Sunday, June 26, 2016

ক্যামেরনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

ডেভিড ক্যামেরন
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের থাকা না-থাকার গণভোট নিয়ে বড় রকমের বাজি ধরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তাতে হেরে যাওয়ার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বেই ইইউ থেকে বেরিয়ে গেল যুক্তরাজ্য। ইতিহাস তাঁকে সেভাবেই মনে রাখবে। এই গণভোটকে একটা পরীক্ষা হিসেবে নিয়েছিলেন ক্যামেরন। ভেবেছিলেন এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ পার্টিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। কিন্তু গণভোটে অংশগ্রহণকারী যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ নাগরিক ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরপর আগামী অক্টোবরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে ক্যামেরন বলেছেন,
তিনি ইইউতে থাকার পক্ষে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ক্যামেরন যুক্তরাজ্যে ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ সময় তাঁর সরকারের পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি ওই সরকার গঠন করেছিল। তবে ২০১৫ সালের মে মাসের নির্বাচনে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এর আগের বছরও দেশটিতে একটি গণভোটের পরীক্ষা হয়, তবে সেই বাধা উতরে যায় কনজারভেটিভ পার্টির সরকার। সেই গণভোটে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেয় স্কটল্যান্ড।

কারও কাছে ‘বড় আঘাত’ কারও মতে ‘কঠিন পরীক্ষা’

বারাক ওবামা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্বনেতারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের অনেকেই ভোটের আগে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়া উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন। গতকাল ফল ঘোষণার পর প্রায় সবাই বলেছেন, যুক্তরাজ্যবাসী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাজ্যবাসীর সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রদ্ধা রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইইউ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য অংশীদার’। তিনি আরও বলেন, লন্ডনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই বলব, ভিন্ন রকম ফল আশা করেছিলাম।’ অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আয়-উপার্জন যাতে এ ঘটনায় বিঘ্নিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ।’
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে সমৃদ্ধ করতে কেউই নিজের দেশের অর্থ ঢালতে রাজি হবে না। শরণার্থীর মতো সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তা যুক্তরাজ্যবাসীর মনঃপূত নয়। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল যুক্তরাজ্যবাসীর রায়কে ইইউর ওপর একটি ‘বড় আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রতিফলিত হয়েছে গণভোটের রায়ে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ গণভোটের রায়কে ইউরোপের জন্য ‘মহাপরীক্ষা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এক জরুরি বৈঠকের পর ইইউ নেতৃত্ব যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করলেও দেশটির জনগণের রায়ের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা জানান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জঁ-ক্লদ জাংকার বলেন, ২৭ সদস্যের জোট তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।

গণভোটে তছনছ বৃটেন by মতিউর রহমান চৌধুরী

একটি গণভোট শুধু বৃটেনকেই নয়, গোটা ইউরোপীয় রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতির হিসাব-নিকাশকে এলোমেলো করে দিয়েছে। বাকি বিশ্বকেও কম চমকে দেয়নি এ গণভোট। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন-এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তিনিও ক্যামেরনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। এখন একটি আগাম নির্বাচন এবং সেই সঙ্গে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক লন্ডন মেয়র বরিস জনসন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভের নাম আলোচনায় এসেছে। স্কটল্যান্ডে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় গণভোটের কথা উঠেছে। বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। আর খোদ ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউ’র প্রভাবশালী রাজধানীগুলোতে নানামাত্রিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
৭২ শতাংশ মানুষ গণভোটে অংশ নেন। আর ৫১ দশমিক ৯ ভাগ ভোট পড়ে বৃটেনের ইইউ ত্যাগের পক্ষে, যা অনেকের মতে বৃটেনের স্বাধীনতার স্বপক্ষে এক গণরায়। নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিয়ে মিস্টার ক্যামেরন কিছুটা নাটকীয়ভাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রী সামান্থাকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। গণভোটের আগেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মিস্টার ক্যামেরনের টোরি দলীয় নয় মন্ত্রী এবং ১৩৭ এমপি তার নিজের পক্ষ ত্যাগ করেছেন। ক্যামেরন তার বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি মনে করি না বৃটেনকে পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে যেতে চালকের ভূমিকায় থাকা আমার জন্য ঠিক হবে’।
পদত্যাগের আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে তিনি শলাপরামর্শ এবং তাকে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করেন। উল্লেখ করা যায় যে, ক্যামেরনের পদত্যাগের সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। সম্পূর্ণ নৈতিকতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, গণভোটের ফল প্রকাশের পর বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতনে বৃটিশ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে। 
এক. বৃটেনকে এক রাখা সম্ভব হবে কি না
দুই. পাউন্ডের দরপতন ঠেকানো যাবে কি না
তিন. শত শত বছরের বৃটিশ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা যাবে কি না।
শরণার্থী সমস্যাটাও এখন প্রকটভাবে উঠে এসেছে। আর এ সমস্যাটিই গণভোটে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে। তবে সবাই একবাক্যে বলছেন, এটা গণতন্ত্রের বিজয়। এখানে ফ্লোর ক্রসিং কোনো সমস্যা হয়নি, কনজারভেটিভ এবং লেবার পার্টি, দুই দলের লোকজনই উভয়পক্ষে ছিলেন।
ওদিকে ইইউ থেকে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিধানে লেখা আছে লিসবন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে। আর এই চুক্তিবলেই ইইউ গঠিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। আর এটা প্রয়োগ করেই বৃটেনের একটি পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী দুই বছরের ক্রান্তিকালের প্রক্রিয়াটি ততটা মধুর না হয়ে কিছুটা তিক্ততা দেখা দিতে পারে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বৃটিশ বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে সরব ছিলেন। বিশেষ করে রেস্টুরেন্টের মালিকরা। তাদের ধারণা, বৃটেন যদি ইইউ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে তারা লাভবান হবেন। কিন্তু যাদের হাতে নেতৃত্ব যাচ্ছে তাতে করে বাংলাদেশীরা লাভবান হবেন কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এখানে বলে রাখা ভালো, দশম শতাব্দীতে গড়ে ওঠা কিংডম অব ইংল্যান্ড ১৭০৭ সালে যুক্তরাজ্যে রূপান্তরিত হওয়া পরবর্তী ৩০৯ বছরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দেশটি ইতিহাসে এই প্রথম স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব জড়িত এমন একটি গণভোটে অংশ নিলো। আর যে গণভোটের ফলাফল বৃটেনের ভবিষ্যতকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। ২৩শে জুনকে বৃটেনের ইতিহাসে একটি লাল হরফে লেখা দিন বলা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফ্যারাজ ২৩শে জুনকে স্বাধীনতা দিবস বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
গণভোটে ত্যাগের রায়
ঐতিহাসিক এই গণভোটে ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন। ভোটে অংশ নিয়েছেন ৩ কোটিরও বেশি ভোটার।
লন্ডন ও স্কটল্যান্ডের ভোটাররা ব্যাপকহারে ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষ বিপুলভাবে সরে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। আর উত্তর ইংল্যান্ডেই মানুষ বেশি। ওয়েলস ও ইংলিশ-শায়ারের ভোটাররাও ইইউ ছাড়ার পক্ষে বিপুল হারে ভোট দিয়েছেন।
এ গণভোটে অংশগ্রহণার্থীর সংখ্যা গত সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও ছিল বেশি।
পদত্যাগের ঘোষণা ক্যামেরনের
গণভোটের ফল আসার পরই আবেগি বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরন। ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘ব্রেক্সিট নামের বিরূপ পানিতে আমি আর রাষ্ট্র নামের এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে পারবো না’। এভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২৩ মিনিটে ক্যামেরন যখন ডাউনিং স্ট্রিটে বেরিয়ে আসেন তখন তাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি স্বীকার করে নেন, দেশ চালাতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। আবেগ সংবরণ করে তিনি নিজেকে সামলে নেন। আবার বক্তব্য দেন। বক্তব্য শেষ হতেই স্ত্রী সামান্থার হাত ধরেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে তা এড়িয়ে সোজা কালো দরজা দিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ভিতরে চলে যান। ব্রেক্সিট ভোট বিজয়ী হওয়ায় ক্যামেরনের প্রতিক্রিয়ার জন্য গতকাল সকাল থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার সাংবাদিকরা জড়ো হতে থাকেন ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে। তাদের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন জমা হতে থাকে ডেভিড ক্যামেরন কী ঘোষণা দিতে পারেন তা নিয়ে। এ সময় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকে টিভির হেলিকপ্টার। ১০ ও ১১ ডাউনিং স্ট্রিটে তখনও উড়ছে দুটি ইউনিয়ন পতাকা। ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে ডেভিড ক্যামেরন বললেন, আমি এই দেশকে ভালোবাসি। এর সেবা করতে পেরে নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। আমাদের একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিত এখন।
কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?
ক্যামেরনের পদত্যাগের ঘোষণার পর কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তা নিয়ে চলছে জল্পনা। প্রচারণা চালানোর সময় ক্যামেরন বলে আসছিলেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়বেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘোষণাই দিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। এবার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কে হবেন তাহলে পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?
প্রত্যাশিতভাবেই ফেভারিট তালিকার শীর্ষে আছেন লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন। এই প্রভাবশালী রাজনীতিক এবার ইইউ ছেড়ে বৃটেনের চলে যাওয়ার পক্ষে (ব্রেক্সিট) ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন।
বলতে গেলে ব্রেক্সিট প্রচারণার মূলব্যক্তিই হয়ে ওঠেন বরিস জনসন। পুরো লড়াইটা হয়ে দাঁড়ায় তার ও প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের মধ্যে! ব্রেক্সিটের আগে থেকেই অবশ্য তাকে রক্ষণশীল কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। এমনকি তাকে হবু প্রধানমন্ত্রী বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি অনেকে। ব্রেক্সিট প্রচারণায় অবদান ও প্রভাবের দরুণ তার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আরো উজ্জ্বল। কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকৃতপক্ষে তারই বেশি। কিন্তু প্রচারণার সময়, তিনি কিছু অসমীচীন কাজ করেছেন, যা তার সম্ভাবনার ক্ষতি করতে পারে। এরপরও জনমত জরিপ থেকে শুরু করে জুয়াড়িদের বাজিতেও অন্যদের তুলনায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বরিস জনসন।  এছাড়া আছেন অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন। যদিও দলীয় প্রভাবের দিক থেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে তার মতো প্রচারণা চালিয়েছেন যে প্রভাবশালী নেতারা, তারাও কনজারভেটিভহোম জনমত জরিপে ভালো করেননি। এ তালিকায় আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভ। থেরেসা মে’কে গণভোটের আগেও অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রার্থী ভাবা হতো।

গণতন্ত্রের বেদিতে উৎসর্গিত এক প্রধানমন্ত্রী by সাজেদুল হক

আবেগ। কান্না। প্রত্যাশিত কিন্তু অভাবনীয় এক ঘোষণা। ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে রচিত হলো গণতন্ত্রের বেদিতে এক প্রধানমন্ত্রীর উৎসর্গিত হওয়ার নতুন ইতিহাস। আর বিশ্ববাসী দেখলো রাজমঞ্চ থেকে এক রাজনীতিবিদের বিদায়ের আখ্যান। ছয় বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে যিনি বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। এই তো কয়দিন আগেই স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরনের জন্য পুরনো একটি গাড়ি কিনে আলোচনায় এসেছিলেন। সমালোচিত হয়েছিলেন পিতার নাম পানামা পেপারসে প্রকাশিত হওয়ার পর। ছবিটির সূত্র জানা নেই। তবে ট্রেনে জনমানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন ডেভিড ক্যামেরন- এমন একটা ছবি প্রায়ই দেখা যায়। যা একজন প্রবল প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর সাদাসিধে জীবনযাপনের দিকেই ইংগিত করে। রাজনীতিতে তার অভিষেক ছিল চমক জাগানিয়া। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। কিছু বছর পর ২০১০ এবং ১৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টির জন্য নিয়ে আসেন অভাবনীয় বিজয়। যা তাকে মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী কনজারভেটিভ নেতায় পরিণত করে। অক্সফোর্ডপড়ুয়া ক্যামেরন খ্যাতি পেয়েছিলেন শেষ মুহূর্তে যেকোনো সমস্যার সমাধান দেয়ার কারিগর হিসেবে। ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি এবং স্কটল্যান্ডের গণভোট উতরে যান তিনি। ছেলে ইভানকে হারানো ব্যক্তি ক্যামেরনের জীবনের সবচেয়ে বিয়োগান্তক অধ্যায়।
 রাজনীতিবিদ ক্যামেরন শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজিটিতে হেরে গেলেন। বৃটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা প্রশ্নে বিতর্কের মধ্যে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এ ভোটকে কেন্দ্র করে দৃশ্যত দুই ভাগ হয়ে গেছে বৃটেন। ভোটের হারেও তার প্রমাণ। ৫২ বনাম ৪৮। নেশন ডিভাইডেড- এ শিরোনাম ইকোনমিস্ট সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ব্যাপারেই ব্যবহার করতো। এবার বৃটেনের ব্যাপারেও ব্যবহৃত হয়েছে তা। তবে বিয়োগান্তক এ ভোট ঐক্যবদ্ধ বৃটেনের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। গণভোটের আওয়াজ উঠেছে স্কটল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডেও।
তবে এই পরিণতির জন্য ডেভিড ক্যামেরন তার নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকেউ দায়ী করতে পারেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা নিয়ে নিয়ে তার দলের ভেতরে ওঠা বিতর্কের পটভূমিতে ২০১৩ সালে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, পুনরায় নির্বাচিত হতে পারলে এ প্রশ্নে তিনি গণভোটের আয়োজন করবেন। সম্প্রতি লেবার পার্টির এমপি জো কক্সের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর গণভোটের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি উঠেছিল। বিপুল সংখ্যক মানুষ এ ব্যাপারে ডেভিড ক্যামেরনের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু জবাবে ক্যামেরন বলেছিলেন, এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই।
প্রাচীন গ্রিসে জন্ম নেয়া গণতন্ত্রকে ইতিহাসে বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গণতন্ত্রের একটি প্রধানতম দুর্বলতা হচ্ছে- সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত ইতিহাসে সবসময় সঠিক হিসেবে প্রমাণিত হয় না। কখনো কখনো দেখা গেছে, তা ভুল এবং ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে হয় পুরো মানবজাতিকেই। বেক্সিট ভোট ইউরোপজুড়েই হাহাকার তৈরি করেছে। দিনটিকে ইউরোপের ইতিহাসে একটি দুঃখজনক দিন হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে গণতন্ত্রে জনগণের অভিপ্রায়ই যে শেষ কথা পদত্যাগের ঘোষণা দিতে এসে তা মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শুধু সংসদীয় গণতন্ত্র আছে তাই নয়, আমাদের শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে সে প্রশ্নেও মাঝে মাঝে জনগণকে জিজ্ঞাসা করা উচিত। আর আমরা সেটাই করেছি। বৃটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাদের ইচ্ছাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।’
গণতন্ত্রের বেদিতে নিজের ইচ্ছা-অভিপ্রায়কে কবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। যা শুধু বৃটেন নয়, সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রসেবীদের জন্য এক ধরনের শিক্ষা। আর ক্যামেরন পৃথিবীর রাজনীতিবিদদের এ বার্তাও দিলেন, কথা দিলে তাদের কথা রাখতে হয়। কোন কোন সমর নায়ক ও রাজনীতিবিদ বলার চেষ্টা করেন, গণতন্ত্র একেক দেশে একেক রকম হবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, গণতন্ত্রের রকমারি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। ভালো হোক, মন্দ হোক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছাই গণতন্ত্রের শেষ কথা। এর কোন ব্যতিক্রম নেই।