Friday, March 21, 2014

বিমানের গুম, মানুষের গুম

মানুষের ক্ষমতার সীমা আমরা জানছি, যখন আস্ত একটা বিমান স্রেফ নাই হয়ে গেল। এতটা দিন পার হয়ে গেল, আমরা তার কোনো হদিসই করতে পারলাম না! মানুষ নাকি মঙ্গলে যাবে। লুলু ফেরদৌস নামের এক বাংলাদেশি আমেরিকান তরুণীও সেই দলে এখন পর্যন্ত আছেন। সেই যাত্রা নাকি হবে একমুখী। ফেরার পথ এখনো জানা যায়নি। ওখানে গিয়ে চাল-ডাল, পানি-অক্সিজেন জোগাড় করে নিজের মতো করে থাকতে হবে। তবু এঁরা যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। অন্যদিকে, স্টিফেন হকিং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, চাঁদে মানুষ বসতি গড়বে ৫০ বছর পরে। সে ক্ষেত্রে আমাদের পত্রপত্রিকাগুলোয় বিজ্ঞাপন ছাপা শুরু হতে পারে: চাঁদে নিষ্কণ্টক জমি। রাজউক অনুমোদিত। নগদ দামে ৭০ শতাংশ ছাড়। সত্যি কথা বলতে কি, চাঁদে জমি বিক্রি শুরুও হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের ঠকবাজদের আগেই বিদেশের ঠকবাজেরা চাঁদের জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া শুরু করেছিল। এবার হয়তো মঙ্গলের জমি বিক্রিতে আমরা বাংলাদেশিরা এগিয়ে আসতে পারি সবার আগে। ড্যাপের আওতামুক্ত বন্যামুক্ত এলাকা। কৃষিজমি নয়। এখনই বাড়ি করার উপযোগী। প্রবাসীদের জন্য অগ্রাধিকার। তিন কাঠা, পাঁচ কাঠা ও ১০ কাঠার প্লটের জন্য আবেদন করুন।
মানুষ চাঁদে বসত করবে, মঙ্গলে বাড়িঘর বানাবে, তবু মানুষের ক্ষমতার সীমাটাও আমরা নতুন করে জানলাম, যখন মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের একটা বিমান স্রেফ হাওয়া হয়ে গেল। হাওয়া হয়ে যাওয়াটাও কথার কথা। ওটা হাওয়া হয়ে গেছে, নাকি সমুদ্রে পানির নিচে গেছে, আকাশেই ছাই হয়ে গেছে, নাকি কোনো গোষ্ঠী বা দেশ সেটাকে কোথাও নামিয়ে গোপন করে রেখেছে, আমরা কেউ জানি না। লুলু ফেরদৌসেরা যখন মঙ্গলে পাড়ি জমানোর জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন, এবং প্রস্তুতির দলে যোগ দিয়েছেন, তখন আমি কিন্তু সেটা ভাবতে গিয়েই দম বন্ধ হওয়ার অস্বস্তি বোধ করছি। আমি উঁচু স্থান ভয় পাই। বদ্ধ স্থানও ভয় পাই। বিমানে চড়তে হবে শুনলেই আমার ভয় লাগতে থাকে। মালয়েশিয়ান বিমানটা নিখোঁজ হওয়ার পর আমি কলম্বো যাত্রা করেছি। বস্তুত এই লেখাটা কলম্বোর হোটেলে বসে লিখছি। আমি জানি না, ২০ মার্চ আমার বিমানটা গুম হয়ে যাবে কি না। আমি অবশ্য লেখাটা মেইল করে দেব। আশা করি, বিমান হারিয়ে গেলেও লেখা হারাবে না। বিমানে ওঠার আগে ঢাকায় দেখা একজন পাইলটের সঙ্গে। তিনি বলছেন, বাংলাদেশে বিমান চলাচলের জন্য খারাপ আবহাওয়া শুরু হয় ১৫ মার্চ থেকে, চলে জুন পর্যন্ত। আমি তাঁকে বললাম, ‘ভাই, আমি ১৬ মার্চ ফ্লাই করব, ২০ মার্চ ফিরব। আপনি কি খারাপ আবহাওয়াটা ২১ মার্চ থেকে শুরু করতে পারেন?’ তিনি বললেন, ‘আচ্ছা যান, আপনার জন্য এটা ২২ মার্চ করে দেওয়া হলো।’ শুনে স্বস্তি পেলাম। শুধু একটাই প্রশ্ন, খারাপ সময়টা পিছিয়ে দেওয়ার খবর আমি না-হয় জানলাম, আবহাওয়া নিজে জানে তো? উঁচু ভবনও আমি খুব ভয় পাই।
এফ আর খান সাহেবের নকশা করা সিয়ারস টাওয়ারের ওপরে ১০৫ থেকে ১০৬ তলার ছাদে একটা জায়গায় একটা কাচ আছে। সেটার ওপরে চড়লে নিচের মাটি দেখা যায়। আমি সেই কাচের আশপাশেও যাইনি। এ থেকে বুঝতে পারছেন, আমার উচ্চাভিলাষ কম। আমি বেশি ওপরে উঠতে পারব না। সড়কপথেও তো খুব দুর্ঘটনা ঘটে। লঞ্চ ডুবে যায়। তবু মনে হয়, সড়কপথের দুর্ঘটনা বা লঞ্চের ডুবে যাওয়াও মেনে নিতে পারব। কিন্তু বিমান যদি দুর্ঘটনায় পড়ে?... আল্লাহ না করুন... কথা হচ্ছিল বিমান হারিয়ে যাওয়া নিয়ে। আমেরিকানরা গবেষণা করছেন, প্রধানত যুদ্ধের প্রয়োজনে, শত্রুর যেকোনো যান বা সদস্যের অবস্থান তাঁরা সব সময় নিরূপণ করবেন। কত বিচিত্র বিষয়েই না গবেষণা হচ্ছে। শুধু মালয়েশিয়ার বিমানের খবর আমরা পাই না। একটা বিমান যখন গুম হয়ে যায়, পৃথিবীর মানুষ তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আজও দেখলাম, বিবিসি ও সিএনএন মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সংবাদ সম্মেলন সরাসরি দেখাচ্ছে। কিন্তু একজন ব্যক্তি যখন গুম হয়ে যায়, তখন? একজন ব্যক্তিকেও বাঁচিয়ে রাখা কত কঠিন, যখন ক্যানসারে আক্রান্ত কোনো তরুণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করার কাজে যুক্ত হয়ে পড়ি, তখন কিছুটা বুঝি। কিন্তু কী অবলীলায় আমরা মানুষেরা মানুষকে গুম করে ফেলছি। ক্রসফায়ারে ফেলছি। মনে রাখতে হবে, মালয়েশিয়ান ওই বিমানের যাত্রীদের প্রত্যেকের আত্মীয়স্বজনের মনে যে উদ্বেগ, বাংলাদেশেও যেকোনো পরিবারের যেকোনো হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির স্বজনদের বুকেও একই উদ্বেগ। মানুষের সীমাবদ্ধতার উদাহরণ হিসেবে রুশ সাবমেরিনের কথাটা আমি ভুলতে পারি না। একটা সাবমেরিনে ক্রুরা আটকা পড়লেন, তাঁরা বললেন, ‘আমরা বিপদে পড়েছি, আমাদের উদ্ধার করো।’ সারাটা পৃথিবী তা জানল, কিন্তু সেই উত্তাল সমুদ্রে তাঁদের কাছে উদ্ধারকারী ব্যক্তিরা পৌঁছাতেই পারলেন না।
লোকগুলো আস্তে আস্তে নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে সমর্পিত হলেন। মানুষ মানুষকে ধ্বংস করার জন্য যত গবেষণা করেছে, যত বিনিয়োগ করেছে, যত মারণাস্ত্র বানিয়েছে, তার একাংশ যদি মানুষকে বাঁচানোর জন্যও করত, পৃথিবীটা সত্যি একটা মনোরম স্থানে পরিণত হতো। মানুষের মৃত্যুও হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু একজন ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে যাবে, এটা তার আত্মীয়স্বজন মেনে নিতে পারে না। তারা সারা জীবন অপেক্ষা করে, একটা ক্ষীণ আশা থাকে—হয়তো ছেলে বা মেয়ে ফিরে আসবে। আর গুম নিয়ে আমি তো একটা উপন্যাসই লিখেছি বছর দুয়েক আগে। ‘সেই গুমের পর’। প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছিল গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি, এর চেয়ে ক্রসফায়ার ভালো ছিল। অন্তত লাশটা পাওয়া যায়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনেরা কতগুলো বাস্তব সমস্যায়ও পড়ে। গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী বিয়ে করতে পারবেন না, তাঁর সম্পত্তির বিষয়েও সহজে ফয়সালা হবে না! কারণ, স্বামী তো মারা যাননি। যদি এখনই এসে হাজির হন! গদ্যকার্টুন আসলে মন খারাপ করা বিষয় নিয়ে লিখতে চাই না। হাস্য-কৌতুক করতে চাই এই কলামে। কাজেই পুরোনো কৌতুকটাই আবার করি। একটা বিমান দুর্ঘটনায় পড়েছে। সব যাত্রী মারা গেছে। শুধু এই বিমানের যাত্রী একটা বাঁদর বেঁচে আছে। তাকে বলা হলো, ‘বিমানটা যখন অ্যাক্সিডেন্ট করে, যাত্রীরা কী করছিল?’
বাঁদর দুই হাত বাঁ কানের কাছে জোড় করে ধরে মাথাটা কাত করে চোখ বন্ধ করে দেখাল: ঘুমাচ্ছিল।
‘তখন বিমানসেবকেরা কী করছিলেন?’
বাঁদর আবার দুই হাত বাঁ কানের কাছে জোড় করে ধরে মাথাটা কাত করে চোখ বন্ধ করে দেখাল: ঘুমাচ্ছিল।
‘চালকেরা কী করছিলেন?’
বাঁদর দেখাল: ঘুমাচ্ছিলেন।
‘তাহলে তুই বাঁদর কী করছিলি?’
বাঁদর ককপিটে বসে বিমানের যন্ত্রগুলো টেপাটেপি করল। অর্থাৎ সে বিমান চালাচ্ছিল! আমরা সব সময় প্রার্থনা করব, আমাদের চালকেরা যেন ঘুমিয়ে না পড়েন। এবং যাঁদের ওপর দায়িত্ব, যাঁরা যে কাজের জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত, তাঁদের বদলে যেন বাঁদরেরা স্টিয়ারিং না ধরে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

স্থানীয় সরকারের নামে ধোঁকা

এ কথা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার যে উপজেলা নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন চলছে। এই প্রহসন নির্বাচন কারচুপি বা সহিংসতার নিরিখে নয়। বরং এটা হলো গভীর হতাশা থেকে উদ্ভূত, যার ভিত্তি হচ্ছে, ১৯৯২ সালের ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি মাইলফলক রায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ে মিলে রায়টি লঙ্ঘন করে চলেছে। এবং আগামী জুলাইয়ে এ রায় লঙ্ঘনের ২২ বছর পূর্তি হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া না-হওয়া নিয়ে দুই দল ব্যতিব্যস্ত। উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির ভোট কারচুপির গ্রহণযোগ্য অভিযোগগুলো গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম এবং আলোচনার মুখ্য খোরাকে পরিণত হয়েছে। অথচ আমরা যদি বাংলাদেশ সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯, ৬০ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করি, যদি আমরা ১৯৯২ সালের কুদরত-ই-ইলাহী বনাম রাষ্ট্র মামলায় আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের নির্যাস গ্রহণ করি, তাহলে বলতেই হবে যে স্থানীয় সরকার নিয়ে জনগণকে চরম ধোঁকা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। আপিল বিভাগ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, সামরিক শাসকেরা স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নাম বদলে পটুত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অভিনবত্ব এনেছেন। কিন্তু তাঁরা কখনোই সংবিধানের নির্দেশিত পথে স্থানীয় জনসাধারণকে তাঁদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা স্বায়ত্তশাসনের স্বাদ নিতে দেননি। গণতন্ত্রের লেবাসধারীরাও একই নায়ের যাত্রী। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা পুরোনো আদলে রেখে নাম বদলে দেন।
এরপর জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ধুয়া তোলেন। আগের মতোই পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেসি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে পরিবার পরিকল্পনা, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালনের মতো কিছু বিষয় থানা পরিষদের কাছে ন্যস্ত করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে আগের মতোই শ্বেতহস্তী অবস্থা বজায় রেখেই ‘থানা ও থানা পরিষদ’ শব্দ মুছে দিয়ে ‘উপজেলা ও উপজেলা পরিষদ’ পুনর্গঠন করেন। ২০০৯ সালে দেখতে হলো, ইউএনওদের উপজেলা পরিষদের সভাপতি, সাংসদদের উপদেষ্টা আর নির্বাচিত চেয়ারম্যানরা দ্বিতীয় উপদেষ্টা। অর্থাৎ শুভংকরের ফাঁকিটা চলছেই। সরকারি প্রচারযন্ত্রের কোরাস থামছে না যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটছে। এর অধিকাংশ প্রচারণা মিথ্যা ও প্রতারণার ওপর দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশকে ফেডারেল কাঠামো না করে এককেন্দ্রিক সরকার করা হয়েছিল। তবে সংবিধানপ্রণেতারা দুধের স্বাদ কী, সেটা জনগণকে দিতে চেয়েছিলেন। তাই অন্তত ঘোল হিসেবে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ সংযোজন করেন। কিন্তু পরিহাস হলো, আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের চপ্পল থেকে বাংলাদেশ কখনো বের হতে পারেনি। সামরিক, আধা সামরিক ও গণতন্ত্রের লেবাসধারী সরকারগুলো কখনো ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সত্যিকারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চায়নি। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে, বিশেষ করে উপজেলা ব্যবস্থা ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা যতই বলা হোক না কেন, সংবিধান লঙ্ঘন চলছেই।
এই ব্যবস্থাকে শাসকেরা গণতন্ত্রের একটি লেবাস হিসেবে রাখতে চান। তাঁরা সম্ভবত মানুষকে ভাঁওতায় রাখার পণ করেছেন। সংবিধান ও রায় কিছুই তাঁরা মানবেন না। এ দুটি অনুচ্ছেদের করুণ ইতিহাস তাই নির্দেশ করে। চতুর্থ সংশোধনীতে এ দুটি অনুচ্ছেদ মুছে ফেলা হয়। এমনকি ১১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের কথাটিও বাকশাল নিতে পারেনি। আর বাকশালকে তুলাধোনা করতে করতে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তাঁর উত্তরসূরিরা জ্ঞাতসারে একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। সে কারণেই পঞ্চম সংশোধনীতেও ওই দুটি অনুচ্ছেদ জ্যান্ত করা হয়নি। এমনকি ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনী পাসের আগ পর্যন্ত এ দুটি আর কখনো ফিরে আসেনি। আমরা যে অনেক সময় বলি, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই শ্রেষ্ঠতম ও শেষ কথা, সেটা এ ক্ষেত্রেও একটি নজির। কারণ, ওই দুটি অনুচ্ছেদ থাকা আর না থাকার মধ্যে শাসকগোষ্ঠী কোনো পার্থক্য রাখেনি। এখনো রাখছে না। আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কেবল উপজেলা নয়, গোটা স্থানীয় সরকারব্যবস্থাটাই কমবেশি সংবিধান লঙ্ঘন করে চলেছে। আপিল বিভাগ বলেছিলেন, আগে ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অতঃপর ৬০ অনুচ্ছেদ কার্যকর করা সম্ভব কি সম্ভব নয়, সেই প্রশ্ন আসবে। সুতরাং ৬০ অনুচ্ছেদমতে, কর আরোপ ও বাজেট প্রণয়নের মতো এখতিয়ারের প্রকৃত অর্থপূর্ণ অনুশীলন নিয়ে আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক থাকছে। সামরিক শাসনামলে যে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, তা ১৯৯২ সালে বাতিল হয়েছিল। তার কারণ ছিল একটি মাত্র বাক্য।
১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশে উপজেলাকে প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। এর মধ্য দিয়ে আমাদের নির্বাচিতের বড়াই করা শাসকেরা ওই টেকনিক্যাল ত্রুটি শুধরে নিয়েছেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, সামরিক শাসনবিরোধী দীর্ঘ লড়াই শেষে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় জনগণ কি পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে? এর উত্তর হলো, ‘প্রশাসনিক একাংশ’ শব্দটি সরকারি কালিতে মুদ্রিত হয়েছে। তাঁরা ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দিতে পারতেন। কিন্তু তা তো তাঁরা করেনইনি, বরং বিদ্যমান বিধানমতে প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন স্থানীয় সরকারের দায়িত্বের সনদে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্ত এবং তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। বরং আইনশৃঙ্খলার মতো স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদে ইউএনওরা আছেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রায়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যদি সরকার তার কর্মকর্তা ও খয়ের খাঁদের দিয়ে স্থানীয় সরকার চালাতে চায়, তাহলে স্থানীয় সরকার বলতে আর কিছু থাকবে না।’ আমরা তো কেবল মনোনীতদের মধ্যে নয়, বহু ক্ষেত্রে নির্দলীয় নির্বাচিত নেতার মধ্যেও ওই ‘খয়ের খাঁ’ দেখতে পাই। ২২ বছর পরে এই ২০১৪ সালেও আমাদের আপিল বিভাগ, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ কী আশ্চর্য প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন বলেছিলেন, অতীতের স্বৈরাচার সরকারগুলো সংবিধান স্থগিত কিংবা ধ্বংস করে দিয়ে এবং জাতীয় সরকারব্যবস্থায় গণতন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে তৃণমূলে সাচ্চা গণতন্ত্র দিতে ছুটেছে। তারা নাম বদল করে বলেছে, এই নাও অধিকতর গণতন্ত্র দিলাম।
কিন্তু এসব ‘গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ’ জনসাধারণের সামান্য আস্থা অর্জন করেছে। আর এ সবই জনসাধারণ ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ভাঁওতা দেওয়ার জন্যই। এটা একটা পরিহাস যে ২২ বছর পরেও আপিল বিভাগের এই পর্যবেক্ষণ একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, নাকি আরও প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করেছে, তা একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন বটে। অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্র অনুশীলন অর্থাৎ সমষ্টিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারার সঙ্গে যে গণতন্ত্রের যোগসূত্র রয়েছে, তা এই রাষ্ট্রের সর্বত্র অনুচ্চারিত। উপজেলা পরিষদ কীভাবে কী কাজ করবে, তা এখন পর্যন্ত বিতর্কের বিষয়। অবশ্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ও চূড়ান্ত কোনো একটি লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাজনৈতিক ইচ্ছা আমরা যথারীতি অনুপস্থিত দেখি। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে পরামর্শ করে উপজেলা পরিষদকে চলতে হবে বলে ২০০৯ সালে যে আইন করা হয়েছে, তা ভদ্র সমাজ হলে ক্ষতির কারণ হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, স্থানীয় সাংসদ অনেক স্থানে উপজেলা পরিষদে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। উপজেলা চেয়ারম্যানরা স্থানীয় সংসদের হস্তক্ষেপ না চাওয়ার দাবি জনপ্রিয় করতে পেরেছেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরাও নিজেদের কোনো সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে দিতে চান না। কারণ, তাঁরাও নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পছন্দ করেন। এমপির হস্তক্ষেপ নয়, যে যেখানে আছেন, নিজের ওপর কেউ কারও হস্তক্ষেপ চান না। উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদের, উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভাইস চেয়ারম্যানের এবং তাঁদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্নায়ুযুদ্ধ সহজেই বোধগম্য।
এ বিষয়ে এমন একটি আলোচনা চলমান হওয়া দরকার, যেটা হতে হবে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও সংবিধানসম্মত। বছরে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা উপজেলা পরিষদ সরাসরি খরচ করলেও ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তদারকিতে ব্যয় হয়ে থাকে। সুতরাং এ তথ্যই নির্দেশ করে যে উপজেলা ব্যবস্থায় কে জমিদার আর কে প্রজা? ইউএনওদের উপজেলা পরিষদের সচিব করা হয়েছিল। এতে তাঁরা রুষ্ট হলে তাঁদের মুখ্য নির্বাহী করা হয়। সংবিধান বা আইনের কোথাও ডিসি মানে জেলা প্রশাসক স্বীকৃত নয়। কিন্তু মানুষ ঠকাতে ডিসির বাংলা ভাষান্তর হিসেবে জেলা প্রশাসকই চালানো হচ্ছে। আর জেলা পরিষদগুলোতে এই সরকারও যথারীতি ‘খয়ের খাঁ’ রেখে দিয়েছে। সুতরাং বাস্তবতা হচ্ছে, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবিত ‘প্রশাসনিক একাংশ’ এখনো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ১৯৯২ সালে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, স্থানীয় সরকারকে সবল ও সংবিধানসম্মত করতে একটি কমিশন করা হয়েছে। এরপর আরও কত কমিশন হলো, কিন্তু গল্প ফুরাল না। দুই শর্ত দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। প্রতিটি স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবে। প্রশাসনিক একাংশ হতে হবে। বাস্তবতা হলো, বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ প্রতিটি জেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অনুপস্থিত। সরকারি কালিতে অবশ্য ‘প্রশাসনিক একাংশ’ আছে, তাই তাদের আইন ‘অমান্যকারী’ বলা যাবে না। সরকার শুধু একাই সুপ্রিম কোর্টের রায় অমান্য করছে তা নয়, একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও করছে। কারণ, অনধিক ছয় মাস সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে কখনো উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি। তারা সংবিধান বোঝে না, সুপ্রিম কোর্টের রায় বোঝে না। মামুলি আইন, যেখানে লেখা আছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কখন হবে, তা সরকার ঠিক করবে—এই কথাটিতে তাদের আস্থা এভারেস্টতুল্য। নির্বাচনী সহিংসতা ও কারচুপিজনিত বাদানুবাদের মধ্যে আমরা কাদের ভোট দিই, কেন দিই, তাদের কী কাজ করা উচিত, আর কী করে, সেদিকে মনোযোগ আনতেই সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন স্মরণে আনলাম। কয়েক বছর সরকারগুলো ওই সময়সীমা বাড়িয়ে নিয়েছে। ওই রায়ের প্রতি সম্মান জানাতে আমাদের গণতান্ত্রিক সৈনিকেরা ভীষণ ক্লান্ত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

পঞ্চাশে মনে হল মনচাষে নেমে গেলাম by আনোয়ার সেলিম

নাসরীন জাহান একজন ব্যতিক্রমী ধারার কথাসাহিত্যিক। এ বছরই তিনি পঞ্চাশে পদার্পণ করলেন। নাসরীন জাহানের লেখালেখি ও ব্যক্তিগত অনেক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন শ্যামল চন্দ্র নাথ। সেই কথোপকথনের অংশবিশেষ যুগান্তর সাময়িকীতে পত্রস্থ হল বি. স.
শ্যামল : এখন আপনার সময় কীভাবে কাটছে?
নাসরীন জাহান : গত চার-পাঁচ মাস থেকে আমি লিখতে পারছি না। আমার ডান হাতের আঙুলে ব্যথা পেয়েছি। যার ফলে আমি একটা ডিপ ডিফরেশনের মধ্যে আছি। আমি আশা করছি, আমি এটা কাটিয়ে উঠব। আঙুলটা ভালো হবে আবার। গত বছর আমার কোনো উপন্যাস বের হয়নি। খুব সিরিয়াসলি ভাবছি এবার একটা উপন্যাস লিখব। তো এর বিষয়বস্তু নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি কম বেশি। আমি যদি থিমটা পেয়ে যাই তাহলে আমি উপন্যাসটা শুরু করব।
শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন..., চারটা কিশোর উপন্যাস লিখে হঠাৎ করে ছেড়ে দিলেন কেন?
: আমি একটা সময়ে ছড়া লিখতাম। ছড়া, কিশোর গল্প দিয়ে আমার উত্থান। শিশু একাডেমির প্রভাবে হোক, বা কিছু পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার প্রভাবে আমার চারটা উপন্যাস লেখা হয়ে গেছে। আমি তো সিরিয়াস ধারার উপন্যাস লিখি। কিন্তু আমার মনে হল আমি যে লিখি এতে বাচ্চাদের ঠিক কমিউনিকেট করতে পারছি না। বা আমার ভাষাটা তা পারে না। আমার লেখাটা বাচ্ছাদের জন্য লিখলেও কিছু তৎসম শব্দ ঢুকে পড়ে। তখন আমার মনে হল, এটা বাচ্চাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
আমি নিজেই এটা বিশ্লেষণ করেছি। ওই বিষয়টা লক্ষ্য করার কারণেই আমি নিজেই যেন গুটিয়ে গেলাম এর থেকে।
আপনার ‘উড়ুক্ক’ উপন্যাসটি খুবই আলোচিত- এ নিয়ে নতুন কিছু বলার আছে?
: নতুন করে যদি বলতে হয় তাহলে আমি বলব, যখন আমি পাঁচটা গল্পের বইয়ের পরে আমার প্রথম উপন্যাস উড়ুক্কু লিখি তখন আমার মনে হয়েছিল বা আমি জানছি যে এটা উপন্যাস হচ্ছে না। উপন্যাস যে লিখতে পারি এটা যাতে বলতে পারি এ কারণে লেখা। পুরস্কার পাওয়ার পরও বেশ অনেকদিন গেছে এটাকে আমার উপন্যাস মনে হয়নি। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি যখন ওই উপন্যাসটার দিকে চোখ বুলাই তখন মনে হয় উপন্যাস হচ্ছে না। প্রতিটি লাইনে লাইনে আমার যে মমতা ছিল সে মমতা এখন আমি আমার লেখাতে দিতে পারি না। আমি যখন উড়ুক্কু লিখছিলাম তখন আমি ধরে নিয়েছিলাম এটাই আমার প্রথম এবং শেষ উপন্যাস। আমি আর উপন্যাস লিখব না। এখন আমার মনে হয় উড়ুক্কুর ধরার বা ওই মানের উপন্যাস আমি আর লিখতে পারিনি আসলে।
আপনার কি আত্মজীবনী লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে ?
: এক সময়ে আমার মনে হতো আত্মজীবনী লেখা মানে মানুষের গোপন বিষয় ফাঁস হয়ে যাওয়া। তারপর মনে হল, না; আÍজীবনীতে তো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক মজার অভিজ্ঞতা থাকে। সারা জীবন আমি ভেবেছি আমি লিখব। কিন্তু এখন আমার মনে হয় লিখলে ভালো হয়। লিখলে তা অনেকের জন্য খুবই ইন্টারেস্টিং হবে।
অবসর সময় কীভাবে কাটান।
: গান শুনি, টিভি দেখি, বই পড়ি, মুভি দেখি।
চলচ্চিত্রকে আপনি কিভাবে দেখেন? কি ধরনের চলচ্চিত্র আপনি দেখেন?
: আমি স্বাভাবিকভাবে আর্ট ফিল্মই দেখি। আমি আবার বাণিজ্যিক ধারার ছবিও দেখি। দুই ধারার ছবিই আমার দেখা। কিন্তু দেখা যেত, আমি শৈশবে আর্ট ফিল্ম ছাড়া কিছু দেখতেই পারতাম না, সহ্যও করতে পারতাম না। এখন সেটা ভিন্ন। আমার মনে হয় সব ছবি থেকে কিছু না কিছু নেয়ার আছে। কোনটা থেকে বিনোদন নেয়ার আছে, আবার কোনটা থেকে মানুষের জ্ঞান নেয়ার ব্যাপার থাকে। সবগুলোই জরুরি জীবনের জন্য।
উপন্যাসে রিয়ালিজম এবং রোমান্টিসিজম এ দুটি ধারাকে বা ভিন্নতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
: দুটিকে আমি ভিন্নভাবে দেখি না। রোমান্টিসিজম তো একটা বাস্তবতা। এটা তো রিয়ালিজমের মধ্যেই পড়ে।
কিন্তু রোমান্টিসিজমে তো অনেক সময় আবেগটাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
: হ্যাঁ, আবেগ থাকলে মানুষ বুঝতে পারে না। মানুষ মনে করে মানুষ স্বপ্নের মধ্যে আছে। মানুষ যখন মনে করে সে স্বপ্নের মধ্যে আছে আবার যখন সে ওই পর্যায়টা পার হয় তখন তো সে বাস্তবে আসে। তখন সে মনে করে সে বাস্তবের মধ্য দিয়েই গেছে। তখন ওটাই তার রিয়েলিটি। এটা চমৎকার একটা বিষয়। দ্বন্দ্ব নেই আবার মনে হয় দ্বন্দ্ব আছে। দ্বন্দ্ব মনে হয় তখন, যখন ভাসতে থাকে। ফলে মনে হয় এটা সত্য না। যখন ফিরে আসে তখন মনে হয় ও আচ্ছা আমি এটার মধ্যে গেলাম।
ছাপার অক্ষরে যখন আপনার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় তখন আপনার কেমন অনুভূতি হয়েছিল।
: এটা ভাষায় প্রকাশের বাইরে। আমার জীবনের অনেক অনেক প্রাপ্তি আছে। অনেক প্রাপ্তির মধ্যে এটা অন্যতম। আমি তখন ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্কুল থেকে ঢাকার শিশু পত্রিকায় আমার গল্প ছাপা হয় প্রথম সংখ্যায়। স্কুলে তো সবাই জানে আমি লেখালেখি করি ক্লাস ফোর থেকে এবং গল্পটা ছাপা হয়। ছাপা হওয়ার পর স্কুলে আমার দাম বেড়ে গেল। আমি তখন নানা বাড়ি যাচ্ছিলাম বাসে। আমার মনে হয়েছিল সবাই আমাকে চিনবে এবং অভিনন্দন জানাবে। কিন্তু আমাকে তো কেউ চিনছে না। আমি সাংঘাতিক স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছিলাম।
আপনি অনেক সময় পেরিয়ে এলেন আপনার জীবনের অপ্রাপ্তি নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
: অপ্রাপ্তি বলতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি আসলে ভালো কোনো উপন্যাস লিখতে পারিনি। আমি সারা জীবন শুনেছি যে এত ছোট মেয়েটা কি করে এত কাজ করছে! এত ছোট মেয়েটা এ বয়সে কি করে? আমি এই করতে করতে জীবনের এ বয়সে এসে যে আমি পৌঁছে যাব বুঝিনি। এ বয়সে এসে আমি দোলাচলে পড়ে গেলাম যে আমি সারা জীবনে ছোট ছিলাম। সেই আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে আমার মনে হয় আমার কিছু করাই হয়নি। আমার মনে হয় সিরিয়াস কোনো কাজই করিনি। এই নিয়ে আমি খুব হতাশার মধ্যে আছি।
৫০তম জন্মদিন নিয়ে আপনার অনুভূতি এবং ভাবনা কেমন?
: পঞ্চাশে আমার মনে হল যে আমি একটা মনচাষে নেমে গেলাম। আমি কখনও বুঝিনি আমার বয়স হয়ে গেছে। এখন আমি আমার মনচাষ করছি এবং নিজেকে খুঁজছি নিরন্তন। আমার শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে এখন এ বয়সে এই ভেবে আমি নিজেকে কিছুতেই বসাতে পারছি না। এ ৫০ বয়সটা আমার না, এটা অন্য কারও। এ নিয়ে আমার ভেতর নেগেটিভ ঘোর যাচ্ছে। জানি না এ থেকে আমি কীভাবে বেরিয়ে আসব।
কি ধরনের লেখা আপনার পছন্দ।
: যার লেখার মধ্যে বাস্তবের চেয়ে স্বপ্ন থাকে একটু বেশি। যেখানে রুঢ় বাস্তবতাকে একটা স্বপ্নের মাধমে একটু ফ্যান্টাসির মাধ্যমে আনতে পারে সেই লেখকের লেখা আমাকে তুমুলভাবে টানে।

যুক্তি তক্ক ভাষা by মাসুদুজ্জামান

বাঙালির হয়তো এটাই স্বভাব কিনা জানি না, সে কথা বলতে ভালোবাসে, তর্ক করতে ভালোবাসে। কথা বলে সে সমস্ত আবেগ দিয়ে, শরীর দিয়ে। মানুষমাত্রেই এভাবে কথা বলে। কিন্তু বাঙালিমাত্রেই নিজের বলা কথাকে যেভাবেই হোক প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর এজন্যে সে অনর্গল কথা বলে যায়। এই সেই বাঙালি, যে হয়তো ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছেন, কিংবা কোনো মহাসড়ক দিয়ে হু হু করে ছুটে চলেছে তার বাস, কিংবা কিছুটা মন্থর কোনো যান- লঞ্চে চেপে যাচ্ছেন দূর কোনো গন্তব্যে- কথা বলার লোক তার চাই-ই চাই। অচেনা সহযাত্রীকে তাই সহজেই সে আপন করে নিয়ে নিজের কথার ‘শ্রোতা’ বানিয়ে নেন। আড্ডা হলে তো কথাই নেই। সবাই সেখানে চেনা-জানা, সবার সঙ্গে সহজ সম্পর্ক, ফলে কথার তুবড়ি ছোটে। টেলিভিশনের টক শোতে দেখি কথার এই অনর্গল অবিরল স্রোত। জনসভায় যারা কথা বলেন, তাদের কথাও থামতে চান না। সংসদেও এই কথার সংকীর্তন। কখনো কখনো প্রকৃত সঙ যারা, তারাও কোনো কোনো সাংসদের কথা শুনলে পেশাদারিত্বের কথা ভুলে যেতে পারেন।
এই যে চারপাশে এত কথা আর কথা, আমাদের কর্ণপীড়ন আর মনোপীড়নের কারণ ঘটাচ্ছে, এসব কথার আদৌ কোনো সারবস্তু আছে কী? মানুষের কথা নিয়ে যেসব গবেষকদের কারবার, সেই ভাষাবিদরা বলছেন, আমরা দুই ধরনের কথা বলি- একটা হলো কেজো কথা, আরেকটা প্রতিদিনের সাদামাঠা কথা। কেজো কথা হলো প্রয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ কথা আর প্রতিদিনের জীবনযাপনের প্রয়োজনে যেসব কথা বলি, সেসব হচ্ছে সাধারণ কথা। সব কথারই কমবেশি গুরুত্ব আছে, তবে কেজো কথার গুরুত্ব অনেক বেশি। কেজো কথাকেই আমরা নানা ভারি ভারি নামে চিহ্নিত করেছি- ‘বক্তৃতা’, ‘ভাষণ’, ‘অভিভাষণ’, ‘টক শো’, ‘বিতর্ক’ ইত্যাদি।
নামে যতই ভারি হোক, কথার মধ্যে যদি সারবস্তু না থাকে, তাহলে সে-কথা যে মাঠে মারা যায়, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কথাকে তাই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হয়, তা সে বক্তৃতাই হোক কিংবা বিতর্ক। ওই ভাষাবিদ বা যোগাযোগবিদরাই জানাচ্ছেন, সেই কথাই এখন গুরুত্বপূর্ণ যাকে আমরা চিন্তা ও মননের সঙ্গে অবিমিশ্র করে উপস্থাপন করে থাকি। অর্থাৎ সহজ সরল কথা নয়, কথার মধ্যে থাকতে হবে ভাবনা ও মননের গভীরতা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সরলভাবে উপস্থাপন না করে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হবে, উপস্থাপন করতে হবে। আমরা যাকে বলি ‘কথার ধার’, গুরুত্বপূর্ণ কথায় থাকতে হবে এই ধার। ভাষাযোগাযোগবিদরা একেই ইংরেজিতে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বলে উল্লেখ করেছেন। যারা সাহিত্য সমালোচক, তার্কিক তাদের কথাও এই চিন্তনের অন্তর্ভুক্ত। কোনো বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণ মূলত এই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক কথপোকথনের এটাই হচ্ছে প্রধান বৈশিষ্ট্য। যে-কোনো বিষয়কে ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে, উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু এই ক্রিটিক্যাল বা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে কী বুঝবো আমরা?
বাঙালিদের স্বভাব নিয়ে একটা কথা প্রচলিত আছে- ‘ছিদ্রান্বেষী’। ক্রিটিক্যাল চিন্তা মূলত এই ছিদ্রান্বেষণই, তবে শুধু ত্র“টি খুঁজে বের করে প্রতিপক্ষকে আত্মভাবনার দ্বারা রক্তাক্ত করা নয়, জর্জরিত করা নয়; প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটা যৌক্তিক বয়ান বা ডিসকোর্স দাঁড় করানোই হচ্ছে সমালোচনামূলক চিন্তনের মূল কথা। ফলে তা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তি ও যুক্তির চর্চাবিশেষ। দার্শনিকরাই সমালোচনামূলক চিন্তনের উদ্ভাবক। জগত ও জীবনের কথা বলতে গিয়ে তারা যে যুক্তিতর্কের অবতারণা করেছেন, সেটাই হচ্ছে সমালোচনামূলক ভাবনার ভিত্তি। তবে এই চিন্তন বহুমুখী। উদ্দেশ্যের ব্যাপকতা লক্ষ্য করবার মতো। কেউ বলেছেন সমালোচনামূলক চিন্তন একধরনের দক্ষতা যে দক্ষতা থাকলে প্রতিপক্ষ কীধরনের যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে কিংবা কী বলা হলো, অথবা প্রতিপক্ষের যুক্তির ত্র“টিপূর্ণ দিকগুলি সম্পর্কে ঠিক ঠিক বোঝা সহজ হয়। কেউ কেউ বলেন, সমালোচনামূলক চিন্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে এটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে সহায়তা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারলে যে-কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা অর্জিত হয়। কীভাবে একটা বিষয়কে সমালোচনা করা যায়, সেই কৌশলও একজন তার্কিক আয়ত্ত করতে পারে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা কৌশল অর্জন করা গেলে প্রতিপক্ষের যুক্তিকে অস্থিতিশীল, অনিশ্চিত করে দেওয়া যায়, যে-কোনো বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন সম্ভব হয়। উপযুক্ত যুক্তির জাল বিস্তার করে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়া যায়। জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে এভাবেই গভীর জ্ঞান ও যুক্তির অধিকারী হতে পারলে, কেউ কেউ মনে করেন, যে-কোনো বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচক বা তার্কিক চিন্তাশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারেন। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমকালের এরকম পাঁচজন শিক্ষাদার্শনিক রবার্ট এনিস, রিচার্ড পল, জন মেপেক, হার্ভে সিয়েজেল এবং জেন রোনাল্ড মার্টিন এভাবেই ক্রিটিক্যাল চিন্তনকে চিহ্নিত করেছেন। সিয়েজেল খুব স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন সমালোচনামূলক চিন্তনের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট বিষয়জ্ঞান এবং যুক্তির সম্পর্ক গভীর।
লক্ষণীয়, সিয়েজেল সাধারণ সাদামাঠা যুক্তি নয়, বলেছেন ক্রিটিক্যাল রিজনিং বা সমালোচনামূলক যুক্তির কথা। একজন সমালোচক এভাবেই সমালোচনামূলক চিন্তক হয়ে উঠতে পারেন। তিনি যুক্তির কথা বলতে গিয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছেন জ্ঞানতত্ত্বের ওপর। জেন মার্টিন আবার এই জ্ঞানতাত্ত্বিক জ্ঞান বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন। অর্থাৎ একমুখী কোনো জ্ঞান নয়, জ্ঞানের নানা শাখায় একজন তার্কিকের বিচরণ থাকা আবশ্যিক। অর্থাৎ জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা দিক সম্পর্কে তাকে অবহিত হতে হবে, বহুত্বধর্মী ও গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এই জ্ঞানই হচ্ছে সমালোচনামূলক যুক্তির মূল ভিত্তি। কার্ল আসস্টোন এই ভাবনাকে আরেকটু বিস্তৃত করে বলেছেন, সমালোচনামূলক চিন্তককে “বহুমুখী মানবীয় সমস্যা সম্পর্কে আগ্রহী হতে হবে আর তাকে চিন্তা, কর্মতৎপরতা, প্রকাশ এবং এদের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক কী, সে-সব বিষয়ে অবহিত হতে হবে।”
মানবীয় চিন্তন ও চিন্তার প্রকাশ মূলত গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিস্তৃত ও গভীরতর হয়ে উঠতে শুরু করে। বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের অনুসন্ধিৎসা তৈরি হবার ফলে আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় মানুষ জ্ঞানচর্চায় যেমন জড়িয়ে পড়েছে, তেমনি উৎপাদন করছে বিপুল জ্ঞান। ইন্টারনেট বা অন্তর্জালের সূত্রে উৎপাদিত এই জ্ঞানের বিপুল বিস্তার এখন একটা সাধারণ ঘটনামাত্র। প্রযুক্তি আমাদের জ্ঞানচর্চাকে শুধু বাড়িয়েই দিচ্ছে না, মানুষকে বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারী করে তুলছে, একেবারে দৈনন্দিন পঠনপাঠনের সীমার মধ্যে নিয়ে এসেছে। অসংখ্য ছাপা গ্রন্থ এখন ইবুকের আকারে অন্তর্জালেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে নানা তত্ত্ব ও ভাবনার সৃষ্টিতে। বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, গণমাধ্যম, রাজনীতি ও বিজ্ঞানের নানা তত্ত্বভাবনার আবির্ভাবে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার এতটাই স্ফীত হয়ে উঠেছে যে, যারা চিন্তক, ভাবুক, সমালোচক, তার্কিক, তাদের এই উৎপাদিত জ্ঞানচর্চার সঙ্গে পরিচিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। সাধারণ ভাবনার পরিবর্তে ভাবুকেরা এই সময় থেকেই জড়িয়ে পড়েছেন সমালোচনামূলক ভাবনায়। বিশ শতকের ভাবনার ইতিহাস মূলত এই সমালোচনামূলক চিন্তনের ইতিহাস। সর্বজনীন যুক্তি এবং কার্যকারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন দার্শনিক ও ভাবুকেরা। ফলে চিন্তার ধরনও অনেকখানি পাল্টে গেছে। এই লেখায় সবার সম্পর্কে নয়, আমি নীৎসে, হাইদেগার, ভিটগেনস্টাইন এবং উত্তর-কাঠামোবাদী ফরাসি ভাবুকেরা যে নতুন চিন্তনের কথা বলেছেন, সেই ভাবনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করব।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সমালোচনামূলক ভাবনার সমগ্র ডিসকোর্স মূলত পাঁচটি স্তরে বিভক্ত। এই ভাবনা, বলাবাহুল্য, শুরু হবে কান্টকে দিয়ে। এরপর দ্বিমুখী ধারায় তা অগ্রসর হয়েছে : এর একটি ধারার প্রবক্তা হচ্ছেন হোর্খেমার এবং আরেকটির আদোর্নো। চতুর্থ স্তরে আবির্ভাব ঘটছে হাবেরমাসের। সবশেষে পাওয়া যাবে ভিটগেনস্টাইন, ফুকো ও লিয়োতার্দের ভাবনাচিন্তনের সূত্রগুলি। বলা নিষ্প্রয়োজন, যুক্তিভাবনার ইতিহাস মূলত দর্শনের ইতিহাস। কান্ট তাই বলেছিলেন, “দর্শন হচ্ছে সবধরনের জ্ঞানের মধ্যে সম্পর্কিত এক বিজ্ঞান, মানবীয় যুক্তিবোধের মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটে।” হাইদেগার তার লেখা ‘কাকে বলে চিন্তন’ (১৯৬৮) শীর্ষক একটি বক্তৃতামালা শুরুই করেছিলেন এইভাবে : “আমরা যখন চিন্তা করতে বসি তখনই কেবল বুঝতে পারি চিন্তা বলতে কী বোঝায়। যদি তাতে সফল হই তাহলে চিন্তা কী জিনিস তা আমরা শিখে ফেলি।” হাইদেগারের মতে যদিও আমরা চিন্তা জাগানিয়া একটা জ্বলন্ত সময়ের মানুষ, তবু আমরা চিন্তা করতে শিখিনি। তাই চিন্তার স্বরূপ-প্রকৃতি বুঝতে হলে, হাইদেগার বলছেন, আমাদের একটা বিষয়কে নানাভাবে ভাবতে হবে, চিন্তা করতে শিখতে হবে।
হাইদেগারের আরেকটা বই- ‘কবিতা, ভাষা ও চিন্তন’ (১৯৭১)-এর ভূমিকায় সম্পাদক আলবেয়ার হফ্সটাটার হাইদেগারের ভাষার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, হাইদেগার নিজের একটা শৈলী আছে। তিনি একজন মৌলিক চিন্তাবিদ। তার একটা দুটো বাক্যই তাকে ভিটগেস্টাইন, রাসেল অথবা হোয়াইটহেড থেকে তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। হফ্সটাটার এইখানে মানবীয় চিন্তনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি হলো ভাষার দিক। অর্থাৎ চিন্তনের সঙ্গে ভাষার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ভাষার মধ্য দিয়েই আমরা সবকিছু ভাবি আবার তা প্রকাশও করি ভাষা দিয়ে। চিন্তাই এখানে হয়ে উঠেছে অনন্য এক শৈলী।
পশ্চিমী দর্শনে হাইদেগার নানা ধরনের ভাবনার উদ্ভাবক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার ভাবনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে চিন্তন আসলে কী, এই ধারণাটি গঠন করে দিয়েছেন তিনি।
হাইদেগারের মতে চিন্তন বা ভাবনা হলো : (১) সাধারণ বিশ্বাস বা ধারণা বা ডক্সা : এটি আমাদের ভাবনা, মতামত গঠন করে দেয় (মতপ্রকাশ); (২) ‘প্রতিনিধিত্বশীলতা’ : বিশেষ কোনো অবস্থাকে প্রকাশ করা (প্রতিনিধিত্ব); (৩) ‘যুক্তিশীলতা’ : ধারাবাহিকভাবে কোনো ভাবনাকে গঠন করে উপসংহারে পৌঁছানো (যুক্তির ক্রম অনুসরণ); (৪) ‘সমস্যার সমাধান’ : বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা (সমস্যার সমাধান করা); (৫) ‘বেরিফ’ (হেগেল) : ধারাবাহিক ভাবনা ও ভাবনার গঠন (অনুধাবন); (৬) সর্বজনীনতার সূত্র অনুসারে কোনো বিষয় সম্পর্কে বোঝা অথবা ব্যাখ্যা করা (বাস্তবোচিত বিচার-বিবেচনা); (৭) যা কিছু অপ্রকাশিত রয়ে গেছে তাকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসা বা প্রকাশ করা (সত্তার অর্থ উন্মোচন- হাইদেগারীয় ভাবনা); (৮) ‘হয়ে ওঠা’র এক প্রক্রিয়া (হাইদেগারের উত্তর-পরাতাত্ত্বিক চিন্তন)। আগেই উল্লেখ করেছি, হাইদেগার কাব্যচিন্তার বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করেও একটি বই লিখেছিলেন। কবিতার ভাষা, বিশেষ করে এর চিন্তাসূত্র যে ভিন্ন সেকথা তিনি ঠিকই অনুধাবন করেছিলেন। হাইদেগারের ভাবনাতেই মূলত বিভিন্ন ধরনের চিন্তনের পরিচয় পাওয়া যাবে। বিভিন্ন ধরনের চিন্তার পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তাকেও তিনি নানা সময়ে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মানবীয় ভাবনা বা চিন্তন যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে, বিশেষ করে জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর যে রূপান্তর ঘটে, হাইদেগার সেকথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। আধুনিক কালে, এমনকি এই সময়েও আমরা জানি, কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে নানা তথ্য বিন্যাসের নানা প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার ঘটছে। উত্তর-আধুনিক দুই ভাবুক-দার্শনিক লিয়োতার এবং দেলেউজ সমকালীন এই চিন্তনকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : প্রথমত, চিন্তা হচ্ছে তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ (জ্ঞানতাত্ত্বিক মনোবিজ্ঞান); দ্বিতীয়ত, চিন্তা হচ্ছে মেটান্যারেটিভ বা পরাবর্ণনা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা : বর্ণনা বা পরাবর্ণনার সমালোচনা - এর মধ্য দিয়ে কোনো বর্ণনার মধ্যে যে আরও অতিরিক্ত কিছু থাকতে পারে তার বিশ্লেষণ (লিয়োতার্দ); তৃতীয়ত, চিন্তা হচ্ছে ধারণার গঠন : দর্শনায়িত করা (দেলেউজ)।
চিন্তা বা সমালোচনার বিষয়টি তাই বহুমুখী, অর্থাৎ চিন্তার রয়েছে না ধরন, নানা রূপ। বিভিন্ন দার্শনিক এই বহুত্বধর্মী চিন্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, হাইদেগার থেকে ভিটগেনস্টাইন পর্যন্ত চিন্তার এই বিশ্লেষণ প্রসারিত হয়ে আছে। ভিটগেনস্টাইনের মতে দর্শন হচ্ছে এমন একধরনের ভাবনামূলক কর্ম যা বিজ্ঞান থেকে পৃথক একটি বিষয় হিসেবে দর্শনকে প্রতিষ্ঠা দেয়। তিনি বলেছেন, ব্যাকরণ যুক্তির কার্যকারণ সূত্র থেকে আলাদা। ভাষা ও জ্ঞান ভাষাতত্ত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলোর সঙ্গে কতটা যুক্ত তা দেখার খুব প্রয়োজন নেই। একসময় যাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হতো, সেই ‘শব্দার্থতাত্ত্বিক ঈশ্বরবাদে’র মৃত্যু ঘটে গেছে। ভিটগেনস্টাইন এভাবেই তার বিশ্লেষণী দর্শনের তত্ত্বটি হাজির করেছেন। বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন বৈশ্লেষিক/সংশ্লেষী, পরিকল্প/আধেয়র মধ্যেকার পার্থক্য। এরই ওপর ভিত্তি করে তিনি বৈশ্লেষিক দর্শনের বিষয়টিকে আরও সুসংহত করেছেন। এখানে বলা প্রয়োজন, যারা তার্কিক বা যুক্তিতর্কে বিশ্বাস করেন, তাদের এই বৈশ্লেষিক দর্শনের বিষয়টি ভালো জানা থাকা দরকার। এই দর্শন আমাদের শেখাতে পারে কীভাবে আধুনিক যুক্তিবিজ্ঞান আর ভাষাবিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে প্রাঞ্জলভাবে যুক্তি দাঁড় করিয়ে কথার পর কথা বলা যায়। আধুনিক বৈশ্লেষিক দর্শন মূলত কান্টের ‘পরিকল্প ও আধেয়’র ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভিটগেনস্টাইন এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন চিন্তনের একটা নতুন ধারণা। এতে তিনি উল্লেখ করেন ‘ঘটনার যৌক্তিক ছবির’ কথা যা আমাদের মনের সঙ্গে যুক্ত, বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ভিটগেনস্টাইন মনে করেন চিন্তন হচ্ছে ভাষিক একটা ব্যাপার। চিন্তার ব্যাপারটি শুধু ভাবনার ওপর নির্ভরশীল নয়, ভাষাকাঠামো বা যে ভাষায় আমরা কথা বলি, তার গঠনের ওপরও নির্ভর করে, পরিণত বয়সে তিনি তা উল্লেখ করেছেন। মানসবাদ (মেন্টালিজম) ও তার নিজস্ব ভাষাবাদ (লিঙ্গুয়ালিজম) এই দুইয়ের মিশ্রণেই চিন্তার ধারণা আমাদের মধ্যে তৈরি হয় বা গঠিত হয়।
ভিটগেনস্টাইন সবধরনের মানসনির্ভর চিন্তাকে অগ্রাহ্য করে ভাবনাকে আচরণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বলেছেন, চিন্তা হচ্ছে একধরনের মানসিক ক্রিয়া; নিষ্ক্রিয় কিছু নয়। এটা এমন একধরনের ‘কর্ম’ যা সাধারণত ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ চিন্তার রয়েছে একটা ভাষিক দিক। বিভিন্ন ধরনের চিন্তাকে বুঝতে হলে ভাষার দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, না হলে তার্কিক হিসেবে কেউ সফল হতে পারবে না, বক্তা হিসেবেও না। বলা বাহুল্য, এটা একটা সাধারণ কথা, আমরা সবাই কমবেশি এই কথাটা জানি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে চিন্তার সঙ্গে যুক্তিকে কিভাবে সমন্বিত করে সমালোচনামূলক ভাষায় কথা বলা যাবে, সেটাই হচ্ছে আসল কথা।
লেখাটা শুরু করেছিলাম ছিদ্রান্বেষণের কথা দিয়ে, কিন্তু এই ছিদ্রান্বেষণ করা বা সমালোচক হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। আমাদের মেধা, পঠনপাঠন আর বিশ্লেষণ ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করছে আমরা যুক্তি তক্ত গপ্পে কতটা পারদর্শী হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু আমাদের চারপাশের যেসব মানুষ গণমাধ্যমে কথা বলেন কিংবা সাহিত্য সমালোচনা করে থাকেন, তারা কেউ কেউ পেশাদার কথাকার হয়ে উঠছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের কথায় বা সমালোচনায় গভীরতা খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা দু-এক পাতার তত্ত্বকথা জেনে বা পড়ে, অথবা অন্যের তাত্ত্বিক লেখার ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে চটকদার নামসর্বস্ব বই লিখে চলেছেন। কথার (এবং সমালোচনার) এই যে অপচয়, অচিরেই তা বন্ধ করা না গেলে জাতিগতভাবে চিন্তনশূন্য বাচালতায় চারপাশ ভরে যাবে, প্রকৃত চিন্তকের দেখা আমরা পাব না।
তথ্যসূত্র : কে. আলস্টন, ‘রি/থিংকিং ক্রিটিক্যাল থিংকিং : দ্য সেডাকশন অফ এভরিডে লাইফ’, স্টাডিজ ইন ফিলোসফি অ্যান্ড এডুকেশন; জাইলস দেলেউজ, কান্ট’স ক্রিটিক্যাল ফিলোসফি: দ্য ডকট্রিন অফ দ্য ফ্যাকাল্টিজ; য়ুরগেন হাবেরমাস, নলেজ অ্যান্ড হিউম্যান ইন্টারেস্ট; মার্টিন হাইদেগার, ডিসকোর্স অন থিংকিং এবং পোয়েট্রি, ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড থট; জ্যঁ-ফ্রাসোঁয়া লিয়োতার্দ, দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন: এ রিপোর্ট অফ নলেজ; হার্ভে সিজেল, এডুকেটিং রিজন: র‌্যাশনালিটি, ক্রিটিক্যাল থিংকিং অ্যান্ড এডুকেশন; ভিটগেনস্টাইন, ফিলোসফিকাল ইনভেস্টিগেশন এবং অন ক্রিয়েটিভিটি।

স্নায়ুযুদ্ধের নতুন রূপ!

ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের নৌবাহিনীর সদর দপ্তরের প্রধান
ফটক গতকাল সরিয়ে দেয় রুশপন্থীরা। এ সময় রুশ
বাহিনীকে সদর দপ্তরের সামনে টহল দিতে দেখা যায়।
এক মাস আগেও অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মানচিত্রে ক্রিমিয়াকে খুঁজে পেতেন না। কিন্তু রাশিয়া ক্রিমিয়ার ‘দখল’ নেওয়ার পর মানচিত্রে পরিবর্তন এসেছে। ক্রিমিয়ার বিষয়টি ২৫ বছর ধরে ওয়াশিংটন-মস্কোর চড়াই-উতরাইয়ের সম্পর্ককে হয়তো একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 
১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতনের পর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটা কমতে শুরু করে। এই সময়ে বিভিন্ন সংকট এসেছে—তা মেনে নিয়েই দুই পক্ষ নিজেদের মতো করে বিচিত্র উপায়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সংকটের সময় সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও অস্বস্তিকর ভারসাম্য নিয়ে আবারও কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছে। কসোভো, ইরাক ও জর্জিয়া ইস্যুতে ওয়াশিংটন-মস্কোর টানাপোড়েন এবং ফিরে আসার ভালো উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে ক্রিমিয়ায় গণভোটের পর দ্রুত তাকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আদেশে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সই এবং তার পরদিন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া-সংক্রান্ত বিলে সই রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে এক নতুন অধ্যায়ে নিয়ে গেছে। এই অধ্যায়কে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলেই মনে করা হচ্ছে। তাই কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এবার বোধ হয় এই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হলো।
তবে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু না হলেও ওয়াশিংটন-মস্কোর এবারের টানাপোড়েন যে দীর্ঘস্থায়ী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই টানাপোড়েন থেকে বেরিয়ে আসাও হবে অত্যন্ত কঠিন। দুই দেশের নেতাদের কথাবার্তাও সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্রিমিয়া নিয়ে উসকানি না দিতে পাশ্চাত্যের দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলেও দাবি করেন তিনি। একই দিন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্রিমিয়ার ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়াকে ‘জমি দখল’ বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে উন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৮ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এর আগে রাশিয়ার ১১ জন নেতার বিরুদ্ধে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি ও তাঁদের সম্পদ জব্দের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে পররাষ্ট্র দপ্তরে দায়িত্ব পালনকারী রাশিয়া বিশেষজ্ঞ টবি টি গ্যাটি বর্তমান ওয়াশিংটন-মস্কোর সম্পর্ককে ‘ভূমিকম্পের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেন, রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা মাত্র চার নয়। স্নায়ুযুদ্ধ ফিরে না এলেও ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়াল পতনের পর যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, তা উড়ে যাবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্টিফেন জে হ্যাডলি বলেন, এবার যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্কে যে পর্যায়ে চলে গেছে, তা কাটিয়ে ওঠা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হবে। নিউইয়র্ক টাইমস।

মোদিকে হারানোই কেজরিওয়ালের মূল লক্ষ্য

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে হারানোই নিজের প্রধান লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লির সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী বারানসিতে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এএপির প্রধান ও দলটির জাতীয় আহ্বায়ক কেজরিওয়াল গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ‘রোডম্যাপ টু ইন্ডিয়ান মুসলিমস’ শীর্ষক এক সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন।
সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বারানসি থেকে তাঁর নির্বাচনী লড়াইয়ে দাঁড়ানো কোনো ‘প্রতীকী বিষয়’ নয়, বরং বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীকে পরাজিত করাই এর উদ্দেশ্য। কেজরিওয়াল আরও বলেন, ‘মোদি বারানসি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই আমিও সেখানে যাচ্ছি।’ পিটিআই।

গান্ধীনগর নয়, ভোপালে লড়তে চান আদভানি

এল কে আদভানি
বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দলটির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানির সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে অনেক দিন ধরে। আদভানির এক ঘোষণায় তাঁদের সেই টানাপোড়েন আবার প্রকাশ্যে এল। প্রবীণ এই নেতা বলেছেন, লোকসভা নির্বাচনে তিনি গুজরাটের গান্ধীনগর আসন নয়, ভোপাল থেকে প্রার্থী হতে চান। বিজেপির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আদভানি তাঁর এই ইচ্ছার কথা ইতিমধ্যে বিজেপির প্রধান রাজনাথ সিংয়ের কাছে জানিয়েছেন। আদভানি বলেন, দলের অধিকাংশ প্রবীণ প্রার্থী নিজেদের পছন্দমতো আসনে লড়াইয়ের জন্য অনুরোধ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরও একটা পছন্দ আছে।
তাঁর পছন্দের আসন হলো ভোপাল। আদভানি (৮৬) এর আগে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, গান্ধীনগর থেকে প্রার্থী হতে তাঁর কোনো সমস্যা নেই। তবে ভোপাল আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সহজে জয় পেতে পারেন। এ জন্যই ওই আসনে প্রার্থিতা সরিয়ে নিতে চান তিনি। তবে এ ক্ষেত্রে দলের দেওয়া সিন্ধান্ত তিনি মেনে নেবেন। গতকাল বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অংশগ্রহণে দলটির সাংবিধানিক বোর্ডের সভা হয়। কিন্তু এতে আদভানি যোগ দেননি। দলের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, দলের শীর্ষ নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, আদভানিকে গান্ধীনগর আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। কারণ তা না হলে ‘ভুল বার্তা’ দেওয়া হবে। পিটিআই।