Wednesday, March 4, 2015

খালেদার গ্রেপ্তারে সঙ্কট বাড়বে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে এই পরোয়ানা জারি করে। সরকার ও বিএনপি উভয় পক্ষই জরুরি ভিত্তিতে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ না নিলে রাজনৈতিক সঙ্কট দেশকে মারাত্মক অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা ব্রাসেলস ভিত্তিক বেসরকারি শক্তিশালী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) এ কথা বলেছে। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্কট পর্যালোচনা করে বাংলাদেশকে রেখেছে ‘কনফ্লিক্ট রিস্ক এলার্ট’-এ। একই অবস্থা ইয়েমেনের। আইসিজি একটি নিরপেক্ষ, অলাভজনক সংগঠন। তারা বিশ্বের ভয়াবহ সব সংঘাত প্রতিরোধ ও তা সমাধানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২রা মার্চ তারা ক্রাইসিস ওয়াচ বা সঙ্কট পর্যবেক্ষণের অধীনে তাদের মাসিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলেছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট অব্যাহত আছে। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য এটা ভয়াবহ এক হুমকি। বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ডাকে সারা দেশে অবরোধ চলছে জানুয়ারির প্রথম দিক থেকে। এতে নিহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তাকে গ্রেপ্তার করা হলে সহিংসতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ৬ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডকে মধ্যপ্রাচ্যের জিহাদি গ্রুপ ইসলামিক স্টেট ( আইএস, আগের নাম আইসিল) -এর সঙ্গে তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে দেখা গেছে সঙ্কট সমাধানের জন্য সুশীল সমাজের উদ্যোগ। দেশব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভসহ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সুপরিচিত জুরিস্ট, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে একটি নতুন কমিটি। তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে সংলাপে বসার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। গঠনমূলক সংলাপে বসতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। ঢাকায় নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছেন খালেদা জিয়া। ১১ই ফেব্রুয়ারি সেখানে খাদ্য ও পানীয় নিতে অস্থায়ীভাবে বাধা দেয় পুলিশ। নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরিরের পোস্টার প্রকাশ করার জন্য ১৮ই ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার করার জন্য গঠন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। ‘বিতর্কিত’ ওই আদালত ১৮ই ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নেতা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই মুক্তির একমাত্র পথ -এমাজউদ্দীন

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ‘রাজনীতি থেকে প্রতিপক্ষকে মুছে ফেলা কখনোই সম্ভব নয়। একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনেও সেটা করা যায়নি। স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট বা নাৎসি শাসনেও ভিন্নমত ছিল। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করে বা বিভিন্ন শাসনামলে শক্তি প্রয়োগ করেও ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করা যায়নি। রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যই হলো এই যে, এখানে বহু মানুষ বহুমত ও পথ গ্রহণ করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ও  ক্রিয়াশীল থাকেন।’’
সোমবার মানবজমিনকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রবীণ  রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “হত্যা, নির্যাতন, হামলা, মামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধনের উদ্যোগ সম্পূর্ণ ভুল পথ। এ পথে চললে পদে পদে বিপদ বাড়বে; সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হবে।” বাংলাদেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “এখানে শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত জনমানুষের মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের বিপুল-বিশাল কর্মী-সমর্থক রয়েছে। এটাই বিদ্যমান বাস্তবতা। এই বাস্তবতার বাইরে গিয়ে শক্তি দিয়ে বা জোর করে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও বিন্যাস বদলানো যায় না। বরং বাস্তবতা মেনে পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে ‘পিসফুল কো-অ্যাকজিসটেন্স’ বা ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ই সঙ্কট মুক্তির একমাত্র পথ।”
বাংলাদেশের চলমান তীব্র ও সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক সঙ্কটের সম্ভাব্য সমাধান প্রসঙ্গে প্রফেসর এমাজউদ্দীন বলেন, “সর্বজনগ্রহণীয় নির্বাচন হলো বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় উত্তরণের বৈধ ও পরীক্ষিত পন্থা। ভোটারবিহীন, নিয়মরক্ষার নির্বাচন সেটা করতে পারে  না। সবার অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনই সঙ্কট-সমস্যার অবসান ঘটাতে পেরেছে এবং ভবিষ্যতেও পারবে। এখানে ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছা বা একগুয়েমি নয়, সুষ্ঠু নির্বাচনী সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া-আসার নীতিকে মান্য করাই প্রধান কথা। এই কথাটি রাজনীতিবিদরা মেনে নিলে সঙ্কট থাকার কথা নয়।” তিনি বলেন, “৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে প্রায়-অর্ধেক এসেছেন ভোট ছাড়াই। বাকি অর্ধেক শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগের বেশি ভোট পেয়েছেন বলে দেশে বা বিদেশে কেউই স্বীকার করছেন না। যে নির্বাচনে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ ভোটই দিতে পারলো না এবং সব দল অংশও নিলো না, সে নির্বাচন শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্রে পৌঁছার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করতে পারবে না। বরং একটি সত্যিকারের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত জনমতের ভিত্তিতে নির্বাচিত নেতৃত্বই সমস্যা ও সঙ্কট দূরীকরণে সফল হতে পারবেন।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, গণতান্ত্রিক সুশাসনের প্রধান কাজ হলো জনমনে স্বস্তি আনা, আইনের নৈর্ব্যক্তিক শাসক প্রতিষ্ঠা করা, দলীয় বা আঞ্চলিক স্বজনপ্রীতির বা বলপ্রয়োগের নীতি পরিহার করা, মত প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা। বাংলাদেশের অগ্রজ নেতৃবৃন্দ এবং সংগ্রামী জনতা এমন আদর্শের জন্যই বৃটিশ-পাকিস্তানি আমলে নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন; প্রয়োজনে জীবন দান করেছেন। বাংলাদেশের সমগ্র জনতাই এমন গণতান্ত্রিক সুশাসনের স্বপ্ন আর প্রত্যাশা তাদের বুকে ও চেতনায় ধারণ করেন। ফলে ঐতিহাসিকভাবেই গণতান্ত্রিক সুশাসনের বাইরে ভিন্ন বিকল্প বা বিকৃত পদ্ধতি বা শক্তির দাম্ভিকতা বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-অঞ্চল নির্বিশেষে কারোপক্ষেই মেনে নেয়ার কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, “সঙ্কট যেমন থাকে; তেমনি থাকে সমাধানও। কখনো সমাধান ধীরে আসে; কখনো দ্রুত। এর মানে হলো, সমস্যা কখনোই চিরস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত, সঙ্কট ও সমস্যাসমূহ অবশ্যই সমাধানের আওতায় আসবে এবং সেটা সুনিশ্চিতভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক-সুশাসনমুখী চিরায়ত-প্রত্যাশার আলোকেই সম্পন্ন হবে।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ড. মাহফুজ পারভেজ

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ১০ বছর স্থগিত রাখতে হবে : ওবামা

একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আগামী এক দশক ধরে স্থগিত রাখা উচিত বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। পাশাপাশি ইরানের এই কর্মসূচি নিয়ে ইসরাইলি তৎপরতারও সমালোচনা করেছেন তিনি।
সোমবার সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, ইরানের পরমাণু কার্যক্রমের ওপর চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে তেহরান সরকারকে এর কার্যক্রম কমপক্ষে ১০ বছর স্থগিত রাখতে হবে।
এদিকে এ চুক্তির বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার জন্য ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন পৌঁছেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার তার মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেয়ার কথা।
ইরানের পরমাণু কার্যক্রম সম্পর্কে তেলআবিব এবং তেহরান দু’পক্ষের কেউই সঠিক অবস্থানে নেই বলেও উল্লেখ করেছেন ওবামা। তিনি আরও বলেন ‘আমরা দেখেছি ইরান তাদের কর্মসূচিতে অগ্রসর হতে পারেনি। তারা এর প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।’ তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধ দু’দেশের সম্পর্ককে ‘স্থায়ীভাবে ধ্বংস’ করতে পারবে না বলেও দাবি করেছেন ওবামা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চুক্তির ঘোর বিরোধিতা করছে ইসরাইল। এ নিয়ে সোমবার সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে ওবামা বলেন, গত বছরও এ চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন নেতানিয়াহু। তার এ ধরনের বিরোধিতাকে ভুল পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘সম্ভাব্য এ চুক্তিটি ভয়াবহ হবে বলে দাবি করেছেন নেতানিয়াহু। এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ছাড় পাবে ইরান। কাজেই তেহরান সরকারের পক্ষে এ চুক্তির শর্তাবলী এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।’ রিপাবলিকান দলের স্পিকার জন বোহেনার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে এ বক্তব্য রাখার জন্য নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক দলের নেতারা। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে পরামর্শ না করেই নেতানিয়াহুর ভাষণের পরিকল্পনা করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এটি বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানা গেছে, ইসরাইলকে সরবরাহকৃত কিছু তথ্য ফাঁস করতে পারেন নেতানিয়াহু। জন কেরির পক্ষ থেকে তার মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেছেন, ‘আমাদের তথ্য প্রকাশ করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা হবে।’
ওবামার বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য-ইরান : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ তার দেশের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকার জনগণকে ধোঁকা দেয়ার লক্ষ্যে ইরান বিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে ওবামা এ বক্তব্য দিয়েছেন।

সোয়াইন ফ্লু

সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় জানা যায়, সোয়াইন ফ্লুর প্রকোপ তার রাজ্যেও দেখা দিয়েছে। উদ্বিগ্ন সফররত মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন, শিগগিরই এই ফ্লুর মোকাবেলা করে সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসবে তার রাজ্য।
সোয়াইন ফ্লু পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশব্যাপী সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেছেন। কিন্তু সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সোয়াইন ফ্লু শনাক্তকারী রি-এজেন্টের অভাবে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে অনেকটা ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার-এর লোককথার মতো। গত ১৮ ফেব্র“য়ারি সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জরুরি ভিত্তিতে সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধে জরুরি করণীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার যুগান্তরে প্রকাশিত স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশও কাজে আসছে না শীর্ষক সংবাদে জানা যায় উপরোল্লিখিত বাস্তব পরিস্থিতি। দেশের ৬৪ জেলার হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট খোলার নির্দেশও দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী; তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধ ইউনিট গঠন বিলম্বিত হয়েছে অনেক জেলাতেই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দরে স্থাপিত থার্মাল স্ক্যানারগুলো ভারত থেকে আসা যাত্রীদের জ্বর পরীক্ষার কাজে লাগানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের স্থলবন্দরগুলোতে মেডিকেল টিম গঠন করা হলেও সোয়াইন ফ্লু পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্র নেই। সোনামসজিদ স্থলবন্দর, দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে ইমিগ্রেশন, দর্শনা-জয়নগর ইমিগ্রেশন চেকপোস্টসহ দেশের অন্য স্থলবন্দরগুলোর অবস্থা প্রায় একই। অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধ টিমগুলো গঠিত হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধের অভাবে সেগুলো ঠুঁটো জগন্নাথ ভূমিকা পালন করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ ও বিদ্যমান বাস্তবতা থেকে এটাই উপলব্ধি করা যায় যে, সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধে মন্ত্রী, ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্ট সবারই সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে; কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের সামর্থ্য একেবারেই শূন্যের কোঠায়। এটা একটা দুঃখজনক বাস্তবতা। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে গত ৪৪ বছরে কতটুকু এগোলো রাষ্ট্র? সামান্য ফ্লু প্রতিরোধের সামর্থ্য অর্জন করল না? আমরা আশা করি, স্বাস্থ্য বিভাগের এই অসামর্থ্য দূরীকরণে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা হবে। মানুষের জীবন এতটা হেলাফেলায় দেখলে চলবে না।

সুব্রামানিয়াম জয়শংকরের সফর

ভারতের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে এলে দেশবাসী আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে- তিনি দু’দেশের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়ে কোনো বার্তা নিয়ে এসেছেন কিনা। ভারতের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শংকরের সফরেও মানুষ আশা করেছে, তার এ সফরে বহু কাক্সিক্ষত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে অগ্রগতি জানা যাবে। কারণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্রুত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আশ্বাসবাণী দিয়েছেন। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশ সফরের সময়ও এ বিষয়ে তার সদিচ্ছা ব্যক্ত করে গেছেন। এ প্রেক্ষাপটে কবে এসবের বাস্তব রূপ দেখতে পাবে মানুষ, সেই অপেক্ষার পালা। এ সংক্রান্ত কর্মতৎপরতার দিকে মানুষের দৃষ্টি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
জয়শংকরের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হকের কাছ থেকে এটুকু জানা গেছে যে, তিস্তা নিয়ে ভারতের কাছে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, তিস্তার পানিপ্রবাহ বর্তমানে সর্বনিু পর্যায়ে রয়েছে। এতে সংকটে পড়েছে চলতি বোরো মৌসুমের কৃষকরা। অন্যদিকে স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় দু’দেশের ছিটমহলের অধিবাসীদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। জয়শংকরের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যসহ দু’দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়, উপ-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। বস্তুত এটি ছিল ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের একটি শুভেচ্ছা সফর। গত ২৯ জানুয়ারি সুব্রামানিয়াম জয়শংকর এ পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তাই শুভেচ্ছা দূত হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় সফরে পাঠিয়েছেন। জয়শংকর রোববার ভুটান সফর শেষ করে বাংলাদেশে আসেন। এ সফর শেষে তিনি যাবেন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেছেন। ওই চিঠিতে মোদি বলেছেন, তিনি আগ্রহের সঙ্গে ঢাকা সফরের অপেক্ষা করছেন। হতে পারে ওই সফরের সময়েই স্বাক্ষরিত হবে তিস্তা চুক্তি। তাই দ্রুত নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।
২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে চুক্তি আর স্বাক্ষরিত হয়নি। বস্তুত এ সমস্যার সমাধান না হওয়া ছিল বাংলাদেশের জনগণের জন্য হতাশাজনক। পরবর্তী সময়েও মমতার বিভিন্ন বক্তব্যে এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ভারতের ক্ষমতা কেন্দ্রে পরিবর্তনের পর তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণ নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। মমতার মনোভাবেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বস্তুত নরেন্দ্র মোদি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। তাই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধানের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বর্তমানে। তবে শুধু তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর এবং সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন নয়- বাণিজ্য, পর্যটন, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানসহ সব ক্ষেত্রেই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। এজন্য আমাদের শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতাও আরও জোরদার করতে হবে।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৬ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিলেতি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলন নামেও পরিচিতি পায়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলনে শহর ও গ্রামগঞ্জে প্রকাশ্যে বিলেতি দ্রব্য পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হয়। স্বদেশী আন্দোলনের ফলে বিদেশী পণ্যের চাহিদা অনেক হ্রাস পায়। ১৯০৬ সালে সরকারি বিবরণ থেকে জানা যায়, বিলেতি সাবান, লবণ, সুতি কাপড় ও সিগারেটের আমদানি অনেক কমে গিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে স্বদেশী তাঁত বস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়ার দ্রব্য।
উপরের আন্দোলনগুলো পরিচালিত হওয়ার পরও সরকারের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না আসায় কংগ্রেসের চরমপন্থী দল বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা ও কলকাতাকে কেন্দ্র করে ঢাকার অনুশীলন সমিতি ও কলকাতার যুগান্তর পার্টি ছিল বৈপ্লবিক আন্দোলনের দুই প্রধান শক্তিশালী সংগঠন। এই বৈপ্লবিক সংগঠনের যুবকেরা অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং ইংরেজ সমর্থকদের হত্যা করে একটি তীব্র সংকট সৃষ্টি করার পদক্ষেপ নেয়। ১৯০৮ সালে বাংলার গভর্নর এন্ড্রু ফ্রেজার এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। বিপ্লবীরা প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ডের গাড়িতে হামলা চালালে তার স্ত্রী ও কন্যা নিহত হন। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়লে প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। ১৯০৮ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে বিপ্লবীদের গুলিতে বহুসংখ্যক ইংরেজ, পুলিশ কর্মকর্তা এবং তাদের দেশীয় সহযোগী নিহত হয়।
মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন (১৯০৯) : বাংলা তথা ভারতের রাজনীতি যখন এভাবে উত্তপ্ত হচ্ছিল, তখন মুসলমানদের দাবি ব্রিটিশ সরকার নতুনভাবে বিবেচনা করার চিন্তা করে। এরই ফল হিসেবে ১৯০৯ সালে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন বাস্তবায়ন করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ভারতের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায় স্বাধিকার লাভের জন্য যে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছিল তা ব্রিটিশ শাসকদের প্রবলভাবে ভাবিয়ে তোলে। এ কারণেই তারা শাসনতন্ত্রে নানা ধরনের সংস্কার এনে ভারতীয় জনসাধারণ ও নেতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে, যার মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের ধারণা প্রকাশ পেয়েছিল। ভারতবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সাংবিধানিক সংস্কারের। মুসলমান নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থা। এ পরিস্থিতিতে ১৯০৬ সালের অক্টোবরে আগা খানের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধিদের একটি দল লর্ড মিন্টোর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। ওই স্মারকপত্রে দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে এবং মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের বদলে রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুসারে তাদের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে জন মর্লি ও লর্ড মিন্টো একটি সংস্কার চিন্তার রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ১৯০৯ সালে এই রূপরেখা ইন্ডিয়া অ্যাক্ট হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। মর্লি ও মিন্টোর নামানুসারে তা পরিচিত হয় ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন নামে। এ আইনের কতগুলো শর্ত ছিল। এগুলো হচ্ছে- ক. জনস্বার্থে ভারতীয় নেতৃবর্গ সরকারকে সহযোগিতা করবে, খ. গভর্নর জেনারেল বা বড়লাটের কার্যনির্বাহী পরিষদে একজন ভারতীয় প্রতিনিধি রাখা হবে, গ. বাংলার গভর্নরের একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হবে এবং ঘ. এই পরিষদে কিশোরী লাল গোস্বামীকে নিযুক্ত করা হবে।

খালেদা জিয়ার আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তার নিয়ে ধোঁয়াশা- আদালতে যেতে দুই শর্ত

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আজ মঙ্গলবার দেখা করতে
তাঁর গুলশান কার্যালয়ে যান ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস
ব্লুম বার্নিকাটসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকেরা। ছবি-বিএনপির সৌজন্যে
সরকার পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসহ নিজ কার্যালয়ে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ বুধবার আদালতে যেতে পারেন। এমনটা জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি।’ খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। আদালত তাঁকে জেলেও পাঠাতে পারেন, আবার জামিনও দিতে পারেন। এদিকে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় আজ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় কয়েক দিন ধরে উদ্বেগের মধ্যে আছেন বিএনপির নেতারা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তারা কোনো সবুজ সংকেত পায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল রাত পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বাসায় তল্লাশি বা তাঁকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা আসেনি। এ ব্যাপারে পুলিশের কোনো প্রস্তুতিও নেই।
এ ছাড়া নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের মিছিলে ককটেল হামলার মামলায় খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশির জন্য আদালত থেকে পুলিশ অনুমতি পেলেও কবে-কখন তল্লাশি করা হবে, সেটাও কর্মকর্তারা নিশ্চিত করছেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশির পরোয়ানা থানা পুলিশের হাতে এসেছে। তবে কখন তল্লাশি করা হবে, সেটা সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের ব্যাপার।
এর আগে গত সোমবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছিল, খালেদা জিয়া আদালতে হাজির না হলে পুলিশ পরোয়ানা অনুযায়ী তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নিয়ে যেতে পারে। গতকাল পরিস্থিতি একটু পাল্টে যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে যাওয়ার পর বিএনপির নেতাদের উদ্বেগ কিছুটা কমে আসে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালতে আজ বুধবার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এ দুটি মামলায় এর আগের তারিখে হাজির না হওয়ায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এ-সংক্রান্ত আদালতের আদেশ ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কোনো আদেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেনি পুলিশ। জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার লুৎফুল কবীর গতকালও প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এখনো সংশ্লিষ্ট থানায় আসেনি। তবে পরোয়ানার কথা তাঁরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুনেছেন।
এ অবস্থায় খালেদা জিয়া আজ আদালতে যাবেন কি না, এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং জামিন পেয়ে আবার নিজ কার্যালয়ে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে নিজ চেম্বারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘মনে হচ্ছে খালেদা জিয়াকে জনবিচ্ছিন্ন করতে তিনি রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বের হলে আর সেখানে ঢুকতে দেওয়া হবে না। তার পরও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে এবং সরকার এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটাবে না, তিনি যদি জামিন পান তাহলে নিজ কার্যালয়ে ফেরত আসতে পারবেন, স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা পেলে খালেদা জিয়া অবশ্যই আদালতের প্রতি সন্মান দেখিয়ে সেখানে হাজির হবেন।’
খন্দকার মাহবুব আরও বলেন, ‘এখন এখানে দুটি বিষয়। বর্তমান যে বিচারিক আদালত আছে, সেই আদালতের ওপর আমরা অনাস্থা দিয়েছি। এটি সচরাচর অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। এই অনাস্থার ব্যাপারে হাইকোর্টে একটি দরখাস্ত করেছি। সেই দরখাস্তটি বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য আসবে। এখন প্রশ্ন হলো, যে আদালতের প্রতি আমরা অনাস্থা দিয়েছি, সে ব্যাপারটি উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় আছে। এটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচারিক আদালতের পক্ষে আইনগতভাবে বা নৈতিকতার দিক থেকেও ওই মামলার শুনানি হতে পারে না। কেননা, তার প্রতি অনাস্থা দিয়েছি।’
মাহবুব হোসেন বলেন, তার পরও যদি আদালতে হাজির হতে হয়, আত্মমসর্পণ করতে হয়, খালেদা জিয়া অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রতিদিন তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা ঘেরাও করে রাখছে। এমনকি বর্তমান সরকারের একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রীর নেতৃত্বে তাঁর বাড়ি ঘেরাও করা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে তিনি নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন।
খালেদা জিয়া দুই মাস ধরে তাঁর কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। বিএনপির দাবি, তাঁকে ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখা হয়েছে। শুরুতে নেতা-কর্মীদের ওই বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হলেও ২ ফেব্রুয়ারি থেকে সেখানে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের ভয়ে এখন আর নেতা-কর্মীরা সেখানে যাচ্ছেন না।
এদিকে খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা স্থগিত চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে সম্পূরক আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁর আরেক আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১৫ জানুয়ারি বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। আদালত পরিবর্তনের জন্য তাঁর পক্ষে হাইকোর্টে ২৮ জানুয়ারি দুটি আবেদন করা হয়। গত সোমবার হাইকোর্টে তা উপস্থাপন করা হয়। ৫ মার্চ শুনানির জন্য তালিকায় আসবে।
সাংবাদিকেরা মাহবুব হোসেনের বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মাহবুব উদ্দিন বলেন, ‘উনি শর্ত দিয়েছেন। উনি ঠিকই বলেছেন, ওনার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত নেই। এই শর্ত সরকার থেকে স্পষ্ট করলে অসুবিধা নেই বলে মনে করি।’
কোকোর চেহলাম আজ: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর চেহলাম আজ বুধবার। এ উপলক্ষে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে আজ সারা দিন কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে। চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান গত রাতে প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আরাফাত রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনায় খালেদা জিয়া দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।
প্রসঙ্গত, আরাফাত রহমান কোকো গত ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

তিস্তা নিয়ে মোদীকে চিঠি দিলেন মমতা

তিস্তার পানিবণ্টন সঙ্কট সমাধানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই জট কাটাতে সহযোগীতার কথাও চিঠিতে জানিয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এ সংবাদ জানিয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, তিস্তা নিয়ে তিনি যে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির বিরোধী নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়ে সে কথা জানিয়ে দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ঢাকা সফর থেকে ফিরে লেখা এই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এই চুক্তি নিয়ে জট কাটাতে তিনি সহযোগিতাই করতে চান।
সব ঠিক থাকলে এপ্রিল মাসেই ঢাকা সফরে যেতে চান প্রধানমন্ত্রী। পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্করের হাত দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন মোদী। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সফরের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন। মোদী হাসিনাকে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় যেতে চান তিনি। ১৯৯৬-এর ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে হাসিনার সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি করার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে সঙ্গে রেখেছিলেন, তিস্তা চুক্তিতেও মমতাকে ঠিক একইভাবে সঙ্গে নিয়ে চলতে চাইছেন মোদী। এই নীতি মেনেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াতেও তিনি তামিলনাড়ুকে সঙ্গে রাখছেন।
বাংলাদেশ থেকে ফিরেই মমতা নিজে তাঁর সফরের খুঁটিনাটি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, তাঁর সফর ইতিবাচক হয়েছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি যে হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছেন, সে কথাও প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে ভোলেননি মমতা। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পানির হিস্যা নিয়ে দু’পক্ষেরই কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে। এই চুক্তি নিয়ে যে জট পাকিয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমেই কাটিয়ে ফেলা সম্ভব। এ বিষয়ে সহযোগিতার প্রস্তাবও দিয়েছেন মমতা। সরকারি সূত্রের খবর, ৯ তারিখে মোদী-মমতা বৈঠকেও তিস্তা চুক্তি ও বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলি উঠবে।
এত দিন নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বাক্যালাপটুকুও সযত্নে এড়িয়ে এসেছেন মমতা। সম্প্রতি মোদীর ডাকা নীতি আয়োগের বৈঠকে তিনি নিজে তো যানইনি, রাজ্যের কোনও প্রতিনিধিও পাঠাননি। কিন্তু সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআইয়ের তদন্তে কোণঠাসা মমতা তাঁর এক সময়ের ডান হাত মুকুল রায়ের বিজেপিতে যোগ দেওয়া নিয়ে জল্পনা শুরু হতেই সুর পাল্টেছেন। মোদীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব কমানোর চেষ্টাও চোখে পড়ছে। ঢাকা সফরের আগে দিল্লিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সম্মানে দেওয়া প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নৈশভোজে মোদীর মুখোমুখি হয়েছিলেন মমতা। অনেকের মতে মোদীর সঙ্গে দেখা করতেই সে যাত্রা দিল্লিবাসের মেয়াদ বাড়িয়েছিলেন তিনি। এর পর অতি সম্প্রতি মোদীর সঙ্গে বৈঠকের জন্য তাঁর সময় চেয়েছেন মমতা। এই প্রেক্ষাপটেই তিস্তা নিয়ে মমতার চিঠি তাঁর নরম অবস্থানের আরও একটি উদাহরণ বলে মনে করা হচ্ছে। এবং তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও আশার আলো দেখছে কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্রের মতে, মমতার এই চিঠির পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণে আর কোনও বাধা থাকবে না।
কিন্তু সারদা নিয়ে চাপ কাটাতে মমতা যদি শেষ পর্যন্ত তিস্তা চুক্তিতে রাজি হয়ে যান, তা হলে উত্তরবঙ্গবাসীদের পানির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকছে। উত্তরবঙ্গের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষবাস তিস্তার জলের ওপর নির্ভরশীল। সিকিম এমনিতেই তিস্তার জলের একটা বড় অংশ নিয়ে নেয়। তার পর বাংলাদেশের ভাগ দিতে হলে রাজ্যের ভাগে কতটুকু পানি জুটবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
অনেক রাজনীতিকের মতে, শুধু সারদা নয়, খাগড়াগড় কাণ্ডের পরে বাংলাদেশে তাঁর সম্পর্কে যে বিরূপ ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে তা কাটানোও লক্ষ্য মমতার। সে জন্য গোড়ায় তিনি ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তিতে সায় দিয়েছেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সফরে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ঢাকাকে শুধু আশ্বাসই দিয়ে আসেননি, দেশের প্রতিনিধি হিসেবে হাসিনা সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি রূপায়ণের পথ নির্দেশিকা নিয়েও আলোচনা করেছেন। ঢাকার ভারতীয় হাই-কমিশনার পঙ্কজ সারন এই আলোচনায় আগাগোড়া মমতার সঙ্গে ছিলেন। মমতা ঢাকায় থাকাকালীনই একরকম আলোচনা শুরু করে দিয়েছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার। তার পরে পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্কর ঢাকায় পৌঁছে নানা বিষয়ের সঙ্গে তিস্তা নিয়েও কথা বলেছেন বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে। এতদিন দিল্লির বিরুদ্ধে তিস্তা চুক্তি নিয়ে টালবাহানার হালকা নালিশ করে এলেও কাল লক্ষ্যণীয়ভাবে ঢাকা জানিয়েছে, এ বিষয়ে দিল্লির তৎপরতায় তারা সন্তুষ্ট।
তিস্তা চুক্তি বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখনই নির্বাচন নেই। গত বছর নির্বাচনের আগে যখন এই চুক্তি করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল, তখনই এ দেশে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদে আটকে যায় বিষয়টি। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। আগামী বছর মে মাসের মধ্যে ভোট হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের গোড়ায় মমতা তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত দিতে পারেন বলে কূটনীতিকদের একটা অংশ মনে করছেন। আবার কারও কারও ধারণা, কলকাতা ও অন্য নির্বাচনগুলিতে সাফল্য এলে মমতা নির্ধারিত সময়ের আগে এ বছরের শেষেই বিধানসভা ভোটে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আরও আগে তিনি এই চুক্তি নিয়ে রাজি হয়ে যেতে পারেন।
তবে দিল্লির কূটনৈতিক মহলের একটি অংশ বলছে, ভোটের সঙ্গে বিষয়টির কোনও সম্পর্ক নেই। মমতা এ বছরেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু, রাজ্য বঞ্চিত হবে এই যুক্তিতে এত দিন মমতা যে তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছেন, কোন যুক্তি তুলে আবার সেটিকে মেনে নেবেন, তা নিয়ে কৌতূহলী সকলেই। সূত্রের খবর, মমতা শেখ হাসিনাকে বলেছেন তিনি তিস্তা চুক্তির বিরুদ্ধে নন।
কিন্তু ইউপিএ জমানায় রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলোচনা না-করে কেন্দ্র যে ভাবে চুক্তিটি করতে চলেছিল, তাতে এ বাংলার উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। কেন্দ্রের সচিবরা অনেক বুঝিয়েও তাকে এ বিষয়ে নরম করতে পারেননি। বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি তাকে বোঝাতে কলকাতায় এলে তার সঙ্গে মমতার কথা কাটাকাটি হয়। ফলে তিস্তা চুক্তিও বিশ বাঁও পানির তলে চলে যায়। এ বারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কলকাতায় গিয়ে মমতার সঙ্গে কথা বলেছেন। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজেও মমতার সঙ্গে ডোভালের বাংলাদেশ নিয়ে কথা হয়। মমতার বক্তব্য, তিস্তার জলের ভাগ কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা হোক। এই আলোচনার মাধ্যমেই একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছনো যাবে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এর আগে ইউপিএ আমলে চুক্তির খসড়া তৈরির সময়ে দেশের নিরাপত্তার যুক্তি তুলে রাজ্যের প্রয়োজনের বিষয়টি খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা।

এক বছরেই মোদি-হাওয়া পাল্টাচ্ছে by মাসুমুর রহমান খলিলী

এক বছরের কম সময় আগে ভারতে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে ঝড় তোলার পর মোদির বিজেপি পালে হাওয়া যেন উল্টো বইতে শুরু করেছে। সরকার গঠনের পর কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপি সাফল্য পেলেও, এখন একের পর এক বিপর্যয়কর ফল দেখা যাচ্ছে। এমনকি বেশ ক’টি রাজ্যে লোকসভা ও বিধানসভার যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাতেও আশানুরূপ ফল আসছে না বিজেপির পদ্মফুলের অনুকূলে। বরং ভারতীয় কংগ্রেস লোকসভার বিপর্যয় কাটাতে না পারলেও আঞ্চলিক দলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে লক্ষ করা যাচ্ছে নতুন নতুন মেরুকরণ।
লোকসভা নির্বাচনের পর যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে মহারাষ্ট্র হরিয়ানা আর ঝাড়খণ্ডে বিজেপি তার অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে পেরেছে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে লোকসভা নির্বাচনে সাফল্যের পথ ধরে কংগ্রেস জোটকে হারিয়ে সরকার গঠন করেছে এনডিএ। যদিও সেখানে বিজেপির সাথে শরিক দল শিবসেনার চলছে টানাপড়েন। হরিয়ানায়ও কংগ্রেসের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে পেরেছে বিজেপি। বাকি দুটো রাজ্যে আগে থেকেই বিজেপির সরকার ছিল। তারা এবারো ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। এর বাইরে জম্মু কাশ্মীরে হিন্দু অধ্যুষিত জম্মুতে সাফল্য পেলেও কাশ্মীর উপত্যকার একটি সিটও পায়নি বিজেপি। ফলে তাদের ক্ষমতায় যেতে পিডিপি’র জুনিয়র পার্টনার হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসে সদ্য অনুষ্ঠিত দিল্লি বিধানসভার নির্বাচন। এই নির্বাচনে ৭০টি আসনের মধ্যে ৬৭টিতে জয় পায় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (আপ)। লোকসভার সাত আসনের মধ্যে যেখানে সব ক’টিতে বিজেপি জয় পেয়েছিল, সেখানে বিধানসভায় এভাবে গো-হারা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর বিজেপি উভয়ের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচনের ফলাফল বিজেপির স্বপ্নযাত্রায় যেন আরো বড় আঘাত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত বনগাঁওয়ের লোকসভা উপনির্বাচনে দুই লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছে তৃণমূল। একই সাথে কৃষ্ণপুরের বিধানসভা উপনির্বাচনে ৩৭ হাজারের বেশি ব্যবধানে জিতেছে তৃণমূল। এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। সারদা কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে বিজেপি তৃণমূলকে তছনছ করার যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, তার মাঝপথেই এসেছিল এই উপনির্বাচন। নির্বাচনের আগে মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে যেন দলত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। কেউ সারদার আঘাত থেকে বাঁচতে কেউবা তৃণমূলের ‘ডুবন্ত তরী’ থেকে সময়ের আগেই লাফ দিতে চেয়েছিল। এমনকি রাজ্যে মমতার ডান হাত বলে খ্যাত আর ইন্ডিয়া তৃণমূলের সেক্রেটারি মুকুল রায়ের দলত্যাগের গুঞ্জনও দিন দিন বাড়ছিল। এ সময়ে উপনির্বাচনের এই ফলাফল এক দিকে যেমন মমতার জন্য স্বস্তিকর, অন্য দিকে তেমনি শাসক দল ভেঙে ২০১৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ দখলের গেরোয়া স্বপ্নে একটি বড় ধরনের আঘাত।
সারদা কেলেঙ্কারি দিয়ে তৃণমূল বধ করার প্রচেষ্টায় মনে হয় উল্টো ফলই এসেছে। বরং মমতা সারদার কর্ণধারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া এবং অন্যভাবে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার যে প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, তার প্রতি ভোটারদের আস্থার প্রকাশ পেয়েছে। বিজেপির সামনে এই বার্তা গেছে যে, সারদা দিয়ে তৃণমূলের সামনে খড়ক দাঁড় করানোর ফলাফল বিজেপির জন্য উল্টো ফলতে পারে। বছরখানেক পর পশ্চিম বঙ্গের নতুন বিধানসভা নির্বাচন আসার আগে হয়তো পানি আরো অনেকদূর গড়াবে। তত দিনে মোদি-হাওয়া আরো শীতল হয়ে যাবে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে গেরোয়া পতাকা উড়ানোর স্ব^প্ন অধরা থেকে যাওয়ার বার্তাই এখন মিলছে।
২০১৫ সালের নভেম্বরে নির্বাচন হবে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য বিহারে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি খেলার নতুন ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছে। লোকসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার দলের একবারে নি¤œবর্ণের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নেতা জিতেন রাম মানজিকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন। লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডির সাথে সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি এই পদক্ষেপ নিলেও শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, নিজের ক্ষমতাকে ধরে রাখতে তিনি বিজেপির সাথে গোপন যোগসূত্র তৈরি করেছেন। শেষ পর্যন্ত জেডিইউ’র এমপিদের এক সভায় তাকে দল ও মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে গ্রহণ না করে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ধরে রেখেছে তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আস্থা ভোটে নিতিশেরই জয় হওয়ার কথা। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার জিতেনের পরামর্শে বিধানসভা ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি এবং নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে। অথবা আস্থা ভোটে জিতেন ও নিতিশের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পারে। অন্তরাল থেকে বিহারে বিজেপির জন্য এই খেলাধুলার ফল খুব একটা ভালো বলে মনে হচ্ছে না।
রাজ্যটিতে বিগত লোকসভা নির্বাচনে নিতিশের জেডিইউ এবং লালু প্রসাদের আরজেডি-কংগ্রেস জোটের মধ্যে ভোট বিভাজনের সুযোগে বিজেপি ও রাম বিলাস পাসোয়ানের কোয়ালিশন ভালো ফল করে। এখন নিতিশ লালুর সমঝোতা রাজ্যে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে। জিতেন তার সহযোগীদের নিয়ে আলাদা দল তৈরি করার পর তাদের সাথে কোনো সমঝোতা করলেও বিহারে বিজেপি ভালো কিছু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।
২০১৬ সালের মে মাসে আসাম কেরালা ও তামিলনাড়–তে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে তামিলনাড়–তে বিজেপির ভালো করার কোনো লক্ষণ নেই। একটি দুর্নীতি মামলায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাকে জেলে পাঠানোর বিষয়টি বিজেপির জন্য খুব ভালো ফল আনতে পারেনি। ফলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জয়ললিতার এআইডিএমকের জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি মনে হচ্ছে।
কেরালায় বিজেপির কোনোকালেই ভালো ফলাফলের রেকর্ড নেই। বিগত লোকসভা নির্বাচনে মোদি-হাওয়ার সময়ও সেখানে বিজেপি কিছুই করতে পারেনি। ভবিষ্যতে তেমন কিছু করতে পারবে এমন সম্ভাবনা নেই। আসামের রাজ্যক্ষমতা দখল করা বিজেপির অন্যতম লক্ষ্য। সেখানে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস সরকার কার্যকর কিছু করতে পারছে না। এই স্থানিক বাস্তবতা ২০১৬ সালে বিজেপিকে একটি ইতিবাচক ফলে লাভের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
২০১৭ সালে অনেক রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, পাঞ্জাব, হিমাচল ও উত্তরাখণ্ড। মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে মোদি বিদায় হওয়ার পর প্রথমবার রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হবে গুজরাটে। এই রাজ্যে বিজেপির শক্ত প্রভাব বলয় থাকায় পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা হয়তো দলটির নেই। তবে অন্য দলগুলো যেকোনো ঐক্য করে সম্মিলিতভাবে নির্বাচন করলে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। আম আদমি পার্টি রাজ্য দখলের জন্য টার্গেট করেছে পাঞ্জাবকে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে সেখানে আপ চারটি আসনে জয় পেয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে সেখানে ভালো ফল করতে পারে দলটি। এখানে বিজেপির প্রভাব প্রতিপত্তি দল ক্ষমতায় থাকার পরও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে।
ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন হবে বিজেপির জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানকার দুই বৃহৎ স্থানিক দল এসপি ও বিএসপির মধ্যে সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এর সাথে কংগ্রেস যুক্ত হয়ে বৃহৎ কোনো নির্বাচনী জোট হলে বিজেপির লোকসভার সাফল্যের ঠিক উল্টো ফল হতে পারে সেখানে।
মাত্র এক বছরের কম সময়ের মধ্যে কেন মোদি-হাওয়া উল্টোমুখী বইতে শুরু করল সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। ভারতের করপোরেট গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় মোদি লোকসভা নির্বাচনের সময় যে আগ্রাসী প্রচারাভিযান চালিয়েছিলেন তার মূল ছিল উন্নয়ন সুশাসন কর্মসংস্থান। এর সাথে অন্তরালে সংঘ পরিবার হিন্দু জাতীয়তাবোধকে জাগাতে চেয়েছিল। ক্ষমতায় যাওয়ার পর মোদি এক বছরেও উন্নয়ন সুশাসনে বা কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সেভাবে কোনো কিছু করতে পারেননি। বরং এর মধ্যে সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ব এজেন্ডা অনেকটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে, যার ফলে সংখ্যালঘু এবং সেকুলার ভারতীয়রা বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বিশেষত আরএসএস প্রধান ভগবত সব ভারতীয়ের পরিচয় হিন্দু হতে হবে বলে উল্লেখ করার পর এ ব্যাপরে মোদির কোনো বক্তব্য না থাকাটা তার এজেন্ডা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করেছে। এর সাথে ভারতের মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচির নামে হিন্দু করে ফেলার যে কর্মসূচি, সেটা মোদি শাসনের ব্যাপারে ভুল বার্তা দিয়েছে। দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে এর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা গেছে। এই আবহ থেকে সরে আসতে হলে হিন্দুত্ব এজেন্ডার রাস টানতে হবে মোদিকে। কিন্তু সংঘ পরিবারের ওপর সে ধরনের প্রভাব মোদি রাখেন কিনা তা নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে।
বিজেপির পালে এই ঠাণ্ডা হাওয়ার কোনো সুফল কিন্তু কোনোভাবেই পাচ্ছে না কংগ্রেস। বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনে তাদের আরো অবক্ষয়ের চিত্র ফুুটে উঠছে। দুই মেয়াদ দিল্লি শাসন করার পরও রাজ্য বিধানসভায় একটি আসনও দখল করতে পারেনি দলটি। ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো প্রয়াসও নজরে আসছে না কারো। এ অবস্থায় তাদের নতুন কিছু করতে হলে রাহুলকে দিয়ে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে তাদের সামনে একমাত্র বিকল্প হলো প্রিয়াঙ্কাকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা। তার খ্রিষ্টান স্বামী রবার্ট ভদ্রকে নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও তার পক্ষে এক ধরনের পুনরুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া হয়তোবা সম্ভব ।
ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতা হলো বিকল্প সেকুলার রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। দিল্লিতে আপের ভমিধস জয়, পশ্চিমবঙ্গে মমতার ভিত শক্ত থেকে যাওয়া, বিহার ও উত্তরপ্রদেশে আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে নতুন মেরুকরণ শক্তিমান তৃতীয় বিকল্প সৃষ্টি করতে পারে ভারতের জন্য। চার প্রদেশের প্রভাবশালী নেতাদের সাথে জয়ললিতা ও নবীন পট্টনায়কের অভিন্ন ফোরাম হলে চার বছর পরের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ভালো একটি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারবে তারা। এটি অবশ্য বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের ওপর অনেকখানি নির্ভর করবে।

বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার জন্যে একটি অগ্নি পরীক্ষা by মিনার রশীদ

৫ জানুয়ারি ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনের যখন তোড়জোর
চলে ওই সময় ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফর অন্য রকম গুরুত্ব বহন
করেছিল। শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্তে ৩০ মিনিটের বেশি সময় আলোচনা
করেন সুজাতা সিং। মনে করা হয়, একান্ত বৈঠকের সময় ভারতের তৎকালীন
কংগ্রেস নেত্বাত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কোনো বার্তা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে
সফরের সময় ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার
লক্ষ্যে বিশেষ দূতিয়ালী করেন সুজাতা সিং। তিনি বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার
জন্য বিশেষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে সেই সাক্ষাৎকারে
জানান খালেদা জিয়া। সেই সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা
জিয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- ভারতের পূর্ববর্তী সরকার নির্বাচনে আপনাকে
সমর্থন না দেয়ায় আপনি কি হতাশ? জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের পররাষ্ট্রসচিব
(সুজাতা সিং) এখানে এসেছিলেন এবং তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, নির্বাচনে
এইচ এম এরশাদের অংশগ্রহণ করা উচিৎ, তা না হলে নির্বাচন হবে না এবং
মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসবে। তিনি আমাদেরও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন,
কিন্তু পারেননি। কেন নির্বাচনে যেতে পারব না, তা আমরা তাকে বলেছিলাম।
আমরা একটা রাজনৈতিক দল, আন্ডারগ্রাউন্ডের দল নই। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে
তাতে অংশগ্রহণের কোনো যুক্তি নেই। এরশাদও প্রকাশ্যে বললেন, তিনি
নির্বাচনে যাবেন না। কিন্তু পরে দেখা গেল, কোনো না কোনো পন্থায় হোক…
আমি জানি না, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না;
অনেকেরই বিশ্বাস যে (এটা হয়েছিল), বিশেষ করে যখন পররাষ্ট্রসচিব
এ রকম কথা বললেন…। এরশাদ পরে বললেন, পররাষ্ট্রসচিব তাকে চাপ
দিয়েছিলেন এবং একমাত্র তারাই (ভারত) এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘ বলেছে, তারা কোনো একদলীয় নির্বাচন সমর্থন
করে না… সেখানে কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষকও ছিলেন না, তাই তারা এটা
গ্রহণ করেনি। এ দেশের জনগণও এটা গ্রহণ করেনি। আর তাই, এটা একটা
অবৈধ সরকার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের শিগগিরই নির্বাচন দিতে বলছে।
আওয়ামী লীগ আমাদের বলছে, তোমরা প্রথমে আমাদের বৈধ সরকার বলে
স্বীকৃতি দাও, এরপর আমরা সংলাপে আসব। সুতরাং, তাদের অবৈধ হওয়ার
বিষয়টি প্রকাশ হয়ে গেছে…। আমি সুষমাকে বলেছি, কোনো দেশ এমন নির্বাচন
দেখেনি, যেখানে পার্লামেন্টের ৩০০ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৫৪ জন (সরকারি হিসেবে
১৫৩ জন) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ২, ৪, ৫ জন হতে পারেন…
তাই বলে ১৫৪ জন? মন্ত্রিসভার সব সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
শেখ হাসিনারও কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না, কিন্তু ডামি প্রার্থী দাঁড় করিয়ে
তারা দেখিয়েছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।’
ইন্ডিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনটি লাভ করা। বর্তমান অবয়বে জন্মের পর থেকে অর্থাৎ ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই এই স্বপ্নটি দেখে এসেছে ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ার সামনে এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কিছু হতে পারে না।
নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমানে যে পাঁচজন স্থায়ী সদস্য রয়েছে, তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি হিসেবে এই মর্যাদা ও আরামের আসনটি সংরক্ষণ করে ফেলেছে। তাদের এ জন্য বিশেষ কোনো পরীক্ষায় বসতে হয়নি। অন্য কারো কাছ থেকে চরিত্রগত সনদ কিংবা অন্য কোনো যোগ্যতার সনদ সংগ্রহ করতে হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে যারা একই অবস্থানে আসতে খায়েশ প্রকাশ করবে, তাদের এসব কঠিন ও জটিল পরীক্ষায় পাস করেই আসতে হবে। এটাই নিয়ম। কারণ ডায়নাকে বিয়ের আগে সতীত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়েছিল। তবে একই বিয়ের জন্য প্রিন্স চার্লসকে তেমন কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি। ব্যাপারটা অনেকটা তেমনি।
জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্য পদ পেতে আগ্রহী প্রার্থীদের জন্য প্রথম ধাপটি হলো, সাধারণ পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি ও সমর্থন অর্জন। এটি অর্জিত হলে পরের ধাপ হলো, খোদ নিরাপত্তা পরিষদের সম্মতি।
এই শর্তগুলো যারপরনাই কঠিন। কারণ নিরাপত্তা পরিষদে যারা আছে, তারা সর্বদা পরস্পর দুটি ব্লক বা মেরুতে অবস্থান করে। পরস্পর মুখোমুখি এই দু’টি পকে একসাথে সন্তুষ্ট করার কাজটি আসলেই কঠিন। কারণ দু’টি শর্তই বানানো হয়েছে যাতে নতুন করে কেউ এখানে ঢুকতে না পারে। তার পরেও যে ক’জন নাছোড়বান্দা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে ইন্ডিয়া অন্যতম।
এই কঠিন কাজটির একটি বিশেষ অধ্যায় অতিক্রম করে ফেলেছে ইন্ডিয়া। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ও চীনের সম্মতি আগেভাগেই নিয়ে রেখেছে। গত ইন্ডিয়া সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন পেতে ইন্ডিয়াকে সমর্থন জানাবেন বলে অঙ্গীকার করে এসেছেন। এখন ‘ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে’ এমন ধরনের কিছু না ঘটলে ইন্ডিয়ার স্বপ্ন পূরণে নিরাপত্তা পরিষদের বাধা বা ঠেকটি আর রইল না।
বলা যায়, ইন্ডিয়ার আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ বিশ্ব পরিসরে ইন্ডিয়ার জন্য মাহেন্দ্রণ উপস্থিত। এখন বাকি চ্যালেঞ্জটি হলো, সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যদের সমর্থনের নিশ্চয়তাটুকু। ১৯২ জন সদস্যের মধ্যে সবার সাথে ইন্ডিয়ার স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। বর বা কনের চরিত্র এবং চালচলন সম্পর্কে জানতে যেমন প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হতে হয়, তেমনি প্রায় পৌনে দুই শ’ সদস্য ইন্ডিয়ার চালচলন ও চরিত্র সম্পর্কে জানতে তার নিকটতম প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ককে বিবেচনায় নেবে, এটাই স্বাভাবিক।
জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বেশির ভাগ দেশই নিরীহ। তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে কম বেশি উদ্বিগ্ন। এদের প্রায় সবাই সমব্যথায় ব্যথী। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্বের শৃঙ্খলে ইতিহাসের দীর্ঘ সময় এদের অনেককেই কাটাতে হয়েছে। চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে। কাজেই দই খাওয়ার আগে ভালো করে চেক করে নেয়। যেকোনো আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী শক্তিকে তারা ভয়, ঘৃণা ও সন্দেহের চোখে দেখে থাকে। যখন তারা সুযোগ পায়, নিপীড়িত নির্যাতিত জাতির দিকে সর্বদা নিজেদের সমর্থন তুলে ধরে। সম্ভবত বিশ্বমানবতা ও নৈতিকতার বাঁশিটি এই সাধারণ পরিষদের কণ্ঠেই বেজে ওঠে। অবশ্য কোনো কিছু কার্যকর করার শক্তি এই পরিষদের হাতে নেই। সে জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর আগ্রাসন নিয়ে আগ্রাসী ইসরাইলের বিরুদ্ধে এ সাধারণ পরিষদে সহজেই নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়ে যায়।
ইন্ডিয়া এই ব্যাপারটি ভালো করেই জানে। নিজের সম্পর্কে আত্মসমালোচনা বা সেলফ অ্যাসেসমেন্ট করেছে। তাই ২০১৩ সালের সাধারণ অধিবেশনে নিরাপত্তা পরিষদে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদে উত্থাপনের সাহস করেনি ইন্ডিয়া। দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য দেশের সমর্থন জুটবে, এমন আস্থা ইন্ডিয়া সঙ্গত কারণেই রাখতে পারেনি। কারণ নিকট প্রতিবেশীর সাথে ইন্ডিয়ার আচরণ নিয়ে সারাবিশ্বের মানুষের মনে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মূলমন্ত্র শান্তি ও নিরাপত্তা (Peace and Security) রক্ষায় ইন্ডিয়ার এই ইমেজটি ততটা উজ্জ্বল নয়। তবে এই স্বপ্নটি পূরণের জন্য মোটামুটি টেনেটুনে একটা ভালোমানুষি অবয়ব বিশ্বসভায় এ যাবত প্রদর্শন করে এসেছে। ছোটখাটো কিছু দাগ থাকলেও চরিত্রে বড় ধরনের কোনো দাগ পড়েনি। কাশ্মিরের সমস্যাকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। ১৯৭১ সালে সবচেয়ে বড় শত্রু পাকিস্তানকে খন্ডিত করার লক্ষ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপ করলেও তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মদানের মতো মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য হয়েছে। যুদ্ধের পর বিজিত ভূখন্ডে সৈন্য রেখে দিতে চাইলেও নিজের এই ইমেজের কথা চিন্তা করে (মুজিব চাহিবা মাত্রই) তা উঠিয়ে নিয়েছে। মাঝখানে স্বাধীন সিকিমকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেও লেন্দুপ দর্জির ভূমিকার কারণে দখলদারের দুর্নামটি ইন্ডিয়ার ঘাড়ে পড়েনি। নেপাল ও ভুটানকে নিজের কব্জায় নিলেও কখনোই দখলদার বা আগ্রাসীর ভূমিকায় নামতে হয়নি। শ্রীলঙ্কার অশান্তিতে কলকাঠি নাড়লেও বা বিভিন্নভাবে ইন্ধন জোগালেও সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি।
বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের একটা প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপরে উল্টো কাজ হিসেবে করছে এমন নয়; এখানে অন্য গণনা কাজ করছে।
সেই গণনাটি হলো, বিশ্বসভায় নিজের ভালো মানুষি প্রদর্শনের তাগিদ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভব করছে ইন্ডিয়া। নির্বাচনের আগে আগে আমাদের অনেক নেত্রী যেমন মাথায় পট্টি বাঁধেন, কেউ কেউ দু’বার আছরের নামাজ পড়েন, গ্রামের ‘আতইরা’কেও জ্বনাব আতর আলী সাহেব বলে ডাক দেন, তেমনি একটা সময় এই গ্লোবাল ভিলেজে ইন্ডিয়ার জন্যও উপস্থিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অদ্ভুত, অবৈধ ও ব্রেইন ডেড একটি সরকারকে (প্রশাসন যার ভেন্টিলেটর হিসেবে কাজ করছে) সমর্থন করা ইন্ডিয়ার নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার শামিল। বিশ্বসভায় যে মুহূর্তে (বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা রায়) তার ভূমিকা আরো উজ্জ্বল করার কথা, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ইন্ডিয়ার মুখে সবচেয়ে বড় দাগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠায় ইন্ডিয়ার নির্লজ্জ সহযোগিতা তাকে ক্রমাগত বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে ।
গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে বাজে নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে সব ধরনের জরিপে উঠে এসেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টিতে কোনো নির্বাচনেরই প্রয়োজন পড়েনি। বাদবাকি আসনগুলোতেও শতকরা পাঁচ ভাগের কম ভোটার ও উপস্থিত হয়েছে। অনেক ভোটকেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। কোনো কোনো ভোটকেন্দ্রে কুকুর ছাড়া কোনো দ্বিপদী প্রাণী দেখা যায়নি। গৃহপালিত বিরোধী দলকেও মহাসার্কাস করে পোষ মানানো হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র প্রমুখ বিশ্বসংস্থা ও বিশ্বশক্তি বারবার এই নির্বাচন নিয়ে তাদের অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গণতান্ত্রিক বিশ্বের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখান থেকে প্রশ্ন ওঠেনি। সব আন্তর্জাতিক সংস্থা মুক্ত, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস কয়েক দিন আগে এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের মন্দা বা রিসেশনে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেছে। এ ব্যাপারে স্পষ্টতই বিশ্বজনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে ইন্ডিয়া।
ইন্ডিয়ার স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশ সত্যিই একটি অগ্নিপরীক্ষা। মনে হচ্ছে, ইন্ডিয়া নিজের নাক কেটে বাংলাদেশের (গণতন্ত্রের) যাত্রাটি ভঙ্গ করছে। অথচ বিশ্বের মধ্যে বেশির ভাগ দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে ইন্ডিয়ার বিরাট ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্কীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে ইন্ডিয়া যদি বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রত্যাশার (Global need and expectation) দিকে মনোযোগ দেয়, তবে পুরো এলাকার চেহারা বদলে যেতে পারে। ইন্ডিয়াকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ষোল-সতের কোটি মানুষকে অশান্তিতে রেখে ইন্ডিয়া নিজের শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।
কোনো বিশেষ দলের সাথে অবৈধ প্রেম নয়, এ দেশের জনগণের সাথে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত । পিপল টু পিপল কন্টাক্ট বা জনগণের সাথে জনগণের সংযোগ খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া এক পা এগিয়ে এলে এ দেশের জনগণ দুই পা এগিয়ে যাবে।
এ দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক সুযোগ ইন্ডিয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। ইন্ডিয়ার জাতীয় স্বার্থও একই লাইনে এসে দাঁড়িয়েছে। কাজেই এই সরকারকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখলে ইন্ডিয়ার লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হবে।
তার পরেও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা অতি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসে ভুগছেন বলে মনে হচ্ছে। ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের নিরিখেই ইন্ডিয়ার ফরেন পলিসি নির্ধারিত হয়। শেখ মুজিব ও খোন্দকার মোশতাকের মধ্যে কে ইন্ডিয়ার বড় সুহৃদ ছিলেন ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে, সেটা বোঝা যায়নি। ১৬ আগস্টে রাষ্ট্রদূত সমর সেন খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে যেভাবে দন্তবিকশিত করে পোজ দিয়েছিলেন, তা সেই নির্মম সত্যটি তুলে ধরে। তখনকার অনেক গোপন চুক্তি ও আশ্বাস গোপনেই রয়ে গেছে। ইন্দিরা গান্ধীর নাকি নির্দেশ ছিল, ডোন্ট ডিস্টার্ব মোশতাক গভর্নমেন্ট!
উত্তরপাড়াকে (দেশের সামরিক বাহিনীকে) ও প্রতিপকে স্বভাবসুলভ খোঁচা মেরে শেখ হাসিনা বলেছেন, তাদের মতাগ্রহণের সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু অসাংবিধানিকভাবে মতায় যারা এসেছেন তারা সংবিধানকে স্থগিত করেই এসেছেন। যারা সংবিধান নামক মূর্তিটি তৈরি করেন, সেই মূর্তিমানেরাও চিরদিন ভূপৃষ্ঠে থাকেন না । কোনো সরকারই শেষ সরকার নয়। কোনো সংবিধানই শেষ সংবিধান নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মানুষের জন্য সংবিধান। সংবিধানের জন্য মানুষ নয়।
ইন্ডিয়ার সাথে বিভিন্ন গোপন চুক্তির কথাও বিভিন্ন কৌশলে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের অনেকগুলোই প্রেমিকাকে লেখা প্রেমপত্রের মতোই মধুর।
কিন্তু প্রয়োজনের সময় ইন্ডিয়া পাঁচ ভাগের কম জনসমর্থিত একটি সরকারকে বিশ্ব জনমতের বিপে গিয়ে রা করবে, সেটা ভাবাও কঠিন। বিশেষ করে যখন বিশ্বসভায় নিজের ইমেজ বৃদ্ধির চাপ রয়েছে, তখন আগ্রাসী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করার এই ঝুঁকি তারা গ্রহণ করবেন, এমন বোকা ইন্ডিয়ার নেতাদের ভাবা যায় না।
কাজেই অতি আত্মবিশ্বাসী সরকার সম্ভবত নিজের ও তার দলের জন্যই বিপদটি টেনে আনছে না। সারা জাতিকে চরম বিপদের দিকে টেনে নিচ্ছে।
এক-এগারোর পর যখন সারা দেশে মাইনাস টু’র পক্ষে বিশাল স্রোত বয়ে চলছিল তখনো এই কলামটি সেই স্রোতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছি। কোনো ধরনের অসাংবিধানিক শাসনের পক্ষে অবস্থান করিনি । এই লেখাটি কোনো পরে জন্য উসকানি নয়। গণতান্ত্রিক সব শক্তির জন্য একটি সাবধান বাণী। জানি না, আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা থেকে সদুপদেশটি গ্রহণ করার মতো প্রজ্ঞা এই সরকারের কোনো পর্যায়ে অবশিষ্ট আছে কি না। আমি মনে করি রাজনৈতিক সমাধানের পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।
বাংলাদেশের মানুষ উত্তর কোরিয়া কিংবা মিয়ানমারের জনগণের মতো নয়। যে কৌশলেই আটকানো হোক না কেন, যেভাবেই মুখটি বন্ধ করা হোক না কেন, মুক্তির একটা উপায় তারা বের করে নেবেই।
পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বড় বড় স্বৈরাচারীরা সব সময় আত্মতৃপ্তি ও আত্মবিশ্বাসে ভুগেছেন । এদের শেষ দৃশ্যটি সব সময় কৌতুক অভিনেতা ভানুর সেই কৌতূকের মতো হয়েছে।
‘ভানু : ওকিল মহাশয়। ফাঁসির হুকুম তো হয়ে গেল! এখন কী করব?
উকিল: ঝুইলা পড়ো। আমি তো আছিই।’
সমস্যা হলো এরা শুধু নিজেরাই ঝোলে না। সারা জাতিকে ঝুলিয়ে দিয়ে যায়।
>>মিনার রশীদ
minarrashid@yahoo.com

সুবচন যখন নির্বাসনে, রাজনীতি তখন... by ড. মাহবুব উল্লাহ্

বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে সুবচন নির্বাসনে গেছে। রাজনীতিকদের তেতো কথা সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তুলেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মিষ্ট ভাষণের কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক দেশে মতপার্থক্য থাকে, মতদ্বৈধতাও থাকে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি যখন উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে তখন মতপার্থক্যের প্রকাশ ঘটে বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা এবং কখনও কখনও বিদ্রুপের ভাষায়। কিন্তু ভাষার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণ কখনোই বিষবাষ্প ছড়ায় না। উন্নতমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনীতিকরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেন প্রতিপক্ষের দুর্বলতা ও ভুল-ভ্রান্তিগুলোকে এমন ভাষায় তুলে ধরতে যার ফলে প্রতিপক্ষ জনগণের কাছে বিদ্রুপের খোরাকে পরিণত হয়। রাজনৈতিক কালচারের সৌন্দর্যকে ধারণ করার জন্যই সংসদীয় বিতর্কে সংসদীয় ভাষা ব্যবহারের চল হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য অপর একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করবেন না। এ রকম ক্ষেত্রে মিথ্যার পরিবর্তে অসত্য কিংবা সত্যের অপলাপ ঘটানোর কথা বলা হয়ে থাকে। সংসদীয় ভব্যতা রক্ষার স্বার্থে সংসদে যিনি উপস্থিত নেই কিংবা যিনি পরলোকগমন করেছেন এমন ব্যক্তি সম্পর্কে অশোভন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হয়। বিগত বছরগুলোতে আমাদের সংসদে পরলোকগত ব্যক্তিদের সম্পর্কেও নানারকম অবাঞ্ছিত, কুৎসিত বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। অথচ সেসব ব্যক্তির এ ধরনের কটুকথার জবাব দেয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। জিয়াউর রহমানের মতো মুক্তিযোদ্ধার সমালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন পাকিস্তানিদের চর এবং আইএসআইয়ের এজেন্ট। এ রকম অশালীন মন্তব্যে জিয়াভক্তরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এ ধরনের মন্তব্য যারা করলেন তারা নিজ দলের জন্য কতটুকু ফায়দা হাসিল করতে পেরেছেন সে ব্যাপারে গভীর সন্দেহ রয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য সংসদের বাইরে থেকে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে প্রদত্ত অবাঞ্ছিত এবং অরাজনৈতক বক্তব্য। যারা এভাবে বক্তব্য দেন তারা হয়তো মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন তাদের অবস্থানটি সঠিক এবং সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তারা বুঝতে চান না কিংবা বুঝতে পারেন না যে, এ ধরনের দায়িত্বহীন ও বলগাহীন বক্তব্যের ফলে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠে। বিভাজন যদি শুধু বিভাজনের মধ্যেই সীমিত থাকত, তাহলে দুর্ভাবনার কারণ থাকলেও প্রচণ্ডভাবে উদ্বিগ্ন হতে হতো না। কিন্তু সমস্যাটা হল বিভাজন থেকে সৃষ্টি হয় বিভাগের এবং বিভাগ থেকে জন্ম নেয় সংঘাত ও সংঘর্ষ। এ সংঘাত ও সংঘর্ষ এতটাই প্রকট হয়ে উঠতে পারে যে, এর ফলে দেশ গৃহযুদ্ধের মতো দুর্ভাগ্যজনক অবস্থায় নিপতিত হতে পারে। রক্তপাত, প্রাণহানি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। সেই অবস্থায় এ রকম দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। জাতির মধ্যে পুনর্বার সদ্ভাব-সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা অসাধ্য সাধনের পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
রাজনীতিকরা আমাদের শিরোধার্য ব্যক্তি। তারা নেতৃত্ব দেন এবং জাতিকে এগিয়ে চলার পথনির্দেশনা দেন। একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সবচেয়ে কঠিন কাজটি হল জাতি গঠন কিংবা রাষ্ট্র গঠন।
ঔপনিবেশিক শক্তিকে পরাস্ত করার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতি গঠিত হয়ে যায় না। এ পর্যায়ে রাজনীতিক বা নেতৃত্বের দায়িত্ব হল জাতির বিভিন্ন খণ্ডাংশকে ঐক্যবদ্ধ করা। তাদের সব অংশের মধ্যে এমন একটি মনোভাবের উজ্জীবন ঘটানো যাতে তারা ভাবতে শুরু করে একে অপরের জন্য তারা অপরিহার্য। এক অংশ থেকে অন্য অংশের দূরে চলে যাওয়ার মানে হল জাতির দুর্বল হওয়া, জাতির মধ্যে সুপ্ত সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা এবং কালক্রমে দুর্বল ও ম্রিয়মাণ হয়ে বহির্শক্তির করতলগত হওয়া। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে অমঙ্গলজনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করছি, বাংলাদেশে এ রকম অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। শুনেছি জাপানিদের মধ্যে একটি চল আছে। এটি হারাকিরি নামে পরিচিত। নিজের ছুরি দিয়ে নিজেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়াকেই হারাকিরি বলা হয়। গত ক’মাসে দেশব্যাপী যেসব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য যারাই দায়ী হোক না কেন, একে হারাকিরি না বলে আর কী বলা যায়? নীরদ চৌধুরী বাঙালিকে আত্মঘাতী বাঙালি বলে উল্লেখ করেছিলেন। অনেক বিদ্বতজনের দৃষ্টিতে নীরদ চৌধুরী ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি মানুষের চিন্তা ও ধারণার বিপরীত উচ্চারণ করে গর্ববোধ করতেন। এখন বাংলাদেশের অবস্থা দেখে মনে হয় বাঙালি নীরদ চৌধুরীর উক্তিকেই স্বপ্রমাণিত করছে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলেও রাজনীতিতে আপত্তিকর কথন হতো। পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি আমাদের তীব্র অপছন্দ সত্ত্বেও আপত্তিকর উক্তির তেমন প্রাবল্য দেখা যায় না। এর কারণ হয়তো এই যে, আমরা তখন যুক্তি ও তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চাইতাম আমাদের প্রতি কতভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। ১৯৬৬ সালের প্রথমদিকে শেখ মুজিবুর রহমান তার ৬ দফার কর্মসূচি উত্থাপন করেছিলেন। এটাকে তিনি বাঙালির বাঁচার দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মহাশক্তিধর ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। সামরিক শক্তির জোরেই তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে তিনি ৬ দফার প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, 'He is using the weapon of language and we shall use the language of weapons?' অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান ভাষার অস্ত্র প্রয়োগ করছেন। কে না জানে তার বাগ্মিতা ছিল অসাধারণ। ৬ দফার পক্ষে তিনি যেভাবে তেজস্বিনী ভাষায় বক্তব্য রাখতেন, তাতে তার বাঙালি শ্রোতারা প্রচণ্ডভাবে উজ্জীবিত হতেন। কিন্তু আইয়ুব খান হুমকি দিলেন যে, তিনি অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করবেন। অর্থাৎ সশস্ত্র পন্থায় এ আন্দোলনকে তিনি দমন করবেন। লক্ষণীয় হল দমনের মতো কোনো শব্দ তিনি উলঙ্গভাবে ব্যবহার করেননি। অথচ ঠিকই দমনের ব্যাপারটি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার জন্য তার এ রকম উচ্চারণই যথেষ্ট ছিল। আর এ উচ্চারণই পাকিস্তানকে অবধারিত ধ্বংসের মুখে নিয়ে গিয়েছিল। যে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির কথা তিনি বারবার উচ্চারণ করতেন, সেই পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি তার একটি দায়িত্বহীন উক্তির ফলে অবধারিতভাবে অনৈক্য ও সংহতিহীনতার বীজ বপন করেছিল। এটি মহীরুহে পরিণত হতে ৪ বছরের বেশি সময় লাগেনি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় ঘটল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব হল। এক কথায় বলা যায় পাকিস্তানি জাতি গঠনের প্রকল্পটি ভেঙে তছনছ হয়ে গেল।
বাঙালিদের সম্পর্কে আইয়ুব খানের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল অশালীন ও আপত্তিকর। তিনি তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Friends not Masters-এ বাঙালিদের সম্পর্কে নানা বিরূপ মন্তব্য করেন। বাঙালিদের সম্পর্কে আইয়ুব খানের মূল্যায়ন তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব রাজনীতিকই তার এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই গেল। পাকস্তানের দুই অংশের মধ্যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ আরও তীব্র আকার ধারণ করল। পাকিস্তানের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজনৈতিক বিরোধীদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘শির কুচাল দেঙ্গে’ অর্থাৎ বিরোধীদের শিরñেদ ঘটানো হবে। বাংলাদেশের এখনকার রাজনীতিতে প্রায় একই ধরনের ভয়াবহ উক্তি উচ্চারিত হতে দেখে প্রমাদ না গুনে পারি না। পত্রিকায় পড়লাম, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া, আপনার রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে। এখন মানুষ হত্যার দায় নিয়ে বাকি দিনগুলো আপনাকে কারাগারে কাটাতে হবে। কারাগারে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষণ গুনতে থাকুন। অবরোধ ও হরতালের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা শুরুর পর থেকেই আপনার রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে।’ বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কটি মামলা হয়েছে, এগুলোর কয়েকটিতে তাকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। আইনি মারপ্যাঁচের আলোচনায় আমি যাব না। কারণ আইন ব্যবসা আমার পেশা নয়। আইনশাস্ত্র সম্পর্কে আমার তেমন কোনো জ্ঞানও নেই। তবে প্রাচীন রোমের আইন বিশেষজ্ঞ সিসারোর লেখা পড়েছি নিছক জ্ঞানচর্চার আনন্দ থেকে। বেগম জিয়াকে চিরকাল কারাগারে কাটাতে হবে কিনা সেটা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে না দিয়ে আগাম এমন সব মন্তব্য করা কার্যত আদালতকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার শামিল। যিনি বা যে পক্ষই হোক না কেন, দলমত নির্বিশেষে সবাই যদি এ ধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন এবং কিছুটা ধৈর্য ধারণ করেন তাহলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই মঙ্গল হবে। ব্যক্তি হিসেবে খালেদা জিয়ার কী হবে তার চেয়েও অনেক বড় কথা হল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কী হবে? আমরা যেন বাংলাদেশের কল্যাণ ও মঙ্গলের কথা ভুলে না যাই।
ড. মাহবুব উল্লাহ : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তালগোল by মাহবুব তালুকদার

আগুণে পুড়ে নিহত পোষাককর্মীদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে..., ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায়
পোশাক কারখানা তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির
পরিবারকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিজিএমইএ
কয়েকদিন চাচার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। আমি নিজেই নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তার বাসায় যেতে পারিনি। তাই আমাদের আলাপচারিতা বন্ধ ছিল। আজ সকাল থেকে চাচার কথা ভাবছিলাম। দুপুরে তিনি নিজেই ফোন করলেন। বললেন, বিকালে কি আসতে পারবে? তোমার সঙ্গে একটা বিশেষ আলাপ আছে।
চাচার কণ্ঠে উদ্বিগ্নতার স্বর আমার কান এড়িয়ে গেল না। বললাম, কি ব্যাপার?
পুলিশ তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। চাচার কথায় এবার সত্যি সত্যি উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল।
পুলিশ তালগোল পাকালে আপনার কী?
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে একটা ভালো পরামর্শ দেয়া প্রত্যেক সুনাগরিকের কর্তব্য। একটু থেমে চাচা আবার বললেন, এসব কথা টেলিফোনে আলাপ করা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। সব কথাই তো রেকর্ড করা হয়। কোন কথার কি অর্থ হবে কে জানে?
বিকালে চাচার বাসায় চলে গেলাম। কথা বলতে গিয়ে মনে হলো, চাচা রীতিমত পেরেশানীতে আছে। তিনি জানালেন, পুলিশ মিরপুরের কাজীপাড়া থেকে তিন যুবকের লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসে। ওখানকার ওসির দাবি ওই তিনজন মনিপুর স্কুলে একটি শাখা পুড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। ওসি বলেছেন, বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের ধরে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে। পত্রিকার ভাষ্যমতে- ‘কারা গুলি করল জানতে চাইলে তিনি (ওসি) বলেন, অনেকেরই কাছেই লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে। মানুষকে অস্ত্র দেয়া হয়েছে নিজের ও অন্যের জানমাল রক্ষার জন্য। এখন সেই অস্ত্র নাশকতার বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে। এটা আসলে নাশকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে জনরোষের প্রচণ্ড বহিঃপ্রকাশ।’
বললাম, খবরটি আমিও পড়েছি। এতে অসুবিধা কি?
পুলিশের ভাবমূর্তির অসুবিধা। সাংবাদিকরা অকুস্থলে গিয়ে ও মেডিকেল কলেজের মর্গে গিয়ে জেনেছে, নিহত তিনজনের গায়ে মোট ৫৪টি (২২+১৭+১৫) গুলির ক্ষত ছিল। তারা গণপিটুনিতে মারা গেছে এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশের এই দাবির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। চাচা আরও বললেন, পত্রিকাওয়ালাদের কাছ থেকে আজকাল কিছুই লুকানো যায় না রে ভাই। তারা রাস্তার ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গুলির খোসাগুলোর ছবি ছেপে দিয়েছে। রক্তমাখা দড়িও ছিল পাশে। সাংবাদিকরা লিখেছে, গণপিটুনির কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ ব্যাপারে আপনি আমাকে ডেকেছেন কেন? আমি কি করবো?
তুমি তো এককালে গল্প লিখতে। তাই ভাবলাম, এসব বিষয়ে তুমি একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প বানিয়ে দিতে পার। বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের ব্যাপারে পুলিশ যা বলছে তা অনেকে বিশ্বাস করছে না। কদিন আগে পুলিশের সাফাই ছিল, সন্ত্রাসী পালাতে গিয়ে গাড়ির চাকার তলে পিষ্ট হয়ে মারা গেছে। এ কথাও কেউ বিশ্বাস করেনি। তবে ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে গল্পের ভেরিয়েশন দরকার। একজন গল্পলেখক হিসেবে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই তুমি বুঝবে। পুলিশের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা কিছু কর রে ভাই!
চাচা নার্ভাস হয়ে গেলে আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। তিনি ভুলে যান যে আমি তার ভাতিজা। তবে চাচার এহেন উদ্বিগ্নতা ও উৎকণ্ঠা আমাকে বিচলিত করলো। সত্যি বলতে কি বিএনপি সরকারের আমলে যখন র‌্যাবের সৃষ্টি হয়, তখন ক্রসফায়ার সম্পর্কে বলা হতো, নিহত ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। এটি ছিল খুবই বিশ্বাসযোগ্য গল্প। কারণ গুলি করে বা পিটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে কাউকে মারা হলে হৃদস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তাকে মৃত ঘোষণা করা যায় না- এটা হচ্ছে ডাক্তারি শাস্ত্রের কথা। ফলে বিচার বহির্ভূতভাবে যিনিই যেভাবেই নিহত হন, তার হার্ট ফেল না হলে মারা যাওয়া সম্ভব নয়। র‌্যাবের তৎকালীন বক্তব্যটি ছিল বিজ্ঞান ভিত্তিক ও সত্যকথন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকার সম্ভবত রাজনৈতিক কারণে গল্পের ফরম্যাটটি পরিত্যাজ্য মনে করে।
আমি বললাম, চাচা! মিরপুরের ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য সম্ভবত নিচের দিকে কারও তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি। পুলিশের মধ্যে অনেক ভালো লেখক আছেন বা ছিলেন। এক সময়ের আইজি আবুল খায়ের মোসলেউদ্দিন ছিলেন ডাকসাইটে লেখক বা কথাশিল্পী। কিন্তু সমস্যাটা গল্প লেখা বা বানানোর নয়।
তাহলে? চাচা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে।
বললাম, পুলিশ যদি নি:সংকোচে নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা ও নিষ্ঠা দ্বারা পরিচালিত হয়ে দায়িত্ব পালন করে তাহলে তাদের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। পুলিশ আত্মসমালোচনা করে কাজ করলে অন্যদের সমালোচনা থেকে রক্ষা পাবে। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের খুবই সতর্কতার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হবে। কারণ, তারা সরকারের পুলিশ হলেও মূলত দেশের জনগণের পুলিশ। প্রশ্নবিদ্ধ বক্তব্য দিয়ে কোনো বিতর্কে জড়ানো তাদের উচিত হবে না।
কিন্তু ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য কি হবে? আসল কথাটা তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?
আমার মনে হয়, পুলিশের নির্ধারিত আইনকানুন ও বিধি অনুযায়ী যে কোন অপরিহার্য ব্যবস্থা নিলে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। যে কোন ঘটনার সত্য প্রকাশ করলে, তাদের গল্প বানাতে হবে না। দেশের মানুষ তাদেরকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করবে।
কথাগুলো শুনে চাচা শান্ত হলেন। বললেন, তোমার কথাই আমি তাদের বুঝিয়ে বলব। যে কোনো ভালো পরামর্শ দেওয়া সুনাগরিক হিসাবে আমাদের কর্তব্য। কি বলো?
সেদিন চাচার বাড়ি থেকে ফিরতে আমার মনটা বেশ ভলো হয়ে গেল। সাধারণত কোনো বিষয়ের আলোচনায় আমাদের মতের মিল হয় না। অনেক সময় সাময়িকভাবে মনেরও গরমিল দেখা দেয়। আমাদের পারস্পরিক মনের দূরত্ব অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী থাকে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাচার অযাচিত আচরণে আমাকে চুপ থাকতে হয়। কারণ, আমার ধারণা, চাচা জনগণের এক বৃহৎ অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর আলাপচারিতার ভিতর দিয়ে আমার নিজের চিন্তার বিপরীত চিন্তাধারার উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। নিজের মননকে পরিপুষ্ট করতে এটা আমার কাছে মূল্যবান মনে হয়।
দুদিন পরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের ঘোষণা শোনার পর থেকে চাচাকে খুবই উৎফুল্ল দেখা গেল। চাচার মতে অব্যাহত হরতাল ও অবরোধের মধ্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রপ্রাণ সরকারের সঠিক পদক্ষেপ। এতে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জ্বল জ্বল করে উঠবে। গণতন্ত্র আর নির্বাচন নিয়ে যারা সরকারের সমালোচনা করে, তাদের মুখে ঝামা ঘষে দেয়া হবে।
দেশের সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকার মেয়র নির্বাচন করার সিদ্ধান্তটি আমার কাছে বোধগম্য নয়। এর আগে দীর্ঘকাল নানা অজুহাতে মেয়র নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়। সেসব অজুহাত এখনও হয়ত আছে। কিন্তু সরকার ভাবছে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে এক ঢিলে দুই পাখি নয়, অনেক পাখি মারা যাবে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এমন ডামাডোলের মধ্যে এ- সময় মেয়র নির্বাচন কি ঠিক হচ্ছে?
এই তো সময়! চাচা হাসিমুখে বললেন, ঢাকা শহরে হরতাল অবরোধের কোনো চিহ্ন নেই। লোকেরা নিশ্চিন্তে এখন ভোট দিতে পারবে। তাছাড়া এ সময়ে কাউন্সিলার পদে নির্বাচনের জন্য বিএনপির কোনো প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না। মামলা-হামলার ভয়ে তারা সবাই আত্মগোপনে আছে।
এখন নির্বাচন হলে কি সরকারি দল জয়ী হতে পারবে? বিএনপি যদি সংসদ নির্বাচনের মতো এই নির্বাচন বর্জন না করে?
কি আশ্চর্য! তুমি সবসময় নেতিবাচক চিন্তা কর। ঢাকা শহরের সব মানুষ এখন আওয়ামী লীগের পক্ষে। হরতাল অবরোধ আর পেট্রলবোমার কারণে মানুষজন তো দূরের কথা, বিএনপির পক্ষে কোনো কাক-পক্ষীও নেই। সরকারের উচিত গোপনে সাধাসাধি করে বিএনপিকে এই নির্বাচনে টেনে আনা।
কেন? আমি বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করলাম।
সহজ উত্তর। ভোটে এলেই বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের অন্ত:সারশূন্যতা প্রকাশ পাবে।
কিন্তু চাচা! বিগত ৫টি মহানগরীতে মেয়র নির্বাচনের মতো বিএনপি প্রার্থী যদি জিতে যায়?
তুমি অকারণে এসব কথা ভাবছ। আমি তো মনে করি ঢাকার উত্তর-দক্ষিণের মেয়র নির্বাচনে বিএনপিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়ে দেয়া উচিত। তাহলে গত সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে একটা ব্যালেন্স হয়ে যাবে।
কি বলছেন আপনি? বিএনপির মেয়র ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত নগরপিতা হবেন?
সাময়িকভাবে হতে অসুবিধা কী? দেশে গণতন্ত্র আছে না?
সাময়িকভাবে বলছেন কেন?
রাজনীতি না বুঝলে আমার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারবে না।
আপনি বুঝিয়ে দিলে পারব।
শোনো। যে ৫টি মহানগরীতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁরা এখন কোথায়? এদের দুজন জেলে, দুজন পলাতক, একজন অসুস্থ। ঢাকা শহরে বিএনপির কেউ মেয়র হলে তাদের পরিণতিও একই হবে। হয় জেল, নয় পলায়ন। কারণ তারা নিশ্চিতই হরতাল অবরোধ ও মানুষ পুড়িয়ে মারার সঙ্গে জড়িত। তখন আনিসুল হক আর সাঈদ খোকনকে প্রশাসক হিসাবে বসিয়ে দিলেই হলো। তাদেরকে আর কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। জবাবদিহিতার অনেক জ্বালা রে ভাই! সফল মেয়র হানিফকেই কি কম জ্বালাতন ভোগ করতে হয়েছে? তবে এভাবে প্রশাসক নিয়োগ না করে আওয়ামী লীগের নেতাদের প্যানেল মেয়র হিসাবেও দায়িত্ব দেয়া যায়। এটা অবশ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
আপনার এই অভিনব চিন্তাটি কি আপনি কারো সঙ্গে শেয়ার করেছেন?
সময় পেলাম কোথায়? আমি আমার আইডিয়াটা উচ্চপর্যায়ে জানাব ভাবছিলাম। কিন্তু তার আগেই আনিসুল হক আর সাঈদ খোকনের নাম ঘোষণা করা হলো।
চাচা! আনিসুল হক খুব ভালো প্রার্থী। হাসি হাসি মুখে টেলিভিশনে খুব ভালো অনুষ্ঠান করতেন। কিন্তু সাঈদ খোকনের ব্যাপারে আমার রিজার্ভেশন আছে।
মানে?
সাঈদ খোকন এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে কিংস পার্টির নেতা হয়েছিলেন। হানিফ সাহেবের ছেলের সেই পদঙ্খলন-
চোপ্‌! একেবারে চোপ্‌!! এ বিষয়ে আর একটি কথাও বলবে না। চাচা ধমকের সুরে বললেন, নেত্রী যদি এক এগারোতে সাঈদ খোকনের ভূমিকার কথা জেনে তাকেই মেয়র হিসাবে চান, তাহলে এ বিষয়ে কথা বলার তুমি কে?

ভরদুপুরে মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট। লোকজনের নড়াচড়া আছে, কিন্তু কেমন সুনসান। আমি যখন যাই তখন ভরদুপুর। বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুর্ঘটনাজনিত আগুনে পুড়ে আহত মানুষগুলো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অবরোধ-হরতালে পেট্রলবোমায় আহত ব্যক্তিরাও আছেন। পাঁচতলায় একটি পুরো ওয়ার্ডই শুধু অবরোধ-হরতালের রোগীদের জন্য। দোতলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। অন্য ওয়ার্ড ঘুরে আমি আইসিইউতে যাই।
তখন ছিলেন আইসিইউ ইনচার্জ রওশন আখতার। তিনি আমাকে চিনলেন, বসালেন এবং বললেন, স্যার (বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক ডা. সামন্তলাল সেন) বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি-বিষয়ক কনফারেন্সে গেছেন সোনারগাঁও হোটেলে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। জানতে চাইলাম পেট্রলবোমায় আহত ব্যক্তিদের অবস্থা। তিনি বললেন, কয়েকজনের অবস্থা খুব খারাপ। বগুড়া থেকে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন যেকোনো সময়—।
কাচের পার্টিশনের এ–পাশ থেকে দেখছিলাম অগ্নিদগ্ধ হতভাগ্য ব্যক্তিদের। আইসিইউতে ডাক্তার-নার্স ও রোগীর নির্বাচিত নিকটজন কেউ ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ। শুনলাম, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন বার্ন ইউনিট পরিদর্শন করেন, তিনিও এখানে কাচের এ-পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছেন। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমিও সেদিন গিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী বীভৎস রকম অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তিদের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছেন। জাহাঙ্গীর হোসেনের পরিবারও পেয়েছে।
কাচের ও-পাশের বেডেই সাত বছরের মরিয়ম। এসেছে গাজীপুর থেকে। পেট্রলবোমায় শরীরের ৪৫ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে। নাকে অক্সিজেন ইত্যাদির নল। অচেতন হয়ে পড়ে আছে মরিয়ম। পাশে দাঁড়িয়ে তার নির্বাক মা। সেরে উঠবে এবং একসময় সঙ্গীসাথিদের সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করে খেলবে, সে আশ্বাস দেননি ডাক্তাররা। আরেক পাশের বেডে সুভাষ নামে ৫৬ বছর বয়স্ক একজন। এসেছেন চট্টগ্রাম থেকে। সাম্যবাদী দলের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আমাদের বন্ধু দিলীপ বড়ুয়ার ঘনিষ্ঠ কেউ। তাঁর অবস্থাও খারাপ। মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে। নাকে-মুখে যন্ত্রপাতি লাগানো। বাঁচার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারেন না।
সুভাষবাবুর ও-পাশের বেডে জাহাঙ্গীর। এক দিন এই পৃথিবীতে তিনি এসেছিলেন। নিজের ইচ্ছায় আসেননি। যদি জানতেন এই জগৎ এতটা নিষ্ঠুর এবং বিধাতা তাঁর মতামত নিতেন, তাহলে তিনি এখানে আসতেন না। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত—সৃষ্টির সেরা জীব, সুন্দর অবয়ববিশিষ্ট প্রাণী, পেট্রলবোমায় পুড়ে গেলে কেমন হয় তার অবয়ব, তা চোখে না দেখলে মৌখিকভাবে হোক বা লিখে হোক অন্য কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও সামান্য লেখক হিসেবে লেখার যেটুকু শক্তি আছে তা দিয়ে বীভৎস অগ্নিদগ্ধের বর্ণনা না দেওয়াই ভালো।
নিমতলী ট্র্যাজেডির পর থেকে বার্ন ইউনিটে আমি বহুবার গিয়েছি। অগ্নিদগ্ধ হয়ে অসুস্থ হওয়া কোনো রোগ নয়। দুর্ঘটনাজনিত শারীরিক সমস্যা। বজ্রপাতসহ নানা কারণে মানুষের শরীর আগুনে ঝলসে যেতে পারে। রক্ত-মাংসের মানবদেহ আগুনে পুড়ে গেলে—অল্প হোক বা বেশি হোক—কী যে যন্ত্রণা, তা যেকোনো মানুষের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে আগুনে পোড়া রোগীদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা অপ্রতুল। পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবিতে নাগরিক সংহতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা সমাবেশ করেছি। শহীদ মিনার, মেডিকেলের সামনে মানববন্ধনও করেছি। আমাদের আন্দোলনের কথা অধ্যাপক সামন্তলাল সেন জানেন। তাঁর সঙ্গে আমার এ বিষয়ে অনেকবার কথা হয়েছে। তিনি সজ্জন ও সহানুভূতিশীল চিকিৎসক।
জাহাঙ্গীরের কোনো কষ্ট নেই, কারণ তাঁর লেশমাত্র চেতনা নেই। অবর্ণনীয় কষ্ট তাঁর প্রিয়জনদের। জাহাঙ্গীরের মুখের খসে যাওয়া চামড়া কেউ ছাড়ালেন। ওই দৃশ্য দেখা যায় না। তখন জাহাঙ্গীর সব সেবা-শুশ্রূষা ও চিকিৎসার ঊর্ধ্বে। তবু ডাক্তার-সেবিকারা তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দুজন কম বয়সী নারী জাহাঙ্গীরের বেডের দুই পাশে দাঁড়িয়ে। তাঁর দিকে তাকিয়ে অপলক। সবচেয়ে নিষ্ঠুর মুহূর্তটি কখন আসে কেউ জানে না। অ্যাটেনডেন্টদের একজন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বিউটি খাতুন আর একজন বিউটির বোন।
আমি ইশারায় বিউটি খাতুনকে ডাকি। তিনি আসেন। কিন্তু তাঁর দিকে আমি তাকাতে পারি না। পাঁচটি সপ্তাহ যাবৎ তিনি স্বামীর পাশে। তাঁর নাওয়া-খাওয়া-ঘুম হারাম। তাতেও তাঁর কষ্ট ছিল না, যদি কেউ তাঁকে আশ্বাস দিতেন যে তাঁর স্বামী সুস্থ হয়ে উঠবেন। তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখ দিয়ে পড়ার মতো পানি বিশেষ অবশিষ্ট ছিল না, তবু টপ টপ করে পড়ছিল পানি। বললাম, সন্তানাদি কী? বললেন, এক মেয়ে এক ছেলে। মনে মনে বললাম, ছোট সংসার, সুখী সংসার। অল্প আয়ে বেশ ভালোই চলে যাচ্ছিল। ছেলে জাহিদের বয়স ১৩, মেয়ে জুঁইয়ের বয়স ৯। অনর্থক সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, দেখবেন, আপনার ছেলেমেয়েরা ভালো হবে। ওদের পড়াশোনা করাবেন, সবাই আপনার পাশে থাকবে। জাহিদ পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে, জুঁই তৃতীয় শ্রেণিতে।
অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জাঁ-পল সাত্রে৴র ভাষায়, মানুষ এক অর্থহীন ভাবাবেগ—আ ইউসলেস প্যাশন। স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধনে এই জগৎ-সংসারে জড়িয়ে থাকে মানুষ। জাহাঙ্গীর তাঁর ছেলে ও মেয়ের নাম তাঁর নিজের নামের আদ্যক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিলেন: জাহিদ ও জুঁই। জাহাঙ্গীরের মা-বাবাও জীবিত।
বিউটি জানালেন, তাঁদের বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। তাঁর স্বামী ছিলেন ট্রাকের হেলপার। ওই ট্রাকের চালক ছিলেন তাঁর বোনজামাই। ২৩ জানুয়ারি রাতে দুপচাঁচিয়া থেকে সারিয়াকান্দী যাচ্ছিল ট্রাক। বগুড়া শহরের চৌমাথায় তাঁদের ওপর নেমে আসে গজব। চালক মাসুদ কম আহত হন। তিনিও বার্ন ইউনিটের অন্য ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। ট্রাকে কাজ নেওয়ার আগে জাহাঙ্গীর ভ্যান চালাতেন।
যে পেট্রলবোমাটি জাহাঙ্গীরদের ট্রাকে ছোড়া হয়েছে, ওটি অলৌকিক ছিল না। কেউ না কেউ—কোনো মানুষই ছুড়ে মেরেছে। ওই বোমা নিক্ষেপকারীর সঙ্গে জাহাঙ্গীরদের জমিজমা নিয়ে কোনো বিবাদ ছিল না। রাস্তার পাশের চা-দোকানে কারও সঙ্গে জাহাঙ্গীর ঝগড়াও করেননি। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, যে লোক বোমা ছুড়েছে সে মাসুদ বা জাহাঙ্গীরকে চিনতও না।
আণবিক বোমাও বোমা, নাপাম বোমাও বোমা, পেট্রলবোমাও বোমা। কোনোটি বড়, কোনোটি মাঝারি, কোনোটি ছোট। সবার একই কাজ। মানুষকে পুড়িয়ে মারা। প্রথম ধাক্কায় যারা মরে না, তারা কিছুকাল নরকযন্ত্রণা ভোগ করে মারা যায়।
কোনো বোমা কারও প্রতি নিক্ষেপ করার আগে যত্ন করে বানাতে হয়। পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করতে সম্ভবত একটি হাতই যথেষ্ট। বানাতে লাগে দুটি হাত ও একটি মাথা। হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমা দুটির কারণে যা ঘটেছে তার দায় আইনস্টাইন এড়াতে পারেন না। যেসব বিজ্ঞানী বোমা দুটি বানিয়েছিলেন তাঁরাও দায় এড়াতে পারেন না। যেসব বৈমানিক ওই বোমা ওখানে বহন করেছেন, তাঁরাও নন। যাঁদের হাত দিয়ে বোমা দুটি ফেলা হয়েছে, তাঁদের অপরাধ কতটা, তা আদালত বলতে পারবেন। কিন্তু আমেরিকার গবেষণাগার থেকে হিরোশিমার আকাশ পর্যন্ত বোমা দুটি যে গেল, তার দায় কার, তা বিধাতা ছাড়া কেউ জানেন না। তবে বাংলায় আজ পেট্রলবোমায় যাঁরা জাহাঙ্গীরের মতো পুড়ছেন, তার দায় আমাদের সবার: ষোলো কোটি জীবিত মানুষের। অবরোধের ৫৫ দিনে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ১১৩; তার মধ্যে পেট্রলবোমার আগুনে নিহত হয়েছেন ৬০ জন, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘গণপিটুনি’তে ৩৬ জন এবং কথিত ‘গুলিবিদ্ধ লাশ’ ও ‘সড়ক দুর্ঘটনা’য় ১৭ জন।
পেট্রলবোমায় যাঁরা পুড়ে মরেছেন, তাঁদের সামাজিক অবস্থান কী? তাঁরা সবাই শ্রমজীবী বা সাধারণ পরিবারের মানুষ। জাহাঙ্গীর একটি দৃষ্টান্ত মাত্র, আমি বলতে চাইছি ‘জাহাঙ্গীরদের’ কথা। সুভাষ, মরিয়ম ও জাহাঙ্গীরদের সবার কথা লিখতে গেলে লাখ লাখ পৃষ্ঠার প্রয়োজন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্যই হোক, ইসলামের খেদমত করার জন্যই হোক, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যই হোক, দারিদ্র্য দূর ও সুশাসনের জন্যই হোক বা জনগণকে দেশপ্রেমে দীক্ষিত করতেই হোক, আমাদের ভাগ্যবানদের কাছে অর্থ আসে বিদেশ থেকে। ওই অর্থ থেকেই দামি গাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বনভূমিতে বাগানবাড়ি, বিদেশভ্রমণ, ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়ানো—সবই চলে। জাহাঙ্গীরদের একমাত্র পুঁজি তাঁদের শরীর। সারা দিন, সারা রাত খাটুনি। মজুরির টাকায় বউ-ছেলে-মেয়ের জন্য বাজার করা। হপ্তায় দুই দিনও মাছ-মাংস জোটে না। কোনো কোনো দিন বাজারের চুনোপুঁটি বা টাকি বা খালের পানিতে চাষের তেলাপিয়া হলেই খুশি। জাহাঙ্গীররা কখনোই পোলাও, কাচ্চি বিরিয়ানি, শিককাবাব, হামবার্গার, পিৎজার প্রত্যাশা করেন না। সামনে ঈদ আসছে। জাহাঙ্গীররা তাঁদের বউদের জামদানি, কাতান বা লেহেঙ্গা নয়, বাবুরহাটি শাড়ি দিলেই সন্তুষ্ট। তাঁদের ওপর এমন গজব কেন?
কবি যে বলেছেন, ‘এই দেশেতে জন্ম আমার যেন এই দেশেতেই মরি’—কথাটা জাহাঙ্গীরদের জীবনেই সত্য। তাঁদের জন্ম এই দেশেতে, তাঁরা মরেনও এই দেশেতেই। তাঁরা কল্পনাও করেন না যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদে বা সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে গিয়ে মরবেন। অথবা সগৌরবে মৃত্যু হবে দিল্লির অ্যাপোলোতে, লন্ডনে বা নিউইয়র্কের কোনো বিলাসবহুল হাসপাতালে। জাহাঙ্গীরদের প্রথম পছন্দ নিজের ঘরের মলিন বিছানায় প্রিয়জনদের মধ্যে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ। খুব বেশি হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদর হাসপাতাল।
আমি দেখে আসার ১৪ ঘণ্টা পরে রাতের গভীর যামে জাহাঙ্গীর তাঁর শেষনিঃশ্বাসটি ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে কোনো রাজনৈতিক দলের কিছুই আসে-যায় না। জগৎ-সংসার তার নিজস্ব নিয়মে চলবে।
সেদিন বার্ন ইউনিট থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের চত্বরে দাঁড়াই। বাংলার আকাশে নীলের পরিমাণ কম, ধূসরতাই বেশি। নগরের যানবাহন ও মানুষের কোলাহলের মধ্যেও কার্জন হলের দিক থেকে কুহু-কুহু-কুহু ডেকে ওঠে একটি কোকিল। কোকিলটির কণ্ঠে কোনো মাধুর্য নেই, কেমন একধরনের উগ্রতা। প্রত্যুত্তরে ফজলুল হক হলের দিক থেকে আর একটি কোকিল ডেকে ওঠে। সে কণ্ঠেও তীব্রতা। সোলায়মান পয়গম্বরের মতো আমরা যদি পাখিদের ভাষা বুঝতে পারতাম, তাহলে জানা যেত, বাংলার কোকিলেরা ফাল্গুনে শুধু আনন্দেই ডাকে না, তারা মানুষের নির্মমতা, হিংসা ও বর্বরতার প্রতিবাদেও চিৎকার করে ওঠে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

'মরু সাহারা' হওয়ার পথে ভারত!

আরও আধুনিক স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট-সহ নানা উচ্চপ্রযুক্তির গ্যাজেট তৈরি করে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় রাখার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে মানুষ। আর গ্যাজেট-দুনিয়ায় ভারত একটি অন্যতম বড় বাজার। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে সজাগ হওয়া উচিত, সেটাই চরম ভাবে ব্রাত্য। এবং যার ফল আগামী ৫ বছরের মধ্যেই হাড়ে হাড়ে টের পেতে চলেছে ভারত। ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চলই পরিণত হতে চলেছে মরুভূমিতে! বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, অতিরিক্ত বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে ভারতে বৃষ্টিপাত কমছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। এবং গাছ কাটা এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে, আগামী ৫ বছরেই বর্ষা সরে যাবে একেবারে দক্ষিণ ভারতের দিকে। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইন্সস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IIS)-এর একটি গবেষণার রিপোর্টে বেশ আশঙ্কাজনক। রিপোর্ট বলছে, উন্নত নগর গড়তে গাছ কাটা বেড়ে যাওয়ায়, ভারতের জলবায়ুতে চরম হারে বেড়েছে কার্বন ডাইঅক্সাইড। ফলে তাপমাত্রার একটা ভয়াবহ বৈষম্য চোখে পড়বে। দেখা যাচ্ছে, সার্বিক ভাবে যে তামপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে, সেই তুলনায় স্থানীয় এলাকাগুলিতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্ষার বৃষ্টি ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
বস্তুত, গোটা বিশ্বকেই গাছ কাটার খেসারত দিতে হবে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, সবচেয়ে বেশি হারে বৃষ্টিপাত কমছে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও উত্তর আফ্রিকায়। তাই ভারতের কপালে যে খাঁড়া ঝুলছে, বলা বাহুল্য।

গণমাধ্যমের ওপর অশুভ ছায়া by সৈয়দ আবদাল আহমদ

অশুভ কালো ছায়ার কবলে আবারো বাংলাদেশের গণমাধ্যম। স্বাধীনভাবে গণমাধ্যম আর কাজ করতে পারছে না। গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে ফেলা হচ্ছে। কখনো ভীতি প্রদর্শন, অলিখিত প্রেস অ্যাডভাইস, আবার কখনো সেন্সরশিপ। খবর নিয়ন্ত্রণের নিত্যনতুন কৌশল প্রয়োগ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ ও সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এসব কৌশল করেও যখন কোনো কোনো গণমাধ্যমকে বাগে আনা যাচ্ছে না, তখন একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে সেটা বন্ধ করেও দেয়া হচ্ছে।
এমন এক পরিস্থিতিতে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকেরাও শেষ পর্যন্ত চুপ করে থাকতে পারলেন না, সোচ্চার হলেন। সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস কাউন্সিল গণমাধ্যমের সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরে বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে সম্পাদকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্র ও জাতীয় প্রচারমাধ্যমের পক্ষে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ এর আগে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের কথা বারবার উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে সামান্য কর্ণপাতও করা হয়নি।
এডিটরস কাউন্সিলের বৈঠকে গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের স্বাক্ষরে ওই বিবৃতি দেয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এক দিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অন্য দিকে সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার মাধ্যমের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। সরকার ও প্রশাসন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনায় বাধা সৃষ্টি করছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সংসদে সম্পাদক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়া হয়েছে, যা তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। ইতোমধ্যে একাধিক সম্পাদক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। কোনো কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনকে অন্যায়ভাবে বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে তকমা দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ডেইলি স্টার পত্রিকায় একটি ছবি ও ক্যাপশন ছাপানোকে কেন্দ্র করে সংসদে দেয়া প্রতিক্রিয়া প্রচারমাধ্যমের প্রতি বৈরী মনোভাবেরই প্রকাশ, যা কোনো সরকারের কাছে কাম্য নয়। একইভাবে ইংরেজি দৈনিক নিউএজ পত্রিকার অফিসে তল্লাশির নামে পুলিশি হয়রানির মতো ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। একাধিক টিভি মালিককে গ্রেফতার করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। টিভি টকশোতে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। কিছু টকশো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টকশোর অতিথি তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার নিয়ে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। কী প্রচার হবে আর হবে না, তা নিয়ে টেলিফোন নির্দেশনা মতপ্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও দলীয় কার্যক্রমের খবর সংগ্রহের সুযোগ কোনো কোনো সাংবাদিককে দেয়া হচ্ছে না।’
সম্পাদকদের এই বিবৃতি সময়োপযোগী এবং তাদের উদ্বেগ যথার্থ। বরং নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখলে যে কেউই বলবেন, সম্পাদকেরা তাদের বিবৃতিতে প্রকৃত অবস্থার চেয়ে কমই উল্লেখ করেছেন। গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের এ অভিযোগ এখন শুধু দেশের সাংবাদিকেরাই করছেন না। নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও এ অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও এ বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। স্বয়ং জাতিসঙ্ঘ, লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক নিউ ইয়র্কে সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অধিকার সমর্থন করে জাতিসঙ্ঘ।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক রিপোর্টে বলেছে, ‘বাংলাদেশে অব্যাহত মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।’ অনেক সাংবাদিক ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বলেছেন, হুমকির কারণে তারা কথা বলার সময় ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ করতে বাধ্য হচ্ছেন। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বাংলাদেশের গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। বিশেষ করে ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে সংসদে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগকে সংগঠনটি গণমাধ্যমে তথ্য জানানোর অধিকারের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে। পাশাপাশি ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিতেও আহ্বান জানিয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মানবাধিকার সাব কমিটির শুনানিতে বলা হয়, বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন, কেননা দেশটিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সন্তোষজনক নয়। একই দিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেসাইর ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মৌলিক স্বাধীনতা থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য সরকারের কর্ণকুহরে এসব ঢুকছে না। উল্টো তথ্য মন্ত্রণালয় অনেকটা নির্লজ্জের মতো বিবৃতি দিয়ে বলছে, দেশে গণমাধ্যম নাকি স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।
মিডিয়ায় হস্তক্ষেপের কিছু নমুনা
গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হওয়ার একেবারে তরতাজা উদাহরণ হচ্ছে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদে প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের একটি পোস্টারের ছবি ছাপানোর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, পজিটিভ অথবা নেগেটিভÑযেভাবেই ডেইলি স্টার লিখুক না কেন এটা বিশাল আকারে ছাপানো হিজবুত তাহরীরকে মদদ দেয়ার শামিল। এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়Ñ ‘প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় অফিসিয়াল ফেসবুকে স্টেটাস দিয়ে বলেছেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং আইনজীবী ড. কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করা উচিত। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় একজন আইনজীবী ডেইলি স্টার সম্পাদক, প্রধান বার্তা সম্পাদক ও প্রধান আলোকচিত্রীকে আসামি করে একটি মামলাও করেছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম বলেন, গণমাধ্যম সন্ত্রাসী বোমাবাজদের উসকানি দিচ্ছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা করা নয়। যারা এসব করছে তাদের সহযোগী হিসেবে বিচার করা হবে। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী টিভি চ্যানেলগুলোকে একধরনের হুমকিই দেন। তিনি টিভি চ্যানেলগুলোতে খালেদা জিয়া এবং বিএনপি-জামায়াতের খবর প্রচারের সমালোচনা করে বলেন, জল্লাদের খবর প্রচার না করলে কি টেলিভিশন চলবে না? এসব চ্যানেলের অনুমোদন কিন্তু আমরাই দিয়েছি। এর আগে সংসদে টকশোর আলোচকদের বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রী বিষোদগার করেন। তিনি বলেন, টকশোর বক্তব্য পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। টকশোর আলোচকদের ‘নিশি কুটুম্ব’ বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মরহুম এবিএম মূসাও সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি।
সংসদের বাইরে সরকারের মন্ত্রী ও শাসকদলের নেতারা অহরহ টকশোর আলোচকদের গালমন্দ করছেন। অদৃশ্য ফোনের হুমকিতে বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাভিশনের জনপ্রিয় টকশো ‘ফ্রন্টলাইন’। মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঞ্চালনায় পাঁচ বছর ধরে এ টকশো চলছিল। একুশে টিভিতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি বক্তব্য প্রচার করার অপরাধে টিভি চ্যানেলটির ওপর ভয়াবহ খড়গ নেমে আসে। একুশে টিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে গ্রেফতার করে দফায় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। টিভি চ্যানেলটিকে কাজই করতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের লাইভ সম্প্রচারসহ স্বাভাবিক সম্প্রচার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে তথ্যমন্ত্রীর চাপ ও ইঙ্গিতে ক্যাবল অপারেটররা একুশে টিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলে সম্প্রচার বাধাগ্রস্ত করতে বাধ্য হচ্ছেন। একুশে টিভির সাংবাদিকেরা এ নিয়ে রিট করলে হাইকোর্ট কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই ইটিভির অনুষ্ঠান সম্প্রচারে হঠাৎ বাধা দেয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে সরকারকে রুল জারি করেছে।
টিভি চ্যানেলগুলোতে অদৃশ্য ফোনের দৌরাত্ম্য এতই ব্যাপক যে, অনেক ক্ষেত্রে ঝামেলা ও ঝুঁকি এড়াতে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সেলফ সেন্সরশিপের আশ্রয় নিচ্ছেন। টকশো শুরুর আগে উপস্থাপক শব্দ চয়ন এবং বিষয়ের ব্যাপারে আলোচকদের সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করে থাকেন। কারণ পান থেকে চুন খসলেই বিটিআরসি ফ্রিকোয়েন্সি বন্ধ কিংবা নানা ধরনের কারিগরি জটিলতার মাধ্যমে সম্প্রচারে জ্যাম করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, ভাইবার বন্ধ করে দেয়ার বেশ কিছু আলামতের কথা নাগরিকদের অজানা নয়।
২০ দলীয় জোটের চলমান আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আন্দোলন হিসেবে একতরফা প্রচারের জন্য গণমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টির নজির কিছু দিন আগে লক্ষ করা গেছে। তথ্যমন্ত্রীসহ সিনিয়র মন্ত্রীরা দুই দফায় গণমাধ্যমের সম্পাদক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে ডেকে সরকারের ওই মনোভাবের কথা জানিয়ে দেন। সিনিয়র সাংবাদিকেরা সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অনুরোধ জানালেও তাতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
মেধাবী সাংবাদিক শওকত মাহমুদ সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ ফোরাম বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজের সভাপতি। তিনি জাতীয় প্রেস কাবের চারবারের সাধারণ সম্পাদক ও দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদসহ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের রুটি-রুজির আন্দোলন এবং মিডিয়া আক্রান্ত হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। টিভি টকশোগুলোতে যুক্তির মাধ্যমে তিনি জোরালো বিশ্লেষণ রেখে এসেছেন। তাকে নিবৃত্ত করার কৌশল হিসেবে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে ছয়টি উদ্দেশ্যমূলক মামলা। একইভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে এনটিভির চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলীকে। এনটিভির মতো একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলকে নিয়ন্ত্রণই এর লক্ষ্য। নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির বরাবরই টকশোতে সাহসী বক্তব্য রেখে এসেছেন। তাকে টেলিফোনে হুমকি দেয়াই শুধু নয়, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের ২০-২৫ জনের একটি দল গত ডিসেম্বরে নিউএজ কার্যালয়ে তল্লাশি চালায়। ভীতসন্ত্রস্ত করার হীন লক্ষ্যই এখানে কাজ করেছে। ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টকে কেন্দ্র করে পত্রিকার বার্তা সম্পাদককে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি জাস্টনিউজ বিডি ডটকম সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। অনলাইন পত্রিকাটির অপরাধ ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দফতর ও নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের ব্রিফিংয়ে কেন ওই অনলাইনের সম্পাদক মুশফিকুল ফজল আনসারী প্রশ্ন করেছেন। ঢাকার বাইরে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের প্রচণ্ড হুমকি ও চাপের মধ্যে কাজ করছেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি একাত্তর টিভির টকশোতে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার পত্রিকার সাংবাদিকদের এমন চাপের মুখোমুখি হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
গত আগস্ট মাসে সরকার বেসরকারি বেতার-টিভির জন্য সম্প্রচার নীতিমালা ঘোষণা করে। এ নীতিমালাটি বেসরকারি বেতার-টিভির হাত-পা বেঁধে দেয়ারই অপপ্রয়াস। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এবং এডিটরস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এ নীতিমালা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানালেও এটি বহাল আছে। নীতিমালায় এমন কিছু ধারার উল্লেখ রয়েছে, যা গণমাধ্যমের জন্য ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি করবে। যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না, বিচারিক ক্ষমতা আছে এমন সরকারি কর্মকর্তা ডিসির বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না। টকশোতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা যাবে না, বিজ্ঞাপন প্রচারে শর্তারোপ ইত্যাদি।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যম নতুন করে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। অতীতের আওয়ামী লীগ আমলের মতোই হাসিনা সরকারের রোষানলে পড়ে ভিন্নমতের গণমাধ্যম। এ যেন এক জন্ম-আক্রোশ! ১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার চারটি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে শত শত সাংবাদিক-কর্মচারীকে বেকারত্বের অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছিল। ১৯৯৬ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে দৈনিক বাংলা, টাইমস, বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়ে এক হাজার সাংবাদিক-কর্মচারীকে কর্মচ্যুত করেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার এবং ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার মিডিয়া দলন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের পাঁচ বছর ও বর্তমান বিতর্কিত শাসনকালে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিসহ ২৪ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি সাংবাদিক। সাগর-রুনি হত্যার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এখনো জানা যায়নি হত্যাকারী কারা এবং হত্যাকাণ্ডের মোটিভ কী ছিল? তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীকে গ্রেফতারের কথা বলেছিলেন। তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন তদন্তে ‘প্রণিধানযোগ্য’ অগ্রগতি হয়েছে। এরপর ডিবি পুলিশ হাইকোর্টে গিয়ে জানায় হত্যা রহস্য উন্মোচনে তারা ব্যর্থ। র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেন হাইকোর্ট। তারা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য ৩২ বার সময় নিয়েছে। সাগর-রুনি হত্যা তদন্তের অগ্রগতি এতটুকুই। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ছিল কারো বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়।
মিডিয়া দলনের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক আমার দেশ সরকার দুইবার বন্ধ করেছে, রহস্যজনক আগুনে পুড়েছে পত্রিকা কার্যালয়। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার নামে আকস্মিকভাবে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার। প্রায় দু’বছর পেরিয়ে গেলেও আজো সেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়নি। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে মফস্বলের দুই শতাধিক আঞ্চলিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয় সরকার। এর ফলে বেকার সাংবাদিক-কর্মচারীর মিছিল বাড়ছেই। এ সরকার আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে দু’বার জেলে ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে ৬৮টি মামলা। বিনাবিচারে তিনি জেল খেটেই যাচ্ছেন। সরকার তো নয়ই, সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টেও আমার দেশ খুলে দেয়াসংক্রান্ত রিটটির শুনানি হচ্ছে না। সরকার জেলে নিয়েছে প্রবীণ সাংবাদিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদকেও।
দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান ও আমার দেশ-এর বেকার সাংবাদিকেরা তাদের মিডিয়া খুলে দেয়ার জন্য সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু এসব দাবি আমলেই নেয়নি সরকার। অতীতের স্বৈরশাসক, একনায়ক এবং সামরিক শাসকদের মতোই মিডিয়া দলন চলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের রেকর্ডও ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমানে আবার একাত্তর টিভির মতো সরকারের স্বার্থ রক্ষাকারী কিছু মিডিয়া দাঁড়িয়ে গেছে, যেগুলো মিডিয়া দলনে সরকারকে উৎসাহিত করছে। এরা নিজেরা খবর গায়েব করে দিচ্ছে এবং অন্যদেরও তা করতে বাধ্য করছে।
কণ্ঠরোধের অতীত ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা
স্বাধীন গণমাধ্যম সব দেশে সব কালেই স্বৈরশাসক, সামরিক শাসক, অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শাসক এবং একনায়কের জন্য ত্রাস। তাই তারা ক্ষমতা দখল কিংবা ক্ষমতা আঁখড়ে রাখার জন্য গণমাধ্যমের ওপর খড়গহস্ত হয়। গণমাধ্যমকে বেড়ি পরিয়ে তারা জনগণের আশা আকাক্সাকে শৃঙ্খলিত করে। ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে মানুষ বারবার স্বৈরশাসনের কবলে পড়েছে। ওই সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাংবিধানিক গ্যারান্টির অনুপস্থিতিতে বাক-ব্যক্তি, সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার বিভিন্ন আলামত জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়। গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ আশান্বিত হয়। কিন্তু বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ সেই আশা-আকাক্সক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের স্থপতি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন গণতন্ত্রীর হাতে এই আইনটি রচিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ স্বৈরশাসকদের জন্য একটি স্বৈরাচারের সনদ রচনার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে জারি করা হয় বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৩ সালে জারি হয় প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট। ১৯৭৫ সালে দেশে প্রবর্তন করা হয় একদলীয় শাসন। একই বছর ১৬ জুন মাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়। রাতারাতি শত শত সাংবাদিক-কর্মচারী চাকরিচ্যুত হন। সাংবাদিকেরা এখনো ১৬ জুন কালো দিবস পালন করেন। সে দিন বেকার হয়ে অনেক সাংবাদিক ফলের দোকান, মুদির দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ অবস্থা থেকে জাতি কিছু দিনের জন্য মুক্তি পেলেও ১৯৮২ সালে আবারো জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসন চেপে বসে এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। গণমাধ্যমের জন্য ওই সময়টি ছিল একটি অন্ধকার যুগ। কঠোর প্রেস সেন্সরশিপ আরোপ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হরণ করা হয়। তবে এরশাদ সাহেব খবর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে প্রেস সেন্সরশিপ নয়, প্রেস অ্যাডভাইস নাম দিয়েছিলেন। এটি ছিল আগেকার প্রেস সেন্সরশিপের চেয়ে অনেক ভয়াবহ। সংবাদপত্র অফিসে সন্ধ্যার পর পিআইডি থেকে ফোন আসত। প্রতিটি সংবাদপত্র অফিসে এই প্রেস অ্যাডভাইসের একটি করে খাতা ‘মেইনটেন’ করা হতো। পিআইডির ফোন এলেই ওই খাতায় লেখা হতো এবং সে অনুযায়ী সংবাদপত্রে খবর ছাপা হতো। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে যেসব দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, তাকে জড়িয়ে যেসব নারীঘটিত স্ক্যান্ডাল হয়েছে এবং যে অনিয়ম, হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নোংরামি এবং আন্দোলনের খবর কিছুই পত্রিকায় ছাপা যেত না। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণমাধ্যম তথা সংবাদপত্রে কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে খবর প্রকাশিত হয়।
বর্তমানে গণমাধ্যম একপ্রকার অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। এরশাদ আমলের মতো পিআইডি থেকে এখন সংবাদপত্র অফিস কিংবা টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ায় ফোন আসে না, আসে না প্রেস অ্যাডভাইস। কিন্তু অদৃশ্য জায়গা থেকে ঠিকই আসছে ফোন এবং অলিখিত প্রেস অ্যাডভাইস। এগুলো খাতায়ও লেখা যাচ্ছে না। যারা ফোন বা প্রেস অ্যাডভাইস দিচ্ছেন তাদের পরিচিতি জানা থাকলেও প্রকাশ করা যাচ্ছে না। একইভাবে প্রযুক্তির কল্যাণে খবর নিয়ন্ত্রণের এমন সব কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে, যার কারণে সরকারের বিপক্ষে যায় এমন অনেক খবর আলোর মুখ দেখছে না। এককথায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বর্তমান কৌশল অতীতের সব কৌশলকে হার মানিয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই শুধু এ অবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব।
লেখক : জাতীয় প্রেস কাবের সাধারণ সম্পাদক