Thursday, October 16, 2025

হামাস মৃত সব জিম্মির মৃতদেহ ফেরত না দিলে ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করবে

হামাসের হাতে জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের সবার মৃতদেহ ফেরত চেয়েছে ইসরাইল। যদি সব মৃতদেহ ফেরত দেয়া না হয়, তাহলে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে হামাসকে পরাজিত করতে ‘ব্যাপক পরিকল্পনার’ জন্য প্রস্তুত থাকতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ। তিনি বলেছেন, হামাস যদি চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ের মাধ্যমে ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করবে। তার মধ্য দিয়ে হামাসকে পরাজিত করবে। গাজার বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা হবে। যুদ্ধের সব লক্ষ্য পূরণ করা হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টিআরটি, জিও নিউজ ও আল জাজিরা।

ওদিকে হামাস আরও দুই ইসরাইলি জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে বাকিদের মৃতদেহ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তা সনাক্ত করতে এবং উদ্ধার করতে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন তাদের। তবে ইসরাইলের এক কথা, যদি ২৮ জিম্মির সবার মৃতদেহ ফেরত না দেয় হামাস, তাহলে গাজায় শান্তি পরিকল্পনা পরবর্তী দফায় যাবে না।

ওদিকে ইসরাইলের হাতে আটক ফিলিস্তিনি মারওয়ান বারগোতিকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বৃটিশ এমপি ইলি চৌন। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ফিলিস্তিনিদের একীভূত করার শক্তিশালী এক কণ্ঠ মারওয়ান বারগুতি। তিনি এ অঞ্চলে অর্থপূর্ণ ও টেকসই শান্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। মারওয়ান বারগুতিকে বিনা বিচারে ২০০২ সাল থেকে ইসরাইলে বন্দি রাখা হয়েছে। অবিলম্বে তার মুক্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে গাজার কিছু এলাকায় আবার ইসরাইলি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে জাতিসংঘের একটি এজেন্সি অভিযোগ করেছে, গাজার ওইসব এলাকায় অব্যাহতভাবে ইসরাইলি বাহিনী বেসামরিক মানুষদের হত্যা করছে। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলা থেকে জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন ইসরাইলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির।

ওদিকে সাংবাদিকদেরকে ইসরাইলের অবৈধ অপহরণ, আটক রাখা ও অশোভন আচরণের নিন্দা জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিওকে চিঠি লিখেছে ডিফেন্ডিং রাইটস অ্যান্ড ডিসেন্ট-এর নেতৃত্বে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক একটি গ্রুপ। এ মাসের শুরুর দিকে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা নিয়ে রিপোর্ট করতে গেলে মার্কিন তিন সাংবাদিক  ড্রপ সাইট নিউজের অ্যালেক্স কোলস্টোন, নোয়া আভিশাগ শনাল এবং জিউস কারেন্টের সাংবাদিক এমিলি ওয়াইল্ডারকে আটক করে ইসরাইল।

চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন সাংবাদিকদের জন্য সুপারিশ করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তবে এখনও যুক্তরাষ্ট্র এসব বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোনো নিন্দা জানায়নি। ওদিকে গাজা চুক্তির পর ইসরাইলের ওপর থেকে আংশিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জার্মানি প্রত্যাশা করে বলে আশা করছে ইসরাইল।  ইসরাইলের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হ্যাসকেল বলেন, তার দেশ আশা করে ইসরাইলের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে জার্মানি। একই সঙ্গে ভ্রমণ সতর্কতাও প্রত্যাহার করবে।  

হামাসের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগকে হালকাভাবে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে এমন অভিযোগকে হালকাভাবে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখ্য, মৃত সব জিম্মির দেহ ফেরত দিচ্ছে না হামাস। তারা বলছে, অনেকের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। তা সনাক্ত করতে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি লাগবে। কিন্তু ইসরাইল এটাকে কৌশল হিসেবে দেখছে। ফলে তারা গাজায় আবার যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিয়েছে। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র হামাসের বিরুদ্ধে আনীত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগকে হালকাভাবে নিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এ পর্যন্ত ২৮ জন মৃত জিম্মির মধ্যে মাত্র ৯ জনের দেহ ফেরত দিয়েছে হামাস। ওদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বৃহস্পতিবার সকালে জানিয়েছে, বুধবার ফেরানো দুইটি দেহই শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, ইনবার হাইম্যান এবং সার্জেন্ট মেজর মুহাম্মদ আল-আত্রেশ।

মৃতদেহ ফেরানোর বিতর্কের কারণে ইসরায়েল গাজায় প্রতিশ্রুত সহায়তা সরবরাহ সীমিত করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দুইজন সিনিয়র উপদেষ্টা বলেছেন, গাজা ধ্বংসস্তরকে নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরিকল্পনা চলমান। ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়নের আপডেটে, উপদেষ্টা দু’জন জানিয়েছেন- মার্কিন সরকার এখনও বিশ্বাস করছে না যে হামাস আরও দেহ উদ্ধার না করায় চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

তারা যুক্তি দিয়েছেন যে, হামাস জীবিত সমস্ত জিম্মিকে ফেরানোর মাধ্যমে সৎ মনোভাব দেখিয়েছে। বাকি মৃতদেহ উদ্ধারে বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর সঙ্গে কাজ করছে। হামাসের সশস্ত্র শাখা একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা চুক্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং তারা যেসব জিম্মির দেহ পেয়েছে সেগুলো ফেরত দিয়েছে।

একজন সিনিয়র মার্কিন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, গাজায় ধ্বংসের মাত্রার কারণে সমস্ত দেহ উদ্ধার হতে সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, তথ্য দেওয়ার জন্য গাজার নাগরিকদের পুরস্কার দেয়া হতে পারে এবং তুর্কি বিশেষজ্ঞরাও অনুসন্ধানে যোগ দেবেন। আইডিএফ বিবৃতিতে বলেছে, হামাসকে চুক্তির অংশ পূরণ করতে হবে এবং সমস্ত জিম্মিকে তাদের পরিবারে ফেরাতে এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জিম্মি পরিবারের ফোরাম বিবৃতিতে বলেছে, জিম্মি ও মুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবাররা ইনবার হাইম্যান এবং মুহাম্মদ আল-আত্রেশের পরিবারকে গ্রহণ করছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/184967_hms.webp

চীনকে মোকাবিলায় এশিয়ার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে জোট করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরল খনিজ সম্পদ। বর্তমান বিশ্বের শক্তিধর এ দুই দেশই অতি মূল্যবান ওই বস্তুটির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো বলছে, বিরল খনিজ ইস্যুতে চীনকে মোকাবিলায় নতুন জোট গঠন করবে যুক্তরাষ্ট্র। যেখানে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ থাকবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, জোটে ভারতকে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি এশিয়ার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। তাতে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা বেসেন্ট তা স্পষ্ট করেননি। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কথা উল্লেখ করেছেন।

আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলছে, বিরল খনিজ নিয়ে চীন যে নীতি ও কৌশলে এগোচ্ছে তাতে বেশ ক্ষুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসন। তাই বেইজিংয়ের মোকাবিলায় নয়াদিল্লিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বেসেন্ট জানিয়েছেন ইতিমধ্যেই এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট। শিঘ্রই চীনকে জবাব দিতে চাইছেন তিনি। রাশিয়ার কাছ থেকে খনিজ তেল কেনার জন্য চিনের বিরুদ্ধে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতেও ওয়াশিংটন প্রস্তুত বলে জানান বেসেন্ট।

বিরল খনিজের দুনিয়ায় চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ চিন থেকে এই পণ্য কিনে থাকে। সম্প্রতি বেইজিং দেশে দেশে একটি নির্দেশিকা পাঠিয়ে জানিয়েছে, তারা বিরল খনিজে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি কার্যকর করতে চলেছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এই খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। চীনের সব পণ্যে ১০০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করে দেন। ১ নভেম্বর থেকে ট্রাম্পের সেই ঘোষণা কার্যকর হলে চিনা পণ্য মার্কিন বাজারে পাঠাতে মোট ১৩০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বুধবার একটি সাক্ষাৎকারে এ প্রসঙ্গে বেসেন্ট বলেন, আমরা ইউরোপে আমাদের বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলব। অস্ট্রেলিয়া, কানা়ডা, ভারত এবং এশিয়ার অন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আলোচনা করব। আমরা এর একটা সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ জবাব দিতে চাই। কারণ চীনের লোকজন সারা বিশ্বের বাণিজ্য, উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

সারা বিশ্বের ৭০ শতাংশ বিরল খনিজের অধিকারী চীন। যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের বাজারেও এই বিরল খনিজের চাহিদা প্রচুর। চীনের অভিযোগ, তাদের পণ্য বিভিন্ন দেশ সামরিক খাতে কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্ব শান্তির কথা ভেবে তাই তারা বিরল খনিজের রপ্তানিতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশে দেশে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছে, সামরিক খাতে ব্যবহার না করলে বিরল খনিজ বিক্রি করা হবে। নচেত নয়।

বেসেন্টের মতে, এই বিষয়ে ভারত ও অন্যান্য ‘মিত্র’ দেশগুলোর সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে আমেরিকা। তার কথায়, এটা চীন বনাম বিশ্ব। আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। চলতি সপ্তাহে তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে আলোচনাও করব। ইউরোপীয়, ভারতীয় এবং এশীয়দের থেকে আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা পাব বলে মনে করছি।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার কাছ থেকে খনিজ তেল কেনার কারণে ভারতের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আবহে চীনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কথায় বিরল খনিজ নিয়ে ভারত আদৌ চীনের বিরুদ্ধে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

mzamin

গাজা যুদ্ধে কে ‘জয়ী’ হলো, কে ‘বিজয়ী’ হলো? by আবদুর রহমান আল-শাম্মারি

যুদ্ধ শেষ হয়েছে—অন্তত গাজাবাসীর তা-ই ধারণা। বিমানের চক্কর থেমেছে। কামানের গর্জন স্তব্ধ। রাত নামলেও গাজা ঘুমায়নি। যেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ উঠে আসছে। যেন মৃতদেহ হঠাৎ পুনর্জীবন পেয়েছে।

তারা ফিরে এল। তারা প্রথমেই বুকে করে নিয়ে এল নিজের মাতৃভূমিকে; তারপর নিজের সামান্য বেঁচে যাওয়া টুকটাক জিনিসপত্র।

বিশ্ব এমন দৃশ্য আগে দেখেনি। পুরুষেরা ঘরবাড়ির দোরগোড়ায় ধুলো ঝাড়ছে। নারীরা সাগরের পানি দিয়ে ভাঙা পাথর ধুচ্ছে। শিশুরা ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে দৌড়াচ্ছে। কেউ হারানো বল খুঁজছে। কেউ খুঁজছে আগুন থেকে বেচে যাওয়া কোনো অদগ্ধ বই।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন মৃত্যু বদলে গেল জীবনে। ধ্বংস বদলে গেল সৃষ্টিতে। নিস্তব্ধতা বদলে গেল মানুষের কর্মমুখরতায়।

মানবতার এমন পুনর্জন্ম পৃথিবী কমই দেখেছে। মনে হলো, গাজা যেন কবর থেকে উঠে ঘোষণা দিচ্ছে—‘আমি বেঁচে উঠেছি আবারও!’

ষাট হাজারেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছে। দেড় লাখের বেশি লোক জখম হয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তবু যারা বেঁচে গেছে, তারা কারও সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করেনি। কারও করুণার আশায় বসে থাকেনি।

যাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও উদাসীনতা তাদের একা ফেলে দিয়েছে, তাদের কাছে কোনো কৈফিয়তও তারা চায়নি। তারা ফিরে এসেছে নিজেদের ধ্বংসস্তূপে। হাতে হাত লাগিয়ে গড়ে তুলছে নিজের জীবন।

যেন পাথরগুলোও তাদের হাত ছুঁয়ে বলছে—‘তুমি-ই সত্যিকারের পাথর, তোমার স্থিরতাই আমার শক্তি।’

ভাঙাচোরা ঘরের মাঝে তারা রুয়ে দিচ্ছে আশার বীজ। তাদের এই জীবনের দিকে ফিরে চলা পৃথিবীকে আবারও চমকে দিয়েছে। বাকি বিশ্ব যাকে ‘ফিরে আসা’ বলছে, গাজার মানুষ সেটাকেই বলছে ‘বিজয়’। সেটি তাদের কাছে চুরি যাওয়া অধিকার ফেরত পাওয়ার ঘোষণা।

আরবি এক আশ্চর্য নিখুঁত ভাষা। আরবিতে ‘ফাওজ’ (فوز) এবং ‘নাসর’ (نصر) দুটি শব্দের মানে প্রায় এক। কিন্তু তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ‘ফাওজ’ মানে ‘জয়’ বা ‘ভিক্টরি’। আর ‘নাসর’ মানে ‘বিজয়’ বা ‘ট্রিয়াম্ফ’।

‘ফাওয” মানে এমন এক ধরনের জয়, যেখানে তুমি আগুনের ভেতর থেকেও আত্মাকে অক্ষত রেখে বেরিয়ে আসো। অর্থাৎ, হয়তো তুমি সব হারিয়েছ—ঘরবাড়ি, প্রিয়জন, সম্পদ; কিন্তু তুমি নিজের সম্মান, বিশ্বাস আর মনুষ্যত্বকে হারাওনি। এটা আত্মিক বা নৈতিক বিজয়।

গাজাবাসীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে ফিরেছে, মাথা নত করেনি, আশা হারায়নি। এটাই তাদের ‘ফাওয’।

‘নাসর’ মানে হলো বাহ্যিক বিজয়, শত্রুকে পরাস্ত করা, নিজের ইচ্ছা ও শক্তি দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়া। এটা হলো যুদ্ধক্ষেত্রের জয়—যেখানে তুমি শত্রুকে দমন করো, তাদের ইচ্ছার বিপরীতে নিজের শর্ত চাপিয়ে দাও।

‘ফাওজ’ আত্মাকে বাঁচায় আর ‘নাসর’ শত্রুকে হারায়। দুটি শব্দই গাজার ক্ষেত্রে খাটে। গাজা ‘ফাওজ’ বা জয় পেয়েছে, কারণ ধ্বংসের পরও গাজা উঠে দাঁড়িয়েছে, হাল ছাড়েনি, মর্যাদা হারায়নি।

গাজা ‘বিজয়ী’ (‘নাসর’ অর্থে) হয়েছে, কারণ তারা শত্রুর ইচ্ছাকে পরাজিত করেছে। ইসরায়েল চেয়েছিল তারা ভেঙে পড়ুক, কিন্তু তারা আরও দৃঢ় হয়েছে।

গাজার ছিল না কোনো যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, অস্ত্র, বা কোনো শক্তিধর জোট। ছিল কেবল এই বিশ্বাস—‘যত দিন হৃদয় ধুকধুক করে, তত দিন ভূমি মরে না।’

মাটির বুক থেকে তারা জন্ম নিয়েছে। তারাই সেই মাটি, সেই ধ্বংসস্তূপ, সেই ভগ্নাবশেষ। তারা ফিরে এসেছে উত্তাল ঢেউয়ের মতো, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, আগামী দিনের দিকে।

গাজা না ধৈর্যের চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র তুলেছে; না উড়িয়েছে আশার চেয়ে উঁচু কোনো পতাকা। আল্লাহ বলেছেন: ‘কত ক্ষুদ্র এক দল আল্লাহর অনুমতিতে জয়ী হয়েছে বৃহৎ বাহিনীর ওপর। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৪৯)

আসলে তাদের বিজয় এসেছে আল্লাহর কাছ থেকে। মানুষের অস্ত্র থেকে নয়।
শত্রুরা যেটিকে অর্জন ভেবেছে, বাস্তবে তারা তার চেয়েও বেশি হারিয়েছে। তারা হারিয়েছে নিজেদের মুখোশ, নিজেদের মর্যাদা, নিজেদের বয়ান।

আর গাজার পতাকা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে; স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে তারা উদ্দাম নাচ নেচে যাচ্ছে।

আজ পৃথিবীর প্রতিটি মুক্ত আত্মা গাজা থেকে এসেছে। সেখানে চামড়ার রং, ধর্ম, ভাষা, জাত—কিছুই বাধা নয়। গাজার এখন নতুন এক ‘পাসপোর্ট’ আছে যা কোনো সরকার দেয়নি। সেই পাসপোর্টের নাম ‘বিজয়’। এটি বহন করে প্রত্যেক মুক্ত, মর্যাদাবান মানুষ যার জন্য লাগে না কোনো ভিসা, কোনো অনুমতি।

গাজার নাম এখন ধ্বনিত হচ্ছে বিশ্বের বড় বড় শহরে, স্টেডিয়ামে, সম্মেলনে, সংবাদমাধ্যমে। অন্যদিকে গাজার শত্রু হারিয়েছে গল্প বলার ক্ষমতা। দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা ভারসাম্য, প্রভাব, ভাবমূর্তি—সব ভেঙে পড়েছে।

এখন সেই জাহাজের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে নেই। এটি নিয়ন্ত্রণ করছে পৃথিবীর মুক্ত মানুষ।

এটাই আল্লাহর বিজয়। যখন তিনি চান, তখন তাঁরই সৈন্যরা সেই জয় এনে দেয়। আসমান-জমিন উভয়েরই সৈন্য তাঁর।

আর গাজা? সে জিতেছে, কারণ সে ফিরে এসেছে। ফিরে আসাটাই এক মহাবিজয়।

গাজা জিতেছে, কারণ তার অটলতা রাজনীতিকদের নত হতে বাধ্য করেছে। তার মানুষ ফের গড়ে নেওয়াকে বেছে নিয়েছে, কান্নাকে নয়; তার মানুষ বেছে নিয়েছে কাজ, বিলাপকে নয়; তার মানুষ বেছে নিয়েছে আশাকে, হতাশাকে নয়।

গাজা জিতেছে, কারণ তারা আত্মসমর্পণ করেনি। তারা বিজয়ী, কারণ পৃথিবীর সব বিশ্বাসঘাতকতা, সব অবরোধের পরও তারা মাথা নত করেনি। তাদের পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবু তারা যায়নি।

তাদের উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল, তবু তারা থেকে গেছে। তাদের ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবু তারা ভাঙেনি। তাদের প্রতিরোধকে চেপে ধরা হয়েছিল, তবু তারা পিছু হটেনি। তাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল, তবু তারা নীরব হয়নি।

এরপরও কি তুমি প্রশ্ন করবে—কে জিতল, কে বিজয়ী হলো?

* মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া
* অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* আবদুর রহমান আল-শাম্মারি সৌদি বংশোদ্ভূত কবি ও লেখক

গাজায় নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খান ইউনিসে ফিলিস্তিনিদের উল্লাস
গাজায় নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খান ইউনিসে ফিলিস্তিনিদের উল্লাস। ছবি: এএফপি

তরুণদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে by ফারহানা আলম

সিলেটের খাসিয়া সম্প্রদায়ের ২০ বছর বয়সী মিং সাং নতুন জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পান, যখন তিনি ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। আজ তাঁর গ্রামে তিনি হোম–স্টে পর্যটনকে সক্রিয়ভাবে প্রচার করছেন, অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছেন, গর্বের সঙ্গে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরছেন এবং একই সঙ্গে উপার্জনও করছেন।

২৭ বছর বয়সী আইনুল হক জুবেল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে একসময় জীবনকে অচল মনে করতেন। নিজেকে বোঝা মনে হতো—যতক্ষণ না একটি স্বল্পমেয়াদি গ্রাফিক ডিজাইন প্রশিক্ষণ তাঁর জন্য নতুন দ্বার উন্মুক্ত করে।

আজ জুবেল সচেতনতামূলক প্রচারে নিজের জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী তরুণদের অভিভাবকদের সঙ্গে। তাঁর বার্তা সহজ, কিন্তু শক্তিশালী—‘হাল ছেড়ো না, দক্ষতা জীবন বদলে দিতে পারে’।

১২ আগস্ট, বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৫—তরুণদের শক্তি, সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতি উদ্‌যাপনের দিন। এ বছর দিবসটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ, আমরা উদ্‌যাপন করছি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর দশম বার্ষিকী—একটি ন্যায্য, সমৃদ্ধ ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী বিশ্ব তৈরির প্রচেষ্টায়।

তবে এই স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যদি তরুণদের জাতীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা যায়।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। উদ্বেগের বিষয়, তাঁদের মধ্যে ৩০ দশমিক ৯% তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে (সূত্র: এনইইটি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের ১২% বেকার (সূত্র: বিবিএস)। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, যাঁদের অনেকেই উচ্চ বেকারত্ব, মানসম্মত দক্ষতা প্রশিক্ষণের সীমিত সুযোগ, শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং শোভন কাজের অভাবের মতো স্থায়ী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বিশ্বের শ্রমবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা হিসেবে তরুণদের এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রমে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা সরকারের অর্থায়নে, আইএলও তরুণদের জন্য দক্ষতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিসর দিয়ে সহায়তা করছে, যা তাঁদের ক্রমবর্ধমান কর্মজগতে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেবে।

আমাদের কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষের প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। আইএলও বাস্তবায়িত কর্মসূচিগুলো চাহিদাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা থেকে শুরু করে এর বিস্তার ডিজিটাল জ্ঞান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিল্প খাতের সঙ্গে পরিচিতি এবং জীবনব্যাপী দক্ষতা উন্নয়ন পর্যন্ত। দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে তরুণদের অভিযোজন, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বের জন্য এগুলো অপরিহার্য।

তবে তরুণেরা কেবল সুবিধাভোগী নন, তাঁরা নিজেরাই পরিবর্তনসাধক, উদ্ভাবক ও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এ জন্য আমরা তাঁদের নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করি, যেমন যুব পরামর্শ, স্কিলস ফেয়ার, ক্যাম্পেইন ও উদ্ভাবনী ল্যাবের মাধ্যমে। আমরা তাঁদের নেতৃত্বকে উৎসাহিত করি, উদ্যোক্তা হিসেবে ও সচেতন কর্মী হিসেবে যাঁরা নিজেদের অধিকার বোঝে ও রক্ষা করে।

বিশেষ করে তরুণ নারীদের জন্য শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানে যাত্রার পথটি মসৃণ হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা। আইএলও মানসম্পন্ন শিক্ষানবিশ ও শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করে, যা তত্ত্ব ও তার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান কমায়। এসব সহযোগিতা তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করে এবং আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার সঙ্গে কর্মজগতে প্রবেশের প্রস্তুতি দেয়।

তবু বিপুলসংখ্যক তরুণ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করেন, যেখানে কাজ অনিরাপদ, কম বেতনের এবং শ্রম সুরক্ষার বাইরে। এসব কাজকে আনুষ্ঠানিক করা এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রসারিত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও টেকসই অর্থনীতি গঠনের জন্য অপরিহার্য। তরুণদের জন্য শোভন কাজ কেবল অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়।

গত এক দশকে, বাংলাদেশি তরুণেরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট, জলবায়ু বিপর্যয় ও ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার অসীম সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তাঁদের সৃজনশীলতা ও দৃঢ়তা আমাদের আশা জোগায়। কিন্তু কেবল আশা যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে থাকতে হবে বিনিয়োগ, নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও সহায়ক পরিবেশের সৃষ্টি। কারণ, তরুণেরা সমৃদ্ধ হলে সমৃদ্ধ হয় পুরো জাতি।

* ফারহানা আলম, যোগাযোগ কর্মকর্তা, স্কিলস প্রোগ্রাম, আইএলও বাংলাদেশ

তরুণদের ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নামে আপাতত শুধুই ‘শব্দ-বিস্ফোরণ’

ডনের সম্পাদকীয়ঃ বিশ্বনেতারা যখন মিশরের লোহিত সাগর তীরবর্তী রিসোর্ট শার্ম আল-শেখে জড়ো হয়েছিলেন তখন সেখানে ভূ-রাজনৈতিক নাটকের মঞ্চায়ন এবং অতিশক্তিই যেন বাস্তবতার স্থান দখল করে নিল। সমবেত বিশিষ্টজনেরা মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি’ উদ্‌যাপন করলেন। দলের নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হামাস-ইসরাইল সংঘাত ও গাজা শান্তি পরিকল্পনার উল্লেখ করে আত্ম-অভিনন্দনের মুহূর্তে ঘোষণা করেন, অবশেষে  দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক দুঃস্বপ্নের অবসান হয়েছে। যদিও দূরদর্শী লক্ষ্য এখনও অধরা।

প্রাথমিকভাবে গাজায় গণহত্যা নিশ্চিতভাবে থামলেও  অধিকৃত ফিলিস্তিনে একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি অর্জন এখনও বহু দূরের বিষয়। গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্প বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন। যার মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসাও রয়েছে। পাক নেতা আবারও ট্রাম্পকে নোবেল দেওয়ার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি তাকে‘লাখ লাখ’ জীবন বাঁচানোর’ কৃতিত্ব দেন। যদিও ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার সারবস্তু সামান্যই।

প্রথমত, একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো স্পষ্ট পথরেখা ট্রাম্পের পরিকল্পনায় নেই। যদিও মিশরের প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, এই চুক্তি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শান্তির জন্য আরও বিস্তৃত ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিও দ্বিতীয় ইন্তিফাদার বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভেঙে পড়ে। এর প্রধান কারণ ছিল প্রকৃত শান্তির প্রতি ইসরাইলের আন্তরিকতার অভাব।

তদুপরি, গাজার উপর নজরদারি করার জন্য বিদেশি শাসন, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ধারণা এবং বিদেশি সৈন্য মোতায়েনের বিষয়টিও রয়েছে। যা গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়। এই অঞ্চলের সঙ্গে পরিচিতদের লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ‘শান্তিরক্ষীদের’ সংশ্লিষ্টতার কথা মনে রাখা উচিত।  ইরাকে ‘জাতি গঠন’-এর ব্যর্থতাও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

সংক্ষেপে, গাজা বা পশ্চিম তীর—কোনোটাই বিদেশি বাহিনীর দ্বারা শাসিত হওয়া উচিত নয়। সব মতের ফিলিস্তিনি দলগুলোর একত্রিত হওয়া এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের ভূখণ্ড নিজেরাই পরিচালনা করা উচিত।

আরেকটি সত্য হচ্ছে শার্ম আল-শেখের এই ‘শান্তি’ উদ্‌যাপনের মাঝে গাজায় গণহত্যার বিষয়ে ইসরাইলের  কোনো জবাবদিহিতার উল্লেখ ছিল না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জায়নবাদী রাষ্ট্রটি দশকের বেশি সময় ধরে এমনভাবে কাজ করছে যেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে। নাকবা’র সময় থেকে শুরু করে তারা ফিলিস্তিনিদের হত্যা, অঙ্গহানি এবং জমি দখল করে চলেছে। ইসরাইল তাদের পূর্বের দায়মুক্তির জন্য শাস্তি না পাওয়ায়, তারা গাজায় হত্যাকাণ্ড চালাতে এমন এমন সাহস দেখিয়েছে।

এই অঞ্চলে যদি প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয় তবে দুটি বিষয় অপরিহার্য। প্রথমত, তেল আবিবে যারা হাজার হাজার গাজাবাসীর হত্যা ও অনাহারের জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিশ্বকে অঙ্গীকার করতে হবে যে গাজার মতো আরেকটি গণহত্যা আর কখনও হবে না। দ্বিতীয়ত, একটি সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দিকে একটি দৃঢ় পথরেখা তৈরি করতে হবে। এর চেয়ে কিছু কম হলে তা কেবল সহিংসতার চক্রকেই স্থায়ী করবে। কারণ ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার দিতে অস্বীকার করছে।

mzamin

গাজা যুদ্ধ শেষঃ খান ইউনিসে পুনরায় চালু হয়েছে বাজার, তাজা খাবার কিনছেন গাজাবাসি

হামাসের কাছে থাকা জিম্মিদের মুক্তিতে বিলম্ব করলে গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বিলম্ব করা হবে বলে জানিয়েছে ইসরাইল। তারা জাতিসংঘকে জানিয়েছে, বুধবার থেকে অনুমোদিত ট্রাকের সংখ্যা সীমিত করা হবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। এতে বলা হয়েছে, হামাসের কাছ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত তিন জিম্মির নাম প্রকাশ করেছে দখলদাররা। তাদের এক সূত্র জানিয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে হামাস আজ আরও কয়েকটি মৃতদেহ হস্তান্তর করবে। এ পর্যন্ত ২৮ জন মৃত জিম্মির মধ্যে মাত্র ৮ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, মিশরে চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, হামাসকে অবশ্যই নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-15%2F8gxv3son%2FScreenshot_2025_10_15_154030.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজাবাসীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে ফিরেছে, মাথা নত করেনি, আশা হারায়নি। ছবি: এএফপি

ত্রাণ সরবরাহ বিলম্বের কথা ইসরাইল জানিয়েছে কিনা এ বিষয়ে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র কে জিজ্ঞাসা করা হয়। ইসরাইল জাতিসংঘকে জানিয়েছে, তারা বুধবার থেকে ৩০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশে অনুমতি দেবে। প্রথমে ওই সংখ্যা ছিলো ৬০০। আরও বলা হয়েছে, উপত্যকাটিতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো প্রকার গ্যাস বা জ্বালানি সরবরাহ করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, হামাসকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত ও মৃত বাকি জিম্মিদের মুক্তি দেয়ার কথা ছিলো। গতকাল ২০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হলেও বাকি ২৮ জন মৃত জিম্মির মধ্যে মাত্র চারজনকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

mzamin
গাজার খান ইউনিস থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহারের পর ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে। দোকানগুলো পুনরায় চালু হয়েছে।

সেখান থেকে তারা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনছেন। ভাঙ্গাচোরা ভবনগুলোর মাঝেই সবজি, ফল ইত্যাদির দোকান বসানো হয়েছে।

এতদিন গাজায় খাদ্য সরবরাহে বাধা দিয়ে এসেছে দখলদাররা। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ফলে ওই অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে। যার কারণে সাধারণ জনগণ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে পারছেন।

যেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ উঠে আসছে। যেন মৃতদেহ হঠাৎ পুনর্জীবন পেয়েছে।
যেন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ উঠে আসছে। যেন মৃতদেহ হঠাৎ পুনর্জীবন পেয়েছে। ছবি: এএফপি

মানবতার এমন পুনর্জন্ম পৃথিবী কমই দেখেছে। মনে হলো, গাজা যেন কবর থেকে উঠে ঘোষণা দিচ্ছে—‘আমি বেঁচে উঠেছি আবারও!’
মানবতার এমন পুনর্জন্ম পৃথিবী কমই দেখেছে। মনে হলো, গাজা যেন কবর থেকে উঠে ঘোষণা দিচ্ছে—‘আমি বেঁচে উঠেছি আবারও!’ ছবি: এএফপি

গাজায় একটি সড়কে কয়েকজনকে গুলি করে হত্যার একটি ভিডিও হামাস প্রকাশ করেছে। ছবিটি ওই ভিডিও থেকে নেওয়া
গাজার বিধ্বস্ত শহরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করছে হামাস। গতকাল মঙ্গলবার সশস্ত্র গোষ্ঠীটি গাজায় অভিযানে নেমেছে। বিরোধীদের সহযোগিতা করেছে, এমন অভিযোগে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে তারা। এদিকে হামাস তাদের আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, চোখ বাঁধা ও মাটিতে হাঁটু গেড়ে থাকা আটজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। হামাস ওই ব্যক্তিদের ‘বিরোধীদের সহযোগী ও অপরাধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ভিডিও ফুটেজটি খুব সম্ভবত সোমবার সন্ধ্যার। এই ভিডিও থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর গাজার বিভিন্ন এলাকায় হামাসের বিভিন্ন নিরাপত্তা ইউনিট এবং অন্যান্য সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গাজা নগরী থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর গাজার উত্তরাঞ্চলে হামাস সরকারের কালো মুখোশধারী সশস্ত্র পুলিশ আবার রাস্তায় পাহারা দিতে শুরু করেছে। সোমবার যখন ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীদের বাসে করে গাজায় আনা হয়, তখন হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেডের যোদ্ধারা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করেছিল। এ ছাড়া হামাসের একটি নিরাপত্তা ইউনিট গাজায় অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। হামাসের অভিযোগ, এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর কেউ কেউ ইসরায়েলের সমর্থন পেয়েছে। মোহাম্মদও নিজের পুরো নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘আমরা তীব্র গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি এবং নিরাপত্তা বাহিনী তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা এটি সমর্থন করি।’ গাজার একটি নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে বলেছে, হামাসের একটি নিরাপত্তা ইউনিট গাজায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করছে। সম্প্রতি গঠিত এই ইউনিটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রতিরোধ বাহিনী’। ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘আমাদের বার্তা একেবারে পরিষ্কার। যারা অপরাধী অথবা নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করবে, গাজার মাটিতে তাদের কোনো স্থান নেই।’


ইউরোপের কঠোর নিয়ম যেভাবে পরিবারগুলোকে আলাদা করে দিচ্ছে

গার্ডিয়ানের রিপোর্টঃ জুন মাসে জার্মান সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে আহমেদ শেখ আলি অশ্রু সংবরণ করছিলেন। হাতে তুলে ধরেন তার তিন বছরের ছেলের অস্পষ্ট একটি ছবি। দুই বছরেরও বেশি আগে আলেপ্পো থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে তিনি সবকিছু করেছিলেন ছেলের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য। হ্যানোভার শহরে বসবাস শুরু করেন। পূর্ণকালীন চাকরি পান। আর পরিবারকে কাছে আনার জন্য কাগজপত্রের অসংখ্য ঝামেলা পেরিয়ে আসেন। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। তিনি প্রায় পরিবারের সাথে পুনর্মিলনের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। তার আবেদনটির আগে মাত্র দুটি মামলা বাকি ছিল। কিন্তু হঠাৎই জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ জুনে একটি বিল পাস করে।

তাতে বলা হয় তার মতো অভিবাসীদের জন্য পারিবারিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া অন্তত দুই বছরের জন্য স্থগিত থাকবে। কান্নাভেজা কণ্ঠে আহমেদ জানান, এই সিদ্ধান্ত জানার পর থেকে আমি ঘুমাতে পারি না। জীবন চালিয়ে নিতে পারি না। যখন আমি ছেলেকে রেখে আসি, সে হামাগুঁড়ি দিত। সে এখন হাঁটছে। অনলাইন গার্ডিয়ানে তার এই দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই অবস্থা আরও অনেকের। রিপোর্টে বলা হয়, এটি কেবল এক ব্যক্তির কষ্ট নয়। কয়েক মাসে ইউরোপের একাধিক সরকার এমন পরিবারের পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, রাজনীতিবিদরা নিজেদের ‘অভিবাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণকারী’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ইউরোপের ফেদেরিকা তোসকানো বলেন, এটি আসলে কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। রাজনীতিবিদরা একদিকে বলছেন অভিবাসনকে সুশৃঙ্খল, ন্যায্য আর পরিকল্পিত করতে চান। আর পরিবারগুলোর পুনর্মিলনই তো সবচেয়ে সুরক্ষিত, আইনসম্মত আর সমাজে একীভূত হওয়ার অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি।
মার্চে অস্ট্রিয়া প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে শরণার্থীদের জন্য পরিবারিক পুনর্মিলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। অজুহাত দেয় সমাজসেবার ওপর বাড়তি চাপের কথা। পরে জার্মানি, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড এবং বেলজিয়ামও একই পথে হাঁটে। বেশ কয়েকটি সরকার জরুরি পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ এসব পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন ও ইইউ চার্টারে স্বীকৃত ‘পারিবারিক জীবনের অধিকার’-এর সঙ্গে।

তোসকানোর ভাষায়, পারিবারিক ঐক্য আমাদের সমাজে এক মহান মূল্যবোধ। কিন্তু বিদেশিদের পরিবার হলে সেটি যেন কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। সেভ দ্য চিলড্রেন ফিনল্যান্ডের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া গড়ে সাড়ে ছয় বছর সময় নেয়। কেউ কেউ এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছেন। এদিকে পারিবারিক পুনর্মিলনের মাধ্যমে আসা মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রিয়ায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পারিবারিক পুনর্মিলন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ১৮০০০ মানুষ গিয়েছে। এর মধ্যে ১৩০০০ই শিশু। তারা অনেকেই বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে দীর্ঘ, বেদনাদায়ক সময় পার করেছে। তোসকানোর মতে, যত বেশি সময় এই প্রক্রিয়া নেয়, তত বেশি মানসিক আঘাত সঞ্চিত হয় শিশুদের মনে।

mzamin