Thursday, July 24, 2025
সুযোগ নিতে পারেন আপা by শামীমুল হক
সুপ্রিয় আপা, রাজনীতিতে মেঘ কালো অন্ধকার এখন। এতে আপনি খুশিই হবেন এটা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু এটা বুঝছে না। এরা যার যার স্বার্থ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজেকে বড় মনে করছে। একে অপরের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিচ্ছে। সভা- সমাবেশে একে অপরের গিবত গাইছে। আপনি পালিয়ে যাওয়ার এক বছরের মাথায় দেশের রাজনীতিতে এমন ঘনঘটা হবে কেউ কল্পনাও করেনি। গত সপ্তাহে পুরনো ঢাকায় সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারা দেশ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে। তাৎক্ষণিক এ হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপিকে দায়ী করে মিছিল বের হয়। ওই মিছিল থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেয়া হয়। অবশ্য দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে খুনের রহস্য। সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চলছে। এ নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। সত্যি বলতে কী এই সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়েও আরেক রাজনীতির চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু, আপা সেটা সাকসেস হয়নি। অর্থাৎ নিখুঁত ছিল না। যাকগে রাজনীতি মানেই হলো রাজার নীতি। আপনারা একেকজন একেকভাবে মেটিকুলাস ডিজাইন করেন। একেকজন একেকভাবে বাস্তবায়ন করেন। সবার লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই খেয়েছে সব কিছু। কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ডিজাইন করে। কেউ ক্ষমতা থেকে ক্ষমতাবানদের সরানোর জন্য ডিজাইন করে। আবার ক্ষমতাবানরা আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার ডিজাইন করে। আবার কেউ নিজে ক্ষমতাশালী এটা দেখানোর জন্য ডিজাইন করে। এই ডিজাইন করতে গিয়ে কেউ হঠাৎ ভুল চালে কুপোকাত হয়ে যায়। যেমনটা আপনার বেলায় হয়েছে। আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন সবার মতামতকে উপেক্ষা করে। এক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে আদালতকে ব্যবহার করেন। কিন্তু কই গেল আপনার এই ডিজাইন। ছাত্রদের আন্দোলনে আপনার সব ডিজাইন মিইয়ে যায় হাওয়ায়। আফসোস হয়- এই ডিজাইন না করলে পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতায় আসতে পারতেন। আপনাকে দল ও দেশকে লজ্জায় ডুবিয়ে পালাতে হতো না। এখনো যারা নানা ডিজাইন করছে তাদের ভাবা উচিত দেশের স্বার্থ। নিজের স্বার্থকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তা না করে কোনো কোনো দল মনে করছে আমি যা বলি সেটাই করতে হবে। অন্যথায় এটা মানি না। এ গোঁ ধরা তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে- সেটা আপনার পরিণতি দেখেও তারা শিখেনি। এখানেও আপনি সফল। কারণ আপনার দেখানো পথেই হাঁটছে সবাই।
আপা, আপনাকে জানানোর জন্য বলছি, দেশে যে দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে তা ভালো লক্ষণ নয়। এর রেশ কোথায় গিয়ে পড়ে আল্লাহ মালুম। আরেকটি সুখবর দেই আপনাকে। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি উঠেছে। কেউ কেউ তো বলছেন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন না হলে তারা নির্বাচনে যাবেন না। আমি মনে করি এমনটা হলে আপনার জন্য বড় সুখবর। কারণ দেশের ত্রিশ ভাগের বেশি ভোট আপনার দলের। আজ না হউক দশ বছর পর হলেও আওয়ামী লীগ অন্যরূপে নির্বাচনে অংশ নেবে। তখন ত্রিশ ভাগ ভোট যদি আপনার দলের বাক্সে যায় তাহলে ৯০টি আসন আপনার নিশ্চিত। আর আপনার সঙ্গীরাও তো রয়েছেই। সারা দেশে তারা সবাই মিলে পাঁচ পার্সেন্ট ভোট পেলে ১৫টি আসন তাদের। এখানেও আপনি এবং আপনার দল এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে যারা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবি করছে তারা সারা দেশে কতো পার্সেন্ট ভোট পাবে নিজেরাই জানে না। একমাত্র জামায়াত ভালো সংখ্যক পার্সেন্টেজ পাবে। আমি ভেবে পাই না যারা সারা দেশে এক-দুই পার্সেন্ট ভোট পাবে তারা কেন পিআর পদ্ধতি নিয়ে লাফাচ্ছে? হ্যাঁ, এক-দুই পার্সেন্ট ভোট পেলে তিন থেকে ছয়টি আসন পাবে। এতটুকুই তাদের লাভ। কিন্তু তারা নিজেদের অজান্তেই আপনার দল আওয়ামী লীগের উপকার করে দিচ্ছে সেটি তারা ভাবছেন না।
আপা, আপাগো-জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় প্রতিদিনই দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছে। সেখানেও একেক দলের একেক মত। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেও দলগুলো একমতে পৌঁছাতে পারেনি। আর কবে তারা একমতে পৌঁছাবে? না। লক্ষণ বলে একমতে পৌঁছাতে কঠিনই হবে। দলগুলো এখন যে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে তার পরিণতি কি হয় জানি না। তবে, এতসব সংস্কার একসঙ্গে না করে শুধুমাত্র নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন দিলে অনেক ভালো হতো। কিন্তু এ ভালোটা কে বুঝাবে বলুন। আপনার শাসনামলে আপনার অনেক ভুল কাজের সমালোচনা করলে আপনি যেমন ছ্যাঁক করে উঠতেন এখনো এমন দল আছে তাদের ভুলের সমালোচনা করলে ছ্যাঁক করে উঠে। এই ছ্যাঁক করে উঠাটাই ফ্যাসিস্টের আলামত। আর ফ্যাসিস্টের পতন কখনোই কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। প্রকৃতিই ফ্যাসিস্টকে শায়েস্তা করে। শুধু অপেক্ষা সময়ের।
প্রিয় আপা, জামায়াতের মহাসমাবেশ থেকে যে বার্তা দেয়া হয়েছে তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে বলে মনে হয়। এটাতেও আপনার লাভ। এখন সামনে শুধু আপনার লাভ আর লাভ দেখছি। এভাবে অপেক্ষা করুন। দেখবেন একদিন আলোর দিশা পাবেন। আরেকটি কথা না বললেই নয়, আপনার পুত্র জয় চব্বিশের আন্দোলনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ সংবলিত আপনার যে ফোনালাপ তাকে ২০১৪ সালের বলে জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার মানে জয় বুঝাতে চেয়েছে- সে সময় থেকেই আপনি মানুষ মারার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছেন। আচ্ছা আপা এসব বিষয়ে কী জয় চুপ থাকতে পারে না? নাকি সেও আপনার মতো সকল বিষয়ের বিশেষজ্ঞ? যদি আপনার মতো হয়ে থাকে তাহলে অন্যকথা। না হলে, তাকে বলুন সব বিষয়ে কথা না বলতে। এতে হিতে বিপরীত হয়।
যাকগে আপা, অনেক কথাই বলা হলো। গোপালগঞ্জ থেকে এনসিপির ওপর হামলা, গুলি। পিআর পদ্ধতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এসবগুলোর পেছনে তাকালে কেন জানি মনে হয় সবকিছু আপনার মনমতো হচ্ছে। সবশেষে বলবো-আপনি ভালো থাকুন সব সময়। আজ এখানেই রাখছি।
সূত্র- জনতার চোখ

Saturday, May 3, 2025
আফসোস, এসবও দেখতে হয় by শামীমুল হক
যাই হোক, হাসু আপা আপনি কিন্তু এ দেশের অনেক উন্নয়ন করেছেন। তবে এসব উন্নয়ন পাশের দেশকে সুবিধা দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেছেন। পদ্মা সেতু করেছেন দেশের উপকার হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এ সেতু ভারতকে খুব কাছে এনে দিয়েছে। এই সেতু ব্যবহার করে ভারত তার সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত রাজ্যে মালামাল দ্রুত পাঠাতে পারবে। আবার সেদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন প্রকল্প আপনি হতে দেননি। বারবার আপনার সামনে ফাইল গেলেও তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এখানেও নাকি আপনার ভারতপ্রীতি কাজ করেছে। বুলেট ট্রেন হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগতো মাত্র ৫৫ মিনিট। চীনের সহায়তায় এ প্রকল্প হবে বলেই আপনার সামনে ছিল বিশাল বাধা। সত্যি মিথ্যা আপনি জানেন। কিন্তু এসব শোনে মানুষের আপনার প্রতি আরও ঘৃণা বাড়ছে। এতদিন বিভিন্ন মাধ্যমে আপনি এবং আপনার পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিলাসী জীবনের কথা শুনেছি। কিন্তু একটি রিপোর্ট ও ছবি দেখে এ কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। মানুষ বলাবলি করছে কোনো মানুষ কী পারে তাদের নেত্রীর বিপদের সময় এমন আনন্দ উৎসব করতে? কিন্তু আপনার নেতাকর্মীরা পেরেছে। ওরা আরও বড় কিছু করতে পারবে- এটাই বিশ্বাস এদেশের মানুষের। কিন্তু সেই উৎসব, আনন্দ? একবার চোখ বুলিয়ে নেই রিপোর্টটির দিকে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে- দামি গাড়িতে করে একে একে নামছিলেন স্যুট পরা ব্যক্তিরা। স্থানটিও ছিল অনেক দামি। সন্ধ্যার আলো ঝলমলে সাজানো লন্ডনের ওটু এরিনার প্রেস্টিজিয়াস ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হলরুমে ঢুকছিলেন অতিথিরা। অতিথিদের লাইনেই ছিল ছবি তোলার হিড়িক। মনে হচ্ছিলো কেউ একজন বা কয়েকজন ভিআইপি অতিথি আছেন। এভাবেই একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক মন্ত্রী ও এমপিরা। সূত্র মতে, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমানের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে নানা দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক মন্ত্রী ও এমপিরা। লন্ডনের ওটু এরিনার প্রেস্টিজিয়াস ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠানে ২০শে এপ্রিল সন্ধ্যায় যোগ দেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রহমান, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া মন্ত্রীরা বেশ হাসি-খুশি ছিলেন। অনেকের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। পালিয়ে আসা মন্ত্রী-এমপিদের এমন আনন্দঘন পরিবেশে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা। তাদের প্রশ্ন, লাখ লাখ নেতাকর্মীকে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে এসে তারা কীভাবে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন? এত আনন্দই বা কীভাবে তাদের মনে আসে?
এ রিপোর্টে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে বাংলাদেশে। সোহাগ নামে একজন তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ছবিতে যে মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছে, এমন নির্লজ্জ মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে? সত্যিই সেলুকাস। আর বাজ চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন- নির্লজ্জ, অমানবিক এবং নির্দয়-এই শব্দগুলোই যথেষ্ট নয় তাদের বর্ণনা করার জন্য। যারা আজ লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেলে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছে, তারাই একসময় দেশের মাটিতে হাজারো নিরীহ মানুষকে গুম, খুন ও নির্যাতনের মধ্যদিয়ে দমন করেছে। ২০০০’রও বেশি মানুষের রক্ত যাদের হাতে লেগে আছে, আর ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে যারা চিরতরে আহত ও নিঃস্ব করেছে, তাদের মুখে হাসি আর বিলাসবহুল কফির আড্ডা জাতির প্রতি এক ধরনের নিষ্ঠুর উপহাস। এই পলাতক ফ্যাসিস্ট মন্ত্রী-এমপিরা আজ প্রবাসে নিরাপদ আশ্রয়ে আনন্দে গা ভাসালেও, দেশের মাটিতে আজও মায়েরা সন্তান হারানোর আহাজারি করছে, পরিবারগুলো খুঁজছে তাদের প্রিয়জনদের। যারা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, আজ তারা আবারো দেখিয়ে দিলো-তারা কেবল দুর্নীতিবাজ নয়, বরং অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি। বাংলার মানুষ এই দুঃশাসনের হিসাব অবশ্যই একদিন চেয়ে নেবে। ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। যারা রক্তে হাত রাঙিয়েছে, তারা কোনো উৎসবের আলোয় নিজেদের অপরাধ ঢাকা দিতে পারবে না। শুধু প্রতিরোধ নয়, এই অন্যায়ের বিচার হোক, এটাই এখন সময়ের দাবি।
সুপ্রিয় আপা, বুঝলেন তো মানুষ কী ভাবছে? এবার বলুন এইসব নেতারা কি আপনার দুঃসহ পরিস্থিতির কথা ভাবেন? অথচ তাদেরই মন্ত্রী, এমপি বানিয়েছেন। দুঃখ হয় না আপা। হাসু আপা, এ লেখা যখন লিখছি তখন খবর এলো আপনিসহ আপনার পরিবারের ১০ জনের এনআইডি স্থগিত করা হয়েছে। আফসোস আপনার বাড়াবাড়ির জন্য আরও কতো কিছু না দেখতে হয়।
সূত্র- জনতার চোখ

Wednesday, April 23, 2025
দায় অন্য কাউকে দেয়া বোকামি by শামীমুল হক
আপাগো, এখন কতো কথা মনে হয়।
এই যে ধরুন না ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে আপনি কতোই না কসরত করেছেন। নির্বাচন নির্বিঘ্নে করতে মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছেন। আবার নির্বাহী ক্ষমতায় তাকে শর্তসাপেক্ষে বাসায় থাকতে দিয়েছেন। একাধিকবার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলেও বিদেশে চিকিৎসা নিতে পারমিশন দেননি। আপনার মহত্ত্ব বোঝাতে বক্তৃতা- বিবৃতিতে সবসময় বলতেন, আমি খালেদার প্রতি দয়া দেখিয়েছি বলেই তাকে বাসায় থাকতে দিয়েছি। আবার তারেক রহমানকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে খালেদা জিয়াকে আবার জেলে পাঠিয়ে দেবেন। একাধিকবার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। আবার তার দল থেকে আন্দোলন তো সবসময়ই ছিল। আপনি আইনের দোহাই দিয়ে তাকে দিনের পর দিন আটকে রেখেছেন। কিন্তু আপনি পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এটাও নির্বাহী আদেশে। এখন পারলে আপনি পারলেন না কেন? আসলে আপনার ভয় ছিল খালেদাকে নিয়ে। তাই না আপা? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনার কোনো কৌশলই তো টিকলো না। ২০০০ মানুষকে গণহত্যা চালিয়েও আপনি পার পেলেন না। মানুষ হাসি মুখে বুক পেতে দিয়েছে বুলেটের সামনে। তবুও তারা আপনার মতো নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় দেখতে চায়নি। আর চায়নি বলে তারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। হেলিকপ্টার থেকেও আপনি আপনার জনগণের ওপর বুলেট ছুড়েছেন। আবার আপনিই ইদানীং সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যা বলে যাচ্ছেন ওরা ২০০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আপনার আক্রোশ নতুন নয়। এটা পুরনো। এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া আপনার বক্তব্য, নেতাকর্মীদের দেয়া নির্দেশনার ফাঁকেও ড. ইউনূসকে সুদখোর বলতে ভুলেন না। আপনি জোর দিয়ে এখনো বলছেন এসবের বিচার অবশ্যই করবেন। আবার এটাও বলেন, আমি শেখ হাসিনা যা বলি তা করে দেখিয়ে দেই।
সত্যিই হাসু আপা, আপনার ভাগ্য খুব ভালো। আপনার প্রতিপক্ষ আপনার মতো এত প্রতিহিংসাপরায়ণ নন। তাই তো তাদের ওপর এত নির্মম অত্যাচার, অবিচার, গুম, হত্যা, হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার চালানোর পরও কোনো কোনো নেতাকে আপনাদের জন্য মায়াকান্না করতে দেখা যায়। কেউ কেউ বলেন, আপনি ক্ষমতায় থাকতে এদের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা আপনিই ভালো জানেন।
আপা, আপাগো আপনার এ দুর্দশার জন্য আপনি নিজেই দায়ী। অন্য কাউকে দায় দেয়া বোকামি। আপনি নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে সব করেছেন। যেসব নেতা আপনার কথার দ্বিমত করবে তাদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন। কাছে টেনে নিয়েছিলেন টাকলা মুরাদের মতো চরিত্রহীনদের। দুর্নীতিবাজ আর চরিত্রহীনরা আপনাকে নিয়ে গীত গাইতেন। আপনি এ গীত শুনে মনের আনন্দে নাচ করতেন। বাহ কি চমৎকার। এমন চমৎকার সভা পরিষদ নিয়ে আপনি দেশ চালিয়েছেন। যে পরিষদ আপনার ভুল সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে। আপনি যত স্বৈরাচারী হয়েছেন ততই তারা খুশি হয়েছে। আর আজীবনের জন্য তো সিংহাসন আপনার করে নিয়েছেন। নির্বাচন দিয়েছেন নামে মাত্র। ষোল বছর সিংহাসনে বসে আপনি যেসব অপকর্ম করেছেন তার ফিরিস্তি দেশের মানুষের মুখে মুখে। এমনকি আপনার দলের ত্যাগী নেতারাও আপনাকে এখন ঘৃণা করে। তারা আপনার মুখটি পর্যন্ত দেখতে চায় না।
হাসু আপা, আপনি ক্ষমতায় থাকতে নানা চমক দেখিয়েছেন। আপনার এসব চমকে মানুষ ভড়কে গেছে। কেউ আপনাকে গুমরানী, কেউবা ছলনাময়ী, আবার কেউ রহস্যময়ী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আপনি জেনে খুশি হবেন আপনাকে এ কারণে মানুষ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই দিয়েছে। যে ইতিহাস যুগের পর যুগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যেমন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস একইভাবে লেখা। আবার মীর জাফরের ইতিহাস আরেকভাবে লেখা। হিটলারের উদাহরণ আজও মানুষ দেয়। বহু জমিদারের অত্যাচারের কাহিনীও কিন্তু মানুষের মুখে মুখে। তবে আপনার যে ইতিহাস সেটা কালো অন্ধকারে ঢাকা। যেটা ইতিমধ্যে পাঠ্য বইয়ে কিছুটা হলেও স্থান করে নিয়েছে। জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস টানতে গিয়ে আপনিও ইতিহাস হয়ে গেলেন।
আপা, আপাগো এখনো আপনি বিচার হবে, বিচার হবে বলে যে দুইদিন পর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন- বিচার করার ক্ষমতায় কি আপনি আছেন? আপনি যদি সত্যিকারের মানবদরদি হতেন, তাহলে বলতেন এসবের বিচার সৃষ্টিকর্তা করবেন। আপনার এই বিচার হবে ভাষণ শুনে মানুষ মুখ টিপে হাসে। আর বলে অসুস্থ মানুষ ছাড়া এমন কথা কেউ বলতে পারে না। আপনার কাছে প্রশ্ন-বিচারটা কখন করবেন? আবার ক্ষমতায় এলে? আপনি নিশ্চিত যে, আবার ক্ষমতায় আসবেন? এমন স্বপ্ন থাকলে ভুলে যান। এ দেশের ক্ষমতায় আপনি ফের বসবেন এটা অমাবস্যার চাঁদের মতো ঘটনা। আপনি বরং ষোল বছর ক্ষমতায় থেকে যে অন্যায় অবিচার করেছেন তার জন্য অনুতপ্ত হওয়ার কথা ছিল। আপনি জনগণের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল। তা করলেও জনগণ আপনাকে ক্ষমা করবে কিনা এটা ভাবনার বিষয়। সত্যিই হাসু আপা, অবাক হই আপনার কথা শুনে। আপনার মনে ক্রোধ থাকা স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশের জনতা আপনার সকল অপকর্মের বিচার করে দিয়েছে। আপনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে আপনার ইজ্জত পাংচার করেছেন আপনি নিজেই। এখন গণহত্যার বিচার হবে আদালতে। বিচারে আপনার কী হয় একটু ভাবুন।
আপা, ক্ষমতায় থাকাকালে আপনি কতো না পলিসি করেছেন। ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ফেনসিডিল খোরদের বেছে নিয়েছেন। সন্ত্রাসীদের বেছে নিয়েছেন। এরা যেন বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোকে শায়েস্তা করতে পারে। এই যে ভিপি নুরকে আপনার এই ছাত্রলীগের গুণ্ডাবাহিনী কতোবার মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে একটু চিন্তা করে দেখুন তো? ভিপি নুর মার খেয়েছে আর আপনি গণভবনে বসে মিটিমিটি হেসেছেন। সর্বশেষ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দামকে বানিয়েছেন তার একটি ভাষণ শুনে। ছাত্রলীগে দেয়া তার ভাষণ শুনে মুগ্ধ হয়েছেন আপনি। শুধু তাই নয়, গোটা দেশের মানুষই অবাক দৃষ্টিতে তার ভাষণ শুনেছে। কিন্তু এ ভাষণ যে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় কয়েক বছর আগে প্রকাশিত একটি উপ-সম্পাদকীয় ছিল সেটা তখন কে জানতো? যখন মানুষ জেনেছে তখন সাদ্দামকে মানুষ লেখা চোর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সাদ্দামকে দিয়েও সর্বশেষ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়েছেন। এই হামলাই কাল হলো আপনার জন্য। ছাত্ররা ক্ষেপে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়িত করে। ক’দিন পরই আপনি নিজেই বিতাড়িত হন। পালিয়ে জীবন বাঁচান। কিন্তু আপনি প্রায় সব ভাষণেই বলতেন জীবনের মায়া করি না। প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন দিবো। আপনার এই পলায়ন প্রমাণ করে এসবই ছিল আপনার মনভোলানো কথা। কথার কথা। মানুষকে আকৃষ্ট করার কথা। আপনি বলতেন পরিবার পরিজন হারিয়েছেন। পরিবার হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। বিগত ষোল বছরে কতো পরিবারকে আপনি স্বজনহারা করেছেন তার হিসাব আছে কি? একটু হিসাব করুন। সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর ওইসব স্বজন হারানো পরিবারগুলোর কাছে মাফ চান। জানি এসব করবেন না। কারণ আপনি নিজেকে বাংলাদেশের মালিক মনে করেন। এখনো মালিক মনে করে বিচার হবে, বিচার হবে হবে গলা ফাটাচ্ছেন। কিসের বিচার আপা? আপনি, আপনার সভা পরিষদসহ পালিয়ে যাওয়া কিসের ঈঙ্গিত বহন করে। এর অর্থ আপনি, আপনার এমপি, মন্ত্রী সবাই অপরাধী। জনতার মারধরের ভয়ে পালিয়েছেন। গর্তে লুকিয়েছে কেউ কেউ। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফীর নজির তো আপনার চোখের সামনেই ছিল। তারপরও আপনি এসব থেকে শিক্ষা নেননি। আপনি উন্নয়নের গণতন্ত্রের নামে এ দেশের জনতাকে পিষে মেরেছেন। এজন্যই বলা হয়ে থাকে- ইতিহাসের বড় নির্মমতা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আপনার ভালোর জন্যই বলছি। আওয়ামী লীগের ভালোর জন্যই বলছি- এভাবে ভিনদেশ থেকে নেতাকর্মীদের উস্কে না দিয়ে তাদের বলুন জনতার কাছে যেতে। মাফ টাফ চেয়ে জনতাকে কাছে টানতে। তাহলে হয়তো একদিন আওয়ামী লীগ ফের জেগে উঠতে পারবে। আর না হয়, মানুষ বলছে আওয়ামী লীগ আস্তে আস্তে মুসলিম লীগ হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে বাংলাদেশ থেকে। সেটাও হবে একটা ইতিহাস। আপনি যদি বলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার একুশ বছর পর আপনি ক্ষমতায় এসেছেন আপনার ক্যারিশমা দিয়ে। তাহলে ভুল করবেন। সে সময় জনতার কাছে মাফ চেয়ে একটিবারের জন্য সুযোগ চেয়েছিলেন। জনগণ আপনাকে সেই সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু আপনি জনগণের দেয়া সেই সুযোগ মিসইউস করেছেন। জনগণ যদি আপনাকে মন থেকে ভালোবাসতো তাহলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই আপনি ক্ষমতায় আসতেন। যে নির্বাচনের আগেই আপনারা মন্ত্রিসভা পর্যন্ত গঠন করে রেখেছিলেন। কিন্তু জনগণ আপনাকে প্রত্যাখ্যান করে। মনে পড়ে আপা সেই দুঃখে আপনি আওয়ামী লীগের প্রধান থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আপনার দলের নেতাকর্মীদের মায়াকান্নায় আবার পদত্যাগ প্রত্যাহার করে নেন। এখন তো বুঝতে পারছেন জনতা কি জিনিস। আপনি দিনের পর দিন অন্যায় করে যাবেন আর জনতা আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে বলবেন এরা সন্ত্রাসী। সরকার উৎখাতে এরা নেমেছে। সরকার যদি সরকারের মতো না হয় তাহলে তো সরকার উৎখাতে জনতা মাঠে নামবেই। এটাই তো গণতন্ত্র। আপনি তো আবার বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই আপনি মনে করেছিলেন আপনার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না। আপনার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার অধিকার রাখে না। এটাই ছিল আপনার ফ্যাসিস্ট হওয়ার প্রধান লক্ষণ।
আপা, আজ আর বেশি কিছু লিখছি না। যদি পারেন নিজেকে একটু শুধরে নেবেন। আক্রোশমূলক বক্তৃতা পরিহার করবেন। আপনার দলের নেতাকর্মীদের উস্কে দিয়ে ওদের আর বিপদে ফেলবেন না। আপনি পালিয়ে যাওয়ার পর আপনার দলের নেতাকর্মীদের ওপর যে এমন আঘাত আসবে তাতো আপনার দলের সাধারণ সম্পাদক নিজেই বলেছেন। প্রকাশ্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না আসতে পারে তাহলে কমপক্ষে এক লাখ লোক মারা যাবে। সে হিসাবে আপনি পালিয়ে যাওয়ার পর এক লাখ ভাগের এক ভাগও তো আপনার দলের ওপর আপনার প্রতিপক্ষ হামলে পড়েনি। বরং তারা আপনার নেতাকর্মীদের গোপনে বাঁচিয়ে দিয়েছে। এখন দিন দিন তা প্রকাশ পাচ্ছে। তারপরও বলছি আপা- আপনি ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।
সূত্র: জনতার চোখ

Saturday, April 19, 2025
সুড়ঙ্গের ওপাশে এখনো অন্ধকার by শামীমুল হক
বেশি কথায় সম্মান নষ্ট/বেশি হাসিতে অন্তর নষ্ট/বেশি আদরে সন্তান নষ্ট/বেশি চুনে পান নষ্ট/ বেশি নেতায় দেশ নষ্ট/বেশি লোভে জীবন নষ্ট/বেশি নুনে তরকারি নষ্ট/বেশি মসলায় স্বাদ নষ্ট/বেশি খাবারে পেট নষ্ট/বেশি আলোতে চোখ নষ্ট/বেশি সন্দেহে সম্পর্ক নষ্ট/বেশি কথায় দন্ত নষ্ট/ বেশি কথা বলিস না ভাই/বেশি কথা ভালো নয়-বাউল কবির এমন গান ছোটবেলায় অনেক শুনেছি। কিন্তু এ পর্যন্তই শেষ। মানুষ হিসেবে আমরা কতোটুকু প্রয়োগ করছি? নাকি উল্টো পথে হাঁটছি? সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক বেশি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশ। বেশি বাড় বাড়ায় শেখ হাসিনাকে সিংহাসন ছেড়ে পালাতে হয়েছে। বেশি কথা বলায় এখন কাঠগড়ায় দুই হাজার চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সমন্বয়করা। বেশি বেশি নির্বাচন নির্বাচন করায় বিএনপিও প্রশ্নের মুখে। শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি বেশি আনুগত্য দেখানোয় জাতীয় পার্টি এখন রেললাইনের বাইরে। ৫ই আগস্টের পর জামায়াতের অতিরিক্ত রাজনীতি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন। আবার নির্বাচনী রোডম্যাপ না দেয়া এবং বেশি বেশি সংস্কার করে আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারও।
এক/এগোরোর সময় আলোচিত একটি কথা ছিল- সুড়ঙ্গের ওপাশে আলো দেখা যাবে কবে? রাজনীতি এখন সুড়ঙ্গের এপাশে। ওপাশে অন্ধকার। কিন্তু ওপাশে আলো দেখতে উদগ্রীব রাজনীতিকরা। সে লক্ষণ মোটেও এখন নেই। এ অবস্থায় দলগুলোও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিএনপি ডিসেম্বরে নির্বাচন দাবি করেছে। এরমধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করার কথা বলছেন তারা। কিন্তু বিএনপি’র সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। সংক্ষেপে যাকে এনসিপি বলা হয়। চব্বিশের আন্দোলনের ছাত্র নেতাদের গঠিত এনসিপি বলছে- মৌলিক সংস্কার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। তাদের কথা সংস্কার ছাড়া নির্বাচনের দিকে গেলে সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। শুধু তাই নয়, সে নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টি অংশগ্রহণ করবে কি-না, সেটাও বিবেচনাধীন থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। নাহিদ ইসলাম আরও বলেছেন, মাঠ প্রশাসন আমাদের কাছে মনে হয়েছে নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চলছে, সেই জায়গায় প্রশাসন নিশ্চুপ। প্রশাসন বিএনপি’র পক্ষে রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে যে চাঁদাবাজি চলছে সেখানেও প্রশাসন নিশ্চুপ। এই ধরনের প্রশাসন থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন, আমলাতন্ত্র এবং পুলিশ আমাদের ঠিক করতে হবে।
চমৎকার কথা বলেছেন, নাহিদ ইসলাম। ষোল বছরের আওয়ামী প্রশাসন আট মাসে বিএনপি’র হয়ে গেল? এটা কীভাবে সম্ভব? নাহিদ সরকারের উপদেষ্টা থাকার সময় কি আওয়ামী প্রশাসনের সবাইকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছেন? না! এমন ঘটনা তো ঘটেনি। তাহলে কোন যুক্তিতে তিনি বলছেন, প্রশাসন বিএনপি’র পক্ষে কাজ করছে। অনেকে তো বলছেন, এই প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন হলে আর আওয়ামী লীগ নির্বিঘ্নে নির্বাচন করতে পারলে আওয়ামী লীগের পাল্লাই ভারী থাকবে। সে যাই হোক। ধরে নিলাম নাহিদের এটি রাজনৈতিক বক্তব্য। কিন্তু নির্বাচনে না যাওয়ার কথা কিসের ঈঙ্গিত দিলেন তিনি? নাহিদ আরও বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসন, আমলাতন্ত্র এবং পুলিশ ঠিক করতে হবে। নাহিদ ক্ষমতায় থাকতে তা করতে পারলেন না কেন? তাকে কি কেউ বাধা দিয়েছে? এখনো তো সরকারে ছাত্র প্রতিনিধি রয়েছে। তারাই বা এটা করছেন না কেন? এ প্রশ্ন কিন্তু এসে যায়। আর প্রশাসন বিএনপি’র পক্ষে বলে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন?
ওদিকে সর্বশেষ নির্বাচন ইস্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে হতাশা প্রকাশ করেছে বিএনপি। শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার এবং সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান করে সংসদ নির্বাচন দিতে চায় সরকার। সরকারের তরফে বলা হয়েছে ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা করা হবে। বৈঠকে বিএনপি জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্ভব। এরপরে নির্বাচন হলে জটিলতা বাড়বে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেদিন বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা সুনির্দিষ্ট করে নির্বাচনের ডেডলাইন দেননি। তিনি বলেছেন যে, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন শেষ করতে চান। আমরা পরিষ্কার করেই বলেছি যে, ডিসেম্বরের মধ্যেই যদি নির্বাচন না হয় তাহলে দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে এবং সেটা তখন নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন হবে। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি’র প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সরকারের তরফ থেকে বলা হয়-ফ্যাসিবাদ দোসরদের বিচার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের কার্যক্রম দৃশ্যমান না করা পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজন কঠিন। শিগগিরই এসব কার্যক্রমকে দৃশ্যমান করার উদ্যোগ ত্বরান্বিত করা হবে। জবাবে বিএনপি নেতারা সংস্কার নিয়ে বলেন, যে সমস্ত সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য হবে তার মধ্যে যে সকল সংস্কার নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন ততগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে এবং বাকিগুলো সনদ হিসেবে থাকবে। সেই সনদ বাস্তবায়নের জন্য যারাই ক্ষমতায় আসবে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। কিন্তু সংস্কার ও বিচারের দোহাই দিয়ে নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের যে গতি, সংস্কারের যে গতি তাতে নির্বাচন নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। বিএনপি পতিত ফ্যাসিবাদী দল ও সেই দলীয় সরকারের সঙ্গে যারাই যুক্ত ছিল তাদের বিচার দ্রুত করে রাজনীতির ময়দানকে জঞ্জালমুক্ত করারও দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে সরকারের সকল ইতিবাচক কর্মপ্রয়াসে সমর্থন প্রদান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ যথাশিগগিরই ঘোষণার মাধ্যমে জনমনে সৃষ্ট সকল বিভ্রান্তি অবসানের আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।
ওদিকে জামায়াতে ইসলামী আগামী রোজার আগে নির্বাচন দাবি করেছে। এক্ষেত্রে জামায়াত আর বিএনপি’র মধ্যে মাত্র দুই মাসের পার্থক্য। এ বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে শেষ করা যায়। তবে সব দলের কথার মধ্যে সংস্কার করার দাবি রয়েছে। তবে কতোটুকু সংস্কার করা হবে তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এনসিপি চায় আগে গণপরিষদ নির্বাচন হোক। তারপর এই গণপরিষদ সংবিধান গঠন করে সরে গেলে জাতীয় নির্বাচন হবে। এমনটা করতে গেলে কতো সময়ের প্রয়োজন? আর গণপরিষদইবা লাগবে কেন? দলগুলো এক হলে একটি সনদে স্বাক্ষর করে জাতীয় নির্বাচন দিলেই হয়ে যায়। সেই নির্বাচনে যে দল ক্ষমতায় যাবে সনদের স্বাক্ষর অনুযায়ী তারা সংস্কার করতে বাধ্য। অন্যথায় তাদের পরিণতিও আওয়ামী লীগের মতো হবে। তাই তারা সরকার গঠন করে সকল বিরোধী দলকে নিয়ে সংস্কার কার্যক্রম চালাবে। এমনটা করলে খুব দ্রুত কাজ শেষ হবে। এ মুহূর্তে নির্বাচনের জন্য যেসব সংস্কার দরকার সেগুলো করে নিলেই হয়। এটাতে যত তাড়াতাড়ি দলগুলো একমত হতে পারবে তত তাড়াতাড়ি সরকার নির্বাচন দিতে পারবে। অন্যথায় সরকার সংস্কারের জন্য আগামী জুনেও নির্বাচন দিতে পারবে না। সময় আরও বেশি যাবে। আরেকটি কথা সরকার ছাড়া সকল দল এক টেবিলে বসে নিজেরা সংস্কার নিয়ে আলোচনা করে সেই সংস্কার সরকারের হাতে তুলে দিলে আরও ভালো হয়। যেহেতু সরকারের গঠিত সকল সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট এখন সরকারের হাতে। এ রিপোর্টগুলো নিয়ে একদিনে না সাতদিন বসে দলগুলো একমত হতে পারে।
বেশি বেশি কথা না বলে কাজে মন দিলেই মীমাংসা হয়ে যাবে। আর বেশি কথা বললে পরিণতি যা হবার হবে। এ পরিণতি কেউ ঠেকাতে পারবে না। দলগুলোকে এ নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। একে অপরের বিরুদ্ধে কথা না বলে কাজের কাজ করতে হবে। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সুড়ঙ্গের ওপারে দ্রুত আলো দেখতে চাইলে অবশ্যই সবাইকে একমত হতে হবে। আর ঐকমত্য কমিশনের কাছে গিয়ে বলতে হবে আমরা সবাই আপনাদের দেয়া সংস্কার প্রস্তাবের এসব ক্ষেত্রে একমত হয়েছি। আপনারা এ পর্যন্তই করুন। বাকিটা সনদ আকারে করুন। এতে আমরা সবাই স্বাক্ষর দেবো। তাহলে সরকারও কোনো অজুহাত দেখাতে পারবে না। তবে সবার আগে একটি কথা বলতে হবে পতিত স্বৈরাচারের গণহত্যার বিচার দ্রুত করতে হবে। গুম, খুনের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের বিচার দাবি অবশ্যই তুলতে হবে। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। যাতে বিচার দ্রুত করা যায়। এটা করতে পারলে জীবনে আর কোনো দলই স্বৈরাচার হওয়ার সাহস দেখাবে না। যেমনটি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেছিলেন আজীবন ক্ষমতায় থাকবেন। এমনভাবেই সংবিধানকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। তিনি একবারও ভাবেননি প্রায় দুইশ’ বছর শাসন করে বৃটিশদেরও এদেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে আন্দোলনের মুখে। আর পৃথিবীর কোনো স্বৈরশাসকেরই শেষটা ভালো হয়নি-এটাও ভুলে গিয়েছিলেন বিদেশি মিডিয়ায় খ্যাতি পাওয়া নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচার শেখ হাসিনা।

Thursday, April 3, 2025
বেহুদা প্যাঁচাল: সকল দলের সরকার তত্ত্ব এবং কিছু কথা by শামীমুল হক
সম্প্রতি রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক পিনাকি ভট্টাচার্য ফেসবুক লাইভে এসে নতুন একটি তত্ত্ব জাতির সামনে হাজির করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা ভাবছি- অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে একটা রাজনৈতিক সরকারে উন্নীত হবো। এখানে আমাদের একটা আউট অব দ্যা বক্স সলিউশন চিন্তা করতে হবে। সেটা হচ্ছে আমরা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে একটা ট্রানজিশনাল সরকার করবো। যা থেকে রাজনৈতিক সরকারের উত্তরণ করবো। তার মানে তিনটা স্টেপে। ধাপে ধাপে। এই ট্রানজিশনাল সরকার থাকবে হাসিনার টার্মটা যতদিন ছিল ততদিন। মানে হাসিনা যদি ক্ষমতায় থেকে যেতো। তাহলে যতদিন পরে আরেকটা ইলেকশন হতো ততদিন। কারা থাকবে এই সরকারে? ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। বিএনপি, জামায়াত, চরমোনাই, নুরের দল, এনসিপি এমনকি বাম সহ সবাই। তিনি আরও বলেন, ন্যাচারালি আমরা দলগুলোর শক্তি জানি। সে হিসেবে তারা মন্ত্রী পাবে। মন্ত্রিসভা পুরা হবে। আর উপ-প্রধান উপদেষ্টা হবেন তারেক রহমান। সে ফেসবুক লাইভে তিনি যা বলেছেন এর সারসংক্ষেপ এটা। তিনি একাধারে সরকারের মেয়াদ, সরকারের ধরন খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। সরকারে ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে রাখার কথাও বলেছেন। তার এ তত্ত্ব নিয়ে কে কি মন্তব্য করবে জানি না। তবে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে। বলতে গেলে আমাকে নাড়া দিয়েছে। এমনটি হলে আমার মতে ভালো হবে। সকল দলের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হবে। সরকারে থেকে সকল দলের প্রতিনিধিরা মিলে দেশ চালাবেন। নতুন করে উপ- প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টি করে তার দায়িত্ব দেয়া হবে তারেক রহমানকে। এতে করে বাকি সময়টুকু যারা সরকারে থাকবেন তাদের একটা অভিজ্ঞতা হবে। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে যে দলই সরকার গঠন করুক অন্তত কিছু হলেও অভিজ্ঞ লোক সরকারে থাকবে। এ সরকার নিশ্চয় ব্যতিক্রম সরকার হবে। নোবেল বিজয়ী, বিশ্বনন্দিত ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এ সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন তরতর করে। কারণ সকল দলের অংশগ্রহণ থাকায় এখানে কেউ সরকারের কোনো কাজে বাধা দিতে আসবে না। বরং প্রত্যেকেই যার যার পারফরমেন্স দেখাতে ব্যস্ত থাকবেন। কার চেয়ে কে ভালো কাজ দেখাতে পারবেন সে প্রতিযোগিতা গড়ে উঠবে সরকারের মধ্যে।
এখন আসা যাক পিনাকি ভট্টাচার্যের নতুন এ তত্ত্বে কারা কারা সাড়া দেয়। কোন কোন রাজনৈতিক দল এ তত্ত্বকে সাদরে গ্রহণ করে। আর কারা এ তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে। তবে আমি যতটুকু বুঝি ষোল বছর জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকা নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচার হাসিনাকে যেভাবে সরকার থেকে উৎখাত করা হয়েছে তা ছিল সকল রাজনৈতিক দলের কাছে অকল্পনীয়। আর ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে যেতে পারবে কিনা তাও ছিল ভীষণ ভাবনার। কারণ স্বৈরাচার হাসিনা সংবিধানকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন নির্বাচন হলেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের কোনো চিন্তা ছিল না। পরপর তিনটি নির্বাচন এভাবে চিন্তাহীনভাবে হাসিনা ক্ষমতায় থেকে গেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই থাকতেন সরকার প্রধান। যদি না বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এভাবে ঝাঁপিয়ে না পড়তেন। হাসিনা সরকারও দিশাহারা হয়ে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ, বিজিবি, আনসার কোনো বাহিনীই বসে ছিলেন না। তাদের সাহস জুগিয়েছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী। ছাত্রলীগের গুণ্ডা বাহিনী। জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। এভাবে দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। কমপক্ষে ত্রিশ হাজার জনতার অঙ্গহানি হয়েছে। কেউ চোখ হারিয়ে অন্ধ হয়েছেন। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর পর সারা দেশের রাজপথ থেকে অলিগলি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে। মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। অবশ্য ৫ই আগস্টের বীজ বপন হয়েছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে। বিএনপি, জামায়াতসহ সকল বিরোধী দলগুলো রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। হামলা, মামলা আর গায়েবি মামলায় দিনের পর দিন জেল খেটেছেন। কেউ বা নিজ বাড়ি ছেড়ে ধানক্ষেতে ঘুমিয়েছেন। এত নির্যাতনের পর এলো মাহিন্দ্রক্ষণ ৫ই আগস্ট। এরপর ভেবেছিলাম রাজনৈতিক দলগুলোর বোধোদয় হবে। তারা সবাই এক টেবিলে বসবেন। দেশ পরিচালনায় নতুন ফর্মুলা হাজির করবেন। এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে দিনের পর দিন বৈঠক হবে। এরপর তারা এক হবেন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেবেন তারা। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? কিংবা কি দেখছি? আমরা দেখছি এখনো সেই আগের মতোই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। সব দলই নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। দেশের স্বার্থ কারও কাছে মুখ্য হয়ে উঠছে না। বরং অন্তর্বর্র্তীকালীন সরকারকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে কোনো কোনো দল। গত আট মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সফলতা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। তবে হিসাব করলে সফলতার পাল্লাই ভারী। বর্তমান সরকার সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতেই। এ নিয়ে কমিশনও হয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশনগুলো তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের কাছে। কমিশনের রিপোর্ট কিন্তু চূড়ান্ত নয়। বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন। তিনি বলেছেন সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এ জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান- প্রধান উপদেষ্টা নিজেই। ইতিমধ্যে কমিশনগুলোর রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে দলগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছে। এখানে দেখা গেছে, একেক রাজনৈতিক দলের একেক মত। দলগুলোর ঐকমত্যে যাওয়ার লক্ষণ একেবারে নেই। বিএনপি আরও কয়েক বছর আগে ৩১ দফা দিয়েছে। যেখানে উল্লেখ রয়েছে দুই বারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কিন্তু সংস্কার কমিশনের দেয়া এই দুইবারেও আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। বলেছে এখানে তিনবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। তবে বিরতি দিয়ে আবার হতে পারবেন। বিএনপি’র এ মতামতে দেখা গেছে তারা ৩১ দফায় দেয়া দুইবার থেকে সরে এসেছেন। আরও এমন অনেক বিষয়ে একদলের সঙ্গে আরেক দলের মতামতে ভিন্নতা দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন মনোভাবে মানুষ কিন্তু ক্ষুব্ধ হচ্ছে। মানুষের এ ক্ষুব্ধতা দলগুলোর জন্য কতোটুকু সুফল বয়ে আনবে? এ বিষয়টি কি রাজনৈতিক দলগুলো ভেবে দেখেছেন।
এবার আসা যাক নির্বাচন নিয়ে। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দল দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে। এনসিপিসহ দুয়েকটি দল আওয়ামী লীগের বিচারের পর নির্বাচন দেয়ার পক্ষে। জামায়াত চায় যৌক্তিক সংস্কারের পর নির্বাচন। এখানে সব দল একমত হতে পারছেন না। একটি কথা ঠিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন দাবি করবেই- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত ষোল বছরের জঞ্জাল সাফ তো করতে হবে আগে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়ে সনদে স্বাক্ষর করতে হবে। ক্ষমতায় গেলে তারা এসব সংস্কার আইনে পরিণত করবেন। এর সংস্কার কোন কোন জায়গায় হবে, কেমন করে হবে- তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন ভাব ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও তো দেখা যাচ্ছে না। বরং একে অন্যকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করতে ছাড়ছেন না। এতে করে বিগত ষোল বছরের স্বৈরাচার সুযোগ নিচ্ছে অবশ্যই। যার প্রতিফলন এখন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। স্বৈরাচার হাসিনা এখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন। তার দলের নেতাদের সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন দেশে অরাজকতার। হাসিনার নির্দেশে যে দুই হাজারেরও বেশি ছাত্র-জনতা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এর দায় দিচ্ছেন সমন্বয়কদের ওপর। প্রধান উপদেষ্টাকে নিয়েও নানা কুমন্তব্য করছেন। জোর গলায় বলছেন, এসবের বিচার কড়ায় গণ্ডায় হিসাব করে করা হবে। এজন্য দায়ী কে? এই আট মাসে কেন আমরা পারলাম না একটি বিষয়ে সংস্কার করে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে? রাজনৈতিক দলগুলো কি মুখে মুখেই সংস্কার সংস্কার করছে? এমনটা হলে জুলাই বিপ্লব মাঠে মারা যাবে। এটা সবার মনে রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্নমত দিতেই পারে। কিন্তু সবাই এক টেবিলে বসে দীর্ঘ আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে দ্রুত। তা না হলে দেশের বিপর্যয় অনিবার্য।
এ অবস্থায় পিনাকি ভট্টাচার্যের সকল দলের সরকার তত্ত্বকে আমার কাছে যথাযথ মনে হয়েছে। এমনটা হলে সকল দল সরকারও চালাবে আবার সংস্কার নিয়ে কাজ করবে। তাদের মধ্যে আলাদা একটা ভালোবাসা জন্ম নিবে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সবার মাঝে এটা সত্য। সকল দলের সরকার হতে পারে নতুন বাংলাদেশ গড়ার একটা প্ল্যাটফরম।

Tuesday, April 1, 2025
বাঘের ইচ্ছে হলেই সম্ভব by শামীমুল হক
আল-আমিন স্পষ্ট করে না বললেও আন্দাজ করা যায়। সুন্দরবনের হরিণের কথাও বললেন তিনি। পাখ-পাখালির কথাও বাদ যায়নি। টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠলো মানচিত্র। আমরা কোন কোন নদী দিয়ে কোথায় যাবো। এমন সময় আল-আমিন জানালেন আগামীকাল আমরা কটকায় যাবো। তবে আপনাদের জন্য সুখবর হলো কটকায় হেঁটে যেতে পারবেন। যেখানে জাহাজ থামবে সেখান থেকে সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। আর যারা যাবেন না তারা জাহাজেই থাকবেন। জাহাজও একই সঙ্গে ছাড়বে। এই সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজ গিয়ে থামবে। ওদিকে যারা হেঁটে যাবেন তারাও সেখানে গিয়ে একসঙ্গে মিলিত হবেন। হেঁটে যাওয়া পথের তিন কিলোমিটার জঙ্গল। তিন কিলোমিটার বিস্তীর্ণ চর। আর তিন কিলোমিটার সাগর। অন্যরকম এক ফিলিংস এই হেঁটে যাওয়ার। যারা গিয়েছেন তারা বলেছেন, এমন স্মৃতি মনের গহীনে গেঁথে থাকবে আজীবন। যারা যাননি তারা বড্ড মিস করেছেন। গাইড আল-আমিন বলেই যাচ্ছিলেন সুন্দরবনের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। এই তিনদিন আমরা কোথায় কোথায় যাবো। কীভাবে যাবো। সবই বলা হলো। পরদিন ভোর ৬টায় পাখি দেখতে যারা যাবেন তাদের কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। কি করতে হবে সবই বললেন। কুমির প্রজনন কেন্দ্রে গিয়ে কি করতে হবে। কীভাবে চলতে হবে। আল-আমিনের সব মুখস্থ। সবশেষে বললেন, এরপরও যদি কারও কিছু জানার থাকে আমাকে বলবেন। আমি সর্বদা আপনাদের সেবায় নিয়োজিত। কথায় কথায় জাহাজ গিয়ে থামলো হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে। এবার আল-আমিন বললেন, এবার আমরা হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে যাবো। ঘুরে দেখবেন জীব বৈচিত্র্য। খুলনা চার নম্বর ঘাট থেকে যে ট্রলারে করে আমরা দূরে অপেক্ষারত জাহাজে গিয়ে উঠেছিলাম সেই ট্রলার আর জাহাজ ছাড়েনি। ট্রলার বেঁধে দেয়া হয় জাহাজের সঙ্গে। যেখানেই যাই জাহাজ মাঝ নদীতে থেমে যায়। তারপর ট্রলার নিয়ে যায় তীরে বা কোনো স্পটে। আমরাও এবার জাহাজ থেকে নেমে ট্রলারে গিয়ে বসলাম। উদ্দেশ্য হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট দেখা। চার কিংবা পাঁচ মিনিট চলার পরেই হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট। ট্রলার থেকে একে একে সবাই নামলাম। প্রবেশ পথেই বানরের দেখা। দলবদ্ধ বানরের দল। এত মানুষ দেখেও বানরগুলোর কোনো ভয় নেই। বরং আমাদের এক সহযাত্রীকে আক্রমণ করে বসে। গাইড আগে এগুচ্ছে আমরা পেছনে পেছনে। যতই এগুচ্ছি সামনে গহীন জঙ্গল। সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে বাঘ দেখা যায় কিনা? ভয়ও কাজ করছে সবার মনে এই বুঝি বাঘ হামলে পড়ছে কারও না কারও ওপর। ভয় আর আতঙ্কে হিমশীতল হয়ে আসছিল শরীর। অন্যদিকে সুন্দরবন দেখার আনন্দও ছিল মনে। মাঝে মাঝে গাইড চিৎকার করে বলছিলেন সবাই একসঙ্গে থাকেন। কেউ একা হবেন না। তাহলে বিপদ হতে পারে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টটি খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দুই কিলোমিটার জঙ্গলের ভেতরে গিয়েও বাঘের দেখা পাওয়া যায়নি। যা দেখা গেছে তা হলো বাঘের পায়ের ছাপ। আর ছাপ কোথায়? যে পথে মানুষ চলাচলের জন্য সুন্দর করে ইটপাথরের সুড়কি দিয়ে বানানো হয়েছে তার পাশেই। মানুষ যেন চলাচল করতে পারে সেজন্য এ পথ বানানো হয়েছে উঁচু করে পিলারের উপর। দুই পাশে আবার রেলিং দেয়া।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পর পর দেখা যাচ্ছিল বাঘের পায়ের ছাপ। আসলেই কি এটা বাঘের পায়ের ছাপ? এখানেও রয়েছে রহস্য। কথিত রয়েছে, বন বিভাগ থেকে এক ধরনের অস্ত্রের মাধ্যমে এমন ছাপ দেয়া হয়। পর্যটকরা যাতে পায়ের ছাপ দেখে শিহরিত হন। বাঘ না দেখলেও পায়ের ছাপ দেখেছি-এটা ভেবে তৃপ্তি পান। এমন তৃপ্তি নিয়েই হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসেন নিজ গন্তব্যে। বেশক’টি নদী ঘিরে রেখেছে সুন্দরবনকে। এর সবক’টিই জোয়ার- ভাটার নদী। তাই জোয়ারে সুন্দরবনে পানি জমে। আবার ভাটায় সেই পানি নেমে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে জোয়ারের পানিতে যেন গাছ না মরে এ প্রতিটি গাছই তাকে রক্ষায় শ্বাসমূল ছড়িয়ে দেয়। ছোট থেকে বড় বহু শ্বাসমূল ঘিরে রাখে প্রতিটি গাছকে। গাইড আল-আমিন সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলটি দেখিয়ে বলেন, এটি সবচেয়ে বড়। মানে হলো জোয়ারে পানি এ শ্বাসমূলের উপরে উঠে না। জোয়ারের সময় গাছ এ শ্বাসমূল থেকে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টেই ছোট খালে এক প্রকার মাছ দেখা যায়। এ মাছগুলোর সামনে গিয়ে গাইড আল-আমিন এ মাছের বিশদ বর্ণনা দেন আমাদের। এ মাছ জলে ও স্থলে বসবাস করে। সামনেই একটি পুকুর। পুকুরে পানি থৈ থৈ। নিশ্চয় জোয়ার- ভাটায় এ পুকুরও ডুবে ও ভাসে।
সুন্দরবন নাম হয়েছে সুন্দরী গাছের কারণে। কিন্তু সুন্দরী গাছ কীভাবে সুন্দর তা বোঝা গেল না। তবে তার একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সুন্দরী গাছের গোড়া এমনভাবে নিজ থেকে তৈরি যা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। গাছটিকে যেন চারদিক থেকে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। যেন ভেঙে না যায়। কারণ সুন্দরী গাছ একেবারে লম্বা ও সোজা হয়। এর কোনো ডালপালা নেই। একেবারে লক-লকিয়ে এগিয়ে গেছে উপরে। প্রচণ্ড বাতাসেও এ গাছ ভেঙে পড়ে না। কারণ তার গোড়ায় নিজ থেকেই মোটা মোটা জড় ঠেস দিয়ে রেখেছে। আসলেই প্রকৃতির কী খেলা! প্রত্যেকেই নিজেকে বাঁচানোর উপায় নিজেই খুঁজে নেয়। সুন্দরী গাছও তেমন। আর এ সুন্দরী গাছ বেশি দেখা যায় আন্দারমানিক পয়েন্টে। হাড়বাড়িয়া ভ্রমণ শেষে আন্দারমানিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা। শুরুতেই বাঘের ছবি দিয়ে বিরাট নিয়ন সাইনের পোস্টার সাঁটানো। এ বাঘ দেখেই আন্দারমানিক স্পটে প্রবেশ। শুরুতেই বিশাল এক উঁচু টাওয়ার। এর নাম ডলফিন টাওয়ার। এ টাওয়ার থেকে নদীতে ডলফিন দেখা যায় বলে এর নাম রাখা হয়েছে ডলফিন টাওয়ার। সহযাত্রীদের অনেকেই ডলফিন দেখতে এ টাওয়ারে উঠেন। তাদের দু’চোখ নদীর দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকানো। ডলফিন দেখার স্বপ্ন এ চোখে। কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই নেমে এলেন। কি ভাই ডলফিন দেখেছেন। কেউ কোনো কথা বলছে না। অবশ্য গাইড আল-আমিন কথার মারপ্যাঁচ জানেন ভালো। আগেই বলে নিয়েছিলেন ডলফিন টাওয়ারে উঠলে ডলফিন দেখা যেতেও পারে। নাও পারে। যাদের ভাগ্য ভালো তারা ডলফিন দেখতে পায়। এই আন্দারমানিকে বেশক’টি হরিণ আটকে রাখা হয়েছে। বাউন্ডারির বাইরে থেকে ডাক দিলে হরিণগুলো ছুটে আসে। কেউ কেউ এসব হরিণকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অবশ্য জাহাজ চলাকালীন সুন্দরবন থেকে অনেক হরিণ নদীতে পানি খেতে এসেছে তা দেখা গেছে। আন্দারমানিকের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে সব সুন্দরী গাছের আখড়া।
এবার পশু-পাখি দেখার পালা। জাহাজ এক জায়গায় গিয়ে থামলো। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো সকাল ৬টায় ট্রলার পশু-পাখি দেখার জন্য যাবে। যথাসময়ে সবাই ট্রলারে গিয়ে উঠলেন। ট্রলার ছাড়লো। একটু সামনে গিয়ে মূল নদীর শাখা দিয়ে প্রবেশ করলো ট্রলার। একটি খালের মতো। সবার নজর খালের দু’পাশের গাছের দিকে। পাখি দেখার জন্য। কিন্তু না! কোনো পাখিই দেখা যাচ্ছিল না। কিছু দূর যাওয়ার পর একজন এসে বললেন, ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে দাও। আস্তে আস্তে চলুক। ইঞ্জিনের শব্দে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। সত্যিই তাই। ইঞ্জিন বন্ধ করে ট্রলার এগুতে থাকে। এবার পাখির কিচিরমিচির শব্দ কানে আসছে। আসছে বন মোরগের ডাক। সত্যিই পাখ-পাখালির এমন ডাক মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু খালের পাশের কোনো গাছেই পাখির চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। ফেরার পথে আবার একই দৃশ্য। চোখ বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু না পাখির দেখা মিললো না। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর বন মোরগের ডাক পুঁজি করেই ফিরে আসা জাহাজে। সেখান থেকে করমজাল যাওয়া। যেখানে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে দেখা মিললো ছোট ছোট দোকানপাটের। দোকানিরা এসেছেন মোংলা থেকে। করমজালে আসা পর্যটকদের কাছে তাদের পণ্য বেচতে। পণ্য বলতে পানি, চা, রুটি, পেয়ারা, শসা, পানীয়। কিন্তু সবই ডাবল দাম। আবার সেখানে হরিণের খাবার বিক্রি হচ্ছে। মানুষ লাইন ধরে খাবার কিনছে। হরিণকে খাবার দিবে বলে। করমজালে হরিণ, বানর সবই আছে। তবে কুমির দেখতেই এখানে ভিড় বেশি। করমজালের নদীতেও কুমিরের আস্তানা। করমজালের ভেতরে একটি পুকুর আছে। এ পুকুরেই প্রথম আনা হয় রোমিও আর জুলিয়েট কুমির জুটিকে। কিন্তু রোমিও আর জুলিয়েট প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে জুলিয়েটকে বন্দি করে রাখা হয় একটি খাঁচায়। আর রোমিওকে নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। রোমিও যেন তার আর কোনো সঙ্গীকে বেছে নিতে পারে। কিংবা সে তার পথ নিজেই বেছে নিবে। বেশক’টি খাঁচায় ছোট কুমির আর বড় কুমির। পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখা গেল বড় দুটি কুমির পানি থেকে পাড়ে উঠে ঘুমিয়ে আছে। একটি উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে আছে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছে মরে আছে। এত মানুষের হইচই তবু কুমিরের ঘুম ভাঙছে না। মনে মনে ভাবলাম এ জন্যই বুঝি বলা হয়, কুমিরের ঘুম ঘুমিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর একটি কুমির সজাগ হয়ে দ্রুত পুকুরে নেমে যায়। অন্যটি মরার মতো ঘুমিয়েই আছে। ফেরার পথে সেখানকার ডাব খেয়ে একে একে সবাই ট্রলারে উঠেন। এরপর ট্রলার নিয়ে যায় আমাদের জাহাজে।
সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে হলেও এ অংশে নাকি বাঘ আছে ১২৫ কি ১২৮টি। আর ভারতের অংশে ৪০ শতাংশ হলেও সেখানে বাঘ রয়েছে ৪০০-এর উপরে। আচ্ছা বাঘ কীভাবে গণনা করে। এ নিয়ে মনে প্রশ্ন। শুধু আমার নয়, অনেকের মনেই এ প্রশ্ন। আর বাঘের সংখ্যা যে বলা হয় এটা কতোটুকু সত্যি? এ নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। তবে লিখলে বাঘ গণনায় যে বাজেট তাতে টান পড়বে। তারচেয়ে বরং যে হিসাব দেয়া হয় সেটা মেনেই সবার চলা উচিত। চলছেও। সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাস করে। কিন্তু এ বনে বাঘের দেখা মেলা অন্য যেকোনো বনের চেয়ে বেশ দুরূহ। সুন্দরবনে দিনে দু’বার জোয়ার-ভাটা হয়। এখানে মোটরবোটে চড়ে বন দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তবে প্রায়ই রিপোর্ট হয় কোনো না কোনো সময়ে জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মধু আহরণকারী ও গোলপাতা আহরণকারীরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।
সুন্দরবনে কথা হয় এক গোলপাতা আহরণকারীর সঙ্গে। তাকে বাঘের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ওই যে বাঘের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে একটা বাঘ এখান দিয়ে গেছে। কথায় কথায় তিনি বলেন, বাঘ দেখবেন কোথা থেকে? বাঘের নির্দিষ্ট একটি এলাকা আছে। সে এলাকায় আপনারা যেতে পারবেন না। তবে একটা কথা শুনে রাখুন সুন্দরবনে কেবল বাঘের ইচ্ছে হলেই মানুষ তাকে দেখতে পায়। করমজালে কথা হয় মামুনের সঙ্গে। তার বাড়ি মোংলায়। প্রতিদিন নদী পার হয়ে করমজালে আসে। পেয়ারা-শসা আর বড়ই বিক্রি করছে এখন। বেশির ভাগ সময় মৌসুমি ফলমূলই বিক্রি করে। মামুনের কথাÑ সুন্দরবনের আনাচকানাচ তার নখদর্পণে। তার মতো এখানকার বাসিন্দাদের কাছে বাঘ হচ্ছে ‘মামা’। সকালে বেরুনোর আগে বনবিবির কাছে প্রার্থনা করে বেরিয়েছে মামুন। সুন্দরবনের নরম মাটিতে বাঘের পায়ের চিহ্ন কয়েক ইঞ্চি ডুবে আছে। যেন কিছুক্ষণ আগে কেওড়ার শ্বাসমূল বাঁচিয়ে নেমে এসেছিল বাঘ। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টের একজন কর্মচারী ফ্যাকাসে মুখে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো। ‘মানুষখেকো, বেজায় চালাক। গত সপ্তাহে এক জেলের ওপর হামলা চালিয়েছিল। বেচারা ছুরি দিয়ে আত্মরক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাঘটিই তার দফারফা করে ফেলে। তার কথা কানে আসতেই আমি ঢোক গিললাম। আগেই বলেছি দিনের মধ্যে দু’বার সুন্দরবন পানির নিচে ডুবে যায়। এখানকার বাঘদের তখন লবণাক্ত পানি পান ও আধা-জলজ জীবনযাপন করতে হয়। এ কারণে সুন্দরবনের বাঘ দক্ষ সাঁতারুও। এ বনের বাঘের লেজ শক্ত ও পেশিবহুল। সাঁতারের সময় পানিতে লেজ ঝাপটায় এটি। সুন্দরবনের বাঘ অন্য জায়গার বেঙ্গল টাইগারের মতো নয়। এর খাদ্যাভ্যাসও অন্যদের থেকে ভিন্ন। এ বনের বাঘেরা মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ, বড় গুঁইসাপ ইত্যাদিও শিকার করে। সুন্দরবনের বাঘের সাপ শিকার করারও নজির আছে। তবে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। ক’দিন আগে একটি বাঘকে নদীর এপার থেকে ওপার যেতে দেখেছেন অনেকেই। কেউ কেউ এটি ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছেন।
সুন্দরবনের জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মৌয়াল এদের বেশির ভাগই বিনা অনুমতিতে ও কোনো প্রকার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া বনে প্রবেশ করে। আর এরা বাঘের জন্য বেশ সহজ শিকার। সহজে শিকার করা যায় বলেই মাঝেমধ্যে এ বাঘগুলো মানুষের ঘাড় মটকায়। কিন্তু গুজব আর মিথ ছাড়া সুন্দরবনকে চিন্তা করা যায় না। এসব চিন্তা করতে করতেই রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সকালে জাহাজের তিন তলায় উঠতেই দেখা হলো জাহাজের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘুম হয়নি মনে হচ্ছে। বাঘের স্বপ্ন দেখলেন নাকি রাতে? ভয় পাবেন না। ও আমি প্রতি রাতে দেখি। ছোটবেলায় বাঘ মামা আর শিয়াল পণ্ডিতের গল্প শোনেননি, এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিংবা, ‘বনের রাজা কে? বাঘ নাকি সিংহ?’, এই ধাঁধার মাঝে পড়েননি, এমন মানুষের সংখ্যাও হাতেগোনা। সিংহকে বনের রাজা বলা হলেও বাস্তবে সিংহ কিন্তু বনে বাস করে না। পৃথিবীর বেশির ভাগ সিংহের বসবাস আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির সাভানা অঞ্চলে। অন্যদিকে, বাঘের বসবাস কিন্তু এশিয়ার মাত্র কয়েকটি দেশের বন-জঙ্গলে। বাংলাদেশ ও ভারতের কোল ঘেঁষা সুন্দরবন এই বাঘের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। একসময় পৃথিবীতে বাঘের নয়টি উপ-প্রজাতি ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বা দুইশ’ বছর আগে তিনটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং পৃথিবীতে এখন টিকে রয়েছে মাত্র ছয়টি উপ-প্রজাতির বাঘ। তবে আকৃতি এবং সৌন্দর্য্যে যেসব বাঘ খ্যাতিমান, তার মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার অন্যতম।
(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

Monday, March 10, 2025
আপা, খুব জানতে ইচ্ছে করে by শামীমুল হক
আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল দেশে থাকতে পারবে না- এমন হুংকার দিবেন। অসংখ্যবার এমন হুংকার দিয়েছেন। আজও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার ভাইরাল বক্তব্য শুনে এলাম। যেখানে আপনি বলছেন- পাড়া-মহল্লা থেকে একটা একটা বিএনপিকে ধরে এনে শাস্তি দিতে হবে। বিএনপি’র এদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। হাসু আপা, ও আপা- নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গের কথা তো আমরা সবাই শুনেছি। আপনিও ঠিক তেমনই। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে সব সময় চেষ্টা করেছেন। আখেরে কোনো লাভ হয়নি। শুধু নিজের কাটা নাক নিয়েই এখন ভিনদেশে বাস করছেন। বড় আফসোস হয় নিজের দেশ থেকেও আজ আপনি বিশ্বের মধ্যে এক নরাধম, যার কোনো দেশ নেই। যে রিফিউজির মতো অন্যের দেশের গলগ্রহে থাকছেন। ক্ষমতার লোভ আপনাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল যে, আপনি নিজেকে গড ভাবতে শুরু করেন। তাই তো এদেশে যখন মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা প্রবেশ করতে থাকে তাদের বাধা দেননি। বরং বলেছেন, আমার বোন রেহানা আমাকে বলেছে দেশের ষোল কোটি মানুষকে তুমি খাওয়াতে পারছো আর এই ১০ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবে না। নাউজুবিল্লাহ। আপা নিজেকে গড না ভাবলে এভাবে কোনো মানুষ বলতে পারে? একটি কথাই ধরুন না। এই যে আপনি জোর গলায় বলতেন, এমন কোনো শক্তি নেই আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানো। আচ্ছা এখন তো দেখছি শক্তি আছে। জানি আপনি বিশ্বাস করবেন না। কারণ আপনি এখনো জুলাই-আগস্টকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ষোল বছর যে অত্যাচার, নির্যাতন চালিয়েছেন দেশবাসীর ওপর। বিরোধী দলের ওপর। বিরোধী মতের ওপর। সেটার কথাতো বলেন না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়িতে থাকতে দিয়ে বলেছেন, দয়া করে দিয়েছেন। আবার তার পুত্র তারেক রহমানের প্রতি রুষ্ট হয়ে বলেছেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে জেলে পুরে দেবো। আপনার এই কথায় প্রমাণ হয় ইচ্ছে করে খালেদা জিয়াকে জেল দিয়েছেন। আবার খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পণ করেছিলেন বহু আগেই- সেই কথাও প্রকাশ্যে বলেছেন। অথচ আপনি শপথ নিয়েছিলেন রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। ওইদিনই তো আপনার প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করা উচিত ছিল।
হাসু আপা, এই লেখা যখন লিখছি- তখন আমার সামনে আওয়ামী লীগপন্থি শীর্ষ এক সাংবাদিক নেতা বসা। তিনি বলছিলেন, শেখ হাসিনার বড় ভুল তিনি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যে কাউকেই পাত্তা দিতেন না। নিজে যা মনে করতেন সেটাই করতেন। আর যাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন তারাও সঠিক পরামর্শ দিতে সাহস করেন নি। কারণ এ স্বাধীনতাও তাদের ছিল না। পরামর্শ দিতে গিয়ে যদি শেখ হাসিনার মতের বিরুদ্ধে যায় তাহলে তো তার ওপর ঝড় বইয়ে যাবে। তিনি বলছিলেন, আমরা আওয়ামী লীগ করি বঙ্গবন্ধুকে দেখে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছিটেফোঁটাও ছিল না শেখ হাসিনার মাঝে। শেখ হাসিনার পতনের জন্য শেখ হাসিনা নিজেই দায়ী। তিনি কেন সর্বশেষ নির্বাচনটা করতে গেলেন এভাবে? পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আর কি থাকে? চতুর্থবারের নির্বাচনটা সবাইকে নিয়ে সুষ্ঠুভাবে করলে আজ তার এই দশা হয় না। বিরোধী দল হয়ে সংসদে থাকতে পারতো। পরের বার তো ক্ষমতায় আসতো? আসলে সবই হলো লোভ।
হাসু আপা, আপনাকে এখন সুসংবাদ দিতে চাই। আপনিবিহীন বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নরম গরম বাহাস চলছে। সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে নতুন রাজনৈতিক দল হয়েছে। এ রাজনৈতিক দল নিয়ে চারদিকে এখন শোরগোল। আসলে কী হতে যাচ্ছে? বিএনপি চাইছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জামায়াত চাইছে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর বৈষম্যবিরোধীরাও চাইছে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তাদের এই মতানৈক্য আপনার দলের কিছুটা হলেও লাভই হচ্ছে মনে হয়। এমনিতেই বাঙালি আত্মভোলা জাতি। গত ষোল বছর যে জুলুম চালিয়েছেন জাতির ওপর- মাত্র ছয় মাসে তা অনেকেই ভুলে বসে আছে। এটা আপনার জন্য মঙ্গল বলেই মনে হয়। দেশের রাজনৈতিক বাহাসে বিএনপি মনে হয় একা হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় অনেকে বলছেন, জামায়াত আর বৈষম্যবিরোধীরা এক কাতারে থাকবে। কেউ কেউ বলছেন, বিএনপি’র ওপর ষোল বছর নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানোর পরও ওরা আওয়ামী লীগকে হাত ধরে টেনে তুলবে। আবার আওয়ামী লীগও তাদের স্বার্থে বিএনপি’র সঙ্গে এক হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। অর্থাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে গেল। এসবই কিন্তু আন্দাজ। বাস্তবে কী ঘটে আল্লাহ মালুম। তবে, আপা জীবনে আপনি যে ভুল করেছেন তা থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। এ মুহূর্তে আপনি কিন্তু একা হয়ে পড়েছেন। আপনার পাশে কেউ নেই। যতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হম্বিতম্বি করে মানুষকে জানান দিলেও মানুষ কিন্তু সব বোঝে। তাই বলছি, হম্বিতম্বি নয়, দেশবাসীর কাছে ষোল বছরের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করুন। ক্ষমা চান। তাহলে যদি জনগণ কিছুটা হলেও আপনাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু আপনি দেশ থেকে পালানোর দিনও যেভাবে আপনার নির্দেশে একের পর এক গুলি ছুড়েছে পুলিশ ও আপনার লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডাবাহিনী- এ দৃশ্য মানুষ ভুলবে কীভাবে? দেশের প্রধানমন্ত্রী মানে ওই দেশের অভিভাবক। আপনি অভিভাবক হয়ে কী করে জনতার বুকে তীর বিদ্ধ করলেন। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে বিখ্যাত সেই গানটি- মারিয়া ভুজঙ্গ তীর কলিজা করিল চৌচির/কেমন শিকারি তীর মারিল/বিষ মাখাইয়া তীরের মুখে/মারিল তীর আমার বুকে/দেহ থুইয়া প্রাণটা লইয়া যায়/আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়/ আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়...।
হ্যাঁ আপা, দেশের মানুষের কলিজা এখন তীর মাখানো বিষের যন্ত্রণায় অস্থির। তাদের দেহ আছে। কিন্তু সেই দেহে প্রাণ নেই। রাজনীতি তাদের নিঃস্ব করে গেছে। যাকে বিশ্বাস করেছে সেই বিষ মাখানো তীর মেরেছে জনতাকে লক্ষ্য করে। এখন মানুষ কাউকে বিশ্বাস করতেও ভয় পায়। তাই তারা ক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ। দেশের মালিক যাদের বলা হয় সেই জনতাকে পিষ্ট করতে আপনি যেমন ছাড়েননি আপা, অন্যরাও একটু হলেও এ দোষে দোষি। তাই তো কেউ কেউ বলছে আগামী নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলো এগিয়ে যাবে। কারণ তাদের সঙ্গে যাবে বৈষম্যবিরোধীরা। এমনটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তারপরও বলবো রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।
আপা, ভালো থাকুন। দূর-দূরান্তে আপনার অতিশয় পাগল ভক্তদের জন্য দোয়া করবেন। কারণ তারা কখন কি করে বসে তা বুঝা মুশকিল। চারদিক খেয়াল করে চলবেন। হিসাব করে, মেপে মেপে কথা বলবেন। নিশ্চয় আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন।
সূত্র- জনতার চোখ
Sunday, February 2, 2025
ততদিন ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে তো? by শামীমুল হক
হাসু আপা, আজ আর কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে চাই না। কারণ আন্দোলনের ডাক যখন দিয়েছেন তখন মনে হচ্ছে আপনি চাঙ্গা। প্রতিপক্ষকে দেখেই ছাড়বেন। বেশ ভালো। তবে গত ষোল বছরে আপনার আমলের আন্দোলন দমনের চিত্র চোখ বুজে একটু দেখে নিয়েন। তাহলে আপনার জন্যই ভালো হবে। আরেকটি কথা হয়তো আপনি জানেন, তারপরও বলছি- দেশের মানুষ কিন্তু আপনাকে এত সহজে আপন করে নিবে না বলেই মনে হয়। আপনার জানার জন্য বলছি, ক’দিন ধরে আপনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ফেসবুকে এক আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর খোলা চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি কি লিখেছেন একটু চোখ বুলিয়ে নিন। তাহলেই বুঝতে পারবেন আপনাকে নিয়ে কে কি ভাবছে। লেখাটির শিরোনাম দিয়েছে ‘কান ফেলে শুনুন’।
আপনি ক্ষমতায় থাকতে কথাগুলো কখনোই বলতে পারতাম না। কারণ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার দলীয় উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা আমার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাকে জানে মেরে ফেলতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতো না। দলীয় ফোরামে যদিও আপনার অনেক সমালোচনা করেছি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে এসব কথা বলবার মতো সাহস আমার কেন বাংলাদেশে কারোই ছিল না। প্রথম থেকে যদি বলি, তবে বলতে হয়, আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ দল চালাবার মতো মেধা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা আপনার ছিল না। শুধু দলের ঐক্যের প্রতীক বিবেচনায় সেদিন বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আপনাকে ওই আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। প্রয়াত জনাব মালেক উকিল সাহেবের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেই কিন্তু আওয়ামী লীগ বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ৩৯টি আসন পেয়ে তারা বিরোধী দলের আসন অর্জন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর পতনের পর অনেকেই বলাবলি করছিল, আওয়ামী লীগ আগামী একশ’ বছরেও রাজনীতিতে ঠাঁই পাবে না। কিন্তু সেটি পেয়েছিল আপনার নেতৃত্ব ছাড়াই।
দ্বিতীয়ত, আপনি দলের ভেতর কোনো নেতৃত্বের বিকাশ একেবারেই সহ্য করতে পারেন নি। আপনার পিতা ভুলবশত তাজউদ্দীনকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। আর আপনি সংজ্ঞানে কামাল হোসেনের মতো মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তোফায়েল, রাজ্জাক সাহেবদের মতো ত্যাগী নেতাদের নানাভাবে অপদস্থ করেছেন। তাদের জনপ্রিয়তা আপনি মেয়েলি প্রতিহিংসায় সহ্য করতে পারেননি। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এসব নেতার অবদান জ্বলজ্বল করে এখনো জ্বলছে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী সাহেবকে আপনি ধরে রাখতে পারেননি।
তৃতীয়ত, অতো বড় দলের নেতা হিসেবে কী বলা উচিত আর কী উচিত নয়- এই জ্ঞান আপনার ছিল না। আপনি কথা বলতেন সাধারণ মানুষের মতো ঝগড়ার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। সেসব কথায় বড় নেতা কিংবা দেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কোনো ছাপ ছিল না। মাধুর্যহীন, প্রতিহিংসার বাক্য এবং শব্দ আপনার বক্তব্যকে অত্যন্ত নিম্নমানের বক্তব্যে পরিণত করতো। একটি বক্তব্যের পনের আনা জুড়ে থাকতো বিরোধীদের সমালোচনা। আর সে সমালোচনায় কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা একেবারেই ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণের রোষানল।
চতুর্থত, বঙ্গবন্ধু একটা বিশেষ আদর্শকে সামনে রেখে বাকশাল কায়েম করতে চেয়েছিলেন। আর আপনি একমাত্র ক্ষমতাকে ধরে রেখে লুটপাটের আদর্শ কায়েম করার জন্য স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আপনার লক্ষ্য ছিল শুধুই ক্ষমতা এবং এক ভীতিকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আপনার সামান্য সমালোচনা করেও কতোজন যে গুরুদণ্ড এমনকি জীবন পর্যন্ত হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি নিজেও কিছুটা ভুক্তভোগী হয়ে সন্দ্বীপ পর্যন্ত দেখে এসেছি। সেটি ছিল পুরাকালের দ্বীপান্তরের মতোই।
পঞ্চমত, এদেশের মানুষ দুইবার আপনাকে খাতির করে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাকি তিনবার আপনি নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি করে, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। তারপরও আপনি এখনো প্রশ্ন করেন, আমার কি অপরাধ ছিল? এটা তো একটা প্রতিবন্ধীর প্রশ্ন। আপনার তো আর কোনো অপরাধ করার প্রয়োজন নেই। শুধু এই বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই যেকোনো শাস্তি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আপনি যদি আপনার অপরাধ না বুঝতে পারেন তাহলে আপনাকে প্রতিবন্ধী ছাড়া ভদ্রভাবে আর কী বলা যায়।
ষষ্ঠত, আপনাকে থামাবার বা সাবধান করার কোনো মানুষ ছিল না। আপনার চারপাশে ছিল কেবল মেরুদণ্ডহীন স্বার্থ উদ্ধারকারী কিছু তোষামোদকারী। আপনি পাগলের প্রলাপ বকলেও তারা উলুধ্বনি দিয়ে তা সাপোর্ট করতো। আপনি একটা পরিশীলিত জনবহুল সভায় দাঁড়িয়েও মুখে লাগাম দিতে পারেন নি। কাউকে কাক বলেছেন, কাউকে পদ্মা সেতু থেকে টুস করে ফেলে দিয়ে পদ্মায় চুবাতে চেয়েছেন। এসব একজন প্রধানমন্ত্রীর মুখে মানায়? হ্যাঁ মানায়। আপনার মতো ক্ষমতালোভী এরচেয়ে ভালো কথা আর কী বলতে পারে।
১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথিতযশা সকল বুদ্ধিজীবী আপনার পক্ষে ছিলেন। কারণ আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তারা আপনাকে সাবধান করে ‘সাধু সাবধান’ রচনা করতেন। কিন্তু আপনি তাদের সকলের মুখেই চুনকালি মেখেছেন। এজন্য ২০১৪ থেকে আপনি তাদের দিক থেকে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৪-এ এসে তারা কেউই আপনার পাশে ছিল না। শুধু আপনার ঠোঁটের জন্য আপনার পতন বারো আনা ত্বরান্বিত হয়েছে। আদালতও একবার আপনার জিহ্বা সংবরণ করার জন্য হুঁশিয়ার করেছিল। কিন্তু আপনার স্বভাব আপনি বিন্দুমাত্র পরিত্যাগ করতে পারেননি। আপনি প্রচুর মিথ্যা কথা বলতেন যা একজন রাষ্ট্রনায়ককে মানায় না। জয়-পরাজয় নিয়েই তো রাজনীতি। আপনি কখনো হেরে যাবেন এটা ভাবতে পারেন নি। আপনার আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ থেকে বহুদূর সরে এসেছিল। আপনার আওয়ামী লীগ একেবারে গ্রাম পর্যন্ত টাউট-বাটপার আর মাস্তান তৈরি করেছিল। বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন একটা মধ্য চরিত্রের সেবক শ্রেণি। আর আপনি গড়ে তুলেছিলেন একটা সন্ত্রাসী লুটেরা শ্রেণি। আপনি কখনোই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। আমলা কামলা আর প্রতিরক্ষার মানুষ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন শুধু আপনার ক্ষমতার জন্য। কিন্তু কে আর চিরকাল ব্যবহৃত হতে চায়? আপন বিবেচনা থেকেই তারা একদিন পিছুটান দিতে বাধ্য হয়।
আপনি উন্নয়নের ঘ্যানর ঘ্যানর ফিরিস্তি আওড়ান যা খুবই বিরক্তিকর। কান ঝালাপালা হয়ে গেছে জনগণের। জনগণ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তারচেয়ে বেশি চায় তার রাজনৈতিক অধিকার তথা ভোটাধিকার। আপনি সেই পবিত্র অধিকার পদদলিত করেছেন। যা আপনার সমস্ত উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছে। আপনার হাতে সুযোগ ছিল ইতিহাস রচনার। আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। আপনার আর কি চাই। অর্থ-সম্পদ থাকবে আপনার পায়ের নিচে। আপনি হতে পারতেন নির্লোভ ত্যাগী মহীয়সী। কিসের অভাব আপনার। আপনি সেসব না করে লুটপাটে নামলেন নিজেই। আর পিওনকে বানালেন চারশ’ কোটি টাকার মালিক। জনসভায় দাঁড়িয়ে পাগল আর উন্মাদের মতো আপনি আবার সেসব কথা গর্বের সঙ্গে বলে বেড়ান। এদেশের মানুষকে আপনি নির্মমভাবে আশাহত করেছেন। মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল আপনার কাছ থেকে। আপনি সে প্রত্যাশার মোটেও যোগ্য ছিলেন না। আপনার কোনো সংশোধন নেই। আজ ভারতে বসেও আপনি যে প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য প্রদান করেন তাতে আপনাকে পাগল ছাড়া আর কী বলা যায়?
আওয়ামী লীগ আর রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না, একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি তা মনে করি না। হয়তো আসবে। কিন্তু সেটি বহুদূরের পথ। বাইরে বাধার দরকার নেই। আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ প্রজন্ম কোনমুখে দাঁড়াবে জনগণের দরজায়? বদলাতে হবে। খোল নলচেসহ। সেটি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ততদিনে ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে কিনা কে জানে। যাই হোক একটি প্রগতিশীল পার্টির কর্মী হিসেবে মনে করি আপনার ফিরে আসা না আসা কোনো ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। যেটি বিক্রি করে আপনি খেয়েছেন। আর ভবিষ্যতে তা বিলীন হওয়ার পূর্বাভাস আমাদেরকে ব্যথিত করে। তবে এদেশের জনগণ বড়ই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে জানে। তারা সময়মতো রুখে দাঁড়াবেই। রক্ষা করবে তাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। সেটি ইতিহাসের অবধারিত নিয়মেই হবে।
আর শেষে আপনাকে বলি, স্বভাব পাল্টান। সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাজে না লাগলেও বৃদ্ধ বয়সে আপনার নিজের কাজে লাগবে। আগেই বলেছি- এসব কথা আগে হয়তো বলতে পারতাম না। এখন বলছি। জানি দৈবাৎ যদি ক্ষমতায় ফিরে আসেন তবে আমাকেই আগে খুঁজবেন। কারণ আপনি সংশোধন হবেন না। হবেন আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ।
দেখলেন তো আপা, আপনার দলীয় বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন? এমন কথা সারা দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন কি করবেন আপনিই ভালো জানেন। তারপরও দূর থেকে আপনার মঙ্গল কামনা করি সব সময়।

Monday, January 20, 2025
উত্তরটা আপাকেই দিতে হবে by শামীমুল হক
দপ্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনা জাতীয় যুব কেন্দ্র। জামালপুরের মেলান্দহে রয়েছে শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি। রয়েছে নৌবাহিনী জাহাজ বিএনএস শেখ হাসিনা। ভবনের মধ্যে রয়েছে- ঢাকায় শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মানিকগঞ্জেও রয়েছে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। জামালপুরে রয়েছে শেখ হাসিনা সাংস্কৃতিক পল্লী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- নেত্রকোনায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়। খুলনায় শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। কিশোরগঞ্জে শেখ হাসিনা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। শেখ হাসিনা কৃষি ইনস্টিটিউট, কৃষি অনুষদ, বশেমুরবিপ্রবি। হলের মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনা হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা হল, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা হল, বুটেক্সে রয়েছে শেখ হাসিনা হল, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে শেখ হাসিনা হল, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে দেশরত্ন শেখ হাসিনা হল, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা হল, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা হল, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা হল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ হাসিনা হল। এ ছাড়া কলেজগুলোর মধ্যে রয়েছে- হবিগঞ্জে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ, মেলান্দহ, জামালপুরে শেখ হাসিনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মাদারীপুরের ডাসারে সরকারি শেখ হাসিনা একাডেমি অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ, গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ঝিনাইদহে শেখ হাসিনা পদ্মপুকুর ডিগ্রি কলেজ, পিরোজপুরে শেখ হাসিনা একাডেমি, পাবনার আতাইকুলায় শেখ হাসিনা উচ্চবিদ্যালয়। ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে রয়েছে- জামালপুরের ইসলামপুরে শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। সড়কের মধ্যে রয়েছে- মাদারীপুর-শরীয়তপুর শেখ হাসিনা মহাসড়ক, চট্টগ্রামে শেখ হাসিনা রোড, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শেখ হাসিনা মহাসড়ক। সেতুর মধ্যে রয়েছে গংগাচড়া শেখ হাসিনা সেতু। সামরিক স্থাপনার মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালীতে শেখ হাসিনা সেনানিবাস, কক্সবাজারে বানৌজা শেখ হাসিনা।
আচ্ছা, হাসু আপা, এত নামের কী দরকার। যেখানে প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের ইতিহাসে নাম লেখিয়েছেন। দেশের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু বারবার প্রধানমন্ত্রী হতে হবে কেন? এ প্রশ্নটা করতাম না। কারণ আপনি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। শতাধিক দিন হরতাল করে যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি দেশে আনলেন সেটা কলমের এক খোঁচায় বাদ দিয়ে দিলেন। আবার এতে ব্যবহার করলেন আদালতকে। আপনার এ উদ্দেশ্য ছিল একেবারে নিজের স্বার্থে। যার পরিণতিতে আপনি হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরশাসক। মনে পড়ে আপা, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিরোধী দলকে নিয়ে আপনি বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে বলেছিলেন- আমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, আমাকে একবার বিশ্বাস করে দেখুন। আপনার এ কথায় বিশ্বাস করে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে গেল। নির্বাচনী প্রচারণাকালীন সময়েই বুঝা গেছে কেমন নির্বাচন হবে। বিরোধী দলের প্রার্থীদের কোনো পোস্টার লাগাতে দেয়া হয়নি। কেউ সাহস করে প্রচারণায় বেরুলে তার ওপর হামলা হয়েছে। মামলা হয়েছে। কেউ কোনো দিন চিন্তা করেনি আগের রাতেই ব্যালট বাক্স পূরণ হয়ে যাবে। দিনের বেলা শুধু লোক দেখানো নির্বাচন। যদিও দিনের বেলায় ৫ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দিতে যায়নি। রাতের ভোটে আপনি পাস। এরপর জোর গলায় বলে বেড়িয়েছেন জনগণ আওয়ামী লীগকে চায়। এ কারণেই তারা আওয়ামী লীগকে বারবার ভোট দেয়। আপা আপাগো, দেশের মানুষ যা দেখে তার উল্টোটা আপনি বলে বেড়ান সভা-সমাবেশে। তা শুনে মানুষ হাসে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে আপনার একটি সাক্ষাৎকার। যেখানে আপনাকে বলতে শোনা যায়- আমি প্রধানমন্ত্রী হলে সপ্তাহে একদিন টিভিতে দেখতে পাবেন। আপনার এ কথা যে কতোটুকু মেনেছেন তা জাতি দেখেছে। এভাবেই আপনি নিজের দেয়া কথা বেমালুম ভুলে যান। তবে কেন? আপা, এর উত্তরটা আপনার কাছে চাই। দয়া করে বলবেন কি?

Wednesday, January 8, 2025
প্রশ্নটা বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছেই by শামীমুল হক
অন্তরের আপা, আমার হাসু আপা, তখন আমার লালনের একটি গানের কলি মনে পড়েছে। ‘সে কি চিনে মানুষ রতন/দরগাতলায় মন মজেছে/শিরনি খাওয়ার লোভ জাগাতে...’। সত্যি আপা আপনি মানুষ চিনেন নি। যারা আপনার দরগায় মন-প্রাণ ঢেলে দিয়েছে তাদের প্রত্যেকের ছিল শিরনি খাওয়ার লোভ। তারা শিরনি খেয়েছে। আপনার বারটা বাজিয়ে ছেড়েছে। আর তা না হলে গোটা দেশটাকে বঙ্গবন্ধুময় করে তুলতেন না আপনি। আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু। আকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট আর পাতালে বঙ্গবন্ধু টানেল। ভাস্কর্য থেকে শুরু করে স্কুল, মাদ্রাসা, সড়ক, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, স্মারক পদও রয়েছে। তাছাড়া অনেক কিছু করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামে। যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে সেটা কী জরুরি ছিল? বঙ্গবন্ধুকে চেনাতে? বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গবন্ধুই। তার সঙ্গে কারও তুলনা হতে পারে? আপনিই বলুন। এতক্ষণে হয়তো আপনি বলবেন কি এমন করেছি? তাহলে একটু নমুনা তুলে ধরি আপনার সামনে। বঙ্গবন্ধুর নামে কি করেছেন। আর এই নামকরণ করাই ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য কাল। আচ্ছা সড়ক দিয়েই শুরু করি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অফিস যে পাড়ায় সে পাড়ার নাম বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। এ সড়কের নাম অবশ্য আপনি দেননি। বাংলাদেশ হওয়ার পর জিন্নাহ এভিনিউ বাদ দিয়ে এ নামটি হয়েছে। এরপর দেখুন ফরিদপুরে রয়েছে বাংলাদেশ মুুুুজিব সড়ক। সাভারে রয়েছে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু সড়ক। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে রয়েছে বাংলাদেশ শেখ মুজিব সড়ক। সিরাজগঞ্জে রয়েছে বাংলাদেশ শেখ মুজিব সড়ক। এ নামকরণ থেকে পাহাড়ও বাদ যায়নি। তাই তো বান্দরবানে করা হয়েছে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সড়ক। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু সড়ক। যশোরে রয়েছে বাংলাদেশ মুজিব সড়ক। গোপালগঞ্জে রয়েছে মুজিব সড়ক। ঠাকুরগাঁওয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু সড়ক। দেশে এত সড়ক বঙ্গবন্ধুর নামে হওয়ার পরও শখ মেটেনি। দেশের বাইরে রয়েছে শিকাগোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেখ মুজিব ওয়ে। কলকাতায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরণি। নয়াদিল্লিতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সড়ক। তুরস্কের আঙ্কারায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুলবার্ড। এবার একটু দেখা যাক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কতো বার ব্যবহার হয়েছেন। ভাসানী নভোথিয়েটার থেকে ভাসানী বাদ দিয়ে করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার। চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল। ঢাকার কুর্মিটোলায় করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার। গাজীপুরে করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি। খুলনার রূপসায় করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। টাঙ্গাইলে রয়েছে বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস। রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র ফ্রিগেট বানৌজা বঙ্গবন্ধু। নভো-উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১। স্মারক পদ হিসেবে রয়েছে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্-এ রয়েছে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। ব্রাজিলের ব্রাসিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে রয়েছে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। কানাডার সাস্কাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু চেয়ার। পোল্যান্ডের ইয়াগোলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু সেন্টার। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু সেন্টার। এবার দৃষ্টি দেয়া যাক সেতুর নামকরণের দিকে। প্রথমেই আসি যমুনা সেতুর দিকে। যমুনা সেতু নামটি বাদ দিয়ে আপনি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু সেতু। অবশ্য বর্তমান সময়ে আবার সেতুটি তার পূর্বের নাম ফিরে পেয়েছে। দেশের পুরনো স্টেডিয়াম যেটা গুলিস্তানে অবস্থিত সেটার নামও দিলেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। সবই যখন দিলেন দ্বীপ কেন বাদ যাবে? দিলেন বঙ্গবন্ধু দ্বীপ। এবার ভবনের দিকে তাকালে কী দেখতে পাই? চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রকে নাম দিলেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র। যেটা আগারগাঁও, শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত। আবার পূর্বাচলে নামকরণ করলেন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র। ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনে রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর। ঢাকায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু চত্বর স্মৃতিস্তম্ভ, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার। ফরিদপুরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্কোয়ার। এবার কিছুটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানকার কী অবস্থা। শুরুতেই পিজি হাসপাতালের নাম বদলে করলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া ঢাকায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি। গাজীপুরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়। গোপালগঞ্জে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। লালমনিরহাটে বয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়। কিশোরগঞ্জে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়। পিরোজপুরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। মেহেরপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয়। নওগাঁয় রয়েছে বঙ্গবন্ধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। টাঙ্গাইলে রয়েছে বঙ্গবন্ধু টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ঢাকায় রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজ। গাজীপুরে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কলেজ। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে রয়েছে ফরিদগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ। কুমিল্লায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু কলেজ। খুলনায় বঙ্গবন্ধু কলেজ। মাদারীপুরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ল’ কলেজ। সাতক্ষীরার কলারোয়ায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ। রাজশাহীতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ। নীলফামারীতে রয়েছে শিমুলবাড়ী বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ। গোপালগঞ্জে রয়েছে সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ। গোপালগঞ্জে আরও একটি রয়েছে সরকারি শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। জামালপুরে সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ। পঞ্চগড়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব-ইন্দিরা মহাবিদ্যালয়। চট্টগ্রামে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল। নীলফামারীতে রয়েছে আম্বরি বঙ্গবন্ধু বিদ্যালয়। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়। চট্টগ্রামে রয়েছে কৈবল্যধাম হাউজিং এসেস্ট বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়। গোপালগঞ্জ সদরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়। পটুয়াখালীর গলাচিপায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে রয়েছে কাকবাসিয়া বঙ্গবন্ধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নোয়াখালীর কবিরহাটে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে রয়েছে হেঞ্চি বঙ্গবন্ধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়। চট্টগ্রামে রয়েছে পোমরা বঙ্গবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এত যখন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর নাম বাদ যাবে কেন? সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল। হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল হল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হল, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হল, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হল, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হল, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হল।
প্রিয় হাসু আপা, এত কিছুর পরও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ’ নামে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। এ ছাড়া মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সাল থেকে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগকে (বিপিএল) বঙ্গবন্ধু বিপিএল নামে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে শেখ মুজিবের নামে ২০২০ সালে বাংলাদেশ গেমসের ৯ম আসরের নামকরণ ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস’ করা হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন গেমস স্থগিত ঘোষণা করে। পার্ক ও উদ্যানেও বঙ্গবন্ধু! গাজীপুরে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, কক্সবাজারে ডুলাহাজরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, ফরিদপুরে রয়েছে মুজিব উদ্যান। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রধানত বাংলা ও পাশাপাশি অন্যান্য ভাষায় বিপুল সংখ্যক রচনা, বই, পুস্তিকা রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠান ও বিষয়বস্তুর নামকরণ শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে করা হয়েছে। তার জীবনের উপর বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে- ১৯৭২: হি ইজ্ ব্যাক। যা ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের উপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৭২: বাংলাদেশ, শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ গঠনের কর্মকাণ্ডের উপর যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টিভি কর্তৃক নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৭২: ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ- শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র। বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের উপর ভিত্তি করে এটি নির্মাণ করেন। ১৯৭৩: শেখ মুজিবুর রহমান, দ্যা ফাদার অফ বেঙ্গল-জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা পরিচালিত শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড ও পরবর্তী পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৭৩: ‘ওয়েলকাম বঙ্গবন্ধু’- জাপানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের উপর ভিত্তি করে জাপানের মাইনিচি প্রডাকশনস-এর প্রযোজনায় নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ২০২২ সালে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে অবস্থিত জাপানের দূতাবাস, ‘বঙ্গবন্ধুর জাপান সফর’ শিরোনামে বাংলা অডিও এবং জাপানি সাবটাইটেল সহ প্রামাণ্যচিত্রটির ডিজিটালি রিমাস্টার করা সংস্করণ প্রকাশ করে। ১৯৯৬: চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু- শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের উপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ১০ই আগস্ট বি এম সালাউদ্দিনের প্রযোজনায় এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৫ই আগস্ট প্রচারিত হয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে প্রামাণ্যচিত্রটি ডিজিটাল ফিল্মে পুনঃনির্মিত হয়। সেই অন্ধকার, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের উপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ, বিশ্বজিত সাহা ও শ্যামল দত্ত পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র। ২০১০: দ্যা স্পিচ- শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণের বিশ্লেষণ নিয়ে ফাখরুল আরেফিন খান পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে ভাষণ রেকর্ডিংয়ের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে সংরক্ষণের ঘটনাসমূহ। ২০১২: অসমাপ্ত মহাকাব্য- শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ উপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ২০১৪: মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রযোজনায় শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের উপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাসিনা: এ ডটার’স টেল’ তথ্যচিত্রে শেখ হাসিনা নিজ ভাষ্যে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিবৃত করেন। ২০১৯: বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু, মুজিববর্ষ উপলক্ষে শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নির্মিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র। ২০২১: বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সৈয়দ সাবাব আলী আরজু পরিচালিত শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র। এটি ‘শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্র’ শাখায় ৪৫তম আসরে বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ২০২৩: দ্য অ্যাসাসিন নেক্সট ডোর, কানাডিয়ান ডকুমেন্টারি সিরিজ দ্য ফিফথ এস্টেট-এর একটি পর্ব, শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতক নূর চৌধুরীর উপর প্রকাশিত হয়েছিল। চলচ্চিত্রও হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। ১৯৭৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘সংগ্রাম’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন শেখ মুজিবুর রহমান। চলচ্চিত্রটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবদানকে দেখানো হয়েছে। ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত পরিচালিত ‘যুদ্ধশিশু’ নামক ভারতীয় বাংলা-হিন্দি চলচ্চিত্রে প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০২১: ‘তারুণ্যের আলোক শিখা’, শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ২০২১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘টুঙ্গিপাড়ার মিয়া ভাই’ চলচ্চিত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেখানো হয়। ২০২০ সালে ‘আগস্ট ১৯৭৫’ নামে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনা নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। যা ১৫ই আগস্ট ২০২০ সালে মুক্তির পরিকল্পনা থাকলেও করোনা মহামারিজনিত জটিলতার কারণে এর মুক্তির তারিখ পিছিয়ে যায়। ২০২১ সালের ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ২০২১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী অবলম্বনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘চিরঞ্জীব মুজিব’ নির্মাণ করা হয়। এটি ২০২১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর মুক্তি পায়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চিত্রিত হয়। ২০২৩: ‘বঙ্গমাতা’, শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের উপর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনির আহমেদ শাকিল। ২০২৩: ‘দুঃসাহসী খোকা’ মুশফিকুর রহমান গুলজারের পরিচালনায় সরকারি অনুদানে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম থেকে কৈশোর ও যৌবনের সময়কে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩: ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি বাংলা, হিন্দি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। ২০২৪: ‘৫৭০’, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড পরবর্তী দাফন পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টার ঘটনাবলী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র। ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, বঙ্গবন্ধুর উপর নির্মিত চিত্রপরিচালক এখলাস আবেদিন পরিচালিত চলচ্চিত্র। এ ছাড়া শেখ হাসিনার লেখা বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ অবলম্বনে তৈরি হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য দ্বিমাত্রিক (টু-ডি) অ্যানিমেশন ‘মুজিব আমার পিতা’ চলচ্চিত্রটি। এটি পরিচালনা করেছেন সোহেল মোহাম্মদ রানা। ১৯৯৬: নিশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি, কায়েস চৌধুরী পরিচালিত শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নির্মিত প্রথম নাটকভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র। ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রামাণ্যচিত্রটি প্রচারিত হয়। শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টার লন্ডনের অর্থায়নে লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তার স্বলিখিত রাজনৈতিক উপন্যাস “পলাশী থেকে ধানমণ্ডি” অবলম্বনে ২০০৭ সালে একই নামে একটি টেলিভিশন চলচ্চিত্র তৈরি করেন, যেখানে শেখ মুজিব চরিত্রে অভিনয় করেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১: ২৮৮ দিন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবন্দি জীবনের উপর নির্মিত মঞ্চনাট্য। ২০২১: অভিশপ্ত আগস্ট, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের উপর নির্মিত বাংলাদেশ পুলিশ নাট্যদলের মঞ্চায়ন। মঞ্চনাট্যটির পরিকল্পনা, গবেষণা ও তথ্য সংকলন করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের এডিশনাল আইজি হাবিবুর রহমান। রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক মো. জাহিদুর রহমান। এ ছাড়া একাধিক অ্যানিমেশন, গান, সাহিত্য, মুদ্রা ও স্ট্যাম্প, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত একশত টাকার ব্যাংকনোট।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এভাবে মেতে ওঠাও ছিল একটি ভুল। এতে করে বঙ্গবন্ধু বরং ছোট হয়েছেন। যার পরিণতিতে দেখা গেল ৫ই আগস্ট।

Saturday, November 30, 2024
স্বৈরাচারের কামড় এবং সোহেল তাজ by শামীমুল হক
দেশ এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে একের পর এক দাবি আদায়ের নামে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। এমনটা কেন হচ্ছে? এ প্রশ্ন সর্বত্র। গত প্রায় ষোল বছরে পুলিশ প্রশাসন, সিভিল প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে স্বৈরাচারের দোসররা কামড় দিয়ে বসেছে। এ অবস্থায়ই দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আর স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালায় তার দোসরদের রেখে। এখন ভিন দেশে বসে দোসরদের নির্দেশ দিচ্ছে দেশকে কীভাবে ব্যর্থ করা যায়। কীভাবে ধ্বংস করা যায়। বিভিন্ন সময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ফাঁস হওয়া কথাবার্তায় তা স্পষ্ট। সর্বশেষ ইসকনকাণ্ডে তার বিবৃতিও এটাই প্রমাণ করে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী সোহেল তাজ তার ফেসবুক পেইজে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে সরাসরি তিনি স্বৈরাচারকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন-হত্যা, গুম, খুন, গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, গণতন্ত্র ধ্বংস করে, দুর্নীতি করে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে, দেশটাকে শেষ করে ছাত্র-জনতার ঝাঁটাপেটা খেয়ে পালিয়ে গিয়ে এখন দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে। ও কতো বড় নির্লজ্জ বেহায়া দেশটাকে এক মুহূর্তের জন্য শান্তিতে থাকতে দিবে না। প্রথমে ডিজিটাল জুডিশিয়াল ক্যু-এর চেষ্টা, তারপর একের পর এক অপচেষ্টা- আনসার বাহিনী দিয়ে, ব্যাটারি রিকশা, নূর হোসেন দিবসে ট্রাম্পকার্ড, ঋণ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শাহবাগে মানুষের জমায়েত করার চেষ্টা, বিভিন্ন কলেজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আর এবার ধর্মীয় সমপ্রীতি নষ্ট করে লাশের উপর ক্ষমতায় ফিরে আসার চেষ্টা। সোহেল তাজ লিখেন- দুইটা বই সবাইকে পড়তে অনুরোধ করবো: ১. আমার ফাঁসি চাই। ২. অন্তরালের হত্যাকারী প্রধানমন্ত্রী। এই দুইটা বই মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর লেখা। স্ট্যাটাসে সোহেল তাজ লিখেন-নীতি আদর্শ বিচ্যুত খারাপ মানুষের প্রশংসা আমার প্রয়োজন নাই- আমি আপাদেরকে চিনি।
বি.দ্র.: আওয়ামী লীগের ব্রেইন ওয়াশড নষ্ট পচা নীতি/আদর্শ বিচ্যুত লুটেরা খুনি হত্যা গুম নির্যাতনকারীদের সমর্থক সকলকে বলবো অনতিবিলম্বে আমার এই ফেসবুক পেইজটি আনফলো করতে- আর অনুরোধ থাকবে নিজের বিবেককে জাগিয়ে আত্মোপলব্ধি আত্মসমালোচনা করে অনুশোচনা করার। সোহেল তাজ এক সময় এই দলের এমপি ছিলেন। হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও। যদিও এই মন্ত্রিত্ব তার কাছে হয়ে উঠেছিল বিষাদময়। তার পিতা ছিলেন মুজিবনগর সরকার বা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ গ্রহণ করেন। ১২ই জানুয়ারি ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভা কার্যকর ছিল। শেখ হাসিনা যখন ভিন্ন দেশের আশ্রয়ে তখন সোহেল তাজের মা জোহরা তাজউদ্দীন ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট। আওয়ামী লীগের হাল ধরে তিনি দলকে এগিয়ে নিয়ে যান অনেকদূর। দুঃখের বিষয় হলো-এই তাজউদ্দীনকেই এক সময় বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়া হয়। আর শেখ হাসিনার আমলে সোহেল তাজ বাধ্য হয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আর কেন ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তার সঙ্গে শেখ হাসিনার আচরণ সবই তিনি মিডিয়ার সামনে তুলে ধরেছেন। দেশের প্রতি তার পরিবারের আত্মত্যাগ, তার পরিবারের অবদান শেখ হাসিনাই স্বীকার করেন না। তাইতো শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে হাজারো বার বলেছেন এই দেশটা আমার বাবা স্বাধীন করেছে। এমনভাবে বলতেন যেন তার পিতা একা দেশটা স্বাধীন করেছে। অন্য কারও কোনো ভূমিকা ছিল না। অথচ দেশটাকে স্বাধীন করতে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এ যুদ্ধে তার বাবাকে অস্ত্র ধরতে হয়নি। এ যুদ্ধ করতে গিয়ে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। সম্ভ্রম হারিয়েছেন দুই লাখ মা-বোন। আর তার পিতা ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলে দেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হয়। কিন্তু এ আত্মসমর্পণ নিয়েও কতো নাটক হয়েছে সবাই জানেন। দেশ স্বাধীনের এক বছরেরও বেশি সময় পর ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরেন। কারাভোগের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে তিনি ৮ই জানুয়ারি মুক্তি লাভ করেন। পরে তিনি পাকিস্তান থেকে লন্ডন যান এবং দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরেন। তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ের লেখা বইয়ে উল্লেখ রয়েছে দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে একই গাড়িতে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন ফিরছিলেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু বলেন, তাজউদ্দীন আমার তো প্রধানমন্ত্রী হতে মন চাইছে। তাজউদ্দীন বললেন, হবেন। তাই হয়েছিলেন। দুইদিন যেতে না যেতেই ১২ই জানুয়ারি তাজউদ্দীনের মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত করে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গঠন করেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হলো সে উদ্দেশ্য থেকে বঙ্গবন্ধু সরকার বিচ্যুত হয়ে পড়েন। দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। নিজ দল আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে গঠন করেন বাকশাল নামে নতুন দল। এই বাকশালে দেশের সকল সরকারি- বেসরকারি মানুষকে সদস্য হতে বাধ্য করেন। দেশে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব বন্ধ করে দেন। ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। যে চারটি পত্রিকা রাখা হয়েছিল সেগুলোও বঙ্গবন্ধুর চাটুকারীতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এরপর ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট দেশের ইতিহাসে নির্মম হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় তারা বেঁচে যান।
আওয়ামী লীগ সবসময়ই ছিল স্বাধীন মত প্রকাশের বিরোধী। এটা প্রমাণিত সত্য। শেখ হাসিনার গত প্রায় ষোল বছরের শাসনামলে দেশবাসী তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিরোধী দলগুলো কোনো কথা বলবে তাতেও বাধা। একদলীয় শাসন থেকে নিষ্ঠুরতম স্বৈরশাসকে পরিণত হন হাসিনা। পরপর তিনটি নির্বাচন তার আমলে হয়েছে যা ছিল নির্বাচনের নামে তামাশা। নির্বাচনের পরদিন শেখ হাসিনা আবার নির্লজ্জের মতো আওয়ামী লীগকে পুনরায় ভোট দিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেন। তা শুনে মানুষ হাসতেন। গুম, খুন, মামলা, হামলার সংস্কৃতি গড়ে তুলেন দেশে। ছাত্রলীগকে হামলার কারিগর হিসেবে লাইসেন্স দিয়ে দেন। তাই তো প্রকাশ্যে দিনে- দুপুরে ছাত্রলীগ বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করলেও তাদের কিছু হয় না। বিশ্বজিৎকে যখন কোপানো হচ্ছিল তখন ছাত্রলীগ বলছিল সে শিবিরের লোক। অথচ বিশ্বজিৎ চিৎকার করে বলছিলেন আমি শিবির নই। আমি হিন্দু। প্রয়োজনে আমার প্যান্ট খুলে দেখতে পারেন। কিন্তু ছাত্রলীগ কারও কথা শুনেনি। অন্যদিকে এ হত্যাকাণ্ডের পর কোনো হিন্দু নেতাকে প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিতেও দেখা যায়নি। কিন্তু এখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা নিজের প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে হিন্দু নেতাদের কেউ কেউ জেগে উঠেছেন। তারা রাজপথে নেমে আসেন হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে বলে। কিন্তু দেশবাসী জানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কোনো হামলা হয়নি। বরং বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশেই হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমান সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি শান্তিতে রয়েছে। তবে দু’একটি হামলার ঘটনা যে ঘটেনি তা কিন্তু নয়। এ হামলা ছিল রাজনৈতিক। অবশ্যই ধর্মীয় নয়। দেশে এখনো স্বৈরাচারের দোসররা রয়েছে। কিন্তু তারা নীরবে নিভৃতে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর কীভাবে তা করছে বৃহস্পতিবার সোহেল তাজ তার ফেসবুক পেইজের স্ট্যাটাসে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, প্রথমে ডিজিটাল জুডিশিয়াল ক্যু-এর চেষ্টা করা হয়। তারপর একের পর এক অপচেষ্টা-আনসার বাহিনী দিয়ে, ব্যাটারি রিকশা, নূর হোসেন দিবসে ট্রাম্পকার্ড, ঋণ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে শাহবাগে মানুষের জমায়েত করার চেষ্টা, বিভিন্ন কলেজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আর এবার ধর্মীয় সমপ্রীতি নষ্ট করে লাশের উপর ক্ষমতায় ফিরে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সবখানেই ব্যর্থ হয়েছেন হাসিনা। তিনি তারপরও বসে নেই। আবার কোন খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেখ হাসিনা একমাত্র তিনিই জানেন। হাসিনার একমাত্র ইচ্ছা দেশটাকে ধ্বংস করা। অন্যথায় তিনি তার নেতাকর্মীদের বলে দিতেন এখন তোমরা চুপ থাকো। সময়মতো মানুষের কাছে যাবে। তাদের হৃদয় জয় করবে। গত ষোল বছরের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে। যদিও এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনাসহ তার দলের কোনো নেতা ষোল বছরের আকামের জন্য অনশোচনা করেছেন কিংবা দুঃখ প্রকাশ করেছেন- এমন কথা শোনা যায়নি। যারা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে এত কার্পণ্য করে তাদের দিয়ে আর কিছু হবে বলে মনে হয় না। এ কারণেই হয়তো আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী দল। যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে তখনই দেশ স্বৈরশাসনের কবলে পড়েছে। শেখ হাসিনা তো নিজে স্বৈরাচার হয়েছে আবার তার সঙ্গে টেনে নিয়েছে আরেক স্বৈরাচার এরশাদের দল জাতীয় পার্টিকে। দুই স্বৈরাচার মিলে দেশটাকে লুটেপুটে খেয়ে ফোকলা করে এখন দেশছাড়া হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সকল দলকে এক কাতারে এসে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে দলমত নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। হাতে হাত রেখে দেশ রক্ষার শপথ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে ছাত্র- জনতার রক্তের বদলে পাওয়া নতুন বাংলাদেশকে হারতে দেয়া যাবে না।

Friday, August 23, 2024
বেহুদা প্যাঁচাল: যেভাবে পতনের দরজা খোলেন হাসিনা by শামীমুল হক
আর ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর ভিশন-২১০০ নিয়ে ভাবনা তুলে ধরেন। অর্থাৎ আজীবন তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। তবে আপাতত ২১০০ পর্যন্ত তার ভিশন নিয়ে এগিয়ে যাবেন। এমন ভাবনাও কি সম্ভব? মানুষের এক সেকেন্ডেরও নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই। যাই হোক- যিনি নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতেন। অন্য সবাইকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেন। বাংলাদেশের হর্তাকর্তা- সেই তিনি এমনভাবে ধপাস করে পড়বেন- এটাই ছিল অকল্পনীয়। অবিশ্বাস্য। যার রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধ আর রাজাকার। আরও ছিল বিএনপি-জামায়াত। তার কথার প্রতিবাদ করলেই দেয়া হতো রাজাকার তকমা। নিজেরা প্রকাশ্যে আকাম করে বলতেন এগুলো বিএনপি-জামায়াতের কাজ।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে উস্কিয়েছেন নিজেরাই। এখানেও বিএনপি- জামায়াত দেখেছেন ওনারা। সব ঠিকঠাক চলছিল। একটি বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তার স্বভাবভঙ্গিতে আন্দোলনকারীদের হুমকি দেন। বলে উঠেন, এই ছাত্রদের দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। কাদেরের এ কথায় ছাত্রলীগ উজ্জীবিত হয়। হামলে পড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর। নির্মম নির্যাতন চালায়। নারী শিক্ষার্থীরাও রেহাই পায়নি ছাত্রলীগের রোষানল থেকে। আহতদের নিয়ে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অন্য শিক্ষার্থীরা তখন সেখানেও হাজির হয় শ’দুয়েক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। তারা সেখানেও হামলা চালায়। নারকীয় এমন ঘটনায় ফুঁসে উঠে ছাত্রসমাজ। ফুঁসে উঠে গোটা দেশ। পরদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয়া সবাই লাঠি নিয়ে হাজির হন শাহবাগে। এদিনও হামলা চালায় ছাত্রলীগ। কিন্তু বিধিবাম! ছাত্রলীগ কুলিয়ে উঠতে পারেনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। সকল শিক্ষার্থী এক হয়ে হলে হলে অভিযান চালায়। ছাত্রলীগের কোনো নেতাকে পেলেই ধাওয়া দেয়। কাউকে কাউকে প্রহার করে। ছাত্রলীগ সভাপতির রুমে তল্লাশি চালায়। করা হয় ভাঙচুর। সেই যে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে আজও ক্যাম্পাস ছাড়া। ফের কখন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ প্রবেশ করতে পারবে আল্লাহ মালুম। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সবক’টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে উঠে। যেন প্রতিটি ক্যাম্পাস আগুনের গোলা। রাস্তায় ছাত্র-জনতার মিছিল। এই মিছিলেই রংপুরে ঘটে এক ঘটনা। শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দু’হাত মেলে ধরে পুলিশের দিকে। বলে গুলি করেন। আবু সাঈদ ভেবেছিলেন এই পুলিশই তো আমার আপনজন। আমার মতো কারও বাবা। কোনো বাবা কী তার পুত্রকে গুলি করতে পারে? আবু সাঈদের বিশ্বাস মুহূর্তেই ভেঙে যায়। যাকে বাবা বলে বিশ্বাস করেছিলেন সে যে সাঈদের আজরাইল সে কি জানতো। দু’হাত মেলে ধরা অবস্থায় প্রথম গুলি করে। তারপরও আবু সাঈদ দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর আরও গুলি চালায়। এ দৃশ্য গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। উত্তাল হয়ে উঠে দেশ। শিক্ষার্থীদের পাশে নেমে আসে আমজনতা। মিছিলে মিছিলে উত্তাল সারা দেশ। সেই মিছিলে চলে পুলিশের গুলি। পুলিশের সঙ্গে মিশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগও গুলি চালায়। মৃত্যুর সংখ্যা মিনিটে মিনিটে বাড়তে থাকে। আহত হন অসংখ্য ছাত্র- জনতা। ঢাকার এমন কোনো হাসপাতাল নেই যেখানে আহতদের ভর্তি করা হয়নি। এমন কোনো হাসপাতাল নেই যেখানে লাশ ছিল না। সারা দেশ অগ্নিকুণ্ডলীতে পরিণত হয়।
আচ্ছা, কোটা আন্দোলন থেকে সরকারের পদত্যাগ দাবির একদফাতে কেন গেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা? কারণ একটাই গণহত্যা। নির্বিচারে পুলিশের গুলিতে চোখের সামনে শত শত সহযোদ্ধার মৃত্যু তাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সরকারের সরাসরি নির্দেশে এমন গণহত্যা কেউ মেনে নিতে পারেনি। মানবজমিনে প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে- কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে। আন্দোলন দমাতে সরকারি কোনো কৌশলই যখন কাজে আসছে না। তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৪ দলীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। ১৯শে জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। বামঘেঁষা দু’জন নেতা বলেন, ছাত্রদের এই আন্দোলন মার্কিন ষড়যন্ত্র। এটাকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারি করতে হবে। বাকিদের বেশির ভাগই রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দেন। কেউ কেউ আলোচনার কথাও বলেন। শেখ হাসিনা হার্ডলাইনে যাওয়ার পক্ষেই মত দেন। দেশব্যাপী কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত দেন। যেখানেই মিছিল সেখানেই গুলি করার নির্দেশনাও আসে।
এ বৈঠকের পরই দেয়া হয় কারফিউ। মাঠে আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলি চলতে থাকে অনবরত। লাশ পড়তে থাকে একের পর এক। এসব ঘটনায় হাসিনাবিরোধী হয়ে পড়ে গোটা দেশ। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ ষোল বছরের আওয়ামী লীগের অপশাসনে অতিষ্ঠ ছিল দেশের বেশির ভাগ মানুষ। সরকারের সুবিধাভোগী ছাড়া কেউই এই সরকারের পক্ষে ছিলেন না। কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কিত ছিল অভিভাবকরা। কখন পুলিশ এসে শিবির বলে ধরে নিয়ে যায়। এমন বহু ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ। আশপাশে এমন উদাহরণ ভূরিভূরি। কোনো রাজনৈতিক দল না করেও শিবির বানিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। যারা মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে পেরেছে তাদের ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। আর যারা দিতে পারেনি তাদের জেল খাটতে হয়েছে দিনের পর দিন। আর যারা সত্যিকারের শিবির করেছে তারা গত ষোল বছর একদিনের জন্যও ঘরে ঘুমাতে পারেনি। আর প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি’র এমন কোনো নেতা নেই যার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। শেখ হাসিনার আমলে নতুন কায়দায় মামলার রূপ দেখেছে দেশবাসী। যা হলো গায়েবি মামলা। কোনো ঘটনা ঘটেনি। বোমা বিস্ফোরণ হয়নি। অথচ এ ব্যাপারে মামলা হয়েছে শত শত। আর আসামি হয়েছে বিএনপি’র লাখ লাখ নেতাকর্মী। এ ছাড়া গুমের সংস্কৃতিও ব্যাপক হারে চালু হয় শেখ হাসিনার আমলে। চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জোরপূর্বক অপহরণ ও গুমের ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। একের পর এক জুলুম জনগণের কাঁধে চাপিয়ে শেখ হাসিনা সুকৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষকে মুখোমুখি করে তুলেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলতেন আওয়ামী লীগের নেতার মতো। এরা যে সাধারণ মানুষের সেবক সেটি ওরা ভুলে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর খড়্গ চালিয়েছে। আর দুই হাতে টাকা কামিয়েছে। এরাই শেখ হাসিনাকে ডুবিয়েছে অনেকখানি। শেখ হাসিনার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনে পৃথিবীর সকল স্বৈরাচারকে হার মানিয়েছে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর কেউ নমরুদ, ফেরাউনের চেয়েও হাসিনা ভয়ঙ্কর এমনটা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচিতও হয়েছে হাসিনার সরকার। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংস করে ফেলা হয় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আইনের আওতায় কাজ না করে ক্ষমতাসীনদের আদেশ মেনে কাজ করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নানা উপায়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় আওয়ামী সরকার দীর্ঘ ষোল বছর জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে পুরোদমে। আর দুর্নীতির মাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশছোঁয়া। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে দুর্নীতি ছিল না। এ ছাড়া শেখ হাসিনার আয়না ঘর দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় তোলে।
বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম করে রাখা হতো এই আয়না ঘরে। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর আয়না ঘর থেকে বেশ ক’জন বেরিয়ে আসে। তাদের মুখের বর্ণনা ইতিমধ্যে দেশের মানুষ শুনেছেন। কি এক নির্মম বয়ান তাদের মুখে। শুনলে গা শিউরে উঠে। চোখের পানি গড়গড়িয়ে পড়ে যে কারও। এরমধ্যে একজন রয়েছেন জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযমের ছেলে। যিনি কিনা নিজেই সেনাবাহিনীর লোক ছিলেন। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও ছিল আলোচনার বিষয়। এ ধরনের গুমের ঘটনার মাধ্যমে শুধুমাত্র বিরোধী পক্ষ এবং সমালোচকদের ভয় দেখিয়ে চুপ করতে বাধ্য করেছিল তা নয় বরং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে সক্ষম সাধারণ নাগরিকদেরও কণ্ঠরোধ করেছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই এখনো নিখোঁজ। নারায়ণগঞ্জে র্যাব-১১ কর্তৃক তুলে নিয়ে সেভেন মার্ডারের কথা দেশের মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি।
বল প্রয়োগের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল সরকারের অন্যতম কৌশল। এবং তা করে গেছে শেখ হাসিনার সরকার অবলীলায়। প্রকাশ্যে তা বলেছেনও। এ জন্য র্যাবকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। কেউ কেউ এখন বলছেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে দোজখে পরিণত করেছিল। দেশে আইন ছিল, কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ না হয়ে অপপ্রয়োগ হয়েছে সর্বক্ষেত্রে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে নানা চাপে রাখা হয়েছে সাংবাদিকদের। কাউকে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সংসদে মিডিয়ার মুখ বন্ধ করতে আইন পর্যন্ত করা হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে করে ফেলেছেন। আবার বড় গলায় বলেছেন জনগণের ভোটে আমরা নির্বাচিত হয়েছি। অথচ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ ভাগ। কোনো কোনো কেন্দ্রে সারাদিনেও কেউ ভোট দিতে যায়নি। গৃহপালিত নির্বাচন কমিশন অবশ্য সবসময় দেখিয়েছে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। আসলে শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে বোকা ভেবেছিলেন। আর কথায় কথায় কান্না ছিল তার আরেক নাটক। ষোল বছরে কতো হাজার মায়ের কোল খালি করেছেন একমাত্র তিনিই জানেন। শেষ ভাষণে এসে তিনি এটা অজান্তে স্বীকারও করেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, স্বজন হারানোর ব্যথা কী এটা আমি বুঝি। তার ভাষণের পর আন্দোলনে থাকা এক মা কোনো টিভি পর্দায় বলছিলেন শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর ব্যথা বুঝেন ঠিকই। কিন্তু সন্তান হারানোর ব্যথা বুঝেন না। কারণ তার তো কোনো সন্তানকে হারাতে হয়নি। হাসিনা মনে করতেন তিনি যে ‘কাউয়া চালাক’ এটা কেউ বুঝতে পারছে না। তিনি যা বলবেন সেটিই বেদবাক্য। অথচ তার কথা শুনে মানুষ হাসতেন। এভাবে কখন যে তিনি বিশ্বের স্বৈরাচারের তালিকায় এসে যান তিনি নিজেই জানেন না। শেষ কথা হলো- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। দেশকে সংস্কার করেই তাদের ঘরে ফিরতে হবে। দেশের মানুষ এটাই চায়। সংস্কার হোক সর্বত্র। সব জায়গায়।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2185)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...