Thursday, September 26, 2024

অসহিষ্ণু সমাজের আলাপ by মোহাম্মদ আরিফ

সমপ্রতি ‘গণপিটুনিতে মৃত্যু’- শীর্ষক কয়েকটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের  লেখালেখিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব। চলছে আলাপ- ঝড় উঠছে আড্ডায় চায়ের কাপে। বাংলাদেশ অনেকদিন ধরে হত্যাপুরী হয়ে উঠেছে। ধর্ষণ করে হত্যা, বিরুদ্ধ মতে হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যা, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধিতে হত্যা, পরকীয়ার কারণে হত্যা, জমিজমা-ঘরবাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে হত্যা, পুড়িয়ে হত্যা, বিষ খাইয়ে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, আত্মহত্যা, গণপিটুনিতে হত্যা ইত্যাদি এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

প্রশ্ন জাগে, সমাজ কি ক্রমাগত অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে? তাহলে কেন? স্বাধীনতার অনেক স্বপ্নের একটি ছিল স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা কায়েম করা। যেখানে মানবিক অধিকার সমুন্নত থাকবে। বস্তুত তা হয়নি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর একদল লোক মেতে ওঠে লুণ্ঠন আর হত্যায়। সমাজে বিশৃঙ্খলার বীজ রোপিত হয়। সদ্য স্বাধীন  দেশের মানুষের স্বপ্ন ভুলুণ্ঠিত হতে শুরু করে।

আমাদের সামাজিক অধঃপতনের অনেক কারণ। তবে অন্যতম কারণ বৈষম্য। সমাজে নানা ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান। এর মধ্যে ধর্মীয় এবং অর্থনীতি- এই বিশেষ দু’টি কারণে সমাজ সবসময় অস্থিতিশীল থাকে। চলমান অসহিষ্ণুতার পেছনেও এ দু’টি কারণ রয়েছে মনে বলে করি। বিগত চার দশকে এদেশে এক  শ্রেণির লুটেরা, লুম্পেন সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

অপরদিকে মধ্যবিত্তের অনেকেই নেমে গেছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর্থিক অসঙ্গতি সাধারণের মধ্যে সার্বক্ষণিক চাপা ক্ষোভ তৈরি করছে। কাঙ্ক্ষিত জীবন অর্জনে ব্যর্থতা সমাজে তৈরি করছে অসম প্রতিযোগিতা। বেকারত্ব সৃষ্টি করছে হতাশা। একই সমাজে উচ্চ শ্রেণির বর্ণাঢ্য জীবন নিম্নবিত্তকে ঈর্শাকাতর করছে। প্রেমে পরাজয় জন্ম দিয়েছে প্রতিহিংসার। ধর্মীয়  গোঁড়ামির ফলে বেড়েছে উন্মাদনা। অযোগ্য ব্যক্তির উত্থান এবং যোগ্যতমের পতনে তৈরি হয়েছে বিভেদ। সমাজের এই অসম বাস্তবতা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। তারা মানসিকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের সমাজ জীবন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে রাষ্ট্র পরিচালকগণ। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আর্থিক বৈষম্য। এদেশের  বেশির ভাগ মানুষ যেখানে মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়, সেখানে লুটেরা শ্রেণি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিত্তবৈভবে আয়েশি জীবনযাপন করে। তারা আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, লন্ডনে সেকেন্ড হোম গড়ে তোলেন। হাওয়া বদলাতে উড়াল দিয়ে চলে যান পৃথিবীর নামি-দামি সৈকতে। বিনোদনের জন্য বেছে নেন জগৎসেরা সব এমাউজমেন্ট হোটেল। তাদের ব্যাংক হিসাবে থাকে কোটি  কোটি টাকা।

অপরদিকে দেশের সাধারণ নাগরিক তিনবেলা ঠিকমতো  খেতে পায় না। চিকিৎসার খরচ  জোটে না। করতে পারে না মাথাগোঁজার একটু খানি ঠাঁই। জীবন-যাপনের ন্যূনতম চাহিদা  মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু শাসকগোষ্ঠী ‘উন্নয়ন’-এর জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন গণমাধ্যম আর রাজনীতির ময়দানে।
গত কয়েক দশক ধরে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদগণ মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কথা বলে উন্নয়নকে ফিতে দিয়ে মাপবার চেষ্টা করেন। অথচ তারা জানেন না এদেশে একজন  পোশাক শিল্প শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি কত? এই সামান্য টাকায় একজন মানুষের পরিবার চলে কী করে? তারা খোঁজ রাখেন না  দেশের এটিএম বুথগুলোয় যারা সিকিউরিটির জব করেন, তাদের। তারা জানেন না, গ্রামে কৃষিক্ষেত্র  থেকে আয় দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসায় অনেক কৃষক নগরে পাড়ি জমাচ্ছেন। শহরে এসে রিকশাচালক বা দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে বেঁচেবর্তে আছেন।

বর্তমান সমাজে চারপাশে এত অন্যায়, বৈষম্য, বিভেদ সাধারণকে মনে মনে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সেজন্য তুচ্ছ ঘটনাতেও হিংস্র হয়ে উঠতে দেখা যায়। মানুষের ভেতর থেকে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই নিষ্ঠুর, পাশবিক হয়ে উঠছি। সাধারণ মানুষ এখন তার ক্ষুদ্ধতাকে কোথাও না কোথাও উগরে দিতে চায়। যা আমরা মব জাস্টিস বা গণপিটুনিতে দেখতে পাই। সুযোগ পেলেই সে এই কাজটি করে। কারণ অন্যকিছু নয়। মূলত পেশি শক্তিই হয়ে উঠছে ব্যক্তির কাছে ন্যায্যতার অন্যতম হাতিয়ার। তাই, খুনের মতো অমার্জনীয় অপরাধ করতে  কেউ দ্বিধা করছে না।

সমাজ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার  পেছনে রাজনীতির দায়  কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। গত তিন তিনটে নির্বাচনে মানুষ  ভোট দিতে পারেনি। গণতন্ত্র হয়েছে ভুলুণ্ঠিত। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। সাধারণ মানুষ আইনানুগ সহায়তা পায়নি। হত্যা, গুম, খুনের কোনো বিচার হয়নি। অসহায় মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। ধর্ষিত নারী পায়নি সুবিচার। রাজনৈতিক গুণ্ডারা জবর দখল করে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য। ফুটপাথের ভিখারীকেও চাঁদা দিতে হয়েছে। খুনি, অত্যাচারী সমাজে বুক চিতিয়ে ঘুরে  বেড়িয়েছে। কেন না তাদের ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সনদ। সরকারবিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক নেতারা পালিয়ে  বেড়িয়েছে। সরকার অনেককে করেছে দেশান্তরী।

উক্ত বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না, তবে খুঁজতে হবে মুক্তির উপায়। সদ্য আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনদিন  দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। মাঝের দিনগুলোতে ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, হত্যাসহ অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা ঘটেছে। সরকার গঠনের পর চুরি, ডাকাতি কমলেও হত্যাযজ্ঞ থামেনি। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। হত্যাযজ্ঞ থামাতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এককভাবে দায় দেয়া যাবে না। আমরা জানি, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হওয়ায় বিদ্যমান পুলিশর দায়িত্ব পালনে পূর্ণ পেশাদারী হয়ে উঠতে পারছে না।

মনে রাখতে হবে প্রতিহিংসাপরায়ণতা শান্তি আনতে পারে না। শান্তি আসে অহিংসায়। আমাদের অনেক  ক্ষোভ আছে, না পাওয়ার কষ্ট আছে, হারানোর বেদনা আছে। কিন্তু প্রতিহিংসা এর কোনোটারই সমাধান নয়। 

mzamin

বিশ্বমঞ্চে বিরল সম্মাননা: ইউনূসকে আলিঙ্গন, আপ্লুত পিটার হাস্‌

জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনকে ঘিরে নিউ ইয়র্কে বসেছে বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন থেকে শুরু করে কে নেই সেখানে? ১৯১ সদস্য-রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা  তো বটেই, সেই মেলায় জড়ো হয়েছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের পদস্থ কর্মকর্তারাও। জাতিসংঘ আসরকে ফলো করছে বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা, ভয়েস অব আমেরিকাসহ পাঠকনন্দিত দুনিয়ার প্রায় সব মিডিয়া। ওয়ার্ল্ড ক্যাপিটাল খ্যাত নিউ ইয়র্কের সেই মঞ্চে নতুন এক পরিচয়ে উপস্থিত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘে তার পদচারণা বহু বছরের। কিন্তু এবারে বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসাবে অভিষেক হয়েছে তার। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। অবশ্য বিশ্বমঞ্চে বিরল সম্মাননাও পাচ্ছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের ভাষ্যমতে, এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন ইউনূসময়। সেইসঙ্গে গৌরবের আসনে বাংলাদেশ। ৫৪ বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি এবার এমন সব ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশকে ঘিরে। আরও খোলাসা করে বলছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছেন তিনি। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে একাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ড. ইউনূস। সবখানেই তার সঙ্গে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে। অনেককেই লাইন ধরে তার সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়। যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস্‌। ড. ইউনূসকে কাছে পেয়ে আলিঙ্গন করেন তিনি। সেইসঙ্গে আপ্লুত পিটার হাস্‌ হাসিমুখে ছবিও  তোলেন। স্মরণ করা যায়, ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালেই বাংলাদেশ মিশন সম্পন্ন হয় পিটার হাসের। তার পূর্ব-নির্ধারিত ফ্লাইটের দু’দিন আগে অর্থাৎ ২১শে জুলাই ছিল কূটনৈতিক ব্রিফিং। যেখানে তিনি ছাত্র-জনতার ওপর শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। জাতিসংঘের লোগোযুক্ত এপিসি থেকে নিরীহ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ নিয়ে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে তিনিও প্রশ্ন তুলেছিলেন।

নতুন বাংলাদেশ গড়তে বিদেশি বন্ধুদের সহযোগিতা চাইলেন ড. ইউনূস
যুবসমাজের জীবন উৎসর্গ এবং অদম্য নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বলেন, একটি বৈষম্যহীন সমাজ ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে তারা জীবন দিয়েছে। তরুণদের এই স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বিদেশি বন্ধুদের সহযোগিতা চাই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ সহায়তা চান। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তরুণদের আত্মত্যাগ আমাদের সামনে বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আমরা এই সুযোগ হারাতে চাই না। বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে তরুণরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়। এটি বাস্তবায়নে আপনাদের সবার সমর্থন প্রয়োজন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপ্রাপ্তির ৫০তম বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডনাল্ড লু-সহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ আবদুল মুহিত, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রমুখ। প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে আলোকচিত্রী ও লেখক শহিদুল আলম শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো নিয়ে লেখা দু’টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, গোটা জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। যারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল আমরা তাদের হতাশ করতে চাই না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার সরকার কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বলেন, যুবসমাজের সামনে কোনো স্বপ্ন ছিল না। স্বৈরাচার তাদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তাই তারা স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে বুলেটের সামনে দাঁড়াতে পিছপা হয়নি। বিদেশি বন্ধুদের উদ্দেশ্যে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের তরুণরা যে সাহস ও প্রত্যয় দেখিয়েছে, তা আমাদেরকে অভিভূত করেছে। বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে তারা জীবন দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তিনি বলেন, তরুণদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে আমরা আপনাদের পাশে চাই। জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে নিউ ইয়র্কে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাইড ইভেন্ট রয়েছে তার। আগামী ২৭শে সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন। ওই রাতেই তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে নিউ ইয়র্ক ছাড়বেন।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না হলে সমগ্র অঞ্চল সমস্যায় পড়বে, বললেন ড. ইউনূস: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, আমাদের সতর্ক হতে হবে, এই সংকটের সমাধান না হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র অঞ্চল সমস্যায় পড়বে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশেনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি, আইসিসি প্রসিকিউটর করিম এএ খান, আইওএম মহাপরিচালক অ্যামি পোপ প্রমুখ বক্তব্য দেন। প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন করে ভাবার প্রস্তাব দেন। বলেন- প্রথমত, আমরা চাই জাতিসংঘ মহাসচিব যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সকল পক্ষের উপস্থিতিতে একটি সম্মেলনের আয়োজন করুক।

সম্মেলনে সংকটের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা পূর্বক নতুন এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সমাধানের উপায় কী হতে পারে, তেমন প্রস্তাব আসতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রফেসর ড. ইউনূস বলেন, দ্বিতীয়ত জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ যৌথভাবে পরিচালিত ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ কার্যক্রমে নতুন করে প্রাণশক্তি যোগ করার প্রয়োজন। যেহেতু এখন রোহিঙ্গাদের পেছনে ব্যয় করার মতো তহবিলের অভাব রয়েছে, তাই রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে। তৃতীয় প্রস্তাবে ড. ইউনূস বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে অবশ্যই আন্তরিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দ্বারা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। প্রতি বছরের ন্যায় এবারো অনুষ্ঠান হচ্ছে তবে ড. ইউনুসের উপস্থিতি ও তার দৃষ্টিভঙ্গি এবারের আলোচনাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বৈষম্য, রাষ্ট্রহীনতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বন্ধ করতে আমাদের অবশ্যই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বৈঠকের পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন,  রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এবারের বৈঠকটি অত্যন্ত সফল ছিল। সবাই বাংলাদেশের প্রচেষ্টার প্রশংসা এবং তাদের অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আইওএম মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এই সংকট সমাধানে আমাদের আরও কাজ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এই আলোচনায় অংশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং বাংলাদেশ ও তাদের আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ১৯ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের নতুন সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দেন। এদিকে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশে অবস্থানরত কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে ‘আমাদের হতাশ করবেন না’ মর্মে একটি বার্তা পাঠিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ওই ভিডিও বার্তায় বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভুলে যাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের সংস্কার উদ্যোগে সহায়তার প্রতিশ্রুতি আইএমএফ প্রধানের: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বাংলাদেশের সংস্কার উদ্যোগে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ঋণদাতা বিষয়টি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় একটি দল পাঠিয়েছি। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক বৈঠকে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার এ সমর্থন ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টা ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাকে বাংলাদেশের পূর্ববর্তী স্বৈরশাসন উৎখাত করা ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করেন। তখন ক্রিস্টালিনা তাকে বলেন, এটি একটি ভিন্ন দেশ। এটি বাংলাদেশ ২.০। বৈঠকে প্রফেসর ড. ইউনূস নির্বাচন, বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন ও সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য তার অন্তর্বর্তী সরকার যে ছয়টি কমিশন গঠন করেছে সে সম্পর্কে কথা বলেন। তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশ নিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে। সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত এবং ভোটার তালিকা তৈরি হলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আইএমএফের প্রধান নির্বাহী এসব উদ্যোগে তার সমর্থন জানিয়ে বলেন, আইএমএফ বাংলাদেশ সরকারের জন্য আর্থিক সহায়তা দ্রুততর করবে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান আইএমএফ প্রধানকে বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র এক সপ্তাহ সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপরাধের ‘দুর্গ’ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ড. দেবপ্রিয় দেশের অর্থ প্রদানের ভারসাম্য বাড়াতে আইএমএফের সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতি: এদিকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের (ইউএনজিএ) ফাঁকে দুই নেতার সাক্ষাতের পর হোয়াইট হাউস একটি বিবৃতি দিয়েছে। যেখানে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওয়াশিংটন ও ঢাকার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এটি অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দুই দেশের জনগণের সম্পর্কের গভীরে প্রোথিত রয়েছে। এতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট বাইডেন দুই সরকারের মধ্যে আরও সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশকে তার নতুন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে মার্কিন সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইউনূসকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে সামপ্রতিক নিয়োগে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

ঢাকা-রোম সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় দেখতে চান ইতালির প্রধানমন্ত্রী: ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইতালীয়রা বাংলাদেশের বন্ধু উল্লেখ করে রোম ও ঢাকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘নতুন অধ্যায়’ সূচনার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। বৈঠকে ড. ইউনূস ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, তারা সমগ্র জাতির জন্য ‘রিসেট বোতাম’ টিপে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মেলোনি বলেন, ইতালি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের পদক্ষেপে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করবে। তিনি বলেন- অবশ্যই, আপনি আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন। আসুন আমাদের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় সূচনার চেষ্টা করি। প্রধান উপদেষ্টা ইতালির নেতাকে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনকে বিধিবদ্ধ করার অনুরোধ করে বলেন, আইনি চ্যানেলের মাধ্যমে ইতালিতে আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রবেশের পথ সুগম করা হলে ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ অভিবাসন হ্রাস পাবে। মেলোনি এ কথায় সম্মতি প্রকাশ করে বলেন, উভয় দেশেরই অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা এবং ইতালিতে কাজ করতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণের জন্য একসঙ্গে কাজ করা উচিত।

mzamin

বাবা-মায়ের মাঝে দাঁড়ানো ছোট্ট আহাদ লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে by ফাহিমা আক্তার সুমি

চার বছরের শিশু আব্দুল আহাদ। প্রাণচাঞ্চল্যতায় মাতিয়ে রাখতো ঘর। মা-বাবার দুই সন্তানের মধ্যে আহাদ ছোট। জানুয়ারিতে তাকে স্কুলে ভর্তির কথা ভেবেছিলেন বাবা-মা। তবে সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তাদের। ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন বিকালে বাসার নিচে শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি। ইটপাটকেল ছোড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে তার। ঘুম চোখে দেখার জন্য দৌড়ে অষ্টমতলার বারান্দায় দাঁড়ায়। তখন বাবাকে বলে, ‘বাবা দেখো নিচে মারামারি হচ্ছে।’ বাবা-মা দু’জনে বারান্দায় আসেন। আহাদ দাঁড়িয়ে ছিল তার বাবা-মায়ের মাঝে। হঠাৎ একটি গুলি এসে আহাদের ডান চোখে বিদ্ধ হলে ঢলে পড়ে মেঝেতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে পরেরদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মারা যায়। রায়েরবাগ মিরাজনগর তিন রাস্তার মোড়ে ভাড়া থাকতো তার পরিবার। আহাদের বাবা আবুল হাসান ঢাকায় কর অঞ্চল-৮ এর উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত। সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছে শিশুটির পরিবার।

আহাদের বাবা আবুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, নতুন বছরে স্কুলে ভর্তি করার কথা ছিল। আমার ১১ বছরের আরেকটি সন্তান রয়েছে সে মাদ্রাসায় পড়ে। পাঁচ মাস ধরে ওই বাসাটিতে ভাড়া থাকতাম। আহাদ যেদিন গুলিবিদ্ধ হয় সেদিন সকালেও আমার বুকের মধ্যে শুয়ে বলেছিল, ‘বাবা তোমার বুকে খুব ভালো লাগে, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না প্রতিদিন অফিসে নিয়ে যাবা।’ ওর খেলনা গাড়িগুলো খুব পছন্দের ছিল। চিকেন ফ্রাই খেতে খুব ভালোবাসতো। আমাদের স্বপ্ন ছিল ওর বড় ভাই যখন মাদ্রাসায় পড়ে তখন ওকেও মাদ্রাসায় পড়াবো।

ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সেদিন আহাদ ঘুমানো অবস্থায় ছিল। ১১ তলা ভবনের ৮ তলায় ভাড়া থাকতাম। বাসার নিচে সংঘর্ষ চলছিল তখন। সেখানে শিক্ষার্থীরা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছিল। দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম অবস্থায় ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি চলে। নিচে যখন চিল্লাচিল্লি হচ্ছিলো সেই শব্দ কানে গিয়ে আহাদের ঘুম ভেঙে যায়। তখন বিকাল সাড়ে ৪টা বাজে। ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে বেলকনির দিকে আসে। তখন আহাদ বলে, ‘বাবা দেখো নিচে মারামারি হচ্ছে।’ ওকে বেলকনিতে আসা দেখে আমি আর আমার স্ত্রী দু’জনেই বেলকনিতে আসি। ও আমাদের দু’জনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় আচমকা নিচ থেকে হঠাৎ একটা গুলি এসে আহাদের ডান চোখে লাগে। পরবর্তীতে তখনই আমরা ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। সেখানে চিকিৎসক দেখে তাকে সঙ্গে সঙ্গে আইসিইউতে দেন। ২০শে জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমার সন্তান মারা যায়। ২১শে জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে আমাদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে দাফন করা হয়।

আবুল হাসান বলেন, গুলিটা যে নিচ থেকে করেছে সেটা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে। নিচে কিছু দোকান ছিল সেখানে সিসিটিভি ছিল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে গুলিগুলো ছাত্রলীগ-যুবলীগ করেছে। গুলিটা যখন লাগে তখন আহাদ আর কোনো শব্দ করেনি মেঝেতে ঢলে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে যখন আমরা ধরি তখন আমাদের হাত রক্তে ভিজে যায়। ওইদিনই আরেকজন বয়স্ক লোক নামাজ পড়তে বের হয়ে গুলিতে মারা যান।

তিনি বলেন, আমার বড় সন্তান মেহরাজ হাসান দিহান যখন মাদ্রাসা থেকে কয়েকদিন পরপর বাসায় আসতো তখন আহাদ অনেক খুশি হতো বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল ওদের। ভাইয়ের মাদ্রাসায় গেলে সেখান থেকে আর আসতে চাইতো না। আহাদ ছিল সবার আদরের। বেশি চঞ্চল প্রকৃতির থাকায় সবাই তাকে খুব পছন্দ করতো। সন্তান হারানোর শূন্যতা কাউকে বোঝানো যায় না। ওর আম্মু একদম ভেঙে পড়েছে। সে এখনো ঢাকায় ফেরেনি। আমরা যে সম্পদ হারিয়েছি সেটি কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। বড় সন্তান দিহান ভাইয়ের জন্য মন খারাপ করে থাকে।

mzamin

আন্দোলন গোছানো ছিল: ক্লিনটনকে ড. ইউনূস

বাংলাদেশের তরুণেরাই নতুন বাংলাদেশ গড়বেন বলে আশা ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি ছাত্র–জনতার তীব্র আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ আন্দোলন খুব পরিকল্পিতভাবে (অগোছালো নয়) চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিছুই হঠাৎ হয়নি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন ড. ইউনূস। গতকাল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ’–এর একটি আয়োজনে অংশ নেন তিনি। সেখানেই অধ্যাপক ইউনূস এ কথাগুলো বলেন। জ্যাকসন হাইটসে আয়োজন করা হয় এ অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সম্পর্কের প্রথম দিনের গল্প, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কাহিনি এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের নানা বিষয় তুলে ধরেন।

এই অনুষ্ঠানের মঞ্চে ড. ইউনূস তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে সফরসঙ্গীদের দুইজনকে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বিশেষ সহকারী মো. মাহফুজ আলমকে সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরে সরকার পতনের আন্দোলনের কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেন।

কথা বলার একপর্যায়ে মাহফুজকে সামনে এগিয়ে দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পেছনের কারিগর মাহফুজ। যদিও মাহফুজ সব সময় বলে, সে একা নয়, আরও অনেকে আছে। যদিও সে গণ-অভ্যুত্থানের পেছনের কারিগর হিসেবে পরিচিত।’

ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘এটি (ছাত্র আন্দোলন) খুব গোছানো ছিল। এমনকি লোকজন জানতেন না, কারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই, আপনি একজনকে ধরে ফেলে বলতে পারবেন না, ঠিক আছে, আন্দোলন শেষ। তাঁরা যেভাবে কথা বলেছেন, তা সারা বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।’

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন অধ্যাপক ইউনূসকে বাংলাদেশের তরুণ নাগরিকদের ডাকে সাড়া দিয়ে দায়িত্বগ্রহণকারী নেতা বলে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় পুরো হল করতালিতে ফেটে পড়ে। দুই নেতা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।

এদিকে ড. ইউনূস তাঁর বক্তব্য শুরু করেন বিল ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর প্রথম যোগাযোগের ঘটনা উল্লেখ করে। বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি চিঠি পেয়েছিলেন (১৯৮৬ সালে), যা তাঁকে অবাক করেছিল। আরকানসের একজন গভর্নর (সে সময় ক্লিনটন এ অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ছিলেন) ওই চিঠি পাঠান। চিঠিতে তাঁর সঙ্গে দ্রুত দেখা করতে চান বলে তিনি লিখেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে মজার ছলে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি জানতাম না, তিনি দ্রুত বলতে ঠিক কতটা দ্রুত বোঝাতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, এরপর আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসব, আমি অবশ্যই যাব এবং আপনার সঙ্গে অবশ্যই দেখা করব।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘তিনি আমাকে বলেছিলেন, এটা (দেখা করা) খুবই জরুরি।’ উত্তরে আমি বলি, ‘আমি দেখছি, কীভাবে দ্রুত আসা যায়। আমি আসব, (তবে) আগেই আসতে পারব না। পরে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছি। এভাবেই আমাদের যোগাযোগের সূচনা হয়।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আরকানসের গভর্নর বুঝতে চাইছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক আসলে কী, যেটি নিয়ে লোকজন কথা বলছে। আমি তাঁদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করি। তিনি ও হিলারি উভয়ই সেখানে একটি হোটেল কক্ষে বসে ছিলেন। ওখানেই আমাকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সব শুনে তিনি বললেন, ‘‘আমাদের এটা দরকার। আমরা কত দ্রুত এটা আরকানসে পেতে পারি।’’ এটাই এই গল্পের শুরু।’

‘তাই, আমি তাঁর আয়োজনে আরকানস ঘুরতে যাই। আমি আরকানসের গ্রামাঞ্চল ঘুরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। লোকজন বন্ধ দোকানের চারপাশে বসে আছেন। কারণ, সেখানকার অর্থনীতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আমার সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, আমাকে ওই সব মানুষকে দেখিয়ে বলেন, ‘‘তাঁরা কি কিছু করতে পারবেন?’’ আমি বলি, অবশ্যই, তাঁরাই যা করার করতে পারবেন’, বলেন অধ্যাপক ইউনূস।

ড. ইউনূস বলেন, ‘ওইসব লোক কিছু করতে পারবেন, এটা তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ওটাই ছিল শুরু। বিল বলেছিলেন, ‘‘হ্যাঁ, আমরা একটা (গ্রামীণ ব্যাংক) করতে চলেছি।’’ কীভাবে এটি কাজ করবে, আমি বুঝিয়ে বললাম। এভাবেই সেখানে গ্রামীণ প্রকল্পের যাত্রা শুরু হলো। হিলারি দায়িত্ব নিলেন। তিনি (বিল) গভর্নর ছিলেন এবং এটা করতে চাইলেন। এটাই এর শুরু। তবে আমি বুঝতে পারিনি, ঠিক কেন তাঁর জন্য বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘তিনি (বিল) প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে নামেন। তখন আমি বিষয়টা বুঝতে পারি। তিনি গভর্নর ছিলেন এবং এখন প্রেসিডেন্ট হতে চান। তিনি আমাকে বলেন, ‘‘আমি যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করব, তখন আপনি অবশ্যই উপস্থিত থাকবেন।’’ আমি বুঝছিলাম না, কেন তিনি আমাকে চাইছেন, আমার উপস্থিত থাকার কথা বলছেন। তখন তিনি বলেন, ‘‘যদি আমি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই। আমি যুক্তরাষ্ট্রের কোনায় কোনায় গ্রামীণ প্রকল্প ছড়িয়ে দেব।’’’

উপস্থিতি ব্যক্তিদের উদ্দেশে এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান বলেন, ‘আপনাদের কি মনে হয়, লোকজন খুশি হয়েছিলেন? পরদিন তাঁকে (বিল) নিয়ে খবর প্রকাশ পায়। বলা হয়, তিনি একজন উন্মাদ। আমেরিকানদের কী করতে হবে, সেটি বলার জন্য তিনি বাংলাদেশ থেকে একজনকে নিয়ে এসেছেন। এটা কীভাবে সম্ভব।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘তিনি চেষ্টা ছাড়েননি। তিনি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কখনো এর গুরুত্বের কথা বলা বন্ধ করেননি। কীভাবে অল্প অর্থের সাহায্যে মানুষকে বদলে ফেলা যায় এবং এটি কত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বলা কখনো বন্ধ করেননি তিনি। এটাই ছিল শুরু এবং তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তা অব্যাহত ছিল।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘তিনি (বিল) এটি করতে চেয়েছেন। সবকিছু দেখতে এরপর হিলারি মেয়ে চেলসিকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। আমি চেলসিকে এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) দেখেছিলাম। তাঁরা চার দিন বাংলাদেশে আমাদের সঙ্গে কাটান, গ্রামীণ পোশাক পরেন; যা গ্রামাঞ্চলে তাঁতে খুব সাধারণভাবে তৈরি করা হয়।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘চার দিনই গ্রামের তাঁতিদের তৈরি পোশাক পরেন তাঁরা (হিলারি ও চেলসি)। স্থানীয় এক তরুণ তাঁদের পোশাকের নকশা করেছিলেন। সবাই বলেছিলেন, ‘‘তিনি (হিলারি) কী পোশাক পরেছেন, কীভাবে আপনি এটি করলেন। কে পোশাকের নকশা করেছে।’’ আমি এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কেন তাঁরা প্রশ্ন করছিলেন, সেটাও জানতাম না।’

‘তবে তাঁরা খুবই কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্টলেডি যেসব পোশাক পরছেন, সেগুলো খুব সাধারণ কাপড়ে তৈরি, গ্রামের তাঁতিরা যা তৈরি করেছেন। এটি ওইসব মানুষের জন্য দারুণ সম্মানের; যাঁরা নিজের হাতে এসব তৈরি করেন এবং বছরের পর বছর ধরে তাঁরা এটি করে আসছেন’, বলেন ড. ইউনূস।

ড. ইউনূস বলেন, ‘এরপর বিল ক্লিনটন (বাংলাদেশে) এলেন। প্রথমেই তিনি বললেন, ‘‘নাশতার টেবিলে আমি এ আলোচনা আর নিতে পারছি না। সবাই বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলছেন। আমি জানি না, তাঁরা কী নিয়ে কথা বলছেন।’’’

‘অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর (বিল) অনুভূতি এতটাই তীব্র ছিল এবং এখনো আছে। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আরকানসাসে গ্রামীণ প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়নি। গতি কমে গিয়েছিল, কিন্তু বন্ধ হয়নি’, বলেন মুহাম্মদ ইউনূস।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘শিকাগোতে একটি প্রকল্প শুরু হয়েছিল। এখন এটি বড় আকারে গ্রামীণ (প্রকল্প) হয়ে আসছে। আমেরিকায় গ্রামীণ আমেরিকা শুরু হয়েছে। এখানে নিউইয়র্ক সিটিতে, জ্যাকসন হাইটসে। এটি খুবই ছোট এক প্রকল্প ছিল এবং পরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গ্রামীণ আমেরিকার ৩৫টি শাখা রয়েছে। প্রতিটি বড় শহরে গ্রামীণ ব্যাংকের শাখা আছে। এখানে গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহক প্রায় দুই লাখ এবং ঋণগ্রহীতাদের শতভাগ নারী।’

‘এটা তাঁর (বিল) স্বপ্ন ছিল। এখন এসব ব্যাংক থেকে বছরে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়া হয়। আমরা (গ্রামীণ ব্যাংক, আমেরিকা) এখন এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। আমরা বছরে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিই, কোনো জামানত ছাড়া, কোনো কিছু ছাড়া এবং সবাই সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন’, বলেন অধ্যাপক ইউনূস।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আগামী ১০ বছরে আমাদের (গ্রামীণ ব্যাংক, আমেরিকা) এই ঋণদানের পরিমাণ বছরে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটা দারুণ এক গল্প, যেটা তিনি (বিল) শুরু করেছিলেন। আমরা (বাংলাদেশে) সবে একটি ব্যাংক হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছি। ১৯৮৩ সালে আমরা ব্যাংক হিসেবে নিবন্ধিত হই।’

‘১৯৮৬ সালে বিল যখন আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, ওই সময় এটা ছিল ছোট্ট একটি পরিকল্পনা। কল্পনা করতে পারেন, তিনি কত দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। এটি সেই কোথাকার ছোট্ট একটি পরিকল্পনা, যেটির বিষয়ে তিনি তখনো ঠিকমতো জানেনই না, এটি কী হতে পারে। তখনই তিনি আরকানসাসে সেটি চেয়েছিলেন’, বলেন অধ্যাপক ইউনূস।

নোবেলজয়ী এই অধ্যাপক বলেন, ‘এভাবেই আমার ও বিলের, বিলের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে যাই। এটি আমাকে কিছু করার প্রেরণা দেয়। আমি এর পর থেকে নিয়মিত সিজিআইয়ের (ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ) অনুষ্ঠানে অংশ নিতে থাকি এবং হঠাৎই যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। এখানে ফিরতে পেরে আমি খুবই খুশি।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আপনারা বিল সম্পর্কে এমন অনেক গল্প শুনেছেন। তবে খুব সম্ভবত, অনেক মানুষ ওই গল্পটা জানেন না, যেটা আমি জানি। আমি তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি, তিনি আসলে কেমন। আমি তাঁর, হিলারি ও চেলসির বন্ধু হতে পেরে খুবই গর্বিত। এটি চমৎকার একটি সম্পর্ক।’

ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘তিনি (বিল) যেখানেই যেতেন, এমনকি আজও যেখানেই যান, ওই গল্প বলেন। আমার ও আমাদের কাজের সঙ্গে কী ঘটেছে, তা কখনো ভুলে যাননি তিনি। আমার চমৎকার একজন বন্ধু হয়ে থাকার জন্য (বিলকে) অনেক অনেক ধন্যবাদ।’

এরপর বিল ক্লিনটন চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ড. ইউনূসকে জড়িয়ে ধরেন। হল আবার করতালিতে ফেটে পড়ে। ক্লিনটন বলতে শুরু করেন, ‘আমার জানামতে, আপনিই একমাত্র বয়স্ক ব্যক্তি, যাঁকে দেশের তরুণেরা তাঁর নিজের অসাধারণ অর্জনের জন্য ক্ষমতায় বসিয়েছে। কারণ, তিনি সেটা অর্জন করার চেষ্টা করেন, যেটি আমাদের সবার করা উচিত। আমাদের সবাইকে ভবিষ্যতের কথা ভাবা উচিত। আমি আপনার জন্য খুবই গর্বিত, আপনার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’

ক্লিনটন বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের সবার বাংলাদশের মঙ্গল কামনা ও তাদের সহায়তার জন্য যা করা দরকার, তা করা উচিত। এমন কাউকে ঋণ দেওয়া উচিত, যিনি জানেন, সেটি কীভাবে ফেরত দিতে হয়।’

এরপর ক্লিনটন ড. ইউনূসকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিতে যান। তখন ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলতে চান। তখন তিনি বলেন, ‘তরুণেরা সব সময় তরুণদের নিয়ে কথা বলতে চান। তরুণদেরই নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। আমাদের মতো বুড়োদের নয়।’

এ সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম না, বাংলাদেশে কী ঘটছে। হঠাৎ বাংলাদেশের সব তরুণ একত্র হয়েছেন এবং বলছেন, যথেষ্ট হয়েছে। আমরা আর এসব (অন্যায়, বৈষম্য) সহ্য করব না। তাঁরা সহ্য করেননি, তাঁরা সরকারের (ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের) ছোড়া গুলির সামনে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন।’

‘তরুণেরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমি কিছু ভিডিও দেখেছি। তাঁরা সেখানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বলছিলেন, ‘‘আমাদের কতজনকে আপনারা হত্যা করতে পারবেন। আমরা এখানে আছি, আমাদের হত্যা করুন। কিন্তু আমরা বিশ্বকে পরিবর্তন করেই ছাড়ব, আমরা বাংলাদেশকে পরিবর্তন করেই ছাড়ব।’’ এটাই তাঁদের প্রতিজ্ঞা ছিল, তাঁরা নতুন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছেন’, বলেন মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তী বাংলাদেশ হবে তরুণদের বাংলাদেশ। তাঁরা এই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আগের সরকার চলে যাওয়ার পর তাঁরা আমাকে আমন্ত্রণ জানান। আমাকে দেশের নেতৃত্ব দিতে আমন্ত্রণ জানান। আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি। তরুণেরা জাতিকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘তাঁরা যেভাবে (আন্দোলন) করেছেন, তাতে পুরো জাতি এক হয়েছে। পুরো দেশের মানুষ এবার তরুণদের সমর্থন দিয়েছেন।’ এ সময় সবাই হাততালি দিয়ে ওঠেন। তখন ড. ইউনূস বিল ক্লিনটনের হাত ধরে বলেন, ‘এটি বাস্তবায়নে (তরুণদের আকাঙ্ক্ষা) যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সমর্থন পেয়ে আমি খুব খুশি। আমরা আরও এগিয়ে যেতে চাই। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। তাঁরা (তরুণেরা) বলেছেন আমরা ‘‘রিসেট বাটন’’ চেপেছি। সব পুরোনো শেষ হয়েছে। এখন আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়ব।’

মাহফুজ আলমসহ দেশে ছাত্র–জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ড. ইউনূস তাঁদের কথাও বলেন। পুরো হল আবার করতালিতে ফেটে পড়ে। তিনি তাঁদের মঞ্চে ডেকে নিয়ে আসেন।

এ সময় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘দেশ গড়তে, নিজেদের গড়তে যে শব্দে, যে ভাষায় তাঁরা (আন্দোলনকারীরা) কথা বলেছেন, তা অসাধারণ। আমি আগে কখনো এভাবে কাউকে কথা বলতে শুনিনি। তাঁরা তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ করতে প্রস্তুত। দয়া করে তাঁদের সাহায্য করুন, সমর্থন করুন। তাঁদের স্বপ্ন যেন সত্য হয়। আমরা একসঙ্গে এ দায়িত্ব নিতে পারি। এ স্বপ্ন পূরণে আপনি (ক্লিনটন) আমাদের সঙ্গে থাকবেন।’

মঞ্চে আসা আন্দোলনকারী তরুণদের প্রশংসা করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘তাঁদের দেখতে অন্য তরুণদের মতোই মনে হয়। আপনি তাঁদের আলাদা করে মনে রাখতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যখন তাঁদের কথা শুনবেন, তাঁদের কাজ দেখবেন, কেঁপে উঠবেন। তাঁরা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছেন।’

ছাত্র–জনতার আন্দোলন প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এ আন্দোলন খুব পরিকল্পিতভাবে (অগোছালোভাবে নয়) চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিছুই এমনিতে হয়নি। এটি খুব গোছানো ছিল। এমনকি, লোকজন জানতেন না, কারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাই, আপনি একজনকে ধরে ফেলে বলতে পারবেন না, ঠিক আছে আন্দোলন শেষ। তাঁরা যেভাবে কথা বলেছেন, তা সারা বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

পরিশেষে ড. ইউনূস বলেন, ‘তরুণেরাই গড়বেন নতুন বাংলাদেশ, তাঁদের সাফল্য কামনা করি।’

অনুষ্ঠানের ভিডিও দেখে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শামিমা নাসরিন।
নিউইয়র্কের হিলটন হোটেলে ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ’–এর একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন
নিউইয়র্কের হিলটন হোটেলে ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ’–এর একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ছবি: পিআইডি

বিশ্বমঞ্চে ছাত্র বিপ্লবের তিন সমন্বয়ককে পরিচয় করিয়ে দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ছাত্র বিপ্লবের তিন সমন্বয়ককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে ‘ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ লিডারস স্টেজ’ অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজসহ দুই সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি এবং নাইম আলীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেন। বিল ক্লিনটনও তাদের নাম শুনে হাততালি দেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিগত সরকার কীভাবে ছাত্র জনতার ওপর গুলি চালিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তাজা গুলির সামনে কীভাবে ছাত্ররা বুক পেতে দাঁড়িয়েছে সেই গল্প শোনান বিশ্ব নেতাদের। একপর্যায়ে নতুন বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের কথা বলার সময় তিনি দর্শকদের জানান, এখানে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি রয়েছেন। তিনি বলেন, তারা যেভাবে কথা বলে এরকম কথা আমি কখনো শুনিনি। তারা নতুন পৃথিবী, নতুন বাংলাদেশ গড়তে প্রস্তুত। প্লিজ আপনারা তাদের হেল্প করবেন। যেন তারা তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। এ গুরু দায়িত্ব আমাদের সবার নিতে হবে। এ সময় তিনি বিল ক্লিনটনের হাত ধরে বলেন, আপনি আমাদের সঙ্গে আছেন এ স্বপ্ন পূরণে।
তিনি আরও বলেন, তাদেরকে দেখতে অন্য তরুণদের মতো মনে হলেও আপনি যখন তাদের কাজ দেখবেন, বক্তব্য শুনবেন, আপনিও অবাক হবেন। তারা সারাদেশ নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক কিছু হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের বক্তব্য, ত্যাগ কিংবা কমিটমেন্ট থেকে পিছিয়ে যায়নি। তাদের বক্তব্য, ‘আপনারা চাইলে আমাদের হত্যা করতে পারেন, কিন্তু আমরা পথ ছেড়ে যাব না’। এ সময় মাহফুজকে এগিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘গণ-অভুত্থানের পেছনের কারিগর মাহফুজ। যদিও মাহফুজ সব সময় বলে, সে নয় আরও অনেকে আছেন। যদিও সে গণ-অভ্যুত্থানের পেছনের কারিগর হিসেবে পরিচিত।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা হঠাৎ করে হয়েছে এমন কিছু নয়। খুবই গোছানো আন্দোলন। এছাড়া এত বড় আন্দোলন হয়েছে মানুষ জানতো না কে আন্দোলনের লিডার! যার ফলে একজনকে আটক করা যেত না। বলাও যেত না যে, একজনকে আটক করলে আন্দোলন শেষ। মাহফুজকে দেখিয়ে ড. ইউনূস বলেন, তার কথা শুনলে সারা পৃথিবীর যেকোনো তরুণ অনুপ্রাণিত হবে। তারা নতুন বাংলাদেশ তৈরি করবে। তাদের সফলতার জন্য আপনারা প্রার্থনা করবেন। তাদের জন্য হাত তালি হোক। এ সময় বিল ক্লিনটনসহ সবাই হাততালি দিয়ে সম্মান জানান।

mzamin

সাইফুজ্জামানের সম্পত্তি জব্দ করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ফেরত পাঠাতে বৃটিশ এমপি’র চিঠি

বাংলাদেশে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বৃটেনে থাকা সকল সহায়-সম্পত্তি জব্দ করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে ফেরত দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ এমপি আফসানা বেগম। ২৪শে সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির মহাপরিচালক গ্রায়েম বিগারের কাছে লেখা চিঠিতে তিনি এসব সহায়-সম্পত্তির বিষয়ে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চেয়েছেন। আফসানা বেগম মনে করেন, বাংলাদেশের সাবেক এই মন্ত্রীর এসব সম্পত্তিতে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক অপরাধের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

চিঠিতে তিনি আরও বলেছেন, সমপ্রতি বাংলাদেশের ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে নিরাপত্তারক্ষাকারী বাহিনীর দমন-পীড়নে কয়েকশ’ মানুষ নিহত হন। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর ব্যাপক এসব দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আফসানা বেগম বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি সাইফুজ্জামান চৌধুরী, যিনি বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী, ইতিমধ্যেই তিনি কর সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্তের অধীনে রয়েছেন, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অর্থ-আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করছে এবং দাবি করেছে যে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী যুক্তরাজ্যে মিলিয়ন মিলিয়ন  ডলার পাচার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, এইচ এম ল্যান্ড রেজিস্ট্রি এবং ইউকে কোম্পানি হাউসের রেকর্ডগুলোর বিষয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলো কমপক্ষে ২৮০টি সম্পত্তি রয়েছে, যার বাজার মূল্য ১৫ কোটি পাউন্ডেরও বেশি। আল-জাজিরার তদন্তে আরও জানা গেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী আমার নির্বাচনী এলাকা পপলার ও লাইম হাউসে ৭৪টি সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
বৃটিশ ওই এমপি আরও লিখেছেন, আমি বিশ্বাস করি, প্রশ্নবিদ্ধ এসব সম্পত্তি বাংলাদেশের। সেগুলো বাংলাদেশের জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া উচিত, যাতে তারা গণতন্ত্র ও নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত একটি সমাজের জন্য কাজ করতে পারে। দুর্নীতি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জীবনমান, কর্মস্থলের অধিকার ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এনসিএ মহাপরিচালকের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যেহেতু বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন অন্যায়ভাবে অর্জিত তহবিল পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইছে, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবো যদি আপনি স্পষ্ট করেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং এই দুর্নীতির তদন্তে অভিযুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সব সম্পদ তদন্ত ও জব্দ করার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, এই তহবিল জব্দ ও প্রত্যর্পণ করা শুধু ন্যায়বিচারের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জনগণের অধিকারের ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে, এটি যুক্তরাজ্যের সুনাম ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের জন্যও অপরিহার্য।

mzamin

ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প: প্রতি মিনিটের অডিও ভিডিও খরচ ২০ হাজার, আপত্তি পরিকল্পনা কমিশনের by মো. আল আমিন

দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে ‘ই-জুডিশিয়ারি’- নামের একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে আইন ও বিচার বিভাগ। দুই হাজার ৬২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্পটির কিছু খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা হয়। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় কিছু খাত যুক্ত করা হয়। এ সব নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। সূত্র বলছে, প্রকল্পটিতে প্রতি মিনিট অডিও-ভিডিও বা চিত্রতথ্য নির্মাণের জন্য ২০ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। মাত্র ২০ মিনিটের একটি অডিও বা ভিডিও নির্মাণে ব্যয় হবে ৪ লাখ টাকা। এই খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্পের উপদেষ্টার জন্য চার কোটি টাকা ব্যয়ে জিপ গাড়ি কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি বাদ দিতে বলা হলেও পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় তা বাদ দেয়া হয়নি। অন্যদিকে অফিস স্টেশনারি, অফিস ভাড়া, পরামর্শক সেবা, পেট্রোল, গ্যাস ও জ্বালানি, কম্পিউটার সামগ্রী, কম্পিউটার মেরামত, যানবাহন সংরক্ষণ ও মেরামত ইত্যাদি ব্যয় আরও পর্যালোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ ও বছরভিত্তিক বিভাজন দেখানোর কথা বলা হয়েছিল আইন ও বিচার বিভাগকে। কিন্তু পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় সেই প্রস্তাবও মানা হয়নি।

এদিকে সেমিনারের ব্যয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ধরা হয়নি বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। এছাড়া ইলেকট্রিক আর্চওয়ে, এক্স-রে ব্যাগেজ স্ক্যানার ও নিরাপত্তা অঙ্গে ১০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। এসব সরঞ্জাম ই-জুডিশিয়ারি কার্যক্রমের সঙ্গে কতটুকু সম্পর্কিত, প্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েও।
ই-কোর্ট রুমের সম্পূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম সিসি ক্যামেরা ও ভিডিও রেকর্ডিং এর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব নিয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলেছে, বিচারিক কার্যক্রমে বাদী-বিবাদীর বক্তব্য, জেরা তাদের ছবির প্রাইভেসি রাখার ক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা ও অডিও-ভিডিও অন্তরায় হতে পারে। ফলে প্রাইভেসি বিবেচনায় এগুলো রাখা ঠিক হবে কিনা আলোচনা হতে পারে।
প্রকল্পের পরামর্শক সেবা খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। পরামর্শক সেবা, টেকনিক্যাল পরামর্শক সেবা ও আইনি পরামর্শক সেবা নামের তিনটি অঙ্গে যথাক্রমে ১৭ কোটি ৩১ লাখ, ৬ কোটি ৩৩ লাখ ও ৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চতর প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ই-জুডিশিয়ারি অনেক বড় একটি প্রকল্প। প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিছু অঙ্গের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি। অহেতুক ব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্প অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু কর্মকর্তা বলেন, ই-জুডিশিয়ারি সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নের প্রকল্প। সেক্ষেত্রে প্রকল্পটি এখনই একনেকে অনুমোদন নাও হতে পারে।
আইন ও বিচার বিভাগ বলছে, নাগরিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিতকরণে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কিন্তু সীমিতসংখ্যক বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, গতানুগতিক পদ্ধতির বিচার কার্যক্রম ইত্যাদি কারণে যথাসময়ে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন ও রায় প্রদান করা সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় মামলার জট বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচার কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার জন্য এবং বিচার প্রাপ্তিতে জনগণের প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করার জন্য বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা জরুরি। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, বিচার ব্যবস্থার জন্য প্রশাসনিক এবং বিচার কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা, ই-আদালত কক্ষ প্রতিষ্ঠা করা এবং আইসিটি’র জ্ঞান ও দক্ষতা দ্বারা বিচারক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এদিকে মাত্র পিইসি সভায় উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও ই-জুডিয়িশারি প্রকল্পটি নতুন নয়। ২০১৬ সালের ১২ই জুলাই ওই সময়কার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পটি ৩২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে দেশের নির্বাচিত কয়েকটি জেলার বাস্তবায়নের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। ওই সভায় উদ্যোগী মন্ত্রণালয় হিসেবে আইন ও বিচার বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে যৌথভাবে উপস্থান করে প্রকল্প এলাকার পরিধি বিস্তৃত করে সারা দেশে বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। পরে আইন ও বিচার বিভাগ বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কারিগরি সহায়তায় ই-জুডিশিয়ারি পাইলট প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়নের মেয়াদ রেখে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয় প্রকল্পটি। ২০১৮ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এরপর আর তেমন অগ্রগতি ছিল না প্রকল্প নিয়ে। দীর্ঘ  ৬ বছর পর প্রকল্পটি নিয়ে আবারো তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে জানতে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম রব্বানীর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

mzamin

দুদকের জালে বিএফআইইউ’র সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এস আলম গ্রুপ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমালসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সুবিধা দিয়েছেন। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। বুধবার সংস্থাটির এক কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) শিরীন আখতারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। সংস্থাটির উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটের অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে বলে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।
প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ৩০শে নভেম্বর ডেপুটি গভর্নর পদমর্যাদায় দুই বছরের জন্য বিএফআইইউ’র প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান মাসুদ বিশ্বাস। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারে সহায়তা ছাড়াও নানাভাবে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মাসুদ বিশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংকে ডেপুটি গভর্নর পদে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এ ছাড়া স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্স লিমিটেডের বিমান ক্রয়ে সন্দেহজনক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি ঘুষের বিনিময়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে না পাঠিয়ে পরিসমাপ্তি করেছেন। এ ছাড়া এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তমাল পারভেজ ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুটপাটসহ আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ এর আওতায় গোয়েন্দা প্রতিবেদন না দিয়ে সাধারণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন হিসেবে পাঠিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনিয়ম ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিমিদ্রী লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত করা হয়। ওই স্থগিতাদেশ মাসুদ বিশ্বাস আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। তানাকা গ্রুপ, এস.এ. গ্রুপ এবং আনোয়ার গ্রুপের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং, অর্থ পাচার সংক্রান্ত সুনিশ্চিত তথ্য থাকা সত্ত্বেও ওই মামলাগুলো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে না পাঠিয়ে নিজে হস্তক্ষেপ করেন মাসুদ বিশ্বাস।  এ ছাড়া এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের সঙ্গে যোগসাজশে ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা ঋণ উত্তোলনের নামে বিদেশে পাচার; আবদুল কাদির মোল্লার থার্মেক্স গ্রুপ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারসহ ঘুষের বিনিময়ে জিনাত এন্টারপ্রাইজের বিদেশে অর্থ পাচারের মামলা ধামাচাপা দিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
অন্যদিকে আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরীন আখতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮তম ও প্রথম নারী উপাচার্য। ২০১৯ সালের ৩রা নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। শিরীন আখতারের দুর্নীতি অনুসন্ধানে গত জুনে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে ইউজিসি’র গঠিত তদন্ত কমিটি।
জানা যায়, অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদ ভবন উদ্বোধন, তার শেষ কর্মদিবসে বিনা বিজ্ঞাপনে অর্ধশতাধিক কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করছে ইউজিসি’র তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিরীন আখতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি পদে নিয়োগের জন্য ১৬ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, সংবিধি ও শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেন।
২০২৩ সালের ৪ঠা জুন ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। চবি’র মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের একাডেমিক ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ও একইদিনে অন্য একটি সভায় ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।

mzamin

মানিকগঞ্জের ছায়ামন্ত্রী আফসার শতকোটি টাকার মালিক by রিপন আনসারী

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের দুর্নীতির আগ্রাসনের প্রধান খলিফা আফসার উদ্দিন সরকার। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি তার নিজ ইউনিয়নের বিতর্কিত চেয়ারম্যান। মন্ত্রীর সমস্ত অবৈধ  কাজের রাজসাক্ষীও তিনি। এ ছাড়া অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সব ধরনের তদবির বাণিজ্য, চাকরি বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, থানা নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল, ঠিকাদারি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদকসহ এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে তার সম্পৃক্ততার হাত পড়েনি। নামে-বেনামে ফসলি জমি থেকে শুরু করে অঢেল জায়গা-সম্পত্তি রয়েছে তার। দেশ-বিদেশে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা। জাহিদ মালেকের অনিয়ম আর দুর্নীতির অঘোষিত ছায়ামন্ত্রী হিসেবেই নিজেকে আবিষ্কার করেছেন আফসার। মানবজমিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার অজানা অনেক তথ্য। জাহিদ মালেকের পিতা এরশাদ সরকারের শাসনামলে ঢাকা সিটির প্রয়াত মেয়র কর্নেল আব্দুল মালেকের অনুসারী ছিলেন আফসার। পরিবারের প্যাঁচগোছের আত্মীয়তার সুবাদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক মামা-ভাগ্নের। সেই সুবাধে তিনি জিরো থেকে হিরো হয়েছেন। তবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আফসার সপরিবারে পালিয়েছেন।

সরজমিন গড়পাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ হাটে প্রবেশ করার মুখেই চোখে পড়ে আফসার সরকারের পাঁচ তলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়িটি। আলিশান এই ভবনটি বেশির ভাগ কক্ষই ভাড়া দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ হাট থেকে কিছু দূরে গ্রামের বাড়ি ডাউলি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় তৃতীয় তলাবিশিষ্ট আরেকটি বাড়ি। বাড়িটি কয়েক বিঘা জায়গার উপর। বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। তাছাড়া গ্রামের বাড়ির চারপাশে তার রয়েছে অঢেল সম্পদ। শুধু গ্রামের বাড়িতেই সম্পদের পাহাড় নয়; গড়পাড়া ইউনিয়নের আরও বেশ কিছু এলাকায় রয়েছে তার শত শত বিঘা সম্পত্তি। তিনি কতো বিঘা সম্পত্তির মালিক সেটা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারেননি। জেলা শহরের কালীবাড়ি এলাকায় বহুতল ভবনে রয়েছে কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট। সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের আশপাশে এবং সদর  উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে তার কোটি টাকা মূল্যের নিজস্ব জায়গা।
অভিযোগ রয়েছে গড়পাড়া এলাকায় বাংলাদেশ হাট সংলগ্ন তার পাঁচতলা ভবনের জায়গা নিয়ে। কয়েক বছর আগে এলাকার ৯০ বছরের বৃদ্ধ অসহায় সাহাম উদ্দিনের স্ত্রী আছিয়া খাতুনের নামে ৭ শতাংশ জায়গার মধ্যে সোয়া ৪ শতাংশ তিনি লিখে নেন। বাজারদর অনুযায়ী প্রতি শতাংশ ১০ লাখ টাকার উপরে বিক্রি করার স্বপ্ন ছিল ওই বৃদ্ধের। কিন্তু ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করে লামছাম টাকা দিয়ে জায়গাটি লিখে নেয়া হয়। বৃদ্ধ সাহাম উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, ওই সময় অনেকেই বেশি দামে আমার জায়গা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান আমাকে বিক্রি করতে দেয়নি। যারা কিনতে এসেছিল তাদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
এলাকার নুরে আলম বলেন, বাংলাদেশ হাটে আমাদের বাপ- চাচার নামে লিজ নেয়া ১১০ শতাংশ জায়গার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা আফসার চেয়ারম্যানের লোকজন জবর দখল করে দোকানপাট তুলেছে। শুধু তাই নয়, আমাদের নিজস্ব একটি জায়গায় অন্যকে দিয়ে মামলা করিয়ে জায়গাটি স্টে অর্ডার করে রাখা হয়েছে। এসব করেছে জাহিদ মালেকের শেল্টারে। মূলত মন্ত্রীর কাঁধে ভর করে চেয়ারম্যান আফসার অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। এলাকার হিন্দু সমপ্রদায়ের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, শুধু মানিকগঞ্জেই নয় আফসার সরকারের ভারতেও বাড়ি রয়েছে। সেটা এলাকার অনেকে জানে।
এলাকাবাসী জানান, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে মাদকের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়পাড়া ইউনিয়নকে কলঙ্কিত করেছেন আফসার সরকারের মেয়ের জামাই মহব্বত হোসেন। মাদক বেচাকেনার ভাগও পেতেন আফসার। প্রধান শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও শ্বশুরের বদৌলতে তাকে জাহিদ মালেকের নামে গড়পাড়া জাহিদ মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একজন শিক্ষক হয়েও তার এই অপকর্ম এলাকার মানুষ ভালো দৃষ্টিতে দেখেনি। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করারও সাহস পায়নি। মাসের বেশিদিনই অনুপস্থিত থেকেছেন। শুধুমাত্র মাস শেষে সাইন করে বেতনের টাকা উত্তোলন করেন। শুধু মাদকই নয় এলাকার বিচার- সালিশ, বাণিজ্যসহ নানান অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন মহব্বত। আফসার সরকারের একমাত্র ছেলে ঝিনুক সরকার গড়পাড়া এলাকায় নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাছাড়া ব্যাংক এশিয়ার এজেন্টও ছেলের নামে আনা হয়েছে। পিতার অপকর্মের বিরুদ্ধে যাতে কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে না পারে তার জন্য এলাকায় তৈরি করেছিলেন নিজস্ব বাহিনী।  
আফসার সরকারের অর্থ বাণিজ্যের আরেকটি খাত ছিল নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার ব্যবসা। এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন মেহেদি হাসান সম্রাট নামের এক  আত্মীয়। সম্রাট ১২ হাজার টাকার বেতনে চাকরি করলেও এলাকায় তার ডুপ্লেক্স বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার রয়েছে নিজস্ব গাড়ি। আফসার সরকারের জমি সম্পর্কিত বিষয়াদি দেখতেন গড়পাড়া এলাকার দু’জন ব্যক্তি। তাছাড়া মানিকগঞ্জের জয়রা এলাকায় সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিতার নামে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জায়গা কেনাবেচা এবং মাটি ভরাটের দায়িত্বে ছিলেন আফসার সরকার। সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন। তাছাড়া কর্নেল মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামাদিসহ সব কিছুই কেনাবেচা আফসার সরকারের মাধ্যমে করতো কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় থেকে শুরু করে খণ্ডকালীন যে সমস্ত শ্রমিককে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে ৩-৪ লাখ টাকা করে উৎকোচ নিয়েছে।
জাহিদ মালেক দুই মেয়াদে মন্ত্রিত্ব থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন তদবির, চাকরি, বদলিসহ ওই মন্ত্রণালয়ের এমন কোনো বাণিজ্য ছিল না যা আফসার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো না। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে দিয়েই মূলত অবৈধ এসব বাণিজ্য করাতেন। এসব বাণিজ্যে মন্ত্রীর পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিতেন আফসার সরকার। এমনও অভিযোগ রয়েছে  দেশের বড় বড় সরকারি হসপিটালের ঠিকাদারি কাজ পেতে অনেক প্রভাবশালীরা ছুটে আসতো আফসার সরকারের কাছে। তাকে ম্যানেজ করেই মন্ত্রীর কাছ থেকে কাজ বাগিয়ে নেয়া হতো। এতে মন্ত্রী ও আফসার সরকার দু’জনেরই পকেট ভারী হতো।
মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড টার্মিনালে গণপরিবহন থেকে মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চাঁদাবাজির একটা অংশ আফসার সরকারকে দেয়া হতো। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির দায়িত্বে ছিলেন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জাহিদ। এ ছাড়া আফসার সরকার মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে মানিকগঞ্জ সদর এবং সাটুরিয়া থানা নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিরোধী পক্ষসহ বিভিন্ন মানুষজনকে যখন খুশি মামলার জালে আটকে দিতেন। তার কথাতেই থানা পুলিশ চলতো। সেখান থেকেও নানাভাবে অর্থ বাণিজ্য করতো আফসার সরকার। মানিকগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার থেকেও আফসার সরকারকে ভাগ দিতে হতো। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত নেতাদেরও কোণঠাসা করে রাখার পেছনে আফসার সরকারের ভূমিকা ছিল। তার অর্থবিত্ত শুধু মানিকগঞ্জকেন্দ্রিকই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পার্শ্ববর্তী ভারত ও মালয়েশিয়ায় বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে এমন তথ্য মানিকগঞ্জের অনেকেই অবগত রয়েছেন। এদিকে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের গড়পাড়ায় বিশাল বাগান বাড়ি এবং ছেলের নামে শুভ্র সেন্টার দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন আফসার। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সেক্টর থেকে আসা টাকার ভাগবাটোয়ারা তিনি নিজে করতেন। বড় একটি অংশ যেত মন্ত্রীর পকেটে। এ ব্যাপারে আফসার উদ্দিন সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে আফসার সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতার দায়ে ইতিমধ্যে মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

mzamin

সিলেটে ‘টোকেন বাণিজ্যে’ টাকার কুমির আলতাফ by ওয়েছ খছরু

এক সময় চালকের সহকারী ছিল সিলেটের আলতাফ হোসেন। টেম্পোতে হেলপারি করে জীবন চালিয়েছেন। কিন্তু গত ৬ থেকে ৭ বছরে সিলেটে অবৈধ সিএনজি-অটোরিকশায় টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে দু’হাতে টাকার মালিক বনেছেন তিনি। পরিবহন সেক্টরে এক নামেই চিনেন সবাই। চোরাই সিএনজি, বহিরাগত জেলার গাড়ি, সিলেটের অন টেস্ট সিএনজি-অটোরিকশার টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে চালাতেন। সিলেট দক্ষিণের উপজেলার দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, ওসমানীনগর, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার ও জকিগঞ্জের সব অবৈধ গাড়ি সড়কে চলে তার কথায়। ৫ই আগস্ট প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তার টোকেন বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। আর সাম্প্রতি সময় সিলেট মেট্রো পুলিশ অবৈধ ধরপাকড় শুরু করার কারণে আলতাফের বাণিজ্যে পুরোপুরি ধস নেমে আসে। এই অবস্থায় সিলেটের সিএনজি-অটোরিকশা শ্রমিকদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। বিভিন্ন উপ-কমিটির নেতাদের দিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন বৈধ সিএনজি-অটোরিকশার শ্রমিকরা। আলতাফ মাসে কতো টোকেন বাণিজ্য করেছে? এ প্রশ্নের উত্তরের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে শ্রমিক নেতারা গত সপ্তাহে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন; হাজার হাজার অবৈধ সিএনজি- অটোরিকশা সিলেট দক্ষিণের উপজেলাগুলোতে চলছে। তারা জানিয়েছেন- এর সংখ্যা কম হলেও ৫ হাজার হবে। বিআরটিএ থেকে নতুন গাড়ির অনুমোদন দেয়া বন্ধ থাকার কারণে টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব সিএনজি-অটোরিকশা সিলেট নগরে চলছে। এ কারণে নগরের যানজট তীব্র হচ্ছে। শ্রমিক নেতারা পরিসংখ্যান তুলে ধরে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- যদি ৫ হাজার অবৈধ সিএনজি চলে তাহলে মাসে প্রতিটি সিএনজি থেকে টোকেনের বিনিময়ে ১ হাজার টাকা দেয়া হয়। আর টোকেন দিয়ে টাকা উত্তোলন করতো আলতাফ হোসেন। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকার টোকেন বাণিজ্য করা হয়। এই টাকার অর্ধেক অংশ পুলিশ প্রশাসনের ট্রাফিক বিভাগের একটি সিন্ডিকেটের কাছে যেতো। আর অর্ধেক টাকার সিংহভাগ আলতাফ নিয়ে নেয়। কিছু অংশ পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ নেতাদের কাছেও যায়। আলতাফের সহকর্মী সিএনজি- অটোরিকশা চালকরা জানিয়েছেন- পেছনে পুলিশের ছায়া থাকায় সিলেটের সিএনজি-অটোরিকশা সেক্টরে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম আলতাফ হোসেন। তার দাপটের কাছে খোদ থানার ওসিরাই অসহায় ছিলেন। তার দেয়া টোকেন সড়কে ছিল বৈধ। প্রকাশ্যে গাড়িতে স্থাপন করা হতো তার টোকেন। আর এই টোকেন দেখলে থানা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ কেউই গাড়ি ধরতো না। জকিগঞ্জে বাড়ি আলতাফের। অনেক আগে সে জীবিকার সন্ধানে সিলেটে এসেছিল। দক্ষিণ সুরমায় তখনকার সময় টেম্পো-অটোরিকশা চালক জমসেদের হেলপার ছিল। পরে সে নিজেই ড্রাইভার হয়েছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত আলতাফ নিজেও সিএনজি অটোরিকশা চালক ছিল। এরপর সে টোকেন বাণিজ্যের রাজা হয়ে ওঠায় আর গাড়ি চালায়নি। বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি করে নিয়ে আসা অর্ধশতাধিক চোরাই গাড়ির মালিক সে। এ ছাড়া সিএনজি-অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের কয়েকজন নেতার গাড়িও অবৈধভাবে তার নিয়ন্ত্রণে চলে। দক্ষিণ সুরমার ভার্থখলা পাম্পের পাশে অফিসে বসে সিলেট জেলা অর্ধেক সিএনজি-অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করে। টাকার লেনদেন সব হয় ওখানে বসেই। এতে দেখা গেছে মাসে মাসে বড় অঙ্কের টাকা গেছে আলতাফের পকেটে। প্রায় চার বছর আগে আলতাফ নগরের বদিকোনা এলাকায় জমি কিনে। এখন সেখানে বহুতল বাসা নির্মাণ করেছে। টোকেনের টাকায় এই বাসার মালিক হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া নামে-বেনামে আরও সম্পত্তির মালিক এখন সে। প্রতি মাসে টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে তার ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা কামাই হয়েছে। এ ছাড়া জকিগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে জমি কিনেছেন বলে জানিয়েছেন তার এক সময়ের সহকর্মী-চালকরা। তারা জানিয়েছেন- টোকেন বাণিজ্যই আলতাফের মূল ধান্দা। যেসব চালকরা তার টোকেন না নিয়ে সড়কে চলতেন তাদের গাড়ি পুলিশ দিয়ে আটকানো হতো। চালক ও সিএনজি’র মালিককে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে; সিলেটে অবৈধ সিএনজি-অটোরিকশাই হচ্ছে যানজটের অন্যতম কারণ। এ কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা ও নগরের সিএনজি পৃথক করার প্রক্রিয়া বহুদিন ধরে চলছে। সম্প্রতি নগর পুলিশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে জোরালো কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এতে নগরের যানজট কমে আসছে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা জানিয়েছেন- আলতাফ এখন শ্রমিকদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। আলতাফ ও তার সহযোগী শ্রমিকরা ক্ষোভ দেখিয়ে পুলিশের কার্যক্রমকে বাধা প্রদান করতে চাইছে। সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কিছু চোরাই ও বহিরাগত জেলার গাড়ির ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে বৈধ অটোরিকশা শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে আলতাফ হোসেন গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন; তিনি কখনো টোকেন বাণিজ্যে ছিলেন না। কখনো করেননি। তার বিরুদ্ধে অযথা অপপ্রচার করা হচ্ছে। তবে; নগরের বদিকোনা এলাকায় তার জমি ও বাড়ি তৈরির কথা স্বীকার করেছেন। তবে টাকার উৎস সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট কিছু না জানাতে পারেননি।  
mzamin

৮ বছর ধরে ওএসডি: এসপি আরেফ এখনো হয়রানিতে

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আরেফ। ২০০১ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। এসপি হিসেবে পদোন্নতি পান ২০১৩ সালে। কিন্তু এরপর আর তার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। সর্বশেষ পদোন্নতি পাওয়ার ১১ বছর পর তিনি এখনো এসপি। তার ব্যাচমেটরা ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। জুনিয়ররাও অতিরিক্ত ডিআইজি। অথচ ৪টি বিভাগীয় মামলার গ্যাঁড়াকলে পড়ে তিনি আর পদোন্নতি পাননি। উল্টো ওএসডি হয়ে আছেন বছরের পর বছর। এরমধ্যে একটি মামলা থেকে সম্প্রতি তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বাকি তিনটি মামলার পুনঃতদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু আরেফ তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সকল মামলা প্রত্যাহার করে তাকে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করতে দেয়ার সুযোগ চাচ্ছেন। তিনি বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় যে স্থগিতাদেশ ছিল সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। অথচ তার মামলাগুলো প্রত্যাহার করে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করা হচ্ছে না। পুনঃতদন্ত হলে তিনি আরও অনেক দিনের জন্য ওএসডি হয়ে থাকতে হবে। তার সময়কালে যাদেরকে রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করা হয়েছিল তাদেরকে আগেই অভিযোগ প্রত্যাহার করে পদোন্নতি দিয়ে পদায়ন করা হয়েছে। অজানা কারণেই তার মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে না।

আরেফের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০শে আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর এক আবেদনে আরেফ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা বিভাগীয় মামলা দিয়ে তার ২টি প্রমোশন থেকে বঞ্চিত করে দীর্ঘদিন ওএসডি করে খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার প্রতি এই অবিচার ও বৈষম্যকে বন্ধ করে মামলা প্রত্যাহার করে তার পদোন্নতি দিয়ে তার প্রাপ্য অবস্থান নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন। ২২শে আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি শাহজাদা মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর এক চিঠিতে বলা হয় আরেফ বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য সিনিয়র সচিব বরাবর আবেদন দাখিল করেছেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের আইন কর্মকর্তার মতামত গ্রহণ করা হলে তিনি মতামত দিয়ে বলেন, দায়েরকৃত মামলাসমূহ প্রত্যাহার সাপেক্ষে সরকার তার আবেদনটি বিবেচনা করতে এখতিয়ার সম্পন্ন তাই আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো যেতে পারে। ১লা সেপ্টেম্বর জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে আরেফকে দেয়া এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানির জন্য ডাকা হয়। ৪ঠা সেপ্টেম্বর তিনি সিনিয়র সচিবের দপ্তরে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। পরে সচিবের নির্দেশেই আরেফ তার বিরুদ্ধে মামলা স্থগিতাদেশ হাইকোর্ট থেকে উঠিয়ে নেন। ১৯শে সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখার এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে ড্রাইভারসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যকে গালিগালাজ, মারধর ও চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি প্রদান করার মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। বাকি মামলাগুলো পুনঃতদন্তের জন্য বলা হয়। ৫ই সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-৩ শাখা আরেফসহ আরও ৪ পুলিশ কর্মকর্তার ওএসডি প্রত্যাহারপূর্বক প্রাপ্য পদোন্নতি প্রদান, চাকরিতে যোগদান ও পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়।
এদিকে, ইন্টারন্যাশনাল ল এনফোর্সমেন্ট অফিসার্স এসোসিয়েশনের (আইএলইওএ) পক্ষ থেকেও আরেফের ওএসডি প্রত্যাহার করে চাকরিতে পুনর্বহাল ও প্রাপ্য পদোন্নতি দেয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আরেফ এই সংগঠনটির বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি। আইএলইওএ এর ইন্টারন্যাশনাল সভাপতি লিনড্রো পোলিনো চিঠিতে আরেফকে বিনা কারণে হয়রানি করার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হাইকোর্ট থেকেও এক রিট আদেশে ষড়যন্ত্রের শিকার আরেফকে হয়রানি না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং তার প্রাপ্য পদোন্নতি ও পদায়ন দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। এক আদেশে বলা হয়েছে কোনো কর্মকর্তার বিভাগীয় মামলায় শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত এবং বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলেও ওই কর্মকর্তার পদোন্নতি দেয়া যাবে।  
ভুক্তভোগী পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আরেফ মানবজমিনকে বলেন, গত সরকারের সময় বিনা কারণে বিভাগীয় মামলা দিয়ে আমাকে ওএসডি করে রাখা হয়। আমার নামে এমন কিছু অভিযোগ দেখিয়ে মামলা দেয়া হয়েছে যা অত্যন্ত তুচ্ছ ও হাস্যকর। এসব ঘটনা সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। প্রায় ৮ বছর ওএসডি থাকার কারণে আমি কোনো পদোন্নতি পাইনি। আমার ব্যাচমেটরা সবাই এখন ডিআইজি। অনেক জুনিয়র কর্মকর্তারাও এখন অতিরিক্ত ডিআইজি। অথচ আমি এখনো ওএসডি এসপি। এমনকি আমার সঙ্গে অন্য যাদেরকে ওএসডি করা হয়েছিল তাদের মামলা প্রত্যাহার করে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার পতনের পর আমি যথাযথ নিয়ম মেনেই পুলিশ প্রধানের সঙ্গে দেখা করে পুরো বিষয়টি খুলে বলি। তিনি বুঝতে পারেন বিগত আমলে আমাকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এসব মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছিল। তাই তিনি আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি ভিত্তিতে চিঠি পাঠিয়ে সুপারিশ করেন। নিয়ম মেনেই আমি সচিবের শুনানিতে অংশগ্রহণ করি। সচিবের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে আমি আমার বিরুদ্ধে করা মামলার স্থগিতাদেশসহ সকল কার্যক্রম প্রত্যাহার করে নেই। অথচ অজানা কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমার বিরুদ্ধে করা ৪টি মামলার একটি প্রত্যাহার করলেও বাকি তিনটি মামলার পুনঃতদন্ত দিয়েছে। এটি আমার কাছে হয়রানিমূলক মনে হচ্ছে। কারণ বিএনপিকে সাপোর্ট করার জন্য আমার বিরুদ্ধে এসব মামলা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় নাই। একটি নিরপেক্ষ সরকার কাজ করছে। তাই আমি আমার ওপর থেকে হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করে আমার পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার জন্য স্বরাষ্ট্র সচিবকে অনুরোধ করছি। 

mzamin

ইলিশ রপ্তানির অনুমতি বাতিলে রিট

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। গতকাল হাইকোর্টের সংস্থার শাখায় রিট পিটিশন দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান। রিটে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আমদানি-রপ্তানি কার্যালয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রককে বিবাদী করা হয়েছে। রিট পিটিশনে ভারতে ৩০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি বাতিল সহ বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও নদীর ইলিশ মাছ রপ্তানির বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে। আইনজীবী বলেন, রিট পিটিশনটি শিগগিরই হাইকোর্টে শুনানি হবে। রিটে বলা হয়েছে, ইলিশ মাছ একটি সামুদ্রিক মাছ। এটি মূলত বঙ্গোপসাগরের মাছ। এই বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার সংযুক্ত। বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমা অনেক বেশি ও বিস্তৃত। এই ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় প্রচুর ইলিশ মাছ উৎপাদন হয়। এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন নদীতে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। মূলত বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ মাছ আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। ভারত মূলত বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ইলিশ আমদানি করে। এই ইলিশ মাছ সাগরের মাছ হলেও ডিম পাড়ার জন্য যখন এই মাছ পদ্মা নদীতে আসে তখন এই ইলিশ মাছ পদ্মা নদীর বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে পরিপুষ্ট হয় এবং অত্যন্ত সুস্বাদু হয়ে উঠে। মূলত পদ্মা নদীর ইলিশ মাছই স্বাদে ও গন্ধে উৎকৃষ্ট। পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ যখন রান্না করা হয় তখন এর সুঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পিটিশনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে যত ইলিশ ধরা পড়ে তার মাত্র ১০ শতাংশ ইলিশ মাছ পদ্মা নদীতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ পদ্মা নদীতে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণ ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। পদ্মা নদীতে যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যায় তা বাংলাদেশের জনগণের চাহিদা পূরণে একেবারে অপ্রতুল।

রিট পিটিশনে আরও বলা হয়েছে, ভারত মূলত বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ইলিশ আমদানি করে থাকে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভারতের “ফিস ইম্পোর্টার্স এসোসিয়েশনের”  নেতাদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে যেখানে তারা স্বীকার করেছেন যে, তারা বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ আমদানি করে থাকেন। প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর সকল মাছ ভারতে রপ্তানি হয় এবং বিপুল পরিমাণ ইলিশ মাছ ভারতে চোরাচালান হয়। বাংলাদেশে ভারতীয় এজেন্ট ও রপ্তানিকারকরা সারা বছর পদ্মা নদীর মাছ সংগ্রহ করে ফ্রিজিং করে রাখেন এবং পরবর্তীতে সুযোগ অনুযায়ী ভারতে রপ্তানি ও পাচার করে থাকেন।  ফলে বাংলাদেশের জনগণ বাজারে গিয়ে পদ্মার ইলিশ পায় না এবং সামান্য পরিমাণ পেলেও তার দাম অত্যন্ত বেশি থাকে যা সাধারণ জনগণের পক্ষে কিনে খাওয়া সম্ভব নয়। ভারতে রপ্তানি ও চোরাচালানের জন্য ব্যবসায়ীরা সারা বছর বিপুল পরিমাণ ইলিশ মাছ ফ্রিজিং করে রাখেন। ফলে বাজারে ইলিশের দাম সব সময় বেশি থাকে এবং সাধারণ জনগণ এই ইলিশ মাছ কিনে খেতে পারে না। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ইলিশ রপ্তানির ঘোষণার ফলে বাংলাদেশে ইলিশ মাছের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; যার ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইলিশ মাছ কিনে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশের রপ্তানি নীতি ২০২১-২৪ অনুযায়ী, ইলিশ মাছ মুক্তভাবে রপ্তানিযোগ্য কোনো পণ্য নয়। এই মাছ রপ্তানি করতে চাইলে যথাযথ শর্ত পূরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। এই ইলিশ মাছ হলো মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন বিষয়। এক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এককভাবে এই ইলিশ মাছ রপ্তানির অনুমোদন দিতে পারে না। এটা এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিব বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছেন এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন।

mzamin

যুবতীর কক্ষে গোপন ক্যামেরা...

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। সেখানে এক নারী ভাড়াটিয়ার বেডরুমে এবং বাথরুমে গোপন ক্যামেরা। এসব রুমে যে বা যারাই প্রবেশ করেন এবং যা-ই করেন, তা গোপনে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল। সার্বক্ষণিক সবার ওপর নজর রাখা হতো। কিন্তু গোপন আর গোপন থাকেনি। ভাড়াটিয়া তা দেখে ফেলেন। তারা অনুসন্ধান শুরু করেন। এক পর্যায়ে সন্দেহ করেন বাড়ির মালিকের ৩০ বছর বয়সী ছেলেকে। তার আচরণেই ফাঁস হয়ে যায় সব। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস নাউ। এতে বলা হয়, নারী ভাড়াটিয়ার ভাড়া নেয়া এই অ্যাপার্টমেন্টে গোপন ক্যামেরা খুঁজে পাওয়ার ঘটনা বিভিন্ন শহরে একা বসবাসকারী নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নারী ভাড়াটের অ্যাপার্টমেন্টে বেআইনিভাবে গোপন ক্যামেরা বসানোর দায়ে অ্যাপার্টমেন্টের মালিকের ছেলেকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশ জানায়, অভিযুক্তের নাম করণ। সে তিন মাস আগে ওই নারীর বেডরুম ও বাথরুমে গোপন ক্যামেরা বসিয়েছিল। ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব দিল্লির শকরপুর এলাকায়।

ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দিল্লির শকরপুরে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের এক যুবতী। যে অ্যাপার্টমেন্টে তিনি থাকতেন, তার উপর তলায় বাড়ির মালিকের স্ত্রী ও ছেলে থাকতেন। তাদের ভালো ব্যবহার, বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণে ভরসা করেই ওই যুবতী বাড়ি যাওয়ার সময় চাবি দিয়ে গিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশ থেকে ফেরার পরই ওই যুবতী হঠাৎ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও, তার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক গতিবিধি হতেই ‘লিঙ্কড ডিভাইস’ চেক করেন। সেখানে দেখেন- একটি অজানা ল্যাপটপের সঙ্গে তার হোয়াটসঅ্যাপ লিংক দেখাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ল্যাপটপ থেকে লগ আউট করে দেন। এ ঘটনার পরই তার সন্দেহ হয় যে, কেউ নজর রাখছে। এরপর বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর নজরে আসে, বাথরুমে লাগানো লাইট বাল্বটি একটু বাঁকা দেখাচ্ছে। খুলতেই দেখেন,  ভেতরে ক্যামেরা। এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে ফোন করেন যুবতী। পরে পুলিশ এসে ফের তল্লাশি চালায়।

এবার যুবতীর বেডরুমের লাইট বাল্ব হোল্ডারের ভেতর থেকেও ক্যামেরা বের হয়। পুলিশ ওই যুবতীকে প্রশ্ন করে- তার অ্যাপার্টমেন্টে কাদের যাতায়াত ছিল। ভুক্তভোগী যুবতী জানান, প্রায় সময়ই তিনি বাড়ির মালিকের ঘরে চাবি দিয়ে যেতেন। এরপরই পুলিশ বাড়ির মালিকের ছেলেকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন, তিন মাস আগে যুবতী যখন বাড়ি গিয়েছিলেন, সেই সময় তার ঘরে ঢুকে বেডরুম ও বাথরুমে ক্যামেরা লাগিয়ে আসে সে। ক্যামেরাগুলোতে মেমোরি কার্ডও ছিল। যখন মেমোরি ফুল হয়ে যেত, তখন বিদ্যুতের কাজের নামে ওই অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে সেই রেকর্ডিং নিজের ল্যাপটপে ট্রান্সফার করে, ফাঁকা চিপ লাগিয়ে আসতো। এই ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্তের কাছ থেকে দুটি ল্যাপটপ উদ্ধার করেছে। এই ল্যাপটপের মধ্যে যুবতীর একাধিক নগ্ন ভিডিও পাওয়া গেছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

mzamin

সংস্কার ও নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চান সজীব ওয়াজেদ জয়

দেশে চলমান সংস্কার এবং আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে ভূমিকা রাখতে চান পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের জন্য যে টাইমলাইন দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, তাকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সেনাপ্রধানের ঘোষণায় তিনি খুশি, যদিও এটা প্রত্যাশার চেয়ে পরে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। বলেছেন, শেখ হাসিনার দলকে ছাড়া প্রকৃত সংস্কার ও নির্বাচন অসম্ভব। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে ভারতের অনলাইন টেলিগ্রাফ। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে ৫ই আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। তার পক্ষে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে দেশে গণতন্ত্র ফেরা উচিত। এ ঘোষণার পর মঙ্গলবার দিনের শেষে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, অন্ততপক্ষে এখন পর্যন্ত একটি টাইমলাইন পাওয়ার খবর শুনে আমি খুশি। কিন্তু এর আগেও আমরা দেখেছি অনির্বাচিত, অসাংবিধানিক সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারপর পরিস্থিতির অবনতি হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাসের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেন। সম্প্রতি ২০০৭ সালে অভ্যুত্থান হয়। তখন সেনাবাহিনী সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর দেশ শাসন করেন। তারপর ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা দেশ চালান ১৫ বছর।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে  সেনাবাহিনী। এমন অবস্থায় জেনারেল ওয়াকার বলেছেন, যেহেতু সেনাবাহিনী স্থিতিশীলতায় সমর্থন করে এ জন্য প্রতি সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের প্রধান দু’টি বিবদমান দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ- উভয়ই আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দাবি করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসা নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের আগে বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেননি। বুধবার ড. ইউনূসের অফিস থেকে বলা হয়েছে, সংস্কার বিষয়ক প্যানেলের সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে সরকার। বিবৃতিতে বলা হয়, যখন সংস্কারের বিষয়ে একমত হওয়া যাবে এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুত হবে, তখনই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। বিএনপি বলেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা নির্বাচন করতে চায়।

সজীব ওয়াজেদ জয় বসবাস করেন ওয়াশিংটনে। তিনি বলেছেন, দেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য আলোচনার জন্য কথা বলেননি তিনি বা অন্তর্বর্তী সরকার। তার ভাষায়- সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে (আওয়ামী লীগ) বাদ দিয়ে বৈধ সংস্কার ও নির্বাচন অসম্ভব। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা গত মাসে পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পর দিল্লির কাছে একটি নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ে আছেন। আওয়ামী লীগের বহু সিনিয়র নেতাকে কমপক্ষে এক হাজার মানুষকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের ভূমিকার কারণে হয় গ্রেপ্তার করা হয়েছে না হয় তারা আত্মগোপন করেছেন। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধি মন্তব্য করতে রাজি হননি। নির্বাচন সংস্কার প্যানেলের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রিভিউয়ের পর তিন মাসের মধ্যে তারা সুপারিশ উপস্থাপন করবেন। তার ভাষায়- আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা করবে কিনা এবং নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ করা সরকারের বিষয়।

গত মাসে সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সকে বলেছেন, দেশে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত শেখ হাসিনা। ছাত্র আন্দোলনকারীদেরও একই দাবি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় বলে জানিয়েছেন জয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে মঙ্গলবার তিনি বলেছেন- এটা তার (শেখ হাসিনা) বিষয়। ঠিক এই মুহূর্তে আমার দলের লোকজনকে নিরাপদ রাখতে চাই। তাই যে নৈরাজ্য চালানো হচ্ছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে চাই। 

mzamin

জয়শঙ্করের দাবি: বাংলাদেশকে ‘নিঃশর্তভাবে সাহায্য’ করেছে ভারত

বাংলাদেশকে ‘নিঃশর্তভাবে সাহায্য’ করে গিয়েছে ভারত, এক অনুষ্ঠানে এমন দাবি করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি মনে করেন, ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক ‘ইতিবাচক এবং গঠনমূলক’ ধারায় অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার এশিয়া সোসাইটি এবং এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘ভারত, এশিয়া এবং বিশ্ব’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ভারতের প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সাথে আমাদের সম্পর্ক ‘ইতিবাচক এবং গঠনমূলক’ ধারায় অব্যাহত থাকবে। এ খবর দিয়েছে দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন। এতে বলা হয়, জয়শঙ্কর বলেছেন- বিষয়টি এমন নয় যে, ভারত প্রতিবেশীর রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের দিকটি শুধু যে ভারতের জন্য কাজ করছে না তেমন নয়, এক্ষেত্রে যেকোনো দেশই দায়ী হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাকে নিঃশর্তভাবে সাহায্য করে গিয়েছে ভারত। তারপরেও সেখানের সরকার পরিবর্তনে দিল্লির জন্য সম্ভাব্য প্রতিকূল বলে মনে হচ্ছে। জয়শঙ্কর বলেছেন, প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব ধারা রয়েছে। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আপনি কেবল এটি বুঝার চেষ্টা করবেন, এরপর অনুমান করে প্রতিক্রিয়া জানাতে চেষ্টা করতে পারেন। সব শেষে আমি আশাবাদী যে, প্রতিবেশীর সাথে আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা বা পারস্পরিক সুবিধার বাস্তবতা প্রতিবেশীদের মধ্যে উভয়েরই স্বার্থ রক্ষা করবে। বাস্তবতাগুলো নিজেরাই প্রকাশ করবে এবং এটাই আমাদের সম্পর্কের ইতিহাস।
জয়শঙ্কর আরও বলেছেন, কয়েক বছর পর পরই আমাদের অঞ্চলে কিছু না কিছু ঘটে। এতে লোকজন পরামর্শ দেয় যে, সেখানে একধরনের অপ্রতিরোধ্য পরিস্থিতি রয়েছে। পরে আপনি সেখানে সংশোধন আনতে নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাই, আমি এই পরিবর্তনকে সেভাবেই নেব এবং আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী যে, এই উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের সম্পর্ক ইতিবাচক এবং গঠনমূলক ধারায় অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সরকার পরিবর্তনের আলোকে এসব মন্তব্য করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশ ইস্যুতে জয়শঙ্কর বলেছেন, আমরা বাংলাদেশের জন্য ভিন্নভাবে কাজ করেছি। গত এক দশকে আমরা সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প করেছি যা আমাদের উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক। সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই অঞ্চলের রসদ উন্নত হয়েছে। এতে উভয় দেশই এর থেকে অনেক কিছু অর্জন করেছে বলে মনে করেন জয়শঙ্কর।
আগস্টে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিয়েছেন। রক্তক্ষয়ী এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশ ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে হাসিনা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে ২১ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মার্কসবাদী নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তিনি চীনপন্থী একজন নেতা। আর এ কারণে ভারত কিছুটা হলেও চিন্তায় পড়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দুই প্রতিবেশী দেশে ভারতপন্থী সরকারের পরাজয়ে দিল্লির কূটনৈতিক মহল কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন বলেও ধারণা তাদের। 

mzamin

ওয়ার্ক পারমিট ভিসার নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিদেশি নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হবে -বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

ওয়ার্ক পারমিট ভিসার নিয়ম ভঙ্গ করেছে এমন প্রতিষ্ঠানের বিদেশ থেকে কর্মচারী নিয়োগ করা নিষিদ্ধ করা হবে বলে নতুন ঘোষণা দিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। মঙ্গলবার লিভারপুলে লেবার পার্টির সম্মেলনে সরকার অভিবাসন এবং বিদেশি শ্রমিকদের উপর বৃটেনের  নির্ভরতা কমিয়ে আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ঘোষণা দেন।

গত দুই বছরে কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষাধিক ওয়ার্কার এনেছে ওয়ার্কপারমিটদাতা কোম্পানিগুলো, আগত ওয়ার্কাররা অধিকাংশই এসে কাজ পাননি এবং পরবর্তীতে এসাইলামের দিকে ঝুঁকেছেন। ওয়ার্কারদের সাথে এমন প্রতারণার অভিযোগও জমা পড়েছে সরকারের কাছে। তাতে দেখা গেছে অধিকাংশ কোম্পানিগুলো ওয়ার্কপারমিটের  নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মূলতঃ লেবার সরকার কোম্পানিগুলোর বিদেশি নিয়োগ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে তরুণ বৃটিশদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশি শ্রমকে ব্যবহার করা রোধ করার জন্য হোম অফিসের ভিসা নীতিগুলি দক্ষতা এবং বাজারের চাহিদার সাথে যুক্ত করা নিশ্চিতকরণের  কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।  
লেবার প্রধানমন্ত্রীর প্রথম পার্টি কনফারেন্সের বক্তৃতায়, নেট মাইগ্রেশন এবং এর উপর দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা উভয়ই হ্রাস করা সরকারের নীতির প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি কখনই ভাবিনি যে লক্ষ লক্ষ তরুণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং উচ্চ মেধাবী, যারা কাজ করতে এবং অবদান রাখতে মরিয়া, সেখানে শ্রম আমদানির কিছু খাত  আমাদের শিথিল হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যসেবা, আইটি এবং আতিথেয়তাসহ বেশ কয়েকটি শিল্পে বৃটিশ সংস্থাগুলি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিদেশি শ্রমের উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু অভিবাসী স্পন্সরশিপ সম্পর্কে নতুন নিয়ম বলবৎ করা হবে, ভিসা আইন লঙ্ঘনের জন্য দোষী নিয়োগকর্তাদের জন্য বিদেশ থেকে নিয়োগ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হবে। সরকার তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান পৃষ্ঠপোষকদের উপর চাপ অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত পরিকল্পনার অধীনে মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজরি কমিটি  করে সেই সেক্টরগুলিকে হাইলাইট করবে যেখানে শ্রমবাজারের ব্যর্থতার কারণে বিদেশি নিয়োগ বেড়েছে এবং একত্রে তদন্তের মাধ্যমে মন্ত্রীদের কার্যক্রমের একটি বার্ষিক মূল্যায়ন প্রদান করবে।
পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত বিদেশি কর্মী ভিসা বিধিগুলি বৃটেনের কর্মশক্তির উপর যে প্রভাব ফেলছে তা ইতিমধ্যেই স্বাধীন সংস্থাটিকে পর্যালোচনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী । এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে নিযুক্ত ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে ডিপেন্ডেন্ট আনা থেকে বিরত রাখা এবং পারমিট পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বেতন বৃদ্ধি করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জন্য  কঠিন সিদ্ধান্ত একটি ''স্বল্পমেয়াদী ব্যথা” তবে তা দেশের জন্য “দীর্ঘমেয়াদী লাভ”। একটি অন্ধকার এই সুড়ঙ্গের শেষে আলো আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ভবিষ্যতের জন্য আরও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চেয়ে বলেছেন, একটি নতুন ব্রিটেন গড়তে এখনই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।

mzamin

চীনের থ্রি গর্জেস বাঁধ কমিয়ে দিলো পৃথিবীর গতি

এশিয়ার দীর্ঘতম এবং বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী চীনের ইয়াংৎজি। এই নদীর উপরেই গড়ে উঠেছে থ্রি গর্জেস বাঁধ। চীনের  ইলিং জেলার সান্ডৌপিং শহরে এই বাঁধ অবস্থিত। পানি ধারণ ক্ষমতার ভিত্তিতে এই বাঁধ পৃথিবীর বৃহত্তম শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম। থ্রি গর্জেস বাঁধ শুধু শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে নজির গড়েনি। পৃথিবীর আহ্নিক গতি পরিবর্তন থেকে শুরু করে পৃথিবীর আকৃতিতেও বদল এনেছে এই বাঁধ।

আইএফএল সায়েন্সের মতে, পৃথিবীর ভর বিতরণ প্রভাবিত হয়েছে এই বাঁধের পানির  কারণে। আর তাই কমে গিয়েছে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি। থ্রি গর্জেস বাঁধের বিপুল জলরাশির চাপে পৃথিবী আগের চেয়ে কিছুটা ন্যুব্জ হয়ে গিয়েছে। নাসার বিজ্ঞানীদের দাবি, এই বাঁধের ফলে পৃথিবীর মাঝের অংশ সামান্য স্ফীত এবং দুই মেরু অঞ্চল চেপে গিয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে পৃথিবীর দুই মেরু অবস্থান অন্তত দুই সেন্টিমিটার বা ০.৮ ইঞ্চি করে সরে গিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত ‘পরিবর্তন’ আমাদের ‘দিন’ এবং ‘বছর’-এর হিসেব গোলমাল করে দিতে পারে। এই সমস্যা মোকাবিলাতেই বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র একটি মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে গুনতে। থ্রি গর্জেস বাঁধের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এই সামান্য পরিবর্তন সাধারণ মানুষর নজরে পড়ে না। থ্রি গর্জেস বাঁধের উচ্চতা প্রায় ৫৯৪ ফুট বা ১৮১ মিটার। দৈর্ঘ্যে এটি ৭,৭৭০ ফুট বা ২,৩৩৫ মিটার। মার্কিন জিওলজিক্যাল সায়েন্স জানিয়েছে, এই বিশাল বাঁধটির যে জলাধার, তার পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল প্রায় ৪০০ বর্গ মাইল বা ১,০৪৫ বর্গ কিলোমিটার।

২০১২ সালে এটি পূর্ণ ক্ষমতায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। তার আগ পর্যন্ত ব্রাজিল এবং প্যারাগুয়ের ইতাইপু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল বিশ্বর সবথেকে বড় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র। কিন্তু, ২০১২-র পর সেই তাজ ছিনিয়ে নেয় চীনের থ্রি গর্জেস বাঁধ। ইটাইপু বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১৪,০০০ মেগাওয়াট। সেখানে থ্রি গর্জেস বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২,৫০০ মেগাওয়াট। ১৭ বছর ধরে ২৬ লাখ ৪২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে  থ্রি গর্জেস বাঁধটি তৈরি করতে। তবে এই বাঁধটি তৈরির আগেই মার্কিন মহাকাশ চর্চা কেন্দ্র, নাসা জানিয়েছিল পৃথিবীতে ভরের বন্টনে এইভাবে পরিবর্তন করলে তা গ্রহের জড়তার ভ্রামককে প্রভাবিত করতে পারে। কোন বস্তুর ঘূর্ণনশীল গতিবিধির পরিবর্তনের জন্য যে বলের প্রয়োজন হয়, তাকেই তার জড়তার ভ্রমাক বলে। নাসার বিজ্ঞানী ডা. বেঞ্জামিন ফং চাও জানিয়েছিলেন, বাঁধটির জলাধারটি মোট ৪০ কিউবিক কিলোমিটার জল ধারণ করতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর ভরের যে স্থানান্তর হবে, তা পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যকে ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বাড়িয়ে দেবে। চাও জানিয়েছিলেন, “মৌসুমী আবহাওয়া থেকে গাড়ি চালানো পর্যন্ত, যে কোনও পার্থিব ঘটনা যা ভর স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িয়ে, তা পৃথিবীর ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করে।”

তাই, বাঁধ তৈরির ফলে এই বিপুল ভরের পরিবর্তন আমাদের গ্রহের সিসমিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দেবে। যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি কমিয়ে দেবে। থ্রি গর্জেস বাঁধের ফলে বর্তমান পৃথিবীতে আরও কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে, বিজ্ঞানীরা সেগুলি নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নন। কিন্তু তাদের মতে, ভবিষ্যতে এর যে প্রভাবগুলো পড়বে, সেগুলিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।

সূত্র : frontpagedetectives

mzamin

রুহুল আমীন গাজীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা

অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় জানানো হয়েছে সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজীকে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে তার প্রতি  শেষ শ্রদ্ধা জানান সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা। তিন দফা জানাজা শেষে তাকে চাঁদপুরে দাফন করা হয়। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের প্রধান প্রতিবেদক রুহুল আমিন গাজী মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার জানাজা প্রেস ক্লাবের টেনিস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়। জানাজায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, তথ্য ও সমপ্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, পিআইবি মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. খুরশীদ আলম, সাংবাদিক নেতা ও কবি আবদুল হাই সিকদার, ডেইলি অবজারভারের সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বাসসের সাবেক এমডি আবুল কালাম আজাদ, বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুক, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি এম আব্দুল্লাহ, বিএফইউজে’র সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ও মোল্লা জালাল, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম, ডিআরইউ’র সাবেক সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বাদশা ও মুরসালিন নোমানী, ডিইউজে’র সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সৈয়দ শুকুর আলী শুভ, সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, রুহুল আমিন গাজী দেশে সাংবাদিকতার অঙ্গনে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বাংলাদেশ গড়তে গাজীর মতো নেতার প্রয়োজন ছিল। সাংবাদিক সমাজকে গাজীর পদাঙ্ক অনুসরণের  আহ্বান জানান তিনি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি’তে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নিজ জেলা চাঁদপুরে তৃতীয় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। রুহুল আমিন গাজী কিডনি ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। বিশিষ্ট এ সাংবাদিক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন, যার ফলে তিনি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। রুহুল আমিন গাজী চাঁদপুর সদর উপজেলার গোবিন্দিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী কফিল উদ্দিন এবং মা আয়েশা খাতুন। তিনি চতুর্থ মেয়াদে বিএফইউজে’র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে প্রবীণ এ সাংবাদিক বিএফইউজে মহাসচিব, ডিইউজে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
mzamin

১৩ বছর ধরে নিখোঁজ সুলতানের ফেরার অপেক্ষায় স্ত্রী

সুলতান হাওলাদার। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০১১ সালের ৮ই ডিসেম্বর ব্যবসার কাজে বের হয়ে আর ফেরেননি। ওইদিন রাতে  রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের প্লেন মসজিদ এলাকায় একটি চায়ের দোকানে এক বন্ধুর সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে তাদের সামনে। ভেতর থেকে ৪-৫ জন ব্যক্তি নেমে আসে। আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা চোখ বেঁধে সুলতানকে ডিবি পরিচয়ে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিন রাতে বাসায় না ফেরায় তার পরিবার ডিবি অফিস, সিআইডি, র‌্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও পাননি তার সন্ধান। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে সুলতানের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন পরিবারটি। তার দুই মেয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

সুলতানের স্ত্রী বিউটি মানবজমিনকে বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ না পেয়ে আনুমানিক ২-৩ দিন পর নিউ মার্কেট থানায় একটি জিডি করি। জিডির কপিটি হারিয়ে ফেলায় গত ১১ সেপ্টেম্বর আরেকটি জিডি করি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী বিএনপি’র একজন সমর্থক ছিলেন। আজ প্রায় ১৩ বছর হলো সে গুম হয়েছে। আমার স্বামী গুম হওয়ার সময়ে আমি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। জন্মের পর আমার ছোট মেয়েটা এখনো তার বাবাকে দেখেনি। তার বয়স এখন ১২ বছর চলে। তার বাবার মুখটি দেখার জন্য সবসময় অপেক্ষায় থাকে। ওদের বাবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। সে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমি অনেক কষ্টে সন্তানদের নিয়ে জীবনযাপন করছি। আওয়ামী লীগ সরকার আমার স্বামীকে গুম করেছে। এতটা বছর আমার স্বামীর গুম হওয়ার কোনো প্রতিকার পাই নাই, শুধু জুলুম ও হয়রানির স্বীকার হয়ে এসেছি।

বিউটি বলেন, দুইটা সন্তান নিয়ে যে কীভাবে সংগ্রাম করছি এটা কাউকে বুঝাতে পারবো না। অনেক কষ্ট করছি, এখনো কষ্ট করে যাচ্ছি। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি আর ছোট মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার পড়াশোনার খরচ চালাতে অনেক কষ্ট। ঠিকমতো খরচ চালাতে পারি না সেজন্য মাদ্রাসায় নিয়ে ভর্তি করেছি। তার একটা ভবিষ্যত আছে। কিছু কাজ করে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে আছি। অপেক্ষায় আছি সে ফিরে আসবে। এখানো মনে হয় এই বুঝি সে ফিরে এলো। আমি এখানো আশাকরি আমার স্বামী ফিরে আসবে আমার সন্তানদের বুকে। এই শহরে সংগ্রাম করে থাকাটা অনেক কষ্টের। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর সেখানে খুব বেশি জায়গাজমি নেই। বর্তমানে লালবাগের নবাবগঞ্জ ভাড়া বাসায় থাকি। শুধু অপেক্ষাই করে যাচ্ছি, কিন্তু আমার স্বামীর খোঁজ মিলছে না। কোথায় গেলে তার খোঁজ পাবো, কে দিবে আমার স্বামীর সন্ধান।

নিখোঁজ সুলতানের বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার সুজনা বলেন, বাবা ছাড়া জীবনটাই এলোমেলো হয়ে যায়। বাবা আমাদের ছায়া ছিলেন। এতটা বছর আমরা কীভাবে চলেছি তা শুধু আমরাই বুঝতে পারছি। বাবার মতো আপন কেউ হয় না। বাবাকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। এখনো আশায় আছি যে বাবাকে পাবো, বাবা ফিরে আসবে। ছোট বোন বাবাকে সবসময় দেখতে চায়। বাবার সঙ্গে আমার অল্পস্বল্প স্মৃতি থাকলেও আমার বোন তো কখনো বাবাকে দেখেনি। নিউমার্কেট থানা, ডিবি অফিস, র‌্যাব অফিসে গিয়েছি তারা সবাই তখন বলতো এই নামে কেউ নেই আমাদের কাছে। বাবা ছাড়া সন্তানদের জীবন কাটানো অনেক কষ্টের। আজও বাবার কোনো সন্ধান পাইনি আমরা। কোথায় গেলে পাবো আমাদের বাবাকে?

বছরের শুরুতে পাঠ্য বই দেয়া নিয়ে শঙ্কা by পিয়াস সরকার

নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বিনামূল্যে বই তুলে দেয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বই প্রস্তুতের জন্য হাতে রয়েছে তিন মাস। কিন্তু এখনো শুরু হয়নি দৃশ্যমান কোনো কাজ। শেষ হয়নি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের কাজ। সিদ্ধান্তের আলোকে পরিমার্জন শেষে কাজ হবে নতুন কারিকুলামের ধরন নিয়ে। আবার বই ছাপানোর প্রাথমিক কাজ বাস্তবায়ন করতে পারছে না দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। গেল কয়েক বছর ধরে ভারত থেকে পাঠ্য বইয়ের একটি বড় অংশ ছাপা হয়। এবার ভারতে বই ছাপার কাজ দেয়া হচ্ছে না।

এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, আগামী বছরে চতুর্থ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে আসছে পরিবর্তন। বিশেষ করে ইতিহাসনির্ভর তথ্য-উপাত্তে। পরিমার্জন বা বাতিল হতে পারে কিছু অধ্যায়। এর জন্য প্রায় অর্ধশতাধিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কাজ করছে সরকার। পুরনো সিলেবাসে বই পরিমার্জনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় বাড়ছে বইয়ের সংখ্যা ও পৃষ্ঠা। ফলে পুরনো দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। আর প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে সামান্য কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আসবে। যা পুরনো দরপত্রের মাধ্যমেই ছাপানো হবে। তবে এই তিন শ্রেণির বইও এখনো পরিমার্জনের কাজ শেষ হয়নি।

পুরনো সিলেবাসে পরিমার্জনের মাধ্যমে বই দেয়ার পর কারিকুলাম বাস্তবায়নে হাত দেবে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাপিয়ে দেয়া কারিকুলাম পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারা বলছে- এই কারিকুলাম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার পুরোপুরি পুরনো কারিকুলামেও ফিরে যাচ্ছে না। দুটি কারিকুলাম থেকে সমন্বয় করে হবে নতুন করে সিলেবাস। তবে এক্ষেত্রে ২০১২ সালের কারিকুলামই মোটাদাগে থাকছে।

এদিকে ২০০৯ সাল থেকে ভারতে বই ছাপানো হতো। সম্প্রতি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি ওই টেন্ডার বাতিল ও নতুন করে টেন্ডার করার সিদ্ধান্ত দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক যথাসময়ে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের (১ম, ২য় ও ৩য় শ্রেণির) ২০টি প্যাকেজে ৯৮টি লটে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে ২৫২টি দরপত্র জমা পড়ে। এরমধ্যে ২০৯টি দরপত্র রেসপনসিভ হয়। ৯৮টি লটের বিপরীতে ৮৮টি লটে সুপারিশ করা রেসপনসিভ সর্বনিম্ন দরদাতা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ৪ কোটি ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৪৬টি বই সরবরাহ করার সুপারিশ করা হয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ১৪৭ কোটি ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩৭ টাকা। প্রতিটি বই মুদ্রণ, কাগজসহ বাঁধাই ও সরবরাহ বাবদ খরচ ধরা হয় ৩৬ টাকা ৭৬ পয়সা। এই ৮৮টি লটের মধ্যে ৭০টি লটের সর্বনিম্ন দরদাতা ৭০টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এবং অবশিষ্ট ১৮টি লটের মধ্যে ২টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা। বাকি ১০টি লটের জন্য রেসপনসিভ দরদাতা নেই। এ কারণে এই ১০টি লটের পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে। এ ছাড়া ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যে দুটি লটের বই নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সে দুটি লটেও নতুন করে দরপত্র নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ভারতে গত বছর বই ছাপিয়েছিল প্রিতম্বর বুকস প্রাইভেট লিমিটেড ও পাইওনিয়ার প্রিন্টার্স। এই প্রিন্টার্সকে কাজ দিতে লিয়াজোঁ করেছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও তার বলয়ের লোকজন। লিয়াজোঁ রক্ষা করতেন দীপু মনির ভাই ওয়াদুদ টিপু ও চাঁদপুর পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার। এজন্য উৎকোচ নেয়ারও অভিযোগ আছে।

ছাপানোর দায়িত্বে এনসিটিবি থাকলেও ডা. দীপু মনি নিজে পড়ে দেখার জন্য নিতেন পাণ্ডুলিপি এবং দীর্ঘদিন নিজের কাছে আটকে রাখতেন। এর জন্য বরাবরই বই ছাপাতে দেরি হতো। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপানো হতো। অজানা এক কারণে একই চক্র পেতো বই ছাপানোর কাজ। কাজগুলো বাগিয়ে নিতো সেগুলো একই মালিকের প্রতিষ্ঠান। দুটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক কাজ দেয়া, নির্ধারিত সময়ে বই না দেয়ার পরও জরিমানা হতো না। সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কাজ দেয়া হতো অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস এবং কচুয়া প্রেসকে। যারা ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বই ছাপানোর কাজ বাগিয়ে নেয়। এমনকি এই দুটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই সরবরাহ করে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৪ থেকে ৫ মাস দেরিতে বই দেয়ার পরও এনসিটিবি সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের বই ডিসেম্বরে ডেলিভারি দেখানো হয়েছে। পুরো জালিয়াতির সঙ্গে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান-উৎপাদন নিয়ন্ত্রক জড়িত ছিল। এমনকি সেই সময়ে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অভিযোগ জানালেও নেয়া হয়নি ব্যবস্থা। আবার বিনামূল্যে বই ছাপার কাগজ কেনায় বড় ধরনের দুর্নীতি করেছে এনসিটিবির একটি চক্র। ২০২১ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোর কাজে ব্যবহৃত কাগজ বাজারদরের চেয়ে গড়ে টনপ্রতি ২০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কেনা হয়েছে। বাড়তি দামে কেনা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ আর্টকার্ডও। ফলে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। নতুন বছরের প্রাথমিকের বইয়ের সিদ্ধান্ত হলেও এখনো মাধ্যমিকের সিদ্ধান্ত আসেনি। যার কারণে যথাসময়ে বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিমার্জনের দায়িত্বে থাকা লেখক রাখাল রাহা বলেন, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন কাজে যুক্ত আছি। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক দল করা হয়েছে। একইসঙ্গে কারেকশনগুলো কম্পিউটারে আপডেট করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে প্রাথমিক কাজ শেষ হবে। এরপর প্রস্তুত হলে সেটি শুধু রিচেক করার কাজ বাকি থাকবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি’র সদ্য দায়িত্ব পাওয়া চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, ২০১২ সালের কারিকুলামের আলোকে বই পরিমার্জন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া এ মাসেই সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। ২০১২ সালের কারিকুলামের আলোকে যে বইগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের আলোকে পরিমার্জনের কাজ চলছে। সবমিলিয়ে অনেক বই, সেগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। আশাকরি এ মাসের মধ্যে এসব কাজ শেষ হবে। এরইমধ্যে টেন্ডার হয়ে যাবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, এ মাসের মধ্যে শেষ করা। সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গত বুধবার আগামী ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখেই পাঠ্যপুস্তক প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ক্রয় কমিটির সভার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিকের বই ছাপানোর ব্যাপারে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যথা সময় যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা বই পায় সেটা নিশ্চিত করা হবে। বইয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বইয়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি বলেও জানান অর্থ উপদেষ্টা।

বিচার বিভাগের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির জিরো টলারেন্স নীতি by রাশিম মোল্লা

বিচারপ্রার্থীর শেষ আশ্রয়স্থল আদালত। প্রতিদিন বিচারপ্রার্থীসহ দেশের অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় বিচারপ্রার্থীদের। গত ১৫ বছরে বিচারিক আদালত ও উচ্চ আদালতে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।  আদালতের এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গত ২১শে সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতির অভিভাষণ অনুষ্ঠানে সারা দেশের বিচারকরা যোগ দেন। অভিভাষণে প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগে যেকোনো প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স  ঘোষণা করেছেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ও মুখপাত্র মোয়াজ্জেম হোছাইন মানবজমিনকে বলেন, বিচারপ্রার্থী জনগণের সেবা সহজীকরণ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি ১২ দফা নির্দেশনা ও হেল্পলাইন চালু করেছেন। উভয় বিভাগের রেজিস্ট্রার বরাবর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের কাছে সময়ে সময়ে মাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

১২ দফা নির্দেশনা
বিচারপ্রার্থী জনগণের সেবা সহজীকরণ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি ১২ দফা নির্দেশনা দেন। দায়িত্ব পালনে কোড অব কন্ডাক্ট যথাযথভাবে পালন; দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে বর্জন; সেবা গ্রহীতাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা; সেবা প্রদানের সময় কোনো বিলম্ব সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য করতে হবে; সেবা গ্রহীতাদের কোনো প্রকার হয়রানি না করা, সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণকে সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ; প্রতিটি শাখায় প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন সম্পন্ন করা এবং কোনো কাজ পেন্ডিং না রাখা; প্রত্যেক শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রারগণকে তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখাসমূহে প্রতিদিন সরজমিন মনিটর; প্রত্যেক শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রারগণ তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখার কার্যক্রম সম্পর্কে স্ব স্ব অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারগণকে নিয়মিত অবহিত করা; প্রতি চার  সপ্তাহ পর পর অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারগণ মনিটরিং কার্যক্রমের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারের কাছে রিপোর্ট করার বিধান চালু করেছেন। যদি কোনো কর্মকর্তা/কর্মচারী আচরণবিধি নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো সেবা গ্রহীতাকে হয়রানি করেন বা আর্থিক লেনদেন করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ছাড়া এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে ৮টি বিষয় অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। (ক) প্রধান বিচারপতির দেয়া ১২ (বার) দফা নির্দেশনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে সচেষ্ট  থাকা; বিচারপ্রার্থী জনগণের সেবা পাওয়ার অধিকার বিষয়ে সচেতন; সেবার বিনিময়ে কোনো লেনদেন বা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ হতে বিরত থাকবেন, প্রত্যেক শাখার সম্মুখে প্রকাশ্য স্থানে সেবা গ্রহীতাদের অধিকার সংক্রান্ত সিটিজেন চার্টার প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সহকারী রেজিস্ট্রারগণ গ্রহণ করবেন। প্রত্যেক শাখার সম্মুখ স্থানে অভিযোগ/পরামর্শ বক্স স্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সহকারী রেজিস্ট্রারগণ তার অধীন প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামফলক/অফিস পরিচয়পত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) স্থাপন ও প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন; যাতে সেবাগ্রহীতাগণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শনাক্ত করতে পারেন।  প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের নির্দেশনাসমূহ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্তে প্রতিদিনের অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং মাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন উভয় বিভাগের রেজিস্ট্রার বরাবর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের কাছে সময়ে সময়ে দাখিল করতে হবে।

হেল্পলাইন চালু
সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপ্রার্থী বা সেবাগ্রহীতা সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো শাখায় সেবা গ্রহণে কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে বা সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অসুবিধার মুখোমুখি হলে সেবাগ্রহীতাকে সহায়তা করার জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। বুধবার বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে এ হেল্পলাইন চালু করা হয়। +৮৮ ০১৩১৬১৫৪২১৬- এই নম্বরে যোগাযোগ করে পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির একজন কর্মকর্তা হেল্পলাইন পরিচালনা করবেন এবং সেবাগ্রহীতাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান করবেন। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতি রোববার হতে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ৪টা পর্যন্ত হেল্পলাইন সার্ভিস চালু থাকবে।
অভিভাষণে প্রধান বিচারপতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে একজন বিচারকের দুর্নীতি সমগ্র বিচার বিভাগের উপরেই কালিমা লেপন করে। এমনকি আদালতের একজন সহায়ক কর্মচারী কিংবা আইনজীবী সহকারীও যদি দুর্নীতি করেন, সাধারণ জনগণ সাদা চোখে সেটিকে বিচার বিভাগের অবক্ষয় হিসেবেই গণ্য করে। তাই বিচারাঙ্গন হতে যেকোনো প্রকার দুর্নীতি বিলোপ করতে হবে। যদি দুর্নীতি প্রতিরোধে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধান, তথা জেলা জজ, কিংবা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক ব্যর্থ হন তবে সেটিকে তার পেশাগত অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের উচ্চ আদালত সম্পর্কেও বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক সময়েই সুপ্রিম কোর্টের এফিডেভিট শাখা, ডেসপাস শাখা, নকল শাখার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নেতিবাচক খবর আমার কানে আসে। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করতে চাই, এ ধরনের কোনো অনিয়ম আর বরদাস্ত করা হবে না।


শুধু সাকিব নয় পুরো দলকে নিয়েই হতাশ হাথুরুসিংহে

পাকিস্তানে ঐতিহাসিক সিরিজ জিতে ভারতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম টেস্টে ২৮০ রানে হারে বড় ধাক্কাই খেয়েছে টাইগাররা। এর সঙ্গে সাকিবকে নিয়ে রয়েছে নেতিবাচক আলোচনা। এমনিতেই অনেকদিন ধরে ছন্দে নেই, তার ওপর প্রথম টেস্টে চোট নিয়ে খেলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের হেড কোচ কোচ চান্ডিকা হাথুরুসিংহে অবশ্য শুধু সাকিব নয় পুরো দলের পারফর্মেন্স নিয়েই হতাশ।

আগামীকাল কানপুরের গ্রিনপার্ক স্টেডিয়ামে সিরিজ বাঁচানোর লড়াইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এর আগে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে শুরুতে সাকিবকে নিয়েই একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হলো তাকে। প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন সকালে জানা যায় আঙ্গুুলে অস্বস্তির কারণে পর্যাপ্ত বোলিং করতে পারছেন না সাকিব আল হাসান। এ সময় প্রশ্ন ওঠে টিম ম্যানেজমেন্ট এটা জেনেও তাকে খেলাচ্ছে কিনা। এরপর গত দুইদিনে পরের টেস্টে সাকিবকে পাওয়া নিয়েও তৈরি হয় শঙ্কা। এ বিষয়ে হাথুরু বলেন, ‘সাকিবের চোট সংক্রান্ত কোনো কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে আমি শুনিনি। তাকে নিয়ে আপাতত কোনো সংশয় নেই (দ্বিতীয় টেস্টের জন্য)। আমি ফিজিও বা কারও কাছ থেকে তার ইঞ্জুরি সংক্রান্ত কিছু শুনিনি। সে সিলেকশনের জন্য বিবেচনায় আছে।’ তবে সাকিবের পারফর্মেন্সও অনেকদিন ধরেই সন্তোষজনক নয়। প্রথম টেস্ট হারের পর সংবাদ সম্মেলনে সাকিবকে বাদ দেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরও দিতে হয়েছে টাইগার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে। হাথুরু অবশ্য শুধু সাকিব নয় প্রথম টেস্টে পুরো দলকে নিয়েই হতাশ। তিনি বলেন, ‘তার (সাকিব) পারফরম্যান্সে নয়, সবার পারফরম্যান্সেই হতাশ। আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। আমি নিশ্চিত সে নিজেও ভাবে, সে আরও ভালো করতে পারে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাট করেছে, বড় করতে পারিনি ইনিংস। এমন নয় যে চেষ্টা করেনি। প্রতিপক্ষের বোলিংয়ের মান অনেক ভালো ছিল।’ ৫১৫ রান তাড়ায় চেন্নাইয়ে দারুণ শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার জাকির হাসান ও সাদমান ইসলাম। কিন্তু ত্রিশোর্ধ ইনিংস খেলেই উইকেট বিলিয়ে দেন তারা। ব্যাটাররের সেট হয়েও উইকেট বিলিয়ে দেয়া নিয়ে চিন্তিত এই লঙ্কান কোচ বলেন, ‘ভালো শুরুর পর ওরা আউট হয়ে যাচ্ছে এটা নিয়ে আমরা একটু চিন্তিত। তারা ভালো করতে মুখিয়ে আছে। গত ম্যাচে আমাদের মেধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারিনি। ভালো শুরু পেলে ইনিংস বড় করতে হবে। এটাই দুশ্চিন্তার বিষয়। ক্রিকেটে কেউ ৩০ বল খেলে ফেললে উইকেটে থিতু হওয়া জরুরি। কীভাবে প্রতিরোধ গড়তে হবে ভারতের এই দল তা ভালো করেই জানে। তাই আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে ভালো ব্যাট করে যেতে হবে।
এই দলে বাংলাদেশের প্রথম ৪ জনই বাঁহাতি ব্যাটার। সবমিলিয়ে ১১ জনের ৬ জনই বাঁহাতি। যদিও এটা নিয়ে মাথাব্যথা নেই হাথুরুর, ‘আমাদের মনে হয় এটাই আমাদের সেরা কম্বিনেশন, হোক ডানহাতি বা বাঁহাতি। একাদশে পরিবর্তন নির্ভর করছে কাল উইকেট দেখার ওপর।’
নতুন বল সামলাতে ব্যাটারদের বেশিই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে এ নিয়ে ওপেনাররাই বেশি ভাবছেন বলে জানান হাথুরু। তিনি বলেন, ‘ওপেনাররা আমাদের চেয়েও বেশি ভাবছে এটা নিয়ে। তারা ভালো শেপে আছে। আশা করছি এবার আরও ভালো করবে। প্রত্যেক ব্যাটারই এসব নিয়ে কাজ করছে।’
ঘরের মাঠে ভারত ৩ পেসার খেলানোয় মোটেও অবাক হননি হাথুরু। তিনি বলেন,
‘আমি অবাক হইনি, কারণ জানি তারা কেন এমন করছে। আমরাও আমাদের দেশে খেলা হলে প্রতিপক্ষ অনুযায়ী স্পিন কন্ডিশন সাজাই। প্রতিপক্ষের শক্তি, নিজেদের শক্তি, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা এসবের ওপর নির্ভর করে উইকেট তৈরি করা হয়। উপমহাদেশ বলে শুধু স্পিন নয়, চাইলে পেস নির্ভর উইকেটও তৈরি করা যায়।’
মাঠে নামার আগে ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণা দেয়ার বিষয়ে এই লঙ্কান কোচের ভাষ্য,
‘সবচেয়ে বড় মোটিভেশন আসে- তুমি তোমার দেশের হয়ে খেলছে। সবাই দেশের হয়ে খেলতে পারে না। সবাই চায় তুমি ভালো করো। সেটা কীভাবে করা যায়, সামর্থ্য অনুযায়ী খেলা যায়, গত ম্যাচ থেকে শিক্ষা নেয়া যায় এসব নিয়েই আমরা ভাবছি।’

mzamin