Showing posts with label সুশাসন. Show all posts
Showing posts with label সুশাসন. Show all posts

Sunday, July 4, 2010

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ by সাঈদ আহমেদ

একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আকাঙ্ক্ষা বহুদিন ধরে লালন করে আসছে দেশের মানুষ। সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের আগ্রহ সব সময় মেলে না। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে সেই মেলবন্ধনটা ছিল। এর ফলস্বরূপ এবং কিছুটা আন্তর্জাতিক চাপে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা হয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৭’। এরপর কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দিতে লেগে যায় প্রায় এক বছর। ২০০৮ সালের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি আমিরুল কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং মুনিরা খান ও অধ্যাপক নীরুকুমার চাকমাকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়।
এর অল্প কিছুদিন পরই ক্ষমতায় আসে বর্তমানের নির্বাচিত সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নতুন সরকার কীভাবে গ্রহণ করে তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশকে অনুমোদন না দেওয়ায় কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০০৮’ নামে একটি আইন সংসদে উত্থাপন করা হয়। বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করার জন্য আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্থায়ী কমিটি খসড়া এই বিলে অনেক সুপারিশ প্রদান করে এবং সংসদে উত্থাপনের এক দিন আগে নাগরিক সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ও করে। ৭ জুলাই ২০০৯ সংসদীয় কমিটির সুপারিশসহ সংসদে উত্থাপিত হয় ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯’। ৯ জুলাই ২০০৯ তা সংসদে পাস হয় এবং ১৪ জুলাই ২০০৯ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভ করে। নতুন আইনটিকে ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্মকে বৈধতা দেওয়া হয়।
২০০৭ সালের অধ্যাদেশ অনুমোদন না করে সরকারের নতুনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ প্রণয়নের কারণ খানিকটা অনুমান করা যায়। বর্তমান সরকার হয়তো চায়নি, ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রতিষ্ঠিত হোক যে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের হাতে। তা ছাড়া ২০০৭ সালের অধ্যাদেশে অনিবার্য কিছু সংশোধনী আনারও প্রয়োজন ছিল।
নতুন আইনে কমিশনের সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়স ৭২ থেকে কমিয়ে যেহেতু ৭০ করা হয়, সেই বয়সসীমা অতিক্রম করায় কমিশনের সদস্য মুনিরা খান পদত্যাগ করেন ২০০৯-এর জুলাই মাসে এবং একই সময়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে কমিশনের অপর সদস্য অধ্যাপক নীরুকুমার চাকমাও ফিরে যান তাঁর অধ্যাপনা পেশায়। সেই থেকে চেয়ারম্যান একাই ছিলেন কমিশনে। তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ ছিল কিছু বিবৃতি আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেওয়ার মধ্যে। এরপর প্রায় এক বছর কমিশন সদস্যহীন অবস্থায় থাকে। ২০০৯-এর ডিসেম্বরে বাছাই কমিটি একটি বৈঠক করে কমিশনের জন্য যোগ্য লোক খোঁজার দায়িত্ব দেয় আইন মন্ত্রণালয়কে।
এদিকে কমিশনের চেয়ারম্যানের অবসর নেওয়ার বয়স পূর্ণ হয় ২২ জুন ২০১০। তার মাত্র কয়েক দিন আগে ১৭ জুন ২০১০ বাছাই কমিটি পুনরায় বৈঠকে বসে এবং আমরা দেখি, ২২ জুন ২০১০ রাষ্ট্রপতি ড. মিজানুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে একজন সার্বক্ষণিক এবং পাঁচজন অবৈতনিক সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন পুনর্গঠন করেন। অনেক দিন পরে হলেও কমিশন পুনর্গঠন করাটা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হলো, একটি কার্যকর ও শক্তিশালী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের পথে তার প্রভাব কী হতে পারে, একটু আলোচনা করে দেখা যাক—
প্রথমত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ অনুযায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া হচ্ছে—জাতীয় সংসদের স্পিকারের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে নিয়োগ দেবেন (ধারা-৭)। বাছাই কমিটি যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ না হওয়ায় (স্পিকার, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদসচিব এবং সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয় দুজন সাংসদ) নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে আমাদের এমনিতেই উদ্বেগ ছিল। উপরন্তু, বাছাই কমিটির আইন মন্ত্রণালয়কে যোগ্য লোক খোঁজার দায়িত্ব দেওয়াটা শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে খুব একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নয়। এরপর যখন দেখা গেল, নিয়োগের মাত্র এক দিন পর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে সরিয়ে দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো এবং তা জানানো হলে আইন মন্ত্রণালয় প্রেরিত বিজ্ঞপ্তি মারফত তখন নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্বের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেল। আমরা পরিষ্কারভাবে জানতে পারলাম না, নতুন যাঁকে নিয়োগ দেওয়া হলো তাঁর নাম কি বাছাই কমিটির প্রস্তাবনায় ছিল? এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জনগণের কাছে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
আবার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যেহেতু একটি ‘সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা’, এর চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আইনেই উল্লেখ রয়েছে (ধারা-৮)। সেখানে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেসব কারণ ও যে পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সে রকম কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত চেয়ারম্যান বা কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। আরও বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্য যদি কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত হন বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিজের দায়িত্ববহির্ভূত অন্য কোনো পদে নিয়োজিত হন (চেয়ারম্যান ও সার্বক্ষণিক সদস্যের ক্ষেত্রে), কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত হন বা নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে রাষ্ট্রপতি তাঁকে অপসারণ করতে পারবেন।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যে খারাপ নজির স্থাপন করা হলো তা হচ্ছে, মন্ত্রণালয় প্রায় এক বছর ধরে যোগ্য লোক খোঁজার পরও এমন একজন ব্যক্তি নিয়োগ পেলেন, যাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগ রয়েছে। আর সেটাকে যে প্রক্রিয়ায় শোধরানো হলো তার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় খারাপ নজির স্থাপিত হলো। প্রথমত, নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় সরকারের কর্তৃত্বের বিষয়টি প্রকাশ্য হয়ে গেল এবং দ্বিতীয়ত, কমিশনের কোনো সদস্যকে অপসারণের আইনি-প্রক্রিয়াকেও ঠুনকো বিষয়ে পরিণত করা হলো। আমরা এর আগে ’৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়েও এ ধরনের বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হতে দেখেছি। শুরুতেই আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জন্য এটা একটা বাজে নজির স্থাপিত হলো এবং একই সঙ্গে কমিশনকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতাও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আমরা মনে করি, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে যেন আস্থার সংকট তৈরি না হয় সেদিকে সরকারের সতর্ক নজর রাখা উচিত।
সাঈদ আহমেদ: মানবাধিকারকর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

Sunday, June 27, 2010

চট্টগ্রামের নতুন মেয়রের জন্য কিছু পরামর্শ by মশিউল আলম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনবারের নির্বাচিত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ে সাক্ষাতের সময় প্রশ্ন করেছিলাম, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনি বিভিন্ন সময়ে একাধিক কাজের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেগুলোর বিরুদ্ধে নগরবাসীর একাংশ প্রবল প্রতিবাদ করেছিল। আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নগরবাসীর মতামত শোনার চেয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেন বলে অনেকে বলছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে কি আপনার উচিত নয় সব সময় জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া? উত্তরে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, জনগণ তাঁকে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেছে, অর্থাৎ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জনগণ তাঁকে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কাজ করার ম্যান্ডেট দিয়ে দিয়েছে। এরপর আর সব সময় জনগণের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এম মন্জুর আলমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি যদি মেয়র নির্বাচিত হন, তাহলে কি একক সিদ্ধান্তেই সিটি করপোরেশন চালাবেন, না সময়ে সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেবেন এবং সেগুলো বিবেচনা করে দেখবেন? অমায়িক বিনয়ী হিসেবে পরিচিত মন্জুর আলম স্মিত হেসে বলেছিলেন, তিনি যদি মেয়র নির্বাচিত হন, তাহলে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে, তাঁদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন, কাজ করবেন।
১৭ জুনের নির্বাচনে এম মন্জুর আলম জয়ী হয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় গিয়েছিলেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে, তাঁর সহযোগিতা চাইতে। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁকে সাদরে বরণ করেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি প্রীতিকর ঘটনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন ঘটনা বিরল। সে কারণেই সংবাদপত্রগুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে খবরটি প্রকাশ করেছে। এবারের সিসিসি নির্বাচনের কিছু প্রশংসনীয় দিক সবারই দৃষ্টি কেড়েছে। যেমন বিএনপিনর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এম মন্জুর আলম নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিলম্বে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মন্জুর আলমের দিক থেকে আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল এই যে, নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কুৎসামূলক প্রচারণায় তিনি নামেননি। যেদিন সন্ধ্যায় তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম, সেখানে তাঁকে পরিবেষ্টন করে ছিলেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। কথার ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা যখনই মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিন্দামূলক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তখনই মন্জুর আলম বিব্রত হচ্ছিলেন, বিনয়ের সঙ্গে তাঁদেরকে নিন্দা পরিহার করতে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন।
সন্দেহ নেই, চট্টগ্রাম নগরবাসী একজন ভদ্রলোক মেয়র পেলেন, যাঁর স্বভাবে বহুলপ্রচলিত রাজনৈতিক কুটিলতা ও খেয়োখেয়ি দৃশ্যত অনুপস্থিত। তবে এসব গুণের সঙ্গে নেতৃত্বদানের দক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি নগরবাসীর পছন্দ-অপছন্দগুলোকে আমলে নেওয়ার মানসিকতা বিশেষভাবে দরকার। নির্বাচনের আগে তিনি নগরবাসীকে জানিয়েছিলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি তাঁদের জন্য কী কী করবেন। কিন্তু নগরবাসী কী চায় তা জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন কি না, করলে কী প্রক্রিয়ায় করেছিলেন তা জানি না। এ দেশের সব নির্বাচনেই এমনটি হয়ে থাকে। নির্বাচনে প্রার্থীরা ও তাঁদের দলগুলো কিছু প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার প্রকাশ করে জনগণের ভোট চান। সেসব প্রতিশ্রুতির তালিকায় থাকে সাধারণভাবে জনপ্রিয় বিষয়গুলো। ‘চট্টগ্রামের উন্নয়ন’ সে রকমই একটি সাধারণ জনপ্রিয় বিষয়। একজন সিটি মেয়র তাঁর নগরটিকে কী রূপে গড়ে তুলতে চান, অর্থাৎ এ বিষয়ে তাঁর ভিশন বা রূপকল্প কী, তা পরিষ্কার ছিল না। এখনো মেয়র মন্জুরের তেমন কোনো রূপকল্প আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য সে রকম একটি রূপকল্প আগে থেকে নিজেই স্থির করার চেয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের ভিত্তিতে গড়ে তোলাই শ্রেয়তর হবে। এখন মেয়র মন্জুরের সেই সময়।
মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালে সিটি করপোরেশনকে প্রায় একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ফেলেছিলেন—এ রকম সমালোচনা গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মন্জুর আলম। মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরবাসীর ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে সিটি করপোরেশনের আয় বাড়িয়েছিলেন—এই ব্যাপারটির মধ্যে একটা প্যারাডক্স ছিল। করের বোঝা খুবই অজনপ্রিয়, সেটা না বাড়িয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী ধনী-গরিব নির্বিশেষে নগরবাসীর সবার ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানোর জন্য যে ব্যাপক বাণিজ্যিক তৎপরতা চালিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও চালাবেন বলেই প্রচার করছিলেন (কেননা তিনি চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে চান সিঙ্গাপুরের মতো করে), সেটা বেশির ভাগ লোকেই পছন্দ করেনি। আমি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ ও শ্রেণী-পেশার ৫০ জন ভোটারের মতামত সংগ্রহের সময় এটা লক্ষ করেছিলাম: অধিকাংশ ভোটারই বলেছেন, সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানো ভালো, কিন্তু একশভাগ বাণিজ্যিকীকরণ ভালো নয়। মন্জুর আলম আমাকে বলেছিলেন, তিনি করও বাড়াবেন না, বাণিজ্যিকীকরণও করবেন না। দুটোর মাঝামাঝি থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়ন করবেন। বিষয়টা ঠিক পরিষ্কার নয়। সিটি করপোরেশন কর না বাড়িয়ে কীভাবে আয় বাড়াতে পারে তা ব্যাখ্যা করার জন্য যে সময় প্রয়োজন, আমার সঙ্গে আলাপের ওই মুহূর্তে মন্জুর আলমের তা ছিল না। এ বিষয়ে নিশ্চয়ই তাঁর কিছু বাস্তবভিত্তিক চিন্তা-ভাবনা থেকে থাকবে।
যাই হোক, মেয়র মন্জুরের এখন সিটি করপোরেশন পরিচালনার নীতি-কৌশলগত পরিকল্পনা করার সময়। এ সময় তিনি যদি স্মরণে রাখেন যে মেয়র নির্বাচিত করার মধ্য দিয়েই চট্টগ্রাম নগরবাসী তাঁকে সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগাম ম্যান্ডেট দিয়ে দেননি, বরং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জনমত গ্রহণ ও বিবেচনা করা উচিত, তাহলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভুল পদক্ষেপগুলো তিনি এড়াতে পারবেন এবং সেটাই গড়ে তুলবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ কর্মপদ্ধতি। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় যে সুবিধার কথা অ্যারিস্টটল বলতেন, সেটা হলো এই: ছোট ইউনিটের শাসনকাজ পরিচালনা অপেক্ষাকৃত সহজ ও অধিকতর গণতান্ত্রিক হতে পারে, কারণ সেখানে নাগরিকের সংখ্যা কম, প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। সেখানে সবার মতামত গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সে রকম হতে পারত যদি শুধু নির্বাচনকালে নয়, সব সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিটের জনগণের মতামত গ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো; যদি মনে করা না হতো যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ একজন প্রার্থীকে সবকিছু করার আগাম ম্যান্ডেট দিয়ে দেয়।
মেয়র মন্জুর আলম যদি সত্যিই সব সময় তাঁর নগরবাসীর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে চলতে চান, তাহলে জনমত সংগ্রহের কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের ৪১ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর তাঁদের নিজ নিজ ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই মেয়র সাহেব যা বলবেন তাই হবে—এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে কাউন্সিলরদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাউন্সিলররা যেন মেয়রের বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের ওয়ার্ডের জনগণের পক্ষে মতামত প্রকাশ করতে পারেন, সে দিকে নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ওয়ার্ড কাউন্সিল কার্যালয়ে একটি করে মতামত প্রদানকেন্দ্র খোলা উচিত, যেখানে ওয়ার্ডবাসীর বক্তব্য নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে মেয়রের কার্যালয়ের থাকবে একটি ওয়েবসাইট, যেখানে শিক্ষিত নগরবাসীরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিজেদের মতামত, অভিযোগ, দাবি-দাওয়া ইত্যাদি জানিয়ে লিখতে পারবেন। এবং সেসব মতামত মেয়রকে নিয়মিতভাবে অবহিত করার স্থায়ী ব্যবস্থা থাকবে; মেয়র ও কাউন্সিলরদের সাধারণ সভায় সেসব নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হবে এবং সেসবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এভাবে আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো শুধু ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্র চর্চার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে হতে পারে নাগরিক পর্যায়ের অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে গণতন্ত্র অনুশীলনের একেকটা মডেল। এই কাজে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে অত্যন্ত সহায়ক। এবারের সিসিসি নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে (২১ নং ওয়ার্ড—জামালখান) ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভোটদানের ব্যবস্থায় বেশ সাড়া মিলেছে। ভবিষ্যতে অবশ্যই এ ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে। সামনে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও নিশ্চয় অনেক ওয়ার্ডে এই ব্যবস্থা করবে নির্বাচন কমিশন।
সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র এম মন্জুর আলম যদি তাঁর নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে, সব সময় তাদের মতামত ও পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন পরিচালনার চেষ্টা করেন, তাহলে চট্টগ্রাম থেকেই সূচিত হতে পারে আমাদের কাঙ্ক্ষিত, কার্যকর ও ফলপ্রসূ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অগ্রযাত্রা। এবং তার কিছু ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যই জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হবে।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mashiul.alam@gmail.com

Wednesday, January 20, 2010

দুদকের স্বাধীনতা বনাম সংবিধানের সুরক্ষা -সুশাসন by এ এম এম শওকত আলী

দুদকের জন্ম হয়েছিল স্বাধীনভাবে দুর্নীতি দমনের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল মহত্ এবং সিদ্ধান্তও ছিল যুগোপযোগী। জন্মলগ্ন থেকেই দুদককে খোঁড়া হাঁস বলে মিডিয়ায় আখ্যায়িত করা হয়। কী কারণে করা হয় তার কিছু বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনও মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জরুরি অবস্থা জারির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদককে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কিছু কাঠামোগত সংস্কার সূচিত হয়। এ সংস্কারের প্রধান অংশ ছিল, দুই কমিশনারসহ নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং বিদ্যমান আইনের সংশোধন। এসব সংস্কারের মাধ্যমে দুদকের দুর্নীতি দমন কার্যক্রম গতিশীল হলেও এ সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে কিছু অত্যাচার ও অনাচারের বিষয় জনমনে ঘনীভূত হয়। ওই সময়ে দুর্নীতি দমনের মূল চালিকাশক্তি কে বা কারা ছিল এবং এর উদ্দেশ্যই বা ছিল কী—এ দুটি প্রশ্নের সঠিক তথ্য জানা না গেলেও দুদকের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিছু মৌলিক তথ্য বিভিন্ন টক শোসহ মিডিয়ার অন্যান্য প্রতিবেদনে জানা যায়।
সংসদ গঠিত হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে একটি সংসদীয় কমিটি দুদকের কমিশনারদের সশরীরে হাজির হয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর অভাবের কারণে সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। অবশ্য দুদকের একজন সাবেক সচিব প্রথমে হাজির হতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তী সময়ে হাজির হন। অন্য কেউ এ বিষয়ে সাড়া দেননি। লক্ষণীয় যে, একমাত্র সরকারি বেতনভুক ব্যক্তিরাই সংসদে জবাবদিহি করতে বাধ্য, অন্য কেউ নয়।
দুদক নির্বাচন কমিশনের মতো কোনো সাংবিধানিক সংস্থা নয়। এ সংস্থার স্বাধীনতার সীমারেখাও বিদ্যমান। এ সীমারেখা কমিশনের আইনেই বলা রয়েছে। এ ছাড়া কমিশনের যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সংগত কারণে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টই স্বাধীন, তবে সংবিধান সাপেক্ষে। প্রকাশ্যে স্বীয় সংস্থার বিষয়ে কোনো অনভিপ্রেত বক্তব্য বিচারপতিরা প্রকাশ করেন না। দুদকের জন্মলগ্নে এ ধরনের কিছু বক্তব্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দিয়েছিলেন—যাকে বলা যায়, ময়লা কাপড় জনসমক্ষে সাফ করা। সম্প্রতি দুদকের প্রধান কর্মকর্তার এমনই একটি বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বক্তব্যে বলা হয়েছে, দুদক দন্তহীন বাঘ। আসলে কি তাই?
সংবিধানের মূলমন্ত্র হচ্ছে—রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গের কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দুদক বা এ ধরনের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা ও শক্তির নামে এ মূলমন্ত্রকে উজিয়ে যেতে পারে না। এটা উপেক্ষা করলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নামে দুঃশাসন বা কুশাসন হবে, যা কারও কাম্য নয়। এ ধরনের উপলব্ধি থেকেই সংসদীয় কমিটি সম্প্রতি দুদক আইন সংশোধনের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে। পত্রিকান্তরে দেখা যায়, অধিকাংশ দিকনির্দেশনার সঙ্গে দুদক দ্বিমত পোষণ করেছে। দুদকের যে উপকমিটি সংসদীয় কমিটির কিছু দিকনির্দেশনার সঙ্গে একমত পোষণ করেছে, সে বিষয়েও দুদকের প্রধানসহ কমিশনাররা একমত নন। প্রকাশিত সংবাদে যে কটি দিকনির্দেশনা সংসদীয় কমিটি দুদককে প্রেরণ করেছে, সে বিষয়গুলো বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বিষয়গুলো হলো : এক. সরকারের বেতনভুক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দাখিলের আগে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করাই বিধান। এ বিধান এর আগে অর্থাত্ পুরোনো আইনে ছিল, নতুন আইনে বিলুপ্ত করা হয়। এ বিধানের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, অনেক সত্ ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা সরল বিশ্বাসে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকলেও পরবর্তীকালে দুদকের আসামি হয়েছেন। এ কারণে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শিথিলতা আসে। এ ধরনের ব্যাখ্যাকে আরও সম্প্রসারিত করা যায়। এক. সরল বিশ্বাসে কাজ করার বিষয়টি দণ্ডযোগ্য অপরাধ নয়। এ স্বীকৃতি ফৌজদারি বিধিমালায়ও বিদ্যমান। দুই. অতীতে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মামলায় বিশেষ করে, ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির জন্য দুর্নীতি দমন অধিদপ্তর ঢালাওভাবে যেসব কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ক্রয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত নন, কিন্তু সরকারি কার্য সম্পাদনবিধি অনুযায়ী তাঁরা ক্রয়সংক্রান্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিন. এমন অনেক নজির রয়েছে, বিভিন্ন কারণে দুর্নীতির মামলায় আসামি সাত-আট বছর পর সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এ সময়কালে তিনি সাময়িকভাবে বরখাস্ত ছিলেন। এ ধরনের উদাহরণ এখনো যে নেই, তা বলা যাবে না। এ ধরনের ক্ষেত্রে দুদক কি ফিরিয়ে দিতে পারবে সেই সাত-আট বছরের কর্মজীবন বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম? এ বিধান প্রতিস্থাপিত হলে পরোক্ষভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে বলে যে যুক্তি প্রকাশিত হয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। দুদকের যুক্তি ভিন্নতর। এককথায় তারা বলেছে, দুদককে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য পরিবর্তনের বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।
পুরোনো বিধানটি কীভাবে কাজ করত, সে বিষয়ে যাঁরা বিপক্ষে বলেছেন, তাঁদের হয়তো জানা নেই। প্রাথমিকভাবে সরকারি অনুমোদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি ছিল। ১৯৮২ পরবর্তী সময়ে এ কমিটির সব সিদ্ধান্ত ক্ষেত্রমতো রাষ্ট্রপতি (রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারে) এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন, সচিব, এমপি ও মন্ত্রীদের মামলার অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। অর্থাত্ সম্পূর্ণ বিষয়টি রাজনীতিকায়ন করা হয়। কোনো বিশ্লেষণধর্মী গবেষণায় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কী করেছে, যাতে নিরপেক্ষতার অভাবের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। যা কিছু আছে, তা অনুমাননির্ভর। এর সঙ্গে যোগ করা যায় ভারতের বিদ্যমান প্রথা। এ প্রথায় সরল বিশ্বাসে কাজ করার জন্য সরকারি অনুমোদনের বিধান এখনো অনুসৃত হয়। এ বিষয়ে কিছু দিন আগে একজন বিজ্ঞ ও প্রবীণ আইনজীবী স্পষ্ট মন্তব্য করেছিলেন—পুরোনো বিধানটি রাখতে হবে, অন্যথায় সরকারি বেতনভুক ব্যক্তিরা কাজ করতে পারবেন না।
আইন সংশোধনীর পরবর্তী দিকনির্দেশনা হলো—২০০৭-০৮ সালে দুদকের যেসব কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে দুই ধরনের প্রস্তাব দুই উত্স থেকে প্রদান করা হয়েছে। সরকারের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি মত দিয়েছে, এ ধরনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুদকের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে অভিযোগ করতে হবে এবং গৃহীত ব্যবস্থা দুদক অভিযোগকারীকে জানাবে। অন্য উত্স অর্থাত্ দুদকের উপকমিটির মত হলো, বিধি অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে বিধায় আইন সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই। বলে রাখা প্রয়োজন, সব সংস্থাই আইন অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তবে এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহারও হয়। বিষয়টি নিয়ে আরও চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াও নিরপেক্ষ তদন্তের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে থাকবে না কেন?
পরবর্তী দিকনির্দেশনা হলো, কমিশনের সচিব সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং তিনি মুখ্য হিসেবে কর্মকর্তা হবেন। এ বিষয়ে দুদকের ভিন্নমত রয়েছে। তাহলো : এক. দুদকের আইন অনুযায়ী এ ক্ষমতা সরকারের নয়, বরং দুদকের। দুই. দুদকের আইন মতে, চেয়ারম্যান এ সংস্থার প্রধান নির্বাহী। এ ধরনের বক্তব্য বিশেষ করে, শেষোক্ত ক্ষেত্রে হয় অজ্ঞতাপ্রসূত অথবা নিছক একগুঁয়েমি। প্রধান নির্বাহী এবং মুখ্য হিসাব কর্মকর্তা সমার্থক নয়। মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী মন্ত্রী, সচিব নয়। সচিব মুখ্য হিসাব কর্মকর্তা, যাঁর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সংসদের সরকারি হিসাবসংক্রান্ত কমিটির কাছে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে জবাবদিহি করা। এটা যদি চেয়ারম্যানকে করতে হয়, তাহলে তাঁকে ওই সংসদীয় কমিটির কাছে সশরীরে হাজির হয়ে প্রতিটি অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। আর যদি দুদকের নিযুক্ত সচিবের কাছে করতে হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী তাঁকে সংস্থার মুখ্য হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। সংসদ রাজি না হলে দুদক এটা করতে পারবে না। প্রথমোক্ত বিষয়ে বলা যায়, এমনকি নির্বাচন কমিশনেও সরকার থেকে প্রেষণে সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব নিয়োগ করা হতো। এখনো তা-ই রয়েছে। এতে কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নিয়ম হবে, দুদক সংগত মনে করলে সরকারকে অনুরোধ জানাতে পারে একজন দক্ষ কর্মকর্তাকে দুদকের অধীনে প্রেষণে স্থানান্তর করার। পরবর্তী সময়ে দুদক নিয়োগ আদেশ দিতে পারে।
প্রকাশিত সংবাদে আরও দেখা যায়, দুদকের উপকমিটির মতের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের দ্বিমত রয়েছে। এ ছাড়া দুদকও আইন সংশোধনের বিষয়ে কিছু নতুন প্রস্তাব সরকারকে প্রেরণ করবে। প্রশ্ন হলো, সংসদ যদি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দুদকের উপায় কী হবে? প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা সংসদের, অন্য কোনো সংস্থার নয়।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হচ্ছে দুদক বনাম সংসদ অথবা দুদক বনাম সরকারের সঙ্গে, তা এ প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দিতে পারে। নিজস্ব সব মতই সঠিক, অন্যের মত সঠিক নয়—এ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের অভ্যন্তরে এবং সরকারের বাইরের সব সংস্থারই একে অন্যের প্রতি অধিকতর সহনশীল হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টিই সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান সহায়ক শক্তি—এ কথা ভুলে গেলে চলবে না।
সবশেষে আলোচনার বিষয়টি হলো, রাষ্ট্রপতির কাছে সরাসরি জবাবদিহিতা। এ বিষয়ে দুদকের পক্ষে মত হলো, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করে থাকে এবং তা সংসদেও পেশ করা হয়। অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থা—যেমন নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনও এ কাজটি করে থাকে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না। কারণ, না রাষ্ট্রপতি, না সংসদ এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো মতামত প্রদান করেন। কারণ আইনে এ সুযোগ নেই। প্রচলিত নিয়মও তা-ই। এ বিষয়ে আরেকটি উত্স থেকে মত প্রকাশ করা হয়েছে যে সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় বিধায় এ জবাবদিহিতার বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে কার্যকর হবে না। তাহলে কি দুদক একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে সংবিধানকেও উজিয়ে যাবে?
বিগত এক বছরে নির্বাচন কমিশনসহ দুদকও স্বীকার করেছে, নির্বাহী বিভাগ থেকে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার বিষয়টি কখনো বাধাগ্রস্ত হয়নি। নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে পারস্পরিক সুসম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত করার ব্যাপারে এ স্বীকারোক্তি কি যথেষ্ট নয়? অন্য একটি প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বেশ কিছুসংখ্যক সাংসদের কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ বোর্ড নির্বাহী বিভাগের অধীন একটি সংস্থা। তাদের যদি এ বিষয়ে সত্ সাহস থাকে, তাহলে সমস্যাটি কোথায়?
এ এম এম শওকত আলী: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

Monday, January 4, 2010

ছোট ছোট উদ্যোগ ও পরিবর্তন আনতে হবে -সুশাসন by আকবর আলিখান

সুশাসন নয়-ছয় করা যত সোজা, নষ্ট হয়ে যাওয়া সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা তত সোজা নয়। সুশাসন একটি ঘটনা নয়, সুশাসন একটি প্রক্রিয়া। কাজেই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে সেটি প্রতিষ্ঠিত হবে—এ ধরনের আশা করা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার ক্রমেই অবনতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এই অবনতিশীল পরিস্থিতি রোধ করার জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রশাসনে দুটি প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। প্রথম উদ্বেগের কারণ হলো বাংলাদেশে যারা ভালো কাজ করে, তারা পুরস্কার পায় না। আর যারা খারাপ কাজ করে, তাদের শাস্তি হয় না। এ কথা প্রশাসনের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, প্রশাসনের বাইরের সমাজ সম্পর্কেও সমভাবে সত্য।
দীর্ঘদিন আগে হজরত আলী (রা.) মিসরের নবনিযুক্ত গভর্নর মালিক আশতারকে বলেছিলেন, ভালো ও খারাপের সঙ্গে একই রকম ব্যবহার কোরো না। যদি করো, তাহলে ভালো লোকেরা ভালো কাজ করবে না। আর খারাপ লোকেরা খারাপ কাজ করা থেকে বিরত হবে না।
ভগ্বত গীতাতেও শ্রীকৃষ্ণ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কথা বলেছেন। শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর প্রতিফল আমরা দেখতে চাই সরকারের নিয়োগ ব্যবস্থায়, পদায়ন এবং পদোন্নতিতেও।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা জনপ্রশাসনের একটি মৌল নীতি থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। এই মৌল নীতিটি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াস। কনফুসিয়াসকে একজন ভক্ত জিজ্ঞেস করেছিল, সুশাসন কাকে বলে? কনফুসিয়াস খুব সোজা কথায় বলেছিলেন, সুশাসন ব্যাপারটি খুব সহজ। সুশাসন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাজা রাজার কাজ করে, মন্ত্রী মন্ত্রীর কাজ করে, পিতা পিতার কাজ করে ও সন্তান সন্তানের কাজ করে। যদি রাজা মন্ত্রীর কাজ করে, আর মন্ত্রী প্রজার কাজ করে, তাহলে সুশাসন থাকবে না।
দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা অতি কেন্দ্রীয়করণের ফলে সব ক্ষমতা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে। এই ব্যবস্থায় সুশাসন সম্ভব নয়। প্রশাসনের এই অচলায়তন ভাঙতে আজকে তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী বিভাগের উচ্চতর পর্যায় থেকে নিম্নতর পর্যায়ে অধিকতর দায়িত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের হাতে প্রত্যর্পণ করতে হবে।
দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদ। কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় দেশের মানুষের সৃজনশীলতা কখনো মুক্তিলাভ করবে না।
এ কথা সত্যি, যেসব পরিবর্তনের কথা এখানে বলা হয়েছে, এগুলো রাতারাতি করা যাবে না। তবুও এ বছরে যদি এসব বিষয়ে ছোট ছোট উদ্যোগও নেওয়া হয়, তাহলে আমরা দিনবদলের আশায় বুক বাঁধতে পারি। শুধু কথা বলাই যথেষ্ট নয়, কাজের মাধ্যমে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে।
আকবর আলি খান: সাবেক সচিব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

Tuesday, November 24, 2009

সুশাসন -সরকারি খাতের সংস্কার ও স্থানীয় সরকার by এ এম এম শওকত আলী

১৯৯৭ সালে একটি আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের চাকরিসংক্রান্ত কাঠামোর বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছিল। যদিও এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের চাকরি কাঠামো, কিন্তু এর সঙ্গে সংগতভাবেই জড়িয়ে যায় স্থানীয় সরকারের কাঠামো। কারণ, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে একই ধারা দৃশ্যমান। এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে ব্যাপক। বাংলাদেশে এ বিতর্ক ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। এ বিতর্কে দুটি পরস্পরবিরোধী মতবাদের ধারা বিদ্যমান। এক. স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত করার লক্ষে শাসনব্যবস্থার আওতাভুক্ত সব ধরনের কাজ স্থানীয় সরকারকে অর্পণ করতে হবে এবং এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার। এ জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর্তৃত্বই কাম্য নয়। দুই. স্থানীয় সরকারকে উপযুক্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের লক্ষে সংসদের একটি আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দেওয়া আশু প্রয়োজন। তিন. কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের মোট বাজেটের অন্তত শতকরা ৪০ ভাগ সরাসরি স্থানীয় সরকারকে দিতে হবে।
এ বিষয়ে ভিন্নমত হলো, সংসদই আইন দিয়ে নির্ধারণ করে দেবে স্থানীয় পর্যায়ের কী কী বিষয় এবং কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে। সব কাজ স্থানীয় সরকারকে দেওয়া সম্ভব বা সংগত নয়। স্থানীয় সরকার রাষ্ট্রেরই একটি অংশ। একে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসেবে দেখার কোনো যুক্তি নেই। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পরিচালিত কিছু কাজ দেশব্যাপী বিস্তৃত বিধায় এসব কাজকে খণ্ডিত করার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এসব কাজের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে বিদ্যুত্, খনিজ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার, বৃহত্ সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো, বিচার বিভাগ, অপরাধ দমন ও আইনের প্রয়োগসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা যা জনস্বার্থে অপরিহার্য। এ ছাড়া রয়েছে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কাজ পরিচালনার কাঠামোগত দুর্বলতা, যার কারণে সব কাজই এদের দিয়ে সুচারুরূপে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
কেন্দ্রীয় বাজেটের নির্দিষ্ট একাংশ স্থানীয় সরকারকে দেওয়ার বিষয়ে অনেকেই বলেন, একাধিক কারণে এটা দেওয়া সম্ভব নয়। এক. ওই পর্যায়ে দুর্নীতি ও অপচয়। দুই. স্থানীয় সম্পদ আহরণে স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা। এতে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে দেওয়া হলে এ প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময়ই সরকার মুখাপেক্ষী বা নির্ভরশীল হবে। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশেই স্থানীয় সম্পদ আহরণের জন্য স্থানীয় সরকারকে উত্সাহিত করার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। এ পদ্ধতি বাংলাদেশেও পাকিস্তান আমল থেকে চালু করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ইউনিয়ন পরিষদকে মোট স্থানীয় করের ন্যূনতম শতকরা ২৫ ভাগ আদায় করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে ওই সব ইউনিয়ন পরিষদ সরকারি কোনো অনুদান লাভের যোগ্য হবে না। কিন্তু মূলত রাজনৈতিক কারণে এটা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
একই পদ্ধতি ইএনডিপি কয়েক বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে। এ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে ২০০৬-০৭ সালে বিশ্বব্যাংক দেশব্যাপী পর্যায়ক্রমে এ প্রথা চালু করে। সরকারি ও দাতা সংস্থার অনুদানপ্রাপ্তি এদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ছকে মূল্যায়ন করার পরই নির্ধারিত অনুদান দেওয়ার প্রথা চালু হয়। এ প্রকল্পের মোট বিনিয়োগ ছিল এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট ছকে ছিল কার্যাবলি প্রণয়নে স্বচ্ছতাসহ কর আদায় ও উন্নয়ন কার্যাবলি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনসম্পৃক্ততা। এ প্রকল্পের আওতায় ২০০৭ সালে অনুদান সরাসরি দেওয়ার বিষয় সম্পর্কেও তত্কালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ প্রকল্পের মূল্যায়নের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সংগত হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের সব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ১৯৮৪-৮৫ সালে উপজেলা প্রথা চালু করার পর একটি ভারসাম্যমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর প্রবর্তন করা হয়েছিল। সে কাঠামো প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু হোঁচট খেলেও পরবর্তী সমেয় অনেকটা সঠিকভাবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পঞ্চায়েত প্রথা অনেক গবেষকের মতে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। এ প্রথার আইনি ও নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রীয় সরকারের নয়। একেক রাজ্যের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাপর মধ্যে পার্থক্যও বিদ্যমান। কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের অনেক ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিত কিছুটা ভিন্নতর। কারণ বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র, যাতে কোনো রাজ্য নেই। অনেকটা যুক্তরাজ্যের অনুরূপ। ওই রাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তবে এতে কোনো সরকারি কর্মকর্তা যুক্ত নন। বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাজ্যেও স্থানীয় সরকার কাঠামোর যথেষ্ট ক্ষমতা। তবে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ওই রাষ্ট্রে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা বিদ্যমান। ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে গবেষকেরা এ কথাই বলেছেন।
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ক্ষমতার কাঠামো ও পরিধি ওই দেশের সংসদ আইন দ্বারা নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের অনুরূপ। এ আইন ‘আইনবহির্ভূত (টষঃত্ধ ারত্বং)’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ওই দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যে ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে দেওয়া হয়, সে ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের মাধ্যমে রহিতও করে। পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশের প্রথায় এ বিষয়টি স্বীকৃত নয় যে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে। ওই সব দেশে এ বিষয়টি স্বীকৃত যে স্থানীয় সরকারের সম্পদ সীমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও দক্ষতাও সীমিত। এ কারণে সব কাজই তারা করতে সক্ষম নয়। তবে নিজস্ব ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতাবান। জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকার প্রকৃত পক্ষে স্থানীয় সরকারকে কিছু কাজ সম্পাদনের বিষয়টি আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করে থাকে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার পরিধির বর্তমান বিতর্কের মূল উত্স এ সরকারের ওপর স্থানীয় সাংসদদের নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের কোনো দেশেই নেই। এমনকি ভারতেও এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে কেন হলো, তা বলা নিষ্প্রয়োজন। সবাই নির্বাহী ক্ষমতালিপ্সু। সরকারি দলের নেতারা যদিও এ প্রথাকে সমর্থন করেন এই যুক্তি দিয়ে যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্যই এটা করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে এতে ক্ষমতার ভারসাম্যই ধ্বংস করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কার্যাবলি সম্পাদনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। ভোগান্তি হচ্ছে জনগণের, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর।
ইতিমধ্যে সাংসদদের কর্তৃত্ব রহিত করার জন্য হাইকোর্টে রিট দাখিল করা হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত সরকারকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ এই মর্মে দিয়েছেন, কেন এ কর্তৃত্ব বিলুপ্ত করা হবে না। এ ধরনের ঘটনা যে ঘটবে, তার কিছু আভাস উপজেলা-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আইন সংসদের অনুমোদনপ্রাপ্তির পরই দৃশ্যমান ছিল। ওই সময়ে কিছু সংক্ষুব্ধ উপজেলা চেয়ারম্যান এ ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন। যা ঘটার তা-ই ঘটেছে। হাইকোর্টের রায় চূড়ান্ত হওয়ার পর বোঝা যাবে, প্রকৃত অবস্থা কী? অনুমান করা যায়, রায় সরকারের বিরুদ্ধে গেলে সরকার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হবে। হওয়াই স্বাভাবিক। তখন আসবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
এ বিষয়ে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে উপজেলা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশে সাংসদদের কোনো কর্তৃত্বই দেওয়া হয়নি। নির্বাচিত সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে সৃষ্ট হয়েছে অনেক জটিলতা। এ জটিলতার কারণে আইনের দ্বারা সৃষ্ট শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা অনেকটা বিফল হবে। এ বিষয়ে আরও জটিলতা বিদ্যমান। এক. ইউনিয়ন পরিষদের ওপর উপজেলা পরিষদের কর্তৃত্ব। দুই. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের প্রথা পরিহার করে পরিষদের অংশ হিসেবে বর্তমান আইনে বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে।
এ এম এম শওকত আলী: তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Monday, November 16, 2009

মানসিকতার বদল না হলে দেশ বদল হবে না -সুশাসন by বদিউল আলম মজুমদার

‘বদলে যাও, বদলে দাও’—স্লোগানটি সামনে রেখে প্রথম আলো তার একাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। পত্রিকার সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। একই সঙ্গে তাঁদের ধন্যবাদ জানাই স্লোগানটির জন্য। স্লোগানটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ, কারণ সারা পৃথিবী বদলে যাচ্ছে আর আমরা যদি না বদলাই, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা পেছনে পড়ে থাকব। এমনকি আমরা সংকটের মুখোমুখি হব, যা আমাদের ভবিষ্যেক বিপন্ন করে তুলতে পারে।
বস্তুত ইতিহাসের শিক্ষা হলো, পরিবর্তনের সঙ্গে অগ্রগতি-সমৃদ্ধি, এমনকি টিকে থাকাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নিজেদের পরিবর্তন করতে পারেনি বলেই অনেক সভ্যতা অতীতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। প্রকৃতিতেও তা-ই ঘটছে। চার্লস ডারউইনের ভাষায়, ‘It is not the strongest species that survived, nor the most intelligent, but the ones most responsive to change.’ অর্থাত্ প্রাণিকুলে সবচেয়ে শক্তিশালী কিংবা সবচেয়ে বুদ্ধিমানেরা টিকে থাকেনি, বরং পরিবর্তনের সঙ্গে যারা খাপ খাওয়াতে পেরেছে, তারাই টিকে রয়েছে।
আর্থসামাজিক অগ্রগতির জন্যও পরিবর্তন আবশ্যক। এমনকি রাজনীতির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য—আমাদের এ উপমহাদেশেই এককালের পরাক্রমশালী বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে কিংবা বিলুপ্তপ্রায়, যার মূল কারণ তাদের পরিবর্তনে অনাগ্রহ। আর এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিকতার পরিবর্তন। মানসিকতার বদল হলেই প্রেক্ষাপট বদলে যায় এবং পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচিত হয়। বস্তুত মানসিকতার বদল সংশ্লিষ্টদের জীবন বদলে দেয়, ফলে বদলে যায় অর্থনীতি, রাজনীতি তথা পুরো সমাজ।
আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কথায় আসা যাক। অর্থনীতির ক্ষেত্রে সনাতন ধারণা হলো যে বিনিয়োগ বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, দারিদ্র্য দূরীভূত হবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে। সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক অঙ্গনেও পরিবর্তন আসবে। নিঃসন্দেহে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের মতো দেশে বিশেষত আইনের শাসন তথা সুশাসনের অভাবে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দুরূহ এবং উত্পাদনের ফলও অনেক ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক নয়। আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও প্রয়োজনীয় সামাজিক উন্নয়ন দ্রুততার সঙ্গে ঘটবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বদল করতে হবে।
মানুষ প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার সম্মুখীন, সেগুলো চারভাবে বিভাজন করা যায়: জীবন-জীবিকার সমস্যা, সামাজিক সমস্যা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-অংশগ্রহণ বা সুশাসনের সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সমস্যা। সামাজিক ও সুশাসনের সমস্যা জনগণকে সংগঠিত করে সামাজিক আন্দোলন-প্রতিরোধ গড়ে তুলে বহুলাংশে সমাধান সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে যথাযথভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং সমাজসচেতন নাগরিকেরা। সামাজিক আন্দোলন-প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজ বিনা বা স্বল্প খরচেই করা সম্ভব। আর সামাজিক আন্দোলন-প্রতিরোধ সৃষ্টিতে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে জনগণের চেতনার উন্মেষ ঘটলে অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য দুরূহ সমস্যা সমাধানের পথ উন্মোচিত হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অবশ্যই উত্পাদনশীল বিনিয়োগ আবশ্যক। তবে আমাদের মতো দেশে, যেখানে জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে, আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপক বিস্তার ছাড়া দারিদ্র্য দূরীভূত হবে না এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে না। আর এ কাজের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধি ও পুঁজির সংস্থান আবশ্যক। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ এ কাজে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জনগণকে সংগঠিত করে এবং স্থানীয় সংগঠন গড়ে তুলেও পুঁজির জোগান দেওয়া যায়। নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রেও স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কাজে লাগিয়ে স্বচ্ছতা-জবাবদিহির সঙ্গে কৃষিঋণ, শস্যবীমা এবং বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ও ভর্তুকি বিতরণ করে কৃষি খাতেও গতিশীলতা আনা যেতে পারে।
দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রেও আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে যে শুধু আয়ের অভাবই দারিদ্র্য নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদির অভাবও দারিদ্র্যের অংশ। আত্মমর্যাদা হনন, নিগ্রহ-বঞ্চনা প্রভৃতির উপস্থিতিও দারিদ্র্য অবস্থারই প্রতিফলন। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন সার্বিক অবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ। আর আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র এ কাজের জন্য উপযোগী নয়।
দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি লাইন স্মরণ করা যেতে পারে: ‘তোরা পারবি নে কেউ ফুল ফোটাতে,/ যতই তোরা পাপড়ি টানিস, আঘাত করিস বোঁটতে/ তোরা পারবি নে কেউ ফুল ফোটাতে।’ ফুলের ধর্মই ফোটা, ফুলকে জোর করে ফোটানো যায় না—ফুল গাছকে আগাছা এবং মানুষের হাত থেকে রক্ষা ও পরিচর্যা করলে ফুল আপনা থেকেই ফুটবে। আর এ কাজটি করার জন্য প্রয়োজন মালীর। অর্থাত্ ফুল ফোটার ব্যাপারে মালীর ভূমিকা সহায়কের।
ফুল যেমন স্বাভাবিকভাবেই ফোটে, তেমনিভাবে আত্মশক্তিতে বলীয়ান প্রত্যেক মানুষের পক্ষেও তার নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব। নিজ জীবনের হাল ধরার মতো প্রয়োজনীয় সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতা দিয়েই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলো মালীর কাজ করতে পারে। তারা জনগণের সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের নিজেদের ভাগ্য গড়ার কারিগরে পরিণত হওয়া সম্ভব হয়।
আর্থসামাজিক উন্নয়নের ব্যাপারে আমাদের চেতনায় আরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে যে উন্নয়ন শুধু টাকা-পয়সার বিষয় নয়, যদিও অবকাঠামো সৃষ্টির জন্য অর্থের প্রয়োজন। বরং টাকা-পয়সার ছড়াছড়ি অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পারে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে অর্থের ছড়াছড়ি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের জন্ম দিতে পারে। ব্যক্তি আত্মপ্রত্যয়ী না হলে, অর্থের আধিক্য তাকে অসফল ও তার মধ্যে পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এভাবে অর্থ অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমাদের উপলদ্ধিতে আনতে হবে যে বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ নয়। একটি দেশের বড় সম্পদ তার জনগণ এবং জনগণের মেধা-সৃজনশীলতা। আর মেধা-সৃজনশীলতার আমরা কোনো অংশেই কারও থেকে কম নই। বিদেশের মাটির সহায়ক পরিবেশে আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের শ্বেতাঙ্গ বন্ধুদের প্রতিনিয়ত পরাভূত করছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। তারা প্রমাণ করছে, নজরুলের ভাষায়: ‘বাঙ্গালী তুমি ক্ষুদ্র নও, তুমি তুচ্ছ নও। একবার জেগে উঠ, দেখবে তুমিও বিশ্ববিজয়ী হতে পার।’ এ ছাড়া আমাদের মিষ্টিপানি, উর্বর মাটি ও সম্ভবত গ্যাস-তেলের মতো সম্পদও রয়েছে। আমাদের অভাব মূলত একতার, শৃঙ্খলার, সহিষ্ণুতার ও দৃষ্টিভঙ্গির। এগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে আমরাও সম্পদশালী হতে পারব। আমাদের প্রতিবেশীদের অনেকেই তা করতে পেরেছে।
রাজনীতি সম্পর্কেও আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে—রাজনীতির উদ্দেশ্য জনসেবা ও মানুষের কল্যাণ, ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধি নয়। মানুষের সঙ্গে শান্তি-সমপ্রীতি গড়ে তোলা, দ্বন্দ্ব-হানাহানি সৃষ্টি নয়। তাদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা, বিভক্তি নয়। সমস্যার সমাধান করা, সমস্যা সৃষ্টি করা নয়। মানুষের মধ্যে আশা-ভরসা জাগ্রত করা, তাদের হতাশ-নিরাশ করা নয়। কারণ চোখের বদলে চোখ নিলে, অন্ধের এবং হাত-পায়ের পরিবর্তে হাত-পা নিলে, পঙ্গুত্বের রাজত্ব সৃষ্টি হয়। আর লুটপাট ও হানাহানির সংস্কৃতিতে এবং হতাশা ও নেতিবাচক পরিবেশে ভালো কিছু ঘটে না; বরংযথেচ্ছাচারের সৃষ্টি হয় এবং সমাজ অধঃপতনের দিকে ধাবিত হয়।
এ ছাড়া রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে যে ক্ষমতায় যাঁরা থাকেন, সমাজকে একত্র করার ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয়তা ও দায়িত্ব সর্বাধিক। যত বেশি ব্যক্তি ক্ষমতাসীনদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে, ততই তাদের সফলতা। তাই তাদেরই হতে হবে অনেক বেশি উদার ও সহিষ্ণু। এ ছাড়া বিরোধীদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের অভিযোগ করে কোনো লাভ নেই—অনেক নাগরিকই মনে করেন, এসব করা হয় সরকারের নিজের অপারগতা ঢাকার জন্য। সরকারের হাতে ক্ষমতা আছে এগুলো উদ্ঘাটন করার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার এবং সত্যিকার অর্থেই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে থাকলে সরকার তা করত।
আন্তরিকভাবে জনগণের কল্যাণ চাইলে বিরোধীদেরও সরকারের কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে, অন্তত জনকল্যাণমূলক কাজে বাধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতার সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে কারও জন্যই মঙ্গলকর নয়, এমনকি বিরোধীদের জন্যও তা সুবিধাজনক পরিণতি সৃষ্টি করে না। আকাশের দিকে থুতু ছুড়লে তা নিজের গায়ে এসেই পড়ে। ঢিল ছুড়লে পরবর্তী সময়ে পাটকেল খেতে হয়। আর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আগুনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে পরবর্তী সময়ে ছাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
রাজনীতির ক্ষেত্রে মানসিকতা বদলের আরও প্রয়োজন যে জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণকে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে এর উল্টো—জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারাই তাদের প্রভুর আসনে অধিষ্ঠিত। আর এই প্রভুরা জনগণকে ভেড়ার পাল হিসেবেই গণ্য করে এবং তাদের পদে পদে বঞ্চিত করে। আর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং তাদের বঞ্চনার অবসান না ঘটলে সত্যিকারের গণতন্ত্র কায়েম ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে না।
এ ছাড়া রাজনীতিকদের উপলব্ধিতে আনতে হবে যে ভোট দিয়ে জনগণ সরকার গঠন করে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়। রাজনৈতিক দল হলে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কোনো সুস্পষ্ট নীতি-আদর্শ বা জনস্বার্থকর কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সিন্ডিকেটের মতো দলের সঙ্গে জড়িতদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান নয়। আর এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিলে দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-হানাহানিই সৃষ্টি হয়, কারণ সুযোগ-সুবিধার পরিমাণের তুলনায় প্রত্যাশীদের সংখ্যা অনেক বেশি—ফায়দার লোভে অনেকেই দলের খাতায় নাম লেখায়। উপরন্তু ফায়দাবাজির সংস্কৃতিতে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি গড়ে উঠতে পারে না।
রাজনীতিকদের মানসিকতায় আরও পরিবর্তন প্রয়োজন যে দলীয়করণের ফলাফল মঙ্গলকর নয়। দলীয়করণের সংস্কৃতিতে অযোগ্য-অদক্ষরাই সাধারণত লাভবান হন এবং যোগ্য-দক্ষ ও নিরপেক্ষরা বঞ্চিত হন। ফলে সরকারের কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। এ ছাড়া দলবাজির সংস্কৃতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরস্পরকে ল্যাং মারার এক অশুভ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতা বিবেচনায় না নেওয়ার এবং পক্ষপাতিত্বের ফলে প্রশাসন মেধাশূন্য হয়ে পড়ে। তাই দলীয়করণের ফলে হিতের চেয়ে বিপরীতই বেশি হয়। বস্তুত লাগামহীন দলীয়করণের ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ভবিষ্যতে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
রাজনীতিবিদদের স্বীকার করতে হবে যে তাঁদের প্রশ্রয়েই এ দেশে উগ্রবাদের উদ্ভব ঘটেছে। আর রাজনীতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না পেলে এবং এর বিস্তার সম্ভব নয়। এ ছাড়া দুর্নীতি ও বঞ্চনা সাধারণ মানুষকে এদিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই উগ্রবাদ রোধ করতে হলে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটাতে হবে, দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনীতিকে নৈতিকতার ওপর দাঁড় করাতে হবে এবং উগ্রবাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান ঘটাতে হবে।
আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতারও বদল হওয়া দরকার। অনেক দিন আগে আমাদের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি আফসোস করে বলেছিলেন, সরকার যেন চারদিকে দোকান পেতে বসে আছে জনগণরূপী মক্কেল ধরে হেনস্থা করার জন্য। বস্তুত বাধা দেওয়া, সমস্যা সৃষ্টি করা, হয়রানি করা যেন আমলাতন্ত্রের আজ ধর্ম হয়ে পড়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ধরনের আবহ সৃষ্টি করে উেকাচ আদায় করেন কিংবা অন্যভাবে লাভবান হন। দলবাজির সঙ্গে দুর্নীতির এ সংমিশ্রণ আমাদের আমলাতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
পরিশেষে, এ কথা সুস্পষ্ট যে সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনতে হলে—যা করা আমাদের জন্য অতি জরুরি—আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে এবং অন্যদের বদলাতে সহায়তা করতে হবে। প্রত্যেককেই পরিবর্তনের রূপকারে পরিণত হতে হবে। তবে স্মরণ রাখতে হবে, সবার পক্ষেই হয়তো মস্ত বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভবপর নয়—কেউ হয়তো পর্বতের পাদদেশের নুড়িপাথর সরাতে পারবে, অন্য কেউ হয়তো পর্বতকেই ঠেলা দিতে পারবে। অসাধারণ কাজ করা অনেকের জন্য সাধারণ ব্যাপার, আর অনেকে অল্পতেই গলদধর্ম। তবু সবাইকেই নিজেদের বদলাতে উদ্যোগী হতে হবে। আশার কথা, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগে আমাদের দিনবদলের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু দিনবদলের জন্য প্রয়োজন মনমানসিকতার পরিবর্তন। তারা কি তা করবে? তাদের কথা রাখবে?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।