Thursday, August 8, 2024

ভারতকে এক দিন আগেই জানানো হয়েছিল, শেখ হাসিনার সময় শেষ -বিবিসির প্রতিবেদন

বাংলাদেশে অস্থিরতা কমাতে গত রোববার শেখ হাসিনা সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক ডেকেছিলেন। তখনো তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময় ফুরানোর বিষয়টি মানতে নারাজ ছিলেন বলে মনে হচ্ছে।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেখ হাসিনা যে জনস্রোতে ভেসে যাবেন—প্রকৃতপক্ষে খুব কম লোকই তাঁর এই বিদায় সম্পর্কে অনুমান করতে পেরেছিলেন।

শেষ পর্যন্ত শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কথা না শুনলেও পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের পরামর্শে তিনি পালিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। তাঁর ছেলে বিবিসিকে এমন কথা বলেছেন।

শেখ হাসিনা ঠিক সময়েই মনস্থির করেছিলেন। তাঁর পালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জনতা তাঁর বাসভবনে প্রবেশ করেছিল।

রোববার সকালে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছিল। বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধান, ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা ও পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠকের পরিবেশ ছিল গম্ভীর।

দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ওপর কয়েক সপ্তাহ ধরেই চাপ বাড়ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই সহিংসতায় কয়েক শ মানুষ নিহত হন।

শুধু রোববার এক দিনে অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিক্ষোভকারী। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। তবে জনতার হাতে পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন।

কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে, শেখ হাসিনা ‘দুটি বিকল্প’ খোলা রাখতে চেয়েছিলেন। যখন তাঁর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল, তখনো তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার কথায় রাজি হননি। রোববার দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঠপর্যায়ের সেনা ও সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার পর জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

একাধিক সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, আলাদাভাবে বৈঠকে সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, সেনারা বেসামরিক লোকজনের ওপর গুলি চালাবেন না। তবে তাঁরা পুলিশকে নিরাপত্তা সহায়তা দিতে পারবেন।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাচ্ছে। যদিও এ বিষয় পরে প্রকাশ পায়।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বিবিসিকে বলেন, ‘পুলিশ ক্লান্ত ছিল। আমরা শুনেছি যে তাদের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ছিল না।’

তবে শেখ হাসিনা তা শোনেননি। আর তখন কেউই সামনে বসে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে রাজি ছিলেন না।

বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পরিস্থিতি উপেক্ষা করে তাঁর বার্তা দেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন। তিনি ‘অগ্নিসংযোগকারীদের’ প্রতিরোধের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

নিরাপত্তা বাহিনী আশঙ্কা করেছিল, তাদের হাত ধরে শিগগিরই দেশে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আসতে পারে।

রোববারের সহিংসতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে (ভাইরাল) পড়ছিল। কারণ, মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছিল। পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুব শাখার সদস্যদের গুলিতে আহত তরুণদের ছবি আরও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছিল।

সংঘর্ষের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা ঢাকামুখী গণমিছিলের কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণায় কর্তৃপক্ষ বিস্মিত হয়ে যায়।

গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়, ছাত্রদের দাবি মানুষকে আকৃষ্ট করছে। পরের দিন হাজারো মানুষ রাজধানীর রাজপথে নামার পরিকল্পনা করছে।

নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে আরেকটি রক্তপাত ঘটবে। তাই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, রোববার সন্ধ্যায় তিন বাহিনীর প্রধান শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা বিনয়ের সঙ্গে ব্যাখ্যা করে বলেন, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। সোমবার সকালে ঢাকায় হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটতে পারে। তাঁরা তাঁর বাসস্থানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না।

শেখ হাসিনা তিন বাহিনীর প্রধানের পরামর্শ গ্রহণ করেননি। তবে ঢাকার সাংবাদিকেরা বলেন, তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, ইতিমধ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হচ্ছে। রোববার রাত নাগাদ অনেক জায়গায় পুলিশের উপস্থিতি ছিল না। অসংখ্য নিরাপত্তা ব্যারিকেড ছিল খালি।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তিনি (হাসিনা) অনড় ছিলেন। পদত্যাগ বা দেশ ছাড়ার ব্যাপারে তিনি রাজি ছিলেন না। তিন বাহিনীর প্রধান তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁকে মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।

এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁরা বলেছিলেন, সৈনিকদের পক্ষে জনতার ওপর গুলি চালানো কঠিন হবে। তাঁরা বলেছিলেন, সেনারাও দেশের অংশ। তাঁরা গ্রাম থেকে এসেছেন। তাঁরা নিজেদের লোকদের ওপর গুলি চালাবেন না।

সোমবার সকাল থেকেই ঢাকা অভিমুখে বিপুল জনতার যাত্রা শুরু হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আবার শেখ হাসিনার বাসভবনে গিয়ে তাঁকে পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করছিলেন। লোকজন কারফিউ ভঙ্গ করছিল। ইতিমধ্যে সহিংসতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

ঢাকার অনেক জায়গা থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হচ্ছিল। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে বলেছিলেন, তাঁরা খুব বেশি সময় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে জনতার পৌঁছানো ঠেকাতে পারবেন না। সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় তা সম্ভব হতে পারে।

এই পর্যায়ে সামরিক প্রধানেরা শেখ হাসিনাকে বোঝানোর জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা তখন শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাঁর বড় বোনকে চলে যেতে রাজি করতে পারেন কি না, সে কথা বলেন তাঁরা।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, কর্মকর্তারা শেখ রেহানার সঙ্গে অন্য একটি কক্ষে আলোচনা করেছিলেন। তাঁরা তাঁকে শেখ হাসিনার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে বলেছিলেন। শেখ রেহানা তখন তাঁর বড় বোনের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে অনড় ছিলেন।

তারপর বিদেশে থাকা শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা তাঁকে চলে যেতে বলেন। পারিবারিক এই আলোচনার পুরোটা সময় সেনাপ্রধান উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি বৈবাহিক সূত্রে শেখ হাসিনার আত্মীয়।

সজীব ওয়াজেদ গত মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেন, ‘আমার মা মোটেও দেশ ছেড়ে যেতে চাননি। আমাদের তাঁকে রাজি করাতে হয়েছিল।’

সজীব ওয়াজেদ আরও বলেন, তাঁর মা গত শনিবার সন্ধ্যা থেকেই পদত্যাগ করার কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন।

সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘আমরা পরিবারের সদস্যরা তাঁর কাছে অনুনয় করেছিলাম। আমরা তাঁকে অনুরোধ করে বলেছিলাম, এই জনতা উচ্ছৃঙ্খল, তারা সহিংসতার জন্য বেরিয়েছে, তারা তোমাকে হত্যা করবে। তোমাকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়া দরকার আমাদের। সেখানে জনতার পৌঁছাতে যতটা সময় লেগেছিল, তাঁর হাতে ততটাই সময় ছিল। তাঁরা কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বেরিয়ে যান।’

সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘গতকাল আমি তাঁকে (শেখ হাসিনা) দিল্লিতে ফোন দিয়েছিলাম। তিনি ভালো আছেন। কিন্তু তিনি খুবই হতাশ। বাংলাদেশের জনগণ তাঁকে খুবই নিরাশ করেছে।’

সূত্র জানায়, সোমবার সকালে শেখ হাসিনা নিরাপদ আশ্রয়ের অনুরোধ জানাতে দিল্লিতে ভারতের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একনিষ্ঠ মিত্র ভারত। ভারতের দিক থেকে তাঁকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

জানা যায়, এক দিন আগে ওয়াশিংটন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বলেছিল, শেখ হাসিনার সময় শেষ। তাঁর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তিনি যখন বুঝতে পেরেছিলেন, সেনাবাহিনী তাঁকে সমর্থন করছে না, তখনই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। লোকজন কারফিউ ভাঙতে যাচ্ছিল। তাঁর বাসভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যেতে ঢাকায় জড়ো হচ্ছিল।

শেখ হাসিনা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর পদত্যাগের নথিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে কীভাবে নিরাপদে দেশ থেকে বের করা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, শেখ হাসিনা কখন পদত্যাগপত্রে সই করেছেন, কখন সামরিক হেলিকপ্টারে উঠেছেন, তা কেবল স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট ও সেনা সদরের কিছু ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা জানতেন। পুরো ব্যাপারটা বেশ গোপনে করা হয়েছিল।

স্থানীয় সময় সোমাবার সকাল সাড়ে ১০টায় কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়, যাতে শেখ হাসিনার গতিবিধির কোনো খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ে। তিনি চলে যাওয়ার পরেই ইন্টারনেট আবার চালু করা হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা যাতে নিরাপদে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল। তার বহরে হামলা হতে পারে, এমন উদ্বেগ ছিল। তাই, পুরো যাত্রাপথটি ফাঁকা করা হয়েছিল। তাঁর প্রস্থানের স্থান (ডিপারচার পয়েন্ট) সুরক্ষিত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে সড়কপথে নিয়ে যাওয়া নিরাপদ ছিল না। তাই, সড়কপথের পরিবর্তে একটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছিল।

ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, চলে যাওয়ার মুহূর্ত পর্যন্ত শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে উঠতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘তিনি (হাসিনা) চেয়েছিলেন, আমার খালা (রেহানা) চলে যাক। আমার মা হেলিকপ্টারে উঠতে চাননি। আমি ফোন করেছিলাম। আমি আমার মাকে রাজি করাচ্ছিলাম। আমার খালাকে বলেছিলাম, তাঁকে চলে যেতে হবে।’

সজীব ওয়াজেদ বলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা তা করেন। তাঁরা গণভবন থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি অপেক্ষমাণ সি-১৩০ হারকিউলিসে ওঠেন।

সজীব ওয়াজেদ বলেন, তাঁর ধারণা, তাঁরা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। আর এই পথ দিয়ে তারা তাঁকে ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছিলেন।

অন্যান্য বিবরণ বলছে, তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার একটি বিমানবন্দরে নেওয়া হয়েছিল। তারপর উড়োজাহাজে করে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁরা যে পথেই যাক না কেন, ভারতের স্থানীয় সময় সোমবার বেলা প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে হাসিনা, তাঁর বোন রেহানা ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমানকে হেলিকপ্টার থেকে উড়োজাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছিল। যেটি তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, চার বা পাঁচটি স্যুটকেস অপেক্ষমাণ উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারে ওঠানোর জন্য রাখা হয়েছিল। তিনি যেসব জিনিস রেখে গেছেন, তার অনেক কিছু তাঁর বাসভবনে হামলা চালিয়ে নিয়ে যায় জনতা। এমনকি এই হামলার সময় তিনি মাঝ–আকাশেই ছিলেন।

কয়েক ঘণ্টা পরে উড়োজাহাজটি দিল্লিতে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটির যাত্রীদের গন্তব্য ছিল অস্পষ্ট।

ঢাকায় ইন্টারনেট আবার চালু হয়েছিল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের সমাপ্তি উপলক্ষে বাংলাদেশজুড়ে উদ্‌যাপন শুরু হয়েছিল।

একজন নারী, যাঁকে একসময় গণতন্ত্রী হিসেবে দেখা হতো, পরে তিনিই স্বৈরাচারী হিসেবে অনেকের কাছে নিন্দিত হন। ইন্টারনেট বন্ধ রেখে তাঁকে শেষ পর্যন্ত একজন পলাতক ব্যক্তির মতো পালিয়ে যেতে হলো।

নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন

শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা। নতুন এক ইতিহাস রচিত হয়েছে। এ ইতিহাসের সাক্ষী দেশের সব শাখার মানুষ। এ আন্দোলনে অনেক শোবিজ তারকাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী, নির্মাতাসহ এ অঙ্গনের তারকারা আশা করছেন নতুন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। এ বিষয়ে কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর বলেন, সন্তানদের মেধা বাংলাদেশের সেরা সম্পদ। এই দেশ পরিচালিত হতে হবে মেধাবী দেশপ্রেমিকদের মাধ্যমে। স্বাধীনতার নতুন সূর্যোদয় দেখেছে বাংলাদেশ। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে, সকল বিভক্তি কাটিয়ে জাতিকে হতে হবে ঐক্যবদ্ধ। একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিই পারে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। বিশ্বাস ছিল এই তারুণ্যই একদিন সমস্ত অচলায়তন ভেঙে দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়বে। তোমাদের অভিনন্দন জানাই একজন গর্বিত বাবা হিসেবে। এ প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক সিয়াম আহমেদ বলেন, ছাত্ররা এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করেছে। নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি আমরা। এখন আমাদের অনেক দায়িত্ব। প্রতিটি ধর্মাবলম্বী মানুষ আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই বাংলাদেশ সবার। এদেশের কারও বাসায় আগুন দেয়া যাবে না। যারা এসব করছে, তারা নিঃসন্দেহে দুর্বৃত্ত। তাদের প্রতিহত করতে হবে। প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকে নিবৃত্ত রাখতে হবে নিজেদের। গণমাধ্যমগুলোর অফিসে আক্রমণ করবেন না, সবাই সবার লিমিটেশন মাথায় রেখে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কোনো ভাস্কর্য ভাঙবেন না। আমাদের আরও সভ্য হতে হবে, উদার হতে হবে,  মানবিক হতে হবে। দেশের সম্পদ রক্ষা করতে হবে। অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, আমাদের জয় এসেছে। এখন সময় এগিয়ে যাওয়ার।

তবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার খবর গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। আমরা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু বর্তমান সহিংসতা নিন্দনীয়। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, এখন দ্রুত সরকার গঠন জরুরি। এবং পুলিশ বাহিনীকে (কিছু অপরাধী অফিসার বাদে) কনফিডেন্স দেন, তাদেরকে কাজে নামান দ্রুত। তারা আমাদেরই বাহিনী। মিলিটারি ভাইয়েরা, সার্বিক নিরাপত্তার দিকে নজর রাখেন। দেশটা দ্রুত স্বাভাবিক করার দিকে এগিয়ে যাই- চলেন। নষ্ট করার মতো এক সেকেন্ডও নাই। নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ বলেন, ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি লোপাট করে, দেশের বাইরে পাচার করে, দেশটাকে অর্থনৈতিকভাবে ফোকলা করে গেছে ইতরের দল। বান্নাহ বলেন, এই দেশটাকে গড়তে সময় লাগবে। খুব কঠিন। আল্লাহ্‌ সহায় হোন এই দেশবাসীর। তবে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে শিক্ষার্থীরা, সংসদ ভবনসহ পুরো দেশ পরিষ্কারের দায়িত্ব নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। দেশের প্রতিটি মন্দির দেখার দায়িত্ব নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। তাদের স্যালুট। এই দেশ আর পথ হারাবে না ইনশাআল্লাহ্‌। দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। অভিনেত্রী রাফিয়াথ রশীদ মিথিলা বলেন, স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা। নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়। ন্যায়বিচার ও সাম্যের দেশ গড়া। আমাদের সন্তানদের, ছাত্রদের ত্যাগের কথা যেন ভুলে না যাই। তবে এতদিনের আন্দোলন আর রক্তের বিনিময়ে আমরা ধ্বংসযজ্ঞ, সহিংসতা চাই না। তবে যারা নাগরিকদের সম্পদ ও শিল্প ধ্বংস করছে, যারা মানুষের (সে যেকোনো ধর্ম, বর্ণ, পেশার মানুষই হোক না কেন) ওপর সহিংসতা করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম বলেন, এটা নতুন এক বাংলাদেশ। একজন শিল্পী হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড সংস্কারের সময় এসেছে। আর চলচ্চিত্রের অনুদান যেন হয় যোগ্যতার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে: মাইলাম

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন রাইট টু ফ্রিডমের প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, বিশ্ব জুড়ে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে। আমরা স্বাধীনতার অধিকারকে প্রশংসার সাথে দেখছি। কেননা বাংলাদেশের জনগণ এ সপ্তাহে তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে। আমরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রাণহানির জন্য শোক প্রকাশ করছি। এছাড়া চলমান সহিংসতার বিষয় নিয়েও আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের যেন আইনের আওতায় আনা হয় সেবিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সহিংসতায় যে প্রাণহানি হয়েছে তার আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন মাইলাম। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের এ মর্মান্তিক ঘটনায় আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাচিত করায় মাইলাম অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তনি বলেছেন, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস ছাড়া আমরা অন্য কাউকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে পারি না।

আমরা আশা করি বাংলাদেশি সমাজের সকল উপাদান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রফেসর ইউনূস এবং তার সরকারকে এই মহান দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।

এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মাইলাম। তিনি বলেছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর বিষয়ে জনগণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আমরা মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে অবাধ, সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন কার্যকর করা। তবে এক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সেটা সম্ভব হবে না। সরকারকে বাংলাদেশের সমালোচনামূলক স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এছাড়া দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বিভাগ সংস্কারে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে তাই যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে কাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন মাইলাম।

আগের অন্তবর্তীকালীন সরকার শাসনের সুযোগ বেছে নিয়ে মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে বলে অভিযোগ করে মাইলাম বলেছেন, হাসিনার স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা যে আত্মত্যাগ করেছে তার আলোকে আগের ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে। যারা তাদের জীবন দিয়েছেন তাদের সম্মান জানাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ওই রাষ্ট্রদূত। এছাড়া তিনি আরও বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বাক ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সম্মান করার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। যারা অপরাধী তাদের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বশেষে মাইলাম বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কী ভাবছে ভারত সরকার by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

সতর্কতা গ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া বাংলাদেশ নিয়ে ভারত এখনো কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণ, উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন ও নতুন ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের সমর্থন কতটা সদর্থক ও ইতিবাচক হয়, ভারতের প্রাথমিক নজর এখন সেদিকেই। ভারত সতর্ক বলেই সেখানকার দূতাবাসের দুই শতাধিক কর্মীকে দেশে ফেরত আনা হয়েছে। ভিসা আবেদন গ্রহণের কেন্দ্রগুলোও আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভারতের প্রাথমিক চিন্তা ভারত বিরোধিতার বহর নিয়ে। আন্দোলনের মাঝপথে যেভাবে ভারতবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে, তাতে দিল্লির সাউথ ব্লক গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দেশের বিভিন্ন জেলায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি, মন্দির আক্রান্ত হয়েছে। হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানপাট লুট হয়েছে। এ নিয়েও ভারত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কয়েক দিন ধরে ভারত চেষ্টা করেছে সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলে এই প্রবণতায় রাশ টানতে। ভারতের পক্ষে স্বস্তির বিষয়, সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে এই অপকর্ম বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা না হলেও মোদি সরকারের ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, ভারতীয় সংস্কৃতিকেন্দ্রসহ কিছু স্থাপনা ও হিন্দুদের ওপর হামলার পেছনে জামায়াতের মতো মৌলবাদী শক্তিই জড়িত। ভারতবিদ্বেষের প্রধান শক্তিও তারা। শেখ হাসিনার জমানায় এই শক্তি সেভাবে মাথাচাড়া দিতে পারেনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা প্রকাশ্যেই নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ও নানা স্থাপত্য ভেঙে ফেলাও তাদের কাজ বলে ভারত মনে করে। নতুন সরকারে প্রধানত জামায়াতের অন্তর্ভুক্তি ও প্রভাব কতটা থাকে, সেদিকে ভারত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে।

ভারত মনে করে, নতুন রাজনৈতিক পরিসরে জামায়াতের উত্থান প্রগতিশীল, উন্নতমনা, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পক্ষেও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নতুন প্রজন্ম, যারা এই বিপ্লবের প্রধান কান্ডারি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টি কীভাবে দেখছে ও আগামী দিনে দেখবে, ভারত তা সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ রাখছে। সাউথ ব্লক মনে করছে, আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা নির্ধারণ করবে এই বিষয়।

সেই কারণেই মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার নজর রাখছে, অধ্যাপক ড. ইউনূসের উপদেষ্টামণ্ডলীতে কারা আসেন তার ওপর। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক হিসেবে ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা ভারতকে আশ্বস্ত করেছে। যদিও প্রশাসক হিসেবে তিনি কতটা দক্ষ, তা অজানা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে, উপদেষ্টামণ্ডলীর গঠন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্র সমন্বয়ক ও সুশীল সমাজে মতপার্থক্য আছে। এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর মতামতও স্পষ্ট নয়। ইউনূস দেশে ফিরে কীভাবে এর সমাধান করেন, সেদিকে দৃষ্টি থাকছে ভারতের।

এই কয়েক দিনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও ভারতের কোনো কোনো মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হাসিনার দেশত্যাগের পেছনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও উদ্যোগের কথা এখন সবার জানা। সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করতে চায়নি। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের রোখা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা কিংবা ভীতসন্ত্রস্ত পুলিশ বাহিনীকে সাহস না জোগানোর ক্ষেত্রে বাহিনী কেন নিষ্ক্রিয় থাকল, সেই ব্যাখ্যা এসব মহলে নেই। যে বাহিনী জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষার কাজে পারদর্শী, তারা কেন নিজের দেশে শান্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ, এই প্রশ্ন উঠছে।

মোদি সরকারের কারও কারও ধারণা, ওই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের কাছে অপ্রিয় হতে চায়নি। কেউবা মনে করেন, হয়তো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগরে জনতাকে শান্ত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কারণ যা-ই হোক, ভারত মনে করে ওই জনরোষ দেশের অনেক ক্ষতি করে দিয়েছে।

শেখ হাসিনাকে নিয়েও ভারত দোলাচলে। চিন্তায়ও। হাসিনাকে পাকাপাকি আশ্রয় দিতে ভারত চায় না। কারণ, বাংলাদেশের নতুন শক্তি তা পছন্দ করবে না এবং আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর তা প্রভাব ফেলবে। আবার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের জন্যও হাসিনাকে ভারত অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিতে পারছে না।

এই কারণেই হয়তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর সর্বদলীয় নেতাদের বলেছেন, হাসিনা সাময়িকভাবে এ দেশে থাকবেন। স্থায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় নির্দিষ্ট হয়ে গেলে তিনি চলে যাবেন। তা যাতে দ্রুত হয়, সেটাই ভারতের কাম্য। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যেই ভারতীয় গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, হাসিনা ভারতে আশ্রয় পান, তা কাম্য নয়।

১৫ বছর ধরে চলে আসা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের গতিপথ আগামী দিনে কেমন হবে, এখনো তা অজানা।

ড. ইউনূস ঢাকায় ফিরলেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে তরুণদের প্রতি জানালেন কৃতজ্ঞতা

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে আজ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। বেলা ২টা ১০ মিনিটের কিছু পরে তিনি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

আজ রাত আটটার দিকে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিতে পারে।  ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, তিন বাহিনীর প্রধান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

বিমানবন্দরে বেলা পৌনে তিনটার দিকে বক্তব্য দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে আজকে নতুন বিজয় সৃষ্টি হলো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তরুণ সমাজ এটা সম্ভব করেছে। তাঁদের প্রতি আমরা সমস্ত কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বক্তব্য দেওয়ার সময় ড. ইউনূসের পাশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দেখা যায়। বক্তব্য শুরুর আগে তাঁরা ড. ইউনূসকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমার ওপর আপনারা আস্থা রাখেন। কারও ওপর হামলা হবে না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য ১৫ জনের মতো হতে পারে বলে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। কে কে এই সরকারে থাকছেন, তা জানা যায়নি। বিভিন্ন নামের তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা আছে। সদস্যসংখ্যার পর যেটি আলোচনা, তা হলো, এ সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৫ জনের নামের একটি তালিকা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। ড. ইউনূস আজ দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে তালিকাটি চূড়ান্ত হবে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে দেখা করে তালিকার বিষয়ে কথা বলেছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় গত সোমবার। এরপর তিন দিন ধরে দেশে কার্যত কোনো সরকার নেই।

প্রতিদিন ১টি এলাচি খেলে কী হবে জানেন?

নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি স্ট্রেস বা মানসিক চাপ। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—মানসিক চাপে ভুগছেন সবাই। সবারই এক প্রশ্ন, কীভাবে কমবে মানসিক চাপ। এর একটা চেনা পরিচিত সমাধানের নাম এলাচি।

এলাচ বা এলাচি একটি সুগন্ধি গাছ। এলাচি সেই গাছের ফল। এলাচিকে বলা হয় মসলার রানি। প্রতিদিন মাত্র একটি এলাচি আপনার মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে জানিয়েছে একাধিক গবেষণা।

এলাচির মধ্যে কালো এলাচি বেশি কার্যকর। তবে আমাদের দেশে যে এলাচি পাওয়া যায়, তাতেও কাজ হবে।
কী আছে এলাচিতে?

১০০ গ্রাম এলাচিতে মেলে ৩১১ ক্যালরি শক্তি, ১১ গ্রাম প্রোটিন ও ২৮ গ্রাম ডায়েটারি ফাইবার। এ ছাড়া নিয়াসিন, পাইরিডক্সিন, রাইবোফ্লোভিন, থিয়ামাইন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও জিংকের চমৎকার উৎস এই মসলা।

মানসিক চাপ, অস্থিরতা, হতাশা ও ভয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে

‘অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট’ হিসেবে নামডাক আছে এলাচির। অনেকেই আছেন, কিছু একটা হলেই অস্থির হয়ে পড়েন। কিছু আশঙ্কা না থাকলেও অনেকের ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করে। কোনো পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর নাম মনে করতে পারছেন না—সেই থেকে শুরু হয়ে গেল অস্থিরতা। এ অস্থিরতা থেকে ঘাম হয় আর বুকের মধ্যে একধরনের অচেনা অনুভূতি কাজ করতে থাকে। বুক ধড়ফড় করতে থাকে। এ ধরনের মানুষের মানসিক অস্থিরতা, চাপ কমাতে এলাচি কার্যকর। যাঁদের ভয়জনিত সমস্যা আছে—ভিড়ের ভেতর হাঁসফাঁস, অন্ধকারে সমস্যা, উচ্চ শব্দে সমস্যা, উত্তেজনা সহ্য হয় না—তাঁরাও উপকার পাবেন এলাচিতে।

আরও কী করে এলাচি?

প্রতিদিন একটি এলাচি সর্দি-কাশি, ফুসফুসের সমস্যা, রক্তসঞ্চালনের সমস্যা থেকে দূরে রাখে। উচ্চ রক্তচাপে এলাচি খুব উপকারী। রক্তনালিতে রক্ত জমে যাওয়ার সমস্যারও সমাধান দেয় রান্নাঘরের চেনা পরিচিত এই মসলা। এলাচির মধ্যে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান হার্টের জন্য ভালো। কোলেস্টেরল কম রাখতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপেও দারুণ ওষুধ এলাচি। এতে প্রচুর ম্যাঙ্গানিজ আছে, যা শরীরে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার এনজাইম তৈরি করে শরীরকে বিষমুক্ত রাখে।

এলাচি ক্যানসার প্রতিরোধে বিশাল ভূমিকা রাখতে সক্ষম, যা শুধু প্রতিরোধেই কাজ করে না, প্রাথমিক স্তরে ক্যানসার নির্মূলেও কাজ করে।

কীভাবে খাবেন

নিয়মিত প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ১টি এলাচি মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খেলে এর উপকারিতা পাওয়া যাবে। যাঁরা নিয়মিত মানসিক চাপে, অস্থিরতায় ভোগেন, তাঁরা প্রতিবেলা খাওয়ার পর ১টি এলাচি চিবিয়ে খেতেই পারেন। ২-৩টি এলাচি গরম পানিতে জ্বাল দিয়ে সেই পানি চায়ের মতো করে খেলেও উপকার পাওয়া যায়। অনেকেই বাড়িতে চায়ের সঙ্গে জ্বাল দিয়েও এলাচি-চা বানিয়ে খান। এ ছাড়া এলাচির তেল খেতে পারেন।

সূত্র: এনডিটিভি ও নিউজ এইটিন অবলম্বনে

অর্থনীতির হাল ফেরাবেন, তাই ভরসা ইউনূসে

ঋণ-জর্জরিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সরকারের মাথায় বসে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-ই পারবেন দিশা দেখাতে। এমনটাই মনে করছেন শান্তিকামী বাংলাদেশি। আজ, বৃহস্পতিবার শপথ নেওয়ার কথা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের। ​​প্যারিস থেকে বাংলাদেশ ফিরছেন ইউনূস। একে তিনি অর্থনীতিবিদ। নোবেল পেয়েছেন শান্তিতে। তাই, এই মুহূর্তে তাঁর চেয়ে আর কেই বা হতে পারেন যোগ্যতম? ঋণ-জর্জরিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সরকারের মাথায় বসে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-ই তো পারবেন দিশা দেখাতে - মনে করছেন শান্তিকামী বাংলাদেশি। আজ, বৃহস্পতিবার শপথ নেওয়ার কথা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের।

প্যারিস থেকে এ দিনই বাংলাদেশে পৌঁছবেন ইউনূস। আর তারপরে তাঁরই হাত ধরে শুধু অর্থনীতিতে নয়, সার্বিক ভাবে দেশ ঘুরে দাঁড়াবে - এমন বিশ্বাসে বুক বাঁধছেন সেখানকার বুদ্ধিজীবীরা। শুধু বিপুল ঋণের বোঝাই নয়। সাম্প্রতিক অস্থিরতার জেরে কারখানা ও উৎপাদন বড় ধাক্কা খেয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৯৯.৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে হিংসা মাত্রা ছাড়িয়েছে। এমন আবহে হাল ধরতে চলেছেন ইউনূস। বাংলাদেশের স্থানীয় সময় দুপুর ২টো ১০-এ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার কথা ইউনূসের। তার আগেই নোবেলজয়ীর আবেদন - ‘আমাদের কোনও ভুলের কারণে এই বিজয় যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়। সবাইকে বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে এবং সব ধরনের হিংসা এবং সম্পদ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশের ‘সাহসী’ পড়ুয়াদের অভিনন্দনও জানিয়ে বলেছেন, এঁরাই ‘দ্বিতীয় বিজয় দিবস’-এর বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের আমজনতাকেও ‘অভিনন্দন’ জানিয়েছেন বাংলাদেশে স্মল ফিনান্সের প্রবক্তা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসাদ বিন রনি বুধবার বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূস এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য চরিত্র। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ীকেই তাই সরকারের মাথায় চেয়েছি আমরা। কারণ দেশের অর্থনীতি বেহাল। হাল ধরতে ওঁর মতো কাউকেই চাই।’

গত সোমবার পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে দিনই সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান জানিয়েছিলেন, আপাতত অন্তর্বর্তী সরকার দেশ চালাবে। তারপরই ক্যাবিনেটের সম্ভাব্য কিছু নাম ঘুরে বেড়াতে থাকে। কিন্তু এর কোনওটিরই নিশ্চয়তা মেলেনি বুধবার সন্ধে পর্যন্ত। সেই অসমর্থিত তালিকায় ছিলেন ‘দৈনিক মানবজমিন’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীও।

তাঁর কাছে ‘এই সময়’-এর প্রশ্ন ছিল, কেন ইউনূস? তাঁর তো সে অর্থে কোন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। মতিউর বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি বিশেষ পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। আগে কখনও সরকারের প্রধান এ ভাবে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েননি। এমন সময়ে সরকার চালাতে ডঃ মূহাম্মদ ইউনূসের নাম আন্দোলনকারী ছাত্র নেতারা প্রস্তাব করলে প্রেসিডেন্ট তা চূড়ান্ত করেছেন। ধরে নেওয়াই যায় যে অন্যান্য মহল এবং রাজনৈতিক দলগুলিরও তাঁর প্রতি সমর্থন আছে।’

এরপরে তাঁর গলাতেও শোনা যায় রনির সুর। মতিউরের বক্তব্য, ‘প্রফেসর ইউনূস এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বাংলাদেশি। ইউরোপ, আমেরিকা, চিন বা ভারত - সর্বত্র তিনি তাঁর কাজের জন্য সমাদৃত। হাসিনার সরকারের দ্বারা তিনি অন্যায় ভাবে নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন বলে বিশ্বাস বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষেরই। দেশের মানুষেরও তাঁর প্রতি বিপুল সমর্থন রয়েছে।’

তা ছাড়া রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলেও সারা জীবন ইউনূস মানুষকে নিয়েই কাজ করেছেন। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রসঙ্গও তোলেন মতিউর। কিছু দিন আগে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাগাজ়িনকে সাক্ষাৎকারে ইউনূস বলেছিলেন, ‘রাজনীতি নিয়ে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়।’ সেই তিনিই ছাত্রদের দাবি মেনে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে রাজি। বুধবার ব্রিটেনের একটি দৈনিককে বলেছেন, ‘দেশ পুনর্গঠনে আমরা এক সঙ্গে কী ভাবে কাজ করতে পারি, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব দলের সঙ্গে কথা বলব।’

দেশে স্থিতাবস্থা ফিরলে দ্রুত নির্বাচনের চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন। স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তরুণ সমাজের অনুরোধেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হতে রাজি হয়েছেন। নির্বাচনী রাজনীতি তাঁর না-পসন্দ। মনোনীত কোনও পদও চান না। বাংলাদেশে এ দিনই শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় দণ্ড বাতিল হয়েছে ইউনূসের। শ্রম-আইন ভাঙার অভিযোগে জানুয়ারিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল বাংলাদেশের আদালত। ছ’মাসের সাজাও হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধেই আবেদন জানান ইউনূস। এ দিন নতুন রায় জানিয়েছে শ্রম আপিল ট্রাইবুনাল।

বুধবার দেশে নতুন করে কোনও হিংসা-হানাহানির খবর মেলেনি। সোনার বাংলা ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরলেও প্রচুর মানুষের নিধন, সম্পত্তি ভাঙচুরের পরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকছেই। এই পরিস্থিতিতে ইউনূসের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? একই সুর রনি, মতিউর-এর গলায়। মতিউরের কথায়, ‘প্রথম চ্যালেঞ্জ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। মানুষকে ভরসা দেওয়া। এই গণঅভ্যুত্থানে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। সেটাও পূরণ করতে হবে। ছাত্রহত্যায় জড়িতদের বিচার করতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। যেটা ইউনূসের চেয়ে ভালো আর কেই বা সামলাতে পারবেন?’

মতিউরের মতে, ইউনূস কী ভাবে দুর্নীতিতে লাগাম পরান, নজর থাকবে সে দিকেও। বাংলাদেশেরই অন্যতম অর্থনীতিবিদ এবং মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্য দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও ‘এই সময়’-কে বলেন, ‘একটি স্থিতিশীল, আস্থাভাজন ও কর্মক্ষম সরকার তৈরিই ইউনূসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
অবশ্যম্ভাবি প্রশ্ন, ভারতের প্রতি নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী হতে পারে? বুধবারেই সাক্ষাৎকারে ইউনূস বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্থিতিশীল না হলে তার প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সেভেন সিস্টার্স স্টেটে (উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য) পড়বে। ফলে চারপাশে অগ্নুৎপাত ঘটবে। তা কখনই একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না।’ নির্বাচনের নামে বাংলাদেশে যে বছরের পর বছর প্রহসন হয়েছে, তা নিয়ে ভারত কোনও সমালোচনা না করায় তিনি অসন্তুষ্ট বলেও জানান।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে মতিউরের পর্যবেক্ষণ, ‘বাংলাদেশ সব সময়েই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কে আগ্রহী। কিন্তু ভারত এক ঝুড়িতে সব আম রাখায় এ নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তবে আমি দেখছি, ভারতের বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে প্রফেসর ইউনূসকে স্বাগত জানিয়েছেন। আমার ধারণা, সঙ্কট কাটিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক ঠিক পথেই এগোবে।’

সূত্র: এই সময়

রিকশায় ছবি দেখে হাসপাতালে নাফিজের লাশ পান বাবা by ফাহিমা আক্তার সুমি

সদ্য এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন গোলাম নাফিজ। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। নাফিজের বাবা একজন ব্যবসায়ী। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসেন ঢাকায়। মহাখালীতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পড়াশোনায় নাফিজ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তার ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে পাইলট হওয়ার। তবে সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তার। ৪ঠা জুলাই কোটা বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে সংষর্ষে নিহত হন তিনি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা। নাফিজের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রোববার নাফিজ আহত হওয়ার পর একজন রিকশাচালক তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। রিকশায় তুলার পরও কিছু সময় তিনি বেঁচে ছিলেন। রিকশায় করে তাকে নিয়ে যাওয়ার ছবি ভাইরাল হলেও তখনো তার পরিচয় নিশ্চিত হয়নি।

নাফিজের বাবা গোলাম রহমান মানবজমিনকে বলেন, রোববার দুপুর বরোটার দিকে বাসা থেকে নাফিজ বের হয়। তিনটার সময় তার এক বন্ধুর মোবাইল থেকে ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তার মায়ের শরীর খারাপ থাকায় দ্রুত বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছিল। কিন্তু আমার নাফিজ আর বাসায় ফেরেনি। নাফিজ ফার্মগেটে ছিল আন্দোলন করার সময় খামারবাড়ী মৃত্তিকা ভবনের সামনে নাফিজ গুলিবিদ্ধ হয়। কিছুক্ষণ পরে মনের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হলো। আমার সন্তানের কোনো খবর না পেয়ে আমি খুঁজতে বের হই। ঢাকা শহরে এমন কোনো থানা, হাসপাতাল, ডিবি অফিসে খুঁজতে বাকি ছিল না। ভেবেছিলাম ওকে মনে হয় পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। দুই সন্তানের মধ্যে নাফিজ ছিল ছোট। মিরপুর ১৪ নম্বরে নেভি কলেজে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছিল। আমার সন্তান খুব মেধাবী ছিল। সে খেলাধুলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক কাজে সংযুক্ত ছিল। ভবিষ্যতে পাইলট হওয়ার ইচ্ছে ছিল, আমরাও ওর আগ্রহ দেখে তাকে উৎসাহ দেই। শুরু থেকেই নাফিজ আন্দোলনে নেমেছে আমিও ওকে বাধা দেইনি কখনো, সবসময় সাহস দিয়েছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে আমি কী করে বেঁচে থাকবো। রোববার পাগলের মতো খুঁজতে থাকি। পরে ওইদিন রাত বারোটার সময় ‘জনবিস্ফোরণ নিহত শতাধিক’ শিরোনামে মানবজমিন পত্রিকায় দেখি রিকশার উপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা একটি ছবি ছাপা হয়েছে- এটিই আমার সন্তান। যখন ছবিটা দেখি আমার ছেলেকে নিথর অবস্থায় রিকশায় নিয়ে যাচ্ছে তখনই বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। আমার আর সহ্য হয়নি, মনে হয়েছে পৃথিবীতে এমন মৃত্যু আর যেন না হয়। কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। এরপর আবার হাসপাতালে হাসপাতালে খুঁজতে থাকি। পরে রাত চারটার সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখি নাফিজ মারা গেছে। পরে তার মরদেহ নিয়ে দক্ষিণখানে দাফন করা হয়। ছাত্র আন্দোলনে আমার ছেলের সঙ্গে আরও অনেকে শহীদ হয়েছে। কতো বাবা-মায়ের বুক খালি হয়েছে। আমার বড় সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এডমিশন দিচ্ছে। ব্যবসা করে দুই সন্তানের লেখাপড়ায় সবসময় সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করেছি সবসময়। এখন আমার বুক খালি করে দিয়ে গেছে। ওর মা কথা বলতে পারছে না। এমন দুঃখজনক মৃত্যু তো চাইনি। তবুও আমার সন্তান রাষ্ট্রের ভালোর জন্য মারা গিয়েছে এটাই এখন সান্ত্ব্তনা। কাঁদতে কাঁদতে নাফিজের মামা আবুল হাশেম বলেন, নাফিজের বুকের বাম পাশে গুলি লাগে। নাকে-মুখে অনেক আঘাতের চিহ্ন ছিল।

ইতিবাচক কাজে প্রশংসায় ভাসছেন শিক্ষার্থীরা: ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে পরিচ্ছন্নতায় তারা

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। ঘটনার দিন সোমবার উত্তেজিত জনতা গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়, লুটপাট করে নিয়ে যায় বিভিন্ন মালপত্র। তবে মঙ্গলবার থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার নিরাপত্তা এবং সড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নেমে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

ভেঙে ফেলা বিভিন্ন স্থাপনা মেরামতের কাজ করছেন ছাত্রছাত্রীরা। আগুনে ঝলসে যাওয়া স্থানের রং করছেন। আঁকছেন বিভিন্ন আলপনা। সড়ক থেকে গাছ উপড়ে ফেলা স্থানে নতুন করে রোপণ করছেন চারা। এ ছাড়া গণভবন, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লুট হওয়া মালপত্র উদ্ধারে বসানো হয়েছে বুথ। শিক্ষার্থীরা ‘লুট হওয়া মাল ফেরত দিন’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে এসব স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়েছেন।

সাধারণ মানুষও শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মালপত্র ফেরত দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের এসব ইতিবাচক কাজ প্রশংসা কুড়াচ্ছে সর্বমহলে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে একদল শিক্ষার্থী। কারও হাতে লাঠি আবার কারও হাতে লাল পতাকা। ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রীরাও প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে সড়কে রয়েছেন। সিগন্যাল না মানলে কিছুক্ষণ আটকে রেখে (শাস্তি) ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। হেলমেট না থাকলে বাইকারদের ৫ মিনিট রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। মিরপুর, গাবতলী, বনানী, ফার্মগেট, শাহবাগসহ পুরো রাজধানীতেই এ চিত্র দেখা গেছে। সংসদ ভবন, গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাঙচুরের সব ক্ষত মুছে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সব ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে দিয়েছেন। এখন এই তিন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় রয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তবে শিক্ষার্থীদেরও এসব স্থাপনার সামনে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। সংসদ ভবনের সামনে কথা হয় ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা বলেন, ‘মঙ্গলবার থেকেই স্বেচ্ছায় আমরা এখানে কাজ করছি। কারও প্রতি কোনো জোর নেই। যে যার মতো যতক্ষণ খুশি কাজ করছেন।’

মিরাজ আহমেদ খান নামে এক শিক্ষার্থী কালবেলাকে বলেন, ‘আমি সকাল থেকে এখানে আছি। আমাদের ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়েরা কিছু নির্দেশনা দিচ্ছেন। আমরা মূলত নিজেদের মতোই কাজ করছি। যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, ততদিন আমরা কাজ করব।’

গতকাল সকাল থেকেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি পরিষ্কার করে একদল শিক্ষার্থী। পরে দুপুরের দিকে সেটির নিয়ন্ত্রণ নিতে দেখা যায় সেনাসদস্যদের। রাজধানীর হলিক্রসের শিক্ষার্থী তাসফিয়া তাসনুম হিয়া বলেন, ‘দেশপ্রেমের তাড়না থেকে এখানে এসেছি। এই দেশটা আমাদের, দেশটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর নিরাপদ রাখার দায়িত্বও আমাদের। বৈষম্যহীন নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়েছে এই দেশের ছাত্রসমাজ। সেই শপথ বাস্তবায়নের সহযোদ্ধা হতে এখানে এসেছি।’

ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আগুনে ঝলসে যাওয়া স্থানে রং-তুলিতে আলপনা আঁকছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া টানা কয়েকদিনের সংঘর্ষে সড়ক ও স্থাপনার বিভিন্ন ক্ষত মেরামত করতেও দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। গতকাল দুপুরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর আড়ং মোড়ে কথা হয় সমতট মুক্ত স্কাউট গ্রুপের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শিক্ষার্থী হলেন আসিফ হাসান, ফারদিন সুনান, এলোন ইসলাম সিয়াম ও সামারা সাবা। তারা কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার গণভবন পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছি। আজকে আমাদের স্কাউট গ্রুপ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে। আমরা সেটিই করছি। যতদিন না দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, আমরা ততদিন সড়ক ছেড়ে যাব না।’

সংসদের সামনে এক শিক্ষার্থীকে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। সেখানে লেখা রয়েছে, সংসদ ভবনের লুট হওয়া মালপত্র ফেরত দিন। শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই লুট হওয়া মালপত্র তাদের কাছে ফেরত দিচ্ছেন বলেও জানান ওই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘লুট হওয়া মালপত্র উদ্ধার করে আমরা সেনাবাহিনীর কাছে ফেরত দিচ্ছি।’

এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে ক্যাম্পাসে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থী টিএসসি, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকা, কলাভবন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ভবন, অপরাজেয় বাংলা, মল চত্বর এলাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিচ্ছন্ন করছেন।

তারা টিএসসি থেকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেন। নির্দিষ্ট স্থান পরিষ্কার শেষে ময়লাভর্তি পলিব্যাগগুলো ময়লার ডাম্পিং স্টেশনে ফেলে দিয়ে বিকেলে তাদের কাজের পরিসমাপ্তি করেন।

এ কাজে যুক্ত ছিলেন ঢাবির মার্কেটিং বিভাগের তিন শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান, ফাইজা তাসনিম তানহা ও ফারদিন খান লাজিম। তারা বলেন, আমাদের ক্যাম্পাস পরিষ্কার করার দায়িত্ব আমাদের। এক মাস ধরে নানান ঘটনায় ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল না। যার ফলে ক্যাম্পাস অনেকটা নোংরা হয়েছিল।

রায়হান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের বিষয়টা সবার জন্য মেসেজ। আমরা সবাই যার যার জায়গা থেকে আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেললে আসলে পরিবেশ ভালো থাকে এবং তা দেখে আমাদের ভালো লাগা অনুভব হয়। প্রতিদিন তো আসলে আমাদের আসা সম্ভব নয়। এজন্য সবাই সচেতন থাকলে সবার জন্যই ভালো।

শিক্ষার্থীদের এসব ভালো কাজে প্রশংসায় ভাসছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি সংবলিত এসব পোস্ট করে প্রশংসা করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা এ ছাত্রসমাজের হাত ধরে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন। তবে অনেকে বলছেন, শিক্ষার্থীদের রক্তে অর্জিত এ বাংলাদেশে ফের যেন কোনো অশুভ শক্তি আর ভর করতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

আমাদের কেউ ভাবেনি আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাতে গড়াবে : জয়

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও সাবেক তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, কোটা আন্দোলন যে সরকার উৎখাতের দিকে গড়াবে, সেটি তারা কেউ ধারণা করতে পারেননি।

শেখ হাসিনা পদত্যাগের বিষয়ে দুয়েক দিন আগে থেকে চিন্তাভাবনা করলেও দেশ ছাড়ার ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না বলে তিনি দাবি করেছেন।

বিক্ষুব্ধ লোকজন গণভবনের দিকে মিছিল করে পৌঁছাতে যতটা সময় লাগবে, দেশত্যাগের জন্য শেখ হাসিনার হাতে সেটুকু সময় ছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে দেশত্যাগের জন্য নির্দিষ্ট করে কোনো সময় বেঁধে দেয়া হয়নি তিনি দাবি করেছেন।

বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক ইথিরাজন আনবারাসনকে দেয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় সেই সময়কার পরিস্থিতি, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তার মতামত এবং কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন পর্যন্ত নানা বিষয়ে কথা বলেছেন।

পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কবে?
বিবিসির প্রশ্ন ছিল ঠিক কবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শেখ হাসিনা, সোমবার সকালে নাকি রোববার সন্ধ্যায়?

জবাবে জয়ের দাবি, সোম কিংবা রোববার না, তারও আগে পদত্যাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এটা শনিবার হতে পারে।

জয় বলেন, ‘না আমার মা কখনো বাংলাদেশ ছাড়তে চায়নি। তাকে আমাদের রাজি করাতে হয়েছে। তিনি পদত্যাগ করার পরিকল্পনা করছিলেন, তিনি একটা ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন এবং সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিক্ষুব্ধ লোকজন গণভবনের দিকে মিছিল করার কথা ঘোষণা করল, আমরা পরিবারের সদস্যরা তার কাছে অনুনয় করি যে তারা সহিংসতার জন্য আসছে, তারা হত্যা করতে পারে, তোমাকে নিরাপত্তার জন্য চলে যেতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার খালা (শেখ রেহানা) তার সাথে ছিলেন। আমার মা চাইছিলেন খালা যেন হেলিকপ্টারে করে সামরিক বিমান ঘাটিতে চলে যান। কিন্তু আমরা মা উঠতে চাচ্ছিলেন না। তখন আমি তাকে এবং আমার খালাকে বলি, তাকে (শেখ হাসিনা) অবশ্যই যেতে হবে।’

তিনি জানান, হেলিকপ্টারে করে ঢাকা ছাড়েন শেখ হাসিনা। সেখান থেকে আগরতলা ও পরে দিল্লি পৌঁছেছেন।

পরিস্থিতি কেন নিয়ন্ত্রণহীন হলো?
পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনায় শেখ হাসিনার সরকার ভুল করেছিল কিনা, জানতে চাওয়া হলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, পরিস্থিতি এই দিকে গড়াবে তা তারা কেউ ভাবেননি।

তিন বলেন, ‘আমাদের কেউ ভাবেনি এই সহিংস আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাতের দিকে গড়াবে। আমরা বুঝতে পারছিলাম, জুলাইয়ের ১৫ তারিখে যে সহিংসতার পেছনে কিছু অজানা গ্রুপ আছে, তারা মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করার সময় আমরা রাজাকার বলে স্লোগান দিয়েছিল। তখন আমাদের সমর্থকদের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কঠোরভাবে সেই সংঘর্ষ থামানোর চেষ্টা করে। আমার বিশ্বাস, সেদিন যারা ওই স্লোগান দিয়েছিল, আমরা এখনো জানি না মধ্যরাতে সেই স্লোগান দেয়া ব্যক্তিরা কারা ছিল, তারাই এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায়ী। আমাদের সরকার কখনো বিক্ষোভকারীদের ওপরে শক্তি প্রয়োগ করতে চায়নি, বরং পুলিশ তাদের পাহারা দিয়েছে, তাদের ওপর হামলার কোনো নির্দেশ ছিল না।’

মাত্র একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে যে সমস্যার সমাধান করা যেত, তা কেন এত প্রাণহানিতে গড়ালো- এমন প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘এর আগে তো আমাদের সরকারই কোটা বাতিল করে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের আবেদনে পরে হাইকোর্ট সেটা বহাল করে। আমাদের সরকারের আইনি টিমও আদালতে শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের চেষ্টা করছিল। এটা এর মধ্যেই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই সহিংসতা শুরু হয়। বলপ্রয়োগ ভুল হয়েছে, কিন্তু এটা উভয়পক্ষেই হয়েছে। শিক্ষার্থী মারা গেছে, বেসামরিক মানুষ মারা গেছে, পুলিশও মারা গেছে।’

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত কী?
এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কে দেবে, জানতে চাইলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘দল টিকে যাবে। ১৯৭৫ পরে যখন বেশিভাগ শীর্ষ নেতা কারাগারে ছিল, তখনো দল টিকে গেছে। এটা হচ্ছে আদর্শের দল, দেশের একমাত্র গণতান্ত্রিক দল যা স্বাধীনতার পূর্বে গণতান্ত্রিকভাবে তৈরি হয়েছে। বাকি দুটি দল সামরিক শাসকদের হাতে তৈরি। দল তাদের নেতা বের করে নেবে। কিন্তু এখন তারা আমাদের দল নির্মূল করার চেষ্টা করছে। নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে, তারা আমাদের মন্ত্রীদের খুঁজছে, অনেকে লুকিয়ে আছে, অনেকে বিদেশে চলে গেছেন।’

দেশে ফিরে সজীব ওয়াজদ জয়ের নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা আছে কিনা, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, এরকম কোনো ইচ্ছা নেই। এটা আমার পরিবারের জন্য তৃতীয় ধাক্কা। যেমন মানুষ, তেমন নেতাই তাদের পাওয়া উচিত। এখন বাংলাদেশে মব রুল চলছে। সামনে যে নির্বাচন হবে, হয়তো আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেয়া হবে না। হয়তো বিএনপি-জামাত নির্বাচনে বিজয়ী হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আসলে অন্ধকারাছন্ন।’

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব
অনেকে অভিযোগ করছেন, আওয়ামী লীগের সময়েও অনেক দমন-পীড়ন হয়েছে, অনেককে গুম করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি আট বছর গুম থাকার পরে দু’জনকে মুক্তিও দেয়া হয়েছে।

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কিছু ভুল হয়েছে। সরকারের মধ্যে অনেক ব্যক্তি ছিলেন যারা এসব ভুল করেছেন। কিন্তু আমরা সবসময়েই সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সরকারেই একজন মন্ত্রীর ছেলে, বিশেষ বাহিনীর সদস্য ছিলেন কিন্তু বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য কারাগারে গেছেন (নারায়ণগঞ্জের সাত খুন)। এটাও ঘটেছে। আমার মা সবসময়েই ঠিক কাজটা করার চেষ্টা করেছেন।’

তবে অনেক সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অনেককে গ্রেফতার করতে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

বিশেষ করে ‘গত দু’টি নির্বাচনে বিরোধীরা গণপরিবহনে আগুন দেয়ায় শত শত নিরীহ মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল’ বলে সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন।

সেসব ঘটনায় অনেক মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল শুধুমাত্র লোকজনকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য বলে তিনি দাবি করেন।

জয় বলেন, ‘জঙ্গিদের আপনি আটক না করলে কিভাবে মানুষজনকে নিরাপদ রাখবেন?’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশ নেবে আওয়ামী লীগ?
বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যগুলো যেভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে, এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অসন্তোষ এবং তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, এটাই আমার এখনকার অনুভূতি। আমি জানি, আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় দল, এখনো আমাদের জনসমর্থন সবচেয়ে বেশি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ১০-২০ হাজার খুব ক্ষুদ্র অংশ।’

জয় বলেন, ‘আপনি জানেন, গণতান্ত্রিক একটি দেশে কোনো দল শতভাগ সমর্থন লাভ করতে পারে না। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এখনো জনপ্রিয় একটি দল। কিন্তু আমি যখন এসব (ভাঙচুরের) ছবি দেখি, আমি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি গভীর অসন্তোষ অনুভব করি। এখন যা বাংলাদেশে ঘটছে, তা পাকিস্তানের মতো।’

তিনি মন্তব্য করেন, ‘একসময় বাংলাদেশের মানুষ পেছন ফিরে তাকিয়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছর সময়কে স্বর্ণযুগ বলে মনে করবে। সেই দিন তারা আফসোস করবে, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক হয়ে গেছে।’

আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশ হবে কিনা, জানতে চাওয়া হলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘তারা আওয়ামী লীগকে কখনোই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশ হতে দেবে না।’

‘বাংলাদেশের মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন শেখ হাসিনা’
শেখ হাসিনার সাথে সর্বশেষ কখন কথা হয়েছে জানতে চাওয়া হলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘তার সাথে আমি গতকাল (মঙ্গলবার) কথা বলেছি। তিনি সুস্থ আছেন, তবে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। আমাদের দলের এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের প্রাণহানি হওয়ায় ব্যথিত। বাংলাদেশের মানুষের আচরণে তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি এবং আমার পরিবার বিদেশে বড় হয়েছি, সেখানেই বাস করি। বাংলাদেশের ডিজিটাইলাইজেশনের জন্য আমি বিনা পয়সায় উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছি। আমি সফল হয়েছি, বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে আমি ডিজিটাল কানেক্টিভটি নিয়ে গেছি। সেই বাংলাদেশের মানুষ আমার মায়ের সাথে এরকম করেছি, আমার নানাকে অসম্মান করেছে যিনি এই দেশের প্রতিষ্ঠাতা, এটা মেনে নেয়া আমার জন্য অনেক কঠিন। বাংলাদেশের মানুষের সাথে আমি আর কোনো সংস্রব রাখতে চাই না।’

যখন ঢাকায় শেষবার শেখ হাসিনার সাথে সংক্ষেপে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কয়েকবার কথা হয়, তখন অনেক হৈচৈ হচ্ছিল।

তখন সংক্ষেপে শেখ হাসিনার সাথে তার শেষ যে কথাটি হয়েছে, তা হলো, ‘মা, তোমাকে এখনি দেশ ছাড়তে হবে।’

তার বোনের সাথেও মায়ের কথা হয় বলে তিনি জানান। তার বোন সায়মা ওয়াজেদ জাতিসঙ্ঘের একটি দফতরের কর্মকর্তা হিসেবে ভারতে থাকেন।

তখন দেশ ত্যাগের জন্য শেখ হাসিনাকে কতটা সময় দেয়া হয়েছিল, জানতে চাওয়া হলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, আসলে কোনো সময়ই দেয়া হয়নি। কারণ বিক্ষুব্ধ লোকজন গণভবনের দিকে মিছিল করে আসছিল। সুতরাং তাদের সেখানে পৌঁছাতে কতটা সময় লাগবে, সেটুকু সময়ই তার হাতে ছিল। তবে তাকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি। এ নিয়ে একটি ভুল তথ্য রয়েছে।

কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি জানান।
সূত্র : বিবিসি


‘সরকার-শূন্যতা’ কাটছে আজ: ড. ইউনূস দুপুরে ফিরছেন, রাতে শপথ

তিন দিনের শূন্যতা কাটিয়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে নতুন সরকারের যাত্রা। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে থাকছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাত ৮টায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন সরকারপ্রধান এবং তার পরিষদের সদস্যরা। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ১৫ জন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গতকাল বুধবার সেনা সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (আজ) দুপুরে ড. ইউনূস দেশে ফিরবেন।

জানা গেছে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে ইতোমধ্যেই দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ দুপুর ২টা ১০ মিনিটে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছাবেন তিনি।

গতকাল বুধবার দেশবাসীর উদ্দেশে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘আমাদের কোনো প্রকার ভুলের কারণে এই বিজয় যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়।’

এ সময় তিনি সবাইকে বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে এবং সব ধরনের সহিংসতা এবং স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চারশ অতিথি উপস্থিত থাকবেন।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কারা থাকছেন, এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম গত রাতের মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চূড়ান্ত রূপরেখা ঘোষণা করা হবে বলে জানান। তবে রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো ঘোষণা আসেনি।

এর আগে গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৩ সমন্বয়ক, তিন বাহিনীর প্রধান ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কিছু নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানানো হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি একজন করে মুক্তিযোদ্ধা, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী রাখার পরামর্শ দেন। আলোচনার মাধ্যমে সেসব নাম চূড়ান্ত করার কথা।

কোনো কিছু চূড়ান্ত না হলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য হিসেবে বেশ কিছু নাম জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে আছেন অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন, নিউএজ পত্রিকার প্রকাশক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ খান বাদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, মানবাধিকার সংগঠক আদিলুর রহমান খান, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ।

অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘উনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লেগেছে। আমার মনে হয়েছে উনি এই কাজটা করার জন্য খুবই আগ্রহী। আমি নিশ্চিত, উনি আমাদের সুন্দর একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে যেতে পারবেন এবং আমরা এ থেকে উপকৃত হবো।’

সেনা সদরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন তিনি বলেন, ‘কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাচন করেছি। আমরা নিজেদের মধ্যে অনেক আলোচনা করেছি। সব রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে, স্টুডেন্ট কো-অর্ডিনেটরদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমার সঙ্গে নেভি ও এয়ার চিফ ছিলেন। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই আলোচনায় সর্বসম্মতভাবে সম্মত হয়ে মহামান্যের কাছে প্রস্তাব দিয়েছি, চিফ অ্যাডভাইজার ড. ইউনূস সাহেবকে করার জন্য এবং উনি এখন আমাদের চিফ অ্যাডভাইজার।’

ড. ইউনূস বৃহস্পতিবার দুপুরে দেশে পৌঁছবেন জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি উনাকে রিসিভ করতে যাব। আমরা উনাকে সর্বতোভাবে সহায়তা করব, আমি আর্মি চিফ, এয়ার চিফ, নেভি চিফ। আমি নিশ্চিত যে, তিনি সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং স্টুডেন্ট কো-অর্ডিনেটরদের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাবেন। আমরা সবাই মিলে উনাকে সাহায্য করব। সবার সহযোগিতায় তিনি তার কাজ সফলভাবে সমাধা করতে সক্ষম হবেন।’

নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান সম্পর্কে সেনাপ্রধান বলেন, ‘কালকে (আজ) শপথ গ্রহণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বিকেলে করার একটা প্রস্তাব ছিল। বিকেলে খুব টাইট হয়ে যেতে পারে। কারণ তিনি ২টা ১০ মিনিটের দিকে এখানে আসবেন। আমরা রাত ৮টার দিকে করতে পারি। হয়তো চারশ জন লোকের উপস্থিতি সেখানে থাকবে। এই পরিসরে আমরা শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান করব।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কতজন থাকবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, আপাতত ১৫ জন হতে পারে। এর কম-বেশি হতে পারে। মোটামুটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যেহেতু ফরমালি প্রকাশ করা হয়নি, তাই আমি এখন বলছি না।’

গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন দমাতে সরকারের ব্যাপক বলপ্রয়োগে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। তবে তাতেও

ছাত্র-জনতার জাগরণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। হাসিনা সরকারকে হটাতে অসহযোগ ও ঢাকামুখী মার্চের ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশ বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে।

দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ সার্বিক বিষয়ে ভূমিকা নেন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবউদ্দীন।

এরপর শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম চূড়ান্ত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অন্য নামগুলো চূড়ান্ত করছেন শিক্ষার্থীরা।

দেড় দশক ধরে আক্রোশের শিকার ড. ইউনূস

ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখায় ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ২৪টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬১টি সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন তিনি। তার ঝুলিতে আছে ৩৩টি দেশের ১৩৬টি সম্মাননা। এর মধ্যে আছে ১০টি দেশের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। এখন পর্যন্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার, ইউনাইটেড স্টেটস প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং ইউনাইটেড স্টেটস কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল পাওয়া মাত্র সাতজন ব্যক্তির মধ্যে তিনি একজন। এর বাইরেও তিনি বেশকিছু ইউরোপীয় দেশের রাজকীয় সম্মাননা পেয়েছেন।

সারা বিশ্বে যাকে নানাভাবে সম্মানিত করছে, গত দেড় দশকে তাকেই নিজের দেশে সইতে হয়েছে নানামুখী লাঞ্ছনা। নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক থেকে বিতাড়িত হওয়া থেকে শুরু করে একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা, এমনকি কারাদণ্ডের রায়ও শুনতে হয়েছে তাকে। আর নানারকম কটূক্তির তো সীমাই ছিল না। মূলত সরকারপ্রধানের চরম আক্রোশের শিকার হয়েই ড. ইউনূসকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে সর্বস্তরের মানুষের ধারণা।

বিশ্বে ড. ইউনূসকে এক নামে চিনলেও দেড় দশক ধরে নিজ দেশেই বিভিন্ন অভিযোগে বারবার দাঁড়িয়েছেন আদালতের কাঠগড়ায়; কখনো ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কখনো হয়েছেন আবেগাপ্লুত। সর্বশেষ কয়েক বছর তার দীর্ঘ সময় কেটেছে আদালত প্রাঙ্গণে।

ঘটনার শুরু অবশ্য রাজনীতিতে তার আগ্রহ দেখানোর পরই। ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল জয়ের পরের বছর ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এরই মধ্যে রাজনীতিতে নামতে দল গঠনের ঘোষণা দেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দলের নাম দেন ‘নাগরিক শক্তি’। যদিও মাস কয়েক পরই রাজনীতি থেকে সরে যান এই অর্থনীতিবিদ। তবে তখন থেকেই ড. ইউনূস সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

সমালোচকরা বলে থাকেন, নোবেল জয় করে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা উঁচু করাই কাল হলো এই অর্থনীতিবিদের। কারণ, সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এই নোবেল জয়কে কোনোভাবেই সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে যিনি দেশ থেকে পালিয়ে এখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

জরুরি অবস্থা অবসানের পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর আক্রোশ হিসেবে বয়সজনিত কারণ দেখিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. ইউনূসকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারের সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গেলেও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে ২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়তে হয় ইউনূসকে।

সেখানেই শেষ নয়; বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতুর ঋণ আটকে দিলে তার জন্য শেখ হাসিনা দায়ী করেন ড. ইউনূসকে। যদিও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে শেখ হাসিনা সরকার। হাসিনা সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত এই বিখ্যাত মানুষটির সমালোচনায় মুখর ছিলেন সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতারা। দল ও সরকারের যে কোনো ফোরামের সভা-সমাবেশ ও আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিকভাবেই ঘুরে ফিরে আসত ড. ইউনূসের নাম। সরকারপ্রধানসহ আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে বারবার ‘গরিবের রক্তচোষা’, ‘ঘুষখোর’ বলে অপমানিত করেন। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঝাড়ু মিছিল করে অসম্মানিত করার অপচেষ্টা করা হয়।

মাস কয়েক আগে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ শক্তিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয় সরকার সমর্থকরা। তার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, এমনকি বিদেশে বক্তৃতা থেকে তিনি যে সম্মানী পান, তা সরকারের করমুক্ত সুবিধার আওতায় বৈধ চ্যানেলে দেশে আনলেও তার বিরুদ্ধে বারবার ট্যাক্স ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়।

ড. ইউনূসের প্রতি শেখ হাসিনার বৈরিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বারবার আলোচিত হয়। বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, নোবেলজয়ী থেকে শুরু করে নানা প্রান্ত থেকে তাকে বিচারিক হয়রানি না করার আহ্বান জানানো হলেও তাতে কোনো কর্ণপাত করেননি শেখ হাসিনা।

ড. ইউনূসকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন। চলমান মামলা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বের ১৬০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খোলা চিঠি দেন।

ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বারবার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিনি যে ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, সেগুলোর একটিতেও তার ১ শতাংশ মালিকানা নেই এবং এগুলো থেকে পারিশ্রমিক, ফি বা লাভ হিসেবে তিনি এক টাকাও নেন না। স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে তিনি এসব কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব প্রতিবাদ কখনোই আমলে নেওয়া হয়নি। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় প্রবীণ এই অধ্যাপককে সবসময়ই সন্দেহের চোখে দেখতেন শেখ হাসিনা।

দেড় দশক ধরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৬৮টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ফৌজদারি আদালতে একটি, দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি এবং বাকি ১৬৬টি মামলা ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন ছিল। সর্বশেষ গত ৪ আগস্ট এক রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পাওনা হিসেবে ৬৬৬ কোটি টাকা ড. ইউনূসকে পরিশোধ করতে হবে। প্রায় ২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালের ৪ জুলাই গ্রামীণ টেলিকমের ৮ কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৩ মার্চ এ মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পান ড. ইউনূস।

এ বছরের ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি ধারায় তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানার শাস্তি দেন ঢাকার একটি শ্রম আদালত। রায়ের পর আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে ড. ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে অপরাধ করিনি, সেই অপরাধের জন্য শাস্তি পেলাম।’

শ্রম আদালতের দেওয়া রায় চ্যালেঞ্জ করে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন ড. ইউনূস। যদিও শেখ হাসিনার সরকার শ্রম আদালতকে প্রভাবিত করে তাকে এই কারাদণ্ড দিয়েছে বলে ধারণা আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের। যিনি সারা জীবন দরিদ্র ও বঞ্চিতদের জন্য কাজ করেছেন, তাকেই শেখ হাসিনা সরকার কারাগারে বন্দি করার পরিকল্পনা নেয়। অবশেষে গতকাল সেই রায় বাতিল করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

বিদায়ী সরকারের আমলে ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ আটটি প্রতিষ্ঠান ‘জবরদখল’ করা হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ টেলিকম, গ্রামীণ কল্যাণসহ এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। ঢাকার মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোডে ‘টেলিকম ভবন’ নামে ১৩ তলা একটি ভবনে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। সম্প্রতি ওই ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা একটা ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছি। আমরা একটা স্বপ্নের বীজতলা হিসেবে এই ভবন তৈরি করেছিলাম।’

বাংলাদেশ পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে মনিটরিং করছে যুক্তরাষ্ট্র -পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং

বাংলাদেশের মানুষের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা সব পক্ষকে আরও সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে মনিটরিং করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বুধবার ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন। গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে অনেক বেশি প্রাণহানি হয়েছে। আমরা সামনের দিনগুলোতে সবাইকে শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানাই। স্বাগত জানাই একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণাকে। আহ্বান জানাই বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের। সপ্তাহান্তে এবং গত সপ্তাহগুলোতে যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, হতাহতের ঘটনা ঘটেছে সে জন্য আমরা গভীর শোক প্রকাশ করি। যেসব মানুষ নিহত হয়েছেন এবং যারা ভুগছেন তাদের জন্য আমাদের গভীর শোক।

তার কাছে সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারি জানতে চান- স্বৈরাচার (সাবেক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেখামাত্র গুলির নির্দেশের অধীনে কয়েক শত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ মুক্তি লাভ করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনও পরিষ্কার নয়। একটি বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ছাত্র, নেতারা, বিরোধী দলগুলো এবং সেনাবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পর্কে আপনি কি আরও কিছু জানাতে পারেন? জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, প্রথমত, গত সপ্তাহগুলোতে সহিংসতায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের সমবেদনা। আমরা এখন দৃষ্টি দিয়েছি সহিংসতা বন্ধে এবং জবাবদিহিতায় সমর্থনে। অন্তর্বর্তী সরকার হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক নীতি, আইনের শাসন ও জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী। এ পর্যায়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনি জবাবদিহিতার কথা বলেছেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে গেছেন। পশ্চিমা কোনো দেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন তিনি। তিনি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছেন। এর প্রেক্ষিতে তাকে কি যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদন  দেবে? জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, এমন কোনো আবেদনের বিষয়ে আমি অবহিত নই।

এরপর তার কাছে অন্য একজন সাংবাদিক জানতে চান, (শেখ হাসিনার) পতনের পর, আপনি এরই মধ্যে জানেন যে, বাংলাদেশে সরকারের পতনের পর ব্যাপক সহিংসতা ও বিশৃংখলা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নৃশংসতার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ কি? জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, আমি পরিষ্কার করেছি যে, সহিংসতা এবং জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছি আমরা। এই জবাবদিহিতা হওয়া উচিত বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী। স্পষ্টতই সহিংসতা এবং আইন ভঙ্গ করার জন্য যারাই দায়ী হবেন তাদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে হবে।

মিলারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, বাংলাদেশের জনগণ ফ্যাসিস্ট শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। আপনি এরই মধ্যে জানিয়েছেন তিনি পালিয়ে অন্য দেশে চলে গেছেন। জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, আমি এ কথা বলিনি। আমি বলেছি, আমরা দেখতে পেয়েছি তিনি পদত্যাগ করেছেন। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, হ্যাঁ, তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর খবর শোনা যাচ্ছে অনেক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকে ব্যাপক নৃশংসতা ঘটিয়েছেন। কিছু মানুষ বলছেন তারা প্রেসিডেন্টের কাছে যাচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের জন্য। জবাবে মিলার বলেন, কয়েক সপ্তাহে যে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার প্রেক্ষিতে বলি এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- এসব মৃত্যুর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমাদের পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকার ইস্যুতে আমি শুরুতেই পরিষ্কার করেছি যে, এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষায় জোর দিয়েছি আমরা। একই সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পথের দিকে আমাদের দৃষ্টি আছে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, আমরা চাই- বাংলাদেশি সরকারের ভবিষ্যত বাংলাদেশি জনগণের সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ম্যাথিউ মিলার বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো রিপোর্ট নেই। আমাদের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে ঘোষণা দেয়ার মতো কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।

একজন সাংবাদিক জানতে চান, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হলো রোহিঙ্গা। আপনার কি মনে হয় এসব ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বসবাসে কোনো প্রভাব পড়বে?

ম্যাথিউ মিলার বলেন, আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এসব শরণার্থীর জন্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলে এসব কর্মসূচিতে কোনো রকম প্রভাব পড়বে কিনা তাৎক্ষণিকভাবে তা বলতে পারছি না। আমি নিশ্চিতভাবে আশা করি, প্রভাব পড়বে না। আমি মনে করি এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব শরণার্থীকে সেবা দেয়া অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ। এটা করতে তাদের সঙ্গে আমরা অব্যাহতভাবে কাজ করবো।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, মার্কিন দূতাবাস কি সেখানে কাজ করছে? সেখানে কি অব্যাহতভাবে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন আছে। ম্যাথিউ মিলার বলেন, আমরা সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণায় জেনেছি পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কিভাবে পদত্যাগ করেছেন সে সম্পর্কে আমাদের কাছে আর কোনো বাড়তি তথ্য নেই। আর্থিক সাপোর্টের বিষয়ে বলি ২০২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় অর্থনীতি, উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য বিষয়ে কমপক্ষে ২১ কোটি ২০ লাখ ডলার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশকে।

প্রায় সরকারহীন দেশে আমরা উলুখাগড়ার প্রাণ, বাঁচান by সুজন সুপান্থ

ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে দেশে বড় এক পরিবর্তন আসছে। টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। গত সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ওই দিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এ তথ্য জানিয়েছেন। আমরা আমজনতা টেলিভিশনের সামনে অধীর আগ্রহে বসে এ বক্তব্য শুনেছি।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিন দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশায় অধীর আগ্রহে দেশবাসী, সেই পরিবর্তনের দেখা এখনো মেলেনি। এখন পর্যন্ত নতুন সরকার গঠিত না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শিক্ষার্থী-জনতার ভাষা বুঝতে পারেনি ক্ষমতাসীন দল। তাই সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল সরকার। এর ফল অসংখ্য ছাত্র-জনতার প্রাণহানি। যেসব প্রাণহানি এখন শুধুই সংখ্যা হয়ে আছে।

আমরা যাঁরা আমজনতা, আমরা যাঁরা একদম সাধারণ মানুষ, যাঁরা কেবল দুবেলা দুমুঠো খাবার আর নিশ্চিন্তে-নিরাপদে বেঁচে থাকার আশায় বেঁচে থাকি; এই আন্দোলন চলাকালে তাঁরা একদিকে আশায় বুক বেঁধেছিলেন, আরেক দিকে ছিলেন আতঙ্কিত। আশায় বুক বেঁধেছিলেন কারণ, দীর্ঘদিনের একচেটিয়া শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। আপামর মানুষ শান্তি ফিরে পাবে, বদল আসবে। আর আতঙ্কিত ছিলেন কারণ, এসব মানুষেরই সন্তান, ভাই, বোন ও স্বজন রাস্তায় নেমে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। আর সরকারি বাহিনীর বলপ্রয়োগে, গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁরাই। এই আতঙ্কে ঘুমাতে পারেননি অনেকেই।

কিন্তু কার্যত সরকারহীন এই দেশে একই আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটছে আমাদের মতো আমজনতার। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই দৃশ্য দেশবাসীসহ সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোও এই লুটপাটের ছবি প্রকাশ করেছে। দেশের সম্পদ এভাবে লুট করার ঘটনা কি আতঙ্কের নয়? শুধু তা–ই নয়, শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের ঘটনায় আনন্দমিছিল থেকে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি, থানা, গণমাধ্যমের কার্যালয়, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা ও পিটুনিতে পুলিশ সদস্যসহ দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আন্দোলনের আগেও মৃত্যু দেখেছে জনতা, আন্দোলনের পরে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরও রক্তে রঞ্জিত হলো নানা প্রান্ত। এসব নিহত মানুষও আমজনতা, কারও না কারও স্বজন।

বিজয় মিছিলের পরদিনও সারা দেশে ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মূল সড়ক থেকে গলি পর্যন্ত অস্ত্র হাতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ভীতি ছড়াচ্ছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গভীর রাতে অস্ত্র নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় শোডাউন চলছে। বাসাবাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে, দোকান ভেঙে জিনিসপত্র লুট করা হচ্ছে। সন্ত্রস্ত হয়ে আছে মানুষ। থানায় পুলিশ নেই, কোথাও কোনো পাহারাদার নেই। তাই কোনো দিক থেকেই প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। আগে মানুষ একচেটিয়া শাসনব্যবস্থায় জোর গলায় কোনো কথা বলতে পারেনি, এখনো পারছে না। কারণ, এ কথা শোনার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ দেশে এখনো নেই। তাহলে আমজনতা তাদের অধিকারের কথা কী সব সময় বুকে ব্যথা নিয়ে গিলে খাবে! কোনো পরিবর্তনই কী তাদের কথা বলার সুযোগ দেবে না?

সোমবার দুপুর থেকে যাঁরা নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কেন সেই দায়িত্ব পালন করছেন না, জানা নেই। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সড়কে কোনো ট্রাফিক–ব্যবস্থা ছিল না। গত সরকারের সময় মানুষ গুলির শব্দ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আন্দোলনে যোগ দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেও সেই একই অস্ত্রের ঝনঝনানি সুর বেজে যাচ্ছে। তাহলে পরিবর্তন কোথায় এল! দীর্ঘদিন পর আশার সঞ্চার হয়েও তাই হতাশ হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

যখনই ক্ষমতার পালাবদলের প্রসঙ্গ, যখনই আন্দোলন, তখনই সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। তাহলে কি এই দেশে সাধারণ মানুষ উলুখাগড়ার প্রাণ! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে আর শুধু যাবে উলুখাগড়ার প্রাণ! কিন্তু যুগে যুগে তো এই উলুখাগড়াই আন্দোলনে, গণবিস্ফোরণে সাহস জুগিয়ে গেছে। আন্দোলনের আগে ও পরে এত এত মানুষের প্রাণ গেলে, আর কারা আপনাদের পেছনে যাবে? আতঙ্কিত হয়ে থাকলে আর কি আপনাদের পেছনে সাহস জোগাতে যাবে এই উলুখাগড়া? তাই সবার আগে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। দেশের সম্পদ রক্ষা করুন, সাহস দিন, বাঁচান আমাদের মতো উলুখাগড়ার প্রাণ।

এক চতুর্থাংশ কিশোরী সঙ্গীর যৌন সহিংসতার শিকার : ডব্লিউএইচও

প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো কিশোরীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার। নতুন এক গবেষণায় এমনই তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও)। এতে বলা হয়েছে, এই ধরনের সহিংসতা কিশোরীদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে আজ মঙ্গলবার গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন এই গবেষণায় ১৫৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কয়েক হাজার কিশোরীর ওপর সমীক্ষাটি চালানো হয়। গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া কিশোরীদের ২৪ শতাংশই অন্তত একবার সঙ্গীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার সময় সহিংসতার শিকার হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর এই সহিংসতার হার ছিল ১৬ শতাংশ। এক বছরে তা বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ডা. লিনম্যারি সার্ডিনহা বলেন, অল্পবয়সী কিশোরীরা নিপীড়িত হচ্ছে এবং কারও সমর্থন পাচ্ছে না; এমন উদ্বেগের জায়গা থেকে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছি, কিশোরী মেয়েদের বিশাল একটি অংশ তাদের ২০তম জন্মদিনের আগেই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সার্ডিনহা বলেন, আমাদের যেখানে থাকার কথা ছিল, আমরা তার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছি।

২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পরিচালিত সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই গবেষণা কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। লিনম্যারি সার্ডিনহা বলেন, তখন থেকেই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এখনো আমরা সেসব যাচাইবাছাই করে দেখছি। এতে কিশোরীদের সহিংসতার শিকার হওয়ার হারে সামান্য পতন হয়েছে।

সমীক্ষায় গণনা করা সহিংসতার ঘটনাগুলোর মধ্যে লাথি মারা অথবা মারধরের পাশাপাশি ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার মতো অযাচিত যৌনতায় লিপ্ত হতে বাধ্য করার মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দেশ ও অঞ্চলের ভিত্তিতে ভাগ করা তথ্যে দেখা যায়, অঞ্চল ভেদে সহিংসতা ও নারী অধিকারের মতো বিষয়গুলোও এতে ভূমিকা রেখেছে। যেখানে মেয়ে ও নারীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং অসম উত্তরাধিকার আইন রয়েছে, সেখানে সহিংসতার উচ্চমাত্রা দেখা গেছে।

ডব্লিউএইচওর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি ওশেনিয়া অঞ্চলে। এরপরই আফ্রিকা মহাদেশের অবস্থান। পাপুয়া নিউগিনির ৪৯ শতাংশ কিশোরী ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর কাছ থেকে সহিংসতার শিকার হন। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ৪২ শতাংশ কিশোরী এমন সহিংসতার শিকার। সহিংস ঘটনা সবচেয়ে কম ঘটে ইউরোপে। সেখানে সহিংসতার হার ১০ শতাংশ।

ডব্লিউএইচওর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং গবেষণা বিভাগের পরিচালক প্যাসকেল অ্যালোটে বলেন, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বয়সে এ ধরনের সহিংসতা তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিষয়টিকে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।