Tuesday, July 21, 2015

রেলওয়ের দুর্দশা ও মন্ত্রীর গলাবাজি by মইনুল ইসলাম

২২ মে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে মহানগর গোধূলী ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার সময় যে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হলো, সেটাই আমাকে রেলওয়ের বর্তমান দুর্দশা সম্পর্কে লিখতে বাধ্য করল। আমি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি অনার্স কোর্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ট্রেনগুলোর নিয়মিত যাত্রী ছিলাম। তাই গত ৪৮ বছরের ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই লেখাটা লিখছি। মহানগর গোধূলী ট্রেনটি কিছুদিন আগেও দেশের খানদানি কয়েকটি আন্তনগর ট্রেনের মর্যাদা পেত। কিন্তু বর্তমান রেলমন্ত্রীর অপরিণামদর্শী ও খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে ট্রেনটি এখন ‘লোকাল ট্রেনে’ পরিণত হয়েছে। এখন ট্রেনটি অতিরিক্ত চারটি স্টেশনে থামছে। তার চেয়েও অসহনীয় হলো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কম্পার্টমেন্টগুলোর প্রতিটিতেই ফেনী স্টেশনের পর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৪০-৫০ জন যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকায় সবার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড় হচ্ছে। এসব দাঁড়ানো যাত্রী বৈধ যাত্রী কি না, সে বিষয়েও সদুত্তর মেলেনি। (যাত্রা শুরুর ১০ মিনিট পর এক ঘণ্টারও বেশি সময় শীতাতপনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিকল হয়ে থাকায় এসব কম্পার্টমেন্টের যাত্রীদের চট্টগ্রাম থেকে চিনকি আস্তানা স্টেশন পর্যন্ত নরক–যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল। ট্রেনটির জেনারেটর নাকি প্রায়ই বিকল হয়ে যাচ্ছে।) এহেন বিপুল যাত্রীবাহী ট্রেনটি রাত নয়টার স্থলে রাত সাড়ে বারোটায় ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছানোর পর এই কষ্টকর অভিজ্ঞতার সমাপ্তি ঘটে। পরদিন ফিরতি যাত্রার সময় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে বেলা তিনটায় ছেড়ে এসে চট্টগ্রামে পৌঁছাতেও রাত পৌনে এগারোটা বেজে গিয়েছিল। মানে, সুবর্ণ এক্সপ্রেস পৌনে আট ঘণ্টা সময় নিয়েছে এবং আগের দিন মহানগর গোধূলী সাড়ে নয় ঘণ্টায় যাত্রা সম্পন্ন করেছে। ট্রেনে কর্মরত রেলওয়ে কর্মচারীরা জানালেন, এটাই নাকি অহরহ ঘটছে। অথচ বহুকাল আগের ট্রেন ‘উল্কায়’ পাঁচ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছে যেতাম আমরা। মহানগর প্রভাতি এবং গোধূলি ট্রেনগুলোও চালু হওয়ার পর বেশ কিছুদিন সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছাত।
তাহলে আমরা রেলওয়ের যে অগ্রযাত্রার কাহিনি শুনতে পাচ্ছি, সেটা কি শুধুই গলাবাজি? ২০১৫ সালের জানুয়ারি-মার্চের বিএনপি-জামায়াতের নাশকতামূলক তাণ্ডবের জের কি এখনো চলছে রেলওয়েতে? নাকি রেলমন্ত্রীর অদক্ষতা ও নেতৃত্বের দুর্বলতা রেলের দুর্দশাকে আরও শোচনীয় করে তুলছে? সৈয়দ আবুল হোসেনের অযোগ্যতা ও খামখেয়ালিপনা ২০০৯-১২ পর্বে শেখ হাসিনার সরকারকে যে মহাবিপদে ফেলে দিয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। মন্ত্রিত্ব কারও আবদার মেটানোর জন্য বা কাউকে কৃপা বিতরণের জন্য প্রদত্ত হলে পুরো জাতিই বিপদে পড়ে যায়।
রেল মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী শুরু থেকেই ইমেজ–সংকটে পড়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি দৃঢ়ভাবে রেল মন্ত্রণালয়ের হাল ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ শেখ হাসিনা রেলওয়েকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার প্রদানের ঘোষণা দিয়ে চলেছেন!
অতীতেও বেশ কয়েকবার লিখেছি যে এ দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে রেলওয়ে ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে যোগাযোগকে অবহেলা করে সড়কযোগাযোগকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের নীতি মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। রেলওয়ে ও নৌ-যোগাযোগের মতো পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার পরিবর্তে আমাদের নীতি প্রণেতারা এখনো কেন সড়কযোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছেন তা বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক একটা দেশে নৌ-যোগাযোগ যে এখনো অবহেলিত ও অনুন্নত রয়ে গেছে, সেটা একজন অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি কোনোমতে মানতে পারি না। অনেকেই হয়তো জানে না যে যত্রতত্র অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণের কারণেই সারা দেশের নগর ও গ্রামগুলোতে পানি নিষ্কাশন বিপর্যস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা তীব্র হয়ে উঠছে এবং নদ-নদী ও খাল-নালাগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এটাও হয়তো অনেকের অজানা যে প্রতি বর্গকিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হিসাবে বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সড়কপথ রয়েছে (বেশির ভাগই অবশ্য কাঁচা রাস্তা)। এটা আমাদের অপরিকল্পিত উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার প্রতিফলন। যে দেশের ওপর দিয়ে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা রিভার সিস্টেমের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ২৩০টি বড় নদ-নদী এবং সাত শতাধিক খালের নেটওয়ার্ক প্রবাহিত, সে দেশে সড়কযোগাযোগকে অগ্রাধিকার প্রদানের নীতি যে কত বড় আহাম্মকি, তা নীতি প্রণেতারা এখনো উপলব্ধি করতে পারছেন না! নদ-নদী-খালের এই নেটওয়ার্ক আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার নেয়ামত, কিন্তু আমাদেরই ভুলে ওগুলোকে ভরাট করে ফেলে নানা রকম পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছি। ওগুলোর নাব্যতা বজায় রাখতে পারলে বন্যার সঙ্গে আমাদের সহাবস্থান যেমন অর্জিত হবে, তেমনি নৌপরিবহনের আধুনিক ও স্বল্পব্যয়ী নেটওয়ার্কও সহজলভ্য হবে।
এর পরের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত রেলযোগাযোগ। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলে এ দেশের রেলওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল প্রধানত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চা-বাগানগুলোর উৎপাদিত চা রপ্তানি সহজ করার স্বার্থে। সে জন্য ২১৩ মাইল দীর্ঘ চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথটি আখাউড়া পর্যন্ত গিয়ে ৬৩ মাইল ঘুরপথ দিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে। আবার দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ ঢাকায় না এসে কলকাতায় চলে গেছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের ৬৮ বছর পার হয়ে গেলেও কোনো সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ৬৮ মাইল ঘুরপথ বাদ দিয়ে লাকসাম বা কুমিল্লা থেকে দাউদকান্দি ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেলপথকে মাত্র ১৫০ মাইলে নামিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আজও শুরু করতে পারেনি। অথচ লাকসাম-ঢাকা কর্ডলাইন নামে খ্যাত একটি প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়ে রয়েছে প্রায় ৩৫ বছর আগে। কিছুদিন আগে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক কুমিল্লা-ঢাকা রেলপথ নির্মাণ কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে বলে ঘোষণা করেছেন। আশা করি, অতীতের মতো এবার আর ফাঁকা বুলি আওড়াননি মন্ত্রী মহোদয়। এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে দেশের রেল–যোগাযোগব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। (লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্প তখন আর গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না।) নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের রেল–যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হবে। ঢাকা নগরের মেট্রোরেল পাতাল রেলপথের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হলে এ দুটি রেল নেটওয়ার্ক একটা আধুনিক যুগে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। একটা ব্যাপার খুবই দুঃখজনক যে ২০০৮ সালের পর চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথে নতুন কোনো যাত্রী বগি সংযুক্ত হয়নি। শোনা যাচ্ছে, এবারের ঈদুল ফিতরের আগেই দেশে প্রায় ৩০০ নতুন বগি আমদানি করা হবে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব নতুন ট্রেন চালু করার অঙ্গীকার কবে বাস্তবায়িত হয় সে জন্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথটি ডুয়াল গেজ কেন করা হলো না, সে প্রশ্নটিও এ পর্যায়ে সামনে চলে আসা উচিত। রেলওয়ের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এখন এতখানি অগ্রসর হয়েছে যে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে শুধু মিটারগেজ ট্রেন চালাতে হবে এমন ধারণা অচল হয়ে গেছে। ব্রডগেজ ট্রেন এখন চট্টগ্রাম ও সিলেটে যেতে পারবে। সারা দেশকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ–সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করার ব্যাপারটিও আমাদের চিন্তায় রাখা উচিত।
রেলযোগাযোগ ও নৌ–যোগাযোগব্যবস্থা শুধু যে পরিবেশবান্ধব তা নয়, এগুলোকে দরিদ্রবান্ধব পরিবহনব্যবস্থাও বলা হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিচারেও সড়ক পরিবহনের চেয়ে রেলপথ উত্তম। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ট্রেনগুলোতে ভ্রমণের সুযোগ যাঁদের হয়েছে, তাঁরা ঠিকই উপলব্ধি করবেন, তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কটিকে কতখানি সহজলভ্য ও আরামদায়ক করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ভারতে গেলে আফসোসের অন্ত থাকে না আমাদের দেশের রেলওয়ের দুর্দশা দেখে। ব্রিটেনের মানুষ পারতপক্ষে সড়কপথে ভ্রমণ করে না, তাদের রেলযোগাযোগের স্বল্প ব্যয় ও আরামপ্রদ ব্যবস্থার কারণে। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের এই অবদানটিকে প্রশংসনীয় মনে করেছেন ঐতিহাসিকেরা।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে পাকিস্তান আমলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিরা নব্য ঔপনিবেশিক শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের রেলব্যবস্থা বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পেরিয়ে এসেও এই বিপর্যয় কাটাতে যথাসম্ভব প্রয়াস নিতে আমরা গাফিলতি করছি কেন? মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, বর্তমান সরকার নতুন কোনো সড়ক নির্মাণকে আর অগ্রাধিকার দেবে না। এটা যদি সরকারের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে সরকারকে সাধুবাদ জানাই। এবার অনুগ্রহ করে রেলওয়ে ও নৌপরিবহনের উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া হোক। বিশেষত রেলওয়ে ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ তুলনামূলকভাবে সহজসাধ্য। তাই এবারের উন্নয়ন বাজেটে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে রেলওয়েকে বেছে নিন। প্রয়োজনে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গতিশীলতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করুন। ট্রেনে ভ্রমণ এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষের বেশি পছন্দনীয়। কিন্তু ট্রেনের টিকিট নিয়ে কালোবাজারিদের যে মচ্ছব, তা বহু দিন আগেই অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। ফলে বাধ্য হয়ে এখন সড়কপথে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। (আমি নীতিগতভাবে কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট কিনি না।) এবার বহু দিন পর ট্রেনের টিকিট পেয়েছিলাম। কিন্তু যে যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা হলো, তার আশু অবসান চাই। রেলমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীরও।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

কী এক অবিশ্বাস ওভার মুস্তাফিজের!

ভেঙে গেল ডি ককের প্রতিরোধ। ছবি: শামসুল হক
টি-টোয়েন্টির প্রথম উইকেটটি শহীদ আফ্রিদির, ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা তারকাদের একজন। ওয়ানডের প্রথম উইকেটটি রোহিত শর্মার, ওয়ানডে ক্রিকেটের একমাত্র ব্যাটসম্যান দুটো ডাবল সেঞ্চুরি আছে যাঁর, ওয়ানডের সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিকও। আর আজ টেস্টে প্রথম উইকেটটা নিলেন হাশিম আমলাকে আউট করে, বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বেরই অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান, নাম লেখাতে পারেন সর্বকালের সেরাদের খাতায়। মুস্তাফিজুর রহমান যেন ঠিকই করেছেন, খাতা খুলবেন বড় শিকার দিয়ে। মুস্তাফিজ যেন ঠিকই করেছেন, অভিষেকেই উপহার দেবেন একটি করে চমক।
আজও চমকে দিলেন। প্রথমে টানা ১৩ ওভার উইকেটশূন্য থেকে। সেই তিনিই এক ওভারে তুলে নিলেন ৩ উইকেট! ৭৮ বলের অপেক্ষা শেষে ১৪তম ওভারের প্রথম বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানালেন হাশিম আমলাকে। পরের বলটা সুইং করল। জেপি ডুমিনি লাইন মিস করলেন। বল লাগল প্যাডে। জোরালো এলবিডব্লুর আবেদনে সাড়া দিলেন না আম্পায়ার। রিভিউ নিল বাংলাদেশ দল। এলবিডব্লুর আবেদনের বিরুদ্ধে রিভিউ নিলে সম্ভাবনার হার কম থাকে। কিন্তু হক আইতে যা দেখা গেল, তাতে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে পারলেন না।
পর পর দুই বলে দুই উইকেট। টেস্ট অভিষেকেই হ্যাটট্রিকের সামনে মুস্তাফিজ! টেস্ট ইতিহাসে অভিষেকে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড মাত তিনজনের—মরিস অ্যালম, পিটার পেথেরিক ও ডেমিয়েন ফ্লেমিংয়ের। সেই তালিকায় নাম উঠবে তো মুস্তাফিজের? অলক কাপালি আর সোহাগ গাজীর পাশে উঠবে তাঁর নাম?
তৃতীয় বলটাও দারুণ হলো। কিন্তু হ্যাটট্রিক বলটা কোনো মতে ঠেকিয়ে দিলেন ডি কক। অবশ্য চূড়ান্ত সর্বনাশ ঠেকাতে পারলেন না। এক বল পরেই ককের অফ স্টাম্প উড়িয়ে দিলেন মুস্তাফিজ। কেবল স্টাম্প উড়ছিল না, উড়ছিল গোটা দলই!
এ দফা হ্যাটট্রিক না হলেও রেকর্ড বইয়ের আরেকটি অধ্যায়ে নাম লিখিয়েছেন মুস্তাফিজ। টেস্ট ইতিহাসে চার বলে তিন উইকেট নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে মোট ৩৭ বার। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন মুস্তাফিজ। আর সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছে ১৮ বছর আগে। ১৯৯৭ সালে ফয়সালাবাদ টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রোটিয়া পেসার শন পোলক পেয়েছিলেন চার বলে তিন উইকেট।
কী এক অবিশ্বাস্য ওভারটাই না করলেন!

খালেদার দল পুনর্গঠন এখনো ‘বাত কা বাত’? by রিয়াদুল করিম

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৯ মে এক মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, তিনি আবার দল পুনর্গঠন করবেন। মধ্যে আরও কয়েকটি অনুষ্ঠানে একই কথা বলেন। সর্বশেষ গতকাল ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় শেষেও বললেন একই কথা। অর্থাৎ​ আড়াই মাস ধরে খালেদা জিয়া দল গোছানোর কথা বলে চলেছেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এই আড়াই মাসে দল গোছানোর তেমন কোনো কাজই হয়নি। অবশ্য খালেদা জিয়া চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করতে পারেন।
অবশ্য সূত্রগুলো এ-ও বলছে যে, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এখন দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। তবে তা কখন থেকে শুরু হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। মির্জা ফখরুলসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা কারাগারে থাকায় এত দিন কাজ শুরু হয়নি। মির্জা ফখরুলের মুক্তিতে এখন অনেকে আশাবাদী। কিন্তু তিনি চিকিৎসার জন্য এ মাসের শেষ সপ্তাহে বিদেশ যাবেন। তাঁর ফিরতে কত দিন লাগবে তা নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে এখনো পলাতক। পরিস্থিতি আরও ‘স্বাভাবিক’ না হলে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা কঠিন হবে। তবে ঈদের ছুটি শেষে যত দ্রুত সম্ভব বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন শুরু করা হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, দল পুনর্গঠনের বিষয়টি এখনো ‘বাত কা বাত’ পর্যায়ে আছে। কোনো কাঠামো দাঁড়ায়নি। পুনর্গঠন নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে দল পুনর্গঠন হবে তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ধোঁয়াশা আছে। তিনি জানান, সর্বশেষ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়া দল গোছানোর কথা বলেছেন। কিন্তু তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। এ নিয়ে বেশি আলোচনাও হয়নি। ওই নেতার মতে, দুই দফায় টানা আন্দোলন সফল না হওয়া আর হামলা-মামলার ঘটনায় নেতা-কর্মীরা চরম হতাশ। এখন আবার আন্দোলনে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই। এ অবস্থায় দল গোছানোর কথা বলে নেতা-কর্মীদের চাঙা রাখা যায়। তবে তিনি মনে করেন, আসলেই দল পুনর্গঠন করা জরুরি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন তা শুরু করবেন। তার আগে দলীয় ফোরামে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এখন দল গোছানোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে আন্দোলন সফল হবে। পুনর্গঠন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবও মুক্তি পেয়েছেন। দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এর আগে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহতের আন্দোলনের পর গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, দল গুছিয়ে তাঁরা আবার আন্দোলন শুরু করবেন। তাঁর ওই বক্তব্যের দুই মাস পর এপ্রিলে গিয়ে পঞ্চগড়, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, নওগাঁ, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম উত্তর, ময়মনসিংহ উত্তরসহ বেশ কয়েকটি জেলা কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। ১৮ জুলাই ঘোষণা করা হয় ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি। এ ছাড়া ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি (আংশিক) ও শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও এসব কমিটির প্রায় কোনটিই পূর্ণাঙ্গ করা হয়নি। দুমাসের মধ্যে ঢাকা মহানগর বিএনপির সব ওয়ার্ড, থানা কমিটি করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আহ্বায়ক কমিটিকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি ওয়ার্ড কমিটিও ঘোষণা করতে পারেনি তারা।
ওই সময় দল পুনর্গঠন শেষ না করেই চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে আবার লাগাতার হরতাল-অবরোধের ডাক দেয় বিএনপি। তবে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে অবরোধ-হরতাল সারা দেশে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে টানা তিন মাসের আন্দোলনে ছেদ টেনে হঠাৎ ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। এখন আবার দল গোছানোর দিকে দলটি মনোযোগ দিচ্ছে। এর আগে আন্দোলনে ব্যর্থতার অভিযোগে ঢাকা মহানগরে খোকা-সালাম কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন কমিটিকেও আন্দোলনে মাঠে দেখা যায়নি। ঢাকায় এবারও বিএনপি কর্মসূচি পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন দলের নেতারা। তাই পুনর্গঠন আসলে কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে দলের অনেকের প্রশ্ন আছে।
বিএনপি মনে করছে, এখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন। কারণ, টানা তিন মাসের আন্দোলনে নেতা-কর্মীরা ক্লান্ত। হাজার হাজার নেতা-কর্মী মামলার আসামি, অনেকে কারাগারে, অনেকে পলাতক। চলছে বর্ষা মৌসুম। সব মিলিয়ে এ সময়টিতে বড় কিছু না হলে বিএনপি রাজপথের আন্দোলনে যেতে চায় না। বরং এ সময় সংগঠনকে কিছুটা গোছানোর চেষ্টা করবে দলটি। দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কিছু খোঁজখবর করছেন। অক্টোবর নাগাদ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করা যায় কি না ভাবা হচ্ছে। এবার দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ওপরে আরেকটি কমিটি করা যায় কি না, তা চিন্তাভাবনা চলছে। দলীয় নেতাদের পাশাপাশি সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, কিন্তু বিএনপিমনা ও গ্রহণযোগ্য এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিটি করার চিন্তা আছে। তবে এমনটি করতে হলে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর বিএনপিকে দুই ভাগে ভাগ করারও চিন্তা আছে। তবে এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি।

শুধু ঘর পোড়েনি, পুড়েছে স্বপ্নও by একরামুল হুদা

আগামী মাসের ৩ তারিখ মেয়ে কল্পনার বিয়ে। তাই দিনমজুর দানা মিয়া কষ্টের জমানো টাকা দিয়ে মেয়ের জন্য সোনার গয়না কিনেছেন। করে রেখেছিলেন আনুষঙ্গিক আরও বাজার সদাইও। প্রথম মেয়ের বিয়ে, তাই সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব ধুমধাম করেই বিয়ে দেবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু সব স্বপ্ন, সব আশা নিমেষেই পুড়ে গেল আগুনে। বাড়ির অন্য সব জিনিসের সঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে মেয়ের বিয়ের জন্য করা সব বাজার। দানা মিয়া বলেন, ‘আগুন লাগছে শুইনা নিচে নামছি, আর উঠতে পারি নাই। আমার সব শেষ হইয়া গেছে।’
রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় আজ সোমবার আগুনে পুড়ে যাওয়া টিনশেড ঘরগুলোর একটিতে থাকতেন দানা মিয়া। দানা মিয়ার মতো পুড়েছে আরও অনেকের সংসার। অনেকের স্বপ্ন। আজ বেলা পৌনে একটার দিকে প্রগতি সরণির ডিআইটির উল্টোদিকে ওসমান গণির বস্তি নামে পরিচিত ওই বস্তিতে আগুন লাগে। ওসমান গণির ছোট ভাই বাড্ডা আলাতুন্নেসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক। তিনি বলেন, তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের মোট ১০টি টিনশেড বাড়ি ছিল। বাঁশ, কাঠ ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি প্রতিটি বাড়িই দুই থেকে তিন তলা। বাড়ি ১০টিতে মোট ৭০০ থেকে ৮০০ পরিবার বাস করত। আজকের আগুনে ১০টি টিনশেডের ছয়টিই ছাই হয়ে গেছে। বাকিগুলোও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
বস্তির বাসিন্দা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মচারী মাজেদা বেগম কয়েক দিন আগে ২৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি ফ্রিজ কিনেছিলেন। স্বামী রুহুল আমিন ভ্যান চালান। এক সন্তান তাঁদের। আগুন লাগার কথা শুনে ঘরের বাইরে বের হন। তখনো জানতেন না তাঁদের ওখানেই আগুন লেগেছে। পরে আর ঘরে ঢুকতে পারেননি। আগুনে পুড়ে গেছে সব। তিনি বলেন, ‘মাত্রই সংসারডা গুছাইয়া আনছিলাম। এখন সব শেষ হয়ে গেল। সবাই ঈদে দেশে গেছে গা। আমরা খালি দুই ঘর ছিলাম। দেশে গেলে টাকা পয়সা নিতাম। এখন সেগুলোও পুইড়া গেছে।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুচকা তৈরির একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত। প্রথমে হালকা আগুন লাগলেও হঠাৎ করেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের ছুটিতে অনেকেই বাড়িতে চলে যাওয়ায় প্রায় সব ঘরই তালাবদ্ধ ছিল। তবে নুরজাহান, সুফিয়া, শিউলি, ফাতেমা বেগম, আজাদসহ অনেকেই প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা বাসায় থাকলেও ঘরের কোনো জিনিস বের করে আনতে পারেননি।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে জানানো হয়, ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ করে। সোয়া দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেল পাঁচটার সময় আগুন নেভানোর কাজ পুরোপুরি শেষ হয়। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজে সহায়তা এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কাজ করছিল রেড ক্রিসেন্টের ২৫ সদস্যের একটি দল। রেড ক্রিসেন্টের ডেপুটি ইয়ুথ চিফ আনিসুর রহমান বলেন, বিকেল চারটা পর্যন্ত তাঁরা কমপক্ষে ৩০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন। এর মধ্যে অনেকের শরীরের বিভিন্ন জায়গা আগুনের আঁচে পুড়ে গেছে আবার টিনে আঘাতে কোথাও কোথাও কেটে গেছে।
আগুনে যাঁদের ঘর পুড়েছে ক্ষতি শুধু তাঁদেরই হয়েছে তা নয়। যাদের ঘর পোড়েনি, ক্ষতি হয়েছে তাঁদেরও। তেমনই একজন মরিয়ম। মরিয়মের বাড়ি নান্দাইলে। ঈদের বন্ধে বাড়িতে গিয়েছেন তিনি। পারভিন নামের এক নারীর বাড়িতে কাজ করেন মরিয়ম। আগুন লাগার খবর শুনে পারভিন মরিয়মের ঘরের খবর নিতে এসে দেখেন মরিয়মের ঘরের দরজা জানালা ভাঙা। ঘরের ভেতর কোনো মালামাল নেই। পরে ফোনে মরিয়মের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন মরিয়মের ঘরে প্রায় সাত হাজারের মতো টাকা ও স্বর্ণের কানের দুল ছিল। এখন নেই এর কিছুই। পারভিন বলেন, ‘শুনলাম, প্রত্যেক ঘরেই চুরি হইছে। কেউ আগুন নেভাতে ব্যস্ত ছিল, আর কেউ মালামাল লুটে।’

গ্রিসের ঋণ পরিশোধ শুরু

ইউরোপের দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ পরিশোধ শুরু করেছে গ্রিস। সোমবার ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (ইসিবি) ৪২০ কোটি ইউরো (৪৬০ কোটি ডলার) পরিশোধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকেও (আইএমএফ) উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছে গ্রিক অর্থ মন্ত্রণালয়। খবর এএফপির। গ্রিক অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, ‘ঋণ-পরিশোধ শুরু হয়েছে।’ শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ৭১৬ কোটি ইউরো স্বল্পমেয়াদি ঋণ পাওয়ার ফলে এ অর্থ হস্তান্তর করতে পারছে গ্রিস। এদিকে তিন সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর সোমবার খুলে দেয়া হয়েছে গ্রিসের সবক’টি ব্যাংক। দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে গত ২৯ জুন থেকে সাময়িকভাবে ব্যাংক বন্ধ রাখা ও এটিএম থেকে টাকা তোলার সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল গ্রিস সরকার। কঠোর ব্যয় সংকোচনের শর্তে করা সংস্কার চুক্তির বিনিময়ে ঋণদাতাদের কাছ থেকে তৃতীয় বেইল আউটের অর্থ পেয়েছে গ্রিস। এ চুক্তির মাধ্যমে ঋণ খেলাপি হওয়া এড়িয়ে ইউরোজোনে টিকে থাকতে পেরেছে গ্রিস। ব্যাংক বন্ধ হওয়ার পর এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারতো গ্রিসবাসীরা।
কিন্তু দিনে ৬০ ইউরোর বেশি তুলতে পারতো না। ব্যাংকগুলোতে তারল্য শূন্যতা ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল কঠিন আর্থিক সংকটে পড়া গ্রিক সরকার। এরপর থেকে গত তিন সপ্তাহজুড়ে এটিএম বুথগুলোর সামনে গ্রিকদের লম্বা লাইন পড়তো। কিন্তু সোমবার থেকে গ্রিকরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪২০ ইউরো একবারেই তুলতে পারবে বলে জানিয়েছে সরকার। জার্মান পার্লামেন্টে গ্রিসের ঋণ প্রস্তাবনা পাস : উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্কের পরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জার্মান পার্লামেন্টে পাস হয়েছে গ্রিসের ঋণ এবং ব্যয় সংকোচন সংক্রান্ত প্রস্তাবনা। তবে এত কাঠখড় পুড়িয়ে ঋণ পাওয়ার সুযোগ এলেও গ্রিসের পদত্যাগপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস বলেছেন, পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হবে গ্রিস। এদিকে, সিরজা পার্টির যেসব সদস্য ব্যয় সংকোচন প্রস্তাবনার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাদের মন্ত্রিত্ব থেকে বহিষ্কার করেছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপরাস।

৫৪ বছর পর খুলল দূতাবাস

পাঁচ দশক ধরে চলা বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার চালু করেছে। রোববার স্থানীয় সময় মধ্যরাতের পর দুই দেশে থাকা পরস্পরের কূটনৈতিক মিশনকে পূর্ণ দূতাবাসে পরিণত করা হয়। এরই মধ্য দিয়ে অর্ধ-শতকের স্নায়ুযুদ্ধ শেষে নতুন এক যাত্রা শুরু করল দেশ দুটি। ৫৪ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। গত বছর ১৭ ডিসেম্বর দূতাবাস খোলার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন দুই দেশের প্রেসিডেন্ট- বারাক ওবামা ও রাহুল ক্যাস্ত্রো। সোমবার কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রোনো রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনস্থ দেশটির দূতাবাসের শুভ উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের রান টেলিভিশন। কিউবান কূটনীতিকদের একটি প্রতিনিধি দলও শিল্পীসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৫০০ ব্যক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কিউবার পতাকা উত্তোলন করা হয়। তবে আগামী মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি কিউবা সফর না করা পর্যন্ত হাভানায় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলন করা হবে না। এর আগে, হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সমঝোতার ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেন ।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, এটি তার মেয়াদ কালের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অর্জন। উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে প্রথম কিউবাকে সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বিভিন্ন সংগঠনকে সশস্ত্র বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ করতে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, কিউবা অনেকদিন ধরে কলোম্বিয়ার ফার্ক বিদ্রোহী ও লাতিন আমেরিকায় সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ইটিএ’র সদস্যদের নিরাপদ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা দেশগুলোর তালিকায় সিরিয়া, ইরান, সুদানের মতো দেশের নামও রয়েছে। দূতাবাস চালুর পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজের সঙ্গে ওয়াশিংটনে আলাপ করেছেন। দুই দেশের জন্যই বিষয়টি ঐতিহাসিক হলেও এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধকালীন দুদেশের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। সেই দীর্ঘ বৈরিতার ইতি টেনে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবা গত জানুয়ারি থেকে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করে।

যেভাবে এল তিন সিরিজ জয় by তারেক মাহমুদ

ক্রিকেটাঙ্গনে এখন ‘কমন’ রসিকতা—আর কোনো দল তো বাংলাদেশে খেলতে আসবে না। এখানে এলেই যে সবাই হারে! নিশ্চয়ই এখন সব দল বাংলাদেশকে নিজেদের দেশে ডেকে নিয়ে খেলতে চাইবে।
রসিকতাকে রসিকতার মধ্যে রাখাই ভালো। তবে বাস্তবতাও কি এর চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন? পাকিস্তান, ভারতের পর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও ওয়ানডে সিরিজে হারিয়ে বাংলাদেশ তো আসলেই নিজেদের মাঠে হুংকার ছাড়ল! কী এমন জাদুমন্ত্র লুকিয়ে আছে এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে? বাংলাদেশে এসে কেন সবাইকেই বিদায় নিতে হচ্ছে লেজ গুটিয়ে? তিন সিরিজে বাংলাদেশ দলকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে সেটাই খুঁজে বের করতে চেয়েছেন তারেক মাহমুদ

পাকিস্তান: লক্ষ্যই ছিল সিরিজ জয়
বিশ্বকাপের পর পরই হলো পাকিস্তান সিরিজ। একে তো দেশের মাটিতে খেলা, তার ওপর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে আসার আত্মবিশ্বাসও তখন সঙ্গী। বড় কিছুর স্বপ্ন তাই চলেই আসছিল। স্বপ্নের পরিধি বাড়িয়ে দিল পাকিস্তানের অনভিজ্ঞ দল। কাউকে বাদ দেওয়া হলো, কেউ নিলেন অবসর। বাংলাদেশের সামনে খুলে গেল সম্ভাবনার দরজা। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার ভাষায়, ‘বিশ্বাস ছিল, পাকিস্তানকে অন্তত দুটি ওয়ানডেতে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে।’
দুটি নয়, একে একে তিনটি ওয়ানডেই জিতে গেল বাংলাদেশ! কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলার মন্ত্র যেন দলের শিরায় বইয়ে দিল আত্মবিশ্বাসের তাজা স্রোত। একেক দলের বিপক্ষে ‘রণকৌশল’ একেক রকম হতেই পারে। তবে পাকিস্তান সিরিজের সাফল্যে একটা বিশেষ প্রতিজ্ঞা ভর করল দলের মধ্যে, খেলতে হবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। ‘এই একটা জায়গায় আমরা কোনো সিরিজেই আপস করিনি। অনেক সমালোচনার পরও আট ব্যাটসম্যান খেলানোর পরিকল্পনায় অটল ছিলাম। দলের জন্য যেটা ভালো মনে করেছি সেটাই করেছি’—বলেছেন অধিনায়ক
ভারত: এগিয়ে দিল প্রথম জয়টাই
ভারতকে অনভিজ্ঞ পাকিস্তানের মতো সহজ ভাবার কারণ ছিল না। তবু জয়ের ধারা থেকে এই সিরিজেও সরতে চায়নি বাংলাদেশ। লক্ষ্য ছিল অন্তত একটি হলেও ম্যাচ জেতার। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পরের সিরিজেও জয়ের অভ্যাসটা সঙ্গী থাকে তাহলে। কিন্তু প্রথম ওয়ানডেতেই সেই কাঙ্ক্ষিত জয় এসে যাবে, তা কে ভেবেছিল! ওই এক জয় পুরো সিরিজের চিত্রনাট্যই বদলে দিল।
ভারত সিরিজে চমক ছিলেন তরুণ বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। অধিনায়ক মাশরাফির দৃষ্টিতে যিনি একাই গড়ে দিয়েছেন ব্যবধান, ‘মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল আমরা কিছু একটা করতে পারব।’
সেই ‘কিছু একটা’ শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামল সিরিজ জয়ে। কিন্তু শেষ ম্যাচে এ কোন বাংলাদেশ? টানা ম্যাচ খেলার ক্লান্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেই হোক, কিংবা আত্মতৃপ্তি বা অন্য কিছু; জয়ের ধারাবাহিকতা শেষ ম্যাচ পর্যন্ত ধরে রাখা গেল না। সিরিজ শেষে মাশরাফি অবশ্য বলেছেন, ভারতকে হোয়াইটওয়াশ করার যে প্রত্যাশা ভর করেছিল দলের ওপর, কাল হয়েছে সেটাই। ভয়ডরহীন ক্রিকেটের পাশাপাশি ‘নির্ভার ক্রিকেট’ খেলার স্লোগানও উচ্চারিত হয় এই সিরিজের পর।
দ. আফ্রিকা : সবচেয়ে বড় সাফল্য
পাকিস্তান, ভারতের বিপক্ষে এক মাসের মধ্যে দুটি সিরিজ জয় প্রত্যাশার সীমায় নিয়ে আসে দক্ষিণ আফ্রিকাকেও। প্রথমে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য সিরিজের শুরু অস্বস্তি দিয়ে। তারপরও ভারত সিরিজের মতো প্রথম ম্যাচটিকেই পাখির চোখ করে বাংলাদেশ। যেভাবেই হোক জিততে হবে এই ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে জিতলে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত সিরিজে থাকা যায়।
তবে এবার হলো না। হার দিয়ে শুরু দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। সেই হার উসকে দেয় সমালোচনার বিষবাষ্প। তাহলে কি পুরোনো দিনে ফিরে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট? শেষ হয়ে গেল সাফল্যের মধুচন্দ্রিমা!
না, আহত বাঘ শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে। মাশরাফির দলও পিছু হটল না। ঢাকায় পরের ম্যাচেই সমতা এনে চট্টগ্রামে হ্যাটট্রিক সিরিজ জয়ের উৎসব করল বাংলাদেশ। মাশরাফির দৃষ্টিতে তো তিন সিরিজ জয়ের মধ্যে এটাই সবচেয়ে এগিয়ে, ‘আমরা আমাদের আসল চেহারাটা দেখিয়েছি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ওদের মতো দলের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ হেরেও ২-১-এ সিরিজ জয় বিরাট সাফল্য। আমাদের ক্রিকেটের জন্যই অন্য রকম পাওয়া এটা।’
সিরিজ জয়ের ঝা-চকচকে সব ট্রফিতে ভরে উঠেছে বিসিবির শোকেস। তবে ট্রফি নয়, তিন সিরিজে তিন রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও শেষ হাসি হাসতে পারাটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বাংলাদেশের। প্রথম সিরিজে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেওয়ার পরও ভারতের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশের চাপ নিতে না পারা আরেকবার তাদের সামর্থ্যকে দাঁড় করিয়েছিল আত্মোপলব্ধির আয়নার সামনে। সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে বাংলাদেশ করে দেখিয়েছে আসল কাজটা, যা এত দিন অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো দলের কাছেই দেখেছে সবাই। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পেশাদার দলের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে হেরেও ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ জেতা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক মাইলফলক।
মাশরাফির দৃষ্টিতে অবশ্য এটাই পেশাদারি। বড় দল হয়ে ওঠার লক্ষণ, ‘আপনি যখন সব সময় জিততে থাকবেন তখন জেতাটা সহজ হয়ে যায়। যেকোনো দলের বিপক্ষেই তখন ছন্দে থাকবেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়টা এখানেই আলাদা।’ তাঁর হিসাবে, তিন সিরিজেই ৯০ শতাংশ পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পেরেছে বাংলাদেশ। সাফল্যের আসল রহস্য লুকিয়ে এখানেই।

পরীক্ষা এবার টেস্টের by ইশতিয়াক পারভেজ

ওয়ানডে সাফল্যের ডানায় চড়ে টেস্টেও উড়তে চায় বাংলাদেশ। প্রোটিয়াদের ওয়ানডে সিরিজ হারিয়ে ঈদের আগেই ঈদ আনন্দে ভেসেছে দেশ। সেই খুশির রেশ না কাটতেই আজ চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে অনেক স্বপ্ন নিয়ে টেস্ট লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা। যদিও শ্রাবণের অঝোর  কান্নায় প্রায় সারা দেশের মানুষই  ঈদের খুশি ঘরে বসেই ভাগ করে নিতে হয়েছে বৃষ্টির সঙ্গে। তবে গতকাল সকালে চট্টগ্রামে বৃষ্টি হলেও দুপুর থেকেই রোদ ঝলমলে আকাশ। যদিও বৃষ্টির হুমকি থাকছে এই টেস্টে আরও দুটি দিন। এর আগে ঢাকায় প্রথম ওয়ানডে হারলেও ঘুরে দাঁড়ায় দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। এরপর শেষ ম্যাচে সাগরিকাতে প্রোটিয়াদের ক্রিকেট আভিজাত্যের দম্ভ ভেঙে সিরিজ জিতে নেয় মাশরাফি বাহিনী। সেই সাফল্যের পতাকা টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহীমের হাতে তুলে বিদায় নিয়েছেন ওয়ানডের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি। এবার  টেস্ট অধিনায়কের পালা সেই পতাকা আরও দূরে উড়িয়ে নেয়ার। তবে স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবতা বুঝেন মুশফিক। তাই চ্যালেঞ্জ  নিয়ে সেই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন বলেই মনে করেন তিনি। মুশফিক বলেন, ‘যে  কোন কিছু অর্জন করা আর সেটাকে ধরে রাখা খুব কঠিন। এটাই আমাদের বাংলাদেশ দলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। এই  টেস্টেও আমরা ভাল  খেলতে পারি। এটা বাংলাদেশের জন্য  সম্ভব।’
এর আগে ওয়ানডেতে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে একটি জয় ছিল ২০০৭ সালে। ৮ বছর  পর  দুই ম্যাচ জিতেছে টাইগররা ইতিহাস পরিবর্তন করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত টেস্টে সেই  জয় এমনকি কোন ড্রও  নেই র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে থাকা এই দলটির বিপক্ষে। ২০০২  সাল থেকে এই পর্যন্ত ৮ বারের দেখা হার হার হার ছাড়া কিছু পায়নি টাইগাররা। এমনকি প্রোটিয়াদের বিপক্ষে টেস্টে দেশের সর্বাাধক রান করা পাঁচ ব্যাটসম্যান হাবিবুল বাশার (৩০১), জুনায়েদ সিদ্দিক (২১১),  মো. আশরাফুল, জাবেদ ওমর ও আল শাহরিয়ার রোকন দলে নেই। তবে তাদের পরই চার টেস্টে ১৪৫ রান করা মুশফিকুর রহীম আছেন দলের নেতৃত্বে।  সেই সঙ্গে বল হাতে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সর্বাধিক ১৫ উইকেট শিকারী শাহাদাত হোসেন রাজীব ও ১২ উইকেট  নেয়া মো. রফিকও দলে নেই। তবে ১২ উইকেট নেয়া সাকিব আল হাসান আছেন দলে। বলা চলে দলের দুই ভরসা এখন সাকিব ও মুশফিক। অন্যদিকে  দেশের সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল এই  পর্যন্ত  প্রোটিয়াদের বিপক্ষে চারটি টেস্ট খেললেও রান মাত্র ১০৩। নেই কোন সেঞ্চুরি এমনকি ফিফটিও। অন্যদিকে দুই ওপেনার ইমরুল কায়েসের দুই টেস্টে মাত্র ২৫ রান। তবে এই সব পরিসখ্যান এখন প্রোটিয়াদের স্বস্তি দিতে পারবে না।
দলে আছে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুমিনুল হক সৌরভের মত ব্যাটিং ভরসা। আছেন লিটন কুমার দাস ও  সৌম্য সরকারদের প্রতিভার ঝড়। অধিনায়কের কিপিং গ্লাভস এবারও থাকছে লিটন দাসের হাতেই জানিয়েছেন মুশফিকই। শুধু তাই নয় এই ম্যাচে দলের সব চেয়ে বড় চমক হতে পারেন তরুণ পেসার মুস্তাফিজুর রহমান। টি-টোয়েন্টিতে দুর্দান্ত অভিষেকের পর ওয়ানডে অভিষেকে ইতিহাসের জন্ম দেন। এবার টেস্ট অভিষেকে কি হবে? তা কাল মাঠে নামার আগে প্রোটিয়াদের জন্য রহস্যই হয়ে থাকবে। মুস্তাফিজের অভিষেকের বিষয়ে মুশফিক বলেন, ‘কোচ যা বললেন ও (মুস্তাফিজ) শুধু এই ফরম্যাটে না যে  কোন ধরনের ক্রিকেটে ভাল করতে পারে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ও ভাল করেছে। বড় দৈর্ঘ্যর ম্যাচেও কিন্তু ভাল করেছে। ওদের ব্যাটিং লাইনআপের নতুন চার-পঁচজন এসেছে তারা কিন্তু  কেউ মুস্তাফিজকে  দেখেনি বা  খেলে নাই। আমরা যদি ওকে খেলাই অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না, আর সেটা ওর প্রাপ্যই হবে।’ তবে এই ম্যাচে এক পেসার নয় দ্বিতীয় পেসার হিসেবে থাকতে পারেন রুবেল হোসেন। অন্যদিকে স্পিনে সাকিবের সঙ্গে যোগ দিবেন আরেক স্পেশালিস্ট স্পিনার তাইজুলও। আর স্পিন শক্তি বাড়াতে হয়তো এই ম্যাচে দেখা যেতে পারে একমাত্র লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখনকেও। তবে অধিনায়ক টিম কম্বিনেশন ঠিক করেবন মাঠের উইকেট আর আবহাওয়া দেখেই। তাই স্পিনার বেশি খেলবেন নাকি পেসার তা সেটির উপরই নির্ভর করছে। কারণ বদলে গেছে বাংলাদেশ দল। তবে টানা বৃষ্টি পাতে মুশফিকুর রহীম অবশ্য বেশি চিন্তিতো অবশ্য টস নিয়ে। এই কন্ডিশনে দুই দলের জন্য টসে জয়ই হবে এগিয়ে যাওয়ার বড় পুঁজি।
অন্যদিকে হাশিম আমলার নেতৃত্বে ওয়ানডে সিরিজ হেরে ঘোর বিপদেই আছে প্রোটিয়ারা। তাই বলে টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকা দল খুব ভয়ে আছে তা নয়। দলে পাঁচ জন নতুন ক্রিকেটার থাকলেও নিজেদের ও বাংলাদেশের টেস্ট খেলার সামর্থের কথা খুব ভালভাবে জানেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক। সেই সঙ্গে দলে ফিরেছেন বাংলাদেশকে পাত্তা না দেয়া বিশ্বের সেরা পেসার ডেইল স্টেন। আছেন অভিজ্ঞ ফ্যাফ ডু প্লেসি, জেপি ডুমিনি, ডি. কক ও অ্যারন ফাঙ্গিসো। যারা ব্যাট-বল হাতে যে কোন সময় হয়ে উঠতে পারেন ভয়ঙ্কর।

দুই কারণে বাজার চড়া

একদিকে ঈদের ছুটি অন্যদিকে টানা বৃষ্টি। দুই অজুহাতে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। কোথাও মাংস কোথাও কাঁচা পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। ঈদের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মাংসের দাম বেড়েছে। সঙ্গে কাঁচা পণ্যের দামও চড়া। পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি খোদ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি ও সরকারি বিপণন সংস্থা- ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশও (টিসিবি) স্বীকার করেছে। তবে টিসিবি মাত্র পাঁচ পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি ওয়েবসাইটে তুলে ধরেছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, খাসি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা ও  ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। একইভাবে প্রতিহালি ফার্মের ডিম ৩০ থেকে ৩২ টাকা ও প্রতি কেজি দেশী পিয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। টিসিবির ওই তথ্যে আরও দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সাধারণত টিসিবি শাহজাহানপুর, মালিবাগ বাজার, কাওরান বাজার, ঠাঁটারি বাজার, বাদামতলী বাজার, সূত্রাপুর বাজার, শ্যামবাজার, মৌলভীবাজার, রহমতগঞ্জ বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল, নিউ মার্কেট, শান্তিনগর, ফকিরাপুল বাজার, মিরপুর-১ ও ৬নং বাজার এবং আজমপুর বাজার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এর বাইরে রাজধানীর অন্যান্য বাজারের চিত্রও ছিল প্রায় অভিন্ন। ঈদের আগের দিন রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হয় ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। বেড়েছে মসলার দরও। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদ ও টানা বৃষ্টির কারণে কয়েক দিন ধরেই বাজারে কাঁচা মরিচের দর বাড়ছে। একদিকে চাহিদা বেশি অন্য দিকে আমদানি কম। সব মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানান তারা। বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম জানান, ৫ মাস আগেও ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সীমান্ত দিয়ে গরু আনা একদম বন্ধ ছিল। তখন গরুর মাংস ২৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি হয়ে যায়। কিছু ব্যবসায়ী চাহিদা মেটাতে মিয়ানমার থেকে গরু আনা শুরু করেন। তখন কিছুটা কমে। তবে সীমান্তে বিজিবি সদস্য আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে ঝামেলার কারণে সেখান থেকেও গরু আনা বন্ধ হয়ে যায়। সে থেকে গরুর মাংসের দাম বেড়েই চলেছে। এদিকে ঈদের আগের দিন শুক্রবার খুচরা বাজারে এক ধরনের আগুন ধরে যায়। সব পণ্যের দাম বাড়তি। এ সময় মানভেদে প্রতি কেজি শসা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, গাজর ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ধনেপাতা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকা, করলা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ঢেঁড়স ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, কাকরোল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ঝিঁঙা ৪০ থেকে ৫০ টাকা, সাদা গোল আলু ২৫ টাকা, লাল গোলআলু ৩০ টাকা, ধোন্দল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, চিঁচিঙ্গা ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। এছাড়া প্রতি লিটার সয়াবিন তেল (লুজ) ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, ৫ লিটার বোতল ৪৫০ থেকে ৪৮৬ টাকা, এক লিটার বোতল ৯৩ থেকে ১১০ টাকা, পাম অয়েল (লুজ) প্রতি লিটার ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা, পাম অয়েল সুপার প্রতি লিটার ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে সবচেয়ে ভাল মানের এরফানের পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায়; যা কয়েকদিন আগে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা ছিল। পাশাপাশি খোলা পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়। একই সঙ্গে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। এদিকে ঈদকে ঘিরে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির (সাদা) দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়; যা আগে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা ছিল। লেয়ার মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকা থেকে ২১৫ টাকায়; যা আগে ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। যাত্রাবাড়ী পাইকারি কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতা নূরু হাজী বলেন, ঈদের সময় যানজট ও বৃষ্টির কারণে কাঁচা পণ্য আমদানিতে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সে কারণে পণ্যের দর একটু ওঠানামা করছে। এছাড়া ঈদে কয়েকটি মসলার দর অতিরিক্ত বেড়েছে। এর মধ্যে পোলাওয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে খ্যাত আলু বোখারার দর প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, যা তিন দিন আগেও ছিল ৪০০ টাকা কেজি। এ নিয়ে মশলার দর ঈদের আগের দুই দফা বাড়লো। বাংলাদেশ গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী এনায়েতুল্লাহ জানান, মসলার দর ওঠানামা স্বাভাবিক ব্যাপার। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মসলার দর বাড়ে-কমে। এগুলোর দর বছরের বেশির ভাগ সময় ওঠানামা করে। তবে ঈদে মসলার কাটতি তুলনামূলক বেশি কিন্তু আমদানি কম থাকায় কিছু মসলার দর সামান্য বেড়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।