Showing posts with label সংসদ. Show all posts
Showing posts with label সংসদ. Show all posts

Sunday, April 6, 2025

ভারতের নতুন ওয়াক্‌ফ বিল মুসলমানদের জন্য যে সমস্যা ডেকে আনবে by এজাজ হুসেইন ও শেখ সালিক

ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা আইন সংশোধনের একটি বিতর্কিত বিল পাস হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকারের উত্থাপিত এই বিলের বিরোধিতা করেছে মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো।

বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, ‘ওয়াক্‌ফ’ সম্পত্তি পরিচালনা বোর্ডে অমুসলিমদেরও রাখা যাবে। এ ছাড়া ওয়াক্‌ফ করা জমির মালিকানা যাচাইয়ে সরকারের ক্ষমতাও বাড়বে। সরকার অবশ্য বলছে, এতে দুর্নীতি কমবে, ব্যবস্থাপনা হবে সুষ্ঠু আর বৈচিত্র্য বাড়বে। কিন্তু সমালোচকেরা বলছেন, এই বিল মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকারে আঘাত হানবে। আর সেই সুযোগে পুরোনো মসজিদসহ বহু ঐতিহাসিক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

বিলটি নিয়ে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। বুধ থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চলেছে লোকসভায় আলোচনা। আর রাজ্যসভায় টানা ১৬ ঘণ্টা ধরে হয়েছে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা।

বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, এই বিল অসাংবিধানিক এবং মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও মোদির বিজেপি মিত্রদলগুলোর সমর্থনে বিলটি পাস করাতে সক্ষম হয়েছে।

লোকসভায় এই বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৮৮ জন সংসদ সদস্য, আর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৩২ জন। রাজ্যসভায় ১২৮ জন বিলের পক্ষে ও ৯৫ জন এর বিরুদ্ধে ভোট দেন। এখন বিলটি আইনে পরিণত করবার জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

১৯৯৫ সালের একটি আইন পরিবর্তনের জন্য বিলটি পেশ করেন সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। ওই আইনে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির নিয়মকানুন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তা পরিচালনার জন্য গঠন করা হয়েছিল রাজ্যভিত্তিক বোর্ড।

অনেক মুসলিম সংগঠন ও বিরোধী দল বলছে, এই বিল বৈষম্যমূলক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।

বিলটি প্রথম সংসদে পেশ করা হয় গত বছর। বিরোধী দলগুলো বলছে, এরপর তারা কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। সরকারের দাবি, বিরোধীরা গুজব ছড়াচ্ছে এবং ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত করছে।

ওয়াক্‌ফ কী

ওয়াক্‌ফ হলো ইসলামি দানের একটি প্রাচীন ব্যবস্থা। ওয়াক্‌ফের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি স্থায়ীভাবে সাধারণত জমির মতো কোনো সম্পত্তি ধর্মীয় বা জনহিতকর কাজে ব্যবহারের জন্য দান করেন। এ ধরনের ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি বিক্রি করা বা কারও নামে হস্তান্তর করা যায় না।

ভারতে ওয়াক্‌ফ বোর্ডগুলোর অধীন প্রায় ৮ লাখ ৭২ হাজারটি সম্পত্তি আছে। এগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১০ লাখ একর। এসবের মোট মূল্য প্রায় ১৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। এসব সম্পত্তির অনেকগুলোর ইতিহাস শত শত বছর পুরোনো। অধিকাংশই ব্যবহার করা হয় মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও এতিমখানার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে।

নতুন আইন ওয়াক্‌ফ পরিচালনা বদলে দেবে

ভারতে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি পরিচালনা করে আধা সরকারি বোর্ড। এই বোর্ড প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আলাদাভাবে গঠিত। নতুন আইনে বলা হয়েছে, এসব বোর্ডে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক হবে।

এখন পর্যন্ত ওয়াক্‌ফ বোর্ডে কেবল মুসলিমরাই সদস্য হন। ভারতে অন্য ধর্মীয় দাতব্য সংস্থাগুলোও নিজ নিজ ধর্মাবলম্বীদের দিয়েই পরিচালিত হয়।

সংসদীয় বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, অমুসলিম সদস্যরা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং সম্পত্তি পরিচালনায় সহায়তা করবেন। ধর্মীয় বিষয়ে তাঁরা হস্তক্ষেপ করবেন না। তিনি বলেন,‘অমুসলিম সদস্যরা শুধু নজরদারি করবেন যে বোর্ড আইন মেনে চলছে কি না আর দানকৃত সম্পত্তি যথাযথ কাজে লাগছে কি না।’

তবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মতো সংগঠনগুলো বলছে, এই বক্তব্য ইসলামি ওয়াক্‌ফ ব্যবস্থার মূল চেতনার পরিপন্থী। তাদের মতে, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের পরিচালনা মুসলমানদের দ্বারাই হওয়া উচিত। তারা একে মুসলিম নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এই বিলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছে এই বোর্ড।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘যখন হিন্দু মন্দির পরিচালনা কমিটিতে অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্থান পান না, তখন ওয়াক্‌ফ বোর্ডে অমুসলিমদের রাখা হবে কেন?’

সবচেয়ে বিতর্কিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মালিকানাসংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন। এর ফলে বহু পুরোনো মসজিদ, দরগাহ বা কবরস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, বহু সম্পত্তিই একসময় মৌখিকভাবে বা কাগজপত্র ছাড়াই ওয়াক্‌ফ হিসেবে দান করা হয়েছিল। এসবের অনেকেরই কোনো আইনি নথি নেই, যেগুলো কয়েক দশক বা এমনকি শত শত বছর আগের।

মালিকানা নিয়ে শুরু হবে দ্বন্দ্ব

নতুন আইনের অন্য পরিবর্তনগুলো শত শত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ওয়াক্‌ফ জমির ওপর গড়া মসজিদগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। চরমপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো ভারতের নানা প্রান্তে বেশ কিছু মসজিদের ওপর তাদের মন্দির আছে বলে দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, এসব মসজিদ পুরোনো হিন্দু মন্দির ভেঙে তৈরি। এ ধরনের অনেক মামলা আদালতে বিচারাধীন।

নতুন আইন অনুযায়ী, এখন থেকে ওয়াক্‌ফ বোর্ডকে তাদের জমির মালিকানা প্রমাণ করতে জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন নিতে হবে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব হবে। আর তা মুসলমানদের জমি কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি করবে। বোর্ডগুলোকে কতবার এই রকম জমির দাবির বৈধতা প্রমাণ করতে বলা হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।

বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী এক্সে লিখেছেন, ‘ওয়াক্‌ফ (সংশোধনী) বিল মুসলিমদের কোণঠাসা করার এবং তাঁদের ব্যক্তিগত আইন ও সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার।’ তিনি এটিকে সংবিধানের ওপর ‘আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘বিজেপি এবং তাদের মিত্ররা এখন মুসলিমদের নিশানা করছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এটি অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে।’

মুসলমানদের উদ্বেগ

অনেক মুসলমানই স্বীকার করেন যে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তিতে দুর্নীতি, দখলদারি আর অব্যবস্থাপনা রয়েছে। তবে তাঁরা আশঙ্কা করছেন, নতুন আইনের ফলে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার মুসলিমদের সম্পত্তির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। আর এখন তো ভারতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে।

নরেন্দ্র মোদির শাসনে মুসলমানরা প্রায়ই টার্গেট হচ্ছেন। তাঁদের খাবার, পোশাক, এমনকি হিন্দু-মুসলিম বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়েও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন তাঁরা।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলেজিয়াস ফ্রিডম) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়, ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নির্বাচনের সময় মোদি ও তাঁর দল মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা ছাড়ানো বক্তব্য’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়িয়েছে।

তবে ভারতের সরকার বলছে, দেশটি গণতান্ত্রিক নীতিতে পরিচালিত হয় এবং সেখানে কারও সঙ্গে কোনো বৈষম্য নেই।

ভারতের মোট ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১৪ শতাংশ মুসলমান। তাঁরা ভারতের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হলেও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। ২০১৩ সালের এক সরকারি জরিপে দেখা গেছে, মুসলমানরা দেশটির সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি।

* এজাজ হুসেইন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, অ্যাসোসিয়েট প্রেস

* শেখ সালিক অ্যাসোসিয়েট প্রেসে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে লেখেন

অ্যাসোসিয়েট প্রেস থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

অমৃতসরে ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ
অমৃতসরে ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

Wednesday, January 10, 2018

সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ খাওয়ার কথা বলায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি সংসদে

সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ খাওয়ার কথা বলায় এবং সব মন্ত্রী ঘুষ খায়- এমন মন্তব্য করায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে সব মন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ এবং এ বিষয়ে সংসদে বিবৃতির দাবি জানিয়েছেন ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী। একইসাথে তিনি এ ধরনের মন্তব্যের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেন। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে বিভিন্ন বিষয়ে যারা প্রতিবেদন দেন সেই কর্মকর্তাদের ‘সহনশীল মাত্রা’য় ঘুষ খেতে শিক্ষামন্ত্রীর পরামর্শ দেয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে সংবাদ সম্মেলন করে এই খবর তার বক্তব্যের ভুল বোঝাবুঝির উপস্থাপন বলে দাবি করেন শিক্ষামন্ত্রী। তাহজীব আলম বলেন, শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ খান। আপনাদের ঘুষ না খাওয়ার নৈতিক সাহস আমার নেই। কারণ আমি ঘুষ খাই।
মন্ত্রীরা ঘুষ খান। তিনি বলেন, সব মন্ত্রী বিশেষ করে যারা স্বচ্ছতা ও শততার সঙ্গে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে কাজ করে যাচ্ছেন এই সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে তাদের কাছ নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার অনুরোধ করছি, আবেদন করছি, নিবেদন জানাচ্ছি। তাহজীব বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে তার বক্তব্যের ব্যাপারে সংসদে ব্যাখ্যা দিতে হবে। আর সত্যি সত্যি তিনি যদি আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ হন তাহলে সমগ্র সরকারকে জনগণের কাছে বিতর্কিত না করে তার উচিত নিজ পদ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে সেয়া। নিশ্চয় একটি সফল সরকারের ভাবমূর্তি তার বক্তব্যে ভুলণ্ঠিত হতে পারে না। যারা নির্বাহী দায়িত্বে আছেন তারা অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করবেন। এরপর কুমিল্লার জাতীয় পার্টির এমপি নূরুল ইসলাম মিলন শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন একপর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার নেয়ার বিরোধিতা করে বলেন, এর প্রয়োজন ছিল না। এর ফলে দুর্নীতি বাড়ে। শিক্ষকরা আজকে প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন।

Monday, January 8, 2018

বসেছে সংসদ অধিবেশন

নতুন বছরে দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। আজ রোববার বিকেল ৪টা ০৮ মিনিটে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ১৯তম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশন শুরুর আগে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরা হলেন মোহাম্মদ ফারুক খান, পঞ্চানন বিশ্বাস, বি এম মোজাম্মেল, ফখরুল ইমাম ও বেগম সায়রা মহসিন। তাঁরা স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তালিকার ক্রম অনুযায়ী বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

Saturday, January 8, 2011

কার অধীনে, কবে হবে দশম সংসদ নির্বাচন? by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কোন সময়ে আর কেমন সরকারের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের মধ্যে ঐকমত্য নেই। ক্ষমতাসীনেরা সব সময় নিজেদের নির্বাচিত ও জনসমর্থিত সরকার আখ্যায়িত করে মেয়াদপূর্তির পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে। আর যাঁরা বিরোধী দলে থাকেন, তাঁরা সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতি আলোকপাত করে সরকারের জনসমর্থন হ্রাসের কথা বলেন, পুনরায় জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আগামী নির্বাচনের আর কত দিন বাকি, সে ব্যাপারে দুই রকম হিসাব আছে। সাধারণ হিসাবে সরকারের মেয়াদপূর্তির পর নির্বাচন হলে এখনো বছর তিনেক বাকি। আর পরিস্থিতি স্বাভাবিকতা হারালে সম্মানিত ভোটাররা চাইলে এর আগেও নির্বাচন আদায় করে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। গণতান্ত্রিক সমাজে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে, যার চর্চা এ দেশে একাধিকবার হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, সরকার কী জনসমর্থন হারাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, সরকারের জনপ্রিয়তা পরিমাপের একাধিক উপায় আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অথবা উপনির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হলে ওই সব নির্বাচনে সরকারি দলের পারফরম্যান্স দেখে সরকারের জনপ্রিয়তা অনুধাবন করা যায়। আর একটি উপায় হলো, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সার্বিক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে পারে কি না, তা বুঝে নেওয়া। আবার বিভিন্ন জনমত জরিপেও সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাই করা যায়। এই তিন পরিমাপকে যাচাই করলে দুই বছরে মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এই সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, তার মধ্যে ছিল উপজেলা নির্বাচন, ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) নির্বাচন। উপজেলা নির্বাচন ও ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীরা বেশি ভোট পেলেও ওই দুটি নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সনদপত্র দেওয়া যায় না। সংসদ নির্বাচনের অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে চরম নৈরাজ্য আর সরকারি দলের নির্বাচিত এমপি-মন্ত্রীদের দাপটে যখন নির্বাচন কমিশন ও সিইসি অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তখন সেই নির্বাচনের নেতিবাচকতা সম্পর্কে কম বলাই উত্তম। ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে সন্ত্রাস, হোন্ডা-গুণ্ডার দাপট আর ভোট প্রদানে বাধা দেওয়ায় নির্বাচনটি স্বাভাবিকতা হারায়।
সিসিসি নির্বাচনে সরকার যে রাজনৈতিক অঙ্ক কষেছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। সরকার ক্ষমতায় আসার অনেক আগেই ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচন করার সময় হলেও গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংকট আর দ্রব্যমূল্যের চাপে অতিষ্ঠ ডিসিসি নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা হাতে ব্যালট পেলে যে কী জবাব দেবেন, তা সরকার বুঝতে পারে। সে কারণে সরকার কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে প্রথমে চট্টগ্রামে সাড়ে তিন লাখ সংখ্যালঘু ভোটার এবং ১৭ বছর ধরে মেয়র পদে থাকা সরকারি দলের ডাকসাইটে প্রার্থীকে নির্বাচন করে সহজে জিতিয়ে আনা নিরাপদ মনে করে। কিন্তু সিসিসি নির্বাচনী এলাকার সম্মানিত ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সরকারের সেই নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের অঙ্ক মেলেনি। মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভূমিধস পরাজয়ে সরকারি দলের জনপ্রিয়তা হুমকির মুখে পড়ে। কাজেই সরকারের প্রথম দুই বছরে যেসব নির্বাচন হয়েছে, তা নির্বাচনী পরিমাপকে মাপলে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে বলা যায়। কারণ, উল্লিখিত তিনটি নির্বাচনের মধ্যে একমাত্র সিসিসি নির্বাচনেই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলতে যা বোঝায়, ওই নির্বাচনের আয়োজকেরা তা নির্মাণে অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। যদিও নির্বাচনটিতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার নমুনা দেশের প্রধান দুই সম্মানিত নেত্রী নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙলেও তাঁদের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং কমিশনকে কিছু না জানিয়ে নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপির জনৈক কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিধৃত হয়।
আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের ফলেও সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে কি না, তা কিছুটা অনুধাবন করা যাবে। আওয়ামী লীগ শক্তিশালী দল হলেও বুঝতে পেরেছে যে দুই বছরের দলীয় পারফরম্যান্সে সাধারণ মানুষ খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। তাই পৌরসভা নির্বাচনের ফল যাতে সিসিসি নির্বাচনের ফলের অনুরূপ না হয়, সে জন্য এই নির্বাচন একা না করে ১৪ দল জোটগতভাবে করার পকিল্পনা করেছে। তবে জোটগতভাবে করা হোক, আর যেভাবেই করা হোক, পেঁয়াজ-রসুনের ঝাঁজ আর কাঁচাবাজারের উত্তাপ যে জনমতকে এই নির্বাচনে বিগড়ে দেবে না, এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় প্রসঙ্গের চেয়ে স্থানীয় প্রসঙ্গ এবং প্রার্থী ইমেজ গুরুত্ব পায়। সরকারের মনে রাখা ভালো, জনমত যদি একবার বিপক্ষে চলে যেতে থাকে, তা খুব দ্রুতই সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলে। সে ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণ করতে পারে এমন কাজ করেই একমাত্র জনপ্রিয়তার নিম্নমুখী ধস ঠেকানো যায়। কিন্তু সরকারকে এমন কোনো কাজ করতে দেখা যাচ্ছে কী? সরকারের জনপ্রিয়তার নিম্নগামী ধারা প্রথম আলোর সাম্প্রতিক জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে মহাজোট সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে গেলেও সরকারের জনপ্রিয়তাকে হুমকিযুক্ত প্রতীয়মান হয়। সরকার দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কালো টাকার মালিকদের আরও কালো টাকা করার সুযোগ করে দিয়েছে। দ্রব্যমূল্য আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যে কতটা এগিয়েছে, তা সাধারণ মানুষ যাঁরা সমাজে চলাফেরা করেন, বাজারে যান, তাঁদের না বললেও চলে। সরকার মূল্যসন্ত্রাসী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে যে ব্যর্থ হয়েছে, তা অর্থমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী মহোদয় স্বীকার করেন। এই ব্যর্থতা সব নাগরিককে স্পর্শ করে এবং এতে সাধারণ মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ।
বাণিজ্যমন্ত্রী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রথম রমজানের ঈদের ১৫ দিনে চিনি সিন্ডিকেট করে যাঁরা ৮০ কোটি টাকা পকেটেস্থ করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করার পরও শাস্তি দিতে না পারলেও মাঝেমধ্যে ব্যবসায়ীদের বকাঝকা করার সাহস দেখাতে পেরেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত সন্ত্রাস, খুন, এনকাউন্টার-ক্রসফায়ার প্রভৃতির আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান দেখার পর এবং সরকারি হিসাবেই ২০১০ সালের প্রথম ১১ মাসে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন খুন হওয়ার তথ্য জানার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে বেশি কিছু না বলাই শ্রেয়। কাজেই কোনো সরকারের আমলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন আর জীবনের নিরাপত্তা সংকীর্ণ হয়ে উঠলে সাধারণ মানুষের সেই সরকারের ওপর তুষ্ট থাকার কথা নয়। এ রকম সময়ে সরকারবিরোধী প্রতিবাদী কর্মসূচিতে মানুষ ঝাঁপিয়ে না পড়লেও সমর্থন দিতে শুরু করে। আর সরকারের ওপর নাগরিকেরা বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবে তাঁরা সেই সরকার পরিবর্তন করতে চান। এ রকম পরিস্থিতিতে আন্দোলন কর্মসূচি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে যদি সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, তাহলে মেয়াদপূর্তির পরই ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন হবে বলে ভাবা যায়। কিন্তু যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়, যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যদি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করে নাগরিকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব দানা বাঁধে, যদি চাল-ডাল, সয়াবিন, পেঁয়াজ-রসুন আর কাঁচাবাজারের উত্তাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে, আর সেসবকে পুঁজি করে বিরোধী দলগুলো সরকারবিরোধী আন্দোলন শাণায়, তাহলে সরকারের পক্ষে পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব না-ও হতে পারে। সরকার যদি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারায়, তাহলে দশম সংসদ নির্বাচন সরকারের মেয়াদপূর্তির আগে অনুষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে ২০১২ সালের শেষ দিকে বা ২০১৩ সালে যেকোনো সময় নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নির্বাচন যখনই হোক, নির্বাচনের প্রসঙ্গ এলে সরকারের শরিক দল বা দলগুলো সব সময় নিজেদের নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার আখ্যা দিয়ে তাদের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব বলে দাবি করে। আর বিরোধী দলগুলো সরকারি দলের কার্যক্রমকে অগণতান্ত্রিক ব্যাখ্যা দিয়ে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। মহাজোট সরকার গঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আর প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন। তবে মহাজোটের শরিক ছোট দলগুলো তাদের এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। আবার আওয়ামী লীগের কিছুসংখ্যক নেতাও মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরও কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আইনমন্ত্রী মনে করেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, এই জাতি আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরে যেতে চায় না। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার যদি পাঁচ বছর দেশ চালাতে পারে, তাহলে তিন মাস বা দুই বছরও পারবে। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি সরকারি দলের নেতাদের এহেন বক্তব্যের মধ্যে ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়ে বলছে, সরকারি দল জনপ্রিয়তা হারিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ভয় পাচ্ছে। সে কারণে তারা নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে চায়।
লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তুলে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছেন, তাঁরা কিন্তু নির্বাচনী সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অবদানের নমুনা দেখাতে পারছেন না। তবে হ্যাঁ, তাঁরা চাইলে নতুন আরপিও হওয়ার কারণে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন যেমন—মনোনয়নপত্র জমাদানকালীন শোডাউন বন্ধ, রঙিন পোস্টার ছাপানো বন্ধ, দেয়ালে চিকা বা পোস্টার মারা বন্ধ প্রভৃতি দেখাতে পারেন। কিন্তু এসব পরিবর্তন ইতিবাচক হলেও শুধু এসব দিয়ে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। যত দিন নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ড-সবল ও স্বাধীন হতে না পারবে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা সুনিশ্চিত করা না যাবে, তত দিন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন দুর্নীতিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবে বলে বিশ্বাস করা যায় না। কাজেই কমিশনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী সংস্কৃতিতে প্রত্যাশিত ইতিবাচক পরিবর্তন না আনতে পারলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও ভোটাররা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নিতে চাইবেন না। তাঁরা চাইবেন, সাংবিধানিকভাবে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেন সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে এবং সেই নির্বাচনী রায় যেন সবাই গ্রহণ করে নেয়।
আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচন যখনই হোক, আর যে রকম সরকারই এই নির্বাচনের আয়োজক হোক না কেন, নির্বাচনটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া দরকার। তা না হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে চলমান অসমঝোতা ও সংসদীয় অকার্যকারিতা বহাল থেকে যাবে। আর অস্থিতিশীলতা ও হিংসাত্মক রাজনীতি বহাল রেখে দেশ ও মানুষের জন্য উন্নয়ন অর্জন এবং তা টেকসই করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করা যেকোনো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
akhtermy@gmail.com

Thursday, August 19, 2010

মন্ত্রী বনাম সংসদীয় কমিটি -বিমানকে রাহুমুক্ত করতে হবে

জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের খবরের শিরোনাম হওয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা বাহুল্য, সংস্থাটির সুনামের চেয়ে দুর্নামের পাল্লাই ভারী হচ্ছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বারবার বিমান অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির শিকার হয়ে যাত্রী হারিয়েছে, লোকসান দিয়েছে, এমনকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়েছে। গত মঙ্গলবারের প্রথম আলোয় উড়োজাহাজ ভাড়া করা নিয়ে সংসদীয় কমিটি বনাম মন্ত্রীর দ্বন্দ্বের খবরে বিমানের দুর্নীতির যে নতুন চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
গত বছর হজযাত্রী পরিবহনের সময় নাইজেরিয়ার কাবো এয়ারলাইনস থেকে একটি পুরোনো ত্রুটিপূর্ণ উড়োজাহাজ ভাড়া করা হয়। অথচ সে সময় বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজ ছিল। ওই অবস্থায় বড়জোর একটি উড়োজাহাজ ভাড়া করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ভাড়া করা হয় তিনটি। এর মধ্যে কাবোর উড়োজাহাজটি হজফ্লাইট শেষে আরও ছয় মাস বেশি চালানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, উড়োজাহাজের ভাড়া বাবদ কাবোকে সাত মাসে প্রায় ৮১ কোটি টাকা দেওয়া হয় এবং এ থেকে ৪১ কোটি টাকার কমিশন তথা ঘুষ নিয়েছে বিমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মহল।
কাবো এয়ারলাইনসের গর্হিত আচরণের জন্য একে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য বিমান পরিচালনা পর্ষদে প্রস্তাবও উঠেছিল। তা ছাড়া ওই উড়োজাহাজটি ২০ বছরেরও বেশি পুরোনো হওয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন-অযোগ্য ছিল। উপরন্তু উড়োজাহাজটির চালকদের লাইসেন্স নিয়ে সমস্যা থাকায় সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের একবার আটকও করেছিল। তার পরও বিশেষ বিবেচনায় একে চালানোর অনুমতি না দেওয়ায় বিমান মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কয়েকজন সদস্য বিমানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন।
সংসদীয় কমিটি স্পষ্টতই নাইজেরীয় কাবো এয়ারলাইনসের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে। অনিয়মকে জায়েজ করার জন্য কমিটির কিছু সদস্য কেন চাপাচাপি করলেন, তা উদ্ঘাটিত হওয়া দরকার।
সংসদীয় কমিটি শুধু কাবোর বিষয়েই আগ্রহী নয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জমিতে হোটেল করার জন্য একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার ব্যাপারেও মন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়েছে। মন্ত্রী অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া বিমানবন্দরসংলগ্ন ১৩০ একর জমি উদ্ধার করে সরকারকে দিতে চান, কিন্তু সংসদীয় কমিটি চায়, পুরোটা না হলেও অন্তত ২৫ একর জমি হোটেল ও গলফ ক্লাব করার জন্য ইজারাদারদের হাতেই থাকুক। এ বিষয়টিরও সুষ্ঠু নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। আগের অনিয়মের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এ দুটি অনিয়ম প্রমাণ করে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস স্বার্থান্বেষী মহলের দুর্নীতির রাহুগ্রাসে বিপন্ন। এদের হাত থেকে বিমানকে রক্ষা এবং সংস্থাটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।