Thursday, August 21, 2014

‘মৃত্যু চাইনি, নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোতে চেয়েছি’ by মাহমুদ মানজুর

মৃত্যু চাইনি, নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোতে চেয়েছি। সত্যি বলছি পালানোর ইচ্ছে আমার নেই। কারণ, জীবন অনেক সুন্দর। যেটা এখন আরও বেশি উপলব্ধি করতে পারছি। এটা ঠিক আমি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছি। তবে সেটা নেহায়েত নিশ্চিন্তে একটু ঘুমের লোভে। বিলিভ মি। কথাগুলো বেশ আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বললেন হাসপাতাল থেকে সদ্য মুক্ত ন্যান্সি। মঙ্গলবার দুপুরে স্বামী নাজিমুজ্জামান জায়েদসহ ভাইয়ের রামপুরাস্থ বাসায় উঠেছেন ন্যান্সি। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মুঠোফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। যার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরেছেন মাহমুদ মানজুর
কেমন আছেন?
ভাল আছি। বেশ সুস্থ আছি। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। তবে শরীরটা এখনও বেশ দুর্বল।
এটাই স্বাভাবিক। ৬০টি ঘুমের বড়ির ধকল তো আর এতো সহজে যাওয়ার নয়
আমাকে নিয়ে আর কত মিথ্যা প্রচারণা চলবে বলুন তো? আমাকে কি আপনারা বাঁচতে দেবেন না? বিষণ্নতা কাটানোর জন্য ডাক্তারের পরামর্শে গেলো ক’মাস ধরে ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করতাম। তাই আমার কাছে দুই পাতা ঘুমের ট্যাবলেট ছিল। সেদিন মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না বলে জেদেরবসে সেখান থেকে আমি আট-দশটি বড়ি খেয়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ব্যাস এটুকুই। অথচ এই ক’দিনে কতরকম বাজার কাটতি গল্প প্রকাশ পেয়েছে পত্রিকা-টিভিতে! আমি তীব্র ঘৃণা জানাই এসব মনগড়া খবরের।
আট-দশটি হলেও কম নয়। কিন্তু হঠাৎ ঘুমের বড়ি সেবনের কারণ কি?
আপনারা অবশ্যই জানেন, গেল সাত আট মাস ধরে আমি কি ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগুচ্ছিলাম। এ নিয়ে মানবজমিনেই তো কয়েক দফা সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে। আমার স্টেজ শো দিনের পর দিন বাতিল হয়ে যায়। ফেসবুকে বসতে পারি না। একাউন্ট গায়েব হয়ে যায়। বিটিভিতে ব্ল্যাক লিস্টেড। আয়োজক-প্রযোজকরা বলে আমার গান নাকি চলে না। নানামাত্রিক রাজনীতির শিকার হচ্ছি আমি। এসব মিলিয়ে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার নিয়ে দারুণ হতাশায় ভুগছিলাম। তাই ঈদের পর এতো কষ্ট করে সাজানো মগবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। সেদিন (শনিবার) এসব ভেবে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়েছে। ঘুম আসছিল না। তাই হাতের কাছে পেয়ে মায়ের ঘুমের বড়ি গিলে ফেললাম।
এটা কি হতাশার জীবন থেকে বিদায় নেয়ার আশায়?
বিশ্বাস করুন আমি মৃত্যু চাইনি, নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোতে চেয়েছি। আমার রোদেলা-নায়লাকে ফেলে পালানোর সাহস আমার নেই। কারণ, জীবন অনেক সুন্দর। যেটা এখন আরও বেশি উপলব্ধি করতে পারছি। এটা ঠিক আমি ঘুমের বড়ি খেয়েছি। তবে সেটা নেহায়েত নিশ্চিন্ত একটু ঘুমের লোভে। বিলিভ মি।
এবার কি হতাশা কাটিয়ে নতুন করে ভাববেন?
ভাবতে তো হবেই। আমি তো এক জীবনে কারও কোন ক্ষতি করিনি। তবুও কেন মানুষ আমার ক্ষতিটা করে যাচ্ছে অনবরত। এসব মাথায় এলে তো আর ভাল লাগে না। রাতের পর রাত নির্ঘুম কেটে যায়। সত্যি বলি, আমি একটু ঘুমোতে চাই। দীর্ঘ নিশ্চিত ঘুম দিতে চাই। আমি নোংরা রাজনীতির শিকার হতে চাই না। একজন ক্ষুদ্র শিল্পী হিসেবে আমি আমার স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি চাই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে। আমি এটাও চাই না আমার সুখের পরিবারের দিকে মিডিয়াগুলো সন্দেহের দিকে তাকাক। আমার জন্য সবাই একটু দোয়া করবেন।

আক্রান্ত সাংবাদিক -পুলিশ গ্রেপ্তার করে, দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়

গত দুই দিনে ঢাকা, সিলেট ও বরিশালে তিনজন সাংবাদিক আক্রমণের শিকারে পরিণত হয়েছেন। ঢাকায় দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার বার্তা সম্পাদককে তাঁর কার্যালয় থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ওই পত্রিকা নাকি ‘মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রকাশ করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে’।
অভিযোগ গুরুতর সন্দেহ নেই। এ ধরনের অভিযোগের সামান্য ভিত্তি থাকলেও তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য হুমকি, সেটাও সত্য। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়েছে কি? তার আগেই সাংবাদিক গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানি উদ্বেগের বিষয়। কারণ, মামলার জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক সমাজ প্রথম থেকেই এই আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা করছিল। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রেস কাউন্সিলে যাওয়া যায়। দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকদের কেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে জড়ানো হলো, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা দরকার। অন্যথায় এ ধরনের মামলা ও গ্রেপ্তার স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত হিসেবেই সবাই ধরে নেবে।
দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সিেলটের বিশেষ প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করার পর ‘ধর্ষণ’ মামলা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সিলেটের সাংবাদিকেরা দাবি করছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে তাঁর করা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছে। পুলিশ অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন এর সুষ্ঠু তদন্ত ও পুরো ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে রাতে কাজ শেষে বাসায় যাওয়ার পথে দৈনিক সমকাল পত্রিকার বরিশাল ব্যুরোপ্রধানকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে জখম করেছে। পেশাগত কারণে শত্রুতার জের ধরে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথায় তাহলে আইনশৃঙ্খলা?
কিছু লেখার কারণে গ্রেপ্তার-মামলা-মোকদ্দমা-হামলা চালিয়ে যেভাবে সাংবাদিকতা পেশাকে অনিরাপদ করে তোলা হচ্ছে, তা দেশ বা সরকারের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। অতীতে সাংবাদিক দমনের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। এটা সবাই জানে।

বিচার বিভাগের সংসদীয় তদারকি! by কামাল আহমেদ

একজন নারী প্রথমবারের মতো প্রধান বিচারপতির আসনে আসীন হওয়ায় দেশজুড়ে যে ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি হওয়ার কথা, তার ঘোর তখনো কাটেনি। বছর না ঘুরতেই ওই প্রধান বিচারপতি এমন দুটি সিদ্ধান্ত দিলেন, যা সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা রূপায়ণে বাধার সৃষ্টি করল। ক্ষুব্ধ সরকারের রোষানলে পড়লেন সেই প্রধান বিচারপতি। শুরু হলো আদালতের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের টানাপোড়েন। সংসদে উত্থাপিত হলো প্রধান বিচারপতির অভিশংসন প্রস্তাব, যে সংসদে ক্ষমতাসীন দলের রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতির। তিনি নাকি বিদেশে টাকা পাচার করে ব্যাংকে গচ্ছিত রেখেছেন।

কেউ বিশ্বাস করছেন না ওই অভিযোগ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের নেতারা সোচ্চার হলেন। সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সংসদের অভিশংসন প্রস্তাবকে অবৈধ বলে রায় দিলেন। কিন্তু, সংসদ অভিশংসনের উদ্যোগ থেকে পিছু হটতে রাজি হলো না। বহির্বিশ্বে রীতিমতো বিস্ময়। কমনওয়েলথ, জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা, বিচারক ও আইনজীবীদের বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো দেশটির বিপন্ন বিচার বিভাগের পাশে দাঁড়াল, সরকারের প্রতি যত ধরনের চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব, তার সবই করল। কিন্তু, সংসদ পিছপা হয় না। দেশটির রাজনীতি যে পরিবারের নিয়ন্ত্রণে, সেই পরিবারপ্রধান তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। সুতরাং, সংসদে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন পালা সাঙ্গ হলো এবং রাষ্ট্রপতি তাঁকে পদচ্যুত করলেন। যেসব বিচারপতি প্রধান বিচারপতির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অনেককেই সরে যেতে হয়। রাষ্ট্রপতি নতুন একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন এবং নতুন চেহারায় পুনর্গঠিত হয় দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।
ওপরের এই বর্ণনার একটুও কিন্তু কল্পনা নয়। এখানে কোনো অতিরঞ্জনও নেই। বরং, শুধু ঘটনাক্রম তুলে ধরা হয়েছে, ঘটনাগুলোর বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়নি। যে দেশটিতে এটা ঘটেছে, সেটা আমাদের প্রতিবেশী এবং বঙ্গোপসাগরেরই একটি দ্বীপরাষ্ট্র—শ্রীলঙ্কা। এগুলোর সবই ঘটেছে ২০১২ সালের শেষ ও ২০১৩ সালের গোড়ার দিকে। ওই প্রধান বিচারপতির নাম শিরানি বন্দরনায়েক, যিনি ২০১১ সালের জানুয়ারিতে আদালতের সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। যে পরিবারটি এখন দেশটির রাজনীতিতে প্রায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি হচ্ছে প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের পরিবার। তাঁর আপন ভাই দেশটির সবচেয়ে প্রতাপশালী দপ্তর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদের অধিকারী।
দেশটিতে মন্ত্রী-সাংসদদের পদ ধরে রাখতে কী ধরনের আনুগত্য প্রয়োজন হয়, তার একটি নমুনা ২০১৩ সালের একটি পত্রিকা সাহস করে প্রকাশ করে দিয়েছিল৷ যাতে দেখা যায় যে দেশটির পর্যটনমন্ত্রী প্রেসিডেন্টের পায়ে মাথা ছোঁয়াচ্ছেন। শিরানি বন্দরনায়েক যেসব কারণে সরকারের রোষানলে পড়েন, তার মধ্যে দুটো খুবই উল্লেখযোগ্য। স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল কেন্দ্রীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরের একটি উদ্যোগ তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্তের কারণে বিলম্বিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন উন্নয়নমন্ত্রী, যিনি আবার প্রেসিডেন্টের সহোদরদের একজন। তারও আগে, প্রদেশগুলোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি আইনকে সুপ্রিম কোর্ট আটকে দিয়ে সিদ্ধান্ত দেন যে এসব ক্ষমতা প্রত্যাবাসনে প্রাদেশিক পরিষদগুলোর অনুমোদন লাগবে (বিবিসি, ৫ নভেম্বর ২০১২)।
একসময় ধারণা চালু ছিল যে শ্রীলঙ্কা হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যে আদর্শ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কিন্তু, সময়ের ব্যবধানে দেশটির অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাঁকে পরিবারতন্ত্রের এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করা ছাড়া বিকল্প নেই। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো তুলনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমার লক্ষ্য হলো, শুধু সেখানকার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শেখার আছে কি না, সেই প্রশ্নটি মনে করিয়ে দেওয়া।
অভিশংসন ধারণাটির উৎস হচ্ছে ব্রিটেন, যেখানে এই ব্যবস্থাটি প্রয়োগ হয় সাধারণত পাবলিক অফিস বা রাষ্ট্রীয় পদের অধিকারীদের ক্ষেত্রে। গুরুতর অসদাচরণ, কিংবা নৈতিক স্খলনের মতো অপরাধের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে শুনানি এবং বিচারের এই ব্যবস্থা মূলত এক সংসদীয় বিচারব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সর্বশেষ বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন লর্ডসভার সদস্য হেনরি ডুনডাস, ১৮০৬ সালে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ, হাউস অব লর্ডসে বিভিন্ন পেশার মধ্যে আইনজীবী ও বিচারপতিদেরও প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আর, হাউস অব লর্ডসের সদস্য বিচারপতিরা ল লর্ডস নামে পরিচিত হতেন এবং তাঁরা গত দশক পর্যন্ত সর্বোচ্চ আপিল আদালতের ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু, ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে সে ব্যবস্থার অবসান ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় সুপ্রিম কোর্ট, যার প্রথম আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় সেপ্টেম্বরে। অতীতে ল লর্ডসদের মধ্যে কাউকে অসদাচরণ বা আইন লঙ্ঘনের জন্য অভিশংসনের সম্মুখীন হওয়ার কোনো রেকর্ড কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর, বর্তমান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের জবাবদিহির প্রশ্ন নিয়ে কোনো আলোচনা গত দেড় দশকে ব্রিটিশ প্রচারমাধ্যমে আমার নজরে আসেনি। তবে, বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অপরাধমূলক কাজের তদন্তে সেখানে রয়েছে একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান, দ্য জুডিশিয়াল কনডাক্টস ইনভেস্টিগেশন অফিস। আইনমন্ত্রী (লর্ড চ্যান্সেলর) এবং প্রধান বিচারপতি (লর্ড চিফ জাস্টিস) যৌথভাবে এই দপ্তরের কার্যক্রম তদারক করে থাকেন। তবে, এই দপ্তর শুধু বিচারকদের ব্যক্তিগত আচার-আচরণসম্পর্কিত অভিযোগই তদন্ত করতে পারে, কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।
ব্রিটেনে হাইকোর্টের এক স্বাধীনচেতা বিচারপতির সঙ্গে মন্ত্রী, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের টানাপোড়েন নিয়ে গত দশকে বিবিসিতে প্রচারিত হয় খুব জনপ্রিয় এবং সফল একটি ধারাবাহিক, জাজ জন ডিড। ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চলা এই ধারাবাহিকটি আমার খুবই প্রিয়। কাল্পনিক ওই কাহিনিগুলোয় বিচারপতি ডিড প্রচলিত নিয়মনীতি ভেঙে সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে কীভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেন, তা-ই চিত্রায়িত হয়েছে ওই নাটকে। আমাদের বাংলাদেশি কোনো আদালতে কোনো বিচারপতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে অতীতে এতটা দুঃসাহস দেখিয়েছেন বলে আমার মনে পড়ে না। সাংবাদিকতার আগে আইন পেশায় সংক্ষিপ্ত বিচরণ এবং পারিবারিক কারণে আদালত ও বিচারব্যবস্থার বিষয়ে আমার আগ্রহ অনেক দিনের। আমার শঙ্কার উৎসও সেখানে। বিচারপতিদের জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রবর্তনের যে তড়িঘড়ি আয়োজন, তাতে ভবিষ্যতে কোনো বিচারপতি তাঁর পেশাগত দায়বদ্ধতা ধরে রাখতে সমর্থ হবেন কি না, সে প্রশ্ন এখন খুবই প্রাসঙ্গিক।
এ বছরের মে ও জুন মাসের দুটি দেশের দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা, বিশেষ করে একজন মন্ত্রীর জামাই জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার পটভূমিতে হাইকোর্ট তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে নির্দেশ দিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হন। তিনি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমে বিচার বিভাগ অযথা বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ করেন (সমকাল, ১৫ মে ২০১৪)। অন্য ঘটনাটি ব্রিটেনের। বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকা নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর বেআইনিভাবে অন্যের ফোনের রেকর্ড শোনার মামলায় পত্রিকাটির সাবেক একজন সম্পাদক অ্যান্ডি কুলসনকে দোষী সাব্যস্ত করেন সেখানকার এক বিচারিক আদালত। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাঁর সাবেক প্রচার উপদেষ্টা, ওই সম্পাদক অ্যান্ডি কুলসনের দোষী সাব্যস্ত করার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে কুলসনকে চিনতে ভুল করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান। অথচ, অ্যান্ডি কুলসনের বিরুদ্ধে তখনো বিচার শেষ হয়নি। আরও কয়েকটি অভিযোগ সম্পর্কে জুরিরা আলোচনা করছিলেন এবং সাজা ঘোষণাও বাকি আছে। বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা আদালত অবমাননার শামিল। সুতরাং, ওই বিচারক প্রকাশ্য আদালতে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের বিচারবুদ্ধির সমালোচনা করেন (গার্ডিয়ান, ২৫ জুন ২০১৪)। ওই বিচারিক আদালতের মর্যাদা আমাদের দায়রা আদালতের বিচারকের সমতুল্য।
বিচার বিভাগের জবাবদিহির বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়েই বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি প্রবর্তন এবং সেগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে ও হচ্ছে। সে কারণেই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বৈশ্বিক পরিসরে বেশ কিছু মৌলিক নীতিমালা অনুসরণের প্রশ্নে বৃহত্তর সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের মানবাধিকার কমিটির সুপারিশমালা। হিউম্যান রাইটস কমিটি ২০১২ সালের ৯ থেকে ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ১০৫তম অধিবেশনের প্রস্তাবে সুপারিশ করেছে যে ‘রাষ্ট্রের উচিত বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং শৃঙ্খলার বিষয়ে দায়িত্ব দিয়ে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।’ ওই কমিটি তার সুপারিশমালায় আরও বলেছে যে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করার জন্য রাষ্ট্রের উচিত বিচারিক আচরণ এবং শৃঙ্খলায় বিচারিক (জুডিশিয়াল) তদারকির ব্যবস্থা করা, সংসদীয় (পার্লামেন্টারি) তদারকি নয়।’
বিচারপতিদের নিয়োগ–প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক দূষণের অভিযোগ যখন প্রকট (আইনজীবী আমীর-উল ইসলামের সাক্ষাৎকার: ইত্তেফাক, ২০ আগস্ট ২০১৪), তখন তাঁদের অভিশংসনের আইন পাসে রাজনৈতিক আবেগকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ খুবই উদ্বেগজনক। ’৭২-এর সংবিধান পুনর্জীবনের যুক্তি যে পুরোটাই রাজনৈতিক আবেগকে ব্যবহারের বাসনাতাড়িত, তা ওই সংবিধানের অন্য কয়েকটি ধারার বিষয়ে নির্বিকার মনোভাবেই প্রতিফলিত হয়। বিচারপতিদের নিয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে ৪২ বছরেও কোনো আইন তৈরির ফুরসত মেলেনি আমাদের রাজনীতিকদের। কেননা, তাতে সময়ে-অসময়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চালানোর সুযোগ মিলেছে।
রাজনীতিকদের হাতে বিচারপতিদের জবাবদিহির ভার তুলে দেওয়ার বিপদ বহুমাত্রিক। প্রথমত, আমাদের প্রধান দলগুলোর রাজনীতি পুরোটাই ব্যক্তি তথা পরিবারকেন্দ্রিক। যে কারণে সংসদের স্পিকারের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী একজন বহুল আলোচিত বিচারপতির বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমালোচনা সত্ত্বেও কোনো প্রস্তাব উত্থাপনও সম্ভব হয়নি। সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্যের ব্যবস্থায় সংসদীয় জবাবদিহির অর্থ দাঁড়াবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি। তদুপরি, সংবিধানের ৭০ ধারা তো রয়েছেই। আর, দ্বিতীয় বিপদ হলো, যেসব রাজনীতিক বিচার এড়িয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ঐতিহ্য গড়েছেন, তাঁরাই এখন হবেন বিচারপতিদের আচরণের যথার্থতা বিচারকারী।

কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

‘নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন’ by আলী ইমাম মজুমদার

দুর্ঘটনা যেকোনো দেশে যেকোনো ক্ষেত্রে যেকোনো সময় ঘটতে পারে। তবে এর আশঙ্কা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া বিশ্বজনীন নীতি। এর পরও যদি তা ঘটে, তার দায় নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারও অবজ্ঞা-অবহেলায় এটা ঘটে থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনার কথা। অথচ আমাদের দেশে যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনায় দায়িত্ব নির্ধারণ আর দায়ী ব্যক্তির শাস্তি বিধান হয় না বললেই চলে। এ ছাড়া এক কর্তৃপক্ষের অন্য কারও ওপর দায়িত্ব চাপানোর প্রচেষ্টাও বেদনাদায়কভাবে লক্ষণীয়। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে প্রচেষ্টা না নিয়ে এবং এর জন্য তাদের কোনো দায়িত্ব নেই বলেও আগাম নোটিশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। সচেতন ব্যক্তিরা একে অস্বাভাবিক বললেও আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই এটা বাস্তব।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সম্প্রতি রেলক্রসিংয়ে একটি চলমান বাসকে ধাবমান ট্রেন ধাক্কা দিলে ১১ জন নিহত ও ৪০ জনের বেশি আহত হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে তোলপাড় হয়েছে। রেলক্রসিংগুলো নিয়ে হয়েছে বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে সারা দেশে রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা দুই হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে মাত্র ৩৭১টিতে গেট ও প্রহরী আছেন। অর্থাৎ দুই হাজার ১৭০টিই অরক্ষিত। অবশ্য কালীগঞ্জের ক্রসিংটিতে গেট আছে, গেটম্যানও আছেন; কিন্তু গেটটি খোলা রেখে গেটম্যান ছিলেন লাপাত্তা। এমনটা মাঝেমধ্যেই হয়। অন্তত এ ক্ষেত্রে রেলক্রসিংটিকে অবৈধ বা অরক্ষিত বলা যাবে না। এভাবে চাকরিরত ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলা অনেক হতাহতের কারণ ঘটিয়েছে। আলোচ্য ঘটনার পর পর স্টেশনমাস্টার আর গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরাবর তা-ই হয়। তদন্তও হচ্ছে। দায়ী ব্যক্তি সরল বিশ্বাসে এ ধরনের কাজ করেছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তাই অতি দ্রুত দায়িত্ব নির্ধারণ করে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি দণ্ডবিধির আওতায় ফৌজদারি মামলা করা দরকার। কিন্তু হবে কী? এ ধরনের ঘটনায় মামলা তো হয় মূলত বিধ্বস্ত গাড়িচালকের বিরুদ্ধে, মোটরযান আইনে। সে আইনে নির্দেশিত সতর্কতা অবলম্বন না করায় চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। কিন্তু যাদের গেট বন্ধ করার কথা, তারা তা না করায় তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা সংগত। আর অবৈধ বাদ থাকুক, বৈধ ক্রসিংগুলো যারা বছরের পর বছর অরক্ষিত রাখছে, তাদের তো কোনো কালেই কিছু হয় না।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, রেলওয়ে স্বীকৃত ক্রসিং এক হাজার ৪১৩ আর অস্বীকৃত বা অবৈধ এক হাজার ১২৮। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক তৈরির সময় রেল কর্তৃপক্ষের সম্মতি না নিয়ে যে ক্রসিংগুলো করেছে, সেগুলোকে বলা হয় অবৈধ। অবশ্য স্বীকৃত বা বৈধ এক হাজার ৪১৩টি ক্রসিংয়ের মধ্যে প্রহরী নেই এক হাজার ৪২টিতে। কোনো কোনো অরক্ষিত ক্রসিংয়ে রেলওয়ের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এগুলোয় লেখা থাকে, ‘এখানে কোনো গেটম্যান নাই। দেখিয়া-শুনিয়া চলিবেন।’ কোথাও বা ‘এখানে কোনো গেটম্যান নাই। পথচারী ও সকল যানবাহন চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং যেকোনো দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে নিজেই বাধ্য থাকিবেন।’ বিস্ময়কর হলেও সত্য, এরূপ চলছে প্রায় তিন যুগ ধরে। শুধু দিনে দিনে বেড়ে চলেছে এ ধরনের ক্রসিংয়ের সংখ্যা। এসব বিষয়ের দায়িত্বে থাকা রেলপথ মন্ত্রণালয়েরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতায় তারা প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে পারছে না। রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে যারা এ ক্রসিংগুলো করেছে, তারাও এ কাজের পক্ষে নানা যুক্তি দেখায়। এসব রাস্তাঘাট জনস্বার্থে হয়েছে, এমনটা বলা যায়। তবে ব্যক্তিগত কলকারখানার সামনের রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ক্রসিং আছে বলেও জানা যায়। তবে সব পক্ষই জেনেশুনে এ নিরাপত্তাব্যবস্থাটিকে উপেক্ষা করছে, এ অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা সমস্যাটিকে প্রকট করে তুলেছে।
রেলওয়ে এ দেশে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এখন এর আওতায় রয়েছে দুই হাজার ৮৫৫ কিলোমিটার রেলপথ। এ ভূখণ্ডে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে রেলের যাত্রা শুরু হয় ১৮৬২ সালে। ১৮৯৫ সালে এর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কাছে। আবার ১৯৪২ সালে তা চলে আসে সরকারি দায়িত্বে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রেলওয়ে ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে একটি সংস্থা। ১৯৬১ সালে এটা প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়। ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইন দিয়ে চলছে সংস্থাটি। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এ বছরের মে মাস পর্যন্ত গত সাত বছরে রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ২০১ জন। ঘটনার সংখ্যা ২৬৪। এ অবস্থা চলতে থাকলে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়বে। আমাদের সড়ক পরিবহন খাত কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন বললে দোষ ধরা যাবে না। এসব গাড়িচালকের বেপরোয়া আচরণে নিয়মিত হতাহতের ঘটনা ঘটে চলেছে। রেললাইন পার হওয়ার সময় কাছে গিয়ে থেমে ডানে-বাঁয়ে দেখার শিক্ষাই বা কজন চালকের আছে। লাইসেন্সপ্রাপ্তির জন্য এ ধরনের শিক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও তা যাচাই করা হয় বলে মনে হয় না। এমনকি লেখাপড়া না জানা লোককেও লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব যখন দায়িত্বশীল মহল থেকে আসে, তখন পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে আছে, তা বিশদ বিশ্লেষণের আবশ্যকতা নেই।
এ দেশে যাতায়াতব্যবস্থায় নৌপথের পরপরই রেলপথ স্থান নিয়েছিল। যাত্রী চলাচলসহ মালামাল পরিবহন—সব কাজেই ছিল এর ব্যবহার। দু-একটি দুর্ঘটনাও সময়ে সময়ে ঘটেছে। তবে মোটামুটি নিরাপদই মনে করা হতো রেল যোগাযোগব্যবস্থাকে। সময়সূচি অনুসরণেও বিচ্যুতি কমই ঘটত। স্টেশন, ইঞ্জিন, বগি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হতো নিয়মিত। রেলপথের সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ চলমান ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে থেকেই রেল পরিবহনব্যবস্থা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে অধিক তৎপর হয় সরকার। ততোধিক অমনোযোগী হয় রেল যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়ে। রেলওয়ে ছিল অগ্রসরমাণ সড়ক পরিবহনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। যেভাবেই ঘটুক, স্থলপথে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রেল যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। দীর্ঘদিনের অবজ্ঞা ও অবহেলায় রেললাইন অনেক ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক। নিয়মিত ও পরিমিত পাথর ফেলা হয় না। সেতু-কালভার্টগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খুব দুর্বল। বগি ও ইঞ্জিনগুলোর বেশির ভাগই নড়বড়ে। স্টেশনগুলোর হতশ্রী অবস্থা। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয় না। আর অন্য খাতের মতো এখানেও দুর্নীতির ছড়াছড়ি। মালামাল পরিবহনেও এটা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী কনটেইনারের ১০ শতাংশও টানতে পারছে না রেলওয়ে। অথচ কনটেইনার পরিবহনই এর আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক পরিত্রাণ পেতে পারে এসব মালামাল বহনের চাপ থেকে। ব্রিটিশ–ভারত থেকে পাওয়া একটি রেলওয়ে ব্যবস্থাকে ভারতের মতো আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ দূরে থাকুক, আমরা ধরেও রাখতে পারছি না। বরং বেশ কটি শাখা লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
রেলক্রসিংয়ে অযাচিত দুর্ঘটনার আশঙ্কা দূর করতে বৈধ-অবৈধ সব ক্রসিংয়ে গেট তৈরি, সিগন্যালিং ও প্রহরীর ব্যবস্থা করা আবশ্যক। প্রয়োজন তাদের কাজ নিবিড় তদারকির। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যারা এ ধরনের ক্রসিং করেছে, তাদের থেকে উপযুক্ত টাকা নিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেলওয়েকে করতে হবে। আর টাকা না দিলে এসব ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়াই হবে সংগত। এগুলোসহ সব রেলক্রসিং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা সরকারকেই সংস্থান করতে হবে। সে জন্য রেলে ব্যাপক বিনিয়োগ করে একে আকর্ষণীয় ও লাভজনক পরিবহন হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার আবশ্যকতা রয়েছে। অপচয় ও দুর্নীতি হ্রাসে দৃশ্যমান উদ্যোগ দরকার। ফলে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পেলেও তা যুক্তিসংগত হবে। বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে রেল চালানোর দাবি কেউ করে না। আর ছিটেফোঁটা বিনিয়োগে একে লাভজনক করা সম্ভব হবে বলে অনেকে মনে করে না।
পাতাল রেল, মেট্রো রেল—এগুলো সম্পর্কে আমরা অনেক শুনছি। অবশ্যই প্রয়োজন আছে। করতে জোর প্রস্তুতি নেওয়া হোক, এটা সবাই চায়। তবে খুব বেশি করে চায় বিদ্যমান রেল যোগাযোগব্যবস্থাটির হতশ্রী অবস্থা থেকে উত্তরণ। আর একে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করা। রেলক্রসিং সড়কপথে পাড়ি দেওয়ার ব্যাপারটি শুধু ‘নিজ দায়িত্বের’ ওপর ছেড়ে না দিয়ে রেলের দায়িত্বেও রাখা যুক্তিসংগত।

আলী ইমাম মজুমদার
: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

বাঙালির বিদ্যাভ্যাস ও পরীক্ষায় পাস-ফেল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যুগে যুগে বাঙালির আনন্দ-উল্লাস ও দুঃখ-শোক প্রকাশের ধরন বদলায়। ১৯৪৪ বা ৫৪ কিংবা ৬৪-তে বাঙালি যে ভঙ্গিতে আনন্দ-উল্লাস করত, ২০০৪ বা ২০১৪-তে সে ভঙ্গিতে করবে না। ভিজ্যুয়াল মিডিয়া আজ মানুষকে বদলে দিয়েছে। কারও আনন্দ-উল্লাস প্রকাশের দৃশ্যও আজ একটি পণ্য। জীবনের সবকিছুই—সুখ ও দুঃখ—আজ বিক্রয়যোগ্য পণ্য।
নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী তর্জনী ও মধ্যমা ফাঁক করে ইংরেজি ‘ভি’ চিহ্ন দেখাতেন। এখন পরীক্ষায় যারা ভালো ফল করছেন, তাঁরাও আনন্দ প্রকাশের অতীতের সব পদ্ধতি বাতিল করে সম্মিলিতভাবে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। আনন্দ একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, কারও কারও আনন্দ-উল্লাসের দৃশ্য পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। রেডিওর সম্প্রচার চোখে দেখা যায় না বলে আজ তার দাম নেই।
আনুষ্ঠানিক হাসি-কান্না শুধু বাঙালিরই রয়েছে। আনুষ্ঠানিক কান্না ও শোক প্রকাশের জন্য বাঙালির প্রয়োজন শুধু একটি জুতসই উপলক্ষ। কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুর সময় হাসপাতালের বারান্দায় তাঁর অনেক গুণগ্রাহী ও কবি-সাহিত্যিক ছিলেন। কবির শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের কথা শুনে নয়, ঘণ্টা খানেক পরে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা তাঁর দিকে আসায় শামসুর রাহমানের সমসাময়িক এক কবি-কথাশিল্পীর কান্নার বেগ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। টিভি ক্যামেরা সরে যেতেই তাঁর শোক প্রশমিত হয়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা তাঁদের শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। সেই পদ্ধতিটিই মোটামুটি চালু রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। গত ৫০ বছরে তার কিছু সংস্কার হয়েছে, তবে অধঃপতনই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যাচর্চা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পাস ও ফেল। বালক-বালিকাকে বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে পাঠদান করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পর তারা কতটা বিদ্যা অর্জন করেছে, তার একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেই পরীক্ষায় কেউ উত্তীর্ণ হয়, কেউ বা অকৃতকার্য। যার প্রচলিত নাম পাস বা ফেল। ফেলের কোনো ডিভিশন বা গ্রেড নেই, কিন্তু পাসের ডিভিশন বা গ্রেড রয়েছে। এই উপমহাদেশে পরীক্ষায় অতি ভালো ফলাফল করে কেউ আনন্দ-উল্লাস করতে গিয়ে বুক ফেটে মারা যায়নি। কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করে গত ১০০ বছরে আত্মহত্যা করেছে অন্তত হাজার খানেক ছাত্রছাত্রী। দুঃখে হার্টফেল করে মারা গেছেন বহু বাবা-মা।
আশির দশকের প্রথম দিকে একবার স্ত্রী-ছেলেমেয়েকে নিয়ে গ্রামে যাচ্ছিলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। গ্রামের ভেতর দিয়ে সড়ক। এক বাড়ি থেকে সমস্বরে কান্নার রোল শোনা গেল। সেটি আমার পরিচিত বাড়ি। মনে হলো, কেউ মারা গেছে। গেলাম বাড়ির ভেতরে। শুনলাম, ওই বাড়ির এক শরিকের ছেলেটি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। পাস করতে পারেনি। আগেরবারও সে ফেল করেছে। ছেলেটির বাবা অনেক আশা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলেন, শুনবেন, ছেলে এবার পাস করেছে। ফেল করার কথা শুনে বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরছিলেন। কেউ একজন বলল, গরু বাঁধার একটি মোটা দড়ি নিয়ে তাঁর ছেলেকে গ্রামের প্রান্তে গাছপালার দিকে যেতে দেখেছে। ফেলের শোকের মধ্যে ছেলের দড়ি হাতে আম-জাম বাগানের দিকে যাওয়ার কথা শুনে তিনি রাস্তার মধ্যেই লুটিয়ে পড়েন। ধরাধরি করে তাঁকে বাড়িতে আনা হয়। অবস্থা খুবই খারাপ। আমি যখন দেখি, তখন তিনি অচেতন। এক দিন কি দুই দিন পর ওই বাড়ি থেকে দ্বিতীয়বার কান্নার রোল শোনা যায়। ফেল করা ছেলে নয়, তার বাবাই চিরবিদায় নিয়েছেন।
এবার এসএসসি ও এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য ১৫ থেকে ১৬টি ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এসব আত্মহত্যার কথা শুনে খুব খারাপ লাগে। মনে হয় আমরাই—আমাদের সমাজ—তাদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী। আমরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলকে অতি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে হইচই করি বলেই তারা লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিদ্যার্জন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বৈষয়িক বলেই পাস-ফেল নিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। দেশে গণতন্ত্র নেই, কিন্তু পাস-ফেল একটি রাজনৈতিক বিষয়।
নব্বইয়ের শুরুতে আজকের কাগজ-এ কলাম লিখতাম। তখন আমি কৌতূহলবশত একটি সমীক্ষা করে লিখেছিলাম। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত কুড়ি বছরে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েটে যাঁরা প্রথম ১০ জনের মধ্যে ছিলেন, তেমন ২০০ জন কর্মজীবনে কে কী হয়েছিলেন, তার অনুসন্ধান করেছিলাম। যাঁরা ম্যাট্রিক ও আইএ, আইএসসি ও আইকমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়েছিলেন, তাঁদেরও খোঁজ করেছিলাম। ৩০০-এর মধ্যে ১১ জন জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, যদি মন্ত্রণালয়ের সচিব বা পিডব্লিউডি/ সড়ক ও জনপথের প্রধান বা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হওয়া সাফল্যজনক বিষয় হয়ে থাকে। কেউ কেউ শিক্ষা বিভাগে গিয়েছিলেন, কিন্তু সমাজে তাঁদের দাম ছিল না।
পরীক্ষায় ভালো ফল করা খুবই গৌরবের কথা। কিন্তু ফেল করলেই জীবন ব্যর্থ হয়ে গেল, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলায় ফেল করেছিলেন। ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিএ পরীক্ষা প্রবর্তন করে। প্রথম বছর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও বার্মা (মিয়ানমার) থেকে ১৩ জন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পাস করেছিলেন দুজন এবং ফেল করেছিলেন ১১ জন। টেনেটুনে দ্বিতীয় বিভাগে যে দুজন পাস করেছিলেন, তাঁরা হলেন যদুনাথ বসু ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকারী গ্র্যাজুয়েট যদুনাথ বাবু কোথায়? আর বঙ্কিমচন্দ্র কোথায়?
বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু প্রথমবার বিএ পরীক্ষায় ফেল করেন। তাঁর পরবর্তীকালের বিএসসি, এমএসসি, ডিএসসির কাজ ঈর্ষণীয়। বিশ শতকের উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক স্যার নীলরতন সরকার (আমাদের বাংলাদেশের মানুষ) কোনোরকমে বিএ পাস করে চাতরা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছিলেন। তাঁর মনে হলো, মানুষের সেবা করতে ডাক্তারি পড়া দরকার। স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৮৮৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। শুনেছি, তাঁকে লন্ডনে গিয়ে এমডি পড়ার জন্য এক অজ্ঞাত হিন্দু বিধবা অর্থসাহায্য করেছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কুমুদশঙ্কর যক্ষ্মা হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল প্রভৃতি। তিনি ছিলেন সর্বভারতীয় মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। মৃত্যুর পর তাঁর নামে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ’। প্রথম জীবনে এন্ট্রান্স, আইএ, বিএ পরীক্ষায় তেমন ভালো ফল করেননি। কোনো পরীক্ষায় পাস করে ‘ভি’ চিহ্ন দেখানোর সৌভাগ্য স্যার নীলরতনের হয়নি। কিন্তু তাঁর মেধা ছিল, সংকল্প ছিল আর ছিল মানুষ ও জাতির কল্যাণ করার অনমনীয় স্পৃহা।
১৮৪০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত বাঙালির শিক্ষার মান ছিল বিশ্বমানের, নিশ্চয়ই ইউরোপের মতো নয়, কিন্তু অধিকাংশ কমনওয়েলথ দেশের চেয়ে নিচে নয়। উন্নত ছিল সেকালের কি স্কুল-কলেজের শিক্ষা, কি মাদ্রাসার শিক্ষা৷ উপমহাদেশের প্রথম শ্রেষ্ঠ মুসলমান পদার্থবিজ্ঞানী মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন মাদ্রাসার ছাত্র। প্রাবন্ধিক-কথাশিল্পী আবুল ফজল এবং ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান মাদ্রাসায় পড়েছেন। কলকাতা ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ছিল আন্তর্জাতিক মানের। শুনলে অনেকে অবাক হবেন, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার একজন প্রিন্সিপাল ছিলেন হিন্দু। বহু মেধাবী ছাত্র বেরিয়েছেন আলিয়া মাদ্রাসা ও অন্যান্য মাদ্রাসা থেকে। এখনকার মাদ্রাসাশিক্ষার মান সম্পর্কে আমার মতো অল্প শিক্ষিত লোকের ধারণা নেই, কামরাঙ্গীরচরের মানুষ ভালো জানেন।
গতবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ঢাকার কয়েকটি নামী স্কুলে গিয়েছিলাম। একটি স্কুল ও কলেজে গিয়ে দেখি, মেয়েরা হাসাহাসি করে স্বাভাবিকভাবে গল্প-গুজব করছে। এসব পাবলিক পরীক্ষা জীবনের দরজা খুলে দেয়। এর পরই উচ্চতর শিক্ষাজীবনে তারা প্রবেশ করবে। এ এক মহা-আনন্দের দিন। গাছতলায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। এমন সময় বিকট হইচই দল বেঁধে। লাফালাফি, হট্টগোল। পেছনে তাকিয়ে দেখি, তিনটি টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাঁদের পক্ষেও কঠিন হয়ে গেল। তারা কোমলমতি। তাদের দোষ নেই। যেখানে মন্ত্রী ও বড় বড় দলের নেতারা ক্যামেরা দেখলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা তা থেকে শিখবে না কেন?
এখন যাঁরা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেন, তাঁদের প্রায় সবাই সাত-আট বছরের মধ্যে কর্মজীবনে প্রবেশ করবেন। কেউ হবেন চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী-স্থপতি, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা প্রভৃতি। কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বর্তাবে তাঁদের ওপর। কেউ হবেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সেনাবাহিনীর জেনারেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসক, পোশাকশিল্প ও কলকারখানার মালিক। যাঁরা কোনো কিছুই হতে পারবেন না, তাঁরা পত্রিকায় কলাম লিখবেন। যাঁরা খুব বুদ্ধিমান, তাঁরা সরকারকে প্রবল প্রশংসা করে লিখবেন। সরকারের প্রতিটি কাজকে সমর্থন দেবেন। আহাম্মক গোছের যাঁরা, তাঁরা সরকারের সব ব্যাপারেই সমালোচনা করবেন।
আজকের তরুণ-তরুণীদের কেউ রাজনীতিতে যাবেন। প্রথমে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনে। তারপর যুব সংগঠনে। তারপর উপজেলা চেয়ারম্যান বা সংসদ সদস্য। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী। কারও দুদকে ডাক পড়বে। সবার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। তবে এ কথাও বলি, যে শিক্ষা আপনকে পর করে, শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সে শিক্ষা নিয়ে কী লাভ? যে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করে একটি বছরও তাঁর গ্রামের মানুষকে চিকিৎসা দেবেন না, তাঁর ভালো ফলাফলে গ্রামের মানুষের অহংকার করার কী আছে?
বাংলাদেশকে অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের দ্বারা একটি মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত করার দায়িত্ব আজ যাঁরা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তাঁদের। তখন সারা দেশের মানুষ আনন্দ করবে। সে আনন্দ ক্যামেরানির্ভর নয়। নির্মল আনন্দ। বাধ্যতামূলক আনন্দ-উল্লাস নয়। নির্মল আনন্দ আপনা-আপনি উদ্ভাসিত হয় চোখেমুখে স্বর্গীয় আভার মতো। সুদর্শন গুটি কয়েকের মধ্যে কৃত্রিম আনন্দ-উল্লাস নয়, ১৬ কোটির চোখেমুখে সেই আনন্দের আভা দেখতে চাই।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

ন্যান্সি ও তাঁর মনের এক্স–রে by ফারুক ওয়াসিফ

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ন্যান্সির বড় অমঙ্গল ঘটেনি, এটা দারুণ খুশির ব্যাপার। অমঙ্গল হলে খুব দুঃখের কারণ ঘটত। এই একটি ব্যাপারে অন্যের ব্যর্থতায় আমরা খুশি হব, বাহবা দেব। মনেও রাখব এ এক ট্র্যাজিক ঘটনা; একজনের ব্যক্তিগত বিপর্যয় অন্য কারও মশকরার উপলক্ষ হতে পারে না। আত্মহত্যার চেষ্টাকারী অথবা আত্মহত্যাকারীকে দোষ দেওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। কিন্তু এই কলঙ্কের কালিটা কার হাতে? কাউকে কেন আত্মহত্যায় বাধ্য বা প্ররোচিত হতে হয়, ন্যান্সির খবরের উষ্ণ সেনসেশনাল আমেজ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাহলে কি ধরেই নেওয়া হয়েছিল ন্যান্সি আর ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফিরবেন না? তাঁর পরিবার আছে, দুটি শিশুসন্তান আছে। এমন উপস্থাপন এদের জন্যও কষ্টের। আত্মহত্যা–চেষ্টার সংবাদ দিতে গিয়ে সাংবাদিকতা নিজেই আত্মহত্যা করলে আর যাব কোথায়!

কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা অসুস্থ ন্যান্সির এমন ছবি ছেপেছে, যা তিনি সুস্থ অবস্থায় কখনোই তুলতে দিতেন না। বেশ কটি খবরের কাগজে, টেলিভিশনে এবং ফেসবুক ও ব্লগ ফোরামে ন্যান্সিবিষয়ক খবরে গুজব ও সমালোচনার প্রতিযোগিতা চলছিল। তাঁর অসুস্থকালীন ভিডিও ও ছবি প্রচার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দোষে দুষ্ট হতে পারে। তাঁর খুবই নাজুক অবস্থার ঘটনা ও ছবির বিশেষ অ্যাঙ্গেল আবিষ্কারের মধ্যে আঙুল-তোলা অভিযোগ আছে। কোনো মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে ঝুঁকতে থাকেন, তখন তাঁর দরকার পাশে থাকার মানুষ; নীতি বা যুক্তির মোল্লা-মাতবরি নয়। এসব তাঁর ভক্তদেরও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। তাই আত্মহত্যা বা তার চেষ্টার খবর যেন কারও জীবনকে আরও কঠিন না করে। এটা অবশ্যই খবরের যোগ্য বিষয়, তবে পরিবেশনে কিছু বিষয় মানা দরকার।

সংবাদ-নৈতিকতাই সাংবাদিকতা। খবরে কেমন বার্তা যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। পাঠকের অবশ্যই আগ্রহ থাকবে জানার, কিন্তু সীমাটা ঠিক করে নিতে হবে সাংবাদিকদেরই। কোন আগ্রহ সংগত আর কোনটা অসংগত, সে বিষয়েও বোঝাপড়া লাগবে। খবর আত্মহত্যা কমাতে যেমন পারে, তেমনি পারে উসকানি দিতেও। সন্ত্রাস, ধর্ষণ, আত্মহত্যার সংবাদের প্রতি গণমাধ্যমের অতি-উৎসাহ কাউকে সন্ত্রাস, ধর্ষণ অথবা আত্মঘাতের ‘সংবাদ’ হতে উৎসাহী করতে পারে। একটি আত্মহত্যার অতি প্রচার, একই অবস্থায় থাকা অনেককে একইভাবে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিতে পারে। যৌন নিপীড়ন ও সামাজিক অসম্মানে আত্মহত্যার ঢল আমরা দেখেছি। পৃথিবীর অনেক দেশেই আত্মহত্যাকারীর নাম, আত্মহত্যার বিশদ পদ্ধতি, ব্যবহৃত পদার্থ ও তার পরিমাণ এবং অন্তিম চিঠি প্রকাশে নৈতিক বাধা আছে। বিখ্যাত না হলে আত্মহত্যাকারীর ছবি দেওয়া উচিত না। বিখ্যাতদের বেলায়ও ছবি বা ভিডিওকে হতে হবে স্বাভাবিক অবস্থার। আত্মহত্যার চেষ্টা আর আত্মহত্যার মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। ‘আত্মহত্যা-চেষ্টা’র খবর যত কম হবে, ততই এর প্রকোপ কমবে বলে ভাবা হয়। মানুষের শরীর ও মনের নিজস্ব কিছু অধিকার আছে: এই দুইয়ের কোনো কিছুকে ইচ্ছার বাইরে জনসমক্ষে আনলে ভেতরের মানুষটা বিপন্ন বোধ করতে পারে। যখন কেউ মানসিক ও শারীরিকভাবে অপরের সাহায্য/ সহমর্মিতা/চিকিৎসার মুখাপেক্ষী; তখন তাঁর দুর্বলতাকে জনসমক্ষে আনা ঠিক নয়। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার ট্রমা কাটিয়ে ওঠায়ও এগুলো বাধা।

খাদের কিনারে অনেকেরই জীবন চলে। এর মধ্যে কেউ পিছলে দাগের বাইরে চলে গেলে, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে না পারুন, আরও কমজোরি করে দেবেন না। এসব অসংগত খবরে তাঁর যে ভাবমূর্তি তৈরি হবে, তা তাঁর উঠে দাঁড়ানোর পথের কাঁটা। ফলে আত্মহত্যা-কাল তাঁর আর ফুরাবে না। এ রকম দীর্ঘ আত্মহত্যা-কাল পার হতে হতে মাইকেল জ্যাকসন পড়ে গেছেন। হলিউডি অভিনেতা রবিন উইলিয়ামসও রেহাই পাননি উৎকট আগ্রহ থেকে। যেকোনো অনামা মানুষ যতটা নজরদারি, শাসানো ও চরিত্রবিচারের বিছাতু থেকে আবরু পায়, জনপ্রিয় তারকারা তা পান না। অথচ তাঁরাও মানুষ। তাঁদেরও পরিবার-পরিজন থাকে, দুর্বলতা ও সংকট থাকে। সেসবকে খোঁচানো গণপিটুনির মতোই গণনিষ্ঠুরতা।

মৃত্যু প্রসঙ্গটাই শোকের। পবিত্রতার চাদরে সব মৃত্যুকেই ঢেকে রাখা উচিত। আত্মহত্যা-চেষ্টার জন্য কাউকে বিড়ম্বিত করার আগে ভাবা উচিত, মৃত্যু প্রসঙ্গকে পবিত্রতা ও শোকের ঢাকনার বাইরে আনা ঠিক কি না? জীবনের মতো আত্মহত্যাও সমাজ-সংসারের শাসনের অধীন। সেই শাসন যদি কেবল অভিযোগ করে, ছোট চোখে দেখে, তাহলে আত্মহত্যাকাতর মানুষ কোথায় যাবে? ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়’ লেখা থাকে অন্তিম চিঠিতে। তা হলেও দায় থাকে। আত্মহত্যা কারও করুণ-কঠিন বাস্তবতার শেষ ‘অ্যাকশন’। আত্মহত্যার চেষ্টার মধ্যে যে চেতনা অবশ করা দুঃখ দেখে না, মৃত্যু তার কাছে ঘটনামাত্র, জীবনের পরাজয় সে দেখে না।

ব্যক্তির জটিল ও গোপনীয় মনের এক্স-রে করা সাংবাদিকের কাজ না। কীভাবে এ রকম বিপর্যয় এড়ানো যায়, সেই আশার জায়গাগুলো তুলে ধরাই তাঁর দায়িত্ব। আত্মহত্যার কারণগুলো চরিত্রগতভাবেই গোপনীয়। অনেক সময় এর ব্যাখ্যা মেলে না। তাই আত্মহত্যা বিষয়ে সেনসেশনাল হওয়ার বদলে এ নিয়ে কথা বলার ধরনে যত্নবান হওয়া দরকার। আত্মহত্যার প্রাইভেট কারণ ঘেঁটে এটাই জানবেন, এর জন্ম পাবলিক সংস্কৃতির কারখানায়। সমাজ-সম্পর্কের মহাসড়কে এর যাত্রা নিয়ত চলমান। মানুষ বসবাস করে সামাজিক সম্পর্কের জালের মধ্যে। এই জাল তাকে ভরসা দেয়, আশা দেয়। যার সেই জাল ছিঁড়ে যায় অথবা সমাজ যাকে সেই জালের বাইরে ফেলে দেয়, তার পক্ষে একা একা উঠে দাঁড়ানো কঠিন। সেখানেই সমাজের দায়িত্ব তাকে আবার তুলে আনার।

আইনের দিক থেকে ঠিক থাকলেও নৈতিক বিচারে আত্মহত্যা কথাটা ভুল। সব হত্যাই খুন, আত্মকে খুন করাও খুন। সেই খুন একজনে করে না, সমাজের সম্মিলিত অবস্থা এর জন্য দায়ী। আত্মহত্যার মধ্যে পরোক্ষ হত্যা দেখুন, বিপন্নতা দেখুন, কলঙ্ক দেখবেন না। কিছু করার থাকলে করতে হবে আগেই। জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘মানুষটা ম’রে গেলে যদি তাকে ওষুধের শিশি/ কেউ দেয়-বিনি দামে-তবে কার লাভ?’

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।  
bagharu@gmail.com

মহাযুদ্ধের ভুলে যাওয়া নায়কেরা by শশী থারুর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ১০০ বছর পর দুনিয়াজুড়ে এই মহিরুহ ঘটনার স্মৃতিচারণা হচ্ছে। এটাকে দুনিয়ার শেষ যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলেও যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এ যুদ্ধে যাঁরা লড়েছেন বা জীবন দিয়েছেন, তাঁরা কি কেউ ভেবেছিলেন, মাত্র ২৫ বছর পরই এ যুদ্ধের পরবর্তী সংস্করণ মঞ্চায়িত হবে?
এই যুদ্ধ ইউরোপের তরুণদের জীবন প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই তাঁদের ঠেলে কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে। পরিখার মধ্যে এক প্রজন্মের প্রতিভাবান কবি, শিল্পী, খেলোয়াড়দের প্রতিভার রক্তক্ষরণ হয়েছে। যুদ্ধটা মূলত ইউরোপের হলেও অন্যান্য মহাদেশের মানুষও সেখানে জীবন দান করেছেন, যাঁদের সঙ্গে ইউরোপের সেই প্রথাগত ঘৃণার কোনো সম্পর্কই নেই।
ইতিহাস ও উপন্যাসের পাতায় এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্রের পর্দায় অস্ট্রেলীয়, কানাডিয়ান, নিউজিল্যান্ডারদের জীবনদানের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যে ১৩ লাখ ভারতীয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, সে সম্পর্কে দুনিয়া খুব কমই জানে। শুধু তা-ই নয়, এ যুদ্ধে ৭৪ হাজার ১৮৭ জন ভারতীয় সেনা মারা যান এবং ৬৭ হাজার সেনা আহত হন। যুদ্ধের জনপ্রিয় ইতিহাসে তাঁদের স্থান হয়নি, হলেও তাঁদের পাদটীকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ভারত ইউরোপ, ভূমধ্যসাগর, পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকায় ডিভিশন ও ব্রিগেড পাঠিয়েছে। ইউরোপে ভারতীয় সেনারাই পরিখায় প্রথম আক্রান্ত হয়েছেন। যুদ্ধের দ্বিতীয় বছরের আগেই তাঁরা তাড়া খেয়ে মরেছেন, জার্মান বাহিনীর বহু আক্রমণের মুখেও তাঁরা পড়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ১৯১৪ সালের শুরুতে ভারতীয় সেনারা বেলজিয়ামের ওয়াইপ্রেসে জার্মান বাহিনীর আক্রমণ রুখে দিয়েছেন। আর ব্রিটিশরা তখনো সেনা ভর্তি ও তাদের প্রশিক্ষণে ব্যস্ত ছিল। চার্চিলের ভুলের কারণে বহু ভারতীয় সেনা গ্যালিপলিতে মারা পড়েছেন। মেসোপটেমিয়ায় প্রায় সাত লাখ ভারতীয় সেনা জার্মানদের মিত্র অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন।
ইউরোপ থেকে ভারতীয় সেনারা তাঁদের পরিবার-পরিজনের কাছে যে চিঠি লিখেছেন, সেগুলোয় তাঁদের সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি ও ট্র্যাজেডির চিত্র পাওয়া যায়। একজন লিখেছেন, ‘বৃষ্টির মতো গোলা পড়ছে।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘দেশজুড়ে সৈন্যদের মরদেহ এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে যে দেখলে মনে হয়, কাটা ধান মাঠে পড়ে আছে।’ এই সেনারা নিঃসন্দেহে বীরত্ব দেখিয়েছেন। এক অপরিচিত জায়গায় তাঁদের যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়েছিল। সেখানকার জলবায়ু সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না, এর জন্য তাঁদের কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। যে শত্রুর বিরুদ্ধে তাঁরা লড়ছিলেন, তাঁদের সম্পর্কেও ভারতীয় সেনাদের কোনো ধারণা ছিল না। শুধু মর্যাদা ছাড়া অন্য কোনো কারণে তাঁদের জীবন বাজি রাখেননি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও তাঁরা অজানাই থেকে যান, যে ব্রিটিশদের হয়ে তাঁরা লড়েছেন, তারাও তাঁদের উপেক্ষা করেছে। ভারতীয়রাও তাঁদের উপেক্ষা করেছে।
একটি কারণ হচ্ছে, তাঁরা ভারতের হয়ে লড়েননি। এই সেনারা ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক, তাঁরা পেশায় ছিলেন সেনা। যে ব্রিটিশরাজের সেবা তাঁরা করেছেন, সেই ব্রিটিশরাই ভারতে তাঁদের দেশবাসীকে শোষণ করেছে।
ভারত থেকে সেনা সংগ্রহ ও অর্থ তুলে ব্রিটিশরা ভারতকে স্বশাসনের অধিকার দেবে, এমনই অঙ্গীকার তারা করেছিল। তারা যদি সে কথা রাখত, তাহলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে ভারতীয় সেনারা মারা পড়েছিলেন, তাঁদের জাতীয় বীর হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের কথা রাখেনি, ফলে জাতীয়তাবাদীরাও এই সেনাদের কোনো ধন্যবাদ দেয়নি। তাঁরা বিদেশি প্রভুদের সেবা দিতে বিদেশে গিয়েছিলেন, ব্যাপারটা এমনই দাঁড়িয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকদের সেবায় বিদেশে জীবন দান করা পেশাগত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এটাকে প্রশংসনীয় জাতীয় সেবা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা এভাবেই এ সেনাদের অবদানকে ভুলিয়ে দেন। ১৯৬৪ সালের এই যুদ্ধ শুরুর ৫০ বছর পূর্তিতে দুনিয়া এই যুদ্ধের যে স্মৃতিচারণা করে, তাতে ভারতীয় সেনাদের কথা কেউ বলেনি। এমনকি নিজ দেশেই এই সেনারা সবচেয়ে উপেক্ষিত হয়েছেন। ১৯৩১ সালে নির্মিত নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটে দৈনিক বহু দর্শনার্থীই ভিড় করে, কিন্তু তারা কেউই জানে না যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে ভারতীয় সেনারা জীবন দান করেছিলেন, তাঁদের স্মরণে এটা নির্মিত হয়েছে।
ভারতে এই মহাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিভ্রম সর্বভারতীয় রূপ লাভ করেছে। তবে এই যুদ্ধ শুরুর ১০০ বছর পূর্তিতে নতুন চিন্তার অবকাশ সৃষ্টি হচ্ছে। ব্রিটেনে এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের অবদান প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে, ব্রিটিশরা সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফরাসিরাও এই বাদামি চামড়ার পাগড়িওয়ালা সেনাদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে, যাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে তাঁদের মাতৃভূমি রক্ষা করেছেন। আর ভারতীয়রা ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের ক্ষোভ ভুলে এ বিষয়ে কিছুটা হলেও ঔৎসুক্য দেখাতে শুরু করেছেন।
ভারতীয়রা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সেনাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করে পরভূমে তাঁদের জীবনদানের ঘটনাকে স্বাদেশিকতার পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। দিল্লির সেন্টার ফর আর্মড ফোর্সেস হিস্টরিক্যাল রিসার্চ খুব কষ্ট করে সেই সেনাদের স্মৃতিরক্ষার চেষ্টা করছে, ভুলে যাওয়া গল্পের পুনর্গঠন করছে।
কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভ কমিশন ভারতের যুদ্ধ কবরস্থানগুলোর দেখভাল করে। এসব কবরস্থানে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সেনাদের কবর রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সমাধিলিপিটি রয়েছে কোহিমা ওয়ার সিমেট্রিতে, ‘বাড়ি গিয়ে সবাইকে বলুন, আপনাদের আগামী দিনের জন্য আমরা আমাদের আজ বিসর্জন দিয়েছি।’
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে ভারতীয় সেনারা জীবন দিয়েছেন, তাঁরা এমন কোনো দাবি করতে পারেন না। তাঁরা অন্য কারোর ‘গতকালের’ জন্য নিজেদের ‘আজ’ বিসর্জন দিয়েছেন। তাঁদের সন্তানেরা এতিম হয়েছেন, আর ইতিহাস তাঁদের এতিম বানিয়ে ফেলেছে। তবে এই ভেবে সন্তুষ্টি বোধ করছি যে তাঁদের বহুদিনের পাওনা পুনর্বাসন শেষমেশ শুরু হয়েছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাংসদ।

তাহেরকে নিয়ে কেন এই মিথ্যাচার? by মো. আনোয়ার হোসেন

প্রথম আলোয় প্রকাশিত যেকোনো নিবন্ধ বা প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য সত্য উদ্ঘাটন; কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা নয়। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে প্রথম আলোয় যেসব নিবন্ধ ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, লেখক–গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের নিবন্ধটি ছিল তার একটি। প্রকাশিত নিবন্ধটি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন যে প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন, তা এখানে প্রকাশ করা হলো। বি.স.  প্রথম আলো

কদিন ধরে মন ছিল বিষণ্ণ। প্রথম আলো ও মানবজমিন পত্রিকায় কয়েক কিস্তিতে কর্নেল তাহের ও আমার সম্পর্কে কিছু নির্জলা মিথ্যা ও বানোয়াট কল্পকাহিনি প্রকাশিত হয়েছে। তা-ও শোকের মাস আগস্টে। চমক হিসেবে হয়তো শেষ কিস্তি ছাপা হয়েছে ১৫ আগস্ট কালরাত্রির আগের দিন। আমি ক্ষুদ্র ব্যক্তি, নিতান্ত সাধারণ। আমার সম্পর্কে মিথ্যাচারে দেশ ও জাতির তেমন কিছু এসে-যায় না। কিন্তু কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম সাধারণ ব্যক্তি নন। অসাধারণ তিনি হয়ে উঠেছেন নিজ কর্ম দিয়ে। তা কেউ করে দেয়নি। জীবনও দিয়েছেন আপন বিশ্বাসে অটল ও পবিত্র থেকে।
আর সেই মৃত মানুষটিকে নিয়ে নির্জলা মিথ্যাচার ও নিম্নমানের কল্পকাহিনি প্রথম আলো পত্রিকায়! গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কথা থাকে এই যে প্রকাশিত মতটি যুক্তিনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর কি না; বিনা অপরাধে অন্যকে তা আঘাত করে কি না, অন্যায়ভাবে তাঁর মান-মর্যাদা ও অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কি না; দায়িত্বশীল সংবাদপত্র তা পর্যালোচনা করে কিছু প্রকাশের আগে।
সমাজের অসংগতি ও অবিচার বিষয়ে প্রথম আলো নানা সময়ে কথা বলেছে। সত্য প্রকাশে সহায়তা করেছে। অন্যায়ভাবে তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা; তাঁর বিরুদ্ধে তাহের পরিবারের আইনি লড়াই বিষয়ে প্রথম আলোর ভূমিকা আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। জনাব মহিউদ্দিন আহমদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসত্য লেখাকে প্রথম আলো প্রশ্রয় দিয়েছে, এটা বেদনাদায়ক।
১৪ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘বাকশালকে বাদ দিয়ে তাহেরের জাতীয় সরকার?’ কিস্তির শিরোনামটি দেখুন। জাসদ বা তার মুখ্য নেতা সিরাজুল আলম খান নন, ‘তাহেরের জাতীয় সরকার!’ সত্য হলো, তাহের যা কিছু করেছেন তা দলীয় সিদ্ধান্তেই করেছেন। বলা হয়েছে, ‘সন্ধ্যায় খন্দকার মোশতাক আহমদ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তাহের উপস্থিত ছিলেন।’ এটা সর্বৈব মিথ্যা। তাহের সেখানে ছিলেন না।
এই কিস্তিতে শুরুতেই জাসদ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বর্তমানে একটি এনজিওর প্রধান আবুল হাসিব খানের কথা বলা হয়েছে। ১৫ আগস্ট সকালে মুহসীন হলের ছাত্র নূর মোহাম্মদ নাকি আমার চিরকূট দিয়েছেন আবুল হাসিবকে, যাতে গণবাহিনীর জরুরি সভার কথা উল্লেখ ছিল। আবুল হাসিব খানকে আমি নিজেই ফোন করেছি। তিনি বলেছেন, ‘এসব লুজ টক’। নূর মোহাম্মদ পরে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে পুলিশের সর্বোচ্চ আইজি পদ অলংকৃত করেন। তিনি তো বেঁচে আছেন। তিনিই বলুন মহিউদ্দিনের এসব কথা সঠিক কি না।
গণবাহিনীতে আমার সক্রিয় অবস্থান কোনো অজানা বিষয় নয়। ইতিমধ্যে প্রকাশিত দুটি পুস্তকে (মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশিত তাহেরের স্বপ্ন এবং আগামী প্রকাশিত মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ই নভেম্বর অভ্যুত্থানে কর্নেল তাহের) তার অনুপুঙ্খ বিবরণ আছে। সামান্য বিচার-বুদ্ধি থাকলে জনাব মহিউদ্দিন আমার প্রকাশিত পুস্তকের ভাষ্য থেকে জানতেন গণবাহিনীর মতো গোপন সংগঠনে ভাই, ভাইজান—এসব সম্বোধনের এবং তাঁর উক্তি উদ্ধৃত করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাই মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ‘সভা শুরু হলে আনোয়ার হোসেন উপস্থিত সবাইকে বলেন, ভাইজান (লে. কর্নেল আবু তাহের) সকালে রেডিও স্টেশনে গিয়েছিলেন। তিনি মেজর ডালিমকে বকাঝকা করে বলেছেন, ‘... মেজর হয়েছ, এখন পর্যন্ত একটা মার্শাল ল প্রক্লেমেশন ড্রাফট করতে পারলে না। জান, কাল ইউনিভার্সিটিতে কারা বোমা ফাটিয়েছে? দে আর মাই বয়েজ’—এসব যে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও হাস্যকর, তা নিশ্চয়ই পাঠক বুঝবেন।
১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা নঈম জাহাঙ্গীরের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘১৭ আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে। ১৯৭১ সালে নঈম ১১ নম্বর সেক্টরে তাহেরের সহযোদ্ধা ছিলেন এবং প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, “ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া।”’
১৯৭৬ সালে কারাভ্যন্তরে গোপন প্রহসন বিচারের জবানবন্দিতে

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তাহের বলেন,
‘সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে গভীর উদ্বেগ নিয়ে আমি বাংলাদেশ বেতারের কার্যালয় থেকে বের হই। ধারণা করলাম, জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো বিদেশি শক্তি জড়িত।... ১৭ আগস্ট আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, পুরো ঘটনাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মদদে ঘটেছে। খন্দার মোশতাকও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এই গ্রুপটি আগে থেকেই সব ঠিকঠাক করে রেখেছিল।’ (‘At 11:30 in the morning I left Bangladesh Betar with a feeling of deep concern. I sensed that some outside power was involved in the killing of the Father of the Nation. [...] On August 17, it became clear to me that the whole game was backed by the United States of America and Pakistan. I also understood that Khondokar Mushtaque was directly involved in the killing of Sheikh Mujib. This group it was also clear, had a pre-determined course set for them.’)- ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত Economic and Political Weekly 33/34, p. 1350-1351)।
তাহের যখন বলছেন, ‘ফাদার অব নেশন’, সেখানে ওপরে কথিত ‘উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া’ যে কোন স্তরের মিথ্যা, তা সহজেই অনুমেয়। কর্নেল তাহের রাজনৈতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছেন, কোনো ষড়যন্ত্র করেননি, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে সাবধান করেছেন (১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে লেখা তাহেরের পদত্যাগপত্র, মার্শাল ল ট্রাইব্যুনালে তাহেরের জবানবন্দি দ্রষ্টব্য)। তাহের রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতেন জাতির জনককে।
আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডারের স্টাফ অফিসার এবং পরে সব কর্মের সাথি হিসেবে ছায়ার মতো কর্নেল তাহেরের পাশে থেকেছি। নঈম জাহাঙ্গীর নামের কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে তাহের ভাইয়ের বাসায় কখনো দেখিনি। খবর নিয়ে জানলাম, বিভিন্ন সময়ে বিএনপি এবং নানা সংগঠনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। আমার ভাবি সংসদ সদস্য লুতফা তাহেরও তাঁর কথা কিছুই জানেন না। সর্বোপরি আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সাংসদ ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীর প্রতীক প্রথম আলোর সংবাদ পড়ে মোবাইল ফোনে তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে নঈমও বলেন এসব ‘লুজ টক’। বিশদ কিছু না বলে তিনি ফোন কেটে দেন। সেসব ‘লুজ টকের’ বরাত দিয়ে মহিউদ্দিনের নানা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আবিষ্কার জনমনে কী বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিক কি তা ভাববে না?
এমন উদ্ভট বক্তব্য আরও আছে। জেনারেল জিয়ার সঙ্গে নাকি আমার ছোট ভাই ‘বাহারের সখ্য ছিল।... ছুটির দিনে প্রায়ই জিয়া সস্ত্রীক নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় চলে যেতেন। বাহার ছিলেন জিয়ার খুবই প্রিয় এবং জিয়া ও বাহার পরস্পরকে ‘দোস্ত’ বলে সম্বোধন করতেন। এমন অবাস্তব বক্তব্যও মহিউদ্দিন লিখেছেন। বাস্তব সত্য হলো, কখনো জেনারেল জিয়া নিজে বা সস্ত্রীক নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় আসেননি।
এই কিস্তিতে মহিউদ্দিন বলেন, ‘কর্নেল তাহের সম্ভবত জানতেন না, ১৫ আগস্ট তারিখটিই অভ্যুত্থানের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে। তবে এ রকম একটা ঘটনা যে ঘটতে পারে, তা তাঁর অজানা থাকার কথা নয়।’ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে কত তদন্ত, বছরের পর বছর ধরে সাক্ষী-সওয়াল-জবাব, জজকোর্ট, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ পেরিয়ে রায় হলো। কোথাও তাহেরের সংশ্লিষ্টতা নেই। আর এখন মহিউদ্দিন সাহেব যিনি ছাত্রলীগ, জাসদ বা গণবাহিনীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন না, তিনি এমন রায় দিয়ে দিলেন!
১২ আগস্ট তারিখে প্রকাশিত ‘তাজউদ্দীন খুনিদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন’ শিরোনামের কিস্তিতে মহিউদ্দিন বলেন, ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আসবেন …আনোয়ার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে কর্মরত। রসায়ন তিনি ভালো বোঝেন। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের আগমন যাতে নির্বিঘ্ন না হয়, সে জন্য তাঁর নির্দেশে গণবাহিনীর সদস্যরা ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে তিনটি “নিখিল” ফোটায়।’ এই নির্জলা মিথ্যা তিনি অবলীলায় বলে দেন কোনো তথ্য–প্রমাণ ছাড়াই।
জনাব মহিউদ্দিনের গল্পের যে কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই তা ওপরের কয়েকটি উদাহরণ থেকে পাঠক বুঝতে পারবেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে এমন শক্তি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও জাসদ যে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তাকে ভেঙে ফেলা এবং জিয়াউর রহমানকে মহিমান্বিত করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যে মহিউদ্দিনের এই প্রকল্প ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সময়ই তা বলে দেবে।

মো. আনোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ভয়ঙ্কর এক খুনির গল্প by ইমরান আলী

মানুষ সৃষ্টির সেরা  হলেও মানুষে মানুষে রয়েছে প্রকার ভেদ। ভাল এবং মন্দ। তবে শুধু মন্দই নয়, সামান্য কারণে, কখনও বিনাকারণে মানুষের মন্দ দিকটা ফুটে উঠে। আর তা রীতিমতো তার সগোত্রীয় আরেকজন মানুষকে খুন করার মাধ্যমেও হতে পারে। ইতিহাসে আমরা অনেক খুনির বিস্তারিত পাই। কেউ খুন করেছে তিন শতাধিক, কেউ শতাধিক, কেউ এক ডজন বা তার কম। সংখ্যায় যে ক’টাই হোক না কেন খুন তো খুনই। এরচেয়ে বড় অপরাধ আর কি হতে পারে। মানুষকে হত্যা করে সে মৃতদেহ ভক্ষণ করাও কি কম অপরাধ। এমন খুনির উদাহরণ ইতিহাসে ভূরি ভূরি। জোয়াছিম ক্রল (১৭ এপ্রিল, ১৯৩৩, জার্মান) ক্ষীণকায় শরীরে বেড়ে ওঠা তেমনই এক খুনি এবং রাক্ষস। ক্রলের মা মারা যাওয়ার পর থেকে শুরু হয় তার বীভৎস সব কৃতকর্ম। খুন শুরু হয় একজন টয়লেট ক্লিনারকে  ধর্ষণ শেষে হত্যার  মধ্য দিয়ে।  জার্মান এই সিরিয়াল কিলার ৮টি খুনের সরাসরি অভিযুক্ত হলেও দোষী ছিল ১৪টি  খুনের।

জুলাই ১৩, ১৯৭৬। ম্যারিওন কেটার নামের চার বছর বয়সী এক মেয়ে শিশুকে অপহরণ ও খুনের দায়ে গ্রেপ্তার হয় ক্রল।  পুলিশ বাড়ি বাড়ি ঘুরছিল মেয়েটির সন্ধানে। ক্রলের এপার্টমেন্টের এক প্রতিবেশী  ক্রলকে যখন জানায় তার বাসার পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপটি ময়লায় ব্লক হয়ে  গেছে। তখন নাকি ক্রল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিল- নাড়িভুড়িতে এমনটা হয়েছে।
ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান ক্রলের প্রতিবেশী এমন উত্তর শুনে। পরবর্তীতে ওই প্রতিবেশীর কথা শুনেই পুলিশ ক্রলকে সন্দেহ করে। পুলিশ ক্রলের এপার্টমেন্টে তল্লাশি চালায়। ম্যারিওনের ছিনভিন্ন শরীর তারা দেখতে পায়। শরীরের কিছু অংশ কেটে রাখা হয়েছে ফ্রিজে, কিছু অংশ মেজেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, হাত কেটে রাখা হয়েছে গরম পানিতে – যা দিয়ে ক্রল রান্না করতে চেয়েছিল। আর নাড়িভুড়ি ফেলেছিল ময়লা নিষ্কাশনের পাইপে। এক জবানবন্দিতে ক্রল জানায়, গ্রোসারি শপের বিল বাঁচাতেই তার এই বিকৃত রুচির আবির্ভাব হয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে খুন করে। শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আলাদা করে টুকরো টুকরো করে রান্নার জন্য প্রস্তুত করে। বন শহরের কাছে এক জেলে ১৯৯১ সালে এই খুনি মারা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। যে অপরাধী তার অন্যায়কে অন্যায় মনে করেনি কখনও, যে ঠা-া মাথায় একের পর এক খুন করেছে তাকে কিভাবে শুধু অপরাধী বলা যায়। সে মূলত ইতিহাসের সবচেয়ে নোংরা ও কুখ্যাত খুনি হিসেবেই জায়গা পাওয়ার যোগ্য।

‘শাহবাগ আন্দোলন বিভাজনে সরকারের ভূমিকা ছিল’ -আনিসুজ্জামান

যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকারের তরফে গতি আনার জন্য তেমন কোনও প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি সত্যই অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। তার মতে, আসলে এই যুদ্ধাপরাধের বিচার অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। শেষ অবধি কাজটা শুরু হলো বটে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধের মামলাগুলোর বিচার চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। এই ধরনের মামলার আপিলের নিষ্পত্তি হচ্ছে আরও ধীরে। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলের কোন আঁতাত হয়েছে, এমন কথা বলব না। অথচ এটা রূঢ় বাস্তব যে, সরকারের তরফে এই মামলাগুলোতে গতি আনার জন্য তেমন কোন প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বুধবারের সংস্করণের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় আনিসুজ্জামানের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। ওই সাক্ষাৎকারে আনিসুজ্জামান শাহবাগ আন্দোলনের পরিণতি নিয়ে যেমন তার স্পষ্ট মত জানিয়েছেন তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোলামেলা তার মত জানিয়েছেন। শাহবাগ আন্দোলনের পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, শাহবাগ আন্দোলন ভাঙার পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। নিজেদের মধ্যে বিরোধ যেমন তৈরি হচ্ছিল, তেমনই আন্দোলন বিভাজন সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকারও কিন্তু নির্দিষ্ট ভূমিকা নিয়েছিল। সে যা-ই হোক, মোদ্দা কথা হলো, এই স্বপ্ন দেখানো আন্দোলন শেষ অবধি ভেঙে গেল। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ধরনের ঐক্য আর কখনও নজরে আসেনি। কাজেই, শেষ পর্যন্ত শাহবাগ আন্দোলনের এই পরিণতি বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক বলে জানিযেছেন আনিসুজ্জামান। তার মতে, গণজাগরণ মঞ্চ একসময় উদ্দীপনামূলক ছিল, এখন শুধুই দৈনন্দিনতা। তবে শাহবাগ আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন, শাহবাগ নিঃসন্দেহে মেয়েদের অগ্রগতির চিহ্ন। সাধারণ মানুষ তো এগিয়েছে। শাহবাগের জমায়েতে যাবে শুনলে রিকশাচালকও সওয়ারির কাছ থেকে ভাড়া নিতে চাননি। বিনা পয়সায় গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন! কিন্তু এই পরিস্থিতি, এই ঐক্য ধরে রাখা গেল না। তবে, শাহবাগ আন্দোলন মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন সূচিত করে না। আন্দোলনের তো এক সময়ে সমাপ্তি হয়। আরও আগে সমাপ্তি হলে হয়তো এতটা অনৈক্য দেখা দিতো না। আবার এই আন্দোলন আরও এগোলেও হয়তো তা ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শেষ হতে পারত। বাংলাদেশের নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এই সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও বেড়েছে। বিগত মাস ছয়েক ধরে সরকার নিজের অবস্থা অনেক শক্তিশালী করেছে। কিন্তু পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। শাসক দলের অনেক সাংসদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকার এবং শাসক দলের দুর্নামও বেড়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, পশ্চিমা দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো নির্বাচনের পরেও বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এতে বাংলাদেশের সরকার শক্তিশালীই হয়েছে। মনে রাখা দরকার, আমেরিকা ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নই সেই সময়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বৈধতা নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন তুলেছিল। আবার এই ইইউ-এর তরফেই কিন্তু বাংলাদেশকে বর্ধিত আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়েছে। সেটা বাংলাদেশের এখনকার স্থিতিশীলতা দেখে কিনা, তা অজানা। সামগ্রিক বিচারে এই সরকারের আইনগত ভিত্তি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। তবে নৈতিকতার প্রশ্ন থেকেই গেছে বলে মনে করেন আনিসুজ্জামান। তিনি স্বীকার করেন যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশে এখনও বিতর্ক আছে। ২০০৭ সালে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে দেশের প্রধান দুই দলের যে ধরনের মনোভাব ছিল, ইদানীংকালে তা দেখা যায়নি। বিতর্ক এতে বেড়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও সংকটের মধ্যে পড়েছে। সঙ্গে দেশও। উপরন্তু, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য দেখাতে পারেনি। এই প্রেক্ষিতে বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে বলতে গিয়ে আনিসুজ্জামান বলেছেন, বিরোধীদের আন্দোলনও এখন স্তিমিত। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) কার্যত নিষ্ক্রিয়। ভোটের ঠিক আগে, গত বছরে নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের প্রভাব জনজীবনে পড়েছিল। বিরোধীদের আন্দোলনে জনগণের যোগ না থাকলেও দৈনন্দিন বিপর্যয় হতে পারে। যেমনটা তখন হয়েছিল। এখন তা নেই। আনিসুজ্জামান আরও জানিয়েছেন, আগে যখন জামায়াত আন্দোলনের পথে পা বাড়িয়েছিল, বিএনপি তখন জামায়তের পাশে দাঁড়ায়নি। এখন বিএনপি নতুন করে আন্দোলনের কথা ভাবলেও তাতে জামায়াতের সাড়া মিলছে না। অন্যদিকে, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছেই। দলের নেতাদেরও জনসাধারণের কাছে তেমন স্বীকৃতি নেই। তাই সরকারের বর্তমান মেয়াদ পূরণের পথে আপাতত কোন বাধা নেই বলে মনে করেন আনিসুজ্জামান। আর তাই তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাইরের জগতের উৎসাহও এখন কম। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও রাজনীতি সম্পর্কে প্রবীণ এই অধ্যাপক জানিয়েছেন, আওয়ামী লিগ সরকার ২০০৮-এ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বরাবরই তার কাজের মাধ্যমে দিল্লিকে বোঝাতে চেয়েছে যে, তারা কোনভাবেই ভারত-বিরোধিতাকে সমর্থন করে না। সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার প্রশ্নেও দুই দেশের মধ্যে মিল দেখা গেছে। অথচ, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় যখন বাংলাদেশ গেলেন, বিএনপি নেত্রী তার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন না। এতে ভারতের তরফে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন আরও বেড়েছে। তবে ভারত সম্পর্কে যে অভিযোগটা বাংলাদেশে শোনা যায় সে সম্পর্কে আনিসুজ্জামান বলেন, মূল অভিযোগ এটাই যে দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত একতরফা। বাংলাদেশ বহুভাবে ভারতকে সাহায্য করলেও ঢাকার কোন প্রত্যাশাই দিল্লি পূরণ করছে না। এবং আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে কিছু করছে না। এতে বাংলাদেশের সরকারের সংকট বাড়বে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পক্ষেও এটা ভাল হবে না বলে স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন তিনি। তবে বিএনপি  সম্পর্কে ভারতের নতুন সরকারের মনোভাবকে তিনি সদর্থক বলে জানিয়েও বলেছেন, বিএনপির ধারাবাহিক ভারত-বিরোধিতা দুই দেশের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অটুট রাখতে দেবে কিনা, সেটাই প্রশ্ন।

১৪ বছর পর লৌহমানবীর মুক্তি

সেনাবাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনশন করা ইরম শর্মিলাকে মুক্তি দিয়েছেন ভারতের আদালত। দেশের প্রত্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নারী অধিকার লংঘনের প্রতিবাদে ১৪ বছর অনশন ধর্মঘট পালন করছিলেন তিনি। এই নারীর আইনজীবী মনি খাইদেম জানান, ‘প্রতিবাদ শুরুর পরে গ্রেফতার হওয়া ইরম শর্মিলাকে আদালত মুক্তি দিয়েছে।’
মনিপুরের লৌহমানবী হিসেবে পরিচিত শর্মিলা সামরিক বাহিনীর কথিত নারী নির্যাতনের দিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রায় ১৪ বছর ধরে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করেননি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মনিপুরে বাড়ির কাছে একটি জিপে সেনাবাহিনীর হাতে ২০ ব্যক্তির মৃত্যু প্রত্যক্ষ করার পর শর্মিলা ২০০০ সালের নভেম্বরে উপবাস শুরু করেন। তাকে আত্মহত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয় এবং সেখানে তাকে জোরপূর্বক দিনে বেশ কয়েকবার খাবার দেয়া হয়। শর্মিলার ঘনিষ্ঠ একজন মানবাধিকার কর্মী বাবলু লইটাংবাম বলেন, আদালত অভিযোগ টেকসই নয় বলে মেনে নিয়েছেন। তিনি এনডিটিভি নেটওয়ার্ককে বলেন, শর্মিলা আত্মহত্যা নয়- আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট বাতিলের দাবিতেই এই অ্যাকশন করছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত না পাঠানোর নিশ্চয়তা পেলেই দূতাবাস ছাড়বেন অ্যাসাঞ্জ

উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করা হবে না- এই নিশ্চয়তা না দিলে তিনি লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাস ত্যাগ করবেন না। তার আইনজীবী জেনিফার রবিনসন মঙ্গলবার এ কথা জানান। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যাসাঞ্জ গত দুই বছর ধরে ইকুয়েডরের দূতাবাসে অবস্থান করছেন। শিগগিরই তিনি দূতাবাস ত্যাগ করবেন বলে সোমবার আভাস পাওয়া গেছে। যদিও তিনি হৃদরোগসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। রবিনসন অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে জানান, ৪৩ বছর বয়সী অ্যাসাঞ্জ কখন দূতাবাস ত্যাগ করবেন এ বিষয়ে সময়সীমা বেঁধে দেয়া মুশকিল। তিনি বলেন, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করা হবে না- এই আশ্বাস পাওয়া গেলে শিগগিরই তিনি দূতাবাস ত্যাগ করবেন। তবে আমরা এখন পর্যন্ত সে রকম কোনো লক্ষণ দেখিনি।
সুইডেনে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়। তিনি এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তার আশংকা তাকে প্রথমে সুইডেন পাঠিয়ে পরে যুক্তরাষ্ট্রে সমর্পণ করা হতে পারে। অ্যাসাঞ্জ তার উইকিলিকসের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস করেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেনিফার রবিনসন বলেন, ইকুয়েডর দূতাবাসে গত দু’বছর ধরে থাকার ফলে ৪৩ বছর বয়সী অ্যাসাঞ্জের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তিনি বলেন, ইকুয়েডরের রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন এবং আমেরিকায় ফেরত পাঠানো হবে না মর্মে নিশ্চিত হওয়ার পরই ইকুয়েডর দূতাবাস ছাড়বেন অ্যাসাঞ্জ।

সুয়ারেজের অভিষেকে ঝলমলে বার্সা

অবশেষে বার্সোলোনার জার্সিতে অভিষেক হল লুইস সুয়ারেজের। বদলি হিসেবে নেমে খেলেছেন মাত্র ১৫ মিনিট। গোল পাননি, তেমন কোনো ঝলকও দেখাতে পারেননি। তারপরও অভিষেক রজনীটা দুর্দান্তই কেটেছে উরুগুয়ান ফরোয়ার্ডের। অভিষেকেই ছয় গোলের জয়। আর কি চাই! গত মৌসুমে মেসি-নেইমার জুটি সেভাবে জমে উঠেনি। এবার সুয়ারেজ যোগ দেয়ায় বার্সার তারকাখচিত আক্রমণভাগে লাতিন ত্রয়ীকে কিভাবে খেলানো হবে, এ নিয়ে আগ্রহ ছিল সবার। ত্রিরত্ন একসঙ্গে সফল হবেন কিনা সেই প্রশ্নতো থাকছেই। তবে আপাতত নির্ভার থাকতে পারেন কোচ লুইস এনরিকে। মেসি ও নেইমারের রসায়ন যে জমে উঠেছে। তাহলে আর দুশ্চিন্তার কি আছে! সোমবার মেক্সিকান ক্লাব লিওনের বিপক্ষে সুয়ারেজের অভিষেক ম্যাচে বার্সোলোনার ৬-০ গোলের দাপুটে জয়ের কারিগর মেসি-নেইমারই। এবারের প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি পর্বে ঘরের মাঠে এটাই বার্সেলোনার প্রথম প্রীতি ম্যাচ। আর লীগ মৌসুম শুরুর আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচ। হোয়ান গাম্পার ট্রফির মর্যাদার লড়াইটি ছিল আবার সুয়ারেজের অভিষেক মঞ্চ। সব মিলিয়ে দর্শকের ঢল নেমেছিল ন্যুক্যাম্পে। সমর্থকদের হতাশ করেনি কাতালানরা। চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেই জোড়া গোল করেছেন নেইমার।
এক গোল করে এবং একটি করিয়ে ম্যাচসেরা মেসি। নেইমারের মতো মেসিরও বিশ্বকাপের পর প্রথম ম্যাচ এটি। নেইমারের বদলি হিসেবে নেমে জোড়া গোল করেছেন যুব দল থেকে আসা নতুন সেনসেশন মুনির আল হাদাদিও। লিওনের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকেন আরেক তরুণ ফরোয়ার্ড সান্দ্রো রামিরেজ। নেইমারের একটি আক্রমণ থেকে তিন মিনিটেই গোল উৎসবের সূচনা করেন মেসি। ১২ মিনিটে ইনিয়েস্তার নিখুঁত পাস থেকে ব্যবধান বাড়ান নেইমার। বিরতির ঠিক আগে মেসির পাস থেকে দুর্দান্ত ব্যাকহিলে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় গোলটি করেন ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড। দ্বিতয়ার্ধে জাদু দেখান দুই তরুণতুর্কি মুনির ও সান্দ্রো। শেষ বাঁশি বাজার ১৫ মিনিট আগে রাফিনহার বদলি হিসেবে অভিষেক হয় সুয়ারেজের। গ্যালারিতে করতালির শব্দপ্রপাত ঘটিয়ে মাঠে নামেন সাবেক লিভারপুল তারকা। তবে তার আগেই মেসি ও নেইমার উঠে যাওয়ায় লাতিন ত্রয়ীকে একসঙ্গে দেখতে আরও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সমর্থকদের। কামড়-কাণ্ডে চার মাসের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিল করে অনুশীলন ও প্রীতি ম্যাচ খেলার অনুমতি পেয়েছেন সুয়ারেজ। তবে বার্সার হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অভিষেকের জন্য ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাকে। আপাতত প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামতে পেরেই আপ্লুত সুয়ারেজ, ‘অবিস্মরণীয় একটি দিন ছিল। এমন ভালোবাসার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’ ইনিয়েস্তার বিশ্বাস, ন্যুক্যাম্পে মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হবে না উরুগুয়ান তারকার। রোববার এলচের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে লীগ মৌসুম শুরু করবে বার্সা। ওয়েবসাইট।

গুঞ্জন শুনি

৪৪ বছর বয়স হলেও ভবিষ্যতে নিজের কাজটা চালিয়ে যেতে চান। এজন্য দরকার অবসাদমুক্ত জীবন। তাই ঠিক করেছেন একটি ফুটফুটে বাচ্চা দত্তক নেবেন। বলা হচ্ছিল ‘খামোশি’ খ্যাত নায়িকা মনীষা কৈরালার কথা। কিছুদিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মরণ রোগের চিকিৎসা করে দেশে ফিরেছেন তিনি।
তাই নিজের জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস অবসাদমুক্ত এবং সুন্দরভাবে কাটানোর জন্য মনীষা চাইছেন একটি সন্তান দত্তক নিতে। তিনি জানান, এই মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ নন। প্রায় তিন থেকে চার মাস লাগবে তার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য। এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরই তিনি দত্তক নেবেন এবং সেটি একটি মেয়ে। শোনা গেছে মনীষা কিছুদিনের মধ্যেই বলিউডের অভিনয় জগতে কামব্যাক করবেন মীনা কুমারীর জীবনী অবলম্বনে একটি ছবির মধ্য দিয়ে। যদিও এই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। সম্প্রতি তাকে জিজ্ঞেস করা হলে বিষয়টি এড়িয়ে যান বলেও জানা যায়। একদিকে বাচ্চা দত্তক নিচ্ছেন আবার ছবিতেও অভিনয় করার গুঞ্জন উঠেছে। সব মিলিয়ে অসুস্থ অবস্থা থেকে ফিরে নতুন করে সব একসঙ্গে করতে পারবেন তো মনীষা?