Friday, January 30, 2015

সুজাতা বরখাস্তের নেপথ্যে- আরো পরিবর্তন আসছে ভারতের পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে by মেহেদী হাসান

ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে সুজাতা সিংকে বরখাস্ত করা নিয়ে সে দেশের গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফর শেষ হওয়ার ঠিক এক দিনের মাথায় তাকে আকস্মিক বরখাস্তের কারণে বিষয়টিকে অনেকেই নিছক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না। বরখাস্তের সময় বিবেচনায় অনেকে এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক মহলের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম সুজাতার বরখাস্তের নেপথ্য কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অনেকে মেলাতে শুরু করেছেন নানা ধরনের অঙ্কের হিসাব।  টাইমস অব ইন্ডিয়া গতকাল সুজাতাকে বরখাস্তের পেছনে তিনটি সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেছে। এর একটি হলো ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল হওয়া প্রসঙ্গ। গত ১১-১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ভাইব্রান্ট (চনমনে) গুজরাট সামিট। এতে আমন্ত্রণ জানানো হয় ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীকে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী আসতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতায়।  একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কোনো দেশে সফর করতে হলে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রাথমিক পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপনসহ অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। করতে হয় বহুমাত্রিক গ্রাউন্ড ওয়ার্ক। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ডেনমার্ক কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া হয়, কিম ডেভি ইস্যু সুরাহা না করা পর্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা যাবে না।  প্রসঙ্গত, ১৯৯৫ সালে ১৭ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় বিমান থেকে অস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ডেনমার্কের নাগরিক কিম ডেভি। কিম ডেভির অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী সরকারকে অপসারণে এটা ছিল কেন্দ্রীয় সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ও এমআইফাইভের একটি সম্মিলিত ষড়যন্ত্র। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাকে আশ্বস্ত করেছিল নিরাপদে ডেনমার্ক প্রত্যাবর্তনে। তবে এ ঘটনার প্রকৃত কারণ যাই থাক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আনন্দ মার্গ গ্রুপ দাবি করেছে এ অস্ত্র তাদের কাছে আসছিল। ভারতের একটি আদালতও এর পক্ষে মত দেয় তখন। ডেনমার্ক বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ অবস্থান ও অসহযোগিতায় বাতিল হয়ে যায় ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর গুজরাট সফর। এতে সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটে দুই দেশের মধ্যে। এ ঘটনায় বেশ ুব্ধ হন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কারণ ডেনমার্ক তার কাছে অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে উল্লেখ কর হয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কারোর সাথেই প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অর্থপূর্ণ কোনো যোগাযোগ ছিল না। যদিও সুজাতা সিং ও সুষমা স্বরাজের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পররাষ্ট্র বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এভাবে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীতল সম্পর্কের পেছনে সুজাতার অনাগ্রহ বা অনচ্ছিাকে দায়ী বলে মনে করা হয়।  সুজাতার ওপর নরেন্দ্র মোদির নাখোস হওয়ার পেছনে টাইমস অব ইন্ডিয়া আরেকটি কারণ উল্লেখ করেছে। তা হলো ইসরাইল ইস্যু। ইসরাইলের ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দীর্ঘ দিন ধরে প্রথাগত যে সম্পর্ক বজায় রেখে আসছিল তার সাথে একমত নন মোদি। বলা যায়, মোদির অবস্থান এর বিপরীত। মোদির অগ্রাধিকার তালিকায় ইসরাইলও রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে মোদি সাক্ষাৎ করে দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারের উদ্যোগ নেন।  টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, ছয় মাস ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুজাতা সিংয়ের ওপর ক্রমাগতভাবে ুব্ধ হচ্ছিলেন মোদি। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির আকক্সক্ষা, অগ্রাধিকার ও বৃহত্তর স্বার্থের সাথে সম্পূর্ণ তালমিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হয়েছে মন্ত্রণালয়।
অন্য দিকে আনন্দবাজার পত্রিকা গতকাল লিখেছে, সুজাতাকে সরিয়ে দেয়ায় বেশ চটেছেন সুষমা স্বরাজ। তিনি বেশ ুব্ধ। এমনকি বৃহস্পতিবার দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনী জনসভাও তিনি বাতিল করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা আরো উল্লেখ করেছে অতীতে মোদিবিরোধী হিসেবে সুজাতার রেকর্ড রয়েছে। তবে স্বরাজ এখন চেষ্টা করছেন মোদিবিরোধী আদভানিসহ অন্য কারোর সাথে যোগাযোগ না রাখতে। তিনি তার দায়িত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাচ্ছেন।
এ দিকে সুজাতা সিং বরখাস্তের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও একটি ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে। বিশেষ করে দেবযানি ইস্যু। দেবযানি নিউ ইয়র্কে ভারতের কনসুলেট জেনারেল অফিসে ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র তাকে আটক করে। তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও নিজ বাসায় নিযুক্ত গৃহকর্মী সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে স্ট্রিপ সার্চ (বিবসনা করে দেহ তল্লাশি) করা হয়। এ ঘটনাকে ভারত গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত সম্মানহানিকর ও অমর্যাদাকর হিসেবে বিবেচনা করে। দেবযানি ইস্যুতে ভারত অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নেয়। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ক তখন নাজুক অবস্থার সম্মুখীন হয়।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফর শেষের ঠিক একদিন পরেই পররাষ্ট্র সচিব সুজাতাকে বরখাস্তের ঘটনার সাথে অনেকে দেবযানি ইস্যুকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় কংগ্রেস নেতা মনিশ তেওয়ারির অভিযোগ থেকে। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় পরিবেশিত খবরে বলা হয়েছে সাবেক এ তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, সুজতা সিংকে বরখাস্ত করে দেবযানি ইস্যুর প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে। কারণ দেবযানি ইস্যুতে ভারতের শক্ত অবস্থানের পেছনে তখন সুজাতা সিং জোরাল ভূমিকা পালন করেন।  সুজাতা সিং বরখাস্ত ঘটনার নেপথ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ভারত সফর করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা। কূটনৈতিক সূত্র মতে, ড্যান মজিনা ভারতের আমন্ত্রণে তখন দিল্লি সফর করেননি। বরং ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তেই দিল্লি যান তিনি। বাংলাদেশে তখন তীব্র রাজনৈতিক সঙ্কট বিরাজমান ছিল। ভারতের কংগ্রেস সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যেই আওয়ামী লীগের পক্ষে তাদের শক্ত অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য কূটনৈতিকপর্যায়ে চেষ্টা চালায়। তাই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের ঠিক দুই মাস আগে ড্যান মজিনার ওই দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকায় বেশ গুঞ্জন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ করে ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান অবহিত হওয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরা ও বাংলাদেশের তখনকার ইস্যুতে দুই দেশ মিলে একটি অবস্থানে আসা যায় কি না এসব বিষয়কে সামনে রেখেই মজিনা তখন দিল্লি সফর করেন বলে অনেকে মনে করেন।
কূটনৈতিক সূত্র আরো জানায়, ড্যান মজিনার এ সফরের পরও ভারতের কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থন জোরালভাবেই ধরে রাখে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকা সফরে এসে সুজাতা সিং একতরফা নির্বাচনের পক্ষে কংগ্রেস সরকারের অবস্থান জানিয়ে দেন। এমনকি তিনি একতরফা নির্বাচনে অংশ নিতে এরশাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এরশাদ তা সাথে সাথে ফাঁস করে দেন। অনেকের মতে, এভাবে কার্যত গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সে সময় আওয়ামী লীগ শুধু ভারতের একনিষ্ঠ সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহলের সব দাবি উপেক্ষা করে একটি একতরফা জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায় ও তা সম্পন্ন করে। বাংলাদেশে সঙ্ঘাত নিরসন করে একটি শান্তিপূর্ণ স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য আরো অনেক দেশ ও সংস্থার সব চেষ্টা মূলত ব্যর্থ হয়ে যায়, বাংলাদেশ বিষয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারত সরকারের অনমনীয় অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের প্রতি অন্ধ সমর্থনের কারণে। তাই কারো কারো মতে, সুজাতা বরখাস্তের পেছনে বাংলাদেশের ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পূর্ব অবস্থারও যোগসাজশ থাকতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে আরো পরিবর্তন আসছে দ্রুত
মোদি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর গত ছয় মাসে ভারতে রাষ্ট্রদূত পর্যায়েও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পরিবর্তনের প্রস্তাব করে ফাইল পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মোদি তাতে অনুমোদন দেননি। নরেন্দ্র মোদি চাইছিলেন সবার আগে ঘরের ভেতর থেকে অর্থাৎ মন্ত্রণালয় থেকেই পরিবর্তনের সূচনা করতে। এরপর রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার পর্যায়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ খবর দিয়েছে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া।  টাইমস অব ইন্ডিয়া বৃহস্পতিবারই লিখেছে, জয়শঙ্করের নিয়োগের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দ্রুত নতুন পরিবর্তনের সূচনা ঘটিয়েছে। সুজাতাকে সরিয়ে দেয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে পরিবর্তন শুরু হবে।
সুজাতাকে অপসারণের মধ্য দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দ্রুত পরিবর্তনের সূচনা হবে বলে আশা করা হয়েছে ভারতের গণমাধ্যমসহ কূটনৈতিক মহল থেকে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব পরিবর্তন বৈদেশিক সম্পর্কের ওপরও যে প্রভাব ফেলবে ও নতুন মাত্রা পাবে তা অনেকটা স্পষ্ট।  ভারতের ফরেন সার্ভিসের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ আরো অদল-বদলের ফলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে যেমন গতি আসবে; তেমনি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী পরিবর্তন আসবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।  সুজাতা সিংকে বরখাস্ত ও রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে অদল-বদলের খবরে ঢাকায়ও অনেকে কৌতূহলি হয়ে উঠেছেন এখানে ভারতীয় দূতাবাসে কোনো পরিবর্তন হবে কি না সে বিষয়ে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে বুধবার রাতে বরখাস্ত করা হয় সুজাতা সিংকে ও তার স্থলে নিয়োগ দেয়া হয় সুব্রামনিয়ামস জয়শঙ্করকে।

সমুদ্র পেরিয়ে স্বপ্নপূরণ

অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল৷ এবার সেই স্বপ্নই পূরণ হতে চলেছে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া র৷ স্বপ্ন ছিল সমুদ্রের ধারে একটা বাড়ি হবে৷ না, মুম্বাইতে এমন কোনো বাড়ি কেনেননি বা উপহার পাননি প্রিয়াঙ্কা৷ কিন্ত্ত এমনই এক বাড়ি তিনি পেয়েছেন লস অ্যাঞ্জেলস৷ তবে পাকাপাকিভাবে নয়৷ তিন মাসের জন্য৷ আর সেই বাড়িটা একেবারেই সি -ফেসিং৷ আসলে প্রিয়াঙ্কা তিন মাসের জন্য আমেরিকা যাচ্ছেন টেলিভিশনের একটি শো-এর জন্য৷ আর তার প্রযোজকরাই প্রিয়াঙ্কার থাকার ব্যবস্থা করছেন এই বাড়িতে৷ প্রিয়াঙ্কার সমুদ্রের সামনাসামনি একটি বাড়িতে থাকার ইচ্ছে বহু দিনের, এটা জানতে পেরে আসলে একটি বাড়ি না, গোটা একটা ভিলা-ই ভাড়া নিয়ে ফেলেছেন তারা৷ 'প্রিয়াঙ্কার পছন্দের কথা জানতে পেরে প্রযোজকরা এই ভিলাটি ভাড়া নেওয়ার পরিকল্পনা নেন৷ শ্যুটিং-এর তিন মাস প্রিয়াঙ্কা এবং তার টিমের বাকিরা ওই বাড়িতে থাকবেন৷ তবে বাড়ির ভিতরে কী কী থাকবে, তা এখনও পাকাপাকিভাবে ঠিক হয়নি৷ প্রযোজকদের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার কথা চলছে, বাড়ির ইন্টিরিয়রের ব্যাপারে', জানিয়েছেন প্রিয়াঙ্কার এক ঘনিষ্ঠ৷ তিন মাস কিন্তু লম্বা সময়৷ আর তিন মাস বাড়ি ছেড়ে থাকতে গিয়ে অনেকই 'হোমসিক' হয়ে পড়েন৷ বাড়ির জন্য মন খারাপ লাগতে থাকে৷ প্রিয়াঙ্কাও যে তার ব্যতিক্রম হবেন না, তেমনও তো কোনো কথা নেই৷ তাই বাড়ি থেকে অত দূরে থাকার সময় যাতে প্রিয়াঙ্কা যত দূর সম্ভব বাড়ির মেজাজেই থাকতে পারেন, তার ব্যবস্থাও করছেন শো-এর প্রযোজকরা৷ 'প্রিয়াঙ্কা প্রতি দিনই পূজা করেন৷ তাই তার ওই প্রযোজনের কথা জানতে পেরে ওই ভিলায় একটি ছোটখাটো মন্দিরের ব্যবস্থাও করছেন তারা৷ শুধু তাই নয়, নিজের বাড়িতে প্রিয়াঙ্কার ঘরে যেমন নিজের এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠদের ছবি লাগানো থাকে, লস অ্যাঞ্জেলসের এই বাড়িতেও থাকছে তার ব্যবস্থা৷' জানিয়েছেন ওই ঘনিষ্ঠই৷- ওয়েবসাইট।

‘আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান’ -আব্বাস-সোহেলের যৌথ বিবৃতি

ঢাকা মহানগরসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের যার যার অবস্থান থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস এবং সদস্য সচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল। আজ গণমাধ্যমে পাঠানো এক যুক্ত বিবৃতিতে তারা এ আহ্বান জানান। সরকারের উদ্দেশে তারা বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অস্ত্র-গুলি দিয়ে না দমিয়ে সমঝোতার পথে ফিরে আসুন। আপনাদের কোন অশুভ পরিকল্পনাই ফলপ্রসূ হবে না। জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন গন্তব্যে  পৌঁছা না পর্যন্ত কেউ ঘরে ফিরে যাবে না। মামলা-হামলা-গ্রেপ্তার করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন কোনদিনই বন্ধ করা যায়নি। এবারও যাবে না। তারা বলেন, বিএনপি নাশকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কোন নাশকতার সঙ্গেই বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত নন। দেশনেত্রী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন সফল করছেন। তারা বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তারের চক্রান্ত করছে। সে রকম কোন চেষ্টা হলে তার পরিণতি শুভ হবে না। দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশে সমন্বিতভাবে আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে। তার নির্দেশে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে। প্রতিটি নেতাকর্মী কৌশলী অবস্থানে থেকে যার যার দায়িত্ব পালন করছেন। চলমান অবরোধের সঙ্গে রোববার থেকে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতাল সর্বাত্মকভাবে পালনেরও আহ্বান জানান মহানগর বিএনপির এ শীর্ষ দুই নেতা।

পুরনো নীতির সঙ্গে নতুন নীতির সংঘর্ষের বলি সুজাতা

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে ভালো কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে নীতির প্রশ্নে নানা বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন সুজাতা সিং। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে প্রযোজনীয় সংশোধনে অনীহা দেখিয়েছিলেন বলে সুজাতা সিংয়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। গত কয়েক মাসে সেই বিরোধ তীব্রতা পেয়েছে ইসরায়েল ও ডেনমার্কের প্রশ্নে। শেষ পর্যন্ত প্রায় মধ্যরাতের এক বৈঠকে তাকে অপসারিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইচ্ছেতেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রচলিত বেশ কয়েকটি নীতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করার জন্যই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অখুশির কারণ হয়েছিলেন তিনি। আর তাই পররাষ্ট্রসচিব বদলের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও প্রধানমন্ত্রী বার্তা দিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। একটি সূত্রে বলা হয়েছে, বারাক ওবামার সফল ভারত সফরের ২৪ ঘণ্টা কাটার আগেই সুজাতা সিংকে সরিয়ে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সৌহার্দ্যের নতুন বার্তা দেয়া হয়েছে। আর তাই কংগ্রেস এই অপসারণের সঙ্গে ভারতীয় কুটনীতিক দেবযানী খোবড়াগাড়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আক্রমন শানিয়েছে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় কুটনীতিক দেবযানী ভিসা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে সুজাতা সিং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা তুলে নেয়ার পক্ষে  মত দিয়েছিলেন। এতে অখুশি ছিল মার্কিন সরকার। আর তাই ওবামার ভারত সফরের আগেই সুজাতা সিংকে সরে যাবার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাকে সম্মানসূচক সাংবিধানিক পদ দেবার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সুজাতা তিন দিনের জন্য ভাবনার সময় নিয়েও পরে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন বলে সাউথ ব্লক সূত্রে জানানো হয়েছে। ওবামার ভারত সফর পর্বে জয়শঙ্করকেই প্রধানমন্ত্রী প্রাধান্য দেন, উপেক্ষা করেন পররাষ্ট্র সচিবকে। তবে সর্বশেষ যে ঘটনায় সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তথা প্রধানমন্ত্রীর বিরোধ তীব্র হয়েছিল সেটি ছিল ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সম্মেলনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রশ্নে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ব্যাক্তিগতভাবে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। গুজরাট সরকার ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সম্মেলনে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীকে অতিথি করতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীরও তাই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রকের আপত্তিতেই তা সম্ভব হয়নি। কিম ডেভি সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে ডেনমার্কের সঙ্গে কোনও উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ না রাখার নীতিতে পররাষ্ট্র সচিব অবিচল ছিলেন। এর ফলে ডেনমার্কের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক  সম্পর্কে আলোড়ন তৈরি হয়। ইসরায়েলের প্রশ্নেও পররাষ্ট্র মন্ত্রক পুরনো অবস্থানে অনঢ় থেকে ব্রিকস সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে ইসরায়েল সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু মোদী সরকারের আসার পর ইসরায়েলকে ভারতের সহযোগীদের তালিকায় প্রাধান্য দিয়েছিলেন। একই ভাবে ভারতের পুরনো অবস্থান অনুযায়ী রাষ্ট্রসংঘের মানবিক অধিকার রক্ষা সম্মেলনে ভারত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল।  ভোটদানে অনুপস্থিত থেকে মুখরক্ষার চেষ্টাও করেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রক। অথচ নতুন সরকারের নীতিই হচ্ছে ইজরায়েলের প্রতি খানিকটা নরম মনোভবাব নিযে চলা। এই সব ঘটনাকে সামাল দিতে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদী নিউইয়র্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানুয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আরও অভিযোগ ছিল, মোদীর জাপান সফরের সাফল্যকে এগিয়ে নিযে যাওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র সচিবের দ্বিধা ছিল । এই সব কারণেই গত মাস ছয়েক ধরে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নতুন সরকারের নীতির সঙ্গে পুরনো অবস্থানের ব্যাপক ফারাকই অচলাবস্থা তৈরি করেছিল। তবে বিদায় নেবার মুহূর্তে অপসারিত পররাষ্ট্র সচিব তার সহকর্মীদের কাছে পাঠানো বার্তায় স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান তৈরিতে কোনও ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তি কখনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হতে পারেন না। তবে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, জয়শঙ্করকে নতুন পররাষ্ট্র সচিব করে প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র মন্ত্রকে নিজের কর্তত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। জয়শঙ্করের কাজে নরেন্দ্র মোদী অনেক দিন ধরেই খুশি। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মোদী যখন চীন সফর করেছিলেন তখন জয়শঙ্কর চীনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন্। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয রাষ্ট্রদূত হিসেবে জয়শঙ্কর যেভাবে ভুমিকা রেখেছেন তাতেও খুশি ছিলেন মোদী। আর ওবামার  সফর ফলপ্রসু করার পিছনেও জয়শঙ্করের ভুমিকা ছিল যথেষ্ট। মোদী তাই তার নতুন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাল মেলাতেই জয়শঙ্করকে নতুন পদে বসিয়েছেন। এই ভাবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকেও তিনি বার্তা দিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

অবরোধের পাশাপাশি রোববার থেকে ৭২ ঘণ্টার হরতাল

লাগাতার অবরোধের পাশাপাশি আগামী রোববার ভোর ৬টা থেকে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত টানা ৭২ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে ২০ দলীয় জোট। বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারে হত্যা, যৌথবাহিনীর তাণ্ডব বন্ধ ও জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে এ হরতাল ঘোষণা করা হয়। বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ এক বিবৃতিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৭২ ঘণ্টার হরতাল পালনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর আগে সভা-সমাবেশের অধিকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ৬ই জানুয়ারি থেকে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে বিরোধী জোট। 

পাকিস্তানে শিয়া মসজিদে বিস্ফোরণ, নিহত ২৫

(পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর এলাকায় ইমামবড়ায় বিস্ফোরণে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে আছেন অনেকে। ছবি: ডন) পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের শিকারপুর এলাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদ–সংলগ্ন ইমামবাড়ায় শক্তিশালী বিস্ফোরণে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পরই ভবনের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে ছাদ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়ে আছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ডনের খবরে জানা যায়, আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনাকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে মজলিশ ওয়াহদাতুল মুসলিমিনের (এমডব্লিউএম) নেতা আল্লামা মোহাম্মেদ আমিন শাহদি তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন। ডনকে তিনি জানান, সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলন করে দলের পরবর্তী পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন। আহত লোকজনকে শিকারপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সিন্ধু প্রদেশের তথ্যমন্ত্রী শারজিল ইনাম মেমন জানান, শিকারপুরের সব হাসপাতালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সায়্যিদ কায়েম আলী শাহ এবং সিন্ধু প্রদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাম মেহতাব দাহার ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসেন, পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফের চেয়ারম্যান ইমরান খান এবং মুত্তাহিদা কওমি আন্দোলনের প্রধান আলতাফ হোসেন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আত্মঘাতী হামলাকারীরা ওই হামলা করেছে।

রাহুলকে দোষারোপ করে কংগ্রেস ছাড়লেন জয়ন্তী

রাহুল গান্ধীকে প্রকাশ্যে দোষারোপ করে দল ছাড়লেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা ও সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জয়ন্তী নটরাজন। আজ শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে জয়ন্তী নটরাজন এ ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি তামিলনাড়ু কংগ্রেস ট্রাস্টের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আজ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে জানানো হয়, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখে নিজের অপমানের ফিরিস্তি দিয়েছেন নটরাজন। চিঠিতে তিনি জানান, দলের সহসভাপতি রাহুল গান্ধীর চাপে পরিবেশ-সংক্রান্ত বড় প্রকল্প হাতছাড়া করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সবুজসংকেত থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই প্রকল্পের ছাড়পত্র দিতে পারেননি। তাঁর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে রাহুল অপপ্রচার চালিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন জয়ন্তী। সংবাদ সম্মেলনে জয়ন্তী বলেন, ইউপিএ সরকারে সোনিয়া ও রাহুল যেকোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না এবং মন্ত্রীরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, এ ধারণাটি ভুল।
জয়ন্তী বলেন, ‘আমি কোনো দোষ করিনি, তবুও আমি বঞ্চিত হচ্ছি। আর যদি কোনো দোষ করেও থাকি এবং তার যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপন কেউ করতে পারে, তাহলে আমি জেলে যেতে বা ফাঁসিতে ঝুলতে রাজি। আমার এই দলত্যাগ কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং বঞ্চিত হয়েই আমি দলত্যাগ করলাম। এই মুহূর্তে অন্য কোনো দলেও যোগ দেওয়ার ইচ্ছে নেই।’ কংগ্রেসের এই বর্ষীয়ান নেতা বলেন, দলত্যাগের বিষয়ে দলের ওপরমহল থেকে কোনো ফোন তিনি প্রত্যাশা করেন না। কারণ কোনোভাবেই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমি এসব বিষয় নিয়ে রাহুলের সঙ্গে শতাধিকবার দেখা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি দেখা করেননি। আমার দলই যখন আমাকে বাজেভাবে মূল্যায়ন করে, সে দলে থাকার কোনো মানে নেই। আর আমি যে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলাম, আজ আর সেই কংগ্রেসও নেই।’

পুলিশের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান- পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে

বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূতভাবে বিরোধী দলের আটজন নেতাকর্মী মারা গেছেন। এরা কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। এ ছাড়া, বিভিন্ন স্থানে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর নানাভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে বিরোধী জোটের অবরোধের মধ্যে যেসব নাশকতামূলক কাজ হচ্ছে, তা ‘যেকোনো উপায়ে’ দমন করতে পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘এখানে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই, কোনো চিন্তা নেই। যা কিছু হোক, সে দায়িত্ব আমি নেবো।’ প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা কতকগুলো গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। অবরোধ ও হরতালের মধ্যে যেসব ধ্বংসাত্মক কাজ হচ্ছে, নিঃসন্দেহে তা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের সাথে যারা বা যে কেউ জড়িত থাকুক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আইনের হাতে সোর্পদ করবে। এটা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু ‘যেকোনো উপায়ে’ তা দমনের এখতিয়ার কোনো বাহিনীর নেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের সুস্পষ্ট বিধিবিধানের মধ্যে থেকে জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। আইনের বাইরে গিয়ে, খেয়াল খুশিমতো তারা কোনো কাজ করতে পারেন না। যদি করেন, তা হবে সংবিধানের পরিপন্থী এবং এতে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। দেশ তখন পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা গণতান্ত্রিক শাসনে অকল্পনীয়।  প্রধানমন্ত্রী যেকোনো উপায়ে নাশকতা দমনে নিজে সব দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার এ ঘোষণা শুধু বিস্ময়কর নয়, উদ্বেগজনকও। কারণ, পুলিশ ও র‌্যাবের বিরুদ্ধে যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে, তার দায়দায়িত্ব কি তিনি নেবেন? আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এসব অপরাধের দায় জেনেবুঝে কেন তিনি নেবেন, তা বোধগম্য নয়।  এ কথা সত্য, দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই সমস্যা আইনশৃঙ্খলাজনিত নয়, সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধান করতে হবে রাজনৈতিক উপায়েই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার অতীতে সমাধান হয়নি, বর্তমানেও হবে না।  আমরা আশা করব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের সুস্পষ্ট বিধিবিধানের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশন দেয়া হবে। একই সাথে, চলমান সঙ্কট উত্তরণে দ্রুত আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেয়া জরুরি, যাতে দেশে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তার আশু অবসান ঘটে।

রহমান শেলীর ইজ্জতের রশি

ব্যক্তিজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা লেখালেখির প্রধান সহায়ক। সম্ভবত এ কারণেই আল মাহমুদ বলেছেন- গ্রাম বাংলাকে এত ভালোভাবে না দেখলে তিনি কবি হতে পারতেন না। শুধু পঠনই লেখালেখির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে না। তাই জসীমউদ্দীন বলেছেন- শুধু পড়ে নকশিকাঁথার মাঠের মতো কাব্যগ্রন্থ লেখার মতো জ্ঞানী সাহিত্যিক তিনি নন। ঠিক একই কারণেই হয়তো বলা যায়- কবি রহমান শেলীর ক্রাইম ফিকশন লেখার প্রচেষ্টা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগের সূচনা সাহিত্যের প্রথম ধাপে প্রবেশ করে ক্রাইম ফিকশন দিয়ে। তারপর দ্বিতীয় সাইন্স ফিকশন ধাপে প্রবেশ করে। আর পরবর্তী ও শেষ ধাপে সংযোজন হয় ক্লাইমেট ফিকশন। এভাবে সাহিত্যে গদ্যের স্পেসিফিকেশন বা নির্ধারণ অতীতে ছিল না। বিশেষত বাংলা সাহিত্যে ফেলুদার পর দ্বিতীয়বার ক্রাইম ফিকশনের প্রচলন হয়তো ইজ্জতের রশির মধ্য দিয়েই ঘটেছে। ক্রাইম ফিকশনের শাখা- গোয়েন্দা গল্প উপন্যাস, থ্রিলার উপন্যাস, আদালতের নাটক ও রোমহর্ষক ভয়ংকর অপরাধমূলক গল্প। ডিটেক্টিভ উপন্যাস ও গল্পে সাধারণত ঘটে যাওয়া ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও অপরাধের চিত্র উপস্থাপনের পাশাপাশি অপরাধীকে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা থাকে বা থাকে সমস্যার সমাধান। আর সাধারণ এ দিকগুলোর সঙ্গে শার্লক হোমস ও ফেলুদার মাধ্যমে আমরা ভালোভাবে পরিচিত। কিন্তু মূল ক্রাইম ফিকশনে থাকে ঘটনা ঘটে যাওয়ার চিত্র, অপরাধের চিত্রায়ন, অপরাধীর মোটিভ ও ডিকটেটশন। গোয়েন্দা গল্পের মতো এতে নির্দিষ্ট কোনো সমাধান নাও থাকতে পারে। আর তাই সাধারণত প্রশ্ন হতে পারে- এত ডিটেক্টিভ উপন্যাস বা গল্প থাকতে পাঠক কেনো ক্রাইম ফিকশন পড়বে। এ কারণটি অনুসন্ধান করতে রহমান শেলীর লেখক সত্তার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্বও ভূমিকা রেখেছে। দায়িত্ব নিয়েছেন বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সংযোজন করে সাহিত্যের আঙ্গিকে ও শিল্পে পরিবর্তন সাধনা করার। কিন্তু তার সফলতা কতটুকু- তা বলতে পারবে পাঠক। কারণ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্যাত্রিক মোদিয়ানো নোবেল বক্তব্যেই বলেছেন- পাঠক লেখকে আরও বেশি ভালোভাবে জানেন তার লেখা উপন্যাস পড়ে। এবার এই ছোটগল্প সংকলন বা ক্রাইমফিকশন সংকলন ইজ্জতের রশিতে আসা যাক। এখানে লেখক অধিকাংশ ঘটনার পেছনের ঘটনা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরেছেন- কী সংকেত ধরে পুলিশ যে কোনো সমস্যার সমাধান করে। যেমন ফটোগ্রাফি। এ গল্পটি পড়ার পর মনে হবে- কী রহস্যই না যেন পাঠকের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু পাঠ শেষে মনে হবে কোনো রহস্য নেই। রোমহর্ষক উত্তেজনা তৈরি করে এভাবে পাঠককে ধরে রাখার কৌশলটা হুমায়ূন আহমেদের। এ কৌশলটি যে ক্রাইম ফিকশনেও ব্যবহার করা যায়- তা সফলভাবে দেখিয়েছেন রহমান শেলী। সাকলাইনের জিডি গল্প পাঠের পর মনে হবে- এ তো ঢাকার সাধারণ মধ্যবিত্তের প্রতিদিন পুলিশি তদন্ত মামলা করে হয়রান হওয়ার চিত্র। এ ক্ষেত্রে বলা যায় স্পাই গল্পটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কারণ এতদিন আমরা শুধু গোয়েন্দাদের ছদ্মবেশে তথ্য সংগ্রহের গল্প শুনতাম। আর এ গল্পের বাস্তবতা উঠে এসেছে কীভাবে সিআইডি আত্মপরিচয় গোপন রেখে সত্য বের করার মতো দুঃসাধ্য সাধন করেন। কিন্তু এ গল্পটি পড়ে সহজেই লেখকের লেখার মাঝে এক ধরনের তাড়াহুড়ো ভাব অনুভব করা যায়। মনে হয় এ গল্পটি অনেক ক্ষেত্রে রিপোর্টিংয়ের কাছাকাছি। গল্পটি যদি এত তাড়াতাড়ি শুরু হওয়ার আগে শেষ না করা হতো, তবে আরও ভালো লাগত।
এতসব গল্পের মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পটি বলা যায় ট্রিপল জিরো। এখানে পুলিশের এসিপি আসাদ গাড়ি চোর চক্রের প্রধানের সঙ্গে রসালাপে মেতে ওঠে। এ গল্পটি সত্যিই অসাধারণ। কারণ এখানে রহমান শেলী নামের যে হাস্যোজ্জ্বল রসিক মানুষটির বাস্তব চরিত্র সরাসরি ফুটে উঠেছে। যদি লেখকের সঙ্গে কোনো পাঠকের পূর্বপরিচয় ঘটে, তবে তিনি সহজেই বলে দিতে পারবেন এটি লেখক নিজে। ইজ্জতের রশি গল্পটিও এ ক্ষেত্রে কম যায় না। লেখক ইচ্ছে করলে এ গল্পটির সমাপ্তি টানতে পারতেন। কিন্তু তিনি টানেননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন- পুলিশ নয়, পুলিশের স্ত্রী ও পরিবার-পরিজনই মূলত পুলিশের মান-সম্মানের রক্ষক। আর ইজ্জতের রশি হচ্ছে তারই প্রতি ইঙ্গিত। অন্যদিকে সপ্তম গল্প মোডাস হচ্ছে সমাজে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া ভুলগুলোর একটি। কারণ লেখক লেখেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তিনি কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে হলের ছাত্রদের মাধ্যমে কীভাবে অপরাধ সংগঠিত হয়, তার ধারণা অনেকেরই নেই। এ বাস্তবতা বুঝাতে তিনি সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন- কারা ঘটনার অনুঘটক। রাজনীতির বিষাক্ত গোখরা কীভাবে দংশন করে নিজের প্রয়োজনে শিক্ষা ব্যবস্থাকে, তার বাস্তব উদাহরণ এ গল্প। শুধু তাই নয়, নামকরণেও আমরা এক ধরনের কাব্যিক ভাবের ভূমিকা পাই এ বইয়ে। যেমন একটি আত্মহত্যার হত্যা। অর্থাৎ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়া একটি মেয়েকে কীভাবে মা মানসিক সমর্থন দিয়ে বাঁচাতে পারেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সামাজিক পটভূমি ভেঙে-গুঁড়িয়ে দিয়েই মূলত সাহিত্য সম্ভব নয়। বরং সাহিত্য হচ্ছে সমাজের কাঠামোর দুর্বলতা ও বাস্তবতা বোঝানো। যেমন নাগরিক বাস্তবতা বুঝে আসে হুমায়ূনের হিমুর মাধ্যমে, তেমনি অপরাধ বাস্তবতা বুঝতে হলে আমাদের কিছুটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে ক্রাইম ফিকশন ইজ্জতের রশি। অবশেষে বলব- একটু সময় নিয়ে যদি লেখক আবার গল্পগুলো দেখেন- তবে হয়তো বাংলা সাহিত্যের জন্য আমরা অনন্য সংযোজন পাব বলে আশা করতে পারি।
বই
ইজ্জতের রশি
রহমান শেলী

রাজাকার by শাহাবুদ্দীন নাগরী

পাকিস্তানি বাহিনীর সেনারা দখল করে নিলে মানুষশূন্য হয়ে যাওয়া মহকুমা শহরটা আবার মানুষজনে ভরে ওঠে। সরকারি অফিসগুলো চালু হয়, কিছু মিল-কারখানায় কাজ শুরু হয়, স্কুল-কলেজ খোলে, দোকানপাট চালু করে দোকানিরা। খুব অল্প গাড়ি চলাচল শুরু হয়, বেশিরভাগই আর্মির জিপ, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স, কিছু রেডক্রসের গাড়ি। রিকশাও নামে রাস্তায়। শহরের লোকজনের এক কথা, মাস শেষে কারও হাতে টাকা-পয়সা ছিল না। আগে পেট বাঁচাতে হবে, তারপর যা হওয়ার তা হবে। চেনাজানা রাজনৈতিক লোকজন প্রথমদিকে ইপিআরের জওয়ানদের সঙ্গে ব্যারিকেড দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরোধ দেয়ার চেষ্টা করলেও প্রস্তুতি তেমন না থাকার কারণে পেছনে হটে গেছে সবাই। পদ্মা পার হয়ে ওদের অনেকেই সীমান্তের দিকে চলে গেছে। কেউ কেউ শিবগঞ্জের দিকে। আবদুল্লাহ যায়নি। বাজারে ওর একটা মুদি দোকান আছে। বাসায় বৌ আর ছোট দু’টো বাচ্চা আছে। এই দোকানের আয়ই তার একমাত্র ভরসা। হাতে টাকা-পয়সা থাকলে নরেনের পরিবারের সঙ্গে ও ভারতে চলে যেতে পারত, যারা গেছে তারা ওকে অনুরোধও করেছিল। কিন্তু তেমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই কঠিন কাজ ছিল আবদুল্লাহ্র জন্য। ভাগ্যকে তো আর পানির স্রোতে ভাসিয়ে দেয়া যায় না। ওপারে কে আছে তার? এলাকার অনেকে আশাবাদী ছিল যে মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর যে আলোচনা ঢাকায় চলছে তা থেকে একটা ফলাফল পাওয়া যাবে। বাঙালির দাবির কাছে পশ্চিমাদের মাথানত করতেই হবে। কারণে সংসদে বাঙালির মেজরিটি ডিসেম্বরের ইলেকশনে নির্ধারিত হয়ে গেছে। পাকিস্তান টিকে থাকবে পূর্ব পাকিস্তানের এই ফলাফলের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে। মার্চের ওই সময়গুলোতে খুব আড্ডা চলত তার মুদি দোকানে। সবই রাজনৈতিক আলোচনা। পাশের দোকান থেকে চা আসত কাপ-কাপ, কলিমুল্লাহ্র চায়ের দোকান, গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে গরম আলোচনা চৈত্রের গরম বাতাসে মিশে যেত। এখন এক বিষণœ নীরবতা। সব সুনসান।
আবদুল্লাহ্ দোকান খোলে, দোকানের ওপর বাঁশের আগায় উড়িয়ে দেয় পাকিস্তানের পতাকা। মাথায় টুপি পরে। দাড়ি সে কখনও রাখার কথা চিন্তা করেনি আগে, এবার সেটাও রেখে দেয়। অন্তত নাপিতের পয়সাটা তো বাঁচবে। তাছাড়া, অরুণ শীল দোকান বন্ধ করে ওইপারে চলে যাওয়ায় চুল-দাড়ি কাটাও এখন সমস্যা হয়ে পড়েছে। তাই একমাত্র সমাধান ক্ষৌরকর্মে না যাওয়া।
দোকানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র ছবি টাঙিয়ে দেয় আবদুল্লাহ্। বাজারে এই দু’জনের ছবি কেনার হুড়োহুড়ি দেখে নিজেই তাজ্জব হয়ে যাচ্ছিল। কদিন আগেও যাদের ছবি নামিয়ে ভেঙেছে, থুতু দিয়েছে, অবলীলায় তা আবার পয়সা খরচ করে কিনে লাগাচ্ছে। কাচ বাঁধানো ছবি। ইয়াহিয়া নিজেও হয়তো জানে না তার ছবি কিনছে বাঙালিরা, দোকানে ঝুলিয়ে সম্মান দেখাচ্ছে তাকে। আহারে মানুষ।
দোকান খুলতেই প্রাণে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো লাফিয়ে পড়েছে ওর দোকানে। চাল চাই, ডাল চাই, ছাতু চাই, মরিচ-পেঁয়াজের অত চাহিদা না থাকলেও কেরোসিন, লবণ আর দিয়াশলাই হু-হু করে বিক্রয় হচ্ছে। আবদুল্লাহ্ জানে, দু’চার দিনে তার স্টক শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ঢাকা-রাজশাহীর সঙ্গে এখনও যোগাযোগ না হওয়ায় সাপ্লাই থাকবে না।
এখন ডিমান্ড বেশি, সাপ্লাই জিরো।
মাগরিবের আজানের পরপরই দোকান বন্ধ করে দেয় সে। বাসায় ফিরে যায়। হারিকেনটার সলতেটা ছোট করে দেয়, যেন আলো বাইরে না যায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাকিস্তানি সৈন্য। সন্ধ্যা হলে মেশিনগান উঁচিয়ে বালির বস্তার পেছনে বসে থাকে। মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠা ‘হল্ট’ শব্দটা উড়িয়ে নিয়ে আসে ভারি বাতাস। প্রায় প্রতিদিনই দূর থেকে ফুটফাট গুলির আওয়াজ শোনা যায়। কে যে কাকে মারছে তা বোঝা যায় না। এক ধরনের ভয় চেপে বসে আবদুল্লাহ্র মনে। তার আশপাশের বাসাগুলো ফাঁকা, তবে পাড়ায় কিছু লোক এখনও আছে। একটু দূরে থাকে ওরা। আবদুল মজিদ আছে, নামকরা মুসলিম লীগার। দলবল নিয়ে হেঁটে বেড়ায়।
লোকটা একদিন তার দোকানে এসেছিল সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে। ‘কী খবর আবদুল্লাহ্, ওপারে যাওনি? সবাই তো ইন্ডিয়া ভাগতেছে।’ ‘মজিদ ভাই কী যে বলেন। আমরা পাকিস্তানের মানুষ, ইন্ডিয়া যাব ক্যান?’
‘তোমার কথা শুইনা খুশি হইলাম মিয়া। আইজকাল মানুষ তো আর পাকিস্তানরে দ্যাশ মানে না, কয় বাংলাদেশ। তুমি তো মিয়া ভালোই বললা।’
কলিমুদ্দিনের দোকান থেকে চা আসে। বেঞ্চিতে বসে আবদুল মজিদ। চা খায়। ‘শোনো, মেজর সাহেবের সঙ্গে আমি কথা বলছি। চিন্তার কুনু কারণ নাই। তোমরা যারা পাকিস্তানরে ভালোবাসো, তাদের একটা তালিকা আমি তাকে দিবো। তোমাদের যাতে কুনু অসুবিধা না হয় সেটা দেখার দায়িত্ব সেনাবাহিনী নিবে।’ আবদুল মজিদ আরও কী কী সব বলে।
‘তো মিয়া, তুমি মাথায় টুপি দিয়া ভালোই করছো। মুসলমান হয়া মাথায় টুপি দিবা না, এইটা ঠিক না।’
নিজের মাথার টুপিটা হাত দিয়ে একটু নেড়েচেড়ে আবার বসায় আবদুল মজিদ। তার দলের সবার মাথায় টুপি। বেশ একটা ইসলামী আমেজ ফুটে উঠেছে।
‘নরেন ব্যাটা একটা আস্তা ইন্ডিয়ান এজেন্ট। ইন্ডিয়া গেছে, কিন্তু পুরা বাড়িটা সাফ কইরা নিয়া গেছে। একটা সুইও রাখে নাই।’
মিথ্যা কথাটা শুনেও আবদুল্লাহ্ চুপ করে থাকে। নরেন চক্রবর্তী চলে যাওয়ার সময় ওর সামনে দিয়েই গেছে। পরনের কয়টা কাপড় ছাড়া আর কিছুই নিতে পারেনি। চুলোর ওপর ভাত ফুটছিল, সে ভাতটা খাবারও সময় হয়নি ওদের। কামানের গোলা এসে পড়ছিল চতুর্দিকে। বাঙালিকে তাড়ানোর জন্য মেশিনগানের গুলি সাঁই সাঁই করে ছুটে যাচ্ছিল চারপাশ দিয়ে। এমন গোলাগুলি ওরা জীবনে দেখেনি। আসলে নরেন চক্রবর্তী চলে যাওয়ার পর তার ঘর লুট করেছে আবদুল মজিদের লোকেরা। এ খবর তার কানেও এসেছে। এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো।
শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে সভা করে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, ন্যাপ এবং আরও অন্যান্য পার্টির লোকেরা। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রক্ষায় তারা জনমত সংগ্রহে নেমে পড়েছে। একেই বলে রাজনীতি, আবদুল্লাহ্ বোঝে। যখন যার ক্ষমতা তখনই তার দাপট। পহেলা মার্চের পর এসব লোক ইঁদুরের মতো গর্তে পালিয়ে ছিল। এখন বীরদর্পে মঞ্চ দখল করেছে। বাঙালিকে ১৯৪৭ সালের গল্প শোনাচ্ছে।
আবদুল্লাহ্ মনে মনে হাসে।
দিন যায়, পাকিস্তানি বাহিনীর আগ্রাসন বাড়ে। পুরো দেশটাই মনে হয় দখল করে নিয়েছে পাঞ্জাবিরা। প্রথম প্রথম যারা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল তারা কেউ আর দেশে নেই। হয় মারা পড়েছে, না হয় ওপারে চলে গেছে। ওয়াসেক মোল্লা, মোবারক হোসেন, কামাল বিশ্বাস, ঈমান আলী, আবদুল মজিদরা সংঘবদ্ধ হয়েছে। মহকুমা অফিসারের কাচারিতে মেজর সাহেবের ক্যাম্প। ওরা প্রায় প্রতিদিনই দল বেঁধে ক্যাম্পে যায়। নানা শলাপরামর্শ করে। নানা ফরমান জারি হয়।
নির্দেশ আসে আইডেন্টিটি কার্ড বানাতে হবে। লোকজন বলে ডান্ডি কার্ড। স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলে এলাকার সবাই, তারপর আবদুল মজিদের বাসায় যায় বাজারের লোকজন। সরকারি ফরমান অনুযায়ী সবার কাছে ডান্ডি কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক। রাস্তাঘাটে আর্মি নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, সেই বিড়ম্বনা এড়াতেই ডান্ডি কার্ডের প্রচলন করা হয়েছে। যাদের কাছে কার্ড পাওয়া যাবে না, তাদের ধরে নিয়ে যাবে আর্মি। কিছু পুলিশ আছে, টহলও দিচ্ছে, কিন্তু শাসন আর্মির, পুলিশের মূল্য কী? আবদুল মজিদ দায়িত্ব পেয়েছে ডান্ডি কার্ড ইস্যু করার।
একদিন সকালে দোকান খুলতে খুলতে কলিমুল্লাহ ফিস ফিস করে বলে, ‘স্বাধীন বাংলার রেডিও হয়্যাছে, শুনেছো?’ ‘কোথায়?’ ‘ক্যানো, শুনোনি?’
‘না তো?’ ‘বাসায় রেডিও আছে?’ ‘আছে।’
‘আজকে শুইনবা।’ আবদুল্লাহ আর বেশি কথা বলে না। রেডিও পাকিস্তান কিছুক্ষণ পরপরই আজকাল নসিহত করছে, দেয়ালেরও কান আছে। কোথায় কে কার কথা শোনে, আর সেটা পাকিস্তানি ক্যাম্পে পৌঁছে দেয় বলা মুশকিল, তখন জান নিয়ে টানাটানি। পাকিস্তান আর্মির লোকজন বাঙালিকে বিশ্বাস করে না, কোনো কথাই শোনে না ওরা, তথ্য পেলেই কাচারির পাশে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি আছে, সেখানে নিয়ে গিয়ে টর্চার করে। তারপর রাতের আঁধারে মহানন্দা নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে ব্রাশফায়ার করে লাশ ঠেলে দেয় নদীতে। মানুষজন অনেক লাশ দেখেছে নদীতে ভাসতে। গ্রীষ্মকাল বলে নদীতে পানি কম, লাশগুলো তাই ধীরগতিতে যায়। আতংকে কেউ কিছু বলে না। আল্লাহ্ আল্লাহ্ করে।
চৌরাস্তায় সেদিন সদর কলেজের এক প্রফেসরকে আটক করেছিল আর্মিরা। বাংলার অধ্যাপক। উর্দু-ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বলা কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি খান সেনারা। ‘কেয়া কারতা?’
‘বাংলা পড়াতা স্যার।’
সৈনিকগুলোকেও স্যার বলেছিল প্রফেসর। কিন্তু সব ছাপিয়ে খান সেনাদের কানে ‘বাংলা’ শব্দটাই ঢুকেছিল বোধহয়। আর কোনো কথা শোনার আগ্রহ দেখায়নি ওরা। চোখ বেঁধে হাত পিছমোড়া করে পাঠিয়ে দিয়েছিল টর্চার সেলে। তিন দিন পর তার লাশ নদীতে ভাসতে দেখেছিল লোকজন।
আবদুল্লাহ্ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে একটা। ছোট বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে তাকায়। তার বউয়ের বয়স ত্রিশও হয়নি। তার মুখের দিকে তাকানো যায় না। আতংকে কেমন সিঁটিয়ে থাকে সব সময়। ওরা শুনেছে, সোমত্ত মেয়েদের ধরে ধরে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে অখণ্ড পাকিস্তানের দাবিদার বাঙালিরা। প্রতিদিন এপাড়া-ওপাড়া ঘেরাও দিয়ে মেয়েদের আর যুবকদের খুঁজছে। যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা আর ফিরে আসে না। সের-সের গরুর মাংশ আর রুটি যাচ্ছে অফিসারদের জন্য, আবদুল মজিদরাই সাপ্লাই দিচ্ছে সব। সারারাত ক্যাম্পে উৎসব চলছে। অন্ধকার শহরের বিপরীতে এমন দুর্লভ চিত্র খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। পাখির জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা, আবদুল্লাহ্র কষ্ট হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই তার। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়ায় সাধ্য কার?
শহরে শান্তি কমিটি গঠিত হয়। রাজাকার বাহিনীতে অশিক্ষিত যুবকদের আহ্বান জানানো হয় পাকিস্তান রক্ষায় কাজ করার জন্য। মাসে বেতন তিনশ’ টাকা। আবদুল মজিদ একদিন ডেকে পাঠায় আবদুল্লাহ্কে। ‘দোকানে মাসে আয় কতো?’ আবদুল্লাহ্ ঠিক বুঝতে পারেনি কেন তাকে এমন প্রশ্ন করা হচ্ছে। ‘এই ধরেন গিয়ে, দিয়ে-থুয়ে দুইশ’ টাকা তো হয়।’ ‘তুমি মিয়া তিনশ’ টাকা পাইবা, রাজাকার বাহিনীতে যোগ দ্যাও।’
আকাশ বাণী কলকাতা আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চুপ চুপ করে লো-ভলিউমে শোনে আবদুল্লাহ্। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আর ইভা নাগ বাংলাদেশ নিয়ে নানা খবর দেয়। মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছে এ খবর ওখানেই শুনেছে সে। রীতিমতো ট্রেনিং নিয়ে ওরা যুদ্ধে নেমেছে। তাছাড়া, গেরিলা বাহিনী দেশের ভেতরে ঢুকে গেছে। মানুষজনের ভেতর থেকে আচমকা ওরা গ্রেনেড বা বোমা মেরে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বহু খানসেনা মারা যাচ্ছে। পুল-ব্রিজ ধ্বংস করে দিচ্ছে মুক্তিবাহিনী। যেসব রাস্তা দিয়ে পাকিস্তানিরা গোলাবারুদ আর রসদ নিয়ে যাচ্ছে সেসব জায়গায় অতর্কিত অ্যামবুশ করছে ট্রেনিং নেয়া ছেলেরা।
ওপার থেকে তার কাছে খবর পাঠিয়েছিল জয়নাল। যে লোকটা খবর নিয়ে এসেছিল তাকে আবদুল্লাহ্ কখনও দেখেনি। লোকটা মনে হয় মুক্তিবাহিনীর লোক। তার চোখের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। আবদুল্লাহ্র তখন মনে হয়েছিল, মুক্তিবাহিনীর চোখে বোধহয় আগুনই জ্বলে। জয়নাল বলেছিল লোকটাকে সহায়তা করতে। শান্তি কমিটির লোকজনদের চিনিয়ে দিতে। ওরা ওদের শেষ করে দেবে। জয়নাল দিনাজপুরে যুদ্ধ করছিল তখন। লোকটা পরে একদিন নিজেই বলেছিল, ও মুক্তিবাহিনীর লোক। ওদের দল আছে শহরের আশপাশে। বাড়ি নোয়াখালী। ওরা চাইছিল স্থানীয় লোকজনের সহায়তা। সাহায্য-সহযোগিতা পেলে ওদের কাজ করতে সুবিধা হবে।
আবদুল মজিদের প্রস্তাবে তাই একটা ঠোক্কর খেয়েছিল আবদুল্লাহ্।
‘মজিদ ভাই, ভাবতে একটু সময় দেন।’
‘যাও, সময় দিলাম। কিন্তু না করবা না। বোঝোই তো, তিনশ’ রাজাকার রিক্রুট করার অর্ডার দিছে মেজর সাহেব। তোমরা না করলে তোমাদেরই ক্ষতি হবে।’ ‘কিসের ক্ষতি?’ চমকে উঠেছিল আবদুল্লাহ্। ‘সময় হইলে বুঝবা মিয়া।’ কথার ভেতর একটা তাচ্ছিল্য ছিল তার। আবদুল্লাহ্ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘দোকান বন্ধ করে পাকিস্তান পাহারা দিতে হবে?’ ‘পাকিস্তান তোমারে পাহারা দিতে হবে না, সেজন্যে আল্লাহ্তায়ালা আছেন। তোমরা রাজাকাররা পুল-ব্রিজ পাহারা দিবা আর মেজর সাহেবদের খেদমত করবা। পারবা না?’ ‘পারবা না’ শব্দটা খেঁকিয়ে ওঠার মতো মনে হয়েছিল আবদুল্লাহ্র। কিন্তু কিছুই করার নেই তার। রাজাকার বাহিনীতে যোগ না দিলে তার পরিবারের ওপর আঘাত আসতে পারে। আনারকলিকে পাড়ার সবাই চেনে। নিজের বৌ বলে নয়, আবদুল্লাহ্ জানে তার ঝকঝকা চেহারা যে কারও চোখে লাগার মতো। আনারকলির বিপদ হতেই পারে। মজিদ-মোল্লা-ঈমান আলীরা যা করছে তা কোনো মানুষে করে না।
জয়নালের পাঠানো লোকটা আবার আসে তার দোকানে। নাম তার দেলওয়ার। দেলওয়ার আবদুল্লাহ্কে বোঝায় এলাকায় নতুন বলে অনেকে তাকে দেখে সন্দেহ করতে পারে। সে যেন তাকে তার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই বলে পরিচয় দেয়। ডান্ডি কার্ড তার আছে। ভয় নাই। ঠিকানাটা শুধু মুখস্থ করে নিতে হবে তাকে। আর তার প্রয়োজনমতো কাজ করলে তার পরিবারের ওপর নজর রাখা মুক্তিবাহিনীর দায়িত্ব। দু’জনে ফিসফিস করে আরও কী সব শলাপরামর্শ করে।
দু’দিন চিন্তা-ভাবনা করে আবদুল্লাহ্ রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। রোজ সকালে উঠে পুলিশ লাইনে যায়, প্যারেড করে। লুঙ্গির ওপর খাকি শার্ট, কোমরে গামছা পেঁচিয়ে নিতে হয়। কাঁধে একটা দু’নলা বন্দুক। ডিউটির কোনো টাইম নাই। যখন-তখন ডাক পড়ে। রাস্তায়, নদীর ঘাটে, বাজারে, সরকারি অফিসের সামনে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ক্যাম্পে গেলে খাওয়া-দাওয়া ফ্রি। মাছ-মাংস কোথা থেকে যে আসে আল্লাহ্ জানেন। মাস গেলে নগদ তিনশ’ টাকা। দু’তিন মাস ভালোই চলে যায় আবদুল্লাহ্র। কিন্তু মনটা তার উসখুস করে। ভালো করে ঢোক গিলতে পারে না, মনে হয় গলায় কাঁটা আটকে গেছে। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে উদয় হয় দেলওয়ারের। ‘ভাই কি কিছু ভাবলেন?’ দু’জনে ফিসফিস করে আবার। আনারকলি আড়াল থেকে শোনে। বাচ্চা দু’টোকে বুকের কাছে চেপে ধরে। আগস্ট মাসের দিকে পানি বাড়ে নদীতে। বৃষ্টি শুরু হলে আর থামার লক্ষণ দেখা যায় না। একনাগাড়ে কয়েকদিন বৃষ্টি হলে খালেও পানি বাড়ে। তখন জেলা শহরের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী রাস্তাগুলোর উপর সিএন্ডবি’র তৈরি কালভার্টগুলো ঝুঁকিতে পড়ে যায়। মেজর সাহেব এলাকার শান্তি কমিটির লোকদের নিয়ে জরুরি সভা করেন। রাস্তাঘাট অরক্ষিত রাখা যাবে না। রাজাকারদের টহল বাড়াতে হবে। আবদুল্লাহ্ শুনেছে পাকিস্তানের সেনারা পানিকে নাকি খুব ভয় পায়, অনেকে সাঁতারও জানে না। তাছাড়া, সাপখোপ এবং জোঁকের উপদ্রব সামলাতে পারলেও মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় তারা একেবারে কাবু হয়ে গেছে। তাই মেজর সাহেবের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতের বেলা পাকিস্তানের গর্বিত সেনাবাহিনী বাংকারে এবং ক্যাম্পে থাকবে, বাইরে পাহারা এবং টহলের কাজ করবে বাঙালি রাজাকাররা। শহরের ভেতর কিছু বোমা ফাটা ছাড়া যদিও এখনও কোনো বড় অঘটন ঘটেনি।
আবদুল্লাহ্ রাত-বিরেতে ডিউটি করে বেড়ায়। পুল পাহারা দেয়। বিদ্যুৎ অফিসে, টেলিফোন অফিসে ডিউটি করে। একদিন মেজর সাহেবের কাচারি বাড়ি পাহারা দিতে হয় তাকে। আজ এখানে, তো কাল ওখানে। ভালোই ডিউটি, মনে মনে হাসে আবদুল্লাহ্।
রাজাকার কমান্ডার লতিফ খুব চালু। মুসলিম লীগ করে। গত বছর ইলেকশনের সময় এক ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কিছু লোক তাকে পিটিয়েছিল। ভাঙা পা নিয়ে বিছানায় পড়েছিল দুই মাস। কমান্ডার হওয়ার পর প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছে। ওইসব লোকের বাড়ির একটা একটা করে ইট খুলে নিয়ে এসেছে, তারপর বসতভিটায় মই চালিয়ে সবজির ক্ষেত বানিয়েছে। সারাক্ষণ পান খায়, তার কষ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে লতিফের। সেই কষ দেখতে রক্তের মতো মনে হয় আবদুল্লাহ্র, মনে হয় জীবন্ত রাক্ষস।
‘কী ভাই আবদুল্লাহ্, তুমি ডিউটিতে ফাঁকি দিতেছো মনে হয়।’
লতিফের কর্কশ কণ্ঠস্বর। ‘ক্যান ভাই? ডিউটিতো পুরাই দিতাছি।’ ‘না মানে, তুমি যেদিন যেখানে ডিউটি দ্যাও, পরদিন সেইখানে ইন্ডিয়ান এজেন্টরা বোমা মারে। কেইস কী?’
‘আমি যেদিন ডিউটি দেই সেইদিন তো মারে না। তাইলে আমার দোষ কোথায়? যারা ডিউটি দেয় তাদের কন।’
আবদুল্লাহ্ জোর দিয়ে কথা বলায় একটু ভড়কে যায় কমান্ডার।
‘আরে না মিয়া, এমনিই কইলাম আর কী। পাকিস্তান রক্ষায় তোমার যে অবদান তুমি রাখতেছো, আমার সঙ্গে সঙ্গে জাতি তোমাকেও সেইভাবে স্মরণ করবে।’
আবদুল্লাহ্ এতদিনে বুঝে গেছে শক্তের ভক্ত নরমের যম কাকে বলে। নরম মানুষকে সবাই চিবিয়ে খায়। লতিফ কমান্ডার সুযোগ পেলেই ঘায়েল করতে চায় সবাইকে। মনে করে তার ক্ষমতাই বেশি। আসলে কার যে কোথায় ক্ষমতা সেটা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন। তবুও আবদুল্লাহ্ নজরে রাখে লতিফ কমান্ডারকে। সাপের জাত। কখন ছোবল দেবে কেউ জানে না। তাকে সুযোগ দেয়া যাবে না। সে বুঝতে পেরেছিল লতিফের কান ভারি করা কথায় তার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল মেজর সাহেব। সেদিন বাজারে তার ডিউটি ছিল। ওই বাজারে মেজর সাহেবের গাড়ির কাছাকাছি একটা বোমা বিস্ফোরণ হওয়ায় মেজর সাহেবকে তার কথাই বলা হয়েছিল। ভাগ্য ভালো ছিল তরুণ পাঞ্জাবি মেজর সাহেবের, জীবনে কী পুণ্য করেছিল কে জানে, তার গাড়ির ছাদে পড়া বোমাটা বিস্ফোরিত হয়নি। গাড়ি দ্রুত চলতে শুরু করলে ফাটা বোমাটা তার নাগালে পৌঁছুতে পারেনি। ভাগ্য ভালো আবদুল্লাহ্রও, মেজর সাহেবের কিছু একটা হয়ে গেলে তার জন্য একটা বুলেট খরচ করতে ওরা দ্বিধা করত না। কিন্তু সে জেরার মুখে পড়েছিল, নানা প্রশ্নে তাকে জর্জরিত করেছিল ক্যাপ্টেন সাহেব। সে থরথর করে কাঁপছিল। মৃত্যু দাঁড়িয়ে ছিল তার পাশে।
আজ সন্ধ্যা থেকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ ঘিরে আছে ঘন কালো মেঘ। আর পাঁচটা দিনের মতোই আর্মি অফিসাররা সুরায় ডুবে আছে কাচারি ক্যাম্পে। সুনসান রাস্তাঘাট। মাঝে মাঝে ‘হল্ট’ শব্দটি সচকিত করে দিচ্ছে সজাগ মানুষগুলোকে। আবদুল্লাহ্র ডিউটি পড়েছে কাচারি ক্যাম্পের সামনের রাস্তায়। যদিও ক্যাম্পের প্রবেশমুখে চারজন সৈন্য মেশিনগান নিয়ে পাহারায় আছে। লতিফ কমান্ডার এসে একবার ডিউটি চেক করে গেছে। ‘মিয়া, চোখ-কান খোলা রাখবা।’
চোখ-কান খোলাই রেখেছে আবদুল্লাহ্। কাচারি বাড়ির পেছনে একটা আমবাগান। বেশ বড় আমবাগান। ওখানেও বাংকার করে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেয় সৈনিকরা। বাগানের সঙ্গে কাচারিবাড়ির দেয়ালটা ছিল চার ফুট উঁচু, সেটাকে সাত ফুট উঁচু করা হয়েছে। দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকা এখন বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। তাছাড়া, সার্চলাইট বসিয়ে পুরো দেয়ালটাকে দিনের মতো আলোকিত করে রাখা হয় সন্ধ্যা হলেই। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দলের অন্যদের রাস্তার ডিউটিতে রেখে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ গান গাইতে গাইতে আবদুল্লাহ্ পেছনটা ঘুরে এসেছে একবার।
রাস্তায় ফিরে এসে সে একটা সিগারেট ধরায়। বগলা সিগারেট। আজ সে এক প্যাকেট কিনেছে। অথচ আবদুল্লাহ্কে কেউ কোনোদিন সিগারেট খেতে দেখেনি। সে একটার পর একটা সিগারেট খেতে থাকে। তাই দেখে মিনু রাজাকার জিজ্ঞেস করেছে,
‘আবদুল্লাহ্ ভাই, সিগারেট খাইতাছো যে?’
এমন প্রশ্ন আসবেই। জবাবও প্রস্তুত ছিল তাই তার মুখে।
‘দেখতাছো না, কেমুন জার লাগতেছে, তাই শরীলডারে গরম কইরা নিতাছি।’ ‘সিগারেট খাইলে শরীল গরম হয়?’
‘হয় কি না, খায়া দেখো।’ একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়েছিল মিনুর দিকে আবদুল্লাহ্। ‘না-না, খামু না। মাথা ঘুরে।’ রাজাকারের একটা দল তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওরা পাঁচজন। বৃষ্টি বলেই হয়তো গামছা দিয়ে মুখের নিচ দিক ঢাকা। গায়ে চাদর। অন্য কোথাও ডিউটিতে যাচ্ছে হয়তো। আবদুল্লাহ্ চুপ করে থাকে। মিনু রাজাকার জিজ্ঞেস করে, ‘কারা যায়?’ ‘আমরা।’ আবদুল্লাহ্ স্পষ্ট বুঝতে পারে ওটা দেলওয়ারের কণ্ঠ। ‘আমরা কারা?’ ‘নতুন রাজাকার। চৌহালি থাইকা আইছি।’ ‘ও আচ্ছা।’ প্রশ্ন শেষ মিনু রাজাকারের। কিন্তু মুহূর্তেই পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা চাদরের তলা থেকে ছুরি বের করে বুক বরাবর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় আবদুল্লাহ্র সঙ্গে থাকা তিন রাজাকারের। মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশগুলোকে টেনে ড্রেনে ফেলে দেয়। আবদুল্লাহ্ হাত লাগায় ওদের সঙ্গে। মুহূর্তের মধ্যে দলটি কাচারি গেটে গিয়ে একই কাজ করে। চার সেন্ট্রির লাশ বালির বস্তায় চাপা দিয়ে দু’জন স্টেনগান হাতে দাঁড়িয়ে যায়, অন্য তিনজন সামনের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
পুরো ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। এক মিনিটের মাথায় ফিরে আসে ওরা। তারপর পাঁচজন একপ্রকার দৌড়ে তার কাছে আসে। পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা স্টেনগান হাতে তার সামনে দাঁড়িয়ে।
দেলওয়ারই বলে,
‘আবদুল্লাহ্ ভাই, মেজর শ্যাষ। গুলি খরচ করি নাই, তারেও খরচ করতে দেই নাই। ছুরি ঢুকায়া দিছি প্যাটে।’
সিগারেটের প্যাকেটটা ছুড়ে ফেলে দেয় আবদুল্লাহ্। দেলওয়ার এবং মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের কাছে তার সিগারেটের আগুন ছিল গ্রিন সিগন্যাল। তাদের অনেক দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে।
আর দাঁড়ায় না ওরা। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় করে ওরা দ্রুত সরে যেতে থাকে অবরুদ্ধ শহর থেকে। আবদুল্লাহ্ ওদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। পেছনে পড়ে থাকে তিন রাজাকার, পাকিস্তানি মেজর আর তার সৈনিকদের লাশ।
আনারকলি বাচ্চাদের নিয়ে এতক্ষণে নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে গোবিন্দপুর। রাজাকার আবদুল্লাহ্র খোঁজ পড়ার আগেই তাকে গোবিন্দপুর পৌঁছে যেতে হবে। সেখান থেকে সীমান্ত বেশি দূরে নয়।

দেশে দেশে বইমেলা by ইমরান মাহফুজ

মানব জীবনের ইতিহাসের মতো বইয়ের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। মানুষ যখন থেকে সভ্য হতে শুরু করেছে, নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছে তখন থেকেই বইকে আঁকড়ে ধরেছে। বইয়ের এ হাট-বাজারে, যাকে আজকে আমরা মেলা বলছি তা ঠিক কবে-কোথায় শুরু হয়েছিল; তার দিন তারিখ কোথাও লেখা নেই। তবে হাট-বাজার যে মুদ্র্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে বসেনি, তা নিয়ে মোটামুটি দ্বিমত নেই। কারণ মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে তো বই লেখা হতো হাতে। আর তা ছিল ঝামেলার কাজ। তাই সে সময় বই নিয়ে মেলা বা হাট-বাজারের কথা চিন্তাও করা যায় না। বই কেনা-বেচার হাট-বাজারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় মাত্র কয়েকশ বছর আগের কথা। খ্রিস্টীয় পনেরো শতকে গুটেনবার্গ মুদ্রণ যন্ত্রের সুবিধা ভোগ করতে শুরু করল মানুষ। আর এতেই ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকল বই। ফলে দেখা দিল বই বেচাকেনার জন্য নির্ধারিত স্থানের। আর তা থেকেই শুরু হল বইমেলা। সেই হিসেবে বিশ্বের প্রথম বইমেলা শুরু হয় জার্মানিতে। কারও কারও মতে জার্মানির লিপজিগ শহরে হয়েছিল প্রথম বইমেলা। আবার কেউ ধারণা করেন লিপজিগ নয়, গুটেনবার্গের শহর ফ্রাঙ্কফুর্টেই হয়েছিল বিশ্বের প্রথম বইমেলা। জার্মানি থেকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে বইমেলা। খ্রিস্টীয় ১৭ শতকের পর থেকে ইউরোপের আরও বিভিন্ন দেশ জার্মানির বইমেলার আদলে আয়োজন করতে থাকে মেলার। মানুষ নানারকম মেলার সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের মেলার সঙ্গেও পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে। ক্রমে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠতে থাকে বইমেলা। এখানে তুলে ধরা হল দেশ-বিদেশের কয়েকটি বইমেলার কথা।
একুশের বইমেলা
ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে অন্যরকম এক মূল্যবোধের মাস। এ মাসে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল বাঙালি। বিশ্বে এ এক বিরল ইতিহাস। বাঙালির স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সূচনা এ ফেব্র“য়ারি মাসে। চেতনার পরশ বুলিয়ে ফেব্র“য়ারিতে উৎসবের আমেজ এনে দেয় বাংলা একাডেমির অমর একুশের বইমেলা। এ মেলা এখন বাঙালির প্রাণের মেলা এ মেলা অনুষ্ঠিত হয় ফেব্র“য়ারিতে। চলে পুরো মাস। বইপ্রেমিকরা সারা বছর অপেক্ষা করেন এ মাসের জন্য। লেখক-প্রকাশক এবং প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট সবার নজর থাকে ফেব্র“য়ারিজুড়ে। মেলা চলে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে। আমাদের প্রকাশনা জগতে সারা বছরই বই প্রকাশ পায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বই প্রকাশ পায় মেলার মাসে। লেখকরাও এ মাসেই নিজেদের বই প্রকাশে আগ্রহ দেখান। কারণ, একসঙ্গে এত পাঠকের সামনে নিজের বইটি তুলে দেয়ার এমন সুযোগ আর দ্বিতীয়টি নেই। বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন অনেকে। তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য আমাদের বইমেলার নাম দেয়া হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আজকের বইমেলা শুরুতে এমন অবস্থায় ছিল না। তেমনি ছিল না এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ঠিক পরের বছর থেকে শুরু হয় বইমেলার। ১৯৭২ সালে মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ফেব্র“য়ারি মাসের ৮ তারিখে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনের বটতলায় তার প্রকাশনীর বই বিছিয়ে বসেন। সে সময় মুক্তধারার ছিল ৩২টি বই। বইগুলো ছিল বাংলাদেশের শরণার্থী লেখকদের লেখা। এ বছর বাংলা একাডেমিও একুশে ফেব্র“য়ারি উপলক্ষে বিশেষ মূল্য ছাড়ের মাধ্যমে তাদের বই বিক্রি করে। সেই শুরু থেকে একটানা ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তার প্রকাশনীর বই বিক্রির জন্য নিয়ে বসেন। ধীরে ধীরে এখানে লোক সমাগম বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে বইয়ের বিক্রিও। ফলে অন্য প্রকাশকরাও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অন্যরাও এগিয়ে আসতে থাকে তাদের বই নিয়ে। ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি এ মেলাকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি সরাসরি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে। ১৯৭৯ সালে বইমেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। তারপর থেকে প্রতিবছর ফেব্র“য়ারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা। কিন্তু ধীরে ধীরে মেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ায় মেলার সময় বাড়ানো হয়। এখন ফেব্রুয়ারিজুড়েই চলে একুশের গ্রন্থমেলা। দ্বিতীয় বছরের মতো বইমেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণসহ বাইরে বসছে খুব সুন্দরভাবে। উল্লেখ্য, প্রতিবছর ডিসেম্বরে ১০ দিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের বইমেলাও অনুষ্ঠিত হয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতকে। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারক ইয়োহানেস গুটেনবার্গ থাকতেন ফ্রাঙ্কফুর্টের সামান্য দূরের মেঞ্জ শহরে। তার আবিষ্কৃত ছাপাখানার যন্ত্র বইয়ের জগতে নিয়ে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি নিজের ছাপাখানার যন্ত্রাংশ এবং ছাপানো বই বিক্রির জন্য ফ্রাঙ্কফুর্টে আসেন। গুটেনবার্গের দেখাদেখি ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের স্থানীয় কিছু বই বিক্রেতাও তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে বসতে থাকে। আর এগুলো কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষও আসতে শুরু করে। সেই আসা-যাওয়া থেকেই জমে উঠতে থাকে ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালে এ মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় জার্মান প্রকাশক সমিতি। আর ১৯৬৪ সাল থেকে এ মেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। বছরের অক্টবরের মাঝামাঝি সময়ে মেলা শুরু হয়। মেলার সময়কাল পাঁচ দিন। মেলার আয়োজক জার্মান পাবলিশার অ্যান্ড বুক সেলার অ্যাসোসিয়েশন। প্রতি বছরই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার প্রকাশক, বিক্রেতা, লেখক, পাঠক, দর্শক ও সাংবাদিকের অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে ওঠে মেলা।
লন্ডন বইমেলা
প্রকাশনার দিক থেকে লন্ডন বইমেলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলার অন্যতম। তবে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো বড় না হলেও এ মেলার গুরুত্ব অনেক। সাধারণত বছরের মার্চ মাসে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তবে কখনও কখনও অক্টোবরেও মেলার তারিখ পরিবর্তন হয়, সেই সঙ্গে পাল্টে যায় মেলার স্থানও । যেমন ২০০৬ সালে মেলাটি হয়েছিল লন্ডনের অলিম্পিয়া এক্সিবিশন সেন্টারে আবার পরের বছর হয় ডকল্যান্ডের আর্ল কোট এক্সিবিশন সেন্টারে। আয়তনে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার সমান না হলেও নিজের গুরুত্ব ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে লন্ডন বইমেলা। গত বছর এ মেলায় বিশ্বের প্রায় একশরও বেশি দেশ থেকে ২৩ হাজার প্রকাশক, বই বিক্রেতা, সাহিত্য প্রতিনিধি, লাইব্রেরিয়ান, সংবাদমাধ্যম কর্মী অংশ নিয়েছিল। প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচারের জন্য, অন্য প্রকাশক থেকে বইয়ের স্বত্ব অথবা বইয়ের অনুবাদ স্বত্ব কেনা-বেচার জন্য প্রকাশকরা এ মেলায় অংশ নেয়। ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলার সঙ্গে এ মেলার বড় পার্থক্য হল- এটি প্রকৃত অর্থে প্রকাশকদের মেলা। এখানে সাধারণ পাঠকের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এখানে ভিড় করেন বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা।
কলকাতা বইমেলা
ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং লন্ডন বইমেলার পরের স্থানটি কলকাতা বইমেলার। সে হিসেবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। মেলা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারির শেষ বুধবার থেকে ফেব্র“য়ারির প্রথম রোববার পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। তবে মেলা আয়োজনের প্রথম দিকে এর মেয়াদ ছিল সাতদিন। জনপ্রিয়তার কারণে পরে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়। বইমেলা ছাড়া কলকাতাকে কল্পনা করতে পারে না কলকাতাবাসী। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মেলায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষের সমাগম হয়। সবদিক বিবেচনায় ২০০৫ সালে মেলার মেয়াদ সাতদিন থেকে বাড়িয়ে বারদিন করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং লন্ডন এ দুটি বইমেলার সঙ্গে কলকাতার বইমেলার পার্থক্য হল- এখানে পাঠকদেও গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। বই ব্যবসা এ মেলার মূল উদ্দেশ্য নয়। সেদিক থেকে কলকাতা বইমেলাকে বলা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অব্যবসায়িক বইমেলা। কলকাতা বইমেলার অফিসিয়াল নাম কলকাতা বইমেলা বা কলকাতা পুস্তকমেলা।
ভারতের দিল্লি ও হংকং বইমেলা ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে একথা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে, সারা বিশ্বে ক্রমেই বইয়ের প্রতি মানুষের আলাদা একটা টান তৈরি হচ্ছে। সেটা বিভিন্ন বইমেলার কারণেই হয়ে থাকে বলে অনেকের অভিমত।

অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ পেট্রলবোমা হামলার জবাব নয়: অ্যামনেস্টি

সম্প্রতি একের পর এক ভয়াবহ পেট্রলবোমা হামলার জবাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে পুলিশকে দায়মুক্তি দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার দেশটিতে এরই মধ্যে বিরাজমান সহিংস পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। চলমান সহিংস রাজনৈতিক বিক্ষোভের মধ্যেই কর্তৃপক্ষ এ ঘোষণা দেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ‘বাংলাদেশ: এক্সেসিভ পোলিস ফোর্স নট দি অ্যানসার টু হরিফিক পেট্রল  বম অ্যাটাকস’ অর্থাৎ ‘পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ভয়াবহ পেট্রল  বোমা হামলার জবাব নয়’ - শিরোনামে গতকাল প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত দুই ডজনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের হামলা বন্ধে ‘যখন এবং যেখানেই প্রয়োজন মনে হবে, সরকার প্রধান হিসেবে আমি (পুলিশকে) যে কোন ব্যবস্থা নেয়ার স্বাধীনতা দিচ্ছি’। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ বিষয়ক গবেষক আব্বাস ফয়েজ বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগে বা এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ঘটাতে এ ধরনের মন্তব্য পুলিশকে উন্মুক্ত আমন্ত্রণবার্তা পাঠানোর উচ্চ ঝুঁকি বহন করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীসমূহ অতীতে এ ধরনের ঘটনা ভয়াবহ মাত্রায় ঘটিয়েছে। পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে এক ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ অভিযানে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নেরও (র‌্যাব) সম্পৃক্ততা রয়েছে। অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে র‌্যাবের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি গত ১২ থেকে ২৮শে জানুয়ারির মধ্যে যে প্রাণহানির ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোকে ‘গুলি চালিয়ে হত্যা’ বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ। আব্বাস ফয়েজ বলেন, পুলিশি অভিযানের সময় এ প্রাণহানির ঘটনাগুলো- যার মধ্যে কিছু ঘটনা বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হিসেবে পরিগণিত হতে পারে- সে ঘটনাগুলোর অবশ্যই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত হতে হবে এবং দায়ীদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীসমূহের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু, এটা তাদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না এবং অতিরিক্ত বল প্রয়োগের আশ্রয় নেয়া কখনোই কোন অজুহাত হতে পারে না। আব্বাস ফয়েজ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও মানদ-ে পুলিশ শুধু সেই শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, যা নিতান্তই অপরিহার্য এবং ততোটা প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাঁচার অধিকারকে তাদের সব সময় সম্মান করতে হবে এবং আহত ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী প্রয়োগের অনুমতি তখনই দেয়া যাবে, জীবন বাঁচাতে যখন তা একান্তই অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র প্রতি আহ্বান জানিয়ে আব্বাস ফয়েজ বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) উচিত রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব অপরাধ কর্মকা- বন্ধে তাদের কর্মী ও সমর্থকদের আহ্বান জানানো। অপরাধ আইনে এ কর্মকা-সমূহকে নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা উচিত। সব পক্ষের উচিত জনসমক্ষে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতার নিন্দা জানানো এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে যে কোন তদন্ত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে তাদের সমর্থকদের উৎসাহিত করা।

সৌদি বাদশাহ সালমানের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল

সৌদি আরবের প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল এনেছেন তার সৎ-ভাই ও নতুন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সউদ (৭৯)। এরই মধ্যে বাদশাহের পক্ষ থেকে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে ৩১ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা। সিংহাসনে আরোহণের এক সপ্তাহ পর এ ঘোষণা দিলেন সালমান। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। এদিকে পৃথক এক রাজ-অধ্যাদেশে আবদুল্লাহর ভাইয়ের পুত্র যুবরাজ বানদার বিন সুলতানকে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাসচিব ও বাদশাহের উপদেষ্টার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রয়াত বাদশাহের দুই পুত্র যুবরাজ মিশাল ও যুবরাজ তুর্কিকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। যুবরাজ মিশাল মক্কা অঞ্চলের গভর্নর ছিলেন এবং যুবরাজ তুর্কি রাজধানী রিয়াদের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এদিকে ন্যাশনাল গার্ডের মন্ত্রী হিসেবে তার পদে বহাল রয়েছেন প্রয়াত আবদুল্লাহর পুত্র যুবরাজ মিতেব। সালমান ৩১ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছেন। সংস্কৃতি ও তথ্য, যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে এসেছে পরিবর্তন। তেল বিষয়ক মন্ত্রী আলি আল-নুয়াইমি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ সউদ আল-ফয়সাল ও অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-আসাফকে তাদের দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে।

মিশরে আইএসের সিরিজ হামলার দাবি: নিহত ২৭, আহত ৬৮

মিশরের উত্তর সিনাই ও সুয়েজ প্রদেশের কয়েকটি অঞ্চলে ৪টি জঙ্গি হামলায় কমপক্ষে ২৭ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই সেনা সদস্য। এ সিরিজ হামলায় আহত হয়েছে ৬৮ জনেরও বেশি। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মিশরভিত্তিক শাখা এ সিরিজ হামলার দায় স্বীকার করেছে। গতকাল রাতে এ হামলাগুলো পরিচালিত হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। উত্তর সিনাইয়ে সামরিক বাহিনীর সদরদপ্তর, সেনা ঘাঁটি ও হোটেল লক্ষ্য করে প্রথম বোমা হামলা চালানো হয়। সেখানে ২৫ জন নিহত ও কমপক্ষে ৫৮ জন আহত হয়। এর মধ্যে ৯ বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। এরপর সন্দেহভাজন জঙ্গিরা রাফা অঞ্চলের একটি চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর এক মেজরকে হত্যা করে ও ৬ জনকে আহত করে। এর আগে সুয়েজ শহরে রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমার আঘাতে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। আল-আরিশের দক্ষিণে অবস্থিত এক চেকপোস্টে হামলায় ৪ সেনা সদস্য আহত হন। এদিকে মিশর সামরিক বাহিনীর ফেইসবুক পেইজে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জঙ্গিদের চাপে রাখতে সেনাবাহিনীর সফল অভিযানের জবাবে জঙ্গিরা এ সিরিজ হামলা চালিয়েছে। এদিকে সিরিজ হামলার পর সিনাই প্রদেশ নামে একটি টুইটার অ্যাকাউন্টে একের পর টুইট-বার্তা আসতে থাকে। ওই বার্তাগুলোতে হামলার দায় স্বীকার করে বার্তা দিয়েছে মিশরে অবস্থিত আইএসের শাখা-সংগঠন। মিশরের সবচেয়ে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন আনসার বাইত আল-মাকদিস গত বছর ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে তাদের নাম পরিবর্তন করে রাখে সিনাই প্রদেশ। সিনাইয়ে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মিশর সরকারের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। তবে ক্রমাগত জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে চলায়, উদ্বেগে রয়েছে প্রশাসন।

‘পরিবর্তনের সূচনা’ by মিজানুর রহমান

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব পদে আকস্মিক পরিবর্তন সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দিল্লি সফরের সফল সমাপ্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশটির শীর্ষ কূটনীতিকের পদে এ পরিবর্তন এসেছে। বিদায়ী কংগ্রেস সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কূটনীতিক সুজাতা সিং ‘বরখাস্ত’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন সচিব এস জয়শঙ্করের দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করানোর মধ্য দিয়ে মোদি সরকার আসলে কি বার্তা দিতে চাইছেন? সেই পর্যালোচনাই চলছে ঢাকায়। খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন এ পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে। এটিকে ‘পরিবর্তনের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন তিনি। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে ওই বিশ্লেষক বলেন, এখনই এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য করার সময় আসেনি। ইটস টু আরলি। তবে এটা বুঝা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের বিষয়টি তার পছন্দের লোকদের হাত দিয়েই করতে চাইছেন। এক বছর কংগ্রেস সরকারের সেটআপ দিয়ে চালানোর পর হয়তো মোদি সরকার সেভাবে সুফল পাচ্ছিলেন না। এ পরিবর্তনের ফলে বিজেপি তার ফরেন পলিসির এজেন্ডাগুলো আরও ভালভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। মোদি সরকারের এজেন্ডা কি? বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রশ্নে সেটি বিবেচ্য হবে বলে মনে করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আরেক প্রফেসর, বিশ্লেষক আমেনা মহসিনের মতে, কংগ্রেস সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বিজেপি সরকারের নীতিতে ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে বাস্তবায়নের প্রশ্নে।
কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষ করে একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিতো। সেখানে মোদি সরকার ইকো-ডিসটেন্স বা সম-দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। তার ‘স্টেট টু স্টেট, পিপল টু পিপল’ সম্পর্কটা রাখার চেষ্টা করছে। ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ‘শুভেচ্ছা সফরে’ বাংলাদেশে আসা এবং সব দলের অংশগ্রহণের পরিবর্তে ‘বেশিরভাগ দলের অংশগ্রহণে এখানে নির্বাচন দেখার’ যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন সে প্রসঙ্গে ওই বিশ্লেষক বলেন, আমার মনে হয় একজন সচিবের এমনভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এটি পেশাদারিত্বের ঘাটতি বলেই মনে হয়েছে আমার।
তাকে সরিয়ে দিয়ে পররাষ্ট্র সচিবের পদে নতুন একজনকে নিয়োগের বিষয়টি একান্তভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সুজাতা সিংকে নিয়ে যে ‘বিতর্ক’ আর মোদি সরকারের ‘সমদূরত্ব নীতি’ ঠিক যাচ্ছিলো না। তার পরিবর্তনের নেপথ্য কি ঘটনা এটি স্পষ্ট হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করেন ওই বিশ্লেষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রফেসর তারেক শামসুর রেহমান মনে করেন বাংলাদেশ প্রশ্নে মোদি সরকারের যে নীতি নতুন পররাষ্ট্র সচিব সেটি জোরালোভাবে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। ওই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তির চেয়ে সরকারের ইচ্ছাই প্রাধান্য পায় মন্তব্য করে তিনি বলেন, সচিবের পদে পরিবর্তনের নীতিতে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। তবে এ পরিবর্তন যে ‘আরও বড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে’ সে বিষয়ে ভিন্নমত নেই তারও।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজীবনের জন্য হুমকি?

(বেশ কিছু ছবির মতো সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া অ্যালেক্স গার​ল্যান্ডের এক্স–মেশিনা চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দেখানো হয়েছে মানবজীবনের প্রতি হুমকি হিসেবে) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) রয়েছে এমন রোবট কিংবা সেবা মানবজীবনের জন্য হুমকি হতে পারে। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পদ্ধতি দারুণ কিছু উদ্ভাবন কিংবা নানা ক্ষেত্রে উন্নয়নে সহায়তা রাখছে এটি যেমন সত্য, তেমনি মানবজীবনের জন্যও এআই হুমকিস্বরূপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। মাইক্রোসফট রিসার্চের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের প্রধান এরিক হরভিটজ এ বিষয়ে বলেন, আমরা নানা ধরনের গবেষণা করে যাচ্ছি এবং দেখা যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিতে এ ধরনের বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণও একসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিষয়টি যে নাও ঘটতে পারে সেটিও উল্লেখ করে এরিক জানান, এমনই যে হবে এমনটাও নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি এআই পদ্ধতি গবেষণার ক্ষেত্রে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ইতিমধ্যে সাধারণভাবে যা করা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি এবং দারুণ সব কাজ হচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান থেকে শিক্ষা কার্যক্রম, অর্থনীতির নানা বিষয় থেকে সাধারণ জীবনযাপন, সবক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখছে এআই পদ্ধতি। এরিক এবং তার দল দীর্ঘ গবেষণা শেষে উইন্ডোজ ফোনের জন্য কণ্ঠনিয়ন্ত্রিত একটি ভার্চুয়াল সহকারী তৈরি করেছেন। ‘কর্টানা’ নামের এ সুবিধা উইন্ডোজ দশ অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে ডেস্কটপ কম্পিউটারেও পাওয়া যাবে। এরিকের মতে, এআই ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, এ যুদ্ধে বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর লড়াই হবে। যেমন ইতিমধ্যে গুগলের ‘গুগল নাউ’, অ্যাপলের ‘সিরি’ এবং উইন্ডোজের জন্য চালু হতে যাচ্ছে ‘কর্টানা’। অনেক সিনেমাতেও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পদ্ধতি ব্যবহারও হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধাগুলোকে ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিও নিজেদেরই নির্ধারণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। —বিবিসি অবলম্বনে কাজী আলম

কোনোভাবেই সচল রাখা যাচ্ছে না পরিবহন সেক্টর by আবু সালেহ আকন

কোনোভাবেই সচল রাখা যাচ্ছে না পরিবহন সেক্টর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের প্রহরার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনেই ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। পরিবহন সেক্টরকে সচল করতে গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে তিনজন পরিবহন নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পাঁচজন মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে পরিবহন সেক্টর সচল রাখতে আরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। পুলিশ-বিজিবির পাশাপাশি আনসার সদস্যদের মোতায়েন করার কথাও বলা হয় বৈঠকে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা বলেছেন, যেভাবে নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে তাতে পরিবহন সেক্টর সচল রাখা সম্ভব না। কোনো কোনো এলাকায় একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইতোমধ্যে দেড় হাজারের ওপরে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। হতাহত হয়েছেন বেশ কিছু পুলিশ। সর্বশেষ গতকাল চাঁদপুরে নিহত হয়েছেন এক ট্রাক হেলপার। ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের মধ্যে ৪০০-এর মতো গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তুম আলী খান বলেন, পরিবহন সেক্টরকে সচল করতে হলে আরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও চোরাগোপ্তাভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। দেখা যায় রাস্তার পাশ থেকে হঠাৎই হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চাচ্ছে এই সেক্টরকে সচল রাখতে। তিনি বলেন, কোনো কোনো এলাকায় সচল থাকলেও সব এলাকায় সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।  বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব মাহমুদুল আলম মন্টু বলেন, শ্রমিকেরা রিস্ক নিয়ে গাড়ি চালাতে রাজি নন। তিনি বলেন, সরকার যেভাবে নিরাপত্তা দিচ্ছে তাতে কাজ হচ্ছে না। ভয়ে অনেকেই গাড়ি নিয়ে এখন আর রাস্তায় নামছেন না। যাদের একেবারেই কোনো উপায় নেই তারা জীবনের রিস্ক নিয়ে রাস্তায় নামছেন। আবার কেউ কেউ দেখা যায় গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আবার ফিরে আসছেন। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারছেন না।  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবহন সেক্টরের অপর এক নেতা বলেন, এভাবে পরিবহন সেক্টর সচল রাখা যায় না। দীর্ঘ রাস্তায় কোনোভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না। দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ৩০-৪০টি গাড়ির একটি বহর নিয়ে যাত্রা শুরু করল। পথে যেকোনোভাবে একটি গাড়ি অচল হয়ে পড়তে পারে। তখন ওই গাড়িটির জন্য হয়তো পুরো বহর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। না হলে ওই গাড়িটিকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যেতে হবে। ওই নেতা বলেন, এভাবে একটি বিশাল সেক্টর সচল রাখা সম্ভব নয়।  অপর এক নেতা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিবহন সেক্টরের সাথে বেশ কয়েকটি মিটিং করছে। পরিবহন সেক্টরের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় পরিবহন সেক্টর সচল রাখা সম্ভব না। এ দিকে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মহাসচিব ওসমান আলী বলেছেন, ২৪ দিন পরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বোধোদয় হলো মিটিং করার ব্যাপারে। তিনি বলেন, এভাবে পরিবহন সেক্টর সচল রাখা সম্ভব না। নিরাপত্তা যে পরিমাণ দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ১৫ জন শ্রমিক মারা গেছেন। তারা মারা গেলে লাশ পরিবহনেরও টাকা পাওয়া যায় না। ২০১৩ সালে ৫৬ জন শ্রমিক মারা গেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে মাত্রা ৩৭ জনের জন্য ৯৬ লাখ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় পরিবহন শ্রমিকেরা খুবই ভয়ের মধ্যে আছেন। যারা গাড়ি চালাচ্ছেন তারা খুবই রিস্কের মধ্যে থাকেন।

জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি- ব্রিফিং-এ বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী প্রসঙ্গ

বিরোধী দলের কোন শীর্ষ নেতাকে খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার করতে পারে না আইনপ্রয়োগকারীরা। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষিতে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশী সেনা মোতায়েনের বিষয়টি মানদ- যাচাইয়ের নীতির অধীনে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে আবারও উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব কথা বলেছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে উঠে আসে বাংলাদেশ পরিস্থিতি। তাতে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি উঠে আসে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক এসব প্রশ্নের উত্তর দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশী সেনা মোতায়েনে কোন প্রভাব ফেলবে কিনা- এমন প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। উত্তরে জাতিসংঘের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন ডুজাররিক। তিনি বলেন, মানবাধিকারের মানদ- যাচাইয়ের যে নীতি রয়েছে তা অব্যাহতভাবে প্রয়োগ করা হবে। বলা হয়, বাংলাদেশ পরিস্থিতি হতাশ হওয়ার মতো। নিচে ওই ব্রিফিং প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশ নিয়ে আমি কিছু প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে। এখানে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা ক্রমাগত বাড়ছে। এরই মধ্যে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী (খালেদা জিয়া)কে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। মিডিয়াতে সেন্সরশিপ চলছে। এর আগেও এ বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুন, এমনকি আমি মনে করি তিনি সংলাপের চেষ্টা করেছিলেন। এটা জেনে আমি বিস্মিত। শান্তিরক্ষী মিশনে বড় অংশগ্রহণকারী দেশ বাংলাদেশ। ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স অথবা মহাসচিব এখন কি করছেন?
উত্তর: এর আগে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার অফিস থেকে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমরাও ওই উদ্বেগের সঙ্গে একইভাবে উদ্বিগ্ন। সরকারের এটা নিশ্চিত করা উচিত যে, আইনপ্রয়োগকারীরা খেয়ালখুশি মতো বিরোধীদলীয় কোন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারবে না। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে যেসব মানদ- আছে তা মেনে চলতে হবে। আপনি জানেন, অবশ্যই, আমরা দেখেছি এবং দেখছি যে, পরিস্থিতি আরও বেশি হতাশ হওয়ার মতো।
প্রশ্ন: আমি আপনাকে আরও একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। সেটা হলো- আমি মনে করি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ অংশ নেয়া এখন এক নম্বর দেশ। যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে তার অনেকটার জন্য দায়ী নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে যে পর্যালোচনা করা হয় তাতে এ বিষয়টি কিভাবে দেখা হবে?
উত্তর: আমি মনে করি এক্ষেত্রে  মানবাধিকারের মানদ- যাচাইয়ের যে নীতি রয়েছে তা অব্যাহতভাবে প্রয়োগ করা হবে।

গলাকাটা মুরগির অর্থহীন নাচানাচি by সিরাজুর রহমান

আমার আব্বা-আম্মার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের সবাই তখন জীবিত। একাত্তরের নভেম্বরের শেষে আম্মা মারা যান। সবচেয়ে বড় ভাই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা হলেও করাচিতে কোর্ট মার্শালের প্রতীক্ষায় সামরিক কারাগারে বন্দী ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে হুঁশিয়ার করে দেয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আমরা পরবর্তী দুই ভাই যুক্তরাজ্যে ছিলাম। সব ছোট দুই ভাই পূর্ব পাকিস্তানে থাকলেও আম্মা শেষ বিদায়ে তাদেরও হাতের মাটি পাননি। এরা কাছের এক গ্রামে লুকিয়ে ছিল। আব্বা যখন তাদের আম্মার জানাজায় আসতে নিষেধ করে খবর পাঠান মাত্র তখনই তারা মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েছিল। এরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের ধরার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের একটা দল আমাদের বাড়িতেই শিবির গেড়ে ছিল। একাত্তরের এই ছিল দেশের চেহারা। খুব কম পুরুষই নিজের বাড়িতে রাত কাটাতেন। গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনারা বিশ্বাসঘাতক চরদের দেয়া খবর অনুসরণ করে সব সক্ষম লোকেদের ধরে ধরে নিয়ে যেত। তারপর তাদের কী হতো প্রায়ই জানা যেত না। পাকিস্তানি গুপ্তচরদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী আমাদের বুদ্ধিজীবী নেতৃত্বকে এরা ধরে ধরে নিয়ে গেছে। পরে দেশের মানুষ দেখেছে এখানে-সেখানে রোদ-বৃষ্টি-ধৌত কঙ্কালের স্তূপ। দেশে তখন কী ধরনের ত্রাসের রাজত্ব চলেছে পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে বোঝানো খুবই কঠিনÑ প্রায় অসম্ভব।  প্রায় সে ধরনেরই একটা অবস্থা আবার সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। বিগত কয়েক বছরে যারা মুখ খুলে গণতন্ত্রের, স্বাধীনতার, মানবাধিকারের কিংবা নির্বাচনের কথা বলেছেন তাদের অনেকে শহীদ রুমি, আমার বন্ধু সিরাজুদ্দিন হোসেন, জহির রায়হান কিংবা বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দিন আহমেদের মতো গুম ও খুন হয়ে গেছেন। একাত্তরের রাজাকার, আর আল বদরেরা আসত মুখোশ পরে। বিগত ছয় বছরের ছিনতাইকারীরা এসেছে পুলিশের কিংবা র‌্যাবের ইউনিফর্ম পরে। আপাত দৃষ্টিতে পুরুষহীন বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের ধরিয়ে দিচ্ছে একাত্তরের মতোই ছিঁচকে বিশ্বাসঘাতকেরা সামান্য কিছু টাকার লোভে।
অপর দিকে, এদের মন্ত্রী বলতে ইচ্ছা করে না, কারণ এরা এমন নোংরা কথা বলেন ও কাজ করেন যে, শুনে গা ঘিন ঘিন করে। তাদের একজন ঘোষণা দিয়েছেন যারা নির্বাচন কিংবা গণতন্ত্রের কথা বলেন কিংবা বলেছেন তাদের খবর দিলে ৫০ হাজার টাকা, আর ধরিয়ে দিলে লাখ টাকা পুরস্কার। ওদিকে রাজধানীতে সরকারের পক্ষে সমর্থন দেখানোর জন্য রোজ কয়েক শ’ টাকা করে ভাড়া পাচ্ছেন কর্মহীন আর দিনমজুরেরা। কর্মসংস্থান আর সম্পদের বণ্টনের অপূর্ব ব্যবস্থা করে ফেলেছে অবৈধ সরকার! আরো অনেক মিল দেখবেন একাত্তরের সাথে। গোড়ার দিকে হলেও মাঝে মাঝে এখানেÑ সেখানে অভিযান চালাত পাকিস্তানি সেনারা। সাধারণত দেশের ভেতরে ঢোকার সাহস তাদের ছিল না। মাঝে মাঝে কয়েক ডজন সামরিক যান ভর্তি সৈন্য আর দুই-চারজন বিশ্বাসঘাতক চরকে নিয়ে এরা গেরিলা আক্রমণের মতো করে হামিলা চালিয়ে অতি দ্রুত ঘাঁটিতে ফিরে যেত। হুবহু একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে এখন। রাজধানীর বাইরের বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন। প্রশাসন নিজেই এখন বিপন্ন বোধ করছে। জেলা প্রশাসকেরা বিজিবি প্রার্থনা করে চিঠি লিখে মন্ত্রীদের অস্থির করে তুলেছেন। অত বিজিবি সরকার পাবে কোথায়? সুতরাং আরো ৫০ হাজার গোপালী পুলিশ নিয়োগ করো। পুলিশ বাহিনীর গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার সাহস অনেক দিন আগেই চলে গেছে। এখন রাজধানীর বাইরে যেতে হলে অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত পুলিশ র‌্যাব ও বিজিবি ডজন ডজন গাড়ি ও ভ্যানের কনভয়ে চলাচল করে। বিভিন্ন সময়ে হলিউডের দৌলতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনেক ফিল্ম দেখেছিলাম। বাংলাদেশের তথাকথিত শান্তিরক্ষী বাহিনীর রাজধানীর বাইরে যাওয়ার দৃশ্য প্রায়ই আমাকে ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর কনভয় অভিযানের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।
খাসি করে দেয়া পাঁঠা?
এসব ছবিও হয়তো শিগগির আর দেখতে পাবো না। বর্তমানে তারা যা করছে তার প্রস্তুতিস্বরূপ মিডিয়া নামে পাঁঠাটাকে তারা ২০০৯ সালেই খাসি করে দিয়েছিল। হারানো পৌরুষের স্মৃতি মনে করে খাসির দুঃখ হয়, ম্যা-ম্যা করে সে মনের আকুতি প্রকাশ করতে চায়। সেটাও সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মাঝে মাঝেই তারা দুটো-চারটে মিডিয়া-খাসি হত্যা করেছে এবং করছে। যারা খাসি হতে আপত্তি করেছে তাদের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। সাহসী মাহমুদুর রহমানকে এত দিন বিনা বিচারে আটক রাখা এবং মাঝে মাঝে লোকচক্ষুর অগোচরে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও প্রবল। এখন হুকুমের গোলাম দুদককে দিয়ে মামলা সাজানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার পত্রিকা আমার দেশের মুদ্রণ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামী টেলিভিশনও বন্ধ আছে। এখন কোপ পড়েছে একুশে টেলিভিশনের ওপর। আমার কেন জানি মনে পড়ছে এককালে এ স্টেশনটি শেখ হাসিনার প্রিয়পাত্র ছিল। ও দিকে টেলিভিশনের টকশোতে কাকে আমন্ত্রণ করা যাবে আর কাকে যাবে না তার একটা অলিখিত তালিকা স্টেশনগুলোকে আগেই দেয়া হয়েছিল। তাতেও সরকারের মনঃস্তুষ্টি হয়নি। টকশোর অতিথিদের বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের কুৎসা-নিন্দা বৃষ্টি শুরু হতে দেরি হয়নি।
সরকারের জানাই ছিল তাদের নির্বাচন চুরি, গণতন্ত্র চুরি ও স্বাধীনতা চুরির বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঘটবেই। তার আগেই সম্প্রচার বিধির নামে মিডিয়া নামক খাসিটার চার পায়ে দড়ি বেঁধে দেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে আবার টেলিভিশন স্টেশন মালিক ও সাংবাদিকদের সচিবালয়ে ডেকে পাঁচ মন্ত্রী একযোগে দলাইমলাই করেছেন। মনে রাখতে হবে যে মালিকপক্ষগুলোর মাথা নানা কারণেই সরকারের কাছে বাঁধা। এরা সাধারণত বিভিন্ন শিল্প-গ্রুপের মালিক। সরকারের অনেক নুন খেয়েছেন এরা, ভবিষ্যতেও খেতে হবে। হয়তো সরকারের চোখের সামনে গুরুতর অন্যায় কেউ কেউ করেছেন অতীতে, সরকার অপত্য স্নেহে ক্ষমা করে দিয়েছে। এখন মাটিতে টেনে দেয়া লাইনের একচুল এ দিক-ও দিক পা দিলে অনেক দড়িতে এক সাথে টান পড়বে। আবার টেবিলের তলা দিয়ে ডান হাত-বাঁ হাতের কারবার তো হরহামেশাই হচ্ছে। দুই-তিন মাস আগে এ রকম একটা গুজব শুনেছিলাম। সত্য-মিথ্যা বলতে পারব না। তবে একজন তথাকথিত বামপন্থী মিডিয়া ব্যক্তিত্বের রাতারাতি ১৮০ ডিগ্রি মোড় ফেরা লক্ষ করেছি।
ফলটা যা হওয়ার তাই হয়েছে। স্টেশন মালিক ও তাদের মিডিয়া কর্মীরা পাঁচ মন্ত্রীকে নাকে খৎ দিয়ে এসেছেন। অনির্বাচিত, অবৈধ সরকার যা বলবে সেটাকেই তারা ধ্রুব সত্য বলে প্রচার করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে কয়েক বছর পড়াশুনা করে এবং বহু বছর ধরে মিডিয়ায় কাজ করে তারা যা শিখেছেন সেটাকে আর সংবাদ বলা যাবে না। পাঁচ মন্ত্রী দলাইমলাই করে বলে দিয়েছেন আন্দোলন-অবরোধ উসকানি পেতে পারে এমন খবর প্রকাশ করা যাবে না। এবং বেছে বেছে ভালো খবরগুলো ছাপতে হবে। আমার মনে আছে পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়া খানও একই উপদেশ দিয়েছিলেন সাংবাদিকদের। এরও আগে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বলেছিলেন, আপনারা ভারতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার করেন কেন, রবীন্দ্রনাথ তো পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিলেন (সত্য নয়, লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব পাস হওয়ার সময় থেকে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন), রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনারা লিখতে পারেন না?
বিদেশীদের চোখে ঠুলি বাঁধা?
বাংলাদেশে এখন বলতে গেলে একমাত্র ঘটনা নিরপেক্ষ নির্বাচন আর গণতন্ত্রের দাবিতে অবরোধ আন্দোলন। সেটা সরকারের জন্য দুঃসংবাদ, কেননা দেশে অবরোধ চলছে শুনে ধীরে ধীরে আরো মানুষ অবরোধে শরিক হচ্ছে। সুতরাং এ খবর প্রচার করা যাবে না। সুখবর কোনটাকে বলবেন তাহলে? মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, অবরোধ সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবেন বলে আশ্বাস বিভিন্ন মন্ত্রী তিন সপ্তাহ ধরে দিয়ে চলেছেন। এমনকি কেউ এ দেশে আছেন যিনি মন্ত্রীদের আশ্বাসে বিশ্বাস করেন? সে খবর আপনি কী করে প্রচার করতে পারেন, কেননা অন্য কোনো মন্ত্রী বলেছেন, অবরোধ-টবরোধ কিচ্ছু হচ্ছে না, ওসব একদম বাজে কথা! বিএনপির আন্দোলনের সময়ের ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলো বিদেশে প্রচার জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রী কূটনীতিকদের তাগিদ দিচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নিমন্ত্রণ করে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বলে বোঝাতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য, যে বিদেশীরা কোনো কোনো বাংলাদেশী মন্ত্রীর মতো স্টুপিড লোকেদের মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠায়নি। রাষ্ট্রদূতেরা পরিস্থিতি দেখছেন এবং দেখে তার যথার্থ মূল্যায়নের মানসিক ক্ষমতা তাদের আছে। সেজন্যই তারা এবং স্বদেশে তাদের সরকার হাজারবার করে বলছে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় এসে সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দাও, নইলে বাংলাদেশের সঙ্কটের অবসান হবে না।
 শুনেছি এখন আবার অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদির ভয়াবহ ছবি ডিভিডি করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে সেসব দেশের সরকারকে জ্ঞানদান করার জন্য। প্রশ্ন উঠবে অবরোধ-হরতাল যদি মিথ্যা হয় তাহলে এসব ঘটনা ঘটছে কেন? এবং মনে রাখতে হবে এই সরকারগুলোই দুই বছর ধরে বাংলাদেশের সরকারকে সুপরামর্শ দিয়ে আসছে, আর ঢাকার সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। সুতরাং সরকারি উদ্যোগে পাঠানো ডিভিডিগুলো দেখে বিদেশী সরকারগুলো কুপোকাত হয়ে যাবে ভাবার কোনো কারণ আছে কি? তা ছাড়া বাংলাদেশে এখন ব্যাপক বলা-কওয়া হচ্ছে যে বাসে-ট্রাকে আগুন লাগানোর অনেক ঘটনা সরকার পক্ষই ঘটাচ্ছে বিএনপিকে অপবাদ দেয়ার জন্য। এসব ঘটনার জন্য পুলিশ এ যাবৎ যাদের ধরতে পেরেছে তাদের মধ্যেও সরকার পক্ষের লোক অনেক থাকছে। আরো স্মরণীয় যে, বাসে আগুন লাগানোর রাজনীতি বাংলাদেশে ‘প্রবর্তন’ করেছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৪ সালের ৪ জুন আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে শেরাটন মোড়ে বাসে আগুন লাগিয়ে ১১ জন যাত্রী হত্যা করার কথা আওয়ামী লীগ নেতারা ভুলে গেছেন? সে ঘটনার জন্য কাউকে হুকুমের আসামি করা যায় না? এসব খবর রাষ্ট্রদূতদেরও কানে যায় এবং তারা সেসব খবর এবং তাৎপর্য অবশ্যই স্বদেশে সরকারকে জানিয়ে দেন। ‘তোমাদের কথা আমি শুনব না, কিন্তু আমার কথা তোমাদের শুনতে হবে’Ñ বাংলাদেশ সরকারের এই গোঁয়ার্তুমির মনোভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধোপে টিকবে বলে কেউ মনে করেন?
অনেক ব্যাপারের উল্লেখ করে ফেললাম। এগুলো অবশ্যই খবর। এগুলোর যেকোনোটা প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রের দাবিতে একটা অবরোধ এবং সেই সাথে মাঝে মাঝে হরতাল চলছে। এবং আরো মেনে নিতে হবে যে প্রায় চার সপ্তাহ থেকে গ্রেফতার, গুম, হত্যা, নির্যাতন ইত্যাদি চালিয়েও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সুতরাং মিডিয়াকর্মী যদি বর্তমান বাংলাদেশ সম্বন্ধে কোনো সংবাদই প্রচার না করেন তাহলেই শুধু মন্ত্রীদের হুকুম মেনে চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে।
লাশের রাজনীতির নতুন মাত্রা
শুধু বিশ্বসমাজই নয়, দেশের ভেতরের যেসব মহলের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা অত্যধিক তারাও এখন সরকারকে সংলাপে বসে সমঝোতায় আসতে এবং সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পরামর্শ দিচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই ব্যবসায়ী সমাজের উদার অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য বিগত ছয় বছরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরাট একটা খুঁটি ছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবরের লগি-লাঠি-বৈঠার আন্দোলনের সময় থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে জানাজানি হয়ে গেছে যে জনতা ভাড়া করতে, সে জনতাকে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাবদ বহু কোটি টাকা ব্যবসায়ীসমাজ আওয়ামী লীগকে দিয়েছে। সব দেশেই ব্যবসায়ীসমাজ সরকারের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে চায়। কিন্তু গণবিরোধী সরকারকে সমর্থন দেয়ার বেলায় তারা হুঁশিয়ার থাকে। সারা দেশের মানুষ যখন গণতন্ত্র চেয়েছেন, গণতন্ত্র না দিলে সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছেন, তখন ব্যবসায়ীসমাজ গণবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করে গণবিরোধী সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। ব্যবসায়ীসমাজের কান্নাকাটিতে এখন দেশের মানুষের মন গলবে কি?
সেই ব্যবসায়ীসমাজও এখন করজোড়ে সরকারের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে, বলছে, ‘দয়া করে এবার সংলাপে বসুন, নইলে আমরা সর্বহারা হয়ে যাব।’ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লাঠালাঠি করতে গিয়ে তৈরী পোশাকের শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা সরকার আগেই হারিয়েছে। পাঁচ লাখ বিদেশী ম্যানেজার আমদানি করে গার্মেন্ট শিল্পের বারোটা আগেই বাজিয়ে দেয়া হয়েছে। মালিকেরা বলছেন, অবরোধ আর হরতালের কারণে বিদেশী বায়াররা ৪০ শতাংশ অর্ডার ইতোমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট হোসেন খালেদ গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বলেছেন, অবরোধের প্রথম ১৬ দিনে তাদের লোকসান হয়েছে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ডিসিসিআই এখন বলছে, বিএনপি ও ২০ দলের সাথে সংলাপই সঙ্কট নিরসনের একমাত্র পন্থা। মাত্র সেদিন সুজন একই পরামর্শ দিয়েছে, সম্পাদকেরা তথ্যমন্ত্রীকেও বলেছেন একই কথা, দেশী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টসহ সব বিদেশী সাহায্যদাতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদার সরকার ও সংস্থা বরাবরই এই একই কথা বলেছে। দেশে একজন ব্যক্তি কারো পরামর্শই শুনতে রাজি নন বলেই বাংলাদেশ অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে।
খালেদা জিয়ার স্বামীকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। খালেদার অস্তিত্ব বিলোপেরও কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখা হয়নি। খালেদাকে তার বাড়ি এবং চার দশকের সংসার থেকে উৎখাত করা হয়েছে, রাজনৈতিক মামলা সাজিয়ে তার ছেলেদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, ইট আর বালুর ট্রাক দিয়ে তাকে ভাড়া বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হয়নি, চার সপ্তাহ ধরে নিজের কার্যালয়ে প্রায়-শরণার্থী জীবন যাপন করতে তিনি বাধ্য হচ্ছেন। একের পর এক বেশুমার মিথ্যা মামলা সাজানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে। তাকে নির্মূল করে দেয়ার নির্দেশের প্রতীক্ষা করছেন নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামীম ওসমান। সরকারের মন্ত্রীরা অনর্গল তাকে গ্রেফতার করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তার মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করাই যে সরকারের উদ্দেশ্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে তার ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন মালয়েশিয়ায়। মায়ের সীমাহীন ভোগান্তি যে তার মৃত্যু ত্বরান্বিত করেনি কে বলবে? এই আকস্মিক বজ্রপাতে খালেদা জিয়ার মনের অবস্থা কেমন হতে পারে সরকারের মন্ত্রীরা ছাড়া অন্য সবাই তা বুঝবেন। সঙ্গত কারণেই তার চিকিৎসক সিডেটিভ ইনজেকশন দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে খবর প্রধানমন্ত্রীর অজানা থাকার কথা নয়। খালেদার কার্যালয়ের সব খবর বিদ্যুৎ গতিতে তার কানে পৌঁছে যায়। বেছে বেছে ওই সময়টাতেই তিনি সমবেদনা জানাতে খালেদার কার্যালয়ে গেলেন। খালেদার উপদেষ্টা-সহায়কদের কি উচিত ছিল ওই অবস্থায় তার ঘুম ভাঙিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির করা? প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা কোরাস জুড়ে দিলেন ঘুমন্ত খালেদা জিয়া জাগ্রত প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করেছেন। হাতে-পায়ে দড়ি বাঁধা, আর আগেই খাসি করা মিডিয়া ‘অপমান, অপমান’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে কি এমন একটিও দিন ছিল যে দিন তিনি খালেদাকে অপমান করার চেষ্টা করেননি?
জাতির জননী, গণতন্ত্রের জননী
পরলোকগত কোকোর দাফন নিয়েও পরস্পর বিরোধী প্রচারণার অবধি ছিল না। কেউ যেন এক মন্ত্রীর মাথায় ঢুকিয়েছিল আওয়ামী লীগ কোকোর দাফনে অংশ নিলে খালেদাকে শাস্তি দেয়া হবে। পরে সে আইডিয়া পরিত্যক্ত হলো। শহীদ জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি জিয়ার ছেলে হিসেবে সামরিক গোরস্থানে সমাহিত হওয়ার অধিকার কোকোর ছিল। সরকার সেখান থেকেও তাকে ‘নির্বাসিত’ করেছে। লন্ডনে কোকোর গায়েবানা নামাজে জানাজায় তারেক রহমান তার অতি আদরের ভাই সম্বন্ধে কিছু বললে তা প্রকাশ না করার নির্দেশ আগে থেকেই মিডিয়া-খাসিকে দেয়া হলো। এ দিকে দেশের কোথায় গাড়ি পুড়েছে, কোথায় পুড়েছে বাস এবং সেটা যে সরকারের লোকেরাই করেনি তার নিশ্চয়তা কী। এসবের জন্য খালেদাকে ‘হুকুমের আসামি’ করা হচ্ছে। এবং মন্ত্রীরা তার গ্রেফতার নিয়ে এমন জল্পনা-কল্পনা শুরু করলেন যে কানে তালা ধরে গেল। পুলিশ, র‌্যাব আর বিজিবিতে ইউনিফর্ম পরা আওয়ামী লীগ ঠ্যাঙাড়েরাও যোগ দিলেন সে জল্পনায়। খালেদার মাথা খারাপ করার চেষ্টা করতে গিয়ে মন্ত্রীদেরই যেন মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা গলাকাটা মুরগির মতো অর্থহীন নাচানাচি করছেন।
আসলে এই মন্ত্রী ও ইউনিফর্মধারী আওয়ামী লীগ নেতারা আজো খালেদা জিয়ার আসল পরিচয় জানতে পারেননি। তার স্বামী বাকশালী স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া খুন হলেন সেজন্য। স্বামীর অসমাপ্ত কাজ কাঁধে তুলে নিলেন খালেদা। দৃঢ় হাতে বিএনপির হাল চেপে ধরলেন। সামরিক স্বৈরতন্ত্র আমদানি করে বাধা সৃষ্টি করা হলো। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বৈরতন্ত্রকে জিইয়ে রেখে গণতন্ত্রে উত্তরণ নয় বছর বিলম্বিত করলেন। খালেদা জিয়া হাল ছেড়ে দেননি। শত ভয়-ভীতি ও চোখ-রাঙানোকে উপেক্ষা করে তিনি স্বৈরতন্ত্রকে টেনে নামালেন, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেন। বিগত ছয় বছরের নির্যাতন-নিপীড়নের কথা তো আগেই বললাম।
এক ছেলে সাত বছর ধরে নির্বাসিত। সাত বছরেরই নির্বাসনের পর অন্য ছেলে এখন মৃত, সদ্য সমাহিত। তার নিজের বিরুদ্ধে অজস্র সাজানো মামলা। অহরহ তাকে গ্রেফতারের, হত্যার ভয় দেখানো হচ্ছে। শোকে-দুঃখে খালেদা জিয়া মৃতকল্প। এখন কী করবেন তিনি? গণতন্ত্রের আন্দোলন ছেড়ে দিয়ে তসবিহ হাতে দিন কাটাবেন? ক্ষেপেছেন? জাতি তাকে নেতৃত্ব দিয়েছে, গণতন্ত্রের জননী আখ্যা দিয়েছে। অর্ধমৃত হলেও মৃত তো তিনি নন। সুতরাং মাঝ নদীতে হাল ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। খালেদা জিয়া শোক ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়াবেন, স্বামীর অসমাপ্ত কাজ নতুন করে সমাপন করবেন। শত হলেও তিনি জাতির ও গণতন্ত্রের জননী।
(লন্ডন, ২৭.০১.১৫)
serajurrahman34@gmail.com

দেশ রক্ষায় সমঝোতার বিকল্প নেই- ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

দেশের চলমান জাতীয় সঙ্কট থেকে উত্তরণে সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ প্রস্তাব পেশ করে তিনি বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই জাতিকে বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের সহায়তা করতে পারে। প্রস্তাবে বলা হয়, যেহেতু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে বর্তমান কাঠামোতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের ত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, মতার উৎস হিসেবে জনগণের ইচ্ছা এই সংশোধনে প্রতিফলিত হয়নি, জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা গ্রাস করেছে। এ কারণে অর্থনৈতিক অগ্রগতিও স্তব্ধ হয়েছে। সেজন্য সময় এসেছে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার। জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের প্রধান কাজ হবে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে পরিচালনার ল্েয সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান। ঐকমত্যের সরকারের প্রধান কর্তব্য হবে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অর্থবহ সংস্কারের মাধ্যমে একটি অবাধ, নিরপে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট হিসেবে যে যুক্তি তুলে ধরেছেন, তার সাথে দ্বিমত পোষণের অবকাশ খুব কমই রয়েছে। আসলেই একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ছাড়া এমন ঘোর সঙ্কট জাতির জীবনে কখনো আসেনি। জনগণের অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের পর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সংবিধানকে নির্বিচারে কাটাছেঁড়ার কারণে এটি জাতির সঙ্কটকালে দিকনির্দেশনা দিতে অমে পরিণত হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্দলীয় নিরপে সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে অব্যাহত আন্দোলন করে যাচ্ছে। অন্য দিকে সরকার তাদের দাবি বিবেচনার পরিবর্তে দমনপীড়ন ও নিঃশেষ করার নীতি গ্রহণ করেছে। সরকার ও বিরোধী শক্তির এই প্রাণঘাতী লড়াইয়ে জনগণ এক নিরাপত্তাহীন, শঙ্কাকুল এবং অনিশ্চিত সময়ে নিপ্তি হয়েছে। এই অনিশ্চিত অচলাবস্থার সমাধান হওয়া জরুরি।  সাংবিধানিক ব্যবস্থার বাইরে অতীতেও জাতীয় সঙ্কট সময়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব হতো যদি সব রাজনৈতিক পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে একমত হতে পারত। বাস্তবে যেহেতু এটি দেখা যাচ্ছে না, তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি বিবেচনা করা দরকার। এ সরকারের বিস্তারিত কাঠামো কেমন হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বসে ঠিক করতে পারে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সময়ও এভাবে ঠিক করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব সংস্থা বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম বা অভ্যন্তরীণ কোনো সংস্থার সহযোগিতার প্রয়োজন হলে সেটিও বিবেচনার মধ্যে আনা যেতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সমঝোতার বিপরীতে সঙ্ঘাতের পথে দুই পক্ষ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ধ্বংস আর রক্তপাত ছাড়া ভালো পরিণতি নেই। শুভবুদ্ধির উদয় হতেই হবে।

সুজাতা সিং বরখাস্ত নানা অঙ্ক

অনেকটা আকস্মিকভাবেই এলো সিদ্ধান্তটি। বুধবার রাতে ভারত সরকার জানিয়ে দেয়, দেশটির পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নয়া দিল্লি ছাড়ার একদিনের মাথায় পররাষ্ট্র সচিব পদে পরিবর্তন আনলো ভারত। নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করকে। যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গতকালই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করে জয়শঙ্কর বলেছেন, এ পদে নিয়োগ পেয়ে তিনি গর্বিত। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরের নেপথ্যে ভূমিকা পালনের পুরস্কার হিসেবেই তিনি এ নিয়োগ পেয়েছেন। ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির মূল পরিকল্পনাকারীও মনে করা হয় তাকে। সুজাতা সিং ভারতের ইতিহাসে দ্বিতীয় পররাষ্ট্র সচিব যাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হলো। ২৮ বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী চলমান সংবাদ সম্মেলনে বরখাস্ত করেছিলেন এপি ভেঙ্কটেশ্বরণকে। মেয়াদ শেষ হওয়ার সাত মাস আগেই সুজাতা সিংকে কেন আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করা হলো এ নিয়ে নানা জল্পনা। সুজাতা সিং সোনিয়া গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জয়শঙ্করকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে চাইলেও সোনিয়া গান্ধীর ইচ্ছায় সুজাতা সিং নিয়োগ পান। কেউ কেউ বলছেন, গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণেই সুজাতা সিংকে বিজেপি সরকার বরখাস্ত করেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ বরখাস্তের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। দলটি বলছে, দেবযানীর ঘটনার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত ভূমিকা রাখার জন্যই তাকে এখন পদ হারাতে হয়েছে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে এসব সমালোচনা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। বিজেপির মুখপাত্র বলেছেন, এমন বরখাস্তের ঘটনা নতুন ঘটেনি। কাউকে বরখাস্ত অথবা নিয়োগ করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
সুজাতা সিং বাংলাদেশেও বিপুল আলোচিত, সমালোচিত। তার ভূমিকার কারণেই প্রধান বিরোধী দলসহ অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম হয়েছিল। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি একতরফা নির্বাচনের পক্ষে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। এমনকি সেসময় জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য তিনি চাপ দেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে সুজাতা সিং তাকে বলেছিলেন, তাহলেতো জামায়াত-শিবির ক্ষমতায় আসবে। সেসময় ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হওয়া জরুরি। এটি অবশ্যই স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ হতে হবে। সেটি সব দলের অংশগ্রহণে হবে না অধিক সংখ্যক দলের অংশগ্রহণে হবে তা বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে। ভারত প্রত্যাশা করে এখানে সহিংসতামুক্ত একটি নির্বাচন হবে। যাতে অধিক সংখ্যক দল অংশ নিবে। নির্বাচনের আগে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা ভারত সফরে যান। সেসময় তিনি সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সুজাতা সিং অত্যন্ত শীতল ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে মার্কিন ভূমিকাকে নিরুৎসাহিত করেন তিনি। এদিকে, সুজাতা সিংয়ের বরখাস্তের খবর বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। ভারতে পররাষ্ট্র সচিবের পদে নতুন কেউ দায়িত্ব পেলে ঢাকার তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানানোর রেওয়াজ রয়েছে। গতকালের নাটকীয় এ পরিবর্তনের পর ঢাকার তরফে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো সুজাতার বরখাস্তের সংবাদ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।
সাউথ ব্লক সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মেদির সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সম্পর্ক ভাল ছিল না। সুজাতা সিংয়ের কাজ নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট ভবনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে সুজাতাকে কোন ভূমিকাতেই রাখা হয়নি। অথচ বিশ্বে ভারতের উপস্থিতি ও অবস্থান মজবুত করতে পররাষ্ট্র সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্ভরযোগ্য কাউকে বসাতে চাইছিলেন মোদি। চীনসহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বাড়ানোর কাজ দ্রুত গতিতে করার তাগিদেই জয়শঙ্করকে এনে সেই প্রয়োজন পূরণ করলেন তিনি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে অন্য সব বিষয়ের সঙ্গে ওবামার ভারত সফরের প্রস্তুতি পর্বও ভালই সামলান জয়শঙ্কর। এর আগে বছর চারেক চীনেও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। জাপান, সিঙ্গাপুর, চেক প্রজাতন্ত্রসহ বহু দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

বিদেশি পণ্যেই বেশি ঝোঁক

(ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় একটি বিদেশি প্যাভিলিয়ন l প্রথম আলো) ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিদেশি পণ্যের দিকেই ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ঝোঁক বেশি। বিভিন্ন দেশের প্রস্তুত করা নিত্য তৈজসপত্র ও গয়না-কসমেটিকস কেনার ধুম পড়েছে। অনেক স্টলের বিক্রেতারা হাঁকডাক দিয়ে অবিরাম ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর গয়না ও তৈজসপত্রের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই আছে। এখানে পুরুষের চেয়ে নারী ক্রেতাই বেশি। শেরেবাংলা নগরের বাণিজ্য মেলায় সরেজমিনে এ চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিদিন দুপুর গড়িয়ে বিকেলে মেলায় ভিড় বাড়ে। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার মেলায় ভিড় কম। এবারের মেলায় এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ মহাদেশের ১৪টি দেশের মোট ৪৮টি প্রতিষ্ঠান মেলায় স্টল দিয়েছে। এর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের বাহারি পণ্যের দোকানগুলোতে বেচাকেনা বেশি। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা সবাই খুশি।
মেলায় আরও যেসব দেশ অংশ নিয়েছে—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কোরিয়া ও জার্মানি। বিদেশি স্টলগুলোতে হাঁড়ি-পাতিল, ওভেন, থালা-বাটি, সসপেন, ননস্টিকি হাঁড়ি-পাতিল, প্রেশার কুকার, হটপট, চামচসহ নানা ধরনের তৈজসপত্রই বেশি। এ ছাড়া ঘর সাজানোর শোপিস, বেডশিট, পর্দা, পাপোশ ইত্যাদিও রয়েছে। আর তরুণীদের বেশি ভিড় গয়নার দোকানে। বিদেশি তৈজসপত্রে আগ্রহী বেশি: মেলায় আসা ক্রেতাদের মধ্যে অন্য পণ্য কেনার চেয়ে বাসাবাড়িতে ব্যবহার্য বিদেশি তৈজসপত্র কেনায় বেশি আগ্রহ। এমনকি দর্শনার্থীদের ভিড়ও এসব দোকানে বেশি। মেলা ঘুরে দেখা গেছে, তৈজসপত্রগুলোর মধ্যে নতুন ও ব্যতিক্রমী পণ্যের দিকে আগ্রহ বেশি ক্রেতাদের। ভারতীয় দোকানে ভেজিটেবল চপার বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা, ভেজিটেবল স্লাইসার ৪০০ টাকা ও টমেটো চপার ২০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর সবজি কাটার পুরো একটি সেট (১০ পিস) এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এগুলো কিনতেই এ দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। দিল্লি অ্যালুমিনিয়ামের স্টলেও ভিড় দেখা গেছে।
আবার ইরানি পণ্যের দোকানে কার্পেটের চাহিদা বেশি। দুই হাজার থেকে নয় হাজার টাকায় মিলছে নানা আকারের কার্পেট। এখানে হটপট বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকায়। ইরানি এ দোকানে আরও রয়েছে মেলামিনের তৈজসপত্র, গয়না, চাদর ইত্যাদি। তুরস্কের দোকানে গিয়ে গেছে, দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি ও টেবিল ল্যাম্প রয়েছে এখানে। ইস্তাম্বুল ল্যাম্প নামের এসব বাতির দাম ৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে কাশ্মীরি, পসমিনা শালও মিলছে ভারত ও পাকিস্তানের দোকানগুলোতে। দাম পড়ছে সাড়ে চার শ থেকে চার হাজার টাকা। কয়েক দিন আগে তানভীর আহমেদ ও মোসাম্মৎ জেবুন্নেসা দম্পত্তি মেলায় এসেছিলেন। বিদেশি পণ্যের স্টল ঘুরে দেখে অভিভূত তাঁরা। তানভীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা যাতে এসব পণ্য দেখে শেখেন। মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করেন। যদিও এই দম্পত্তি ওই দিন কোনো পণ্য কেনেননি, তবে মেলা শেষ হওয়ার দু-একদিন আগে এসে ঝাড়বাতি কিনবেন বলে জানান তানভীর।
তরুণীদের আগ্রহ গয়নায়: মেলায় আসা তরুণীদের বিদেশি গয়নার দিকেই ঝোঁক বেশি। বিশেষ করে ইরান, তুরস্ক ও ভারতীয় কসমেটিকসের দোকানে এই ভিড় একটু বেশি। তুরস্কের দোকানে নানা ধরনের গয়নার পসরা রয়েছে। এই দোকানে একটি আংটি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, গলার চেইন ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, কানের দুল ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর পাশাপাশি থাইল্যান্ড, ইরান ও মালয়েশিয়ার গয়নার চাহিদাও বেশ।

বিব্রত শ্রুতি হাসান

বর্তমানে একাধিক ছবির কাজ নিয়ে ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করছেন কমল হাসান কন্যা শ্রুতি হাসান। ‘রামাইয়া বাসতাভিয়া’র সফলতার পর এখন মুম্বইতেই নিজের ক্যারিয়ার গড়ছেন দক্ষিণ ভারতীয় ছবি থেকে আসা এই অভিনেত্রী। সব মিলিয়ে বর্তমানে চারটি ছবি করছেন তিনি। ছবিগুলো হলো ‘রকি হ্যান্ডসাম’, ‘ম্যায় গাব্বর’, ‘ওয়েলকাম ব্যাক’ এবং ‘ইয়ারা’। এর মধ্যে যথাক্রমে জন আব্রাহাম, অক্ষয় কুমার, নানা পাটেকার ও বিদ্যুৎ জামালের বিপরীতে অভিনয় করছেন তিনি। গত কয়েক দিন ধরে ‘ম্যায় গাব্বার’ ছবির শুটিং নিয়ে ব্যস্ত শ্রুতি। তবে সম্প্রতি এই ছবিতে তিনি একটি নগ্ন দৃশ্যে ক্যামেরাবন্দি হয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় চলে এসেছেন। শুধু তাই নয়, ছবির কাজ শেষ না হলেও এর একটি ৩০ সেকেন্ডের ক্লিপ প্রকাশ পেয়ে গেছে ইন্টারনেটে। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন শ্রুতি হাসান। কারণ, তার ক্যারিয়ারে এ রকম ঘটনা এর আগে ঘটেনি। তবে কিভাবে এটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লো তার কারণ জানা যায়নি। অনেকেই মনে করছেন পরিচালক কিংবা প্রযোজক ছবির আগাম প্রচারণার জন্যই এমনটি করেছেন। তবে এমন অভিযোগের বিষয়টি অসত্য বলে জানিয়েছেন পরিচালক ক্রিশ। ‘ম্যায় গাব্বার’ ছবির একটি স্নানের দৃশ্য করতে গিয়ে নগ্ন হয়েছেন শ্রুতি। তবে সেখান থেকে কাটছাঁট করেই দৃশ্যটি ছবির জন্য রাখা হবে। কিন্তু তার আগেই নগ্ন দৃশ্যটির ভিডিও প্রকাশ পেয়ে গেল। এ বিষয়ে শ্রুতি হাসান বলেন, এটা খুবই বিব্রতকর একটি বিষয়। কারণ, ছবি মুক্তির আগে সেটির ক্লিপ যদি প্রকাশ হয় এটা আমাদের সবার জন্য ক্ষতি। আমি এরই মধ্যে ইউটিউব ও গুগুলের কাছে আবেদন জানিয়েছি ভিডিওটি মুছে দেয়ার জন্য। আমি অনুরোধ করছি আমার ভক্ত-দর্শকরা এই ভিডিওটি আপলোড কিংবা শেয়ার করবেন না।