোটি ডলার। ২০১০ সালের মধ্যেই প্রথম কিস্তির টাকা দেবে বিপি। বিপির চেয়ারম্যান কার্ল হেনরিক হোয়াইট হাউস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই এই বিবৃতি দেওয়া হয়।
এ দুর্ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিপির চেয়ারম্যান হেনরিক। তিনি বলেন, ‘বিপির কর্মীদের পক্ষ থেকে আমি মার্কিন জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, বড় তেল কোম্পানিগুলো লোভী হয়, কিন্তু বিপি তা নয়।’ তিনি জানান, বিপি প্রতিষ্ঠানটি
মানুষের ওপর আস্থা ফেরাতে চায়।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ও ডেমোক্র্যাট নেতা ন্যান্সি পেলোসি বিপির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, বিপি কোনো না কোনোভাবে উপকূলের জনগণ, ছোট ব্যবসায়ী ও কর্মীদের কাছ থেকেই ওই অর্থ তুলে নেবে। তাই সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। পেলোসি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি আমাদের সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিপি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করা যাবে না।’
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হ্যারি রিড বলেন, ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রথম পদক্ষেপ ভালোই হলো। এর মাধ্যমে বিপির এই দুর্ঘটনার দায় নেওয়ার মানসিকতা বোঝা গেল। ডেমোক্র্যাট সিনেটর রবার্ট মেন্ডেজ বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় অর্থনীতি ও পরিবেশগত যে বিপর্যয় হলো, বিপিকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করতে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
রিপাবলিকান দলের নেতা এরিক ক্যানটর বলেন, ‘বিপির কাছ থেকে টাকা আদায়ে প্রেসিডেন্ট ওমাবার পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তিনি এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কোনো পদক্ষেপ নেননি।’
গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের ওই তেলক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ দিয়ে এখনো দিনে ৩৫ থেকে ৬০ হাজার ব্যারেল তেল সাগরের পানিতে মিশছে। এতে সাগরের জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।

উৎসে আয়কর আগের অবস্থায় রাখতে হবে -রপ্তানিকারক সমিতির দাবি

প্রস্তাবিত ২০১০-১১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সব ধরনের রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎসে আয়কর দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বাড়িভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।
বাজেটের এ দুটি প্রস্তাবে রপ্তানিমুখী খাতগুলোর মধ্যে গভীর হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর ফলে প্রতিটি রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।
সমিতির নেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নাজুক পরিস্থিতির কারণে কোনো কারখানা তার সক্ষমতার পুরো মাত্রায় উৎপাদন করতে পারছে না। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বাড়িভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করার এবং উৎসে আয়কর কর্তনের হার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা এসব দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ও বিজিএমইএ সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী। এ সময় রপ্তানিমুখী বিভিন্ন সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সালাম মুর্শেদী বলেন, ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি জনকল্যাণমুখী, রপ্তানি ও বাণিজ্যবান্ধব বাজেট। এ বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ছয় হাজার ১১৫ কোটি বরাদ্দ করা।
তবে রপ্তানিকারকেরা মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ খাতে আরও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ার কারণে কোনো রপ্তানি খাতই পূর্ণ সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করতে পারছে না।
সালাম মুর্শেদী আরও বলেন, অবকাঠামো খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো, নীতি নির্দেশিকা স্পষ্টীকরণ ও দপ্তর দ্রুত হওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যুতের অফ পিক হারকেই (৩.১৫ টাকা) ফ্লাট রেট হিসেবে ধার্য করার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পরিস্থিতি উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত ন্যূনতম চার্জ প্রথা বাতিলের দাবি করা হয়।
অনুষ্ঠানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সাত শতাংশে নির্ধারণ এবং ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের দর লিটারপ্রতি যথাক্রমে ১০ টাকা ও ২০ টাকায় নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। পাদুকা শিল্পে চলতি অর্থবছরের মতোই আগামী অর্থবছরের প্রণোদনা প্যাকেজ অব্যাহত রাখা, কৃষিভিত্তিক শিল্পের মতো রেশমজাত দ্রব্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দেওয়া, প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও ক্রাফট চামড়া রপ্তানিতে ১০ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া হিমায়িত খাদ্যে নগদ সহায়তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং মৎস্য খামারিদের ওপর আরোপিত পাঁচ শতাংশ আয়কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের জন্য শিল্পোদ্যোক্তাদের ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে স্থাপন করা ৫০টি কারখানায় অনতি বিলম্বে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোজন দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

হোলসিমের গ্রিন বিল্ট প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ

হোলসিম (বাংলাদেশ) লিমিটেড আয়োজিত ‘হোলসিম গ্রিন বিল্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হয়েছে।
সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার প্রথম ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরস্কার পান বুয়েট থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শুভ্র শোভন চৌধুরী ও তাঁর দল। দ্বিতীয় বিজয়ী হলেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র সাখাওয়াৎ হোসেন। তৃতীয় পুরস্কার লাভ করেন শামসুদ্দোহা ও তাঁর দল। এ ছাড়া আইডিয়া প্রজেক্ট তুলে ধরেন তানজিম হাসান সালিম।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে শেখ আহসান উল্লাহ মজুমদার ও তাঁর দল প্রথম পুরস্কার পান। দ্বিতীয় পুরস্কার জেতেন নাহাছ আহমেদ খলিল ও তাঁর দল। তৃতীয় পুরস্কার বিজয়ী হন খান মো. মোস্তফা খালিদ ও তাঁর দল। এ ছাড়া সম্মানী আইডিয়া প্রজেক্ট বিজয়ী হলো—নিসর্গ ভিজিটর ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার (এহসান খান ও তাঁর দল)।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত বুধবার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে অ্যাডভাইজরি বোর্ডের চেয়্যারম্যান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান বশিরুল হক, হোলসিম বাংলাদেশের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রজনিস কাপুর এবং হোলসিম গ্রুপের রিজিওনাল ম্যানেজার এইডেন লেইনাম বক্তব্য দেন

সেই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে জাপান

পার্সি, স্নাইডার, বোমেলদের হল্যান্ড বড় প্রতিপক্ষই বটে। তবে শক্তিশালী ডাচদের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে এশিয়ার জাপানও ফুটছে টগবগে আত্মবিশ্বাসে।
ক্যামেরুনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-০ গোলের জয় তো আছেই। ডাচ-বাধার মুখে পড়ার আগে জাপানকে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচটি। হল্যান্ডের এনশেডের সে ম্যাচে জাপান হেরেছিল ০-৩ গোলে। ০-৩ গোলের হারা ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের ফুলকি খোঁজা! হ্যাঁ, স্কোরলাইনে ফিরে না তাকিয়ে ম্যাচের চিত্রনাট্যটাই মাথায় রাখতে চাইছে তারা। প্রথমার্ধে দুর্দান্ত খেলা জাপান ৭০ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য রেখেছিল ডাচদের। ৭০ মিনিট হতাশায় কাটানো ডাচরা গোল তিনটি করেছিল শেষ ২০ মিনিটে।
ওই ম্যাচের স্মৃতিচারণা করে মিডফিল্ডার জুনিচি ইনামোতো বলেছেন, ‘প্রথমার্ধে আমরা অবশ্যই ভালো খেলেছিলাম।’ ওই ম্যাচের সূত্র টেনে এবার জয়ের স্বপ্নই দেখছেন ৩০-এ পা দেওয়া এই জাপানি, ‘আমরা কঠিন আক্রমণ করতে চাই। কারণ জানি ম্যাচটিও কঠিন হবে।’ সাইড বেঞ্চে বসে সেপ্টেম্বরের সেই ম্যাচ উপভোগ করা এই খেলোয়াড় কালকের ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনাই দেখছেন বেশি।
তবে গাম্বা ওসাকার মিডফিল্ডার ইয়াসুহিতো এন্দো পুরোপুরি শ্রদ্ধা রাখছেন ডাচদের প্রতি, ‘দক্ষতার দিক থেকে তারা অবশ্যই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে।

টিকে রইল গ্রিসের আশা

নতুন কোনো ট্র্যাজিক উপাখ্যান রচিত হয়নি, টিকে রইল গ্রিক অভিযান। কাল নাইজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে অন্তত কাগজে-কলমে দ্বিতীয় রাউন্ডের আশা বাঁচিয়ে রাখল গ্রিস।
গ্রিস কাল ঠিক যেন ফিনিক্স পাখির মতোই ভস্ম থেকে পুনর্জন্ম নিয়েছে। ১৬ মিনিটে উচের গোলে পিছিয়ে পড়েছিল গ্রিস। শুধু গোলের হিসেবেই নয়, পিছিয়ে ছিল আসলে তারা সামগ্রিকভাবেও। বল পজেশন, পাসিং...সব দিক দিয়েই। কিন্তু নাইজেরিয়াকে এলোমেলো করে দিল ৩৫ মিনিটের একটি ঘটনা—প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে লাথি মারার কারণে লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয় সানি কেইটাকে।
এর পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় গ্রিস। ৪৪ মিনিটে সালপিংগিদিস গ্রিসকে ম্যাচে ফেরান, ৭১ মিনিটে জয়সূচক গোল করেন টোরোসিডিস। এরপর ১০ জন নিয়েও সমানে সমান লড়াই করলেও গোল আর শোধ দিতে পারেনি নাইজেরিয়া।

অস্ট্রেলিয়াকে জেতালেন পাইন ও হোপস

২২ জুন থেকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। এর আগে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে কাল খেলল একমাত্র ওয়ানডে। সেটিতে জিতল ৩৯ রানে। ডাবলিনে প্রথমে ব্যাট করে টিম পাইনের হাফ সেঞ্চুরিতে (১২২ বলে ৮১) ৯ উইকেটে ২৩১ রান করে টসজয়ী অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ৪২ ওভারে ১৯২ রানে অলআউট হয়ে যায় আয়ারল্যান্ড। সর্বোচ্চ ৩৯ রান করেছেন পোর্টারফিল্ড। ১৪ রানে ৫ উইকেট নিয়েছেন হোপস।

হিগুয়েইনকে ঘিরে আলো

ড্যানিয়েল প্যাসারেলা নিশ্চয়ই কাল মুচকি হেসে সবাইকে বলেছেন, ‘কী, বলেছিলাম না...?’ আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোচ বছর চারেক আগেই এক ম্যাচে গঞ্জালো হিগুয়েইনকে দেখে বলেছিলেন, ‘এই ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, বড় তারকা ও হবেই।’
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ‘লা লিগা’য় এবার ২৭ গোল করেছেন, তবু পড়ে থাকেন রোনালদো-কাকাদের আড়ালে। আর্জেন্টিনায় দলে থাকেন মেসি-তেভেজদের ছায়া হয়ে। আলোটা নিজের দিকে ফেরাতে হিগুয়েইন বেছে নিলেন বড় মঞ্চকেই। গোল-খরার এবারের বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক করে ২২ বছর বয়সী স্ট্রাইকার জানিয়ে দিলেন, তারকা তো তিনিও, একটু-আধটু আলোচনা বোধহয় তাঁকে নিয়েও হওয়া উচিত!
হিগুয়েইনের হ্যাটট্রিকে একটা অপেক্ষা ঘুচল বিশ্বকাপেরও। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ে পোল্যান্ডের বিপক্ষে পর্তুগাল স্ট্রাইকার পলেতার হ্যাটট্রিকের পর ম্যাচে কোনো ফুটবলারের তিন গোল আর দেখেনি বিশ্বকাপ। জার্মানি বিশ্বকাপে হয়নি কোনো হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আগের হ্যাটট্রিক তো হয়েছে আরও আগেই, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে জ্যামাইকার বিপক্ষে সেটা করেছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ভক্তদের প্রিয় ‘বাতিগোল।’
বাতিস্তুতার মতো তিনিও নিখাদ স্ট্রাইকার, বর্তমান ফুটবল-বিশ্বে বিরল প্রজাতি। পুরো ম্যাচে যাঁদের খুঁজেও পাওয়া যাবে না, কিন্তু সময়মতো দেখা যাবে আসল কাজটি তাঁরাই করেছেন—গোল! কালকের ম্যাচটাই দেখুন না, বল নিয়ে কারিকুরি করলেন মেসি-তেভেজ-ডি মারিয়ারা, কিন্তু গোল পেলেন ওই হিগুয়েইন। প্রথম দুটি গোলে তো তাঁর মাথা আর পা ছোঁয়ানো ছাড়া আর কিছু করারই ছিল না। সতীর্থরাই বল বানিয়ে দিয়েছিলেন দারুণভাবে। কিন্তু ওই যে সময়মতো ঠিক জায়গায় হাজির থাকা, নিখাদ স্ট্রাইকারদের সবচেয়ে বড় গুণ তো ওটাই! হ্যাটট্রিক পূরণ করা গোলটা অবশ্য ছিল দারুণ। দক্ষিণ কোরিয়ান গোলকিপারের পাশ দিয়ে হেডে বলটা এত ঠান্ডা মাথায় প্লেস করেছেন, বুঝতেই দেননি কঠিন কাজটা কত সহজে করে ফেললেন!
কালকের হিগুয়েইনকে দেখে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ হতে পারে রেমন্ড ডমেনেখের। ২০০৬ সালেই হিগুয়েইনকে ফ্রান্স দলে নিতে চেয়েছিলেন ফরাসি কোচ, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে হিগুয়েইন খেলতে রাজি হননি। ভাবছেন ফ্রান্স দলে হিগুয়েইন কেন? তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই তো ফ্রান্সে! বাবা হোর্হে হিগুয়েইনও ছিলেন ফুটবলার, অবশ্য জাতীয় দলে কখনো খেলা হয়নি। ক্লাব ক্যারিয়ার শেষে হোর্হে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। সেখানেই হিগুয়েইনের জন্ম। ক্লাব ফুটবল শুরু করেছেন অবশ্য আর্জেন্টিনায়, বাবার সাবেক ক্লাব রিভার প্লেটে। পরে তাঁকে দলে নেয় রিয়াল।
জাতীয় দল নিয়ে শুরুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কোনটিতে খেলবেন, ফ্রান্স না আর্জেন্টিনা। ২০০৭ সালের শুরুর দিকে বেছে নেন বাবার দেশ আর্জেন্টিনাকেই। রিয়ালের হয়ে দারুণ খেলার পরও ডিয়েগো ম্যারাডোনার দলে সুযোগ হচ্ছিল না। তবে বাছাইপর্বে গত বছর দলের সংকটময় মুহূর্তে আর উপেক্ষা করতে পারেননি ম্যারাডোনা। অভিষেক ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে গোল করে জানিয়ে দেন, তিনি থাকতেই এসেছেন।
সতীর্থরা হিগুয়েইনকে ডাকে ‘এল পিপিতা’, মানে লম্বা নাকওয়ালার ছেলে। বাবা হোর্হেকে তাঁর সতীর্থরা ডাকতেন ‘এল পিপা’ বা লম্বা নাকওয়ালা। ছেলের নামের রহস্যটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন! তবে সময় বোধহয় হয়ে গেছে, ছেলের নামে বাবাকে কোনো নাম দেওয়ার। হোর্হেকে সবাই তো এখন হিগুইয়েনের বাবা বলেই চেনে!

যত দোষ রেফারির

৭৬ মিনিটে গোল বাঁচাতে গিয়ে উরুগুয়ের ফরোয়ার্ড লুইস সুয়ারেজকে ফেলে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক ইতুমেলেং খুনে। সঙ্গে সঙ্গে বেজে ওঠে মেক্সিকান রেফারি মাসিমো বুসাক্কার বাঁশি। পেনাল্টি পায় উরুগুয়ে। লাল কার্ড দেখেন খুনে। বদলি গোলরক্ষক মোয়েনেব জোসেফের বিপক্ষে নেওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করেন ডিয়াগো ফোরলান। উরুগুয়ে এগিয়ে যায় ২-০ গোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রাজিলিয়ান কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা রেফারির এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না।
ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে পাহেইরা বলেছেন, ‘তিনি এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বাজে রেফারি। আশা করছি, তাঁর মুখ আর আমাদের দেখতে হবে না। সে আসলে এখানে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছে।’
পেনাল্টি নিয়ে পাহেইরা অসন্তুষ্ট হলেও কুনের লাল কার্ড দেখায় হয়তো খুশিই হবেন ইতালির সাবেক গোলরক্ষক জিয়ানলুকা পালিউকা। এত দিন বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখা একমাত্র গোলরক্ষক হয়ে ছিলেন নব্বই বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখা এই পালিউকাই। এবার যে একজন সঙ্গী পেলেন! লাল কার্ডের পরও ঘটেছে অদ্ভুত এক ঘটনা। আরেক গোলরক্ষক মোনরায়েবের মাঠে নামার কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে নামতে মিনিট পাঁচেক লেগে গেল তাঁর। দক্ষিণ আফ্রিকা পরশু ম্যাচের সবকিছুতেই এমন পিছিয়ে ছিল। দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড় স্টিভ পিনার তাই কোচের মতো রেফারির সমালোচনা না করে পরাজয়ের দায় নিয়ে নিলেন নিজেদের কাঁধে, ‘আমার মনে হয় রেফারিকে না দুষে আমাদের নিজেদেরই দায় নেওয়া উচিত।’
আর উরুগুয়ের কোচ রেফারিং নিয়ে কোনো কথাই বলতে চাইলেন না, ‘আমি পাহেইরার সঙ্গে একমত নই। রেফারির কারণে জিতেছি, এটা শুনেই তো আমার হাসি পাচ্ছে

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নেই বুফন

নিজে বলেছিলেন, দুই দিনের মধ্যেই ফিরবেন, খেলতে পারবেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এর পর খবর এল, অনির্দিষ্টকালের জন্য বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। কেউ কেউ তো ধারণা করেছেন, বিশ্বকাপটাই শেষ হয়ে যেতে পারে তাঁর। আপাতত খবর—অন্তত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা হচ্ছে না ইতালি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনের।
প্রথম গ্রুপ ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে ইতালি। এমনিতেই রক্ষণাত্মক খেলা ইতালি সেদিন খেলেছিল ভীষণই নেতিবাচক ফুটবল। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে মার্সেলো লিপ্পির ইতালিকে নিয়ে। এর সঙ্গে বুফনের চোট তাদের একটু বেশিই চাপে ফেলে দিয়েছে।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গত সোমবারের ড্র ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে নিতম্বের ইনজুরির জন্য খেলেননি গত বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক বুফন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক বলেছিলেন, তিনি কবে মাঠে ফিরতে পারবেন, তার ঠিক নেই। বিশ্বকাপেও আর খেলা নাও হতে পারে। কাল ইতালি দলের চিকিৎসক এনরিকো কাস্টেল্লাচ্চি আনুষ্ঠানিকভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বুফনের খেলতে না পারার কথা, ‘বুফনের পিঠের নিচের দিকের সমস্যাটা সামান্য। তবে ব্যথা আছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তার ফিট হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই।’ তবে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে খেলতে পারবেন কি না, আপাতত সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি টিম ডাক্তার।
ইতালি দলে চোট আছে আরেকজনের। দেশ থেকেই চোট নিয়ে এসেছেন এসি মিলান প্লে-মেকার আন্দ্রে পিরলো। তবে পিরলোকে নিয়ে সুখবর আছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেরে উঠছেন তিনি। হালকা অনুশীলন করছেন। তবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে পাচ্ছে না ইতালি, হয়তো তিনি খেলতে পারবেন গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে।

ফোরলান ও দুই ভাগ্যবান

গোলশূন্য প্রথম ম্যাচের পর আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই, গোল আসছে।’ ডিয়েগো ফোরলান পরশু প্রমাণ করলেন, তিনি এখন শুধু প্রতিশ্রুতি দেন না, প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দু গোল করে হলেন ম্যাচ-সেরা, ২০ বছর পর বিশ্বকাপে দলকে এনে দিলেন জয়।
পরশুর আর দুই ম্যাচ-সেরার গল্পটা আবার অন্য রকম। হন্ডুরাসের বিপক্ষে চিলির জিয়ান বোশেজো এবং স্পেনের বিপক্ষে সুইজারল্যান্ডের গেলসন ফার্নান্দেজ একটি করে গোল করা ছাড়া পুরো ম্যাচে তেমন কিছু করেননি। তবুও তাঁরা সেরা, কারণ ওই গোল দুটিই গড়ে দিয়েছে দু ম্যাচের ভাগ্য।
এই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে থেকেই বাবার কীর্তি ছোঁয়া নিশ্চিত করে ফেলেছেন ফোরলান। বাবা পাবলো ছিলেন রাইটব্যাক, ২০ বছরের ক্যারিয়ারে উরুগুয়ের হয়ে খেলেছেন ১৯৬৬ ও ১৯৭৪ বিশ্বকাপে। ফোরলানেরও এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ২০০২ বিশ্বকাপে দলের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেললেও ঠিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। একটি গোল করেছিলেন, সেটিও সেনেগালের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে। উরুগুয়ের জার্সি গায়ে ফোরলান অবশ্য ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ জুড়েই ছিলেন এমন। ২০০২ সালে অভিষেকের পর থেকেই তাঁকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনেছে উরুগুয়ে, কিন্তু প্রতিদান দিতে পেরেছেন খুব কম সময়ই। জাতীয় দলে জায়গা পাকা করতে পেরেছেন তাই মাত্রই বছর তিনেক হলো।
অথচ ক্লাব ফুটবলে ফোরলান রীতিমতো গোলমেশিন। লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘পিচিচি ট্রফি’ জিতেছেন দুবার, দুবার জিতেছেন ইউরোপীয় সোনার বুট। সদ্য শেষ মৌসুমেও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে করেছেন ২৮ গোল। এবার প্রথম ম্যাচে গোল না পাওয়ার পর আবার ঘিরে ধরেছিল পুরোনো সেই শঙ্কা, তবে পরশু দু গোল করে জানিয়ে দিলেন এখন তিনি আকাশি জার্সিতেও উজ্জ্বল। গোল-খরার বিশ্বকাপের প্রথম ৬ দিনের ম্যাচে একাধিক গোল করলেন একমাত্র তিনিই। তার চেয়েও বড় কথা, এই দুই গোলে ২০ বছর পর আবার দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়াটা মোটামুটি নিশ্চিত করে ফেলেছে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
হন্ডুরাসের বিপক্ষে খেলা শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকেই সমানে আক্রমণ চালিয়ে গেছে চিলি। গতি আর স্কিলে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে আসা হন্ডুরাসকে। কিন্তু গোলটা হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত করেছেন ফার্নান্দেজ। তবে করেছেন না বলে হয়ে গেছে বলাই ভালো। ৩৪ মিনিটে বক্সের ভেতর ডান দিক থেকে মরিসিও ইসলার ক্রস হন্ডুরাসের ডিফেন্ডার বার্নারডেজের পায়ে ফিরে গোলে ঢুকেছে বোশেজের গায়ে লেগে।
স্পেনের বিপক্ষে সুইজারল্যান্ড লক্ষ্যে কিকই নিতেই পেরেছে তিনটি। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে এর একটিকেই গোলে পরিণত করেছেন ফার্নান্দেজ। সেটি ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে এমনই গুরুত্বপূর্ণ যে ম্যাচ-সেরা নিয়ে ভাবতে হয়নি।

বড়দিনের চেয়েও বড় উৎসব

জাতিগতভাবে সুইসরা নিজেদের আবেগটাকে চেপে রাখতেই অভ্যস্ত। অতি শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বা অতি উল্লাসে মেতে ওঠাটা যেন তাদের সঙ্গে ঠিক যায় না। অথচ সেই সুইজারল্যান্ডের পত্রপত্রিকাগুলোই কাল বড় বড় ব্যানার হেডলাইন করল। দেশের শীর্ষস্থানীয় ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোর একটি বিরাট হরফে শিরোনাম করল—সেনসেশন! আবার কোনো কোনো পত্রিকা বড় বড় করে লিখে দিল—ক্রিসমাসের চেয়েও বড় উৎসব!
হ্যাঁ, সুইজারল্যান্ডের জন্য বড়দিনের চেয়ে ‘স্পেন-বধ’ বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম স্প্যানিশদের হারানোর আনন্দ, সঙ্গে এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই জয়ের আনন্দ তো আছেই।
১৯৫৪ বিশ্বকাপে ইতালিকে দু দুবার হারানো (২-১ ও ৪-১) কিংবা ১৯৩৪ বিশ্বকাপে হল্যান্ডকে হারানোর (৩-২) মতো সাফল্যও আছে দেশটির। কিন্তু স্পেনকে হারানোর গল্প তারা কোনো দিন করতে পারেনি। সেই গল্পের পাণ্ডুলিপি লিখতে পেরে সুইজারল্যান্ডের জার্মান কোচ ওটমার হিজফেল্ডের আবেগও আর বাঁধ মানছে না, ‘খেলোয়াড়দের নিয়ে খুবই গর্বিত আমি। আমি বিশ্বাস করি আজ (বুধবার) আমার দল ঐতিহাসিক এক অর্জন করে ফেলেছে। আমার ধারণা, গত ১০৫ বছরের মধ্যে আমরা স্পেনকে কখনো হারাইনি।’
১০৫ বছর না বলে হিজফেল্ড বছরের সংখ্যা যা খুশি বলতে পারেন। কারণ, স্পেনকে সুইজারল্যান্ড কখনোই হারাতে পারেনি। ১৯২৫ সালে দু দলের প্রথম সাক্ষাতের পর থেকে এই বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ১৮ বার মুখোমুখি হয়েছে স্পেন ও সুইজারল্যান্ড। তার মধ্যে ১৫ বার স্পেন জিতেছে, ৩ বার ড্র হয়েছে।
সুইস টেলিভিশন ‘টিএসআর’-এর ডারবান প্রতিনিধি ফিলিপ ফন বার্গ বলছিলেন, ‘কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, সুইসরা তাদের ইতিহাসের সুন্দরতম অধ্যায়টি লিখে ফেলেছে।’ আনন্দ যেন ফুরোতেই চাইছে না হিজফেল্ডেরও। ইনজুরির জন্য অধিনায়ক ও দলের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাইকার অ্যালেক্স ফ্রেই এবং মিডফিল্ডার বেহরামিকে ছাড়াই দল মাঠে নামাতে হয়েছিল হিজফেল্ডকে। ৩৫ মিনিটের মাথায়ই চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছেন ডিফেন্ডার ফিলিপ সেন্ডেরস। তার পরও খর্বশক্তির এই দলকেই মহাশক্তিধর স্পেনের বিপক্ষে জিতিয়ে দিয়েছেন গেলসন ফার্নান্দেজ। এই জয়ে পাওয়া তিন পয়েন্টকে ‘উপহার’ হিসেবে দেখছেন হিজফেল্ড, ‘আমরা এই তিন পয়েন্টের উপহার খুবই খুশিমনে নিলাম। শিরোপার অন্যতম বড় দাবিদারের কাছ থেকে তিন পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করার চেয়ে ভালো অনুভূতি আর কী হতে পারে! পয়েন্ট তিনটি আসলে খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল।’
স্পেনের বিপক্ষে সুইজারল্যান্ড যে কিছু আশা না নিয়েই মাঠে নেমেছিল, সে তাদের খেলাই বলে দিচ্ছিল। আক্রমণে না উঠে নিজেদের দুর্গটা টিকিয়ে রাখাকেই ব্রত করেছিল হিজফেল্ডের দল। এই রক্ষণাত্মক খেলা নিয়ে কোনো অনুশোচনাও নেই হিজফেল্ডের, ‘স্পেনের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক খেলতে গেলে আমরা বিরাট ব্যবধানে হেরে যেতাম। আমি খেলোয়াড়দের বলেছিলাম, বলের পেছনে ছুটে শক্তি খরচ না করে বরং নিজেদের ডিফেন্সটা শক্ত রাখতে। এরপর কাউন্টার অ্যাটাক করার জন্য অপেক্ষা করতে।’
শেষ পর্যন্ত হিজফেল্ডের কৌশল কাজে লেগেছে। এখন অপেক্ষা হন্ডুরাস ও চিলির বিপক্ষে হিজফেল্ডের জার্মান-মস্তিষ্ক থেকে কী বের হয়, সেটা দেখার। গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচ নিয়ে এখই ভাবা শুরু করে দিয়েছেন সুইজারল্যান্ড কোচ, ‘স্পেনের মতো দলকে হারানোর পর চিলি বা হন্ডুরাসের কাছে হেরে গেলে সেটা খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। এখন আমাদের খুবই শান্ত ও স্থির থাকতে হবে।

ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল ও দুঙ্গার বিশ্বকাপ

ব্রাজিল উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ২-১ গোলে জিতলেও (১৫ জুন) সাম্বা ছন্দের ফুটবলের জন্য পাগল দর্শকেরা মোটেও খুশি হতে পারেনি। আর্জেন্টিনার সঙ্গে তুলনাটা স্পষ্ট। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসি তো বটেই, পুরো আর্জেন্টিনা দল যেন একটা ঘোরলাগা ফুটবল খেলেছিল। অন্যদিকে দুঙ্গার ব্রাজিল বাহিনী ‘অজানা’ উত্তর কোরিয়ার গতি এবং প্রাণশক্তির কাছে ছিল তটস্থ। তাদের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় মাইকন ৫৫ মিনিটে সত্যিকার ব্রাজিলীয় ম্যাজিক দেখিয়ে প্রায় শূন্য দৃষ্টিসীমা থেকে বিস্ময়কর প্রথম গোলটি করলেও তাদের ‘মেসি’ অর্থাৎ কাকা ছিলেন একেবারে নিষ্প্রভ, যে রকম নিষ্প্রভ ছিলেন পর্তুগালের রোনালদো আইভরিকোস্টের বিপক্ষে। রবিনহো অবশ্য ছিলেন চমৎকার। ব্রাজিলের বিপক্ষে উত্তর কোরিয়া পাঁচজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলে, যা সচরাচর দেখা যায় না।
সে যা-ই হোক, খেলা শেষে মাইকন জাবুলানি বলটার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এতে বলটির প্রস্তুতকারক এডিডাস কোম্পানির খুশি হওয়ার কথা। রবিনহোর ছন্দ ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে ব্রাজিলের কোচ দুঙ্গা বলেছেন, ‘আমার সমস্যা হলো, আমার হস্তীসম অতিকায় স্মৃতিশক্তি। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে রবিনহোকে বাদ দিলেও আমি তাঁর প্রতিভার কথা স্মরণ রেখেছিলাম।’
১৯৯৪-এর বিশ্বকাপে দুঙ্গার নেতৃত্বেই ব্রাজিল তার চার নম্বর বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। তবে সেটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ফাইনাল, যার নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। এবং রবার্তো বাজ্জো তাঁর স্পট কিকটি মিস না করলে হয়তো ইতালিই চ্যাম্পিয়ন হতো।
‘শিল্পকে ছেড়ে জয়কে বড় করে দেখার’ অপরাধে অনেক সমালোচনা হয়েছে দুঙ্গার। কিন্তু এর পেছনের ইতিহাসটার মধ্যে খানিকটা ট্র্যাজেডি আছে। ১৯৭০ সালে মেক্সিকোয় ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় পেলে, কার্লোস আলবার্তো, গারসন, জেয়ারজিনহো, টোসটাও এবং রিভেলিনোর মতো অতুলনীয় ফুটবলশিল্পীদের কারণে। তাঁদের ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে ব্রাজিল ইতালির বিপক্ষে ৪-১ গোলে জেতে। গোল করেন পেলে, গারসন, জেয়ারজিনহো ও কার্লোস আলবার্তো। ইতালির পক্ষে বনিনসেঙ্গা। জুলেরিমে কাপ চিরতরে তাদের করে নেয় ব্রাজিল ’৫৮, ’৬২, ’৭০ পরপর তিনবার বিশ্বকাপ জেতার জন্য।
এর পর থেকে ধারণা করা হয়, ব্রাজিল মানে সাম্বার ছান্দসিক ফুটবল। ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলটাকে বলা হয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি দল, যারা বিশ্বকাপ জেতেনি। তাদের দলে তখন এডার, ফ্যালকাও, সার্জিনহো, সক্রেটিস এবং পেলের ছায়া যাঁর মধ্যে ছিল, সেই জিকো। সে সময় দ্বিতীয় রাউন্ডের ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ পড়ল ইতালি, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। আর্জেন্টিনাকে ইতালিও হারায়, ব্রাজিলও হারায়। ব্রাজিলের সঙ্গে খেলার সময় ম্যারাডোনা একটি কাণ্ড করেন। তিনি তখন ২১ বছরের দুর্ধর্ষ উঠতি ফরোয়ার্ড। স্বভাবতই ব্রাজিলের রক্ষণ ভাগ তাঁকে চেপে রাখে। বিরক্তির চরমে পৌঁছে ম্যারাডোনা একসময় ফালক্যাওয়ের পিঠে লাথি মারলে রেফারি সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে লাল কার্ড দেখান।
যা হোক, ব্রাজিল যেহেতু গ্রুপে গোলগড়ে এগিয়ে ছিল, তারা ড্র করলেও হয়ে যেত। ওদিকে ইতালির কোচ বিয়ারজোট একটি বাজি ধরলেন পাওলো রসিকে নিয়ে। রসি বাজির কেলেঙ্কারির জন্য তিন বছরের জন্য বহিষ্কৃত ছিলেন। কিন্তু শাস্তি কমিয়ে দুই বছরে আনা হলে তিনি বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত হন। ম্যারাডোনা, উরুগুয়ের ফ্রান্সিস কোলি বা রুমানিয়ার হাজ্জির মতো সারা মাঠ দাপিয়ে খেলা রসির কায়দা ছিল না। তাঁর অভ্যাস ছিল, ডি বক্সের বাইরে কোথাও ওত পেতে থেকে বল পাওয়ামাত্র জালে ঢুকিয়ে দেওয়া। খেলার পাঁচ মিনিটেই রসি গোল করলেন। সক্রেটিস সেটা ১২ মিনিটে ফেরত দেন। ব্রাজিলের ড্র হলেই চলত। কিন্তু সাম্বাশিল্পীরা তো আর গা বাঁচানো খেলায় অভ্যস্ত নন। তাঁরা গোল সামলে বসে রইলেন না। সেই ফাঁকে সুযোগসন্ধানী রসি আবার ২৫ মিনিটে গোল করেন। সে গোলও শোধ করে ব্রাজিল ৬৮ মিনিটে। তারা আবার আক্রমণে যায়, আর সে সুযোগে রসির তৃতীয় গোল এবং হ্যাটট্রিক আসে ৭৫ মিনিটে। রসির এ কৃতিত্বে মুগ্ধ ব্রাজিলের গোলরক্ষক বলটি জাল থেকে কুড়িয়ে নিয়ে হাসিমুখে তাঁর হাতে ফেরত দেন। ফল, ব্রাজিল আউট। ফুটবলপণ্ডিতেরা এ খেলাটিকে একটি শ্রেষ্ঠ খেলা বললেও এখনো বুঝতে পারেন না, কিসের নেশায় ব্রাজিল বারবার আক্রমণে যাচ্ছিল, যখন তাদের রক্ষণাত্মক হলেই চলত।
তাই দুঙ্গা সবার পছন্দের সাম্বা শিল্পরীতি বাদ দিয়ে জয় নিয়েই ফিরতে হবে—এ দর্শন বেছে নিলেন। দুঙ্গা বলেন, ‘আই লাইক উইনিং।’ কিন্তু ব্রাজিলীয় কোচ বাংলা জানলে তাঁকে রবীন্দ্রনাথের ‘জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না’ গানটি শোনানো যেত।

শ্রীলঙ্কার বিশাল রানের সামনে সেই নড়বড়ে ব্যাটিং

এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার ৩১২ রান তাড়া করতে নেমেছে বাংলাদেশ। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সংগ্রহ ২৯ ওভারে ৫ উইকেটে ১৪৩ রান। বাংলাদেশের তামিম ইকবাল ৫৩ বল খেলে ৫১ রান করে আউট হয়েছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংগ্রহ ৩৪ রান এসেছে জুনায়েদ সিদ্দিকীর ব্যাট থেকে। আশরাফুল ২৯ বলে ৯ রান করে নিজেদের ব্যর্থতার ধারা অব্যাহত রেখে আউট হয়ে গেছেন। মুশফিকুর রহিমও আউট হয়েছেন ৬ রান করে। অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ মিলে এখন দেশের সম্মান বাঁচানোর লড়াই করে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের দুজনের লড়াই কতক্ষণ স্থায়ী হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাকিব ২০ ও মাহমুদউল্লাহ ৬ রান নিয়ে উইকেটে রয়েছেন।
এর আগে ডাম্বুলার রানগিরি স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়াও হয়। উপুল থারাঙ্গা ৫৪, তিলকরত্নে দিলশান ৭১ ও কুমার সাঙ্গাকারা ৫২ রান করেন। শ্রীলঙ্কা সংগ্রহ করে ৪ উইকেটে ৩১২ রান। বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন শফিউল ইসলাম তিনি ২ উইকেট নিলেও খরচ করেন ৫৯ রান। এ ছাড়া আর সব বোলারই ছিলেন দারুণ খরুচে। দলের প্রধানতম স্ট্রাইক বোলার মাশরাফি বিন মুর্তজা ৭২ রান ব্যয়ে ছিলেন উইকেট শূন্য।