Tuesday, January 13, 2026

আমরা মার্কিন নাগরিক হতে চাই না: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতারা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির জবাবে গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিবিদেরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা ‘আমেরিকান হতে চান না’। এই আর্কটিক দ্বীপের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ডবাসী নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ডবাসী পছন্দ করুক বা না করুক, যুক্তরাষ্ট্র ‘কিছু একটা করবেই’।

গত শুক্রবার রাতে গ্রিনল্যান্ড পার্লামেন্টের পাঁচটি রাজনৈতিক দলের নেতারা একজোট হয়ে এই বিবৃতি দেন। এর কিছুক্ষণ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দ্বীপটি দখল করার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডরিক নিলসেনসহ ওই নেতারা বলেন, ‘আমরা আমেরিকান হতে চাই না, আমরা ডেনিশ হতে চাই না, আমরা গ্রিনল্যান্ডবাসী হতে চাই। গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ গ্রিনল্যান্ডবাসীকেই নির্ধারণ করতে হবে।’

নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার অধিকারের ওপর জোর দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের নেতারা বলেন, ‘অন্য কোনো দেশ এতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কোনো চাপ বা দেরি না করে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ আমাদেরই ঠিক করতে হবে।’

ট্রাম্পের ‘সহজ বা কঠিন’ পথ

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, গ্রিনল্যান্ড মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা রাশিয়া বা চীনকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে দেব না। আমরা যদি ব্যবস্থা না নিই, তবে তারাই এটা করবে। তাই আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করতে যাচ্ছি, তা সে সহজ পথেই হোক বা কঠিন পথে।’

হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে দ্বীপটি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে ‘সক্রিয়ভাবে’ আলোচনা করছেন।

জনমত এবং ডেনমার্কের প্রতিক্রিয়া

২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ডের ৮৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযানের পক্ষে মত দিয়েছেন।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সম্প্রতি বলেছেন, এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের অর্থ হবে ন্যাটো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমাপ্তি। তিনি ট্রাম্পকে হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ডেনমার্কের কোনো অংশ দখল করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

জবাবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি না থাকলে ন্যাটোর অস্তিত্বই থাকত না। ন্যাটো রক্ষা করবেন নাকি গ্রিনল্যান্ড দখল করবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, ‘এটি একটি পছন্দ হতে পারে।’

ভূরাজনৈতিক পটভূমি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ট্রাম্প সেখানে যত খুশি সৈন্য পাঠাতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্প মনে করেন, কেবল চুক্তিতে কাজ হবে না। তিনি বলেন, ‘মালিকানা থাকতে হয়। আপনি মালিকানা রক্ষা করেন, লিজ নয়।’

এর আগে ট্রাম্প ২০১৯ সালেও দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে জানানো হয়েছিল, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।

ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ডের চারপাশে প্রচুর রুশ ও চীনা জাহাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে গ্রিনল্যান্ডের জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের প্রধান জেস বার্থেলসেন এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘আমরা এমন কিছু দেখি না। ট্রাম্পের কথা আমাদের বোধগম্য নয়।’

গ্রিনল্যান্ডের ওল্ড নুক
গ্রিনল্যান্ডের ওল্ড নুক। রয়টার্স ফাইল ছবি

চীনে উত্তাল হচ্ছে ভারতবিরোধিতার ঢেউ by ঝেনলিন চুই

প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা টানাপোড়েনের পর চীন ও ভারতের সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে বেড়েছে যোগাযোগ ও লেনদেন। সদিচ্ছার ইঙ্গিত হিসেবে চীনা সরকার মার্চ মাসে ভারতীয় নাগরিকদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ভিসানীতিও শিথিল করা হয়। এর ফলে ভারতীয়দের চীনে ভ্রমণ সহজ হয়েছে।

তবে এতে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু ভিডিওতে ভারতীয় পর্যটকদের নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে। যেমন সাবওয়েতে হাত দিয়ে খাবার খাওয়া বা পর্যটনস্থলে গোসল করার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

অনেক মন্তব্যে ভারতীয়দের লক্ষ্য করে বর্ণবাদী ভাষাও ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ দাবি করে, চীনে সব ভারতীয় পর্যটকের প্রবেশ বন্ধ করা উচিত। এমনকি চীনে থাকা সব ভারতীয়কে বহিষ্কারের কথাও বলা হয়।এই ভারতবিরোধী মনোভাব দ্রুত চরম আকার নেয়। হাজার হাজার মন্তব্যের ভিড়ে শান্ত ও নিরপেক্ষ মতামত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই মনোভাবের পেছনে ভারতীয়দের নিয়ে প্রচলিত নানা ধ্যানধারণা কাজ করছে। ডৌইনসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভারতীয়দের প্রায়ই অপরিচ্ছন্ন ও নৈতিকভাবে দুর্বল হিসেবে দেখানো হয়। পাশাপাশি কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে ভারতীয় অভিবাসীরা নাকি জায়গা দখল করে নিচ্ছে, এমন খবরও ছড়ানো হয়েছে। এসব খবর সত্য নয়। তবু অনেক চীনা নেটিজেন মনে করছেন, চীনও ভারতীয় অভিবাসনের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীনের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী প্রবাসী ভারতীয়ের সংখ্যা মাত্র ৮ হাজার ৪৬০। এই সংখ্যা চীনের পাশের হংকংয়ের তুলনায়ও অনেক কম, সেখানে ভারতীয় আছেন ৪৪ হাজার ১৪০ জন। জাপানে আছেন ৪৭ হাজার ৮১০ জন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৭ হাজার ১ জন।

সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে বলা হয়, বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাকি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে চীনে থেকে যাচ্ছেন, এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বাস্তবে চীন আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের জন্য বড় কোনো গন্তব্য নয়। দেশটি অভিবাসনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

তবু ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর চীন ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাওয়ায় এবং চীনা সামাজিক মাধ্যমের বদ্ধ পরিবেশের কারণে ভিন্ন তথ্য সহজে ছড়াতে পারে না। ফলে প্রচলিত ধ্যানধারণা ও ভুল তথ্য ভাঙাও কঠিন হয়ে পড়ে। এর পেছনে আরও গভীর একটি কারণ আছে। তা হলো চীনা সমাজে ভারতবিরোধী বক্তব্যের প্রতি সহনশীলতা। চীন ও ভারতের সম্পর্ক যখন উত্তপ্ত ছিল, তখন ভারতীয়দের উপহাস ও বৈষম্যের লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কিছু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ভারতকে আক্রমণ করে নিজেদের নিরাপত্তাবোধ ধরে রাখে। তারা ভারতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীনের তুলনায় দুর্বল দেশ হিসেবে দেখে।

পশ্চিমা বর্ণবাদের শিকার হিসেবে নিজেকে দেখলেও, চরম জাতীয়তাবাদীরা একইভাবে ভারতকে ব্যর্থ ও মূল্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে। পাশাপাশি চীনা সমাজের মূলধারার আলোচনায় বর্ণবাদবিরোধী শক্তিশালী ভাষ্য না থাকায়, অনলাইনে এসব বক্তব্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমতকে প্রভাবিত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব দেখা যাচ্ছে, চীনা সরকার সম্ভবত তা সমর্থন করে না। অতীতে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার সময় সরকার জাতীয়তাবাদী ভাষ্য ব্যবহার করে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল। তবে মহামারিকালীন বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর সরকার এখন দুর্বল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিয়েছে। এই লক্ষ্যেই বিদেশিদের জন্য ভিসা নীতি শিথিলসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীন ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ২ লাখ ৬৫ হাজার ভিসা ইস্যু করেছে।

এসব কূটনৈতিক উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত এখনো চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। বিশেষ করে চীনা পণ্যের বড় ক্রেতা হিসেবে ভারতের ভূমিকা এতে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই মুহূর্তে চীন ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব উসকে দিচ্ছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং এই মনোভাব অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ধারণার গণ্ডি ছাড়িয়ে চীনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকেই প্রশ্ন করার পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা সত্ত্বেও চীন এখনো মহামারির পরের মন্দা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ বেকারত্ব মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অনাস্থা বাড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাস্তবে অস্তিত্বহীন ‘ভারতীয়দের গণ অভিবাসন’কে সীমিত চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেহেতু ভিসা দিচ্ছে সরকার, তাই এই আলোচনায় চীনা সরকারকেই মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, কম জন্মহারের কারণে যে শ্রমিক–সংকট তৈরি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে সরকার ভারতীয় অভিবাসী আনতে চাইছে।

আগস্ট মাসে চীনা সরকার তরুণ বিদেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিভাদের জন্য যে কে ভিসা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, সেটিকেও একটি কাঠামোগত ফাঁক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এর ফলে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় চীনে ঢুকে পড়বে। এমনকি চীনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এবং চীনা অভিবাসন কর্মকর্তারা নাকি ভারতীয় গুপ্তচর, এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বও ছড়ানো হয়েছে।

এই ভিত্তিহীন অভিযোগগুলো আসলে একটি সামষ্টিক সামাজিক উদ্বেগের প্রতিফলন। এই উদ্বেগ কমানোর কার্যকর উপায় না থাকায় জনমত অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এর ফলে কিছু ‘অপছন্দের গোষ্ঠী’কে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে কল্পনা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই ভারতীয়রা জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে উঠেছে।

নিঃসন্দেহে জাতীয়তাবাদী ভাষ্যের প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। এটি সরকারের ক্ষমতা সংহত করার একটি হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সরকার যখন ক্রমেই উগ্র হয়ে ওঠা এই মনোভাবকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়, তখন জাতীয়তাবাদই উল্টো বিপদ ডেকে আনতে পারে।

* ঝেনলিন চুই, লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো
- দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-09%2Facdf789e-bb50-4f8c-a0cf-f774e8424616%2FIndia_1.webp?rect=50%2C0%2C450%2C300&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘হলুদ লাইন’ যেভাবে গাজার জনজীবনে চাপ বাড়াচ্ছে

গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি সেনাদের নতুন লাইন নির্দেশকারী হলুদ রঙের কংক্রিট ব্লকের কয়েক মিটার দূরে চার সন্তানের পিতা জায়েদ মোহাম্মদ তার পরিবারসহ ছোট একটি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। এই হলুদ লাইন হলো সেই সীমারেখা যেখানে ইসরাইলি সেনাদের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া গাজা শান্তি চুক্তির প্রথম ধাপে সরতে হয়েছিল। ইসরাইলি সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী, লাইনটি গাজার পূর্বসীমা থেকে ১.৫ কিমি থেকে ৬.৫ কিমি  ভেতরে বিস্তৃত এবং আনুমানিক ৫৮ শতাংশ এলাকা জুড়ে। এই লাইন গাজাকে দুই অংশে ভাগ করেছে। পূর্বাঞ্চল- ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিমাঞ্চল। সেখানে ফিলিস্তিনিরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। তবে তারা ক্রমাগত বিমান হামলা ও জোরপূর্বক স্থানান্তরের হুমকির মুখোমুখি। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ লিখেছেন, জায়েদের ত্রাণ শিবির ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে মাটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, গাজায় ৬ কোটি টনের বেশি ধ্বংসাবশেষ সরাতে সাত বছরেরও বেশি সময় লাগবে। ইসরাইলের দুই বছরেরও বেশি গণহত্যার যুদ্ধ গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন বেশির ভাগ মানুষ তীব্র ঝড়, বিমান হামলা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য।

জায়েদ আল-জাজিরাকে বলেন, শেলিং এবং গুলির আওয়াজ সারাক্ষণ শোনা যায়। তিনি পূর্ব দিগন্তের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এখান থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে ইসরাইলি সৈন্যরা অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে আমরা দেখছি বুলডোজার বাড়ি ধ্বংস করছে বা ফসলের জমি সমতল করছে। এক দু’ধাপও এগোনো বিপজ্জনক।
হলুদ লাইনের কাছে বসবাসকারীরা বলেন, তারা প্রায়ই গোলাগুলি বা ছোট বিস্ফোরণের শব্দে জাগেন। জায়েদ বলেন, রাতে পুরোপুরি অন্ধকারে থাকেন তারা। কারণ বিদ্যুৎ নেই। তবে সৈন্যরা ফ্লেয়ার ব্যবহার করে আকাশ কিছু সময়ের জন্য আলোকিত করে।

জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলি জানিয়েছে, এই শত্রু এলাকা যুদ্ধের সময় বারবার প্রসারিত, স্থানান্তরিত ও সংকুচিত হয়েছে। ফলে এটি কার্যত অভ্যন্তরীণ সীমারেখার মতো কাজ করছে। ডিসেম্বরে গাজার সফরে ইসরাইলি সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির স্পষ্টভাবে বলেছেন, হলুদ লাইন হলো একটি নতুন সীমারেখা। এই লাইন প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যার মধ্যে দক্ষিণের রাফাহ এবং উত্তরের বেইত হানুন শহর অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধের সময় ইসরাইলি জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে হলুদ লাইন তৈরি হয়েছে। অনেক সময় স্থানান্তরের নোটিশ দেয়া হতো পত্রিকা, ফোন মেসেজ বা অনলাইন মানচিত্রে, তখনই বোমা বিস্ফোরণ চলছিল। ফলে ফিলিস্তিনিদের নিরাপদে চলে যাওয়ার সময় খুব কম থাকতো।

জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধের বিভিন্ন সময়ে গাজার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকা জোরপূর্বক ত্যাগ বা নিরাপদ নয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। হলুদ লাইন হল গাজার পরিবর্তনশীল সামরিক এলাকা। মানচিত্রে এগুলো স্থানান্তরিত, সম্প্রসারিত বা অদৃশ্য হলেও নাগরিকদের জন্য সব সময় উপস্থিত। এই লাইন নির্ধারণ করে- কোন রাস্তা নিরাপদ, কোন বাড়ি খালি, কখন পালাতে হবে। অনেক জায়গায় দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। ফিলিস্তিনিরা নির্ভর করে অনুভুতি, শব্দ ও স্মৃতির ওপর। একদিন নিরাপদ মনে হওয়া এলাকা পরের রাতেই বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। পরিবার দ্রুতই প্যাক করে চলে যায়, অনেক সময় বাড়ি খালি থাকে, যদিও স্থাপনাটি এখনও আছে। অধিকাংশ মানুষ অন্তত একবার, অনেকে একাধিকবার স্থানান্তরিত হয়েছেন। এভাবে থাকা মানসিক চাপ বাড়ায়। 

mzamin

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় ভেঙে যাবে ন্যাটো by মুজতবা রহমান

২০২৫ সালজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ঘিরে ইউরোপীয় নেতাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের নিরাপত্তাকাঠামো, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ন্যাটোর সঙ্গে যুক্ত রাখা। তাঁরা চেয়েছিলেন ওয়াশিংটন যেন হঠাৎ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে না নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ২০২৬ সালে সেই লক্ষ্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের আশঙ্কা, হোয়াইট হাউস ধীরে ধীরে সেদিকেই এগোচ্ছে।

ইউরোপের চোখে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিছক মিত্ররাষ্ট্র নয়, বরং একটি শিকারি শক্তি। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যাদের অনেক ইউরোপীয় নেতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বদলে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ খুঁজছে।

তবু ইউরোপ এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো ইউরোপ এখনো নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সামরিক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। এই সময় পর্যন্ত ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখতে ইউরোপকে মার্কিন অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সহায়তা ও কৌশলগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতেই হবে। একইভাবে রাশিয়াকে চাপে রাখতে ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা থেকেও যাবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের এই দুর্বলতা দেখছে এবং তা কাজে লাগাচ্ছে।

গত বছর তারা ইউরোপকে চাপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নিতে বাধ্য করেছিল, যাতে ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ না করা হয় এবং ইউক্রেন ও ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে যাওয়ার ঝুঁকি না বাড়ে। এবারও একই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনো ইউরোপের বন্ধু—এই ধারণা ভেঙে পড়বে।

ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আর্কটিকে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা, চীনের নতুন সামরিক সক্ষমতা সীমিত করা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার, যুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো। তাঁরা মনে করেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড এসব নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে যথেষ্ট কার্যকর নয়।

অবশ্য ডেনমার্কের যুক্তি অনুযায়ী, তারা ছোট দেশ হলেও ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ ব্যয় করেছে এবং আর্কটিকে নজরদারি, জাহাজ, ড্রোন ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর ভূখণ্ডের অংশ; তাই সেখানে সার্বভৌমত্ব নিয়ে চাপ তৈরি হলে শুধু কোপেনহেগেন নয়, পুরো জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। এ কারণেই অনেক ইউরোপীয় রাজধানীতে বিষয়টি ‘সীমান্ত বদলের রাজনীতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউরোপীয় নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব: দ্বীপটিতে আরও মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনে আপত্তি নেই, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেই নিশ্চিত, আর ১৯৫১ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে উল্লেখযোগ্য সামরিক প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। অর্থনৈতিক আগ্রহ থাকলে দ্বীপটির খনিজ ও বিরল খনিজ সম্পদ আহরণও ইতিমধ্যে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত।

এই কারণেই ইউরোপ আশঙ্কা করছে, আসল লক্ষ্য নিরাপত্তা নয়, বরং ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের ৫৭ হাজার বাসিন্দাকে প্রভাবিত করা হতে পারে, এমনকি একটি গণভোটের মাধ্যমেও।

এভাবে যুক্তরাষ্ট্র এগোলে ইউরোপের হাতে কার্যকর বিকল্প সীমিত। তারা ‘ইউরোপীয় ন্যাটো’ গড়ার কথা ভাবতে পারে, চীনের সঙ্গে ঝুঁকি কমানোর নীতি ধীর করে নতুন সমীকরণ খুঁজতে পারে বা সবচেয়ে বাস্তবসম্মতভাবে কোপেনহেগেনকে চাপ দিতে পারে যেন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়।

ডেনমার্ক ইতিমধ্যে কৌশল বদলেছে। প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, ন্যাটোর কোনো সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা থেমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ডলার দিয়ে হলেও গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তা ইউরোপের জন্য চরম অপমান হবে—জোটের শেষ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি।

* মুজতবা রহমান, ইউরেশিয়া গ্রুপের ইউরোপ অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক
- টাইম ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের বিক্ষোভ
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে চাওয়ার বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন দিকে by আসিম সাজ্জাদ আখতার

প্রায় আট দশক আগে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে জন্ম নিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। এত দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও দক্ষিণ এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা আজও এক কঠিন ও জরুরি কাজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দুই দেশের জনগণ এখনো ঘৃণা, সন্দেহ ও সামরিক উন্মাদনায় বন্দী—যেন একে অপরের রক্ত দেখেই তারা আশ্বস্ত হতে চায়।

এ বছরের ১৪-১৫ আগস্টে যখন দুই দেশ স্বাধীনতা উদ্‌যাপন করেছে, তখনো মে মাসের সীমান্ত সংঘর্ষের তীব্রতা কাটেনি। দুই পাশ থেকেই ‘আমরাই জিতব’ ধরনের বিদ্রূপাত্মক স্লোগান উঠেছে। যদিও অনেকেই ঘৃণার এই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তবু ভারত ও পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই জানে না যে তাদের ইতিহাস এক ছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎও আসলে একসঙ্গে গড়া যেতে পারে।

রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের নতুন ঢেউয়ের মুখে আমি এখানে দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাব্য কিছু ভবিষ্যৎ চিত্র তুলে ধরতে চাই। শুধু ভারত ও পাকিস্তান মিলিয়েই এখানে প্রায় ১৭০ কোটি মানুষ বাস করে। যদি বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালকেও ধরা হয়, তাহলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০০ কোটিতে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হচ্ছে—আমরা এখন যে অবস্থায় আছি, সেটাই আরও গভীরভাবে ও কঠিনভাবে টিকে থাকবে। হিন্দুত্ববাদ, উগ্র ইসলামবাদ আর বিদেশিবিদ্বেষী জাতীয়তাবাদের নানা রূপ তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি প্রভাবিত করবে।

ভারতের ক্ষেত্রে এর মানে হবে—বিজেপি, আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) প্রভাব সমাজে আরও শক্তিশালী হবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর মানে হবে—সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা আরও পোক্ত হবে, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো সেনাবাহিনীর ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, আর ধর্মীয় ডানপন্থী শক্তিগুলো রাস্তায় নেমে বড় আন্দোলন গড়ে তোলার সামর্থ্য অর্জন করবে। কিন্তু আমাদের এই বিপজ্জনক বাস্তবতাকে কখনোই স্থায়ী ধরে নেওয়া উচিত নয়।

দুই দেশেই রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চল বহুদিন ধরে নিপীড়নের শিকার, সেখানে এগুলো বাড়বে। ‘সন্ত্রাস দমন’-এর নামে রাষ্ট্র আরও ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করবে। এর ফলে ঘৃণা, ভয় ও বিভাজনের রাজনীতি সমাজের একমাত্র চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে। সেখানে শান্তি, সহাবস্থান কিংবা মানবিক সংলাপের কোনো জায়গা থাকবে না।

তবু এই ‘অধঃপতনের দৌড়’-এর গতি কিছু সময়ের জন্য থামাতে পারে যদি উদার বা মাঝারি ধারার রাজনীতি কিছুটা পুনরুজ্জীবিত হয়।

ভারতে এর অর্থ হতে পারে কংগ্রেস ও তার সহযোগী কয়েকটি ছোট দল ক্ষমতায় ফিরে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের কিছু দিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। পাকিস্তানে এর মানে হতে পারে বর্তমান ‘হাইব্রিড শাসনব্যবস্থার’ (অর্থাৎ সেনা ও বেসামরিক প্রশাসনের মিশ্র রূপ) বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক গণ-আন্দোলন দেখা দিতে পারে।

তবে এই উদার কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা গুরুতর। তারা প্রচলিত উন্নয়ন মডেল—যা জমি কেড়ে নেওয়া, পরিবেশ ধ্বংস ও অন্ধ ভোগবাদে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে—তার কোনো বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি দিতে চায় না। ফলে এই মধ্যপন্থী প্রতিরোধও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে। এর ফলে প্রতিক্রিয়াশীল, সামরিকবাদী ও অতি-ডানপন্থী শক্তিগুলো আরও গভীরভাবে রাষ্ট্রের ভেতরে শিকড় গাড়বে।

সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত কিন্তু একমাত্র টেকসই ভবিষ্যৎ হতে পারে—জনগণনির্ভর ঐক্যের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি ও যৌথ সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা। এটা তখনই সম্ভব, যখন শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী প্রগতিশীল শক্তিগুলো একসঙ্গে আসবে। কাজটি সহজ নয়, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার বাম ও প্রগতিশীল রাজনীতি এখন প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় আছে। তবু আমাদের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। স্থবির বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ না করে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখতে হবে।

এই নতুন রাজনীতির জন্য বামপন্থী ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলোর (যারা শ্রেণিসংগ্রাম ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতি করে) দরকার জাতিগত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা গড়ে তোলা। না হলে এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি তৈরি হবে না, যা অতি ডানপন্থা ও উদার কেন্দ্র—দুয়েরই আধিপত্য ভাঙতে পারে।

ভারতে হিন্দিভাষী উত্তর ভারতের রাজনৈতিক প্রাধান্য ভাঙতে হবে। কাশ্মীরি, নাগা, আদিবাসী ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর ঐতিহাসিক নিপীড়ন স্বীকার করতে হবে এবং দক্ষিণ ভারতের প্রগতিশীল নেতাদের জন্য আরও জায়গা তৈরি করতে হবে।

পাকিস্তানে বালুচ, পশতুন, গিলগিট-বালটিস্তানি, কাশ্মীরি, সিন্ধি ও সিরাইকি জনগণের জাতীয় প্রশ্নগুলোকে শ্রেণিনির্ভর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সবশেষে দরকার একটি আঞ্চলিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ—লাদাখ থেকে বালটিস্তান, দুই কাশ্মীর থেকে সিন্ধু ও রাজস্থান, দুই পাঞ্জাব থেকে ডুরান্ড রেখার দুই পাশের পশতুন, এমনকি সবচেয়ে নিপীড়িত বালুচ ও নাগাদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন হিসেবে দেখা হবে।

শুধু এই মানবিক ঐক্যই পারে সাম্রাজ্যবাদের সব রূপকে ইতিহাসের আবর্জনার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলতে।

* আসিম সাজ্জাদ আখতার, কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
- ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

স্বাধীনতার আট দশক পরেও ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি
স্বাধীনতার আট দশক পরেও ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ভারতবিরোধী ‘রেটরিক’ নয়, চাই জাতীয় সক্ষমতা by মাহা মির্জা

নির্বাচনী জোট আর ভারতবিরোধী রাজনীতির ডামাডোলে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ইস্যু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। গত ২৭ ডিসেম্বর দেশের সুতা মিলের মালিকেরা জরুরি মিটিং ডেকেছিলেন। তাঁরা সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন দেশের সুতা মিলগুলোকে ভারতীয় আমদানির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

আমাদের পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশের বেশি সুতা আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এর মানে কি এই যে আমাদের সুতা নেই, ভারতের সুতাই ভরসা? মোটেও তা নয়। আমাদের শিল্প অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৫০০ সুতা কারখানা আছে। অথচ ভারতীয় সস্তা সুতা আমদানিতে দেশের সুতা কারখানাগুলো ধ্বংসের পথে। গত অর্থবছরে ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ!

ভারতের সুতা আমাদের দেশীয় কারখানার সুতার চেয়ে সস্তা। কেজিতে ২ দশমিক ৭ ডলার। এদিকে লোকাল সুতা কেজিতে ৩ ডলার। যখন ‘ইনসেনটিভ’ ছিল, দামের পার্থক্য ছিল মাত্র ৫ সেন্ট। এখন পার্থক্য ৩০ সেন্ট। খুব স্বাভাবিকভাবেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা খরচ বাঁচাতে ‘ঢাকা’র সুতা বাদ দিয়ে ‘দিল্লি’র সুতাই কিনছেন। বিটিএমএ বলছে, এক বছরে বন্ধ হয়েছে ৫০টির বেশি সুতা কারখানা। চাকরি হারিয়েছেন দেড়-দুই লাখ শ্রমিক। অর্থাৎ ভারতীয় সস্তা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারছে না দেশের সুতা মিল।

এখন যদি প্রশ্ন করি, দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচ বেশি কেন? ভারতের খরচ কম কেন? আমরা অদক্ষ, অপদার্থ, আর ভারত দক্ষ, তাই? তা এই দক্ষতা, এই ‘এফিশিয়েন্সি’ কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি তৈরি করতে হয়? ভারতের আছে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, বিনিয়োগ আর ভর্তুকির ধারাবাহিক ইতিহাস। ভারতের সুতা মিলগুলো ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পায়, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে তহবিল পায়। কিন্তু ভারতীয় সুতার হাত থেকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বাঁচাতে কী করেছে আমাদের ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ সরকার?

আগে স্থানীয় সুতা উৎপাদনে নগদ প্রণোদনা ছিল ৫ শতাংশ। সেটা কমিয়ে করা হলো ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বভাবতই উৎপাদন খরচ বাড়ল, দামও বাড়ল। গার্মেন্টসের মালিক বেশি দামের দেশি সুতা কিনবে কেন? গার্মেন্টসওয়ালাদের ‘ভারতীয় দালাল’ বলে গালি দিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু গার্মেন্টসের মালিক দিন শেষে ব্যবসায়ী, সস্তা ভারতীয় সুতাটাই সে কিনবে।

‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি করার দায়িত্ব পোশাকশিল্পের মালিকের নয়। যে তরুণ শাহবাগে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, এটা তার কাজও না। এটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের কাজ। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে সরকারি ‘ইন্টারভেনশনে’। অথচ কী ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক, একদিকে ইন্টেরিম আমলেই ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২ বিলিয়ন ডলারের সুতা আর অন্যদিকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ স্থানীয় সুতার স্টক অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে! বিটিএমএ বলছে, সুতা মিলগুলো বাঁচাতে আমদানি করা সুতায় অন্তত ৩০ সেন্ট শুল্ক বসাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সাড়াশব্দ নেই।

অর্থাৎ একদিকে আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাই, আরেক দিকে হাজার হাজার কোটি টাকার দেশীয় সুতার স্টক ফেলে ভারতীয় সুতা আমদানি করি। এটা কি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, নাকি নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা তৈরিতে চরম ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা? শুধু সুতাশিল্প নয়, আরও বহু শিল্পের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।

বিয়ের মৌসুমে ঢাকা না দিল্লি?

দেশে এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। প্রতিদিন শত শত বিয়ে হচ্ছে শুধু রাজধানীতেই। খোঁজ নিন, বিয়েবাড়ির লোকেরা কোন দেশের শাড়ি বা লেহেঙ্গা বা কুর্তা পরছে? ঢাকার না দিল্লির? এখানে ঢাকা ঢাকা স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। মিরপুর বেনারসিপল্লিতে গিয়ে খোঁজ নিলেই ঢাকাই শাড়ির করুণ অবস্থাটা টের পাওয়া যায়।

বেনারসিপল্লি করাই হয়েছিল দেশীয় তাঁতিদের সুরক্ষা দিতে। অথচ ঢাকার এই পল্লির ৬০ শতাংশ শাড়ি আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ ঢাকাই তাঁতিদের প্রাণকেন্দ্রেই ঢাকাই কাতানের বদলে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় কাঞ্জিভরম, ভারতীয় বেনারসি। ধনীরা যেমন কিনছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরাও কিনছে। মূল কারণ ওই একটাই, ভারতীয় শাড়ির উৎপাদন খরচ কম। দামও কম। কিন্তু ভারতীয় সুতা ও শাড়ির উৎপাদন খরচ কি এমনি এমনি কমেছে, নাকি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক পলিসির কারণে কমেছে?

ভারত নিজেদের ‘হ্যান্ডলুম’ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে। আর আমরা কী করেছি? ১০ লাখ কারিগরের রুটিরুজির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। দেশের মার্কেট ছেয়ে গেছে ভারতীয় শাড়িতে। কয়েক দশকের সুনিপুণ কারুকার্যের দক্ষতা নিয়ে ৭ লাখ তাঁতি কাজ হারিয়েছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ অটোরিকশা কিনেছেন।

আরও পরিহাসের বিষয় হলো অটোরিকশার পার্টসগুলো পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে! ইঞ্জিন, বিয়ারিং, শকার, জয়েন্ট—সবই আসছে ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ এবং লুম্যাক্স থেকে। স্থানীয় মেকানিকরা কম দামি ভারতীয় যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না। এখানেও সেই একই কারণ। ভারতে অটোরিকশাশিল্পের বিকাশই হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণোদনায় (ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বাহনের প্রসার ঘটাতে)। এদিকে আমরা লাখে লাখে ভারতীয় পার্টস আমদানি করছি ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র মানুষ অটোরিকশা কিনে রাস্তায় নামলে বুলডোজার চালাচ্ছি!

দেশের পাটকল বন্ধ, ভারতে পাটশিল্পের বিকাশ

আমাদের কাঁচা পাটের বৃহত্তম বাজার ভারত। ভারত পাটশিল্পের এমন প্রসার ঘটিয়েছে যে নিজেরা উৎপাদক হলেও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট কিনছে। অথচ এই দেশের পাটচাষিদের কষ্টে ফলানো পাট এই দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগার কথা ছিল না? আমরা ভুলিনি, আমাদের একশ্রেণির মিডিয়া, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী ভর্তুকির ধুয়া তুলে রাষ্ট্রীয় ২৬টি কারখানা বন্ধ করার পক্ষে জনমত তৈরি করেছিলেন। অথচ এখন খুলনা, যশোর ও ডেমরার বৃহত্তম পাটকলগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে কাঁচা পাট বিক্রির জন্য সেই ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে ভারত এ দেশের কাঁচা পাট কিনে নিজেদের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে, ‘ভ্যালু এডিশনে’ বিনিয়োগ করেছে, সরকারি করপোরেশনগুলোয় দেশীয় পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে এবং পাশাপাশি ‘হাই-এন্ড’ পাটপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, এগুলো বিচ্ছিন্ন পলিসি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা নেহরুর আমল থেকেই প্রতিটি ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোয় ৫০ বছরে কোনো নতুন বিনিয়োগ হয়নি। অথচ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা ছিল কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন। পাট, চিনি, ডেইরি, পোলট্রি, ফিশারি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ। কিন্তু আমরা আমাদের সচল কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সের দরে বেচে দিয়েছি (ঘুরে আসুন, খালিশপুর, প্লাটিনাম ও ক্রিসেন্ট জুটমিল)।

একদিকে আমাদের লাখ লাখ চাকরির গল্প শোনানো হয়েছে; অন্যদিকে আমাদের মাটি, পানি, জলবায়ু ও স্থানীয় দক্ষতায় তৈরি হওয়া লাখো শ্রমিকের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, সক্ষমতাসহ এমন কিছু ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ১০০ লোকের কাজ তৈরি করার সক্ষমতা নেই। ফল—ধসে পড়েছে দক্ষিণের গোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায়?

ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাইলে লাখো শ্রমিকের পাটকল, চিনিকল বাঁচানোর আন্দোলন করা দরকার ছিল না? স্কপ ও বিজিএমসি থেকে ক্রমাগত সুপারিশ গেছে, মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি বিনিয়োগ করুন, প্রযুক্তি ‘আপগ্রেড’ করুন, সেকিং/হেসিয়ান তাঁতের বদলে আধুনিক তাঁত বসান, স্পিনিং-ব্যাচিং বিভাগে আধুনিক যন্ত্র বসান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান, পাট ক্রয়ে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কমান; মোটকথা সংস্কার করুন।

রাষ্ট্র বিনিয়োগ না করলে ‘মডার্ন’ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ায় না—এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়? যারা মনে করে বাজার একটি অরাজনৈতিক ‘ম্যাজিক’, ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে ছেড়ে দিলে এমনি এমনিই ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়ে যায়, তারা কি ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া বা ভারতের শিল্পায়নের ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখবেন?

ভর্তুকির দোহাই তুলে ভারতের হাতে চলে গেল বাংলাদেশের কাঁচা পাট। অথচ সেই ভারতের পাটকল, কাগজকল, টেক্সটাইলশিল্প, ওষুধশিল্প, জাহাজশিল্প, ইস্পাতশিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল, সার কারখানা, বিমান, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি—এই সবকিছুর পেছনেই আছে দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ভর্তুকির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মার্কিন মুলুকে একটিও ফুড চেইন, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বা ব্যাংক-বিমা নেই, যারা ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়নি। ওয়াল-মার্ট, জেপি মরগান, ফেডেক্স, নাইকি, নেস্‌লে, আইবিএম, ইন্টেল, ম্যাকডোনাল্ডস, পিৎজা হাট, কেএফসি, বার্গার কিং, ডোমিনোস পিৎজা—কে পায় না ফেডারেল সরকারের ভর্তুকি?

এই যে আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে অ্যামাজন আসবে, অ্যাপল আসবে, ডেল-এইচপি-স্যামসাং-লেনোভা-গুগল আসবে। একটু গুগল করেই দেখুন না, এই কোম্পানিগুলো ঠিক কী পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়? বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কিনবে বাংলাদেশ, তো বোয়িং বা এয়ারবাস কি এমনি এমনি লাভ করে? নাকি এদের টিকে থাকার পেছনে আছে বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ভর্তুকি? জেনারেল মোটর, ফোর্ড কিংবা বিএমডব্লিউ তাদের ‘এসেম্বলি লাইন’ বসাতে ভর্তুকি পায় না? বৈদ্যুতিক গাড়িকে উৎসাহিত করতে টেসলাকে ভর্তুকি দেওয়া হয়নি (টেসলা তো স্বীকারও করে যে ফেডারেল ভর্তুকি ছাড়া টেসলার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতো না)?

ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো পাবলিকের ট্যাক্সের টাকাতেই শিল্পায়ন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে টানা ভর্তুকি দিয়েছে, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ দিয়েছে, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি খাতে বাজেট বাড়িয়েছে, ‘কৌশলগত’ খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত কৌশলগত শিল্পগুলোকে গড়ে তোলা, টেনে তোলা বা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এসব ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাবৎ শিল্পোন্নত দেশের ইতিহাস ‘ফ্রি মার্কেটের’ অরাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিনিয়োগের রাজনৈতিক ইতিহাস।

অন্যদিকে আমরা আধিপত্য মোকাবিলার কথা বলে বাজার ছেড়ে দিয়েছি তথাকথিত ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে। ভারতীয় হোক, চীনা হোক আর মার্কিন হোক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া শক্তিশালী আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করা কি সম্ভব? ভারতের বাজার, ভারতের কাঁচামাল আর ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানো সম্ভব?

আমাদের হাজার কোটি টাকার সুতার মজুত পড়ে থাকবে আর আমরা পোশাকশিল্পের সুতা আনব ভারত থেকে? আমাদের চিনিকলগুলো বন্ধ থাকবে, আর আমাদের রিফাইনারিগুলো কাঁচা চিনি আনবে ভারত থেকে? আমাদের বেনারসিপল্লি চলবে ভারতের বেনারসি দিয়ে, অটোরিকশার পার্টস আর ট্রাক্টর আসবে ভারত থেকে, আমাদের ৮০ শতাংশ পাটের বীজ আসবে ভারত থেকে, আমরা স্বনির্ভর হওয়ার পথে একটা আলাপও দেব না; কিন্তু মুখে মুখে শুধু ভারতবিরোধিতা করব?

আমাদের লাখো শ্রমিক দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে লড়াই করেছেন, কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, জেলে গেছেন, কিন্তু সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে আমরা ভুলেও শরিক হইনি। দেশের সুতা মিল বাঁচাতে টুঁ শব্দ করিনি, অথচ এখন ভারতনির্ভর একটা অর্থনীতি জিইয়ে রেখে শুধু স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে আমরা ভারতকে ঠেকাব?

‘ঢাকা না দিল্লি’ একটি শক্তিশালী স্লোগান। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ সময় ধরে এই স্লোগান আমরা দিয়েছি। আমরা বরাবর বলেছি, ভারতের সঙ্গে হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিএসএফের সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, জ্বালানি খাতে আদানির আধিপত্যবাদী চুক্তি, তিস্তার পানির বণ্টন, অন্যায্য ট্রানজিট চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভারতের নিম্নমানের কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করা—এসব অন্যায্য বন্দোবস্ত মোকাবিলা করতে হলে অর্থনীতির একটা স্বনির্ভর ভিত্তি লাগে। জাতীয় সক্ষমতা লাগে। ভারতনির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি লাগে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে মুখে ‘ঢাকা ঢাকা’ বললে জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি হয়, আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায় না।

* মাহা মির্জা, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কুকিদের অশান্তিময় এক বছর ও ইতিহাসের নতুন অধ্যায় by আলতাফ পারভেজ

প্রকাশ ২৭ এপ্রিল ২০২৪ঃ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হিন্দিভাষী, বাংলাভাষী এবং বার্মিজদের ত্রিমুখী সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখে থাকা কুকি–চিন–মিজো–বমদের বঞ্চনা ও অধিকারের পাশাপাশি তিনটি দেশে তাদের সশস্ত্র তৎপরতা ও এর প্রভাব নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

‘কুকিদের’ সম্পর্কে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ সামান্যই অবহিত ছিল। এর মধ্যে পরপর চারটি ঘটনা ঘটল। প্রায় এক বছর আগে মণিপুরে মেইতেই-কুকি সংঘাত বাধল। একই সময়ে মিয়ানমারের চিন প্রদেশে বেগবান হলো বামারদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিরোধযুদ্ধ। পরপরই বান্দরবানে কুকিরা নজর কাড়ল কিছু দাবিদাওয়া তুলে ধরে।

মণিপুর, চিন, বান্দরবানের ঘটনাবলির খবরাখবর গেল মিজোরামে। সব সহজাতির সঙ্গে সংহতি দেখিয়ে সেখানেও কিছু মিটিং-মিছিল হলো। এভাবেই গত এক বছরে কুকি-দুনিয়া বিশেষ মনোযোগ পেল অকুকিদের। সেই সূত্রেই অনেকের আগ্রহ এখন জাতিসত্তাটি নিয়ে। তবে এই আগ্রহের আগে-পরে কুকি অঞ্চলগুলোতে সহিংসতাও চলেছে। যুগের পর যুগ আশপাশের সংখ্যাগুরুর সাংস্কৃতিক দাপট ও নানানমুখী চাপে কুকি সমাজ ক্লান্ত ও বিপন্ন।

বুক চিতিয়ে না দাঁড়ালে কোনো সংখ্যাগুরু কোনো দিন তাঁদের কথা শোনেননি। ফিরেও তাকাননি। আবার সশস্ত্রতা এবং সন্ত্রাসও তাঁদের শান্তি ও স্বস্তির অতীত ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পাশাপাশি কল্পনার স্বাধীন ভূমি ‘জালেন-গামে’র কথাও ভুলতে পারে না তাদের ইতিহাস।

মূলত তাঁরা ‘জো’ এবং শান্তিতে নেই

‘কুকি’ শব্দের সঙ্গে চলে আসে ‘চিন’ শব্দ। ‘চিন’ কুকি পরিবারের আরেক ট্রাইবমণ্ডলী। একই পরিবারের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় মিজো, বম, খিয়াং, লুসাইদেরও। সবাই তাঁরা বৃহত্তর ‘জো’ জাতির মানুষ। যেহেতু এসব জাতিসত্তার মানুষ দু-তিনটি রাষ্ট্রের সীমানায় বহু রাজ্যে বিভক্ত এবং এ রকম সব রাষ্ট্রে তাঁদের অবস্থান বেশ প্রান্তিক, সে কারণে তাঁদের সঠিক সংখ্যা বলতে পারে না কেউ।

কেবল অনুমান করা হয়, সবচেয়ে বেশি জো আছে মিজোরামে। ১০ লাখ অধিবাসীর রাজ্যটিতে জোরা হবে ৮ লাখ। ৩৬ লাখ মানুষের মণিপুরে ১৫-২০ শতাংশ হলো জো। রাজধানী ইম্ফলে তাঁদের সংখ্যা ৬-৭ শতাংশ ছিল। এখন অনেকটাই নেই।

■ কুকি-চিন-বম-মিজোরা দু-তিনটি রাষ্ট্রের সীমানায় বহু রাজ্যে বিভক্ত এবং এ রকম সব রাষ্ট্রে তাঁদের অবস্থান বেশ প্রান্তিক।

■ মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘাতের মধ্যেই বান্দরবানের জো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অশান্তি ও অস্থিরতা শুরু হয়।

■ জোরা এখন মিজোরাম ও বান্দরবানের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে চাইছেন। বিষয়টি কোনো কোনো দেশের জন্য অস্বস্তিকর।

চিন প্রদেশে জো আছেন চার-পাঁচ লাখ। সেখানে তাঁরাই সংখ্যায় বেশি। তবে প্রায় ৫০টি ট্রাইবে বিভক্ত। নাগাল্যান্ড ও বান্দরবানেও জোরা আছেন যথাক্রমে ৩০ ও ১৫ হাজারের মতো। ফলে অনুমাননির্ভর হিসাব বলে, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মিলে জো জাতির মানুষ আছেন আনুমানিক ২০ লাখ।

এর মধ্যে আবার কুকি-চিন-মিজো সমাজের ছোট একটি অংশ নিজেদের ‘বেনে মেনাশে’ নামে ইহুদি ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া একটি গোত্র হিসেবেও মনে করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে কীভাবে তারা এল, এ নিয়ে নানা মত আছে। এ রকম দাবিদার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ আছেন মণিপুরে। যাঁদের অনেকে অবশ্য মেইতেইয়ের তাড়া খেয়ে এখন মিজোরামে শরণার্থী। ছোট এই ট্রাইবসহ গত এক বছরে মণিপুর থেকে চিন-বান্দরবান—সর্বত্র জোরা অশান্তিময় এক জীবনে আছে।

যে আগুন থামেনি এক বছরেও

সমকালীন ইতিহাসে জো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আঘাতে এসেছে মণিপুরে। এক বছর ধরে সেখানে সহিংসতা চলছে। রাজ্যের বড় জাতি মেইতেইদের ‘শিডিউল ট্রাইব’ সুবিধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে আয়োজিত কুকি সমাবেশ থেকে ওই সংঘাতের শুরু।

প্রথম দিকে ক্ষয়ক্ষতি সমানে সমান হলেও ক্রমে ‘দাঙ্গা’ একপক্ষীয় চেহারা নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। কুকিদের ইম্ফল থেকে এখন অনেকটাই সরে যেতে হয়েছে। জোদের ক্ষোভের আগুন সেখানে এত বিস্তৃত যে ভারতের চলতি জাতীয় নির্বাচনও বর্জন করেছে তারা।

মণিপুরে লোকসভার দুটি আসন। ‘আউটার মণিপুরের’ আসনটিতে সচরাচর কুকিরা দাঁড়ান এবং জেতেন। এটা ‘শিডিউল ট্রাইবদের’ জন্য সংরক্ষিত। কুকিরা নির্বাচনে না থাকায় হয়তো কোনো নাগা এই আসনে জিতে আসবেন, যাঁরা এ মুহূর্তে কুকিদের আরেক জাতিগত প্রতিপক্ষ।

রাজনৈতিক বিবেচনায় মণিপুরজুড়ে কুকিদের এখন চূড়ান্ত প্রান্তিক অবস্থা। কেউ যেন তাদের কথা শোনার জায়গায় নেই। বিশেষ করে রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলে। বিধানসভার কুকি এমএলএরাও সেখানে যান না বা যেতে পারেন না। ৬০ সদস্যবিশিষ্ট বিধানসভায় কুকি প্রতিনিধিদের মধ্যে যাঁরা বিজেপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরাও ইম্ফলে নিরাপত্তাসংকটে ভোগেন।

রাজধানীতে অভিগম্যতা না থাকায় কুকিরা বিচারব্যবস্থার সুবিধা থেকেও বঞ্চিতও হচ্ছেন। এ অবস্থায় রাজ্যের এখনকার ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার থেকে ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার কেটে তাঁদের জন্য আলাদা রাজ্য চাইছেন কুকিরা। এই দাবিতে যুক্ত হয়েছেন রাজ্য মন্ত্রিসভার দুই কুকি সদস্যও। বলা বাহুল্য, মেইতেইরা তার বিরুদ্ধে। কুকিদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসে’র অভিযোগ আছে তাঁদেরও।

অস্থিরতার ঢেউ বান্দরবানেও

মণিপুরে কুকি-মেইতেই সংঘাতের মধ্যেই বান্দরবানের জো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অশান্তি ও অস্থিরতা শুরু হয়। যার একরকম পরিণতি হিসেবে সর্বশেষ এপ্রিলে একদিকে ‘ব্যাংক ডাকাতি’, অন্যদিকে অনেক মানুষ গ্রেপ্তার হলেন। দ্য নিউএজ ৯ এপ্রিল বিভিন্ন প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে ৫৪ ব্যক্তির আটকের খবর দিয়েছিল। যাঁদের মধ্যে ১৮ জন জো নারীও আছেন। নিরাপত্তা প্রশ্নে নারীদের আটকের ঘটনা এদিকে অতীতে কমই ঘটেছে। ব্যাংক ডাকাতির মতো ত্রাসও বিরল।

বান্দরবানের চলতি অবস্থার শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না। বমদের অনেক গ্রাম এখন মানুষশূন্য। কোথায় চলে গেলেন এসব মানুষ, তার কোনো হদিসও পাওয়া গেল না সংবাদমাধ্যমে। কেবল বলা হচ্ছে, সেখানে জনজীবন আগের মতো স্বাভাবিক নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও খারাপ।

এর মধ্যে স্থানীয় ত্রিপুরারা জানাচ্ছেন, কুকি-চিন বলে অনেক ত্রিপুরাকেও আটক করা হয়েছে। সত্য হলে, এসব নিশ্চয়ই পাহাড়ি সমাজে জটিলতা বাড়াচ্ছে। বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত সংঘাতের ইতিহাস একধরনের অন্ধকারাচ্ছন্ন একমুখী সড়কের মতো। সংখ্যাগুরু সমাজের আন্তরিক ও সুচিন্তিত চেষ্টা ছাড়া যার নিদান নেই।

স্বায়ত্তশাসনচর্চায় ‘চিনল্যান্ড’

মণিপুর ও বান্দরবানের তুলনায় চিন প্রদেশের জোরা ভিন্ন ধাঁচের এক সময় পার করছে। পাহাড়ি প্রদেশটির কুকি-চিনরা বহুকাল প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করছে। দেশটির প্রধান জাতিসত্তা বামারদের সঙ্গে পেরে উঠছিল না তারা। ২০২১ থেকে যখন গণতন্ত্রের প্রশ্নে মিয়ানমারে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সুযোগ নেয় কুকি-চিনদের বড় একাংশ। চিন প্রদেশের অনেকখানি মুক্তাঞ্চলও বানিয়েছে তারা।

ভারত সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো অনেকটাই এখন সশস্ত্র চিনদের দখলে। সংবিধান, প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষাব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে নিজেদের ভাবনাচিন্তায়। চিন প্রদেশ এভাবে দ্রুত ‘চিনল্যান্ড’ হয়ে যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে ‘চিনল্যান্ডে’র প্রথম রাজনৈতিক সম্মেলন হলো ঐতিহাসিক শহর ক্যাম্প ভিক্টোরিয়ায়।

মিয়ানমারে জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ (এনইউজি)–এর নেতারাও বেশির ভাগ চিনল্যান্ডে থাকেন এখন। চিনল্যান্ড ন্যাশনাল ফ্রন্ট (চিএনএফ) এবং এনইউজি রীতিমতো চুক্তি করে রাজনৈতিক সম্পর্ক পাতিয়েছে।

সংখ্যাগুরু জাতির সঙ্গে সংখ্যালঘু জাতির প্রতিনিধিদের এ রকম চুক্তি এ অঞ্চলে এই প্রথম। এতে তাঁরা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের সংগ্রাম বিজয়ী হলে চিন-বামার ওই চুক্তির চূড়ান্ত সুফল দেখা যাবে। চিনের রাজনীতিবিদ এল এইচ সেখং এনইউজির হয়ে পুরো মিয়ানমারের জন্য নতুন সংবিধান লিখছেন।

চিনে জো জাতির ভেতর বেশ কটি উপশাখা রয়েছে। ৪০টির মতো ভাষায় কথা বলেন এখানকার পাহাড়ের মানুষ। স্থানীয় নানান বিষয়ে এদের দ্বন্দ্ব-বিবাদও আছে এবং সব জো চিনল্যান্ড কাউন্সিলে যুক্তও হননি। কিন্তু এই মুহূর্তে সাধারণভাবে তাঁরা সবাই বেশ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছেন।

এই জোরা এখন মিজোরাম ও বান্দরবানের সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে চাইছেন। বিষয়টি আশপাশের কোনো কোনো দেশের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ, চিন-মিজোরাম-বান্দরবানজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের ভিন্ন রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় তাৎপর্যও আছে। অর্থনীতি যে অনেক সময় রাজনীতি ও ধর্মকেও তার বিকাশে সঙ্গে নেয়, সেটি অসত্য নয়।

জোদের নেতৃত্বে মিজোরাম

চিএনএফ এবং মিজোরামের এমএনএফ (মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট) হলো পুরো কুকি জগতের দুটি প্রধান জাতীয়তাবাদী সংগঠন। মণিপুরের কুকিদেরও একটি সশস্ত্র সংগঠন আছে কেএনও বা কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন নামে। চিএনএফ ও কেএনও গঠিত হয়েছিল একই বছর, ১৯৮৮ সালে।

চিএনএফ এখনো প্রবলভাবে সশস্ত্র ধরনের হলেও মিজোদের এমএনএফ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে চলে এসেছে। মণিপুর দাঙ্গার পর কেএনও কর্মীরা আবারও অস্ত্র ব্যবহার করছেন বলে খবর আছে। দাঙ্গার আগপর্যন্ত তাঁরা ভারত সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে ছিল।

সীমান্তের ওদিকের এ রকম অস্থিরতার মধ্যেই পার্শ্ববর্তী বান্দরবানে একই রকম আরেক সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা উঠেছে। জো জগতের আলোচ্য চারটি সংগঠনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেই বিতর্ক এ মুহূর্তে যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, ততটাই আড়ালে পড়ে আছে, কী ধরনের আর্থসামাজিক পরিবেশে বিভিন্ন দেশে বিভক্ত হয়ে থাকা জো সমাজে সশস্ত্রতার ব্যাপারগুলো দানা বাঁধল।

দেশি-বিদেশি গবেষকদের সূত্রে দেখা যায়, একদা জো সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা এবং প্রান্তিকতার আরেক পার্শ্বফল হিসেবে খ্রিষ্টধর্মের বিকাশ শুরু হয়েছিল।

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থীদের সঙ্গে পশ্চিমের নাগরিক সমাজের যোগাযোগ মূলত চিনল্যান্ড ও মিজোরামের যাজকদের মাধ্যমে। তবে জো বা কুকিদের সমস্যা ‘খ্রিষ্টত্ব বনাম হিন্দুত্ব’র কিংবা ‘খ্রিষ্টত্ব বনাম বৌদ্ধধর্মীয়’ সমস্যা নয়। এ হলো যার যার জনপদে প্রত্যাশিত প্রশাসনিক অংশীদারত্বের ঘাটতি ও দারিদ্র্যজনিত সমস্যা।

ধর্ম ও স্বায়ত্তশাসন বিতর্ক

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি জো সমাজকে বেশ কটি দেশে বিভক্ত করে যে ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়ে গেছে, তার মৃদু কিছু ক্ষতিপূরণ হতে পারত এলাকার প্রশাসনে এসব মানুষের কার্যকর সামাজিক-অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটলে। আইজল, ইম্ফল কিংবা ক্যাম্প ভিক্টোরিয়া—সর্বত্র জো নেতাদের ও রকম মত। সেটি হয়তো ধীরে ধীরে হবে।

তবে প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুর শাসনতান্ত্রিক অধিকারের দাবি সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে অতি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ। বরং আঞ্চলিক অনেক শক্তি এ রকমও ভাবে, কুকি অঞ্চলে ‘ভারসাম্য’ আনতে অন্যান্য ধর্মের প্রভাব বাড়াতে হবে। এই সূত্রেই একদা মণিপুরে মেইতেইদের সঙ্গে আরএসএসের মৈত্রী বেড়েছিল। আবার কুকিদের কেএনও’ও সেখানে একদা বিজেপিকেই রাজনৈতিক সমর্থন দেয়। এই সবই ‘স্বার্থের সম্পর্ক’ এবং প্রতিনিয়ত তার ধরন বদলাচ্ছে সীমান্তের এদিকে-ওদিকে।

মণিপুরে আরএসএসের মনোযোগ বাড়ার একটা ফল হলো ২০১২ সালেও যে মণিপুরে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কোনো আসন পায়নি, তারাই পরের নির্বাচনে ২১টি আসন পায় এবং ক্রমে এখন সেখানে সরকার চালাচ্ছে।

অপর দিকে একই সময়ে ৬০ আসনের বিধানসভায় কংগ্রেসের শক্তি কমতে কমতে ৪২ থেকে ৫–এ এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আরএসএস মণিপুরে হিন্দু মেইতেইদের প্রতি বেশি পক্ষপাত দেখাতে গিয়ে পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ইতিমধ্যে এবং এভাবে পুরো কুকি জগতেও প্রবল ঝাঁকুনি তৈরি হয়েছে।

সব মিলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হিন্দিভাষী, বাংলাভাষী এবং বার্মিজদের ত্রিমুখী সংখ্যাগরিষ্ঠতার মুখে থাকা কুকি-চিন-মিজো-বমদের শান্তি ও স্বস্তির নিরিবিলি পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়া আগামী দিনে কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অনেক অনিশ্চয়তা।

তবে এর মধ্যে মণিপুরে শান্তি ফেরাতে কুকিদের এলাকায় তাদের দাবিমতো যদি নতুন একটা ‘রাজ্য’ হয়, তাহলে চিন ও মিজোরামের পাশাপাশি জোদের তৃতীয় আরেক ঠিকানা হবে। এ ঘটনার আঞ্চলিক তাৎপর্যও থাকবে অবশ্যই। অনেকেই একে জো সাহিত্য-সংস্কৃতির অধরা ‘জালেন-গাম’ ধারণা দিয়েও ব্যাখ্যা করতে চাইবেন।

গত ১২ মাসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুকি-বিশ্ব প্রকৃতই ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করল। দেখার ব্যাপার, অশান্তির সময় পেরিয়ে সামনে তারা ঐক্য ও অর্জনের পরিসর বাড়াতে পারে কি না?

আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিষয়ক গবেষক

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-04%2F8d6bea44-53d8-4770-b664-577d9948ad3d%2FCHT.jpg?rect=155%2C0%2C891%2C594&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

গাজায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হবে পাকিস্তানের জন্য ভয়াবহ by মালিহা লোধি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অধীন গঠিত ইন্টারন্যাশনাল স্টেবেলাইজিং ফোর্সেস (আইএফএফ) সেনা পাঠানো নিয়ে পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন ও সংশয় ক্রমে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী একজন মার্কিন জেনারেল এই বহুজাতিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন। এটা ট্রাকের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু হামাস যদি সম্মতি না দেয়, তাহলে এতে যুক্ত দেশগুলো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, তারা এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকেও এটা জানানো হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। গত মাসে পাকিস্তানে উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, আইএসএফে অবদান রাখতে পাকিস্তান ‘নিশ্চিতভাবেই প্রস্তুত’, তবে হামাসকে নিরস্ত্র করা ‘আমাদের কাজ নয়’।

কয়েক মাস ধরে আইএসএফের ম্যান্ডেট, কাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আইএসএফের অংশ হওয়ার প্রস্তাবের জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বাহিনীর ম্যান্ডেট, কমান্ড কাঠামো ও অর্থায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে এর আগে আইএসএফে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও পরে একাধিক মুসলিম রাষ্ট্র সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় এখনো কোনো দেশই সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ১৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড দোহায় একটি সম্মেলনের আয়োজন করে, যেখানে পাকিস্তানও অংশ নেয়। সেখানে আইএসএফ মোতায়েনসহ ট্রাম্পের পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আলোচনা এবং বাহিনীর ম্যান্ডেট বিষয়ে ঐকমত্য গঠনের চেষ্টা করা হয়। তবে ওই বৈঠকে ম্যান্ডেট নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এর অর্থ হলো, গাজায় সেনা পাঠানোর ব্যাপারে মুসলিম দেশগুলোর সংশয় এখনো কাটেনি। বিশেষ করে আইএসএফের এখতিয়ারে যদি হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধী গোষ্ঠীকে জোরপূর্বক নিরস্ত্র করার বিষয়টি থাকে, তাহলে দেশগুলো বহুজাতিক এই বাহিনীতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আইএসএফে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ করা উচিত কি না, সেটি বিবেচনার জন্য সবার আগে গাজায় বর্তমানে কী পরিস্থিতি চলছে এবং ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে, সেটি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপটি বেশ কিছু কঠিন বাধার মুখে পড়েছে। বলা চলে এর অগ্রগতি থমকে পড়েছে।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে গাজার জন্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, ইসরায়েলি বাহিনীর আরও প্রত্যাহার, হামাসকে নিরস্ত্র করা ও আইএসএফ মোতায়েন। তবে গাজার অন্তর্বর্তীকালীন শাসন তদারকির দায়িত্বে ট্রাম্পের নেতৃত্বে যে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। একইভাবে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য যে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের কথা, সেই কমিটির সদস্যদের নামও প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, এসব শিগগিরই করা হবে; কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে পরিকল্পনা নিয়ে অস্পষ্টতা ও ঐকমত্যের ঘাটতি রয়েছে।

গাজায় একটি দুর্বল অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়েছে। প্রতিদিনই ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করছে। সেই সঙ্গে পশ্চিম তীরে সামরিক কর্মকাণ্ডের মধে৵ নতুন বসতি গড়ে তুলছে। অক্টোবরে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার বলছেন, শান্তি পরিকল্পনা মেনে তারা গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করবে না। সে ক্ষেত্রে হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে না। সম্প্রতি এক হামাস কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা অচলাবস্থায়, আইএসএফের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি। হামাসের সমর্থন ছাড়া গাজায় আইএসএফ মোতায়েন কার্যকর হবে না।

পাকিস্তানে আইএসএফের অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে যাবে। যদি আইএসএফের দায়িত্ব হয় হামাসকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাহলে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। তা না হলে পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি হামাস বা অন্যান্য প্রতিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করার দাবিও বিশ্বাসযোগ্য হবে না। পাকিস্তানি সেনারা যদি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তার পরিণতি নৈতিক এবং জনমত প্রতিক্রিয়া—দুই ক্ষেত্রেই ভয়াবহ হবে।

* মালিহা লোধি, পাকিস্তানের একজন সাবেক কূটনীতিক
- দ্য ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ট্রাম্প গাজায় যে বাহিনী পাঠাতে চান, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাকিস্তান
ট্রাম্প গাজায় যে বাহিনী পাঠাতে চান, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাকিস্তান। ছবি: পাকিস্তান সরকারের এক্স

ইরানিরা কি আসলেই ‘রাজার শাসনে’ ফিরতে চায় by তামারা কিবলাভি

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ৪০ বছরের শাসনের পতন ঘটে। তখন তাঁর বড় ছেলে রেজা পাহলভির বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। তেলসমৃদ্ধ হাজার বছরের পুরোনো সেই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম সারিতে। নিজের ‘জন্মগত অধিকার’ হারানোর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ৬৫ বছর বয়সে এসে পাহলভির অপেক্ষার প্রহর হয়তো শেষ হতে চলেছে।

‘এটিই শেষ লড়াই। পাহলভি ফিরবেন!’—গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান স্লোগান ছিল এটি। নির্বাসিত সাবেক ক্রাউন প্রিন্স (যুবরাজ) তাঁর স্বদেশবাসীকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানানোর পর এই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয়। বিক্ষোভকারীদের অনেকে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘জাভিদ...শাহ’ (রাজা জিন্দাবাদ)! এবং ‘রেজা শাহ, আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তি দিন!’

বৃহস্পতির এই বিক্ষোভ ছিল মূলত কয়েক দিনের লাগাতার আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। এটি তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় দেশটিতে অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদে শুরু হলেও দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাহলভি নিজেকে এই আন্দোলনের ডিফ্যাক্টো লিডার বা ‘কার্যত নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।

ইরানে ক্ষমতাচ্যুত রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানানো একটি ‘ট্যাবু’ এবং ফৌজদারি অপরাধ। তাছাড়া যে সমাজ একসময় শাহের একনায়কতন্ত্রকে হঠাতে গণ-অভ্যুত্থান করেছিল, সেখানে এ ধরনের রাজকীয় মনোভাবকে দীর্ঘকাল ধরেই বাঁকা চোখে দেখা হতো।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাসিত এই রাজপরিবার এবং এর প্রধানকে ঘিরে নতুন করে কেন এই উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও অস্পষ্ট। ইরানিরা কি আসলেই রাজতন্ত্রের পুনর্বহাল চায়, নাকি তারা কেবল বর্তমান দমনমূলক থিওক্র্যাসি (ধর্মতন্ত্র) থেকে মুক্তি পেতে চায়?

‘রেজা পাহলভি নিঃসন্দেহে তাঁর প্রভাব বৃদ্ধি করেছেন এবং নিজেকে বিরোধী রাজনীতির সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন।’—বলেছেন আরশ আজিজি, যিনি ‘হোয়াট ইরানিয়ান্স ওয়ান্ট’ বইয়ের লেখক। তিনি আরও যোগ করেন, ‘তবে তাঁর (পাহলভি) অনেক সমস্যাও রয়েছে। তিনি সমাজে বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার মতো নেতা নন।’

ইসলামিক রিপাবলিক দশকের পর দশক ধরে ইরানের ভেতরের বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করে রেখেছে, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্টদেরও কারাগারে পাঠিয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নির্বাচিত সরকারের ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতা সীমিত করে রেখেছেন এবং নিজেকে এই শাসনের অভিভাবক মনে করেন, যা যেকোনো চ্যালেঞ্জকে কঠোরভাবে দমন করে।

দেশের ভেতরের বিরোধীদের এই দশা বাইরের বিরোধীদের শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে বিশাল ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে পাহলভির মতো ব্যক্তিত্বরা আড়াল থেকে সামনে উঠে এসেছেন।

২০২০ সালে তেহরান থেকে ইউক্রেনগামী একটি যাত্রীবাহী বিমান ভুলবশত ইরান গুলি করে ভূপাতিত করার পর পাহলভি প্রথম আলোচনায় আসেন। সেই ঘটনা দেশের বাইরের বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি কাউন্সিল গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেখানে পাহলভি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সদস্য।

বিরোধীদের সেই জোড়াতালির কাউন্সিলটি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দ্রুতই ভেঙে যায়। তবে পাহলভি বিরোধী শিবিরের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হিসেবে টিকে থাকেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই জোটটি ইরানিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে (বিশেষ করে গত জুনে দুই দেশের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর)।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন, তা হয়তো ইরানের বিরোধীদেরও আশাবাদী করেছে যে খুব দ্রুত বর্তমান শাসনের পতন ঘটবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফুটেজে দেখা গেছে, একজন বিক্ষোভকারী একটি রাস্তার নাম বদলে ‘ট্রাম্প স্ট্রিট’ রেখেছেন।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই আশা হয়তো বাড়াবাড়ি। আজিজি মনে করেন, ট্রাম্প ‘বিকল্পগুলো বিবেচনা করছেন কিন্তু কেউ নিজেকে জয়ী হিসেবে প্রমাণ করার আগে তাঁকে বৈধতা দেওয়ার কোনো ইচ্ছা ট্রাম্পের নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাহলভির ব্যক্তিগত গুণাবলি ট্রাম্পের পছন্দ হওয়ার মতো নয়। তিনি বইপত্র নিয়ে থাকা মানুষ, ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণ করার মতো সহজাত ক্যারিশমা তাঁর নেই। ট্রাম্পকে তুষ্ট করা তাঁর জন্য কঠিন হবে।’

পাহলভি সরাসরি লড়াইয়ে নামার বিষয়ে এখনও অস্পষ্ট। তিনি জানিয়েছেন, যদি এই বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনকে হঠাতে সফল হয়, তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক। গত এক দশকে এটি পঞ্চম বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। তবে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে এবং সমালোচকেরা বলছেন, তাঁর অভিজ্ঞতাহীনতা দ্রুতই তাঁর বিরুদ্ধে যেতে পারে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ ওয়ালি নাসর বলেন, ‘তিনি (পাহলভি) অন্তর্বর্তীকালীন নেতা এবং অন্তর্বর্তী পরিষদের কথা বলেন, কিন্তু সেই সরকারে কারা থাকবে, কারা নির্বাচনে দাঁড়াবে, প্রার্থী কারা—এসবের কোনো উত্তর নেই। ভিড় দেখে শাহের যুগে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবা এক জিনিস, কিন্তু বাস্তবে তিনি তা কীভাবে করবেন?’

বিশ্লেষকদের মতে, পাহলভিকে ঘিরে এই ঐক্যবদ্ধ হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক একটি কানাগলিতে এসে ঠেকেছে। দুর্নীতি ও বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি ধসে পড়েছে এবং বেশ কিছু সংস্কারবাদী সরকার চেষ্টা করেও দেশটিকে একঘরে দশা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।

ইরানের তরুণ সমাজ রক্ষণশীল শাসন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবে হাঁপিয়ে উঠেছে। আর সরকার যদি আগের মতো এবারও সহিংসভাবে বিদ্রোহ দমনে নামে, তবে তারা ট্রাম্পের রোষানলে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

ওয়ালি নাসর বলেন, ‘ইরানিরা পাহলভিকে বেছে নিচ্ছে কারণ তারা বর্তমান অবস্থা নিয়ে হতাশ, পাহলভি তাদের মাঝে খুব জনপ্রিয় বলে নয়।’

পাহলভি ইসলামিক রিপাবলিক পূর্ববর্তী যুগের সেই নস্টালজিয়াকে কাজে লাগাচ্ছেন। এ সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, ‘অনেক বয়স্ক ইরানি আজও আমার জন্মের সেই দিনটির কথা মনে করেন, যখন দেশজুড়ে উন্মাদনা ছিল। এখন ৬৫ বছর বয়সে… তরুণ ইরানিরা আমাকে বাবা বলে ডাকে। আর এটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

* তামারা কিবলাভি, সিএনএন-এর লন্ডন ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
- সিএনএন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব

শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলা থেকে আর তেল ও অর্থ পাবে না কিউবা, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

দীর্ঘদিনের শত্রু কিউবার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটিতে আর কোনো জ্বালানি তেল বা অর্থ যাবে না। তিনি বড় ধরনের সংকট এড়াতে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে দ্রুত ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে ট্রাম্পের এই হুমকির মুখে নতি স্বীকার না করে কঠোর জবাব দিয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল।

গতকাল রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প কিউবাকে কড়া বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘কিউবায় আর কোনো তেল বা টাকা যাবে না—একদমই না। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমি তাদের একটি চুক্তিতে আসার পরামর্শ দিচ্ছি।’

ট্রাম্প আরও বলেন, কিউবা বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেল ও অর্থের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিল। এর বিনিময়ে দেশটি ভেনেজুয়েলার ‘স্বৈরশাসকদের’ নিরাপত্তা দিয়ে আসছিল। তবে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো আটক হওয়ার পর থেকে দেশটিতে কিউবার তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, ‘কিউবা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা কী করব না করব, তা কেউ বলে দিতে পারে না। ৬৬ বছর ধরে কিউবা মার্কিন আক্রমণের শিকার হয়েছে। কিউবা কাউকে হুমকি দেয় না, তবে মাতৃভূমি রক্ষায় শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়তে প্রস্তুত।’

একই সুরে কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজও। তিনি বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশের কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির অধিকার কিউবার আছে এবং কোনো সামরিক চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।

ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আসা বন্ধ হওয়ায় কিউবায় বর্তমানে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। রাজধানী হাভানাসহ পুরো দেশ দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকছে। খাবার, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে গত কয়েক বছরে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন।

হাভানার বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী মারিয়া এলেনা সাবিনা আক্ষেপ করে বলেন, এখানে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, কিছুই নেই। জীবন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন দ্রুত একটা পরিবর্তন দরকার।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কিউবাকে কোণঠাসা করাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলার সমর্থন হারানোয় কিউবা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বলছে, কিউবার অর্থনীতি চরম চাপের মধ্যে থাকলেও দেশটির সরকার এখনই ভেঙে পড়বে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

বর্তমানে মেক্সিকো কিউবাকে সামান্য তেল সরবরাহ করলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগণ্য। ফলে ট্রাম্পের এই নতুন অর্থনৈতিক অবরোধ কিউবাকে এক নজিরবিহীন মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-12%2F35ymgavf%2FCuba.jpg?rect=0%2C5%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল ও অর্থপ্রবাহ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। গত রোববার কিউবার রাজধানী হাভানার একটি দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স


ইরানে বিক্ষোভে যে ‘ফাঁদে’ পড়েছে ইসরায়েল by মাহদি মোতলাঘ

পশ্চিমাদের চোখে ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ইসরায়েলি গোয়েন্দা মহলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো গভীরভাবে পড়লে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। ইরানের অভ্যন্তরে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার এখনই পতনের দিকেও যাচ্ছে না।

এই মাঝামাঝি অবস্থা তেহরানকে একটি নিরাপত্তা ধূসর বা ‘গ্রে সিকিউরিটি’ অঞ্চলে নিয়ে পরিণত করেছে। এর ফলে ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের হিসাবি দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সেই দ্বিধাই ইরানের জন্য পরিণত হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে। সেই সম্পদ হলো সময়।

ইরানের রাজপথের অস্থিরতা কেন শাসকের সময়কেন্দ্রিক রাজনীতির পক্ষে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে তেল আবিবের দৃষ্টিকোণ থেকে হুমকির যুক্তি নতুন করে পড়তে হবে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ২০২৫ সালে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ইরান যেন আগের অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি, কারণ এতে ইরান চুক্তিহীন অবস্থার ছায়া এবং কম নজরদারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে।

প্রচলিত সামরিক যুক্তি অনুযায়ী, এমন হুমকির জবাব হওয়া উচিত আগাম হামলা অথবা অন্তত সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ, যাতে প্রতিপক্ষ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে ইনস্টিটিউটটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে ইরানের শাসনব্যবস্থার বৈধতা কমে গেলেও ক্ষমতাকাঠামো এখনো অটুট রয়েছে।

ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তেহরানের রাজপথের বাস্তবতা বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, অসন্তোষ থাকলেও এসব বিক্ষোভের এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব নেই এবং তাৎক্ষণিকভাবে সরকার উৎখাত করার সক্ষমতাও তৈরি হয়নি।

আট বছরব্যাপী ইরান–ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বড় ধরনের বিদেশি হামলা জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে পারে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সতর্ক করে বলেছে, একটি সামরিক হামলা বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে। বিভাজন আরও গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন যেকোনো ভিন্নমতকে চিহ্নিত করে দমন করার অজুহাত পাবে।

ফলে তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এক জটিল কৌশলগত সংকটে পড়েছেন। তারা যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আবার আক্রমণ না করলে ইরান এই অবকাশকে ব্যবহার করে নিজেকে পুনর্গঠনের সময় পায়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৌশলের ভেতরে কেবল টিকে থাকার চেয়েও শক্তিশালী একটি গোপন লক্ষ্য লুকিয়ে আছে। নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিশৃঙ্খলা বজায় রেখে তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজের কাঁধ থেকে তেল আবিবের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ সতর্ক ও উদ্যোগী অবস্থানে, এখন তারা কৌশলগত বিভ্রান্তিতে নেমে এসেছে। এই বিভ্রান্তি শুধু ইসরায়েলি হামলা বিলম্বিত করছে না, বরং তেহরানের জন্য হামলার উদ্যোগ নেওয়ার একটি সুযোগও খুলে দিচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য নিয়মিতভাবে মোসাদের ষড়যন্ত্রকে দায়ী করছে। এর একটি দ্বিমুখী কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। দেশের ভেতরে এটি বিক্ষোভকে অবৈধ প্রমাণ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগাম বা পাল্টা হামলার জন্য একধরনের বয়ানগত বৈধতা তৈরি করে। অস্থিরতাকে বাইরের আগ্রাসনের ফল হিসেবে তুলে ধরে তেহরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি বা পরোক্ষ আঘাতকে জাতীয় আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে।

আইএনএসএসের নথিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে একসঙ্গে চুক্তি আর সামরিক হুমকির কৌশল নিতে হবে। কিন্তু ইরানের ভেতরের অস্থিরতার কারণে এটা বাস্তবে করা কঠিন। কোনো দেশ যখন দীর্ঘদিন এমন অবস্থায় থাকে, যা দেশকে ভেঙে পড়তে দেয় না, আবার পুরোপুরি স্থিরও হতে দেয় না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো শক্তিগুলো হামলায় যেতে চায় না। তারা অপেক্ষা করে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার জন্য। এই অপেক্ষার অবস্থাটাই তেহরানের জন্য সবচেয়ে লাভজনক।

আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আইএনএসএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে অসম পুনর্গঠনের কৌশলের ওপর ভর করে এগোচ্ছে। প্রক্সি শক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায়, তেহরান এখন ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের সংখ্যা এবং পারমাণবিক সীমারেখা বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

কম তীব্রতার বিক্ষোভ গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা নজরদারিকে রাস্তায় ব্যস্ত রাখে, আর সেই আড়ালে ইরানি প্রযুক্তিবিদেরা সরবরাহ লাইন মেরামত করেন এবং সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যান। ইরান ও রাশিয়ার পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ইরান এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্ত করছে, যা সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সম্ভব হতো না।

তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে তৈরি কৌশলগত নথিগুলো পর্যালোচনা করলে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সমীকরণে সময় তৈরি করে দেওয়ার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল ইরানের সক্ষমতা ক্ষয় করতে চায়, কিন্তু সামরিক পদক্ষেপের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি নিয়ে তারা শঙ্কিত।

বিষয়টি বুঝে তেহরান এই ধূসর পরিসরকে শুধু পুনর্গঠনের জন্য নয়, বরং সংঘাতের মনস্তাত্ত্বিক গতি উল্টে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করছে। এ কারণে বিক্ষোভ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধকে নিশ্চিত ঘটনা থেকে সরিয়ে এমন এক অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ সম্ভব হলেও ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি খুব বেশি।

* মাহদি মোতলাঘ, নীতি বিশ্লেষক ও গবেষক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

তেহরানের রাজপথের বাস্তবতা বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে
তেহরানের রাজপথের বাস্তবতা বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। গ্রাফিক্স: এআই/প্রথম আলো

দলের পদ গেলেও এলাকার মানুষ আমাকে ছেড়ে যায় নাই: রুমিন ফারহানা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির বহিষ্কৃত আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘আমার দলের পদ চলে গেলেও আমার এলাকার মানুষ তো আমাকে ছেড়ে চলে যায় নাই।’

আজ সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শাখাইতি গ্রামে এক উঠান বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাকে যখন দল মনোনয়ন দেয়নি, তখন অনেকেই আমাকে বলেছেন, আপনি তো সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে পারতেন, আপনি তো উচ্চকক্ষেও যেতে পারতেন। আপনি কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হইলেন? দল যদি ক্ষমতায় যায়, আপনার তো অনেক ভালো অবস্থা হইতে পারত। এসব ছেড়ে কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন? আমি বললাম, এলাকার মানুষের কষ্ট, পরিশ্রম, তাঁদের অর্থ ব্যয়, তাঁদের ভালোবাসা ও আমার প্রতি তাঁদের বিশ্বাস আমাকে আজকে এত দূর নিয়ে আসছে।’

বিএনপি থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে দল নেই বলে আমি আমার মানুষদের ফালাই দিয়ে চলে যাব—আমি সেইটা করব না। এই কারণেই দলে আমার পদ গেছে। আমি বলেছি, পদ গেছে ঠিক আছে, আমার মানুষ তো আছে। দল যদি জোটকেও দেয়, আমার মানুষের ভালোবাসা তো আমাকে ঘিরে রাখছে। সুতরাং আপনারা যতক্ষণ আমার পাশে আছেন, পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই ইনশা আল্লাহ আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে সরাই দেয়। আমার লক্ষ্য হচ্ছে, অবহেলিত সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটিকে মডেল উপজেলা করা।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘আপনাদের বাপ-দাদাদের ভোটে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমার বাবা (ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এই আসন থেকে জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবাকে কাজ করতে দেওয়া হয় নাই। আমার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি বিজয়ী হয়ে আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-12%2Ffbeu5apm%2FWhatsApp-Image-2026-01-12-at-8.43.39-PM.jpeg?rect=108%2C0%2C900%2C600&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
উঠান বৈঠকে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ সোমবার বিকেলে সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের শাখাইতি গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো