Friday, September 4, 2026

ইরানে বিয়েবাড়িতে সরাসরি আঘাত হানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র

বিশ্লেষণঃ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিস্ফোরণের ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত মার্কিন অস্ত্রের সরাসরি আঘাতে ঘটেছে বলে দাবি করেছেন অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা। রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা এ মত দিয়েছেন।

মঙ্গলবার ছোট শহর কুহেস্তাকে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। চার সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভবনটির ক্ষয়ক্ষতির ধরন কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর অস্ত্রের প্রতিফলিত আঘাতের চেয়ে সরাসরি আঘাতের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তিনজনের ধারণা, ব্যবহৃত অস্ত্রটি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে মার্কিন অস্ত্র হতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত কারণ ও অস্ত্রের ধরন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।

১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আইআরজিসির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক হামলা চালানোর কথা জানায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। কুহেস্তাক এলাকার একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারও ওই হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটিতে আঘাত হানা হয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার বলেছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত করছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তারা ঘটনাটির বিষয়ে অবগত এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী দুই সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠানের তিন অতিথি ৪৩ বছর বয়সী কলসুম মোল্লাহী নাজহানদানিয়া, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমি রয়েছেন। ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ মল্লাহী যোগাযোগ টাওয়ারের কাছে মোটরসাইকেলে থাকা অবস্থায় নিহত হন বলে জানানো হয়েছে।

ইরানে চলমান সংঘাতে বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এ ঘটনা। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল ইরানি কর্তৃপক্ষ।

ওই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে তারা বলেছেন, হামলাটি সম্ভবত সরাসরি আঘাত ছিল; কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ধ্বংসাবশেষ ছিটকে এসে বাড়িটিতে আঘাত করার সম্ভাবনা কম।

১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, হামলার পর প্রত্যক্ষদর্শীদের বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চাপ দিয়েছিল। রয়টার্স মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে।

রয়টার্সকে দেওয়া এক ভয়েস বার্তায় এক বাসিন্দা জানান, অনুষ্ঠানে অনেক মানুষ ছিলেন এবং হামলার পর আহতদের অনেকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কাছের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি সামরিক স্থাপনা নয়; এটি সিরিক কাউন্টির বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে।

অস্ত্র বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, বাড়িটির ছাদে বিস্ফোরণের চিহ্ন দেখে মনে হচ্ছে কোনো অস্ত্র সরাসরি ছাদে বা ছাদের ঠিক ওপর বিস্ফোরিত হয়েছে। তার মতে, কাছের যোগাযোগ টাওয়ারে হামলার ফলে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ দিয়ে এমন ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তিনি অস্ত্রটি মার্কিন বলে মনে করছেন।

আরেক বিশেষজ্ঞ কলেটের মতে, প্রমাণের ভার একটি মার্কিন ৫০০ পাউন্ডের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে। অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক সেবাস্টিয়ান শুটও বলেন, ছাদের ক্ষতির ধরন টেলিযোগাযোগ টাওয়ার থেকে অস্ত্রের আঘাত ছিটকে আসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিন বিশেষজ্ঞই বলেছেন, বাড়িটি কোনো ভুল করে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়েছে, এমন সম্ভাবনা কম। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষকে ট্রেভর বল মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত জেএসওডব্লিউ ধরনের গ্লাইড বোমার অংশ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে এসব ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের ওই বাড়িতে হামলারই অংশ ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

এদিকে হামলায় নিহতদের স্মরণে বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে জানাজা ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সিরিকের পরিস্থিতি শোকাবহ এবং হামলার পরও মানুষ এখনো গভীরভাবে হতবাক।

ছয় মাসের চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাডার ও যোগাযোগ স্থাপনায় একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর ইরানি সামরিক হুমকি ঠেকাতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন। ছবি: রয়টার্স

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা

বিশ্লেষণঃ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনী জানায়, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইরানের সামরিক বাহিনীর দাবির বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়েতের আহমদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার ও যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়।

ইউএইর আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও মার্কিন সেনাদের অবস্থান ও রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।

কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের ‘আগ্রাসনের’ সময় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। এর আগে বাহরাইন ও জর্ডানও বুধবার ইরানের কয়েকটি বিমান হামলা প্রতিহত করার দাবি করে।

রোববার হরমুজ প্রণালির একটি দ্বীপে ইরানের রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর চলতি সপ্তাহে দুই দেশের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই রকেট দিয়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল।

এদিকে, ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সতর্ক করে বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপ তেহরানকে আরও ‘চরম পদক্ষেপ’ নিতে প্ররোচিত করতে পারে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলেও। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই নৌপথে তেল পরিবহন এখনো অনেক কম রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইরানের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও আবার বেড়েছে।

চলতি সপ্তাহে ইরান বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইরানের কাছে থাকা কঠিন জ্বালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত মোতায়েন করা যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে বলে দাবি করা হলেও তেহরান এখনো নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যবহৃত এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে।

বসে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। ইরানে গত কয়েক দিনের মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ১৪২ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কারমানপুর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কারমানপুর জানান, গত ৩০ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার মধ্যে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।

আহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী ৪৪ জন রয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে জানান তিনি।

কারমানপুর বলেন, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ এবং একটি পরিবার রয়েছে।

রোববার লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় এক মাসের যুদ্ধবিরতির মতো পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সমুদ্রের মাইন বহনে সক্ষম রকেট মোতায়েনের প্রস্তুতি দেখতে পাওয়ার পর ইরানের দুটি রকেট উৎক্ষেপণকারী ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।

ইরানে নতুন মার্কিন অভিযান কতদিন চলবে

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান বেশি দিন চলবে না বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জুলাইয়ের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ কথা বলেন তিনি।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন ফেলতে সক্ষম একটি রকেট তৈরির চেষ্টা করছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেটি ধ্বংস করেছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান তাদের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল। মার্কিন হামলায় এসব ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির কাছে তারা যে নতুন সরঞ্জাম তৈরি করার চেষ্টা করেছিল, আমরা সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছি। কিছু ছিল প্রতিরক্ষামূলক, কিছু আক্রমণাত্মক।’

তবে নতুন করে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান খুব বেশি সময় চলবে না বলেও জানান তিনি।

যদিও এর আগে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কানকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ফের যুদ্ধ শুরু হতে পারে; এ নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট, আমি বিষয়টি সামলে নেব।’

চাপে ট্রাম্প প্রশাসন

এদিকে যুদ্ধ সপ্তম মাসে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ক্রমেই সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে পড়ছে।

হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘সময়সূচি বদলে গেছে।’ আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘ক্যালেন্ডারই ইরানকে চালাচ্ছে।’

আগস্টে রয়টার্স জানিয়েছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় পুরোপুরি ব্যবহার করে ফেলেছে। রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান পিট হেগসেথকে লিখিত মূল্যায়নে জানিয়েছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা টেকসই হবে না। এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে পেন্টাগনের দাবি, অভিযান পরিচালনার জন্য সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছেন এবং ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অবশিষ্ট অর্থনীতিকেও দুর্বল করে দিচ্ছেন। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপের পক্ষে থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর কয়েকটি সাম্প্রতিক হামলার পর এখন সংঘাত কমানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক কূটনীতিকরা।

হোয়াইট হাউসের দুই কর্মকর্তা জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ট্রাম্পের কয়েকজন শীর্ষ সহযোগী নভেম্বর পর্যন্ত ইরান সংঘাতকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্ত’ রাখার কৌশলের পক্ষে রয়েছেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: এএফপি
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিলবোর্ড। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্তের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্ত

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করে হামলার আশঙ্কার মধ্যে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ফোন ও কম্পিউটারে বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সিনেটর রন ওয়াইডেনের প্রকাশ করা চিঠি ও রয়টার্সকে দেওয়া সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন শিল্পের সংগৃহীত এবং ডেটা ব্রোকারদের কাছে বিক্রি করা অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সামরিক সদস্যদের গতিবিধি শনাক্ত ও তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন উদ্বেগের মধ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী সিনেটর ওয়াইডেনকে জানিয়েছে, প্রায় দুই মাস আগে সামরিক বাহিনীর কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে থাকা বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার বন্ধ করা হয়েছে।

ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড পৃথক এক চিঠিতে জানিয়েছে, তাদের উইন্ডোজ ডিভাইসগুলোতেও সম্প্রতি এসব ট্র্যাকার নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সেনাবাহিনী রয়টার্সকে জানিয়েছে, মোবাইল ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার চলতি বছরের শুরুর দিক থেকেই বন্ধ রয়েছে।

তবে সেনাবাহিনী জানায়, উইন্ডোজ কম্পিউটারে বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার ২০২১ সালেরও আগে থেকে বন্ধ ছিল। অন্যদিকে অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের মোবাইল ডিভাইসে অন্তত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে।

নৌবাহিনীও সামরিক ডিভাইসে এসব ট্র্যাকার বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। তবে কবে থেকে তা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

মোবাইল বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার বা ‘মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি’ (এমএআইডি) হলো নির্দিষ্ট ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত একটি অনন্য পরিচয়। বিভিন্ন অ্যাপে ব্যবহারকারীর কার্যক্রম অনুসরণ এবং তার অবস্থান শনাক্ত করতে এগুলো ব্যবহার করা যায়।

ডেটা ব্রোকাররা বিজ্ঞাপন শিল্প থেকে সংগৃহীত এসব তথ্য সংগ্রহ করে আবার বিভিন্ন ক্রেতার কাছে বিক্রি করে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন সেনাদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও বাণিজ্যিকভাবে কেনা সম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

সিনেটর ওয়াইডেন ও নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি প্যাট হ্যারিগান শুক্রবার পেন্টাগনের কাছে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ওয়াইডেন বলেন, সামরিক বাহিনীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো যে এই হুমকি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে কার্যকর হয়নি, তা স্পষ্ট। হ্যারিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের এমন সুযোগ থাকা উচিত নয় যে তারা ‘ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তথ্য কিনে’ মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারবে।

পেন্টাগন জানিয়েছে, আইনপ্রণেতাদের চিঠির জবাব সরাসরি দেওয়া হবে।

স্মার্টফোন থেকে তৈরি হওয়া অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য কমানোর উদ্যোগ এমন সময় নেওয়া হলো, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

জুলাইয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনাকে তাদের মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। কারণ, সেনাদের ইন্টারনেটে প্রকাশ করা মোবাইল ভিডিও থেকে ইরান ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান শনাক্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গোপনীয়তা ও বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিক্রিপ্টঅ্যাডসের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক এডওয়ার্ডস বলেন, সামরিক বাহিনীর পরিচালিত ডিভাইসে এমএআইডি বন্ধ করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর পরও অন্যান্য অ্যাপ বা প্রযুক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। নেটওয়ার্ক তথ্যের সঙ্গে ডিভাইসের কারিগরি তথ্য বা অবস্থানসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য মিলিয়েও এ ধরনের নজরদারি চালানো যেতে পারে।

সূত্র : রয়টার্স

মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তিন পাইলট নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তিন পাইলট নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন নৌবাহিনীর এবং একজন বিমানবাহিনীর পাইলট।

বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এ তথ্য জানিয়েছে।

নিহত পাইলটেরা হলেন মোজতবা বাঘেরি, হামেদ ওকাতি ও হোসেইন মাহদাভিয়ান।

তাদের মধ্যে মোজতবা বাঘেরি ও হামেদ ওকাতি নৌবাহিনীর পাইলট ছিলেন। হোসেইন মাহদাভিয়ান ছিলেন বিমানবাহিনীর পাইলট।

তবে তারা কোথায় মার্কিন হামলার শিকার হয়েছেন, তা জানায়নি ইরান। হামলার সময় তারা যুদ্ধবিমান চালাচ্ছিলেন কি না, সেটিও স্পষ্ট করেনি তেহরান। কোনো হামলা বা সামরিক অভিযানে তারা অংশ নিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।

তিন পাইলটের মৃত্যুর পাশাপাশি নৌবাহিনীর আরো ছয় সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে ইরান।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ও বুধবার দেশজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বোমাবর্ষণে অন্তত ১৯ জন ইরানি নিহত হয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশে সাতজন নিহত হয়েছেন। কেরমানশাহ প্রদেশে নিহত হয়েছেন ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের চার সদস্য।

এ ছাড়া উপসাগরের লাভান দ্বীপে আধাসামরিক বাহিনীর তিন সদস্য এবং ফার্স প্রদেশে আরো একজন নিহত হয়েছেন।

হরমুজগান প্রদেশে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনাতেও মার্কিন হামলাকে দায়ী করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।

তবে নৌবাহিনীর যে ছয় সদস্য নিহত হওয়ার কথা ইরান জানিয়েছে, তারা খুজেস্তানে নিহত সাতজনের মধ্যে রয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের তিন পাইলট নিহত
ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্কুল ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের নীতিমালা তৈরিতেও এই সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃহস্পতিবার আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ঘোষিত এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা এক বছর কার্যকর থাকবে। এর আওতায় প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী প্রভাবিত হবে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ৪০টি এআই-ভিত্তিক টুলের ব্যবহার বন্ধ থাকবে। তবে শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজে এআই ব্যবহার করতে পারবেন।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি বলেছেন, শিশুদের শেখা ও বেড়ে ওঠার জন্য শিক্ষক ও মানবিক যোগাযোগ প্রয়োজন। সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখা এবং নিজেরা কঠিন সমস্যার সমাধান করার সুযোগ শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মামদানি জানান, আগামী এক বছর এই নীতির ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর কী প্রভাব পড়ে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে উচ্চবিদ্যালয়ে এআই ব্যবহারের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা হবে।

পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে গণিতের এআই প্ল্যাটফর্ম ‘এডিয়া’ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় ‘কুইল’ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট ব্যবহার করা যাবে।

নীতিমালায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দৈনিক স্ক্রিন টাইমও ধাপে ধাপে সীমিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৪৫ মিনিটের কম স্ক্রিন ব্যবহারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত ‘কম্প্যানিয়ন চ্যাটবট’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এমন সিদ্ধান্তের সময় নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলগুলো শিক্ষার ফলাফল নিয়েও চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ২০২৫ সালে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতার স্কোর ৬ শতাংশ কমে যায়।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মার্গারেট মুরি বলেন, নিউইয়র্কের এআই নিষেধাজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। তবে নিষেধাজ্ঞাটি কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই বলা কঠিন, কারণ এর প্রয়োগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

সূত্র: আলজাজিরা

জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স
জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

ইরানে নতুন মার্কিন অভিযান কতদিন চলবে, জানালেন ট্রাম্প

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে শুরু হওয়া সামরিক অভিযান বেশি দিন চলবে না বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জুলাইয়ের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ কথা বলেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন ফেলতে সক্ষম একটি রকেট তৈরির চেষ্টা করছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেটি ধ্বংস করেছে ।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান তাদের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল। মার্কিন হামলায় এসব ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির কাছে তারা যে নতুন সরঞ্জাম তৈরি করার চেষ্টা করেছিল, আমরা সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছি। কিছু ছিল প্রতিরক্ষামূলক, কিছু আক্রমণাত্মক।’

গত রাতের হামলাকে খুবই বড় আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যে কোনো সময় আবারও হামলা চালাতে প্রস্তুত।

তবে নতুন করে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান খুব বেশি সময় চলবে না বলেও জানান তিনি।

যদিও এর আগে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কানকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ফের যুদ্ধ শুরু হতে পারে; এ নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট, আমি বিষয়টি সামলে নেব।’

এদিকে ইরানে ইসরায়েলের অভিযান এখনো শেষ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমার নির্দেশনায় আমাদের সব ব্যবস্থা এই শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের জন্য কাজ করছে।’

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য বলেও জানান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

তবে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে ইসরায়েল সরাসরি জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত করেননি তিনি।

সূত্র : রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স

আমাদের বোমা হত্যা করছে নিরীহ নারী ও শিশুদের: মার্কিন কংগ্রেস সদস্য

ফিলিস্তিন ও ইরানে চলমান সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ডেলিয়া রামিরেজ। যুদ্ধ বন্ধ করতে কংগ্রেসে আইন পাসের ওপর জোর দেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিন, ইরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের বোমা নিরীহ নারী ও শিশুদের হত্যা করছে।’

রামিরেজ আরো বলেন, ‘আমাদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে এবং এই অন্তহীন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কংগ্রেসকে ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’ পাস করতে হবে।’

তার মতে, ‘ট্রাম্প ও হেগসেথের যুদ্ধাপরাধের প্রতি কংগ্রেস আর চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না।’

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এতে বহু বেসামরিক মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলায় সহায়তা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

সূত্র: আল জাজিরা

আমাদের বোমা হত্যা করছে নিরীহ নারী ও শিশুদের: মার্কিন কংগ্রেস সদস্য
ছবি: সংগৃহীত।

হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এসব সরঞ্জাম সেখানে পাঠানো হতে পারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি ও সামরিক সূত্রের বরাতে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের জন্য আইনসভার অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। মন্ত্রিসভার পর্যালোচনার পর চলতি মাসেই আইনসভায় সম্মতি প্রস্তাব জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

সরকারের বিবেচনায় রয়েছে তিন ধরনের সামরিক সহায়তা। এর মধ্যে একটি সামুদ্রিক টহল বিমান, একটি রসদ সরবরাহকারী জাহাজ অথবা মাইন শনাক্ত ও অপসারণকারী একটি ইউনিট মোতায়েনের বিকল্প রয়েছে।

সম্ভাব্য সহায়তার ধরন ও পরিসর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার আলোচনা চলছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ব্লু হাউস।

ব্লু হাউস বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে সিউল আলোচনা করছে। কিন্তু সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন খবর ‘তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’।

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার আকার আংশিক কমিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া
ছবি: সংগৃহীত

গাজার সব বাসিন্দাকে ৭ বছরের মধ্যে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইসরাইলি মন্ত্রীর

মিডল ইস্ট আইঃ গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে অন্য দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।

তার প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী সাত বছরে গাজা থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৬০ হাজার ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার তিনি পরিকল্পনাটি প্রকাশ করেন।

বেন গভিরের প্রস্তাবের নাম ‘ডিসএনগেজমেন্ট ৭১০’। তিনি উগ্র ডানপন্থি ও ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী দল ওতজমা ইয়েহুদিতের (জিউইশ পাওয়ার) নেতা। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি তার নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়। ভবিষ্যতে কোনো জোট সরকারে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি এটিকে শর্ত হিসেবে রাখতে চান।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে এই পরিকল্পনা তৈরি করেছেন বেন গভির। এতে প্রথম বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে গাজা থেকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তিন বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ১১ লাখ ১০ হাজারে এবং সাত বছরের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

গাজায় ইতোমধ্যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ইসরাইলি হামলায় ৮০ শতাংশের বেশি ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য ও পানির সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যেও ইসরাইলি বাহিনী গাজায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেন গভিরের পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায়’ গাজা ছাড়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের তুরস্ক, ইথিওপিয়া, কঙ্গো এবং কয়েকটি আরব দেশে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। এ জন্য ‘আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব’ প্রয়োজন হবে। যেসব দেশ ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করবে, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করার কথাও পরিকল্পনায় রয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রথম বছরেই ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হতে পারে। সাত বছরে মোট ব্যয় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বেন গভির বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের অংশ। আগামী সরকার গঠনের সময়ও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকে তিনি জোটে যোগ দেওয়ার শর্ত করতে চান।

এ জন্য জোরপূর্বক স্থানান্তর তদারকির দায়িত্বে একজন মন্ত্রী নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন বেন গভির। ওই মন্ত্রীর অধীনে একজন মহাপরিচালক, আলাদা বাজেট এবং ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালানোর জন্য একটি বিশেষ দল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বুধবার একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত অভিবাসন ছাড়া গাজার জন্য কোনো বাস্তব সমাধান নেই।’

ফিলিস্তিনিদের গ্রহণ করতে পারে এমন দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চায় বলেও জানান কাৎজ। তার ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনা বাতিল করেননি; বরং এটি স্থগিত রেখেছেন।

আরব দেশগুলোর চাপের কারণে এমনটি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জুনের শেষ দিকে ইসরাইল পরিকল্পনাটির নাম ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’ থেকে বদলে ‘ফ্রিডম অব মুভমেন্ট প্ল্যান’ বা ‘চলাচলের স্বাধীনতা পরিকল্পনা’ করে। তবে এর কাঠামোয় ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফিরে আসার অধিকার বা সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তার উল্লেখ নেই।

ফিলিস্তিনিরা ‘স্বেচ্ছায়’ গাজা ছাড়বেন—ইসরাইলের এমন বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ ও জীবনযাপনের অনুপযোগী পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে চলে যেতে বাধ্য করা হলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে ‘স্বেচ্ছা’ বলা যায় না।

গাজার সব বাসিন্দাকে ৭ বছরের মধ্যে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইসরাইলি মন্ত্রীর
২৩ জুলাই আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ করেন ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির। ছবি: এএফপি

কেমন ছিলেন সাহাবি যুগের নারীরা by মনযূরুল হক

ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা সমাজে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তারা কেবল সংসারের কাজে স্বামীর সহায়তাই করতেন না, বরং সন্তানকে জিহাদে উৎসাহিত করতেন, নিজেরা ধর্মীয় জ্ঞানে গভীরতা অর্জন করতেন এবং কেউ কেউ জ্ঞান বিতরণে ‘শাইখা’ বা শিক্ষকের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিলেন।

এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে বড় বড় পুরুষ আলেম নারী শিক্ষক/শাইখাদের থেকে হাদিস, ফিকহ এবং অন্যান্য শরয়ী জ্ঞান অর্জন করেছেন।

ইসলামের প্রারম্ভে নারী

শাইখ ইউসুফ কারজাভি (রহ.) ইসলামের প্রথম যুগের নারীদের জ্ঞানান্বেষণের মানসিকতা সম্পর্কে বলেছেন, “নারীরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে আসতেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়েও জিজ্ঞাসা করতেন। এমনকি আয়েশা (রা.) বলতেন, ‘আল্লাহ আনসার নারীদের প্রতি রহম করুন, লজ্জা তাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞান শেখা থেকে বিরত রাখেনি।’”

তারা জীবনের গোপনতম বিষয়েও নবীজি (সা.)-কে প্রশ্ন করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, কারণ দ্বীনের বিষয়ে কোনো লজ্জা নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩০)

নারীরা আল্লাহর আদেশ পালনে ছিলেন অতিশয় দ্রুত ও তৎপর। যখন পর্দার বিধান সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হলো, “আর ইমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ব্যতীত তাদের অলংকারাদি প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের ওড়না দ্বারা আপন বক্ষদেশ আবৃত করে।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)

আয়েশা (রা.) সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, আয়াতটি নাজিল হওয়ার পরই, “আনসার নারীরা তাদের কাছে যা কিছু চাদর ছিল, তাই নিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন, অতঃপর তারা নামাজের জন্য এলেন, তাদের মাথায় সেই চাদর জড়ানো ছিল, মনে হচ্ছিল যেন তাদের মাথার ওপর কাক বসে আছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪১০২)

তারা এক মুহূর্তের জন্যও অপেক্ষা করেননি, দ্রুত আল্লাহর আদেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এভাবেই ছিল আল্লাহর আদেশ ও দ্বীনের বিধিবিধানের প্রতি সেই নারীদের অবিচল নিষ্ঠা।

স্বামীর জন্য সহযোগী

ইসলামের প্রথম যুগের নারীরা ছিলেন স্বামীর জন্য সর্বোত্তম সাহায্যকারী।

আসমা বিনতে আবি বকর (রা.): তিনি ছিলেন নবীজির ফুফাতো ভাই ও সহচর জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.)-এর স্ত্রী এবং ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। তিনি তাঁর স্বামীকে সাহায্য করতেন। জুবাইরের এক খণ্ড জমি ছিল যা মদিনা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।

আসমা পায়ে হেঁটে সেখানে যেতেন এবং কাজ করে আসতেন। জুবাইরের একটি ঘোড়াও ছিল, যাকে খাওয়াতে তিনি খেজুরের আঁটি পিষতেন। একবার ফেরার পথে নবীজি তাঁকে দেখে নিজের পিছনে সওয়ার করিয়ে আনেন। জুবাইর তা জানতে পারেন এবং তাঁর কষ্ট দেখে ব্যথিত হন। তবে আসমা (রা.) তার পরও নিয়মিত স্বামীকে সাহায্য করতেন এবং স্বামীর দুঃসময় ও সংকটের মুহূর্তে তাঁর পাশে থাকতেন।

ফাতিমা আয-যাহরা (রা.): নবীজির কন্যা ফাতিমা (রা.) নিজ হাতে ঘর ঝাড়ু দিতেন, আটা মাখতেন, রান্না করতেন এবং রুটি বানাতেন। তিনি এত বেশি যাতা ঘুরিয়েছিলেন যে তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। একদিন তিনি নবীজির কাছে গিয়ে একজন সাহায্যকারী (খাদেম) পেতে আরজি জানালেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বলেন, “ফাতিমা আমার অংশ; যা তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়।”

এরপর তিনি তাঁকে বললেন, “আমি কি তোমাকে এর চেয়েও উত্তম কিছু শিখিয়ে দেব না? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আল্লাহর এই জিকির তোমার জন্য খাদেমের চেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭০৫)

নবীজি (সা.) বোঝালেন যে, আল্লাহর স্মরণ তাঁকে এমন আত্মিক শক্তি দেবে, যা জীবনের কঠিন দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। আলী (রা.) সেই সময় তাঁর জন্য খাদেমের ব্যবস্থা করতে পারেননি, তাই ফাতিমা (রা.) জীবনের তিক্ততা ও কঠোরতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।

স্বামীর প্রতি উপদেশ

সেই সময়ের নারীরা স্বামী কাজ বা ব্যবসার জন্য বের হওয়ার সময় বলতেন, “হে অমুকের পিতা, আপনি হারাম উপার্জন থেকে সাবধান থাকবেন। কারণ আমরা ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারি, কিন্তু জাহান্নামের আগুন এবং পরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধ সহ্য করতে পারব না।”

যদি কোনো পুরুষের অসৎ পথে উপার্জনের প্রতি দুর্বলতা থাকত, তবে স্ত্রীর এই কথা তাকে সতর্ক করত এবং বিবেককে জাগ্রত করত।

নারীদের ত্যাগ

যদি স্বামী জিহাদের জন্য যেতেন, স্ত্রীর অবস্থান মোটেও নিরুৎসাহিত করার মতো ছিল না, বরং তাঁরা স্বামীকে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করতেন। যদি স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হতো, ‘স্বামী ছাড়া তুমি তোমার সন্তানাদি নিয়ে কী করবে?’ তখন একজন নিশ্চিত ইমানদার নারীর উত্তর হতো, “আল্লাহ তো আছেন!”

তিনি সন্তানকে উত্তম চরিত্র, ইসলামি মূল্যবোধ এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলতেন এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখতেন।

প্রাচীন জাহেলি যুগের কবি খানসা (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁর ভাই সাখরের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান ছিলেন এবং পুরো একটি কাব্যগ্রন্থ কেবল তাঁর ভাইয়ের জন্য বিলাপ করে রচনা করেছিলেন। কিন্তু ইসলামের আলো তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করার পর ইসলাম তাঁকে নতুন করে গড়ে তুলল, নতুন ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাচেতনা দিল।

উমর (রা.)-এর যুগে তাঁর চার পুত্র কাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। তিনি তাদের উপদেশ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর পথে শহীদ হতে এগিয়ে যান, পিছপা না হন এবং দ্বিধা না করেন।

চারজনই শহীদ হলেন। খবর শুনে তিনি কোনো আর্তনাদ করেননি বা জাহেলি যুগের মতো আচরণ করেননি। বরং অত্যন্ত দৃঢ় ইমানের সঙ্গে বলেছিলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে তাঁর পথে তাদের শহীদ হওয়ার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং কেয়ামতের দিন তাদের আমার জন্য সুপারিশকারী বানিয়েছেন।” (ইবনে আব্দিল বার, আল-ইসতিআব ফী মা’রিফাতিল আসহাব, ৪/১৬৫৫, বৈরুত: দারুল জীল, ১৯৯২)

আসমা (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) খিলাফত নিয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আত্মসমর্পণের আগে তিনি মায়ের কাছে যান। সেই দৃঢ়চেতা ধৈর্যশীল মা আসমা তাঁকে বলেন, “হে আমার পুত্র, যদি তুমি সত্যের ওপর থাকো, তবে এই জাতিকে তোমার মাথা নিয়ে খেলতে দিয়ো না।”

ইবনে জুবাইর (রা.) যখন বললেন, ‘আম্মা, আমি ভয় পাচ্ছি যে আমি নিহত হলে তারা আমার অঙ্গহানি করবে।’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, “হে আমার পুত্র, জবাই করার পর চামড়া ছাড়ানোতে মেষের কোনো ক্ষতি হয় না!”

এই ছিল সেই মা, যিনি জীবন ও শাহাদাতের মূল্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতেন।

নারীদের জ্ঞানার্জন

নারীর জন্য জ্ঞানার্জন ফরজ। যারা কোনো কোনো সময় নারীকে মূর্খতার মধ্যে রাখতে চেয়েছেন, তারা নিজেরাই অজ্ঞ ছিলেন। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দেয়। মুসলিম নারীদের মধ্যে এমন বহুজন ছিলেন যারা পুরুষদেরকে ফতোয়া দিতেন।

নবীজির স্ত্রীদের জ্ঞান: পুরুষেরা আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে যেতেন হাদিস বর্ণনা করতে এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে। এমনকি বড় বড় সাহাবি ও তাবেয়িগণ আয়েশা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, আর তিনি উত্তর দিতেন এবং প্রয়োজনে তাদের ত্রুটি সংশোধন করতেন। ইমাম জারকাশি (রহ.) এ নিয়ে একটি বই-ও লিখেছেন যার নাম আল-ইজাবাহ লিমা ইস্তাদরাকাতহু আয়েশা আলা আস-সাহাবাহ (সাহাবিদের বিষয়ে আয়েশা যা সংশোধন করেছেন তার উত্তর)।

শিষ্যত্ব ও শিক্ষকতা: পরবর্তী যুগগুলোতেও মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চার মজলিস ছিল। সাকিনা বিনতে হুসাইন (রা.)-এর একটি জ্ঞান মজলিস ছিল, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সফর করত। কথিত আছে, চার ইমামের একজন ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-ও তাঁর মজলিসে উপস্থিত হয়েছিলেন।

বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার আল-আসক্বালানি (রহ.) তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অনেক নারীর নাম উল্লেখ করেছেন। হানাফি মাজহাবের একজন প্রবীণ আলেমের এমন একজন কন্যা ছিলেন যিনি পিতার মতোই ফতোয়া দিতেন। ফতোয়ার নিচে পিতার সঙ্গে কন্যারও স্বাক্ষর থাকত।

এই ছিল ইসলামের প্রথম যুগের নারীর প্রতিচ্ছবি। মুসলিম নারীদেরকে অবশ্যই তাদের ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্ব ও দাওয়াতি দায়িত্বের প্রতি আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে।

কেমন ছিলেন সাহাবি যুগের নারীরা
ছবি: ফ্রিপিক

উত্তর গাজায় দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যার কথা নিশ্চিত করল ইসরাইল

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এলাকায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ)। বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে এর আগে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা আগেই জানিয়েছিল, বেইত লাহিয়ায় একদল লোকের ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনী গুলি চালালে দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরো বেশ কয়েকজন আহত হন।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুজন ব্যক্তি ‘হুমকি’ দেওয়ার পর তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করার পর নিহত হন। এই ‘ইয়েলো লাইন’ হলো ইসরাইল-অধিকৃত সামরিক সীমারেখা, যা ফিলিস্তিনিদের অতিক্রম করার অনুমতি নেই।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্যাটেলাইট চিত্র প্রমাণ করে যে ইসরাইলিসামরিক বাহিনী এই রেখাটি তৈরি করা হলুদ কংক্রিটের ব্লকগুলোকে গাজা উপত্যকার আরও গভীরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভূখণ্ডটির প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়ে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হচ্ছে।

বেইত লাহিয়ায় দুই ফিলিস্তিনির নিহত হওয়ার ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন গাজায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি হামলা ও গুলিবর্ষণ অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

উত্তর গাজায় দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যার কথা নিশ্চিত করল ইসরাইল

অভিযোগ নেই, বিচার নেই— তবু ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া

আল-জাজিরাঃ ইসরাইলি কারাগারে আটক গাজার চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়ার ওপর নির্যাতন এখনো চলছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী। নতুন সাক্ষ্যে আবু সাফিয়া বলেছেন, কারারক্ষীরা তাকে মারধর করছেন, ঘুমাতে দিচ্ছেন না। আটকের পরিস্থিতি আইনজীবীকে জানালে তাকে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এতে তার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে আবু সাফিয়াকে আটক করে ইসরাইলি বাহিনী। তখন হাসপাতালটি গাজায় চালু থাকা শেষ দিকের কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্রের একটি ছিল। হাসপাতাল খালি করার ইসরাইলি নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তিনি।

গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে শত শত চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে উপত্যকার প্রায় সব হাসপাতাল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আবু সাফিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার পরিবার ও অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। তাকে মুক্তি দেওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

জুলাইয়ে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন জানায়, আবু সাফিয়া ‘নিরবচ্ছিন্ন ও গুরুতর নির্যাতনের’ শিকার হচ্ছেন। গত মাসে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকও তার জীবন রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নতুন সাক্ষ্যে নির্যাতনের বর্ণনা

বুধবার ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরাইল (পিএইচআরআই) এক বিবৃতিতে আবু সাফিয়ার নতুন সাক্ষ্যের কথা জানায়। তার আইনজীবী নাসের ওদেহ গত রোববার মধ্য ইসরাইলের নিজান কারাগারের রাকেফেত আটককেন্দ্রে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন।

আবু সাফিয়া আইনজীবীকে বলেন, কারারক্ষীরা তাকে নিয়মিত মারধর করছেন। রাতে তাকে ঘুমাতে দেওয়া হচ্ছে না। আটকের পরিস্থিতি আইনজীবীকে জানালে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

পিএইচআরআইয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, কারারক্ষীরা ঘুষি ও লাথি মেরে এবং লাঠি দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেছেন। সংবেদনশীল স্থানেও তাকে পেটানো হয়েছে।

রাতে লাউডস্পিকারসহ বিভিন্ন উৎস থেকে শব্দ করে ইচ্ছাকৃতভাবে তার ঘুম নষ্ট করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

আগে থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ

আবু সাফিয়ার পরিবার ও অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তিনি নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

তার আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাকেফেতের ভূগর্ভস্থ আটককেন্দ্রে তাকে একাকী রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই তাকে মারধর করা হচ্ছে।

জুলাইয়ে পিএইচআরআই জানায়, একপর্যায়ে আবু সাফিয়ার মাথা, চোখের চারপাশ, কান ও ঘাড়ে গুরুতর ও তাজা আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার চেহারা এতটাই বদলে গিয়েছিল যে আইনজীবীর তাকে চিনতে কষ্ট হয়েছিল।

জুনে ইসরাইলি আদালতে ভিডিও সংযোগে আবু সাফিয়াকে হাজির করার একটি ফুটেজ প্রকাশিত হয়। এতে তার মুখ ও পেটের অংশ আগের তুলনায় অনেক বেশি শুকনো দেখাচ্ছিল।

১০ আগস্ট তাকে রাকেফেত থেকে রামলা কারাগারের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

পিএইচআরআই বলেছে, এই স্থানান্তর তার গুরুতর চিকিৎসার প্রয়োজনের ইঙ্গিত দেয়। সাধারণ কারাগারের ওয়ার্ডে সেই চিকিৎসা যথাযথভাবে দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

মুক্তির দাবিতে আইনি পদক্ষেপ

আবু সাফিয়ার চিকিৎসা নিয়ে আইনি পদক্ষেপও চালিয়ে যাচ্ছে পিএইচআরআই। সংগঠনটি একজন স্বাধীন চিকিৎসক দিয়ে তার শারীরিক পরীক্ষা করানোর দাবি জানিয়েছে।

৭ জুলাই ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এ আবেদন করা হয়েছিল। তবে এখনো তা অনুমোদন করা হয়নি বলে জানিয়েছে পিএইচআরআই।

আবু সাফিয়া ওই সংগঠনের মাধ্যমে ইসরাইলের একটি প্রশাসনিক আদালতেও আবেদন করেছেন। ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জবাব দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।

পিএইচআরআই বলেছে, এ বিষয়ে আর দেরি করার কোনো কারণ নেই।

অভিযোগ নেই, বিচারও হয়নি

আবু সাফিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। তার কোনো বিচারও হয়নি। ইসরাইলের ‘কমব্যাট্যান্ট আইন’-এর আওতায় তাকে আটক রাখা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সময় বিচার ছাড়াই আটক রাখা যায়।

কামাল আদওয়ান হাসপাতালে অভিযান চালানোর পর ইসরাইলি বাহিনী তাকে আটক করে। পরে হাসপাতালটি ধ্বংস করে ইসরাইলি বাহিনী। হাসপাতাল খালি করার নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন আবু সাফিয়া।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই আইনকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছে।

সংগঠনটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের উপপরিচালক সারা হাশাশ আল-জাজিরাকে বলেন, এই আইনের আওতায় গাজা থেকে আসা এমন ব্যক্তিদের অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটক রাখা যায়, যাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করা যায়। অভিযোগপত্রও দিতে হয় না।

আটক হওয়ার আগে গাজার বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিস্থিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে আবু সাফিয়া ছিলেন অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ। ইসরাইলি ড্রোন হামলায় তার এক ছেলে নিহত হওয়ার পরও তিনি চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন।

পিএইচআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজার আরো অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসককে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কোনো অভিযোগ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে।

বুধবারের বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, গাজা থেকে আটক ১৪ জন চিকিৎসককে মুক্তি দেওয়াই তাদের প্রধান দাবি। এর মধ্যে আবু সাফিয়াও রয়েছেন। তারা যেন পরিবারের কাছে ফিরতে এবং আবার চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হতে পারেন, সেটিই তাদের দাবি।

আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

জুলাইয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন আবু সাফিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তাকে দ্রুত স্বাধীন চিকিৎসাসেবা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তার মুক্তি এবং ইসরাইলি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছে।

সারা হাশাশ বলেন, আবু সাফিয়ার ওপর গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দীর্ঘ সময় একাকী রাখা, মারধর এবং অন্যান্য দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে অ্যামনেস্টি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, আবু সাফিয়াসহ অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক রাখা সব ফিলিস্তিনিকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া উচিত।

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ

জাতিসংঘের জুলাইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবু সাফিয়ার সঙ্গে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের আচরণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের যে বিস্তৃত চিত্র আগের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছে, তার ঘটনাও তার সঙ্গে মেলে।

তদন্ত কমিশনের মতে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার ব্যাপক এবং নিয়মতান্ত্রিক।

কমিশন ইসরাইলকে নির্বিচারে আটক ও নির্যাতনের নীতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আটককেন্দ্রগুলোতে স্বাধীন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের অবাধ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরাইলের অব্যাহত অবজ্ঞা এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার অভাবের কথা উল্লেখ করে সারা হাশাশ বলেন, আবু সাফিয়াসহ নির্বিচারে আটক সব ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিতে ইসরাইলের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো জরুরি।

পিএইচআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতনের কারণে অন্তত ১০৫ জন নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে ৯ হাজার ৪০০-এর বেশি বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জন নারী এবং ৩৭০-এর বেশি শিশু।

ইসরাইলি হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত মারধর, অনাহারে রাখা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দীরা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, কারারক্ষী ও সেনাদের হাতে তারা অমানবিক আচরণ, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

অভিযোগ নেই, বিচার নেই— তবু ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া
ইসরাইলি কারাগারে নির্যাতনের শিকার গাজার চিকিৎসক আবু সাফিয়া। ছবি: রয়টার্স

ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বেদনার নিদর্শন তাজমহল

বিবিসি বাংলাঃ ১৭শে জুন ১৬৩১ সাল। দাক্ষিণাত্যে (দক্ষিণ ভারত) মুঘলদের প্রধান কেন্দ্র বুরহানপুরে তখন তীব্র গরম। পঞ্চম মুঘল সম্রাট শাহজাহানের প্রিয় সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল সেই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ১৪তম বারের মতো প্রসববেদনা সহ্য করছিলেন।

এই রাজ দম্পতির ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে তখন পর্যন্ত ১৩টি সন্তানের জন্ম হয়েছিল, যাদের মধ্যে সাতজন শৈশবেই মারা যায়। বেঁচে থাকা ছয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন জাহানারা। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। মায়ের প্রসবের সময় তিনি পাশেই উপস্থিত ছিলেন।

রাজ চিকিৎসক এবং প্রসবে সহায়তাকারী ধাত্রীরাও ছিলেন সেখানে। ১৭ বছর বয়সী জাহানারা এর আগেও তার মায়ের বেশ কয়েকটি প্রসবে সহায়তা করেছিলেন।কিন্তু এবার, অর্থাৎ চতুর্দশ সন্তানের জন্মের সময় কিছু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

সুপ্রিয়া গান্ধী তার বই 'দ্য এম্পেরর হু নেভার ওয়াজ: দারা শিকোহ ইন মুঘল ইন্ডিয়া'তে লিখেছেন, বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের চিন্তাধারায় প্রভাবিত মুঘল হাকিমরা মানবদেহকে চার ধরনের তরল বা উপাদানের সমন্বয় বলে মনে করতেন এবং তাদের মতে মানুষের স্বাস্থ্য নির্ভর করে এসব উপাদানের ভারসাম্যের ওপর।

সে হিসেবে মমতাজ মহলের শরীরে এ ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। ৩০ ঘণ্টা দীর্ঘ প্রসববেদনার পর মমতাজ মহল একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন; কিন্তু এরপর তার প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।সম্ভবত তিনি সেই জটিলতার শিকার হয়েছিলেন, যাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পোস্টপার্টাম হেমোরেজ, অর্থাৎ প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বলা হয়।

যন্ত্রণায় কাতর মমতাজ মহল জাহানারাকে বলেন তার বাবা, মানে শাহজাহানকে ডেকে আনতে। শোকে মুহ্যমান সম্রাট দ্রুত সেখানে আসেন এবং মুমতাজ মহলের শিয়রের পাশে বসেন। তাদের বাকি সন্তানদের আর মায়ের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ হয়নি, তবে মমতাজ মহল সম্রাটকে বলেন যে তিনি তার সন্তানদের এবং তার মাকে সম্রাটের তত্ত্বাবধানে রেখে যাচ্ছেন। এরপর ৩৮ বছর বয়সে প্রসব পরবর্তী জটিলতার কারণেই মমতাজ মহল পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

ভালোবাসায় ভরা জীবন

শাহজাহান ও মমতাজ মহলের বিয়ে হয়েছিল ১৬১২ সালে। তখন শাহজাহান পরিচিত ছিলেন যুবরাজ খুররম নামে এবং মমতাজ মহলের নাম ছিল 'আরজুমান্দ বানু বেগম'। বিয়ের কিছুদিন পরই আরজুমান্দ বানু বেগমকে 'মমতাজ মহল' উপাধি দেন যুবরাজ খুররম, যার অর্থ 'প্রাসাদের সবচেয়ে পছন্দের নারী'।

ইতিহাসবিদদের মতে, মমতাজ মহল ও শাহজাহানের দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা ও পারস্পরিক অনুরাগে পূর্ণ ছিল। ১৬২৮ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর শাহজাহান মমতাজ মহলকে 'পাদশাহ বেগম', 'মালিকা-এ-জাহান', 'মালিকা-এ-জামানি' এবং 'মালিকা-এ-হিন্দুস্তান' উপাধি দেন এবং সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন।

অ্যালিসন ব্যাংকস ফাইন্ডলির বই 'নূরজাহান: এমপ্রেস অব মুঘল ইন্ডিয়া' থেকে জানা যায়, শাহজাহান আরো দুটি বিয়ে করেছিলেন। একটি আরজুমান্দ বানুকে বিয়ের আগে এবং আরেকটি পরে। দরবারি ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথম ও তৃতীয় বিয়ের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক জোট গঠন, এবং এসব বিয়ে থেকে একটি করে সন্তানও হয়েছিল।"তবে অন্য কোনো সম্রাজ্ঞীর প্রাসাদ 'খাস মহলে'র মতো জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। এ প্রাসাদে মমতাজ মহল শাহজাহানের সঙ্গে থাকতেন। খাঁটি সোনা ও মূল্যবান পাথরে সজ্জিত এ প্রাসাদে গোলাপজলের ফোয়ারা ছিল।"

"মুঘল সম্রাটের প্রত্যেক স্ত্রী মাসিক ভাতা পেতেন। সবচেয়ে বড় অঙ্ক ছিল বার্ষিক ১০ লাখ রুপি, যা শাহজাহান মমতাজ মহলকে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তাকে খুবই লাভজনক বহু জমি-জমাও দেওয়া হয়েছিল।"

রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত, উভয় ক্ষেত্রেই মমতাজ মহল ছিলেন শাহজাহানের ঘনিষ্ঠ বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য উপদেষ্টা।

ভালডেমার হ্যানসেন তার বই দ্য পিকক থ্রোন-এ লিখেছেন, তার ফুফু নূরজাহানের মতো মমতাজ মহলও ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য দরবারে সম্রাটের সঙ্গে উপস্থিত থাকতেন।

"তিনি একটি পর্দার আড়ালে থাকতেন। কোনো বিষয়ে তার মত ভিন্ন হলে তিনি সবার দৃষ্টির বাইরে থেকে সম্রাটের পিঠে হাত রাখতেন। তার সুপারিশে সম্রাট শত্রুদের ক্ষমা করে দিতেন বা মৃত্যুদণ্ড হ্রাস করতেন।"

ইতিহাসবিদদের মতে, শাহজাহান তাকে রাজমোহর দিয়েছিলেন, যা রাজকীয় আদেশের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যবহৃত হতো।

মমতাজের অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হত না।

মমতাজ মহলের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা না থাকলেও, তিনি তার অসাধারণ প্রভাব প্রায়ই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করতেন।

ইতিহাসবিদ সুপ্রিয়া গান্ধীর মতে, আজও মমতাজ মহলের মোহরযুক্ত একটি ফরমান পাওয়া যায়, যাতে তিনি এরান্ডোলের (খানদেশের একটি মারাঠিভাষী জেলা) কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিচ্ছেন।

"তিনি নতুন দেশমুখ (সর্দার) কানোজির পদ নিশ্চিত করেন এবং নির্দেশ দেন যাতে প্রজাদের কল্যাণের দিকে নজর রাখা হয়, যাতে তারা সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে।

সম্ভবত এটি ছিল সম্রাজ্ঞীর জারি করা অসংখ্য সরকারি ফরমানের একটি। তার বিশ্বস্ত সহকারী সতি-উল-নিসাকে তার মোহররক্ষক করা হয়েছিল।"

"সতি-উল-নিসা নারীদের আবেদনপত্র পর্যালোচনা করতেন এবং যোগ্য আবেদনকারীদের নির্বাচন করতেন, আর মমতাজ মহল সেগুলো সম্রাটের নজরে আনতেন। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও সম্রাজ্ঞী সুপারিশ করতেন এবং প্রায়ই শাহজাহানের কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করতেন।"

রাজদরবারের ইতিহাসবিদরা তাদের সম্পর্ককে এতটাই অসাধারণ বলে মনে করেছিলেন যে তারা সাধারণত রাজদম্পতিদের বিষয়ে যে সংযম দেখানো হতো, তা থেকে সরে এসে তাদের গভীর আবেগপূর্ণ ও দাম্পত্য সম্পর্কেরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

মমতাজ মহল শাহজাহানের প্রাথমিক সামরিক অভিযান এবং পরে তার বাবা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময়ও স্বামীর সঙ্গে ছিলেন।

বুরহানপুরে যেখানে সম্রাট সেসময় একটি বিদ্রোহ দমন করতে অবস্থান করছিলেন, সম্রাজ্ঞীর সুসজ্জিত ও জাঁকজমকপূর্ণ শিবিরও তার খুব কাছেই স্থাপন করা হয়।

স্ত্রীর মৃত্যুর আঘাত

মমতাজ মহল চতুর্দশ সন্তান প্রসবের সময় মারা গেলেও এ প্রসব থেকে জন্ম নেওয়া শিশুকন্যাটি বেঁচে যায়। সেই কন্যার নাম রাখা হয় গওহর আরা, যার অর্থ 'গহনায় সজ্জিত'।

শাহজাহানের ইতিহাসবিদরা সম্রাটের শোক পালনের বিষয়ে অনেক তথ্য দিয়েছেন। তবে তার সন্তানরাও যে মায়ের মৃত্যুতে গভীর আঘাত পেয়েছিল, তা অনুমান করা যায়।

সম্রাট শাহজাহানের দরবারের ইতিহাসবিদ আবদুল হামিদ লাহৌরি 'পাদশাহনামা'য় লিখেছেন, "দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতা ও অশ্রুর আর্দ্রতায় সূর্যের মতো সম্রাটের হৃদয়ের আয়না, যা কখনো অন্ধকারের মুখ দেখেনি, মরিচা পড়ে ম্লান হয়ে গিয়েছিল।"

মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর সম্রাট সাদা পোশাক পরতে শুরু করেন। সেসময় সব রাজপুত্র, দরবারি এবং কর্মচারীরাও শোকের পোশাক ধারণ করেন। এক সপ্তাহ শাহজাহান ঘরের বাইরে দেখা দেননি এবং রাজকার্যও পরিচালনা করেননি। স্ত্রীর মৃত্যুর আগে তার মাথায় কষ্টে খুঁজেপেতে ২০টি সাদা চুল পাওয়া যেত, কিন্তু অল্প সময়েই সে সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন তিনি তার অশ্রু সম্বরণ করতে পারেননি।

১৬ বছর বয়সী রাজকুমার দারা শিকোহ তা মা মমতাজ মহলকে জয়নাবাদের বাগানে, তাপ্তি নদীর তীরে সমাহিত হতে দেখেছিলেন। শাহজাহান প্রতি শুক্রবার কবর জিয়ারত করতেন এবং সম্ভবত দারা শিকোহ ও তার কয়েকজন ভাইও তার সঙ্গে যেতেন। কবি কালিম সম্রাটের শোককে এভাবে বর্ণনা করেছেন, "তার ছায়া কবরের ওপর পড়ামাত্রই তার কান্নার আর্দ্রতা কাফন পর্যন্ত পৌঁছে যেত।"

তবে, ইতিহাসবিদ সুপ্রিয়া গান্ধীর মতে, বুরহানপুরকে মুমতাজ মহলের চূড়ান্ত বিশ্রামস্থল বানানোর কোনো ইচ্ছাই শাহজাহানের ছিল না। তার নজর ছিল আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে একটি সুন্দর স্থানের দিকে।

"রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে শাহজাহান রাজকীয় অধিকার প্রয়োগ করে এ জমি নিয়েছিলেন এবং বিনিময়ে তাকে রাজসম্পত্তি থেকে চারটি প্রাসাদসদৃশ ভবন দিয়েছিলেন।"

১৬৩১ সালের ডিসেম্বর মাসে মমতাজ মহলের মরদেহ কবর থেকে তোলা হয় এবং তার পুত্র সুজা কফিনসহ আগ্রার উদ্দেশে রওনা হন। সতি-উল-নিসাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সুপ্রিয়া গান্ধী লিখেছেন, পথে জানাজার শোভাযাত্রায় মানুষকে মুদ্রা ও খাবার বিতরণ করা হয়েছিল। আগ্রায় পৌঁছানোর পর কবরের ওপর একটি ছোট গম্বুজ নির্মাণ করা হয়, যাতে বাইরের দৃষ্টির আড়ালে নিরাপদ থাকে।

শোকাহত শাহজাহান এরপর একটি বিশাল সমাধি নির্মাণের পরিকল্পনায় মন দেন, যার নাম হয় 'তাজমহল'। যৌবন থেকেই স্থাপত্যের প্রতি শাহজাহানের আগ্রহ ছিল। ফরাসি রত্ন ব্যবসায়ী জ্যাঁ-বাতিস্ত তাভার্নিয়েরের ভ্রমণবৃত্তান্ত অনুযায়ী, এ প্রকল্পে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক ও এক হাজার হাতি নিয়োজিত ছিল। তাজমহলের নির্মাণকাজ ২২ বছর ধরে চলেছিল এবং এর ব্যয় সেই সময় ৫০ লাখ রুপিতে গিয়ে পৌঁছেছিল, ফলে মুঘল কোষাগার অনেকটাই শূন্য হয়ে যায়।

ইভা ফার্নান্দেজ দেল কাম্পো লিখেছেন, শাহজাহান তাজমহল নির্মাণে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে সাম্রাজ্যের অন্যান্য বিষয় অবহেলিত হতে শুরু করে। ১৬৫৮ সালে আওরঙ্গজেব তার বাবা শাহজাহানের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন এবং নিজের তিন ভাইকে হত্যা করেন। শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দি করা হয়, যেখানে তিনি ১৬৬৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বন্দি ছিলেন।

কালো তাজমহলের পরিকল্পনা?

লোকমুখে প্রচলিত আছে যে শাহজাহান নিজের জন্যও একটি সমাধি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, যা তার শোকের প্রতীক হিসেবে কালো পাথরে নির্মিত হতো এবং একটি সেতুর মাধ্যমে তাজমহলের সঙ্গে যুক্ত থাকত।

ফরাসি পর্যটক জ্যাঁ-বাতিস্ত তাভার্নিয়ে ১৬৬৫ সালে তার লেখায় এ ধারণার প্রথম উল্লেখ করেন।

সেখানে বলা হয়েছিল, শাহজাহান নিজের সমাধি নির্মাণ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তার ছেলে আওরঙ্গজেব তাকে ক্ষমতাচ্যুত করায় নির্মান সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

তবে, আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ এটিকে ভিত্তিহীন জনশ্রুতি বলে মনে করেন। তাজমহলে শাহজাহানের কবর মমতাজ মহলের কবরের মতো ঠিক কেন্দ্রস্থলে নয়, বরং তার পাশে অবস্থিত।

এই অসম বিন্যাস দেখে কেউ কেউ ধারণা করেছেন, হয়তো শাহজাহানের সমাধি অন্য কোথাও হওয়ার কথা ছিল। তবে, তাজমহল নির্মিত হয়েছিল শুধু মমতাজ মহলের জন্য, আর শাহজাহানকে তার মৃত্যুর পর স্ত্রীর পাশেই সমাহিত করা হয়। এ কারণেই তার কবর কেন্দ্র থেকে সরে রয়েছে।

আর. নাথ তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, তাজমহল ১৬৪৮ সালেই সম্পূর্ণ হয়েছিল, আর "যদি দ্বিতীয় কোনো পরিকল্পনা থেকে থাকত, তাহলে তার শক্ত প্রমাণ থাকত। এবং সমসাময়িক ফারসি ইতিহাসবিদরা অবশ্যই তার উল্লেখ করতেন। কিন্তু তারা তা করেননি।"

তাজমহল এবং মমতাজের একের পর এক প্রসব

'মাদ্রাস কুরিয়ার'-এর মতে, তাজমহলকে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্যের গুরুত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত।

"মমতাজ মহল ছিলেন শাহজাহানের সব স্ত্রীর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ ছিল, তিনি শাহজাহানের জন্য ১৪ বার গর্ভধারণের কষ্ট সহ্য করেছিলেন। তাদের বিয়ের ১৯ বছরের মধ্যে প্রায় প্রতি বছরই মমতাজ মহল গর্ভবতী ছিলেন। ১৪টি গর্ভধারণের মধ্যে মাত্র সাতটি সন্তান (তিন কন্যা ও চার পুত্র) জীবিত ছিল এবং চতুর্দশ সন্তানের জন্মই মমতাজ মহলের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। "মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়েছিল প্রসবসংক্রান্ত জটিলতার কারণে।"

অনন্ত কুমার তার মনুমেন্ট অব লাভ অ্যান্ড সিম্বল অব ম্যাটারনাল ডেথ শীর্ষক নিবন্ধে লেখেন, মমতাজ মহলের ধারাবাহিক ও অত্যধিক গর্ভধারণ তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত এই পুনঃপুন গর্ভধারণের ফলেই তাকে প্রাণ হারাতে হয়। "অন্যদিকে, সপ্তদশ শতকের সুইডেনের রানি উলরিকা এলিওনোরা প্রসবকালীন মৃত্যুর সমস্যা সমাধানে বিশ্বের সামনে নানা পদক্ষেপের উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন।

তিনি ধাত্রীবিদ্যার প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং এমন একটি নীতি চালু করেন, যাতে প্রতিটি গ্রাম থেকে একজন বা দুজন নারীকে ধাত্রী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।"

"সুইডেনে এই সম্প্রদায়ভিত্তিক ধাত্রী প্রশিক্ষণ কৌশলের ফলে ১৯০০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার, অর্থাৎ প্রতি এক লাখ জীবিত শিশুজন্মে প্রসবজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কমে ২৩০-এ নেমে আসে।

উল্লেখ্য, তখনও সাধারণ সার্জিক্যাল ডেলিভারি, রক্তসঞ্চালন ও অ্যান্টিবায়োটিকের প্রচলন হয়নি।"

সপ্তদশ শতকের মুঘল সাম্রাজ্যে প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঘটনার কোনো নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

তবে, চিকিৎসা বিষয়ক ঐতিহাসিকেরা একমত যে, সে সময় প্রসবকালীন বা প্রসব-পরবর্তী নারী মৃত্যুর হার ছিল অস্বাভাবিক রকম বেশি এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ছিল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

মুঘল যুগে সাধারণ চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা যথেষ্ট উন্নত ছিল। ইউরোপের পর্যটক ও ইতিহাসবিদরাও এর উল্লেখ করেছেন।

'মাদ্রাজ কুরিয়ার'-এর মতে, "ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতিস্তম্ভটি যদিও মমতাজ মহলের প্রতি শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু এর চেয়েও বড় উত্তরাধিকার হতে পারত উন্নত মাতৃত্বকালীন সেবার প্রসার।"

কিছু বিশ্লেষকের মত, তাজমহল নির্মাণে ব্যয় করা বিপুল সম্পদের সামান্য অংশও যদি প্রসূতি ও শিশু পরিচর্যার জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় করা হতো, তবে তা শুধু ভালোবাসার প্রতীকই হতো না, বরং ভালোবাসা রক্ষাকারী অগণিত সাধারণ মানুষ মমতাজ মহলের জীবনও বাঁচাতে পারত।

সেই সব নারীর জীবন, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রসবজনিত জটিলতার কারণে অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

অর্থাৎ তাজমহল যেমন ভালোবাসার অমর প্রতীক হয়ে আছে, তেমনি নারীর জীবনেরও এক প্রতীক হয়ে উঠতে পারত।

ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বেদনার নিদর্শন তাজমহল

ইরানকে সমর্থন পুতিনের, পশ্চিমাদের ‘দাঁতভাঙা জবাবের’ হুঁশিয়ারি

ইরানের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে গ্রাস করতে চাইলে তাদের ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেছেন পুতিন। খবর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের।

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর এসব কথা বলেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করতে রাশিয়া স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলেও জানান পুতিন।

পুতিন বলেন, আমরা যাদের ভালোভাবে চিনি এবং সাধারণভাবে যাদের ওপর আস্থা রাখি, তাদের সঙ্গে কাজ করতে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ তিনি বলেন, উইটকফ ও কুশনার ট্রাম্পের আস্থাভাজন ব্যক্তি।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ মস্কো সফর করে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সফরের বিষয়ে পুতিন বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তবে বর্তমানে এ ধরনের আলোচনা কিছুটা স্থগিত রয়েছে।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুপক্ষই পরস্পরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেন গত কয়েক মাসে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জাহাজ ও বিভিন্ন স্থাপনায় দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি মস্কোর।

পুতিনের দাবি, ইউক্রেনের হামলায় গত ৪০ দিনে রাশিয়ার প্রায় ১০০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাশিয়ার ক্ষতির পরিমাণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান।

এর জবাবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান পুতিন। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোতে রুশ হামলার কারণে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

পুতিন বলেন, ‘আমি বলছি না যে, আমরা সেখানকার অর্থনীতি ধসিয়ে দেব। তবে এটি তাদের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বলেছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপদ থাকবে না। এর প্রতিক্রিয়ায় পুতিন ওই মন্তব্যকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা হয় না।’ একই সঙ্গে দাবি করেন, ইউক্রেনই আবার রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চাইছে এবং ব্যক্তিগত বৈঠকের অনুরোধ করছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নতুন করে সেনা নিয়োগের আশঙ্কা নিয়ে ওঠা আলোচনা উড়িয়ে দিয়ে পুতিন বলেন, এ ধরনের আশঙ্কা আজেবাজে কথা।

এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। বৈঠকে ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির জনগণের সাহস ও দৃঢ়তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্টকে পুতিন বলেন, ‘এ কঠিন সময়ে আপনাদের যে সহায়তা প্রয়োজন, তা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যও আমরা সরবরাহ করছি।’

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই তেহরানের পাশে রয়েছে মস্কো। রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি ড্রোন তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও পরস্পরের ওপর হামলা শুরু করেছে।

এসসিও সম্মেলনে যাওয়ার আগে রাশিয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে মেরুভালুক ও ঘাতক তিমির উদাহরণ দিয়েছিলেন পুতিন।

বিশকেকে এ বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সোভিয়েত আমলে পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো।

পুতিন বলেন, ‘কেউ যদি খাদ্যশৃঙ্খলে আমাদের নিচে নামিয়ে দিতে চায়, আমাদের গিলে খেতে বা গ্রাস করতে চায়, তাহলে তারা দাঁতভাঙা জবাব পেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব হাঙরের ক্ষুধা ও দাঁত দ্রুত বাড়লেও রাশিয়া তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।’

এদিকে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনীর অগ্রগতি নিয়েও দাবি করেন পুতিন। তিনি বলেন, আগস্টে ওই অঞ্চলের ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে রুশ বাহিনী। তবে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী ইউক্রেনীয় সংগঠন ডিপস্টেটের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে রাশিয়া সেখানে প্রায় ২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি

তিন বছরেরও কম সময়ে ৬০ লাখ শরণার্থী ফিরলেন আফগানিস্তানে

তিন বছরেরও কম সময়ে রেকর্ড ৬০ লাখ আফগান শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত বড় পরিসরে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের নজির খুবই বিরল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইউএনএইচসিআর এসব তথ্য জানায়। এ বরাতে খবর প্রকাশ করেছে আনাদোলু এজেন্সি।

ইউএনএইচসিআর বলেছে, ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসে এত বড় পরিসরের প্রত্যাবর্তন এর আগে দেখা যায়নি।’ একই সঙ্গে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।

তবে আফগান শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি ইউএনএইচসিআর। ধারণা করা হচ্ছে, ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের বড় একটি অংশ প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ইরান থেকে আফগানিস্তানে ফিরেছেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ গত জুনে জানিয়েছিলেন, ইসলামাবাদ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ধাপে ধাপে আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু করার পর থেকে ২৪ লাখের বেশি আফগান নাগরিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ইরান থেকেও প্রায় ২১ লাখ আফগান আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণের পর দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা শুরু হলে লাখ লাখ আফগান প্রতিবেশী পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। এরপর কয়েক দশক ধরে পাকিস্তান বিপুলসংখ্যক আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।

সর্বশেষ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে এখনো ৭ লাখ ৭৭ হাজারের বেশি নথিভুক্ত আফগান শরণার্থী বসবাস করছেন। এর বাইরে অনিবন্ধিত আফগান শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শরণার্থীদের ব্যাপক প্রত্যাবর্তনের এই প্রবাহ আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

আফগান শরণার্থী। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি
আফগান শরণার্থী। ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

১০০ বছর পর ১ ডলারের কয়েনে জীবিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ১ ডলারের নতুন কয়েন বাজারে ছাড়া হয়েছে। জীবিত কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ছবি মুদ্রায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে এটিই প্রথম ঘটনা।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মুদ্রা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মিন্ট জানায়, কয়েনগুলো ইতোমধ্যে বাজারে লেনদেনে চালু হয়েছে এবং তাদের ওয়েবসাইট থেকে কেনা যাচ্ছে। এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নতুন এই কয়েনটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি করা হয়েছে। ২৫টি কয়েনের এক রোলের দাম ৬১ ডলার এবং ১০০টি কয়েনের এক ব্যাগের দাম ১৫৪.৫০ ডলার। এগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

মিন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, কয়েনগুলো যেহেতু বাজারে ছাড়া হয়েছে, তাই সাধারণ মানুষের পকেটে খুচরা টাকার মধ্যেও এগুলো পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সংগ্রহের জন্য এই কয়েন কিনতে আহ্বান জানিয়েছে মিন্ট।

দেখতে সোনালি হলেও কয়েনগুলো আসল সোনার তৈরি নয়। এগুলোতে ম্যাঙ্গানিজ ব্রাসের সোনালি রঙের ফিনিশ ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েনগুলো ফিলাডেলফিয়া মিন্টে তৈরি করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত জীবিত কোনো প্রেসিডেন্টের ছবি মুদ্রায় ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, ২০২০ সালের সার্কুলেটিং কালেকটিভেল কয়েনরিজাইন অ্যাক্ট স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ কয়েন তৈরির অনুমতি দিয়েছে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ট্রেজারি সেক্রেটারির রয়েছে।

এর ১০০ বছর আগে ১৯২৬ সালে শেষবার জীবিত ৩০তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের ছবি যুক্তরাষ্ট্রের মিন্টের তৈরি মুদ্রায় ছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ১৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি রৌপ্য আধা-ডলার কয়েন তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ট্রাম্পের নতুন কয়েন তৈরির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচনার অন্যতম বিষয় হলো, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কয়েনটির নকশা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত দ্বিদলীয় সিটিজেনস কয়েনেজ অ্যাডভাইজরি কমিটির (সিসিএসি) কাছে পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করেননি।

এদিকে নতুন কয়েন কেনার ক্ষেত্রেও আপাতত সীমা নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিন্ট। বর্তমানে একটি পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ দুইটি আইটেম কেনার অনুমতি রয়েছে। মিন্ট জানিয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত এই অর্ডার সীমা বহাল থাকবে।

ফলে স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে তৈরি নতুন এই ১ ডলারের কয়েন একদিকে সংগ্রাহকদের আগ্রহ তৈরি করেছে, অন্যদিকে জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি ব্যবহারের কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্কও তৈরি করেছে।

সূত্র: এবিসি নিউজ

ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ১ ডলারের কয়েন বাজারে। ছবি: এবিসি নিউজ
ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ১ ডলারের কয়েন বাজারে। ছবি: এবিসি নিউজ

মহাকাশে ছায়াযুদ্ধ: যেভাবে সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে এবার মহাকাশের কক্ষপথে দানা বাঁধছে এক নতুন লড়াই। একে অপরের স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ শনাক্ত করা, অনুসরণ করা, এমনকি অচল বা ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মহাকাশ যুদ্ধের এই নেপথ্য প্রস্তুতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে বেইজিংয়ের তৎপরতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। গত জুনে চীন একটি গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান থেকে কক্ষপথে একটি ছোট স্যাটেলাইট অবমুক্ত করে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘লিওল্যাবস’ জানায়, ওই ছোট স্যাটেলাইটটি অন্য একটি চীনা স্যাটেলাইটকে প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মূল যানে ফিরে আসে।

গবেষকরা বলছেন, চীন এমন ‘হান্টার’ বা শিকারি স্যাটেলাইট তৈরি করছে যা প্রতিপক্ষের মহাকাশযানকে অনুসরণ করতে এবং প্রয়োজনে সেটিকে ধরে ফেলতে বা জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল চান্স সাল্টজম্যান সতর্ক করে বলেছেন, চীনের এই স্থল ও মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র তৈরির গতি অত্যন্ত দ্রুত এবং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ব্যাপক হুমকি’।

পরাশক্তিদের গোপন প্রযুক্তির লড়াই

পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। চীনের মতো ওয়াশিংটনেরও রয়েছে ছোট শাটল আকৃতির গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান। আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট এখন স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সব যুদ্ধেই যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য এবং নেভিগেশনের জন্য স্যাটেলাইট অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, স্যাটেলাইটগুলোকে সক্রিয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। লেজার দিয়ে সেন্সর অচল করা, জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা সরাসরি অন্য স্যাটেলাইট দখল করে নেওয়া, সবই এখন ভবিষ্যতের মহাকাশ যুদ্ধের অংশ। মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এভারেট ডলম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা কোনোভাবে ব্যাহত হলে পৃথিবীতে দেশটির বিশাল সামরিক শক্তি পঙ্গু হয়ে পড়বে।

একাট্টা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা

মহাকাশে চীনের আধিপত্য রুখতে মিত্রদের নিয়ে জোট বাঁধছে ওয়াশিংটন। গত বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মহাকাশে তাদের প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে পরিচালিত এই অভিযানে একটি মার্কিন স্যাটেলাইটকে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ব্রিটিশ স্যাটেলাইটের খুব কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

মজার বিষয় হলো, সেই সময় তাদের নিচ দিয়েই অতিক্রম করছিল চীনের ‘শিয়ান-১২-০১’ স্যাটেলাইট। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ছিল বেইজিংয়ের প্রতি একটি ‘কৌশলগত বার্তা’। এর মাধ্যমে মিত্রদেশগুলো তাদের সক্ষমতা ও ঐক্যের জানান দিয়েছে, যাতে চীন তাদের মহাকাশ সম্পদে হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়।

ব্যস্ত কক্ষপথ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথ ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর ১১ হাজার স্টারলিংক স্যাটেলাইট, অন্যদিকে চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে মহাকাশ এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতেও মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিজ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মহাকাশ এখন ভূ-রাজনীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নতুন ময়দান। যেখানে গোপন অভিযান আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাল্টাপাল্টি প্রদর্শনীতে ভবিষ্যতের ‘স্টার ওয়ার্স’ বা মহাকাশ যুদ্ধের সলতে পাকানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স
মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স

‘সুপার সাইজড’ এল নিনোর কবলে বিশ্ব, সতর্কতা জাতিসংঘের

বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার এক ‘বিপজ্জনক অঞ্চল’ বা ডেঞ্জার জোনে প্রবেশের বার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির প্রধান আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আবহাওয়া পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ এবার ‘সুপার সাইজড’ বা অতি শক্তিশালী রূপ ধারণ করছে, যা বিশ্বজুড়ে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত উঠে এসেছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এবারের এল নিনো গত ৭০ বছরের মধ্যে শক্তিশালী হতে পারে এবং এটি অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনে বিশাল আকার ধারণ করছে। বিজ্ঞান নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, আমাদের পৃথিবী এখন এক অচেনা এবং অনিশ্চিত জলসীমায় প্রবেশ করেছে, যা ক্রমাগত উত্তপ্ত হচ্ছে।’

মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এমনিতেই বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, তার ওপর এল নিনোর এই শক্তিশালী উপস্থিতি উত্তাপকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের মাধ্যমে সাগরের উপরিভাগের পানিকে অস্বাভাবিকভাবে উত্তপ্ত করে তোলে। ডব্লিউএমও-র মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে।’

এর ফলে কোথাও দেখা দেবে দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও শক্তিশালী টাইফুন ও আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব চলবে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ১৯৫০ সালের পর সর্বোচ্চ। এমনকি সাগরের তলদেশের কোনো কোনো অংশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি দেখা গেছে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা কেবল প্রশান্ত মহাসাগরই নয়, ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরেও ছড়িয়ে পড়ছে।

অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানী ড. অ্যালিস্টেয়ার হবডে জানিয়েছেন, সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কারণে এরই মধ্যে সাগরের কোরাল বা প্রবাল ধ্বংস হচ্ছে এবং শৈবালের অস্বাভাবিক বিস্তার ঘটছে। এবারের এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া এবং তাসমানিয়া অঞ্চলে সামুদ্রিক প্রাণীদের ব্যাপক মৃত্যু, শৈবাল আক্রমণ এবং জেলিফিশের উপদ্রব দেখা দিতে পারে।

ভয়াবহ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থাগুলো আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ডব্লিউএমও জানিয়েছে, তারা সম্ভাব্য দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাপক জনবিকাশ কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ছাড়া মৃত্যুর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম চিকিৎসা সহায়তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তবে এই এল নিনোর শক্তি এবং স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

গাজায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় ‘নজিরবিহীন’ সংকট

গাজায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি পানি কর্তৃপক্ষ। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্যালেস্টাইন টিভির বরাতে আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবারের (৩ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ছে। আরও প্রায় ১৫ হাজার ঘনমিটার শোষণ গর্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

গাজার ৫টি প্রধান বর্জ্যপানি শোধনাগারের সবকটিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধের আগে থাকা প্রায় ৭৪টি পাম্পিং স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১৮টি আংশিকভাবে হলেও চালু রয়েছে। এর ফলে পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা জনসংখ্যার হার ৮৫ শতাংশের বেশি থেকে কমে প্রায় ৪৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

পানি শোধনের সক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমেছে। সংকটের আগে গাজার শোধনাগারগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ছিল প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ঘনমিটার। বর্তমানে কার্যত তা শূন্যে নেমে এসেছে।

তবে শেখ ইজলিন শোধনাগার পুনর্বাসনের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সহায়তায় এর প্রাথমিক পর্যায়ে দৈনিক ২২ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যপানি শোধনের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ৬৫ হাজার ঘনমিটারে নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি, পানির পাম্প, জেনারেটর, যন্ত্রাংশ এবং ভারী সরঞ্জাম প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি পানি কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, এভাবে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি অব্যাহতভাবে পরিবেশে ও সাগরে পড়তে থাকলে জনস্বাস্থ্য এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজার একটি এলাকা। ছবি: এএফপি
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজার একটি এলাকা। ছবি: এএফপি

জানেন কালো বিড়াল অশুভ কেন?

সুদূর প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের মধ্যে কিছু প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও যুক্তি-দর্শনও মানুষকে সেই বিশ্বাস থেকে দূরে সরাতে পারেনি। এরকমই এক অশুভ প্রাণী কালো বিড়াল। প্রচলিত ধারণায়, যেকোনও কাজে কালো বিড়াল দেখলে সেই কাজ অশুভ হয়। কাজে সফলতা আসে না। বিপত্তি ও বিড়ম্বনা তৈরি হয়।
বিশ্বের বহু মনীষী ও প্রখ্যাত লেখকগণও তাদের ভৌতিক গল্প বা কাহিনিতে কালো বিড়ালকে ‘বিভীষিকার প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু কেন কালো বিড়ালকে অশুভ শক্তির প্রতীক ভাবা হয়?
যুক্তিবাদীরা মনে করেন, কালো বিড়ালকে অশুভ ভাবার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তারা জানান, অতীতে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। আর গরুদের সামনে দিয়ে কালো বিড়াল গেলেই তারা অস্থির হয়ে পড়ত। গরুদের শান্ত করতে চালককে কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি থামিয়ে দিতে হত।
সেই রেওয়াজই নাকি পরবর্তীকালে কুসংস্কারে পরিণত হয় এবং সেই থেকেই নাকি যেকোনও গাড়ির সামনে দিয়ে কালো বিড়াল গেলেই গাড়ি থামিয়ে দেয়ার রীতি শুরু হয়।
যুক্তিবাদীদের এরকম আরও যুক্তি হচ্ছে, বিড়াল কালো হোক কিংবা সাদা- এ জাতীয় ছোট প্রাণীদের সাধারণত অন্য বড় প্রাণী বা মানুষ তাড়া করে। ফলে এসকল প্রাণী সবসময় দৌড়ের ওপর থাকে। মানুষের সঙ্গে তাদের ধাক্কা লাগারও সম্ভাবনা কম। সেজন্যও কালো বিড়ালকে অনেকেই অশুভ ভাবেন।

শিশুদের টাইফয়েড টিকার স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি? by ডা. আয়শা আক্তার

প্রকাশ ৩০ নভেম্বর ২০২৫ঃ সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে টাইফয়েড নামের তীব্র জ্বর সৃষ্টি করে।

দেশে প্রথমবারের মতো শিশুদের বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে টাইফয়েডের টিকা। এর আগে পাকিস্তান ও নেপালে শিশুদের এই টিকা দেওয়া হয়। নেপালে এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ২০ হাজার শিশুর মধ্যে একটি গবেষণা চালায় বিশ্বখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ।

২০২১ সালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, টিকাটি প্রথম বছরে ৮১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৭৯ শতাংশ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। ‘টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন’ (টিসিভি) নামের এই টিকা ৯ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সবার জন্য নিরাপদ। টিকা দেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা ছাড়া বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা যায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, টাইফয়েড টিকা (টিসিভি) বাংলাদেশের শিশুদের জন্য ৮৫ শতাংশের বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।

টাইফয়েড যা সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণের মাধ্যমে টাইফয়েড নামের তীব্র জ্বর সৃষ্টি করে। এটি সালমোনেলা প্যারাটাইফির কারণেও হতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

টাইফয়েডের সংক্রমণ শরীরের রক্ত সংবহন তন্ত্র এবং ভেতরের অঙ্গগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে; যা ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক বা অন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা যায়, তাহলে টাইফয়েড জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে মৃত্যুঝুঁকিও আছে।

টাইফয়েড জ্বর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি বিরাট জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বন্যার সময় এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। প্রচণ্ড পেটব্যথা, তীব্র জ্বর যেখানে তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে, মাথাব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, চামড়ায় লালচে দানা দেখা দেওয়া, দুর্বলতা, প্রচণ্ড কাশি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো শুরু টাইফয়েডের টিকা মাসব্যাপী চলেছে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত। দেশে টাইফয়েডের টিকার এটাই প্রথম ক্যাম্পেইন।

* ডা. আয়শা আক্তার, উপপরিচালক, ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল, শ্যামলী, ঢাকা

টাইফয়েড টিকা নিচ্ছে এক শিশু। গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা, ২৩ অক্টোবর
টাইফয়েড টিকা নিচ্ছে এক শিশু। গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা, ২৩ অক্টোবর। ছবি: আবদুর রহমান ঢালী