Tuesday, February 17, 2015

মালাওয়িতে ‘বাল্যবিবাহ’ নিষিদ্ধ, বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮

দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাওয়িতে বাল্যবিবাহ ‘নিষিদ্ধ’ করতে দেশটির পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে একটি আইন পাস করা হয়েছে। দেশটিতে মেয়েদের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। মালাওয়িতে অর্ধেক মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার। এ আইনকে স্বাগত জানিয়েছে দেশটির নারী অধিকার সংগঠনগুলো। এ পদক্ষেপকে মালাওয়ি মেয়েদের জন্য মহান একটি দিন বলে মন্তব্য করেছেন অধিকার কর্মীরা। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি মালাওয়ি। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, হতদরিদ্র এ দেশটির উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্ত। আইনটি পাসে অন্যতম ভূমিকা রাখা পার্লামেন্ট সদস্য জেসি কাবউয়িলা বলেন, এ আইনটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ অনেক বড় একটি সমস্যা। পরিসংখ্যানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের ঘটনার দিক থেকে অন্যতম বাংলাদেশ। ১৮ বছর বয়সে পা রাখার আগেই দেশটির অর্ধেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আর, ১৫ বছর বয়সে ৮ জনে ১ জন মেয়ে বিয়ে করে। বাল্যবিবাহের কারণে শিক্ষা ও অন্যান্য অধিকার থেকে মেয়েরা শুধু বঞ্চিতই হয় না, একই সঙ্গে সন্তান জন্মদানের সময় তারা মাতৃত্বকালীন মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থ হওয়ার সমূহ ঝুঁকিতে থাকে। কারণ, এতো অল্প বয়সে তাদের শরীর সন্তান-ধারণের জন্য সমর্থ হয় না। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে আরও বেশি ঘরোয়া সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। পার্লামেন্ট সদস্য জেসি এ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহের সমস্যা থাকলে, আমরা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে পারি না। তিনি আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন দেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক এবং নারীরা যদি শিক্ষিত না হয়, তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে দেশটিতে পিতামাতার অনুমতি সাপেক্ষে ১৫ বা ১৬ বছর বয়সে মেয়েরা বিয়ে করতে পারে। কিন্তু, অনেকেই আরও কম বয়সে বিয়ে করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু আইনের প্রয়োগে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য প্রয়োজন গণ-সচেতনতা।

অপারেশন ২১ সেকেন্ড- সিসিটিভিতে ধরা পড়ল অপহরণ দৃশ্য by সাহাদাত হোসেন পরশ

কালো গ্গ্নাসের দামি মাইক্রোবাস। গাড়ির সামনে গ্গ্নাসে লেখা 'ডিবি'। যাত্রীরা দেখতেও হ্যান্ডসাম। দেখে যে কারও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যই মনে হতে পারে। ওই মাইক্রোবাস থেকে পাঁচ ব্যক্তি নেমে মাত্র ২১ সেকেন্ডের মধ্যে আলী আফসার নামের এক ব্যবসায়ীকে রাস্তা থেকে তুলে নিল। এর পর ঘণ্টাখানেক গাড়িতে ঘুরিয়ে সোয়া এক লাখ টাকা হাতিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। গত রোববার দিনদুপুরে রাজধানীর পল্লবীতে ফিল্মি কায়দায় ব্যবসায়ীকে অপহরণের এমন দৃশ্য ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ওই ব্যবসায়ী টাকা জমা দিতে বেসরকারি ব্যাংকের একটি শাখায় যাচ্ছিলেন। ব্যাংকে পেঁৗছার আগেই তিনি দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন। পুলিশের পল্লবী বিভাগের সহকারী কমিশনার কামাল হোসেন সমকালকে বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। পল্লবী থানার ওসি জিয়াউজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আহত ব্যবসায়ী মিরপুর এলাকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, পল্লবীর ১১ নম্বর বাসস্টেশন সংলগ্ন একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে রাস্তার ওপারে আরেকটি ব্যাংকে ওই টাকা জমা দিতে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী আলী আফসার। ওই ব্যাংকের শাখার কাছাকাছি পেঁৗছার পর সেখানে ওত পেতে ছিল অপহরণকারীদের একজন সোর্স। ফুটপাত ধরে আফসার হেঁটে হেঁটে ব্যাংকের দিকে এগোতে থাকলে একটি মাইক্রোবাস রাস্তার কাছে এসে দাঁড়ায়। এ সময় ওই সোর্স আফসারের গায়ে প্রথমে ধাক্কা দেয়। এর পরই পেছনে থেকে ইশারা দিয়ে মাইক্রোবাসে থাকা সঙ্গীদের আফসারের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত করে ওই সোর্স। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাইক্রোবাস থেকে এক ব্যক্তি ফুটপাতে দাঁড়ানো আফসারের কাছে কিছু একটা জানতে চায়। উত্তর দেওয়ার পরপরই পাঁচ ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে আফসারকে চ্যাংদোলা করে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পথচারীরা নির্বাক হয়ে ওই দৃশ্য দেখেন। মাত্র ২১ সেকেন্ডের মধ্যে ব্যবসায়ীকে কালো গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। এর পর সেখানে অপহরণকারীদের দু'জন সহযোগী উপস্থিত হয়ে পথচারী সেজে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। নির্বিঘ্নে অপহরণকারীরা এলাকা ত্যাগ করার পর এক সোর্স ও তাদের দুই সহযোগীও সটকে পড়ে।
সূত্র জানায়, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একটি চক্র টার্গেট করে ব্যবসায়ীদের মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ অন্যান্য মালপত্র রেখে ছেড়ে দিচ্ছে।

‘দল নিয়ে জুয়া খেলা হয়েছে’ -শাহরিয়ার নাফীস

চার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পরাজয়ের মূল কারণ ছিল ব্যাটিং ব্যর্থতা। এর মধ্যে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপটিকে সফল হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। সেই দলের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন এক সময়ের জাতীয় দলের প্রতিভাবান ক্রিকেটার শাহরিয়ার নাফীস। জাতীয় দলের হয়ে ৭৫টি ওয়ানডে খেলা নাফীস ৮টি সেঞ্চুরি ও ১৩টি ফিফটি হাঁকিয়ে করেছেন ৩১.৪৪ গড়ে ২২০১ রান। ২০১৫ সালের অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন মানবজমিন-এর স্পোর্টস রিপোর্টার ইশতিয়াক পারভেজের সঙ্গে। তার ধারণা, একটি অনভিজ্ঞ দলই লড়াই করবে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে। দল নিয়ে অনেকটাই গ্যাম্বলিং করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার সঙ্গে কথোপকথনের মূল অংশ তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সম্ভাবনা কতটুকু?
শাহরিয়ার নাফীস: আমি এক কথায় বলবো, বাংলাদেশ দলের জন্য এ বিশ্বকাপটি অনেক কঠিন হবে। যদি দলকে ভাল করতে হয় তাহলে অনেক ভাল খেলতে হবে।
প্রশ্ন: ভাল ক্রিকেট বলতে কি বোঝাতে চাইছেন?
নাফীস: আসলে ব্যাটে বলে, সেই সঙ্গে ফিল্ডিংয়েও অসাধারণ খেলতে হবে। জিততে হলে শুধু ভাল ব্যাট করলেই হবে না। অনেক ভাল বল করতে হবে। ফিল্ডিংটাও করতে হবে অন্যমাত্রায়।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে দলের জন্য কি পরামর্শ থাকবে?
নাফীস: পরামর্শ দেয়ার কিছু নেই। যারা সেখানে আছেন তারাই ভাল বুঝবেন কন্ডিশন অনুসারে কি করতে হবে। তবে আমি আশা করবো ব্যাটসম্যানরা এখানে তাদের সেরাটি দিয়ে খেলবেন। আর একটি বিষয় আমি দলের ব্যাটসম্যানদের কাছে আশা করবো তা হলো, যারা সেট হবেন ক্রিজে তারা যেন ইনিংসটা লম্বা খেলেন। দলের জন্য বড় স্কোর করার দায়িত্বটা পালন করেন। দলের প্রয়োজনটা যেন মিটিয়ে আসতে পারেন।
প্রশ্ন: বলা হচ্ছে ৩শ’র বেশি রান না হলে এই উইকেটে জেতা কঠিন। আপনি বিশ্বাস করেন কি?
নাফীস: সত্যি কথা বলতে কি, আমি এটি বিশ্বাস করি না। ৩শ’ রান করলে জিতবে তা কি করে হয়। এটা সত্য যে, বিশ্বকাপের উইকেটগুলো বেশ ব্যাটিং নির্ভরই হয়। আর অস্ট্রেলিয়ায় সেটা একটু বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু আপনি ৩শ’র বেশি রান করলেন আর বোলিংয়ে যাচ্ছেতাই করবেন, তাহলে কিভাবে হবে? আসলে বিশ্বকাপের মতো আসরে আর ওয়ানডে ম্যাচে আপনাকে জয়ের জন্য যেমন রান করতে হবে, তেমনি আপনাকে ভাল বোলিং ও ফিল্ডিং করতে হবে।
প্রশ্ন: আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে টিম কম্বিনেশনটা কেমন দেখতে চান?
নাফীস: অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ, আমাদের যদি আফগানদের বিপক্ষে জিততে হয় তাহলে অবশ্যই বেশ ভাল ব্যাটিং করতে হবে।
প্রশ্ন: প্রথম ম্যাচে দলের নতুন সদস্যদের মধ্যে একাদশে কাকে দেখতে চান?
নাফীস: সত্যি কথা বলতে কি, আমি প্রথম ম্যাচের একাদশে নতুন কাউকে দেখতে চাই না। কারণ, এ ম্যাচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যাদের বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার, তাদেরই যেন প্রথম একাদশে রাখা হয়।
প্রশ্ন: ২০০৭ সালের তুলনায় এ দলটির মূল্যায়ন কিভাবে করবেন?
নাফীস: আমি বলবো, এবারের দল একেবারেই অনভিজ্ঞ। এখানে ৯ জন নতুনকে রাখা হয়েছে। তাদের অনেকেই দুই-তিনটির বেশি ওয়ানডে খেলে নি। কিন্তু অন্যদিকে দেখেন, ২০০৭ বিশ্বকাপে এমনটা ছিল না। সেটি ছিল সবদিক থেকে অত্যন্ত ব্যালান্সড দল। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল তারুণ্যের। আর খুব বেশি নতুন কেউ ছিল না মুশফিক, সাকিব ছাড়া। সেখানে বাশার ভাই, রফিক ভাই, জাবেদ ভাই ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। এছাড়াও আশরাফুল, রাজ্জাক, আফতাব ও রাজিন সালেহর মতো ক্রিকেটাররা ছিলেন। এখন তো মাশরাফি, তামিম, সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদুল্লাহ ছাড়া আর তেমন কাউকে চোখে পড়ে না। আমি বলবো, দল নিয়ে অনেকটাই গ্যাম্বলিং করা হয়েছে। এছাড়াও আমরা ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ৪টি প্রস্তুতি ম্যাচেই জিতেছিলাম। শুধু তাই নয়, আমরা সেই বিশ্বকাপের আগে বেশ ভাল ক্রিকেট খেলেছিলাম, যা আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসের প্রভাবও ছিল। কিন্তু এবার বাংলাদেশের জন্য শুরুটা ভাল হয়নি। প্রস্ততি ম্যাচগুলোতে হেরেছে। তবে তাই বলে এখনই রায় দেয়া উচিত না। আমি মনে করি আমাদের অ্যাবিলিটি আছে। ভাল খেলে আফগানদের হারাতে পারলে আমরা পরের ম্যাচগুলোও ভাল করবো।
প্রশ্ন: ৯ জন প্রথম বিশ্বকাপে খেলবে। এটি গ্যাম্বলিং মনে করেন?
নাফীস: অবশ্যই। কারণ, তরুণ আর নতুনরা হয় খুব ভাল করবে, নয় খুব খারাপ করবে। এটি তো জুয়ার মতোই হলো।
প্রশ্ন: ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে আপনার কেমন কেটেছে?
নাফীস: সত্যি কথা বলতে কি, সেই বিশ্বকাপে আমি ভাল কিছু করতে পারিনি। তাই আমার নিজের ব্যক্তিগত কোন ভাল স্মৃতি নেই।
প্রশ্ন: আপনার দেখা বাংলাদেশের সেরা ইনিংস কোনটি?
নাফীস: দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আশরাফুলের ৮৭ রানের ইনিংসটিই সেরা বলবো। এছাড়াও আরও কয়েকটি ইনিংস ভাল ছিল।
প্রশ্ন: এবার কোন দলের হাতে কাপ যাবে বলে মনে করেন?
নাফীস: আমার ধারণা অস্ট্রেলিয়াই বিশ্বকাপ নেবে। ওরা অসাধারণ একটি দল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলের কাছে আপনার চাওয়া কি?
নাফীস: চাওয়া একটাই। ভাল খেলবে, সবাই দায়িত্ব নিয়ে খেলবে। আমাদের অন্তত কিছু জয় উপহার দেবে। আমি বিশ্বাস করি, যদি তিন বিভাগে দল ভাল খেলতে পারে তাহলে অন্তত তিনটি জয় আমরা পাবোই।

সংবিধান নয়, জনগণের অভিপ্রায়ই শেষ কথা by ফরহাদ মজহার

পাঁচই জানুয়ারির নির্বাচন আদর্শ নির্বাচন ছিল না; এ বিষয়ে সমাজে কোনো বিতর্ক নেই। ক্ষমতাসীনরা শুরুতে বলতেন নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, তবে বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করায় একে আদর্শ নির্বাচন বলা যায় না। তারা অচিরেই আরেকটি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা তারা আর মান্য-গণ্য করেননি, বরং আরও পাঁচ কি দশ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন বলে ক্ষমতাসীনরা অহংকারী হয়েছিলেন। ক্ষমতাসীনদের ভাষা, কথা বলার ধরন ও শরীরের ভঙ্গি দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন শেখ হাসিনা বুঝি চিরকালের জন্যই ক্ষমতায় এসেছেন। সমাজে এর প্রতিক্রিয়া হয়েছে নেতিবাচক।
দ্বিতীয়ত একশ’ তেপান্নজন অনির্বাচিত ব্যক্তিকে নিয়ে পার্লামেন্ট গঠন এবং তাদের সংখ্যার জোরে সরকার গঠনের যে নৈতিক ভিত্তি নেই, এটা বোঝা কারও পক্ষেই খুব কঠিন ছিল না। তা নিয়েও কোনো তর্ক দেখিনি। এ নিয়ে তর্ক ওঠার সুবিধা বা সুযোগ কোনোটাই নেই।
তারপরও ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দম্ভে ভাটা পড়েনি। দম্ভোক্তি থামেনি। সমাজে এর প্রতিক্রিয়াও কম হয়নি। ক্ষমতাসীনদের পক্ষের গণমধ্যমগুলোর বিচার-বিবেচনাহীন পক্ষাবলম্বন এ কারণে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যায়নি। বরং জনগণ আরও ক্ষুব্ধ হয়েছে।
ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতাসীনরা এরপর প্রচার করতে শুরু করে যে ‘গণতন্ত্রের দরকার কী, দরকার উন্নয়ন’! তাদের পক্ষের গণমাধ্যমগুলো এই মহান তত্ত্ব নিয়ে বেশ বাগাড়ম্বরও শুরু করে। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তিক দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নতির আকাক্সক্ষার সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো ?বিশেষ ধরন সঙ্গতিপূর্ণ তা নিয়ে গুরুতর চিন্তা-ভাবনার দরকার আছে, সন্দেহ নেই। কাঁচা খোলা বাজার ব্যবস্থার ওপর সামাজিক, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাণ এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য শক্ত বাধা-নিষেধ ছাড়া বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক দেশগুলোর দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি অসম্ভব। সমাজে ভুঁইফোঁড় সিন্ডিকেট ও মাফিয়া গোষ্ঠীসহ নানা কিসিমের লুটেরা ও ডাকাতগোষ্ঠীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। রাষ্ট্র জনগণের না হলে জনগণের পক্ষে কাজ করতে পারে না।
কিন্তু গণতন্ত্র নয়, দরকার উন্নয়ন বলে যে তত্ত্ব দেয়া শুরু হল, তাতে জনগণ বুঝে নিল এই লুটেরা ও দুর্বৃত্তদের পক্ষেই ক্ষমতাসীনরা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। বুঝল, উন্নয়নের কথা বলে অল্প কিছু পরিবার বাংলাদেশকে লুট করে যাবে, আর তাকেই আমাদের উন্নয়ন বলে স্বীকার করতে হবে। সাধারণ মানুষ গ্যাস, তেল, পানি ও বিদ্যুৎ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হবে আর পকেট ভারি হবে লুটেরাদের। বলাবাহুল্য জনগণ এই বিকৃত উন্নয়ন তত্ত্বে বিরক্ত বোধ করেছে। ক্ষমতাসীনদের এই স্মার্ট প্রপাগাণ্ডাও কাজ করেনি, মুখ থুবড়ে পড়েছে।
গণতন্ত্র না, দরকার উন্নয়ন- এই প্রচারে গিয়ে ক্ষমতাসীনরা স্বীকার করে নিল তারা অগণতান্ত্রিক শক্তি। অগণতান্ত্রিক সরকার অগণতান্ত্রিক কায়দায় ক্ষমতায় আঁকড়ে ধরে রাখে জনগণের উন্নতির জন্য নয়, বরং জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়াবার জন্য- এটা বুঝতে সাধারণ মানুষের খুব একটা অসুবিধা হয়নি।
বাকি থাকল সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন। এই সরকার বৈধ নয় এবং অবৈধ সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছে এই উপলব্ধিটুকু সমাজে প্রবল। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা অবৈধ প্রমাণিত হলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা মুশকিল। এই কারণেই অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে একটা তর্ক ক্ষমতাসীনরা জবরদস্তি সমাজে জারি রাখতে বাধ্য হয়েছে। কেন এই অমীমাংসার বাহানা? বাহানার প্রধান কারণ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখা। কিন্তু ক্ষমতা বৈধ না হলে কিভাবে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব? সেটা সম্ভব হয়েছে বৈধতার বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে। যদি ক্ষমতাসীনরা সাংবিধানিকভাবে অবৈধ প্রমাণিত হয়, তাহলে তারা ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। অতএব বৈধতার তর্ক অমীমাংসিত রেখেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখা সম্ভব। এই তর্ক জারি না রেখে ক্ষমতাসীনদের কোনো উপায় ছিল না।
বিষয়টি আদালতে উঠেছিল। ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেছেন, ‘৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের কথিত নির্বাচন আইনের চোখে কোনো নির্বাচনই নয়। এটা ছিল একটি তামাশার নির্বাচন। নির্বাচন নয়, এটা ছিল সিলেকশন। এটা ছিল এমন একটি ফুটবল খেলা যাতে কোনো গোলকিপার ছিল না। আমাদের সংবিধান সরাসরি নির্বাচন না করে কাউকে পার্লামেন্টের সদস্য করার অনুমোদন দেয় না। সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাগুলো থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, সিলেকশন নয়’।
ব্যারিস্টার কামাল হোসেনও প্রায় একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ত্রুটিযুক্ত। তাই আরেকটি নির্বাচন চাই। না হয় জনগণ এবং ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। তিনি ঠিকই বলেছেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি প্রেসে মুদ্রিত গেজেট প্রকাশ করাই নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। যে নির্বাচনে ৮০ ভাগ ভোটার অংশ নেয় না, সে নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যায় না।
আইনজীবীদের কাছ থেকে সত্য কথা শুনতে ভালো লাগে। আদালতের এমিকাস কিউরি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আর নির্বাচন হয়ে গেছে বলে পাঁচ বছর বসে থাকার সুযোগ নেই। এ মামলায় যদি সমাধান না হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের এখনও সুযোগ রয়েছে আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ চাওয়া’।
বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধানের বৈধতা নিয়ে গত বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেছিল। জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস সালাম রিট আবেদন দায়ের করেছিলেন। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
রিট আবেদনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারার সঙ্গে সংবিধানের অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ১৯ ধারা অনুসারে, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর বা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী থাকলে তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়। এ ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের কোনো বিধান রাখা হয়নি। অথচ সংবিধান স্পষ্ট বলছে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদ গঠিত হবে। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ ছাড়া কাউকে নির্বাচিত ঘোষণা করা সংবিধানের পরিপন্থী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারা সংবিধানের ৭, ১১, ২৭, ৩১, ৬৫(২), ১২১ ও ১২২(২) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হইতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য লইয়া এবং এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার কার্যকরতাকালে উক্ত দফায় বর্ণিত সদস্যদিগকে লইয়া সংসদ গঠিত
হইবে; সদস্যগণ সংসদ সদস্য বলিয়া অভিহিত হইবেন।’ ১২২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত বয়স্কের ভোটাধিকারভিত্তিতে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ ইত্যাদি। (দেখুন, ‘৫ জানুয়ারি ছিল তামাশার নির্বাচন’, আমার দেশ, ৬ জুন ২০১৪)
কিন্তু আদালত ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়া ব্যক্তিদের বৈধতার প্রশ্ন তুলে করা আবেদন খারিজ করে দেয়। হাইকোর্ট বলেছে, ‘এই ১৫৩ জনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই’। আবেদন খারিজ হয়ে যাবার পর একটি সভায় ব্যারিস্টার ডক্টর কামাল হোসেন বলেছেন, ‘উচ্চ আদালত গণতন্ত্র হত্যা করেছে’। খুবই কঠিন মন্তব্য।
এর মধ্য দিয়ে সরকারের বৈধতার প্রশ্ন একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে টিকে যায় এবং বৈধতার বিষয়টিকে বিতর্কিত করে রাখবার সাফল্যের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় থাকতে পারছেন। আদলতের এই ভূমিকার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার বৈধতা আর অবৈধতার তর্ক সংবিধান কিংবা আইন দ্বারা মীমাংসার সুযোগ রইল না। বাংলাদেশ প্রকট সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হল। রাজনৈতিক সংকট মীমাংসা করবার ক্ষেত্রে সংবিধান, আইন বা আদালতের কোনো সুযোগ ছিল কিনা সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মানবেন সে সুযোগ ছিল, কিন্তু জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সাংবিধানিক বা আইনি সুযোগ আর রইল না। এরপর বিরোধী দলের কর্মসূচি, টানা অবরোধ ও রক্তপাত আমাদের সবার জানা। আমাদের আইনজীবীরা চেষ্টা করেছেন, তার জন্য আমি তাদের প্রশংসা করি।
দুই
কিন্তু আমরা ভারি এক অদ্ভূত সমাজ গড়ে তুলেছি। এখানে সংবিধান ও আইন নিয়ে কথাবার্তা বলার এখতিয়ার শুধু উকিল-ব্যারিস্টারদের। আইন একটি পেশাগত চর্চা, ফলে আইন-আদালত কোর্ট-কাছারির কাজে আইনজীবীরাই পারদর্শী হবেন তা নিয়ে তর্ক নেই, আমি পেশাগত দক্ষতার তর্ক করছি না। কিন্তু কন্সটিটিউশন বা সংবিধান যার মূলনীতি ও গাঠনিক ভিত্তি মেনে জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে, সেই সংবিধান তো আইনি ব্যাপার নয়। যদি তাই হতো তাহলে উকিল-ব্যারিস্টার আর আদালতই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, আমাদের আর আদালতের বাইরে আলাদাভাবে আইন প্রণয়ন করবার জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় সংসদ বা আইনপ্রণয়নী সংস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়ত না। মতাদর্শ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিরও দরকার থাকত না। আদালত রায় দিয়ে সব বিরোধের অবসান করে দিতেন। কারোরই কোনো দরকারই থাকত না। আদালতের হাতে সব সমস্যার সমাধানের ভার দিয়ে আমরা ঘরে গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতাম। দুর্ভাগ্য যে, আমাদের জীবন তেলের মতো এত মসৃণ নয়, তৈলাক্ত তো একদমই না।
আমি ভেবে দেখেছি আমার বন্ধু-বান্ধব ও সুহৃদদের মধ্যে অধিকাংশই আইন পেশার সঙ্গে জড়িত। উকিল, ব্যারিস্টার কিংবা বিচারক ইত্যাদি। কিন্তু আমি যখন উকিলি আর ব্যারিস্টারি বুদ্ধিকে কঠোরভাবে সমালোচনা করি, তখন এই মহৎ পেশার প্রতি আমার শ্রদ্ধার কোনো কমতি থাকে না। কিন্তু অনেকে, যারা আমাকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন না তারা একে উকিলি বা ব্যারিস্টারি পেশার সমালোচনা হিসেবে দেখেন। কিংবা উকিল বা ব্যারিস্টারদের আমি ভালো চোখে দেখি না বলে ধারণা করেন। কথাটা মোটেও ঠিক না। ঠিক যে, আমি প্রায়ই সমাজে উকিলি বা ব্যারিস্টারি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাব নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করি, কিন্তু সেটা ব্যক্তি কিংবা সামষ্টিকভাবে উকিল, মোক্তার বা ব্যারিস্টারদের বিরুদ্ধে মত নয়।
উকিলি বা ব্যারিস্টারি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাব ব্যাপারটা তাহলে কী? সেটা হল- একটি দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক প্রশ্নকে আইনের বিষয় হিসেবে গণ্য করা এবং কোনো সমস্যা বা সংকট যে স্তরে সমাধান করা উচিত সেই স্তরে সমাধান না করে একে সংবিধান ও আইন দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা। আইন সমাজের বাইরের কোনো ক্রিয়াকাণ্ড নয়, অতএব একইভাবে অর্থনীতি, সমাজ, ইতিহাস, শ্রেণী, লিঙ্গ, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদিও আইন ও সংবিধানের নির্ণায়ক এবং তাদের প্রতিচ্ছবিও বটে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও শক্তির ক্ষমতার সংঘাত ও ভারসাম্য সংবিধান ও আইনে বদল ঘটাতে পারে এবং আইনের চরিত্রও নির্ধারণ করে। সংবিধান বা আইন কোনো ঐশ্বরিক ব্যাপার নয়। মানুষই এই সব প্রণয়ন করে এমং মানুষই তাদের প্রয়োজনে সেগুলো বদলায় ও নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। ‘পবিত্র’ সংবিধান নামক কোনো পবিত্র গ্রন্থ দুনিয়ার কোথাও নেই। প্রয়োজনে তার বদল হতে পারে এবং হয়, অবশ্যই।
সমাজে উকিলি বা ব্যারিস্টারি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাব কথাটার সরল মানে হচ্ছে- মানুষই সংবিধান ও আইন প্রণয়ন করে এবং মানুষ তা চাইলে বদলাতে পারে এই সত্য ভুলে যাওয়া। দ্বিতীয়ত সংবিধান ও আইনকে সামগ্রিক দিক থেকে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে তাকে নিছকই ক্ষমতা চর্চার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এ যাবতকাল বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারা প্রত্যকেই এই কুকাণ্ড করেছেন। পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের জোরে নাগরিক ও মানবিক অধিকার যেভাবে হরণ করা হয়েছে, তেমনি অসাংবিধানিকভাবে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বদৌলতে অবৈধ ক্ষমতাকেও বৈধ করা হয়েছে অনায়াসে। কিন্তু যখনই গণঅভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন কিংবা নতুনভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের কথা ওঠে, তখনই জনগণকে সংবিধানের দোহাই দেয়া হয়। বলা হয়, সংবিধানের বাইরে কিছু করা যাবে না। শাসক ও শোষক শ্রেণী যে সংবিধান বারবার পুরনো কাপড়ের মতো ফালি ফালি করে ছিঁড়েছে অথবা অস্ত্রে ও বেয়নেটে বারবার ফুটা করেছে, সেই সংবিধান দিয়েই জনগণের উত্থানকে দমন করা হয়। উকিলি ও ব্যারিস্টারি বুদ্ধির প্রধান কাজ হচ্ছে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংস্কার কিংবা নতুনভাবে বাংলাদেশ গঠন করার গণতান্ত্রিক প্রয়াসকে নস্যাৎ করা। জুজুর ভয় হয়ে সংবিধান উকিলি ও ব্যারিস্টারি বুদ্ধির ভূত হয়ে সামনে হাজির হয়ে যায়। এই ভুত রাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঠেকিয়ে দিতে পারে।
কেন উকিলি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাব নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আজ যে জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে তার রাজনৈতিক সমাধান দরকার। সংবিধানের মধ্যে এর কোনো সমাধান নেই। পঞ্চদশ সংশোধনী তা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা ধীশক্তিসম্পন্ন সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু তার পরপরই রাজনীতির সমস্যাকে বিদ্যমান সংবিধান বা আইন দিয়ে নিরসনের চেষ্টাই উদ্বিগ্নতার কারণ। বিশেষত যখন বিদ্যমান সংবিধান বিশেষত পঞ্চদশ সংশোধনী নিজেই একটি সমস্যা।
তাছাড়া এক ভুতুড়ে চিন্তা সমাজে জারি রয়েছে। সেটা হল এই বিচিত্র ধারণা যে, ইতিহাস ও রাজনীতির বিতর্কিত বিষয় সংবিধান, আইন ও কোর্ট-কাচারি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব। স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন সেটা আদালতকে স্থির করে দিতে হয়, ইতিহাসবিদরা না। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কতজন মারা গেছেন সেটাও স্থির হয় কোর্টে। এর মধ্য দিয়ে আমরা আদালতকে বিতর্কিত করে তুলছি কিনা সেই হুঁশ আমাদের নেই। এর পরিণতি ভয়ংকর, অতিশয় ভয়ংকর হতে পারে।
আদালতের রায় বলবৎযোগ্য বটে, অর্থাৎ আদালতের সিদ্ধান্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের দায়। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ আদালতের শক্তির ভিত্তি নয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আদালতের শক্তির ভিত্তি কি সংবিধানে, আইনে, নাকি অন্যত্র? আবারও বলা যায়, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেই শক্তির ভিত্তি অবশ্যই জনগণ।
উকিলি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাবকে নানাভাবে বিচার করা যায়। যেমন উকিলদের হাতে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে বলে তারা ইংরেজি ‘কন্সটিটিউশনের’-এর বাংলা করেছেন, ‘সংবিধান’। অথচ হওয়া উচিত ছিল রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি, ছক বা নকশা, কিংবা সংক্ষেপে ‘গঠনতন্ত্র’। উকিলের হাতে মুসাবিদা হয়েছে বলেই লেখা হয়েছে, ‘সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’। কিন্তু ইচ্ছা ও অভিপ্রায় তো শুধু আইন নয়, তার ধর্মীয়, আদর্শিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক দিক রয়েছে, যাকে সে ফ আইন দিয়ে বোঝা বা ধরা যায় না। যেসব ধর্ম, নীতি, আদর্শ ও সাংস্কৃতিক চেতনা ধারণ করে একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিকতা অভিব্যাক্ত হয় সেটা শুধু আইন নয়। সেটা একই সঙ্গে নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম করার অন্তর্নিহিত তাগিদ। এই প্রশ্নগুলো তুলছি কারণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান বিদ্যমান সংবিধানে নেই, এ কথাটা জোর দিয়ে বলার জন্য। এটা কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞ বা আইনজীবী সমাধান করতে পারবেন না। রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। একে আইনি সমস্যায় পরিণত করার চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
উৎকণ্ঠা এ কারণে যে, সমাজে উকিলি বা ব্যারিস্টারি বুদ্ধির প্রাদুর্ভাব অনেক সময় মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে হাজির হয় এবং দেশের রাজনৈতিক প্রশ্নের রাজনৈতিক মীমাংসার পথকে বারবারই ঘোলাটে ও ভুল পথে নিয়ে যায়। জনগণ যদি মনে করে, বিদ্যমান সংবিধান তাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাহলে তার সংস্কার বা নতুনভাবে সংবিধান প্রণয়নের অধিকার জনগণের অবশ্যই আছে। থাকতেই হবে। জনগণ সব সময়ই সংবিধানের ঊর্ধ্বে, সংবিধানের অধীন নয়, এই অর্থে যে জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে সংবিধান সঙ্গতিপূর্ণ না হলে সেই সংবিধান শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। এই সত্যের প্রতিষ্ঠা ও উপলব্ধি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সময় খুবই জরুরি। ইতিহাসের যে কোনো মুহূর্তে সংবিধানের সংস্কার বা নতুনভাবে রাষ্ট্র গড়বার সংকল্প ও দায় জনগণ বোধ করতেই পারে এবং গণতান্ত্রিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী নতুন সংবিধান বা গঠনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকার সব সময়ই জনগণের এখতিয়ার। এই সত্য বারবার বলা এখন জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানও এই সহজ সত্যটা মানে। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ পরিষ্কারই বলছে, “জনগণের অভিপ্রায়ের সর্বোচ্চ অভিব্যক্তিরূপে (solemn expression of the will of the people) এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের অসমঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, সংবিধান কেবল ততক্ষণই ‘প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’ যতক্ষণ তা ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’। যদি তা না হয় তাহলে তা মানতে জনগণ বাধ্য নয়। আদালতও জনগণের অভিপ্রায়ের বাইরের কোনো সংবিধান কিংবা গণঅভিপ্রায়ের বিরোধী অথবা জনগণের ইচ্ছার বাইরে প্রণীত কিংবা সংশোধিত কোনো সংবিধান কিংবা আইন মানতে বাধ্য নয়।
জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি বাংলাদেশের জনগণ বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে কিভাবে ব্যক্ত করে সেটাই আগামী দিনে দেখার বিষয়।
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। ১ ফাল্গুন ১৪২১। শ্যামলী।

অল্প দগ্ধ রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছে, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার জনবল নেই by শেখ সাবিহা আলম

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চালু করা বার্ন ইউনিটে অল্প পোড়া রোগীরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে। দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় এ দুই ইউনিটে মারাত্মক পোড়া রোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চালু হওয়া ১০ শয্যার বার্ন ইউনিটে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসক নেই। এ তিন বার্ন ইউনিটে সরেজমিনে ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।
সরকারি নির্দেশে ৩ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও মুগদা হাসপাতাল বার্ন ইউনিট চালু করে। বিএসএমএমইউতে ১০ শয্যার বার্ন ইউনিট চালু হয় গত রোববার। চলমান অবরোধ-হরতালে পেট্রলবোমা ও আগুনে দগ্ধ রোগীদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। এই চাপ কমানোর লক্ষ্যে এসব হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫০০ শয্যার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও ৫০০ শয্যার মুগদা জেনারেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ২০টি করে শয্যা রয়েছে। কিন্তু মারাত্মক দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিরও অভাব রয়েছে। হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, গত অক্টোবর থেকে বাজেট বরাদ্দ বন্ধ থাকায় হাসপাতাল দুটি চরম সংকটে পড়েছে। এতে হাসপাতাল দুটি রোগীদের ১০ শতাংশ চাহিদাও পূরণ করতে পারছে না। সরকার বার্ন ইউনিট চালুর নির্দেশ দিলেও এখনো ইউনিট চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়নি, এ জন্য বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক শামিউল ইসলাম গতকাল সোমবার বলেন, হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনমতো জিনিসপত্র কিনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা দরপত্র আহ্বান করে জিনিস সংগ্রহ করবে। পরে সরকার টাকা দেবে।
নতুন ইউনিট দুটির চিত্র: কুর্মিটোলা হাসপাতালের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান ৩ ফেব্রুয়ারি বার্ন ইউনিট চালুর বিষয়ে নোটিশ জারি করেন। ওই নোটিশে বলা হয়, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ‘মাইনর টু মডারেট বার্ন উইদাউট ইনহেলেশন বার্ন’ ও ‘হিলিং স্টেজড সিভিয়ার বার্ন’-এর ফলোআপ (অল্প থেকে মাঝারি ধরনের পোড়া রোগী, যাদের শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং গুরুতর আহত যেসব রোগী সেরে উঠছে) চিকিৎসা দেওয়া হবে। গতকাল এ ইউনিটে একজন রোগী ছিলেন। ৩০ বছর বয়সী এই যুবক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর ১০ শতাংশ পুড়েছে, তবে গভীর ক্ষত হয়নি। মুগদা হাসপাতালেও মারাত্মক দগ্ধ রোগীদের সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। যাদের শরীর ১০ শতাংশের কম পুড়েছে এবং মুখ, গলা, বুক ও তলপেট পোড়েনি, শুধু তারাই এখানে চিকিৎসা পাবে। গতকাল এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কেউ ভর্তি ছিল না। তবে এ পর্যন্ত এখানে হরতাল-অবরোধে সামান্য দগ্ধ হয়েছে এমন ১৪ জন রোগী সেবা পেয়েছে।
মারাত্মক দগ্ধ রোগী না রাখার কারণ হিসেবে হাসপাতাল দুটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), সার্বক্ষণিক সেবাকেন্দ্র (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট-এইচডিইউ), রক্ত সঞ্চালন কেন্দ্র নেই। এ দুটি হাসপাতালে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানো হয়েছে। তাঁরা জনবল তৈরির কাজ করবেন এবং রোগীদের সেবা দেবেন।
কুর্মিটোলা হাসপাতালের পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। তবু আমরা আশাবাদী। যা আছে তাই নিয়ে ইউনিট চালানোর চেষ্টা করছি।’
মুগদা হাসপাতালের পরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি প্রস্তুত, তবে ১০ শতাংশের কম দগ্ধ রোগীদের জন্য।’
বিএসএমএমইউর চিত্র: বিএসএমএমইউর বার্ন ইউনিটে গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে গিয়ে দুজন শিশু রোগীকে ভর্তি দেখা যায়। এদের একজন সাজু (৫)। তার মা মোসাম্মৎ সাথী খাতুন বলেন, শনিবার সন্ধ্যায় কয়েকজন গিয়ে তাঁদের ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিট থেকে এখানে এনেছেন। যাঁরা এনেছেন তাঁরা বলেছেন, ভালো না লাগলে ঢাকা মেডিকেলে ফিরে যেতে পারবেন। তিনি সন্তান নিয়ে চলে যেতে চান। কিন্তু চিকিৎসকেরা ছাড়ছেন না।
ওই সময় রোগীর সামনে থাকা কর্তব্যরত চিকিৎসক এক প্রশ্নের জবাবে জানান, তিনি দাঁতের চিকিৎসক। ওই পালায় তাঁর সঙ্গে আরও একজন দাঁতের চিকিৎসক আছেন। তাঁরা দুজনেই স্নাতকোত্তর লেখাপড়া করছেন বিএসএমএমইউতে। তবে বিএসএমএমইউর দাবি, এ ইউনিটে রোগীরা বিনা মূল্যে ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞসেবা পাবেন।

‘জনগণই সমস্যার সমাধান করবে, প্রয়োজনে সাহায্য করবে যুক্তরাষ্ট্র’

(যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তির পক্ষ নেয় না বলে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট, তবে যদি কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ জন্য তৈরি আছে। আজ মঙ্গলবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন। ছবিটি গুলশানে আমেরিকান ক্লাব থেকে তোলা। ছবি: প্রথম আলো) মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট দেশের জনগণই সমাধান করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সাহায্য করবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন যে কোন ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে চলমান সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। আজ দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশে কাজ শুরু করার পর এটিই ছিল বার্নিকাটের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। আমেরিকান সেন্টারে আয়োজিত ঘণ্টাব্যাপী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন মার্কিন দূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে সমস্যা চলছে বাংলাদেশেই এর সমাধান করতে হবে। আমি আশা করি সমাধানের একটি পথ খুঁজে বের করা যাবে। বাস, ট্রেনে যে হামলা ভাঙচুর ও আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটছে এবং এতে নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করছে। কোন গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের কাজ চলতে পারে না। এক্ষেত্রে সব পক্ষকে অহিংস ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ করতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোন দলকে সমর্থন করে না। বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করবো এবং বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চেষ্টা করে যাব। নির্বাচন বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন দূত বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগেই অবস্থান পরিষ্কার করেছে। নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী দেখতে চায়। চলমান অস্থিরতায় উগ্রপন্থাকে উস্কে দেবে কিনা এমন এক প্রশ্নে বার্নিকাট বলেন, অনেকভাবেই চরমপন্থা উৎসাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।

বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সঙ্কটের সুরাহা হবে না -এএফপি

বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সঙ্কটের সুরাহা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে রেষারেষি কয়েক দশকের। দু’পক্ষের মধ্যে সহিংসতার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এ অবস্থায় পর্যবেক্ষকরা আতঙ্কিত যে, সর্বশেষ রক্তপাত ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। সহিংসতার জন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করা হলেও তার জনপ্রিয়তা এখনও ব্যাপক। তাকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচির মতো গৃহবন্দি থাকতে হতে পারে বছরের পর বছর। গতকাল বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। একই সঙ্গে তারা এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে সহিংসতা ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি। ‘নো অ্যান্ড ইন সাইট টু স্লো-বার্ন বাংলাদেশ টারময়েল’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন ক্রিশ্চিয়ান ওটোন। তিনি লিখেছেন, ১২ বছরের শিশু রাকিব মিয়া তার পরিবারের জন্য দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের লক্ষ্যে বাসে চড়েছিল। বাসে দুর্বৃত্তের ছুড়ে মারা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয় সে। ঢাকায় একটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাদৃষ্টে আশঙ্কা, এ অস্থিরতা বাংলাদেশে নিত্যদিনের জীবনযাত্রার একটি অংশ হয়ে যেতে পারে। বিলাপ করে রাকিবের মা রাশিদা খাতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, আমার ছেলে কার কি ক্ষতি করেছে? ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে হুইল চেয়ারে করে মায়ের সামনে দিয়ে ছেলেকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলছিলেন, সে আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। সরকার ও বিরোধী দলের সহিংসতায় ঢাকার হাসপাতালে আহতদের উপচে পড়া ভিড়। এ বছর কমপক্ষে ৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন সহিংসতায়। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত। প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থান ও দলীয় কার্যালয়ে খালেদা জিয়া আটক থাকায়, আশার আলো খুব বেশি দেখছেন না কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঢাকার বিশ্লেষক আতাউর রহমান বলেন, এ সহিংসতা চলতেই থাকবে। তাতে ধীরে ধীরে ক্ষতি হতেই থাকবে। ২০১৯ সালে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে। আতাউর রহমান বলেন, খালেদা জিয়া সহিংসতার জন্য অনেকাংশে অবশ্যই দায়ী। তা সত্ত্বেও তিনি এখনও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। তার ধারণা, মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচি’র মতো গৃহবন্দি হিসেবে কাটাতে হতে পারে বিরোধীদলীয় নেত্রী। খালেদা জিয়া বলছেন, ৩রা জানুয়ারি থেকে তিনি গুলশান কার্যালয় থেকে বের হতে পারছেন না। ‘প্রহসনমূলক’ নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকীতে বিক্ষোভ-আন্দোলনের আহ্বান জানানোর সময় থেকেই তিনি কার্যালয়ে আটক। নতুন করে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে খালেদা জিয়া সড়ক-অবরোধের ডাক দিয়েছেন। তারপর থেকে শ’ শ’ যানবাহন পেট্রলবোমার আগুনে পুড়েছে। সরকার বলছে, এসব হামলা করছে বিরোধী দলের জঙ্গিরা। অন্যদিকে, বিএনপি এর দায় চাপাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ওপর।
বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নানা দিক থেকে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাপ্রবাহ বেশি আতঙ্কজনক। কারণ, এ ঘটনাগুলো ঘটছে বিশৃঙ্খলভাবে এবং ২০১৯ সালে নির্বাচন হওয়ার আগে সহিংসতা অবসানের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষণ নেই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের সার্জন সাজ্জাদ খন্দকার (৫৫) বলেন, ককটেল বা বিশেষ হাতবোমা ও পেট্রলবোমায় দগ্ধ ৫৫ জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন ইউনিটের করিডরে চিকিৎসার অপেক্ষায় স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন বহু মানুষ। বেশির ভাগ মানুষই বলছে, কিভাবে তাদের যানবাহনে আগুন দেয়া হলো। ৫ ডলারেরও কম পারিশ্রমিকে এ হামলা চালাচ্ছে তরুণ, যুবকরা। গাজীপুরের একটি সবজির বাজার থেকে রাস্তায় পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট সবজি সংগ্রহ করতে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয় রাকিব। তার সারা শরীর আগুনে দগ্ধ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহে আহতদের দেখতে গিয়ে বার্ন ইউনিটে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নি। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি বিএনপি’র সঙ্গে সংলাপে বসতে চান কিনা। প্রত্যুত্তরে তিনি ক্ষুব্ধভাবে বলেন, খুনিদের সঙ্গে, যারা আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের সঙ্গে? এমন প্রসঙ্গ উঠতে পারে না। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, সরকার সংলাপ নীতির বিরুদ্ধে নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সম্ভব নয়। এএফপি’কে ইনু বলেন, আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে ধর্মীয় জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গত সপ্তাহে এএফপি’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরে দাঁড়ানো ও একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সব দলের ঐকমত্যে ও আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই নির্বাচন হওয়া উচিত। পাল্টা জবাবে ইনু বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে ঐক্যের সরকারে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু, সেটা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। খালেদা জিয়ার নির্বাচন বর্জনকে মারাত্মক ভুল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, জনমত জরিপগুলো বিএনপি’র জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইউরোপীয় এক কূটনীতিক বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনে গেলে সেই নির্বাচন ব্যাপক পর্যবেক্ষণের আওতায় হতো। ওই নির্বাচনে ভোটে কারচুপির মাধ্যমে পরাজিত হলে, খালেদা জিয়া ব্যাপক কূটনৈতিক সমর্থন পেতেন। ওই কূটনীতিক বলেন, ঢাকায় জনজীবন স্বাভাবিক। দেশকে অচল করে দিতে বিএনপি’র প্রচেষ্টা এখন তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না। অপর এক পশ্চিমা কূটনীতিক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, খালেদা জিয়াকে কোণঠাসা করে ফেলায়, চলমান সহিংসতাই ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থা হয়ে ওঠার মতো ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ, নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় এ সহিংসতাই হয়ে উঠতে পারে স্বাভাবিক।
এ দু’নেত্রীর বিরোধ ৩ দশকের। এ জন্য তাদেরকে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার স্বামী সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের নায়ক। দুই জনই হত্যাকা-ের শিকার হন, যা তাদের শহীদী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মও দুই নেত্রীর শত্রুতার বিষে আক্রান্ত। খালেদা জিয়ার পুত্র ও তার সুস্পষ্ট উত্তরাধিকারী তারেক রহমান সরকারকে ভীষণভাবে অপছন্দ করেন। তিনি এখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। ২০০৪ সালে বোমা হামলার ঘটনায় অনুপস্থিতিতে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বিএনপির মধ্যে কেউ কেউ আশঙ্কা করেন যে, সরকার বিএনপি’কে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। খালেদা জিয়া ও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ এনে তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখার ষড়যন্ত্র করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সাল থেকে প্রায় ২০টি অভ্যুত্থানের সাক্ষী বাংলাদেশ। তবে, পুনরায় সেনা হস্তক্ষেপ হতে পারে এমন রিপোর্ট নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, দ্রুত সঙ্কট সমাধানের কোন ইঙ্গিত নেই। তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ সংঘাত চলতেই থাকবে।

শিক্ষায় সর্বনাশ by সাবি্বর নেওয়াজ ও কামরান সিদ্দিকী

লাগাতার হরতাল-অবরোধ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিঘি্নত হচ্ছে পাঠদান। একের পর এক পরীক্ষার জট পাকছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের দেড় মাস পার হতে চললেও এখনও পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই। পরীক্ষার শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে সারাদেশের এসএসসি ও সমমানের ১৫ লাখ পরীক্ষার্থী। চারটি পরীক্ষা দিয়ে এখন বাকি পরীক্ষাগুলো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে তারা। জানা নেই, কবে শেষ হবে এসএসসি পরীক্ষা। আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া ১২ লাখ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীও একই কারণে মন বসাতে পারছে না পড়ার টেবিলে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ শিক্ষার্থীর সব ধরনের পরীক্ষা আটকে গেছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর মিলিয়ে সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা তথ্যমতে, সব শিক্ষাস্তর মিলিয়ে একদিনে ক্লাস না হলে ১৬ কোটি শিক্ষাঘণ্টা (ক্লাস আওয়ার) নষ্ট হয়। সে হিসাবে গত ৬ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার বাদে গত ৩৭ দিনে বাংলাদেশের সর্বস্তরের ছাত্রছাত্রীর মোট ৫৯২ কোটি শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, চলমান হরতাল-অবরোধের কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার যা ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে আগামী ৩০ বছর লাগবে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, শিক্ষার ক্ষতি বা উন্নতি দুটোই রাতারাতি বোঝা যায় না। এ দুটোরই ফল সুদূরপ্রসারী।
চলমান হরতাল-অবরোধে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতও। রোববার হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ হরতাল-অবরোধের নামে নৈরাজ্য বন্ধে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। অপর এক রিট আদেশে হরতাল-অবরোধে মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন একই আদালত। এ ক্ষেত্রে কেউ বাধা দিলে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে সাধারণ অভিভাবকরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় বাস্তবে এ আদেশ কতটুকু প্রতিপালন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নগণ্য। প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত সব বিদ্যালয়েরই ক্লাস পুরোপুরি বন্ধ। পাড়া-মহল্লার ভেতরে কিছু কিছু বিদ্যালয়ে অবরোধে ক্লাস হলেও হরতালে তা বন্ধ থাকে। সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই একই চিত্র। এখন আবার এসএসসির পরীক্ষাকেন্দ্র থাকায় বহু বিদ্যালয় এমনিতেই বন্ধ রয়েছে। আগামী জুনে বিদ্যালয়গুলোর ষাণ্মাসিক পরীক্ষা। শিক্ষাসূচি ভেঙে পড়ায় ওই পরীক্ষার সিলেবাস শেষ করা নিয়েই শিক্ষকরা এখন উদ্বিগ্ন। ঢাকার মিরপুর বাঙলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বদরউদ্দিন হাওলাদার সমকালকে বলেন, 'আমরা হরতাল-অবরোধে ক্লাস নিচ্ছি। তবে এসএসসির দিনগুলোতে ক্লাস বন্ধ থাকে।'
মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, এভাবে যদি হরতাল-অবরোধ চলতে থাকে, তাহলে সিলেবাস শেষ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসরিন সুলতানা জানান, নতুন বছরের ক্লাসে দূরের শিক্ষার্থীরা আসতে পারছে না। তার পরও যারা আসছে, তাদের নিয়ে চলছে পাঠদান। রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে কোনো অভিভাবক তার সন্তানকে নিয়ে স্কুলে আসবেন না, এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষকরা অনেক কষ্ট করে এসে অফিস করছেন।
এ প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, 'মানুষের তৈরি দুর্যোগে বাচ্চাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া মোটেই কাম্য নয়। এ ধরনের হরতালের ফলে নতুন প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হবে।'
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম দিন ১ জানুয়ারি ছিল জামায়াতে ইসলামীর হরতাল। ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি ছিল সাপ্তাহিক এবং সরকারি ছুটি। ৫ জানুয়ারি ঘিরে ছিল উত্তেজনা, অনেকেই সেদিন স্কুলে যায়নি। আর ৬ জানুয়ারি থেকে চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি। রাজনীতির খেলায় পিষ্ট হচ্ছে সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি বিদ্যালয়ে চার কোটি ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৪ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। দশম শ্রেণীতে রয়েছে আরও অন্তত ১৮ লাখ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিকে দুই ক্লাসে ২০ লাখ ও উচ্চশিক্ষাস্তরে প্রায় ২৫ লাখ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রথম থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে ১ জানুয়ারি। আর উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের সেশন শুরু হবে আগামী ১ জুলাই।
প্রতিদিন নষ্ট ১৬ কোটি শ্রেণীঘণ্টা: জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদনমতে, বাংলাদেশে এখন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা চার কোটি ৭৬ লাখ। তারা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। এই তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ও নেতৃত্ব দেবে, যাদের বেশির ভাগই এখন শিক্ষার্থী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখরের গবেষণায় দেখা যায়, একদিনের হরতালে নষ্ট হয় সাড়ে ১৬ কোটি শিক্ষাঘণ্টা। তার গবেষণামতে, দেশে নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে চার কোটির মতো। আর একদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলে গড়ে একজন শিক্ষার্থী চারটি শ্রেণীঘণ্টার পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত হয়। সে হিসাবে হরতালে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একদিন বন্ধ থাকলে সাড়ে ১৬ কোটি শ্রেণীঘণ্টা পাঠ থেকে শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করা হয়। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে সৌমিত্র শেখর বলেন, শিক্ষার প্রতিযোগিতা এখন আন্তর্জাতিকভাবে বিবেচনা করা হয়। কোটি কোটি শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট করে আমরা একটি স্থবির জাতিতে পরিণত হচ্ছি। তিনি বলেন, 'আমরা একদিনের হরতালে আলু-পটোলের কত টাকার ক্ষতি হলো, সেই হিসাব করি। শিক্ষার ক্ষতির হিসাব কখনও করি না।'
হিসাব করে দেখা গেছে, বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি ৫২ দিন আর অন্যান্য ছুটি থাকে ৮৫ দিন। সেই হিসাবে ১৩৭ দিন এমনিতেই বন্ধ থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছরেই থাকে চারটি পাবলিক পরীক্ষা। ফলে বছরের বড় একটি অংশ ক্লাস ছাড়াই চলে শিক্ষার্থীদের। এর ওপর গত দেড় মাস টানা অবরোধ-হরতালে অনির্ধারিতভাবে বন্ধ আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে কোনোভাবেই সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
দুর্ভাবনায় হাবুডুবু খাচ্ছে পরীক্ষার্থীরা: ২ ফেব্রুয়ারির এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে ৬ ফেব্রুয়ারি। পরীক্ষার্থীরা এ পর্যন্ত মাত্র চারটি পরীক্ষা দিতে পেরেছে। শুক্র ও শনিবার এসব পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। কোনো কর্মদিবসেই হরতালের কারণে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শুক্র-শনিবার মিলিয়ে এখন অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর পরীক্ষা আগেভাগে নিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পর বাকি বিষয়গুলোর পরীক্ষা প্রয়োজনে একদিনে দুটি নেওয়া হবে। যদিও দিনে দুটি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের আপত্তি রয়েছে।
এদিকে, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরাও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুর্ভাবনায় পড়েছে। এসএসসি সময়মতো শেষ না হলে তাদের পরীক্ষাও পিছিয়ে যাবে। টানা হরতাল-অবরোধের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারাদেশের কলেজগুলোয় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ও ডিগ্রি পাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। সারাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও একই চিত্র। কোথাও কোথাও ক্লাস হলেও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে প্রতিটিতেই। ফলে তৈরি হচ্ছে সেশনজট। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, 'হরতাল-অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তৈরি হচ্ছে সেশনজট। স্কুলের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যেতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা ও ভীতি ঢুকে গেছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় রুটিনের অনিশ্চয়তা পরীক্ষার্থীদের জন্য কষ্টদায়ক ও মানসিক পীড়ার কারণ। এ অনিশ্চয়তায় পরীক্ষার পরের সময়টা তাদের নিজেদের মতো করে ব্যয়ের ইচ্ছাও ঝুলে আছে। ক্লাস-পরীক্ষা না হলে চাকরিজীবী মা-বাবা সাধারণত বাচ্চাদের বাসায় রেখে যান। অনেকটা গৃহবন্দি অবস্থায় টিভি দেখা ছাড়া তখন তাদের কোনো কাজ থাকে না। আর টিভি খুললেই জ্বালাও-পোড়াও, অগি্নদগ্ধ মানুষের বীভৎস দৃশ্য শিশুদের ওপর মানসিকভাবে খারাপ প্রভাব ফেলে। জীবনের শুরুতেই শিশুরা খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেমন হবে- সে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীরাও: গত ২১ ও ২২ জানুয়ারি ইংরেজি মাধ্যমের এডেক্সেল কারিকুলামের 'ও' এবং 'এ' লেভেল পরীক্ষা দিতে পারেনি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। ৬ জানুয়ারি শুরু হয়ে ২৮ জানুয়ারি তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। সারাদেশের প্রায় সাত হাজার পরীক্ষার্থী ওই পরীক্ষা দিতে না পারায় একটি সেশন পিছিয়ে গেছে তারা। আগামী ছয় মাস পর ফের একই পরীক্ষায় তাদের অবতীর্ণ হতে হবে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'বর্তমানে যা চলছে এটা জনবিধ্বংসী, সন্ত্রাসী কর্মকা ।
বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বললেও গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমের যেসব শিক্ষার্থীর ছয় মাস পিছিয়ে গেল, আগামী পরীক্ষায়ও তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে। অভিভাবকদের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ল। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের পরীক্ষা নেপাল বা মালয়েশিয়ায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে ইংরেজি মাধ্যমের পড়ালেখা পুরোপুরি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এভাবে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় এটাই প্রমাণিত হলো, আমরা জাতি হিসেবে ব্যর্থ।'
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অভিভাবকদের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট আমিনা রতনা সমকালকে বলেন, 'দেশের এখন যা অবস্থা, তাতে রাস্তায় বাচ্চা নিয়ে বের হলে বাড়িতে ফিরতে পারব কি-না এর নিশ্চয়তা নেই। বাচ্চাকে স্কুলে পড়াতে এসে যদি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করাতে হয়, তাহলে কে স্কুলে যাবে?'
শিক্ষা ব্যবস্থার এই করুণ দশায় নিজের উদ্বেগ জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে আরও বলেন, 'আমরা খুবই মর্মাহত যে, একটি বছরের শুরু থেকেই লেখাপড়া লাটে উঠেছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না পেট্রোল বোমার ভয়ে। ঠিকমতো পরীক্ষাটাও নিতে পারছি না। খুবই উদ্বেগের মধ্যে আমরা দিন কাটাচ্ছি।
অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, অচিন্তনীয় ও অমানবিক পরিবেশের মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবাইকে দিন কাটাতে হচ্ছে।' তিনি বলেন, 'অনেক আবেদন-নিবেদন করেছি। আর লাভ নেই। শুধু পরীক্ষা পিছিয়ে যাচ্ছে তা নয়। শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা ও চেতনায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যার খেসারত বহু বছর ধরে দেশকে, প্রজন্মকে দিতে হবে। এগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, প্রজন্মকে ধ্বংস করার কর্মসূচি।'

প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে সিরিসেনা

শ্রীলংকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে এসেছেন মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। রোববার ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি নিয়ে চার দিনের সফরে তিনি নয়াদিল্লিতে পৌঁছান। বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বিমানে চড়েননি সিরিসেনা। সাধারণ মানুষের মতো বাণিজ্যিক বিমানে ভ্রমণ করলেন তিনি। খবর এনডিটিভি ও সিলন টুডের। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, আজ (সোমবার) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে শ্রীলংকার শান্তি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হবে। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন সিরিসেনা। এর একদিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরবেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট।
শ্রীলংকায় ভারতের ব্যাপক বিনিয়োগের আশা করছেন সিরিসেনা। গত সপ্তাহে তিনি জানিয়েছিলেন তার দেশে ৪০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রত্যাশা করছেন। এই সফরে সিরিসেনা বুদ্ধ গয়ার বৌদ্ধ তীর্থস্থান ও তিরুপতির হিন্দু মন্দির পরিদর্শন করবেন। গত মাসের শুরুর দিকে শ্রীলংকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহেন্দ রাজাপাকসে পরাজিত হন। রাজাপাকসের শাসনামলে চীন শ্রীলংকার অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই শ্রীলংকাকে তাদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখার কথা বিবেচনা করে আসছে। আর এ লক্ষ্যেই দিল্লি কলম্বো ও তামিল বিদ্রোহীদের মধ্যে তাদের মধ্যস্থতায় করা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে ১৯৮৭ সালে সেখানে সেনা পাঠায়। গত বছর শ্রীলংকার জলসীমায় চীনের দুটি ডুবোজাহাজের অবস্থান করার ঘটনায় দিল্লি ক্ষুব্ধ হয়। এপি।

এসওএস: বাংলাদেশের প্রাণ বাঁচাও! by ফারুক ওয়াসিফ

‘আমি সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়েছি উত্তাল ঝড়ের মধ্যে, ভয় পাই নাই। এখন আমার মনে দিনরাত পেট্রলবোমার ভয়। এইখানে আর থাকব না, সব বিক্রি করে বিদেশ চলে যাব।’
মধ্যবয়সী শক্ত গড়নের মানুষ। সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এক যুগেরও বেশি সময় পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে জাহাজ নিয়ে ঘুরেছেন। চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমি থেকে পাস করে নৌশিক্ষার উচ্চ ডিগ্রি নেন লন্ডনে। চাকরি নেন বিদেশি জাহাজে। ২০০৫ সালে দেশে ফেরেন। দোকান-বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি করেন। বছরের অর্ধেকটা বিদেশে থাকেন, বাকি সময় দেশেই কাটান। কিন্তু এখন তাঁর ‘মন উঠে গেছে এই দেশ থেকে’।
‘১৫ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ এসেছিল, যাইনি। কিন্তু এখন আর ভালো লাগে না। এই দেশে আমার সন্তান নিরাপদ নয়।’ ভয় আর হতাশায় তিনি এক বিকেলে ছুটে আসেন প্রথম আলোর দপ্তরে। কথা হয় সেখানেই।
মানুষটার মধ্যে তীব্র প্রাণশক্তি আছে। কিন্তু কোনোভাবেই ভরসা পাচ্ছেন না। অরূপ রাহীর একটি গান ইদানীং এফএম রেডিওতে খুব বাজে: মরার দেশে ভালো লাগে না। মরার দেশে কারোরই ভলো লাগছে না। পোড়ার দেশে জীবনও জিয়াচ্ছে না। অকালে, বীভৎস অপঘাতে শিশু ও সাধারণের মৃত্যু মানা যাচ্ছে না। জয়-জিন্দাবাদী ঝগড়াপুরি রাজনীতি যত প্রবল হয়, ততই অকাতরে মানুষ মরে আর দেশত্যাগের ঝোঁক বাড়ে। গরিব মানুষের স্বদেশ একটাই। প্রবাসে কর্ম করার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশই তাদের স্থায়ী নিবাস। তবে যাঁরা ওপরের লোক; দ্বিতীয় স্বদেশ খোঁজার ঝোঁক তাঁদেরই বেশি। আরও যাঁরা বড়লোক অথবা অবৈধ পথে সম্পদশালী যাঁরা, তাঁরাও ধনপ্রাণ বাঁচাতে বিদেশমুখী হচ্ছেন। হানাহানির সময়ই সম্পদ পাচারে গতি আসে আর ভরে ওঠে বিদেশি ব্যাংক। পরিচিত এক ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে মালয়েশিয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছেন। জাতীয় আত্মবিশ্বাস তলানিতে, তাই দেশে বিনিয়োগে ভরসা আসছে না। দুর্নীতি ও সহিংসতার রেকর্ডের মতো ভরসাহীনতার জরিপেও আমরাই সেরা।
যেখানে সম্মান আর নিরাপত্তা নেই, তাকে আর দেশ বলা যায় না। এমন দেশে মানুষ থাকতে চায় না। পুরোনো যুগে দেশ ছিল মা, তাকে কখনো ছাড়া যেত না। কিন্তু এখন এমন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যাদের কাছে দেশের চেয়েও বড় হলো ‘উন্নতি’। কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়’। আজকের কথা হলো, উন্নতিহীনতায় কে বাঁচিতে চায়! স্বাধীনতার চাইতে সুযোগ ও নিরাপত্তা বোধগম্য কারণেই অনেকের কাছে বড়। নিরাপদ পরিবেশে উন্নতি করার সুযোগ তাঁরা যেখানে পাবেন, যোগ্যতাবলে তাঁরা সেখানেই চলে যাবেন। দেশ তাঁদের আটকে রাখতে পারবে না। এভাবে কেউ পুঁজি, কেউ শ্রম, কেউ শিক্ষা, কেউ মেধা-যোগ্যতা, কেউবা শুধু ডিভি লটারি সম্বল করে দেশ ছাড়ায় মরিয়া।
কিন্তু যাঁরা দেশ ছাড়তে চান না, যাঁরা ‘আমার সোনার বাংলা’কে ভালোবাসেন, যাঁরা মনে করেন ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’; তাঁরা কী করবেন? চেয়ে চেয়ে দেখবেন এবং হত্যা-ধ্বংস-লাঞ্ছনার অপেক্ষমাণ তালিকাভুক্ত হয়ে অপেক্ষা করবেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি দেয়াললিখন চোখে পড়ে: রাজনীতি আপনার জীবনকে বদলায়, আপনি কেন রাজনীতিকে বদলাবেন না? এ ধরনের আরও অনেক কথা প্রবাদপ্রতিম মনীষীরা বলে গেছেন। যেমন: রাজনীতি এতই গুরুতর বিষয় যে তা কেবল রাজনীতিবিদদের মর্জির ওপর ছেড়ে রাখা চলে না। রাজনীতিতে জড়িত না হওয়ার শাস্তি হলো, আপনি আপনার থেকে অযোগ্য ব্যক্তিদের দ্বারা শাসিত হবেন। যতই আপনি মনে করবেন রাজনীতিতে আপনার কিছুই করার ক্ষমতা নেই, ততই আপনি আপনার সরকারকে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে সাহায্য করবেন। আর চতুর স্বৈরাচারীরা জনগণের মধ্যে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের বিশ্বাস করিয়ে ফেলে যে সাধারণ মানুষ আসলেই অসহায় ও অক্ষম। যখন রাজনীতি মারাত্মক ভুলের পথে চলে, তখন সঠিক কথা বলা বিপজ্জনক।
বিপজ্জনক বলেই নাম না প্রকাশ করার শর্তে রাজনীতি নিয়েও কথা বলেছেন ওই নাবিক। সংলাপ নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘সংলাপ কীভাবে সম্ভব? দুই নেত্রীর কেউ কাউকে কোনো দিন মানবে না। এত ঘৃণা যাঁদের মনে, তাঁরা কীভাবে একসাথে বসবেন? কোনো জাপানি কোনো জাপানির সাথে রাগ করে না, মিথ্যা বলে না। কিন্তু আমাদের সবার মধ্যে এত অবিশ্বাস, এত হানাহানির মেজাজ!’ অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই, কবি জীবনানন্দ দাশও বলে গিয়েছিলেন, ‘এত হিংসা নিয়ে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’
বাংলাদেশিরা গণতন্ত্রের অযোগ্য; কথাটি অনেকেই বললেও ইতিহাসে এর উল্টা উদাহরণও বিস্তর। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টির উত্থান ছিল বাংলাদেশে সেক্যুলার গণভিত্তিক রাজনীতির বিরাট বিজয়। জমিদার-মহাজনের শক্তিকে কাবু করেছিল এই নির্বাচন। ১৯৭০-এর নির্বাচন নিয়ে এসেছিল স্বাধীনতার সুযোগ। ১৯৯১-এর নির্বাচনে বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার ফিরেছিল। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আহমেদ কামাল লিখেছেন, ‘নির্বাচনের সংস্কৃতি খুব ভালো করে জানা ছিল বাঙালি বৌদ্ধদের। বৌদ্ধবিহার ও ধর্মসংঘের প্রধান সংঘের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন এবং রাজা গোপালও ছিলেন বৌদ্ধ।’
আবাসিক ভবন বা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি থেকে শুরু করে বণিক সমিতি পর্যন্ত সবখানেই নির্বাচিতরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সমঝোতার অলিখিত বিধানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রেষারেষি কমেছে। আমিও পাব তুমিও কিছু পাবে, এই অলিখিত বিধানে সমাজ চলছে। কিন্তু রাজনীতি চলছে ‘কেউ পাবে কেউ পাবে না’ নীতিতে। এ জন্যই ক্ষমতাসীনেরা নির্বাচন নিয়ে ছলচাতুরীতে নামে: কি ২০০৬ সালে, কি ২০১৪ সালে। পুরাকালে গোপাল রাজা নির্বাচিত হওয়ায় রাজা-প্রজা দুই-ই বেঁচেছিল। এখন নির্বাচন নিয়ে সংঘাতে রাজা-প্রজা উভয়েই বিপদে।
যাঁরা এতকাল ভেবে এসেছেন, দেয়াল আর পিঠের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান, তাঁদের পিঠও এখন দেয়ালে ঠেকে যাচ্ছে। ওই দেয়াললিখন এখন আমাদের কপাললিখন হয়ে উঠেছে। তবু দুই নেত্রী জনগণের আকুতিতে সাড়া দেবেন না! অথচ দুই দলেরই জেলা বা থানা পর্যায়ের নেতারা মারো অথবা মরো নীতিতে বিশ্বাসী নন। কারণ, তাঁদের এলাকায় থাকতে হবে। তাই লুটপাটও তাঁরা সমঝোতা করেই করেন। হিংসার হাওয়া বরং ওপরেই বেশি।
এ মাসের প্রথম সপ্তাহে কলাবাগানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা যথারীতি ডেকোরেটর থেকে চেয়ার ভাড়া করে রাস্তার পাশে বসে হরতাল মোকাবিলায় ব্যস্ত। তাঁদের একজন সালেহা বেগম (ছদ্মনাম) বলছিলেন: ‘আইজ মন ভালো নাই। সকালে মেয়ের লগে অনেক ঝগড়া করসি, মেয়েও আমারে অনেক কথা শুনায়া দিছে। মেয়ে বিএনপি করে। সে চলে তার নেত্রীর কথায়, আমি চলি আমার নেত্রীর কথায়। কিন্তু ঘরে এত ঝগড়া লাগে দুইজনায়। আমার ভালো লাগে না।’
তাঁকে বলি: যদি দ্যাখেন আপনার মেয়ে মিছিল করছে, আপনি কী করবেন, মারতে যাবেন? সরাসরি উত্তর না দিয়ে গৃহিণী বললেন, ‘বিএনপি যুদ্ধ করতে করতে আগাবে, কষ্ট করতে করতে একদিন ঠিকই ক্ষমতায় আইসা পড়বে। ক্ষমতায় আসতে হলে কষ্ট তাদের করতেই হবে।’ কিন্তু সেখানে উপস্থিত তাঁরই নেত্রী সালমা সরকার জানান: আইনের মাধ্যমে বিএনপিকে নিষিদ্ধ করা হলে ভালো। নরম হয়ে তো কাজ হচ্ছে না।
কর্মী নারীটি সংকটকে দেখছেন মায়ের অবস্থান থেকে, সমাজের সদস্য হিসেবে। আর ওই নেত্রী দেখছেন ক্ষমতার অবস্থান থেকে। দুই দলেরই অবস্থান সমাজের বিপক্ষে। দেশ ডুবলে যে তাঁরাও রেহাই পাবেন না, সেই হুঁশ নেই । জাহাজ ডুবলে প্রথম টের পায় খোলের তলার প্রাণীরা। দেশ ডুবলে প্রথম ‘বাঁচাও’ বলে সাধারণ মানুষ। ডুবন্ত জাহাজের নাবিকেরা বার্তা পাঠান: এসওএস (সেইভ আওয়ার সোউলস), আমাদের বাঁচাও! আজ সমগ্র বাংলাদেশই বলে উঠতে চাইছে, ‘সেইভ আওয়ার সৌলস’!
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক নির্দেশনা

বিজিবির একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৭ জানুয়ারি ২০১৫ পার্বত্য চুক্তি–পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ১১টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ৫ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘কোন দেশি-বিদেশি ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাৎ কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে’—এর অর্থ দাঁড়ায় যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো আদিবাসী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চাইলে, কিংবা সেখানে বৈঠক করতে চাইলে, অথবা আদিবাসীর মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে চাইলে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন বা সেনাবাহিনী/বিজিবির প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে কথা বলতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষায় ‘উপজাতি’, আমাদের ভাষায় আদিবাসী। আদিবাসীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে এটা করতে হবে, কিন্তু যদি ওখানে বাঙালির সঙ্গে কথা বলতে যান কিংবা মৌলবাদী সংগঠন সম-অধিকার আন্দোলন বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, তাহলে কারও উপস্থিতি বা মনিটরিং লাগবে না। এটা তো অ্যাডলফ হিটলারের সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে কোনো ইহুদি কোনো জার্মানের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না। কতটা সাম্প্রদায়িক হলে এ রকম নির্লজ্জ একটা নির্দেশনা আসতে পারে।
বৈষম্য এখানে কতটা প্রকট, তা এই সিদ্ধান্তে সহজে অনুমেয়। দেশপ্রেম কি শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা সেনাসদস্য বা বিজিবি সদস্যদের আছে? আদিবাসীদের কি দেশপ্রেম নেই? মানবাধিকার নিয়ে আমরা যাঁরা কাজ করি, আমাদের নেই? ৬ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সঙ্গে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বয় সাধন করে কাজ করবে। তার মানে স্পষ্টভাবেই সেখানে সিভিল প্রশাসন সেনা প্রশাসনের অধীনস্থ হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এমন একটা অঞ্চল, যেখানে ১৯৭২ সাল থেকে কার্যত সেনাশাসন বিরাজ করছে। প্রিয় পাঠক, একবার ভাবুন দেশে সেনাশাসন কদিন থাকলে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে যাই এবং তার বিরুদ্ধে জনগণ মাঠে নেমে পড়ে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন চলছে সাড়ে চার দশক ধরে!
বিজিবির সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে ৭ নম্বর সিদ্ধান্তে। অরক্ষিত সীমান্তে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য পদক্ষেপ নিতে বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নে নিশ্চয়ই কারও আপত্তি থাকবে না। সীমানা সুরক্ষিত হোক কিন্তু যদি সেখানে আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ করে বিজিবির স্থাপনা তৈরি করা হয়, তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। চুক্তি অনুযায়ী আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার সমাধান না করে বর্তমানে বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ হচ্ছে, দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ২১টি জুম্ম পরিবারকে উচ্ছেদ করে এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় দখল করে বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রুমা উপজেলার পাইন্দু মৌজা, পলি মৌজা, চান্দুপাড়া ও চাইপোপাড়ার ৫০০ মারমাকে উচ্ছেদ করে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন, রোয়াংছড়ি উপজেলার রামজাদিতে জায়গা দখল করে বিজিবির ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৪৭৯ কিলোমিটার সীমান্ত রক্ষার জন্য আদিবাসীদের গ্রাম উচ্ছেদ করে সীমান্ত চেকপোস্ট স্থাপন অগ্রহণযোগ্য; কিন্তু সিদ্ধান্ত ৯ ও ১০ এ রকম নির্দেশনার ইঙ্গিতবাহী। আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টিকে নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখে আনাচকানাচে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প সম্প্রসারণ না করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে স্থায়ী সমাধানের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
সিদ্ধান্ত ৩-এ পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ এসেছে। সিএইচটি কমিশনের জন্ম হয়েছে ইউরোপে, ১৯৯২ সালে; প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে সামরিক শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্মীয় নির্যাতন হয়েছে এবং এসব বিষয়াদি জাতিসংঘে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত হয়েছে, তার পরিপ্রেিক্ষতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গড়ে উঠেছে। উক্ত সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ কতখানি গ্রহণযোগ্য? এটা কি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত? বলা হয়েছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘উপজাতীয়দের’ আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা করাই ওই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য। আদিবাসীদের আদিবাসী বলাটাই তো সংগত। সারা পৃথিবী যখন বলছে, তখন আমরা কেন বলব না?
সিদ্ধান্ত ১-এ বলা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউএনডিপির উন্নয়ন প্রকল্প মনিটরিং করতে হবে। নিশ্চয়ই। সব দেশীয়, আন্তর্জাতিক সংস্থারই মনিটারিং দরকার; কিন্তু শুধু ইউএনডিপির পার্বত্য চট্টগ্রামের কার্যক্রমকে কেন মনিটরিং করতে হবে? সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার মনিটরিং করাও জরুরি।
সিদ্ধান্ত ৪-এ আছে: এখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের জন্য বিদেিশদের অন্তত এক মাস আগে অনুমতি নিতে হবে এবং কূটনীতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি নেবেন। যখন চুক্তি সম্পাদিত হয় তখন বিএনপি-জামায়াত বিরোধিতা করেছিল এই অজুহাতে যে বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বলেছিল সেখানে যেতে পাসপোর্ট লাগবে।
প্রশ্ন জাগে, সরকারি কর্মকর্তারা কি বিএনপি-জামায়াতের সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নের দ্বার উন্মোচন করছেন? সারা দেশে যে মৌলবাদী তৎপরতা আছে, এর বিপরীতে বরং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার। আমরা মনে করি, এই উল্টো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য ‘ডিপ্লোমেটিক আইসোলেশন’ তৈরি করবে। বিদেিশ নাগরিকদের জন্য ‘কোড অব কন্ডাক্ট’–এর যে কথা এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের সঙ্গে তা বিরোধাত্মক। আমাদের প্রতীতি, এসব সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামকে চুক্তিপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।
সিদ্ধান্ত ১১-এ আছে, পার্বত্য জেলাসমূহে পুলিশ/আনসার বাহিনীতে কর্মরত সাবেক শািন্তবাহিনীর সদস্যদের অন্য জেলায় বদলি করা হবে। এটা সুস্পষ্টভাবে চুক্তির লঙ্ঘন। এই সিদ্ধােন্তর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পাদিত চুক্তিকে অসম্মান ও অস্বীকার করা হয়েছে। আমরা বরং ‘মিশ্র পুলিশিং’-এর পক্ষ। কারণ, পার্বত্যাঞ্চলে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক, ভাষাভাষী ও ধর্মগোষ্ঠীর পুলিশ মোতায়েন করলে পুলিশ কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট সমাজ, সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারবে। বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে পুলিশ গঠন করা হলে তা আদিবাসী এলাকায় উত্তেজনা ও অবিশ্বাস কমাতে ভূমিকা রাখবে। আর সরকারের তরফ থেকে এখন ঠিক তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী এবং আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চুক্তি বাস্তবায়ন কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো নিয়ে সংশোধনী আনার বিষয়ে সরকার এবং জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। পার্বত্য ভূমি কমিশনের সভা আয়োজনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যখন চুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপে স্বস্তি পাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও হতাশ হয়েছি।
মনে হচ্ছে সরকারের ভেতরেই একটা শক্তি আছে, যারা প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে যে চুক্তি সই হয়েছে, তাকে সফল হতে দিতে চায় না। এটা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নয়, এটা জাতীয় সমস্যা। যে সিদ্ধান্তগুলো এসেছে, সেটা শুধু পার্বত্য চুক্তিবিরোধী নয়, এটা সংবিধানবিরোধী। এই সার্কুলারের মাধ্যমে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৩৬ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত দেশের সব মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে একটি কায়েমি গোষ্ঠী সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। আমরা মনে করি, মন্ত্রণালয়ের পদেক্ষপগুলো আদিবাসীর সঙ্গে বাঙালির দূরত্ব বাড়াবে। ধর্মীয় উন্মাদনা যেভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, ঠিক সেভাবে উগ্র বাঙালিত্ব ও উগ্র মুসলমানিত্ব আদিবাসী ও সংখ্যালঘুর জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এই নির্দেশনা নাগরিক সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে।
আমরা মনে করি, এসব নির্দেশনা বৈষম্যমূলক এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। জাতীয় জীবনের দুর্ভাগ্যের সাক্ষী এই নির্দেশনা। রাষ্ট্র আদিবাসীদের সঙ্গে কী সাম্প্রদায়িক আচরণ করছে—এই নির্দেশনার মধ্যে দিয়ে তা বেরিয়ে এসেছে। যাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার পরাকাষ্ঠার আড়ালে নিজেদের সাম্প্রদায়িক অবয়বকেই প্রকাশ করেছেন। আমরা অত্যন্ত লজ্জিতবোধ করছি যে, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, এই নির্দেশনার মাধ্যমে সেই বাংলাদেশ এখন জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার কদর্য পথেই পা বাড়িয়েছে। আমরা অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নির্দেশনাটি প্রত্যাহারের দাবি করছি।
পংকজ ভট্টাচার্য, মেসবাহ কামাল, দীপায়ন খীসা, জান্নাত-এ-ফেরদৌসী ও রোবায়েত ফেরদৌস
লেখকেরা: মানবাধিকার ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।

সুন্দরবনে তেলবাহী জাহাজডুবি- ঝুঁকিতে জীবন–জীবিকা ও স্বাস্থ্য by ইফতেখার মাহমুদ

(গত ২৫ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীর তাম্বুলবুনিয়া খালে তেল ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য। ছবি: জিয়া ইসলাম) গত ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে এমটি টোটাল নামের একটি জাহাজের ধাক্কায় তেলবাহী জাহাজ ওটি সাউদার্ন-৭ সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল নিয়ে ডুবে যায়। এ ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় ও তথ্য সংগ্রহে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দল ২৩ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে সমীক্ষা চালায়। তাঁদের সমীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে এ আয়োজন পরিকল্পনার ঘাটতি ও সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান না থাকায় সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর তা অপসারণ করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে নিয়মিত জোয়ারভাটা ও দুর্ঘটনার পর নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষতি কমেছে। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ দলের ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। সমীক্ষায় প্রতিবেদনে সুন্দরবনের জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকায় কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য সুপারিশ করা হয়। অল্প সময়ের পর্যবেক্ষণে দৃশ্যমান কোনো প্রভাব দেখা না গেলেও সূক্ষ্ম প্রভাব পড়ার কথা ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, স্বল্প সময়ে তা বোঝা সম্ভব না।
সুন্দরবনের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ একটি এলাকার মধ্য দিয়ে তেল পরিবহন করা বন এবং বনজীবীদের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তেল নিঃসরণ ও নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার তেল ছিল সাউদার্ন সেভেন অয়েল ট্যাংকারে। তেল দুর্ঘটনার পর উজানে মংলা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার ও ভাটিতে হরিণটানা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তেল নদীর দুই পাড়, খাল ও খাঁড়ির মধ্যে আটকে যায়, যা সুন্দরবনের জন্য ব্যাপক আশঙ্কার জন্ম দেয়।
ফার্নেস তেল বেশ আঠালো হয়। তবে পানিতে ছড়িয়ে পড়ার পর এই তেলের রাসায়নিক উপাদান পরিবর্তিত হয়ে যায়। পানির সংস্পর্শে এসে এই তেল বাষ্পীভবন, তৈলাক্ত আঠালো পদার্থে পরিণত হওয়া, চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়া, অক্সিজেনের সঙ্গে মিশ্রণে মরিচাযুক্ত হয়।
তেলের একটি নমুনা পাঠানো হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানিতে। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই পরীক্ষার ফলাফল বিশেষজ্ঞ দলের হাতে এসে পৌঁছায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের একটি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ফার্নেস তেলের অবশেষের মধ্যে সালফারের মিশ্রণ রয়েছে।
মাটির নিচে চাপা দেওয়া তেল: সমীক্ষা দলটি শ্যালা নদী ও পশুর নদের ওপরে পাতলা তেলের আস্তরণ দেখতে পায়। দুই পাড়ের গোলপাতা এবং ঘাসের মধ্যে তেল জমে ছিল। তেল জমে থাকার এই ধরন দেখে তারা বলেছে, তাপমাত্রা বাড়লে সুন্দরবনের গাছ থেকে তেল গলে পানিতে পড়বে। গ্রীষ্মকালে গাছ থেকে আরও তেল গলে পানির সঙ্গে মিশবে। শুরুতে নেওয়া ভিডিওচিত্রের সঙ্গে সমীক্ষা দলের পর্যবেক্ষণ তুলনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অপসারণ প্রক্রিয়ায় ফলাফল হিসেবে মনে হয়েছে নদীর পাড়ে জমে থাকা তেল কাদামাটির নিচে চাপা দেওয়া হতে পারে। প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটায় নদীর পাড়ে পলি পড়েও তেল মাটির নিচে চাপা পড়েছে।
পেশা ও জীবিকায় প্রভাব: সমীক্ষায় ১১টি মাছ, পাঁচটি চিংড়ি আহরণকারী ও ২৬টি কাঁকড়া সংগ্রহকারী দলের সঙ্গে কথা বলা হয়। চাঁদপাই, জয়মনিরগোল ও আন্ধারমানিক এলাকার জেলেরা বলেছেন, তাঁরা আগের চেয়ে কম মাছ পাচ্ছেন। অন্যদিকে তাম্বুলবুনিয়া, আলকেরচর ও হরিণটানা এলাকার জেলেরা বলেছেন, তাঁরা কিছুটা কম মাছ পাচ্ছেন। ১৮ শতাংশের বাড়িতে পালন করা হাঁস এবং প্রায় ৬ শতাংশের খাওয়ার পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তেল পড়ার পর নদীতে মাছ ধরার পরিমাণ কমেছে। তবে ৩৯ শতাংশ বলেছেন, মাছ আগের মতো ধরা পড়ছে। আর আড়াই শতাংশ বলেছেন মাছ বেড়েছে।
বন্য প্রাণীর ওপরে প্রভাব: ২৩ থেকে ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা দলটি ৮২টি এলাকায় ১০৮টি বন্য প্রাণীর দেখা পায়। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ প্রাণীর দেহে তেল দেখা গেছে।
স্বাস্থ্যগত প্রভাব: সমীক্ষায় তিনটি দলীয় আলোচনা, ১৩টি সাক্ষাৎকার ও ১৫৯টি খানাভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে ওই নমুনাগুলো সংগ্রহ করা হয়। বাতাসের সঙ্গে, গোসলের সঙ্গে, মাছ খেলে তার সঙ্গে, খাওয়ার পানির সঙ্গে এবং তেল স্পর্শ করলে তা মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এই তেলে পলি সাইক্লিক এরোমেটিক হাইড্রোকার্বন, সালফার এবং নাইট্রোজেনযুক্ত ভারী ধাতু থাকে। যার সংস্পর্শে এলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ত্বক, চোখ, কণ্ঠনালিতে সমস্যা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব ও ডায়রিয়া হতে পারে।
১৫৯ জনের মধ্যে ১১৫ জন বলেছেন, তাঁরা তেল সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে ৫৫ জন বলেছেন তাঁরা মাথাব্যথায়, ২৭ জন চোখ জ্বালাপোড়া করা, আটজন বমি বমি ভাব এবং চারজনের শরীরে চুলকানি হয়েছে। তবে এঁদের কেউই এ জন্য হাসপাতালে ভর্তি হননি। প্রায় ৮২ শতাংশ গ্রামবাসী বলেছেন, তেলের কারণে তাঁদের মাছ ধরার যন্ত্র ও ৮১ শতাংশের পোশাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সুন্দরবন সম্পর্কে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বলেছে, ‘এর প্রাকৃতিক সম্পদ অমূল্য।’ বিশ্বসেরা বেঙ্গল টাইগার আর ডলফিনের সবচেয়ে বড় বসতি এলাকাও এই বন। আর জীববৈচিত্র্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই শ্বাসমূলীয় বনটির প্রতি বর্গমিটারে যে পরিমাণ জীববৈচিত্র্য রয়েছে, তা একমাত্র ব্রাজিলের আমাজন বনের সঙ্গেই তুলনীয়।
এককথা সুন্দরবন ‘বিশ্বের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের আধার।’ বনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন, বাঘের সবচেয়ে বড় বসতি এলাকা, আমাজনের পর সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করার সময় বলা হয়েছিল, এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্য অমূল্য।

বাজারের জায়গায় আ.লীগ নেতার দোকানঘর

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার জিন্নানগর বাজারের জায়গা
দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা।
সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার জিন্নানগর বাজারের জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা। কাজী রবিউল ইসলাম নামের ওই নেতা বাজারের প্রায় ছয় শতক জমিতে চারটি পাকা ঘর নির্মাণ শুরু করেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, মহেশপুর উপজেলার অন্যতম ব্যস্ত বাজার এটি। এখানে ৫০০ থেকে ৬০০টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাজারের মাঝ দিয়ে চলে গেছে উপজেলার প্রধান সড়ক। এটি ঘেঁষে পশ্চিম পাশে বাজারের মাঝামাঝি প্রায় ছয় শতক জমির চারদিকে খুঁটি গেড়ে দখল করা হয়েছে। কাজিরবেড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কাজী রবিউলদুই মাস ধরে ওই জায়গায় দোকান ঘর তুলছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। অন্য ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে কিছুদিন নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছিলেন। গত শুক্রবার থেকে তিনি আবারও নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, জমিটি সরকারের ১/১ খতিয়ানভুক্ত। এখানে ওই আওয়ামী লীগের নেতা ঘর করতে পারেন না। ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, যেখানে ঘর তোলা হচ্ছে, সেখানে সাপ্তাহিক বাজারের দিন খোলা দোকান বসে। ওই নেতা সেখানে ঘর তুললে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তা ছাড়া বাজারের জায়গাও কমে যাবে। কাজী রবিউল ক্ষমতাসীন দলের লোক হওয়ায় কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তারপরও সাধারণ ব্যবাসায়ীরা একবার বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আবারও ওই নেতা নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। অবশ্য কাজী রবিউলের দাবি, এই স্থানে তাঁর আগে থেকেই দোকান ছিল। এখন সেটি ভেঙে পাকা করছেন মাত্র। তা ছাড়া জায়গা নিয়ে বিতর্ক থাকায় আদালতে তিনি একটি মামলা করেছেন বলেও জানান। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. আকরামুজ্জামান বলেন, তিনি বিষয়টি শুনে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। জায়গাটি বাজারের। তাই এখানে পাকা ঘর করার সুযোগ নেই। উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা হাফিজ আল আসাদ বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

১০ দিনের তদন্ত ৬৯ দিনেও হয়নি by ইফতেখার মাহমুদ

সুন্দরবনের তেল বিপর্যয়ের ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ১০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও ৬৯ দিনেও তা হয়নি। এ ছাড়া এই মন্ত্রণালয়ের অধীন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরও তাদের প্রতিবেদন দেয়নি। এ দুটি তদন্ত কমিটির দায়িত্ব দুর্ঘটনার কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা।
তবে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলের যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এর আগে বন বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তদন্ত কমিটিও তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দূরে থাক, ডুবে যাওয়া জাহাজ পরিদর্শনও করেনি। ডুবে যাওয়া জাহাজ সাউদার্ন স্টার সেভেন এবং একে ধাক্কা দেওয়া অপর জাহাজটি এমটি টোটালের কর্মচারী ও মালিকদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।
২০১১ সালের এপ্রিলে নৌপরিহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সুন্দরবনের ভেতরে শ্যালা নদী দিয়ে নৌপথ চালু করে। নৌপথটি চালুর পরপরই বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার আপত্তি তোলা হলেও তা বন্ধ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনবার এই পথটি বন্ধ করে জাহাজ চলাচলের জন্য ঘসিয়াখালি খাল খননের নির্দেশ দেন। বিআইডব্লিউটিএ থেকে তা-ও আমলে নেওয়া হয়নি। গত চার বছরে ঘসিয়াখালি খালের মাত্র ৭ শতাংশ খনন করা হয়েছে।
গত ৯ ডিসেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নুর উর রহমানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অন্য সদস্যরা হলেন বিআইডব্লিউটিএর সদস্য (প্রকৌশল) ফিরোজ আহমেদ ও প্রধান প্রকৌশলী আবদুর রহিম তালুকদার, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক গৌতম কুমার সাহা, মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুল হাসান ও চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন কে এম জসীমউদ্দীন সরকার।
ক্যাপ্টেন জসীমউদ্দীন সরকার গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবরোধ-হরতালের কারণে আমরা এখনো জাহাজটি পরিদর্শনে যেতে পারিনি। তাই সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ করতে পারিনি। আশা করি, দ্রুত আমরা প্রতিবেদন দিতে পারব।’
আইন অনুযায়ী দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও দায়ী ব্যক্তি বা সংস্থাকে চিহ্নিত করার জন্য ওই তদন্ত কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে একটি সুপারিশও দিতে বলা হয়েছে। ৯ ডিসেম্বর গঠন করা ওই কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সংস্থাটির নটিক্যাল সার্ভেয়ার অ্যান্ড এক্সামিনার ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ, স্পেশাল অফিসার মেরিন সেফটি এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান ও পরিদর্শক আবু জাফর মিয়া কমিটির সদস্য। দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, আইএসও-৭৬ ধারা লঙ্ঘনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকলে তা শনান্ত করা, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও সংস্থাকে চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা কীভাবে রোধ করা যায়, তা শনাক্ত করার কথা ওই কমিটির।
জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজটি নারায়ণগঞ্জে আনা হয়েছে। শিগগিরই আমরা তা দেখতে যাব। দেখার পরপরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেব।’

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা

রোববার সকাল থেকে ডাকা ৭২ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে শনিবার সারা দেশে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দিয়েছিল ২০ দলীয় জোট। এদিন বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ ও বিএনপির সংঘর্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ঠাকুরগাঁও ও মাগুরায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে; সিলেট, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ আরও কিছু জায়গায় পুলিশি বাধার মুখে পড়েছে বিক্ষোভ কর্মসূচি। আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে এদিন আটকও হয়েছেন বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সেই যে গাজীপুরে বিএনপির সমাবেশ করতে দেয়া হল না, তারপর থেকে সংগঠনটিকে কোথাও দাঁড়াতেই দিতে চাইছে না সরকার। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। দেশে তো জরুরি অবস্থাও বিরাজ করছে না। তাহলে কেন এই বাধা? এটা ঠিক, বিরোধী দলের অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি চলাকালে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হচ্ছে সাধারণ মানুষ, ইতিমধ্যে গত দেড় মাসের অবরোধে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন অর্ধশতাধিক নর-নারী। এককথায় দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দিলেই কি নাশকতা বন্ধ হবে? নাকি নাশকতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া? সরকার বিএনপিকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সুযোগ দেয়ার পরও যদি নাশকতা বন্ধ না হয়, সেক্ষেত্রে সরকারের বলার সুযোগ থাকবে যে, বিরোধী দল সত্যি সত্যি সন্ত্রাসের মাধ্যমেই ক্ষমতায় যেতে চায়। সরকার সে পথে কেন হাঁটছে না, তা এক প্রশ্ন বটে। সরকারের আরও কিছু আচরণ ব্যাখ্যার অতীত। খালেদা জিয়ার কার্যালয় কেন অবরুদ্ধ করা হল, সেখানে কেন বালুর ট্রাক রাখা হল, কার্যালয়ে খাবার নেয়ায় কেন বাধা দেয়া হচ্ছে- এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। আমাদের প্রশ্ন, এসব করে কি বর্তমান নাশকতা বন্ধ করা যাবে? এটা স্পষ্ট, সাধারণ মানুষ পেট্রলবোমা সংস্কৃতিকে যেমন ধিক্কার জানাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের দমননীতিরও সমালোচনা করছে। তারা আসলে শান্তি চায় এবং এই শান্তি যেভাবে আসতে পারে, সরকার ও বিরোধী দল সেভাবেই অ্যাক্ট করবে- এটাই চায়। বিরোধী দল আইনানুগ আন্দোলন করবে- এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। আবার সমাজে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় সরকার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। এ দুয়ের কীভাবে সমন্বয় হতে পারে, সেটাই উদ্ভাবনের চেষ্টা করা উচিত দু’পক্ষের।
আমরা বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার বিষয়টির নিন্দা জানাই। একইসঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বকে অনুরোধ করতে চাই, তারা যেন শুধুই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেন, কোনো ধরনের নাশকতার সঙ্গে জড়িয়ে না যান। সংঘাত তৈরি করা খুব সহজ কাজ, শান্তি স্থাপন সহজ নয়। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে সুবিবেচনার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না কারও মধ্যেই। উভয় পক্ষই মনে করছে, জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে একে অন্যকে পরাস্ত করতে পারবে। এটা ভ্রান্তিবিলাস ছাড়া কিছুই নয়। বল প্রয়োগের পরিণাম ক্ষতি ছাড়া অন্যকিছু নয়। অহিংস নীতিই সমাজে আনতে পারে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা। ভবিষ্যতে বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সরকার বাধা দেবে না আশা করি। বিরোধী দলকেও সরে আসতে হবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি থেকে।

এসএস​সি পরীক্ষা পেছানোয় খরচ বেড়ে যাচ্ছে- ‘এত টাকা পামু কই?’ by এম জসীম উদ্দীন

‘মানষের বাড়িতে বদলা দিয়া পোলাটারে লেহাপড়া করাই, এহন ধারদেনা কইর‌্যা পোলারে উপজেলা সদরে এসএসসি পরীক্ষা দেতে পাডাইছি। এই জন্য স্কুলের স্যারেরা পরীক্ষার সময় থাকা ও খাওন বাবদ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা নেছে। এহন পরীক্ষা পিছাইয়্যা দেওনে স্যারেরা আরও হাজার দুই টাকা জোগাড় রাখতে কইছে। এই টাকা কোমনে গোনে জোগাড় করমু হেই চিন্তায় রাইতে ঘুমাইতে পারি না। কন, এত টাকা পামু কই?’
কথাগুলো বলছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার চরকগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত বৃহস্পতিবার এভাবেই তিনি কথাগুলো বলেন।
টানা অবরোধ ও হরতালে বরগুনার প্রায় ১১ হাজার ৫০০ এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়েছে। সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়েছে গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থী জেলা ও উপজেলা সদরে এসে বাড়ি ভাড়া করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
গ্রামের এসব শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রের দূরত্ব ২৫-৩০ কিলোমিটার। কখনো নৌকায়, কখনো কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে তাদের জেলা বা উপজেলা সদরে পরীক্ষা দিতে যাওয়া সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে পরীক্ষার সময়ে তারা সদরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের এ ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এ জন্য তারা অভিভাবকদের কাছ থেকে এক মাসের থাকা-খাওয়া খরচ বাবদ সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু ক্রমাগত পরীক্ষা পেছানোয় তাঁরা এখন শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আরও টাকা দিতে বলছে। 
চরকগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুল আমিন বলেন, ‘আগামী মাসের (মার্চ) ১০ তারিখ পর্যন্ত হিসাব করে (দৈনিক মাথাপিছু ৮০ টাকা হারে) প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আমরা ৫ হাজার ৫০০ টাকা করে নিয়েছি। এখন যে অবস্থা, তাতে পরীক্ষা কবে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। তাই পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব বাড়তি কত টাকা লাগবে। আমাদের তো কিছু করার নেই, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে এটা করতে হচ্ছে।’
তালতলী উপজেলার লাউপাড়া সাগর সৈকত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বছর ১৬৭ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী। এসব পরীক্ষার্থী তালতলী শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। শিক্ষার্থী মো. মহসিন বলে, ‘গরিব বাবা ধারদেনা করে পরীক্ষার জন্য তালতলী সদরে থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়েছেন। আমার গরিব বাবা কীভাবে বাড়তি অর্থ জোগাবেন, তা ভাবতে পারছি না।’
আমতলী উপজেলার উত্তর সোনাখালী স্কুল ও কলেজের এএসসি পরীক্ষার্থী ৬৬ জন। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে আমতলী শহরে ভাড়া বাসায় থেকে তাদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। বরগুনা সদর উপজেলার শিয়ালিয়া, নলী মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আমতলী-নিমতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ সদরের পশ্চিমাংশের ১০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীরখাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য পরীরখাল বাজার এলাকায় বাড়ি ভাড়া করে অবস্থান করছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুকুমার চন্দ্র হালদার বলেন, ‘নির্বিঘ্নে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন হরতাল দিলে তো আমাদের কিছু করার নেই।’

শিক্ষার্থীদের চোখে আমাদের দুই ভাষাকন্যা by ড. সুফিয়া আহমেদ ও ড. হাবিবা খাতুন

(১৯৪৮-৫২ ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী। মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। তৈরি করেছেন শিক্ষায়-দীক্ষায় অসংখ্য সফল মানুষ। জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ এবং প্রতিভা মুৎসুদ্দিকে নিয়ে লিখেছেন তেমনি দুজন সফল শিক্ষার্থী ড. হাবিবা খাতুনডা. জুলিয়া আহমেদ আলোকচিত্রী মাহমুদুল হাসান) সদ্য বিলেত ফেরত নারী শিক্ষক সুফিয়া আহমেদ যেদিন কলাভবনের তিনতলার শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করলেন তখনই বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলাম। সেদিন আমার মতো ছাত্রছাত্রীরা তার মাঝে আধুনিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করেছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের কৃতী ছাত্রী ছিলেন। বিলেতে SOAS থেকে পিএইচডি শেষ করে সরাসরি একই বিভাগে শিক্ষক হয়েছিলেন তারই শিক্ষকদের সঙ্গে। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষকও বটে।
নির্ভীক বাস্তববাদী ইতিহাসবিদ জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ আমাদের প্রিয় শিক্ষক। মানুষ হিসেবেও তিনি অমায়িক। পাঠকালীন সময়েই জানতে পারি, তিনি একজন ভাষাকন্যা। সর্বজন শ্রদ্ধেয় নির্ভীক এ শিক্ষককে আমরা প্রতি পদক্ষেপে অনুসরণ করেছি। যদিও জীবনের শুরু থেকে তিনি তার আইনজ্ঞ বাবাকে চিন্তায় ও চেতনায় অনুকরণ করতেন। জাতীয়তাবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনের চিন্তালগ্নের শুরুতেই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার কথা হৃদয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে, যুক্তির সঙ্গে ভাবতেন। সাহসী বাবার মতো যৌক্তিক কারণনির্ভর সুফিয়া আহমেদ ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের ছাত্রী হওয়ার সুবাদে ছাত্র আন্দোলনে জড়িত হন। তিনি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনের অংশীদার হন। এ আন্দোলনে তিনি নিজে, বোরখা পরা পর্দানশীন সহপাঠী শামসুন নাহার সক্রিয়ভাবে এবং বিভিন্ন বাড়ির গৃহিণীরা মানসিকভাবে যে সম্পৃক্ত ছিলেন একথা তার বিভিন্ন বক্তৃতায় অকপটে ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে দেশমাতৃকার প্রয়োজনে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। জয়তু সুফিয়া আহমেদ। তাকে শিক্ষক হিসেবে পেয়ে ধন্য আমরা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা করে ইংরেজিতে পারদর্শী ড. সুফিয়া আহমেদ বাংলা ভাষায় সর্বসাধারণের মাঝে ইতিহাস চর্চা হোক এটা চাইতেন। তিনি বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সুদক্ষ কর্মী। আর্থিক যোগান দিয়ে, চিন্তা দিয়ে বিভিন্ন গুণীজনদের সুচিন্তিত ঐতিহাসিক বক্তৃতার আয়োজন করে তিনি বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চাকে অব্যাহত রেখেছেন, গতিময় রেখেছেন। বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের মুখপাত্র ‘ইতিহাস’ প্রচার তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উজ্জ্বলতর ভূমিকা রাখছে। তিনি আমাদের ধ্রুবশক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের গৌরবের পীঠস্থান। এর চত্বরে কিংবা শ্রেণীকক্ষে আমাদের প্রিয় শিক্ষক ড. সুফিয়া আহমেদ এক স্মরণীয়, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি কীভাবে ক্লাসে পড়াতেন, কীভাবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী রাখতেন সে এক আশ্চর্য বিষয়। তিনি দৃঢ়পদে শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে মনোযোগী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে পাঠদান করতেন। পাঠ্য বিষয়ের পরিমাণ এত বেশি ও আকর্ষণীয় থাকত যে, অমনোযোগী হওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ আজ জাতীয় অধ্যাপক। জাতীয় গৌরবের ধারক। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে কথ্য ইতিহাস কার্যক্রমের আওতায় বরেণ্য ব্যক্তিদের মাঝে বরণীয় হয়েছেন। বরেণ্যদের জীবনের ওপর প্রামাণ্য চিত্রগ্রহণ করা হয়েছে। তাদের জীবনকর্মের বিভিন্ন অর্জনের ওপর প্রদর্শনী হয়েছে এবং স্মৃতিচারণ করেছেন তারা। ভাষাকন্যা জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের কৃতী ছাত্রী ও শিক্ষক হিসেবে এসব বরেণ্যদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তার সব গুণগ্রাহীদের মুগ্ধ করেছেন। বরণীয় হয়েছেন সবার কাছে। তিনি অনেক দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। তারই আর্থিক সহযোগিতায় এসব শিক্ষার্থীরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে।
ড. সুফিয়া আহমেদ আমাদের জাতির গৌরব। আধুনিক বিশ্বের নারী জাতির তিনি পথপ্রদর্শক। সুশিক্ষার আলোকদানকারী এ মহীয়সী নারীর দীর্ঘায়ু কামনা করি, যারা আলোকিত হয়েছি তারই আদর্শ নিয়ে।
প্রিয় অধ্যক্ষ ভাষাকন্যা মিস্ মুৎসুদ্দি
ডা. জুলিয়া আহমেদ
কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের গভীর প্রভাব হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকে। জীবনে চলার পথে সেসব স্মৃতি আলোকবর্তিকা হয়ে ক্ষণে ক্ষণেই উজ্জীবিত করে তোলে আমার মনন। আমি আজ যার কথা বলছি, তিনি এমনই একজন মানুষ; যার মহান ছোঁয়ায় আমার আর আমার বোন ডালিয়া আহমেদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এনে দিয়েছে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার সুশিক্ষা। শিক্ষা পরবর্তী জীবনে যার সুপ্রভাবে আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে ও পারিবারিক জীবনে পেয়েছি নান্দনিক পরিপূর্ণতা। তিনি আমাদের সবার প্রিয় ভারতেশ্বরী হোমসের সাবেক অধ্যক্ষ প্রতিভা মুৎসুদ্দি। আমরা তাকে মিস্ মুৎসুদ্দি নামেই সম্বোধন করতাম।
খুব অল্প বয়সেই আমি জীবন শুরু করেছিলাম। তখন বইপত্র থেকে আমি কি শিখেছি তা মনে করা কঠিন; কিন্তু আমি অনায়াসে যা মনে করতে পারি তা হল কঠিন নিয়মানুবর্তিতা। শ্রেণী শিক্ষক, হোস্টেল শিক্ষক যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা আমাদের দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা সময়ানুযায়ী সব কাজ নিয়মমতো করতে বাধ্য করেছিলেন। যদিও সেসব কঠিন নিয়মানুবর্তিতা মেনে নিতে বা মেনে চলতে তখন খুব কষ্ট হতো। কিন্তু পরে অনুধাবন করতে পেরেছি, সেই কঠিন অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যবসায়ই ছিল আসলে সুপরিশীলিত জীবন গড়া ও চলার দক্ষতা অর্জনের জন্য মহান শিক্ষা। যা আমরা খুব অল্প বয়সেই বই পড়ার পাশাপাশি বাস্তব কাজ যেমন- থাকার ঘর, বাথরুম, খাবার ঘর, সিঁড়ি, রাস্তা, ড্রেন, মাঠ ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমেই শিখেছিলাম।
আমরা আরও শিখেছিলাম মানবিকতা, মূল্যবোধ, সততা। এগুলো শুধু পড়া বা বলার জন্যই নয় বরং প্রাত্যহিক জীবনে সব কাজে সৎ থাকা, সময় মেনে চলা, বঞ্চিতদের সহায়তা করা, সামাজিক ন্যায্যতা চিন্তা-চেতনা সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ হিসেবে জীবন পরিচালিত করার সুদৃঢ় প্রত্যয়ী শিক্ষা। যা আমরা বহন করে চলেছি আজও নিরলস নিরন্তর।
আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে যে অত্যুজ্জ্বল মানুষটির কথা বলতে চাই তিনি সেই মিস্ মুৎসুদ্দি। যিনি তার সুদৃঢ় সুশৃংখল চালিকাশক্তির দ্বারা ভারতেশ্বরী হোমসকে নিয়ে গিয়েছেন বা রূপান্তরিত করেছেন অনেক উঁচুমাত্রার সুযোগ্য শিক্ষালয়ে। তার নেতৃত্বে আমরা পেয়েছিলাম এক চমৎকার সংস্কৃতিময় পরিবেশ। ধর্ম বর্ণ মত নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছি আমরা তারই সুনিবিড় ছায়াতলে। ভারতেশ্বরী হোমসে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের ছাত্রীরাই ছিল একসঙ্গে। নামাজ শিক্ষা, ঈদ, সরস্বতী পূজা অর্চনা, বড়দিন বা বৌদ্ধপূর্ণিমা সব উৎসবে আমরা সবাই মিলে সমানভাবে উপভোগ করেছি- তা থেকে আমরা প্রায়োগিকভাবে বিশ্বাস করতে শিখেছি মানব কল্যাণই হল বড় ধর্ম। ধর্মে ধর্মে, গোত্রে গোত্রে কোনো বিভেদ নয়- কবির ভাষায় ‘সকলেই আমরা সকলের তরে’।
ভারতেশ্বরী হোমসের সাবেক একজন গর্বিত শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা সেই সুশিক্ষাকে আজ অনায়াসে অনুধাবন করতে পারি এবং সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারি আমাদের মূল সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভ- ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে।
ভারতেশ্বরী হোমস আজ যে গৌরবময় অবস্থানে এসে পৌঁছেছে তার পেছনে প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধাস্পদ জেঠামণি ও রণদা প্রসাদ সাহার অবদান ইতিহাস হয়ে আছে। আজ যে আমরা বাংলাদেশের নারী ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় বা সময় অতিবাহিত করছি সেখানে ভারতেশ্বরী হোমসের অবদান প্রণিধানযোগ্য।
মিস্ মুৎসুদ্দি ভাষা আন্দোলনের (১৯৪৮-৫২) একজন সক্রিয় সৈনিক, ভাষা কন্যা। এ অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক। আজ যখন আমি আমার স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের সঙ্গে মনে করি, তার মর্যাদাপূর্ণ জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা। আমার ছোট্ট কৈশোর চেতনায় তিনি তা আমার মনের গভীরে প্রোথিত করেছেন। জীবনের প্রথম ধাপেই তার কাছে শিখেছিলাম, ‘বিয়েই একজন মেয়ের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে না।’ তার কাছ থেকে শেখার অদম্য আকাক্সক্ষা আজও সমান অম্লান। তাই ধবধবে সাদা শাড়ি পরা সাদা মনের প্রিয় মিস্ মুৎসুদ্দিকে নিশ্চিত প্রেরণায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছি জীবনের সম্মুখ পানে।
এ সাহসী মানুষটির কাছ থেকে এখনও আমার শেখার আছে অনেক কিছু।