Showing posts with label জাতিসংঘ. Show all posts
Showing posts with label জাতিসংঘ. Show all posts

Thursday, August 27, 2026

ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ

আল-জাজিরাঃ ইসরাইল কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র দখলে নিলেও ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ক্রিশ্চিয়ান সন্ডার্স।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছি না।’

আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সন্ডার্স এ কথা বলেন। এ সময় কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র দখল নিয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিভিন্ন দাবিরও জবাব দেন তিনি।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি, কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ইহুদি ন্যাশনাল ফান্ডের মালিকানাধীন। পরিকল্পিত একটি কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য জায়গাটি জেরুজালেম পৌরসভাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে পাস হওয়া একটি আইনের কথাও উল্লেখ করেছে তারা। ওই আইনে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম সীমিত করার কথা বলা হয়।

ইউএনআরডব্লিউএ অবশ্য এসব দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির বক্তব্য, কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র জাতিসংঘের একটি স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এটি সুরক্ষিত।

সন্ডার্স বলেন, ইউএনআরডব্লিউএর দায়িত্ব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সরাসরি দিয়েছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটির কাজ হলো ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মানবিক ও জনসেবা দেওয়া।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মানবিক সংস্থা। আমরা উন্নয়নমূলক কাজও করি। গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে।’

সন্ডার্স জানান, সাধারণ পরিষদ অন্য কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত অথবা ফিলিস্তিন প্রশ্নের একটি স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইউএনআরডব্লিউএ তার কাজ চালিয়ে যাবে।

ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানের পর কর্মী ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে জাতিসংঘের স্থাপনায় ইসরাইলি বাহিনীর বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেছেন সন্ডার্স। তার মতে, এ ধরনের বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেওয়া ঠিক হয়নি। এসব সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই করতে হবে।

সন্ডার্স বলেন, ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মুখোমুখি বসে এসব সমস্যা সমাধানের সময় অনেক আগেই এসেছে।

ইউএনআরডব্লিউএর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছি না।’ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল -:ইউএনআরডব্লিউএ প্রধান

ইসরাইল জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএকে বিলুপ্ত করে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যুটিই ‘মুছে ফেলতে’ চায় বলে মন্তব্য করেছেন সংস্থাটির প্রধান ক্রিশ্চিয়ান সন্ডার্স।

তার মতে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘের উপস্থিতি বিলীন করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই ইউএনআরডব্লিউএর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অভিযান চালানো হয়েছে।

আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সন্ডার্স এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের কাছে কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান শুধু একটি স্থাপনা দখলের ঘটনা নয়। এর পেছনে আরো বড় লক্ষ্য রয়েছে।

মঙ্গলবার কাফর আকাব এলাকায় অবস্থিত ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি দখলে নেয় ইসরাইলি বাহিনী। অভিযানে ইউএনআরডব্লিউএর কর্মীরা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। এ সময় ইসরাইলি বাহিনীর ছোড়া গুলিতে অন্তত সাতজন ফিলিস্তিনি আহত হন।

অভিযানে অংশ নেন ইসরাইলের কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, ‘জেরুজালেম ও ইসরাইলে এই সংস্থার কোনো জায়গা নেই।’

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই অভিযান ও স্থাপনা খালি করার সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি দাবি করেন, ইসরাইলি আইনের আওতায় এ পদক্ষেপ বৈধ। একই সঙ্গে ইউএনআরডব্লিউএর বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় হামাসকে সহায়তা করার অভিযোগ তোলেন তিনি।

তবে ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান সন্ডার্সের বক্তব্য, এর লক্ষ্য আরো গভীরে।

তার ভাষ্য, সংস্থাটিকে অর্থসংকটে ফেলে বিলুপ্ত করা গেলে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যুটিও আর থাকবে না—এমনটাই আশা করছে ইসরাইল।

সন্ডার্স বলেন, ইউএনআরডব্লিউএর অর্থায়ন বন্ধ করে সংস্থাটিকে বিলুপ্ত করা হলে ফিলিস্তিনি শরণার্থী সমস্যাটি ‘শেষ হয়ে যাবে’। একই সঙ্গে শরণার্থীদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার, পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিপূরণের দাবিও আর থাকবে না।

কালান্দিয়া প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সন্ডার্স। তিনি বলেন, কেন্দ্রটি স্থানীয় তরুণদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল।

তার ভাষ্য, কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩৪০ তরুণ প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হবে। এই কর্মসূচি তরুণদের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ার সুযোগ করে দিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সন্ডার্স বলেন, প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি হারানোর অর্থ শুধু একটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে শত শত তরুণের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল।

ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল
ছবি: এপি

Wednesday, August 26, 2026

জেরুজালেমে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যালয় দখল করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল ইসরাইলি মন্ত্রী

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অভিযান চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এ সময় কেন্দ্রটির কর্মীদের বের করে দেওয়া হয়। পরে এর প্রাঙ্গণে ইসরাইলের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উগ্রপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এ ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। অভিযান ও পতাকা উত্তোলনের পর তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরাও ঘটনাটিকে একইভাবে দেখছেন।

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের একটি সংস্থার পরিচালিত স্থাপনায় ইসরাইলি বাহিনীর প্রবেশ এবং কর্মীদের সেখান থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাকে গুরুতর বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের সংস্থার কার্যক্রমে এ ধরনের হস্তক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি প্রশ্ন উঠেছে।

ইউএনআরডব্লিউএ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দিয়ে থাকে। সংস্থাটির স্থাপনায় অভিযান চালানো এবং সেখানে ইসরাইলের পতাকা তোলার ঘটনা তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইসরাইলের উগ্রপন্থি রাজনীতিক বেন-গভির দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। পূর্ব জেরুজালেমে ইউএনআরডব্লিউএ-এর এই স্থাপনায় অভিযানকে তার প্রকাশ্য সমর্থন সেই অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউএনআরডব্লিউএ ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের সংস্থার পরিচালিত স্থাপনায় এ ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জেরুজালেমে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যালয় দখল করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল ইসরাইলি মন্ত্রী
ইতামার বেন-গভির। ছবি: আল-জাজিরা

Monday, August 24, 2026

ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান আলবানিজের

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজি । তিনি বলেছেন, এ ধরনের উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।

মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আলবানিজি বলেন, ‘তৃতীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর দায়িত্ব রয়েছে—আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায় অনুযায়ী ইসরাইলের অবৈধ দখলদারত্বের অবসানে পদক্ষেপ নেওয়া।’

২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া একটি পরামর্শমূলক রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি এ মন্তব্য করেন। ওই রায়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারত্বকে অবৈধ বলে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে দখলদারত্ব বজায় রাখতে সহায়তা না করার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

আলবানিজি জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সাধারণ পরিষদের ‘ইউনাইটিং ফর পিস’ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। গাজা ও পশ্চিম তীরের সংঘাত নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

‘ইউনাইটিং ফর পিস’ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার আওতায় নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে কোনো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।

গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে পরিষদ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

সূত্র: আনাদোলু

ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান আলবানিজের

Thursday, August 20, 2026

ত্রাণকর্মীদের জন্য আবারো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা গাজা

ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের জন্য ২০২৫ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্থান ছিল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। টানা তৃতীয় বছরের মতো প্রাণঘাতী এলাকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে গাজা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেখানে ১৮৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

গাজার পর ত্রাণকর্মীদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশ ছিল সুদান। চলমান সংঘাতের মধ্যে ২০২৫ সালে দেশটিতে ৭১ জন ত্রাণকর্মী নিহত হন।

জাতিসংঘের তথ্য ও এইড ওয়ার্কার সিকিউরিটি ডাটাবেস-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ৯০৭ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত, আহত অথবা অপহৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৮৭ জন। তবে নিহত, আহত ও অপহরণের সম্মিলিত সংখ্যা ২০২৫ সালে আগের বছরের ৮৩৩ জনের তুলনায় বেড়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।

জাতিসংঘ বলছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সস্তা ও সহজলভ্য সশস্ত্র ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াও ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা বাড়ার অন্যতম কারণ। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর এ মাত্রার সহিংসতাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং হামলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং বছরের শুরু থেকে ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা ও হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৮২ জন ত্রাণকর্মী নিহত, ৯৭ জন আহত এবং ৩৯ জন অপহৃত হয়েছেন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩২৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং গত তিন বছরে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীরেই এই সময়ের মধ্যে ৫৬০ জনের বেশি মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে জীবন হারাচ্ছেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীরা। ফলে যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক জনগণের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

ত্রাণকর্মীদের জন্য আবারো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা গাজা

Sunday, August 2, 2026

গত ২০২৪ সালে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনঃ গত ২০২৪ সালে বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন। নিহত ৬০ শতাংশ নারী তাঁর সঙ্গী বা আত্মীয় যেমন বাবা, চাচা, মা ও ভাইদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে গত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার জাতিসংঘের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। সংস্থাটি নারী হত্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রগতি না হওয়ার নিন্দা জানিয়েছে।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং জাতিসংঘ নারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর প্রায় ৫০ হাজার নারী ও কন্যাশিশুকে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছেন। ১১৭টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী নিহত হয়েছেন।

এই সংখ্যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে সামান্য কম। তবে এটি আসলে হত্যাকাণ্ড কমার বিষয়টি নির্দেশ করে না। কেননা, বিভিন্ন দেশে তথ্য সরবরাহের তারতম্যের কারণে এ পার্থক্য দেখা গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড প্রতিবছর হাজার হাজার নারী ও মেয়ের জীবন কেড়ে নিচ্ছে এবং কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া হত্যার ঝুঁকির ক্ষেত্রে ঘরই নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। তবে গত বছর আফ্রিকায় সর্বোচ্চসংখ্যক, প্রায় ২২ হাজার নারীকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জাতিসংঘের নারীনীতি বিভাগের পরিচালক সারাহ হেন্ড্রিক্স বলেন, নারী হত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রায়ই ধারাবাহিক সহিংসতার একটি অংশ, যা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, হুমকি এবং অনলাইনসহ হয়রানি থেকে শুরু হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। ছবি: রয়টার্স

Sunday, May 31, 2026

২০২৪ সালে যক্ষ্মায় মারা গেছে ১২ লাখের বেশি মানুষ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মায় (টিবি) ১২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির বার্ষিক যক্ষ্মা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর টিবি রোগীর সংখ্যাও প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, এটি কোভিড-১৯ মহামারির পর প্রথমবারের মতো যক্ষ্মা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমার ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে  ৮৩ লাখ মানুষ নতুনভাবে শনাক্ত হওয়ার পর যক্ষ্মার চিকিৎসা পেয়েছেন। যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। চিকিৎসা সফলতার হারও বেড়ে ৬৮ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এই অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়তে পারে। সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস আধানম গেব্রেইসুস বলেন, এই ঘাটতি আমাদের অর্জিত কঠিন সাফল্যগুলোকে উল্টে দিতে পারে।
২০২৪ সালে যক্ষ্মা প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছিল ৫.৯ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২৭ সালের মধ্যে নির্ধারিত বার্ষিক ২২ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম। টেড্রস বলেন, যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সাম্প্রতিক অগ্রগতি অবশ্যই ইতিবাচক, তবে এটিকে বিজয় বলা যায় না। এখনও প্রতিবছর এক মিলিয়নের বেশি মানুষ এই প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগে মারা যাচ্ছেন। এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে যক্ষ্মাজনিত মৃত্যু ২৯ শতাংশ কম হলেও ডব্লিউএইচও-এর লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৭৫ শতাংশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ কমানো।

ডব্লিউএইচও-এর টিবি, এইচআইভি ও সংশ্লিষ্ট সংক্রমণবিষয়ক বিভাগের পরিচালক তেরেজা কাসায়েভা সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে ২০২৫ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে এবং আরও ১ কোটি মানুষ নতুনভাবে টিবিতে আক্রান্ত হতে পারে। সংস্থাটি বড় ধাক্কা খায় যখন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচও থেকে সরে যায়। ফলে এর প্রস্তাবিত বাজেটে ২১ শতাংশ কাটছাঁট করতে হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি সহায়তা বিশেষ করে ইউএসএইডের অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক টিবি চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, গত বছর আন্তর্জাতিক সহায়তার কারণে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জীবন যক্ষ্মা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।

mzamin

Friday, May 15, 2026

জাতিসংঘের প্রতিবেদন: জলবায়ু বিপর্যয়ে এক দশকে ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত

১০ নভেম্বর ২০২৫ঃ জলবায়ু সংকটের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ বছর ২৫ কোটি হিসাবে প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরবাড়ি ত্যাগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে কপ৩০ প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

‘নো স্কেপ-২: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ বা ‘পালানোর পথ নেই-২: আগামীর দিশা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা, ঝড়, খরা ও তীব্র তাপমাত্রার মতো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ও সংঘাত বাড়ছে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে আঘাত হানা বিভিন্ন দুর্যোগ, যেমন বন উজাড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাস্তুসংস্থান ধ্বংস, খাবার ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।

সংঘাত ও জলবায়ুর কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে—এমন দেশের সংখ্যা ২০০৯ সাল থেকে তিন গুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। এরপরও দুর্দশাগ্রস্ত ও সংঘাতে জর্জর যেসব দেশে শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে, ওই দেশগুলো প্রয়োজনের চার ভাগের এক ভাগ জলবায়ু সহায়তা পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা না রেখেও বাস্তুচ্যুতদের অনেক সময় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে।

দেশে দেশে দুর্যোগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে শরণার্থী ও অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের চার ভাগের তিন ভাগ এমন সব দেশে বাস করছে, যেগুলো উচ্চ বা চরম জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে আক্রান্ত। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ইউএনএইচসিআর যতবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, তার তিন ভাগের এক ভাগের কারণ ছিল বন্যা, খরা, দাবানলসহ অন্যান্য চরম আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঘটনা।

উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের মে মাসে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের রিও গ্রানদে দো সুল রাজ্যে ভয়াবহ বন্যার কথা বলা হয়েছে। ওই বন্যায় ১৮১ জনের মৃত্যু হয়। বাস্তুচ্যুত হয় ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ৪৩ হাজার শরণার্থী ছিল। এর আগের বছরে এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় মোচা।

আফ্রিকার দেশ চাদে ১৪ লাখের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বসবাস করে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যার কারণে দেশটিতে ১৩ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ও আশ্রয়শিবির ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সুদানের শরণার্থীরা প্রতিদিনের ১০ লিটারের কম পানি পাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব মিলিয়ে আফ্রিকার ৭৫ শতাংশ ভূখণ্ডের অবস্থা খারাপ হচ্ছে।

যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০৪০ সাল নাগাদ চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে পড়া দেশের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৬৫–তে পৌঁছাতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ গাম্বিয়া, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, সেনেগাল ও মালির ১৫টি শরণার্থীশিবির বছরে প্রায় ২০০ দিন বিপর্যয়কর তাপমাত্রার মুখে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, ‘চরম জলবায়ুর প্রভাব থেকে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে তহবিলে কাটছাঁট। আমরা যদি স্থিতিশীলতা চাই, তাহলে মানুষ যেখানে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ করতে হবে। বাস্তুচ্যুত হওয়া থামাতে জলবায়ু তহবিল সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।’

পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে এগিয়ে চীন

আজ শুরু হওয়া কপ৩০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ১৯৪ দেশের প্রতিনিধিরা। প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সে বিষয়ে আলোচনা করবেন তাঁরা। একই সঙ্গে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করা যায় এবং দরিদ্র দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হবে।

তবে এসব লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ব্রাজিলের কূটনীতিক আন্দ্রে কোরেরা দো লাগো বলেন, জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো এই সংকট নিরসনের লড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়েছে। তবে ভালো করছে চীন। দেশটি সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করলেও পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী। অন্য দেশগুলোকে এটি অনুসরণ করতে হবে।

জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় শিকার দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। জাতিসংঘে পালাউয়ের রাষ্ট্রদূত এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের (এওসিস) মুখপাত্র ইলানা সেইড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বড় পরিসরে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য একটি বৈশ্বিক পথরেখা তৈরি করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন যতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা খুবই সামান্য। আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া জানি না, আমরা কোথায় যাচ্ছি।’

কপ৩০-এর আয়োজনে ব্রাজিল এমন বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে, যেগুলো নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধ, ২০৩০ সালের মধ্যে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তিন গুণ বাড়ানো এবং জ্বালানিবিষয়ক দক্ষতা দ্বিগুণ করা। তবে এওসিস আরও বেশি কিছু চায়। তাদের ভাষ্য, নীতি নির্ধারণ ছাড়া দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। সম্প্রতি নদের এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। সম্প্রতি নদের এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে। ছবি: রয়টার্স

Saturday, May 9, 2026

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনীতির এ এক অদ্ভুত প্রকৃতি। যাদের সহায়তা গতকাল অপরিহার্য বিবেচিত হয়েছে, আজ তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে অবিশ্বাস্য সব ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পেছনে ছোটা।

দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনায় যাদের সমর্থনের আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতে দেখা যেত কিংবা যাদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দুঃশাসনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এখন সেই জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের (ওএইচসিএইচআর) উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

বাম ও ডানপন্থী, ধর্মবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ—বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দলগুলো যেন একই মোহনায় মিলিত হচ্ছে। আরও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ছাত্র ও গণ-অভ্যুত্থানের নেতারাও এ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।

হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলার পেছনে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পেয়েছেন।

ডয়চে ভেলে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ‘তারা এখানে অফিস করলে সমকামিতা উৎসাহিত হবে। তাহলে তো সভ্যতা থাকবে না। তারা কাদিয়ানি (আহমদিয়া), সংখ্যালঘু, পাহাড়ি, নানা ইস্যু তৈরি করবে। খ্রিষ্টানদের প্রভাব বেড়ে যাবে। আর নারী স্বাধীনতার নামে তারা নারীদের ইসলামের বিধিবিধানের বাইরে নিয়ে যেতে কাজ করবে।’

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স একই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তো এমন কোনো দীর্ঘ মেয়াদে সংকটে পড়ে নাই যে তাদের অফিস লাগবে।’ তিনি বরং অভিযোগ করেছেন, ‘জাতিসংঘ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তারা সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদীর স্বার্থ রক্ষা করছে।’

এনসিপি দলীয়ভাবে কিছু না বললেও দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সমঝোতা স্মারক নিয়ে ফেসবুকে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি ওএইচসিএইচআরের ভূমিকাকে পক্ষপাতমূলক ও সাম্রাজ্যবাদ-সমর্থক অভিহিত করে ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যক্রমের কিছু বাংলাদেশে হোক, এটা না চাওয়ার কারণ হিসেবে যা পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর সম–অধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার কারণ বলে মনে হচ্ছে। বিরোধিতার আরেকটি বিষয় হচ্ছে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নটি, যা প্রধানত উঠেছে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্য থেকে। বাম-ডান সবার ভাষ্যে কথিত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্বের কথাও আছে।

সব সরকারের আমলে সুবিধাভোগী একজন অধ্যাপক এক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন, বিশ্বের ১৮ দেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় রয়েছে, বাংলাদেশ যদি সেই তালিকায় চলে যায়, তাহলে এটা আমাদের জন্য বিরাট ইমেজ সংকট হবে। বিনিয়োগকারীরা তখন বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে অন্য দেশে চলে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডে তাদের কার্যালয় প্রতিষ্ঠায় কোনো বিনিয়োগকারী দেশ দুটি ছেড়ে গেছেন কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য তাঁকে কেউ করেনি।

মানবাধিকারের প্রশ্নে বহির্বিশ্বের কারও নজরদারি ও জবাবদিহি যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর কেউ সমর্থন করেন না, সেটা মোটেও অজানা কিছু নয়। তাঁদের উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, জনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁদের শক্তি প্রয়োগ সব সময় নিয়মনীতি মেনে চলে না এবং সে কারণে এ ধরনের নিবিড় নজরদারিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে জাতিসংঘে কাজের সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর সবচেয়ে বড় শরিক হিসেবে এ আশঙ্কার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষায় আমাদের সৈনিক ও পুলিশ সদস্য যখন যান, তখন তাঁদের কর্মস্থল যত ঝঞ্ঝাপূর্ণ ও বিপজ্জনক হোক না কেন, তাঁরা তখন ঠিকই মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলেন। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে দ্রুততার সঙ্গে তার তদন্ত এবং সামরিক আদালতে বিচারের কথাও আমরা জানি।

বিদেশের মাটিতে যে সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা মানবাধিকারের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে চলেন, তাঁরা স্বদেশে তা অনুসরণ করতে পারবেন না, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এখানে অবশ্য স্মরণ করা দরকার, স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর গণ-অভ্যুত্থানে এসব বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এমন সব প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, যা শান্তি মিশনে তাঁরা ব্যবহার করতে পারতেন না। স্বাভাবিকভাবেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার উপস্থিতিও নিরোধক হিসেবে কাজ করত।

সব জনগোষ্ঠীর সম–অধিকারের প্রশ্নে যে উদ্বেগ, তা আগেও ছিল এবং দেশের বাইরে থেকেই এর সমালোচনা হয়ে এসেছে। এই সমালোচনা তত দিন চলবে, যত দিন বাস্তবে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠা না পাবে। পশ্চিমা বিশ্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমসুযোগ না থাকা এবং যৌন হয়রানির বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতই হতাশাজনক প্রতিবেদন প্রকাশ পায় ও বিতর্ক হয়।

আমাদের দেশে সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ধর্মীয় বিধিবিধানের কথা বলে সম্পদের অধিকারসহ নানাভাবে নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়। নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ সত্ত্বেও উপার্জনের জন্য নারীকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর কোনো আপত্তির কথা কখনো শোনা যায় না, কিন্তু সম্পদের উত্তরাধিকারের দাবি উঠলেই ‘গেল, গেল’ রব তোলা হয়।

দেশে নারী-পুরুষ, ধর্ম-জাতি-গোত্রনির্বিশেষে কারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না—এমন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ঘোষণা ও তা প্রতিপালন করা হলে জাতিসংঘ বা বিদেশি কোনো সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। সমস্যা কেবল তখনই হতে পারে, যদি আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনকে প্রশ্রয় দিই এবং তা আড়াল করতে চাই।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা ও কাজ সম্পর্কে আমরা পর্যাপ্ত তথ্য না জেনেই বিতর্ক ও বিরোধিতায় নেমে পড়ি। গাজা ও পুরো ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের যে গণহত্যা ও দখলদারি, সেটা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটের বিষয়, যার সমাধান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ শক্তিগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার কাজ শুধুই সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তথ্য সংগ্রহ এবং তা বৃহৎ পরিসরে তুলে ধরা, যেটা তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের কাছে নিয়মিত পেশ করে।

বাংলাদেশে তাদের দপ্তর খোলার বিরোধিতায় বলা হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনে গণহত্যা রোধ করতে পারেনি। তাঁরা জানেনও না যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে জাতিসংঘের র‍্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ গণহত্যা নিয়ে অব্যাহত সমালোচনা করতে থাকায় ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকদের চক্ষুশূল হয়েছেন।

সম্প্রতি কোন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইসরায়েলের জন্য সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ করছে, তার তালিকা সমপ্রমাণে প্রকাশ করার পর যুক্তরাষ্ট্র তাঁর বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার দপ্তর খোলা হলে তারা দেশে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন ডান ও বামপন্থী—উভয় ধারার রাজনীতিকেরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে এক নির্বাহী আদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও এমন বক্তব্যের ভিত্তি কী? প্রথমবারও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন মানবাধিকার সংস্থার কথিত ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাতের অভিযোগে। এবার ক্ষমতা গ্রহণের দিনই তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছেন।

২২ জুলাই ট্রাম্প জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংস্থাটি বিভাজন সৃষ্টি করে, এমন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর প্রসার ঘটাচ্ছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে সংস্থার সদস্যপদ দেওয়াও আরেকটি কারণ। বলা দরকার যে যৌনশিক্ষার বিষয়টি ইউনেসকোর কার্যক্রমের অংশ। নারী অধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রক্ষণশীল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কি আমাদের ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর খুব একটা পার্থক্য করা যায়?

ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিপরীতে আমাদের বরং এই সংস্থার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ জরুরি, কেননা গুমের মতো নিষ্ঠুর বর্বরতার বিরুদ্ধে এক দশক ধরে সবচেয়ে বেশি তৎপর ও সোচ্চার ছিল এই সংস্থা। হেফাজতের শাপলা চত্বরের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অধিকারের প্রতিবেদনের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যাহত অপবাদ সত্ত্বেও সংস্থাটি অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।

গত বছর ছাত্রহত্যার নিন্দা ও তদন্ত দাবি করে সবার আগে সবচেয়ে জোরালো বিবৃতিটি এসেছিল কোত্থেকে? ১৯ জুলাই মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক প্রথম বিবৃতি দিয়ে ছাত্র হত্যা বন্ধ ও সব ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার তদন্ত নিয়েও আপত্তি তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু তাদের তদন্তের কারণেই ১ হাজার ৪০০ প্রাণহানি এবং শেখ হাসিনার সরকারের নিষ্ঠুরতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। না হলে আওয়ামী লীগের বিদেশি বন্ধুদের অপপ্রচার মোকাবিলা দুঃসাধ্য হতো। তিন বছরের জন্য সংস্থাটির দপ্তর খোলার পেছনে তাই ষড়যন্ত্র না খুঁজে তাদের সহায়তায় মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি ও অতীত অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করায় মনোযোগী হওয়াই জরুরি। তাহলে তিন বছর পর আর তাদের প্রয়োজন হবে না।

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মানবাধিকার লঙ্ঘন আড়াল না করলে দপ্তরে আপত্তি কেন

Sunday, March 29, 2026

জাতিসংঘের পাল্টা ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’ কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

গাজা পুনর্গঠন ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন নকশা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘শান্তি পর্ষদ’ (বোর্ড অব পিস) এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে। ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের সদস্যপদ আর ট্রাম্পের আজীবন কর্তৃত্বের সংস্থাটিকে বিশ্লেষকেরা দেখছেন জাতিসংঘের বিকল্প এক ‘ঔপনিবেশিক কাঠামো’ হিসেবে। ব্যবসায়িক স্বার্থ আর ব্যক্তিগত ক্ষমতার এই মেলবন্ধন বিশ্ব কূটনীতিকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের বরফঢাকা দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে গত ২২ জানুয়ারি এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বহুল আলোচিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উজ্জ্বল আলোকচ্ছটার নিচে কয়েক ডজন দেশের নেতার উপস্থিতিতে এ ঘোষণা এলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

বিশ্লেষকেরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ উদ্যোগকে শুধু একটি শান্তি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন না; বরং একে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাতিসংঘ কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে হটিয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রভাবাধীন নতুন ‘ঔপনিবেশিক কাঠামো’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

এ পর্ষদের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও সুচতুর কূটনৈতিক পরিকল্পনা; যাকে অনেকে ‘বেইট-অ্যান্ড-সুইচ’ বা টোপ দেখিয়ে প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। গত ১৮ নভেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ‘রেজোল্যুশন ২৮০৩’ পাস হয়েছিল ১৩-০ ভোটে।

তখন বিশ্বনেতারা এবং ইউরোপ ও আরব দেশগুলো এ ভেবে ওই প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিল যে এটি গাজায় ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিকে একটি আন্তর্জাতিক বৈধতা দেবে, সেখানকার পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে শান্ত করবে, উপত্যকাটিতে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এমনকি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি অন্তত নামমাত্র বা কাগুজে সমর্থন বজায় রাখার শর্তে এতে রাজি হয়েছিল অনেক দেশ।

কিন্তু দুই মাস যেতে না যেতেই দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। ঘোষিত এ পর্ষদের যে সনদ (চার্টার) সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে; সেখানে ‘গাজা’ শব্দটির কোনো উল্লেখ পর্যন্ত নেই। এর পরিবর্তে পর্ষদকে ‘বিশ্বজুড়ে’ শান্তি ও সুশাসন প্রচারের ‘একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘকে ব্যর্থ ও অকেজো সংস্থা হিসেবে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কটাক্ষ করে শান্তি পর্ষদ নিজেকে আরও তৎপর ও কার্যকর হিসেবে জাহির করছে। ট্রাম্পের দাবি, এটি পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হয়ে গেলে তাঁরা যা খুশি তা-ই করতে পারবেন এবং তা হবে জাতিসংঘের সমান্তরালে।

এ প্রসঙ্গে গত ২০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁর প্রস্তাবিত শান্তি পর্ষদ জাতিসংঘের স্থলাভিষিক্ত হবে বলে তিনি মনে করেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘হতে পারে। জাতিসংঘ খুব একটা কাজের নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, এ সংস্থার (জাতিসংঘ) সম্ভাবনা আছে, কিন্তু কোনো যুদ্ধ মীমাংসার জন্য তাদের কাছে যাওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি।

চেয়ারম্যান যখন সর্বেসর্বা

জাতিসংঘের ১৯৪৫ সালের সনদের মূল ভিত্তি ছিল, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সাম্য। কিন্তু ট্রাম্পের এ শান্তি পর্ষদের সনদ সম্পূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এ সনদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অন্তত ৩৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে; যা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সনদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন।

আবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই এ পর্ষদের একমাত্র চেয়ারম্যান ও ‘সর্বময় ক্ষমতা’র অধিকারী। সনদে তাঁকে একাধারে বিচারক, জুরি, দণ্ডদানকারী, অর্থ নিয়ন্ত্রক, এমনকি অর্থায়ন ও পর্ষদের প্রচারমূলক কাজের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে রাখা হয়েছে।

সনদ অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের পদ শুধু তখনই শূন্য হতে পারে; যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন অথবা পর্ষদের সদস্যরা তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে অযোগ্য ঘোষণা করে। এটি কার্যত অসম্ভব একটি প্রক্রিয়া। ট্রাম্প একাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং তাঁর হাতে থাকবে নিরঙ্কুশ ভেটো ক্ষমতা।

যেকোনো সফল বহুপক্ষীয় সংস্থা যেখানে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে চলে; সেখানে এ পর্ষদ চলবে একক নেতার ব্র্যান্ড ও ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ওপর ভিত্তি করে।

বিলিয়ন ডলারের সদস্যপদ: ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাব

এই নতুন পর্ষদের সদস্যপদ পাওয়ার শর্ত অত্যন্ত বিতর্কিত এবং আর্থিক বৈষম্যে ভরা। এতে যোগ দিতে হলে সদস্য দেশগুলোকে নগদ ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার ‘হার্ড কারেন্সি’তে দিতে হবে। এটি অন্তত তিন বছর বা এর বেশি সময়ের সদস্যপদ নিশ্চিত করবে।

বিশ্লেষকেরা এ শর্তকে একটি ‘পে-টু-প্লে’ ক্লাব হিসেবে দেখছেন; যেখানে শুধু ধনী রাষ্ট্রগুলোই প্রাধান্য পাবে এবং দরিদ্র বা স্বল্পোন্নত দেশগুলো প্রান্তিক হয়ে পড়বে। ট্রাম্পের এ মডেলে ‘করদ রাষ্ট্রগুলো’ নগদ অর্থের বিনিময়ে তাঁর আনুগত্য স্বীকার এবং তাঁর ব্যক্তিগত অনুকম্পা লাভের চেষ্টা করবে।

ইতিমধ্যে, ইতালির মতো দেশের জন্য এ অর্থ পরিশোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এর ফলে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজেট বা জাতিসংঘের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, যারা এতে যোগ দিতে অস্বীকার করছে, যেমন ফ্রান্স; তাদের ওপর শাস্তিমূলক ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

থাকছে নিজস্ব বাহিনী আইএসএফ

ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় শুধু কূটনৈতিক বা আর্থিক শর্তই নেই; বরং একটি নিজস্ব সামরিক কাঠামোও রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স/আইএসএফ) সরাসরি একজন মার্কিন মেজর জেনারেলের অধীনে পরিচালিত হবে।

এ বাহিনী জাতিসংঘের চিরাচরিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর আদলে তৈরি হলেও এর মূল দর্শনে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। যেখানে জাতিসংঘের বাহিনী ‘নিরপেক্ষতা’ এবং সব পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে কাজ করে; সেখানে ট্রাম্পের এ বাহিনী কোনো আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ছাড়াই মিত্র দেশগুলোর সমন্বয়ে একতরফা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।

মিত্রদের অনীহা ও বৈশ্বিক বিভাজন

ট্রাম্পের এ উদ্যোগ বিদ্যমান বহুপাক্ষিকতাবাদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন পশ্চিমা মিত্ররা এ বোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে।

ফরাসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এ পর্ষদ জাতিসংঘের কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে ট্রাম্প দুই দেশের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতু বন্ধের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। এটি পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে দ্বিধা ও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ পর্ষদের ‘অসীম সম্ভাবনা’র প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘শান্তি পর্ষদ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।’

কিন্তু সমালোচকেরা এ পর্ষদকে ট্রাম্পের ‘সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এটি কার্যত জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই তৈরি করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউস মোট ৫০টি দেশকে শান্তি পর্ষদে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও এ পর্যন্ত ৩৫টি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে ১৪টি দেশ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।

যোগ দেওয়া দেশের তালিকার কয়েকটি—আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এতে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা খুব কম।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক আইনের নির্ধারক নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই শুধু এ পর্ষদে আছে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মস্কোর জব্দকৃত মার্কিন সম্পদ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ‘ফিলিস্তিনিদের সহায়তায়’ দিতে প্রস্তুত।

চীন এখনো তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এই মুহূর্তে পর্ষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ব্যবসায়িক বলয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাব

পর্ষদের গঠন কাঠামো ও নেতৃত্বের তালিকা স্পষ্ট করছে যে এটি রাজনীতির চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ‘ব্যক্তিগত ক্লাব’ সংস্কৃতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

সদস্য হিসেবে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তারা মূলত ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মিত্র বা অর্থলগ্নি জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এ তালিকায় আছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, ধনাঢ্য আবাসন ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফ এবং মার্ক রোয়ান ও অজয় বাঙ্গার মতো ব্যক্তিরা।

জ্যারেড কুশনার জানিয়েছেন, এ পর্ষদের মাধ্যমে গাজার পুনর্গঠনে অর্থায়ন ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কাজ করা হবে। তাঁর মতে, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ না করলে এ পুরো পরিকল্পনা থমকে যাবে।

আবার গাজার পুনর্গঠনে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো হটিয়ে সেখানে ‘মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়িক উদ্যোগ’ চালুর ইঙ্গিত রয়েছে পর্ষদের সনদে।

যখন পর্ষদের বিলিয়ন ডলারের হিসাব আর প্রশাসনিক ছক নিয়ে তোলপাড় চলছে, তখন গাজার সাধারণ মানুষের জন্য কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি। ফিলিস্তিনিদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে শুধু সর্বনিম্ন স্তরের ‘ন্যাশনাল কমিটি’তে।

অতিসম্প্রতি গাজার মূল প্রবেশপথ রাফাহ সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। তবু গাজার মানুষ এখনো ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনের শিকার হচ্ছেন। তাঁদের জন্য এ পরিস্থিতি দুঃসহ নরক যন্ত্রণার মতো। আর তাঁদেরই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে ট্রাম্পের এই তথাকথিত শান্তি পর্ষদ।

বহুপাক্ষিকতার সংকট ও ভবিষ্যৎ

সমালোচকদের মতে, এ পর্ষদ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে কোনো নির্দিষ্ট আইনি মর্যাদা বা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই গঠিত হয়েছে। এটি মূলত একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক ক্লাব’ তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে; যা ভিন্নমত পোষণকারী দেশগুলোকে কোণঠাসা করবে।

সাধারণত কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরিতে বছরের পর বছর সময় লাগে, যেমন জাতিসংঘ গঠনে লেগেছিল চার বছর। কিন্তু ট্রাম্প মাত্র দুই মাসেই তাঁর ওই ‘চটপটে’ সংস্থাটি দাঁড় করিয়েছেন এবং দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে খুব অল্প সময় দিয়েছেন।

পরিশেষে বলতে হয়, যদি এই পর্ষদ তার কাঠামো ও লক্ষ্যতে আমূল পরিবর্তন না আনে; অর্থাৎ ম্যান্ডেট স্পষ্ট করা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না করে; তবে এটি কোনো ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে নয়; বরং দাভোসের একটি ‘ফটো সেশন’ হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।

এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্পের এ উদ্যোগ একটি সত্যিকারের কিছু গড়ার দুর্লভ সুযোগকে স্রেফ অপচয় করবে। মনে রাখতে হবে, টেকসই শান্তি আসে ক্ষমতার অংশীদারত্ব, কার্যকর নিয়মনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর মাধ্যমে; এক নেতার ইমেজ কিংবা ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে তৈরি কোনো অতি-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নয়।

[তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আল–জাজিরা, দ্য হিল ও রিনিউঅ্যাবল ম্যাটার]

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-20%2Fha1963h0%2FUntitled-3.jpg?rect=0%2C0%2C960%2C640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৫৬তম বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে ‘শান্তি পর্ষদ’ গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় পর্ষদের সনদ তুলে ধরেন তিনি। ২২ জানুয়ারি ২০২৬, দাভোস, সুইজারল্যান্ড. ছবি: রয়টার্স

Wednesday, March 4, 2026

ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দিতে মিত্রদের অনীহা কেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ (বোর্ড অব পিস) থেকে দূরে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদেশগুলো। তাঁর ঘনিষ্ঠ বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—কেউই এতে খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।

গত বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রস্তাবের মাধ্যমে এই পর্ষদ গঠিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খামখেয়ালির কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন তখন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন।

চলতি মাসের শেষ দিকে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন এই শান্তি পর্ষদের প্রথম বৈঠক হবে। এতে বিশ্বের প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর অধিকাংশই অংশ নিচ্ছে না। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও এই বোর্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মূলত এই শান্তি পর্ষদের যে সনদ তৈরি করা হয়েছে, সেটিই দেশগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। সেই সনদে ট্রাম্পকে একাধারে বিচারক, জুরি, দণ্ডদানকারী, অর্থ নিয়ন্ত্রক এমনকি গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে—অর্থাৎ তিনি যা চাইবেন, তা-ই করতে পারবেন।

গত জানুয়ারিতে এই পর্ষদ সম্পর্কে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংস্থায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এই বোর্ডের।’

পর্ষদে কারা থাকছে

গত নভেম্বরে পর্ষদ গঠনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে যোগ দিতে প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, মিসর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম এতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে পর্ষদে যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশ খুব কম।

জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী

গত বছর ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে এ শান্তি পর্ষদের পরিকল্পনা করা হয়। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য এখন কেবল গাজা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রকৃতপক্ষে এই পর্ষদের সনদে এর লক্ষ্য ও সাংগঠনিক কাঠামো বর্ণনা করা হয়েছে—সেখানে ‘গাজা’ শব্দটির একবারও উল্লেখ নেই।

জাতিসংঘের আগের ঘোষণার সঙ্গে পর্ষদের সনদে মিল নেই। সম্ভবত জাতিসংঘ এমন কোনো শান্তি সংস্থার কথা কল্পনাও করেনি, যার আজীবন চেয়ারম্যান থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বোর্ডের সনদে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের পদ কেবল তখনই শূন্য হবে যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন কিংবা বোর্ড তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে। যেকোনো সংস্থায় ট্রাম্প নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইবেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে বিশ্বনেতাদের চমকে দিয়েছে অন্য একটি বিষয়—জাতিসংঘের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনি যেভাবে এই ‘শান্তি পর্ষদকে’ দাঁড় করাচ্ছেন।

মিত্রদের অনীহার কারণ

পর্ষদের সদস্য হতে হলে যেকোনো দেশকে গুনতে হবে ১০০ কোটি ডলার। সনদে বলা হয়েছে, এই সংস্থা ‘সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করবে’। একে জাতিসংঘের প্রতি প্রকাশ্য কটাক্ষ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই অনেক দেশ এর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। ফ্রান্স এই সংস্থায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফরাসি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এটি জাতিসংঘের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ ও আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইতিহাস বেশ পুরোনো। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে তিনি দুই দেশের সংযোগকারী সেতু বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। এমন একজনের হাতে বিশ্বশান্তির চাবিকাঠি ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? এমন প্রশ্নে দ্বিধায় পড়ে গেছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

Wednesday, February 11, 2026

পশ্চিম তীর দখলে ইসরায়েলের তৎপরতার বিরোধিতা–সমালোচনা

প্রকাশ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর তৎপরতা শুরু করেছে ইসরায়েল। এ লক্ষ্যে নতুন কিছু আইনের অনুমোদন দিয়েছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এমন খবর আসার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সংগঠন। এর বিরোধিতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমের গত রোববারের খবর অনুযায়ী, নতুন আইনে দখল করা পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য জমি কেনা আরও সহজ হবে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর আইন প্রয়োগের জন্য আরও ক্ষমতা পাবেন ইসরায়েলিরা। পাশাপাশি ধর্মীয় কিছু স্থাপনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারবে ইসরায়েল। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের এলাকায় কার্যক্রম জোরদারও করতে পারবে তারা।

এরই মধ্যে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচের দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে কবর দেওয়া অব্যাহত রাখব।’ গাজা ও দখল করা পূর্ব জেরুজালেম ছাড়াও পশ্চিম তীর নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে চান ফিলিস্তিনিরা। পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি অল্প কিছু এলাকায় পশ্চিম–সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের খুবই সীমিত স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। পশ্চিম তীরে প্রায়ই ইসরায়েলি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে ভয়ংকর পদক্ষেপ

পশ্চিম তীরের বিরজেইত থেকে আল–জাজিরার সংবাদদাতা নিদা ইব্রাহিম বলেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে ভয়ংকর পদক্ষেপ। ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখলের পর থেকে এটি ইসরায়েলের নেওয়া সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের যে জমি রয়েছে, তার মালিক হতে পারবেন ইসরায়েলিরা।

নিদা ইব্রাহিম বলেন, ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীদের জমি মালিকানা পাওয়া বা বাড়ি নির্মাণ করা অবৈধ। কারণ, এসব আইনে দখলদার শক্তিকে দখল করা এলাকায় নিজ দেশের নাগরিকদের স্থানান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পুরো পশ্চিম তীরকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের পর অবিলম্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের কার্যালয়। এক বিবৃতিতে কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত খুবই বিপজ্জনক। ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারি বৃদ্ধির বৈধতা দিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আট মুসলিম দেশের নিন্দা

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আট দেশ সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। দেশগুলো হলো হলো মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারা বলেছে, ইসরায়েলের পদক্ষেপের লক্ষ্য—অবৈধ বসতি স্থাপন আরও পাকাপোক্ত করা। পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া।

ইসরায়েলি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিম তীর দখলের চেষ্টা আরও বেগবান করা এবং সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনের জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাতের পথ তৈরি করা হচ্ছে বলেও যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে আট দেশ।

ট্রাম্পের বিরোধিতা


পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারি সম্প্রসারণের নতুন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, গত সোমবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, পশ্চিম তীর স্থিতিশীল থাকলে ইসরায়েলও নিরাপদ থাকে। এটা ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি পদক্ষেপে সম্মত নন ট্রাম্প।

ইসরায়েলের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করছে এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক’ সমাধানের (ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকট) সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন মহাসচিব গুতেরেস।

এদিকে ইসরায়েলকে পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকার বলেছে, ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাজ্য দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানায়। ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক বা জনসংখ্যাগত গঠন একতরফাভাবে পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

পশ্চিম তীরের তুবাস এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান
পশ্চিম তীরের তুবাস এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

একের পর এক গণহত্যা: কতবার পার পাবে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা by মং জার্নি

প্রকাশ ১৭ মার্চ ২০২৩ঃ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারে মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা সরকার যে পাইলট প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক চাপ থেকে মুক্তির একটি ফন্দি ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়।

আপাতভাবে মিয়ানমারের সামরিক নেতারা ভেবে নিয়েছেন, একের পর এক জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে তারা যে মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ করে চলেছেন, সেটি তাঁরা নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যেতে পারবেন। গণহত্যাসহ অন্যান্য অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ তাঁরা নিষ্ঠুর কৌশল প্রয়োগ করে এড়িয়ে চলেছেন। সর্বশেষ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রহেলিকা সৃষ্টি করে জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোকা বানাতে চাইছে।

কিন্তু জার্মানির নাৎসি, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো ও কম্বোডিয়ার খেমার রুজ শাসকদের পরিচালিত গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে যেভাবে হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের সামরিক শাসকেরাও রোহিঙ্গাসহ একাধিক জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের ঘটনায় পার পাবেন না। নাৎসি শাসকেরা ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা-কর্মী, কমিউনিস্ট, জার্মান প্রতিবন্ধী, সমকামী, ইহুদি, রোমা ও সিন্থিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে সুহার্তো সরকার কমিউনিস্ট তকমা দিয়ে ইন্দোনেশিয়ান ও চীনাদের বিরুদ্ধে আর খেমার রুজরা ১৯৭০-এর দশকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, চ্যাম মুসলিম ও খেমার বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া এখন চলমান। কিন্তু মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত মিয়ানমারের সেই একই সামরিক নেতৃত্ব নতুন করে একই ধরনের অপরাধ সংঘটন করে চলেছে। মিয়ানমারের কারেননি, কারেন, কাচিনসহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেই অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, কেন্দ্রস্থলের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা অভ্যুত্থানবিরোধী, তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি জাতিসংঘ প্রকাশ করেছে। জেনেভাতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৫২তম অধিবেশনে সংস্থাটির হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়েছে—
‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে একটি কৌশল সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। সেটা হলো গ্রামগুলো ও মানুষের বাড়িঘরগুলো পদ্ধতিগতভাবে ও বিস্তৃতভাবে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গতিবিধির ওপর নজর রেখে জাতিসংঘ প্রতিবেদন বলছে যে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশজুড়ে সামরিক অভিযানে (এর মধ্যে ২০১১ সালে কাচিনের ও ২০১৭ সালে রাখাইনের ঘটনা রয়েছে) অন্তত ৩৯ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।’

মাত্র পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে যায়। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা বাংলাদেশে চলে যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যেভাবে শত শত গ্রাম পুরোপুরি জ্বালিয়ে দেয়, তা থেকে জীবন বাঁচাতেই তারা পালিয়ে যান। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে মিয়ানমারের সেই একই সামরিক বাহিনী একই কৌশল প্রয়োগ করে চলেছে। মিয়ানমারের ৮০ শতাংশ এলাকাজুড়ে যে সংঘাত চলছে, সেসব এলাকায় ১৩ লাখের বেশি মানুষ ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ধর্মীয় পরিচয়ে বৌদ্ধ নয় কিংবা জাতিগত পরিচয়ে বর্মিজ নয়, এমন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জঘন্য ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৃশংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরেই তারা এটা করে চলেছে। কিন্তু এবারের সামরিক শাসকেরা নতুন যেটা করছেন, তা হলো ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ব্যাপক অজনপ্রিয় অভ্যুত্থানের সমালোচনা বা বিরোধিতা যেসব গোষ্ঠী করেছে, তাদেরকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল মিয়ানমার নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশের এক সপ্তাহ পর কারেননি ও স্যাগায়িং অঞ্চল থেকে আসা অভ্যুত্থানবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সেখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জান্তারা যে ভয়ংকর নৃশংসতা চালিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তারা। বিমান থেকে গোলাবর্ষণ, মর্টার সেল নিক্ষেপ ও গণহত্যা করেছে। পুরো গ্রাম ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।

জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু কারেননিরা বংশানুক্রমিকভাবে থাইল্যান্ডের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বাস করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এই জাতিগোষ্ঠীর বেসামরিক নাগরিক ও তাদের ঘরবাড়ি ও উপাসনালয়ে উপর্যুপরি হামলা চালায়। এর ফলে তাদের প্রায় অর্ধেক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্যাগায়িং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

মিয়ানমারের সেনারা এখন সংঘাত-কবলিত এলাকায় নিয়মিতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করছে। সেসব কাটা মাথা তারা জনসম্মুখে প্রদর্শন করছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দা নয়, অভ্যুত্থানবিরোধী সমস্ত জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানোর জন্য তারা সেসব বিচ্ছিন্ন মাথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমানাসংলগ্ন কারেননি ও কারেন অঞ্চলের জাতিগত সংখ্যালঘুদের গ্রামগুলোতে খবার পানির কুয়াগুলোতে বিষও মিশিয়ে দিয়েছে তারা।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ৩৯ হাজার বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। কিন্তু অন্যান্য বেসামরিক ও ধর্মীয় স্থাপনা যেমন হাসপাতাল, বিদ্যালয়, বৌদ্ধমঠ, চার্চ, মসজিদ, খাদ্য ও ধান সংরক্ষণের গুদাম ও হাটবাজার তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেগুলো এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে ধরনের জাতিগত নির্মূলের শিকার হয়েছিল, তার সঙ্গেই কেবল চলমান ধ্বংসযজ্ঞের তুলনা চলে।

কিন্তু নানা পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর (গণতন্ত্রকামী ও ভিন্নমতালম্বী এবং তাদের জাতিগোষ্ঠী এবং অভ্যুত্থানবিরোধী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী) বিরুদ্ধে যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে, সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি আমরা শুনছি না। এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা জানে যে গণহত্যা সনদ অনুসারে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন।

কিন্তু গণহত্যার সংজ্ঞা নাৎসি গণহত্যার আগে নির্ধারণ করা হয়েছে। পোল্যান্ডের ইহুদি আইনবিশারদ র‌্যাফেল লেমকিন গণহত্যার যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে গণহত্যা বলতে শুধু নির্দিষ্ট পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড বোঝানো হয়নি। লেমকিনের এই ধারণা যখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গণহত্যাবিষয়ক সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন মাত্র চার ধরনের বিষয় তাতে ঠাঁই পায়। জাতি, বর্ণ, গোত্র ও ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই গণহত্যার সংজ্ঞাটি প্রযোজ্য। কিন্তু গণতন্ত্রী, ভিন্নমতাবলম্বী, কমিউনিস্ট—এ ধরনের ভিন্ন পরিচয়ের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য হয় না।

বার্মিজ মানবাধিকারকর্মী ও নির্বাসনবিশেষজ্ঞ হিসেবে এক দশক আগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ধ্রুপদি গণহত্যার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রথম ফাঁস করেছিলাম। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি নির্মূল করার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের ওপর তিন বছর ধরে পদ্ধিতগত নিপীড়ন চালিয়েছিল।

অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি শুনে এবং দেশজুড়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে কৌশল প্রয়োগ করছে তার অসংখ্য নথি ঘেঁটে, আমি এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছি যে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের গণহত্যাকারী সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ যেভাবে অস্বীকার করে চলেছে এবং এ অপরাধের পক্ষে যেভাবে সাফই গেয়েছে, নতুন গণহত্যার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা সেটার পুনরাবৃত্তি করবে। এ দফায় তারা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গণতন্ত্রপন্থী, ভিন্নমতাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জাতিগত সংখ্যাগুরু বামার এবং সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করে চলেছে।

মং জার্নি, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী
- ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনোজ দে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-03%2F63f29e11-d4ee-432b-9708-1f3dcbca5313%2Frohingya_myanmar.jpg?rect=126%2C0%2C1347%2C898&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কৌশল হলো তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে

Friday, January 23, 2026

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কি জাতিসংঘকে অকার্যকর করার নীলনকশা?

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড অব পিস’ ক্রমেই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসছে। শুরুতে গাজা উপত্যকায় শান্তি ও পুনর্গঠন তদারকির লক্ষ্যে এই সংস্থার কথা বলা হলেও, সর্বশেষ প্রকাশিত সনদে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কোনো উল্লেখই নেই। এতে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে- এই বোর্ড কি আদতে জাতিসংঘকে দুর্বল বা অকার্যকর করার একটি পরিকল্পনা?

ডয়চে ভেলের এক খবরে বলা হচ্ছে, গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩-এর মাধ্যমে গাজা সংকটে সীমিত ভূমিকার অনুমোদন পেলেও, আইন বিশেষজ্ঞরা তখনই সতর্ক করেছিলেন যে এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ট্রাম্প বোর্ড অব পিসকে একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যা জাতিসংঘের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
বোর্ড অব পিসের সনদ অনুযায়ী, এই সংস্থার লক্ষ্য হলো বিশ্বের সংঘাতপীড়িত বা সংঘাত-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ‘স্থিতিশীলতা, কার্যকর ও বৈধ শাসনব্যবস্থা এবং স্থায়ী শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো- ডনাল্ড ট্রাম্পকে আজীবনের জন্য বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করা বা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া অপসারণযোগ্য নন। এমনকি তিনি নিজেই উত্তরসূরি মনোনীত করার ক্ষমতাও রাখেন। ফলে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হলেও, বোর্ড অব পিস কার্যত মার্কিন প্রভাবেই থেকে যাবে।

সদস্য নির্বাচনের পূর্ণ ক্ষমতা চেয়ারম্যানের হাতে। প্রথম বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন না করলে কোনো দেশ স্থায়ী সদস্য হতে পারবে না। ইতিমধ্যে জার্মানি, কানাডা, তুরস্ক, হাঙ্গেরিসহ ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশ আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আমন্ত্রণ বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। মধ্যপ্রাচ্যে মিশর ও জর্ডান, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান এবং লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েও আমন্ত্রণ পেয়েছে। এরমধ্যে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড অব পিসে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বোর্ডের কার্যক্রম চেয়ারম্যান-কেন্দ্রিক। সদস্য রাষ্ট্রগুলো এজেন্ডা প্রস্তাব ও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও, সব সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে চেয়ারম্যানের অনুমোদন প্রয়োজন। এমনকি সদস্য বহিষ্কারের ক্ষমতাও তার হাতে, যা কেবল দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে আটকে দেয়া সম্ভব।
ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে যুক্ত করার খবরে বিতর্ক তৈরি হলেও, সনদ অনুযায়ী তারা ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্য নন। তারা বিভিন্ন উপকমিটিতে দায়িত্ব পালন করবেন।

জাতিসংঘের বিকল্প নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী?
বোর্ড অব পিসের সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহস প্রয়োজন। জাতিসংঘের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমালোচনা বিবেচনায় এটি জাতিসংঘকেই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এলিয়াভ লিবলিখের মতে, এই সনদ জাতিসংঘের প্রতি অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। তার ভাষায়, বোর্ড অব পিস যদি তার মূল ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে কাজ শুরু করে, তবে তা সরাসরি জাতিসংঘের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামবে। অনেক দেশ এতে যোগ দিলে জাতিসংঘের ভূমিকা সত্যিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার নতুন উদ্যোগ নাকি জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র তৈরির চেষ্টা- এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে, তা নিশ্চিত।

mzamin

Tuesday, January 6, 2026

দুর্ভিক্ষ দূর হলেও গাজাবাসীর ক্ষুধার কষ্ট দূর হয়নি

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ, অবরোধ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে গাজাবাসী দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়েছিল। তবে বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) জানিয়েছে, গাজা এখন আর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্ভিক্ষ’ অবস্থায় নেই। ১০ অক্টোবর শুরু হয়েছে যুদ্ধবিরতি। তবে সেটা মাঝেমধ্যেই ভঙ্গ হচ্ছে বলে বিভিন্ন পক্ষ অভিযোগ করছে। এ অবস্থায় গাজায় মানবিক ও বাণিজ্যিক খাদ্যসহায়তার প্রবেশ কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হয়েছে বলে আইপিসির সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সতর্কবার্তাও রয়েছে। এই অগ্রগতি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

চার মাস আগে আইপিসি জানিয়েছিল, গাজা উপত্যকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে। সংখ্যায় প্রায় ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। ইসরায়েল তখন সেই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবার নতুন প্রতিবেদনে আইপিসি বলছে, দুর্ভিক্ষের শর্ত পূরণ না হলেও গাজার পরিস্থিতি এখনো ‘গুরুতর ও সংকটাপন্ন’। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয় এবং মানবিক ও বাণিজ্যিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো গাজাই আবার দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দুর্ভিক্ষ আপাতত ঠেকানো গেছে। কিন্তু এই অর্জন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন বাড়ছে এমন গতিতে, যা সহায়তার দিয়ে সামলানো যাচ্ছে না।

গাজার সব কটি প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকছে, যার ৭০ শতাংশই খাদ্যসামগ্রী। হামাস এই দাবি মানতে চায় না। তাদের বক্তব্য, দিনে ৬০০ ট্রাক তো দূরের কথা, তার চেয়ে অনেক কম ঢুকতে পারছে। শুক্রবার আইপিসির মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে কোগাট অভিযোগ করে, প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহে বড় ফাঁক রয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, প্রতিবেদনে দেখানো সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি সহায়তা গাজায় যাচ্ছে এবং জুলাইয়ের পর থেকে সেখানে খাদ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অন্যদিকে ত্রাণ সংস্থাগুলো বারবার বলছে, গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা এখনো খুবই কম এবং অনেক জরুরি সামগ্রী ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের দাবি, খাবারের ঘাটতি নেই; সমস্যা হচ্ছে গাজার ভেতরে বিতরণব্যবস্থায়।

আইপিসি মনে করিয়ে দিয়েছে, গত ১৫ বছরে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে এমন দুর্ভিক্ষ বিশ্বে ঘটেছে মাত্র পাঁচটি। ২০১১ সালে সোমালিয়া, ২০১৭ ও ২০২০ সালে দক্ষিণ সুদান, ২০২৪ সালে সুদান এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের আগস্টে গাজা। কোনো অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে হলে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষকে চরম খাদ্যসংকটে থাকতে হয়, প্রতি তিন শিশুর একজনকে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে হয় এবং প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত দুজনকে অনাহার বা অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যেতে হয়।

শুক্রবারের প্রতিবেদনে আইপিসি বলেছে, বর্তমানে গাজার কোনো এলাকাই আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ শ্রেণিতে নেই। তবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে নিয়মিত, বিস্তৃত ও নিরবচ্ছিন্ন মানবিক এবং বাণিজ্যিক সহায়তার ওপর। দুর্ভিক্ষের মানদণ্ড পূরণ না হলেও আইপিসি ‘বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ নির্ধারণ করতে পারে। এমন জায়গার জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি নির্ধারণ করা হয়, যেখানে পরিবারগুলো চরম খাদ্যাভাব, অনাহার এবং অপুষ্টি ও মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

এ মুহূর্তে গাজায় এক লাখের বেশি মানুষ এমন বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইপিসি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ এই সংখ্যা কমে প্রায় ১ হাজার ৯০০-এ নামতে পারে। তবে পুরো গাজা উপত্যকাই এখনো ‘জরুরি’ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিপর্যয়কর অবস্থার ঠিক এক ধাপ নিচে।

গাজায় শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক বছরে গাজায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১ লাখ ১ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগবে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ৩১ হাজারের বেশি হবে মারাত্মকভাবে অপুষ্ট। একই সময়ে ৩৭ হাজার গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীও তীব্র অপুষ্টির শিকার হবেন।

দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালে চিকিৎসকেরা শঙ্কায় আছেন ৪ বছরের আরজওয়ান আল-দাহিনি ও ছয় বছরের ইয়াসের আরাফাতকে নিয়ে। দুজনই মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, ক্ষুধার সবচেয়ে ভয়ংকর স্তরে আছে এরা। আরজওয়ানের মা হানিন বলেন, খাবারের সংকটে মেয়েটি হাঁটা বন্ধ করে দিয়েছে, বেড়ে ওঠা থেমে গেছে এবং শরীরের প্রায় অর্ধেক ওজন কমে গেছে। ইয়াসের আরাফাতের ভাই ইতিমধ্যেই অপুষ্টিতে মারা গেছে বলে জানান চিকিৎসক আহমেদ আল-ফাররা। তাঁর বাবা নিজেও অসুস্থ ও অপুষ্ট, আর মা ইমান বলেন, পরিবারটি ডিম বা অন্য কোনো উচ্চ প্রোটিন খাবার কিনতেই পারছে না।

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া জানান, অপুষ্টি এখনো ব্যাপক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষায় ছয় হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় এক হাজার অপুষ্টিতে ভুগছে, যার মধ্যে ১০০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির গাজা ও পশ্চিম তীরের প্রধান কর্মকর্তা আন্তোয়ান রেনার্ড বলেন, উন্নতির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এখন গাজার বেশির ভাগ মানুষ দিনে দুই বেলা খাবার পাচ্ছে। কিন্তু গাজায় সহায়তা প্রবেশ সহজ করা এখনো ‘নিরন্তর সংগ্রাম’। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, ইসরায়েল যদি বাধা না তোলে, তবে মানবিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গুতেরেস আবারও বলেন, টেকসই যুদ্ধবিরতি ছাড়া সমাধান নেই। আরও প্রবেশপথ খুলতে হবে, জরুরি সামগ্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে, গাজার ভেতরে নিরাপদ চলাচলের পথ নিশ্চিত করতে হবে, স্থায়ী অর্থায়ন দরকার এবং বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটি সতর্ক করে বলেছে, এই অগ্রগতিকে যেন সংকট শেষ হয়ে গেছে বলে ভুল না করা হয়। তাদের ভাষায়, গাজায় ক্ষুধা এখনো বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত, পর্যাপ্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা না পেলে দুর্ভিক্ষ ও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঝুঁকি খুব দ্রুতই ফিরে আসতে পারে।

গাজায় দুর্ভিক্ষ হয়তো আপাতত দূর হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষুধা, অপুষ্টি আর অনিশ্চয়তা।

সূত্র: র‌য়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-11%2Fkmwrjhez%2F1.JPG?rect=0%2C0%2C2100%2C1400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করেছে ত্রাণবাহী ট্রাক। ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে। ছবি: রয়টার্স

Wednesday, December 31, 2025

নাইজেরীয় শিল্পী হলেন জাতিসংঘের প্রথম বৈশ্বিক শান্তির দূত

জাতিসংঘের প্রথম বৈশ্বিক শান্তির দূত হলেন নাইজেরিয়ার স্পোকেন-ওয়ার্ড শিল্পী ও কবি মরিয়ম বুকার হাসান। সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল অ্যাডভোকেট ফর পিস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। জাতিসংঘের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এ খবর দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয় মরিয়ম বুকার হাসান লিখেছেন ‘শান্তি এমন কোনো নীরবতা নয়, যা মানুষের মুখে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়’। তিনি ‘আলহান ইসলাম’ নামেও পরিচিত। তিনি আরও লিখেছেন, শান্তি ‘যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়, বরং বোঝাপড়ার বিষয়।’ এই ভাবনাই ফুটে উঠেছে তার সাম্প্রতিক কবিতা ‘পিস ইজ এ ভার্ব’-এ। উত্তর নাইজেরিয়ায় জন্ম নেয়া বুকারের শৈশব ছিল সশস্ত্র বিদ্রোহের করাল ছায়ায় গড়া।

বরনো ও কাদুনা অঙ্গরাজ্যের মধ্যে বারবার স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন বোকো হারামের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নৃশংস সহিংসতা। এই অঞ্চলেই এক দশকেরও বেশি আগে প্রায় ৩০০ স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করা হয়েছিল। এখনও তাদের  অনেকের কোনো খোঁজ নেই। মরিয়ম বুকার হাসান স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি প্রথম যে যুদ্ধ দেখেছি, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। তিনি জানান, সশস্ত্র লোকেরা তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তার ভাষায়, ‘তারা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাচ্ছিল। যদি দেখত কেউ মুসলিম, তাকে টেনে বের করে এনে হত্যা করত।’ বুকার ব্যথাভরা কণ্ঠে বলেন, ‘চার বছর বয়সে কোনো শিশুর এমন কিছু মনে থাকার কথা নয়। তাদের মনে থাকার কথা হাসিখুশিতে সময় কাটানোর স্মৃতি। তারা প্রায় মারা যাচ্ছিল শুধু মুসলিম বা খ্রিস্টান হওয়ার কারণে এমন স্মৃতি তাদের ধারণ করার কথা নয়।’

বুকারের কবিতা কেবল তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দলিল নয়; এটি একই সঙ্গে সংকট ও সংঘাতে টিকে থাকা মানুষের সংগ্রাম, টিকে থাকার শক্তি আর আশার কাহিনি। কবিতাটি মানুষকে শান্তির সুযোগ দিতে আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, ‘আমি মানবমনের দৃঢ়তাকে ধরতে চেয়েছি। কেউ একদিন সকালে ঘুম ভেঙে হঠাৎ বোমা মারতে শুরু করে না। এর পেছনে থাকে ইতিহাস, বঞ্চনা, ক্ষোভ- থাকে হৃদয়ের ভেতরের যুদ্ধ।’

বুকারের কাছে শান্তিতে বিনিয়োগ মানে হলো সহিংসতা ও সংঘাতের মূল কারণগুলোকে চিহ্নিত ও সমাধান করা। তিনি কল্পনা করেন এমন এক পৃথিবীর, ‘যেখানে বিশ্বনেতারা সত্যিই আলোচনা করবেন- কীভাবে নাগরিকরা নিজেদের দেশে উন্নত হবে, নিরাপদ বোধ করবে এবং শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবে।’

mzamin

Sunday, December 28, 2025

মিয়ানমারে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে ‘নৃশংসতা’ চালাচ্ছে জান্তা: জাতিসংঘ

জাতিসংঘ মঙ্গলবার জানিয়েছে, মিয়ানমারের জান্তা সরকার আসন্ন সেনানিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে সহিংসতা চালাচ্ছে এবং ভয়ভীতিও প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে মানুষকে ভোট থেকে বিরত রাখতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে। জেনেভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান এক বিবৃতিতে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষকে ভোট দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের প্রতি নৃশংস সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশের কারণে মানুষকে গ্রেপ্তার থামাতে হবে। মিয়ানমারের জান্তা আগামী রোববার থেকে ভোট আয়োজন করতে যাচ্ছে। তারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হিসেবে প্রচার করছে। দেশটির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ও গৃহযুদ্ধ শুরুর পাঁচ বছর পর নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে।

অপর দিকে সাবেক বেসামরিক নেতা নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি এখনো কারাগারে রয়েছেন এবং তার জনপ্রিয় দলটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা ধাপে ধাপে এক মাসব্যাপী এই ভোটকে সামরিক শাসনের নতুন রূপ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলকার টুর্ক গত মাসে এএফপিকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে নির্বাচন আয়োজন ‘অকল্পনীয়’। মঙ্গলবার তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সাধারণ মানুষ সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী উভয়ের হুমকির মুখে পড়ছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’-এর অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগের কারণে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অনেককে ‘অত্যন্ত কঠোর সাজা’ দেওয়া হয়েছে। ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের হ্লাইংহায়া শহরতলির তিন যুবককে নির্বাচনবিরোধী পোস্টার টাঙানোর কারণে ৪২ থেকে ৪৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, তারা ম্যান্ডালে অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছে। তাদের সতর্ক করা হয়েছে, ভোট দিতে না গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে বা তাদের বাড়িঘর দখল করা হবে।

ফলকার টুর্ক জোর দিয়ে বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষকে অনিরাপদ অবস্থায় ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, মানুষ সামরিক সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকেও ‘মারাত্মক হুমকির’ মুখে পড়ছে। এর মধ্যে রয়েছেন ৯ জন নারী শিক্ষক, যাঁদের গত মাসে কিয়াইকতো থেকে অপহরণ করা হয়। তখন তাঁরা ব্যালটসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন। বিবৃতিতে বলা হয়, পরে তাঁদের অপরাধীদের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তাসহ মুক্তি দেওয়া হয়।

ফলকার টুর্ক বলেন, এই নির্বাচন স্পষ্টতই সহিংসতা ও দমন–পীড়নের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যেখানে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের কোনো পরিবেশ নেই।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-23%2Fi1l5dl6n%2FMyanmar-Army.jpg?rect=0%2C0%2C608%2C405&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, December 20, 2025

মিয়ানমারের আফিম চাষ ১০ বছরে সর্বোচ্চ উল্লম্ফন: জাতিসংঘের সতর্কর্তা

মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেই দেশে আফিম চাষ গত দশ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দফতর (ইউএনওডিসি)- এর সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, গত এক বছরে দেশটিতে আফিম চাষের ক্ষেত্র ১৭ শতাংশ বেড়ে ৫৩ হাজার ১০০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। যা ২০২৪ সালে ছিল ৪৫ হাজার ২০০ হেক্টর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বিশ্বের প্রধান অবৈধ আফিম উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের অবস্থান পুনঃনিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ইউএনওডিসি এর তথ্যমতে, আফগানিস্তানে চাষ কমে যাওয়ার পর বৈশ্বিক অবৈধ আফিমের মূল উৎস হিসেবে মিয়ানমারের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ বলেন, আফিম চাষের এই ব্যাপক বৃদ্ধির অর্থ হলো মিয়ানমারের আফিম অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ ঘটতে পারে।

জরিপে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ সালে পপি চাষের জমি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রতি হেক্টরে আফিম উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। ইউএনওডিসি বলছে, তীব্র সংঘাত, অনিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে কৃষকরা ঠিকমতো চাষ করতে পারছেন না। ফলে ফলন কম হচ্ছে। এদিকে মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা আবার পপি চাষে মনোযোগী হচ্ছেন। ২০১৯ সালে ১ কেজি কাঁচা আফিমের দাম ছিল ১৪৫ ডলার। বর্তমানে যার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩২৯ ডলারে। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্ধিত বাজারমূল্য ও জীবিকার সংকটে কৃষকদের বড় অংশ আবার পপি চাষে ঝুঁকছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইনের প্রবাহ বাড়ছে। ইউএনওডিসি জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে হেরোইন সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমারের হেরোইন দ্রুত প্রবেশ করছে। এমনকি ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এ বাণিজ্যিক বিমানের যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ কেজি মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইন জব্দ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নতুন সরবরাহ অঞ্চল বৈশ্বিক মাদকবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বলা হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই মাদক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষীরা। ডেলফিন শান্টজ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সংঘাত, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং মূল্যবৃদ্ধির লোভ- সব মিলিয়ে কৃষকরা পপি চাষে আকৃষ্ট হচ্ছেন। গত বছরের বৃদ্ধি মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য গভীর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শুধু অঞ্চলই নয়, বৈশ্বিক মাদকবাজারকেও প্রভাবিত করবে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

mzamin

Wednesday, December 10, 2025

পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘ সংস্থার সদর দপ্তরে ইসরায়েলের অভিযান, টানানো হলো ইসরায়েলি পতাকা

দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তারা কার্যালয় থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে গেছে এবং জাতিসংঘের পতাকা নামিয়ে সেখানে ইসরায়েলের পতাকা তুলে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি বলেছেন, গতকাল সোমবার ভোরে ইসরায়েলি পুলিশ পৌরসভার কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে শেখ জারাহ এলাকায় সংস্থার প্রাঙ্গণে জোর করে ঢুকে পড়ে।

লাজারিনি বলেন, ‘পুলিশ মোটরসাইকেল, ট্রাক আর ফর্কলিফট নিয়ে আসে। এ সময় পুরো এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আসবাবপত্র, তথ্যপ্রযুক্তির সরঞ্জামসহ নানা জিনিসপত্র জব্দ করে তারা।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের পতাকা নামিয়ে সেটির জায়গায় ইসরায়েলের পতাকা তুলে দেওয়া হয়।’

এ বছরের শুরুর দিক থেকেই ভবনটি ব্যবহার করতে পারছে না ইউএনআরডব্লিউএ। ইসরায়েলের কর্তৃপক্ষ দেশটির অভ্যন্তরে সংস্থাটির সব অফিস খালি ও কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়।

লাজারিনি বলেন, এ অভিযান কয়েক মাস ধরে চলা হয়রানির অংশ। ২০২৪ সালে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যালয়ে আগুন লাগানো, বিদ্বেষমূলক বিক্ষোভ, ভয় দেখানো, ইউএনআরডব্লিউএ–বিরোধী অপপ্রচার ও ইসরায়েলি পার্লামেন্টে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এ–সংক্রান্ত আইন পাস—এসবের ধারাবাহিকতায় এ ঘটনা ঘটেছে।

ইসরায়েল দাবি করে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হওয়া হামলায় ওই সংস্থার কিছু কর্মী যুক্ত ছিলেন। এ অভিযোগ তুলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সংস্থাটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তবে সংস্থাটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) জানান, ইসরায়েলি অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

তবু ইসরায়েলের অভিযোগের জেরে ইউএনআরডব্লিউএর সবচেয়ে বড় দাতা যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থায়ন স্থগিত করে দেয়।

এ অবস্থায় গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে আন্তর্জাতিক কর্মীদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ইউএনআরডব্লিউএ। এতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের যুদ্ধে খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের ভয়ানক সংকটে ভুগছেন ফিলিস্তিনিরা।

অক্টোবরে আইসিজে তাঁর পরামর্শমূলক মতামতে জানান, গাজায় ইউএনআরডব্লিউএর তৎপরতাসহ জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম সমর্থন করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দখলকৃত অঞ্চলে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতেও ইসরায়েল বাধ্য।

‘একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত’

লাজারিনি বলেন, ইউএনআরডব্লিউএর ওপর সাম্প্রতিক হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সরাসরি উদাহরণ। এটি দেখায় যে সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের স্থাপনার নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষার যে বাধ্যবাধকতা ইসরায়েলের আছে, তাকে তারা প্রকাশ্যে উপেক্ষা করেছে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইসরায়েল ওই কম্পাউন্ডের জাতিসংঘ–স্ট্যাটাস বাতিল করার চেষ্টা করলেও এর কোনো আইনি বৈধতা নেই।

লাজারিনি বলেন, ‘ইসরায়েল নিজে থেকে যে সিদ্ধান্তই নিক, কম্পাউন্ডটি জাতিসংঘের স্থাপনা হিসেবেই থাকবে এবং এতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়।’ ইসরায়েল জাতিসংঘের ‘প্রিভিলেজ ও ইমিউনিটিজ’ কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ার বিষয়ও মনে করিয়ে দেন তিনি।

গাজা ও পশ্চিম তীরে কাজ করা সবচেয়ে বড় মানবিক সংস্থা হলো ইউএনআরডব্লিউএ। এটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত লাখো ফিলিস্তিনি শরণার্থীকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা ও আশ্রয় দিয়ে থাকে।

এসব ফিলিস্তিনি শরণার্থীর কাছে এই সংস্থা তাঁদের নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রতীক। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় যেসব ঘরবাড়ি থেকে তাঁদের বা তাঁদের পরিবারকে উৎখাত করা হয়েছিল, সেই ঘরে ফেরার আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অধিকারকে তাঁরা সংস্থাটির অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত মনে করেন।

গাজায় ইসরায়েলের চলমান জাতিগত হত্যার মধ্যেই এ অভিযান চালানো হলো। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হিসেবে, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭০ হাজার ৩৬৫ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৮ জন।

দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কার্যালয়ের বাইরে ইসরায়েলি পুলিশ সদস্যরা
দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কার্যালয়ের বাইরে ইসরায়েলি পুলিশ সদস্যরা। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, December 9, 2025

গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত হামাস ও ইসরায়েল

গাজায় ইসরায়েলের ‘জাতিগতনিধন’ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হতে প্রস্তুত ইসরায়েল ও হামাস।

তবে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর ভূমিকা কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয় এবং এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাসেম নাঈম গতকাল রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া প্রস্তাবে থাকা অনেক বিষয় নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

নাঈম আরও বলেন, চলমান যুদ্ধবিরতির সময় অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা দেওয়া নিয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত; কিন্তু নিরস্ত্রীকরণের দায়িত্ব কোনো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নেবে—এটি তাঁরা মেনে নেবেন না।

এ নিয়ে বাসেম নাঈম বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের বাহিনীকে স্বাগত জানাই, যারা সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করবে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারক করবে, লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তা জানাবে এবং যেকোনো ধরনের উত্তেজনা প্রতিরোধ করবে।’

কিন্তু হামাস ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ওই বাহিনীর কোনো ধরনের কর্তৃত্ব মেনে নেবে না বলেও জানান নাঈম।

হামাস কর্মকর্তার এই বক্তব্যের আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করবেন এবং গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার নতুন ধাপে প্রবেশ নিয়ে আলোচনা করবেন।

রোববার নেতানিয়াহু আরও বলেন, (ট্রাম্পের সঙ্গে) বৈঠকের মূল লক্ষ্য হবে গাজায় হামাসের শাসন শেষ করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে পরিকল্পনায় দেওয়া ‘অঙ্গীকার’ তারা পূরণ করবে।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় অবরুদ্ধ ভূখণ্ডের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার কথা বলা আছে।

হামাসের অস্ত্র ব্যবহার না করা বা অস্ত্র জমা রাখার বিষয়ে নাঈম হামাসের যে অবস্থানের কথা বলেছেন, তা ইসরায়েলের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি পূরণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

হামাস কর্মকর্তা বলেন, হামাসও প্রতিরোধ করার অধিকার রাখে।

নাঈম আরও বলেন, অস্ত্র নামিয়ে রাখা হতে হবে এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যা একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাবে এবং যেখানে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ৫ থেকে ১০ বছর স্থায়ী হতে হবে।

গাজার জন্য মার্কিন খসড়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি পথ খোলা রাখা হয়েছে; কিন্তু নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাঁর দাবি, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে হামাসকে পুরস্কৃত করা হবে।

গাজার মধ্যাঞ্চলের একটি শরণার্থীশিবিরে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষের ভেতর মৃতদেহ খুঁজছে সেখানকার সিভিল ডিফেন্সের দল, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
গাজার মধ্যাঞ্চলের একটি শরণার্থীশিবিরে ধসে পড়া একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষের ভেতর মৃতদেহ খুঁজছে সেখানকার সিভিল ডিফেন্সের দল, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি