Showing posts with label মেঘালয়. Show all posts
Showing posts with label মেঘালয়. Show all posts

Monday, March 30, 2026

দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন by আলতাফ পারভেজ

দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের মানুষের সংখ্যা ১০ শতাংশও নয়। এমনকি শ্রীলঙ্কার বাইরে বাকি সাতটি দেশে ৫ শতাংশের নিচে। তারপরও এই অঞ্চলজুড়ে একটা খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন আছে বহুদিন ধরে। এসব দেশের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাঝেমধ্যে এ গুঞ্জনের কথা এত গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে তাতে আঁচ-অনুমানের শাখা-প্রশাখা আরও বাড়ে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে এ রকম একটা কল্পিত রাষ্ট্রের সত্যতা কতটুকু? নাকি এটা শুধু সংখ্যাগুরুদের জুজু দেখানোর রাজনৈতিক কৌশলমাত্র?

প্রায় ২ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিশাল বলয়!

দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার শুরু কেরালা, তামিলনাড়ুর দিকে। কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে তক্ষশীলার কথাও বলে। পুরোনো তক্ষশীলা এখন পড়েছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে। এর মধ্যে কেরালায় এখন প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা খ্রিষ্টান। তামিলনাড়ুতে সেটা ৬ শতাংশের মতো। পাকিস্তানে ১ শতাংশের কম।

খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনটা অবশ্য এসব পরিসংখ্যান থেকে তৈরি হয়নি। এ গুঞ্জনের ভরকেন্দ্র দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদগুলো। মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চলও তাতে যুক্ত হয়েছে। উত্তর–পূর্ব জনপদগুলোর মধ্যে মেঘালয় (৭১ শতাংশ), মিজোরাম (৮৭ শতাংশ) এবং নাগাল্যান্ডে (৮৮ শতাংশ) খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এই তিন জনপদ যে লাগোয়া, তা নয়, তবে কাছাকাছি। মিয়ানমারের চিন এস্টেট এদের কাছের জনপদ। চিন এলাকায় ৯৬ শতাংশ মানুষ একই ধর্মাবলম্বী।

দক্ষিণ এশিয়ায় চারটি জায়গা হলো খ্রিষ্টানপ্রধান। চারটি জায়গাতেই খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রাজনীতিবিদদের রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। তবে জনপদগুলো আয়তনে ও লোকসংখ্যায় ছোট।

এই চারটি এলাকার পাশাপাশি মণিপুর ও অরুণাচলকেও যদি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক খ্রিষ্টান জনসংখ্যার (৪১ ও ৩০ শতাংশ) কারণে কাছে টানা হয়, তাহলে বেশ বড় একটা বলয় তৈরি হয়। আয়তনে যা দুই লাখ বর্গকিলোমিটারও ছাড়িয়ে যায়।

ভিন্ন ভিন্ন নামে কাছাকাছি থাকা বেশ বড় একটি এলাকার জনবিন্যাসের এ রকম প্রবণতা নিশ্চিতভাবে চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিন ধর্ম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ‘মুরব্বিদের’ এটা ভালোভাবে নজরে পড়েছে। মিজোরাম ও চিনসংলগ্ন বাংলাদেশের বান্দরবানের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় (রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি) খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে বিষয়টা ঢাকায়ও মনোযোগের বিষয় হয়েছে। বান্দরবানে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১০ শতাংশের মতো।

গুঞ্জনের বহু কারণ

দক্ষিণ এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাজ্যের গুঞ্জন কেবল এই বিশ্বাসীদের সংখ্যাগত বৃদ্ধির কারণে নয়; উল্লিখিত এলাকাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যও এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, চিন, মণিপুর, বান্দরবানের একাংশ এবং অরুণাচলের মধ্যে অনেক এলাকায় নানা ধরনের দাবিতে নিরস্ত্র-সশস্ত্র ব্যাপক আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে।

কোথাও কোথাও সশস্ত্রতার ধরন অনেক ব্যাপক ও গভীর, কোথাও তা মৃদু, কিন্তু অগ্রাহ্য করার মতো নয়। এসব সশস্ত্রতার আবার প্রধান একটা ধরন দেখা যাচ্ছে, এ অঞ্চলের ‘রাষ্ট্র’গুলোর পরিচালকদের প্রতি আস্থার গভীর এক সংকট। এ রকম অনাস্থার পটভূমি তৈরি করেছে উপরিউক্ত প্রতিটি এলাকার উন্নয়ন-প্রান্তিকতা। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর থেকে এ রকম প্রতিটি জনপদের মানুষ নিজেদের ক্রমে সংকুচিত ও সীমিত গণ্ডিতে আবিষ্কার করছে। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের আত্মরক্ষার বোধ বাড়ছে।

এসব জনপদের মানুষ জানে তারা কোনো দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসিদ্ধান্তকে খুব একটা প্রভাবিত করতে পারবে না। যেমন ৫৪৩ আসনের ভারতীয় লোকসভায় অরুণাচল-মণিপুর-মেঘালয়-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড মিলে আসন ৯টি। অথচ সেখানে শুধু উত্তর প্রদেশের জন্য আসন ৮০টি। মিয়ানমারের পার্লামেন্টের (দুই কক্ষ মিলে) ৬৬৪ আসনে চিন এস্টেটের জন্য আসন আছে ২১টি। বাংলাদেশে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে বান্দরবানের জন্য আসন ১টি। যেহেতু আসন বণ্টিত হয় জনসংখ্যার হিস্যায়, তাই এই বাস্তবতাটা শিগগিরই বদলাবেও না। ফলে এসব জনপদের মানুষ জানে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি সীমিত থাকতে বাধ্য।

অতীতে বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনামলের আগে ও তার মধ্যে এসব জায়গার জাতিসত্তাগুলো সমতলের মানুষদের থেকে দূরে পাহাড়ি এলাকায় যে রকম ট্রাইবাল স্বশাসন ভোগ করেছে, তার ঘাটতিও তাদের মধ্যে একধরনের হতাশার বোধ তৈরি করে।

এখন নিজেদের চারপাশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের সংখ্যাবৃদ্ধির মুখে তারা স্বধর্ম রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন সময় চার্চগুলোয় আক্রমণ এবং এই ধর্মবিশ্বাসীদের ওপর হামলার ঘটনাও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদের মানুষদের আত্মরক্ষার বোধে একটা ধর্মীয় ধরন যুক্ত করেছে। একেই ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মূলধারার অনেক মানুষ খ্রিষ্টবলয় তৈরির চেষ্টা আকারে ভাবেন। এ রকম ভাবনার কারণ এটাও যে ওপরের এলাকাগুলোয় খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে চার্চের সম্পর্কও বেশ নিবিড়।

আবার কিছু কিছু এলাকায় খ্রিষ্টান জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং তার অতি প্রচারও কথিত গুঞ্জনের একটা উপাদান হয়েছে। তবে এরপরও ভারতে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ৩ শতাংশেরও কম। কিন্তু বিষয়টি আরএসএস পরিবারের কাছে এত স্পর্শকাতর যে খ্রিষ্টানমুখী ধর্মান্তরকরণ ঠেকাতে অন্তত ৯টি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণবিরোধী আইন করা হয়েছে। সেখানে আরএসএস-বিজেপি পরিবারের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হলো গির্জামণ্ডলী।

তবে ধর্মান্তরকরণ ও খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বাড়ার প্রচার দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অনেক সময় একপেশে চেহারাও নেয়। যেমন বাংলাদেশে অনেকে বান্দরবানের খ্রিষ্টান জনসংখ্যার বৃদ্ধি নিয়ে বলেন। কিন্তু শুমারির তথ্যে দেখা যায়, সেখানে ৯-১০ শতাংশ খ্রিষ্টানের বিপরীতে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং সর্বশেষ দুটি শুমারির মধ্যে শেষোক্তরা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা ১ শতাংশও বাড়েনি সেখানে।

কিন্তু খ্রিষ্টানরা কি নতুন দেশ চাইছে?

প্রশ্ন হলো, এত কিছুর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার খ্রিষ্টান সমাজ বা উল্লিখিত জনপদগুলো কি কখনো ধর্মভিত্তিক নতুন কোনো রাষ্ট্রের দাবি তুলেছে? এর জন্য কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন আছে? এ রকম দাবির সপক্ষে খ্রিষ্টান সমাজের বা গির্জামণ্ডলীর কোনো ইশতেহার আছে? সচরাচর এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় না।

তারপরও ক্রমাগত এ রকম দাবি ও গুঞ্জন উঠছে। সেটা ঘটছে মুখ্যত অখ্রিষ্টানদের তরফ থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে বিশেষ বিশেষ মতাদর্শের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই বিষয়টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভারতে ‘স্বরাজমার্গ’ নামে হিন্দুত্ববাদী একটা বিখ্যাত মিডিয়া এই ইস্যুতে বেশ এগিয়ে।

কৌতূহলোদ্দীপক হলো, ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের মতো আশপাশের অন্যান্য দেশের বৌদ্ধ ও ইসলামপন্থী অনেক মহলও এ প্রচারণায় উৎসাহী। বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির সংস্থাগুলোর এ রকম একই ধরনের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক আর কোনো বিষয়ে তেমন দেখা যায় না। ভারতসহ সর্বত্র ভোট এলে দেখা যায়, খ্রিষ্টানরা প্রধানত মধ্যপন্থী কংগ্রেস বা মধ্য-বাম আঞ্চলিক দলগুলোকে ভোট দিচ্ছে। এটাও তাদের প্রতি ডানপন্থী প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।

খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কথিত ওই রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপ-আমেরিকার আগ্রহের কথাও বলা হয় প্রচারে। কিন্তু তার সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না এখনো। কিন্তু এ রকম প্রচার খ্রিষ্টানদের জন্য নানাভাবে বিব্রত অবস্থা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের নেতা অ্যালবার্ট ডি কস্টা কয়েক মাস আগে এ বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের প্রচার তাদের সঙ্গে অন্যান্য সম্প্রদায়ের দূরত্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।

তারপরও যে এ রকম একটা প্রচারের পালে সম্প্রতি আরও বাতাস লেগেছে, তার কারণ মণিপুর ও চিন প্রদেশের ঘটনাবলি। মাসের পর মাস ধরে চলমান মণিপুর দাঙ্গায় হিন্দু মৈইতৈইদের হাতে খ্রিষ্টান কুকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী মিজোরামে তাদের প্রতি সহানুভূতির নীরব এক ঢেউ তৈরি হয়েছে। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মিয়ানমারের চিন প্রদেশের স্থানীয়দের প্রতিও মিজোরামের অনুরূপ সহানুভূতি রয়েছে।

এই তিন জায়গার মানুষই ‘জো’ জাতির শাখা-উপশাখা। বান্দরবানের বম খ্রিষ্টানরাও একই জাতিসত্তার দূরবর্তী অংশীদার। উত্তর-পূর্বাঞ্চলজুড়ে জো সমাজের এ রকম ঘটনাবলিতে এতদঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন তীব্রতা পেলেও কার্যত এ ধারণা বাস্তবসম্মত না হওয়ার কারণ একই জনপদগুলোয় নাগাদের উপস্থিতি।

নাগারাও খ্রিষ্টান, কিন্তু জোদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুব বেশি প্রীতিকর নয়। ফলে নাগাল্যান্ড, মণিপুরসহ আশপাশে কেবল খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিশ্বাস সামনে রেখে নাগা ও কুকিরা (জো) একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইবে বা পারবেন সেটা খুব কম রাজনৈতিক ভাষ্যকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

এমনকি কেবল জো–অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের ধারণাও মিজো নেতা জোরামথাংঙা কিছুদিন আগে (২১ জুন) প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘জো’দের বিভক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও এটা এখন এক বাস্তবতা। কারণ, তিনটি পৃথক রাষ্ট্রের সীমান্তে আছে তারা।

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইন্ধন দিচ্ছে

মিয়ানমারের চলতি গৃহযুদ্ধ এবং তার সম্ভাব্য পরিণতিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে একধরনের উসকানি হিসেবে কাজ করছে বলা যায়। এই গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি প্রান্তিক অঞ্চল হলো দক্ষিণ-পূর্বের কারেন, উত্তরের কাচিন এবং পশ্চিমের চিন অঞ্চল। এই তিন এলাকায় গেরিলা যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি সুসংগঠিত এবং এই তিন অঞ্চলে খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মানুষও অনেক।

এ রকম মনে করা হয় যে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গণতন্ত্রপন্থীদের সশস্ত্র সংগ্রাম যদি বিজয়ী হয় তাহলে প্রান্তিক এলাকা যে বাড়তি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে, সেটা অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে। আবার গণতন্ত্রপন্থীদের সংগ্রাম অনিশ্চিতভাবে দীর্ঘায়িত হলেও গেরিলা-দৃঢ়তা এ তিন অঞ্চলকে অনুরূপ চেহারা দিতে পারে।

মিয়ানমারের এ রকম সম্ভাবনায় ভারত উদ্বিগ্ন। সে কারণে তারা ওই দেশের সঙ্গে তার সীমান্ত অনেকটাই বন্ধ করে দিতে চায় বলে খবর বেরিয়েছে। সীমান্ত এলাকার ট্রাইবালরা অবশ্য এর ঘোর বিরোধী। কারণ, এতে তারা জাতিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর এক চুক্তির বলে সীমান্তবর্তী ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী পাসপোর্ট-ভিসাবিহীন একধরনের সাধারণ ভ্রমণ পাস নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারে। শুরুতে চুক্তি অনুযায়ী ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত এই সুবিধা ছিল। পরে কমিয়ে ১৬ কিলোমিটার করা হয় সেটা।

মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এ সুবিধা রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা এ সুবিধা আর রাখতে চায় না। কারণ, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

অন্যদিকে এ ঘোষণার পর জো সংগঠনগুলো বলছে, এটা করার আগে ভারত-মিয়ানমার-বাংলাদেশে বিভক্ত হয়ে থাকা তাদের জাতির মানুষদের একত্র করে দেওয়া হোক। তা না হলে তারা এ রকম পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে। জো-রিইউনিফিকেশন অর্গানাইজেশন (জো-রো) নামের একটা সংগঠন দেশ-বিদেশে এ বিষয়ে কথা বলছে। দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জন বাড়ার এটাও এক কারণ।

তবে এ রকম যাবতীয় গুঞ্জন অতিক্রম করে সরেজমিনে আরও গভীরে মনোযোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব পাহাড়ি উপত্যকায় ধর্মের বদলে একধরনের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের আকুতিই বেশি শোনা যায়। কিন্তু মূলধারার রাজনীতি তার স্বার্থেই যেন কেবল খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের গুঞ্জনে বেশি আগ্রহী, সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক সুশাসন বা স্বশাসনে নয়।

● আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

দক্ষিণ এশিয়ায় কেন ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের’ গুঞ্জন

Monday, December 29, 2025

হাদি হত্যার দুই অভিযুক্ত মেঘালয়ে প্রবেশ করার খবর অস্বীকার করেছে ভারতীয় পুলিশ

বাংলাদেশে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দুই অভিযুক্ত ভারতে ঢুকেছে বলে বাংলাদেশের পুলিশ যে দাবি করেছে মেঘালয় পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। মেঘালয় পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ডিএমপির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ওসমান হাদি হত্যার দুই অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর শেখ ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের এই দাবিকে মেঘালয় পুলিশের পক্ষ থেকেদ ‘অসত্য’ এবং ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বাংলাদেশ পুলিশের কাছ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। পুলিশ সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কাউকে গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তার করা  হয়নি। মেঘালয় পুলিশ এই দাবিগুলিকে সরাসরি খারিজ করে দিয়ে বলেছে যে, পুর্ত্তি এবং সামি নামে স্থানীয় দুইজন অভিযুক্তকে সীমান্ত অতিক্রম বা ভূমিকার সমর্থনে কোনও গোয়েন্দা তথ্য বা অপারেশনাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, পুর্ত্তি বা সামিকে মেঘালয়ের কোথাও শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে যাচাই বা সমন্বয় ছাড়াই এই বক্তব্য  দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মেঘালয় পুলিশের বক্তব্যকে সমর্থন করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের (মেঘালয় ফ্রন্টিয়ার) ইন্সপেক্টর জেনারেল ওপি উপাধ্যায় দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশ পুলিশের দাবিগুলি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, এই ব্যক্তিদের হালুয়াঘাট সেক্টর থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে মেঘালয়ে প্রবেশের কোনও প্রমাণ নেই। বিএসএফ কর্তৃক এই ধরণের কোনও ঘটনা সনাক্ত বা রিপোর্ট করা হয়নি। এই দাবিগুলি ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন উপাধ্যায়। 

mzamin

Thursday, June 12, 2025

রেইনকোট, খুকরি আর রক্তমাখা ষড়যন্ত্র

ভারতের মেঘালয়ের গিরিখাতে ২রা জুন যে পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার হয়, তা ইন্দোরের বাসিন্দা রাজা রঘুবংশীর। হত্যাকাণ্ডটি এখন এক চাঞ্চল্যকর চুক্তিভিত্তিক খুন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে- যার মূল অভিযুক্ত তার নববিবাহিতা স্ত্রী সোনম রঘুবংশী এবং তার কথিত প্রেমিক রাজ কুশওহা। সোনম স্বামীকে নিয়ে ‘হানিমুন’-এর নাম করে চেরাপুঞ্জি বেড়াতে যান। কিন্তু সেই ভ্রমণের পরিণতি দাঁড়ায় মৃত্যু যাত্রায়। তদন্তে উঠে এসেছে ডিজিটাল প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তমাখা পোশাক এবং সাক্ষীদের বিবরণ- যেগুলো একেকটি করে খুলে দিয়েছে এক রোমহর্ষক হত্যার পর্দা।

প্রমাণের পাহাড়
তদন্তে যে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ও ডিজিটাল প্রমাণ মিলেছে, তা হলো- অভিযুক্ত আকাশের একটি রক্তমাখা শার্ট, ফরেনসিকে নিশ্চিত হয়েছে তাতে যে রক্ত লেগে আছে তা রাজার। সোনমের রেইনকোটেও মিলেছে রক্তের দাগ। হত্যায় ব্যবহৃত ‘খুকরি’ নামের বাঁকা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত আনন্দের পরনে থাকা রক্তমাখা জামাকাপড়। হত্যাযন্ত্র এবং রাজার ব্যবহৃত জিনিসে অভিযুক্তদের আঙুলের ছাপ। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস। মোট ৪২টি লোকেশনের সিসিটিভি ফুটেজ, যাতে অভিযুক্তদের গতিবিধি ধরা পড়েছে। হোটেল মালিকদের বক্তব্য, যেখানে অভিযুক্তরা নিজেদের আসল নামেই বুকিং দিয়েছিল। স্কুটার ভাড়ার কাগজ, যেখানে নবদম্পতির সই রয়েছে। খুকরি বিক্রেতার সাক্ষ্য। আধার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের ফটোকপি, যা অভিযুক্তরা লজে জমা দিয়েছিল। ট্রেন ও ফ্লাইট টিকিট, যা অভিযুক্তদের যাত্রাপথের সঙ্গে মিলে যায়। কল ডিটেইল রেকর্ড: সোনম, রাজ এবং তিন খুনির সক্রিয় যোগাযোগ। মোবাইল লোকেশন ডেটা: হত্যার দিন, ২৩ মে, সকলেই ঘটনাস্থলের আশপাশে। তিন অভিযুক্তের প্রাথমিক স্বীকারোক্তি। অনেক ডিজিটাল প্রমাণ ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।

যেসব প্রমাণ এখনো অধরা
তদন্তকারীরা এখনো খুঁজে পাননি সোনমের মোবাইল ফোন। তাতে থাকতে পারে ফাঁস হওয়ার মতো চ্যাট, ছবি বা কল লগ। একইসঙ্গে অন্য অভিযুক্তদের মোবাইল ও ঘটনার সময়কার পোশাকও এখনো উদ্ধার হয়নি। আরো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে রুপির লেনদেন ঘিরে। পুলিশ বলছে, ২০ লক্ষ রুপির বিনিময়ে এই খুন করা হয়েছে। কিন্তু সেই রুপির উৎস ও লেনদেনের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।

ঘটনার কালানুক্রম
মে ১১: রাজা ও সোনমের বিয়ে হয় ইন্দোরে।
মে ২১: তাদের শিলং আগমন, বালাজি গেস্ট হাউজে থাকা।
মে ২২: স্কুটার ভাড়া নিয়ে চেরাপুঞ্জির উদ্দেশে রওনা।
মে ২৩: ‘হানিমুন ট্রেক’ শুরু, রাজাকে খুন করা হয়।
মে ২৪: ফেলে যাওয়া স্কুটার উদ্ধার, সোহরারিম এলাকা।
জুন ২: রাজার দেহ উদ্ধার।
জুন ৭: অভিযুক্ত তিন খুনি গ্রেফতার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ থেকে।
জুন ৮: সোনম আত্মসমর্পণ করেন উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের নন্দগঞ্জ থানায়।

খুনের ছক ও ঘটনার পুনর্গঠন
সোনম ও রাজের সম্পর্ক: রাজা কিছুই জানতেন না। রাজ ছিলেন সোনমের পারিবারিক ব্যবসায় কর্মরত। তিন খুনি (আকাশ, আনন্দ, বিকাশ) ইন্দোর থেকে শিলং পৌঁছান বিভিন্ন যানবাহনে চেপে, যাতে কারো নজরে না আসেন।
মে ২৩: চেরাপুঞ্জির কম চেনা মাওলিংখিয়াত ট্রেইল দিয়ে ট্রেক শুরু করেন পাঁচজন।
১০টা নাগাদ: স্থানীয় গাইড আলবার্ট দেখেন যে তারা গাইড নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ট্রেইলে একান্তে যাওয়ার পর: সোনম পিছিয়ে পড়েন এবং চিৎকার করেন ‘মেরে দো!’
তারপর: বিকাশ প্রথম আঘাত করে, বাকিরা মিলে রাজাকে মাথা ও বুকে কোপায়।
দেহ গিরিখাতে ফেলে দেওয়া হয়: যেখানে সোনম নিজেও সহায়তা করেন বলে অভিযোগ।

পলায়নের রাস্তায়
খুনের পর সোনম মাওকাডক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। এরপর গুয়াহাটি হয়ে ট্রেনে ইন্দোর ফেরেন বলে অনুমান। তিন খুনি আলাদা আলাদা ট্রেনে করে গিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ।

কীভাবে ফাঁস হলো ষড়যন্ত্র
প্রথমে সোনম নিজেকে নিখোঁজ দেখানোর চেষ্টা করেন, যেন মনে হয় তিনিও অপহৃত। কিন্তু পরবর্তীতে ৮ জুন গাজিপুরে আত্মসমর্পণ করেন। তদন্তে নেতৃত্ব দেন মেঘালয় পুলিশের এসপি বিবেক সিয়েম। তার ভাষায়, উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল, ফরেনসিক ও সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে সোনম ও রাজ কুশওহার বিরুদ্ধে।

mzamin

হানিমুনে স্বামী হত্যা, ২০ লাখ রুপির চুক্তি, হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন সোনম

তখনও হাতের মেহেদিতে টকটকে রঙ। স্বামী-স্ত্রীর কাছাকাছি আসার সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময়। দু’টি চেনা অথবা অচেনা নারী ও পুরুষের মধ্যে নতুন করে ভালবাসা, প্রেম ডালপালা ছড়ানোর কথা। সেই ভালবাসার রঙ বাড়াতেই হানিমুনে গিয়েছিলেন নববধূ সোনম ও তার স্বামী রাজা রঘুবংশী। কিন্তু সোনমের মধ্যে আগে থেকেই স্বামীকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য মেঘালয়ে হানিমুন করতে যাওয়ার আগে ভাড়া করেন খুনি। তার মধ্যে একজন তার কথিত প্রেমিক। কিভাবে স্বামীকে হত্যা করবেন- সেই ফর্মুলা দিয়েছেন সোনম। প্রত্যক্ষ করেছেন রাজা রঘুবংশীকে হত্যাকাণ্ড। এরপর তিনি নিজে থেকেই নিখোঁজ হওয়ার ভান ধরেন। বিভিন্ন পথ মাড়িয়ে অবশেষে পুলিশে ধরা দেন। এ ঘটনায় প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। ফলে পুরো ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছে এই একটি ঘটনা। মেঘালয়ে হানিমুনে গিয়ে ২৩শে মে তারা হত্যা করে রাজাকে। মৃতদেহ উদ্ধার হয় ২রা জুন। এ সময়ের মধ্যে স্ত্রী সোনমের কোনো খোঁজ ছিল না। পুলিশের ধারণা ছিল, হানিমুনে যাওয়া দম্পতির স্ত্রী হয়তো নিখোঁজ বা অপহৃত হয়েছেন। পুলিশ তখনও জানত না, স্বামী রাজা রঘুবংশীর হত্যাকাণ্ডের পিছনে মূল অভিযুক্তই হচ্ছেন তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী সোনম রঘুবংশী। শুধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা নয়, সোনম নিজেই তা প্রত্যক্ষ করেন এবং পরে মৃতদেহ গিরিখাদে ফেলে দিতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার উত্তরপ্রদেশে সোনমের সন্ধান পাওয়ার পর মেঘালয় পুলিশ তার পালানোর রুট এবং পুরো হত্যার পরিকল্পনার তথ্য একত্র করতে সক্ষম হয়েছে।

২৪ বছর বয়সী সোনম ও ২৯ বছর বয়সী রাজা ১১ই মে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে হানিমুনের জন্য সোনম মেঘালয় ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। তারা ২১শে মে শিলং পৌঁছান। এরপর তারা পূর্ব খাসি হিল জেলার চেরাপুঞ্জি বা সোহরা অঞ্চলে যান। কিন্তু রাজার পরিবার জানত না যে, সোনম প্রেমে পড়েছেন তাদের পারিবারিক ব্যবসায় কাজ করা ২১ বছর বয়সী কর্মচারী রাজ কুশওয়াহার সঙ্গে। অভিযোগ আছে, কুশওয়াহা তার তিন বন্ধুকে রাজাকে হত্যা করার জন্য নিয়োগ দেন এবং সোনম তাদের ২০ লাখ রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২৩শে মে সোনম ও রাজা জলপ্রপাত দেখতে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ট্রেকিংয়ে যান। সেই সময়ই হত্যাকারীরা তাদের পিছু নেয় এবং নির্জন স্থানে পৌঁছালে সোনমই রাজাকে হত্যার নির্দেশ দেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোনম এরপর নিজেই তার স্বামীর দেহ গিরিখাদে ফেলে দিতে সাহায্য করেন।

পূর্ব খাসি হিল জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম জানান, হত্যার পর সোনম প্রথমে মাওকাদক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। সেখান থেকে গৌহাটি পৌঁছান একটি পর্যটক ট্যাক্সিতে। এরপর গৌহাটি থেকে একটি ট্রেনে চেপে পালিয়ে যান। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি ইন্দোরে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য অভিযুক্তদের জবানবন্দি পাওয়ার পরই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরদিকে তিন হত্যাকারী সোহরা থেকে ট্যাক্সিতে গৌহাটি যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে ইন্দোরে ফিরে যায়। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, তাদের আলাদা ও সমন্বিত পালানোর পদ্ধতি দেখে বোঝা যায়, হত্যার পর পালানোর পরিকল্পনাও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহ উদ্ধারের সাত দিনের মধ্যেই তারা সোনমের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তাকে গ্রেফতার করে। যদিও সোনমের মোবাইল এখনও উদ্ধার হয়নি, তবে পুলিশ নিশ্চিত যে হত্যার দিন সে কুশওয়াহার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং কুশওয়াহা আবার তার ঘাতক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তবে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি সোনম আগে কখনও মেঘালয়ে এসেছিলেন কিনা অথবা হত্যার নির্দিষ্ট স্থানটি তিনি আগে থেকেই ঠিক করেছিলেন কিনা।
এসপি বিবেক সিয়েম বলেন, তিনি হয়তো গুগল সার্স করে নির্জন জায়গা খুঁজে বের করেছিলেন।  এখানে প্রচুর বন আছে। হয়তো সুযোগ বুঝে এটাই করেছে। এটা অন্য যেকোনো জায়গায়ও হতে পারত। আমরা নিশ্চিত নই। কারণ তিনি বলছেন আগে কখনও শিলং আসেননি।

সোনম মঙ্গলবার রাতে শিলং পৌঁছানোর কথা। কুশওয়াহা ও বাকি তিন ঘাতক বুধবার সকালে পৌঁছানোর কথা। পুলিশ সুপার বলেন, আমরা তাদের আদালতে হাজির করবো এবং এরপর পুলিশ রিমান্ডে নেব। তখনই ঠিক করবো কবে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের পুনর্গঠন করা হবে। তিনি আরও বলেন, তারা একসঙ্গে উপরে উঠেছিল। তারা একটি দর্শনীয় স্থানে মিলিত হয় এবং সেখান থেকে হেঁটে যায়। তাদের স্কুটারগুলো নিচে ছিল। ঘাতকদের মতে, সোনমই তাদের ‘ওয়েই সাওডং’ ঝরনায় নিয়ে যায় এবং সেখানেই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এই ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সদ্য বিবাহিত এক নারী কীভাবে এমন নির্মম পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়লেন, তা নিয়ে সমাজে বিস্তর প্রশ্ন উঠছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে পুলিশ জানতে পারবে হত্যার পুরো পরিকল্পনা কার মাথা থেকে এসেছিল এবং আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।

mzamin

Wednesday, June 11, 2025

প্রেম পরিণতি, কুপিয়ে স্বামীকে হত্যা: ক্ষণে ক্ষণে বাঁক পরিবর্তন

ইন্দোরের নববিবাহিতা যুবতী সোনমের বিরুদ্ধে তার স্বামী রাজা রঘুবংশীকে হানিমুনে নিয়ে মেঘালয়ে হত্যার অভিযোগে তোলপাড় ভারত। এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছে সোনমের প্রেমিক রাজ কুশওয়াহা। পুলিশ বলছে, এই প্রেমিক ও তিনজন ভাড়াটে খুনির সহায়তায় সোনম তার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেন। দিন যত যাচ্ছে, এ ঘটনায় তত চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। মুহূর্তে মুহূর্তে ঘটনা বাঁক পরিবর্তন করছে। বিয়ের মাত্র কয়েকদিন পরেই হানিমুনে গিয়ে এভাবে স্বামীকে হত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে সব মানুষকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এ মামলায় সোনম, তার প্রেমিক রাজ এবং তিন ভাড়াটে খুনি-  বিকাশ, আনন্দ ও আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পুরো ঘটনার সবচেয়ে শিউরে ওঠা অংশ হলো-  রাজ কুশওয়াহাকে দেখা গেছে সোনমের মৃত স্বামী রাজা রঘুবংশীর শেষকৃত্যের সময় সোনমের পিতাকে সান্ত্বনা দিতে।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, সোনমের পিতা দেবী সিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন রাজ। এ সময় রাজার মরদেহ বাড়িতে নেয়া হয়। রাজার প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সার বোন শ্রষ্টি, যার প্রায় ৪ লাখ অনুসারী রয়েছে ইনস্টাগ্রামে- তিনি এই ঘটনাগুলো নিয়ে ক্রমাগত পোস্ট করে চলেছেন। তিনি ভাইয়ের বিয়ে, হত্যার পরবর্তী তদন্ত এবং সোনমের গ্রেপ্তারের ভিডিও-ছবি পোস্ট করেছেন। একটি ভিডিওর ক্যাপশনে শ্রষ্টি লিখেছেন, রাজ কুশওয়াহা রাজার বাড়িতে, সোনমের পিতার সঙ্গে দেখা গেছে।

রাজার মা উমা রঘুবংশীও জানান, সোনমের বিয়েতে রাজকে উপস্থিত দেখা গিয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি পুত্রবধূর ওপর দোষারোপ করেননি। তবে প্রশ্ন তোলেন- সে কেন ওকে ওখানে (মেঘালয়ে) একা রেখে এল? কেন বাঁচানোর চেষ্টা করল না?

ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় শ্রষ্টি বলেন, আমার ভাই সাত জন্ম একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছিল সোনমের সঙ্গে। কিন্তু সাত দিনও কাটাতে পারল না। সে কী অপরাধ করেছিল যে তার এমন পরিণতি হলো? সোনমের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, তুমি পালিয়ে যেতে পারতে, যদি কাউকে ভালোবাসতে। খুনের কী দরকার ছিল?

ঘটনার সূত্রপাত ১১ই মে রাজা ও সোনমের বিয়ের মাধ্যমে। ২০ মে তারা হানিমুনে মেঘালয়ে যান। ২৩ মে একটি পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার পথে তারা নিখোঁজ হন। এরপর ২রা জুন রাজার মৃতদেহ উদ্ধার হয় - তার দেহে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। ৮ই জুন উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে সোনমের খোঁজ মেলে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার মূল পরিকল্পনাকারী সোনম ও রাজ।

মেঘালয় পুলিশ জানায়, সোনম-রাজ তিনজন ভাড়াটে খুনি ভাড়া করে রাজাকে হত্যা করেন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিশেষ করে, শেষকৃত্যে খুনির উপস্থিতি ও মৃতের পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে- প্রেম, প্রতারণা, হত্যাকাণ্ড এবং বিশ্বাসঘাতকতার এক নির্মম চিত্র যেন ফুটে উঠেছে এই ঘটনায়। এখন সবার দৃষ্টি আদালতের দিকে - কী শাস্তি পায় সোনম ও তার প্রেমিক রাজ, সেটাই দেখার বিষয়।

mzamin

Tuesday, June 10, 2025

‘হানিমুনে স্বামী হত্যা’, অতঃপর...

ভারতের মেঘালয় রাজ্যে হানিমুনে গিয়ে স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যার পর নিখোঁজ নববধূ সোনম রঘুবংশী (২৫)। এ নিয়ে নানা রহস্যের পর অবশেষে আত্মসমর্পণ করেছেন সোনম। উত্তর প্রদেশের গাজিপুর জেলার নন্দগঞ্জ থানায় সোমবার সকালে তিনি আত্মসমর্পণ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। মেঘালয়ের পুলিশ জানিয়েছে, সোনম তার স্বামী রাজা রঘুবংশীকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছিলেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আরও তিনজন এবং মেঘালয় থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোট চারজন অভিযুক্ত পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম ব্রিফিংয়ে বলেন, সোনম হলেন মামলার প্রধান সন্দেহভাজন। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি জানান, অভিযুক্তদের একজনের সঙ্গে সোনমের সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তবে ‘ডটগুলো মিলিয়ে নিলে সেরকমই মনে হয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ১১ই মে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরে পারিবারিকভাবে রাজা (৩০) ও সোনমের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ২০ মে এই দম্পতি মেঘালয়ে হানিমুনে যান। চারদিন পর তাঁরা নিখোঁজ হন। এক সপ্তাহ পরে রাজার পচা-গলা মৃতদেহ একটি গিরিখাতে উদ্ধার করা হয়— তার গলা কাটা পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানিব্যাগ, সোনার আংটি ও চেইন পাওয়া যাচ্ছিল না। সোনম তখনও অজ্ঞাতভাবে নিখোঁজ ছিলেন।

পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা মেঘালয়ের পুলিশকে অভিযুক্ত করে প্রচারণা শুরু করেন। তারা অভিযোগ করেন, রাজ্যের পুলিশ যথাযথ তদন্ত করছে না এবং সোনমকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ। পরিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও চিঠি দিয়ে বিচার চেয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবিতে বিভিন্ন রাজনীতিক ও জাতিগত নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সোমবার সকালে পুলিশ জানায়, সোনম গাজিপুরের একটি ধাবায় (সড়কপথের খাবারের দোকান) পৌঁছান, সেখানে তিনি একজনের মোবাইল ধার করে তার ভাইকে ফোন করেন। তিনি এরপর পুলিশকে খবর দেন।

সোনমের পিতা দেবী সিং দাবি করেন, আমার মেয়ে নির্দোষ। সে এটি করতে পারে না। হয়তো সে অপহরণকারীদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে। তিনি মেঘালয় পুলিশের বিরুদ্ধে ‘গল্প তৈরি’ করার অভিযোগ করেন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর কাছে অনুরোধ জানান যাতে এই মামলার কেন্দ্রীয় তদন্ত করা হয়। রাজার ভাই বিপিন রঘুবংশী প্রাথমিকভাবে বলেন, সোনম নিজে না বললে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না যে সে জড়িত। তবে পরে তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া একজন অভিযুক্ত সোনমের অফিসের কর্মী ছিলেন। তাই এখন শুধু সোনমই সত্যটা বলতে পারে। যদি সে দোষী হয়, তবে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বলেছেন, এই মামলায় আমাদের রাজ্যের পুলিশের বড় সাফল্য মাত্র সাতদিনে। একজন মন্ত্রী আলেকজান্ডার লালু হেক বলেন, যখন উদ্ধার অভিযান চলছিল, তখন পুলিশ ও সরকারকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হচ্ছিল। এখন সত্য উদঘাটিত হয়েছে।

mzamin

Monday, March 17, 2025

শিস দিয়ে কথা বলেন ভারতের এই গ্রামের মানুষেরা

কখনও শিস, কখনও কিচিরমিচির, আবার কখনও অন্য রকম কিছু সুর। তবে পাখির নয়, এ সুর মানুষেরই। এমনও এক গ্রাম আছে যেখানে পরস্পর পরস্পরকে ডাকেন সুরে সুরে। মায়েরা প্রতিটি সন্তানের জন্য তৈরি করেন আলাদা আলাদা সুর। সেই সুরেই বাকিরা তাদের ডাকে সারাটা জীবন। তাই প্রত্যেকের রয়েছে নিজের একটি সুর, এটাই তাদের পরিচয়।

পাহাড়ি এই গ্রামে মানববসতি খুবই সীমিত। মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই আলাদা এই গ্রামের নাম কংথং। গ্রামটির অবস্থান ভারতের মেঘালয় রাজ্যে। এখানকার মানুষজন নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে বিচিত্র সব সুরের মাধ্যমে।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গ্রামের বাসিন্দাদের অক্ষরভিত্তিক নামও রয়েছে। তবে নিজেদের মধ্যে সেই নামের ব্যবহার খুবই কম। সন্তানদের আলাদা আলাদা সুরে ডাকেন মা। খাবার খেতে সন্তানদের ডাকতে হলে, সুরের আশ্রয় নেন মায়েরা। আবার সুরে সুরেই জবাবও দেয় সন্তানেরা। এভাবেই সুরে সুরে চলে কথাবার্তা। এটাই এই গ্রামের রীতি।

ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখাতেই মূলত সুরে সুরে ডাকেন মায়েরা। তবে রেগে গেলে কিন্তু পোশাকি নামেই ডাকেন। আবার জঙ্গলে কাজ করার সময় গ্রামের বাসিন্দারা একে-অপরের সঙ্গে সুরে সুরে কথা বলেন। আধুনিক পৃথিবী থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন কংথং। ২০০০ সালে গ্রামটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগে। রাস্তা তৈরি হয় আরও তিন বছর পর অর্থাৎ ২০১৩ সালে।

কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় আস্তে আস্তে এই গ্রামের সুর ও গানে আসছে পরিবর্তন। কিন্তু নিজের ঐতিহ্য ধরে রাখছেন গ্রামের বাসিন্দারা। তাদেরই একজনের ভাষায়, আমরা ছোটকাল থেকেই এভাবে গাইতাম, শব্দ তৈরি করতাম। আমাদের বাবা-মা এই সুর শিখিয়েছেন। আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝেও এখন সেই সুর ছড়িয়ে দিচ্ছি।

অনন্য এমন জীবনযাত্রার জন্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কংথং গ্রাম। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামের অবস্থান। মাতৃতান্ত্রিক এই গ্রামে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মায়েরা। কারণ মায়েরা সন্তানের প্রতিপালন করেন, আবার সংসারও সামলান। তাই মায়ের সুরেই পরিচিতি পায় সন্তানরা।

ভারতের মেঘালয়ার কংথং গ্রাম। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের মেঘালয়ার কংথং গ্রাম। ছবি : সংগৃহীত