Monday, May 17, 2010

হংকংয়ে চীনের সরকারি বন্ড বিক্রিতে তিন গুণ বেশি আবেদন পড়েছে

চীন ৬০০ কোটি ইউয়ানের সরকারি বন্ড হংকংয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তাব আহ্বান করেছিল ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে।
সময় শেষ হওয়ার পর দেখা গেছে, প্রস্তাবের তিন গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যার পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি ইউয়ান বা ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এই তিন গুণ বেশি আবেদন জমা পড়াকে চীনের অর্থনীতির শক্তিমত্তার প্রতি হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের আস্থারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
৬০০ কোটি ইউয়ানের বন্ডের মধ্যে ৫০০ কোটি ইউয়ান ছাড়া হয়েছে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য। দুই ও তিন বছর মেয়াদি এসব বন্ডের সুদের হার যথাক্রমে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। খবর এএফপির।
বাকি ১০০ কোটি ইউয়ানের বন্ড প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা হয়েছে। এর মেয়াদ পাঁচ বছর ও সুদের হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
সরকারি বন্ড ছেড়ে সরকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ গ্রহণ করে থাকে।

তিব্বতিদের উঁচুতে বাস করার পেছনের কারণ

উঁচু স্থানে তিব্বতিদের বাস করার কারণ খুুঁজতে গিয়ে দুটি জিন (বংশগতির সূত্র) শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। গবেষকদের মতে, এসব জিন তাদের অতি হালকা বায়ুর ভেতর বাস করার শক্তি জোগাতে পারে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন গত শুক্রবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিব্বতের উচ্চতা চার হাজার ৯০০ মিটার (১৬ হাজার ফুট)। এত উঁচুতে বিরূপ পরিবেশে তিব্বতিদের স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার পেছনে বিশেষ জিন রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে গবেষণা চালান চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। পরস্পর আত্মীয় নয় এমন ৩১ জন তিব্বতির জিনের নমুনা জোগাড় করেন তাঁরা। তাদের ডিএনএর সঙ্গে তুলনা করা হয় সমতলে বাস করা ৯০ জন চীনা ও জাপানি নাগরিকের ডিএনএর। গবেষণায় তাঁরা স্থানভেদে জিনগত বৈচিত্র্য খতিয়ে দেখেন।
গবেষকদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উটাহ স্কুল অব মেডিসিনের একলিস ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান জেনেটিকসের গবেষক জিনচুয়ান জিং বলেন, এ গবেষণায় তাঁরা মানবদেহের ১ ও ২২ ক্রোমোজমে ইজিএলএন ১ ও পিপিএআরএ নামে দুটি জিনের সন্ধান পান। ধারণা করা হচ্ছে, এই জিন দুটি অতি উঁচুতে তিব্বতিদের স্বাভাবিক বাস করার ক্ষমতা জুগিয়ে থাকে। তবে উঁচু স্থানে খাপ খাইয়ে চলার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো অনুদ্ঘাটিত রয়েছে। তিনি বলেন, এই জিন দুটি তিব্বতিদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমানোর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিব্বতিদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা অস্বাভাবিক কম। ধারণা করা হয়, এটি তাদের উঁচু স্থানে বাস করার পেছনে কাজ করছে। রয়টার্স।

উ. কোরিয়ার টহল নৌকা তাড়িয়ে দিতে দ. কোরিয়ার গুলি

পীত সাগরে আন্তকোরীয় সীমান্তে উত্তর কোরিয়ার দুটি টহলনৌকা তাড়িয়ে দিতে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনী। শনিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় উত্তর কোরিয়ার নৌকা দুটি পালিয়ে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র গতকাল রোববার জানান, পীত সাগরে উত্তর কোরিয়ার দুটি টহল নৌকা জলসীমা লঙ্ঘন করে দ. কোরিয়ায় প্রবেশ করলে তাঁরা সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ করেন। এতে নৌকা দুটি কোনো রকম জবাব না দিয়ে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যায়।
গত ২৬ মার্চ বিতর্কিত ওই সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ রহস্যজনকভাবে ডুবে যাওয়ার পর এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটল।

ইরাকে ভোট পুনর্গণনায় ফলাফল অপরিবর্তিত

ইরাকে গত মার্চ মাসের সাধারণ নির্বাচনের ভোট পুনর্গণনায় ফলাফলের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রাথমিক ভোট গণনায় যে ফল এসেছিল, তা-ই বহাল রয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারা গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির নেতৃত্বাধীন জোটের পুনরায় সরকার গঠনের সম্ভাবনা অনেকটা কমে গেল।
ইরাকের নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ইন্ডিপেন্ডেন্ট হাই ইলেক্টোরাল কমিশনের (আইএইচইসি) কর্মকর্তা সাদ আল রাবি বলেছেন, ‘বাগদাদের ভোট পুনর্গণনায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। কোনো জোটের আসন ভাগাভাগিতে হেরফের হয়নি।’
ইরাকে গত ৭ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইয়াদ আলাবির নেতৃত্বাধীন ইরাকিয়া জোট পার্লামেন্টের ৩২৫টি আসনের মধ্যে ৯১টিতে জয়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকির নেতৃত্বাধীন স্টেট অব ল অ্যালায়েন্স পায় ৮৯টি আসন। শিয়া ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতৃত্বাধীন ইরাকি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ৭০টি আসন পেয়ে তৃতীয় হয়।
ইরাকের পার্লামেন্টে কোনো দল বা জোট ১৬৩টি আসনে জয়ী হলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠনের ক্ষমতা রাখে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফল ঘোষণার পর স্টেট অব ল অ্যালায়েন্স ও ইরাকি ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স এ মাসের শুরুতে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা জোট সরকার গঠন করবে। কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের চারটি আসন কম ছিল।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে এখনো সক্রিয় মার্কিন গোয়েন্দারা

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক গোয়েন্দাদের একটি গোপন নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। মার্কিন সেনাদের তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গি সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে তাঁরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস শনিবার এ কথা জানিয়েছে। অবশ্য মার্কিন সরকার ওই দেশ দুটিতে কোনো বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
অজ্ঞাত মার্কিন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী হলেও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মার্কিন ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গঠিত বেসামরিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এখনো পুরোদমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তানে এই নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয়। তারা তালেবানদের কর্মকাণ্ড ও লুকিয়ে থাকা তালেবান নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন মার্কিন কমান্ডারদের প্রায় প্রতিদিনই অবহিত করে।
টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাইকেল ফারলং গত মার্চে বেসরকারি ঠিকাদারদের নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে একটি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সন্দেহভাজন জঙ্গিদের খুঁজে বের করে হত্যার উদ্দেশ্যেই তিনি এ কাজটি করেন বলে পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়।

আয়ারল্যান্ডে বিমান চলাচলে বির্পযয়

কিছু দিন শান্ত থাকার পর আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে আইসল্যান্ডের এয়াকিউয়াতুলয়োকুটল আগ্নেয়গিরি। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ফের সেখান থেকে ছাই উদিগরণ হচ্ছে। ছাইয়ের কারণে উত্তর আয়ারল্যান্ডের কিছু অংশে গতকাল বিমান চলাচলের ওপর আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
ছাই ধেয়ে আসায় ব্রিটেনসহ ইউরোপে বিমান চলাচলে আবারও বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আয়ারল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং আইল অব ম্যানের অনেক বিমানবন্দর গতকাল রোববার বন্ধ করে দেওয়া হয়। আজ সোমবার ও কাল মঙ্গলবার অনেক বিমানবন্দর বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই আগ্নেয়গিরি থেকে এখন এত বেশি পরিমাণে ছাই উদিগরণ হচ্ছে যে তা আয়ারল্যান্ডের আকাশ ঢেকে ফেলেছে। ফলে স্লিগো, ডোনেগেলও নক বিমানবন্দর গতকাল রোববার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডাবলিন ও শ্যানন বিমানবন্দরও গ্রিনিচ মান সময় ১২টা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়। ছাইয়ে আকাশ ঢেকে যাওয়ায় বেলফাস্ট ইন্টারন্যাশনাল, বেলফাস্ট হারবার ও রোনাল্ডসওয়ে বিমানবন্দরও কার্যত বন্ধ থাকে। রোববার বেলফাস্ট ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর ১১টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আগ্নেয়গিরির ছাই থেকে সৃষ্ট মেঘ কাল মঙ্গলবার ব্রিটেনের আকাশ ঢেকে ফেলবে, পরশু বুধবার নাগাদ তা ইউরোপের আকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই খোঁজখবর নিয়ে বিমানযাত্রীদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ অবশ্য বলেছে, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। ফ্লাইট ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

মেক্সিকো উপসাগরে তেলক্ষেত্রে বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণে নেওয়া পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সাগরে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরা। স্থানীয় জেলেরা সতর্ক করেছে, এতে উপসাগরের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের কাছে উপসাগরে ওই তেলক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) এই পরিবেশ বিপর্যয় সামাল দিতে সম্প্রতি নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কোম্পানিটি গভীর সাগরে এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের কারণে সাগরের প্রাণিকুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ওই তেলক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের প্রতি অসন্তোষ জানিয়েছেন। ওই তেলক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট তিনটি কোম্পানি এ দুর্ঘটনার জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে। হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে ওবামা বলেন, ‘দুর্ঘটনার ব্যাপারে পরস্পরের প্রতি এই দোষারোপ বা দায়িত্বহীনতা মেনে নেব না আমি। তেল উত্তোলনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি খুব খারাপভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই নিতে হবে।’
লুইজিয়ানার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী ও জেলেদের সতর্কবার্তা এবং আশঙ্কা প্রকাশের পরও গত শুক্রবার বিপিকে ‘কোরেক্সাইট ৯৫০০’ নামের রাসায়নিক পদার্থ সাগরতলে প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি (ইপিএ)। বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেন, বিপির নতুন উদ্যোগ অপরীক্ষিত এবং সাগরের প্রাণিকুলের জন্য ক্ষতিকর। লুইজিয়ানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপি ও ইপিএ তাদের আশঙ্কা ও সতর্কবার্তার ব্যাপারে কান দেয়নি।
রাসায়নিক পদার্থটি তেলকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় বিভক্ত করে ফেলবে। ফলে পানি থেকে তেলকে দ্রুত আলাদা করা সম্ভব হবে। তবে সাগরের গভীরে এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা নিয়ে আশঙ্কা জানানো হচ্ছে। কারণ, এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য মাঝারি ধরনের ক্ষতিকর পদার্থ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে এটি চোখের ক্ষতি করে। এত দিন পর্যন্ত কোরেক্সাইট ৯৫০০ শুধু মাটিতে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হতো।
কয়েক দিনের মধ্যে বিপি বর্জ্য ছুড়ে ফেলার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কোম্পানিটি সাগরের তলদেশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্ফোরণ প্রতিরোধকটি তুলে আনবে। এর আগে সাগরের তলদেশে বিস্ফোরণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেল সরবরাহ পাইপের ছিদ্রে একটি বাক্স বসানোর উদ্যোগ নেয় বিপি। কিন্তু সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

জুনে ভারত সফর করবেন রাজাপক্ষে

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে আগামী ৮ জুন ভারত সফর করতে পারেন। গতকাল রোববার ইরানের রাজধানী তেহরানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি এল পেইরিসের বৈঠক শেষে এ কথা জানানো হয়। বৈঠকে তাঁদের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় শরণার্থী শিবিরে থাকা তামিল নাগরিকদের পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে এসএম কৃষ্ণা বলেন, ‘আগামী ৮ জুন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের ভারত সফরের কথা রয়েছে।’ এ বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর এটাই হবে রাজাপক্ষের প্রথম ভারত সফর। দুই মন্ত্রী বৈঠকে ওই সফরের বিষয়েও আলোচনা করেন।
শ্রীলঙ্কার যুদ্ধবিধ্বস্ত উত্তরাঞ্চলে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজে সে দেশের সরকারকে সাহায্য করছে নয়াদিল্লি। এ জন্য ভারত সরকার কলম্বোকে ৫০০ কোটি রুপি সহায়তা দিয়েছে।
কৃষ্ণা ও পেইরিসের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। জি-১৫ সম্মেলন উপলক্ষে বর্তমানে ইরান সফরে রয়েছেন দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ১৭টি দেশের জোট জি-১৫। আজ সোমবার তেহরানে এই সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা।

ফ্রান্সের শিক্ষাবিদকে মুক্তি দিল ইরান

ইরানে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্রান্সের শিক্ষাবিদ ক্লোতিদে রেইসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গতকাল তিনি ফ্রান্সে পৌঁছেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
গুপ্তচরবৃত্তি ও ইরানে গত বছর জুনে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ছবি ইমেইলের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে প্রচার করার দায়ে রেইসকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাদণ্ডের বিপরীতে দুই লাখ ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার দিলে রেইসকে মুক্তি দেয় ইরান। গত বছরের জুলাই মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয় সপ্তাহ আগে তিনি জামিন পান।

ভারতের পাঁচ রাজ্যে কাল থেকে মাওবাদীদের বন্ধ্

ভারতের মাওবাদী অধ্যুষিত পাঁচ রাজ্যে মাওবাদীরা আবার ৪৮ ঘণ্টার বন্ধ্ ডেকেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে এই বন্ধ্। রাজ্য পাঁচটি হলো ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িষা, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার। আইপিএল ক্রিকেট বন্ধ, সরকারি সংস্থাকে বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত বাতিলসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দী মাওবাদীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে এই বনেধর ডাক দিয়েছে মাওবাদীরা।
শুক্রবারও মাওবাদীরা পশ্চিমবঙ্গের মাও অধ্যুষিত জঙ্গল মহলেও বনেধর ডাক দিয়েছিল। এই বনেধর মধ্যেই মাওবাদীরা জঙ্গল মহলে পাঁচ সিপিএম কর্মীকে অপহরণ করে হত্যা করে।
এদিকে রাজ্য সিপিএম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে দীর্ঘ এই এক বছরে মাওবাদী ও তৃণমূলের হামলায় ২১০ জন বামপন্থী নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন।
দীর্ঘ আড়াই মাস গুলিতে জখম হয়ে আত্মগোপন করে থাকার পর শনিবার কিষেনজি প্রথম কলকাতার সংবাদপত্র অফিসে টেলিফোনে জানিয়ে দেন তিনি এখন সুস্থ এবং লালগড়েই আছেন। গত মার্চ মাসে জঙ্গল মহলের হাতিলোটায় যৌথ বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে কিষেনজি গুরুতর জখম হন।
এদিকে দার্জিলিংয়ে জনমুক্তি মোর্চার ডাকে ৪৮ ঘণ্টার পাহাড় বন্ধ্ শেষ হয়েছে গতকাল রোববার। এই বনেধ জনমুক্তি মোর্চার কর্মীরা সিকিম যাওয়ার পথ অবরোধ করে অন্তত আটটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এই বনেধর ফলে পাহাড়ের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আটকে পড়ে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক। জনমুক্তি মোর্চার নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন গোর্খা পার্বত্য পরিষদে দার্জিলিংয়ের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী শিলিগুড়ি এবং ডুয়ার্সকে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে আগামী মাসের ১২ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত আরও ১০ দিনের লাগাতার বন্ধ্ পালন করবে তারা। ২৪ মে দিল্লিতে বসছে জনমুক্তি মোর্চার নেতাদের সঙ্গে ভারত সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক।

বন্দী গ্রহণের প্রস্তাব দিল মালদ্বীপ

কিউবায় গুয়ানতানামোয় মার্কিন বন্দিশিবিরে আটক দুই মুসলিম বন্দীকে গ্রহণ করার বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে মালদ্বীপ। গত জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গুয়ানতানামো বন্দিশিবির বন্ধ করার ঘোষণা দেন। তিনি নির্দোষ বন্দীদের নিজ দেশের পরিবর্তে ভিন্ন দেশে পুনর্বাসন করারও কথা বলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মালদ্বীপ এ প্রস্তাব দেয়।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ নাসিম জানান, সন্ত্রাসী তৎপরতায় অভিযুক্ত নয়, এমন দুজন মুসলিম বন্দীর জন্য এটি একটি মানবিক প্রস্তাব। তাঁদের একজন ফিলিস্তিনি, অন্যজনের পরিচয় অজ্ঞাত। ফিলিস্তিনি বন্দীর কোনো পরিবার নেই। সন্ত্রাসে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ডও তাঁর নেই।

পাকিস্তানে অপহূত ৫০ জনকে মুক্তি দিল জঙ্গিরা

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সহিংসতাকবলিত এলাকা থেকে শনিবার অপহূত ৫০ নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে সন্দেহভাজন জঙ্গিরা। এক সরকারি কর্মকর্তা গতকাল রোববার এ কথা জানিয়েছেন।
সন্দেহভাজন জঙ্গিরা পুলিশের পোশাক পরে দেশটির পশতুন উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা কুররামে পৃথক দুটি ঘটনায় ৬০ জনকে অপহরণ করে। সম্প্রতি এ এলাকাতেই সরকারি বাহিনী এক জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে।
আঞ্চলিক সরকারি কর্মকর্তা মুমতাজ বেগম বলেন, বাকি ১০ জনের মুক্তির ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। তাঁরা সবাই রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবী বলে জঙ্গিরা তাঁদের ছেড়ে দিতে চাইছে না। তবে তাঁদের মুক্ত করতে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি।
এক জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা হামিদুল্লাহ খান ওই ১০ জনের মুক্তির ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে বলেন, তাঁদের কাছে কোনো পরিচয়পত্র নেই। তাই তালেবান নেতারা তাঁদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য আটকে রেখেছেন।

জেসিকাকে বীর আখ্যা দিলেন কেভিন রাড

অস্ট্রেলিয়ার ‘দস্যি মেয়ে’ জেসিকা ওয়াটসনকে বীর আখ্যা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড। তিনি জেসিকাকে দেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ বলে অভিহিত করেছেন। সবচেয়ে কম বয়সে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ করায় জেসিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম। তারা বলেছে, জেসিকা এ অভিযানের মাধ্যমে সবার মন জয় করেছে।
প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড জেসিকার উদ্দেশে বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার সব তরুণের কাছে তুমি এখন বীর। তুমি অস্ট্রেলিয়ার মেয়েদের কাছেও বীর। তুমি আমাদের গর্বিত করেছ। এ দিনটি আমাদের জন্য অসাধারণ।’ গত শনিবার সিডনি অপেরা হাউসে বসে কেভিন রাড এসব কথা বলেন। জেসিকা সাত মাসের সমুদ্র অভিযান শেষে সিডনি অপেরা হাউসেই যায়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার জবাবে জেসিকা বলেছে, ‘আমি নিজেকে বীর বলে মনে করি না, আমি সাধারণ একটি মেয়ে।’ সে বলে, ‘বিস্ময়কর কিছু অর্জনের জন্য বিশেষ কোনো ব্যক্তিত্বের দরকার হয় না। এ জন্য চাই শুধু স্বপ্ন। আর এ স্বপ্নে বিশ্বাস করে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমার মনে হয় আমি প্রমাণ করতে পেরেছি, হূদয়ে কিছু ধারণ করলে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’
দ্য সানডে টেলিগ্রাফ গতকাল রোববার প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম করেছে, ‘তুমি সত্যিই সুন্দর। তুমি সিডনি পোতাশ্রয়ে পাল তুলেছ, আমাদের হূদয়ে ঝড় তুলেছ।’
দ্য সান হেরাল্ড সাহসী জেসিকার প্রশংসা করে বলেছে, ২১০ দিন সমুদ্রে কাটিয়ে সে ৩৩ ফুট লম্বা ইয়টটি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর ‘দেশ প্রেরণার ঢেউয়ে দুলছে’।
জেসিকার ম্যানেজার অ্যান্ড্রু ফ্রেজার জানান, সে এখন স্কুলে যেতে চায়। গাড়ি চালানোও শিখতে চায় সে। এখন থেকে তার জীবনটা হবে অন্য রকম। তিনি বলেন, ‘জেসিকা এখন থেকে খুবই ব্যস্ত জীবন কাটাবে। সাগর থেকে ফিরে আসার পর তার দুনিয়াটাই পাল্টে গেছে। সে এখন সামনের দিকে এগোতে চায়।’ তিনি জানান, কাল মঙ্গলবার জেসিকা ১৭ বছরে পা দেবে।
সমুদ্রে ২৩ হাজার নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিয়ে জেসিকা শনিবার সিডনি পোতাশ্রয়ে নোঙর করে। সবচেয়ে কম বয়সে একা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বভ্রমণ করা প্রথম মানুষ এখন সে। গত বছরের ১৮ অক্টোবর জেসিকা তার অভিযান শুরু করে।

কাসাবের জল্লাদ হতে চান আরও তিনজন

আজমল আমির কাসাবের ফাঁসি কার্যকর করতে ভারতের আরও তিন ব্যক্তি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা হলেন সরোজ কুমার, অরবিন্দ দোমান ও গিঁদো রাম।
তাঁদের মধ্যে মধ্যবয়সী সরোজ কুমার ও অরবিন্দ দোমানের বাড়ি বিহারের সমস্তিপুর জেলায়। গত সপ্তাহে দুজনেই রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং মহারাষ্ট্র সরকারের কাছে কাসাবের জল্লাদ হতে তাঁদের আগ্রহের কথা চিঠি লিখে জানিয়েছেন।
গিঁদো রামের বয়স ৩৬ বছর। বাড়ি হিমাচল প্রদেশের চাম্বা জেলায়। তিনিও রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, কাসাবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেশের একটি সেবা করার আগ্রহ তাঁর রয়েছে। গিঁদো একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির গাড়িচালক। তিনি বলেন, তাঁর একটা স্বপ্ন ছিল সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার। তা পূরণ হয়নি। এখন একটাই স্বপ্ন— কাসাবকে ফাঁসিতে ঝোলানো।
এর আগে ভারতের মিরাট কেন্দ্রীয় কারাগারের জল্লাদ ৬৫ বছর বয়সী মম্মু সিং একই ধরনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর বিষয়টিকে শিল্প মনে করেন মম্মু সিং। জীবনে আরেক দফা এই শিল্পের নিদর্শন রাখতে চান তিনি।

সম্পর্ক জোরদার করার আশাবাদ

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের মধ্যে প্রথম বৈঠক হয়েছে গত শনিবার। লন্ডন ও কাবুলের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করার ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়েছেন দুই নেতা। যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফেরার পথে কারজাই ব্রিটেনে যাত্রাবিরতি করেন। এ সময় তাঁদের বৈঠক হয়।
ক্যামেরনের নেতৃত্বাধীন ব্রিটেনের নতুন জোট সরকারের আলোচ্যসূচিতে আফগানিস্তান যুদ্ধ খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্রিটেনে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এটাই প্রথম সফর। আগের দিন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় আফগানিস্তান প্রসঙ্গ গুরুত্ব পায়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর গ্রামের বাড়ি চেকারসে কারজাই ও ক্যামেরনের বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডাউনিং স্ট্রিট কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, চেকারসে কারজাইকে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে প্রধানমন্ত্রী খুশি। কারজাইয়ের সফল যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাপ হয়েছে।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে এ মাসের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠেয় আফগান গোত্রপ্রধানদের সম্মেলন ‘পিস জিরগা’ নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। দুই নেতাই ব্রিটেন ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করার ব্যাপারে আশাবাদ জানান।

৯৪ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি!

শিক্ষার যে কোনো বয়স নেই তা আরেকবার প্রমাণ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রবীণ নারী। হ্যাজেল সোয়ার্স নামের ওই নারী ৯৪ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি বয়সে স্নাতক অর্জনকারীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান দখল করেছেন।
১৯১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার রিচমন্ডে হ্যাজেল সোয়ার্সের জন্ম। ১৯৩২ সালে মাধ্যমিক পাস করলেও পারিবারিক ঝামেলার কারণে তিনি কলেজে ভর্তির সুযোগ পাননি। হ্যাজেল স্বীকার করেন, ৭৮ বছর ধরে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা মনের মধে পুষে রেখেছিলেন। তাঁর সে স্বপ্ন আজ সার্থক হয়েছে। তিনি ছয় সন্তানের জননী। এ ছাড়া হ্যাজেলের প্রায় ৪০ জন নাতি, নাতনি ও তাঁদের ছেলেমেয়ে রয়েছে। অকল্যান্ডের মিলস্ কলেজে তাঁর এ সাফল্যে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাতে মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নিজের এ সাফল্যের ব্যাপারে হ্যাজেল সোয়ার্স বলেন, অনেক চেষ্টার পর তিনি এটা অর্জন করতে পেরেছেন এবং এতে তাঁর খুবই ভালো লাগছে। এর আগে ২০০৭ সালে কানসাসের বাসিন্দা নোলা ওখস্ ৯৫ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে রেকর্ড করেন।
হ্যাজেল সোয়ার্স বলেছেন, তিনি থামবেন না। এবার তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন।

ভারত সরকার আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও শতাধিক ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সংশোধিত বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের আওতায় দিল্লি সরকার এসব সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এসব সংগঠনের কোনো সদস্যকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে পুলিশকে যাতে কোনো আইনি বাধার মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে ভারত আরও ৩৩টি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
নতুন করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জেমাহ ইসলামিয়া, লিবিয়ার ইসলামিক জিহাদ গ্রুপ, মরক্কোর ইসলামিক কমব্যাট্যান্ট গ্রুপ, মিসরের ইসলামিক জিহাদ, ফিলিপাইনের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশন ও উজবেকিস্তানের ইসলামিক মুভমেন্ট।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও (ইউএনএসসি) এসব সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে ঘোষণা দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব পুরোনো ও নতুন সংগঠনের তালিকা একীভূত করা হয়েছে, যাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভবিষ্যতে এ সংক্রান্ত কোনো সংশোধন আনলে ভারত সরকারের তালিকাটি নতুন করে তৈরি করতে না হয়।
ওই কর্মকর্তা অরও বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত এসব সংগঠনের তালিকা পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আইনের সংশোধন করে বাড়ানো বা কমানো হবে। তিনি জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত নতুন সংগঠনগুলোর তালিকা শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
ভারত সরকারের নিষিদ্ধ ঘোষিত অন্য সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে লস্কর-ই-তাইয়েবা, জইশ-ই-মোহাম্মদ, তাহরিক-ই-ফুরকান, আল-বদর, জমিয়াত-উল-মুজাহিদিন, আল-কায়েদা, হরকাত-উল-মুজাহিদিন, হরকাত-উল-আনসার, হরকাত-উল-জেহাদ-ই-ইসলামি, হিজব-উল-মুজাহিদিন, আল-উমর-মুজাহিদিন, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর ইসলামিক ফ্রন্ট, ইউএলএফএ (উলফা), এনডিএফবি, এলটিটিই, এসআইএমআই, দীনদার আঞ্জুমান, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-জনযুদ্ধ), মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মাওবাদী)।

আবারও গোলগড়ে বিদায় আবাহনীর

দরকার ছিল জয়। কিন্তু সেই জয় এল না। ম্যাচ থাকল গোলশূন্য। এর অর্থ, এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপ থেকে বিদায় আবাহনীর। গতবারের মতো এবারও আক্ষেপের নাম গোলগড়।
কিরগিজস্তানের দরদই বিশকেক ক্লাব এই ম্যাচ থেকে এক পয়েন্ট নিয়ে চলে গেল সেমিফাইনালে।
বৃষ্টিভেজা বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠে দরদইয়ের জালে একবার বল পাঠিয়েছিল আবাহনী। সংঘবদ্ধ আক্রমণ থেকে ৩৯ মিনিটে ডিফেন্ডার আতিকুর রহমান (মিশু) বল জালে ঠেলতেই যখন উল্লাসে মাতল গোটা স্টেডিয়াম, তখনই সবাইকে অবাক করে থাইল্যান্ডের সহকারী রেফারির পতাকা (আগের ম্যাচে ভারতীয় সহকারী রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত ছিল আবাহনীর বিপক্ষে)। আতিকুরের হ্যান্ডবল! দক্ষিণ কোরিয়ার রেফারি কিম সান গোলের বাঁশি বাজিয়েও গোল বাতিল করেন হ্যান্ডবলের দায়ে!
ম্যাচের পর আকাশি-নীলদের কোচ অমলেশ সেন দাবি করলেন, ‘ওটা গোল ছিল। সহকারী রেফারি অনেক দূরে থেকে কীভাবে দেখলেন হ্যান্ডবল হয়েছে! আমাদের ন্যায্য গোল দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় আমরা আর কী করতে পারি!’
দরদইয়ের রাশিয়ান কোচ সার্গেইকে সংবাদ সম্মেলনে দেখে মনে হলো, এই মাত্র বড় একটা ম্যাচ জিতে উঠেছেন। ড্র-টাই তাঁর দলের কাছে জয়ের সমান। আবাহনীর গোল বাতিল না হলে তাঁর দলের এএফসি কাপ মিশন শেষই হয়ে যেতে পারত ঢাকায়। ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিলে বললেন, ‘রেফারি তাঁর কাজ করেছেন। আমরা আমাদের খেলা খেলেছি।’
আগের দুটি ম্যাচের চেয়ে এদিন আবাহনী অনেকটা গোছানো ফুটবল খেলেছে। প্রথমার্ধে বেশ চাপ তৈরি করেছে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের ওপর। দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা ছিল দরইয়ের। বেশ কয়েকবার আক্রমণেও উঠেছে। তুল্যমূল্য বিচারে ম্যাচে প্রাধান্য ছিল আবাহনীরই। যা দেখে কিরগিজ কোচ এদিন প্রশংসা করে গেলেন বাংলাদেশ লিগ চ্যাম্পিয়নদের। এই কোচই আবাহনীর প্রথম ম্যাচ দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিলেন, ‘আবাহনী ফুটবল খেলেছে নাকি!’
সেই আবাহনী কাল দরদই কোচকে দেখিয়েছেন, ফুটবল খেলতে জানে তারা। কিন্তু আবাহনী একটা সমস্যায় পড়ে গেল শেষ দিকে। আঘাত পাওয়ায় ৮০ মিনিটে উঠে যেতে হলো স্ট্রাইকার এনামুলকে। আক্রমণে তখন ইব্রাহিম একা। তার পরও ঘানাইয়ান স্ট্রাইকার গোলের চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু ভাগ্যও সহায় ছিল না।
তিন ম্যাচে ৫ পয়েন্ট আবাহনীর। তবে রানার্সআপ হওয়ার প্রশ্নে গ্রুপের (এ গ্রুপ) সর্বনিম্ন দল চীনা তাইপের হাসুসের বিপক্ষে পাওয়া এক পয়েন্ট বিবেচনায় আসবে না। বাকি দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট, গোলগড় প্লাস দুই। ওদিকে সি গ্রুপের দল তুর্কমেনিস্তানের ইতোরও ৪ পয়েন্ট, তবে তাদের গোলগড় প্লাস ৮। ইতো তাদের দুর্বল গ্রুপ প্রতিপক্ষ ভুটানের ড্রুকস্ট্রার্সকে ৮ গোলে হারিয়েছে।
আবাহনী এখন শুধুই দর্শক এই টুর্নামেন্টে। ঘরের মাঠে টানা দুবার গোলগড়ে বিদায় নেওয়ার আক্ষেপটাও সঙ্গী!

দুই দুর্বলের লড়াইয়ে জয়ী নিউ রোড

দুবার পিছিয়েও জয় ছিনিয়ে নিয়েছে নেপালের নিউ রোড। চীনা তাইপের হাসুসের বিপক্ষে তারা জিতল ৪-৩ গোলে।
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপে নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে হাসুস আর নিউ রোডের লড়াইটা ছিল বেশ উপভোগ্য। ৭ গোল হয়েছে বলেই শুধু নয়, ক্লান্তি ছাপিয়ে গরমের মধ্যেও গতিময় ফুটবল খেলল দুই দল। দুই দলের খেলাতেই খুঁজে পাওয়া গেল জয়ের তাড়না। প্রেসবক্সে উদ্বিগ্ন খানিক সময় কাটিয়ে কয়েকজন নেপালি দলের জয় দেখেই শেষ পর্যন্ত ফিরে গেছেন খুশি মনে।
প্রথম গোল হাসুসের। পরে দুই গোল করে (২-১) এগিয়ে যায় নিউ রোড। এর পর হাসুসের সমতা (২-২) এবং মিনিট তিনেক পর এগিয়ে যাওয়া (৩-২)। আবার ম্যাচে ফেরে নিউ রোড (৩-৩)। খেলা শেষের ৯ মিনিট আগে জয়সূচক গোল করে জয়ী নেপালের দলটিই। নিউ রোডের হয়ে গোল করেছেন রণজিৎ, সায়ন, জীবন ও নবীন এবং হাসুসের পক্ষে ডি সি চু ২টি ও চেন ১টি গোল করেছেন।
তিন ম্যাচে এক পয়েন্ট নিয়ে ‘এ’ গ্রুপে সবার নিচে হাসুস। আবাহনীর সঙ্গে গোলশূন্য ড্র-ই এই সফরে তাদের একমাত্র সাফল্য। আবাহনী ও দরদইয়ের কাছে হারলেও শেষ ম্যাচ জিতে নিউ রোড তৃতীয়।

ভারতের দিকে ভিভের সাহায্যের হাত

যাঁর একটি মাত্র টিপস খুলে দিতে পারে একজন ক্রিকেটারের সাফল্যের দরজা, সেই ভিভ রিচার্ডস কি না নিজে থেকেই হতে চাইছেন ভারতের ব্যাটিং পরামর্শক। আরেকটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করে ধোনিরা ভালোই করেছেন তাহলে!
২০০৯ ইংল্যান্ডের মতো এবারও সুপার এইটের ৩টি ম্যাচেই হেরে ভারত ক্যারিবিয়ানে জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে শিরোপা-স্বপ্ন। ধোনিদের হতাশাজনক এই পারফরম্যান্সের জের ধরে ভারতজুড়ে যখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড়, তখনই নিজেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চাইছেন স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস।
ভিভ রিচার্ডসকে মানুষ বেশি মনে রেখেছে, তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের কারণে। হেলমেট, প্যাড, গার্ড—শরীর রক্ষার এসব সরঞ্জাম ছাড়াই দুরন্তগতির বল উড়িয়ে মারতেন। ক্যারিয়ানে ভারতের ব্যর্থতার মূলে ছিল ফাস্ট বোলিং। বিশেষ করে শর্ট বলে দুর্বলতাটা ছিল স্পষ্ট। ধোনি-যুবরাজ-রায়নাদের নিয়ে এই জায়গাটাতেই কাজ করতে চান সর্বকালের সেরাদের একজন ভিভ রিচার্ডস, ‘বিষয়টি যখন ব্যাটিংয়ের এবং বিশেষ করে এমন আক্রমণাত্মক ফাস্ট বোলিংয়ের, আমি ভালো একজন ব্যাটিং পরামর্শক হতে পারি। দলের কিছু জায়গায় অল্প হলেও সাহায্য আমি করতেই পারি।’ ভারতীয় নিউজ চ্যানেল ‘টাইমস নাউ’কে ভিভ রিচার্ডস স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমি প্রস্তুত। হতে পারে, এমন আক্রমণাত্মক বোলিং সামলানোর জন্য তারা (ভারত) আমাকে মাঝেমধ্যে ডাকবে।’
সুপার এইটে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ১৮৫ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলীয় বোলারদের তোপের মুখে ৫০ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলে ভারত। এই ম্যাচের স্মৃতি মনে করে ভিভ বলেছেন, ‘ওই দিন অস্ট্রেলিয়ানরা ভারতীয়দের ধসিয়ে দিয়েছিল। তবে ভারতকে এটি কাটিয়ে উঠতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতকে এখন সত্যিকারের ফাস্ট বোলিংয়ের বিপক্ষে একটু প্র্যাকটিস করতে হবে।

নেপালের মাওবাদীরা তাদের কর্মীদের সরকারবিরোধী

নেপালের মাওবাদীরা তাদের কর্মীদের সরকারবিরোধী ‘চূড়ান্ত যুদ্ধের’ প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছে। অস্ত্র সমর্পণ করে মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার তিন বছর পর তারা এ প্রশিক্ষণদেওয়া শুরু করলো।
দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এটিকে আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা হিসেবে দাবি করলেও মাওবাদী যুব সংগঠনের জেলা পর্যায়ের নেতারা স্বীকার করেছেন, শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাঁদের চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। এর অংশ হিসেবে তাঁরা তরুণ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছেন। খবর হিন্দুস্তান টাইমস।
জানা গেছে, গত শনিবার থেকে নেপালের সিন্ধুলি জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাওবাদী দল ইউসিপিএনের যুব সংগঠন ওয়াইসিএল (ইয়ুথ কমিউনিস্ট লিগ) তাদের কর্মীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়াও শুরু করেছে। ওয়াইসিএলের কমান্ডাররা রাইফেল ও খুকুড়ির (নেপালের স্থানীয় ছোরাজাতীয় ধারালো অস্ত্র) আদলে বানানো কাঠের ডামি অস্ত্র দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সিন্ধুলি জেলার অন্যতম জ্যেষ্ঠ মাওবাদী নেতা রাজন দহল বলেছেন, চূড়ান্ত বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসেবে তাঁদের জেলায় তাঁরা সাড়ে তিন হাজার কর্মীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবেন।
ইউসিপিএনের শিক্ষক সংগঠনের কয়েকজন নেতা বলেছেন, একই ধরনের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যে কয়েকটি জেলায় শুরু হয়েছে। শিগগিরই এই প্রশিক্ষণের কার্যক্রম ৭৫টি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
মাওবাদী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা শান্তিচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামী ২৮ মের মধ্যে নতুন সংবিধান কার্যকর করা না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আন্দোলন জোরদার করার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে যুব সংগঠনগুলোর সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

রিকেলমেকে চেয়েছিলেন ম্যারাডোনা

দল ঘোষণার দিনও আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা আশায় বুক বেঁধে ছিল—যদি ম্যারাডোনার মন গলে! যদি সব ভুলে হুয়ান রোমান রিকেলমের নামটা লিখে ফেলেন ৩০ জনের তালিকায়! কিছুতেই কিছু হলো না। রিকেলমে তো বটেই, জানেত্তি-ক্যাম্বিয়াসোর মতো খেলোয়াড়েরাও বাদ। ম্যারাডোনা কি তাহলে সত্যিই উন্মাদ?
ম্যারাডোনার কথা বিশ্বাস করলে অবশ্য তাঁকে আর ‘উন্মাদ’ বলে মনে হবে না। দল ঘোষণার পর কয়েকটা দিন মুখ বুজে দুনিয়াজোড়া আর্জেন্টাইন সমর্থকের গালি সয়েছেন। তারপর ক্যাম্বিয়াসো-জানেত্তি কেন নেই, সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সোজা বলে দিয়েছেন, তিনি মরিনহোর মতো ‘বার্সেলোনাকে আটকানো’ ফুটবল খেলতে চান না। তাই জানেত্তি-ক্যাম্বিয়াসোর জায়গা হয়নি।
এবার ম্যারাডোনা মুখ খুললেন রিকেলমে প্রসঙ্গেও। ‘রেডিও কনসেপ্তো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ফুটবলার বলেছেন, রিকেলমেকে ঘিরেই সাজিয়েছিলেন তিনি বিশ্বকাপ দল। গত কয়েক বছরের আর্জেন্টিনার মতো, ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাও নাকি রিকেলমে-কেন্দ্রিক হবে বলে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু রিকেলমের অনাগ্রহের কারণেই সেটা হলো না।
রিকেলমে রাজি হননি বলেই ম্যারাডোনাকে নতুন করে ভাবতে হয়েছে, ‘আমি রোমানকে (রিকেলমে) নিয়েই দল ভেবেছিলাম। কিন্তু আমাকে রোমান-বিহীন একটা দলেই মানিয়ে নিতে হলো। আমি ওকে ডেকেছিলাম। কিন্তু ও তো আসতে চাইল না।’
এক দিকে রিকেলমে বলছেন, তাঁর মন কাঁদছে দলের জন্য। আরেক দিকে ম্যারাডোনা ‘কাঁদছেন’ রিকেলমের জন্য। এই কান্নাকাটির দরকার কি ছিল? ওয়েবসাইট।

সংবাদ সম্মেলনের অধিনায়কেরা

ফাইনালের টস দেখতে দেখতে এই লেখা শুরু করার সময় ভাবছি, ঘণ্টা চারেক পর সংবাদ সম্মেলনে হাসিমুখে আসবেন কে? মাইকেল ক্লার্ক, না পল কলিংউড?
পল কলিংউডের মধ্যে অদ্ভুত একটা বিষণ্নতা আছে। চোখেমুখে তো তা খেলা করেই, কণ্ঠস্বরেও মিশে থাকে কেমন যেন এক বিষণ্নতা। হাসিতেও!
ফাইনাল জিতে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-আক্ষেপ ঘোচাতে পারলেও সেটিতে পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ওটা যে কলিংউডের ট্রেডমার্ক।
কলিংউড কী বলবেন, সেটি অবশ্য অনুমান করতে পারছি না। মাইকেল ক্লার্কের ক্ষেত্রে একেবারেই যে সমস্যা হচ্ছে না। যা-ই বলুন না কেন, অসংখ্যবার তাতে ‘ফ্যা-ন্টা-স্টি-ক’ শব্দটা থাকবেই। হাইফেনগুলো অকারণে দিইনি। ফ্যান্টাস্টিক কথাটা ক্লার্ক অমন টেনে টেনেই বলেন।
ক্লার্কের একটা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেই আপনি বুঝে ফেলবেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শব্দও বোধহয় ওটাই। ফাইনাল-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে কতবার যে তা বললেন! পাকিস্তানের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জয় ‘ফ্যা-ন্টা-স্টি-ক’, মাইক হাসির ইনিংসটা ‘ফ্যা-ন্টা-স্টি-ক’, ফাইনালে খেলার অনুভূতি ‘ফ্যা-ন্টা-স্টি-ক’, ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শিরোপার সঙ্গে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটাও যোগ করতে পারাটাও হবে ‘ফ্যা-ন্টা-স্টি-ক’!
নির্দিষ্ট কিছু শব্দের প্রতি এমন দুর্বলতা থাকে অনেকেরই। সংবাদ সম্মেলনে ওয়াসিম আকরামের যেমন বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই শুরু হতো ‘ডেফিনিটলি’ দিয়ে। একবার এই বাঁহাতি পেস জাদুকরের মিনিট দশেকের একটা সংবাদ সম্মেলন শেষে হিসাব করে দেখেছিলাম, নয় বার ‘ডেফিনিটলি’ বলেছেন!
একসময় শচীন টেন্ডুলকারের খুব প্রিয় শব্দ ছিল ‘অফ কোর্স’। কোর্স-এর ও-কার প্রায় উহ্যই থাকত বলে শোনাত অফ কর্স-এর মতো। গত কিছুদিন এই মুদ্রাদোষটা একটু কম দেখছি।
আবার এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই ফিরে আসা যাক। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর এই প্রথম গ্রায়েম স্মিথের সংবাদ সম্মেলন। কিন্তু প্রায় সব প্রশ্নের উত্তরই ‘লুক’ দিয়ে শুরু করার অভ্যাসটা দেখলাম এখনো আছে। তাঁর ব্যাটিংয়ে যেমন গায়ের জোরটা খুব প্রকাশিত, কথাও খুব জোর দিয়ে বলেন গ্রায়েম স্মিথ। ‘আপফ্রন্ট’ তাঁর আরেকটি প্রিয় শব্দ। আপফ্রন্টে বোলিং ভালো হয়নি মানে শুরুতে বোলিং ভালো হয়নি। ব্যাটিংয়ের কথা হলে বুঝতে হবে টপ অর্ডার।
মাহেলা জয়াবর্ধনেরও আপফ্রন্ট-প্রীতি আছে। কুমারা সাঙ্গাকারার একটু কম। বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মধ্যে ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে বেশ নাম হয়ে গেছে সাঙ্গাকারার। খেলার এই ব্যস্ততার মধ্যেই আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়েছেন। ক্রিকইনফোতে নিয়মিত কলাম লেখেন। ২০০৮ সালে পাকিস্তানে এশিয়া কাপের সময় এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল আয়োজিত ‘এশিয়ান ক্রিকেট: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক সেমিনারে কি-নোট স্পিকার ছিলেন। ঘটনাচক্রে সেই সেমিনারে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সে সময়ের পরিচালক শাফকাত নাগমি ও সাবেক পাকিস্তান-অধিনায়ক আসিফ ইকবালের সঙ্গে আমিও আলোচকের ভূমিকায়। তিনজনই একটা ব্যাপারে একমত হয়েছিলাম, রাহুল দ্রাবিড় পারলেও পারতে পারেন, এর বাইরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর কোনো ক্রিকেটারের এমন একটা পেপার লেখার সাধ্য নেই।
অথচ সাঙ্গাকারা আগের দিন ডে-নাইট ম্যাচ খেলার পর হোটেলে ফিরে ওই পেপারটা লিখেছেন। খসড়াটা চূড়ান্ত করারও সুযোগ পাননি। মঞ্চেও তো উঠলেন প্র্যাকটিসের পোশাকেই।
সংবাদ সম্মেলনে সেই সাঙ্গাকারার কথায় গভীর চিন্তাভাবনার ছাপ থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। যদিও ডেডলাইনের তাড়া থাকলে সেটির মজা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সাঙ্গাকারা যে সব প্রশ্নেরই এক মাইল লম্বা উত্তর দেন!
কথাবার্তায় মাঝেমধ্যে দার্শনিকতার ছাপ পাওয়া গেলেও সাঙ্গাকারার চেহারায় তা নেই। যা যথেষ্টই আছে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির মধ্যে। চাপদাড়ি আর চশমায় এমনিতেই তাঁকে প্রফেসর-প্রফেসর দেখায়। কথাবার্তাও সেটির সঙ্গে মানানসই। ‘সিরিয়াস’ শব্দটা ভেট্টোরির সঙ্গে খুবই যায়।
ঠিক উল্টো হলেন শহীদ আফ্রিদি। মাঠে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিংয়ে যেমন তাড়াহুড়ো, সংবাদ সম্মেলনেও তা-ই। ছটফটে স্বভাবটা এখানেও ফুটে ওঠে। কথা বলেন দ্রুত। উত্তরগুলোও বেশি বড় হয় না। যেন সব সময়ই তাঁর ট্রেন ধরার তাড়া!
মহেন্দ্র সিং ধোনি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে দীর্ঘতম সংবাদ সম্মেলন করার রেকর্ডটির অধিকারী। গত বছর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ভারতের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর লর্ডসে ধোনির সংবাদ সম্মেলন ২৭ মিনিট ধরে চলেছিল! ভারতের প্রচুর সাংবাদিক, প্রায় সবারই কোনো না কোনো প্রশ্ন আছে। এটা যদি একটা কারণ হয়, আরেকটা কারণ অবশ্যই সাঙ্গাকারার মতো ধোনিরও বড় উত্তর দেওয়ার অভ্যাস।
মাইক আথারটন যা শুনলে খুবই অবাক হবেন। খেলা ছাড়ার পর ক্রিকেট সাংবাদিকতায় খুব নাম করা আথারটন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক থাকার সময় মিডিয়াকে অপছন্দ করার ব্যাপারে খুব ধারাবাহিক ছিলেন। আত্মজীবনীতে তা স্বীকার করে আথারটন লিখেছেন, ‘আমার নীতি ছিল সংবাদ সম্মেলনে যত কম কথা বলে পারা যায়। কারণ বেশি বলা মানে পত্রপত্রিকায় সেটিকে বিকৃত করে লেখার সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়া।’
ধোনির কথা বলতে গিয়ে আথারটনের কথা মনে পড়ার কারণ, এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভালোই হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার পর ধোনির সংবাদ সম্মেলনে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ভারতের ব্যর্থতার কারণ আইপিএল কি না, ঘুরেফিরে এই প্রশ্ন উঠল। প্রতিবারই কিন্তু ধোনি সেটি উড়িয়ে দিয়েছেন। ‘আইপিএলের কোনো দোষ নেই’ সরাসরিও বলেছেন এ কথা। শুনতে শুনতে মনে মনে এ কথাও বলেছি, ‘তুমি তো বলবেই। কোটি কোটি পাও। তুমি তো চাইবে আইপিএল বছরে দুটি হোক।’
অথচ গত কয়েক দিন ভারতীয় মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে, ধোনি নাকি এই ব্যর্থতার জন্য আইপিএলের পার্টিকে দায়ী করেছেন। মিডিয়া চাইলে কোনো কিছুকে কীভাবে ঘুরিয়ে দিতে পারে, তার একটা আদর্শ উদাহরণ হতে পারে এটি। ধোনি আসলে বলেছিলেন, আইপিএলে খেলার সময় ক্রিকেটারদের স্মার্ট হতে হবে। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে যাওয়া-আসা আছে, তার ওপর রাতে ম্যাচ খেলে পার্টি-টার্টি করলে শরীরে তো তার প্রভাব পড়বেই।
এখানে আইপিএলকে দায়ী করলেন কোথায়? ধোনি এ কথাটাও বলেছিলেন বেশ বড় একটা উত্তরের অংশ হিসেবে। ইচ্ছেমতো কেটে নিলে অনেক উত্তরকেই এমন বিতর্কিত বানিয়ে দেওয়া যায়।
ধোনি না এখন থেকে সংবাদ সম্মেলনে মাইক আথারটনের অনুসারী হয়ে পড়েন!

মেসি-জাদুতে চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা

সেই ৩১তম রাউন্ড থেকে শুরু হয়েছে ইঁদুর-দৌড়টা। ম্যাচের পর ম্যাচ জিতেও কিছুতেই রিয়াল মাদ্রিদকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না বার্সেলোনা। মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধান। যার যার শেষ ম্যাচে বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদ খেলতে নামল ৯৬ ও ৯৫ পয়েন্ট নিয়ে। কী বিপুল মানসিক চাপ!
কোথায় কিসের চাপ! লিগে নিজের ৩৪তম ও সব মিলিয়ে মৌসুমের ৪৭তম গোল করে বার্সেলোনার সব চাপ উড়িয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন তারকা মেসির জোড়া গোলে নিজেদের মাঠে ৪-০ ব্যবধানে ভ্যালাদোলিদকে উড়িয়ে দিয়ে লা-লিগার চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা।
আর একই সময়ে মালাগার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে বার্সেলোনার থেকে পরিষ্কার ৩ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়ে লিগের দ্বিতীয় দল হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদকে।
লিগের শেষ ম্যাচ খেলতে ন্যু ক্যাম্পে এসে রেলিগেশনের খাড়ায় পড়ে থাকা ভ্যালাদোলিদ ম্যাচজুড়েই বার্সেলোনার প্রবল আক্রমণ ঠেকিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টার মধ্যেই ২৭ মিনিটে ভ্যালাদোলিদের পিরিয়েতো আত্মঘাতী গোল করে বার্সেলোনার খাতা খুলে দেন। এরপর ৩১ মিনিটে ডিফেন্স ছত্রভঙ্গ করে মেসির বাড়িয়ে দেওয়া বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ২-০ করেন পেদ্রো।
ম্যাচের বাকিটা স্রেফ ‘মেসি শো’। একের পর এক আক্রমণ করেছেন, করিয়েছেন। ৬১ ও ৭৫ মিনিটে দু গোল করে নাম লিখিয়ে ফেলেছেন ইতিহাসে। এই নিয়ে স্প্যানিশ লিগে এই মৌসুমে মেসির গোলের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪। আর সব মিলিয়ে এই মৌসুমে ৪৭ গোল করেছেন বর্তমান ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার।
যদি বার্সেলোনা হারে বা ড্র করে এবং নিজেরা জিততে পারে, তাহলে শিরোপা জুটবে—এমন সমীকরণ নিয়ে মালাগার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল রিয়াল। কোনোটাই হয়নি। বার্সেলোনা বড় ব্যবধানে জিতেছে। আর নিজেরা ড্র করে মাঠ ছেড়েছে। খেলার ৯ মিনিটেই ডুডার গোলে পিছিয়ে পড়েছিল রিয়াল। ৪৮ মিনিটে ভ্যান ডার ভার্ট গোল শোধ করলেও ম্যাচ জেতা হয়নি।
আর সবকিছুর ফল ন্যু ক্যাম্পে বাঁধভাঙা উল্লাস।

পটিয়ার কেলিশহর হত্যাকাণ্ড by আবদুর রাজ্জাক

১৯৭১ সালের ১৬ মে সকাল প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে পটিয়া থেকে দ্রুতগতিতে কেলিশহর সড়ক দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাত-আটটি গাড়ি এসে সোজা চলে যায় কেলিশহর সীমানার শেষ দিকে। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে শুক্লদাশপাড়ার বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জ্বালাও-পোড়াওয়ের সূত্রপাত করে। বিকেল চারটা পর্যন্ত চলে তাদের এ তাণ্ডব। ওই দিন এই এলাকায় ২৪ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। এ ছাড়া তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেক নারী-পুরুষ। একই দিনে উত্তর হাইদগাঁও গ্রামেও চলে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও জ্বালাও-পোড়াও। এ ছাড়া স্থানীয় লুটেরারা হিন্দুসম্প্রদায়ের লোকজনের গরু-ছাগলসহ ঘরের মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
১৬ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্ব দিকে হিন্দু-অধ্যুষিত, বীর বিপ্লবীদের চারণভূমি এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত কেলিশহর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা মনে হলে এলাকার মানুষের লোম শিহরে ওঠে। স্বজনহারানোর কথা মনে হলে চোখ পানিতে ছলছল করে।
একাত্তর সালে পাকিস্তানি হানাদার ও এ-দেশীয় রাজাকার, আল-বদরদের হাতে এ গ্রামে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দেহরক্ষী ও কমিউনিস্ট নেতা সুধাংশু কাঞ্জিলাল, ভারতীয় মিত্রসেনা এবং কেলিশহর গ্রামের সন্তান প্রফুল্ল সেন, প্রমোদ বিশ্বাস, গৌরাঙ্গ দে, নিবারণ দে, নগেন্দ্র দে, রঞ্জিত দে, শশাংক চক্রবর্তী, অনিমেষ দে, অন্নদা দে, যামিনী দে, হূদয় আচার্য, নিশি সেন, যতীন্দ্র সেন, মনীন্দ্র দে, মাণিক্য দে, নতুন শুক্লদাশ, ননাই দে, শ্যামলচরণ দে, অন্নদাচরণ দে, মোহনবাঁশি চক্রবর্তী, কানাই দে, কৃষ্ণ শুক্লদাশ, মৃদুল শীল, মহেন্দ্র শীল, প্রফু্ল্ল দে, আলি আহমদ মিস্ত্রি, প্রাণহরী চক্রবর্তী। এ ছাড়া অমল গুহ, হরিপদ বিশ্বাস ও মধু মহাজনকে ১৬ মের আগে পাকিস্তানি হানাদাররা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা আর ফিরে আসেননি।
স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক অনিল কুমার বিশ্বাস জানান, ‘সেদিনের হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি যারা লুটপাটে জড়িত ছিল, তাদের অনেকেই ছিল আমাদের পরিচিত ও প্রতিবেশী।’ হাইদগাঁও গ্রামের প্রবীণ কণিকা দে (৬৫) সেদিনের বর্বরতার বর্ণনা দিতে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমরা এলাকার নারী-পুরুষ সবাই আত্মরক্ষার্থে পূর্বের পাহাড়ে আশ্রয় নিলেও পরিমল চৌধুরী বাড়ি ছেড়ে যাননি।’ তাঁর মায়ের সামনেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। মায়ের আকুতিও টলাতে পারেনি হানাদারদের মন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ বরুণ কানুনগো বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর পিছু নিয়ে দূরে থেকে ভয়ে ভয়ে তাদের ধ্বংসযজ্ঞ অবলোকন করছিলাম। অ্যাডভোকেট ননী দাশগুপ্তের হত্যাকাণ্ড ও বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার পর গিয়ে দেখি, তাদের বাড়ির সামনে মন্দিরে অবস্থান করা অবস্থায় অন্নদা মাঝি ও মাণিক্য দের নিথর লাশ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। তাঁদের দেহ থেকে রক্ত ঝরছে। কেলিশহর পূর্বপাড়ার এক খেতের মধ্যে লুকিয়ে ছিলেন ননাই দে ও শ্যামাচরণ দে। এ সময় শ্যামাচরণ মাথা উঁচু করে দেখতে চাইলে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের ওপর গুলি ছুড়লে তাঁরা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।’ স্থানীয় মিলন দে (৬৬) বলেন, অনেকে পালিয়ে গেলেও কেলিশহর গ্রামের বাসিন্দা নেতাজি সুভাষ বসুর দেহরক্ষী সুধাংশু কাঞ্জিলাল বাড়িতেই ছিলেন। ১৬ মের কিছুদিন পর স্থানীয় রাজাকাররা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। পল্লিচিকিৎসক তপন দে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মা সে সময় খুবই অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার ও স্থানীয় দালালদের ভয়ে তাঁকে কোনো চিকিৎসকের কাছে নিতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। ১৫ মে পাকিস্তানি সেনারা গাড়ি নিয়ে এসে পুরো কেলিশহর গ্রাম ঘুরে দেখে এবং ভট্টাচার্যের হাটটি জ্বালিয়ে দেয়। পরদিন তাদের গাড়ির আওয়াজ শুনে আমাদের এলাকার প্রায় সবাই পূর্ব পাহাড়ে পালিয়ে গেলেও আমরা কয়েকজন পার্শ্ববর্তী পুকুরপাড়ে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকি। ওই খান থেকে দেখি আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের কিছু দালাল পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে লুটতরাজ চালাচ্ছে।’ ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হরিসাধন দেববর্মণ বলেন, ‘আগের দিন রাতে আমরা খবর পেয়েছি, কেলিশহর এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এসে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবে। তখন আমাদের গ্রামের লোকজন জায়গাজমির মূল্যবান কাগজপত্র মাটির নিচে এবং থালাবাটি পুকুরে ফেলে দেয় এবং যে যার মতো করে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকে। এই দিন সকাল সাতটার মধ্যে সবাই পাহাড়ে চলে যায়। বাড়িতে ছিলাম আমি এবং আমার ভাইপো অমূল্য; আমরা পুকুরের দুই পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছি। হঠাৎ আমার ভাইপো অমূল্য “বিহারিরা আসছে” এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি হানাদাররা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আমি অল্পের জন্য বেঁচে যাই। পাকিস্তানি হানাদাররা ওই দিন আমাদের এলাকার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিলেও আমার বাবার ঔষধালয় ও মণ্ডপটি রক্ষা পায়। ফলে প্রতিদিন ওই মণ্ডপে এসে এলাকার লোকজন রাত যাপন করতেন। কিন্তু কিছুদিন পর এসে স্থানীয় রাজাকাররা ওই ঔষধালয় ও মণ্ডপঘরটি জ্বালিয়ে দেয়।’
এলাকাবাসী জানান, পাকিস্তানি হানাদাররা প্রতিদিন নারকেলগাছ থেকে এলাকার লোক দিয়ে ডাব পেড়ে খেত এবং চলে যাওয়ার সময় হিন্দু-মুসলমান সবার বাড়ি থেকে ছাগল ধরে নিয়ে যেত।
স্বাধীনতার পরপর কেলিশহর গ্রামে ৩২ শহীদ স্মরণে স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। তাঁদের স্মরণে আজ (রোববার) সকালে আলোচনা, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের কর্মসূচি নিয়েছেন স্থানীয় প্রগতিশীল লোকজন। এ ছাড়া হাইদগাঁও গ্রামে শহীদ পরিমল চৌধুরী স্মৃতিস্তম্ভের উন্মোচন ও আলোচনা সভার আয়োজন করছে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন শান্তিনিকেতন।

আবেগ নয়, চাই অঙ্গীকার by মাহমুদুর রহমান মান্না

১০ মে একটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ অনুযায়ী ছাত্রলীগের নয়া নেতৃত্বের খোঁজে নেমেছে গোয়েন্দারা। ছাত্রলীগকে পথে আনতে নতুন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে। নতুন নেতৃত্ব যাতে কোনোভাবেই বিতর্কের জন্ম না দেয়, বিষয়টি মাথায় রেখে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে। ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নেতাদের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে তাঁদের আমলনামাও তৈরি করেছে গোয়েন্দারা। এটি আমার আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে এই সরকার বিব্রত। বিভিন্ন মন্ত্রী, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর আচরণে ও উচ্চারণে এটা বোঝা গেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংবিধানিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তখন অনেকেই আশা করেছিল যে একটা কিছু হবে। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের বারো-চৌদ্দবার দেশের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। প্রতিবারই জনতার অনুরোধে ও চাপে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপও ছাত্রলীগের মধ্যে সে রকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে, এটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের নেত্রীকে তাঁর পদে অধিষ্ঠিত থাকার জন্য অনুরোধ করেছেন, কিন্তু শেখ হাসিনা তাঁর মত পাল্টাননি। তিনি কি ভেবেছিলেন এতে ছাত্রলীগ শুধরে যাবে? না, ছাত্রলীগ শোধরায়নি। শেখ হাসিনার এই পদক্ষেপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
কেন? যে নেতার কথা ছাড়া আওয়ামী লীগের গাছের পাতা নড়ে না, যাঁর ইশারায় দল ও দেশের বাঘা বাঘা ব্যক্তি ও নেতারা ধরাশায়ী হন, তাঁর কথা ছাত্রলীগের তরুণ নেতা-কর্মীরা মানবে না? ব্যাপারটা ভাবার মতো ছিল, গভীরভাবে ভাবা উচিত ছিল, যা হয়নি।
ছাত্রলীগের নেতৃত্বের বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া মোটামুটিভাবে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তা কার্যকর করার ফলাফল তো ভালো দেখা যাচ্ছে না। দেশব্যাপী এই নৈরাজ্যের মুখে ছাত্রলীগের তরুণ নেতৃত্বের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। যতগুলো জায়গা বা শাখা সম্পর্কে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে, তার কোথায়ও তাঁরা এ প্রসঙ্গে একটি সভাও করেননি। আর এ রকম একটা পরিস্থিতি তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করবেনই কীভাবে? যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা নতুন, আর সব শাখার নেতৃত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা তাঁদের চাইতে প্রবীণ। ফলে দেশব্যাপী তাঁদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভেবে দুঃখ লাগে যে এই নেতৃত্ব বিদায় নেবেন ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে। কারণ, বর্তমান অবস্থার সব দায় তাঁদের ওপর বর্তাবে।
আমি আমার পূর্বের কথায় ফিরে আসি, শেখ হাসিনার সেই পদক্ষেপ যে কাজে লাগল না, তার কারণ এই নয় যে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাঁকে আর আগের মতো মানেন না। কারণটি হলো আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক। সামনে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে হাজারটা প্রশ্ন, তাতে বিভ্রান্ত তাঁরা। এই যে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অনুরোধ শুনলেন না, তার মানে কী? এটি কি সুচিন্তিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত? নাকি তাঁর সন্তানদের পথে আনার জন্য একটি আবেগপ্রসূত কাঠিন্য?
পাঠক, এই লেখক একজন রাজনীতির সন্তান। আমার রাজনীতির পাঠশালার নাম ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ তথা ছাত্র আন্দোলনের অতীত ও ঐতিহ্য নিয়ে এই বর্তমানেও গর্ববোধ করি আমি। এই যে জরুরি অবস্থার সময় ছাত্ররা আন্দোলন করল, বলা যায় দুই বছরে এই একটিই উদাহরণ, যার কাছে পেছনে থাকা সামরিক জান্তা পরাজিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগসহ কোনো রাজনৈতিক দলেরই উল্লেখ করার মতো ভূমিকা ছিল না তখন। কিন্তু এ-ও ঠিক, ছাত্র আন্দোলনের এই সুদীর্ঘ গৌরবগাথায় বর্তমানে কলঙ্কের দাগ লেগেছে। কারা করেছে সেগুলো? এ দেশের ছোট বা মাঝারি আকারের ছাত্রসংগঠনগুলো, যারা কোনো দিন ক্ষমতার স্বাদ পায়নি, তাদের এ সমস্যা নেই। এই সমস্যার ভিত্তি হলো ক্ষমতা। আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, তাই ছাত্রলীগ সামনে এসেছে। গতকাল বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তখন ছাত্রদল এসব করেছে। ক্ষমতাকে বুঝতে হবে যে তাদেরও পরিচ্ছন্ন হওয়া দরকার, অন্য সবকিছু পরিচ্ছন্ন করা দরকার। এটা কেবল আবেগ দেখানোর ব্যাপার নয়। আমি বরং বলব, একেবারে আবেগমুক্ত হয়ে গলদটা কোথায়, তা খুঁজে বের করতে হবে এবং এর মূল উৎপাটন করতে হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জনাব ওবায়দুল কাদের (যিনি দীর্ঘদিন ছাত্ররাজনীতি করেছেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, ছাত্রলীগের দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওকে কমিশনের প্রধান ছিলেন) সার্বিক ঘটনায় তাঁর হতাশা, দুঃখ ও লজ্জার কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, যেন দ্রুত বিচার আইনে অপরাধীদের বিচার করা হয়।
অপরাধী কারা? কয়জন? আমি আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এবং বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখেছি, অপরাধীর সংখ্যা সাধারণের তুলনায় সব সময় কম থাকে। এই অপরাধীদের ঠিকমতো খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদেরই শাস্তি দিতে হবে। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে গেলে ভয় পেলে চলবে না। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, মাটি খুঁড়তে গিয়ে পুরো জমিটাই যেন নষ্ট করে না ফেলি। আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে যেন বাগান উজাড় হয়ে না যায়। ছাত্রলীগে যা কলুষ তা থেকে মুক্ত হতে হবে। কিন্তু তার মানে ছাত্রলীগ থেকে মুক্ত হওয়া নয়। আমি ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে তো নয়ই, এমনকি সাময়িকভাবে এর কার্যক্রম স্থগিত করারও বিপক্ষে। আমি বরং লাগাতারভাবে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরের সব অপশক্তি ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে চাই। ছাত্রলীগকে দুর্বল বা অস্বীকার করলে অন্যরা বেড়ে যাবে, যাদের বেড়ে যাওয়া আমি চাই না।
পত্রিকায় পড়লাম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ছাত্রলীগের সভায় যেতে অস্বীকার করেছেন। এমনকি অন্য কোনো সংগঠনের সভায় যদি ছাত্রলীগের নেতারা উপস্থিত থাকেন, সেখানেও যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি। আমি খুব অবাক হয়েছি। বেগম মতিয়া চৌধুরী এ দেশের ছাত্র আন্দোলনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। মন্ত্রী ও নেতা হিসেবে তাঁর মতো সৎ ও নিষ্ঠ মানুষও বিরল। সেই তিনি যদি সত্যিই এ রকম বলে থাকেন, তবে তো ধরে নিতে হবে যে ছাত্রলীগ একেবারে পচে গেছে, যার কাছেও যাওয়া যায় না। ব্যাপারটা কি সত্যি এ রকম? ছাত্রলীগ একেবারে পচে গেছে? নিশ্চয়ই না। ছাত্রলীগে অবশ্য পচন ধরেছে। কিন্তু এখনো ঠিকমতো সততার সঙ্গে ব্যক্তি, গ্রুপ, আঞ্চলিকতা, আত্মীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে শুদ্ধি অভিযান চালালে ছাত্রসংগঠনকে আবারও সম্মানের জায়গায় আনা যাবে।
পত্রিকায় দেখলাম, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া হচ্ছে এবং আগামী মাসেই গঠন করা হচ্ছে নতুন কমিটি। এটি একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, পদক্ষেপটা নিল কে বা কারা? এটা কি ছাত্রলীগের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা উপলব্ধি? নাকি ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত? আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে এ কথা বুঝতে হবে যে এখন ছাত্রলীগকে সক্রিয়ভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। শেখ হাসিনার ছাত্রলীগের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিংবা মতিয়া চৌধুরীর বক্তব্য কেবল এই বিবেচনায় গ্রহণ ও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। ওকে কমিশন কিংবা বর্তমানে আওয়ামী লীগের তিনজন সাংগঠনিক সম্পাদককে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল এই বিবেচনাতেই সঠিক হতে পারে। সহযোগী সংগঠন হিসেবে তাঁরা ছাত্রলীগকে আজকের রাজনীতির প্রয়োজন ও চাহিদা বোঝাবেন, তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবেন এবং সতর্ক করে দেবেন এই বলে যে এর ব্যত্যয় হলে মূল দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকবে না।
এবার মূল প্রতিপাদ্যে আসি। নতুন কমিটির নেতৃত্বের খোঁজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাকে—এই খবর পড়ে যারপরনাই হতাশ হয়েছি। দেশে যখন গণতন্ত্র থাকে না, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সামরিক শাসন চলে, তখন গোয়েন্দাদের রাজত্ব চলে। কিন্তু এই গোয়েন্দারা বিডিআর বিদ্রোহ ঠেকাতে পারে না; বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবরই রাখে না; নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার নামে সমগ্র রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের মধ্যে এ ধরনের চিন্তা কাজ করছে, তা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। আমি আশা করব, এই সংবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হবে।
পত্রিকায় এ-ও পড়লাম, ছাত্রলীগের এই কমিটি ভেঙে দিয়ে আগামী জুনে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। এটি একটি ভালো খবর। গতবার যে রকম করে স্বচ্ছ ব্যালটবাক্সে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছিল, তা সবার প্রশংসা পেয়েছিল। এর মাধ্যমে যে নেতৃত্ব বেরিয়ে এসেছিল, তার ওপর আজ হয়তো অনেকেই হতাশ। কিন্তু আমি আগেই বলেছি, এ অবস্থার দায় সব তাদের নয়। এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে এই পদ্ধতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো।
মাহমুদুর রহমান মান্না: রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক।

গণতন্ত্রের স্বার্থে বর্ণপ্রথার বিলোপ by কুলদীপ নায়ার

স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথম যে কাজগুলো হাতে নিয়েছিলেন, তার মধ্যে বর্ণপ্রথার বিলোপ ছিল অন্যতম। সব সরকারি নথিপত্র, দলিল ও দরখাস্তে বর্ণ চিহ্নিত করার কলামটি মুছে দেওয়া হয়। এভাবে ঔপনিবেশিক যুগের একটি অভ্যাস বাতিল হলো, পূর্ণ করা হলো স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের একটি প্রতিশ্রুতি। বর্ণ উল্লেখ করার ব্রিটিশ রীতি প্রবর্তনের ৮৮ বছর পর ভারত বৈষম্যের এই কলঙ্কচিহ্ন থেকে মুক্ত হলো।
কিন্তু স্বাধীনতাসংগ্রামীরা কল্পনাও করতে পারেননি, স্বাধীনতার ৬২ বছর পর স্বাধীন দেশের সার্বভৌম সংসদ ব্রিটিশ যুগের সেই কলঙ্ক আবার ফিরিয়ে আনবে। পরিহাস আর কী, যে কংগ্রেস দল ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ছিল, তারাই আবার ব্রিটিশদের চালু করা বর্ণবাদী নিয়মটি ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিল। গত সপ্তাহে ঘোষণা করা হয়েছে, আগামী বছরের আদমশুমারির ফরমে যার যার বর্ণ চিহ্নিত করার একটি ঘর থাকবে। মনমোহন সিং সরকার খুব একটা উৎসাহের সঙ্গে এটা করেছে বলে মনে হয় না। কারণ, মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য এমন বিধিকে বৈষম্যমূলক বলে এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু এটাও মনে হয় যে কোনো মন্ত্রীই বর্ণবৈষম্যহীন একটি সমাজের জন্য ততটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নন। কিন্তু পূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য আবশ্যিক শর্ত হলো বর্ণপ্রথার সম্পূর্ণ বিলোপ।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এখন এ বিষয়ে কিছু করার রয়েছে। কারণ, সরকার ততটা সাহসী নয়। এবং এটাও সত্য যে লোকসভায় কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাহলেও কংগ্রেস যদি চাইত তাহলে বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সমর্থন তারা পেত। কিন্তু অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়কে তুষ্ট করার প্রয়োজন কংগ্রেস বোধ করেনি।
জাত নিয়ে সংকীর্ণতাকে উসকে দেওয়ার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা কংগ্রেস বুঝতে পারেনি। ভাগ করো, শাসন করো, এই ছিল ব্রিটিশনীতি। বিভক্তির শক্তিগুলো যতই সবল হোক, স্বাধীনতা-উত্তর সমাজকে হতে হবে সমন্বিত।
সরকারের নিদেনপক্ষে জাতীয় সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা উচিত ছিল। এ ধরনের সমস্যা আলোচনার জন্য সেটাই উপযুক্ত জায়গা। বর্ণপ্রথা সমগ্র জাতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যে সংসদ ভোটারদের ৫০ শতাংশেরও প্রতিনিধিত্ব করে না, তারা দেশকে অন্ধকার যুগে ঠেলে দিতে পারে না।

বিশ্বাসঘাতকতা
নির্বাচনী রাজনীতি তিন যাদব নেতাকে অন্ধ করে দিয়েছে—জনতা দলের বিচ্ছিন্ন অংশের নেতা শারদ যাদব এবং দুই মুখ্যমন্ত্রী উত্তর প্রদেশের মুলায়ম সিং যাদব আর বিহারের লালু প্রসাদ যাদব। এঁরা তিনজনই তাঁদের গুরু সমাজতন্ত্রী রাম মনোহর লোহিয়া এবং গান্ধীতে জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। লোহিয়া ও জয়প্রকাশ বর্ণভেদহীন সমাজে বিশ্বাস করতেন।
যাদব নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, আদমশুমারিতে বর্ণ চিহ্নিত করে রাখা হলে তাঁরা যেসব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (ওবিসি—আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস) স্বার্থ দেখেন, তারা জাতিগত সংরক্ষণ কোটায় আরও বেশি করে চাকরি ও পড়ালেখার সুযোগ পাবে। তাঁদের ধারণা, আদমশুমারি হলে দেখা যাবে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানের থেকে অনেক বেশি হবে। এখনই তাদের জন্য ২৭ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রয়েছে। এই পরিমাণ তফসিলি সম্প্রদায় ও উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত আসনের থেকে চার শতাংশ বেশি। সংবিধানে কিন্তু তফসিলি সম্প্রদায় ও উপজাতীয় ছাড়া আর কোনো সামাজিক গোষ্ঠীকে স্বীকার করা হয় না।
সুপ্রিম কোর্ট ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণের বিধান দিতে পারে। অর্থাৎ চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বেলায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশকে মেধার ভিত্তিতে আসতে হবে। এখন যাদবরা যদি আরও বেশি চান, তাহলে তাঁদের সুপ্রিম কোর্টে যেতে হবে। আদমশুমারি করে বা সংসদ তাঁদের এর বেশি সুবিধা দিতে পারবে না।
আদমশুমারির মাধ্যমেই সঠিক সংখ্যাটি জানার নিশ্চয়তা কী? শুমারকর্মী হয়তো কোনো সাধারণ মানুষকে তাঁর বর্ণ জানতে চাইবেন, উত্তরে ব্যক্তিটি যেকোনো কিছু বলতে পারে। উত্তরটি সঠিক কিনা তা জানার কোনো উপায় নেই। শুমারকারীর দায়িত্ব কেবল তাঁকে, যা বলা হবে তা লিপিবদ্ধ করা।
আইন বিষয়ে আমার জ্ঞান সীমিত। তার পরও আমার ধারণা, আদমশুমারিতে বর্ণ চিহ্নিত করা সংবিধানবিরোধী। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা রয়েছে যে জনগণ ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে গঠন করবেন। কেশবানন্দ ভারতীর মামলায়, সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে এই প্রস্তাবনার মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোটি দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, সংসদ কোনোভাবেই এটা বদলাতে পারবে না।
বর্ণপ্রথা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বিরোধী। জনগণকে বর্ণপ্রথার মাধ্যমে বিভক্ত করা অসাংবিধানিক। সরকার যদি এ বিষয়ে আরও এগোতে চায়, তাহলে তাদের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হবে। এখনই সেটা করা হচ্ছে না কেন?

উদ্দেশ্য
খুবই অবাক করা ব্যাপার যে বিজেপিও শুমারির ফরমে বর্ণের বিষয়টি উল্লেখ করাকে মেনে নিয়েছে। এই দলটি সবসময় আবেগের ঐক্যের কথা বলে আসছে। অথচ তারাই নির্বাচনী সুবিধার জন্য বর্ণপ্রথাকে মেনে নিচ্ছে। তারাও যাদবদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাচ্ছে। যাদবরা দেখাতে চাইছেন এটাই প্রগতিশীলতা। কেননা, তাঁরাও বুঝে গেছেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কেবল বর্ণই নয়, উপবর্ণীয়দেরও সমর্থন দরকার।
দারিদ্র্য কেবল ওবিসিদের মধ্যেই সীমিত নয়। যে দেশের ৪০ ভাগ মানুষের দৈনিক রোজগার এক ডলারেরও কম, সে দেশে সব রাজনৈতিক দলেরই উচিত দারিদ্র্যমুক্তির জন্য একযোগে কাজ করে যাওয়া। এখন সময় এসেছে সংরক্ষণ ও কোটাব্যবস্থাকে বর্ণের ভিত্তিতে নয়, দারিদ্র্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করার।
সংরক্ষণের পেছনে ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও, এর প্রধান সুফলভোগী হয়েছে ওবিসি এবং অন্যান্য তফসিলী সম্প্রদায় ও উপজাতীয় নেতারা। সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছে যে পরের প্রজন্মের এর সুফল পাওয়া উচিত। কিন্তু এসব গোষ্ঠীর নেতারা বিশেষত যাদবরা লাভবান হতে মরিয়া। ভারতকে সত্যিকারভাবে বর্ণভেদহীন দেশে পরিণত হতে হলে সংরক্ষণ ও কোটাব্যবস্থার ওপর থেকে এসব নেতার একচেটিয়া অবসান হওয়া উচিত।
ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক।

সরকার, রাজস্ব বিভাগ ও করদাতা by সাজ্জাদ জহির

রাষ্ট্রের চরিত্র যা-ই হোক না কেন, তার ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থ প্রয়োজন। হীরকের খনি বাইরে বিক্রি করে অথবা অন্য কোনো লাভজনক সম্পদ নিজের ব্যবস্থাপনায় রেখে, অথবা প্রজাদের (বা নাগরিকদের) ওপর করারোপ করে সে অর্থের জোগান হতে পারে। মানবসমাজে আদিকাল থেকেই এসব ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই পদস্খলনের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। হীরকের রাজা প্রশাসনের প্রতি অবহেলা করে ব্যক্তি ভোগবিলাসে অধিক মনোযোগী ছিলেন। তেমনই, তুঘলকি আমলে জমির খাজনা ফসলের অর্ধেক থেকে বৃদ্ধি করে দুই-তৃতীয়াংশ করলে প্রজাদের জঙ্গলে পালাতে হয়েছিল। ফলে কোষাগার শূন্য হতে বসেছিল। অপরদিকে, দিল্লির সম্রাটের প্রতিনিধি হয়ে খাজনা তুলতে এসে অনেকেই বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বতন্ত্র রাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে সেই খাজনার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়েছিল।
এসব কাহিনি ও ঘটনা সত্ত্বেও এটা অনস্বীকার্য যে সুষ্ঠু নাগরিক-জীবন নিশ্চিত করতে প্রশাসন আবশ্যিক এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই জনসাধারণকেই অর্থ সরবরাহ করতে হবে। আর এই অর্থ সরবরাহটি হয় মূলত কর আদায়-প্রদানের মাধ্যমে।
কর আদায় প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে সরকারের হাতে সম্পদের স্থানান্তর ঘটে, যা বরাবরই প্রশাসনের ব্যয়ভার নির্বাহে ও বিনিয়োগে যৌক্তিকতা পায়। তবে নীতিনির্ধারকেরা কর কাঠামোকে হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেন; বিশেষত, বাজারের ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট অদক্ষতা দূর করতে অথবা সার্বিক রাজস্ব নীতির আলোকে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে। অনেক সময় সেই হাতিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, যা সরকারি বণ্টন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। এসবের বাইরেও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের সমাজে কর-সংক্রান্ত তথ্যের অপব্যবহার হতে দেখা গেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের কয়েকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করব।
কর-সংগ্রহ বনাম করজালের আওতা বৃদ্ধি: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপক ও জনসাধারণের মাঝে যে প্রয়োগকারী সংস্থা রয়েছে, তাদের উদ্যোগী করতে অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়ার রীতি বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে দেখা যায়। যেমন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ করতে হয়; ট্রাফিক পুলিশকে ফি আদায় করতে হয় ইত্যাদি। কর কর্মকর্তাদের ন্যূনতম পরিমাণ কর আদায়ের মাত্রা বেঁধে দেওয়া ও সেই পরিমাণের অধিক কর সংগ্রহ হলে তার ওপর প্রণোদনা দেওয়ার চল শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এ জাতীয় পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো কর সংগ্রহের পরিমাণ সর্বাধিক করা। কিন্তু একটি কর আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের জন্য এ জাতীয় লক্ষ্য থাকা কাম্য কি?
বস্তুত কর আদায়ের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রচলিত কর কাঠামোতে যাঁদের প্রত্যক্ষ কর দেওয়ার কথা, তাঁরা সেটা দিচ্ছেন কি না। সেটা করতে গিয়ে একদিকে যেমন সৎ ও আগ্রহী করদাতাদের হয়রানি না হয়, তেমনি অসৎভাবে যাঁরা কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের যেন অনাকাঙ্ক্ষিত যোগসাজশ না ঘটে। যদি কর কর্মকর্তাদের অসাধুতার কারণে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের পরিমাণ কম হয়, উল্লিখিত ধরনের প্রণোদনা দিয়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। বরং, কর্মকর্তা প্রতি কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিলে তার অপপ্রয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নানা অজুহাতে সৎ করদাতাদের হয়রানি করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের প্রবণতাও দেখা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে করজালে নিবন্ধন করার লক্ষ্যমাত্রা (সম্ভাব্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যাদের আইনানুগভাবে কর দেওয়া উচিত) নির্ধারণই অধিক কাম্য।
ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠান: এটা অনস্বীকার্য যে আমাদের সমাজের অনেকেই প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আয় উপার্জন করেন না। তার পরও করদাতাদের অধিকাংশই কোনো না কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে মালিক বা বেতনভোগী হিসেবে কর্মরত আছেন। এসব ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে করজালে নিয়ে আসা এবং পরবর্তীকালে নিয়মিত কর প্রদানে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
কেননা, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তি করদাতার তুলনায় সাধারণত একজন কর কর্মকর্তা অধিক ক্ষমতাবান হওয়ায় স্বেচ্ছাচারিতার সম্ভাবনা অধিক। এবং অনস্বীকার্য যে ব্যক্তিপর্যায়ে অবৈধ লেনদেনের সুযোগ বেশি। সেই তুলনায় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হলে, নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার আশ্রয় এবং অন্যান্য সহকর্মীর সহায়তা নিতে হবে।
পর্যায়ক্রমে প্রত্যক্ষ কর-সংক্রান্ত তথ্যাদি কম্পিউটারে মজুদ করতে হবে, যা প্রয়োজনে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি যাচাইয়ের সুযোগ এনে দেবে। যত বেশি প্রতিষ্ঠান করজালে নিবন্ধিত হবে এবং তাদের দ্বারা ব্যক্তিদের সম্মানী/বেতনসংক্রান্ত তথ্যাদি পাওয়া যাবে, তত বেশি ব্যক্তিপর্যায়ে কর দাখিল নিশ্চিত সম্ভব হবে।
আবার প্রত্যেক ব্যক্তির পেছনে লেগে থাকতে যে লোকবল ও অর্থের প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক কম লোকবল ও অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে করজালে আনা সম্ভব। তাদের মাধ্যমে করযোগ্য ব্যক্তিদের অধিক সম্পদশালী অংশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।
কর কর্মকর্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনাকে তাই কে কয়টি প্রতিষ্ঠান করজালে আবদ্ধ করল তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এর ফলে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে, কর্মকর্তাদের প্রণোদনাভিত্তিক আয় বৃদ্ধি পাবে, মোট রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হবে এবং সর্বোপরি সৎ করদাতাদের হয়রানি কমে কর ফাঁকি দেওয়া ব্যক্তিদের করজালে আবদ্ধ করা সহজ হবে। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকেরা এটাই কি চান না?
কয়েকটি প্রস্তাব: ব্যক্তির ওপর সরাসরি আরোপিত কর আদায়ের ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিলের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ব্যক্তিকে দেয় বেতন/সম্মানী সংশ্লিষ্ট সব তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। উৎসে আগাম কর কর্তন সম্পর্কে বিধিমালা স্পষ্ট করা ও চালান জমা দেওয়ার ফরমে বেতন/সম্মানীপ্রাপ্তদের ওপরও সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি রাখা প্রয়োজন।
যেহেতু কর জালের আওতায় আনার অর্থ এই নয় যে একজনকে কর দিতেই হবে, সেহেতু কর বিবরণী দাখিলকারী প্রতিটি ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম কর ধার্য করা অনুচিত। বিশেষত করযোগ্য আয়ের নিম্নসীমা যেখানে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সেখানে ব্যক্তিপ্রতি কর ধার্য নিঃসন্দেহে অসংগতিপূর্ণ। এ জাতীয় ভাবনাহীন নীতি স্বল্প মেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ক্ষতিকারক।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের সরকার ব্যক্তির অধিকারের প্রতি প্রায়শই শ্রদ্ধাশীল নয়। তাই কারও পক্ষে অতিরিক্ত কর জমা পড়লে তা ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমতাবস্থায় ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা দরকার। যাঁরা মাসিক ১৫ হাজার টাকা বা তার কম পাবেন তাঁদের ক্ষেত্রে কর্তন হবে না, যাঁরা মাসিক ১৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পাবেন তাঁদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ; এবং যাঁরা ৩৫ হাজার টাকার পাবেন তাঁদের জন্য ১০ শতাংশ হারে আগাম উৎসে কর কর্তন করা যেতে পারে।
দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এ নিয়ম বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। দেশি, বিদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সব বিদেশি নাগরিক, যাঁরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানী/বেতন পেয়ে থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বাছবিচার করতে গিয়ে করজালেই ফাঁক তৈরি হয়।
আবার আজকের যুগে যেখানে দাতা নামক প্রতিষ্ঠানও বাণিজ্যিক কর্মে লিপ্ত এবং সবাই যখন শেষ বিচারে বেতনভোগী, সেখানে বেশ কিছু বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে করমুক্ত রাখায় (সেবাধর্মী) শ্রমবাজারে বিকৃতি দেখা দিয়েছে, কর আদায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠাও দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের (বহিঃসম্পদ বিভাগ) সঙ্গে ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর যে কর অবমুক্তির চুক্তি রয়েছে, তার পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তথ্য সবরাহ করে, এ জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে লিমিটেড কোম্পানির মুনাফার ওপর বড় অঙ্কের কর দেওয়ার কথা। এবং কর-পরবর্তী লভ্যাংশকে ব্যক্তি আয় গণ্য করে দ্বিতীয় দফায় কোম্পানির মালিকদের কর দেওয়ার কথা। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, করের বোঝার কারণে অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবের মারপ্যাঁচে মুনাফা দেখান না। অনেক ক্ষেত্রে এমন অভিযোগও ওঠে যে এসব অনিয়মে কর প্রশাসন থেকেই সহায়তা পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তথ্য প্রদানে উৎসাহিত করতে তাই করকাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।
সাজ্জাদ জহির: পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ।
sajjad@ergonline.org

সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি হতাহত -ভারতের আশ্বাস কি নিছক আশ্বাস হয়ে থাকবে

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে আবারও প্রাণ দিতে হলো দুই নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিককে। নিহত ব্যক্তিদের একজন ১০ বছরের শিশু। আর আহত হয়েছেন এক গৃহবধূসহ দুজন। বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহতের এ ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার রত্নাই সীমান্তে গরুকে ঘাস খাওয়ানোর জন্য ভুলে সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে ঢুকে পড়লে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। কোনোরূপ উসকানি ছাড়াই নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যার মাধ্যমে বিএসএফ আমাদের কাছে তার পরিচিত রূপেই হাজির হলো।
বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক আলোচনায় অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার বিষয়টি। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়, সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হবে না। কিন্তু বিএসএফের আচরণে তার কোনো প্রতিফলন লক্ষ করা যায় না। এই আশ্বাস কি নিছক আশ্বাস হয়েই থাকবে?
গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে শুভ সূচনা ঘটেছে, তাকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হলে সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা, তথা বিএসএফের গোলাগুলি বন্ধ করতেই হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তখন দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের আচরণ সংযত করা এবং জীবনহানি বন্ধ করার আবশ্যকতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের এ ধরনের আচরণ তাদের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অপরাধ দমনের নামে নিরীহ ব্যক্তিদের হত্যার বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না। সীমান্তরক্ষীদের মনে রাখা দরকার, মানুষ হত্যা করে সীমান্তে চোরাচালান বা কোনো ধরনের বেআইনি কাজ রোধ করা যায় না। একদিকে নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যা করা হয়, অন্যদিকে বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির উপাদানসহ নানা ধরনের পণ্যের চোরাচালানের খবর পত্রিকায় ছাপা হতে দেখা যায়। মানুষ মেরে সীমান্তসংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনের ভাবনা থেকে সরে আসা দরকার বলে আমরা মনে করি।
বাংলাদেশ ন্যায়সংগতভাবেই প্রত্যাশা করে, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ভারত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, সীমান্তে নিরীহ নাগরিকদের হত্যার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে সীমান্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জরুরি।

বিএনপির মহাসমাবেশ -পারস্পরিক দোষারোপ কাম্য নয়

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সভা-সমাবেশ করার অধিকার যেকোনো নাগরিক বা সংগঠনের আছে। এসব সভা-সমাবেশ বাধাগ্রস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এসবের নামে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হোক, সেটাও কাম্য নয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরে যে মহাসমাবেশ করছে, তা তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবেই আমরা বিবেচনা করছি। ইতিমধ্যে চারটি বিভাগীয় শহরে বিএনপির মহাসমাবেশ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি স্থানে সমাবেশগামী নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির দাবি, সরকারি দলের ক্যাডাররা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দল বলছে, অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বোঝা যায়, বিষয়টিতে পারস্পরিক দোষারোপের পুরোনো সংস্কৃতি কাজ করছে, যা প্রত্যাশিত ছিল না।
১৯ মে ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চাপান-উতোর চলছে। বিএনপির অভিযোগ, সরকার নানাভাবে তাদের মহাসমাবেশ বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। সমাবেশের অনুমতি দিলেও মাইকিং ও প্রজেক্টরের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমতি দেয়নি। একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশকে কেন্দ্র করে এ ধরনের পরিস্থিতি কাম্য নয়। সরকারের দায়িত্ব বিএনপিকে সভা করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। আর বিএনপিরও কর্তব্য হবে আইন মেনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করা। এ নিয়ে অহেতুক উত্তেজনা ছড়ালে জনমনে শঙ্কা বাড়বে, বিঘ্নিত হতে পারে শান্তিশৃঙ্খলাও। আত্মপক্ষ সমর্থনের নামে কারোরই উচিত হবে না উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া।
বিরোধী দলের একটি মহাসমাবেশের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অকারণ উত্তেজনা সৃষ্টি হোক, তা কেউ চায় না। এ ব্যাপারে সরকারকে যেমন সহনশীল আচরণ করতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকেও হতে হবে সংযত। সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যা বিরোধী দলের সমাবেশকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অনেক সময় সমাবেশকে ঘিরে রাস্তাঘাটে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, সৃষ্টি হয় যানজট; এমনকি জবরদস্তিভাবে যানবাহন চলাচল বন্ধ করার ঘটনাও ঘটে। রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে জনগণের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে খেয়াল রাখতে হবে। এসব সভা-সমাবেশ সাপ্তাহিক বা কোনো ছুটির দিনে করলে জনদুর্ভোগ কম হয়। জনগণের জন্য যাঁরা রাজনীতি করেন, কর্মসূচি নেওয়ার সময় জনদুর্ভোগের বিষয়টি তাঁদের মাথায় রাখতে হবে।
সবার প্রত্যাশা, বিএনপির ১৯ মের মহাসমাবেশ নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপি জানিয়েছে, এই মহাসমাবেশ থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। আমাদের সবার প্রত্যাশা, বিরোধী দল এমন কোনো কর্মসূচি দেবে না, যাতে জনজীবন বিপর্যস্ত কিংবা দেশের ভঙ্গুর অবস্থা আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াতের জীবনাবসান

ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ভৈরোঁ সিং শেখাওয়াত আর নেই। গতকাল শনিবার জয়পুরের সওয়াই মান সিং হাসপাতালে স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ১০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৩ মে তিনি শ্বাসকষ্ট নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি ফুসফুস ও বুকের সংক্রমণে ভুগছিলেন। তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
ভৈরোঁ সিং ১৯২৩ সালের ২৩ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। তিনি তিন মেয়াদে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
২০০২ সালে তিনি ভারতের ১১তম উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিভা পাতিলের কাছে হেরে যাওয়ার পর ২০০৭ সালের ২১ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।

রোমান পোলানস্কির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের নতুন অভিযোগ

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক রোমান পোলানস্কির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির নতুন অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে এক সংবাদ সম্মেলনে একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্রাভিনেত্রী এই অভিযোগ করেন। ওই অভিনেত্রী দাবি করেন, ১৬ বছর বয়সে তিনি পোলানস্কির যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
১৯৭৮ সালে একটি শিশুকে যৌন নির্যাতন করার মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে পোলানস্কির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কয়েক মাস আগে সুইজারল্যান্ড সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করলেও পরে তিনি জামিন পান। যুক্তরাষ্ট্র সরকার পোলানস্কিকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সুইস সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। বর্তমানে তিনি সেখানে গৃহবন্দী রয়েছেন। ২০০২ সালে দ্য পিয়ানিস্ট চলচ্চিত্রের জন্য অস্কার পুরস্কার পান পোলানস্কি।
সংবাদ সম্মেলনে ওই অভিনেত্রী (৪২) দাবি করেন, প্রায় ৩০ বছর আগে প্যারিসে একটি অ্যাপার্টমেন্টে পোলানস্কির যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমিও পোলানস্কির একজন শিকার। যখন আমার বয়স মাত্র ১৬, তখন তিনি আমাকে সবচেয়ে খারাপ উপায়ে যৌন নির্যাতন করেছেন। তিনি জানতেন আমার বয়স ১৬। ওই ঘটনার পর থেকে আমি এর প্রভাব বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি ন্যায়বিচার চাই।’ তবে সংবাদ সম্মেলনে ধর্ষণ শব্দটি ব্যবহার করেননি তিনি।
অভিযোগকারী এই অভিনেত্রী ১৯৮৬ সালে পোলানস্কি নির্মিত পাইরেটস নামের চলচ্চিত্রে একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
অভিনেত্রীর আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড বলেন, অভিনেত্রী লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। পোলানস্কিকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হলে এই অভিযোগটি আদালত আমলে নেবেন বলে আশা করছেন তাঁরা।
এ ব্যাপারে পোলানস্কির আইনজীবী জর্জেস কিজমান ফরাসি সংবাদমাধ্যম আই-টেলেকে বলেন, ওই অভিনেত্রীর অভিযোগ শুনে তিনি সত্যিই বিস্মিত। কিজমান আরও বলেন, ‘তিনি যদি আবারও এমন অভিযোগ তোলেন, তাহলে আমরা আদালতের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব।

এটিএম থেকে স্বর্ণমুদ্রা

অটোমেটেড টেলার মেশিন বা এটিএম টাকা-পয়সা তোলার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অর্থ লেনদেনের জন্য এই যন্ত্রের ব্যবহার এখন একটি সাধারণ ঘটনা। সাধারণত গ্রাহক ওই যন্ত্র থেকে একটি যন্ত্রপাঠযোগ্য কার্ড ব্যবহার করে কাগুজে নোট তুলে থাকেন। কিন্তু আবুধাবির একটি হোটেলে এমন একটি এটিএম বসানো হয়েছে যেখান থেকে স্বর্ণ মুদ্রা বা ছোটো আকারের স্বর্ণ খণ্ড পাওয়া যাবে।
গত বৃহস্পতিবার আবুধাবির এমিরেটস প্যালেস হোটেলে ওই এটিএমের উদ্বোধন করা হয়। সেখানে প্রতিদিনের স্বর্ণের দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে এটিএম থেকে ১০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের সোনার বার বা সোনার মুদ্রা দেওয়া হবে।
অভিনব এই এটিএমের ধারণা জার্মান উদ্যোক্তা থমাস গিজলেরের। তিনি বলেন, স্বর্ণ বাণিজ্যের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক রয়েছে। আর আবুধাবির জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশেই এ ধরনের যন্ত্র মানানসই।

লেবার পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে এড মিলিব্যান্ড

ব্রিটেনের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন। গত শুক্রবার ব্রিটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস এ খবর জানায়। এড মিলিব্যান্ড লেবার পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে আরেক প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড মিলিব্যান্ডের ছোট ভাই।
যুক্তরাজ্যের এবারের সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় লেবার পার্টির ১৩ বছরের শাসনের অবসান হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন গর্ডন ব্রাউন। নেতৃত্বের এই শূন্যপদ পূরণ করতেই দুই ভাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
এড বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার ব্যাপারে তিনি অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ অন্যদিকে বড় ভাই ডেভিড বলেন, ‘এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে দুই ভাইয়ের সম্পর্কে কোনো সমস্যা তৈরি হবে না। কারণ, রাজনীতির চেয়ে ভ্রাতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ।’ এখন পর্যন্ত দলের নেতৃত্বের জন্য এই দুই ভাই আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক শিক্ষামন্ত্রী এড বলস ও পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) জন ক্রুডাসও এই পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গত বুধবার প্রার্থিতার ঘোষণা দেন ডেভিড মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে লেবার পার্টিকে একটি সংস্কারবাদী দল হিসেবে পুনর্গঠিত করতে চান তিনি। ডেভিড আরও বলেন, ‘লেবার পার্টি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে এবং খুব খারাপভাবে হেরেছে। এখন আমাদের জনগণের সঙ্গে আবার সম্পর্ক ভালো করতে হবে এবং জানার চেষ্টা করতে হবে কেন আমরা পরাজিত হলাম।’
এর আগে লেবার পার্টির নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন অ্যালান জনসন, হ্যারিয়েট হারম্যান ও জ্যাক স্ট্রর মতো নেতারা। এড মিলিব্যান্ডের সমর্থকেরা এরই মধ্যে একটি ওয়েব সাইট চালু করেছে। এতে বলা হয়েছে, তারা দ্রুত কনজারভেটিভ পার্টির শাসনের অবসান চান।
ডেভিড মিলিব্যান্ডের চেয়ে এড মিলিব্যান্ড কম পরিচিত। তবে এডের পেছনে শ্রমিক সংঘ ইউনাইটের সমর্থন রয়েছে। এ ছাড়া দলের নির্বাচিত কয়েকজন এমপিও তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন। অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালান জনসনসহ লেবার পার্টির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ডেভিডের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন।

মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত শুক্রবার মিয়ানমারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়িয়েছেন। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে চাপে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৭ সালে ওই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারে বিনিয়োগ করছে না। মিয়ানমারও যুক্তরাষ্ট্রে তার কোনো পণ্য রপ্তানি করতে পারে না।
নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওবামা কংগ্রেসে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমার সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও নীতি মার্কিন সরকারের নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আবারও বাড়ানো হলো।
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সে দেশের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) বিলুপ্ত করার কয়েক দিনের মাথায় মার্কিন সরকার ওই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধি করল।

ব্রিটেনে সাবেক মন্ত্রী ছুরিকাঘাতে আহত

ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী ও লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য স্টিফেন টিমস হামলার শিকার হয়েছেন। একজন মুসলিম নারী তাঁকে ছুরিকাঘাত করেছেন। তিনি টিমসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর পেটের দুটি স্থানে ছুরিকাঘাত করেন। পূর্ব লন্ডনের নির্বাচনী এলাকায় গত শুক্রবার সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠককালে এ ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে ইস্ট হ্যামের আসন থেকে টিমস পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। খবর পিটিআইর।
পুলিশ জানায়, স্টিফেন টিমস শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর নির্বাচনী এলাকার সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠককালে মুসলিম পোশাক ও স্কার্ফ পরিহিত এক নারী তাঁর ওপর হামলা চালান। এ সময় টিমসের সহযোগী অ্যান্ড্রু বেইজলি তড়িঘড়ি করে ওই নারীকে ধরে ফেলেন এবং তাঁর কাছ থেকে অস্ত্রটি ছিনিয়ে নেন।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত টিমসের নির্বাচনী সহযোগী উন্মেষ দেসাই বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! এ কারণে যে অ্যান্ড্রু সময়মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ওই নারীর কাছ থেকে ছুরিটি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং তাঁকে পুলিশ আসা না পর্যন্ত ঝাপটে ধরেছিলেন।’ টিমস বর্তমানে রয়াল লন্ডন হসপিটালে ভর্তি রয়েছেন।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড জানায়, ঘটনাস্থল থেকে একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে টিমসকে কেন ছুরিকাঘাত করা হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ওই নারী বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।
২০০০ সালের পর ব্রিটেনে কোনো এমপির ওপর হামলা এটাই প্রথম। তখন লিবারেল ডেমোক্র্যাটস পার্টির এমপি নিগেল জোনসের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। রবার্ট আশম্যান নামের এক ব্যক্তি তলোয়ার দিয়ে তাঁকে আঘাত করেছিলেন।

শেষ মিশনে আটলান্টিসের মহাকাশ যাত্রা

মার্কিন মহাকাশযান আটলান্টিস শেষ মিশনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। ছয়জন নভোচারী নিয়ে যানটি গত শুক্রবার ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উড়াল দেয়।
উৎক্ষেপণ-উত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে নাসার প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিল গেরস্টেনমেইর সাংবাদিকদের জানান, আটলান্টিসের উড্ডয়ন সফল হয়েছে। যানটি ঠিকমতো কাজ করছে। সব কিছু ভালো আছে।
এবারের মিশন ১২ দিনের। আটলান্টিস রাশিয়ার তৈরি গবেষণা মডিউল ও কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ ছাড়াও গবেষণাকাজে সহায়ক অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। এটি আটলান্টিসের ৩২তম মিশন। এই মিশনের মধ্য দিয়ে আটলান্টিসের মিশন শেষ হচ্ছে। এরপর যানটির জায়গা হবে জাদুঘরে।
খরচ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নাসা কর্তৃপক্ষ এই নভোযানটিকে মহাকাশ অভিযানে আর ব্যবহার করবে না। এরপর থেকে এ ধরনের অভিযানে মহাকাশযান ডিসকভারি ও এনডেভার অংশ নেবে। আটলান্টিস ১৯৮৫ সালে প্রথম মহাকাশের উদ্দেশে যাত্রা করে।

থাইল্যান্ডে সেনাদের দমনাভিযান অব্যাহত, আরও ছয়জন নিহত

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের পরিস্থিতি এখনো অশান্ত। থাকসিনপন্থী লালশার্ট পরা বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন পুরোদমে চলছে। বসে নেই নিরাপত্তা বাহিনীও। তারাও কঠোর হাতে দমন চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার সেনাদের গুলিতে আরও ছয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত তিন দিনে সেনাদের গুলিতে ২৩ জন নিহত ও দেড় শতাধিক আহত হয়েছেন।
রাজধানী ব্যাংকক থেকে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দিতে সেনাবাহিনী আরও কঠোর দমন অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে কবে, কখন ওই অভিযান শুরু হবে, সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। এদিকে লালশার্ট পরা বিক্ষোভকারীদের নেতা জতুপর্ন প্রমপান থাইল্যান্ডের বর্তমান পরিস্থিতিকে গৃহযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ব্যাংককের যে বাণিজ্যিক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তার পাশে অবস্থিত রাচাপ্রাসং রোড এলাকা থেকে গতকাল তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিদেশি নাগরিক এএফপিকে জানান, থাইল্যান্ডের জাতীয় পতাকা নিয়ে ২০ জন লালশার্ট বিক্ষোভকারী সেনাদের দিকে এগিয়ে গেলে সৈন্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ওই ছয়জন নিহত হন।
ওই বিদেশি জানান, মাত্র ২০ মিটার দূর থেকে কোনো রকম হুঁশিয়ারি ছাড়াই তাঁদের গুলি করা হয়। ওই এলাকার একটি হাসপাতাল সূত্রে বলা হয়েছে, শনিবার ছয়টি মৃতদেহ তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ওই বিদেশির বর্ণনা করা মৃতদেহ কি না, সেটা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ওই এলাকায় আরেকজনকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তিনি মারা গেছেন কি না, তা জানা যায়নি। বাণিজ্য ও পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত সিলমেও সৈন্যরা গুলি ছোড়ে। সেখানে দুজন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ সময় বিক্ষোভকারীরা সেনাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। ব্যাংককের আশপাশের শহরগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে সেনাদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে।
এদিকে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সানসান কাওকুমনার বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভের অবসান না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা আছে সেনাবাহিনীর। তবে তারা ওই অভিযান চালানোর জন্য কোনো সময় ঠিক করেনি। কারণ অভিযান শুরু হলে অনেক প্রাণহানির আশংকা রয়েছে।
ব্যাংককের সিলম এলাকা বিক্ষোভকারীরা দুই মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। এতে ব্যাংককের এক কোটি ২০ লাখ লোকের জীবনযাত্রা কার্যত থমকে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। কমে গেছে পর্যটক। ওই এলাকায় বড় বড় বিপণিকেন্দ্রে, পাইকারি দোকান, বিলাসবহুল হোটেলসহ পর্যটন-সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এদিকে লালশার্ট বিক্ষোভকারীদের নেতা জতুপর্ন প্রমপান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আর গৃহযুদ্ধের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই সংঘাতের অবসান কীভাবে হবে, সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীরা এম-৭৯ গ্রেনেডের সাহায্যে তাঁদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন।
থাইল্যান্ডের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সিঙ্গাপুর। দেশগুলো উভয়পক্ষকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ভিনগ্রহের প্রাণীর নভোযান ছিনতাই!

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার একটি নভোযান ‘ভিনগ্রহের প্রাণীরা ছিনতাই’ করেছে বলে খবর চাউড় হয়েছে। জার্মানির একজন শিক্ষাবিদ দাবি করেছেন, নাসার মহাকাশযান ভয়েজার-২ পৃথিবী ও এর বায়ুমণ্ডলের বাইরের কেউ ‘ছিনতাই’ করেছে। ভিনগ্রহের প্রাণীরা এখন এই যান ব্যবহার করে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
মনুষ্যবিহীন নভোযান ‘ভয়েজার-২’ ১৯৭৭ সালে মহাশূন্যে পাঠানো হয়। এর পর থেকে এটি অব্যাহতভাবে তথ্য পাঠাতে থাকে। নাসার বিজ্ঞানীরা এই তথ্যের সহায়তায় মহাশূন্য নিয়ে গবেষণা করতেন। কিন্তু নভোযানটি ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল হঠাৎ তথ্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে। তাঁরা দাবি করেছেন, সফটওয়ার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে নভোযানটির তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে।
তবে জার্মান শিক্ষাবিদ হার্টউইগ হুজডর্ফ বলেছেন, ‘তাঁর বিশ্বাস, নভোযানটি ভিনগ্রহের কেউ ছিনতাই করেছে। এটি তাদেরই কাজ।’ নিজের বক্তব্যের পক্ষে হুজডর্ফ বলেন, ভয়েজার-২ নভোযানের অন্য সব অংশের কাজ খুবই সুন্দরভাবে চালু রয়েছে। শুধু তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে এর সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
জার্মান পত্রিকা বিল্ডকে হুজডর্ফ বলেন, ‘ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, কেউ না কেউ নভোযানটির যান্ত্রিক কলাকৌশল নিয়ন্ত্রণ করছে অথবা ছিনতাই করেছে। তবে পুরো সত্য ঘটনাটি আমরা এখনো জানতে পারিনি।’
ভয়েজার-২ নভোযানে ৫৫টি ভাষার একটি ডিস্ক সংযুক্ত করা আছে। মহাশূন্যে কোনো শত্রুর সামনে পড়লে সে বিষয়ে ভয়েজার-২ যেন তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠাতে পারে, সে জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের অন্যতম বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড স্টোন বলেন, ‘গোল্ডেন রেকর্ড’ নামের ৫৫টি ভাষার এই ডিস্ক এ কারণে সংযুক্ত করা হয়েছে যে পৃথিবী বা এর বায়ুমণ্ডলের বাইরের কারও মুখোমুখি হলে ভয়েজার-২ যেন পৃথিবী সম্পর্কে তাকে ধারণা দিতে পারে। এ জন্য ডিস্কটিতে ১২ ইঞ্চির একটি ফোনোগ্রাফ রেকর্ডার সংযুক্ত করা আছে। এই রেকর্ডারে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ছবি ও শব্দ রেকর্ড করা হয়েছে।’

বড় হামলা চালানোর ক্ষমতা কমে গেছে আল-কায়েদার

আল-কায়েদার বড় ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা কমে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ব্যাপক অভিযানের কারণে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এই সন্ত্রাসী সংগঠন ছোটখাটো হামলা চালাতে চেষ্টা করছে, যা শনাক্ত করা ও ঠেকানো তুলনামূলকভাবে বেশ কঠিন। আল-কায়েদার ক্ষমতা সম্পর্কে সম্প্রতি এ মন্তব্য করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একজন সাবেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বহু লোক হতাহত হওয়ার মতো এমন হামলা হতে পারে, যার সঙ্গে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা থাকবে। এই বিশ্লেষক পাকিস্তান ও আফগানিস্তানবিষয়ক নীতি প্রণয়নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সহযোগিতা করেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র জিওফ মোরেল বলেন, আল-কায়েদা ও তাদের সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলোর বড় ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা যে কমে গেছে, তা একদম পরিষ্কার। তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানোর ফলে তাদের এই ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
মোরেল বলেন, ‘পেন্টাগন ও ওবামা প্রশাসনের বিশ্বাস, আমাদের দেশকে আমরা রক্ষা করতে সক্ষম হব। কারণ সন্ত্রাসীরা যেখানে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, হামলার ষড়যন্ত্র করছে, সেখানে গিয়ে আমরা লড়াই করতে পারছি। এভাবে তাদের দৌড়ের ওপর রাখায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানোর মতো বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা তারা করতে পারছে না। ৯/১১-এর হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি দেখেছি, এ ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা তাদের কমে গেছে।’
এদিকে সিআইএর ওই সাবেক বিশ্লেষক ব্রুস রিডেল বলেন, ‘পাকিস্তানে এখন যা ঘটতে দেখছি, তা খুব বিপজ্জনক।’ তিনি বলেন, আল-কায়েদাসহ বিশ্বের ইসলামি জিহাদি সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোর শত্রু হিসেবে দেখে। এসব সংগঠনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে ওবামা ও বুশ প্রশাসন পাকিস্তানকে চাপ দিয়ে এসেছে। কিন্তু পাকিস্তানের কোনো সরকারই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর গোটা নেটওয়ার্ক বন্ধে উদ্যোগ নেয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও পাকিস্তান সরকারের কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। সন্দেহ করা হচ্ছে, আফগান তালেবান, পাকিস্তানি তালেবান, লস্কর-ই-তাইয়েবাসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র রয়েছে।

সাতের দুই রাজ

টি-টোয়েন্টিতে সাত নম্বরে নেমে বেশি কিছু করার সুযোগ বলতে গেলে থাকেই না। অথচ নিয়মিতই দারুণ সব ইনিংস খেলে যাচ্ছেন মাইক হাসি। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অতিমানবীয় ইনিংসটার আগে এই বিশ্বকাপেই বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাতে নেমে খেলেছেন গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইনিংস। সব মিলিয়ে সাত নম্বরে ৬ ইনিংস খেলে ২০৬ রান করেছেন, টি-টোয়েন্টিতে সাতে নেমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান। মাত্র একবার আউট হওয়ায় গড়ও ২০৬! পরশু তাঁর অপরাজিত ৬০ টি-টোয়েন্টিতে সাতে নেমে তৃতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। এর চেয়ে বড় ইনিংস দুটি যাঁর, সাতে নেমে সবচেয়ে বেশি রানও তাঁর। সাত নম্বরে ১০ ইনিংস খেলে ২২০ রান করেছেন জ্যাকব ওরাম, দুটি ইনিংস আছে ৬৬ ও ৬১ রানের।

হকির লাঠিখেলা!

রবি এশিয়ান গেমস বাছাই হকিতে দর্শক টানতে কত চেষ্টাই না করল ফেডারেশন! গ্যালারি উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। ম্যাচের বিরতিতে দর্শকদের বিনোদন দিতে আনা হলো ঢোলবাদকের দল। প্রতি ম্যাচের বিরতিতেই দেখা যায় তাদের সরব উপস্থিতি। ঢোলের বাজনা শোনা যাবে আজকের সমাপনী অনুষ্ঠানেও। বেলা ৩টায় বাংলাদেশ-ওমান ম্যাচ শেষে হকি মাঠে এই বাজনার তালে শুরু হবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। এ জন্য কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কুষ্টিয়া থেকে আনা হবে শ-খানেক লাঠিয়াল।

জয়ের আশা নিয়েই নামবে আবাহনী

দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট পাওয়া আবাহনীর সামনে শেষ গ্রুপ ম্যাচে জয়ের বিকল্প নেই। এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপে দুবারের চ্যাম্পিয়ন কিরগিজস্তানের শক্তিশালী দরদই বিশকেক আজ তাদের প্রতিপক্ষ। এই ম্যাচে জিতলে প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলার টিকিট পেয়ে যাবে আবাহনী।
দুই ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় দরদই। আজ আবাহনীর বিপক্ষে তাদের ড্র করলেই চলে। টুর্নামেন্টের আগের ৫টি আসরেই ফাইনালে খেলা দরদইয়ের কাছে সেমিফাইনাল একরকম ডালভাত।
আবাহনীর জন্য কাজটা কঠিন। তবে হেরে বা ড্র করে বিদায় নয়, কোচ অমলেশ সেন আজ জয়ের আশাই করছেন, ‘দরদইকে হারানো অসম্ভব নয়। ভালো ফুটবল খেলতে হবে এবং গোলের সুযোগ নষ্ট করা যাবে না।’
নেপালের নিউ রোডকে ২-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা আবাহনী পরশু চীনা তাইপের হাসুসের বিপক্ষে দিয়েছে গোল মিসের মহড়া (০-০)। তবে আবাহনী অধিনায়ক বিপ্লব ওই ম্যাচটাকেই নিচ্ছেন জয়ের প্রেরণা হিসেবে, ‘হাসুস আমাদের সঙ্গে ড্র করতে পারলে আমরা কেন পারব না দরদই হারতে? আমরা পারব। তবে ভালো খেলতে হবে এবং গোল মিস করা যাবে না।’
হাসুসের বিপক্ষে ৫-০ ও নিউ রোডকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে দরদই। দলটির রুশ কোচ সার্গেইয়ের কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাসের বিচ্ছুরণ, ‘আমাদের লক্ষ্য টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আবাহনীর সঙ্গে আমরা জেতার জন্য খেলব এবং আশা করি, জিতেই সেমিতে যাব।’
আবাহনীকে কীভাবে নিচ্ছেন—এই প্রশ্নে তাঁর কণ্ঠে যেন তাচ্ছিল্য, ‘আবাহনীর প্রথম ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে ওরা সত্যিকারের ফুটবল খেলেনি। দুটি পাস খেলেই লম্বা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা তো ফুটবল খেলা হলো না!’
প্রচণ্ড গরমে প্রথম দুটি ম্যাচ খেলেছে দরদই। তার পরও তাদের খেলা ছিল গোছানো ও পরিকল্পিত। আজ সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইটের আলোয় ভালো ফুটবল খেলার পরিবেশই পাচ্ছে দরদই। আবাহনীর জন্য যেটা ভয়ের কারণ। উচ্চতায় এগিয়ে থাকা কিরগিজ খেলোয়াড়দের বাতাসে আটকানো বড় চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ ঘরের মাঠে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানোর।
এরই মধ্যে যে কাজটা করেছে মিয়ানমারের ইয়াদানারবন। ‘সি’ গ্রুপ থেকে ৪ পয়েন্ট (১১ গোল) নিয়ে গোলগড়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন তারা, ‘এ’ গ্রুপ থেকে তাজিকিস্তানের ভাসক ক্লাব তিন ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ-সেরা। ‘সি’ গ্রুপ থেকে তুর্কমেনিস্তানের ইতো ক্লাব ৪ পয়েন্ট (গোলগড় প্লাস ৮) নিয়ে সেরা রানার্সআপ হয়ে গেছে।
সেমিফাইনালের চতুর্থ দলটি কারা—আবাহনী, না দরদই?

১৫ হাজার পৃষ্ঠায় মোদির জবাব

মুম্বাই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে গতকাল বিকেলে কয়েকটা ভারী বাক্স ঢুকল। বিসিসিআই সদর দপ্তরে কত জরুরি জিনিসপত্রই তো আসে—আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি। কিন্তু এসব বাক্সে করে এল একটা নোটিশের জবাব!
হ্যাঁ, বিশ্বাস করুণ আর না-ই করুণ, বিসিসিআইয়ের কাছে ১৫ হাজার পাতার জবাব দিয়েছেন লোলিত মোদি! গত ২৬ এপ্রিলে পাওয়া কারণ দর্শাও নোটিশের জবাব দিতে সময় বাড়িয়ে নিয়েছিলেন বিসিসিআইয়ের বহিষ্কৃত সহসভাপতি মোদি। গতকাল ছিল সেই বর্ধিত সময়ের শেষ দিন। শেষ দিন বিকেলে মোদির আইনজীবী মোহাম্মদ আবদি এভাবেই জবাব দিলেন বিসিসিআইকে।
জবাব দেওয়ার আগ পর্যন্ত মুখে খুব হম্বিতম্বি করে বলছিলেন, সশরীরে উপস্থিত হয়ে জবাব দেবেন। এত বড় ‘জবাব’ নিজে বয়ে নিয়ে যাওয়া বাড়াবাড়ি হয়ে যেত! মোদি যাননি। ক্রিকইনফো জানাচ্ছে, জবাব দেওয়ার সময় মোদি দেশেই ছিলেন না।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে শীতল সম্পর্কের জের ধরেই সর্বশেষ আইপিএলের সমাপনী অনুষ্ঠান চলাকালে বহিষ্কার করা হয় আইপিএলের প্রধান ও বিসিসিআই সহসভাপতি লোলিত মোদিকে। গোলটা বাধে ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর সম্পর্কে টুইটারে মোদি আপত্তিকর মন্তব্য করায়। বহিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মোদিকে ই-মেইলে ৩৫ পৃষ্ঠার একটি কারণ দর্শাও নোটিশ দেয় বিসিসিআই।
৩৫ পৃষ্ঠার জবাবে ১৫ হাজার পৃষ্ঠার ‘পাহাড়’ পাঠিয়েছেন মোদি। যদিও এনডিটিভির দাবি, ছয় বাক্স-বোঝাই মোদির জবাবপত্রের পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২ হাজার। মোদির আইনজীবী আবদির দাবি, ‘বিসিসিআই তাদের এই অভিযোগও প্রমাণ করতে পারবে না।’ তাঁর আশা, এই জবাব পেয়ে মোদিকে নির্দোষ ঘোষণা করে বিসিসিআই স্বপদে বহাল করবে। ওয়েবসাইট।
বিসিসিআই আগে জানিয়েছিল, জবাব পাওয়ার পর বোর্ড সভাপতি শশাঙ্ক মনোহর, সহসভাপতি অরুণ জেটলি ও আইপিএলের প্রধান চিরায়ু আমিনকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের ডিসিপ্লিনারি কমিটি ব্যাপারটি পর্যালোচনা করবেন। জুনের মাঝামাঝি এ কমিটির সিদ্ধান্ত জানানোর কথা।

সেপ্টেম্বরে ফেরার আশা বেকহামের

বিশ্বকাপে হয়তো যাবেন, তবে মাঠে নামতে পারবেন না। খেলা দূরে থাক, এখনো দৌড়ানোর মতো শারীরিক সামর্থ্যই নেই তাঁর। মার্চে এসি মিলানের হয়ে খেলতে গিয়ে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়া বেকহাম এর আগে ভেবেছিলেন, আগামী নভেম্বরে হয়তো মাঠে ফিরতে পারবেন। এবার সময়টা আরেকটু কমালেন। বললেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সেপ্টেম্বরেই নেমে যাবেন।
জাতীয় দলে খেলার জন্য, বিশেষ করে আরেকটা বিশ্বকাপে খেলার জন্য কী চেষ্টাটাই না করেছেন বেকহাম! ইংল্যান্ড কোচের সুদৃষ্টিতে থাকতে এলএ গ্যালাক্সি থেকে ধারে এসে খেলেছেন এসি মিলানে। সেই এসি মিলানে খেলতে গিয়েই বিশ্বকাপের স্বপ্নঘাতক ইনজুরিতে পড়েছেন। ৩৪ বছর বয়সী বেকহামের আরেকটি বিশ্বকাপ পর্যন্ত ফুটবলে থাকাটা অসম্ভব ব্যাপার। এবার হয়তো সহকারী কোচ বা এ রকম কোনো ভূমিকায় ইংল্যান্ড দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা যাবেন।
কিন্তু তাতে কি আর মাঠে নামার দুঃখ ঘোচে? ঘোচে না বলেই মাঠে নামার পরিকল্পনাটা জানালেন, ‘সম্ভবত সেপ্টেম্বরে ফিরব। কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলাম, নভেম্বরে হয়তো ফিরব। কিন্তু এখন পরিস্থিতি যেমন যাচ্ছে তাতে সেপ্টেম্বরেই হয়তো মাঠে নামতে পারব।

শেষবিন্দুতে মহাকাব্যিক শিরোপা লড়াই

বার্সেলোনা, না রিয়াল মাদ্রিদ? কোন দল পরবে স্প্যানিশ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট? মৌসুমের শুরু থেকে শিরোপার লড়াইয়ে গায়ে গা ঘেঁষে চলেছে দল দুটি। কখনো পয়েন্টের, কখনো আবার গোল ব্যবধানে পয়েন্ট তালিকার এক নম্বর জায়গাটা হাতবদল হয়েছে রিয়াল-বার্সার মধ্যে। মহাকাব্যিক এই শিরোপা লড়াইয়ের শেষ দিন আজ।
৯৬ পয়েন্ট নিয়ে শেষ ম্যাচের আগে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে বার্সেলোনার ঘাড়ে নিঃশ্বাস পড়ছে রিয়াল মাদ্রিদের, যাদের পয়েন্ট ৯৫। তবে ভ্যালাদোলিদের বিপক্ষে বার্সেলোনা জিতে গেলেই হতাশার আগুনে পুড়বে বার্নাব্যু। কারণ জিতলেই যে বার্সা চ্যাম্পিয়ন।
জিতলেই শিরোপা—পরিস্থিতি যখন এই, বলাই যায় বার্সেলোনার শিরোপা-ভাগ্য আসলে তাদেরই হাতে। বার্সেলোনা কোচ পেপ গার্দিওলা শিষ্যদের এবং অধিনায়ক কার্লোস পুয়োল তাঁর সতীর্থদের প্রেরণা জোগাচ্ছেন এই বলেই। রিয়াল মাদ্রিদের ব্যাপারটা ভিন্ন। শিরোপা-স্বপ্ন পূরণের জন্য সরাসরি ভাগ্যের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাবটিকে। আজ মালাগার মাঠে জিতলেই শুধু চলবে না, ন্যু ক্যাম্পে বার্সোলোনাকেও পয়েন্ট হারাতে হবে ভ্যালাদোলিদের কাছে।
রিয়ালের ঘর বার্নাব্যুতে আজ তাই দুটি প্রার্থনা—প্রথমটি রিয়ালের জয় চেয়ে, দ্বিতীয়টি বার্সেলোনার পরাজয় বা ড্র কামনায়। রিয়াল মাদ্রিদ অধিনায়ক গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস বার্সেলোনা-ভ্যালাদোলিদ ম্যাচে অঘটন ঘটার আশা নিয়ে বসে আছেন।
কিন্তু অঘটন তো ঘটে যেতে পারে রিয়ালের ক্ষেত্রেও। শিরোপা লড়াইয়ের দিক থেকে রিয়াল-বার্সা যেমন একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, তেমনই এই দুই দলের দুই প্রতিপক্ষ ভ্যালাদোলিদ ও মালাগাও একই বিন্দুতে। দুই দলেরই অবনমন এড়ানোর লড়াই। ৩৬ পয়েন্ট নিয়ে ১৬ নম্বরে আছে ভ্যালাদোলিদ, গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকার কারণে সমান পয়েন্ট নিয়েও এক ধাপ পিছিয়ে মালাগা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এই দুটি দল আজ নিশ্চয়ই সর্বস্ব উজাড় করে দেবে। মহা গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে পুরো শক্তি নিয়েই মাঠে নামতে পারছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে বার্সেলোনাকে হয়তো মাঠে নামতে হচ্ছে রক্ষণ আর মাঝমাঠে দুর্বলতা নিয়েই। নিষেধাজ্ঞায় আটকে যাওয়ার কারণে আজ নাও খেলতে পারছেন না বার্সেলোনার খেলা তৈরির কারিগর জাভি হার্নান্দেজ। লিগের ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে জাভির নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আবেদন করেছিল বার্সা। তাতে কাজ হয়নি। ডিফেন্ডার ম্যাক্সওয়েলকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছে ইনজুরি।

সংগীতই ছিল যাঁর একমাত্র আরাধ্য by রাশেদুর রহমান

বাঙালি মুসলমান সমাজে সংগীতকে জনপ্রিয় করতে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, আবদুল আহাদ তাঁদের অন্যতম। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সংগীতের বহুমাত্রিক ধারায় তিনি নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। একাধারে ছিলেন সুরকার, প্রশিক্ষক, পরিচালক, সংগঠক ও গায়ক।
বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে সংগীতের যে বিস্ময়কর বিকাশ, তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই চলে আসে আব্বাস উদ্দীন আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম ও আবদুল আহাদের নাম। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর সংগীতশিল্পীদের একটি বড় অংশ এ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ফলে তখনকার পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজধানী ঢাকা ও তার বেতার কেন্দ্র প্রায় সংগীতশিল্পীশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাই জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন হয়ে পড়ে ঢাকা বেতার কেন্দ্রকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর।
এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আবদুল আহাদ। সেই সময় পূর্ববাংলার পরিবেশ সংস্কৃতি, বিশেষত, সংগীতের বিকাশের জন্য মোটেও অনুকূল ছিল না। কূপমণ্ডূকতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব, অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম্য, সংকীর্ণ মানসিকতা—সবকিছু মিলিয়ে এক অসহনীয় পরিবেশ। এর মধ্যেই ঢাকাকে ঘিরে আবদুল আহাদ এক বিস্ময়কর যুগের প্রবর্তনে সক্ষম হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা সহায়ক হয়েছিল।
আবদুল আহাদ ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনে তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন। শান্তিদেব ঘোষ ও শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন তাঁর শিক্ষক। ১৯৩৮ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে যান। এর আগেই অবশ্য তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় অল বেঙ্গল মিউজিক প্রতিযোগিতায় ঠুংরি ও গজলে প্রথম স্থান অধিকার করে আবদুল আহাদ তখনকার সংগীতজগতে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
শান্তিনিকেতনের শিক্ষাজীবনে আবদুল আহাদ সাহিত্যসভা, গানের অনুষ্ঠান ও প্রার্থনাঘরে গান পরিবেশন করতেন। বৈতালিক ও মন্দিরে সংগীত পরিবেশনের দায়িত্বও বেশির ভাগ সময় তাঁর ওপরই বর্তাত। তখন শ্যামা, চণ্ডালিকা ও তাসের দেশ নাটকের মহড়া হতো উত্তরায়ণে। স্বয়ং কবিগুরু উপস্থিত থাকতেন এসবের মহড়ায়। এই সময় কবিগুরুর পরম সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয় আবদুল আহাদের।
১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ কবিগুরুর প্রয়াণ-সংবাদ শান্তিনিকেতনে পৌঁছার পর শৈলজারঞ্জন মজুমদার তাঁকে ডেকে নিয়ে সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার জন্য একটি গানের স্বরলিপি দেন। বিখ্যাত সেই গানটি ছিল ‘সম্মুখে শান্তি পারাবার’। শান্তিনিকেতনের প্রার্থনাঘরে সেদিন সন্ধ্যায় সবাই মিলে তাঁরা গানটি গেয়েছিলেন।
শান্তিনিকেতনের শিক্ষাজীবন শেষে তিনি বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। এবার তিনি গ্রামোফোন কোম্পানি হিজ মাস্টার্স ভয়েজে রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর নিবিড় তত্ত্বাবধানে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেন তখনকার প্রখ্যাত সব শিল্পী। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সুধা মুখার্জি, সন্তোষ সেনগুপ্ত, সুচিত্রা মিত্র, পঙ্কজকুমার মল্লিক, শান্তিদেব ঘোষ, সত্য চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
আবদুল আহাদের নিজের সুরারোপিত প্রথম আধুনিক গানের রেকর্ড এইচ এম ডি থেকে বের করেন সন্তোষ সেনগুপ্ত। গান দুটি ছিল, ‘তুমি আমি দুই তীর সুগভীর তটিনীর’ ও ‘সে পথ ধরি আস নাই আস নাই তুমি’।
১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি আবদুল আহাদ ঢাকায় চলে আসেন। এরপর শুরু হয় তাঁর সাংগীতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। ঢাকায় এসে তিনি যোগ দেন পাকিস্তান রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রে। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের তখন শোচনীয় অবস্থা। তাঁকে নিয়ে প্রযোজকের সংখ্যা তখন মাত্র তিনজন। ফলে এখান থেকে সংগীত সম্প্রচারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ওপর। পাকিস্তান হলেও ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতিদিনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ানোর ব্যাপারে তাঁর ছিল উদ্যোগী ভূমিকা।
আবদুল আহাদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৮ সালে, রাজশাহীতে। তাঁর বাবা আবদুস সামাদ, মা হাসিনা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর আদি পৈতৃক নিবাস ফরিদপুরে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পাবনায় নানার বাড়িতে। আবদুল আহাদ জীবনের প্রায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারে প্রযোজক-সুরকার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বয়সসীমা শেষ হওয়ার পরও সাতবার তাঁর চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।
আবদুল আহাদ ছিলেন খুবই আত্মপ্রচারবিমুখ একজন সংগীত অন্তঃপ্রাণ মানুষ। সংগীতই ছিল তাঁর সারা জীবনের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘যে গানের মধ্য দিয়ে জীবনের উন্মেষ হয়েছিল, সেই গানই ছিল আমার পাথেয় এবং কর্মজীবনের সম্বল।’
গতকাল (১৪ মে) ছিল তাঁর ষোড়শ মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুতেই মানুষের সব নিঃশেষ হয়ে বা ফুরিয়ে যায় না। কেউ কেউ বেঁচে থাকেন মৃত্যুর পরও। আবদুল আহাদও তেমনি একজন। তাঁর নাম গুঞ্জরিত হবে যতদিন থাকবে বাংলা গান।

বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেটের প্রত্যাশা by মামুন রশীদ

যতই বলা হোক না কেন, বাজেট কিন্তু সামগ্রিকভাবে সম্পদ সৃষ্টি, সঞ্চয় বাড়ানো এবং প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করা বা সম্পদের সুষম বণ্টনের মতো বিষয়গুলোর চূড়ান্ত সুরাহা করে না। তবে সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের দলিল মানে বাজেটের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হলে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সুশাসন, জনপ্রশাসনের জবাবদিহি এবং কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য।
যদি প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধিমুখী অর্থনৈতিক উত্তরণের এই সময় কী করা উচিত? জবাব হবে, সুশাসন জোরদারকরণের মাধ্যমে অব্যাহতভাবে সম্পদ সৃষ্টি এবং সম্পদের সমবণ্টন নিশ্চিত করা। তবে নীরবে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠা মূল্যস্ফীতি রোধেও সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং দারিদ্র্য বিমোচনে থাকতে হবে সচল ও সজাগ দৃষ্টি। আমাদের উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গ্রহণ করলেই চলবে না, আমাদেরকে প্রয়োজনের নিরিখে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সঠিকভাবে এডিপি গ্রহণ করতে হবে। এর চেয়ে বড় কথা, ‘রণক্ষেত্রের পদক্ষেপের’ মতো অলঙ্ঘনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে; যাতে সময়মতো এডিপি বাস্তবায়িত হয়।
রাজস্ব বাজেটের ক্ষেত্রেও অবশ্যই সম্পদ সৃষ্টি এবং ব্যবসার জন্য নির্বিঘ্ন ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনার ব্যবস্থা করা উচিত। আমরা অর্থনীতিতে ‘ভর্তুকি যুগের’ অবসান চাই। নেহাত যদি ভর্তুকি দিতেই হয়, তাহলে সেটা শুধু ব্যবসায়িকভাবে ঠেকায় পড়ে যাওয়া বা নিছক ব্যবসায়িক স্বার্থেই প্রয়োজন—এমন গোষ্ঠীকেই দিতে হবে। লোভী, স্বার্থান্বেষী ও সম্পদশালীরা যাতে কোনোভাবেই ভর্তুকি-সুবিধা নিতে না পারেন, সেদিকেও রাখতে হবে সতর্ক নজর। আমরা জোরালো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী চাই। তবে এ কর্মসূচির আওতায় দেওয়া সুবিধা যেন সত্যিকারের দুঃস্থ ও অসহায় মানুষেরাই পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ‘অদক্ষদের’ রক্ষা করতে গিয়ে যেন প্রতিযোগিতায় সক্ষম এবং দেশ-বিদেশের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করার পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। আমরা কোনোভাবেই আর অদক্ষ উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী এবং কর ফাঁকি দেন—এমন ধরনের উৎপাদকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য কর অবকাশ-সুবিধা অব্যাহত রাখার পক্ষপাতি নই।
দেশে কয়েক বছর ধরেই বাজেটে কালো টাকার মালিকদের তাঁদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা অর্থনীতিতে খুব একটা ভালো ফল বয়ে এনেছে—এমন দাবি করা যাবে না। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৫০ কোটি টাকা সাদা করার পরিপ্রেক্ষিতে শুধু পাঁচ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে।
সম্প্রতি এক আলোচনায় অর্থমন্ত্রী স্বীকার করে বলেন, ‘অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিয়ে এখন পর্যন্ত ভালো ফল পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি অবস্থার সময়টুকু বাদ দিলে কেউই এতে সাড়া দেয়নি তেমন।’ অর্থাৎ অপ্রদর্শিত অর্থ অপ্রদর্শিতই থেকে গেছে। তাই এ বিষয়ে অভিজ্ঞতাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হলো, কালো টাকা সাদা করার প্রণোদনা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। অবৈধ উপায়ে তথা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে আইনগত বৈধতা দেওয়া উচিত নয়। এ সুযোগ দেওয়া হলে, যাঁরা বৈধ পথে অর্থ উপার্জন করে সরকারকে ঠিকমতো কর দেন এবং যাঁরা কর দেন না, তাদের উভয়কে সমান সুযোগ দেওয়া হয়ে যায়, যা উচিত নয়। বরং বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার চেয়ে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয়ের উৎস বন্ধ করা বেশি জরুরি।
আমরা করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর পদক্ষেপ চাই। বর্তমান ২০০৯-১০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে করের আওতায় নিয়ে করের পরিধি বাড়ানো হয়। আগামী ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটেও এ ধরনের আরও অনেক ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় নিয়ে আসা উচিত এবং এটি খুব সহজেই সম্ভব বলে মনে করি। একটি উদাহরণ দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে উঠবে। যেমন, যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিবন্ধকের পরিদপ্তরে (রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস) যেখানে ৬২ হাজার কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে, সেখানে মাত্র ছয় হাজারটির আয়কর রিটার্ন দাখিলের রেকর্ড রয়েছে। ব্যাপকভাবে করের আওতা সম্প্রসারণে সরকার বাজেটে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে কর পরিশোধে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ইতিবাচক সাড়া দেওয়া উচিত হবে। বদৌলতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আমরা আশা করি। অর্থনীতির যেসব খাতে পুঁজির সংবর্ধন হচ্ছে, সে খাতগুলোকে করের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। উদাহরণ হিসেবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে আয় বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, আবাসন খাত, রপ্তানি, বাণিজ্যিক বা বৃহৎ কৃষি ইত্যাদি খাতে কর সম্প্রসারণের যুুক্তি ভেবে দেখা উচিত। দেশের প্রায় ২৩ লাখ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টধারীর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখেরই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই বলে জানা যায়। যাঁদের টিআইএন আছে, শোনা যায় যে তাঁদের বেশির ভাগই ভুয়া। সম্পত্তি কেনা-বেচা এবং শুধু উল্লেখযোগ্য স্থানে ফ্ল্যাট বা জায়গা থাকার নিমিত্তে প্রতিদিনই প্রায় নতুন নতুন কোটিপতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁদের সেই সৃষ্ট সম্পদ সীমিত পর্যায়ে হলেও সাধারণ জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত।
তবে শুধু করের আওতা বাড়ালেই হবে না, এর পাশাপাশি যাঁরা কর পরিশোধের ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু এ সম্পর্কে ভালো জানেন না বা হয়রানির ভয়ে পিছিয়ে থাকেন, তাঁদের সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে তাঁরা কর পরিশোধে উৎসাহিত হবেন ধারণা করা যায়। কর পরিশোধের বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখাও জরুরি। প্রয়োজন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আকার, আয়তন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিরও। টিআইএন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মধ্যে সমম্বয়সাধনসহ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়টিও ভাবতে হবে।
বাজেটের মূল প্রক্রিয়ায় একটি বাস্তবসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের দিকটি অনেকটাই উপেক্ষিত থাকে। যথাযথ বাস্তবায়নের পথ সুগম করার সম্ভাব্য সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়ানো এবং সেটার চারপাশে নিশ্ছিদ্র ব্যূহ তৈরি করা।
এডিপি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। কারণ অনেক সময়ই শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায়ই বহু এডিপি নেওয়া হতো। আবার সময়মতো এডিপি বাস্তবায়নের হারও ছিল নগণ্য। সরকার এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। গত বছর এডিপি অনুমোদনের বৈঠকের পর পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ‘নতুন এডিপি বাস্তবায়নের জন্য অর্থবছরের শুরু থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়গুলোকে এ জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হবে এবং সময়মতো অর্থ-ছাড়েরও ব্যবস্থা করা হবে।’ এডিপির আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
প্রবাসে অবস্থানরত নাগরিকেরা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে হারে দেশে অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স পাঠিয়ে আসছেন, তা খুবই সন্তোষজনক। তাঁদের জন্য যদি যথোপযুক্ত সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই দেশে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণে উন্নীত হবে বলে ধারণা করা যায়। এ ব্যাপারে অর্থাৎ প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ বাড়াতে হলে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আমাদের বিদেশ গমনে ইচ্ছুক শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে তাঁরা যাতে উপযুক্ত মজুরি বা পারিশ্রমিক পান, সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে নতুন সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। দেশের কৃষি-গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং প্রকৃত দুঃস্থদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করার বিষয়ে এত দিনে অনেক কথাই হয়েছে। এ প্রসঙ্গে যা বলার তা হচ্ছে, এক্ষেত্রে বাজেটীয় পদক্ষেপ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি ইত্যাদির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে জোর দেওয়াও খুব জরুরি।

 মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

শিল্পোদ্যোক্তাদের একীভূত প্ল্যাটফরম দরকার by মুনির হাসান

বিগত এক দশক ধরে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনেক উন্নতি হয়েছে দাবি করা যায়। বিশেষ করে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি একটি মুক্ত আউটসোর্সিংয়ের ওয়েবসাইটে ঢাকাকে এই কাজের জন্য তৃতীয় পছন্দ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ১৯৯৭ সালে গঠিত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর কমিটি আইসিটি ব্যবসা খাতের যে বিকাশের কথা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তেমনটি কিন্তু হয়নি। বর্তমানে আইসিটি খাতের রপ্তানি আয় মাত্র ৩৩ মিলিয়ন ডলার। অর্থমন্ত্রী মনে করেন, ২০২১ সালে এই খাতটি আমাদের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত হতে পারে।
দেশে আইসিটি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের একাধিক সংগঠন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্যসংখ্যা সাত শতাধিক। রয়েছে সাড়ে তিন শ সদস্যের বেসিস, দুই শতাধিক সদস্যের আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন। মোবাইল এবং পিএসটিএন ব্যবসায়ীদেরও দুটি পৃথক সংগঠন রয়েছে। গঠিত হয়েছে সাইবার ক্যাফে ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং সর্বশেষে সৃষ্টি হয়েছে কলসেন্টার ও আউটসোর্সিং সংস্থাগুলোর একটি সংগঠন। এই সংগঠনগুলো পৃথকভাবে নিজেদের মতো করে আইসিটি খাতে কাজ করছে। দেখা যাচ্ছে, সাড়ে তিন শ বেসিস সদস্যের মাত্র ১৮৯ জন তাদের চাঁদা পরিশোধ করে নির্বাচনের জন্য ভোটার হয়েছেন! এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ১০টি জেলায় প্রায় দুই হাজার আইটি সেবা প্রদানকারী সংস্থা রয়েছে, যাদের বেশির ভাগের সঙ্গে কোনো সংগঠনেরই সম্পর্ক নেই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রায় তিন হাজার তরুণ উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর স্বাধীন ভাবে মুক্তপেশায় জড়িত। তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার কোনো সংস্থা নেই।
একাধিক সমিতির কারণে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প গ্রহণ কিংবা বাস্তবায়নের বেলায় কোনো সামগ্রিক চিত্র উঠে আসছে না। আবার আকারে ছোট হওয়ায় অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সক্ষমতাও কম বলে মনে হয়। দেশের অন্য ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বাজার গবেষণা, বাজার অনুসন্ধানী কার্যক্রম, সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ যে কর্মকাণ্ড রয়েছে তার কোনোটিই এসব সমিতি সাফল্যের সঙ্গে করেছে বলে আমার জানা নেই।
ডিজিটালবান্ধব সরকারের আনুকূল্য গ্রহণ করে, দেশে বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিতে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অপরিসীম। এ কারণে নিজেদের মধ্যে বিভেদ-বৈষম্য কমিয়ে এ খাতে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফরম দরকার। ভারতের নাসকম (http://www.nasscom.in/) এই ধারার সবচেয়ে সফল উদাহরণ। নিজেদের মধ্যে আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে না তুলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তির উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা নাসকম গড়ে তোলেন। ভারতীয় সংস্থাটিতে কেবল ভারতের আইটি সংস্থাগুলো আছে এমন নয়। সেখানে আছে বহুজাতিক আইটি-আউটসোর্সিং সংস্থা, যাদের ভারতে কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বিদেশি আইটি সংস্থা থাকলেও তারা কোনো সমিতির সদস্য নয়। একই কাজ করেছে শ্রীলঙ্কার সংস্থাগুলো। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন আইসিটি সেবাদানকারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সব সংগঠন মিলে গঠন করেছে স্ল্যাশকম (http://www.slasscom.lk/)। উদ্দেশ্য এমন একটি ফোরাম গঠন করা যাতে আইটি ও আউটসোর্সিং খাতের একটি একক কণ্ঠস্বর তৈরি হয়। এরই মধ্যে আইটি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে শ্রীলঙ্কা।
বাংলাদেশের আইসিটি সংস্থাগুলোকে ভবিষ্যতে ব্যাসকম (BASSCOM) গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এ জন্য চলতি বছরের মধ্যে সমিতিগুলো সবাই মিলে একটি ফেডারেশন গঠন করতে পারে। ফেডারেশন গঠনের তিন বছরের মধ্যে ব্যাসকম গঠন সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস।
খাত হিসেবে এর বিকাশের জন্য পরের কাজটি হবে এই খাত সম্পর্কে একটি প্রাথমিক সমীক্ষা। এই সমীক্ষায় হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিকস, টেলিযোগাযোগ, মুক্ত আউটসোর্সিং, আইটি সেবা সার্ভিস—প্রত্যেকটি উপখাতে বর্তমান অবস্থা তুলে আনতে হবে। প্রস্তাবিত ফেডারেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হলে তা যথাযথ হবে এবং একই সঙ্গে তা ফেডারেশনের সক্ষমতাকেও বাড়াবে। সমীক্ষার ভিত্তিতে তখন পরবর্তী কর্মপন্থা ও মাইলফলকগুলো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, আইসিটি ব্যবসা খাতের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা হবে প্রণোদনা ও উৎসাহমূলক। কারণ সরকার নিজে ব্যবসা করুক এটি আজকাল কেউ চায় না।
আইসিটি খাতের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা গেলে উপখাতগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা যাবে। সে ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে আইসিটি খাতের জন্য আগামী বছরগুলোয় প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদা নিরূপণ। শিল্পোদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এ রূপ কোনো চাহিদাতালিকা তৈরি করা সম্ভব হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই জনবল সরবরাহের দায়িত্ব নিতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগ না থাকার ফলে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে আইটি শিক্ষার প্রশিক্ষণ খাতটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে বলে আমার ধারণা। মান নিয়ন্ত্রণের অভাব, বাজার-চাহিদার ভুল নিরূপণ এবং যথাযথ মনোযোগের অভাবে প্রথমে সফটওয়্যার ও ডেটা এন্ট্রি শিল্প এবং অতিসম্প্রতি কলসেন্টারের দক্ষ জনবল তৈরির নাম করে দেশ থেকে এক বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার হয়ে গেছে। জনবল-চাহিদার প্রকৃত চিত্র পাওয়া গেলে, প্রকৃত কম্পিউটার স্নাতক এবং অন্যান্য বিষয় থেকে আগ্রহীদের এই খাতে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। নতুন শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ইনকিউবেটর স্থাপনের ক্ষেত্রেও ফেডারেশন বা ব্যাসকম উদ্যোগ নিতে সক্ষম হবে।
বিগত এক দশক ধরে উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাঁদের চাহিদামতো স্নাতক সরবরাহ করছেন না বলে অভিযোগ করছেন। কিন্তু সম্প্রতি খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষতার কোনো চাহিদা-প্রতিবেদন আছে কি না তার খোঁজ নিতে গিয়ে আমি দেখেছি, এরূপ কোনো প্রতিবেদন নেই (আমি খুঁজে পাইনি)। কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ লক্ষ্যে কোনো কার্যক্রম গ্রহণও সম্ভব হচ্ছে না। স্মর্তব্য, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেবাস পরিবর্তন করতে হলে কমপক্ষে দুই-তিন বছর সময়ের পরিবর্তন হয়। সে জন্য কমপক্ষে পাঁচ বছর পরের অবস্থা সম্পর্কে ধারনা করতে পারলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হতে পারে। তা ছাড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো আইটি সেবাখাত। এখানে প্রয়োজনীয় লোকবলের অনেক বেশি দক্ষতার প্রয়োজন হয় না বা সবাইকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক হতে হয় না। তিন থেকে আট মাসের প্রশিক্ষণ এবং কাজের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত এই খাতের প্রয়োজনীয় লোকবল তৈরি করা সম্ভব। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের অধুনা লুপ্ত আইটি প্রশিক্ষণক্ষেত্রটি পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান জনবল সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। মনে রাখা দরকার, চীনের কোন ল্যাপটপ সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান এখানে কারখানা করলে তারা বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের দিয়ে তা চালাতে চাইবে। চীন থেকে প্রকৌশলী নিয়ে আসার কথা তারা ভুলেও ভাববে না।
বাংলাদেশের আইসিটি খাতের সম্ভাবনা অসীম। তবে সেটি একটি অসীম সম্ভাবনাই থেকে যেতে পারে, যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি না করা হয়।
আশা করি, এ খাতের সংশ্লিষ্ট সবাই এটি উপলব্ধি করবেন।
মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।